প্রশ্ন-উত্তর: শয়তান কিংবা জ্বিন কি মানুষের উপর নিয়ন্ত্রন নিতে পারে?

কিছু রোগ আছে যা মানুষকে আক্রান্ত করে এবং তারা জ্বীনকে দায়ী করে। এমন লোকও আছে যারা জ্বিনদের দেখার ও শোনার দাবি করে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে বা তাদের মাধ্যমে মানুষকে আদেশ ও অনেক কাজ সম্পাদন করিয়ে নেয়। এর বাস্তবতা কী? মানুষ ও জ্বিনের মধ্যে কি কোন বস্তুগত, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সম্পর্ক আছে?

১. জ্বিন অদৃশ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত; আমরা তাদের দেখতে পারি না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

«يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ»

“সে তোমাদের দেখে, সে ও তার গোত্র, যে অবস্থা থেকে তোমরা তাদের দেখতে পাও না” (আল আরাফ: ২৭), অর্থাৎ ইবলীস এবং তার সম্প্রদায় বা অন্য কথায়, জ্বীন, এই কারণে যে ইবলীস জ্বিনদের থেকে।

«إِلَّا إِبْلِيسَ كَانَ مِنَ الْجِنِّ»

“ইবলীস ব্যতীত – সে জ্বিনদের অন্তর্ভুক্ত” (আল-কাহফ: ৫০)।

২. তাদের সাথে আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি বা উৎস হল যে তারা আমাদের কাছে ফিসফিস করতে এবং আমাদের প্রলুব্ধ করতে সক্ষম হয় [ওয়াসওয়াসা]। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

«فَوَسْوَسَ لَهُمَا الشَّيْطَانُ»

“অতএব শয়তান তাদের উভয়কে ফিসফিস করে বলল” (আল-আরাফ : ২০);

এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেন,

«فَوَسْوَسَ إِلَيْهِ الشَّيْطَانُ»

“অতএব শয়তান তাকে ফিসফিস করে বলল” (তোয়া-হা: ১২০), আর শয়তান এখানে ইবলিস এবং সে জ্বিনদের অন্তর্ভুক্ত।

৩. শয়তানের মানুষের উপর তাকে বাধ্য করার কোনো কর্তৃত্ব নেই, যদি না মানুষ তার নিজের ইচ্ছায় শয়তানকে অনুসরণ করা বেছে নেয়। মহান আল্লাহ বলেন,

«وَقَالَ الشَّيْطَانُ لَمَّا قُضِيَ الْأَمْرُ إِنَّ اللَّهَ وَعَدَكُمْ وَعْدَ الْحَقِّ وَوَعَدْتُكُمْ فَأَخْلَفْتُكُمْ وَمَا كَانَ لِيَ عَلَيْكُمْ مِنْ سُلْطَانٍ إِلَّا أَنْ دَعَوْتُكُمْ فَاسْتَجَبْتُمْ لِي»

“যখন সব কাজের ফায়সলা হয়ে যাবে, তখন শয়তান বলবে: নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে সত্য ওয়াদা দিয়েছিলেন এবং আমি তোমাদের সাথে ওয়াদা করেছি, অতঃপর তা ভঙ্গ করেছি। তোমাদের উপর তো আমার কোনো ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু এতটুকু যে, আমি তোমাদেরকে ডেকেছি, অতঃপর তোমরা আমার কথা মেনে নিয়েছ।” (ইবরাহীম: ২২)

এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেন,

«إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ إِلَّا مَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْغَاوِينَ»

“যারা আমার বান্দা, তাদের উপর তোমার কোন ক্ষমতা নেই; কিন্তু পথভ্রান্তদের মধ্য থেকে যারা তোমার পথে চলে।” (হিজর: ৪২)

এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেন,

«فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ • إِنَّهُ لَيْسَ لَهُ سُلْطَانٌ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ • إِنَّمَا سُلْطَانُهُ عَلَى الَّذِينَ يَتَوَلَّوْنَهُ وَالَّذِينَ هُمْ بِهِ مُشْرِكُونَ»

“অতএব, যখন আপনি কোরআন পাঠ করেন তখন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করুন। তার আধিপত্য চলে না তাদের উপর যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আপন পালন কর্তার উপর ভরসা রাখে। তার আধিপত্য তো তাদের উপরই চলে, যারা তাকে বন্ধু মনে করে এবং যারা তাকে অংশীদার মানে।” (নাহল: ৯৮-১০০)

৪. এই মৌলিক সম্পর্ক যা আল্লাহ সুস্পষ্ট করেছেন তা ব্যতীত অন্য যে কোন বস্তুগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার জন্য নির্দিষ্ট দলীল প্রয়োজন। যদি এমন কোনো সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে কোনো টেক্সট বিদ্যমান থাকে তবে আমরা সেই টেক্সট এর দলীল অনুসারে এটি নিশ্চিত করতে পারবো। যেমন জ্বীনদের উপর সুলায়মান (আ)-এর কর্তৃত্ব এবং তাদের আদেশ ও নিষেধ করার ক্ষমতা এমন একটি বিষয় যা সম্পর্কে টেক্সট এসেছে, সুতরাং আমরা এটি নিশ্চিত করতে পারছি। সুলায়মান (আ) সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সূরা আন-নামলে বলেন,

«قَالَ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ أَيُّكُمْ يَأْتِينِي بِعَرْشِهَا قَبْلَ أَنْ يَأْتُونِي مُسْلِمِينَ • قَالَ عِفْرِيتٌ مِنَ الْجِنِّ أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ تَقُومَ مِنْ مَقَامِكَ وَإِنِّي عَلَيْهِ لَقَوِيٌّ أَمِينٌ»

“সুলায়মান বললেন, হে পরিষদবর্গ, তারা আত্নসমর্পণ করে আমার কাছে আসার পূর্বে কে বিলকীসের সিংহাসন আমাকে এনে দেবে? জনৈক দৈত্য-জ্বিন বলল, আপনি আপনার স্থান থেকে উঠার পূর্বে আমি তা এনে দেব এবং আমি একাজে শক্তিবান, বিশ্বস্ত।” (নামল: ৩৮-৩৯)

এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেন,

«وَلِسُلَيْمَانَ الرِّيحَ غُدُوُّهَا شَهْرٌ وَرَوَاحُهَا شَهْرٌ وَأَسَلْنَا لَهُ عَيْنَ الْقِطْرِ وَمِنَ الْجِنِّ مَنْ يَعْمَلُ بَيْنَ يَدَيْهِ بِإِذْنِ رَبِّهِ وَمَنْ يَزِغْ مِنْهُمْ عَنْ أَمْرِنَا نُذِقْهُ مِنْ عَذَابِ السَّعِيرِ • يَعْمَلُونَ لَهُ مَا يَشَاءُ مِنْ مَحَارِيبَ وَتَمَاثِيلَ وَجِفَانٍ كَالْجَوَابِ وَقُدُورٍ رَاسِيَاتٍ اعْمَلُوا آلَ دَاوُودَ شُكْرًا وَقَلِيلٌ مِنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ»

“আর আমি সুলায়মানের অধীন করেছিলাম বায়ুকে, যা সকালে এক মাসের পথ এবং বিকালে এক মাসের পথ অতিক্রম করত। আমি তার জন্যে গলিত তামার এক ঝরণা প্রবাহিত করেছিলাম। কিছু জিন তার সামনে কাজ করত তার পালনকর্তার আদেশে। তাদের যে কেউ আমার আদেশ অমান্য করবে, আমি জ্বলন্ত অগ্নির-শাস্তি আস্বাদন করাব।” (সাবা: ১২)

৫. আল্লাহর রাসূল (সা) যে কোনো বস্তুগত ঘটনাকে মানবীয় বিষয় হিসাবে বিবেচনা করতেন, যতক্ষণ না কোনো ওহী এসে নিশ্চিত করে যে বিষয়টির সাথে জিনের সম্পর্ক রয়েছে। সমস্ত বিষয়ই মৌলিকভাবে মানবীয় বিষয় হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছিল। উদাহরণ স্বরূপ যদি কোনো মৃত মানুষকে পাওয়া যায় তাহলে মনে করা যেত না যে জ্বীন তাকে হত্যা করেছে যদি না এরকম কোন টেক্সট পাওয়া যায়। খায়বারে পাওয়া মৃত ব্যক্তির ঘটনার ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটেছিল যেখানে অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল যে তাদের মধ্যে কে তাকে হত্যা করেছে এবং এমনকি এক্ষেত্রে জ্বীনের এটি করার সম্ভাবনাও আনা হয়নি।

মুসলিম তার সহীহতে বর্ণনা করেছেন যে আবদুল্লাহ ইবনে সাহল এবং মুহায়িসা প্রচণ্ড ক্লান্তিতে খায়বারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। যখন মুহায়িসাহ জানতে পারলেন যে আবদুল্লাহ ইবনে সাহলকে হত্যা করে একটি কূপে ফেলে দেওয়া হয়েছে তিনি ইহুদিদের কাছে গিয়ে বললেন, আল্লাহর কসম, তোমরা তাকে হত্যা করেছ!” তারা বলল, “আল্লাহর কসম, আমরা তাকে হত্যা করিনি।” বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে পৌঁছালে তিনি বললেন, “হয় তারা তোমার সঙ্গীর রক্তের টাকা পরিশোধ করবে অথবা তারা যুদ্ধ ঘোষণা করবে (শরীয়াহ বিধি মেনে চলতে অস্বীকার করার দরূন)।” তাই তিনি (সা) তাদের কাছে চিঠি প্রেরণ করে লিখেছিলেন এবং তারা আবার জবাবে বলেছিল, “আল্লাহর কসম, আমরা তাকে হত্যা করিনি।”…ঘটনাটি সর্বজনবিদিত। আমাদের বর্তমান আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, জ্বীনের কোনো ভূমিকার প্রশ্ন কোনোভাবেই আলোচনায় আসেনি।

৬. তাই যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো ঘটনা সম্পর্কিত বস্তুগত সম্পর্কের উল্লেখ করে কোনো টেক্সট পাওয়া না যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত জ্বীন ও মানুষের মধ্যে সম্পর্ক ফিসফিস ও প্ররোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। অধিকন্তু, যেহেতু রসূল (সা) এর বাণী হল ওহীর সীলমোহর, তারপরে ওহী বন্ধ হয়ে গিয়েছে এবং নতুন কোনও টেক্সট আসবে না, তাই জ্বিন ও মানুষের মধ্যে কোনো বৈষয়িক সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে না। শুধু ফিসফিস ও প্ররোচনার সম্ভাবনাই অবশিষ্ট থাকে এবং আমরা যেমন বলেছি মানুষের উপর জ্বীনের ফিসফিস করে কর্তৃত্ব নেয়ার শক্তি নেই যদি না মানুষ তার নিজের ইচ্ছামত সেই ফিসফিসানির ডাকে সাড়া দেয়।

খুলাফা আল-রাশিদীনের সময়ে বস্তুগত বিষয়গুলো এভাবেই দেখা হতো, কোনো বস্তুগত ঘটনা ঘটলে, তা হত্যা, চুরি, প্রতারণা কিংবা প্রতারণাই হোক না কেন, মন জ্বীনের দিকে চলে যেত না। এটি সর্বদা মানুষের দিকে যেত, কারণ জ্বীনের সাথে সম্পর্ক হল ফিসফিস ও প্ররোচনার, যদি না অন্যথা বলার জন্য টেক্সট বিদ্যমান থাকে। যেহেতু রাসূল (সা) এর পরে কোনো নির্দিষ্ট গ্রন্থ আসতে পারে না, তাই সমস্ত বস্তুগত ঘটনা মানুষের থেকে, জিন থেকে নয়, কারণ তাদের জগৎ আমাদের থেকে আলাদা, এবং আমাদের সাথে তাদের সম্পর্ক নিভৃতে ফিসফিস করার সাথে সম্পর্কিত।

তাই কেউ অসুস্থ হলে জ্বীনের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। অসুস্থতার চিকিৎসা ইসলামী হুকুম অনুযায়ী অর্থাৎ থেরাপির মাধ্যমে করতে হবে। এই চিকিৎসা হতে পারে বস্তুগত (ঔষধ) অথবা দুআ ও রুকিয়ার মাধ্যমে।

প্রথমটির উদাহরণ, যেমন উসামা ইবনে শারীক থেকে হাদীসে এসেছে যে তিনি বলেছেন, “আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাহাবিদের কাছে এসেছিলাম এমন যেন তাদের মাথায় পাখি ছিল। আমি তাদের সালাম দিয়ে বসলাম। অতঃপর বিভিন্ন এলাকা থেকে বেদুইনরা এসে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কি ওষুধ খাব? তিনি উত্তরে বললেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি যে তিনি তার প্রতিষেধক সৃষ্টি না করেছেন, একমাত্র অসুস্থতা, মৃত্যু ব্যতীত।’ (আবু দাউদ)

এর পরের উদাহরণ, মুমিনদের মা আয়েশা (রা.) থেকে মুসলিম দ্বারা বর্ণিত হাদিসে যা এসেছে, “আল্লাহর রসূল এই মন্ত্রটি (রুকিয়াহ) পাঠ করতেন, ‘প্রভু। মানুষ, কষ্ট দূর করো তোমার হাতেই নিরাময়; আপনি ছাড়া তাকে উপশম করার আর কেউ নেই।’” এটি এবং কুরআন ও সুন্নাহর অনুরূপ প্রার্থনা বা তাদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যা ব্যবহার করা যেতে পারে।

যারা অসুস্থতা নিরাময়ের জন্য জ্বীনের সাথে বস্তুগত সম্পর্ক থাকার দাবি করে এবং তাদের আশ্রয় নেয়ার দাবি করে, সেকল বিষয় প্রতারকদের প্রতারণা এবং যারা সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে তাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে।

১১/০৬/২০০৯

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply