Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:

    ((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))

    “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    «أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»

    “আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:

    «عليك بتقوى الله ما استطعت»

    “তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:

    «فاتقوا الله ولو بشق تمرة»

    “একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।

    তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))

    “আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))

    “যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))

    “মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:

    ((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))

    “মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))

    “পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]

    এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))

    “যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))

    “এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:

    ((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))

    “হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]

  • রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন। 

    “হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩) 

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ

    রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি? 

    আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত। 

    এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।

    আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    “আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)

    وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ

    আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

    মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। 

    ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: 

    “আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩) 

    وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ

    “আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ

    “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮) 

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ

      “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)

    حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ

    আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।

  • রমজান এর শিক্ষা

    রমজান এর শিক্ষা

    সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্‌কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:

    রমজান – রহমতের মাস:

    এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।

    রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।

    সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর  মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।

    সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।

    জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।

    রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।

    ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্‌ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।

    এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।

    রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:

    রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।

    এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।

    রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্‌কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।

    তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।

    তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্‌র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্‌ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্‌কে রাগান্বিত করে।

    আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্‌ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।

    এখানে আল্লাহ্‌ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।

    উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্‌ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্‌ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”

    আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।

    তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্‌ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)

    এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)

    অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।

    এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্‌ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।

    তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।

    আর আল্লাহ্‌কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্‌র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।

    বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।

    রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।

    রমজান – কোরআনের মাস:

    একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।

    আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?

    আল্লাহ্‌ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্‌র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।

    এখানে আল্লাহ্‌ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্‌ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?

    বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।

    যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্‌ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্‌ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”

    আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”

    একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”

    তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।

    রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)

    আল্লাহ্‌ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।

    সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্‌র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।

    অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।

    যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।

    বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।

    রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:

    আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।

    রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।

    কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্‌র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।

    আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।

    তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্‌ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্‌ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।

    রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)

    আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্‌র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্‌ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্‌র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।

    পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)

    অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্‌র ক্ষমা পাওয়া যায় না।

    রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:

    পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।

    রমজান এর পর কী হবে?

    প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।

    রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্‌র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্‌র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্‌র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।



    আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
    ২৫শে শাবান, ১৪৩৩
    ১৪ই জুলাই, ২০১২ 

  • খলীফার প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী বা ডেপুটি (মু’ওয়ায়ীন আত তাফউয়ীদ)

    খলীফার প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী বা ডেপুটি (মু’ওয়ায়ীন আত তাফউয়ীদ)

    সহকারীরা হলেন ওয়াযির (মন্ত্রী) যাদেরকে খলীফা খিলাফতের দায়িত্ব পালনে তাকে সহযোগিতা করার জন্য নিযুক্ত করে থাকেন। খিলাফত রাষ্ট্রের অসংখ্য কাজ রয়েছে; বিশেষ করে তখন যখন রাষ্ট্রের সীমানা ক্রমান্বয়ে বড় হচ্ছে এবং তা সম্প্রসারিত হচ্ছে। এমতাবস্থায় খলীফার একার পক্ষে খিলাফতের গুরুদায়িত্ব পালন করা খুবই কষ্টসাধ্য। এ কারণেই তার ভার বহন করা এবং তার দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করার জন্য সহকারীর প্রয়োজন।

    তবে, কোন সীমাবদ্ধতা ছাড়া তাদের ওয়াযির (মন্ত্রী) বলা যুক্তিসঙ্গত হবে না। অন্যথায় ইসলামে ওয়াযির এর ধারণার সাথে বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ, পুঁজিবাদী, গণতান্ত্রিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত মানবরচিত ব্যবস্থা অথবা, অন্য যে সকল ব্যবস্থা আমরা দেখে থাকি, তাদের ধারণার দ্বন্দ বা বিভ্রান্তি তৈরি হবে।

    প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী বা মু’ওয়ায়ীন আত তাফউয়ীদ হলেন খলীফার শাসন ও কর্তৃত্বের দায়িত্বে সহায়তা করার জন্য খলীফা কর্তৃক নিয়োজিত ওয়াযির বা ডেপুটি। খলীফা বিভিন্ন বিষয়সমূহে শারী’আহ্ হুকুমের আওতায় সহকারীকে তার নিজস্ব মতামত এবং ইজতিহাদের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালনে তাকে তার (খলীফার) প্রতিনিধি হিসাবে নিযুক্ত করতে পারেন। অর্থাৎ, খলীফা তার সহকারীকে সাধারণভাবে বিভিন্ন বিষয় নিরীক্ষণ ও তদারকি করার দায়িত্ব দেন এবং সাধারণভাবে তাদের প্রতিনিধিত্ব দিয়ে থাকেন।

    আল হাকীম এবং আত তিরমিযী আবু সাইদ আল খুদরীর (রা) রেওয়াতে বর্ণনা করেন রাসূল (সা) বলেছেন যে,

    “আকাশে আমার দুই ওয়াযির জিবরাইল এবং মিকাইল এবং পৃথিবীতে আমার দুই ওয়াযির আবু বকর ও উমর।”
    (আলহাকিম, আল মুসতাদরাক, খন্ড-১, পৃষ্ঠা-১০, হাদীস নং-৩০৪৬ এবং সূনানে তিরমিযী, হাদীস নং-৩৬৮০)

    উপরোক্ত হাদীসে ওয়াযির বলতে সাহায্যকারী এবং সহযোগী বলা হয়েছে – যেটা ভাষাগত অর্থ। একই ধরনের অর্থ পবিত্র কুর’আনেও পাওয়া যায়:

    “আমার পরিবারের মধ্য থেকে একজন সাহায্যকারী (মন্ত্রী) পাঠান।”
    [সূরা তোয়াহা: ২৯]

    এখানেও সাহায্যকারী এবং সহযোগী বোঝানো হয়েছে। হাদীসে ওয়াযির শব্দটি সুনির্দিষ্ট কোন অর্থ হিসাবে আসেনি, যার মধ্যে যে কোন সাহায্য ও সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং, বলা যায় যে, খিলাফতের গুরুদায়িত্ব পালনে ওয়াযিরগণ খলীফাকে সহায়তা করতে পারেন। আবু সাইদ খুদরির বর্ণিত হাদীসে যে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে তা শাসনকার্যে সহযোগিতার অর্থে সীমাবদ্ধ নয়, কেননা জিবরাইল এবং মিকাইলকে আকাশে রাসূল (সা) এর সহযোগী বলা হয়েছে যার সাথে তাঁকে শাসনকার্যে সহযোগিতা করার কোন সম্পর্ক নেই। সে কারণে এখানে ‘ওয়াযিরাই’ (আমার দুই ওয়াযির) ভাষাগত ছাড়া অন্যকোন অর্থ বহন করে না, যার অর্থ হচ্ছে আমার দুই সহকারী। এ হাদীস থেকে আরও বোঝা যায় যে, একের অধিক সহযোগী থাকাও অনুমোদন যোগ্য।

    যদিও আবু বকর (রা) ও উমর (রা) সরাসরি রাসূল (সা) এর সাথে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন না, তবে কোন ধরনের সীমাবদ্ধতা আরোপ করা ছাড়াই তিনি (সা) তাঁদেরকে শাসনকাযর্স হ সব ব্যাপারে সহযোগিতা করার আবশ্যিক ক্ষমতা প্রদান করেছিলেন। আবু বকর (রা) খলীফা হবার পর উমর (রা) কে তাঁর সহকারী হিসেবে নিযুক্ত করেন এবং এ ব্যাপারে উমর (রা) এর সহযোগিতা ছিল খুব প্রত্যক্ষ। যখন উমর (রা) খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন উসমান (রা) এবং আলী (রা) ছিলেন তাঁর সহকারীবৃন্দ। কিন্তু, শাসনের ব্যাপারে উমর (রা) কে সহযোগিতা করতে তাঁদের দেখা যায়নি। তাঁদের অবস্থা ছিল রাসূলের (সা) এর পাশে থাকা আবু বকর (রা) ও উমরের (রা) মতো। উসমান (রা) এর সময় আলী (রা) এবং মারওয়ান বিন আল হাকাম (রা) ছিলেন তাঁর দুই সহকারী। যেহেতু আলী (রা) কিছু ব্যাপারে উসমানের (রা) উপর অসন্তুষ্ট ছিলেন সেহেতু তিনি দূরে ছিলেন। কিন্তু, মারওয়ান বিন আল হাকাম বেশ প্রত্যক্ষভাবেই শাসনকার্যে উসমান (রা) কে সহযোগিতা করেন।

    যদি প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী সৎ হন তাহলে তিনি খলীফার জন্য বড় নেয়ামত হবেন। তিনি তাকে সব ভাল কাজের ব্যাপারে স্মরণ করিয়ে দিবেন এবং তা সম্পাদনে তাকে সহায়তা করবেন। আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেন:

    ‘যদি আল্লাহ্ আমিরের জন্য ভাল কিছু চান তবে তাকে একজন ভাল ওয়াযির দান করেন। আমির যখন কিছু ভুলে যান তখন সে তাকে তা স্বরণ করিয়ে দেন এবং আর স্বরণ থাকলে সে ব্যাপারে ওয়াযির তাকে সাহায্য করেন। যদি আল্লাহ্’র অন্য কোন ইচ্ছা থাকে তাহলে তাকে একজন মন্দ ওয়াযির দান করেন। তখন আমির যদি কিছু ভুলে যান ওয়াযির কিছু স্বরণ করিয়ে দেন না এবং যে কাজ স্বরণ আছে তা সম্পাদনে অসহযোগিতা করেন।’
    (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং- ২৯৩২)

    এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেছেন। আন নাববী এর সনদকে উত্তম বলেছেন এবং আল বাজ্জার তার নিজস্ব ইসনাদ সহ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, যে ব্যাপারে আল হায়ছামি বলেছেন ‘এর সকল বর্ণনাকারীরা সহীহ্’।

    রাসূল (সা) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনদের (রা) সময়কার সহকারীদের কাজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, এইসব সহকারীদের কিছু বিশেষ কাজের জন্যও নিযুক্ত করা যায়, যেখানে তিনি সাধারণভাবে এই সমস্ত কাজের তদারকি করে থাকেন। আবার, তাকে সব বিষয় পর্যবেক্ষণ করবার জন্যও সাধারণভাবেও নিযুক্ত করা যায়। তাকে কোন একটি বিশেষ এলাকায় সাধারণ পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়া যায় কিংবা ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে সাধারণ পর্যবেক্ষণের দায়িত্বও দেয়া যায়। আল বুখারী ও মুসলিম আবু হুরাইরা (রা) এর রেওয়াতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন,

    ‘রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাদাকার দায়িত্ব দিয়ে উমরকে প্রেরণ করলেন।’
    (সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-১৪৬৮, সহীহ্ মুসলিম, হাদীস নং-২২৭৪)

    ইবনে খুজায়মা এবং ইবনে হিব্বান বর্ণনা করেছেন যে,

    ‘রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন যি’রানার উমরা থেকে ফিরে আসলেন তখন তিনি আবু বকরকে হজ্জ্বের ব্যাপারে দায়িত্ব দিয়ে পাঠালেন।’
    (আল নাসাঈ, সুনান, হাদীস নং-২৯৯৩)

    সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, আবু বকর (রা) ও উমর (রা) রাসূল (সা) এর সহকারী ছিলেন, যাদের সাধারণভাবে নির্দিষ্ট বিশেষ কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, যদিও তাঁরা দু’জন ওয়াযির ও প্রতিনিধি হিসাবে সাধারণভাবে পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পেয়েছিলেন, যা কিনা প্রতিনিধিত্বের জন্য প্রয়োজনীয়। উমর (রা) এর শাসনামলে আলী (রা) এবং উসমান (রা) এরও একই অবস্থা ছিল। এমনকি আবু বকর (রা) এর খিলাফতের সময়েও সব ব্যাপার সাধারণভাবে তদারকির জন্য উমরকে এমনভাবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল যে, কিছু সাহাবী (রা) আবু বকরকে (রা) বলেই বসলেন, “আমরা বুঝতে পারি না খলীফা কে? উমর না তুমি?” যদিও আবু বকর (রা) উমরকে (রা) কিছু সময়ের জন্য বিচারক পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন – যে ব্যাপারে আল হাফিযের সমর্থনে আল বায়হাকীর বণর্না পাওয়া যায়।

    সুতরাং, রাসূল (সা) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনদের (রা) জীবনী থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, সহকারীগণ কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে সাধারণ পর্যবেক্ষণ ও খলীফার প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তবে, একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বা নির্দিষ্ট দায়িত্বে তাদের নিযুক্ত করার ব্যাপারটিও অনুমোদিত, কেননা রাসূল (সা) আবু বকর (রা) ও উমর (রা) কে এবং আবু বকর (রা) উমর (রা) কে এভাবে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এটা এমন হতে পারে যে, একজনকে খিলাফত রাষ্ট্রের উত্তরপ্রান্ত এবং অন্যজনকে রাষ্ট্রের দক্ষিণ প্রান্তের দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। এছাড়া, খলীফার প্রথম সহকারীকে দ্বিতীয়জনের স্থানে এবং দ্বিতীয়জনকে প্রথমজনের স্থানে স্থানান্তরিত করারও অধিকার রয়েছে। তিনি একজনকে একটি বিশেষ এলাকায় দায়িত্ব দিয়ে পাঠাতে পারেন এবং অন্যজনকে অন্য দায়িত্ব দিতে পারেন; তিনি খিলাফতের দায়িত্ব পালনে যে ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন সেভাবেই তার সহকারীদের দায়িত্ব দিতে পারেন। এজন্য তাদের নতুন কোন পদবীর প্রয়োজন নেই; শুধুমাত্র যা প্রয়োজন তা হল তাদের এক দায়িত্ব থেকে অন্য দায়িত্বে স্থানান্তরিত করা। কারণ, তাদের মূলতঃ সাধারণভাবে খলীফার যে কোন কাজে সহযোগিতা করার জন্যই নিযুক্ত করা হয়েছে এবং এই সমস্ত কাজগুলো সহকারী হিসাবে তার দায়িত্বের মধ্যেই পরে। এক্ষেত্রে, ওয়ালী’র (গভর্ণর) কাজের সাথে সহকারীর কাজের পার্থক্য রয়েছে। কারণ, ওয়ালী’কে একটি নির্দিষ্ট স্থানে সাধারণ পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পালনের জন্য নিযুক্ত করা হয়, যেক্ষেত্রে তাদেরকে স্থানান্তরিত করা হয় না। যদি কোন কারণে তাকে স্থানান্তরিত করা হয়, তবে তাকে প্রদত্ত নতুন দায়িত্বের জন্য পুণরায় নিযুক্ত করতে হয়; কারণ, তার প্রথম নিযুক্তিকরণের মধ্যে পরের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। কিন্তু সহকারীদের যেহেতু সাধারণ পর্যবেক্ষণ ও প্রতিনিধিত্বের জন্য নিযুক্ত করা হয়, তাই তাকে স্থানান্তরিত করলে তার নতুন কোন পদবী বা নিযুক্তিকরণের প্রয়োজন হয় না। কারণ, মূলতঃ সহকারীদেরকে খলীফার সকল কাজের সাধারণ পর্যবেক্ষণ এবং তার প্রতিনিধিত্ব করার জন্যই নিযুক্ত করা হয়েছে।

    উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, খলীফা তার সহকারীদেরকে রাষ্ট্রের সমস্ত অঞ্চলে তার সমস্ত কাজ সাধারণভাবে পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা দিয়ে নিযুক্ত করতে পারেন। আবার, তিনি তাদেরকে একটি বিশেষ দায়িত্বও দিতে পারেন, যেমন: একজনকে পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশসমূহের (উলাই’য়াহ্) দায়িত্ব, আবার অন্যজনকে পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশসমূহের দায়িত্ব ইত্যাদি। খলীফার একাধিক সহকারী থাকলে এক এক জনকে একেক দায়িত্বে নিযুক্ত করার এই ব্যবস্থা আবশ্যকীয়, যাতে করে তাদের কর্তব্য পালনে কোন প্রকার সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি না হয়।

    সুতরাং, উপরোক্ত এই বিষয়গুলোর ভিত্তিতে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে:

    সহকারী নিয়োগের ক্ষেত্রে: প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীকে রাষ্ট্রের সর্বত্র সমস্ত কাজ সাধারণভাবে পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়ে নিযুক্ত করা হবে।

    সহকারীর কাজের ক্ষেত্রে: তাদের রাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের দায়িত্ব দেয়া হবে। অর্থাৎ, খিলাফত রাষ্ট্রকে বিভিন্ন উলাই’য়াহ্’তে বিভক্ত করে একেক জনকে একেক অঞ্চলের দায়িত্ব দেয়া হবে। একজন সহকারী পূর্বাঞ্চলীয় উলাই’য়াহগুলো পরিচালনার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন, একইভাবে অন্যজন পশ্চিম দিক, আবার আরেকজন উত্তরাঞ্চল পরিচালনার ব্যাপারে খলীফাকে সাহায্য করবেন ইত্যাদি।

    সহকারীকে স্থানান্তরিত করার ক্ষেত্রে: নতুন নিয়োগ ব্যতিরেকেই সহকারীদের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চল কিংবা এক কাজ থেকে অন্য কাজের দায়িত্ব দিয়েই স্থানান্তরিত করা হবে। এক্ষেত্রে, তাকে নতুনভাবে নতুন কাজের জন্য নিযুক্ত করা হবে না। বরং, প্রথম নিয়োগের ভিত্তিতেই তাকে স্থানান্তরিত করা হবে, কারণ, মূলতঃ তাকে সাধারণভাবে সমস্ত কাজ পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়েই খলীফার প্রতিনিধি হিসাবে নিযুক্ত করা হয়েছিল।

    প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী হবার শর্ত

    খলীফা পদে নিযুক্ত হবার জন্য যে সব শর্ত প্রয়োজন, প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী হবার জন্যও একই শর্তাবলী পূরণ করতে হবে, যেমন: তাকে পুরুষ, মুক্ত, মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী এবং ন্যায়পরায়ণ হতে হবে। এছাড়াও তাকে অবশ্যই প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য হতে নির্বাচিত করতে হবে।

    খলীফার প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীকে যে খলীফা হবার প্রয়োজনীয় শর্তসমূহ পূরণ করতে হবে এক্ষেত্রে দলিল হল, যেহেতু প্রতিনিধির দায়িত্ব শাসনকার্য পরিচালনার অংশ সেহেতু তাকে অবশ্যই পুরুষ হতে হবে। কারণ, রাসূল (সা) বলেছেন,

    ‘যারা নারীদেরকে শাসনকার্য পরিচালনার জন্য নিযুক্ত করে তারা কখনওই সফল হবে না।’
    (সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং- ৪৪২৫)

    তাকে অবশ্যই আযাদ বা মুক্ত হতে হবে। কারণ, একজন দাসের তার নিজের কর্মকান্ড পরিচালনার ব্যাপারেই কোন প্রকার কর্তৃত্ব থাকে না, সুতরাং, জনগণের বিষয়াবলী দেখাশোনা করা ও তাদের শাসন করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সেইসাথে, তাকে অবশ্যই পরিণত (বালেগ) হতে হবে। কারণ, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:

    “তিন প্রকার ব্যক্তিকে জবাবদিহিতা থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছে: ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না সে জেগে উঠে, নাবালক যতক্ষণ পর্যন্ত না সে পরিণত হয় এবং উন্মাদ ব্যক্তি যতক্ষণ না সে মানসিকভাবে সুস্থ হয়।”
    (সূনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৪৩৫৮)

    একই হাদীসের বক্তব্য অনুযায়ী তাকে অবশ্যই মানসিকভাবে সুস্থ হতে হবে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,

    ‘উন্মাদ ব্যক্তি যতক্ষণ না সে মানসিকভাবে সুস্থ হয়।’

    অন্য এক হাদীসে বর্ণিত আছে যে,

    “সে ব্যক্তি যে তার মস্তিষ্কের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে যতক্ষণ পর্যন্ত সে নিয়ন্ত্রণ ফিরে না পায়।”

    এছাড়া, মু’ওয়ায়ীন’কে অবশ্যই ন্যায়পরায়ণ হতে হবে। কারণ, ন্যায়পরায়নতাকে আল্লাহ্ তা’আলা সাক্ষ্যদানকারীদের শর্ত হিসাবে আরোপ করেছেন। তিনি বলেন:

    ‘আর এমন দু’জন লোককে তোমরা সাক্ষী বানাবে যারা তোমাদের মধ্যে ন্যায়পরায়ণ হবে।’
    [সূরা আত-তালাক: ২]

    বৃহত্তর যুক্তিতে খলীফার সহযোগীর ন্যায়পরায়ণতার গুণাবলী থাকা আবশ্যকীয় বলে ধরা হয়েছে। এছাড়া, মু’ওয়ায়ীন’কে অবশ্যই শাসনকার্যে নিযুক্ত যোগ্য ব্যক্তিবর্গের মধ্য হতেই নিয়োগ করতে হবে, যেন সে খিলাফত পরিচালনা এবং শাসন- কর্তৃত্বের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে খলীফার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাকে সহায়তা করতে পারে।

    প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীর দায়িত্ব

    প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীর দায়িত্ব হলো তিনি যে সমস্ত কাজ সম্পাদন করতে চান তার ব্যাপারে খলীফাকে পুরোপুরি অবহিত করা। পরবর্তীতে, তিনি যে সব সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছেন এবং ব্যবস্থাপনা ও নিয়োগের ব্যাপারে যে সব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছেন সে সম্পর্কে খলীফাকে অবহিত করবেন, যাতে করে তার ক্ষমতা খলীফার সমপর্যায়ভুক্ত না হয়। সুতরাং, তার দায়িত্ব হল কাজের ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গি খলীফাকে অবহিত করা এবং তারপর তা বাস্তবায়ন করা, যতক্ষণ পর্যন্ত না খলীফা তাকে এ কাজ করতে নিষেধ করেন।

    মু’ওয়ায়ীন এর দায়িত্বের যে এ ধরনের প্রকৃতি হবে সে ব্যাপারে দলিল হল, একজন ডেপুটি নিযুক্ত প্রতিনিধি হিসাবে তার পক্ষ হয়েই কাজ করেন যিনি তাকে নিয়োগ করে থাকেন। সুতরাং, দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে তিনি খলীফার জবাবদিহিতা থেকে মুক্ত বা স্বাধীন হতে পারেন না। বরং, তিনি সবসময়ই খলীফাকে তার কাজের ব্যাপারে অবহিত করবেন, যেভাবে উমর (রা) আবু বকরকে অবহিত করতেন যখন তিনি আবু বকর (রা) এর ওয়াযির (সহকারী) ছিলেন। তিনি যে সব কাজ সম্পাদন করতে চাইতেন তা আগে থেকেই আবু বকর (রা) কে অবহিত করতেন এবং তারপর তা বাস্তবায়ন করতেন। খলীফার সাথে আলোচনা বা তাকে অবহিত করার অর্থ এই নয় যে, সহকারীকে সবসময় প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ে খলীফার অনুমতি প্রার্থনা করতে হবে, কারণ তাহলে তা প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীর প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক হবে। খলীফার সাথে আলোচনা করার অর্থ হল বিষয়টির ব্যাপারে খলীফাকে অবহিত করা এবং তার সাথে পরামর্শ করা। এটা হতে পারে কোন এক প্রদেশে (উলাই’য়াহ্) একজন যোগ্য গভর্ণর বা ওয়ালী নিয়োগ দেয়ার ব্যাপারে, বাজারে খাদ্য ঘাটতির ব্যাপারে জনগণের অভিযোগের ব্যাপারে কিংবা রাষ্ট্রের যে কোন বিষয় সম্পর্কে। এটা এ রকমও হতে পারে যে, তিনি খলীফার নিকট কোন একটি বিষয় উপস্থাপন করতে পারেন, যাতে করে ভবিষ্যতে খলীফার অনুমতি ছাড়াই খুঁটিনাটি বিষয়সহ এ কাজটি সম্পাদন করা মু’ওয়ায়ীন এর জন্য বৈধ বলে বিবেচিত হতে পারে। তবে, খলীফা যদি কোন কার্য সম্পাদন না করার জন্য কোন নির্দেশ জারি করেন, তবে তা বাস্তবায়ন করা যাবে না। তবে, খলীফার সামনে কোন বিষয় উপস্থাপনের অর্থ হল একটি প্রস্তাবকে সামনে নিয়ে যাওয়া ও তার সাথে এ বিষয়ে আলাপ আলোচনা করা; তার অনুমতি প্রার্থনা করা নয়। মু’ওয়ায়ীন ততক্ষণ পর্যন্ত যে কোন কাজ সম্পাদন করতে পারবেন যতক্ষণ পর্যন্ত না খলীফা তাকে সেটি করতে বারণ করছেন।

    সঠিক সিদ্ধান্তকে অনুমোদন করা এবং ভুল সিদ্ধান্তকে সংশোধন করার জন্য খলীফাকে অবশ্যই মু’ওয়ায়ীন এর কাজ এবং ব্যবস্থাপনার বিষয়সমূহ পর্যালোচনা করতে হবে। কারণ, উম্মাহ্’র বিষয়সমূহ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব মূলতঃ খলীফার এবং তার ইজতিহাদের ভিত্তিতেই সমস্ত কার্যাবলী সম্পন্ন হয়ে থাকে। এ বিষয়ে দলিল হল জনগণের দায়িত্বের ব্যাপারে রাসূল (সা) এর হাদীস যেখানে তিনি (সা) বলেছেন,

    “ইমাম হলেন অভিভাবক এবং তিনি তার নাগরিকদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।”
    (সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-৮৯৩)

    সুতরাং, খলীফাকেই সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এবং তিনিই তার নাগরিকদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। কিন্তু, মু’ওয়ায়ীন জনগণের ব্যাপারে দায়িত্বশীল নন; বরং তিনি শুধুমাত্র তার কাজের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, জনগণের দায়িত্বের বিষয়টি একমাত্র খলীফার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এ কারণে, জনগণের প্রতি তার নিজ দায়িত্ব পালনের স্বার্থেই খলীফাকে অবশ্যই মু’ওয়ায়ীন এর কাজ এবং কর্মদক্ষতার পর্যালোচনা করতে হবে। এছাড়া, প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীরা কখনও ভুল-ভ্রান্তি করতে পারেন এবং খলীফাকে এ ত্রæটি-বিচ্যুতি সমূহ ধরিয়ে দিতে হবে। এভাবে তাকে তার প্রতিটি সহকারীর কাজসমূহ পর্যালোচনা করতে হবে। সুতরাং, বলা যায় যে, দু’টি কারণে খলীফা মু’ওয়ায়ীন এর কাজ পর্যালোচনা করতে বাধ্য – জনগণের প্রতি তার যে দায়িত্ব তা পরিপূর্ণভাবে পালনের জন্য এবং তার সহকারীদের সম্ভাব্য ভুল-ভ্রান্তি সংশোধনের জন্য। কাজেই, এ দু’টো কারণেই খলীফা তার সহকারীদের কাজসমূহ পর্যালোচনা করতে বাধ্য।

    যদি প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং খলীফা সেটি অনুমোদন করেন, তখন কোন ধরনের সংশোধন বা পরিবর্তন ছাড়াই মু’ওয়ায়ীন এ কাজটি সম্পাদন করতে পারেন। আর, যদি মু’ওয়ায়ীন এর সম্পাদিত এ কাজের ব্যাপারে খলীফা কোন ধরনের আপত্তি জানান তাহলে এক্ষেত্রে বিষয়টি পর্যালোচনা করতে হবে। যদি মু’ওয়ায়ীন সঠিকভাবে কোন একটি রায়কে বাস্তবায়ন করেন কিংবা, সঠিক খাতে বা প্রকল্পে কিছু অর্থ ব্যয় করে থাকেন, তবে এক্ষেত্রে মু’ওয়ায়ীন এর মতামতই প্রাধান্য পাবে। কেননা, নীতিগতভাবে এটা আসলে খলীফারই মতামত এবং আইনপ্রয়োগ বা অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে মু’ওয়ায়ীন যা সম্পাদন করেছে তা সংশোধন বা বাতিল করার কোন অধিকার খলীফার থাকবে না। কিন্তু, মু’ওয়ায়ীন যদি অন্য কোন ধরনের কাজ করে থাকেন, যেমন তিনি যদি কোন ওয়ালী নিযুক্ত করে থাকেন কিংবা, (যুদ্ধের জন্য) কোন সেনাদল প্রেরণের প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন, তবে এ সকল ক্ষেত্রে মু’ওয়ায়ীন এর সিদ্ধান্তকে সংশোধন বা বাতিল করে খলীফা তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে। কারণ, খলীফার তার নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার অধিকার রয়েছে, সুতরাং তার প্রতিনিধির সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের অধিকারও তার আছে।

    এটা হল মু’ওয়ায়ীন কোন পদ্ধতিতে কাজ করবেন এবং খলীফা কিভাবে তার কর্মকান্ড পর্যালোচনা করবেন সে সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা। মূলতঃ এ বিষয়টি খলীফার যে কাজসমূহকে পরিবর্তন বা সংশোধন করা যায় এবং যে কাজসমূহকে কোন প্রকার সংশোধন বা পরিবর্তন করা যায় না তার উপর ভিত্তি করেই নির্ধারণ করা হয়েছে। কারণ, মু’ওয়ায়ীন এর কাজকে মূলতঃ খলীফার কাজ হিসাবেই ধরা হয়ে থাকে। এর ব্যাখ্যা হিসাবে বলা যায় যে, মু’ওয়ায়ীন এর জন্য নিজে শাসন করা কিংবা তার স্থলে অন্য কাউকে শাসক হিসাবে নিযুক্ত করা অনুমোদিত, যেভাবে বিষয়টি খলীফার জন্যও অনুমোদিত। কারণ, শাসনকার্য পরিচালনার সব শর্তই তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তিনি নিজে কোন অভিযোগের তদন্ত করতে পারেন বা কাউকে এ ব্যাপারে নিযুক্ত করতে পারেন। কারণ, অভিযোগের সকল শর্তও তার উপর প্রযোজ্য হবে।

    এছাড়া, তিনি স্বয়ং জিহাদের দায়িত্ব নিতে পারেন বা কাউকে এ কাজের জন্য নিযুক্ত করতে পারেন; কারণ, যুদ্ধের সকল শর্তই তার জন্য প্রযোজ্য হবে। তিনি তার গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোন কার্য সম্পাদন করতে পারেন কিংবা এ কাজ সম্পাদনের জন্য তার পক্ষ হতে তিনি কাউকে নিযুক্ত করতে পারেন; কারণ, জোরালোভাবে কোন মতামতকে উপস্থাপন করা কিংবা ব্যবস্থাপনার সকল শর্তই তার জন্য প্রযোজ্য হবে। তবে, এর অর্থ এই নয় যে, খলীফাকে পূর্ব থেকে অবহিত করলে মু’ওয়ায়ীন যাই করুক না কেন খলীফা তা সংশোধন বা পরিবর্তন করতে পারবেন না। বরং, এর অর্থ হল তিনি খলীফার মতোই ক্ষমতা সংরক্ষণ করেন; তবে, তিনি খলীফার পক্ষ হয়ে কাজ করেন এবং তার কাজের ব্যাপারে তিনি পুরোপুরি স্বাধীন নন। সুতরাং, খলীফা মু’ওয়ায়ীন এর সাথে দ্বিমত করতে পারেন কিংবা, তার সম্পাদিত যে কোন কাজ পুনঃমূল্যায়ন, বাতিল বা সংশোধন করতে পারেন; তবে, এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, এটি প্রযোজ্য হবে শুধুমাত্র সেই সব বিষয়ের ক্ষেত্রে যে সকল বিষয়ে খলীফা তার নিজের গৃহীত সিদ্ধান্ত ও কাজ পুনঃমূল্যায়ন বা পরিবর্তন করতে পারেন।

    আর, যদি মু’ওয়ায়ীন কোন একটি আইনকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করেন এবং সঠিক ক্ষেত্রে কোন অর্থ ব্যয় করেন তখন এক্ষেত্রে খলীফা’র কোন আপত্তি অবৈধ বলে বিবেচিত হবে এবং মু’ওয়ায়ীন এর গৃহীত সিদ্ধান্তই বাস্তবায়িত হবে। কারণ, নীতিগতভাবে এটি খলীফা’র নিজস্ব মতামত হিসেবে গণ্য হবে এবং এ সকল ক্ষেত্রে তার নিজের সম্পাদিত বা বাস্তবায়িত কর্মকান্ডকেও তিনি পরিবর্তন বা বাতিল করতে পারবেন না। সুতরাং, তিনি তার সহকারীর কাজকেও বাতিল বা পরিবর্তন করতে পারবেন না। অন্যদিকে, মু’ওয়ায়ীন যদি একজন ওয়ালী, প্রশাসক, আর্মি কমান্ডার বা অন্য কাউকে নিয়োগ দেন অথবা তিনি যদি কোন অর্থনৈতিক কৌশল, সামরিক পরিকল্পনা কিংবা শিল্পায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন তখন খলীফা এগুলোকে বাতিল করে দিতে পারেন। কারণ, যদিও এগুলোকে খলীফার সিদ্ধান্ত হিসাবেই বিবেচনা করা হয়ে থাকে, কিন্তু, এ সিদ্ধান্তগুলো এমন শ্রেণীতে পড়ে যেগুলো খলীফা নিজে গ্রহণ করলেও তা পরিবর্তন বা বাতিল করার অধিকার তিনি রাখেন। সুতরাং, এ কারণে তিনি তার সহকারীর সিদ্ধান্তকেও বাতিল করতে পারেন। পরিশেষে বলা যায় যে, মু’ওয়ায়ীন এর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা খলীফার জন্য অনুমোদিত। তবে এক্ষেত্রে মূলনীতি হল: খলীফা মু’ওয়ায়ীন এর সে সমস্ত কাজই পুনঃমূল্যায়ন বা পরিবর্তন করতে পারবেন যে সমস্ত কাজ তিনি নিজের ক্ষেত্রে পুনঃমূল্যায়ন বা পরিবর্তন করতে পারেন।

    আর, তার নিজের যে সকল কাজ তিনি পুনঃমূল্যায়ন বা পরিবর্তন করতে পারেন না, তার মু’ওয়ায়ীন সে সকল কাজ সম্পাদন করবার পর তিনিও তা পুনঃমূল্যায়ন বা পরিবর্তন করতে পারবেন না।

    প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীকে প্রশাসনিক ব্যবস্থার কোন নির্দিষ্ট বিভাগের দায়িত্বে নিযুক্ত করা যাবে না, যেমন: শিক্ষা বিভাগ। কারণ, প্রশাসনিক কাজের দায়িত্ব দেয়া হয় আমলা বা সচিবদের, যারা কিনা সরকারী কর্মচারী, শাসক নয়। কিন্তু, প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীর পদ হল শাসকের পদ, কর্মচারীর পদ নয়। তার কাজ হল জনগণের বিষয়াদি দেখাশোনা করা, সরকারী কর্মচারী হিসাবে নিজেকে নিয়োজিত করা নয়।

    মূলতঃ এ কারণেই তিনি প্রশাসনিক কর্মকান্ড পরিচালনা করতে পারবেন না। অবশ্য তার অর্থ এই নয় যে, তিনি প্রশাসনিক বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন না। এক্ষেত্রে বলা যায় যে, প্রশাসনিক বিষয়ে তার কর্মকান্ড সীমাবদ্ধ নয়, বরং শাসক হিসাবে তার দায়িত্ব সাধারণ ও বিস্তৃত।

    প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীর নিয়োগ ও অপসারণ

    খলীফার নির্দেশ অনুসারেই প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীকে নিযুক্ত ও অপসারণ করা হবে। খলীফার মৃত্যুর সাথে সাথে তাদের ক্ষমতার মেয়াদ অতিক্রান্ত হয়ে যাবে এবং শুধুমাত্র অন্তর্বর্তীকালীন আমীরের মেয়াদকাল ব্যতীত তারা আর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। অন্তর্বর্তীকালীন আমীরের মেয়াদ অতিক্রান্ত হবার পর যদি তারা দায়িত্ব পালন করতে চান তবে নতুন খলীফা কর্তৃক তাদের নিযুক্তিকরণকে নবায়ন করতে হবে। এছাড়া, তাদের বরখাস্তের ক্ষেত্রে কারও কোন সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হবে না; কারণ পূর্বের খলীফা, যিনি তাদেরকে সহকারী হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন, তার মৃত্যুর সাথে সাথেই তাদের ক্ষমতা রহিত হয়ে যাবে।

  • খলীফা

    খলীফা

    খলীফা হচ্ছেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি শাসন, কর্তৃত্ব এবং শারী’আহ্‌’র বিধি-বিধান সমূহ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহ্‌’র প্রতিনিধিত্ব করেন। ইসলাম এটি নির্ধারণ করে দিয়েছে যে, শাসন ও কর্তৃত থাকবে উম্মাহ্‌’র অধিকারে।

    এজন্যই উম্মাহ্‌ শাসনকার্য পরিচালনা ও তাদের উপর শারী’আহ্‌’র হুকুম-আহ্‌কাম সমূহ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তার পক্ষ হতে একজনকে নিযুক্ত করে। বস্তুতঃ আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রতিটি শারী’আহ্‌ আইন বাস্তবায়ন করা উম্মাহ্‌’র জন্য বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। যেহেতু খলীফা মুসলিমদের দ্বারা নির্বাচিত হন, সেহেতু স্বভাবতই তাকে শাসন, কর্তৃত্ব ও শারী’আহ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উম্মাহ্‌’র প্রতিনিধি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। সুতরাং, কোন ব্যক্তিই ততক্ষণ পর্যন্ত খলীফা হতে পারবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত না তিনি উম্মাহ্‌’র কাছ থেকে বাই’আত প্রাপ্ত হবেন; কারণ, মূলতঃ শাসন, কর্তৃত্ব ও শারী’আহ্‌ আইনসমূহ বাস্তবায়ন করা উম্মাহ্‌’র এখতিয়ারে। প্রকৃতঅর্থে, একজন ব্যক্তিকে খলীফা হিসাবে বাই’আত দিয়েই মুসলিম উম্মাহ্‌ কার্যকরীভাবে তাকে উম্মাহ্‌’র প্রতিনিধি হিসাবে নিযুক্ত করে। আর, এই বাই’আতের মাধ্যমেই তার উপর খিলাফত রাষ্ট্রের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, খলীফাকে (উম্মাহ্‌’র উপর) কর্তৃত্বশীল করা হয় এবং সর্বোপরি, উম্মাহ্‌কে তার আনুগত্য করতে বাধ্য করা হয়।

    বস্তুতঃ যিনি মুসলিমদের শাসন করবেন, তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত খলীফা হতে পারবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত না উম্মাহ্‌’র মধ্য হতে প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ (আহ্‌লুল হাল্লি ওয়াল আকদ্‌) স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাকে বাই’আত প্রদান করেন। খলীফা হিসেবে নিয়োগ পাবার জন্য তাকে অবশ্যই বাধ্যতামূলক কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে এবং তারপর তাকে শারী’আহ বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হতে হবে।

    পদবি

    খলীফার পদবি হতে পারে খলীফা অথবা ‘ইমাম’ কিংবা ‘আমীর উল মু’মিনীন (বিশ্বাসীদের নেতা)। এই পদবিসমূহ সহীহ্‌ হাদীস এবং ইজ্‌মা আস্‌ সাহাবা (রা) থেকে পাওয়া যায়। খোলাফায়ে রাশেদীনদের (প্রথম চার খলীফা) এইসব পদবী দেয়া হয়েছিল। আবু সা’ঈদ আল খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত রাসূল (সাঃ) বলেছেন,

    “যদি দুই জন খলীফাকে আনুগত্যের শপথ দেয়া হয়, তাহলে তাদের মধ্যে পরের জনকে হত্যা কর।”
    (সহীহ্‌ মুসলিম, হাদীস নং- ১৮৪২)

    আবদুল্লাহ্‌ বিন আমর বিন আল আস্‌ (রা) থেকে হতে ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেছেন,

    “যখন একজন ইমামের হাতে বাই’আত গ্রহণ সম্পূর্ণ হয়ে যায় তখন তাকে যথাসাধ্য মান্য করবে…”
    (সহীহ্‌ মুসলিম, হাদীস নং-১৮৪৪)

    আউফ ইবনে মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, “রাসূল (সাঃ) বলেছেন,

    “তোমাদের ইমামদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে তারা যারা তোমাদেরকে ভালবাসে এবং তোমরা তাদেরকে ভালবাসো এবং যারা তোমাদের জন্য প্রার্থনা করে এবং তোমরা যাদের জন্য প্রার্থনা কর;… ”
    (সহীহ্‌ মুসলিম, হাদীস নং-৪৭৮২)

    এসব হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, ইসলামের নিয়ম অনুসারে শাসকদের পদবি হল খলীফা অথবা ইমাম।

    “আমীর উল মু’মিনীন” উপাধির ব্যাপারে সবচাইতে নির্ভরযোগ্য হাদীসটি এসেছে শিহাব আল জুহরী’র বর্ণনা থেকে। এ হাদীসটি আল-হাকিম তার মুসতাদরাক গ্রন্থে (খন্ড-৩, পৃষ্ঠা-৭৩, হাদীস নং-৪৪৮০) উল্লেখ করেছেন এবং আল-জাহাবী (তালখিস গ্রন্থে) এটিকে সহীহ্‌ হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। একই বিষয়ে আল-তাবারাণীর একটি বর্ণনা পাওয়া যায় যেটি সম্পর্কে আল-হাইছামী বলেছেন, এ হাদীসের বর্ণনাকারীদের ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। আল-হাকিম হাদীসটি এভাবে বর্ণনা করেছেন যে :”ইবনে শিহাব বর্ণনা করেছেন যে, উমর ইবন আব্দুল আজিজ, আবু বকর ইবন সুলাইমান ইবন আবি হাইছামাকে জিজ্ঞেস করেন যে, “কে প্রথম আমীর উল মু’মিনীন উপাধি লিখতে আরম্ভ করেন? তিনি বলেন, “আশ-শিফা’, যিনি নারীদের মধ্যে সর্বপ্রথম হিজরতকারী ছিলেন, আমাকে বললেন যে, উমর ইবন আল-খাত্তাব (রা) ইরাকের গভর্ণরকে পত্র মারফত দু’জন সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিকে পাঠানোর আদেশ দিলেন যেন তিনি (রা) তাদের কাছ থেকে ইরাক এবং সেখানকার জনগণ সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে পারেন। তিনি (ইরাকের গভর্ণর) লাবিদ ইবন রাবিয়াহ্‌ এবং আদি ইবন হাতিমকে তাঁর কাছে পাঠালেন।

    মদিনায় এসে পৌঁছানোর পর তারা তাদের উটগুলোকে (মদিনার) মসজিদ প্রাঙ্গনে থামালেন এবং মসজিদের ভেতর প্রবেশ করলেন। হঠাৎ তারা আমর ইবন আল-আসকে দেখলেন এবং বললেন, “হে আমর! আমীর উল মু’মিনীনের সাথে আমাদের সাক্ষাতের অনুমতির ব্যবস্থা করে দাও!” আমর বললেন, “আল্লাহ’র কসম, তোমরা তাঁকে সঠিক নামেই ডেকেছো। তিনি হচ্ছেন আমাদের আমির, আর আমরা হচ্ছি বিশ্বাসী (মু’মিনীন)।” তারপর আমর লাফিয়ে উঠে উমর, আমির উল মু’মিনীনের কক্ষে প্রবেশ করলেন এবং বললেন, “আস্‌সালামু আলাইকুম, হে আমীর উল মু’মিনীন (আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক, হে বিশ্বাসীদের আমীর)। উমর (রা) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার মাথায় এ উপাধি কিভাবে আসলো, হে আমর? আল্লাহ্‌’র কসম, তুমি যা বলেছো (এটা যে ঠিক) তা তোমাকে প্রমাণ করতে হবে।” তখন তিনি (আমর) বললেন, “লাবিদ ইবন রাবিয়াহ্‌ এবং আদি ইবন হাতিম মদিনায় এসে পৌঁছেছে এবং তারা তাদের উটগুলো মসজিদ প্রাঙ্গনে বেঁধে রেখে আমাকে বলেছে, “হে আমর! আমীর উল মু’মিনীদের সাথে আমাদের সাক্ষাতের অনুমতির ব্যবস্থা করে দাও। আল্লাহ্‌’র কসম! তারা আপনাকে সঠিক উপাধিই দিয়েছে। কারণ, আমরা হলাম বিশ্বাসী (মু’মিনীন) আর আপনি হলেন আমাদের আমীর (নেতা)।” তারপর থেকেই তারা তাদের লেখনীতে আমীর উল মু’মিনীন উপাধি ব্যবহার করতে আরম্ভ করেন।” আশ-শিফা (রা) ছিলেন আবু বকর ইবন সুলাইমানের নানী। এরপর থেকে উমর (রা) এর পরের খলীফাদেরও মুসলিমরা এই উপাধিতে সম্বোধন করতে আরম্ভ করে।”

    খলীফা হওয়ার শর্তাবলী

    একজন ব্যক্তিকে খলীফা পদের জন্য এবং বাই’য়াতের জন্য বৈধভাবে উপযুক্ত হতে হলে তাকে সাতটি শর্ত পূর্ণ করতে হবে। এ সাতটি শর্ত অবশ্যই পূরণীয়। যদি এদের মধ্যে কোন একটির ব্যত্যয় ঘটে, তাহলে তিনি খলীফার পদের জন্য অনুপযুক্ত হবেন।

    অবশ্য পূরণীয় শর্ত সমূহ

    প্রথমত: খলীফা অবশ্যই মুসলিম হবেন।

    কাফেরদের জন্য এ পদ সংরক্ষিত নয় এবং তাকে মানতেও মুসলিমরা বাধ্য নয়। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    আর মুসলিমদের উপর কাফেরদের কর্তৃত্ব করার কোন পথই আল্লাহ অবশিষ্ট রাখেননি।
    [সূরা আন-নিসা: ১৪১]

    শাসন করা হল শাসিতের উপর শাসকের শক্তিশালী অবস্থান। সে কারণে ‘লান’ (কখনওই না) শব্দটি দিয়ে মুসলিমদের উপর কাফিরদের কর্তৃত্ব করবার (খলীফা বা অন্য কোন শাসন সংক্রান্ত পদ) ব্যাপারটি সন্দেহাতীত ভাবে নিষিদ্ধ (categorical prohibition) হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ কারণে কাফেরদের শাসন মেনে নেয়া মুসলিমদের জন্য হারাম।

    যেহেতু খলীফা একজন কর্তৃত্বশীল ব্যক্তি এবং আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাকে মুসলিমদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল করেছেন সেহেতু তাকে মুসলিম হতে হবে। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    হে ঈমানদারগণ; আলাহ্‌’র নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বশীল (উলীল আমর) তাদের
    [সূরা আন-নিসা: ৫৯]

    তিনি (আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,

    তারা যখনই কোন প্রকার জননিরাপত্তা সংক্রান্ত কিংবা ভীতিকর খবর শুনতে পায়, তখনি তা সর্বত্র প্রচার করে দেয় অথচ তারা যদি তা রাসূল ও তাদের উপর কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিদের (উলীল আমর) কাছে পৌছে দিত।
    [সূরা আন-নিসা: ৮৩]

    উলীল আমর শব্দ দুটি সব সময় মুসলিমদের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া অন্য কোন অর্থে এদের ব্যবহার করা হয়নি। এটা প্রমাণ করে যে, তাদেরকে (কর্ততৃশীল বা উলীল আমর)) সব সময় মুসলিম হতে হবে। যেহেতু খলীফা পদ হচ্ছে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বশীল পদ এবং তিনিই অন্যান্যদের কর্তৃত্বশীল পদে নিযুক্ত করবেন, যেমন: তার সহকারীগণ, ওয়ালী, আমীল প্রমুখ, সেহেতু তাকে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে।

    দ্বিতীয়ত: খলীফাকে অবশ্যই পুরুষ হতে হবে।

    মহিলাদের খলীফা হবার কোন বিধান নেই অর্থাৎ কোন নারী খলীফা হতে পারবেন না। বুখারী থেকে বর্ণিত যে, রাসূল (সা) যখন শুনলেন পারস্যের জনগণ কিসরার কন্যাকে তাদের রাণী হিসেবে নিযুক্ত করেছে, তখন তিনি (সা) বললেন,

    যারা নারীদেরকে শাসক হিসেবে নিযুক্ত করে তারা কখনওই সফল হবে না।

    যেহেতু রাসূলুল্লাহ (সা) এই হাদীসে যারা তাদের বিষয়সমূহ নিষ্পত্তির জন্য নারীদের শাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে তাদের সফল না হবার ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, সেহেতু তিনি এ ব্যাপারটি নিষিদ্ধ করেছেন। অর্থাৎ যারা নারীদের তাদের বিষয়াবলী নিষ্পত্তির জন্য শাসক হিসেবে নিযুক্ত করবে তাদেরকে সাফল্য পরিত্যাগ করবে এবং এখানে ‘সাফল্য পরিত্যাগ করবে’ শব্দের ব্যবহার হবার কারণে এ নিষেধাজ্ঞাটি অকাট্য (Decisive) বলে গণ্য হবে, অর্থাৎ একজন মহিলাকে ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ দান হারাম। সে কারণে নারীদের জন্য যে কোন শাসকের পদ অলংকৃত করা সেটি খলীফা কিংবা অন্য কিছু হোক সেটা হারাম। এর কারণ হচ্ছে হাদীসের বিষয়বস্তু শুধুমাত্র কিসরার কন্যার রাণী হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি শাসনের সাথে বিজড়িত। আবার হাদীসটি সব বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় যেমন বিচারব্যবস্থা, শূরা কাউন্সিল, শাসকদের জবাবদিহি করা কিংবা নির্বাচনে ভোট দিতে পারা ইত্যাদি। বরং এসবই নারীদের জন্য বৈধ, যা পরবর্তীতে আলোচিত হবে।

    তৃতীয়ত: খলীফাকে অবশ্যই বালেগ হতে হবে।

    নাবালেগ কাউকে খলীফা হিসেবে নিযুক্ত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আবু দাউদ, আলী (রা:) থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা) বলেন:

    জবাবদিহিতা তিন ব্যক্তির জন্য নয়: ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না সে জেগে উঠে, বালক যতক্ষণ না প্রাপ্তবয়স্ক হয় এবং উম্মাদ ব্যক্তি যতক্ষণ না সে মানসিকভাবে সুস্থ হয়।

    আলী (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন:

    তিন ব্যক্তির আমল নামায় কিছুই লেখা হয় না: উম্মাদ ব্যক্তি যতক্ষন না সে সুস্থ হয়, ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষন না সে জেগে উঠে এবং নাবালেগ যতক্ষন না সে বালেগ হয়।

    অর্থাৎ যার উপর থেকে বিচারের কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে সে তার কাজের জন্য দায়ী হবে না। তার কোন শরীয়াগত দায়দায়িত্ব নেই। যে ব্যক্তি নিজের কর্মকান্ডের জন্য দায়িত্বশীল নয় তাকে সে কারণে খলীফাও বানানো যাবে না। এ ব্যাপারে আরও দলিল পাওয়া যায় বুখারীর কাছ থেকে যিনি বর্ণনা করেছেন আবু আকীল জাহারা ইবনে মা’বাদ থেকে; তিনি বর্ণনা করেছেন তার দাদা আবদুলাহ ইবনে হিশাম থেকে যিনি রাসূল (সা) এর সময় জীবিত ছিলেন। ইবনে হিশামের মা তাঁকে রাসূলুলাহ (সা) এর কাছে নিয়ে গেলেন এবং বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! তাঁর কাছ থেকে বাই’য়াত গ্রহণ করুন।’ তখন রাসূল (সা) বললেন, ‘সে তো ছোট’। অতঃপর তিনি (সা) আবদুল্লাহ ইবনে হিশামের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং তার জন্য দোয়া করলেন। সুতরাং নাবালেগের বাই’য়াত যেহেতু গ্রহণযোগ্য নয় সেহেতু তার পক্ষে খলীফা হওয়াও সম্ভবপর নয়।

    চতুর্থত: খলীফাকে সুস্থ মস্তিষ্কের হতে হবে।

    অসুস্থ মস্তিষ্কের কোন ব্যক্তি খলীফা হতে পারবে না। কারণ রাসূল (সা) বলেন:

    “তিন ব্যক্তির আমল নামায় কিছুই লেখা হয় না: উম্মাদ ব্যক্তি যতক্ষন না সে সুস্থ হয়…” বলতে বুঝানো হয়েছে অপ্রকৃতস্থ ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত জবাবদিহিতার আওতায় আসবে না যতক্ষন সে মানসিকভাবে সুস্থ হয়। কারণ মানসিক সুস্থতা যে কোন দায়িত্ব অনুভব করবার জন্য একান্ত প্রয়োজন। খলীফা আইন গ্রহণ করেন এবং বাস্তবায়ন করেন। সে কারণে একজন অপ্রকৃতস্থ খলীফা থাকা বৈধ নয়, কারণ যে ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে দায়িত্বশীল নয় সে ব্যক্তি কি করে উম্মাহ্‌র ব্যাপারে দায়িত্বশীল হবেন?

    পঞ্চমত: খলীফা ন্যায়পরায়ণ হবেন।

    কোন ফাসিক ব্যক্তি – যিনি নির্ভরযোগ্য নন তিনি খলীফা হতে পারবেন না। খলীফা নিয়োগ ও এর ধারাবাহিকতার জন্য সততা একটি আবশ্যিক গুণ। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন, সাক্ষ্যদানকারী গন অবশ্যই ন্যায়পরায়ণ হবেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:

    আর এমন দু’জন লোককে সাক্ষী বানাবে যারা তোমাদের মাঝে সুবিচারবাদী হবে।”
    [সূরা আত-তালাক: ২]

    যেহেতু সাক্ষ্য দানকারীদের সততার কথা বলা হয়েছে সেহেতু যিনি ঐসব সাক্ষ্য দানকারীর শাসক ও উচ্চপদস্থ হবেন তাকে তো অবশ্যই সৎ হতে হবে।

    ষষ্ঠত: খলীফা অবশ্যই আযাদ বা মুক্ত হবেন।

    যেহেতু একজন দাস তার ব্যাপারে স্বাধীন নয়, সে তার প্রভূর নিয়ন্ত্রনাধীন, সেহেতু জনগণের বিষয়াবলী দেখা ও তাদের শাসন করা তার পক্ষে সম্ভবপর নয়।

    সপ্তমত: খিলাফতের দায়িত্ব পালনে খলীফাকে অবশ্যই পারঙ্গম হতে হবে।

    কারণ এটি বাই’য়াতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে ব্যক্তি দায়িত্ব পালনে অক্ষম সে কীভাবে বাই’য়াত অনুসারে মানুষের সমস্যাবলী নিরসন করবে এবং আল্লাহ্‌’র কিতাব ও রাসূল (সা) এর সুন্নাহ্‌ দিয়ে শাসন করবে? মাযালিম আদালত (The Court of Unjust Act) এর ক্ষমতা রয়েছে একজন খলীফার কী ধরণের অযোগ্যতা থাকতে পারবে না সে বিষয়সমূহ নির্ধারণ করবার।

    পছন্দনীয় শর্তাবলী

    উপরে উল্লেখিত শর্তাবলী একজন খলীফা নিযুক্ত হবার জন্য আবশ্যিক গুনাবলী। এ সাতটি বাদে বাকী কোন শর্তই খলীফা নিযুক্ত হবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। আর কিছু শর্তাবলী রয়েছে যেগুলো সহীহ দলিল প্রমাণের মাধ্যমে যদি জরুরী প্রমাণিত হয় তাহলে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে, তবে সেগুলো হবে পছন্দনীয় শর্তাবলী। যদি কোন নির্দেশ অকাট্য (Decisive) বলে প্রমাণিত হয় তাহলে সেটাকে আবশ্যিক শর্তাবলীর আওতায় নেয়া হবে। আর যদি দলিলের ভিত্তিতে সেটি অকাট্য বা চূড়ান্ত (Decisive) বলে প্রমাণিত না হয় তাহলে সে শর্তটি পছন্দনীয় বলে পরিগণিত হবে। এখন পর্যন্ত উল্লেখিত সাতটি আবশ্যিক শর্তাবলী ব্যতীত দলিল প্রমাণের ভিত্তিতে আর কোন গুনাবলী আবশ্যিক বলে পরিগণিত হয়নি। সে কারণে এই সাতটিই খলীফা নিয়োগের জন্য আবশ্যিক শর্তাবলী হিসেবে বিবেচিত। পছন্দনীয় শর্তাবলীর মধ্যে রয়েছে, যেমন:খলীফা হবেন কুরাই’শ, মুজতাহিদ কিংবা অস্ত্র চালনায় পারদর্শী – যেগুলোর ব্যাপারে অকাট্য দলীল নেই।

    খলীফা নিয়োগ করার প্রক্রিয়া

    শরী’আহ যখন উম্মাহ্‌’র উপর একজন খলীফা নিয়োগ করাকে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে, একইসাথে, শরী’আহ খলীফা নিয়োগ করার পদ্ধতিও নির্ধারণ করে দিয়েছে। এ পদ্ধতি আল্লাহ্‌’র কিতাব ও রাসূল (সা) এর সুন্নাহ্‌ দ্বারা প্রমাণিত। যে সমস্ত মুসলিম খলীফাকে বাই’আত দিবে তাদের অবশ্যই সে সময়ে খিলাফত রাষ্ট্রের নাগরিক হতে হবে। আর, যদি পরিস্থিতি এরকম হয় যে, যখন কোন খিলাফত রাষ্ট্র নেই, তখন সে অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর উপরই বাই’আত দেবার দায়িত্ব বর্তাবে যেখানে খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা কার্যকর করা হবে।

    বাই’আত যে খলীফা নির্বাচনের পদ্ধতি তা প্রমাণিত হয়, রাসূল (সা) কে মুসলিমদের বাই’আত দেবার ঘটনা ও ইমামকে বাই’আত দেয়ার ব্যাপারে আল্লাহ্‌’র রাসূল (সা) এর নির্দেশ থেকে। তৎকালীন মুসলিমরা রাসূল (সা) কে নবী হিসাবে বাই’আত দেয়নি; বরং শাসক হিসাবে বাই’আত দিয়েছিল। কারণ, তাদের এ বাই’আত বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত ছিল না, বরঞ্চ তাদের কাজের সাথে সম্পর্কিত ছিল। সুতরাং, রাসূল (সা) কে নবী বা রাসূল হিসেবে বাই’আত দেয়া হয়নি বরং শাসক হিসেবেই বাই’আত দেয়া হয়েছিল। কারণ, নবুয়্যতকে স্বীকৃতি দেবার বিষয়টি মূলতঃ বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত এবং এখানে বাই’আতের প্রক্রিয়াটি প্রযোজ্য নয়। সুতরাং, আল্লাহ্‌’র রাসূলকে বাই’আত দেবার বিষয়টি তাকে শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া বলেই বিবেচিত হবে।

    পবিত্র কুর’আন ও হাদীসেও বাই’আতের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    হে নবী ! তোমার নিকট মুমিন স্ত্রী লোকেরা যদি একথার উপর বাই’আত করবার জন্য আসে যে, তারা আল্লাহ্‌’র সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যাভিচার করবে না, নিজেদের সন্তান হত্যা করবে না, আপন গর্ভজাত জারজ সন্তানকে স্বামীর সন্তান বলে মিথ্যা দাবি করবে না এবং কোন ভাল কাজের ব্যাপারে তোমার অবাধ্যতা করবে না, তবে তুমি তাদের বাই’আত গ্রহণ কর।”
    [সূরা মুমতাহিনা : ১২]

    অন্য আয়াতে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    হে নবী! যেসব লোক তোমার নিকট বাই’আত গ্রহণ করেছিল তারা আসলে আল্লাহ্‌’র নিকট বাই’আত করছিল। তাদের হাতের উপর আল্লাহ্‌’র হাত ছিল।”
    [সূরা আল ফাত্‌হ : ১০]

    বুখারী থেকে বর্ণিত হযরত উবাদা ইবন সামিত (রা) বর্ণনা করেন,

    “আমরা রাসূল (সা) এর নিকট সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি উভয় অবস্থায় শ্রবন ও আনুগত্য করার শপথ নিয়েছি। একথার উপরও শপথ নিয়েছি যে, আমরা উলূল আমর (শাসন কর্তৃত্বশীল)-এর সাথে বিবাদ করবনা। আমরা এই মর্মেও শপথ নিয়েছি যে, হকের জন্য উঠে দাঁড়াবো কিংবা হক কথা বলব যে অবস্থায়ই থাকি না কেন। আর, আল্লাহ্‌’র কাজের ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করবো না।”
    (সহীহ্‌ বুখারী, হাদীস নং-৭০৫৪; সহীহ্‌ মুসলিম, হাদীস নং-৪৭৪৮)

    হযরত আবদুল্লাহ্‌ বিন আমর বিন আ’স (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি আল্লাহ্‌’র রাসূলকে (সা) বলতে শুনেছি যে,

    “যে ব্যক্তি কোন ইমামকে বাই’আত প্রদান করল, সে যেন তাকে নিজ হাতের কর্তৃত্ব ও স্বীয় অন্তরের ফল (অর্থাৎ সব কিছু) দিয়ে দিল। এরপর তার উচিৎ উক্ত ইমামের আনুগত্য করা। যদি অন্য কেউ এসে (প্রথম নিযুক্ত) খলীফার সাথে (ক্ষমতার ব্যাপারে) বিবাদে লিপ্ত হয়, তাহলে দ্বিতীয় জনের গর্দান উড়িয়ে দাও।”
    (মুসনাদে আহমাদ, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা-১০)

    এছাড়াও মুসলিম বর্ণনা করেন আবু সাইদ খুদ্‌রী (রা) রাসূল (সা) কে বলতে শুনেছেন:

    যদি দু’জন খলীফাকে বাই’আত দেয়া হয়, তাহলে দ্বিতীয়জনকে হত্যা কর।
    (সহীহ্‌ মুসলিম, হাদীস নং-১৮৫৩)

    আবু হাজিমের বরাত দিয়ে ইমাম মুসলিম আরও বর্ণনা করেন যে, আমি আবু হুরায়রার সাথে পাঁচ বছর অতিবাহিত করেছি এবং তাঁকে বলতে শুনেছি, রাসূল (সা) বলেছেন,

    বনী ইসরাইলকে শাসন করতেন নবীগণ। যখন এক নবী মৃত্যুবরণ করতেন তখন তাঁর স্থলে অন্য নবী আসতেন, কিন্তু আমার পর আর কোনও নবী নেই। শীঘ্রই অনেক সংখ্যক খলীফা আসবেন। তাঁরা (রা) জিজ্ঞেস করলেন তখন আপনি আমাদের কী করতে আদেশ করেন? তিনি (সাঃ) বললেন, তোমরা একজনের পর একজনের বাই’আত পূর্ণ করবে, তাদের হক আদায় করবে। অবশ্যই আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাদেরকে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবেন।” (সহীহ্‌ বুখারী, হাদীস নং-৩৪৫৫)

    উপরোক্ত দলীল সমূহ এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আল্লাহ্‌’র কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহ্‌ অনুযায়ী খলীফা নিয়োগ করার প্রক্রিয়া হল বাই’আত। সকল সাহাবী (রা) এটি জানতেন এবং তাদের জীবনে তা কার্যকর করেছিলেন। সুতরাং, খোলাফায়ে রাশেদীনদের কেন বাই’আত দেয়া হয়েছিল, এ সমস্ত দলীল-প্রমাণ থেকে তা পরিষ্কার।

    খলীফা নিয়োগ করা ও বাই’আত প্রদানের জন্য গৃহীত বাস্তব পদক্ষেপসমূহ

    বাই’আত প্রদানের পূর্বে খলীফা নিয়োগের বাস্তব পদক্ষেপসমূহ বিভিন্ন রকম হতে পারে। যে রকমটি হয়েছিল খোলাফায়ে রাশেদীনদের সময়ে, যারা আল্লাহ্‌’র রাসূল (সা) এর ইন্তিকালের পরপরই উম্মাহ্‌’র খলীফা হিসাবে মনোনীত হয়েছিলেন – যেমন: আবু বকর, উমর, উসমান এবং আলী (রা)। এ সমস্ত পদক্ষেপের ব্যাপারে সকল সাহাবী (রা) নীরব থেকে তাঁদের স্বীকৃতি ও সম্মতি প্রদান করেছিলেন। এ বিষয়সমূহ যদি শারী’আহ্‌ সম্মত না হত তাহলে তাঁরা তা কোনক্রমেই মেনে নিতেন না। কারণ, এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যার উপর মুসলিমদের মর্যাদা ও শরী’আহ্‌ হুকুম-আহ্‌কাম বাস্তবায়ন নির্ভর করে। আমরা যদি খোলাফায়ে রাশেদীনদের নিয়োগের বিভিন্ন ধাপসমূহের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখব যে, বনু সা’ইদার প্রাঙ্গনে কিছু মুসলিমের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। (আল্লাহ্‌’র রাসূলের পর) সম্ভাব্য খলীফা হিসাবে সা’দ, আবু উবাইদাহ্‌, উমর ও আবু বকর (রা) প্রাথমিকভাবে মনোনীত হয়েছিলেন। এদের মধ্যে, উমর ও আবু উবাইদাহ্‌ (রা) আবু বকর (রা) কে চ্যালেঞ্জ করতে অস্বীকৃতি জানান। অর্থাৎ, বিষয়টি তখন সা’দ এবং আবু বকর (রা) মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। অনেক তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনার পর আবু বকর (রা) কে খলীফা হিসাবে বাই’আত দেয়া হয়। পরদিন মুসলিমদেরকে মসজিদে আহ্বান করা হয় এবং তারা সেখানে আবু বকর (রা) কে বাই’আত দেয়। এ ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে, বনু সা’ইদার প্রাঙ্গনের বাই’আতটি ছিল খলীফা হিসাবে নিয়োগের বাই’আত – যার মাধ্যমে আবু বকর (রা) মুসলিমদের খলীফা হিসাবে নির্বাচিত হন। আর তার পরের দিন, মসজিদে গৃহীত বাই’আতটি ছিল আনুগত্যের বাই’আত।

    আবু বকর (রা) যখন বুঝতে পারলেন যে তাঁর অসুস্থতা তাঁকে ক্রমশঃ মৃত্যুর দিকে ধাবিত করছে, ঠিক সে সময়ে মুসলিম সেনাবাহিনী পারস্য ও রোমান পরাশক্তিগুলোর সাথে যুদ্ধ করছিল। তখন তিনি তাঁর মৃত্যুর পর কে খলীফা হবেন এ ব্যাপারে মুসলিমদের সাথে আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। তিনি প্রায় ৩ মাস ব্যাপী মদীনার মুসলিমদের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করলেন। আলোচনার এক পর্যায়ে যখন তিনি অধিকাংশ মুসলিমের মনোভাব বুঝতে পারলেন, তখন তাঁর উত্তরসূরী হিসাবে তিনি উমর (রা.) এর নাম ঘোষণা করলেন। তবে, তাঁর এই মনোনয়ন উমরকে তাঁর পরবর্তী খলীফা হিসেবে নিয়োগের চুড়ান্ত চুক্তি হিসাবে বিবেচিত হয়নি। কারণ, আবু বকরের মৃত্যুর পর মুসলিমরা মসজিদে এসে উমর (রা) কে বাইয়াত দেয় এবং এভাবেই খলীফা হিসাবে তাঁর নিয়োগ চূড়ান্ত হয়। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, উমর (রা) শুধুমাত্র বাই’আতের মাধ্যমেই খলীফা হয়েছিলেন; মুসলিমদের সাথে আবু বকর (রা) এর আলাপ-আলোচনা বা তাঁর মনোনয়নের মাধ্যমে নয়। যদি আবু বকর (রা) এর মনোনয়নই খলীফা নিয়োগের চূড়ান্ত চুক্তি হত, তাহলে উমর (রা) কে মুসলিমদের বাই’আত দেবার কোন প্রয়োজন ছিল না। সুতরাং, এ ঘটনা আমাদের স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে যে, মুসলিমদের বাই’আত ছাড়া কেউ খলীফা হিসাবে নির্বাচিত হতে পারবে না।

    খলীফা থাকাকালীন সময়ে উমর (রা) যখন গুরুতরভাবে আহত হলেন তখন মুসলিমরা তাঁকে একজন খলীফা মনোনীত করার জন্য অনুরোধ করলেন; কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করলেন। কিন্তু, এ ব্যাপারে তাদের ক্রমাগত অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ছয়জনকে খলীফা পদের জন্য মনোনীত করেন। অতঃপর তিনি শুয়াইব (রা) কে ইমাম নিযুক্ত করলেন এবং তাঁর মনোনীত ছয়ব্যক্তিকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করে (তাঁর মৃত্যুর) তিনদিনের মধ্যে শুয়াইব (রা) কে খলীফা নির্বাচনের দায়িত্ব দিলেন। উমর (রা), শুয়াইব (রা) কে বললেন, “…যদি (ছয়জনের মধ্যে) পাঁচজন একব্যক্তির (খলীফা হবার) ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছে এবং একজন দ্বিমত পোষণ করে তাহলে তরবারি দিয়ে তার মস্তক উড়িয়ে দেবে..।” এ ঘটনাটি তাবারণী তার তা’রীখ গ্রন্থেও উল্লেখ করেছেন; এছাড়া, আরও উল্লেখিত আছে ইবন কুতাইবা’র গ্রন্থ আল ইমামা ও সিয়াসাহ, যা কিনা ‘খিলাফতের ইতিহাস’ (দ্যা হিস্ট্রি অফ খিলাফাহ্‌) নামে পরিচিত এবং ইবন সা’দ এর গ্রন্থ আত-তাবাকাত আল-কুবরাহ্‌’তে। তারপর উমর (রা) আবু তাল্‌হা আল-আনসারীকে পঞ্চাশ জন ব্যক্তির সহায়তায় তাঁর মনোনীত ছয়ব্যক্তির নিরাপত্তার দায়িত্বে নিযুক্ত করলেন এবং সেই সাথে, আল মিকদাদ ইবনে আল-আসওয়াদকে উক্ত ছয়প্রার্থীর মিলিত হবার স্থান নির্ধারণের দায়িত্ব দিলেন। উমর (রা) এর মৃত্যুর পর তাঁর মনোনীত ছয় ব্যক্তি একত্রিত হলেন। এরপর, আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা) তাদের প্রশ্ন করলেন, “তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিকে খলীফা নির্বাচিত করার জন্য কে নিজেকে এ পদ থেকে সরিয়ে নিতে চাও?” এ প্রশ্নের উত্তরে সকলে নিশ্চুপ থাকলে তিনি বললেন, “আমি স্বেচ্ছায় খলীফার পদ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছি।” তারপর তিনি এক এক করে প্রত্যেকের সাথে আলাদাভাবে আলোচনা করলেন। তিনি প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করলেন, “নিজেকে ছাড়া ছয়জনের মধ্যে আর কাকে তুমি এ পদের জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি বলে মনে কর?” তাদের সকলের উত্তর আলী (রা) এবং উসমানের (রা) মধ্যে সীমাবদ্ধ হল। এরপর, আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা) এ দু’জনের মধ্যে কাকে জনগণ খলীফা নির্বাচিত করতে চায়, সে বিষয়ে মতামত সংগ্রহের জন্য বেরিয়ে পড়লেন। জনমত যাচাই এর জন্য তিনি মদীনার নারী-পুরুষ সবাইকে জিজ্ঞেস করেছিলেন এবং খলীফা নির্বাচনের এ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি দিনরাত কাজ করেছিলেন। আল মুসওয়ার ইবনে মাখরামা’র বরাত দিয়ে আল-বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, “রাতের কিছু সময় অতিবাহিত হবার পর আব্দুর রহমান বিন আউফ আমার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ছিল যে পর্যন্ত না আমি জেগে উঠলাম। তিনি বললেন, “আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি ঘুমাচ্ছো, কিন্তু আল্লাহ্‌’র কসম, গত তিন রাত আমি খুব কমই ঘুমের আনন্দ উপভোগ করেছি।” এরপর মদীনার জনগণ ফজরের সালাত আদায় করার পর উসমান (রা) কে খলীফা হিসেবে বাই’আত দিল এবং এভাবেই তিনি মুসলিমদের বাই’আতের মাধ্যমে খলীফা হিসাবে নির্বাচিত হলেন। সুতরাং, উসমান (রা) মুসলিমদের বাই’আতের মাধ্যমেই খলীফা হয়েছিলেন, উমর (রা) কর্তৃক মনোনয়নের মাধ্যমে নয়।

    উসমান (রা) নিহত হওয়ার সময় মদীনার সাধারণ জনগণ এবং কুফাবাসী আলী ইবনে আবি তালিব (রা) কে খলীফা হিসেবে বাই’আত দেন। এভাবে তিনিও মুসলিমদের বাই’আতের মাধ্যমে খলীফা হিসাবে নির্বাচিত হন।

    সাহাবীদের বাই’আত দেয়ার প্রক্রিয়াকে সূক্ষ্ণ বিশ্লেষণ করলে এটা পরিস্কারভাবে বোঝা যায় যে, প্রথমে জনগণের কাছে খলীফা পদপ্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হতো এবং এদের প্রত্যেককে অবশ্যই খলীফা হবার আবশ্যিক শর্তাবলী পূরণ করতে হত। তারপর উম্মাহ্‌’র প্রভাবশালী ব্যক্তি – যারা উম্মাহ্‌কে প্রতিনিধিত্ব করতেন তাদের মতামত সংগ্রহ করা হত।

    খোলাফায়ে রাশেদীনদের সময়ে উম্মাহ্‌’র প্রতিনিধি ছিলেন সাহাবা (রা) কিংবা মদীনার অধিবাসীগণ। যে ব্যক্তি সাহাবীদের (রা) অথবা অধিকাংশ জনগণের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচিত হতেন, তাকেই বাই’আত দেয়া হত এবং তার আনুগত্য করা তখন মুসলিমদের উপর ফরয হয়ে যেত। এভাবেই মুসলিমরা খলীফাকে আনুগত্যের বাই’আত প্রদান করতো এবং তাদের নির্বাচিত খলীফাই শাসন ও কর্তৃত্বের ব্যাপারে উম্মাহ্‌’র প্রতিনিধি হয়ে যেতেন।

    খোলাফায়ে রাশেদীনদের (রা) বাই’আত দেবার ঘটনাসমূহ থেকে মূলতঃ এ বিষয়গুলোই বোঝা যায়। এছাড়া, উমর (রা) এর ছয়জন ব্যক্তি মনোনীত করার বিষয়টি এবং উসমান (রা) কে বাই’আত দেবার সময় যে প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়েছিল, তা থেকে আরও দু’টি বিষয় পরিস্কারভাবে বোঝা যায়। আর তা হল, প্রথমত একজন অন্তর্বর্তীকালীন আমীর (নেতা) এর উপস্থিতি, যিনি নতুন খলীফা নির্বাচিত হওয়া কালীন সময় উম্মাহ্‌’র দায়িত্বে থাকবেন এবং দ্বিতীয়ত খলীফার জন্য মনোনীত ব্যক্তিদের সংখ্যা ছয়জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা।

    অন্তর্বর্তীকালীন আমীর

    একজন খলীফার কাছে তার মৃত্যু নিকটবর্তী মনে হলে কিংবা খলীফার পদ শূন্য হবার মত কোন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে নতুন খলীফা নির্বাচিত হওয়া কালীন সময়ে মুসলিমদের বিষয়াবলী দেখশুনা করার জন্য একজন অন্তর্বর্তীকালীন আমীর নিয়োগ করার ক্ষমতা খলীফার রয়েছে। পূর্ববর্তী খলীফার মৃত্যুর পর তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং তার প্রধান কাজ হবে তিনদিনের ভেতর নতুন খলীফা নির্বাচিত করা।

    নতুন কোন আইন গ্রহণ করবার ক্ষমতা অন্তর্বর্তীকালীন খলীফার নেই। কারণ, এটি কেবলমাত্র উম্মাহ্‌’র বাই’আতের মাধ্যমে নির্বাচিত খলীফার জন্য সংরক্ষিত। খলীফা পদের জন্য মনোনীতদের মধ্য হতে কেউ অন্তর্বর্তীকালীন আমীর হতে পারবেন না কিংবা মনোনীতদের কাউকে তিনি সমর্থন করতে পারবে না। কারণ, উমর (রা) তাঁর মনোনীত ছয়জনের মধ্য হতে কাউকে অন্তর্বর্তীকালীন আমীর হিসেবে নিয়োগ দেননি।

    নতুন খলীফা নির্বাচিত হওয়া মাত্রই অন্তর্বর্তীকালীন আমীরের কার্যকাল শেষ হয়ে যাবে, কারণ তার মেয়াদ অস্থায়ী এবং দায়িত্ব একটি বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের (নতুন খলীফা নির্বাচিত করা) মধ্যেই সীমিত।

    শুয়াইব (রা) যে উমর (রা) কর্তৃক নির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন আমীর ছিলেন তা উমর (রা) এর মনোনীত ছয়ব্যক্তি সম্পর্কিত উক্তি থেকে বোঝা যায়: “যে তিনদিন তোমরা আলোচনা করবে সে সময় শুয়াইব তোমাদের সালাতে ইমামতি করবে।” এরপর তিনি বলেছিলেন, “…যদি (ছয়জনের মধ্যে) পাঁচজন একব্যক্তির (খলীফা হবার) ব্যাপারে ঐক্যমতে পৌঁছে এবং একজন দ্বিমত পোষণ করে তাহলে তরবারি দিয়ে তার মস্তক উড়িয়ে দেবে..।” এটা প্রমাণ করে যে, শুয়াইব (রা) কে তাদের উপর কর্তৃত্ব দেয়া হয়েছিল। এছাড়া, শুয়াইব (রা) কে সালাতের ইমামও নিযুক্ত করা হয়েছিল এবং সে সময়ে সালাতে ইমামতির অর্থ ছিল জনগণের উপরও ইমাম (নেতা) নিযুক্ত হওয়া। এছাড়া, তাঁকে শাস্তি প্রদানের (মস্তক উড়িয়ে দেয়ার) ক্ষমতাও দেয়া হয়েছিল এবং আমরা জানি যে, একমাত্র আমীরই কোন ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদান করার ক্ষমতা রাখেন।

    আমীর নির্বাচনের এ ঘটনাটি একদল সাহাবীদের সম্মুখেই ঘটেছিল এবং এ বিষয়ে তারা কেউ কোন দ্বিমত পোষণ করেননি। সুতরাং, এটি ইজমা আস-সাহাবা বা সাহাবীগণের ঐক্যমত যে, নতুন খলীফা নির্বাচিত হবার পূর্বে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে উম্মাহ্‌’র বিষয়াবলী এবং নতুন খলীফা নিযুক্ত করার প্রক্রিয়া সমূহ দেখাশুনা করার জন্য একজনকে আমীর নিযুক্ত করার ক্ষমতা খলীফার রয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে বলা যায় যে, খলীফা তার জীবদ্দশায় রাষ্ট্রের সংবিধানে এ অনুচ্ছেদটি সংযুক্ত করতে পারেন যে, যদি কোন খলীফা অন্তর্বর্তীকালীন আমীর নিযুক্ত না করেই ইন্তেকাল করেন, তবে একজনকে অবশ্যই অন্তর্বর্তীকালীন আমীর হিসাবে নিযুক্ত করতে হবে।

    একইভাবে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, খলীফার শাসনকালের শেষের দিকে যদি তার পক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন আমীর নিয়োগ করা সম্ভব না হয়, তবে খলীফার পরবর্তী জ্যেষ্ঠ্য প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী (Next Eldest Delegated Assistant) অন্তর্বর্তীকালীন আমীর হবেন যদি না তাকে খলীফা পদের জন্য মনোনীত করা হয়। যদি তিনি খলীফা পদের জন্য মনোনীত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হন, তাহলে তার পরবর্তী জ্যেষ্ঠ্য প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী অন্তর্বর্তীকালীন আমীর হবেন। যদি খলীফার সব প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীই পরবর্তী খলীফা পদের জন্য মনোনীত হন, তবে খলীফার জ্যেষ্ঠ্য নির্বাহী সহকারীকে আমীর নিযুক্ত করা হবে এবং পূর্বের মতোই ব্যাপারটি চলতে থাকবে। যদি উল্লেখিত সকলেই মনোনীত হন তবে কনিষ্ঠ নির্বাহী সহকারী অন্তর্বর্তীকালীন আমীর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবেন।

    যদি খলীফাকে কোন কারণে তার পদ থেকে অপসারণ করা হয় তাহলেও এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে। এক্ষেত্রেও একইভাবে খলীফার জ্যেষ্ঠ্য প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী অন্তর্বর্তীকালীন আমীর হবেন, যদি না তিনি মনোনীতদের মধ্যে কেউ হন। আর, যদি তিনি মনোনীতদের একজন হন তাহলে তার পরবর্তী জ্যেষ্ঠ্য প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী আমীর নিযুক্ত হবেন এবং এভাবে প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীদের শেষব্যক্তি পর্যন্ত ব্যাপারটি চলতে থাকবে। প্রতিনিধিত্ব সহকারীদের সকলেই মনোনীত হলে, জ্যেষ্ঠ্য নির্বাহী সহকারী আমীর হবেন এবং পূর্বের মতোই ব্যাপারটি চলতে থাকবে। যদি উল্লেখিত সকলেই মনোনীত হন তবে কনিষ্ঠ নির্বাহী সহকারী অন্তর্বর্তীকালীন আমীর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবেন।

    খলীফা যদি শত্রুর হাতে বন্দী হন সেক্ষেত্রেও এ নিয়ম প্রযোজ্য। তবে, এক্ষেত্রে খলীফাকে উদ্ধার করার কোন সম্ভাবনা না থাকলে অন্তর্বর্তীকালীন আমীরের নির্বাহী ক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ থাকতে হবে। এ বিষয়ে একটি প্রস্তাবনা যথাযথ সময়ে উম্মাহ্‌’র কাছে উপস্থাপন করা হবে।

    এখানে উল্লেখ্য যে, এই অন্তর্বর্তীকালীন আমীর খলীফা জিহাদে বা ভ্রমণে যাবার সময় যে ধরনের ডেপুটি বা প্রতিনিধি নিয়োগ করেন সেরকম কিছু নয়। রাসূল (সা) যখন জিহাদে বা হিজ্জাত আল ওয়াদাতে যেতেন তখন এ রকম ডেপুটি নিয়োগ করতেন। জনগণের বিষয়াদি দেখাশুনা করার জন্য যতটুকু নির্বাহী ক্ষমতার দরকার হয়, সাধারণত এ ধরনের ডেপুটি খলীফা কর্তৃক ততটুকু নির্বাহী ক্ষমতা প্রাপ্ত হন।

    মনোনীতদের তালিকা সংক্ষিপ্তকরণ

    খোলাফায়ে রাশেদীনদের খলীফাপদে নিযুক্ত করার প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এখানে মনোনীত ব্যক্তিদের তালিকা সংক্ষিপ্তকরণের একটি বিষয় ছিল। বানু সা’ইদার প্রাঙ্গনে মনোনীত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন আবু বকর (রা), উমর (রা), আবু উবাইদাহ (রা) এবং সা’দ বিন উবাদাহ্‌ (রা)। কিন্তু, উমর (রা) এবং আবু উবাইদাহ (রা) নিজেদেরকে আবু বকরের সমতুল্য মনে করেননি, এজন্য তাঁরা আবু বকরকে চ্যালেঞ্জও করেননি। এ কারণে প্রতিযোগিতা আবু বকর ও সা’দ বিন উবাদাহ্‌র মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে, বানু সাইদা’র প্রাঙ্গণে উপস্থিত মদীনার প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ আবু বকরকে বাই’আত দিয়ে খলীফা হিসাবে নির্বাচিত করলেন এবং এর পরদিন জনগণ আবু বকর (রা) কে আনুগত্যের বাই’আত দিলেন।

    আবু বকর (রা) শুধুমাত্র উমর (রা) কে তাঁর পরবর্তী খলীফা হিসাবে মনোনীত করেছিলেন। এ পদের জন্য তিনি অন্য আর কাউকেই মনোনীত করে যাননি। পরবর্তীতে, মদীনার মুসলিমরা প্রথমে উমরকে নিযুক্তির বাই’আত ও পরে আনুগত্যের বাই’আত প্রদান করে।

    উমর (রা) ছয়ব্যক্তিকে খলীফা পদের জন্য মনোনীত করেছিলেন এবং খিলাফতকে এদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করেছিলেন।

    সেইসাথে, তিনি জনগণকে ছয়জনের মধ্য হতে একজনকে পছন্দ করবার সুযোগ দিয়েছিলেন। মনোনীতদের মধ্য হতে আব্দুর রহমান (রা) নিজেকে এ পদ থেকে সরিয়ে নিয়ে বাকী পাঁচজনের সাথে একান্তে আলোচনা করে সংখ্যাটি দুইয়ে নামিয়ে এনেছিলেন – এরা ছিলেন আলী (রা) এবং উসমান (রা)। পরবর্তীতে জনগণের মতামত যাচাই-বাছাই এর পর উসমান (রা) দিকে পাল্লা ভারী হয় এবং উসমান (রা) মুসলিমদের খলীফা নিযুক্ত হন।

    আলী (রা) কে খলীফা হিসাবে নিযুক্ত করার ক্ষেত্রে সে সময় খলীফা পদের জন্য আর কেউ মনোনীত না হওয়ায় মদীনা ও কুফার অধিকাংশ মুসলিম তাঁকেই বাই’আত দেয়। আর, এভাবেই তিনি চতুর্থ খলীফা হিসাবে নিযুক্ত হন।

    যেহেতু উসমান (রা) কে খলীফা হিসাবে নিয়োগ করার ক্ষেত্রে (শরী’আহ্‌) অনুমোদিত সর্বোচ্চ সময়ের সবটুকুই নেয়া হয়েছিল; অর্থাৎ, তিনদিন ও এই দিনগুলোর মধ্যবর্তী দুই রাত এবং মনোনীত ব্যক্তিদের সংখ্যা ছয়জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে সংক্ষিপ্ত করে দুই ব্যক্তিতে নামিয়ে আনা হয়েছিল, সেহেতু গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে সঠিকভাবে বিষয়টি বোঝার জন্য আমরা বিস্তারিতভাবে এ ঘটনা সম্পর্কে আলোচনা করবো :

    ১. ২৩ হিজরীর জিলহজ্ব মাস শেষ হবার চারদিন আগে বুধবার ভোরে মিহরাবে নামাজে দাঁড়ানো অবস্থায় উমর (রা) কে ছুরিকাঘাত করা হয়। অভিশপ্ত আবু লু’লুয়া’র ছুরিকাঘাতে আহত হয়ে ২৪ হিজরীর মহররম মাসের প্রথমদিন রবিবার সকালে উমর (রা) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। উমর (রা) এর ইচ্ছা অনুসারে শুয়াইব (রা) তাঁর জানাযার নামাজ পড়ান।

    ২. উমর (রা) এর দাফনের পর, তাঁর পূর্ববর্তী নির্দেশ অনুসারে আল মিকদাদ (রা) উমরের মনোনীত ছয়ব্যক্তিকে একটি বাড়ীতে একত্রিত করেন; যাদের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব ছিল আবু তাল্‌হা’র উপর। এরপর, তাঁরা একে অন্যের সাথে আলোচনায় বসেন। পরবর্তীতে তাঁরা আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা) কে তাঁদের মধ্য হতে এবং তাঁদের সম্মতিক্রমে খলীফা নির্বাচিত করার ব্যাপারে প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত করেন।

    ৩. আব্দুর রহমান (রা.) তাঁদের সাথে একান্তে আলোচনা করেন এবং প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করলেন, “নিজেকে ছাড়া ছয়জনের মধ্যে আর কাকে তুমি এ পদের জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি বলে মনে কর?” তাঁদের উত্তর আলী (রা) এবং উসমানের (রা) মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়েছিল। এভাবে আব্দুর রহমান (রা) বিষয়টি ছয়ব্যক্তি থেকে বিষয়টি দুইব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করেন।

    ৪. এরপর আব্দুর রহমান (রা) মদীনার জনগণের সাথে আলোচনা করা শুরু করেন।

    ৫. বুধবার রাতে, অর্থাৎ (রবিবার) উমর (রা) ইন্তেকালের পর তৃতীয় দিন রাতে আব্দুর রহমান তাঁর ভাতিজা আল মুসওয়ার ইবনে মাখরামার বাড়িতে গেলেন। এ বিষয়ে ইবনে কাসীর তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াতে বর্ণনা করেছেন যে :

    “যখন উমরের মৃত্যুর পর চতুর্থ দিনের রাত শুরু হল আবদূর রহমান তাঁর ভাতিজা আল মুসওয়ার ইবনে মাখরামার বাড়িতে গেলেন এবং বললেন, “দেখতে পাচ্ছি তুমি ঘুমাচ্ছো, কিন্তু আল্লাহ্‌’র কসম! গত তিনরাত আমি খুব কমই ঘুমের আনন্দ উপভোগ করেছি।” তিনরাত মানে রবিবার সকালে উমর (রা.) মারা যাবার পরে অর্থাৎ, সোম, মঙ্গল ও বুধবারের রাত। তারপর তিনি বললেন, “…যাও আলী এবং উসমানকে ডেকে নিয়ে এসো..”, তারপর তিনি তাঁদেরকে (আলী ও উসমানকে) মসজিদে ডেকে নিয়ে আসলেন এবং জনসাধারণকে নামাজের জন্য ডাকা হলো। এটা ছিল বুধবার ভোরের ঘটনা। তারপর তিনি আলী (রা) এর হাত ধরলেন এবং তাঁকে আল্লাহ্‌’র কিতাব, রাসূল (সা) এর সুন্নাহ্‌ ও আবু বকর ও উমর (রা) এর কর্মের উপর বাই’আত করতে বললেন। আলী (রা) তাঁকে তার সেই বিখ্যাত উত্তরটি দিলেন, “আল্লাহ্‌’র কিতাব ও রাসূল (সা) এর সুন্নাহ্‌র উপর আমি বাই’আত নিলাম। কিন্তু, আবু বকর ও উমরের কর্মের বিষয়ে তিনি বললেন যে, এ সকল বিষয়ে তিনি তাঁর নিজস্ব ইজ্‌তিহাদ প্রয়োগ করবেন। এ কথা শুনার পর আব্দুর রহমান, আলীর হাত ছেড়ে দিলেন। এরপর, আব্দুর রহমান বিন আউফ, উসমান (রা) এর হাতটি ধরলেন ও তাঁকেও একই কথা বলতে বললেন। উসমান (রা) বললেন, ‘হ্যাঁ, আল্লাহ্‌’র নামে।’ এভাবে উসমান (রা) এর বাই’আত সম্পন্ন হল।

    শুয়াইব (রা) সেদিনের ফযর ও জোহরের নামাযে ইমামতি করলেন। এরপর, উসমান (রা) মুসলিম উম্মাহ্‌’র খলীফা হিসেবে আসর থেকে ইমামতি শুরু করলেন। এর অর্থ হচ্ছে, যদিও উসমান (রা) ফজরের সময় নিযুক্তির বাই’আত পেয়েছিলেন, কিন্তু মদীনার প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের বাই’আত পাবার পূর্ব পর্যন্ত মুসলিমদের আমীর হিসেবে শুয়াইব (রা) এর কর্তৃত্বই বহাল ছিল। প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের বাই’আত দেবার পর্ব শেষ হয়েছিল মূলতঃ আসরের কিছু আগে, যখন সাহাবারা উসমান (রা) কে বাই’আত দেয়ার ব্যাপারে একে অপরকে আহ্বান করছিলেন। আসরের কিছুকাল পূর্বে বাই’আত গ্রহণ পর্ব শেষ হয়ে যাবার সাথে সাথে আমীর হিসাবে শুয়াইব (রা) এর কার্যকালও শেষ হয়ে যায় এবং আসরের নামায থেকে উম্মাহ্‌’র খলীফা হিসাবে উসমান (রা) ইমামতি শুরু করেন।

    ‘আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থের রচয়িতা ব্যাখ্যা করেছেন, কেন উসমান (রা) ফজরের সময় বাই’আত নেয়া সত্ত্বেও শুয়াইব (রা) জোহরের নামাযে ইমামতি করেছিলেন। এ বিষয়ে তার ব্যাখ্যা হল: “কিছু মানুষ মসজিদে উসমানকে বাই’আত দেয়ার পর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় মাজলিশ আশ-শুরা ভবনে (যেখানে শুরা কমিটির লোকজন মিলিত হতেন)।

    সেখানে বাকীরা তাঁকে বাই’আত দেয়। এ ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে, জোহর নামায অতিক্রান্ত হবার পরও উসমানের বাই’আত গ্রহণ পর্ব চলছিল। আর, এ কারণেই মসজিদে নববীতে জোহরের নামাযে শুয়াইব (রা) ইমামতি করেছিলেন।

    সুতরাং, মুসলিম উম্মাহ্‌’র খলীফা হিসাবে উসমান (রা) প্রথম যে নামাযে ইমামতি করেছিলেন তা ছিল আসরের নামায।”

    বিভিন্ন বর্ণনা অনুসারে উমর (রা) ছুরিকাহত হওয়ার দিন, আহত হবার পর তাঁর ইন্তিকালের দিন এবং উসমান (রা) এর বাই’আতের দিনগুলোর ব্যাপারে কিছু মতপার্থক্য আছে। তবে, আমরা চেষ্টা করেছি দলীল-প্রমাণের দিক থেকে যেটি সবচাইতে শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য সেটি উপস্থাপন করতে।

    উপরোক্ত আলোচনা অনুসারে, (খলীফার ইন্তিকাল কিংবা অপসারণের মাধ্যমে) খলীফার পদ শূন্য হওয়ার পর নতুন খলীফা মনোনয়নের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়াবলীর প্রতি অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে :

    ১. খলীফা নিয়োগের কাজটি দিন-রাত ব্যাপী করতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত না এটি সম্পন্ন হয়।

    ২. খলীফা নিযুক্ত হবার আবশ্যিক শর্তাবলী পূরণের মাধ্যমে মনোনীতদের তালিকা করতে হবে এবং এ বিষয়টি মূলতঃ পরিচালিত হবে মাহ্‌কামাতুল মাযালিমের মাধ্যমে।

    ৩. তারপর মনোনীতদের তালিকা সংক্ষিপ্ত করা হবে দু’বার: প্রথমে ছয় এবং পরে দুই। উম্মাহ্‌’র প্রতিনিধি হিসাবে মজলিশ আল-উম্মাহ্‌ এই সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরীর কাজ করবে। এর কারণ হল, উম্মাহ্‌ উমর (রা) কে তাদের প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছিল এবং উম্মাহ্‌’র প্রতিনিধি হিসাবেই তিনি সম্ভাব্য ছয়জনের তালিকা প্রস্তুত করেছিলেন।

    পরবর্তীতে, মনোনীত এই ছয়জন তাঁদের মধ্য হতে একজনকে অর্থাৎ, আব্দুর রহমান বিন আউফকে তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেছিলেন। যিনি আবার আলোচনার ভিত্তিতে এই তালিকা সংক্ষিপ্ত করে তা দু’জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছিলেন। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি পর্যায়ে উম্মাহ্‌’র প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই বিষয়টি সম্পন্ন হয়েছে। সুতরাং, এটি উম্মাহ্‌’র প্রতিনিধিত্বকারী মজলিশ আল-উম্মাহ্‌’র কাজ।

    ৪. নতুন খলীফা নির্বাচনের ঘোষণার সাথে সাথে অন্তর্বর্তীকালীন আমীরের কার্যকাল শেষ হবে না; বরং বাই’আত গ্রহণ পর্ব পুরোপুরি সম্পন্ন হবার পর তার কার্যকাল শেষ হয়ে যাবে। কারণ, শুয়াইব (রা) এর কার্যকাল উসমান (রা) খলীফা নির্বাচিত হবার সাথে সাথে শেষ হয়নি; বরং বাই’আত গ্রহণ পর্ব সম্পন্ন হবার পরই তা শেষ হয়েছিল।

    তিন দিন এবং এদের অন্তর্বর্তী রাত সমূহের ভেতর কিভাবে নতুন খলীফা নির্বাচিত করা যায় সে ব্যাপারে একটি বিল পাশ করা হবে। অবশ্য এটি ইতিমধ্যে কার্যকর হয়ে গেছে। ইন্‌শাআল্লাহ্‌ আমরা যথা সময়ে এটি উম্মাহ্‌’র কাছে উপস্থাপন করবো।

    সুতরাং, মুসলিম উম্মাহ্‌’র যদি একজন খলীফা থাকে এবং কোন কারণে যদি তাকে অপসারণ করা হয় কিংবা তার মৃত্যু হয়, তবে এ সকল ক্ষেত্রে এ বিধানগুলো প্রযোজ্য হবে। কিন্তু পরিস্থিতি যদি এমন হয় যে, মুসলিম উম্মাহ্‌’র উপর কোন খলীফা কর্তৃত্বশীল অবস্থায় নেই, তবে সেক্ষেত্রে মুসলিমদের জন্য শারী’আহ্‌ আইন বাস্তবায়ন করা এবং বিশ্বব্যাপী ইসলামের দাওয়াতকে ছড়িয়ে দেবার জন্য তাদের উপর একজন খলীফা নিয়োগ করা বাধ্যতামূলক হবে; ১৩৪২ হিজরীর ২৮ রজব তারিখে (১৯২৪ সালে ৩ মার্চ) ইস্তাম্বুলে খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবার পর যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় মুসলিমদের প্রতিটি ভূমিই খলীফা নিয়োগ দেবার জন্য উপযুক্ত, যে খলীফার উপর খিলাফত রাষ্ট্রের গুরুভার অর্পণ করা হবে। সুতরাং, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে কোন একটি দেশের জনগণ যদি কাউকে খলীফা হিসেবে বাই’আত দেয় এবং তার উপর খিলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, তাহলে বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর উপর উক্ত খলীফাকে আনুগত্যের বাই’আত দেয়া ফরয হয়ে যাবে, অর্থাৎ তার শাসন-কর্তৃত্বকে পরিপূর্ণভাবে স্বীকার করে নিতে হবে। তবে, এটি শুধুমাত্র উক্ত খলীফাকে তার নিজ ভূমির জনগণ বাই’আতের মাধ্যমে তার উপর খিলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করার পরেই কার্যকরী হবে। যাই হোক, উক্ত রাষ্ট্রকে (যে রাষ্ট্রে খলীফা নিয়োগ করা হবে) নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ করতে হবে:

    ১. উক্ত রাষ্ট্রের শাসন-কর্তৃত্ব অবশ্যই মুসলিমদের হাতে থাকতে হবে। এ শাসন-কর্তৃত্ব কোন কাফির-মুশরিক
    রাষ্ট্র কিংবা শক্তির অধীনস্থ হতে পারবে না।

    ২. উক্ত রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ইসলামের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে অর্থাৎ দেশের আভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক নিরাপত্তা অন্য সবকিছু ব্যাতীত শুধুমাত্র ইসলামের নামে হতে হবে এবং তা ইসলামী (মুসলিম) সেনাবাহিনীর হাতে থাকতে হবে।

    ৩. উক্ত রাষ্ট্রে ইসলামকে তাৎক্ষণিক, পূর্ণাঙ্গ এবং মৌলিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ইসলামের দাওয়াতী কার্যক্রমের সাথে খলীফাকে যুক্ত থাকতে হবে।

    ৪. খলীফাকে অবশ্যই নিয়োগের সকল আবশ্যিক শর্ত পূরণ করতে হবে, যদিও পছন্দনীয় শর্তসমূহ (preferred condition) পূরণ না করলেও চলবে।

    যদি কোন রাষ্ট্র এ চারটি শর্ত পূরণ করতে সক্ষম হয় তাহলে শুধুমাত্র তাদের বাই’আতের মাধ্যমেই খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তাদের মাধ্যমেই খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজটি সম্পন্ন হবে। সেইসাথে, তাদের নির্বাচিত খলীফা হবেন উম্মাহ্‌’র বৈধ খলীফা এবং এ অবস্থায় তাকে ছাড়া অন্য কাউকে বাই’আত প্রদান করা শরী’আহ্‌ সম্মত হবে না।

    এরপর যদি অন্য কোন রাষ্ট্র কাউকে খলীফা হিসাবে বাই’আত দেয় তবে তা বাতিল বলে বিবেচিত হবে। কারণ রাসূল (সাঃ) বলেছেন,

    যদি দুই জন খলীফাকে বাই’আত দেয়া হয় তাহলে পরের জনকে হত্যা কর।” (সহীহ্‌ মুসলিম, হাদীস নং-১৮৫৩)

    প্রথমজনের বাই’আত সম্পূর্ণ কর, তারপরও প্রথমজনের।” (সহীহ্‌ বুখারী, হাদীস নং-৩৪৫৫)

    যে ব্যক্তি কোন ইমামকে বাই’আত প্রদান করল, সে যেন তাকে নিজ হাতের কর্তৃত্ব ও স্বীয় অন্তরের ফল (অর্থাৎ সব কিছু) দিয়ে দিল। এরপর তার উচিত উক্ত ইমামের আনুগত্য করা। যদি অন্য কেউ এসে (প্রথম নিযুক্ত) খলীফার সাথে (ক্ষমতার ব্যাপারে) বিবাদে লিপ্ত হয়, তাহলে দ্বিতীয় জনের গর্দান উড়িয়ে দাও।
    (সহীহ্‌ মুসলিম, হাদীস নং-১৮৪৪)

    বাই’আতের প্রক্রিয়া

    পূর্বের আলোচনায় আমরা খলীফা নিয়োগের ক্ষেত্রে বাই’আত-ই যে একমাত্র ইসলাম সম্মত প্রক্রিয়া সে ব্যাপারে দলীলপ্রমাণ উপস্থাপন করেছি। বাস্তবে বাই’আত প্রদান প্রক্রিয়াটি হাতে হাত মিলানো কিংবা লেখার মাধ্যমে সম্পন্ন হতে পারে।

    আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে দীনার থেকে বর্ণিত আছে যে, “যখন জনসাধারণ আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানকে খলীফা নির্বাচনের বিষয়ে সম্মত হল তখন আমি ইবনে উমরকে এটি লিখতে দেখেছি যে, ‘আমি এই মর্মে লিখছি যে, আল্লাহ্‌’র কিতাব, রাসূলের (সা) সুন্নাহ এবং আমার সাধ্যনুসারে আমি আমীর উল মু’মিনীন আবদুল মালিকের নির্দেশ শুনতে ও মানতে রাজী আছি।” অন্য যে উপায়েও বাই’আত দেয়া যেতে পারে।

    তবে, কেবলমাত্র প্রাপ্তবয়স্করাই বাই’আত দিতে পারবে। কারণ, অপ্রাপ্তবয়স্কদের বাই’আত গ্রহণযোগ্য নয়। আবু আকীল জাহ্‌রাহ ইবনে মা’বাদ তাঁর দাদা আবদুল্লাহ বিন হিশাম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, যিনি (ইবনে হিশাম) রাসূল (সা) এর সময় জীবিত ছিল। তাঁর মা যয়নাব ইবনাতু হামিদ তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে নিয়ে গেলেন এবং বললেন, ‘হে আল্লাহ্‌’র রাসূল! তাঁর কাছ থেকে বাই’আত গ্রহণ করুন।’ তখন রাসূল (সা) বললেন, ‘সে তো ছোট’। অতঃপর তিনি আবদুল্লাহ ইবনে হিশামের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং দোয়া করলেন। (সহীহ্‌ বুখারী, হাদীস নং-৭২১০)

    বাই’আতে উচ্চারিত শব্দ সমূহের ব্যাপারে কোন সীমাবদ্ধতা নেই; তবে খলীফা যে আল্লাহ্‌’র কিতাব এবং রাসূলের সুন্নাহ্‌ দ্বারা শাসন করবেন এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি থাকা উচিত এবং যে ব্যক্তি বাই’আত দেবে সে যে সুসময়ে ও দুঃসময়ে এবং ভাল-মন্দ উভয় অবস্থাতেই খলীফার আনুগত্য করবে তাও উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। উপরে উল্লেখিত বিষয়বস্তু অনুসারে বাই’আতে উচ্চারিত শব্দসমূহের ব্যাপারে পরবর্তীতে একটি আইন পাশ করা হবে।

    কোন ব্যক্তি যখন খলীফাকে বাই’আত দেবে তখন প্রদত্ত বাই’আত উক্ত ব্যক্তির উপর আমানত হয়ে যাবে এবং সে চাইলেই এ বাই’আত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারবে না। কারণ, খলীফা নিয়োগের ক্ষেত্রে বাই’আত প্রদান পর্যন্ত অন্যসব মুসলিমদের মতোই এটি তার অধিকার। কিন্তু, একবার বাই’আত প্রদান করলে সেখান থেকে হাত উঠিয়ে নেবার কোন অধিকার তার নেই। এমনকি সে চাইলেও তাকে অনুমতি দেয়া হবে না। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) থেকে আল বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, একজন বেদুইন রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) কে ইসলামের ব্যাপারে বাই’আত দিল। কিন্তু তারপর সে অসুস্থ হয়ে পড়ল। এরপর সে রাসূল (সা) এর কাছে গিয়ে বলল,

    “আমাকে বাই’আত থেকে মুক্ত করে দিন।’ তিনি (সা) তা করতে অস্বীকৃতি জানালেন। তারপর ঐ ব্যক্তি আবার আসল এবং একই দাবি করল কিন্তু রাসূল (সা) আবারও তাকে প্রত্যাখান করলেন। তারপর সে ব্যক্তি শহর ছেড়ে চলে গেল। [এ পরিপ্রেক্ষিতে] রাসূল (সা) বললেন, “এই শহর হচ্ছে কামারের জ্বলন্ত চুল্লীর মতো; এটি অপবিত্রতা ও অপরিচ্ছন্নতা থেকে নিজেকে মুক্ত করে এবং সেইসাথে, শ্বাশত সুন্দর ও সত্যকে আলোকদ্যুতির মতো বিচ্ছুরিত করে।”
    (সহীহ্‌ বুখারী, হাদীস নং-৭২০৯)

    এছাড়া, আব্দুল্লাহ্‌ বিন উমরের বরাত দিয়ে মুসলিম নাফিঈ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (ইবন উমর (রা) রাসূল (সা) কে বলতে শুনেছেন,

    ‘যে ব্যক্তি আনুগত্যের হাত সরিয়ে নিল, সে কিয়ামতের দিন এমনভাবে আল্লাহ্‌’র সাথে দেখা করবে যে তার পক্ষে কোন প্রমাণ থাকবে না।’ 
    (সহীহ্‌ মুসলিম, হাদীস নং-১৮৫১)

    বস্তুতঃ খলীফার বাই’আত থেকে হাত উঠিয়ে নেবার অর্থ হল আল্লাহ্‌’র আনুগত্য থেকে হাত সরিয়ে নেয়া। তবে, এটি শুধুমাত্র সে অবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে যখন খলীফাকে নিযুক্তির বাই’আত দেয়া হবে কিংবা মুসলিম উম্মাহ্‌ খলীফাকে পূর্ণ আনুগত্যের শপথ প্রদান করবে। তবে, কেউ যদি কোন ব্যক্তিকে প্রাথমিকভাবে খলীফা হিসাবে মনোনীত করে বাই’আত দেয়, কিন্তু উক্ত মনোনীত ব্যক্তি যদি মুসলিম উম্মাহ্‌ কর্তৃক নিযুক্তির বাই’আত না পায়, তবে এক্ষেত্রে বাই’আত দানকারী ব্যক্তি তার প্রদত্ত বাই’আত থেকে হাত সরিয়ে নিতে পারবে। কারণ, সে মুসলিম উম্মাহ্‌ কর্তৃক নিযুক্তির বাই’আত প্রাপ্ত হয়নি। মূলতঃ উপরোক্ত হাদীসটি (চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত) খলীফার আনুগত্য থেকে হাত সরিয়ে নেবার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে; এমন ব্যক্তির উপর থেকে নয় যিনি খলীফা হিসাবে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত বা নিযুক্ত হননি।

    খিলাফতের ঐক্য

    মুসলিমরা এক রাষ্ট্রে একজন শাসক দ্বারা শাসিত হতে বাধ্য। একের বেশী রাষ্ট্র থাকা এবং একাধিক শাসক দ্বারা শাসিত হওয়া অবৈধ। খিলাফত হল একটি ঐক্যের শাসন এবং এটি ফেডারেল পদ্ধতির শাসন নয়।

    হযরত আবদুলাহ্‌ বিন আমর বিন আ’স (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-আমি আল্লাহ্‌’র রাসূলকে (সা) বলতে শুনেছি যে,

    “যে ব্যক্তি কোন ইমামকে বাই’আত প্রদান করল, সে যেন তাকে নিজ হাতের কর্তৃত্ব ও স্বীয় অন্তরের ফল (অর্থাৎ সব কিছু) দিয়ে দিল। এর পর তার উচিৎ উক্ত ইমামের আনুগত্য করা। যদি অন্য কেউ এসে (প্রথম নিযুক্ত) খলীফার সাথে (ক্ষমতার ব্যপারে) বিবাদে লিপ্ত হয়, তাহলে দ্বিতীয় জনের গর্দান উড়িয়ে দাও।”
    (মুসলিম)

    ’আরফাযার রেওয়াতে ইমাম মুসলিম বর্ণণা করেন, তিনি রাসুল (সা) কে বলতে শুনেছেন,

    “যখন তোমরা এক ব্যক্তির নেতৃত্বের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ অবস্থায় থাকবে তখন কেউ যদি তোমাদের কর্তৃত্ব ও ঐক্যে ফাটল সৃষ্টি করার বাসনা নিয়ে আসে তবে তাকে হত্যা কর।”

    আবু সাঈদ খুদরী (রা) এর রেওয়াতে মুসলিম বর্ণণা করেন যে, তিনি রাসূল (সা) -কে বর্ণনা করতে শুনেছেন,

    “যদি দু’জনের জন্য খলীফা নিযুক্তির বাই’য়াত নেয়া হয় তাহলে পরের জনকে হত্যা কর।”

    আবু হাজিমের বরাত দিয়ে ইমাম মুসলিম আরও বর্ণনা করেন যে, আমি আবু হুরায়রার সাথে পাঁচ বছর অতিবাহিত করেছি এবং তাকে বলতে শুনেছি, রাসূল (সা) বলেন,

    “বনী ইসরাইলকে শাসন করতেন নবীগণ। যখন এক নবী মৃত্যুবরণ করতেন তখন তাঁর স্থলে অন্য নবী আসতেন, কিন্তু আমার পর আর কোনও নবী নেই। শীঘ্রই অনেক সংখ্যক খলীফা আসবেন। তাঁরা (রা) জিজ্ঞেস করলেন তখন আপনি আমাদের কী করতে আদেশ করেন? তিনি (সা) বললেন, তোমরা একজনের পর একজনের বাই’য়াত পূর্ণ করবে, তাদের হক আদায় করবে। অবশ্যই আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) তাদেরকে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের ব্যাপারে জবাবদিহি করবেন।”

    প্রথম হাদীস অনুসারে, যদি কাউকে ইমাম বা খলীফা নিযুক্ত করা হয় তবে তার আনুগত্য করতে হবে। এমতাবস্থায় কেউ যদি খলীফার কর্তৃত্বের ব্যাপারে বিবাদ করতে আসে তাহলে তার সাথে যুদ্ধ করতে হবে এবং তাকে হত্যা করতে হবে – যদি সে বিবাদ থেকে বিরত না হয়।

    দ্বিতীয় হাদীস অনুসারে, মুসলিমরা এক আমীরের অধীনে ঐক্যবদ্ধ থাকবে। এ অবস্থায় কোন ব্যক্তি যদি খলীফার কর্তৃত্বের এবং মুসলমানদের ঐক্যে ফাটল ধরাতে চায় তাহলে তাকে হত্যা করা বাধ্যতামূলক। দু’টি হাদীসই রাষ্ট্রের অখন্ডতা, রাষ্ট্রের নেতৃত্বের অভিন্নতার কথা বলেছে সেটা শক্তি প্রয়োগ করে হলেও।

    তৃতীয় হাদীস অনুসারে, খলীফার অনুপস্থিতি – সেটা মৃত্যুর কারণে কিংবা অপসারণ বা পদত্যাগের পর দু’জন খলীফাকে বাই’য়াত দেয়া হলে দ্বিতীয় জনকে হত্যা করবার কথা বলা হয়েছে। তার মানে হল প্রথম যাকে বাই’য়াত দেয়া হয় তিনিই খলীফা এবং দ্বিতীয় জনকে অবশ্যই হত্যা করতে হবে যদি না তিনি তাকে সে পদ থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। এর অর্থ হল রাষ্ট্রকে খন্ড খন্ড করা, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে বিভক্ত করা নিষিদ্ধ, এটা একটি অখন্ড রাষ্ট্র হবে।

    চতুর্থ হাদীস অনুসারে, রাসূল (সা) এর পর খলীফা আসবেন এবং তারা সংখ্যায় হবেন অনেক। তারপর সাহাবা (রা) যখন এ ব্যাপারে তাদের দায়িত্ব সর্ম্পকে জিজ্ঞেস করলেন তখন রাসূল (সা) বললেন, তাদেরকে (সাহাবাদেরকে) একজনের পর একজন খলীফার প্রতি নিযুক্তির বাই’য়াত সম্পন্ন করতে হবে এবং প্রত্যেক ক্ষেত্রেই প্রথমজনকে বৈধ খলীফা হিসেবে মেনে নিতে হবে। প্রথমজনের পরে যে বা যারা নিজেদের খলীফা হিসেবে বাই’য়াত গ্রহণ করবে, সেই বাই’য়াত বাতিল ও অবৈধ বলে পরিগণিত হবেন। এ হাদীস অনুসারে একজন খলীফার প্রতি আনুগত্য বাধ্যতামূলক। সুতরাং মুসলমানদের একের অধিক খলীফা থাকা এবং একাধিক রাষ্ট্র থাকা অনুমোদিত নয়।

    খলীফার নির্বাহী ক্ষমতাসমূহ

    খলীফা নিম্নলিখিত নির্বাহী ক্ষমতাসমূহ ভোগ করবেন:

    ক- তিনি উম্মাহ্‌’র বিষয়াবলী নিরসনের জন্য আহকামে শরী’আহ বা শরী’আহ আইন গ্রহণ করবেন-যেগুলো আল্লাহর কিতাব, রাসূল (সা) এর সুন্নাহ অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য ইজতিহাদের ভিত্তিতে উৎসারিত। সুতরাং এগুলো বাধ্যতামূলক আইন হবে এবং কেউ প্রত্যাখান করতে পারবে না।

    খ- তিনি আভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক নীতির জন্য দায়িত্বশীল হবেন; তিনি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হবেন এবং যে কোন যুদ্ধ ঘোষণা, শান্তি চুক্তি সম্পাদন, যুদ্ধ বিরতি চুক্তি ইত্যাদি বিভিন্ন চুক্তি সম্পাদনের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হবেন।

    গ- তার বিদেশী দূত গ্রহণ ও প্রত্যাখানের ক্ষমতা থাকবে এবং অন্য রাষ্ট্রে মুসলিম দূত প্রেরণ ও প্রত্যাহারে ক্ষমতাধিকারী হবেন।

    ঘ- খলীফা তার সহকারীগণ ও ওয়ালীগণকে নিয়োগ ও প্রত্যাহার করতে পারবেন। তারা সবাই খলীফা ও মজলিসে উম্মাহর কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।

    ঙ- খলীফা সর্বোচ্চ বিচারপতি (কাজী-উল-কুযাত – qadhi-ul-qudhat), অন্যান্য বিচারপতি নিয়োগ ও অপসারণ করতে পারবেন। শুধুমাত্র মাহকামাতুল মাজালিমকে তিনি নিয়োগ করতে পারবেন কিন্তু তাকে সরিয়ে দেবার ক্ষেত্রে খলীফার কিছু সীমাবদ্ধতা থাকবে যা বিচারব্যবস্থার অধ্যায়ে আলোচিত হবে। তিনি প্রশাসনিক বিভাগের ব্যবস্থাপক, সেনা কমান্ডার, চীফ অব স্টাফ, প্রধান সেনা কমান্ডারদেরকেও নিয়োগ দেবেন। তাদের সবার দায়বদ্ধতা খলীফার প্রতি, মজলিসে উম্মাহর প্রতি নয়।

    চ- তিনি শরী’আহ্‌র আলোকে রাষ্ট্রের বাজেট প্রণয়ন করবেন এবং বাজেটের খুটিনাটি, প্রত্যেক বিভাগে অর্থ বরাদ্দ সেটা আয় কিংবা ব্যয়ের ক্ষেত্রেই হোক না কেন সবই তাঁর এখতিয়ারধীন থাকবে।

    উপরে উল্লেখিত ছয়টি ভাগের বিশদ দলীলের ক্ষেত্রে:

    ‘ক’ অংশের ব্যাপারে সাহাবাগণের সাধারণ ঐকমত্য ছিল। কানুন (আইন) শব্দের অর্থ হল শাসকের আদেশ যা জনগন মেনে চলে, বিশেষজ্ঞগণের মতে, “The host of principles that the Sultan (ruler) compels people to follow in their relations.” অন্য কথায় যদি সুলতান কোন বিধি জারি করেন সেটাই মানুষের জন্য আইন হয়ে যায় এবং তাদেরকে এটা মেনে চলতে হয় এবং যদি সুলতান বিধিটি জারি না করেন তাহলে জনগন তা মেনে চলতে বাধ্য নয়। মুসলিমরা শারী’আহর বিধিসমূহ মেনে চলে অর্থাৎ তারা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বিধি নিষেধ মেনে চলে। তারা আল্লাহর আদেশ নিষেধ মেনে চলে, সুলতানের নয় অর্থাৎ সুলতানের নিজের আইন মুসলিমরা মানে না বরং শরী’আহ আইনই তাদের বিবেচ্য বিষয়। তবে সাহাবারা শরী’আহর বিধির ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করতেন। তারা সরাসরি ঐশী বাণী থেকে আইন বুঝতেন এবং বুঝার ভিন্নতার কারণে ভিন্নতা দেখা যেত। প্রত্যেকে তিনি যা বুঝতেন তার উপরই আমল করতেন এবং সেটাই তার পক্ষ থেকে শরী’আহ বলে পরিগনিত হত। তবে উম্মাহর বিভিন্ন বিষয়ের উপরে কিছু কিছু শরী’আহ নির্দেশনা রয়েছে যার ব্যাপারে একটি মতামত গ্রহণ করা উচিত এবং একাধিক ইজতিহাদ একই সময়ে চর্চা করা ঠিক নয়। এরকম অতীতে হয়েছিল। যেমন আবু বকর (রা) সব মুসলিমকে সমানভাবে অর্থ বরাদ্দ করতেন কেননা তিনি মনে করতেন এতে সকল মুসলমানের সমান অধিকার। কিন্তু উমর (রা) এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করতেন এবং যারা রাসূল (সা) এ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে এবং যারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে কিন্তু পরবর্তীতে মুসলমান হয়েছে তাদের একচোখে দেখতে আগ্রহী ছিলেন না। তাঁর উমর (রা) আর একটি যুক্তি ছিল যে, স্বচ্ছল আর অস্বচ্ছলদের একভাবে দেখাও ঠিক নয়। তবে যতদিন আবু বকর (রা) খলীফা ছিলেন ততদিন তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন এবং বিচারক, ওয়ালীগণ এমনকি ওমর (রা) সে অনুযায়ী বিচার ফায়সালা ও আইন বাস্তবায়ন করেছেন। তারপর ওমর (রা) যখন খলীফা হলেন তখন তিনি তাঁর মতামতকে প্রয়োগ করলেন এবং তার মতামত অনুযায়ী সম্পদ বণ্টন করলেন। অর্থাৎ মুসলিম হওয়ার সময়কাল এবং প্রয়োজনীয়তা অনুসারে সম্পদ বন্টিত হল। মুসলিমরা এভাবে আইন মেনে চলে এবং ওয়ালী ও বিচারকগণ তা বাস্তবায়ন করেন। সুতরাং এ ব্যাপারে সাহাবাদের মধ্যে ঐকমত্য ছিল যে, শাসকগণ বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে এভাবে আইন গ্রহণ করতে পারবেন এবং বাস্তবায়ন করতে পারবেন। মুসলিমদের সেক্ষেত্রে তাদের নিজেদের ইজতিহাদের সাথে সাংঘর্ষিক হলেও মেনে নিতে হবে এবং ঐ বিষয়ে নিজেদের ইজতিহাদ বর্জন করতে হবে। খলীফার ইজতিহাদই ছিল আইন (কানুন) এবং ইজতিহাকে আইনে রূপ দেয়ার ক্ষমতা অন্য কারো নয় কেবলমাত্র খলীফারই রয়েছে।

    ‘খ’ অংশের ব্যাপারে দলীল পাওয়া যায় রাসূল (সা) এর সুন্নাহ থেকে। তিনি (সা) ওয়ালী এবং বিচারক নিয়োগ করতেন এবং তাদের জবাবদিহি করতেন। তিনি (সা) বাজার তদারকি করতেন এবং প্রতারণা, ফটকাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেন। রাসূল (সা) লোকদের মধ্যে অর্থ বিতরণ করতেন এবং কর্মহীনদের কাজ পাবার ব্যাপারে সহায়তা দিতেন। তিনি রাষ্ট্রের সকল আভ্যন্তরীণ বিষয়াবলী দেখতেন।

    তিনি (সা) অন্য রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে চিঠি পাঠাতেন এবং বৈদেশিক কর্মকর্তা ও দূতদের সাথে বসতেন। তিনি রাষ্ট্রের সকল বৈদেশিক বিষয়গুলো দেখাশুনা করতেন।

    রাসূল (সা) যুদ্ধের সময় নেতৃত্ব দিতেন এবং নতুন এলাকা জয় করবার জন্য অভিযান চালানোর অনুমতি দিতেন এবং অভিযানের নেতৃত্ব ঠিক করে দিতেন। একটা সময়ে তিনি (সা) ওসামা বিন জায়েদ (রা) কে আশ শাম অঞ্চলে অভিযানের প্রধান হিসেবে পাঠালেন। ওসামা (রা) এর কম বয়সের কারণে সাহাবীরা এ ব্যাপারে অখুশী ছিলেন। কিন্তু রাসূল (সা) তাদের বাধ্য করেছিলেন ওসামার নেতৃত্ব মেনে নেবার জন্য। এটাই প্রমান করে তিনি (সা) কার্যকরভাবেই সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন কেবলমাত্র নামমাত্র প্রধান ছিলেন না।

    তিনি (সা) কুরাইশ, বানু কুরাইজা, বানু নাদির, বানু কায়নুকা, খায়বার এবং রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। এর অর্থ হল কেবলমাত্র খলীফার যুদ্ধ ঘোষণার অধিকার রয়েছে। তিনি (সা) বানু মাদলিজ এবং তাদের বন্ধু গোত্র বানু ধোমরার সাথে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। তিনি আয়লার (Ayla) প্রধান ইউহানা বিন রু’বার সাথে চুক্তি করেন এবং হুদাইবিয়ার সন্ধিতেও স্বাক্ষর করেন। মুসলিমরা এক্ষেত্রে অসন্তুষ্ট থাকলেও তিনি (সা) তাদের আপত্তি অগ্রাহ্য করেন এবং চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এটাই প্রমাণ করে কেবলমাত্র খলীফার চুক্তি স্বাক্ষরের নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে -সেটা শান্তি চুক্তি বা অন্য কোন চুক্তিই হোক।

    ‘গ’ অংশের ক্ষেত্রে প্রমাণ হল যে, রাসূল (সা) নিজে মুসায়লামার দুইজন দূতকে গ্রহণ করেন এবং কুরাইশদের প্রতিনিধি আবু রাফির সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি হিরাক্লিয়াস, খসরু, আল মুকাওকিস, আল হারিস আল গাসানী এবং আল হেরার রাজা, আল হারিদ আল হিমিয়ারী, ইয়েমেনের রাজা, আবিসিনিয়ার নিগাসের কাছে দূত পাঠান এবং উসমান বিন আফফানকে হুদাইবিয়ার ব্যপারে কুরাইশদের কাছে প্রেরণ করেছিলেন। এটাই প্রমাণ করে খলীফা বিদেশী দূত গ্রহণ ও প্রত্যাখানের ক্ষমতা রাখেন এবং অন্য রাষ্ট্রে মুসলিম দূত প্রেরণ ও প্রত্যাহারের ক্ষমতা রাখেন।

    ‘ঘ’ অংশের জন্য প্রমাণ হচ্ছে রাসূল (সা) নিজে ওয়ালীদের নিয়োগ দিতেন, যেমন: তিনি মু’য়াজ (রা) কে ইয়েমেনের ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন। তিনি তাদের পদচ্যুতও করতেন যেমন: লোকজন অভিযোগ করায় আল আলা বিন আল হাদরামীকে বাহরাইনের ওয়ালীর পদ থেকে বরখাস্ত করেন। এর অর্থ হল ওয়ালীদের জবাবদিহিতা জনগণ, খলীফা এবং মজলিসে উম্মাহের প্রতি- যেহেতু সব ওলাইয়ার প্রতিনিধিত্ব এখানে রয়েছে।

    খলীফার সহকারীর ক্ষেত্রে রাসুল (সা) এর দুইজন সহরকারী ছিলেন, আবু বকর (রা) এবং উমর (রা)। তাঁর (সা) এর জীবদ্দশায় এই দুইজনকে পদচ্যূতও করা হয়নি এবং অন্য কাউকে তাদের স্থলাভিষিক্তও করা হয়নি। সহকারীগণ খলীফার কাছ থেকে কর্তৃত্ব লাভ করেন এবং খলীফাকে তার সহকারীর দক্ষতার উপর নির্ভর করতে হয়-সেকারণে খলীফার অধিকার রয়েছে সহকারীকে পদচ্যুত করবার। এটা অনেকটা প্রতিনিধিত্বের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। একজন ব্যক্তি তার প্রতিনিধিকে বরখাস্ত করতেই পারে।

    ‘ঙ’ অংশের জন্য প্রমাণ হিসেবে বলা যায়, রাসূল (সা) আলী (রা) কে ইয়েমেনের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

    আহমাদ থেকে বর্ণিত, আমরু বিন আল আস (রা) বলেন, ‘দুই জন লোক তাদের মধ্যকার বিবাদের কারণে ন্যায়বিচারের জন্য রাসূল (সা) এর কাছে আসলেন। তারপর তিনি (সা) আমাকে বললেন, ”হে আমরু, তাদের মধ্যে ফায়সালা কর।” আমি বললাম, ‘আপনিই এর জন্য ভাল ও যোগ্যতর।’ তিনি (সা) বললেন, ‘তারপরেও’। অতপর আমি বললাম, ‘আমি বিচার করলে কি পাব?’ তিনি (সা) বললেন,”তুমি যদি বিচার কর এবং তা যদি সঠিক হয় তাহলে তুমি দশ নেকী পাবে এবং যদি তুমি ভুল কর তাহলে এক নেকী পাবে।

    উমর (রা) বিচারক নিয়োগ ও বরখাস্ত করতেন। তিনি শারীই’কে কুফার বিচারক নিয়োগ করেন এবং আবু মুসাকে বসরার বিচারক নিয়োগ করেন। তিনি শুরাহবিল বিন হাসনাকে আশ শামের ওয়ালীর পদ থেকে সরিয়ে সেখানে মুয়া’বিয়া (রা)কে স্থলাভিষিক্ত করেন। শুরাহবিল উমরকে বললেন, ‘আমাকে কি আনুগত্যহীনতা কিংবা রাষ্ট্রদ্রোহিতার কারণে অপসারণ করা হয়েছে?’ ওমর প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘না, কিন্তু আমি আরও শক্তিশালী কাউকে চাচ্ছিলাম।’ আলী (রা) ও একসময় আবু আল আসওয়াদকে নিয়োগ দেন এবং পরর্বীতে সরিয়ে নেন। আবু আল আসওয়াদ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কেন আমাকে অপসারণ করলেন? আমি প্রতারণা করিনি এবং কোন অপরাধ করিনি। আলী বললেন, ‘আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি বিবাদী লোকদের চেয়ে উচ্চস্বরে কথা বলছ।’ ওমর এবং আলী অন্যান্য সাহাবাদের সম্মুখেই এরকম করতেন এবং তারা এ কাজকে অগ্রহণযোগ্য মনে করেননি বা নিন্দা করেননি। এর অর্থ হল নীতিগতভাবে খলীফা বিচারক

    নিয়োগের অধিকার সংরক্ষণ করেন এবং ইচ্ছে করলে তিনি কাউকে এ নিয়োগ প্রদানের ব্যাপারে প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব দিতে পারবেন। এটা প্রতিনিধিত্বের অনুরূপ। তিনি যে কাউকে তার নির্বাহী ক্ষমতাসমূহ চর্চার জন্য সহকারী হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন।

    খলীফা, তার সহকারী ও প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে মাহকামাত আল মাজালিমের আদালতে চলমান মামলার সময় মাহকামাত আল মাজালিমের বিচারককে অপসারণ করা যাবে না। শরীয়ার মূলনীতি অনুসারে, ‘হারাম করবার সকল উপকরণই হারাম’। যদি খলীফাকে সেসময় মাজালিমের বিচারককে বরখাস্ত করবার অধিকার দেয়া হয় তাহলে বিচারককে প্রভাবিত করবার ক্ষমতা তিনি পেয়ে যান, অর্থাৎ তিনি শারী’আহর আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারবেন এবং এটা হারাম। সেকারণে এই বিষয়ে মাজালিমের বিচারককে বরখাস্ত করবার ব্যাপারে খলীফার কর্তৃত্ব একটি হারামের উপকরণ। তাই এ সময় মাজালিমের বিচারককে বরখাস্ত করবার ক্ষমতা রয়েছে মাহকামাত আল মাজালিমের। এটা ছাড়া অন্য সবক্ষেত্রে হুকুম আগের মতই অর্থাৎ খলীফা মাজালিমের বিচারক নিয়োগ ও বরখাস্ত করতে পারবেন।

    রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিভাগের পরিচালকের ক্ষেত্রে, রাসূল (সা) নিজে বিভিন্ন বিভাগের সচিবদের নিয়োগ দিতেন। তারাই বিভিন্ন বিভাগের পরিচালক হিসেবে বিবেচিত হতেন। তিনি (সা) আল মুয়েকীব বিন আবি ফাতিমা আদ দুসিকে অফিসিয়াল সীলমোহর ও গনীমতের মালের দায়িত্ব দেন। হিজাজ অঞ্চলের ফসলের উপর কর নির্ধারণের জন্য হুযাইফা বিন ইয়ামান (রা) কে এবং জুবায়ের বিন আল আওমকে সাদাকার কোষাগারের দায়িত্ব দেন। তিনি (সা) আল মুগীরা বিন শুভাকে ঋণ লিপিবদ্ধকরণ এবং বিভিন্ন হিসাবাদির দায়িত্ব দেন।

    সেনা কমান্ডার এবং প্রধান কমান্ডার নিয়োগের ক্ষেত্রে, রাসূল (সা) হামজা বিন আবদুল মুত্তালিবকে সমুদ্রতীরে কুরাইশদের সাথে সংঘাতের জন্য ত্রিশটি অশ্বারোহী দলের কমান্ডার পদে এবং কুরাইশদের সাথে রাবিগের ওয়াযিতে যুদ্ধের জন্য মুহাম্মদ বিন উবাইদা বিন হারিসকে ষাটজন যোদ্ধার কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেন। সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাসকে বিশজন যোদ্ধার কমান্ডার হিসেবে মক্কার দিকে প্রেরণ করেন। এর অর্থ তিনি (সা) সেনাবাহিনীর কমান্ডারদের নিয়োগ দিতেন অর্থাৎ খলীফা সেনাবাহিনীর কমান্ডার ও সেনাপ্রধানকে নিয়োগ দিয়ে থাকেন।

    উল্লেখিত পদসমূহে নিযুক্ত ব্যক্তিরা শুধুমাত্র রাসূল (সা) এর কাছে জবাবদিহী করতেন, আর কারো কাছে নয়। এটাই প্রমাণ করে খলীফা বিচারক, প্রশাসনিক বিভাগের ব্যবস্থাপক, সেনা কমান্ডার, চীফ অব স্টাফ, এবং বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা খলীফার প্রতি, মজলিসে উম্মাহর প্রতি নয়। কেবলমাত্র খলীফার প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীগণ, ওয়ালী ও আমীলগণ মজলিসে উম্মাহর কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন কেননা তারা হচ্ছেন শাসক পদে নিযুক্ত। তাদের ছাড়া আর কেউই মজলিসে উম্মাহর কাছে দায়বদ্ধ নন, বরং বাকি সবাই খলীফার কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।

    ‘চ’ অংশের জন্য, রাষ্ট্রীয় বাজেটে আয় এবং ব্যয় পুরোপরি শারী’আহ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। শারী’আহর হুকুম ছাড়া এক ফুটো পয়সাও কর ধার্য করা যাবে না এবং ব্যয় করা যাবে না। ব্যয়ের বিস্তারিত অর্থাৎ যাকে বাজেটীয় অংশ বলে এ ব্যাপারে খলীফার সিদ্ধান্তই শেষ কথা- যা তিনি ইজতিহাদের মাধ্যমে গ্রহণ করবেন। একই কথা আয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

    উদাহরনস্বরুপ কেবলমাত্র খলীফাই খারাজ, জিযিয়া এবং অন্যান্য করের পরিমাণ ধার্য করবেন। রাস্তাঘাট নির্মাণ বা সংস্কার, হাসপাতাল তৈরী করা এবং অন্যান্য সকল ব্যয়ের ক্ষেত্রে খলীফার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এ ব্যাপারে তিনি তার মতামত বা ইজতিহাদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।

    রাসূল (সা) আমিল’দের কাছ থেকে রাজস্ব গ্রহণ করতেন এবং তা ব্যয় করতেন। মাঝে মাঝে তিনি ওয়ালীগণদের অর্থ গ্রহণ ও খরচ করবার কর্তৃত্ব দিতেন। এরকম হয়েছিল রাসূল (সা) যখন মুয়াজকে ইয়েমেনে পাঠিয়েছিলেন। পরবর্তীতে খোলাফায়ে রাশেদীনগণ এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখেন। তারাও নিজ নিজ মতামত ও ইজতিহাদ ব্যবহার করে রাজস্ব আদায় করতেন এবং ব্যয় করতেন। কোন সাহাবা এ ব্যাপারে কখনওই দ্বিমত করেন নি বা খলীফার মতামত ছাড়া একটি ফুটো পয়সাও খরচ করেননি। যখন উমর (রা) মুয়াবিয়া কে ওয়ালী হিসেবে একটি উলাই’য়াহ্‌তে নিয়োগ দেন তখন তিনি তাকে অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয়ের সাধারণ অধিকার প্রদান করেন। এর অর্থ হল খলীফা বাজেটের বিভিন্ন অংশের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন অথবা তার পক্ষ থেকে কেউ এ ব্যাপারে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

    এগুলোই হল খলীফার নির্বাহী ক্ষমতার বিস্তারিত আলোচনা এবং এটি নিশ্চিত হওয়া যায় আহমাদ এবং আল বুখারী বর্ণিত হাদীস থেকে যা নেয়া হয়েছে আবদুল্লাহ বিন উমর থেকে যিনি রাসূল (সা) কে বলতে শুনেছেন: ”ইমাম হলেন অভিভাবক এবং তিনি তার প্রজাদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।”

    এর অর্থ হল প্রজাদের সব বিষয়ে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব খলীফার এবং তিনি যে কাউকে যে কোন দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করতে পারেন। তার এ ক্ষমতার ব্যাপারে ওয়াকালা’র (representation – প্রতিনিধিত্ব) হুকুম প্রযোজ্য, অর্থাৎ তিনি যে কাউকে তার নির্বাহী ক্ষমতাসমূহ চর্চার জন্য প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন।

    খলীফা শরী’আহ্‌ বিধান দিয়ে আইন গ্রহণে বাধ্য

    খলীফা তার আইন গ্রহণের ক্ষমতার (power of adopting laws) ক্ষেত্রে শরী’আহ বিধান অনুসরণ করতে বাধ্য। তার এমন কোন আইন গ্রহণ করার অধিকার নেই যার কোন শরী’আহ দলীল নেই। এছাড়া, তিনি যে সব শরী’আহ বিধিবিধান অনুসরণ করবেন এবং (নিজস্ব কিংবা অন্য কারও) ইজতিহাদের যে পদ্ধতি অনুসরণ করবেন তা দিয়েও আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা।

    সুতরাং, এমন কোন আইন গ্রহণ করা তার জন্য নিষিদ্ধ, যা তার অনুসৃত ইজতিহাদের পদ্ধতির সাথে সাংঘর্ষিক।

    একইসাথে, এমন কোন আইনকানুন জারি করাও তার জন্য নিষিদ্ধ, যা তার অনুসৃত আইনের সাথে সাংঘর্ষিক। সুতরাং, আইন গ্রহণের ক্ষমতার ক্ষেত্রে খলীফার সীমাবদ্ধতা দু’টি।

    খলীফার প্রথম সীমাবদ্ধতা অর্থাৎ, আইন গ্রহণের ক্ষেত্রে খলীফা যে শরী’আহ্‌ বিধান অনুসরণ করতে বাধ্য – এ ব্যাপারে শরী’আহ্‌ দলীল নিম্নরূপ:

    ১. আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা খলীফা সহ প্রতিটি মুসলিমকে তাদের সকল কাজের ক্ষেত্রে ঐশী বিধান (শরী’আহ্‌) মেনে চলা বাধ্যতামূলক করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    ‘কিন্তু না, তোমার রবের শপথ! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা তাদের পারস্পরিক বিবাদ-বিসম্ববাদের বিষয় সমূহে তোমাকে বিচারক হিসেবে মেনে নেয়।’
    [সূরা নিসা : ৬৫]

    আইনপ্রণেতার (আল্লাহ্‌’র) বাণী বোঝার ক্ষেত্রে যদি কোনপ্রকার মতভেদের সৃষ্টি হয় (অর্থাৎ, কোন আয়াতের যদি একাধিক ব্যাখ্যা থাকে) তবে সেক্ষেত্রে, মুসলিমরা একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট শারী’আহ্‌ আইন অনুসরণ করতে বাধ্য। সুতরাং, (একই বিষয়ের জন্য অনুমোদিত) বিভিন্ন শরী’আহ্‌ আইন থেকে একটি নির্দিষ্ট আইনকে নিজের জন্য গ্রহণ করতে মুসলিমরা বাধ্য, যখন তারা উক্ত কাজটি সম্পাদন করতে চায় বা বিধানটি প্রয়োগ করতে চায়। এ নিয়মটি একইভাবে খলীফার কার্যসম্পাদনের জন্যও প্রযোজ্য; অর্থাৎ, যখন তিনি শাসনকার্য সম্পাদন করতে চান তখন এ বিধানটি সমভাবে তার উপরও প্রযোজ্য হবে। (অর্থাৎ, তাকেও এক্ষেত্রে কোন নির্দিষ্ট শরী’আহ্‌ আইন অনুসরণ করতে হবে।)

    ২. বাই’আতের শপথে উচ্চারিত শব্দসমূহ ও খলীফাকে শরী’আহ আইন-কানুন দ্বারা শাসন করতে বাধ্য করে, কেননা খলীফা আল্লাহ্‌’র কিতাব ও রাসূল ( ﷺ) এর সুন্নাহ্‌’র ভিত্তিতেই বাই’আত প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। সুতরাং, এ শপথ ভঙ্গ করা তার জন্য আইনত নিষিদ্ধ এবং যদি তিনি সজ্ঞানে ও দৃঢ়তার সাথে তা করে থাকেন তবে তা কুফরী হিসাবে বিবেচিত হবে।

    কিন্তু, তিনি যদি দৃঢ়তার সাথে তা না করে থাকেন, তাহলে সেক্ষেত্রে তিনি অবাধ্য, পথভ্রষ্ট এবং বিদ্রোহী বলে বিবেচিত হবেন।

    ৩. বস্তুতঃ খলীফাকে শাসক হিসাবে নিয়োগ দেয়াই হয় হুকুম-শারী’আহ্‌ বাস্তবায়ন করার জন্য, সেকারণে মুসলিমদের শাসনের ক্ষেত্রে শারী’আহ্‌ আইন-কানুন ছাড়া অন্য কোনকিছু বিবেচনায় আনা তার জন্য নিষিদ্ধ। কারণ, হুকুম-শারী’আহ্‌ নিজেই একে অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে। যে ব্যক্তি হুকুম শারী’আহ্‌ ছাড়া অন্য কোন কিছু দিয়ে শাসন করবে, প্রকৃতঅর্থে সে তার ঈমানকেই ক্ষতিগ্রস্থ করবে। আর, এটা হচ্ছে এমন একটি বিষয় যে ব্যাপারে অকাট্য শারী’আহ্‌ দলীল রয়েছে।

    সুতরাং, খলীফা কেবলমাত্র হুকুম শরী’আহ্‌’র ভিত্তিতেই আইন গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে পারবেন এবং এ ব্যাপারে তিনি দায়বদ্ধ। এছাড়া, তিনি যদি দৃঢ়তার সাথে জেনেশুনে শরী’আহ ছাড়া অন্য কোনকিছুর ভিত্তিতে আইন গ্রহণ করেন তাহলে তা প্রকাশ্য কুফরী হিসাবে বিবেচিত হবে। আর, তিনি যদি শারী’আহ্‌ বহির্ভূত ভিত্তিতে বিশ্বাস না করে তা বাস্তবায়ন করেন, তাহলে তিনি অবাধ্য, পথভ্রষ্ট এবং বিদ্রোহী হিসেবে বিবেচিত হবেন।

    আর, খলীফার দ্বিতীয় সীমাবদ্ধতার ব্যাপারে বলা যায় যে, খলীফা যে সমস্ত শারী’আহ্‌ বিধি-বিধান অনুসরণ করবেন এবং ইজতিহাদের যে পদ্ধতি অনুসরণ করবেন, তা দিয়েই তার কার্যাবলী সীমাবদ্ধ থাকবে। এ ব্যাপারে শরী’আহ্‌ দলিল হল, তিনি যে শারী’আহ্‌ আইন বাস্তবায়ন করবেন, ঐ আইনের ব্যাপারে তারই দ্বায়বদ্ধতা থাকবে, অন্য কারো নয়। অন্যভাবে বললে বলা যায় যে, খলীফা তার কার্যাবলী সম্পাদন করার জন্য ঐ নির্দিষ্ট শরী’আহ্‌ আইনটিই গ্রহণ করেছেন, যে কোন আইন গ্রহণ করেননি; তাই এ আইনের ব্যাপারে তার নিজস্ব দ্বায়বদ্ধতা রয়েছে। অর্থাৎ, খলীফা যদি কোন বিষয়ে নিজস্ব ইজতিহাদের মাধ্যমে কোন আইন গ্রহণ করেন কিংবা কোন মুজতাহিদের ইজতিহাদ অনুসরণ করেন, তবে উক্ত বিষয়ের ক্ষেত্রে ঐ নির্দিষ্ট বিধানটি তার জন্য আল্লাহ্‌’র বিধান হিসাবে বিবেচিত হবে। তাই, মুসলিমদের জন্যও তাকে ঐ আইন গ্রহণ করতে হবে। অন্য কোন আইন গ্রহণ করা তার জন্য নিষিদ্ধ হবে কারণ, অন্য কোন আইনের ব্যাপারে তার কোন শরী’আহ্‌ দ্বায়বদ্ধতা নেই অর্থাৎ, এটি তার জন্য আল্লাহ্‌’র বিধান হিসাবে বিবেচিত নয় তাই, একইভাবে এটি মুসলিমদের জন্যও শারী’আহ্‌ বিধান বলে বিবেচিত হবে না। সুতরাং, জনগণকে শাসন করার ক্ষেত্রে তার গ্রহণকৃত শারী’আহ আইন সমূহের মাধ্যমেই তাকে বিধিবিধান জারি করতে হবে। তিনি এমন কোন আইন বা বিধি-বিধান জারি করতে পারবেন না যা তার অনুসৃত শরী’আহ্‌ আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হয়। কারণ, যদি তিনি তা করেন অর্থাৎ, তার গ্রহণকৃত শরী’আহ্‌ আইনের সাথে সাংঘর্ষিক অন্য কোন (শরী’আহ্‌) আইনের মাধ্যমে তিনি যদি কোন বিধান জারি করেন, তবে এক্ষেত্রে তা হুকুম-শারী’আহ্‌’র সাথে সাংঘর্ষিক বলেই বিবেচিত হবে।

    ইসতিনবাত বা ইজতিহাদের পদ্ধতির ভিন্নতার কারণেও শরী’আহ্‌’র হুকুম বোঝা বা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে ভিন্নতা সৃষ্টি হয়।

    উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, খলীফা যদি আইনপ্রণেতার বাণী থেকে উৎসারিত ইল্লাহ্‌কে’ই (কোন হুকুম প্রণয়নের কারণ, effective legal cause of a rule) শরী’আহ্‌ সঙ্গত ইল্লাহ্‌ বলে মনে করেন এবং সেইসাথে, তিনি লাভ-ক্ষতিকে (মাসলাহা) শারী’আহ সঙ্গত ইল্লাহ্‌ কিংবা মাসালিহ্‌ মুরসালাকে (অসংজ্ঞায়িত পার্থিব লাভ-ক্ষতি) শারী’আহ সঙ্গত দলীলপ্রমাণ হিসেবে বিবেচনা না করেন, তাহলে এটাই তার জন্য ইসতিনবাতের পদ্ধতি হিসাবে বিবেচিত হবে। কারণ, এ পদ্ধতিই তিনি নিজের জন্য গ্রহণ করেছেন। এক্ষেত্রে, তার গৃহীত বিধি-বিধান এই নীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে এবং তিনি এমন কোন আইন গ্রহণ করতে পারবেন না যার দলীল-প্রমাণ মাসালিহ্‌ মুরসালাহ্‌’র উপর প্রতিষ্ঠিত; কিংবা, এমন কোন ক্বিয়াস গ্রহণ করতে পারবেন না যার ইল্লাহ্‌ আল্লাহ্‌’র বাণী থেকে উৎসারিত হয়নি। এই ধরনের শরী’আহ্‌ আইন তার জন্য আল্লাহ্‌’র বিধান হিসাবে বিবেচিত হবে না এবং এ আইনকানুনের ব্যাপারে তার কোনপ্রকার দ্বায়বদ্ধতাও থাকবে না; কেননা তিনি এ সমস্ত বিধিবিধানের উৎসকে শারী’আহ্‌ সঙ্গত উৎস বলে বিবেচনা করেননি। সুতরাং, তার দৃষ্টিকোন থেকে এগুলো শারী’আহ্‌ আইন হিসাবে বিবেচিত হবে না। আর, যেহেতু এটি খলীফার জন্য শারী’আহ্‌ আইন হিসাবে গ্রহণযোগ্য হবে না, সুতরাং একইভাবে এটি মুসলিমদের জন্যও শারী’আহ্‌ আইন হিসাবে গ্রহণযোগ্য হবে না।

    তিনি যদি (তার গৃহীত ভিত্তি ছাড়া) অন্য কোন ভিত্তির উপর আইনকানুন গ্রহণ করেন, তাহলে বিষয়টি এমন হবে যেন তিনি শরী’আহ্‌ ব্যতীত অন্যকিছুকে ভিত্তি করে আইন গ্রহণ করলেন, যা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।

    আর, খলীফা যদি মুকাল্লিদ (অনুকারক) হন অথবা মুজতাহিদ ফী মাসা’লা হন অর্থাৎ একটি মাত্র বিষয়ের উপর তিনি ইজতিহাদ করে থাকেন; কিংবা তার যদি নিজস্ব কোন ইসতিনবাতের পদ্ধতি না থাকে, এ সমস্ত ক্ষেত্রে যে কোন শরী’আহ্‌ আইন গ্রহণ করার অধিকার তার রয়েছে, তার দলীল যাই হোক না কেন। যতক্ষণ পর্যন্ত তার গ্রহণকৃত আইনকানুনের শারী’আহ সঙ্গত দলীল-প্রমাণ থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত যে কোন বিধিবিধান গ্রহণের ক্ষেত্রে তার কোনপ্রকার সীমাবদ্ধতা থাকবে না। শুধুমাত্র কোন বিষয়ে নির্দেশ প্রদানের ক্ষেত্রেই তার সীমাবদ্ধতা থাকবে; কারণ তাকে তার গৃহীত বিধিবিধানের ভিত্তিতেই নির্দেশ প্রদান করতে হবে, অন্যকোন বিধানের উপর ভিত্তি করে নয়।

    খিলাফত কোন যাজকতান্ত্রিক বা মোল্লাতান্ত্রিক (theocratic) রাষ্ট্র নয়

    ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাই হচ্ছে খিলাফত রাষ্ট্র। সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদের জন্য এটি হচ্ছে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব। সুতরাং, যদি কোন মুসলিম রাষ্ট্রে একজন খলীফাকে বৈধভাবে বাই’আত দেয়া হয় এবং পৃথিবীর কোন স্থানে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তখন বিশ্বের সকল মুসলিমদের জন্য আরেকটি খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। কারণ রাসূল (সা) বলেছেন,

    যদি দুইজন খলীফার জন্য বাই’আত নেয়া হয়, তবে দ্বিতীয় জনকে হত্যা কর।
    (সহীহ্‌ মুসলিম, হাদীস নং-১৮৫৩)

    বস্তুতঃ ইসলামী ধ্যান-ধারণার ভিত্তিতে শারী’আহ্ আইনকানুন ও বিধিবিধান সমূহ বাস্তবায়ন করা এবং সেইসাথে, ইসলামের আহবানকে সমগ্র বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত করার লক্ষ্যেই খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ইসলামী ধ্যান-ধারণার সাথে মানুষকে পরিচিত করিয়ে, তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের দিকে আহ্বান করে এবং সেইসাথে, আল্লাহ্‌’র রাস্তায় জিহাদের মাধ্যমেই ইসলামের সুমহান বাণীকে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। খিলাফতকে আবার ইমামাহ্‌ বা ইমারাতুল মু’মিনীনও (বিশ্বাসীদের নেতৃত্ব) বলা হয়। এটি ক্ষণস্থায়ী এ দুনিয়ার অস্থায়ী একটি পদ, পরকালের সাথে এ পদ সম্পর্কিত নয়।

    মানুষের মাঝে ইসলামকে বাস্তবায়ন করা এবং ইসলামের দাওয়াতকে বিস্তৃত করার জন্যই খিলাফত রাষ্ট্রের প্রয়োজন। তাই, এটি অবশ্যই নব্যুয়তের চেয়ে আলাদা। নব্যুয়ত হল একটি ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক পদ। এটি আল্লাহ্‌ যাকে ইচ্ছা তাকে দান করেন। অপরদিকে খিলাফত হল একটি মানবীয় পদ; যেখানে মুসলিমরা যাকে ইচ্ছা তাকে বাই’আত দিতে পারে এবং মুসলিমদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা তাকে নির্বাচিত করে খলীফা হিসাবে নিযুক্ত করতে পারে। আমাদের নবী মুহম্মদ (সা) একজন শাসক ছিলেন যিনি আল্লাহ্‌ প্রদত্ত শারী’আহ্‌’কে বাস্তবায়ন করেছিলেন।

    সুতরাং, একদিকে তিনি যেমন নবী ও আল্লাহ্‌’র রাসূল ছিলেন, সেইসাথে তিনি (সা) আল্লাহ্‌’র বিধানকে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মুসলিমদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এভাবে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁকে রিসালাতের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শাসনকার্য পরিচালনা করারও দায়িত্ব দিয়েছিলেন।তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন:

    “এবং তাদের মধ্যে ফায়সালা করুন যা আল্লাহ্‌ অবতীর্ণ করেছেন তা দিয়ে” 
    [সূরা মায়িদাহ্‌: ৪৯]

    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন:

    “আমরা এই কিতাব পূর্ণ সত্যতা সহকারে তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যেন আল্লাহ্‌ তোমাকে যে সত্য পথ দেখিয়েছেন, সে অনুসারে মানুষের মাঝে তুমি বিচার-ফায়সালা করতে পার”। 
    [সূরা নিসা : ১০৫]

    আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,

    “হে রাসূল, তোমার রবের পক্ষ হতে তোমার প্রতি যা কিছু নাযিল করা হয়েছে, তা লোকদের নিকট পৌছিয়ে দাও।”
    [সূরা মায়িদাহ্‌: ৬৭]

    “আর এ কুর’আন আমার নিকট ওহীর মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়েছে; যেন আমি তোমাদের ও যাদের নিকট এটা পৌঁছাবে তাদের সকলকে সতর্ক ও সাবধান করে দেই।” 
    [সূরা আনআম: ১৯]

    হে কম্বল আবৃতকারী! উঠো এবং সতর্ক কর।” 
    [সূরা মুদ্দাস্সির : ১-২]

    সুতরাং, উপরোক্ত দলিল-প্রমাণ থেকে দেখা যাচ্ছে যে, রাসূল (সা) দুটি পদের অধিকারী ছিলেন। একটি হল নবুয়্যত ও রিসালাতের পদ এবং অপরটি হল, মুসলিমদের নেতা হিসাবে দুনিয়ার জীবনে আল্লাহ্‌’র নাযিলকৃত শারী’আহ্‌ বিধানসমূহ বাস্তবায়নের পদ।

    তবে রাসূল (সা) এর পর যারা খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেছেন তারা শুধুমাত্র মানুষ ছিলেন; অর্থাৎ, এদের কেউই রাসূল ছিলেন না। সুতরাং, এটা সম্ভব যে, এই সমস্ত খলীফারা অন্য মানুষদের মতোই ভুলভ্রান্ত চিন্তা করতে পারেন কিংবা, অন্যমনস্ক, অমনোযোগী বা গুণাহ্‌’র কাজে লিপ্ত হতে পারেন ইত্যাদি। কারণ, তারা ছিলেন মানুষ। তাই, মানুষ হিসাবে তারা কেউই ভুল-ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে ছিলেন না। রাসূল (সা) আমাদের বলে গেছেন যে, ইমামগণ ভুল করতে পারেন কিংবা এমন কোন কাজও করতে পারেন যার জন্য জনগণ তাদের ঘৃণা করতে পারে বা অভিশাপ দিতে পারে, যেমন: তিনি অত্যাচারী হতে পারেন, (আল্লাহ্‌’র প্রতি) অবাধ্যতা প্রদর্শন করতে পারেন ইত্যাদি। তিনি আরও বলেছেন যে, ইমামগণ প্রকাশ্যে কুফরীতেও লিপ্ত হতে পারেন। আবু হুরাইরা (রা) রেওয়ায়াতে ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন,

    অবশ্যই ইমামগণ ঢালস্বরূপ যার পেছনে থেকে লোকেরা যুদ্ধ করে ও নিজেদের রক্ষা করে। সুতরাং তিনি যদি তাকওয়া অবলম্বন করবার আদেশ দেন এবং ন্যায়বিচারক হন তাহলে তিনি এ সমস্ত কাজের সমপরিমাণ পুরস্কার পাবেন। আর, যদি তিনি তার এর বিরুদ্ধে কিছু করেন তবে তিনি সমপরিমাণ শাস্তি পাবেন। ”
    (সহীহ্‌ বুখারী, হাদীস নং-২৯৫৭)

    এর অর্থ হল, ইমামগণ আল্লাহ্‌’কে ভয় না করে অন্য কোন হুকুম দিতে পারেন। আবদুল্লাহ্‌ ইবনে মাসউদ থেকে মুসলিম বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:

    আমার পরে স্বার্থপরতা এবং এমন ঘটনা ঘটতে পারে যা তোমরা ঘৃণা করবে। সাহাবীগণ তখন বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ্‌! আমাদের মধ্য হতে যারা ঐ ঘটনাগুলোর সাক্ষী হবে, তাদের আপনি কি করার আদেশ দেবেন?’ তিনি (সা) তখন বললেন, ‘তোমাদের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে এবং আল্লাহ্‌ প্রদত্ত তোমাদের অধিকার চাইবে।”
    (সহীহ্‌ বুখারী, হাদীস নং-৭০৫২)

    জুনাদা বিন আবু উমাইয়া হতে ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, ‘আমরা উবাদা বিন আস সামিতকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে গেলাম এবং তাকে বললাম আল্লাহ্‌ তোমাকে পথ প্রদর্শন করুন! রাসূল (সা) এর কাছ থেকে শোনা একটি হাদীস আমাদের শোনাও যার মাধ্যমে তুমি উপকৃত হবে। তিনি বললেন:

    ‘রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) আমাদের ডাকলেন এবং আমরা তাঁকে বাই’আত দিলাম। তিনি আমাদের কাছে যে ব্যাপারে বাই’আত গ্রহণ করেছেন সে ব্যাপারে বললেন যে, আমরা তাঁকে সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি কিংবা সুসময় ও দুঃসময় উভয় অবস্থায় তাঁর আদেশ শ্রবণ ও তাঁর আনুগত্যের শপথ নিয়েছি। আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের উপর যারা কর্তৃত্বশীল তাদের সাথে কোন বিবাদ করবো না যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের প্রকাশ্যে কুফরে লিপ্ত হতে দেখি, যে ব্যাপারে আমাদের কাছে আল্লাহ্‌ পক্ষ হতে শক্তিশালী দলীল রয়েছে।’
    (সহীহ্‌ বুখারী, হাদীস নং-৭০৫৫)

    আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে রাসূল (সা) বলেছেন,

    যতটা সম্ভব মুসলিমদের শাস্তি থেকে পরিত্রাণ দেবে। সুতরাং, যদি সম্ভব হয় তাহলে আসামীকে মুক্ত করে দাও; কেননা শাস্তি দেবার ক্ষেত্রে ইমামদের ভুল করার চেয়ে ক্ষমা করার ক্ষেত্রে ভুল করা অধিকতর ভাল।”
    (সূনানে তিরমিযী, হাদীস নং-১৪২৪)

    সুতরাং, এইসব হাদীস এটাই প্রমাণ করে যে, ইমামদের পক্ষে ভুল করা, অমনোযোগী বা গুণাহের কাজে লিপ্ত হওয়া সম্ভব। এ সবকিছুর পরও রাসূল (সা) তাকে মান্য করার নির্দেশ দিয়েছেন যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি ইসলাম দিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করছেন এবং প্রকাশ্যে কুফরী থেকে বিরত থাকছেন ও গুণাহ্‌’র কাজে লিপ্ত হবার নির্দেশ না দিচ্ছেন। সুতরাং, রাসূল (সা) এর পর যে সব খলীফা এসেছেন তারা সঠিক ও ভুল দুটোই করেছেন এবং তারা কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। কারণ, তারা শুধু মানুষ ছিলেন, নবী ছিলেন না। সুতরাং, এটা বলা ভুল হবে যে খিলাফত একটি আধ্যাত্মিক রাষ্ট্র।বরং, এটা একটি মানবীয় রাষ্ট্র, যেখানে মুসলিমরা খলীফাকে ইসলামী শারী’আহ্‌’র বিধিবিধান সমূহ বাস্তবায়নের জন্য বাই’আত দিয়ে থাকে।

    খলীফার মেয়াদকাল

    খলীফার মেয়াদকাল সুনির্দিষ্ট নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি শারী’আহ্ মেনে চলবেন এবং এর বিধিবিধান সমূহকে কার্যকর করবেন এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে সক্ষম থাকবেন ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি খলীফা পদে বহাল থাকবেন। এর কারণ হচ্ছে বাই’আত সংক্রান্ত দলিল-প্রমাণগুলো এসেছে অনির্দিষ্ট (মুতলাক) অর্থে, যেখানে কোন নির্দিষ্ট সময়কাল নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি। আনাস বিন মালিক বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন,

    ‘যদি একজন আবিসিয়ান দাসও তোমাদের উপর কর্তৃত্বশীল হয়, যার চুল কিসমিসের মতো কালো, তবুও তোমরা তার কথা শুনবে এবং আনুগত্য করবে।’
    (সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-৭১৪২)

    অপর একটি বর্ণনা অনুসারে তিনি (সা) বলেছেন যে,

    ‘…যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি তোমাদের আল্লাহ্’র কিতাব দ্বারা পরিচালিত করবেন।’

    এছাড়া, হাদীসগুলোতে যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে খোলাফায়ে রাশেদীনরা (রা.) এভাবে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বাই’আত প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তাঁরা কেউই নির্দিষ্ট কোন সময়ের জন্য খলীফা পদে নিযুক্ত ছিলেন না। বরং, প্রত্যেকেই তাঁদের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত খলীফার পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এ ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, সাহাবীরা (রা.) এ ব্যাপারে একমত ছিলেন যে খিলাফতের দায়িত্ব কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয়; বরং তা অনির্দিষ্টকালের জন্য। সুতরাং, যদি কোন খলীফাকে বাই’আত দেয়া হয়, তবে তিনি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সে পদে বহাল থাকতে পারেন।

    কিন্তু, খলীফার মধ্যে যদি এমন কোন পরিবর্তন সাধিত হয়, যা তাকে উক্ত পদের জন্য অযোগ্য হিসাবে প্রমাণ করে এবং  তাকে অপসারণ করার প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে সেক্ষেত্রে তার সময়কাল শেষ হয়ে যাবে এবং তাকে অপসারণও করা  যাবে। তবে, এ বিষয়টিকে খলীফার পদে বহাল থাকার সময়কালের সীমাবদ্ধতা হিসাবে গ্রহণ করা যাবে না। বরঞ্চ, খিলাফতের দায়িত্ব প্রাপ্ত হবার ক্ষেত্রে কোন প্রকার শর্ত ভঙ্গ হলেই কেবল এ বিধানটি প্রযোজ্য হবে। বস্তুতঃ বাই’আত প্রদানের শব্দাবলী এবং সাহাবীদের ঐক্যমত অনুসারে খিলাফতের দায়িত্ব অনির্দিষ্ট সময়ের জন্যই নির্ধারিত। প্রকৃতপক্ষে,  খলীফার পদে বহাল থাকার সীমাবদ্ধতা সে কাজ দ্বারা নির্ধারিত, যে কাজের জন্য তিনি বাই’আত প্রাপ্ত হয়ে থাকেন; অর্থাৎ, আল্লাহ্’র কিতাব ও সুন্নাহ্’র ভিত্তিতে শাসন করা এবং শারী’আহ্ বিধিবিধান সমূহকে বাস্তবায়ন করতে খলীফা দ্বায়বদ্ধ।  সুতরাং, তিনি যদি শারী’আহ্’কে সুউচ্চ না করেন কিংবা এর বাস্তবায়ন না করেন, তবে তাকে অবশ্যই অপসারণ করতে  হবে।

    খলীফার অপসারণ

    খলীফা যদি এ পদে নিযুক্ত হবার সাতটি আবশ্যিক গুণাবলীর মধ্যে কোন একটি হারিয়ে ফেলেন তাহলে আইনগতভাবে তাকে অবশ্যই পদচ্যুত করতে হবে।

    এ সিদ্ধান্তের একচ্ছত্র মালিক ‘মাহ্কামাতুল মাযালিম’- যিনি সিদ্ধান্ত নেবেন খলীফা আবশ্যিক গুণাবলীর কোনটি হারিয়ে  ফেলেছেন কিনা। কারণ, কোন বিষয় যার জন্য খলীফাকে অপসারণ করা যায় অথবা তাকে পদচ্যুত করা জরুরী হয়ে পড়ে, তাকে বলা হয় ‘মাযলিমা’(অন্যায় কাজ)। এ বিষয়গুলোর সমাধান করা প্রয়োজন। তাই, খলীফার বিরুদ্ধে এ ধরনের  কোন অভিযোগ থাকলে সেগুলো অবশ্যই তদন্ত করতে হবে এবং একজন বিচারকের সম্মুখে তার অপরাধ প্রমাণ করতে হবে। মাহ্কামাতুল মাযালিম-ই (অন্যায় কাজ তদন্তের জন্য নির্ধারিত আদালত) হচ্ছে একমাত্র দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান যা খলীফার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল অভিযোগ গ্রহণ করবে এবং এ আদালতের বিচারক এ ব্যাপারটি প্রমাণ করবেন এবং  প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। অর্থাৎ, মাহ্কামাতুল মাযালিম সিদ্ধান্ত নেবে খলীফা কোন আবশ্যকীয় শর্তাবলী ভঙ্গ  করেছেন কিনা এবং তাকে অপসারণ করা প্রয়োজন কিনা। যদি এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং খলীফা পদত্যাগ  করেন, তাহলে বিষয়টি এখানেই নিস্পত্তি হয়ে যাবে। আর, যদি মুসলিমরা মনে করে যে খলীফাকে পদচ্যুত করা উচিত;  কিন্তু, খলীফা এ ব্যাপারে তাদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয় তাহলে এ বিষয়টি বিচারব্যবস্থার উপর ন্যস্ত করা হবে। কারণ  আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    “…অতঃপর কোন ব্যাপারে তোমরা যদি এক অপরের সাথে মতবিরোধে লিপ্ত হও, তাহলে সে বিষয়টি (ফয়সালার জন্য) আল্লাহ্ ও তার রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও।”
    [সূরা নিসা: ৫৯]

    অন্যভাবে বললে বলা যায়, উম্মাহ্’র  যদি কর্তৃত্বশীল কারও সাথে বিরোধপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হয়, তার অর্থ হচ্ছে এ বিরোধ হচ্ছে শাসক এবং উম্মাহ্’র  মধ্যে। আর, এ বিরোধকে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের কাছে উপস্থাপন করার অর্থ হল ইসলামী বিচারব্যবস্থা অর্থাৎ মাহ্কামাতুল মাযালিমের কাছে তা উপস্থাপন করা।

    খলীফা নির্বাচনে মুসলিমদের জন্য বরাদ্দকৃত সময়কাল

    খলীফা নির্বাচনে মুসলিমদের জন্য অনুমোদিত সর্বোচ্চ সময়কাল হল তিনদিন এবং তাদের মধ্যবর্তী রাতসমূহ। কাঁধে বাই’আত নেই এ অবস্থায় তিনরাতের বেশী থাকা যে কোন মুসলিমের জন্য হারাম। তিনরাতের সর্বোচ্চ সময়টুকু ব্যবহার

    করা অনুমদিত এ কারণে যে, পূর্ববর্তী খলীফার মৃত্যু বা অপসারণ হওয়া মাত্রই পরবর্তী খলীফা নির্বাচন করা মুসলিমদের  জন্য ফরয বা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। তাই, মুসলিমরা যদি তিনদিন এবং এর মধ্যবর্তী রাতসমূহ খলীফা নির্বাচন কাজেই  ব্যস্ত থাকে, তবে এক্ষেত্রে খলীফা নির্বাচনে এই বিলম্ব অনুমোদন যোগ্য হবে। যদি নির্ধারিত তিনরাত অতিক্রান্ত হয়ে যায়  এবং তারপরেও এ সময়ের মধ্যে খলীফা নির্বাচিত না হয়, তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। মুসলিমরা যদি খলীফা নির্বাচনে ব্যস্ত থাকে এবং এমন কোন কারণে খলীফা নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়, যা তাদের নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতার বাইরে, তবে  এর জন্য তারা গুনাহ্গার হবে না। এর কারণ, এক্ষেত্রে তারা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে আপ্রাণ চেষ্টায় রত ছিল  এবং তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তারা তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ ইবনে হাব্বান এবং ইবনে মাজাহ ইবনে  আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    ‘আল্লাহ্ আমার উম্মাহ্’কে তাদের ভুল-ভ্রান্তি, ভুলে যাওয়া এবং তাদেরকে যে সব বিষয়ের জন্য বাধ্য করা হয়েছে, তার জন্য ক্ষমা করে দিয়েছেন’
    (আল-নাওয়ায়ী, আল-মাজমু’ শারহ্ আল-মুহাদ্দাব, খন্ড-৮, পৃষ্ঠা-৪৫০)

    কিন্তু, তারা যদি সে চেষ্টায় রত না থাকে তাহলে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা গুনাহ্’র মধ্যে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না একজন খলীফা নির্বাচিত হয় এবং একমাত্র তখনই তাদের কাঁধ থেকে গুনাহ্’র বোঝা অপসারিত হবে। তবে, খলীফা নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অবহেলা করার কারণে তারা যে গুনাহ্গার হয়েছিল, তা থেকে তারা মুক্ত হবে না। বরং, এটা তাদের কাঁধেই থাকবে এবং আল্লাহ্ তা’আলা যে কোন মুসলিমকে গুণাহ্ করলে বা কোন ফরয দায়িত্ব পালন না করলে যেমন শাস্তি দেবেন এ জন্যও তাদের তেমন শাস্তি প্রদান করবেন।

    খলীফার পদটি শূন্য হওয়া মাত্রই যে খলীফা নির্বাচন করার কাজে সম্পৃক্ত হতে হবে, এ বিষয়ে দলীল হল সাহাবীগণ (রা.) রাসূল (সা) এর ইন্তেকালের পরপরই একই দিনে, তাঁর (সা) দাফনের পূর্বেই এ কাজটি সম্পন্ন করার জন্য বানু সাই’দা’র প্রাঙ্গনে মিলিত হয়েছিলেন। আবু বকরকে (রা.) খলীফা নিযুক্তির বাই’আত সেদিনই সম্পন্ন হয়েছিল। পরেরদিন মদীনার জনগণ আনুগত্যের বাই’আত প্রদানের জন্য মসজিদে সমবেত হয়েছিল।

    আর, খলীফা নির্বাচনে সর্বোচ্চ সময়সীমা যে তিনদিন এবং তাদের মধ্যবর্তী রাতসমূহ, এ ব্যাপারে দলিল হল, যখন উমর (রা.) অনুভব করলেন যে তাঁর মৃত্যু আসন্ন তখন তিনি একজন খলীফা নির্বাচনের জন্য (মাজলিসে) শুরার লোকদের দায়িত্ব দিয়ে তাদের তিনদিনের একটি সময়সীমা বেঁধে দিলেন এবং তিনদিন পার হয়ে যাবার পর যে কারও মতানৈক্যের জন্য যদি খলীফা নির্বাচন করা সম্ভব না হয় তাহলে তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন। হত্যা করার এ নির্দেশ মুসলিমদের মধ্য হতে পঞ্চাশ জন ব্যক্তিকে দেয়া হয়েছিল, যদিও যে দলের মধ্য হতে কোন একজনকে হত্যার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, তাঁরা প্রত্যেকেই শুরা সদস্য ও উচ্চ পর্যায়ের সাহাবী (রা.) ছিলেন। সাহাবীদের (রা.) উপস্থিতিতেই এ নির্দেশ দেয়া হয়েছিল এবং তাঁদের কেউ এ নির্দেশের প্রতিবাদ কিংবা এর সাথে দ্বিমত পোষণ করেননি। তাই, এটা বলা যায় যে, মুসলিমদের তিনদিন এবং তাদের মধ্যবর্তী রাতসমূহের অধিক সময় খলীফাবিহীন অবস্থায় থাকা নিষিদ্ধ এটা সাহাবীদের (রা.) একটি সাধারণ ঐক্যমত। আর, কোন বিষয়ে সাহাবীদের (রা.) ঐক্যমত কুর’আন ও সুন্নাহ্’র মতোই শারী’আহ্ দলিল।

    আল-মিশওয়ার ইবন মাকরামাহ্ থেকে আল-বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (ইবন মাকরামাহ্) বলেছেন যে,

    “রাতের কিছু অংশ অতিবাহিত হবার পর আব্দুর রহমান আমার দরজায় কড়া নাড়তে থাকলেন যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি জেগে উঠলাম। তিনি বললেন, ‘আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি ঘুমাচ্ছো। আল্লাহ্’র কসম! গত তিনরাত যাবত আমি ঘুমের আনন্দ উপভোগ করতে পারিনি…।”
    (সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-৭২০৭)

    মদীনার লোকেরা ফজর নামাজের পর উসমান (রা.) কে বাই’আত প্রদান সম্পন্ন করলো।

    সুতরাং, এটা মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক যে, যখনই খলীফার পদ শূন্য হয়ে যায় তখনই পরবর্তী খলীফাকে বাই’আত প্রদানের কাজে সম্পৃক্ত হওয়া এবং তিনদিনের মধ্যে তা সম্পন্ন করা। আর, যদি মুসলিমরা নিজেদেরকে এ কাজে  নিয়োজিত না করে, তাহলে এ ব্যাপারে নীরবতার জন্য পূর্ববর্তী খলীফার মৃত্যুর পর থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা গুনাহ্গার হবে যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নীরব থাকবে। এ অবস্থা এখন বিরাজ করছে; যেখানে মুসলিমরা এখন গুনাহ্গার, কারণ তারা  ১৩৪২ হিজরীর ২৮ রজব তারিখে খিলাফত বিলুপ্ত হবার পর এখন পর্যন্ত খিলাফত প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। কেবলমাত্র  তারাই এ গুনাহ্’র  হাত থেকে রক্ষা পাবে যারা এটা প্রতিষ্ঠিত করবার মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজে আন্তরিকতার

    সাথে একটি সত্যপন্থী ও সত্যনিষ্ঠ দলের সাথে গভীর প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। একমাত্র এক্ষেত্রেই কোন মুসলিম এ গুনাহ্’র   হাত থেকে রক্ষা পাবে। মনে রাখতে হবে যে, এ পাপ ততখানি ভয়াবহ যতোটা রাসূল (সা) হাদীসের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন:

    “যে ব্যক্তি কাঁধে বাই’আতের শপথ ব্যতীত মৃত্যুবরণ করলো সে যেন জাহেলিয়াতের (ইসলামবিহীন অবস্থায় মৃত্যু) মৃত্যুবরণ করল।”
    (সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-৭০৫৪; সহীহ্ মুসলিম, হাদীস নং-৪৭৬৭)

    এই হাদীস এ অপরাধের ব্যাপকতাকে তুলে ধরে।

  • ভূমিকা

    ভূমিকা

    খিলাফত রাষ্ট্রের কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানসমূহ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার আগে কিছু বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন:

    ১. ইসলামে শাসনব্যবস্থা বলতে খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বুঝায়, যা এ মহাবিশ্বের প্রতিপালক মহান আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক নির্ধারিত এবং যেখানে রাষ্ট্রের প্রধান, খলীফা মুসলিমদের বাই’আত মাধ্যমে নিযুক্ত হয়ে থাকেন। এই বিষয়টির অকাট্য দলিল হচ্ছে আল্লাহ’র কিতাব, রাসূল (সা) এর সুন্নাহ্ এবং সাহাবাদের (রা.) ইজ্‌মা (ঐক্যমত)

    আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুর’আনে বলেন:

    “অতএব, আপনি আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা দিয়ে তাদের মাঝে শাসন করুন এবং আপনার কাছে যে মহান সত্য এসেছে, তা পরিত্যাগ করে তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না।”
    [সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৮]

    তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরও বলেন:

    “অতএব, আপনি আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা দিয়ে তাদের মাঝে শাসন করুন, আর তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না এবং তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন; যেন তারা আপনার নিকট আল্লাহ’র প্রেরিত কোন বিধান থেকে আপনাকে বিচ্যুত করতে না পারে।”
    [সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৯]

    রাসূল (সা) এর প্রতি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত শাসন সংক্রান্ত এই নির্দেশনা তাঁর উম্মাহ্’র  প্রতিও সমভাবে প্রযোজ্য। এর অর্থ হল উম্মাহ্কে অবশ্যই রাসূল (সা) এর পরে এমন একজন শাসক নিযুক্ত করতে হবে যিনি আল্লাহ’র কিতাব অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করবেন। উসূল-উল-ফিকহ্ (Islamic Jurisprudence) এর নীতি অনুসারে এই আদেশের ভাষা অকাট্য (Decisive) যা থেকে বোঝা যায় যে, নির্দেশটি অবশ্য পালনীয় অর্থাৎ ফরয।

    রাসূল (সা) এর পর”আল্লাহ’র আইন দ্বারা মুসলিমদের শাসনকার্য পরিচালনার জন্য যাকে নিয়োগ করা হবে তিনিই খলীফা। একইভাবে সেই শাসন পদ্ধতির নাম হল খিলাফত। এছাড়া, এ ব্যাপারে আরও যে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করা যায় তা হল, ইসলামী শারী’আহ্ অনুযায়ী আইনী শাস্তির বিধি-বিধান (হুদুদ) এবং অন্যান্য শারী’আহ্  আইন (আহ্‌কাম) বাস্তবায়ন করা মুসলিমদের জন্য ফরয। আর এটা সর্বজনবিদিত যে, একজন শাসক ছাড়া হুকুম-আহকাম বা শাস্তির বিধিবিধান কোনকিছুই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। হুকুম শারী’আহ্ ’র মূলনীতি অনুযায়ী কোন ফরয বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত সমূহ যেহেত  ফরয, সেহেতু ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কবার ব্যাপারে কর্তৃত্বশীল একজন শাসক নিযুক্ত করাও ফরয। এক্ষেত্রে, শাসক হলেন খলীফা এবং শাসন ব্যবস্থাটির নাম হল খিলাফত।

    সুন্নাহ্ ভিত্তিক দলিল-প্রমাণের দিকে আমরা আলোকপাত করলে দেখতে পাই, আব্দুল্লাহ্ বিন উমর (রা.) বলেছেন, “আমি রাসূল (সা) কে বলতে শুনেছি,

    “যে আনুগত্যের শপথ (বাই’আত) থেকে তার হাত ফিরিয়ে নেয়, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তার সাথে এমনভাবে সাক্ষাৎ করবেন যে, ঐ ব্যক্তির পক্ষে কোন দলিল থাকবে না এবং যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে যে, যখন তার কাঁধে কোন আনুগত্যের শপথ নেই, তবে তার মৃত্যু হবে জাহেলি যুগের মৃত্যু।”
    (সহীহ্ মুসলিম, হাদীস নং-১৮৫১)

    রাসূল (সা) প্রত্যেক মুসলিমের উপর বাই’আত   শপথকে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। যে বাই’আত (আনুগত্যের শপথ) ছাড়া মৃত্যুবরণ করে তিনি (সা) তার মৃত্যুকে ইসলামপূর্ব অজ্ঞানতার (জাহেলিয়াতের) যুগের মৃত্যু হিসাবে বর্ণনা করেছেন। রাসূল (সা) এর পরে কেবলমাত্র খলীফাকেই বাই’আ দেয়া যায়। যেহেতু হাদীসটি প্রত্যেক মুসলিমের কাঁধে বাই’আত শপথ থাকাকে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে, তাই একইসাথে এ হাদীসটি মুসলিমদের উপর একজন খলীফা নিযুক্ত করাকেও বাধ্যতামূলক করেছে।

     আবু হুরায়রা (রা.) থেকে আল-আরাজ ও সেই সূত্রে ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেছেন,

    “নিশ্চয়ই, ইমাম হচ্ছেন ঢাল স্বরূপ যার পেছনে থেকে মুসলিমরা যুদ্ধ করে এবং যার মাধ্যমে নিজেদেরকে রক্ষা করে।”
    (সহীহ্ মুসলিম, হাদীস নং-১৮৪১)

    আবু হাজিমের বরাত দিয়ে ইমাম মুসলিম আরও বর্ণনা করেন যে, আমি আবু হুরায়রার সাথে পাঁচ বছর অতিবাহিত করেছি

    এবং তাঁকে বলতে শুনেছি, রাসূল (সা) বলেছেন,

    “বনী ইসরাইলকে শাসন করতেন নবীগণ। যখন এক নবী মৃত্যুবরণ করতেন তখন তাঁর স্থলে অন্য নবী আসতেন, কিন্তু আমার পর আর কোনও নবী নেই। শীঘ্রই অনেক সংখ্যক খলীফা আসবেন। তাঁরা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন তখন আপনি আমাদের কী করতে আদেশ করেন? তিনি (সা) বললেন, তোমরা একজনের পর একজনের বাই’আতপূর্ণ করবে, তাদের হক আদায় করবে। অবশ্যই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাদেরকে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের ব্যাপারে জবাবদিহি করবেন।”
    (সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-৩৪৫৫; সহীহ্ মুসলিম, হাদীস নং-৪৭৫০)

    প্রথম হাদীসে খলীফাকে ঢাল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে ‘ঢাল শব্দটি নিরাপত্তা বা আত্মরক্ষার প্রতীক হিসাবে উল্লেখিত হয়েছে। মূলতঃ এ হাদীসে ইমামকে ‘ঢাল’ হিসেবে বর্ণনা করে ইমামের উপস্থিতির বিষয়টিকে প্রশংসা করা হয়েছে এবং সেইসাথে, ইমামের উপস্থিতির ব্যাপারে অনুরোধ (তালাব) জানানো হয়েছে। হুকুম শারী’আহ্’র নীতি অনুযায়ী যখন আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল (সা) আমাদেরকে এমন কোন কাজের ব্যাপারে অবহিত করেন যার সাথে তিরষ্কার সূচক শব্দ ব্যবহৃত হয়, তখন ধরে নেয়া হয় যে মুসলিমদের সে কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। বিপরীতভাবে কুর’আনের কোনও আয়াত বা রাসূলের (সা) কোনও হাদীসে যদি কোনও কোন কাজের ব্যাপারে প্রশংসা সূচক শব্দ উল্লেখিত হয়, তবে ধরে নেয়া হয় যে, মুসলিমদের সে কাজটি করতে উৎসাহিত বা আদেশ করা হয়েছে। আর, এ কাজটি যদি”আল্লাহ’র কোন আদেশ বাস্তবায়নের জন্য অবশ্য পালনীয় হয় কিংবা, এ কাজে অবহেলা প্রদর্শন করলে যদি”আল্লাহ’র কোন আদেশ লঙ্ঘিত হয়, তাহলে এটি অকাট্য আদেশ (Decisive Command) বা অবশ্য পালনীয় কাজ হিসাবে গৃহীত হয়। এই হাদীসগুলো থেকে আমরা এটাও জানতে পারি যে, মুসলিমদের বিভিন্ন বিষয় দেখাশুনার দায়িত্ব হচ্ছে খলীফাদের – যা কিনা প্রকৃতপক্ষে মুসলিমদের উপর একজন খলীফা নিয়োগ করার ব্যাপারটিকেই নির্দেশ করে। এছাড়া,”আল্লাহ’র রাসূল (সা) মুসলিমদের খলীফার আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং খলীফার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে কেউ তার সাথে বিরোধে লিপ্ত হলে তার সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন, যা প্রকৃতঅর্থে একজন খলীফা নিয়োগ করার বাধ্যবাধকতা ও তার খিলাফতকে যুদ্ধের মাধ্যমে হলেও রক্ষা করারই একটি নির্দেশ। আব্দুল্লাহ্ বিন আমর বিন আল আস (রা.) হতে ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেছেন,

    “যখন একজন ইমামের হাতে বাই’আত গ্রহণ সম্পূর্ণ হয়ে যায় তখন তাকে যথাসাধ্য মান্য করবে, এমতাবস্থায় যদি কেউ তার সাথে বিরোধ করতে আসে ( বাই’আত দাবি করে) তবে দ্বিতীয় জনকে হত্যা করবে।”
    (সহীহ্ মুসলিম, হাদীস নং-১৮৪৪)

    অতএব, খলীফার আনুগত্যের আদেশটি প্রকৃতপক্ষে একজন খলীফা নিয়োগ করার আদেশ, কারণ একজন খলীফা উপস্থিত না থাকলে খলীফাকে মান্য করার আদেশটি রহিত হয়ে যায়। আর, যারা খলীফার সাথে দ্বন্দে লিপ্ত হয় তাদের সাথে যুদ্ধ করার আদেশটি মূলতঃ একজন খলীফার উপস্থিতির বাধ্যবাধকতার বিষয়ে বর্ধিত দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করে।

    আর সাহাবীদের ইজ্মার বিষয়ে বলা যায় যে, তাঁরা (রা) রাসূল (সা) এর মৃত্যুর পর তাঁর (সা) উত্তরাধিকারী হিসেবে একজন খলীফা নিয়োগের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছেছিলেন। তাঁরা সকলেই আবু বকর (রা) কে রাসূল (সা) এর উত্তরাধিকারী হিসেবে এবং আবু বকর (রা.) এর মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে উমর (রা.) কে নিয়োগ করেন। পরবর্তীতে একইভাবে, তাঁরা উসমান (রা.) এর মৃত্যুর পর আলী (রা.) কে তাঁর উত্তরাধিকারী হিসাবে নিয়োগ করেন। মুসলিমদের উপর একজন খলীফা নিয়োগের ব্যাপারে সাহাবীদের (রা.) ঐক্যমত রাসূল (সা) এর মৃত্যুর পরপরই খুব জোরালোভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। আর, এ কারণেই তাঁরা (রা.) রাসূল (সা) এর দাফনকার্য সম্পাদন করার চাইতেও খলীফা নিয়োগের বিষয়টিকে বেশী গুরুত্ব দিয়েছিলেন। যদিও তাঁদের প্রত্যেকেরই এটা জানা ছিল যে, যে কোন ব্যক্তির মৃত্যুর পর যত শীঘ্র সম্ভব তাঁর দাফনকার্য সম্পন্ন করা মুসলিমদের জন্য অবশ্য পালনীয় কাজ।

    রাসূল (সা) এর মৃত্যুর পর সাহাবাদের (রা.) উপর সর্বপ্রথম বাই’আত রাসূল (সা) এর দাফন কার্য সম্পন্ন করা ফরয ছিল; কিন্তু তা না করে তাঁরা (রা.) মুসলিমদের প্রথম খলীফা নির্বাচনে ব্যস্ত ছিলেন। অন্যান্য সাহাবারা (রা.) নীরব থেকে রাসূল (সা) এর দাফন কার্য ২ রাত বিলম্ব করার ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছিলেন, যদিও তাঁদের বাই’আত রাসূল (সা) এর দাফন কার্য শীঘ্রই সম্পন্ন করার সু্যোগ ও সামর্থ্য ছিল। রাসূল (সা) সোমবার সকালের শেষার্ধে ইন্তেকাল করলেন। কিন্তু, সেদিন সমস্ত দিন, এমনকি রাতেও তাঁকে দাফন করা হল না। মঙ্গলবার রাতে, আবু বকর (রা.) কে বাই’আত দিয়ে

    খলীফা নিযুক্ত করার পর, বাই’আত রাসূল (সা) এর দাফন কার্য সম্পন্ন করা হল। সুতরাং, রাসূল (সা) এর দাফন দুই রাত্রি বিলম্বিত হয়েছিল এবং তাঁর দাফন কার্য সম্পাদন হবার পূর্বেই আবু বকর (রা.) কে বাই’আত দেয়া হয়েছিল।

    সুতরাং, মৃতব্যক্তিকে দাফন না করে তার পূর্বে খলীফা নিয়োগে ব্যস্ত থাকার এই কাজটি সকল সাহাবাদের (রা.) সম্মিলিত ঐক্যমতের (ইজমা আস-সাহাবা) একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। যদি না মুসলিমদের উপর একজন খলীফা নিয়োগ করা বাধ্যতামূলক হত এবং মৃতব্যক্তির দাফন কার্য হতে খলীফা নিয়োগের ব্যাপারটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ হত, তবে সকল সাহাবীরা (রা.) সম্মিলিতভাবে এ বিষয়ে কখনোই ঐক্যমতে পৌঁছাতেন না।

    এছাড়া, মুসলিমদের উপর একজন খলীফা নিয়োগ করা যে ফরয (বাধ্যতামূলক) এ ব্যাপারে সকল সাহাবাই (রা.) সারাজীবন সম্মতি প্রকাশ করেছেন। যদিও কাকে খলীফা নির্বাচিত করা হবে এ ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল; কিন্তু একজন খলীফা যে নিয়োগ করতে হবে এ ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে কোন মতবিরোধ ছিল না – হোক তা রাসূল (সা) এর মৃত্যুর পর কিংবা খোলাফায়ে রাশেদীনদের মৃত্যুর পর। সুতরাং, খলীফা নিয়োগের ব্যাপারে সাহাবাদের (রা.) এই সম্মিলিত ঐক্যমত সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, মুসলিমদের উপর একজন খলীফা নিয়োগ করা ফরয বা বাধ্যতামূলক।

    ২. বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত যে শাসনব্যবস্থাগুলো আছে, এগুলো তাদের ভিত্তি, চিন্তা, ধ্যান-ধারণা, মাপকাঠি, গঠন, এমনকি যে বিধিবিধান দিয়ে এ ব্যবস্থাগুলো তাদের কার্যাবলী পরিচালনা করে এবং যে সংবিধান ও আইন-কানুনের মাধ্যমে এ ব্যবস্থাগুলো তাদের বিধিবিধানগুলো বাস্তবায়ন ও কার্যকর করে – এ সমস্ত দিক থেকেই ইসলামী শাসনব্যবস্থা (খিলাফত) থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

    খিলাফতের শাসন কাঠামো রাজতান্ত্রিক নয়:

    খিলাফত কোন রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা নয় কিংবা এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণও নয়। রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজপুত্র উত্তরাধিকার সূত্রে বাদশাহ্ হয় যেখানে সাধারণ জনগণের বলার কিছু থাকে না। অন্যদিকে, খিলাফত শাসনব্যবস্থায় খলীফা নিয়োগ করার পদ্ধতি হল  বাই’আত। রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজা-বাদশাহ্দের জন্য রয়েছে বিশেষ সুবিধা, যে কারণে সে নিজেকে সকল আইনের উর্ধ্বে রাখতে পারে। কিছু রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বাদশাহ্কে জাতির প্রতীক হিসাবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে সে রাজ্যের মালিক কিন্তু শাসক নয়। আবার কিছু রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সে মালিক এবং একইসাথে রাজ্যের শাসকও; যেখানে সে তার রাজ্য ও জনগণকে তার ইচ্ছামত শাসন করে। জনগণের উপর অত্যাচার, নির্যাতন ও দুঃশাসনের মাত্রা যত ভয়াবহ হোক না কেন, এদুটি ক্ষেত্রেই সে সকল প্রকার জবাবদিহিতার উর্ধ্বে। অপরদিকে, খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা খলীফাকে বিশেষ কোন অধিকার প্রদান করে না – যা তাকে রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মত জনগণের উপরে স্থান দেয়। না এ ব্যবস্থায় তিনি এমন কোন অধিকার প্রাপ্ত হন যাতে বিচার বিভাগের সামনে তাকে সাধারণ জনগণ থেকে আলাদা কোন মানুষ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া, রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মত তিনি জাতির কাছে কোন প্রতীকও নন। বরং, তিনি শাসন ও কর্তৃত্বের দিক থেকে জনগণের একজন প্রতিনিধি। যার অর্থ হচ্ছে, উম্মাহ্ (জনগণ) তাকে নির্বাচিত করেছে এবং  বাই’আত    মাধ্যমে স্বেচ্ছায় নিয়োগ দিয়েছে, যেন তিনি আল্লাহ্ প্রদত্ত আইন দিয়ে তাদের শাসন করেন। খলীফার সমস্ত কাজ, সিদ্ধান্ত এবং জনগণের স্বার্থসংশিষ্ট  বিষয়সমূহ দেখভাল করার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ্ প্রদত্ত সীমারেখা দ্বারা নির্ধারিত।

    খিলাফত রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার অনুরূপ নয়:

    সাম্রাজ্যবাদ ইসলামের সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। ইসলামী শাসনব্যবস্থায় জাতি ও বর্ণভেদে এ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষেরা শাসিত হয়েছে। যদিও এ অঞ্চলগুলো সবসময় একটি কেন্দ্রের সাথে যুক্ত ছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও এটি সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার অনুরূপ ছিল না। সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের অধীনস্থ বিভিন্ন জাতি ও বর্ণের জনগোষ্ঠীকে কখনও এক দৃষ্টিতে দেখেনা। বরং, তারা শাসন, অর্থায়ন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সবসময় কেন্দ্রকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ইসলামী শাসনব্যবস্থার লক্ষ্য হচ্ছে এর অধীনস্থ সকল অঞ্চলের জনগণের মাঝে সমতা তৈরী করা। ইসলাম গোত্রবাদকে প্রত্যাখান করেছে এবং শারী’আহ্  আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের অমুসলিম জনগোষ্ঠীকে পরিপূর্ণ নাগরিক অধিকার দিয়েছে ও সেইসাথে তাদের নাগরিক কর্তব্য নির্ধারণ করেছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে ইসলাম অমুসলিমদেরকেও মুসলিমদের মতোই জবাবদিহিতার সম্মুখীন করেছে। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে ইসলামী রাষ্ট্র সমান

    নাগরিক সুবিধা প্রদান করেছে। বিপরীতভাবে, ইসলামী রাষ্ট্রের বাইরে বসবাসরত মুসলিমদেরকে ইসলামী রাষ্ট্র নাগরিক সুবিধা প্রদান থেকে বিরত থেকেছে। সকল নাগরিককে সমান অধিকার প্রদানের দিক থেকে ইসলামী শাসনব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো তাদের ক্ষমতাকে সুসংহত করার লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে উপনিবেশ (Colony)স্থাপন করে সে অঞ্চলসমূহকে শোষণ করে কেন্দ্রকে ক্রমাগত  শক্তিশালী করে। অপরদিকে, খিলাফত রাষ্ট্র কখনই তার অধীনস্থ অঞ্চলসমূহকে উপনিবেশ হিসেবে দেখে না এবং এ অঞ্চলগুলো থেকে ধনসম্পদ লুটপাট করে কেন্দ্রকেও সম্পদশালী করে না। বরং খিলাফত রাষ্ট্র সব অঞ্চলকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখে, তা কেন্দ্র থেকে যত দূরেই অবস্থিত হোক না কেন, কিংবা, সে অঞ্চলের মানুষ যে বর্ণেরই হোক না কেন। এ রাষ্ট্র প্রতিটি অঞ্চলকে রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে এবং প্রতিটি অঞ্চলের জনগণ কেন্দ্রে বসবাসকারী নাগরিকের মতই সমান নাগরিক সুবিধা ভোগ করে। একই সাথে, এ রাষ্ট্র এর অধীনস্থ সকল অঞ্চলে একই শাসন কর্তৃত্ব, কাঠামো এবং আইন-কানুন প্রয়োগ করে।

    খিলাফত ফেডারেল রাষ্ট্রও নয়:

    খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থার মতোও নয়, যেখানে রাষ্ট্রের বিভিনড়ব অঞ্চলসমূহ স্বায়ত্বশাসন ভোগ করে এবং সাধারণ কিছু আইনকানুন দিয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকে। প্রকৃত অর্থে, খিলাফত একটি ঐক্যবদ্ধ ব্যবস্থা। যেখানে পশ্চিমের মারাকেশ পূর্বের খোরাসানের মতই সমান গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হয়। আবার, আল ফায়ূম প্রদেশ কায়রোর মতই বিবেচিত হয় –  যদিও বা এটা হয় ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী। এ রাষ্ট্রে সব অঞ্চলের জন্য সমানভাবে অর্থায়ন করা হবে, একইভাবে নির্ধারণ করা হবে বাজেট। প্রতিটি প্রদেশের জন্য ন্যায্যভাবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বাজেট বরাদ্দ করা হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যদি কোন প্রদেশ হতে সংগৃহীত ট্যাক্স উক্ত প্রদেশের প্রয়োজনের দ্বিগুণ হয়, তাহলেও ঐ প্রদেশের প্রয়োজন অনুযায়ীই ব্যয় নির্ধারণ করা হবে, উক্ত প্রদেশ থেকে কতটুকু ট্রাক্স সংগৃহীত হল তার উপর নির্ভর করে নয়। আবার, অন্য কোন প্রদেশের সংগৃহীত ট্যাক্স যদি প্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাইতে কম হয়, তাহলে সাধারণ বাজেট থেকে ঐ প্রদেশের ব্যয় মেটানো হবে; সে প্রদেশের ট্যাক্স যাই সংগৃহীত হোক না কেন।

    খিলাফত প্রজাতান্ত্রিক (Republic) ব্যবস্থা নয়:

    রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিষ্ঠুর আচরণের ফলস্বরূপ প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থার উদ্ভব হয়, যেখানে রাজা-বাদশাহরা ছিল স্বাধীন, সার্বভৌম ও স্বেচ্ছাচারী এবং তারা নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী রাজ্য ও জনগণকে শাসন করত। সুতরাং, রাজতন্ত্রে রাজার ইচ্ছাই ছিল আইন। প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা গণতন্ত্রের মাধ্যমে জনগণের কাছে সার্বভৌমত্ব ও কর্তৃত্ব হস্তান্তরের চেষ্টা চালায়। ফলে, মানুষ আইন প্রণয়ন করতে শুরু করে এবং সেইসাথে, জনগণ তাদের ইচ্ছানুযায়ী যে কোনকিছু অনুমোদন ও নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়। এ ব্যবস্থায় শাসন-কর্তৃত্ব বাস্তবিকভাবে প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট, তার কেবিনেট বা মন্ত্রী পরিষদের হাতে ন্যস্ত হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শাসন-কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রী ও তার কেবিনেটের হাতে অর্পণ করা হয় এবং এক্ষেত্রে, রাজা বা রাণীকে নেহায়েত প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করা হয়।

    উপরে বর্ণিত প্রতিটি (প্রজাতান্ত্রিক) ব্যবস্থা থেকে ইসলামী শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণ আলাদা। ইসলামে মানুষের আইন তৈরির কোন অধিকার নেই। এ অধিকার শুধুমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার। আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো কোন ব্যাপারে অনুমতি প্রদান বা নিষেধাজ্ঞা জারি করার ক্ষমতা নেই। ইসলামী দৃষ্টিকোন থেকে মানুষকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা প্রদান করা অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ। পবিত্র কুর’আনে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার। বলেন:

    “তারা আল্লাহ’র পরিবর্তে তাদের ধর্মযাজক ও সাধুদেরকে নিজেদের প্রভূ বানিয়ে নিয়েছে।”
    [সূরা আত-তাওবা: ৩১]

    রাসূল (সা) এই আয়াতের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন, বনী ইসরাইলীরা তাদের ধর্মযাজক ও সাধুদের হাতে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছিল, যা তাদের কাছে প্রেরিত আল্লাহ’র বিধানের বিপরীত ছিল। অর্থাৎ, তাদের ধর্মযাজকেরা যে কাজকে অনুমোদন দিত তারা তাই করতো, আর যার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতো তারা তা থেকে বিরত থাকতো। এটাই হচ্ছে আল্লাহ’র পরিবর্তে তাদের (ধর্মযাজকদের) প্রভু হিসাবে মেনে নেয়ার অর্থ। ইসলামে আল্লাহ’র পরিবর্তে কাউকে প্রভু হিসাবে গ্রহণ করাকে শিরক বলা হয়, যা কিনা ভয়ঙ্কর অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হয়।

    সুতরাং, উপরোক্ত আয়াতটি সেই সমস্ত মানুষের ভয়ঙ্কর অপরাধের দিকে নির্দেশ করছে যারা আল্লাহ’র আইন অনুসরণের পরিবর্তে নিজেদের হাতে আইন প্রণয়ের ক্ষমতা তুলে নিয়েছে। আদি ইবনে হাতিমের রেওয়াতে তিরমিযী বর্ণনা করেন,

    “আমি একদিন একটি স্বর্ণের ক্রস গলায় ঝুলানো অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি (সা) বললেন, ‘হে আদি! এই মূর্তিকে ছুঁড়ে ফেলে দাও।’ তখন আমি তাঁকে (সা) পবিত্র কালামের এই আয়াতটি তিলাওয়াতকরতে শুনেছি যে, তারা আল্লাহ’র পরিবর্তে তাদের ধর্মযাজক ও সাধুদের নিজেদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছে। অতঃপর রাসূল(সা) বললেন, “তারা এইসব আলেম ও দরবেশদের উপাসনা করে না; কিন্তু, (আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে) তাদের জন্য যা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তারা (ধর্মযাজকেরা) তাদের জন্য তা হালাল করেছে। আর, তাদের জন্য যা হালাল করা হয়েছিল তারা (ধর্মযাজকেরা) তাদের জন্য তা নিষিদ্ধ করেছে।” (সূনানে তিরমিযী, হাদীস নং-৩০৯৫)

    বস্তুতঃ ইসলাম মন্ত্রী পরিষদ দ্বারা শাসিত কোন ব্যবস্থা নয় –  যেখানে মন্ত্রীদের রয়েছে নির্দিষ্ট ক্ষমতা ও পৃথক বাজেট। এই ধরনের ব্যবস্থায় (প্রজাতন্ত্রে) সাধারণত এতবেশী প্রশাসনিক জটিলতা (red tape) থাকে, যে কারণে এক মন্ত্রনালয়ের উদ্বৃত্ত বাজেট সহজে অন্য মন্ত্রনালয়ে স্থানান্তরিত হয় না; যা জনগণের সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে অনেক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। তাছাড়া, এক বিষয়ে একাধিক মন্ত্রনালয়ের হস্তক্ষেপের ফলে অনেক জটিলতার সৃষ্টি হয়। অথচ জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহকে একটি একক প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসলে খুব সহজেই এসব সমস্যা এড়ানো সম্ভব হয়।

    রিপাবলিকান বা প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসনকার্য পরিচালনার দায়িত্ব বিভিনড়ব মন্ত্রীদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয় এবং প্রতিটি মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীগণ একত্রিত হয়ে একটি মন্ত্রী পরিষদ গঠিত হয়। এভাবে সম্মিলিতভাবে মন্ত্রী পরিষদের মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালনা করা হয়। ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রজাতন্ত্রের মতো কোন মন্ত্রীপরিষদ নেই যারা কিনা সম্মিলিতভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করে। বরং, এখানে খলীফাকে জনগণ”আল্লাহ’র কিতাব ও রাসূল (সা) এর সুনড়বাহ্ অনুসারে শাসন করার জন্য  বাই’আত দিয়ে থাকে। তবে, এক্ষেত্রে খলীফা তার গুরুভার লাঘব করার জন্য প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী (Delegated Assistants) নিয়োগ করতে পারেন। এদের আক্ষরিক অর্থেই খলীফার সহকারী হিসাবে বিবেচনা করা হয়, যারা খিলাফতের গুরুদায়িত্ব পালনে খলীফাকে সহায়তা করেন।

    খিলাফত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নয়:

    জনগণকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা প্রদানের দিক থেকে বিবেচনা করলে বলা যায় যে, খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা গণতান্ত্রিক নয়; যেখানে জনগণই তাদের ইচ্ছানুযায়ী কোন বিষয়কে অনুমোদন দেয়, নিষিদ্ধ করে, উৎসাহিত করে কিংবা তিরস্কার করে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কোন অবস্থাতেই শারী’আহ্ আইনের কাছে দায়বদ্ধ নয়। বরং, তাদের আইনু-কানুনের মূলভিত্তি হচ্ছে ব্যক্তিস্বাধীনতা (freedom) । অবিশ্বাসীরা জানে যে, মুসলিমরা গণতন্ত্রকে এর প্রকৃত চেহারায় গ্রহণ করবে না। এ কারণে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, একথা বলে মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্রের বিস্তার ঘটাতে চেয়েছে যে, গণতন্ত্র শুধুমাত্র শাসক নির্বাচনের একটি পদ্ধতি। এভাবেই তারা মুসলিম উম্মাহ্কে প্রতারিত করেছে এবং উম্মাহ্কে শাসনব্যবস্থা হিসাবে গণতন্ত্রকে মেনে নিতে প্ররোচিত করেছে। যেহেতু মুসলিম দেশসমূহ ইতিমধ্যে প্রকৃত রাজতান্ত্রিক কিংবাপ্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থার মোড়কে বিভিনড়ব স্বৈরশাসকদের স্বৈরাচারী শাসনের নীচে নানাভাবে অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এবং সেইসাথে, মুসলিম বিশ্বে জনগণের আবেগ-অনুভূতিকে প্রচন্ডভাবে অবদমিত রাখা হয়েছে, তাই এ ভূমিগুলোতে নতুন শাসক নির্বাচনের পদ্ধতি হিসাবে গণতন্ত্রের বিস্তার ঘটানো সহজ। এভাবেই তারা গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্পর্কে আলোচনাকে সযতেড়ব এড়িয়ে গেছে –  যা হচ্ছে স্রষ্টার পরিবর্তে তাঁর সৃষ্ট মানুষকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতার বিষয়টি।

    দূর্ভাগ্যবশত কিছু ইসলামী শাস্তি বিদ, যাদের মধ্যে কিছু উলামাও আছেন, তারা সৎ কিংবা অসৎ নিয়তে এই প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়েছেন। যদি তাদের কাছে গণতন্ত্র সম্বন্ধে জানতে চাওয়া হয়, তাহলে তারা বলেন এটা শাসক নির্বাচন করার একটি পদ্ধতি মাত্র। আর, এদের মধ্যে যারা অবিশ্বাসীদের মতোই মুসলিমদের সাথে প্রতারণা করতে চায়, তারা গণতান্ত্রিক মতবাদ প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থটি এড়িয়ে গিয়েই এ বিষয়ে জনগণকে তথ্য প্রদান করে। তারা এ বিষয়ে আলোচনা সবসময় পরিহার করতে চায় যে, গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে মানুষকে সার্বভৌমত্ব প্রদান করা, মানুষের হাতে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা অর্পণ করা, সংখ্যা গরিষ্ঠের ইচ্ছানুযায়ী আইন প্রণয়ন করা; এমনকি সংখ্যাগরিষ্ঠের

    ইচ্ছানুযায়ীই যে কোন বিষয়ে অনুমোদন, নিষেধাজ্ঞা, উৎসাহ প্রদান কিংবা তিরষ্কার করা। এ সকল গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার পরিবর্তে এ মতবাদের প্রচারকরা শুধুমাত্র নির্বাচনের বিষয়টি জনসম্মুখে তুলে ধরে।

    গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তিকে তার ইচ্ছানুযায়ী যা খুশী তাই করার জন্য অবশ্যই স্বাধীন হতে হবে (তা না হলে সে সার্বভৌম হবে কিভাবে?) অতএব, এ ব্যবস্থায় সে চাইলে মদ পান করতে পারে, যিনাহ্ করতে পারে, ধর্মত্যাগ করতে পারে কিংবা পবিত্র বিষয় নিয়ে কটুক্তিও পারে। এ সবকিছুই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে অনুমোদিত। মূলতঃ এটাই হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রকৃত বাস্তবতা এবং প্রকৃত অর্থ। এ সবকিছু অনুধাবন করার পরেও কিভাবে একজন মুসলিম, যে কিনা ইসলামী আক্বীদাহ্’র উপর বিশ্বাস করে বলতে পারে যে, গণতন্ত্র মুসলিমদের জন্য অনুমোদিত কিংবা গণতন্ত্র ইসলাম থেকেই উত্থিত?

    ইসলাম জনগণ কর্তৃক খলীফা নির্বাচনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নির্ধারণ করেছে। যদিও ইসলামে সার্বভৌমত্ব সম্পূর্ণভাবে শারী’আহ্’র, কিন্তু উম্মাহ্’র   (জনগণ) বাই’আতের মাধ্যমে নির্বাচিত হওয়া যে কারও খলীফা হবার একটি মৌলিক শর্ত। ইসলামী শাসনব্যবস্থায় সেই সপ্তম শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকেই খলীফা নির্বাচন হয়েছে, যখন সমগ্র বিশ্ব স্বৈরশাসক ও রাজা-বাদশাহদের ভয়ঙ্কর অত্যাচার, নির্যাতন ও নিপীড়নের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত ছিল। কেউ যদি খোলাফায়ে রাশেদীন অর্থাৎ, আবু বকর (রা.), উমর (রা.), উসমান (রা.) এবং আলী (রা.) এর নির্বাচন প্রক্রিয়াকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেন, তবে এটা তার কাছে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হবে যে, এদের প্রত্যেককে খলীফা হিসাবে নির্বাচনের ক্ষেত্রেই মুসলিম উম্মাহ্’র  প্রভাবশালী অংশ এবং উম্মাহ্’র  প্রতিনিধিদের কাছ থেকে বাই’আত      গ্রহণ করা হয়েছিল। উমর (রা.) এর শাসনামলের শেষের দিকে আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা.) কে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল মুসলিম উম্মাহ্’র  প্রতিনিধিদের (তৎকালীন মদীনার জনগণ) কাছ থেকে খলীফা নির্বাচনের ব্যাপারে মতামত সংগ্রহের জন্য। মদীনার জনগণ খলীফা পদে কাকে নির্বাচিত করতে চায় এ তথ্য অনুসন্ধানে তিনি মদীনার বহুসংখ্যক মানুষের বাসগৃহে প্রবেশ করে জনগণের মতামত যাচাই করেছিলেন। তিনি মদীনার নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের সাথে এ বিষয়ে কথা বলেছিলেন যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি এ সিদ্ধান্ত পৌঁছেছিলেন যে, সামগ্রিকভাবে জনমতের পাল্লা উসমান (রা.) এর দিকেই ভারী হয়েছে। এরপর, উসমান (রা.)কে বাই’আতের মাধ্যমে খলীফা হিসাবে নির্বাচন করা হয়।

    পরিশেষে একথা বলা যায় যে, গণতন্ত্র একটি কুফরী ব্যবস্থা। এটি এ কারণে নয় যে, এটা মানুষকে শাসক নির্বাচনের ক্ষমতা দেয়; কারণ এটি প্রকৃতঅর্থে মূল আলোচ্য বিষয়ও নয়। বরং এটি এ কারণে যে, যে কোন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূলভিত্তিই হল মানুষের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা, এ মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নয়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    “বস্তুত সার্বভৌমত্ব ও শাসন কর্তৃত্ব আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো জন্য নয়।”
    [সূরা ইউসুফ: ৪০]

    “কিন্তু ‘না, তোমার রব এর শপথ, এরা কিছুতেই ঈমানদার হতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা তাদের পারস্পরিক মতভেদের ব্যাপারসমূহে তোমাকে ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে নেবে। অতঃপর তুমি যাই ফায়সালা করবে, সে সম্পর্কে তারা নিজেদের মনে কিছুমাত্র কুন্ঠাবোধ করবে না, বরং এর সম্মুখে নিজেদেরকে পূর্ণরূপে সোপর্দ করে দেবে।”
    [সূরা আননিসা: ৬৫]

    এরকম আরও অনেক প্রসিদ্ধ দলিল রয়েছে যা নিশ্চিত করে যে, আইন প্রণয়নের একমাত্র ক্ষমতা হল আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার।  এছাড়া, আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, গণতন্ত্র ব্যক্তিস্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়, যেখানে কোন নারী বা পুরুষ হালাল-হারামের প্রতি লক্ষ্য না করেই যা খুশী তাই করতে পারে। গণতন্ত্র ধর্মীয় স্বাধীনতার নামে ধর্মত্যাগের অধিকার প্রদান করে এবং ধর্ম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কোনরূপ বাঁধা আরোপ করে না। এছাড়া, মালিকানা অর্জনের স্বাধীনতা মূলতঃ ধনীকে অসৎ ও প্রতারণাপূর্ণ উপায়ে দূর্বলকে শোষণ করার অনুমোদন দেয়; ফলে, ধনীর সম্পদ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং দরিদ্র আরও বেশী দরিদ্র হতে থাকে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা সত্য বলাকে উৎসাহিত করে না, বরং উম্মাহ্’র পবিত্র আবেগ-অনুভূতিকে নির্মম আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করতেই তা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এটি এ পর্যায়ে ব্যবহৃত হয়ে থাকে যে, যারা মত প্রকাশের ছদ্মাবরণে ইসলামকে আক্রমণ করে তাদের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার মানুষ হিসাবে গণ্য করা হয় এবং এ হীনচেষ্টার জন্য তাদেরকে পুরস্কৃতও করা হয়।

    উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামী শাসনব্যবস্থা (খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা) রাজতান্ত্রিক, সাম্রাজ্যবাদী, ফেডারেল, প্রজাতান্ত্রিক কিংবা গণতান্ত্রিক কোনটিই নয়।

    ৩. খিলাফত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানসমূহ বর্তমান প্রচলিত শাসনব্যবস্থার প্রতিষ্ঠানসমূহের অনুরূপ নয়, যদিও কোন কোন অংশকে আপাতদৃষ্টিতে সদৃশ মনে হতে পারে। বস্তুতঃ খিলাফত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানসমূহ উদ্ভুত হয়েছে হিজরতের পর মদীনা আল-মুনাওওরায় রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত প্রথম ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানসমূহ থেকে। এই শাসনব্যবস্থাই পরবর্তীতে খোলাফায়ে রাশেদীন (রা.) কর্তৃক অনুসৃত হয়েছিল, যারা শাসক হিসাবে রাসূল (সা) এর উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন।

    (এ বিষয়ের সাথে) প্রাসঙ্গিক ইসলামী দলিল-প্রমাণগুলোর সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ এটা নিশ্চিত করে যে, খিলাফত রাষ্ট্র

    নিমড়বলিখিত প্রতিষ্ঠানসমূহ নিয়ে গঠিত ছিল:

    ১. খলীফা

    ২. খলীফার প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী (মু’ওয়ায়ীন আত তাফউয়ীদ বা Delegated Assistants)

    ৩. খলীফার নির্বাহী সহকারী (মু’ওয়ায়ীন আত তানফীদ – Executive Assistants)

    ৪. গভর্ণরবৃন্দ (উ’লাহ্ – Wulah)

    ৫. আমীর-উল-জিহাদ

    ৬. আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ

    ৭. পররাষ্ট্র বিষয়ক বিভাগ

    ৮. শিল্প বিষয়ক বিভাগ

    ৯. বিচার বিভাগ

    ১০. প্রশাসনিক বিভাগ

    ১১. বাইতুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার)

    ১২. তথ্য বিভাগ (আল ই’লাম – I’laam)

    ১৩. উম্মাহ্ কাউন্সিল (মাজলিস আল-উম্মাহ্ – Majlis al-Ummah)

    এই বইয়ের উদ্দেশ্যই হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানসমূহকে বিস্তৃত আকারে শারী’আহ্ দলিল-প্রমাণের বিশ্লেষণসহ উৎস থেকে বিশদভাবে আলোচনা করা। আমরা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে প্রার্থনা করছি যেন তিনি বিজয়ের মাধ্যমে আমাদের সম্মানিত করেন এবং দ্বিতীয় খোলাফায়ে রাশেদীন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আমাদেরকে সাহায্য করে ইসলাম এবং মুসলিমদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে দেন। সেইসাথে, এ খিলাফতের মাধ্যমেই কাফের ও মুশরিকদের অপমানিত করেন। সর্বোপরি, সমগ্র বিশ্বব্যাপী ইসলামের সুসংবাদকে ছড়িয়ে দিয়ে পৃথিবীর সর্বত্র সুবিচার প্রতিষ্ঠিত করেন।

    “আল্লাহ্ তো নিজের কাজ সম্পূর্ণ করবেনই। আল্লাহ্ প্রতিটি জিনিসের জন্য একটি তকদীর বা মাত্রা নির্দিষ্ট করে রেখেছেন।”
    [সূরা আত-তালাক: ৩]

    ১৪ই জ্বিল-হজ্ব ১৪২৫ হিজরী
    ২৪/০১/২০০৫ইং

  • মুখবন্ধ

    মুখবন্ধ

    (নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি বিশ্বখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেম শাইখ আতা ইবনু খলীল আল-রাশতার অধীনে সম্পাদিত ‘আজহিজাতু দাওলিাতিল খিলাফাহ – ফিল হুকমি ওয়াল ইদারাহ’ বইটির বাংলা অনুবাদ হতে গৃহীত)

    সকল প্রশংসা মহান আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার এবং দুরূদ ও সালাম রাসূলুল্লাহ্ (সা), তাঁর পরিবার, সাহাবীগণ (রা.) এবং পরবর্তীযুগের অনুসারীদের প্রতি।

    আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন:

    তোমাদের মধ্য হতে যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে আল্লাহ্ তাদের এ ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি তাদের পৃথিবীতে খিলাফত দান করবেন, যেরূপ তাদের পূর্ববর্তীদের দান করেছিলেন আর তিনি অবশ্যই তাদের দ্বীনকে, যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন, সুদৃঢ় করবেন এবং তাদের (বর্তমান) ভয়-ভীতির পরিবর্তে তাদের নিরাপত্তা দান করবেন। তারা শুধু আমারই বন্দেগী করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না। অতঃপর যারা কুফরী করবে তারাই আসলে ফাসেক।
    [সূরা আন-নূর: ৫৫]

    রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:

    “তোমাদের মধ্যে নবুয়্যত থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ্ ইচ্ছা করেন, তারপর আল্লাহ্ তার সমাপ্তি ঘটাবেন। তারপর প্রতিষ্ঠিত হবে নবুয়্যতের আদলে খিলাফত। তা তোমাদের মধ্যে থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ্ ইচ্ছা করেন, অতঃপর তিনি তারও সমাপ্তি ঘটাবেন। তারপর আসবে যন্ত্রণাদায়ক বংশের শাসন, তা থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ্ ইচ্ছা করেন। এক সময়”আল্লাহ’র ইচ্ছায় এরও অবসান ঘটবে। তারপর প্রতিষ্ঠিত হবে জুলুমের শাসন এবং তা তোমাদের উপর থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ্ ইচ্ছা করেন। তারপর তিনি তা অপসারণ করবেন। তারপর আবার ফিরে আসবে খিলাফত  নবুয়্যতের আদলে।”
    (মুসনাদে আহমদ, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা-২৭৩, হাদীস নং-১৮৫৯৬)

    আমরা, হিযবুত তাহরীর-এর সদস্যগণ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দেয়া এ প্রতিশ্রতিতে বিশ্বাস করি এবং সেইসাথে বিশ্বাস করি, রাসূল (সা) আমাদেরকে যে সুসংবাদ দিয়েছেন তার উপর। এ পৃথিবীর বুকে খিলাফত রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠারজন্য সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্কে সাথে নিয়ে এবং এই উম্মাহ্’র   মধ্যে আমরা ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছি। লক্ষ্যে পৌঁছানোর ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত এবং সফলতার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। আমরা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে প্রার্থনা করি যেন খিলাফত রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি আমাদেরকে সম্মানিত করেন এবং আমাদেরকে খিলাফত রাষ্ট্রের অকুতোভয় সৈনিকে পরিণত করেন, যেন আমরা খিলাফতের পতাকা গৌরবের সাথে উত্তোলিত করতে পারি এবং এ পতাকাকে একের পর এক বিজয়ের দিকে ধাবিত করতে পারি। নিশ্চয়ই কৃত প্রতিশ্রতিতে সত্যে পরিণত করা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার জন্য কোন কঠিন কাজ নয়।

    বস্তুতঃ এই বইয়ের মাধ্যমে আমরা খিলাফত রাষ্ট্রের শাসন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার বাস্তব রূপরেখা মুসলিম উম্মাহ্’র কাছে স্বচ্ছ ও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে চেয়েছি – যাতে করে এটি মুসলিমদের খিলাফত রাষ্ট্রের ব্যাপারে স্বচ্ছ ধারণা দেয়। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, খিলাফত রাষ্ট্রের ব্যাপারে স্পষ্ট এ ধারণার মাধ্যমে মুসলিমদের হৃদয় যেন এমন পর্যায়ে উন্নীতহয়, যাতে তারা খিলাফত রাষ্ট্রকে অন্তর দিয়ে স্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে পারে এবং এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণপণ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়।

    প্রকৃতপক্ষে, এ বইটি রচনার পেছনে আমাদের মূল প্রেরণা হল, বর্তমান বিশ্বের শাসনব্যবস্থা সমূহ তাদের উৎস, ভিত্তি কিংবা কাঠামো কোনদিক থেকেই ইসলামী শাসনব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এছাড়া, মুসলিম উম্মাহ্’র  কাছে এটি স্পষ্ট যে, বর্তমান শাসনব্যবস্থাসমূহ আল্লাহ্ প্রদত্ত কিতাব, রাসূল (সা) এর সুন্নাহ্ ও ইসলামী শারী’আহ্ ’র অন্যান্য বৈধ উৎস থেকে উৎসারিত নয়। শুধু তাই নয়, মুসলিমদের মধ্যে এ ব্যাপারে কোন মতানৈক্য নেই যে বর্তমানে প্রচলিত এসকল ব্যবস্থা ইসলামী আক্বীদাহ্’র সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। মূলতঃ যে বিষয়ে মুসলিমরা বিভ্রান্ত হন তা হল, প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে বর্তমানে বাস্তবায়িত শাসনব্যবস্থা সমূহের গঠন প্রণালী ইসলামী শাসনব্যবস্থার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কি না। আর, এ কারণেই তারা মন্ত্রী পরিষদ ও বিভিন্ন মন্ত্রনালয় দিয়ে পরিচালিত ইসলাম বহির্ভূত মানবরচিত ব্যবস্থাগুলোর মতোই বিভিন্ন মন্ত্রী ও মন্ত্রনালয়ের অস্তিত্বকে অবলীলায় স্বীকার করে নেন। এ বইয়ে খিলাফত রাষ্ট্রের কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানসমূহ (Structure and Institutions) নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে, যেন এ পৃথিবীতে খিলাফত রাষ্ট্র পুণরায় আবির্ভূত হবার আগেই মুসলিমদের অন্তরে এ রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা তৈরী হয়, ইনশা’আল্লাহ্।

    এ বইয়ে আমরা খিলাফত রাষ্ট্রের পতাকা ও ব্যানার ব্যবহারের বিষয়টিকেও অন্তর্ভূক্ত করেছি। এছাড়া, অন্যান্য অনেক প্রয়োজনীয় বিষয় রয়েছে যা নিয়ে এ বইয়ে আমরা বিশদভাবে আলোচনা করিনি। ইন্শা’আল্লাহ্, সেগুলো নির্ধারিত সময়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে খলীফা নির্বাচন পদ্ধতি, খলীফার  বাই’আত    বা শপথে উচ্চারিত শব্দসমূহ, খলীফা বন্দী হলে অন্তর্বর্তীকালীন আমীরের আবশ্যিক ক্ষমতাসমূহ, উলাই’য়াহ্ বা প্রদেশসমূহের পুলিশ প্রশাসন গঠন ও আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগে নারীপুলিশ সদস্যের নিয়োগ, উলাই’য়াহ্ প্রতিনিধি পরিষদ নির্বাচন করার প্রক্রিয়া, মাজলিস আল উম্মাহ্’র   প্রতিনিধি নির্বাচন করার প্রক্রিয়া, ইসলামী রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সঙ্গীতের ব্যাপারে ঐক্যমতে পৌঁছানো (official state anthem) ইত্যাদি। অবশ্য এ বইয়ে এই বিষয়গুলো সম্পর্কে নির্ধারিত স্থানে আমরা প্রয়োজনানুসারে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছি।

    আমরা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে প্রার্থনা করছি যেন তিনি অতিসত্ত্বর আমাদের বিজয় দান করেন, আমাদের উপর তাঁর করুণা বর্ষণ করেন এবং সর্বোপরি, তাঁর সাহায্য ও রহমতের দ্বারা আমাদের সম্মানিত করেন – যেন মুসলিম উম্মাহ্ আবারও এ পৃথিবীতে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাহ্ হিসেবে পরিগণিত হয়। সেইসাথে, প্রথমবার প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের আদলে এ বিশ্বে খিলাফত রাষ্ট্র আবারও প্রতিষ্ঠিত হয় – যেন এ রাষ্ট্র তার অধীকৃত সমগ্র অঞ্চল ও সীমানার সর্বত্র ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

    বস্তুতঃ সেটাই হবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যখন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রদত্ত বিজয়ে মুসলিমদের চিত্ত আনন্দে উদ্ভাসিত হবে এবং এ বিজয়ের মাধ্যমেই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের অন্তর কে প্রশান্ত করবেন।

    পরিশেষে, আমরা শুধু সন্তুষ্টচিত্তে ও অকুন্ঠভাবে মহান আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রশংসা করি, যিনি এ সমগ্র বিশ্বব্রক্ষ্মান্ডের প্রতিপালক, সৃষ্টিকর্তা এবং একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী।

  • বহুরূপী সেকুলারিজম!

    বহুরূপী সেকুলারিজম!

    ইদানিং আমাদের সমাজ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু কনসেপ্ট আলোচনা করা হয়। যেমন, সেকুলারিজম (ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ/ইহজাগতিকতাবাদ), প্লুরালিজম (বহুত্ববাদ), বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা এবং ইসলাম ও ইসলামের মধ্যে ফিরকার সাথে এর সম্পর্ক বা সংঘর্ষ কী। আজ আমরা এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো।

    ১. Pluralism (বহুত্ববাদ): সমাজ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সেকুলার গোষ্ঠী বহুত্ববাদকে সংজ্ঞায়িত করে। সমাজে বিভিন্ন ধরণের, বিভিন্ন চিন্তার মানুষ থাকে এবং বিভিন্ন (রাজনৈতিক/সামাজিক) ভাবে তারা তাদের মত/দাবীসমূহ প্রকাশ করে থাকে। সমাজের মানুষের বিভিন্ন ধাঁচের চিন্তাসমূহকে সেকুলার ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে থেকে সমাজে জায়গা করে দেওয়া ও সহ-অবস্থানের সুযোগ দেয়ার নামই হচ্ছে প্লুরালিজম। তবে এ ক্ষেত্রে সেকুলার পুঁজিবাদী ফ্রেমওয়ার্ক তার বিরুদ্ধে কাজ করে এমন কোন চিন্তার অবস্থানের সুযোগ দিতে চায় না। 

    পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি সেকুলারিজম তথা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ; এটিই সমাজের মানুষের জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভংগি নির্ধারন করে দেয়। এই সেকুলার ভিত্তি হচ্ছে জীবন থেকে ধর্মের পৃথকীকরণ। অর্থাৎ কোন দল বা ব্যক্তি যখন সেকুলার পুঁজিবাদী আদর্শের মধ্যে পরিচালিত হবে, তখন তাকে মূলত পুঁজিবাদী সেট করে দেওয়া নীতির মধ্যে থেকেই কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে এ ব্যবস্থায় গড়ে উঠা কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সমকামীতা, মদ খাওয়া কিংবা পতিতাবৃত্তির বৈধতার জন্য দাবি তুলতে পারে, কারণ এর সাথে পুঁজিবাদের সংঘর্ষ নেই। আবার এ আদর্শ মসজিদ, মাদ্রাসা, দান-খয়রাতের সংস্থার বৈধতাকেও সুযোগ করে দিতে পারে।

    ইসলামী জীবন ব্যবস্থায়ও সমাজে বিভিন্ন ধরণের মানুষই থাকবে, কিন্তু তা সেকুলার পুঁজিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি যেভাবে রাখতে চায় সেভাবে নয়। ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার ভিত্তি এর আকীদা; তথা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলু্ল্লাহ। আর এই আকীদাকে ভিত্তি করেই রাজনৈতিক দল, মত, গোষ্ঠী ও আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হবে। ইসলামী আকীদার সাথে সাংঘর্ষিক কোন দৃষ্টিভঙ্গি/চিন্তার সুযোগ এ সমাজে থাকতে পারবে না। অর্থাৎ একের অধিক দল, মত ও গোষ্ঠী ও ব্যক্তিবর্গ থাকলেও প্রত্যেককে ইসলামী আকীদার ভিত্তিতেই চলতে হবে। এবং তাদের মধ্যে ইসলামের মৌলিক বিষয় ব্যতীত শাখা প্রশাখা নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। এবং এ সব কিছু ইসলামী আকীদার ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে থেকেই হবে, এর বাইরে গিয়ে নয়। অর্থাৎ, সে একটি সঠিক মত তথা আল্লাহর হুকুমটি খুঁজতে গিয়ে একটি ফিকহী মতামতে উপনীত হতে পারে কিংবা ইসলামী আকীদা ও আদর্শের প্রসারের নিমিত্তে কোনো রাজনৈতিক পলিসির প্রচারক হতে পারে। কিন্তু তার এই স্বাধীনতা কোনোভাবেই তাকে ইসলামী আকীদার বাইরে গিয়ে কোনো সুস্পষ্ট হারামকে প্রচার কিংবা প্রসার করবার অনুমতি দেবে না। সুতরাং, একজন মুসলিম একইসাথে ইসলাম ও পুঁজিবাদীদের পণ্য Pluralism (বহুত্ববাদ), যা কুফরের অস্তিত্বকে প্রচার করে তা গ্রহণ করতে পারে না। 

    ২. ফিরকা: বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমরা বহুতত্ত্বের পাশাপাশি বহুদলীয় সংঘাতময় রাজনীতি দেখি। অনেক সময় আমরা এই মানদন্ডে ইসলামের রাজনীতিকেও পরিমাপ করা শুরু করি। এবং এই মানদন্ড আমাদের মুসলিম উম্মাহ’র মাঝে ঐক্য সম্ভব নয় এমন চিন্তাও সৃষ্টি করে দেয়। আর এক্ষেত্রে অনেকে বুঝে কিংবা না বুঝে ইসলামের দলীলগুলোকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে, যাতে করে মুসলিম উম্মাহ’র মাঝে পরাজিত মানসিকতা তৈরি হয়।

    বনী ইসরাইল (আহলে কিতাবীরা/ইহুদী-খ্রীস্টানরা) বাহাত্তরটি ফিরকায় বিভক্ত হয়েছিল। আমার উম্মত তিহাত্তরটি ফিরকায় বিভক্ত হবে। তার মধ্যে এই জামা’আত ছাড়া বাকি সবাই জাহান্নামে যাবে।” [আবু দাউদ, মুসনাদে আহমদ, হাকিম] 

    এই হাদীসটির ভুল অর্থ নিয়ে আমাদের সমাজে প্রচলিত হচ্ছে, মুসলিম উম্মাহ’র মধ্যে অনেকগুলো দল হবে, এদের মধ্যে একটি দল জান্নাতে যাবে, বাকিগুলো সব জাহান্নামে। 

    ‘ফিরকা’ শব্দটি বহু শব্দের অর্থ প্রকাশ করে। কুর’আনে আল্লাহ ফিরকা শব্দটি কোথাও অংশবিশেষ বুঝাতে ব্যবহার করেছেন। আবার কোথাও নিন্দাসূচক অর্থে সেইসকল দলকে বুঝিয়েছেন, যারা ওহীকে বিকৃত করে নিজেদের বাসনা দিয়ে জীবন পরিচালিত করতো। 

    উক্ত হাদীসে আল্লাহ’র রাসূল(সা) ইহুদী ও খৃস্টানদের উদাহরণ এনে বুঝিয়েছেন, তারা বিভক্ত হয়ে পড়েছিল যেসব ইস্যুতে, তার অনুসরণকারীরাও তাদের মতোই পথভ্রষ্ট হবে। 

    ইহুদী ও খৃস্টনরা নবী-রাসূলদের ব্যাপারে মতভেদ করেছিল, তাদের প্রতি নাযিলকৃত কিতাবের ব্যাপারে মতভেদ করেছিল এবং একে অপরকে কাফির/মুরতাদ বলে সম্বোধন করতো। 

    সুতরাং, ইহুদী-খ্রীস্টানরা দ্বীনের বুনিয়াদী বিষয়গুলো নিয়ে মতভেদ করেছিল। নবী-রাসূল, কিয়ামত দিবস, আল্লাহর একত্ব, পুনরুত্থান, জান্নাত-জাহান্নামের মতো ঈমানের ভিত্তিসমূহ নিয়ে তারা মতভেদে জড়িয়ে পড়েছিল। রাসূল (সা) আলোচ্য ‘ফিরকা’ বিষয়ক হাদীসে আমাদেরকে ইহুদী-খ্রীস্টানদের মতো মতভেদ করতে নিষেধ করেছেন। এর মানে হলো, দ্বীনের ভিত্তিসমূহ নিয়ে মতভেদ নিষিদ্ধ। 

    অর্থ্যাৎ ফিরকা হচ্ছে ঐ সকল দল যারা দ্বীনের মৌলিক বিষয় নিয়ে মতভেদ করে (যেমন কাদিয়ানী, ঈসমাঈলী ও আলাওয়ী শিয়া ইত্যাদি)। কিন্তু দ্বীনের শাখাপ্রশাখার ক্ষেত্রে মতভেদ করলে তা উপরোক্ত হাদীসে উল্লেখিত ফিরকা হবে না, কারণ এই মতভেদ বৈধ। সাহাবীগণ (রা) এরূপ মতভেদ করেছেন। বর্তমান উম্মাহর মাঝে বৈধ দল, মত ও গোষ্ঠী যেমন রয়েছে, তেমনি ফিরকাও রয়েছে। প্রত্যেককে আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে হবে। যেমন হাদীসে এসেছে: 

    সত্ত্বরই আমার উম্মত ৭০-এরও কিছু বেশি ফিরকায় বিভক্ত হবে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফিরকা হবে একদল যারা বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মনগড়া সিদ্ধান্ত দেবে এবং তারা হালালকে হারাম করবে ও হারামকে হালাল করবে”। [হাকিম] 

    এ হাদীস অনুযায়ী বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় ফিরকা হচ্ছে যারা আল্লাহর আইন তৈরির একচ্ছত্র অধিকারকে নিজেদের অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে, সমাজের জন্য কোনটি বৈধ তথা হালাল এবং কোনটি অবৈধ তথা হারাম তা আইনগতভাবে নির্ধারন করা নিজেদের অধিকার বলে বিবেচনা করে। এবং সেকুলার গণতন্ত্র হচ্ছে সেই ব্যবস্থা যা এর উপর ভিত্তি করে পরিচালিত। সুতরাং যারা যেনে বুঝে সেকুলার গণতন্ত্রকে ব্যবস্থারূপে গ্রহণ করে, তারাও হাদীসে বর্ণিত পথভ্রষ্ট ফিরকার অংশ বলে বিবেচিত হবে। 

    ৩. বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা: ইসলামে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা রয়েছে, ফলে ব্যক্তি ভালো-মন্দ যেকোনো চিন্তা ও কাজকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বুঝে নিতে পারবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও চিন্তা থাকবে উন্মুক্ত। তবে যেহেতু একজন মুসলিমের কাজের ভিত্তি হলো হালাল-হারাম, তাই পুঁজিবাদের তথাকথিত স্বাধীনতার বুলি উড়িয়ে স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ ইসলামে নেই, কর্মের ক্ষেত্রে শরীআহর গন্ডির ভিতরেই অবস্থান থাকতে হবে। ইসলামী সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক বা চিন্তার স্বাধীনতার উদাহরণ দিতে গেলে, সাহাবাদের (রা) চিন্তাগুলো উঠে আসে। বদরের যুদ্ধের পরে বন্দীদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে আল্লাহ’র রাসূল (সা) সাহাবাদের মত জানতে চান। উমার (রা) ভিন্ন সকলেই একই মত এবং রাসূল (সা) তা শাসক হিসেবেই গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রের শাসক হিসেবে যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাই সকলেই মেনে নিতে বাধ্য, যদিওবা তার মত ভিন্ন হতে পারে। একইভাবে, আবু বকর (রা) খিলাফতকালে উমার (রা) এর নিজস্ব মত থাকলেও, তিনি খলীফার মতকেই মেনে নিয়েছেন। কারণ শরীয়াহ’র দুটো মূলনীতি হলো “খলীফার আদেশ মতভেদের অবসান ঘটায়” ও “খলীফার আদেশ মান্য করা বাধ্যতামূলক”।

    অর্থাৎ রাষ্ট্র যখন কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে (লেনদেন ও শাস্তির বিধানের ক্ষেত্রে), তা ব্যতিরেকে অন্য বিষয়াবলী শরীয়াহ’র গন্ডির মধ্যে পালন করাই বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা, কারণ যেহেতু ইসলামী আকীদাহ একটি বুদ্ধিবৃত্তিক তথা নিশ্চিত আকীদা, তাই ইসলামী আদর্শের গন্ডির ভেতরে থাকাটা বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার পরিপন্থী নয়। এবং এর সাথে সেকুলার আকীদা থেকে উৎসরিত প্লুরালিজমের কোনো সম্পর্ক নেই, বরং এ স্বাধীনতা পুরোটাই ইসলামী আকীদা থেকে উৎসরিত। 

    পুঁজিবাদী জীবন ব্যবস্থায় Pluralism এর দোহাই দিয়ে তারা মানুষকে নিজেদের তাড়নার দাসে পরিণত করে রেখেছে এবং ইসলামের রাজনীতিকে তারা ফিরকা হিসেবে সাব্যস্ত করতে চায়। পাশাপাশি ইসলামে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার কোন অবকাশ নেই বলে প্রচারণা চালায়। কিন্তু মূল বাস্তবতা ভিন্ন; তা হলো, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পুঁজিবাদ নিজেই তার ফ্রেমওয়ার্কের সমালোচনা করার কোন সুযোগ রাখে না, যদিও বহুত্ববাদের প্রচারণা তারাই চালায়। ফিরকার দোহাই দিইয়ে পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার মাধ্যমে তারা উম্মাহ’র মধ্যে ঐক্যের ফাটল ধরিয়ে রেখেছে আর বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতাকেও তারা নিজেদের সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করেছে, যাতে করে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে উম্মাহ’র মাঝে পরাজিত মানসিকতা তৈরি হয়। 

    ১৯২৪ সালে ইসলামি খিলাফত রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর থেকে সেকুলার পুঁজিবাদ ইসলামী রাষ্ট্রকে ভেঙ্গে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রসমূহে পরিণত করে। রাজনৈতিক, সামরিক আগ্রাসনের পাশাপাশি সে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনও চালিয়ে যাচ্ছে মুসলিমদের উপর। মুসলিম উম্মাহ’র মাঝে বপন করছে পুঁজিবাদের নিজস্ব চিন্তা থেকে উৎসরিত বিষফোঁড়া। 

    ফলশ্রুতিতে মুসলিম উম্মাহ’র মাঝে তাদের নিজেদের অজান্তেই ইসলামী আকীদার সাথে সাংঘর্ষিক চিন্তাসমূহ লালিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি মুসলিমদের মাঝে পরাজিত মানসিকতাবোধ তৈরির জন্যও বিভিন্ন চিন্তা প্রবেশ করাচ্ছে। জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম ইত্যাদির পাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ দ্বারা গড়া বহুত্ববাদ (Pluralism) তারা আমাদের মাঝে প্রবেশ করিয়েছে। ইসলামের দলীলগুলো সম্পর্কে তাদের নিজেদের ব্যাখ্যা জুড়ে দিয়েছে, যা আমাদের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি করছে এবং ইসলাম বাস্তবায়নের থেকে মুসলিম উম্মাহকে দূরে সরিয়ে রাখছে।

  • আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ

    আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ

    প্রশ্ন:

    বিগত ২৪/৫/২০১৮ তারিখে বিশ্বব্যাপী তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেল প্রতি ৭৯ মার্কিন ডলার এবং টেক্সাস ক্রুড ব্যারেল প্রতি ৭১ মার্কিন ডলার মূল্যে বিক্রয় হচ্ছে। ২০১৪ সালের ক্রমাগত দরপতনের পর এই মূল্য বৃদ্ধি কী আবারও তেলের উচ্চ মূল্যের যুগের সূচনার লক্ষণ? আমরা কি অতীতের মত আবারও ব্যারেল প্রতি ১৫০ মার্কিন ডলার মূল্যের দিকে যাচ্ছি? এই উচ্চমূল্য বৃদ্ধির কারণ কী?

    উত্তর:

    অন্য যে কোন পণ্যের মত তেলের মূল্য চাহিদা এবং যোগানের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু অন্য সকল পণ্য থেকে তেলের মূল্য অতি মাত্রায় অস্থিতিশীল। আন্যভাবে বলা যায় চাহিদা বা যোগানের যে কোন উপাদানের সমান্যতম পরিবর্তন তেলের মূল্যকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে। জ্বালানী তেলের বাজারের প্রকৃতির কারণেই তেলের মূল্যের এই উঠানামা। এছাড়াও রয়েছে ফটকা কারবারের প্রভাব বিশেষ করে রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন বা এর সম্ভবনা তেলের বাজারকে করে আরও অস্থিতিশীল। বিষয়টি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য নিচের আলোচনাটি উপস্থাপন করা হল:

    ১. বিশ্ব বাজারে তেলের যোগান 

    ক. পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশসমূহের সংগঠন ওপেক এবং নন-ওপেকভুক্ত দেশ সমূহ বিশ্ববাজারে তেলের যোগনকে সীমিত করার বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেছে। ২০১৬ সালের শেষের দিকে রাশিয়া এবং ওপেকভুক্ত দেশসমূহ তেলের অতিরিক্ত যোগনকে সীমিত করা এবং মূল্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিদিনে তেলের উৎপাদনকে ১.৮ মিলিয়ন ব্যারেলে সীমিত রাখার জন্য চুক্তি সম্পাদন করেছিল। গবেষণায় উঠে এসেছে যে গত এপ্রিল মাসে টানা তৃতীয়বারের মত তেলের উৎপাদন ছিল সর্বনিম্ন প্রতিদিন মাত্র ৩২ মিলিয়ন ব্যারেল যা গত মার্চ মাসের প্রতিদিনের উৎপাদন থেকে ১৪০,০০০ ব্যারেল কম। আজকে তেলের উৎপাদন প্রতিদিন মাত্র ৩২.৭৩ মিলিয়ন ব্যারেল যা ওপেকের প্রতিদিনের জন্য নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৭৩০,০০০ ব্যারেল কম। ওপেকের চুক্তিটি আগামী এক বছর কার্যকর থাকবে। যদি বর্তমান অবস্থা আব্যাহত থাকে তবে তেলের মূল্য আরও বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। এনার্জি আসপেক্টসের দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা দলের প্রধান পরামর্শক ম্যাথি ব্যারি বলেন, “বর্তমানে যোগান স্বল্পতার কারণে যে মূল্য বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে ভবিষ্যতে এর তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে অনুমান করা যাচ্ছে ” (marketwatch.com)

    খ. ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেশটির তেলের উৎপাদনের লক্ষ্যকে পূরণে বাধা সৃষ্টি করছে। ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে দেশটি প্রতি দিন মাত্র ১.৪১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করে যা ছিল ২০১৮ সালের মার্চ মাস থেকে ৮০,০০০ ব্যারেল কম, এবং ২০১৭ সালের প্রতি দিনের গড় উৎপাদন থেকে ৫,৪০,০০০ ব্যারেল কম। ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন কমার জন্য মূলত দায়ী দেশটির সরকারের নীতি এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল এবং গ্যাস কোম্পানী পিডিভিএসএর অদক্ষতা। এছাড়াও সাম্প্রতি ২ টি তেল ক্ষেত্র নিয়ে বিরোধের বিচারাধীন মামলায় আদালত পিডিভিএসএকে কনকো-ফিলিপসকে ২ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ প্রদানের রায় প্রদান করে। এখন পর্যন্ত পডিভিএসএ ক্ষতিপূরণের ২.৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধে ব্যার্থ হয়েছে। এই সকল ঘটনাগুলো ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে হ্রাস করে যার ফলে বিশ্ববাজারে দেশটির তেলের যোগান যথেষ্ট পরিমাণে হ্রাস পায়। 

    গ. প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণায় ইরনের তেল শিল্পের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০১২ সালে ওবামা ইরানের উপর এই ধরনের একটি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। উক্ত নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের উৎপাদন ক্ষমতা ২০% বা দিনে ৫০০,০০০ থেকে ৪০০,০০০ ব্যারেলে হ্রাস পেতে পারে যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (foreignpolicy.com). যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইরানের উপর কোন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে তা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে নাই, ইরানের তেল শিল্পকে টার্গেট করে ব্যবস্থা নেয়ার আশংকা করা হচ্ছে। 

    উপরোক্ত তিনটি ঘটনার প্রভাবে বিশ্বব্যাপী তেলের যোগান সীমিত হচ্ছে এবং এর প্রভাবে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

    ২. চাহিদা 

    ক. আর্ন্তজাতিক শক্তি সংস্থার মতে বিশ্বব্যাপী প্রতি দিনের তেলের চাহিদা ৯৯.৩ মিলিয়ন ব্যারেল যা ২০১৭ সালে ছিল ৯৭.৮ মিলিয়ন ব্যারেল। সংস্থাটি বিশ্বব্যাপী তেলের প্রতিদিনের চাহিদার প্রবৃদ্ধি ১.৩ থেকে ১.৪ মিলিয়ন হবে বলে প্রাক্কলন করে। আর্ন্তজাতিক শক্তি সংস্থা তাদের মাসিক মার্কেট রিপোর্টে ২০১৭ সালে প্রতি দিন তেলের ব্যাবহার ১.৬ মিলিয়ন ব্যারেল করে বৃদ্ধি পায় বলে প্রকাশ করে (reuters.com)। 

    খ. চাহিদা বৃদ্ধির আর একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে চীনের তেলের চাহিদার উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি। চীন ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে দিনে ৯ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ব্যবহার করেছিল যা ছিল সমগ্র বিশ্বের তেলের ব্যাবহারের ১০% এবং এশিয়ার মোট চাহিদার ১/৩ এরও বেশী। যদি তেলের মূল্য ব্যারেল প্রতি ৭৫ ডলার হয়, তবে চীনের এক মাসের তেল আমদানীর খরচ হবে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেও বেশী। ধারণা করা হয় চীনের প্রকৃত চাহিদা আরও অনেক বেশী। গোল্ডম্যান সাসেস ব্যাংক তাদের একজন গ্রাহককে এক নোটে বলেন, “চীনের চাহিদা দেশটির উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির বহিঃপ্রকাশ, প্রকৃত চাহিদা বর্তমান প্রাক্কলন থেকে আনেক বেশী বলে ধারনা করা হয়” (reuters.com)

    উপরের আলোচনা থেকে বলা যায়, তেলের ব্যাবহারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে যার ফলে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

    ৩. ফটকা কারবার 

    জ্বালানী তেলের চাহিদা এবং যোগানের নাটকীয় পরিবর্তন ফটকা কারবারীদের তেলের বাজারে আকৃষ্টি করে। বাজারের স্বাভাবিক চাহিদা ও যোগানের কারণেই যে তেলের মূল্যের ব্যাপক উত্থান-পতনর কারণ বলে প্রতিয়মান হচ্ছে না। ইহা থেকে সহজে অনুমেয় যে তেলের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির পিছনে রয়েছে ফটকা কারবারের প্রভাব। বড় হেজ ফান্ডগুলো ক্রয় এবং বিপুল পরিমাণ চুক্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে তেলের বাজারকে প্রভাবিত করে। সুতরাং, বলা যায় ফটকা কারবারের তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও হ্রাসের দ্বৈত ভূমিকা রাখে। এই কারবারিরা কখনও চাহিদা বৃদ্ধি করে তেলের মূল্য বাড়ায় আবার কখনও চাহিদা হ্রাস করে তেলের মূল্য কমায়। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ফটকা বাজারের প্রভাব খুব বেশি নয় বরং চাহিদা যোগানই তেলের মূল্য বৃদ্ধির মূল কারণ বলে প্রতীয়মান হয়। 

    বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তেলের মূল্য ব্যারেল ১৫০ মার্কিন ডলার বা তার বেশি হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি দেখা যাচ্ছেনা। ধারনা কার যাচ্ছে তেলের মূল্য ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেল প্রতি প্রায় ১০০ মার্কিন ডলারে পর্যন্ত হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের আসন্ন বাণিজ্যযুদ্ধ তেলের চাহিদাকে হ্রাস করতে পারে যার ফলে তেলের মূল্য হ্রাস পাবে বলে ধারণা করা যায়। এছাড়াও, তেলের মূল্য যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছার বাহিরে বৃদ্ধি পায় তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাউদি আরবকে দিয়ে ওপেকভুক্ত দেশগুলোকে চাপ দিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করবে যা তেলের মূল্যকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসবে।

  • বিটকয়েন বা ক্রিপ্টোকারেন্সি কি ইসলামে বৈধ?

    বিটকয়েন বা ক্রিপ্টোকারেন্সি কি ইসলামে বৈধ?

    নিচের অনুবাদটি সম্মানিত মুজতাহিদ ও মুফাচ্ছির শাইখ আতা ইবন খলীল আবু রাশতা (আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন) কর্তৃক দেয়া এক প্রশ্নের জবাব হতে সংগৃহীত

    ১) বিটকয়েন কোনো কারেন্সি তথা মুদ্রা নয়। এটি মুদ্রার শর্ত পূরণ করে না। কারণ নবী (সা) কর্তৃক গৃহীত ও বাস্তবায়িত মুদ্রা ছিল স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা অর্থাৎ, দিরহাম ও দিনার। এই ইসলামী মুদ্রা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করে:

    – এটি পন্য ও সেবা পরিমাপের ভিত্তি হতে হবে অর্থাৎ, এটি দাম ও মজুরীর নিরুপনকারী হতে হবে।

    – এটি একটি কেন্দ্রী কর্তৃপক্ষ প্রচলন করবে। যা দিনার ও দিরহাম প্রচলনের দায়ভার বহন করবে এবং এটি কোনো অজানা পক্ষ হতে পারবে না।

    – এটি মানুষের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ও সহজলভ্য হতে হবে, শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হলে চলবে না।

    উপরিউক্ত শর্তাদি বিটকয়েন এর উপর আরোপিত করলে এটি পরিষ্কার হয় যে তা এই তিন শর্ত পূরণ করে না:

    এটি পন্য ও সেবা পরিমাপের ভিত্তি নয়। বরং নির্দিষ্ট কিছু পণ্য ও সেবা বিনিময়ের মাধ্যম।

    কোনো জ্ঞাত পক্ষ কর্তৃক এর প্রচলন হয়নি, বরং তা অজ্ঞাত।

    এটি মানুষের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ও সহজলভ্য নয়। এবং এটি তাদের মাঝেই সীমাবদ্ধ যারা এটি বিনিময় করে ও এর মূল্য স্বীকার করে অর্থাৎ, এটি সমাজের সকলের জন্য নয়।

    সুতরাং, বিটকয়েন মুদ্রা ইসলামী শরীআহতে কোনো মুদ্রা হিসেবে সিদ্ধ নয়।

    ২) সুতরাং, বিটকয়েন একটি পন্য ব্যতিত আর কিছুই নয়। তথাপি, এই পন্য একটি অজ্ঞাত উৎস হতে ছাড়া হয়, এর কোনো ব্যাকিং ছাড়াই। উপরন্ত, এটি জোচ্চুরি, প্রতারণা, ফটকাবাজি ও ধোঁকাবাজির বিশাল ক্ষেত্র। তাই এতে ব্যবসা করা বৈধ নয় অর্থাৎ, এটি কেনা ও বেচা বৈধ নয়। বিশেষত এটি যেহেতু অজ্ঞাত উৎস হতে ছাড়া হয়, তাই এটি সন্দেহ তৈরি করে হয়তো এর সাথে বড় পুঁজিবাদী দেশসমূহ সংশ্লিষ্ট রয়েছে, বিশেষ করে আমেরিকা। অথবা অসৎ উদ্দেশ্যে বড় কোনো দেশের গ্যাং কিংবা আন্তর্জাতিক বড় কোনো জুয়া কোম্পানি, মাদক চোরাচালান, অর্থ পাচার কিংবা সংঘটিত অপরাধচক্র জড়িত। নয়তো এর উৎস গোপন কেন?

    সর্বশেষ সিদ্ধান্ত হচ্ছে বিটকয়েন অজ্ঞাত (مجهول) উৎস হতে ছাড়া কেবল একটি পণ্য যার কোনো প্রকৃত মূল্য নেই এবং তাই এটি ফটকাবাজি ও জোচ্চুরির জন্য উন্মুক্ত, এবং এটি উপনিবেশিক পুঁজিবাদী দেশ, বিশেষত আমেরিকার জন্য এটি মানুষের সম্পদ কাজে লাগানোর ও লুঠ করার সুযোগ।

    এ কারণেই এটি ক্রয় করা বৈধ নয় যেহেতু শরীআহর দলীল অজ্ঞাত পণ্য বিক্রয় ও ক্রয় হতে নিষেধ করেছে। এবং এর জন্য দলীল হচ্ছে:

    «نَهَى رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ بَيْعِ الْحَصَاةِ، وَعَنْ بَيْعِ الْغَرَرِ»

    আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত মুসলিম তার সহীহতে বর্ণনা করেছেন:

    আল্লাহর রাসূল (সা) ‘হাসাহ’ ও ‘গারার’ ব্যবসা হতে নিষেধ করেছেন

    আবু হুরায়রা হতে তিরমিযি অনুরূপ বর্ণনা করেছেন…

    এবং ‘হাসাহ ব্যবসা’ বলতে বোঝানো হয়েছে যখন বিক্রেতা ক্রেতার কাছে কাপড় বিক্রির সময় বলে, ‘আমি আপনার কাছে তা-ই বিক্রি করবো যার উপর আমার ছোড়া পাথরটি পড়বে।’ অথবা ‘আমি আপনাকে সেই জমিই বিক্রি করবো যার উপর আমার ছোড়া পাথরটি পড়বে।’ সুতরাং, যা বিক্রি হচ্ছে তা জ্ঞাত নয়, এবং এটি নিষিদ্ধ।

    গারার ব্যবসা বলতে যা অনিশ্চিত; অর্থাৎ, হতেও পারে, নাও হতে পারে, যেমন পানির মাছ বিক্রি করা, গরুর বাঁটের দুধ বিক্রি করা কিংবা গর্ভবতী পশুর গর্ভে যা আছে তা বিক্রি করা ইত্যাদি। এটি নিষিদ্ধ কারণ এটি গারার।

    সুতরাং, এটি পরিষ্কার যে গারার ব্যবসা বা যা অনিশ্চিত, যা বিটকয়েন এর বাস্তবতা, যা একটি অজ্ঞাত উৎস হতে ছাড়া একটি পণ্য এবং অকর্তৃত্বশালী পক্ষ হতে প্রচলন করা হয় যা এটির গ্যারান্টি দিতে পারে। এটি ক্রয় বা বিক্রয় বৈধ নয়।

    আতা বিন খলীল আবু আল-রাশতা
    ৩০ রবিউল আউয়্যাল, ১৪৩৯ হিজরী
    ১৮/১২/২০১৭ ইং
    অনুবাদকৃত, মূল উৎসের জন্য: এখানে ক্লিক করুন

  • ইলেকট্রনিক পেমেন্ট ওয়ালেট এ ক্যাশব্যাকের শর’ঈ বিধান

    ইলেকট্রনিক পেমেন্ট ওয়ালেট এ ক্যাশব্যাকের শর’ঈ বিধান

    নিচের প্রশ্নোত্তরটি অনুদিত। মূল ফতওয়ার জন্য অরিজিনাল ভার্শনটি পড়ুন। 

    প্রশ্ন: ইলেকট্রনিক ওয়ালেট অথবা পেমেন্ট ওয়ালেট এ ক্যাশব্যাক পাওয়ার ব্যাপারে হুকুম কী? অনেক ইলেকট্রনিক ওয়ালেট ৫% ক্যাশব্যাক দিচ্ছে এবং বেশি ব্যবহার তথা ইলেকট্রিসিটি বিল ইত্যাদি দেয়ার উপর ভিত্তি করে আরো বেশি দিচ্ছে, এই ক্যাশব্যাক কি সুদ বলে বিবেচিত হবে? উপরন্তু, কখনো কখনো এসব ওয়ালেট রিচার্জ করার পর যে এমাউন্ট পাই তা মুল এমাউন্ট হতে অতিরিক্ত হয়। উদাহরণসরূপ, যদি ১০০ রিয়াল রিচার্জ করি তাহলে আমরা ১১০ রিয়াল পাই ইলেকট্রনিক ওয়ালেটে। এই অতিরিক্ত পরিমান কি সুদ? এক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখতে হবে যে এসব ওয়ালেট ব্যাংক নয়।

    উত্তর: ইলেকট্রনিক ওয়ালেট হচ্ছে ডিজিটাল এপ্লিকেশন যাতে পেমেন্ট এর ব্যাবস্থাপনা ডিজিটালি করা হয়, এ প্রক্রিয়ায় একটি ওয়ালেট থাকে যাতে বা যার সার্ভারে গ্রাহকের তথ্যাদি এনক্রিপটেড অবস্থায় থাকে। এসব ওয়ালেটের ব্যবহারকারীগণ এসব ওয়ালেট হতে অর্থ প্রদান ও গ্রহণ করতে পারেন এবং কিছু কিনতে বা বিল প্রদান করতে পারেন তা থেকে। 

    এসব পেমেন্ট ওয়ালেট রিচার্জ ও এর দ্বারা পেমেন্ট এর ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট রয়েছে। 

    প্রথমত, এসব ওয়ালেট দিয়ে বিল প্রদানের সময়, গ্রাহক ইনভয়েজ এর মূল্যের উপর ৫% থেকে ১০% ডিসকাউন্ট পাচ্ছে এবং এই ডিসকাউন্টকে বলা হয় ক্যাশব্যাক। এবং এই ডিসকাউন্ট কখনো ওয়ালেট কম্পানি কর্তৃক হয় আবার কখনো বিক্রেতা হতে হয়। 

    দ্বিতীয়ত, যখন কেউ পেমেন্ট ওয়ালেট রিচার্জ করে, সে মাঝে মাঝে অতিরিক্ত পরিমান পায় তার ওয়ালেটে। উদাহরণস্বরূপ, সে ১০০ রিয়াল রিচার্জ করলে ১১০ রিয়াল পাচ্ছে। 

    ওয়ালেট হতে পেমেন্ট করার পর অর্থের অংকটি সেন্ডার এর একাউন্ট হতে রিসিভারের একাউন্টে চলে যায় এবং সে চাইলে তা নগদে রূপান্তর করে নিতে পারে কিংবা ওয়ালেট দিয়ে তা তার ব্যাংক একাউন্টে পাঠিয়ে দিতে পারে। 

    এটি হচ্ছে পেমেন্ট ওয়ালেট সমূহের বাস্তবতা এবং এসব পেমেন্ট ওয়ালেট এর শরঈ বিধান নিম্নরূপ: 

    ১. এসব পেমেন্ট ওয়ালেট এর বাস্তবতা হচ্ছে চেক বা শুকুক এর বাস্তবতার মতো, এবং যে অর্থ পেমেন্ট ওয়ালেট এ জমা আছে তা ব্যাংক একাউন্ট এ অর্থ জমা রাখার মতো। 

    ২. পেমেন্ট করার সময় যদি প্রদানকারী বিক্রেতার কাছ হতে মূল্যহ্রাস (ক্যাশব্যাক) পায় তবে তা বৈধ। 

    এটি এ কারণে যে, পণ্য ও সেবার দাম নির্ধারিত হয় যারা কেনা বেচা করছে তাদের দ্বারা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, 

    إلا أن تكون تجارة عن تراض منكم 

    কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ। [নিসা: ২৯] 

    সুতরাং, যদি বিক্রেতা তার পন্য বা সেবা কম দামে বিক্রি করতে চায়, তবে তা বৈধ। ব্যবসার ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো তা হালাল। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, 

    وأحل الله البيع 

    আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন। [বাকারাহ: ২৭৫]

    ৩. পেমেন্ট ওয়ালেট ব্যবহার করে পেমেন্ট করার ক্ষেত্রে, যদি ডিসকাউন্ট (ক্যাশব্যাক) পেমেন্ট ওয়ালেট থেকেই আসে, তাহলে তা বৈধ নয় কারণ এই ডিসকাউন্ট বা ক্যাশব্যাক হচ্ছে সুদ। এ বাস্তবতা ব্যাংকে অর্থ রাখার ক্ষেত্রে আমানতকারী যে ইন্টারেস্ট পায় তার মতোই, যা অর্থের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ এবং তা সুদ। 

    ৪. আর একাউন্ট রিচার্জ করার সময় ১০০ রিয়ালে ১১০ রিয়াল পাওয়া যায়, এই অতিরিক্ত প্রাপ্ত ১০ রিয়াল হচ্ছে সুদ। 

    কারণ ওয়ালেটে প্রদত্ত ১০০ রিয়াল হচ্ছে গচ্ছিত রাখার উদ্দেশ্যে যা ব্যবহারকারী তার চাহিদা অনুযায়ী ব্যবহার করবেন। এবং কোনো গচ্ছিত অর্থের উপর অতিরিক্ত অর্থ প্রদান নিষিদ্ধ এবং তা সুদ বলে বিবেচিত হবে। 

    এবং আল্লাহই ভালো জানেন 

    আবু খালেদ আল হিজাজী 
    মূল ভার্শন

  • জাতি-রাষ্ট্র বনাম খিলাফত রাষ্ট্র

    জাতি-রাষ্ট্র বনাম খিলাফত রাষ্ট্র

    জাতি-রাষ্ট্র: কুফর সাম্রাজ্যবাদীদের ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও উম্মাহকে বিভক্তি করার ফসল 

    খিলাফাহ রাষ্ট্র : নবী-রাসূলদের দেখানো পথ যা উম্মাহকে একত্রিত করে

    গত ৪৭ বছর ধরে, আমরা প্রতিবছর তথাকথিত স্বাধীনতা দিবস পালন করে আসছি যা আমাদের জন্য আনন্দের (!) উৎসব হিসাবে পরিগনিত হচ্ছে। এ দিবস পালনের সময় আমদের প্রশ্ন করা উচিত এ রাষ্ট্রের বাস্তবতা কী, কে এটা তৈরি করেছে, কেন এবং কিইবা পেলাম?

    রাসূল (সা) মক্কা থেকে মদীনায় হিযরত করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ইচ্ছায় ইসলামী জীবনব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন যার মাধ্যমে ইসলাম বাস্তবায়িত ছিলো ও সমগ্র পৃথিবীতে দাওয়ার কার্য সম্পাদিত হয়েছিল। তথন থেকেই কুফর ও হক্ব এর দ্বন্দ শুরু হয় যার ফলশ্রুতিকে ১৩০০ বছর পর পশ্চিমা কুফর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি খিলাফত ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছিল যা মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ রাখতো। তার পরিবর্তে ৯ই মে সাইকস-পিকো (ব্রিটেন ও ফ্রান্স এর দুই পররাষ্ট্র মন্ত্রী) চুক্তির মাধ্যমে ক্ষুদ্র জাতি রাষ্ট্র তৈরি করলো যার ফলে মুসলিম রাষ্ট্রগুলি তাদের করায়ত হলো ও তাদের তাবেদার শাসক তৈরির ভুমি হিসাবে ব্যবহৃত হতে থাকলো। অন্যদিকে রেডক্লিফ লাইন এর মাধ্যমে ভারত-পাকিস্তান নামের দুই দেশ তৈরি পরবর্তীতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নামের দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা একই ধারাবাহিকতার ফসল।

    তাই আমাদের সত্যটা উপলব্দি করতে হবে আর তা হলো খিলাফত রাষ্ট্র মুসলমানদের ঐক্যবব্ধ করে আর জাতি রাষ্ট্র মুসলমানদেরকে বিভক্ত করে যা মুসলমানদের শত্রু কাফির সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কার্যফল। জাতি রাষ্ট্রের বর্তমান বাস্তবতা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। 

    ১. জাতি রাষ্ট্র তৈরির মাধ্যমে কুফর শক্তি মানবখচিত রাষ্ট্রীয় সীমানা তৈরি করেছে যা সমুন্নত রাখতে আমারা একে অপরের সাথে যুদ্ধ করতেও পিছপা হই না হোক সে আমার মুসলিম ভাই যে সীমানার অপর প্রান্তে থাকে। তাছাড়া অন্য প্রান্তে কুফরের বোমার আঘাতে প্রতিনিয়ত মুসলমান মা বোন, শিশু, বৃদ্ধ মারা যাচ্ছে যা আমরা দেখেও না দেখার ভান করছি কারন তারা আমাদের জাতি রাষ্ট্রের নাগরিক নয়। যার বাস্তবতা আমরা দেখছি সিরিয়াতে নারী শিশু হত্যা, আরাকানের মুসলিমদের উপর অত্যাচার, কাশ্মির সমস্যা ইত্যাদি। সর্বোপরি আমরা সাম্রাজ্যবাদীদের সৃষ্ট জাতি রাষ্ট্রের সীমাকে রক্ষা করে মুসলিমদেরকে একত্রিত হতে বাধা দিচ্ছি। এবং এই বিভক্তিকে ধরে রাখার জন্য প্রত্যেক জাতি রাষ্ট্রের নিজস্ব জাতীয় দিবস, পতাকা আছে যা মিথ্যা বাস্তাবতাকে (!!) প্রকাশ করে। 

    রাসূল (সা) বলেছেন, “সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয়, যে জাতীয়তাবাদের দিকে আহ্বান করে, এর জন্য লড়াই করে এবং এর জন্য মারা যায়

    ২. জাতি রাষ্ট্রগুলো তাদের জনগনের জন্য কুফর আইন বাস্তবায়ন করে তারা শরীয়াহ আইনের কোন প্রয়োগ করে না যা ইসলামি জীবন ব্যবস্থা থেকে আমাদেরকে দূরে সরিয়ে নেয়। আর এই তাগুত বাস্তবায়নের পদ্ধতি হলো বেশিরভাগ লোকের সম্মতি (যদিও বা তা ইসলামী নিয়ম নীতির বিরুদ্ধে হয়) নিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে তা বাস্তবায়ন। যেখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ও তাঁর ঐশী বানীর কোন মূল্য নেই (নাউযুবিল্লাহ)। যা আমাদেরকে দেশে দেশে খুবই মানবেতর জীবন যাপনের জন্য ঠেলে দিচ্ছে। 

    যে আমার স্মরণে বিমুখ তার জীবন-যাপন হবে সংকুচিত এবং আমি তাকে কিয়ামতে দিন উত্থিত করবো অন্ধ অবস্থায়। ” (ত্ব-হা-১২৪)

    ৩. জাতি রাষ্ট্রগুলো “সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” এর ব্যানারে ইসলামের উত্থানকে ঠেকাতে কাজ করে যা বাস্তবিকভাবে ইসলামকে জীবন ব্যবস্থা হিসাবে বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। দেশে দেশে আজ সাম্রাজ্যবাদীদের যে চাপানো যুদ্ধ চলছে তা তারা সিদ্ধ করতে চায় “সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” এর শ্লোগান তুলে বাস্তবিক ভাবে তারা সবাই মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে যার বলি হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের সাধারন মানুষ।

    বস্তুত: তাদের মুখ থেকে শত্রুতা প্রকাশিত হয় এবং তাদের অন্তর যা গোপন করে তা গুরুতর…” [আলে ইমরান: ১১৮]

    সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সম্পর্কে পশ্চিমাদের (র‍্যান্ড কর্পোরেশান) ব্যাখ্যা হলো, “সন্ত্রাসী তারা যারা শরীয়াহ আইন বাস্তবায়নের দাবী তোলে”, কারণ তারা মনে করে মুসলিম মাত্রই সন্ত্রাসী যারা ইসলামি আইন বাস্তবায়নের দাবী তোলে।”

    ৪. মুসলিম অধ্যুষিত জাতি রাষ্ট্রগুলো ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃত কারন রাষ্ট্র হিসাবে যে সকল গুনাবলী থাকা দরকার তাদের তা নেই যার কারণে সকল ক্ষেত্রে তারা কুফর সাম্রাজ্যবাদীদের নিয়ন্ত্রেনে থাকে। যখনই কোন সমস্যা হয় এই জাতি রাষ্ট্রগুলো কাফিরদের স্মরনাপন্ন হয় এবং কাফিররা সময় সময় তাদের সাক্ষাত অব্যাহত রাখে। আরাকানে মুসলমানদের সমস্যার জন্য বিভিন্ন কুফর ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশে আসে যাদের মধ্যে রাজনীতিবিদ, মানবাধিকার কর্মী, ধর্মীয় নেতা অন্যতম। অ্যডভেন্টিস্ট ডেভেলপমেন্ট এন্ড রিলিফ অ্যজেন্সির সভাপতি জনাথন ডাফি, প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা অন্যতম, অথবা পোপ ফ্রান্সিস এর আগমন। তাছাড়া জাতি রাষ্ট্রসমূহের রাষ্ট্রপ্রধানরা সব সময় মুখিয়ে থাকে বিদেশী শক্তির সাথে দেখা করার জন্য যার উদাহরন হলো মুসলিম বিশ্বের শাসকদের কুফর রাষ্ট্রগুলোতো কিছুদিন পরপর সফর। তাছাড়া আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোও ঐ জাতিরাষ্ট্রগুলোকে নিয়ন্ত্রনের জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যাবস্থাপত্র দিয়ে থাকে যা জাতি রাষ্ট্র হিসাবে সবাই নতচিত্তে মেনে নেয়। তাছাড়া গত ১৬, ১১, ২০১৭ তারিখে ইউ এস ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট এর খার্তুম সফর ও তার ১৭.১২.১৭ তারিখের বক্তব্য এবং ২০.১২.২০১৭ তারিখে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট প্রতিনিধির দেশ ত্যাগ যা কাফিরদের জাতিরাষ্ট্রগুলোর নিয়ন্ত্রনের একটি চিত্র মাত্র। IMF, WB, ADB’র ব্যবস্থাপত্র মুসলিম বিশ্বের জাতিরাষ্ট্রে অবস্থানরত মুসলিমদের জীবন মানকে মারাত্মক ভাবে প্রভাবিত করছে। 

    ৫. জাতি রাষ্ট্রগুলো মুসলিম দেশগুলোর ক্ষুদ্র একক যারা নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারে না । কুফর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিও আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো ক্রমাগত তাদেরকে শোষন করে যাচ্ছে। উদাহরনস্বরুপ, ভারত কর্তৃক ফারাক্কা বাধঁ, টিপাইমুখ বাঁধ, পদ্মার পানি প্রত্যাহার, সীমান্তে পাখির মতো গুলি করে মানুষ হত্যা তারপর কাটাতারে ঝুলিয়ে রাখা অথবা আন-নাহদা বাঁধকে আত্মসমর্পন করা যার মাধ্যমে সুদান ও মিশরের মুসলমানদের স্বার্থ বহুগুনে ক্ষুন্ন হচ্ছে। 

    রাসূল (সা) বলেছেন, “মুসলমানরা সমগ্র মানবজাতির মধ্যে এক অনন্য উম্মাহ” অর্থাৎ, তাদের এক দেশ, এক যুদ্ধ, শান্তি ও সম্মান এক, বিশ্বাসও এক“।

    হে মুসলিমগন, এই হলো জাতি রাষ্ট্রের স্বরূপ ও ফলাফল যা কেবল আমাদেরকে জাতি হিসাবে করেছে দুর্বল, পর্যুদস্ত, ব্যর্থ এবং আমাদের পিছিয়ে পরা জনগোষ্ঠী হিসাবে স্বীকৃতি দান করেছে। এ থেকে বের হওয়ার একটাই সমাধান, তা হলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দেয়া জীবন ব্যবস্থা ইসলামকে নবুওয়াতের আদলের খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা। যা রাসূল (সা) এর ব্যানার আল-উক্কাব সুউচ্চে তুলে ধরবে, মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করবে, ইসলামি শরীয়াহ বাস্তবায়ন করবে, কাফেরদের পরাজিত করবে এবং সমগ্র মানবজাতির কাছে আল্লাহর হেদায়েত সম্বলিত বানী পৌছে দিবে ইন শা আল্লাহ।

    এতে রয়েছে বানী সেই সম্প্রদায়ের জন্য যারা ইবাদত করে।” [সূরা আম্বিয়া-১০৬]

  • এই উন্নয়ন, উন্নয়ন না, আরও উন্নয়ন আছে…!

    এই উন্নয়ন, উন্নয়ন না, আরও উন্নয়ন আছে…!

    বর্তমান বাংলাদেশ সরকার নিজেকে উন্নয়নে রোল মডেল হিসেবে দাবি করছে। ফলাও করে প্রচার করছে গত ৯ বছরে তাদের তথাকথিত অর্জনসমূহ। যার মধ্যে রয়েছে গুটি কয়েক ফ্লাইওভার, ণির্মানাধীন মেট্রোরেল প্রকল্প, এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে, রূপপূর পারমাণবিক প্রকল্প, পদ্মা সেতু, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, বাংলাদেশকে স্বল্প উন্নত দেশের কাতার থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, ছয় বা তার উপরে জিডিপি ধরে রাখা, ডলারের রিজার্ভ বৃদ্ধি পাওয়া ইত্যাদি।

    এ ধরনের প্রচারণার পেছনে কারণ কী?

    এ ধরনের প্রচারণার মাধ্যমে সরকার জনগনের দৃষ্টি মূল ইস্যু থেকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে রাখতে চায়। প্রশ্ন হচ্ছে কী সেসব মূল ইস্যু? এসব প্রচারণার মাধ্যমে সরকার আড়াল করতে চায় নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর উচ্চমূল্য, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূলবৃদ্ধি, দক্ষিণ এশিয়ার সর্বাধিক বেকারত্বের হার, ঢাকার উচ্চ জীবনযাত্রা ব্যয়, দেশের খনিজ সম্পদ উপনিবেশবাদী বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর হাতে তুলে দেয়া, প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়া, গরীব ধনীর মধ্যকার ব্যাপক বৈষম্য, ব্যাংকসমূহ লুটপাটের মাধ্যমে সাধারণ জনগনের গচ্ছিত সঞ্চয় নিঃশেষ করে দেয়া, হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার করা, আইন শৃৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, জঙ্গীবাদ দমনের নামে নিষ্ঠাবান মুসলিম ও ইসলামি রাজনৈতিক দলসমূহকে দমন করার উপনিবেশবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়ন ইত্যাদি।

    অবকাঠামো উন্নয়ন কি উন্নয়ন নয়?

    একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে অবশ্যই অবকাঠামো উন্নয়নের সর্ম্পক রয়েছে। তবে কেবলমাত্র অবকাঠামো উন্নত করলেই দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নয়ন হয় না। এখন পর্যন্ত ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় যানজট সমস্যা নিরসন কল্পে যতগুলো ফ্লাইওভার ণির্মাণ করা হয়েছে তার কোনটিই বাস্তবতার নিরীখে সফল হয়নি। ঢাকার উত্তর প্রান্ত থেকে দক্ষিণ প্রান্তে যেতে আগে যত সময় লাগত এখন একই বা তার চেয়ে বেশী সময় লাগে। মেট্রো রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে, পদ্মা সেতু ও রূপপূর পারমাণবিক প্রকল্পের মত মেগা প্রজেক্টের মাধ্যমে দেশ ও জনগনের উন্নয়নের ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছাও প্রশ্নবিদ্ধ। কেননা এসব প্রজেক্ট নির্ধারিত সময়ে শেষ করার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আর প্রজেক্ট নির্ধারিত সময়ে শেষ না হলে এর ব্যয় বহুগুনে বৃদ্ধি পায়। আর ব্যয় বৃদ্ধি পেলে এর থেকে সরকারের মন্ত্রী ও সচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বখরার টাকাটাও বেড়ে যায়। আর এসব প্রজেক্টসমূহ সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার আওতায় করা হয়নি। অনেক সময় এসব অবকাঠামো ণির্মাণের পেছনে রয়েছে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কারণ। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাস্তা ও সেতু ণির্মাণের পেছনে রয়েছে আধিপত্যবাদী শত্রু রাষ্ট্র ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়া। রূপপূর পারমাণবিক প্রকল্প ণির্মাণের সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে সরকার গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি রাশিয়াকে অনুকূলে রাখতে চায়। তাছাড়া বিশ^ব্যাংক, আই এম এফ, জাইকা, এডিবির ঋণ সহায়তা কৃষি বা শিল্প ণির্মাণে খরচ না করে অবকাঠামো খাতে খরচ করতে হবে বলে শর্ত দেয়া হয়। এরূপ শর্তের কারণ হল অবকাঠামো উন্নয়ন হলে বহুজাতিক কোম্পানীসমূহের পণ্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌছানো সহজতর হয়। সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, সাম্প্রতিক অবকাঠামো উন্নয়ন নিছক দেশ ও জনগনের উন্নয়নের জন্য হচ্ছে না। 

    সরকার প্রচারিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকসমূহকে (Macro Economic Index) কীভাবে দেখা উচিত?

    বাংলাদেশ পুজিবাদী অর্থনেতিক ব্যবস্থা অনুযায়ী চলে। পুজিবাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকসমূহকে (Macro Economic Index) বুঝতে হলে এ অর্থনীতি কতৃক নির্ধারিত মানুষের মৌলিক অর্থনৈতিক সমস্যাকে বুঝতে হবে। পুজিবাদের মতে, মানুষের প্রধান অর্থনৈতিক সমস্যা হল, সম্পদ সীমিত কিন্তু চাহিদা অসীম। সম্পদের অপ্রতুলতাই যেহেতু সমস্যা, সেহেতু সম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধিই এর যুতসই সমাদান। আবার চাহিদা অসীম এবং সম্পদ সীমিত হওয়ায় সব মানুষের চাহিদা পূরণ কখনওই সম্ভব নয়। পুজিবাদী অর্থনীতিতে বন্টন নিয়ে আলোচনা থাকলে বন্টন এর প্রধান লক্ষ্য নয়, বরং উৎপাদনই মূল লক্ষ্য। সেকারণে সামষ্টিক উৎপাদনই উন্নয়নের সূচক হিসেবে কাজ করে, যেমন: জিডিপি(Gross Domestic Production), জি এন পি (Gross National Production), মাথাপিছু আয় (Per capita Income)। জিডিপি (Gross Domestic Production), জি এন পি (Gross National Production) তে বিশাল পুজির মালিক কর্পোরেট কোম্পানীসমূহের উৎপাদনই হিসেবে আসে। এতে অধিকাংশ সাধারণ মানুষের উৎপাদনের কোন প্রতিফলন নেই। আর মাথাপিছু আয় (Per capita Income) এ প্রধানত বিশাল পুজির মালিক দেশের কর্পোরেট কোম্পানীসমূহের মোট রাজস্বকে দেশের মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ দেয়া হয়। এটি একটি ধোকাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। কেননা এখানে একজন হাজার কোটি টাকার মালিক ধনী ব্যক্তির রাজস্বের সাথে কয়েকশ টাকা আয়ের দিনমজুর বা রিকশাচালকের বাৎসরিক আয়কে গড় করা হয় যদিও তাদের দু’জনের মধ্যে আয়ের ব্যবধান আকাশ পাতাল। এসব সূচকের মাধ্যমে দেশে প্রতিটি ব্যক্তির সত্যিকারের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা, গরীব ও ধনীর মধ্যকার ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্যকে সূচারুরূপে আড়াল করা হয়। এসব সূচক থেকে বুঝা যায় না দেশের সব জনগনের নূন্যতম মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয়েছে কিনা। তাই এসব প্রতারণামূলক সূচক তথা পুজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করা উচিত।

    বাংলাদেশের অতি ধীর প্রক্রিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নকে কিভাবে দেখা উচিত?

    বাংলাদেশের তথাকথিত স্বাধীনতার পর চল্লিশের বেশী বছর পার হয়ে গেলেও রাষ্ট্রের যে সামগ্রিক উন্নয়ন হয়েছে তা সত্যিই নগন্য। অনেক আদর্শিক ও অনাদর্শিক রাষ্ট্র এর চেয়েও কম সময়ে উন্নয়নের চূড়ান্ত শিখরে আরোহণ করেছে। ইতিহাস স্বাক্ষী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় সোভিয়েত ইউনিয়নের মত আদর্শিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভারী শিল্প নির্ভর উন্নয়ন, হিটলারের অধীনে উগ্র জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র জার্মানীর ভারী শিল্প নির্ভর অর্থননীতির বিকাশ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে বিপর্যস্ত জাপানের প্রযুক্তিগত বিকাশ, সমরশিল্পনির্ভর আদর্শিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির বিকাশ প্রভৃতি প্রমাণ করে একটি রূপকল্পের ভিত্তিতে কীভাবে সম্ভব স্বল্পতম সময়ে একটি রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়ন করতে পারে। এক্ষেত্রে ভিশন ২০৪১ এর মত ফাঁকা বুলি সর্বস্ব প্রতারণামূলক শ্লোগান কতটুকু যুক্তিযুক্ত। 

    স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি নব্য উপনিবেশবাদী বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক, আই এম এফ, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা এডিবির প্রত্যক্ষ প্রেসক্রিপশন ও খবরদারিতে পরিচালিত হচ্ছে। এসব উপনিবেশবাদী আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের অর্থনীতিকে Structural Adjustment Program, Millennium Development Goal ইত্যাদির নামে দারিদ্রতাকে টেকসই রূপ দিয়েছে। দেশীয় শিল্পের বিকাশকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নের নামে বাংলাদেশের বাজারকে সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানীসমূহের বাজারে পরিণত করা হয়েছে। দেশের সস্তা শ্রম, কর রেয়াত সুবিধা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাবিহীন স্বল্প উৎপাদন খরচ সুবিধাপ্রাপ্ত বিদেশী বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা হয়েছে। FDI বা Foreign Direct Investment কতটুকু আসল সেটাকে উন্নয়নের সূচক বানানো হয়েছে! কৃষি ও চামাড়াশিল্পসহ দেশীয় অন্যান্য শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে ঝুকিপূর্ণ ও রপ্তানী নির্ভর গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে অর্থনৈতিক দাসত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়েছে। ভারী শিল্প নয়, বরং ঝুকিপূর্ণ ও পরনির্ভরশীল সেবাখাতের বিকাশকে সরকারিভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। 

    এতদসত্ত্বেও যে যৎসামান্য বস্তুগত উন্নয়ন আমরা দেখতে পাই তা হল গনমানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিজাত প্রচেষ্টার ফল। এতে সরকারের ভূমিকা নগন্য। বরং অনেকক্ষেত্রেই সরকারের নীতিসমূহ সাধারণ জনগনকে উদ্যোক্তা হতে অনুৎসাহিত করে। এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ হল দেশের ব্যাংকসমূহে রেকর্ড পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকা অবিনিয়োগকৃত অলস অর্থ পড়ে আছে। আমাদের দেশের পরিশ্রমী কৃষক, নিপীড়িত লক্ষ লক্ষ নারী পোশাক শ্রমিক, প্রবাসী শ্রমিক ও দূর্দমনীয় সাধারণ মানুষের প্রচেষ্টাই যৎসামান্য উন্নয়নের মূল নিয়ামক শক্তি। 

    প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন

    পুঁজিবাদের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এর মাধ্যমে দারিদ্রতা বিমোচন, বেকারত্বের বিলোপ সাধন, সম্পদের সুষম বন্টন, ধনী দরিদ্রের আকাশসম বৈষম্য নিরসন সম্ভব নয়। একমাত্র ইসলামের মাধ্যমে এগুলো অর্জন করা সম্ভব। কেননা ইসলামিক অর্থনীতিতে মূল অর্থনৈতিক সমস্যা হল সম্পদের বন্টন এবং এ ব্যবস্থা মনে করে সব মানুষের মৌলিক অধিকার পরিপূর্ণভাবে পূরণের জন্য পৃথিবীতে যথেষ্ট সম্পদ রয়েছে। ইসলামি ব্যবস্থায় খলিফা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক চাহিদা হিসেবে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের পরিপূর্ণ ব্যবস্থা করতে বাধ্য। এছাড়াও উম্মাহ’র অধিকার হিসেবে খলিফা জনগনের শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শরীআহগতভাবে বাধ্য। ‘…আর সম্পদ যাতে কেবল বিত্তশালীদের মধ্যে আবর্তিত না হয়।’ (সূরা হাশর:৭) – পবিত্র কুরআনের এ আয়াতটিই ইসলামি অর্থনীতি সর্ম্পকে সম্যক ধারণা দেয়। সেকারণে এ ব্যবস্থায় মাত্র ২০ ভাগ লোক শতকরা ৮০ ভাগ সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব নয়। পরাশক্তিমূলক ভিশনারী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, উপনিবেশবাদীদের নিয়ন্ত্রনমুক্ত, সুদের জুলুমবিহীন বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ থাকায় খিলাফত রাষ্ট্রে সমরশিল্পভিত্তিক ভারীশিল্পের বিকাশ ঘটবে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ইসলামি ব্যবস্থায় জনগনের আয়ের উপর নয় বরং সম্পদের উপর কর ধার্য করা হয়। সেকারণে পুজিবাদী ব্যবস্থার আয়কর ও ভ্যাটের জুলুম থেকে জনগন মুক্তি পাবে।

    উন্নয়নের সামগ্রিক ধারণাটি কেমন? 

    একটি জাতির পূর্ণজাগরণের জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়নই যথেষ্ট নয়, যদিও স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারই অর্থনৈতিক উন্নয়নই করতে দারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে এবং এক্ষেত্রে তাদের সামান্যতম রাজনৈতিক সদিচ্ছাও ছিল না। 

    উন্নয়নের সামগ্রিক ধারণার মধ্যে একটি জাতির অর্থনৈতিক বা বস্তুগত (Material), আধ্যাত্মিক (Spiritual), নৈতিক (Moral) ও মানবিক (Humanitarian) উন্নয়ন অর্ন্তভূক্ত রয়েছে। আদর্শিক পুঁজিবাদের বাস্তবায়ন হলে অর্থনৈতিক বা বস্তুগত (Material) হলেও আধ্যাত্মিক (Spiritual), নৈতিক (Moral) ও মানবিক (Humanitarian) উন্নয়ন সম্ভব হয় না। পশ্চিমা বিশ্বই এর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ। পশ্চিমা সভ্যতা আধ্যাত্মিকতাশূন্য, নৈতিকতা ও মানবিকতা বিবর্জিত। সেকারণে তাদের অর্থনৈতিক বা বস্তুগত (Material) উন্নয়ন স্বভাবতই একটি আংশিক উন্নয়ন যা মানুষকে প্রশান্তি দিতে দারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ব্যাপক অস্থিরতা সেখানকার সাধারণ ঘটনা। অপরাধ ও মানসিক বৈকল্য সীমাহীন। পশ্চিমা বিশ্বের ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ড্রাস্ট্রিগুলো স্লিপিং পিল ও অ্যান্টিডিপ্রেশনের ওষুধের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সবচেয়ে বেশী আয় হয় পর্ণ ইন্ডাস্ট্রি থেকে। এসবই প্রমাণ করে তাদের আংশিক উন্নয়ন মানবতার মুক্তি দিতে একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে। 

    বাংলাদেশের তাবেদার শাসকগোষ্ঠী তাদের পশ্চিমা প্রভূদের মত জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন সাধনের চেষ্টা করে না এবং এ নিয়ে চিন্তিতও নয়। ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখার জন্য ফ্লাইওভার, ণির্মানাধীন মেট্রোরেল প্রকল্প, এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে, রূপপূর পারমাণবিক প্রকল্প, পদ্মা সেতু নির্মাণকে উল্লেখ করলেও সামাজিক নিরাপত্তা (Social Security), শিক্ষা, চিকিৎসা, আইনের শাসন, সম্পদের সুষম বন্টন, বেকারত্ব, উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ, খনিজ সম্পদের উপর জনগনের মালিকানা ও অধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের সাফল্য একেবারেই শূন্যের কোটায়। বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ড, গুম, অপহরণ, খুন, শিশু ধর্ষণ, ডাকাতি, ছিনতাই, দূর্নীতি, প্রশ্নপত্র ফাসের মহোৎসব, বিচার বিভাগের উপর নির্বাহী বিভাগের পূর্ণ নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা, ভিন্নমত দমন, শিক্ষা ও চিকিৎসার বাণিজ্যিকীকরণ এমন এক পর্যায়ে পৌছেছে, তখন তথাকথিত অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাফল্যের দাবি অযৌক্তিক, হাস্যকর এবং জনগনের সাথে কঠিন তামাসা ছাড়া আর কিছুই নয়। 

    একমাত্র ইসলামের মাধ্যমে একটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন (অর্থনৈতিক বা বস্তুগত (Material), আধ্যাত্মিক (Spiritual), নৈতিক (Moral) ও মানবিক (Humanitarian) সম্ভব। কেননা ইসলাম মানুষের বস্তুগত উন্নয়নের পাশাপাশি তার আধ্যাত্মিক (Spiritual), নৈতিক (Moral) ও মানবিক (Humanitarian) চাহিদাকে অনুমোদন দেয় ও এগুলোর উন্নয়নের পথ বাতলে দেয়। জীবনে সামগ্রিকভাবে ইসলামী আদর্শের বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ সামগ্রিক উন্নয়ন সুনিশ্চিত করা সম্ভব। 

    বাংলাদেশের মত দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্রে পশ্চিমা কাফেরদের পুজিবাদী জীবনব্যবস্থা অন্ধ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগনের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে না, বরং আক্বীদা সমেত ইসলামী জীবনাদর্শ পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়নই সমাধান। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামরত আদর্শিক ইসলামি রাজনৈতিক দলের সাথে মুসলিমদের সম্পৃক্ত হওয়া বাঞ্চণীয়।