Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • বাংলাদেশকে ঘিরে সাম্রাজ্যবাদীদের পরিকল্পনার সার সংক্ষেপ ও খিলাফতের সমাধান

    বাংলাদেশকে ঘিরে সাম্রাজ্যবাদীদের সমস্ত পরিকল্পনা আজ জাতির সামনে দিবালোকের মতো স্পষ্ট। আমাদের অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে এসব পরিকল্পনার মুখোশ জাতির সামনে উন্মোচন করতে হবে। এর সার সংক্ষেপ নিম্নরুপ:

    ১. ক্রুসেডারদের মোড়ল আমেরিকা এ অঞ্চলে ইসলামী খিলাফতের পুনরুত্থান ঠেকানোর পরিকল্পনা করছে এবং তার নিয়ন্ত্রণাধীন রাষ্ট্রসমূহের বলয় দ্বারা চীনকে ঘীরে রাখতে চাচ্ছে। এ অঞ্চলে তার ঘনঘন সামরিক মহড়া এবং নানা অজুহাতে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি, এ পরিকল্পনারই অংশ, যা এখন তার পররাষ্ট্রনীতির প্রধান ভিত্তি, যা “এশিয়ান পিভট” (Asian pivot) নামে পরিচিত। বাংলাদেশের সাথে মার্কিনীদের কৌশলগত ও নিরাপত্তা সংলাপ, তার এ নীতি বাস্তবায়নের একটি অংশ।

    ২. তাছাড়া, ভারত যাতে তার হয়ে কাজ করে, এজন্য ভারতকে নিয়ে মার্কিন নীতি হচ্ছে – ভারতকে তার আওতাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করা; যাকে তারা “কৌশলগত অংশীদারিত্ব” বলে উল্লেখ করছে। অর্থাৎ, ভারতকে তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছাড় দেয়া কিংবা ফায়দা লুটের সুযোগ করে দেয়া, কারণ, আমেরিকা অনুধাবন করতে পেরেছে যে, এটা ছাড়া ভারতকে ঐতিহাসিকভাবে চলমান বৃটিশ প্রভাব বলয় (বিশেষতঃ কংগ্রেস পার্টির মাধ্যমে জারি রাখা) থেকে বের করে আনা যাবে না।

    ৩. কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং ভারতকে ফায়দা লুটের সুযোগ করে দেয়ার মার্কিন এ নীতির অর্থ হচ্ছে, ভারতের প্রতিবেশী দুই মুসলিম দেশ অর্থাৎ পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে, বশীভুত দাস রাষ্ট্রে পরিণত করা, যাতে এই দুই রাষ্ট্রের শাসকরা সবকিছু জলাঞ্জলী দিয়ে হলেও ভারতকে যেকোন সুবিধা কিংবা ছাড় দিতে কুণ্ঠাবোধ না করে। যেমন, ভারতের স্বার্থ রক্ষায় মার্কিন হুকুমে, পাকিস্তানের দালাল শাসকরা কাশ্মিরের মুসলিমদের পক্ষ ত্যাগ করেছে।

    ৪. এই নীতির বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই মার্কিনীরা, বৃটেন ও ভারতের সমঝোতায়, হাসিনাকে ক্ষমতায় বসায়। পাশাপাশি মার্কিনীরা এদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে পুনর্গঠনের এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করে যাতে তা এই নীতি কার্যকরে সহায়ক হয়, তারা নির্বিঘ্নে তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে পারে, ভারতকেও তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুবিধা কিংবা ছাড় দিতে পারে এবং এর মাধ্যমে মার্কিন-ভারত কৌশলগত সম্পর্ক সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারে।

    মার্কিন-ভারত ষড়যন্ত্রে হাসিনার ভূমিকা:

    আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “তারা যদি তোমাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে, তাহলে তারা তোমাদের বিরুদ্ধে শত্রুতায় লিপ্ত হবে, এবং তাদের হস্ত ও রসনাসমূহ প্রসারিত করে তোমাদের ক্ষতি সাধন করবে, এবং তাদের আকাংখা, তোমরা যেন কাফিরদের কাতারে শামিল হও।” [সূরা আল-মুমতাহিনা : ২]

    আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সত্যই বলেছেন। হাসিনাকে ক্ষমতায় বসানোর পর, ইসলাম ও মুসলিমদের শত্রু, মার্কিন-ভারত, তাদের ঘৃণ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অনেক অগ্রসর হয়েছে। এবং দেশের সাথে গাদ্দারীতে কোনরকম সীমা ছাড়াই, হাসিনা এ ঘৃণ্য কাজে তাদের পূর্ণ সহযোগীতা করেছে। তার কিছু নমূনা হচ্ছে:

    – পিলখানায় সেনাঅফিসারদেরকে নৃশংস হত্যাকান্ডে হাসিনা সহযোগীতা করেছে; এবং তারপর মার্কিন-ভারতের নির্দেশে ইসলাম, দেশ ও জাতীয় স্বার্থের পক্ষে অবস্থানকারী সেনাঅফিসারদেরকে নিশ্চিহ্ন করার নীতি বাস্তবায়ন করেছে।

    – বাংলাদেশকে, নরঘাতক মার্কিন সেনাদের এমন ঘাঁটিতে রুপান্তর করেছে, যাতে তারা নির্দ্বিধায় নিজের মাটি মনে করে, যখন-তখন এদেশে সামরিক মহড়ার আয়োজন করতে পারে। এবং ACSA চুক্তি (সামরিক ব্যক্তি, মালামাল ও অস্ত্রের সরবরাহ, মজুদ, চলাচল ও বিনিময় চুক্তি) সইয়ের ব্যাপারে মার্কিনীদের সাথে গোপন সন্ধি করেছে, যাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি ডিভিশনে পরিণত হয় এবং মার্কিন যুদ্ধে নিজেদের আত্মনিয়োগ করে, যার নমূনা আমরা ইতোমধ্যে পাকিস্তানে দেখেছি যেখানে ঠিক এই রকমই একটি চুক্তির কারণে আজ পাকিস্তানের মুসলিম সেনাবাহিনী নিজ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধে নিজেদের আত্মনিয়োগ করেছে।

    – বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনায় না রেখে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্য, “সেভেন সিস্টারস্‌”-এর স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের নেতাদেরকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে, যা ভারতের জন্য অত্যন্ত এক গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সংশিষ্ট বিষয়।

    – ট্রানজিট প্রদান করেছে, যা ভারতের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

    – সীমান্ত হত্যা ও টিপাইমুখ বাঁধ-এর ব্যাপারে শুন্য-প্রতিরোধ (zero-resistance) বা কোন বাঁধা না দেয়ার নীতি গ্রহণ করেছে।

    – গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনের প্রকল্পে সাম্রাজ্যবাদীদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে, যা ভবিষ্যতে তাদের হীন স্বার্থে ব্যবহৃত হবে।

    – মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানীর কর্তৃক দেশের তেল ও গ্যাস লুট করার রাস্তা সহজ করতে তাদের সাথে বিভিন্ন চুক্তি সম্পাদন করেছে, এবং দেশের ব্যবসাবাণিজ্যের উপর মার্কিন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায়, TICFA চুক্তি সম্পাদনের সন্ধি করেছে।

    – রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে ইসলামের বিরম্নদ্ধে এবং রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে ইসলামী খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শামীল হয়েছে, যা মার্কিন, বৃটেন ও ভারতের এক নম্বর এজেন্ডা।

    সুতরাং, মার্কিন ও ভারতের সেবায় বিশ্বাসঘাতক হাসিনা চেষ্টার কোন কমতিই রাখেনি। কিন্তু তারপরও, যা আমরা ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি, সাম্রাজ্যবাদীদের নিকট এটা কোন মূখ্য বিষয়ই নয়, কে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলো, বরং, তাদের কাছে মূখ্য বিষয় হলো, পুরো শাসনব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজানো, যা তাদের নীতি বাস্তবায়নে সহায়ক হয়; এজন্য প্রয়োজনে সে তার এক দালাল শাসককে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আরেক দালালকে ক্ষমতায় বসাবে, যারাও একইভাবে তাদের সেবায় ব্যস্ত থাকবে।

    মার্কিন-ভারতের দাসত্বে খালেদা জিয়ার ভূমিকা একই:

    একথা কারও অজানা নয় যে, খালেদা জিয়া হচ্ছে, বহু বছর ধরে পুষে রাখা মার্কিনীদের বিশ্বস্ত এক দালাল, যার ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। আর এজন্যই অর্থাৎ, মার্কিন স্বার্থের কারণেই, তার ভারতবিরোধী ছদ্দবেশ, “দেশের প্রতি ভালবাসার” মুখোশ। তার সাম্প্রতিক ভারত সফরে তা আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যেখানে সে ভারতের স্বার্থ হাসিলে সব রকম সেবা প্রদানের অঙ্গীকার করেছে, যা সে মূলতঃ মার্কিন হুকুমেই, মার্কিন নীতির কারণেই করেছে যাতে ভারতের সাথে মার্কিনীদের কৌশলগত সম্পর্ক আরও এগিয়ে যায়। খালেদা জিয়া বলেছে, সে অতীত ভুলে যেতে চায়! সে কোন অতীত ভুলে যেতে চায়, এই মুশরিক শত্রুরাষ্ট্রের কোন কুকর্ম সে ভুলে যেতে চায়? সেনাঅফিসারদের বীভৎস লাশ? নাকি ফেলানীর ঝুলন্ত লাশ? নাকি ফারাক্কা?…

    এবং তাকে যদি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা হয়, তবে ভবিষ্যতে সে কোন পথে হাটবে?

    – সে পিলখানা হত্যাকান্ড ভুলে যাবে এবং সেনাহত্যাকারীরা পার পেয়ে যাবে। এবং মার্কিন-ভারতের স্বার্থের বিপক্ষে অবস্থানকারী এবং ইসলাম ও জাতীয় স্বার্থের পক্ষে অবস্থানকারী নিষ্ঠাবান অফিসারগণের জন্য সামরিকবাহিনীতে কোন জায়গা থাকবে না।

    – সে দেশের সেনাবাহিনীর উপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ আরও সুদৃঢ় করতে সহায়তা অব্যাহত রাখবে, যেমনটি সে পূর্বে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ও করেছিল।

    – “সেভেন সিস্টারস্‌”-এর স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের ইস্যুতে তার অবস্থান জানিয়ে দিল্লী সফরে খালেদা জিয়া, হাসিনার মতো একই ভাষায় বলেছে, “বাংলাদেশের মাটিকে আমি ভারতের বিরম্নদ্ধে ব্যবহার হতে দিব না।”

    – ট্রানজিট ইস্যুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার অবস্থান জানাতে গিয়ে খালেদা জিয়া, হাসিনার ভাষাই ব্যবহার করেছে, “আমরা আঞ্চলিক সংযোগের অংশ হিসেবে ট্রানজিটকে সমর্থন করি।”

    – সীমান্ত হত্যাকান্ড এবং টিপাইমুখ বাঁধ ইস্যুতেও তার অবস্থান একই অর্থাৎ হাসিনার মতো শুন্য-প্রতিরোধ (zero-resistance) বা কোন বাঁধা না দেয়ার নীতি গ্রহণ করবে, যা তার সফরসঙ্গীর এই বক্তব্যে পরিষ্কার: “তিনি [খালেদা জিয়া] এসব বিষয় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নিকট উপস্থাপন করেছেন!”

    – আন্তর্জাতিক শক্তিসমুহের অংশগ্রহণে গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরির ব্যাপারেও খালেদা জিয়া একমত হয়েছে।

    – মার্কিন তেল এবং গ্যাস কোম্পানীর সাথে চুক্তি সই করার ব্যাপারে ও TICFA চুক্তির ব্যাপারেও তার গৃহীত নীতি হাসিনার মতোই।

    – এবং রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া তার প্রভুদের সন্তুষ্টির লক্ষে যুদ্ধ অব্যাহত রেখে হাসিনার পথই অনুসরণ করবে।

    সুতরাং, খালেদা জিয়া যে হাসিনার মতোই অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদীদের একনিষ্ট দাস, তা দিবালোকের মতো পরিষ্কার। এদেশের মানুষ বহুপূর্বে এই আশা ছেড়ে দিয়েছে যে, হাসিনা-খালেদা কোনদিন দেশের আভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান করবে। কিন্তু তারপরও, কিছু লোক খালেদা জিয়ার আড়ম্বরপূর্ণ ভারতবিরোধী বক্তব্যে বিশ্বাস করার কারণে ভাবতো যে, খালেদা এইক্ষেত্রে অন্ততঃ হাসিনা থেকে ভিন্ন। কিন্তু, তারা এটা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, হাসিনা এবং খালেদা হচ্ছে একই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ফসল, যা এমন শাসকের জন্ম দেয় যারা একদিকে দেশের ভিতরে মানুষের জন্য দুঃখ-কষ্ট বয়ে আনে এবং অপরদিকে বিদেশের মাটিতে তাদের প্রভুদের দালাল হিসেবে কাজ করে।

    গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হচ্ছে সেই কারখানা যা এমন দালালদের তৈরি করে

    আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “নিশ্চয়ই, আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকের নিকট ফিরিয়ে দিবে; এবং যখন শাসনকার্য পরিচালনা করবে তখন অবশ্যই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে।” [সূরা আন-নিসা : ৫৮]

    এই হচ্ছে শাসকদের উপর আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত হুকুম। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তি হচ্ছে তার ঠিক উল্টো অর্থাৎ আল্লাহ্‌’র হুকুম অমান্য করা। এতে শাসক প্রতিনিয়ত জনগণের বিরুদ্ধে অন্যায় শাসন ও বিশ্বাসঘাতক কর্মকান্ড পরিচালনা করে। ঔপনিবেশিকতাবাদ আগমণের পূর্ব পর্যন্ত, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা মুসলিমদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। খিলাফতের বিলুপ্তির পর, কাফির সাম্রাজ্যবাদীরা মুসলিম উম্মাহ্‌’কে নিজেদের মধ্যে টুকরো-টুকরো করে ভাগ করে নিয়ে, সরাসরি মুসলিম দেশগুলোকে শাসন করতে থাকে। যখন অবস্থার প্রেক্ষিতে তারা সরাসরি শাসন থেকে বিদায় নেয়, তখন তাদের দালালদের সে স্থানে বসিয়ে যায়, যাতে তাদের স্বার্থ হাসিলের পথ অব্যাহত থাকে। বেশিরভাগ দেশে তারা রাজাবাদশা ও স্বেচ্ছাচারী শাসকদের শাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়, যেমন মধ্যপ্রাচ্যে। যখন এসব দালালদের অন্যায়-অবিচার এবং বিশ্বাসঘাতক কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ হয়ে, জনগণ পরিবর্তনের দাবীতে সোচ্চার হয়, তখন এই পশ্চিমা শক্তিরা গণতন্ত্রের শ্লোগাণ নিয়ে হাজির হয়ে নতুন দালালদের ক্ষমতায় বসায়, আরববিশ্বে যার সুস্পষ্ট কিছু নমূনা এখন আমাদের চোখের সামনেই বিদ্যমান। কিছু কিছু জায়গায় উপনিবেশবাদী শক্তিরা বিদায় নেয়ার সময়ই স্বেচ্ছাচারী শাসক নিয়োগের পন্থা অবলম্বন না করে “গণতান্ত্রিক” ব্যবস্থা রেখে গেছে, কিন্তু এই বিষয়ে নিশ্চিত হবার পরই যে, এর দ্বারা ক্ষমতা তার দালালদের হাতেই কুক্ষিগত থাকবে, ঠিক যেমনটি ঘটেছিল ভারতে নেহরু এবং পাকিস্তানে জিন্নাহ্‌’র মাধ্যমে। কখনওবা সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের নিজেদের পারস্পরিক প্রতিযোগীতার কারণে, গণতন্ত্রের শ্লোগাণকে ব্যবহার করেছে ও করছে, প্রতিদ্বন্দ্বীর দালালকে অপসারণ করে নিজেদের দালালকে ক্ষমতায় বসানোর কাজে। কোথাও কোথাও তারা “ই৫২” বোমা মেরেও গণতন্ত্রের ফেরী করেছে, যেমন ইরাক ও আফগানিস্তান।

    সুতরাং, মুসলিম দেশগুলোতে (এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে) সবসময়ই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা আর পশ্চিমা দালালদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া পারস্পরিকভাবে সম্পর্কিত, যা পূর্বেও ঘটেছে, এখনও ঘটছে এবং ভবিষ্যতেও ঘটবে। এটা হচ্ছে নব্য-উপনিবেশকতাবাদের ধোঁকাবাজীর এমন এক ঘৃণ্য উপকরণ, যেখানে জনগণ মনে করে সে তারা শাসককে ভোট দ্বারা নির্বাচিত করেছে, অথচ প্রকৃতপক্ষে শাসক হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদীদের একনিষ্ঠ দালাল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও, তার চিত্র একই রকম। স্বাধীনতার পর তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ, যারা ছিল বৃটেনের দালাল, তারাই দেশের শাসক হয়েছিল। তারপর জিয়াউর রহমান, যে ছিল মার্কিন দালাল এবং তারপর এরশাদ, যে ছিল বৃটেন-ভারতের দালাল, তারা দেশ শাসন করেছে। এরপর এরশাদের পতনের পর, মার্কিনীদের মদদপুষ্ট খালেদা এবং বৃটিশ-ভারতের মদদপুষ্ট হাসিনা তথাকথিক গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশ নেয় এবং তারপর থেকে আজ পর্যন্ত এই দুই দালালের মধ্যে ক্ষমতার হাত বদল হচ্ছে, আর তাদের সাথে থাকছে তাদের জোটভুক্ত বড় মিত্ররা।

    হে মুসলিমগণ! কতবার আমরা প্রতারিত হব? মুজিব, জিয়া এবং এরশাদের ধোকাবাজীর কথা না হয় বাদই দিলাম; শুধুমাত্র হাসিনা-খালেদার কথাই ধরুন, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮; মাত্র ২০ বছরে ৪ বার! একই ব্যক্তিদের কাছে!!

    রাসূল (সা) বলেছেন,

    “মুমিনগণ কখনও একই গর্তে দুইবার পড়ে আঘাত প্রাপ্ত হয় না।”

    ৫ম বারের মতো প্রতারিত হবেন না। হাসিনা ও খালেদাকে প্রত্যাখ্যান করুন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অপসারণ করুন এবং খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করুন। খিলাফত, আপনাদের মা, বোন, স্ত্রী ও কন্যাদের গার্মেন্টস্‌ ফ্যাক্টরীর ভেতরে তালাবদ্ধ অবস্থায় পুড়ে মরতে দেবে না। খিলাফত, নিম্নমানের ফ্লাইওভারের মতো মৃত্যুফাঁদ নির্মাণ হতে দিবে না। খিলাফত, আপনাদের সকল বিষয়কে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখবে, আপনাদের উপর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে এবং আপনাদের আস্থার মর্যাদা রাখবে; এবং দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, সম্পদ এবং সেনাবাহিনীর উপর মার্কিন-বৃটেনভারতের নিয়ন্ত্রণের পথ চিরতরে রুদ্ধ করবে।

    হে ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিবর্গ! আপনাদের চোখের সামনে সংঘটিত, হাসিনা-খালেদার অপরাধমূলক কর্মকান্ডের ব্যাপারে আপনারা নিশ্চয়ই সচেতন আছেন। দ্বিতীয়ত, আপনারা এটাও ভালো করে জানেন যে, তথাকথিত গণতান্ত্রিক নির্বাচন হচ্ছে এদেরকে কিংবা এদের মতো কাউকে ক্ষমতায় বসানো এবং নিষ্ঠাবান ও সচেতন রাজনীতিবিদদের ক্ষমতা হতে দূরে রাখার এক প্রক্রিয়া মাত্র। মুসলিম হিসেবে এ বাস্তবতা উপেক্ষ করে চোখ বন্ধ করে রাখার কোন সুযোগ নাই। কারণ, আপনাদের রয়েছে বস্তুগত সামর্থ্য, যার দ্বারা আপনারা নিষ্ঠাবান ও সচেতন রাজনীতিবিদদের নুসরাহ্‌ প্রদান করতে পারেন, যাতে এসব শাসকরা অপসারিত হয় এবং খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

    ইসলামী খিলাফত বিশ্বে এক নম্বর রাষ্ট্রের অবস্থান অর্জন ও উম্মাহ্‌’র হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করে কিভাবে আঞ্চলিক ও বিশ্বমন্ডলে শক্তির ভারসাম্যের মধ্যে স্থায়ী পরিবর্তন আনবে, তার রোডম্যাপ তৈরিতে সক্ষম। সুতরাং সাড়া দিন, আল্লাহ্‌’র হুকুম পালনে সবচেয়ে অগ্রগামী হউন এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য নুসরাহ্‌ প্রদান করুন।

    “এবং (বিশ্বাস ও সৎকর্মে) অগ্রবর্তীগণ তো অগ্রবর্তীই হবে (জান্নাতে)। তারাই (আল্লাহ্‌’র) নৈকট্য পাবে। আহ্লাদপূর্ণ উদ্যানসমূহে। তাদের (অগ্রবর্তীগণ) অধিকাংশ হবে পূর্ববর্তীদের (মুসলিমদের) মধ্য থেকে; এবং অল্পসংখ্যক পরবর্তীদের মধ্যে থেকে।” [সূরা আল-ওয়াক্বি’য়া : ১০-১৪]

  • মানুষ হতে হতাশ হয়ে পড়ার মারাত্মক পরিনতি

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুমিনদের প্রতি উত্তম ধারণা রাখার প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলছেন,

    তোমরা যখন একথা শুনলে, তখন ঈমানদার পুরুষ ও নারীগণ কেন নিজেদের লোক সম্পর্কে উত্তম ধারণা করনি এবং বলনি যে, এটা তো নির্জলা অপবাদ? [সূরা আন-নূর: ১২]

    এছাড়াও আবু হুরাইরা (রা) হতে বর্ণিত যে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    যদি কোনো ব্যক্তি বলে যে, মানুষ ধ্বংস হয়ে গেছে, তবে সেই (ব্যক্তিই) মানুষকে ধ্বংস করে দিল (আরেক ভাষ্য অনুযায়ী – ‘সেই ব্যক্তিই মানুষের মধ্যে সবচেয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত’) [মুসলিম]

    মুসলিমদের মধ্যে যে কল্যাণ রয়েছে এর গুরুত্ব আমাদের অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে। আর যদি তা না করে আমরা উম্মাহকে কল্যাণের তালিকা হতে বাদ দিয়ে দেই তবে তা আমাদের দাওয়ার ব্যর্থতার উপলক্ষে পরিনত হবে এবং দাওয়ার ফরযিয়্যাত অবহেলিত হবে। এবং তা আমাদের ভগ্ন হৃদয় ও সংকীর্ন দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন ব্যক্তিতে পরিনত করবে। ফলে আমরা বিজয় অর্জন করার ব্যপারে হাল ছেড়ে দিব যদিওবা বিজয় হয়তো আমাদের কল্পনার চেয়েও কাছাকাছি অবস্থান করছে। আমরা আমাদের দাওয়ার জীবন হতে ছিটকে পড়ব এবং শূন্য তরী হয়ে নিজেদের মধ্যেই ঘুরপাক খেতে থাকবো।

    সুতরাং এটি আমাদের জন্য একটি অনিবার্য দায়িত্ব যে আমরা উম্মাহর মধ্যে কল্যাণের উপস্থিতি ও সাধারন মানুষের বাস্তবতা উপলব্ধি করব। আমরা জানি যে মানুষ তার কাছে থাকা চিন্তা (concept for life) অনুযায়ী কাজ করে। সুতরাং যদি তার চিন্তা কলুষিত হয় তবে তার কাজও ভূলভাবে পরিচালিত হবে। আবার যদি তার চিন্তা ন্যায়নিষ্ঠ হয়, তবে তার কাজও এমনভাবে পরিচালিত হবে যা তাকে নিয়ামতের জান্নাতের দিকে নিয়ে যার যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয় জলধারাসমূহ যেভাবে কুরআনে ওয়াদা করা হয়েছে।

    আমরা যদি একইভাবে সারা ‍বিশ্বের অসংখ্য উম্মতের দিকে লক্ষ্য করি তবে দেখতে পাব যে তাদের ভুল কাজগুলো মূলত তাদের অধঃপতিত চিন্তারই ফলাফল। তবুও আমাদের বুঝতে হবে এই অসংখ্য উম্মত আল্লাহ তরফ হতে আসা নিয়ামতসরূপ ইসলামী আকীদাকে ধারণ করে এবং তাদের অধিকাংশই জেনে বুঝে কখনোই ইসলামী আকীদাকে অস্বীকার বা পরিত্যাগ করে না। মুসলিম জনগোষ্ঠির অভ্যন্তরে ইসলামের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস (শুধুমাত্র আবেগের কারণে হলেও তা) তাদের মধ্যে কল্যাণের উপস্থিতি নিশ্চিত করে এবং তা আমাদের উম্মতের মধ্যে অফুরন্ত সম্ভাবনার উপলব্ধিকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। এবং এ কারণে আমাদের তাদের থেকে নিজেদের পৃথক করা উচিত নয়। আমাদের চেষ্টায় রত থাকা উচিত তাদের আবেগি উত্থান-পতনের ইসলামকে গভীর চিন্তার ইসলামে পরিনত করার জন্য। এমনকি কেউ যদি ইসলামকে গভীরভাবে বুঝে থাকার পরও কোনো পরিস্থিতিতে এসে জীবনকে অন্য কোনোভাবে সাজিয়ে নেন, তাকেও আবার সঠিকভাবে বোঝালে তার মধ্যে ইসলামী গভীর চিন্তা ও আবেগের পূনঃর্সূচনা করা সম্ভব। এভাবে ক্রমান্বয়ে তার চিন্তার দিগন্তের ব্যপ্তি আমরা ঘটাতে পারব।

    যেসব মুসলিম জীবনের কোনো প্রান্তে এসে আজ শক্তিশালীভাবে ইসলাম পালন করছেন তাদের অনেকেরই উপলব্ধি করা উচিত যে তা নিজেরাও একসময় এই অধঃপতিত অবস্থার একটি অংশ ছিলেন এবং তাদের আকস্মিক উত্থানও উম্মতের অভ্যন্তরে থাকা অফুরন্ত সম্ভাবনারই একটি ফলাফল।

    পরিবর্তনের সম্ভাবনা উম্মতের মধ্যে সন্দেহাতীতভাবে রয়েছে। সুতরাং আমাদের ভুল-ভ্রান্তির দিকে বেশি চক্ষুপাত না করে উম্মাহর সম্ভাবনা অন্বেষন করা উচিত। সুতরাং যদি কোনো ভাই যদি ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ না করে কিন্তু সালাত আদায় করে এবং তার ভাইয়ের দিকে হাসিমুখে তাকায় তবে তা আমাদের ইসলামের অংশ হিসেবেই দেখতে হবে। পাশাপাশি এটাও দেখতে হবে যে কোন চিন্তার উপর ভিত্তি করে ভাইটি জীবনের অন্যান্য বিষয়গুলো সাজান এবং তার ভুলগুলো কী এবং কিভাবে সংশোধন করা যায়।

    যদি কেউ একরোখা ও অহংকারী প্রকৃতির হয় কিন্তু আবার শিশুদের প্রতি কোমল আচরন করে, তাহলে আমাদের উপলব্ধি করা উচিত যে এটিও তার মধ্যে নিহিত সুপ্ত সম্ভাবনার দিকে আমাদের নির্দেশনা দেয় এবং এর মাধ্যমে তাকে তার অহংকার হতে সংশোধিত করে দেয়ার সুযোগ অন্বেষন করা উচিত আমাদের যা তাকে ইসলামের আরো কাছে নিয়ে আসবে।

    এই মানসিকতা আমাদের ফলপ্রসু মানসিকতার চিন্তাশীল ব্যক্তিতে পরিনত করবে। ফলে আমরা সমাজের কোনো অবক্ষয় ও নৈতিক অধঃপতনের মোকাবেলায় পরাজিত হব না। বরং আমরা সমাজের প্রচলিত চিন্তা ও আবেগকে পরিবর্তন করার দিকে দৃষ্টিপাত করব এবং সমাজে সমস্যার আধিক্য হতাশার পরিবর্তে আমাদের জন্য একটি সুযোগে পরিনত হবে মানুষকে বোঝানোর জন্য যে পরিবর্তন কতটা প্রয়োজন। বাংলাদেশসহ মুসলিম দেশগুলোর জনগণের দিকে লক্ষ্য করলে আমরা ইসলামের জন্য তাদের সম্ভাবনার বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করি। এমনকি এসব দেশের দুর্নীতিগ্রস্থ রাজনীতিবিদরাও জনগণের মধ্যে বিদ্যমান ইসলামী আবেগকে তাদের হীন রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে অত্যন্ত অগ্রসর। এসব দেশের সেনাবাহিনীর মুসলিম সদস্যদের অনেকের মধ্যেও ইসলামের প্রতি আবেগ লক্ষ্য করা যায়।

    যথার্থই, ইসলামী আকীদা বহনকারী না হলেও একজনের পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। যদি এরকম না হতো তবে ইসলামের প্রসার ঘটতো না এবং তা রাসূল (সা) এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো। ঐতিহাসিকভাবে লক্ষ-কোটি মানুষের ইসলামে প্রবেশ করাটা মানুষের পরিবর্তনের প্রবল সম্ভাবনাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা)ও দু’আ করেছিলেন যাতে দুই উমরের এক উমর তথা উমর বিন আল-খাত্তাব ও আমর বিন আল-হিশাম ইসলাম গ্রহণ করেন। আমরা সকলেই জানি যে উমর (রা) ইসলাম কবুল করেন এবং প্রচন্ড ইসলাম বিরোধী ব্যক্তি হতে পরিবতন হয়ে অত্যন্ত উঁচুমাপের একজন সাহাবী ও মুসলিমদের রক্ষকে পরিনত হন তিনি। যার ব্যপারে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছিলেন, যখন উমর রাস্তার এক দিয়ে হাটে, শয়তান তার উল্টো পথে হাটে

    যদিওবা আবু জাহল কখনোই ইসলাম গ্রহণ করে নি, রাসূল (সা) নিশ্চয়ই তার মধ্যে কোনো সম্ভাবনা দেখেছিলেন নয়তো তিনি তাকে দাওয়াতও দিতেননা এবং তার জন্য দুআও করতেন না।

    ইসলামী দাওয়াতের শক্তি এবং সমাজ ও মানুষের জীবনে দ্রুত আমূল পরিবর্তন আনার উপর এর প্রভাবের এরকম আরো অসংখ্য জলন্ত উদাহরন রয়েছে ইতিহাসে।

    ইন শা আল্লাহ, এ বিষয়গুলো আমাদের বুঝলে আমরা আল্লাহর অনুমতিক্রমে মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোয়  বের করে নিয়ে আসতে পারব। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দিন। আমীন।

  • হারিস (রা) ও ইকরিমা (রা)-এর আত্মত্যাগ

    মুহাম্মদুর রাসূল (সা)-এর শাসনকালেই খ্রিস্টান রোমানরা মুসলিমদের সঙ্গে শত্রুতা শুরু করে। মুহাম্মদুর রাসূল (সা)-এর ইন্তিকালের পর তাদের শত্রুতার মাত্রা বেড়ে যায়।

    আবু বকর আস্‌ সিদ্দিক (রা)-এর শাসনকালে মুসলিম বাহিনী সিরিয়ার বহু জনপদ থেকে রোমানদেরকে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। রোমানরা বিশাল সেনাবাহিনী সংগঠিত করে সিরিয়ার অন্তর্গত ইয়ারমুক উপত্যকায় মুসলিমদের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এই যুদ্ধে এক লাখ বিশ হাজার খ্রিস্টান রোমানদের মুকাবিলা করেন মাত্র ছাব্বিশ হাজার মুসলিম।

    যুদ্ধ চলাকালেই আল-মদিনায় আবু বকর আস্‌ সিদ্দিক (রা) ইন্তিকাল করেন। আমিরুল মুমিনীন হন উমর বিন আল-খাত্তাব (রা) বিপুল সংখ্যক রোমান সৈন্য মুসলিমদের হাতে নিহত হয়। যুদ্ধে মুসলিমরা বিজয়ী হন। তবে বেশ কিছু নামীদামী মুসলিমও এই যুদ্ধে শহীদ হন।

    এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন হারিস ইবনু হিশাম, ইকরিমা বিন আবী জাহেল এবং আইয়াশ বিন আবী রাবিয়া (রা)। যুদ্ধের পূর্বে ইকরিমা (রা) বক্তব্য ছিল: আমার ইতিপূর্বের জীবনে আমি রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রচন্ড বিরোধিতা করেছি। সুতরাং আজকে আমি এই (যুদ্ধ করতে করতে শত্রুদের) ভীড়ে ঢুকে পড়ব এবং আর বের হব না। কে আছো যে রাসূলুল্লাহ (সা) কে কোনো বার্তা দিতে চাও।

    যুদ্ধের পূর্বে এই তিন বীর একে অপরের কাছ হতে মৃত্যুর বা’য়াত গ্রহণ করে অর্থাৎ আমৃত্যু তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন।

    পরে যুদ্ধে আহত হয়ে ময়দানে পাশাপাশি পড়ে ছিলেন এই তিন মুসলিম বীর: হারিস ইবনু হিশাম, ইকরিমা বিন আবী জাহেল এবং আইয়াশ বিন আবী রাবিয়া (রা)। জখম থেকে অনবরত রক্ত গড়িয়ে পড়তে থাকে। তাঁরা নিস্তেজ হয়ে পড়েন। বাঁচার কোনো আশাই ছিল না।

    “পানি, পানি” বলে চিৎকার করছিলেন হারিস ইবনু হিশাম (রা)। একজন মুসলিম সৈনিক এক পেয়ালা পানি নিয়ে ছুটে আসেন তাঁর কাছে। তিনি পানি পান করতে যাবেন, এমন সময় দেখেন ইকরিমা (রা) তাকিয়ে আছেন পেয়ালার দিকে। হারিস ইবনু হিশাম (রা) পেয়ালাধারী সৈনিককে বললেন, “আগে ইকরিমাকে পানি পান করাও।”

    সৈনিকটি পেয়ালা হাতে ছুটে আসেন তাঁর কাছে। ইকরিমা পানি পান করতে যাবেন, এমন সময় দেখতে পান আইয়াশ ইবনু আবী রাবিয়া (রা) তাকিয়ে আছেন পেয়ালার দিকে। ইকরিমা (রা) বললেন, “আগে আইয়াশকে পানি পান করাও।” পেয়ালা হাতে সৈনিকটি আইয়াশ বিন আবী রাবিয়া (রা)-এর কাছে পৌঁছার আগেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। সেনিকটি পেয়ালা হাতে ইকরিমা (রা)-এর কাছে। দেখেন ইকরিমা (রা) শহীদ হয়ে গেছেন। এবার পেয়ালা নিয়ে সৈনিকটি ছুটে আসেন হারিস বিন হিশাম (রা)-এর কাছে। দেখেন, তিনিও আর বেঁচে নেই।

    ইন্তিকালের পূর্বে প্রচণ্ড পিপাসায় ছটফট করাকালেও অপর ভাইয়ের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা তারা ভূলে যান নি যদি প্রত্যেকেই অত্যন্ত বেদনা ও পিপাসায় কাতর ছিলেন। আসহাবে রাসূল এমন কঠিন মুহূর্তেও স্থাপন করে আত্ম-ত্যাগের অনন্য উদাহরণ।

    মূল: এ কে এম নাজির আহমেদ কর্তৃক লিখিত আসহাবে রাসূলের জীবনধারা

  • রিয্‌ক ও জীবনকাল একমাত্র আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে

    রিয্‌ক-এর আভিধানিক অর্থ এমন বস্তু যা কোনো প্রাণী খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে, যা দ্বারা সে দৈহিক শক্তি সঞ্চয়, প্রবৃদ্ধি সাধন ও জীবন রক্ষা করে থাকে। রিয্‌কের জন্য মালিকানা-স্বত্ব শর্ত নয়। সকল জীবজন্তুই রিয্‌ক ভোগ করে থাকে, কিন্তু তারা এর মালিক হয় না। কারণ মালিক হওয়ার যোগ্যতাই তাদের নেই। অনুরূপভাবে ছোট শিশুরাও মালিক নয়, কিন্তু ওদের রিয্‌ক অব্যাহতভাবে তাদের কাছে পৌঁছতে থাকে। কুরআনের বহু আয়াত থেকে একথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ হয় যে, রিয্‌ক একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। যেমন:

    নিশ্চয়ই আল্লাহই আমার রিয্‌কদাতা, অসীম শক্তিধর। [সূরা যারিয়াত: ৫৮]

    আর জমিনে বিচরণশীল প্রাণীর জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর। [সূরা হুদ: ৬]

    আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের উপাসনা করছ, নিঃসন্দেহে তারা তোমাদেরকে রিয্‌ক দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। সুতরাং তোমরা আল্লাহর কাছেই রিয্‌ক প্রার্থনা কর। [সূরা আনকাবুত: ১৭]

    আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পর্যাপ্ত রিয্‌ক প্রদান করেন, আর যাকে ইচ্ছা কমিয়ে দেন। [সূরা রাদ:২৬]

    আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অগণিত রিয্‌ক দান করেন। [সূরা আলে-ইমরান: ৩৭]

    মুসনাদে আহমদ, ইবনে মাজাহ ও দারিমীতে আবু যার (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন,

    কুরআনের এমন একটি আয়াত আমি জানি, যদি লোকেরা ওই আয়াতের উপর আমল করত, তবে সেটাই তাদের জন্য যথেষ্ট হতো: ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে চলে তিনি তার মুক্তির রাস্তা তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিয্‌ক দেন, যা সে ধারণাও করতে পারে না।’ [সূরা তালাক: ২]

    অপর হাদীসে আছে, বান্দার রিয্‌ক তাকে এভাবে খুঁজে বেড়ায় যেমন তার মৃত্যুকাল তাকে খোঁজ করে। [মিশকাত]

    বুখারী ও মুসলিম শরীফে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) একখানি দীর্ঘ হাদিস বর্ণনা করেন যার সারমর্ম হল – মানুষ তার জন্মের পূর্বে বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে আসে। মাতৃগর্ভে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠিত হওয়ার পর আল্লাহ তা’লার নির্দেশ মুতাবিক একজন ফেরেশতা তার সম্পর্কে চারটি বিষয় লিপিবদ্ধ করেন। প্রথম, ভালো-মন্দ তার যাবতীয় কার্যকলাপ, যা সে জীবনভর করবে। দ্বিতীয়, তার আয়ুষ্কালের বর্ষ, মাস, দিন, ঘণ্টা, মিনিট ও শ্বাস-প্রশ্বাস। তৃতীয়, কোথায় তার মৃত্যু হবে এবং কোথায় সমাধিস্থ হবে। চতুর্থ, তার রিয্‌ক কী পরিমাণ হবে এবং কোন্‌ পথে তার কাছে পৌঁছবে।

    কোনো কোনো রেওয়াতে আছে যে, হযরত মুসা (আ) আগুনের খোঁজে তূর পাহাড়ে পৌঁছে আগুনের পরিবর্তে যখন সেখানে আল্লাহর নূরের তাজাল্লী দেখতে পেলেন, নবুয়ত ও রিসালাত লাভ করলেন এবং ফিরাউন ও তার কওমকে হিদায়তের জন্য মিশর গমনের নির্দেশ প্রাপ্ত হলেন, তখন তাঁর মনের কোণে উদয় হল যে, আমি স্বীয় স্ত্রীকে জনহীন-মরুপ্রান্তরে একাকিনী রেখে এসেছি, তার দায়িত্ব কে গ্রহণ করবে? তখন আল্লাহ পাক হযরত মুসা (আ)-এর সন্দেহ নিরসনের জন্য আদেশ করলেন যে, “তোমার সম্মুখে পতিত প্রস্তরখানির উপর লাঠি দ্বারা আঘাত হান।” তিনি আঘাত করলেন। তখন উক্ত প্রস্তরখানি বিদীর্ণ হয়ে তার মধ্য হতে আরেকখানি পাথর বের হল। দ্বিতীয় পাথরখানির উপর আঘাত করার জন্য পুনরায় আদেশ হল। হযরত মুসা (আ) আদেশ পালন করলেন। তখন তা ফেটে গিয়ে আরেকখানি প্রস্তর বের হল। তৃতীয় পাথরখানি উপর আঘাত হানার জন্য আবার নির্দেশ দেওয়া হল। তিনি আঘাত করলেন। তা বিদীর্ণ হল এবং এর অভ্যন্তর হতে একটি জীবিত কীট বেরিয়ে এল, যার মুখে ছিল একটি তরু-তাজা তৃণ। আল্লাহতা’লার অসীম কুদরতের বিশ্বাস হযরত মুসা (আ)-র পূর্বেও ছিল। তবে বাস্তব দৃষ্টান্ত প্রত্যক্ষ করার প্রতিক্রিয়া স্বতন্ত্র হয়ে থাকে। তাই এ দৃশ্য দেখার পর হযরত মুসা (আ) সরাসরি মিশরের দিকে রওয়ানা হলেন। সহধর্মীকে এটা বলা প্রয়োজন মনে করেননি যে, মিশর যাওয়ার জন্য আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। [তাফসীরে মা’রেফুল কোরআন]

    এগুলোসহ কুরআনের আরো বহু আয়াত ও বহু হাদীস দ্বারা একথাই প্রমাণিত হয় যে, রিয্‌কের নিয়ন্ত্রণ কেবল আল্লাহর হাতে। অবশ্য আল্লাহ তাঁর বান্দাকে রিয্‌ক উপার্জন করার কাজ করার আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু বান্দার ওই ‘কাজ’ তার রিয্‌কের ‘কারণ’ নয়। বরং এটা রিয্‌কের মাধ্যম মাত্র। এই মাধ্যম হালাল বা হারাম দুই রকমের হতে পারে। রিয্‌ক উপার্জনের মাধ্যম হালাল বা হারাম যা-ই হোক না কেন, রিয্‌কটি আসে আল্লাহর পক্ষ থেকেই। তবে ইসলাম মানুষকে রিয্‌ক অর্জনের হালাল পথগুলো দেখিয়ে দিয়েছে এবং হারাম পথগুলোও চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে। একজন মুমিন রিয্‌ক অর্জনের জন্য কেবল হালাল পন্থাগুলোই ব্যবহার করবে। অবশ্য কেউ হারাম পথ অবলম্বন করলেও সে-ই রিয্‌ক আল্লাহই প্রদান করেন। যখন কোনো ব্যক্তি অবৈধভাবে অন্যের মাল হস্তগত ও উপভোগ করে, তখন উক্ত বস্তু তার রিয্‌ক হওয়া সাব্যস্ত হয়, তবে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করার কারণে তা তার জন্য হারাম হয়েছে। যদি সে লোভের বশবর্তী হয়ে অবৈধ পন্থা অবলম্বন না করত; তাহলে তার জন্য নির্ধারিত রিয্‌ক বৈধ পন্থায়ই তার নিকট পৌঁছে যেত।

    জীবনকাল

    পবিত্র কুরআনের বহু আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, জীবনকাল (আজল)-এর পরিসমাপ্তিই মৃত্যুর কারণ এবং একমাত্র আল্লাহই মৃত্যু ঘটান।

    আর আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারো মৃত্যু হতে পারে না, যেহেতু প্রত্যেকের মেয়াদ নির্ধারিত। [সূরা আলে ইমরান: ১৪৫]

    আল্লাহই জীবের প্রাণসমূহ তাদের মৃত্যুর সময় হরণ করে থাকেন। [সূরা যুমার: ৪২]

    রব তিনি যিনি জীবন ও মৃত্যু প্রদান করেন। [সূরা বাকারা: ২৫৮]

    আল্লাহই বাঁচান ও মারেন। [সূরা আলে ইমরান: ১৫৬]

    তোমরা যেখানেই থাক না কেন, মৃত্যু তোমাদের অবধারিত, যদি তোমরা সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান কর তবুও। [সূরা নিসা: ৭৮]

  • ফিলিস্তিন: বর্তমান পরিস্থিতি, প্রতিক্রিয়া ও করণীয়

    بسم الله الرحمن الرحيم

    ১) ইয়াকুব আলাইহি সালামেরই অপর নাম ইসরাইল। হিব্রু ইসরাইল শব্দটি আরবী আবদুল্লাহ্’র সমার্থক হলেও; আজ ইসরাইলীরা হচ্ছে আদু’আল্লাহ্ [আল্লাহ্’র শত্রু]। তিনি মৃত্যুশয্যায় তার সন্তানদের জিজ্ঞেস করেছিলেন:

    “তোমরা কি উপস্থিত ছিলে, যখন ইয়াকুবের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়? যখন সে সন্তানদের বলল: আমার পর তোমরা কার এবাদত করবে? তারা বললো, আমরা তোমার পিতৃ-পুরুষ ইব্রাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাকের উপাস্যের এবাদত করব। তিনি একক উপাস্য।” [সুরা বাকারাহ: ১৩৩]

    অথচ তাদের সীমালঙ্গন আর বিধিবিধান না মানার কারনে তাদের উপর আরোপিত হয়েছে লাঞ্ছনা ও পরমুখাপেক্ষিতা:

    “আর তাদের উপর আরোপ করা হল লাঞ্ছনা ও পরমুখাপেক্ষিতা। তারা আল্লাহর রোষানলে পতিত হয়ে ঘুরতে থাকল। এমন হলো এ জন্য যে, তারা আল্লাহর বিধি বিধান মানতো না এবং নবীগনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করত। তার কারণ, তারা ছিল নাফরমান সীমালংঘকারী।” [সুরা বাকারাহ: ৬১]

    আর এই সীমালঙ্গনকারীদের সীমালঙ্গনের বর্তমান শিকার ফিলিস্তিন। ফিলিস্তিনি ভূমিতে তাদের দখলদারিত্ব আর আগ্রাসনের ইতিহাস সুদীর্ঘ। অথচ যেখানে ইসরাইলের অস্তিত্বের ভিতই *দখলদারিত্ব*; সেখানে আজ তারাই শোর তুলছে ফিলিস্তিনিদের *সন্ত্রাস* বলে। এ যেন বাড়ীতে অতিথিকে থাকতে দেয়া গৃহকর্তা; যাকে তার অতিথি নিজ গৃহ থেকে *বহিষ্কার* করতে চায় জবরদখলকারী বলে। কিংবা পকেটমার ধরা পরার পর ভুক্তভোগীকে চোর সাজানোর মত প্রহসন। ঔপনৈবেশিকদের সহায়তায়, জার্মান ইহুদী নিধন পরবর্তী সময়ে এই প্রহসন মঞ্চস্থ হয়। আর নিঃসন্দেহে এই প্রহসনকারীদের জন্য অপেক্ষা করছে লাঞ্ছনা।

    ২) ফিলিস্তিনের বর্তমান পরিস্থিতি সম্বন্ধে হামাস নেতা খালিদ মিশালের মন্তব্যটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ:

    “আজ ইসরাইল স্নায়ু পরীক্ষা করছে এই জাতির, তারা মিশরকে পরীক্ষা করছে, আরব আর মুসলিমদের পরীক্ষা করছে…যে তারা পূর্বের মত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করতে পারে কিনা নাকি বর্তমান নেতৃবৃন্দের অন্য কোন লক্ষ্য আছে।”

    এই মন্তব্যটিই ফিলিস্তিনের দীর্ঘদিনের পরিস্থিতির সারাংশ। তাই, এই আলোচনা টেনে দীর্ঘ করতে চাই না আর মুসলিম দেশসমূহের পশ্চিমাদের মদদপুষ্ট নেতৃবৃন্দের পরচর্চায় ও লিপ্ত হতে চাই না।

    ৩) তবে, এই চিত্র খুবই হতাশার যে, যখন দেখি গঁৎবাধা আর একই ধরনের প্রতিক্রিয়া: ফিলিস্তিনে ইসরাইলী হামলার পরিপ্রক্ষিতে। ফেসবুকে ফিলিস্তিনি পতাকার বন্যা বইয়ে দেয়া হচ্ছে। আর অনেক ভাই ফিলিস্তিনকে তালিকাভুক্ত দেশের অন্তর্ভুক্তির পিটিশান সাইন আর শেয়ার করছেন। আর প্রতিবাদকারীরা রাস্তায় প্রতিবাদ করছে সমাজতন্ত্রীদের সাথে এই ধ্বনিতে: “ফিলিস্তিন মুক্ত করো” আর মুসলিমরা বলছে: “ও ফিলিস্তিন…”।

    ইয়াহুদীরা ফিলিস্তিনের বর্ণবাদী-জাতীয়তাবাদী পতাকাকে ভয় করে না। তারা ইসলামের পতাকাকে ভয় করে। আমরা এটা জানার চেষ্টা করি না কেন যে ফিলিস্তিনি পতাকার ভিত্তি কি? এর ডিজাইনটি নেয়া হয়েছে আরব বিদ্রোহের পতাকা [প্রায় অন্যান্য আরব জাতীয় পতাকার মত] যা খিলাফহ্’র বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়ছিলো আর যার হোতা ছিলো ব্রিটিশরা। এটি হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আর “আরব” জাতীয়তাবাদের প্রতীক। আর আমরা রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস থেকে জানতে পারি, জাতীয়তাবাদের অসারতা আর এর পরিত্যাগের নির্দেশ। এই চিন্তা আমাদের মাথায় আসা উচিত না যে, ফিলিস্তিনি পতাকাতো যেকোনভাবে ইসলামিক; বস্তুতঃ তা হচ্ছে উম্মাহ্’র দুর্বলতা আর বিভাজনের প্রতীক আর যার বিরুদ্ধে আমাদের নিরন্তর সংগ্রাম করতে হবে, সমর্থন নয়।

    এই পতাকাগুলো ছুড়ে ফেলতে হবে আর তার পরিবর্তে ধারন করতে হবে তাওহীদের পতাকা। কমিউনিস্ট কিংবা সমাজতন্ত্রী কাফিরদের সাথে বিক্ষোভ পরিহার করতে হবে; যারা ইসলামেরই বিরুদ্ধাচরণ করে আর তাদের কোন চেতনা নাই ফিলিস্তিনকে সাহায্য করার আর না তারা চায় কোন মুসলিম ভূমি ইসলামি বিধিবিধান দ্বারা শাসিত হোক।

    আমাদেরকে এটাও মাথায় রাখতে হবে প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা, ফিলিস্তিন অনেকগুলো আক্রান্ত মুসলিম ভূমির একটি ভূমি; একমাত্র ভূমি নয়। নিঃসন্দেহে এই ভুমি সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্’র জন্য পবিত্র ভূমি। এর সাথে জড়িয়ে আছে মুসলিমদের প্রথম কিবলা আল-আকসা, রাসুলুল্লাহ’র ইসরা আর অসংখ্য আন্বিয়াদের স্মৃতি। তাই কেবল ফিলিস্তিনি মুসলিম ভাইদের নিকট নয় বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্’র ভাইদের কাছে এর তাৎপর্য অপরিসীম। কেননা,মিডিয়ার সবসময়ের প্রচেষ্টা একে ফিলিস্তিনি ইস্যু কিংবা আরব ইস্যু বলে তুলে ধরা। আমাদের দেখতে হবে, আমরা কি মিডিয়ার এই কাজে অজান্তে সাহায্য করছি কিনা? সাথে সাথে আমাদের সামগ্রিক বিশ্ব-পরিস্থিতিও অনুধাবন করতে হবে। এই আক্রান্ত ভূমির তালিকায় রয়েছে মালি, ইয়েমেন, সোমালিয়া, চেচনিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক, আরাকান, কাশ্মীর, মিন্ডানো এবং আরো অনেক। তাদের জন্য দু’আ করা আর সত্যিকারের তাগাদা অনুভব করতে হবে সমগ্র উম্মাহ্’র জন্য; আর এটাই প্রকৃত ভালবাসার নিদর্শণ।

    আমাদের গৌরবোজ্জল ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হবে; আর সাথে সাথে এই উপলব্ধি ও শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে, গতকালের ঘটনাপ্রবাহ থেকে যার মধ্যে নিহিত রয়েছে আজকের সমস্যার উত্তর। আমাদের বুঝা উচিত, আল-কুদসের জন্য জাতিসংঘের সমর্থন আদায়, এর জন্য কোন সমাধান নয়। এর সমাধান হচ্ছে, উম্মাহ্’র সমস্ত ভূমিকে একত্রীকরণ আর সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্’র একক নেতৃত্বের অধীনে একক জাতি হিসেবে সম্মলিত বাহিনী প্রেরণ এই দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে; যেভাবে তা করেছিলেন সালাহউদ্দীন আইয়ুবী রহিমাহুল্লাহ। আর তা শরীয়াহ্’য় প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে; আরব, সমাজতান্ত্রিক, গনতান্ত্রিক আর অন্য যে কোন পন্থায় নয়: যা ইসলাম বহির্ভূত।

    ৪) ইসরাইল আর হামাস বর্তমানে ইঁদুর-বিড়ালের খেলায় রয়েছে। ইসরাইল এখনো তার প্রকৃত শত্রুর মুকাবিলায় অবতীর্ণ হয়নি। কিন্তু, শীঘ্রই তারা ইসলামের সত্যিকার সিংহের সন্মূখীন হবে, যখন তারা জীবন ভিক্ষা চাইবে আর বৃক্ষ আর পাথরের আড়ালে গিয়ে লুকোবে। আর পাথর বলে উঠবে আমার পিছনে লুকায়িত ইহুদীকে হত্যা কর, ইনশা’আল্লাহ্।

    আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

    “আমি বনী ইসরাঈলকে কিতাবে পরিষ্কার বলে দিয়েছি যে, তোমরা পৃথিবীর বুকে দুবার অনর্থ সৃষ্টি করবে এবং অত্যন্ত বড় ধরনের অবাধ্যতায় লিপ্ত হবে।অতঃপর যখন প্রতিশ্রুতি সেই প্রথম সময়টি এল, তখন আমি তোমাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করলাম আমার কঠোর যোদ্ধা বান্দাদেরকে। অতঃপর তারা প্রতিটি জনপদের আনাচে-কানাচে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। এ ওয়াদা পূর্ণ হওয়ারই ছিল। অতঃপর আমি তোমাদের জন্যে তাদের বিরুদ্ধে পালা ঘুয়িয়ে দিলাম, তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও পুত্রসন্তান দ্বারা সাহায্য করলাম এবং তোমাদেরকে জনসংখ্যার দিক দিয়ে একটা বিরাট বাহিনীতে পরিণত করলাম।তোমরা যদি ভাল কর, তবে নিজেদেরই ভাল করবে এবং যদি মন্দ কর তবে তাও নিজেদের জন্যেই। এরপর যখন দ্বিতীয় সে সময়টি এল, তখন অন্য বান্দাদেরকে প্রেরণ করলাম, যাতে তোমাদের মুখমন্ডল বিকৃত করে দেয়, আর মসজিদে ঢুকে পড়ে যেমন প্রথমবার ঢুকেছিল এবং যেখানেই জয়ী হয়, সেখানেই পুরোপুরি ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। হয়ত তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন। কিন্তু যদি পুনরায় তদ্রূপ কর, আমিও পুনরায় তাই করব। আমি জাহান্নামকে কাফেরদের জন্যে কয়েদখানা করেছি।” [সুরা বনী ইসরাইল:০৪-০৮]

    আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন:

    আর তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মুমিন হও তবে, তোমরাই জয়ী হবে। [সুরা আল-ই-ইমরান: ১৩৯]

    মুসলিম উম্মাহ সর্বত্র আজ যে নির্যাতন, নিপীড়ন আর হত্যার মুখোমুখি হচ্ছে তার মাধ্যমে আল্লাহ্ তা’আলা উম্মাহ্’কে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা থেকে বিচ্যুতি, জাতীয়তাবাদ, মানব-রচিত বিধান, ঔপনৈবেশিক দাসত্বের মনন, অনৈক্য আর পরাজিত মানসিকতার কলুষতা থেকে মুক্তি দান করুন। আর আমাদেরকে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষায় ফিরে যাওয়ার তাওফীক দিন। আল্লাহ্ তা’আলা বিশ্বাসীদের বিজয় দান করুন এবং ঐক্য দান করুন। আমাদের বিশ্বাস আর জ্ঞানকে পরিশুদ্ধ করুন আর আমাদের একনিষ্ঠতা দান করুন। আল্লাহ্ তা’আলা ফিলিস্তিনি ভাই-বোনদের ধৈর্য ধারন করার তাওফীক দিন আর দৃঢ়পদ করুন। আমীন।

    সায়্যিদ মাহমূদ গজনবী

  • সালাফিবাদ ও সুফিবাদের মাঝে..

    দুঃখজনক হলেও সত্য বর্তমান সময়ে উম্মাহর মধ্যে এমন কিছু দল আছে যারা উম্মাহর মধ্যে অতীতকাল থেকে আক্বীদার শাখা, উসুল আল ফিক্বহ কিংবা ফিক্বহ নিয়ে বিদ্যমান বিভেদগুলোকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। প্রতিটি দলই বাকি দলগুলোকে বর্জন করার জন্য সর্বোচ্চ প্রচারণা চালায় এবং একে অপরকে ভীষণ শত্রু মনে করে অথচ তারা ভুলে যায় আমাদের মুসলিম ভুমিগুলো শত্রুদের দখলে, উদাহরণস্বরূপ – ইসরা এবং মিরাজের ভুমি প্যালেস্টাইন। তারা ভুলে যায় মুসলিম ভূমিগুলোত প্রতিদিন রক্তে রঞ্জিত হয় সাম্রাজ্যবাদী কিংবা এদের দালাল দ্বারা কিংবা তারা ভুলে যায় ইসলামের শত্রুরা ধ্বংস করতে ব্যস্ত আমাদের দ্বীনের মূল শিক্ষা, শরীয়াহ আইন এমন কি আক্বীদার অনেক বিষয় পর্যন্তও।

    সালাফি কিংবা সুফি দুই পক্ষেরই চরম্পন্থীদের কথা আমরা বাদ দিচ্ছি যারা সম্পূর্ণ ভুল পথে চলে গেছে। এ সব চরমপন্থীদের মধ্যে রয়েছে সে সব সূফি যারা ওয়াহদাতুল উজুদ অর্থাৎ আল্লাহ নিজেও সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত এ ধরনের ভ্রান্ত মতবাদে বিশ্বাসী কিংবা সে সব অতি জাহেরী (কেবল কুরআন ও হাদিসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণকারী) সালাফি যারা নিজেরা ছাড়া সবাইকে কাফির বলে আখ্যা দেয়। আমরা যদি আজকে শুধু মূলধারার সালাফি কিংবা সূফিদের দিকে তাকাই তাহলে আমরা দেখতে পাবো উভয় দলই তাদের মতের প্রতিষ্ঠাতা এবং তাদের ক্লাসিকাল স্কলারদের দেখানো পথ থেকে দূরে চলে গেছে।

    আশ’আরি মতবাদ ও সূফিবাদের উল্লেখযোগ্য কিছু স্কলাররা তারা জাহেরীদের সাথে অনেক বিষয় নিয়ে মতবিরোধ করেছে কিন্তু কখনই তাদেরকে শত্রু মনে করে নি। তারা কখনই ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়্যিম কিংবা ইবনে কাছির কে ভ্রান্ত মনে করেন নি যদিও তারা ঈমানের সংজ্ঞা থেকে শুরু করে আল্লাহর সিফাত বোঝা, তাক্বলিদ করা যাবে কিনা, ক্বিয়াসের ব্যবহার এর মত বিষয়গুলোতে দ্বিমত পোষন করেছে। এমনকি তারা একে অপরকে মুতাজিলা কিংবা আল খারেজিদের মত ভ্রান্তও মনে করে নি। উল্টো বিভিন্ন বইএ তারা জাহেরি স্কলারদের যথেষ্ট সম্মান এবং তাদের রেফারেন্স ব্যবহার করেছে। এটা সত্য তারা একে অপরের সমলোচনা করেছে কিন্তু এটা আমাদের মনে রাখতে হবে সমালোচনাগুলো ছিলো জ্ঞান এবং বিচক্ষণতার দিক দিয়ে অতি উচ্চ পর্যায়ের। আমাদের সালাফে সালেহীনদের মধ্যেও এই বৈশিষ্ট পরিলক্ষিত হয়েছিলো, যেমন ইমাম শাফেঈ (রহ) ইমাম আবু হানিফা (রহ) এর ইহতিহসান (আইনগত অগ্রাধিকার যা হানাফি মাজহাবে আইনগ্রহণের গৌণ মাধ্যম ধরা হয়েছে) এর নীতিমালা এর সমালোচনা করেছিলেন এবং তার মতে যারা ইহতিহসান করে তারা নিজের মনকে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী মনে করে (অধ্যায়: ইবতাল উল ইসতিহসান, গ্রন্থ: কিতাবুল উম্ম)। কিন্তু তিনি কখনই ইমাম আবু হানিফাকে ভ্রান্ত মনে করেন নি, উপরন্তু তিনি তার শিক্ষক মুহাম্মদ ইবনে আল হাসান আল শায়বানি (রহ) যিনি আবু হানিফার ছাত্র ছিলেন তাকে খুব সম্মান করতেন।

    একি ভাবে সালাফি স্কলাররাও আশআরি স্কলারদের অনেক সমালোচনা করেছেন বিশেষত আল্লাহর গুণ, কুরআনের সংজ্ঞা, তাকলিদ এর গ্রহণযোগ্যতা, ইমানের সংজ্ঞা এই বিষয়গুলোতে। তদুপরি তাদেরকে ভ্রান্ত কিংবা মুরতাদ মনে না করে যথাযথ সম্মান করেছেন। ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেছেন,

    “এটা ভাবার কোন অবকাশ নেই আক্বীদার বিষয়গুলোত যারা ভুল করে তারা ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা জাহিল। সম্ভবত যে মুজতাহিদ ভুল করেছেন তাকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন। বিষয়টা এমনও হতে পারে তার কাছে হয়ত পর্যাপ্ত তথ্য পোছায়নি যা দ্বারা বোঝা যাবে সে ভুল।” [ইবনে তাইয়্যিমিয়াহ, মাজমু আল ফাতোয়াহ, ভলিউম ৩, পৃষ্ঠা ২৩৯-২৪০]

    তিনি এটাও বলেছেন সালাফ এ সালেহরাও আক্বীদার বিষয়গুলো নিয়ে মতবিরোধ করেছেন। তিনি বলেন,

    “সালাফরা আক্বীদার বেশ কিছু বিষয় নিয়ে মতবিরোধ করেছেন, কিন্তু কেউই কাউকে কাফির, ফাসেক কিংবা শয়তান নামে আখ্যায়িত করেন নি। শুরাইহ (রহ) এই আয়াত পাঠ করতে অস্বীকৃতি জানান, “আমি অবাক হই, যখন তারা বিদ্রুপ করে”, তার মতে আল্লাহ অবাক হন না। এ খবর যখন ইব্রাহিম আল নাখাই এর কাছে পৌছালো তিনি বললেন, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ শুরাইহ এর চেয়ে জ্ঞানী লোক ছিলো এবং তাকে আমরা “আমি অবাক হই” পাঠ করতে দেখেছি। আবার আয়েশা (রা) অন্যান্য সাহাবিদের সাথে রাসুলুল্লাহ (সা) এর আল্লাহকে দেখা নিয়ে মতবিরোধ হয়েছিলো। আয়েশা (রা) এর মতে যে বলবে রাসুলুল্লাহ (সা) আল্লাহ কে দেখেছিলেন বলবে সে আল্লাহর সম্পর্কে মিথ্যা বলবে, যদিও বাকি সাহাবিরা এর সাত্থে এক মত ছিলেননা, কিন্তু কেউ কাউকে ভ্রান্ত বলে নি। আবার মৃত জীবিতদের কথা শুনতে পায় কিনা, স্বজনদের কান্নার জন্য মৃতকে শাস্তি দেয়া হয় কিনা বিষয়গুলো নিয়ে মতবিরোধ হয়েছিলো।” [ইবনে তাইমিয়্যাহ, মাজমু আল ফাতাওয়াহ, ভলিউম ৩, পৃষ্ঠা ২৩৯-২৪০]

    তারা মনে মনে এ ধারণা রাখতেন যে আল্লাহ তার অনুগত বান্দাদের ক্ষমা করবেন। রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “আল্লাহ আমার উম্মাহকে সে সব অপরাধ ক্ষমা করেছেন, যা ভুলে হয়, ভুলে যাওয়ার দরুন কিংবা জবরদস্তির কারণে হয়”

    ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে আবুল হাসান আল-আশআরি (রহ) (মৃত্যু- ৯৩৬ খ্রীষ্টাব্দ) কিংবা জাহেরি স্কলার যেমন ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ) (মৃত্যু- ১৩২৮ খ্রীষ্টাব্দ) যখনই আক্বীদার শাখা সম্পর্কিত কোন বিতর্কে অংশগ্রহণ করেছেন তারা তা শুধুমাত্র করেছিলেন মহৎ উদ্দ্যেশে। যেমন আবুল হাসান আল-আশআরি (রহ) সচেষ্ট ছিলেন মুতাজিলা নামক ভ্রান্ত সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করতে যারা ইসলামে অনেক বিভ্রান্তি তৈরি করছিলো। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ) মোকাবেলা করেছেন তদানিন্তন সময়ের কিছু চরম্পন্থি সূফিদের।

    সুতরাং বর্তমান সময়ে একে অপরকে শত্রু ভাবা সালাফি এবং সূফিদের উচিত হবে তাদের বিখ্যাত আলেমদের পথ অনুসরণ করা। তাদের উচিত “সৎ কাজে আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ” এর আলোকে বর্তমান সময়ে কুফফার দ্বারা আমাদের দ্বীন, তার মূল শিক্ষা, আইন এমনকি আক্বীদার উপর বুদ্ধিবৃত্তিক ধ্বংসযজ্ঞ চলছে তার দিকে অধিক মনোযোগী হওয়া। আজকে কুফফারদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মুসলিমরা আধুনিকতার নামে আল্লাহ নির্ধারিত হুদুদকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, আজকে তারা কুফফারদের সাথে মিলিত হয়ে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ধারণাকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালাচ্ছে, তারা আজকে মহিলাদের খিমার (headscarf) এবং জিলবাবকে জনজীবন থেকে বিলুপ্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে, আজকে তারা মানবরচিত আইন সমাজে প্রণয়ন করে “আল্লাহ সার্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী” এ আক্বীদাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত সেকুলার লিবারেলিজম মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি, কখনই আক্বীদার শাখা (ফুরু আল আক্বীদা) কিংবা উসুল আল ফিক্বহের মতবিরোধগুলো নয়। সুফি এবং সালাফিদের কেউ কেউ একে অপরের সাথে নেহাৎ বিতর্কের উদ্দেশে নিজেদের মতকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ইসলামের অনেক মূল বিষয়গুলোর বিরুদ্ধে কথা বলে।

    এখানে একটি বিষয় সম্পুর্ণ পরিস্কার যে, এ উভয় পক্ষের কিছু কিছু লোকদিগকে মুসলিমদের মূল বিষয়গুলোতে বিভ্রান্তি তৈরি করার উদ্দেশে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিছু লোক আছেন যারা নিজেদেরকে আবুল হাসান আল-আশআরির অনুসরণকারি বলে দাবি করেন কিন্তু শরীয়ার অনেক ক্বাতঈ (নিশ্চিত) বিষয় গুলো অস্বীকার করে, ক্বাতাঈ দলিল তাদেরকেই বলা হয় যেগুলো অর্থ এবং দলিল বিশুদ্ধ। তারা চার ইমাম সহ অনেক আশআরি স্কলার যেমন কাযি ইয়াদ, আল গাজালি, ইমাম আল হারামাইন আল জুয়াইনি, আল সুয়ূতি, আন নববি, আল রাজি, ইবন হাজর আল আসকালানি যেসব বিষয়ে একমত সেসব বিষয়গুলোকে পরিত্যাগ করে।

    তাদের মতে হুদুদ কায়েম যেমন চোরের হাত কাটা কিংবা অবিবাহিত জিনাকারীকে চাবুক মারা এ বিষয়গুলো সময় কিংবা স্থানভেদে পরিবর্তন হতে পারে। এ ধরনের ব্যক্তিবর্গ মাসালিহ আল মুরসালা (Public Interest), জরুরাত, দুটি মন্দের মধ্যে অপেক্ষাকৃত ভালো এ ধারণাগুলোর অপব্যবহার করেন। তারা সুদ গ্রহণ কিংবা ইসলাম ছাড়া অন্য পদ্ধতিতে শাসক নির্বাচনকে বৈধ মনে করেন। অথচ আশআরি ক্লাসিকাল স্কলাররা এগুলোকে কখনো অনুমোদন দেয় নি, এ ধরনের দাবি তাদের প্রতি অপবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়।

    প্রকৃতপক্ষে মডার্নিস্ট স্কলারদের ভুল মূলত আশআরি হবার জন্য নয় বরং হালাল কে হারাম কিংবা হারামকে হালাল করার প্রবণতা। তাদের এ ধরনের হীনমন্যতা আশআরি এবং ভিন্নমত পোষণকারী সকল আলোচনাকারীর সামনে তুলে ধরা উচিত।

    অনুরূপভাবে বর্তমান সালাফি আলেমরা অনৈতিকভাবে সৌদি আরবের অনৈসলামিক সরকারকে বৈধতা দিয়েছে এমনকি তাদের অনেক অনৈসলামিক কার্যক্রম যেমন আমেরিকার সাথে মৈত্রীকেও তারা জায়েজ করে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে যারা এমনটি করে তারা সালাফদের অনুসরন করে না বরং সালাফের পথ থেকে সরে আসে। তাদের এ ধরনের মনোভাব সালাফি স্কলার যেমন ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়্যিম, ইবনে কাছির, এর মতবাদের সাথে চরম বিরোধী। জাহেরি স্কলাররা শরীয়াহ আইন ছাড়া অন্য আইন দ্বারা শাসনকে কেবল নিষেধই বলেন নি বরং কুফর বলে দাবি করেছেন, ইবনে তাইমিয়্যাহর মতে,

    “যে ব্যক্তি মনে করে না যে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা দ্বারা শাসন করা ফরয সে ব্যক্তি কাফের। আর যে ব্যক্তি মনে করে যে, তার নিজের মতামত দিয়ে শাসন করা বৈধ এবং আল্লাহর আইন থেকে সরে যায় এবং অনুসরণ করে না, সে ব্যক্তিও কাফের। সুতরাং সমগ্র উম্মাহর জন্য সাধারণ নিয়ম হলো, কুরআন-সুন্নাহ ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে শাসন করা বা রায় দেয়া বৈধ নয়। কোনো জ্ঞানী বা নেতার আবার শায়খ বা রাজার আদেশ মানতে জনগনকে বাধ্য করানোর অধিকার কোনো ব্যক্তিরই নেই। যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে, সে ওইরূপ কোন কিছু দিয়ে বিচার করতে পারবে এবং কুরআন সুন্নাহ দিয়ে বিচার করবে না সেও কাফের।” [মিনহাজুস সুন্নাহ, ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা ১৩০-১৩২]

    তাই সালাফি মডার্নিস্টদের হীনমন্যতা সালাফি এবং অন্যান্য স্কলার দ্বারা সকলের সামনে তুলে ধরা উচিত।

    শুধু তাই নয় সালাফি এবং সূফি স্কলারদের উচিত তাদের সকল আইনের মূল উৎস কুরআন অনুসরণ করে তাদের কিছু পরস্পরবিরোধী কিছু বিষয় পরিবর্তন করা যেগুলো ভুল কিংবা দূর্বল হিসেবে গণ্য। তাদের উচিত তাদের মূল মতবাদে উল্লেখিত উসুল গ্রহণ করা। যেমন কিছু আশআরিদের মতে ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইজতিহাদ করা ফরজে কিফায়া। ঠিক তেমনি সালাফি মতাবলম্বিরা তাকলিদ বিষয়ে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা উচিত কারণ তাকলিদ না করাতে সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে, যেখানে কুরআনে বলা হয়েছে, “যদি না জানো তবে জ্ঞানী লোকদের জিজ্ঞেস কর” (২১:৭)। রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “অজ্ঞানতার প্রতিকার হচ্ছে জিজ্ঞেস করা” এ ছাড়াও আরো অনেক দলীল রয়েছে। আমরা যদি নিরপেক্ষ ভাবে আমাদের মূল উৎসসমুহ যাচাই করি তাহলে আমরা দেখতে পাবো, সালাফিবাদ কিংবা সূফিবাদ, আশআরি কিংবা জাহেরি কোন মতবাদই প্রকৃত পথ নয় বরং এ দুই এর মধ্যে।

    বর্তমানে আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য, ফিক্বহী কিংবা স্কলারদের ভেদাভেদ দূরে ঠেলে সেকুলার লিবারেলিজমের কুফর এর বিরুদ্ধে উম্মাহর এক হওয়া এবং আল্লাহর নির্দেশের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করা, আল্লাহ বলছেন,

    আর কাফেররা একে অপরের বন্ধু, তোমরাও যদি অনুরূপ না কর তাহলে জমিনে ফিতনা এবং জুলুম ছড়িয়ে পরবে” [আনফাল: ৭৩]

    আমরা এমন এক সময়ে বাস করি যখন ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রবল, তাই আমাদের পুরাতন মতবিরোধ নিয়ে পরে থাকাটা আমাদের বোকামি হবে, এর থেকে কোন সমাধান আসবে না। সুনিশ্চিতভাবে ঈমানের সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্কের থেকে জীবন থেকে রাজনীতিকে আলাদা করে ফেলায় উম্মাহ যে ক্ষতির সম্মুক্ষীন হচ্ছে তা সমাধান করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্কলারদের আল্লাহর গুণ আক্ষরিক না রূপক এ নিয়ে হাজার হাজার ঘন্টা গবেষণায় অতিবাহিত না করে তাগুতি আইন বর্জন করে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকা উচিত। আমাদের মতবিরোধ থাকা স্বত্ত্বেও ইসলামের মূল বিশ্বাসের ভিত্তেতে এক হতে হবে যাতে কালিমা সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হতে পারে।

    আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদিগকে দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে, এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুন্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ নিজের নিদর্শনসমুহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা হেদায়েত প্রাপ্ত হতে পার। [সুরা আল ইমরান: ১০৩]

    আবু ইসমাঈল

  • মুমিনদের ভবিষ্যত অবশ্যই অবশ্যই অতীত হতে উত্তম হবে

    মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন,

    وَالضُّحَى (1) وَاللَّيْلِ إِذَا سَجَى (2) مَا وَدَّعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَى (3) وَلَلْآَخِرَةُ خَيْرٌ لَكَ مِنَ الْأُولَى (4) وَلَسَوْفَ يُعْطِيكَ رَبُّكَ فَتَرْضَى (5)

    অর্থ: ‍”কসম আলোকিত সকালের, কসম রাতের যখন তা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়। আপনার রব আপনাকে পরিত্যাগ করেননি এবং অসন্তুষ্টও হননি। আর অবশ্যই আপনার ভবিষ্যত সময় পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে উত্তম। আর অচিরেই আপনার রব আপনাকে এমন কিছু দান করবেন, যার ফলে আপনি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন।” (সূরা দুহা, আয়াত ১-৫)

    সূরায় দুহা’র এই আয়াত গুলো প্রিয়নবী সা. এর উপর এমন এক সময় অবতীর্ণ হয়েছিলো, যখন তিনি নানাবিধ পেরেশানি আর মানসিক কষ্টের মধ্যে ছিলেন। নবুওয়াতের শুরুর দিকে বিশেষ কিছু কারণে কয়েকদিন সাময়িকভাবে রাসূলের প্রতি ওহী আসা বন্ধ থাকলে কাফিররা বিষয়টিতে রঙ চড়িয়ে ব্যাপকভাবে অপপ্রচারে মেতে ওঠে। আবূ লাহাবের স্ত্রী ও তার দোসররা বলতে থাকে যে রাসূল সা. কে (নাউযুবিল্লাহ) তার রব পরিত্যাগ করেছেন, ফলে আর ওহী আসছে না।…

    কাফির-মুশরিকদের অজ্ঞতাপ্রসূত নিন্দাবাদ আর চক্রান্তের বেড়াজাল ছিন্ন করে প্রিয়নবী সা. কে মানসিক প্রশান্তি এনে দিতে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করতেই মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের ঐতিহাসিক এই আয়াত গুলো অবতীর্ণ করেন। এর মাধ্যমে পরিস্কারভাবে এটা জানিয়ে দেয়া হয় যে, সাময়িকভাবে বিশেষ কারণে রাসূল সা. কিংবা মুমিনরা বিপদগ্রস্থ বা সমস্যার সম্মুখীন হলেও এটা খুবই সাময়িক। শীঘ্রই এই আধার রজনী কেটে যাবে। নব প্রভাতের সূর্যোদয়ও সন্নিকটে। সবচেয়ে মহাসত্য বাস্তবতা পরকাল তথা আখেরাতে তো মুমিনদের জন্য মহা সফলতা আছেই এমনকি এই দুনিয়াতেও সাময়িক বিপর্যয়ের পর আবারও তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে।

    একইভাবে প্রতিটি মানুষের জীবনেই সফলতা-ব্যর্থতা, সমস্যা-সম্ভাবনা আসে যায়। প্রকৃত মুমিন এবং মহান আল্লাহর উপর পূর্ণ বিশ্বাসী ঈমানদারের সকল অবস্থাই কল্যাণকর। কেননা সে সুখে-দুখে সর্বাবস্থায়ই একটি স্বাভাবিক রোল প্লে করে থাকে। আর এই অবস্থায় তার ধৈর্য্য ও সবর তার জন্য মহান আল্লাহর অশেষ রহমত ও বরকত নিশ্চিত করে দেয়। যারা তাদের কঠিন এবং সমস্যা সঙ্কুল পরিস্থিতিতেও মহান আল্লাহর উপর অবিচল আস্থায় সৎ থাকে, সঠিক পথের উপর চলতে চেষ্টা করে, মহান আল্লাহ তাদেরকে আখেরাতে তো বটেই এই দুনিয়াতেও নিজ অনুগ্রহে ধন্য করেন। আর পরকালের চির কল্যাণ তো আছেই।

    পরিশেষে মহান আল্লাহর সেই ঘোষণাটি স্মরণ করতে চাই, তিনি বলেছেন-

    فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا (5) إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا (6) فَإِذَا فَرَغْتَ فَانْصَبْ (7) وَإِلَى رَبِّكَ فَارْغَبْ

    অর্থ: ‍“সুতরাং কষ্টের সাথেই রয়েছে সুখ। নিশ্চয় কষ্টের সাথেই রয়েছে সুখ। অতএব যখনই তুমি অবসর পাবে, তখনই কঠোর ইবাদাতে রত হও। আর তোমার রবের প্রতি আকৃষ্ট হও।” (সূরা ইনশিরাহ, আয়াত ৫-৭)

    ইসহাক খান

  • তারকা বিভ্রম আর দ্বৈতচারিতা

    আজকাল চারদিকে তারকার ছড়াছড়ি। এখন চাইলেই খুব সহজে যে কেউ তারকা বনে যেতে পারে। রূপালী পর্দার তারকা, ক্রীড়াতারকা, রিয়েলিটি শো তারকা, সঙ্গীত তারকা। কেননা মানুষের স্বেচ্ছাচারিতা, গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসানো, হুজুগ আর অন্ধ অনুকরন আজ ব্যবসার আসল মূলধন। আর এসব নিপতিত বৈশিষ্ঠ্য কেবল এটাই জানান দেয়, মানুষের চিন্তা-চেতনা আর বিবেকবোধ লোপ পেয়েছে আর তারা তাদের চিন্তাশীলতা আর মননকে বন্ধক দিয়েছে মিডিয়ার কাছে। ছোট্ট একটা উদাহরন দেই, যা আমি প্রায় সময়ই দেই। সমকামিতা: আজ থেকে এক দশক আগেও পশ্চিমা কিছু কুকুর ব্যতীত অধিকাংশ মানুষের কাছেই তা ছিলো ঘৃন্য এক কাজ। অথচ মিডিয়ার জঘন্য মিথ্যাচারিতা আর প্রতারনার ধারাবাহিক ফলস্বরূপ আজ অধিকাংশ মানুষই এই ধরনের আচরন যা পশুদের মধ্যে নেই তাকে মানবাধিকার বলে শোরগোল ফেলে দিচ্ছে। অর্থ্যাৎ পশুবৃত্তিকেও ছাড়িয়ে গেছে মানবাধিকারের সংজ্ঞা।

    আরো সহজ করে দেই। টারজান এক জনপ্রিয় টিভি চরিত্র। যে জঙ্গলের মাঝখানে বসবাস করে অথচ তার মুখমন্ডল অসম্ভব রকমের মসৃণ। এবার ভাবুন কোথায় বন্ধক রেখেছেন আপনার চিন্তাশক্তিকে? অবসাদগ্রস্থতা বলে একটা ব্যাপার আছে; আপনাকে এটা গ্রাস করেনি তো? জেগে জেগে ঘুমানো ব্যক্তিকে জাগানো কি যায়!

    আরো বলি, শুনুন। মুসলিম সেই ব্যক্তি যে ইসলাম পালন করে। অর্থ্যাৎ যে ব্যক্তি নিজের স্বাধীন ইচ্ছাকে আত্মসমর্পন আর সঁপে দিয়েছে বিশ্বপ্রতিপালকের কাছে নিষ্ঠা আর বাধ্যবাধকতায়; শান্তি অর্জনের নিমিত্তে। এর বিপরীতার্থক কোন শব্দ হলো সন্ত্রাসবাদ। অথচ এই বিপরীত বৈশিষ্ট্যমন্ডিত দুইটি বিষয়কে সমার্থক বানানোর মতো অসম্ভব কাজটুকুও মিডিয়া করে ফেললো; বন্ধকী মস্তিষ্কের কল্যানে। এটাকে ইংরেজীতে বলে Oxymoron; অর্থ্যাৎ বিপরীতার্থক বৈশিষ্ট্য সম্বলিত ধাঁধাঁ। যেমন-স্থল বৈমানিক [Ground Pilot ]। সত্যিই হাস্যকর।

    আজ তরুণরা “Assassin’s Creed” গেমসে মত্ত থাকলে ও জানে না “Islamic Creed” সম্পর্কে। তারা “Call of Duty” খেললেও সাড়া দেয় না “Call of Duty”- সলাতে। তারা ট্রয়ের কাল্পনিক ক্ষয়িঞ্চু চরিত্র একিলিস [Achilles] কে চিনলেও চিনে না সত্যিকারের তারকা মাসজিদে আল-আকসা বিজয়ী সালাহদীন আইয়ুবীকে। তারা টোয়াইলাইট [Twilight] দ্বারা মোহগ্রস্থ থাকলে ও Towards Light তাদের পদযুগল এগোয় না। তারা আভ্যাটারে [Avatar] এ মন্ত্রমুগ্ধ; পরকালে বিশ্বাস তাদের কাছে সেকেলে। প্রবৃত্তির ডাকে আর টানে তারা সাড়া দেয় Nike এর স্লোগান এর মতো “Just do it” অথচ ফজরের সলাতে তারাই “Never did it”। খুব বেশী pacy life, খুব বেশী rush, খুব বেশী events আর happening তাদের জীবন। অথচ বড় বেশী অন্তঃশূণ্য তাদের অন্তরাত্মা; ঢুকরে কাঁদে সঙ্গোপনে। তারপরও তারা pretend করে iron-man হওয়ার; তাদের thyroid ইনজেকশানে বাড়ানো মাংসপেশীর প্রদর্শনীতে, Hardy’s এর নতুন cool t-shirt এ, Levis এর ছেড়া জিন্সে। আত্ম-প্রতারণা আর আত্ম-বিদ্রুপ কার সাথে হচ্ছে?

    আর ক্রীড়াসক্তির কথা কি বলবো? লা লিগা মেসি-রোনালদোর দ্বৈরথতো দ্বীনদার ভাইদেরও ছেড়ে কথা বলে না। টেনিসে ফেদেরার-নাদাল, ক্রিকেটে শচীন-লারা, ফর্মুলা ওয়ানে শুমাখার পেরিয়ে নতুন কেউ, স্প্রিন্টে বোল্ট, NBA তে জর্ডান কিংবা গলফে উডসদের নিয়ে বড় বেশী মত্ত। বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দল নিয়ে বাড়াবাড়ি তো আর কম হয় না। এসকল তারকাদের অধিকাংশেরই চারিত্রিক দোষে দুষ্ট আর তাদের হামবড়া ভাবের কথা নাই বললাম। কেবল বিনোদিত হওয়ার জন্যই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের খরচ করা হচ্ছে। অথচ কেবল আফ্রিকার দিকে তাকাইলে আমাদের আমুদে ভাব কেটে যাওয়ার কথা। এ সকল খেলোয়াড়রা যতটা না তাদের ক্রীড়াশৈলীর জন্য তার চেয়ে বেশী এনডোর্সমেন্ট, বিপনন, পন্যের দূত কিংবা নারীঘটিত কারনে সংবাদশিরোনাম হন। আর তা গিলার জন্য রয়েছে; একপাল উৎসুক ভেঁড়ার পালসদৃশ তরুণগোষ্ঠী।

    সঙ্গীত-তারকাদের দুর্দশার কথা না বলে কেবল যদি তাদের মধ্যে আত্মহত্যাকারীদের তালিকা করা হয় তা অনেক দীর্ঘ হবে। এটা কেবল সঙ্গীততারকা নয় রূপালীপর্দার তথাকথিত তারকারাও এই মিছিলে পিছিয়ে নেই। সঙ্গীতের নামে কপটতা, অপরের দুঃখের ফিরিস্তি, আত্ম-গরিমা আর হতাশার বিকিকিনি কেবল সাময়িক মোহ তৈরী করে; যা জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে ভুলিয়ে রাখে। আমরা এমন এক Big Brother Society তে বসবাস করি যেখানে অন্যের জীবনের দুর্দশা আনন্দ হিসেবে বিকানো হয়; রিয়েলটি শো নামক ধোঁকায়।

    এসব তারকাদেরকে আর তাদের গুরুদের আপাতঃ দৃষ্টিতে দেখলে মনে হয় তাদের জীবনের সবকিছুই তারা নিয়ন্ত্রণ করছে [as though they are dictating their terms of life]। তারা তাকদীরের উপর প্রবল হওয়ার প্রচেষ্টা করে। বস্তুতঃ তাদেরকে দেয়া হয়েছে অবকাশ আর তাদের সীমালঙ্গনকে তাদের কাছে করা হয়েছে সুশোভিত। আর তাদের সংকীর্ণ জীবনাচরণের কথা নাই বললাম। তাই তাদেরকে দেখে ধোঁকায় নিমজ্জিত হওয়া বোকামি আর মূর্খতা ছাড়া কিছুই নয়।

    আর হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী, যারা যাকে ভালবাসবে কিয়ামাহ্’র দিন তাদের সাথে উত্থিত হবে। তাই আমি কাকে ভালবাসছি তা দেখতে হবে। মুসলিম তরুণদের এই ভালবাসার সবচেয়ে বেশী হকদার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবীগণ। অথচ আজ তরুণসমাজ আদর্শ শূণ্যতায় ভুগছে।

    আর এই অনর্থক মোহগ্রস্থতাকে যারা জীবনের উপজীব্য ভাবে তাদের জন্য এই সতর্কবাণী:

    “তোমরা কি ধারণা কর যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না? [সুরা মুমিনুন:১১৫]”

    সায়্যিদ মাহমূদ গজনবী

  • কান্ডারী: নৈরাশ্যতা পেরিয়ে আশার আলোয়

    নৈরাশ্য:

    ১) রিকশায় চড়ছিলাম। রিকশার চালকের বয়স ষাটোর্ধ্ব। হঠাৎ মনে প্রচন্ড এক ভাবনা এলো; রিকশা চালাতে সক্ষম এমন বয়সে আমি যাত্রী আর জীবনের শেষপ্রান্তে অবসরে সময়কাটানোর বয়সে ওই ব্যক্তি রিকশা চালানোর মতো পরিশ্রমের কাজ করছেন। হঠাৎ এ পরিস্থিতির সাথে মুসলিম উম্মাহ্’র বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে ভাবছিলাম। কয়েকদিন আগেও সিরিয়ায় এক বয়োবৃদ্ধ যিনি ইউটিউবে তার ভিডিও শেয়ার দিয়েছিলেন; শাহাদাহ [ইনশা’আল্লাহ] বরন করেছেন কিংবা এমন হাজারো বয়োবৃদ্ধ যাদের রক্ত কেবল তাদের প্রতিপালক আল্লাহ্; এই স্বীকারোক্তি দানের কারনে প্রবাহিত হচ্ছে অথচ এক্ষেত্রে তরুণদের নির্বিকার আচরণ পীঁড়া দেয়।

    ২) মাসজিদে ইকামাত আস-সলাত দানের তাৎপর্য বেশ। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই দেখি মাসজিদে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটির আন্জাম দেন বয়োজেষ্ঠরা; যাদের কন্ঠস্বর বয়সের সাথে সাথে ক্ষীনতর হয়ে এসেছে। এসব কাজে তরুণদের অগ্রগামী দেখতে মন বড়ই আনচান করে।

    ৩) সমাজের সার্বিক পরিবর্তনে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ড; যার পূঁজি করে অসৎ রাজনীতিবিদরা লোকচক্ষুকে ধুলি দেয় আর তথাকথিত সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্টের ধ্বজ্জাধারীরা সহানুভূতির আর সহমর্মিতার অভিনয়টুকু মঞ্চস্থ করতে কার্পন্য করে না। সেই তুলনায় মুসলিম জাতি; যাদের উত্তরণ ঘটানোই হয়েছে ভাল কাজের আদেশ আর মন্দের নিষেধ করার জন্য, তাদের তরুণ প্রজন্মকে অপেক্ষাকৃত কম যুক্ত দেখেও মনটা ভারী হয়। সমাজে ন্যায়ের বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর আর অন্যায়ের প্রতিবাদে পর্বতসম বাধা তো এই উম্মাহ’র তরুণদেরই হতে হবে।

    আশার আলো:

    ১) যখন দেখি সদ্য ইন্টারমেডিয়েট পাশ করা তরুণরা ইসলামকে তাদের জীবনের সার্বিক বিধান হিসেবে মানতে অগ্রগামী হচ্ছে আর পারিপার্শ্বিকতার চাপকে উপেক্ষা করে ইসলামের প্রথম যুগের লোকদের অনুসরণের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালায়; তখন বুকটা আনন্দে ভরে উঠে। এসব তরুণরাই যখন নিজের যৌবনের সবচেয়ে আবেগঘন সময়ে নিজের চোখের হিফাজত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে তখন কেবল এই ভেবে লজ্জায় মাথা নিচু করি তার বয়সে তো আমি লজ্জাশীলতার ব্যাপারে গাফিল ছিলাম। আর এসব তরুণদের জন্যই তো রাহমানের আরশের ছায়ার প্রতিশ্রুতি।

    ২) এ সকল তরুণদের দ্বীনের প্রতি ভালবাসা, আরবী শিখার প্রতি আগ্রহ আর নিষ্ঠা দেখে আমিও উৎসাহ পাই। সত্যিই আল্লাহ্ তা’আলা প্রস্তুত করছেন এমন এক প্রজন্মকে যারা ইসলামী ব্যক্তিত্ববোধ আর নেতৃত্বের মশালকে প্রজ্জলিত করবে।

    ৩) রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দ্বীনের দাওয়াহ্ দিচ্ছিলেন তখন প্রথম থেকেই তরুণদের সাড়া ছিলো স্বতঃস্ফুর্ত। মাক্কী জীবনে আবদুল্লাহ্ ইবন মাসঊদ, মুসাইব ইবন উমায়র কিংবা আলী রাযিআল্লহু আনহুমা তো তারই উদাহরণ। অনুরূপভাবে মাদানী জীবনে আবদুল্লাহ্ ইবনু উমার, আবদুল্লাহ্ ইবনু যুবাইর, আবদুল্লাহ্ ইবনু আমর ইবনু আস কিংবা আবদুল্লাহ্ ইবনু আব্বাস রাযিআল্লহু আনহুদের উদাহরন কেবল শিহরিতই করে। বর্তমান সময়ে তরুণদের শত বাধা-বিপত্তির মধ্যেও দ্বীনী কার্যক্রমে স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ কেবল সেই স্বর্ণালী যুগেরই আভাস দেয়।

    তরুণদের হাত ধরেই সমাজ পশ্চিমা সংস্কৃতি আর প্রবৃত্তিতাড়িত জীবনের মোহে মোহগ্রস্থ হয়েছিল; আর তাদের হাত ধরেই বিপন্ন মানবতায় নিমজ্জিত সমাজ মুক্তির দিশা খুঁজে পাবে: ইসলামে।

    নৈরাশ্যবাদীতা নয় আশার আলোরই সিঞ্চন করি; এই প্রত্যয়ই ক্রমান্বয়ে দৃঢ়তর হচ্ছে নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তা’আলা প্রস্তুত করছেন বিজয়ের ক্ষেত্র ।

    সায়্যিদ মাহমূদ গজনবী

  • ফিরাসাহ্ [অন্তর্দৃষ্টি]

    [লেখাটি খানিকটা দীর্ঘ হলেও ধৈর্য সহকারে পড়ার অনুরোধ করছি] 

    بسم الله الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله 

    ফিরাসাহ্ হচ্ছে ধীশক্তির অনুভব, উপলব্ধি ও অন্তর্দৃষ্টি। 

    আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: 

    إِنَّ فِي ذَلِكَ لآيَاتٍ لِّلْمُتَوَسِّمِينَ 

    “নিশ্চয় এতে চিন্তাশীলদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।“ [সুরা হিজর: ৭৫] 

    এবং لِّلْمُتَوَسِّمِينَ এর অর্থ, এখানে কিছু প্রখ্যাত তাফসীরবিদদের মতামত উল্লেখ করা হলো: 

    মুজাহিদ রাহিমাহু’ল্লাহ্ বলেন, এটা হচ্ছে “যারা ধীশক্তির অধিকারী”। 

    ইবনু আব্বাস রাদি’আল্লাহু আনহুমা বলেন, এর অর্থ হচ্ছে “যারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে।” কাতাদাহ্ রহিমাহু’ল্লাহ্ বলেন, এর অর্থ হচ্ছে “যারা শিক্ষা গ্রহণ করে।” 

    মুতাকিল রাহিমাহু’ল্লাহ্ বলেন, এর অর্থ হচ্ছে, “যারা চিন্তাশীল”। 

    এখানে, সকল ব্যাখ্যাকারদের মধ্যে তেমন কোন মতপার্থক্য কিংবা বাহ্যিক অসামঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। যেমন-কেউ যদি যারা আল্লাহ্’র রাসূলকে অস্বীকার করেছিল তাদের ধ্বংসস্তুপ এবং আবাস দেখে, তবে সে অন্তর্দৃষ্টি, সতর্কবাণী এবং চিন্তার খোরাক খুঁজে পাবে। 

    আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুনাফিকদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন: 

    وَلَوْ نَشَاء لَأَرَيْنَاكَهُمْ فَلَعَرَفْتَهُم بِسِيمَاهُمْ وَلَتَعْرِفَنَّهُمْ فِي لَحْنِ الْقَوْلِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ أَعْمَالَكُمْ 

    “আমি ইচ্ছা করলে আপনাকে তাদের সাথে পরিচিত করে দিতাম। তখন আপনি তাদের চেহারা দেখে তাদেরকে চিনতে পারতেন এবং আপনি অবশ্যই কথার ভঙ্গিতে তাদেরকে চিনতে পারবেন। আল্লাহ তোমাদের কর্মসমূহের খবর রাখেন।“ [সুরা মুহাম্মদ: ৩০] 

    এখানে, যে বিষয়টি প্রথমে উল্লেখ করা হয়েছে, তা হলো চোখের ফিরাসাহ্ [অন্তর্দৃষ্টি] এবং দ্বিতীয় যে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে তা হচ্ছে কর্ণকুহরের এবং শ্রবণশক্তির ফিরাসাহ্। তাদের কথার ভঙ্গি যা মূলতঃ দুই ধরনের। যার একটি ভাল, অপরটি মন্দ। 

    এখানে যথার্থ কিংবা ভাল কথার ভঙ্গি বলতে হয়তো বুঝানো হয়েছে যেমনটি হাদীসে বর্ণিত আছে: “এবং হয়তো তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ অন্যদের তুলনায় তাদের দাবীতে বেশী বাগ্মী” [বুখারী এবং মুসলিম]; অথবা এটা দ্বারা পরোক্ষ উল্লেখ কিংবা নির্দেশ বুঝানো হয়েছে। আর মন্দ কথা বলার ভঙ্গি হচ্ছে যার মধ্যে ব্যাকরণগত অশুদ্ধি রয়েছে। এর ব্যবহার দ্বারা লোকজনের ভুল ব্যাখ্যার তাড়না অথবা গোপন কোন অর্থ খোঁজার প্রয়াস থাকে; যা হয়তো উদ্দেশ্য করা হয়নি। 

    এই আয়াতের অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ্ তা’আলা তার রাসূলকে [صلى الله عليه وسلم] নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি তাদেরকে তাদের বাচনভঙ্গি দেখে চিনতে পারবেন। একজন বক্তা আর তার অন্তরের অবস্থা সম্পর্কে; বাহ্যিক অবয়বের চেয়ে তার বক্তব্য এবং তার কন্ঠস্বর দ্বারা জানার সম্ভাবনা বেশী। ভাষ্য এবং কন্ঠস্বর দ্বারা বক্তার উদ্দেশ্য অনেক বেশী প্রকাশ পায় , বাহ্যিক উপস্থিতির চেয়ে। ফিরাসাহ্ [অন্তর্দৃষ্টি] দর্শন কিংবা শ্রবণের হতে পারে। 

    এটা বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল [صلى الله عليه وسلم] বলেন: 

    “বিশ্বাসীদের অন্তর্দৃষ্টি সম্পর্কে সতর্ক হও, কেননা সে আল্লাহ্ প্রদত্ত জ্যোতি দ্বারা দেখে।” এরপর তিনি আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন: “নিশ্চয় এতে চিন্তাশীলদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।” [তিরমিযী]। বিশ্বাসীদের ফিরাসাহ্ সবসময় সত্য হয়।

    ফিরাসাহ্ হচ্ছে আল্লাহ্ প্রদত্ত জ্যোতি যা তিনি তার বান্দার অন্তরে প্রবিষ্ট করান। এই জ্যোতি দ্বারা তার বান্দা সত্য-মিথ্যার এবং ভাল-মন্দের পার্থক্য নিরুপণে সমর্থ হন।

    প্রকৃতপক্ষে, ফিরাসাহ্’র স্বরুপ হলো কোন তীক্ষ্ন চিন্তা অন্তরে প্রবেশ করা এবং মতামতের উপর তা প্রবলতর হওয়া। এটা অন্তরের উপর এত বেশী প্রভাব বিস্তার করে যেভাবে সিংহ তার শিকারের উপর। এজন্য আরবীতে ফিরাসাহ্ আর ফারিসাহ্’র মিল দেখুন। ভাষাগতভাবে, ফারিসাহ্ হলো বস্তু আর ফিরাসাহ্’র সাথে সামন্জস্য রয়েছে ওয়াইলাইআহ্ [কতৃত্ব এবং ক্ষমতা], ইমারাহ্ [কর্তৃত্ব এবং নিয়ন্ত্রনক্ষমতা ] এবং সিয়াসাহ্ [প্রশাসন এবং নেতৃত্ব] এর সাথে।

    ফিরাসাহ্’র প্রখরতা নির্ভর করে ঈমানের প্রখরতার উপর। প্রখর ঈমানের একজন ব্যক্তির ফিরাসাহ্ প্রখর হয়। আমর বিন নুযাইদ বলেন, শাহ আল-কিরমানির ফিরাসাহ্ ছিলো খুবই প্রখর এবং কখনো ভুল ছিল না। তিনি আরো বলতেন, যে ব্যক্তি তার দৃষ্টি সংযত করবে, নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বিরত থাকবে, নিজের অন্তঃকরণকে গড়ে তুলবে মুরাকাবাহ্ [আল্লাহ্ সর্বদ্রষ্টা : এই উপলব্ধি থাকা], তার বাহ্যিক অবয়বকে সুন্নাহ্ দ্বারা এবং নিজেকে হালাল ভক্ষণে অভ্যস্থ করে; তার ফিরাসাহ্ কখনো ভুল হবার নয়। 

    আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসউদ রাদি’আল্লাহু আনহু বলেন: “তিনজন লোকের ফিরাসাহ্ সবচেয়ে তীক্ষ্নতম। যে মিশরীয় ইউসুফ আলাইহি সালাম কে খরিদ করেছিল আর তার স্ত্রীকে বলেছিল, “একে সম্মানে রাখ। সম্ভবতঃ সে আমাদের কাজে আসবে অথবা আমরা তাকে পুত্ররূপে গ্রহণ করে নেব।“ [সুরা ইউসুফ: ২১]। অন্যজন হলেন শোয়াইব তণয়া, যে তার পিতাকে মুসা আলাইহি সালাম সম্পর্কে বলেছিল, “একে বরং তুমি (তোমার) কাজে নিয়োগ করো। [সুরা কাসাস: ২৮]”। এবং আবু বকর, কেননা তিনি উমারকে তার উত্তরসূরী নিযুক্ত করেছিলেন।” 

    অন্য বর্ণনায় যুক্ত হয়েছে, ফিরআউনের স্ত্রী’র কথা যিনি মুসা আলাইহি সালাম সম্পর্কে বলেছিলেন: “এ শিশু আমার ও তোমার চক্ষু শীতলকারী [হবে], তাকে হত্যা করো না। এ আমাদের উপকারে আসতে পারে অথবা আমরা তাকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। [সুরা কাসাস: ৯]” 

    আবু বকর সিদ্দিক রাদি’আল্লাহু আনহু ই এই উম্মাহ্’র সর্বোত্তম ফিরাসাহ্’র অধিকারী এবং উমার রাদি’আল্লাহু আনহু কে দ্বিতীয় হিসেবে ধরা হয়। উমার রাদি’আল্লাহু আনহু’র ফিরাসাহ্’র উদাহরণ অনেক, পরিচিত আর সর্বজনবিদিত। তিনি কখনো কিছু সম্বন্ধে বলেননি, “আমার মনে হয় এটা এমন…” বরং এটা ছিল তার চিন্তার প্রতিফলন। বাস্তবিক পক্ষে, কুরআনে তার মতের স্বপক্ষে অনেক ঘটনাকে সত্যায়িত করেছে। এর মধ্যে একটি হলো বদর যুদ্ধের যুদ্ধবন্দীদের সম্পর্কে। 

    একদা সাওয়াদ বিন কারিব নামে এক ব্যক্তি উমার রাদি’আল্লাহু আনহু’র সামনে হেটে গেল এবং তিনি তাকে চিনতেন না। উমার রাদি’আল্লাহু আনহু বললেন: “হয় সে গণক অথবা জাহিলিয়্যাহ’য় সে গণক ছিলো।” উমার রাদি’আল্লাহু আনহু’র সামনে বসার পূর্বে, সাওয়াদ বলেন: “ও আমিরুল মু’মিনীন! আপনি কখনো আপনার অতিথিদের এভাবে স্বাগত জানান না; যেভাবে আমাকে জানালেন। উমার বললেন, “আমরা জাহিলিয়্যাহ’য় এর চেয়ে মন্দ কাজ করতাম। কিন্তু আমি যা জিজ্ঞেস করেছি তার সম্পর্কে বল।” সাওয়াদ বলেন: আপনি সঠিক ছিলেন, ও আমিরুল মু’মিনুন! আমি জাহিলিয়্যাহ’য় গণক ছিলাম, এরপর তিনি তাকে তার গল্প বললেন। ” 

    স্বাভাবিকভাবেই, সাহাবারাই ছিলেন সবচেয়ে তীক্ষ্ন আর নির্ভুল ফিরাসাহ্’র অধিকারী। সত্য ফিরাসাহ্ অর্জিত হয় জীবন থেকে এবং আল্লাহ্ প্রদত্ত জ্যোতি দ্বারা; যা তিনি তার অনুগত বান্দাদের যাকে খুশি প্রদান করেন। হৃদয় প্রাণশক্তি লাভ করে এবং আলোকিত হয়; অতঃপর এর ফিরাসাহ্ প্রায় নির্ভুল হয়। 

    আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: 

    “আর যে মৃত ছিল অতঃপর আমি তাকে জীবিত করেছি এবং তাকে এমন একটি আলো দিয়েছি, যা নিয়ে সে মানুষের মধ্যে চলাফেরা করে। সে কি ঐ ব্যক্তির সমতুল্য হতে পারে, যে অন্ধকারে রয়েছে-সেখান থেকে বের হতে পারছে না?” [সুরা আল-আনআম: ১২২] 

    এই আয়াহ্’য় ব্যক্তিকে ‘মৃত’ বলা হয়েছে তার অন্তরের অবিশ্বাস এবং তার দ্বারা যাপিত অজ্ঞতাপূর্ণ জীবনকে কিন্তু তারপর আল্লাহ্ তাকে জীবন দান করলেন তাকে ঈমানের জ্ঞান দান করে। আর এই উপহারসমুহ লাভের মাধ্যমে কুরআন আর ঈমান তার আলোকবর্তিকা হয়, যা দ্বারা সে অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার পাথেয় লাভ করে এবং সরলপথ প্রাপ্ত হয়। 

    ফিরাসাহ্’র সাথে তিনটি মানব-অঙ্গ সম্পর্কযুক্ত: চোখ, কান এবং অন্তর। তার চোখ বাহ্যিকতা আর নিদর্শনসমুহ পরীক্ষণ করে, তার কর্ণ পরীক্ষণ করে ভাষ্য, অতিশয়োক্তি, তির্যক অনুমান ও ইঙ্গিত, সারমর্ম, যুক্তি এবং কন্ঠস্বর। এবং তার অন্তর পর্যালোচনা করে দৃশ্য এবং শ্রাব্য উপাত্তসমুহ যা দ্বারা অন্যের লুকায়িত চিন্তার উপলব্ধি লাভ করে। তার অন্তর্নিহিত পর্যালোচনা এবং পরীক্ষণ বাহ্যিকতার সাথে তুলনার স্বরুপ যেভাবে মুদ্রার বাহ্যিকতা দেখে তা নকল কিনা পরীক্ষণের মত। এটার অন্য স্বরুপ হলো হাদীস-বিশারদদের ভাল সনদের একটি হাদীস পাঠের পর হাদীসের শব্দচয়ন [মতন] পরীক্ষণে হাদীস জাল প্রমানিত হওয়ার মত। 
      
    ফিরাসাহ্’র ক্ষেত্রে দুটো ব্যাপার বেশ গুরুত্বপূর্ণ। একটি হচ্ছে স্মৃতিশক্তির প্রখরতা, অন্তরের সূক্ষ্নদর্শীতা আর বোধশক্তি। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে নিদর্শণের উপস্হিতি আর অন্যের উপর এর নির্দেশিকা। যখন উভয় গুণের সমন্বয় ঘটে তখন কারো ফিরাসাহ্ ভুল হয় না। ইয়াস্ বিন মুয়াউইয়াহ্’র প্রখর ফিরাসাহ্ ছিলো এবং তিনি এর জন্য সুপরিচিত, এরুপ ইমাম শাফিঈ ও যার ফিরাসাহ্’র উপর লেখনীর বর্ণনা পাওয়া যায়। 

    [প্রবন্ধের সমাপ্তি এখানেই] 
      
    আল্লাহ্ তা’আলা আমাদেরকে অনুধাবন করার তাওফীক দিন। 

    سبحانك اللهم و بحمدك أشهد أن لا إله إلا أنت أستغفرك و أتوب إليك 

    [অনুবাদকর্মের শব্দচয়ণে দুর্বলতা, ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।] 

    সায়্যিদ মাহমূদ গজনবী
    [মূল: ইবনুল কায়্যিম এর একটি প্রবন্ধ থেকে অনুদিত]