তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২সাইফুল আজম: ইসরায়েলের সবচেয়ে বেশি বিমান গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন যে বাংলাদেশি

খবর:
ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে বিরোধ চলছে কয়েক দশক ধরে। গোটা আরব মিলে ইসরাইলের সঙ্গে এ পর্যন্ত ৩ বার যুদ্ধ হয়েছে। তৃতীয় আরব ইসরাইল যুদ্ধ হয় ১৯৬৭ সালে। তবে এই যুদ্ধে বীরত্ব দেখায় এক বাংলাদেশী। ইসরাইলের বিমান ভূপাতিত করে রেকর্ড করেন তিনি। এমনকি ইসরাইলের ইতিহাসে কোন একক ব্যক্তির হাতে সবচেয়ে বেশি যুদ্ধ বিমান ধ্বংসের রেকর্ড এই বাংলাদেশীর। বাংলাদেশের এই আকাশ যোদ্ধার নাম সাইফুল আজম সুজা। পৃথিবীর মাত্র ২২ জন “লিভিং ইগল” খেতাব পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি একজন। আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই সাইফুল আজম একটি অনন্য রেকর্ড তৈরি করেন। ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ভূপাতিত করেছেন সর্বোচ্চ তিনটি ইসরায়েলি বিমান। (https://www.youtube.com/watch?v=nG34intSig4)
মন্তব্য:
মুসলিম ফাইটার পাইলট সাইফুল আজমের এই সাহসী গল্প প্রমাণ করেছে যে, মুসলিম সামরিক বাহিনী শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শারীয়াহ্ বাধ্যবাধকতাকে কখনোই সে যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতি/ফলাফলের (Consequences) দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না। বরং মুসলিম সেনাবাহিনী দখলকৃত ইসলামী ভূমিকে শত্রুদের কবল থেকে মুক্ত করাকে সর্বদাই শরীয়াহ বাধ্যবাধকতা (ওয়াজিব) হিসেবে বিবেচনা করেছে। যার ফলে ইসলামী উম্মাহ্’র এই অকুতোভয় ও সাহসী বীর সন্তান সাইফুল আজম ব্যাকডেটেড সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে উন্নতমানের সামরিক সরঞ্জামে সজ্জিত শত্রুদেরকে ধরাশায়ী এবং পরাস্ত করার রোল মডেল হয়ে উঠেছিলেন। সে সময়ে ইসরাইলি সুপারসনিকের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো সমকক্ষ বিমান আরবদের না থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধের সম্ভাব্য ফলাফল/পরিণতির দিকে চিন্তা না করে ইসরাইলিদের ঠেকাতে শুধুমাত্র সাধারণ মানের “হকার হান্টার’ জঙ্গি বিমান দিয়ে ক্ষিপ্রগতির দুটি ইসরাইলি সুপারসনিক ঘায়েল করেন সাইফুল আজম। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই সাইফুল আজম সর্বোচ্চ তিনটি ইসরাইলি বিমান ভূপাতিত করার অনন্য রেকর্ড তৈরি করেন।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে সাইফুল আজমের মতো অগণিত সাহসী যোদ্ধারা এখনও মুসলিম সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিদ্যমান থাকলেও মুসলিম ভূখন্ডের দালাল শাসকরা ফিলিস্তিনকে মুক্ত করতে সামরিকভাবে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাব্য ফলাফল, সহকর্মী কিংবা উচ্চপদস্থ ও অধীনস্ত অফিসারদের প্রতিক্রিয়া এবং এই পদক্ষেপের সফলতার অনিশ্চয়তার ব্যাপারে তাদেরকে প্রতিনিয়ত ভয়-ভীতি দেখাচ্ছে। অথচ মুসলিম ভুমিতে কাফিরদের আক্রমণ ও আগ্রাসনের মুখে শারীয়াহ্’র স্পষ্ট ফরজ (ওয়াজিব) বিধান হল উপযুক্ত সামরিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে তাদেরকে বিতাড়িত করা। এবং এক্ষেত্রে এইকাজে যাদের ‘সক্ষমতা’ আছে তাদের উপর তথা সামরিক বাহিনীর উপর মূল দায়িত্ব বর্তায়। কিন্তু বর্তমান দালাল শাসকগোষ্ঠী তাদেরকে জাতিসংঘের অধীনে পশ্চিমা কাফিরদের কুফর যুদ্ধে অংশ নিতে ও জীবন দিতে প্রেরণ করছে আর মুসলিমদের সাহায্যের বেলায় তাদেরকে ব্যারাকে বন্দি করে রেখেছে। তাই এরাই সামরিক বাহিনীর শারীয়াহ্ হুকুমের দায়িত্ব পালনের পথে প্রধান বাধা।
তাই সামরিক বাহিনীর নিষ্ঠাবান অফিসারদের মধ্যে যারা মসজিদুল আকসা ও ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিকে অবৈধ ইহুদী রাষ্ট্রের কবল মুক্ত করার চেতনায় উদ্বুদ্ধ ও ব্যাকুল হয়ে আছেন তাদেরকে অবশ্যই অনতিবিলম্বে দালাল শাসকগোষ্ঠীকে অপসারণ করে খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলিম জাহানের খলিফার নেতৃত্বে আসতে হবে। যিনি দ্রুততার সহিত আমাদের এই সুসংগঠিত ও প্রশিক্ষিত বাহিনীকে অভিযানে পাঠাবেন যাতে অবৈধ ইহুদী রাষ্ট্রটি দুনিয়া থেকে স্থায়ীভাবে বিলিন হয় এবং মাসজিদুল আক্বসা ও ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমি মুক্ত হয়। আমাদের সামরিক বাহিনীর নিষ্ঠাবান অফিসারদের তাদের পূর্বসুরী সাইফুল আজম, সালাউদ্দিন আইয়্যুবী, সাইফুদ্দিন কুতুজ এর পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে। দখলদার ইহুদী সত্ত্বার তথাকথিত অজেয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কল্পকথা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ইতিপূর্বে ফিলিস্তিনকে মুক্ত করার বীর সেনানায়ক সালাহউদ্দিন আইয়ুবিও জেরুজালেম অভিযানের সময় এর ফলাফলের চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হননি যাকে ক্রুসেডাররা সতর্ক করে বলেছিল, “জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হলে আপনার একটি চোখ নষ্ট হতে পারে। উত্তরে সালাহউদ্দিন বললেন: “আমি আল্লাহ্’র নামে শপথ করে বলছি, আমি জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হবোই, এমনকি যদি আমাকে জেরুজালেমে অন্ধ হয়েও প্রবেশ করতে হয়!” এমনকি যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, “আপনি মিশর, সিরিয়া এবং অন্যান্য ভূ-খণ্ডের সুলতান তবুও আমরা আপনাকে হাসতে দেখি না, তিনি উত্তর দিয়েছিলেন: যখন বায়তুল মাকদিস, জেরুজালেম ক্রুসেডারদের হাতে বন্দি তখন কীভাবে আমি হাসতে পারি?”
– সিফাত নেওয়াজ
ইউরোপে সেকুলারিজমের উত্থান

পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক মুল্যবোধ চাপিয়ে দিতে প্রতিনিয়ত ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও আঘাত করে চলেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকার রাষ্ট্রদূতগণ একের পর এক সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত মুসলিম ভুমিগুলোতে সফর শুরু করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের ইসলামী জীবনাদর্শ দূরে রাখা এবং সেকুলার পুঁজিবাদী আদর্শ মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দেওয়া। আমরা এই আর্টিকেলে ইউরোপে সেকুলার চিন্তার উত্থান নিয়ে আলোচনা করব। সেকুলার পুঁজিবাদী চিন্তা কত ঠুনকো, প্রতিক্রিয়াশীল এবং কোন স্বাভাবিক/বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নয়; আমরা তা আলোকপাত করব।
সুদীর্ঘ সময় চার্চের জুলুম অত্যাচারের ফলে ১৮ শতকে ইউরোপের মানুষের মাঝে একধরনের চিন্তার বিপ্লব ঘটে। ফলে চার্চ সবক্ষেত্রে তার জুলুমে নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ও শাসন কর্তৃত্ব হারায়। এই উত্থান ছিল মুলতঃ চার্চের বিরুদ্ধে তৎকালীন বুদ্ধিজীবীদের দীর্ঘ সংগ্রামের ফল। তাদের এই উত্থান মানব, জীবন ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের পুর্ববর্তী দৃষ্টিভংগী পালটে দিতে থাকে। ইউরোপের জনগণ চার্চের চাপিয়ে দেওয়া সব নিয়মকানুনের বিরদ্ধে চলে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে রাজতন্ত্র; চার্চ এবং খৃষ্টানধর্মকে জনগণের উপর জুলুমের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার ফলে তৎকালীন চিন্তাবিদ ও দার্শনিকগণ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর পুরোপরি আস্থা হারিয়ে ফেলে। তারা এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমাজ থেকে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তিতে এই চিন্তাবিদগণ দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তাদের একপক্ষ চার্চকে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করার ডাক দেয় এবং অপরপক্ষ ধর্ম থেকে রাষ্ট্রকে পৃথক করার দাবি তুলে। যারা সম্পূর্ণরূপে চার্চকে বিলুপ্তির কথা বলে তাদের থেকে পরবর্তিতে কমিউনিজম এবং রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করার পক্ষ থেকে সেকুলার পুজিবাদের উত্থান ঘটে। বর্তমানে তাদের ধর্মনিরপেক্ষ/সেকুলার গণতন্ত্রের তল্পিবাহক রুপে আমরা দেখতে পাই। সেকুলারদের উত্থান সম্পর্কে জানতে মধ্যযুগের ইউরোপে চার্চের ভুমিকা ও ইতিহাস নিয়ে আমরা আলোকপাত করব।
চার্চের ভুমিকা:
তৃতীয় শতকে রোমান সাম্রাজের কর্তৃত্ব কমে আশার সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডে চার্চের ভুমিকা বৃদ্ধি পেতে থাকে। রাজা কন্সটানটিনের পর থেকে চার্চ এবং রাষ্ট্র সরকারীভাবে একীভুত হয়ে পড়ে। চার্চ এবং রাজতন্ত্রের এই জোটবদ্ধ মুহুর্ত থেকে ইউরোপীয় জনগণের উপর অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা নেমে আসে। ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপের অভ্যন্তরে বিভক্তি শুরু হয় (internal divide and rule by church) ফলে নতুন নতুন দূর্বল সামন্ত রাজ্যের উত্থান ঘটে। সামন্ত রাজ্যগুলোর দূর্বলতার কারণে চার্চ আরো বেশি আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ পায়।
খ্রিস্টান ধর্মে জনগণের কর্মকান্ড দেখাশুনা করার মত কোন পদ্ধতি নেই। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে চার্চ পুরোনো রোমান সাম্রাজ্যের নিয়মকানুনগুলো ধার করে নিয়ে আসে। চার্চ জ্ঞানের প্রচার এবং আইন-কানুন তৈরির উপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। স্বাভাবিকভাবেই নতুন নতুন উত্থান ঘটা সামন্ত রাজাগণ তাদের রাজ্যগুলো পরিচালনার নিয়মকানুন ধারণ করার ক্ষেত্রে পুরোপুরি চার্চের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
শুরুর দিক পোপ রোমান সাম্রাজ্যের অল্প সল্প জায়গা শাসন করলেও সময়ের সাথে সাথে ইংল্যান্ড, সিসিলি ও জেরুজালেমের উপর চার্চ শাসন কতৃত্ব লাভ করে। ধীরে ধীরে চার্চ হয়ে উঠে ইউরোপের বুকে সবচেয়ে বড় কর্তৃত্বপরায়ণ সরকার; সে চাইলেই যেকোন সামন্ত রাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। একসময় চার্চের লোকাল কার্ডিনালরা (পাদ্রী) সামন্ত রাজাদের নিয়োগ দেওয়ার কর্তৃত্বও পেয়ে যায়, এমনকি সামন্ত রাজাদের নামকরণও হয়ে উঠে চার্চ প্রিন্স নামে। অন্যদিকে এইসব কার্ডিনালরা সরাসরি পোপ কর্তৃত্ব নিয়োগ প্রাপ্ত হত। চার্চ ইউরোপের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু পরিণত হয়। পোপ হয়ে উঠে শক্তির উৎস। পোপ চাইলে যেকোন বিশপদের নিয়োগ দিতে ও পাদ্রীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারত, লোকাল চার্চগুলোর উপর ট্যাক্স আরোপ করত এবং পোপ চাইলেই জীবনের সবক্ষেত্রে (আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক) যেকোন নিয়মকানুন জারী করতে পারত। বিশ্বাস করা হত পোপের সাথে সরাসরি খোদার যোগাযোগ আছে। ধর্মের নামে ও জান্নাতের ওয়াদা করে নির্দোষ জনগণকে শোষণ করা হত। ধীরে ধীরে চার্চ সকল সীমারেখা অতিক্রম করে বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতার আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে। ইতিহাসে যা নজীরবিহীন।
ধনী খৃষ্টানদের অর্থ-সম্পদের বিনিময়ে জান্নাতের চাবি বিক্রি ছিল চার্চের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। ইউরোপের বেশিরভাগ উর্বর জমি ও সম্পদে চার্চগুলো পুঞ্জিভুত হতে থাকে। চার্চের ঘোষণার মাধ্যমে বিশাল সংখ্যক মুক্তবুদ্ধির নারীদের ডাইনী নাম দিয়ে অত্যাচার এবং হত্যা করা হয়। চার্চের নিয়মের বিরুদ্ধে যায় এমন কোন তত্ত্ব, কোন বিজ্ঞানী প্রচার করলে তাকে হত্যা করা হত। শত অত্যচার সত্বেও চার্চের জুলুম-নিপীড়নের ভয়ে কেউ প্রতিবাদের সাহস পেত না। চার্চ দ্বারা সংঘটিত নৃশংসতা বলে শেষ করা যাবে না। এই যুগটাকেই ইউরোপিয়ানরা মধ্যযুগ বা অন্ধকার যুগ নামে চিহ্নিত করে।
এভাবে ১৪শতকে অসন্তোষ দানা বাধার আগ পর্যন্ত চার্চের শাসন চলতে থাকে। এই যুগকে ইউরোপীয় ইতিহাসবিদ্গণ মধ্যযুগের শেষ সময় হিসেবে চিহ্নিত করে।
দ্যা গ্রেট খিলাফত রাষ্ট্রের হাতে বারবার ক্রুসেডে হারের ফল ছিল চার্চের বিরুদ্ধে ততকালীন ইউরোপীয় চিন্তাবিদের বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান কারণ। অন্যদিকে খৃষ্টানধর্ম যেহেতু সমাজের সকল সমাধান দিতে অক্ষম ছিল, ফলে সামাজিক সমস্যাগুলো দিনদিন আরো বেশি বিপর্যয়কর হয়ে উঠে। এই সম্মিলিত কারণগুলোর ফলে ইউরোপের বুকে চার্চ এবং খৃষ্টানধর্মের পতন দেখা দিতে শুরু করে।
ত্রিশ বছরের যুদ্ধ:
১৬শতকে; ইউরোপে ধর্মতাত্ত্বিক (ধর্মের ভুমিকা কী হবে) বিতর্ক তীব্র হতে থাকে। এতে চার্চ দূর্বল হয়ে পড়ে। প্রত্যেক সামন্ত রাজ্য অন্য রাজ্যগুলো নিয়ন্ত্রণ নিতে চার্চকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। ১৬১৮ খ্রিস্টাব্দে পুরো ইউরোপ পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধের তীব্রতা পূর্বে ঘটা যেকোন সামন্ত বিবাদকে ছাড়িয়ে যেতে থাকে। এই যুদ্ধে জার্মানী সহ পুরো ইউরোপ ধংসের ধারপ্রান্তে চলে যায়, শহরের পর শহর ও মিল-কারখানাগুলো ধংস হয়ে যায়। যুদ্ধের তীব্রতা, যুদ্ধের ফলে প্লেগ ও দুর্ভিক্ষের কারণে ইউরোপের এক তৃতীয়াংশ মানুষ মৃত্যু মুখে পতিত হয়। এমনকি স্পেন ও ফ্রান্সের মধ্যে ১৬৫৯ পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলমান ছিল।
কম্প্রোমাইজ বা আপস:
যুদ্ধটি শেষের কোন লক্ষণ দেখা না যাওয়ায় ফলে চিন্তাবিদগণ আপোষের সিদ্ধান্ত নেয়। এই আপোষের ফল ছিল ধর্মকে রাষ্ট্রের সকল কর্মকান্ড থেকে আলাদা করে ফেলা। প্রোটেন্সটেন্ট সংস্কারবাদী মার্টিন লুথার ও ক্যালভিন; চার্চের রাজনীতি করাকে লজ্জার বলে ঘোষনা দেয়। তারা আরো বলেন; খৃষ্টানদের প্রধান দ্বায়িত্ব হচ্ছে কর্তৃত্বশীলদের আনুগত্য করা। তারা এই ক্ষেত্রে ধুর্ততা অবলম্বন করে। ফলে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নের জন্ম দেয়; কার শাসন করা উচিত? মানুষের না খোদার? এবং এই প্রশ্নের উত্তর ছাড়াই অপ্রাসঙ্গিক ভাবেই কোন চিন্তা-ভাবনাহীন সম্পূর্ণ নতুন একটি মতাদর্শের জন্ম হয়।
গ্রীক দর্শনের আবির্ভাব:
পশ্চিমা চিন্তাশূন্য সিদ্ধান্তহীন এই অবস্থান থেকে চার্চকে মানুষের জীবন থেকে অপসারণ করা হয়। তৎকালীন চিন্তাবিদগণ অন্যকোন উৎসের সন্ধান না করে হাজার বছরের পুরোনো গ্রীক দর্শন থেকে এই সমস্যার সমাধানের পদক্ষেপ নেয় (প্রকৃত সত্য ইসলামকে তারা বর্জন করে)। পর্বরতীতে এই সব চিন্তাবিদগণ দুটি পক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একপক্ষ প্রকৃতিবাদকে ধারণ করে এবং মানুষই সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে বলে দাবি করে, অপরপক্ষ যারা চার্চের পক্ষে অবস্থান নেয় তারা বাস্তববাদীতাকে ধারণ করে এবং সৃষ্টকর্তাকে বর্জনে অক্ষমতা প্রকাশ করে। ফলে সংশয়পূর্ণ সেকুলার চিন্তার উদ্ভব ঘটে।
ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা বা ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করার চিন্তা নিয়ে এই সমাজ আগাতে থাকে। মানুষের জীবনের সাথে মহাবিশ্বের সম্পর্কটিও অস্বচ্ছ ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। এই অস্বচ্ছ অবস্থায় ইউরোপে নতুন নতুন দার্শনিকদের উন্মেষ ঘটে। জীবনের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব নিয়ে দার্শনিকগণ নতুন নতুন তত্ত্ব নিয়ে হাযির হন। তাদের মধ্যে ফ্রান্সের দার্শনিক রেনে ডেকার্তে অভিমত দেয় যে; “জনগণের ভিন্নতার ভিত্তিতে বাস্তবতাও ভিন্ন হতে পারে। সৃষ্টিকর্তার ধারণা সম্পূর্ণরুপে ব্যাক্তির নিজস্ব চিন্তা চেতনার উপর ছেড়ে দেওয়া উত্তম।” এই চিন্তার ফলে সৃষ্টিকর্তার বিশ্বাসকে ব্যক্তি স্বাধীনতার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়। দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট দাবি করেন; “মানুষের মন হচ্ছে বস্তুর অস্তিত্বের কারণ, আর বস্তুর ভোগই ইন্দ্রীয় সুখ।”
পুঁজিবাদের প্রাথমিক লক্ষণ:
মধ্যযুগীয় চার্চের শাসক কর্তৃত্ব শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সেকুলারিজমের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গুলো প্রতিষ্ঠা হয় এবং ইউরোপে পুঁজিবাদী নতুন আদর্শের উত্থান ঘটে। রাষ্ট্রগুলো শুধুমাত্র তাদের নাগরিকদের কথা চিন্তা শুরু করে। বর্ণ এবং নিজস্ব জাতিগত অবস্থা, ভৌগলিকভাবে আলাদা হওয়া, নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও ভিন্নতার কারণে তারা একে অপর থেকে শ্রেষ্ঠ ও নিখুঁত জাতি দাবি করা শুরু করে। নিজ নিজ স্বাধীনতা রক্ষায় তারা সচেতন হয়। এমনকি ১৪শতকে জার্মান প্রকাশকগণ তাদের রাজাদের শাসন করার পারদর্শিতা উপস্থাপন করে দাবি করে, তারা জাতি হিসেবে বীরত্বপূর্ণ এবং জার্মানরা অন্য জাতিদের শাসন করার অধিকার রাখে। রাইন নদীর তীর নিয়ন্ত্রণ ও ফরাসী জনগণের বানিজ্য করার অধিকার পাওয়ার কারণে ফরাসী জনগণ জনপ্রিয়তা পায় ফলে তারাও শ্রেষ্ঠত্বের দাবি শুরু করে। ব্রিটেনও কম যায়না; চিন্তাবিদ জন ফরটেস এর মতে ব্রিটেনের সংবিধান ও আইন অন্যদের থেকে শ্রেষ্ঠ। মুলতঃ ইউরোপীয়রা এরিসটটলের পার্টিকুলারিজম (নিজেদের কমন স্বার্থকেন্দ্রিক) চিন্তা ধারণ করার কারণে তাদের মধ্যে জাতিয়তাবাদের প্রবণতার উদ্ভব ঘটে।
রাজতন্ত্রের উপর চার্চ সম্পূর্ণরুপে আধিপত্য হারায়, উলটো জনগণকে নিয়ন্ত্রণে সেকুলার রাষ্ট্রগুলো চার্চকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। পুঁজিবাদের আসফালনের ফলে, সেকুলার রাষ্ট্র ও আইন কানুনের সাথে তাল মিলিয়ে চলা ছাড়া চার্চের আর কোন গতি ছিল না। যার নজির আমরা চার্চের ঘোষণার মাধ্যমে দেখতে পাই; চার্চ বলে যার সেকুলার রাষ্ট্রে সততা ও বিশ্বসতার সাথে জীবন যাপন করবে তারা সৃষ্টিকর্তার সামনে ধার্মিক হিসেবে থাকবে। তাছাড়া প্রতিনিয়ত চার্চকে সংশোধন করে সেকুলার রাষ্ট্রের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যহত আছে।
পুঁজিবাদের রাজনৈতিক চিন্তা:
ইতালীর পৌত্তলিক মেকিয়্যভেলি তার The discourses on the First Ten Books of Livy এবং The Prince এই দুটি বিখ্যাত বইয়ের মাধ্যমে আধুনিক পুঁজিবাদের চিন্তা ধারা প্রতিষ্ঠা করে।
ম্যাকেয়াভেলির মতে রাজনীতি সম্পূর্ণ একটি সেকুলার কর্মকান্ড। তার মতে রাজনীতি মানুষের ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা মাত্র। ম্যাকিয়াভেলির মতে মানুষ প্রকৃতপক্ষে বর্বর, স্বার্থপর কেন্দ্রিক রাজনীতি সবার মধ্যে বিরাজমান। তার মতে সফল শাসক জনগণকে জানার চেষ্টা করে; তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সবসময় পর্যবেক্ষণে রাখে এবং দূর্বলদের শোষণের চেষ্টা করে।
বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজে রাজনীতিবিদরা হুবহু ম্যাকিয়াভেলীর আদর্শকে ধারণ করে রাজনীতি করে। একজন আর্টিস্ট শুধুমাত্র শিল্পের কারণে আর্ট করে, যা জনগণের কোন বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত নয়। লেখকরা সমাজের ভালোর জন্য না লিখে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা জন্য লিখে। খাচায় বন্দি বুদ্ধিজীবীরা সমাধান না দিয়ে শুধুমাত্র প্রতিশ্রুতি দেয়। পুঁজিবাদী এই সমাজে সরকারগুলোর ১% ধনীদের স্বার্থ হাসিলের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হয়, এই সমাজের মানুষগুলো পরিবার ও সমাজকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র নিজের জন্য বাঁচে।
পরবর্তীতে ১৭৯০ সালে ফরাসী বিপ্লবের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং বর্তমান পার্লামেন্টারী পদ্ধতিকে তারা গ্রহণ করে। আমেরিকা সহ সব ইউরোপীয় দেশগুলো এই রেভুলেশন দ্বারা প্রভাবিত হয়। নেপোলিয়ানের শাসনের পর থেকে, ফ্রান্সসহ পশ্চিমা দেশগুলো সারা বিশ্বে পুঁজিবাদকে বহন করে চলেছে। অর্থনৈতিক শোষণের উদ্দেশ্যে উপনিবেশ স্থাপন করাই পুঁজিবাদের উদ্দেশ্য। বর্তমানে তারা কলোনী স্থাপন পদ্ধতিতে একটু পরিবর্তন করে পুঁজিবাদকে আরো কার্যকারীভাবে বাস্তবায়ন করে চলেছে।
বর্তমান ইউরোপ চার্চ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। করপোরেট কোম্পানী ও ব্যাংকগুলো চার্চের স্থান দখল করেছে মাত্র। এটাই সেই পুঁজিবাদ যার দিকে পশ্চিমারা সারা বিশ্ব ও মুসলিমদের ডাকছে। বর্তমান বিশ্বও আগের মতই আরেকটি দ্বন্দ্ব শুরুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। আমরা আশা করি তারা নতুন কোন কম্প্রোমাইজের দিকে না গিয়ে তাঁদের চিন্তা শক্তিকে ব্যবহার করবে। আমরা মুসলিমরা এই সেকুলার পুঁজিবাদী জাহেলিয়াতকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করেছি। আমরা মানবজাতির জন্য আল্লাহ প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থা ইসলামকে ধারণ করি। আল্লাহর দ্বীনের জন্য কাজ করি। যেন আল্লাহর দ্বীন বাস্তবায়নের মাধ্যমে সারা বিশ্ব প্রকৃত হকের দিকে ফিরে আসে।
উৎস: আর-রায়া ম্যাগাজিন, এপ্রিল ১৯৯৪
নারী কিসে আটকায়?

খবর:
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রেন্ডিং বা আলোচনায় আছে যে বিষয়টি তা হলো, নারী কিসে আটকায়। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টইন ট্রুডো ও তাঁর স্ত্রী সোভি গ্রেগয়ের ট্রুডোর আলাদা থাকার ঘোষণার পরই আলোচনাটির সূত্রপাত। এর জের হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইতে শুরু করে মিম, ট্রল আর পোস্ট–পাল্টা পোস্টের ঝড়। এর মধ্যে একটি পোস্টের বক্তব্য ছিল এমন, ‘জাস্টিন ট্রুডোর ক্ষমতা, বিল গেটসের টাকা, হাকিমির জনপ্রিয়তা হুমায়ুন ফরিদীর ভালোবাসা, তাহসানের কণ্ঠ কিংবা হৃত্বিক রোশানের স্মার্টনেস। কোনো কিছুই নারীকে আটকাতে পারে নাই, বলতে পারবেন নারী কিসে আটকায়?’ (https://www.prothomalo.com/onnoalo/treatise/f8o1qkyren)
মন্তব্য:
“বিবাহবন্ধন” শব্দটি আমাদের বর্তমান সেক্যুলার সমাজে সত্যিকার অর্থেই ‘বন্ধন’ বা ‘handcuff’ এর চেয়ে অতিরিক্ত কোন তাৎপর্য বহন করছেনা। বিয়ে বর্তমানে নারী-পুরুষ উভয়ের কাছে শৃংখলার নামান্তর। ‘নারী কিসে আটকায়’ ট্রেন্ডিং এর বিপরীতে প্রথম আলোর ‘পুরুষ যেখানে আটকায়’ শীর্ষক প্রতিবেদনও আছে যেখানে বলা হচ্ছে, “আফসোস! কেউ বলছে না, পুরুষ কিসে আটকায়? কিন্তু যে কথাটা সবাই জানে এবং মানে, কিন্তু বলে না; সেটি হলো সম্পর্কের ফাটকে দীর্ঘমেয়াদে সে আটকা থাকে বটে; কিন্তু সেই থাকায় তার সায় থাকে না” অর্থাৎ, নারী ও পুরুষ উভয়েই হতাশ যে বিয়ের পর তারা পারিবারিক দ্বায়িত্ববোধের কাছে আটকা পড়ে যাচ্ছে, বৈবাহিক সম্পর্ক প্রশান্তির বদলে হয়ে যাচ্ছে এক শৃংখলাবৃত কয়েদখানা।
একটি স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা যদি দেখি, মানুষ হিসেবে আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে আমরা সঙ্গী খুঁজি, বংশবৃদ্ধি করতে চাই; স্বামী/স্ত্রী-সন্তানসন্ততি নিয়ে পরিবার গঠন করতে চাই। এই পরিবার গঠনের মাধ্যমে একদিকে আমাদের যেমন প্রজনন প্রবৃত্তি পূরণ হয়, তেমনি একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, নির্ভরশীলতা ও দায়দায়িত্বও তৈরি হয়। একসাথে থাকতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই অনেক সময় সুবিধা-অসুবিধা, পছন্দ-অপছন্দ কিংবা মতের অমিল হয়, যার যার নিজের জায়গা থেকে কিছু বিষয় ছাড় দিতে হয়। এটা যেকোনো পরিবারের মধ্যকার স্বাভাবিক একটা বিষয়। কিন্তু বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ ‘ব্যক্তি স্বাধীনতা’ মানুষকে শেখায়, ‘প্রত্যেক ব্যক্তিই নাকি চায় তার নিজের মত করে জীবন কাটাতে, সমস্ত সিদ্ধান্ত নিজের মত করে, নিজের ইচ্ছায় নিতে’। নারী-পুরুষের সম্পর্কের উদ্দেশ্যকে এখানে শুধুমাত্র যৌন চাহিদা পূরণকে কেন্দ্র করে আবর্তিত করা হয়েছে। যার ফলস্বরূপ, বিবাহ-পরবর্তী পারিবারিক প্রত্যাশা বা দায়িত্ব নারী-পুরুষ উভয়ের কাছে স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ মনে হতে থাকে। ব্যক্তিস্বাধীনতার এই চিন্তা থেকে সংসারের, সঙ্গীর কিংবা সন্তানের প্রয়োজনে নিজের পছন্দ-অপছন্দ, চাকরি, বেড়ানো এমনকি শপিং এর মত ছোটখাট বিষয়ে ছাড় দেওয়া, একে অপরকে প্রাধান্য দেওয়া, দোষত্রুটি ক্ষমা করা, পরিবারের কল্যানে শ্রম দেওয়া ইত্যাদি স্বাভাবিক বিষয়গুলোও কঠিন হয়ে যায়। সর্বক্ষণ কি পেলাম, কি দিলাম এর হিসাব নিকাশ চলতে থাকে। নিজের মত করে জীবন কাটানোর ব্যক্তি-স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং পারিবারিক দায়িত্ববোধ – এই দুই বিষয়ে তখন দ্বৈরথ তৈরি হয়। তাছাড়া, সৃষ্টিকর্তা বিবর্জিত ধর্মনিরপেক্ষবাদ যখন সমাজের ভিত্তি অর্থাৎ আখিরাতের সাথে জীবনের কোন সম্পর্ক নাই, তখন ছোটবড় এই স্যাক্রিফাইসগুলো মানুষের জীবনে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কেননা, এর বিনিময়ে আল্লাহ্’র কাছ থেকে উত্তম কোন প্রতিদান পাওয়ার ব্যাপারে সে ভরসা খুঁজে পায় না। কোনকিছু নিজের পছন্দমত না হলে নিজেকে সে সবসময় বঞ্চিত মনে করে। এভাবে অনেক ‘না পাওয়া’ বা ‘করতে না পারা’র বাধা যখন পুঞ্জিভূত হয়ে বড় আকার ধারণ করে, ব্যক্তি তখন সম্পর্কের ব্যাপারে শ্বাসরুদ্ধ বা শৃঙ্খলিত বোধ করে, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায় এবং একপর্যায়ে সে সম্পর্ক থেকে মুক্তি পেতে চায়। যার কারণে আমরা দেখি, ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণার কর্ণধার ফ্রান্সে বিবাহবিচ্ছেদের হার ৫৫ শতাংশ। মার্কিন ডিভোর্স এটর্নি স্কট স্ট্যাডলারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বিবাহিত দম্পতিদের মধ্যে প্রথম বিবাহে ডিভোর্সের হার ৫০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় বিয়েতে ৬৭ শতাংশ এবং তৃতীয় বিয়েতে সেটা ৭৩ শতাংশে গিয়ে ঠেকছে। আমাদের দেশেও গত এক বছরে ডিভোর্সের হার বেড়ে গেছে দ্বিগুন। ঢাকা শহরে প্রতি ৪০ মিনিটে একটা করে ডিভোর্স হচ্ছে। তাদের এই দূষিত চিন্তা গ্রহণ করার ফলে তাদের মতই আমাদের পরিবারব্যবস্থা এবং গোটা সমাজব্যবস্থায় ভাঙ্গন ধরতে শুরু করেছে।
অথচ, একটি তাক্বওয়াভিত্তিক সমাজে ব্যক্তিস্বাধীনতা বা মানুষের নিজেদের খেয়ালখুশি দিয়ে পরিচালিত হবার সুযোগ নেই। কারণ, মুসলিম মাত্রই সে আল্লাহ্’র দাস এবং আল্লাহ্’র আদেশ-নিষেধের কাছে আত্মসমর্পনকারী। মহান আল্লাহ্’র আদেশ মেনে নারী ও পুরুষ বিয়ে করে, যার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র যৌন চাহিদা পূরণ নয়, বরং দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে পরিবার গঠন ও এর যত্ন করা। আল্লাহ্’র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তারা তখন একে-অপরের যত্ন নেয়, ছাড় দেয়, ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে, কিছু অপ্রাপ্তি থাকলেও আখিরাতের কথা ভেবে বিচলিত হয়না এবং এভাবেই স্বেচ্ছাচারিতার বদলে একটি সুস্থ সুন্দর দায়িত্বশীল পরিবার তথা সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা পবিত্র কুরআনে বলেন, “তোমরা তোমাদের সঙ্গীদের সাথে সদ্ভাবে জীবন-যাপন কর। অতঃপর, যদি তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে হয়ত তোমরা এমন এক জিনিসকে অপছন্দ করছ, যেখানে আল্লাহ্ তোমাদের জন্য অনেক কল্যাণ রেখেছেন” (সুরা আন-নিসা, আয়াত ১৯)। সুতরাং, বিশ্বব্যাপী ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের ভিত্তিতে গড়ে উঠা সমাজগুলোতে পরিবার ভাংগনের যে সামাজিক মহামারী চলছে, তার প্রতিষেধক রয়েছে কেবলমাত্র আল্লাহ্’র দেয়া জীবনব্যবস্থায়। সচেতন মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত নিজেদের আক্বীদার প্রতি আত্মবিশ্বাস রাখা এবং ইসলাম প্রদত্ত ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক ব্যবস্থার পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের ডাক সমাজের সর্বত্র পৌঁছে দেওয়া। পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থা গঠনে ইসলামের নেতৃত্ব আজ শুধু মুসলিমদেরই প্রয়োজন নয়, বরং পুরো মানবজাতির একমাত্র বিকল্প।
– যায়নাব মায়সূরা
৭ মাসে ১০ বার ডুবল চট্রগ্রাম

বাস্তবতা: ভারী বর্ষন ও জোয়ারের পানিতে যাতে জলাবদ্ধতা না হয় সে জন্য অনেক ব্যয় বহুল উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের একটি, চট্রগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সি ডি এ) দুটি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রকল্পের আওতায় ১১ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকার কাজ চলছে। এর মধ্যে গত ছয় বছরে ৫ হাজার ৭৯০ কোটি টাকার খরচ হলেও খুব বেশি সুফল আসেনি। জোয়ার ঠেকাতে নগরের বিভিন্ন খালের মুখে ৪০ টি জলকপাটের মধ্যে মাত্র ৫ টি নির্মান কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ৩৫ টি কাজ ছয় বছর ধরেই চলছে।
মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, (সি ডি এ) তাদের প্রকল্পের আওতাধীন খাল গুলো থেকে যে পরিমাণ মাটি (সাড়ে ৯ লক্ষ ঘনমিটার) উত্তোলনের কথা, তার চার ভাগের একভাগ ও তোলেনি। রাস্তা করার জন্য খালের প্রশস্থতা কমিয়েছে। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ মাটি উত্তোলন না করায় খালের গভীরতা কমেছে। জাতে পানি প্রবাহের পরিমাণ কমে গেছে। এছাড়া জলকপাট গুলো এখনো চালু হয়নি। পাম্পের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা করেনি। এসব কারণে জলাবদ্ধতা হচ্ছে।
তবে এই দাবি অস্বীকার করে (সিডিএ) প্রধান প্রৌকশলী কাজী হাসান বিন শামস প্রথম আলোকে বলেন, তাদের প্রকল্পের আওতায় খালগুলো ঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু সিটি কর্পোরেশন নালা গুলো পরিষ্কার করেনি। যার কারণে নালা থেকে খালে পানি নামতে পারছেনা, এতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: “৭ মাসে ১০ বার ডুবল চট্রগ্রাম” প্রথম আলো প্রতিবেদন থেকে।”
মন্তব্য: চট্রগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতার অণুঘটক গুলো নিন্মরুপ:
১) জলাবদ্ধতা প্রকল্পোর জলকাপট গুলো কার্যকর রাখা হয়নি।
২) নালা ও খালগুলো পরিষ্কার করা হয়নি।
৩) অতিরিক্ত পানি জমা রাখার জন্য কোন জলাধার তৈরি করা হয়নি
৪) জোয়ারের সময় জলকপাটগুলো বন্ধ করে খাল থেকে পানি নিষ্কাশনের জন্য উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন পাম্প স্থাপন করা হয়নি।
সিটি কর্পোরেশন এবং সিডিএ কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে উল্লেখিত টেকনিক্যাল সমস্যা গুলোর সমাধান করতে পারেনি। দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করে প্রত্যেক বছর তারা একে অপরকে দোষারোপ করছে।
ধর্মনিরপেক্ষ পুজিবাদী রাজনৈতিক কাঠামোর গর্ভজাত রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক নেতৃত্বে জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে উদাসীন। রাজনৈতিক ক্ষমতাকে তারা কেবল নিজের প্রভাব প্রতিপত্তি, শান-শওকত এবং জনগণের সম্পদ লুন্ঠনের হাতিয়ার হিসাবে বুণে। মানব রচিত মতবাদ মানেই গনদুর্ভোগ। বিদ্যমান গনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা এবং লুটেরা শাসকদের কাছ থেকে আমরা কি প্রত্যাশা করতে পারি? ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে রাজনীতি থেকে স্রষ্টাকে পৃথক করার কারণে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিবিদ এবং প্রশাসকবৃন্দ তাদের কর্মকান্ড এবং অর্পিত দায়িত্বে ‘লাভ-ক্ষতি’ ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করতে পারে না।
ইসলামের মাধ্যমে জনগণের বিষয়াদি অভ্যন্তরীণভাবে দেখাশুনা করা ও বহিশক্তির আগ্রাসন থেকে জনগণকে রক্ষা করাই সত্যিকারের রাজনীতি। খিলাফত হলো সেই রাষ্ট্রকাঠামো যে সেটি বাস্তবে জনগণের পক্ষ থেকে বাস্তবে এই কার্যক্রমে নিয়োজিত থাকে। কেবল আল্লাহ্ সুবহান তা’আলার সন্তুষ্টির জন্য শাসক জনগণের দেখাশুনা করবে ইনশাল্লাহ। রাসুল (সা) বলেন: “খলিফা হচ্ছেন অভিভাবক এবং তিনিই তাঁর নাগরিকদের জন্য দায়িত্বশীল।”
রায়হান রফিক
প্রশ্ন-উত্তর: মুদ্রা বিনিময়

প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহু,
আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে আপনি ভাল আছেন, সুস্থ আছেন এবং ভাল করছেন এবং আমি আশা করি যে অবশেষে মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুসংবাদ এসে পৌছেছে। আমার প্রশ্ন হল: কোনো কিছু নগদ না করে একটি মুদ্রা অন্যের সাথে বিনিময় করা এবং এটি অন্য জায়গায় স্থানান্তর করা কি অনুমোদিত? উদাহরণস্বরূপ: আমি সবকিছুর সাথে একমত হয়ে এক্সচেঞ্জারের কাছ থেকে ১০০০ দিনার কিনতে চাই এবং আমি তাকে ঘটনাস্থলেই সম্মতি অনুযায়ী অর্থ প্রদান করেছি এবং ১০০০ দিনার নগদ না করে একটি নির্দিষ্ট স্থানে টাকা পাঠানোর জন্য তাকে জানিয়েছি। এটা কি অনুমোদিত নাকি নগদ বুঝে নিয়ে হওয়া উচিত? আল্লাহ আপনাকে বরকত দিন, আপনাকে সাহায্য করুন, আপনাকে অবিচল রাখুন এবং বিজয়ের দান করুন।
মোহাম্মদ আজ-জারু থেকে
উত্তর:
ওয়া আলাইকুম উস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহু
এই লেনদেনটি শুধুমাত্র এক্সচেঞ্জেই থেমে থাকে না, তবে এটিতে একটি বিনিময় লেনদেনও অন্তর্ভুক্ত, যেহেতু আপনি অন্য মুদ্রা দিয়ে দিনার কিনছেন, তাই উদাহরণস্বরূপ আপনি তাকে ১০০০ দিনারের জন্য ৩০০০ রিয়াল দিচ্ছেন এবং তারপরে তিনি আপনার পছন্দ অনুযায়ী স্থানে তা স্থানান্তর করছেন, অর্থাৎ, এটি প্রথমে বিনিময় করা হয়েছে এবং তারপর স্থানান্তর করা হয়েছে:
বিভিন্ন অর্থের মধ্যে বিনিময়ের ক্ষেত্রে, এটি হাতে হাতে হতে হবে, অর্থাৎ এটি সরাসরি বিনিময় হতে হবে, অন্যথায় এটি হারাম হবে:
বুখারী সুলাইমান বিন আবু মুসলিম থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: আমি আবু আল-মিনহালকে হাতে-হাতে বিনিময় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম, তাই তিনি বললেন: “আমি এবং আমার ব্যবসার অংশীদার হাতে-হাতে কিছু জিনিস কিনেছিলাম এবং বাকিতেও।” আল-বারা ইবনে আযিব এলেন এবং আমরা তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম, তখন তিনি বললেন: “আমার ব্যবসায়িক অংশীদার যায়েদ ইবনে আরকাম এবং আমি এটি করেছিলাম, তাই আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম এবং তিনি বললেন: «مَا كَانَ يَدًا بِيَدٍ ، فَخُذُوهُ وَمَا كَانَ نَسِيَةً فَذَرُوهُ» “যা সরাসরি হাতে-হাতে কেনা হয়েছিল, তা নিয়ে নাও, কিন্তু যা বাকিতে কেনা হয়েছিল, তা ছেড়ে দাও।”
মুসলিম মালিক বিন আওস বিন আল-হাদাছান থেকে বর্ণনা করেছেন যে তিনি বলেছেন: আমি এসে বলছিলাম: “কে দিরহাম বিনিময় করবে?” তাই, তালহা বিন ওবায়েদুল্লাহ, যখন তিনি উমর বিন আল-খাত্তাব (রা)-এর কাছে ছিলেন, তখন বলেছিলেন: “আমাদেরকে তোমার স্বর্ণ দেখাও, তারপর আমাদের কাছে এসো। যদি আমাদের চাকর আসে, আমরা আপনাকে তোমার টাকা দেব।” উমর বিন আল-খাত্তাব (রা) বললেন: “না, আল্লাহর নামে বলছি, আপনি তাকে তার টাকা দেবেন অথবা তাকে তার স্বর্ণ ফিরিয়ে দেবেন, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«الْوَرِقُ بِالذَّهَبِ رِبًا، إِلَّا هَاءَ وَهَاءَ، وَالْبُرُّ بِالْبُرِّ رِبًا، إِلَّا هَاءَ وَهَاءَ، وَالشَّعِيرُ بِالشَّعِيرِ رِبًا، إِلَّا هَاءَ وَهَاءَ، وَالتَّمْرُ بِالتَّمْرِ رِبًا، إِلَّا هَاءَ وَهَاءَ»
অর্থের বিনিময়ে স্বর্ণের লেনদেন হল রিবা (সুদ), ঘটনাস্থলে (হাতে-হাতে) লেনদেন ব্যতীত; এবং গমের বিনিময়ে গম কেনাকাটা করা হল রিবা, ঘটনাস্থলে (হাতে-হাতে) লেনদেন ব্যতীত; এবং যবের সাথে যবের লেনদেন করা হল রিবা, ঘটনাস্থলে (হাতে-হাতে) লেনদেন ব্যতীত। খেজুরের সাথে খেজুর হল রিবা, ঘটনাস্থলে (হাতে-হাতে) লেনদেন ব্যতীত।”
মুসলিম উবাদা বিন আস-সামিত থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«الذَّهَبُ بِالذَّهَبِ، وَالْفِضَّةُ بِالْفِضَّةِ، وَالْبُرُّ بِالْبُرِّ، وَالشَّعِيرُ بِالشَّعِيرِ، وَالتَّمْرُ بِالتَّمْرِ، وَالْمِلْحُ بِالْمِلْحِ، مِثْلًا بِمِثْلٍ، سَوَاءً بِسَوَاءٍ، يَدًا بِيَدٍ، فَإِذَا اخْتَلَفَتْ هَذِهِ الْأَصْنَافُ، فَبِيعُوا كَيْفَ شِئْتُمْ، إِذَا كَانَ يَدًا بِيَدٍ»
“স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য, গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর, লবণের বিনিময়ে লবন লেনদেন, অনুরূপের বিনিময়ে যখন লেনদেন করা হয়, একই রকম এর সাথে, হাতে-হাতে যদিওবা সে জিনিসগুলো বিভিন্ন ধরণের, তা সত্ত্বেও তোমাদের ইচ্ছানুযায়ী বিক্রি করতে পারো, যতক্ষণ পর্যন্ত এটি হাতে-হাতে (লেনদেন হয়ে) থাকে।”
‘হাতে-হাতে’ এর অর্থ হল কেনা-বেচাটি হাত দ্বারা হয়, অর্থাৎ এক ব্যক্তিকে রিয়ালে অর্থ প্রদান করা হচ্ছে, এবং দ্বিতীয় ব্যক্তিকে দিনারে অর্থ প্রদান করা হচ্ছে, সব একই সময়ে ঘটছে…
এটি ক্যাশ-ইন করার পরে, আপনি এটিকে ঐ স্থানে স্থানান্তর করতে পারেন তা সেটি এই এক্সচেঞ্জারের মাধ্যমে হোক কিংবা অন্য।
কেউ বলতে পারে: এই অর্থ নগদ করে লাভ কী যখন এটি স্থানান্তরই হবে? এর উত্তর তথা এর পেছনের কারণ হল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস, কারণ এতে স্পষ্ট ও নিশ্চিত প্রমাণ রয়েছে যাতে কোনো সন্দেহ বা অস্পষ্টতা নেই, কারণ তাতে স্পষ্টভাবে নগদ করার বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে: “ঘটনাস্থলে লেনদেন ব্যতীত”, ‘হাতে-হাতে’ এবং এ সমস্ত বাক্যাংশগুলি এটিকে ক্যাশ করার জন্য স্পষ্ট প্রমাণ, তাই কোনও অজুহাত বা বিকল্প ব্যাখ্যা গ্রহণ করার সুযোগ নেই। এ থেকে আমি এভাবেই বিষয়টি বুঝেছি, আর আল্লাহই সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়।
আপনাদের ভাই
শীতের যুদ্ধ ও গনীমত

গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোতে শীতকাল একটি অল্প সময়ের বিষয় এবং এ সময়কালে যেমন কিছু সহজ বাস্তবতা রয়েছে তেমনি রয়েছে কিছু কষ্টসাধ্য বাস্তবতা। বিশেষ করে ঈমানদারদের এ সময়ে বেশকিছু চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যেমন, সালাতের সময়ে পরিবর্তন। রাত গড়াতে শুরু করলে ঈশার সালাত পড়া অনেকের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে, একইভাবে ঘুম থেকে উঠে ফজর সালাত পড়াও অনেকের জন্য কষ্টসাধ্য হয়। আবার, জোহর, আসর ও মাগরিবের সালাতের মাঝের ব্যবধান এতই কমে আসে যে একটু দেরি করলেই অনেকের জন্য সালাত কাযা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এর বাইরে শীতের তীব্রতায় ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল কিংবা ওযু করাটিও কষ্টকর কাজ।
তবে লড়াই যত কঠিন, এর পুরস্কারও তেমন ব্যাপক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তিনটি আমল পাপ মোচন করে—সংকটকালীন দান, গ্রীষ্মের রোজা ও শীতের অজু।’ (আদ দোয়া লিত তাবরানি: ১৪১৪)। উমর (রা.) তাঁর ছেলের উদ্দেশে বলেন, ‘শীতের দিনে ভালোভাবে অজু করা বড় গুরুত্বপূর্ণ ও সওয়াবের কাজ।’ আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন কাজের কথা বলব না! যা দ্বারা গুনাহ মাফ হয় এবং মর্যাদা বৃদ্ধি হয়?’ সাহাবিরা বললেন, ‘অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল!’ তিনি বললেন, ‘মন না চাইলেও অজু করা, অধিক পদক্ষেপে মসজিদে যাওয়া এবং এক নামাজের পর আরেক নামাজের জন্য অপেক্ষা করা।’ (মুসলিম)।
একইভাবে শীতকালের সকাল, সন্ধ্যা কিংবা রাত্রিতে একজন ঈমানদার আল্লাহর দ্বীনের জন্য, দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য, ইসলামকে সমাজ ও রাষ্ট্রের সকলক্ষেত্রে বাস্তবায়িত করার দাবির যে সুমহান দাওয়াত তা পৌঁছিয়ে দেওয়ার স্বার্থে যেকোনো দৌড়ঝাপ তথা যেকোনো কষ্টসাধ্য কাজই করুক না কেন তার পুরস্কারও ঠিক সেরকমই বিশাল হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সকল কাজ পর্যবেক্ষন করেন।
আবার যদি মুদ্রার অপর পিঠে আসি তবে শীতের কিছু সহজ বাস্তবতায়ও রয়েছে। তবে এ বাস্তবতা কি ঈমানদারের প্রয়োজন নাকি প্রয়োজন ছাড়াই বাড়তি প্রাপ্তি?
উমর (রা) বলতেন:
الشتاء غنيمة العابدين
[আশ-শিতা-উ গনীমাতুল ’আ-বিদীন]
“শীতকাল ইবাদতকারীদের জন্য গনীমতসরূপ”
যুদ্ধলব্ধ সম্পদকে আরবীতে গনীমত বলা হয়। গনীমত একজন ঈমানদার সৈনিকের জন্য অতিরিক্ত প্রাপ্তি। একে আনফালও বলা হয়ে থাকে (যা নফল বা অতিরিক্ত থেকে এসেছে) অর্থাৎ, এটি অতিরিক্ত প্রাপ্তি। ঈমানদার গনীমতের জন্য যুদ্ধ করে না। বরং ঈমানদার লড়াই করে ইসলামের পতাকাকে তুলে ধরার জন্য, আল্লাহর কালিমাকে সুউচ্চ করার জন্য, এবং এর বদলে সে আখিরাতের পুরস্কারের আকাঙ্ক্ষা করে, বৈষয়িক ব্যক্তিগত কোনো প্রাপ্তি সে আশা করে না। সুতরাং, একজন মুমিনের জন্য গনীমত অতিরিক্ত প্রাপ্তি বৈ আর কিছু নয়।
যথার্থই, শীতকালে রাতগুলো দীর্ঘ ও দিনগুলো ছোট এবং রাতে কিয়াম করা খুবই সহজতর। যেহেতু রাত দীর্ঘ, কিছুটা ঘুমিয়েও কিয়াম উল-লাইল করা যায়। আর যারা ঘুমোতে চান না তাদের জন্য কিয়াম করার জন্য রয়েছে রাতের দীর্ঘ সময়।
এছাড়াও, দিনগুলো ছোট, তাই সিয়াম পালন করা সহজতর। অল্প সময়কাল রোজা রেখেও একজন পুরো একটি রোজার আজর বা পুরষ্কার পায়।
একজন খুশূ’প্রাপ্ত ঈমানদারের জন্য গ্রীষ্মকালের রাতে সালাত আদায় করা কঠিন কিছু নয়, যদিওবা রাত্রিগুলোর ব্যপ্তি ছোট এবং ঘুমের সময় অল্প। একজন বিশ্বাসী ঠিকই তার সময় বের করে নেয়। একইভাবে, একজন ঈমানদারের জন্য গ্রীষ্মকালের দীর্ঘ ও উত্তপ্ত দিনগুলোয় রোজা রাখা গুরুতর কিছু নয়। মু’আজ বিন জাবাল (রা) বলতেন: ’হে আল্লাহ আমি এই জন্য বেঁচে থাকতে চাই না যে আমি দুনিয়া চাই। বরং আমি এই জন্য বেচে থাকতে চাই যাতে আমি গ্রীষ্মের দীর্ঘ দিনগুলোতে রোজা রাখতে পারি এবং শীতের দীর্ঘ রাতগুলোতে কিয়াম করতে পারি।’ শীতকাল আগমন করলে উবাঈদ বিন উমাঈর (রা.) বলতেন, ‘হে কুরআনের ধারক! তোমাদের রাতগুলো তিলাওয়াতের জন্য প্রলম্বিত করা হয়েছে, অতএব তা পড়তে থাকো। আর রোজা রাখার জন্য তোমাদের দিনগুলো সংক্ষেপিত করা হয়েছে, তাই বেশি বেশি রোজা রাখো।’
এসবকিছুর পাশাপাশি, শীতকাল একজন আল্লাহর পথে দায়ীর জন্য দাওয়া করার জন্য একটি সুবর্ণ সময়। যদিও শীত-গ্রীষ্ম সকল ঋতুতেই একজন দায়ী ইসলামী আদর্শের দাওয়াত নিয়ে সমাজের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষকে আহ্বানে ব্যস্ত থাকে। তবে, শীতকালে আবহাওয়া শীতল ও রাত দীর্ঘ হবার কারণে মানুষ দীর্ঘ সময় বাইরে থাকে, বিভিন্ন লোক-সমাগমের স্থান, যেমন, মাঠ-ময়দান, রেস্টুরেন্ট, চায়ের দোকানগুলো সরগরম থাকে, মানুষ আড্ডা দেয়, বন্ধু-বান্ধব পরিচিতদের সাথে সময় কাটায়। তাই যেকোনো বিষয়বস্তু নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা করার অবকাশ থাকে। তাই একজন দা’ঈ শীতের অল্প কয়েক মাসে অনেক মানুষকে দাওয়া করার সুযোগ পায় এবং এভাবে অল্প সময়ে অনেক বেশি পুরষ্কার অর্জন করতে পারে।সুতরাং, যদিও শীতকালের সহজতর অংশটুকু প্রকৃত ঈমানদারের জন্য কোনো চাহিদাপূরণ নয়, এরপরও একজন ঈমানদারের জন্য শীতকাল এক প্রকারের বোনাস যেখানে অল্প পরিশ্রমে বেশি পুরস্কার অর্জন করা যায়। এবং একজন প্রকৃত ঈমানদার এ সুযোগ কখনোই হাতছাড়া করবে না, হেলায় হারাবে না।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
فَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ وَأَنْ تَصُومُوا خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ
কিন্তু যে কেউ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে ভালো কাজ করে, সেটি তার জন্য ভালো। [বাকারাহ: ১৮৪]كَانُوا قَلِيلًا مِنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ ، وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ
তারা রাতের সামান্য অংশই এরা ঘুমিয়ে কাটায়, আর রাতের শেষ প্রহরে এরা ক্ষমা চাওয়ায় রত থাকে। [সুরা জারিয়াত: ১৭-১৮]
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلَّا عَلَى الْخَاشِعِينَ
ধৈর্য্যর সাথে সাহায্য প্রার্থনা কর নামাযের মাধ্যমে। নিশ্চয় তা যথেষ্ট কঠিন কেবলমাত্র তাদের ছাড়া যারা বিনয়ী (খুশু’প্রাপ্ত) [বাকারাহ: ৪৫]
وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا
আর যারা রাত্রি কাটিয়ে দেয় তাদের পালনকর্তার উদ্দেশ্যে সেজদাবনত ও দন্ডায়মান হয়ে [ফুরকান: ৬৪]
وَأَنْ تَصُومُوا خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ
আর যদি রোজা রাখ, তবে তা তোমাদের জন্যে বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পার [বাকারাহ: ১৮৪]পুনর্জাগরণের পথে বুদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতিই একমাত্র সঠিক চিন্তা পদ্ধতি

মুসলিমদের মাঝে ইসলামী রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি এবং ফলশ্রুতিতে সঠিক ইসলামী চিন্তা না থাকার ফলে ‘জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে’ মুসলিম মননে বেশ কিছু ভুল চিন্তা পদ্ধতি স্থান করে নিয়েছে। এ ধারা বেশ আগে থেকেই হয়ে রয়েছে, তবে তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে এখন তা দ্রুত সারফেসে উঠে আসছে। ফলে বিভ্রান্ত হচ্ছে অসংখ্য মুসলিম। এ বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। তবে আমরা সংক্ষেপে কয়েকটি বিপথগামি চিন্তা পদ্ধতির কথা উল্লেখ করবো ইন শা আল্লাহ।
১) আবেগি চিন্তা পদ্ধতি
এ ধরনের চিন্তায় মানুষ গভীর চিন্তা খাটিয়ে সমাধানে আসে না। বরং আবেগকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। উপরিতলের চিন্তায় আবেগীভাবে মশগুল থাকাটাই এ চিন্তার বৈশিষ্ট্য। এ ধরণের চিন্তায় মানুষ ‘সেভিয়র’ তথা ‘ত্রাণকর্তা’ খুঁজে বা কাউকে ত্রাণকর্তা হিসেবে গ্রহণ করে। যেহেতু চিন্তা করে সমাধান নেয়া এই চিন্তা পদ্ধতিতে দুষ্কর কাজ তাই মানুষ তার জীবনের বড় সমস্যাগুলোর সমাধানের জন্য সবসময় ত্রাণকর্তা খুঁজে বেড়ায়। দুর্ভাগ্যবশত, অধিকাংশ সাধারন খেটে খাওয়া মানুষই এ চিন্তা পদ্ধতি অনুসরণ করে। এটি তাদের যতটা না দোষ, তার চেয়ে বেশি করুণ বাস্তবতা।ইমাম মাহদী এসে সব সমস্যার সমাধান করবেন – এ ক্যাটাগরির চিন্তায় মানুষ এই আকাঙ্ক্ষায় বিভোর থাকতে পুলকিত বোধ করে।
২) প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তা পদ্ধতি
এ ধরণের চিন্তা অনেক আবেগী চিন্তার মতোই, তবে প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় সল্প মেয়াদে বেশি আবেগী। এ চিন্তায় মানুষ কোনো বড় দুর্যোগ বা প্রেক্ষাপট তৈরি হলেই প্রতিক্রিয়া দেখায়, এর বাইরে সে তার গথবাধা জীবন পরিচালনা করে। এরাও চিন্তার দিক বিবেচনায় পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী। ‘শক’ তাদের সল্প মেয়াদে কিছুটা চিন্তাশীল করে, কিন্ত তা ক্রমেই ক্ষীন হয়ে যায়। সমাজের খেটে খাওয়া মানুষ হতে উচ্চ মধ্যবিত্ত পর্যন্ত যেকোনো লেয়ারেই এই ধরণের মানুষ থাকতে পারে। এদের মধ্যে অনেকসময় তীব্র আবেগ দেখা যায় আবার কখনো দেখা যায় পরাজিত মানসিকতা।
উপরের দুই চিন্তা পদ্ধতিতে যেহেতু চিন্তা থেকে আবেগ বেশি প্রাধান্য পায়, তাই এসব মানুষ দীর্ঘমেয়াদে কিভাবে অগ্রসর হবে, তা দেখতে পায় না, খুঁজে বের করার চেষ্টাও করতে চায় না। এদের মাঝে কেউ কেউ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের আবেগ দ্বারা বেশি তাড়িত হন এবং সমাধানের জন্য নিজস্ব চেষ্টার গন্ডিতে কোনোরূপ কারণ-ফলাফলের হিসেব-নিকেষ না করে, কেবল কিছু ইবাদত-বন্দেগি তথা আচার-অনুষ্ঠানের করেই গায়েবি তথা সয়ংক্রিয় কোনো সমাধানের আশায় থাকেন।
৩) লজিকাল চিন্তা পদ্ধতি
এ ধরণের চিন্তা সাধারণত সমাজের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মাঝে বিদ্যমান। বৃটিশদের কেরানী তৈরির শিক্ষা ব্যবস্থায় পাবলিক-প্রাইভেটে পড়ে এই জনগোষ্ঠী তৈরি হয়। এরা নিজেদের সমাজের অন্যান্য মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে তাই তাদের যেকোনো সিদ্ধান্ত অন্যদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হবে ধরেই এরা চিন্তা করে। এ চিন্তায় মানুষ যতটা না বাস্তবতাকে বুঝে চিন্তা করেন, তার চেয়ে যৌক্তিক মানসিকতা নিয়ে চিন্তা করে। তারা তাদের এডুকেটেড মেন্টালিটিকে মানুষের বাস্তবতাকে বোঝার বা অনুমান/পরিমাপ করার জন্য যথেষ্ঠ মনে করে। এতে করে তারা ক্রমেই সাধারন মানুষের চিন্তা ও আবেগ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে। এদের মধ্যে যারা সরাসরি ফিল্ড রিয়েলিটি ভালোভাবে বুঝে বা বুঝতে চায়, ব্যক্তি হিসেবে তারা তুলনামূলকভাবে বেশি ধন্য হয় সমাজে। লজিকাল শিক্ষায় শিক্ষায় শিক্ষিত হবার কারণে এরা ইসলামকেও লজিকালি নিতে চায়। ইসলামী চিন্তাকে এরা অন্ধভাবে নিলেও ইসলামের কাজকে এরা যৌক্তিকভাবে নিতে চায়, এবং যুক্তির মানদন্ডে না টিকলে তারা সে ইসলামী কাজকে হীনজ্ঞান করে এবং মেনে নিতে দ্বিধাদন্দ্ব প্রকাশ করে। আবার এদের অনেকে হাদীসে আসা অল্পবিস্তর কিয়ামতের আলামত ঘেটে, লজিকাল মাইন্ড খাটিয়ে পূণদৈঘ্য “ইসলামী শেষ জমানা” নামক চলচিত্রও তৈরি করেন, যার হিরো হচ্ছেন ঈসা (আ) ও সাইডকিক আল-মাহদী। এবং তারা তা দেখে পুলকিত বোধ করে সুখনিদ্রা যান। দুর্ভাগ্যবশতঃ উম্মাহর কল্যাণে কোনো একশন পয়েন্টে যেতে পারেন না, এবং কোনো ডিরেকশনও দিতে পারেন না। ভাগ্য গণনাকারীরা যেমন ভাগ্য গণনা করে ভবিষ্যত বলে দেন, এনারাও সুসংবাদ দেয়া ও হতাশা দূরকারী হাদীসগুলোকে ভবিষ্যত গণনার উপকরণে পরিণত করেছেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, আবেগী ও প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তার মানুষদের মাঝেও ইমাম মাহদী বা ঈসা (আ)-এর এসে সমস্যা সমাধান করে দিবেন – এরূপ চিন্তা থাকতে পারে। তবে তারা এসব ব্যপারে লজিকালদের মতো জটিলভাবে চিন্তা করেন না, কেবল পরিত্রানদাতা হিসেবে এদের কল্পনা করেন এবং আবেগী কল্পনায় বিভোর হন।
সমাজে অল্পকিছু ব্যক্তি থাকতে পারেন যাদের মাঝে তীব্র লজিকাল মাইন্ডসেট এবং তীব্র আবেগ দুটোই কার্যকর বলে মনে হয়, তবে তারা মূলত লজিকাল চিন্তা দ্বারা দিনের শেষে সিদ্ধান্ত নেন। এরা নিজেদের বস্তুগত স্বার্থ ও নিরাপত্তাকে তাদের জীবনের কেন্দ্রে রেখে জীবনের সিদ্ধান্তগুলো নেন। মানবসমাজের এরাই খুব সম্ভবত সবচেয়ে বিপজ্জনক চরিত্র। তবে এরা যদি সত্যের পক্ষে একনিষ্ঠভাবে চলে আসেন, তবে তারা প্রভুত কল্যাণের উসিলাও হতে পারেন।
৪) বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতি
এ চিন্তা পদ্ধতি লজিকাল চিন্তা পদ্ধতিরই একটি সাবসেট তথা শাখা। এমপিরিকাল ড্যাটার উপর ভিত্তি করে এই চিন্তা করা হয়। বিজ্ঞান কোনো দৃষ্টিভংগি দেয় না, আবার কোনো নির্দিষ্ট একশন পয়েন্টও দেয় না। সর্বোচ্চ একটি পরিধি দিতে পারে। বর্তমানে পশ্চিমা সেকুলার-লিবারেল হিউম্যানিস্ট জীবনচিন্তার মানুষদের অনেকেরই সিদ্ধান্ত তারা বৈজ্ঞানিক চিন্তা দিয়ে করে। তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমাদের অনেকেই মানবজীবনের সমাধান বিজ্ঞান দিয়ে করার চেষ্ঠা করে। কিন্তু এতে তাদের সমস্যার সমাধান হয়না, পাশাপাশি তাদের এই পলিসির কারণে সমাজের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উপর ব্যাপক চাপ পড়ে।
৫) ফিকহী চিন্তা পদ্ধতি
এ ধরণের চিন্তায় মানুষ একটি ফিকহী মনস্তত্ব দ্বারা তাদের কার্যক্রম নির্ধারণ করতে চায়। কাজ করার সময় যখন প্রশ্ন করা হয় – “ভাই, কাজটাতো হালাল, সুতরাং করলে সমস্যা কোথায়”। সমস্যা এই সংকীর্ণ মনস্তত্ত্বের মাঝেই। আমাদের বোঝা প্রয়োজন, বিজ্ঞানের মতো আইনশাস্ত্র তথা ফিকহও কোনো একশন পয়েন্ট দেয়না, সর্বোচ্চ একটি সীমানা দিতে পারে। সুতরাং, এ চিন্তায় এক এক মানুষ এক এক একশন পয়েন্টে ফোকাস দিবে এবং এতে জাতিগত ঐক্য তৈরি হবার সম্ভাবনা হয়ে পরে দুরূহ। উদাহরণস্বরূপ, আপনি একটি ফুটবল ম্যাচ এর কথা চিন্তা করুন। যাকে মিডফিল্ডার হিসেবে নামানো হয়েছে, সে যদি চিরকাল আইনী বিবেচনায় চিন্তা করতে থাকে, তাহলে সে প্রয়োজন সাপেক্ষে কখনোই গোল দেবার জন্য ছুটে যাবে না, আবার প্রয়োজন সাপেক্ষে কখনোই গোল ঠেকাবার জন্য ডিফেন্সে নেমে আসবে না। আবার, যাদের দৃষ্টিভংগি ম্যাচ জেতা, তারা কোচ কাকে কোথায় দাড় করিয়েছে সে বিবেচনা না করে ম্যাচ জেতার জন্য যখন যে বাস্তবতায় যেটি করা প্রয়োজন পুরো টিম মিলে সে দৃষ্টিভংগিতে এগিয়ে যাবে। এখানে ডিসিশন থেকে দৃষ্টিভংগিই গুরুত্বপূর্ণ।—
প্রকৃতপক্ষে, আমাদের জীবন পরিচালনার প্রকৃত চিন্তার ভিত্তি হবে আমাদের আকীদা যা আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভংগি প্রদান করে, যা অন্য যেকোনো মতাদর্শ হতে পৃথক একটি সতন্ত্র মতাদর্শিক দৃষ্টিভংগিও বটে। এবং সেই দৃষ্টিভংগিই নির্ধারণ করবে আমাদের একশন পয়েন্ট কী হবে। এবং সেই জীবনযাত্রায় ফিকহ, বিজ্ঞান ও উম্মাহর আবেগ হচ্ছে কেবল এক একটি সহায়ক শক্তি। লজিকাল চিন্তাকে টুকটাক মেকানিক ট্রাবলশুটিং টাইপ কাজে সীমাবদ্ধ রেখে, ফিকহী চিন্তাকে আইন বের করার কাজে সীমাবদ্ধ রেখে এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে কেবলমাত্র বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখে মানবজীবনকে বাস্তবতাকে সামনে রেখে করা “বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা” প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনার মধ্যে রয়েছে সমাজের প্রকৃত কল্যাণ ও মুক্তি।
আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ করে দিন।
ইসলামে পিতৃত্বের অবস্থান (Fatherhood in Islam)

ভূমিকা: একজন মুসলিম পিতা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শক্ত ভিত গড়ে দেন
ইসলামে পিতৃত্ব এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, মূলত এর মাধ্যমেই মুসলিমদের বংশ-পরিচয় নির্ধারিত হয়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [ادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِندَ اللَّهِ] “তাদেরকে (সন্তানদেরকে) তোমরা তাদের পিতার পরিচয়ে সম্বোধন কর। এটাই আল্লাহ্’র দৃষ্টিতে অধিক ন্যায়সঙ্গত” [সূরা আল-আহযাব: ৫]। এই আয়াত পিতৃত্বের ভিত গড়ে দিয়েছে, যা হচ্ছে সন্তান লালন-পালনে পিতার বাধ্যবাধকতার ভিত্তি। যার মধ্যে রয়েছে সাহচর্য বা সঙ্গদান, আর্থিক ভরণপোষণ, ইসলামী চিন্তাসমূহ প্রোথিত করা, আক্বীদার প্রতি বিশ্বাস সুদৃঢ়করণ ও তাদেরকে শাসনের মাধ্যমে সুশৃঙ্খল রাখা। নিঃসন্দেহে বলা যায় ইসলামে পিতার ভূমিকা শুধুমাত্র ছেলে-মেয়েদের নামকরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর চেয়ে অনেক ব্যাপক।
ইসলামী উম্মাহ্’র শিক্ষক হিসেবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর ভূমিকাকে পিতার সাথে তুলনা করেছেন। তিনি (সা) বলেন, إِنَّمَا أَنَا لَكُمْ بِمَنْزِلَةِ الْوَالِدِ أُعَلِّمُكُمْ “আমি যেভাবে তোমাদেরকে শিক্ষা দেই, সেই অর্থে আমি বস্তুত তোমাদের পিতার মত” [সুনানে আবু দাউদ]। আমাদের নেতা ও শিক্ষক আল্লাহ্’র রাসূল (সা) নারী ও পুরুষের পুরো একটি প্রজন্মকে অভিভাবকের মতো লালন-পালন করে তাদেরকে ইসলামের একেকটি পিলার হিসেবে তৈরি করেছেন, যাদের প্রভাব মুসলিম উম্মাহ্’র ওপর এখনও বিদ্যমান। তিনি চারজন মহিমান্বিত কন্যাকে লালন-পালন করেছেন, যারা মুসলিম উম্মাহ্’র জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন। তিনি (সা) তাঁর বয়োঃজেষ্ঠ কিন্তু গরিবতম চাচার সন্তান আলী ইবনে আবু তালিব (রা.)-কে লালন-পালন করেছেন, যিনি পরবর্তী সময়ে ইসলামের চতুর্থ খলীফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি (সা) তাঁর পালকপুত্র যায়েদ ইবনে হারিসা ও তার সন্তান উসামা বিন যায়ীদকে দ্বীনি পরিবেশে বড় করেছেন। তাঁর (সা) তত্ত্বাবধানে থাকা তরুণদের জন্য তিনি ছিলেন যত্নবান সঙ্গী ও ধৈর্যশীল শিক্ষক। রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুসলিম তরুণদেরকে ইসলামী চিন্তা দ্বারা গড়ে তুলেছেন, ইসলামী আক্বীদার প্রতি তাদের ঈমানকে সুদৃঢ় করেছেন এবং তাদেরকে প্রজ্ঞা ও সহানুভূতি দ্বারা সুশৃঙ্খল করেছেন। তাঁর (সা) তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠা মুসলিম নারী ও পুরুষেরাই এই পৃথিবীতে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র বিধান বাস্তবায়নকারী ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তীতে নবুয়্যতের আদলে প্রতিষ্ঠিত প্রথম খিলাফত রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেন। পর্যায়ক্রমে সাহাবাগণ (রা.) কর্তব্যনিষ্ঠ পিতা হিসেবে একটি আল্লাহভীরু ও সাহসী প্রজন্মকে লালন-পালন করেন; উদাহরণস্বরূপ বলা যায় চারজন আব্দুল্লাহ্’র কথা, যারা ইয়াজিদের যুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। শাসক কিংবা সামরিক নেতৃত্ব, স্বামী কিংবা প্রতিবেশী ইত্যাদি জীবনের সকল ক্ষেত্রেই অনুকরণীয় মানদন্ড হিসেবে অনুসরণের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভের জন্য আমরা নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দৃষ্টান্তের কাছে ফিরে যাই। সুতরাং, আজকে যারা পিতা তাদের উচিত তাদের সন্তানদের লালন-পালনের ক্ষেত্রে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাদের উপর যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তা স্মরণ রাখা, কেননা বর্তমান প্রজন্ম দ্বিতীয় খিলাফতে রাশিদাহ্’র প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সুসংবাদ বাস্তবায়নের জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করছে। তাদের উচিত তাদের প্রত্যেকের ঘরের মধ্যে সেই শক্তিশালী ইসলামী ব্যক্তিত্বদেরকে প্রস্তুত করা যারা ইসলামকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে পুনরায় বাস্তবায়ন করবে এবং ইসলামকে দাওয়াহ্ হিসেবে সমগ্র পৃথিবীর কাছে নিয়ে যাবে।
পিতা তার সন্তানের যত্নবান সঙ্গী
একদিকে পিতা যেমন সন্তানের শিক্ষক, পরামর্শদাতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিতকারী, ঠিক তেমনি তিনি কোমল ও যত্নবান সহচর। স্বীয় কন্যাদের প্রতি রাসূলুল্লাহ্ (সা) ছিলেন কোমল, শ্রদ্ধাশীল, যত্নশীল অভিভাবক। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) বলেন, مَا رَأَيْتُ أَحَدًا مِنَ النَّاسِ كَانَ أَشْبَهَ بِالنَّبِيِّ ﷺ كَلاَمًا وَلاَ حَدِيثًا وَلاَ جِلْسَةً مِنْ فَاطِمَةَ. وَكَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا رَآهَا قَدْ أَقْبَلَتْ رَحَّبَ بِهَا، ثُمَّ قَامَ إِلَيْهَا فَقَبَّلَهَا، ثُمَّ أَخَذَ بِيَدِهَا فَجَاءَ بِهَا حَتَّى يُجْلِسَهَا فِي مَكَانِهِ، وَكَانَتْ إِذَا أَتَاهَا النَّبِيُّ ﷺ رَحَّبَتْ بِهِ، ثُمَّ قَامَتْ إِلَيْهِ فَقَبَّلَتْهُ “কথোপকথন, বক্তব্য কিংবা আচরণে আমি ফাতিমার (রা.) তুলনায় এমন কাউকে দেখিনি যে কিনা আল্লাহ্’র রাসূল (সা)-এর সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফাতিমা (রা.) যখন আল্লাহ্’র রাসূল (সা)-এর কাছে আসতেন তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে সালাম জানাতেন, তার সম্মানে উঠে দাঁড়াতেন, তার কপালে চুমু খেতেন এবং তার হাত ধরে টেনে নিয়ে তার নিজের আসনে বসাতেন। যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) ফাতিমার ঘরে বেড়াতে যেতেন তখন ফাতিমা অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ্’কে সালাম জানাতেন, তাঁর সম্মানে উঠে দাঁড়াতেন এবং তাঁর কপালে চুমু খেতেন।” [আল-আদাবুল মুফরাদ]।
আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, কতিপয় বেদুইন রাসূলুল্লাহ্ (সা) কাছে আসলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কি আপনার সন্তানদেরকে চুমু খান?” তিনি (সা) বললেন, “হ্যাঁ।” এর প্রেক্ষিতে তারা বলল, “আল্লাহ্’র শপথ আমরা আমাদের সন্তানদের চুমু খাইনা।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “তবে আমার কিইবা করার আছে যদি আল্লাহ্ তোমাদেরকে রহমত থেকে বঞ্চিত রাখেন?” [মুসলিম]। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, আল-আক্বরা বিন হাবিস দেখলেন যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) হাসান (রা.)-কে চুমু দিচ্ছেন। তখন আল-আক্বরা বললেন, “আমার দশটি সন্তান রয়েছে কিন্তু আমি কখনই তাদেরকে চুমু দেইনি,” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “যে তার সন্তানদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে না, তার প্রতিও (আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে) কোন দয়া প্রদর্শন করা হবে না।” [মুসলিম]।
উপরন্তু, ইসলামে একজন পিতাকে সন্তানদের প্রতি তার স্নেহ ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানে সমতা নিশ্চিত করার জন্য বলা হয়েছে যেন কোন পক্ষপাত না হয়। নুমান বিন বশির (রা) বর্ণনা করেছেন, ذَهَبَ بِي أَبِي إِلَى النَّبِيِّ ﷺ يُشْهِدُهُ عَلَى شَىْءٍ أَعْطَانِيهِ فَقَالَ: أَلَكَ وَلَدٌ غَيْرُهُ. قَالَ نَعَمْ. وَصَفَّ بِيَدِهِ بِكَفِّهِ أَجْمَعَ كَذَا أَلاَ سَوَّيْتَ بَيْنَهُمْ “আমার পিতা আমাকে রাসূলের কাছে নিয়ে গেলেন এবং আমাকে মূল্যবান কিছু একটা দিবেন যার জন্য আল্লাহ্’র রাসূল (সা)-কে সাক্ষী হিসেবে রাখতে চাইলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা)) জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কি আর কোন সন্তান রয়েছে? আমার পিতা বললেন, হ্যাঁ। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার হাত দিয়ে আনুভূমিকভাবে ইশারা করে বললেন, তাহলে সবাইকে তুমি সমানভাবে অনুগ্রহ করছ না কেন? [আন নাসাঈ]।
পৃথিবীতে ইসলামকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার বিশাল দায়িত্ব পালন করা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর তত্ত্বাবধানে থাকা শিশুদের চাহিদার দিকে সবসময় একজন পিতার মত মনোযোগী থাকতেন। আনাস বিন মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের বাসায় বেড়াতে আসতেন। আমার একটি ছোট ভাই ছিল, যার ডাকনাম ছিল আবু উমাইর। তার একটি পোষা চড়–ই পাখি ছিল যাকে নিয়ে সে খেলা করত। একদিন পাখিটা মরে গেল। এরপর একদিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বেড়াতে এসে দেখলেন আবু উমাইরের মন খারাপ। তিনি আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ওর কি হয়েছে?” আমরা বললাম, ওর চড়–ই পাখিটা মরে গিয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ্ আবু উমাইরকে বললেন, “আবু উমাইর তোমার চড়–ই পাখিটার কি হয়েছিল?” (আবু দাঊদ)।
একজন মুসলিম পিতা শিশুদের সাথে শিশুসুলভ, কিন্তু প্রয়োজনের সময় তিনি একজন দৃঢ়চেতা পুরুষ। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) বলেন, “একজন পুরুষের এই গুণটি আমাকে মোহিত করে যে, সে তার পরিবারের কাছে শিশুসুলভ কিন্তু তাকে যখন প্রয়োজনের সময় ডাকা হয় তখন তাকে সত্যিকারের পৌরুষদীপ্ত মানুষ হিসেবে পাওয়া যায়।” [সুত্র: সোয়াব আল-ইমান ৭৮৫১]। একজন পিতার পৌরুষদীপ্ততার উৎস হল তার শক্তিশালী ইসলামী চরিত্র এবং তার মর্যাদার উৎস হলো তার দ্বীন। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, একজন পুরুষের ব্যক্তিত্বের মূলভিত্তি হলো তার বুদ্ধিবৃত্তি, তার মর্যাদা বা সম্মান হল তার দ্বীন, তার চরিত্রের মধ্যে রয়েছে তার পৌরুষদীপ্ততা। [সুত্র: আদাব আল-দুনিয়া ওয়াল-দ্বীন ১/১৭]। একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম পিতা তার সন্তানদের একজন ভালো বন্ধু হয়ে সন্তানকে খারাপ সঙ্গের ধ্বংসাত্মক প্রভাব ও নেতিবাচক উদ্দীপনা থেকে রক্ষা করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, الرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ “একজন মানুষ তার বন্ধুর দ্বীন অনুসরণ করে, সুতরাং প্রত্যেককেই এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিৎ সে কার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে।” [আবু দাউদ]
একজন মুসলিম পিতা ধৈর্যশীল ও প্রেরণাদায়ক শিক্ষক
সন্তানকে শিক্ষাদানের সময় একজন মুসলিম পিতা তার সন্তানকে তার দুর্বলতার জন্য উপহাস বা বিদ্রুপ করেন না, অভিশাপ দেন না, গালিগালাজ করেন না কিংবা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা হেয়-প্রতিপন্ন করেন না, বরং তিনি ধৈর্য্যরে সাথে তাদের সম্মান বজায় রেখে কথা বলেন, তাদের মধ্যে সম্মানবোধ জাগিয়ে তোলা ও তাদেরকে সম্মান প্রাপ্তিতে প্রবল আগ্রহপূর্ণ করে তোলেন। তিনি তাদেরকে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করা এবং তাদের আত্মমর্যাদাবোধকে দৃঢ়ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ وَلَا اللَّعَّانِ وَلَا الْفَاحِشِ وَلَا الْبَذِيءِ “একজন মুমিন কাউকে উপহাস করে না, অভিসম্পাত করে না, অশ্লীল শব্দের দ্বারা আহ্বান করে না এবং কাউকে গালমন্দ করে না।” (তিরমিজি)। ওমর বিন আল-খাত্তাব (রা.) বলেন, “কোন ব্যক্তির তর্জন-গর্জন শুনে তোমরা বিমোহিত হয়ো না, বরং সে যদি তার আমানত রক্ষা করে, অন্য মানুষের সম্মানে আঘাত করা থেকে নিজেকে বিরত রাখে তবেই সে একজন সত্যিকারের পুরুষ।” [আল যুহদ ওয়াল রাক্বাইক ৬৮১]।
নিঃসন্দেহে ইসলামের বিভিন্ন যুগের প্রখ্যাত আলেমগণ মন্তব্য করেছেন যে, একজন ব্যক্তির পৌরুষের প্রমাণ হলো সে কাউকে অপমান করে না, কারো সমালোচনা করে না কিংবা কাউকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে না। ইমাম আইয়্যুব আল শাখতিয়ানী (রহ.) বলেন, “একজন পুরুষ কখনোই তার পৌরুষে পৌঁছাতে পারবে না কিংবা পৌরুষের পরিপূর্ণতা অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে দুটি বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে না পারে: মানুষকে ক্ষমা করে দেওয়া এবং তাদের ভুলত্রুটিকে উপেক্ষা করা। ইমাম আব্দুল্লাহ্ ইবনে আল মুবারক (রহ.) বলেন, “যে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করল সে অচিরেই তার পৌরুষ হারিয়ে ফেলবে।” [সিয়ার আ‘লাম আল নুবালা ১৭/২৫১]। সাঈদ ইবন আল-আস (রহ.), যিনি একসময় মদিনার ওয়ালী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, ঘোষণা করেন, আমি যৌবনে পদার্পণ করার পর থেকে কখনো কাউকে অপমান করিনি। [আল-হিলম লি-ইবন আবি দুনিয়া, ১১৯]
কম বয়সী সাহাবাদের শিক্ষাদানের সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) যথেষ্ট ধৈর্য্য প্রদর্শন করতেন এবং তাদের মনোবল ও আত্মবিশ্বাসকে অক্ষুন্ন রাখতেন। আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, خَدَمْتُ النَّبِيَّ ﷺ عَشْرَ سِنِينَ، فَمَا قَالَ لِي أُفٍّ وَلاَ لِمَ صَنَعْتَ وَلاَ أَلاَّ صَنَعْتَ “আমি দীর্ঘ ১০ বছর আল্লাহ্’র রাসূল (সা)-কে গৃহস্থালী কাজে সাহায্য করেছি। তিনি কখনোই আমার প্রতি বিরক্তিসূচক উফ্ শব্দটিও উচ্চারণ করেননি কিংবা কখনোই এই বলে অভিযোগ করেননি যে, এটা কেন করেছ বা ওটা কেন করো নাই। [বুখারী]। কম বয়সী সাহাবাদের শিক্ষাদানের সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের কোমল মনকে চিন্তাশীলতার দিকে উদ্বুদ্ধ করতেন। আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, كُنَّا عِنْدَ النَّبِيِّ ﷺ فَأُتِيَ بِجُمَّارٍ فَقَالَ إِنَّ مِنَ الشَّجَرِ شَجَرَةً مَثَلُهَا كَمَثَلِ الْمُسْلِمِ . فَأَرَدْتُ أَنْ أَقُولَ هِيَ النَّخْلَةُ، فَإِذَا أَنَا أَصْغَرُ الْقَوْمِ فَسَكَتُّ، قَالَ النَّبِيُّ ﷺ هِيَ النَّخْلَةُ “আমরা রাসুলুল্লাহ্’র সাথে ছিলাম এমন সময় কিছু তাজা খেজুর তার নিকট নিয়ে আসা হল। তিনি বললেন, গাছের মধ্যে এমন একটি গাছ রয়েছে যা বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে একজন মুসলিমের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তখন আমি বলতে চেয়েছিলাম এর উত্তর হলো খেজুরগাছ, কিন্তু যেহেতু আমি বয়সে সবার ছোট ছিলাম তাই চুপ করে থাকলাম। তখন রাসূল নিজেই বললেন, এর উত্তর হলো খেজুর গাছ।” [বুখারী]।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) শিশু-কিশোরদেরকে একজন আদর্শ পিতার মত ইতিবাচকভাবে অনুপ্রাণিত করতেন। আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর (রা.) তার বোন উম্মুল মুমিনীন হাফসা (রা.) এর কাছ থেকে জানতে পারেন যে, তিনি (সা) হাফসা (রা.)-কে বলেছেন, إِنَّ عَبْدَ اللَّهِ رَجُلٌ صَالِحٌ لَوْ كَانَ يُكْثِرُ الصَّلاَةَ مِنَ اللَّيْلِ “আব্দুল্লাহ্ একজন ন্যায়পরায়ন ও ধার্মিক লোক, তবে সে যদি রাতে আরো বেশি সালাত আদায় করত তবে আরো ভালো হতো। [বুখারী]। আল জুহরী বলেন, “এরপর থেকে আব্দুল্লাহ্ (রা.) রাতের বেলায় বেশি করে সালাত আদায় করতেন।”
কর্তৃত্বপ্রয়াসী মানসিকতার অনেক ঊর্ধ্বে উঠে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তরুণ সাহাবাদেরকে যথাযথভাবে প্রস্তুত করে তাদেরকে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করতেন। আল্লাহ্’র রাসূল (সা) ওসামা বিন যায়িদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি সেনা অভিযান প্রেরণ করেন। এরপর কেউ কেউ যখন ওসামার নেতৃত্বের ব্যাপারে নেতিবাচক কথা বলতে লাগলো তখন রাসূলুল্লাহ্ ঘোষণা করলেন, إِنْ تَطْعُنُوا فِي إِمَارَتِهِ فَقَدْ كُنْتُمْ تَطْعُنُونَ فِي إِمَارَةِ أَبِيهِ مِنْ قَبْلُ، وَايْمُ اللَّهِ، إِنْ كَانَ لَخَلِيقًا لِلإِمَارَةِ “যদি এটা হয় যে, তোমরা ওসামার নেতৃত্বের সমালোচনা করছ, যেমনটি পূর্বে তার পিতার (যায়েদ বিন হারিসা) ব্যাপারে করেছিলে। আল্লাহ্’র কসম! তবে জেনে রাখ, সে নেতৃত্বের যোগ্য ছিল। [বুখারী]
পিতা তার সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষা ও পরিবেশে বড় করবেন
সন্তানদের রক্ষা করতে তাদেরকে দ্বীনের শিক্ষায় শিক্ষিত করা মুসলিম পিতার দায়িত্ব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ] “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের সেই আগুন থেকে রক্ষা করো যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর। [আত-তাহরীম: ৬]। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, “তোমরা আল্লাহ্’র আনুগত্য কর, তাঁর অবাধ্য হইও না এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আল্লাহ্’র আনুগত্যের আদেশ কর। তাহলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তোমাদের সকলকে একত্রে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন।” আলী (রা.) বলেন, “অবশ্যই তোমরা এবং তোমাদের পরিবার সৎকাজ করবে এবং অবশ্যই পরিবারকে সঠিক পথে রাখতে শাসন করবে।” মুজাহিদ (রহ.) বলেন, “তোমরা তাকওয়া অর্জন কর এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে তাকওয়া অর্জনের আদেশ দাও।” কাতাদা (রহ.) বলেন, “তার দায়িত্ব হল আল্লাহ্’র আনুগত্যের এবং আল্লাহ্’র অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকার আদেশ প্রদান করা। সে তার পরিবার-পরিজনকে আল্লাহ্’র আনুগত্যের আদেশ দেয় এবং তাদেরকে আল্লাহ্’র আনুগত্য করতে সাহায্য করে। যখনই সে তাদের কারো মধ্যে আল্লাহ্’র প্রতি অবাধ্যতা লক্ষ্য করে সে তাদেরকে নিবৃত করে এবং তা করতে নিষেধ করে।
পিতা তার সন্তানের জন্য এমন একজন শিক্ষক যিনি তার সন্তানদেরকে হালাল ও হারাম সম্পর্কে শিক্ষা দেন। সূরা তাহরীম এর ৬ নম্বর আয়াত সম্পর্কে আদ-দাহ্হাক ও মুক্বাতিল বলেন, নিকটাত্মীয়দেরকে ফরজ ও হারাম সম্পর্কে শিক্ষা দেয়াটা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক। সন্তানকে ইসলাম শিক্ষা দেওয়া একজন মুসলিম পিতার দায়িত্ব। তবে, এই দায়িত্ব তিনি নিজে সরাসরি সন্তানকে শিক্ষাদানের মাধ্যমে পালন করতে পারেন কিংবা অন্য কোন উপযুক্ত ব্যক্তিকে নিয়োগের মাধ্যমেও করতে পারেন, যিনি পিতার সরাসরি তত্ত্বাবধানে থেকে সন্তানকে ইসলাম শিক্ষা দিবেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ “জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক।” [তিরমিজি]। এই বাধ্যবাধকতার মধ্যে রয়েছে সকল প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহের ব্যাপারে জ্ঞানার্জন; যার মধ্যে রয়েছে সালাত, সাওম, আর্থিক লেনদেন, বিপরীত লিঙ্গের সাথে সম্পর্ক এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর আল ফারুক (রা.)-এর কাছে একবার এক লোক তার সন্তানের ব্যাপারে অভিযোগ করলেন যে, তার পুত্র তাকে সম্মান করেনা। ওমর (রা.) তার পুত্রকে ডেকে পাঠালেন এবং তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কেন তোমার পিতাকে অবজ্ঞা/অসম্মান কর?” উত্তরে লোকটির ছেলে বলল, “হে আমীরুল মুমিনীন! সন্তানের কি তার পিতার উপর কোন অধিকার নেই?” ওমর (রা.) বললেন: “অবশ্যই আছে।” তখন ছেলেটি প্রশ্ন করল, “সেগুলো কি?” এর জবাবে ওমর (রা.) বললেন, “পিতা তার জন্য ভালো মা নির্বাচন করবে, তার একটি সুন্দর নাম রাখবে এবং তাকে কুর‘আন শিক্ষা দিবে।” তখন ছেলেটি বলল, “আপনি নিশ্চিত থাকেন আমার পিতা এগুলোর কোনোটিই করেনি। আমার মা একজন অগ্নি উপাসক, সে (পিতা) আমার নাম রেখেছে যুলান (যার অর্থ গুবড়েপোঁকা) এবং সে আমাকে কুর‘আন-এর একটি হরফও শিক্ষা দেয়নি। এটা শুনে ওমর (রা.) তার পিতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “হে জনাব! তুমি তোমার ছেলের বেয়াদবির ব্যাপারে অভিযোগ করতে আমার কাছে এসেছ। তোমার পুত্র তোমার হক্ব আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার আগে তুমি নিজেই তোমার পুত্রের হক্ব আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছ। সে তোমার প্রতি অন্যায় করার পূর্বেই তুমি তার প্রতি অন্যায় করেছ।”
অপরদিকে ওমর (রা.) পিতা হিসেবে তার নিজের ছেলে আব্দুল্লাহ্ বিন ওমর (রা.)-এর প্রতি তার হক্ব যথাযথভাবে আদায় করেছেন। আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রা.) ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর একজন সাহাবা, তিনি ছিলেন একজন ফকিহ্ এবং মুসলিম সমাজের জন্য একজন শক্তিমান ও কার্যকর নেতা ও পথপ্রদর্শক। বাস্তবিক অর্থে তিনি (রা.) ছিলেন চারজন বিখ্যাত আব্দুল্লাহ্’র মধ্যে একজন যিনি আমির মুয়াবিয়াকে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করেছিলেন যখন মুয়াবিয়া তার সন্তানকে পরবর্তী খলিফা হিসাবে মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রা.) বলেছিলেন, “এই খিলাফত ব্যবস্থা বাইজেন্টাইন, সিজার কিংবা খসরুর রাজতন্ত্র নয় যেখানে সন্তান তার বাবার রাজত্বের উত্তরাধিকারী হয়। যদি তাই হত তাহলে আমার পিতার মৃত্যুর পর আমি খলিফার দায়িত্ব পালন করতাম। এমনকি আমার পিতা আমার নাম ৬ জন মনোনয়ন প্রার্থীর মধ্যেও রাখেননি, তিনি খিলাফতের নির্ধারিত শর্তের বাইরে অন্যকিছুকে প্রাধান্য দেননি।”
মালিকী মাযহাবের ইমাম আবুল হাসান আলী ইবনে খালাফ আল-কাসিম (রহ.) বলেন, “যে ব্যক্তি ইচ্ছা পোষণ করে তার সন্তানকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তার জন্য চক্ষু শীতলকারী হিসেবে মঞ্জুর করবেন, সে যেন সন্তানকে কুর‘আন শিক্ষাদানে ব্যয়কৃত অর্থের ব্যাপারে কৃপণ না হয়। সে যদি তার সন্তানের কুর‘আন শিক্ষার জন্য অর্থ ব্যয় করে তাহলে তা তার জন্য একটি চমৎকার নেক আমল হিসেবে গণ্য হবে, ইনশাআল্লাহ্। আর যে তার সন্তানকে ভালোভাবে শিক্ষাদান করবে, তার পড়াশোনার তদারকী বা অগ্রগতি সাধন করবে এবং তাকে শৃঙ্খলা শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে সুশৃঙ্খল করবে, তাহলে সে একটি উত্তম আমল করল এবং আশা করা যায়, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাকে দ্বিগুণ পুরস্কার দিবেন।”
পিতা তার সন্তানের ঈমানকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করবেন
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [وَوَصَّى بِهَا إِبْرَاهِيمُ بَنِيهِ وَيَعْقُوبُ يَا بَنِيَّ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى لَكُمُ الدِّينَ فَلا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ] “এরই উপদেশ দিয়েছিল ইব্রাহীম তার সন্তানদের এবং একইভাবে ইয়াকুবও যে, হে আমার সন্তানগণ, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তোমাদের জন্য এ দ্বীনকে মনোনীত করেছেন। কাজেই তোমরা মুসলিম না হয়ে কখনও মৃত্যুবরণ করো না।” [আল-বাকারা ১৩২]। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যেভাবে দারুল-আরকামে কিশোর/তরুণ সাহাবাদেরকে ঈমানী চেতনায় গড়ে তুলেছিলেন, ঠিক তেমনিভাবে একজন মুসলিম পিতার উচিত তার সন্তানদেরকে ইসলামী আকীদার উপর অটল ঈমানের অধিকারী হিসেবে গড়ে তোলা। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেন, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম তাদের ঈমানের উপর ভিত্তি করে জান্নাতের সুউচ্চ মর্যাদা লাভ করবে এবং তাদের পূণ্যবান পিতাদের সাথে একত্রিত হবে। নিঃসন্দেহে এটি হবে মৃত্যুর সাময়িক বিরতির পর এক আনন্দঘন চিরস্থায়ী সাক্ষাৎ। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُم بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَا أَلَتْنَاهُم مِّنْ عَمَلِهِم مِّن شَيْءٍ] “যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের সন্তান-সন্ততিরাও ঈমানের ক্ষেত্রে তাদেরকে অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সন্তান-সন্ততিকে তাদের অনুরূপ মর্যাদায় সমুন্নত করব এবং তাদের নিজেদের পুরস্কার (মর্যাদার) কোনো কমতি হবে না।” [আত তুর-২১]। ইসলাম একজন মুসলিম পিতাকে তার সন্তানের জন্য দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী প্রতিপত্তি অর্জনের জন্য সম্পদ, লেখাপড়া ও বৈষয়িক সুবিধার প্রতিযোগীতায় মশগুল হয়ে পরার তুচ্ছ স্বপ্ন দেখায় না, বরং আখিরাতের সুউচ্চ সম্মান অর্জনের লোভনীয় স্বপ্ন দেখায়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ] “আর স্মরণ কর যখন লুকমান তার পুত্রকে উপদেশ দিয়ে বলেছিল, হে আমার পুত্র! আল্লাহ্’র ইবাদতে কাউকে শরিক করবে না, কারণ র্শিক হল সবচেয়ে বড় জুলুম। [লুকমান- ১৩]। একজন মুসলিম পিতা তার সন্তানের ঈমানকে সুদৃঢ় করার জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকবেন, কারণ তিনি জানেন যে সন্তানের সঠিকপথ বা হিদায়েত লাভের জন্য পিতা-মাতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, مَا مِنْ مَوْلُودٍ إِلَّا يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَجِّسَانِهِ “প্রত্যেক আদম সন্তানই মুসলিম হিসেবে ভূমিষ্ঠ হয়, কিন্তু তার পিতা-মাতা তাকে একজন ইহুদি, খ্রিস্টান কিংবা অগ্নি-উপাসক বানিয়ে ফেলে। [বুখারী ও মুসলিম]।
ইসলামের প্রতি সঠিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বর্তমানের মুসলিম পিতারা ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থার কারণে অনেক বড় প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন, যে ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত আমাদের দ্বীনের ক্ষতি সাধন করে চলেছে। ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা ধর্মকে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে ধর্মবিশ্বাসের গুরুত্ব শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা হয়েছে। যার ফলে, এতে অবাক হওয়ার কোনোও কারণ নেই যে পৃথিবীব্যাপী সন্দেহবাদী (agnostic) লোকের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে যারা বলে যে জীবনের উদ্দেশ্যের ব্যাপারে তারা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। এই সন্দেহবাদ (agnosticism) এর উত্থান কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি হল বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সরাসরি ফলাফল, যেগুলো ধর্মনিরপেক্ষতার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। আর তাই একজন সন্তানের মধ্যে সঠিক ঈমান প্রতিষ্ঠা করার জন্য মুসলিম পিতাকে অবশ্যই একটি শক্তিশালী এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ ইসলামী শিক্ষাদান পদ্ধতির সাহায্য নিতে হবে।
একজন মুসলিম পিতাকে অবশ্যই আক্বীদার সাথে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়সমূহকে নিজে জানতে হবে ও সন্তানকে শিখাতে হবে; যার মধ্যে রয়েছে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র অস্তিত্বের অপরিহার্যতা, নবী রাসুলের প্রয়োজনীয়তা, মহাগ্রন্থ আল কুর‘আন-এর মোজেজা, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর সুন্নাহ্’কে ওহী হিসেবে প্রমাণ এবং ক্বাদা ও ক্বদর সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা। পাশাপাশি তাকে এ ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে যে ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থার ছত্রছায়ায় বস্তুবাদকে মহাবিশ্বের উৎপত্তির কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় যেখানে ইসলামী আক্বীদার অকাট্যতাকে এবং এর ঐশীবাণীসমূহের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। তাকে স্থানীয় বা আঞ্চলিক প্রথা ও আচার-অনুষ্ঠানের ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে, যেখানে পূর্বপুরুষের ধর্মবিশ্বাসকে কোন যথাযথ প্রমাণ ছাড়াই গ্রহণ করা হয়। তাকে অদৃষ্টবাদিতার (fatalism) ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে যা মুসলিমদের ইসলামী দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকারকে দুর্বল করে দেয়। এর অর্থ হল, একজন মুসলিম পিতা তার ঘরকে দারুল-আরকামের আদলে পরিচালনা করবেন যেখানে হিদায়েতের আলো প্রস্ফুটিত হবে এবং একই সাথে সকল ভ্রান্ত ও কুফরী বিশ্বাসগুলোর কবর রচিত হবে। আর এই সঠিক প্রক্রিয়া আমাদের সন্তানদেরকে কুফরের সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকার শক্তি যোগাবে যে সংক্রমণ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকেও ভয়ঙ্কর; কেননা কুফর চিরস্থায়ী আখিরাতকে ধ্বংস করে দেয়। এ সকল প্রচেষ্টা সত্ত্বেও একজন মুসলিম পিতা তার সন্তানের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র কাছে এই বিশ্বাস নিয়ে ক্রমাগত দোয়া করবেন যেন আমাদের এই কঠিন দুর্যোগপূর্ণ সময়ে তার সন্তানের ঈমান দৃঢ় থাকে। কেননা হিদায়াত একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র ই হাতে এবং পিতা হলেন এমন ব্যক্তি সন্তানের জন্য যার দোয়া আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ফিরিয়ে দেন না। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ثَلاَثُ دَعَوَاتٍ يُسْتَجَابُ لَهُنَّ لاَ شَكَّ فِيهِنَّ دَعْوَةُ الْمَظْلُومِ وَدَعْوَةُ الْمُسَافِرِ وَدَعْوَةُ الْوَالِدِ لِوَلَدِهِ “তিনটি দোয়া আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা অবশ্যই কবুল করেন; অত্যাচারীতের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং সন্তানের জন্য পিতার দোয়া।” [ইবনে মাজাহ]
পিতা সন্তানদেরকে ইসলামের হুকুম পালনে অভ্যস্ত করে তুলবেন
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَاماً] “এবং যারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দান করুন এমন স্ত্রী ও সন্তানদের যারা আমাদের জন্য চক্ষুশীতলকারক হবে এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য নেতা বানিয়ে দিন।” [আল-ফুরক্বান-৭৪]। একজন মুসলিম পিতার দায়িত্ব হল তার সন্তানদেরকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র ইবাদতের দিকে ধাবিত করা এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ও রাসূলের আনুগত্যের আদেশ দেওয়া। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আমাদের লুকমান (আ:)-এর ঘটনা স্মরণ করিয়ে পবিত্র কুর‘আন-এ বলেন, [يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَٰلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ] “হে আমার পুত্র! সালাত কায়েম কর, সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ কর এবং (এর ফলশ্রুতিতে) তোমার উপর যে বিপদ আপতিত হয় তা তুমি ধৈর্য্যসহকারে মোকাবেলা কর। নিঃসন্দেহে এটি একটি সাহসিকতাপূর্ণ কাজ যা দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।” [লুকমান-১৭]। একজন মুসলিম পিতা তার সন্তানের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র কাছে দোয়া করবেন এবং দৃঢ়তার সাথে এটি নিশ্চিত করবেন যেন তার সন্তানদের মধ্যে ন্যায়পরায়নতার গুণাবলী প্রোথিত হয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [قَالَ رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحاً تَرْضَاهُ وَأَصْلِحْ لِي فِي ذُرِّيَّتِي إِنِّي تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّي مِنَ الْمُسْلِمِينَ] “তারা বলে, হে আমাদের রব! আমার ও আমার পিতামাতার প্রতি আপনার অনুগ্রহকে স্মরণ করে আমি যেন আপনার শুকরিয়া আদায় করতে পারি সেই তৌফিক দান করুন। এবং আমার সন্তানদেরকে ন্যায়পরায়ণতার পথে পরিচালিত করুন। আমি আপনার নিকট তওবা করছি এবং কেবল আপনার কাছেই নিজেকে সমর্পণ করছি। [আহক্বাফ- ১৫]। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, مَا نَحَلَ وَالِدٌ وَلَدًا مِنْ نَحْلٍ أَفْضَلَ مِنْ أَدَبٍ حَسَنٍ পিতা কর্তৃক পুত্রকে দেওয়া সবচেয়ে মূল্যবান উপহার হল উত্তম আচরণ শিক্ষাদান। [তিরমিযী]
সুতরাং মুসলিম পিতা একজন বন্ধুসুলভ ও যত্নবান শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি তার সন্তানকে প্রজ্ঞার সাথে শাসন দ্বারা সুশৃঙ্খল করবেন, যেন তার প্রিয় সন্তানকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র ক্রোধ ও আখেরাতের কঠিন শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, لأَنْ يُؤَدِّبَ الرَّجُلُ وَلَدَهُ خَيْرٌ مِنْ أَنْ يَتَصَدَّقَ بِصَاعٍ “একজন ব্যক্তির জন্য এক সা‘আ পরিমাণ সম্পদ দান করার চেয়ে তার সন্তানকে সুশৃঙ্খলভাবে গড়ে তোলা অধিক উত্তম।” [তিরমিযী]। আল্লাহ্’র রাসূল (সা) আরও বলেন, مَنْ عَالَ ثَلاَثَ بَنَاتٍ فَأَدَّبَهُنَّ وَزَوَّجَهُنَّ وَأَحْسَنَ إِلَيْهِنَّ فَلَهُ الْجَنَّةُ “কোন ব্যক্তি যদি তিনটি কন্যা সন্তানকে লালন-পালন করে, তাদেরকে সুশৃঙ্খল হিসেবে গড়ে তুলে, তাদেরকে উত্তমভাবে বিয়ে দেয় এবং তাদের জন্য কল্যানকর কিছু করে তাহলে সে জান্নাতী।” [আবু দাউদ]।
সন্তানের প্রতি একজন মুসলিম পিতার শাসন হওয়া উচিত সন্তানের প্রতি তার মমতা ও যত্নশীলতার বহিঃপ্রকাশস্বরূপ। এই শাসন কখনোই হতাশা, রাগ কিংবা শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব থেকে হওয়া উচিত নয়। সন্তানের জন্য দুনিয়ার পদমর্যাদার আকাঙ্খা থেকেও একজন মুসলিম পিতা তার সন্তানকে শাসন করবেন না, বরং এই শাসন হবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এবং চিরস্থায়ী আখিরাতে সন্তানের উচ্চ মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, “সাহরি না খেয়ে কেউ যদি সকালে ঘুম থেকে উঠে তাহলে সে নাস্তা না খেয়ে তার রোজা সম্পূর্ণ করবে এবং কেউ যদি সকালে নাস্তা খেয়ে ফেলে তাহলে ইফতার পর্যন্ত বাকি দিন সে না খেয়ে থাকবে।” [মুসলিম]। ইমাম মুসলিম আরও বর্ণনা করেন, সাহাবাগণ (রা.) বলেছেন, “সুতরাং আমরা সবাই আশুরার দিনে সওম পালন করতাম এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র রহমতে আমাদের সন্তানরাও সাওম পালন করত। আমরা সন্তানদেরকে নিয়ে মসজিদে চলে যেতাম এবং তাদের জন্য তুলা দিয়ে খেলনা বানিয়ে নিতাম। যখন তাদের ক্ষুধা পেত এবং খাবারের জন্য কান্না করত তখন আমরা এই খেলনাগুলো তাদেরকে দিতাম যেন ইফতার পর্যন্ত তাদের কান্না বন্ধ থাকে।”
যথাযথভাবে শিক্ষাদান, উৎসাহ প্রদান, উপদেশ দেওয়া, আদেশ করা, তিরস্কার করা এবং ভীতি প্রদর্শনের পরও যদি দশ বা তার অধিক বছরের সন্তান সালাত আদায় না করে তাহলে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে মুসলিম পিতার উচিত সন্তানকে প্রহার করা। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, مُرُوا الصَّبِيَّ بِالصَّلَاةِ إِذَا بَلَغَ سَبْعَ سِنِينَ، فَإِذَا بَلَغَ عَشْرَ سِنِينَ فَاضْرِبُوهُ عَلَيْهَا সাত বছর পূর্ণ হলে তোমরা সন্তানদেরকে সালাত আদায়ের আদেশ কর। যদি বয়স ১০ বছর পূর্ণ হয় তাহলে সালাত আদায় না করলে তাদেরকে প্রহারের মাধ্যমে সুশৃঙ্খল কর। [আবু দাউদ, তিরমিযী]।
আজকের দিনের মুসলিম পিতাকে সন্তানদের কঠোর নিয়মানুবর্তিতার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে, কেননা বর্তমানে জীবনব্যবস্থা হিসেবে ইসলাম অনুপস্থিত। বিশ্বব্যাপী ধর্মনিরপেক্ষতার আধিপত্যের কারণে ব্যক্তিস্বাধীনতার মূল্যবোধসমূহ মুসলিম তরুণদের বিপথগামী করছে। এর পরিণাম হিসেবে উদ্ভূত সমস্যাগুলো মুসলিম পিতাদের জন্য গভীর চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে যাদের বয়সন্ধিকালীন ও কিশোর বয়সী সন্তান রয়েছে। এই বয়সী সন্তানের বাবাদেরকে প্রায়শই তাদের নিজেদের কিশোর সময়ের স্মৃতিচারণ করে পরিতাপ প্রকাশ করতে দেখা যায়। শিক্ষাব্যবস্থার পশ্চিমীকরণ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবে তরুণদের মধ্যে এক ধরনের ধ্বংসাত্মক পরিণতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্যাক্তিস্বাধীনতার চর্চা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতা তরুণদের মধ্যে অন্য কারো প্রভুত্ব বা শাসন না মানার সহজাত প্রবণতা তৈরি করেছে; যেখানে তারা পিতা তো দূরে থাক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র আদেশও মানতে চায় না।
বস্তুবাদ ও হেডোনিসম (hedonism) তরুণদের মধ্যে কামনা-বাসনা বশবর্তী হওয়ার অদম্য আকাঙ্খা তৈরি করেছে, যেখানে তারা কোনো বিধিনিষেধ বা পরামর্শের তোয়াক্কাই করছেনা। বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থায় মুসলিম তরুণদের হরহামেশাই বিভিন্ন ফরজ দায়িত্ব পরিত্যাগ করতে এবং হারাম কাজে জড়িত হতে দেখা যায়; যেমন, মদ্যপান, নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন ও যিনা-ব্যভিচার। পাপাচার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক অবিবাহিত মেয়েরা গর্ভপাত করছে এবং কেউ কেউ তো প্রকাশ্যে নিজেদেরকে সমকামী হিসেবে ঘোষণা করছে। এসব কিছুই ঘটছে কারণ আমাদের মুসলিম পরিবারগুলো অসংখ্য দুর্বল ব্যক্তিত্ব তৈরি করছে। এসব অপকর্মের পাশাপাশি এই দুর্বল ব্যক্তিত্বের মানুষগুলো তাদের রাগকে দমন করতে পারছেনা এবং নারী ও শিশুদেরকে অত্যাচার করছে; সেটা নির্দয় শারীরিক প্রহারই হোক কিংবা মানসিক নির্যাতনই হোক। এই সমস্যাগুলো পশ্চিমা সমাজে যেমন বিদ্যমান তেমনি মুসলিম দেশগুলোতেও দৃশ্যমান; পার্থক্য শুধুমাত্র তীব্রতার মাত্রায়।
আর্থিক ভরণপোষণের দায়িত্ব পিতার
ইসলামে স্ত্রী ও তার সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করা পিতার উপর ফরজ। সন্তানের মা যতই অর্থ-বিত্তের মালিক হোন না কেন সন্তান কিংবা স্বামীর ভরণপোষণের কোন দায়বদ্ধতা তার নেই। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ] “পুরুষ হলো নারীর অভিভাবক/তত্ত্বাবধায়ক, কারণ পুরুষকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা নারীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং তার দায়িত্ব হলো নারীর ভরণপোষণ। [নিসা: ৩৪]। স্ত্রী-সন্তানের পাশাপাশি একজন মুসলিম পিতার দায়িত্ব হলো তার স্বীয় পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দেরকে আর্থিকভাবে সহায়তা করা। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [قُلْ مَا أَنفَقْتُم مِّنْ خَيْرٍ فَلِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ] “বল, আর যা কিছুই তোমরা খরচ কর তা তোমাদের পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য।” [সূরা আল বাকারা-২১৫]। এই আর্থিক ভরণপোষণ কোন অনুগ্রহ কিংবা দান নয়, বরং তা হল আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা প্রদত্ত একটি ফরজ দায়িত্ব। ভরণপোষণ এমনভাবে প্রদান করতে হবে যেন তা প্রয়োজন পূরণের জন্য যথেষ্ট হয় এবং এক্ষেত্রে কৃপণতাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর কোনরুপ ব্যতয় একটি গুরুতর বিষয় যার জন্য ইসলামী বিচারক পিতার বিরুদ্ধে রায় প্রদান করবেন। হিন্দ বিন্ত উতবা রাসূলুল্লাহ্-এর কাছে অভিযোগ করে বললেন, আবু সুফিয়ান একজন কৃপণ মানুষ যার কারণে তার সম্পদ থেকে অগোচরে আমাকে ব্যয় করতে হয়। উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, خُذِي مَا يَكْفِيكِ وَوَلَدَكِ بِالْمَعْرُوفِ “তোমার নিজের ও সন্তানদের প্রয়োজন মতো খরচ কর যা তোমাদের জন্য যথেষ্ট (বিল মা‘রুফ) হয়। [বুখারী]।
আর্থিক ভরণপোষণের ক্ষেত্রে বিল-মা‘রুফ এর অন্তর্ভুক্ত হল সকল মৌলিক চাহিদাসমূহ; যেমন, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং কিছু বিলাস দ্রব্য। বিল-মা‘রুফ হতে হবে যুক্তিসঙ্গত উপায়ে যেখানে কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের বসবাসের স্থানের জীবনযাত্রার মানকে মূল বিবেচ্য হিসেবে ধরা হবে; উদাহরণস্বরূপ: ভরণপোষণে বিল মা‘রুফ এর পরিমাণ শহর অঞ্চলে বেশি, গ্রাম অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে কম এবং মরু অঞ্চলে (বেদুইনদের) আরো কম।
বর্তমান মুসলিম বিশ্বে যুক্তিসঙ্গত ভরণপোষণ নিজেই একটি বিরাট প্রতিবন্ধকতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিনামূল্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার আনুপস্থিতিতে অনেক পিতাকেই সন্তানের জন্য প্রাইভেট শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার ব্যয় মেটাতে গিয়ে নিদারূণ সঙ্কটের মুখে পড়তে হচ্ছে। ভরণপোষণ প্রদান করা একজন মুসলিম পিতার জন্য একটি অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব, তবে একমাত্র দায়িত্ব নয়। অন্যান্য দায়িত্বপালনতো দূরে থাক একজন মুসলিম পিতা বর্তমানে আর্থিক ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করতেই হিমশিম খাচ্ছেন।
উপসংহার: ধর্মপ্রাণ সন্তানরা পিতার জন্য দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের জন্যই কল্যাণকর
নিঃসন্দেহে একজন মুসলিম পিতাকে তার সন্তানদের প্রতি অনেকগুলো ফরজ দায়িত্ব পালন করতে হয় যেগুলো সঠিকভাবে পালন করলে যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র পক্ষ থেকে পুরস্কার রয়েছে ঠিক তেমনি উপেক্ষা করলে শাস্তি রয়েছে। একজন পিতা তার পরিবারের উপর দায়িত্বশীল এবং এই দায়িত্বের ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, إن الله َسائلٌ كلَّ راعٍ عما استرعاه أَحَفِظَ أم ضيَع حتى يُسألَ الرجلُ عن أهلِ بيتِه “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে তাদের দায়িত্বের আওতাভুক্ত বিষয়গুলো নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন যে সে তা সঠিকভাবে পালন করেছিল, নাকি উপেক্ষা করেছিল এবং অবশেষে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা একজন ব্যক্তিকে তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবেন।” [নাসাঈ, ইবনে হিব্বান]। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আরো বলেন, مَا مِنْ عَبْدٍ يَسْتَرعِيهِ اللهُ رَعِيَّة يَموتُ يَوْمَ يَمُوتُ وهو غَاشٌّ لِرَعِيَّتِهِ إِلا حَرَّمَ اللهُ عليه الجَنَّةَ “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র বান্দাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যাকে কিছু মানুষের উপর দায়িত্ববান করা হয়েছিল কিন্তু সে তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি যার জন্য জান্নাতকে হারাম করা হয়নি।” (মুসলিম)। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আরো বলেন, مَا مِنْ عَبْدٍ يَسْتَرْعِيهِ اللَّهُ رَعِيَّةً فَلَمْ يَحُطْهَا بِنَصِيحَةٍ إِلَّا لَمْ يجد رَائِحَة الْجنَّة “কাউকে যদি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা কিছু লোকের উপর কর্তৃত্ব দেন এবং সে তার অধীনস্থদেরকে সদুপদেশ দ্বারা রক্ষা না করে তবে সে জান্নাতের গন্ধও পাবে না।” [বুখারী]। তিনিই একজন সৌভাগ্যবান পিতা যিনি সন্তানদেরকে যথাযথ শিক্ষাদান ও শাসন এর মাধ্যমে সুপথে পরিচালিত করেন এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র অনুগ্রহে ন্যায়পরায়ন সন্তান পেয়ে থাকেন। এই ন্যায়পরায়ন সন্তানরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি ভালোবাসা থেকে স্বেচ্ছায় তাদের পিতাকে তার হক্ব মোতাবেক যথাসাধ্য মান্য করবে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র অনুগ্রহে এমন একজন কর্তব্যপরায়ন পিতা দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনে ধন্য। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ “একজন মানুষের মৃত্যুর পর তার আমলের সকল দরজা বন্ধ হয়ে যায়; তিনটি ব্যতীত, সাদাকায়ে যারিয়া, তার রেখে যাওয়া জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং একজন ধর্মপ্রাণ সন্তান যে তার পিতার জন্য দোয়া করতে থাকে।” [আন-নাসাঈ]। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আরো বলেন, إِنَّ الرَّجُلَ لَتُرْفَعُ دَرَجَتُهُ فِي الْجَنَّةِ فَيَقُولُ أَنَّى هَذَا فَيُقَالُ بِاسْتِغْفَارِ وَلَدِكَ لَكَ “একজন ব্যক্তিকে জান্নাতে তার অর্জিত সম্মানের চেয়ে অধিক সম্মানজনক স্থানে রাখা হবে। এর ফলে সে জিজ্ঞাসা করবে, এই বাড়তি সম্মান কেন দেওয়া হল?। তখন তাকে বলা হবে, এর কারণ এই যে তোমার সন্তান তোমার মাগফিরাতের জন্য দোয়া করত।” (ইবনে মাজাহ)।
হে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা! পিতা হিসেবে আমরা যেন আমাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারি। আমাদের পুত্র-কন্যারা যেন আমাদের জন্য চক্ষুশীতলকারক হয় এবং মুসলিম উম্মাহ্’র একেকটি পিলারে পরিণত হয়। আমাদের সন্তানরা যেন দ্বিতীয় খিলাফতে রাশেদাহ্ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমাদের সাথে যোগদান করে এবং ইসলামকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠার পর এর দাওয়াহ-কে পুরো বিশ্বের কাছে নিয়ে যেতে পারে। আমিন।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র আহকামের যথাযথ ব্যাখ্যা তার নিজের উক্তিতে সুন্নাহর অংশ হিসেবে আমাদেরকে অবহিত করেছেন এবং তিনি ওহী ব্যতীত কোন কথা বলতেন না, যা বিশ্বজগতের রবের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হত। আহমদ বর্ণনা করেছেন যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, تَكُونُ النُّبُوَّةُ فِيكُمْ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُونَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ أَنْ يَرْفَعَهَا ثُمَّ تَكُونُ خِلَافَةٌ عَلَى مِنْهَاجِ النُّبُوَّةِ فَتَكُونُ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُونَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَرْفَعَهَا ثُمَّ تَكُونُ مُلْكًا عَاضًّا فَيَكُونُ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَكُونَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ أَنْ يَرْفَعَهَا ثُمَّ تَكُونُ مُلْكًا جَبْرِيَّةً فَتَكُونُ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُونَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ أَنْ يَرْفَعَهَا ثُمَّ تَكُونُ خِلَافَةً عَلَى مِنْهَاجِ النُّبُوَّة “আমার নবুয়াত তোমাদের মধ্যে ততকাল থাকবে যতকাল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ইচ্ছা করেন। এরপর আসবে নবুয়াতের আদলে খিলাফত এবং তা ততদিন থাকবে যতদিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ইচ্ছাপোষণ করেন। এরপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা এর অবসান ঘটাবেন। এরপর আসবে আঁকড়ে ধরা (বংশের) শাসন এবং তা ততদিন অবস্থান করবে যতদিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ইচ্ছা পোষণ করেন। এরপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা এর অবসান ঘটাবেন। এরপর আসবে অত্যাচারী জালিমের শাসন এবং তা ততকাল অবস্থান করবে যতকাল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ইচ্ছা পোষণ করেন। এরপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা এর অবসান ঘটাবেন। এরপর আবার আসবে খিলাফত, নবুয়্যতের আদলে।” এরপর আল্লাহ্’র রাসূল (সা) চুপ থাকলেন।
প্রশ্ন-উত্তর: নামাযে দূরত্ব বজায় রাখা একটি বিদ’আহ্, যার গুনাহ্ শাসকদের আমলনামায় লিপিবদ্ধ হচ্ছে

নিচের অনুবাদটি সম্মানিত মুজতাহিদ ও মুফাচ্ছির শাইখ আতা ইবন খলীল আবু আল-রাশতা (আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন) কর্তৃক দেয়া এক প্রশ্নের জবাব, আরবী থেকে অনুদিত
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র, এবং আল্লাহ্’র রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক রাসূলুল্লাহ্ (সা), তাঁর (সা) পরিবার, সাহাবাগণ (রা), এবং তাঁর (সা) অনুসারীদের প্রতি।
তাদের সবাইকে উদ্দেশ্য করে এই প্রশ্নোত্তর, যারা আমাকে জুম্মা এবং অন্যান্য জামাতে নামায আদায়ের সময়ে ইবাদতকারী এবং তার পাশের জনের মধ্যে দুই-মিটার ব্যবধান বা দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়ে প্রশ্ন করেছেন… এবং তারা বলেছেন, কিছু মুসলিম দেশের শাসকেরা মসজিদসমূহ বন্ধ করে এবং অতঃপর সেগুলো খুলে দেয়ার পর তারা ইবাদতকারীদেরকে পরষ্পরের মধ্যে দুই-মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য করছে। তারা এই বিষয়টিকে এটা বলে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছে, যেহেতু অসুস্থ ব্যক্তির ওজর রয়েছে এবং তাকে বসে নামায আদায়ের অনুমতি দেয়া হয়েছে, সেহেতু ক্বিয়াস অনুসারে একজন মুসলিম তার পাশের ব্যক্তি থেকে দুই মিটার দূরে থাকতে পারেন, যদিওবা তিনি অসুস্থ না হন, কিন্তু অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা করেন, সেক্ষেত্রে তার এই দূরত্ব বজায় রাখা উচিত… এবং তারা জিজ্ঞেস করেছেন: উল্লেখিত পদ্ধতিতে দূরত্ব বজায় রেখে পৃথকভাবে নামায আদায়ে বাধ্য করা কি শাসকদের জন্য বৈধ? কিংবা, এই দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি কি দ্বীনের মধ্যে এমন নতুন এক উদ্ভাবন (বিদ’আহ্) যার গুনাহ শাসকদের আমলনামায় লিপিবদ্ধ হচ্ছে? প্রশ্নকারীগণ উত্তরগুলো খুঁজে পাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন…
তাদের প্রশ্নের জবাবে বলছি, এবং আল্লাহ্ সকল সাফল্যের একমাত্র অভিভাবক:
আমরা ইতিপূর্বে নতুন কিছু উদ্ভাবন (বিদ’আহ্) সম্পর্কিত একাধিক প্রশ্নোত্তর প্রদান করেছি, এবং প্রশ্নকারীগণ যদি সেগুলো পর্যালোচনা করেন তবে তাদের নিকট এই উত্তরটি পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, নামাযে দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি এমন এক নতুন উদ্ভাবন যা পালনে শাসকগণ যদি মানুষকে বাধ্য করে তবে তারা এর জন্য গুনাহ্গার হবে, এবং এর ব্যাখ্যা নিম্নরূপ:
প্রথমত: আরবী ২৮শে রজব, ১৪৩৪ হিজরীতে, এবং ইংরেজি ০৭/০৬/২০১৩ খ্রিস্টাব্দে আমরা একটি প্রশ্নোত্তর প্রকাশ করি, যেখানে বলা হয়েছিল:
(শারী’আহ্’র কোন একটি বিষয়ে নতুন কিছু উদ্ভাবন করা হচ্ছে একটি সুস্পষ্ট সীমালঙ্ঘনকারী কাজ, যখন বিষয়টি ইতিমধ্যে শারী’আহ্ কর্তৃক সুনির্ধারিত হয়ে আছে। লিসান আল-আরব-এ উদ্ভাবন সম্পর্কে ভাষাতত্ত্বের দৃষ্টিকোন থেকে উল্লেখ করা হয়েছে যে: “المبتدع الّذي يأتي أمراً على شبهٍ لم يكن…، وأبدعت الشّيء: اخترعته لا على مثالٍ” “নতুন কিছু আনয়নকারী একটি বিষয়কে নতুন একরূপে নিয়ে আসে যা তার আগ পর্যন্ত অস্তিত্বহীন ছিল… একটি বিষয় ‘উদ্ভাবন’ করে সেটার স্বপক্ষে কোন উদাহরণ (দলিল) ছাড়াই মনগড়াভাবে তৈরি করে”। ইসলামী চিন্তাগত দৃষ্টিকোন থেকে এর অর্থও একই। উদাহরণস্বরূপ, যদি রাসূলুল্লাহ্ (সা) কোন একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কিছু করেন এবং একজন মুসলিম সেই পদ্ধতি থেকে বিচ্যুত হয়, তবে এটি একটি বিদ’আহ্। অতএব,কোন একটি শারী‘আহ্ হুকুম পালনের জন্য শারী’আহ্ নির্ধারিত পদ্ধতি থেকে বিচ্যুত হওয়াটাই বিদ’আহ্। এবং, এই হাদীসটির অনুমিত অর্থ হচ্ছে: «وَمَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ» “যে কেউ আমাদের এই বিষয়ে (অর্থাৎ, ইসলামে) এমন কিছু প্রবর্তন করে যা এর অন্তর্ভূক্ত নয়, তবে তা প্রত্যাখ্যাত।” [বুখারী ও মুসলিম]
উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ তার নামাযে দুইটির বদলে তিনটি সিজদাহ্ দেয়, অর্থাৎ সে নতুন একটি বিষয় উদ্ভাবন করে, তবে সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পদ্ধতি থেকে বিচ্যুত হয়েছে বলে গণ্য হবে। যদি কেউ মিনায় সাতটি পাথরের পরিবর্তে আটটি পাথর নিক্ষেপ করে, তবে সেটা হবে তার পক্ষ থেকে নতুন কিছু উদ্ভাবন, কারণ এটি রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক প্রদর্শিত কাজের বিরোধিতার শামিল। এবং, উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ আযানে নতুন কোন শব্দ যুক্ত করে, বা আযান হতে কোন শব্দ বাদ দিয়ে দেয়, তবে সেই ব্যক্তিও বিদ’আহ্-এর মধ্যে পতিত হবে, যেহেতু নবী করিম (সা) আযানের জন্য সুনির্দিষ্ট শব্দসমূহ অনুমোদন করে গেছেন।
তবে, শারী’আহ্ বিষয়বস্তু (যাতে কোনো পৃথক পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়নি) হতে বিচ্যুতির বিষয়ে হুকুম হচ্ছে, সেটি একটি আইনী অধ্যাদেশের মধ্যে পড়বে, অর্থাৎ: সেটা হয় হারাম, মাকরুহ, ইত্যাদি হিসেবে বিবেচিত হবে; আর যদি সেটা নিয়ন্ত্রক অধ্যাদেশের (হুকুম ওয়াদ’ঈ) অন্তর্ভুক্ত হয় এবং প্রযোজ্য ইঙ্গিতের উপর নির্ভর করে, তবে সেটি বাতিল, ফাসিক, ইত্যাদি শ্রেণীর আওতাভুক্ত হবে।
উদাহরণস্বরূপ, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সালাতের বর্ণনা স¤পর্কে আয়েশা (রা) হতে মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি (রা) বলেছেন: «…وَكَانَ إِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ الرُّكُوعِ لَمْ يَسْجُدْ، حَتَّى يَسْتَوِيَ قَائِمًا، وَكَانَ إِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ السَّجْدَةِ، لَمْ يَسْجُدْ حَتَّى يَسْتَوِيَ جَالِسًا…» “রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন রুকু থেকে মাথা উঠাতেন তখন সোজা হয়ে না দাঁড়িয়ে সিজদাহ্’তে যেতেন না, এবং যখন সিজদাহ্ থেকে মাথা উঠাতেন তখন সোজা হয়ে না বসে পুনরায় সিজদাহ্’তে যেতেন না”।
তদানুসারে, এই বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদেরকে দেখিয়েছেন যে, নামাযরত অবস্থায় একজন মুসলিমের রুকু হতে মাথা উঠানো উচিত এবং সোজা হয়ে দন্ডায়মান না হওয়া পর্যন্ত তার সিজদায় যাওয়া উচিত নয়, এবং যদি সে সিজদাহ্ থেকে উঠে আসে তবে সে যেন সোজা হয়ে বসার আগ পর্যন্ত পুনরায় সিজদাহ্ অবস্থায় ফিরে না যায়। এটাই রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক নির্ধারিত পদ্ধতি, এবং যদি কেউ এই নির্ধারিত পদ্ধতি হতে বিচ্যুত হয় তবে সে নতুন উদ্ভাবন (বিদ’আহ্) মধ্যে পড়ে যাবে। সুতরাং, নামাযে যদি কোন মুসলিম রুকু ও সিজদাহ্’র মধ্যে সোজা হয়ে দন্ডায়মান না হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে রুকু থেকে সিজদায় চলে যায়, তবে সে বিদ’আহ্-এর মধ্যে পতিত হবে, কারণ এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্’র (সা) প্রদর্শিত পদ্ধতির বিরোধিতা করা হবে। এটি হবে একটি বেআইনী উদ্ভাবন এবং এর সম্পাদনকারী গুরুতর গুনাহ্’র মধ্যে পতিত হবে।
উবায়দাহ্ বিন সামিত-এর বর্ণনার ভিত্তিতে মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে, إِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَنْهَى عَنْ بَيْعِ الذَّهَبِ بِالذَّهَبِ، وَالْفِضَّةِ بِالْفِضَّةِ، وَالْبُرِّ بِالْبُرِّ، وَالشَّعِيرِ بِالشَّعِيرِ، وَالتَّمْرِ بِالتَّمْرِ، وَالْمِلْحِ بِالْمِلْحِ، إِلَّا سَوَاءً بِسَوَاءٍ، عَيْنًا بِعَيْنٍ، فَمَنْ زَادَ، أَوِ ازْدَادَ، فَقَدْ أَرْبَى “আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলতে শুনেছি: তিনি (সা) তৎক্ষণাৎ ও সমান মাপের লেনদেন না হলে স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য, গমের বিনিময়ে গম, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর, এবং লবণের বিনিময়ে লবণ বিক্রয় করাকে নিষিদ্ধ করেছেন, যে ব্যক্তি কোন কিছু যোগ করে কিংবা অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করে এই লেনদেন করবে সে সুদের (রিবা) মধ্যে লিপ্ত হয়।” যদি কোন মুসলিম এই হাদীসটিকে লঙ্ঘন করে, এবং ওজনের সাথে ওজন পরিমাপ না করে স্বর্ণের বিনিময়ে বর্ধিত (সুদ) পরিমাণ স্বর্ণ বিক্রয় করে, তবে বলা হয়নি যে, সে বিদ‘আহ্ করেছে, বরং বলা হয়েছে যে, সে হারাম করেছে, অর্থাৎ, সুদে লিপ্ত হয়েছে।
উপসংহারে বলা হয়েছিল: রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক নির্ধারিত পদ্ধতি থেকে বিচ্যুতি হচ্ছে বিদ’আহ্। এবং, কোন নির্দিষ্ট পদ্ধতি বর্ণনা ব্যতিরেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক নির্ধারিত চূড়ান্ত আদেশ থেকে বিচ্যুতি আইন ও অধ্যাদেশের (আহকাম শারী‘আহ্) নিম্নোক্ত যেকোন একটির অন্তর্ভুক্ত: হারাম এবং মাকরুহ, ফাসিদ এবং বাতিল… শারী’আহ্ দলিলসমূহ অনুসারে এটাই নির্ধারিত হয়েছে।) উদ্ধৃতি সমাপ্ত।
আরবী ৮ই জিলহজ, ১৪৩৬ হিজরী, এবং ইংরেজি ২২/০৯/২০১৫ খ্রিস্টাব্দে আমরা বিদ’আহ্-এর বিষয়ে আরো বিস্তারিত তথ্যসম্বলিত উত্তর প্রকাশ করেছি, এবং আমরা এর আগে ও পরে অন্যান্য উত্তরও প্রদান করেছি, যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র অনুগ্রহে যথেষ্ট।
দ্বিতীয়ত: তদনুসারে, যদি মুসলিম দেশগুলোর সরকারসমূহ শুক্রবার বা ওয়াক্তের নামাযের জামায়াতে সংক্রমণের ভয়ে, বিশেষ করে রোগের কোনরূপ উপসর্গ ছাড়াই ইবাদতকারীদেরকে পরষ্পরের কাছ থেকে এক বা দুই মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য করে, তবে তারা গুরুতর গুনাহ্’র কাজ করবে, কারণ এটি একটি বিদ’আহ্, যেহেতু শারী’আহ্ (আইনী) দলিল দ্বারা প্রমাণিত যে, এটি রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক নির্দেশিত পদ্ধতির, অর্থাৎ কাতারবন্দী হওয়া এবং পরস্পর কাছাকাছি থাকার হুকুম হতে পরিষ্কার বিচ্যুতি, নিম্নোক্ত হাদীসসমূহ এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত:
– আল বুখারী তাঁর সহীহ্-তে আবু সুলায়মান মালিক ইবনে আল হুওয়াইরিস হতে বর্ণনা করেছেন: “আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে সমবয়সী যুবক অবস্থায় এসেছিলাম। আমরা তাঁর (সা) সাথে বিশ রাত অতিবাহিত করেছিলাম… তিনি দয়ালু ও সহানুভূতিশীল ছিলেন, এবং বলেছিলেন: «فَقَالَ ارْجِعُوا إِلَى أَهْلِيكُمْ فَعَلِّمُوهُمْ وَمُرُوهُمْ وَصَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي وَإِذَا حَضَرَتِ الصَّلَاةُ فَلْيُؤَذِّنْ لَكُمْ أَحَدُكُمْ ثُمَّ لِيَؤُمَّكُمْ أَكْبَرُكُمْ» “তোমাদের পরিবারের কাছে ফিরে যাও। তাদেরকে শিক্ষা দাও এবং আদেশ কর। তোমরা আমাকে যেভাবে নামায পড়তে দেখেছ সেভাবে নামায পড়। যখন নামাযের সময় হবে তখন তোমাদের মধ্য হতে কাউকে আযান দিতে দাও, এবং তোমাদের মধ্যে যিনি প্রবীণতম ব্যক্তি তাকে নামাযের নেতৃত্ব দিতে দাও।”
– এবং আল-বুখারী তাঁর সহীহ্-তে আনাস বিন মালিক হতে বর্ণিত করেছেন, তিনি বলেছেন: যখন ইকামাহ্ ঘোষণা করা হয়তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন: «أَقِيمُوا صُفُوفَكُمْ، وَتَرَاصُّوا، فَإِنِّي أَرَاكُمْ مِنْ وَرَاءِ ظَهْرِي» “তোমরা কাতার সোজা করো এবং একসাথে কাছাকাছি দাঁড়াও, নিশ্চয়ই আমি আমার পিছন হতেও তোমাদেরকে দেখতে পাই।”
– মুসলিম তাঁর সহীহ্-তে আল নুমান ইবনে বশীর (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের কাতারগুলোকে তীরের মত সোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত বিষয়টির উপর তাগিদ দিতে থাকতেন যতক্ষণ না তিনি বুঝতে পারতেন আমরা এটি তার কাছ থেকে শিখতে পেরেছি (এর তাৎপর্য বুঝতে সক্ষম হয়েছি)। একদিন তিনি মসজিদে এসে দাঁড়ালেন। তিনি তাকবীর (আল্লাহ্ মহান) দিতে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি এমন এক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করলেন যার বুক কাতার থেকে বেরিয়ে এসেছিল, তাই তিনি বললেন: «عِبَادَ اللهِ لَتُسَوُّنَّ صُفُوفَكُمْ، أَوْ لَيُخَالِفَنَّ اللهُ بَيْنَ وُجُوهِكُمْ» “হে আল্লাহ্’র বান্দাগণ, তোমাদের অবশ্যই নিজেদের কাতার সোজা করে নেয়া উচিত, নতুবা আল্লাহ্ তোমাদের চেহারাসমূহকে বৈপরীত্যের (পরস্পর মতভেদ) মধ্যে পতিত করবেন।”
এবং মুসলিম তাঁর সহীহ্-তে জাবির ইবনে সামরাহ্ হতে বর্ণিত করেছেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: «أَلَا تَصُفُّونَ كَمَا تَصُفُّ الْمَلَائِكَةُ عِنْدَ رَبِّهَا؟» فَقُلْنَا يَا رَسُولَ اللهِ، وَكَيْفَ تَصُفُّ الْمَلَائِكَةُ عِنْدَ رَبِّهَا؟ قَالَ: «يُتِمُّونَ الصُّفُوفَ الْأُوَلَ وَيَتَرَاصُّونَ فِي الصَّفِّ» “ফেরেশতারা যেভাবে তাদের প্রতিপালকের সামনে সারি বেঁধে দাঁড়ায় তোমরা কেন সেভাবে সারি বেঁধে দাঁড়াও না? আমরা বলছেলিাম: হে আল্লাহ্’র রাসূল (সা), কিভাবে ফেরেশতারা তাদের রবের সামনে কাতারবন্দী হন? তিনি (সা) বলেছিলেন: তারা প্রথম সারি আগে র্পূণ করে এবং পরষ্পররে সাথে মিলে দাঁড়ায়”।
– আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর হতে আল-হাকমি র্বণনা করছেনে এবং মুসলমি-এর র্শতানুযায়ী এটিকে নির্ভরযোগ্য হিসেবে অভিহিত করেছেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: «مَنْ وَصَلَ صَفّاً وَصَلَهُ اللَّهُ، وَمَنْ قَطَعَ صَفّاً قَطَعَهُ اللَّهُ» “যে ব্যক্তি একটি কাতার পূর্ণ করে আল্লাহ্ তার প্রতি সদয় হন, এবং যে ব্যক্তি কাতার ভঙ্গ করে আল্লাহ্ তাকে বিচ্ছিন্ন বা ধ্বংস করে দেন।”
– আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর হতে আহমাদ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: «أَقِيمُوا الصُّفُوفَ فَإِنَّمَا تَصُفُّونَ بِصُفُوفِ الْمَلَائِكَةِ وَحَاذُوا بَيْنَ الْمَنَاكِبِ وَسُدُّوا الْخَلَلَ وَلِينُوا فِي أَيْدِي إِخْوَانِكُمْ وَلَا تَذَرُوا فُرُجَاتٍ لِلشَّيْطَانِ وَمَنْ وَصَلَ صَفّاً وَصَلَهُ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى وَمَنْ قَطَعَ صَفّاً قَطَعَهُ اللَّهُ» “তোমরা কাতারগুলোকে সোজা করে নাও, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াও, ফাঁকগুলো বন্ধ করে দাও, তোমাদের ভাইদের হাতের প্রতি সদয় থাক, এবং শয়তানের দন্ডায়মান হওয়ার জন্য ফাঁক রেখো না। যদি কেউ একটি কাতারে যোগ দেয় তবে আল্লাহ্ তার সাথে যোগ দেন, কিন্তু কেউ যদি একটি কাতার ভেঙে দেয় তবে আল্লাহ্ তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেন।”
কিভাবে জামায়াতে নামায আদায় করতে হবে সে বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পক্ষ থেকে এটি একটি পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা, এবং সাহাবায়ে কেরামগণ (রা) এর প্রতি অবিচল ছিলেন। আল-মুওয়াতায় মালিক এবং আস-সুনান আল কুবরায় আল বায়হাকী বর্ণনা করেছেন যে, “উমর ইবনে আল-খাত্তাব নামাযের কাতারসমূহ সোজা করার নির্দেশ দিতেন, এবং তারা যখন তার কাছে এসে তাকে বলতো যে, কাতারগুলো সোজা হয়েছে তখন তিনি তাকবীর দিতেন।”
তৃতীয়ত: এটা বলা হয়নি যে, সংক্রামক ব্যাধি এমন একটি ওজর যা নামাযে দূরত্ব বজায় রাখার অনুমতি প্রদান করে, এরকম বলা হয়নি কারণ সংক্রামক ব্যাধি হলে তা মসজিদে না যাওয়ার ওজর হিসেবে বিবেচিত হবে, কিন্তু মসজিদে গমন করা এবং নামাযে পাশের ইবাদতকারী থেকে ১ বা ২ মিটার দূরত্বে থাকার ওজর হিসেবে এটি বিবেচিত হবে না!! কারণ, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগেও সংক্রামক রোগের (প্লেগের) প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল, এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক এটা বর্ণিত নেই যে, প্লেগে আক্রান্ত অসুস্থ ব্যক্তি নামায পড়তে গিয়েছে এবং তার ভাই থেকে ২ মিটার দূরত্ব বজায় রেখেছে, বরং তাকে এ বিষয়ে অব্যাহতি দেয়া হতো এবং সে গৃহে নামায আদায় করে নিত… যে অঞ্চলে ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে সেখানে রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে বিনা খরচে ও সযত্নে চিকিৎসা সেবা জোরদার করা হয়, এবং অসুস্থদের সুস্থদের সাথে মেশানো/একত্রিত করা হয় না… যেমনটি উসামা বিন যায়েদ হতে মুসলিম তার সহীহ্-তে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: «الطَّاعُونُ آيَةُ الرِّجْزِ ابْتَلَى اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ بِهِ نَاساً مِنْ عِبَادِهِ، فَإِذَا سَمِعْتُمْ بِهِ فَلَا تَدْخُلُوا عَلَيْهِ وَإِذَا وَقَعَ بِأَرْضٍ وَأَنْتُمْ بِهَا فَلَا تَفِرُّوا مِنْهُ» “প্লেগ হচ্ছে দুর্যোগের নিদর্শন, যার দ্বারা মহিমান্বিত ও গৌরবময় আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের মধ্যকার জনগোষ্ঠীকে আক্রান্ত করেন। সুতরাং, যখন তোমরা এর উপস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হবে তখন সেখানে প্রবেশ করো না (যেখানে এর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে), এবং যখন এটি কোন ভূ-খন্ডে ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তোমরা সেখানে অবস্থান করছো, তখন সেখান থেকে পালিয়ে যেও না।” অর্থাৎ, সংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগী সুস্থ লোকের সাথে মিশবে না এবং তাকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নির্দেশ মোতাবেক পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা দেয়া হবে। সুস্থ ব্যক্তিগণ মসজিদে যাবে এবং শুক্রবার ও জামাতে নামায আদায় করবে, কোনরূপ দূরত্ব বজায় না রেখেই।
চতুর্থত: অনুরূপভাবে এটি বলাও সঠিক নয় যে, মহামারীর সময়ে নামাযে দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি অসুস্থতার সময়ে বসে নামায আদায় করার অনুমতির (রুখসা) সঙ্গে ক্বিয়াসের মাধ্যমে নির্ধারিত। কেননা, এটি কোন শরঈ ক্বিয়াস নয়, কারণ অসুস্থ ব্যক্তি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত রুখসা’র কারণে বসে নামায পড়তে পারেন, আর এই ওজর-এর কারণ হলো তার অসুস্থতা। ওজর বা অব্যাহতিগুলো হলো আসবাব, কারণ বা যুক্তি (ইলাল) নয়, তাই শরঈ সেগুলোর কারণ ব্যাখ্যা করেনি, বরং প্রতিটি ওজরকে সেই হুকুমের জন্য ওজর হিসেবে নির্ধারণ করেছে, যা কেবলমাত্র নির্দিষ্ট সেই হুকুমের জন্যই প্রযোজ্য হবে, অন্য কোন হুকুমের জন্য নয়, কারণ এটি শুধুমাত্র সেই নির্দিষ্ট হুকুমের জন্যই বিশেষ ওজর হিসেবে এসেছে, এবং এটি সকল হুকুমের জন্য প্রযোজ্য সাধারণ ওজর নয়; এটি ইল্লাহ্-এর কারণ (ওয়াজহ আল-ইল্লাহ্) দিকেও ইঙ্গিত (মুফহিম) করে না। সুতরাং, এর দ্বারা ক্বিয়াস করা যাবে না, কেননা এটি (আসবাব) সুনির্দিষ্ট, এবং এটিকে অন্য কোন ক্ষেত্রে প্রসারিত করা যায় না, যা দিয়ে তুলনা করা যাবে। এটি ইল্লাহ্ হতে আলাদা, কেননা ইল্লাহ্ যে হুকুমের জন্য প্রণীত কেবলমাত্র সেই হুকুমের জন্য সুনির্দিষ্ট নয়, বরং তা অন্যান্য হুকুমে ক্ষেত্রেও প্রসারিত করা যায়, এবং এর দ্বারা ক্বিয়াস করা যায়… অতএব এটি সুস্পষ্ট যে, ইবাদত সংক্রান্ত কাজগুলো হচ্ছে আসবাব, এবং ইলাল নয়, ইবাদত সংক্রান্ত কাজগুলো তাওকিফিয়া (আইনপ্রণেতা কর্তৃক নির্দিষ্ট), ইল্লাহ্ (যুক্তি/কারণ) প্রদান করে না, এবং এগুলোর উপর কোন ক্বিয়াস করার সুযোগ নেই; কেননা আসবাব সুনির্দিষ্টভাবে শুধুমাত্র আসবাব হওয়ার কারণের সাথে সম্পর্কিত।
পঞ্চমত: এছাড়াও, রুখসা (আইনি বৈধতা/অনুমতি) ঘোষণামূলক সুস্পষ্ট বিধিসমূহের (হুকুম ওয়াদ’) অন্তর্ভুক্ত, যা ঘোষণা বা সুস্পষ্ট বক্তব্য হিসেবে বান্দার কাজ সংক্রান্ত বিষয়ে আইনপ্রণেতার বক্তব্য হিসেবে এসেছে, এবং যেহেতু এটি আইনপ্রণেতার বক্তব্য সেহেতু অবশ্যই এর স্বপক্ষে আইনী (শরঈ) দলিল থাকতে হবে যা এটিকে নির্দেশ করবে। উদাহরণস্বরূপ, অসুস্থ ব্যক্তির বসে নামায পড়ার বিষয়ে আল-বুখারী তার সহীহ্ গ্রন্থে ‘ইমরান বিন হুসাইন হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: আমার পাইলস ছিল, তাই আমি নামাযের বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি (সা) বললেন: «صَلِّ قَائِماً فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَقَاعِداً، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَعَلَى جَنْبٍ» “দাঁড়িয়ে নামায পড়, এবং যদিনা পারো তাহলে বসে পড়, এবং সেটাও যদি না পারো তাহলে কাত হয়ে শুয়ে নামায পড়ো”, এটি একটি অনুমতি (রুখসা) যা একটি বৈধ অব্যাহতি, এবং আইনী দলিলগুলোতে সুনির্দিষ্ট হুকুমের জন্য অব্যাহতি হিসেবে যা যা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলোই অব্যাহতি হিসেবে বিবেচিত হবে। এছাড়া যেগুলোর স্বপক্ষে কোন দলিল নেই সেগুলোর কোনো মূল্য নেই, এবং সেগুলো বৈধ অব্যহতি হিসেবে বিবেচিত হবে না। এবং যেহেতু অসুস্থ ব্যক্তির জন্য তার পাশের জনের থেকে ১ বা ২ মিটার দূরত্বে নামায পড়ার পক্ষে কোন দলিল নেই, সেহেতু এই বক্তব্যের কোন মূল্য নেই এবং এটি সঠিক নয়। এটি কেমন সিদ্ধান্ত, সে অসুস্থ নয়, অথচ কেবলমাত্র রোগাক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় সে তা করবে…?!
ষষ্ঠত: উপরোক্ত ব্যাখ্যার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ:
১- রাসূলুল্লাহ্ (সা) নামাযের জন্য যে পদ্ধতি নির্ধারণ করেছেন, তার পরিবর্তন বিদ’আহ্ হিসেবে পরিগণিত। এবং, এ বিষয়ে শরঈ হুকুম হলো সুস্থ ব্যক্তি স্বাভাবিক নিয়মে নামায পড়তে যাবেন, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, সোজা সারিবদ্ধ হয়ে, কোনো ফাঁকা জায়গা না রেখে। আর, অসুস্থ ব্যক্তি যার কোন সংক্রামক ব্যাধি রয়েছে, তিনি মসজিদে যাবেন না এবং অন্যদেরকে সংক্রমিত করবেন না।
২- যদি রাষ্ট্র মসজিদসমূহ বন্ধ করে দেয়, এবং অতঃপর সুস্থ ব্যক্তিদেরকে শুক্রবার ও জামাতে নামায পড়া থেকে বিরত রাখে, তাহলে এটি শুক্রবার ও জামাতের নামায বিঘ্ন করার গুরুতর গুনাহ্ হিসেবে বিবেচিত হবে, কেননা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী মসজিদসমূহ নামাযের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে।
৩- অনুরূপভাবে, যদি রাষ্ট্র রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশিত পদ্ধতিতে নামায আদায় করা থেকে মুসল্লীদেরকে নিষেধ করে, এবং যদি একজন মুসল্লীকে তার পাশের জনের সাথে সংক্রমণের ভয়ে এক বা দুই মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য করে, বিশেষ করে দৃশ্যত কোন উপসর্গ না থাকা সত্ত্বেও, তবে এটা একটি গুরুতর গুনাহ।
এ বিষয়ে এটিই হলো শরঈ হুকুম যা আমার বিবেচনায় সঠিক, আর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সবচেয়ে ভালো জানেন এবং তিনি সর্বজ্ঞানী… এবং, আমি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি মুসলিমদেরকে ন্যায়ের পথে এবং তাঁর নির্দেশ মোতাবেক তাঁর ইবাদতের দিকে পরিচালিত করেন। এবং, তাদের জন্য এটি ফরয যে তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পদ্ধতি অনুসরণ করে এবং কোন বিচ্যুতি ব্যতিরেকে খিলাফতে রাশিদাহ্ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সঠিক শরঈ প্রতিষ্ঠা করে, যার মধ্যে আছে উত্তম বিষয়াবলী এবং বিজয়, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র অনুগ্রহে, যিনি আসমান ও জমিনের কোন কিছু দ্বারা ব্যর্থ হন না, তিনি সর্বশক্তিমান, মহাজ্ঞানী।
ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রহ্মতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহ।
১৭ই শাওয়াল, ১৪৪১ হিজরী
০৮/০৬/২০২০ খ্রিষ্টাব্দ
বর্ণবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদ: আদর্শিক দৈন্যতায় ভারাক্রান্ত বিশ্ব…বিকল্প কী?

২৫শে মে, ২০২০, যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিসে ৪৬ বছর বয়সী কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা ডেরেক চাওভিন। ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যায় যে ফ্লয়েডকে গাড়ি থেকে বের করে কোন কারণ ছাড়াই এই পুলিশ অফিসার রাস্তার উপরে তার ঘাড়ে হাঁটু দিয়ে চেপে ধরে রাখে। এমন অবস্থায় ফ্লয়েড বারবার সেই পুলিশ অফিসারকে বলতে থাকেন যে তিনি নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না। কিন্তু সেই পুলিশ অফিসার হাঁটু সরিয়ে না নেয়ায় আস্তে আস্তে তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন। এরপর দেখা যায় যে, একটি এ্যাম্বুলেন্স এসে রাস্তায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকা ফ্লয়েডকে তুলে নেয়, এবং পরবর্তীতে জানা যায় যে তিনি মারা গেছেন। এই ঘটনার চারদিন পর ২৯শে মে মিনিয়াপলিসে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানগণ বিক্ষোভ শুরু করেন এবং ক্রমান্বয়ে তাদের সাথে শ্বেতাঙ্গসহ মিশ্র বর্ণের মানুষেরা যুক্ত হয়ে দেশটির বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বর্ণবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে গর্জে ওঠে। এর ঢেউ লাগে ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও, যেখানে জনগণকে বর্ণবাদের বিরুদ্ধেস্লোগানে স্লোগানে ফুঁসে উঠতে দেখা গেছে। এমনকি আমরা যুদ্ধবাজ জুনিয়র বুশসহ সাবেক আমেরিকান প্রেসিডেন্টদেরও নিন্দা জ্ঞাপন করতেদেখছি, যদিওবা তাদের সময়ও কৃষ্ণাঙ্গরা বিভিন্ন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। যে পুলিশ এই ঘটনা ঘটিয়েছে সেই পুলিশ বাহিনীর অন্য সদস্যরাও হাঁটু গেড়ে প্রতীকী প্রতিবাদের মাধ্যমে এ হত্যাকান্ডের নিন্দা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আদালত বলেছে যে এই কেসটি এমনভাবে সাজানো হবে যাতে অপরাধী পুলিশ কর্মকর্তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে এমন বর্ণবাদী আচরণ চিরতরে নির্মূল হয়।
জর্জ হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠা বিক্ষোভ দমনে যুক্তরাষ্ট্রের ২২টি অঙ্গরাজ্যের ৪০টি শহরে কারফিউ জারি করা হয়েছে এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এখন পর্যন্ত শত শত মানুষ গ্রেফতারের খবর পাওয়া গেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে প্রতিনিয়ত হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। দিবেনইতো, কারণ তিনিও তো একজন বর্ণবাদী, যা বিভিন্ন সময়ে তার মন্তব্যের মাধ্যমে পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। ২০১৮ সালের ১১ই জানুয়ারি তারিখে অভিবাসন নীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি হাইতি, হন্ডুরাসসহ কিছু আফ্রিকান দেশকে “শিট হোল”-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন!! যুগ যুগ ধরে চলে আসা এমন বর্ণবাদী আচরণের কারণে ১৯৬৩ সালে তৎকালীন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি হত্যার পর কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিং তার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন যে: আমিও এরকম হত্যাকান্ডের শিকার হব, কারণ আমেরিকার সমাজ হচ্ছে একটি অসুস্থ সমাজ।
প্রথমে “বর্ণবাদ কী”-সেবিষয়ে একটু আলোকপাত করা যাক। এটি এমন একটি মতবাদ যাতে বিশ্বাস করা হয় যে কোন গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীর চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যের কারনে উঁচু বা নিচু স্তরের, কিংবা তাদের উপর তারা কর্তৃত্ব করার অধিকারী, বা তুলনামূলকভাবে বেশি যোগ্য। বর্ণবাদী আচরন ও বৈষম্য কখনো গায়ের চামড়ার রঙের ভিত্তিতে করা হয় – অর্থাৎ: সাদা বা কালো, কখনো করা হয় গোত্র কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে, আবার কখনোবা করা হয় ভিন্ন আঞ্চলিকতার কারনে। কিছু উদাহরনের মাধ্যমে আমরা বিষয়টি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা পেতে পারি:শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বে চলমান শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে যে বর্ণবাদী আচরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে তার সর্বশেষ উদাহরণ হলো জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকান্ড। এমনকি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সারা জীবন সংগ্রাম করে আসা দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ নেতা নেলসন মেন্ডেলা জেল থেকে বেরিয়ে আসার পর সেদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ২৫ বছর অতিবাহিত করার পরেও গণমাধ্যমে বলা হয়েছে যে এখনও সেখানে বর্ণবাদ প্রকট। কোথায় নেই বর্ণবাদ, হোক সেটা অধিকার আদায়ে কিংবা ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে, ক্রিকেট বা ফুটবল দুনিয়ায়, বা সিনেমা পাড়ায়। ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ক্রিকেটার ক্রিস গেইল তার দল ও আইসিসির বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ তুলেছেন। ফুটবল স্ট্রাইকার লুকাকু বলেছেন যে তিনি যখন গোল করেন তখন তিনি হিরো হিসেবে মর্যাদা পান আর দল হেরে গেলে তিনি হয়ে যান একজন ঘৃণিত কঙ্গো বংশোদ্ভূত কৃষ্ণাঙ্গ!! ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ জয়ী ফুটবলার এমবাপ্পেকেও আলজেরিয়ার নিগ্রো বলে গালি দেয়া হয়, যখন দল বা ক্লাব ফুটবলে তার অবদান কম হয়। পশ্চিমা দুনিয়ায় কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিগৃহীত হওয়ার খবর আমরা প্রায়ই গণমাধ্যমে পাই। এই করোনা মহামারীর সময়েও দারিদ্র ও বৈষম্যের কারণে কৃষ্ণাঙ্গদের অনেকেরই যাদের স্বাস্থ্য বীমা নেই তারা চিকিৎসা পাচ্ছে না, বরং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাদেরকে সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যেও জোরপূর্বক কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে।
ধর্ম, জাত বা গোত্রের ভিত্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৈষম্যপূর্ণ আচরণ পরিলক্ষিত হয়, ভারতে উচু বা নিচু জাতের ভিত্তিতে ব্রাহ্মণ (পুরোহিত জাতীয় লোক) বা ক্ষত্রিয়দের (শাসক প্রশাসক ও যোদ্ধা) মাধ্যমে দলিতদের উপর বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের খবর প্রায়শঃই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ২০১৪ সালে জার্মান বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার মেসুত ওজিল অভিযোগ করেছিলেন যে, ২০১৮ সালে দল হেরে যাওয়াতে তাকে তুর্কি মুসলিম বলে গালি দেয়া হয়!! এছাড়াও আমরা দেখি যে নাইন-ইলেভেনের পরে সমগ্র বিশ্বে পরিকল্পিতভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে বর্ণবাদী আচরণ উসকে দেয়া হয়েছিল তার অন্যতম ফলাফল হচ্ছে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে টেরেন্ট ব্রেন্টন নামক এক বর্ণবাদী কর্তৃক জুমু‘আর নামাজের সময়ে ৫০ জন মুসলিমকে গুলি করে হত্যা। গত ২৮শে এপ্রিল ইসরাইলী পুলিশ কর্তৃক একজন প্রতিবন্ধী ফিলিস্তিনি যুবককে গুলি করে হত্যার ঘটনা এসবের ধারাবাহিকতা মাত্র। ভারতের মুসলিমগণও এই ধরনের আচরণ থেকে রেহাই পায়নি, যেখানে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের গুজব সৃষ্টি করে মুসলিমদেরকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। এছাড়াও মায়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে বৌদ্ধদের দ্বারা বর্ণনাতীত নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশছেড়ে পালিয়ে আসতে হয়। এগুলো ছাড়াও পশ্চিমা বিশ্বসহ প্রায় প্রতিটি দেশেই মৌলিক অধিকার হরণসহ কর্মক্ষেত্রে মুসলিমদের সাথে বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগ খুবই মামূলি বিষয়।
গত ৬ই মার্চ নিউইয়র্ক সিটিতে ভিন্ন আঞ্চলিকতার কারনে ডানপন্থীদের দ্বারা বর্ণবাদের একটি ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে, ভিডিও ফুটেজ এসেছেযে সাবওয়ে ট্রেনে এক ব্যক্তির সাথে অন্য এক ব্যক্তি তর্ক করছে এবং এশিয়ান-আমেরিকান ওই ব্যক্তির উপরে এয়ার ফ্রেশনার স্প্রে করে দেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে লন্ডনে জনাথন মক নামের এক সিঙ্গাপুরী তরুণকে বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে, লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রীট দিয়ে হাঁটার সময় ৩ বা ৪ জনের একটি দল তাকে বলে যে, আমরা আমাদের দেশে করোনা ভাইরাস চাইনা, এবং তাকে কিল-ঘুষি মেরে মারাত্মকভাবে আহত করে, কারণ সে একজন এশিয়ান। এরকম হাজারো ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে যা বলে শেষ করা যাবে না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকান্ডসহ সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বর্তমান সমাজগুলোতে বিদ্যমান জাতিগত বৈষম্য ও বিভাজনকে তুলে ধরেছে। যদিও মানুষ বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সরব, তথাপি যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় তার বসবাস সেখানেই নিহিত রয়েছে এমন বৈষম্যের বীজ। আমেরিকা ধনী এবং সম্পদশালী রাষ্ট্র হলেও পুঁজিবাদী আদর্শের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা বা দৈন্যতার কারনে তাদের সমাজে আজ প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ, উত্তেজনা ও রক্তপাতের মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে। আর এই অন্তর্নিহিত আদর্শিক দুর্বলতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সুবিচারের অভাব, সম্পদের অসম বন্টন, বর্ণবাদ এবং জাতিগত বৈষম্য। আর কেবল কালোরাই নয়, বরং শেতাঙ্গ-অশেতাঙ্গ থেকে শুরু করে ন্যূনতম সম্পদের মালিক সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সকলেই এগুলোর শিকার। এজন্যই তারা আজ “নো জাস্টিস, নো পিস” স্লোগানে রাজপথ মুখরিত করে তুলেছে, যা আসলেই বাস্তব সত্য। পুঁজিবাদী আদর্শ বৈশ্বিকভাবে সমাজে যথাযথ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এবং সম্পদের সুষম বন্টনের মাধ্যমে গণমানুষের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। সর্বোপরি যেকোন ধরনের বৈষম্য দূর করে সমাজে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সুশাসন নিশ্চিতের সক্ষমতার মাপকাঠিতেও এই পুঁজিবাদী আদর্শ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এবং এর আদর্শিক দৈন্যতার কারনে সমগ্র বিশ্ব কে আজ ভয়াবহ মূল্য চুকাতে হচ্ছে। অতএব, বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা কর্তৃক প্রদত্ত ত্রুটিমুক্ত আদর্শ “ইসলাম” কিভাবে মানবজাতিকে সকল ধরনের বৈষম্য, বর্ণবাদের অভিশাপ এবং দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্তি দিতে পারে সেবিষয়ে যাওয়ার আগে “জাতীয়তাবাদ কী” এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোন থেকে মুসলিম বিশ্বে এর প্রভাব কি সেবিষয়ে আসুন কিছু ধারনা পাওয়ার চেষ্টা করি।
জাতীয়তাবাদ হচ্ছে এমন একটি বন্ধন যা লোকদের মধ্যে পারিবারিক বা গোত্রীয় সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। আধিপত্য অর্জনের মনোভাব থেকেই এটি উদ্ভূত হয়। এটি পরিবার থেকে এর শুরু হয় যেখানে একজন সদস্য পরিবারের অন্য সদস্যের উপর কর্তৃত্ব করতে চায়। পরিবারের উপর কর্তৃত্ব পাওয়ার পর সে যে কমিউনিটিতে বসবাস করে তাদের উপর কর্তৃত্ব অর্জনের চেষ্টা করে। পরবর্তীতে তারা একে অপরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয় যাতে করে সার্বিক কর্তৃত্ব কুক্ষিগত করার সাথে সাথে সবধরনের সুযোগ-সুবিধা ও সম্মান-প্রতিপত্তি অর্জন করতে সক্ষম হয়। ইসলামের বাণী আসার আগে আরব উপদ্বীপ বিভিন্ন গোত্রীয় ধারায় বিভক্ত ছিল এবং তৎকালীন আরব সমাজে জাতীয়তাবাদী ওদেশপ্রেমের বন্ধন বিদ্যমান ছিল। একই বাড়িতে বসবাসকারী লোকেরা একটি পরিবার গঠন করেছিল। একটি পরিবার থেকে বংশ তৈরী হয়েছিল এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত হয়েছিল। প্রতিটি গোত্রের নিজস্ব নিয়ম-কানুন ও বিধি-বিধান ছিল যার দ্বারা লোকেরা শাসিত হতো। সমস্ত ক্রিয়া-কলাপ এই কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং যে কেউ এই সীমা ছাড়িয়ে গেলে তাকে তাদের শাস্তির সম্মুখীন হতে হতো। গোত্রের প্রতিদৃঢ় আনুগত্যের কারণে আন্তঃগোত্রীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে তুচ্ছ বিষয়ে যুদ্ধ শুরু হয়ে যেত। যেমন: মদীনার আওস ও খাজরাজ গোত্র উটের রশি নিয়ে ৮ বছর যুদ্ধ করেছিল!
বহু শতাব্দী ধরে বিদ্যমান আরব সমাজের গোত্রীয় কাঠামো ইসলামের আগমনের ফলে নির্মূল হয়েছিল। ইসলামী আক্বীদার ভিত্তিতে গঠিত আদর্শিক বন্ধন মুসলিমদের মধ্যে প্রায় চৌদ্দশ বছর যাবৎ সুদৃঢ়ভাবে অব্যাহত ছিল। বর্ণ, গোত্র, ভাষা নির্বিশেষে সকল মানুষকে ইসলাম ঐক্যবদ্ধ করেছিল। এ বন্ধন ইসলামী রাষ্ট্রের শক্তি ছিল। ক্রুসেডে মুসলিমদের পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়ে ব্রিটেন ও ফ্রান্স জাতীয়তাবাদের বিষাক্ত মতবাদ দ্বারা মুসলিমদেরকে পৃথক করার দিকে নজর দেয়। উসমানীয় খিলাফতের সময় পশ্চিমা মিশনারীরা মুসলিমদের বিভক্ত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে প্রথমে ব্যর্থ হলেও পরবর্তীতে তারা আরব ও তুর্কি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বিভিন্ন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। ১৮৫৭ সালে মিশনারীরা সিরিয়ান বিজ্ঞান সংঘ এবং ১৮৭৫ সালে বৈরুতে গুপ্তসংঘ প্রতিষ্ঠা করতে সফল হয়। এসব সংগঠন আরব জাতীয়তাবাদকে ধারণ করে প্রাক-ইসলামী সংস্কৃতিকে মেনে নিতে উসমানীয় খিলাফতকে চাপ দেয় এবং তুর্কিদেরকে আরবদের কাছ থেকে খিলাফতকে চুরি করার অভিযোগে অভিযুক্ত করে। এভাবে মুসলিম উম্মাহ্’র মধ্যে আরব জাতীয়তাবাদের প্রচলন করা হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জাতীয়তাবাদের জ্বর ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়ে। যখন উপনিবেশবাদীরা ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশ জাতিরাষ্ট্রের ভিত্তিতে দখল করে নিল তখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে মুসলিমদের ভিতরে দেশপ্রেমের জন্ম দেয়া হয়। এ সময় ইসলামী রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে মুসলিমদের মধ্যে আক্বীদাগত বন্ধন নষ্ট হয়ে যায়, এবং তারা বর্ণ, গোত্র ও ভৌগলিক অবস্থানের ভিতরে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।
খিলাফত রাষ্ট্র ধ্বংস হওয়ার পরে মুসলিম উম্মাহ্’র মধ্যে কাফিরদের দ্বারা প্রোথিত জাতীয়তাবাদের বিষাক্ত বীজ সময়ের পরিক্রমায় বিষবৃক্ষে পরিনত হয়। আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখেছি যে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত মুসলিমদের মধ্যে জাতিগত, গোত্রীয় বা বর্ণগত উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমান পুঁজিবাদী শাসকেরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য জাতীয়তাবাদের সবক দেয় এবং তারা মুসলিমদেরকে জাতি, গোত্র, বর্ণ ওভৌগলিক অবস্থানের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখতে কিছু উপাদান ব্যবহার করে, যেমন: পশ্চিমা পরাশক্তিদের দালাল শাসকদের স্বার্থের দ্বন্দ্বে কিংবাখেলাধূলায় মুসলিম দেশগুলো যখন একে অপরের প্রতিপক্ষ হয় তখন এক মুসলিম অন্য মুসলিমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্যের মাধ্যমে পরষ্পরের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে, তখন তাদের পরিচয় হয়ে দাঁড়ায় সৌদি মুসলিম বা ইরানি মুসলিম বা ইয়েমেনি মুসলিম, বাংলাদেশি মুসলিম বা পাকিস্তানি মুসলিম, মিশরীয় মুসলিম বা নাইজেরিয়ান মুসলিম। আর এই ভিন্ন ভিন্ন জাতি পরিচয়ের অজুহাতে সৌদি আরব, মিশর, তুরস্ক, ইরান সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনের মুসলিমদেরকে রক্ষার জন্য ইসরাইল অভিমুখে তাদের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীকে মার্চ করার নির্দেশদেয় না; পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সেনাবাহিনী কাশ্মিরীদেরকে ভারতীয় মুশরিকদের কবল থেকে উদ্ধারের জন্য ব্যারাক থেকে বের হয় না; বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনী মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের সাহায্যে এগিয়ে আসে না!! কারন কি? এগুলো হচ্ছে এসব দেশের আভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট জাতি-রাষ্ট্রের সীমানার পবিত্রতা যেকোন মূল্যে অক্ষুন্ন রাখতে হবে, নাউজুবিল্লাহ্।
আসুন, এখন আমরা আলোচনা করে দেখি যে ইসলাম কিভাবে জাতীয়তাবাদ কিংবা বর্ণবাদের মতো বৈষম্য সৃষ্টিকারী চিন্তার মূলোৎপাটন করবে?
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন জাতীয়তাবাদ, গোত্রবাদ, বর্ণবাদের মতো কুফর ধ্যান-ধারনার পরিবর্তে ইসলামের সুমহান আদর্শের প্রতি আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) মুসলিমদের মধ্যে বন্ধন হিসেবে ইসলামী আক্বীদাকে ভিত্তি হিসেবে নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন, তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: “হে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করবে না তোমাদের পিতা ও তোমাদের ভাইদের, যদি তারা কুফরীকে প্রিয় মনে করে ঈমানের তুলনায়” (সূরা আত-তাওবা: ২৩)। মদিনায় নব প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রে এক অমুসলিম যুবক কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে আওস ও খাজরাজ গোত্রকে বু‘আছ অভিযানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় তাদের মধ্যে পুরনো আবেগকে জাগিয়ে তোলে। ফলশ্রুতিতে সেখানে অস্ত্রের ঝনঝনানি শুরু হয়ে গেল। যখন রাসূল (সা)-এর কাছে এই সংবাদ পৌঁছাল তখন তিনি (সা) ছুটে এসে পরিস্থিতি অবলোকন করে বললেন: “হে মুসলিমগণ! আল্লাহকে স্মরণ করো,আল্লাহ্কে স্মরণ করো। আল্লাহ্ যখন তোমাদেরকে ইসলামে এনেছেন, এর দ্বারা সম্মানিত করেছেন, পৌত্তলিকতা থেকে দূরে সরিয়েছেন, তখন আমি তোমাদের সাথে উপস্থিত থাকা অবস্থায় তোমরা কি ওদের মতো কাজ করবে? ইসলাম তো তোমাদের একে অপরকে বন্ধু বানিয়েছে”। আওস ও খাজরাজ গোত্র এ কথা শুনে কেঁদে ফেলল এবং একে-অপরকে মুসলিম ভাই হিসেবে জড়িয়ে ধরল। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: “আর স্মরণ কর আল্লাহ্’র সেই অনুগ্রহ যা তোমাদের উপর করা হয়েছে, তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু, আল্লাহ্ তোমাদের হৃদয়ে মহব্বত সৃষ্টি করেছেন, ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে গেলে। তোমরা ছিলে এক অগ্নিকুন্ডের কিনারে, আল্লাহ্ তা থেকে তোমাদের রক্ষা করুন” (সূরা আল ইমরান: ১০৩)। তাই মুসলিমদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল ইসলামী আক্বীদার উপর ভিত্তি করে। পারিবারিক পটভূমি বা বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সবার প্রতি একই আচরণ করা হয়েছিল। যে কেউ শাহাদাঘোষণা করেছে সে স্পষ্টতই মুসলিম উম্মাহ্’র অংশ হয়ে গেছে। রাসূলুলাহ্ (সা:) আসাবিয়াহ্ তথা জাতীয়তাবাদকে নিষিদ্ধ করেছেন, তিনি বলেছেন: “সে আমার উম্মত নয় যে জাতীয়তাবাদের কথা বলে, জাতীয়তাবাদের পক্ষে লড়াই করে, বা এর জন্য মৃত্যুবরণ করে” (আবু দাউদ)।
ভাইয়েরা আমার! পশ্চিমা দেশসমূহে শ্বেতাঙ্গরা স্লোগান দেয়: “হোয়াইট ইজ রাইট, কিল দা ব্ল্যাক বাস্টার্ডস”। তাদের স্লোগানেই তাদের মনোভাব প্রকাশ পায়। আজ থেকে ৪২ বছর আগে লন্ডনে খুন হন বাংলাদেশি যুবক আলতাব আলী, যাকে গণমাধ্যম বলা হয়েছে “বাংলাদেশের জর্জ”, আর এই আলতাব আলীর মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলাদেশিরা স্লোগান দিয়েছে: “সাদাকালো জোট বাঁধো, বর্ণ ঘৃণা নির্মূল করো”। অথচ, বর্ণ ঘৃণা নির্মূলতো হয়ইনি বরং দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, ভারতের পুলিশও আমেরিকার পুলিশের মত হাঁটু দিয়ে চেপে ধরে মুসলিমদেরক নির্যাতন করছে। এই অবস্থার পরিবর্তন ততক্ষন পর্যন্ত আমরা দেখব না, যতক্ষণ না আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার যে মডেল দিয়ে গেছেন সেই ব্যবস্থায়ফেরত যেতে পারি। সেই ব্যবস্থায় হাবশী কৃষ্ণাঙ্গ বেলাল (রা) ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। হিজরী অষ্টম সনে, অর্থাৎ ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে যখন মক্কা বিজয় হয়, তখন রাসুল (সা:) কুরাইশদের পরাজিত করে মক্কা নগরীতে শাসক হিসেবে প্রবেশ করে প্রবিত্র কাবা ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি (সা) প্রথমে জানতে চাইলেন – বেলাল কোথায়? বেলালকে আমার কাছে নিয়ে আসো। কাবা’রদরজার সন্মুখে দাঁড়িয়ে তিনি (সা:) যখন বেলাল (রা:)-এর জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি (সা:) বললেন, “আল্লাহ্র কসম, আমি আজও সেই দিনগুলো স্মরণ করি যখন তারা এই কাবা’র সামনে বেলালকে নির্যাতন করত”। বেলাল (রা:) হাজির হলেন। রাসুল (সাঃ) তাকে বললেন, “বেলাল ভিতরে প্রবেশ কর। আজ একমাত্র তুমি আমার সাথে কাবা’র ভিতরে নামাজে শরীক হবে”। নামাজ শেষে রাসুল (সা) বেলাল (রা) বললেন, “কাবা’র উপর উঠে দাঁড়াও”। বেলাল (রা) চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন উচ্চ কাবা ঘরের উপড় উঠে দাঁড়াতে। নবীজি (সা) দেখলেন আশেপাশে কে আছে তাকে সাহায্য করার জন্য। আর তিনি (সা) পেয়ে গেলেন হযরত আবু বকর (রা) ও হযরত ওমর (রা)-কে। নবীজির নির্দেশে তারাদুজনই বেলাল (রাঃ) কে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। হযরত বেলাল (রা) তার ডান পা হযরত ওমর (রা) এবং তার বাম পা হযরত আবু বকর (রাঃ) এর কাঁধে রেখে প্রবিত্র কাবা ঘরের উপড়ে উঠে দাঁড়ালেন। রাসুল (সা) বললেন, “ও বেলাল, আল্লাহর কসম তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নাই। আল্লাহ্’র সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে এই কাবা ঘরের মর্যাদা সুমহান আর তোমার সম্মান তার কাছে আজ এর চেয়ে অধিক মর্যাদাপূর্ণ।” বেলাল (রা) তখন কাবা ঘরের উপর থেকে আযানের মাধ্যমে উপস্থিত ১০ হাজার বীর যোদ্ধাদেরকে তাওহীদের মহান বাণী শোনালেন, যাদের মধ্যে আরব ও কুরাইশদের সন্মানিত নেতাগণ ছিলেন এবং ইসলামের মহান সাহাবাগনও (রা) ছিলেন। ইসলাম এভাবে একজন সামান্য ক্রীতদাসকেও সম্মানিত করেছিল।
এই প্রেক্ষিতে আরেকটি ঘটনা আপনাদের সামনে আমি তুলে ধরতে চাই, মুসলিম বাহিনী ৬৪১ খ্রিস্টাব্দে ব্যাবিলন দুর্গ (আজকে যেটি কপটিক কায়রো নামে পরিচিত অঞ্চল) অবরোধ করেছিল, যেখানে মিশরীয় শাসক আল-মুকাওকিসকে আটক করা হয়েছিল। জেনারেল আমর ইবনে আল-আস (রা) আল-মুকাওকিসের সাথে কথা বলার জন্য উবাদাহ বিন আস-সামিত (রা)-এর নেতৃত্বে দশ জন ব্যক্তির একটি প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিলেন। উবাদাহ বিন আস-সামিত (রা) কালো ছিলেন এবং প্রতিনিধি দলটি যখন নৌকায় করে আল-মুকাওকিসের উদ্দেশ্যে যাত্রার পরে তার জায়গায় প্রবেশ করল, তখন উবাদাহ (রা) সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং আল-মুকাওকিস তার কৃষ্ণ বর্ণের কারণে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি বলেছিলেন, “এই কালো মানুষটিকে আমার কাছ থেকে দূরে নিয়ে যান এবং অন্য কেউ এসে আমার সাথে কথা বলুন”! বাকিরাবললেন: “এই কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় আমাদের মধ্যে সেরা। তিনি আমাদের নেতা এবং আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম, এবং তাকে আমাদের উপরে নিযুক্ত করা হয়েছে। আমরা সকলেই তার মতামতের গুরুত্ব দেই এবং আমাদের নেতা তাকে আমাদের উপরে নিযুক্ত করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে না যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন”। আল-মুকাওকিস প্রতিনিধিদলকে বলেছিলেন: “আপনারা কিভাবে এই কালো মানুষটিকে আপনাদের মধ্যেসেরা হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন? বরং সে আপনাদের মধ্যে সবচেয়ে কম মর্যাদাসম্পন্ন হওয়া উচিত”। তারা বলল: “না, যদিও আপনি দেখতে পাচ্ছেন যে তিনি কালো, তথাপি তিনি আমাদের মধ্যে মর্যাদার দিক থেকে সেরা, আমাদের মধ্যে অন্যতম এবং বুদ্ধিমান। কালো বর্ণ আমাদের মধ্যে খারাপ কিছু নয়”। আল-মুকাওকিস তখন উবাদাহ বিন আস-সামিত (রা)-কে বললেন: “হে কালো মানুষ, এগিয়ে আসুন এবং আমার সাথে মৃদুভাষায় কথা বলুন, কারণ আপনার কালো বর্ণ আমাকে শঙ্কিত করে, এবং আপনি কড়া কথা বললে তা আমাকে আরও শঙ্কিত করবে। উবাদাহ বিন আস-সামিত (রা) এগিয়ে গিয়ে বললেন: “আপনি যা বলেছেন তা আমি শুনেছি। আমার যে সঙ্গীদের আমি রেখে এসেছি তাদের মধ্যে এমন এক হাজার পুরুষ রয়েছেন যারা সকলেই আমার মতো কালো, এমনকি আমার চেয়েও কালো এবং দেখতে আরও ভয়ানক। আপনি যদি তাদেরকেদেখেন তবে আপনি আরও শঙ্কিত হয়ে পড়বেন। আমার যৌবন চলে গেছে, তবুও আমি ভয় করব না যদি আমার শত্রুদের মধ্য হতে একশতলোক একসাথে আমার মুখোমুখি হতে চায়, এবং আমার সহচরদের ক্ষেত্রেও এটি সত্য, কারণ আমাদের আশা ও আমাদের আকাঙ্খা হচ্ছে কেবল আল্লাহ্’র জন্য, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জিহাদে সংগ্রাম করা”।
ইসলামী জীবন ব্যবস্থার সাথে পশ্চিমা জীবন ব্যবস্থার কি অসাধারণ বৈপরীত্য! ইসলাম মানব জাতিকে মুক্ত করেছে মানুষের গায়ের রং, মুখের ভাষা, জন্মের স্থানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করার মত অসুস্থতা থেকে। ইসলাম শিখিয়েছে কিভাবে মানুষের মন থেকে বর্ণবাদকে উপড়ে ফেলে সাম্যের ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে পরস্পরকে আবদ্ধ করতে হয়। অন্যদিকে পশিমা জীবনাদর্শ শ্বেতবর্ণের খ্রিস্টান ও শ্বেতবর্ণের নাস্তিক ব্যতীত সকলেই দ্বিতীয়শ্রেণির নাগরিক বা অর্ধ-মানব বলে গণ্য করে। তার বহিঃপ্রকাশ কেবলমাত্র তাদের শোষণমূলক পররাষ্ট্রনীতিতেই নয়, বরং আজ তাদের নিজেদের ভূমিতেও পরিলক্ষিত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েড নামক একজন কৃষ্ণাঙ্গের হত্যা থেকে উদ্ভূত আমেরিকাসহ পশিমা বিশ্বে চলমান বর্ণবাদ বিরোধী বিক্ষোভ ও দাঙ্গার মধ্য দিয়ে মৃতপ্রায় পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার কতটুক পাওয়া যাবে তা নিয়ে সংশয় আছে। তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, যতক্ষণ না এই পশ্চিমা অপব্যবস্থার অপসরণ হবে এবং ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে মানুষ তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধকে শুধরেনেবে, বর্ণবাদকে নির্মূল করা সম্ভব হবে না। মানব জাতি আজ বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদের যে ভয়াল সমস্যার সন্মুখিন তার সমাধান নিহিত রয়েছে রাসুল (সা)-এর দেখানো ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায়। একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রই পারে সমাজে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করে বর্ণবাদের বিষবৃক্ষকে সমূলে উপড়ে ফেলতে।
ভাইয়েরা, চলুন আমরা এমন এক আদর্শিক শাসন ব্যবস্থার দিকে ফিরে যাই যেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই শান্তিতে বসবাস করবে। বিনা কারণে জর্জদের প্রাণ দিতে হবে না, যত্ন নেয়া হবে বেলালদের, অমুসলিমরা হবে খিলাফত রাষ্ট্রের সম্মানিত নাগরিক এবং তারা সবসময় নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করবে, নাগরিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুবিধা লাভের জন্য তাদের সাথে চুক্তি থাকবে। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সংখ্যালঘু নামের কোন অমর্যাদাকর উপলব্ধি তাদের থাকবে না, সকল মুসলিম তাদের সাথে সৎ ও বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করতে বাধ্যথাকবে। কারণ, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) বলেছেন: “যে ব্যক্তি চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমের ক্ষতি করল সে যেন আমাকে ক্ষতিগ্রস্থ করল” (আবু দাউদ)। খিলাফতের ইতিহাসে এধরনের অনেক অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্য থেকে দু’টি উদাহরণ আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। একটি হচ্ছে সপ্তম শতাব্দীর ঘটনা: একজন ইহুদি নাগরিক খলিফা আলী (রাঃ)-এর তলোয়ারের ঢাল চুরি করলে বিষয়টি বিচারালয়ে উত্থাপিত হয়। তখন কাজী, অর্থাৎ বিচারক তার পক্ষে সাক্ষী উপস্থিত করতে বললে তিনি তার পুত্রকে সাক্ষী হিসেবে হাজির করেন। বিচারক মামলাটি এই বলে খারিজ করে দেয় যে কোন পিতার পক্ষে পুত্রের সাক্ষী গ্রহণযোগ্য নয়। ন্যায় বিচারের এই চমৎকারিত্ব দেখে ওই ইহুদি দারুণভাবে অভিভূত হইয়া চুরির কথা স্বীকার করে নিজেই মুসলিম হয়ে যান। আরেকটি ঘটনা হচ্ছে: ১৫ শতাব্দীতে ইহুদিদেরকে যখন স্পেন থেকে বের করে দেওয়া হয় তখন ওই ইহুদীরা আশ্রয়স্থল খুঁজে পায় ইসলামী খিলাফতের ছায়াতলে। নাগরিক হিসেবে তারা স্বাস্থ্যসেবা, মেটাল ওয়ার্কিং ইত্যাদি খাতে সরকারকে প্রচুর সহযোগিতা করেছিল। তাদের ছিল অসামান্য মেধা, কর্মদক্ষতা ও বিদেশী জ্ঞান, তাদের এই অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে তদানীন্তন উসমানী সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদ একটি বিখ্যাত উক্তি করেছিলেন: “তোমরা কি করে স্প্যানিশ রাজা ফার্দিনান্দকে বুদ্ধিমান বল? যে নিজের নাগরিকদেরবের করে দিয়ে নিজেকে করেছে গরীব, আর আমাকে করেছে ধনী”। পরিশেষে রাসূল (সা)-এর একটি উক্তি স্মরণ করে শেষ করছি, তিনি বলেছেন: “কোন অনারবের উপর আরবের মর্যাদা নেই, কোন আরবের উপর অনারবের মর্যাদা নেই, কৃষ্ণাঙ্গের উপর মর্যাদা নেই সাদার, সাদার উপর কৃষ্ণাঙ্গের মর্যাদা নেই, মর্যাদা কেবল তাক্বওয়ার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়” (মুসনাদে আহমদ)।
অতএব, আসুন আমরা মানবতার সামনে হুমকি হয়ে দাঁড়ানো এই বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদের আশ্রয়স্থল পুঁজিবাদী জীবনাদর্শ পরিত্যাগ করে ইসলামী আদর্শের বন্ধনে আবদ্ধ হই। যেভাবে রাসুল বলে গেছেন: “একজন হাবশি ক্রীতদাসও যদি তোমাদের শাসক নির্বাচিত হয়, যার মাথা কিসমিসের মত, তবুও তোমরা তাকে মান্য করবে”। আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।
























