তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
উত্তর আধুনিকতাবাদে ইসলামী উম্মাহ

পোস্টমডার্নিজম (তথা উত্তরাধুনিকতাবাদ)-এর আবির্ভাব ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে ঘটে যাওয়া সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সঙ্কটের পটভূমিতে ঘটে। আধুনিকতার ব্যর্থতা—যেমন দুটি বিশ্বযুদ্ধ, ফ্যাসিবাদের উত্থান, উপনিবেশবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী সহিংসতা (যেমন আলজেরিয়া ও ভিয়েতনাম যুদ্ধ), এবং শ্রেণী বৈষম্য—এই সকল বিষয়ে হতাশা থেকেই পোস্টমডার্ন সমালোচনার উদ্ভব ঘটে। মিশেল ফুকো ও জ্যাক দেরিদার মতো চিন্তাবিদগণ আধুনিকতার রৈখিক অগ্রগতির দাবি ও যুক্তির কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং এর পরিবর্তে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতার আপেক্ষিকতার উপর জোর দেন।
পোস্টমডার্নিজম প্রথমে পশ্চিমা বিশ্বের সার্বজনীন দাবিকে চ্যালেঞ্জ করার মাধ্যম হিসেবে গড়ে উঠলেও, পরবর্তী সময়ে কিছু চিন্তাধারার পক্ষ থেকে তা ইসলামি রাজনৈতিক আন্দোলনকে খাটো করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। পরিচয় ও ঐতিহ্যকে “গঠিত” বা “আবিষ্কৃত” বলে দাবী করার মাধ্যমে, পোস্টমডার্ন চিন্তা ইসলাম ও তার চর্চাকে অবৈধ ও মনগড়া হিসেবে উপস্থাপন করতে ব্যবহৃত হয়েছে।
সালমান সাইয়্যিদ তার বই Recalling the Caliphate-এ উল্লেখ করেন, একটি সাধারণ পোস্টমডার্ন কৌশল হচ্ছে ইসলামিজম (এখানে ইসলামি রাজনীতির ধারণা বোঝানো হয়েছে)-কে একটি “কল্পিত আসল ইসলাম”-এর মনগড়া নির্মাণ হিসেবে চিত্রায়িত করা:
“Islamism is presented as being a discourse ‘conjured’ around a fantasy of an authentic essence (al-Azmeh, 1993:7) … cultural forms such as ‘Islamic dress’ or ‘Islamic way of life’ are recent inventions and not the recovery of sacral traditions (1993:21) … The effect of arguments like this is to try and discredit Islamist claims for being legitimate expressions of a Muslim desire for autonomy and deep decolonisation of the world.”
“অর্থাত, ইসলামিজমকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন এটি একটি কল্পিত ‘প্রকৃত সত্তা’ বা ‘আসল ইসলাম’ ধারণার চারপাশে গঠিত একটি কৃত্রিম বর্ণনা (আল-আযমি, ১৯৯৩: ৭)। অর্থাৎ, ইসলামপন্থীরা যে ইসলামকে ‘প্রকৃত’ বলে দাবি করেন, তা মূলত একটি গঠিত ও রূপান্তরিত ঐতিহ্য, যা ইসলামের প্রকৃত বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে। একইভাবে, ‘ইসলামি পোশাক’ বা ‘ইসলামি জীবনধারা’-র মতো সাংস্কৃতিক রূপগুলোকে ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ না বলে বরং আধুনিক সময়ে গঠিত নতুন উদ্ভাবন হিসেবে দেখানো হয় (১৯৯৩: ২১)। এই ধরনের ধারণার উদ্দেশ্য হলো ইসলামপন্থীদের দাবিকে অগ্রহণযোগ্য প্রমাণ করা—যাতে তাদের দাবি মুসলিমদের স্বশাসনের আকাঙ্ক্ষা ও বিশ্বজুড়ে গভীর উপনিবেশমুক্তির একটি ন্যায্য ও বৈধ প্রচেষ্টা হিসেবে গণ্য না হয়।“
এই ধরনের পোস্টমডার্ন আক্রমণ মূলত ইসলামকে একটি ধর্ম হিসেবে সেক্যুলার পথে অগ্রসর না হওয়ার কারণে করা হয়েছে। সালমান সাইয়্যিদ লিখেছেন:
“As late as the last quarter of the twentieth century… Not only has Islam failed to follow the trajectory pursued by variants of Christianity… but it has, in contrast, forcefully reasserted its public presence in the world.”
অর্থ্যাৎ, বিংশ শতকের শেষ চতুর্থাংশ পর্যন্তও… ইসলাম কেবল খ্রিষ্টধর্মের বিভিন্ন ধারার অনুসৃত পথ অনুসরণে ব্যর্থই হয়নি… বরং তার বিপরীতে, বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রকাশ্য উপস্থিতিকে দৃঢ়ভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে।“
এই “মনগড়া ঐতিহ্য” হিসেবে রাজনৈতিক ইসলামের চিত্রায়ন আরও গভীরে গিয়ে এমনকি “ইসলাম” শব্দেরই বৈধতা এবং “উম্মাহ’র মতো ধর্মীয় ধারণাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। সালমান সাইয়্যিদের ভাষায়, এটি একটি “metaphysics of suspicion মানে, সন্দেহের অধিবিদ্যা”—যার মাধ্যমে ইসলামকে এতটাই বৈচিত্র্যময় ও খণ্ডিত বলা হয় যে, একে আর ঐক্যবদ্ধ কোনো সত্তা হিসেবে রাখা যায় না। ফলে মুসলিম উম্মাহ ধারণাটিও খণ্ডিত জাতীয়তা ও মতবাদে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
এই প্রচেষ্টাগুলো আসলে কিসের জন্য? প্রফেসর জোসেফ জে. কামিনস্কি তার বই Islam, Liberalism, and Ontology-তে বলেন:
“The rendering of Islam as an incoherent category ultimately subjects its meaning to the whims of hostile hegemonic actors and brute force… Approaches such as El Zein’s ultimately remove agency from Muslims—they are robbed of their ability to control how their own religious discourse is defined… this is imperialism par excellence.”
অর্থাৎ, ”ইসলামকে যদি বিভ্রান্তিকর ও অস্পষ্ট একটি ধারণা হিসেবে দেখানো হয়, তাহলে এর অর্থ কী হবে—তা ঠিক করে দেয় শত্রুভাবাপন্ন ক্ষমতাধর গোষ্ঠী ও জবরদস্তি করে চলা শক্তিগুলো। এল জেইনের মতো চিন্তাধারা এমনভাবে ইসলামকে ব্যাখ্যা করে যে, এতে মুসলিমদের নিজেদের ধর্ম নিয়ে কথা বলার ও তা ব্যাখ্যা করার অধিকারটাই যেন কেড়ে নেওয়া হয়। তারা আর ঠিক করতে পারে না, তাদের ধর্মের কথা কীভাবে উপস্থাপিত হবে। এটিই হচ্ছে প্রকৃত সাম্রাজ্যবাদ।“
ইসলামকে অস্পষ্ট করে উপস্থাপন করার ফলে পশ্চিমা শক্তি বা সেক্যুলার চিন্তাবিদরা ইসলামের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিতে পারে। তারা নির্ধারণ করতে পারে কোন ইসলামি চর্চা গ্রহণযোগ্য আর কোনটি চরমপন্থা।
উম্মাহ ধারণাটিকে কেবল একটি ভাষাগত নির্মাণ বলে চিহ্নিত করে, মুসলিম সংহতিকে দুর্বল করা হয়। এতে মুসলিমরা বিভক্ত হয় জাতীয়তাবাদী বা মতবাদভিত্তিক গোষ্ঠীতে, এবং খিলাফাহর মতো ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক দর্শন বাস্তবায়নে অক্ষম হয়ে পড়ে।
মুসলমানদের করণীয় হচ্ছে, তাদের ধর্মকে অন্যের দ্বারা সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ না দিয়ে, নিজেদের ঐতিহ্যের সাথে পুনরায় সম্পৃক্ত হওয়া। অধ্যাপক তালাল আসাদ তার প্রবন্ধ The Idea of an Anthropology of Islam-এ লেখেন:
“…one should begin, as Muslims do, from the concept of a discursive tradition that includes and relates itself to the founding texts of the Qur’an and the Hadith.”
“…একজনের উচিত মুসলমানদের মতো করে শুরু করা—একটি বাগ্মীয় ধারার (discursive tradition) ধারণা থেকে, যা কুরআন ও হাদীসের প্রাথমিক পাঠসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং সেগুলোর সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করে।”
ইসলাম, নিঃসন্দেহে, আল্লাহ্ ﷻ প্রদত্ত দ্বীন এবং এটি পূর্ণতা লাভ করেছে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মাধ্যমে প্রেরিত চূড়ান্ত রিসালাহর মধ্য দিয়ে।
আল্লাহ্ ﷻ বলেন,
ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَـٰمَ دِينٗا
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম, আমার অনুগ্রহ তোমাদের ওপর সম্পন্ন করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।” [সূরা আল-মায়েদাহ ৩]
যারা আল্লাহ্ ﷻ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এ ঈমান এনেছে, তারাই মুসলিম এবং একক উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ্ ﷻ বলেন,
إِنَّ هَـٰذِهِۦٓ أُمَّتُكُمۡ أُمَّةٗ وَٰحِدَةٗ وَأَنَا۠ رَبُّكُمۡ فَٱعۡبُدُونِ
“নিশ্চয়ই তোমাদের এই উম্মাহ একক উম্মাহ, আর আমি তোমাদের প্রতিপালক, সুতরাং তোমরা আমারই এবাদত কর।” [সূরা আল-আম্বিয়া ৯২]
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ، هَذَا كِتَابٌ مِنْ مُحَمَّدٍ النَّبِيِّ ﷺ بَيْنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ مِنْ قُرَيْشٍ وَيَثْرِبَ، وَمَنْ تَبِعَهُمْ، وَلَحِقَ بِهِمْ، وَجَاهَدَ مَعَهُمْ، أَنَّهُمْ أُمَّةٌ وَاحِدَةٌ مِنْ دُونِ النَّاسِ»
“রহমান ও রহিম আল্লাহ্র নামে। এ দলিল মুহাম্মদ ﷺ-এর পক্ষ থেকে কুরাইশ ও ইয়াসরিবের মুসলিম ও মুমিনদের মাঝে, এবং যাঁরা তাঁদের অনুসরণ করেছেন, তাঁদের সঙ্গে একত্রিত হয়েছেন ও তাঁদের সঙ্গে জিহাদ করেছেন—তাঁরা একক উম্মাহ, অন্য সকল মানুষের থেকে পৃথক।” (আল-বাইহাকি, আস-সুনান আল-কুবরা)
একক উম্মাহর স্বীকৃতি ও ইসলামের সত্যতার উপর ভিত্তি করে, মু’মিনগণ তাদের সম্মিলিত ফর্যে কিফায়াহ আদায়ের উদ্দেশ্যে প্রচেষ্টা চালাতে পারে—একক ইমারাহ, ইমামাহ ও খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার জন্য, যা আল্লাহ্ ﷻ অবতীর্ণ সকল বিষয় অনুযায়ী শাসন করবে।
তামিম আদ-দারি (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন উমর (রা.)-এর সময় লোকে উঁচু ভবন নির্মাণে প্রতিযোগিতা শুরু করে, তখন দ্বিতীয় খলিফা উমর (রা.) বলেছিলেন:
«يا معشر العرب، تمسكوا بالأرض، فإنه لا إسلام إلا بجماعة، ولا جماعة إلا بإمارة، ولا إمارة إلا بطاعة، فمن ولي من أمر الناس شيئاً على فقه كان له ولهم، ومن ولي على غير فقه كان عليه وعليهم»
“হে আরবগণ, জমিনে দৃঢ় থাকো! কারণ, কোনো জামাআত ছাড়া ইসলাম নেই, কোনো ইমারত ছাড়া জামাআত নেই, কোনো আনুগত্য ছাড়া ইমারত নেই। যে ফিকহ (তথা পোড় খাওয়া অর্থাৎ ইসলামের অভিজ্ঞতায়) সমৃদ্ধ, তাকে নেতা বানানো হলে তা তার ও তাদের (জনগণের) জন্য কল্যাণকর; আর যে ফিকহ (তথা পোড় খাওয়া অর্থাৎ ইসলামের অভিজ্ঞতায়) সমৃদ্ধ না, তাকে দায়িত্ব দিলে তা তার ও তাদের জন্য ধ্বংসকারী।” (আল-দারিমি)
জীবন ও মৃত্যুর রহস্য

নিম্নে আল-ওয়াই ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ দেওয়া হল, আরবি থেকে অনুবাদিত
জীবন একটি ছোট যাত্রা যা প্রতিটি প্রাণীর অনিবার্য মৃত্যুর সাথে শেষ হয়
১- মানুষ স্বভাবতই মৃত্যুকে ভয় পায় এবং এর আবির্ভাবের ব্যাপারে সতর্ক থাকে। এমনকি সে মৃত্যু থেকে পালাতে চায়, এর শক্তি থেকে বাঁচতে চেষ্টা করে। জীবনের অসংখ্য ঘটনা এই মানুষের এই প্রকৃতিকে প্রমাণ করে এবং মহান আল্লাহর কিতাবের অনেক আয়াতে (এ ব্যপারে) বলা হয়েছে:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ خَرَجُواْ مِن دِيَارِهِمْ وَهُمْ أُلُوفٌ حَذَرَ الْمَوْتِ فَقَالَ لَهُمُ اللّهُ مُوتُواْ ثُمَّ أَحْيَاهُمْ إِنَّ اللّهَ لَذُو فَضْلٍ عَلَى النَّاسِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لاَ يَشْكُرُونَ
তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা মৃত্যুর ভয়ে নিজেদের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন? অথচ তারা ছিল হাজার হাজার। তারপর আল্লাহ তাদেরকে বললেন মরে যাও। তারপর তাদেরকে জীবিত করে দিলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের উপর অনুগ্রহকারী। কিন্তু অধিকাংশ লোক শুকরিয়া প্রকাশ করে না [বাকারাহ: ২৪৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
وَجَاءتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ذَلِكَ مَا كُنتَ مِنْهُ تَحِيدُ
মৃত্যুযন্ত্রণা নিশ্চিতই আসবে, এ থেকেই তুমি টালবাহানা করতে [ক্বাফ: ১৯]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
قُلْ إِنَّ الْمَوْتَ الَّذِي تَفِرُّونَ مِنْهُ فَإِنَّهُ مُلَاقِيكُمْ
বলুন, তোমরা যে মৃত্যু থেকে পলায়নপর, সেই মৃত্যু অবশ্যই তোমাদের মুখামুখি হবে [জুমু’আ: ৮]
قُل لَّن يَنفَعَكُمُ الْفِرَارُ إِن فَرَرْتُم مِّنَ الْمَوْتِ أَوِ الْقَتْلِ
বলুন! তোমরা যদি মৃত্যু অথবা হত্যা থেকে পলায়ন কর, তবে এ পলায়ন তোমাদের কাজে আসবে না। তখন তোমাদেরকে সামান্যই ভোগ করতে দেয়া হবে [আহযাব: ১৬]
এই আয়াতগুলো যেমন দেখিয়েছে যে মানুষ মৃত্যু থেকে পালানোর চেষ্টা করে, তেমনি এও দেখিয়েছে যে মৃত্যু থেকে পালানোর চেষ্টা করে কোন লাভ নেই, তা থেকে পালানোর কোন উপায় নেই, যেমনটি বলা হয়েছে, { তারপর আল্লাহ তাদেরকে বললেন ‘মরে যাও‘ } { মৃত্যুযন্ত্রণা নিশ্চিতই আসবে } { বলুন, তোমরা যে মৃত্যু থেকে পলায়নপর, সেই মৃত্যু অবশ্যই তোমাদের মুখামুখি হবে } { বলুন! তোমরা যদি মৃত্যু অথবা হত্যা থেকে পলায়ন কর, তবে এ পলায়ন তোমাদের কাজে আসবে না } { প্রত্যেককে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে } [আম্বিয়া: ৩৫] { অবশেষে যখন তোমাদের কারো কাছে মৃত্যু আসে তখন আমাদের দূতরা তাকে গ্রহণ করে, আর তারা (দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে) অবহেলা করে না } [আন’আম: ৬১]
প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ তাদেরকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন যে, যদি মৃত্যু তাদের কাছে আসে, তাহলে তা থেকে তারা নিজেদের রক্ষা করে দেখাক, যেমনটি তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
قُلْ فَادْرَءُوا عَنْ أَنفُسِكُمُ الْمَوْتَ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ
বলুন, “তাহলে তোমরা নিজেদের থেকে মৃত্যুকে দূরে রাখো, যদি তোমরা সত্যবাদী হও” [আলে ইমরান: ১৬৮]
তারা যদি মৃত্যু থেকে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করে অথবা তাদের সময় এসে পৌঁছালে তা থেকে পালানোর চেষ্টা করে, তবুও তারা তা থেকে পালাতে পারবে না, যেমন মহান আল্লাহর বাণী:
أَيْنَمَا تَكُونُوا يُدْرِككُّمُ الْمَوْتُ وَلَوْ كُنتُمْ فِي بُرُوجٍ مُّشَيَّدَةٍ
তোমরা যেখানেই থাক না কেন; মৃত্যু কিন্তু তোমাদেরকে পাকড়াও করবেই। যদি তোমরা সুদৃঢ় দূর্গের ভেতরেও অবস্থান কর, তবুও [আন-নিসা: ৭৮]।
যেমন নূহ (আ)-এর পুত্রও চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সে নিজেকে রক্ষা করতে সফল হয়নি, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার সম্পর্কে বলেছেন:
قَالَ سَآوِي إِلَىٰ جَبَلٍ يَعْصِمُنِي مِنَ الْمَاءِ ۚ قَالَ لَا عَاصِمَ الْيَوْمَ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ إِلَّا مَن رَّحِمَ ۚ وَحَالَ بَيْنَهُمَا الْمَوْجُ فَكَانَ مِنَ الْمُغْرَقِينَ
সে বলল, আমি অচিরেই কোন পাহাড়ে আশ্রয় নেব, যা আমাকে পানি হতে রক্ষা করবে। নূহ (আ) বল্লেন আজকের দিনে আল্লাহর হুকুম থেকে কোন রক্ষাকারী নেই। একমাত্র তিনি যাকে দয়া করবেন। এমন সময় উভয়ের মাঝে তরঙ্গ আড়াল হয়ে দাঁড়াল, ফলে সে নিমজ্জিত হল [হুদ: ৪৩]
৩- যদি মৃত্যু অনিবার্য হয়, তবে প্রতিটি প্রাণীই অনিবার্যভাবে এর তিক্ততার স্বাদ গ্রহণ করবে, বিষয়টি পবিত্র কুরআন আমাদের এমনভাবে নির্দেশনা দেয় যেমনটি চোখ আছে এমন সকলের কাছে সূর্যের অস্ত্বিত্ব একটি স্পষ্ট বিষয়, তাহলে কে মানুষকে মৃত্যুর তিক্ততার স্বাদ গ্রহণ করায় এবং কে এর মাধ্যমে প্রত্যেক প্রাণীর সমাপ্তি ঘটায়? পবিত্র কুরআন এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেয় এই বলে যে, একমাত্র আল্লাহ তা’আলাই হলেন তিনি যিনি প্রতিটি প্রাণীর জন্য মৃত্যু নির্ধারণ করেছেন এবং তাদের বাধ্য করেছেন যে তারা এর পানপাত্র হতে পান করবে এবং তাঁর কর্তৃত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করবে, যেমনটি আমরা উপরে উদ্ধৃত আয়াতগুলোতে ব্যাখ্যা করেছি।
৪- যদিও কেউ কেউ অস্বীকার করে যে তাদের সৃষ্টিকর্তা আছেন এবং তিনিই তাদের জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান, তবুও তারা অস্বীকার করতে পারে না যে তাদের চোখের সামনে জীবন ও মৃত্যুর দুটি প্রক্রিয়া চলছে, লক্ষ লক্ষ নতুন জীবিত মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদ এবং লক্ষ লক্ষ মৃত মানুষের মধ্যে। তবে, তারা এর জন্য সময় এবং অনন্তকালকে দায়ী করে, এ অস্বীকার করে যে এই পার্থিব জীবনের পরে আরেকটি জীবন আছে। এসব লোকদের বস্তুবাদী বলা হয়। পবিত্র কুরআন তাদের মিথ্যাচার লিপিবদ্ধ করেছে, যেমনটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
وَقَالُوا مَا هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا يُهْلِكُنَا إِلَّا الدَّهْرُ ۚ وَمَا لَهُم بِذَٰلِكَ مِنْ عِلْمٍ ۖ إِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ
তারা বলে, আমাদের পার্থিব জীবনই তো শেষ; আমরা মরি ও বাঁচি মহাকালই আমাদেরকে ধ্বংস করে। তাদের কাছে এ ব্যাপারে কোন জ্ঞান নেই। তারা কেবল অনুমান করে কথা বলে [আল-জাসিয়াহ: ২৪]
৫- আল্লাহ তাআলা কেবল প্রতিটি প্রাণীর জন্য মৃত্যু নির্ধারণ করেননি, বরং তিনি প্রতিটি প্রাণীর জন্য, পাশাপাশি প্রতিটি জাতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি সময় নির্ধারণ করেছেন, যা বৃদ্ধি বা হ্রাস করে অতিক্রম করার ক্ষমতা কারও নেই। কুরআনের আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করেছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন:
وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَن تَمُوتَ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ كِتَابًا مُّؤَجَّلًا
“আর আল্লাহর হুকুম ছাড়া কেউ মরতে পারে না-সেজন্য একটা সময় নির্ধারিত রয়েছে” [আলে ইমরান: ১৪৫], এবং তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
فَيُمْسِكُ الَّتِي قَضَىٰ عَلَيْهَا الْمَوْتَ وَيُرْسِلُ الْأُخْرَىٰ إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى
“অতঃপর যার মৃত্যু অবধারিত করেন, তার প্রাণ ছাড়েন না এবং অন্যান্যদের ছেড়ে দেন এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে” [আয-যুমার: ৪২] এবং তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
وَلَن يُؤَخِّرَ اللَّهُ نَفْسًا إِذَا جَاءَ أَجَلُهَا ۚ وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
“প্রত্যেক ব্যক্তির নির্ধারিত সময় যখন উপস্থিত হবে, তখন আল্লাহ কাউকে অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে খবর রাখেন” [আল-মুনাফিকুন: ১১] এবং তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
وَلِكُلِّ أُمَّةٍ أَجَلٌ ۖ فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً ۖ وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ
“প্রত্যেক সম্প্রদায়ের একটি মেয়াদ রয়েছে। যখন তাদের মেয়াদ এসে যাবে, তখন তারা না এক মুহুর্ত পিছে যেতে পারবে, আর না এগিয়ে আসতে পারবে” [আল-আ’রাফ: ৩৪] তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
وَلَوْ يُؤَاخِذُ اللَّهُ النَّاسَ بِظُلْمِهِم مَّا تَرَكَ عَلَيْهَا مِن دَابَّةٍ وَلَٰكِن يُؤَخِّرُهُمْ إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى ۖ فَإِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ لَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً ۖ وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ
“যদি আল্লাহ লোকদেরকে তাদের অন্যায় কাজের কারণে পাকড়াও করতেন, তবে ভুপৃষ্ঠে চলমান কোন কিছুকেই ছাড়তেন না। কিন্তু তিনি প্রতিশ্রুতি সময় পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দেন। অতঃপর নির্ধারিত সময়ে যখন তাদের মৃত্যু এসে যাবে, তখন এক মুহুর্তও বিলম্বিত কিংবা তরাম্বিত করতে পারবে না” (আন-নাহল: ৬১) আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:
﴿قَالَ یَٰقَوۡمِ إِنِّی لَكُمۡ نَذِیرࣱ مُّبِینٌ 2 أَنِ ٱعۡبُدُوا۟ ٱللَّهَ وَٱتَّقُوهُ وَأَطِیعُونِ 3 یَغۡفِرۡ لَكُم مِّن ذُنُوبِكُمۡ وَیُؤَخِّرۡكُمۡ إِلَىٰۤ أَجَلࣲ مُّسَمًّىۚ إِنَّ أَجَلَ ٱللَّهِ إِذَا جَاۤءَ لَا یُؤَخَّرُۚ لَوۡ كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ﴾
“সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের জন্যে স্পষ্ট সতর্ককারী। এ বিষয়ে যে, তোমরা আল্লাহ তা’আলার এবাদত কর, তাঁকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। আল্লাহ তা’আলা তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলার নির্দিষ্টকাল যখন হবে, তখন অবকাশ দেয়া হবে না, যদি তোমরা তা জানতে!” (নূহ ২-৪) সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেন:
أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّ اللَّهَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ قَادِرٌ عَلَىٰ أَن يَخْلُقَ مِثْلَهُمْ وَجَعَلَ لَهُمْ أَجَلًا لَّا رَيْبَ فِيهِ فَأَبَى الظَّالِمُونَ إِلَّا كُفُورًا
“তারা কি দেখেনি যে, যে আল্লাহ আসমান ও যমিন সৃজিত করেছেন, তিনি তাদের মত মানুষও পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম? তিনি তাদের জন্যে স্থির করেছেন একটি নির্দিষ্ট কাল, এতে কোন সন্দেহ নেই; অতঃপর জালেমরা অস্বীকার ছাড়া কিছু করেনি” [আল-ইসরা: ৯৯] সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেন:
ثُمَّ أَنشَأْنَا مِن بَعْدِهِمْ قُرُونًا آخَرِينَ ، مَا تَسْبِقُ مِنْ أُمَّةٍ أَجَلَهَا وَمَا يَسْتَأْخِرُونَ
এরপর তাদের পরে আমি বহু সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছি, কোন সম্প্রদায় তার নির্দিষ্ট কালের অগ্রে যেতে পারে না এবং পশ্চাতেও থাকতে পারে না [আল-মু’মিনুন: ৪২-৪৩]
৬- যদি কিছু লোকের এই ভ্রান্ত ধারণা থাকে যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ এমন ব্যক্তির উপর মৃত্যু চাপিয়ে দিতে সক্ষম যার সময় এখনও আসেনি, তাহলে কুরআন এই ভ্রান্ত ধারণাকে বাতিল এবং খণ্ডন করতে এসেছে। ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের সম্প্রদায় তাদের ধ্বংস করা মূর্তিগুলির প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিল। তারা তার জন্য আগুন জ্বালালো এবং তাকে তাতে নিক্ষেপ করলো, কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে তাদের চক্রান্ত এবং বিশ্বাসঘাতকতা থেকে রক্ষা করলেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন:
﴿قَالُوا۟ حَرِّقُوهُ وَٱنصُرُوۤا۟ ءَالِهَتَكُمۡ إِن كُنتُمۡ فَٰعِلِینَ 68 قُلۡنَا یَٰنَارُ كُونِی بَرۡدࣰا وَسَلَٰمًا عَلَىٰۤ إِبۡرَٰهِیمَ 69 وَأَرَادُوا۟ بِهِۦ كَیۡدࣰا فَجَعَلۡنَٰهُمُ ٱلۡأَخۡسَرِینَ 70 وَنَجَّیۡنَٰهُ وَلُوطًا إِلَى ٱلۡأَرۡضِ ٱلَّتِی بَٰرَكۡنَا فِیهَا لِلۡعَٰلَمِینَ﴾
“তারা বলল: একে পুড়িয়ে দাও এবং তোমাদের উপাস্যদের সাহায্য কর, যদি তোমরা কিছু করতে চাও। আমি বললাম: হে অগ্নি, তুমি ইব্রাহীমের উপর শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও। তারা ইব্রাহীমের বিরুদ্ধে ফন্দি আঁটতে চাইল, অতঃপর আমি তাদেরকেই সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ করে দিলাম। আমি তাঁকে ও লূতকে উদ্ধার করে সেই দেশে পৌঁছিয়ে দিলাম, যেখানে আমি বিশ্বের জন্যে কল্যাণ রেখেছি” (আল-আম্বিয়া: ৬৮-৭১)
যখন ইউনুস আলাইহিস সালাম রাগান্বিত হয়ে তাঁর কওম ছেড়ে একটি জাহাজের কাছে এলেন, যা তাঁকে তাঁর কওম থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন উত্তাল ঢেউয়ের কারণে জাহাজের তালমাতাল অবস্থা হয়েছিল এবং তার যাত্রীরা (কুসংস্কারবশতঃ) তাদের কাউকে (কুলক্ষনে মনে করে) সমুদ্রে ফেলে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল এই আশায় যে অন্যরা ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা পাবে। (এই প্রেক্ষাপটে) ইউনুস আলাইহিস সালামকে পানিতে নিমজ্জিত হয়েছিলেন এবং একটি তিমি তাকে গিলে নিয়েছিল, (যদিও তা) তার জন্য কবর ছিল না, বরং একটি জীবন্ত-নৌকায় পরিনত হয়েছিল যা তাকে ছায়া ও খাবার সহ নিরাপদ তীরে নিয়ে গিয়েছিল। পবিত্র কুরআন এই মহান ঘটনার কথা উল্লেখ করে:
﴿وَإِنَّ یُونُسَ لَمِنَ ٱلۡمُرۡسَلِینَ 139 إِذۡ أَبَقَ إِلَى ٱلۡفُلۡكِ ٱلۡمَشۡحُونِ 140 فَسَاهَمَ فَكَانَ مِنَ ٱلۡمُدۡحَضِینَ 141 فَٱلۡتَقَمَهُ ٱلۡحُوتُ وَهُوَ مُلِیمࣱ 142 فَلَوۡلَاۤ أَنَّهُۥ كَانَ مِنَ ٱلۡمُسَبِّحِینَ 143 لَلَبِثَ فِی بَطۡنِهِۦۤ إِلَىٰ یَوۡمِ یُبۡعَثُونَ 144 ۞ فَنَبَذۡنَٰهُ بِٱلۡعَرَاۤءِ وَهُوَ سَقِیمࣱ 145 وَأَنۢبَتۡنَا عَلَیۡهِ شَجَرَةࣰ مِّن یَقۡطِینࣲ﴾
“আর নিশ্চয়ই ইউনুস ছিলেন রসূলগণের অন্যতম। স্মরণ করো! তিনি বোঝাই করা জাহাজে গিয়ে উঠেছিলেন। তাই তিনি লটারী করেছিলেন, কিন্তু তিনিই হয়ে গেলেন নিক্ষিপ্তদের একজন। তখন একটি মাছ তাঁকে মুখে তুলে নিল, যখন তিনি নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছিলেন। আর তিনি যদি তাসবীহকারীদের অন্তুর্ভুক্ত না হতেন — তাহলে তিনি তার পেটে রয়ে যেতেন পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত। তারপর আমরা তাঁকে এক বৃক্ষলতা শূন্য উপকূলে ফেলে দিলাম, আর তিনি ছিলেন অসুস্থ। তখন তাঁর উপরে আমরা জন্মিয়েছিলাম লাউজাতীয় গাছ” [আস-সাফফাত: ১৩৯-১৪৬]।
পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত ষড়যন্ত্রের মধ্যে রয়েছে মক্কার মুশরিকরা যখন দারুন-নদওয়ায় আল্লাহর রাসূল (সা)-এর জীবনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল। অবশেষে তারা তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা এবং সমস্ত মানুষ বুঝতে পারেনি যে যদি সমস্ত সৃষ্টি কোনো কিছু দিয়ে কারো ক্ষতি করার জন্য একত্রিত হয় যা আল্লাহ তার জন্য নির্ধারণ করেননি, তবে তারা তা করতে সক্ষম হবে না। এবং যদি তারা সর্বসম্মতভাবে এমন ব্যক্তির জীবন শেষ করতে সম্মত হয় যার সময় এখনও আসেনি, তবে তারা তা করতে সক্ষম হবে না। অতএব, সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাঁর নবীকে তাদের চক্রান্ত থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং তাকে এবং তার সঙ্গী আবু বকর (রা.) কে রক্ষা করেছিলেন এবং রক্ষা করেছিলেন যতক্ষণ না তারা মদিনায় নুসরাহপ্রদাণকারীদের মাঝে সম্মানিত ও বিজয়ী হয়ে পৌঁছেছিলেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِيُثْبِتُوكَ أَوْ يَقْتُلُوكَ أَوْ يُخْرِجُوكَ ۚ وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ ۖ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ
“আর স্মরণ করো! যারা অবিশ্বাস পোষণ করে তারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল যে তারা তোমাকে আটক করবে, অথবা তারা তোমাকে হত্যা করবে, অথবা তারা তোমাকে নির্বাসিত করবে। আর তারা ষড়যন্ত্র করেছিল, আর আল্লাহ্ও পরিকল্পনা করেছিলেন। আর পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে আল্লাহ্ই শ্রেষ্ঠ” [আল-আনফাল: ৩০]।
আর তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
إِلَّا تَنصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا ۖ فَأَنزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ وَأَيَّدَهُ بِجُنُودٍ لَّمْ تَرَوْهَا وَجَعَلَ كَلِمَةَ الَّذِينَ كَفَرُوا السُّفْلَىٰ ۗ وَكَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
যদি তোমরা তাকে (রসূলকে) সাহায্য না কর, তবে মনে রেখো, আল্লাহ তাঁর সাহায্য করেছিলেন, যখন তাকে কাফেররা বহিষ্কার করেছিল, তিনি ছিলেন দু’জনের একজন, যখন তারা গুহার মধ্যে ছিলেন। তখন তিনি আপন সঙ্গীকে বললেন বিষন্ন হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। অতঃপর আল্লাহ তার প্রতি স্বীয় সান্তনা নাযিল করলেন এবং তাঁর সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন, যা তোমরা দেখনি। বস্তুতঃ আল্লাহ কাফেরদের মাথা নীচু করে দিলেন আর আল্লাহর কথাই সদা সমুন্নত এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় [আত-তাওবা: ৪০]
ইহসান উল আ’মাল

কোন কাজকে হাসান তথা ভালো করার জন্য ‘আল্লাহর জন্য নিয়তকে আন্তরিকভাবে বিশুদ্ধ করা এবং কাজটি শরীয়াহ তথা ইসলামী আইন এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া আবশ্যক। এই কারণে, শুরুর দিককার আলেমগণ (তাদের উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক) এই মৌলিক নীতিগুলোকে একত্র করে চিন্তা করতেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন:
الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন তোমাদের যাচাই করতে যে তোমাদের মধ্যে কে কাজকর্মে শ্রেষ্ঠ। [সূরাতুল মুলক ৬৭:২]
এই আয়াত সম্পর্কে আল-ফুদাইল বিন ‘ইয়াদ বলেন, এর অর্থ হল: أَخْلَصُهُ (তথা সর্বাধিক আন্তরিক) এবং أَصْوَبُهُ (তথা সর্বাধিক সঠিক)। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: ‘أَخْلَصُهُ এবং أَصْوَبُهُ বলতে কী বোঝায়?’ তিনি উত্তর দিয়েছিলেন: ‘যদি কর্মটি সঠিক হয় কিন্তু আন্তরিক না হয় তবে তা গৃহীত হয় না এবং যদি আন্তরিক হয় কিন্তু সঠিক না হয় তবে তা গৃহীত হবে না। যতক্ষণ না এটি আন্তরিক এবং সঠিক হয়, আন্তরিক হয় কারণ এটি সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য এবং সঠিক হয় কারণ এটি সুন্নাতের উপর নির্ভর করে’।
সাঈদ ইবনে জুবাইর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: ‘কথা গ্রহণযোগ্য নয় যদি না কর্ম থাকে, (অন্যদিকে) নিয়তের অনুপস্থিতিতে বক্তব্য এবং কাজ গ্রহণযোগ্য হয় না, (আবার) বক্তব্য, কর্ম এবং নিয়ত গ্রহণযোগ্য নয় যদি না এ সবই সুন্নাহর সাথে একমত হয়’।
‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) দু’আ করতেন: ‘হে আল্লাহ, আমার প্রতিটি কাজকে সালিহ (তথা সঠিক) করে দাও, এবং তা সম্পূর্ণরূপে তোমার জন্য করে দাও এবং এর কোন অংশই যেন তোমার জন্য ছাড়া না হয়’।
ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন: ‘সুন্নাহ (তথা সঠিক পন্থায় ইসলাম অনুসরণ করা) হলো নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর নৌকা। যে এতে আরোহণ করল সে রক্ষা পেল এবং যে এ থেকে বিরত রইল সে ডুবে গেল’।
দা’ওয়াহ বাহক তার কর্মের নিখুঁততা এবং দা’ওয়াহর মাধ্যমে যাতে তার কোন পার্থিব লাভের সন্ধান না হয় সে ব্যপারটি নিশ্চিত করার জন্য সে সর্বোচ্চ মনোযোগ দেয় এবং সতর্কতার সাথে নিজেকে পাহারা দেয়। যদি সে তা না করে, তাহলে তার কর্মের কোন মূল্য থাকবে না এবং সে ক্ষতিগ্রস্তদের একজন হবে।
হাদিসে এসেছে:
যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করে যাতে সে জ্ঞানীদের সাথে প্রতিযোগিতা ও বিতর্ক করতে পারে, মূর্খদের সাথে তর্ক করতে পারে এবং মানুষকে তার ব্যক্তিত্বের দিকে আকৃষ্ট করতে পারে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। (তিরমিযী, ইবনে হিব্বান প্রমুখ হতে বর্ণিত, এর ইসনাদে দুর্বলতা রয়েছে, তবে অর্থের বিবেচনায় এ বর্ণনা সঠিক)।
কর্মের পরিমাণের উপর নয়, কর্মকে নিখুঁত করার উপর মনোযোগ দিতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন,
لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেন যে, তোমাদের মধ্যে কে কর্মে সর্বোত্তম [সূরাতুল মুলক ৬৭:২]
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেননি: তোমাদের মধ্যে কে সবচেয়ে বেশি আমল করে তা দেখার জন্য। ইহসান অর্থ কোনো কাজকে সবচেয়ে উত্তমভাবে আদায় করা।
মালিক বিন দীনার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: ‘যারা (কাজে) সাদিক (সত্যবাদী/আন্তরিক) নয় তাদেরকে বলো, নিজেকে ক্লান্ত করো না!’ একবার আবু উমামাহ যখন একজন ব্যক্তির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন যিনি সাজদাহ করছিলেন, তিনি বললেন: ‘কী চমৎকার সাজদাহ, যদি এটা তোমার ঘরেই করা হত’ এবং ফুদাইল বিন ইয়াদ বলেন: ‘এই ঘর (তথা কা’বা) কতবার তাওয়াফ করা হয়েছে অথচ অন্য একজন ব্যক্তি ‘দূরে অবস্থিত’ আছে যার কাছে তার (তথা এই তাওয়াফকারীর) চেয়ে অনেক বেশি সওয়াব রয়েছে?
এই সকল কারণে, সকল কাজ করার সময় বিশুদ্ধ আন্তরিকতা (তথা ইখলাস) এবং ‘সর্বোত্তম নিয়ত’ পালন করা বাধ্যতামূলক। কারণ, কর্মের বৈধতা এবং বিশ্বজগতের রব (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) কাছে তা গ্রহণযোগ্য হওয়া নিয়তের উপর নির্ভর করে। হাদিসের এসেছে:
إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى دُنْيَا يُصِيبُهَا، أَوْ إِلَى امْرَأَةٍ يَنْكِحُهَا، فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ
আমলসমূহ কেবল নিয়তের উপর নির্ভর করে এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তা-ই (অর্জন করবে) যা সে নিয়ত করেছে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের জন্য হিজরত করেছে, তার হিজরত আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের দিকে হয়েছে, আর যার হিজরত দুনিয়া (পার্থিব বস্তু) আহরণ করার জন্য অথবা নারীকে বিয়ে করার জন্য তার হিজরত সে জন্যই বিবেচিত হবে যে জন্য সে হিজরত করেছে। (মুত্তাফাকুন আলাইহি)
অর্থাৎ, নিজের কোনো আশা-আকাংখাকে ইসলামের লেবাসের মোড়কে মুড়িয়ে অর্জন করতে গেলে ইসলাম আর অর্জন হবে না, এতটুকু নিশ্চিত। ব্যবসা, বিয়ে-শাদি, বীরত্ব, ইসলামী জ্ঞান যাহির এসব কিছুই হালাল, কিন্তু ব্যক্তির অন্তরে এসব অর্জনের কারণ আসলে কি আল্লাহর সন্তুষ্টি নাকি এর পার্থিব মূল্য। এটা অদ্ভুত কিছু নয় যে, আলেমগণ এই হাদিসটিকে ইসলামের মধ্যে আবর্তিত এক-তৃতীয়াংশ হাদীসের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে বিবেচনা করতেন। সালাফদের মধ্যে প্রাচীনতম আলেমগণ দ্বীনের বিষয় থেকে উদ্ভূত প্রতিটি বিষয়ে এই হাদিসটিকে প্রথমে এবং অগ্রভাগে স্থান দিতে পছন্দ করতেন, কারণ এটি সকল ধরণের বিষয়ের উপর সাধারণভাবে প্রযোজ্য।
তাদের দৃষ্টিতে ইখলাস বলতে বান্দাদের কর্মকাণ্ডকে প্রকাশ্য হোক বা গোপনে, একই রকম করে তোলা বোঝানো হয়েছে। ইমাম আল-হারিছ আল-মাহাসাবি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: ‘সাদিক (তথা সত্যবাদী আন্তরিক ব্যক্তি) যদি নিজের হৃদয় সংশোধনের জন্য সৃষ্টির হৃদয় থেকে সমস্ত প্রশংসা হারিয়ে ফেলে, তাতে তার আপত্তি নেই। সে তার ভালো কাজ সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করতে পছন্দ করে না, আর মানুষ তার খারাপ কাজ সম্পর্কে জানতে পারে তা ঘৃণা করে না।’
ইমাম আল-কুশাইরি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: ‘আল-ইখলাস তার নিয়তের মাধ্যমে আল-হাক্ক (তথা আল্লাহ) সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আনুগত্যকে এককভাবে তুলে ধরে। এবং এভাবে তার আনুগত্যের মাধ্যমে সে কেবল আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে চায়, অন্য কিছু নয়, সেক্ষেত্রে তার নিয়তের লক্ষ্য সৃষ্টির দিকেই হোক যাতে সে মানুষের মধ্যে প্রশংসিত হয় অথবা সৃষ্টির কাছ থেকে ভালোবাসা ও প্রশংসা অর্জন করা হোক, অথবা অন্য যেকোনো দিক যা কেবল আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের লক্ষ্যে বাইরে পরিচালিত হয় (তা সে পরিহার করে)।
হাসান বিন আর-রাবী (রাহিমাহুল্লাহ) সম্মানিত ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রাহিমাহুল্লাহ)’র জিহাদ সম্পর্কে বলেন: ‘মুসলিমদের মধ্য থেকে একজন মুখোশধারী সওয়ার যুদ্ধে বের হয়ে শত্রুদের মধ্য থেকে একজন সওয়ারকে হত্যা করে, যারা মুসলিমদের সাথে লড়াই করছিল। মুসলিমরা তখন তাকবীর (তথা আল্লাহু আকবর) বলল এবং সে মানুষের মধ্যে প্রবেশ করল এবং কেউ জানল না যে সে কে। আমি তার পিছনে পিছনে গেলাম যতক্ষণ না তাকে বললাম যে আল্লাহর কসম, সে যেন তার মুখোশ খুলে ফেলে। এরপর আমি তাকে চিনতে পারলাম এবং বললাম: ‘আল্লাহ তোমার হাতে এত বড় বিজয় সহজ করে দিয়েছেন, তবুও তুমি কি নিজেকে লুকিয়ে রাখছো?’ তিনি উত্তর দিলেন: ‘যার জন্য আমি এটা করেছি, তার কাছ থেকে কিছুই গোপন নেই’।
ইবনে কুতাইবা তার ‘উয়ুন আল-আখবার’ গ্রন্থে বলেছেন: ‘মাসলামা বিন আব্দুল মালিক একটি দুর্গ অবরোধ করেছিলেন এবং এই দুর্গের দেয়ালে কিছু গর্ত ছিল। তাই লোকেরা চাইছিল কেউ যেন এর মধ্য দিয়ে প্রবেশ করে, কিন্তু কেউ তা করছিল না। তারপর সেনাবাহিনীর মধ্য থেকে একজন (অজানা) ব্যক্তি এসে তার মধ্য দিয়ে প্রবেশ করে এবং তারপর আল্লাহ তাঁর মাধ্যেম দুর্গটি উন্মুক্ত করে দেন যা বিজয়ের দিকে পরিচালিত করে। মাসলামা তখন চিৎকার করে বলেন: ‘যে ব্যক্তি গর্ত দিয়ে প্রবেশ করেছিল সে কোথায়?’ যখন কেউ তার কাছে আসছিল না তখন তিনি আবার ডাকলেন এবং প্রহরীকে নির্দেশ দিলেন যে ‘লোকটিকে যে সময়ে আসবে তখন যেন তাকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়, কারণ তিনি তাঁর জন্য অপেক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। পরে একজন ব্যক্তি প্রহরীটির কাছে গিয়ে আমীর (সেনাপ্রধান)-এর সাথে দেখা করার অনুমতি চায়। প্রহরী তাকে জিজ্ঞাসা করে যে সে কি গর্তের সৈনিক এবং তিনি উত্তরে বলেন: ‘আমি তোমাদের সবাইকে বলব সে কে’। এরপর প্রহরী মাসলামার কাছে যায় এবং তাকে সেই ব্যক্তির কথা জানায় যে এসেছে। মাসলামা তাকে প্রবেশের অনুমতি দিলেন এবং লোকটি তাকে বলল: ‘গর্তের সৈনিক তোমার কাছ থেকে তিনটি জিনিস দাবি করছে (অর্থাৎ শর্ত): তুমি তার নাম প্রচার করবে না, তাকে কিছু করার নির্দেশ দেবে না এবং তাকে জিজ্ঞাসা করবে না যে সে কে অর্থাৎ কোন গোত্রের ইত্যাদি।’ মাসলামা উত্তরে বলল: সে তা করতে পারে। তখন লোকটি বলে উঠল: ‘আমিই সেই ব্যক্তি’। অর্থাৎ সে ব্যক্তি তার নিজের পরিচয় কিংবা তার বংশ বা গোত্রীয় পরিচিতির খ্যাতির আকাঙ্ক্ষী ছিল না, বরং দ্বীনের কার্য উদ্ধারের ব্যপারে চিন্তিত ছিল। তারপর এই ঘটনার পর থেকে মাসলামা এমন কোন নামাজ পড়তেন না কেবল এই বলে: ‘হে আল্লাহ, আমাকে গর্তের সৈনিকের সাথে উঠিয়ে নাও’।
উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রাহিমাহুল্লাহ) কত সুন্দর উক্তি করেছিলেন যখন তিনি আল্লাহ তা’আলার প্রতি বিশুদ্ধ আন্তরিকতার পরিণতি সম্পর্কে কথা বলছিলেন এই বলে যে: ‘আল্লাহর তাঁর বান্দাদের প্রতি সাহায্য ও এর স্তর নিয়তের স্তরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সুতরাং যে তার নিয়ত (সঠিকভাবে) পূর্ণ করেছে তার জন্য আল্লাহর সাহায্য পূর্ণ হয়েছে। যদি সে তার নিয়তে ব্যর্থ হয়, তার জন্য আল্লাহর সাহায্যও অসম্পূর্ণ হবে’।
ইখলাসের (আন্তরিকতার) লক্ষণ ও প্রকাশের মধ্যে রয়েছে সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করা, উপদেশ গ্রহণ করা এবং এমনকি যদি তা তার কাছে নিম্ন স্তরের বা নিচু বলয়ের বলে বিবেচিত কারো কাছ থেকেও আসে, অথবা এমন কারো কাছ হতে আসে যার সাথে তার বিবাদ রয়েছে কিংবা যে তাকে আহত করেছে। সত্য অন্যদের দ্বারা তার কাছে প্রকাশিত হলেও তার বুকে কোনও টান বা সংকোচন অনুভব হয় না।
ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘তাহযীব আত-তাহযীব’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন ‘উবাইদুল্লাহ বিন আল-হাসান আল-আনবারী’র কথা উল্লেখ করে, যিনি আল-বাসরার একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন, তাদের ‘উলামা ও বিচারকদের একজন। তিনি বর্ণনা করেছেন যে তাঁর ছাত্র ‘আব্দুর রহমান বিন মাহদী’ বলেছেন: ‘আমরা এক জানাযায় ছিলাম এবং তাকে একটি প্রশ্ন করা হয়েছিল এবং তিনি তার উত্তরে ভুল করেছিলেন। তাই আমি বললাম: আল্লাহ আপনার ব্যাপারটি সংশোধন করুন, সঠিক উত্তর হল ‘এরকম ও এরকম’। তিনি মাথা নিচু করে বললেন: তাহলে (আমার মত হতে) ফিরে আসুন, কারণ আমি নীচু হয়ে গেছি। হকের (তথা সত্যের) উপর (অটল থেকে) লেজ হওয়া আমার কাছে বাতিলের (তথা মিথ্যার) উপর (দাড়িয়ে) মাথা হওয়ার চেয়ে বেশি প্রিয়’।
ইখলাসের আরেকটি লক্ষণ হলো ফাতওয়া বা আইনগত রায় প্রদানের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত না হওয়া এবং এই কারণেই অনেক ‘সৎকর্মশীল পূর্বসূরী রায় প্রদানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকতেন এবং চাইতেন যে সেগুলো জিজ্ঞাসা করা না হোক।
‘আব্দুর রহমান বিন আবি লায়লা বলেন: ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর একশ বিশ জন সাহাবীর সাথে দেখা করেছি। তাদের একজনকে একটি বিষয়ে প্রশ্ন করা হত এবং তিনি প্রশ্নটি অন্যজনের কাছে পৌঁছে দিতেন, এবং তারপর তিনি তা অন্যজনের কাছে পৌঁছে দিতেন, যতক্ষণ না বিষয়টি ‘প্রথম ব্যক্তির কাছে ফিরে আসে’।
অর্থাৎ, কোনো বৈঠকে রায় দিতে কিংবা নিজেকে ‘জিজ্ঞাসা করার’ বিষয়টি পছন্দ করার ব্যপারে তারা ভীত ছিলেন, নিজেরা যোগ্য হলেও তারা অন্যদের নিজের থেকে বেশি যোগ্য মনে করতেন।
বিশর বিন আল-হারিস (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন সবচেয়ে বিশিষ্ট ‘আলেমদের একজন এবং তিনি ‘আমি জানি না’ বলতে লজ্জা বা বিব্রত বোধ করেননি। একদিন আশ-শা’বীকে একটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: ‘আমি জানি না’। এরপর তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে (আপনি) যখন তিনি ইরাকের জনগণের ফকীহ ছিলেন, তখন তিনি কি এই কথা বলতে লজ্জা পাননি যে (বিষয়টি আপনি) জানেন না। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন: ‘কিন্তু ফেরেশতারাতো লজ্জা পাননি বা বিব্রতবোধ করেননি যখন তারা বলেছিলেন:
سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا
তুমি পবিত্র, তুমি আমাদের যা শিখিয়েছো তা ছাড়া আমাদের আর কোন জ্ঞান নেই (সূরাতুল বাকারা ২:৩২)।
তাবাকাত আশ-শাফিয়াহ-তে নিম্নলিখিত বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে: আল-কাদী ‘ইজ্জউদ্দিন আল-হাকারি তাঁর একটি বইতে শেখ ‘ইজ্জউদ্দিন আব্দুস সালামের জীবনী বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন যে শেখ ‘ইজ্জউদ্দিন একবার একটি ফাতওয়া (তথা রায়) প্রদান করেছিলেন এবং তারপরে তার রায়ের ভুল তার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরপর তিনি মিশর ও কায়রোতে নিজের বিরুদ্ধে (জনগণকে) ডেকে বললেন: ‘যে ব্যক্তি অমুককে একটি রায় দিয়েছে, তোমরা তা অনুসারে আমল করো না, কারণ তা একটি ভুল’।
Taken from the book At-Taqarrub ilaa Allah
পশ্চিমা সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ছে

কয়েক দশক ধরে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে অর্থনৈতিক, সামরিক এবং নৈতিকভাবে বিশ্বের চিরন্তন নেতা হিসেবে চালিয়েছে। কিন্তু এখন পতনের লক্ষণগুলি অনস্বীকার্য। আমরা যা প্রত্যক্ষ করছি তা কেবল একটি পরাশক্তির ক্ষয় নয়, বরং আমেরিকান আধিপত্যের উপর নির্মিত বিশ্বব্যবস্থার ভেঙে পড়া। বুশ-যুগের যুদ্ধ থেকে শুরু করে এর ধারাবাহিকতায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে বিশৃঙ্খলা পর্যন্ত, আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং বিশ্বব্যাপী বিশ্বাসযোগ্যতা ভেঙে পড়া এই ব্যবস্থার মধ্যেই একটি গভীর অসুস্থতার প্রতিফলন।
১৯৯৭ সালে, আমেরিকান মতাদর্শীদের একটি দল “প্রজেক্ট ফর দ্য নিউ আমেরিকান সেঞ্চুরি (PNAC)” শুরু করে। তাদের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট: একবিংশ শতাব্দী সম্পূর্ণরূপে আমেরিকান স্বার্থ ও মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত হবে, তা নিশ্চিত করা। এর অনেক উদ্যোক্তা পরবর্তীতে বুশ প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করার পর, PNAC-এর দৃষ্টিভঙ্গি দ্রুতই রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয় – জলবায়ু চুক্তি থেকে প্রত্যাহার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি বৈরিতা এবং সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ছিল, আফগানিস্তান ও ইরাকের যুদ্ধ। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অজুহাতে এই যুদ্ধগুলো সমগ্র সমাজকে ধ্বংস করে দেয়। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত যুদ্ধের খরচ প্রকল্প অনুসারে, ৪৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ নিহত হয় এবং প্রায় ৪ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। তবুও, স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র, শান্তি – কোন লক্ষ্যই অর্জিত হয়নি। পরিবর্তে, তালেবান ফিরে আসে, ইরাক খণ্ডিত হয় এবং আমেরিকার সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব স্থায়ীভাবে কলঙ্কিত হয়।
ট্রাম্প এই ভঙ্গুর অবস্থা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে এবং একে আরও এগিয়ে নিয়ে গেছে। যদিও সে পিএনএসি-র মতো আদর্শ দ্বারা চালিত নয়, তথাপি তার “আমেরিকা ফার্স্ট” মতবাদটিও ঠিক ততটাই বিপজ্জনক ছিল। হঠাৎ শুল্ক ও বাণিজ্য চুক্তি থেকে প্রত্যাহারের মাধ্যমে চিহ্নিত তার ‘অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ’ বিশ্ব বাজারকে হতবাক করে দিয়েছিল। তার ‘Liberataion Day’-এর ভাষণে, তিনি সমস্ত আমদানির উপর ব্যাপক শুল্ক ঘোষণা করেছিলেন – এমন একটি পদক্ষেপ যা বিনিয়োগকারীদের ভীত করেছিল, মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়েছিল এবং S&P 5001 ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ১৪% কমিয়ে দিয়েছিল। রয়টার্স/ইপসোসের একটি জরিপ অনুসারে, মাত্র ৩৭% আমেরিকান তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন এবং ৭৫% মন্দার আশঙ্কা করেছিলেন। একই সময়ে, ট্রাম্প গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সুরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দিয়েছেন, বিশেষ করে লুইসিয়ানার “ক্যান্সার অ্যালি”-এর মতো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলিতে, যেখানে শিল্প দূষণ এবং নিয়ন্ত্রণের অভাবের কারণে ক্যান্সারের হার বেড়েছে।
কিন্তু ক্ষতি কেবল অর্থনৈতিক বা পরিবেশগত ছিল না। ট্রাম্প আমেরিকাকে কয়েক দশকের তুলনায় আরও বিভক্ত করে রেখেছিলেন। তাঁর রাষ্ট্রপতিত্ব জাতিগত উত্তেজনাকে আরও গভীর করে তুলেছিল, অতি-ডানপন্থী আন্দোলনগুলিকে শক্তিশালী করেছিল এবং প্রতিষ্ঠানগুলির উপর মৌলিক আস্থাকে ক্ষুণ্ন করেছিল। তাঁর মেয়াদের শেষের দিকে, এমনকি আমেরিকার মিত্ররাও মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছিল। পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি জরিপে দেখা গেছে যে ৩২টি দেশের ৬৪% মানুষের মধ্যে ট্রাম্পের নেতৃত্বের উপর কোনও আস্থা ছিল না। জার্মানি, ফ্রান্স এবং পোল্যান্ডের মতো দীর্ঘকালীন অংশীদাররা বিকল্প জোট অনুসন্ধান শুরু করেছে, যার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে একটি স্বাধীন ইউরোপীয় পারমাণবিক প্রতিরোধক সম্পর্কে আলোচনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যে দেশটি একসময় “মুক্ত বিশ্বের নেতা” বলে গর্ব করত, তাদের উপর আস্থা এবং প্রভাবের ক্ষতি গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে।
বিশ্ব পুনর্গঠিত হচ্ছে। নতুন নতুন জোট তৈরি হচ্ছে। বহুমেরুত্ব এখন আর কোনও তত্ত্ব নয় – এটি আমাদের চোখের সামনেই উন্মোচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক রীতিনীতি গঠনে একসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া অধিকার শেষের পথে। এবং এটি কেবল ভূ-রাজনীতির পরিবর্তন নয় – এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।
মুসলিম উম্মাহর জন্য, এই মুহূর্তটি আমাদের অবশ্যই সাইডলাইন থেকে দেখা বন্ধ করতে হবে। আমরা প্রায় ২ বিলিয়ন মুসলিমের এক জাতি, সম্পদে সমৃদ্ধ ভূমিতে বিস্তৃত এবং যারা মানবজাতির জানা মনে সার্বিক, পুর্ণাঙ্গ ও ন্যায়পরায়ণ এক বিশ্বদৃষ্টিভংগির উপর দাড়িয়ে রয়েছে। তবুও আমরা বিভক্ত, কারণ উপনিবেশবাদীদের দ্বারা টানা সীমানা এবং তাদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত। আমাদের বিভক্তি স্বাভাবিক নয় – এটি আমাদের উপরে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এবং এটি কেবল এ কারণেই যে আমরাই এটাকে ধ্বংস না করে টিকিয়ে রেখেছি।
এখন, পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার পতনের সাথে সাথে, জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, শুধুমাত্র কোনভাবে বেঁচে থাকা জীবন পার করার বাইরেও চিন্তা করার সময় এসেছে। আমাদের পুনর্জাগরণের দিক থেকে চিন্তা করতে হবে। কুরআন আমাদের মনে করিয়ে দেয়:
تِلْكَ ٱلْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ ٱلنَّاسِ
আর এইসব দিন আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে আবর্তন করি। (আল ইমরান: ১৪০)
ক্ষমতা কখনোই স্থায়ী হয় না। এক জাতি যে উচ্চতায় পৌঁছেছে তা কেঁড়ে নিয়ে অন্য জাতিকে দেওয়া হয়ে। এটাই ইতিহাসের ঐশ্বরিক সুন্নাহ। আর যদি কখনও পরিবর্তনের জন্য – একটি নতুন বিশ্ব নেতৃত্বের আবির্ভাবের জন্য – কোন মুহূর্ত থাকে – তাহলে তা এখনই।
আমাদের অবশ্যই ভালো কিছু উপহার দিতে হবে, অবশ্যই পশ্চিমাদের প্রদত্ত জীবনব্যবস্থা থেকে: যেখানে থাকবে সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত নির্দেশনা ভিত্তিক জীবনব্যবস্থা, অভিজাত স্বার্থ নয়; স্রষ্টার কাছে জবাবদিহিকারী নেতৃত্ব, কেবল ভোটার বা শেয়ারহোল্ডারদের কাছে নয়; এমন এক ঐক্য যা জাতি, উপজাতি এবং কৃত্রিম সীমানা অতিক্রম করে। খিলাফত কেবল একটি স্মৃতি নয় – এটি একটি মডেল (অর্থাৎ রাষ্ট্র কেমন হতে হবে)। এবং এর প্রত্যাবর্তন স্মৃতিচারণ নয় – এটি একটি প্রয়োজনীয়তা।
পশ্চিমা সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ছে। পশ্চিমা বিশ্ব ক্লান্ত। এর ভিত্তি কাঁপছে। একটি নতুন পৃথিবী গঠনের জন্য অপেক্ষা করছে। প্রশ্নটি পরিবর্তন আসছে কিনা তা নয় – প্রশ্নটি হল আমরা, মুহাম্মদ (সা) এর উম্মাহ, এটির নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াবো কিনা।
References:
- The Standard and Poor’s 500, or simply the S&P 500, is a stock market index tracking the stock performance of 500 leading companies listed on stock exchanges in the United State ↩︎
লেটস প্লে দ্যা রিলস – স্ক্রলের নেশা, শোষণের ফাঁদ!

রিলস (Reels) হলো সোশ্যাল মিডিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অথচ সবচেয়ে ভয়ানক ফিচারগুলোর একটা। এটা এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন মানুষের ব্রেইন প্রতিটা স্ক্রলে একধরনের ডোপামিন হিট পায়। আমরা যখনই ভাবি ‘আরেকটা দেখে বের হবো’, কিন্তু,’ সেই ‘আরেকটা’ আর শেষ হয় না। রিলস আসলে নতুন কিছু না—এই আইডিয়াটা এসেছে মানুষের স্বল্প মনোযোগের সুযোগ নিয়ে একটা লাভজনক কনটেন্ট ফর্ম তৈরি করার চিন্তা থেকে। এর পেছনের মূল কথা হলো: “অল্প সময়ে বেশি এন্টারটেইনমেন্ট”।
রিলসের ধারণা প্রথম জনপ্রিয়তা পায় ২০১৬ সালে চীনা অ্যাপ TikTok (তৎকালীন Musical .ly)-এর মাধ্যমে। এরপর Instagram, Facebook, YouTube – সব বড় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম শর্ট ভিডিও ফিচার চালু করে। মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের মনোযোগ ধরে রাখা।
রিলসের অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর আগ্রহ বিশ্লেষণ করে কনটেন্ট সাজায়, যেন ব্যবহারকারী স্ক্রল করতে করতেই সময় হারায়, আর প্ল্যাটফর্ম বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে সেই “সময়” বিক্রি করতে পারে।
এ এক নতুন অর্থনীতি -“Attention economy” যেখানে পণ্য নয়, মনোযোগই হচ্ছে মুদ্রা।
রিলস কেন এত জনপ্রিয় হলো?
অ্যালগরিদম বেসড ফিড – যেটা আমাদের পছন্দ বুঝে কনটেন্ট সাজায়।
Instant gratification – অল্প সময়েই dopamine হিট।
লো ইনভেস্টমেন্ট, হাই রিওয়ার্ড – ভিডিও বানানো সহজ, ভাইরাল হওয়ার চান্স বেশি।রিলস কিভাবে পুঁজিবাদকে সার্ভ করে—
রিলস কেবল বিনোদনের একটি মাধ্যম নয়, বরং এটি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এর মাধ্যমে ব্যক্তি নয়, গোটা সমাজকেই প্রভাবিত করে এমন একটি সিস্টেম চালু হয়েছে, যেখানে মানুষ নিজের অজান্তেই শোষণের শিকার হচ্ছে।এই বিষয়টা বোঝার জন্য আমাদের আগে বুঝতে হবে পুঁজিবাদ (Capitalism) কী চায়। পুঁজিবাদ চায় তিনটা জিনিস:
১) ব্যক্তির মনোযোগ (Attention)
২) ব্যক্তির আকাঙ্ক্ষা (Desire)
৩) ব্যক্তির টাকা (Money)এখন রিলস এই তিনটা জিনিসই খুব সুচারুভাবে সার্ভ করে।
১. মনোযোগকে পণ্য বানানো
রিলস এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে তুমি যতক্ষণ স্ক্রল করবে, ততক্ষণ আমাদের মনোযোগ বিক্রি করা যায় বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে।
এই ব্যবস্থায় আমরা পণ্য, আমাদের চোখ হলো প্রোডাক্ট।
পুঁজিবাদ মনোযোগ-ভিত্তিক ইকোনমিতে বিশ্বাস করে, আর রিলস হলো সেই ইকোনমির সবচেয়ে মারাত্মক অস্ত্র।
২. আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেওয়া
রিলসে আমরা যেসব জীবন দেখি- দামী গাড়ি, বিলাসবহুল ভ্যাকেশন, পারফেক্ট বডি, বিলাসবহুল ডিজাইনার কাপড় ইত্যাদি ভোগ্যপন্য।
এগুলো দেখে আমাদের অনেকের মনে চাপে একধরনের চাপা হতাশা: “আমার লাইফ এমন কেন না?”
এই ফাঁকে পুঁজিবাদ আমাদের মধ্যে “কৃত্রিম চাহিদা” ঢুকিয়ে দেয়। আমরা মনে করি, “এই প্রোডাক্টটা কিনলেই হয়তো আমার লাইফ ভালো লাগবে।”
এভাবে রিলস আমাদের অভাব তৈরি করে, আর পুঁজিবাদ সেই অভাব পূরণের নামে প্রোডাক্ট বিক্রি করে।
৩. সেলফ ব্র্যান্ড কালচার
রিলসের মাধ্যমে মানুষ ক্রমশ নিজের একটি ‘ব্র্যান্ড’ হয়ে উঠতে চায়। ফলোয়ার বাড়ানো, স্পনসরশিপ পাওয়া, ভাইরাল হওয়া—সবই হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যক্তিগত লাভের মাধ্যম। এই প্রবণতা পুঁজিবাদের মূলমন্ত্রেরই এক রূপ: সবকিছুই একটি প্রোডাক্ট, এমনকি মানুষও।
সম্প্রতি বাবিল খানের “Log Out” মুভিতে সে বলেছে – “I have 10 million people under my control”. সে ভাবছে সে ১০ মিলিয়ন ফলোয়ার কে কন্ট্রোল করছে। কিন্তু আসলে সে পুঁজিপতিদের প্রোডাক্ট হিসেবে ইউজড হচ্ছে।
৪. শ্রম নয়, স্বপ্নের শোষণ
আগে পুঁজিবাদ মানুষের শ্রমকে শোষণ করতো, এখন শোষণ করছে স্বপ্নকে। ভাইরাল হওয়ার লোভ, ইনফ্লুয়েন্সার হওয়ার আশায় হাজার হাজার মানুষ সময়, শ্রম, ও মেধা ব্যয় করছে—কিন্তু লাভের মূল অংশ যাচ্ছে প্ল্যাটফর্ম আর বিজ্ঞাপনদাতাদের হাতে। অধিকাংশ মানুষ শুধু স্ক্রল করে সময় হারাচ্ছে, আবার কেউ কেউ ভাইরাল হওয়ার নামে নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে।
ইসলাম: রিলস-ভিত্তিক পুঁজিবাদী সংস্কৃতির বিকল্প পথ
বর্তমান যুগে রিলস, শর্ট ভিডিও, ও সোশ্যাল মিডিয়া মনোযোগ-নির্ভর একটি বাজারে পরিণত হয়েছে, যেখানে মানুষ বিনোদনের নামে সময়, মনোযোগ, এবং আত্মমর্যাদা হারাচ্ছে। পুঁজিবাদ এই প্রবণতাকে পুঁজি করে মানুষকে কৃত্রিম চাহিদার গোলামে পরিণত করছে। কিন্তু ইসলাম এ সংকটের মধ্যেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ, অন্তর্মুখী ও আত্মশুদ্ধির দিকনির্দেশনা দেয়।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
তোমরা জেনে রাখ যে, দুনিয়ার জীবন ক্রীড়া কৌতুক, শোভা-সৌন্দর্য, তোমাদের পারস্পরিক গর্ব-অহঙ্কার এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র। এর উপমা হল বৃষ্টির মত, যার উৎপন্ন ফসল কৃষকদেরকে আনন্দ দেয়, তারপর তা শুকিয়ে যায়, তখন তুমি তা হলুদ বর্ণের দেখতে পাও, তারপর তা খড়-কুটায় পরিণত হয়। আর আখিরাতে আছে কঠিন আযাব এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। আর দুনিয়ার জীবনটা তো ধোকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়। [সুরা আল হাদীদ, আয়াত-২০]
রিলস ও ইনফ্লুয়েন্সার কালচার এই আয়াতের জীবন্ত উদাহরণ। এটা মানুষকে প্রতিযোগিতার খেলায় ফেলে।
অথচ আমাদের সময় সংক্ষিপ্ত। যেখানে পুজিবাদ ভোগবিলাসে মত্ত থেকে সময়ের অপচয়, অশ্লীলতা শেখায় সেখানে ইসলাম আমাদের চুড়ান্ত সফলতার পথ দেখায়। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই আমাদের মুল সফলতার পথে নিয়ে যাবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
“সময় শেষ হওয়ার কসম! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা নয় যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, পরস্পরকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।” [সূরা আল-আসর, আয়াত ১-৩]
“নিশ্চয় কান, চোখ ও হৃদয় এদের প্রতিটির ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে।” [সুরা বনী ইসরাইল, আয়াত-৩৬]
এই রিলস সংস্কৃতি আমাদের নফসের ধোকায় ফেলে। যারা রিলস বানায় বা দেখে শুধুই চাহিদা ও জনপ্রিয়তার পেছনে ছুটে, তারা বাস্তবে নিজের নফসকেই উপাস্য বানিয়ে ফেলে।
অথচ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
তবে তুমি কি তাকে লক্ষ্য করেছ, যে তার প্রবৃত্তিকে আপন ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে? তার কাছে জ্ঞান আসার পর আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন এবং তিনি তার কান ও অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন। আর তার চোখের উপর স্থাপন করেছেন আবরণ। অতএব আল্লাহর পর কে তাকে হিদায়াত করবে? তারপরও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না? [সুরা আল-জাসিয়া, আয়াত-২৩]
পুজিবাদী এই সংস্কৃতির বিপরীতে ইসলাম একটি তাকওয়া ভিত্তিক সমাজ নির্মাণে সহায়তা করে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
“নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সর্বাধিক সম্মানিত সে, যে সবচেয়ে বেশি মুত্তাকি (তাকওয়াবান)।” [সূরা আল-হুজরাত, আয়াত ১৩]
রাসুলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই। সে তার ওপর জুলুম করে না। তাকে সঙ্গীহীন ও সহায়হীনভাবে ছেড়ে দেয় না। সে তার কাছে মিথ্যা বলে না ও তাকে অপমান করে না।’ এরপর তিনি নিজের বুকের দিকে ইশারা করে বলেন, ‘তাকওয়া হচ্ছে এখানে।’ (সহিহ মুসলিম : ২৫৬৪)।
এই ধরনের ভোগবাদী, পুজিবাদী সংস্কৃতির ধোকায় না পড়ে ইসলামকে জীবন ব্যবস্থা হিসেবে নিলেই আমরা প্রকৃত সুফল পাবো। ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে নিতে হলে খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
খিলাফত রাষ্ট্র কেবল আইন প্রয়োগকারী কোনো যান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা নয়, বরং এটি একটি আদর্শিক কাঠামো—যেখানে মানুষের আত্মা, মন, সমাজ ও রাষ্ট্র সব একসাথে আল্লাহর বিধানে চলার সুযোগ পায়।
এই কাঠামো পুঁজিবাদী সংস্কৃতির উৎপত্তির শেকড়েই আঘাত হানে।
গণতন্ত্রে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রহসন

ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হল গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যা নিয়ে Secularist দের দম্ভের শেষ নেই। তারা দাবী করে Media একটি Shadow Goverment এর মত কাজ করে সরকারকে কঠিন জবাবদিহিতার মধ্য রাখে যেন তারা জনস্বার্থ বিরোধী কোন কাজ করতে না পারে। জনগণের কাছে ফাঁস হয়ে যাবার হুমকির ভয়ে তারা সঠিক কাজটি করবে এটাই আশা। তারা দাবী করে তাদের স্বাধীন গণমাধ্যম একদিকে নানা জনস্বার্থমূলক বিষয়ে জনমত ও সরকারের অবস্থান তুলে ধরে তাদের মধ্যে সেতু হিসাবে কাজ করে, অন্যদিকে এসব বিষয়ে Expert দের মতামত এক করে সরকারকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে জনগণকে দেখভালের কাজে সরকারকে সহায়তা করে। তাই ভিন্ন মত প্রকাশের অন্যতম Platform হল মিডিয়া। এটা নাকি গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, এই ব্যবস্থা ছাড়া নাকি অন্য কোন ব্যবস্থা বিশেষ করে ইসলামি ব্যবস্থা গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে দিবে না। তারা প্রচার চালায় যে ইসলামি কট্টর ব্যবস্থা সরকারের সমালচনার সব পথ বন্ধ করে মতপ্রকাশের স্বাধীনটাকে হরণ করে জনস্বার্থ বা ভিন্নমতের মিলন মেলার পথকে রুদ্ধ করে জনগণকে অন্ধকারে ফেলে রাখবে।
ইসলাম প্রসঙ্গে যাবার আগে দেখা দরকার তাদের এসব কিতাবি কথার কোন অস্তিত্ব বাস্তবে আছে কি নেই। বাংলাদেশে যে নেই তা খুব দৃশ্যমান। শেখ হাসিনার আমলে দেশের ১০১টিরও বেশি গণমাধ্যম ফলাও করে সমুদ্র বিজয়ের প্রচার করলেও পরবর্তীতে জানা যায় বাংলাদেশের প্রাপ্ত ৩৫০ নটিকাল মহিসোপানের ২০০ নটিকাল নাকি ভারতের ইকনোমিক জোনে পড়েছে। অর্থাৎ ওই অঞ্চলে আমরা শুধু মাছ ধরতে যেতে পারব, কিন্তু মাটির নিচের তেল, গ্যাস ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থের উপর আমাদের কোন অধিকার থাকবে। গণতন্ত্রে গণমাধ্যমের যে ভুমিকা দাবি করা হয় তা সত্য হলে তাদের উচিত ছিল বাস্তব ফ্যাক্টসগুলোকে ভেরিফাই করে মানুষের সামনে সত্যটা তুলে ধরা। বলা যেতে পারে হাসিনা স্বৈরশাসক, কিন্তু জুলাই বিপ্লবের পর যদি গণতন্ত্র মুক্ত হয়, তাহলে এখন গণমাধ্যম কেন এই রমজানের ২য় সপ্তাহে যে বাংলাদেশ ও ভারতীয় নৌবাহিনীর অংশগ্রহনে যৌথ টহল ‘CORPAT’ ও দ্বি-পক্ষিয় মহড়া “বঙ্গোপসাগর” অনুষ্ঠিত হয়ে গেল তা কেন সামনে আনলোনা? আমাদের সেনা অফিসার ও জুলাইতে আমাদের ছাত্র জনতার উপর আক্রমনে অভিযুক্ত ভারত যে নিয়মিত সীমান্তে গুলি করে আমাদের নাগরিক হত্যা করে সে যে আমাদের শত্রু বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়া লাগে না। সেই শত্রুরাষ্ট্র ভারতের সাথে যৌথ মহড়া করে আমাদের নৌবাহিনীর মত গুরুত্বপূর্ণ একটা বাহিনীর কী সক্ষমতা, কী সরঞ্জাম আছে তা জানান দেয়া দেশের জননিরাপত্তা আর সার্বভৌমত্বর জন্য বিরাট বড় হুমকি, তবুও মিডিয়া নীরব। অন্যদিকে খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা দাবীতে আয়োজিত বিশাল গণ মিছিল দমনে সরকার কেন আরও অনেক কঠোর হল না তার সমালোচনায় এসব মাধ্যম এক যোগে ফেটে পড়ে, তাদের গণতান্ত্রিক জ্ঞান গায়েব হয়ে যায়।
বলা যেতে পারে, তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ভুমিকা সীমিত হলেও উন্নত বিশ্বে ভিন্ন। কিন্তু মুক্ত বিশ্বের নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমের অবস্থা তো আরও জটিল। আমেরিকার ট্রাম্পপন্থী ফক্স নিউজ একরকম নিউজ করে, আবার ডেমোক্রেটপন্থী এবিসি নিউজ একই বিষয়ে আরেকরকম নিউজ করে। ২০১৭ সালে ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই যখন কর্পোরেট ট্যাক্স কমানোর Law বানায় তখন এই মিডিয়াগুলো কিন্তু বিগত পাঁচটা বছর ধরে জনগণকে এই Narrative গেলায় যে এতে করে বিজনেসে আরও ইনভেস্টমেন্ট বাড়বে, প্রোডাক্টিভিটি বাড়বে। ২০২৪ সালে এসে বাইডেন পন্থী কিছু Capitalist তাদের পন্থী মিডিয়ার মাধ্যমে প্রকাশ করে দেয় যে ট্রাম্প এই Law শুধুমাত্র ক্যাপিটাললিস্টেদের কর ফাঁকি দেওয়ার জন্যই তৈরি করেছে। দুই পন্থী মিডিয়ার দলাদলির কারণে শেষ পর্যন্ত আসলে লাভ কী হল? পাঁচ বছর ধরেই কিন্তু এই ক্যাপিটালিসদের unpaid ট্যাক্সের বোঝা মিডল ও লো ইনকাম ক্লাস ফ্যামিলিগুলো বয়ে বেরায়। তাইতো আমেরিকার জনগনের ৭৭% মনে করে যে তাদের মিডিয়া সোশাল ও পলিটিকাল ইস্যুতে সত্য খবর প্রচার করেনা।
ব্রিটেনেরও একি অবস্থা। British Law মতে, তাদের কোন Talk show তে কেউ সরকারে ঘোষিত Policy এর বিরুদ্ধে কিছু বলতে হলে সেখানে সরকার পক্ষের Defender লাগবে। মানে ফিলিস্থিনের পতাকা উড়ালে প্রয়োজনে গ্রেফতার করা যাবে- সরকারের এই ধরনের ঘোষিত নীতির খোলামেলা সমালোচনা করা যাবে না। মানে হল সরকার ঠিক করে দিবে মিডিয়া কী বলবে। তাই তো কিছুদিন আগে কারিশমা প্যাটেল নামক একজন বি বি সি সাংবাদিক ফিলিস্থিন বিষয়ে অনবরত মিথ্যাচার করতে না পারায় চাকরি ছেড়ে দেয়। এই হল মুক্ত বিশ্বের মুক্ত গণমাধ্যমের ভুমিকা!
প্রশ্ন আসতে পারে কেন গণমাধ্যম তার কাঙ্খিত ভুমিকা পালন করতে পারছে না? উত্তর হল তারা ঠিক সেই ভুমিকা পালন করছে যে জন্যে তাদের বানানো হয়েছে। এই প্রসঙ্গে বিখ্যাত American Political Analyst Noam Chomsky একটা কথা বলেছিলেন “একটা স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেখানে সিক্রেট পুলিশ ব্যবহার করে জনগণকে কন্ট্রোল করে আর একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তাদের কর্পোরেট মিডিয়া ইউজ করে এই জনগণকে কন্ট্রোল করে।” অর্থাৎ তাদের বানানোই হয়েছে যেন জনগণকে বিভ্রান্ত করে সরকারকে সমর্থন বা চাপে ফেলে পুজিপতিদের স্বার্থ রক্ষা করা। যেমন ২০১০ সালে হাসিনা যখন সমস্ত জবাবদিহিতার রাস্তা বন্ধ করে বিদ্যুতের নতুন আইন বানায় তখন পত্র-পত্রিকাগুলো আমাদেরকে দেখায় হাসিনা ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছে। আর এই সুযোগে Summit, United এর মত পুজিপতিরা জনগণের পকেট থেকে কুইক রেন্টাল এর নামে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা লোপাট করে নেয়। কাজ শেষ হলে মিডিয়ার তর্জন-গর্জন শুরু হয় আর দেখায় তারা সরকারের সমালোচনায় কতটা স্বাধীন! গত ডিসেম্বরেও আমেরিকার দা ফেমাস টাইমস ম্যাগাজিন ক্ষমতা আসার পূর্বে ট্রাম্পের মত একটা আনস্টেবল ক্যারেক্টার কে দ্যা পার্সন অফ দ্যা ইয়ার খেতাব দিয়ে কোটি কোটি মানুষকে ট্রাম্পের Marketing করে। Elon Musk তার X handle এ ট্রাম্পের পক্ষে প্রচারণা চালায়। আজকে ট্রাম্প ক্ষমতায় আর Musk গং বা অলিগারকরা ক্ষমতাধর। এইভাবে মিডিয়া পুজিপতিদের ফুলে ফেপে উঠতে সহায়তা করে, সেই ফান্ড দিয়ে তারা ঠিক করে সরকার কে হবে, আর সেই সরকার তাদের স্বার্থ আরও সুরক্ষিত করে, আর তাদের আরো ক্ষমতাধর বানায়, আর এই কাজে তাদের সহযোগিতা করে তাদেরই মালিকানাধীন মিডিয়া, এই এক অনবদ্য চক্র, অসাধারন টিম ওয়ার্ক। সকলে মিলে জনগণকে লুটাই আসল কাজ। এ ব্যবস্থায় মিডিয়া পুঁজিপতিদের মুখপাত্র, এটাই তাদের প্রকৃত ভুমিকা, বাকিটা ধাপ্পাবাজি।
কিছু কৌশল প্রয়োগ করে এই ব্যবস্থা পুজিপতিদের মিডিয়া নিয়ন্ত্রন করতে দেয়।
প্রথমতঃ মিডিয়া খুলতে ও পুষতে যে পরিমান টাকা লাগে তা কেবল পুজিপতিদের আছে। একটা চ্যানেল ওপেন করতে Studio, Camera, Staff সহ অনেক খরচ আর লাইসেন্স তো লাগেই যা নবায়ন করতে হয়। তাই মিডিয়াতে অনেকে কাজ করলেও মালিক কেবল কয়েকজন হতে পারে।
দ্বিতীয়তঃ ফাঁক ফোকরে কোন তুলনা মূলক ছোট মালিকের কোন চ্যানেল জনপ্রিয় হয়ে গেলে বড়রা তা কিনে ফেলে। যেমন ২০১৩ সালে Jeff Bezos Washington Post ও অন্যান্য Local publications, Websites, and Real estate US $250 Million কিনে ফেলে, Businessman Elon Musk ২০২২ সালে American Social Media Company Twitter Inc. এর বেশির ভাগ শেয়ার কিনে নেয়। Mark Zuckerberg, the CEO of Meta, একই প্রক্রিয়ায় Instagram and WhatsApp এর মালিকানা পায়।
এভাবে সারা দুনিয়ায় কয়েক জন পুঁজিপতি পুরো মিডিয়া সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করে। আমেরিকার 90% মিডিয়া Disney, Comcast, AT&T এর মত মাত্র ছয়টা কোম্পানির মালিকানাধীন! এই ছয়টা কোম্পানি, যাদেরকেবলা হয় ‘The big six’, এরাই ডিসাইড করে আমেরিকার কোটি কোটি মানুষ তাদের টিভিতে কোন নিউজ দেখবে, কোন বয়ান গুলো তাদের গেলানো হবে এবং সর্বোপরি যেকোন বিষয়ে তাদের ভিউপয়েন্টটা কেমন হবে। এর মধ্যে মিডিয়া মুঘল নামে পরিচিত Rupert Murdoch একাই Wall Street Journal, The Times সহ শত শত পত্রিকা এবং Sky News, Fox সহ অনেক টিভি চ্যানেল-এর মালিক। এস আলম গ্রুপই কিন্তু বাংলাদেশের কয়েকটা মিডিয়া নিজেই Run করে। এছারা East West Media ও Transcom Media নামে দুটি প্রকাশনা বসুন্ধরা গ্রুপের মালিক যারা কালের কণ্ঠ ও অন্যটি ট্রান্সকমের মালিক চালায় যেখান থেকে প্রথম আলো, Daily Star ইত্যাদি জনপ্রিয় মিডিয়া বের হয়। সারা দুনিয়ায় একই ব্যবস্থা, একই চিত্র।
অনেকে মনে করে Social Media হয়তো এই প্রক্রিয়ার বাইরে। চ্যানেল খোলা তুলনামুলক সহজ বলে দলছুট সৎ সাংবাদিকরা এখানে মুক্তমনে সংবাদ প্রকাশ করতে পারে যা গণতন্ত্রের দাবির সাথে সংগতিপূর্ণ। এটা ঠিক গত ৭৫ বছর ধরে ফিলিস্থিনে গণহত্যার পক্ষে ইসরাইলের সমর্থনে তথাকথিত Western Free মিডিয়া যে ন্যারেটিভ তৈরি করে আসছিল, যার কারণে তাদের জনগণ মনে করত ফিলিস্তিনের মানুষরাই বেশি একরোখা, মিলেনিশে থাকতে চায় না, ৭ অক্টোবরের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় কল্যাণে প্রথমবার ফিলিস্থিনের নারকীয় পরিস্থিতি তারা জানতে পারে। ফলে মূলধারার মিডিয়াগুলোর আবাধ মিথ্যাচার বাধার মুখে পড়ে। তাই তাদের কাতার ভিত্তিক আলজাজিরার মত Creative হতে হচ্ছে। তারা একদিকে গাজা গণহত্যা বিরোধী জোরালো অবস্থান ধরে রেখেছে অন্যদিকে Two State Solution এর নামে দখলদার ইসরায়েলের উপস্থিতি জায়েজিকরণ, মানবাধিকার সংস্থার ঢাল দিয়ে গণতন্ত্রের ফেরি আর গণহত্যার মদদ কারি কাতারসহ মধ্য প্রাচ্যের শাসকদের বিরুদ্ধে নীরব, তার পক্ষে সাফাই গেয়ে যায় এমনভাবে যেন পাবলিক এই ব্যবস্থায় আশা জিইয়ে রাখে। রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসন চালায় আর ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার নিয়ে সংবাদ উপস্থাপনের পার্থক্য কিংবা ফিলিস্তিনির মৃত্যুকে has died আর ইজরাইলি মৃত্যুকে was killed কিংবা ফিলিস্থিনি বন্দিদের prisoner আর ইসরাইলি বন্দীদের hostage বলে সম্বোধন ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের দ্বিচারিতা সাধারনের কাছে উন্মুক্ত করে দেয় এই Social Media ।
কিন্তু সাদা চোখে না দেখা গেলেও এই মিডিয়াও দারুনভাবে নিয়ন্ত্রিত। পুরো সোশ্যাল মিডিয়ার কন্ট্রোল এলন মাস্ক, জাকারবারগ এর মত মাত্র দু-তিন জন পুঁজিপতির হাতে। আর তাদেরই দেওয়া গাইডলাইন মোতাবেক নিউজ হতে হয়। সেখানে ইসলাম ও রাসুল (সা) বিরোধী যা খুশি বলার স্বাধীনতা আছে; খিলাফাহ, ফিলিস্থিন সহ তাদের মানদণ্ডে আপত্তিজনক শব্দ লিখলে ফিল্টার করে আইডিকে রেস্ট্রিক্ট করে দেওয়া সহ এমনকি জঙ্গি সন্দেহে অনলাইন পুলিশিং এর নজরদারিতে পরার হুমকি থাকে। Violent Post এর নামে অধিকাংশ ফিলিস্থিনিদের video আমরা দেখতেই পাইনা, তাদের বিশেষ অ্যালগরিদম সেন্সর অনুযায়ী এসব নিউজ তারা রিচ ই হতে দিবেনা। সালেহ, আবুদ, ইউসুফ, সুবিস দের প্রো-প্যালেস্টিনিয়ান পোস্টের কারণে ১৫ মিলিয়ন ফলোয়ারসহ পুরো ইন্সটা একাউন্টই নাই করে দেয়া হয়েছে!! তাই এখানে কাজ করা দলছুট সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রন করা সহজ। তাদের মধ্যে খালেদ মহিউদ্দিন এর মত কাকে জনগণের সামনে আনবে আর জন অয়েন বা কারিস্মাদের মত কাকে আনবেনা, কোন চ্যানেলের রিচ আপ না ডাউন থাকবে নাকি পুরা পেইজই হাওয়া হয়ে যাবে এটাও ঠিক করে সেই সেকুলার পুজিপতিরাই। সম্প্রতি মার্কিন মন্ত্রনালয় catch and revoke নামে একটি AI app এআই চালু করেছে, যার কাজ ফিলিস্থিনের পক্ষে মন্তব্যকারিকে সনাক্ত করা। এমনকি যারা লাইক দিয়েছে তাদেরকেও ভিসা বাতিল করে দিচ্ছে। এভাবে রিচ কমিয়ে, আইডিকে রেস্ট্রিক্ট করে, বিভিন্ন আইন ও অনলাইন পুলিশিং এর মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়াগুলো নিয়ন্ত্রনে থাকে। এই কারণে ফিলিপাইনের সাংবাদিক মারিয়া রেসা বলছিলেন, “ইলন মাস্ক, মারক জাকারবার্গ এর মতো সোশ্যাল মিডিয়ার কর্তারাই বড় ফ্যাসিস্ট।”
তাই ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণমাধ্যম আসলে স্বাধীনতার নামে পরাধীন। এরকম কাঁচের ঘরে বসে তারা ইসলামে গণমাধ্যমের ভুমিকাকে আক্রমন করে ঢিল ছুড়ার সাহস কিভাবে পায়? সাহস পায় কারণ ১০১ বছর খিলাফার অনুপস্থিতিতে এই মিডিয়া কাজে লাগিয়েই ইসলামকে তারা কেবল ধর্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে আর খিলাফাহ প্রত্যাবর্তনের উপায় রাজনৈতিক ইসলামকে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদের সাথে যুক্ত করে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যে সাধারন মানুষ তা ভয়ের চোখে দেখে। তাই পরিপুর্ণ জীবন ব্যবস্থা হিসাবে এখানে গণমাধ্যমের ভুমিকা কী হবে তা নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে সাধারন অজ্ঞতা বিরাজমান। তারা Secular Media এর বাইরে কিছু ভাবতে পারে না। এই সুযোগে এই ব্যবস্থা ইসলামকে কট্টর আখ্যা দিয়ে সাধারন মানুষকে ভয় দেখায় যে ইসলামী ব্যবস্থা আসলে নাকে এই তথাকথিত স্বাধীনতা হারিয়ে যাবে, সমালোচনার সব দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। আর এসব প্রচারনায় আমরা এত লজ্জিত হয়ে পরি যে তাদের উন্মুক্ত ত্রুটি আমরা ধরার চেষ্টাই করি না, ইসলামকে বিকল্প না ধরে এই বাতিল ব্যাবস্থার সংস্কারের চিন্তা করি যা তাদের এই কাঁচের ঘর টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে। অথচ একমাত্র ইসলামি জীবন ব্যবস্থা পুঁজিপতিদের জিম্মি দশা থেকে মানবতাকে মুক্ত করার সক্ষমতা রাখে। এর অধীনে গণমাধ্যম মিথ্যাকে সত্য দিয়ে সজোরে আঘাত হানবে যেন মিথ্যার মগজ বের হয়ে যায় এবং মানুষ সত্যটা জানতে পারে।
কেমন হবে ইসলামের মিডিয়া?
রাসুল (সা) এর সময় তার প্রশাসন তখনকার Technology ব্যবহার করে মিডিয়ার কাজ করত। রমজান মাসে চাঁদ দেখা গেলে ঘোড়া ছুটিয়ে যতদুর যেতে পারে খবর পাঠান হতো। আমরা বিদায় হজ্জের ভাসনে দেখেছি বিভিন্ন point এ বার্তা বাহক দাঁড়িয়েছিল, রাসুল (সা) ভাসন মুখে মুখে নির্দিষ্ট দূরত্বে দারিয়ে তারা হুবহু ভিড়ের শেষ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলেন। সেই সময় যে নীতিমালা দিয়ে মিডিয়া নিয়িন্ত্রিত হতো, একই নীতিমালায় বর্তমানে মিডিয়া নিয়ন্ত্রিত হবে যদিও Science and Technology এর উৎকর্ষের কারণে Satellite controlled Internet based সোশ্যাল মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ অনেক ধরনের মিডিয়া এখন চালু আছে।
কুরআন ও সুন্নাহ থেকে ভবিষ্যৎ খিলাফাহ রাষ্ট্রের জন্য যে সংবিধান তৈরি করা আছে সেখানে তথ্যনীতির অধীনে ১০৩ ও ১০৪ ধারায় বলা আছে:
অনুচ্ছেদ ১০৩: মিডিয়া অফিস প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক মিডিয়া কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে নিয়োজিত, যাতে ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষা করা যায়। অভ্যন্তরীণভাবে, এটি একটি শক্তিশালী ও সংহত ইসলামি সমাজ গঠনের জন্য কাজ করে, যা মন্দকে খণ্ডন করে এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে। বাহ্যিক ক্ষেত্রে, এটি শান্তি ও যুদ্ধ উভয় অবস্থাতেই ইসলাম প্রচার করবে, এমনভাবে যে ইসলাম ধর্মের মহত্ব, এর ন্যায়বিচার এবং এর সেনাবাহিনীর শক্তি ব্যাখ্যা করা হবে এবং মানবসৃষ্ট ব্যবস্থার দুর্নীতি ও নিপীড়ন এবং তাদের সেনাবাহিনীর দুর্বলতা প্রকাশ করা হবে।
অনুচ্ছেদ ১০৪: রাষ্ট্রের যে কোনো নাগরিকের মালিকানাধীন মিডিয়ার জন্য কোনো অনুমতির প্রয়োজন নেই; বরং তারা কেবল মিডিয়া অফিসকে অবহিত করবে, যাতে অফিসটি নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত মিডিয়া সম্পর্কে জানতে পারে। যে কোনো মিডিয়া মাধ্যমের মালিক ও সম্পাদকরা তাদের প্রকাশিত প্রতিটি নিবন্ধের জন্য দায়ী থাকবে এবং তারা যদি শরীয়াহর বিরোধী কিছু প্রকাশ করে, তবে যে কোনো নাগরিকের মতো তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
ধারা ১০৩ ১০৪ অনুযায়ী, ইসলামী রাষ্ট্রের গণমাধ্যম বিভাগ দুই ভাগে বিভক্ত:
প্রথম বিভাগ: এমন সংবাদ যা রাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, যেমন সামরিক বিষয়, সামরিক শিল্প ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য স্পর্শকাতর বিষয় যেমন রাষ্ট্রের ইন্টারনাল সিকিউরিটি বিষয়, সেনাবাহিনীর তথ্য, যুদ্ধের প্ল্যান ও স্ট্রাটেজি, তা তারা খলীফার অনুমতি ছাড়া প্রচার করতে পারবে না। এই বিষয়ে দলিল হল, আল্লাহ্ বলেছেন, “আর যখন তাদের কাছে নিরাপত্তা বা আশঙ্কা সংক্রান্ত কোনো সংবাদ আসে, তখন তারা তা ছড়িয়ে দেয়। অথচ তারা যদি তা রাসুল (সা.) এবং তাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বশীল, তাদের কাছে পৌঁছে দিত, তবে যারা তা থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত বের করতে পারে, তারা তা জানতে পারত” (হুজুরাত:৬)। রাসুল (সা) আয়শা (রা.) কে বলেন, “আমাকে প্রস্তুত করো, এবং কাউকে এ ব্যাপারে কিছু বলো না… তারপর তিনি নির্দেশ দিলেন যেন মহাসড়কগুলোর পথ বন্ধ করা হয়, ফলে মক্কার জনগণ অন্ধকারে রয়ে গেল এবং তাদের কাছে কোনো সংবাদ পৌঁছেনি”। এই কারণে এ ধরনের খবর অনুমতি ছাড়া প্রচার করা যাবে না।
দ্বিতীয় বিভাগ: অন্যান্য সংবাদ যেগুলোর উপর সরাসরি তত্ত্বাবধানের প্রয়োজন নেই, এসব সংবাদ প্রচারের জন্য রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত গণমাধ্যমের অনুমতির প্রয়োজন নেই।
এই নীতিমালা অনুযায়ী: সরকারি বা বেসরকারি যে কেউ মিডিয়া খুলতে পারবে। এর জন্য কোন বড় বড় ব্যবসায়ীদের দ্বারস্থ হওয়া লাগবে না, কারো সামর্থ্য না থাকলে বায়তুল মাল থেকে সুদবিহীন ঋণ প্রদান করা হবে, মিডিয়ার খোলার ক্ষেত্রে অনুমতিও লাগবেনা। একাধিক মিডিয়া হাউজ থাকবে কিন্তু কোটিপতিদের কন্ট্রোলে না, বরঞ্চ শরিয়ার কন্ট্রোলে। এক্ষেত্রে খলিফা একজন চীফ মিডিয়া অফিসারকে নিযুক্ত করবেন, যেটা হবে centralized. chief officer এর কাজ হবে সাধারণভাবে তদারকি করা, ইসলামের guidance ফলো করছে কিনা। তবে শুধু তদারকি পর্যন্তই, তাদের নিয়ন্ত্রন করার জন্য নয়। এই মিডিয়াগুলো সাধারনভাবে আকিদা ভিত্তিক গভীর আলোচনা ছাড়াও বিশ্বব্যাপী ইসলামী জীবন ব্যবস্থার superiority ও কুফর ব্যবস্থার অসারতা তুলে ধরবে, লাইফের বিভিন্ন aspect ইসলামের সমাধান ও কালচারগুলোকে তুলে ধরবে, অন্যান্য মুসলিম ভূখণ্ডগুলোকে খিলাফতের অধীনে ঐক্যবদ্ধ হতে উদ্বুদ্ধ করবে এবং ইসলামী দাওয়া সারা বিশ্বে পৌঁছে দিবে। এই মিডিয়া আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ রোল হল সৎ কাজে আদেশ অসৎ কাজে নিষেধ করা। সাধারণভাবে,সৎ কাজে আদেশ অসৎ কাজে নিষেধ এবং শাসককে একাউন্ট করা ইসলামে ফরজ। তাই খলিফা, আমিল ও গভর্নর যে কোন পর্যায়ে দুর্নীতির সন্ধান পেলে, কোন গাফিলতি হলে খলিফা এবং সরকারের লোকদের বিরুদ্ধে Investigate ও প্রতিবেদন করবে। এই ব্যাপারে আল্লাহ্ ছাড়া আর কাউকে পরোয়া করতে হবে না। ইবনে আব্বাস বর্ণিত, রাসুল (সা) বলেছেন, “(হাশরের ময়দানে) শহীদদের নেতা হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব এবং সেই ব্যক্তি যে জালিম শাসকের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে সৎকাজের আদেশ দিবে এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে আর একারণে তাকে হত্যা করা হবে।” এছাড়াও জনগণের চাহিদার কথা হতে পারে কোন প্রত্যন্ত জায়গায় ভাঙ্গা রাস্তার মেরামত বা অন্য কোনো জনদুর্ভোগ, সরকারের কাছে মিডিয়া তুলে ধরবে, এইভাবে জনস্বার্থে মিডিয়া ব্যবহৃত হবে।
যদি ইসলামি বহির্ভূত কালচার, বা মিথ্যা নিউজ, twisted নিউজ, বিভ্রান্তিমূলক তথ্য না হয় তা প্রচারে সাংবাদিকদের কোন বাঁধা থাকবে না। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: «আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ সম্পর্কে অবহিত করবো না?” সাহাবিরা বললেন, “অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসূল। “তখন তিনি বললেন: “আল্লাহর সাথে শরিক করা এবং বাবা-মায়ের অবাধ্যতা।” তিনি তখন হেলান দিয়ে ছিলেন, কিন্তু এরপর উঠে বসলেন এবং বললেন: “এবং মিথ্যা কথা ও মিথ্যা সাক্ষ্য।” তিনি এটি বারবার বলতে থাকলেন, যতক্ষণ না তিনি চুপ হয়ে গেলেন। তাই হলুদ সাংবাদিকতা শারিয়ার লঙ্ঘন।
বর্তমান ব্যবস্থায় বাক স্বাধীনতার নামে পুঁজিপতিদের গোলামি চলে। ইসলাম আল্লাহ্ প্রেরিত শাসন ব্যবস্থা, এখানে বাইরে এক আর ভিতরে আরেক ধরনের আলাদা কোন চাতুর্যময় ব্যবস্থা নেই। পুরোটাই উন্মুক্ত। সেই অর্থে ইসলামে কোন স্বাধীনটাই নেই, আছে আল্লাহর অধীনতা যা দুনিয়াকে মানবজাতির জন্য বাসযোগ্য করবে আর আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দিবে। সেই আশায় মুসলিমরা journalism practice করবে, এর মাধ্যমে তারা সত্য প্রচার করে ইসলামের নেতৃত্বকে তুলে ধরে নেকি কামাবে। শারিয়ার অধীনে অমুসলিম সত্যবাদি সাংবাদিকরাও নির্ভয়ে সত্য ও তাদের চাওয়া পাওয়া তুলে ধরতে পারবে আর মানুষ জানতে পারবে সত্য, যা আজকে দুস্প্রাপ্য। ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাক স্বাধীনতার নামক প্রহসনের মাধ্যমে মানবজাতিকে মিথ্যার অন্ধকারে নিমজ্জিত করে রেখেছে। খিলাফাহ তার শক্তিশালী মিডিয়া ব্যবহার করে মানবজাতিকে সত্যকার অর্থে মুক্ত করবে, তাদের কাছে সত্য পৌঁছে দিবে ইনশাআল্লাহ।
ধর্ষণ: ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ নাকি বিকৃত যৌন আচরণ?

ধর্ষণের মতো উদ্বেগজনক ঘটনাগুলো একটি ক্রমবর্ধমান সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা দুর্ভাগ্যবশত, কোনো ভয়াবহ ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার পরেই কেবল মিডিয়ায় মনোযোগ আকর্ষণ করে। সাধারণত, এই ধরনের ঘটনা সামাজিক এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তীব্র বিতর্কের সূত্রপাত করে, যা পরে সরকারী কর্মকর্তা এবং শাসকদের এই বিষয়ে কয়েকটি বিবৃতি জারি করতে বাধ্য করে। যাইহোক, বিতর্কটা কিছুটা কমে গেলে, সরকার সমস্যাটি সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞ হয়ে পড়ে, যেন এটির কোনো অস্তিত্বই ছিল না। ধর্ষণের বিষয়টি কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং সমগ্র বিশ্বকে আক্রান্ত করে। এই সমস্যার তীব্রতা নিম্নলিখিত তথ্য দ্বারা বিচার করা যেতে পারে:
১. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, যুক্তরাজ্যের জনসংখ্যার ৭% – যাদের বেশিরভাগই নারী – যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাছাড়া, প্রতি বছর এই সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।
২. ধর্ষণ, অপব্যবহার এবং অজাচার জাতীয় নেটওয়ার্ক (RAINN), বৃহত্তম আমেরিকান যৌন নির্যাতন বিরোধী সংস্থা, যা কখনো কখনো সরকারের জন্যও কাজ করে। এ সংস্থার অনুসারে, প্রতি ছয়জন মহিলার মধ্যে একজন এবং তেত্রিশজন পুরুষের মধ্যে একজন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই পরিস্থিতির অবনতি ক্রমশ বাড়ছে।
৩. জিও নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে পাকিস্তানে ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে প্রায় ১০,০০০ ধর্ষণের ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে। এই সংখ্যাগুলিও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৪. দ্য নিউজ ইন্টারন্যাশনালের মতে, ২০১৪ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বড় শহরগুলিতে ধর্ষণের ঘটনা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
৫. বাংলাদেশে প্রতি ১ লাখ নারীর মধ্যে প্রায় ১০ জন ধর্ষণের শিকার হন। ২০২১ সালে গৃহীত এক হিসবে পাওয়া গেছে যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পূর্ববর্তী ৫ বছরে ৩০ হাজার ২৭২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী ২০১৯ সালে এক হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন৷ ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিলো ৭৩২ জন৷ অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় গত বছর ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে দ্বিগুণ যা ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি৷ ২০১৭ সালে ধর্ষণের শিকার হন ৮১৮ জন নারী৷ ২০১৯ সালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬ জনকে৷ আর আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১০ জন নারী৷ বাংলাদেশে গণ ধর্ষণের ঘটনাও অহরহ ঘটে থাকে। [তথ্য সূত্র: উইকিপিডিয়া]
একটি সংখ্যালঘু, কিন্তু তবুও প্রভাবশালী গোষ্ঠী বিশ্বাস করে যে ধর্ষণের ঘটনাগুলি একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ফলাফল, যেখানে নারীদের পুরুষের সমান বিবেচনা করা হয় না। তারা যুক্তি দেয় যে এই সমাজ যৌন-হতাশ পুরুষদের জন্ম দেয় যারা নারীদের তাদের অধীনস্থ বলে মনে করে। তাই পুরুষরা বিশ্বাস করে যে তারা তাদের নিজস্ব যৌন তৃপ্তির জন্য যে কোনো উপায়ে এবং যেভাবে ইচ্ছা এই মহিলাদের ব্যবহার করার ক্ষেত্রে তারা স্বাধীন। এই গোষ্ঠীর লোকেরা বিশ্বাস করে যে ধর্ষণ সমাজে নগ্নতা বৃদ্ধির সাথে সম্পর্কিত নয় বা পশ্চিমা দেশ থেকে আমদানি করা কোনো নির্দিষ্ট চিন্তা-ধারণা গ্রহণের ফলাফল নয়। প্রকৃতপক্ষে, এই গোষ্ঠী বিশ্বাস করে যে পুরুষ এবং মহিলাদের তাদের ইচ্ছামত যে কোনো উপায়ে নিজেদের মধ্যে সম্মতিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করার স্বাধীনতা থাকা উচিত। অতএব, যারা নগ্নতা বা পশ্চিমা আদর্শে প্রভাবিত নারীদের পোশাক পছন্দের সমালোচনা করে থাকেন, তাদের তারা ধর্ষণের কৈফিয়তদানকারী (rape apologists) হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন।
তবে, এই কথিত বয়ানকে গভীরভাবে পরীক্ষা করলে দেখা যায় যে এটি প্রকৃতিগতভাবে একটি অগভীর চিন্তা, এবং এই ইস্যুটির সম্পূর্ণ বাস্তবতাকেও তুলে ধরে না। অধিকন্তু, এই কথিত বয়ানটি পশ্চিমা চিন্তাভাবনা দ্বারাও প্রভাবিত, যা সমাজকে মিথ্যা উদারনৈতিকতবাদ (Liberalism)-এর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখায়।
সমাজে ধর্ষণ এবং অন্যান্য অপরাধের প্রকৃত কারণগুলি বুঝতে হলে, প্রথমে মানব প্রকৃতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা অর্জন করতে হবে, প্রথমে বুঝতে হবে মানব প্রকৃতি যা তাদের স্রষ্টার দ্বারা মানব সৃষ্টির ভিত্তি এবং দ্বিতীয়ত, সমাজ কীভাবে গঠিত হয়। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) সমস্ত মানুষকে, পুরুষ এবং মহিলাকে একটি নির্দিষ্ট প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং মানব জাতির বেঁচে থাকা তাদের উভয়ের সহযোগিতা এবং একত্রিত হওয়ার উপর নির্ভরশীল করেছেন। পুরুষ এবং মহিলা উভয়ই মানুষ এবং তাই তাদের মধ্যে এমন সব বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা তাদেরকে মানুষ করে তোলে। এর মধ্যে একটি হল প্রতিটি মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা যা তাদের কর্মকে প্রভাবিত করে। আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল যে সমস্ত মানুষের কিছু জৈব চাহিদা রয়েছে, যেমন খাদ্য এবং জল গ্রহণের প্রয়োজন, বাতাসে শ্বাস নেওয়ার প্রয়োজন এবং নিজেকে ত্যাগ করার প্রয়োজন, যা জীবনের জন্য অত্যাবশ্যক। এই জৈব চাহিদাগুলি ছাড়াও, মানুষের কিছু প্রবৃত্তিও রয়েছে যা পূরণ না হলে উদ্বেগ এবং অসন্তোষের কারণ হতে পারে, যেমন প্রজনন প্রবৃত্তি। মানব প্রকৃতি সম্পর্কে এই তথ্যগুলি স্পষ্ট এবং ব্যতিক্রম ছাড়াই সত্য।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মানুষের মধ্যে এই প্রবৃত্তি স্থাপন করেছেন। অধিকন্তু, তিনি মানুষকে এই প্রবৃত্তি পূরণের জন্য সঠিক উপায়ও প্রদান করেছেন। তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কেবল প্রবৃত্তিই সৃষ্টি করেননি বরং তিনি এর তুষ্টির জন্য উপায়ও প্রদান করেছেন। অধিকন্তু, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মানুষের প্রবৃত্তিকে সঠিকভাবে তুষ্ট করার জন্য শাসন পরিচালনার দিকেও নির্দেশনা দিয়েছেন, তা সেটা বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি, প্রজনন প্রবৃত্তি কিংবা আধ্যাত্মিক প্রবৃত্তিই হোক না কেন। প্রবৃত্তি পূরণের জন্য যেকোনো পদ্ধতিই প্রকৃতপক্ষে সঠিক নয়।
উদাহরণস্বরূপ, প্রতিটি ব্যক্তিরই একটি বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি থাকে, যা তাকে জীবনে নিজের জন্য আরাম খুঁজে পেতে বাধ্য করে, যার জন্য একজন ব্যক্তি অর্থ উপার্জন করে এবং তারপর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং বিলাসদ্রব্য কিনে। তবে, এর অর্থ এই নয় যে নিজের প্রবৃত্তি তৃপ্ত করার জন্য, চুরি, লুটপাট, মজুদ, চোরাচালান বা মাদক বিক্রি সহ যে কোনো উপায়ে অর্থ উপার্জন করা সঠিক। স্পষ্টতই, এটি এমন নয়। তাহলে, কেন এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করা হচ্ছে যে একজন ব্যক্তির যে কোনো উপায়ে, অজাচার বা পশুত্বের মাধ্যমে, প্রজনন প্রবৃত্তির ক্ষেত্রে, তার যৌন ইচ্ছা পূরণের জন্য স্বাধীন হওয়া উচিত?
তাহলে আসল প্রশ্ন হল: প্রবৃত্তি তৃপ্ত করার সঠিক উপায়গুলি নির্ধারণের মানদণ্ড কী হওয়া উচিত? মানদণ্ড কি এই হওয়া উচিত যে একই লিঙ্গের বা বিপরীত লিঙ্গের দুজন সম্মতিপ্রাপ্ত প্রাপ্তবয়স্ককে, বিবাহ বন্ধনের বাইরে, একে অপরকে অর্থ প্রদানের মাধ্যমে, অথবা অংশীদার হিসাবে, যে কোনো উপায়ে তাদের চাহিদা পূরণ করার অনুমতি দেওয়া উচিত? উদার পশ্চিমা চিন্তাধারার অনুসারীরা হ্যাঁ উত্তর দেবেন। যাইহোক, একইভাবে, কোনো ব্যক্তি যদি মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে অন্য কাউকে দাস বানিয়ে সেই অর্থ দিয়ে অন্য ব্যক্তি তার পরিবার এবং সন্তানদের জন্য উন্নত জীবিকার ব্যবস্থা করতে চায়- সেটা কি অনুমোদনযোগ্য হবে? স্বাধীনতার নামে কি ভিন্ন দেশের দুজন সম্মতিপ্রাপ্ত প্রাপ্তবয়স্ককে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিনিময়ে তাদের নিজ নিজ দেশের সংবেদনশীল গোপনীয়তা বিনিময় করার অনুমতি দেওয়া উচিত?
অতএব, একজন ব্যক্তির জন্য কোনটি সঠিক এবং কোনটি সঠিক নয় তা নির্ধারণের জন্য কিছু মানদণ্ডের প্রয়োজন। তাহলে প্রশ্ন হল: এই মানদণ্ড নির্ধারণের কর্তৃত্ব কাকে দেওয়া উচিত? আর যদি মানবজাতির সত্যিই একজন স্রষ্টা থাকে, তাহলে কি সেই স্রষ্টার এই বিষয়ে কি কোনো বক্তব্য রাখা উচিত নয়?
যখন আমরা মানুষের জৈবিক চাহিদা এবং প্রবৃত্তিগুলিকে আরো নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করি, তখন আমরা বুঝতে পারি যে প্রথমটির জন্য কোনো বাহ্যিক উদ্দীপনার প্রয়োজন হয় না। উদাহরণস্বরূপ, মানুষ কোনো সময়ে ক্ষুধার্ত হবে, তাদের সামনে ভাল খাবার থাকুক বা না থাকুক। অন্যদিকে, প্রবৃত্তির জন্য একটি বাহ্যিক উদ্দীপনার প্রয়োজন। যাইহোক, যদি এই প্রবৃত্তিগুলো তুষ্ট না হয়, তবে ব্যক্তি অস্থিরতা ও অপূর্ণতায় ভুগে। উদাহরণস্বরূপ, একজন মাকে তার সন্তানের যত্ন নিতে দেখলে একজন নিঃসন্তান ব্যক্তির মধ্যে আবেগ জাগবে। যাইহোক, যখন মা ও শিশু সেই ব্যক্তির সামনে থাকবে না, তখন তাদের আবেগ কমে যাবে। যাইহোক, তা সত্ত্বেও, নিঃসন্তান ব্যক্তি অস্থির থাকবে এবং অনুভব করতে পারে যে তাদের জীবন থেকে কিছু একটা অনুপস্থিত। একই কথা প্রজনন প্রবৃত্তির ক্ষেত্রেও সত্য, যা উদ্দীপিত হয় যখন একজন ব্যক্তি যৌন উদ্দীপকের মুখোমুখি হয়, এমনকি যদি তা সেই ব্যক্তির কল্পনায়ও সৃষ্টি হয়।
মানব প্রকৃতির আরেকটি দিক হলো জীবন সম্পর্কে একজন ব্যক্তির চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি যথাক্রমে তার প্রবণতা ও প্রবৃত্তিকে প্রভাবিত করার এবং গঠন করার ক্ষমতা। উদাহরণস্বরূপ, একজন মুসলিমের তার মা ও বোনদের প্রতি যৌন প্রবণতা থাকবে না, কারণ ইসলাম এবং তার চারপাশের সমাজ এই সম্পর্কগুলিকে সেভাবে পবিত্র করে রাখে। তবে, পশ্চিমে, অজাচার তুলনামূলকভাবে সাধারণ। তাই, ব্যক্তিদের সঠিক যৌন মনোভাব বিকাশের জন্য, সঠিক চিন্তাভাবনা প্রচার এবং সমাজে তা প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন। বরং, সমস্ত ব্যক্তির জন্য স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ঘোষণা করা কেবল তাদেরকে কেবল যেকোনো উপায়ে তাদের যৌন চাহিদা পূরণের জন্য ধাবিত করবে, এমনকি জোরপূর্বক এবং সহিংসতার মাধ্যমে হলেও।
উপরে উল্লিখিত চিন্তাভাবনার আলোকে, আসুন এখন ধর্ষণের সমস্যাটি আরো গভীরভাবে দেখি। ধর্ষণ তিনটি কারণের ফলাফল:
১. ব্যক্তির যৌন চাহিদা পূরণের আকাঙ্ক্ষা।
২. পুরুষ ও নারীর মধ্যে সম্পর্ক কীভাবে সংগঠিত করা উচিত সে সম্পর্কে ব্যক্তির সঠিক ধারণার অভাব থাকা, অথবা তার আকাঙ্ক্ষাকে এর চেয়ে এগিয়ে রাখার প্রবণতা থাকা।
৩. ভুক্তভোগী যখন তার নাগালের মধ্যে থাকে তখন তার শারীরিকভাবে তাকে পরাভূত কিংবা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থাকা।
এই তিনটি বিষয় একত্রিত হলেই একজন ব্যক্তি ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ করে। উদারনীতিবাদ এই তিনটি বিষয়কেই উৎসাহিত করার চেষ্টা করে, যদিও এর দাবি ভিন্ন, যেখানে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা এগুলো বন্ধ করার কার্যকর উপায় প্রদান করে। অতএব, যে সমাজ সম্পূর্ণরূপে ইসলাম গ্রহণ করে সেখানে ধর্ষণের ঘটনা অত্যন্ত বিরল।
প্রথম বিষয়টির ক্ষেত্রে, ইসলাম একজন ব্যক্তির প্রজনন (অথবা যৌন) প্রবৃত্তির জন্য বাহ্যিক উদ্দীপনা কমাতে চায়। অতএব, ইসলাম পর্নোগ্রাফিক সামগ্রীর অনুমতি দেয় না, এমনকি এমন বিলবোর্ডেরও অনুমতি দেয় না যা নারীদের বস্তুগত প্রচারের জন্য বস্তুগতভাবে উপস্থাপন করে। ইসলাম হাম স্টাইল অ্যাওয়ার্ডের মতো অনুষ্ঠানের মঞ্চে আংশিক নগ্ন মহিলাদের কুচকাওয়াজের অনুমতি দেয় না।
অফিসের মতো জনসাধারণের স্থানে, পুরুষ ও মহিলা উভয়ের ক্ষেত্রে ইসলামী পোশাকের নিয়ম মেনে চলা এবং ইসলাম কর্তৃক নির্ধারিত সীমার মধ্যে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করাটা প্রত্যাশিত বিষয়। এটি সমাজকে আজ সারা বিশ্বে আমরা যে যৌন হতাশার মুখোমুখি হচ্ছি তা থেকে রক্ষা করবে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ইসলাম কোনও ব্যক্তির সন্তান জন্মদানের প্রবৃত্তিকে স্বীকৃতি দেয় না বা দমন করে না। বিপরীতে, ইসলাম পুরুষ ও মহিলাদেরকে বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছানোর সাথে সাথে বিয়ে করতে উৎসাহিত করে, যাতে তারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের যৌন চাহিদা পূরণ করতে পারে। এটি মানুষকে ব্যভিচার এবং সমকামিতার মতো যৌন অনৈতিক উপায়ের দিকে ঝুঁকতে বাধা দেয়। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) পবিত্র কুরআনে বলেন, وَمِنْ آَيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً “ “আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি হলো: তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সাহায্যকারী সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তাদের দ্বারা প্রশান্তি লাভ করতে পারো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও করুণা স্থাপন করেছেন। নিঃসন্দেহে এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে।” [সূরা আর-রুম ৩০:২১] নবী মুহাম্মাদ (সা) বলেছেন: «يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنْ اسْتَطَاعَ منكُم الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ، وَأَحْلْجِرْ، وَأَحْلْبَصَرِ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ» “হে যুবকরা, তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে, সে যেন তা পায়। বিবাহিত, কারণ এটি দৃষ্টিকে অবনত রাখতে এবং সতীত্ব রক্ষা করতে বেশি কার্যকর। যে ব্যক্তি এর সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে, কারণ এটি তার কামনা-বাসনাকে হ্রাস করে।” [মুত্তাফাকুন আলাইহি]
দ্বিতীয় বিষয়টির ক্ষেত্রে, ইসলামী সমাজের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং গণমাধ্যম পুরুষ ও নারী উভয়ের মধ্যে মানবিক প্রবৃত্তি এবং চাহিদা সম্পর্কে সঠিক ধারণা গড়ে তোলার কাজ করে। অতএব, একটি ইসলামী সমাজে, নারীদের সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে দেখা হবে, যাদের সম্মান জীবন ও মৃত্যুর বিষয় হিসেবে রক্ষা করা উচিত। একজন নারীকে মা, কন্যা, স্ত্রী এবং বোন হিসেবে সম্মান করা উচিত, বিজ্ঞাপনের জন্য তার যৌনতা এবং আকর্ষণকে কাজে লাগিয়ে বস্তুগতভাবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। ইসলাম সমকামিতাকেও নিষিদ্ধ করে এবং এটিকে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য একটি জঘন্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে, যা পূর্বে সমগ্র সমাজের উপর আল্লাহর ক্রোধের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কুরআনে বলেন; ﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنَاً كَوْجَهَا وَبَثَّ مِنَاً وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ) “হে মানবজাতি! তোমাদের প্রতিপালকের কথা স্মরণ রাখো, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকেই তার সঙ্গীনী সৃষ্টি করেছেন, এবং উভয়ের মাধ্যমে তিনি অসংখ্য পুরুষ ও নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহর কথা স্মরণ রাখো, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে প্রার্থনা করো।” [সূরা আল-নিসা ৪:১])। নবী মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, «خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي» “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম, আর আমি আমার স্ত্রীদের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।” [তিরমিযী]
তৃতীয় বিষয়টির ক্ষেত্রে, ইসলাম এমন সুযোগ কমাতে চায় যেখানে একজন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি সম্ভাব্য শিকারকে পরাভূত করতে পারে। অতএব, ইসলাম গায়রে মাহরাম পুরুষ ও মহিলাদের একসাথে নির্জনে থাকা নিষিদ্ধ করে, যেমন ভ্রমণের সময় নির্জন রাস্তায়, মাহরাম আত্মীয়দের অনুপস্থিতিতে বাড়িতে, অথবা কাজের সময় স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় বা অফিসে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেছেন যে তিনি নবী (সা)-কে এক খুতবার সময় বলতে শুনেছেন, «لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بامْرَأَةٍ إلَّا وَمعهَا ذُو مَحْرَمٍ» “কোন পুরুষ মাহরামের উপস্থিতি ব্যতীত কোন মহিলার সাথে নির্জনে থাকতে পারে না।” [সহীহ মুসলিম]।
অনুরূপভাবে, রাসূলুল্লাহ (সা) আরো বলেছেন, «لا يَحِلُّ لاِمْرَأَةٍ تُؤْمِنُ باللَّهِ وَالْيَومِ الآخِرِ، تُسَافِرُ مَسِيرَةَ يَومٍ وَلَيْلَةٍ يَومٍ عَلَيْ مَيْلَةٍ إلَّا مع ذِيْمَ». “আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী নারীর জন্য মাহরাম ব্যতীত একদিন ও এক রাতের অধিক সময় সফর করা বৈধ নয়” [সহীহ মুসলিম])। উপরন্তু, ইসলাম কোনো বৈধ শরয়ী কারণ ছাড়া নারী-পুরুষের মিশ্র সমাবেশকেও নিষিদ্ধ করেছে। সুতরাং, গায়রে মাহরাম পুরুষ ও মহিলারা শিক্ষাগত বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে পারে, তবে আনন্দ এবং বিনোদনের উদ্দেশ্যে একে অপরের সাথে সময় কাটানোর অনুমতি নেই।
যারা পশ্চিমা উদারনৈতিক চিন্তাধারার অনুসারী তারা ধর্ষণের দিকে পরিচালিত করে এমন প্রথম দুটি কারণকে উপেক্ষা করে এবং পরিবর্তে কেবল তৃতীয় কারণের উপর নির্ভর করে। তদুপরি, এই সমস্যা সমাধানের জন্য তারা যে সমাধান প্রস্তাব করে তা ইসলামের পরিবার ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। তারা আরও যুক্তি দেয় যে এই সমস্যার সমাধান হল নারীদের ‘ক্ষমতায়ন’ করা, যারা নারীদের উদার অধিকারের জন্য তাদের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করে এবং ইসলাম কর্তৃক নির্ধারিত সামাজিক ব্যবস্থার বিরোধিতা করে। এইভাবে, উদারনৈতিক চিন্তাবিদদের এই দলটি সমাজকে ধ্বংস করার চেষ্টা করে, যেমন তারা ইতিমধ্যে পশ্চিমা সমাজকে ধ্বংস করেছে, জনসংখ্যার অর্ধেককে অন্য অর্ধেকের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে। অনেক নারীবাদী আন্দোলন সত্ত্বেও, পশ্চিমা সমাজ এখনও ধর্ষণের ঘটনাগুলির একটি কেন্দ্রস্থল। এটাও মনে রাখা উচিত যে তথাকথিত পুরুষ-আধিপত্য হ্রাস সত্ত্বেও, গত কয়েক দশকে পাকিস্তানে ধর্ষণের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ধর্ষণ কোন মানসিক ব্যাধি নয় যার জন্য কোন ধরণের চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, অথবা এটি নিপীড়ন ও আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা থেকে উদ্ভূত হয় না। বরং, এটি সমাজে মানুষের মধ্যকার কলুষিত চিন্তাভাবনা, বিদ্যমান সামাজিক পরিবেশ, ধর্মপরায়ণতার অভাব এবং ইসলামী ব্যক্তিত্ব তৈরিতে রাষ্ট্রের কর্তব্য পালনে অবহেলার ফলাফল। একবার একজন ব্যক্তি তার যৌন চাহিদা পূরণের জন্য ভুল উপায় ব্যবহার করলে, তারা সেই পথেই হাঁটতে থাকে।
এটা বলাও ঠিক নয় যে ধর্ষণ কেবল নারীদের ইসলামি পোশাকবিধি অনুসরণ না করার ফলেই ঘটে, কারণ যারা এই পোশাকবিধি অনুসরণ করে তারাও ধর্ষিত হয়। তবে, উদারপন্থী পুঁজিপতি শ্রেণীর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল নারী ও পুরুষদের যথাযথ ইসলামি পোশাকবিধি পালন না করার সুযোগ দেওয়া। সুতরাং, এই অসুস্থ মানসিকতার লোকেরা এই বিষয়ে স্পষ্ট ইসলামী আদেশ-নিষেধকে আক্রমণ করার জন্য ইসলামী পোশাকবিধি অনুসরণকারী নারীদের সাথে জড়িত ধর্ষণের ঘটনাগুলিকে ব্যবহার করে। এখানে বোঝার বিষয় হল যে ইসলামের আদেশ-নিষেধ বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে না। অতএব, শুধুমাত্র নারীদের উপর ইসলামী পোশাকবিধি প্রয়োগ করে ধর্ষণের সমস্যা সমাধান হবে না, এবং শুধুমাত্র এই ধরনের অপরাধের জন্য ইসলামী শাস্তি প্রবর্তন করেই এর সমাধান হবে না। প্রকৃতপক্ষে, বর্তমান ব্যবস্থার মধ্যে ইসলামী শাস্তি প্রবর্তন, নারীদের ব্যাপকভাবে বস্তুনিষ্ঠ করে তোলার মাধ্যমে, কেবল এই ধারণা তৈরি হবে যে তারা এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না এবং তাই তারা অকেজো। কারণ শুধুমাত্র ইসলামী শাস্তি, সমাজকে ধর্ষণের দিকে পরিচালিত করে এমন সমস্ত কারণ থেকে মুক্ত করে না, যার জন্য ইসলাম পৃথক নিয়ম দিয়েছে। অতএব, শুধুমাত্র ইসলামী শাস্তির দাবি একটি অসম্পূর্ণ দাবি। এই সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হবে না যতক্ষণ না আমাদের সমাজ থেকে পশ্চিমা উদারনৈতিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা হয় এবং নবুওয়তের পদ্ধতির খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়, যা জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামকে ব্যাপকভাবে বাস্তবায়ন করবে। এটিই একটি পবিত্র ও সৎ সমাজ গড়ে তোলার একমাত্র উপায়, যা বিশ্বের বাকি অংশের জন্য আলোকময় বাতিঘর হবে।
ধর্ষণ মহামারীর একমাত্র প্রতিষেধক ইসলাম

বিশ্বব্যাপী চলছে ধর্ষণের মহোৎসব। UNICEF এর ২০২৪ অক্টোবরের সার্ভে মতে বিশ্বজুড়ে প্রতি ৮ জনে ১ জন নারী ১৮ বছর বয়স হবার আগে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। Irony হল, উন্নত বিশ্বে ধর্ষণের হার সবচেয়ে বেশি, যদিও টা উল্টো হবার কথা। প্রতি ৬৮ সেকেন্ডে আমেরিকাতে ১ জন ধর্ষিত হয়। লন্ডনে ২০২৩ সালে পুলিশের কাছে গড়ে প্রতিদিন ২৪ টি ধর্ষণের রিপোর্ট জমা হয়েছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশে ধর্ষণের হার এখনও কম হলেও পিছিয়ে নেই। ২০২৫ ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতিদিন গড়ে ১২ টি ধর্ষণ মামলা হয়েছে। মনে রাখা প্রয়োজন, ধর্ষণ মানে কিন্তু শুধুই জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন নয়, বরং হিংস্র যৌন সহিংসতা। ছোট ছোট শিশুদের যৌনাঙ্গ চিরে ফেলা বা অন্তঃসত্তা নারীদের গণধর্ষণ-এর ভয়াবহতা ও বীভৎসতা স্বাভাবিক ভাবে আমদের ভারাক্রান্ত করে তুলছে। শেষ পর্যন্ত হত্যার শিকার না হলেও প্রতিদিন বিশ্বব্যাপী হাজারো Rape Victim ও তাদের পরিবারকে এই ধরনের চরম শারিরিক ও মানসিক যন্ত্রনার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় সবাই চাইছে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে সমাজ বের হয়ে আসুক, কঠোর আইন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, এমনকি প্রয়োজনে ধর্ষককে পাথর মেরে হত্যার দাবি তোলা হচ্ছে। আন্দোলনের মুখে আবার সরকার প্রচলিত আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে যদিও স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে বহুবার এই আইনে পরিবর্তন এনেও ধর্ষণ কমানো যায় নি।
বাংলাদেশে বিচার জটিলতা আছে একথা ঠিক। ২০১৮ সালের একটি জরিপে বলা হচ্ছে মোট ধর্ষণ মামলার ৩% এর কখনো সাজা হয় না। বাকি ৯৭% এর ক্ষেত্রে হয় আসামিরা গ্রেফতার হলেও জামিন নিয়ে বেরিয়ে যায় কিংবা মামলা খালাস হয়ে যায়। আর মামলা জট, মামলার দীর্ঘসূত্রিতায় আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়া, ব্যয়বহুল মামলা চালানোর অপারগতাসহ জেরার মুখে হেনস্তা ইত্যাদির কারণে মামলা বিমুখতা তো আছেই। কিন্তু বিচারহীনতা বা আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকাটাই যদি মূল সমস্যা হত তাহলে কিন্তু যেসব দেশে আইনের প্রয়োগ আছে সেখানে ভিন্ন চিত্র দেখতে পেতাম। যেমন: নর্থ কোরিয়া। সেখানে রেপের শাস্তি Death by Firing Squad। সেখানেও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর রিপোর্ট অনুসারে ৯০% মেয়ে কখনো না কখনো সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট এর শিকার হয়। চীনের বিচার বিভাগ অনেক দ্রুত কাজ করে। বেশিরভাগ ধর্ষণের মামলা ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। মৃত্যুদণ্ড কিংবা আজীবনের জন্য নপুংসক করে দেয়া হয় ধর্ষককে। কিন্তু সেখানেও দৈনিক ৮৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে যদিও বেসরকারি তথ্যমতে সেটা প্রকৃত সংখ্যার মাত্র ১০% । বাংলাদেশ যে বৃটেনের বিচার ব্যাবস্থাকে আদর্শ ধরে অনুসরণ করে, সেখানেও ৮১% মহিলা যৌন হয়রানির শিকার ।
তারপরও সমস্যার গোঁড়ায় না যেয়ে কেবল দ্রুত কঠোর আইন বাস্তবায়নের ব্যর্থ সমাধানকেই বার বার সামনে আনা হয়। যেন আর কিছু করার নাই। তবে এটা ঠিক ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থায় আসলেও কিছু করার নেই। কারণ সমস্যার গোঁড়াতে হাত দিলে গেলে দেখা যাবে উদ্ভুত পরিস্থিতির জন্য এই ব্যাবস্থাই দায়ী, এই ব্যবস্থাই ধর্ষণ রোগের কারণ ও পালনকারী। তাই কোনভাবে এই ব্যাবস্থার অধীনে থেকে এই সমস্যর সমাধান করা যাবে না।
কেন ধর্মনিরপেক্ষ ব্যাবস্থা ধর্ষণ নামক মহামারীর জন্মদাতা ও পালনকারি?
১) স্রষ্টা বিবর্জিত ধর্মনিরপেক্ষ এই ব্যবস্থায় কোন সমাজ ব্যবস্থা নেই অর্থাৎ সমাজে নারী-পুরুষ কিভাবে মিলামিশা করবে বা কার দায়িত্ব কর্তব্য কী হওয়া উচিত ইত্যাদি। এটা তারা ছেড়ে দিয়েছে তাদের ব্যাক্তিগত খেয়াল খুশির উপর। যে যার মত Freedom practice করবে সর্বোচ্চ ইন্দ্রিয় সুখ প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে, আর এই ভিত্তিতেই নিজেদের করণীয় তারা নিজেরা ঠিক করে নিবে। শুধু শর্ত দিয়েছে যেন একজনের স্বাধীনতা চর্চা অন্যজনের স্বাধীনটাকে বাধাগ্রস্থ না করে। একটা রাস্তাতেও যদি কোন যান চলাচল ব্যবস্থা না থাকে, যে যার মত গাড়ি চালায়, সেই রাস্তা চলাচল অনুপযোগী ও দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে পরবে, আর এখানে পুরো সমাজের কথা বলা হয়েছে। ফলে পুরো সমাজ আজ বিশৃঙ্খলাময়, সাধারনভাবে দুর্বলদের জন্য বিশেভাবে নারী ও শিশুদের জন্য আজ তা জঙ্গলে পরিনত হয়েছে যেখানে জান-মাল-সম্মান বাঁচাতে তাদের প্রতিনিয়ত ছুটতে হচ্ছে আর ধাক্কা খেতে হচ্ছে। নারী পুরুষের সম্পর্কের ভিত্তি “স্বাধীনতা” ঘোষণা দিয়ে এই ব্যবস্থা অনেকগুলো সমস্যার জন্ম দেয়:
প্রথমতঃ স্বাধীনতার কোন সংজ্ঞা নাই। তাই যে যার যার মত তাঁর স্বাধীনতা ডিফাইন করবে। একটা ছেলে বা একটা মেয়ে সমাজে কী করবে তারা তা নিজেদের সুবিধা বা খেয়াল খুশি মত ঠিক করবে। কোন পুরুষ তাঁর পুরুষত্ব হিংস্রতার তীব্রতার উপর ভিত্তি করে ঠিক করতে পারে আর মেয়েরা Bold and Beautiful হওয়াকে সমাধান ভাবতে পারে। যার যার জায়গায় সে সে ঠিক। আমরা দেখতে পাই পরস্পরকে প্রমান করার চেষ্টায় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপুর্ণ এক অসহিষ্ণু সমাজ যেখানে পারস্পরিক ঘৃণা, অসুস্থ প্রতিযোগিতা, অসম্মান আর সন্দেহ সবার জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে।
দ্বিতীয়তঃ আছে পুঁজিপতিদের দৌরাত্ম। তারা মিডিয়া ও তাদের নিয়ন্ত্রিত এই ব্যবস্থা ব্যবহার করে বিশেষ করে কম বয়সী নারীদের স্বাধীনতার মুলা ঝুলিয়ে কৌশলে তাদের স্বাধীনতা হরণ করে। রুপালি পর্দায় ঝলমলে উপস্থিতির লোভ দেখিয়ে তাদের Beauty Product হিসেবে উপস্থাপন ও ব্যবহার করে। অল্প বয়সি মেয়েরা সহজেই এই ধূর্ত ভণ্ডদের থাবায় চলে আসে আর তারপর বের হতে পারে না। তাদের পরবর্তী অভিজ্ঞতা #metoo আন্দোলন ভাল ভাবেই সামনে নিয়ে এসেছে। Beauty Industry থেকে ২০২৪ এ Officially ৭১৬ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, এর সাথে Prostitution ও Porno Industry থেকে আয় যোগ করলে এক অবিশ্বাস্য উপার্জন সংখ্যা পাওয়া যাবে। তাই তারা যে অন্যর স্বাধীনতা ভোগের উপকরণে পরিনত হয়েছে তা বুঝতে বুঝতেও অনেক দেরি হয়ে যায়।
তৃতীয়তঃ তাছাড়া ইন্দ্রিয় সুখ বিশেষ করে যৌনতাকে এই ব্যবস্থা এমনভাবে উপস্থাপন করে যে খাদ্য-বস্ত্র-চিকিৎসা না হলেও চলবে কিন্তু নারী পুরুষের অবাধ মেলা মেশা আর যথেচ্ছা যৌনাচারের স্বাধীনতা ছাড়া চলবে না। সব ধরনের মিডিয়াতে বিবাহ পূর্ব আর বিবাহ বহির্ভূত ছাড়াও যেকোন লিঙ্গের যে কোন উপকরণের সব ধরনের শারীরিক সম্পর্ককে এমন Creative way তে সবার সামনে উপস্থাপন করে যে Live Together এখন সামাজিক প্রথায় পরিণত হবার পথে। চলছে Pornography এমনকি Child পর্ণ কেন্দ্রিক রমরমা ব্যাবসা। এসব বিকৃত যৌনাচারের সহজ শিকার হয় শিশু, প্রতিবন্ধি, দুর্বল বা হাতের কাছে থাকা নারী।
২) এই ব্যবস্থা একটা অবাস্তব শর্ত দিয়েছে যে অন্যর স্বাধীনতা নষ্ট না করে যথেচ্ছা স্বাধীনতা ভোগ কর, রাষ্ট্র বাধা দিবে না। তারমানে সীমাবদ্ধ স্বাধীনতা, যা সবসময় মানুষ ছাড়িয়ে যাবার সুযোগ খুঁজবে, আইন কে ফাঁকি দিয়ে বা আইনের সুযোগ নিয়ে। অবাক হবার কিছু নাই যে মোট ধর্ষিতদের মধ্য একটা বড় অংশ তাদের আপনজন অর্থাৎ বাবা, শ্বশুর, মামা, চাচা, ভাই বা স্বামী দ্বারা আক্রান্ত। তাদের বিরুদ্ধে আদালতে নালিশ করা কি সহজ কথা?
তাছাড়া দিন শেষে কখনই ২ ব্যাক্তির স্বাধীনতা এক সাথে সংরক্ষিত হয় না, শুধু শক্তিশালী ব্যক্তির স্বাধীনটাই নিশ্চিত হয়। আমরা জানি Donald Trump or Bill Clinton or Bill gates দের স্বাধীনতা সংরক্ষিত হয়েছে, Monica দের নয়, যতোই তারা আইনি লড়াই চালাক।
ফলে দিনশেষে ধর্ম নিরপেক্ষ ব্যবস্থার অবাধ স্বাধীনতা নামক ঘোড়ার ডিমের চর্চার ভুক্তভোগী আসলে কারা হয়? যারা বড়লোক, প্রতিষ্ঠিত নারী বা পুরুষ তারা কিন্তু ভুক্তভোগী হয় না বরং প্রান্তিক নারী-শিশু-পুরুষ সহ তুলনামুলক দুর্বল মানব অংশ। সুযোগ সন্ধানিরা ওঁত পেতে থাকে শিকারের আশায়। ফলে এই ব্যবস্থায় ধর্ষণ একটি স্বাভাবিক পরিনতি। তাই এই ব্যবস্থার অধীনে কোন কঠোর আইন বা বিচার তা যদি ইসলাম থেকেও নেয়া হয়, তবু ধর্ষণ কোন ভাবে কমবে না, কমে নাই বরং বাড়ছে এবং বাড়বে। ধর্ষণ মহামারীর উৎস ধর্ম নিরপেক্ষ ব্যবস্থা থেকে যারা সমাধান বের করার চেষ্টা করছে তারা আসলে সত্যিকার ভাবে সমাধান চাইছে না, বরং মানুষের অসহায়ত্ব আর বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে তাদের অজ্ঞতাকে পূঁজি করে এই ব্যর্থ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে চাইছে।
সমাধান কী?
শুধুমাত্র ইসলামী জীবন ব্যবস্থার সামগ্রিক বাস্তবায়ন ধর্ষণের এই মহোৎসব বন্ধ করতে পারে। ইসলামের জীবন ব্যবস্থা ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটা ইউনিক সিস্টেম, যেখানে ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা আল্লাহ থেকে কোন কিছু নিবেই না সেখানে ইসলাম আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ছাড়া আর কারও কাছ থেকে কিছু নিবে না। “আর আমি আপনাকে দ্বীনের বিধিবিধানের উপর প্রতিষ্ঠিত করেছি, অতএব আপনি তা অনুসরণ করুন এবং জ্ঞানহীনদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করবেন না” (সূরা আল-জাসিয়া, ১৮)। আর এই জীবনব্যবস্থা থেকে উঠে এসেছে ইসলামের সামাজিক ব্যবস্থা বা সোশ্যাল সিস্টেম। শুধুমাত্র এই ব্যবস্থাই নির্দেশ করেছে একটা সমাজে নারী পুরুষ কিভাবে চলবে, তাদের সম্পর্কে সীমারেখা গুলো কী রকম হবে, তাদের দায়িত্ব কর্তব্য, বিয়ে, তালাক অভিভাবক হিসেবে করণীয়সহ যাবতীয় নিয়ম কানুন যা তাদের মাঝে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আক্রমণাত্মক সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতামূলক সহবস্থান নিশ্চিত করে। ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা কিভাবে শুধু মুসলিম নারী নয় বিশ্বজুড়ে সকল নারী-পুরুষ-শিশু আর দুর্বলকে নিরাপদ করবে তা বোঝার জন্য এই ব্যবস্থার কিছু দিক সংক্ষেপে তুলে ধরছি:
১) ইসলামে নারী মানেই সম্মান; একটা পুঁজিবাদী সমাজ, যেখানে নারীকে তাঁর সৌন্দর্য, সম্পদ, Family Status আর উপার্জনের ভিত্তিতে যাচাই করা হয়, সেখানে ইসলাম মুসলিম-অমুসলিম, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সুন্দর-অসুন্দর, ধনী-দরিদ্র, কর্মজীবি বা গৃহিণী প্রতিটি নারীর সম্মান ঘোষণা করেছে। “শুধুমাত্র একজন সম্মানিত ব্যক্তি নারীদের সম্মানের সাথে আচরণ করে, আর কেবল অজ্ঞ ও নীচ ব্যক্তি তাদের অবমাননা করে” ( আবু দাউদ)। কেউ তাদের ছোট করে কথা বলতে পারবে না ইভটিজিং তো অনেক পরের কথা। তবে এর মাঝে যার তাকওয়া বা আল্লাহ্ভীতি অর্থাৎ আল্লাহর আদেশ নিষেধ যথাযথ ভাবে মেনে চলার প্রবণতা যে নারীর মধ্যে যত বেশি সে তত সম্মানিত। বলা হয়েছে, পৃথিবীতে সকল কিছু মূল্যবান কিন্তু সবচেয়ে মূল্যবান হচ্ছে একজন তাকওয়াবান নারী। স্বয়ং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই Certificate দিয়েছেন।
২) এই ব্যবস্থায় ইসলাম নারী বা পুরুষ কাউকেই স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ দেয়নি। আল্লাহ্ নারী-পুরুষ উভয়ের স্রষ্টা আর তিনি প্রত্যেকের জন্য সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, চলাফেরা, আচরন, এমনকি দৃষ্টি পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হবে। যেমন, ঘরের বাইরে প্রত্যেক নারীকে আল্লাহ্ তায়ালা কর্তৃক নির্ধারিত পোশাক পরতে হবে। পাশাপাশি পুরুষদের তাদের দৃষ্টি সংযত রাখতে আদেশ করেছেন। “মুমিন পুরুষদের বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান সংযত রাখে” (সূরা আন-নূর, ৩০)। আলি (রা) বলেছেন, পরনারীর প্রতি প্রথম দৃষ্টি ভুলবশত হতে পারে কিন্তু দ্বিতীয়টি শয়তানের পক্ষ থেকে। এই দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে যে কোন নারী আজকে সাক্ষ্য দিবে এমনকি পর্দা করার পরেও পুরুষদের লালসা পূর্ণ দৃষ্টি কিভাবে তাদের অপমান করে।
৩) আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইসলামি সমাজে ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশাকে নিষিদ্ধ করেছেন। আবু হুরায়রা রা হতে বর্ণিত: রাসুল (সা) বলেছন, “পুরুষদের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট প্রথম সারি আর সর্বনিকৃষ্ট শেষের সারি আর নারীদের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট শেষের সারি আর সর্ব নিকৃষ্ট ১ম সারি।” এই দলিল থেকে বের হয়ে আসে পুরুষদের সারি নারীদের থেকে পৃথক ও দূরবর্তী হবে। এর ভিত্তিতে সমাজে নারী-পুরুষের পরিপূর্ণ পৃথকীকরণ নিশ্চিত করা হবে। ইসলাম কিন্তু মেয়েদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে বাধা দেয়নি আবার বাধ্যতামুলকও করেনি বরং রুজি-রুটি উপার্জন ছেলেদের জন্য ফরয আর মেয়ের জন্য ঐচ্ছিক করেছে কারণ তাকে পরিবার দেখাশোনার কষ্টসাধ্য কাজ সামলাতে হয়।প্রয়োজনীয় কারণে পবালিক প্লেসে নারী-পুরুষের কথাবার্তা হতেই পারে, যেমন কেনা-কাটা, বানিজ্য, চাকুরি, লেখাপড়া, গবেষণা ইত্যাদি প্রয়োজনে তারা কথা বলবে এবং সহযোগিতা করবে কিন্তু বিয়ে-শাদি, সামাজিক অনুষ্ঠান, যানবাহনসহ যেখানে প্রয়োজন সেখানে তাদের পৃথকীকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
আবার ঘরের ভিতর বা ব্যক্তিগত স্থানে গায়ের মাহরাম (যাদের সাথে বিয়ে বৈধ) এর সামনে নিজেদের সৌন্দর্য এবং কণ্ঠস্বরের কোমলতা প্রকাশ না করার আদেশ দেয়া হয়েছে। তাদের সাথে এমনকি একা থাকার ব্যপারে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। “কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান না করে, কারণ তখন তাদের সঙ্গে তৃতীয় ব্যক্তি হয় শয়তান” (তিরমিজি ২১৬৫)। তাই যত তাকওয়াবান হিজাবি হোক না কেন, কিংবা যত বড় হুজুর আর মাদ্রাসার প্রিন্সিপালই হোক না কেন, কোন মেয়ের সাথে একাকী থাকা নিষিদ্ধের মাধ্যমে ছেলেদের মিনিমাম Temptation তৈরির পথও আল্লাহ বন্ধ করে দিয়েছে ।
তবে অমুসলিম নর-নারী Public place এ আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পোশাক ও মেলামেশা করলেও তারা তাদের নিজ গৃহ বা ব্যক্তিগত জায়গায় নিজেদের মত পোশাক বা খাওয়া-দাওয়া বা মেলামেশায় তাদের মত নিয়ম মানতে পারে, সে স্বাধীনতা ইসলাম তাদের দিয়েছে।
৪) এই সমাজে যেভাবে যিনা বা বিয়ে হীন যৌন সম্পর্ক কে সহজ আর বিয়েকে কঠিন করা মাধ্যমে মানুষের যৌন চাহিদা পুরণকে একটি বিকৃতির পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে, ইসলাম ঠিক তার উল্টো। যিনা কে আল্লাহ্ হারাম করেছে “আর ব্যভিচারের নিকটেও যেও না, নিশ্চয়ই এটি একটি অশ্লীল কাজ এবং খুবই নিকৃষ্ট পথ” (সূরা বনী ইসরাইল: ৩২)। ইসলামে বিয়েকে উৎসাহী করা হয়েছে। রাসুল (সা) বলেছেন, “বিয়ে আমার সুন্নাহর অংশ। যে আমার সুন্নাহ অনুসরন করে না তাঁর সাথে আমার কিছু নাই। বিয়ে কর, কারণ আমি অন্য জাতির সামনে তোমাদের সংখ্যা নিয়ে গর্বিত হতে চাই” ইবনে মাজাহ। বিয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য শারিরিক সম্পর্ক নয় বরং নেক সন্তানে দুনিয়া আবাদ করা। ইসলামী রাষ্ট্র দ্রুত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে যেন দ্রুত পরিবার গঠনে কাউকে বেগ পেতে না হয়। এভাবে আল্লাহ্ প্রয়োজন দিয়েছেন এবং সুন্দরভাবে টা পুরণের উপায় করে দিয়েছেন যা মানুষের Nature এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
৫) আজকে আমরা শুধু রেপ না, নারীদের সাথে ভয়াবহ Violence দেখতে পাই নিজের মাকে আঘাত করা, স্ত্রীকে যৌতুকের দায়ে মেরে ফেলা, কন্যা সন্তান কে এই যুগে এসেও বোঝা ভাবা হয়। অপরদিকে ইসলামী সমাজে স্ত্রী-মা—বোন-সন্তান – সকল পর্যায়ে নারীরা শুধু সম্মানের নয়, অত্যন্ত আদরের। রাসুল সা বলছেন “যে ব্যক্তির একটি কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করে এবং সে তাকে জীবন্ত কবর দেয়নি, তাকে অপমান করেনি এবং তার পুত্রসন্তানের তুলনায় তাকে অবহেলা করেনি, আল্লাহ তাকে সেই কন্যার কারণে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন (Ahmad)। এ প্রিন্সিপাল থেকে একটা সমাজে ও পরিবারে মেয়েরা সব চাইতে আদরের এবং ভালোবাসার পাত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। তাদেরকে জান্নাতের টিকেট বিবেচনা করে তাকে তাঁর বাবা-ভাই-মামা-চাচা সকলে আগলিয়ে রাখে এবং দায়িত্বর সাথে সৎ পাত্রস্থ করে। যখন তার বিয়ে হয়ে যায়, তখন হাসবেন্ড তাকে সম্মান ও ভালবাসার সাথে আগলিয়ে রাখে কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন: “আর তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।” (সূরা আন-নিসা: ১৯)। আর মায়ের পায়ের নিচে জান্নাতের কথা তো সবাই জানি। এভাবে ইসলামী সমাজ নারীকে আদরে-সম্মানে সব সময় সিক্ত রাখে।
৬) মুমিন নারী ও পুরুষ আল্লাহর ভয়ে, আখিরাতে জবাব্দিহিতার চিন্তায় যা তাদের জান্নাত জাহান্নামের নির্ধারণকারি এই সীমা গুলো নিজেরাই মেনে চলবে এবং অন্যরা যেন মানে সে ব্যাপারে সামাজিক ভাবে সচেতন থাকবে। ফলে তাকওয়া ফ্রন্টলাইন ডিফেন্স হিসেবে কাজ করে। আর অমুসলিমরা দুনিয়াতে ভাল ও নিরাপদ থাকার আশায় এই বিধান গুলো মেনে চলবে।
৭) তাই বলে নারীর নিরাপত্তাকে শুধু তাকওয়ার হাতে ছেড়ে দেননি বরং শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা দ্বারা সুরক্ষিত করেছেন। পরস্পরের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে তাঁর অবস্থান সুক্ষাতিসুক্ষভাবে জানিয়ে দেয়ার পর, অপরাধের সকল দরজা বন্ধ করার পর কোন নারীপুরুষ কেউ এই সীমা রেখা অতিক্রম করলে মাত্রা অনুযায়ী আল্লাহ্ তায়ালা শাস্তির বিধান দিয়েছে যা খিলাফাহ রাষ্ট্র প্রয়োগ করবে। যেমন: যিনার শাস্তি ১০০ বেত্রাঘাত বা পাথর মেরে হত্যা, ধর্ষণের মাত্রা ভেদে বিভিন্ন শাস্তি, তাদের ভরণপোষণ, সম্পদের অধিকার লঙ্ঘিত হলে শাস্তি এমনকি নারীর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন গুজব ছড়ালে এমনকি মুখের কথায় তাঁর সম্মান নষ্ট করলে উৎস নিশ্চিত করে তাকে জনসম্মুখে ৮০টি বেত্রাঘাত করা হবে। অপরাধি ব্যক্তি যে পদমর্যাদার বা পরিবারের হোক না কেন, জনসম্মুখে তাঁর শাস্তি নিশ্চিত করা হলে চুনোপুঁটিরা এমনিতেই সোজা হয়ে যাবে।
ইসলামের এই ব্যবস্থা শুধু তাত্ত্বিক আলোচনা নয়। ১৯২৪ সালে খিলাফাহ ধ্বংস হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত এই ব্যবস্থা নারীদের সুরক্ষা দিয়ে এসেছে। রাসুল (সা) একজন নারীর অসম্মানের জন্য পুরো বানু কাইনুকা গোত্রকে নির্বাসনে পাঠায়, মু’তাসিম বিল্লাহ একজন নারীকে উদ্ধার করতে আমুরিয়া দখল করে নেয়, এমনকি ১৯২০ সালে খিলাফাতের দুর্বলতম অবস্থায় তুরস্কের একজন ইমাম দখলদার ফরাসি বাহিনির এক সৈন্যকে গুলি করে হত্যা একজন নারীকে অসম্মান করার প্রতিবাদে যা মারাশের যুদ্ধ শুরু করে বলে অনেক ইতিহাসবিদ দাবি করেন। ১৩০০ বছর জুড়ে ১ জন নারীর সম্মানকে ইসলাম যেভাবে রক্ষা করে এসেছে কেন সেই ব্যবস্থা বাদ দিয়ে আমাদের সামনে নানা জোড়াতালি দিয়ে ঘুরে ফিরে সেই ধর্মনিরপেক্ষতা দিয়েই ধর্ষণ সমস্যার সমাধানের প্রতি আহ্বান করা হয়? আজকে প্রতি মুহূর্তে বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার নারী যে চরম অসম্মান ও নিরাপত্তাহিনতার মধ্য দিয়ে অসহায়ের মত জীবন পার করছে তাঁর দাওয়াই আল্লাহ্ তায়ালা মুসলমানদের উপর নাযিল করেছেন। তাই আমরা যদি সত্যি এই ধর্ষণ মহামারি থেকে মানবজাতিকে বের করে আনতে চাই তাহলে আমাদের এখন উচিত একই ভুল দাওয়াই বার বার না দিয়ে সমস্যার সমাধানে বিকল্প বিশ্ব ব্যবস্থা ইসলামের সামগ্রিক প্রয়োগে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। যারা ইসলামকে ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ করে নানা জোড়াতালি দিয়ে ঘুরে ফিরে সেই ধর্মনিরপেক্ষতা দিয়েই ধর্ষণ সমস্যার সমাধান ফেরি করেন তাদের জন্য একটি আয়াতই যথেষ্ট।
তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে ঈমান রাখ আর কিছু অংশ অস্বীকার কর? সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা তা করে দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ছাড়া তাদের কী প্রতিদান হতে পারে? আর কিয়ামতের দিনে তাদেরকে কঠিনতম আযাবে নিক্ষেপ করা হবে (বাকারা: ৮৫)।
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]

















