তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
উই ওয়ান্ট জাস্টিস

রাজধানী ঢাকার এয়ারপোর্ট রোডে কুর্মিটোলা হাসপাতালের সামনে জাবালে নূর বাসের ধাক্কায় শহীদ রমিজউদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় পুরো দেশব্যাপী এক অভূতপূর্ব আন্দোলন গড়ে উঠে। সরকারের দূর্নীতিগ্রস্ত সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে সর্বোপরি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রধানত স্কুলের কিশোর কিশোরী ও তাদের অভিভাবকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে টানা সাত দিন ব্যাপী যে তীব্র ঘৃণা ও বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে তা ছিল নজিরবিহীন। সরকার এ তুমুল জনপ্রিয় আন্দোলনকে আগের মত প্রতারণা এবং দলীয় পেশী শক্তি ও প্রশাসনের মাধ্যমে দমন করার চেষ্টা করেছে। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এ ধরনের আন্দোলন এ সরকারের সময়ে আরও হয়েছে। যেমন শাহবাগী নাস্তিক চক্রের বিরুদ্ধে গড়ে উঠা হেফাজতের আন্দোলন, ভ্যাটবিরোধী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সারাদেশ ব্যাপী গড়ে উঠা বৈষম্যপূর্ণ কোটা বিরোধী আন্দোলন।
যখন পুঁজিবাদী ও তথাকথিত ইসলামিক রাজনৈতিক দলসমূহ সরকারের দূর্নীতি, অপশাসন, লুটপাট, স্বেচ্ছাচারিতা ও জুলুমের বিরুদ্ধে কার্যকর গণআন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে তখন এ ধরনের আন্দোলনের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ, ঘৃণা ও প্রত্যাখান সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অবশ্য ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্ষেত্রে আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ ভূমিকা পালন করেছে। এই দশকের শুরুর দিকে আরব বিশ্বব্যাপী ঘটে যাওয়া আরব বসন্তের সাথে এসব আন্দোলনের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী গণতন্ত্র অথবা স্বৈরতন্ত্রের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বব্যাপী নব্য উপনিবেশবাদ বজায় রাখা হয়েছে। পুঁজিবাদে আপামর জনগণকে দারিদ্রতার মধ্যে রেখে সম্পদ মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির হাতে কৌশলে তুলে দেয়া হয় । মানুষের আইন তৈরির ক্ষমতার কারণে এ ব্যবস্থায় দূর্নীতি, দুঃশাসন, প্রতারণা, স্বেচ্ছাচারিতা খুবই স্বাভাবিক। সেকারণে মুসলিম বিশ্বের বিশ্বাসঘাতক শাসকগণ তাদের উপনিবেশবাদী প্রভূদের মত জনগণকে প্রতারণা ও ত্রাস সৃষ্টি করার মাধ্যমে ন্যায্য দাবি থেকে দূরে রাখে। কিন্তু মুহম্মদ (সা) এর উম্মতের মধ্যে খায়ের থাকার কারণে উম্মাহ একটি সময় পর প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠে। কারণ উম্মাহ’র মধ্যে সব সময় একটি নিষ্ঠাবান ও অধিক সংবেদনশীল অংশ রয়ে যায়- যারা উম্মাহ’র বিরুদ্ধে করা ষড়যন্ত্রকে সাহসিকতার সাথে উন্মোচন করে দূর্নীতিবাজ শাসকের মুখোশ খুলে দেয়। তবে এসব আন্দোলন অনেক সময় কাঙ্খিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়। এসব আন্দোলনের ভাগ্যে যাই ঘটুক-আন্দোলনের স্পিরিটের সাথে নিষ্ঠাবান যে কেউ একাত্মতা ঘোষণা করবে ও স্বাগত জানাবে।
তবে নিষ্ঠাবান মুসলিমদের ভাবতে হবে কেন উম্মাহ’র এ আন্তরিক প্রতিবাদসমূহ জুলুমের পুরোপুরি অবসান ঘটিয়ে সত্যিকারের পরিবর্তন সূচনা করছে না। এর একটি কারণ হল আন্দোলনগুলো ছিল ইস্যুভিত্তিক। সামগ্রিক পরিবর্তনের জন্য অর্থাৎ আদর্শিক পরিবর্তনের জন্য সেভাবে কোন আন্দোলন গড়ে উঠেনি। ইস্যু আদায় হয়ে গেলে ইস্যু ভিত্তিক আন্দোলন এর অপরিহার্যতা হারিয়ে ফেলে। জনগণ ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন করতে থাকলে শাসকশ্রেণীর তাতে খুব বড় সমস্যা হয় না। কেননা ত্রটিপূর্ণ পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থা মানুষের জীবনে বাস্তবায়িত থাকার কারণে সমস্যার কোন অন্ত নেই। প্রতিটি সমস্যা নিয়ে রাস্তায় নামতে থাকলে একজন মানুষের এক জীবন যথেষ্ট নয়। আর দূর্নীতিপূর্ণ একটি ব্যবস্থাকে অটুট রেখে এর কিয়দংশে সংস্কার করলে সেই ব্যবস্থা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে, কারণ তখন সেটি আগের চেয়ে কম ত্রুটিপূর্ণ বলে মানুষ মনে হতে থাকে। তাই ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন উম্মাহ’র গুরুত্বপূর্ণ প্রাণশক্তি ও উদ্দীপনাকে নষ্ট করে এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। আন্দোলনের নেতৃত্ব এর লক্ষ্য সর্ম্পকে দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ইস্যু ভিত্তিক আন্দোলনে দৃঢ়তা প্রদর্শন সম্ভব নয়। আর আদর্শিক উপনিবেশিক শক্তি আন্দোলনরত জনগনকে ধোকা দিয়ে এর গতিপথকে নিজের সুবিধামতো পরিবর্তন করেছে এবং সর্বশেষ ফলাফলটি নিজের ঘরে তুলে নিয়েছে। আরব বসন্ত এর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ। এসব আন্দোলনের মাধ্যমে দূর্ভাগ্যবশতঃ মুসলিমগণ ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং একধরনের কসমেটিক পরিবর্তন হয়েছে। খুব শীঘ্রই উম্মাহ বুঝতে পেরেছে যে, উপনিবেশবাদী কাফেররা পুরোদমেই নিয়ন্ত্রনে আছে।
তাহলে সমাধান কী? সমাধান হল মূল সমস্যাকে ধরতে পারা এবং এর বিলোপ সাধনের জন্য সব শক্তিকে বিনিয়োগ করা। মূল সমস্যা হল ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং এর শাসনব্যবস্থা গণতন্ত্র-যা থেকে অন্য সব উপসর্গ সমস্যা তৈরি হয়। মূল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে উপসর্গের চিকিৎসা কখনওই প্রকৃত পরিবর্তন বয়ে আনবে না। আবার কেউ যদি মনে করে কেবলমাত্র গণআন্দোলনের মাধ্যমে ব্যবস্থার পরিবর্তন আসবে সেটাও ঠিক নয়। ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য জনসচেতনতা তৈরি করা একটি সামগ্রিক পরিবর্তনের আংশিক কাজ মাত্র। জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজের পাওয়ার পকেটসমূহ থেকে কার্যকর সাহায্য পাওয়া গেলেই কেবলমাত্র ব্যবস্থা বা আদর্শিক পরিবর্তন সম্ভব। এর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ হল আরব বসন্ত। তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মিশর, ইয়েমেন ও সিরিয়ায় ইসলামী ব্যবস্থার পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন থাকলেও পাওয়ার পকেটসমূহ বা সেনাবাহিনী থেকে কার্যকর সাহায্য না পাওয়ায় সেসব দেশ দারুল ইসলামে (ইসলামী রাষ্ট্রে) পরিণত হতে পারেনি। সাধারণ জনগন ও পাওয়ার পকেটের কার্যকর প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই পৃথিবীর ইতিহাসে আদর্শিক সব পরিবর্তন হয়েছে। আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনার আউস ও খাজরাজ গোত্রের সাধারণ জনগণ ও গোত্র প্রধানদের (যারা পাওয়ার পকেট বা আহলুল হাল ওয়াল আকদ ছিলেন) ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ফরাসী বিপ্লব, বলশেভিক বিপ্লব, চীনে কমিউনিস্ট বিপ্লব সব একইভাবে হয়েছে। আদর্শিক পরিবর্তনের এ বাস্তবতা পরিবর্তকামী প্রতিটি ব্যক্তিকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে এবং এ অনুযায়ী কাজ করতে হবে।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের শ্লোগানসমূহ বেশ নজর কেড়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক আলোচিত ছিল ‘ওই ওয়ান্ট জাস্টিস’ (আমরা ন্যায়বিচার চাই)। আসলে এই ‘জাস্টিস’ শব্দটি ব্যাপক। যে কারও মনে হতে পারে এই জাস্টিস কার কাছে চাওয়া হচ্ছে? উত্তর হতে পারে সরকারের কাছে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেখানে মানুষের সার্বভৌমত্ব কায়েম রয়েছে সেখান থেকে কী জাস্টিস পাওয়া সম্ভব? ইসলামে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা। মানুষকে এ ক্ষমতা দেয়া হয়নি কারণ সে সীমাবদ্ধ জ্ঞানের অধিকারী এবং পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত। এ কারণেই আওয়ামীলীগ যে আইন করে তা বিএনপির বিরুদ্ধে যায়। আবার বিএনপি যখন আইন করেছিল তখন তার সুবিধার্থে তা করেছিল। মানুষকে আইন করতে দিলে সে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠে। সেকারণে আমরা দেখতে পাই শিক্ষার্থীগন মন্ত্রী, এমপি, পুলিশের অফিসার ও সচিবদের নিকট ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করে পায়নি। অর্থাৎ শাসকশ্রেণী যে আইন করে সে আইন তারা নিজেরাই মানে না। জনগন শাসকের কাছে জবাবদিহী করে, কিন্তু শাসকের জবাবদিহীতা না থাকায় সে হয়ে উঠে দূর্বিনীত স্বৈরাচার ও জালিম। এই মানবীয় দূর্বলতা অসঙ্গতি, জুলুম ও ভোগান্তির জন্ম দেয়। তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘যারা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে বিচার ফায়সালা করে তারাই জালিম’ (সূরা মায়েদাহ)। সেকারণে মানবরচিত ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কাছে জাস্টিস পাওয়ার আকাঙ্খা আম গাছ লাগিয়ে জাম খাওয়ার মত আকাশ কুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। জাস্টিস পাওয়া যাবে একটি জাস্ট ব্যবস্থা এবং এই ব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিচালিত শাসকের কাছ থেকে। মহাবিশ্বের স্রষ্টা কোন ব্যক্তি বা দল দ্বারা প্রভাবিত নয় এবং মানুষের স্রষ্টা হিসেবে তার বাস্তবতা সর্ম্পকে সম্যক ধারণা থাকায়, তিনিই একটি ত্রটিমুক্ত জীবনব্যবস্থা দিতে পারেন। আর একমাত্র ইসলামই হল জাস্ট ব্যবস্থা এবং ইসলামের ভিত্তিতে পরিচালিত শাসকই ন্যায়পরায়ণ। জাস্টিস তাই ইসলামী ব্যবস্থা ও ইসলামি খলিফার কাছে চাওয়া যেতে পারে, অন্য কারও কাছে নয়। জাস্টিস চাওয়া যেতে পারে ওমর (রা) এর মত শাসকের কাছে কেননা তিনি জনসম্মুখে জবাবদিহীতার সম্মুখীন হতে পরোয়া করতেন না। জাস্টিস চাইতে হবে আলী (রা) এর মত শাসকের কাছে যিনি ছেলে ব্যতিরেকে আর কোন সাক্ষী না থাকার কারণে বিচারপতির কাছে চুরি যাওয়া তলোয়ার ফেরত পাননি। জাস্টিস চাইতে হবে ওমর বিন আবদুল আজিজ (র) এর মত শাসকের কাছে যার সময় যাকাত নেওয়ার মত লোক খুঁজে পাওয়া যেত না অথচ রাষ্ট্রের মধ্যে দরিদ্র লোকের তালিকায় তার নাম শীর্ষে উঠে এসেছিল।
যদি আমরা সবাই রাসূলুল্লাহ (সা) এর তরীকা অনুসারে এই জাস্ট ব্যবস্থা-ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করি, তাহলে সেইদিন খুব বেশী দূরে নয়, যখন জাস্টিসের জন্য লক্ষ মানুষকে রাস্তায় নামতে হবে না, জাস্টিসের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে কোন মা কে সন্তান হারাতে হবে না, জালিম শাসকের কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষিপ্ত হতে হবে না, বরং প্রত্যেক প্রাপককে তার যথাযথ প্রাপ্য পৌঁছে দেয়া হবে এবং সবক্ষেত্রে জাস্টিস প্রতিষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ।
খিলাফত রাষ্ট্রের সঙ্গীত

অন্যান্য জনগোষ্ঠী বা রাষ্ট্র থেকে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী বা রাষ্ট্রকে আলাদা করার জন্য বিশেষ কোন শ্লোগাণ বা সঙ্গীত গ্রহণ করা শারী’আহ্ কর্তৃক অনুমোদিত (মুবাহ্) একটি বিষয়। অতীতে মুসলিমদের নির্দিষ্ট শ্লোগাণ ছিল, যা তারা যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রট্টপক্ষকে মুকাবিলা করার সময় ব্যবহার করতো। রাসূল (সা) এর সময়ই এ বিষয়টি প্রচলিত ও অনুমোদিত ছিল। খন্দক ও বনু কুরাইযা’র বিরুদ্ধে যুদ্ধে মুসলিমদের শ্লোগাণ ছিল ‘হা মীম, তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না’। আর, বনু মুসতালিক এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাদের শ্লোগাণ ছিল ‘তোমরা, যারা সাহায্যপ্রাপ্ত, মৃত্যু বহন করে আনো, মৃত্যু বহন করে আনো’ ইত্যাদি।
এছাড়া, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি ও বাকশক্তি, এগুলো মানুষের মধ্যে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার রহমত হিসাবে প্রদত্ত বৈশিষ্ট্য এবং এ বিষয়গুলো দলিল অনুযায়ী ইবাহাহ্ বা মুবাহ (অনুমোদিত) বিষয়ের অন্তর্ভূক্ত। সুতরাং, মানুষ যা চায় বলতে পারে, যা চায় দেখতে পারে কিংবা, কোন বিষয়ে আবেগাপ্লুত হতে পারে, যতক্ষণ পর্যন্ত না কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে কোন শারী’আহ্ দলিল থাকে।
সুতরাং, ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য একটি নির্দিষ্ট শ্লোগাণ বা সঙ্গীত গ্রহণ করা অনুমোদিত, যার মাধ্যমে তারা আবেগাপ্লুত হবে এবং যা দিয়ে তারা অন্যান্য রাষ্ট্র থেকে নিজেদের পৃথক করবে। অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত হবে এবং খলীফা যখন আন্যান্য রাষ্ট্রে সফর করবেন তখন এটি তাকে সঙ্গ দেবে, অর্থাৎ, এ শ্লোগাণটি ব্যবহার করা হবে। এছাড়া, এটি জনগণকে আবেগাপ্লুত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন উপলক্ষ্যকে কেন্দ্র করে ব্যবহার করা যেতে পারে, যেমন: সমাবেশ, গণজমায়েত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা, সম্প্রচার কেন্দ্রগুলোতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
শ্লোগাণ ব্যবহার করার পদ্ধতির মধ্যে থাকবে: ব্যাপক শোরগোল, নাসিক্যের আওয়াজ ব্যবহার করে বা, না করে নিম্নস্বরে বা উচ্চস্বরে কথা বলা, ইত্যাদি; এসবই শারী’আহ্ কর্তৃক অনুমোদিত। কারণ, অতীতে সাধারণত: মুসলিমরা (রাসূলের (সা) সময়েও) বিভিন্ন উপলক্ষ্যকে কেন্দ্র করে তাদের আবেগ প্রকাশের লক্ষ্যে উত্তেজিত ভঙ্গীতে কবিতা আবৃত্তি করতো।
খিলাফত রাষ্ট্রের জন্য একটি শ্লোগাণ বা সঙ্গীত গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনানুসারে এটি ব্যবহার করা হবে; বিশেষ করে খলীফা যখন অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে সাক্ষাৎ করবেন তখন এটি ব্যবহৃত হবে। এছাড়া, বিভিন্ন উপলক্ষ্যে উম্মাহ্’র এটি ব্যবহার করবে। আল্লাহ্’র ইচ্ছায় যখন দ্বিতীয়বার নবুয়্যতের আদলে খিলাফত আসবে, তখন রাষ্ট্রের শ্লোগাণ বা সঙ্গীতের ব্যাপারে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ মনে রাখতে হবে:
১. এতে উল্লেখিত থাকবে, রাসূল (সা) প্রদত্ত সুসংবাদ অনুযায়ী দ্বিতীয়বার খিলাফত ফিরে আসার ভবিষ্যতদ্বাণী পূর্ণ হবার কথা এবং আবারও উকাবের ব্যানার তথা রাসূলু (সা) এর ব্যানার উত্থিত হওয়ার কথা।
২. এতে উল্লেখিত থাকবে, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) প্রদত্ত সেই সুসংবাদের কথা যে, যখন খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন এ পৃথিবী তার সমস্ত সম্পদ উজাড় করে দেবে, আসমান তার সমস্ত রহমত বর্ষিত করবে এবং সমগ্র পৃথিবী জুলুম-অত্যাচার-নির্যাতনে পরিপূর্ণ হবার পর আবারও ন্যায়বিচারে পরিপূর্ণ হবে।
৩. এতে উল্লেখিত থাকবে, খিলাফত রাষ্ট্রের শাসন-কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর সমগ্র বিশ্বব্যাপী এর জয়যাত্রা এবং সত্য ও ন্যায়ের আলোকদ্যুতি চর্তূদিকব্যাপী বিস্তারের কথা; বিশেষ করে তিনটি পবিত্র ভূমিতে: অর্থাৎ, যে ভূমিগুলোতে মসজিদ-উল-হারাম, মসজিদ-উল-নববী এবং মসজিদ-উল-আকসা, যেখান থেকে ইহুদীদের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করা হবে।
৪. এটি শেষ হবে, এ উম্মাহ্’র পূণরায় শ্রেষ্ঠ উম্মাহ্ হিসাবে প্রত্যাবর্তনের বর্ণনা দিয়ে, যেভাবে আল্লাহ্ তা’আলা তাদের দেখতে চেয়েছেন; যেখানে তাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য হবে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জন, যিনি তাদের স্বীয় রহমত, ক্ষমা ও করুণার মাধ্যমে জান্নাতুল ফেরদৌস প্রদান করে সম্মানিত করবেন।
৫. এতে অবশ্যই তাকবীর ধ্বনিটি পুনঃ পুনঃ অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। কারণ, ইসলাম ও মুসলিমদের জীবনে তাকবীর ধ্বনির রয়েছে বিশেষ প্রভাব। বস্তুতঃ তাকবীরই হচ্ছে সেই ধ্বনি যা মুসলিমদের বিজয় উৎসবে, অবকাশ যাপনের দিনগুলোতে, কিংবা, যে কোন অনুষ্ঠানে কার্যকরীভাবে এবং তাদের মুখ থেকে সবসময় উচ্চারিত হবে। উপরোক্ত বিষয়সমূহ বিবেচনায় রেখে এই বইয়ের সূচীপত্রে এ রকম একটি সঙ্গীত একদিন সংযুক্ত করা হবে এবং আল্লাহ্’র ইচ্ছায় এর পরিবেশন পদ্ধতিও যথাসময়ে ঘোষণা করা হবে, ইন্শাআল্লাহ্ ।
আমাদের শেষদোয়া হল শুধুই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রশংসা করা, যিনি এ বিশ্বব্রহ্মান্ডের প্রভু ও মহান প্রতিপালক।
রাষ্ট্রের পতাকা ও ব্যানার

ইসলামী রাষ্ট্রের পতাকা (আল-ওয়্যিয়াহ্) ও ব্যানার (রাইয়াত) থাকবে যা নেয়া হয়েছে মদিনায় রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত প্রথম ইসলামী রাষ্ট্রের উদাহরণ থেকে। এগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা নিম্নরূপ:
১. ভাষাগতভাবে পতাকা ও ব্যানারকে ’আলম বলা হয়। আল কামুস আল মুহীতে উল্লেখিত আছে যে, মূলতঃ আল-রাইয়া অর্থ হল আল-আলম, যার বহুবচন হল রাইয়াত। এছাড়া, আল-লিওয়া শব্দমূল থেকে আল-আলম শব্দটি এসেছে যার বহুবচন হল আল-ওয়্যিয়াহ্। এর পাশাপাশি এইসব প্রতিটি শব্দের শারী’আহ্ নির্ধারিত অর্থ ও তাৎপর্য রয়েছে:
– পতাকা (লিওয়া) হবে সাদা, যেখানে কাল অক্ষরে লেখা থাকবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদ উর রাসূলুল্লাহ্’। এটা সেনাবাহিনীর আমীর বা নেতার সাথে বাঁধা থাকবে। এটা তার অবস্থানের নিদর্শন হিসেবে থাকবে এবং এটি তার সাথে সাথে যাবে। এ বিষয়ে দলিল হল, মক্কাবিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) একটি সাদা পতাকা উড়িয়েছিলেন। এ হাদীসটি জাবিরের সূত্রে ইবনে মাজাহ্ বর্ণনা করেছেন। এছাড়া, আন-নাসায়ী আনাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) উসামা বিন যায়েদকে সেনাবাহিনীর আমীর নিযুক্ত করেন তখন তিনি নিজ হাতে উসামার পতাকা বেঁধে দেন।
– আর, ব্যানার (রাইয়া) হবে কাল যাতে সাদা অক্ষরে লেখা থাকবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদ উর রাসূলুল্লাহ্’। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন বিভাগের আমীরগণ এটা বহন করবেন (রেজিমেন্ট, ডিটাচমেন্ট এবং অন্যান্য সামরিক ইউনিটসমূহ)। এ বিষয়ে দলিল হল, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন খায়বারের যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তখন ঘোষণা করেছিলেন: “আগামীকাল আমি এমন একজনকে রাইয়া প্রদান করবো যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসে এবং তারপর তিনি এটি আলীকে দিলেন।” এই হাদীসের ব্যাপারে সকলের ঐক্যমত আছে (মুত্তাফিকুন ’আলাইহি)। তখন আলীকে একটি ডিভিশন বা রেজিমেন্টর নেতা হিসাবে ধরা হয়েছিল। এছাড়া, আল-হারিছ বিন হাস্সান বিন আল-বকরী বর্ণিত একটি হাদীসে বলা হয়েছে, “আমরা মদিনাতে এলাম এবং রাসূল (সা) কে মিম্বরে উপবিষ্ট অবস্থায় দেখলাম, যখন বিলাল তাঁর সামনে তলোয়ার পরিহিত অবস্থায় দন্ডায়মান ছিল। রাসূল (সা) এর সামনে কিছু কাল পতাকা ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এগুলো কিসের পতাকা?” তারা বলল, “আমর ইবনুল ’আস এইমাত্র অভিযান থেকে এসেছেন।” “সেখানে কিছু কাল পতাকা ছিল” – একথাটির অর্থ হল, সেনাবাহিনী অনেক পতাকা বহন করছিল, যদিও এর নেতৃত্বে ছিল একজন, যিনি ছিলেন আমর ইবনুল ’আস। এটা নির্দেশ করে যে, সেনাবাহিনীর একটি মাত্র পতাকা (ইলওয়া) থাকবে, কিন্তু, ব্যানার অনেক থাকতে পারে। সুতরাং, পতাকা (লিওয়া) হল সেনাবাহিনী প্রধানের চিহ্ন (’আলম) বা প্রতীক; আর, ব্যানার (রাইয়া) হল সৈন্যদলের প্রতীক (’আলম)।
২. পতাকা (লিওয়া) সেনাবাহিনীর আমীরের সাথে বাঁধা থাকবে – যা সেনাপ্রধানের প্রধান কার্যালয়ের প্রতীক হিসাবে নির্দেশিত হবে। তবে, যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধের আমীর, হোক তিনি সেনাবাহিনীর আমীর অথবা তার পক্ষ থেকে নিযুক্ত কেউ, তাকে যুদ্ধকালীন সময়ের জন্য ব্যানার (রাইয়া) প্রদান করা হবে। একারণে ব্যানারকে (রাইয়া) যুদ্ধের জননী বলা হয়, কারণ যুদ্ধরত নেতাগণ যুদ্ধের ময়দানে এটি বহন করে থাকে।
সুতরাং, প্রকৃত অর্থে যখন যুদ্ধ সংঘটিত হবে, তখন যুদ্ধের প্রতিটি আমীর এর জন্য একটি করে ব্যানার থাকবে – যার প্রচলন অতীতে ছিল। ব্যানারকে উচ্চে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নেতাদের শক্তিমত্তা প্রকাশিত হত। যুদ্ধের ঐতিহ্য অনুসারে এ বিষয়টিকে একটি প্রশাসনিক নির্দেশ হিসাবে পালন করা হত ।
আল্লাহ্’র রাসূল (সা) জা’ফর, যায়িদ ও ইবন রুওয়াহা’র মৃত্যুসংবাদ সেনাবাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে ফিরে আসার আগেই ঘোষণা করেছিলেন:
“যায়িদ ব্যানার (রাইয়া) তুলে নিল, এবং নিহত হল; এবং তারপর, জা’ফর তা তুলে নিল এবং সেও নিহত হল। এবং তারপর, ইবন রুওয়াহা তা নিল এবং সেও নিহত হল।”
(সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৩৫৭৫)এছাড়া, যুদ্ধের সময় যদি যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে খলীফা থাকেন, তবে পতাকা (লিওয়া) ও ব্যানার (রাইয়া) দু’টোই বহন করা যেতে পারে। এ বিষয়ে সীরাত ইবনে হিশামে গাজওয়া বদর (বদরের যুদ্ধ) সম্পর্কে কিছু বর্ণনা আছে যে, সেখানে পতাকা ও ব্যানার দু’টোই ছিল।
আর, যুদ্ধ শেষে শান্তির সময় সাধারণতঃ ব্যানারগুলোকে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট, রেজিমেন্ট, ডিভিশন এবং ব্যাটেলিয়ানের মধ্যে বিতরণ করে দেয়া হয় এবং তারা এগুলো বহন করে, যা কিনা আল-হারিছ ইবন হাস্সান আল-বকরী বর্ণিত হাদীসে আমর ইবনুল ’আস এর বাহিনী সম্পর্কে বলা হয়েছে।
৩. ইসলামে খলীফা হলেন সেনাবাহিনীর প্রধান। এজন্য, আইনত পতাকা তার কার্যালয়ের উপরে উত্তোলিত থাকবে; অর্থাৎ, তার বাসভবনের উপরে। কারণ, এ পতাকা সেনাপ্রধানের সাথে বাঁধা থাকবে। এছাড়া, প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে খলীফার বাসভবনের উপর ব্যানার উত্তোলন করাও অনুমোদিত; কারণ, খলীফা রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানেরও প্রধান। এছাড়া, রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, বিভাগের ও স্থাপনার ক্ষেত্রে, শুধুমাত্র ব্যানার উত্তোলিত হবে। কারণ, পতাকা শুধুমাত্র সেনাপ্রধানের প্রতীক, যা তার অবস্থানকে নির্দেশ করে।
৪. পতাকা সাধারণতঃ সূচালো লাঠির শেষ মাথায় বাঁধা অবস্থায় থাকবে। সেনাবাহিনীর সংখ্যার উপর ভিত্তি করে এটি সেনাবাহিনীর আমীরকে দেয়া হবে। সুতরাং, এটা বাঁধা থাকবে প্রথম বাহিনী, দ্বিতীয় বাহিনী কিংবা, আলশামের বাহিনী, ইরাকের বাহিনী, আলিপ্পোর বাহিনী অথবা বৈরুতের বাহিনী, ইত্যাদি বাহিনীসমূহের প্রধানদের সাথে।
মূলতঃ বর্শার শেষ মাথায় পতাকা প্যাঁচানো অবস্থায় থাকবে এবং প্রয়োজন ব্যতীত এটি খোলা হবে না। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যে, খলীফা বাসভবনের উপর এটি উত্তোলিত থাকবে তার গুরুত্ব বা মর্যাদা বোঝানোর খাতিরে। একই কথা প্রযোজ্য হবে শান্তির সময় সেনাবাহিনীর অন্যান্য আমীরদের অবস্থানের ক্ষেত্রে, যেন উম্মাহ্ তাদের সেনাবাহিনীর শৌর্যবীর্য ও প্রভাবপ্রতিপত্তি অনুভব করতে পারে। কিন্তু, এ বিষয়টি যদি নিরাপত্তার জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, যেমন: এর ফলে যদি শত্রট্টপক্ষ আমীরদের অবস্থান সম্পর্কে অবহিত হয়, তবে, মূল নিয়মে ফিরে যেতে হবে; অর্থাৎ, এটি পেঁচানো অবস্থায় থাকবে এবং প্রয়োজন ব্যতীত খোলা হবে না।
ব্যানারের ক্ষেত্রে বলা যায় যে, এটি বাতাসে পত্পত্ করে উড়ার জন্য মুক্ত রাখা হবে, যেভাবে এখন পতাকা ব্যবহার করা হয়। এজন্য এটিকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগের উপরে উত্তোলন করা হবে। সংক্ষেপে পুরো বিষয়টিকে এভাবে বলা যায়:
প্রথমত: সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে:
১. প্রকৃত যুদ্ধের সময় পতাকা সেনাবাহিনীর আমীরের সাথে সংযুক্ত থাকবে। মূলনীতি অনুযায়ী, সাধারণতঃ এটি খোলা হবে না বরং বর্শার মাথায় প্যাঁচানো অবস্থায় থাকবে। নিরাপত্তা সম্পর্কিত ইস্যুগুলো বিবেচনায় রেখে এটিকে প্রসারিত করা যেতে পারে। যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধক্ষেত্রের আমীর একটি ব্যানার বহন করবে। যদি খলীফা রণক্ষেত্রে উপস্থিত থাকেন তাহলে ব্যানার এর সাথে পতাকাও বহন করা যাবে।
২. শান্তির সময় সেনাবাহিনীর আমীরদের সাথে পতাকা প্যাঁচানো অবস্থায় থাকবে। তবে, তারা যেখানে অবস্থান করবেন সেখানে পতাকা উত্তোলন করা যাবে। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন বিভাগ, রেজিমেন্ট, ব্যাটালিয়ন ইত্যাদি ব্যানার উত্তোলন করবে। প্রত্যেক বিভাগ, রেজিমেন্ট, ব্যাটালিয়নের জন্য আবার নির্দিষ্ট ব্যানার থাকতে পারে যেন তাদের প্রশাসনিকভাবে আলাদা করা যায় – যা মূল ব্যানারের সাথে উত্তোলন করা হবে।
দ্বিতীয়ত: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান, অন্যান্য বিভাগ (departments) ও স্থাপনাগুলোতে ব্যানার উত্তোলন করা হবে; কিন্তু, সেনাবাহিনী প্রধান হিসাবে শুধুমাত্র খলীফার বাসভবনে পতাকা উত্তোলন করা হবে। এছাড়া, প্রশাসনিক দৃষ্টিকোন থেকে খলীফার বাসভবনে ব্যানারও উত্তোলন করা হবে; কারণ, খলীফা রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানেরও প্রধান। সাধারণ জনগণ শুধুমাত্র তাদের বাসভবন, স্কুল-কলেজ কিংবা, অন্যান্য স্থাপনাসমূহে ব্যানার উত্তোলন করতে পারবে; বিশেষ করে উৎসবের দিনগুলোতে, যেমন: ঈদ, বিজয়ের উৎসব ইত্যাদি।
মাজলিস আল উম্মাহ্

(উম্মাহ্’র কাউন্সিল, শূরা ও জবাবদিহিতা)
মাজলিস আল উম্মাহ্ বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে গঠিত এমন একটি কাউন্সিল বা পরামর্শ সভা, যা বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর মতামতের প্রতিনিধিত্ব করবে এবং যাদের সাথে প্রয়োজন হলে খলীফা বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাপারে পরামর্শ করবেন। আবার, অপরদিকে তারা শাসকদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করার ক্ষেত্রে উম্মাহ্’র প্রতিনিধিত্ব করবে। এ বিষয়টি রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর কর্মকান্ডের আলোকে গ্রহণ করা হয়েছে। কারণ, তিনি (সা) আনসার ও মুহাজির’দের কিছু ব্যক্তিবর্গের সাথে পরামর্শ করতেন, যারা তাদের নিজ নিজ গোত্রের প্রতিনিধিত্ব করতেন। এছাড়া, তিনি (সা) পরামর্শদাতা হিসাবে কিছু সাহাবীকেও মনোনীত করেছিলেন, পরামর্শ কালে তিনি (সা) সাধারণতঃ অন্যদের চাইতে তাঁদের মতামতকে বেশী গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতেন; যেমন: আবু বকর (রা), উমর (রা), হামযাহ্ (রা), আলী (রা), সালমান আলফারসী (রা), হুজাইফা (রা) প্রমূখ ব্যক্তিবর্গ।
এছাড়া, এ বিষয়ে আরও দলিল পাওয়া যায় আবু বকরের জীবনী থেকে। প্রকৃত অর্থে, আবু বকর (রা) আনসার ও মুহাজির’দের মধ্য হতে কিছু ব্যক্তিকে মনোনীত করেছিলেন এবং যখন কোন ঘটনা ঘটত (যে বিষয়ে পরামর্শ করা প্রয়োজন) তখন তিনি উক্ত বিষয়ে তাদের মতামত চাইতেন। আবু বকরের সময়ে শূরা কাউন্সিলের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ওলামা ও ফাত্ওয়া প্রদানে সক্ষম ব্যক্তিবর্গ। ইবনে সা’দ, আল-কাসিম হতে বর্ণনা করেছেন যে, যখন কোন ঘটনা ঘটত এবং আবু বকর মতামত প্রদানে সক্ষম ব্যক্তি ও ফকীহ্গণের সাথে আলোচনা করতে চাইতেন, তখন তিনি আনসার ও মুহাজির’দের মধ্য হতে কিছু ব্যক্তিকে ডাকতেন। আবু বকরের সময় উমর (রা), উসমান (রা), আলী (রা), আবদুর রহমান বিন আউফ (রা), উবাই বিন কাব (রা), যায়িদ বিন ছাবিত (রা), মু’য়াজ বিন জাবাল (রা) প্রমুখ সাহাবীগণ তাঁদের মতামত প্রদান করতেন। লোকেরা তাদের ফাত্ওয়া বা রায়ও গ্রহণ করত। পরবর্তীতে, উমর (রা) যখন খলীফা হলেন তখন তিনিও এসব ব্যক্তিবর্গের পরামর্শ গ্রহণ করতেন। এছাড়া, মুসলিমদের পক্ষ থেকে শাসকদের জবাবদিহি করার বিষয়েও দলিল-প্রমাণ রয়েছে। খোলাফায়ে রাশেদীনদের (রা) সময় মুসলিমরা শাসকদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করতো। বস্তুতঃ যেহেতু শূরা বা কাউন্সিলের মাধ্যমে উম্মাহ্’র মতামতের প্রতিনিধিত্ব করা অনুমোদিত; একইভাবে, এ কাউন্সিলের মাধ্যমে উম্মাহ্’র পক্ষ থেকে শাসককে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করাও অনুমোদিত। উপরোল্লিখিত সমস্ত কিছুই প্রমাণ করে যে, মতামত প্রদান ও শাসককে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করার জন্য উম্মাহ্’র পক্ষ থেকে একটি বিশেষ পরামর্শ সভা বা কাউন্সিল গঠন করা শারী’আহ্ কর্তৃক অনুমোদিত, যা কিনা গঠিত হবে আল্লাহ্’র কিতাব ও রাসূল (সা)এর সুন্নাহ্’র আলোকে। এটিকে “উম্মাহ্’র কাউন্সিল” বলা হবে, কারণ এ কাউন্সিল বা পরামর্শ সভাটি উম্মাহ্’র থেকে মতামত প্রদান ও শাসককে জবাবদিহি করার জন্য গর্ঠিত হয়েছে।
রাষ্ট্রের অমুসলিম নাগরিকদেরও এ কাউন্সিলের সদস্য হবার অনুমোদন রয়েছে, যেন তারা তাদের উপর শাসকদের দ্বারা কোন অন্যায়-অবিচার সংঘটিত হলে; কিংবা, তাদের উপর শারী’আহ্ আইনের অপপ্রয়োগ হলে; কিংবা, সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোনপ্রকার ঘাটতি হলে বা এ জাতীয় কোন সমস্যা হলে অভিযোগ দায়ের করতে পারে।
শূরার অধিকার
শূরা হল সমস্ত মুসলিমের অধিকার যা পূরণ করা খলীফার কর্তব্য। খলীফাকে পরামর্শ দেয়া তাদের অধিকার এবং খলীফার উচিত বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ করা। পবিত্র কুর’আনে আল্লাহ্ বলেন,
‘কাজে কর্মে তাদের পরামর্শ কর। অতঃপর যখন কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেল, তখন আল্লাহ্’র উপর ভরসা কর।’
[সূরা আল ইমরান: ১৫৯]তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,
‘তারা পারষ্পরিক পরামর্শক্রমে কাজ করে।’
[সূরা আশ শূরা: ৩৮]রাসূলুল্লাহ্ (সা) লোকদের কাছে মতামত চাইতেন এবং তাদের পরামর্শ শুনতেন। বদরের যুদ্ধের দিন তিনি যুদ্ধক্ষেত্রের অবস্থান নিয়ে সাহাবীদের (রা) সাথে পরামর্শ করেছিলেন, এবং ওহুদের যুদ্ধের সময় মদিনার ভেতরে না বাইরে যুদ্ধ করা উচিত এ বিষয়ে সাহাবীদের (রা) সাথে আলোচনা করেছিলেন। বদরের যুদ্ধের দিন তিনি (সা) যুদ্ধকৌশলের ব্যাপারে অভিজ্ঞ আল হাবাব ইবনুল মুনজির (রা) এর পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন। ওহুদের যুদ্ধের দিন তিনি (সা) সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত গ্রহণ করেছিলেন, যদিও এ ব্যাপারে তাঁর নিজস্ব মতামত ছিল ভিন্ন।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) মুসলিমদের সাথে ইরাকের ভূমি বিষয়ে পরামর্শ করেছিলেন। যেহেতু এটি যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ছিল, সেহেতু এগুলো কি মুসলিমদের মধ্যে বন্টন করে দেয়া হবে, নাকি মালিকানা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের হাতে রেখে খারাজ প্রদানের শর্তে এ অঞ্চলের লোকদের হাতেই ভূমিগুলো ছেড়ে দেয়া হবে। তারপর তিনি তাঁর নিজের ইজতিহাদ অনুসারে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং অধিকাংশ সাহাবী (রা) এ ব্যাপারে সমর্থন দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, তিনি সে অঞ্চলের লোকদের হাতেই ভূমিগুলো ছেড়ে দেন এবং তাদের খারাজ প্রদানের নির্দেশ প্রদান করেন।
জবাবদিহিতার অধিকার
মুসলিমদের এ অধিকার রয়েছে যে, খলীফা তাদের পরামর্শ করবেন এবং সেইসাথে, তাদেরও অবশ্যই শাসকদের গৃহীত সিদ্ধান্ত ও কর্মকান্ড সম্পর্কে তাদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করতে হবে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা শাসকদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করাকে মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন; এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) মুসলিমদের অকাট্য নির্দেশের মাধ্যমে আদেশ দিয়েছেন যেন মুসলিমরা শাসকদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করে এবং অপসারিত করে, যদি তারা জনগণের অধিকার ক্ষুন্ন করে, তাদের প্রতি দায়িত্বপালনে ব্যর্থতার পরিচয় দেয় কিংবা, জনগণের কোন বিষয় অবহেলা করে, বা, শারী’আহ্ আইন লঙ্ঘন করে, কিংবা, আল্লাহ্’র আইন ব্যতীত অন্য কোন আইন দিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করে। উম্মে সালামা (রা) থেকে মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,
“এমন কিছু আমীর আসবে যাদের কিছু কাজের ব্যাপারে তোমরা একমত পোষণ করবে এবং কিছু কাজ প্রত্যাখান করবে। সুতরাং, যারা তাদের ভাল কাজের ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করবে তারা গুনাহ থেকে মুক্তি পেল; যে মন্দ কাজকে প্রত্যাখান করল সেও নিরাপদ হয়ে গেল। কিন্তু, তার কী হল যে (মন্দ কাজকে) গ্রহণ করল এবং তা প্রত্যাখান করল না? তারা জিজ্ঞেস করলেন, ‘এমতাবস্থায় আমাদের কী তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা উচিত নয়?’ উত্তরে তিনি (সা) বললেন, ‘না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সালাত কায়েম রাখে।”এখানে সালাত বলতে শারী’আহ্ আইন অনুযায়ী শাসন করাকে বোঝানো হয়েছে।
আবু বকরের খিলাফতের সময় উমর (রা) ও তাঁর অনুসারী মুসলিমগণ মুরতাদদের বিরুদ্ধে আবু বকরের যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন (যখন প্রথম মুরতাদ সম্পর্কিত সমস্যা শুরু হয়েছিল)। আল বুখারী ও মুসলিম আবু হুরাইরা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন:
“যখন আল্লাহ্’র রাসূল (সা) ইন্তেকাল করলেন এবং আবু বকর খলীফা হলেন তখন আরবের কিছু গোত্র মুরতাদ (অর্থাৎ, ইসলাম ত্যাগ করল) হয়ে গেল। উমর বললেন, ‘আপনি কিভাবে লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,
“আমি (আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে) আদিষ্ট হয়েছি যেন মানুষের সাথে আমি ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ করতে থাকি যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা “আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ্’র রাসূল” এ কথার স্বীকৃতি দেয় এবং নামাজ কায়েম করে ও যাকাত আদায় করে। অতএব, যদি তারা তা করে তবে তাদের জীবন ও সম্পদ আমার নিকট হতে নিরাপদ, তবে যেটা আল্লাহ্’র আইন (অর্থাৎ, শারী’আহ্ লঙ্ঘনে প্রাপ্য শাস্তি) তা ব্যতীত। আর, তাদের হিসাবনিকাশ তো আল্লাহ্’র কাছে।”
(সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-২৯৪৬)উত্তরে আবু বকর বললেন, ‘আল্লাহ্’র কসম! আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব যারা সালাত ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করেছে। কারণ, যাকাত হল সম্পদের উপর (আল্লাহ্’র) অধিকার। আল্লাহ্’র কসম, তারা যদি কোন বাচ্চা ছাগীও যাকাত দিতে অস্বীকার করে, যা তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে দিত, এই অস্বীকৃতির কারণে আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করব।’ তখন উমর (রা) বললেন, ‘আল্লাহ্’র কসম, তিনিই আল্লাহ্ যিনি দ্রুত আবু বকরের হৃদয়কে প্রশস্ত করে দিয়েছেন এবং আমি জানি তিনি সত্য বলেছেন।’
উমর (রা) এর সময় বিলাল ইবনে রাবাহ্ এবং আল-যুবায়ের সহ অন্যান্যরাও মুজাহিদদের মাঝে ইরাকের ভূমি বন্টন না করার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। একজন বেদুইনও উমরের রাষ্ট্রের জন্য কিছু জমি সংরক্ষিত করার সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখান করেছিল। আবু উবাইদ তার আল-আমওয়াল গ্রন্থে আমীর আব্দুল্লাহ্ ইবন যুবায়ের হতে এবং ইবন যুবায়ের তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, ‘একজন বেদুইন উমরের কাছে আসল এবং বলল, ‘হে আমীরুল মু’মিনীন, অন্ধকার যুগে এগুলো আমাদের ভূমি ছিল যেগুলোর জন্য আমরা যুদ্ধ করেছিলাম। এখন আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং এগুলো আমাদেরই থাকার কথা। তাহলে, আপনি কেন এ ভূমি সংরক্ষিত করতে চাইছেন?’ উমর একথা শোনার পর মাথা নাড়াতে লাগলেন এবং নিজের গোঁফে আঙুল চালাতে লাগলেন। যখন কোন বিষয় নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়তেন তখন তিনি এরকম করতেন। এমতাবস্থায় বেদুইন উমরকে আবারও প্রশ্ন করল। অতঃপর উমর বললেন, ‘সম্পদের মালিক হলেন আল্লাহ্ এবং লোকেরা তাঁর দাস মাত্র। আল্লাহ্’র কসম, আমি যদি ফি সাবিলিল্লাহর (জিহাদের) ব্যাপারে কোনরূপ চাপ অনুভব না করতাম তাহলে এই জমির এক ইঞ্চিও রাখতাম না।’ তারপর, উমর গণমালিকানাধীন সম্পদ হতে মুসলিমদের (জিহাদে ব্যবহৃত) ঘোড়ার জন্য কিছু ভূমি অধিগ্রহণ করেন। এছাড়া, (বিবাহের সময়) চারশত দিরহামের বেশী মোহরানা ধার্য না করার ব্যাপারে উমরের নিষেধাজ্ঞাকে এক মহিলা চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। উক্ত মহিলা উমরকে বলেছিলেন, ‘হে উমর, ‘আপনার এটা বলার কোন অধিকার নেই। আপনি কি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার এ আয়াত শুনেননি যে, “তোমরা যদি তাদের একজনকে রাশি রাশি ধন প্রদান করে থাকো, তবে তার মধ্য হতে কিছুই ফিরিয়ে নিও না।” [সূরা নিসা : ২০]
তিনি প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘এই মহিলা সঠিক আর উমর ভুল।’
এছাড়া, উসমানের (রা) সাথে, যখন তিনি আমীর-উল-মু’মিনীন ছিলেন, আলী (রা) হজ্জ্ব ও উমরাহ্ সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গীর বিষয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন। আহমাদ বিশুদ্ধ সনদ সহকারে আবদুল্লাহ্ ইবন যুবায়ের থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “আমরা উসমানের সাথে আল-জুফাহ্’তে থাকাকালে আল-শাম থেকে আগত একদল লোক, যাদের মধ্যে হাবীব ইবন মাসলামা আল-ফাহ্রী ছিলেন। উসমানকে হজ্জ্বের সাথে (তামাত্তু) উমরাহ্’র বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন: ‘হজ্জ্বের মাসে হজ্জ্ব ও উমরাহ একসাথে না করাই উত্তম। এটা ভাল হবে যে, তোমরা দ্বিতীয়বার আল্লাহ্’র ঘরে না আসা পর্যন্ত উমরাহ’কে বিলম্বিত করে নিও। কারণ, তিনি তাঁর এ ঘরকে সৎকাজের জন্য প্রশস্ত করেছেন।’ আলী এসময় এ উপত্যকায় উট চরাচ্ছিলেন। উসমানের উমরাহ্’র বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গী জানার পর তিনি তাঁর দিকে অগ্রসর হলেন যে পর্যন্ত না তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং বললেন: ‘তুমি কি রাসূলের সুন্নাহ্’কে পাল্টে দিতে চাও এবং আল্লাহ্ তাঁর কিতাবে তাঁর বান্দাদের যে বিষয়ে অনুমতি (রুখসাহ্) দিয়েছেন তা রহিত করতে চাও? তুমি এ ব্যাপারে নিষেধ করছো, অথচ যারা দূরবর্তী স্থান থেকে আসে সে সকল লোকের জন্য এটা অনুমোদিত।’ একথা শুনে উসমান লোকদের দিকে ফিরলেন এবং বললেন, ‘আমি কি তোমাদের এটা করতে নিষেধ করেছি? না, আমি তা করিনি। এটা শুধু আমার দৃষ্টিভঙ্গী এবং উপদেশ। যে কেউ চাইলে এটা গ্রহণ করতে পারে কিংবা, না চাইলে প্রত্যাখান করতে পারে।”
সুতরাং, উম্মাহ্’র কাউন্সিল বা পরামর্শ সভার পরামর্শ (শূরা) দেয়ার অধিকার রয়েছে এবং শাসকদের জবাবদিহি করা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক।
শূরা এবং জবাবদিহিতার মধ্যকার পার্থক্য সুস্পষ্ট। শূরা হল একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে এ ব্যাপারে মতামত চাওয়া এবং শোনা; আর, জবাবদিহিতা হল সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সমালোচনা বা বিরোধিতা করা।
উম্মাহ্’র কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচন
উম্মাহ্’র কাউন্সিলের সদস্যরা নির্বাচিত, নিয়োগ প্রাপ্ত নন। জনগণের মতামতকে জোরালোভাবে উপস্থাপনের জন্য তারা হলেন জনগণের প্রতিনিধি। প্রতিনিধি তাদের দ্বারাই নির্বাচিত হওয়া উচিত যাদের প্রতিনিধিত্ব তারা করবেন এবং কোন অবস্থাতেই এ প্রতিনিধিদের জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়া যাবে না। তাছাড়া, যেহেতু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মতামত জোরালোভাবে উপস্থাপনের জন্য এবং তাদের পক্ষ থেকে শাসককে জবাবদিহি করার জন্য উম্মাহ্’র কাউন্সিল গঠন করা হয়, সেহেতু এ উদ্দেশ্য কখনও অর্জিত হবে না, যদি উক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেরা তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত না করে।
এছাড়া, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) যাদের সাথে পরামর্শ করতেন তাদের তিনি ব্যক্তিত্ব, যোগ্যতা বা সক্ষমতার ভিত্তিতে নির্বাচিত করতেন না; বরং, তাদের নির্বাচন করার ক্ষেত্রে তিনি (সা) দুটি বিষয়কে প্রাধান্য দিতেন। প্রথমত: তারা তাদের গোত্র বা গোষ্ঠীর প্রধান ছিলেন, তাদের যোগ্যতা যাই হোক না কেন। আর, দ্বিতীয়ত: তারা আনসার আর মুহাজিরদের প্রতিনিধিত্ব করতেন। কারণ, শূরা গঠনের মূল উদ্দেশ্য হল জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা। সুতরাং, যে নীতির ভিত্তিতে উম্মাহ্’র কাউন্সিলের সদস্যরা নির্বাচিত হবেন, তা হল: প্রথমত: জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা – যা প্রতিফলিত হয়েছিল রাসূল (সা) কর্তৃক গোত্র প্রধানদের নির্বাচিত করার মাধ্যমে। আর, দ্বিতীয়ত: কোন দল বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করা – যা প্রতিফলিত হয়েছিল তিনি (সা) কর্তৃক আনসার ও মুহাজিরদের প্রতিনিধি বাছাই করার ক্ষেত্রে। বস্তুতঃ অগনিত মানুষ ও দলের ক্ষেত্রে নির্বাচন ব্যতীত এ প্রতিনিধি নির্বাচন করা সম্ভব নয়। আর, তাই উম্মাহ্ কাউন্সিলের সদস্যদের অবশ্যই নির্বাচিত হতে হবে।
তবে এটা সত্য যে, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) যাদের সাথে পরামর্শ করতেন তাদের তিনি (সা) নিজেই মনোনীত করেছিলেন। এর কারণ হল, মদিনা ছিল একটি ছোট অঞ্চল এবং এখানে সকল মুসলিমই তাঁর পরিচিত ছিল। বিপরীতভাবে, আমরা দেখতে পাই যে, আক্বাবার দ্বিতীয় শপথের সময় যে মুসলিমরা তাঁকে বাই’আত দিয়েছিলেন তারা তাঁর পরিচিত ছিল না বিধায় তিনি নেতা নির্বাচনের বিষয়টি তাদের উপর ন্যস্ত করেছিলেন এবং বলেছিলেন:
“তোমরা তোমাদের মধ্য হতে বারো জন নেতা নির্বাচিত করো যারা তাদের লোকেদের উপর দায়িত্বশীল।”
এ ঘটনাটি কা’ব ইবন মালিকের সূত্রে সীরাত ইবন হিশামে বর্ণিত আছে।
উপরোক্ত ঘটনাবলী থেকে আমরা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে, যেহেতু উম্মাহ্ বা শূরা কাউন্সিলের সদস্যগণ বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর মতামতের প্রতিনিধিত্ব করে, এবং যেহেতু এ কাউন্সিল গঠনের মূল উদ্দেশ্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মতামতকে জোরালোভাবে উপস্থাপন করা এবং সেইসাথে, তাদের পক্ষ থেকে শাসকদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করা; এবং যেহেতু এ উদ্দেশ্য অর্জন করা কখনো সম্ভব নয় যদি না প্রতিনিধিবৃন্দ জনগণের মধ্য হতে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয়; সুতরাং, এটা প্রমাণিত যে, উম্মাহ্ বা শূরা কাউন্সিলের সদস্যদের অবশ্যই নির্বাচিত হতে হবে, তারা রাষ্ট্র কর্তৃক নিযুক্ত হবে না।
উম্মাহ্’র কাউন্সিল নির্বাচিত করার পদ্ধতি
১. গভর্ণর (ওয়ালী) সংক্রান্ত আলোচনায় আমরা পূর্বেই বলেছি যে, আমরা দু’টি কারণে উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল (যা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে) নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। প্রথমত: উলাই’য়াহর জনগণের প্রয়োজন ও অবস্থা সম্পর্কে ওয়ালীকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা। এর কারণ হল, ওয়ালীকে তার দায়িত্ব পালনে এমনভাবে সহায়তা করা যাতে উলাই’য়াহর জনগণের স্বস্তিপূর্ণ ও নিরাপদ জীবন সুনিশ্চিত করা সম্ভব হয় এবং সেইসাথে, তাদের প্রয়োজন পূরণ ও সেবার বিভিন্ন অনুসঙ্গ সরবরাহ করা যায়। দ্বিতীয়ত: উলাই’য়াহর শাসনকার্য পরিচালনার ব্যাপারে জনগণের সন্তুষ্টি ও অভিযোগ সম্পর্কে অবহিত হওয়া। কারণ, উলাই’য়াহ্ কাউন্সিলের অধিকাংশের অভিযোগ ওয়ালীর অপসারণকে অনিবার্য করে তুলে। সুতরাং, উলাই’য়াহ্ কাউন্সিলের বাস্তবতা প্রশাসনিক – যা উলাই’য়াহর জনগণের অবস্থা সম্পর্কে এবং ওয়ালীর কাজের ব্যাপারে সন্তুষ্টি ও অভিযোগ অবহিতকরণের মাধ্যমে ওয়ালীকে তার দায়িত্ব পালনে সহায়তা করে। এ সমস্ত কিছুই ওয়ালীকে প্রতিনিয়ত তার কাজ উন্নত করতে উদ্ধুদ্ধ করে। এছাড়া, উম্মাহ্’র কাউন্সিল এর মত এই কাউন্সিলের কিছু আবশ্যিক বা নির্বাহী
ক্ষমতা (mandatory power) রয়েছে যে সম্পর্কে (উম্মাহ্’র কাউন্সিল এর আবশ্যিক বা নির্বাহী ক্ষমতা সম্পর্কে) কিছু পরে আলোচিত হবে।
২. আমরা সমগ্র উম্মাহ্’র জন্য একটি কেন্দ্রীয় উম্মাহ্ কাউন্সিল (শূরা ও জবাবদিহিতার জন্য) গঠন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছি, যা অবশ্যই উম্মাহ্’র দ্বারা নির্বাচিত হবে এবং উম্মাহ্’কে প্রতিনিধিত্ব করবে। এর আবশ্যিক ক্ষমতাগুলো পরবর্তীতে আলোচিত হবে।
৩. এর অর্থ হল উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল এর সদস্য নির্বাচনের জন্য একটি নির্বাচন হবে এবং উম্মাহ্’র কাউন্সিল এর সদস্যদের জন্য আরেকটি নির্বাচন হবে।
৪. নির্বাচনী প্রক্রিয়া সহজতর করার লক্ষ্যে ও জনগণকে পুনঃনির্বাচনের বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য আমরা প্রথমে উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল এর নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি; তারপর, যারা এ নির্বাচনে জয়লাভ করবে তারা নিজেদের মধ্য হতে উম্মাহ্’র কাউন্সিল এর সদস্য নির্বাচিত করবে। এর অর্থ হল, উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল এর সদস্যগণ উম্মাহ্ কর্তৃক সরাসরি নির্বাচিত হবেন; আর, উম্মাহ্’র কাউন্সিল উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল এর দ্বারা নির্বাচিত হবে। অর্থাৎ, উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল এর শুরু ও শেষের মেয়াদকাল উম্মাহ্’র কাউন্সিল এর শুরু ও শেষের মেয়াদকাল একই হবে।
৫. উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল থেকে যিনি উম্মাহ্’র কাউন্সিল এর সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হবেন, তার শূণ্য আসনটি
উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল নির্বাচনে পরাজিত ব্যক্তিদের মধ্য হতে যিনি সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, তার দ্বারা পূরণ করা হবে। যদি এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যে দু’জন ব্যক্তি সমান ভোট পেয়েছিলেন, সেক্ষেত্রে লটারির মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পন্ন করা হবে।
৬. অমুসলিমগণ (আহলুল দিম্মা) উলাই’য়াহ্ কাউন্সিলে তাদের নিজস্ব প্রতিনিধি নির্বাচন করবে এবং তারাই আবার উম্মাহ্’র কাউন্সিলে তাদের নিজস্ব সদস্য নির্বাচন করবেন। এ সমস্ত কিছুই উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল নির্বাচন ও উম্মাহ্’র কাউন্সিল নির্বাচনের সময়ে সংঘটিত হবে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে, আমরা একটি আইন প্রস্তুত করেছি, যা উপরে বর্ণিত বিষয়সমূহকে বিবেচনা করবে এবং উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল ও উম্মাহ্’র কাউন্সিল নির্বাচন সংক্রান্ত প্রস্তুতি ও সাবধানতা সমূহকে বিশদ ভাবে ব্যাখ্যা করবে। এই আইনটি যথাসময়ে আলোচিত ও গৃহীত হবে, ইনশাআল্লাহ্ ।
উম্মাহ্ কাউন্সিলের সদস্যপদ
যে কোন ব্যক্তি, যে রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব বহন করে, যদি সে পরিণত ও সুস্থ মস্তিকের অধিকারী হয়, তবে তার উম্মাহ্’র কাউন্সিল এর সদস্য নির্বাচিত হবার এবং কাউন্সিল এর সদস্য নির্বাচন করার অধিকার রয়েছে; সে ব্যক্তি নারী বা পুরুষ যে’ই হোক না কেন। এর কারণ হল, উম্মাহ্’র কাউন্সিল এর শাসন করার কোন এখতিয়ার নেই। এজন্য এটি রাসূল (সা) এর সেই প্রসিদ্ধ হাদীস যা নারীদের শাসক পদে নিযুক্ত করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তা এক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। এটা বরং শূরা (পরামর্শ) ও জবাবদিহিতার সাথে সম্পর্কিত, যা কিনা নারী এবং পুরুষ উভয়েরই অধিকার। আল্লাহ্’র রাসূল (সা) এর নবুয়্যতের তেরতম বছরে, অর্থাৎ যে বছরে তিনি হিজরত করেছিলেন, সে বছর মদিনা থেকে ৭৫ জন মুসলিম মক্কায় আগমন করেছিলেন, যাদের মধ্যে দুই জন ছিলেন নারী; এবং তারা সকলেই তাঁকে বাই’আত দিয়েছিলেন, যা আক্বাবার দ্বিতীয় শপথ নামে পরিচিত। প্রকৃতপক্ষে এ বাই’আত ছিল যুদ্ধের বাই’আত, ছিল স্বশস্ত্র সংগ্রাম ও রাজনৈতিক বাই’আত। তারা সকলে বাই’আত দেবার পর রাসূল (সা) বললেন:
“তোমরা তোমাদের মধ্য হতে বারো জন নেতা (নাকীব) নির্বাচিত করো যারা তাদের লোকেদের উপর দায়িত্বশীল।”এটি কা’ব ইবন মালিকে সূত্রে আহমাদ বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীসের অংশ; এবং এটা তাঁর পক্ষ থেকে উপস্থিত সকলের মধ্য হতে বারোজন নির্বাচিত করার নির্দেশ।
এখানে তিনি (সা) পুরুষদের কথা বিশেষভাবে বলেননি, আবার নারীদেরকেও বাদ দেননি কিংবা, কাদের নির্বাচিত করা হবে বা কারা নির্বাচিত করবে, সে বিষয়েও কিছু বলেননি। সুতরাং, এক্ষেত্রে শারী’আহ্’র মুতলাক্ব (অনির্ধারিত) এর নিয়ম অনুসরণ করা হবে, যে পর্যন্ত এমন কোন দলিল পাওয়া যায় যা এ বিষয়ে কোন সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। এছাড়া, একইসাথে এক্ষেত্রে ’আম (সাধারণ) নির্দেশের আওতায় এ নির্দেশটিকে ধরা হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না কোন দলিলের মাধ্যমে এটি নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। উপরোক্ত হাদীসের ক্ষেত্রে রাসূল (সা) এর নির্দেশটি ছিল মুতলাক্ব (অনির্ধারিত) এবং আ’ম (সাধারণ) এবং এ ব্যাপারে এমন কোন দলিল নেই যা, নির্দিষ্টকরণ বা কোনপ্রকার সীমাবদ্ধতা আরোপ করাকে নির্দেশ করে। সুতরাং, এর মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এখানে উক্ত দু’জন নারীকেও তাদের নাকীব নির্বাচন করার এবং তাদের পক্ষ থেকে নাকীব হিসাবে নির্বাচিত হবার অধিকার প্রদান করেছেন।
একবার রাসূলুল্লাহ্ (সা) বাই’আত গ্রহণ করছিলেন, যখন তাঁর সাথে আবু বকর (রা) ও উমর (রা) ও ছিলেন। এসময় তিনি (সা) নারী-পুরুষ উভয়েরই বাই’আত গ্রহণ করেছিলেন। এই বাই’আত ইসলামের জন্য ছিল না, বরং শাসনের জন্য ছিল; আর ঐসব নারীগণ তখন মুসলিমই ছিল। হুদাইবিয়ার প্রান্তরে রিদওয়ানের বাই’আতের পর নারীগণও তাঁকে বাই’আত দিয়েছিল। আল্লাহ্ বলেন,
‘হে নবী, ঈমানদার নারীরা যখন আপনার কাছে এসে আনুগত্যের শপথ করে যে, তারা আল্লাহ্’র সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, তাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, জারজ সন্তানকে স্বামীর ঔরস থেকে আপন গর্ভজাত সন্তান বলে মিথ্যা দাবি করবে না এবং ভাল কাজে আপনার অবাধ্যতা করবে না, তখন তাদের আনুগত্য গ্রহণ করুন এবং তাদের জন্যে আল্লাহ্’র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ্ ক্ষমাশীল অত্যন্ত দয়ালু।’
[সূরা মুমতাহিনা: ১২]এই আয়াতে বর্ণিত বাই’আতও শাসনের বাই’আত। পবিত্র কুর’আনের বর্ণনা অনুযায়ী নারীরা এখানে ঈমানদার এবং তাদের প্রদত্ত বাই’আত এই বিষয়ে যে, তারা সৎ কাজে আল্লাহ্’র রাসূলকে অমান্য করবে না।
এছাড়া, নারীদের রয়েছে প্রতিনিধিত্ব করার ও মতামত উপস্থাপনের ক্ষেত্রে প্রতিনিধি হিসাবে নির্বাচিত হবার অধিকার। এর কারণ হল, তার নিজস্ব মত উপস্থাপন বা প্রকাশের অধিকার রয়েছে; সুতরাং, তার প্রতিনিধি নির্বাচন করার অধিকারও রয়েছে। উপরন্তু, যেহেতু এ ধরনের প্রতিনিধিত্বের জন্য পুরুষ হওয়া আবশ্যিক নয়, তাই যারা তাকে নির্বাচিত করবে তাদের প্রতিনিধিত্ব করার অধিকারও তার রয়েছে।
এছাড়া, এটাও প্রমাণিত যে, আমাদের নেতা উমর (রা) যখন কোন সমস্যায় পড়তেন – হোক সেটা হুকুম শারী’আহ্ সংক্রান্ত বা, শাসনকার্য সংক্রান্ত বা, রাষ্ট্রীয় কোন কাজ সংক্রান্ত, তখন তিনি এসব ব্যাপারে মতামতের জন্য মুসলিমদের দ্বারস্থ হতেন। কোন সমস্যার মুখোমুখি হলে তিনি সাধারণতঃ মদিনার মুসলিমদের মসজিদে সমবেত হতে বলতেন, এবং নারী ও পুরুষ সকলকেই তিনি আহ্বান করতেন এবং তাদের সকলেন কাছে মতামত চাইতেন। মোহরানার সীমাবদ্ধতা আরোপের ব্যাপারে যখন একজন নারী তার সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করেছিল, তখন উমর তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছিলেন।
অমুসলিমদেরও মুসলিমদের মত উম্মাহ্’র কাউন্সিলে প্রতিনিধিত্ব করার এবং তাদের নিজস্ব প্রতিনিধি নির্বাচন করার অধিকার রয়েছে; যেন তারা এর মাধ্যমে তাদের পক্ষ থেকে, তাদের উপর শারী’আহ্ আইনের অপপ্রয়োগ এবং তাদের উপর পতিত শাসকের জুলুম-নির্যাতন সংক্রান্ত বিষয়গুলো তুলে ধরতে পারে।
তবে, শারী’আহ্ আইনের সাথে সংশ্লিষ্ট কোন বিষয়ে অমুসলিমগণ তাদের মতামত উপস্থাপন করতে পারবে না, কেননা শারী’আহ্ আইন ইসলামী আক্বীদাহ্ থেকে উৎসারিত। বস্তুতঃ আহ্কাম শারী’আহ্ হচ্ছে বাস্তবে প্রয়োগের লক্ষ্যে বিশদ দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে গৃহীত একগুচ্ছ শারী’আহ্ আইনের সমষ্টি, যা মানুষের জীবনের সাথে জড়িত সকল সমস্যাকে ইসলামী আক্বীদাহ্ নির্দেশিত একটি বিশেষ দৃষ্টিকোন থেকে বিচার করে। আর, অমুসলিমরা জীবন সম্পর্কে এমন এক বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে যা সম্পূর্ণ ভাবে ইসলামী আক্বীদাহ্ বর্হিভূত ও এর সাথে সাংঘর্ষিক; সেইসাথে, জীবন সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গীও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সংঘর্ষপূর্ণ। তাই, শারী’আহ্ আইনসংক্রান্ত বিষয়ে তাদের মতামত বিবেচনা করা হয় না।
এছাড়া, অমুসলিমদের খলীফা নির্বাচন করারও কোন অধিকার নেই; না তাদের খলীফা নির্বাচিত হতে ইচ্ছুক প্রার্থীদের তালিকা সংক্ষেপণে অংশগ্রহণ করার অধিকার রয়েছে; কারণ, শাসনকার্য সম্পর্কিত কোন বিষয়ে তাদের অধিকার নেই। এছাড়া অন্যান্য বিষয়ে, যা উম্মাহ্’র কাউন্সিল এর আবশ্যিক ক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত, এ সকল বিষয়ে মুসলিমদের মতোই তার মতামত জোরালোভাবে উপস্থাপনের অধিকার রয়েছে।
উম্মাহ্’র কাউন্সিলের সদস্যপদের মেয়াদকাল
উম্মাহ্’র কাউন্সিলের সদস্যপদের মেয়াদকাল সীমাবদ্ধ। কারণ, আবু বকরের (রা) তাদের সাথে পরামর্শ করার ব্যাপারে কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না যাদের সাথে রাসূলুল্লাহ্ (সা) পরামর্শ করতেন। আবার, উমর ইবনুল খাত্তাবের (রা) উপরও আবু বকর (রা) তাঁর শাসনামলের শেষদিকে যাদের সাথে পরামর্শ করতেন, তাদের সাথে পরামর্শ করার ব্যাপারে কোনপ্রকার বাধ্যবাধকতা ছিল না। উমর (রা) তাঁর শাসনামলের প্রথম বছরগুলোতে যাদের সাথে পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন, পরের বছরগুলোতে তিনি পরামর্শের জন্য অন্যান্যদের পছন্দ করেছেন। এ ঘটনাসমূহ থেকে বোঝা যায় যে, উম্মাহ্’র কাউন্সিল এর সদস্যপদ একটি নির্দিষ্ট মেয়াদকালের জন্য। আমরা এই মেয়াদকাল পাঁচ বছর করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি।
উম্মাহ্’র কাউন্সিলের আবশ্যিক ক্ষমতাসমূহ
উম্মাহ্’র কাউন্সিলের আবশ্যিক ক্ষমতাসমূহ নিম্নরূপ এবং এগুলো হল:
১. ক) খলীফাকে অবশ্যই কাউন্সিলের সাথে পরামর্শ করতে হবে এবং কাউন্সিলের অধিকার রয়েছে খলীফাকে এমন সব বাস্তব বিষয় ও কর্মকান্ডের ব্যাপারে পরামর্শ দেয়ার, যেগুলো আভ্যন্তরীণ নীতি বাস্তবায়নের সাথে জড়িত এবং যে সমস্ত বিষয়ে গভীর চিন্তাভাবনা ও পর্যালোচনার কোন প্রয়োজন হয় না। যেমন: শাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, বাণিজ্য, শিল্প, কৃষি ইত্যাদি। বস্তুতঃ এ সমস্ত ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা জনগণের জীবনকে করে আনন্দময় ও প্রশান্তিমন্ডিত। এ বিষয়গুলো ছাড়াও রয়েছে নগরসমূহের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা, জনগণের জীবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শত্রু হুমকী বিদূরিত করা ইত্যাদি। এ সমস্ত বিষয়ে কাউন্সিলের মতামত গ্রহণ করা খলীফার জন্য বাধ্যতামূলক; অর্থাৎ, এক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত কার্যকরী করা হবে।
খ) এছাড়া, বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয় যেগুলোতে গভীর চিন্তা ও বিশ্লেষণের অবকাশ রয়েছে, যেমন: তথ্য প্রকাশ, যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া, কিংবা, যে সমস্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান ও প্রয়োজনীয় তথ্যের দরকার হয়, যেমন: সামরিক পরিকল্পনা এবং সকল ধরনের প্রযুক্তি বা শিল্পসংক্রান্ত বিষয় – এ সকল ক্ষেত্রে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করা হবে, সংখ্যাগরিষ্ঠের নয়। একই কথা প্রযোজ্য হবে, অর্থনীতি, সেনাবাহিনী ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে। এ সমস্ত বিষয়ে শারী’আহ্ আইনের আলোকে খলীফার নিজস্ব মত ও ইজতিহাদ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার আছে, এ সমস্ত বিষয় উম্মাহ্’র কাউন্সিলের আবশ্যিক ক্ষমতার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হবে না। তবে, খলীফার অধিকার রয়েছে এ বিষয়সমূহ কাউন্সিলের মাধ্যমে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা এবং তাদের মতামত সম্পর্কে অবহিত হওয়া। কিন্তু, এ সকল বিষয়ে তাদের মতামত গ্রহণ করতে খলীফা বাধ্য নন।
২. আইন গ্রহণ সংক্রান্ত বিষয়ে কাউন্সিলের পরামর্শ বা মতামত জানতে চাওয়া হবে না। বরং, আইন প্রণয়ণ করা হবে শুধুমাত্র আল্লাহ্’র কিতাব, রাসূলের সুন্নাহ্, সাহাবীদের ইজমা’ এবং সঠিক ইজতিহাদের মাধ্যমে কৃত ক্বিয়াসের ভিত্তিতে। এভাবেই বিভিন্ন বিষয়ে শারী’আহ্ আইন গ্রহণ ও কার্যকর করা হবে। তবে, খলীফা চাইলে তিনি যে আইন ও বিধিবিধান গ্রহণ করতে চান তা কাউন্সিলের সামনে উপস্থাপন করতে পারেন। কাউন্সিলের মুসলিম সদস্যগণ এ বিষয়ে তাদের মতামত প্রদান ও বিতর্ক করতে পারেন। তবে, রাষ্ট্র কর্তৃক শারী’আহ্ আইন গ্রহণ করার যে শারী’আহ্ মূলনীতি (উসুল) গৃহীত হয়েছে, কোন বিষয়ে খলীফার উপস্থাপিত দলিল-প্রমাণ যদি এ মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক বা মূলনীতি বহির্ভূত হয়, তবে কাউন্সিলের (মুসলিম) সদস্যরা এ আইনের বিরোধীতা করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে, এ বিষয়টি মাহকামাতুল মাযালিম এর কাছে ন্যস্ত করা হবে এবং এ বিষয়ে তার প্রদত্ত সিদ্ধান্তকেই বাস্তবায়ন করা হবে।
৩. উম্মাহ্’র কাউন্সিল রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কার্যকরীভাবে সংঘটিত যে কোন বিষয়ের ব্যাপারে খলীফাকে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করার অধিকার সংরক্ষণ করে; তা আভ্যন্তরীণ বিষয়, বৈদেশিক বিষয়, অর্থনৈতিক বিষয় বা সামরিক বিষয় যে কোন ধরনের বিষয় সম্পর্কেই হোক। যে সকল ক্ষেত্রে কাউন্সিলের অধিকাংশ সদস্যদের মতামত গ্রহণ করা খলীফার জন্য বাধ্যতামূলক, সে সকল ক্ষেত্রে তাকে তাদের মতামত গ্রহণ করতে হবে। আর, যে সকল বিষয়ে অধিকাংশের মতামত গ্রহণ করার উপর কোন বাধ্যবাধকতা নেই, সেক্ষেত্রে তাদের রায় মেনে নেয়া আবশ্যিক হবে না।
যদি উম্মাহ্’র কাউন্সিল ও খলীফার সাথে এমন কোন বিষয়ে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়, যা ইতোমধ্যে কার্যকরী হয়ে গেছে, তবে সেক্ষেত্রে এ বিষয়টি সমাধানের জন্য মাযালিম আদালতে উপস্থাপন করতে হবে এবং এ আদালতে প্রদত্ত রায়ই বাস্তবায়ন করতে হবে।
৪. উম্মাহ্’র কাউন্সিল খলীফার সহকারী, ওয়ালী ও আমীলদের ব্যাপারে অসন্তুষ্টি প্রকাশের অধিকার সংরক্ষণ করে। এসব ক্ষেত্রে তাদের মতামত গ্রহণ করা খলীফার জন্য বাধ্যতামূলক এবং কাউন্সিলের মতামতের ভিত্তিতে
খলীফাকে তাদের তৎক্ষণাৎ পদচ্যূত করতে হবে। যদি ওয়ালী বা আমীলদের উপর সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টি বিষয়ে
উম্মাহ্’র কাউন্সিলের সাথে সংশ্লিষ্ট উলাই’য়াহ্ কাউন্সিলের মতপার্থক্য দেখা দেয়, তবে এক্ষেত্রে উলাই’য়াহ্ কাউন্সিলের মতামতকে প্রাধান্য দেয়া হবে।
৫. খলীফা হিসাবে নিযুক্ত হবার সকল শর্তপূরণের মাধ্যমে যারা এ পদে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করার জন্য মাহকামাতুল মাযালিম কর্তৃক ছাড়পত্র পেয়েছেন, উম্মাহ্’র কাউন্সিলের মুসলিম সদস্যগণ তাদের তালিকা সংক্ষিপ্ত করতে পারেন; হতে পারে এই সংখ্যা দুই বা ছয়, যা কিনা ইতোমধ্যে খলীফা নির্বাচন অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের মতামত গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক এবং তাদের সংক্ষিপ্তকৃত তালিকার বাইরে কোন প্রার্থীকে বিবেচনা করা হবে না।
বস্তুতঃ এগুলোই হল উম্মাহ্’র কাউন্সিলের আবশ্যিক ক্ষমতাসমূহ। এগুলোর দলিল-প্রমাণ সম্পর্কিত আলোচনা নিম্নরূপ:
প্রথম অনুচ্ছেদ, ক. বাস্তবতা ভিত্তিক বিষয় ও কর্মকান্ডসমূহে, যেগুলোর ব্যাপারে কোন গভীর চিন্তাভাবনা বা পর্যালোচনার প্রয়োজন নেই, এ সকল ক্ষেত্রে উম্মাহ্’র কাউন্সিলের মতামত গ্রহণ করা যে খলীফার জন্য বাধ্যতামূলক তার দলিল হিসাবে বলা যায় যে, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) ওহুদের যুদ্ধের সময় মদিনার বাইরে মুশরিক শত্রুপক্ষের মুকাবিলার ব্যাপারে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত গ্রহণ করেছিলেন, যদিও এ বিষয়ে তাঁর ও তাঁর সাহাবীদের মতামত ছিল মদিনার বাইরে না গিয়ে ভেতরে থেকেই যুদ্ধ পরিচালনা করা।
এ নীতিটি আরও গ্রহণযোগ্য হয়েছে আবু বকর (রা) ও উমর (রা) এর প্রতি রাসূল (সা) এর উক্তি থেকে: “যদি তোমরা দু’জনে কোন বিষয়ে পরামর্শের মাধ্যমে একমত হও তবে আমি তোমাদের সাথে দ্বিমত পোষণ করবো না।”
সুতরাং, মতামতের সাথে জড়িত বাস্তবভিত্তিক যে সমস্ত বিষয়, যেমন: নাগরিকের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সেবাপ্রদান করা, তাদের নিরাপত্তা বিধান করা, নগরের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা, জনগণের জন্য হুমকীস্বরূপ বিষয়গুলোকে দূরীভূত করা ইত্যাদি বিষয়ে খলীফাকে বাধ্যতামূলক ভাবে উম্মাহ্ কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত গ্রহণ করতে হবে, যদিও এ ব্যাপারে খলীফার মতামত ভিন্ন হয়ে থাকে। এর কারণ, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) ওহুদের যুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতকে মেনে নিয়েই মদিনার বাইরে শত্রুপক্ষের মুকাবিলা করেছিলেন।
প্রথম অনুচ্ছেদ, খ. নীতিগতভাবে, খলীফা এ অনুচ্ছেদে আলোচিত বিষয়সমূহের ব্যাপারে বিজ্ঞ পন্ডিত ব্যক্তিবর্গ, বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ ব্যক্তিদের পরামর্শ গ্রহণ করবেন। এ বিষয়ের দলিল হল, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) বদরের যুদ্ধের স্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে আল-হাবাব বিন আল-মুনদির (রা) এর পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন। সীরাত ইবন হিশামে বর্ণিত আছে যে,
“যখন আল্লাহ্’র রাসূল (সা) বদরের কুপের কাছাকাছি তাঁবু স্থাপন করলেন, তখন তাঁর স্থান নির্বাচনের বিষয়ে আল-হাবাব বিন আল-মুনদির সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। তিনি রাসূল (সা) কে জিজ্ঞেস করলেন: ‘হে আল্লাহ্’র রাসূল! আল্লাহ্ কি আপনাকে এ স্থানে তাঁবু স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন যে আমরা এ স্থান ত্যাগ করতে পারবো না? নাকি, এটা যুদ্ধ ও কৌশলের ব্যাপারে আপনার নিজস্ব মতামত? তিনি (সা) বললেন: ‘এটা যুদ্ধ ও কৌশলের ব্যাপারে শুধুই একটা মতামত।’ তখন আল-হাবাব বিন আল-মুনদির বললেন: ‘হে আল্লাহ্’র রাসূল! যুদ্ধ করার জন্য এটা সঠিক স্থান নয়। এখান থেকে লোকদের সরিয়ে নিন যে পর্যন্ত না আমরা শত্রুপক্ষের কাছাকাছি অবস্থিত কুপের নিকট পৌঁছাই এবং আমরা সেখানে অবস্থান গ্রহণ করবো; তারপর আমরা কুপের পানি অন্যত্র সরিয়ে নেব, তার উপর আমরা একটি বেসিন (পাত্র সদৃশ) তৈরী করবো; তারপর উক্ত বেসিনটি পানি দিয়ে পূর্ণ করবো। তারপর, আমরা আমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো, যাতে আমরা পানি পান করি, কিন্তু, পান করার জন্য তারা কোন পানি না পায়।’ আল্লাহ্’র রাসূল (সা) বললেন: ‘তুমি ঠিক কথাই বলেছো।’ সুতরাং, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) এবং মুসলিমরা উঠে দাঁড়ালেন এবং হাঁটতে শুরু করলেন যে পর্যন্ত না শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী কুপের কাছে পৌঁছালেন এবং সেখানেই তাঁবু স্থাপন করলেন। তারপর, তিনি (সা) উক্ত কুপের পানি সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিলেন এবং তাই করা হল। এরপর, একটি বেসিন তৈরী করে তা পানি দিয়ে পূর্ণ করা হল এবং বাকী কুপগুলো বন্ধ করে দেয়া হল এবং তারা তাদের পানির পাত্রগুলো উক্ত বেসিনে নিক্ষেপ করলেন।”
সুতরাং,
এক্ষেত্রে আল্লাহ্’র রাসূল (সা) আল-হাবাবের মতামতের সাথে একমত পোষণ করেছিলেন।
এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে যুদ্ধ ও কৌশলই মুখ্য, এখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতের কোন মূল্য নেই। বরং, একজন বিশেষজ্ঞের মতামতই এক্ষেত্রে বিবেচনা করা হবে। এছাড়া, প্রযুক্তি সংক্রান্ত ও গভীর চিন্তাভাবনার সাথে জড়িত বিষয়গুলো যেখানে পর্যাপ্ত গবেষণা ও পর্যালোচনার প্রয়োজন সে সকল ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য হবে। এই সমস্ত ক্ষেত্রে, সাধারণ মানুষের মতামতের চাইতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতামতকে অধিক গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হবে। বস্তুতঃ এ সকল বিষয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতের কোন মূল্যই নেই। বরং, মূল্য আছে অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও পান্ডিত্যের।
অর্থনৈতিক বিষয়ের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কারণ, হুকুম শারী’আহ্ অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্র, যা অবশ্যই সংগ্রহ করতে হবে এবং এ প্রাপ্ত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রগুলোও সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। এছাড়া, কখন ও কোন অবস্থায় জনগণের উপর কর ধার্য করা যাবে সেটাও নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। সুতরাং, অর্থ সংগ্রহ বা বরাদ্দের ব্যাপারে জনগণের মতামত জানতে চাওয়ার কোন প্রয়োজন এখানে নেই। একই কথা সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ, হুকুম শারী’আহ্ খলীফাকে সেনাবাহিনীর বিষয়সমূহ পরিচালনা করার অধিকার দিয়েছে এবং জিহাদের সম্পর্কিত আইনকানুনও শারী’আহ্ কর্তৃক নির্ধারণ করে দিয়েছে। সুতরাং, শারী’আহ্ নির্ধারিত বিষয়সমূহে জনগণের মতামতের কোন মূল্য নেই। একই কথা খিলাফত রাষ্ট্রের সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রের সম্পর্ক বিষয়েও প্রযোজ্য। কারণ, এ বিষয়ে মতামত প্রদান করতে হলে পর্যাপ্ত চিন্তাভাবনা, গবেষণা, পর্যালোচনা ও গভীর অর্ন্তদৃষ্টি প্রয়োজন এবং এ বিষয়টি জিহাদের সাথেও সম্পর্কিত। উপরন্তু, এ বিষয়টি যুদ্ধ ও এর কৌশলের সাথে জড়িত। সুতরাং, এ বিষয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা লঘিষ্ঠ কারো মতামতেরই কোন মূল্য নেই। তবে, এ বিষয়ে জনগণের সাথে পরামর্শ বা তাদের মতামত জানার জন্য খলীফার এ বিষয়সমূহকে কাউন্সিলের সামনে উপস্থাপন করার অধিকার রয়েছে। কারণ, এ বিষয়টি মুবাহ্ (অনুমোদিত) বিষয়ের অন্তর্ভূক্ত। তবে, বদরের প্রান্তরের মতো এক্ষেত্রে কাউন্সিলের মতামত গ্রহণ করা খলীফার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। বরং, এ সিদ্ধান্তগুলো যোগ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে সম্পর্কিত।
‘ক’ ও ‘খ’ অনুচ্ছেদের মধ্যে পার্থক্যের নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি যে,
প্রায় সম্পূর্ণভাবে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন একটি গ্রামে বসবাসরত মানুষের স্বার্থরক্ষার্থে অর্থাৎ, উক্ত গ্রামের বাসিন্দাদের যাতায়াতের সুবিধার্থে কোন নদীর উপর যদি একটি সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তবে এক্ষেত্রে জনসাধারণের যাতায়াত সমস্যা সমাধান করার লক্ষ্যে উম্মাহ্’র কাউন্সিলের অধিকাংশের মতামত গ্রহণ করা খলীফার জন্য বাধ্যতামূলক। তবে, প্রযুক্তিগত দিক থেকে সেতু নির্মাণের উপযুক্ত স্থান এবং সর্বোত্তম প্রকৌশল ও স্থাপত্য নকশা নির্ধারণের ক্ষেত্রে, যেমন: সেতুটি কি ঝুলন্ত হবে না বা ভিত্তির উপর নির্মাণ করা হবে, ইত্যাদি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের সাথেই পরামর্শ করা উচিত। এক্ষেত্রে, কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত গ্রহণ করা অবান্তর।
একইভাবে, কোন এক গ্রামে শিশুদের জন্য একটি বিদ্যালয় নির্মাণের ক্ষেত্রে, যেখানে এসব শিশুদের জন্য দূরবর্তী শহরে গিয়ে পড়াশোনা করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য বিষয়, এক্ষেত্রে কাউন্সিলের অধিকাংশের মতামত গ্রহণ করা খলীফার জন্য বাধ্যতামূলক। কিন্তু, মাটির ধারণ ক্ষমতার উপর নির্ভর করে প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী বিদ্যালয়টি গ্রামের কোন এলাকায় হলে ভাল হয়, কিংবা, ভবনের নকশাটি কেমন হওয়া উচিত, কিংবা, বিদ্যালয়টি রাষ্ট্রের অধীনে থাকবে কিনা, বা, এর জন্য বরাদ্দকৃত জমি কি লিজ নেয়া হবে নাকি ক্রয় করা হবে, এ সমস্ত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের পরামর্শই গ্রহণ করতে হবে। যদিও খলীফা চাইলে এ বিষয়সমূহের ব্যাপারে কাউন্সিলের সাথে পরামর্শ করতে পারেন, কিন্তু, এক্ষেত্রে তাদের মতামত গ্রহণ করা তার জন্য বাধ্যতামূলক হবে না।
একইভাবে, রাষ্ট্রের কোন অঞ্চল যদি একেবারে সীমান্তবর্তী এলাকায় হয় এবং শত্রুর আক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে থাকে, এক্ষেত্রে অঞ্চলটিকে সুরক্ষিত করা, শত্রুপক্ষের আক্রমণ থেকে নিরাপদ করা, এ অঞ্চলে বসবাসরত জনগণকে শত্রুর হাতে হত্যা ও নিজভূমি হতে বিতাড়ন বা যে কোন ধরনের সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে রক্ষার খাতিরে কাউন্সিলের অধিকাংশ সদস্যের মতামত গ্রহণ করা খলীফার জন্য বাধ্যতামূলক। তবে, উক্ত অঞ্চলকে সুরক্ষিত করার পদ্ধতি এবং শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার বা তাদের সাথে যুদ্ধ করার পদ্ধতি সম্পর্কে কাউন্সিলের অধিকাংশ সদস্যদের মতামতের পরিবর্তে অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করতে হবে।
দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ: আইন প্রণয়নের একমাত্র অধিপতি হচ্ছেন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘আল্লাহ্ ছাড়া কারও বিধান দেবার ক্ষমতা নেই।’
[সূরা ইউসুফ: ৪০]‘কিন্তু না, তোমার রবের কসম! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা তাদের বিবাদবিসম্বাদের ভার তোমার উপর ন্যস্ত করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজেদের মনে কোন রকম সংকীর্ণতা পায় না এবং তা হƒষ্টচিত্তে কবুল করে নেয়।’
[সূরা নিসা: ৬৫]‘তারা আল্লাহ্’র পরিবর্তে তাদের ধর্মযাজক ও সাধুদের নিজেদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছে।’
[সূরা তওবাহ: ৩১]এ আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন, হাদীসটি আদি ইবনে হাতীমের মাধ্যমে তিরমিযী বর্ণনা করেছেন:
‘আমি একদিন একটি স্বর্ণের ক্রস পরিহিত অবস্থায় নবী (সা) এর সামনে উপস্থিত হলাম। তিনি বললেন, হে আদি! এই মূর্তি ছুড়ে ফেল। তারপর, আমি তাঁকে সূরা আল-বারা’আহ্ তেলাওয়াত করতে শুনলাম, ‘তারা আল্লাহ্’র পরিবর্তে তাদের ধর্মযাজক ও সাধুদের নিজেদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছে।’ তিনি বললেন, ‘তারা তাদের উপাসনা করত না, কিন্তু, তারা যে ব্যাপারে অনুমোদন দিত তাকে তারা হালাল মনে করত এবং যেটা নিষেধ করত সেটাকে হারাম মনে করত।’
(সূনানে তিরমিযী, হাদীস নং-৩০৯৫)সুতরাং, কাউন্সিলের অধিকাংশের মতামত, এমনকি সর্বসম্মতিক্রমেও আইনগ্রহণ করা যাবে না। বরং, এটা গ্রহণ করতে হবে আল্লাহ্’র কিতাব, রাসূলের সনন্নাহ ও এগুলোর ভিত্তিতে কৃত সঠিক ইজতিহাদের মাধ্যমে। সেকারণে রাসূলুল্লাহ্ (সা) হুদাইবিয়ার সন্ধিতে অধিকাংশের মতামতকে অগ্রাহ্য করেছেন এবং বলেছেন,
‘আমি হচ্ছি আল্লাহ্’র বান্দা ও তাঁর প্রেরিত রাসূল এবং কখনোই তার আদেশ অমান্য করব না।’
এর কারণ হল, এই শান্তিচুক্তি ছিল আল্লাহ্’র দেয়া একটি বিধান। এজন্য এক্ষেত্রে জনগণের মতামত গ্রহণ করা হয়নি। এর উপর ভিত্তি করে বলা যায় যে, আহ্কাম শারী’আহ্ গ্রহণ করা, কোন শারী’আহ্ বিধানকে কার্যকর করা এবং শারী’আহ্ বিধিবিধান ও আইনকানুন জারি করা একমাত্র খলীফার আবশ্যিক ক্ষমতার অন্তর্ভূক্ত, যে বিষয়ে পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে। তবে, হুকুম শারী’আহ্ গ্রহণ বা কোন আইনকানুন জারি করার পূর্বে উম্মাহ্’র মতামত সম্পর্কে অবহিত হওয়ার জন্য খলীফা চাইলে এ বিষয়সমূহকে উম্মাহ্’র কাউন্সিলে উপস্থাপন করতে পারেন। যেমনটি হয়েছিল, ইরাকের যুদ্ধলব্ধ ভূমিসমূহ বন্টনের বিষয়ে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে উমর (রা) মুসলিমদের মতামত জানার জন্য তাদের কাছে এ বিষয়টি উপস্থাপন করেছিলেন এবং এ ব্যাপারে সাহাবীরা (রা) তাঁকে বাঁধা দেননি। মুসলিমরা তাঁকে এ ভূমি মুজাহিদদের (যারা এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে) মধ্যে বন্টন করে দিতে বলেছিলেন। কিন্তু, উমর তাঁর নিজস্ব ইজতিহাদ অনুযায়ী এ ভূমি মুসলিমদের মধ্যে বন্টন না করে উক্ত জনপদের বাসিন্দাদের হাতেই ছেড়ে দিয়েছিলেন, বিনিময়ে তাদেরকে মাথাপিছু জিযিয়া প্রদানের পাশাপাশি উক্ত জমির উপর খারাজ দেবার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সাহাবীদের উপস্থিতিতে উমরের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যেখানে তাঁরা কেউ তাঁকে এ ব্যাপারে বাঁধা দেননি, প্রমাণ করে যে এ ব্যাপারে সাহাবীদের ইজমা ছিল। এটাই প্রমাণ করে যে, খলীফার এ সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার আছে।
এছাড়া, কোন বিষয়ে শারী’আহ্ আইন গ্রহণ সম্পর্কে, কিংবা, রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত উসুলের সাথে সংঘর্ষপূর্ণ দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে আইন গ্রহণ, ইত্যাদি বিষয়ে খলীফার সাথে উম্মাহ’র কাউন্সিলের কোনপ্রকার মতবিরোধের সৃষ্টি হলে তা মাহকামাতুল মাযালিম এর নিকট পেশ করতে হবে। এ সকল ক্ষেত্রে, মাহকামাতুল মাযালিম এর বিচারক খলীফা কর্তৃক গৃহীত আইনটি শারী’আহ্ দলিলের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করবেন; অর্থাৎ, এর কি শারী’আহ্ দলিল-প্রমাণ আছে কিনা, কিংবা, যে দলিল তিনি উপস্থাপন করেছেন তা ঐ বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা যাচাই-বাছাই করবেন। সুতরাং, খলীফা গৃহীত কোন হুকুমের বৈধতার ব্যাপারে যদি তার সাথে উম্মাহ্ কাউন্সিলের বেশীর ভাগ সদস্যের মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়, তবে এ বিবাদ নিরসনের দায়িত্ব অবশ্যই মাহকামাতুল মাযালিম এর হাতে ন্যস্ত করতে হবে। কারণ, এটা তার বিশেষত্ব বা এ সমস্যা সমাধানে তিনিই একমাত্র যোগ্যব্যক্তি এবং এ ব্যাপারে মাযালিম এর বিচারকের রায় গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক হবে।
কাউন্সিলের অমুসলিম সদস্যদের খলীফা যে সমস্ত শারী’আহ্ আইনকানুন গ্রহণ করতে চান, সে ব্যাপারে পর্যালোচনা করা বা মতামত দেয়ার কোন অধিকার নেই। কারণ, তারা ইসলামী মতাদর্শে বিশ্বাস করে না। তাদের অধিকার শুধুমাত্র শাসকের মাধ্যমে তাদের উপর আপতিত জুলুম-নির্যাতন বা তাদের উপর শারী’আহ্ আইন অপপ্রয়োগের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
তৃতীয় অনুচ্ছেদ: এটি শাসককে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করার সাথে সম্পৃক্ত সার্বজনীন শারী’আহ্ দলিল থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। ইবনে উমর (রা) থেকে আহমদ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,
‘তোমাদের উপর এমন আমীর আসবেন তারা তোমাদের যা করতে বলবেন তা নিজেরা করবেন না। যে তাদের মিথ্যাকে বিশ্বাস করবে এবং তাদের জুলুমে সহায়তা করবে তারা আমার দলভুক্ত নয় এবং আমিও তাদের দলভুক্ত নই এবং সে ব্যক্তি আমার সাথে হাউজে কাউসারে অংশ নেবে না।’
(আল মুনদিরী, আল তারগীব ওয়াল তারহীব, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২২০৩)আবু সা’ঈদ আল খুদরী (রা) থেকে আহমাদ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,
‘অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে হক্ব কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ।’
(সূনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৪৩৪৪)আল হাকীম, আল জাবের থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সা) বলেছেন,
‘শহীদদের সর্দার হল হামযাহ্ বিন আবদুল মুত্তালিব এবং সেই ব্যক্তি যে অত্যাচারী শাসকের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে (হক্ব কাজের) আদেশ করলো এবং (মন্দ কাজ থেকে) নিষেধ করলো এবং ঐ শাসক তাকে হত্যা করল।
(আল মুনদিরী, আল তারগীব ওয়াল তারহীব, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২২৯)উম্মে সালামাহ্ (রা) হতে মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে,
“এমন কিছু আমীর আসবে যাদের কিছু কাজের ব্যাপারে তোমরা একমত পোষণ করবে এবং কিছু কাজ প্রত্যাখান করবে। সুতরাং, তাদের ভাল কাজের ব্যাপারে যারা ঐক্যমত পোষণ করবে তারা গুনাহ থেকে মুক্তি পেল; যে মন্দ কাজকে প্রত্যাখান করল সেও নিরাপদ হয়ে গেল। কিন্তু, তার কী হল যে (মন্দ কাজকে) গ্রহণ করল, আর তা প্রত্যাখান করল না? (অর্থাৎ, সে নিরাপদ নয়)।”
এ দলিলগুলো সার্বজনীন এবং এখানে, শারী’আহ্ আইন অনুযায়ী শাসকদের জবাবদিহি করার কথা বলা হয়েছে। এই জবাবদিহিতা শাসকদের যে কোন কাজের ব্যাপারেই হতে পারে। উম্মাহ্’র কাউন্সিল কর্তৃক এই জবাবদিহিতা খলীফা, তার সহকারীবৃন্দ, গভর্ণর বা আমীলের যে কোন কাজ, যা কিনা শারী’আহ্ আইনের সাথে সাংঘর্ষিক, কিংবা, মুসলিমদের জন্য ক্ষতিকারক, কিংবা, তাদের ভুল সিদ্ধান্ত অথবা, জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণের দিক থেকে তাদের প্রতি অবিচারসুলভ, ইত্যাদি। এ জবাবদিহিতার ব্যাপারে খলীফাকে অবশ্যই ইতিবাচক সাড়া দিতে হবে এবং তার বক্তব্য ও কাজের স্বপক্ষে উপযুক্ত দলিল-প্রমাণ হাজির করতে হবে, যেন কাউন্সিল তার সততা, যোগ্যতা ও আন্তরিকতার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারে। আর, যদি কাউন্সিলের কাছে তার বক্তব্য, দৃষ্টিভঙ্গি ও উপস্থাপিত দলিল-প্রমাণ গৃহীত না হয়, তবে বিষয়টি ভালভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। যদি বিষয়টি এমন হয়, যে ব্যাপারে কাউন্সিলের অধিকাংশের মতামত গ্রহণ করা খলীফার জন্য বাধ্যতামূলক যেমনটি বলা হয়েছে ১(ক) অনুচ্ছেদে তবে, খলীফাকে কাউন্সিলের মতামত গ্রহণ করতে হবে। যেমন: পূর্বে বর্ণিত বিদ্যালয়ের উদাহরণ থেকে বলা যায় যে, যদি খলীফাকে উক্ত গ্রামে বিদ্যালয় স্থাপনের ব্যাপারে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করা হয়, তবে তার জন্য এ জবাবদিহিতা বাধ্যতামূলক। আর, যদি জবাবদিহিতা হয় বিদ্যালয়ের জন্য তার বাছাইকৃত নকশা বিষয়ক, তবে এক্ষেত্রে এ জবাবদিহিতা তার জন্য বাধ্যতামূলক হবে না।
আর, যারা তাকে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করবেন তারা যদি কোন শারী’আহ্ আইনের ব্যাপারে আইনী দৃষ্টিকোন থেকে তার বিরোধিতা করে, তবে কাউন্সিলকে অবশ্যই অন্যায় আচরণ সংক্রান্ত আদালত বা মাহকামাতুল মাযালিম এর কাছে বিষয়টি ন্যস্ত করতে হবে। কারণ, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুর’আনে বলেন:
‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ্’র নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে উপর যারা কর্তৃত্বশীল তাদের। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও।’
[সূরা নিসা : ৫৯]অর্থাৎ, মুসলিমরা যদি কোন বিষয়ে কর্তৃত্বশীল কারও সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়, তাহলে তা অবশ্যই আল্লাহ্ ও রাসূলের কাছে সমর্পণ করতে হবে এবং এটাই শারী’আহ্’র নির্দেশ। আল্লাহ্ ও রাসূলের কাছে সমর্পণ করার অর্থ হল বিচারব্যবস্থার কাছে সমর্পণ করা, অর্থাৎ, মাহকামাতুল মাযালিম এর কাছে বিষয়টি ন্যস্ত করা। কারণ, এই সমস্ত ক্ষেত্রে একমাত্র আদালতেরই আবশ্যিক ক্ষমতা আছে।
চতুর্থ অনুচ্ছেদ: এ অনুচ্ছেদের দলিল হিসাবে বলা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর বাহরাইনে নিযুক্ত আমীল, আল ’আলা ইবনে আল-হাদরামীকে অপসারণ করেছিলেন। কারণ, আবদ ক্বায়েস এর প্রতিনিধিগণ তার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর কাছে অভিযোগ করেছিলেন। মুহম্মদ বিন উমরের বরাত দিয়ে ইবনে সা’দ বর্ণনা করেছেন যে,
“আল্লাহ্’র রাসূল (সা) পত্র মারফত আল ’আলা ইবন আল-হাদরামীকে ’আবদ ক্বায়েসের বিশজন প্রতিনিধিসহ তাঁর নিকট উপস্থিত হবার নির্দেশ দিলেন। তিনি বিশজন লোকসহ তাঁর কাছে হাজির হলেন, যাদের নেতৃত্বে ছিলেন আবদুল্লাহ্ বিন আউফ আল-আসহাজ্জ্ব; এবং তারপরে, এ দলের দায়িত্বে ছিল আল-মুনদির বিন সাওয়া। প্রতিনিধিবৃন্দ রাসূল (সা)এর কাছে আল ’আলা হাদরামীর ব্যাপারে অভিযোগ করলে তিনি (সা) তাকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করেন এবং তার স্থলে ইবান বিন সাইদ বিন আল-আস’কে নিযুক্ত করেন এবং তাকে বলেন: “আবদ ক্বায়েসের দেখাশোনা করবে এবং তাদের নেতৃস্থানীয়দের সম্মান করবে।”
এছাড়া, উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) শুধুমাত্র জনগণের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একটি উলাই’য়াহ্ থেকে সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাসকে অপসারণ করেছিলেন এবং বলেছিলেন: “আমি তাকে তার অযোগ্যতা বা বিশ্বাসঘাতকতার জন্য অপসারণ করিনি।” এ সমস্ত উদাহরণ থেকে বোঝা যায় যে, ওয়ালী বা আমীলদের বিরুদ্ধে অসন্তুষ্টি বা উষ্মা প্রকাশের অধিকার উলাই’য়াহ্’র জনগণের রয়েছে এবং এক্ষেত্রে, খলীফাকে অবশ্যই তাদের অপসারণ করতে হবে। একইভাবে, বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসাবে উম্মাহ্’র কাউন্সিলেরও ওয়ালী ও আমীলের ব্যাপারে তাদের অসন্তুষ্টি বা উষ্মা প্রকাশের অধিকার রয়েছে; এবং এ অভিযোগ যদি উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল বা উম্মাহ্’র কাউন্সিলের অধিকাংশ সদস্যদের পক্ষ থেকে আসে তাহলে খলীফাকে তৎক্ষণাৎ তাদের অপসারণ করতে হবে। আর, যদি এমন হয় যে, দুটি কাউন্সিলের মধ্যে এ বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে, তবে খলীফা উলাই’য়াহ্ কাউন্সিলের মতামতকে প্রাধান্য দেবেন। কারণ, ওয়ালী ও আমীলদের কার্য সম্পর্কে এ কাউন্সিল উম্মাহ্’র কাউন্সিলের চাইতে অনেক বেশী সচেতন ও অবগত।
পঞ্চম অনুচ্ছেদ: এখানে দু’টি ইস্যু রয়েছে: প্রথমটি হল মনোনীতদের তালিকা সংক্ষেপন এবং দ্বিতীয়ত, এই তালিকা সংক্ষিপ্ত করে প্রথমে ছয় এবং পরে দুইজনে নামিয়ে আনা।
প্রথম ইস্যুর ক্ষেত্রে, খোলাফায়ে রাশেদীনদের (রা) ধারা অনুসরণ করলে আমরা দেখতে পাই তালিকা সংক্ষেপনের দায়িত্ব সরাসরি মুসলিমদের প্রতিনিধিরা পালন করতেন অথবা তাদের পক্ষ থেকে খলীফাকে এ দায়িত্ব পালনে অনুরোধ করা হত। বনু সাঈদার প্রাঙ্গনে মনোনীতরা ছিলেন আবু বকর (রা), উমর (রা), আবু উবাইদা (রা) এবং সা’দ ইবনে উবাইদা (রা)। তাঁরা সকলের কাছেই পরীক্ষিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যেই মনোনয়ন সীমাবদ্ধ ছিল। পুরো প্রাঙ্গনভর্তি লোকের সামনে এ মনোনয়ন পর্ব অনুষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তীতে সাহাবীগণও এ বিষয়ে সম্মতি প্রদান করেন। পরবর্তীতে, বাই’আতের মাধ্যমে তাঁরা আবু বকরকে খলীফা হিসাবে নির্বাচিত করেন।
আবু বকরের শাসনামলের শেষের দিকে তিনি তিনমাস মুসলিমদের সাথে আলোচনা করেন খলীফার পদের ব্যাপারে। আলোচনার পর তারা খলীফা হিসাবে উমরকে মনোনীত করে অর্থাৎ, এক্ষেত্রে মনোনয়ন মাত্র একজন ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়।
তালিকা সংক্ষেপনের বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় উমর (রা) ছুরিকাঘাতে আহত হবার পর। বস্তুতঃ তখন মনোনয়ন একটি অপরিহার্য বিষয়ে পরিণত হয়। এমতাবস্থায় মুসলিমরা তাঁর কাছে যায় এবং তাদের জন্য প্রার্থী মনোনীত করতে অনুরোধ জানায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে তিনি অন্যদেরকে বঞ্চিত করে তালিকা ৬ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেন; এবং এ ব্যাপারে জোরালো নির্দেশ দেন, যে ব্যাপারটি সকলের জানা আছে। এছাড়া, আলী (রা) এর মনোনয়নের সময় তিনি একমাত্র প্রার্থী ছিলেন। আর কেউ তাঁর প্রতিদ্বন্দী ছিল না। সেকারণে তালিকা সংক্ষেপনের কোন প্রয়োজন ছিল না।
তালিকা সংক্ষেপনের এই প্রক্রিয়াটি সাধারণতঃ মুসলিমদের জনসমাবেশের সামনে সংঘটিত হত; যদি বিষয়টির বিরোধিতা করা হত, এর অর্থ হত বিষয়টি আসলে অনুমোদিত নয়। কারণ, এর মাধ্যমে (তালিকা সংক্ষেপণ) আসলে অন্যদের মনোনীত হবার অধিকার রহিত হয়ে যায়। এর অর্থ হচ্ছে খলীফা পদপ্রার্থীদের তালিকা সংক্ষেপণের বিষয়টি সাহাবীদের ইজমা (ঐক্যমত)। সুতরাং, উম্মাহ্’র অর্থাৎ, প্রতিনিধিবৃন্দের জন্য তালিকা সংক্ষেপণের কাজ অনুমোদিত; এ সংক্ষিপ্তকরণ প্রক্রিয়া সরাসরি উম্মাহ্ অর্থাৎ, তার প্রতিনিধি কর্তৃক সংঘটিত হোক বা, তাদের পক্ষ থেকে বিদায়ী খলীফাকে এ অধিকার প্রদানের মাধ্যমেই হোক।
এটা গেল তালিকা সংক্ষেপণ সংক্রান্ত বিষয়। আর, প্রার্থীদের তালিকা প্রথমে ছয়জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার বিষয়টি নেয়া হয়েছে উমর (রা) এর কর্মকান্ড থেকে এবং পরবর্তীতে, ছয়জন থেকে দুইজনে নামিয়ে নিয়ে আসার বিষয়টি নেয়া হয়েছে আবদুর রহমান বিন আউফ (রা) এর কর্মকান্ড থেকে। এছাড়া, এটা একইসাথে অধিকাংশ মুসলিম ভোটারের বাই’আতের মাধ্যমে নির্বাচিত হওয়ার যথার্থতা প্রমাণ করে। কারণ, যদি প্রার্থী দু’য়ের অধিক হত তাহলে হয়ত বিজয়ী প্রার্থী শতকরা ৩০ ভাগ ভোট পেত; যা কিনা অধিকাংশের চাইতে কম। আর যদি প্রার্থী দুইয়ের বেশী না হয় সেক্ষেত্রে বিজয়ী প্রার্থী সবসময়ই সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটেই নির্বাচিত হবে।
উম্মাহ্ কাউন্সিলের মাধ্যমে ছয়জন এবং পরবর্তীতে দুইজন বাছাই করার ক্ষেত্রে, মাহকামাতুল মাযালিম’কে এটা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে, প্রার্থীগণ খলীফা পদে নিযুক্ত হবার সকল শর্তাবলী পুরণ করেছেন। কারণ, উম্মাহ্ কাউন্সিল এদের মধ্য হতেই খলীফা নির্বাচনের জন্য তালিকা সংক্ষেপণ করবে। অন্য ভাবে বলা যায় যে, প্রার্থীদের অবশ্যই নিয়োগচুক্তির সকল শর্তাবলী পূরণ করতে হবে। সুতরাং, মাহকামাতুল মাযালিম চুক্তির শর্তাবলী পূরণে ব্যর্থ ব্যক্তিদের তালিকা থেকে বাদ দেবেন। এরপর, মাহকামাতুল মাযালিম প্রদত্ত তালিকার ভিত্তিতেই উম্মাহ্ কাউন্সিল প্রার্থীদের তালিকা সংক্ষিপ্ত করবেন।
নির্বিঘ্নে মতামত উপস্থাপন ও প্রকাশ করার অধিকার
উম্মাহ্ কাউন্সিলের প্রতিটি সদস্যের শারী’আহ্ প্রদত্ত সীমার মধ্যে থেকে নির্বিঘ্নে ও কোনপ্রকার চাপ ছাড়াই তার নিজস্ব মতামত জোরালো ভাবে উপস্থাপন করার অধিকার রয়েছে। কাউন্সিলের সদস্যরা হলেন উম্মাহ্’র মতামত উপস্থাপনের জন্য তাদের পক্ষ থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি। সুতরাং, তাদের কাজ হল খলীফা, তার সহকারীবৃন্দ এবং ওয়ালী ও আমীল সহ রাষ্ট্রের সকল শাসক কিংবা, রাষ্ট্রের যে কোন বিভাগের যে কোন কর্মচারী ও জনপ্রশাসকদের কার্যাবলী সতর্কতার সাথে পর্যালোচনা করে তাদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করা, উপদেশ প্রদান করা, তাদের কাজের ব্যাপারে মতামত উপস্থাপন করা। তারা এ কাজগুলো করবেন মুসলিমদের পক্ষ থেকে যাদের উপর সৎকাজের আদেশ দান ও অসৎকাজে বাঁধা দেয়া এবং শাসকদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করাকে আল্লাহ্ তা’আলা ফরয করেছেন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মাহ্, মানবজাতির কল্যাণের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাঁধা দেবে।’
[সূরা আলি ইমরান : ১১০]এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
‘তারা এমন লোক যাদেরকে আমি পৃথিবীতে শাসন-কর্তৃত্ব দান করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করবে।’
[সূরা হাজ্জ: ৪১]আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এ ব্যাপারে আরও বলেন,
‘আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকবে যারা কল্যাণের প্রতি আহ্বান করবে এবং সৎকাজের নির্দেশ দেবে আর অসৎকাজে নিষেধ করবে এবং তারাই হবে সফলকাম।’
[সূরা আলি ইমরান: ১০৪]সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের ব্যাপারে অসংখ্য হাদীস রয়েছে। যেমন: একটি হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেন,
“ঐ সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা অবশ্যই আমর বিল মা’রূফ এবং নাহি আ’নিল মুনকার (সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ) করবে। অন্যথায় অচিরেই তোমাদের উপর আল্লাহ্’র শাস্তি আরোপিত হবে। অতঃপর তোমরা তাঁকে ডাকবে কিন্তু তোমাদের ডাকে সাড়া দেয়া হবে না।’ এটি হুযাইফার বরাত দিয়ে আহমাদ বর্ণনা করেন।
(সূনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৪৩৩৬)তিনি (সা) আরও বলেছেন,
“তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি অন্যায় কাজ হতে দেখলে সে যেন তার হাত দ্বারা তা প্রতিহত করে। তার এই সামর্থ্য না থাকলে সে যেন তার মুখ দ্বারা তা প্রতিহত করে। আর. তার যদি এ সামর্থ্যও না থাকে সে যেন তার অন্তর দ্বারা তা করে (ঘৃণার মাধ্যমে); আর, এটা হলো দূর্বলতম ঈমান।”
(এ হাদীসটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন আবু সা’ইদ এর সূত্রে, সহীহ্, হাদীস নং-১৭৫)এইসব আয়াত ও হাদীস মুসলিমদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার ব্যাপারে নির্দেশ প্রদান করে। শাসককে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করাও এ কাজের অর্ন্তভুক্ত। কিছু কিছু হাদীসে সুনির্দিষ্ট ভাবে শাসকদের জবাবদিহি করার কথা বলা হয়েছে। আবু সা’দ এর বরাত দিয়ে উম্মে আতিয়া (রা) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন:
‘অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে হক্ব কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ।’
(সূনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৪৩৪৪)এ হাদীসে এ কাজকে সর্বোত্তম জিহাদ হিসাবে বিবেচনা করে, শাসকের ভৎর্সনা বা সমালোচনা করা এবং তার মুখের উপর সত্য কথা উচ্চারণকে বাধ্যবাধকতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ ধরনের জিহাদকে প্রচন্ডভাবে উদ্ধুদ্ধ করেছেন এবং মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত আকাঙ্খিত করেছেন, যদিও এতে জীবন নাশের ঝুঁকি থাকে। ইতোমধ্যে বর্ণিত একটি সহীহ্ হাদীসে নবী (সা) বলেছেন,
“শহীদদের সর্দার হামযাহ্ এবং ঐ ব্যক্তি, যে অত্যাচারী শাসকের সামনে দাঁড়িয়ে (উক্ত শাসককে) হক্ব কথার উপদেশ দেয় এবং (ঐ শাসক) তাকে হত্যা করে।”
(আল মুনদিরী, আল-তারগীব ওয়াল তারতীব, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২২৯)যখন সাহাবাগণ (আল্লাহ্ তাঁদের উপর সন্তুষ্ট থাকুন) হুদাইবিয়ার শান্তিচুক্তির ব্যাপারে আল্লাহ্’র রাসূলের প্রচন্ড বিরোধিতা করেন, তখন তিনি (সা) তাঁদের এ কাজকে তিরষ্কার বা ভৎর্সনা করেননি। বরং, তিনি (সা) শুধুমাত্র তাঁদের মতামতকে প্রত্যাখান করেছিলেন এবং শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। কেননা এ ব্যাপারে আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা এসেছিল, যেখানে তাঁদের মতামতের কোন মূল্য ছিল না। তিনি (সা) সাহাবীদের এজন্য ভৎর্সনা করেছিলেন যে, তাঁরা আদেশ মান্য করেনি যখন তাঁরা কুরবানীর জন্য রাখা উটগুলোকে কুরবানী করেনি, তাঁদের মাথা মুন্ডন করেনি এবং এহরাম ভঙ্গ করেনি। এছাড়া, রাসূলুল্লাহ্ (সা) হাবাব বিন মুনযির (রা) কে বদরের যুদ্ধে ভৎর্সনা করেননি যখন তিনি নবী (সা) এর সাথে তাবু স্থাপনের অবস্থান নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন, বরং তিনি (সা) তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেছিলেন।
এছাড়া, অধিকাংশের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) কুরাইশদের সাথে মদিনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করেছেন, যদিও এ ব্যাপারে তাঁর নিজস্ব মতামত ছিল ভিন্ন। এ সমস্ত ক্ষেত্রেই রাসূল (সা) সকলের অভিযোগ শুনেছেন এবং পরে, তাঁর নিজস্ব মতামত দিয়েছেন।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর পর খোলাফায়ে রাশেদীনদের শাসনামলেও সাহাবীগণ (রা) এই ধারা অব্যাহত রাখেন। এজন্য তাঁরাও কাউকে ভৎর্সনা করেননি। তাঁরা উমরকে (রা) মিম্বরে দাঁড়ানো অবস্থায় ইয়েমেনী কাপড়ের বন্টন সম্পর্কে জবাবদিহি করেছিলেন। একজন নারী তাঁকে (রা) চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, কারণ উমর (রা) মোহরানা বৃদ্ধির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন এবং সাহাবীরাও (রা) ইরাক বিজয়ের পর ইরাকের ভূমি বন্টনের ব্যাপারে উমরের (রা) সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন। বিশেষ করে, বিলাল (রা) ও আল যুবায়ের (রা) বিরোধিতার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। তিনি (রা) তাঁদের (রা) সাথে বিতর্ক করতেন এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না তাঁর (রা) মতামত সাহাবীদের (রা) বুঝাতে পারতেন ততক্ষণ আলোচনা চালিয়ে যেতেন।
সুতরাং, বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহ্’র প্রতিনিধি হিসেবে উম্মাহ্ কাউন্সিলের সদস্য কোনপ্রকার বাঁধা বা চাপ ব্যতীত তার ইচ্ছানুযায়ী মতপ্রকাশের অধিকার সংরক্ষণ করেন। তার রয়েছে খলীফা, মু’ওয়ায়ীন (খলীফার সহকারীবৃন্দ), ওয়ালী, আমীল ও জনপ্রশাসকদের জবাবদিহি করার অধিকার। এরা সকলেই কাউন্সিল সদস্যদের কাছে ততক্ষণ পর্যন্ত জবাবদিহি করতে বাধ্য যতক্ষণ পর্যন্ত তারা শারী’আহ্ আইনের সীমার মধ্যে এ কার্য সম্পাদন করেন এবং তাদের মতামত উপস্থাপন করেন। উম্মাহ্ কাউন্সিলের অমুসলিম সদস্যগণও শারী’আহ্ নির্ধারিত সীমার মধ্যে নির্বিঘ্ন ও চাপমুক্ত অবস্থায় তাদের উপর শাসক কর্তৃক সংঘটিত সকল জুলুম-নির্যাতনের ব্যাপারে মতামত তুলে ধরার অধিকার সংরক্ষণ করেন।
তথ্য বিভাগ (আল ই’লাম)

রাষ্ট্র এবং এর দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যতগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ আছে, তথ্যবিভাগ তাদের মধ্যে একটি। এটি জনস্বার্থের (মাসালিহ্) সাথে সম্পর্কিত নয় যে, এটি জনকল্যাণ বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত থাকবে; বরং, রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সমূহের মতোই একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসাবে এটি সরাসরি খলীফার তত্ত্বাবধানের অধীন থাকবে।
একটি সুনির্দিষ্ট তথ্যনীতি যা বিশ্বের দরবারে ইসলামকে শক্তিশালী ও কার্যকরভাবে উপস্থাপন করবে, স্বাভাবিকভাবেই তা ইসলামের প্রতি গণমানুষের মনকে আকৃষ্ট করবে; সেইসাথে, তাদের আগ্রহী করবে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন ও চিন্তাভাবনা করতে। এছাড়া, মুসলিম ভূমিসমূহকে খিলাফত রাষ্ট্রের সাথে একীভূত করার ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এছাড়া, তথ্য-উপাত্তের মধ্যে এমন অনেক বিষয় আছে, যা রাষ্ট্রের (ভাল-মন্দের) সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত; এজন্য খলীফার অনুমতি বা নির্দেশ ব্যতীত এ তথ্যগুলো প্রকাশ করা যাবে না। বিশেষতঃ এটা প্রযোজ্য সামরিক বাহিনী এবং এর সাথে সম্পর্কযুক্ত বিষয়গুলো, যেমন: সেনাবাহিনীর গতিবিধি; কিংবা, জয় বা পরাজয়ের সংবাদ, কিংবা, সামরিক শিল্পবিষয়ক তথ্য ইত্যাদি। এই জাতীয় তথ্যগুলো সরাসরি ইমাম বা খলীফার সাথে যুক্ত থাকতে হবে, যেন কোন কোন খবর গোপন রাখতে হবে এবং কোন কোন সংবাদ ঘোষণা এবং প্রচার করতে হবে সে বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।
এ বিষয়ে শারী’আহ্ দলিল হল আল্লাহ্’র কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহ্।
আল্লাহ্’র কিতাবের ক্ষেত্রে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“আর যখন তাদের নিকট কোন শাস্তি সংক্রান্ত বা ভীতিজনক কোন বিষয় উপস্থিত হয়, তখন তারা সেটা রটনা করতে থাকে। যদি তারা ওগুলোকে (সংবাদ) রাসূল ও তাদের উপর কর্তৃত্বশীলদের কাছে পৌঁছে দিত তবে অবশ্যই তথ্যঅনুসন্ধিৎসু ব্যক্তিবর্গ তা উপলব্ধি করতো।”
[সূরা নিসা: ৮৩]এ আয়াতের বিষয়বস্তু সরাসরি তথ্য-উপাত্ত সংক্রান্ত।
আর, রাসূলের সুন্নাহ্’র দলিল হিসাবে মক্কা বিজয়ের উপর ইবন আব্বাসের হাদীসটি উল্লেখ করা যায়, যে হাদীসটি আলহাকিম তার আল-মুসতাদরাক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী এটি সহীহ্ হাদীসের অন্তর্ভূক্ত হয়েছে এবং আল-জাহাবী এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন: “কুরাইশদের নিকট হতে তথ্য গোপন করা হয়েছিল; যেন আল্লাহ্’র রাসূল (সা) এর সংবাদ তাদের কাছে না পৌঁছায়; এবং তারা যেন তাঁর পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছুই জানতে না পারে।”
আবু সালামাহ্’র একটি মুরসাল হাদীস (যে হাদীস সরাসরি রাসূলুল্লাহ্’র সাথে যুক্ত নয়; বরং এখানে বর্ণনাকারী সাহাবীর নাম খুঁজে পাওয়া যায়নি) আছে যা ইবনে আবু শায়বাহ্ বর্ণনা করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে:
‘অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) আয়েশাকে বললেন: আমাকে সবকিছু প্রস্তুত করে দাও এবং এ ব্যাপারে কাউকে কিছু বলো না। তারপর তিনি রাস্তা-ঘাট বন্ধ করে দেবার নির্দেশ দিলেন, যেন মক্কার লোকেরা চলাচল করতে না পারে এবং তাদের কাছে কোন সংবাদ না পৌঁছে।’
এছাড়া, গাজওয়া ’উসরাহ্ (তাবুকের অভিযান) সম্পর্কে কা’ব বর্ণিত একটি হাদীস রয়েছে, যে হাদীসের ব্যাপারে ঐক্যমত আছে, এ হাদীসে বলা হয়েছে:
“রাসূল (সা) কখনও কোন অভিযানে তাঁর সঠিক গন্তব্যের ব্যাপারে পরিকল্পনা প্রকাশ করতেন না, একমাত্র সে অভিযানটি ছাড়া যেটির জন্য তিনি ভয়াবহ উত্তপ্ত আবহাওয়ায় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন; যেটি ছিল একটি দূরবর্তী স্থানে, মরুভূমিতে এবং বিশাল সংখ্যক শত্রুর বিরুদ্ধে। সুতরাং, তিনি মুসলিমদের পুরো ব্যাপারটি বর্ণনা করলেন যাতে তারা অতর্কিত আক্রমণের জন্য প্রস্তুত থাকে এবং তিনি তাদেরকে তাঁর গন্তব্যও জানিয়ে দিলেন।”
এ ব্যাপারে আনাসের একটি হাদীস রয়েছে যা আল-বুখারী বর্ণনা করেন,
“রাসূলুল্লাহ্ (সা) যায়িদ, জাফর ও ইবনে রুওয়াহার মৃত্যু সংবাদ পৌঁছানোর আগেই এ ব্যাপারে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘যায়িদ প্রথমে পতাকা হাতে নিল ও শহীদ হল; অতঃপর জাফর হাতে নিল এবং সেও শহীদ হল; তারপর, ইবনে রুওয়াহা পতাকা হাতে নিল এবং সেও শহীদ হল; একথা বলতে বলতে তিনি কাঁদছিলেন। অতঃপর, আল্লাহ্’র তরবারীর মধ্য হতে একটি তরবারী তা তুলে নিল এবং আল্লাহ্ তাদের জন্য বিজয় নির্ধারণ করলেন।”
(সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-৩৭৫৭)তথ্য সম্পর্কিত এই সমস্ত নীতির কিছু কিছু খোলাফায়ে রাশেদীনদের সময়েও প্রয়োগ করা হয়; যা কিনা ইবন আল-মুবারক এর জিহাদ সম্পর্কিত এক বর্ণনায় এসেছে; আল-হাকিম এটি তার আল-মুসতাদরাক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন এবং ইমাম মুসলিমের (সহীহ্ হাদীসের) শর্তানুযায়ী তিনি এটিকে বিশুদ্ধ বলেছেন, যে ব্যাপারে আল-জাহাবী একমত পোষণ করেছেন। উক্ত হাদীসটি যায়িদ ইবন আসলাম থেকে ইবন আল-মুবারক, ইবন আসলাম আবার তার পিতা হতে, তার পিতা আবার উমর ইবনুল খাত্তাব থেকে বর্ণনা করেছেন: তিনি (’উমর) এ ব্যাপারে অবগত হলেন যে, আবু উবাইদাহ শত্রু দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে গেছে এবং তারা তাদের দিকে সমবেতভাবে এগিয়ে আসছে। শোনার পর উমর তাঁকে লিখলেন, ‘তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক! ঈমানদারদের উপর এমন কোন বিপদ আপতিত হয় না, যেখান থেকে উদ্ধারের জন্য আল্লাহ্ তা’আলা তাকে পথ করে দেন না; এবং (জেনে রাখ) একটি কঠিন সময় কখনও দু’টি সুসময়ের কাছে পরাজিত হয় না।’
‘হে ঈমানদানগণ! ধৈর্য্য ধারণ কর এবং মোকাবেলায় দৃঢ়তা অবলম্বন কর। আর আল্লাহ্কে ভয় করতে থাক যাতে তোমরা তোমাদের উদ্দেশ্য লাভে সমর্থ হতে পার।’
[সূরা আল ইমরান : ২০০]তিনি বলেন: তারপর, আবু উবায়দা তাঁকে লিখেন, ‘আপনার উপরেও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর আল্লাহ্ বলেন,
‘তোমরা জেনে রাখ, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারষ্পরিক অহমিকা এবং ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ব্যতীত আর কিছুই নয়।’
[সূরা হাদীদ : ২০]তারপর তিনি বলেন: অতঃপর ’উমর তাঁর হাতের বইখানা নিয়ে মিম্বারে উঠে দাঁড়ালেন এবং মদীনার লোকদের এটা পাঠ করে শোনালেন এবং বললেন, ‘হে মদিনাবাসী! আবু উবাইদা পরোক্ষভাবে তোমাদের জিহাদের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছে, যেন তোমরা এ ব্যাপারে আগ্রহী হও।”
যে বিষয়গুলো সমরবিষয়ক তথ্যের সাথে সম্পর্কিত সেগুলো হল, সমঝোতা, শান্তিচুক্তি এবং বিতর্ক বিষয়ক তথ্য যা কিনা খলীফা কিংবা তার সহকারীবৃন্দ এবং কুফর রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে সংঘটিত হয়ে থাকে। সমঝোতার উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যে, হুদাইবিয়া’র প্রান্তরে আল্লাহ্’র রাসূল (সা) এবং কুরাইশদের প্রতিনিধির সাথে প্রদত্ত শর্তের ভিত্তিতে শান্তিচুক্তি সংঘটিত হবার পূর্বপর্যন্ত যে সংলাপ সংঘটিত হয়েছিল। এছাড়া, সরাসরি বিতর্কের উদাহরণ হিসাবে রাসূল (সা) এর সাথে জাজরান থেকে আগত প্রতিনিধিদের বিতর্কের বিষয়টি উল্লেখ করা যায়, যেখানে তিনি (সা) তাদেরকে নিজেদের উপর আল্লাহ্’র অভিশম্পাত নাযিলের ঘোষণা দিয়েছিলেন যদি তারা (তাদের দাবির ব্যাপারে) সত্যবাদী না হয়ে থাকে। এছাড়া, রাসূল (সা)এর নির্দেশক্রমে তামিমের প্রতিনিধিদের সাথে ছাবিত ইবন কায়েস ও হাস্সান এর বিতর্কের ঘটনাও উল্লেখ করা যায়।
বস্তুতঃ উপরোল্লিখিত ঘটনাগুলোর কোনটির ক্ষেত্রেই কোন প্রকার গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়নি।
এছাড়া, আরও অনেক ধরনের সংবাদ বা তথ্য আছে যেগুলোর রাষ্ট্রের সাথে সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই, সেগুলোর ক্ষেত্রে খলীফার সরাসরি অনুমোদন বা নির্দেশ অপরিহার্য নয়; যেমন: প্রতিদিনকার খবর, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং বিজ্ঞান বিষয়ক কিংবা, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঘটনা ইত্যাদি। বস্তুতঃ এ ধরনের সংবাদ বা তথ্যসমূহে জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গী কিংবা, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে রাষ্ট্রের নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গীর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এজন্য, এ ধরনের সংবাদ পরিবেশন ও প্রচার বিষয়ে রাষ্ট্রের তদারকী ও পর্যবেক্ষণ প্রথমোক্ত তথ্যসমূহের থেকে ভিন্নতর হবে। এজন্য, রাষ্ট্রের তথ্য বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের অবশ্যই দু’টি প্রধান বিভাগ থাকতে হবে:
প্রথমত: এ বিভাগের কাজ রাষ্ট্রের সাথে সরাসরিযুক্ত এমন তথ্যের সাথে সম্পর্কিত, যেমন: সামরিক বিষয়সমূহ, সামরিক শিল্প বিষয়ক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক, ইত্যাদি। এ বিভাগের কাজ হল এ সম্পর্কিত তথ্যগুলো সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা; যেন এ ধরনের সংবাদসমূহ এ বিভাগে উপস্থাপনের পূর্বে রাষ্ট্রের কোন সংবাদ মাধ্যম বা অন্যকোন বিশেষ সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত না হয়।
দ্বিতীয়ত: এ বিভাগটি অন্যান্য খবরের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং এ ব্যাপারে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ অপরিহার্য নয়। রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম কিংবা, অন্যকোন বিশেষ সংবাদ মাধ্যমে এ সংক্রান্ত খবর প্রচারের জন্য কোন পূর্বানুমোদনের প্রয়োজন নেই।
প্রচারমাধ্যম সমূহের অনুমোদন প্রাপ্তি
ইসলামী রাষ্ট্রে প্রচারমাধ্যমসমূহের কাজ করার জন্য কোনপ্রকার অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। বরং, রাষ্ট্রের যে কোন নাগরিক যে কোন ধরনের প্রচারযন্ত্র স্থাপন করতে পারবে, সেটা প্রকাশনার মাধ্যমে হোক কিংবা, অডিও বা ভিজ্যুয়াল যাই হোক না কেন। তবে, তিনি কোন ধরনের প্রচারযন্ত্র স্থাপন করতে চান তা অবশ্যই তাকে তথ্যবিভাগে অবহিত করতে হবে।
এবং, তাকে অবশ্যই উপরোল্লিখিত নীতি অনুসরণ করতে হবে অর্থাৎ, রাষ্ট্রের সাথে সরাসরিযুক্ত এমন তথ্য প্রচারের পূর্বে তথ্যবিভাগের অনুমতি নিতে হবে; আর অন্যান্য খবরের ক্ষেত্রে তথ্যবিভাগের পূর্বানুমোদনের প্রয়োজন নেই।
সকল ক্ষেত্রে, প্রচারমাধ্যমের মালিককেই তার প্রচারিত সংবাদের দায়দায়িত্ব বহন করতে হবে এবং অন্যান্য নাগরিকের মত তাকেও জবাবাদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে, যদি তিনি তথ্য পরিবেশনের ক্ষেত্রে শারী’আহ্ আইন লঙ্ঘন করেন।
রাষ্ট্রের তথ্য নীতি
তথ্য সংক্রান্ত একটি আইন প্রকাশ করা হবে, যেখানে শারী’আহ্ আইনের আলোকে গঠিত রাষ্ট্রের তথ্যনীতির ব্যাপারে কিছু সাধারণ দিকনির্দেশনা থাকবে। ইসলাম ও মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষার্থে রাষ্ট্র এ নীতিকে অনুসরণ করবে, যেন এমন একটি পরস্পর নিবিড় সম্পর্কযুক্ত ও শক্তিশালী ইসলামী সমাজ গঠিত হয়, যা আল্লাহ্’র রজ্জুকে শক্ত ভাবে আঁকড়ে ধরবে এবং যা থেকে ক্রমাগত উন্নত আদর্শের আলোকময় শিখা বিচ্ছুরিত হবে; যেখানে অনৈতিক, দুষ্ট ও ক্ষতিকর ধ্যান-ধারণার কোন স্থান থাকবে না; থাকবে না ভ্রান্ত পথনির্দেশনাপূর্ণ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন কোন সংস্কৃতি। এটি হবে এমন একটি ইসলামী সমাজ যা নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী সকল দুষ্ট চিন্তাধারাকে নস্যাৎ করবে এবং বিচ্ছুরিত করবে ন্যায় ও সত্যাদর্শের আলোকময় শিখা এবং সকল সময়, সকল ক্ষেত্রে বিশ্বব্রহ্মান্ডের প্রভু, মহান আল্লাহ্ তা’আলার প্রশংসা জ্ঞাপন করবে।
বাইতুল মাল

বাইতুল মাল শব্দটি গঠনের দিক থেকে জটিল ও বহু অর্থবোধক এবং এটি রাষ্ট্রের এমন একটি স্থানকে নির্দেশ করে যেখানে ব্যয়ের পূর্ব পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রাপ্ত সকল রাজস্ব জমা রাখা হয়। এছাড়া, এর দ্বারা এমন একটি কর্তৃপক্ষকেও বোঝানো হয়ে থাকে, যা মুসলিমদের অধিকারকৃত সম্পদসমূহ গ্রহণ ও ব্যয়ের জন্য দায়িত্বশীল।
আমরা ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি যে, সেনাবাহিনী, বিচারব্যবস্থা এবং তহবিল ব্যতীত ওয়ালীকে বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করা হবে। সুতরাং, সমগ্র সেনাবাহিনীর একটি কেন্দ্রীয় বিভাগ থাকবে, যার নেতৃত্বে থাকবে আমীর-উল-জিহাদ।
একইভাবে, বিচারব্যবস্থার জন্যও একটি কেন্দ্রীয় বিভাগ, যাকে বিচারবিভাগ বলা হবে এবং রাষ্ট্রের সকল রাজস্ব বা তহবিল একটি কেন্দ্রীয় বিভাগের অধীনে থাকবে, যাকে বলা হবে বাইতুল মাল।
এ ব্যাপারে অসংখ্য দলিল-প্রমাণ রয়েছে যে, রাসূল (সা) এর সময় বাইতুল মাল সরাসরি তাঁর কিংবা, তিনি (সা) যাকে এর প্রধান হিসাবে নিযুক্ত করতেন তার তত্ত¡াবধানের অধীন ছিল। আল্লাহ্’র রাসূল (সা) ক্ষেত্রবিশেষে সরাসরি রাষ্ট্রীয় তহবিল তদারকী করতেন, যেখানে এ তহবিল একটি সিন্দুকে জমা রাখা হত। তিনি (সা) সাধারণত নিজে তহবিল গ্রহণ করতেন, এগুলো বন্টন করতেন এবং সঠিক স্থানে সেগুলো ব্যয় করতেন। আবার, কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি (সা) অন্য কাউকে এ তহবিলের দায়িত্বে নিযুক্ত করতেন। রাসূল (সা) কে অনুসরণ করে খোলাফায়ে রাশেদীনরাও (রা) একই কাজ করেছেন; হয় তাঁরা নিজেরা সরাসরি বাইতুল মাল এর দায়িত্ব নিয়েছেন কিংবা, তাঁদের পক্ষ থেকে এ দায়িত্ব পালন করার জন্য অন্য কোন ব্যক্তিকে মনোনীত করেছেন।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) মসজিদেই বাইতুল মাল-এর তহবিল রাখতেন। আনাসের (রা) সূত্রে আল বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (আনাস (রা)) বলেছেন:
‘বাহরাইন থেকে আগত কিছু তহবিল নবী (সা) এর নিকট আনা হল। তিনি (সা) বললেন, ‘এগুলো মসজিদে ছড়িয়ে রাখো।’
(সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-৪২১)তিনি (সা) মাঝে মাঝে এগুলো তাঁর স্ত্রীদের কক্ষে রাখতেন। এ ব্যাপারে আল বুখারী উকবা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, উকবা বলেছেন,
‘আমি মদীনাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর পেছনে আসরের সালাত আদায় করলাম। নামাজের শেষে তিনি সালাম দিয়ে অতি দ্রæত উঠে দাঁড়ালেন। তিনি কাতারবন্দী মুসলিমদের অতিক্রম করে তাঁর স্ত্রীদের ঘরের দিকে ছুটে গেলেন। লোকেরা তাঁর গতিতে অবাক হয়ে গেল। তিনি ফিরে আসলেন এবং দেখলেন লোকেরা তাঁর দ্রæতগতিতে ছুটে চলা দেখে অবাক হয়ে আছে। তিনি বললেন, ‘আমার মনে পড়ল, কিছু স্বর্ণের ধূলা আমাদের জিম্মায় আছে। এগুলো আমাকে পেছন থেকে তাড়া করবে ভেবে ভীত ছিলাম এবং সে কারণে ওগুলোকে বন্টন করার নির্দেশ দিয়ে এলাম।’’ অন্যথায় তিনি (সা) এগুলোকে তাঁর (সা) সিন্দুকে জমা রাখতেন। এ ব্যাপারে উমর (রা) থেকে মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে,
‘সুতরাং আমি তাঁকে (তাঁর স্ত্রীকে) বললাম, ‘রাসূলুল্লাহ্ (সা) কোথায়?’ তিনি বললেন, ‘তিনি তাঁর সিন্দুকের ঘরে।’, আমি রাসূল (সা) এর সিন্দুকের দিকে তাকালাম এবং হঠাৎ করে এক সা’ (ক্ষুদ্র পরিমাণের একক) পরিমাণ বার্লি দেখতে পেলাম এবং ঘরের ফলের রস তৈরীর জন্য এক পাশে একই পরিমাণের কিছু ফল দেখতে পেলাম; আর দেখলাম ঘরের দেয়ালে টাঙানো একখানা চামড়ার টুকরা। তা দেখে আমার দু’চোখ অশ্রæসিক্ত হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, ‘হে খাত্তাবের পুত্র, কিসে তোমাকে কাঁদালো?’ আমি বললাম, ‘হে রাসূলুল্লাহ্! কেন আমি কাঁদবো না, যখন আমি দেখতে পাচ্ছি এই পাটির দাগ আপনার শরীরে বসে গেছে এবং এই হচ্ছে আপনার সিন্দুক, যেখানে আমি যা দেখলাম এছাড়া আর কিছুই নেই।”
খোলাফায়ে রাশেদীনদের (রা) সময়ে রাষ্ট্রীয় তহবিল রাখার স্থানকে বাইতুল মাল নামে অভিহিত করা হয়। সাহল ইবন আবু হাছমা এবং অন্যান্যদের থেকে সা’দ তার আল তাবাকাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, “আল-শানে আবু বকরের একটি গৃহ ছিল যার জন্য কোন পাহারাদার নিযুক্ত ছিল না। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, ‘কেন আপনি এর জন্য কোন পাহারাদার নিযুক্ত করছেন না?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘এর জন্য তালা আছে।’ তিনি এ গৃহ থেকে এর মধ্যে যা রক্ষিত থাকত তা বিতরণ করতেন যে পর্যন্ত না তা খালি হয়ে যেত। যখন তিনি মদিনায় গেলেন, তিনি এটিকে (তহবিল) স্থানান্তরিত করে নিজ গৃহে রাখলেন।”
হিনাদ তার আল জুহদ গ্রন্থে আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, “এক ব্যক্তি উমরের নিকট আসলো এবং বললো, ‘হে আমীর-উল-মু’মিনীন! আমাকে সাহায্য করুন, যেন আমি জিহাদে যেতে পারি।’ উত্তরে উমর বললেন, ‘তার হাত ধর এবং তাকে বাইতুল মাল-এ নিয়ে যাও, যেন সে তার প্রয়োজন মত অর্থ সংগ্রহ করতে পারে।’ আল-শাফীঈ তার আল-উম্ম গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, যে বর্ণনাকে আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াদিয়্যাহ’র সূত্রে ইবন হাজার সঠিক বলেছেন, তিনি বলেছেন: ‘আবু হুজাইফা’র সালিম নামের এক দাস ছিল, পূর্বে যে আমাদের গোত্রের সালমা বিনত ইয়ার নামের এক নারীর দাস ছিল। অন্ধকার যুগেই সে তাকে মুক্ত করে দিয়েছিল। যখন উক্ত দাস ইয়ামামা’র যুদ্ধে শহীদ হলেন, তখন তার রেখে যাওয়া সম্পদ (উত্তরাধিকার) উমর ইবনুল খাত্তাবের কাছে নিয়ে আসা হল। তখন তিনি ওয়াদিয়্যাহ ইবন খিদমাহ্’কে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন: ‘এটা হল তোমার দাসের উত্তরাধিকার এবং তোমরাই এর অধিক দাবিদার।’ (একথা শুনে) তিনি বললেন: ‘হে আমির-উল-মু’মিনীন! আল্লাহ্ আমাদেরকে এর মুখাপেক্ষী করেননি। আমাদের বংশের নারী তাকে কোন শর্ত ছাড়াই মুক্ত করে দিয়েছে। সুতরাং, আমরা আমাদেরকে এ বিষয়ে অসম্মানিত করতে চাই না।’ অতঃপর, উমর তার (উক্ত দাসের) উত্তরাধিকারের সম্পদ বাইতুল মালে জমা রাখলেন।” এছাড়া, আল বায়হাকী এবং আল দারিমী বর্ণনা করেছেন এবং ইবন হাজিম এটাকে শুদ্ধ করেছেন: “সুফিয়ান ইবন আবদুল্লাহ ইবন রাবিয়্যাহ আল ছাকাফি একটি চামড়ার ব্যাগ কুড়িয়ে পান এবং তা উমর ইবন আল-খাত্তাবের কাছে নিয়ে যান। তিনি বলেন: ‘এক বছরের জন্য ঘোষণা দাও এবং এ সময়ের মধ্যে যদি কোন দাবিদার চিহ্নিত হয়, তাহলে এটি ফিরিয়ে দাও। আর, যদি না পাওয়া যায় তাহলে এটা তোমার।’
এক বছরের মধ্যে এটার কোন দাবিদার আসল না। পরের বছর তার সাথে সাক্ষাৎ কালে তাকে এটা স্মরণ করিয়ে দেয়া হল। তখন উমর বললেন: “এটা এখন তোমার। কারণ, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) আমাদের এরূপ করার নির্দেশ দিয়েছেন।” তিনি (সুফিয়ান ইবন আবদুল্লাহ) বললেন: ‘আমি এটা চাই না।’ তখন ’উমর সেটাকে নিলেন এবং বাইতুল মালে জমা রাখলেন।” এছাড়া, আবদুল্লাহ ইবন আমরু থেকে আল দারিমী বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “উসমানের শাসনামলে এক ভৃত্য কোন আত্মীয়-স্বজন না রেখেই মৃত্যুবরণ করলো। তিনি তার সম্পদ বাইতুল মাল-এ জমা করার নির্দেশ দিলেন।” আনাস ইবন শিরিন থেকে ইবন আবদ আল-বার তার আল-ইসতিদকার গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, “আলী সে পর্যন্ত সম্পদ বিতরণ করতেন যে পর্যন্ত না বাইতুল মাল শূণ্য হয়ে যেত। এরপর, তা পরিস্কার করা হত এবং তখন তিনি সেখানে বসতেন।”
এসব হাদীস বা ঘটনায় বাইতুল মাল’কে স্থান অর্থে বোঝানো হয়েছে। আর, বাইতুল মাল-এর দ্বিতীয় অর্থ, যেখানে এ শব্দসমূহের দ্বারা একটি দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকে বোঝানো হয়; সে সম্পর্কে বলা যায় যে, তহবিল বা সম্পদ অনেক সময় কোন একটি নির্দিষ্ট স্থানে থাকে না বলে এ কর্তৃপক্ষের অপরিহার্যতা তৈরি হয়েছে, যেমন: জমি, তেলের খনি, গ্যাসের খনি, যে সব সাদাকা গ্রহণ করার পর কোন নির্দিষ্ট স্থানে না রেখেই উপযুক্ত লোকদের মাঝে তা বন্টন করে দেয়া হয় ইত্যাদি। আল বায়হাকী, আহমদ ইবনে হাম্বল এর আল মুসনাদ, আবদুর রাজ্জাক এর মুসান্নাফে বর্ণিত হাদীস অনুসারে দেখা যায় যে, বাইতুল মাল’কে কখনও কখনও একটি কর্তৃপক্ষ বোঝানোর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। লাহিক ইবনে হুমাইয়াদ থেকে জানা যায়, ‘ইবনে মাসউদকে বিচারব্যবস্থা ও বাইতুল মালের প্রধান হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছিল।’ এর অর্থ এই নয় যে, উমর (রা) ইবনে মাসউদকে বাইতুল মাল-এর দরজার পাহারাদার হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন; বরং, এর অর্থ হল, তাঁকে তহবিল সংগ্রহ ও ব্যয়ের কর্তৃত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছিল। আল-হাসান থেকে ইবন আল-মুবারক তার আল-জুহদ গ্রন্থে যে ঘটনা বর্ণনা করেছেন, সেখানেও বাইতুল মাল’কে একই অর্থে বোঝানো হয়েছে। যখন বসরার আমীরগণ আবু মুসা আল-আশয়ারী’র সাথে আসলেন, তারা তাঁকে তাদের জন্য কিছু খাবার বরাদ্দ করার জন্য অনুরোধ করলেন। তিনি একথা বলে তাঁর বক্তব্য শেষ করলেন: ‘হে আমীর সম্প্রদায়! আমি আপনাদের জন্য বাইতুল মাল থেকে দুটি ভেড়া এবং
এক টুকরো কৃষি (গারীব) জমি বরাদ্দ করছি।” এখানেও বাইতুল মাল বলতে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ বোঝানো হতে পারে।
খলীফা হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি বাইতুল মালের আয়-ব্যয় তত্ত্বাবধান করেন
রাসূল (সা) হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি তাঁর নিজের কোলে উসমান (রা) এর কাছ থেকে বিপদসঙ্কুল (’উসরাহ) যাত্রার সেনাবাহিনী’র জন্য অনুদান গ্রহণ করেছিলেন। এছাড়া, হাসান ও গারীব থেকে তিরমিযী এবং আহমাদ বর্ণনা করেছেন এবং আব্দুর রহমান ইবন সামরাহ্ থেকে আল-হাকিম বর্ণনা করেছেন এবং শুদ্ধ করেছেন এবং আল জাহাবী এর সাথে একমক পোষণ করেছেন, তিনি বলেছেন যে:
“উসমান রাসূল (সা) এর নিকট এক হাজার দিনার নিয়ে আসলেন, যখন তিনি (সা) বিপদসঙ্কুল যাত্রার সেনাবাহিনী অর্থাৎ, তাবুকের যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনী প্রস্তুত করছিলেন। তিনি এ মুদ্রাগুলো রাসূল (সা) এর কোলের উপর রাখলেন। তিনি বলেন, রাসূল (সা) এগুলোকে নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন: “আজকের পর থেকে আর কোন কাজের দ্বারা উসমান ক্ষতিগ্রস্থ হবে না; এবং তিনি (সা) এ কথাটি অনেকবার বললেন।” তিনি (সা) মাঝে মাঝে বাইতুল মাল-এর অর্থ নিজেই বন্টন করতেন। আল বুখারী আনাসের সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে:
“বাইরাইন থেকে আগত অর্থ রাসূল (সা) এর নিকট আনা হল। তিনি (সা) বললেন: এগুলোকে মসজিদে ছড়িয়ে রাখ। নামাজ শেষ করে তিনি (সা) এগুলোর খুব কাছে বসলেন এবং উপস্থিত কাউকে সে অর্থ থেকে বঞ্চিত করলেন না। যখন রাসূল (সা) উঠে দাঁড়ালেন তখন আর কোন অর্থই অবশিষ্ট থাকল না।”
আবু বকরের (রা) শাসনামলেও তিনি নিজে বাহরাইন থেকে আগত অর্থ বন্টনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। আল বুখারী জাবিরের সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন:
“রাসূল (সা) বলেছিলেন: ‘যদি বাহরাইন থেকে অর্থ আসে তবে আমি তোমাকে এভাবে, এভাবে এবং এভাবে দেব, অর্থাৎ, তিনবার বললেন। রাসূল (সা) এর ইন্তিকালের পর বাহরাইন থেকে অর্থ আসলো। তখন আবু বকর কাউকে এ ঘোষণা দেবার নির্দেশ দিলেন: যার যার রাসূল (সা)এর কাছে কোন ঋণ বা অন্যকিছু পাওনা আছে, সে যেন আমার কাছে আসে। এ কথা শোনার পর আমি তাঁর কাছে গেলাম এবং বললাম আল্লাহ্’র রাসূল আমাকে বলেছিলেন: “আমার জন্য এভাবে, এভাবে এবং এভাবে; তারপর তিনি আমাকে তিনবার দিলেন।”
উপরে উল্লিখিত সুফিয়ান আল-ছাকাফী’র চামড়ার ব্যাগ সম্পর্কিত হাদীসটি যেখানে তিনি ব্যাগটি পাবার পর ঘোষণা দেন এবং শেষ পর্যন্ত কোন দাবিদার না পাওয়ায়: “উমর সেটাকে নিলেন এবং বাইতুল মালে জমা রাখলেন।” আল শাফীঈ তার আল-উম্ম গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: “একাধিক পন্ডিত ব্যক্তি আমাকে বলেছেন যে, যখন ইরাকের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গনীমত) উমর ইবনুল খাত্তাবের নিকট আসলো, বাইতুল মাল-এর তত্ত¡াবধায়ক তাকে বললেন: “আমাকে এগুলো বাইতুল মালে রাখতে দিন।” তিনি বললেন: “না! কাবার প্রভুর শপথ! এগুলো ততক্ষণ পর্যন্ত কোন গৃহে রাখা হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না এগুলোকে বন্টন করা হবে।” এরপর তিনি এগুলোকে মসজিদে রাখার নির্দেশ দিলেন এবং চামড়ার মাদুর দিয়ে এগুলোকে ঢেকে দেয়া হল। তারপর, আনসার ও মুহাজিরিনদের মধ্য হতে কিছু ব্যক্তি এগুলোকে পাহারা দেবার দায়িত্বে নিয়োজিত হল। সকাল বেলায় আল-আব্বাস ইবন আব্দুল-মুত্তালিব (রা) এবং আব্দুর রহমান ইবন আউফ (রা) তাঁর (উমর (রা)) সাথে বের হলেন; হয় তিনি এদের মধ্যে কোন একজনের হাত ধরে ছিলেন কিংবা, এদের মধ্যে কেউ একজন তাঁর হাত ধরে ছিলেন। যখন তারা (পাহারাদার) তাঁকে দেখল, তারা গণীমতের মালগুলোর উপর থেকে চামড়ার মাদুর সরিয়ে নিল। এরপর তিনি এমন এক দৃশ্য অবলোকন করলেন, যা তিনি পূর্বে কখনও দেখেননি। তিনি দেখলেন স্বর্ণ, ইন্দ্রনীলমণি, ক্রিসোলাইট, মুক্তা ঝল্মল্ করছে। এ দৃশ্য অবলোকন করার পর তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। তাদের একজন বললেন, “আল্লাহ্’র কসম! আজকের এদিন কান্নার নয়; বরং, এদিন আনন্দের, এদিন (আল্লাহ্’র) প্রশংসা করার।” তিনি (উমর (রা)) বললেন: “আল্লাহ্’র কসম! তুমি বিষয়টিকে যেভাবে দেখছো আমি সেভাবে দেখছি না। এ ধরনের সম্পদ কোন জাতির মধ্যে ততক্ষণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়নি, যতক্ষণ পর্যন্ত এগুলো তাদের ক্ষতি সাধন করেছে।” তারপর তিনি কিবলা’র দিকে ফিরলেন, তাঁর দুই হাত তুলে বললেন, “হে আমার প্রভু! আমি এসবের প্রলোভন থেকে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি। কারণ তুমি বলেছো:
“আমি তাদের অজ্ঞাতসারে তাদেরকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাব।”
[সূরা ’আরাফ: ১৮২]তারপর তিনি বললেন, সুরাকা ইবন জা’শম কোথায়? তাকে নিয়ে আসা হল যখন তার দুই হাত ছিল সরু ও চুলে আবৃত। তিনি তাকে কিসরা’র বাহুবন্ধনীগুলো দিলেন এবং বললেন: ‘এগুলো পরো’। তারপর তিনি বললেন, ‘বল, আল্লাহু আকবর।’ সে বলল, ‘আল্লাহু আকবর’। তখন তিনি বললেন, ‘বল প্রশংসা সেই আল্লাহ্’র যিনি কিসরা ইবন হিরমিজের হাত থেকে এটা বের করে করেছেন এবং বনু মিদলাজের এক (সামান্য) বেদুইন সুরাকা ইবন জা’শামকে তা দিয়ে অলঙ্কৃত করেছেন।’ তারপর তিনি একটি লাঠি দিয়ে মালামালগুলো উল্টে-পাল্টে দেখতে লাগলেন এবং বললেন, ‘নিঃসন্দেহে যে এগুলো আমাদের কাছে সমর্পণ করেছে সে সৎ।’ তখন এক ব্যক্তি তাঁকে বলল, ‘আমাকে বলতে দিন, আপনি আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে (আমাদের) তত্ত্বাবধায়ক(আমিন উল্লাহ্) এবং তারা আপনার কাছে তাই সর্মপণ করেছে, যা আপনি আল্লাহ্’র কাছে সর্মপণ করেছেন। একথা শুনে তিনি বললেন, ‘তুমি সত্য বলেছো।’ তারপর তিনি সেগুলোকে বন্টন করে দিলেন। এছাড়া, আমরা ইতোমধ্যে আবদুল্লাহ ইবন আমরু’র সূত্রে আল-দারিমী বর্ণিত হাদীসটি উল্লেখ করেছি: “এক ভৃত্য কোন আত্মীয়-স্বজন না রেখেই মৃত্যুবরণ করলো। সুতরাং, উসমান তার উত্তরাধিকারের সম্পদ বাইতুল মালে জমা করতে বললেন।” এর সাথে সাথে আল-ইসতিদকার গ্রন্থে উল্লেখিত আনাস ইবন শিরিন এর হাদীসটিই উল্লেখ করা হয়েছে যে: “আলী (রা) ততক্ষণ পর্যন্ত অর্থ বিতরণ করতেন যতক্ষণ পর্যন্ত না বাইতুল মাল শূণ্য হয়ে যেত (তারপর সে গৃহকে পরিস্কার করা হত এবং তিনি সেখানে বসতেন)।”
কখনও কখনও রাসূল (সা) সম্পদ বন্টনের সময় সাহাবীদের (রা) মধ্য হতে কাউকে সামগ্রিকভাবে এ বিষয়ে নেতৃত্ব দেবার জন্য মনোনীত করতেন। কিংবা, তিনি তহবিল বন্টন সম্পর্কিত কিছু বিষয়ের দায়িত্ব দিয়ে কাউকে নিযুক্ত করতেন। উকবাহ্’র সূত্রে আল বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন:
‘আমার মনে পড়ল, কিছু স্বর্ণের ধূলা আমাদের জিম্মায় আছে। এগুলো আমাকে পেছন থেকে তাড়া করবে ভেবে ভীত ছিলাম এবং সে কারণে ওগুলোকে বন্টন করার নির্দেশ দিয়ে এলাম।’’
এছাড়া, ইবন শিহাবের একটি হাদীস, যা ইবন আবি শায়বাহ বর্ণনা করেছেন এবং এ বর্ণনাটি আল-হাফিয ইবন আল হাজার আল-আশক্বালানী, আল মুনদিরী এবং আল হাইছামী বিশুদ্ধ বলেছেন: “আল্লাহ্’র রাসূল (সা) বিলালের সিন্দুকের ঘরে গেলেন যেখানে তিনি সাদাকাহ্ জমা রাখতেন। সেখানে তিনি (সা) কিছু স্তুপীকৃত খেজুর দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এ খেজুরগুলো কিসের জন্য, বিলাল?” তিনি বললেন, ‘হে রাসূলুল্লাহ্! আমি এগুলো আপনার দূর্দিনের জন্য রেখে দিয়েছি।’ তখন তিনি বললেন, ‘তুমি কি নিজেকে নিরাপদ মনে কর, যখন তুমি ঘুম থেকে উঠো এবং নিজেকে জাহান্নামের ধোঁয়ার মধ্যে আবিস্কার করো?’ এগুলো বিতরণ করে দাও এবং আরশের মালিকের পক্ষ থেকে কোন প্রকার কৃপণতার ভয় করো না।”
এছাড়া, অন্য একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, “রাসূল (সা) এর সময় আব্দুর রহমান ইবন আউফ সাদাকা’র উট ও ভেড়ার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। আর, বিলাল নিযুক্ত ছিলেন সাদাকা’র ফল-ফলাদির দায়িত্বে; আর, মাহমিয়্যাহ ইবন জুয (আল্লাহ্’র রাসূল ও তাঁর পরিবারের) এক পঞ্চমাংশের দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন। আর, খলীফা বলেছেন: “এবং বিলাল তাঁর ব্যয়ের জন্য দায়িত্বশীল ছিলেন।”
আবদুল্লাহ ইবন লাহী আল-হুযানী’র সূত্রে ইবন হিব্বান তার সহীহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি বলেছেন: ‘আমি রাসূল (সা) এর মুয়াজ্জিন বিলালের সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে বিলাল! আল্লাহ্’র রাসূল এর ব্যয়ের পরিমাণ কেমন ছিল?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘তাঁর (ব্যয় করার মত) কিছুই ছিল না। আমি তাঁর রাসূল হিসাবে মনোনীত হবার দিন থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত এ দায়িত্বে ছিলাম। তাঁর কাছে যদি কোন মুসলিম আসতো, যার পরনে কোন কাপড় থাকতো না, তিনি আমাকে দ্রুত কিছু অর্থ ঋণ করে নিয়ে আসার নির্দেশ দিতেন, যেন তিনি ঐ ব্যক্তির জন্য পোষাক ও খাবারের ব্যবস্থা করতে পারেন।’ ইমাম মুসলিম রাসূল (সা) এর ক্রীতদাস আবু রাফি’ থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
‘রাসূল (সা) একটি বাচ্চা উট ধার করেছিলেন। যখন তাঁর কাছে উটের সাদাকাহ্ পৌঁছাল, তখন তিনি আমাকে ঐ উটের মালিককে বাচ্চা উটটি ফেরত দেবার নির্দেশ দিলেন। আমি বললাম, চার বছরের একটি ভাল উট ছাড়া আমি আর কোন উট দেখতে পাচ্ছি না। রাসূল (সা) বললেন, ‘ওটাই তাকে দাও; কারণ, উত্তম মানুষ তারাই যারা ঋণ পরিশোধে উত্তম।’ এছাড়া, ইবনে আব্বাসের হাদীসে এটি উল্লেখিত আছে, যে ব্যাপারে চার ইমাম একমত পোষণ করেছেন:
‘রাসূল (সা) যখন মু’য়াজকে ইয়েমেনে প্রেরণ করেন, তখন তিনি (সা) তাঁকে বলেন:
‘যদি তারা তোমার কথা মেনে নেয়, তবে তাদের জানাবে যে, আল্লাহ্ তা’আলা তাদের উপর সাদাকাহ্ ধার্য করেছেন, যা তাদের মধ্যকার সম্পদশালী ব্যক্তিদের নিকট হতে সংগ্রহ করা হবে এবং দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। যদি তারা এটা মেনে নেয়, তবে তাদের নিকট হতে তাদের সর্বাপেক্ষা ভালো সম্পদ নেয়া থেকে বিরত থাকবে; এবং মজলুমদের অভিশাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করবে; কারণ, তাদের ও আল্লাহ্’র মধ্যে কোন পর্দা থাকে না।”
এছাড়া, আবু হুরাইরাহ থেকে দুটি সহীহ্ গ্রন্থে (সহীহ্ বুখারী ও মুসলিম) বর্ণিত আছে যে: “আল্লাহ্’র রাসূল (সা) উমর (রা) কে সাদাকাহ্ সংগ্রহের জন্য প্রেরণ করেছিলেন।”
খোলাফায়ে রাশেদীনগণও তাঁর পদ্ধতিই অনুসরণ করেছিলেন; এজন্য তাঁরাও তহবিল সংক্রান্ত বিষয়াদি পরিচালনার জন্য কিছু মানুষ নিযুক্ত করেছিলেন। ইবন ইসহাক এবং খলীফা বর্ণনা করেছেন যে: “আবু বকর বাইতুল মাল-এর দায়িত্বে আবু উবাইদাহ ইবন আল-জাররাহ্’কে নিযুক্ত করেছিলেন এবং তারপর, তিনি তাঁকে আল-শামে প্রেরণ করেছিলেন।”
মুয়াকিবের জীবনের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে আল জাহাবী বলেছেন যে, আবু বকর ও উমর তাকে বাইতুল মাল-এর দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আবদুল্লাহ ইবন যুবায়ের হতে ইবন ইসহাক বর্ণনা করেছেন, যা আল-তারাতিব আল-ইদারিয়্যাহ (প্রশাসনিক বিন্যাস) গ্রন্থের রচয়িতা আল-হাকিম কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে, তিনি বলেছেন: “তিনি আবু বকরকে পত্র লিখেন এবং আবু বকর তাকে বাইতুল মাল-এর দায়িত্বে নিয়োজিত করেন এবং উমর ইবনুল খাত্তাব এ বিষয়ে সম্মতি প্রদান করেন।” এখানে আবদুল্লাহ ইবন আল-আরকামকে বোঝানো হয়েছে। ইবন সা’দ তার তাবাকাত গ্রন্থে এবং ইবন হাজার তার আল-ইসাবাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, উমর (রা) এর কোষাধ্যক্ষ ছিল তাঁর ভৃত্য ইয়াছ্ছার ইবন নুমায়ের। ইমাম আহমাদ তাঁর আল-মুসনাদে এবং আব্দুর রাজ্জাক তার আল-মুসান্নাফে লাহিক ইবনে হামিদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “এবং তিনি (উমর) ইবন মাসউদকে বিচারবিভাগ ও বাইতুল মাল-এর দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করলেন।” অর্থাৎ, আল-কুফাতে প্রেরণ করলেন। মালিক ইবন আনাস থেকে খলীফা এবং মালিক ইবন আনাস বর্ণনা করেছেন যায়িদ ইবন আসলাম থেকে, তিনি বলেছেন: “উমর বাইতুল মাল-এর দায়িত্ব দিয়ে আবদুল্লাহ ইবন আরকাম’কে নিযুক্ত করেছিলেন।”
উরওয়া ইবনে আল যুবায়ের থেকে ইবনে খুজায়মা তার সহীহ্ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, ‘আব্দুর রহমান ইবনে আব্দুল ক্বারী বলেছেন, ‘উমর ইবনুল খাত্তাবের সময় আমি বাইতুল মাল-এর দায়িত্বে ছিলাম।’ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের গুণাবলীর বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনে হাজার তার আল-ফাতহ্ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘এবং উমর ও উসমান তাঁকে কুফায় বাইতুল মাল-এর দায়িত্বে নিয়োজিত করেন।’ আল জাশাইয়ারী তার আল-ওজারা ওয়াল কুত্তাব গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ‘মনে করা হয় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর লেখক (scribe) আবদুল্লাহ ইবনে আরকাম ইবনে আবদ ইয়াগুছ তাঁর সময় বাইতুল মাল-এর দায়িত্ব ছিলেন’ অর্থাৎ উসমান এর খিলাফত কালে। আল যুবায়ের ইবনে বক্কর থেকে আল হাকীম আল মুসতাদরাক গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, ‘আবদুল্লাহ ইবনে আরকাম ইবনে আবদ ইয়াগুছ ’উমরের সময়ে এবং উসমানের শাসনামলের শুরুর দিকে বাইতুল মাল এর দায়িত্বে ছিলেন, যে পর্যন্ত না তার মৃত্যু হয়; এবং তিনি কিছুদিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সাহচার্য পেয়েছিলেন।’
আল ইসতি’য়াব গ্রন্থে ইবনে আবদুল বার বর্ণনা করেছেন যে, “উসমানের খিলাফতের সময় যায়িদ ইবনে সাবিত বাইতুল মাল-এর দায়িত্বে ছিলেন; যায়িদ এর ওয়াহিব নামে একজন ক্রীতদাস ছিল। উসমান তাকে বাইতুল মালে সহায়তা করতে দেখেন। উসমান বললেন, ‘কে এই ব্যক্তি?’ যায়িদ প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘আমার ক্রীতদাস।’ তিনি বললেন, ‘আমি তাকে মুসলিমদের সহায়তা করতে দেখছি এবং একারণে সে কিছু পাবার অধিকার লাভ করেছে; আমি তার জন্য এটা (ভাতা) বরাদ্দ করলাম।’ এরপর, তিনি ঐ ক্রীতদাসের জন্য দু’হাজার (দিরহাম) বরাদ্দ করলেন। যায়িদ বললেন, ‘আল্লাহ্’র কসম, আপনি একজন দাসকে দু’হাজার দিতে পারেন না।’ অতঃপর, তিনি তার জন্য একহাজার বরাদ্দ করলেন।’
আল সাফাদি মিশরের পন্ডিতগণ ও রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সাহাবীদের (রা) সম্পর্কে তার গ্রন্থে বলেছেন, ‘আবু রাফি’কে
’আলী ইবনে আবু তালিবের কাছে প্রেরণ করা হলে তিনি তাকে কুফায় বাইতুল মাল-এর দায়িত্ব দেন।’ আল ইসতি’য়াব গ্রন্থে ইবনে আবদুল বার উল্লেখ করেছেন যে, ‘উবায়দুল্লাহ ইবনে রাফি’ আলীর একজন কোষাধ্যক্ষ ও সচিব ছিলেন।’ আল আইনী তার উমদাত উল ক্বারী গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ‘আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহাব আল সুয়্যি’কে আলী সম্মান করতেন, ভালবাসতেন এবং বিশ্বাস করতেন। সেকারণে তিনি আল-কুফা’তে তাকে বাইতুল মাল-এর দায়িত্ব প্রদান করেন।’ এছাড়া, আলী বসরাতে এ কাজের জন্য যিয়াদকে নিযুক্ত করেন। আল জাশিয়্যারী বলেছেন, ‘আল-বসরা ত্যাগ করার সময়, তিনি তাকে আল-খারাজ ও দিওয়ানের দায়িত্ব অর্পণ করেন।’ বাইতুল মাল’কে দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে:
১. রাজস্ব : এর মধ্যে তিনটি দিওয়ান আছে:
– গণীমত ও খারাজ এর দিওয়ান: এর মধ্যে রয়েছে – গণীমত, খারাজ, ভূমি, জিজিয়া, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ এবং কর।
– গণমালিকানাধীন সম্পত্তির দিওয়ান: এর মধ্যে রয়েছে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, খনিজ সম্পদ, সমুদ্র, নদী, খালবিল, ঝর্ণা, বন, তৃণভূমি এবং হিমা (সংরক্ষিত ভূমিসমূহ)।
– সাদাকাহ্’র দিওয়ান: এর মধ্যে রয়েছে টাকা, ব্যবসায়িক পণ্য, ফসল ও ফলমূল, উট, গরু ও ভেড়ার উপর যাকাত ।
২. ব্যয় : এর মধ্যে আটটি দিওয়ান রয়েছে:
- খলীফার বাসভবনের দিওয়ান
- রাষ্ট্রীয় সেবার দিওয়ান
- মঞ্জুরীর দিওয়ান
- জিহাদের দিওয়ান
- সাদাকাহ্ ব্যয়ের দিওয়ান
- গণমালিকানাধীন সম্পদের ব্যয়ের দিওয়ান
- জরুরী অবস্থার দিওয়ান
- সাধারণ বাজেট, হিসাব-নিকাশ ও পরিদর্শনের দিওয়ান
প্রশাসনিক ব্যবস্থা (জনকল্যাণ বিভাগ, Administrative System)

রাষ্ট্র পরিচালনা ও জনগণের স্বার্থসংক্রান্ত কার্যাবলী বিভিন্ন অফিস, বিভাগ এবং প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত হয় – যাদের কাজ হল জনগণের স্বার্থসংক্রান্ত বিষয়াবলী ও রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডের সুব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। প্রত্যেক অফিসের (মাসলাহা) প্রধান হিসেবে একজন মহাব্যবস্থাপক, প্রত্যেক বিভাগ (দায়রাহ্) ও প্রশাসনের (ইদারা) প্রধান হিসেবে একজন পরিচালক এর পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন। এই পরিচালকগণ পেশাগতভাবে তাদের অফিস, বিভাগ ও প্রশাসনের মহাপরিচালকের কাছে এবং আইন ও সাধারণ নিয়মনীতি পালনের ক্ষেত্রে ওয়ালী বা আমীলের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাধারণত প্রশাসন পরিচালনা ও জনগণের বিষয়াদি দেখভাল করতেন এবং প্রশাসনে কর্মরত সচিবদেরও তিনি (সা) নিয়োগ দিতেন। এভাবেই, রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনার লোকদের দেখাশোনার দায়িত্ব নেন, তাদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করেন, তাদের মধ্যকার বিভিন্ন সম্পর্ক নির্ধারণ করেন, তাদের সকল প্রয়োজন নিশ্চিত করেন এবং তাদের জন্য যথোপযুক্ত বিষয়ে নির্দেশনা দিতেন। এসবই ছিল প্রশাসনিক বিষয় যা তাদের জীবনের বিভিন্ন জটিলতা বা সমস্যা দূর করে জীবনকে করেছিল সহজ।
শিক্ষাক্ষেত্রে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) দশজন মুসলিম শিশুকে শিক্ষা দেওয়াকে কাফের বন্দীদের জন্য মুক্তিপণ হিসেবে ধার্য করেছিলেন, যেখানে মুক্তিপণ গণীমতের মালের বিনিময়ে দেয়া হত যা মুসলিমদের সম্পদ হিসাবে গণ্য হত। এভাবেই তিনি (সা) মুসলিমদের শিক্ষা লাভের ব্যাপারটি নিশ্চিত করেছিলেন।
স্বাস্থ্য ক্ষেত্র উন্নয়নের জন্য তিনি (সা) তাঁর নিজের জন্য উপহার হিসেবে প্রাপ্ত একজন ডাক্তারকে মুসলিমদের সেবার কাজে নিয়োজিত করেছিলেন। বস্তুতঃ রাসূল (সা) তাঁর নিজের জন্য প্রাপ্ত উপহারটি নিজে ব্যবহার না করে কিংবা নিজে গ্রহণ না করে জনসেবার জন্য নিয়োজিত করার ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, স্বাস্থ্যসেবা মুসলিমদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট একটি কাজ।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এক ব্যক্তিকে ভিক্ষা করার বদলে আগে একটি জামা ও পরে একটি কুঠার ক্রয় করার নির্দেশ দিলেন। তারপর সেই কুঠার দিয়ে বন থেকে কাঠ কেটে তিনি (সা) তাকে বাজারে বিক্রির নির্দেশ দিয়েছিলেন। কারণ, ভিক্ষার ক্ষেত্রে ভিক্ষুককে কেউ ভিক্ষা দিতেও পারে আবার প্রত্যাখানও করতে পারে। এভাবে রাসূল (সা) কর্তৃক লোকটির কর্মসংস্থানের ঘটনা প্রমাণ করে যে, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাও মুসলিমদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট একটি কাজ। তিরমিযী সমর্থিত আহমাদ বর্ণিত একটি হাদীসে উল্লেখ আছে যে,
‘আনসারদের মধ্য হতে এক ব্যক্তি নবী (সা) এর কাছে আসলো এবং তাঁর কাছে সাদাকা চাইলো। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার ঘরে কি কিছুই নেই?’ লোকটি বললো,‘আছে।’ তিনি (সা) বললেন, ‘ওগুলো আমার কাছে নিয়ে আসো।’ লোকটি রাসূল (সা) এর কথা অনুসারে কাজ করলো। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এগুলো হাতে নিয়ে বললেন, ‘এ দু’টিকে কে খরিদ করবে?’ একজন লোক বললো, ‘দুই দিরহামের বিনিময়ে আমি এগুলো ক্রয় করতে চাই।’ তিনি (সা) জিনিসগুলো তাকে দিলেন এবং বিনিময়ে দিরহাম দু’খানা নিলেন এবং দিরহাম দুটো আনসারীকে দিয়ে বললেন, ‘একটি দিরহাম পরিবারের জন্য খরচ কর এবং আরেকটি দিয়ে কুঠার খরিদ করে আমার কাছে নিয়ে এস।’ লোকটি তাই করল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে বললেন, ‘যাও কুঠার দিয়ে বন থেকে কাঠ সংগ্রহ কর ও বিক্রয় কর; আর পনের দিনের আগে আমার সাথে দেখা করো না।’ লোকটি এ কথা মেনে নিল এবং পরবর্তীতে দশ দিরহাম নিয়ে ফেরত এল।’
(সূনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-১৬৪১)আল বুখারী থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,
‘মানুষের কাছে ভিক্ষা করার চাইতে তোমাদের জন্য একটি রশি দিয়ে জ্বালানী কাঠ বেঁধে পিঠে বয়ে নিয়ে বাজারে বিক্রি করে তার মুখ (সম্মান) রক্ষা করা শ্রেয়তর; কারণ মানুষ তাকে ভিক্ষা দিতেও পারে আবার প্রত্যাখ্যানও করতে পারে।’
(সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-২০৭৫)রাস্তাঘাট নির্মাণের ক্ষেত্রে, রাসূল (সা) তাঁর সময়ে বিবাদের আশঙ্কার ক্ষেত্রে রাস্তার প্রশস্ততা সাত হাত করবার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আবু হুরাইরার সূত্রে আল বুখারী বর্ণনা করেছেন যে,
‘বিবাদের আশঙ্কার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সিদ্ধান্ত ছিল রাস্তার প্রশস্ততা হবে সাত হাত।’
(সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং২৪৭৩)আর মুসলিমে বর্ণিত
‘যদি রাস্তার ব্যাপারে বিবাদ হয় তাহলে তোমরা এর প্রশস্ততা সাত হাত করো।’
তখনকার প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল। শাফীঈ’র মতানুযায়ী, প্রয়োজনে রাস্তার প্রশস্ততা এর থেকে বেশী করাও অনুমোদিত।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) রাস্তার উপর দখল প্রতিষ্ঠা বা আগ্রাসন থেকে নিবৃত্ত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তাবারানী (আল জামী’) আল সগীরে বর্ণনা করেছেন যে:
‘যে ব্যক্তি মুসলিমদের রাস্তা থেকে এক হাত পরিমাণ জায়গা নিল, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাকে সাত জমীনের মাটি দ্বারা আবদ্ধ করবেন।’
সেচকাজের ক্ষেত্রে বলা যায় যে, আল যুবায়ের তার জমির উপর দিয়ে যাওয়া একটি জলধারার পানি দিয়ে সেচকার্য নিয়ে একজন আনসারের সাথে দ্বন্দে জড়িয়ে পড়েন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে বলেন,
‘হে যুবায়ের, সেচকার্যের পর তোমার প্রতিবেশীকে পানি ছেড়ে দাও।’
(মুসলিমের বর্ণিত এ হাদীসটির ব্যাপারে ঐকমত্য আছে)এভাবেই রাসূল (সা) মুসলিমদের প্রতিটি বিষয় দেখাশুনা করতেন এবং কোন প্রকার জটিলতা ব্যতীত সহজ সরল ভাবে তাদের সমস্যাসমূহ সমাধান করতেন। এ সমস্ত কার্য পরিচালনার জন্য তিনি (সা) কিছু কিছু সাহাবীদের (রা) সাহায্য নিতেন, এবং এভাবেই তিনি (সা) জনগণের বিষয়সমূহ দেখাশুনার বিষয়টিকে খলীফার তত্ত¡াবধানের অধীন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন; কিংবা, কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি (সা) এ বিষয়সমূহ দেখাশুনা করার জন্য যোগ্য পরিচালক নিয়োগ করেন। এজন্যই আমরা খলীফার গুরুভার লাঘব করার জন্য এটিকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিশেষ করে, বর্তমানে যখন জনগণ সম্পর্কিত বিষয়সমূহ বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শাখাপ্রশাখা বিস্তার করেছে। সুতরাং, জনগণের বিষয়সমূহ দেখাশুনা করার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান (জনকল্যাণ বিভাগ) থাকবে, যার দায়িত্বভার একজন যোগ্য পরিচালকের হাতে ন্যস্ত করা হবে, এবং এমন উপায় উপকরণ ও পদ্ধতিতে তা পরিচালনা করা হবে যা রাষ্ট্রে বসবাসরত নাগরিকদের জীবনকে সহজতর করে।
এ ব্যবস্থাটি বিভিন্ন প্রশাসন, বিভাগ ও পরিষদের দ্বারা গঠিত হবে। প্রশাসন হল রাষ্ট্রের যে কোন কর্মকান্ড সম্পর্কিত সার্বিক পরিচালনা, যেমন: নাগরিকত্ব, যাতায়াত, মুদ্রা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান, রাস্তাঘাট এবং অন্যান্য বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কিত। এই প্রশাসন তার নিজস্ব কর্মকান্ড এবং এর অধীনস্থ বিভাগ ও পরিষদ সমূহের পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। প্রতিটি বিভাগ আবার তার নিজস্ব কর্মকান্ড এবং এ বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন পরিষদের পরিচালনা করবে। পরিষদগুলো আবার তাদের নিজস্ব কর্মকান্ড এবং এর অধীনস্থ প্রতিটি শাখা ও বিভাগ পরিচালনা করবে।
বস্তুতঃ এই প্রশাসন, বিভাগ ও পরিষদ প্রতিষ্ঠা করার মূল লক্ষ্য হল রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ড সুষ্ঠভাবে সম্পাদন করা এবং সেইসাথে, জনস্বার্থ সম্পর্কিত বিষয়সমূহ দেখাশুনা করা।
এছাড়া, এইসব প্রশাসন, বিভাগ ও পরিষদগুলোর সুষ্ঠ পরিচালনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অবশ্যই এদের জন্য পরিচালক নিযুক্ত করতে হবে। প্রতিটি প্রশাসনে একজন মহাব্যবস্থাপক নিয়োগ করা হবে, যিনি সরাসরি এর দায়িত্বে থাকবেন এবং এর অধীনস্থ সকল বিভাগ ও পরিষদের কর্মকান্ড তদারকী করবেন। আবার, প্রত্যেক বিভাগ ও পরিষদে একজন পরিচালক নিয়োগ করা হবে, যিনি সরাসরি এর দায়িত্বে থাকবেন এবং সংশ্লিষ্ট সকল শাখা ও বিভাগসমূহের কর্মকান্ড পর্যবেক্ষণ করবেন।
প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রশাসন পরিচালনার একটি বিশেষ পদ্ধতি, এটি শাসনকার্য সম্পর্কিত নয়
প্রশাসনিক ব্যবস্থা হল কোন কাজ সম্পাদনের পন্থা (style) এবং মাধ্যম (means)। সুতরাং, এর জন্য সুনির্দিষ্ট কোন শারী’আহ্ দলিলের প্রয়োজন নেই। এজন্য, প্রশাসনের উৎস বা মূলকে নির্দেশ করে এমন সাধারণ দলিল-প্রমাণই যথেষ্ট। সুতরাং, এটা বলা ভুল হবে যে, এই পন্থা বা মাধ্যমগুলো মানুষের কাজ, যার প্রতিটির জন্য শারী’আহ্ দলিলের প্রয়োজন। কারণ, এই বিষয় সম্পর্কিত কর্মকান্ডগুলোর মূল সাধারণ দলিলের মাধ্যমে প্রমাণিত। সুতরাং, এই মূল থেকে উৎসারিত সকল শাখাপ্রশাখা এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত, যতক্ষণ পর্যন্ত না এর শাখাপ্রশাখার ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট দলিল থাকে। সেক্ষেত্রে, এ নির্দিষ্ট বিষয়ে শারী’আহ্ দলিলের অনুসরণ করতে হবে। যেমন: আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,
‘এবং তোমরা যাকাত আদায় কর।’
[সূরা মুয্যাম্মিল: ২০]যা মূলতঃ যাকাতের ব্যাপারে একটি সাধারণ দলিল। এরপর, এ কাজের শাখাপ্রশাখার ব্যাপারেও দলিল এসেছে। যেমন: নিসাবের পরিমাণ, যাকাত সংগ্রহকারী ব্যক্তিদের বিষয়ে এবং কোন ধরনের মানুষের কাছ থেকে যাকাত আদায় করা হবে ইত্যাদি। এই সমস্ত কর্মকান্ডই ‘তোমরা যাকাত আদায় কর’ এ আয়াত থেকে উৎসারিত হয়েছে।
কিন্তু, যাকাত সংগ্রহকারী ব্যক্তিবর্গ কোন উপায়ে যাকাত সংগ্রহ করবেন এ ব্যাপারে কোন দলিল পাওয়া যায়নি। যেমন: তারা কি পায়ে হেঁটে সংগ্রহ করবে, না কোন বাহনে চড়ে করবে? তারা কি এ কাজে তাদের সাহায্য করার জন্য কোন কর্মচারী নিযুক্ত করবে? তারা কি কোন রেকর্ড অনুযায়ী তা সংগ্রহ করবে? তারা কি এ কাজের জন্য কোন কার্যালয় প্রতিষ্ঠিত করবে, যেখানে তারা সকলে একত্রিত হবে? তারা কি কোন গুদামঘর তৈরি করবে যেখানে তারা তাদের সংগৃহীত মালামাল জমা করবে? এ স্থাপনাসমূহ কি মাটির নীচে হবে, নাকি শস্য রাখবার ঘরের মতই হবে? নগদ যাকাত কি ব্যাগে নাকি তহবিলে জমা দিতে হবে? বস্তুতঃ এ সমস্ত কাজ ‘এবং তোমরা যাকাত আদায় কর’ এই আয়াত থেকে উৎসারিত এবং এ আয়াতের নির্দেশাধীন কাজ।
সুতরাং, এ সকল কাজই যাকাত আদায়ের সাধারণ দলিল-প্রমাণের আওতাধীন। কারণ, এ সকল কাজের জন্য কোন সুনির্দিষ্ট দলিল-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়া, এ কাজগুলো আসলে উপায় বা পন্থার সাথে সম্পর্কিত। সুতরাং, কোন কাজ করার উপায় বা পন্থা হচ্ছে সে কাজের অধীনস্থ একটি বিষয়। এ কারণেই কোন কাজের উপায় বা পন্থা নির্ধারণের জন্য কোন নির্দিষ্ট দলিল-প্রমাণের প্রয়োজন হয় না। কারণ, মূল কাজটির ক্ষেত্রে প্রাপ্ত দলিলই এ বিষয়ের দলিল হিসাবে যথেষ্ট হয়।
সুতরাং, প্রশাসনিক পন্থা বা মাধ্যম যে কোন ব্যবস্থা থেকে গ্রহণ করা যেতে পারে, যদি না কোন সুনির্দিষ্ট শারী’আহ্ দলিলের দ্বারা ঐ বিশেষ পন্থা বা মাধ্যম গ্রহণ করা নিষিদ্ধ বলে প্রমাণিত হয়। এ ধরনের পরিস্থিতি ছাড়া, প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানকে সুষ্ঠ ও সুন্দরভাবে পরিচালনা এবং জনগণের বিষয়সমূহ দেখাশুনা করার জন্য যে কোন পন্থা বা উপায়ে প্রশাসন পরিচালনা করা যায়। এর কারণ হল, প্রশাসন পরিচালনার পন্থা বা উপায় কোন শারী’আহ্ বিধান নয় যার জন্য শারী’আহ্ দলিল প্রয়োজন। এ কারণে, উমর (রা) তাঁর সেনাসদস্য ও নাগরিকদের নামের তালিকা করার প্রয়োজনে দিওয়ান নিযুক্ত করেছিলেন যেন রাষ্ট্রীয় বা গণমালিকানাধীন সম্পদভূক্ত অর্থ থেকে তাদের জন্য বরাদ্দকৃত মজুরী বা বেতনভাতা সুষ্ঠভাবে বিতরণ করা যায়।
আল হারিস ইবনু নুফায়েলের বরাত দিয়ে ’আবিদ ইবনে ইয়াহিয়া বর্ণনা করেছেন যে, উমর মুসলিমদের সাথে দিওয়ান এর তালিকার ব্যাপারে পরামর্শ করেন। তখন আলী (রা) তাঁকে পরামর্শ দিয়ে বলেন যে, ‘প্রতি বছরের সংগৃহীত সম্পদ না রেখে সবই আপনি বন্টন করে দিন।’ উসমান ইবনে আফফান বলেন, ‘আমি দেখছি যে বড় আকারের সম্পদ জনগণের মাঝে বন্টিত হয়। যারা পেল আর যারা পেল না এদের কোন তালিকা না করা হলে আমার ভয় হয় পরিস্থিতি আওতার বাইরে চলে যাবে।’ এ বিষয়ে আল ওয়ালিদ ইবনু হিশাম ইবনে আল মুগীরা বলেন, ‘আমি আল-শামে ছিলাম এবং লক্ষ্য করেছি যে, সেখানকার বাদশাহ্গণ সৈন্য সংগ্রহের সময় দিওয়ান ব্যবস্থার প্রচলন করেছিল। সুতরাং, আপনি এটার প্রচলন করছেন না কেন?’ তখন উমর তাঁর উপদেশ গ্রহণ করেন এবং কুরাইশ যুবক আকীল ইবনে আবি তালিব, মাখরামা ইবনে নুফায়েল এবং যুবায়ের ইবনে মাতাম’কে ডেকে পাঠান এবং নির্দেশ দেন যে, ‘প্রত্যেক বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে জনসংখ্যার তালিকা প্রস্তুত কর।’
যখন ইসলাম ইরাকে পৌঁছাল, তখন তহবিল সংগ্রহ ও বেতনভাতা পরিশোধের জন্য দিওয়ান পূর্বের মতই অব্যাহত থাকে। আল-শামের দিওয়ান ছিল ল্যাটিন ভাষায়, কারণ এটি রোমান সাম্রাজ্যের অংশ ছিল; আর, বাগদাদের দিওয়ান ছিল ফারসী ভাষায়, কারণ এটি পারস্য সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। খলীফা আব্দুল মালিক ইবন মারওয়ানের সময় আল-শামের দিওয়ান আরবী ভাষায় রূপান্তর করা হয় (৮১ হিজরীতে)। জনগণের স্বার্থরক্ষার নিমিত্তে প্রয়োজন অনুসারে বেশকিছু দিওয়ান চালু করা হয়। সেনাসদস্যদের অর্ন্তভূক্তি ও বরাদ্দকৃত মজ্ঞুরীর প্রয়োজনে সেনাবাহিনীতে দিওয়ানের প্রচলন করা হয় এবং বিভিন্ন ধরনের ফি ও লেনদেনের দাবি দাওয়ার তালিকা সংরক্ষরণের আরও কিছু দিওয়ানের প্রচলন করা হয়। আরেকটি দিওয়ানের সূচনা করা হয় প্রত্যেক ওয়ালী ও আমীলের নিয়োগ ও পদচ্যুতির তালিকা সংরক্ষণের জন্য। বাইতুল মালের আয় ও ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণের জন্যও দিওয়ানের প্রচলন হয়। দিওয়ানের প্রচলণ হয়েছিল প্রয়োজনের তাগিদে এবং সময়ের আবর্তে এর পন্থায় অনেক পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হয়েছে। কারণ, এগুলো হল পন্থা বা মাধ্যম, যা প্রয়োজনের তাগিদে এবং সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন করা অনুমোদিত।
প্রতিটি দিওয়ানে অন্যান্য কর্মচারীসহ একজন প্রধান নিয়োগ করা হত। কখনো কখনো দিওয়ানের প্রধানকে তার অধীনস্থ কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা প্রদান করা হত; আবার, কখনো বা তার জন্য তা নিয়োগ করে দেয়া হত।
এভাবে, প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনানুসারে এবং যে পন্থা বা উপায় উক্ত কাজকে সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করতে সহায়তা করবে, সে অনুযায়ী দিওয়ান প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে; এবং এক্ষেত্রে বিভিন্ন এলাকা, বা উলাই’য়াহ্ ভেদে বিভিন্ন রকম পন্থা ও উপায় অনুসরণ করা অনুমোদিত।
সরকারী কর্মচারীদের দায়িত্ব সম্পর্কে বলা যায় যে, একদিকে তারা রাষ্ট্রের বেতনভূক্ত কর্মচারী এবং অন্যদিকে, একইসাথে তারা রাষ্ট্রের নাগরিক। সুতরাং, পেশাগত দিক থেকে তারা তাদের নিজ নিজ বিভাগ বা পরিষদের ব্যবস্থাপকদের কাছে জবাবদিহিতা করতে বাধ্য; আবার, নাগরিক হিসাবে তারা শাসকের কাছে, অর্থাৎ, খলীফা, তার সহকারীবৃন্দ বা ওয়ালীদের কাছেও জবাবদিহিতার ব্যাপারে দায়বদ্ধ। এজন্য তাদের শারী’আহ্ বিধিবিধান এবং প্রশাসনিক নিয়মনীতি সবই মেনে চলতে হবে।
প্রশাসনিক নীতি
প্রশাসনিক নীতির ভিত্তি হল ব্যবস্থার সহজীকরণ, কাজের গতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসকদেও যোগ্যতা নিশ্চিত করা। জনগণের স্বার্থ নিশ্চিত করার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই এ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। কারণ, যদি কোন ব্যক্তির কর্মসংস্থান বা চাকুরীর প্রয়োজন হয়, তবে তার এ প্রয়োজন যথাসম্ভব দ্রুততার সাথে ও দক্ষ প্রক্রিয়ায় পূরণ করতে হবে। আল্লাহ্’র রাসূল (সা) বলেছেন:
‘অবশ্যই আল্লাহ্ সবকিছু নিখুঁতভাবে সম্পাদনের নির্দেশ দিয়েছেন; যখন তুমি হত্যা কর, তখন তা সুন্দরভাবে কর এবং যখন জবাই কর তখনও তা সুন্দরভাবে কর।’
(এ হাদীসটি সাদ্দাদ বিন আওসের সূত্রে সহীহ্ মুসলিম বর্ণনা করেছেন, হাদীস নং-১৯৫৫)সুতরাং, নিখুঁত, পূর্ণাঙ্গ বা সঠিকভাবে কার্যসম্পাদন করা শারী’আহ্ কর্তৃক নির্দেশিত। আর, এ যোগ্যতা অর্জন করতে হলে প্রশাসনকে তিনটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে:
প্রথমত: প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে সহজ-সরল করতে হবে, যেন তা যে কোন প্রক্রিয়াকে দ্রুতগতিসম্পন্ন করে মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজতর করে; বিপরীতক্রমে, প্রশাসনিক জটিলতা মানুষের জীবনকে দূর্বিসহ করে।
দ্বিতীয়ত: লেনদেনের প্রক্রিয়াকে দ্রুতগতিসম্পন্ন করতে হবে, যেন তা জনগণকে অহেতুক বিলম্বজনিত হয়রানি থেকে রক্ষা করে।
তৃতীয়ত: কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দক্ষতা ও যোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে; কারণ, তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতার উপরই নির্ভর করবে কাজের পূর্ণাঙ্গতা ও ফলাফল।
রাষ্ট্রীয় বিভাগে কাজের যোগ্যতা
যে কোন ব্যক্তি, যারা রাষ্ট্রের নাগরিক ও যোগ্য, হোক সে নারী কিংবা পুরুষ, মুসলিম কিংবা অমুসলিম, প্রশাসনের যে কোন বিভাগের পরিচালক বা কর্মচারী হিসাবে নিযুক্ত হতে পারে।
এ নীতিটি ইজারা বা অর্থের বিনিময়ে নিযুক্ত করা সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানের ভিত্তিতে গৃহীত হয়েছে, যেখানে নারী বা পুরুষ, মুসলিম বা অমুসলিম যে কাউকে অর্থের বিনিময়ে নিযুক্ত করা অনুমোদিত। এর কারণ হল ইজারা’র জন্য প্রাপ্ত দলিলপ্রমাণ সার্বজনীন। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:
‘যদি তারা তোমাদের সন্তানদেরকে স্তন্যদান করে, তবে তাদেরকে প্রাপ্য পারিশ্রমিক দেবে’
[সূরা ত্বালাক: ৬]এটি হল সার্বজনীন দলিল।
আবু হুরাইরা থেকে বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,
“আল্লাহ্ বলেছেন, ‘আমি হাশরের ময়দানে তিন ধরনের ব্যক্তিকে কঠিন জবাবদিহিতার মুখোমুখি করব… এবং সে ব্যক্তি যে কাউকে কাজে নিয়োগ দিল, তার কাছ থেকে কাজ আদায় করে নিল কিন্তু, তাকে পারিশ্রমিক দিল না।’
(সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-২২৭)এই দলিলটিও সার্বজনীন। এছাড়া, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) স্বয়ং বনু আল-দীল গোত্রের এক অমুসলিম ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের বেতনভূক্ত কর্মচারী হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন, যা প্রমাণ করে যে, মুসলিম নাগরিকের মতো রাষ্ট্রের একজন অমুসলিম নাগরিককেও প্রশাসনে নিযুক্ত করা অনুমোদিত। এছাড়া, এ বিষয়ে দলিলের সার্বজনীনতা প্রমাণ করে যে, পুরুষের মতো একজন নারীকেও এ সমস্ত কাজের জন্য নিয়োগ করা অনুমোদিত। সুতরাং, নারীকে সরকারী কোন বিভাগের পরিচালক বা কর্মচারী যে কোন পদে নিয়োগ দেয়া যেমন অনুমোদিত; তেমনিভাবে, একজন অমুসলিম নাগরিককেও পরিচালক বা কর্মচারী যে কোন পদে নিযুক্ত করা অনুমোদিত। কারণ, এরা সকলেই রাষ্ট্রের বেতনভূক্ত কর্মচারী (শাসক নন) এবং কর্মচারী নিযুক্ত করার সাধারণ দলিল-প্রমাণই এক্ষেত্রে যথেষ্ট।
বিচার বিভাগ

আদালতের রায় কার্যকর করার লক্ষ্যে রায় প্রদান করা বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব। এ বিভাগ জনগণের মধ্যকার বিবাদের মীমাংসা করে, জনস্বার্থ ক্ষুন্ন হতে পারে বা জনস্বার্থের জন্য হুমকীস্বরূপ বিষয়সমূহ প্রতিহত করে এবং জনগণ ও শাসনব্যবস্থার সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গের মধ্যকার বিবাদ নিরসন করে, এসব ব্যক্তিবর্গ হতে পারেন শাসক, সরকারী কর্মকর্তা, খলীফা বা অন্য কোন ব্যক্তি।
ইসলামী বিচারব্যবস্থার উৎস ও এর বৈধতার দলিল হল আল্লাহ্’র কিতাব ও রাসূল (সা) এর সুন্নাহ্।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘আর আপনি তাদের পারষ্পরিক বিষয়সমূহে আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তদানুযায়ী ফয়সালা করুন।’
[সূরা মায়েদা: ৪৯]তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,
‘তাদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্য যখন তাদেরকে আল্লাহ্ ও রাসূলের দিকে আহ্বান করা হয়, তখন তাদের মধ্য হতে কোন কোন দল মুখ ফিরিয়ে নেয়।’
[সূরা নূর: ৪৮]সুন্নাহ্’র ক্ষেত্রে বলা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) নিজে বিচারব্যবস্থার দায়িত্বে ছিলেন এবং তিনি (সা) স্বয়ং লোকদের মধ্যে বিচার-ফায়সালা করতেন।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) নিজে বিচারকদের নিয়োগ দিতেন। তিনি (সা) আলীকে ইয়েমেনের বিচারক হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন এবং বিচারকার্য পরিচালনার জন্য এভাবে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে,
‘যদি দুইজন ব্যক্তি তোমার কাছে বিচারের জন্য আসে তাহলে ততক্ষণ পর্যন্ত একজনের পক্ষে রায় দিও না যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি অপরজনের কথা শুনো; আর, এভাবেই তুমি লোকদের মধ্যে ফায়সালা করতে পারবে।’
(সূনানে তিরমিযী, হাদীস নং-১৩৩১ এবং মুসনাদে আহমাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৬৫)আহমেদ এর অন্য এক বর্ণনায় পাওয়া যায় যে:
‘যদি দু’জন বিবাদমান ব্যক্তি তোমার সামনে বসে তবে ততক্ষণ পর্যন্ত কোন কথা বলো না যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি অন্যজনের কথা শোন, যেভাবে তুমি প্রথমজনের কথা শুনেছো।’
(মুসনাদে আহমাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৬৫)এছাড়া, তিনি (সা) মুয়াজকে আল-জানাদের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন। উল্লেখিত এ প্রতিটি ঘটনা বিচারব্যবস্থার বৈধতাকে প্রমাণ করে।
বিচারব্যবস্থার সংজ্ঞার মধ্যে জনগণের মধ্যকার বিবাদ নিষ্পত্তি করা অন্তর্ভূক্ত। এছাড়া, এর মধ্যে হিসবাহ্ (জনগণের অধিকার) ও অন্তর্ভূক্ত, যার অর্থ হল: “বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জনগণকে শারী’আহ্ বিধিবিধান সম্পর্কে অবহিত করা, যে বিধিবিধান লঙ্ঘনের ফলে জনস্বার্থ ক্ষুন্ন বা জনগণের অধিকার বিনষ্ট হয়।” এই বিষয়টি খাদ্যের স্তুপ সম্পর্কিত হাদীসে স্পষ্টভাবে নির্দেশিত আছে। আবু হুরাইরার বরাত দিয়ে সহীহ্ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে,
‘রাসূলুল্লাহ্ (সা) একবার খাবারের একটি স্তুপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি স্তুপের ভেতর তার আঙ্গুল প্রবেশ করানোর পর আর্দ্রতা অনুভব করলেন এবং তখন বিক্রেতাকে বললেন, ’এটা কি?’ তখন উক্ত বিক্রেতা তাকে বললেন, ‘হে ‘রাসূলুল্লাহ্ (সা), এগুলো বৃষ্টিতে ভিজে গেছে।’ তখন তিনি (সা) বললেন, ‘তুমি এগুলোকে উপরে রাখছ না কেন যাতে লোকেরা দেখতে পায়? যে প্রতারণা করে সে আমাদের কেউ নয়।’
(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১০২)এছাড়া, বিভাগের মধ্যে মাযালিম (অন্যায় আচরণ) ও অন্তর্ভূক্ত। কারণ, মাযালিম বিচারকার্যের অংশ, শাসনকার্যের নয়। প্রকৃত অর্থে, মাযালিম বলতে শাসকের বিরুদ্ধে কৃত অভিযোগকে বোঝায়। মাযালিমকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে: “সাধারণ জনগণ এবং খলীফা কিংবা, তার কোন ওয়ালী বা কর্মকর্তার মধ্যকার বিবাদ নিরসনের জন্য বাস্তবায়নের নিমিত্তে শারী’আহ্ রায় প্রদান করা; কিংবা, জনগণকে শাসন করার নিমিত্তে ব্যবহৃত কোন শারী’আহ্ দলিলের ব্যাখ্যার ব্যাপারে জনগণ ও শাসকের মধ্যে কোন প্রকার মতপার্থক্যের সৃষ্টি হলে সে বিষয়টি নিরসন করা।” রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর মূল্য নির্ধারণ সম্পর্কিত হাদীসে মাযালিম -এর ব্যাপারটি উল্লেখিত আছে, যেখানে তিনি (সা) বলেছেন:
‘এবং আমি অবশ্যই আশা করি যে, আমি আল্লাহ্ ওয়া জাল্লার সামনে এমনভাবে হাজির হব যাতে কেউ আমার বিরুদ্ধে মাযালিমা’র (অন্যায় আচরণের) অভিযোগ না করতে পারে, সেটা রক্ত সম্পর্কিত হোক বা অর্থ সম্পর্কিতই হোক।’
(আনাসের বরাত দিয়ে আহমাদ এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন; দেখুন: আল হাইছামী, মাজমা’ আল-জাওয়ায়িদ, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১০২)এ হাদীসটি আমাদের দিকনির্দেশনা দেয় যে, শাসক, ওয়ালী অথবা জনপ্রশাসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যে মাযালিমের বিচারকদের নিকট পেশ করতে হবে এবং তিনি প্রয়োগের নিমিত্তে এ ব্যাপারে শারী’আহ্ বিধিবিধান অনুযায়ী রায় প্রদান করবেন।
সুতরাং, রাসূল (সা) এর হাদীস ও কর্মকান্ড থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে, বিচারব্যবস্থার সংজ্ঞার মধ্যে তিনটি বিষয় অন্তর্ভূক্ত এবং এগুলো হল: জনগণের মধ্যকার বিবাদ নিরসন করা, জনগণের অধিকার ক্ষুন্ন হতে পারে এমন কর্মকান্ড প্রতিরোধ করা এবং জনগণ ও শাসকের মধ্যকার বিরোধ অথবা জনপ্রশাসক ও জনগণের মধ্যকার বিরোধের মীমাংসা করা। বিচারকদের প্রকারভেদ
ইসলামী বিচারব্যবস্থায় তিন ধরনের বিচারক রয়েছে
১. কাজী আল-খুশুমাত: যিনি হুদুদ (শাস্তি সম্পর্কিত) এবং লেনদেন বিষয়ে জনগণের মধ্যকার বিবাদ নিরসন করবেন।
২. কাজী আল-মুহতাসিব: যিনি কোন আইন লঙ্ঘনের কারণে যদি জনস্বার্থ ক্ষুন্ন বা জনসম্পদ বিনষ্ট হয় তাহলে সে বিষয়ে বিচার করবেন।
৩. কাজী আল- মাযালিম: যিনি রাষ্ট্র এবং জনগণের মধ্যকার বিবাদের নিষ্পত্তি করবেন।
কাজী আল-খুশুমাত (যিনি জনগণের মধ্যকার বিবাদ নিরসন করবেন) এর ব্যাপারে দলিল হল রাসূল (সা)এর কর্মকান্ড এবং রাসূল (সা) কর্তৃক বিভিন্ন অঞ্চলে বিচারক নিযুক্তকরণ। যেমন: তিনি মুয়াজ ইবন জাবালকে ইয়েমেনের একটি অঞ্চলের বিচারক হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
কাজী আল-মুহতাসিব (যিনি জনস্বার্থ ক্ষুন্ন হওয়া সংক্রান্ত ব্যাপারে বিচার করবেন) এর ব্যাপারে দলিল হল রাসূল (সা) এর কাজ এবং উক্তি যেখানে তিনি বলেছেন: “যে প্রতারণা করে সে আমাদের কেউ নয়।” [এটি আবু হুরাইরার বরাত দিয়ে আহমাদ বর্ণিত একটি হাদীসের অংশ]; এ হাদীস থেকে এটি প্রমাণিত হয় যে, রাসূল (সা) প্রতারকদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করতেন এবং তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করতেন।
এছাড়া, তিনি (সা) ব্যবসায়ীদের ব্যবসাকালে সত্য কথা বলার এবং সাদাকা প্রদানের নির্দেশ দিতেন। কায়েস ইবনে আবি ঘারজা আল কিনানীর সূত্রে আহমাদ বর্ণনা করেছেন যে, আবি ঘারজা বলেছেন: “আমরা মদিনাতে সাধারণত মালামাল ভর্তি কার্গো ক্রয় করতাম এবং নিজেদের ফরিয়া বলে পরিচয় দিতাম। রাসূল (সা) আমাদের কাছে এলেন এবং আমাদের উত্তম নামে অভিহিত করলেন এবং বললেন,
‘হে ব্যবসায়ীগণ, অবশ্যই ব্যবসার সাথে শপথ গ্রহণ ও কথাবলার বিষয়গুলো জড়িত। সুতরাং, তোমরা এর সাথে সাদাকাকে সম্পর্কিত করে নাও।’
এছাড়া, আবু আল মিনহাল থেকে আহমাদ বর্ণনা করেছেন যে:
‘জায়েদ ইবনে আরকাম ও আল বারা ইবনু ’আযিব ব্যবসায়িক অংশীদার ছিল। তারা কিছু রৌপ্য নগদ অর্থে এবং কিছু বাকীতে খরিদ করল। এ খবর যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর নিকট পৌঁছালো তখন তিনি নির্দেশ দিলেন যে, ‘যেখানে নগদ পরিশোধ করা হয়েছে সেখানে কোন ক্ষতি নেই; কিন্তু, যা বাকীতে বিক্রয় করা হয়েছে তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।’ এভাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে ঋণের সাথে যুক্ত সুদ থেকে রক্ষা করলেন।
এ সবই কাজী হিসবাহ্’র বিচারকার্যের এখতিয়ারভূক্ত বিষয়। জনস্বার্থের জন্য হুমকীস্বরূপ বিষয়সমূহ মীমাংসা করার জন্য বিচারব্যবস্থার হিসবাহ্ নামক এ বিভাগটি আসলে একটি বিশেষ অর্থবোধক শব্দ যা দ্বারা ইসলামী রাষ্ট্রে সম্পাদিত একটি বিশেষ কাজকে বোঝানো হয়ে থাকে; যেমন: ব্যবসায়ী ও দক্ষ শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ করা যেন তারা তাদের ব্যবসা, তাদের শ্রম, উৎপাদিত পণ্যের মাধ্যমে কিংবা পণ্যদ্রব্য ওজন ও পরিমাপের সময় কিংবা অন্যকোন পদ্ধতিতে জনগণকে প্রতারিত করতে না পারে, যা কিনা জনস্বার্থকে ক্ষুন্ন করতে পারে। বস্তুতঃ এটা হচ্ছে সেই কাজ যা রাসূল (সা) নিজে করে দেখিয়েছেন, এ বিষয়ে তদারকি করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং এ বিষয়ে সরাসরি রায় প্রদান করেছেন; যা কিনা আল-বারা ইবনে আযিব বর্ণিত হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে, যেখানে তিনি (সা) উভয়পক্ষকে সুদভিত্তিক ঋণে ক্রয়বিক্রয় থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
এছাড়া, মক্কা বিজয়ের পর আল্লাহ্’র রাসূল (সা) সা’ইদ ইবনুল আসকে মক্কার বাজারের মুহতাসিব হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন, যা ইবন সা’দ এর তাবাকাত ও ইবন ’আবদ আল-বার এর আল-ইসতিয়াব গ্রন্থে উল্লেখিত আছে। সুতরাং, হিসবাহ্’র দলিল হল রাসূল (সা) এর সুন্নাহ্। এছাড়া, উমর (রা) তাঁর নিজ গোত্রের উম্ম সুলাইমান ইবন আবি হিশমা উরফে আশ-শিফা নামের এক মহিলাকে বাজার পর্যবেক্ষক (ইন্সপেক্টর) হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন; এবং তিনি আবদুল্লাহ্ ইবন উতবাহ’কে মদিনার বাজারের বিচারক হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন, যা ইমাম মালিক তাঁর আল-মুয়াত্তা এবং ইমাম শাফী’ তাঁর মুসনাদে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া, তিনি নিজেও মুহাম্মদ (সা) এর মতো বাজারে টহল দিতেন এবং হিসবাহ সম্পর্কিত বিষয়াদি তদারকি করতেন। খলীফাগণ এভাবেই নিজেরা হিসবাহ্ সম্পর্কিত বিষয়াদি তদারকী করতে থাকেন যে পর্যন্ত না আল-মাহদী তার শাসনামলে হিসবাহ্’কে বিচারব্যবস্থার একটি বিশেষ বিভাগে পরিণত করেন। খলীফা হারুনুর রশীদের সময় মুহতাসিবগণ (হিসবাহ’র বিচারক) বাজারে ঘুরে ঘুরে টহল দিতেন, ওজন ও পরিমাপের বিষয়সমূহ তদারকি করতেন এবং সকল প্রকার লেনদেন পর্যবেক্ষণ করতেন।
আর, কাজী আল-মাযালিমের দলিল পাওয়া যায় পবিত্র কুর’আন থেকে যেখানে আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,
‘যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়ে পর, তাহলে তা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও।’
[সূরা নিসা : ৫৯]এর ঠিক আগে আল্লাহ্ বলেন,
‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ্’র নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বশীল তাদের।’
[সূরা নিসা: ৫৯]সুতরাং, সাধারণ জনগণ ও কর্তৃত্বশীলদের মধ্যকার যে কোন বিরোধ আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল (সা) এর দিকে ফিরিয়ে দিতে হবে অর্থাৎ, আল্লাহ্’র হুকুমের নিকট পেশ করতে হবে। মূলতঃ এ ব্যাপারটিই একজন বিচারকের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে যিনি এ ধরনের বিবাদের ব্যাপারে আল্লাহ্’র হুকুম অনুযায়ী রায় প্রদান করবেন; আর এ বিচারকই হচ্ছেন মাযালিমের বিচারক। এছাড়া, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) এর কাজ ও উক্তি থেকেও এ বিষয়ে দলিল পাওয়া যায়। তবে, রাসূল (সা) সমগ্র রাষ্ট্রের উপর বিশেষ কাউকে মাযালিমের বিচারক হিসাবে নিয়োগ করেননি; কিংবা তাঁর পরবর্তী সময়ে খোলাফায়ে রাশেদীনগণও তা করেননি। বরং, তাঁরা নিজেরাই এ দায়িত্ব পালন করেছেন; যেমনটি হয়েছিল ’আলী ইবন আবি তালেবের (রা) সময়। কিন্তু, তিনি মাযালিমের জন্য কোন নির্দিষ্ট সময় বা বিশেষ কোন পদ্ধতি নির্ধারণ করেননি; তিনি এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই সেটি ফয়সালা করতেন। সুতরাং, এটা আসলে তিনি তার সাধারণ দায়িত্বকর্তব্যের অংশ হিসাবেই করতেন। খলীফা আব্দুল মালিক ইবন মারওয়ানের শাসনামলের পূর্ব পর্যন্ত ব্যাপারটি এভাবেই চলতে থাকে। বস্তুতঃ তিনিই হচ্ছেন প্রথম খলীফা যিনি মাযালিমের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করেন। যখনই মাযালিম সম্পর্কিত কোন বিষয় তার কাছে অস্পষ্ট মনে হত তিনি তখন তার বিচারককে এ বিষয়টি ফয়সালার দায়িত্ব দিতেন। এর পরবর্তী সময় থেকে খলীফাগণ জনগণের অভিযোগ সম্পর্কিত বিষয় দেখাশুনার জন্য সহকারী নিয়োগ করতেন। তখন থেকেই মাযালিমের জন্য একটি বিশেষ ব্যবস্থার জন্ম হয়, যা কিনা ‘সুবিচারের গৃহ’ বা দার-উল-আদল নামে পরিচিতি লাভ করে। মাযালিমের বিচারক নিয়োগ করা এজন্য অনুমোদিত যে, খলীফা তার নির্বাহী ক্ষমতা বলে তার পক্ষ থেকে যে কাউকে তার সহকারী হিসাবে নিযুক্ত করতে পারেন। সুতরাং, এ কাজ সম্পাদনের জন্য তিনি একজন বিচারকও নিয়োগ করতে পারেন। এছাড়া, মাযালিমের জন্য কোন বিশেষ সময় বা পদ্ধতি নির্ধারণ করাও অনুমোদিত, কারণ এসবই মুবাহ্ (অনুমোদিত) কাজের অন্তর্ভূক্ত।
বিচারকের যোগ্যতার শর্তাবলী
যিনি বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন তাকে অবশ্যই মুসলিম, স্বাধীন, পূর্ণবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন, ন্যায় বিচারক, ফকীহ্ (বিজ্ঞ আলেম) এবং বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে শারী’আহ্ আইন প্রয়োগের ক্ষমতাসম্পন্ন হতে হবে। এছাড়া, যিনি মাযালিমের বিচারকের দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন তাকে উপরোক্ত শর্তাবলী পূরণ করা ছাড়াও অতিরিক্ত যোগ্যতা হিসাবে পুরুষ ও মুজতাহিদ হতে হবে, যা কিনা প্রধান বিচারপতির (কাজী আল কুদাহ্) ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ, মাযালিমের বিচারকের কাজে বিচার ও শাসন এদু’টি বিষয়ই জড়িত ও এক্ষেত্রে শাসকের উপর শারী’আহ্ আইন বাস্তবায়ন করা হয়। সুতরাং, বিচারকের অন্যান্য পদের ব্যতিক্রম হিসেবে অতিরিক্ত যোগ্যতা হিসাবে মাযালিমের বিচারককে পুরুষ হতে হবে। এছাড়া, শাসকগণ আল্লাহ্’র আইন ছাড়া অন্যকোন কিছু দিয়ে শাসন করছেন কিনা, অর্থাৎ, তারা এমন কোন আইন প্রয়োগ করছেন কিনা যার কোন শারী’আহ্ দলিল নেই, সে বিষয়গুলোকে প্রতিহত করতে, কিংবা, তারা এমন কোন দলিল ব্যবহার করছেন কিনা যা ঘটনার সাথে সম্পর্কিত নয় তা বোঝার জন্য তাকে মুজতাহিদও হতে হবে। কারণ, একমাত্র একজন মুজতাহিদই মাযালিমা সম্পর্কিত এ জটিল বিষয়সমূহ বুঝতে পারেন। আর, তিনি যদি মুজতাহিদ না হন তবে এমন হতে পারে যে, তিনি এমন সব বিষয়ে বিচার করতে পারেন যে বিষয়ে তার কোন জ্ঞান নেই, যা কিনা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। একারণে, শাসক বা অন্যান্য বিচারক পদের যোগ্যতার শর্তের ব্যতিক্রম হিসাবে মাযালিমের বিচারককে মুজতাহিদ হতে হবে।
বিচারক নিয়োগ
কাজী-উল খুশুমাত, মুহতাসিব এবং মাযালিমের বিচারকগণকে সমগ্র রাষ্ট্রব্যাপী সব বিষয়ে সাধারণ ক্ষমতা দিয়ে নিয়োগ করা অনুমোদিত। আবার, তাদের ভৌগলিক অঞ্চল ভেদে কোন বিশেষ এলাকায় কিংবা, কোন বিশেষ বিষয়ের দায়িত্ব দিয়ে নিয়োগ দেয়াও অনুমোদিত। রাসূল (সা) এর সুন্নাহ্’তে এ ব্যাপারে দলিল রয়েছে; যেমন: তিনি (সা) আলী ইবনে আবি তালিবকে সমগ্র ইয়েমেনের উপর, মু’য়াজ ইবনে জাবালকে ইয়েমেনের কিছু অঞ্চলের উপর এবং আমর ইবনে আল আসকে একটি বিশেষ বিষয়ে বিচারক হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন।
বিচারকদের সম্মানী বা বেতন ভাতা
আল হাফিয তার আল-ফাতেহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে: সম্মানী বা বেতন ভাতা হচ্ছে সেটাই যা মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষার কাজে নিয়োজিত কোন ব্যক্তিকে ইমাম বাইতুল মাল থেকে প্রদান করেন। বিচারকার্য সম্পাদন করা রাষ্ট্রের এমন একটি কাজ যার জন্য অবশ্যই বাইতুল মাল থেকে সম্মানী গ্রহণ করা বৈধ। কারণ, এটি জনস্বার্থ রক্ষার্থে রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত কাজ। বস্তুতঃ কাউকে যদি মুসলিমদের স্বার্থরক্ষার্থে শারী’আহ্ আইন অনুযায়ী কোন কাজ সম্পাদন করার জন্য নিযুক্ত করা হয়, তা ইবাদত সংক্রান্ত হোক বা অন্য কোন বিষয় হোক, তাহলেই সে সম্মানী পাবার উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়। এর পক্ষে দলিল হল আল্লাহ্’র আয়াত; কারণ, আল্লাহ্ তা’আলা সাদাকাহ্ সংগ্রহকারীদের জন্য সাদাকার (যাকাতের) একটি অংশ নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:
‘এবং যারা তা সংগ্রহ করে।’
[সূরা তাওবা: ৬০]আবু দাউদের শুনান গ্রন্থে এবং ইবনে খুজায়মা’র সহীহ্ হাদীস গ্রন্থে বুরাইদা থেকে বর্ণিত একটি হাদীস রয়েছে – যাকে আল বায়হাকী ও আল হাকীম বুখারী ও মুসলিমের সহীহ্ হাদীসের শর্ত পূরণ করেছে বলে মতামত দিয়েছেন এবং আল জাহাবীও এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন। উক্ত হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেন যে:
‘আমরা যদি কোন কর্মচারীকে নিয়োগ দেই ও তার জন্য সম্মানী ভাতা নির্ধারণ করে দেই, তারপরও যদি কেউ এর অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করে তবে তা অবশ্যই প্রতারণা (ঘূলুল)।’
(সূনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-২৯৪৩)আল মাওয়ারদী তার আল-হাওয়ী গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ‘বিচারকগণ বাইতুল মাল থেকে ভাতা গ্রহণ করতে পারবেন। কেননা আল্লাহ্ সাদাকার মধ্যে সাদাকা সংগ্রহকারীদের জন্য একটি অংশ নির্ধারণ করেছেন। এছাড়া, উমর (রা) সুরাই’কে নিয়োগ করেছিলেন এবং তার জন্য মাসিক একশত দিরহাম ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন। আলীর (রা) খিলাফতের সময় তিনি সুরাই এর জন্য মাসিক পাঁচশত দিরহাম নির্ধারণ করেন; এছাড়া জায়েদ ইবনে সাবিতও (রা) বিচারকার্যের জন্য অর্থ গ্রহণ করতেন।’ আল বুখারী এ বক্তব্যের ব্যাপারে বলেছেন যে, ‘সুরাই বিচারকার্যের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করতেন।’
এছাড়া, আল-হাফিয এ মন্তব্যের ব্যাপারে বলেন যে, ‘সা’ইদ ইবন মানসুর সুরাই এর অর্থ গ্রহণের বিষয়ে সুফিয়ান হতে, সুফিয়ান মুজাহিদ হতে, আবার মুজাহিদ আশ-শা’বী থেকে আমাদের জানান যে: ‘মাশরুক বিচারকার্যের জন্য অর্থ গ্রহণ করতেন না; আর, সুরাই সম্মানী গ্রহণ করতেন।’ আল-হাফিয তার আল-ফাতিহ্ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে: ‘ইবন আল মুনদির বলেছেন যে, জায়িদ ইবন ছাবিত বিচারকার্যের জন্য সম্মানী গ্রহণ করতেন।’ নাফি’ থেকে ইবন সাদ বর্ণনা করেছেন যে: ‘উমর ইবনুল খাত্তাব যায়িদ ইবন ছাবিতকে বিচারক হিসাবে নিয়োগ দেন এবং তার জন্য ভাতা নির্ধারণ করে দেন।’ বিচারকার্যের জন্য সম্মানী গ্রহণ করা যে শারী’আহ্ কর্তৃক অনুমোদিত এ ব্যাপারে সাহাবীদের (রা) ঐক্যমত এবং তার পরবর্তী প্রজন্মের (তাবেঈনদের) ঐক্যমত ছিল। আল-হাফিয তার আল-ফাতিহ্ গ্রন্থে বলেছেন যে: “আবু আলী আলকারাবিজি বলেছেন: বিচারকদের বিচারকার্যের জন্য সম্মানী গ্রহণ করার মধ্যে কোন দোষ নেই; এ বিষয়টিকে সাহাবী (রা) ও তাবেঈনগণ সহ ইসলামের সকল পন্ডিত একইভাবে দেখেছেন এবং বুঝেছেন। সেইসাথে, সকল প্রদেশের আইনবিদদের এ বিষয়ে একই মতামত এবং জানামতে তাদের মধ্যে এ বিষয়ে কোন মতদ্বৈততা নেই। মাশরুক এটিকে অপছন্দ করেছেন; কিন্তু, কেউই এটাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেননি।” ইবন কুদামাহ্ তার আল-মুগনী গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, “মুয়াজ ইবন জাবাল ও আবু উবাইদাহ’কে আল-শাম অঞ্চলে প্রেরণকালে উমর (রা) তাঁদের পত্র মারফত কিছু ভাল লোক খুঁজে বের করার এবং তাদেরকে বিচারকার্যে নিয়োগ করার নির্দেশ দেন। তিনি তাঁদের বলেন যে, “তাদের জন্য যথাসাধ্য কর, তাদের জন্য সম্পদ বরাদ্দ কর এবং আল্লাহ্’র সম্পদ দিয়ে তাদের সন্তুষ্ট কর।”
ট্রাইবুনাল গঠন
ইসলামী বিচারব্যবস্থায় একের বেশী বিচারকের সমন্বয়ে ট্রাইবুনাল (Bench) গঠন করা, যাদের বিচারের রায় প্রদানের ক্ষমতা রয়েছে, তা অনুমোদিত নয়। তবে, শুধুমাত্র পরামর্শ করার খাতিরে কিংবা, মতামত ব্যক্ত করার জন্য একের অধিক বিচারকের উপস্থিতি অনুমোদিত; তবে, এক্ষেত্রে একজন বিচারক ছাড়া অন্য কারো রায় প্রদানের কোন ক্ষমতা থাকবে না বা উক্ত বিচারকের জন্য অন্যান্যদের মতামত বা পরামর্শ গ্রহণে কোনপ্রকার বাধ্যবাধকতা থাকবে না।
কারণ, রাসূল (সা) কখনও একটি বিষয়ের জন্য দু’জন বিচারক নিযুক্ত করেননি; বরং, তিনি (সা) একটি বিষয়ের জন্য শুধুমাত্র একজন বিচারক নিয়োগ করেছেন। এছাড়া, বিচারব্যবস্থা হল প্রয়োগের নিমিত্তে কোন বিষয়ে শারী’আহ্ রায় প্রদান করা। আর, একজন মুসলিমের জন্য কোন বিশেষ বিষয়ে শারী’আহ্ বিধান একের অধিক হতে পারে না; কারণ, প্রদত্ত রায়টি তার জন্য আল্লাহ্’র বিধান এবং একটি বিষয়ে আল্লাহ্’র বিধান একটিই হবে। তবে এটা ঠিক যে, একটি শারী’আহ্ হুকুমের বিভিন্ন রকম ব্যাখ্যা থাকতে পারে। কিন্তু, মুসলিমদের জন্য বাস্তবিকভাবে হুকুমটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে এটা একটি মাত্র বিধান হতে হবে এবং তা কখনও বিভিন্ন রকম হতে পারবে না। সুতরাং, বিচারক যখন কোন বিশেষ বিষয়ে প্রয়োগের নিমিত্তে কোন রায় প্রদান করবেন, তখন এই রায় অবশ্যই একটি হতে হবে। কারণ, প্রয়োগের বাধ্যবাধকতার শর্তে রায়টি প্রদান করা হয়েছে এবং এই রায় কার্যকর করার অর্থ হল উক্ত বিষয়ে আল্লাহ্’র বিধান কার্যকর করা। আর, বাস্তব দৃষ্টিকোন থেকে আল্লাহ্’র বিধান কখনও বিভিন্ন রকম হবে না, যদিও এর ব্যাখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। এজন্য, একই বিষয়ের জন্য একই আদালতে একের অধিক বিচারক নিয়োগ করা বৈধ নয়। তবে কোন দেশের ক্ষেত্রে, দুটি পৃথক আদালতে একটি অঞ্চলের সব ধরনের বিষয়সমূহ ফয়সালা করা অনুমোদিত। কারণ, বিচারব্যবস্থার কার্যাবলী খলীফার দায়িত্বের অন্তর্ভূক্ত। সুতরাং, বিচারকার্য পরিচালনার জন্য কাউকে নিয়োগ করা আসলে খলীফার পক্ষ থেকে প্রতিনিধি নিয়োগ করার সাথে তুলনীয়, অর্থাৎ, একের অধিক প্রতিনিধি নিয়োগ করা বৈধ; আর তাই, একই অঞ্চলে একের অধিক বিচারক থাকা বৈধ। যদি বিবাদমান দু’পক্ষ কোন ট্রাইবুনাল বা আদালতে তাদের বিবাদ মীমাংসা করবে বা কোন বিচারকের দারস্থ হবে এ বিষয়ে মতৈক্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে বিবাদীর পছন্দের উপর বাদীর পছন্দকে গুরুত্ব দেয়া হবে এবং তার পছন্দের বিচারকের হাতেই মামলা ন্যস্ত করা হবে। যেহেতু মামলা করার মাধ্যমে সে তার অধিকার দাবি করছে, তাই এক্ষেত্রে বিবাদীর চাইতে বাদীর পছন্দকে বেশী গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হবে।
বিচারকগণ একমাত্র আদালতেই বিচারকার্য পরিচালনা করতে পারেন; এবং শুধুমাত্র আদালতেই দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন, সাক্ষ্য প্রদান এবং শপথগ্রহণ করতে হবে। কারণ, আব্দুল্লাহ্ ইবন যুবায়ের (রা) এর বরাত দিয়ে আবু দাউদের সূনানে বর্ণিত আছে যে:
‘রাসূলুল্লাহ্ (সা) নির্দেশ দিয়েছেন যে, বিবাদমান দু’পক্ষকে অবশ্যই বিচারকের সামনে বসতে হবে।’
(সূনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৩৫৮৮)এ হাদীসটি বিচারকার্য কিভাবে পরিচালনা করতে হবে সে ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছে এবং এটাই বিচারকার্য পরিচালনার আইনসঙ্গত পদ্ধতি। অর্থাৎ, এ হাদীস নির্দেশ দিচ্ছে যে, বিচারকার্য পরিচালনার জন্য অবশ্যই একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি ও কাঠামো থাকতে হবে। আর, তা হল, বিবাদমান দু’পক্ষকে অবশ্যই বিচারকের সামনে উপস্থিত থাকতে হবে এবং এটাই হবে আদালত। সুতরাং, বিচারকার্যক্রমের বৈধতার ক্ষেত্রে এটা শর্ত যে, প্রথমত: এ কাজের জন্য অবশ্যই একটি নির্ধারিত স্থান থাকতে হবে যেখানে মামলা সংক্রান্ত রায় প্রদান করা হবে এবং শুধুমাত্র সেক্ষেত্রেই এই রায়কে আইনসঙ্গত রায় বলে বিবেচনা করা হবে। আর, দ্বিতীয়ত: বিবাদমান দু’পক্ষকে অবশ্যই বিচারকের সামনে উপস্থিত থাকতে হবে। এ বিষয়টি আলী (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদীস দ্বারাও সমর্থিত, যেখানে রাসূল (সা) বলেছেন:
‘হে ’আলী, যদি তোমার সামনে বিচারের জন্য বিবাদমান দু’পক্ষ বসে; তাহলে ততক্ষণ পর্যন্ত একজনের পক্ষে রায় দিও না যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি প্রথম পক্ষের মত অন্য পক্ষের কথাও শুনে থাক।’
এ হাদীসটিও বিচারের জন্য একটি বিশেষ কাঠামোর প্রয়োজনীয়তাকে নির্দেশ করে; কারণ, এ হাদীসে বলা হয়েছে: ‘যদি তোমার সামনে বিচারের জন্য বিবাদমান দু’পক্ষ বসে…’।
সুতরাং, বিচারের রায় বৈধ হিসাবে বিবেচিত হবার শর্ত হিসাবে আদালতের উপস্থিতি আবশ্যক; এবং একইসাথে এটা শপথগ্রহণের জন্যও আবশ্যকীয়। কারণ, রাসূল (সা) বলেছেন:
‘বিবাদীকে অবশ্যই শপথ নিতে হবে।’
এই হাদীসটি ইবনে আব্বাসের সূত্রে আল-বুখারী বর্ণনা করেছেন। (সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-২৬৬৮)বস্তুতঃ আদালত ব্যতীত বিবাদীকে বিবাদী হিসাবে বিবেচনা করা হবে না; এবং একই কথা সাক্ষ্যপ্রমাণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা ব্যতীত তা প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করা হবে না। কারণ, রাসূল (সা) বলেছেন:
‘ফরিয়াদীকে সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করতে হবে এবং শপথগ্রহণ করা বাধ্যতামূলক হবে তার প্রতিপক্ষের উপর (অর্থাৎ, আসামীর উপর)।’
(বায়হাকী)উপরন্তু, আদালত ব্যতীত কোন ফরিয়াদীকে বাদী হিসাবে বিবেচনা করা হবে না।
মামলার প্রকারভেদ অনুযায়ী বিভিন্ন স্তরের আদালত থাকা অনুমোদিত। সুতরাং, এটা অনুমোদিত যে, কিছু সংখ্যক বিচারক একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত কিছু বিশেষ ধরনের মামলার দায়িত্বে থাকবেন; এবং অন্য মামলাসমূহকে তারা অন্য আদালতে পাঠাবেন।
এর কারণ হল, বিচারকার্যের জন্য বিচারক নিয়োগ করা খলীফার পক্ষ থেকে তার প্রতিনিধি নিয়োগের অনুরূপ; এবং এদুটো বিষয়ের মধ্যে মূলতঃ কোন পার্থক্য নেই। প্রকৃত অর্থে, বিচারব্যবস্থা প্রতিনিধিত্বের (deputyship) আরেকটি রূপ, যা কিনা সাধারণভাবে খলীফার প্রতিনিধিত্ব করা হতে পারে, আবার কোন বিশেষ বিষয়ে তার প্রতিনিধিত্ব করার অনুরূপও হতে পারে। সুতরাং, একজন বিচারককে শুধু কিছু বিশেষ ধরনের মামলা পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োগ করা যেমন অনুমোদিত, যেখানে উক্ত বিচারক নির্ধারিত ঐ ধরনের মামলা ছাড়া অন্য কোন মামলা পরিচালনা করতে পারবেন না; আবার, অন্য কোন বিচারককে একই স্থানে নির্ধারিত ঐ ধরনের মামলাসমূহ সহ সকল প্রকার মামলা পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে নিয়োগ করাও অনুমোদিত। সুতরাং, বিভিন্ন স্তরের ট্রাইবুনাল গঠন করা অনুমোদিত এবং অতীতে মুসলিমদের এই ধরনের ট্রাইবুনাল ছিল।
আল মাওয়ারদী তাঁর আল আহ্কাম আল সুলতানিয়্যাহ্ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে: ‘আবু আবদুল্লাহ আল যুবায়ের বলেছেন, “কিছুকাল যাবত এখানে বসরার আমীরগণ কেন্দ্রীয় মসজিদে (আল মাসজিদ আল-জামী’) একজন বিচারক নিয়োগ করতেন, তারা তাকে মসজিদের বিচারক বলে অভিহিত করতেন। তিনি (উক্ত বিচারক) সাধারণতঃ বিশ দিনার বা দুই’শ দিরহামের অনুর্ধ্ব পরিমাণ অর্থ সম্পর্কিত বিবাদগুলো মীমাংসা করতেন; এবং ভরণপোষণ আরোপ করতেন (অর্থাৎ, ভরণপোষণ সম্পর্কিত মামলাগুলো পরিচালনা করতেন)। তিনি তার জন্য নির্ধারিত ঐ স্থানের বাইরে যেতেন না কিংবা, তার জন্য বেঁধে দেয়া সীমা অতিক্রম করতেন না।”
আল্লাহ্’র রাসূল (সা) তাঁর পক্ষ থেকে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগ করতেন। যেমন: তিনি (সা) আমর ইবনুল আস’কে (রা) একটি এলাকার মামলা পরিচালনার দায়িত্ব দেন; এবং তিনি (সা) ’আলী ইবন আবি তালিব’কে যে কোন ধরনের মামলা পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে ইয়েমেনের বিচারক হিসাবে নিযুক্ত করেন। এ সমস্ত ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, সাধারণ কিংবা বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন আদালত, এদু’টোই শারী’আহ্ কর্তৃক অনুমোদিত।
ইসলামী বিচারব্যবস্থায় আপীল বা খারিজের জন্য কোন আদালত নেই। সুতরাং, একটি মামলার ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়া অভিন্ন হবে এবং একই হবে। যদি কোন বিচারক কোন রায় প্রদান করেন, তবে তা কার্যকর করা বাধ্যতামূলক হবে; এবং কোন অবস্থাতেই অন্য কোন বিচারকের এ রায় পরিবর্তন করার কোন এখতিয়ার থাকবে না। কারণ, শারী’আহ্ মূলনীতি অনুযায়ী: “একই বিষয়ের উপর কৃত একটি ইজতিহাদ আরেকটি ইজতিহাদ’কে বাতিল করে না।” সুতরাং, একজন মুজতাহিদের বিপক্ষে আরেকজন মুজতাহিদ প্রামাণ্য দলিল নন। সুতরাং, একটি আদালতের রায়কে খারিজ করে দিতে পারে এইরকম একটি আদালতের অস্তিত্ব অবৈধ।
তবে, যদি কোন বিচারক বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে শারী’আহ্ পরিত্যাগ করেন এবং কুফর আইন দিয়ে বিচার করেন; কিংবা, তার অনুসৃত আইন যদি আল্লাহ্’র কিতাব, রাসূলের সুন্নাহ্ এবং সাহাবীদের ইজমা’র সাথে সাংঘর্ষিক হয় কিংবা, যদি তিনি এমন কোন রায় দেন যা বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যহীন হয়, যেমন: তিনি কাউকে খুনী সাব্যস্ত করার পর যদি প্রকৃত খুনী উপস্থিত হয় – তবে, এ সকল ক্ষেত্রে বিচারের রায় পরিবর্তন করা যেতে পারে। কারণ, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,
‘যদি কেউ আমাদের দ্বীনের (ইসলামের) ভেতর এমন কোন কিছু উদ্ভাবন করে যা আসলে ইসলাম থেকে নয়, তবে তা প্রত্যাখাত।’
এ হাদীসটি আয়শা (রা) এর সূত্রে সহীহ্ আল বুখারী [হাদীস নং-২৬৯৭] ও সহীহ্ মুসলিমে [হাদীস নং১৭৯৮] বর্ণিত আছে।জাবির বিন আবদুল্লাহ’র সূত্রে বর্ণিত আছে যে: “এক ব্যক্তি এক মহিলার সাথে যিনাহ্ করলে রাসূল (সা) তাকে চাবুক মারার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে যখন তিনি জানলেন যে, লোকটি বিবাহিত, তখন তিনি তাকে পাথর নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেন।” এছাড়া, মালিক বিন আনাস থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন: “আমি উসমান (রা) সম্পর্কে জানতে পেরেছি যে, তাঁর কাছে একজন (যিনাহকারী) মহিলাকে আনা হল যে ছয়মাস পরে একটি সন্তান প্রসব করেছে। উসমান মহিলাটিকে পাথর মারার নির্দেশ দিলেন। আলী (রা) তাঁকে বললেন, ‘মহিলাটিকে পাথর মারা বৈধ হবে না, কারণ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও দুগ্ধ ছাড়াতে লেগেছে ত্রিশ মাস।’
[সূরা আল আহকাফ: ১৫]এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরও বলেন,
‘আর সন্তানবতী নারীরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু’বছর দুধ খাওয়াবে, যদি দুধ খাওয়াবার পূর্ণ মেয়াদ সমাপ্ত করতে চায়।’
[সূরা আল বাক্বারাহ্ : ২৩৩]সুতরাং, তাকে (এখন) পাথর মারা বৈধ হবে না। একথা শুনে উসমান (রা) উক্ত মহিলাটিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু, দেখা গেল যে, ততক্ষণে পাথর নিক্ষেপ হয়ে গেছে।” আব্দুর রাজ্জাক, ইমাম ছাওরী থেকে বর্ণনা করেছেন যে: “যদি কোন বিচারক আল্লাহ্’র কিতাব কিংবা, রাসূল (সা) এর সুন্নাহ্ অথবা, সাহাবীদের ঐক্যমত আছে এমন কোন বিষয়ের বিপরীত কোন রায় প্রদান করে, তবে অন্য বিচারক চাইলে সে রায় পরিবর্তন করতে পারবেন।”
তবে, বিচারের রায় পরিবর্তনের দায়িত্ব আসলে মাযালিমের বিচারকের।
মুহ্তাসিব
মুহ্তাসিব হচ্ছেন সেই বিচারক, যিনি সেই সমস্ত মামলার বিচারকার্য পরিচালনা করেন যেগুলো জনসাধারণের অধিকারের সাথে সম্পর্কিত এবং যে সকল মামলার কোন বাদী বা ফরিয়াদী নেই, যদি না এ মামলাগুলো পেনাল কোড (হুদুদ) এবং ফৌজদারী আইন (Criminal Law) এর অন্তর্ভূক্ত হয়।
এটাই হচ্ছে হিসবাহ্’র বিচারকের সংজ্ঞা, যা কিনা রাসূল (সা) এর খাবারের স্তুপ সম্পর্কিত হাদীস থেকে নেয়া হয়েছে। রাসূল (সা) খাবারের স্তুপের ভেতর হাত দিয়ে স্যাঁতস্যাঁতে অবস্থা দেখতে পেলেন। তখন, তিনি (সা) ভেজা খাবারগুলোকে উপরে রাখার নির্দেশ দিলেন যেন লোকেরা তা দেখতে পায়। সুতরাং, এটা ছিল জনস্বার্থ সম্পর্কিত একটি বিষয়, যে ব্যাপারে রাসূল (সা) তদারকী করেছিলেন; এবং ঠকবাজি বা প্রতারণামূলক কর্মকান্ড প্রতিরোধ করার জন্য তিনি (সা) ভেজা খাবারগুলোকে উপরে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ বিষয়টি জনগণের অধিকার বা স্বার্থসম্পর্কিত একই প্রকৃতির সকল বিষয়ের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। আর, পেনাল কোড (হুদুদ) এবং ফৌজদারী আইন (Criminal Law) এর অন্তর্ভূক্ত নয়, এগুলো এই প্রকৃতির (জনগণের অধিকার বা স্বার্থসম্পর্কিত) নয়, এগুলো জনগণের মধ্যকার বিবাদ হিসাবে বিবেচনা করা হবে।
মুহ্তাসিবের আবশ্যিক ক্ষমতা
কোন অপরাধ সংঘটিত হলে, সে বিষয়ে অবহিত হবার সাথে সাথে ঘটনাস্থলেই মুহ্তাসিব সে ব্যাপারে রায় প্রদান করতে পারেন; এবং এ রায় প্রদান অপরাধ সংঘটিত হবার স্থানে কিংবা, যে কোন স্থানে হতে পারে; এজন্য তার কোন আদালতের প্রয়োজন নেই। মুহ্তাসিবের নির্দেশ এবং (যে কোন স্থানে) রায় কার্যকর করার লক্ষ্যে তার অধীনে কিছু পুলিশ নিযুক্ত থাকবে।
তার অধীনস্থ মামলাসমূহ পরিচালনার জন্য মুহ্তাসিবের কোন আদালতের প্রয়োজন নেই। যখনই তিনি নিশ্চিত হবেন যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তখনই তিনি এ ব্যাপারে রায় প্রদান করবেন; এবং তার যে কোন স্থানে এবং যে কোন সময়ে রায় প্রদানের ক্ষমতা রয়েছে; সেটা হাট-বাজারে হোক, কিংবা, কোন গৃহে হোক, কিংবা, ভ্রমনরত অবস্থায় বা যানবাহনে থাকা অবস্থায় দিনে কিংবা রাতে যে অবস্থাতেই হোক না কেন। কারণ, যে সমস্ত দলিল-প্রমাণ আদালতের প্রয়োজনীয়তার অপরিহার্যতাকে প্রমাণ করে, তা মুহ্তাসিবের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। যে হাদীসটি আদালতের অপরিহার্যতাকে প্রমাণ করে সেখানে বলা হয়েছে:
‘বিবাদমান দু’পক্ষকে বিচারকের সামনে বসতে হবে।’
এবং রাসূল (সা) আরও বলেছেন, ‘যদি বিবাদমান দু’পক্ষ তোমার সামনে বসে…।’ এ শর্তটি হিসবাহ’র বিচারকের জন্য প্রযোজ্য নয়। কারণ, তার এখতিয়ারভূক্ত মামলাসমূহে কোন বাদী বা বিবাদী নেই; বরং, এটা জনগণের অধিকার যা ক্ষুন্ন করা হয়েছে, অথবা, এ বিষয়ে শারী’আহ্ আইন লঙ্ঘিত হয়েছে।
এছাড়া, রাসূল (সা) যখন খাবারের স্তুপের বিষয়টি তদারকী করছিলেন, সে সময় তিনি (সা) বাজারের ভেতর দিয়ে হাঁটছিলেন এবং খাবারগুলো বিক্রির জন্য সাজানো ছিল। রাসূল (সা) উক্ত বিক্রেতাকে তাঁর কাছে উপস্থিত হবার নির্দেশ দেননি; বরং, তিনি (সা) অপরাধটি শনাক্ত করার সাথে সাথে ঐ স্থানেই এ বিষয়ে রায় দিয়েছেন। এটিই প্রমাণ করে যে, রায় প্রদানের জন্য হিসবাহ্’র বিচারকের আদালতের প্রয়োজন নেই।
এছাড়া, মুহ্তাসিবের তার নিজের জন্য ডেপুটি নির্বাচন করার অধিকার রয়েছে। তবে, তাদেরকে অবশ্যই মুহ্তাসিব পদের সকল শর্ত পূরণ করতে হবে। এছাড়া, তিনি তার ডেপুটিদের বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালনের জন্য নিযুক্ত করতে পারেন। এসব ডেপুটি বা সহকারীগণ তাদের জন্য নির্ধারিত অঞ্চলে এবং তাদেরকে যে সমস্ত বিষয় তদারকী করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, সে সব ক্ষেত্রে মুহ্তাসিবের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
অবশ্য এটা নির্ভর করবে, মুহ্তাসিবের নিয়োগপত্রে তাকে ডেপুটি নিয়োগের ক্ষমতা প্রদান করা বা না করার উপর। যদি, এ বিষয়ে ক্ষমতা প্রদান করে তার নিয়োগপত্রে কোন অনুচ্ছেদ অন্তর্ভূক্ত থাকে, শুধুমাত্র তখনই তিনি তার নিজের জন্য সহকারী নিয়োগ করতে পারবেন। আর, যদি তাকে এ ব্যাপারে কোন ক্ষমতা দেয়া না হয়, তবে নিজের জন্য কোন সহকারী নিয়োগ করার অধিকার তার থাকবে না।
মাযালিমের বিচারক
মাযালিমের বিচারক হলেন এমন একজন বিচারক যাকে রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক যে কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কৃত সকল প্রকার মাযলিমা’র (অন্যায় আচরণ) মীমাংসা করার জন্য নিয়োগ দেয়া হয়; সে ব্যক্তি হতে পারে রাষ্ট্রের কোন সাধারণ নাগরিক কিংবা, হতে পারে রাষ্ট্রের শাসন-কর্তৃত্বের নীচে বসবাসরত কেউ; এবং এ অন্যায় আচরণ (মাযলিমা) খলীফা কিংবা, তার অধীনে কর্মরত কেউ কিংবা, কোন সরকারী কর্মচারী কর্তৃক সংঘটিত হতে পারে।
এটাই হল মাযালিমের বিচারকের সংজ্ঞা। মাযালিমের বিচারকের উৎস হিসাবে রাসূল (সা) এর হাদীসকে উল্লেখ করা হয়, যেখানে তিনি (সা) জনগণের উপর শাসন পরিচালনা কালে শাসক কর্তৃক নাগরিকদের উপর কৃত অন্যায় আচরণকে মাযলিমা বলে অভিহিত করেছেন। আনাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে:
‘রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সময়ে একবার মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। তখন তা তাঁরা (সাহাবীরা) তাঁকে বললেন, ‘হে আল্লাহ্’র রাসূল, আপনি কেন দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছেন না?’ তখন তিনি (সা) বললেন, ‘অবশ্যই আল্লাহ্ হচ্ছেন সৃষ্টিকর্তা, সব বিষয়ের অধিকর্তা, সম্পদ বৃদ্ধিকারী, রিযিকদাতা এবং মূল্য নির্ধারণকারী, এবং আমি আশা করি যে, আমি এ অবস্থায় আল্লাহ্’র সাথে সাক্ষাৎ করবো যাতে কেউ আমার বিরুদ্ধে মাযালিমা’র অভিযোগ না আনতে পারে, হোক সেটা রক্ত সম্পর্কিতই হোক বা অর্থ সম্পর্কিত হোক।’
এ হাদীসটি ইমাম আহমদ তার মুসনাদে উল্লেখ করেছেন (মুসনাদে আহমদ খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৮৬)।রাসূল (সা) এক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণ করে দেয়ার বিষয়টিকে মাযালিমা বা অন্যায় আচরণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ, তিনি যদি মূল্য নির্ধারণ করে দিতেন, তাহলে এক্ষেত্রে তিনি তাঁর এখতিয়ার বর্হিভূত কাজ করতেন।
এছাড়া, তিনি (সা) রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত কোন বিষয়, যা জনস্বার্থ ক্ষুন্ন করে তাকেও মাযলিমা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। জনস্বার্থ সম্পর্কিত কোন বিষয় পরিচালনার জন্য যদি কোন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গঠিত হয় এবং কোন ব্যক্তি যদি সে ব্যবস্থাকে তার স্বার্থের পরিপন্থী বলে মনে করে, তবে তার বিষয়টি মাযালিমের বিচারক খতিয়ে দেখবেন। কারণ, এটি জনগণের স্বার্থরক্ষার নিমিত্তে রাষ্ট্র কর্তৃক স্থাপিত একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা। যেমন এটা হতে পারে, গণমালিকানাধীন কোন জলাধারের বিষয়ে রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত পরিকল্পনা অনুযায়ী সর্বসাধারণের কৃষিজমিতে সেচকার্য করা।
এ ব্যাপারে দলিল হল, রাসূল (সা) এর সময় রাষ্ট্র কর্তৃক সেচকার্যের জন্য গৃহীত পরিকল্পনার বিরুদ্ধে উত্থাপিত মদিনার একজন আনসারীর অভিযোগ। রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত পরিকল্পনাটি ছিল এরকম যে: যার জমির উপর দিয়ে জলধারা প্রথমে বয়ে যাবে সে প্রথমে সেচকাজ করবে, তারপর তার পরবর্তী জন করবে। আনসারী ঐ ব্যক্তিটি চাচ্ছিলেন যে, আল-যুবায়ের (রা) (যার জমির উপর দিয়ে প্রথমে জলধারা বয়ে গিয়েছিল) নিজের জমিতে সেচকার্য করার পূর্বেই তার (উক্ত আনসারীর) জমিতে পানি প্রবাহিত হতে দেবেন। কিন্তু, আল-যুবায়ের তা প্রত্যাখান করেন এবং শেষপর্যন্ত বিষয়টি রাসূল (সা) এর নিকট উত্থাপিত হয়। তিনি (সা) বিষয়টি ফয়সালা করে দেন এবং যুবায়েরকে তার জমিতে হালকা ভাবে সেচকার্য করার পর তার প্রতিবেশী আনসারীকে পানি ছেড়ে দিতে বলেন (অর্থাৎ, প্রতিবেশীকে সাহায্যের নিদর্শন হিসাবে তিনি (সা) আল-যুবায়েরকে তার প্রাপ্য পানি সম্পূর্ণরূপে ব্যবহার করার পূর্বেই তা ছেড়ে দিতে বলেন)। কিন্তু, উক্ত আনসারী এ রায় প্রত্যাখান করে এবং আল-যুবায়েরের পূর্বে সে নিজ জমিতে সেচকার্য করার দাবি জানায়। তারপর সে রাসূল (সা) বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে যে, আল-যুবায়ের সম্পর্কে তার চাচাতো ভাই হবার কারণে তিনি (সা) এ রায় দিয়েছেন (যা ছিল আল্লাহ্’র রাসূলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত গুরুতর মিথ্যা অভিযোগ; আল-বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার কারণে উক্ত আনসারীকে ক্ষমা করে দেয়া হয়)।
ঘটনার এ পর্যায়ে, রাসূল (সা) রায় দেন যে, যুবায়ের তার সেচকার্যের পূর্ণ অধিকার ভোগ করবে; অর্থাৎ, ততক্ষণ পর্যন্ত সে তার জমিতে সেচকার্য করবে যতক্ষণ পর্যন্ত না পানি তার দেয়ালের মূলে কিংবা গাছের মূল পর্যন্ত না পৌঁছায়। যাকে আলেমগণ এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, ততক্ষণ পর্যন্ত পানির উচ্চতা বাড়তে দিতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত তা মানুষের পা ডুবিয়ে দেয়। এই সম্পূর্ণ হাদীসটি ’উরওয়া ইবন আল-যুবায়েরের বরাত দিয়ে সহীহ্ মুসলিমে [হাদীস নং-২৩৫৭] এভাবে বর্ণিত আছে যে:
“আবদুল্লাহ্ ইবন যুবায়ের তাকে বলেছেন যে, আনসারদের মধ্য হতে এক ব্যক্তি রাসূল (সা) এর সামনেই সিরাজ আলহাররাহ্ নিয়ে আল-যুবায়েরের সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়, যার দ্বারা তারা তাদের খেজুর বাগানে পানি দিত। উক্ত আনসারী (আল-যুবায়েরকে) পানি ছেড়ে দিতে বলে; কিন্তু, আল-যুবায়ের তা প্রত্যাখান করেন। তারা রাসূল (সা) এর সামনেই বিবাদে লিপ্ত হয়। আল্লাহ্’র রাসূল যুবায়েরকে বলেন: “হে যুবায়ের, তুমি প্রথমে সেচকাজ কর, তারপর তোমার প্রতিবেশীর জন্য পানি ছেড়ে দাও।” এতে উক্ত আনসারী খুব রাগান্বিত হয়ে যায় এবং বলে: “হে আল্লাহ্’র রাসূল, এরকম রায়ের কারণ হল সে আপনার চাচাতো ভাই।” তার একথা শুনে রাসূল (সা) এর মুখের রঙ পরিবর্তন হয়ে যায় এবং তারপর তিনি (সা) বলেন: “হে যুবায়ের! তুমি সেচকাজ কর এবং ততক্ষণ পর্যন্ত পানি ধরে রাখো যতক্ষণ পর্যন্ত না তা দেয়ালের গোড়ায় গিয়ে পৌঁছায়।” আল-যুবায়ের বলেন: “আল্লাহ্’র কসম, আমার মনে হয় এ বিষয়েই এই আয়াতটি নাযিল হয়েছে: “তোমার রবের কসম! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার বলে গণ্য হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায়বিচারক বলে মনে করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজেদের মনে কোনরকম সংকীর্ণতা না পায় এবং তা সন্তুষ্টচিত্তে কবুল করে নেয়।” [সিরাজ আল-হাররাহ্ হল মদিনার আল-হাররাহ্ অঞ্চলের একটি নদী। আবু উবাইদ বলেছেন যে, মদিনাতে দু’টি নদী ছিল, যাতে বৃষ্টির পানি প্রবাহিত হত এবং মদিনার লোকেরা এ নদীগুলোর ব্যাপারে একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করতো। এজন্য রাসূল (সা) সিদ্ধান্ত নেন যে, প্রথম ব্যক্তি প্রথমে সেচকাজ করবে; যার অর্থ হল, নদীর শুরুর দিকে যার জমি রয়েছে সে প্রথমে সেচকাজ করবে এবং তারপর সে পানিকে পরবর্তী জমিতে প্রবাহিত হতে দেবে এবং ব্যাপারটি এভাবে চলতে থাকবে]।
সুতরাং, কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাসক বা রাষ্ট্রের কোন প্রতিষ্ঠান বা নির্দেশের কারণে যদি কোন অন্যায় আচরণ ঘটে থাকে, তবে এ বিষয়টিকে মাযলিমা হিসাবে বিবেচনা করা হবে, যা কিনা উপরোল্লিখিত দু’টি হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। এ সকল ক্ষেত্রে এ বিষয়সমূহ ফয়সালার জন্য খলীফার কাছে ন্যস্ত করা হবে কিংবা, তিনি মাযালিমের বিচারক হিসাবে তার পক্ষ থেকে যাকে নিয়োগ করবেন তার নিকট উপস্থাপন করা হবে। মাযালিমের
মাযালিমের বিচারক নিয়োগ ও অপসারণ
মাযালিমের বিচারক খলীফা বা প্রধান বিচারপতি (কাজী আল কুদাহ্) কর্তৃক নিযুক্ত হবেন। এর কারণ হল, মাযালিম বিচারব্যবস্থার একটি অংশ, যার মাধ্যমে শারী’আহ্ আইন কার্যকর করার নিমিত্তে রায় প্রদান করা হয় এবং সকল ধরনের বিচারককে অবশ্যই খলীফা কর্তৃক নিযুক্ত হতে হয়। এছাড়া, রাসূল (সা) এর সীরাত থেকেও এটি প্রমাণিত যে, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) নিজেই বিচারকদের নিয়োগ দিতেন। এ সবকিছুই প্রমাণ করে যে, খলীফাই মাযালিমের বিচারক নিয়োগ করবেন। তবে, প্রধান বিচারপতিও মাযালিমের বিচারক নিয়োগ করতে পারেন, যদি খলীফা তার নিয়োগপত্রে তাকে এ বিষয়ে ক্ষমতা প্রদানের বিষয়টি অনুচ্ছেদ আকারে যুক্ত করেন। এটি অনুমোদিত যে, রাষ্ট্রের কেন্দ্রে থাকা মাযালিমের প্রধান আদালত (মাহকামাতুল মাযালিম) শুধুমাত্র খলীফা, তার সহকারীবৃন্দ এবং প্রধান বিচারপতির পক্ষ থেকে সংঘটিত অন্যায় আচরণের বিষয়ে তদন্ত করবে; অন্যদিকে, বিভিন্ন প্রদেশে (উলাই’য়াহ্) অবস্থিত মাযালিম আদালতের শাখাসমূহ ওয়ালী বা রাষ্ট্রের অন্যান্য কর্মচারীদের দ্বারা সংঘটিত মাযলিমা তদন্ত করবে। খলীফা ইচ্ছা করলে মাযালিমের প্রধান আদালতকে বিভিন্ন উলাই’য়াহ্তে অবস্থিত মাযালিমের শাখা আদালত সমূহের বিচারক নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতা প্রদান করতে পারেন।
তবে, খলীফাই হচ্ছেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি রাষ্ট্রের কেন্দ্রে অবস্থিত মাহকামাতুল মাযালিমের সদস্যদের নিয়োগ ও অপসারণ করার অধিকার সংরক্ষণ করেন। তবে, মাহকামাতুল মাযালিমের প্রধান বিচারককে অপসারণের ক্ষেত্রে বলা যায় যে, যদিও তিনিই খলীফার অপসারণ সম্পর্কিত বিষয়ে তদন্ত করবেন, তারপরেও নীতিগতভাবে খলীফারই রয়েছে তাকে অপসারণের ক্ষমতা। এর কারণ হল, খলীফাই হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যার তাকে নিযুক্ত করার ক্ষমতা রয়েছে, ঠিক যেভাবে তিনি অন্যান্য বিচারকদের নিযুক্ত করে থাকেন। তবে, খলীফার বিরুদ্ধে কোন তদন্ত চলাকালে যদি তাকে মাযালিমের প্রধান বিচারককে অপসারণের ক্ষমতা প্রদান করা হয়, তবে প্রদত্ত এ ক্ষমতা তাকে হারামের দিকে পরিচালিত করতে পারে। এজন্য, এ ধরনের পরিস্থিতিতে শারী’আহ্ মূলনীতি: “যা কিছু হারামের দিকে ধাবিত করে, তা নিজেই হারাম” এটি প্রযোজ্য হবে। যেহেতু এই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে, সেহেতু এক্ষেত্রে শারী’আহ্ এ মূলনীতিটি প্রযোজ্য হবে।
এই ধরনের পরিস্থিতি বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে যে, যখন খলীফা কিংবা, তার সহকারীবৃন্দ অথবা, তার প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে কোন তদন্ত বা মামলা চলতে থাকবে। এর কারণ হল, এ ধরনের পরিস্থিতিতে যদি খলীফাকে মাযালিমের প্রধান বিচারককে অপসারণ করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়, তবে তা বিচারের রায়কে প্রভাবিত করতে পারে; এবং স্বাভাবিকভাবেই এ পরিস্থিতি, প্রয়োজনের খাতিরে উক্ত বিচারকের খলীফা বা, তার সহকারীবৃন্দ কিংবা, প্রধান বিচারককে অপসারণ করার ক্ষমতাকে সংকুচিত করবে। এক্ষেত্রে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে খলীফার হাতে উক্ত বিচারককে অপসারণ করার প্রদত্ত ক্ষমতা হারাম কার্য সম্পাদনের একটি উপায় বা পন্থা; অর্থাৎ, এ পরিস্থিতিতে খলীফার হাতে এ ক্ষমতা প্রদান করা শারী’আহ্ দৃষ্টিকোন থেকে হারাম বা নিষিদ্ধ।
এছাড়া অন্য সবক্ষেত্রে, বিধানটি একই রকম থাকবে। অর্থাৎ, মাযালিমের বিচারককে অপসারণ করার ক্ষমতা খলীফার হাতেই ন্যস্ত থাকবে, যেভাবে তার উক্ত বিচারককে নিয়োগ করার ক্ষমতা রয়েছে।
মাযালিমের বিচারকের আবশ্যিক ক্ষমতা
মাযালিম আদালতের অন্যায় আচরণ (মাযলিমা) সংক্রান্ত যে কোন বিষয়ে তদন্ত করার আবশ্যিক ক্ষমতা রয়েছে; সে অন্যায় আচরণ সরকারী কোন কর্মচারীর দ্বারা সংঘটিত হোক; কিংবা, খলীফার কাজের সাথে শারী’আহ্’র দ্বন্দ বিষয়ক হোক; কিংবা, সংবিধানের আইনী ব্যাখ্যা বিষয়ক হোক; কিংবা, খলীফা কর্তৃক গৃহীত আইনকানুন বা বিভিন্ন প্রকারের শারী’আহ্ বিধিবিধান যেমন: জনগণের উপর করধার্য করা বা অন্যকোন বিষয় সম্পর্কিত হোক।
মাযালিম আদালত যে কোন ধরনের অন্যায় আচরণ, তা কোন সরকারী কর্মচারীর সাথে সম্পর্কিত হোক, খলীফার দ্বারা শারী’আহ্ আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে হোক, সংবিধান, আইনী দলিল বা খলীফা কর্তৃক জারিকৃত কোন আইনকানুনের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত হোক, জনগণের উপর করধার্যের বিষয়ে হোক; কিংবা, রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক জনগণের উপর কৃত জুলুম-নির্যাতন বিষয়ক হোক, যেমন: রাষ্ট্র কর্তৃক জোরপূর্বক জনগণের সম্পদ দখল করা বা, তাদের নিকট হতে সম্পদ সংগ্রহ কালে শারী’আহ্ নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করা; কিংবা, সরকারী কর্মচারী বা সেনাবাহিনীর সদস্যদের বেতনভাতা কমিয়ে দেয়া বা বেতন প্রদানে বিলম্বিত করা ইত্যাদি বিষয়ক হোক: এ সকল বিষয়ের তদন্ত করার জন্য কোন ব্যক্তির বিচারকের সম্মুখে উপস্থিতি, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সমনজারী বা, কোন ফরিয়াদীর প্রয়োজন নেই। বরং, এটা হল এ সকল বিষয়ে মাযালিম আদালতের তদন্ত করার আবশ্যিক ক্ষমতা, এমনকি এ সব বিষয়ে যদি কেউ কোন অভিযোগ দায়ের না করে তবুও।
এর কারণ হল, যে সমস্ত শারী’আহ্ দলিল-প্রমাণ বিচারকার্য চলাকালে বিচারকের সম্মুখে উপস্থিতিকে শর্ত হিসাবে আরোপ করে, সেগুলো মাযালিম আদালতের জন্য প্রযোজ্য নয়। কারণ, এ সকল মামলার কোন ফরিয়াদী নেই, তাই ফরিয়াদীর আদালতে উপস্থিতি শর্ত হিসাবে বিবেচ্য নয়। বস্তুতঃ কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে কোন অভিযোগ দায়ের না করলেও মাযালিম আদালতের কোন মাযলিমা (অন্যায় আচরণ) তদন্ত করার অধিকার রয়েছে; এ কারণে বাদীর আদালতে হাজির হবার কোন প্রয়োজন নেই। একইসাথে, বিবাদী বা অভিযুক্ত ব্যক্তির উপস্থিতি ব্যতীতই এ আদালত এ সকল মামলার তদন্ত করতে পারে। সুতরাং, আদালতের প্রয়োজনীয়তাকে অপরিহার্য প্রমাণিত করে এমন শারী’আহ্ দলিল এক্ষেত্রে বিবেচিত হবে না। আদালতের প্রয়োজনীতাকে অপরিহার্য করে এ রকম দলিলসমূহ হল: আবদুল্লাহ্ ইবন যুবায়েরের বরাত দিয়ে আবু দাউদ ও আহমাদ বর্ণিত হাদীসটি, যেখানে তিনি বলেছেন: “আল্লাহ্’র রাসূল (সা) নির্দেশ দিয়েছেন যে, “বিবাদমান দু’পক্ষ যেন বিচারকের সামনে বসে।” এবং আলী (রা) এর প্রতি রাসূল (সা) এর নির্দেশ: “যদি বিবাদমান দু’পক্ষ তোমার সামনে উপস্থিত হয়…।”
সুতরাং, মাযালিমের বিচারক এ ক্ষমতা সংরক্ষণ করেন যে, কোন মাযলিমা সংঘটিত হলে যে কোন স্থানে, যে কোন সময় কিংবা, কোন আদালত ব্যতীতই এ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারেন। বস্তুতঃ এ আদালতের আবশ্যিক ক্ষমতা এবং এর অবস্থানগত মর্যাদার ভিত্তিতে, অতীতে সবসময়ই এটি উচ্চ সামাজিক মর্যাদা ও আড়ম্বরপূর্ণতা দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। মিশর ও আল-শামে সুলতানদের শাসনামলে, সুলতানদের কাউন্সিল যা কিনা মাযলিমা সংক্রান্ত বিষয়সমূহ দেখাশুনা করতো, তা ‘ন্যায়বিচারের গৃহ’ (House Of Justice) নামে পরিচিত ছিল; যেখানে সুলতান তার পক্ষ থেকে সহকারী নিয়োগ করতেন এবং সেইসাথে, বিচারক ও ফকীহ্গণও সেখানে উপস্থিত থাকতেন। আল মাকরিজী তার “আল-সুলুক ইলা মা’রিফাত দুওয়াল আল-মুলক” (The way to know the states of the king) নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, সুলতান আল-মালিক আল-সালিহ্ আইয়ুব হাউস অব জাস্টিস-এ তার পক্ষ থেকে ডেপুটি নিয়োগ করতেন; যেখানে তারা সাক্ষী, বিচারক এবং ফকীহ্’দের উপস্থিতিতে সকল প্রকার অন্যায় আচরণ দূরীভূত করার লক্ষ্যে কাজ করতেন। সুতরাং, মাযালিমের আদালতের জন্য চমৎকার ও আকর্ষণীয় স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ভবন নির্মাণে কোন ক্ষতি নেই; কারণ, এটি মুবাহ্ (অনুমোদিত) কাজের অন্তর্ভূক্ত; বিশেষ করে এ রকম একটি ভবনের মাধ্যমে যদি বিচারব্যবস্থার প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিফলিত হয়।
খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বেকার চুক্তি, লেনদেন ও বিচারিক রায়
খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি ও লেনদেন, সেইসাথে এ সংক্রান্ত আদালতের রায় যা ইতিমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ও খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বেই কার্যকর হয়েছে, তা খিলাফতের অধীনে বৈধ বলে বিবেচিত হবে। খিলাফতের বিচার বিভাগ এ মামলাগুলো পূণরায় তদন্ত করবে না, বা এগুলোকে পূণরায় নিষ্পত্তি করবে না। খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পর এগুলোর ব্যাপারে আর নতুন কোন মামলা গৃহীত হবে না। তবে, দু’টি বিষয় এর বাইরে থাকবে:
১) খিলাফতের পূর্বে যে মামলাটি নিষ্পন্ন হয়েছে এবং কার্যকরী হয়েছে যদি এর ধারাবাহিকতা খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পরও রয়ে যায় এবং তা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক হয়।
২) যদি মামলাটি এমন কারও সাথে সম্পর্কিত হয়, যার কারণে ইসলাম ও মুসলিম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উপরোক্ত দু’টি বিষয় ব্যতীত, খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বেকার নিষ্পত্তিকৃত চুক্তি, লেনদেন এবং মামলাসমূহ, যে সংক্রান্ত রায় খিলাফতের পূবেই কার্যকরী হয়েছে, তা পূণরায় নিষ্পত্তি না করা বা এ সংক্রান্ত মামলা নতুন করে গৃহীত না হবার দলিল হিসাবে বলা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যে গৃহ থেকে মদিনায় হিজরত করেছিলেন, মক্কাবিজয়ের পর তিনি আর সে গৃহে ফিরে যাননি। কুরাইশদের আইন অনুসারে, উকাইদ ইবন আবি তালিব তার সে সব আত্মীয়-স্বজনের গৃহসমূহ উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছিলেন, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং হিজরত করেছিল।
উত্তরাধিকার সূত্রে এ গৃহসমূহের মালিকানা লাভ করার পর উকাইদ এগুলো অধিগ্রহণ করে এবং পরবর্তীতে বিক্রি করে দেয়, যার মধ্যে রাসূল (সা) এর গৃহও অন্তর্ভূক্ত ছিল। মক্কাবিজয়ের পর রাসূল (সা) কে জিজ্ঞেস করা হল: “আপনি কোন গৃহে অবস্থান করতে চাচ্ছেন?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “উকাইদ কি আমাদের কোন গৃহ ছেড়ে দিয়েছে?” (সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-৩০৫৮) অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি বললেন: “উকাইদ কি আমাদের জন্য কোন গৃহ ছেড়ে দিয়েছে?” তখন তাঁকে বলা হল যে, উকাইদ রাসূল (সা) এর বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছে, কিন্তু রাসূল (সা) তা বাতিল বলে ঘোষণা করলেন না। এই হাদীসটি উসামা বিন যায়িদের সূত্রে আল-বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (উসামা (রা)) বলেছেন: মক্কা বিজয়ের দিন তিনি বললেন, “হে আল্লাহ্’র রাসূল! আগামীকাল আপনি কোথায় থাকতে চান?” তখন রাসূল (সা) জিজ্ঞেস করলেন, “উকাইল কি আমাদের কোন বাড়ি ছেড়ে দিয়েছে?” (সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-৩০৫৮)
এছাড়া, আরও বর্ণিত আছে যে, আবু আল-’আস ইবন আল-রাবী ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মদিনায় হিজরত করেন। কিন্তু, এর পূর্বে তার স্ত্রী যয়নাব ইসলাম গ্রহণ করেন এবং বদরের যুদ্ধের পর মদিনায় হিজরত করেন, তখনও তিনি (ইবন আল-রাবী) মুশরিক অবস্থায় মক্কায় ছিলেন। (মুসলিম হবার পর) রাসূল (সা) বিবাহচুক্তি নবায়ন না করেই তার স্ত্রী’কে তার নিকট ফেরত দেন। এটা ছিল অন্ধকার যুগে সম্পাদিত বিবাহচুক্তির স্বীকৃতি প্রদান। এছাড়া, ইবন আব্বাসের সূত্রে ইবনে মাজাহ্ বর্ণনা করেছেন যে:
“রাসূল (সা) দুই বছর পর তাঁর কন্যাকে অর্থাৎ, যয়নাবকে প্রথম বিবাহের চুক্তির উপর ভিত্তি করেই আবু আল-’আস ইবন আল-রাবী কাছে ফেরত পাঠান।”
(সূনানে তিরমিযী, হাদীস নং-১১৪২)এছাড়া, খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বের যেসব লেনদেন ও মামলার ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক ধারাবাহিক প্রভাব বিদ্যমান থাকে, সেসব ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সেগুলোকে বাতিল বলে ঘোষণা করেছেন। যেমন: ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে আসার পর মক্কার লোকদের উপর ইবন আব্বাসের ঋণের যে সুদ ছিল, তিনি (সা) তা বাতিল বলে ঘোষণা করেন এবং লোকেরা শুধু প্রকৃত ঋণ ফেরত দেয়। এর অর্থ হচ্ছে, দার-উল-ইসলামে তাদের উপর আরোপিত সুদ বাতিল বলে গণ্য হয়েছিল। সূলাইমান ইবন আমরু তার পিতা হতে এবং আবু দাউদ সুলাইমান হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (সুলাইমানের পিতা) বলেছেন যে:
‘আমি বিদায়হজ্জ্বের দিন আল্লাহ্’র রাসূল (সা) কে বলতে শুনেছি যে:
“সাবধান! অন্ধকার যুগের (জাহিলিয়াতের) সমস্ত সুদ বাতিল করা হয়েছে। তোমরা কেবলমাত্র আসল অর্থের দাবি করতে পারবে। তোমরা একে অন্যের উপর জুলুম করো না এবং জুলুমের শিকার হয়ো না।”
এছাড়া, জাহিলিয়াতের সময় যাদের চারের অধিক স্ত্রী ছিল, দার-উল-ইসলামে তাদেরকে শুধুমাত্র চারজন স্ত্রী রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকে তিরমিযী বর্ণনা করেছেন যে, ঘাইলান ইবনে সালামাহ্ ইবনে ছাকাফি যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তার দশজন স্ত্রী ছিল যারা তার সাথেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। “রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে স্ত্রীদের মধ্য হতে চারজনকে পছন্দ করার নির্দেশ দেন।”
সুতরাং, সেইসব চুক্তি, যার ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক ধারাবাহিক প্রভাব বিদ্যমান রয়েছে, এই ধরনের প্রভাব অবশ্যই দূরীভূত করতে হবে। এই প্রভাব দূর করা আবশ্যকীয় বলে বিবেচিত হবে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, যদি কোন মুসলিম নারী খিলাফত প্রতিষ্ঠার পূর্বে কোন খ্রিষ্টান পুরুষকে বিয়ে করে, তাহলে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার সাথে সাথে শারী’আহ্ নিয়ম অনুযায়ী সে বিয়ে বাতিল বলে গণ্য করা হবে।
আর, যাদের দ্বারা ইসলাম ও মুসলিমগণ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করার ব্যাপারে বলা যায় যে, এটা অনুমোদিত এ কারণে যে, মক্কাবিজয়ের পর আল্লাহ্’র রাসূল (সা) ক্ষমা ঘোষণার সাথে সাথে কিছু কিছু কাফের ব্যক্তিদের রক্তপাতের ঘোষণা দেন; কারণ, তারা সবসময় ইসলাম ও মুসলিমদের ক্ষতিসাধনে ব্যস্ত ছিল। এমনকি যদি তারা কাবার চাদর ধরে ঝুলে থাকে তবুও তাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। যদিও এর পূর্বে তিনি (সা) এ ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, “ইসলাম তার পূর্বের সবকিছুকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়”, যে হাদীসটি আমর ইবনুল ’আস (রা) এর সূত্রে আহমাদ ও তাবারানী কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে। এর অর্থ হল, যারা ইসলাম ও মুসলিমদের ক্ষতিসাধন করেছে, তারা এ হাদীসের বর্হিভূত বলে বিবেচিত হবে।
তবে, যেহেতু রাসূল (সা) পরবর্তীতে এদের মধ্যে কিছু ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন, যেমন, তিনি (সা) ইকরামা ইবন আবু জাহলকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। এজন্য খলীফা চাইলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন; কিংবা, তাদেরকে ক্ষমাও করে দিতে পারেন।
উপরোল্লিখিত বিষয় দু’টি বাদে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বে নিষ্পত্তিকৃত সকল চুক্তি ও লেনদেন এবং এ সংক্রান্ত মামলার রায় বাতিল বলে গণ্য করা হবে না; বা, পূণরায় নিষ্পত্তি করা হবে না, যদি সেগুলো খিলাফতের পূর্বেই নিষ্পত্তি ও কার্যকরী হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, কোন ব্যক্তি যদি স্কুলের দরজা ভাঙ্গার দায়ে দু’বছরের কারাদন্ড প্রাপ্ত হয় এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বেই সে তার সাজার মেয়াদ শেষ করে এবং জেল থেকে বেরিয়ে যায়; এরপর, খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পর যদি সে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা শুরু করতে চায়, কারণ, তার দৃষ্টিতে তার উপর অন্যায় করা হয়েছে, তবে এ বিষয়ে কোন মামলা গৃহীত হবে না। কারণ, ঘটনাটি ঘটে গেছে এবং এ ব্যাপারে রায় প্রদান করা হয়েছে এবং সাজার মেয়াদ খিলাফত প্রতিষ্ঠার পূর্বেই শেষ হয়েছে। এ ধরনের বিষয়সমূহ পুরস্কারের আশায় আল্লাহ্’র তা’আলার কাছে পেশ করতে হবে।
কিন্তু, যদি এমন হয় যে, উক্ত ব্যক্তিকে এ অভিযোগে দশ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়েছে এবং দশ বছরের মধ্যে সে দু’বছর সাজা ভোগ করেছে এবং এর মধ্যে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তখন এক্ষেত্রে খলীফার বিষয়টি পুনঃতদন্ত করার এখতিয়ার রয়েছে; হয় তিনি শাস্তির এ রায় বাতিল করে এবং তাকে অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দিয়ে তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দিতে পারেন; কিংবা, যে শাস্তি সে ইতিমধ্যে ভোগ করেছে তা যথেষ্ট মনে করে তাকে মুক্ত করতে পারেন। আবার এমনও হতে পারে যে, তিনি জনস্বার্থ ও এ সংশ্লিষ্ট শারী’আহ্ আইন বিবেচনায় রেখে, বিশেষ করে এ বিষয়টি যদি জনস্বার্থের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ হয় তাহলে তিনি শাস্তির বাকী সময়টুকু পূণর্বিবেচনা করতে পারেন।
শিল্প বিভাগ

শিল্প বিভাগ হচ্ছে এমন একটি বিভাগ যা শিল্প সংক্রান্ত সকল বিষয়ের দায়িত্ব পালন করে থাকে; তা ভারী শিল্প সম্পর্কিতই হোক, যেমন: মোটর, ইঞ্জিন, যানবাহন, সরঞ্জামাদি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি কিংবা হালকা শিল্পের সাথে সম্পর্কিতই হোক। রাষ্ট্রে অবস্থিত গণমালিকানাধীন বা ব্যক্তি মালিকানাধীন সকল শিল্পকারখানা, যেগুলোর সাথে সামরিক শিল্পের সম্পর্ক রয়েছে, সেগুলো অবশ্যই যুদ্ধনীতির উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এর কারণ হল, জিহাদের জন্য প্রয়োজন সেনাবাহিনী; আর, সেনাবাহিনীর প্রয়োজন অস্ত্রশস্ত্র। এই সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র যেন সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন এবং সর্বাবস্থায় সহজলভ্য হয় এজন্য রাষ্ট্রের নিজস্ব শিল্পকারখানা থাকা আবশ্যক। বিশেষ করে সামরিক শিল্পকারখানা কারণ, জিহাদের সাথে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
খিলাফত রাষ্ট্র যেন স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অধিকারী হয় এবং অন্যকোন রাষ্ট্র যেন তাকে প্রভাবিত করতে না পারে, এজন্য রাষ্ট্রকে অবশ্যই নিজে নিজের অস্ত্রশস্ত্র তৈরী করতে হবে এবং এগুলোকে ক্রমাগতভাবে উন্নত করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এ নীতি খিলাফত রাষ্ট্রকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অধিকারী করবে এবং রাষ্ট্রকে প্রযুক্তিগতভাবে সর্বাধুনিক ও সবচাইতে শক্তিশালী অস্ত্রশস্ত্রের অধিকারী রাষ্ট্রে পরিণত করবে। একইসাথে, এ নীতি রাষ্ট্রকে এমন সব যুদ্ধাস্ত্রের অধিকারী করবে যা রাষ্ট্রের নিশ্চিত ও সম্ভাব্য শত্রুর অন্তরে প্রচন্ড ভীতির সৃষ্টি করবে। এ ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘আর প্রস্তূত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যাই কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি সামর্থ্যরে মধ্যে থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে, যেন ভীতির সঞ্চার হয় আল্লাহ্’র শত্রুদের উপর এবং তোমাদের শত্রুদের উপর আর তাদেরকে ছাড়া অন্যান্যদের উপরও যাদেরকে তোমরা জান না; আল্লাহ্ তাদেরকে চেনেন।’
[সূরা আনফাল: ৬০]সুতরাং, উপরোক্ত আয়াত অনুসারে, খিলাফত রাষ্ট্রের থাকবে নিজস্ব ইচ্ছাশক্তি, সে উৎপাদন করবে তার প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র এবং এগুলোকে সে ক্রমাগত এমন ভাবে উন্নত করবে যাতে করে রাষ্ট্রের নিশ্চিত ও সম্ভাব্য শত্রুর অন্তরে প্রবল ভীতির সৃষ্টি করার লক্ষ্যে রাষ্ট্র সর্বোচ্চ শক্তিশালী ও সর্বাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের অধিকারী হয়। সুতরাং, নিজের অস্ত্রশস্ত্র নিজে উৎপাদন করা খিলাফত রাষ্ট্রের একটি অত্যাবশ্যকীয় দায়িত্ব এবং এ ব্যাপারে অন্য কারো উপর নির্ভর করা রাষ্ট্রের জন্য অনুমোদিত নয়। কারণ, তাহলে এ নির্ভরশীলতা অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহকে খিলাফত রাষ্ট্রের ইচ্ছাশক্তি, এর অস্ত্রশস্ত্র ও এর যুদ্ধঘোষণাকে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ তৈরী করে দেবে।
বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় এটা সুস্পষ্ট যে, অস্ত্রবিক্রেতা দেশসমূহ অন্যান্য দেশগুলোর কাছে সাধারণতঃ সব ধরনের অস্ত্র বিক্রি করে না, বিশেষ করে সর্বাধুনিক অস্ত্র। এমনকি তারা বিশেষ শর্ত আরোপ ব্যতীতও অস্ত্র বিক্রয় করে না, যাতে করে তাদের স্বার্থ রক্ষিত হয়। আবার অস্ত্র বিক্রয়ের সময় ক্রেতা দেশ নয়, বরং তারা নিজেরাই এর পরিমাণ নির্ধারণ করে থাকে। যা অস্ত্রবিক্রেতা দেশটিকে ক্রেতা দেশটির উপর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরী করে এবং তারা সহজেই ক্রেতা দেশটির উপর তাদের নিজস্ব ইচ্ছা ও সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে ক্রেতা দেশটি যদি যুদ্ধরত অবস্থায় থাকে; কারণ, এ পরিস্থিতিতে তাদের ব্যাপক অস্ত্রশস্ত্র, ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ ও গোলাবারুদের প্রয়োজন হয়। ফলশ্রুতিতে, ক্রেতা দেশটি অস্ত্রবিক্রেতা দেশটির উপর ক্রমান্বয়ে আরও বেশী নির্ভরশীল হয়ে যায় এবং এ পরিস্থিতি দেশটিকে অন্যান্য দেশের চাওয়া-পাওয়ার অধীনস্থ করে তোলে। এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে, অস্ত্রবিক্রেতা দেশটি ক্রেতা দেশটির স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে পুরোপুরি ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, বিশেষতঃ যুদ্ধের সময় যখন গোলাবারুদ, অস্ত্রশস্ত্র ও ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশের ব্যাপক চাহিদা থাকে। এর ফলে, ক্রেতা দেশটি অস্ত্র রপ্তানীকারক দেশটির কাছে তার নিজস্ব ইচ্ছাশক্তি বিকিয়ে দিয়ে জিম্মি রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
উপরোল্লিখিত কারণসমূহ পর্যালোচনা করে এটা বলা যায় যে, খিলাফত রাষ্ট্রকে অবশ্যই স্বাধীনভাবে নিজে নিজের অস্ত্রশস্ত্র এবং ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশসহ যুদ্ধযন্ত্রের সাথে জড়িত সমস্ত কিছু উৎপাদন করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। আর এটা কখনই সম্ভবপর হবে না, যদি না রাষ্ট্রের অধিকারে ভারী শিল্প থাকে এবং রাষ্ট্র এমন সব কলকারখানা স্থাপন করে যা সামরিক ও বেসামরিক ভারী শিল্পদ্রব্যাদি উৎপাদন করে। সুতরাং, এটা অত্যাবশ্যকীয় যে, সকল ধরনের পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র, রকেট, স্যাটেলাইট, উড়োজাহাজ, ট্যাঙ্ক, মহাকাশযান, মোটরগাড়ি, নৌযান, সাঁজোয়াযান এবং অন্যান্য সকল ভারী ও হালকা অস্ত্রশস্ত্র উৎপাদনের জন্য রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় কলকারখানা স্থাপন করতে হবে; এবং সেইসাথে এটাও প্রয়োজনীয় যে, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এমন সব কলকারখানা থাকবে যা যন্ত্রপাতি, মোটর, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি, ইলেক্ট্রনিক পণ্য ইত্যাদি তৈরী করবে। এছাড়া, রাষ্ট্রে থাকবে গণমালিকানা সম্পদের সাথে সম্পর্কিত কলকারখানা এবং সেইসাথে থাকবে সামরিকশিল্পের সাথে জড়িত হালকা সরঞ্জামাদি উৎপাদনের কারখানা। এ সমস্ত কিছুই যুদ্ধ প্রস্তুতির আওতাধীন এবং আল্লাহ্’র বিধান অনুযায়ী এ প্রস্তুতি গ্রহণ করা মুসলিমদের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। পবিত্র কুর’আনে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
‘আর প্রস্তূত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যাই কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি সামর্থ্যরে মধ্যে থেকে’
[সূরা আনফাল : ৬০]যেহেতু ইসলামী রাষ্ট্র দাওয়াতী কার্যক্রম ও জিহাদের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ইসলামের বাণী বহন করে নিয়ে যাবে, সেহেতু এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রকে সবসময় অব্যাহতভাবে জিহাদের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আর একারণেই, যুদ্ধনীতির উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রকে নিজস্ব ভারী ও হালকা শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে হবে। যেন যে কোন সময় রাষ্ট্র এ কলকারখানাগুলোকে সামরিক প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে রূপান্তরিত করতে পারে। সুতরাং, খিলাফত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরস্থ সকল ভারী ও হালকা শিল্পকারখানা অবশ্যই যুদ্ধনীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে যেন রাষ্ট্রের প্রয়োজনে যে কোন সময় এ সকল কারখানাকে সামরিক।
পররাষ্ট্র বিষয়ক বিভাগ

পররাষ্ট্র বিভাগ রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সম্পর্কিত বিষয় অর্থাৎ, খিলাফত রাষ্ট্রের সাথে অন্যান্য রাষ্ট্র সম্পর্কিত সকল বিষয়ের দায়িত্ব পালন করে থাকে – এই বিষয় ও সম্পর্ক যাই হোক না কেন। এ বিষয়সমূহ রাজনৈতিক হতে পারে যেখানে শান্তি চুক্তি, যুদ্ধবিরতি, সমঝোতা চুক্তি, দূত নিয়োগ, বার্তাবাহক ও প্রতিনিধি প্রেরণ এবং দূতাবাস ও বাণিজ্যিক দূতের আবাস স্থাপন অন্তর্ভুক্ত। আবার অন্যান্য সম্পর্কও হতে পারে, যেমন: অর্থনৈতিক, কৃষি, বাণিজ্য, ডাকযোগাযোগ, তারযুক্ত বা তারবিহীন যোগাযোগ ইত্যাদি। খিলাফত রাষ্ট্রের সাথে অন্য রাষ্ট্রের সম্পর্ক বজায় রাখার দায়িত্বে নিয়োজিত পররাষ্ট্র বিষয়ক বিভাগ এসব কার্যই সম্পাদন করে থাকে।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) অন্যান্য বৈদেশিক রাষ্ট্র ও জনগোষ্ঠীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। তিনি উসমান বিন আফফান (রা) কে কুরাইশদের সাথে সমঝোতার জন্য পাঠিয়েছিলেন; ঠিক একইভাবে তিনি কুরাইশ প্রতিনিধিদের সাথে সমঝোতার লক্ষ্যে আলোচনায় বসেছিলেন। তিনি বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ্’র কাছে প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন এবং রাজা-বাদশাহ্ ও নেতাদের প্রতিনিধি গ্রহণ করেছেন। এছাড়া, তিনি বিভিন্ন ধরনের চুক্তি ও শান্তি চুক্তি সম্পাদন করেছেন। পরবর্তীতে, তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে খোলাফায়ে রাশেদীনগণও (রা) অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। তাঁরা হয় নিজেরা এ সকল কাজ সম্পাদন করতেন কিংবা তাঁরা তাঁদের পক্ষ থেকে এ সকল কার্যাবলী সম্পাদন করার জন্য যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিনিধি নিয়োগ করতেন।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সম্পর্কের জটিলতা, বিস্তৃতি ও বৈচিত্র্যতার কারণে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, খলীফা তার পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র বিষয়ক একটি আলাদা বিভাগ গঠন করবেন; যেখানে খলীফা হয় রাষ্ট্রের অন্যান্য শাসন বিষয়ক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের মত প্রত্যক্ষভাবে শারী’আহ্ বিধিবিধান অনুযায়ী এ সব বিষয় তদারকী করবেন কিংবা, তার নির্বাহী সহকারীর মাধ্যমে এ সকল বিষয়ের তদারকী করবেন।










