Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:

    ((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))

    “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    «أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»

    “আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:

    «عليك بتقوى الله ما استطعت»

    “তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:

    «فاتقوا الله ولو بشق تمرة»

    “একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।

    তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))

    “আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))

    “যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))

    “মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:

    ((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))

    “মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))

    “পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]

    এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))

    “যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))

    “এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:

    ((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))

    “হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]

  • রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন। 

    “হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩) 

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ

    রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি? 

    আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত। 

    এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।

    আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    “আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)

    وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ

    আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

    মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। 

    ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: 

    “আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩) 

    وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ

    “আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ

    “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮) 

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ

      “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)

    حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ

    আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।

  • রমজান এর শিক্ষা

    রমজান এর শিক্ষা

    সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্‌কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:

    রমজান – রহমতের মাস:

    এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।

    রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।

    সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর  মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।

    সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।

    জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।

    রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।

    ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্‌ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।

    এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।

    রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:

    রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।

    এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।

    রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্‌কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।

    তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।

    তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্‌র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্‌ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্‌কে রাগান্বিত করে।

    আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্‌ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।

    এখানে আল্লাহ্‌ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।

    উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্‌ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্‌ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”

    আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।

    তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্‌ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)

    এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)

    অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।

    এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্‌ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।

    তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।

    আর আল্লাহ্‌কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্‌র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।

    বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।

    রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।

    রমজান – কোরআনের মাস:

    একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।

    আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?

    আল্লাহ্‌ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্‌র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।

    এখানে আল্লাহ্‌ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্‌ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?

    বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।

    যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্‌ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্‌ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”

    আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”

    একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”

    তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।

    রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)

    আল্লাহ্‌ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।

    সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্‌র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।

    অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।

    যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।

    বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।

    রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:

    আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।

    রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।

    কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্‌র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।

    আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।

    তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্‌ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্‌ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।

    রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)

    আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্‌র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্‌ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্‌র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।

    পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)

    অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্‌র ক্ষমা পাওয়া যায় না।

    রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:

    পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।

    রমজান এর পর কী হবে?

    প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।

    রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্‌র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্‌র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্‌র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।



    আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
    ২৫শে শাবান, ১৪৩৩
    ১৪ই জুলাই, ২০১২ 

  • খিলাফত রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক পতাকা কী হবে?

    খিলাফত রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক পতাকা কী হবে?

    ইসলামি রাষ্ট্রের সরকারী পতাকাকে রাইয়াহ (الراية) বলা হয়। এটি একটি কালো আয়তক্ষেত্রাকার পতাকা যার উপর সাদা রঙে لا إِلٰهَ إِلَّا ٱلله مُحَمَّدٌ رَسُولُ ٱلله লেখা রয়েছে। এর পেছনের ইজতিহাদের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো।

    ঐতিহাসিকভাবে, পতাকাগুলো মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে বিভিন্ন সেনাবাহিনীকে চিহ্নিত করার জন্য যুদ্ধে ব্যবহৃত হত। আধুনিক সময়ে বিভিন্ন দেশকে চিহ্নিত করতে পতাকা ব্যবহার করা হয় এবং কোনো জাতিকে একত্রিত করার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আমেরিকাতে, পতাকার জন্য একটি নির্দিষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে এবং বেশিরভাগ পাবলিক স্কুলগুলিকে এর আবৃত্তির জন্য নিয়মিত সেশন নির্ধারণ করা বাধ্যতামূলক:

    “আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার প্রতি আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, এবং যে প্রজাতন্ত্রের জন্য এটি দাঁড়িয়ে আছে, ঈশ্বরের অধীনে এক জাতি, অবিভাজ্য, সবার জন্য স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারসহ।”

    তাহলে ভবিষ্যৎ খিলাফত নিজেকে চিহ্নিত করতে কোন পতাকা ব্যবহার করবে?

    খিলাফত একটি ইসলামী রাষ্ট্র এবং এর কাঠামো অবশ্যই ইসলামী গ্রন্থ (কুরআন ও সুন্নাহ) থেকে উদ্ভূত হতে হবে। অতএব, কোনো পতাকা ব্যবহার করার আলোচনার সূচনাবিন্দু হবে ইসলামি দলীলাদি। যদি নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীদের দ্বারা ব্যবহৃত পতাকার কোনো নির্দিষ্ট বর্ণনা পাওয়া না যায়, তাহলে এটি কুরআনের শাসনের সাধারণ বাধ্যবাধকতা থেকে উদ্ভূত একটি সহায়ক নিয়ম হিসাবে শৈলী (উসলুব) এবং উপকরণ (ওয়াসিলাহ) এর আওতায় পড়বে।

    إِنِ الحُكمُ إِلّا لِلَّهِ

    “শাসন আল্লাহ ছাড়া কারো জন্য নয়।” [সূরা ইউসুফ, ১২:৬৭]

    রাষ্ট্র এবং সরকার সম্পর্কিত সমস্ত ইসলামি নিয়মগুলোর ক্ষেত্রে, বিশদ আলোচনা নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ (কর্ম, বাণী ও মৌনসম্মতি)’র মাধ্যমে এসেছে।

    আমরা হাদিসের দিকে তাকালে তাহলে আমরা ইসলামী সেনাবাহিনীর নেতা ও কমান্ডারদের দ্বারা ব্যবহৃত দুই ধরনের পতাকা দেখতে পাই। তারা হল লিওয়া’ (اللواء) এবং রায়াহ (الراية) যা পতাকা ও ব্যানার হিসাবে অনুবাদ করা হয়।

    عَنْ جَابِرٍ، رضى الله عنه أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم دَخَلَ مَكَّةَ وَلِوَاؤُهُ أَبْيَضُ

    জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত যে, “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাদা লিওয়া নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন” (সুনানে নাসাঈ ২৮৬৬)

    لأُعْطِيَنَّ الرَّايَةَ الْيَوْمَ رَجُلاً يُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ

    রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আমি আজকে এমন এক ব্যক্তিকে (ইমাম আলী) রাইয়াহ দেব যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসে।” (ইবনে মাজাহ)

    আল-কামুস আল-মুহিত অভিধানে লিওয়া’ এবং রায়াহ উভয়ের ভাষাগত অর্থকে ‘আলাম (العلم) হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে যার অর্থ একটি চিহ্ন বা ব্যানার।

    যদি হাদিসে লিওয়া’ এবং রায়াহর আর কোনো বর্ণনা পাওয়া না যেত তাহলে আমরা যে কোনো ধরনের পতাকা গ্রহণ করতে পারতাম যতক্ষণ পর্যন্ত এতে ইসলামি প্রতীক যেমন উসমানীয়রা অর্ধচন্দ্রাকৃতি ও তারা ব্যবহার করত।

    যাইহোক, যদি আমরা হাদিসের দিকে তাকাই তাহলে আমরা লিওয়া ও রায়াহ উভয়েরই বিশদ বর্ণনা পাই যার অর্থ এই শব্দগুলি একটি সাধারণ ভাষাগত অর্থ থেকে একটি নির্দিষ্ট বর্ণনাসহ একটি শরঈ অর্থে স্থানান্তরিত হয়েছে।

    লিওয়া’ এবং রায়াহ’র মধ্যে পার্থক্য কী?

    লিওয়া’ হল একটি নির্দিষ্ট পতাকা যা কর্প কমান্ডার (লেফটেন্যান্ট জেনারেল), বা কমান্ডার ইন-চীফ (খলিফা) এর জন্য একটি চিহ্ন হিসাবে ব্যবহৃত হয়, যেখানে রায়াহ সমগ্র সশস্ত্র বাহিনী এবং কিয়াসের মাধ্যমে তা সম্প্রসারণ করে তা সমগ্র জনগোষ্ঠীর দ্বারা ব্যবহৃত বিষয় হয়। রাষ্ট্র যুদ্ধের সময় রায়াহ উড্ডয়ন করবে এবং যদি প্রধান সেনাপতি (খলিফা)ও যুদ্ধ করেন তবে লিওয়া’ও রায়াহর পাশাপাশি উড্ডয়ন করা হবে। এটি নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধের উপর ভিত্তি করে, যিনি বদর ও উহুদের মতো যুদ্ধে প্রধান সেনাপতি ছিলেন। এটি খুলাফায়ে রাশিদার (সৎপথপ্রাপ্ত খলিফাদের) সময়কার যুদ্ধেও দেখা যায়।

    সিফফিনের যুদ্ধে, খলিফা আলী ইবনে আবি তালিব সরাসরি যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং তাই লিওয়া ও রায়াহ উভয়ই উড্ডয়ন করা হয়েছিল। আলী (রা), মুহাম্মদ ইবনে আল হানাফিয়াকে লিওয়া বহন করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন এবং হিশাম ইবনে উতবাহকে রায়াহ বহন করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। (মুহাম্মাদ আস-সাল্লাবী, আলী, ভলিউম ২, পৃ. ১৫৫)

    যুদ্ধের সময় রায়াহ বা লিওয়া’কে উঁচু করে রাখা সৈন্যদের প্রেরণার লক্ষণ। সাহাবীগণ পতাকা বহনকারীর দায়িত্বকে অবিশ্বাস্যভাবে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করতেন যেমনটি মুস’আব ইবনে উমাইর দেখিয়েছিলেন যখন তিনি তাঁর শাহাদাত পর্যন্ত উহুদ যুদ্ধে লিওয়া বহন করেছিলেন।

    يقول ابن سعد: أخبرنا ابراهيم بن محمد بن شرحبيل العبدري، عن أبيه قال:

    حمل مصعب بن عمير اللواء يوم أحد، فلما جال المسلمون ثبت به مصعب، فأقبل ابن قميئة وهو فارس، فضربه على يده اليمنى فقطعها، ومصعب يقول: وما محمد الا رسول قد خلت من قبله الرسل..

    وأخذ اللواء بيده اليسرى وحنا عليه، فضرب يده اليسرى فقطعها، فحنا على اللواء وضمّه بعضديه الى صدره وهو يقول: وما محمد الا رسول قد خلت من قبله الرسل..

    ثم حمل عليه الثالثة بالرمح فأنفذه وأندق الرمح، ووقع مصعب، وسقط اللواء

    ইবনে সা’দ বলেছেন: ইব্রাহীম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে শারহাবিল আল-আবদারী তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি বলেছেন: মুস’আব ইবনে উমাইর উহুদের দিনে লিওয়া বহন করেছিলেন। মুসলমানরা যখন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল, তখন তিনি দ্রুত দাঁড়ালেন যতক্ষণ না তিনি একজন যোদ্ধা ইবনে কামিয়াহ-এর মুখোমুখি হলেন। তিনি তাকে তার ডান হাতের উপর আঘাত করে কেটে ফেললেন, কিন্তু মুসআব বললেন, وما محمد الا رسول قد خلت من قبله الرسل “আর মুহাম্মাদ একজন রাসূল মাত্র, তাঁর পূর্বে রসূলগণ গত হয়েছেন” (আলে ইমরান, ৩:১৪৪)।

    তিনি বাম হাতে লিওয়া’টি বহন করলেন এবং তাতে ভর দিলেন। তিনি তার বাম হাতে আঘাত করে সেটি কেটে ফেলেন এবং তাই তিনি লিওয়া’র উপর ঝুঁকে পড়েন এবং তার উপরের বাহু দিয়ে এটিকে তার বুকের সাথে চেপে ধরেন, এবং বলতে থাকলেন, وما محمد الا رسول قد خلت من قبله الرسل “আর মুহাম্মদ কেবল একজন রাসূল, তাঁর পূর্বে রাসুলগণ গত হয়েছেন।” তারপর তৃতীয় একজন তার বর্শা দিয়ে তাকে আঘাত করল এবং বর্শাটি তার মধ্য দিয়ে বের হয়ে গেল, মুসআবের পতন হলো এবং এরপর লিওয়া’। (Men around the Messenger)

    পতাকার রং কী?

    রায়াহ কালো এবং লিওয়া’ সাদা। তাই আমরা উদাহরণস্বরূপ লাল বা সবুজ পতাকা ব্যবহার করতে পারি না।

    أخرج الترمذي وابن ماجه عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: كَانَتْ رَايَةُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَوْدَاءَ، وَلِوَاؤُهُ أَبْيَضَ

    আত-তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি বলেছেন: “নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রায়াহ ছিল কালো এবং তাঁর লিওয়া ছিল সাদা।”

    পতাকার আকৃতি কেমন?

    রায়াহর চারটি কোণ রয়েছে তাই আমরা একটি ত্রিভুজাকার পতাকা ব্যবহার করতে পারি না। কিয়াসের মাধ্যমে এটি লিওয়াহর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

    أخرج أحمد، وأبو داود، والنسائي في سننه الكبرى عن يُونُسُ بْنُ عُبَيْدٍ مَوْلَى مُحَمَّدِ بْنِ الْقَاسِمِ، قَالَ: بَعَثَنِي مُحَمَّدُ بْنُ الْقَاسِمِ إِلَى الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ يَسْأَلُهُ عَنْ رَايَةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَاهى؟ فَقَالَ: كَانَتْ سَوْدَاءَ مُرَبَّعَةً مِنْ نَمِرَةٍ

    আহমাদ, আবু দাউদ এবং আন-নাসায়ী তার আল-সুনান আল-কুবরা গ্রন্থে মোহাম্মদ বিন আল-কাসেমের দাস ইউনুস বিন ওবায়েদের কর্তৃত্বে বর্ণনা করেছেন যে তিনি বলেছেন: মোহাম্মদ বিন আল-কাসেম আমাকে আল-কাসেমের কাছে পাঠিয়েছিলেন। বারা বিন আজেব রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রায়াহ সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে এটা কী? তিনি বললেন: “এটি ছিল একটি কালো চতুর্ভুজ (مُرَبَّعَةً) যা নমিরা থেকে তৈরি করা হয়েছিল”।

    পতাকার উপাদান কী?

    উপরের হাদিসটি সুনির্দিষ্ট করে যে রায়াহ’র জন্য ব্যবহৃত উপাদানটি ছিল নামিরা (পশম)। যাইহোক, এই উপাদান ব্যবহার করা একটি হুকম নয়, বরং উপকরণ (ওয়াসীলাহ) শ্রেণীতে পড়ে। আপনি জিজ্ঞাসা করতে পারেন কেন একে উপকরণ অর্থ হিসাবে বিবেচনা করা হবে, আর আকৃতিকে হুকম হিসাবে বিবেচনা করা হয়। উত্তর হল কারণ সাহাবীগণ তাদের সময়ের কাপড়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন যা প্রধানত উল ছিল এবং এ ব্যপারে অন্য সুযোগ ছিল না, যেখানে আকৃতি, রঙ এবং প্রতীকের জন্য তাদের সুযোগ ছিল, এরপরও একটি নির্দিষ্ট নকশা বেছে নেয়া হয়েছে।

    অতএব, আমরা পতাকার জন্য নাইলন বা সুতির মতো যে কোনো উপাদান ব্যবহার করতে পারি।

    পতাকার আকার কতটুকু?

    পতাকার মাপ টেক্সটে নির্দিষ্ট করা নেই তাই আমাদের ইচ্ছামত পতাকার যে কোন আকার থাকতে পারে।

    আশ-শাখসিয়্যা আল-ইসলামিয়া উল্লেখ করেছে “দলীল নিবিড় যাচাই-বাছাই স্পষ্ট করে যে রায়াহ লিওয়া’র চেয়ে ছোট” এবং আরো বলা হয়েছে “(এর চেয়ে) বৃহত্তর বা কম পরিমাপের রায়াহ এবং লিওয়া ব্যবহার করা অনুমোদিত।”

    বইটি পতাকার জন্য একটি আকারও নির্দিষ্ট করেছে। তবে ভবিষ্যতে এটি গ্রহণ করার বিষয়টি খলিফার উপর নির্ভর করে।

    লিওয়া = ১২০ সেন্টিমিটার x ৮০ সেন্টিমিটার

    রায়াহ = ৯০ সেন্টিমিটার x ৬০ সেন্টিমিটার

    আকৃতির অনুপাত কী?

    পতাকার আকৃতির অনুপাত নির্দিষ্ট করা নেই তাই আমরা আমাদের ইচ্ছামত যেকোনো অনুপাত ব্যবহার করতে পারি, তবে আশ-শাখসিয়া আল-ইসলামিয়া বর্তমানে বেশিরভাগ পতাকার সাথে সঙ্গতি রেখে একটি ২/৩ অনুপাত উল্লেখ করেছে। উদাহরণস্বরূপ অটোমান পতাকা একটি ২/৩ অনুপাত ব্যবহার করতো।

    পতাকায় কি প্রতীক আছে?

    রায়াহ ও লিওয়া’তে যা বর্ণনা করা হয়েছে তার ব্যপারে ইখতিলাফ (মতভেদ) রয়েছে। হাদীসের শক্তির পার্থক্যের কারণে এই মতভিন্নতা ঘটেছে যা রায়াহ ও লিওয়া’র উপর নির্দিষ্ট শব্দ উল্লেখ করেছে। যদি কোনো আলেম এই হাদীসটিকে দুর্বল বলে মনে করেন তাহলে এর অর্থ হল রায়াহ ও লিওয়া’র উপর যে কোনো প্রতীক বা লেখা একটি স্টাইল হয়ে যাবে এবং আমরা আমাদের ইচ্ছামত যে কোনো ইসলামি প্রতীক বেছে নিতে পারি। তবে যদি কোনো আলেম হাদিসটিকে ভালো মনে করেন তাহলে শব্দটি হুকমে পরিণত হবে এবং এক্ষেত্রে কোনো বিকল্প নেই। প্রশ্নবিদ্ধ হাদীসটি নিচে দেওয়া হলো।

    فقد أخرج الطبراني في الأوسط قال: حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ رِشْدِينَ قَالَ: نا عَبْدُ الْغَفَّارِ بْنُ دَاوُدَ أَبُو صَالِحٍ الْحَرَّانِيُّ قَالَ: نا حَيَّانُ بْنُ عُبَيْدِ اللَّهِ قَالَ: نا أَبُو مِجْلَزٍ لَاحِقُ بْنُ حُمَيْدٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: «كَانَتْ رَايَةُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَوْدَاءَ وَلِوَاؤُهُ أَبْيَضُ، مَكْتُوبٌ عَلَيْهِ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ». لَا يُرْوَى هَذَا الْحَدِيثُ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ إِلَّا بِهَذَا الْإِسْنَادِ، تَفَرَّدَ بِهِ: حَيَّانُ بْنُ عُبَيْدِ اللَّهِ

    এটি আল-আওসাতে আত-তাবারানী দ্বারা তাখরীজ করা হয়েছে: (আহমাদ বিন রাশদিন বর্ণনা করেছেন যে আব্দুল গাফফার বিন দাউদ আবু সালেহ আল-হাররানী বলেছেন: হায়ান বিন ওবাইদিল্লাহ আমাদেরকে বলেছেন যে আবু মিজলাজ লাহেক বিন হুমাইদ ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে বলেছেন: “ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রায়াহ ছিল কালো এবং তার ব্যানার (লিওয়া) সাদা ছিল যারা উপর লেখা ছিল: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ”.

    এই হাদীসটি ইবনে আব্বাস এই সনদ ব্যতীত বর্ণনা করেননি এবং এটি হাইয়ান বিন ওবাইদিল্লাহর জন্য একক বর্ণনা।

    বিতর্কটি হাদিস বর্ণনাকারী হাইয়ান বিন ওবাইদিল্লাহর সাথে সম্পর্কিত। শায়খ আতা আবু আল-রাশতা তার ফেসবুক প্রশ্নোত্তরগুলির মধ্যে একটিতে এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন:

    ১) ইবনে হিব্বান এটি আল-ছিকাতে উল্লেখ করেছেন এবং এটি তার গ্রন্থ আল-ছিকাত ভলিউম ৬/২৩০ এ রয়েছে:

    (৭৪৯১ – বনি ওদাইয়ের দাস হাইয়ান বিন ওবাইদিল্লাহ আবু জুহাইর আবু মিজলাজ ও তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন এবং মুসলিম বিন ইব্রাহিম ও মুসা বিন ইসমাইল তার থেকে বর্ণনা করেছেন)

    ২) আল-যাহাবী তার মিজান আল-ই’তিদাল (৬২৩/১) গ্রন্থে এটি উল্লেখ করেছেন:

    (২৩৮৮ – হায়্যান বিন ওবাইদিল্লাহ, আবু জুহাইর, আবি মিজলাজের কর্তৃত্বে বুসরার শায়খ। আল-বুখারি বর্ণনা করেছেন: আস-সালত তার (বর্ণনা) মিশ্রন করে ফেলার কথা উল্লেখ করেছেন)।

    3- আল-সালত হলেন বিন মোহাম্মদ আবু হাম্মাম, এবং আবু আল-হাজ্জাজ তার গ্রন্থ তাহজীব আল-কামাল ফী আসমা আল-রিজাল ৭৯/২-এ তাকে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন: আবু হাম্মাম আল-সালত বিন মোহাম্মদ আল-খারকি ওমানের নিকটবর্তী উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি দ্বীপ খারেক থেকে এসেছেন এবং আল-বুখরী আল-সহীহ গ্রন্থে তার জন্য বর্ণনা করেছেন।

    4- বার্ধক্যজনিত কারণে হাদীসে তার মিশ্রণের কারণে, আল-উকাইলি তার গ্রন্থ আল-দুয়াফা’ আল-কবীর ৩১৯/১-এ তাকে দুর্বল বর্ণনাকারীদের থেকে বিবেচনা করেছিলেন যেখানে তিনি বলেছেন: হাইয়ান বিন ওবায়দিল্লাহ আবু যুহাইর বুসরা থেকে এসেছেন… এবং আদম বিন মূসা বর্ণনা করেছেন যে তিনি আল-বুখারীকে বলতে শুনেছেন: হায়ান বিন ওবাইদিল্লাহ আবু জুহাইরকে আল-সালত উল্লেখ করেছেন যে তিনি হাদিস মিশ্রিত করছেন…

    5- আল-যাহাবী তার আল-মুগনি ফী আদ-দুআফা ১৯৮/১ গ্রন্থে তার সম্পর্কে বলেছেন “আবু মিজলাজের কর্তৃত্বে হাইয়ান বিন ওবাইদিল্লাহ আবু জুহাইর আল-বসরী নির্ভরযোগ্য নয়।”

    তাই তিনি বিতর্কিত কারণ সেখানে এমন লোক রয়েছে যারা তাকে নির্ভরযোগ্য করে তোলে এবং অন্যরা যারা তাকে দুর্বলদের থেকে বিবেচনা করে কারণ তিনি বৃদ্ধ হওয়ার পরে মিশ্রন করে ফেলতেন। মনে হচ্ছে তিনি বুড়ো হয়ে যাওয়ার পর তার মিশিয়ে ফেলা শুরু হয়। যাইহোক, ইস্যুটি হল রায়াহ এবং লিওয়া’র উপর “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” লেখা, এবং হাদিস মিশিয়ে ফেলা এই লেখাকে প্রভাবিত করে না, বিশেষ করে যেহেতু তাঁর এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে সনদে দুজন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী রয়েছে। অর্থাৎ আবু মিজলাজ লাহেক বিন হামেদ ও ইবনে আব্বাস (রা.)। তাই আমরা রায়াহ ও লিওয়া’র উপর দুটি শাহাদাহ-এর লেখা গ্রহণ করেছি।

    আরবি হরফ/ফন্ট কী হবে?

    আরবি হরফ/ফন্ট নির্দিষ্ট করা নেই তাই আমরা যেকোনো আরবি হরফ বা ক্যালিগ্রাফি ব্যবহার করতে পারি। এটি শৈলী (usloob) এর অধীনে পড়ে।

    অন্য কোন পতাকা আছে?

    বিভিন্ন সেনা কর্পস, ডিভিশন এবং রেজিমেন্টগুলি রায়াহর পাশাপাশি তাদের নিজস্ব পতাকা ব্যবহার করতে পারে যেমনটি আমরা আজ যে কোনও সেনাবাহিনীতে পাই। এই হাদীস থেকে উদ্ভূত হয়েছে যেখানে বিভিন্ন ইউনিট বা গোত্র সরকারী রায়াহর পাশাপাশি যুদ্ধে তাদের নিজস্ব ব্যানার ব্যবহার করেছিল।

    وقد ورد عند الطبراني في الكبير عن مَزِيدَةَ الْعَبْدِيَّ، يَقُولُ: إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَقَدَ رَايَاتِ الْأَنْصَارِ فَجَعَلَهُنَّ صُفَرًا

    মাজিদা আল-আবদির সূত্রে আল-কাবীরে আত-তাবারানী কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে: “রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল-আনসারদের পতাকাগুলোকে গিঁট দিয়ে হলুদ করেছেন।”

    وكذلك ورد عند ابن أبي عاصم في الآحاد والمثاني عَنْ كُرْزِ بْنِ سَامَةَ قَالَ: …وَإِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَقَدَ رَايَةَ بَنِي سُلَيْمٍ حَمْرَاءَ

    এবং এটি ইবনে আবি আসেম থেকে আল-আহাদ এবং আল-মাথানি থেকে কুরজ ইবনে সামা থেকে বর্ণিত হয়েছে, যিনি বলেছেন: “… এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনী সুলাইমের পতাকাকে লাল করে দিয়েছিলেন“।

    The Ottoman 136th Infantry flag

    The Ottoman 136th Infantry flag

    উপসংহার

    খিলাফতের সরকারী পতাকা হল রায়াহ। এটি রূপকভাবে “যুদ্ধের জননী” (উম উল-হারব) নামে পরিচিত, এবং এটি খলিফার বাসভবন সহ রাজ্যের সমস্ত সরকারি ভবনের উপরে উড়ানো হবে। জনগণ এই পতাকার চারপাশে একত্রিত হবে এবং এটি তাদের বাড়ি, মসজিদ এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রদর্শন করবে। সশস্ত্র বাহিনী তাদের রেজিমেন্টাল ব্যানারের পাশাপাশি এটি প্রদর্শন করবে যাতে তাদেরকে খেলাফতের সরকারী সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

    লিওয়া’ হল একটি বিশেষ পতাকা যা শুধুমাত্র খলিফার বাসভবনের উপরে রায়াহর পাশাপাশি উড়ানো হবে।

  • ইসলামের সংবিধানই একমাত্র বিকল্প

    ইসলামের সংবিধানই একমাত্র বিকল্প

    ৫ই অগাস্ট গণঅসন্তোষ থেকে সৃষ্ট রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জালিম হাসিনার ১৬ বছরের দুঃশাসনের অবসান ঘটল। চারিদিকে এখন পরিবর্তনের ডাক। দেশের মানুষ আশা করছে যে এবার তারা রাষ্ট্রকে এমনভাবে মেরামত করবে যে পুনরায়  যেন এইধরনের জালিম শাসকের জন্ম এবং অসহনীয় পরিস্থিতির উদ্ভব না হয়। আমাদের সংবিধানে যে মারাত্মক কোন সমস্যা আছে তা সবাই বুঝে, তাই পরিবর্তনটা সেখান থেকেই শুরু করার দাবী জোরাল হচ্ছে। অথচ শাসক ও সুশীল সম্প্রদায় – “পশ্চিমা নয় প্রাচ্য ধাচের বা inclusive society উপযোগী” ইত্যাদি নানা term এ  ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে মূল সমস্যাকে আড়াল করে সেই সেকুলার গণতান্ত্রিক সংবিধান আমাদের ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। তাই  ইউনুস সরকার সংবিধান সংস্কারের আলোচনার টেবিলে আসার শর্ত দিয়েছে যে  সেকুলার গণতান্ত্রিক সংবিধানকে ভিত্তি ধরে আলোচনা হতে হবে।

    অক্সফোর্ড ডিকশেনারী অনুযায়ী সেকুলার বা ধর্ম নিরপেক্ষতা হল, “The belief that religion should not be involved in the organization of society, education etc. অর্থাৎ সমাজের গঠন/সংগঠন ইত্যাদিতে ধর্ম যুক্ত হবে না। তৎকালীন ইউরোপের চার্চ কেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থার পোপদের দ্বারা ধর্মের নামে নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে ঐ অঞ্চলের মানুষ এই বিশ্বাসে ঐক্যবদ্ধ হয় যে মৃত্যু পরবর্তী জীবন থাকতেও পারে বা নাও পারে, যার যা খুশি ভাবুক কিন্তু দুনিয়া, যেখানে আমরা আছি সেখানে সৃষ্টিকর্তা কোন কথা বলবে না। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের দেওয়া একটা সীমারেখার (খুবই ব্যক্তিগত কিছু আমল, আখলাক, রীতিনীতি) মধ্যে কেউ চাইলে ধর্ম পালন করতে পারবে কিন্তু রাষ্ট্রীয় কোন বিষয়াদিতে (শাসন ও বিচার ব্যবস্থা, পররাষ্ট্র নীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি ইত্যাদিতে) স্রষ্টার কোন বিধান আনা যাবে না। মানুষই মানুষের জন্য আইন তৈরি করবে যা পুরোপুরি আমাদের বিশ্বাস বিরোধী। এই বিশ্বাসই মানুষকে আইন বানানোর ক্ষমতা দেয় আর বিশ্বজুড়ে হাসিনার মত দানবদের উত্থান ঘটায় আর আমদের মাথার উপর মার্কিন-ব্রিটিশ উপনিবেশবাদিদের কর্তৃত্ব বজায় রাখে, যা আমাদের দুরবস্থার জন্য দায়ী।

    মূল সমস্যা জিয়িয়ে রেখে শাখায় পরিবর্তন কোন নতুন সমাধান নয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এ পর্যন্ত আমাদের দেশে সংবিধান সংশোধন হয়েছে মোট ১৭ বার। কিন্তু আমরা প্রতিবার নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়েছি আর শাসক ও শাসকদের মদদপুষ্ট গোষ্ঠী আরও ফুলেফেপে উঠেছে। আগে দুর্নীতি শত কোটি, এখন হাজার কোটি। রুপপুর পরমানু প্রকল্প থেকে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা একাই নিয়েছে ৫.৬ বিলিয়ন টাকা, তার পিয়নের আছে ৪০০ কোটি টাকা। আর বাংলাদেরশের একজন সাধারন ভুমি মন্ত্রি কয়েক বছরে London এ ৩৬০ টি বাড়ি বানিয়ে ফেলেছে। আর সাধারনের দুরবস্থা এমন যে একটা মোবাইল ফোন কিনতে তাদের অবস্থা খারাপ হয়ে যায় আর তা চুরির জন্য পিটিয়ে হত্যা করে।  এই হল আমাদের সেকুলার গণতান্ত্রিক সংবিধানের স্বাভাবিক ফলাফল। মানব রচিত এই সেকুলার সংবিধান কখনই আমাদের দারিদ্র দূর করবে না, কর্মসংস্থান তৈরি করবে না। চিকিৎসা সেবা সহজলভ্য করবে বা শিক্ষাকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া নিয়ে মার্কিন-ব্রিটেনের কোন মাথা ব্যথা নেই, কখনই ছিল না। তাদের serve  করার জন্য আমাদের যতটুকু দেয়া দরকার ততটুকু দিয়ে বাকিটা তারা smoothly নিয়ে নিবে এমন শাসক, সুশীল জায়গা মত রাখতে পারাটাই এই সংবিধানের  মূল লক্ষ্য। তারপরও আমাদের মানব রচিত গণতান্ত্রিক সংবিধান দিয়েই চলতে হবে, মূলে হাত দেয়া যাবে না, কেন? এমনত না যে বিশ্ব এই সেকুলার সংবিধান দিয়ে চলে খুব ভালো আছে। আপনারা জানেন মাত্র ৮ জন বাক্তির হাতে পৃথিবির ৯৯% সম্পদ, বাকি ১% সম্পদ নিয়ে বাকি ৯৯% মানুষ কামরা কামড়ি করে ।

    যারা সেকুলার ব্যবস্থার ধারক ও বাহক, তাদের ভয় বোধগম্য। মানুষের হাতে আইন তৈরির ক্ষমতা না থাকলে তাদের নিয়োগকারি মার্কিন-ব্রিটিশের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে না, জনগণকে তাদের নীতি মানতে বাধ্য করা যাবে না, জনগণকে নিঃস্ব করে তাদের নিজেদের রুজি রুটি আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাবে। তাই তারা তাদের সমস্ত মেধা প্রয়োগ করে উম্মাহকে নতুন মোড়কে পুরোন মাল গছিয়ে দিতে চায়। এই ব্যাপারে তাদের অন্যতম সহায়ক ইসলামের সংবিধান নিয়ে সাধারন  অজ্ঞতা। ইসলামের ব্যাপারে আমাদের আবেগ আছে কিন্তু এই সেকুলার শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে যেন আমরা ইসলামকে ধর্মীয় গণ্ডির বাইরে ভাবতে না পারি।

    তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় আল্লাহর বিধান প্রয়োগের কথা আসলে জনসাধারনের মনে একটা প্রশ্ন  ঘুরপাক খায়, ইসলাম আধ্যাত্মিক বিষয়,  আধুনিক  রাষ্ট্র পরিচালনার মত জটিল কার্যক্রম ইসলাম দিয়ে  কিভাবে সম্ভব? তাদের মনে ভীতির সঞ্চার হয় এই ভেবে যে পরে দেখা যাবে রাসুল (সা)-এর অবর্তমানে আল্লাহর নামে হুজুররা তাদের মন মত আইন বানিয়ে সাধারনকে অন্ধকার যুগে প্রবেশ করাবে।  আর উদাহরণ হিসেবে আফগানিস্তানের নাম তো আসেই। তাই বর্তমানে মানব রচিত সংবিধানের মধ্যে ইসলামের কিছু বিধান ঢুকিয়ে সকলের গ্রহণযোগ্য সংবিধান রচনার দাবী জোরাল হয়েছে। কিন্তু মানুষের বিধানের সাথে ইসলামের বিধান ঢুকিয়ে দিলে তা আর ইসলামের সংবিধান থাকে না, মানব রচিত হয়ে যায়, আল্লাহর দাস থেকে মানুষের দাসে পরিনত হই আমরা। তাই একমাত্র ইসলামের সংবিধানের প্রতি জোরাল দাবির জন্য আমাদের ইসলামের সংবিধান সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারনা থাকা দরকার।

    ইসলাম একটি পূর্ণ জীবন বিধান। আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনা, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ [নাহল: ৮৯]। অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা সহ প্রতিটি বিষয়ে ইসলামের দিক নির্দেশনা আছে। আল্লাহ বলেছেন,”যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না? অথচ তিনি অতি সূক্ষ্দর্শী, পূর্ণ অবহিত” [সুরাহ মুলক: ১৪]। ইসলামের সংবিধানের মূল ভিত্তি লা ইলাহা ইল্লা আল্লাহ। মানে হল রাষ্ট্রের প্রতিটি কার্যক্রম পরিচালিত হবে শুধু মাত্র আল্লাহ দেয়া বিধান অনুযায়ী। নির্বাচিত খালিফা কেবল তার প্রয়োগ করবে। আল্লাহ সুবহাসানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক নাযিলকৃত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করে শেষ নবী রাসুল (সা) ১০ বছর তার ছোট্ট মদিনা রাষ্ট্র শুধু পরিচালনা করেন নি বরং, বিশ্ব নেতৃত্বের ভীত গড়ে দিয়ে গেছেন আর আমাদের জন্য রেখে গেছেন বিধান। এত ডিটেইলে যে, যেকোনো রাষ্ট্রীয় সমস্যার সমাধানের মূলনীতি সেখানে পাওয়া যায়। সেই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী খালিফারা ব্রিটিশ কূটকৌশলের কারণে ১৯২৪ সালে খিলাফাহ ধ্বংসের আগ পর্যন্ত শত শত বছর বিশ্ব নেতৃত্বর  দিয়েছেন।

    মূল উৎস কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস  থেকে প্রয়োজনীয় হুকুম বের করে আনার সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রাসুল (সা) আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছেন যেন তাঁর (সা) অবর্তমানে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)’র  বিধান দিয়ে চলতে আমাদের কোন অসুবিধা না হয়। কারণ তাঁর পরে আর কোন নবী আসবে না, আর ইসলাম অনুযায়ী জীবন পরিচালনা না করলে আমাদের জবাবদিহিতা ও শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। যদি  ইসলাম নিয়ে নুন্যতম ফিকহি বুঝও আমাদের দেয়া হত যা এই সেকুলার ব্যবস্থা ইসলামকে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনার অংশ হিসাবে আমাদের দেয়নি, তাহলেও  এই প্রক্রিয়া বোঝা আমাদের জন্য কঠিন হত না। এই  process কে বলা হয় ইস্তিনবাত। যোগ্যতা সম্পন্ন scholar যারা মুজতাহিদ, তারা ইজতিহাদ করে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হুকুম বের করে আনে। শেখ তাকিউদ্দিন আন নাবহানি এমনি একজন উচ্চ যোগ্যতা সম্পন্ন মুজতাহিদ,  যিনি ১৯৫৩ সালে ইসলামি জীবন বিধান দুনিয়াতে ফিরিয়ে আনার জন্য ইসলামি রাজনৈতিক দল হিযবুত তাহরীর গঠন করেন। তার কাজের অংশ হিসেবে উম্মাহ যেন  ইসলামকে ব্যবস্থা  হিসাবে visualize করতে পারে সেই জন্য খিলাফার রুপরেখা তথা একটি সংবিধান তৈরি করে যা ইসলামের বিশুদ্ধতম উৎস কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস  থেকে উদ্ভূত। সেই সাথে তিনি এর ব্যাখ্যা প্রদান করে দেখিয়ে দেন যে এর প্রতিটি  বিধান শারিয়ার বিশুদ্ধ উৎস থেকে উঠে এসেছে যেখানে কোন ব্যক্তির কোন নিজস্ব মতামত নাই। তাই এর অধীনে শাসিত হওয়া মানে ইসলামের অধীনে থাকা। প্রতিটা সেক্টরের জন্য সব মিলিয়ে ১৯১ টি ধারা নিয়ে তৈরি  সেই constitution ভবিষ্যৎ খিলাফাহ রাষ্ট্র যা প্রয়োগ করবে ইনশাআল্লাহ। বোঝার সুবিধার্থে কয়েকটি ধারা আলোচনা করছি।  

    পররাষ্ট্রনীতি বিভাগে ১১ টি ধারা আছে। সুরা নিসা: ১৪১, সুরা ছফ: ৯ (তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্যদ্বীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি সকল দ্বীনের উপর তা বিজয়ী করে দেন, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে) , সুরা মায়িদা: ৫১ ইত্যাদি এরকম অসংখ্য আয়াত এবং সুন্নাহ  থেকে এটা স্পষ্ট যে খিলাফাহ রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির মূলভিত্তি হল ইসলামের বানী ও ন্যায় বিচার দুনিয়ার বাকি সব জাতির কাছে পৌছে দেয়া। এই ultimate উদ্দেশ্য পূরণের জন্য কোন রাষ্ট্রের সাথে কী আচরণ করা হবে তা নির্ধারণ করতে ধারা ১৮৯ এ শারিয়ার ভিত্তিতে অমুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে ২ ভাগে ভাগ করা হয়েছে।  শত্রু রাষ্ট্র – যারা মুসলমানদের সাথে সরাসরি যুদ্ধরত আছে, যেমন – আমেরিকা, ইসরাঈল, ভারত ইত্যাদি;  সম্ভাব্য শত্রু রাষ্ট্র – যারা ইসলামের বিরোধিতা করতে পারে কিন্তু এই মুহুর্তে সরাসরি যুদ্ধে নাই – সুইজারল্যান্ড, ফিনল্যান্ড ইত্যাদি। 

    এখন যদি আরও specific হই, ভারতের সাথে সম্পর্ক কী হবে? এটা নির্ভর করবে অমুসলিম রাষ্ট্র হিসাবে ভারতের status কি তার উপরে। কাশ্মির দখলকারি, মুসলিম নিপীড়নকারি, রাসুল (সা) এর অপমানকারি আর আমাদের ব্যপারে আগ্রাসি ও সীমান্তে হত্যাকারি ভারত আমাদের শত্রু রাষ্ট্র। এই definition একমাত্র আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত এবং এই শারিয়া অনুসারে ভারতের সাথে সম্পর্ক ঠিক হবে। রাষ্ট্রের খালিফারও এখতিয়ার নাই তার ইচ্ছামত সম্পর্কের ভিত্তি ঠিক করার। গণতান্ত্রিক সংবিধানের দোহাই দিয়ে মার্কিন ভারতের দালালেরা যেমন আমাদের বোঝায় সমস্যায় জর্জরিত ভারতের সাথে আমরা পারব না, সে শুকনা মৌসুমে পানি দিবে না, বর্ষায় ডুবাবে, সীমান্তে পাখির মত মানুষ মারবে, তবু আমাদের জী হুজুর বলতে হবে, না খেয়ে আমাদের ইলিশ দিয়ে দিতে হবে, বিনা শুল্কে আমাদের ভিতর দিয়ে তাদের যা খুশি তা নিয়ে  যাবার স্বাধীনতা দিতে হবে একারণে ভারতের শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হতে হল। মোটকথা আমাদের সাথে যাই করুক না কেন তার সাথের বন্ধুত্ব মানে তাদের দাসত্ব মানতেই হবে, এসব জালিয়াতির সুযোগ ইসলামে নাই। শত্রু রাষ্ট্র হিসাবে তাদের সাথে নতজানু সব চুক্তি বাতিল হবে, তাদের নাগরিকদের এখানে আসলে ভিসা লাগবে এবং তাদের উপর নজর থাকবে। ধারা ১৯০ অনুসারে ভারতের সাথে কোনরকম সামরিক চুক্তি, সন্ধি, সমঝোতা, গুরুত্বপূর্ণ ঘাটি লীজ দেয়া সম্পুর্ণ নিষিদ্ধ। বর্তমান এন্টিটেরোরিজম চুক্তি, যৌথ সেনা মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়সহ নিরাপত্তা নষ্টকারী সব চুক্তি বাতিল হবে। ধারা ১৮২ অনুযায়ী শত্রুরাষ্ট্র ভারতের সাথে dealings শুধু মাত্র রাষ্ট্রীয়ভাবে হবে, ব্যবসায়ী বা সাংস্কৃতিককর্মী নাম দিয়ে এদেশের কোন ব্যক্তি, দল কিংবা প্রতিষ্ঠান ভারতের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে পারবে না। এপার বাংলা ওপার বাংলা সংস্কৃতি বিনিময়ের মাধ্যমে আমরা দেখেছি আকিদা বিরোধী অশ্লীল সংস্কৃতি আমাদের দেশে আমদানি করা, আর এর আড়ালে টাকা পাচার করা যাবে না। 

    অর্থনীতি বিভাগের ধারা ১৬৫ অনুযায়ী যেকোনো ধরনের বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) নিষিদ্ধ। ভারত বা আমেরিকার বিশেষ বানিজ্য সুবিধা, অর্থনৈতিক এলাকা বরাদ্দ নিষিদ্ধ। তাই ঋন সহায়তা, বানিজ্য সহায়তার নামে  Donald Loo  আর বিদেশি শকুনরা ২০০ কোটি ডলার দিয়ে আমাদের বঞ্চিত করে ১০০০ কোটি তুলে নিয়ে যাবে, তা  হবে না।  ধারা ১৩৭ অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি গণ মালিকানাধীন সম্পত্তি, এই খাত দেশি বা বিদেশি ব্যক্তি বা কোম্পানির মালিকানায় দেয়া যাবে না, এগুলোর মালিক আমরা জনগণ। এই ধারা অনুযায়ী ভারতের আদানি বা কুইক রেন্টালের ফাঁদে আমাদের কেউ ফেলতে পারবে না।  বণিক বার্তা নিউজে এসেছে  GSB (ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর) অনুসারে বাংলাদেশে ২.৬ ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ  সম্পদ মজুদ আছে। এগুলো উত্তোলন করে আমাদের বণ্টন করলে আমাদের এই দারিদ্র্য আর বিদেশ  নির্ভরতা থাকে? প্রতিবছর বিপদসংকুল সমুদ্র পথে দালাল দিয়ে বিদেশ যাবার পথে আমাদের কত ভাই বোন অসহায়ের মত ডুবে মারা যায় আর আমদের সম্পদ বিদেশিরা লুটে খায়। বর্তমান গণতান্ত্রিক সংবিধানের মাধ্যমে বিভিন্ন চুক্তি করে এই সম্পদ নিয়ে যাচ্ছে নব্য উপনিবেশবাদীদের কোম্পানি নাইকো, গেটকো, কনকো, ফিলিপ্স, শেভরন, এক্সনমবিল। ইসলামের সংবিধানের মাধ্যমে যখন বিদেশি আধিপত্য বন্ধ করে, সম্পদের পাচার রোধ, সম্পদের সুষম বন্টন সর্বোপরি উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাষ্ট্র হওয়াতে খিলাফা রাষ্ট্রে কর্মসংস্থান এমনিতেই তৈরি  হবে, বেকার থাকবে না, বৈষম্য হবে না। ধারা ১৫৩- রাষ্ট্র সকল নাগরিকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে। ধারা ১৫৪ অনুযায়ী আমাদের পোশাক কর্মী ভাই বোনদের সহ সকলে ঘাম শুকানোর আগে উপযুক্ত বেতন পেয়ে যাবে। দলিল: হাদিস কুদসি- কিয়ামতের ময়দানে ঐ তিন ব্যাক্তির প্রতিপক্ষ আল্লাহ হবেন, যার একজন হল সে যে শ্রমিকের কাজের সাথে সাথে তাকে মজুরি প্রদান করে না।  ধারা ১৫৫- প্রত্যেকের কাজের দক্ষতা অনুসারে কাজের বেতন নির্ধারিত হবে। এসব ধারা কেউ চাইলেই পরিবর্তন করতে পারবে না, একে বলে পবিত্র সংবিধান। জেনারেল মইন  কিছুদিন আগে অত্যাচারী পুঁজিপতি, শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা বঞ্চিতকারী  গার্মেন্টস  মালিকদের আশ্বস্ত করল যে তাদের সবারটা দেখে রাখবে কারণ তাদের করের টাকায় নাকি সেনাবাহিনীর বেতন হয়। যদিও এরা সব সময় প্রনোদনা আর কর সুবিধা পায় আর এই দরিদ্র শ্রমিক রা VAT এর মত oppressive tax এর কারণে ঐ মালিকদের সমান কর দিয়ে এদের পালে। ধারা ১৪৬ অনুযায়ী এমন সব কর হারাম।

    এই হল আমাদের বিশ্বাস থেকে উঠে আসা ইসলামি সংবিধান, যার প্রতিটি আইন আল্লাহ সুব কর্তৃক রচিত আর রাসুল (সা) দ্বারা প্রণীত। আমরা যখন এই বিধান দিয়ে চালিত হয়েছি তখন যাকাত দেয়ার লোক পাওয়া যায়নি, এই সেদিন শায়েস্তা খার আমলে টাকায় ৮ মন চাল পাওয়া যেত, আর একজন রোগীর জন্য ৩ জন নার্স, শিক্ষায়- সভ্যতায় আমরা বিশ্বকে পথ দেখিয়েছি।

    এই সংবিধান বা ব্যবস্থার প্রয়োগের  সাথে আমাদের উপর পশ্চিমাদের খবরদারি শেষ হয় যাবে, জন সাধারনের প্রকৃত মুক্তি মিলবে আর অল্প কিছু জালিম দুস্কৃতিকারী তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, জ্ঞানীগুণী নামধারী মূর্খ ব্যক্তিগণের যারা তাদের প্রভুদের বানানো সংবিধান আমাদের গিলতে বাধ্য করে নিজেদের জীবিকা উপার্জন করে তারা  নিশ্চিহ্ন  হয়ে যাবে। জালিম হাসিনা সহ মধ্য প্রাচ্যর আমেরিকা ইসরায়েলের পদলেহি সকল গাদ্দার শাসক যাদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে আমাদের চোখের সামনে  ফিলিস্থিনি ভাই বোনদের হত্যা করা হচ্ছে, তাদের কে ইসলামের বিধান অনুযায়ী বিচারের মুখোমুখি করা হবে। এবার বলুন, কেন তারা তাদের সর্ব শক্তি নিয়োগ করবে না যেন এই ব্যবস্থা আর সংবিধান আমরা দূরে রাখি? কেন তারা এই ধরনের সংবিধান নিয়ে কোন আলাপ করতে চাইবে? তারা ভয় পায়, দুনিয়া হারানোর ভয় আর তাই আমাদের ভয় দেখায় যে আমরা আফগানিস্তান হয়ে যাব যেই আফগানিস্তানে আমেরিকা শক্তিতে না পেরে বুদ্ধিতে হারিয়ে দেয় আর মোল্লাতান্ত্রিক শাসন প্রবর্তন করে যা ইসলাম থেকে আসেনি।

    এটা স্পষ্ট যে বর্তমান এই ব্যবস্থা, সংবিধান আমাদের না। ‘ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বাস’ পশ্চিমাদের বিশ্বাস। আমাদের মুসলিমদের না। পশ্চিমারা তাদের এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের উপর একমত। তাই তো পর্ন ইন্ডাস্ট্রি হলো ওয়েস্টদের ২য় সর্বোচ্চ রাজস্ব আয়ের মাধ্যম। এই কুফফার সেকুলার সংবিধানের উপর এই খাইরে উম্মত কখনই ঐক্যবদ্ধ হবে না, ২০০১ সালে যখন হাইকোর্টের এক রুলে বলা হয়, “পতিতাবৃত্তি বাংলাদেশে আইনগত স্বীকৃত একটি পেশা” আমি আপনি কি তা মেনে নিতে পেরেছি? নাকি সমকামিতার মতো স্পষ্ট কুফররকে যখন রাষ্ট্র স্বীকৃতি দেয়, পাঠ্য বইয়ে “শরীফ থেকে শরিফা” এর মাধ্যমে সমকামিতা অন্তর্ভুক্ত করে তখন তা কি আমরা মেনে নেই? এটা আমাদের আকিদা বিরোধী। কেন এই ব্যবস্থা, এই সংবিধান আমাদের মুসলিমদের মেনে নিতেই হবে যাদের উপর আল্লাহ ইসলাম নাযিল করেছে মানব জাতিকে অন্ধকার থেকে আলোকে বের করে আনার জন্য (ইব্রাহিম: ১)।

    তাছাড়া এখন ইনক্লুসিভ সোসাইটির বরাত দিয়ে সংবিধানে সকল ধরম-বর্ণ-লিঙ্গের মতামতের ভিত্তিতে সমাজের কথা যদি বলি, তা কি  এই secular system  দিতে পেরেছে? তাহলে, পিউ রিসার্চ অনুযায়ী বাংলাদেশের ৮১%মানুষই তো শরীয়া আইন তথা আল্লাহর বিধান দিয়ে চলতে চায়। ইসলামকে আলোচনার টেবিলের বাইরে রেখে গণতন্ত্র দিয়ে রাষ্ট্র চালানোর সিদ্ধান্ত কিভাবে ইনক্লুসিভ হয়? মাত্র ১৯% মানুষের চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তের ভার কেন সকলে বহন করবে? তাই চলুন আমরা ইসলামের সংবিধান, ইসলামি ব্যবস্থার সাথে পরিচিত হই আর অন্য সকল প্রস্তাব প্রত্যাখান করি। 

  • যুগে যুগে ফকীহ্‌গণ খিলাফত সম্পর্কে কী বলেছেন

    যুগে যুগে ফকীহ্‌গণ খিলাফত সম্পর্কে কী বলেছেন

    Classical Scholars on Khilafah:

    আমিরুল মু’মিনিন উমর আল-ফারুক (রা.) সম্পর্কে আদ-দারামি (রহ.)

    ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)

    আল-খতিব আল-বাগদাদী (রহ.)

    ইমাম আন-নববী (রহ.)

    ইমাম আল-মাওয়ার্দী (রহ.)

    ইবনে তাইমিয়্যাহ্ (রহ.)

    ইবনে খালদুন (রহ.)

    ইমাম শামস আদ-দ্বীন আর-রামলী আল-আনসারী (রহ.)

    আল-হায়ছামী (রহ.)

    শেখ আলী বেলহাজ (হা.)

    শেখ আত-তাহির ইবনে আশুর (রহ.)

    ফকীহ্ আবু আল-ফাতেহ্ আশ-শাহরিসতানী‌ (রহ.)

    قال الدارمي عن عمر بن الخطاب رضي الله عنه في (سنته)

    إنه لا إسلام إلا بجماعة ولا جماعة إلا بإمارة ولا إمارة إلا بطاعة فمن سوده قومه على الفقه كان حياة له ولهم ومن سوده قومه على غير فقه كان هلاكا له ولهم

    Ad-Darami (rh) about Ameer ul-Mu’mineen, Umar al-Farooq (ra)

    In his Sunan, Ad-Daarimi narrated from Umar (ra)

    “Indeed, there is no Islam without a community (jama’ah). There is no community without an emirate. There is no emirate without obedience (Taa’ah). So, whoever his people make a ruler upon fiqh, there is life for both him and them, but whoever his people make a ruler upon other than fiqh, there is ruin for both him and them.”

    আমিরুল মু’মিনিন উমর আল-ফারুক (রা.) সম্পর্কে আদ-দারামি (রহ.)

    আদ-দারামি তার সুনানে উমর (রা.) হতে বর্ণিত করেন:

    “নিশ্চয়ই, কোন জামা’আহ্ (সমাজ) ব্যতীত ইসলাম হয় না। কোন আমীর ব্যতীত জামা’আহ্ হয় না। কোন আনুগত্য ব্যতীত আমীর হয় না। সুতরাং, যদি কাউকে তার সমাজের লোকজন ফিকহ্‌-এর (জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার) ভিত্তিতে শাসন পরিচালনার জন্য নিয়োগ প্রদান করে, তবে তার ও তাদের উভয়ের জন্যই কল্যানকর জীবন রয়েছে, কিন্তু সমাজের লোকজন যদি তাকে ফিকহ্ (জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা) ব্যতীত অন্য কিছু দ্বারা শাসন পরিচালনার জন্য নিয়োগ প্রদান করে, তবে তার ও তাদের উভয়ের জন্যই ধ্বংস রয়েছে।”

    قال الإمام أحمد في (مسنده) المتوفي 241ه

    عن عبد الله بن عمرو أن النبي صلى الله عليه وسلم قال : { لا يحل لثلاثة يكونون بفلاة من الأرض إلا أمروا عليهم أحدهم } فأوجب صلى الله عليه وسلم تأمير الواحد في الاجتماع القليل العارض في السفر تنبيها بذلك على سائر أنواع الاجتماع . ولأن الله تعالى أوجب الأمر بالمعروف والنهي عن المنكر ولا يتم ذلك إلا بقوة وإمارة . وكذلك سائر ما أوجبه من الجهاد والعدل وإقامة الحج والجمع والأعياد ونصر المظلوم . وإقامة الحدود لا تتم إلا بالقوة والإمارة ; ولهذا روي } أن السلطان ظل الله في الأرض{

    Imam Ahmad bin Hanbal (rh)

    Imam Ahmad bin Hanbal (d. 241 AH) stated in his “Musnad”

    It was narrated in his Musnad from Abdullah ibn Am’r from the Prophet (saw) who said, “It is not permissible for any three in an area of land (to be without an emir), so they must appoint one of them as an emir.” The Prophet (saw) obliged the appointment of an Amir in the small temporary gathering during the travel, clarifying this for all other types of collective. This is because Allah (swt) obliged the enjoining of good and the forbidding of evil and this is accomplished only by power and emirate. In addition, all the other obligations of the Deen, such as Jihad, justice, establishing the Hajj, the Juma’a and the Eid, the helping of the oppressed and the execution of the prescribed penalties, cannot be accomplished without power and emirate. Thus, it is narrated, “The leader (Sultan) is Allah’s shade on Earth.”

    ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)

    (মাজমূ’ আল ফাতাওয়াতে এসেছে) ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (মৃত্যু ২৪১ হিজরী) তার “মুসনাদে” বর্ণনা করেন,

    তার মুসনাদে আবদুল্লাহ্ ইবনে আমর (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেন, যেকোন তিনজনের জন্য এটা অনুমোদিত নয় যে তারা কোন ভূখণ্ডে (আমীর ব্যতীত) অবস্থান করবে, সুতরাং তাদের অবশ্যই যেকোন একজনকে আমির নিযুক্ত করতে হবেরাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) সফরের সময় ক্ষুদ্র কাফেলার জন্যও একজন আমিরের নিয়োগকে বাধ্যতামূলক করেন, সে বিবেচনায় সবধরনের জনসমষ্টির জন্য এটি সতর্কবানী (যাতে তারাও আমীর নির্ধারণ করে নেয়)। কারণ আল্লাহ্ সুবহানাহু তা’আলা সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করাকে বাধ্যতামূলক করেছেন এবং এটি শুধুমাত্র শাসনক্ষমতা ও আমীরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এছাড়া দ্বীনের অন্য সকল অত্যাবশ্যকীয় বিষয়সমূহ যেমন: জিহাদ, ন্যায়বিচার, হজ্জ্ব প্রতিষ্ঠা, জুমু’আ ও ঈদ, নিপীড়িতদের সহায়তা করা এবং নির্ধারিত শাস্তি কার্যকর করা, যা শাসনক্ষমতা ও আমীর ব্যতীত সম্পাদন করা যায় না। সুতরাং, বর্ণিত আছে যে, শাসক (সুলতান) হচ্ছে জমীনে আল্লাহ্র ছায়া

    (المتوفي 463ه) قال الخطيب البغدادي

    أجمع المهاجرون والأنصار على خلافة أبي بكر قالوا له: يا خليفة رسول الله ولم يسم أحد بعده خليفة، وقيل: إنه قبض النبي صلى الله عليه وسلم عن ثلاثين ألف مسلم كل قال لأبي بكر: يا خليفة رسول الله ورضوا به من بعده رضي الله عنهم وليست العبرة ببيعة آحاد المسلمين كلهم له، بل العبرة بإجماعهم على حرمة خلو العصر من إمام، وعلو فرضية خلافة رسول الله ﷺ، فالرسول ﷺ إذ قال: «ومن مات وليس في عنقه بيعة مات ميتة جاهلية»، يفهم من هذا أن المطلوب هو وجود خليفة له في الأعناق بيعة لا أن يبايعه كل مسلم، وبالتالي فلو كان عدد المسلمين ملياراً فليس المطلوب أن يبايع المليار، بل أن يكون على المليارِ خليفةٌ أخذ البيعة بالتراضي من الأمة أو ممن يمثل الأمة!.

    Al-Khateeb al-Baghdadi (rh)

    Al-Khateeb Al-Baghdadi (rh) (died 463 AH) stated,

    “All the Muhajiroon and the Ansar agreed on the Khilafah of Abu Bakr (ra); they said to him: ‘O Khalifah of the Messenger of Allah’, and no one after him was called a Khalifah. It was said that after the death of the Prophet (saw), there were thirty thousand Muslims. They all called Abu Bakr a Khalifah and they, may Allah be pleased with them, accepted him as a leader after the Prophet (saw). I say: the point here is not that every individual gave allegiance to him, but the point is that they consented that the absence of Imam at that era was prohibited, and they consented on the obligation of the Khilafah (succession to the Messenger of Allah (saw); the Prophet (saw) said, “… and one who dies without having sworn allegiance will die the death of one belonging to the Days of Ignorance.” It is understood that this demands the existence of a Bay’ah on the neck for the Khaleefah and not that every Muslim must give the pledge, and therefore if the number of Muslims is billion, it is not demanded that the billion gives the pledge, but that there must be a Khaleefah present who will take the Bay’ah by consent from the Ummah or those who represent the Ummah.”

    আল-খতিব আল বাগদাদী (রহ.)

    আল-খতিব আল-বাগদাদী (রহ.) (মৃত্যু ৪৬৩ হিজরী) বর্ণনা করেন,

    “সকল মুহাজির এবং আনসারগণ আবু বকর (রা.)-এর খিলাফত সম্পর্কে একমত হন; তারা তাকে বলেন: ‘হে আল্লাহ্’র রাসূলের খলীফা; এবং উনার পরে আর কাউকে খলীফা বলা হয়নি। এটা বলা হয়েছিল যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মৃত্যুর পর ত্রিশ হাজার মুসলিম ছিলেন। তারা সবাই আবু বকর (রা.)-কে খলীফা বলে অভিহিত করেন, এবং তারা (রা.) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পরে তাকে নেতা হিসেবে মেনে নেন। আমি বলি: এখানে মূল বিষয়টি এই নয় যে প্রত্যেক ব্যক্তি তার প্রতি আনুগত্য করেছিল, বরং মূল বিষয় হচ্ছে তারা একমত হয়েছিল যে, একজন ইমামের অনুপস্থিতি নিষিদ্ধ এবং তারা খিলাফতের (আল্লাহ্’র রাসুলের (সা) উত্তরাধিকারীর) বাধ্যবাধকতার বিষয়ে একমত হন; রাসুলুল্লাহ্ (সা) বলেন, “… এবং যে ব্যক্তি আনুগত্যের শপথ না করে মারা যায় সে জাহিলিয়্যাতের মৃত্যুবরণ করবে।” এই হাদীস থেকে বোঝা যায় যে এটি খলীফার প্রতি বাইয়াতের অস্তিত্বের দাবী করে। প্রত্যেক মুসলিমকেই যে বাইয়াত প্রদান করতে হবে তা নয়, অর্থাৎ যদি মুসলিমদের সংখ্যা বিলিয়ন হয় তবে বিলিয়নের প্রত্যেকের ব্যক্তিগতভাবে বাইয়াত দেয়ার প্রয়োজন নেই, বরং অবশ্যই একজন খলীফার উপস্থিতি থাকতে হবে যিনি উম্মাহ্ কিংবা উম্মাহ্’র প্রতিনিধিত্বকারীদের সম্মতিক্রমে বাইয়াত গ্রহণ করবেন।”

    قال الإمام النووي في كتابه (المنهاج شرح صحيح مسلم) – المتوفي 676ه

    وأجمعوا على أنه يجب على المسلمين نصب خليفة ووجوبه بالشرع لا بالعقل

    Imam an-Nawawi (rh)

    Imam An-Nawawi (d. 676 AH), in his book “Al-Minhaj Sharh Sahih Muslim”

    “And they (the Imams) unanimously agreed that it is obligatory for Muslims to appoint a Khaleefah and the obligation is by Islamic Law, not by human reasoning.”

    ইমাম আন-নববী (রহ.)

    ইমাম আন-নববী (মৃত্যু ৬৭৬ হিজরী) তার “আল-মিনহাজ শারহ্ সহীহ মুসলিম” গ্রন্থে বর্ণনা করেন,

    “এবং তারা (ইমামগণ) সর্বসম্মতিক্রমে একমত হয়েছেন যে, একজন খলীফা নিয়োগ করা মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক এবং এই বাধ্যবাধকতা মানব মস্তিষ্কপ্রসূত যুক্তিপ্রয়োগে নয়, বরং ইসলামী আইন দ্বারা আরোপিত হয়েছে।”

    قال الإمام الماوردي في كتابه (الأحكام السلطانية) – المتوقي 450ه

    الْإِمَامَةُ مَوْضُوعَةٌ لِخِلَافَةِ النُّبُوَّةِ فِي حِرَاسَةِ الدِّينِ وَسِيَاسَةِ الدُّنْيَا، وَعَقْدُهَا لِمَنْ يَقُومُ بِهَا فِي الْأُمَّةِ وَاجِبٌ بِالْإِجْمَاعِ

    Imam al-Maawardi (rh)

    Imam al-Maawardi (d. 450 AH) said in his book “Al-Ahkam Al-Sultania”

    “The Imamate is constituted for the Khilafah of the Prophethood in guarding the Deen and the politics of the world and it is contracted upon the one who establishes it in the Ummah, as an obligation by Consensus.”

    ইমাম আল-মাওয়ার্দী (রহ.)

    ইমাম আল-মাওয়ার্দী (মৃত্যু ৪৫০ হিজরী) তার “আল-আহ্‌কাম আল-সুলতানিয়া” গ্রন্থে বলেন:

    “দ্বীন এবং বিশ্বরাজনীতির (তথা দুনিয়া শাসনের) সুরক্ষা করতে নবুয়্যতের প্রতিনিধিত্বকারী (খিলাফতের শাসন তথা) ইমামত গঠিত হয় এবং যিনি উম্মাহ্’র মধ্যে এটি প্রতিষ্ঠা করবেন সে সাপেক্ষে তার সাথে আনুগত্যের চুক্তি করা হয়, যা ইজমা দ্বারা অত্যাবশ্যক (হিসেবে প্রমানিত)।”

    قال شيخ الإسلام بن تيمية في كتابه (مجموع الفتاوى) – المتوقي 728ه

    يجب أن يعرف أن ولاية أمر الناس من أعظم واجبات الدين ; بل لا قيام للدين ولا للدنيا إلا بها . فإن بني آدم لا تتم مصلحتهم إلا بالاجتماع لحاجة بعضهم إلى بعض ولا بد لهم عند الاجتماع من رأس

    Ibn Taymiyah (rh)

    Ibn Taymiyyah (d. 728 AH) says in the book Majmou’ Al-Fataawa:

    “It is obliged to know that the ruling of the people is of the greatest obligations of the Deen. Indeed the Deen cannot be established without it. The interests of the sons of Adam cannot be fulfilled except by gathering for each other’s needs; they inevitably need a leader when they gather.”

    ইবনে তাইমিয়্যাহ্ (রহ.)

    ইবনে তাইমিয়্যাহ্ (মৃত্যু ৭২৮ হিজরী) মাজমু’ আল-ফাতাওয়া গ্রন্থে বলেন:

    “এটা জানা অত্যাবশ্যক যে, দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জনগণকে শাসন করা। নিশ্চয়ই এটা ব্যতীত দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। আদম সন্তান তাদের চাহিদা পূরণের নিমিত্তে একে অপরের সান্নিধ্যে এসে সমাজবদ্ধ হতে হয়; এবং যখন তারা সমাজবদ্ধ হয় তখন অনিবার্যভাবে তাদের একজন নেতার দরকার হয়।”

    قال إبن خلدون في كتابه (المقدمة) – المتوقي 808ه

    إن نصب الإمام واجب قد عرف وجوبه في الشرع بإجماع الصحابة والتابعين، لأن أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم عند وفاته بادروا إلى بيعة أبي بكر رضي الله عنه وتسليم النظر إليه في أمورهم. وكذا في كل عصر من بعد ذلك. ولم تترك الناس فوضى في عصر من الأعصار. واستقر ذلك إجماعاً دالاً على وجوب نصب الإمام

    Ibn Khaldun (rh)

    Ibn Khaldun (d. 808 AH) in his book, “Al-Muqadamma” stated,

    “The appointment of an Imam is obligatory in Islamic Law by Consensus of the Sohaba (ra) and the Taabi’een. This is because the Sohaba (ra) of the Messenger of Allah (saw) upon his (saw) passing strove to render the Bay’ah to Abu Bakr (ra) and to entrust him with the supervision of their affairs. It was so in all subsequent periods. In no period were the people left in a state of anarchy. This was so by Consensus which evidences that the appointment of an Imam is an obligation.”

    ইবনে খালদুন (রহ.)

    ইবনে খালদুন (মৃত্যু ৮০৮ হিজরী) তার “আল-মুকাদ্দিমা” গ্রন্থে বলেন,

    “সাহাবা (রা.) ও তাবে’ঈনদের ঐকমত্য যে, ইমাম নিয়োগ করা ইসলামী শারী‘আহ্‌ অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় তথা ফরয। এর কারণ হল, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর ওফাতের পর সাহাবাগণ (রা.) আবু বকর (রা.)-কে বাইয়াত দিতে উদ্যোগী হন এবং শাসনকার্য তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তার (রা.) উপর ন্যস্ত করেন। পরবর্তী সকল সময়ে এই অবস্থা বিরাজ করে। কোন যুগেই জনগণকে অভিভাবকহীন নৈরাজ্যকর অবস্থার মধ্যে ফেলা হয়নি। সাহাবাদের (রা.) ঐক্যমত্যের মাধ্যমে শারী‘আহ্ দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত যে, একজন ইমাম নিয়োগ করা বাধ্যতামূলক।”

    قال شمس الدين محمد بن أحمد الرملي الأنصاري المشهور بالشافعي الصغير في كتابه (غاية البيان في شرح زبد ابن رسلان)

    يجب على الناس نصب إمام يقوم بمصالحهم، كتنفيذ أحكامهم وإقامة حدودهم وسد ثغورهم وتجهيز جيوشهم وأخذ صدقاتهم أن دفعوها وقهر المتغلبة والمتلصصة وقطاع الطريق وقطع المنازعات الواقعة بين الخصوم وقسمة الغنائم وغير ذلك، لإجماع الصحابة بعد وفاته صلى الله عليه وآله وسلم على نصبه حتى جعلوه أهم الواجبات، وقدموه على دفنه صلى الله عليه وآله وسلم ولم تزل الناس في كل عصر على ذلك

    Imam Shams Ad-Din Ar-Ramli Al-Ansari (rh)

    Imam Shams Ad-Din Ar-Ramli Al-Ansari, known as the Small Shafi’i, states in his book “Ghayat Al Bayan Sharh Zubd Bin Raslan” states that,

    “People must appoint an Imam who serves their interests, such as implementing their penal rules, guarding their borders, preparing armies, taking their charity if they give it, defeating the enemy and spies and high way robbers, solving conflicts, and dividing spoils and others. This is an obligation because of the consensus of the Companions after the death of the Prophet (saw) to appoint an Imam; they even made it the most important obligation, and gave it priority over the burial of the Prophet (saw), and people in every era adopted this.”

    ইমাম শামস আদ-দ্বীন আর-রামলী আল-আনসারী (রহ.)

    ইমাম শামস আদ-দ্বীন আর-রামলী আল-আনসারী, যিনি ছোট শাফি’ঈ নামে পরিচিত, তার “গায়াত আল-বায়ান শারহ্ জুবদ বিন রাসলান” গ্রন্থে বলেন:

    “জনগণকে অবশ্যই একজন ইমাম নিয়োগ করতে হবে যিনি তাদের স্বার্থ রক্ষা করবেন, যেমন: তাদের ইসলামী দন্ডবিধি কার্যকর করা, তাদের সীমান্ত রক্ষা করা, সামরিক বাহিনী প্রস্তুত করা, তারা দান করলে তাদের দান গ্রহণ করা, শত্রু ও গুপ্তচর এবং মহাসড়ক ডাকাতদের পরাজিত করা, দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসন করা এবং যুদ্ধলব্ধ মালামাল ও অন্যান্য সম্পদ বন্টন করা। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর ওফাতের পরে সাহাবাগণ (রা.)-এর ইজমার (ঐক্যমত্য) কারণে ইমাম নিয়োগের বিষয়টি একটি বাধ্যবাধকতা; এমনকি তারা (রা.) এটিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাধ্যবাধকতা হিসাবে নির্ধারণ করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর দাফনের চেয়ে এটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। প্রতিটি যুগের লোকেরা এটি গ্রহণ করেছে।”

    قال الفقيه الهيثمي في كتابه (الصواعق المحرقة) – المتوفي 974ه

     اعلم أيضاً أن الصحابة رضوان الله عليهم أجمعوا على أن نصب الإمام بعد انقراض زمن النبوة واجب بل جعلوه أهم الواجبات حيث اشتغلوا به عن دفن الرسول ﷺ

    Al-Haythami (rh)

    Al-Haythami (rh) (died 974 aH) says in As-Saw’iq Al-Muhtariqa,

    “I also know that the Companions, may Allah be pleased with them, unanimously agreed that appointing an Imam after the end of the time of Prophethood is an obligation. Indeed they made it the most important of obligations to the extent that they were occupied with it instead of with burying the Prophet (saw).”

    আল-হায়ছামী (রহ.)

    আল-হায়ছামী (মৃত্যু ৯৭৪ হিজরী) আস-সাওআ’য়িক আল-মুহাররাকা বলেন,

    “আমি এটাও জানি যে, সাহাবাগণ (রা.) সর্বসম্মতভাবে একমত হন যে নবুয়্যতের সময় শেষ হওয়ার পরে ইমাম নিয়োগ করা অত্যাবশ্যক। নিশ্চয়ই এটিকে তারা (রা.) এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছেন যে, তারা (রা.) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দাফনকার্য হতে তা গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব মনে করে (তা বিলম্বিত করে) এই কাজে নিয়োজিত হন।”

    قال الشيخ علي بلحاج (حفظه الله) في كراسته (إعادة الخلافة)  

     “إعادة الخلافة من أعظم واجبات الدين”: “الخلافة على منهج النبوة” كيف لا وقد قرر علماء الإسلام وأعلامه أن الخلافة فرض أساسي من فروض هذا الدين العظيم بل هو “الفرض الأكبر” الذي يتوقف عليه تنفيذ سائر الفروض، وإن الزهد في إقامة هذه الفريضة من “كبائر الإثم”، وما الضياع والتيه والخلافات والنزاعات الناشبة بين المسلمين كأفراد وبين الشعوب الإسلامية كدول إلا لتفريط المسلمين في إقامة هذه الفريضة العظيمة،”

    Sheikh Ali Belhaj (ha)

    Sheikh Ali Belhaj (may Allah (swt) preserve him) said in his booklet, “The Restoration of the Khilafah”

    “Khilafah on the method of Prophethood” is one of the greatest obligations of the Deen. How can it not be?! It is the greatest duty since the scholars of Islam and its famous people decided that the Khilafah is the fundamental obligation from the obligations of this great Deen, but is “the greatest obligation,” upon which the establishment of other obligations depend. Neglecting the establishment of their obligation is one of the “greatest sins,” and the loss, confusion, disputes, and the conflicts between Muslims, as individuals, and between the Islamic people, as countries, are only because the Muslims neglected the establishment of this great duty.”

    শেখ আলী বেলহাজ (হা.)

    শেখ আলী বেলহাজ (আল্লাহ্‌ তাকে হেফাজত করুন) “খিলাফতের পুনরুদ্ধার” নামক তার পুস্তিকাতে বলেন,

    “নবুয়্যতের আদলে খিলাফত” দ্বীনের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বাধ্যবাধকতাগুলোর মধ্যে একটি। কেনইবা এটা হবে না?! এটি সবচেয়ে বড় দায়িত্ব কারণ ইসলামের আলেমগণ ও এর বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ এই সিদ্ধান্তে ঐক্যমত্য যে, খিলাফত হচ্ছে মহান দ্বীন আল-ইসলামের বাধ্যবাধকতাগুলোর মধ্যে অন্যতম মৌলিক একটি বাধ্যবাধকতা, বরং এটিই “সবচেয়ে বড় বাধ্যবাধকতা”, যার উপর অন্যান্য বাধ্যবাধকতাসমূহের প্রতিষ্ঠা নির্ভর করে। তাদের বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠার অবহেলা “সবচেয়ে বড় গুনাহ্‌গুলোর” একটি। মুসলিমদের মধ্যে ব্যক্তি হিসেবে ও ইসলামী জনগণের মধ্যে দেশ হিসেবে ক্ষয়ক্ষতি, বিশৃংখলা, বিরোধ ও দ্বন্দ্বের কারণ হচ্ছে মুসলিমগণ এই মহান কর্তব্য পালনে অবহেলা করেছে।”

    قال الشيخ بن عاشور في (أصول النظام الإجتماعي في الإسلام) – المتوفي 1393ه

    “فإقامة حكومة عامة وخاصة للمسلمين أصل من أصول التشريع الإسلامي ثبت ذلك بدلائل كثيرة من الكتاب والسنة بلغت مبلغ التواتر المعنوي. مما دعا الصحابة بعد وفاة النبي ﷺ إلى الإسراع بالتجمع والتفاوض لإقامة خلف عن الرسول في رعاية الأمة الإسلامية”

    Sheikh At-Taher Ibn Ashour (rh)

    Sheikh At-Taher Ibn Ashour (d. 1393) (rh) said in his book Usul AnNitham Al-Ijtima’I Fil Islam,

    “The establishment of a public and specific government for Muslims is one of the origins of Islamic legislation. This has been proven by numerous evidences from the Book and the Sunnah that reached the level of Tawatur Ma’nawi which made the Sahaba after the Prophet’s passing to rush, meet and consult to appoint a successor to the Prophet (saw) in looking after the affairs of the Islamic Ummah.”

    শেখ আত-তাহির ইবনে আশুর (রহ.)

    শেখ আত-তাহির ইবনে আশুর (রহ.) (মৃত্যু ১৩৯৩) তার উসুল আন-নিযাম আল-ইজতিমাঈ ফিল ইসলাম কিতাবে বলেছেন,

    “মুসলিমদের জন্য একটি প্রকাশ্য ও সুনির্দিষ্ট সরকার প্রতিষ্ঠা ইসলামী শারী‘আহ্‌’র মৌলিক বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম। কিতাব ও সুন্নাহ্’র অসংখ্য দলিল দ্বারা এটা প্রমাণিত হয়েছে যা তাওয়াতুর মা’নাবী-এর স্তরে পৌঁছে গিয়েছে; এবং রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর ওফাতের পরে ইসলামী উম্মাহ্’র বিষয়াদি দেখাশোনার জন্য তাঁর (সাঃ) উত্তরসূরী নিয়োগের উদ্দেশ্যে এটি সাহাবাদেরকে (রা.) বৈঠক ও পরামর্শ করতে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল।”

    قال الفقيه أبو الفتح الشهرستاني في كتابه (نهاية الأقدام)

     “وما دار في قلبه ولا في قلب أحد أن يجوز خلو الأرض عن إمام … فدل ذلك كله على أن الصحابة رضوان الله عليهم وهم الصدر الأول كانوا على بكرة أبيهم متفقين على أنه لا بد من إمام … فذلك الإجماع على هذا الوجه دليل قاطع على وجوب الإمامة..”

    Faqih Abu Al-Fateh Ash-Shahristani (rh)

    Faqih Abu Al-Fateh Ash-Shahristani (rh) stated in his book

    “It was not in his heart (i.e. Abu Bakr (ra)) nor was it in the heart of anyone that it is allowed for the Earth may be free from an Imam. All this indicates that the Companions, the first generation, all agreed that there must be an Imam. Such consensus is a conclusive evidence of the obligation of the Imamah”

    ফকীহ্ আবু আল-ফাতেহ্ আশ-শাহরিসতানী‌ (রহ.)

    ফকীহ্ আবু আল-ফাতেহ্ আশ-শাহরিসতানী‌ (রহ.) তার গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন:

    “তার (অর্থাৎ, আবু বকরের (রা.)) অন্তরে কিংবা অন্য কারো অন্তরে এটা ছিলই না যে পৃথিবীতে একজন ইমামবিহীন অবস্থায় থাকা বৈধ হতে পারে। এসবকিছুই নির্দেশ করে যে, সাহাবাগণ (রা.) – ইসলামের প্রথম প্রজন্ম, সকলেই একমত হন যে অবশ্যই একজন ইমাম থাকতে হবে। এ জাতীয় ঐক্যমত্য ইমামতের বাধ্যবাধকতার বিষয়ে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অকাট্য দলিল।”

  • ইসলামে রাজনীতি

    ইসলামে রাজনীতি

    বর্তমানে রাজনীতি একটা অতীব অপছন্দের বস্তুতে পরিণত হয়েছে। হানাহানি , লুটপাট আর দোষাদোষীর এ রাজনীতিতে মানুষ হাঁপিয়ে উঠেছে। এই সেকুলার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমরা ৫ বছর পর পর ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করি যেন তারা আমাদের হয়ে সংসদে কথা বলে, এলাকার উন্নয়ন হয়, আমরা একটু শান্তি, স্বস্তিতে, সন্তান-সন্তুতি নিয়ে নিরাপদে ধর্ম-কর্ম পালন করতে পারি। অথচ রাজনীতির প্রকৃত চর্চা যেটা দেখা যায় তা হলো, জনগণকে এই দিব সেই দিব নামক এক গাল মিথ্যা কথা বলে  ক্ষমতায় যাওয়া, আর তারপর ব্যক্তিবিশেষ বা বিশেষ গোষ্ঠী এমনকি বিদেশি শক্তির হাতে জিম্মি করে যেকোনো মুল্যে সেখানে বসে থাকা। এর যেন কোন ব্যাতিক্রম নেই। এখানে সরকারি দলের মূল কাজ – যখন যে থাকে থাকে – তা হল বিরোধী দল ও মত কে দমন করা। এই উদ্দেশ্য হাসিলে তারা রাষ্ট্রের সকল শক্তি যেমন পুলিশ, র‍্যাব, বিচার বিভাগসহ সকল প্রশাসনিক কাঠামো, এমনকি সেনাবাহিনী পর্যন্ত ব্যবহারে দ্বিধা করে না।

    এই অবস্থায় রাজনীতি ঘৃণা করা, নিজে দূরে থাকা, পরবর্তী প্রজন্মকে দূরে রাখতে আপ্রান চেষ্টা করা স্বাভাবিক। তাই আমরা অনেক জায়গায় বিশেষ করে মসজিদে লেখা দেখি “এখানে রাজনৈতিক আলাপ নিষিদ্ধ”। তাই আমরা দেখি ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের আহ্বান এবং তা বন্ধের জন্য রীতিমতো আন্দোলন।

    কিন্তু আমরা ছাড়তে চাইলেও কি রাজনীতি আমাদের ছাড়ে? বেঁচে থাকতে হলে আমাদের সমাজবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রে বাস করতে হয়, রাষ্ট্রীয় নিয়মকানুন মানতে হয়। রাষ্ট্র একটি ব্যবস্থার অধীনে এইসব নিয়ম কানুন বানায় যা আমাদের  প্রতিটি নাগরিকের জীবনকে প্রভাবিত করে, তা আমরা রাজনীতি পছন্দ করি বা না করি। যেমন: ভারতকে ঘৃণা করলেও রাষ্ট্রীয় নীতির কারণে ভারতের কর্তৃত্বর কাছে মাথা নোয়াতে বাধ্য হতে হয়, রাজনীতি করি বা না করি, ভারতের বাঁধ ছাড়া পানি সবার বাড়ি তলিয়ে দেয়। রাজনীতি না করলেও প্রতিমাসে গ্যাসের বিল দেয়ার পরও সিলিন্ডার কিনতে টাকা গুনতে হয় হয়, মাসে মাসে স্কুলে বেতন দিয়ে  শিশুসন্তানকে LGBTQ বা সম্মতি থাকলে কিভাবে নিরাপদে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা যায় তা শিখতে পাঠাতে হয়। চোখ বন্ধ করলে তো আর প্রলয় বন্ধ হয় না। তাছাড়া আমাদের রাজনীতি বিমুখতা কিন্তু অযোগ্য ব্যক্তিদের আমাদের নিয়ে যা খুশি তাই করার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। রাজনীতি একদল অর্বাচীনের হাতে বন্দি হয়ে গেছে। 

    তাই আমাদের রাজনীতি বিমুখ নয় বরং রাজনীতি সচেতন জাতি হিসেবে তৈরি হতে হবে।  তাহলে আমরা বুঝতে পারব রাজনীতি সমস্যা নয়, বরং সেকুলার গণতান্ত্রিক রাজনীতি সমস্যা যার একমাত্র সমাধান ইসলামের রাজনীতি।

    ইসলামে রাজনীতি কী, কিভাবে করতে হবে তা আল্লাহ তায়ালা পরিস্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন আর রাসূল (সা) করে দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। আল্লাহভীতি, দায়িত্বশীলতা আর জবাবদিহিতা যে রাজনীতির মূল চিন্তা। আর অন্যদিকে প্রচলিত সেকুলার রাজনীতি আমাদের মত ক্ষুদ্র সীমাবদ্ধ লোভী মানুষের মাথা থেকে এসেছে, যা তাকে “যা খুশি তা করার সার্বভৌম ক্ষমতা” দিয়ে রেখেছে। দিয়েছে নিজের পক্ষে আইন বানানোর দায়হীন-সীমাহীন স্বাধীনতা।

    প্রচলিত সেকুলার রাজনীতির নোংরা practice এর কারণে ইসলাম আর রাজনীতির কথা আসলে আমাদের মাথায় click করে –  ইসলামের মত পবিত্র জিনিসের সাথে রাজনীতির মত নোংরা জিনিস থাকতে পারে না।

    তাছাড়া কাফেরদের continuous effort আর সেকুলার রাষ্ট্রে থাকার কারণে আমাদের শিখতে হয়েছে ইসলাম একটা ধর্ম আর এতে কার্যকরী কোন পলিটিক্যাল সিস্টেম নাই। আমি সংক্ষেপে আপনাদের সামনে ইসলামের রাজনীতির চর্চা উপস্থাপন  করার চেষ্টা করব ইনশাল্লাহ।  

    আমরা জানি ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,

    الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا

    আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিআমত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে। (সূরা মায়িদা: ৩)

    ইসলাম একটি দীন। অর্থাৎ জীবন পরিচালনার সবকিছুই এতে আছে।

    نَزَّلۡنَا عَلَیۡكَ الۡكِتٰبَ تِبۡیَانًا لِّكُلِّ شَیۡءٍ

    আমি তোমার প্রতি এ কিতাব নাযিল করেছি যা প্রত্যেকটি বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা। (সূরা নাহল: ৮৯)

    জীবনের ছোট বড় সব সমস্যার সমাধান যেখানে আছে, রাজনীতির মতো vast একটি বিষয় যা জীবনের সাথে এভাবে ওতপ্রোত ভাবে মিশে আছে তা ইসলাম থেকে বাদ যায় কিভাবে? 

    তাছাড়া আমরা জানি ইসলাম সগৌরবে হাজার বছরের উপরে দুনিয়ার শাসন করেছে, ইসলামের পলিটিক্স ছাড়া পৃথিবীর শাসন করা  সম্ভব ছিল কি ?

    ইসলামে রাজনীতি অবশ্যই আছে তবে তার পেছনের চিন্তা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

    ইসলামে যে আরবি শব্দটি ব্যবহার করে পলিটিক্স বোঝানো হয় সেটি হলো সিয়াসা। যা এসেছে মুল শব্দ সা-সা ইয়া সুসু থেকে। শব্দটির অর্থই হলো “উম্মাহর দেখাশোনা করা”। আগে এই বৃহৎ ও মহান কাজ নবী-রাসূলগণের উপর অর্পিত হত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, “বনী ইসরাঈলের নবী‎গণ তাঁদের উম্মতদের শাসন করতেন। যখন কোন একজন নবী‎ মারা যেতেন, তখন অন্য একজন নবী‎ তাঁর স্থলাভিসিক্ত হতেন। আর আমার পরে কোন নবী‎ নেই। তবে অনেক খলীফাহ্ হবে। সাহাবগণ আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনি আমাদেরকে কী নির্দেশ করছেন? তিনি বললেন, তোমরা একের পর এক করে তাদের বায়’আতের হক আদায় করবে। তোমাদের উপর তাদের যে হক রয়েছে তা আদায় করবে। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করবেন ঐ সকল বিষয়ে যেসবের দায়িত্ব তাদের উপর অর্পণ করা হয়েছিল। [সহিহ বুখারী-হাদীস নং-৩৪৫৫;সহীহ মুসলিম-হাদিস নং ৪৭৫০]

    ইতিহাসে আমরা দেখি পরবর্তীতে এই দায়িত্বটি খলীফার মাধ্যমে খিলাফতে ব্যবস্থায় পালিত হত।  

    Secular democratic system এ রাজনীতির করার ধরণটা হলো এইরকম – রাজনৈতিক ব্যক্তি  বা দল ক্ষমতায় আরোহণ করে দেশ শাসন করার সুযোগ হাতিয়ে  বলে – “জনকল্যাণ করবে theoretically” আর practically ছলে বলে কৌশলে  নিজেদের আখের গোছাবে।  বিনিময়ে পুঁজিপতিদের স্বার্থ দেখা, এমনকি দেশও যদি বিক্রি করতে হয়।  ইসলামের রাজনীতিতে  “ক্ষমতায় যেতেই হবে” এইকেন্দ্রিক না। কারণ খলীফা একবার নির্বাচিত হওয়ার পর শরীয়াহ নির্ধারিত কারণ, যেমন মারা যাওয়া, পাগল বা deadly diseases এ আক্রান্ত হওয়া বা শত্রু দারা অপহৃত হওয়া যেক্ষেত্রে মুক্তির আশা নাই ইত্যাদি না হলে তিনি যতদিন শরীয়াহ দিয়ে আমাদের পরিচালনা করবে ততদিন দায়িত্বে থাকবেন। কোন মেয়াদ নাই। এটাই তার সাথে আমাদের চুক্তি।

    জনগণ কর্তৃক নিযুক্ত খলীফার মৃত্যু হলে পুনরায় নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরবর্তীকালে নির্বাচন এবং জনগণের বায়াত  এর মাধ্যমে পরবর্তী খলীফা নির্বাচিত হবে। সে যেকোনো নাগরিক নিজেকে শরীয়াহ নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী যোগ্য মনে করলে নির্বাচনে অংশগ্রহন করতে পারে। তাছাড়া মাজলিশে উম্মাহতে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আমাদের প্রয়োজন ও দাবী খলীফাকে  জানিয়ে দিবে, তাকে প্রয়োজনীয় উপদেশও দিবে। শরীয়াহর অধীনে থাকা আমাদের জন্য ফরয। আমাদের পক্ষ থেকে খলীফাকে আমরা  শরীয়াহ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করব, আর এ কারণে আমরা তাকে দেখে রাখব যে তিনি এ কাজ যথাযথ ভাবে আদায় করছে।  আবু বাকর (রা.) তার খলীফা নিযুক্তির পর প্রথম ভাষণে  বলেছিলেন, “আপনারা যদি দেখেন আমি সঠিক কাজ করছি আমাকে সহায়তা করবেন। যদি দেখেন আমি বিপথগামী হচ্ছি, আমাকে সতর্ক করে দেবেন। (বিদায়াহ ওয়ান – নিহায়াহ ৬/৩০৫,৩০৬)

    খিলাফাতে প্রত্যেক ব্যক্তি বা প্রতিটি ইসলামের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল আল্লাহ কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব হিসাবে তা পালন করবে। এভাবে শাসক সিয়াসাহ বা জনগণের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করবে এবং উম্মাহ তাকে দেখে রাখবে। এভাবে শাসক থেকে জনগন, প্রত্যেকে আমরা রাজনীতির এই মহান কাজে অংশগ্রহণ করব । এখন ইতিহাসে দেখি কিভাবে এই রাজনীতির চর্চা অর্থাৎ সকলের অংশগ্রহণে সিয়াসাহ বা জনগণের দেখাশনার দেখার কাজটি হয়েছে।

    প্রতিটি  জনগণের basic need fulfil  করা খিলাফাহ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। খলিফা হযরত ওমর (রা) কে কাবার গিলাব সজ্জিত করার কথা বললে উনি বলেন, কাবার গিলাব সজ্জিত করার চাইতে উম্মার ক্ষুধার্ত পেট গুলি ভরা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।  তিনি এটা শরীয়াহ প্রয়োগ করে, তার পুরো প্রশাসনকে খাটিয়ে এটি বাস্তবে পরিণত করেছেন। তার শাসনামলে যখন খিলাফাহর বয়স মাত্র ১০ বছর, তখন শিশু জন্ম নেয়া মাত্র আর ব্যক্তি বৃদ্ধ হওয়া মাত্র ভাতা পেত। আর  সাধারণ মানুষের ভাবনা এমন ছিল না যে- “যাক! আমরা ভাল লোক নিয়োগ  দিয়েছি, দেশ – জনগণ সব ভাবনা তার উপর, আমরা কামাই রোজগার করি, খাই দাই ঘুরে বেড়াই, সুবিধা মত দান সাদাকা আর নফল ইবাদতে ডুবে  থাকি,”  না! বরং অতীতে হাজার বছরের খিলাফতের ইতিহাসে জনগণ খুব ভালভাবে শাসককে দেখে রেখেছে। আমাদের অতি পরিচিত একটা ঘটনা। একবার খলিফা ওমর (রা) এর  কাপড় এক টুকরার জায়গায় দুই টুকরা পাওয়ায়, ভরা মজলিশে তার কাছে জবাব চাওয়া হয়। খলিফা ওমর (রা) “আমি এত করি তাও দেখেন না, দিব সব কাপড়ের মিল বন্ধ করে “– এই হুমকি তিনি দেননি।  ওমর (রা)’র বিব্রতকর ভাব দেখে তার ছেলে তার হয়ে ব্যাখ্যা দেন যে তিনি তার পিতাকে নিজের কাপড়টি  দিয়েছেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন যেন তাকে খলীফা হিসেবে কঠিন জবাবদিহিতায় রাখা হয়। একটি নির্দিষ্ট দিনে তিনি সবার সামনে এসে পিছনে ঘুরে থাকতেন এবং বলতেন আমার বিরুদ্ধে কার অভিযোগ থাকলে নির্ভয়ে বল, আমি তার চেহারাও দেখব না।  

    উম্মাহকে রাজনৈতিক ভাবে সচেতন রাখাও রাষ্ট্রের কাজ। প্রখ্যাত ইসলামি scholar রাজনিতিবিদ শেখ তাকিউদ্দিন আন নাবহানি (রহ.) বলেছেন, ” চিন্তা কোন জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ”। তাই রাষ্ট্র উম্মাহ চিন্তা শানিত করতে সম্ভাব্য সকল কিছু করবে।   উম্মাহ যেন রাজনৈতিক ভাবে সচেতন থাকে তারজন্য উমার (রা) আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন।  তিনি সমাজের বিভিন্ন স্তরে ঘুরে ঘুরে খোঁজ রাখতেন সাধারন মানুষের আলাপ আলোচনায় কি প্রাধান্য পায়? তারা কি জীবনের ছোট ছোট বিষয়, খাওয়া-দাওয়া, জীবিকা নিয়েই কেবল ব্যস্ত হয়ে পরছে নাকি জিহাদ, রাষ্ট্র, নীতিমালা এসব দিকেও খেয়াল রাখছে। একজন সাধারন নারী যখন মজলিসে তার দেন-মোহর নিয়ে ঘোষিত নীতির বিরোধিতা করেন, তখন তার শরীয়াহ গ্রহণযোগ্যতা বেশি  থাকায় তিনি আনন্দিত হয়ে যান এবং বলেন একজন নারীও খলীফা উমর থেকে বেশি জানেন, আলহামদুলিল্লাহ। এক জনাকীর্ণ ভাষণে খলিফা উমর (রা) সকলে তার কথায় সায় দিচ্ছে দেখে জন্য চিন্তিত হয়ে পরেন এবং জিজ্ঞেস করেন,”আমি ভুল করলে তোমরা কী করবে? উম্মাহর থেকে একজন যুবক জবাব দিয়েছিল “আপনাকে তীরের মত সোজা করে দেবো।” হযরত উমর (রা) খুশি হয়েছিলেন এরকম সচেতন উম্মাহ পেয়ে। আর  আজকে জাতিকে অন্ধকারে রাখা রাষ্ট্রের agenda। ভারতের সাথে কী চুক্তি হয়েছে আমরা জানি না। আমেরিকা, আদানি এদের সাথে চুক্তি হবার বহু পড়ে আমরা জানতে পারি আর এর ঘানি টানি। রাষ্ট্র  প্রথমতঃ পরিকল্পিত শিক্ষানীতির মাধ্যমে আমাদের চিন্তাহীন, অনুকরণ প্রিয়, দাস মনোবৃত্তির জেনারেশন হিসেবে গড়ে তুলেছে। দ্বিতীয়তঃ আমাদের জন্য ফান ফুর্তিকে সহজ আর জীবিকা উপার্জন কে চরম কঠিন করে তা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে একরকম বাধ্য করে রেখেছে ।   

    যাই হোক, তার মৃত্যুর পর তিন দিনের মাথায় পরবর্তী খলীফা নির্বাচিত হয়। অন্তর্বর্তীকালীন আমিরের তত্ত্বাবধানে নির্বাচিত ছয়জন খলীফা প্রার্থীদের মধ্য থেকে জনগণের বায়াতের মাধ্যমে । এভাবে জনগণ খলিফা নির্বাচন, জবাবাদিহিতা, উপদেশসহ প্রতিটি কাজে অংশগ্রহনের মাধ্যমে রাজনীতিতে শরিক হয়।

    শাসক পরিবর্তনের কারণ ও উপায় সম্পর্কেও ইসলামের রাজনীতিতে দিকনির্দেশনা আছে।

    শাসক ভাল বা খারাপ হতে পারে। এই ব্যবস্থা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছ থেকে আসা ত্রুটিমুক্ত একটি ব্যবস্থা, কিন্তু এই ব্যবস্থা চালাবে মানুষ যার ভুল হয়। তাহলে কী করতে হবে? প্রথমে আল্লাহ খারাপ শাসক define করেছেন। সেই definition টাও আমাদের হাতে ছাড়েননি। এমন না, আমার ব্যবসাকে সুযোগ কম দিলে বা আমার দলকে ক্ষমতায় বসাতে আমরা শাসক বিরোধী কাজে লিপ্ত হতে পারব,  জ্বালাও – পোড়াও আন্দোলন শুরু করতে পারব । হাদীসে আছে,

    “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ডাকলেন এবং আমরা তাঁকে বাইয়াত দিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের থেকে যে বিষয়ে বাইআত নিলেন তা হলো, আমরা আমাদের পছন্দনীয়-অপছন্দনীয় বিষয়ে, সুখে-দুঃখে এবং আমাদের উপর যদি অন্য কাউকে প্রাধান্য দেয়া হয় তথাপিও (আমীরের কথা) শুনব ও আনুগত্য করব এবং আমরা শাসকদের সাথে শাসনকার্য নিয়ে বিবাদে জড়াব না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন তবে হ্যাঁ, যদি তোমরা কুফরে বাওয়াহ তথা সুস্পষ্ট কোন কুফর দেখতে পাও, যার ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে- তাহলে ভিন্ন কথা।” – সহীহ মুসলিম: ১৭০৯

    সুস্পষ্ট কুফর কোনটা?

    সুরা মায়িদা র ৪৪,৪৫ ৪৭ আল্লাহ সেটা ও clear করেছেন।  

    وَ مَنۡ لَّمۡ یَحۡكُمۡ بِمَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰهُ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الۡكٰفِرُوۡنَ

    আর যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে ফয়সালা করে না, তারাই কাফির। [সূরা মায়িদা ৫: ৪৪]

    مَنۡ لَّمۡ یَحۡكُمۡ بِمَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰهُ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الظّٰلِمُوۡنَ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিচার ফায়সালা করে না তারাই যালিম। [সূরা মায়িদা ৫: ৪৫]

    وَ مَنۡ لَّمۡ یَحۡكُمۡ بِمَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰهُ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الۡفٰسِقُوۡنَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করে না, তারাই ফাসিক। [সূরা মায়িদা ৫: ৪৭]

    এমন হলে কী করতে হবে? তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। আমরা জানি শাসকদের কাছে রাষ্ট্র ক্ষমতা, তারা শক্তিশালী। তাদের বিরুদ্ধে এমনকি দলবদ্ধভাবেও জবাব চাওয়া কঠিন। তাই আল্লাহ রাসূল (সা) এই কাজকে চূড়ান্ত সাহসিকতার কাজ বলেছেন, এই কাজে সর্বোচ্চ সম্মানের কথা বলেছেন।  জাবির (রা.) বলেন, নবী করীম (সা) বলেছেন, ‘শহীদদের সর্দার হচ্ছেন হামযা ইবনু আবদুল মুত্তালিব এবং সেই ব্যক্তিও শহীদদের সর্দার যে অত্যাচারী নেতার নিকটে গেল এবং তাকে ভাল কাজের আদেশ করল এবং মন্দ কাজের নিষেধ করল। তখন সে তাকে হত্যা করল’ (তিরমিযী, তারগীব হা/৩৩০২), (ত্বাবারানীর আওসাত্ব ৪০৭৯,হাকেম ৪৮৮৪,স: তারগীব ২৩০৮)

    আমরা ইমাম ইবনে হাম্বল (রহ), আবু হানিফা (রহ)-কে এ কাজ করতে যেয়ে কারাবরণ ও নির্যাতিত হতে দেখেছি। ক্ষমতায় যেতে নয়, বরং ফরজ দায়িত্ব থেকে তারা সেটা করেছেন।

    ইসলামের ভিত্তিতে রাজনীতি করা হলো সবচাইতে উচ্চ মানের একটি কাজ, উম্মাহর দেখাশোনা করা। নবী-রাসূলগণ এটা আগে করে গেছেন, এখন আমরা করছি। আর এই উঁচু মানের কাজটি আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড। আমাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে,

    كُنۡتُمۡ خَیۡرَ اُمَّۃٍ اُخۡرِجَتۡ لِلنَّاسِ تَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ تَنۡهَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡكَرِ وَ تُؤۡمِنُوۡنَ

    তোমরাই সর্বোত্তম উম্মাত, মানবজাতির (সর্বাত্মক কল্যাণের) জন্য তোমাদের আবির্ভুত করা হয়েছে, তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ কর ও আল্লাহর প্রতি ঈমান রক্ষা করে চল। (সুরা আলে ইমরান : ১১০)

    সুতরাং রাজনীতি করা, ইসলাম যেভাবে করতে বলেছে সেভাবে করা – প্রত্যেকের উপর ফরজ এবং সবচাইতে গৌরবের কাজ।

    আর যদি আমরা তা না করি-  রাসুল (সা) বলেন, ‘‘সে সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন! তোমরা অবশ্যই একে অপরকে সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। তা না হলে আল্লাহ্ তা‘আলা অচিরেই তোমাদের উপর তাঁর পক্ষ থেকে বিশেষ শাস্তি পাঠাবেন। তখন তোমরা তাঁকে ডাকবে; অথচ তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না’’। (তিরমিযী ২১৬৯)

    আজ ইসলামের রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, ইসলামের ভিত্তিতে সৎকাজের আদেশ আর অসৎ কাজের নিষেধ থেকে বিরত থেকে আমরা নিজেদের সেই পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছি যেখানে আমরা দুহাত তুলে আল্লাহকে ডাকছি, কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সাড়া দিচ্ছেন না। ফিলিস্থিনে হত্যা বন্ধ হচ্ছে না, ভারত তার আগ্রাসন বন্ধ করে না, আমরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি। রোহিঙ্গা ভাই বোনেরা সমদ্রে, জঙ্গলে পশুদের মত মারা যাচ্ছে, আমরা কিছুই থামাতে পারছি না।

    এবার আমরা যদি একটু আমাদের নিজেদের দিকে তাকাই। আমাদের ব্যস্ত রাখা হয়েছে আর আমরাও এই ফাঁদে পড়ে নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত আছি। আমরা ব্যস্ত আছি আমাদের ঘর-সংসার, চাকরি-বাকরি, পড়াশোনা আর ব্যক্তিগত ইবাদতে আর পরিস্থিতিকে গালি দিয়ে দুইটা face book post দিয়ে দায়িত্ব সারছি! রাজনীতি বিমুখ হয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। আজকে আমাদের এই তরুণ ছেলেগুলো যদি শুধু মাত্র স্বার্থপরের মত নিজেদের কথাই ভাবত, আমরা কি এই যালিম শাসক থেকে মুক্তি পেতাম? পেতাম না।

    এখন যদি আমরা ভাবি, একই ভাবে জীবন চালিয়ে যাব আর অন্তর্বর্তীকালীন একটা সরকার তারা আমাদের হয়ে এই ব্যর্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দিয়ে আমাদের সব সমস্যার সমাধান করে দিবে, আর যদি তারা কিছু problem করে তাহলে আবার টেনে নামাই দিবো। এভাবে বারবার error and trial এর চক্করে মুসলমান জাতি আর কত পড়বে? এই পুরা প্রক্রিয়াটা আসছে সেকুলার চিন্তা থেকে। মানুষের মাথা থেকে ভুলে ভরা সমাধান আসবে, কয়দিন তার উপরে আমল করব, ভুল ধরা পড়বে, আবার নতুন সমাধান বের করার গোল বৈঠক করবো। এবার আমরা থামি।

    এই process যেহেতু ইসলাম থেকে আসে নাই এটা দিয়ে আমাদের কোন একটা সমস্যার সমাধান হয় নাই, কোনদিন হবেও না। তাই সেকুলার পলিটিক্সের চেহারা দেখে রাজনীতিকে ঘৃণা করলে, এড়িয়ে চললে আমাদের বাস্তবতার পরিবর্তন হবে না। পরিবর্তন শুধুমাত্র আল্লাহর বলে দেওয়ার রাজনীতির মাধ্যমেই আনা সম্ভব। কারণ ইসলামি রাজনীতি যেমন theoretically perfect তেমনি এই মুহুর্তে practically একমাত্র option।  তাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থেকে দেশ রাষ্ট্র সম্পর্কে উদাসীন হয়ে থাকলে, আমাদের জন্য রাসূল (সা) ভয়ানক warning রেখে গেছেন –

    “ঐ সত্ত্বার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা অতি সত্বর আমর বিল মা’রূফ এবং নাহি আ’নিল মুনকার (সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ) কর। অন্যথায় অচিরেই তোমাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আরোপিত হবে। অতঃপর তোমরা তাকে ডাকবে কিন্তু তোমাদের ডাকে সাড়া দেয়া হবেনা।” (তিরমিযী)

    আমরা চাই হানাহানি সেকুলার দলীয় রাজনীতি বন্ধ হয়ে সত্যিকারের রাজনীতি – ইসলামী রাজনীতি চালু হোক। খিলাফত ফিরে আসা না পর্যন্ত এই রাজনীতি সামগ্রিক ভাবে শুরু করা যাচ্ছে না। তাই আমদের সবার উচিত রাসুল (সা) পথ অনুসরণ করে এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার ঐক্যবদ্ধ চেষ্টা শুরু করা, খিলাফাহ ফিরিয়ে আনার রাজনীতি শুরু করা। রাসুল (সা) সে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে খিলাফাহ ফিরিয়ে এনেছেন সেই রাজনীতিতে শামিল হওয়া। শত শত মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই সুযোগ আমরা যেন কাফেরদের পক্ষে এবং ব্যর্থ গণতন্ত্র ঘষামাজার পিছনে ব্যয় না করে ফেলি। পরিশেষে যে কথাটি বলতে চাই, ইসলামের রাজনীতি সম্পর্কে আমাদের সচেতনতাই শুধুমাত্র এই অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ের অর্জিত এই মুভমেন্ট হাইজ্যাক হতে দেবে না। ইনশাআল্লাহ আমরা এই আন্দোলনকে খিলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারবো। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন। আমিন।

  • প্রশ্ন-উত্তর: মোটাতাজা বাছুর কুরবানি করা

    প্রশ্ন-উত্তর: মোটাতাজা বাছুর কুরবানি করা

    আমজাদ আল-তামরির প্রশ্ন: আমাদের প্রিয় আমীর, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহ। আমি আল্লাহর কাছে আপনাকে সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল কামনা করছি। আমার প্রশ্ন: মোটাতাজা বাছুর দুই বছরের কম বয়সী হলে কি কোরবানির জন্য গ্রহণযোগ্য?

    হাইথাম আবু শিখাইদিম প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম। দুই বছরের কম বয়সী মোটাতাজা বাছুর কোরবানি করা কি জায়েজ?

    উত্তর:

    আপনাদের উভয়ের প্রশ্ন একই বিষয়ে, এবং এর উত্তর হচ্ছে:

    ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহ

    ১) কুরবানী একটি ইবাদত এবং রাসূল (সা:) এর শর্তাবলী ব্যাখ্যা করেছেন। কোরবানির শর্তের মধ্যে রয়েছে এর বয়স।

    রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন:

    «لَا تَذْبَحُوا إِلَّا مُسِنَّةً، إِلَّا أَنْ يَعْسُرَ عَلَيْكُمْ، فَتَذْبَحُوا جَذَعَةً مِنَ الضَّأْنِ»

    “শুধুমাত্র একটি পূর্ণ বয়স্ক পশু কোরবানি কর যদি না এটি তোমাদের পক্ষে কঠিন হয়, সেক্ষেত্রে একটি মেষশাবক কোরবানি দাও।” [মুসলিম বর্ণনা করেছেন]। গরুর বড় প্রাণী হওয়ার অর্থ দুই বছর বা তার বেশি বয়স হওয়া। মোটাতাজা এবং প্রচুর গোশত থাকলে যাদের বয়স দুই বছরের কম তাদের জন্য কুরবানী বৈধ বলে আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে যে বক্তব্য রয়েছে তা একটি ভুল বক্তব্য। এই যুগে কয়েকজন ফতোয়াদাতা ছাড়া যদি দুই বছরের কম বয়সী গরুর প্রচুর গোশত থাকে তবে তা কুরবানী করা জায়েজ বলে কেউ বলেনি, এবং তাদের ফতোয়া দলীল-প্রমাণের বিপরীত এবং যা সালফে সালেহীন আলেমদের বক্তব্যের খেলাপ।

    শরীয়তে বৈধ শেয়ার ও পরিমাণের কোন ‘ইল্লাহ নেই, তাই শেয়ার বা পরিমাণ ‘ইল্লাহ’ প্রয়োগ ছাড়াই বিবেচনা করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাদীসটি স্পষ্ট:

    «لَا تَذْبَحُوا إِلَّا مُسِنَّةً»

    “শুধুমাত্র একটি পূর্ণ বয়স্ক পশু কোরবানি কর”, বয়স্ক গরু বলতে বোঝায় যা দুই বছর বয়স অতিক্রম করেছে এবং তৃতীয় বছরে প্রবেশ করেছে। এখানে নিষেধাজ্ঞা একটি কঠোর নিষেধাজ্ঞা, এবং টেক্সট-এর মধ্যে চুড়ান্ত ইঙ্গিত (কারীনা) স্পষ্ট, এবং এটি দরিদ্রদের জন্য একটি ব্যতিক্রম যাদেরকে ভেড়ার বাচ্চা তথা জাযা’আর কোরবানি করা জায়েয করা হয়েছে। আর তা হলো ভেড়ার বাচ্চা যা ছয় মাস পূর্ণ করেছে।

    কুরবানী করা একটি ইবাদত, এটি একটি নির্ধারিত (তাওকীফিয়াহ) ইবাদত, অন্যান্য ইবাদতের মতো। এটি তার শর্ত ও কারণ অনুযায়ী সম্পাদিত হয়, যা শরীয়ত দ্বারা বর্ণিত হয়েছে। এসব শর্তে ‘ইল্লাহ’ নেই এবং এসব (শর্ত) ছাড়া কুরবানী বৈধ নয়।

    2- “মাফাহিম” (কনসেপ্টস)-এর আরবি পৃষ্ঠা ৩৪-এ বলা হয়েছে: (ইসলামী ব্যবস্থাগুলি ‘ইবাদত, নৈতিকতা, খাদ্যদ্রব্য, পোশাক, মুআমালাত (লেনদেন) এবং দণ্ডবিধি সম্পর্কিত আহকাম শরীয়াহ দ্বারা গঠিত।

    ইবাদত, নৈতিকতা, খাদ্যদ্রব্য, পোশাক-আশাক সম্পর্কিত খোদায়ী বিধি-বিধানকে ‘ইল্লাহ’ (আইনগত কারণ) দ্বারা যুক্তিযুক্ত করা যায় না।

    রাসূল (সা) বললেন:

    «حُرِّمَتِ الْخَمْرَةُ لِعَيْنِهَا»

    “মদ (খামর) নিজের (বৈশিষ্ট্যের) জন্যই হারাম।”

    তবে লেনদেন এবং দণ্ডবিধি সম্পর্কিত আহকাম শরাহ ‘ইল্লাহ’ দ্বারা যুক্তিযুক্ত। কারণ এসব বিষয়ে হুকম শারঈ একটি ‘ইল্লাহ’র ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা বিধি-বিধান প্রণয়নের কারণ। অনেকেই শরীয়াহর সকল বিধি-বিধানকে সুবিধা (মাসলাহাহ) অনুসারে ন্যায্যতা দিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে, কারণ তারা পশ্চিমা মতাদর্শ এবং পশ্চিমা সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত, যা শুধুমাত্র উপযোগকেই কর্মের মাপকাঠি হিসাবে দেখে।

    এই ধরনের বুঝ ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের সাথে সাংঘর্ষিক, যা রূহকে সকল কর্মের ভিত্তি বলে মনে করে; এবং বস্তুর সাথে রূহের মিশ্রণকে সমস্ত কর্মের নিয়ন্ত্রক করে তোলে। ইবাদত, নৈতিকতা, খাদ্যসামগ্রী ও পোশাকের সাথে সম্পর্কিত আহকাম শরীয়াহ একেবারেই যুক্তিনির্ভর নয়, কারণ এই নিয়মগুলির জন্য কোনো ‘ইল্লাহ’ নেই। সেগুলোকে সেভাবে নেওয়া উচিত যেমন ভাবে সেগুলো টেক্সটে এসেছে এবং ‘ইল্লাহ’র উপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত নয়। নামাজ (সালাত), রোজা (সাওম), হজ, যাকাত, নামাজ পড়ার পদ্ধতি এবং এর রাকাতের সংখ্যা, হজের আচার এবং যাকাত প্রদানের জন্য ন্যূনতম সম্পত্তির পরিমাণ (যাকাতের নিসাব) এবং অনুরূপ, এসবকিছু নিতে হবে, গ্রহণ করতে হবে এবং এ ব্যপারে অনুগত হতে হবে যেমনভাবে তারা (তাওকিফি) টেক্সটে এসেছে এবং তাদের জন্য কোন ‘ইল্লাহ খোঁজা হবে না…)

    সুতরাং কোরবানির বয়স অতিক্রম করা জায়েজ নয়, বাছুরটি মোটাতাজা হোক বা বয়স্ক না হোক না কেন, যেহেতু টেক্সটে কোনো ‘ইল্লাহ ছাড়া বয়স উল্লেখ করা হয়েছে, তাই এটি (অনুসরণ) বাধ্যতামূলক।

  • যুল হিজ্জার প্রথম ১০ দিন – তাৎপর্য ও পুরস্কার

    যুল হিজ্জার প্রথম ১০ দিন – তাৎপর্য ও পুরস্কার

    যুল হিজ্জার প্রথম দশ দিন কী? এই দিনগুলো আসে এবং মুসলমানদের সাথে তাদের গুরুত্ব অজানা রেখে চলে যায়, অনেকেই গাফেল থেকে যায়। কখনো কখনো এই দিনগুলোকে ঈদের কাউন্টডাউন ছাড়া আর কিছুই মনে করা হয় না।

    আলেমদের মতামত

    ইবনুল কাইম ব্যাখ্যা করেছেন যে বছরের শ্রেষ্ঠ রাত হল রমজানের শেষ দশ রাত এবং বছরের শ্রেষ্ঠ দিন হল যুল হিজ্জার প্রথম দশ দিন।

    ইবনে তাইমিয়াকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল এবং তার উত্তর ছিল, “রমজানের শেষ দশ রাত রাতের দিক থেকে উত্তম এবং যিলহজ্জের প্রথম দশ দিন দিনগুলির দিক থেকে উত্তম”।

    ইবনুল কাইয়্যিম এটি নিশ্চিত করেছেন এবং ইবনে কাছীর এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।

    কুরআনে তাৎপর্য

    যিলহজ্জের প্রথম দশ দিন এতই পবিত্র যে, আল্লাহ তায়ালা তাদের দ্বারা শপথ করেন যখন তিনি কুরআনে বলেন: “ভোরের শপথ; এবং দশ রাতের” [৮৯:১-২]। কোনো কিছুর শপথ করা তার গুরুত্ব ও বড় উপকারের ইঙ্গিত দেয়।

    ভোর আসলেই আল্লাহর এক মহৎ নিদর্শন। এটি অন্ধকারের সমাপ্তি এবং রাত পেরিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয় এবং একটি নতুন দিনের সূচনা করে। তাই অনেক ইবাদত এই সময়ের সাথে যুক্ত, যেমন তাহাজ্জুদ নামাযের সমাপ্তি, ফজরের নামাযের শুরু এবং রোযার শুরু।

    অনুরূপভাবে এ দশটি রাত আল্লাহর একটি বড় নিদর্শন। কিছু এত তাৎপর্যপূর্ণ যে, আল্লাহ তাদের দ্বারা শপথ গ্রহণ করতে বেছে নিয়েছেন। কিছু এত গুরুত্বপূর্ণ যে আল্লাহ নিজেই এটিকে ভোরের সাথে সংযুক্ত করেছেন।

    ইবনে আব্বাস (রা.) ব্যাখ্যা করেছেন যে, এই দশটি রাত প্রকৃতপক্ষে যুল হিজ্জার প্রথম দশ দিন।

    হাদীসের গুরুত্ব

    জাবির ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত একটি সুস্পষ্ট হাদীস রয়েছে যেখানে নবী (সা.) বলেছেন: “পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দিন হল দশটি দিন (অর্থাৎ যুল-হিজ্জার দশ দিন)।”

    হাদিসটি আল-বাজ্জার দ্বারা রিপোর্ট করা হয়েছিল এবং অনেক ঐতিহ্যবাদীরা এটিকে প্রামাণিক বলে মনে করেন।

    ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “এই দশ দিনের (যুল হিজ্জার প্রথম দশ দিন) চেয়ে কোন দিন নেই যেদিন কোন ভাল কাজ আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়”। সাহাবা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) জিজ্ঞাসা করলেন: “এমনকি আল্লাহর পথে জিহাদও?” রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “এমনকি আল্লাহর পথে জিহাদ করাও নয়, সেই ব্যক্তি ব্যতীত যে নিজের জীবন ও সম্পদ (আল্লাহর পথে) ত্যাগ করেছে এবং এর কিছুই নিয়ে ফিরে আসেনি (অর্থাৎ তিনি শহীদ)”। (বুখারী)

    নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর এই বাণীর পর আমাদের জন্য আর কোন প্রেরণার প্রয়োজন হবে না। জিহাদ ইসলামের সর্বোচ্চ চুড়া। ইবাদতের মহৎ কাজ যেখানে একজন বান্দা আল্লাহর বাণীকে সর্বোচ্চ করে তোলার জন্য তার কাছে প্রিয় সবকিছুকে লাইনে রাখে।

    তথাপি এই হাদীস ইঙ্গিত করে যে, এর চেয়েও উত্তম হল যিলহজ্জের প্রথম দশ দিনে আল্লাহর ইবাদত করা! এই দশ দিনে আল্লাহ আমাদের জন্য কল্যাণের প্রতিটি দরজা খুলে দিয়েছেন, তাই আল্লাহর রহমত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে ক্লান্ত হবেন না, পাছে সেই দরজাটি আবার আপনার জন্য খোলা না হয়।

    ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে আরো বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “যুল-হিজ্জার প্রথম দশদিনের তুলনায় কোন দিনই আল্লাহর কাছে নেক আমলের জন্য এত ভারী এবং পছন্দনীয় নয়”। তাই এই দিনগুলিতে ক্রমবর্ধমানভাবে পাঠ করুন: “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, আল-হামদু-লিল্লাহ, সুব-হানাল্লাহ।” (তাবরানী)

    এই বরকতময় দিনগুলিতে উৎসাহিত আমল

    সাধারণভাবে বলতে গেলে যে কোনো আমল করা উচিত যাতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন এই দিনগুলোতে। যে কাজগুলো বেশি বেশি করা উচিত তা হল তাহলীল, তাকবীর এবং তাহমীদ কারণ ইবন উমর (রা.) এর বর্ণনায় এগুলি সর্বপ্রথম উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহর কাছে এই দশদিনের চেয়ে বড় কোনো দিন নেই বা যেগুলোতে নেক আমল তাঁর কাছে বেশি প্রিয়, তাই বেশি বেশি তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা), তাকবীর (আল্লাহু আকবার বলা) এবং তাদের সময় তাহমীদ (আলহামদুলিল্লাহ) বলা।

    কথিত আছে যে, একবার দশ দিন শুরু হলে দ্বিতীয় প্রজন্মের বিখ্যাত আলেম সাঈদ বিন জুবায়ের আল্লাহর অতিরিক্ত ইবাদতে নিজেকে নিয়োজিত করতেন।

    যিকির [আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার স্মরণ]

    আল্লাহর জিকির (স্মরণ) দিয়ে শুরু করুন যেমনটি আল্লাহ কুরআনে বলেছেন “[হে মুহাম্মদ], আপনার প্রতি কিতাব থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে তা পাঠ করুন এবং সালাত কায়েম করুন। নিঃসন্দেহে নামায অশ্লীলতা ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে এবং নিঃসন্দেহে আল্লাহর স্মরণ সবচেয়ে বড়। আর তোমরা যা কর আল্লাহ তা জানেন” [২৯:৪৫]

    এটি আল্লাহর রহমত থেকে যে তিনি আমাদেরকে এমন ইবাদতের আদেশ দিয়েছেন যা আমাদের অন্তরে শান্তি ও তৃপ্তি নিয়ে আসে এবং যার একটি অন্তর্নিহিত আনন্দ রয়েছে, যেমনটি আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, “যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের অন্তর স্মরণে আশ্বস্ত হয়। আল্লাহর। নিঃসন্দেহে, আল্লাহর স্মরণে অন্তরসমূহ আশ্বস্ত হয়” [১৩:২৮]

    আল্লাহর জিকিরে প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি করুন। ইবনু উমর ও আবু হুরায়রা যিলহজ্জে প্রবেশের পর বাজারে প্রবেশ করতেন এবং আল্লাহর তাকবীর উচ্চারণ করতেন। এতটাই যে সমগ্র বাজারটি আল্লাহর তাসবীহ ও প্রশংসায় মুখরিত হয়ে উঠত।

    ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “এমন কোন দিন নেই যেদিনে এই দশ দিনের চেয়ে নেক আমল আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়। তাই বেশি করে তাহলীল, তাকবীর ও তাহমীদ পাঠ করুন।” [ইমাম আহমদ কর্তৃক বর্ণিত]

    সিয়াম

    রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “এই দিনগুলোতে একটি রোজা পূর্ণ এক বছরের রোযার সমান এবং এই সময়ের একটি রাতের ইবাদত লাইলাতুল কদরের ইবাদতের সমান। (তিরমিযী)

    আবু কাতাদাহ (রা.) বর্ণনা করেন যে, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে, আরাফাতের রোযা বিগত ও আগামী বছরের গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে। (তিরমিযী)

    আবু কাতাদাহ (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে বলেছেন, “এটি বিগত এক বছরের ও আগামী বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়। [সহীহ মুসলিম]

    প্রকৃতপক্ষে হুনাইদা ইবনে খালিদ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে নবীর স্ত্রীদের মধ্যে একজন বলেছেন যে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুল হিজ্জার প্রথম নয় দিন রোজা রাখতেন [আল-নাসায়ী ও আবু দাউদ]

    আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রোজা ও কুরআন কিয়ামতের দিন আল্লাহর বান্দার জন্য দু’টি সুপারিশকারী। রোজা বলবে: ‘হে প্রভু, আমি তাকে দিনের বেলায় তার খাবার ও কামনা থেকে বিরত রেখেছিলাম। আমাকে তার জন্য সুপারিশ করতে দিন।’ কুরআন বলবে: ‘আমি তাকে রাতে ঘুমাতে বাধা দিয়েছিলাম। আমাকে তার জন্য সুপারিশ করতে দিন।’ এবং তাদের সুপারিশ কবুল করা হবে।

    কুরবানি

    কুরবানি করুন, কারণ এটি আমাদের পূর্বপুরুষ ইব্রাহিম (আ)-এর প্রাচীন রীতি এবং আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর জন্য আদেশ করা হয়েছিল যখন আল্লাহ বলেছিলেন “সুতরাং আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করুন এবং [একমাত্র তাঁর উদ্দেশ্যে] কুরবানী করুন” [১০৮:২]

    রাসুল (সা) বলেছেন: “আদম সন্তান কুরবানীর দিনে এমন কোন আমল করে না যা রক্তপাতের চেয়ে আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয়। কুরবানির পশু কিয়ামতের দিন তার শিং, চুল ও খুরসহ উপস্থিত হবে। রক্ত মাটিতে পৌঁছানোর আগেই কোরবানি আল্লাহ কবুল করেন…” [তিরমিযী, ইবনে মাজাহ]

    দু’আ

    সাঈদ ইবন জুবায়ের (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি এই দশ দিনে রাতের নামায ও নেক আমল এত বেশি বৃদ্ধি করতেন যে, লোকেরা তার যে দৃষ্টান্তের সাথে তাল মেলাতে পারছিল না এবং তাকে কিছুটা বিশ্রাম নেবার কথা বলছিল।

    তিলাওয়াত

    কুরআন তিলাওয়াত করুন কারণ এটি যিকিরের সর্বোত্তম রূপ এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের সবচেয়ে ছোট পথ। এই দিনগুলির জন্য নিজেকে একটি উচ্চাকাঙ্খী লক্ষ্য নির্ধারণ করুন যেমন আপনি রমজানের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন।

    দানশীলতা

    দান করুন কারণ দান করাকে বীরত্বের সাথে তুলনা করা হয়েছে আর কৃপণতাকে ভীরুতার সাথে তুলনা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ডাকতেন, “হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।”

    তাকবীর

    তাকবীর আত-তাশরীক পুরুষদের জন্য ওয়াজিব এবং মহিলাদের জন্য মুস্তাহাব, প্রত্যেক ফরজ নামাযের পর ৯ই জুলহিজ্জার ফজর থেকে ১৩ই জুলহিজ্জাহর আসর পর্যন্ত।

    তা হল: “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ; ওয়া আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল-হামদ (আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই; আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ এবং প্রশংসা আল্লাহরই)।

    পুরুষদের জোরে এবং মহিলাদের শান্তভাবে এই বাক্যাংশগুলি উচ্চারন করতে উত্সাহিত করা হয়।

    এই দশ দিনে দুই প্রকার তাকবীর দিতে হবে। সাধারণ তাকবীর যা প্রথম যুল হিজ্জার মাগরিব থেকে দশ তারিখ পর্যন্ত করা হয়। আর নির্দিষ্ট তাকবীর যা নবম যুল হিজ্জার (আরাফার দিন) ফজর থেকে যুল হিজ্জার তেরো তারিখের আসর পর্যন্ত করা হয়। শব্দগুলো সহজ, যেমন ইবনে মাসউদ দ্বারা বর্ণিত, “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল-হামদ।”

    উপসংহার

    এই দশটি দিনকে পুনরুজ্জীবিত করা প্রতিটি মুসলিম, নর-নারী, বৃদ্ধ ও যুবকের দায়িত্ব, যতক্ষণ না তারা আমাদের সম্প্রদায়ের জন্য রমজানের শেষ দশ রাতের মতো হয়ে ওঠে।

    আমাদের জীবন ছোট এবং আমাদের জবাবদিহিতা অনেক বড়। আমরা আল্লাহর ইবাদতে নিজেদের ব্যয় না করে এই ধরনের সোনালী মুহূর্তগুলোকে পার হতে দিতে পারি না।

    আল্লাহ আমাদের জন্য এই কাজটি সহজ করে দিন এবং এই মহান কয়েক দিনে আমাদের আমলগুলো কবুল করুন।

  • প্রশ্ন-উত্তর: বাই’আহ শব্দের কোন শর’ঈ অর্থ আছে কি?

    প্রশ্ন-উত্তর: বাই’আহ শব্দের কোন শর’ঈ অর্থ আছে কি?

    হাদীসে উল্লিখিত “আল-বাইয়াহ” শব্দের অর্থ ‘খলীফাহ ও উম্মাহর মধ্যে চুক্তি’। “আল-বাইআহ” শব্দটি কি একটি ভাষাগত (হাকীকি) অর্থ নাকি আইনগত (শরঈ) অর্থ?

    “বাইয়াহ” শব্দটি একটি আইনগত (শরঈ) অর্থ, এটি প্রথাগত (শাব্দিক) অর্থ বা একটি নির্দিষ্ট প্রথাগত (ইসতিলাহি) অর্থ নয়। কারণ এর সংজ্ঞা আইনপ্রণেতা (আল্লাহ) দ্বারা নির্দিষ্ট করা হয়েছে, ঐতিহ্য (উরফ) দ্বারা নয়।

    এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, আরবি ভাষায় “বাইয়াহ” বিক্রি (আল-বাই’) এবং ক্রয় (আল-শিরা’) থেকে উদ্ভূত হয়েছে।

    ب ي ع (অক্ষর): Ba ya ‘Aa: একটি জিনিস “সে বিক্রি করেছে”; “সে এটি বিক্রি করে” “এটি বিক্রি করছে” … [মুখতার আল-সিহাহ]

    বা’আহু: বিক্রি করা, ক্রয় করা…[আল-কামুস আল-মুহীত, অভিধান]

    বাই’য়: বিক্রি করা: ক্রয়ের বিপরীত। বিক্রয়: এছাড়াও বিক্রি, যে এছাড়াও বিপরীত শব্দ; জিনিস বিক্রি, ক্রয় ইত্যাদি… [সাধারণ ভাষা]

    ইসলামী আইন (শর’ঈ) বাই’আহ শব্দের একটি ভিন্ন অর্থ নির্দেশ করে যা হল: খলীফা নিয়োগের পদ্ধতি (তারীকা) এবং এই পদ্ধতিটি কুরআন, সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের ঐক্যমতে স্থির করা হয়েছে, যা বাইয়াতের মাধ্যমে করা হয়েছে। সুতরাং খলীফা সেই মুসলমানদের দ্বারা নিযুক্ত হন যারা আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নাহ দ্বারা শাসন করার জন্য তাঁর প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার করেন। মুসলমান বলতে যা বোঝায় তা হল পূর্ববর্তী খলীফার অধীনস্থ মুসলিম নাগরিকরা যদি খিলাফাহ বিদ্যমান থাকে, অথবা যে অঞ্চলে খিলাফাহ প্রতিষ্ঠিত হয় (যদি তা অস্তিত্বহীন হয়) সেই অঞ্চলের মুসলমানরা। কুরআন, সুন্নাহ ও সাহাবাদের ঐক্যমতের দলীল দ্বারা বা’ইয়াহ শব্দের একটি শর’ঈ অর্থ দেওয়া হয়েছে:

    আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ

    “যারা আপনার কাছে আনুগত্যের শপথ করে, তারা তো আল্লাহর কাছে আনুগত্যের শপথ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর রয়েছে।” (আল-ফাতহ: ১০)

    উবাদা ইবনুস সামিত থেকে বুখারি বর্ণনা করেন,

    «بايعْنا رسولَ الله على السمع والطاعة، في المنشط والمكره، وأن لا ننازع الأمر أهله، وأن نقوم أو نقول بالحق حيثما كنا، لا نخاف في الله لومة لائم».

    “আমরা আল্লাহর রসূলকে বা’ইয়াত দিয়েছিলাম যে আমরা যখন সক্রিয় ছিলাম এবং যখন আমরা ক্লান্ত ছিলাম উভয় সময়েই আমরা তাঁর কথা শুনব এবং মানব এবং শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না বা তাঁর অবাধ্য হব না। আমরা যেখানেই থাকি না কেন সত্য বলবো বা সত্যের জন্য দাড়াবো এবং আল্লাহর পথে আমরা দোষারোপকারীদের দোষে ভয় পাই না।”

    কুরআন ও সুন্নাহর টেক্সট থেকে স্পষ্ট যে একজন খলীফা নিয়োগের পদ্ধতি বাই’য়াহর মাধ্যমে। এটা সমগ্র সাহাবায়ে কেরাম বুঝতে পেরেছিলেন যেমনটি খুলাফায়ে রাশেদীনের বাই’আতে স্পষ্ট।

    অতএব, ‘বাই’য়াহ’ শব্দটির একটি শর’ঈ অর্থ রয়েছে।

    ০১ শা’বান ১৪৩৩ হিজরি

    ২০/০৬/২০১২

    শায়খ আতা ইবনু খলীল আবু আল-রাশতা

    আরবী থেকে ইংরেজি খসড়া অনুবাদের উপর ভিত্তি করে লেখা

  • প্রশ্ন-উত্তর: শয়তান কিংবা জ্বিন কি মানুষের উপর নিয়ন্ত্রন নিতে পারে?

    প্রশ্ন-উত্তর: শয়তান কিংবা জ্বিন কি মানুষের উপর নিয়ন্ত্রন নিতে পারে?

    কিছু রোগ আছে যা মানুষকে আক্রান্ত করে এবং তারা জ্বীনকে দায়ী করে। এমন লোকও আছে যারা জ্বিনদের দেখার ও শোনার দাবি করে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে বা তাদের মাধ্যমে মানুষকে আদেশ ও অনেক কাজ সম্পাদন করিয়ে নেয়। এর বাস্তবতা কী? মানুষ ও জ্বিনের মধ্যে কি কোন বস্তুগত, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সম্পর্ক আছে?

    ১. জ্বিন অদৃশ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত; আমরা তাদের দেখতে পারি না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    «يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ»

    “সে তোমাদের দেখে, সে ও তার গোত্র, যে অবস্থা থেকে তোমরা তাদের দেখতে পাও না” (আল আরাফ: ২৭), অর্থাৎ ইবলীস এবং তার সম্প্রদায় বা অন্য কথায়, জ্বীন, এই কারণে যে ইবলীস জ্বিনদের থেকে।

    «إِلَّا إِبْلِيسَ كَانَ مِنَ الْجِنِّ»

    “ইবলীস ব্যতীত – সে জ্বিনদের অন্তর্ভুক্ত” (আল-কাহফ: ৫০)

    ২. তাদের সাথে আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি বা উৎস হল যে তারা আমাদের কাছে ফিসফিস করতে এবং আমাদের প্রলুব্ধ করতে সক্ষম হয় [ওয়াসওয়াসা]। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    «فَوَسْوَسَ لَهُمَا الشَّيْطَانُ»

    “অতএব শয়তান তাদের উভয়কে ফিসফিস করে বলল” (আল-আরাফ : ২০);

    এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেন,

    «فَوَسْوَسَ إِلَيْهِ الشَّيْطَانُ»

    “অতএব শয়তান তাকে ফিসফিস করে বলল” (তোয়া-হা: ১২০), আর শয়তান এখানে ইবলিস এবং সে জ্বিনদের অন্তর্ভুক্ত।

    ৩. শয়তানের মানুষের উপর তাকে বাধ্য করার কোনো কর্তৃত্ব নেই, যদি না মানুষ তার নিজের ইচ্ছায় শয়তানকে অনুসরণ করা বেছে নেয়। মহান আল্লাহ বলেন,

    «وَقَالَ الشَّيْطَانُ لَمَّا قُضِيَ الْأَمْرُ إِنَّ اللَّهَ وَعَدَكُمْ وَعْدَ الْحَقِّ وَوَعَدْتُكُمْ فَأَخْلَفْتُكُمْ وَمَا كَانَ لِيَ عَلَيْكُمْ مِنْ سُلْطَانٍ إِلَّا أَنْ دَعَوْتُكُمْ فَاسْتَجَبْتُمْ لِي»

    “যখন সব কাজের ফায়সলা হয়ে যাবে, তখন শয়তান বলবে: নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে সত্য ওয়াদা দিয়েছিলেন এবং আমি তোমাদের সাথে ওয়াদা করেছি, অতঃপর তা ভঙ্গ করেছি। তোমাদের উপর তো আমার কোনো ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু এতটুকু যে, আমি তোমাদেরকে ডেকেছি, অতঃপর তোমরা আমার কথা মেনে নিয়েছ।” (ইবরাহীম: ২২)

    এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেন,

    «إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ إِلَّا مَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْغَاوِينَ»

    “যারা আমার বান্দা, তাদের উপর তোমার কোন ক্ষমতা নেই; কিন্তু পথভ্রান্তদের মধ্য থেকে যারা তোমার পথে চলে।” (হিজর: ৪২)

    এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেন,

    «فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ • إِنَّهُ لَيْسَ لَهُ سُلْطَانٌ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ • إِنَّمَا سُلْطَانُهُ عَلَى الَّذِينَ يَتَوَلَّوْنَهُ وَالَّذِينَ هُمْ بِهِ مُشْرِكُونَ»

    “অতএব, যখন আপনি কোরআন পাঠ করেন তখন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করুন। তার আধিপত্য চলে না তাদের উপর যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আপন পালন কর্তার উপর ভরসা রাখে। তার আধিপত্য তো তাদের উপরই চলে, যারা তাকে বন্ধু মনে করে এবং যারা তাকে অংশীদার মানে।” (নাহল: ৯৮-১০০)

    ৪. এই মৌলিক সম্পর্ক যা আল্লাহ সুস্পষ্ট করেছেন তা ব্যতীত অন্য যে কোন বস্তুগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার জন্য নির্দিষ্ট দলীল প্রয়োজন। যদি এমন কোনো সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে কোনো টেক্সট বিদ্যমান থাকে তবে আমরা সেই টেক্সট এর দলীল অনুসারে এটি নিশ্চিত করতে পারবো। যেমন জ্বীনদের উপর সুলায়মান (আ)-এর কর্তৃত্ব এবং তাদের আদেশ ও নিষেধ করার ক্ষমতা এমন একটি বিষয় যা সম্পর্কে টেক্সট এসেছে, সুতরাং আমরা এটি নিশ্চিত করতে পারছি। সুলায়মান (আ) সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সূরা আন-নামলে বলেন,

    «قَالَ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ أَيُّكُمْ يَأْتِينِي بِعَرْشِهَا قَبْلَ أَنْ يَأْتُونِي مُسْلِمِينَ • قَالَ عِفْرِيتٌ مِنَ الْجِنِّ أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ تَقُومَ مِنْ مَقَامِكَ وَإِنِّي عَلَيْهِ لَقَوِيٌّ أَمِينٌ»

    “সুলায়মান বললেন, হে পরিষদবর্গ, তারা আত্নসমর্পণ করে আমার কাছে আসার পূর্বে কে বিলকীসের সিংহাসন আমাকে এনে দেবে? জনৈক দৈত্য-জ্বিন বলল, আপনি আপনার স্থান থেকে উঠার পূর্বে আমি তা এনে দেব এবং আমি একাজে শক্তিবান, বিশ্বস্ত।” (নামল: ৩৮-৩৯)

    এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেন,

    «وَلِسُلَيْمَانَ الرِّيحَ غُدُوُّهَا شَهْرٌ وَرَوَاحُهَا شَهْرٌ وَأَسَلْنَا لَهُ عَيْنَ الْقِطْرِ وَمِنَ الْجِنِّ مَنْ يَعْمَلُ بَيْنَ يَدَيْهِ بِإِذْنِ رَبِّهِ وَمَنْ يَزِغْ مِنْهُمْ عَنْ أَمْرِنَا نُذِقْهُ مِنْ عَذَابِ السَّعِيرِ • يَعْمَلُونَ لَهُ مَا يَشَاءُ مِنْ مَحَارِيبَ وَتَمَاثِيلَ وَجِفَانٍ كَالْجَوَابِ وَقُدُورٍ رَاسِيَاتٍ اعْمَلُوا آلَ دَاوُودَ شُكْرًا وَقَلِيلٌ مِنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ»

    “আর আমি সুলায়মানের অধীন করেছিলাম বায়ুকে, যা সকালে এক মাসের পথ এবং বিকালে এক মাসের পথ অতিক্রম করত। আমি তার জন্যে গলিত তামার এক ঝরণা প্রবাহিত করেছিলাম। কিছু জিন তার সামনে কাজ করত তার পালনকর্তার আদেশে। তাদের যে কেউ আমার আদেশ অমান্য করবে, আমি জ্বলন্ত অগ্নির-শাস্তি আস্বাদন করাব।” (সাবা: ১২)

    ৫. আল্লাহর রাসূল (সা) যে কোনো বস্তুগত ঘটনাকে মানবীয় বিষয় হিসাবে বিবেচনা করতেন, যতক্ষণ না কোনো ওহী এসে নিশ্চিত করে যে বিষয়টির সাথে জিনের সম্পর্ক রয়েছে। সমস্ত বিষয়ই মৌলিকভাবে মানবীয় বিষয় হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছিল। উদাহরণ স্বরূপ যদি কোনো মৃত মানুষকে পাওয়া যায় তাহলে মনে করা যেত না যে জ্বীন তাকে হত্যা করেছে যদি না এরকম কোন টেক্সট পাওয়া যায়। খায়বারে পাওয়া মৃত ব্যক্তির ঘটনার ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটেছিল যেখানে অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল যে তাদের মধ্যে কে তাকে হত্যা করেছে এবং এমনকি এক্ষেত্রে জ্বীনের এটি করার সম্ভাবনাও আনা হয়নি।

    মুসলিম তার সহীহতে বর্ণনা করেছেন যে আবদুল্লাহ ইবনে সাহল এবং মুহায়িসা প্রচণ্ড ক্লান্তিতে খায়বারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। যখন মুহায়িসাহ জানতে পারলেন যে আবদুল্লাহ ইবনে সাহলকে হত্যা করে একটি কূপে ফেলে দেওয়া হয়েছে তিনি ইহুদিদের কাছে গিয়ে বললেন, আল্লাহর কসম, তোমরা তাকে হত্যা করেছ!” তারা বলল, “আল্লাহর কসম, আমরা তাকে হত্যা করিনি।” বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে পৌঁছালে তিনি বললেন, “হয় তারা তোমার সঙ্গীর রক্তের টাকা পরিশোধ করবে অথবা তারা যুদ্ধ ঘোষণা করবে (শরীয়াহ বিধি মেনে চলতে অস্বীকার করার দরূন)।” তাই তিনি (সা) তাদের কাছে চিঠি প্রেরণ করে লিখেছিলেন এবং তারা আবার জবাবে বলেছিল, “আল্লাহর কসম, আমরা তাকে হত্যা করিনি।”…ঘটনাটি সর্বজনবিদিত। আমাদের বর্তমান আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, জ্বীনের কোনো ভূমিকার প্রশ্ন কোনোভাবেই আলোচনায় আসেনি।

    ৬. তাই যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো ঘটনা সম্পর্কিত বস্তুগত সম্পর্কের উল্লেখ করে কোনো টেক্সট পাওয়া না যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত জ্বীন ও মানুষের মধ্যে সম্পর্ক ফিসফিস ও প্ররোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। অধিকন্তু, যেহেতু রসূল (সা) এর বাণী হল ওহীর সীলমোহর, তারপরে ওহী বন্ধ হয়ে গিয়েছে এবং নতুন কোনও টেক্সট আসবে না, তাই জ্বিন ও মানুষের মধ্যে কোনো বৈষয়িক সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে না। শুধু ফিসফিস ও প্ররোচনার সম্ভাবনাই অবশিষ্ট থাকে এবং আমরা যেমন বলেছি মানুষের উপর জ্বীনের ফিসফিস করে কর্তৃত্ব নেয়ার শক্তি নেই যদি না মানুষ তার নিজের ইচ্ছামত সেই ফিসফিসানির ডাকে সাড়া দেয়।

    খুলাফা আল-রাশিদীনের সময়ে বস্তুগত বিষয়গুলো এভাবেই দেখা হতো, কোনো বস্তুগত ঘটনা ঘটলে, তা হত্যা, চুরি, প্রতারণা কিংবা প্রতারণাই হোক না কেন, মন জ্বীনের দিকে চলে যেত না। এটি সর্বদা মানুষের দিকে যেত, কারণ জ্বীনের সাথে সম্পর্ক হল ফিসফিস ও প্ররোচনার, যদি না অন্যথা বলার জন্য টেক্সট বিদ্যমান থাকে। যেহেতু রাসূল (সা) এর পরে কোনো নির্দিষ্ট গ্রন্থ আসতে পারে না, তাই সমস্ত বস্তুগত ঘটনা মানুষের থেকে, জিন থেকে নয়, কারণ তাদের জগৎ আমাদের থেকে আলাদা, এবং আমাদের সাথে তাদের সম্পর্ক নিভৃতে ফিসফিস করার সাথে সম্পর্কিত।

    তাই কেউ অসুস্থ হলে জ্বীনের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। অসুস্থতার চিকিৎসা ইসলামী হুকুম অনুযায়ী অর্থাৎ থেরাপির মাধ্যমে করতে হবে। এই চিকিৎসা হতে পারে বস্তুগত (ঔষধ) অথবা দুআ ও রুকিয়ার মাধ্যমে।

    প্রথমটির উদাহরণ, যেমন উসামা ইবনে শারীক থেকে হাদীসে এসেছে যে তিনি বলেছেন, “আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাহাবিদের কাছে এসেছিলাম এমন যেন তাদের মাথায় পাখি ছিল। আমি তাদের সালাম দিয়ে বসলাম। অতঃপর বিভিন্ন এলাকা থেকে বেদুইনরা এসে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কি ওষুধ খাব? তিনি উত্তরে বললেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি যে তিনি তার প্রতিষেধক সৃষ্টি না করেছেন, একমাত্র অসুস্থতা, মৃত্যু ব্যতীত।’ (আবু দাউদ)

    এর পরের উদাহরণ, মুমিনদের মা আয়েশা (রা.) থেকে মুসলিম দ্বারা বর্ণিত হাদিসে যা এসেছে, “আল্লাহর রসূল এই মন্ত্রটি (রুকিয়াহ) পাঠ করতেন, ‘প্রভু। মানুষ, কষ্ট দূর করো তোমার হাতেই নিরাময়; আপনি ছাড়া তাকে উপশম করার আর কেউ নেই।’” এটি এবং কুরআন ও সুন্নাহর অনুরূপ প্রার্থনা বা তাদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যা ব্যবহার করা যেতে পারে।

    যারা অসুস্থতা নিরাময়ের জন্য জ্বীনের সাথে বস্তুগত সম্পর্ক থাকার দাবি করে এবং তাদের আশ্রয় নেয়ার দাবি করে, সেকল বিষয় প্রতারকদের প্রতারণা এবং যারা সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে তাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে।

    ১১/০৬/২০০৯

  • ধার্মিকতা একটি প্রবৃত্তি

    ধার্মিকতা একটি প্রবৃত্তি

    মানুষের মধ্যে জীবনী শক্তি আছে যা তাকে কাজের ক্ষেত্রে চালিত করে এবং তুষ্টি কামনা করে। এই জীবন শক্তির দুটি দিক রয়েছে: তাদের মধ্যে একটির অনিবার্য তুষ্টি প্রয়োজন, এবং এটি তুষ্ট না হলে মানুষ মারা যাবে। এটি জৈবিক চাহিদা, যেমন খাওয়া, পান করা এবং প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া। দ্বিতীয়টিরও তুষ্টি প্রয়োজন, কিন্তু তা তুষ্ট না হওয়ার কারণে মানুষ মরে না, যদিও তা তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত সে তাড়িত থাকবে; আর এটি হল প্রবৃত্তি, যা স্বাভাবিক অনুভূতির মাধ্যমে ক্রিয়াশীল থাকে এবং উদগীরণের তুষ্টি অন্বেষন করে। যাইহোক, তাড়নাভেদে প্রবৃত্তি জৈবিক চাহিদার থেকে ভিন্ন। এর কারণ হল জৈবিক চাহিদা ভিতর থেকে তাড়িত হয়, আর প্রবৃত্তিকে তাড়িত করে কিংবা এর তুষ্টির প্রয়োজন অনুভূত হয় এমন চিন্তা অথবা ভৌত বাস্তবতা দ্বারা যা তুষ্টির জন্য আবেগকে উদ্দীপিত করে। প্রজনন প্রবৃত্তি (গারীজাত-আল-নাও’) উদাহরণস্বরূপ, একটি সুন্দর মেয়ের কথা বা যৌন সম্পর্কিত কিছু চিন্তা করে কিংবা একটি সুন্দরী মেয়েকে দেখে বা যৌন সম্পর্কিত কিছু দেখে উত্তেজিত হয়। যদি এরূপ কিছু না ঘটে থাকে, তাহলে প্রবৃত্তিকে উত্তেজিত করার মতো কিছুই ঘটবে না। একইভাবে ধার্মিকতার প্রবৃত্তি (গারীজাত আল-তাদাউয়্যুন) আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আয়াত, কেয়ামত বা এর সাথে সম্পর্কিত কিছু, আসমান ও জমিনে আল্লাহর নিখুঁত সৃষ্টি অথবা এর সাথে সম্পর্কিত কিছু সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে আন্দোলিত হয়। এভাবে, প্রবৃত্তির প্রভাব দেখা দেয় যখন এমন কিছু থাকে যা একে তাড়িত করে। যা একে তাড়িত করে তার অনুপস্থিতির ক্ষেত্রে, কিংবা যা একে উত্তেজিত করে সে বিষয়টি এমনভাবে ব্যাখ্যা করলে তথা যা ব্যক্তির প্রবৃত্তিকে উদ্দীপিত করে তার মূল বৈশিষ্ট্যের ধারণাটি হারিয়ে ফেললে আমরা এর প্রভাব আর দেখতে পাই না।

    ধর্মীয় প্রবৃত্তি প্রাকৃতিক এবং অপরিবর্তনীয়, এটি স্রষ্টা ও পালনকর্তার প্রতি চাহিদার অনুভূতি থেকে আগত, তা সে স্রষ্টা ও পালনকর্তার ব্যাপারে ধারণা যা-ই হোক না কেন।

    এই অনুভূতি মানুষ হিসাবে তার মধ্যে সহজাত, সে স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করুক কিংবা তাকে অবিশ্বাস করুক, কিংবা সে বস্তু বা প্রকৃতিতে বিশ্বাস করুক। মানুষের মধ্যে এই অনুভূতির উপস্থিতি অনিবার্য, কারণ এটি একটি মানুষের মধ্যে তার সৃষ্টির অংশ হিসাবে সৃষ্ট; এবং তার থেকে একে আলাদা বা বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। এটাই ধার্মিকতা।

    এই ধার্মিকতার বহিঃপ্রকাশ হল স্রষ্টা ও পালনকর্তা বলে যাকে বিশ্বাস করা হয় কিংবা স্রষ্টা ও পালনকর্তাকে অবতার হিসেবে যার মধ্যে কল্পনা করা হয় তার প্রতি চুড়ান্ত ভক্তি প্রদর্শন (তাকদীস)। এই তাকদীস তার প্রকৃত রূপে আবির্ভূত হতে পারে, তখন একে বলা হয় উপাসনা (’ইবাদাহ)। এটি হতে পারে কোনো নিম্নতর রূপে প্রদর্শিত হতে পারে, যেমন শ্রদ্ধা ও বন্দনা।

    তাকদীস হলো মানুষের অন্তরের চূড়ান্ত ভক্তির বহিঃপ্রকাশ। এটা ভীতি থেকে নয়, বরং ধার্মিকতা থেকে। কারণ ভয়ের প্রকাশ তাকদীস নয়, বরং চাটুকারি, সুরক্ষার রেহাইপ্রাপ্তি; এসব তাকদীস-এর বাস্তবতার বিরোধী। সুতরাং, তাকদীস ধার্মিকতার প্রকাশ, ভয়ের নয়। অতএব, ধার্মিকতা বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি থেকে স্বাধীন একটি প্রবৃত্তি, আর ভয় হচ্ছে (বেঁচে থাকার প্রবৃত্তির) প্রকাশগুলোর মধ্যে একটি। এই কারণেই মানুষ ধার্মিক হয়, এবং আমরা তাকে কিছু না কিছু উপাসনা করতে দেখি যখন থেকে আল্লাহ তাকে পৃথিবীতে নিয়ে এসেছেন। সে সূর্য, গ্রহ, আগুন ও মূর্তি পূজা করেছে। সে আল্লাহর ইবাদতও করেছে। আমরা কোনো যুগে, কোনো জাতি বা সম্প্রদায়কে কোনো না কোনো কিছুর উপাসনা করা ছাড়া দেখি না। এমনকি জনগণ, যখন কর্তৃপক্ষ তাদের ধার্মিকতা ত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল, তা তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও তারা ধার্মিক ছিল এবং কিছু না কিছুর উপাসনা করেছে। ইবাদত-বন্দেগি করার প্রয়াসে তাদের অনেক দুর্ভোগের শিকার হতে হয়েছে। এমন কোন শক্তি নেই যা মানুষের কাছ থেকে ধার্মিকতাকে ছিনিয়ে নিতে পারে, তার থেকে সৃষ্টিকর্তার তাকদীস (তথা চুড়ান্ত ভক্তি প্রদর্শন) দূর করতে পারে এবং তাকে উপাসনা থেকে বিরত রাখতে পারে। এটি একটি সময়ের জন্য (বড়জোড়) দমন করতে পারবে। এর কারণ হল উপাসনা (’ইবাদাত) হল ধার্মিকতার একটি স্বাভাবিক প্রকাশ, যা মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি।

    উপাসনার অনুপস্থিতি বা উপাসনাকে উপহাস করার যে বিষয়টি কিছু নাস্তিকদের মধ্যে দেখা যায়, এ ধরনের লোকেদের মধ্যে ধার্মিকতার প্রবৃত্তি আল্লাহর উপাসনা থেকে সৃষ্টির উপাসনার দিকে সরে গেছে। প্রকৃতি, বীরত্বপূর্ণ মহান বিষয়াদি এবং অনুরূপ ক্ষেত্রে তাদের তাকদীস (তথা চুড়ান্ত ভক্তি প্রদর্শন)-এর প্রকাশ ঘটেছে। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বিক্ষিপ্ততা, বিকৃতি এবং বিষয়াদির ভুল ব্যাখ্যাকে ব্যবহার করা হয়েছে।

    অতএব, কুফর (কুফর) ঈমানের (বিশ্বাস) চেয়েও কঠিন, কারণ এটি মানুষকে তার সহজাত স্বভাব (ফিতরাহ) থেকে বিক্ষিপ্ত করে এবং এর প্রকৃত প্রকাশ থেকে সরিয়ে রাখে। এর জন্য অনেক বড় প্রচেষ্টা প্রয়োজন হয়। তার সহজাত প্রকৃতির (ফিতরাহ) জন্য যা প্রয়োজনীয় তা থেকে দূরে সরে যাওয়া মানুষের পক্ষে কতইনা কঠিন!

    অতএব, আমরা দেখি নাস্তিকদের কাছে সত্য (হক্ক) প্রকাশ পেলে, এবং যখন তারা আল্লাহর অস্তিত্ব অনুভব করে অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা দ্বারা যখন তাঁর অস্তিত্ব নিশ্চিতভাবে উপলব্ধি করে, দেখবেন তারা সাচ্ছন্দ্য ও প্রশান্তি সহকারে ঈমানের দিকে ছুটে যায়; এবং একটি ভারী দুঃস্বপ্ন যা তাদের বোঝা আকারে চেপে ছিল, তা অদৃশ্য হয়ে যায়। এ ধরনের লোকদের ঈমান শক্তিশালী এবং অবিচল হয়, কারণ তা সংবেদনশীলতা এবং নিশ্চিত হবার মাধ্যমে আসে। এর কারণ হল তাদের চিন্তা তাদের আবেগের সাথে সংযুক্ত থাকে, তাই তারা যখন নিশ্চিতভাবে আল্লাহর অস্তিত্ব উপলব্ধি করে, তাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কে তাদের একটি অনুভূতি তৈরি হয়। এভাবে তাদের সহজাত প্রকৃতি (ফিতরাহ) তাদের চিন্তার সাথে মিলিত হয়, তাই শক্তিশালী ঈমান তৈরি হয়।

    Taken from the book “Islamic Thought”

  • ম্যাকার্থিজমের পুনঃঅনুমোদন

    ম্যাকার্থিজমের পুনঃঅনুমোদন

    ফরেন ইন্টেলিজেন্স সার্ভিলেন্স অ্যাক্ট (FISA) এর ৭০২ ধারা পুনঃঅনুমোদিত করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের সাম্প্রতিক অনুমোদন নাগরিক স্বাধীনতা ও জাতীয় নিরাপত্তাকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই বিতর্কিত নজরদারি কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক স্বাধীনতা সংস্থাগুলির মধ্যে উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলিকে বিচারিক ওয়ারেন্ট ছাড়াই ইলেকট্রনিক নজরদারি পরিচালনা করতে সুযোগ করে দেয় ৷ ৬০-৩৪ ভোটে বিলটির পাস, জাতীয় নিরাপত্তা এবং মার্কিন নাগরিক স্বাধীনতার মধ্যে চলমান উত্তেজনাকে তুলে ধরছে।

    ম্যাককার্থিজম, যা Second Red Scare নামেও পরিচিত, যা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৪০-৫০ সাল মধ্যকার রাজনৈতিক দমন-নিপীড়ন এবং ৫০এর দশকের শেষের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মার্কিন প্রতিষ্ঠানের উপর কথিত কমিউনিস্ট ও সোভিয়েত প্রভাব এবং সোভিয়েত গুপ্তচরবৃত্তির ভয় ছড়ানোর একটি প্রচারণা। অসংখ্য শিক্ষক, শিল্পী, বিজ্ঞানী, প্রযোজক ও পরিচালকদের এই উইচহান্ট এর শিকার হতে হয়েছিল। ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝির পরে, মার্কিন সিনেটর জোসেফ ম্যাককার্থি, যিনি প্রচারণার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, ধীরে ধীরে সে তার জনপ্রিয়তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা হারায় যখন তার বেশ কয়েকটি অভিযোগ মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়। প্রধান বিচারপতি আর্ল ওয়ারেনের অধীনে ইউএস সুপ্রিম কোর্ট নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের উপর একাধিক রায় দেয় যা বেশ কয়েকটি মূল আইন এবং আইন প্রণয়ন নির্দেশকে বাতিল করে এবং Second Red Scare এর অবসান ঘটাতে সাহায্য করে। পরবর্তীতে অন্যান্য মার্কিন সরকারও একই ধরণের গুপ্তচরবৃত্তির প্রচেষ্টা অব্যহত রেখেছে। তারই ধারাবাহিকতা Section 702 এর আলোচনা এসেছে।

    বর্তমানে, ধারা ৭০২ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলিকে মার্কিন ভূখণ্ডের বাইরে মার্কিন নাগরিকরা বিদেশিদের সাথে কিভাবে যোগাযোগ করে তার উপর নজরদারির কর্তৃত্ব দেয়। মূলত, এই বিধানটি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলিকে মার্কিন নাগরিক এবং অ-নাগরিকদের মধ্যে যোগাযোগ আটকাতে এবং সংগ্রহ করতে সুযোগ করে দেয়, সেক্ষেত্রে মার্কিন নাগরিক নজরদারির লক্ষ্য হোক বা না হোক। এর মধ্যে ফোন কল, ইমেল, টেক্সট মেসেজ বা অন্য যেকোনো ধরনের যোগাযোগ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

    অনিয়ন্ত্রিত নজরদারি, অপব্যবহার এবং গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একেবারেই নতুন নয়; বরং, এটাই মূল ধারা। “নিরাপত্তার উদ্বেগ” দেখিয়ে ৭০২ ধারা পুনঃঅনুমোদিত করার সিদ্ধান্তটি মার্কিন নাগরিকদের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ন্যাশনাল কাউন্টার টেরোরিজম সেন্টারের ডিরেক্টর ক্রিস্টিন আবিজাইদ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিষয়ক সিনেট কমিটিকে সম্বোধন করে বলেন, “গত মাসের ঘটনাগুলো থেকে প্রমাণিত যে, সন্ত্রাসবাদের হুমকির পরিধি অত্যন্ত ডাইনামিক এবং আমাদের দেশকে [সন্ত্রাস এর বিরুদ্ধে] অবশ্যই মৌলিক বিষয়গুলো রক্ষা করতে হবে।” তিনি ‘ইসরায়েল’-এর উপর হামাসের আক্রমণের কথা বারবার উল্লেখ করেছেন এবং কংগ্রেসকে “এই গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃপক্ষকে পুনঃঅনুমোদিত করার” আহ্বান জানিয়েছেন।

    অতএব, ৭০২ ধারা তাদের ধর্ম, জাতিগত কিংবা রাজনৈতিক অভিযোগের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীগুলির নজরদারী করার জন্য প্রয়োজনীয় অজুহাত প্রদান করা অব্যাহত রাখবে, এবং এটি  ব্যক্তি স্বাধীনতাকে যে পদদলিত করে তার ব্যপারে তারা উদ্বিগ্ন নয়। যখন নির্বাচিত কর্মকর্তারা প্যালেস্টাইনপন্থী গোষ্ঠীগুলির ব্যাপারে তদন্তের আহ্বান জানান তখন সরকারের নজরদারি ক্ষমতা বাড়ানোর চাপ আরো বাড়তে থাকে। ইতোমধ্যে ভার্জিনিয়ায়, অ্যাটর্নি জেনারেল ফিলিস্তিনের তহবিল সংগ্রহের কার্যক্রমের তদন্ত শুরু করেছেন, এতে অভিযোগ রয়েছে যে এটি হামাসকে সমর্থন করে। স্পষ্টতই, পুনঃঅনুমোদনের পিছনে রয়েছে ভিন্নমতকে চুপ করিয়ে দেওয়া এবং বিরোধিতাকে দমন করার প্রচেষ্টা, বিশেষ করে গাজায় চলমান ঘটনাগুলির বিষয়ে। মার্কিন প্রশাসনের প্রতি ক্রমবর্ধমান হতাশা এবং গাজায় গণহত্যায় তার ভূমিকার মধ্যে সাম্প্রতিক ভোটটি আসে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনিয়ন্ত্রিত সরকারী নজরদারি বজায় রাখতে হবে এবং এটি তারা যেকোনো মূল্যে করবে। এটি হল আমেরিকার নীতি এবং ইসলামের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে মুসলমানদের বশীভূত করার একটি উপায়। মুসলিম হিসেবে, আমরা এই কঠোর পদক্ষেপগুলোকে আমাদের ভীত করবার অনুমতি দিতে পারি না এবং আমাদের অবশ্যই হক কথা বলতে হবে। ইসলামের আলো অবশ্যই বিরাজ করবে।

    আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    [إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُواْ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ لِيَصُدُّواْ عَن سَبِيلِ اللّهِ فَسَيُنفِقُونَهَا ثُمَّ تَكُونُ عَلَيْهِمْ حَسْرَةً ثُمَّ يُغْلَبُونَ وَالَّذِينَ كَفَرُواْ إِلَى جَهَنَّمَ يُحْشَرُونَ]

    নিঃসন্দেহ যারা কুফরী করে তারা তাদের ধনসম্পত্তি খরচ করে আল্লাহ্‌র পথ থেকে বাধা দেবার জন্যে। তারা এটা খরচ করবেই, তারপর এটি হবে তাদের জন্য মনস্তাপের কারণ, তারপর তাদের পরাজিত করা হবে। আর যারা কুফরী করে তাদের জাহান্নামের দিকে একত্রিত করা হবে [আনফাল: ৩৬]

    উৎস: হাইছাম বিন ছাবিত কর্তৃক লিখিত প্রবন্ধ