তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
ধর্ষণ – সেকুলার বিষবৃক্ষের একটি অন্যতম ফল

মাগুরায় বড় বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসে বোনের শ্বশুরের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয় ৮ বছরের শিশু (আছিয়া)। গত ৮ মার্চ সন্ধ্যা ৬টায় শিশুটিকে সংকটাপন্ন অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে লাইফ সাপোর্টে থাকাকালীন অবস্থায় ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি হয়। ওই সময় শিশুটি সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় ছিল। শিশুটির গলার সামনের দিকে গভীর ক্ষত এবং শরীরের অন্যান্য স্পর্শকাতর স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। পরীক্ষায় শিশুটির ডান ফুসফুসে বাতাস জমা হওয়া (নিউমোথোরাক্স), তীব্র শ্বাসকষ্ট সিনড্রোম, মস্তিষ্কে ব্যাপক ফোলা ধরা পড়ে। এ ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এই ঘটনা নিয়ে আলোচনা এখন মুখে মুখে। ধর্ষককে গ্রেফতার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ভিন্ন ভিন্ন ব্যানারে আন্দোলন চলছে।
ধর্ষণের মতো বিকৃত মানসিকতার ঘটনা গত কয়েক বছরে ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েই চলেছে। যার কিছু মিডিয়াতে আসে কিছু আসে না। নারীর প্রতি যৌন হয়রানির ঘটনা বাড়ার পাশাপাশি ধরনের ক্ষেত্রেও এসেছে নিত্যনতুন মাত্রা। গত এক দশকে বিভিন্ন ধরণের যৌন হয়রানীর ঘটনা শুনেই আসছি। আমরা বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের সময় টিএসসিতে প্রকাশ্যে সবার সামনে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটতে দেখেছি। এছাড়াও শুধু গণপরিবহনেই প্রতি বছর একাধিক নারী ধর্ষণ বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে চলছেন। আমরা কুমিল্লার তনু হত্যার কথা শুনেছি যাকে ধর্ষন করে মেরে জঙ্গলে ফেলে রাখা হয়েছিল। রাজধানীতে এক গারো তরুণীকে জোর করে মাইক্রোবাসে তুলে চলন্ত অবস্থায় গণধর্ষণ করার ঘটনা শুনেছি। রাজধানীর অদূরে সোনারগাঁর আড়াইহাজারে চলন্ত বাসে এক নারী শ্রমিককে বাস ড্রাইভার ও সহকারীসহ চারজন মিলে গণধর্ষণ করার কথা জেনেছি। টাঙ্গাইলের মধুপুরে একটি বাসে নারীকে গণধর্ষণের অভিযোগ শুনেছি। কয়েক মাসের শিশুরাও রেহায় পাচ্ছে না বিকৃত মানসিকতার এই ধর্ষকদের হাত হতে। বিভিন্ন প্রতিবেদন ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি বছর নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। এবং বলা হচ্ছে অধিকাংশ নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়না। এসব সহিংসতার মধ্যে রয়েছে, এডিস নিক্ষেপ, অপহরণ, ধর্ষণ, ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা, পাচার, খুন এবং যৌতুকের জন্য নির্যাতন। সর্বশেষ আমরা রাজশাহীতে ডাকাতদল কর্তৃক রাতভর নারীদের ধর্ষন করার খবর জানতে পেরেছি।
বিষয়টি লক্ষনীয় যে, নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ নির্যাতন যেমন পাল্লা দিয়ে ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি নারী নির্যাতন প্রতিরোধে তোড়জোড়ও তথা নারীবাদীদের কলাম লেখনী, নারী সংগঠনের সভা সেমিনার, সরকারের মহিলা ও শিশু মন্ত্রণলয়ের সচেতনতামুলক প্রকল্পের মাত্রাও বহুগুন বেড়েছে। সমাধান হিসাবে দেওয়া হচ্ছে পশ্চিমাদের কাছ থেকে ধার করা বুলিসমূহ – নারীকে শিক্ষিত হতে হবে, নারীর সমঅধিকার ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে, নারীদেরকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে ও সর্বোপরি নারীর প্রতি সমাজের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমে ঐ নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব। এছাড়া নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। এই সমাধানসমূহ গ্রহণের ফলাফল হিসাবে দেখা যাচ্ছে, নব্বই এর গণঅভ্যত্থানের পর এদেশে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীর পদ অলংকৃত করেছেন নারী। কিছুদিন আগ পর্যন্তও স্পীকারের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন একজন নারী। নারী শিক্ষার হারও বৃদ্ধি পেয়ে এখন প্রায় পুরুষের সমান। নারীরা দিনে দিনে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বীও হয়ে উঠছে। নারী অধিকার রক্ষাই প্রতিনিয়ত উৎপাদিত ও আমদানী হচ্ছে দেশী বিদেশী এনজিও ও মানবাধিকার সংস্থা যারা নিরলসভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে প্রত্যেক সরকারই প্রণয়ন করছে ডজন ডজন আইন। পূর্বের আইন সমুহকে আরো কঠোর করা হচ্ছে। পশ্চিমা শক্তিগুলো আমাদের সমাজে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রগামীদের পুরস্কৃতও করছে তাদের অবদানের জন্য। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক নারী দিবসে দেশের অদম্য নারীদের হাতে সম্মাননা পুরস্কার তুলে দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শনিবার (৮ মার্চ) সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠান তিনি এ পুরস্কার তুলে দেন।
কিন্তু এত কিছুর পরও নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ নির্যাতন বন্ধ তো স্বপ্নের বিষয়, কমার কোন লক্ষনই আপাতত: দেখা যাচ্ছেনা। বরং এই নির্যাতনের গ্রাফটা দিন দিন আরো উর্ধ্বগামী হচ্ছে। কারণ আমরা নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ নির্যাতনের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করতে ব্যর্থ হয়েছি।
প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান:
একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় পশ্চিমাদের দেওয়া এই সমাাধানগুলো কত দুর্বল এবং মৌলিকভাবে কত অসার। পরিসংখ্যান বলছে, যেসব দেশ নারী উন্নয়ন সূচক হিসাবে- নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতা, শিক্ষা, অধিকার সচেতনতা, নারী ক্ষমতায়নকে মাপকাঠি বিবেচনা করে তারা নারীকে উন্নত জীবন দেওয়াতো দূরের কথা, নিরাপত্তাই দিতে পারেনি।
ভারতে প্রতি ১৫ মিনিটে একজন নারী ধর্ষিত হয় (রিপোর্টেড)। ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইমস রিপোর্ট ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০২১ সালে ৩১,৬৭৭ জন নারী হয়রানীর শিকার হয়েছেন (The Hindu)। নারী নির্যাতনের প্রতিযোগীতায় অগ্রগামী তারাই যারা যথারীতি নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ। যেমন USA এবং UK। পরিসংখ্যানের আলোকে, UK-তে প্রতিদিন ১৬৭ জন নারী ধর্ষিত হয়। USA-তে প্রতি ১৮ সেকেন্ডে ১ জন নারী, স্বামী কর্তৃক শারীরিকভাবে নির্যাতিত হয়। ২০২৪ এর RAINN-এর রিপোর্ট অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সে বছর ৪,৩৩,০০০ নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে।
UK ২.৫ হাজার স্বীকৃত Pedophiles (শিশু যৌন নির্যাতনকারী) লালন করেছে। বৃটেন এর ONS এর তথ্যমতে ২০২৪ সাল সেখানে ২০ লক্ষ নারী নির্যাতন কিংবা নির্যাতনের প্রচেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। USA- তে প্রতিদিন ৩ জন নারী তার পার্টনার কর্তৃক হত্যা হয়। ইউরোপ প্রতি ১০ জনে ১ জন নারী যৌন হয়রানীর শিকার হয়। USA – তে প্রতি ৪৫ সেকেন্ডে একজন নারী ধর্ষিত হয়। (সুত্র: মাইকেল প্যারেন্টি-২০০০ সালে প্রকাশিত The Ugly Truth)
উপরোক্ত পরিসংখ্যানগুলো কি যথেষ্ট নয় এটা বুঝার জন্য যে নারী নির্যাতন বন্ধের যে দাওয়াই পশ্চিমা সমাজ থেকে গ্রহণ করছি তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।
অর্থাৎ আমরা সহজে একটা লাইন টানতে পারি যে, ভারত পশ্চিমাদের মূল্যবোধ, ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতি অনুসরন করেছে যার ফলশ্রুতিতে আজকে ভারতে পশ্চিমা সমাজের ন্যায় নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ নির্যাতন চরম পর্যায়ে যেখানে দিল্লীকে বলা হয় ধর্ষনের নগরী। ভারতের নাম Re-public of India থেকে Rape-public of India তে পরিবর্তন করা যেতে পারে। আর আমরাও পশ্চিমাদের অনুসরন করে ভারতের পথেই হাঁটছি। যার নমুনা বাসে গণধর্ষনের মত ঘটনা।
একজন যুবক যখন দিনের পর দিন হলিউড-বলিউডের মুভি, কারিনা-ক্যাটরিনা-সানি লিওনদের আইটেম song, নাটক-সিনেমা-বিজ্ঞাপনে নারীকে খোলামেলা উপস্থাপন করাকে দেখে, স্মার্ট মোবাইলে কম রেটের ইন্টারনেট প্যাকেজ ব্যাবহারে সহজলভ্য পর্ণ সাইট গুলো বিচরণ করে এবং এরপর রাস্তায় বা ক্যাম্পাসে কোন নারীকে সে কোন দৃষ্টিতে দেখবে? যেখানে নারীরাও স্বাধীনতার নামে বা অধিকার আদায়ের নামে নিজেদের উপস্থাপন করছে আকর্ষণীয় রূপে। এক্ষেত্রে নারীদেরকেও বেশি দোষ দেওয়া যায় না। কারণ প্রতিনিয়ত নাটক-সিনেমা-বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নারীদেরকে উৎসাহিত করা হচ্ছে পশ্চিমাদের বা ভারতীয় নারীদের মত আধুনিক হতে। ফলশ্রুতিতে আমাদের সামনে একজন নারী উপস্থাপিত হচ্ছে একটি ভোগ্যপণ্য হিসাবে। ফলে পরকীয়া, ধর্ষন এমনকি ৬ মাসের শিশুটিও বাদ যাচ্ছে না পর্ণ দেখায় অভ্যস্ত যুবকটির লোলুপ হাত হতে।
পশ্চিমারা মুনাফা সর্বোচ্চকরন নীতির কারনে যেকোন উপায়কে সঠিক মনে করে। এর জন্য নারীর সম্মান বিক্রি করে মুনাফা আসলেও তারা তা বৈধতা দেয়। তাই পর্ণোগ্রাফি Industry কে West প্রতিষ্ঠা করেছে এবং সারা বিশ্বে এর প্রচার-প্রসার করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যবসা করছে। আর অন্যদিকে নারী মুক্তির বা নারী অধিকারের আন্দোলনকে উৎসাহিত করছে। এটা তাদের স্পষ্ট দ্বৈতনীতি। সর্বোপরি পশ্চিমারা ও আমাদের শাসকগোষ্ঠী নারীদের সম্মান ও নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ।
তাই বলা যা যে, নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ হত্যা ও নির্যাতনের মূল কারণ হলো-
– পশ্চিমারা বাংলাদেশে তাদের দালাল শাসকগোষ্ঠী ও বুদ্ধিজীবিদের মাধ্যমে জীবন সম্পর্কে তাদের মূল্যবোধ (জীবনটাকে উপভোগ করা যেকোন উপায়ে), ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতির ব্যাপক প্রচার-প্রসার করেছে এবং সর্বত্র নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসাবে উপস্থাপন করেছে।
– এবং আমরা জনগন না বুঝে তাদেরকে অন্ধ অনুসরণ করছি।
সমাধান:
সময় পার হয়ে যায় অথচ যৌন হয়রানির প্রকৃত অপরাধিরা গ্রেফতার হয় না! আর হলেও আইনের ফাক-ফোঁকর দিয়ে তারা কিছু সময় পর পার হয়ে যায়। তাই অনেকে মনে করছেন যে, প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তি দিলে এই ধরনের অপরাধ কমে যাবে। কিন্তু শুধুমাত্র কঠোর শাস্তিই এই সমস্যার সমাধান করবে না। যদিও দোষীদের সনাক্ত করা ও তাদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে বর্তমান পুঁজিবাদী ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ ব্যবস্থার বৃটিশ আমলের আইনের ব্যর্থতা অস্বীকার করার উপায় নেই। তথাপি এটা মূল কারণ নয়। অনেকেরই প্রতি বছর এমন অপরাধের জন্য যাবৎ জীবন কারাদণ্ড বা বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হচ্ছে। কিন্তু অপরাধ কমার কোন লক্ষন নেই। মূল কারণ বা সমস্যা এটাও না যে আমরা কত আইন শৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োগ করতে পারলাম। নারীর নিরাপত্তার মুল সমস্যা চিহ্নিত করা না গেলে, প্রত্যেক নারীর জন্যও একজন পুলিশ নিয়োগ করলেও নারীর সম্ভ্রম রক্ষা করা যাবে না। যার উদাহরণ স্বয়ং নারী পুলিশ, পুরুষ পুলিশ কর্তৃক নির্যাতনের করুণ চিত্র আমেরিকা, বৃটেন, ভারত বা বাংলাদেশে, কোথাও এর ব্যতিক্রম নেই।
অনেকে মোল্লাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলছেন যে, পর্দা করলে নারীরা যৌন হয়রানিসহ নির্যাতন হতে রেহায় পাবে। কিন্তু যখন বোরকা পরার পরও ধর্ষন হয় তখন অন্যরা বলছে – ‘পোষাকতো তাকে বাঁচাতে পারলনা’ বা ‘আরো কত পোষাক পরলে ধর্ষন করা হবে না’। আমরা ২০১৬’র ঘটনায় তনুকে হিজাব পরতে দেখেছি। এগুলো আসলে ইসলামকে ব্যঙ্গ করে বলা হচ্ছে। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, শুধুমাত্র পোষাক পরিবর্তন করে এই ধরনের অপরাধ বন্ধ হবে না। বরং সমাজ থেকে পশ্চিমাদের কাছ থেকে ধার করা মূল্যবোধ (জীবনটাকে উপভোগ করা যেকোন উপায়ে), ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন করতে হবে।
এবং সমাধান হিসাবে শুধুমাত্র ইসলামী পোষাক নয় বরং পরিপূর্ণ ইসলামকে গ্রহণ করতে হবে। ইসলামী মূল্যবোধ, ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে যা কেবল একমাত্র ইসলামি রাষ্ট্র তথা খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সম্ভব।
ইসলাম মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে কিভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অর্জনের জন্য। ইসলামই নারীকে দিয়েছে সম্মান, এবং নিরাপত্তা এবং এই উদ্দেশ্যে ইসলাম প্রথমত ব্যক্তি স্বাধীনতাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। দ্বিতীয়ত সমাজে আল্লাহ প্রতি আনুগত্য উৎসাহিত করা হয়েছে। যার মাধ্যমে নারীর প্রতি সঠিক মানসিকতারও দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করা যাবে। ইসলাম সমাজে যৌনতার বিস্তারকে নিষিদ্ধ করে, নারীর দেহের সকল ধরনের বস্তুকীকরন এবং শোষন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে। নারী পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ককে কখনও সস্তা করেনা এবং সকল ধরনের বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক সমাজ থেকে দূর করে। নারী ও পুরুষের একে অপরের প্রতি আকর্ষন বিষয়ক ও সকল চাহিদার পূরণের একমাত্র উপায় হিসাবে বিবাহকে নির্দেশ করে এবং বিবাহের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরী করে। যা কিনা নারী-পুরুষ ও সমাজকে রক্ষা করে। ইসলাম নারীকে সর্বাধিক সম্মান দিতে উৎসাহিত করে। ইসলাম কখনোই সস্তা দামে নারীর সম্মান বিক্রি করে না। রাসুল (সা:) বলেন- “এই বিশ্ব এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে সবকিছুই মূল্যবান। কিন্তু সবচেয়ে মূল্যবান একজন পরহেযগার নারী।”
ইসলাম নারীর সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তিনি (সা:) আরো বলেন- “এমন একটা সময় আসবে যখন মহিলারা সানা থেকে হাজরে মাউত পর্যন্ত (নির্ভয়ে রাতের বেলা) পাড়ি দিতে পারবে, জীব-জন্তু ও আল্লাহর ভয় ছাড়া অন্য কোনো ভয় তাদের অন্তরে কাজ করবে না।” আল্লাহর রহমতে খলীফা ওমর (রা:) এর সময় এই হাদীসের বাস্তবতা দেখা গিয়েছিল। আব্বাসীয় খিলাফতের সময় রোমান সীমান্তে কিছু রোমান সৈন্য একজন মুসলিম নারীর কাপড় ধরে টানাটানি করে অপমানিত করলে, সেই নারীর অভিযোগ খলিফার কাছে পৌছলে খলিফা মু’তাসিম বিল্লাহ সৈন্য বাহিনী পাঠিয়ে দিয়েছিল একজন মুসলিম নারীর সম্মান ও নিরাপত্তার জন্য।
এছাড়া খিলাফত রাষ্ট্র কঠোরভাবে কুরআন-সুন্নাহর আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করবে। কেউ ব্যভিচার করলে তাকে পাথর মেরে হত্যা করা হবে। ফলে ঐ ব্যক্তি ২য়বার অপরাধ করার সুযোগ পাবে না এবং অন্যরা ঐ ধরনের অপরাধ করার সাহস পাবে না। ১৩০০ বছরের খিলাফতের ইতিহাসে পাথর মেরে হত্যার ঘটনা অনেক বেশি না। সুতরাং, বোঝা যাচ্ছে শাস্তির চেয়ে সমাজব্যবস্থা ও সমাজে ইসলামী মূল্যবোধ তথা তাকওয়ার পরিবেশ প্রতিষ্ঠার কারণেই ধর্ষনের পরিমান কমে আসে।
তাই ইসলামি জীবন ব্যবস্থা তথা খিলাফতের অধীনে নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ সকল ধরনের নির্যাতন বন্ধ হবে কারণ –
– একজন মুসলিম কুরআন-সুন্নাহর সীমারেখা দ্বারা সীমাবদ্ধ। একজন মুসলিম একমাত্র আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এর ভয়ে ভীত হয়ে সমাজে নিরাপত্তার হুমকি হতে পারে এরকম ঘৃণ্য কাজ সমূহ থেকে বিরত থাকে।
– পাশাপাশি খিলাফত রাষ্ট্র কঠোরভাবে কুরআন-সুন্নাহর আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে ন্যায় বিচার চালু রাখে, যার ফলে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা হয়।
করণীয়:
রাসূল (সা) বলেছেন,
“যারা আল্লাহর হুকুম মেনে চলে তাদের সাথে থেকে যারা সেগুলো (আল্লাহর হুকুম)-কে নিজেদের প্রবৃত্তির খেয়ালে লঙ্ঘন করে, (এরা উভয়ই) যেন তাদের মত যারা একই জাহাজে আরোহণ করে। তাদের একাংশ জাহাজের উপরের অংশে তাদের জায়গা করে নিয়েছে এবং অন্যরা এর নীচের অংশে নিজেদের জায়গা করে নেয়। যখন নিচের লোকদের পিপাসা নিবৃত্ত করার প্রয়োজন হয় তখন তাদেরকে জাহাজের উপরের অংশের লোকদের অতিক্রম করে যেতে হয়। (তাই) তারা (নিচের অংশের লোকেরা) নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে নিল, ‘আমরা যদি জাহাজের নীচের দিকে একটা ফুটো করে নিই তাহলে জাহাজের উপরের অংশের লোকদের কোন সমস্যা করব না।’ এখন যদি উপরের অংশের অধিকারীরা নিচের ডেক’এর লোকদেরকে এ কাজ করতে দেয় তবে নিশ্চিতভাবেই তারা সবাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। অবশ্য তারা (উপরের অংশের লোক) যদি তাদের (নীচের লোকদের)কে এ কাজ থেকে বিরত রাখে, (তবে) তারা (উপরের অংশের লোক) রক্ষা পাবে এবং এভাবে (জাহাজের) সবাই রক্ষা পাবে।” (বুখারী )
সমাজের কোনো ঘটনা বিচ্ছিন্ন কিছু না, পুরো সমাজ একটি ইউনিট এবং নির্দিষ্ট কিছু চিন্তা-ধারণা, চেতনা-আবেগ ও ব্যবস্থা দ্বারা চালিত হয়। সুতরাং সমাজ ব্যবস্থার একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে, সমাজকে এমন সব নির্দিষ্ট কার্যাবলী থেকে বিরত রাখা, যা ঘটলে তা হবে পুরো জাতির জন্য ক্ষতিকর। তাই ধর্ষনের মত বাজে ঘটনার শিকার আমার পরিচিত (মা-বোন-আত্মীয়স্বজন-সহপাঠী) কেউ হওয়ার আগে এ থেকে পরিত্রানের জন্য পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তরুণ সমাজকে রুখে দাঁড়াতে হবে এবং প্রকৃত সমাধান ইসলামি রাষ্ট্র তথা খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসনকর্তৃত্ব দান করবেন। যেমন তিনি শাসনকর্তৃত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববতীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের ধর্মকে, যা তিনি তাদের জন্যে পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়-ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে শান্তি দান করবেন। তারা আমার এবাদত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না। এরপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারাই অবাধ্য। [সূরা নূর: ৫৫]
ট্রাম্পের কথায় পশ্চিমাদের প্রকৃত ঔপনিবেশিক চরিত্র ফুটে উঠেছে

মার্কিন নেতার লুণ্ঠনমূলক “গাজা দখল” এর ভাষা পশ্চিমাদের উপনিবেশ স্থাপনের আকাঙ্ক্ষাকে নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছে
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক গাজাকে দখল করে নেওয়া, এর মালিকানা নিয়ে নেওয়া, একে রিভেরা কিংবা রিসোর্টে পরিণত করা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তার বক্তব্য বিশ্বব্যাপী ঔপনিবেশিক ওদ্ধত্যের এক বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সমালোচিত হয়েছে।
এসব বক্তব্যের মাধ্যমে পশ্চিমাদের আসল চেহারা তথা তাদের ঔপনিবেশিক পুঁজিবাদী ডিএনএকেই কেবলমাত্র উন্মোচিত করে।
যুদ্ধাপরাধী নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প নির্লজ্জভাবে একে অপরকে শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে কাজ করার প্রশংসা করে প্রশংসা করেছেন।
গাজায় তাদের গণহত্যা – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করার জন্য সহায়তা করেছে – তা-ই কি যথেষ্ট ছিল না?
গাজা ও ফিলিস্তিন কোন ধ্বংসস্তূপের নাম না
গাজাকে “বাসযোগ্য নয়” বলে দাবি করার এই অযৌক্তিক প্রস্তাবটি একটি পুরোন ঔপনিবেশিক কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়।
এর উদ্দেশ্য হল বিভাজন, অস্থিতিশীলতা, ধ্বংস, অস্থিরতা তৈরি করা এবং তারপর নিজেকে এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমাধান হিসাবে উপস্থাপন করা, এবং এই প্রক্রিয়ায় মূল ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে মুছে ফেলা।
ইসরাইলের সীমানা বাড়ানোর আমেরিকান আকাঙ্ক্ষা
কয়েক দশক ধরে, পশ্চিমা শক্তিগুলো ফিলিস্তিনের ভাগ্য নির্ধারণ করে আসছে, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নয় বরং জায়নবাদীদের শক্তিশালী করার জন্য এবং প্রতিরোধ দমন করার জন্য।
গণহত্যা সমর্থনকারী এবং যুদ্ধবাজরা ‘তথাকথিত’ শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে কাজ করছে। প্রথমে ধ্বংসের জন্য অর্থায়ন করছে এবং এরপর পুনর্নির্মাণের দাবি তুলছে। এখন তারা গাজার সরাসরি মালিকানা নিতে চায়, এই প্রক্রিয়ায় ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়। যদিও তারা দাবি করে যে এটি সবই অস্থায়ী!
এটি এমন কিছু নয় যা আমরা আগে কখনও দেখিনি, এটি মার্কিনিদের পুরনো উপনিবেশবাদ এবং পুঁজিবাদী আগ্রাসন যা বিদ্যমান জায়নবাদী দখলদারিত্বকে প্রসারিত করা এবং যেকোনো মূল্যে তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত করা।
কিছু মুসলিম শাসক অনেক আগেই ফিলিস্তিনকে বিক্রি করে দিয়েছে!
ঔপনিবেশিকতাবাদকে সফল হতে হলে, ম্যালকম এক্স যেমন বলেছিলেন, তার জন্য দালাল, প্রক্সি তথা “গৃহপালিত নিগ্রোদের” প্রয়োজন।
এই ধরনের এজেন্টরা তাদের ঔপনিবেশিক প্রভুদের পক্ষে কাজ করার জন্য রয়েছে এবং বর্তমান মুসলিম শাসকগণ – যারা তাদের পূর্বপুরুষদের মতো – সম্পূর্ণরূপে সহযোগী এজেন্ট।
গাজায় গণহত্যা প্রত্যক্ষ করার সময় এসব মুসলিম শাসকদের লজ্জাজনক অবস্থান, তাদের “দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান” – যা প্রায় বিলোপ হতে বসেছে – এবং গণহত্যা-প্ররোচনাকারীদের সাথে “স্বাভাবিকীকরণ” এর রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা আজ আমাদের চোখের সামনে পরিষ্কার।
ট্রাম্প সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন যে, রিয়াদ দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের দাবি ত্যাগ করেছে!
এই শাসকরা আসলে যা ভয় পায় তা হলো তাদের নিজস্ব জনগণের ক্রোধ।
যদি তারা গাজার জাতিগত নির্মূল এবং মার্কিন উপনিবেশবাদ মেনে নেয় – তাদের নিজস্ব ভূমি ইতিমধ্যেই বিশাল সামরিক ঘাঁটির মাধ্যমে মার্কিন উপনিবেশের অধীনে রয়েছে – তাহলে ভিন্নমত এবং অস্থিতিশীলতা তাদের অবস্থানের জন্য একটি বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
সত্য হলো ট্রাম্প, নেতানিয়াহু এবং গাজা গণহত্যা কখনোই এই শাসক এবং তাদের পূর্বপুরুষদের সহযোগিতা এবং সমর্থন ছাড়া ঘটতে পারত না।
এই ধরনের শাসকরা:
- তাদের নিজেদের নাগরিকদের বিক্রি করে দিয়েছে, যেমন, পাকিস্তান ড. আফিয়া সিদ্দিকীর সাথে করেছে
- ভবিষ্যতের দোহাই তুলে ফিলিস্তিনকে বিক্রি করেছে, যেমন সৌদি আরবের এমবিএস
- ইহুদিবাদীদের সাথে ক্রমাগত বাণিজ্য এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিনিময়ে গাজা বিক্রি করেছে, যেমন তুর্কির এরদোগান এবং উপসাগরীয় শেখতন্ত্র।
এটা কোন কারণ ছাড়া বলা হয় না যে কিছু মুসলিম শাসকদের ইসরায়েলের প্রতিরক্ষার প্রথম সারির সদস্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
কয়েক দশক ধরে, তারা পশ্চিমা নীতি প্রয়োগ করেছে, ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে এবং শান্তি নামে পরিচিত একটি বিভ্রম প্রচার করেছে।
ফিলিস্তিনি স্বার্থের জন্য তাদের মুক্তি অনিবার্য
উপনিবেশবাদীদের পূর্বপুরুষদের (ক্রুসেডারদের) দানবীয়তা হোক বা ইহুদিবাদীদের বর্ণবাদ, জাতিগত নির্মূল এবং গণহত্যা হোক না কেন, গাজা ও ফিলিস্তিন বরকতময় ভূমি এবং এর জনগণ অধ্যবসায়ী এবং প্রতিরোধ ও অটুট চেতনার অধিকারী, যারা আত্মসমর্পণ বা পরাজয় জানে না।
পশ্চিম তীর, গাজা এবং বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ শরণার্থী শিবিরে বসবাস করেছে। দশকের পর দশক ধরে দখলদারিত্ব, গণহত্যা এবং অবরোধের মধ্যে বসবাস করা সত্ত্বেও, তারা তাদের অধিকারের জন্য সবরের সাথে পুনর্নির্মাণ ও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তারা তাদের স্বদেশে ফিরে যাওয়ার এবং ফিলিস্তিনকে মুক্ত করার জন্য কাজ করে চলেছে।
দুটি বিষয় পরিষ্কারভাবে স্পষ্ট
প্রথমত, ইসলামী উম্মাহ এবং ফিলিস্তিনকে মুক্ত করার লক্ষ্য আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, গাজা বা ফিলিস্তিন বিক্রির জন্য নয়। এই জমি নিয়ে দেন-দরবার করার, এটি দান করা বা কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।
ঠিক যেমন ১৯০১ সালে এটি বিক্রির জন্য ছিল না, যখন আধুনিক রাজনৈতিক ইহুদিবাদের প্রতিষ্ঠাতা থিওডর হার্জল ফিলিস্তিনে ইহুদি বসতি স্থাপনের অনুমতি দেওয়ার জন্য জমির বিনিময়ে খলিফা দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের কাছে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তা দিতে চেয়েছিল।
খলিফা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন:
“আমি এক ফুট জমিও বিক্রি করতে পারি না, কারণ এটি আমার নয়, বরং আমার জনগণের।
আমার জনগণ তাদের রক্ত দিয়ে এই সাম্রাজ্যের জন্য লড়াই করে জয়লাভ করেছে এবং তাদের রক্ত দিয়ে এটিকে রঞ্জিত করেছে।
আমরা এটিকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার আগে আবার আমাদের রক্ত দিয়ে ঢেকে দেব।”
আমি কীভাবে ফিলিস্তিনিদের সাহায্য করতে পারি এবং ফিলিস্তিনের সেবা করতে পারি?
ব্যক্তি পর্যায়ে
আপনার কণ্ঠস্বরের শক্তিকে অবমূল্যায়ন করবেন না, চুপ থাকবেন না।
আপনি যদি নীরব থাকেন, তাহলে আপনি নিপীড়নকে চ্যালেঞ্জ ছাড়াই ছেড়ে দিলেন। তাই আপনার পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং সহকর্মীদের সাথে কথা বলুন। গাজার বাস্তবতা এবং পশ্চিমা উপনিবেশবাদ সম্পর্কে তাদের সচেতন করুন।
এবং যারা কিছুই বলেন না তাদের চ্যালেঞ্জ করুন। তাদের মনে করিয়ে দিন যে নীরবতা হল সহযোগিতা।
আপনি যখন কথা বলেন, তখন আপনি নিপীড়কের বর্ণনাকে দুর্বল করে দেন এবং ন্যায়বিচারের কারণকে শক্তিশালী করেন!
অন্যায়ের বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রতিটি কণ্ঠস্বর গুরুত্বপূর্ণ, এবং ইতিহাস দেখিয়েছে যে জনগণ যখন নীরব থাকতে অস্বীকার করে তখন সাম্রাজ্যের পতন হয়।
প্রভাবশালী পর্যায়ে
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবশালীরা: যদি আপনার কোন প্ল্যাটফর্ম থাকে, তাহলে তাদের মিথ্যা উন্মোচন করে, সত্য প্রকাশ করে ফিলিস্তিনের পক্ষে তা ব্যবহার করুন!
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গাজার “মালিকানা” নিতে পারে এই ধারণাটি ফিলিস্তিনিদের তাদের ভূমি থেকে বিতাড়িত করার এবং ইসরায়েলের আধিপত্যকে বৈধতা দেওয়ার আরেকটি পদক্ষেপ।
ইহুদিবাদী রাষ্ট্রকে সমর্থনকারী মুসলিম শাসকদের ভণ্ডামি উন্মোচন করুন, দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের ব্যর্থতা উন্মোচন করুন এবং এই অঞ্চলে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক প্রকল্প উন্মোচন করুন।
আপনি বিশ্বকে দেখাতে পারেন যে এটি “রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন” সম্পর্কে নয় – এটি একটি জনগোষ্ঠীকে মুছে ফেলা এবং উপনিবেশবাদের সাথে সম্পর্কিত।
এই বিপজ্জনক পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আপনার কণ্ঠস্বর ব্যবহার করুন এবং জনসাধারণকে জাগিয়ে তুলুন।
আলেম পর্যায়ে
ইমাম ও আলেমগণ, উম্মাহর কান আছে এবং কথা বলা কর্তব্য; জুমার খুতবায় এই বিষয়টির সমাধান আলোচনা করা উচিত।
এটি কেবল রাজনৈতিক বিষয় নয় – এটি ন্যায়বিচার, নিপীড়ন এবং মুসলিম ভূমির পবিত্রতা সংক্রান্ত বিষয়।
গাজার জনগণকে বহিষ্কার করা হচ্ছে, বিদেশী শক্তি তাদের ভূমি দাবি করছে এবং তাদের মর্যাদা ভুলুন্ঠিত করা হচ্ছে।
মানুষকে মনে করিয়ে দিন যে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো একটি কর্তব্য, এবং নিপীড়নকে প্রত্যাখ্যান করা আমাদের দ্বীনের অংশ।
যদি উম্মাহর মিম্বরগুলি নীরব থাকে, তাহলে তারা কী উদ্দেশ্যে কাজ করবে?!
উম্মাহ পর্যায়ে
এটি একটি মোক্ষম সময়; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে তার ঔপনিবেশিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ঘোষণা করেছে, কিন্তু জনগণকে এটি মেনে নিতে দেয়া যাবে না।
আমাদের সম্মিলিত কর্তব্য হলো আমাদের আওয়াজ তোলা, এই প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করা এবং স্পষ্ট করে বলা যে গাজা ফিলিস্তিনের জনগণের!
উম্মাহর রাজনৈতিক ঐক্যের মধ্যেই সমাধান নিহিত
আমরা প্রতিটি সমাধান প্রত্যক্ষ করেছি, এবং একটি প্রকল্প ছাড়া সব প্রকল্প উম্মাহর জন্য ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের খেলাফতের প্রত্যাবর্তনকে আমাদের সত্যিকারের সমাধানের প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
আল্লাহর প্রতিশ্রুতি থেকে আমাদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া উচিত নয়। আমাদের অবশ্যই প্রকাশ্যে এবং সাহসের সাথে আমাদের ঢাল – খেলাফত – ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানাতে হবে যা নিশ্চিত করবে যে কোনও মুসলিম ভূমি দখল হয়ে থাকবে না।
শুধুমাত্র উম্মাহর ঐক্য এবং খেলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই আমরা নিশ্চিত করতে পারি যে গাজা এবং সমস্ত মুসলিম ভূমি ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত থাকবে।
উম্মাহ শক্তিহীন নয়। ইতিহাস দেখিয়েছে যে যখন জনগণ উত্থিত হয়, তখন সাম্রাজ্যের পতন হয়।
ন্যায়বিচারের পক্ষে, ফিলিস্তিনের পক্ষে এবং নিপীড়িতদের মর্যাদার পক্ষে দাঁড়ান। গাজা বিক্রির জন্য নয়।
প্রবন্ধটি ইংরেজি থেকে ভাবানুবাদ ও ঈষৎ পরিমার্জিত করা হয়েছে
ডোনাল্ড ট্রাম্প কি সত্যিই গাজার দখল নিতে চলেছে?

মার্কিন রাষ্ট্রপতি তার অদ্ভুত বক্তব্যের জন্য পরিচিত, কিন্তু এই ধরনের মন্তব্যের চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে তা এখনো দেখার বাকি আছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাষ্ট্রপতিত্বের একটি ভালো দিক আছে: সে যা আছে তা-ই বলে। এবং আমেরিকা যা ভাবে তা সে গোপন করে না।
কয়েক দশক ধরে, হ্যারি ট্রুম্যান, বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা, অথবা জো বাইডেন যে-ই হোক না কেন, আমরা ফিলিস্তিনিদের প্রতি “ন্যায়বিচার করার” কথা বলতে শুনেছি।
আমরা বারবার “ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র” তৈরির প্রতিশ্রুতি শুনেছি যা রাষ্ট্রের প্রকৃত অর্থে বাস্তবসম্মত নয়!
ট্রাম্প অবশ্যই তার ভেতরকার কথা বলে থাকে।
কিন্তু এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট এমনভাবে কথা বলে থাকে ঠিক যেভাবে আমেরিকা ভাবে তাদের ক্ষেত্রে হওয়া উচিত।
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে সে বলে,
“আমেরিকা গাজা উপত্যকা দখল করবে এবং আমরা এতে কাজও করব।
আমরা এর মালিক হব এবং এ অঞ্চলে থাকা সমস্ত বিপজ্জনক অবিস্ফোরিত বোমা এবং অন্যান্য অস্ত্র নিস্ক্রিয় করে ফেলার দায়িত্ব পালন করব।
অঞ্চলটি সমতল করব এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনগুলো সরিয়ে ফেলব। এমন অর্থনৈতিক উন্নয়ন তৈরি করব যা এলাকার মানুষের জন্য সীমাহীন সংখ্যক কর্মসংস্থান এবং আবাসন সরবরাহ করবে।
আমাদের এমন কিছু করার সুযোগ রয়েছে যা অসাধারণ হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের রিভেরা (আকর্ষনীয় উপকূল)। এটি দুর্দান্ত কিছু হতে পারে।”
যায়নবাদী রাষ্ট্র মূলত একটি ইউরোপীয় উপনিবেশ
আমরা যারা কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্য পর্যবেক্ষণ করেছি তারা ভালো করেই জানি যে ফিলিস্তিনের ইহুদিবাদী দখলদারিত্ব মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী একটি উপনিবেশ ছাড়া আর কিছুই নয়।
প্রকৃতপক্ষে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশরা মূলত এই দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল।
কিন্তু এখন, ৭৫ বছরেরও বেশি সময় পর এই প্রথম ট্রাম্প প্রস্তাব করছে যে ফিলিস্তিনের অংশ, অর্থাৎ গাজা উপত্যকা, সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশভুক্ত করা উচিত।
এই বিষয়ে প্রতিটি সচেতন মহল – তা সে ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের মতো ইসরাইলপন্থী পশ্চিমা সরকার হোক কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দালাল রাষ্ট্র হোক – এই প্রস্তাবের নিন্দা করেছে।
তারা সকলেই জানে যে এটি অকার্যকর প্রস্তাব।
মধ্যপ্রাচ্যের দালাল রাষ্ট্রগুলোও নড়েচড়ে উঠেছে
মধ্যপ্রাচ্যের দালাল রাষ্ট্রগুলো – উপসাগরীয় ও আশেপাশের সরকারসমূহ, যেমন মিশরের সিসির শাসন – নিঃসন্দেহে তাদের সেরা সময়েও বিপজ্জনকভাবে ভঙ্গুর।
যদি তারা গাজার জাতিগত নির্মূল এবং সরাসরি মার্কিন দখলদারিত্ব মেনে নেয়, সেইসাথে লক্ষ লক্ষ শরণার্থী তাদের দেশে প্রবেশ করে, তবে তারা নিশ্চিতভাবে জানে যে এর ফলে যে ভিন্নমত এবং অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে তা তাদের নিজস্ব অবস্থানের জন্য হুমকিস্বরূপ হবে।
ট্রাম্পের চিন্তা প্রক্রিয়া বোঝা
একটি সম্ভাব্য কারণ
তাহলে উপরের কথা অনুযায়ী এই প্রশ্ন উঠে, ট্রাম্প কেন এই প্রস্তাব দিচ্ছে?
এর একটা কারণ হতে পারে যে, ট্রাম্পের ব্যবসা করার ধরণই এটি। সে এমন একজন ব্যবসায়ী যে সে যা কিনতে চায় তা এত কম দামে কিনতে চায় এবং তার জন্য দর কষাকষি শুরু করে যে, এটি বিক্রেতার জন্য অপমানজনক হয়!
কিন্তু একই সাথে সে এমন একজন ব্যবসায়ীও যার পেছনে শক্তি (muscle) আছে।
সে বাজারের সেই সওদাগরদের মতো যে কৃষকদেরকে দিয়ে একেবারেই কম দামে সবজি বিক্রি করাতে পারে, এমনকি যদি তাদের দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিও থাকে… কারণ তাদের কাছে তা করার মতো আর্থিক শক্তি আছে।
এবং আন্তর্জাতিক ময়দানে ট্রাম্পের ঠিক এটাই কর্মপদ্ধতি।
সে আমেরিকার পক্ষে এতটাই দৃঢ়ভাবে এজেন্ডা স্থাপন করে যে এটি যে কোনও বহিরাগত পর্যবেক্ষকের কাছে অযৌক্তিক বলে মনে হবে।
কিন্তু ফলাফল হল হয় সে যা চায় তা পায়, অথবা সে যা চায় তার একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পায়, এমনকি যদি তাকে তার দর কষাকষির অবস্থানের সাথে আপস করতে বাধ্যও করা হয়।
এবং এটি কেবল এই কারণে যে সে একটি হাস্যকর জায়গা থেকে তার দর কষাকষি শুরু করেছিল।
আরেকটি ব্যাখ্যা?
আরেকটি সম্ভাবনা হল, ট্রাম্প সত্যিই মনে করে যে ইহুদিবাদী আক্রমণে গাজা এতটাই ধ্বংসপ্রাপ্ত যে কেউই এমন অঞ্চলে থাকতে চাইবে না।
যদি তাই হয় (এবং আমার সন্দেহ আছে যে তা সত্য), তাহলে ট্রাম্প ফিলিস্তিনের জনগণ এবং গাজার জনগণকে চেনে না।
এই জনগোষ্ঠীকে ১৯৪৮ সালে এবং তার আগে তাদের বাড়িঘর থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল এবং অনেকেই পশ্চিম তীর, গাজা এবং লেবাননের শরণার্থী শিবিরে অথবা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য স্থানে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করে আসছেন।
ফিলিস্তিনি জনগণ তাদের নতুন জীবনযাত্রাকে “সুন্দর” বলে মনে করে না। তাই, তারা তার সাথে একমত হবে না, এবং তারা আশা করবে না যে গাজা থেকে স্থানান্তরের তার প্রতিশ্রুতি আজ পর্যন্ত তাদের অভিজ্ঞতার চেয়ে ভালো কিছু হবে।
ট্রাম্প বোকা না; সে মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে সরাসরি ভালোভাবে অবগত নাও হতে পারে, তবে সে নিজেকে এমন উপদেষ্টাদের সাথে ঘিরে রাখবে যারা বিষয়গুলো জানে এবং বুঝবে যে তার প্রস্তাবগুলি ইহুদিবাদী দখলদারদের বাদে অঞ্চলের যেকোনো গোষ্ঠীর কাছেই অগ্রহণযোগ্য হতে পারে।
তৃতীয় সম্ভাব্য ব্যাখ্যা
তৃতীয় সম্ভাবনা হলো, তার এবং যুক্তরাষ্ট্রের অহংকারের কারণে, সে সত্যিকার অর্থেই বিশ্বাস করে যে দেশটির এমন ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব রয়েছে যে এই অঞ্চলে একে একটি সৎ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখা যায়।
সে এমনকি এও বিশ্বাস করতে পারে যে গাজা পুনর্নির্মাণ করে এবং মিশর ও জর্ডানকে শরণার্থীদের গ্রহণে উৎসাহিত করে আমেরিকা এই অঞ্চলে শান্তি আনতে পারবে, একই সাথে উপসাগরীয় দেশগুলোকে স্থানান্তরের জন্য অর্থায়নের জন্য চাপ দিতে হবে যাতে তারা কোনোরকম ভালো পরিস্থিতিতে (সেখানে) বসবাস করতে পারে।
এই স্তরের অহংকার ও দম্ভ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বিপর্যয়ের বীজ বপন ছাড়া আর কিছু হিসাবে দেখা কঠিন।
এটি অহংকারের এমন এক পর্যায় যা ইরাক যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে “স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র” আনতে চলেছে অথবা এটিকে স্বাগত জানানো হবে, এই ধারণার চেয়েও বড়!
যায়নবাদী শাসনের প্রতি পশ্চিমাদের সমর্থন
গত ১৫ মাস ধরে, গণহত্যা, ফিলিস্তিনের জাতিগত নির্মূল এবং অকথিত যুদ্ধাপরাধের সমর্থনে আমরা পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিটি পবিত্র মূল্যবোধ (sacred cow)-কে তাদের নিজস্ব হাতে জবাই করতে দেখেছি।
আমরা দেখেছি যে পশ্চিমা নেতারা রাজনৈতিকভাবে এটিকে সমর্থন করেছে এবং সামরিকভাবে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের জন্য ইহুদিবাদী দখলদারদের অস্ত্র সরবরাহ করেছে। এই নতুন প্রস্তাব একই দিকের কেবল আরেকটি পদক্ষেপ।
ট্রাম্প বিশ্বের অন্য অংশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দখলকে ন্যায্যতা দিচ্ছে, কারণ সে মনে করে আমেরিকা পারবে!
উপসংহার
আমার বিশ্বাস, হয় ট্রাম্প এই পরিকল্পনা থেকে সরে আসবে এবং কম কিছু পাবার জন্য আপস করবে – যদিও সেটাও নিঃসন্দেহে ফিলিস্তিনিদের জন্য ক্ষতিকর হবে – অথবা যদি সে এগিয়ে যায়, তাহলে সে ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধের চেয়েও অঞ্চলটিকে বেশি অস্থিতিশীল করবে।
এবং যদি অঞ্চলটি অস্থিতিশীল হয়, তাহলে সে সেই দিনের জন্য অনুশোচনা করতে পারে যেদিন সে মধ্যপ্রাচ্যে ভঙ্গুর শাসনব্যবস্থার পতনের সূচনা করেছিল, যারা কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলের জনগণের স্বার্থের চেয়ে তাদের নিজস্ব এবং পশ্চিমা স্বার্থ সুরক্ষিত করে আসছে।
প্রকৃতপক্ষে, এটিই হতে পারে ফিলিস্তিনের মুক্তি এবং এই অঞ্চলে আরও উন্নততর শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার দিকে প্রথম পদক্ষেপ, যা সকল মানুষের জন্য শান্তি, ন্যায়বিচার এবং নিরাপত্তা বয়ে আনবে।
কেবলমাত্র ইসলামী শাসনের ইতিহাসেই মুসলিম, ইহুদি এবং খ্রিস্টানরা যে কোনও উল্লেখযোগ্য সময়ের জন্য শান্তি ও ন্যায়বিচারের সাথে বসবাস করতে পেরেছে এবং করেছে।
আমরা দু’আ করি যে আমরা সেই সময়টি আবারও পুনরুদ্ধার হতে দেখতে পাব!
গাজার মুসলিমদেরকে বাস্তুচ্যুত করার ট্রাম্পের নীতিকে প্রত্যাখ্যান করা মুসলিমদের ঈমানি দায়িত্ব

দীর্ঘ ১৫ মাসের ধংসযজ্ঞের পর গত ১৫ জানুয়ারী ইসরাঈল ও হামাস এর মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয় এবং গত ১৯ জানুয়ারী হতে তা কার্যকর হতে শুরু হয়েছে যা এখনো চলমান। আমরা জানি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর নেতৃত্বে তার ক্ষমতায় আসার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে দেখা যাচ্ছে, যা থেকে পরিস্কারভাবে বোঝা যায় যে মার্কিনিরা ইচ্ছাকৃতভাবেই এ যুদ্ধ এতদিন জিইয়ে রেখেছিল, আরো অনেক পুর্বেই ধ্বংস ও গণহত্যা বন্ধ করা সম্ভব ছিল।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেছে, তারা তথা যুক্তরাষ্ট্র গাজা উপত্যকা দখল করবে, সেটির মালিক হবে এবং গাজাকে পুনঃনির্মান করবে। এই লক্ষ্যে সে জর্ডান ও মিশরকে গাজার মুসলিমদেরকে ভাগ করে নেয়ার জন্য প্রস্তাব করে এবং বলে তারা তা করতে বাধ্য হবে। ট্রাম্পের এই ঘোষণা তখন আসলো, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল যুদ্ধ ও গণহত্যার মাধ্যমে গাজার মুসলিমদের মনোবলকে পরাজিত করতে পারে নাই। টানা ১৫ মাস ধরে ইসরায়েলি বোমা হামলায় হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলসহ গাজার ৬০ শতাংশের বেশি অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরও গাজার মুসলিমরা তাদের বরকতময় ভূমিতে ফেরত আসতে শুরু করেছে। ট্রাম্প এবং তার অনুসারীরা, যখন গাজার বাস্তুচ্যুত মানুষদের দক্ষিণ থেকে ধ্বংসপ্রাপ্ত উত্তরে ফিরে আসার দৃশ্য দেখছেন, তাদের হৃদয় ও মনে তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য একটি অদম্য সংকল্প বহন করছেন, তখন তাদের বুঝতে হবে যে গাজার মানুষ তাদের ভূমিতে পাহাড়ের মতোই দৃঢ় এবং গাজা থেকে তাদের উচ্ছেদ করার জন্য ট্রাম্পের বক্তব্য বা পরিকল্পনা তাদের ভূমি এবং তাদের বিশ্বাসের উপর তাদের দৃঢ়তা এবং অধ্যবসায়ের পাথরে ভেঙে পড়বে। মুসলিম উম্মাহর অংশ এই গাজাবাসী তাদের সর্বোচ্চ ত্যাগ করেও পবিত্র ভূমি ও মুসলিমদের প্রথম কেবলা আল-আকসাকে তারা ঘিরে আছে। রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “আল-শাম কত বরকতময়! সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেন এটা?’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আমি আল্লাহর ফেরেশতাদেরকে আল-শামের উপর তাদের ডানা ছড়িয়ে দিতে দেখছি।’ ইবনে আব্বাস আরও বলেন, ‘আর নবীগণ সেখানে বসবাস করতেন। আল-কুদসে (জেরুজালেমে) এমন একটি ইঞ্চিও নেই যেখানে কোন নবী সালাত আদায় করেননি বা কোন ফেরেশতা দাঁড়াননি।“ (তিরমিযী, আহমদ)।
সুতরাং, যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও এ থেকে ভাবার কোনো অবকাশ নেই যে ট্রাম্প এর পলিসি মুসলিমদের পক্ষে যাবে। বরং ট্রাম্প এর নতুন পলিসি যেখানে সে গাজাকে আমেরিকান নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসতে চাইছে, গাজাবাসীদের আশেপাশের দেশগুলোতে পাঠিয়ে দিতে চাচ্ছে। যেখানে দীর্ঘ যুদ্ধের পর ক্লান্ত পরিশ্রান্ত গাজাবাসী তাদের অঞ্চলে ফিরে আসতে চাইছে, তখন এ ধরণের পলিসি বাস্তবায়নের কথা থেকে বোঝা যায় মার্কিনিরা ফিলিস্তিনের দুঃখ-কষ্টের ব্যপারে কতটা নির্বিকার!!
আমরা জানি গত প্রায় এক যুগ ধরে বিভিন্ন মেয়াদে ইসরাঈলের কারাগারে বন্দী হয়ে আছে অসংখ্য গাজাবাসি ও ফিলিস্তিনি মুসলিম। এসব কারাগারে দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতন ও অনাহারে থাকা বন্দীগণ মুক্তির কোনো আশা ছিল না। এছাড়াও যারা খোলা আকাশের নিচের গাজা নামক কারাগারে বন্দী জনগণ, তারাও নিত্যনৈমিত্তিকভাবে হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে। এবং এই সিলসিলা গত ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন মাত্রায় ভোগ করে আসছে ফিলিস্তিনিরা। সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিকামী গাজাবাসিরা এই যুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল এবং ইসরাঈলকে দেখিয়ে দিয়েছিল যে তাদের প্রতিরোধের মনোবল এখনও ভেঙে পড়েনি, ঠিক তখনই ইসরাঈল নামক বর্বর অবৈধ রাষ্ট্রটি গাজার মুসলিমদের উপর ইতিহাসের বর্বরোচিত গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো শুরু করে। ১৫ মাসের সেই যুদ্ধ যা আমরা তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে লাইভ দেখতে পেয়েছি, তাতে প্রায় ৭০ হাজারের মতো মানুষ ইতোমধ্যে প্রাণ হারিয়েছে, যার একটি বড় অংশ ছিল শিশু। এছাড়া আরো অসংখ্যা লাশ যা ধ্বংসস্তুপের মধ্যে চাপা পড়ে থাকার কারণে এখনো গণনার বাইরে রয়েছে। এছাড়াও লক্ষাধিক মানুষ হতাহত হয়েছে কারো হাত চলে গিয়েছে, কারো পা চলে গিয়েছে, কারো চক্ষু চলে গিয়েছে, সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গিয়েছে অসংখ্য মানুষ। গাজা শহরের প্রায় পুরোটাই একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে হাসপাতাল থেকে শুরু করে, স্কুল থেকে শুরু করে কোন স্থাপনা কেই আর বাকি রাখা হয়নি ধ্বংস করার ব্যাপারে। উত্তর গাজার ৯০ শতাংশ মানুষ আজ ঘর ছাড়া অবস্থায় রয়েছে। এমনকি মুসলিম বিশ্ব থেকে আগত ত্রাণের গাড়িগুলোকেও ঠিকমতো ঢুকতে দেয়া হয়নি এই অবৈধ রাষ্ট্রের কারণে। দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমাদের ক্রমাগত মাসের পর মাস ধরে এ গণহত্যা দেখে যেতে হয়েছে।
আর এখন যখন যুদ্ধবিরতির কারণে গাজাবাসী তাদের ঘরে ফিরতে শুরু করেছে, তাদের নির্যাতিত বন্দীদের অনেকে যখন ফিরে আসতে শুরু করেছে – যারা অনেকেই ফিরে তাদের আপনজনদের আর জীবিত খুঁজে পাচ্ছেন না – অনাহারে অর্ধাহারে লক্ষাধিক গাজাবাসী যখন তাদের অঞ্চলে ফিরে তাদের জীবন পুনর্গঠন করার কথা চিন্তা করছেন, ঠিক সেই সময়ে মার্কিনিরা তাদের গাজা ত্যাগ করে চলে যেতে বলছে এবং গাজা দখল করে নেওয়ার কথা বলছে!!
আমাদের মনে রাখা উচিত, এই ডোনাল্ড ট্রাম্প, যারা মেয়ে একজন ধর্মান্তরিত ইহুদী, যার জামাতা একজন ইহুদী, যেই জামাতা ‘জ্যারেড কুশনার’কে দিয়ে তার ক্ষমতার গত টার্মে সে মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের “শতাব্দির শ্রেষ্ঠ চুক্তি” তথা “ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি” নামক একটি প্রজেক্ট বাস্তবায়নের আহ্বান দিয়েছিল যেখানে সে মাত্র ১৫ শতাংশ ভুমি ফিলিস্তিনিদের দিয়ে বাকি ৮৫ শতাংশ ইসরাঈলীদের হাতে তুলে দেওয়ার একটি মাল্টি বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব দিয়েছিল। যে প্রজেক্ট বাস্তবায়ন হলে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বলে কিছুই থাকবে না, তারা একটি করদ রাজ্যে পরিনত হবে। জি ভাইয়েরা, এটাই পশ্চিমাদের তথাকথিত “টু স্টেট সলুশ্যন” তথা “দ্বি-জাতি সমাধান”, যেখানে আসলে থাকবে একটিই রাষ্ট্র যা হচ্ছে পশ্চিমাদের অনুগত অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল, যা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী রাজনৈতিক ও সামরিক ঘাঁটি হিসেবে কাজ করে।
১৯৪৮ সালে পশ্চিমাদের মাধ্যমের মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম ভূমির বুকে এই অবৈধ ইহুদি রাষ্ট্রটির জন্ম হয়। লক্ষাধিক মানুষকে হারাতে হয় তাদের ভিটামাটি এবং আশ্রয় নিতে হয় পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের রেফিউজি ক্যাম্পে। মুসলিমদের কাছ থেকে তাদের ইসলামি ভূমিকে জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে এরপর পশ্চিমারা তাদেরই গৃহপালিত সংস্থা জাতিসংঘকে ব্যবহার করে এ রাষ্ট্রটিকে বৈধতা দেয়। তখন থেকে এখন পর্যন্ত ভাবে কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই একের পর এক আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমাদের এই জারজ সন্তান। পশ্চিমা সাম্রোজ্যবাদী শক্তি সমূহ ক্রমাগতভাবে এই রাষ্ট্রকে মদদ জুগিয়ে গিয়েছে যুগের পর যুগ ধরে অর্থনৈতিক ভাবে সামরিক ভাবে, কূটনৈতিক ভাবে।
প্রিয় মুসলিমগণ! যেখানে ফিলিস্তিন ভূমি সামরিকভাবে শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্র দ্বারা পরিবেষ্টিত, আমরা পৃথিবীতে দুইশত কোটি মুসলিম জীবিত আছি, মুসলিমদের সামরিক বাহিনীর কয়েক কোটি সদস্য রয়েছে, সেখানে ট্রাম্প এই দুঃসাহস কীভাবে দেখাচ্ছে? কারণ সে জানে বর্তমান মুসলিম শাসকরা পশ্চিমাদের দালাল, তারা মুসলিমদেরকে জাতীয়তার ভিত্তিতে ভাগ করে রেখেছে এবং মুসলিম সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে আবদ্ধ করে রেখেছে। এসব দালাল গোষ্ঠী প্রকাশ্যে নিন্দা জানালেও মার্কিন নীতি বাস্তবায়নে তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অথচ আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“নিশ্চয়ই মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই” [সূরা হুজুরাত: ১০]।
আমরা এও দেখছি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিরা তাদের অর্থায়ন এবং তাদের অস্ত্র যোগানের মাধ্যমে এই গণহত্যার প্রক্রিয়াকে ক্রমাগত সাহায্য করে চলছে। এমনকি তাদের নিজেদের নির্বাচনের ক্ষেত্রেও কে কত বেশি এই গণহত্যার সমর্থনকারী সেটাকে ব্যবহার করে তাদের নির্বাচনে জেতার চেষ্টা করতে দেখেছি। সুতরাং তাদের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ডেমোক্রেট বলেন কিংবা রিপাবলিকান উভয়ই এই অবৈধ রাষ্ট্রের পক্ষে এবং মুসলিমদের স্বার্থের বিরুদ্ধে রয়েছে। যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ছিল তখন আমরা দেখেছি সে জোরপূর্বক জেরুজালেমকে এই অবৈধ রাষ্ট্রের রাজধানী ঘোষণা করে। এরপর বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর সে নগ্ন ভাবে এই অবৈধ রাষ্ট্র কে সাহায্য করার জন্য প্রতিশ্রুত বদ্ধ হয়। এই সেই বাইডেন যে একসময় বলেছিল, যদি ইসরাইল নামক কোন রাষ্ট্র না থাকতো তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ইসরাইল নামক রাষ্ট্র তৈরি করতে হতো। ভাইয়েরা, এ যেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কুরআনে বর্ণিত বক্তব্যের বাস্তব রূপ যেখানে তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
<< ইহুদি ও খ্রিস্টানদের তোমরা বন্ধু রূপে গ্রহণ করো না, তারা একে অপরের বন্ধু >>
মুসলিম বিশ্ব আজকে ৫৮ টির মত টুকরো ভাগ হয়ে আছে আমাদের এই বিভাজনের কারণে এবং আমাদের ঐক্যের অভাবের কারণে আজকে মুসলিম বিশ্ব অভিভাবকহীন। মুসলিম বিশ্বের শাসকরা কেবলমাত্র কিছু চটকদার বুলি, মায়া কান্না এবং নিন্দা প্রস্তাব ছাড়া ফিলিস্তিনের জন্য কিছুই করতে পারে না। ইদানিং তারা সেটাও তেমন করছে না। তাদের ফাঁপা বুলি এবং স্বল্প মেয়াদের ত্রাণ সহায়তা ফিলিস্তিনের জনগণের মুক্তির ক্ষেত্রে কোন কাজেই আসেনা। অথচ মুসলিম বিশ্বের রয়েছে প্রায় ৬০ লক্ষ প্রশিক্ষিত সেনা সদস্য। এরপরও এসব শাসকগোষ্ঠী কেবলমাত্র তোতা পাখির মত পশ্চিমাদের তৈরি করা “টু স্টেট সলিউশন”, “ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি” কিংবা “রিভেরিয়া অব মিডল ইস্ট” এর সমাধান আওড়ে চলছে। এই তথাকথিত সমাধান, যার কথা তারা বলে, তা যদি আদৌ বাস্তবায়িত হয়, সেক্ষেত্রে না থাকবে ফিলিস্তিনের কোন সার্বভৌমত্ব, না থাকবে তাদের কোন নিরাপত্তা। ফিলিস্তিন অবৈধ ইহুদী রাষ্ট্রের একটি করদরাজ্যে পরিণত হবে, গোলামে পরিণত হবে। ভাইয়েরা আমরা দেখতে পাচ্ছি এই অবৈধ ইহুদী রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কোন দিকে আগাচ্ছে, তারা একটি বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করতে চায় মধ্যপ্রাচ্যে। সেজন্য এখন তারা আমাদের পার্শ্ববর্তী আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র ভারতকেও তাদের সঙ্গে নিয়েছে। সেই ভারত, যারা ফিলিস্তিনের হত্যার প্রতিবাদে নিন্দা প্রস্তাব আসলে, সেখানে সাক্ষর করে না। যারা আমাদের বন্যার পানিতে ডুবিয়ে মারে, যারা সীমান্তে ক্রমাগত পাখির মত গুলি করে আমাদের জনগণকে হত্যা করে, সেই শক্তিকে আজকে ইহুদিরা তাদের দেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে মুসলিমদেরকে হত্যা করার জন্য সুযোগ করে দিচ্ছে। আমরা বিভিন্ন সূত্রে জানতে পারছি, ভারতের সেনা সদস্যরা এই অবৈধ রাষ্ট্রে গিয়ে “শুধুমাত্র আনন্দ লাভ করার জন্য” মুসলিমদের হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে, যেমনটি তারা গত জুলাই মাসে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে এ দেশের সাধারণ মানুষকে জুলুমের প্রতিবাদ জানানোর কারণে নৃশংসভাবে বিভিন্ন জায়গায় হত্যা করে। এই সেই ভারত, যেই ভারতের হিন্দুত্ববাদী শক্তির প্রচারক রামগিরি মহারাজ কিছুদিন পুর্বেই আল্লাহর নবীকে অপমান করার স্পর্ধা দেখিয়েছিল এবং বিজেপির নেতা নিতেশ রানে তা সমর্থন করেছিল। যে অপমানের কারণে ভারতের মুসলিম জনতা জেগে উঠেছিল। এই সেই ভারত যেখানে বসে খুনী হাসিনা বাংলাদেশে ধ্বংস চালানোর জন্য উসকানীমূলক বক্তব্য দেয়। এসব কিছু হচ্ছে কারণ আজ মুসলিমরা অভিভাবকহীন এবং মুসলিমরা বিশ্বে বিভক্ত হয়ে আছে এবং এই সুযোগে ইহুদীবাদী শক্তি এবং হিন্দুত্ববাদী শক্তি পশ্চিমা মদদপুষ্ট হয়ে আজ জোট বেঁধেছে মুসলিমদের বিরুদ্ধে। ভাইয়েরা, এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের বলে গিয়েছেন,
<< ঈমানদারদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি শত্রুভাবাপন্ন হিসেবে আপনি যাদেরকে দেখতে পাবেন তারা হচ্ছে ইয়াহুদী এবং মুশরিকগণ >>
প্রিয় মুসলিমগণ! আপনারা প্রত্যক্ষ করেছেন, আমাদের দেশের একশ্রেণীর রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবিরা একটি উপনিবেশবাদি শক্তি এবং মুসলিমদের শত্রু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহন করেছে। যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য কামনা করে, যারা প্রেসিডেন্টের দাওয়াত পেলে গর্ববোধ করে তাদের কাছ থেকে আমরা কী আশা করতে পারি? আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইয়াহূদী ও খৃষ্টানদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না, তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে কেউ তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। আল্লাহ যালিমদেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না। [সূরা আল-মায়িদা: ৫১]। তাই ই*হু*দি*দের মদদ দাতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ত্যাগ করা এবং এদেশের মার্কিন দালাল গোষ্ঠীকে প্রত্যাখ্যান করা মুসলিমদের জন্য ইমানি দায়িত্ব।
হে মুসলিমগণ, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইমাম (খলিফা) হচ্ছেন ঢাল স্বরূপ, যার অধীনে তোমরা যুদ্ধ করো এবং নিজেদের রক্ষা করো” [হাদিস: মুসনাদ আহমদ]। মুসলিমদের একমাত্র অভিভাবক হচ্ছেন খলিফা। আজকে এই অভিভাবকের অনুপস্থিতিরে কারণে বিশ্বব্যাপী মুসলিমরা নির্যাতিত। এই বিষয়টি এখন প্রকাশ্য দিবালোকের মত পরিষ্কার। তাই আমাদের মুসলিম উম্মাহর প্রকৃত অভিভাবক-খিলাফত প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক বন্দোবস্তকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে, অন্যথায় বিচার দিবসে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। নবুয়্যতের আদলে প্রতিষ্ঠিত খিলাফত রাষ্ট্র মুসলিম উম্মাহ এবং তার সামরিক বাহিনীকে ঐক্যবদ্ধ করবে। ফলে খিলাফতের অধীনে মুসলিম সামরিক বাহিনীর গর্জনই মুসলিম উম্মাহর উপর সকল যুলুম বন্ধ করতে সক্ষম।
সম্মানিত মুসল্লিগন, আমরা জানি ইতিহাসের পাতা খুললে আমরা দেখতে পাই এই ফিলিস্তিন এক সময় ক্রুসেডারদের কর্তৃক দখল হয়েছিল। সে সময় মুসলিম বিশ্ব বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সালাহউদ্দিন আইয়ুবী মুসলিম বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতা ও সমরনায়ক সেসময় মুসলিম জাহানকে ঐক্যবদ্ধ করে, মুসলিম সেনাবাহিনীকে ঐক্যবদ্ধ করে ফিলিস্তিনকে সেই দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করেছিল। ঠিক একইভাবে বর্তমানেও যদি আমরা মুসলিম বিশ্বকে পশ্চিমাদের দখলদারিত্ব হতে মুক্ত করতে চাই ইহুদীবাদ হতে মুক্ত হতে চাই হিন্দুত্ববাদ হতে মুক্ত হতে চাই আধিপত্যবাদ হতে মুক্ত হতে চাই তাহলে আবার আমাদেরকে মুসলিম বিশ্বকে খিলাফতের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।
সুতরাং আমাদের এই ঐক্যের জন্য এই খিলাফত ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনার জন্য আল্লাহর রাসূলের দেখানো কর্ম পদ্ধতি অনুযায়ী বুদ্ধিভিত্তিক ও রাজনৈতিকভাবে আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। আমাদের মাঝে কিংবা আমাদের পরিচিতের মধ্যে সালাউদ্দিন আইউবির উত্তরসূরি সামরিক বাহিনিতে কর্মরত নিষ্ঠাবান অফিসারগন যারা রয়েছেন তাদের স্মরণ করা উচিত, জেরুজালেমকে মুক্ত করতে সালাউদ্দিন আইয়ুবই কীভাবে তার বাধাসমূহ অপসারণ করেছিলেন। আমাদের সামনে বাধা হচ্ছে, বর্তমান দালাল শাসকগোষ্ঠী এবং ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। তাই দালাল গোষ্ঠীদেরকে প্রত্যাখ্যান করে আমাদের খিলাফত প্রতিষ্ঠায় অগ্রগামী হতে হবে। আমরা জানি, যখন মদিনায় সা’দ বিন মোয়াজের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনী কাফির নেতা আবু-ওবায়দা থেকে সমর্থন ও পাহারা প্রত্যাহার করে রাসুলুল্লাহ (সা) কে প্রটোকল দিয়েছিলেন, তখন ক্ষমতাহীন আবু-ওবায়দা টের পেয়ে সাধারণ দর্শকে পরিণত হয়েছিল। এছাড়া দেশের সর্বোস্তরের জনগণ বর্তমান দালালদের সার্কাসে অতিষ্ট। ইসলামের বিজয়ে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হবে এবং তাকবীর ধ্বনিতে তা উৎযাপন করবে। এই লক্ষ্য অর্জনে আমাদের উপনিবেশবাদি শক্তি কিংবা হিন্দুত্ববাদি রাষ্ট্র ভারতকে ভয় করার কোন কারণ নাই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণভাবে ভঙ্গুর ও আদর্শিকভাবে বিশ্বে দেউলিয়া, আর তারা দালাল গোষ্ঠীকে (হাসিনা গং) ছাড়া ভারত কতটা অক্ষম। আপনাদেরকে আরও স্মরণ রাখতে হবে, আমরা যখন অগ্রগামী হব আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আমাদের সাহায্য করবেন।
“নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে ও মু’মিনদেরকে সাহায্য করব পার্থিব জীবনে এবং যেদিন (বিচার দিবসে) সাক্ষীগণ দন্ডায়মান হবে” [সূরা গাফির: ৫১] ।
বিভিন্ন চড়াই উতরাই পার হয়ে আজ আল্লাহর রহমতে খিলাফতের আহবান সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। এই আহবান কে আরো বুলন্দ করবার জন্য, আরও বেশি ছড়িয়ে দেবার জন্য আমাদের আরও সচেষ্ট হতে হবে এবং আল্লাহর কাছে আমাদের ক্রমাগত দোয়া করতে হবে যাতে আল্লাহ আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তৌফিক দান করেন এবং আমরা যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুসলিম উম্মাহকে এই সমস্যাগুলো থেকে মুক্ত করতে পারি ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ সুবহান ওয়া তা’আলা বলেন,
<< হে ঈমানদারগণ তোমরা যদি আল্লাহকে সাহায্য করো তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবে এবং তোমাদের পা গুলোকে শক্তিশালী করবেন >>
একই সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম আমাদেরকে ভবিষ্যৎবাণী করেছেন,
জুলুমের শাসনের পর আবার ফিরে আসবে খিলাফত, নবুয়তের আদলে। [মুসনাদ আহমাদ]
ইসকন-সহ সকল উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধকরণ: আইনী প্রেক্ষিত

ইসকন-সহ সকল উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধকরণ: আইনী প্রেক্ষিত
আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ, ইংরেজিতে International Society for Krishna Consciousness, সংক্ষেপে ISKCON/ইসকন-এর কার্যক্রম বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ছাত্র-শ্রমিক-জনতার গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে বিভিন্ন নামে কিছু উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন যেভাবে বিদ্বেষমূলক ও সহিংস কর্মকাণ্ড করে বেড়াচ্ছে, তাতে জনমনে ইসকনসহ অন্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষত গত সপ্তাহে চট্টগ্রাম কোর্টে ইসকন সমর্থকদের সন্ত্রাসী হামলা ও ভাঙচুর এবং তরুণ আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ-কে হত্যার ঘটনায় দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ইসকন-কে নিষিদ্ধ করার দাবি জোরালো হয়েছে।
“ইসকন বাংলাদেশ”-এর নেতৃবৃন্দ অবশ্য ইতোমধ্যে বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন, রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আসামি চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে ইসকন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। ফলে সংগঠনটির সঙ্গে বর্তমানে তার কোনো সম্পর্ক নেই। ফলে চিন্ময়ের কোনো কর্মকাণ্ডের দায় নেবে না ইসকন।
বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, ইসকনকে নিষিদ্ধ করার কোনো আলোচনা সরকারের মধ্যে হয়নি। …ব্যক্তির অপরাধের সঙ্গে সংস্থার অপরাধকে সরকার জড়িয়ে ফেলছে না।
বাংলাদেশে ইসকন বা অন্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো আসলে ঠিক কী ধরনের কর্মকাণ্ড করছে? তাদের কার্যক্রম কি রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক? তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার আইনগত ভিত্তি আছে কী? আজকের সেমিনারে আমরা এই প্রশ্নগুলোরই জবাব দেওয়ার চেষ্টা করবো ইন-শা-আল্লাহ।
ইসকনের পরিচয়:
অফিসিয়ালি ইসকন (ISKCON) একটি আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, যা গৌড়ীয় বৈষ্ণব ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়। গৌড়ীয় বৈষ্ণব ঐতিহ্য হলো বৈষ্ণবধর্মের একটি বিশেষ শাখা, যা পঞ্চদশ শতাব্দীতে শ্রী চৈতন্য কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়। “গৌড়ীয়” শব্দটি বঙ্গ বা গৌড় অঞ্চল (বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের কিছু অংশ) থেকে এসেছে, যা এই ঐতিহ্যের উৎসস্থান।
ইসকন ১৯৬৬ সালের ১৩ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন অভয়চরণ দে (১ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৬ – ১৪ নভেম্বর, ১৯৭৭) নামের ভারতের পশ্চিম বঙ্গের একজন হিন্দু ধর্মগুরু, যিনি সাংগঠনিকভাবে “স্বামী অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত প্রভুপাদ” নামে পরিচিত। তিনি গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধারার হিন্দু ছিলেন। অফিসিয়ালি ইসকনের প্রধান লক্ষ্য হলো শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তি, বৈষ্ণবধর্ম প্রচার ও সনাতন ধর্মের মূল আদর্শ প্রচার করা। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০০টিরও বেশি দেশে ইসকনের লক্ষাধিক অনুসারী রয়েছে এবং তারা সেসব দেশে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। ইসকনের প্রধান কার্যালয় ভারতের পশ্চিম বঙ্গের মায়াপুরে অবস্থিত।
ইসকনের বিবর্তন:
প্রতিষ্ঠার প্রথম চার দশক ধরে ইসকন একটি বৈষ্ণব ভাব-আন্দোলন হিসেবে পরিচালিত হয়। তবে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ার হামলার পর বিশ্ব পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়ায় সংগঠনটির কার্যক্রম ও উদ্দেশ্যে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। নাইন-ইলেভেনের পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত “ওয়ার অন টেরর”-এ গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র হিসেবে ভারত আবির্ভূত হয়। এই প্রেক্ষাপটে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক আরও মজবুত করতে “বিশ্ব হিন্দু পরিষদ আমেরিকা”-র উত্তরসূরি হিসেবে “হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশন” গঠিত হয়। [দেখুন: https://politicalresearch.org/2024/10/15/haf-way-supremacy] মূলত, এই ফাউন্ডেশনের লক্ষ্য ছিল ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করা। এরই ধারাবাহিকতায় ইসকনের মতো হিন্দু সংগঠনগুলোকেও যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থে সম্পৃক্ত করা হয়। [দেখুন: www.hinduamerican.org/press/caste-statement-iskcon-communications]
নাইন-ইলেভেন-পরবর্তী ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইসকন ভারতের জন্য “সফট পাওয়ার” হিসেবে কাজ করছে। ইসকনের সদস্য এবং সাবেক মার্কিন কংগ্রেস সদস্য তুলসি গ্যাবার্ড, যিনি মার্কিন কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম হিন্দু, ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে বহু কাজ করেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আসন্ন প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার পরিচালক হিসেবে মনোনীত তুলসি গ্যাবার্ড মার্কিন কংগ্রেসে তার কার্যকালীন সময়ে ভারত-মার্কিন কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে ইসকনের সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। [দেখুন: https://iskconnews.org/iskcon-pakistan-is-growing/] পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, ভারত বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে মদদ দিচ্ছে, এবং সেই অঞ্চলে ইসকনের কার্যক্রমকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা হয়।
বিশ্বব্যাপী, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রে, ইসকন ভারতের স্বার্থরক্ষার “সফট পাওয়ার” হিসেবে সফলতা অর্জন করেছে। ভারতের পর ইসকনের সর্বাধিক মন্দির ও ধর্মীয় কেন্দ্র রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং বাংলাদেশে। যেখানে ভারতের কৌশলগত স্বার্থ বেশি, সেই অঞ্চলগুলোতেই ইসকন সক্রিয়ভাবে কাজ করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় ইসকনের নেতারা হোয়াইট হাউজে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। [দেখুন: tinyurl.com/bdcvm6au]
ভারতের বিজেপি সরকার ও ইসকনের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। নরেন্দ্র মোদী ইসকনের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তার মতে, “ইসকন বিশ্বকে জানিয়েছে যে ভারতের জন্য ধর্ম মানে উদ্দীপনা, মানবতার প্রতি বিশ্বাস এবং উদ্যম।” [দেখুন: tinyurl.com/3ew6fkxr] ইসকনের কার্যক্রম ও নেতাদের বক্তব্য বিজেপি-আরএসএসের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতও ইসকনের মন্দিরে গিয়ে কর্মীদের দীক্ষা গ্রহণে উৎসাহ দেন এবং সংগঠনের প্রশংসা করেন। [দেখুন: tinyurl.com/3aa9xh86]
বাংলাদেশে ইসকন:
বাংলাদেশে ইসকনের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৮০-এর দশকে। তবে নাইন-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে এর কার্যক্রম ও সদস্যসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। ২০০৯ সালের দিকে বাংলাদেশে ইসকনের মন্দির সংখ্যা ছিল ৩৫টি। শেখ হাসিনার সরকার (২০০৯-২০২৪) আমলে এই সংখ্যা বেড়ে ১০০টির বেশি হয়েছে। বর্তমানে ইসকনের মন্দির ও ধর্মীয় কেন্দ্রগুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর ও সিলেট বিভাগে বেশি সক্রিয়।
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল নিজেই ইসকনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। [দেখুন: www.youtube.com/watch?v=j8taQDKGQDY] তার মন্ত্রিত্বকালে বাংলাদেশের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তকে কিছু বিতর্কিত হিন্দুত্ববাদী বয়ান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফ্যাসিস্ট শাসনামলে প্রশাসন ও পুলিশের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তার ইসকনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার বিষয়টিও প্রকাশ্যে এসেছে।
ইসকনের কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক:
প্রাথমিকভাবে ইসকন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসকন নেতারা রাজনৈতিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়েছে। চট্টগ্রামের প্রবর্ত্তক সংঘের সাথে জমি নিয়ে বিরোধ এবং ইসকনের বিভিন্ন নেতার সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দেশটির ধর্মীয় সহাবস্থানের পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। ২০২১ সালের জুন মাসে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রবর্ত্তক সংঘের নেতারা ইসকনের বিরুদ্ধে অর্থ লোপাট ও বিদেশে পাচারেরও অভিযোগ করেন। প্রবর্ত্তক সংঘের সাধারণ সম্পাদক তিনকড়ি চক্রবর্তী সাংবাদিকদের বলেন, “ইসকনকে প্রবর্ত্তক সংঘ মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান করে। সেখানে মন্দির তৈরি করে তা পরিচালনা করবে ইসকন। কিন্তু এখন তারা চুক্তির সব শর্ত ভঙ্গ করে প্রবর্তক সংঘের জমি দখলসহ সন্ত্রাসী ও জঙ্গি তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে। ইসকন নামীয় জঙ্গিদের ক্রমবর্ধমান ভূমি আগ্রাসন চলছে। তারা প্রবর্ত্তক মন্দিরের নাম ব্যবহার করে ধর্মপ্রাণ ভক্তদের কাছ থেকে অনুদান সংগ্রহ করে অন্যত্র পাচার করছে। তারা মন্দিরে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের জড়ো করে তাদের জঙ্গি কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ করার চেষ্টা করছে। ইসকন জঙ্গিরা নিজেরা বড় ধরনের কোনো নাশকতামূলক ঘটনা ঘটিয়ে তা আমাদের নামে চালিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করছে বলেও আমরা জানতে পেরেছি। সনাতন ধর্মে জঙ্গিবাদের কোনো স্থান নেই। এরা ধর্মকে কলঙ্কিত করেছে। আমরা আগেই বলেছি এরা সাধুবেশে সন্ত্রাসী।” [দেখুন: tinyurl.com/4jvr43rd]
২০১৯ সালে সিলেট প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বিশ্বনাথ ইউনিটের ডেপুটি কমান্ডার ও বিশ্বনাথ উপজেলা আওয়ামী লীগের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক শ্রী রনজিত চন্দ্র ধর অভিযোগ করেছিলেন যে, আদালতের নির্দেশনার পরেও অন্যের মালিকানাধীন ভূমিকে দেবোত্তর সম্পত্তি দাবি করে সিলেট ইসকন কর্তৃপক্ষ ভূমি দখল নেওয়ার পায়তারা করছে। [দেখুন: tinyurl.com/3aj63hxt]
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের শ্রীশ্রী রশিক রায় জিউ মন্দিরের জমির দখল নিয়ে হিন্দুধর্মের মূলধারা ও ইসকন অনুসারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চলে আসছিল। ২০০৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রশিক রায় জিউ মন্দিরে দুর্গাপূজা নিয়ে অনুসারীদের সাথে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বড় ধরনের সংঘর্ষ হয়। এ সময় ইসকন ভক্তদের হামলায় ফুলবাবু নামের একজন সনাতন ধর্ম অনুসারী নিহত হন। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে উপজেলা প্রশাসন মন্দির সিলগালা করে কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব নেয়।
২০২০ সালের অক্টোবর মাসে ওই মন্দিরের দখল নিয়ে মূলধারার হিন্দুদের সাথে ইসকন অনুসারীদের আবারও ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দেয়। ফলে স্থানীয় প্রশাসন সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করতে বাধ্য হয়। [দেখুন: www.amadershomoy.com/bn/2020/10/21/1233688.html]
এভাবে বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশের মূল ধারার হিন্দুদের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়ার পর ইসকন তাদের কৌশল পরিবর্তন করে। ইসকন নেতারা নিত্য নতুন সাংগঠনিক নামের আড়ালে উগ্রবাদী রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে থাকেন। ইসকনের সাথে বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চের অন্যতম কেন্দ্রীয় মুখপাত্র হলেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী, যিনি চট্টগ্রামের ইসকন পুণ্ডরীক ধামের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চ-সহ আরও কিছু সংগঠনের ছদ্মাবরণে ইসকনই বাংলাদেশে ভারতের উগ্রবাদী সংগঠন আরএসএসের গেরুয়া পতাকা ব্যবহার করা শুরু করে। এদের সাম্প্রতিক মিছিল ও সমাবেশগুলোতে আরএসএসের গেরুয়া পতাকা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন, গত ৪ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে “বাংলাদেশ সম্মিলিত সংখ্যালঘু জোট“-এর নাম ব্যবহার করে আয়োজিত সমাবেশে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গেরুয়া পতাকা উড়ানো হয়। সেই সমাবেশে ইসকনের পুণ্ডরীক ধামের অধ্যক্ষ চিন্ময়কৃষ্ণ দাশ ব্রহ্মচারী বলেছিলেন, “আপনারা বলেছেন, এ দেশে সহিংসতা হচ্ছে না, রাজনৈতিক নিপীড়ন হচ্ছে। তাহলে দুর্গাপূজায় কেন মাদ্রাসার ছাত্রদের নামিয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন? এতেই প্রতীয়মান হয় এ দেশের সংখ্যালঘুরা কতটা অনিরাপদ।” প্রধান উপদেষ্টার ড. ইউনূসের উদ্দেশে চিন্ময়কৃষ্ণ বলেন, “পৃথিবীতে আপনি শান্তির বার্তা দিয়েছেন, শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা যদি নিরাপদ না থাকে, এ শান্তি স্থায়ীভাবে বিপন্ন হবে। এই দেশ সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। রাজনীতি আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপিত হবে।” [দেখুন: www.prothomalo.com/bangladesh/9rwz8vu5xv]
এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে চট্টগ্রামের চেরাগী পাহাড় মোড়ে “সম্মিলিত সনাতনী ছাত্র সমাজ” নাম ব্যবহার করে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে ইসকনের পুণ্ডরীক ধামের অধ্যক্ষ চিন্ময়কৃষ্ণ দাশ ব্রহ্মচারী বলেছিলেন, “আমরা সনাতনী ধর্মাবলম্বীরা অবিভক্ত ভারতের ভূমিপুত্র। আমরা কোনো দেশ থেকে এখানে আসিনি। …আমরা নিজেদের সুরক্ষার জন্য লড়তে জানি।” [দেখুন: bangla.bdnews24.com/ctg/aadfe522774d]
গত ২৫ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে চট্টগ্রামের লালদিঘিতে আয়োজিত বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চের সমাবেশেও বিপুল পরিমাণ গেরুয়া পতাকা ওড়ানো হয় এবং ওই সমাবেশে ইসকনের পুণ্ডরীক ধামের অধ্যক্ষ চিন্ময়কৃষ্ণ দাশ ব্রহ্মচারী বলেন, “এ বঙ্গের উত্তরাধিকার আমরা। আমরা এ ভূমির ভূমিপুত্র, উড়ে আসিনি। আমরা মোগল, ব্রিটিশ,পর্তুগীজ নয়, আমরা এ ভূমির সন্তান। আমাদের উচ্ছেদের চেষ্টা করবেন না। কেউ যদি আমাদের উৎখাত করে শান্তিতে থাকার চেষ্টা করেন, তাহলে এ ভূমি সাম্প্রদায়িকতার অভয়ারণ্য হবে। এ ভূমি আফগানিস্তান, সিরিয়া হবে। বাংলাদেশের কোনো গণতান্ত্রিক শক্তি রাজনীতি করার সুযোগ পাবে না।” [দেখুন: bangla.bdnews24.com/ctg/113f67e2f73e]
লালদীঘির ওই সমাবেশের সঞ্চালক ছিলেন গৌরাঙ্গ দাস ব্রহ্মচারী, যিনি বাংলাদেশে ইসকনের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তিনি ইসকনের শীর্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা গভার্নিং বডি কমিশন (GBC)-এর সদস্য। ওই সমাবেশে ইসকন প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরের অধ্যক্ষ লীলারাজ গৌর দাস ব্রহ্মচারীও বক্তব্য রেখেছিলেন। দেখুন: www.prothomalo.com/bangladesh/district/jp9q1zmewi)
ইসকন সমর্থকদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড:
ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ায় বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে হত্যার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের আইন বিষয়ক উপ-সম্পাদক অমিত সাহা। এই অমিত সাহা ছিল ইসকনের সদস্য। [দৈনিক ইত্তেফাক: tinyurl.com/4b5fftjn] শহীদ আবরার হত্যাকাণ্ডে কারাদণ্ড প্রাপ্ত হয়ে অমিত সাহা এখন কারাগারে আছে।
গত ৫ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে চট্টগ্রামের হাজারী গলিতে “ইসকন নিয়ে ফেসবুকে দেয়া পোস্ট”-কে কেন্দ্র করে এক মুসলিম ব্যবসায়ীর দোকানে হামলা করে ইসকন সমর্থকেরা। পরে পুলিশ-সেনাবাহিনীর যৌথদল ওই অবরুদ্ধ দোকানিকে উদ্ধার করতে গেলে যৌথবাহিনীর ওপর হামলা ও এসিড নিক্ষেপ করে ইসকন সমর্থকেরা। চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র উপ-কমিশনার (অপরাধ) রইছ উদ্দিন মিডিয়াকে পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা ও এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় ইসকন সমর্থকরা জড়িত। [দেশ রূপান্তর: tinyurl.com/ye2xujvh]
গ্রেফতারকৃত ইসকন নেতা চিন্ময় দাসকে আদালত জামিন না দেওয়ায় গত ২৬ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে চট্টগ্রামে আদালত প্রাঙ্গনে ইসকন সমর্থকেরা নজিরবিহীন হামলা ও ভাঙচুর চালায়। ওই দিনের হামলায় নিহত আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজনদের মধ্যে বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির ছাত্র শুভ কান্তি দাশ একজন ইসকন অনুসারী। [দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড: tinyurl.com/bdfajas6]
ইসকনকে নিষিদ্ধ করার আইনি প্রেক্ষিত:
শহীদ আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেশের সচেতন মহলে ইসকনকে নিষিদ্ধ করার জোর দাবি উঠেছে।
ইসকনের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইসকন সমর্থকরা সরাসরি খুন, সংঘাত, সংঘর্ষ, ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টি সহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। কোনো সংগঠনের সদস্যরা এই ধরনের অপরাধে যুক্ত হলে সেই সংগঠনকে “সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯”-এর আওতায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করার বিধান রয়েছে। সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯-এর ৬(১) ধারায় “সন্ত্রাসী কার্য”-এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে:
যদি কোন ব্যক্তি, সত্তা বা বিদেশী নাগরিক-
(ক) বাংলাদেশের অখণ্ডতা, সংহতি, জননিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করিবার জন্য জনসাধারণ বা জনসাধারণের কোন অংশের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে সরকার বা কোন সত্তা বা কোন ব্যক্তিকে কোন কার্য করিতে বা করা হইতে বিরত রাখিতে বাধ্য করিবার উদ্দেশ্যে-
(অ) অন্য কোন ব্যক্তিকে হত্যা, গুরুতর আঘাত, আটক বা অপহরণ করে বা করিবার প্রচেষ্টা গ্রহণ করে; অথবা
(আ) অন্য কোন ব্যক্তিকে হত্যা, গুরুতর জখম, আটক বা অপহরণ করার জন্য অপর কোন ব্যক্তিকে ষড়যন্ত্র বা সহায়তা বা প্ররোচিত করে; অথবা
(ই) অন্য কোন ব্যক্তি, সত্তা বা প্রজাতন্ত্রের কোন সম্পত্তির ক্ষতি সাধন করে বা করিবার প্রচেষ্টা গ্রহণ করে; অথবা
(ঈ) অন্য কোন ব্যক্তি, সত্তা বা প্রজাতন্ত্রের কোন সম্পত্তির ক্ষতি সাধন করিবার উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্র বা সহায়তা বা প্ররোচিত করে;
…তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি, সত্তা বা বিদেশী নাগরিক ‘‘সন্ত্রাসী কার্য’’ সংঘটনের অপরাধ করিয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে।”
ইসকনের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইসকন সমর্থকরা সরাসরি খুন, সংঘাত, সংঘর্ষ, ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টি সহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত।
এখানে এই যুক্তি দেওয়া হাস্যকর যে, ইসকনের সমর্থকদের কর্মকান্ডের দায় সংগঠন হিসেবে ইসকনের উপর চাপানো যাবে না।
কেননা সংগঠনের নেতা কর্মীদের কর্মকান্ডই সংগঠনের চরিত্রের মূল পরিচয়ক। যেমন, সম্প্রতি নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র বা ওয়েবসাইটে ছাত্রলীগের মূলনীতি হিসেবে শিক্ষা, শান্তি ও প্রগতির কথাই বলা আছে। কিন্তু ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়ে সরকার সংগঠন হিসেবেই ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করেছে।
একইভাবে ইসকনের ওয়েবসাইটে বা গঠনতন্ত্রে ভাব আন্দোলনের কথা লেখা থাকলেও সংগঠনটির কি নেতাকর্মীরা বর্তমানে স্পষ্টই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিদ্বেষমূলক প্রচারণা ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িত হয়ে পড়েছে।
ইসকনের কার্যক্রম শুধু সন্ত্রাসী কার্যই নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের ওপরও আঘাত:
বাংলাদেশের ইসকন নেতারা কৌশলে চিন্ময় দাসকে বহিষ্কারের গল্প শোনালেও ইসকনের আন্তর্জাতিক কমিটির অফিশিয়াল এক্স হ্যান্ডেল থেকে গত ২৫ নভেম্বরে চিন্ময় দাসকে “ইসকন নেতা” হিসেবে উল্লেখ করেই তার মুক্তি চাওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ কথাটি হলো, চিন্ময় দাসের মুক্তির বিষয়ে ইসকন সদর দপ্তর সরাসরিই ভারতের হস্তক্ষেপ চেয়েছে। [দৈনিক সমকাল: tinyurl.com/mpca6uw7]
ইসকনের এই বিবৃতির পরদিনই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চিন্ময় দাসের গ্রেপ্তার ও জামিন নামঞ্জুরের ঘটনায় অত্যন্ত আপত্তিকর ভাষায় উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ ইসকনের সদর দপ্তর থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে এবং ভারত কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা ছাড়িয়ে সেই হস্তক্ষেপ করেছেও।
ইসকন সদর দপ্তরের এই বিবৃতি সুস্পষ্টভাবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের উপর হস্তক্ষেপ করে এমন কোনো সংগঠন বাংলাদেশ কোনোভাবেই বৈধ থাকতে পারে না। বাংলাদেশে ইসকনের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার জন্য এই একটি কারণই যথেষ্ট।
ইসকনের সাংগঠনিক কার্যক্রমে বাংলাদেশী আইনের কমপ্লায়েন্স ইস্যু
ইসকন তাদের সাংগঠনিক স্ট্যাটাসের বিষয়ে ধোঁয়াশা রেখেছে। তারা বাংলাদেশে কোন্ আইনের অধীনে নিবন্ধিত কিংবা আদৌ নিবন্ধিত কিনা—সেটাও স্পষ্ট নয়। মিডিয়ায় এসেছে, ইসকন নাকি একটি এনজিও প্রতিষ্ঠান, কিন্তু এনজিও হিসেবে কার্যক্রম চালালেও তাদের একাউন্টগুলোর দীর্ঘদিন কোনো অডিট হয় না। তাদের আয়-ব্যয়ের উৎস কেউ জানে না। এক্ষেত্রে এনজিও ব্যুরোর সঠিক মনিটরিং প্রয়োজন।
বিদেশী প্রতিষ্ঠানের ব্রাঞ্চ হিসেবে বাংলাদেশে কার্যক্রম চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদনগুলো ইসকন আদৌ নিয়েছে কিনা, সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন আইন, ২০১৬-এর আওতায় ইসকনের ফান্ডিং প্রক্রিয়া আইনসম্মত কিনা, সেটাও তদন্ত হওয়া উচিত।
ইসকনের বাংলাদেশ শাখা ও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একই কূটকৌশল অবলম্বন:
লক্ষণীয় যে, ইসকন সদর দপ্তরের বিবৃতিতে ও ভারতীয় মিডিয়ায় চিন্ময় দাসকে “ইসকন নেতা” হিসেবে উল্লেখ করা হলেও ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে চিন্ময় দাসকে তথাকথিত “বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতন জাগরণ জোট”-এর মুখপাত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চিন্ময় দাসের ইসকন পরিচয়টি লুকাতে চায়, যেভাবে ইসকন বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক চারু চন্দ্র দাস স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, চিন্ময় দাস নাকি ইসকন থেকে বহিষ্কৃত এবং বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের কর্মসূচির সঙ্গে ইসকনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই!
এই দাবির হাস্যকর দিকটি হলো, ইসকনের নিউ ইয়র্ক সদর দপ্তর ২৫ নভেম্বর ২০২৪ তারিখেও চিন্ময়কে “ইসকন নেতা”ই বলেছে এবং গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত চিন্ময় চট্টগ্রামে ইসকনের অন্যতম প্রাচীন মন্দির পুণ্ডরীক ধামের অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
মূলত এমন মিথ্যাচার ও ধোঁকাবাজিই ইসকন ও ভারতের কৌশল। তথাকথিত একটি “ভাব-আন্দোলন”-কে ব্যবহার করে তারা তরুণদেরকে রেডিকালাইজ করে, তারপর বিভিন্ন ভুঁইফোঁড় সংগঠনের নামে উস্কানিমূলক বক্তব্য ও কর্মসূচি দিয়ে সেই তরুণদেরকে ব্যবহার করে সংঘাত ও সংঘর্ষ সৃষ্টি করে। চট্টগ্রাম জেলা আদালতের তরুণ আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে এভাবেই ভিন্ন সংগঠনের নামে উগ্র ও সশস্ত্র তরুণদেরকে জড়ো করে হত্যা করা হয়েছে।
এভাবে ইসকনের নেতারা সাধুর ছদ্মবেশে বাংলাদেশে ক্রমাগত উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি, বিভাজনমূলক প্রচারণা ও সহিংসতা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষত বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী চট্টগ্রাম বিভাগ, রংপুর বিভাগ ও সিলেট বিভাগে ইসকন বেশি সক্রিয়। বাংলাদেশের এই বিভাগগুলো নিয়ে, বিশেষত চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগ নিয়ে, ভারতের কোনো কোনো মহলের বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক প্রকল্প ও বিচ্ছিন্নতাবাদের উস্কানির কথা ব্যাপকভাবে শোনা যায়।
চলতি মাসের শুরুর দিকে চট্টগ্রামের হাজারী গলিতে সহিংসতায় জড়িত ইসকন সমর্থকদেরকে গ্রেফতারের সাথে সাথেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। মার্কিন-ভারতের মদদে বাংলাদেশে ইসকনের গেরুয়া রাজনীতি ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের মূল উদ্দেশ্য আসলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ধ্বংস করা এবং সর্বোপরি বাংলাদেশকে মার্কিন-ভারতের অধীনস্ত রাখা।
উপসংহার
সার্বিক আলোচনায় দেখা যায় যে, বাংলাদেশে ইসকন, বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চ, বাংলাদেশ সম্মিলিত সংখ্যালঘু জোট, সম্মিলিত সনাতনী ছাত্র সমাজ ইত্যাদি বিভিন্ন নামে আসলে একই ধরনের বিদ্বেষ ও বিভাজনমূলক কর্মকাণ্ড, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্ব বিরোধী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ইসকনের বিভিন্ন কার্যকলাপ বাংলাদেশের মূলধারার অনেক হিন্দুদের মধ্যেও অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
সাধুর ছদ্মবেশে ইসকনের গেরুয়া রাজনীতি ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারকে চাপে রাখতে ভারতের “সফট পাওয়ার” হিসেবে বাংলাদেশে ইসকন এসব উগ্রতা ছড়াচ্ছে—এমন ইঙ্গিত খুবই স্পষ্ট। তাই দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ইসকন-সহ সকল উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধের উদ্যোগ নেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। সিঙ্গাপুর, রাশিয়া, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান-সহ বিভিন্ন দেশে ইসকনের কার্যক্রম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিং করা হয়। বাংলাদেশেও অবিলম্বে একই ধরনের আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। ইসকন-বিরোধী হিন্দু নেতৃবৃন্দের পরামর্শ নিয়ে সরকার এক্ষেত্রে আগাতে পারে।
খিলাফত রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক পতাকা কী হবে?

ইসলামি রাষ্ট্রের সরকারী পতাকাকে রাইয়াহ (الراية) বলা হয়। এটি একটি কালো আয়তক্ষেত্রাকার পতাকা যার উপর সাদা রঙে لا إِلٰهَ إِلَّا ٱلله مُحَمَّدٌ رَسُولُ ٱلله লেখা রয়েছে। এর পেছনের ইজতিহাদের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো।
ঐতিহাসিকভাবে, পতাকাগুলো মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে বিভিন্ন সেনাবাহিনীকে চিহ্নিত করার জন্য যুদ্ধে ব্যবহৃত হত। আধুনিক সময়ে বিভিন্ন দেশকে চিহ্নিত করতে পতাকা ব্যবহার করা হয় এবং কোনো জাতিকে একত্রিত করার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আমেরিকাতে, পতাকার জন্য একটি নির্দিষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে এবং বেশিরভাগ পাবলিক স্কুলগুলিকে এর আবৃত্তির জন্য নিয়মিত সেশন নির্ধারণ করা বাধ্যতামূলক:
“আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার প্রতি আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, এবং যে প্রজাতন্ত্রের জন্য এটি দাঁড়িয়ে আছে, ঈশ্বরের অধীনে এক জাতি, অবিভাজ্য, সবার জন্য স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারসহ।”
তাহলে ভবিষ্যৎ খিলাফত নিজেকে চিহ্নিত করতে কোন পতাকা ব্যবহার করবে?
খিলাফত একটি ইসলামী রাষ্ট্র এবং এর কাঠামো অবশ্যই ইসলামী গ্রন্থ (কুরআন ও সুন্নাহ) থেকে উদ্ভূত হতে হবে। অতএব, কোনো পতাকা ব্যবহার করার আলোচনার সূচনাবিন্দু হবে ইসলামি দলীলাদি। যদি নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীদের দ্বারা ব্যবহৃত পতাকার কোনো নির্দিষ্ট বর্ণনা পাওয়া না যায়, তাহলে এটি কুরআনের শাসনের সাধারণ বাধ্যবাধকতা থেকে উদ্ভূত একটি সহায়ক নিয়ম হিসাবে শৈলী (উসলুব) এবং উপকরণ (ওয়াসিলাহ) এর আওতায় পড়বে।
إِنِ الحُكمُ إِلّا لِلَّهِ
“শাসন আল্লাহ ছাড়া কারো জন্য নয়।” [সূরা ইউসুফ, ১২:৬৭]
রাষ্ট্র এবং সরকার সম্পর্কিত সমস্ত ইসলামি নিয়মগুলোর ক্ষেত্রে, বিশদ আলোচনা নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ (কর্ম, বাণী ও মৌনসম্মতি)’র মাধ্যমে এসেছে।
আমরা হাদিসের দিকে তাকালে তাহলে আমরা ইসলামী সেনাবাহিনীর নেতা ও কমান্ডারদের দ্বারা ব্যবহৃত দুই ধরনের পতাকা দেখতে পাই। তারা হল লিওয়া’ (اللواء) এবং রায়াহ (الراية) যা পতাকা ও ব্যানার হিসাবে অনুবাদ করা হয়।


عَنْ جَابِرٍ، رضى الله عنه أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم دَخَلَ مَكَّةَ وَلِوَاؤُهُ أَبْيَضُ
জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত যে, “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাদা লিওয়া নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন” (সুনানে নাসাঈ ২৮৬৬)
لأُعْطِيَنَّ الرَّايَةَ الْيَوْمَ رَجُلاً يُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আমি আজকে এমন এক ব্যক্তিকে (ইমাম আলী) রাইয়াহ দেব যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসে।” (ইবনে মাজাহ)
আল-কামুস আল-মুহিত অভিধানে লিওয়া’ এবং রায়াহ উভয়ের ভাষাগত অর্থকে ‘আলাম (العلم) হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে যার অর্থ একটি চিহ্ন বা ব্যানার।
যদি হাদিসে লিওয়া’ এবং রায়াহর আর কোনো বর্ণনা পাওয়া না যেত তাহলে আমরা যে কোনো ধরনের পতাকা গ্রহণ করতে পারতাম যতক্ষণ পর্যন্ত এতে ইসলামি প্রতীক যেমন উসমানীয়রা অর্ধচন্দ্রাকৃতি ও তারা ব্যবহার করত।
যাইহোক, যদি আমরা হাদিসের দিকে তাকাই তাহলে আমরা লিওয়া ও রায়াহ উভয়েরই বিশদ বর্ণনা পাই যার অর্থ এই শব্দগুলি একটি সাধারণ ভাষাগত অর্থ থেকে একটি নির্দিষ্ট বর্ণনাসহ একটি শরঈ অর্থে স্থানান্তরিত হয়েছে।
লিওয়া’ এবং রায়াহ’র মধ্যে পার্থক্য কী?
লিওয়া’ হল একটি নির্দিষ্ট পতাকা যা কর্প কমান্ডার (লেফটেন্যান্ট জেনারেল), বা কমান্ডার ইন-চীফ (খলিফা) এর জন্য একটি চিহ্ন হিসাবে ব্যবহৃত হয়, যেখানে রায়াহ সমগ্র সশস্ত্র বাহিনী এবং কিয়াসের মাধ্যমে তা সম্প্রসারণ করে তা সমগ্র জনগোষ্ঠীর দ্বারা ব্যবহৃত বিষয় হয়। রাষ্ট্র যুদ্ধের সময় রায়াহ উড্ডয়ন করবে এবং যদি প্রধান সেনাপতি (খলিফা)ও যুদ্ধ করেন তবে লিওয়া’ও রায়াহর পাশাপাশি উড্ডয়ন করা হবে। এটি নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধের উপর ভিত্তি করে, যিনি বদর ও উহুদের মতো যুদ্ধে প্রধান সেনাপতি ছিলেন। এটি খুলাফায়ে রাশিদার (সৎপথপ্রাপ্ত খলিফাদের) সময়কার যুদ্ধেও দেখা যায়।
সিফফিনের যুদ্ধে, খলিফা আলী ইবনে আবি তালিব সরাসরি যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং তাই লিওয়া ও রায়াহ উভয়ই উড্ডয়ন করা হয়েছিল। আলী (রা), মুহাম্মদ ইবনে আল হানাফিয়াকে লিওয়া বহন করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন এবং হিশাম ইবনে উতবাহকে রায়াহ বহন করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। (মুহাম্মাদ আস-সাল্লাবী, আলী, ভলিউম ২, পৃ. ১৫৫)

যুদ্ধের সময় রায়াহ বা লিওয়া’কে উঁচু করে রাখা সৈন্যদের প্রেরণার লক্ষণ। সাহাবীগণ পতাকা বহনকারীর দায়িত্বকে অবিশ্বাস্যভাবে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করতেন যেমনটি মুস’আব ইবনে উমাইর দেখিয়েছিলেন যখন তিনি তাঁর শাহাদাত পর্যন্ত উহুদ যুদ্ধে লিওয়া বহন করেছিলেন।
يقول ابن سعد: أخبرنا ابراهيم بن محمد بن شرحبيل العبدري، عن أبيه قال:
حمل مصعب بن عمير اللواء يوم أحد، فلما جال المسلمون ثبت به مصعب، فأقبل ابن قميئة وهو فارس، فضربه على يده اليمنى فقطعها، ومصعب يقول: وما محمد الا رسول قد خلت من قبله الرسل..
وأخذ اللواء بيده اليسرى وحنا عليه، فضرب يده اليسرى فقطعها، فحنا على اللواء وضمّه بعضديه الى صدره وهو يقول: وما محمد الا رسول قد خلت من قبله الرسل..
ثم حمل عليه الثالثة بالرمح فأنفذه وأندق الرمح، ووقع مصعب، وسقط اللواء
ইবনে সা’দ বলেছেন: ইব্রাহীম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে শারহাবিল আল-আবদারী তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি বলেছেন: মুস’আব ইবনে উমাইর উহুদের দিনে লিওয়া বহন করেছিলেন। মুসলমানরা যখন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল, তখন তিনি দ্রুত দাঁড়ালেন যতক্ষণ না তিনি একজন যোদ্ধা ইবনে কামিয়াহ-এর মুখোমুখি হলেন। তিনি তাকে তার ডান হাতের উপর আঘাত করে কেটে ফেললেন, কিন্তু মুসআব বললেন, وما محمد الا رسول قد خلت من قبله الرسل “আর মুহাম্মাদ একজন রাসূল মাত্র, তাঁর পূর্বে রসূলগণ গত হয়েছেন” (আলে ইমরান, ৩:১৪৪)।
তিনি বাম হাতে লিওয়া’টি বহন করলেন এবং তাতে ভর দিলেন। তিনি তার বাম হাতে আঘাত করে সেটি কেটে ফেলেন এবং তাই তিনি লিওয়া’র উপর ঝুঁকে পড়েন এবং তার উপরের বাহু দিয়ে এটিকে তার বুকের সাথে চেপে ধরেন, এবং বলতে থাকলেন, وما محمد الا رسول قد خلت من قبله الرسل “আর মুহাম্মদ কেবল একজন রাসূল, তাঁর পূর্বে রাসুলগণ গত হয়েছেন।” তারপর তৃতীয় একজন তার বর্শা দিয়ে তাকে আঘাত করল এবং বর্শাটি তার মধ্য দিয়ে বের হয়ে গেল, মুসআবের পতন হলো এবং এরপর লিওয়া’। (Men around the Messenger)
পতাকার রং কী?
রায়াহ কালো এবং লিওয়া’ সাদা। তাই আমরা উদাহরণস্বরূপ লাল বা সবুজ পতাকা ব্যবহার করতে পারি না।
أخرج الترمذي وابن ماجه عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: كَانَتْ رَايَةُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَوْدَاءَ، وَلِوَاؤُهُ أَبْيَضَ
আত-তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি বলেছেন: “নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রায়াহ ছিল কালো এবং তাঁর লিওয়া ছিল সাদা।”


পতাকার আকৃতি কেমন?
রায়াহর চারটি কোণ রয়েছে তাই আমরা একটি ত্রিভুজাকার পতাকা ব্যবহার করতে পারি না। কিয়াসের মাধ্যমে এটি লিওয়াহর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
أخرج أحمد، وأبو داود، والنسائي في سننه الكبرى عن يُونُسُ بْنُ عُبَيْدٍ مَوْلَى مُحَمَّدِ بْنِ الْقَاسِمِ، قَالَ: بَعَثَنِي مُحَمَّدُ بْنُ الْقَاسِمِ إِلَى الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ يَسْأَلُهُ عَنْ رَايَةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَاهى؟ فَقَالَ: كَانَتْ سَوْدَاءَ مُرَبَّعَةً مِنْ نَمِرَةٍ
আহমাদ, আবু দাউদ এবং আন-নাসায়ী তার আল-সুনান আল-কুবরা গ্রন্থে মোহাম্মদ বিন আল-কাসেমের দাস ইউনুস বিন ওবায়েদের কর্তৃত্বে বর্ণনা করেছেন যে তিনি বলেছেন: মোহাম্মদ বিন আল-কাসেম আমাকে আল-কাসেমের কাছে পাঠিয়েছিলেন। বারা বিন আজেব রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রায়াহ সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে এটা কী? তিনি বললেন: “এটি ছিল একটি কালো চতুর্ভুজ (مُرَبَّعَةً) যা নমিরা থেকে তৈরি করা হয়েছিল”।
পতাকার উপাদান কী?
উপরের হাদিসটি সুনির্দিষ্ট করে যে রায়াহ’র জন্য ব্যবহৃত উপাদানটি ছিল নামিরা (পশম)। যাইহোক, এই উপাদান ব্যবহার করা একটি হুকম নয়, বরং উপকরণ (ওয়াসীলাহ) শ্রেণীতে পড়ে। আপনি জিজ্ঞাসা করতে পারেন কেন একে উপকরণ অর্থ হিসাবে বিবেচনা করা হবে, আর আকৃতিকে হুকম হিসাবে বিবেচনা করা হয়। উত্তর হল কারণ সাহাবীগণ তাদের সময়ের কাপড়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন যা প্রধানত উল ছিল এবং এ ব্যপারে অন্য সুযোগ ছিল না, যেখানে আকৃতি, রঙ এবং প্রতীকের জন্য তাদের সুযোগ ছিল, এরপরও একটি নির্দিষ্ট নকশা বেছে নেয়া হয়েছে।
অতএব, আমরা পতাকার জন্য নাইলন বা সুতির মতো যে কোনো উপাদান ব্যবহার করতে পারি।
পতাকার আকার কতটুকু?
পতাকার মাপ টেক্সটে নির্দিষ্ট করা নেই তাই আমাদের ইচ্ছামত পতাকার যে কোন আকার থাকতে পারে।
আশ-শাখসিয়্যা আল-ইসলামিয়া উল্লেখ করেছে “দলীল নিবিড় যাচাই-বাছাই স্পষ্ট করে যে রায়াহ লিওয়া’র চেয়ে ছোট” এবং আরো বলা হয়েছে “(এর চেয়ে) বৃহত্তর বা কম পরিমাপের রায়াহ এবং লিওয়া ব্যবহার করা অনুমোদিত।”
বইটি পতাকার জন্য একটি আকারও নির্দিষ্ট করেছে। তবে ভবিষ্যতে এটি গ্রহণ করার বিষয়টি খলিফার উপর নির্ভর করে।
লিওয়া = ১২০ সেন্টিমিটার x ৮০ সেন্টিমিটার
রায়াহ = ৯০ সেন্টিমিটার x ৬০ সেন্টিমিটার
আকৃতির অনুপাত কী?
পতাকার আকৃতির অনুপাত নির্দিষ্ট করা নেই তাই আমরা আমাদের ইচ্ছামত যেকোনো অনুপাত ব্যবহার করতে পারি, তবে আশ-শাখসিয়া আল-ইসলামিয়া বর্তমানে বেশিরভাগ পতাকার সাথে সঙ্গতি রেখে একটি ২/৩ অনুপাত উল্লেখ করেছে। উদাহরণস্বরূপ অটোমান পতাকা একটি ২/৩ অনুপাত ব্যবহার করতো।
পতাকায় কি প্রতীক আছে?
রায়াহ ও লিওয়া’তে যা বর্ণনা করা হয়েছে তার ব্যপারে ইখতিলাফ (মতভেদ) রয়েছে। হাদীসের শক্তির পার্থক্যের কারণে এই মতভিন্নতা ঘটেছে যা রায়াহ ও লিওয়া’র উপর নির্দিষ্ট শব্দ উল্লেখ করেছে। যদি কোনো আলেম এই হাদীসটিকে দুর্বল বলে মনে করেন তাহলে এর অর্থ হল রায়াহ ও লিওয়া’র উপর যে কোনো প্রতীক বা লেখা একটি স্টাইল হয়ে যাবে এবং আমরা আমাদের ইচ্ছামত যে কোনো ইসলামি প্রতীক বেছে নিতে পারি। তবে যদি কোনো আলেম হাদিসটিকে ভালো মনে করেন তাহলে শব্দটি হুকমে পরিণত হবে এবং এক্ষেত্রে কোনো বিকল্প নেই। প্রশ্নবিদ্ধ হাদীসটি নিচে দেওয়া হলো।
فقد أخرج الطبراني في الأوسط قال: حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ رِشْدِينَ قَالَ: نا عَبْدُ الْغَفَّارِ بْنُ دَاوُدَ أَبُو صَالِحٍ الْحَرَّانِيُّ قَالَ: نا حَيَّانُ بْنُ عُبَيْدِ اللَّهِ قَالَ: نا أَبُو مِجْلَزٍ لَاحِقُ بْنُ حُمَيْدٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: «كَانَتْ رَايَةُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَوْدَاءَ وَلِوَاؤُهُ أَبْيَضُ، مَكْتُوبٌ عَلَيْهِ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ». لَا يُرْوَى هَذَا الْحَدِيثُ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ إِلَّا بِهَذَا الْإِسْنَادِ، تَفَرَّدَ بِهِ: حَيَّانُ بْنُ عُبَيْدِ اللَّهِ
এটি আল-আওসাতে আত-তাবারানী দ্বারা তাখরীজ করা হয়েছে: (আহমাদ বিন রাশদিন বর্ণনা করেছেন যে আব্দুল গাফফার বিন দাউদ আবু সালেহ আল-হাররানী বলেছেন: হায়ান বিন ওবাইদিল্লাহ আমাদেরকে বলেছেন যে আবু মিজলাজ লাহেক বিন হুমাইদ ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে বলেছেন: “ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রায়াহ ছিল কালো এবং তার ব্যানার (লিওয়া) সাদা ছিল যারা উপর লেখা ছিল: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ”.
এই হাদীসটি ইবনে আব্বাস এই সনদ ব্যতীত বর্ণনা করেননি এবং এটি হাইয়ান বিন ওবাইদিল্লাহর জন্য একক বর্ণনা।
বিতর্কটি হাদিস বর্ণনাকারী হাইয়ান বিন ওবাইদিল্লাহর সাথে সম্পর্কিত। শায়খ আতা আবু আল-রাশতা তার ফেসবুক প্রশ্নোত্তরগুলির মধ্যে একটিতে এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন:
১) ইবনে হিব্বান এটি আল-ছিকাতে উল্লেখ করেছেন এবং এটি তার গ্রন্থ আল-ছিকাত ভলিউম ৬/২৩০ এ রয়েছে:
(৭৪৯১ – বনি ওদাইয়ের দাস হাইয়ান বিন ওবাইদিল্লাহ আবু জুহাইর আবু মিজলাজ ও তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন এবং মুসলিম বিন ইব্রাহিম ও মুসা বিন ইসমাইল তার থেকে বর্ণনা করেছেন)
২) আল-যাহাবী তার মিজান আল-ই’তিদাল (৬২৩/১) গ্রন্থে এটি উল্লেখ করেছেন:
(২৩৮৮ – হায়্যান বিন ওবাইদিল্লাহ, আবু জুহাইর, আবি মিজলাজের কর্তৃত্বে বুসরার শায়খ। আল-বুখারি বর্ণনা করেছেন: আস-সালত তার (বর্ণনা) মিশ্রন করে ফেলার কথা উল্লেখ করেছেন)।
3- আল-সালত হলেন বিন মোহাম্মদ আবু হাম্মাম, এবং আবু আল-হাজ্জাজ তার গ্রন্থ তাহজীব আল-কামাল ফী আসমা আল-রিজাল ৭৯/২-এ তাকে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন: আবু হাম্মাম আল-সালত বিন মোহাম্মদ আল-খারকি ওমানের নিকটবর্তী উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি দ্বীপ খারেক থেকে এসেছেন এবং আল-বুখরী আল-সহীহ গ্রন্থে তার জন্য বর্ণনা করেছেন।
4- বার্ধক্যজনিত কারণে হাদীসে তার মিশ্রণের কারণে, আল-উকাইলি তার গ্রন্থ আল-দুয়াফা’ আল-কবীর ৩১৯/১-এ তাকে দুর্বল বর্ণনাকারীদের থেকে বিবেচনা করেছিলেন যেখানে তিনি বলেছেন: হাইয়ান বিন ওবায়দিল্লাহ আবু যুহাইর বুসরা থেকে এসেছেন… এবং আদম বিন মূসা বর্ণনা করেছেন যে তিনি আল-বুখারীকে বলতে শুনেছেন: হায়ান বিন ওবাইদিল্লাহ আবু জুহাইরকে আল-সালত উল্লেখ করেছেন যে তিনি হাদিস মিশ্রিত করছেন…
5- আল-যাহাবী তার আল-মুগনি ফী আদ-দুআফা ১৯৮/১ গ্রন্থে তার সম্পর্কে বলেছেন “আবু মিজলাজের কর্তৃত্বে হাইয়ান বিন ওবাইদিল্লাহ আবু জুহাইর আল-বসরী নির্ভরযোগ্য নয়।”
তাই তিনি বিতর্কিত কারণ সেখানে এমন লোক রয়েছে যারা তাকে নির্ভরযোগ্য করে তোলে এবং অন্যরা যারা তাকে দুর্বলদের থেকে বিবেচনা করে কারণ তিনি বৃদ্ধ হওয়ার পরে মিশ্রন করে ফেলতেন। মনে হচ্ছে তিনি বুড়ো হয়ে যাওয়ার পর তার মিশিয়ে ফেলা শুরু হয়। যাইহোক, ইস্যুটি হল রায়াহ এবং লিওয়া’র উপর “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” লেখা, এবং হাদিস মিশিয়ে ফেলা এই লেখাকে প্রভাবিত করে না, বিশেষ করে যেহেতু তাঁর এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে সনদে দুজন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী রয়েছে। অর্থাৎ আবু মিজলাজ লাহেক বিন হামেদ ও ইবনে আব্বাস (রা.)। তাই আমরা রায়াহ ও লিওয়া’র উপর দুটি শাহাদাহ-এর লেখা গ্রহণ করেছি।
আরবি হরফ/ফন্ট কী হবে?
আরবি হরফ/ফন্ট নির্দিষ্ট করা নেই তাই আমরা যেকোনো আরবি হরফ বা ক্যালিগ্রাফি ব্যবহার করতে পারি। এটি শৈলী (usloob) এর অধীনে পড়ে।
অন্য কোন পতাকা আছে?
বিভিন্ন সেনা কর্পস, ডিভিশন এবং রেজিমেন্টগুলি রায়াহর পাশাপাশি তাদের নিজস্ব পতাকা ব্যবহার করতে পারে যেমনটি আমরা আজ যে কোনও সেনাবাহিনীতে পাই। এই হাদীস থেকে উদ্ভূত হয়েছে যেখানে বিভিন্ন ইউনিট বা গোত্র সরকারী রায়াহর পাশাপাশি যুদ্ধে তাদের নিজস্ব ব্যানার ব্যবহার করেছিল।
وقد ورد عند الطبراني في الكبير عن مَزِيدَةَ الْعَبْدِيَّ، يَقُولُ: إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَقَدَ رَايَاتِ الْأَنْصَارِ فَجَعَلَهُنَّ صُفَرًا
মাজিদা আল-আবদির সূত্রে আল-কাবীরে আত-তাবারানী কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে: “রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল-আনসারদের পতাকাগুলোকে গিঁট দিয়ে হলুদ করেছেন।”
وكذلك ورد عند ابن أبي عاصم في الآحاد والمثاني عَنْ كُرْزِ بْنِ سَامَةَ قَالَ: …وَإِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَقَدَ رَايَةَ بَنِي سُلَيْمٍ حَمْرَاءَ
এবং এটি ইবনে আবি আসেম থেকে আল-আহাদ এবং আল-মাথানি থেকে কুরজ ইবনে সামা থেকে বর্ণিত হয়েছে, যিনি বলেছেন: “… এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনী সুলাইমের পতাকাকে লাল করে দিয়েছিলেন“।

The Ottoman 136th Infantry flag
উপসংহার
খিলাফতের সরকারী পতাকা হল রায়াহ। এটি রূপকভাবে “যুদ্ধের জননী” (উম উল-হারব) নামে পরিচিত, এবং এটি খলিফার বাসভবন সহ রাজ্যের সমস্ত সরকারি ভবনের উপরে উড়ানো হবে। জনগণ এই পতাকার চারপাশে একত্রিত হবে এবং এটি তাদের বাড়ি, মসজিদ এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রদর্শন করবে। সশস্ত্র বাহিনী তাদের রেজিমেন্টাল ব্যানারের পাশাপাশি এটি প্রদর্শন করবে যাতে তাদেরকে খেলাফতের সরকারী সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
লিওয়া’ হল একটি বিশেষ পতাকা যা শুধুমাত্র খলিফার বাসভবনের উপরে রায়াহর পাশাপাশি উড়ানো হবে।
ইসলামের সংবিধানই একমাত্র বিকল্প

৫ই অগাস্ট গণঅসন্তোষ থেকে সৃষ্ট রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জালিম হাসিনার ১৬ বছরের দুঃশাসনের অবসান ঘটল। চারিদিকে এখন পরিবর্তনের ডাক। দেশের মানুষ আশা করছে যে এবার তারা রাষ্ট্রকে এমনভাবে মেরামত করবে যে পুনরায় যেন এইধরনের জালিম শাসকের জন্ম এবং অসহনীয় পরিস্থিতির উদ্ভব না হয়। আমাদের সংবিধানে যে মারাত্মক কোন সমস্যা আছে তা সবাই বুঝে, তাই পরিবর্তনটা সেখান থেকেই শুরু করার দাবী জোরাল হচ্ছে। অথচ শাসক ও সুশীল সম্প্রদায় – “পশ্চিমা নয় প্রাচ্য ধাচের বা inclusive society উপযোগী” ইত্যাদি নানা term এ ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে মূল সমস্যাকে আড়াল করে সেই সেকুলার গণতান্ত্রিক সংবিধান আমাদের ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। তাই ইউনুস সরকার সংবিধান সংস্কারের আলোচনার টেবিলে আসার শর্ত দিয়েছে যে সেকুলার গণতান্ত্রিক সংবিধানকে ভিত্তি ধরে আলোচনা হতে হবে।
অক্সফোর্ড ডিকশেনারী অনুযায়ী সেকুলার বা ধর্ম নিরপেক্ষতা হল, “The belief that religion should not be involved in the organization of society, education etc. অর্থাৎ সমাজের গঠন/সংগঠন ইত্যাদিতে ধর্ম যুক্ত হবে না। তৎকালীন ইউরোপের চার্চ কেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থার পোপদের দ্বারা ধর্মের নামে নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে ঐ অঞ্চলের মানুষ এই বিশ্বাসে ঐক্যবদ্ধ হয় যে মৃত্যু পরবর্তী জীবন থাকতেও পারে বা নাও পারে, যার যা খুশি ভাবুক কিন্তু দুনিয়া, যেখানে আমরা আছি সেখানে সৃষ্টিকর্তা কোন কথা বলবে না। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের দেওয়া একটা সীমারেখার (খুবই ব্যক্তিগত কিছু আমল, আখলাক, রীতিনীতি) মধ্যে কেউ চাইলে ধর্ম পালন করতে পারবে কিন্তু রাষ্ট্রীয় কোন বিষয়াদিতে (শাসন ও বিচার ব্যবস্থা, পররাষ্ট্র নীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি ইত্যাদিতে) স্রষ্টার কোন বিধান আনা যাবে না। মানুষই মানুষের জন্য আইন তৈরি করবে যা পুরোপুরি আমাদের বিশ্বাস বিরোধী। এই বিশ্বাসই মানুষকে আইন বানানোর ক্ষমতা দেয় আর বিশ্বজুড়ে হাসিনার মত দানবদের উত্থান ঘটায় আর আমদের মাথার উপর মার্কিন-ব্রিটিশ উপনিবেশবাদিদের কর্তৃত্ব বজায় রাখে, যা আমাদের দুরবস্থার জন্য দায়ী।
মূল সমস্যা জিয়িয়ে রেখে শাখায় পরিবর্তন কোন নতুন সমাধান নয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এ পর্যন্ত আমাদের দেশে সংবিধান সংশোধন হয়েছে মোট ১৭ বার। কিন্তু আমরা প্রতিবার নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়েছি আর শাসক ও শাসকদের মদদপুষ্ট গোষ্ঠী আরও ফুলেফেপে উঠেছে। আগে দুর্নীতি শত কোটি, এখন হাজার কোটি। রুপপুর পরমানু প্রকল্প থেকে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা একাই নিয়েছে ৫.৬ বিলিয়ন টাকা, তার পিয়নের আছে ৪০০ কোটি টাকা। আর বাংলাদেরশের একজন সাধারন ভুমি মন্ত্রি কয়েক বছরে London এ ৩৬০ টি বাড়ি বানিয়ে ফেলেছে। আর সাধারনের দুরবস্থা এমন যে একটা মোবাইল ফোন কিনতে তাদের অবস্থা খারাপ হয়ে যায় আর তা চুরির জন্য পিটিয়ে হত্যা করে। এই হল আমাদের সেকুলার গণতান্ত্রিক সংবিধানের স্বাভাবিক ফলাফল। মানব রচিত এই সেকুলার সংবিধান কখনই আমাদের দারিদ্র দূর করবে না, কর্মসংস্থান তৈরি করবে না। চিকিৎসা সেবা সহজলভ্য করবে বা শিক্ষাকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া নিয়ে মার্কিন-ব্রিটেনের কোন মাথা ব্যথা নেই, কখনই ছিল না। তাদের serve করার জন্য আমাদের যতটুকু দেয়া দরকার ততটুকু দিয়ে বাকিটা তারা smoothly নিয়ে নিবে এমন শাসক, সুশীল জায়গা মত রাখতে পারাটাই এই সংবিধানের মূল লক্ষ্য। তারপরও আমাদের মানব রচিত গণতান্ত্রিক সংবিধান দিয়েই চলতে হবে, মূলে হাত দেয়া যাবে না, কেন? এমনত না যে বিশ্ব এই সেকুলার সংবিধান দিয়ে চলে খুব ভালো আছে। আপনারা জানেন মাত্র ৮ জন বাক্তির হাতে পৃথিবির ৯৯% সম্পদ, বাকি ১% সম্পদ নিয়ে বাকি ৯৯% মানুষ কামরা কামড়ি করে ।
যারা সেকুলার ব্যবস্থার ধারক ও বাহক, তাদের ভয় বোধগম্য। মানুষের হাতে আইন তৈরির ক্ষমতা না থাকলে তাদের নিয়োগকারি মার্কিন-ব্রিটিশের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে না, জনগণকে তাদের নীতি মানতে বাধ্য করা যাবে না, জনগণকে নিঃস্ব করে তাদের নিজেদের রুজি রুটি আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাবে। তাই তারা তাদের সমস্ত মেধা প্রয়োগ করে উম্মাহকে নতুন মোড়কে পুরোন মাল গছিয়ে দিতে চায়। এই ব্যাপারে তাদের অন্যতম সহায়ক ইসলামের সংবিধান নিয়ে সাধারন অজ্ঞতা। ইসলামের ব্যাপারে আমাদের আবেগ আছে কিন্তু এই সেকুলার শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে যেন আমরা ইসলামকে ধর্মীয় গণ্ডির বাইরে ভাবতে না পারি।
তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় আল্লাহর বিধান প্রয়োগের কথা আসলে জনসাধারনের মনে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, ইসলাম আধ্যাত্মিক বিষয়, আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার মত জটিল কার্যক্রম ইসলাম দিয়ে কিভাবে সম্ভব? তাদের মনে ভীতির সঞ্চার হয় এই ভেবে যে পরে দেখা যাবে রাসুল (সা)-এর অবর্তমানে আল্লাহর নামে হুজুররা তাদের মন মত আইন বানিয়ে সাধারনকে অন্ধকার যুগে প্রবেশ করাবে। আর উদাহরণ হিসেবে আফগানিস্তানের নাম তো আসেই। তাই বর্তমানে মানব রচিত সংবিধানের মধ্যে ইসলামের কিছু বিধান ঢুকিয়ে সকলের গ্রহণযোগ্য সংবিধান রচনার দাবী জোরাল হয়েছে। কিন্তু মানুষের বিধানের সাথে ইসলামের বিধান ঢুকিয়ে দিলে তা আর ইসলামের সংবিধান থাকে না, মানব রচিত হয়ে যায়, আল্লাহর দাস থেকে মানুষের দাসে পরিনত হই আমরা। তাই একমাত্র ইসলামের সংবিধানের প্রতি জোরাল দাবির জন্য আমাদের ইসলামের সংবিধান সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারনা থাকা দরকার।
ইসলাম একটি পূর্ণ জীবন বিধান। আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনা, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ [নাহল: ৮৯]। অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা সহ প্রতিটি বিষয়ে ইসলামের দিক নির্দেশনা আছে। আল্লাহ বলেছেন,”যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না? অথচ তিনি অতি সূক্ষ্দর্শী, পূর্ণ অবহিত” [সুরাহ মুলক: ১৪]। ইসলামের সংবিধানের মূল ভিত্তি লা ইলাহা ইল্লা আল্লাহ। মানে হল রাষ্ট্রের প্রতিটি কার্যক্রম পরিচালিত হবে শুধু মাত্র আল্লাহ দেয়া বিধান অনুযায়ী। নির্বাচিত খালিফা কেবল তার প্রয়োগ করবে। আল্লাহ সুবহাসানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক নাযিলকৃত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করে শেষ নবী রাসুল (সা) ১০ বছর তার ছোট্ট মদিনা রাষ্ট্র শুধু পরিচালনা করেন নি বরং, বিশ্ব নেতৃত্বের ভীত গড়ে দিয়ে গেছেন আর আমাদের জন্য রেখে গেছেন বিধান। এত ডিটেইলে যে, যেকোনো রাষ্ট্রীয় সমস্যার সমাধানের মূলনীতি সেখানে পাওয়া যায়। সেই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী খালিফারা ব্রিটিশ কূটকৌশলের কারণে ১৯২৪ সালে খিলাফাহ ধ্বংসের আগ পর্যন্ত শত শত বছর বিশ্ব নেতৃত্বর দিয়েছেন।
মূল উৎস কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস থেকে প্রয়োজনীয় হুকুম বের করে আনার সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রাসুল (সা) আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছেন যেন তাঁর (সা) অবর্তমানে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)’র বিধান দিয়ে চলতে আমাদের কোন অসুবিধা না হয়। কারণ তাঁর পরে আর কোন নবী আসবে না, আর ইসলাম অনুযায়ী জীবন পরিচালনা না করলে আমাদের জবাবদিহিতা ও শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। যদি ইসলাম নিয়ে নুন্যতম ফিকহি বুঝও আমাদের দেয়া হত যা এই সেকুলার ব্যবস্থা ইসলামকে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনার অংশ হিসাবে আমাদের দেয়নি, তাহলেও এই প্রক্রিয়া বোঝা আমাদের জন্য কঠিন হত না। এই process কে বলা হয় ইস্তিনবাত। যোগ্যতা সম্পন্ন scholar যারা মুজতাহিদ, তারা ইজতিহাদ করে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হুকুম বের করে আনে। শেখ তাকিউদ্দিন আন নাবহানি এমনি একজন উচ্চ যোগ্যতা সম্পন্ন মুজতাহিদ, যিনি ১৯৫৩ সালে ইসলামি জীবন বিধান দুনিয়াতে ফিরিয়ে আনার জন্য ইসলামি রাজনৈতিক দল হিযবুত তাহরীর গঠন করেন। তার কাজের অংশ হিসেবে উম্মাহ যেন ইসলামকে ব্যবস্থা হিসাবে visualize করতে পারে সেই জন্য খিলাফার রুপরেখা তথা একটি সংবিধান তৈরি করে যা ইসলামের বিশুদ্ধতম উৎস কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস থেকে উদ্ভূত। সেই সাথে তিনি এর ব্যাখ্যা প্রদান করে দেখিয়ে দেন যে এর প্রতিটি বিধান শারিয়ার বিশুদ্ধ উৎস থেকে উঠে এসেছে যেখানে কোন ব্যক্তির কোন নিজস্ব মতামত নাই। তাই এর অধীনে শাসিত হওয়া মানে ইসলামের অধীনে থাকা। প্রতিটা সেক্টরের জন্য সব মিলিয়ে ১৯১ টি ধারা নিয়ে তৈরি সেই constitution ভবিষ্যৎ খিলাফাহ রাষ্ট্র যা প্রয়োগ করবে ইনশাআল্লাহ। বোঝার সুবিধার্থে কয়েকটি ধারা আলোচনা করছি।
পররাষ্ট্রনীতি বিভাগে ১১ টি ধারা আছে। সুরা নিসা: ১৪১, সুরা ছফ: ৯ (তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্যদ্বীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি সকল দ্বীনের উপর তা বিজয়ী করে দেন, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে) , সুরা মায়িদা: ৫১ ইত্যাদি এরকম অসংখ্য আয়াত এবং সুন্নাহ থেকে এটা স্পষ্ট যে খিলাফাহ রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির মূলভিত্তি হল ইসলামের বানী ও ন্যায় বিচার দুনিয়ার বাকি সব জাতির কাছে পৌছে দেয়া। এই ultimate উদ্দেশ্য পূরণের জন্য কোন রাষ্ট্রের সাথে কী আচরণ করা হবে তা নির্ধারণ করতে ধারা ১৮৯ এ শারিয়ার ভিত্তিতে অমুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে ২ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। শত্রু রাষ্ট্র – যারা মুসলমানদের সাথে সরাসরি যুদ্ধরত আছে, যেমন – আমেরিকা, ইসরাঈল, ভারত ইত্যাদি; সম্ভাব্য শত্রু রাষ্ট্র – যারা ইসলামের বিরোধিতা করতে পারে কিন্তু এই মুহুর্তে সরাসরি যুদ্ধে নাই – সুইজারল্যান্ড, ফিনল্যান্ড ইত্যাদি।
এখন যদি আরও specific হই, ভারতের সাথে সম্পর্ক কী হবে? এটা নির্ভর করবে অমুসলিম রাষ্ট্র হিসাবে ভারতের status কি তার উপরে। কাশ্মির দখলকারি, মুসলিম নিপীড়নকারি, রাসুল (সা) এর অপমানকারি আর আমাদের ব্যপারে আগ্রাসি ও সীমান্তে হত্যাকারি ভারত আমাদের শত্রু রাষ্ট্র। এই definition একমাত্র আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত এবং এই শারিয়া অনুসারে ভারতের সাথে সম্পর্ক ঠিক হবে। রাষ্ট্রের খালিফারও এখতিয়ার নাই তার ইচ্ছামত সম্পর্কের ভিত্তি ঠিক করার। গণতান্ত্রিক সংবিধানের দোহাই দিয়ে মার্কিন ভারতের দালালেরা যেমন আমাদের বোঝায় সমস্যায় জর্জরিত ভারতের সাথে আমরা পারব না, সে শুকনা মৌসুমে পানি দিবে না, বর্ষায় ডুবাবে, সীমান্তে পাখির মত মানুষ মারবে, তবু আমাদের জী হুজুর বলতে হবে, না খেয়ে আমাদের ইলিশ দিয়ে দিতে হবে, বিনা শুল্কে আমাদের ভিতর দিয়ে তাদের যা খুশি তা নিয়ে যাবার স্বাধীনতা দিতে হবে একারণে ভারতের শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হতে হল। মোটকথা আমাদের সাথে যাই করুক না কেন তার সাথের বন্ধুত্ব মানে তাদের দাসত্ব মানতেই হবে, এসব জালিয়াতির সুযোগ ইসলামে নাই। শত্রু রাষ্ট্র হিসাবে তাদের সাথে নতজানু সব চুক্তি বাতিল হবে, তাদের নাগরিকদের এখানে আসলে ভিসা লাগবে এবং তাদের উপর নজর থাকবে। ধারা ১৯০ অনুসারে ভারতের সাথে কোনরকম সামরিক চুক্তি, সন্ধি, সমঝোতা, গুরুত্বপূর্ণ ঘাটি লীজ দেয়া সম্পুর্ণ নিষিদ্ধ। বর্তমান এন্টিটেরোরিজম চুক্তি, যৌথ সেনা মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়সহ নিরাপত্তা নষ্টকারী সব চুক্তি বাতিল হবে। ধারা ১৮২ অনুযায়ী শত্রুরাষ্ট্র ভারতের সাথে dealings শুধু মাত্র রাষ্ট্রীয়ভাবে হবে, ব্যবসায়ী বা সাংস্কৃতিককর্মী নাম দিয়ে এদেশের কোন ব্যক্তি, দল কিংবা প্রতিষ্ঠান ভারতের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে পারবে না। এপার বাংলা ওপার বাংলা সংস্কৃতি বিনিময়ের মাধ্যমে আমরা দেখেছি আকিদা বিরোধী অশ্লীল সংস্কৃতি আমাদের দেশে আমদানি করা, আর এর আড়ালে টাকা পাচার করা যাবে না।
অর্থনীতি বিভাগের ধারা ১৬৫ অনুযায়ী যেকোনো ধরনের বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) নিষিদ্ধ। ভারত বা আমেরিকার বিশেষ বানিজ্য সুবিধা, অর্থনৈতিক এলাকা বরাদ্দ নিষিদ্ধ। তাই ঋন সহায়তা, বানিজ্য সহায়তার নামে Donald Loo আর বিদেশি শকুনরা ২০০ কোটি ডলার দিয়ে আমাদের বঞ্চিত করে ১০০০ কোটি তুলে নিয়ে যাবে, তা হবে না। ধারা ১৩৭ অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি গণ মালিকানাধীন সম্পত্তি, এই খাত দেশি বা বিদেশি ব্যক্তি বা কোম্পানির মালিকানায় দেয়া যাবে না, এগুলোর মালিক আমরা জনগণ। এই ধারা অনুযায়ী ভারতের আদানি বা কুইক রেন্টালের ফাঁদে আমাদের কেউ ফেলতে পারবে না। বণিক বার্তা নিউজে এসেছে GSB (ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর) অনুসারে বাংলাদেশে ২.৬ ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদ মজুদ আছে। এগুলো উত্তোলন করে আমাদের বণ্টন করলে আমাদের এই দারিদ্র্য আর বিদেশ নির্ভরতা থাকে? প্রতিবছর বিপদসংকুল সমুদ্র পথে দালাল দিয়ে বিদেশ যাবার পথে আমাদের কত ভাই বোন অসহায়ের মত ডুবে মারা যায় আর আমদের সম্পদ বিদেশিরা লুটে খায়। বর্তমান গণতান্ত্রিক সংবিধানের মাধ্যমে বিভিন্ন চুক্তি করে এই সম্পদ নিয়ে যাচ্ছে নব্য উপনিবেশবাদীদের কোম্পানি নাইকো, গেটকো, কনকো, ফিলিপ্স, শেভরন, এক্সনমবিল। ইসলামের সংবিধানের মাধ্যমে যখন বিদেশি আধিপত্য বন্ধ করে, সম্পদের পাচার রোধ, সম্পদের সুষম বন্টন সর্বোপরি উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাষ্ট্র হওয়াতে খিলাফা রাষ্ট্রে কর্মসংস্থান এমনিতেই তৈরি হবে, বেকার থাকবে না, বৈষম্য হবে না। ধারা ১৫৩- রাষ্ট্র সকল নাগরিকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে। ধারা ১৫৪ অনুযায়ী আমাদের পোশাক কর্মী ভাই বোনদের সহ সকলে ঘাম শুকানোর আগে উপযুক্ত বেতন পেয়ে যাবে। দলিল: হাদিস কুদসি- কিয়ামতের ময়দানে ঐ তিন ব্যাক্তির প্রতিপক্ষ আল্লাহ হবেন, যার একজন হল সে যে শ্রমিকের কাজের সাথে সাথে তাকে মজুরি প্রদান করে না। ধারা ১৫৫- প্রত্যেকের কাজের দক্ষতা অনুসারে কাজের বেতন নির্ধারিত হবে। এসব ধারা কেউ চাইলেই পরিবর্তন করতে পারবে না, একে বলে পবিত্র সংবিধান। জেনারেল মইন কিছুদিন আগে অত্যাচারী পুঁজিপতি, শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা বঞ্চিতকারী গার্মেন্টস মালিকদের আশ্বস্ত করল যে তাদের সবারটা দেখে রাখবে কারণ তাদের করের টাকায় নাকি সেনাবাহিনীর বেতন হয়। যদিও এরা সব সময় প্রনোদনা আর কর সুবিধা পায় আর এই দরিদ্র শ্রমিক রা VAT এর মত oppressive tax এর কারণে ঐ মালিকদের সমান কর দিয়ে এদের পালে। ধারা ১৪৬ অনুযায়ী এমন সব কর হারাম।
এই হল আমাদের বিশ্বাস থেকে উঠে আসা ইসলামি সংবিধান, যার প্রতিটি আইন আল্লাহ সুব কর্তৃক রচিত আর রাসুল (সা) দ্বারা প্রণীত। আমরা যখন এই বিধান দিয়ে চালিত হয়েছি তখন যাকাত দেয়ার লোক পাওয়া যায়নি, এই সেদিন শায়েস্তা খার আমলে টাকায় ৮ মন চাল পাওয়া যেত, আর একজন রোগীর জন্য ৩ জন নার্স, শিক্ষায়- সভ্যতায় আমরা বিশ্বকে পথ দেখিয়েছি।
এই সংবিধান বা ব্যবস্থার প্রয়োগের সাথে আমাদের উপর পশ্চিমাদের খবরদারি শেষ হয় যাবে, জন সাধারনের প্রকৃত মুক্তি মিলবে আর অল্প কিছু জালিম দুস্কৃতিকারী তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, জ্ঞানীগুণী নামধারী মূর্খ ব্যক্তিগণের যারা তাদের প্রভুদের বানানো সংবিধান আমাদের গিলতে বাধ্য করে নিজেদের জীবিকা উপার্জন করে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। জালিম হাসিনা সহ মধ্য প্রাচ্যর আমেরিকা ইসরায়েলের পদলেহি সকল গাদ্দার শাসক যাদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে আমাদের চোখের সামনে ফিলিস্থিনি ভাই বোনদের হত্যা করা হচ্ছে, তাদের কে ইসলামের বিধান অনুযায়ী বিচারের মুখোমুখি করা হবে। এবার বলুন, কেন তারা তাদের সর্ব শক্তি নিয়োগ করবে না যেন এই ব্যবস্থা আর সংবিধান আমরা দূরে রাখি? কেন তারা এই ধরনের সংবিধান নিয়ে কোন আলাপ করতে চাইবে? তারা ভয় পায়, দুনিয়া হারানোর ভয় আর তাই আমাদের ভয় দেখায় যে আমরা আফগানিস্তান হয়ে যাব যেই আফগানিস্তানে আমেরিকা শক্তিতে না পেরে বুদ্ধিতে হারিয়ে দেয় আর মোল্লাতান্ত্রিক শাসন প্রবর্তন করে যা ইসলাম থেকে আসেনি।
এটা স্পষ্ট যে বর্তমান এই ব্যবস্থা, সংবিধান আমাদের না। ‘ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বাস’ পশ্চিমাদের বিশ্বাস। আমাদের মুসলিমদের না। পশ্চিমারা তাদের এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের উপর একমত। তাই তো পর্ন ইন্ডাস্ট্রি হলো ওয়েস্টদের ২য় সর্বোচ্চ রাজস্ব আয়ের মাধ্যম। এই কুফফার সেকুলার সংবিধানের উপর এই খাইরে উম্মত কখনই ঐক্যবদ্ধ হবে না, ২০০১ সালে যখন হাইকোর্টের এক রুলে বলা হয়, “পতিতাবৃত্তি বাংলাদেশে আইনগত স্বীকৃত একটি পেশা” আমি আপনি কি তা মেনে নিতে পেরেছি? নাকি সমকামিতার মতো স্পষ্ট কুফররকে যখন রাষ্ট্র স্বীকৃতি দেয়, পাঠ্য বইয়ে “শরীফ থেকে শরিফা” এর মাধ্যমে সমকামিতা অন্তর্ভুক্ত করে তখন তা কি আমরা মেনে নেই? এটা আমাদের আকিদা বিরোধী। কেন এই ব্যবস্থা, এই সংবিধান আমাদের মুসলিমদের মেনে নিতেই হবে যাদের উপর আল্লাহ ইসলাম নাযিল করেছে মানব জাতিকে অন্ধকার থেকে আলোকে বের করে আনার জন্য (ইব্রাহিম: ১)।
তাছাড়া এখন ইনক্লুসিভ সোসাইটির বরাত দিয়ে সংবিধানে সকল ধরম-বর্ণ-লিঙ্গের মতামতের ভিত্তিতে সমাজের কথা যদি বলি, তা কি এই secular system দিতে পেরেছে? তাহলে, পিউ রিসার্চ অনুযায়ী বাংলাদেশের ৮১%মানুষই তো শরীয়া আইন তথা আল্লাহর বিধান দিয়ে চলতে চায়। ইসলামকে আলোচনার টেবিলের বাইরে রেখে গণতন্ত্র দিয়ে রাষ্ট্র চালানোর সিদ্ধান্ত কিভাবে ইনক্লুসিভ হয়? মাত্র ১৯% মানুষের চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তের ভার কেন সকলে বহন করবে? তাই চলুন আমরা ইসলামের সংবিধান, ইসলামি ব্যবস্থার সাথে পরিচিত হই আর অন্য সকল প্রস্তাব প্রত্যাখান করি।
যুগে যুগে ফকীহ্গণ খিলাফত সম্পর্কে কী বলেছেন

Classical Scholars on Khilafah:
আমিরুল মু’মিনিন উমর আল-ফারুক (রা.) সম্পর্কে আদ-দারামি (রহ.)
ইমাম শামস আদ-দ্বীন আর-রামলী আল-আনসারী (রহ.)
ফকীহ্ আবু আল-ফাতেহ্ আশ-শাহরিসতানী (রহ.)
قال الدارمي عن عمر بن الخطاب رضي الله عنه في (سنته)
إنه لا إسلام إلا بجماعة ولا جماعة إلا بإمارة ولا إمارة إلا بطاعة فمن سوده قومه على الفقه كان حياة له ولهم ومن سوده قومه على غير فقه كان هلاكا له ولهم
Ad-Darami (rh) about Ameer ul-Mu’mineen, Umar al-Farooq (ra)
In his Sunan, Ad-Daarimi narrated from Umar (ra)
“Indeed, there is no Islam without a community (jama’ah). There is no community without an emirate. There is no emirate without obedience (Taa’ah). So, whoever his people make a ruler upon fiqh, there is life for both him and them, but whoever his people make a ruler upon other than fiqh, there is ruin for both him and them.”
আমিরুল মু’মিনিন উমর আল-ফারুক (রা.) সম্পর্কে আদ-দারামি (রহ.)
আদ-দারামি তার সুনানে উমর (রা.) হতে বর্ণিত করেন:
“নিশ্চয়ই, কোন জামা’আহ্ (সমাজ) ব্যতীত ইসলাম হয় না। কোন আমীর ব্যতীত জামা’আহ্ হয় না। কোন আনুগত্য ব্যতীত আমীর হয় না। সুতরাং, যদি কাউকে তার সমাজের লোকজন ফিকহ্-এর (জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার) ভিত্তিতে শাসন পরিচালনার জন্য নিয়োগ প্রদান করে, তবে তার ও তাদের উভয়ের জন্যই কল্যানকর জীবন রয়েছে, কিন্তু সমাজের লোকজন যদি তাকে ফিকহ্ (জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা) ব্যতীত অন্য কিছু দ্বারা শাসন পরিচালনার জন্য নিয়োগ প্রদান করে, তবে তার ও তাদের উভয়ের জন্যই ধ্বংস রয়েছে।”
قال الإمام أحمد في (مسنده) المتوفي 241ه
عن عبد الله بن عمرو أن النبي صلى الله عليه وسلم قال : { لا يحل لثلاثة يكونون بفلاة من الأرض إلا أمروا عليهم أحدهم } فأوجب صلى الله عليه وسلم تأمير الواحد في الاجتماع القليل العارض في السفر تنبيها بذلك على سائر أنواع الاجتماع . ولأن الله تعالى أوجب الأمر بالمعروف والنهي عن المنكر ولا يتم ذلك إلا بقوة وإمارة . وكذلك سائر ما أوجبه من الجهاد والعدل وإقامة الحج والجمع والأعياد ونصر المظلوم . وإقامة الحدود لا تتم إلا بالقوة والإمارة ; ولهذا روي } أن السلطان ظل الله في الأرض{
Imam Ahmad bin Hanbal (d. 241 AH) stated in his “Musnad”
It was narrated in his Musnad from Abdullah ibn Am’r from the Prophet (saw) who said, “It is not permissible for any three in an area of land (to be without an emir), so they must appoint one of them as an emir.” The Prophet (saw) obliged the appointment of an Amir in the small temporary gathering during the travel, clarifying this for all other types of collective. This is because Allah (swt) obliged the enjoining of good and the forbidding of evil and this is accomplished only by power and emirate. In addition, all the other obligations of the Deen, such as Jihad, justice, establishing the Hajj, the Juma’a and the Eid, the helping of the oppressed and the execution of the prescribed penalties, cannot be accomplished without power and emirate. Thus, it is narrated, “The leader (Sultan) is Allah’s shade on Earth.”
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)
(মাজমূ’ আল ফাতাওয়াতে এসেছে) ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (মৃত্যু ২৪১ হিজরী) তার “মুসনাদে” বর্ণনা করেন,
তার মুসনাদে আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেন, “যেকোন তিনজনের জন্য এটা অনুমোদিত নয় যে তারা কোন ভূখণ্ডে (আমীর ব্যতীত) অবস্থান করবে, সুতরাং তাদের অবশ্যই যেকোন একজনকে আমির নিযুক্ত করতে হবে।” রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) সফরের সময় ক্ষুদ্র কাফেলার জন্যও একজন আমিরের নিয়োগকে বাধ্যতামূলক করেন, সে বিবেচনায় সবধরনের জনসমষ্টির জন্য এটি সতর্কবানী (যাতে তারাও আমীর নির্ধারণ করে নেয়)। কারণ আল্লাহ্ সুবহানাহু তা’আলা সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করাকে বাধ্যতামূলক করেছেন এবং এটি শুধুমাত্র শাসনক্ষমতা ও আমীরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এছাড়া দ্বীনের অন্য সকল অত্যাবশ্যকীয় বিষয়সমূহ যেমন: জিহাদ, ন্যায়বিচার, হজ্জ্ব প্রতিষ্ঠা, জুমু’আ ও ঈদ, নিপীড়িতদের সহায়তা করা এবং নির্ধারিত শাস্তি কার্যকর করা, যা শাসনক্ষমতা ও আমীর ব্যতীত সম্পাদন করা যায় না। সুতরাং, বর্ণিত আছে যে, “শাসক (সুলতান) হচ্ছে জমীনে আল্লাহ্‘র ছায়া।”
(المتوفي 463ه) قال الخطيب البغدادي
أجمع المهاجرون والأنصار على خلافة أبي بكر قالوا له: يا خليفة رسول الله ولم يسم أحد بعده خليفة، وقيل: إنه قبض النبي صلى الله عليه وسلم عن ثلاثين ألف مسلم كل قال لأبي بكر: يا خليفة رسول الله ورضوا به من بعده رضي الله عنهم وليست العبرة ببيعة آحاد المسلمين كلهم له، بل العبرة بإجماعهم على حرمة خلو العصر من إمام، وعلو فرضية خلافة رسول الله ﷺ، فالرسول ﷺ إذ قال: «ومن مات وليس في عنقه بيعة مات ميتة جاهلية»، يفهم من هذا أن المطلوب هو وجود خليفة له في الأعناق بيعة لا أن يبايعه كل مسلم، وبالتالي فلو كان عدد المسلمين ملياراً فليس المطلوب أن يبايع المليار، بل أن يكون على المليارِ خليفةٌ أخذ البيعة بالتراضي من الأمة أو ممن يمثل الأمة!.
Al-Khateeb Al-Baghdadi (rh) (died 463 AH) stated,
“All the Muhajiroon and the Ansar agreed on the Khilafah of Abu Bakr (ra); they said to him: ‘O Khalifah of the Messenger of Allah’, and no one after him was called a Khalifah. It was said that after the death of the Prophet (saw), there were thirty thousand Muslims. They all called Abu Bakr a Khalifah and they, may Allah be pleased with them, accepted him as a leader after the Prophet (saw). I say: the point here is not that every individual gave allegiance to him, but the point is that they consented that the absence of Imam at that era was prohibited, and they consented on the obligation of the Khilafah (succession to the Messenger of Allah (saw); the Prophet (saw) said, “… and one who dies without having sworn allegiance will die the death of one belonging to the Days of Ignorance.” It is understood that this demands the existence of a Bay’ah on the neck for the Khaleefah and not that every Muslim must give the pledge, and therefore if the number of Muslims is billion, it is not demanded that the billion gives the pledge, but that there must be a Khaleefah present who will take the Bay’ah by consent from the Ummah or those who represent the Ummah.”
আল-খতিব আল বাগদাদী (রহ.)
আল-খতিব আল-বাগদাদী (রহ.) (মৃত্যু ৪৬৩ হিজরী) বর্ণনা করেন,
“সকল মুহাজির এবং আনসারগণ আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত সম্পর্কে একমত হন; তারা তাকে বলেন: ‘হে আল্লাহ্’র রাসূলের খলীফা; এবং উনার পরে আর কাউকে খলীফা বলা হয়নি। এটা বলা হয়েছিল যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মৃত্যুর পর ত্রিশ হাজার মুসলিম ছিলেন। তারা সবাই আবু বকর (রা.)-কে খলীফা বলে অভিহিত করেন, এবং তারা (রা.) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পরে তাকে নেতা হিসেবে মেনে নেন। আমি বলি: এখানে মূল বিষয়টি এই নয় যে প্রত্যেক ব্যক্তি তার প্রতি আনুগত্য করেছিল, বরং মূল বিষয় হচ্ছে তারা একমত হয়েছিল যে, একজন ইমামের অনুপস্থিতি নিষিদ্ধ এবং তারা খিলাফতের (আল্লাহ্’র রাসুলের (সা) উত্তরাধিকারীর) বাধ্যবাধকতার বিষয়ে একমত হন; রাসুলুল্লাহ্ (সা) বলেন, “… এবং যে ব্যক্তি আনুগত্যের শপথ না করে মারা যায় সে জাহিলিয়্যাতের মৃত্যুবরণ করবে।” এই হাদীস থেকে বোঝা যায় যে এটি খলীফার প্রতি বাইয়াতের অস্তিত্বের দাবী করে। প্রত্যেক মুসলিমকেই যে বাইয়াত প্রদান করতে হবে তা নয়, অর্থাৎ যদি মুসলিমদের সংখ্যা বিলিয়ন হয় তবে বিলিয়নের প্রত্যেকের ব্যক্তিগতভাবে বাইয়াত দেয়ার প্রয়োজন নেই, বরং অবশ্যই একজন খলীফার উপস্থিতি থাকতে হবে যিনি উম্মাহ্ কিংবা উম্মাহ্’র প্রতিনিধিত্বকারীদের সম্মতিক্রমে বাইয়াত গ্রহণ করবেন।”
قال الإمام النووي في كتابه (المنهاج شرح صحيح مسلم) – المتوفي 676ه
وأجمعوا على أنه يجب على المسلمين نصب خليفة ووجوبه بالشرع لا بالعقل
Imam An-Nawawi (d. 676 AH), in his book “Al-Minhaj Sharh Sahih Muslim”
“And they (the Imams) unanimously agreed that it is obligatory for Muslims to appoint a Khaleefah and the obligation is by Islamic Law, not by human reasoning.”
ইমাম আন-নববী (রহ.)
ইমাম আন-নববী (মৃত্যু ৬৭৬ হিজরী) তার “আল-মিনহাজ শারহ্ সহীহ মুসলিম” গ্রন্থে বর্ণনা করেন,
“এবং তারা (ইমামগণ) সর্বসম্মতিক্রমে একমত হয়েছেন যে, একজন খলীফা নিয়োগ করা মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক এবং এই বাধ্যবাধকতা মানব মস্তিষ্কপ্রসূত যুক্তিপ্রয়োগে নয়, বরং ইসলামী আইন দ্বারা আরোপিত হয়েছে।”
قال الإمام الماوردي في كتابه (الأحكام السلطانية) – المتوقي 450ه
الْإِمَامَةُ مَوْضُوعَةٌ لِخِلَافَةِ النُّبُوَّةِ فِي حِرَاسَةِ الدِّينِ وَسِيَاسَةِ الدُّنْيَا، وَعَقْدُهَا لِمَنْ يَقُومُ بِهَا فِي الْأُمَّةِ وَاجِبٌ بِالْإِجْمَاعِ
Imam al-Maawardi (d. 450 AH) said in his book “Al-Ahkam Al-Sultania”
“The Imamate is constituted for the Khilafah of the Prophethood in guarding the Deen and the politics of the world and it is contracted upon the one who establishes it in the Ummah, as an obligation by Consensus.”
ইমাম আল-মাওয়ার্দী (রহ.)
ইমাম আল-মাওয়ার্দী (মৃত্যু ৪৫০ হিজরী) তার “আল-আহ্কাম আল-সুলতানিয়া” গ্রন্থে বলেন:
“দ্বীন এবং বিশ্বরাজনীতির (তথা দুনিয়া শাসনের) সুরক্ষা করতে নবুয়্যতের প্রতিনিধিত্বকারী (খিলাফতের শাসন তথা) ইমামত গঠিত হয় এবং যিনি উম্মাহ্’র মধ্যে এটি প্রতিষ্ঠা করবেন সে সাপেক্ষে তার সাথে আনুগত্যের চুক্তি করা হয়, যা ইজমা দ্বারা অত্যাবশ্যক (হিসেবে প্রমানিত)।”
قال شيخ الإسلام بن تيمية في كتابه (مجموع الفتاوى) – المتوقي 728ه
يجب أن يعرف أن ولاية أمر الناس من أعظم واجبات الدين ; بل لا قيام للدين ولا للدنيا إلا بها . فإن بني آدم لا تتم مصلحتهم إلا بالاجتماع لحاجة بعضهم إلى بعض ولا بد لهم عند الاجتماع من رأس
Ibn Taymiyyah (d. 728 AH) says in the book Majmou’ Al-Fataawa:
“It is obliged to know that the ruling of the people is of the greatest obligations of the Deen. Indeed the Deen cannot be established without it. The interests of the sons of Adam cannot be fulfilled except by gathering for each other’s needs; they inevitably need a leader when they gather.”
ইবনে তাইমিয়্যাহ্ (রহ.)
ইবনে তাইমিয়্যাহ্ (মৃত্যু ৭২৮ হিজরী) মাজমু’ আল-ফাতাওয়া গ্রন্থে বলেন:
“এটা জানা অত্যাবশ্যক যে, দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জনগণকে শাসন করা। নিশ্চয়ই এটা ব্যতীত দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। আদম সন্তান তাদের চাহিদা পূরণের নিমিত্তে একে অপরের সান্নিধ্যে এসে সমাজবদ্ধ হতে হয়; এবং যখন তারা সমাজবদ্ধ হয় তখন অনিবার্যভাবে তাদের একজন নেতার দরকার হয়।”
قال إبن خلدون في كتابه (المقدمة) – المتوقي 808ه
إن نصب الإمام واجب قد عرف وجوبه في الشرع بإجماع الصحابة والتابعين، لأن أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم عند وفاته بادروا إلى بيعة أبي بكر رضي الله عنه وتسليم النظر إليه في أمورهم. وكذا في كل عصر من بعد ذلك. ولم تترك الناس فوضى في عصر من الأعصار. واستقر ذلك إجماعاً دالاً على وجوب نصب الإمام
Ibn Khaldun (d. 808 AH) in his book, “Al-Muqadamma” stated,
“The appointment of an Imam is obligatory in Islamic Law by Consensus of the Sohaba (ra) and the Taabi’een. This is because the Sohaba (ra) of the Messenger of Allah (saw) upon his (saw) passing strove to render the Bay’ah to Abu Bakr (ra) and to entrust him with the supervision of their affairs. It was so in all subsequent periods. In no period were the people left in a state of anarchy. This was so by Consensus which evidences that the appointment of an Imam is an obligation.”
ইবনে খালদুন (রহ.)
ইবনে খালদুন (মৃত্যু ৮০৮ হিজরী) তার “আল-মুকাদ্দিমা” গ্রন্থে বলেন,
“সাহাবা (রা.) ও তাবে’ঈনদের ঐকমত্য যে, ইমাম নিয়োগ করা ইসলামী শারী‘আহ্ অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় তথা ফরয। এর কারণ হল, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর ওফাতের পর সাহাবাগণ (রা.) আবু বকর (রা.)-কে বাইয়াত দিতে উদ্যোগী হন এবং শাসনকার্য তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তার (রা.) উপর ন্যস্ত করেন। পরবর্তী সকল সময়ে এই অবস্থা বিরাজ করে। কোন যুগেই জনগণকে অভিভাবকহীন নৈরাজ্যকর অবস্থার মধ্যে ফেলা হয়নি। সাহাবাদের (রা.) ঐক্যমত্যের মাধ্যমে শারী‘আহ্ দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত যে, একজন ইমাম নিয়োগ করা বাধ্যতামূলক।”
قال شمس الدين محمد بن أحمد الرملي الأنصاري المشهور بالشافعي الصغير في كتابه (غاية البيان في شرح زبد ابن رسلان)
يجب على الناس نصب إمام يقوم بمصالحهم، كتنفيذ أحكامهم وإقامة حدودهم وسد ثغورهم وتجهيز جيوشهم وأخذ صدقاتهم أن دفعوها وقهر المتغلبة والمتلصصة وقطاع الطريق وقطع المنازعات الواقعة بين الخصوم وقسمة الغنائم وغير ذلك، لإجماع الصحابة بعد وفاته صلى الله عليه وآله وسلم على نصبه حتى جعلوه أهم الواجبات، وقدموه على دفنه صلى الله عليه وآله وسلم ولم تزل الناس في كل عصر على ذلك
Imam Shams Ad-Din Ar-Ramli Al-Ansari (rh)
Imam Shams Ad-Din Ar-Ramli Al-Ansari, known as the Small Shafi’i, states in his book “Ghayat Al Bayan Sharh Zubd Bin Raslan” states that,
“People must appoint an Imam who serves their interests, such as implementing their penal rules, guarding their borders, preparing armies, taking their charity if they give it, defeating the enemy and spies and high way robbers, solving conflicts, and dividing spoils and others. This is an obligation because of the consensus of the Companions after the death of the Prophet (saw) to appoint an Imam; they even made it the most important obligation, and gave it priority over the burial of the Prophet (saw), and people in every era adopted this.”
ইমাম শামস আদ-দ্বীন আর-রামলী আল-আনসারী (রহ.)
ইমাম শামস আদ-দ্বীন আর-রামলী আল-আনসারী, যিনি ছোট শাফি’ঈ নামে পরিচিত, তার “গায়াত আল-বায়ান শারহ্ জুবদ বিন রাসলান” গ্রন্থে বলেন:
“জনগণকে অবশ্যই একজন ইমাম নিয়োগ করতে হবে যিনি তাদের স্বার্থ রক্ষা করবেন, যেমন: তাদের ইসলামী দন্ডবিধি কার্যকর করা, তাদের সীমান্ত রক্ষা করা, সামরিক বাহিনী প্রস্তুত করা, তারা দান করলে তাদের দান গ্রহণ করা, শত্রু ও গুপ্তচর এবং মহাসড়ক ডাকাতদের পরাজিত করা, দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসন করা এবং যুদ্ধলব্ধ মালামাল ও অন্যান্য সম্পদ বন্টন করা। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর ওফাতের পরে সাহাবাগণ (রা.)-এর ইজমার (ঐক্যমত্য) কারণে ইমাম নিয়োগের বিষয়টি একটি বাধ্যবাধকতা; এমনকি তারা (রা.) এটিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাধ্যবাধকতা হিসাবে নির্ধারণ করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর দাফনের চেয়ে এটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। প্রতিটি যুগের লোকেরা এটি গ্রহণ করেছে।”
قال الفقيه الهيثمي في كتابه (الصواعق المحرقة) – المتوفي 974ه
اعلم أيضاً أن الصحابة رضوان الله عليهم أجمعوا على أن نصب الإمام بعد انقراض زمن النبوة واجب بل جعلوه أهم الواجبات حيث اشتغلوا به عن دفن الرسول ﷺ
Al-Haythami (rh)
Al-Haythami (rh) (died 974 aH) says in As-Saw’iq Al-Muhtariqa,
“I also know that the Companions, may Allah be pleased with them, unanimously agreed that appointing an Imam after the end of the time of Prophethood is an obligation. Indeed they made it the most important of obligations to the extent that they were occupied with it instead of with burying the Prophet (saw).”
আল-হায়ছামী (রহ.)
আল-হায়ছামী (মৃত্যু ৯৭৪ হিজরী) আস-সাওআ’য়িক আল-মুহাররাকা বলেন,
“আমি এটাও জানি যে, সাহাবাগণ (রা.) সর্বসম্মতভাবে একমত হন যে নবুয়্যতের সময় শেষ হওয়ার পরে ইমাম নিয়োগ করা অত্যাবশ্যক। নিশ্চয়ই এটিকে তারা (রা.) এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছেন যে, তারা (রা.) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দাফনকার্য হতে তা গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব মনে করে (তা বিলম্বিত করে) এই কাজে নিয়োজিত হন।”
قال الشيخ علي بلحاج (حفظه الله) في كراسته (إعادة الخلافة)
“إعادة الخلافة من أعظم واجبات الدين”: “الخلافة على منهج النبوة” كيف لا وقد قرر علماء الإسلام وأعلامه أن الخلافة فرض أساسي من فروض هذا الدين العظيم بل هو “الفرض الأكبر” الذي يتوقف عليه تنفيذ سائر الفروض، وإن الزهد في إقامة هذه الفريضة من “كبائر الإثم”، وما الضياع والتيه والخلافات والنزاعات الناشبة بين المسلمين كأفراد وبين الشعوب الإسلامية كدول إلا لتفريط المسلمين في إقامة هذه الفريضة العظيمة،”
Sheikh Ali Belhaj (may Allah (swt) preserve him) said in his booklet, “The Restoration of the Khilafah”
“Khilafah on the method of Prophethood” is one of the greatest obligations of the Deen. How can it not be?! It is the greatest duty since the scholars of Islam and its famous people decided that the Khilafah is the fundamental obligation from the obligations of this great Deen, but is “the greatest obligation,” upon which the establishment of other obligations depend. Neglecting the establishment of their obligation is one of the “greatest sins,” and the loss, confusion, disputes, and the conflicts between Muslims, as individuals, and between the Islamic people, as countries, are only because the Muslims neglected the establishment of this great duty.”
শেখ আলী বেলহাজ (হা.)
শেখ আলী বেলহাজ (আল্লাহ্ তাকে হেফাজত করুন) “খিলাফতের পুনরুদ্ধার” নামক তার পুস্তিকাতে বলেন,
“নবুয়্যতের আদলে খিলাফত” দ্বীনের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বাধ্যবাধকতাগুলোর মধ্যে একটি। কেনইবা এটা হবে না?! এটি সবচেয়ে বড় দায়িত্ব কারণ ইসলামের আলেমগণ ও এর বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ এই সিদ্ধান্তে ঐক্যমত্য যে, খিলাফত হচ্ছে মহান দ্বীন আল-ইসলামের বাধ্যবাধকতাগুলোর মধ্যে অন্যতম মৌলিক একটি বাধ্যবাধকতা, বরং এটিই “সবচেয়ে বড় বাধ্যবাধকতা”, যার উপর অন্যান্য বাধ্যবাধকতাসমূহের প্রতিষ্ঠা নির্ভর করে। তাদের বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠার অবহেলা “সবচেয়ে বড় গুনাহ্গুলোর” একটি। মুসলিমদের মধ্যে ব্যক্তি হিসেবে ও ইসলামী জনগণের মধ্যে দেশ হিসেবে ক্ষয়ক্ষতি, বিশৃংখলা, বিরোধ ও দ্বন্দ্বের কারণ হচ্ছে মুসলিমগণ এই মহান কর্তব্য পালনে অবহেলা করেছে।”
قال الشيخ بن عاشور في (أصول النظام الإجتماعي في الإسلام) – المتوفي 1393ه
“فإقامة حكومة عامة وخاصة للمسلمين أصل من أصول التشريع الإسلامي ثبت ذلك بدلائل كثيرة من الكتاب والسنة بلغت مبلغ التواتر المعنوي. مما دعا الصحابة بعد وفاة النبي ﷺ إلى الإسراع بالتجمع والتفاوض لإقامة خلف عن الرسول في رعاية الأمة الإسلامية”
Sheikh At-Taher Ibn Ashour (rh)
Sheikh At-Taher Ibn Ashour (d. 1393) (rh) said in his book Usul AnNitham Al-Ijtima’I Fil Islam,
“The establishment of a public and specific government for Muslims is one of the origins of Islamic legislation. This has been proven by numerous evidences from the Book and the Sunnah that reached the level of Tawatur Ma’nawi which made the Sahaba after the Prophet’s passing to rush, meet and consult to appoint a successor to the Prophet (saw) in looking after the affairs of the Islamic Ummah.”
শেখ আত-তাহির ইবনে আশুর (রহ.)
শেখ আত-তাহির ইবনে আশুর (রহ.) (মৃত্যু ১৩৯৩) তার উসুল আন-নিযাম আল-ইজতিমাঈ ফিল ইসলাম কিতাবে বলেছেন,
“মুসলিমদের জন্য একটি প্রকাশ্য ও সুনির্দিষ্ট সরকার প্রতিষ্ঠা ইসলামী শারী‘আহ্’র মৌলিক বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম। কিতাব ও সুন্নাহ্’র অসংখ্য দলিল দ্বারা এটা প্রমাণিত হয়েছে যা তাওয়াতুর মা’নাবী-এর স্তরে পৌঁছে গিয়েছে; এবং রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর ওফাতের পরে ইসলামী উম্মাহ্’র বিষয়াদি দেখাশোনার জন্য তাঁর (সাঃ) উত্তরসূরী নিয়োগের উদ্দেশ্যে এটি সাহাবাদেরকে (রা.) বৈঠক ও পরামর্শ করতে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল।”
قال الفقيه أبو الفتح الشهرستاني في كتابه (نهاية الأقدام)
“وما دار في قلبه ولا في قلب أحد أن يجوز خلو الأرض عن إمام … فدل ذلك كله على أن الصحابة رضوان الله عليهم وهم الصدر الأول كانوا على بكرة أبيهم متفقين على أنه لا بد من إمام … فذلك الإجماع على هذا الوجه دليل قاطع على وجوب الإمامة..”
Faqih Abu Al-Fateh Ash-Shahristani (rh)
Faqih Abu Al-Fateh Ash-Shahristani (rh) stated in his book
“It was not in his heart (i.e. Abu Bakr (ra)) nor was it in the heart of anyone that it is allowed for the Earth may be free from an Imam. All this indicates that the Companions, the first generation, all agreed that there must be an Imam. Such consensus is a conclusive evidence of the obligation of the Imamah”
ফকীহ্ আবু আল-ফাতেহ্ আশ-শাহরিসতানী (রহ.)
ফকীহ্ আবু আল-ফাতেহ্ আশ-শাহরিসতানী (রহ.) তার গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন:
“তার (অর্থাৎ, আবু বকরের (রা.)) অন্তরে কিংবা অন্য কারো অন্তরে এটা ছিলই না যে পৃথিবীতে একজন ইমামবিহীন অবস্থায় থাকা বৈধ হতে পারে। এসবকিছুই নির্দেশ করে যে, সাহাবাগণ (রা.) – ইসলামের প্রথম প্রজন্ম, সকলেই একমত হন যে অবশ্যই একজন ইমাম থাকতে হবে। এ জাতীয় ঐক্যমত্য ইমামতের বাধ্যবাধকতার বিষয়ে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অকাট্য দলিল।”
ইসলামে রাজনীতি

বর্তমানে রাজনীতি একটা অতীব অপছন্দের বস্তুতে পরিণত হয়েছে। হানাহানি , লুটপাট আর দোষাদোষীর এ রাজনীতিতে মানুষ হাঁপিয়ে উঠেছে। এই সেকুলার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমরা ৫ বছর পর পর ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করি যেন তারা আমাদের হয়ে সংসদে কথা বলে, এলাকার উন্নয়ন হয়, আমরা একটু শান্তি, স্বস্তিতে, সন্তান-সন্তুতি নিয়ে নিরাপদে ধর্ম-কর্ম পালন করতে পারি। অথচ রাজনীতির প্রকৃত চর্চা যেটা দেখা যায় তা হলো, জনগণকে এই দিব সেই দিব নামক এক গাল মিথ্যা কথা বলে ক্ষমতায় যাওয়া, আর তারপর ব্যক্তিবিশেষ বা বিশেষ গোষ্ঠী এমনকি বিদেশি শক্তির হাতে জিম্মি করে যেকোনো মুল্যে সেখানে বসে থাকা। এর যেন কোন ব্যাতিক্রম নেই। এখানে সরকারি দলের মূল কাজ – যখন যে থাকে থাকে – তা হল বিরোধী দল ও মত কে দমন করা। এই উদ্দেশ্য হাসিলে তারা রাষ্ট্রের সকল শক্তি যেমন পুলিশ, র্যাব, বিচার বিভাগসহ সকল প্রশাসনিক কাঠামো, এমনকি সেনাবাহিনী পর্যন্ত ব্যবহারে দ্বিধা করে না।
এই অবস্থায় রাজনীতি ঘৃণা করা, নিজে দূরে থাকা, পরবর্তী প্রজন্মকে দূরে রাখতে আপ্রান চেষ্টা করা স্বাভাবিক। তাই আমরা অনেক জায়গায় বিশেষ করে মসজিদে লেখা দেখি “এখানে রাজনৈতিক আলাপ নিষিদ্ধ”। তাই আমরা দেখি ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের আহ্বান এবং তা বন্ধের জন্য রীতিমতো আন্দোলন।
কিন্তু আমরা ছাড়তে চাইলেও কি রাজনীতি আমাদের ছাড়ে? বেঁচে থাকতে হলে আমাদের সমাজবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রে বাস করতে হয়, রাষ্ট্রীয় নিয়মকানুন মানতে হয়। রাষ্ট্র একটি ব্যবস্থার অধীনে এইসব নিয়ম কানুন বানায় যা আমাদের প্রতিটি নাগরিকের জীবনকে প্রভাবিত করে, তা আমরা রাজনীতি পছন্দ করি বা না করি। যেমন: ভারতকে ঘৃণা করলেও রাষ্ট্রীয় নীতির কারণে ভারতের কর্তৃত্বর কাছে মাথা নোয়াতে বাধ্য হতে হয়, রাজনীতি করি বা না করি, ভারতের বাঁধ ছাড়া পানি সবার বাড়ি তলিয়ে দেয়। রাজনীতি না করলেও প্রতিমাসে গ্যাসের বিল দেয়ার পরও সিলিন্ডার কিনতে টাকা গুনতে হয় হয়, মাসে মাসে স্কুলে বেতন দিয়ে শিশুসন্তানকে LGBTQ বা সম্মতি থাকলে কিভাবে নিরাপদে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা যায় তা শিখতে পাঠাতে হয়। চোখ বন্ধ করলে তো আর প্রলয় বন্ধ হয় না। তাছাড়া আমাদের রাজনীতি বিমুখতা কিন্তু অযোগ্য ব্যক্তিদের আমাদের নিয়ে যা খুশি তাই করার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। রাজনীতি একদল অর্বাচীনের হাতে বন্দি হয়ে গেছে।
তাই আমাদের রাজনীতি বিমুখ নয় বরং রাজনীতি সচেতন জাতি হিসেবে তৈরি হতে হবে। তাহলে আমরা বুঝতে পারব রাজনীতি সমস্যা নয়, বরং সেকুলার গণতান্ত্রিক রাজনীতি সমস্যা যার একমাত্র সমাধান ইসলামের রাজনীতি।
ইসলামে রাজনীতি কী, কিভাবে করতে হবে তা আল্লাহ তায়ালা পরিস্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন আর রাসূল (সা) করে দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। আল্লাহভীতি, দায়িত্বশীলতা আর জবাবদিহিতা যে রাজনীতির মূল চিন্তা। আর অন্যদিকে প্রচলিত সেকুলার রাজনীতি আমাদের মত ক্ষুদ্র সীমাবদ্ধ লোভী মানুষের মাথা থেকে এসেছে, যা তাকে “যা খুশি তা করার সার্বভৌম ক্ষমতা” দিয়ে রেখেছে। দিয়েছে নিজের পক্ষে আইন বানানোর দায়হীন-সীমাহীন স্বাধীনতা।
প্রচলিত সেকুলার রাজনীতির নোংরা practice এর কারণে ইসলাম আর রাজনীতির কথা আসলে আমাদের মাথায় click করে – ইসলামের মত পবিত্র জিনিসের সাথে রাজনীতির মত নোংরা জিনিস থাকতে পারে না।
তাছাড়া কাফেরদের continuous effort আর সেকুলার রাষ্ট্রে থাকার কারণে আমাদের শিখতে হয়েছে ইসলাম একটা ধর্ম আর এতে কার্যকরী কোন পলিটিক্যাল সিস্টেম নাই। আমি সংক্ষেপে আপনাদের সামনে ইসলামের রাজনীতির চর্চা উপস্থাপন করার চেষ্টা করব ইনশাল্লাহ।
আমরা জানি ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিআমত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে। (সূরা মায়িদা: ৩)
ইসলাম একটি দীন। অর্থাৎ জীবন পরিচালনার সবকিছুই এতে আছে।
نَزَّلۡنَا عَلَیۡكَ الۡكِتٰبَ تِبۡیَانًا لِّكُلِّ شَیۡءٍ
আমি তোমার প্রতি এ কিতাব নাযিল করেছি যা প্রত্যেকটি বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা। (সূরা নাহল: ৮৯)
জীবনের ছোট বড় সব সমস্যার সমাধান যেখানে আছে, রাজনীতির মতো vast একটি বিষয় যা জীবনের সাথে এভাবে ওতপ্রোত ভাবে মিশে আছে তা ইসলাম থেকে বাদ যায় কিভাবে?
তাছাড়া আমরা জানি ইসলাম সগৌরবে হাজার বছরের উপরে দুনিয়ার শাসন করেছে, ইসলামের পলিটিক্স ছাড়া পৃথিবীর শাসন করা সম্ভব ছিল কি ?
ইসলামে রাজনীতি অবশ্যই আছে তবে তার পেছনের চিন্তা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ইসলামে যে আরবি শব্দটি ব্যবহার করে পলিটিক্স বোঝানো হয় সেটি হলো সিয়াসা। যা এসেছে মুল শব্দ সা-সা ইয়া সুসু থেকে। শব্দটির অর্থই হলো “উম্মাহর দেখাশোনা করা”। আগে এই বৃহৎ ও মহান কাজ নবী-রাসূলগণের উপর অর্পিত হত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, “বনী ইসরাঈলের নবীগণ তাঁদের উম্মতদের শাসন করতেন। যখন কোন একজন নবী মারা যেতেন, তখন অন্য একজন নবী তাঁর স্থলাভিসিক্ত হতেন। আর আমার পরে কোন নবী নেই। তবে অনেক খলীফাহ্ হবে। সাহাবগণ আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনি আমাদেরকে কী নির্দেশ করছেন? তিনি বললেন, তোমরা একের পর এক করে তাদের বায়’আতের হক আদায় করবে। তোমাদের উপর তাদের যে হক রয়েছে তা আদায় করবে। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করবেন ঐ সকল বিষয়ে যেসবের দায়িত্ব তাদের উপর অর্পণ করা হয়েছিল। [সহিহ বুখারী-হাদীস নং-৩৪৫৫;সহীহ মুসলিম-হাদিস নং ৪৭৫০]
ইতিহাসে আমরা দেখি পরবর্তীতে এই দায়িত্বটি খলীফার মাধ্যমে খিলাফতে ব্যবস্থায় পালিত হত।
Secular democratic system এ রাজনীতির করার ধরণটা হলো এইরকম – রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দল ক্ষমতায় আরোহণ করে দেশ শাসন করার সুযোগ হাতিয়ে বলে – “জনকল্যাণ করবে theoretically” আর practically ছলে বলে কৌশলে নিজেদের আখের গোছাবে। বিনিময়ে পুঁজিপতিদের স্বার্থ দেখা, এমনকি দেশও যদি বিক্রি করতে হয়। ইসলামের রাজনীতিতে “ক্ষমতায় যেতেই হবে” এইকেন্দ্রিক না। কারণ খলীফা একবার নির্বাচিত হওয়ার পর শরীয়াহ নির্ধারিত কারণ, যেমন মারা যাওয়া, পাগল বা deadly diseases এ আক্রান্ত হওয়া বা শত্রু দারা অপহৃত হওয়া যেক্ষেত্রে মুক্তির আশা নাই ইত্যাদি না হলে তিনি যতদিন শরীয়াহ দিয়ে আমাদের পরিচালনা করবে ততদিন দায়িত্বে থাকবেন। কোন মেয়াদ নাই। এটাই তার সাথে আমাদের চুক্তি।
জনগণ কর্তৃক নিযুক্ত খলীফার মৃত্যু হলে পুনরায় নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরবর্তীকালে নির্বাচন এবং জনগণের বায়াত এর মাধ্যমে পরবর্তী খলীফা নির্বাচিত হবে। সে যেকোনো নাগরিক নিজেকে শরীয়াহ নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী যোগ্য মনে করলে নির্বাচনে অংশগ্রহন করতে পারে। তাছাড়া মাজলিশে উম্মাহতে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আমাদের প্রয়োজন ও দাবী খলীফাকে জানিয়ে দিবে, তাকে প্রয়োজনীয় উপদেশও দিবে। শরীয়াহর অধীনে থাকা আমাদের জন্য ফরয। আমাদের পক্ষ থেকে খলীফাকে আমরা শরীয়াহ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করব, আর এ কারণে আমরা তাকে দেখে রাখব যে তিনি এ কাজ যথাযথ ভাবে আদায় করছে। আবু বাকর (রা.) তার খলীফা নিযুক্তির পর প্রথম ভাষণে বলেছিলেন, “আপনারা যদি দেখেন আমি সঠিক কাজ করছি আমাকে সহায়তা করবেন। যদি দেখেন আমি বিপথগামী হচ্ছি, আমাকে সতর্ক করে দেবেন। “(বিদায়াহ ওয়ান – নিহায়াহ ৬/৩০৫,৩০৬)
খিলাফাতে প্রত্যেক ব্যক্তি বা প্রতিটি ইসলামের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল আল্লাহ কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব হিসাবে তা পালন করবে। এভাবে শাসক সিয়াসাহ বা জনগণের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করবে এবং উম্মাহ তাকে দেখে রাখবে। এভাবে শাসক থেকে জনগন, প্রত্যেকে আমরা রাজনীতির এই মহান কাজে অংশগ্রহণ করব । এখন ইতিহাসে দেখি কিভাবে এই রাজনীতির চর্চা অর্থাৎ সকলের অংশগ্রহণে সিয়াসাহ বা জনগণের দেখাশনার দেখার কাজটি হয়েছে।
প্রতিটি জনগণের basic need fulfil করা খিলাফাহ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। খলিফা হযরত ওমর (রা) কে কাবার গিলাব সজ্জিত করার কথা বললে উনি বলেন, কাবার গিলাব সজ্জিত করার চাইতে উম্মার ক্ষুধার্ত পেট গুলি ভরা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এটা শরীয়াহ প্রয়োগ করে, তার পুরো প্রশাসনকে খাটিয়ে এটি বাস্তবে পরিণত করেছেন। তার শাসনামলে যখন খিলাফাহর বয়স মাত্র ১০ বছর, তখন শিশু জন্ম নেয়া মাত্র আর ব্যক্তি বৃদ্ধ হওয়া মাত্র ভাতা পেত। আর সাধারণ মানুষের ভাবনা এমন ছিল না যে- “যাক! আমরা ভাল লোক নিয়োগ দিয়েছি, দেশ – জনগণ সব ভাবনা তার উপর, আমরা কামাই রোজগার করি, খাই দাই ঘুরে বেড়াই, সুবিধা মত দান সাদাকা আর নফল ইবাদতে ডুবে থাকি,” না! বরং অতীতে হাজার বছরের খিলাফতের ইতিহাসে জনগণ খুব ভালভাবে শাসককে দেখে রেখেছে। আমাদের অতি পরিচিত একটা ঘটনা। একবার খলিফা ওমর (রা) এর কাপড় এক টুকরার জায়গায় দুই টুকরা পাওয়ায়, ভরা মজলিশে তার কাছে জবাব চাওয়া হয়। খলিফা ওমর (রা) “আমি এত করি তাও দেখেন না, দিব সব কাপড়ের মিল বন্ধ করে “– এই হুমকি তিনি দেননি। ওমর (রা)’র বিব্রতকর ভাব দেখে তার ছেলে তার হয়ে ব্যাখ্যা দেন যে তিনি তার পিতাকে নিজের কাপড়টি দিয়েছেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন যেন তাকে খলীফা হিসেবে কঠিন জবাবদিহিতায় রাখা হয়। একটি নির্দিষ্ট দিনে তিনি সবার সামনে এসে পিছনে ঘুরে থাকতেন এবং বলতেন আমার বিরুদ্ধে কার অভিযোগ থাকলে নির্ভয়ে বল, আমি তার চেহারাও দেখব না।
উম্মাহকে রাজনৈতিক ভাবে সচেতন রাখাও রাষ্ট্রের কাজ। প্রখ্যাত ইসলামি scholar রাজনিতিবিদ শেখ তাকিউদ্দিন আন নাবহানি (রহ.) বলেছেন, ” চিন্তা কোন জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ”। তাই রাষ্ট্র উম্মাহ চিন্তা শানিত করতে সম্ভাব্য সকল কিছু করবে। উম্মাহ যেন রাজনৈতিক ভাবে সচেতন থাকে তারজন্য উমার (রা) আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তিনি সমাজের বিভিন্ন স্তরে ঘুরে ঘুরে খোঁজ রাখতেন সাধারন মানুষের আলাপ আলোচনায় কি প্রাধান্য পায়? তারা কি জীবনের ছোট ছোট বিষয়, খাওয়া-দাওয়া, জীবিকা নিয়েই কেবল ব্যস্ত হয়ে পরছে নাকি জিহাদ, রাষ্ট্র, নীতিমালা এসব দিকেও খেয়াল রাখছে। একজন সাধারন নারী যখন মজলিসে তার দেন-মোহর নিয়ে ঘোষিত নীতির বিরোধিতা করেন, তখন তার শরীয়াহ গ্রহণযোগ্যতা বেশি থাকায় তিনি আনন্দিত হয়ে যান এবং বলেন একজন নারীও খলীফা উমর থেকে বেশি জানেন, আলহামদুলিল্লাহ। এক জনাকীর্ণ ভাষণে খলিফা উমর (রা) সকলে তার কথায় সায় দিচ্ছে দেখে জন্য চিন্তিত হয়ে পরেন এবং জিজ্ঞেস করেন,”আমি ভুল করলে তোমরা কী করবে? উম্মাহর থেকে একজন যুবক জবাব দিয়েছিল “আপনাকে তীরের মত সোজা করে দেবো।” হযরত উমর (রা) খুশি হয়েছিলেন এরকম সচেতন উম্মাহ পেয়ে। আর আজকে জাতিকে অন্ধকারে রাখা রাষ্ট্রের agenda। ভারতের সাথে কী চুক্তি হয়েছে আমরা জানি না। আমেরিকা, আদানি এদের সাথে চুক্তি হবার বহু পড়ে আমরা জানতে পারি আর এর ঘানি টানি। রাষ্ট্র প্রথমতঃ পরিকল্পিত শিক্ষানীতির মাধ্যমে আমাদের চিন্তাহীন, অনুকরণ প্রিয়, দাস মনোবৃত্তির জেনারেশন হিসেবে গড়ে তুলেছে। দ্বিতীয়তঃ আমাদের জন্য ফান ফুর্তিকে সহজ আর জীবিকা উপার্জন কে চরম কঠিন করে তা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে একরকম বাধ্য করে রেখেছে ।
যাই হোক, তার মৃত্যুর পর তিন দিনের মাথায় পরবর্তী খলীফা নির্বাচিত হয়। অন্তর্বর্তীকালীন আমিরের তত্ত্বাবধানে নির্বাচিত ছয়জন খলীফা প্রার্থীদের মধ্য থেকে জনগণের বায়াতের মাধ্যমে । এভাবে জনগণ খলিফা নির্বাচন, জবাবাদিহিতা, উপদেশসহ প্রতিটি কাজে অংশগ্রহনের মাধ্যমে রাজনীতিতে শরিক হয়।
শাসক পরিবর্তনের কারণ ও উপায় সম্পর্কেও ইসলামের রাজনীতিতে দিকনির্দেশনা আছে।
শাসক ভাল বা খারাপ হতে পারে। এই ব্যবস্থা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছ থেকে আসা ত্রুটিমুক্ত একটি ব্যবস্থা, কিন্তু এই ব্যবস্থা চালাবে মানুষ যার ভুল হয়। তাহলে কী করতে হবে? প্রথমে আল্লাহ খারাপ শাসক define করেছেন। সেই definition টাও আমাদের হাতে ছাড়েননি। এমন না, আমার ব্যবসাকে সুযোগ কম দিলে বা আমার দলকে ক্ষমতায় বসাতে আমরা শাসক বিরোধী কাজে লিপ্ত হতে পারব, জ্বালাও – পোড়াও আন্দোলন শুরু করতে পারব । হাদীসে আছে,
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ডাকলেন এবং আমরা তাঁকে বাইয়াত দিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের থেকে যে বিষয়ে বাইআত নিলেন তা হলো, আমরা আমাদের পছন্দনীয়-অপছন্দনীয় বিষয়ে, সুখে-দুঃখে এবং আমাদের উপর যদি অন্য কাউকে প্রাধান্য দেয়া হয় তথাপিও (আমীরের কথা) শুনব ও আনুগত্য করব এবং আমরা শাসকদের সাথে শাসনকার্য নিয়ে বিবাদে জড়াব না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন তবে হ্যাঁ, যদি তোমরা কুফরে বাওয়াহ তথা সুস্পষ্ট কোন কুফর দেখতে পাও, যার ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে- তাহলে ভিন্ন কথা।” – সহীহ মুসলিম: ১৭০৯
সুস্পষ্ট কুফর কোনটা?
সুরা মায়িদা র ৪৪,৪৫ ৪৭ আল্লাহ সেটা ও clear করেছেন।
وَ مَنۡ لَّمۡ یَحۡكُمۡ بِمَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰهُ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الۡكٰفِرُوۡنَ
আর যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে ফয়সালা করে না, তারাই কাফির। [সূরা মায়িদা ৫: ৪৪]
مَنۡ لَّمۡ یَحۡكُمۡ بِمَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰهُ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الظّٰلِمُوۡنَ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিচার ফায়সালা করে না তারাই যালিম। [সূরা মায়িদা ৫: ৪৫]
وَ مَنۡ لَّمۡ یَحۡكُمۡ بِمَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰهُ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الۡفٰسِقُوۡنَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করে না, তারাই ফাসিক। [সূরা মায়িদা ৫: ৪৭]
এমন হলে কী করতে হবে? তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। আমরা জানি শাসকদের কাছে রাষ্ট্র ক্ষমতা, তারা শক্তিশালী। তাদের বিরুদ্ধে এমনকি দলবদ্ধভাবেও জবাব চাওয়া কঠিন। তাই আল্লাহ রাসূল (সা) এই কাজকে চূড়ান্ত সাহসিকতার কাজ বলেছেন, এই কাজে সর্বোচ্চ সম্মানের কথা বলেছেন। জাবির (রা.) বলেন, নবী করীম (সা) বলেছেন, ‘শহীদদের সর্দার হচ্ছেন হামযা ইবনু আবদুল মুত্তালিব এবং সেই ব্যক্তিও শহীদদের সর্দার যে অত্যাচারী নেতার নিকটে গেল এবং তাকে ভাল কাজের আদেশ করল এবং মন্দ কাজের নিষেধ করল। তখন সে তাকে হত্যা করল’ (তিরমিযী, তারগীব হা/৩৩০২), (ত্বাবারানীর আওসাত্ব ৪০৭৯,হাকেম ৪৮৮৪,স: তারগীব ২৩০৮)
আমরা ইমাম ইবনে হাম্বল (রহ), আবু হানিফা (রহ)-কে এ কাজ করতে যেয়ে কারাবরণ ও নির্যাতিত হতে দেখেছি। ক্ষমতায় যেতে নয়, বরং ফরজ দায়িত্ব থেকে তারা সেটা করেছেন।
ইসলামের ভিত্তিতে রাজনীতি করা হলো সবচাইতে উচ্চ মানের একটি কাজ, উম্মাহর দেখাশোনা করা। নবী-রাসূলগণ এটা আগে করে গেছেন, এখন আমরা করছি। আর এই উঁচু মানের কাজটি আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড। আমাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে,
كُنۡتُمۡ خَیۡرَ اُمَّۃٍ اُخۡرِجَتۡ لِلنَّاسِ تَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ تَنۡهَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡكَرِ وَ تُؤۡمِنُوۡنَ
তোমরাই সর্বোত্তম উম্মাত, মানবজাতির (সর্বাত্মক কল্যাণের) জন্য তোমাদের আবির্ভুত করা হয়েছে, তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ কর ও আল্লাহর প্রতি ঈমান রক্ষা করে চল। (সুরা আলে ইমরান : ১১০)
সুতরাং রাজনীতি করা, ইসলাম যেভাবে করতে বলেছে সেভাবে করা – প্রত্যেকের উপর ফরজ এবং সবচাইতে গৌরবের কাজ।
আর যদি আমরা তা না করি- রাসুল (সা) বলেন, ‘‘সে সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন! তোমরা অবশ্যই একে অপরকে সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। তা না হলে আল্লাহ্ তা‘আলা অচিরেই তোমাদের উপর তাঁর পক্ষ থেকে বিশেষ শাস্তি পাঠাবেন। তখন তোমরা তাঁকে ডাকবে; অথচ তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না’’। (তিরমিযী ২১৬৯)
আজ ইসলামের রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, ইসলামের ভিত্তিতে সৎকাজের আদেশ আর অসৎ কাজের নিষেধ থেকে বিরত থেকে আমরা নিজেদের সেই পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছি যেখানে আমরা দুহাত তুলে আল্লাহকে ডাকছি, কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সাড়া দিচ্ছেন না। ফিলিস্থিনে হত্যা বন্ধ হচ্ছে না, ভারত তার আগ্রাসন বন্ধ করে না, আমরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি। রোহিঙ্গা ভাই বোনেরা সমদ্রে, জঙ্গলে পশুদের মত মারা যাচ্ছে, আমরা কিছুই থামাতে পারছি না।
এবার আমরা যদি একটু আমাদের নিজেদের দিকে তাকাই। আমাদের ব্যস্ত রাখা হয়েছে আর আমরাও এই ফাঁদে পড়ে নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত আছি। আমরা ব্যস্ত আছি আমাদের ঘর-সংসার, চাকরি-বাকরি, পড়াশোনা আর ব্যক্তিগত ইবাদতে আর পরিস্থিতিকে গালি দিয়ে দুইটা face book post দিয়ে দায়িত্ব সারছি! রাজনীতি বিমুখ হয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। আজকে আমাদের এই তরুণ ছেলেগুলো যদি শুধু মাত্র স্বার্থপরের মত নিজেদের কথাই ভাবত, আমরা কি এই যালিম শাসক থেকে মুক্তি পেতাম? পেতাম না।
এখন যদি আমরা ভাবি, একই ভাবে জীবন চালিয়ে যাব আর অন্তর্বর্তীকালীন একটা সরকার তারা আমাদের হয়ে এই ব্যর্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দিয়ে আমাদের সব সমস্যার সমাধান করে দিবে, আর যদি তারা কিছু problem করে তাহলে আবার টেনে নামাই দিবো। এভাবে বারবার error and trial এর চক্করে মুসলমান জাতি আর কত পড়বে? এই পুরা প্রক্রিয়াটা আসছে সেকুলার চিন্তা থেকে। মানুষের মাথা থেকে ভুলে ভরা সমাধান আসবে, কয়দিন তার উপরে আমল করব, ভুল ধরা পড়বে, আবার নতুন সমাধান বের করার গোল বৈঠক করবো। এবার আমরা থামি।
এই process যেহেতু ইসলাম থেকে আসে নাই এটা দিয়ে আমাদের কোন একটা সমস্যার সমাধান হয় নাই, কোনদিন হবেও না। তাই সেকুলার পলিটিক্সের চেহারা দেখে রাজনীতিকে ঘৃণা করলে, এড়িয়ে চললে আমাদের বাস্তবতার পরিবর্তন হবে না। পরিবর্তন শুধুমাত্র আল্লাহর বলে দেওয়ার রাজনীতির মাধ্যমেই আনা সম্ভব। কারণ ইসলামি রাজনীতি যেমন theoretically perfect তেমনি এই মুহুর্তে practically একমাত্র option। তাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থেকে দেশ রাষ্ট্র সম্পর্কে উদাসীন হয়ে থাকলে, আমাদের জন্য রাসূল (সা) ভয়ানক warning রেখে গেছেন –
“ঐ সত্ত্বার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা অতি সত্বর আমর বিল মা’রূফ এবং নাহি আ’নিল মুনকার (সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ) কর। অন্যথায় অচিরেই তোমাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আরোপিত হবে। অতঃপর তোমরা তাকে ডাকবে কিন্তু তোমাদের ডাকে সাড়া দেয়া হবেনা।” (তিরমিযী)
আমরা চাই হানাহানি সেকুলার দলীয় রাজনীতি বন্ধ হয়ে সত্যিকারের রাজনীতি – ইসলামী রাজনীতি চালু হোক। খিলাফত ফিরে আসা না পর্যন্ত এই রাজনীতি সামগ্রিক ভাবে শুরু করা যাচ্ছে না। তাই আমদের সবার উচিত রাসুল (সা) পথ অনুসরণ করে এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার ঐক্যবদ্ধ চেষ্টা শুরু করা, খিলাফাহ ফিরিয়ে আনার রাজনীতি শুরু করা। রাসুল (সা) সে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে খিলাফাহ ফিরিয়ে এনেছেন সেই রাজনীতিতে শামিল হওয়া। শত শত মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই সুযোগ আমরা যেন কাফেরদের পক্ষে এবং ব্যর্থ গণতন্ত্র ঘষামাজার পিছনে ব্যয় না করে ফেলি। পরিশেষে যে কথাটি বলতে চাই, ইসলামের রাজনীতি সম্পর্কে আমাদের সচেতনতাই শুধুমাত্র এই অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ের অর্জিত এই মুভমেন্ট হাইজ্যাক হতে দেবে না। ইনশাআল্লাহ আমরা এই আন্দোলনকে খিলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারবো। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন। আমিন।
প্রশ্ন-উত্তর: মোটাতাজা বাছুর কুরবানি করা

আমজাদ আল-তামরির প্রশ্ন: আমাদের প্রিয় আমীর, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহ। আমি আল্লাহর কাছে আপনাকে সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল কামনা করছি। আমার প্রশ্ন: মোটাতাজা বাছুর দুই বছরের কম বয়সী হলে কি কোরবানির জন্য গ্রহণযোগ্য?
হাইথাম আবু শিখাইদিম প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম। দুই বছরের কম বয়সী মোটাতাজা বাছুর কোরবানি করা কি জায়েজ?
উত্তর:
আপনাদের উভয়ের প্রশ্ন একই বিষয়ে, এবং এর উত্তর হচ্ছে:
ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহ
১) কুরবানী একটি ইবাদত এবং রাসূল (সা:) এর শর্তাবলী ব্যাখ্যা করেছেন। কোরবানির শর্তের মধ্যে রয়েছে এর বয়স।
রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন:
«لَا تَذْبَحُوا إِلَّا مُسِنَّةً، إِلَّا أَنْ يَعْسُرَ عَلَيْكُمْ، فَتَذْبَحُوا جَذَعَةً مِنَ الضَّأْنِ»
“শুধুমাত্র একটি পূর্ণ বয়স্ক পশু কোরবানি কর যদি না এটি তোমাদের পক্ষে কঠিন হয়, সেক্ষেত্রে একটি মেষশাবক কোরবানি দাও।” [মুসলিম বর্ণনা করেছেন]। গরুর বড় প্রাণী হওয়ার অর্থ দুই বছর বা তার বেশি বয়স হওয়া। মোটাতাজা এবং প্রচুর গোশত থাকলে যাদের বয়স দুই বছরের কম তাদের জন্য কুরবানী বৈধ বলে আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে যে বক্তব্য রয়েছে তা একটি ভুল বক্তব্য। এই যুগে কয়েকজন ফতোয়াদাতা ছাড়া যদি দুই বছরের কম বয়সী গরুর প্রচুর গোশত থাকে তবে তা কুরবানী করা জায়েজ বলে কেউ বলেনি, এবং তাদের ফতোয়া দলীল-প্রমাণের বিপরীত এবং যা সালফে সালেহীন আলেমদের বক্তব্যের খেলাপ।
শরীয়তে বৈধ শেয়ার ও পরিমাণের কোন ‘ইল্লাহ নেই, তাই শেয়ার বা পরিমাণ ‘ইল্লাহ’ প্রয়োগ ছাড়াই বিবেচনা করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাদীসটি স্পষ্ট:
«لَا تَذْبَحُوا إِلَّا مُسِنَّةً»
“শুধুমাত্র একটি পূর্ণ বয়স্ক পশু কোরবানি কর”, বয়স্ক গরু বলতে বোঝায় যা দুই বছর বয়স অতিক্রম করেছে এবং তৃতীয় বছরে প্রবেশ করেছে। এখানে নিষেধাজ্ঞা একটি কঠোর নিষেধাজ্ঞা, এবং টেক্সট-এর মধ্যে চুড়ান্ত ইঙ্গিত (কারীনা) স্পষ্ট, এবং এটি দরিদ্রদের জন্য একটি ব্যতিক্রম যাদেরকে ভেড়ার বাচ্চা তথা জাযা’আর কোরবানি করা জায়েয করা হয়েছে। আর তা হলো ভেড়ার বাচ্চা যা ছয় মাস পূর্ণ করেছে।
কুরবানী করা একটি ইবাদত, এটি একটি নির্ধারিত (তাওকীফিয়াহ) ইবাদত, অন্যান্য ইবাদতের মতো। এটি তার শর্ত ও কারণ অনুযায়ী সম্পাদিত হয়, যা শরীয়ত দ্বারা বর্ণিত হয়েছে। এসব শর্তে ‘ইল্লাহ’ নেই এবং এসব (শর্ত) ছাড়া কুরবানী বৈধ নয়।
2- “মাফাহিম” (কনসেপ্টস)-এর আরবি পৃষ্ঠা ৩৪-এ বলা হয়েছে: (ইসলামী ব্যবস্থাগুলি ‘ইবাদত, নৈতিকতা, খাদ্যদ্রব্য, পোশাক, মুআমালাত (লেনদেন) এবং দণ্ডবিধি সম্পর্কিত আহকাম শরীয়াহ দ্বারা গঠিত।
ইবাদত, নৈতিকতা, খাদ্যদ্রব্য, পোশাক-আশাক সম্পর্কিত খোদায়ী বিধি-বিধানকে ‘ইল্লাহ’ (আইনগত কারণ) দ্বারা যুক্তিযুক্ত করা যায় না।
রাসূল (সা) বললেন:
«حُرِّمَتِ الْخَمْرَةُ لِعَيْنِهَا»
“মদ (খামর) নিজের (বৈশিষ্ট্যের) জন্যই হারাম।”
তবে লেনদেন এবং দণ্ডবিধি সম্পর্কিত আহকাম শরাহ ‘ইল্লাহ’ দ্বারা যুক্তিযুক্ত। কারণ এসব বিষয়ে হুকম শারঈ একটি ‘ইল্লাহ’র ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা বিধি-বিধান প্রণয়নের কারণ। অনেকেই শরীয়াহর সকল বিধি-বিধানকে সুবিধা (মাসলাহাহ) অনুসারে ন্যায্যতা দিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে, কারণ তারা পশ্চিমা মতাদর্শ এবং পশ্চিমা সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত, যা শুধুমাত্র উপযোগকেই কর্মের মাপকাঠি হিসাবে দেখে।
এই ধরনের বুঝ ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের সাথে সাংঘর্ষিক, যা রূহকে সকল কর্মের ভিত্তি বলে মনে করে; এবং বস্তুর সাথে রূহের মিশ্রণকে সমস্ত কর্মের নিয়ন্ত্রক করে তোলে। ইবাদত, নৈতিকতা, খাদ্যসামগ্রী ও পোশাকের সাথে সম্পর্কিত আহকাম শরীয়াহ একেবারেই যুক্তিনির্ভর নয়, কারণ এই নিয়মগুলির জন্য কোনো ‘ইল্লাহ’ নেই। সেগুলোকে সেভাবে নেওয়া উচিত যেমন ভাবে সেগুলো টেক্সটে এসেছে এবং ‘ইল্লাহ’র উপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত নয়। নামাজ (সালাত), রোজা (সাওম), হজ, যাকাত, নামাজ পড়ার পদ্ধতি এবং এর রাকাতের সংখ্যা, হজের আচার এবং যাকাত প্রদানের জন্য ন্যূনতম সম্পত্তির পরিমাণ (যাকাতের নিসাব) এবং অনুরূপ, এসবকিছু নিতে হবে, গ্রহণ করতে হবে এবং এ ব্যপারে অনুগত হতে হবে যেমনভাবে তারা (তাওকিফি) টেক্সটে এসেছে এবং তাদের জন্য কোন ‘ইল্লাহ খোঁজা হবে না…)
সুতরাং কোরবানির বয়স অতিক্রম করা জায়েজ নয়, বাছুরটি মোটাতাজা হোক বা বয়স্ক না হোক না কেন, যেহেতু টেক্সটে কোনো ‘ইল্লাহ ছাড়া বয়স উল্লেখ করা হয়েছে, তাই এটি (অনুসরণ) বাধ্যতামূলক।
























