Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • পশ্চিমা বিশ্বে নারী নির্যাতন

    পশ্চিমা বিশ্বে নারী নির্যাতন

    পশ্চিমের নারী স্বাধীনতার অলীক ধারণা:

    নারী নির্যাতনের সমাধান হিসাবে পশ্চিমা বিশ্ব সমস্ত পৃথিবীব্যাপী ফ্রিডম বা স্বাধীনতার ধ্যানধারণাকে জোরের সাথে প্রচার করলেও, প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার মিথ্যা শোগানে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে পশ্চিমের নারীরা হয়েছে এক অভিনব দাসত্বের শিকার। বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতা, সুপার হিট হলিউড মুভি, নামী-দামী ফ্যাশন ম্যাগাজিন কিংবা চোখ ধাঁধানো বিজ্ঞাপনের সাহায্যে তারা মুসলিম বিশ্বেও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করছে তাদের মুক্ত-স্বাধীন নারীদের। তাদের ইলেক্ট্রনিক আর প্রিন্ট মিডিয়াতে আধুনিকা নারীদের দেখলে মনে হয় জীবনের সবক্ষেত্রেই তারা প্রচন্ড রকম স্বাধীন। স্বাধীন সমাজে তাদের ভূমিকা নির্ধারণের ক্ষেত্রে, স্বাধীন পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রে কিংবা স্বাধীন পুরুষের সাথে সম্পর্ক তৈরীর ক্ষেত্রে।

    কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাদের শরীরের ওজন, প্রতিটি অঙ্গের মাপ, পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে সাজসজ্জা পর্যন্ত সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় ফ্যাশন, ডায়েট কিংবা কসমেটিকস ইন্ডাস্ট্রীর দ্বারা। সমাজের নির্দেশ মানতে গিয়ে তারা নিজেকে পরিণত করে সস্তা বিনোদনের পাত্রে।

    আর, মুক্ত-স্বাধীন হবার জন্য বাধ্যতামূলক ভাবে কাঁধে তুলে নেয় জীবিকা উপার্জনের মতো কঠিন দায়িত্ব।

    পশ্চিমা পুঁজিবাদী সভ্যতা – নারী নির্যাতনের মূল কারণ:

    পুঁজিবাদ হচ্ছে মানুষের তৈরী এক জীবনব্যবস্থা, যার মূলভিত্তি ব্যক্তি স্বার্থসিদ্ধি। এ জীবনব্যবস্থায় মানুষের নেই কারো কাছে কোন জবাবদিহিতা। বরং রয়েছে লাগামহীন ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারীতার সুযোগ। তাই, পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রিত সমাজে জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি আর চূড়ান্ত ব্যক্তি স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে মানুষ, অন্যের চাওয়া-পাওয়া, আবেগঅনুভূতি, অসহায়ত্ব এমনকি নারীকেও পরিণত করে মুনাফা হাসিলের পণ্যে।

    পুঁজিবাদী সমাজ নারীকে দেখে নিরেট ভোগ্যপণ্য ও মুনাফা হাসিলের উপকরণ হিসাবে। ফলে, নারী সমাজের কোন সম্মানিত সদস্য হিসাবে বিবেচিত না হয়ে, সমাজে প্রচলিত অন্যান্য পণ্যের মতোই পরিণত হয় বিকিকিনির পণ্যে। আর হীন স্বার্থ সিদ্ধির মোহে অন্ধ মানুষ নারীর দৈহিক সৌন্দর্যকে পুঁজি করে চালায় জমজমাট ব্যবসা। বস্তুতঃ নারীর প্রতি এ জঘণ্য দৃষ্টিভঙ্গীর প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসাবে স্বেচ্ছাচারী মানুষ শুধুমাত্র লাভবান হবার জন্য শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র সকল নারীকেই করে নির্যাতিত।

    মুক্ত সমাজ, মুক্ত মানুষ, মুক্ত অর্থনীতি ইত্যাদি পশ্চিমা পুঁজিবাদী জীবনদর্শনের মূলমন্ত্র হলেও, মুক্ত সমাজের মুক্ত জীবনের ধারণা নারীকে মুক্তি দেয়নি বরং বহুগুনে বেড়েছে তার উপর অত্যাচার আর নির্যাতনের পরিমাণ। বাস্তবতা হলো, ফ্রিডম বা স্বাধীনতার ধারণা পশ্চিমা সমাজের মানুষকে ঠেলে দিয়েছে স্বেচ্ছাচারী ও দায়িত্বজ্ঞানহীন এক জীবনের দিকে। যেখানে স্বাধীনতার অপব্যবহারে নির্যাতিত হচ্ছে নারীসহ সমাজের অগণিত মানুষ। জবাবদিহিতার অনুপস্থিতিতে এক মানুষের স্বাধীনতা হচ্ছে অন্য মানুষের দাসত্বের কারণ। আর, ব্যক্তি স্বাধীনতার চূড়ান্ত অপপ্রয়োগে তাদের সমাজে বাড়ছে খুন, ধর্ষণ, যৌন হয়রানী ও পারিবারিক সহিংসতাসহ সকল প্রকার নারী নির্যাতন। এছাড়া, সীমাহীন স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলোও শুধুমাত্র লাভবান হবার জন্য নারীকে পরিণত করছে নিখাদ ভোগ্যপণ্যে।

    এক নজরে পশ্চিমা সমাজে নারী নির্যাতন:

    ১. ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির নির্যাতন: পশ্চিমা সমাজে মূলতঃ তাদের ফ্যাশন, ডায়েট আর কসমেটিকস্‌ ইন্ডাস্ট্রিগুলোই নির্ধারণ করে নারীর পোশাক, তার সাজ-সজ্জা, এমনকি তার দেহের প্রতিটি অঙ্গের মাপ। স্বাধীনতার মিথ্যা শ্লোগানে নারীকে তারা বাধ্য করে জঘণ্যভাবে দেহ প্রদর্শন করতে। তারপর, অর্ধনগ্ন সেইসব নারীদেহকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। ১৯৮৮ সালে টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের বিউটি ইন্ডাস্ট্রিগুলো প্রতিবছর ৮.৯ বিলিয়ন পাউন্ড মুনাফা অর্জন করে থাকে। আর, সমস্ত বিশ্বব্যাপী ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিগুলো বছরে অর্জন করে মাত্র ১.৫ হাজার বিলিয়ন ডলারের মুনাফা।

    অপরদিকে, নামকরা মডেল বা সুপার মডেল হতে গিয়ে নারীকে কমাতে হয় আশঙ্কাজনক পর্যায়ে তার ওজন। পরিণতিতে বন্ধ্যাত্ব, ভয়াবহ নিম্ন রক্তচাপ, অ্যানোরেক্সিয়া কিংবা বুলেমিয়ার মতো মারাত্মক রোগ হয় তার জীবনসঙ্গী।

    ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেনটাল হেলথ এর প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ২০ জনে ১ জন নারী অ্যানোরেক্সিয়া, বুলেমিয়া কিংবা মারাত্মক ক্ষুধামন্দার শিকার হয়। আর প্রতিবছর ১০০০ জন মার্কিন নারী অ্যানোরেক্সিয়া রোগে মৃত্যুবরণ করে। (সূত্র: আমেরিকান অ্যানোরেক্সিয়া/বুলেমিয়া অ্যাসোসিয়েশন)। বস্তুতঃ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিগুলোর বেঁধে দেয়া ভাইটাল স্ট্যাটিকটিকস্‌ অর্জন করতে গিয়েই পশ্চিমে অকালে ঝরে যায় এ সব নারীর জীবন।

    ২. ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি: নারী-পুরুষের লাগামহীন মেলামেশা আর প্রবৃত্তি পূরণের অবাধ স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ ফলাফল স্বরূপ পশ্চিমা সমাজের নারীরা অহরহ হয় ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার। এমনকি এই বিকৃত আচরণ থেকে সে সমাজের নিষ্পাপ শিশুরা পর্যন্ত রেহাই পায় না। নারী স্বাধীনতার অগ্রপথিক যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৪৫ সেকেন্ডে ধর্ষিত হয় একজন নারী, আর বছরে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় সাড়ে সাত লক্ষে। (সূত্র : দি আগলি ট্রু, লেখক মাইকেল প্যারেন্টি)। আর, বৃটেনে প্রতি ২০ জনের মধ্যে একজন নারী ধর্ষিত হয় এবং মাত্র ১০০ জনের মধ্যে একজন ধর্ষক ধরা পড়ে।

    ৩. কর্মক্ষেত্রে হয়রানি: গণমাধ্যম গুলোতে নারীকে প্রতিনিয়ত সেক্স সিম্বল হিসাবে উপস্থাপন করার ফলে নারীর প্রতি সমাজের সর্বস্তরে তৈরী হয় অসম্মানজনক এক বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গী। আর বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গীর ফলাফল হিসাবে শিক্ষিত নারীরাও কর্মক্ষেত্রে তাদের পুরুষ সহকর্মীর কাছে প্রতিনিয়ত হয় যৌন হয়রানির শিকার।

    মিডিয়া ও সরকারী তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ৪০-৬০% নারী কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হয়। আর ইউরোপিয়ান উইমেনস লবির প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাজ্যেও ৪০-৫০% নারী তার পুরুষ সহকর্মীর কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের যৌন হয়রানির শিকার হয়।

    ৪. পারিবারিক সহিংসতা: যে সমাজে নেই কারো কোন জবাবদিহিতা, নেই পরস্পরের প্রতি কোন শ্রদ্ধাবোধ আর সেই সাথে রয়েছে সীমাহীন স্বেচ্ছাচারীতার সুযোগ, সে সমাজে ভয়াবহ পারিবারিক সহিংসতা হয় নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। বস্তুতঃ জীবন সম্পর্কে এ ধরণের ভয়ঙ্কর ভ্রান্তিমূলক ধারণা থেকেই বিয়ের পূর্বে বা পরে সবসময়ই পশ্চিমের নারীরা হয় তার পুরুষসঙ্গীর পাশবিক নির্যাতনের শিকার। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১৮ সেকেন্ডে একজন নারী স্বামী কর্তৃক প্রহৃত হয়। ইউএস জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট এর ১৯৯৮ সালে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ৯ লক্ষ ৬০ হাজার পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। আর, প্রায় ৪০ লক্ষ নারী তার স্বামী অথবা বয়ফ্রেন্ডের দ্বারা শারীরিকভাবে হয় নির্যাতিত।

    ৫. কুমারী মায়েদের যন্ত্রনা: নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার প্রধান অসহায় শিকার হয় পশ্চিমের কুমারী অল্পবয়সী নারীরা। আনন্দের পর্ব শেষে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই পুরুষ সঙ্গী আর্থিক বা সামাজিক কোন দায়দায়িত্ব স্বীকার না করায় একাকী নিতে হয় তাকে অনাহুত সন্তানের দায়িত্ব। আর, অপরিণত বয়সে পর্বতসম দায়িত্ব নিয়ে গিয়ে তাকে হতে হয় ভয়ঙ্কর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার। যুক্তরাষ্ট্রের গুটম্যাচার ইনস্টিটিউট এর প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ১৫-১৭ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে প্রায় ৭ লক্ষ ৫০ হাজার অবিবাহিত নারী গর্ভবতী হয়।

    আর, সেদেশের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যে বছরে ১ লক্ষ ১৩ হাজার কিশোরী মেয়ে গর্ভধারণ করে।

    ৬. কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক নির্যাতন: পশ্চিমা সভ্যতা পৃথিবীব্যাপী নারী-পুরুষের সমঅধিকারের বার্তা প্রচার করলেও তাদের নিজেদের সমাজেই নারীরা প্রচন্ড বৈষ্যমের শিকার। শুধু মাত্র নারী হবার জন্য একই কাজের জন্য তাকে পুরুষের চাইতে দেয়া হয় অনেক কম অর্থ। এখন থেকে প্রায় ৪০ বছর আগে প্রেসিডেন্ট কেনেডি যুক্তরাষ্ট্রে ইকুয়েল পে অ্যাক্ট আইন পাশ করলেও, এখনও ১৫ বছর ও তার উর্ধ্বে কর্মরত নারীরা একই কাজের জন্য পুরুষদের চাইতে প্রতি ডলারে ২৩ সেন্ট কম উপার্জন করে। ইউ.এস গর্ভমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিস এর জরিপ থেকে দেখা যায়, সে দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা বিভাগের মোট কর্মচারীর প্রায় ৭০ ভাগ নারী হলেও নারী ব্যবস্থাপকরা পুরুষের চাইতে অনেক কম অর্থ পেয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, ১৯৯৫-২০০০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নারী-পুরুষের উপার্জনের এই বৈষম্য ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। বস্তুতঃ পশ্চিমের দেশগুলোতে নারীরা শুধুমাত্র দুটি পেশায় পুরুষদের চাইতে বেশী উপার্জন করে, তার একটি হচ্ছে মডেলিং আর অন্যটি হচ্ছে পতিতাবৃত্তি।

    ৭. পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রির নির্যাতন: পশ্চিমা বিশ্বে নারীরা সবচাইতে জঘন্য ভাবে নির্যাতিত হয় পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে। যেখানে, ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির মতোই নগ্ন নারীদেহকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয়েছে পৃথিবী ব্যাপী বিস্তৃত মুনাফালোভী এক চক্র। আর, এর জঘন্য শিকার হচ্ছে লক্ষ কোটি অসহায় নারী ও শিশু। শুধু নগ্ন নারী দেহকে উপজীব্য করে এই পৃথিবীতে ৫৭ বিলিয়ন ইউ.এস ডলারের পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রির বার্ষিক রাজস্ব সে দেশের বহুল প্রচারিত ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এ.বি.সি, সি.বি.এস এবং এন.বি.সি-র প্রদত্ত মোট রাজস্বের চাইতেও বেশী (৬.২ বিলিয়ন ডলার)। প্রকৃতপক্ষে, পুঁজিবাদী মন্ত্রে দীক্ষিত মানুষের সীমাহীন লোভ আর চূড়ান্ত স্বেচ্ছাচারীতাই বিশ্বব্যাপী পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠার মূলকারণ।

    প্রথম প্রকাশ: ডিসেম্বর ২০১২

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৩ (সাহাবাদের গঠন পর্যায়)

    নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে

    দাওয়াতের প্রাথমিক পর্যায়ে রাসুল (সা) যাদের মাঝেই ইসলাম গ্রহণ করার মতো মনমানসিকতা লক্ষ্য করতেন, জাতি, বর্ণ, বয়স, সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি ভেদাভেদে তাদের কাছেই তাঁর এ আহবান পৌঁছে দিতেন। তিনি কখনো তাঁর নির্বাচিত কিছু সংখ্যক মানুষের কাছে দ্বীনের আহবান পৌঁছে দেননি বরং সকল শ্রেনীর মানুষকে তিনি সমান ভাবে ইসলামের দিকে আহবান করেছেন এবং তারপর ইসলাম গ্রহণে তাদের মনমানসিকতা বিচারে সমর্থ হয়েছেন। এভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ঈমান আনে এবং ইসলাম গ্রহণ করে।

    নও মুসলিমদের পরিপূর্ণ ভাবে দ্বীন এবং কুরআন শিক্ষা দেবার ব্যাপারে তিনি খুবই উদ্বিগ্ন থাকতেন। তিনি তাঁর সাহাবীদের মধ্য হতে একটি দল তৈরী করেন যারা পরবর্তীতে দাওয়াতের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। এ দলে নারী-পুরুষ সহ মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চল্লিশ জনে উন্নীত হয়। যদিও এরা ছিল বিভিন্ন বয়সের কিন্তু এদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই ছিল বেশী। এদের মধ্যে ছিল ধনী, গরীব, সবল এবং দূর্বল সবধরনের মানুষ।

    মুসলিমদের এদলটি আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ ভাবে ঈমান এনেছিল এবং এরাই মূলতঃ দাওয়াতের কার্য পরিচালনা করেছিল। এরা হলোঃ

    ১. ‘আলী ইবন আবু তালিব (৮ বছর)
    ২. যুবাইর ইবন আল ‘আওওয়াম ( ৮ বছর)
    ৩. তালহাহ্‌ ইবন আল ‘উবাইদুল্লাহ্‌ (১১ বছর)
    ৪. আল আরকাম ইবন আবি আল আরকাম (১২ বছর)
    ৫. ‘আব্দুল্লাহ্‌ বিন মাস’উদ (১৪ বছর)
    ৬. সাঈদ ইবন যায়িদ (বিশ বছরের নীচে)
    ৭. সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (১৭ বছর)
    ৮. সা’উদ ইবন রবি’য়াহ্‌ (১৭ বছর)
    ৯. জা’ফর ইবন আবি তালিব (১৮ বছর)
    ১০. শুহাইব আল রুমি (বিশ বছরের নীচে )
    ১১. যায়িদ ইবন হারিছা (প্রায় বিশ)
    ১২. ‘উছমান বিন ‘আফফান (প্রায় বিশ)
    ১৩. তুলাইব বিন ‘উমায়ির (প্রায় বিশ)
    ১৪. খাব্বাব ইবন আল আরাত (প্রায় বিশ)
    ১৫. ‘আমির ইবন ফুহাইরাহ (২৩ বছর)
    ১৬. মুসআব ইবন উমায়ির (২৪ বছর)
    ১৭. আল মিকদাদ ইবন আল আসওয়াদ (২৪ বছর)
    ১৮. ‘আব্দুলাহ ইবন জাহস (২৫ বছর)
    ১৯. ‘উমর ইবন আল খাত্তাব (২৬ বছর)
    ২০. আবু উবাইদাহ ইবন আল জাররাহ (২৭ বছর)
    ২১. ‘উতবাহ ইবন গাজওয়ান (২৭ বছর)
    ২২. আবু হুদাইফাহ ইবন ‘উতবাহ (৩০ বছর)
    ২৩. বিলাল ইবন রাবাহ (প্রায় ৩০ বছর)
    ২৪. ‘আইইয়াস ইবন রাবি’আহ (প্রায় ৩০ বছর)
    ২৫. ‘আমির ইবন রাবি’আহ (প্রায় ৩০ বছর)
    ২৬. না’ইম ইবন ‘আব্দুলাহ (প্রায় ৩০ বছর)
    ২৭. ‘উছমান (৩০ বছর) এবং
    ২৮. ‘আব্দুলাহ (১৭ বছর) এবং
    ২৯. কুদামাহ্‌ (১৯ বছর) এবং
    ৩০. আল সাইব (প্রায় ২০, এরা সবাই মাজ’য়ুন ইবন হাবিব এর চার ছেলে)
    ৩১. আবু সালামাহ ‘আব্দুলাহ ইবন ‘আবদ আল আসাদ আল মাখযুমি (প্রায় ৩০ বছর)
    ৩২. ‘আবদ আর রাহমান ইবন ‘আওফ (প্রায় ৩০ বছর)
    ৩৩. ‘আম্মার ইবন ইয়াসির (৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে)
    ৩৪. আবু বকর আল সিদ্দিক (৩৭ বছর)
    ৩৫. হামজাহ্‌ ইবন ‘আবদ আল মুত্তালিব (৪২ বছর)
    ৩৬. ‘উবাইদাহ ইবন আল হারিছ (৫০বছর)

    কিছু সংখ্যক মহিলাও এদের সাথে ইসলাম গ্রহণ করে।

    তিন বছর পর এ সকল সাহাবাদের হৃদয় এবং অন্তর যখন পুরোপুরি ইসলামের আদর্শ এবং ধ্যান-ধারনার ভিত্তিতে পরিপূর্ণতা লাভ করে তখন মুহাম্মদ (সা) আশ্বস্ত বোধ করেন। তিনি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হন যে, তাদের হৃদয়ে ইসলাম গভীর ভাবে প্রোথিত হয়েছে এবং ইসলামি আকীদার ভিত্তিতে তারা উচ্চমান সম্পন্ন ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে। এছাড়া, এই দলের অর্ন্তভূক্ত মুসলিমরা যখন সমাজের মানুষকে মুকাবিলা করার জন্য যথাযথ যোগ্যতা এবং দৃঢ়তা অর্জন করে তখন আল্লাহর রাসুল (সা) দুশ্চিন্তা মুক্ত হন এবং আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী কুরাইশদের মুকাবিলায় মুসলিমদের নেতৃত্ব দেন।

  • মৃত্যুপুরীতে বসবাস

    পুরো দেশটা মনে হচ্ছে এক মৃত্যুপুরী। ঘর থেকে বাইরে বের হওয়ার আগে শতবার ভাবতে হয়। যুদ্ধের ময়দানে বেসামরিক লোকদের হেটে যাওয়ার চেয়েও কঠিন হয়ে গেছে বাসা থেকে অফিসে আসা। কখন কার আঘাতে কে আহত বা নিহত হবে সেটি আক্রান্ত ব্যক্তি যেমন জানে না, তেমনি আক্রমণকারীও জানে না সে একটু পরে কাকে খুন করবে, জখম করবে।

    এ কেমন দেশ?
    এ কেমন স্বাধীনতা?

    একটি জংগলেও বোধহয় প্রাণীরা এতোটা শংকিত ও আতংকিত থাকে না।
    পুরো দেশ জুড়ে, বিশেষত ঢাকা শহরে এবং এর সড়ক পথে বর্তমান পরিস্থিতি গৃহযুদ্ধের মতো। কখন কোন চিপা গলি থেকে কে হরতাল বা অবরোধের পক্ষে আর কে বিপক্ষে মিছিল বের করবে, কে রড, চাপাতি আর বোমা-পটকা নিয়ে কার উপর কখন হামলে পড়বে, সরকারী বাহিনী কখন কোনদিকে টিয়ার শেল, রাবার বুলেট ছুড়বে আর লাঠি নিয়ে দৌঁড় দিবে তা কেউ বলতে পারছে না।

    রোববার ঢাকায় ঘটে যাওয়া সেই মর্মান্তিক ঘটনার কাছেই আমাকে বারবার যেতে হয়। বিশ্বজিৎ দাস নিহত হওয়ার সেদিনও সেই এলাকার পাশে দিয়েই আমাকে যেতে হয়েছে। গুলিস্তান থেকে বাসে নেমে রিকসা নিয়ে যাচ্ছিলাম। কিছুদূর যাওয়ার পরই দেখলাম সামনে মিছিলকারী ও পুলিশের সংঘর্ষ। সাথে সাথে রিকসা ঘুরিয়ে ভিন্ন পথে অনেক সময় ব্যয় করে কর্মস্থলে যেতে হয়েছিলো সেদিন। আর দুপুরেই সংবাদ পেয়েছিলাম সেই সংঘর্ষে হতাহত হতভাগ্য বিশ্বজিৎ দাসের।

    এই হানাহানি আর স্বার্থের রাজনীতি আর কত নিরীহ প্রাণ কেড়ে নিবে?
    আর কত মায়ের বুক খালি করবে?
    আমাদের দেশের দুর্নীতিবাজ শাসক ও রাজনীতিকরা সাম্রাজ্যবাদীদের ইশারায় আর কতো বিশৃংখলা আর অরাজকতার পর মার্কিনী ও তাদের অন্য প্রভুদের হাতে এদেশ তুলে দিবে? -তা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন।

    তবে আমার মনে হচ্ছে খুব শীঘ্রই এই দেশ ও এই জাতীর ভাগ্যে সেই কঠিন সময় ও পরিস্থিতি আসছে। যখন ইরাক আফগানিস্তানের মতো এই দেশেও রক্ত আর লাশের বন্যা বয়ে যাবে। বঙ্গোপসাগরে যখন মার্কিন রণতরী চলে আসবে আর চীন ও ভারত যখন এদেশে বিশৃংখলা আর অশান্ত পরিস্থিতিতে শান্তির ধ্বজাধারী হিসেবে প্রকৃত গণতন্ত্রের ফেরী নিয়ে উপস্থিত হবে, তখনই এদেশের মানুষ তাদের আসল ভুলটি বুঝতে পারবে।

    আজকে রাজনীতিকদের ক্রীড়নক হিসেবে যারা হানাহানি উসকে দিচ্ছে, যারা সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একনিষ্ট কর্মী সমর্থক হয়ে দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য জান-প্রাণ দিয়ে রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, সীমাহীন অশান্ত পরিস্থিতিতে যখন সাম্রাজ্যবাদীরা সুযোগ নিয়ে এদেশে চলে আসবে তখন সবার আগে এই বেকুব ছেলে গুলোই তাদের বুলেট ও বোমায় আক্রান্ত হবে। কারজাই আর মিরজাফরের মতো আমাদের শাসকরাও কেবলমাত্র সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থ চরিতার্থের জন্য টিস্যু পেপারের মতো প্রয়োজন অনুসারে ব্যবহার হবে মাত্র। এক সময় তাদের শেষ পরিণতিও হবে অত্যন্ত মর্মান্তিক। কিন্তু তখন আর শত আফসোস করেও কোনো লাভ হবে না।

    মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে অনাগত সেই কঠিন বিপদের হাত থেকে হিফাজত করুন। সময় থাকতে রাজনীতিক ও দেশের আপামর জনসাধারণকে সঠিক বিষয়টি বোঝার তাওফীক দিন। যেনো তারা সময় থাকতে মানব রচিত মতবাদ আর মতাদর্শের বাইরে এসে মহান আল্লাহর জন্য নিবেদিত হওয়ার সুযোগ পান।

    ইসহাক খান

  • সাহাবীগণ ও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ

    সাহাবীগণ (রা) কিভাবে এই মহান কালিমাকে বুঝেছিলেন ও এর দাবিগুলো পূরণ করেছিলেন, সেটা ইমাম সুফিয়ান ইবন উয়াইনাহ (রহ) সুন্দরভাবে ব্যখ্যা করেছেন। মুহম্মদ ইবন আবদুল মালিক আল মুসাইসি বলেন:

    ১৭০ হিজরিতে আমরা সুফিয়ান ইবন উয়াইনাহর সাথে ছিলাম। এক ব্যক্তি তাকে ঈমান সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলো। তিনি জবাব দিলেন, ‘এটা হলো সত্যের স্বীকোরোক্তি ও আমল।’

    লোকটি জিজ্ঞাসা করলো, এটা কি বাড়ে-কমে?

    তিনি জবাব দিলেন, আল্লাহ ইচ্ছা করলে এটা বাড়ে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে এটা কমে; এমনভাবে কমে যে আর এতটুকুই বাকি থাকে [তিনি তার বা হাত দিয়ে তা দেখান]।

    লোকটি প্রশ্ন করলো, ঈমানকে যারা আমলহীন স্বীকরোক্তি বলে তাদেরকে আমরা কিভাবে মোকাবেলা করবো? [সম্ভবত তিনি মুরজিয়্যাদের কিভাবে মোকাবেলা করতে হবে তা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছিলেন। মুরজিয়্যাগণ চিন্তা অনেকটা এরকম ছিল যে ঈমান আনলে মানুষ জান্নাতে যাবেই (শাস্তি ছাড়া) তার আমল থাকুক বা না থাকুক]

    সুফিয়ান জবাব দিলেন, ঈমানের বিধিবিধান ও সীমাগুলো নির্ধারিত হওয়ার আগে তারা এই কথাটি বলতো। আসলে আল্লাহ সুবহানাহুতা’আলা আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা)-কে মানবজাতির কাছে এই কথা বলার জন্য পাঠিয়েছেন যে, আল্লাহ ছাড়া আর কারোই উপাসনা পাওয়ার অধিকার নেই এবং আমি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। মানুষ এটা বলার পর তাদের রক্ত ও সম্পদ (বৈধ কারণ ব্যতিত) নিরাপত্তা পেল এবং তাদের হিসাব হবে আল্লাহর সাথে। যখন আল্লাহ হাইয়ুল কাইয়ুম এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন তখন তিনি রাসূল (সা) কে বললেন তাদেরকে নামাজের নির্দেশ দিতে। রাসূল (সা) তাদেরকে নামাজের নির্দেশ দিলেন ও তারা তা পালন করলেন। আল্লাহর শপথ, তারা যদি এটা না করতো তাহলে তাদের প্রথম কাজটা কোনোই উপকারে আসতো না।

    যখন আল্লাহ হাইয়ুল কাইয়ুম এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন তখন তিনি রাসূল (সা) কে বললেন তাদেরকে মদীনায় হিজরতের নির্দেশ দিতে। রাসূল (সা) তাদেরকে সেই নির্দেশ দিলেন ও তারা তা পালন করলো। আল্লাহর শপথ, তারা যদি এটা না করতো তাহলে তাদের প্রথম কাজ কিংবা নামাজ কোনোটাই তাদের উপকারে আসতো না।

    যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন তখন তিনি রাসূল (সা) কে বললেন তাদেরকে মক্কায় ফেরার নির্দেশ দিতে যেন তারা তাদের (কাফের) পিতা ও সন্তানদের সাথে ততক্ষন পর্যন্ত যুদ্ধ করে যতক্ষন না তারা (কাফেররা) সেই কালিমাটি বলে যেটি তারা নিজেরা বলেছে, তাদের সাথে নামাজ পড়ে ও তাদের হিজরতের সাথে যুক্ত হয়। রাসূল (সা) তাদেরকে সেই নির্দেশ দিলেন ও তারা তা পালন করলো। আল্লাহর শপথ, তারা যদি এটা না করতো তাহলে প্রথম প্রথম কাজ, নামাজ কিংবা হিজরত কোনোটাই তাদের উপকারে আসতো না।

    যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন তখন তিনি রাসূল (সা)-কে বললেন তাদেরকে নির্দেশ দিতে তারা যেন হিজরত করে এসে আল্লাহকে উপাসনার জন্য কারা তাওয়াফ করে ও দীনহীনভাবে মাথার চুল ছেটে ফেলে। রাসূল (সা) তাদেরকে সেই নির্দেশ দিলেন ও তারা তা পালন করলো। আল্লাহর শপথ, যদি তারা এটা না করত তাহলে তাদের প্রথম কাজ, তাদের নামাজ, তাদের হিজরত কিংবা পিতার সাথে যুদ্ধ করা কোনটাই তাদের উপকারে আসতো না।

    যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন তখন তিনি রাসূল (সা)-কে বললেন তাদেরকে নির্দেশ দিতে তারা যেন হিজরত করে গিয়ে নিজেদের সম্পদ থেকে যাকাত প্রদান করে, যাতে সেই সম্পদ পবিত্রতা অর্জন করে। রাসূল (সা) তাদেরকে সেই নির্দেশ দিল এবং তারা তা পালন করলো ……..। আল্লাহর শপথ, তারা যদি এটা না করতো তাহলে তাদের প্রথম কাজ, তাদের নামাজ, তাদের হিজরত, তাদের পিতাদের সাথে যুদ্ধ কিংবা তাদের তাওয়াফ কোনোটাই তাদের উপকারে আসতো না।

    যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন, যেটা ঈমানের বিধিবিধান ও সীমাগুলোর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হলো, তখন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বললেন:

    আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম। [মাইদাহ:৩]

    সুফিয়ান এরপর বললেন, ‘তাই কেউ যদি ঈমানের কোনো একটি অংশ বাদ দেয় তাহলে আমাদের দৃষ্টিতে সে ঈমানহীন (কাফের)। অবশ্য যদি সে আলস্য বা অবহেলার কারণে তা ত্যাগ করে থাকে, তাহলে আমরা তাকে শুধরাবো এবং আমাদের দৃষ্টিতে সে দূর্বল/অপূর্ন ঈমানের অধিকারী। এটাই সুন্নাহ। কেউ এ বিষয়ে কোনকিছু জিজ্ঞাসা করলে এই কথাগুলো আমার বরাত দিয়ে বলবে।

    সূত্র: মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাব লিখিত ’আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা’ থেকে সংগৃহিত

    প্রথম প্রকাশ: ২০১২ইং

  • খিলাফাহ কিভাবে মুসলিম বিশ্বে শিল্পায়ন ঘটাবে?

    খিলাফাহ কিভাবে মুসলিম বিশ্বে শিল্পায়ন ঘটাবে?

    ভূমিকা

    খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজ করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই যে প্রশ্নটির সম্মূখীন হই তা হলো, খিলাফাহ কিভাবে এই একবিংশ শতকে ইউরোপ ও আমেরিকার সাথে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকবে? মুসলমানদের মধ্যে এ ধারণা প্রবল যে বর্তমান পরাশক্তিগুলো শুধু সামরিকভাবেই নয় বরং অর্থনৈতিকভাবেও খুবই শক্তিশালী। উম্মাহর মধ্যে প্রচলিত এ ধারণার কারণে ‘খিলাফাহ শুধুমাত্র স্বপ্ন… আজকের দুনিয়ায় এর বাস্তবায়ন কখনোই সম্ভব নয়’ এমন বোধ অনেকাংশেই শক্তিশালী হয়েছে।

    আমরা যদি উম্মাহকে খিলাফতের প্রয়োজনীয়তা তথা মুসলিম বিশ্বের যাবতীয় সমস্যা মোকাবেলায় খিলাফতের অপরিহার্যতার বিষয়টি বোঝাতে চাই তাহলে শুধুমাত্র ইসলামী শরীয়াহর দলীলই সব সময় যথেষ্ট নয়। উম্মাহর আস্থা অর্জনের জন্য আমাদেরকে খিলাফত কিভাবে বাস্তবে মুসলিম বিশ্বের সমস্যাগুলোর সমাধান করবে এবং সেই সাথে বর্তমান পরাশক্তিগুলোকে মোকাবেলা করে মাথা উঁচু দাঁড়িয়ে থাকবে সেই পরিকল্পনার কথাও জনগণকে জানাতে হবে।

    আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় খিলাফতের সামরিক শক্তির আলোচনা নয় বরং আজ আমরা খিলাফতের শিল্প ও অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে চিন্তা-ভাবনা উপস্থাপন করবো ইনশাআল্লাহ।

    আমরা যদি শিল্পায়নের মতো একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয় নিয়ে অর্থবহ আলোচনা করতে পারি তাহলে তা সংশয়বাদীদেরকে এমন ধারণাও দিতে পারে যে খিলাফত শুধুমাত্র শিল্পের প্রসার ঘটাবে না বরং আল্লাহর অনুগ্রহ থাকলে বিশ্বের তাবৎ জাতিসমূহের উপরেও নিজের অবস্থানকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।

    শিল্পায়ন বলতে কী বোঝায়?

    আজকের মুসলিম বিশ্ব শিল্পন্নোত দেশগুলো থেকে অবশ্যই অনেকদূর পিছিয়ে। যদিও পশ্চিমা দেশগুলো এখন থেকে দেড়শ দুইশ বছর আগেই শিল্পের প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে কিন্তু মুসিলম দেশগুলো এখনও প্রায় প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে এবং অনেকাংশেই উন্নত দেশগুলোর উপর নির্ভরশীল থেকে গেছে। তবে আলোচনার শুরুতে শিল্পায়ন তথা শিল্পোন্নত অর্থনীতি বলতে কি বোঝায় তা ব্যাখ্যা করা যাক। বাস্তবে যখন কোন অর্থনীতি ম্যানুফ্যাকচারিংকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এবং ম্যানুফ্যাকচারিংই অর্থনীতির অন্য সেক্টরগুলোর চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে তখন সেই অর্থনীতিকে আমরা শিল্পোন্নত অর্থনীতি হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি। আর ম্যানুফ্যাকচারিং বলতে কাঁচামালকে প্রক্রিয়াজাতকরণ করে ব্যবহার্য পণ্যে পরিণত করা বোঝায়। উদাহরণস্বরুপ আমরা বৃটিশ সম্রাজ্যের কথা বলতে পারি। ম্যানুফ্যাকচারিং ছিল তার অর্থনীতির মূল বিষয়। জাহাজ নির্মান, গোলাবারুদ উৎপাদন, খনিজ আহরনে তাদের দক্ষতা তাদেরকে পরাশক্তিতে পরিণত করেছিল। অর্থনীতির এই বৈশিষ্ট্যের কারণে তারা সহজেই যে কোন স্থানে যুদ্ধ সূচনা এবং উপনিবেশ স্থাপন করতে পারতো। শান্তিকালীন সময়ে এসব শিল্পকারখানা অসামরিক কাজে ব্যবহৃত হতো।

    একটি জাতি যখন বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে দক্ষতা অর্জন করে এবং তার শিল্পভিত্তি মজবুত থাকে তখনই সেই জাতি স্বনির্ভর হয় এবং অন্য জাতির নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। কিন্তু শিল্পায়ন না ঘটলে একটি জাতিকে অবশ্যই তার প্রতিরক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে অন্য জাতির উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। আর এই অবাঞ্ছিত বাস্তবতাতেই আজকের মুসলিম বিশ্ব নিমজ্জিত।

    কেন মুসলিম বিশ্বে শিল্পের প্রসার ঘটেনি?

    যে কোন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকই মুসলিম বিশ্বের বর্তমান বাস্তবতায় হতাশ এবং অবাক হবেন। কেননা বিশাল খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডার নিয়েও এই দেশগুলো দরিদ্র এবং শিল্পের প্রসার ঘটাতে দারুনভাবে ব্যর্থ। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, ইরাক একাই পৃথিবীর মোট তেল রিজার্ভের ১০% এর অধিকারী। তেমনিভাবে ক্ষুদ্র কুয়েতও পৃথিবীর মোট তেলের ১০ শতাংশের মালিক। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াসহ মুসলিম বিশ্বের মানচিত্রের সর্বত্র একই দশা। সব জায়গাতেই চোখে পড়বে অব্যবস্থাপনা ও ভ্রান্তনীতির শত-সহস্র উদাহরণ।

    সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং নীতি না থাকায় – মুসলিম দেশগুলোর শাসকরা সব সময়ই অদূরদর্শী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যস্ত। আর এ ধরণের প্রবণতা শুরু হয়েছে সেই ১৯২৪ সালে খিলাফত ধ্বংসের সময় থেকেই।

    তুরস্কের মধ্যে যে সম্ভবনা ছিল তা বিকশিত হয়নি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ এর বিতর্কিত এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত নীতি বাস্তবায়নের কারণে। তেমনি পাকিস্তানও এমনভাবে বিশ্বব্যাংকের নীতিকে বাস্তবায়ন করছে, যার ফলাফল হলো পাকিস্তান টেঙ্টাইল পণ্য রপ্তানি করছে ঠিকই কিন্তু তার শিল্পভিত্তি গড়ে উঠছে না। একই ঘটনা ঘটছে বাংলাদেশেও। আরব দেশগুলিও পণ্য উৎপাদনের জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ কারখানা গড়ে তুলতে পারেনি। এমনকি তেল উৎপাদনের জন্য যেসব স্থাপনা গড়ে উঠেছে সেগুলোও মূলত পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলোরই অবদান। আর পুঁজিবাদী এই কোম্পানিগুলো এ কাজটি করেছে মূলত অপরিশোধিত তেল উৎপাদন এবং তা রিফাইনিং এর ক্ষেত্রে তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য। এছাড়া তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে রাজনৈতিকভাবে বশে রাখাটাও তাদের এ সেক্টরে বিনিয়োগ করার অন্যতম উদ্দেশ্য। ২০০৬ সালে মধ্যপ্রাচ্য পৃথিবীর মোট অপরিশোধিত তেলের ৩১.২ শতাংশ উৎপাদন করে। কিন্তু এসময় তারা মাত্র ৩.২ শতাংশ তেল পরিশোধন করতে সক্ষম হয়।

    ইন্দোনেশিয়া পুরো ৮০ এবং ৯০ দশক জুড়ে অর্থনৈতিক উদারীকরণের নীতি বাস্তবায়ন করে এবং বিদেশী বিনিয়োগের জন্য সবকিছু উন্মুক্ত করে দেয়। কিন্তু তার ফল দাঁড়ায় ১৯৯৭ এর এশিয়া সংকট যা ইন্দোনেশিয়া এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আজ ইন্দোনেশিয়া ১৪০ বিলিয়ন ডলার ঋণের জালে বন্দী।

    মুসলিম দেশগুলো রাষ্ট্রীয় জীবনে যে সব নীতি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে তার বেশিরভাগই পরস্পরবিরোধী, যার কারণে রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে জনগণের দৈনন্দিন প্রয়োজন পূরণ করা কোনভাবেই সম্ভব হয়ে উঠছে না। অর্থনৈতিক টানাপোড়ন এখানে এত প্রকট যে জনগণ শুধুমাত্র রুটি-রুজির ধান্ধা করতে গিয়েই দিন পার করে ফেলে; রাষ্ট্রকে পরাশক্তিতে পরিণত করার জন্য কাজ করার সময় তাদের হয়ে ওঠেনা। এজন্য কেউ যদি মুসলিম দেশগুলোকে শক্তিশালী তথা শিল্পোন্নত করতে চায় তাহলে তাকে অবশ্যই জনগণকে তার (শিল্পোন্নয়নের) প্রয়োজনীয়তা বুঝাতে হবে এবং এজন্য যে যে ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন হবে সে ব্যাপারে জনগণকে রাজী করাতে হবে।

    ২য় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ভোগ্যপণ্য বিপননের অর্থনীতিকে পাশে সরিয়ে রেখে সমরাস্ত্র উৎপাদন ভিত্তিক শিল্পের প্রসার ঘটানোর নীতিতে মার্কিন জনগণের সহযোগীতা এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

    সে সময়কার মার্কিন সরকার যুদ্ধ জাহাজ ও এরোপ্লেন নির্মান এবং সমরাস্ত্র উদ্ভাবন ও উৎপাদনের জন্য বিশাল বাজেট বরাদ্দ করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এর মাধ্যমে জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করা। যুদ্ধকেন্দ্রীক এই শিল্পায়ন দ্রুত মার্কিন অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করলো। রাতারাতি বেকারত্ব কমে গেলো। ১৯৪১ এর ডিসেম্বরে যখন আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে জড়িত হলো তখন অর্থনীতির প্রত্যেকটি সেক্টর যুদ্ধের যোগান দিতে সক্ষম হলো। সে সময় এত দ্রুত শিল্প প্রবৃদ্ধি ঘটলো যে আমেরিকাতে বেকারত্বের বদলে শ্রমিক সংকট দেখা দিলো। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জনগণ ও শিল্পকে ক্রমাগত উৎসাহ দেয়ার ব্যাপারটিও সমান তালে চলতে থাকলো। ফলে ত্রিশ দশকের শেষাংশে মার্কিন ওয়ার ইন্ডাষ্ট্রি ৩ লক্ষ এরোপ্লেন, ৫ হাজার কার্গো জাহাজ, ৬০ হাজার ল্যান্ডিং ক্র্যফট এবং ৮৬ হাজার ট্যাঙ্ক তৈরী করে ফেলল। অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় মার্কিন অর্থনীতিতে নারীশ্রম সবচেয়ে বেশি পরিমাণে নিয়োজিত হলো।

    যুদ্ধ সরঞ্জাম তৈরীতে মার্কিন সরকারের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করলো মার্কিন ব্যবসায়ীরা। দশক ধরে চলমান মন্দাকে উপেক্ষা করে তারা বড় বড় বিনিয়োগ করলো। ফলে বিশাল শ্রমবাজার সৃষ্টি হলো। জনগণ, পুঁজিপতি শ্রেণী এবং রাষ্ট্র সবাই একসাথে কাজ করে যুদ্ধের প্রয়োজন মেটাতে লাগলো। এই প্রথমবারের মত মার্কিন জনগণ রেশনিং ব্যবস্থা মেনে নিলো। যুদ্ধ অর্থনীতির একটি স্বাভাবিক নিয়ম হলো এখানে খরচ নয় বরং দ্রুত ও নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহই প্রাধান্য পেয়ে থাকে। ফলে কম সময়ে অনেক বেশী শ্রমের প্রয়োজন হয়। মার্কিন অর্থনীতিতেও তাই হয়েছিল, এমনকি রাস্তার ভিক্ষুক পর্যন্ত চাকরির বাজারে লাইন দিয়েছিল। সামরিক বাহিনীতে নিয়োজিত হয়েছিল ১ কোটি ১০ লক্ষ সক্ষম মানুষ। তাদের অনেকেই এর আগে বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত ছিলো; তাদের শুণ্যস্থান পূরণের জন্যও নতুন শ্রমিকের প্রয়োজন পড়লো। ওয়ার ইন্ডাষ্ট্রির টানে কৃষি, খনিজ উত্তোলণ, শিক্ষা-সংস্কৃতি সব জায়গায় নবগতির সঞ্চার হলো। যোগাযোগ ব্যবস্থায় রাতারাতি বিপ্লব সাধিত হলো, শ্রম বাজার ও সামগ্রিক বিপনন ব্যবস্থাও প্রভূত উন্নতি সাধন করলো। শিল্পে ও বাণিজ্যে দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজনে শিক্ষা ও সংস্কৃতির অঙ্গনকে দ্রুত বিকশিত হতে হলো।

    এসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সেরা বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের চিন্তাকে ব্যাপকভাবে কাজে লাগিয়েছিল। মার্কিন সরকার বুঝতে পেরেছিল তারা যদি পারমানবিক বিক্রিয়ার সূত্রকে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র উদ্ভাবনে সক্ষম হয় তাহলে তা তাদেরকে কৌশলগত প্রাধান্য এনে দিতে পারবে। পরাশক্তিগুলোর সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রতিযোগীতার এ পর্যায়েই ঐতিহাসিক ‘ম্যানহাটন’ প্রকল্পের জন্ম হলো।

    মুসলিম বিশ্বের বর্তমান ব্যর্থতা দিয়ে বোঝা যায় প্রাকৃতিক সম্পদের কী পর্যায়ের অব্যবস্থাপনা এখানে চলছে। আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক দূরবস্থা মূলতঃ দুটি কারণে সৃষ্ট; প্রথমত: শাসকদের আদর্শিক শূণ্যতা, দ্বিতীয়ত: আদর্শিক শূণ্যতার ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক অদূরদর্শীতা।

    যতদিন পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বে এ দুটি বিষয়ে পরিবর্তন না ঘটবে ততদিন পর্যন্ত যত সম্পদই থাকুক না কেন আমরা রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উভয়ভাবেই পশ্চিমা শক্তিগুলোর আধিপত্যের শিকার হতে থাকবো। কোন শক্তিশালী আদর্শিক ভিত্তি না থাকলে কিসের উপর আমরা আমাদের অর্থনীতিকে গড়ে তুলবো? যখন কোন সুনির্দিষ্ট আদর্শিক ভিত অনুপস্থিত থাকে তখন রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় যেসব নীতি ও কৌশল গ্রহণ করা হয় তা পরস্পর সাংঘর্ষিক হতে বাধ্য এবং এমতাবস্থায় কোন সুনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে অর্থনীতিকে পরিচালনা করা কখনই সম্ভব নয়।

    নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে খিলাফতের শিল্পায়ন নীতি সাজানো উচিত:

    ১. প্রতিরক্ষা কেন্দ্রীক অর্থনীতি গড়ে তোলা:

    কোন অর্থনীতি যে সেক্টরে বেশি গুরুত্ব দেয় তার ভিত্তিতেই সে অর্থনীতির চরিত্র নির্ধারিত হয়। সেই সেক্টরটিই অন্যান্য সেক্টরের জন্য চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে। উদাহরণস্বরুপ বলা যায় ১৯৮০র দশক পর্যন্ত বৃটেনের অর্থনীতি ছিল মূলতঃ ম্যানুফ্যাকচারিং কেন্দ্রীক। কিন্তু ৮০র দশক থেকে সেখানে সেবাখাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে বৃটেনের অধিকাংশ অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বিদ্যুৎ, পানি, পয়নিস্কাশন, টেলি কম্যুনিকেশন, তথ্যপ্রযুক্তি, হোটেল ম্যানেজমেন্ট, এন্টারটেইনমেন্ট ইত্যাদি সেবাখাতকে ঘিরে আবর্তিত। এসব সেবাখাতের প্রয়োজনেই অন্যান্য অর্থনৈতিক সেক্টর নিজেকে গড়ে তুলছে। কিন্তু খিলাফতের অর্থনীতি হবে প্রতিরক্ষাশিল্প কেন্দ্রীক অর্থনীতি। উন্নত প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা ও তার ক্রমাগত প্রবৃদ্ধি ও আধুনিকায়নই হবে অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। এধরণের অর্থনীতি যে শুধুমাত্র কর্মসংস্থান ও সম্পদ সৃষ্টি করবে তা নয় বরং বৈরী পরাশক্তিগুলোর আগ্রাসী পরিকল্পনা থেকেও খিলাফতকে রক্ষা করবে।

    প্রতিরক্ষা কেন্দ্রীক অর্থনীতির অপরিহার্য করণীয় হলো সমরাস্ত্র তৈরীর কারখানার পাশাপাশি সাপোর্ট ইন্ডাষ্ট্রি হিসেবে স্টীল, লোহা, কয়লা, যানবাহন নির্মান, খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ইত্যাদি শিল্প গড়ে তোলা।

    রাষ্ট্রকে শিল্পোন্নত করতে হলে আরেকটি বিষয় প্রয়োজন আর তা হলো এমন একটি ফোরাম গড়ে তোলা যারা সুনির্দিষ্টভাবে শিল্পপতিদেরকে নিয়ে কাজ করবে এবং সব সময় তাদেরকে উৎসাহ যোগাবে। ভারী শিল্পের প্রয়োজনে সাপোর্ট ইন্ডাষ্ট্রি গড়ে তোলার কাজটি অনেকাংশেই শিল্প উদ্যোক্তাদেরকে করতে হবে এবং এক্ষেত্রে তাদেরকে বিশেষ সুবিধা প্রদান করার সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় পলিসি থাকতে হবে। দরকার হলে লোহা, কেমিক্যাল ইত্যাদি শিল্পের জন্য উদ্যোক্তাদেরকে বিনামূল্যে সরকারী জমি বরাদ্দ দিতে হবে। খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও অন্যান্য কেমিক্যাল নিস্কাশনের জন্য যৌথ বিনিয়োগের নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে; যেসব শিল্প রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তায় সরাসরি অংশগ্রহণ করছে তাদের ক্ষেত্রে কর রেয়াত ও ঋণ প্রদানসহ বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করতে হবে।

    ১৯৫২ সালে যখন জাপানে মার্কিন দখলদারিত্বের অবসান ঘটলো তখন জাপান ঠিক এ ধরণের নীতি গ্রহন করেছিল। উত্তর কোরিয়া পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া কমিউনিজমের হুমকি মোকাবেলায় জাপান তখন তার সেরা ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের কাজে লাগায়। আর স্বাভাবিকভাবেই এক্ষেত্রে তারা মার্কিনীদের কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পেয়েছিল।

    শিল্পবিকাশের সুযোগ সৃষ্টির জন্য তখনকার জাপান সরকার অংশীদারী ব্যবসার শর্তসমূহ শিথিল করে এবং বড় বড় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অনুমোদন দেয়। সেসময় যে সব বিজনেস হাউসের জন্ম হয়েছিল এখনও তারা জাপানের অর্থনীতির নেতৃত্ব দিচ্ছে। বড় বড় শিল্পপতিরা তখন রাষ্ট্রের পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে বুঝেছিল যে রাষ্ট্রের নীতি অনুযায়ী বিনিয়োগ করলে তারা স্বল্প সময়েই বড় পুঁজি সৃষ্টি করতে পারবে। এদিকে মার্কিনীরাও সেসময় জাপানের কাছ থেকে সামরিক রসদ কেনা শুরু করে, ফলে বিশ্ব বাজারে জাপানী পণ্যের বিশাল চাহিদা সৃষ্টি হয়। শিল্প স্থাপনের এই কর্মযজ্ঞের কারণে অর্থনীতিতে সম্পদের প্রবাহ বেড়ে যায় এবং অনেক বিনিয়োগকারী কৃষি এবং টেক্সটাইলের মতো মন্থর প্রকৃতির অর্থনৈতিক কর্মকান্ড থেকে পুঁজি সরিয়ে এনে অত্যাধুনিক কলকারখানা গড়ে তোলে।

    এভাবে উদ্যমী বিনিয়োগকারীদের প্রতিযোগীতামূলক অংশগ্রহণের ফলে জাপানের মন্থর প্রকৃতির শিল্পসমূহ এক সময় অত্যাধুনিক যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরীর শিল্প দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়ে যায়। ১৯৭০ সাল নাগাদ জাপানের শিল্পপণ্যের তালিকার প্রথম দিকে স্থান করে নেয় রঙিন টিভি, এসি, পেট্রোকেমিকেলের মতো অনেক উন্নত প্রযুক্তির পণ্য যার কোন কোনটি এর ২০ বছর আগে জাপানের মানুষ চোখেই দেখেনি।

    অনুরূপ নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে খিলাফত ব্যক্তিমালিকানাধীন পুঁজিকে রাষ্ট্রের পরিকল্পনার সাথে সংযুক্ত করবে এবং প্রধান প্রধান শিল্পপতিদেরকে রাষ্ট্রের সমৃদ্ধির জন্য ঐক্যবদ্ধ করতে সচেষ্ট থাকবে। আমাদের এ কথা মনে রাখতে হবে যে এমনকি আজকের দুঃখজনক বাস্তবতায়ও মুসলিম বিশ্বে ধনাঢ্য শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীর কোন অভাব নেই। রাষ্ট্রের পরিকল্পনার মধ্যে বড় অর্থনৈতিক লাভের সম্ভাবনা দেখলে আমাদের বর্তমান সম্পদশালীরাও কৌশলগত শিল্পে বড় বিনিয়োগে অবশ্যই উৎসাহিত হবে। এছাড়া পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তাদেরকে যদি লাভের পাশাপাশি দেশ ও জনগণের কল্যাণের বিষয়টিও বোঝানো যায় তাহলে তাদের উৎসাহ ও উদ্যাম নিঃসন্দেহে আরো বৃদ্ধি পাবে।

    ২. রাজনৈতিক আকাংখা:

    মুসলিম বিশ্ব শিল্পায়নের দিক থেকে পশ্চাৎপদ থাকার একটি মূল কারণ হচ্ছে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক আকাংখার অনুপস্থিতি। মুসলিম শাসকরা এতদিন আমাদের দেশগুলোকে শুধুমাত্র পশ্চিমা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বাজারে পরিণত করার নীতি বাস্তবায়ন করেছে। তথাকথিত মুক্তবাজার ও মুক্তবাণিজ্যের ধারণা সব সময়ই আমাদের দেশগুলোর শিল্প কারখানা ধ্বংসের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। শিল্প কারখানা বলতে যা অবশিষ্ট আছে সেগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছে মূলতঃ পশ্চিমাদের ভোগের সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে। সার্বিক আদর্শিক শূণ্যতার মাঝেও যখনই কোন মুসলিম রাষ্ট্র রাজনৈতিক পরিকল্পনাকে সম্পৃক্ত করে শিল্প স্থাপন করেছে তখনই তারা সরাসরি লভবান হয়েছে। উদাহরণস্বরুপ বলা যায় পাকিস্তান আঞ্চলিক রাজনীতিতে টিকে থাকতে গিয়ে পারমানবিক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল এবং অবশেষে সে পারমানবিক শক্তির অধিকারী হতেও সক্ষম হয়েছে; মিশরও ৫০ এর দশকে অনুরূপ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল কিন্তু ১৯৬৭ সালে ইসরাইলের কাছে পরাজিত হওয়ার পর দেশটি তার পরিকল্পনা পরিত্যাগ করে।

    খিলাফাহ যখন আবার প্রতিষ্ঠিত হবে তখন তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে অভিন্ন রাজনৈতিক লক্ষ্য ও আকাংখার ভিত্তিতে সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে একতাবদ্ধ করা। যখন খিলাফাহ রাষ্ট্রের জনগণ একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্যের ব্যাপারে একমত হবে তখন তারা সবাই সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করতে থাকবে। এক সময় মুসলমানদের বাকী ভূ-খন্ডগুলোও এ ব্যাপারে একমত হবে এবং তারাও খিলাফাহ্‌র সাথে একাত্ম হওয়ার জন্য অগ্রসর হবে। বর্তমানে বিদ্যমান পরিকল্পনাহীনতা থেকে খিলাফাহ উম্মাহকে বের করে আনবে এবং সুনির্দিষ্ট নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রের সকল দক্ষ ও অভিজ্ঞ নাগরিককে একতাবদ্ধ করবে।

    বৃহত্তর জনগণের আস্থা সৃষ্টির জন্য যা সবচেয়ে কার্যকর তা হলো যথাযথ সামরিক সক্ষমতা। নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষা এবং শত্রুকে পরাজিত করার জন্য একটি বৃহৎ ও অত্যাধুনিক সামরিক বাহিনীর কোন বিকল্প নেই। এ ধরণের একটি সামরিক শক্তির আকাঙ্খা, যা এই মুহুর্তে মুসলিম বিশ্বে অনুপস্থিত, স্বাভাবিকভাবেই খিলাফতকে দ্রুত প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিকে ধাবিত করবে যার জন্য প্রয়োজন হবে ব্যাপক শিল্পায়ন। আর শিল্পায়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে কারিগরি দক্ষতা আর কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ। এ দুটি পূর্বশর্ত কিভাবে পূরণ হবে সে জন্যও আমাদের যথাযথ নীতি ও কৌশল থাকতে হবে।

    সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ। কমিউনিষ্টরা ক্ষমতায় আসার পর ১৯২৮ সালে ৫ বছর মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করে যার উদ্দেশ্য ছিল দেশে ভারী শিল্পের শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলা।

    সে সময় গৃহীত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ছিল কতগুলো অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রার সমষ্টি মাত্র। ১৯২৮ থেকে ১৯৩২ এর মাঝামাঝি ইউএসএসআর- এর অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য এসব লক্ষমাত্রা গ্রহণ করা হয়েছিল, যেসকল পদক্ষেপগুলোর মধ্যদিয়ে জাতিটি শিল্প ও সামরিক দিক থেকে স্বনির্ভর হতে চেয়েছিল।

    সেই পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনীতির পদ্ধতিগত উন্নয়নের মধ্যদিয়ে ভারি শিল্পের দিকে ধাবিত হওয়া, তথা ভারি শিল্পের মাধ্যমে আদিম কৃষিভিত্তিক জাতি থেকে শিল্পোন্নত ও সামরিক দিক থেকে একটি শক্তিশালী জাতিতে রূপান্তরিত হওয়া। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে স্টালিন তার শাসনামলে রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা ও সম্পদকে কয়লা, লোহা, স্টিল ও রেলওয়ের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি উৎপাদনে নিয়োগ করেছিলেন। ম্যাগনিটোগোর্সকের মতো ইউরালের অন্তর্গত নতুন নতুন শহরগুলোতে উৎসাহী তরুণ কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টাও চালানো হয়েছিল।

    ৩. খনিজ প্রক্রিয়াকরণ:

    নিজস্ব খনিজ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উপর পূর্ণ নিযয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য ও অন্য জাতির উপর নির্ভশীলতা কমানোর লক্ষ্যে খিলাফত রাষ্ট্র তার খনিজদ্রব্য উত্তোলন, প্রক্রিয়াকরণ ও শোধনাগার তৈরি করবে। যেহেতু কাঁচামাল শিল্পের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, কাঁচামালকে ঘিরে আমাদের মূল উদ্দেশ্য থাকবে পরনির্ভশীলতা কমানো।

    প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধশালী একটিমাত্র দেশ পাকিস্ত্মানের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সম্পদ হলো- তেল, গ্যাস, সোনা, ক্রোমিয়াম, লোহা, কয়লা, বক্সাইট, কপার, এন্টিমনি, সালফার, লাইমস্টোন, মার্বেল, বালি, রক-সল্ট এবং সিরামিকের ক্লে বা কাদামাটি। যেহেতু খিলাফত অন্যান্য মুসলিম ভূ-খণ্ডগুলোকেও একীভূত করার মধ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে, তাই অন্যান্য দেশ গুলোর সম্পদগুলোও খিলাফতের আওতায় আসবে। যার ফলে স্বাভাবিকভাবেই খিলাফতের অভ্যন্তরীণ সম্পদগুলোর উত্তোলন ও প্রক্রিয়াকরণের নীতি বিদেশী কারিগরি দক্ষতার উপর নির্ভশীল রাখা হবে না।

    মুসলিমদের বেশিরভাগ সম্পদই প্রক্রিয়াকরণ করা হয় বিদেশী কম্পানিগুলোকে দিয়ে তথা আমেরিকান কম্পানিগুলোকে দিয়ে। উত্তোলনের নামে এসব সম্পদের বেশিরভাগ অংশই এসকল পশ্চিমা কম্পানিগুলোকে দিয়ে দেওয়া হয়। কখনও কখনও দেশীয় তেল কম্পানিগুলোকেও বেসরকারিকরণের নামে বিক্রি করে দেয়া হয় ঐসব কম্পানিগুলোর কাছে।

    খনিজ প্রক্রিয়াকরণে স্বনির্ভশীল হওয়ার জন্য বেশকিছূ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। যেসকল সম্পদ খিলাফতের মধ্যে থাকবে না সেগুলো অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করে আনা হবে। ইদানিং চীনও একই নীতি গ্রহণ করেছে। চীন তার তেলের প্রয়োজন মেটাতে আফ্রিকান দেশগুলোতে তেলের বিনিময় প্রচুর পরিমানে অন্যান্য সাহায্য প্রদান করে চলেছে। পাশ্চাত্য নীতির অনুসরণেই চীন এখন আফ্রিকায় প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠানসহ দরকারী রাস্তা-ঘাট, স্কুল, হাসপাতাল ও অফিস-আদালত গড়ে তুলেছে। সাম্প্রতিক ইন্দো-আফ্রিকান সম্মেলনও এ নীতির একটি সুন্দর উদাহরণ। একই ধরণের নীতি খিলাফত রাষ্ট্রও প্রয়োজনে গ্রহণ করবে, যদিও আল্লাহর রহমতে মুসলিম ভূ-খণ্ডগুলো পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর।

    মুসলিম বিশ্বে বিদ্যমান পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর ব্যাপারেও খিলাফতকে কিছু নীতি নির্ধারণ করতে হবে। তারা মুসলিম বিশ্বে থাকলে আমাদের কি সুবিধা, আর কি সমস্যা, তা গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। বর্তমানে তারা চরম স্বাধীনতা ভোগ করছে; বিশেষ করে খনিজ সম্পদের বিষয়টিতে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা শ্রম ও দক্ষতার মজুরি হিসেবে খনিজ সম্পদের অংশীদারিত্ব পেয়ে থাকে, এছাড়া মুসলিম বিশ্বের দূর্নীতিপরায়ন শাসকগোষ্ঠী ও অভিজাতশ্রেণী ব্যক্তিগত স্বার্থের বিনিময়ে জনগণের সম্পদ বিদেশীদের হাতে তুলে দিচ্ছে; যার কারণে খনিজ সম্পদের প্রকৃত অধিকারী হয়েও তা থেকে জনগণ তেমন কোন সুবিধা পাচ্ছে না।

    সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এসব কোম্পানি কোন দক্ষতা বা প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর কাছে হস্তান্তর করছে না। খিলাফতের অভ্যন্তরে কোন বিদেশী কোম্পানীকে কাজ করতে হলে অবশ্যই মুসলমানদের সাথে প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি করতে হবে। পারস্পারিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ব্যবসা বানিজ্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। যদি দুটি দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বানিজ্যিক সম্পর্ক থাকে তাহলে তাদের পক্ষে সহজে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া সম্ভব হয় না। বর্তমান বিশ্বে চীন-মার্কিন সম্পর্কের দিকে তাকালে বিষয়টি সহজেই বোঝা যায়। পরস্পর বৈরী এই দুটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে একে অপরের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাদের পক্ষে হঠাৎ করে সংঘর্ষে জড়ানো খুবই কঠিন। প্রযুক্তি বিনিময়ের ক্ষেত্রে পাকিস্তান সম্প্রতি একটি ভাল নজির স্থাপন করেছে। সম্প্রতি ফ্রান্স ও পাকিস্তানের মধ্যে সাবমেরিন নির্মান ও সরবরাহের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ চুক্তি বলে ফ্রান্সের কাছ থেকে পাকিস্তান ৩টি সাবমেরিন কিনবে, কিন্তু শর্ত হলো এর একটি নির্মিত হবে ফ্রান্সে আর বাকী দুটি ফ্রান্সের তত্বাবধানে পাকিস্তানের প্রযুক্তিবিদদের হাতে তৈরী হবে। এ ধরণের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্বলিত নির্মান চুক্তি অবশ্যই উন্নত শিল্প বিকাশে সহায়ক হবে।

    খিলাফাহ রাষ্ট্রকে অবশ্যই তার নিজস্ব কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা সম্পর্কে গতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে। যে সব প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি আমাদের নেই তা দ্রুত বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে সংগ্রহ করে নিজেদের সক্ষমতাকে যুগোপযোগী করে রাখতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় পাকিস্তানে বর্তমানে চিনি ও সিমেন্ট নির্মানের প্লান্ট, কৃষি যন্ত্রাংশ উৎপাদন কারখানা, সড়ক নির্মানের জন্য রোলার তৈরীর কারখানা ইত্যাদি ক্ষুদ্র ও ভারী শিল্পের কারখানা আছে। এসব কারখানাকে সামান্য পরিবর্তন করেই সেখানে ভারী লৌহ ও ইস্পাতজাত সামগ্রী তৈরী করা সম্ভব। এসব লৌহ ও ইস্পাতজাত পণ্য আবার অন্যান্য শিল্প, যেমন গাড়ী নির্মান, সমরাস্ত্র নির্মান ইত্যাদিতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

    ৪. খিলাফত তিনভাবে শিল্পে বিনিয়োগ করবে:

    – সরাসরি বিনিয়োগ: যে সব শিল্প সাধারণত লাভজনক ভিত্তিতে চালানো সম্ভব নয়, কিন্তু রাষ্ট্রের অন্যান্য শিল্পের বিকাশ ও নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য সেগুলোকে অবশ্যই রাষ্ট্রের নিজস্ব বিনিয়োগে স্থাপন করতে ও চালু রাখতে হবে। যেমন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র, সাবমেরিন ও যুদ্ধ জাহাজ নির্মান, রেলওয়ে ইত্যাদি।

    – যৌথ বিনিয়োগ: যেসব ক্ষেত্রে পরবর্তীতে রাষ্ট্র তথা জনগণ লাভবান হবে, অথবা যেসব শিল্প সরকারের অংশগ্রহণ ছাড়া গড়ে উঠতে পারবে না, যেমন তেল উত্তোলন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা ইত্যদিতে রাষ্ট্র ব্যক্তিখাতের সাথে যৌথ বিনিয়োগ করবে।

    – ব্যক্তিখাতের শিল্পে ভর্তুকি বা সুবিধা প্রদান: যারা রাষ্ট্রের চাহিদা মতো পণ্য উৎপাদন করবে, যেমন কোন গাড়ি কারখানা যদি সামরিক যান বা ট্যাঙ্ক উৎপাদন করে তবে তাকে যথাযথ আর্থিক সুবিধা দিতে হবে। যারা অন্যান্য শিল্পের জন্য কাঁচামাল উৎপাদন করে তাদেরকে ভর্তুকি বা ঋণ সুবিধা দেয়া যেতে পারে। রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বৃহৎ ইন্ডাষ্ট্রি (যেমন অস্ত্র কারখানা ইত্যাদি) স্থাপনকারীদেরকে বিনামূল্যে সরকারী জমি বরাদ্দ দিতে হবে।

    খিলাফতের কর্তব্য হবে প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগের জন্য সম্পদশালী উদ্যোক্তাদেরকে উৎসাহিত করা। ইতিমধ্যেই মুসলমানদের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণ পরমানু বিজ্ঞানী এবং পেট্রোলিয়াম বিশেষজ্ঞ তৈরী হয়েছে; কিন্তু রাষ্ট্রের যথাযথ রাজনৈতিক লক্ষ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় তারা বিদেশে চাকরী খুঁজে নিচ্ছে; যার কারণে মুসলিম বিশ্বে দক্ষ জনশক্তির সংকট ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ১৯৬৭ তে যখন মিশর তার পারমানবিক কর্মসূচি বন্ধ ঘোষণা করে তখন সেখানকার বিজ্ঞানীরা সাদ্দাম হোসেনের সামরিক প্রকল্পে যোগ দেয়। পাকিস্তানের পরমানু প্রকল্পের স্থপতি আব্দুল কাদির খাঁন এখন বেকার।

    শিল্পায়নের গতি ধারাকে যদি অব্যাহত রাখা যায় তাহলে তা সামগ্রিক অর্থনীতিতে অবশ্যই ব্যাপক গতি সঞ্চার করবে। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, যে জন্য শিল্পে এই গতি অর্জন করা যাচ্ছে না তা হলো যথাযথ রাজনৈতিক আকাংখা ও পরিকল্পনার অভাব। মুসলিম দেশগুলোর বর্তমান অর্থনীতিতে সত্যিকারের কোন চালিকা শক্তি নেই এবং অধিকাংশ ধনী দেশ শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সম্পদ বিক্রির টাকায় ভোগ-বিলাস করছে।

    আমরা যদি বিশাল আকারের প্রতিরক্ষা ইন্ডাষ্ট্রি গড়ে তোলার কাজে হাত দিই তাহলে ব্যক্তিখাত থেকে অবশ্যই বড় ধরণের বিনিয়োগ আসবে কারণ সরকারের তৈরী করা বড় ধরণের চাহিদা যে সুযোগ সৃষ্টি করবে তাকে কাজে লাগাবে প্রাইভেট সেক্টর। সবার আগে যে ভাল ফলটি দৃশ্যমান হবে তা হলো ব্যাপক কর্মসংস্থান। যদিও মুসলিম বিশ্বে দক্ষ জনবলের অভাব নেই তার পরও হঠাৎ করে শিল্পায়ন ঘটলে আমাদেরকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রশিক্ষণ সুবিধা চালু করতে হতে পারে।

    কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেলে স্বাভাবিকভাবেই দৈনন্দিন পণ্যের ব্যবহার ও চাহিদা বাড়বে, কেননা অনেক মানুষের হাতে তখন খরচ করার মত টাকা আসবে। পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে অর্থনীতির অন্যান্য সেক্টরেও কাজ ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে। নিত্য পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি বিলাসী পণ্যের চাহিদা, ব্যবহার ও উৎপাদন বাড়বে, সেখানে আবার নতুন শিল্প গড়ে উঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ আরো সম্প্রসারিত হবে; বাড়বে অর্থনীতিতে সম্পদের প্রবাহ।

    ৫. কৃষি:

    একটি টেকসই শিল্পায়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। জাতি যাতে খাদ্যের জন্য বিদেশী শক্তির উপর নির্ভরশীল না থাকে এটা নিশ্চিত করা অতীব জরুরী। সকল উন্নয়নই অর্থহীন হয়ে পড়বে যদি জনগণের মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা না থাকে। তাই খিলাফতকে স্রষ্টা প্রদত্ত বিশাল উর্বর ভূমিকে কৃষি উৎপাদনে যথাযথভাবে ব্যবহার করার জন্য একটি সুষম নীতি প্রনয়ণ করতে হবে।

    ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর তুরস্ক শিল্পের পাশাপাশি একটি মোটামুটি শক্তিশালী কৃষিভিত্তি তৈরী করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু ১৯৮০ সালের পর আইএমএফ এর ধ্বংসাত্মক প্রেসক্রিপশন তার কৃষিখাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। তার পরও তুরস্ক এখনও খাদ্যপণ্য, গবাদি পশু এবং পোল্ট্রি রপ্তানীকারক দেশ।

    খিলাফতের উচিত হবে কৃষি ক্ষেত্রে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও কৌশল প্রয়োগ করা। এখানে উল্লেখ্য করার মতো একটি বিষয় হলো ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর উত্তর কোরিয়া ‘যাচ্‌ ফিলসফি’ নামে একটি সুষম কৃষিনীতি বাস্তবায়ন করে। কমিউনিস্ট চিন্তাধারার অনুসরণে এটি ছিল একটি তিন স্তরের কর্মসূচী। উত্তর কোরিয়া এখন তার কৃষি সারঞ্জাম ও প্রযুক্তি অন্যান্য দেশে রপ্তানি করতে আগ্রহী কিন্তু ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন শর্তের কারণে তা এই মুহুর্তে সম্ভব হচ্ছে না। আগামী দিনে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হলে উত্তর কোরিয়ার সাথে কৃষি উন্নয়ন চুক্তি করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে খিলাফত নিশ্চয়ই এমন বাণিজ্য সমঝোতায় পৌঁছবে যাতে করে আমরা তাদের কৃষি প্রযুক্তি ও কৌশল থেকে লাভবান হতে পারি।

    উপসংহার

    এ নিবন্ধে যে আলোচনা হল তা মূলতঃ মোটাদাগের নীতি ও কৌশল। খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যে সব ভূমি খিলাফতের অন্তর্ভূক্ত থাকবে সেগুলোর বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই আসল কৌশল স্থির করতে হবে। আজকের মুসলিম বিশ্ব সম্পদ, দক্ষতা ও জনশক্তিতে সমৃদ্ধ। খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হলে আমাদের এই দক্ষ জনগোষ্ঠীই খিলাফতের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করবে।

    আমাদের বর্তমান শাসকরা পশ্চিমা উপনিবেশবাদী শক্তিগুলোর এজেন্ট। এরা কখোনই রাষ্ট্রের সামর্থ ও সম্ভাবনাকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাবে না। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে জার্মানি দ্রুত শিল্পায়ন করে বাকী ইউরোপের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, যার প্রেক্ষাপটে ১ম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়। মাত্র ৬ বছরের শিল্প বিপ্লব পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্যকে জার্মানীর অনুকুলে নিয়ে এসেছিল এবং তাকে রুখতে পৃথিবীর বাদবাকি পরাশক্তিগুলোকে একতাবদ্ধ হতে হয়েছিল। মাত্র ২০ বছরের শিল্পায়ন সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরবর্তী ৫০ বছর ধরে মার্কিন পরাশক্তির মোকাবেলায় সামর্থ যুগিয়েছিল। এই উদাহরণগুলো থেকে এটা স্পষ্ট যে, যদি প্রবল ইচ্ছা শক্তি থাকে তাহলে যে কোন জাতি শিল্পোন্নত হতে পারে এবং নিজেকে রক্ষা করতে পারে। আর শিল্প ক্ষমতা না থাকলে প্রত্যেকটি জাতিকেই হতে হবে অন্যজাতির অনুগ্রহ নির্ভর।

    তবে খিলাফতের শিল্প ক্ষমতা অর্জন আর এতক্ষণ ধরে আলোচিত জাতিগুলোর শিল্প ক্ষমতা অর্জনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। কুফর ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত জাতিগুলো শিল্পায়ন ঘটিয়েছে অন্য জাতিকে পদানত করা, উপনিবেশ স্থাপন ও পরাশক্তি হওয়ার আকাঙ্খা বাস্তবায়ন করার উদ্দেশ্যে।

    অপরদিকে মুসলিম উম্মাহর শিল্প ক্ষমতা অর্জন ও প্রযুক্তিগত উন্নতি সাধনের যে চেষ্টা, তার পেছনের চালিকা শক্তি ও প্রেরণা হলো ইসলামী আক্বীদা। আর মুসলমানদের সকল কর্ম পরিকল্পনা অবশ্যই হবে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আদেশ ও রাসূল (সা) এর মহান বাণীর আলোকে আলোকিত।

    “হে ঈমানদারগণ! যখন আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূল এমনভাবে তোমাদেরকে ডাকেন যা তোমাদের মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করে তখন সেই ডাকে সাড়া দাও।” [আল কুরআন ৮:২৪]

    হানিফ মতিন
    এপ্রিল, ২০০৮

  • ইসলামী সমাজব্যবস্থায় নারীর সম্মান ও মর্যাদা

    প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য – তথা সমগ্র বিশ্বব্যাপী নারী নির্যাতন একটি সমস্যা। কিন্তু এ সম্পর্কিত সমস্ত আলোচনায় এমনভাবে এ ব্যাপারটিকে উপস্থাপন করা হয় যেন এটি শুধুমাত্র মুসলিম বিশ্বেরই একটি সমস্যা আর এর কারণ হিসেবে সব সময় দায়ী করা হয় ইসলামকে। ইসলামে নারীর অধিকার ও মর্যাদা সম্পর্কে অনেক ভ্রান্ত ধারণা সমাজে প্রচলিত আছে। যেমন:

    – ইসলাম পুরুষকে দিয়েছে নারী নির্যাতন করার অধিকার।

    – নারীর নেই শিক্ষা গ্রহণ, রাজনীতি কিংবা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের অধিকার।

    – নারীর নেই কোন বিষয়ে নিজস্ব মত প্রকাশের অধিকার।

    – নারীর নেই স্বামী নির্বাচন বা তালাকের অধিকার।

    – হিজাব বা পর্দাপ্রার মূল উদ্দেশ্য নারীদের অবরুদ্ধ করা।

    – হিল্লা বিয়ে, গ্রামগঞ্জের মোলাদের অন্যায় ফতোয়া, অনার কিলিং ইত্যাদি ইসলাম অনুমোদিত বিষয়।

    কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, উপরোক্ত কোন প্রচারণার সাথেই নেই ইসলামের দূরতম সম্পর্ক। এখন থেকে চৌদ্দ’শত বছর আগে ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে সকল প্রকার নারী নির্যাতন। উপযুক্ত সম্মানের সাথে নিশ্চিত করেছে নারীর সুষ্পষ্ট সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার। কিন্তু, আজ সমস্ত বিশ্বব্যাপী ইসলামী রাষ্ট্রের অনুপস্থিতিতে নারী বঞ্চিত হয়েছে তার আল্লাহ্‌ প্রদত্ত সকল অধিকার থেকে।

    ইসলাম নারীদের ভূমিকাকে যথার্থ সম্মান দিয়েছে। একটু বিশ্লেষন ও গবেষনা করলেই আমরা দেখবো মা, স্ত্রী ও কন্যা হিসেবে অথবা একজন পেশাজীবি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ভূমিকা পালনকারী হিসেবে কীভাবে ইসলাম নারীদের মর্যদাকে সুউচ্চ করেছে।

    ১. সম্মান ও মর্যাদার মাপকাঠি: পুঁজিবাদী সমাজে মূলতঃ নারীর সম্মান ও মর্যাদার মাপকাঠি হচ্ছে নারীর দৈহিক সৌন্দর্য ও আর্থিক প্রতিষ্ঠা। আর ইসলামী সমাজে নারীর সম্মান ও মর্যাদার মাপকাঠি হচ্ছে তার আলাহ্‌ভীরুতা বা তাকওয়া। রাসূল (সা) বলেছেন, “এই পৃথিবী এবং এর মধ্যস্থিত সমস্ত কিছুই মূল্যবান। কিন্তু সবচাইতে মূল্যবান হচ্ছে একজন সৎকর্মশীল নারী।” (মুসলিম)

    ২. মাতৃত্বের সম্মান: পুঁজিবাদী সমাজ নারীর মাতৃত্বকে দেয়নি কোন সম্মান ও মর্যাদা। আর ইসলাম নারীকে মা হিসাবে করেছে সবচাইতে বেশী সম্মানিত। রাসূল (সা) বলেছেন, “মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের জান্নাত।”

    ৩. গৃহকর্মের মর্যাদা: পুঁজিবাদী সমাজ নারীর গৃহকর্মের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজকে করেছে তুচ্ছতাচ্ছিল্য। আর ইসলাম নারীর গৃহের অভ্যন্তরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, সন্তান জন্মদান ও লালনপালন করাকে দিয়েছে জিহাদের মর্যাদা। মূলত এটিই একজন নারীর মৌলিক ও প্রধান কাজ। রাসূল (সা) বলেছেন, “ঘরে তোমরা (নারীরা) তোমাদের সন্তানদের যত্ন নাও আর এটাই তোমাদের জন্য জিহাদ।” (মুসনাদে আহমাদ)

    ৪. স্ত্রী হিসাবে সম্মান: স্ত্রী হিসাবেও নারীকে ইসলাম দিয়েছে পরিপূর্ণ সম্মান ও মর্যাদা। রাসূল (সা) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম। আর নিশ্চয়ই আমি আমার স্ত্রীর কাছে সর্বাপেক্ষা বেশী উত্তম।” (তিরমিযী)

    ৫. কন্যাসন্তানের সম্মান: পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক এই পৃথিবীতে এখনও কন্যাসন্তান অনাকাঙ্খিত। অথচ ইসলাম উত্তম রূপে কন্যা সন্তান লালন-পালন করাকেও ইবাদত হিসাবে গণ্য করেছে। রাসূল (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তির কোন কন্যা সন্তান থাকে এবং তাকে সে উত্তম শিক্ষা দেয়, তার জন্য জান্নাত অবধারিত হয়ে যায়।

    ৬. সর্বস্তরে নারীর সম্মান: ইসলাম সমাজের সকল স্তরের মানুষকে নারীর সাথে সম্মানজনক আচরণ করার জন্য উৎসাহিত করেছে। রাসূল (সা) বলেছেন, “শুধুমাত্র সম্মানিত লোকেরাই নারীদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করে। আর যারা অসম্মানিত, নারীদের প্রতি তাদের আচরণও হয় অসম্মানজনক।” (তিরমিযী)

    এই হলো ইসলামে নারীর মর্যাদা আর এটা বর্তমান বিশ্বের প্রচলিত মূল্যবোধের মতো নয় যেখানে নারীদের দেখা হয় কেবলমাত্র যৌনতার প্রতীকরূপে এবং ভোগের উপাদান হিসেবে। এর ফলশ্রুতিতে প্রতিনিয়ত নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে।

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ২ (শুরুর কথা)

    [নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]

    শুরুর কথাঃ

    রাসূল হিসাবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হবার পর মুহাম্মদ (সা) সর্বপ্রথম আহবান জানালেন তার সহধর্মিনী খাদিজা (রা)কে এবং তিনি তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করলেন। তারপর তিনি তাঁর চাচাতো ভাই আলী (রা) কে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং তিনিও তাঁর উপর বিশ্বাস আনেন। এরপর তিনি তাঁর ক্রীতদাস যায়েদ (রা) কে আহবান করলে যায়েদ (রা)ও তাঁর উপর ঈমান আনেন। তারপর তিনি তাঁর বন্ধু আবু বকর (রা) কে আহবান জানান এবং তিনিও বিশ্বাস স্থাপন করেন। এরপর তিনি জনসাধারনকে ইসলামের দিকে আহবান করতে থাকেন, এদের মধ্যে কিছু মানুষ ঈমান আনে আর বাকীরা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে।

    আবু বকর (রা) ইসলাম গ্রহন করার পর তার কাছের মানুষদেরকে তার বিশ্বাসের কথা জানান এবং তাদের আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসুলের (সা) দিকে আহবান করেন। আবু বকর ছিলেন তার আপন লোকদের মধ্যে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন। লোকেরা তার সাহচার্য উপভোগ করত এবং বিভিন্ন বিষয়ে তার সাথে পরামর্শ করত। সমাজে তার এ সমস্ত প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি উসমান ইবনে ‘আফফান (রা)কে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসেন। এভাবে পরবর্তীতে যুবাইর ইবন আল-‘আওওয়াম (রা), ‘আবদুর রহমান ইবন ‘আওফ (রা), সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা), তালহা ইবন ‘উবাইদুল্লাহ ইসলাম গ্রহন করেন। এদের সকলকে তিনি মুহাম্মদ (সা) এর কাছে নিয়ে আসেন, তারা সকলে তাদের ঈমান আনার ঘোষনা দেন এবং নামাজ আদায় করেন। এরপর, ‘আমির ইবন আল-যাররাহ্‌ (আবু উবাইদাহ নামে পরিচিত) ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ‘আব্দুলাহ্‌ ইবন ‘আবদ আল-আসাদ (আবু সালামাহ্‌ নামে পরিচিত) ও তার সাথে আল-আরকাম ইবন আবি আল-আরকাম, ‘উসমান ইবন মাজ’য়ুন এবং আরও অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেন। এভাবে একের পর এক বহুসংখ্যক মানুষ ইসলামের ছায়াতলে চলে আসে যে পর্যন্ত না এ বিষয়টি কুরাইশ সম্প্রদায়ের মাঝে আলোচনার বস্তুতে পরিণত হয়।

    প্রথম দিকে মুহাম্মদ (সা) বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। তাদের বলতেন যে, আল্লাহতায়ালা তাদের তাঁর ইবাদত করতে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করার জন্য আদেশ দিয়েছেন। এরপর তিনি কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে মক্কার মানুষকে প্রকাশ্যে ইসলামের দিকে আহবান করতে শুরু করেন, যেখানে আল্লাহ আদেশ করছেন,

    “হে বস্ত্রাবৃত! উঠো এবং সতর্ক করো।” [সুরা আল-মুদ্দাছির: ১-২]

    পরবর্তীতে আল্লাহর রাসুল (সা) দ্বীন ইসলামের দলভুক্ত মানুষেদের নিয়ে গোপনে একত্রিত হতেন এবং তাদের দ্বীন শিক্ষা দিতেন। প্রথমদিকে রাসুল (সা) এর সাহাবীরা কুরাইশদের আড়ালে মক্কার প্রান্তসীমায় অবস্থিত পাহাড়ে নামাজ আদায় করতেন। যখনই নতুন কেউ ইসলাম গ্রহণ করতো, আলাহর রাসুল (সা) তাকে কুরআন শেখানোর জন্য পূর্বে ইসলাম গ্রহনকারী একজনকে পাঠাতেন। তিনি (সা) ফাতিমা বিনত আল-খাত্তাব ও তার স্বামী সা’ঈদ কে কুরআন শেখানোর কাজে খাব্বাব ইবনে আল-আরাতকে নিযুক্ত করেছিলেন। একদিন যখন তারা দু’জন এভাবে খাব্বাব (রা) এর কাছে কুরআন শিখছিলেন, তখন সেখানে ওমর ইবন আল-খাত্তাব আকষ্মিক ভাবে উপস্থিত হন এবং সাথে সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে আল্লাহর রাসুল (সা) অনুভব করেন এভাবে শিক্ষা দান যথেষ্ঠ নয়, তাই তিনি আরকাম ইবনে আল আরকামের বাসগৃহকে তাঁর দাওয়াতের কেন্দ্র হিসাবে মনোনীত করেন এবং এখান থেকেই তিনি মুসলিমদের কুরআন শিক্ষা দিতেন, ইসলাম সম্মন্ধে আলোচনা করতেন, তাদেরকে কুরআন তিলওয়াত ও কুরআন নিয়ে চিন্তা করার জন্য উৎসাহ দিতেন। যখন কেউ ইসলাম গ্রহন করতো, আলাহর রাসুল (সা) তার সাথে দার-উল-আরকামে সাক্ষাৎ করতেন। তিন বছর পর্যন্ত তিনি এভাবে মুসলিমদের শিক্ষা দেন, নামাজে ইমামতি করেন, শেষ রাত্রে তাদেও সাথে তাহাজ্জুদ আদায় করেন, তাদের চিন্তা চেতনাকে উদ্দীপ্ত করেন, নামাজ এবং কুরআন তিলওয়াতের মাধ্যমে তাদের ঈমানকে আরও মজবুত করেন। কুরআনের আয়াত ও আল্লাহর সৃষ্টিকে গভীর ভাবে পর্যালোচনার মাধ্যমে নও মুসলিমদের চিন্তাধারাকে আলোকিত করেন। এছাড়াও তিনি তাদেরকে আল্লাহর কাছে নিজেকে পরিপূর্ণ ভাবে সর্মপনের মাধ্যমে সকল কষ্ট ও বাধাঁ অতিক্রমের উপায় শেখান।

    মুহাম্মদ (সা) তাঁর দলভুক্ত মুসলিমদের সাথে এভাবে দার-উল-আরকামে সময় অতিবাহিত করতে থাকেন যে পর্যন্ত না আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন,

    “অতএব তোমাকে যে বিষয়ে আদেশ করা হয়েছে, তা প্রকাশ্যে ঘোষণা কর এবং মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও।” [সুরা হিজরঃ ৯৪]

  • সম্পদ যথেষ্ট, সম্পদের বিতরণই মূল অর্থনৈতিক সমস্যা

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং জীবন পরিচালনা করার জন্য সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা প্রদান করেছেন। পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ তিনি সৃষ্টি করে তা মানুষের ব্যবহারের জন্য অর্পণ করেছেন। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন,

    “তিনিই সে সত্তা যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য যা কিছু জমিনে রয়েছে সেই সমস্ত।” [সূরা বাকারা : ২৯]

    “এবং আয়ত্ত্বাধীন করে দিয়েছে তোমাদের, যা আছে নভোমন্ডলে ও যা আছে ভূমন্ডলে; তার পক্ষ থেকে।” [সূরা আল জাসিয়া : ১৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরো বলেছেন,

    “যেন সম্পদ তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যে আবর্তিত না হয়” [সূরা হাশর: ৭]

    আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থা বাদ দিলে তার পরিণতি কি হবে সে সম্পর্কেও তিনি সমগ্র মানব জাতিকে সতর্ক করে দিয়েছেন,

    “যে আমার বাণী (কুরআন) প্রত্যাখ্যান করবে, তার জীবনসামগ্রী সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে পুনরুত্থান দিবসে অন্ধভাবে তুলব।” [সূরা তোয়াহা : ১২৪]

    উন্নততর জীবনের পথ প্রদর্শনের লক্ষ্যে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য কুরআন প্রেরণ করেছেন। তিনি পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমস্যাসহ মানব জীবনের সকল সমস্যার বিস্তারিত সমাধান তুলে ধরেছেন। ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি তথা খিলা-ফত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশ ও নিষেধ। এই ব্যবস্থা মানবরচিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সকল ভ্রান্তি আর পক্ষপাতদুষ্টতা থেকে মুক্ত। আর একমাত্র খিলা-ফত সরকারই অত্যন্ত দ্রুত ও কার্যকরভাবে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির সমস্যা সমাধান করার সাথে সাথে গণমানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি নিশ্চিত করতে পরে।

    ইসলাম মানুষের চাহিদাগুলোকে সামষ্টিকভাবে না দেখে প্রত্যেক ব্যক্তির চাহিদাগুলোকে স্বতন্ত্রভাবে বিচার করে। স্বতন্ত্রভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক চাহিদা পূরণ না করে সামগ্রিকভাবে পুরো সমাজের জীবন যাত্রার মান বৃদ্ধি করা তথা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ইসলামিক রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নয়। ইসলাম প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত না করে সবাইকে সমাজ থেকে যেনতেনভাবে তা অর্জন করার জন্য বিচ্ছিন্নবভাবে ছেড়ে দেয়না। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা খিলা-ফত রাষ্ট্রের উপর জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকটি নাগরিকের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা – এইসব মৌলিক চাহিদা পূরণকে ফরয বা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। রাসূল (সা) বলেন, “বাস করার জন্য একটি গৃহ, আব্রু রক্ষার জন্য এক টুকরা কাপড়, আর খাওয়ার জন্য এক টুকরা রুটি ও একটু পানি এসবের চেয়ে অধিকতর জরুরী কোন অধিকার আদম সন্তানের থাকতে পারে না।” (তিরমিযী)

    রাষ্ট্রের নাগরিকের এই মৌলিক চাহিদা পূরণে খলীফা বাধ্য। যদি খলীফা এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তবে তার জন্যে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন রাসূলুল্লাহ (সা)। রাসূল (সা) বলেছেন: “সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্বন্ধে জবাবদিহি করতে হবে।” ইমাম (তথা খলীফা যিনি সর্বসাধারণের উপর শাসক হিসেবে নিয়োজিত তিনি)ও দায়িত্বশীল, তাকেও তার দায়িত্ব সম্বন্ধে জবাবদিহি করতে হবে।

    মা’কিল (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    “এমন আমীর যার উপর মুসলিমদের শাসনভার অর্পিত হয় অথচ এরপর সে তাদের কল্যাণ সাধনে চেষ্টা না করে বা তাদের মঙ্গল কামনা না করে; আল্লাহ্‌ তাকে তাদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না।” (মুসলিম)

    সুতরাং খিলা-ফত রাষ্ট্রে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ বা স্থিতিশীল রাখা কোন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়। এটি প্রত্যেক খলীফার সার্বক্ষণিক দায়িত্ব। তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জনগণের এইসব মৌলিক চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করবেন।

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ১ (ভূমিকা)

    [নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]

    ভূমিকা:

    বর্তমান প্রজন্ম সেই ইসলামী রাষ্ট্রের স্মরণ থেকে বিস্মৃত হয়েছে, যা সত্যিকার ভাবে ইসলাম কায়েম করেছিল। আর ইসলামী রাষ্ট্রের (উসমানী খিলাফত-এর) সমাপনী বছর গুলোতে যারা এখানে বসবাস করেছে, যখন পশ্চিমা বিশ্ব এ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষনা করে, তারা মূলতঃ একটি ক্ষয়ে যাওয়া ধ্বংসোম্মুখ রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাক্ষী যেখানে ইসলামী বিধিবিধানের খুব ক্ষুদ্র একটি অংশই কার্যকর ছিল। তাই আজ অধিকাংশ মুসলিমদের পক্ষেই ইসলামী শাসন-ব্যবস্থার সত্যিকারের স্বরূপ নির্নয় করা খুবই কঠিন। সমস্ত মুসলিম জাতির মনমগজ আজ বর্তমানে বিরাজমান পরিস্থিতির বেড়াজালে বন্দী। আর তাই, রাষ্ট্র-ব্যবস্থা বলতে কেবলই তাদের মানসপটে ভেসে উঠে নীতি বিবর্জিত হীন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বরূপ, যা মূলতঃ মুসলিমদের উপর জোরপূর্বক চাপানো হয়েছিল।

    বস্তুতঃ মুসলিম জাতির এই দূর্ভাগ্যজনক অধ্যায়ের এটিই একমাত্র সমস্যাযুক্ত দিক নয়। বরং এর চাইতেও কঠিনতম সমস্যা হলো সেইসব মুসলিমদের মন-মানসিকতার আমূল পরিবর্তন ঘটানো, যা পশ্চিমা সংস্কৃতির মোহে আবিষ্ট। আর পশ্চিমা সংস্কৃতি হচ্ছে পশ্চিমা বিশ্ব কর্তৃক প্রয়োগকৃত এমন এক অস্ত্র, যা দ্বারা তারা ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থাকে করেছে ভয়ংকর ভাবে রক্তাক্ত আর ক্ষতবিক্ষত। তারপর সেই রক্তাক্ত খঞ্জর হাতে গর্বিত ভঙ্গিমায় এ রাষ্ট্রের সন্তানদের ডেকে বলেছে, ”আমি তোমাদের রুগ্ন জননীকে হত্যা করেছি। যার ব্যবস্থাপনা আর অভিভাবকত্ব অতিশয় দূর্বল, তারতো নিহত হওয়াই উচিত। এছাড়া আমি তোমাদের জন্য সংরক্ষিত করেছি এমন এক জীবন ধারা, যেখানে তোমরা পাবে সুখ আর সমৃদ্ধির নাগাল।” তারপর তারা সেই দূর্ভাগা জননীর সন্তানদের উদ্বুদ্ধ করেছে সেইসব খুনীদের সাথে হাত মিলাতে যাদের খঞ্জর তখনও ছিল তাদের জননীর রক্তে রঞ্জিত। এ যেন হিংস্র হায়েনার ইপ্সিত শিকারের সাথে আচরন সদৃশ। শিকার যেখানে নিশ্চল, হতবিহবল আর কিংকর্তব্যবিমূঢ়। এক প্রচন্ড রক্তক্ষয়ী আঘাত কিংবা ভোজের জন্য কোন উপত্যকার পাদপ্রান্তে টেনে হিচঁড়ে নিয়ে যাবার পূব পর্যন্ত সে যেন চেতনায় ফিরে আসে না।

    সুতরাং কিভাবে এইসব মোহাবিষ্ট হতবিহবল মানুষেরা অনুভব করবে, যে বিষাক্ত খঞ্জর তাদের জননীকে হত্যা করেছে, সেই একই মারনাস্ত্রেও মুখে আজ তাদের অস্তিত্বও বিপন্ন। এই একই অস্ত্র তাদের জীবনও নাশ করবে যদি না তারা এর থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারে। জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা (ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করা) সহ আরো অনেক ইসলাম বিরোধী ধ্যান ধারনা যা আজ মুসলিমরা বয়ে বেড়াচ্ছে, এসবই হচ্ছে বিষাক্ত গরল যা পশ্চিমা সংস্কৃতি মুসলিমদের ধমনীতে প্রবাহিত করেছে। এই বইয়ের মিশনারীদের আগ্রাসন সম্পর্কে আলোচিত অধ্যায়ে উপযুক্ত তথ্য প্রমান সহ এ সকল হত্যাকারীদের প্রকৃত উদ্দেশ্য, তাদের অপরাধের পেছনের কারন এবং উদ্দেশ্য সাধনে গৃহীত পদ্ধতি ও উপায় উপকরন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। বস্তুতঃ তাদের সকল কার্যক্রমের এক ও একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ইসলামকে এই পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা। আর এ লক্ষ্যে তাদের সবচাইতে কার্যকরী অস্ত্র ছিল পশ্চিমা বিশ্বের সংস্কৃতি, যা তারা ঢালাও ভাবে প্রচার করেছিল এবং এর ফলে মুসলিমরা ক্রমশঃ পরিণত হয়েছিল তাদের স্বেচ্ছা প্রনোদিত শিকারে।

    মুসলিম জনগোষ্ঠি ভিন্নবধর্মী এ সংস্কৃতির সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে ছিল সম্পূর্ন অজ্ঞ। তাই যদিও তারা একদিকে পশ্চিমাদের সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তুলেছিল, কিন্তু অপরদিকে তাদের সংস্কৃতিকেই সাদরে বরণ করে নিয়েছিল, যা ছিল পশ্চিমাদের দখলদারিত্ব শেকড় গেড়ে বসার মূল কারন। নির্মম বাস্তবতা হলো, মুসলিমরা কোনও গভীর পর্যালোচনা বা যুক্তি প্রমান ছাড়াই বিদেশীদের পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছিল ও তাদের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাচ্ছিল এবং একই সাথে তাদের আলিঙ্গন করতেই নিজ বাহু উন্মুক্ত করে দিয়েছিল, পান করছিল তাদেরই এগিয়ে দেয়া বিষের পেয়ালা থেকে যে পর্যন্ত না তারা প্রাণহীন, নির্জীব আর ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। কেউ কেউ হয়তো ভেবে থাকবে, এসবই হচ্ছে যুদ্ধের স্বভাব সুলভ ধ্বংসাত্মক ফলাফল, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মুসলিমরা ছিল অজ্ঞানতা আর ভ্রান্ত নির্দেশনার অসহায় শিকার।

    কিন্তু প্রশ্ন হলো, আসলে মুসলিমরা কি চেয়েছিল? তারা কি চেয়েছিল এমন একটি রাষ্ট্র যার ভিত্তি হবে ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু? নাকি তারা চেয়েছিল মুসলিম ভূখন্ডে বহু সংখ্যক রাষ্ট্রের উপস্থিতি? পশ্চিমা বিশ্ব মুসলিম ভূখন্ডে শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী হবার পর, ইতিমধ্যেই মুসলিমদের উপহার দিয়েছে অনেকগুলো রাষ্ট্র। তারপর এ রাষ্ট্রগুলোর সরকারকে প্রকৃত ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে, মুসলিম ভূখন্ড গুলোকে খন্ডে খন্ডে বিভক্ত করে এবং সর্বোপরি ইসলামী শাসনকে প্রয়োজনহীনতায় পর্যবসিত করে তারা তাদের পরিকল্পনার চূড়ান্ত বাস্তব রূপ দান করেছে। এভাবে যতই সময় যেতে থাকে, তারা মুসলিম বিশ্বে তৈরী করতে থাকে নতুন নতুন রাষ্ট্র। এবং এ প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে যতদিন পর্যন্ত মুসলিমরা তাদের প্রস্তাবিত নীতি এবং ধ্যান-ধারনার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে।

    বস্তুতঃ এখানে মূল বিষয় বহু সংখ্যক রাষ্ট্র নয় বরং সমস্ত মুসলিম বিশ্বে একটি একক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। আবার শুধুমাত্র একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাও নয়, এবং নয় প্রতিষ্ঠা করা একটি নাম সর্বস্ব ইসলামী রাষ্ট্র – যার শাসন ব্যবস্থা আল্লাহতায়ালার নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী পরিচালিত নয়। কিংবা এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাও নয়, যা ইসলামী বিধিবিধান বাস্তবায়ন করে কিন্তু একটি বুদ্ধিবৃত্তিক বলিষ্ঠ ইসলামী নেতৃত্ব ছাড়াই যা সমস্ত বিশ্বে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেবে। বরং সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে, এমন একটি একক রাষ্ট্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যা ইসলামী আকীদার (বিশ্বাস) ভিত্তিতে পুনরায় ফিরিয়ে নিয়ে আসবে ইসলামী জীবন-ব্যবস্থা, মানুষের হৃদয় এবং মানষিকতার গভীরে ইসলাম প্রোথিত করে সমাজের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত করবে ইসলাম, এ বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে দেবে ইসলামের আহবান।

    ইসলামী রাষ্ট্র কোনও স্বপ্ন নয়, নয় এটা কারও মগজ প্রসূত আকাশ কুসুম কল্পনা। বরং এটা এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যা পৃথিবী শাসন করেছে দাপটের সাথে আর দীর্ঘ তেরশত বছর ধরে প্রভাবিত করেছে এ বিশ্বের ইতিহাস। এটা এমন এক বাস্তবতা, যা সব সময় ছিল এবং থাকবে। ইসলামী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব প্রমাণের অপরিহার্য উপাদানগুলো কোনও ব্যক্তি বা অন্য কোনকিছুর উপেক্ষা অথবা আক্রমনের বহু ঊর্ধ্বে। আলোকিত মানুষেরা এটাকে তাদের জীবনে বাস্তবায়িত করেছে এবং সমস্ত মুসলিম উম্মাহ্‌ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেদিনের, যেদিন ফিরে আসবে ইসলামের সেই হারানো গৌরবমন্ডিত অধ্যায়। ইসলামী রাষ্ট্র কোনও ব্যক্তির আপন খেয়ালের অভিলাষ নয় বরং এটা আল্লাহতায়ালার পক্ষ হতে মুসলিমদের উপর অর্পিত দায়িত্ব, যা পালনে তারা অঙ্গীকারাবদ্ধ। এ দায়িত্ব পালনে অবহেলাকারীদের জন্য অপেক্ষা করছে শাস্তি। আর যারা নিষ্ঠার সাথে পালন করবে এ দায়িত্ব, তাদের জন্য রয়েছে প্রতিশ্রুত উত্তম পুরস্কার।

    কিভাবে এই মুসলিম উম্মাহ্‌ তাদের রবের সন্তুষ্টি অর্জন করবে, যদি না তাদের রাষ্ট্রে সম্মান ও মর্যাদা না আল্লাহতায়ালা, না তাঁর রাসুল (সাঃ), না ঈমানদারদের জন্য নির্দিষ্ট হয়? কিভাবে তারা তাঁর শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করবে যদি না তারা এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, যা প্রস্তুত করবে এর সামরিক শক্তি, রক্ষা করবে এর সীমানা, বাস্তবায়িত করবে আলাহ্‌ প্রদত্ত আইন কানুন এবং শাসন করবে আলাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী? সুতরাং, মুসলিমদের অবশ্যই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে, কারন ইসলামী রাষ্ট্র ব্যতীত দ্বীন ইসলাম প্রভাবশালী অস্তিত্ব হিসাবে আত্মপ্রকাশ করবে না এবং তাদের ভূখন্ড কখনোই দার-উল-ইসলাম হিসাবে বিবেচিত হবে না, যদি না তা শাসিত হয় আলাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী।

    ইসলামী রাষ্ট্র কোনও অবস্থাতেই একটি সহজলব্ধ প্রচেষ্টা নয়। তাই এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটি সুবিধাবাদীদের মনে জ্বালায় না মিথ্যা আশার আলো (রাষ্ট্র ক্ষমতায় আরোহন করাই যাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য)। প্রচেষ্টার এ পথে বিছানো রয়েছে কন্টক, অপেক্ষা করছে ভয়াবহ বিপদ, রয়েছে শত বাঁধা এবং কঠিন কষ্ট। এছাড়া ইসলাম বর্হিভূত সংস্কৃতি, অগভীর চিন্তাধারা এবং পশ্চিমা বিশ্বের তাঁবেদার শাসন-ব্যবস্থা যা তৈরী করেছে লক্ষ্য অর্জনে ভয়ংকর বাঁধা, এগুলোর কথা বলাই বাহুল্য। ইসলামী রাষ্ট্র পূর্নগঠনে যারা সত্যিকার ভাবে এ আহবানের পথে পা বাড়িয়েছে, তাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক শাসন ব্যবস্থা যা মুসলিম ভূখন্ড গুলোতে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসবে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা এবং ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেবে সমস্ত বিশ্বে। আর এজন্যই তারা শত প্রলোভনের পরও প্রত্যাখান করবে অন্য কারও সাথে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব। ততক্ষন পর্যন্ত তারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আরোহনও করবে না, যতক্ষন পর্যন্ত না তারা ইসলামকে মৌলিক, তাৎক্ষনিক এবং সর্বতোভাবে প্রয়োগ করতে পারে।

    পরিশেষে এটা বলা যায় যে, ইসলামী রাষ্ট্র সর্ম্পকিত এই বইটির উদ্দেশ্য নয় এ রাষ্ট্রের অতীত ইতিহাস বর্ণনা করা। বরং, আলাহর রাসুল (সা) কিভাবে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং অবিশ্বাসী সাম্রাজ্যবাদীরা কিভাবে এটাকে ধ্বংস করেছিল,তা ব্যাখ্যা করাই এর মূল উদ্দেশ্য। এই বইটি পরিস্কার ভাবে বর্ণনা করেছে মুসলিম জনগোষ্ঠি কিভাবে তাদের রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে, যেন যে আলো গভীরতম অন্ধকারে একসময় তাবৎ বিশ্বকে পথপ্রর্দশন করেছিল, সেই একই আলো যেন প্রত্যাবর্তিত হয় আবারও সমগ্র মানবতাকে আলোকিত করতে।

  • উম্মু শুরাইক (রা)-এর ঈমানী দৃঢ়তা

    উম্মু শুরাইক (রা) মক্কার একজন মহিলা। ইসলামের কথা পৌঁছালো তাঁর কানে। তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। অতঃপর নেমে পড়লেন দাওয়াতি কাজে। তিনি বিভিন্ন বাড়িতে যেতেন। আলাপ করতেন বাড়ির মহিলাদের সঙ্গে। সুযোগ বুঝে ইসলামের মর্মকথা তুলে ধরতেন তাদের কাছে।

    একসময় বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। মুশরিক নেতারা তাঁকে গ্রেফতার করে। তুলে দেয় তাঁর গোত্রের লোকদের হাতে। তাঁকে শাস্তি দিতে বলে। তাঁর গোত্রের লোকেরা তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। তাঁকে শুকনো রুটি ও মধু খেতে বাধ্য করে। অতঃপর তাঁকে প্রচণ্ড রোদে গরম বালুর ওপর শুইয়ে দেয়।

    প্রচণ্ড রোদ আর গরম বালুর উত্তাপে তিনি ছটফট করতে থাকেন। পিপাসায় কাঁতারাতে থাকেন। একটু পানি দেবার জন্য লোকদেরকে বারবার অনুরোধ করতে থাকেন। কেউ তাঁর অনুরোধে সাড়া দিলো না। কেউ তাঁকে একটু পানি দিলো না। এইভাবে কেটে যায় তিনটি দিন। প্রচণ্ড উত্তাপ ও পিপাসায় তিনি মুমূর্ষ হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে এসে তিনি বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেন। জালিমরা তাঁকে ইসলাম ত্যাগ করতে বলতো। কিন্তু বোধশক্তি হারিয়ে ফেলায় তিনি তাদের কথা বুঝে ওঠতে পারতেন না। তৃতীয় দিন একব্যক্তি আসমানের দিকে ইশারা করে তাঁকে এক আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান ত্যাগ করতে বলে। অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে যে যা বুঝাতে চেয়েছিল তিনি তা বুঝতে সক্ষম হন। চিৎকার দিয়ে তিনি বলে ওঠেন, 

    “আল্লাহর কসম, আমি তো এখনো সেই ঈমানের ওপরই অটল আছি।”

    [আল্লাহর প্রতি তাঁর নিখাদ ঈমান দেখে তাঁর গোত্রের লোকেরা খুবই প্রভাবিত হয়। তারা তাঁকে ছেড়ে দেয়। একসময় তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁর গোত্রের বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করে।]

    মূল: এ কে এম নাজির আহমেদ কর্তৃক লিখিত আসহাবে রাসূলের জীবনধারা

    প্রথম প্রকাশ: ৯ ডিসেম্বর ২০১২