তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২মুমিনদের ভবিষ্যত অবশ্যই অবশ্যই অতীত হতে উত্তম হবে
মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন,
وَالضُّحَى (1) وَاللَّيْلِ إِذَا سَجَى (2) مَا وَدَّعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَى (3) وَلَلْآَخِرَةُ خَيْرٌ لَكَ مِنَ الْأُولَى (4) وَلَسَوْفَ يُعْطِيكَ رَبُّكَ فَتَرْضَى (5)
অর্থ: ”কসম আলোকিত সকালের, কসম রাতের যখন তা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়। আপনার রব আপনাকে পরিত্যাগ করেননি এবং অসন্তুষ্টও হননি। আর অবশ্যই আপনার ভবিষ্যত সময় পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে উত্তম। আর অচিরেই আপনার রব আপনাকে এমন কিছু দান করবেন, যার ফলে আপনি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন।” (সূরা দুহা, আয়াত ১-৫)
সূরায় দুহা’র এই আয়াত গুলো প্রিয়নবী সা. এর উপর এমন এক সময় অবতীর্ণ হয়েছিলো, যখন তিনি নানাবিধ পেরেশানি আর মানসিক কষ্টের মধ্যে ছিলেন। নবুওয়াতের শুরুর দিকে বিশেষ কিছু কারণে কয়েকদিন সাময়িকভাবে রাসূলের প্রতি ওহী আসা বন্ধ থাকলে কাফিররা বিষয়টিতে রঙ চড়িয়ে ব্যাপকভাবে অপপ্রচারে মেতে ওঠে। আবূ লাহাবের স্ত্রী ও তার দোসররা বলতে থাকে যে রাসূল সা. কে (নাউযুবিল্লাহ) তার রব পরিত্যাগ করেছেন, ফলে আর ওহী আসছে না।…
কাফির-মুশরিকদের অজ্ঞতাপ্রসূত নিন্দাবাদ আর চক্রান্তের বেড়াজাল ছিন্ন করে প্রিয়নবী সা. কে মানসিক প্রশান্তি এনে দিতে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করতেই মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের ঐতিহাসিক এই আয়াত গুলো অবতীর্ণ করেন। এর মাধ্যমে পরিস্কারভাবে এটা জানিয়ে দেয়া হয় যে, সাময়িকভাবে বিশেষ কারণে রাসূল সা. কিংবা মুমিনরা বিপদগ্রস্থ বা সমস্যার সম্মুখীন হলেও এটা খুবই সাময়িক। শীঘ্রই এই আধার রজনী কেটে যাবে। নব প্রভাতের সূর্যোদয়ও সন্নিকটে। সবচেয়ে মহাসত্য বাস্তবতা পরকাল তথা আখেরাতে তো মুমিনদের জন্য মহা সফলতা আছেই এমনকি এই দুনিয়াতেও সাময়িক বিপর্যয়ের পর আবারও তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে।
একইভাবে প্রতিটি মানুষের জীবনেই সফলতা-ব্যর্থতা, সমস্যা-সম্ভাবনা আসে যায়। প্রকৃত মুমিন এবং মহান আল্লাহর উপর পূর্ণ বিশ্বাসী ঈমানদারের সকল অবস্থাই কল্যাণকর। কেননা সে সুখে-দুখে সর্বাবস্থায়ই একটি স্বাভাবিক রোল প্লে করে থাকে। আর এই অবস্থায় তার ধৈর্য্য ও সবর তার জন্য মহান আল্লাহর অশেষ রহমত ও বরকত নিশ্চিত করে দেয়। যারা তাদের কঠিন এবং সমস্যা সঙ্কুল পরিস্থিতিতেও মহান আল্লাহর উপর অবিচল আস্থায় সৎ থাকে, সঠিক পথের উপর চলতে চেষ্টা করে, মহান আল্লাহ তাদেরকে আখেরাতে তো বটেই এই দুনিয়াতেও নিজ অনুগ্রহে ধন্য করেন। আর পরকালের চির কল্যাণ তো আছেই।
পরিশেষে মহান আল্লাহর সেই ঘোষণাটি স্মরণ করতে চাই, তিনি বলেছেন-
فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا (5) إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا (6) فَإِذَا فَرَغْتَ فَانْصَبْ (7) وَإِلَى رَبِّكَ فَارْغَبْ
অর্থ: “সুতরাং কষ্টের সাথেই রয়েছে সুখ। নিশ্চয় কষ্টের সাথেই রয়েছে সুখ। অতএব যখনই তুমি অবসর পাবে, তখনই কঠোর ইবাদাতে রত হও। আর তোমার রবের প্রতি আকৃষ্ট হও।” (সূরা ইনশিরাহ, আয়াত ৫-৭)ইসহাক খান
তারকা বিভ্রম আর দ্বৈতচারিতা
আজকাল চারদিকে তারকার ছড়াছড়ি। এখন চাইলেই খুব সহজে যে কেউ তারকা বনে যেতে পারে। রূপালী পর্দার তারকা, ক্রীড়াতারকা, রিয়েলিটি শো তারকা, সঙ্গীত তারকা। কেননা মানুষের স্বেচ্ছাচারিতা, গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসানো, হুজুগ আর অন্ধ অনুকরন আজ ব্যবসার আসল মূলধন। আর এসব নিপতিত বৈশিষ্ঠ্য কেবল এটাই জানান দেয়, মানুষের চিন্তা-চেতনা আর বিবেকবোধ লোপ পেয়েছে আর তারা তাদের চিন্তাশীলতা আর মননকে বন্ধক দিয়েছে মিডিয়ার কাছে। ছোট্ট একটা উদাহরন দেই, যা আমি প্রায় সময়ই দেই। সমকামিতা: আজ থেকে এক দশক আগেও পশ্চিমা কিছু কুকুর ব্যতীত অধিকাংশ মানুষের কাছেই তা ছিলো ঘৃন্য এক কাজ। অথচ মিডিয়ার জঘন্য মিথ্যাচারিতা আর প্রতারনার ধারাবাহিক ফলস্বরূপ আজ অধিকাংশ মানুষই এই ধরনের আচরন যা পশুদের মধ্যে নেই তাকে মানবাধিকার বলে শোরগোল ফেলে দিচ্ছে। অর্থ্যাৎ পশুবৃত্তিকেও ছাড়িয়ে গেছে মানবাধিকারের সংজ্ঞা।
আরো সহজ করে দেই। টারজান এক জনপ্রিয় টিভি চরিত্র। যে জঙ্গলের মাঝখানে বসবাস করে অথচ তার মুখমন্ডল অসম্ভব রকমের মসৃণ। এবার ভাবুন কোথায় বন্ধক রেখেছেন আপনার চিন্তাশক্তিকে? অবসাদগ্রস্থতা বলে একটা ব্যাপার আছে; আপনাকে এটা গ্রাস করেনি তো? জেগে জেগে ঘুমানো ব্যক্তিকে জাগানো কি যায়!
আরো বলি, শুনুন। মুসলিম সেই ব্যক্তি যে ইসলাম পালন করে। অর্থ্যাৎ যে ব্যক্তি নিজের স্বাধীন ইচ্ছাকে আত্মসমর্পন আর সঁপে দিয়েছে বিশ্বপ্রতিপালকের কাছে নিষ্ঠা আর বাধ্যবাধকতায়; শান্তি অর্জনের নিমিত্তে। এর বিপরীতার্থক কোন শব্দ হলো সন্ত্রাসবাদ। অথচ এই বিপরীত বৈশিষ্ট্যমন্ডিত দুইটি বিষয়কে সমার্থক বানানোর মতো অসম্ভব কাজটুকুও মিডিয়া করে ফেললো; বন্ধকী মস্তিষ্কের কল্যানে। এটাকে ইংরেজীতে বলে Oxymoron; অর্থ্যাৎ বিপরীতার্থক বৈশিষ্ট্য সম্বলিত ধাঁধাঁ। যেমন-স্থল বৈমানিক [Ground Pilot ]। সত্যিই হাস্যকর।
আজ তরুণরা “Assassin’s Creed” গেমসে মত্ত থাকলে ও জানে না “Islamic Creed” সম্পর্কে। তারা “Call of Duty” খেললেও সাড়া দেয় না “Call of Duty”- সলাতে। তারা ট্রয়ের কাল্পনিক ক্ষয়িঞ্চু চরিত্র একিলিস [Achilles] কে চিনলেও চিনে না সত্যিকারের তারকা মাসজিদে আল-আকসা বিজয়ী সালাহদীন আইয়ুবীকে। তারা টোয়াইলাইট [Twilight] দ্বারা মোহগ্রস্থ থাকলে ও Towards Light তাদের পদযুগল এগোয় না। তারা আভ্যাটারে [Avatar] এ মন্ত্রমুগ্ধ; পরকালে বিশ্বাস তাদের কাছে সেকেলে। প্রবৃত্তির ডাকে আর টানে তারা সাড়া দেয় Nike এর স্লোগান এর মতো “Just do it” অথচ ফজরের সলাতে তারাই “Never did it”। খুব বেশী pacy life, খুব বেশী rush, খুব বেশী events আর happening তাদের জীবন। অথচ বড় বেশী অন্তঃশূণ্য তাদের অন্তরাত্মা; ঢুকরে কাঁদে সঙ্গোপনে। তারপরও তারা pretend করে iron-man হওয়ার; তাদের thyroid ইনজেকশানে বাড়ানো মাংসপেশীর প্রদর্শনীতে, Hardy’s এর নতুন cool t-shirt এ, Levis এর ছেড়া জিন্সে। আত্ম-প্রতারণা আর আত্ম-বিদ্রুপ কার সাথে হচ্ছে?
আর ক্রীড়াসক্তির কথা কি বলবো? লা লিগা মেসি-রোনালদোর দ্বৈরথতো দ্বীনদার ভাইদেরও ছেড়ে কথা বলে না। টেনিসে ফেদেরার-নাদাল, ক্রিকেটে শচীন-লারা, ফর্মুলা ওয়ানে শুমাখার পেরিয়ে নতুন কেউ, স্প্রিন্টে বোল্ট, NBA তে জর্ডান কিংবা গলফে উডসদের নিয়ে বড় বেশী মত্ত। বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দল নিয়ে বাড়াবাড়ি তো আর কম হয় না। এসকল তারকাদের অধিকাংশেরই চারিত্রিক দোষে দুষ্ট আর তাদের হামবড়া ভাবের কথা নাই বললাম। কেবল বিনোদিত হওয়ার জন্যই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের খরচ করা হচ্ছে। অথচ কেবল আফ্রিকার দিকে তাকাইলে আমাদের আমুদে ভাব কেটে যাওয়ার কথা। এ সকল খেলোয়াড়রা যতটা না তাদের ক্রীড়াশৈলীর জন্য তার চেয়ে বেশী এনডোর্সমেন্ট, বিপনন, পন্যের দূত কিংবা নারীঘটিত কারনে সংবাদশিরোনাম হন। আর তা গিলার জন্য রয়েছে; একপাল উৎসুক ভেঁড়ার পালসদৃশ তরুণগোষ্ঠী।
সঙ্গীত-তারকাদের দুর্দশার কথা না বলে কেবল যদি তাদের মধ্যে আত্মহত্যাকারীদের তালিকা করা হয় তা অনেক দীর্ঘ হবে। এটা কেবল সঙ্গীততারকা নয় রূপালীপর্দার তথাকথিত তারকারাও এই মিছিলে পিছিয়ে নেই। সঙ্গীতের নামে কপটতা, অপরের দুঃখের ফিরিস্তি, আত্ম-গরিমা আর হতাশার বিকিকিনি কেবল সাময়িক মোহ তৈরী করে; যা জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে ভুলিয়ে রাখে। আমরা এমন এক Big Brother Society তে বসবাস করি যেখানে অন্যের জীবনের দুর্দশা আনন্দ হিসেবে বিকানো হয়; রিয়েলটি শো নামক ধোঁকায়।
এসব তারকাদেরকে আর তাদের গুরুদের আপাতঃ দৃষ্টিতে দেখলে মনে হয় তাদের জীবনের সবকিছুই তারা নিয়ন্ত্রণ করছে [as though they are dictating their terms of life]। তারা তাকদীরের উপর প্রবল হওয়ার প্রচেষ্টা করে। বস্তুতঃ তাদেরকে দেয়া হয়েছে অবকাশ আর তাদের সীমালঙ্গনকে তাদের কাছে করা হয়েছে সুশোভিত। আর তাদের সংকীর্ণ জীবনাচরণের কথা নাই বললাম। তাই তাদেরকে দেখে ধোঁকায় নিমজ্জিত হওয়া বোকামি আর মূর্খতা ছাড়া কিছুই নয়।
আর হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী, যারা যাকে ভালবাসবে কিয়ামাহ্’র দিন তাদের সাথে উত্থিত হবে। তাই আমি কাকে ভালবাসছি তা দেখতে হবে। মুসলিম তরুণদের এই ভালবাসার সবচেয়ে বেশী হকদার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবীগণ। অথচ আজ তরুণসমাজ আদর্শ শূণ্যতায় ভুগছে।
আর এই অনর্থক মোহগ্রস্থতাকে যারা জীবনের উপজীব্য ভাবে তাদের জন্য এই সতর্কবাণী:
“তোমরা কি ধারণা কর যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না? [সুরা মুমিনুন:১১৫]”
সায়্যিদ মাহমূদ গজনবী
কান্ডারী: নৈরাশ্যতা পেরিয়ে আশার আলোয়
নৈরাশ্য:
১) রিকশায় চড়ছিলাম। রিকশার চালকের বয়স ষাটোর্ধ্ব। হঠাৎ মনে প্রচন্ড এক ভাবনা এলো; রিকশা চালাতে সক্ষম এমন বয়সে আমি যাত্রী আর জীবনের শেষপ্রান্তে অবসরে সময়কাটানোর বয়সে ওই ব্যক্তি রিকশা চালানোর মতো পরিশ্রমের কাজ করছেন। হঠাৎ এ পরিস্থিতির সাথে মুসলিম উম্মাহ্’র বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে ভাবছিলাম। কয়েকদিন আগেও সিরিয়ায় এক বয়োবৃদ্ধ যিনি ইউটিউবে তার ভিডিও শেয়ার দিয়েছিলেন; শাহাদাহ [ইনশা’আল্লাহ] বরন করেছেন কিংবা এমন হাজারো বয়োবৃদ্ধ যাদের রক্ত কেবল তাদের প্রতিপালক আল্লাহ্; এই স্বীকারোক্তি দানের কারনে প্রবাহিত হচ্ছে অথচ এক্ষেত্রে তরুণদের নির্বিকার আচরণ পীঁড়া দেয়।
২) মাসজিদে ইকামাত আস-সলাত দানের তাৎপর্য বেশ। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই দেখি মাসজিদে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটির আন্জাম দেন বয়োজেষ্ঠরা; যাদের কন্ঠস্বর বয়সের সাথে সাথে ক্ষীনতর হয়ে এসেছে। এসব কাজে তরুণদের অগ্রগামী দেখতে মন বড়ই আনচান করে।
৩) সমাজের সার্বিক পরিবর্তনে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ড; যার পূঁজি করে অসৎ রাজনীতিবিদরা লোকচক্ষুকে ধুলি দেয় আর তথাকথিত সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্টের ধ্বজ্জাধারীরা সহানুভূতির আর সহমর্মিতার অভিনয়টুকু মঞ্চস্থ করতে কার্পন্য করে না। সেই তুলনায় মুসলিম জাতি; যাদের উত্তরণ ঘটানোই হয়েছে ভাল কাজের আদেশ আর মন্দের নিষেধ করার জন্য, তাদের তরুণ প্রজন্মকে অপেক্ষাকৃত কম যুক্ত দেখেও মনটা ভারী হয়। সমাজে ন্যায়ের বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর আর অন্যায়ের প্রতিবাদে পর্বতসম বাধা তো এই উম্মাহ’র তরুণদেরই হতে হবে।
আশার আলো:
১) যখন দেখি সদ্য ইন্টারমেডিয়েট পাশ করা তরুণরা ইসলামকে তাদের জীবনের সার্বিক বিধান হিসেবে মানতে অগ্রগামী হচ্ছে আর পারিপার্শ্বিকতার চাপকে উপেক্ষা করে ইসলামের প্রথম যুগের লোকদের অনুসরণের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালায়; তখন বুকটা আনন্দে ভরে উঠে। এসব তরুণরাই যখন নিজের যৌবনের সবচেয়ে আবেগঘন সময়ে নিজের চোখের হিফাজত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে তখন কেবল এই ভেবে লজ্জায় মাথা নিচু করি তার বয়সে তো আমি লজ্জাশীলতার ব্যাপারে গাফিল ছিলাম। আর এসব তরুণদের জন্যই তো রাহমানের আরশের ছায়ার প্রতিশ্রুতি।
২) এ সকল তরুণদের দ্বীনের প্রতি ভালবাসা, আরবী শিখার প্রতি আগ্রহ আর নিষ্ঠা দেখে আমিও উৎসাহ পাই। সত্যিই আল্লাহ্ তা’আলা প্রস্তুত করছেন এমন এক প্রজন্মকে যারা ইসলামী ব্যক্তিত্ববোধ আর নেতৃত্বের মশালকে প্রজ্জলিত করবে।
৩) রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দ্বীনের দাওয়াহ্ দিচ্ছিলেন তখন প্রথম থেকেই তরুণদের সাড়া ছিলো স্বতঃস্ফুর্ত। মাক্কী জীবনে আবদুল্লাহ্ ইবন মাসঊদ, মুসাইব ইবন উমায়র কিংবা আলী রাযিআল্লহু আনহুমা তো তারই উদাহরণ। অনুরূপভাবে মাদানী জীবনে আবদুল্লাহ্ ইবনু উমার, আবদুল্লাহ্ ইবনু যুবাইর, আবদুল্লাহ্ ইবনু আমর ইবনু আস কিংবা আবদুল্লাহ্ ইবনু আব্বাস রাযিআল্লহু আনহুদের উদাহরন কেবল শিহরিতই করে। বর্তমান সময়ে তরুণদের শত বাধা-বিপত্তির মধ্যেও দ্বীনী কার্যক্রমে স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ কেবল সেই স্বর্ণালী যুগেরই আভাস দেয়।
তরুণদের হাত ধরেই সমাজ পশ্চিমা সংস্কৃতি আর প্রবৃত্তিতাড়িত জীবনের মোহে মোহগ্রস্থ হয়েছিল; আর তাদের হাত ধরেই বিপন্ন মানবতায় নিমজ্জিত সমাজ মুক্তির দিশা খুঁজে পাবে: ইসলামে।
নৈরাশ্যবাদীতা নয় আশার আলোরই সিঞ্চন করি; এই প্রত্যয়ই ক্রমান্বয়ে দৃঢ়তর হচ্ছে নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তা’আলা প্রস্তুত করছেন বিজয়ের ক্ষেত্র ।
সায়্যিদ মাহমূদ গজনবী
ফিরাসাহ্ [অন্তর্দৃষ্টি]
[লেখাটি খানিকটা দীর্ঘ হলেও ধৈর্য সহকারে পড়ার অনুরোধ করছি]
بسم الله الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله
ফিরাসাহ্ হচ্ছে ধীশক্তির অনুভব, উপলব্ধি ও অন্তর্দৃষ্টি।
আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:إِنَّ فِي ذَلِكَ لآيَاتٍ لِّلْمُتَوَسِّمِينَ
“নিশ্চয় এতে চিন্তাশীলদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।“ [সুরা হিজর: ৭৫]এবং لِّلْمُتَوَسِّمِينَ এর অর্থ, এখানে কিছু প্রখ্যাত তাফসীরবিদদের মতামত উল্লেখ করা হলো:
মুজাহিদ রাহিমাহু’ল্লাহ্ বলেন, এটা হচ্ছে “যারা ধীশক্তির অধিকারী”।
ইবনু আব্বাস রাদি’আল্লাহু আনহুমা বলেন, এর অর্থ হচ্ছে “যারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে।” কাতাদাহ্ রহিমাহু’ল্লাহ্ বলেন, এর অর্থ হচ্ছে “যারা শিক্ষা গ্রহণ করে।”
মুতাকিল রাহিমাহু’ল্লাহ্ বলেন, এর অর্থ হচ্ছে, “যারা চিন্তাশীল”।
এখানে, সকল ব্যাখ্যাকারদের মধ্যে তেমন কোন মতপার্থক্য কিংবা বাহ্যিক অসামঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। যেমন-কেউ যদি যারা আল্লাহ্’র রাসূলকে অস্বীকার করেছিল তাদের ধ্বংসস্তুপ এবং আবাস দেখে, তবে সে অন্তর্দৃষ্টি, সতর্কবাণী এবং চিন্তার খোরাক খুঁজে পাবে।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুনাফিকদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন:وَلَوْ نَشَاء لَأَرَيْنَاكَهُمْ فَلَعَرَفْتَهُم بِسِيمَاهُمْ وَلَتَعْرِفَنَّهُمْ فِي لَحْنِ الْقَوْلِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ أَعْمَالَكُمْ
“আমি ইচ্ছা করলে আপনাকে তাদের সাথে পরিচিত করে দিতাম। তখন আপনি তাদের চেহারা দেখে তাদেরকে চিনতে পারতেন এবং আপনি অবশ্যই কথার ভঙ্গিতে তাদেরকে চিনতে পারবেন। আল্লাহ তোমাদের কর্মসমূহের খবর রাখেন।“ [সুরা মুহাম্মদ: ৩০]এখানে, যে বিষয়টি প্রথমে উল্লেখ করা হয়েছে, তা হলো চোখের ফিরাসাহ্ [অন্তর্দৃষ্টি] এবং দ্বিতীয় যে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে তা হচ্ছে কর্ণকুহরের এবং শ্রবণশক্তির ফিরাসাহ্। তাদের কথার ভঙ্গি যা মূলতঃ দুই ধরনের। যার একটি ভাল, অপরটি মন্দ।
এখানে যথার্থ কিংবা ভাল কথার ভঙ্গি বলতে হয়তো বুঝানো হয়েছে যেমনটি হাদীসে বর্ণিত আছে: “এবং হয়তো তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ অন্যদের তুলনায় তাদের দাবীতে বেশী বাগ্মী” [বুখারী এবং মুসলিম]; অথবা এটা দ্বারা পরোক্ষ উল্লেখ কিংবা নির্দেশ বুঝানো হয়েছে। আর মন্দ কথা বলার ভঙ্গি হচ্ছে যার মধ্যে ব্যাকরণগত অশুদ্ধি রয়েছে। এর ব্যবহার দ্বারা লোকজনের ভুল ব্যাখ্যার তাড়না অথবা গোপন কোন অর্থ খোঁজার প্রয়াস থাকে; যা হয়তো উদ্দেশ্য করা হয়নি।
এই আয়াতের অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ্ তা’আলা তার রাসূলকে [صلى الله عليه وسلم] নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি তাদেরকে তাদের বাচনভঙ্গি দেখে চিনতে পারবেন। একজন বক্তা আর তার অন্তরের অবস্থা সম্পর্কে; বাহ্যিক অবয়বের চেয়ে তার বক্তব্য এবং তার কন্ঠস্বর দ্বারা জানার সম্ভাবনা বেশী। ভাষ্য এবং কন্ঠস্বর দ্বারা বক্তার উদ্দেশ্য অনেক বেশী প্রকাশ পায় , বাহ্যিক উপস্থিতির চেয়ে। ফিরাসাহ্ [অন্তর্দৃষ্টি] দর্শন কিংবা শ্রবণের হতে পারে।
এটা বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল [صلى الله عليه وسلم] বলেন:
“বিশ্বাসীদের অন্তর্দৃষ্টি সম্পর্কে সতর্ক হও, কেননা সে আল্লাহ্ প্রদত্ত জ্যোতি দ্বারা দেখে।” এরপর তিনি আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন: “নিশ্চয় এতে চিন্তাশীলদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।” [তিরমিযী]। বিশ্বাসীদের ফিরাসাহ্ সবসময় সত্য হয়।
ফিরাসাহ্ হচ্ছে আল্লাহ্ প্রদত্ত জ্যোতি যা তিনি তার বান্দার অন্তরে প্রবিষ্ট করান। এই জ্যোতি দ্বারা তার বান্দা সত্য-মিথ্যার এবং ভাল-মন্দের পার্থক্য নিরুপণে সমর্থ হন।
প্রকৃতপক্ষে, ফিরাসাহ্’র স্বরুপ হলো কোন তীক্ষ্ন চিন্তা অন্তরে প্রবেশ করা এবং মতামতের উপর তা প্রবলতর হওয়া। এটা অন্তরের উপর এত বেশী প্রভাব বিস্তার করে যেভাবে সিংহ তার শিকারের উপর। এজন্য আরবীতে ফিরাসাহ্ আর ফারিসাহ্’র মিল দেখুন। ভাষাগতভাবে, ফারিসাহ্ হলো বস্তু আর ফিরাসাহ্’র সাথে সামন্জস্য রয়েছে ওয়াইলাইআহ্ [কতৃত্ব এবং ক্ষমতা], ইমারাহ্ [কর্তৃত্ব এবং নিয়ন্ত্রনক্ষমতা ] এবং সিয়াসাহ্ [প্রশাসন এবং নেতৃত্ব] এর সাথে।
ফিরাসাহ্’র প্রখরতা নির্ভর করে ঈমানের প্রখরতার উপর। প্রখর ঈমানের একজন ব্যক্তির ফিরাসাহ্ প্রখর হয়। আমর বিন নুযাইদ বলেন, শাহ আল-কিরমানির ফিরাসাহ্ ছিলো খুবই প্রখর এবং কখনো ভুল ছিল না। তিনি আরো বলতেন, যে ব্যক্তি তার দৃষ্টি সংযত করবে, নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বিরত থাকবে, নিজের অন্তঃকরণকে গড়ে তুলবে মুরাকাবাহ্ [আল্লাহ্ সর্বদ্রষ্টা : এই উপলব্ধি থাকা], তার বাহ্যিক অবয়বকে সুন্নাহ্ দ্বারা এবং নিজেকে হালাল ভক্ষণে অভ্যস্থ করে; তার ফিরাসাহ্ কখনো ভুল হবার নয়।
আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসউদ রাদি’আল্লাহু আনহু বলেন: “তিনজন লোকের ফিরাসাহ্ সবচেয়ে তীক্ষ্নতম। যে মিশরীয় ইউসুফ আলাইহি সালাম কে খরিদ করেছিল আর তার স্ত্রীকে বলেছিল, “একে সম্মানে রাখ। সম্ভবতঃ সে আমাদের কাজে আসবে অথবা আমরা তাকে পুত্ররূপে গ্রহণ করে নেব।“ [সুরা ইউসুফ: ২১]। অন্যজন হলেন শোয়াইব তণয়া, যে তার পিতাকে মুসা আলাইহি সালাম সম্পর্কে বলেছিল, “একে বরং তুমি (তোমার) কাজে নিয়োগ করো। [সুরা কাসাস: ২৮]”। এবং আবু বকর, কেননা তিনি উমারকে তার উত্তরসূরী নিযুক্ত করেছিলেন।”
অন্য বর্ণনায় যুক্ত হয়েছে, ফিরআউনের স্ত্রী’র কথা যিনি মুসা আলাইহি সালাম সম্পর্কে বলেছিলেন: “এ শিশু আমার ও তোমার চক্ষু শীতলকারী [হবে], তাকে হত্যা করো না। এ আমাদের উপকারে আসতে পারে অথবা আমরা তাকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। [সুরা কাসাস: ৯]”
আবু বকর সিদ্দিক রাদি’আল্লাহু আনহু ই এই উম্মাহ্’র সর্বোত্তম ফিরাসাহ্’র অধিকারী এবং উমার রাদি’আল্লাহু আনহু কে দ্বিতীয় হিসেবে ধরা হয়। উমার রাদি’আল্লাহু আনহু’র ফিরাসাহ্’র উদাহরণ অনেক, পরিচিত আর সর্বজনবিদিত। তিনি কখনো কিছু সম্বন্ধে বলেননি, “আমার মনে হয় এটা এমন…” বরং এটা ছিল তার চিন্তার প্রতিফলন। বাস্তবিক পক্ষে, কুরআনে তার মতের স্বপক্ষে অনেক ঘটনাকে সত্যায়িত করেছে। এর মধ্যে একটি হলো বদর যুদ্ধের যুদ্ধবন্দীদের সম্পর্কে।
একদা সাওয়াদ বিন কারিব নামে এক ব্যক্তি উমার রাদি’আল্লাহু আনহু’র সামনে হেটে গেল এবং তিনি তাকে চিনতেন না। উমার রাদি’আল্লাহু আনহু বললেন: “হয় সে গণক অথবা জাহিলিয়্যাহ’য় সে গণক ছিলো।” উমার রাদি’আল্লাহু আনহু’র সামনে বসার পূর্বে, সাওয়াদ বলেন: “ও আমিরুল মু’মিনীন! আপনি কখনো আপনার অতিথিদের এভাবে স্বাগত জানান না; যেভাবে আমাকে জানালেন। উমার বললেন, “আমরা জাহিলিয়্যাহ’য় এর চেয়ে মন্দ কাজ করতাম। কিন্তু আমি যা জিজ্ঞেস করেছি তার সম্পর্কে বল।” সাওয়াদ বলেন: আপনি সঠিক ছিলেন, ও আমিরুল মু’মিনুন! আমি জাহিলিয়্যাহ’য় গণক ছিলাম, এরপর তিনি তাকে তার গল্প বললেন। ”
স্বাভাবিকভাবেই, সাহাবারাই ছিলেন সবচেয়ে তীক্ষ্ন আর নির্ভুল ফিরাসাহ্’র অধিকারী। সত্য ফিরাসাহ্ অর্জিত হয় জীবন থেকে এবং আল্লাহ্ প্রদত্ত জ্যোতি দ্বারা; যা তিনি তার অনুগত বান্দাদের যাকে খুশি প্রদান করেন। হৃদয় প্রাণশক্তি লাভ করে এবং আলোকিত হয়; অতঃপর এর ফিরাসাহ্ প্রায় নির্ভুল হয়।
আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:“আর যে মৃত ছিল অতঃপর আমি তাকে জীবিত করেছি এবং তাকে এমন একটি আলো দিয়েছি, যা নিয়ে সে মানুষের মধ্যে চলাফেরা করে। সে কি ঐ ব্যক্তির সমতুল্য হতে পারে, যে অন্ধকারে রয়েছে-সেখান থেকে বের হতে পারছে না?” [সুরা আল-আনআম: ১২২]
এই আয়াহ্’য় ব্যক্তিকে ‘মৃত’ বলা হয়েছে তার অন্তরের অবিশ্বাস এবং তার দ্বারা যাপিত অজ্ঞতাপূর্ণ জীবনকে কিন্তু তারপর আল্লাহ্ তাকে জীবন দান করলেন তাকে ঈমানের জ্ঞান দান করে। আর এই উপহারসমুহ লাভের মাধ্যমে কুরআন আর ঈমান তার আলোকবর্তিকা হয়, যা দ্বারা সে অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার পাথেয় লাভ করে এবং সরলপথ প্রাপ্ত হয়।
ফিরাসাহ্’র সাথে তিনটি মানব-অঙ্গ সম্পর্কযুক্ত: চোখ, কান এবং অন্তর। তার চোখ বাহ্যিকতা আর নিদর্শনসমুহ পরীক্ষণ করে, তার কর্ণ পরীক্ষণ করে ভাষ্য, অতিশয়োক্তি, তির্যক অনুমান ও ইঙ্গিত, সারমর্ম, যুক্তি এবং কন্ঠস্বর। এবং তার অন্তর পর্যালোচনা করে দৃশ্য এবং শ্রাব্য উপাত্তসমুহ যা দ্বারা অন্যের লুকায়িত চিন্তার উপলব্ধি লাভ করে। তার অন্তর্নিহিত পর্যালোচনা এবং পরীক্ষণ বাহ্যিকতার সাথে তুলনার স্বরুপ যেভাবে মুদ্রার বাহ্যিকতা দেখে তা নকল কিনা পরীক্ষণের মত। এটার অন্য স্বরুপ হলো হাদীস-বিশারদদের ভাল সনদের একটি হাদীস পাঠের পর হাদীসের শব্দচয়ন [মতন] পরীক্ষণে হাদীস জাল প্রমানিত হওয়ার মত।
ফিরাসাহ্’র ক্ষেত্রে দুটো ব্যাপার বেশ গুরুত্বপূর্ণ। একটি হচ্ছে স্মৃতিশক্তির প্রখরতা, অন্তরের সূক্ষ্নদর্শীতা আর বোধশক্তি। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে নিদর্শণের উপস্হিতি আর অন্যের উপর এর নির্দেশিকা। যখন উভয় গুণের সমন্বয় ঘটে তখন কারো ফিরাসাহ্ ভুল হয় না। ইয়াস্ বিন মুয়াউইয়াহ্’র প্রখর ফিরাসাহ্ ছিলো এবং তিনি এর জন্য সুপরিচিত, এরুপ ইমাম শাফিঈ ও যার ফিরাসাহ্’র উপর লেখনীর বর্ণনা পাওয়া যায়।
[প্রবন্ধের সমাপ্তি এখানেই]
আল্লাহ্ তা’আলা আমাদেরকে অনুধাবন করার তাওফীক দিন।
سبحانك اللهم و بحمدك أشهد أن لا إله إلا أنت أستغفرك و أتوب إليك
[অনুবাদকর্মের শব্দচয়ণে দুর্বলতা, ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।]
সায়্যিদ মাহমূদ গজনবী
[মূল: ইবনুল কায়্যিম এর একটি প্রবন্ধ থেকে অনুদিত]নূরুদ্দীন জঙ্গী ও ইহুদী চক্রান্ত
ইতিহাসের সোনালী পাতায় যেসব মনীষীদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে, সুলতান নূরুদ্দীন জঙ্গী (র:) ছিলেন তাদের অন্যতম।
হিজরী ৫৫৭ সালের একরাতের ঘটনা।
সুলতান নূরুদ্দীন জঙ্গী (র:) তাহাজ্জুদ ও দীর্ঘ মুনাজাতের পর ঘুমিয়ে পড়েছেন। চারিদিক নিরব নিস্তব্দ। কোথাও কোন সাড়া-শব্দ নেই। এমতাবস্থায় হঠাৎ তিনি স্বপ্নে দেখলেন স্বয়ং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কামরায় উপস্থিত। তিনি কোন ভূমিকা ছাড়াই দু’জন নীল চক্ষু বিশিষ্ট লোকের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, (নূরুদ্দীন) মাহমূদ! (এরা আমাকে বিরক্ত করছে), এ দুজন থেকে আমাকে মুক্ত কর।
এই ভয়াবহ স্বপ্ন দেখে নূরুদ্দীন জঙ্গী (র:) অত্যন্ত ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ঘুম থেকে জাগ্রত হলেন এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গোটা কক্ষময় পায়চারি করতে লাগলেন। সাথে সাথে তার মাথায় বিভিন্ন প্রকার চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগল। হৃদয় রাজ্যে ভীড় জমাল হাজারও রকমের প্রশ্ন। তিনি ভাবলেন-আল্লাহর রাসূল তো এখন কবরে জীবনে!
তার সাথে অভিশপ্ত ইহুদীরা এমনকি ষড়যন্ত্র করতে পারে?
কী হতে পারে তাদের চক্রান্তের স্বরুপ?
তারা কি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কোন ক্ষতি করতে চায়?চায় কি পর জীবনেও তার সাথে ষড়যন্ত্র লিপ্ত হতে?
আমাকে দু’জন ইহুদীর চেহারা দেখানো হল কেন?
শয়তান তো আল্লাহর নবীর অবয়বে আসতে পারে না। তাহলে কি আমি সত্য স্বপ্ন দেখেছি?
এসব ভাবতে ভাবতে সুলতান অস্থির হয়ে পড়লেন। তিনি অজু-গোসল সেরে তাড়াতাড়ি দু’রাকাত নামায আদায় করলেন। তারপর মহান আল্লাহর দরবারে ক্রন্দনরত অবস্থায় অনেকক্ষণ মুনাজাত করলেন।
সুলতানের এমন কেউ ছিল না যার সাথে তিনি পরামর্শ করবেন। আবার এ স্বপ্নও এমন নয় যে, যার তার কাছে ব্যক্ত করবেন। অবশেষে আবারও তিনি শয়ন করলেন। দীর্ঘ সময় পর যখনই তার একটু ঘুমের ভাব এলো, সঙ্গে সঙ্গে এবারও তিনি প্রথম বারের ন্যায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখলেন। তিনি তাকে পূর্বের ন্যায় বলছেন,
(নূরুদ্দীন) মাহমূদ! এ দুজন থেকে আমাকে মুক্ত কর।
এবার নূরুদ্দীন জঙ্গী (র:) আল্লাহ্, আল্লাহ্ বলতে বলতে বিছানা থেকে উঠে বসলেন। তারপর কোথায় যাবেন, কী করবেন কিছুই ঠিক করতে পা পেরে দ্রুত অজু-গোসল শেষ করে মুসল্লায় দাড়িয়ে অত্যধিক ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় দু’রাকাত নামায আদায় করলেন এবং দীর্ঘ সময় অশ্রু সিক্ত নয়নে দোয়া করলেন।
রাতের অনেক অংশ এখনও বাকী। সমগ্র পৃথিবী যেন কি এক বিপদের সম্মুখীন হয়ে নিঝুম হয়ে আছে। কী এক মহা বিপর্যয় যেন পৃথিবীর বুকে সংঘটিত হতে যাচ্ছে । কঠিন বিপদের ঘনঘটা যেন চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি মুখ তুলে আকাশ পানে তাকালেন। মনে হলো স্বপ্ন দেখা ঐ দু’জন লোক যেন তাকে ধরার জন্য দ্রুতগতিতে ধেয়ে আসছে। তিনি সেই চেহারা দুটোকে মনের মনিকোষ্ঠা থেকে সরাবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কিছুতেই তা সম্ভব হল না। শেষ পর্যন্তু নিরুপায় হয়ে নূরুদ্দীন জঙ্গী (র:) চোখ বন্ধ করে আবারও তন্দ্রা-বিভোর হয়ে শুয়ে পড়লেন।
শোয়ার পর তৃতীয়বারও তিনি একই ধরনের স্বপ্ন দেখলেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর নূরুদ্দীন জঙ্গী (র:) ক্রন্দনরত অবস্থায় বিছানা পরিত্যাগ করলেন। এবার তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল যে, নিশ্চয়ই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা মোবারক কোন না মহাবিপদের সম্মুখীন হয়েছে।
তিনি তড়িৎ গতিতে অজু-গোসল করে ফজরের নামায আদায় করলেন। নামায শেষে প্রধানমন্ত্রী জালালুদ্দীন মৌশুলীর নিকট গমন করত: গোপনীয়তা রক্ষার প্রতিশ্রুতি নিয়ে স্বপ্নের বিবরণ শুনালেন এবং এ মুহূর্তে কী করা যায়, এ ব্যাপারে সুচিন্তিত পরামর্শ চাইলেন।
জালালুদ্দীন মৌশুলী স্বপ্নের বৃত্তান্ত অবগত হয়ে বললে, হুজুর! আপনি এখনও বসে আছেন? নিশ্চয়ই প্রিয় নবীর রওজা মোবারক কোন কঠিন বিপদের সম্মুখীন হয়েছে। তাই এ বিপদ থেকে উদ্ধার করার জন্য বারবার তিনি আপনাকে স্মরণ করছেন। অতএব, আমার পরামর্শ হল, সময় নষ্ট না করে অতিসত্তর মদীনার পথে অগ্রসর হোন।
নূরুদ্দীন জঙ্গী (র:) আর কালবিলম্ব করলেন না। তিনি ষোল হাজার দ্রুতগামী অশ্রারোহী সৈন্য এবং বিপুল ধন সম্পদ নিয়ে বাগদাদ থেকে মদিনা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। রাত দিন সফর করে সতেরতম দিনে মদিনা শরীফে পৌঁছলেন এবং সৈন্য বাহিনীসহ গোছল ও অজু সেরে দু’ রাকাত নফল নামাজান্তে দীর্ঘ সময় ধরে মোনাজাত করলেন। তারপর সৈন্য বাহিনী দ্বারা মদিনা ঘেরাও করে ফেললেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আদেশ জারী করে দিলেন যে, বাইরের লোক মদিনায় আসতে পারবে, কিন্তু সাবধান! মদিনা থেকে কোন লোক বাইরে যেতে পারবে না।
নূরুদ্দীন জঙ্গী (র:) জুম্মার খোৎবা দান করলেন এবং ঘোষণা দিলেন, আমি মদিনাবাসীকে দাওয়াত দিয়ে এক বেলা খানা খাওয়াতে চাই। আমার অভিলাষ, সকলেই যেন এই দাওয়াতে অংশ গ্রহণ করে।
সুলতান মদিনাবাসীকে আপ্যায়নের জন্য বিশাল আয়োজন করলেন এবং প্রত্যেকের নিকট অনুরোধ করলেন, মদিনার কোন লোক যেন এই দাওয়াত থেকে বঞ্চিত না হয়।
নির্ধারিত সময়ে খাওয়া-দাওয়া শুরু হল। প্রত্যেকেই তৃপ্তিসহকারে খানা খেল। যারা দুরদুরান্ত থেকে আসতে পারেনি তাদেরকেও শেষ পর্যন্ত ঘোড়া ও গাধার পিঠে চড়িয়ে আনা হল। এভাবে প্রায় পনের দিন পর্যন্ত অগণিথ লোক শাহী দাওয়াতে শরিক হওয়ার পর সুলতান জিজ্ঞাসা করলেন আরও কেউ অবশিষ্ট আছে কি? থাকলে তাদেরকেও ডেকে আন।
এই নির্দেশের পর সুলতান বিশ্বস্ত সূত্রে অবগত হলেন যে, আর কোন লোক দাওয়াতে আসতে বাকী নেই। একথা শুনে তিনি সীমাহীন অস্থির হয়ে পড়লেন। চিন্তার অথৈই সাগরে হারিয়ে গেলেন তিনি। ভাবলেন, যদি আর কোন লোক দাওয়াতে শরীক হতে বাকী না থাকে তাহলে সেই অভিশপ্ত লোক দু’জন গেল কোথায়? আমি তো দাওয়াতে শরীক হওয়া প্রতিটি লোককেই অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। কিন্তু কারও চেহারাইতো স্বপ্নে দেখা লোক দুটোর চেহারার সাথে মিলল না, তাহলে কি আমার মিশন ব্যর্থ হবে? আমি কি ঐ কুচক্রী লোক দুটোকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দিতে সক্ষম হব না? এসব চিন্তায় বেশ কিছুক্ষণ তিনি ডুবে রইলেন। তারপর আবারও তিনি নতুন করে ঘোষণা করলেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মদিনার সকল লোকদের দাওয়াত খাওয়া এখনও শেষ হয়নি। অতএব সবাইকে আবারও অনুরোধ করা যাচ্ছে, যারা এখনও আসেনি তাদেরকে যেন অনুসন্ধান করে দাওয়াতে শরীক করা হয়।
একথা শ্রবণে মদিনাবাসী সকলেই এক বাক্যে বলে উঠল, হুজুর! মদিনার আশে পাশে এমন কোন লোক বাকী নেই, যারা আপনার দাওয়াতে অংশ গ্রহণ করেনি। তখন নূরুদ্দীন জঙ্গী (র:) বলিষ্ঠ কন্ঠে বললেন, আমি যা বলেছি, ঠিকই বলেছি। আপনারা ভাল ভাবে অনুসন্ধান করুন।
সুলতানের এই দৃঢ়তা দেখে লক্ষাধিক জনতার মধ্য থেকে এক ব্যক্তি হঠাৎ করে বলে উঠল, হুজুর! আমার জানামতে দু’জন লোক সম্ভবত এখনও বাকী আছে। তারা আল্লাহ্ওয়ালা বুযুর্গ মানুষ। জীবনে কখনও কারও কাছ থেকে হাদীয়া তোহফা গ্রহণ করেন না, এমনকি কারও দাওয়াতেও শরীক হন না। তারা নিজেরাই লোকদেরকে অনেক দান-খয়রাত করে থাকেন। নীরবতাই অধিক পছন্দ করেন। লোক সমাজে উপস্থিত হওয়া মোটেও ভালবাসেন না।
লোকটির বক্তব্য শুনে সুলতানের চেহারায় একটি বিদ্যুত চমক খেলে গেল। তিনি কাল বিলম্ব না করে কয়েকজন লোক সহকারে ঐ লোক দুটোর আবাসস্থলে উপস্থিত হলেন। তিনি দেখলেন, এতো সেই দু’জন, যাদেরকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছিল। তাদেরকে দেখে সুলতানের দু’চোখ রক্তবর্ণ ধারণ করল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কে তোমরা? কোথা থেকে এসেছ? তোমরা সুলতানের দাওয়াতে শরীক হলে না কেন?
লোক দুটো নিজের পরিচয় গোপন করে বলল, আমরা মুসাফির। হজ্বের উদ্দেশে এসেছিলাম। হজ্ব কার্য সমাধা করে জিয়ারতের নিয়তে রওজা শরীকে এসেছি। কিন্তু প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেমে আত্মহারা হয়ে ফিরে যেতে মনে চাইল না। তাই বাকী জীবন রওজার পাশে কাটিয়ে দেওয়ার নিয়তেই এখানে রয়ে গেছি। আমরা কারও দাওয়াত গ্রহণ করি না। এক আল্লাহর উপরই আমাদের পূর্ণ আস্থা। আমরা তারই উপর নির্ভরশীল। এবাদত, রিয়াজত ও পরকালের চিন্তায় বিভোর থাকাই আমাদের কাজ। কুরআন পাক তিলাওয়াত, নফল নামায ও অজিফা পাঠেই আমাদের সময় শেষ হয়ে যায়। সুতরাং দাওয়াত খাওয়ার সময়টা কোথায়?
উপস্থিত জনগণ তাদের পক্ষ হয়ে বলল যে, হুজুর! এরা দীর্ঘদিন যাবত এখানে অবস্থান করছে। এদের মত ভাল লোক আর হয় না। সব সময় দরিদ্র, এতিম ও অসহায় লোকদের প্রচুর পরিমাণে সাহায্য করে। তাদের দানের উপর অত্র লোকদের প্রচুর পরিমাণে জীবিকা নির্ভর করে। নূরুদ্দীন জঙ্গী (র:) লোকদের কথা শ্রবণ করে লোক দুটোর প্রতি পুনরায় গভীর দৃষ্টিতে তাকালেন। অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে তাদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করলেন। এতে আবারও তিনি নিশ্চিত হলেন, এরা তারাই যাদেরকে তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন।
এবার সুলতান জলদ গম্ভীর স্বরে তাদেরকে বললেন, সত্য কথা বল। তোমরা কে? কেন, কী উদ্দেশ্যে এখানে থাকছ?
এবারও তারা পূর্বের কথা পুনরাবৃত্তি করে বলল, আমরা পশ্চিম দেশ থেকে পবিত্র হজ্বব্রত পালনের জন্য এখানে এসেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নৈকট্য লাভই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। এ উদ্দেশ্যেই আমরা এখানে অবস্থান করছি।
সুলতান এবার কারও কথায় কান না দিয়ে তাদেরকে সেখানে আটক রাখার নির্দেশ দিলেন, অত:পর স্বয়ং তাদের থাকার জায়গায় গিয়ে খুব ভাল করে অনুসন্ধাণ চালালেন। সেখানে অনেক মাল সম্পদ পাওয়া গেল। পাওয়া গেল বহু দুর্লভ কিতাবপত্র। কিন্তু এমন কোন জিনিষ পাওয়া গেল না, যদ্বারা স্বপ্নের বিষয়ে কোন প্রকার সহায়তা হয়।
নূরুদ্দীন জঙ্গী (র:) অত্যধিক পেরেশান, অস্থির। এখনও রহস্য উদঘাটন করতে না পারায় তিনি সীমাহীন চিন্তিত। এদিকে মদীনায় বহু লোক তাদের জন্য সুপারিশ করছে। তারা আবারও বলছে হুজুর! এরা নেককার বুযুর্গ লোক। দিনভর রোজা রাখেন। রাতের অধিকাংশ সময় ইবাদত বন্দেগীতে কাটিয়ে দেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযই রওজা শরীফের নিকটে এসি আদায় করেন। প্রতিদিন নিয়মিত জান্নাতুল বাকী যিয়ারত করতে যান। প্রতি শনিবার মসজিদুল কোবাতে গমন করেন। কেউ কিছু চাইলে খালি হাতে ফিরিয়ে দেন না।
সুলতান তাদের অবস্থা শুনে সীমাহীন আশ্চর্যবোধ করলেন। তথাপি তিনি হাল ছাড়ছেন না। কক্ষের অংশে অনুসন্ধানী দৃষ্টি ফিরিয়ে যাচ্ছেন। ঘরের প্রতিটি বস্তুকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। কিন্তু সন্দেহ করার মত কিছুই তিনি পাচ্ছেন না।
নূরুদ্দীন জঙ্গী (র:) এক পর্যায়ে সঙ্গীদের বললেন- আচ্ছা, তাদের নামাযের মুসাল্লাটা একটু উঠাও দেখি। সঙ্গীরা নির্দেশ পালন করল। নামাযের মুসল্লাটি বিছানো ছিল একটি চাটাইয়ের উপর। সুলতান আবার নির্দেশ দিলেন, চাটাইটিও সরিয়ে ফেল।
চাটাই সরানোর পর দেখা গেল একখানা বিশাল পাথর। সুলতারেন নির্দেশে তাও সরানো হল। এবার পাওয়া গেল এমন একটি সুরঙ্গপথ যা বহুদূর পর্যন্ত চলে গেছে। এমনকি তা পৌছে গেছে, রওজা শরীফের অতি সন্নিকটে।
এ দৃশ্য অবলোকন করা মাত্র নূরুদ্দীন জঙ্গী (র:) বিজলী আহতের ন্যায় চমকে উঠলেন। অস্থিরতার কালো মেঘ ছেয়ে যায় তার সমস্ত হৃদয় আকাশে। ক্রোধে লাল হয়ে যায় গোটা মুখমন্ডল। অবশেষে লোক দুটোকে লক্ষ্য করে ক্ষিপ্ত-ক্রদ্ধ সিংহের ন্যায় গর্জন করে ঝাঁঝাঁলো কন্ঠে বললেন-
তোমরা পরিস্কার ভাষায় সত্যি কথাটা খুলে বল, নইলে এক্ষুনি তোমাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সম্মুক্ষিন হতে হবে। বল, তোমরা কে? তোমাদরে আসল পরিচয় কী? কারা, কী উদ্দেশ্যে তোমাদেরকে এখানে পাঠিয়েছে?
সুলতানের কথায় তারা ঘাবড়ে গেল। কঠিন বিপদ সামনে দেখে আসল পরিচয় প্রকাশ করে বলল,-
আমরা ইহুদী। দীর্ঘদিন যাবত আমাদেরকে মুসল শহরের ইহুদীরা সুদক্ষ কর্মী দ্বারা প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রচুর অর্থ সহকারে এখানে পাঠিয়েছে। আমাদেরকে এজন্য পাঠানো হয়েছে যে, আমরা যেন কোন উপায়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শবদেহ বের করে ইউরোপীয় ইহুদীদের হাতে হস্তান্তর করি। এই দুরহ কাজে সফল হলে তারা আমাদেরকে আরও ধনসম্পদ দিবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সুলতান বললেন, তোমরা তোমাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কী পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলে? কিভাবে তোমরা কাজ করতে?
তারা বলল, আমাদের নিয়মিত কাজ ছিল, রাত গভীর হলে অল্প পরিমাণ সুড়ঙ্গ খনন করা এবং সাথে ঐ মাটিগুলো চামড়ার মজকে ভর্তি করে অতি সন্তর্পণে মদীনার বাইরে নিয়ে ফেলে আসা। আজ দীর্ঘ তিন বৎসর যাবত এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজে আমরা অনবরত ব্যস্ত আছি। যে সময় আমরা রওজা মোবারকের নিকট পৌছে গেলাম এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম যে, এক সপ্তাহের মধ্যে বিশ্বনবীর লাশ বের করে নিয়ে যাব, ঠিক সে সময় ধরে আমাদের মনে হল, আকাশ যেন ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। জমীন যেন প্রচন্ড ভূমিকম্পে থরথর করে কাঁপছে। যেন সমগ্র পৃথিবী জুড়ে মহাপ্রলয় সংঘটিত হচ্ছে। অবস্থা এতাটাই শোচনীয় রূপ ধারণ করল, মনে হল সুড়ঙ্গের ভিতরেই যেন আমরা সমাধিস্থ হয়ে পড়ব। এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে আমরা কাজ বন্ধ করে রেখেছি।
তাদের বক্তব্যে সুলতানের নিকট সব কিছুই পরিস্কার হয়ে গেল। তাই তিনি লোক দুটোকে নযীর বিহীন শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন । যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর এমন দু:সাহস দেখাতে না পারে।
তিনি মসজিদ হতে অর্ধ মাইল দূরে একটি বিশাল ময়দানে বিশ তাহ উঁচু একটি কাঠের মঞ্চ তৈরী করলেন। সাথে সাথে সংবাদ পাঠিয়ে মদীনা ও মদীনার আশেপাশের লোকদেরকে উক্ত ময়দানে হাজির হওয়ার নির্দেশ প্রদান করলেন।
নির্ধারিত সময়ে লক্ষ লক্ষ লোক উক্ত মাঠে সমবেত হল। সুলতান নূরুদ্দীন জঙ্গী (র:) অপরাধী লোক দুটোকে লৌহ শিকলে আবদ্ধ করে মঞ্চের উপর বসালেন । তারপর বিশাল জনসমুদ্রের মাঝে তাদের হীন চক্রান্ত ও ঘৃণ্য তৎপরতার কথা উল্লেখ করলেন।
সুলতান নূরুদ্দীন জঙ্গী (র:) -এর বক্তব্য শ্রবণ করে লোকজন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। তারা এ ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করল। সুলতান বললেন- হ্যাঁ, এদের শাস্তি দৃষ্টান্তমূলকই হবে।
তিনি লোকদেরকে বিপুল পরিমাণ লাকড়ী সংগ্রহের নির্দেশ দিলেন। তারপর লক্ষ জনতার সামনে সেই ইহুদী দুটোকে মঞ্চের নিম্নভাগে আগুন লাগিয়ে পুড়ে ভস্ম করে ফেলেন। কোন কোন বর্ণনায় আছে, সেই আগুন নাকি দীর্ঘ এগার দিন পর্যন্ত জ্বলছিল।
অত:পর তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে এক হাজার মন সিসা গলিয়ে রওজা শরীফের চতুষ্পার্শে মজবুত প্রাচীর নির্মাণ করে দেন। যেন ভবিষ্যতে আর কেউ প্রিয় নবীজির কবর পর্যন্ত পৌছাতে সক্ষম না হয়। তারপর তিনি কায়মনোবাক্যে আল্লাহ্পাকের শুকরিয়া আদায় করলেন এবং তাকে যে এত বড় খেদমতের জন্য কবুল করা হল সেজন্য সপ্তাহকাল ব্যাপী আনন্দাশ্রু বিসর্জন দিলেন। ইতিহাসের পাতা থেকে অবগত হওয়া যায় যে, নূরুদ্দীন জঙ্গী (র:) ইন্তিকাল করলে অসীয়ত মোতাবেক তার লাশকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা মোবারকের অতি নিকটে দাফন করা হয়।
অত্যাচারী বাশারের বিরুদ্ধে দু’আ কুনূত
Dua Qunut against the tyrant Bashar
অত্যাচারী বাশারের বিরুদ্ধে দু’আ কুনূত
يا هَادِيَا مِنَ الضَلالَةِ، يَا نَاصَر الفِئَةِ القَلِيلَةِ عَلَى الفِئَةِ الكَثِيْرَةِ، اللّهُمَّ عَجِلَ بالفَرْجِ، اللّهُمَّ يَسِّرْ نُصْرَةَ دِيْنِكَ، اللّهُمَّ انْصُرْ حَمْلَةَ دَعْوَتِكَ فِي كُلِّ مَكَانٍ،
ইয়া হা-দিয়া- মিন আদ-দোয়ালা-লাহ, ইয়া না-সিরা আল-ফিআতিল কালী-লাতি ’আলাল ফিআতিল কাছী-রাহ, আল্লাহুম্মা আযিলা বিল-ফারজ, আল্লাহুম্মা ইয়াস্সির নুসরাতা দী-নিক, আল্লাহুম্মানসুর হামলাতা দাওয়াতিকা ফী কুল্লি মাকা-ন
O Who guides against misguidance, O Who gives victory to the small group over the large group, O Allah hasten relief, O Allah facilitate the Nussrah of your deen, O Allah help the carriers of your Da’wa everywhere.
اللّهُمَّ انْتَقِمْ مِنْ طَاغِيَةِ سوريا وَزَبانِيَتِهِ، فَإِنَهُمْ يَحَارِبُونَ دِيْنَكَ وَدَعْوَتَكَ، وَ يَقْتُلُوْنَ مَن يَرْفَعُ رَاَيَتَكَ،
আল্লাহুম্মানতাকিম মিন তোগিয়াতি সূ-রিয়া- ওয়া জাবা-নিয়াতি, ফা ইন্নাহুম ইউহা-রিবূনা দী-নাকা ওয়া দা’ওয়াতাকা, ওয়া ইয়াকতুলূ-না মাই ইয়ারফা’উ রায়াইয়াতাক
O Allah take revenge upon the tyrant of Syria and his henchmen, for they war against your Deen and your Dawa and kill those who raise your banner.
اللّهُمَّ عَجِلَ بِالخِلَافَةِ حَتَّى تَنْتَقِمْ مِنْهُم، وَمِنْ أَسْيَادِهِم الأَمْرِيْكَانِ، وَأَمْثَالَهِمْ مِنْ حُكَّامِ المُسْلَمِينَ العُمَلَاءِ،
আল্লাহুম্মা ’আজিলা বিল-খিলা-ফাতি হাত্তা- তানতাকিম মিনহুম, ওয়া মিন আসইয়া-দিহিম আল-আমরী-কান, ওয়া আমছা-লিহিম মিন হুক্কামিল-মুসলিমী-নাল উমালা-‘
O Allah hasten the Khilafah so that you take revenge from them and their American masters and those similar to them from the agent rulers of Muslims.
اللّهُمَّ صُبَّ عَليْهِم عَذَابَكَ، وَاقْصِمْ ظَهُورَهم، واقطِعْ دَابِرَهُم، ومَكَنَّا مِن رِقَابِهِم، وانْصُرْنَا عَلَيْهِمْ، وأَشْفِ مِنْهُمْ صُدُوْرَنَا، وأَكْرِمْنَا بِفَتْحٍ قَرِيْبٍ إِنَكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْر.
আল্লাহুম্মা সুব্বা আলাইহিম আযা-বাক, ওয়াকসিম জুহূ-রাহুম, ওয়াকতি’ দা-বিরাহুম, ওয়া মাক্কান্না মির-রিকাবিহিম, ওয়ানসুরনা- আলাইহিম, ওয়াশফি মিনহুম সুদূ-রানা-, ওয়া আকরিমনা- বিফাতহিন কারী-বিন, ইন্নাকা ’আলা কুল্লি শাইয়িন কাদী-র
O Allah cast upon them Your punishment, break their backs, uproot them, empower us against their necks, make us victorious over them, heal our chests from them, honour us with an imminent victory, indeed You are Capable over everything.
اللَهُمَّ يَا مُجْرِيَ السحَابِ وَيَا هَازِمَ الأَحْزَابِ يَا نَاصِرَ المَظْلُومِيْنَ وَلَوْ بَعْدَ حِيْنِ اللّهُمَّ اهْلِكِ الطَاغِيَةَ بَشار
আল্লাহুম্মা ইয়া মুজরিয়াস সাহা-ব, ওয়া ইয়া হা-জিমাল আহযা-ব, ইয়া না-সিরাল মাজলুমী-না ওয়া লাও বা’দা হী-নি, আল্লাহুম্মা বাশারুত তোয়াগিয়াতা আহলিক
O Allah Controller of the Clouds, Vanquisher of the Confederates, Helper of the Oppressed, even after a while destroy the tyranny of Bashar
اللّهُمَّ زَلْزِلِ الأَرْضَ مِنْ تَحْتِهِ اللّهُمَّ اَقْتُلْهُ شَرَّ قَتَلِ ودَمَّرْهُ شَرَّ تَدْمِيْرِ هُوَ وَزَبَانِيَتَهُ،
আল্লাহুম্মা জালজিলিল আরদা মিন তাহতিহি, আল্লাহুম্মা আকতুলহু শার্রা কাতলি ওয়া দাম্মারহু শার্রা তাদমী-রি হুয়া ওয়া জাবা-নিয়াতাহ
O Allah shake the earth beneath him. O Allah kill him in the most evil of deaths and destroy him in the most evil of destruction, him and his henchmen.
اللّهُمَّ كُنْ مَعَ إِخْوَانِنَا مِنْ المُسْلِمِيْنَ فِيْ سُوريا اللّهُمَّ انْصُرْهُمْ وَصَبِّرْهُمْ وَكُنْ مَعَهُمْ عَلَىْ عَدُوِّهِمْ
اللّهُمًّ آمِيْن آمِيْن آمِيْنআল্লাহুম্মা কুম-মা’আ ইখওয়ানিনা মিনাল মুসলিমী-না ফী সূ-রিয়া- আল্লাহুম্মানসুরহুম ওয়া সোয়াব্বিরহুম ওয়া কুম-মা’আহুম আলা- আদুয়্যিহিম আল্লাহুম্মা আ-মী-ন আ-মী-ন আ-মী-ন
O Allah be with our brothers from the Muslims in Syria. O Allah make them victorious and comfort them. Be with them against their enemies. O Allah. Aameen. Aameen. Aameen.
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে জনদুর্ভোগ ও ইসলামের সমাধান
বর্তমানে মার্কিন-ব্রিটিশ-ভারতের তাবেদার শেখ হাসিনা সরকার যেভাবে একের পর এক বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়েছে তাতে করে বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে নাগালের বাইরে। ক্ষমতায় আসার পর এ সরকার কর্তৃক পাইকারি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির হার এখন র্পযন্ত ২.৩৪ থেকে ৫.৬১ যা দিগুনেরও বেশি। এবার আরো একধাপ এগিয়ে ৩০ শতাংশ হারে দাম বাড়লে এ মূল্য দাঁড়াবে ৭.২৯ টাকায় যা প্রায় তিনগুন। শহরাঞ্চলের আবাসিক গ্রাহকরা যদি ৪০০ ইউনিটের মধ্যে ব্যবহার সীমাবদ্ধ রাখতে পারেন তাহলে ৩৫ শতাংশ হারে দাম বাড়লে প্রতি ইউনিটের জন্য তাদের গুণতে হবে ৫.৭৯ টাকা। আর ৪০০ ইউনিট কোনোভাবে পার হয়ে গেলে প্রতি ইউনিটের জন্য দিতে হবে ১০.৬১ টাকা। যা আসলে বিশাল এক জুলুম।
অনুসন্ধানে দেখা যায় পিডিবির বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো থেকে যে বিদ্যুৎ পাওয়া যায় সবগুলোকে একত্রিত করে গড় করলে এর প্রতি ইউনিটের উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় ১.৭০ টাকা। সঞ্চালন ও অন্যান্য সব মিলিয়ে গ্রাহক র্পযায়ে যেতে প্রতি ইউনিটের মূল্য শেষ র্পযন্ত ২.৭০ টাকায় পৌঁছায়। অথচ আইপিপি (Independent Power Producer) খাত থেকে প্রতি ইউনিট ৪.৫০ টাকা, আর ভাড়াভত্তিকি (Quick rental) বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে এক ইউনিট ১২ টাকা দামেও বিদ্যুৎ কিনছে সরকার। তাহলে কার স্বার্থে সরকার কম মূল্যে বিদ্যুৎ না কিনে ভাড়াভত্তিকি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ১২ টাকা দামে বিদ্যুৎ কিনছে।
কারণ দেশের গ্যাস বিদেশী কোম্পানিকে দিয়ে সেই গ্যাস বেশি দামে কিনছে সরকার এতে বিদ্যুতের দাম যাচ্ছে বেড়ে। আইপিপি এবং ভাড়াভত্তিকি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মালিক হল বিদেশী কোম্পানি এবং সরকারের দেশী আত্মীয়স্বজনদের কোম্পানি যাদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে সরকার জনগণের সম্পদ দিয়ে নিজেদের পকেট ভর্তি করছে। যেমন: সামিটগ্রুপ, ওরিয়নগ্রুপ, লং কিং, ভারতীয় এনটিপিসি, কোয়ান্টাম পাওয়ার লিঃ (অটবি লিঃ এর প্রতিষ্ঠান) ইত্যাদি। জনগণের কষ্টার্জিত টাকা কর ও বিদ্যুৎ বিলের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে এদের পকেটে।
আজ এই দালাল সরকার গুলো উম্মাহর সম্পদকে লুটেপুটে খাওয়া এবং সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে তুলে দিতে পারার মূল কারণ হল এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যাতে মানুষের সার্বভৌমত্ব ও স্বেচ্ছাচারিতা হল শাসন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। এই ব্যবস্থায় ক্ষমতা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে সীমাবদ্ধ আর এই ক্ষমতাবানরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। তারা ইচ্ছামত নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে আইন তৈরী করতে পারে অথচ নিজেরা থাকে সকল আইনের উর্ধে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসকগোষ্ঠী জনগণের দায়িত্ব কাঁধে নেয়না। তারা ক্ষমতার রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার জন্য এবং জাতিকে দরিদ্র করে হলেও নিজেদের পকেট ভর্তি করতে সবসময় ব্যস্ত। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসকদেরকে কারো কাছে কোন জবাবদিহি করতে হয়না। কারো কাছে তারা দায়বদ্ধ নয়। অর্থাৎ তাদের অবাধ ও নিরংকুশ ক্ষমতা আছে কিন্তু কোন দায়বদ্ধতা নেই।
খিলাফতই পারে এ সমস্ত সমস্যার মূলোৎপাটন করতে কারণ এটা হচ্ছে আমাদের স্রষ্টা, বিশ্বজাহানের মালিক, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক নাযিলকৃত ও মনোনিত একমাত্র ব্যবস্থা। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
আমি আপনার প্রতি এমন কিতাব নাযিল করেছি যা প্রত্যেক বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা। [সূরা নাহল : ৮৯]
তাই ইসলামে সকল সমস্যার সমাধান রয়েছে এবং ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান (খলীফা) নিজে কোন আইন তৈরী করতে পারবেন না, তাই তাঁর স্বেচ্ছাচারী ও স্বৈরাচারী হবার কোন সুযোগ নেই। খলীফা আল্লাহ্র প্রতি ভয় ও জনগণের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে দেশ শাসন করবেন। এবং তাকে তার দায়িত্ব সম্বন্ধে জনগণ তথা মুসলিম ও অমুসলিম সকল নাগরিকের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
খিলাফত সরকারের বিদ্যুৎ নীতিমালা:
ইসলামি রাষ্ট্রে একজন ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে তার নিত্য প্রয়োজনীয় কাজের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে তবে ব্যক্তি বিদ্যুৎ বিপণনের জন্য উৎপাদন করতে পারবে না। কারণ তাহলে তা গণ-মালকিানাধীন সম্পদে পরণিত হয়। শরীয়াহ নীতি হচ্ছে,
উৎপাদনের নীতি নির্ধারিত হয় যা উৎপাদিত হচ্ছে তার উপর ভিত্তি করে।
যেমন: রাসুল (সা) মদের কারনে মদের উৎপাদনকে নিষিদ্ধ করেছেন।
রাসুল (সা) বলেন,
তিন জিনিসের মাঝে সকল মানুষ শরীক । এগুলো হচ্ছে পানি, ঘাস (চারন ভুমি) ও আগুন।
এখানে আগুনের সাথে সামাঞ্জস্য র্পূণ যে কোন জিনিস যেমন: জ্বালানি, তাপ ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে বিদ্যুতের উৎপাদন গণ-মালিকানাধীন সম্পদের মাঝে পরে।
এমন সম্পত্তি যা তার স্বাভাবিক সৃষ্টিগত কারনেই ব্যক্তি মালিকানার কবজায় যাওয়ার উপযুক্ত নয়। যেমন: নদী, বড় ময়দান, মহা সড়ক ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে রাসূল (সা) বলনে,
যে আগে আসে আমার দিক থেকে পরিবেশ তার অনুকুলে (র্অথাৎ আগে আসলে আগে পাবে)।
রাসুল (সা) বলনে,
আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল ছাড়া চারণ ভুমি আর কারো নয়।
তাই বিদুৎ বিপননের জন্য ব্যবহারিত খুঁটি, তার যা কিনা গণ-মালিকানাধীন সম্পদের উপর স্থাপিত হওয়ার কারনে গন-মালিকানাধীন সম্পদে পরিনত হয়।
নদী, জলপ্রপাত, লেক ইত্যাদি যত গন-মালিকানাধীন সম্পদ হতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ গণ-মালিকানা সম্পদের হুকুমের মাঝে পড়ে।
যেহেতু গণ-মালিকানাধীন সম্পদে সকল জনগণের হক রয়েছে তাই খলীফা,
১। সকল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসবেন।
২। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন যাতে সকল মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে পারেন।
৩। জনগণকে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবেন এবং বিদ্যুৎ খাত হতে আয়ের অর্থ জনকল্যাণ মুলক কাজে ব্যয় করবেন।
একমাত্র আল্লাহর দেয়া এই বিধানই আমাদের বিদ্যুৎ নিয়ে এই দুর্ভোগ থেকে পরিত্রান দিতে পারে তাই আমাদের উচিৎ সেই খিলাফত ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা যা দুনিয়াতে কল্যান নিয়ে আসবে। খিলাফত কায়েমের মাধ্যমেই আমাদের দূরবস্থার পরিসমাপ্তি সম্ভব, নতুবা যুগ যুগ ধরে এ মূল্যবৃদ্ধির ভোগান্তি আমাদের বয়ে যেতে হবে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলনে,
যে আমার বাণী (কুরআন) প্রত্যাখ্যান করবে তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে পুনরুথান দিবসে অন্ধভাবে তুলবো। [সুরা তোয়াহা-১২৪]
এন. মুহাম্মদ
সেপ্টেম্বর ২০১২বিশ্বব্যাপী পূঁজি বাজারের ধস, পূঁজিবাদের ব্যর্থতা এবং খিলাফতের সমাধান
বিশ্বঅর্থনীতি পতনের ঘটনা প্রবাহ : বর্তমান বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সমস্যার কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা প্রবাহ তুলে ধরা হলো :
৪ এপ্রিল- ২০০৭ : নিউসেঞ্চুরী লিমিডেট নামের মার্কিন সাব-প্রাইম মর্গেজ ব্যাংক দেউলিয়া ঘোষণা।
মে- ২০০৭ : এক মাসের মধ্যে প্রায় ২৫টি সাব-প্রাইম মর্গেজ ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে পড়ে।
মে-২০০৭ : এর এক সপ্তাহের মাঝে আর্থিক বাজারের মোট ক্ষতির পরিমান দাড়ায় প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলার।জুন-২০০৭ : শুরু হয় তারল্য সংকট এবং ঋণ প্রদান বন্ধ করে দেয় অনেক ব্যাংক। একেই বলা হয় credit crunch
ফেব্রুয়ারী-২০০৮ : Citi Group Credit মার্কেটে loss করে প্রায় ৪০.৭ বিলিয়ন ডলার, HSBC ব্যাংক এর ক্ষতির পরিমান ১৫.৫ বিলিয়ন, Merrill Lynch এর ক্ষতির পরিমান দাড়ায় ৩১.৭ বিলিয়ন।
মার্চ- ২০০৮ : বৃটেনের পঞ্চম বৃহত্তম ব্যাংক Northern Rock দেউলিয়া ঘোষিত হয়।
সেপ্টেম্বর-২০০৮ : ১৮৪ বছরের পুরানো পঞ্চম বৃহত্তম মার্কিন ব্যাংক Lehman Brothers দেউলিয়া ঘোষিত হয়।
সেপ্টেম্বর-২০০৮ : বিশ্বের সবচে বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠা AIG Group দেউলিয়ার কবলে পড়ে এবং মার্কিন সরকার ৮০% মালিকানা গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করন করে নেয়।
সেপ্টেম্বর-২০০৮ : আইসল্যান্ডের/আয়ারল্যান্ডের প্রায় সমস্ত ব্যাংক জাতীয় করন করা হয়।
সেপ্টেম্বর-২০০৮ : ৭৪০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন এবং ৫০০ বিলিয়ন পাউন্ডের বৃটিশ rescue plan অনুমোদন হয়।
সেপ্টেম্বর-২০০৮ : শেয়ার বাজারের দর পতন অব্যাহত থাকে। ইউরোপ, এশিয়া ও মার্কিন শেয়ার বাজারগুলো এক বছরে প্রায় ৩০-৪০% সম্পত্তি হারিয়ে ফেলে।
সেপ্টেম্বর-২০০৮ : সারা বিশ্বে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী মহামন্দার সূচনা।
ভূমিকা :
বিশ্বব্যাপী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিয়েল ষ্টেট সেক্টরে যে সংকট দেখা দিয়েছে এবং এর পরবর্তীতে যেভাবে সারা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট ছড়িয়ে পড়েছে তা উপরের ঘটনা প্রবাহ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান। এই প্রবন্ধে আমরা সমস্যার স্বরূপ ও প্রকৃত কারণ তুলে ধরার চেষ্টা করব এবং এই ধরণের সমস্যা, আশু খিলাফত কিভাবে সমাধান করবে তা বিস্তারিত উপস্থাপন করা হবে। এই প্রবন্ধের বেশ কিছু কন্সেপ্ট যেহেতু খুব বেশী টেকনিক্যাল তাই উপস্থাপনা এবং বুঝার সুবিধার জন্য পুরো প্রবনন্ধটিকে নিম্নোক্ত ভাবে সাজানো হলো।
– কিছু টেকনিক্যাল শব্দের সংজ্ঞা।
– আর্থিক সংকটের তৈরীর পেছনে কার্যক্রর প্রক্রিয়াটি এবং এতে জড়িত বিভিন্ন ধরণের বাজারের কার্যপ্রক্রিয়া বর্ণনা করা।
– পুঁজিবাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সংকটের কারণ এবং সংকট উত্তোরণে পুঁজিবাদী প্রেসক্রিপশন।
– সংকটের প্রকৃত কারণের বিবরণ।
– খিলাফতের সমাধান।
– বর্তমান সংকটে আমাদের ভূমিকা।
১ম ধাপ : কিছু টেকনিক্যাল শব্দের সংজ্ঞা
– বাণিজ্যিক ব্যাংক (Commercial Bank) : যেসব ব্যাংক জনগণের সঞ্চয়কৃত অর্থ সুদের বিনিময়ে জমা নেয় এবং অধিক সুদের বিনিময়ে অন্যের কাছে তা ঋণ দেয় তাকে বাণিজ্যিক ব্যাংক বলে।
– পেনশন ফান্ড প্রতিষ্ঠান : যে সকল প্রতিষ্ঠান চাকুরীজীবিদের পেনশনের টাকা জমা নেয় এবং তা বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে এবং চাকুরী শেষে তা ফেরৎ দেয়।
– মিউচ্যুয়াল ফান্ড কোম্পানী : যে সকল প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির কাছ থেকে কাগজি সার্টিফিকেট বিক্রি করে টাকা সংগ্রহ করে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে।
– বন্ড বাজার : যে বাজারে ঋণের দলিল ক্রয়-বিক্রয় হয়।
– ঝুঁকি : ঋণ দেয়ার পর ফেরৎ না পাবার সম্ভবনা কে ঝুঁকি বলে।
– সিকিউরিটি : এক ধরনের দলিল যার মাধ্যমে কোন কিছুর উপর আপনার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। যেমন : শেয়ার।
– জামানাতযুক্ত গৃহঋণ (Home Loan Mortgage) : কোন ব্যক্তি যদি গৃহ নির্মানের জন্য গৃহিত ঋনের (Loan) এর বিপরীত জামানত হিসাবে ঋণ দাতাকে বা ঋণদাতার পক্ষে অন্য কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিকট স্থাবর সম্পত্তি (যেমন বাড়ী, জমি ইত্যাদি) জামানত রেখে ঋণ গ্রহণ করে তাকে জামানতযুক্ত গৃহঋণ বলে।
– প্রাইম মর্গেজ বাজার (Prime-Mortgage Market) : জামানতযুক্ত গৃহঋণ গ্রহণের সময় ঋণ গ্রহীতার আর্থিক সামর্থ্য এবং ঋণ পরিশোধের সম্ভবনা ক্ষতিয়ে দেখা হয়। যেসব ঋণ গ্রহীতার ঋণ পরিশোধের আর্থিক সামর্থ্য আছে তাদেরকে বলা হয় প্রাইম কাষ্টমার (Prime Customer)। এই বাজারে যেসব গৃহঋণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণ দেয় তাদেরকে Prime-Mortgage Bank বলে। এক্ষেত্রে ঋনের জামানত হিসাবে ঐ বাড়ীটিই (যা এখনও তৈরী হয়নি) মর্গেজ ব্যাংক এর নিকট দায়বদ্ধ রাখা হয়।
– ক্রেডিট রেটিং প্রতিষ্ঠান : যেসব প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ ঝুঁকির পরিমান নির্ধারণ করে।
– সাব প্রাইম মর্গেজ (Subprime-Mortgage Market) : সারা বিশ্বব্যাপী আমেরিকান মর্গেজ বাজারের পতন যে ভয়বহ অর্থনৈতিক সংকট তৈরী করেছ তার মূলে রয়েছে সাব প্রাইম মর্গেজ বাজার (Subprime-Mortgage Market)।
খুব সহজ ভাষায়, যেহেতু ঋণ পাবার জন্য ঋণগ্রহীতার আর্থিক অবস্থার মূল্যায়ন অতীব গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, তাই যখন কোন ব্যক্তির গ্রহণযোগ্য পরিমান আর্থিক অবস্থা না থাকে তখন সে ব্যক্তি প্রথম শ্রেণীর প্রাইম মর্গেজ ব্যাংক সমূহ হতে ঋণ পায় না। যখন মার্কিনীদের মাঝে সকল প্রাইম কাষ্টমাররা মর্গেজ ঋণ নিয়ে নিল তখন এ ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে স্থবিরতা চলে আসল। সেই সময় কম অবস্থা সম্পন্নদের জন্য সাব-প্রাইম মর্গেজ ব্যাংক সমূহ ঋণ প্রদান শুরু করে। প্রায় ২৫% মার্কিন জনগণ এই ধরনের কম অবস্থা সম্পন্ন আয়ের মানুষ। এটি একটি বিশাল বাজার। ফলে বেশীর ভাগ সাব প্রাইম মর্গেজ ব্যাংক এ ধরনের লোকদের কাছে ঋণ দিতে থাকে। যার বিনিময়ে জামানত হলো ভবিষ্যতে তৈরী বাড়ীটি।
– নিলাম কৃত সম্পত্তি বাজার : যদিও এই ধরণের ঋণ খুব বেশী ঝুঁকিপূর্ণ, তারপরও এই ব্যাংকগুলো এই ধরনের ঋণ প্রদান অব্যাহত রাখল এই যুক্তিতে যে, যদি ঋণ গ্রহীতা ঋণ প্রদান ব্যর্থ হয়, তবে ব্যাংকগুলো জামানতকৃত বাড়ী বিক্রি করে এই ঋণ আদায় করবে। এই ধরণের বাড়ী বিক্রি করার জন্য আমেরিকায় রয়েছে নিলাম কৃত সম্পত্তি বাজার।
২০০৭ সালের দিকে এই ধরনের বাজারে প্রদান করা ঋণের পরিমান দাড়াল ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। যা মার্কিন জিডিপির (GDP) প্রায় এক-দশমাংশ। এভাবেই Subprime-Mortgage Bank গুলো আরো বেশী মুনাফা করার জন্য ঝুঁকির পরিমাণ চিন্তা না করে বিনিয়োগ করতে থাকলো।
– মর্গেজ বেকর্ড বন্ড (Mortgage Backed Bond) : পশ্চিমা অর্থব্যবস্থা বর্তমান সংকট যে কারণে এত প্রকট হয়েছে তার মূলে রয়েছে এই বন্ড। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, একটি সাব-প্রাইম মর্গেজ ব্যাংক কয়েকজনকে গৃহঋণ দিয়েছে। যার বিপরীতে জামানত হল নির্মিতব্য গৃহটি এবং ধরা যাক সব মিলিয়ে ঋণ দিয়েছে ২ কোটি ডলার। এখন মরগেজ ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানটি এই ঋণের বিপরীতে মাসিক বা ত্রৈমাসিক বা অর্ধ-বাৎসরিক বা বাৎসরিক কিস্তি পাবে। যার মাধ্যমে ঋণ আদায় হবে। এখন প্রতিষ্ঠানটি আরো বেশি অর্থ বিনিয়োগ করার জন্য এই প্রাপ্য কিস্তির (ভবিষ্যতে পাবার) বিপরীতে অন্যের কাছ থেকে (যেমন: প্রাইম মর্জেগ ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক ব্যাংক ইত্যাদি) কাছ থেকে বিভিন্ন ঋণ দলিল বিক্রি করে আরো ঋণ গ্রহণ করল। আর এই নতুন ঋণপত্র ক্রেতাকে মর্গেজ লোন থেকে প্রাপ্ত কিস্তি হতে সুদ প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দেয়।। এর ফলে ঋণ কিস্তি একটি ক্রয় বিক্রয়ের সামগ্রী হয়ে পড়ল। একেই বলা হয় মর্গেজ বেকর্ড বন্ড (Mortgage Backed Bond)।
২য় ধাপ : আর্থিক সংকটের তৈরীর পেছনে কার্যক্রয় প্রক্রিয়া এবং এতে জড়িত বিভিন্ন ধরণের বাজারের কার্যপ্রণালী
২.১ বুদ্ধিমান (?) মার্কিনীদের ঋণ বিক্রি :
আমরা হয়তো একটু আশ্বার্যই হব যে, বুদ্ধিহীন মার্কিনীরা বা সমগ্র পাশ্চাত্য সভ্যতা তাদের পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক দর্শন, মুনাফা অর্জনের জন্য কি না করে থাকে। আশ্চর্য্য তাদের কৌশলসমূহ। তবে এখানে আমরা তাদের ঋণ বিক্রির (অপ) কৌশল দেখব।
সাব-প্রাইম মর্গেজ বাজার যেহেতু বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এবং একই সাথে বেশি লাভজনক তাই, বড় বড় ব্যাংকগুলো (বলা হয় Wall Street Banks) এই জায়গায় বিনিয়োগ করার নানান রকম উপায় বের করল। যার মাধ্যমে তারা আরো বেশি অর্থায়ন এবং এর ফলে আরো বেশি মুনাফা করার সুযোগ পেল। এই উপায়গুলো হলো বিভিন্ন প্রকার মর্গেজ সিকিউরিটির উদ্ভাবন। বিভিন্ন ধরনের মর্গেজ সিকিউরিটির মাঝে Mortgage Backed Bond, Mortgage Pay-through Securities, Collateralized Mortgage Obligation Mortgage Backed Bond ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক ব্যাংক (মানুষের সঞ্চয় কৃত অর্থ) মিচুয়্যাল ফান্ড প্রতিষ্ঠান (সাধারণ মানুষের বিনিয়োগকৃত অর্থ), প্যানশান ফান্ড প্রতিষ্ঠান (চাকুরী জীবিদের প্যানশনের কিস্তির অর্থ), বীমা প্রতিষ্ঠান (সাধারণ মানুষের বীমা পলিসির কিস্তি হতে প্রাপ্ত অর্থ) এই মর্গেজ বেকর্ড বন্ড (Mortgage Backed Bond) ক্রয় করতে থাকে। এর মাধ্যমে এই বাজারে আরো বেশি অর্থায়নের সুযোগ তৈরী হলো।
শুধুমাত্র এই ধরণের মার্কিন প্রতিষ্ঠানই নয় বরং ইউরোপ, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যে, প্রাচ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ সারা বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই ধরণের ঋণপত্রে বিনিয়োগ শুরু করলো। লক্ষ্যনীয় যে, যে সকল প্রতিষ্ঠান এই মর্গেজ বন্ড কিনছে তারা মোটেও জানতে পারছে না যে, মার্কিন এই মর্গেজ ব্যাংকগুলো কোথায়, কি পরিমানে এবং কত ঝুঁকিতে তাদের অর্থ বিনিয়োগ করছে। আর কতইবা এই মর্গেজ বাজারের প্রকৃত ঝুঁকির পরিমান। Credit Rating প্রতিষ্ঠান সমূহ মর্গেজ ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপকদের যোগ সাজসে এই সেক্টরের বিনিয়োগ ঝুঁকির পরিমান প্রকৃত ঝুঁকির পরিমান থেকে কম বলে রির্পোট বের করতে থাকল।
সাধারণ মানুষ, যারা বীমা প্রতিষ্ঠানে টাকা দেয় বীমা পলিসীর জন্য, যারা পেনসন ফান্ড কোম্পানীতে মাসিক কিস্তি দেয় বৃদ্ধ অবস্থায় পেনসন পাবার জন্য, যারা ব্যাংকে টাকা জমা দেয় ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সমস্যা হতে মুক্ত থাকার জন্য, তাদের পক্ষে এই সব বিনিয়োগের ঝুঁকি জানা একদমই অসম্ভব।
২.২ Farnic Mae & Faddie Mac এর ভূমিকা (SWAP এর উদ্ভব):
যেহেতু সাব প্রাইম ব্যাংকের ইস্যুকৃত মর্গেজ বেকর্ড বন্ড ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, Federal National Mortgage Association বা সংক্ষেপে Fannie Mac/FNMA এই ঝুঁকির পরিমান কমানোর জন্য এই সব ঋণ পত্রের বিনিময় গ্যারান্টি প্রদান করে নতুন ঋণপত্র বিক্রি শুরু করে। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় Credit SWAP। যেহেতু Fannie Mac একটি মার্কিন সরকারী প্রতিষ্ঠান, যা বাংলাদেশের House Building Finance Corporation (BITBFC) এর মত, তাই এই প্রতিষ্ঠানটির গ্যারান্টির বিপরীতে ইস্যুকৃত মর্গেজ বেকর্ড বন্ড আস্তে আস্তে বাজারে জনপ্রিয় হতে থাকলো। ২০০৭ সালে এই বাজারের মোট মূল্য দাড়ায় ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। এখানে লক্ষ্যনীয়, যে প্রতিষ্ঠানটি এই গ্যারান্টি প্রদান করলো তার নিজের আর্থিক অবস্থাই নাজেহাল। ২০০৭ সালের মোট সম্পত্তির পরিমান ৮৮২.৫ বিলিয়ন ডলার অথচ নিজস্ব মুলধন হল মাত্র ৪৪ বিলিয়ন ডলার। এইভাবে SWAP এর মাধ্যমে Fannie Mac প্রাইভেট মর্গেজ ব্যাংকগুলোকে আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিক্রির মাধ্যমে ব্যবসা করার জন্য উৎসাহিত করলো।
তাছাড়াও শেয়ার বাজার, বন্ড বাজার, বিভিন্ন ধরণের ঋণপত্র, margin trading, ডোরভেটিবস ও হেজ্ফান্ড ইত্যাদি জটিল কাগুজে সম্পত্তির মাধ্যমে এই সেক্টরে প্রকৃত সম্পত্তির মূল্যের তুলনায় অধিক হারে ঋণ ক্রয়-বিক্রয় শুরু হলো। ২০০৭ সালে এ বাজারের পরিমাণ ছিল ১.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। অথচ এর বিপরীতে অধিক পরিমান ঋণ বিক্রির ফলে ঋণ বাজারের পরিমান দাঁড়ায় ৫১ ট্রিলিয়ন ডলার, শেয়ার বাজারের পরিমান দাড়ায় ৪৮ ট্রিলিয়ন ডলার এবং এসবের বিপরীতে ডেরিভেটিব্স বাজারের পরিমান ছিল ৫০০ ট্রিলিয়ন ডলার। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, সেই একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের কোন ব্যক্তির একটি বাড়ী তৈরীর বিষয়কে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক ব্যাংক, মর্গেজ ব্যাংক, সাব-প্রাইজ মর্গেজ ব্যাংক নিলামে বাড়ী বিক্রির বাজার, পেনশন ফান্ড, মিউচুয়্যাল ফান্ড, লিজিং ফার্ম, বীমা প্রতিষ্ঠানসহ সবাই কিভাবে ব্যবসা করছে। আর সুদ হচ্ছে এই সমস্ত ব্যবসায়ের পণ্য।
২.৩ আর্থিক বাজারে ধসের প্রক্রিয়া ও প্রভাব:
এই ভাবে যখন বিভিন্ন ধরণের আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ সাব-প্রাইম মর্গেজ বন্ড ও এর বিপরীতে তৈরী হওয়া বিভিন্ন ডেরিবেটিবস-এ বিনিয়োগ শুরু করলো তখন মর্গেজ এবং সাব-প্রাইম মর্গেজ ব্যাংকগুলোর ঋণ দেয়ার পরিমাণ বেড়ে গেল। যেসব মর্গেজ ব্যাংক গৃহঋণ দিল তারা ভবিষ্যতে এই বাড়ীর মূল্য কয়েকগুণ বাড়বে এই চিন্তায় ঐ পরিমান ঋণের দলিল ইস্যু করতে থাকলো। এই ভাবে বাজারে মর্গেজ বন্ড ও অন্যান্য ঋণপত্রের পরিমাণ বেড়ে গেল। অন্যদিকে জর্জ ডব্লিউ বুশের গত ৮ বছরের জঘণ্য অর্থনৈতিক ও বৈদিশিক নীতির কারণে সাধারণ মার্কিন জনগণের পক্ষে সময়মত গৃহ ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ল।
মার্কিন অর্থনীতি ধ্বংসের প্রথম লক্ষণ দেখা গেল যখন ২রা এপ্রিল ২০০৭ সালে নিউ সেঞ্চুরী লিমিটেড নামের সর্ববৃহৎ সাব-প্রাইম মর্গেজ ব্যাংকে দেউলিয়া ঘোষিত হল। এক মাসের মধ্যে প্রায় ২৫টি সাব-প্রাইম ব্যাংক দেউলিয়া ঘোষিত হল। আর যখন এক সাথে অনেকগুলো মর্গেজ ব্যাংক দেউলিয়া হলো তখন নিলাম বাজারে বাড়ী বিক্রির পরিমান বেড়ে গেল। ফলে দ্রুত এসব বাড়ীর দাম কমতে শুরু করলো। অন্যদিকে যেহেতু আর্থিক অর্থনীতির সকল সেক্টরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই মর্গেজ বন্ড বাজারে বিনিয়োগ করেছিল তাই সাব-প্রাইম মর্গেজ ব্যাংকগুলোর দেউলিয়ার ফলে দ্রুত মর্গেজ বন্ডের দাম কমে গেল। শুরু হল বাজারে দরপতন। এতে করে সংকট চক্রবৃদ্ধি হারে প্রভাব ফেলতে শুরু করলো এবং যারাই এই বাজারে বিনিয়োগ করলো তারা সবাই একে একে ক্ষতির সম্মুখিন হতে শুরু করলো। একে একে ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান, হেজ ফান্ড, পেনশন ফান্ড, মিউচুয়্যাল ফান্ড, বিনিয়োগ ব্যাংক, এরা সবাই ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হয়। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে মাত্র ৭ দিনেই এই ক্ষতির পরিমাণ দাড়াল ৮০০ বিলিয়ন ডলার। এই বিক্রি বেড়ে যাবার কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো প্রাইম মর্গেজ ব্যাংকগুলোকেও ঋণ দেয়া বন্ধ করে দিল। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অন্যান্য ব্যাংককেও ঋণ প্রদান বন্ধ করে দিল। তৈরী হলো Credit Crunch।
অন্যান্য দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যখন বুঝতে পারে তারা ইউ,ইস-এর মর্গেজ বাজারে বিনিয়োগকৃত টাকা উদ্ধার করতে পারবে না। তখন তারাও বন্ড বাজারে বিক্রি আরো বাড়িয়ে দিল। আস্তে আস্তে এর প্রভাব শেয়ার বাজারেও পড়তে থাকে। ব্যাপক হারে শেয়ার এবং Derivative securities বিক্রির ফলে একে একে বিভিন্ন বন্ড ও শেয়ার বাজারে দাম কমতে শুরু করে এবং বিভিন্ন বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাপক হারে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। পশ্চিমা Central bank গুলো মাত্র ৪৮ ঘন্টা সময়ের মধ্যে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার নগদ অর্থ আর্থিক বাজারে সরবরাহের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করলো। যেহেতু মর্গেজ বন্ড বাজারের পরিমান ছিল ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার, বন্ড বাজারের পরিমান ছিল ৫১ ট্রিলিয়ন ডলার, শেয়ার বাজারের পরিমান ছিল ৪৮ ট্রিলিয়ন ডলার এবং এসবের বিপরীতে ডেরিভেটিব্স বাজারের পরিমান ছিল ৫০০ ট্রিলিয়ন ডলার তাই শুরু হলো ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট। অনেক ব্যাংক দেউলিয়ার দারপ্রান্তে পৌছে যায়। যাদের মাঝে রয়েছে বৃটেনের Northern Rock, সুইজারল্যান্ডের USB, ১৮৫ বছরের পুরাতন আমেরিকান ব্যাংক Lehman Brothers.
এই সমস্যার ফলে USA, Japan, UK, Germany, France, ইটালি, অষ্টেলিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশে প্রকৃত উৎপাদন কমে গেছে। মর্গেজ লোন নিয়ে করা বাড়িগুলো নিলামে উঠছে। টঝঅ-তে প্রত্যেক দশ সেকেন্ডে ১টি বাড়ী নিলামে বিক্রি হয়- যার দাম গত বছরের তুলনায় ১/৩ অংশ। বিলাস পণ্যের ভোগ কমে গেছে। USA-তে গাড়ি বিক্রি কমে গেছে প্রায় ৭৮%, দাম কমেছে প্রায় ৪০%। চীনে অনেক ফ্যাক্টরী বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ আমেরিকানরা তাদের ক্রয় ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশেও প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার গার্মেন্টেস বাজারের আশু পতন পরিলক্ষিত হচ্ছে। কারণ স্টেপ্টম্বর ডিসেম্বর হল বিক্রির মৌসুম। প্রায় ৭০০ বড় বড় আমেরিকানরা নতুন অর্ডারতো দূরে থাক, পুরাতন অর্ডার গুলোও তুলে নিচ্ছেন।
৩য় ধাপ : পুঁজিবাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সংকটের কারণ এবং সংকট উত্তোরণে পুঁজিবাদী প্রেসক্রিপশন
৩.১ সংকট উত্তরণে পুঁজিবাদীদের ব্যবস্থা:
এই ঘটনার পরবর্তীতে অনেকেই এই সমস্যার কারন ও সমাধান খুঁজার চেষ্টা করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্ণর, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্ণর, G8 সম্মেলনের বক্তারা কারণ হিসেবে আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, হিসাব রক্ষন ব্যবস্থা ও Regulation-কে দায়ী করেছেন। যা সত্যিকার অর্থে সমস্যার মূল কারণ নয়।
তাছাড়া এই অবস্থা হতে উদ্ধারের জন্য পশ্চিমা পুঁজিবাদী সরকারগুলো সাধারণ মানুষের টাকা এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি পূরণে ব্যায় করার মত সিদ্ধান্ত নেয়। Free market economy-তে আমরা এই সিদ্ধান্ত দেখে আশ্চার্য নই। এটি তাদের আর্থিক নয় বরং আদর্শিক দেউলিয়াত্বই প্রমাণ করে। ইউএসএ-তে প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ডলারের উদ্ধার প্যাকেজ এবং ইউকে-তে প্রায় ৫৫০ বিলিয়ন পাউন্ড উদ্ধার প্ল্যান সরকার ভাবে গ্রহণ করা হয়। এর ফলে বৃটেনে জনপ্রতি প্রায় ২২০০ পাউন্ড পরিমান ঋণের বোঝা বাড়াবে। এসব উত্তরণ পরিকল্পনা সত্যিকারের কোন সমাধানতো দেয়ই নি বরং সমস্যা আরো ঘনীভূত করেছে। পরবর্তীতে আরো ৩৫০ বিলিয়ন ডলার উদ্ধার পরিকল্পনাও কোন সমাধান আনতে পারেনি। বিশ্বব্যাপী শেয়ার ও বন্ড বাজারের দরপতন আজঅব্দি অব্যহত আছে। গত ১ বছরে মার্কিনসহ সারা বিশ্বের শেয়ার বাজারের দরপতন হয়েছে গড়ে ৩৫-৪৫%।
৩.২ সংকট উত্তরণে সত্যিকার পুঁজিবাদীদের ব্যবস্থা:
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে উত্তরণের উপায় হিসাবে সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা সভ্যতার মোড়ল আমেরিকার রয়েছে পুরাতন ফর্মূলা। তারা নিজেরাও জানে আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, হিসাব রক্ষণ ব্যবস্থা ও Regulation-ইত্যাদির মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান হবে না। তাদের ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। তাদের ১৯৩০ এর অর্থনৈতিক মহামন্দা কেটেছে ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় অস্ত্র বিক্রির মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ দ্বারা এবং পরবর্তীতে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে। ১৯৫০ এর অর্থনৈতিক সংকট কেটেছে কোরিয়ান যুদ্ধ দ্বারা। ১৯৬০ এর অর্থনৈতিক সংকট কেটেছে ভিয়েতনাম যুদ্ধ দ্বারা। ১৯৭০ সালের মন্দা কেটেছে সৌদি রাজা ফয়সালকে হত্যা করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমিয়ে। ১৯৮০-র দশকের অর্থনৈতিক মন্দা কেটেছে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ঠান্ডা যুদ্ধ বিজয়ের মাধ্যমে মধ্য এশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের মাধ্যমে। ১৯৯০ এর সমস্যা কেটেছে সিনিয়র বুশের নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার প্রথম যুদ্ধ- মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রথম ইরাক যুদ্ধের মাধ্যমে এবং তারপর ২০০০ সালের সমস্যা কাটানোর চেষ্টায় রয়েছে ২য় ইরাক যুদ্ধ। পরবর্তীতে war on terror নামে মুসলমানদের বিরুদ্ধে নব্য ক্রুসেড পরিচালনার মাধ্যমে। বর্তমান সমস্যা সমাধানের জন্য তাদের লক্ষ্য আশু Pakistan আক্রমন, প্রক্সি-ওয়ারের মাধ্যমে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে arm race শুরু করে। আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি প্রায় ৩০ বছর পুরনো ভারতের বিরুদ্ধের অবরোধ উত্তোলণের মাধ্যমে ভারতকে nuclear fuel সরবরাহ করার পরিকল্পনা। যা ভারত-পাকিস্তানের মাঝে প্রতিযোগীতা তৈরী করবে এবং USA এর অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করবে। এছাড়াও রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমানো, যাতে করে আমেরিকানদের জীবন নির্বাহ ব্যয় হ্রাস পায়। বিষয়টি ইতিমধ্যেই ঘটতে শুরু করেছে। প্রায় ৭-৮ মাস আগে তেলের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের মত, যা বর্তমানে মাত্র ৫০ ডলারে নেমে এসেছে। সর্বপরি রয়েছে আরো বেশি ডলার মুদ্রা ছাপানো কাজ। যা USA এর সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখবে এবং অন্যান্য দেশকে সমস্যায় ফেলবে। কারণ এতে করে অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখা ডলার রির্জার্ভের মূল্য কমে যাবে।
তবে লক্ষ্যনীয় যে, আজকের আমেরিকা সারা বিশ্বে সামরিক দিক থেকে একটি পরাজিত শক্তিতে পরিনত হয়েছে। পরিনত হয়েছে পরাজিত শক্তি হিসেবে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এবং সারা বিশ্বে তাদের ফেরী করা রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন ভাবে অস্ত্র প্রচার হচ্ছে। সত্যিকার অর্থে বর্তমান আমেরিকা আরেকটি উন্নত আদর্শিক রাষ্ট্রেও আগমনের জন্য পথ ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
৩.৩ পুঁজিবাদী সভ্যতার আদর্শিক দেউলিয়াত্ব:
বিশ্বব্যাপী পূঁজিবাদী অর্থনৈতিক এই সংকটের কারণে মানব সভ্যতার যে সংকট দেখা দিয়েছে তাতে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অষ্ট্রেলিয়া, হংকং, জাপান, নিউজিল্যান্ড, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানী, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, ইটালী, ইউকে, আরব রাষ্ট্রসমূহ এবং ভারত সহ সারা বিশ্বে ব্যাপক ভাবে এ অর্থনৈতিক সংকট ছড়িয়ে পড়েছে। সকল দেশের সরকারই তাদের আর্থিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রানান্তরকর চেষ্টা করে যাচ্ছে। যেমন করে একজন জুয়ারী ক্যাসিনোতে বারবার ফিরে যায় তার ক্ষতি পুরণের জন্য। ইউএসএ-ইউকে সরকার তাদের সাধারণ মানুষের করের টাকা এই ধরণের জুয়ারী আর্থিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য ঢেলে যাচ্ছেন। যদিও তাদের এ উদ্ধার পরিকল্পনা কাজ করবে কিনা এ নিয়ে বির্তক আছে, তবে পুঁজিবাদের আর্দশিক মৃত্যু নিয়ে আর কোন সন্দেহ বা বিতর্ক নেই। পশ্চিমা জাতি সমূহ দশকের পর দশক বিশ্বব্যাপী মুক্ত বাজার অর্থনীতি, মালিকানার স্বাধীনতা, বাজার অর্থনীতি, ইত্যাদি বিষয়গুলো সারা বিশ্বে ফেরি করে আসছে। প্রচুর বেতনভূক্ত পরামর্শক (consultant) ও তাদের প্রতিষ্ঠান ও IMF, World Bank এর মাধ্যমে তারা বেসরকারীকরণ (Privatization), মুক্তবাজার নীতিমালা, যৌথমুলধনী পাবলিক কোম্পানী এবং শেয়ার ও বন্ড বাজারের প্রসারের কাজ করে যাচ্ছে। আমরা দেখেছি বাংলাদেশ কিভাবে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন : সোনালী, জনতা, রূপালী, অগ্রণী ব্যাংক এসব প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারীকরণ করেছে। অথচ তারা যখন নিজেদের দেশে সমস্যায় পড়েছে তখন তারা তাদের মুক্তবাজার অর্থনীতির শ্লোগান, প্রাইভেটাইজেশনে বা প্রতিযোগিতামূলক প্রেশক্রিপশনকে নিজেদের জন্য গ্রহণ করছেনা।
– USA তাদের দেশের বিখ্যাত গৃহ ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান “Fannie Mae” এবং “Faddie Mac”-কে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব করেছে। বিখ্যাত ইন্সুরেন্স প্রতিষ্ঠান AIG গ্রুপকেও করা হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব। এমনিভাবে তারা প্রচুর আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব করেছে, যার উদাহারণ ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, জার্মানী, ফ্রান্স-এ প্রচুর পাওয়া যায়।
– পশ্চিমা পুঁজিবাদী রাষট্রগুলো বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর কথা বলে, অথচ বর্তমান সমস্যা তারা তাদেররই তৈরী “Anti-competition” আইন পরিত্যাগ করে দু’টি প্রতিষ্ঠানকে একত্রে মার্জ হওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করছে। যা তাদের শিখানো “competition” আইন প্রতিযোগিতা আইন -এর সম্পূর্ণ পরিপন্থী। উদাহরণ হচ্ছে, যুক্তরাজ্যের Loyads & HBOS- আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মার্জার।
– তাদের সরকারী কোষাগারে বর্তমানে আর্থিক সংকট চলছে। এই সময় করের হার ও করের ধরণ বাড়ানোর কথা ছিল যা তারা সারা বিশ্বে ফেরি করে বেড়ায়। অথচ বর্তমান সময় তরা নিজেরা নিজেদের দেশে করের হার কমাচ্ছে। যা তাদের Frudent (কৃচ্ছতাসাধন) অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধ।
এইভাবেই তাদের শুধু অর্থনৈতিক নয়, আদর্শিক দেউলিয়াত্ব প্রকাশ পাচ্ছে। ইনশাআল্লাহ, ভবিষ্যতে যখন তাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কাঠামোর দেউলিয়াত্ব বিশ্ববাসীর কাছে প্রকাশ পাবে তখন জনগণ তা ছুঁড়ে ফেলে দিবে।
৪র্থ ধাপ : সংকটের প্রকৃত কারণের বিবরণ
পূঁজিবাদী অর্থনীতির ব্যর্থতার সত্যিকার কারণ : বর্তমান পুঁচিবাদী অর্থনীতির ব্যর্থতার কারণ আলোচনায় এই নিবন্ধে সমস্যার মূল কারণ হিসাবে ৪টি বিষয়কে চিহ্নিত করা হলো। সমস্যার ৪টি মূল কারণ হলো-
১। সুদ ভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা
২। Complex Financial Product System & Practices
৩। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের গঠন প্রক্রিয়া (Corporate Structure)
৪। Currency Standard৪.১ সুদ ভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা (Interest based economy & financial system):
পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো “সুদ”। পশ্চিমা অর্থনীতির বইগুলোতে বলা হয় সুদের কারণে মানুষ ব্যাংকে সঞ্চয় করে, যা মূলধন তৈরী করে এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে ফলে অর্থনীতি শক্তিশালী হয়। তাছাড়া বলা হয় যে ব্যাংক যেহেতু ব্যক্তি হতে বেশি তথ্যসমৃদ্ধ তারা বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্পের মাঝে সবচেয়ে safe বা কম ঝুঁকি সম্পন্ন প্রকল্প খুব সহজেই চিহ্নিত করতে পারে এবং দেশের মূলধন সবচেয়ে বেশি কার্যকর খাতে খাটাতে পারে। অথচ তাদের সব দাবিই মিথ্যা-
ক. বর্তমান সমস্যায় তারা কিভাবে ১.৭ ট্রিলিয়ন ডলার মর্গেজ বাজারের বিপরীতে Complex financial products তৈরী এবং এসব Product এর বিপরীতে আবার Derivative তৈরী (অর্থাৎ ঋণের উপর ঋণ এবং তার উপর ঋণ থাকে ইংরেজীতে বলে turbo-debt তৈরী করে) কিভাবে এই ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ৫০০ ট্রিলিয়ন ডলার বাজারে বিনিয়োগ করল? আর credit-rating প্রতিষ্ঠানগুলোও কি কারণে এই bubble investment এর ঝুঁকি সঠিক ভাবে নির্ধারণ করতে পারল না? তাহাল কিভাবে বলা যায় যে, সুদ ভিত্তিক ব্যাংক কম ঝুঁকিতে বিনিয়োগ করতে পারে? তাহলে কেন Northern Rock, Lehman brothers দেউলিয়া হলো। বাংলাদেশের ঋণ খেলাপীর ইতিহাস ও তাদের দাবির ভিত্তিহীনতার প্রমাণ। তাছাড়া সঠিক খাতে বিনিয়োগের অর্থ কি এই যে, আদমজীতে বিনিয়োগ না করে বসুন্ধরার মত শপিংমলে বিনিয়োগ করা?
খ. তাদের আরো দাবি যে, সুদ ভিত্তিক ব্যবস্থার কারণে বিনিয়োগ উৎসাহিত হয়। এটিও পুরোপুরি মিথ্যা কথা। ধরুণ তাদের ব্যবস্থা মতে পূবালী ব্যাংক ঋণের উপর ১০% সুদ চার্জ করে, আর IFIC ব্যাংক চার্জ করে ১৫%। তাহলে অবশ্যই বর্তমান ব্যবস্থায় সবাই পূবালী ব্যাংক থেকে ঋণ নিবে। কারণ এতে উৎপাদন খরচ কমবে। তাহলে কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি ঋণের উপর ০% সুদ ধার্য করে, তবে! এমন আর্থিক প্রতিষ্ঠান কি সম্ভব! প্রবন্ধের পরবর্তী অংশে এই বিষয়ে আলোচনা করা হবে।
গ. তাছাড়া বর্তমান ব্যবস্থায় আমানতকৃত অর্থের উপর প্রায় ২০% রিজার্ভ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখতে হয়। অন্যদিকে minimum deposit এর নামে কোটি কোটি টাকা অলস পড়ে থাকে। সুতরাং ব্যাংককে তার লাভ, আমানতকারীদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সুদ ফেরৎ দেবার জন্য ঋণের উপর অধীক হারে সুদ চার্জ করে। তাছাড়া top management এর বোনাস ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা যেহেতু বেশি বেশি মুনাফার সাথে জড়িত তাই তারা বেশি risky project এ বিনিয়োগ করার জন্য এবং আরো বেশি ঋণ বিক্রির জন্য নিচের কর্মচারীদের চাঁপ দেয়। ফলে প্রকৃত জমার বিপরীতে ঋণ আমানত সৃষ্টির মাধ্যমে ১ ডলার মূলধনের বিপরীতে কয়েকগুণ ঋণ প্রদান করা হয়। যেমন : আইন অনুযায়ী যেখানে ১ ডলার মূলধনের বিপরীতে ৩০ ডলার ঋণ প্রদান সম্ভব মার্কিন অর্থনীতিতে, তা বর্তমানে ৯৯ ডলার ঋণে এসে দাড়িয়েছে।
প্রকৃত অর্থে এটি হলো সাধারন মানুষ থেকে সুদের মূলা ঝুলিয়ে পূঁজিপতিদের টাকা হাতিয়ে নেবার উপকরণ।
৪.২ Complex Financial Products, system Practices:
বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ধ্বস একটি অনিবার্য বাস্তবাতা ছিল। কারণ লোভের বশবর্তী হওয়া এ পশ্চিমা সভ্যতা মূনাফার জন্য তাদের Financial System এ প্রচুর পরিমান Complex Financial Products, System ও Securities তৈরী করেছে যাতে বৈধ চুক্তির কোন শর্ত নেই।
– যেমন Margin Trading যেখানে মূলধনের কিছু অংশ ধার করে শেয়ার বা বন্ড ক্রয় করা যায়। শুধু পুঁজিপতিরাই Margin Trading এর সুযোগ পায়। ফলে শেয়ার বাজারে চাঙ্গা অবস্থায় তারা অধীকহারে মূনাফা অর্জন করতে পারে। আর দর পতন শুরু হলে তারা শেয়ার বা বন্ড বিক্রি বাড়িয়ে দেয় ফলে তাদের ক্ষতির পরিমান কমে যায় এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
– Short Sale : যদি বাজারে দাম কমে তবে দাম কমার মূহুর্তে অন্যের কাছ থেকে শেয়ার ধার করে বিক্রি করে পরবর্তীতে দাম আরো কমলে তা আবার কিনে শেয়ারের মালিককে শেয়ার ফেরৎ দেয়া হবে। এর মাঝখানে এই কৌশলের মাধ্যম মূনাফা কিছু অর্জন সম্ভব। আশ্চর্য যা কোন ব্যক্তির নিজের নয় তা সে কিভাবে বিক্রি করে?
– Speculation & Hyping : কোন সাদা চামড়ার লোক এসে সংবাদ সম্মেলন করলো, যে তিনি অনেক পরিমান কোন বিশেষ বা একাধিক কোম্পানীর শেয়ার কিনবেন। পরের দিন media তা প্রচার করল। জনগণ মনে করল যেহেতু এই লোক এসব শেয়ার কিনছেন, তার মানে এসব শেয়ারের অবস্থা ভালো হবে, তারাও এই শেয়ার ক্রয় শুরু করেন ফলে বাজারে দাম বেড়ে যায়। পরবর্তীতে ঐলোক তার শেয়ারগুলী বিক্রি করে মুনাফা হাতিয়ে নেয় এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পথে বসিয়ে সে বাজার ছাড়ে।
– Derivatives : এটি একটি জটিল ধরণের Financial Product যা ভবিষ্যত ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে জড়িত। একটি উদাহরণের মাধ্যমে এর প্রভাব বুঝানো যেতে পারে। ২০০৭ এর শুরুতে তেলের উপর derivative সিকিউরিটির জন্য ব্যারেল প্রতি তেলের দাম বেড়ে দাড়ায় প্রায় ১৪৮ ডলার। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব ব্যবস্থা এর জন্য suffer করে। অথচ বর্তমান সংকটে এই বাজারের পতনের পর তেলের দাম ১/৩ ভাগে নেমে এসেছে।
৪.৩ Corporate Structure:
বর্তমান সংকটের জন্য দায়ী অন্যতম আরেকটি কারণ হলো তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের গঠণ প্রক্রিয়া। এই প্রতিষ্ঠান গঠণ হয় একটি চুক্তির মাঝে যাকে বলা হয় Article of Association I Memorandum of Association বা কোম্পানী গঠণতন্ত্র। চুক্তি অনুযায়ী যারা শেয়ার কিনে তারা প্রতিষ্ঠানের মালিক এবং পরবর্তীতে তারা এ শেয়ার বাজারে ক্রয়-বিক্রয় করতে পারে। এখানে শেয়ার ক্রেতা কোন ব্যক্তি হতে শেয়ার ক্রয়ের প্রস্তাব পাচ্ছে না, না শেয়ার বিক্রেতা শেয়ার ক্রেতা হতে বিক্রয়ের প্রস্তাব পাচ্ছে। কারণ এখানে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের লিখিত সংবিধান অনুযায়ী শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় করছে কোন আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব বা স্বীকৃতি এতে নেই। তাছাড়া আপনি যে কোম্পানীর শেয়ার কিনছেন হয়তবা একজন মদ্যপ, ব্যভিচারী ও সেই কোম্পানীর শেয়ার মালিক। এখানে এ বিষয়ে কোন বাচ বিচার নাই। তাছাড়া ক্রেতা বিক্রেতার সরাসরি চুক্তি অনুপস্থিত বলে যে কেউ যে কোন তথ্য দিয়ে বাজারের দামকে প্রভাবিত করতে পারে এবং এক ধরণের জুয়াড়ি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দামের সাথে কোম্পানীর সত্যিকার উৎপাদন (Real Production) এর কোন সম্পর্ক নেই। যেমন- IPO ইস্যু করার পর বাজারে শেয়ারের দাম বাজারে যেভাবে একদিনেই ৮/১০ গুন বেড়ে যায়। সত্যিকার অর্থেই কোম্পানীর উৎপাদন ঐ পরিমান বাড়ে কি? বর্ধিত এই দামে শেয়ার ক্রেতারা যদি কোম্পানীর কাছে তাদের টাকা দাবী করে তাহলে কোম্পানী কি তা ফেরত দিবে পারবে?
তাছাড়া, কোম্পানীগুলোর দায় সীমাবদ্ধ অর্থাৎ কোম্পানীগুলো দেউলিয়া হলে ঋণদাতারা শুধু শেয়ার মূলধনের সমপরিমান অর্থ ফেরত পাবেন। আজ যদি একটি ব্যাংকের ঋণের পরিমান কয়েক হাজার কোটি টাকা হয় তারা দেউলিয়া হলে ঋণ দাতারা শুধু ঐ ব্যাংকের মূলধনের সমপরিমান (মাত্র ২৫০ কোটি টাকার মত) সর্বোচ্চ ফেরত পাবেন। অথচ তাদের নিয়মেই ক্ষুদ্র ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠানের মালিক পুরো দায় বহন করবে। তাহলে এই বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো কেন তাদের সমূদয় ঋণ বহন করবে না? আমরা দেখেছি Lehman Brothers দেউলিয়া হবার পর ৪৪ বিলিয়ন ডলার ঋণের বিপরীতে মাত্র ২.৭ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে।
সত্যিকার অর্থে বড় বড় পূঁজিপতিদের রক্ষা করার জন্যই এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের ঋণের টাকায় তারা ব্যবসা করবে অথচ ফেরত দেবার সময় পুরোটা ফেরত দিতে অস্বীকার করবে। এটিই হলো পশ্চিমা অর্থ ব্যবস্থার প্রতারণা।
৪.৪ Currency Standard:
বর্তমান সমস্যার সম্ভবত সবচে বড় কারণ হল বিশ্বব্যাপী ডলার ভিত্তিক মুদ্রা ব্যবস্থা। যার ফলে সারা বিশ্বের মুদ্রাস্ফিতি বেড়ে অসম্ভব হারে। ১৯৭১ সালে নিক্সন যখন স্বর্ণমান মুদ্রা ব্যবস্থা (Gold Standard) বাদ দেয় তখন এক আউন্স স্বর্ণের দাম ছিল ৩৫ ডলার যা বর্তমানে ৯৫০ ডলার।
স্বর্ণমান মুদ্রা ব্যবস্থা ব্যবস্থা বাদ দেবার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক ভাবে ডলারকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালায়। বিভিন্ন দেশ স্বর্ণের পরিবর্তে ডলার রিজার্ভ রেখে তাদের নিজস্ব মুদ্রা প্রচলন শুরু করে। ফলে সারা বিশ্বের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিদ্বারা প্রভাবিত হতে শুরু করে। প্রতিবছর USA এর Federal Reserve System প্রায় ৮ থেকে ১২% হারে ডলার ছাপানো বৃদ্ধি করে। অথচ USA এর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩-৪%। আর তাই বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যায়। তাছাড়া এই ব্যবস্থায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যেহেতু টাকার বিনিময়ে নোট, চেক, ড্রাফট, ইত্যাদি ইস্যু করে টাকার মত প্রচলনযোগ্য মুদ্রা বাজারে ছাড়তে পারে ফলে অর্থনৈতিক সংকট আরো মারাত্মক আকার ধারন করে। অথচ এই সব মুদ্রার বিপরীতে কোন প্রকৃত সম্পদ জমা নেই। আজ যদি সারা বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মার্কিন যুক্টরাষ্ট্রের কাছে ডলার জমা দিয়ে দেয় তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এইসব দেশকে কিছুই ফেরত দিতে পারবে না।
এছাড়া পূঁজিবাদী এই সংকটের কারণগুলোর পেছনে কিছু আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি আছে যা এই ব্যবস্থার পতন নিশ্চিত করছে, সেগুলি হল:
– আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যক্তিকে Economic Unit বা ব্যবসায়ের পণ্য হিসাবে গণ্য করা।
– অর্থনীতির মূল সমস্যা চিহ্নিত করণে ব্যর্থতা।
– Real Economy এর পাশাপাশি কৃতিম Financial Side of the Economy চালু করা।ক. আদর্শিক দৃষ্টি : পূজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিটি ব্যক্তিকে Economic Unit বা অর্থনৈতিক একক হিসাবে বিবেচণা করে। আর তার সমস্ত প্রয়োজনকে ব্যবসায়ের পণ্য মনে করে। মুনাফা তাদের মূল লক্ষ্য। তথাকথিত ব্যবসায়ের সামাজিক দায়বদ্ধতা তাদের মোহনীয় এক বুলিমাত্র। আর মুনাফা অর্জনের উপায় হিসাবে যে কোন প্রথাই সিদ্ধ যা বাজার ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করবে। আর অর্থনীতির basic বইগুলোতে পড়ানো হয় অর্থনীতি নীতিস্বাশ্র নিয়ে আলোচনা করেনা, তা নীতিবিজ্ঞানের কাজ। তাই মানুষের দয়া, মায়া ভালভাসা, মৌলিক চাহিদা যেমন- বাসস্থান এসবই ব্যবসায়ের পণ্য। প্রয়োজন হলে নতুন চাহিদা তৈরী করে ব্যবসা করতে হবে (যেমন- আপনি যে কোন সময় মরতে পারেন, আপনার Family-র কি হবে ইত্যাদি বলে, আপনাকে চিন্তাগ্রস্ত করে বীমা করানো)।
খ. অর্থনীতির মূল সমস্যা চিহ্নিত করণের ব্যার্থতা : পশ্চিমা পুঁজিবাদী সভ্যতা অর্থনীতি সম্পদের সল্পতাকে সবচে বড় সমস্যা মনে করে। তারা মনে করে তাদের প্রভু পৃথিবীতে তাদের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় কম সম্পদ রেখেছেন। আর মানুষদের কে দিয়েছেন অসীম অভাব এবং প্রতিটি অভাবই পূরণ করতে হবে। কারো যদি জুয়া খেলায় তাগিদ হয় তার জন্য Casino পর্যন্ত বানাতে হবে। আর বাজার ব্যবস্থা নির্ধারণ করবে কার প্রয়োজন পূরণ করার জন্য দেশের এই সীমিত সম্পদ ব্যয় করতে হবে। যে ব্যক্তি তার চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দিতে পারবেন তাই পূরণ করা হবে, চাহিদাটি যতই অদ্ভদ হউক না কেন। ধরুণ কেউ উস্কি কাটবে। তার জন্য সে যদি দাম দিতে পারে, তবে বাজার ব্যবস্থায় তাকে তা সরবরাহ নিশ্চিত করবে। মানুষের প্রয়োজনের কোন অগ্রাধিকার নেই। সাধারন মানুষের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এগুলো উৎপাদনের চাইতে যদি ফ্যাশন বা বিনোদনের জন্য সিনেমা তৈরী বেশি বেশি লাভজনক হয় তবে, তাই উৎপাদন করতে হবে। আর যেহেতু Service sector এর ক্ষেত্রে উৎপাদনের খরচ কম ও লাভ বেশি তাই আস্তে আস্তে পূঁজিবাদী অর্থনীতিগুলো Manufacturing থেকে service sector এ transform হতে শুরু করল। বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ৮০% service sector এবং service sector এর ক্ষেত্রে financial service industry হল সবচেয়ে বড়।
গ. Real economy এর পাশাপাশি কৃত্রিম financial side of the economy চালু করা : ১৯৪০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৪৪% লোকের নিজস্ব বাড়ী ছিল, ১৯৬০ সালে তা হয়েছে ৬২% আর বর্তমানে প্রায় ৭০% এর বেশি লোক বাড়ীর মালিক। আর এই বাড়ীর মালিকানা পাবার প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণ নিয়ে। বর্তমানে প্রায় ২০% USA-র লোকের সম্পত্তি হতে দায় বেশি। আর অধিকাংশ দায়ই দীর্ঘমেয়াদী যা পরিশোধ করতে হয়ত অনেকেরই সারা জীবন পেরিয়ে যায়। আমরা যদি বৃটেনের দিকে তাকাই তবে দেখব বৃটেনের GDP হল ২.৭ ট্রিলিয়ন ডলার অথচ বৃটেনের জাতীয় ঋণ (National debt) হল ১১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার, USA এর ক্ষেত্রে GDP ১৩.৮ ট্রিলিয়ন ডলার, National debt ১২.৮ ট্রিলিয়ন, Service based Industry এবং বিলাসজাত পণ্য ও সেবার ব্যবহারের কারণে তাদের এই অবস্থা। সম্পদ বৃদ্ধির জন্য তারা বিভিন্ন ধরণের পুঁজি বাজারের উদ্ভব ঘটালো। অথচ শুধু Real Sector এ আমরা যা সরাসরি ভোগ করতে পারি তা উৎপাদন ও বন্টন হয়, financial sector এ হয় জুয়াখেলা। এটি কখনোই real sector এর মত কোন ভোগ করার কিছু তৈরী করতে পারে না। অথচ পুরো বিশ্বে real sector এর তুলনায় financial sector কয়েকগুণ বড়। বিশ্বব্যাপী বন্ড মার্কেটের সাইজ হল ৪৫ ট্রিলিয়ন, Stock market এর মোট সাইজ হল ৫১ ট্রিলিয়ন এবং এইসব সিকিউরিটিজের উপর নির্ভর করে গঠিত ডেরিভেটিবস বাজারের সাইজ হল ৫০০ ট্রিলিয়ন, যা মার্কিন প্রকৃত অর্থনীতির ৩০ গুন আর বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ১২ গুণ। অর্থাৎ পুরো বিশ্বকে ১২ বার বিক্রয় করা হলেও এই ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়।
৫ম ধাপ : ইসলামি সমাধান
খিলাফতের সমাধান :
বিগত শতাব্দীর মাঝামাঝিতে finance বা অর্থায়নের উদ্ভাবন পশ্চিমা পূঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থার তথাকথিত লালসার অর্থনীতিকে তার অনিবার্য পরিণতির দিকে ধাবিত করেছে। আজ পশ্চিমা পূঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা মৃত্যুশয্যায় শায়িত। আর এই লোভ লালসার অর্থনীতির বিপক্ষে একমাত্র টেকসই সমাধার খিলাফতের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। যখন খিলাফত ব্যবস্থা ফিরে আসেব তখন খিলাফত অর্থনীতিকে ঢেলে সাজাবে শরীয়াভিত্তিক নীতিমালা এবং এ নীতিমালার আঙ্গিকে প্রণীত বিভিন্ন শরীঈ নিয়ম কানুনের মাধ্যমে। আর এই শরীঈ নিয়মকানুনই পরবর্তীতে সমাজের বিভিন্ন অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য পূর্ণাঙ্গ ভিত্তি হিসাবে কাজ করবে। বর্তমান পূঁজিবাদী সমাজের ভয়াবহ অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব, ইসলামী অর্থনীতিতে পূরোপুরি অনুপস্থিত কারণ ইসলাম অর্থনৈতিক সমস্যাকে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করে এবং সমাধাণের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ধর্মী এবং একমাত্র টেকসই ব্যাপকতর ব্যবস্থা প্রণয়ন করে।
মূলনীতিমালা:
পূঁজিবাদ যেখানে অর্থনৈতিক সমস্যার মূল হিসাবে অসীম অভাব এর বিপরীতে সীমিত সম্পদ কে দায়ী করছে এবং উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে মানুষের utility maximization কে ultimate লক্ষ্য হিসাবে নির্ধারণ করছে; ইসলাম তা সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করে। ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূলে রয়েছে তিনটি নীতিমালা- ক. সম্পত্তির মালিকানা, খ. সম্পত্তি ব্যবহার, গ. সম্পত্তির বন্টন ব্যবস্থা।
এই তিনটি মূলনীতির ভিত্তিতে খিলাফত রাষ্ট্র জনগণের মধ্যে অর্থনীতিক লেনদেনের বিভিন্ন নিয়মকানুন নির্ধারণ করে দেয়। নিম্নে আমরা খিলাফতের অর্থব্যবস্থার কিছু উল্লেখযোগ্য নিয়মকানুন আলোচনা করব। এর মাধ্যমে খিলাফত পশ্চিমা অর্থব্যবস্থার মত সমস্যাগ্রস্ততা হতে নিজেকে রক্ষা করবে, উপরন্ত অর্থনেতিক কর্মকান্ডের মাঝে গতির সঞ্চার করবে, জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করবে এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।
প্রথমত : ইসলাম মানুষকে অর্থনৈতিক একক বা ব্যবসায়ের নিষয় মনে করেনা
যেহেতু ইসলাম মানুষকে অর্থনৈতিক একক বা ব্যবসায়ের বিষয় মনে করেনা, তাই ইসলাম মানুষের সকল সমস্যাকে কেন্দ্র করে ব্যবসা করা বা সব কিছু লাভ ক্ষতির দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করা নিষেধ করে। পূঁজিবাদ যেমন মানুষের বাসস্থানের বিষয়কে নিয়ে ব্যবসা করে বর্তমান পরিস্থিতি ডেকে এনেছে, ইসলাম এর পরিবর্তে কিছু বিষয়কে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসাবে সুনির্ধারিত করেছে।
রাসুল (সা) বলেন- “আদম সন্তানের তিনটি অধিকার রয়েছে, বসবাসের জন্য একটি বাড়ী, পরিধানের জন্য এক টুকরা কাপড় এবং আহারের জন্য এক টুকরা রুটি” (তিরমিজী)।
খিলাফত ব্যবস্থার জন্য এটি বাধ্যতামূলক যে, খলীফা দেশের সমস্ত জনগনের জন্য খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করবে। এটি খিলাফতের অর্থনীতির সবচে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তাছাড়া ইসলাম যেহেতু মানুষের জৈবিক চাহিদা ও প্রবৃত্তিকে বিবেচনা করে, তাই ইসলাম এসমস্ত জৈবিক চাহিদা ও প্রবৃত্তি পূরণের বিস্তারিত নীতিমালা প্রণয়ন করে। এরই অংশ হিসেবে ইসলাম মানুষকে সম্পত্তি অর্জনের বৈধ ও অবৈধ উপায় সুনির্ধারিত করে দেয়।
সম্পত্তির অর্জনের বৈধ ও অবৈধ উপায়সমূহ : ইসলাম কাজের মাধ্যমে সম্পত্তি উপার্জনের উপায় নির্ধারণ করে দিয়েছে। এর মাঝে আছে : পতিত জমি চাষাবাদ, ভূ-পৃষ্ঠে ছড়িয়ে থাকা সম্পদ আহরণ, শিকার, দালালী ও কমিশন এজেন্সি, বৈধ ব্যবসা, যৌথ চাষাবাদ (Shared Cropping) ও শ্রমের মাধ্যমে। তাছাড়াও উত্তারাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ, রাষ্ট্র থেকে প্রাপ্ত সম্পদ, বিনা শ্রমে অর্জিত সম্পদ উপার্জণের বৈধ উপায় হিসাবে ঘোষণা দিয়েছে। পশ্চিমা সভ্যতারমত সম্পদের লালসার জন্য যে কোন উপায়ে সম্পদ অর্জন ইসলাম নিষেধ করেছে।
ইসলাম শুধু সম্পত্তি উপার্জনের বৈধ উপায়ই বলে দেয়নি, পাশাপাশি ইসলাম সম্পত্তি অর্জনের অবৈধ উপায়ও বলে দিয়েছে। যেমন- জুয়া খেলা, সুদ, অপরাধ বা প্রতারণার মাধ্যমে সম্পত্তি অর্জন, একচেটিয়া ব্যবসা ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া। এর মাঝে একচেটিয়া ব্যবসা ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া এই দু’টি বিষয় সম্পর্কে সামান্য আলোচনা করা হলো।
– একচেটিয়া ব্যবসা : ইসলাম কোন ব্যাক্তিকে একটি ব্যবসায়ের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনকে সম্পূর্ণ রূপে নিষেধ করেছে। সাদ ইবনে আল-মুসাঈব, মুয়াম্মার ইবনে আবদুল্লাহ আল-আদওয়াই হতে বর্ণনা করেন যে রাসুল (সা) বলেন “অপরাধী ছাড়া আর কেহই বাজারকে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে আনেনা“। (বুখারী)
উল্লেখ্য যে, একচেটিয়া হিসাবে গণ্য হতে হলে শর্ত হল এই যে, ক্রেতারা ঐ প্রয়োজনীয় দ্রব্যটি অতিরিক্ত দামের কারণে ক্রয় করতে পারছেনা। এখন সে এটি নিজে উৎপাদন করুক বা ক্রয় করে জমা করুক। একজন একচেটিয়া ব্যবসায়ী কোন পণ্য জমা করে তার ইচ্ছামাফিক পণ্যের দাম চার্জ করে এবং ক্রেতাকে বাধ্য করে ঐ দামে পণ্যটি ক্রয় করার কারণ ঐপণ্যটি অন্য কোথায়ও পওয়া যাবেনা। মাকাল ইবনে ইয়াছার হইতে বর্ণিত রাসুল (স) বলেন, যে ব্যক্তি মুসলামনদের কাছ থেকে ছড়ামূল্য আদায় করে আর এর ফলে তার সম্পত্তির পরিমান বেড়ে যায়, আল্লাহ তাকে বিচারের দিন জাহান্নামে ছুঁড়ে ফেলাকে সুনির্ধারিত করে রাখেন।
– মূল্য নির্ধারন : আবু সাঈদ হতে বর্ণিত রাসুল (সা) বলেন লেনদেন হবে ক্রেতা বিক্রেতার সম্মতিতে (ইবনে মাজা) আর তাই ইসলাম ক্রয় বিক্রয়ের ক্ষেত্রে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ হারাম করেছেন। আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত “রাসুল (সা) এর সময় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়, সুতরাং সাহাবীরা মূল্য নির্ধারণের জন্য বললেন। রাসুল (সা) বলেন: নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিকর্তা, তিনি রিজিক দাতা আর তিনিই মূল্য নির্ধারক। তিনি আরো বললেন, আমি আশা করি, আমি আল্লাহ (সুত্তার) সম্মুখে দাড়াই এমতাবস্থায় যে, কেউই আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করবেন না, যে আমি তাদের প্রতি অন্যায় করেছি না রক্তের বিষয়ে না সম্পত্তির বিষয়ে (ইমাম আহমদ)। এমনকি দুর্ভিক্ষের বছরও ওমর ইবনুল খাত্তাব হিজাজে মূল্য নির্ধারণ করেনি বরং মিশর ও সিরিয়া হতে পণ্য দ্রব্য হিজাজে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত : ইসলাম কাগজী মুদ্রা ব্যবস্থার পরিবর্তে দ্বি-ধাতু মুদ্রা ব্যবস্থা প্রচলন করে
ইসলামি খিলাফতের অর্থব্যবস্থা অর্থ প্রচলন করবে স্বর্ণ ও রোপ্য এই দ্বি-ধাতুকে বাইতুল মালে জমা রাখার মাধ্যমে। ইসলাম অর্থের একক হিসাবে স্বর্ণ ও রোপ্যকেই শুধু গ্রহণ করবে এবং বর্তমান কাগুজে মুদ্রা ডলারকে ভিত্তি করে অর্থ প্রচলণ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করবে।
কারণ রাসুল (সা) যখন যাকাত সংগ্রহ করতেন বা কোন ট্যাক্স ধার্য্যকরতেন এবং কারোর উপর জরিমানা আরোপ করতেন, এসবই তিনি পরিমাপ করতেন স্বর্ণ ও রোপ্যের ভিত্তিতে। যার ফলে খিলাফত ইচ্ছামত কাগজ ছাপিয়ে দেশে মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি করবেনা বা করতে পারবেনা। কারণ যে কোন পরিমান মুদ্রা প্রচলন এর বিপরীতে বাইতুল মালকে স্বর্ণ বা রোপ্য জমা রাখতে হবে এবং জনগণ যদি চায় যে কোন সময় কাগুজে মুদ্রা জমা দিয়ে স্বর্ণ বা রৌপ্য উত্তোলণ করে নিতে পারবে। অর্থাৎ খিলাফত ব্যবস্থায় যে কোন পরিমান অর্থ সরবরাহ কোন প্রকৃত সম্পত্তির বিপরীত হতে হবে। বর্তমানে আমেরিকা যে ডলার ছাঁপছে তার বিপরীতে কোন প্রকৃত সম্পত্তিই জামানত নেই, এটি শুধুই ফাঁকা। জনগণের হাতে যে ডলার আছে, তা যদি তারা জমা দিতে চায় এই পূঁজিবাদী মার্কিন সরকার এর বিপরীতে কোন প্রকৃত সম্পত্তিই ফেরত দিতে পারবেনা।
তৃতীয়ত : ইসলামে কোম্পানী গঠন প্রক্রিয়া পূঁজিবাদী প্রক্রিয়া হতে সম্পুর্ণ ভিন্ন
ইসলাম বর্তমান পূঁজিবাদী কোম্পানী ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। রাসুল (সা) বলেন, যে ব্যক্তি কারো থেকে ঋণ গ্রহণ করে এই উদ্দেশ্যে যে, সে তার সম্পূর্ণরূপে ফিরিয়ে দিবেনা সে যেন জাহান্নামে তার জন্য স্থান নির্ধারণ করে নেয়।”
ইসলাম তাই বর্তমান পূঁজিবাদী কোম্পানী গঠন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ ঘোষণা করবে। ইসলামে কোম্পানী ব্যবস্থা হল একটি চুক্তির ভিত্তিক বিষয় এবং এই চুক্তির জন্য আইনসিদ্ধ প্রস্তাব ও স্বীকৃতি থাকতে হবে। আর এই প্রস্তাব ও স্বীকৃতির ভিত্তি হবে হবে কোন সম্পদ বা এমন কিছু যা ব্যবহার করা যায়। তাছাড়াও তারা কি বিষয়ের ব্যবসা করবেন, কিভাবে লাভ-ক্ষতি বন্টন হবে এসব পূর্ণাঙ্গ লিপিবদ্ধ থাকবে। ইসলামে ৫ ধরণের কোম্পানী রয়েছে- যেমন : আল ইনাম (company of Equals), আল-আবদান (Company of Bodies), মুদারাবা (Company of body & capital), সুনামের ভিত্তিতে ব্যবসা (Company of Reputations) এবং মুফাওয়াদা।
আর তাই ইসলাম এ ধরণের কোম্পানী গঠণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পূঁজিবাতিদের স্বার্থ সংরক্ষণ করার পরিবর্তে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে। এই ধরণের ব্যবসা সরাসরি প্রকৃত অর্থনীতির সাথে জড়িত বলে বর্তমান পূঁজিবাদী লিমিটেড কোম্পানীর জুড়ার আসর শেয়ার বাজার বা বন্ড বাজার এর প্রয়োজনীয়তাকে খিলাফত পূরোপূরো বিলুপ্ত করবে। তাছাড়া এই সব ব্যবসার মাধ্যমে কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয় বরং কোন ব্যাক্তি যিনি প্রতিষ্ঠানের মালিক সে (তারা) সরাসরি নিজের দায়ে পুরোপুরি পরিশোধের অঙ্গীকারসহ গ্রহণ করবে।
চতুর্থ : খিলাফত বর্তমান অর্থনীতির Financial Sector কে পুরোপুরি বিলুপ্ত করবে এবং অর্থনীতি হবে শুধু financial sector এর ভিত্তিতে
যখন খিলাফত আসবে তখন বর্তমান financial sector কে পুরোপুরি বিলুপ্ত করা হবে। কারণ financial sector এর মাধ্যমে কোন সত্যিকার উৎপাদণ হয় না। যমুনা ওয়েল কোম্পানীর একটি শেয়ার ১০ টাকায় ইস্যু করলেও শেয়ার বাজারে প্রথম দিন এই শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে ৭৮০ টাকায়। সত্যিকার অর্থে একদিনে প্রায় ৭৮ গুণ দাম বৃদ্ধি প্রকৃত অর্থনীতিতে কোন উৎপাদন বাড়ায়নি। বর্তমানে ব্যাংক ও শেয়ার বাজার ব্যবস্থার কারণে মানুষ শেয়ার অবস্থা ভালো থাকলে ব্যাংক হতে টাকা তুলে শেয়ার বাজারে অর্থ বিনিয়োগ করে আর শেয়ার বাজারের অবস্থা খারাপ থাকলে শেয়ার বিক্রি করে ব্যাংকে টাকা জমা রাখে। ফলে প্রকৃত কোন উৎপাদন হয় না। তাছাড়া বিভিন্ন ধরণের মুনাফা লোভী কৌশল যেমন : ধারের ক্রয়, ডেরিভেটিবিস এর মাধ্যমে অর্জিত মুনাফার পেছনে কোন প্রকার প্রকৃত উৎপাদন নাই। পুরোটাই লালসার জুড়াবাজি।
তাছাড়া এই financial sector এর সমস্ত প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা, হেজফান্ড, লিজিং ফার্ম, বিনিয়োগ ব্যাংক, সিকিউরিটি হাউস, পেনশন ফান্ড কোম্পানী, মিউচুয়্যাল ফান্ড প্রতিষ্ঠান এরা সবাই সুদের বিনিময়ে জনগণের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়। আর তারা ঋণ বিক্রি করে অধিক মুনাফা ভোগ করে এবং উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। যার জন্য সাধারণ মানুষকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়। খিলাফত আসলে জনগণ বাইতুল মালে তাদের অর্থ জমাকরতে পারবে। কিন্তু এর জন্য সুদ দেয়াতো দুরে থাক বরং তাদের কাছ থেকে একটি নির্দিষ্ট হারে চার্জ রাখা হবে। ফলে ১০০ টাকা জমা রাখলে আগামী বছর এটি হবে ধরুণ ৯৫ টাকা। আর তাই খিলাফতের অর্থনীতিতে জনগণের যেহেতু বাইতুলমালে জমা রাখার জন্য কোন প্রকার সুবিধা পাচ্ছে না। ফলে অতিরিক্ত অর্থের ব্যবহার তিনটি : ক. বেশি বেশি করে পণ্য দ্রব্য ক্রয় বা (consumption) বাড়ানো, খ. এই অর্থ real economy তে বিনিয়োগ করে ব্যবসা শুরু করা। যেমনঃ আল-ইনাম, আল-আবদান, মুদারাবা, ওযুহ বা মুফাওয়াদার মত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তৈরী করা এবং গ. অথবা অন্যকে ব্যবসা করার জন্য ঋণ দেয়া। ফলে অর্থনীতিতে প্রচুর পরিমান উদ্যোক্ত তৈরী হবে এবং প্রকৃত উপাদন, বেড়ে যাবে।
অন্যদিকে খলীফা যেহেতু জনগণকে তার জীবিকা নির্বাহের জন্য নুন্যতম ব্যবস্থা করতে বাধ্য, তাই জনগণ তার মৌলিক অধিকার পূরণের জন্য কোন প্রকার ঋণ গ্রহণের প্রয়োজন পড়বেনা। শেয়ার বাজার না থাকার কারণে ব্যবসায়ের জন্য অর্থ প্রয়োজন পড়লে তা নতুন অংশীদার এনে অর্থায়ন করতে পারবে। তাছাড়া বাইতুল মালের ফান্ড হতেও ব্যবসায়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ঋণ গ্রহণ করা যাবে। আর এসব ঋণ গ্রহণের সময় সুদ থাকবেনা বলে, উৎপাদণ খরচ অনেক কমে যাবে।
এরই সাথে সাথে খিলাফত ব্যবস্থায় যেহেতু বর্তমান ব্যবস্থার মত বিভিন্ন প্রকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কর থাকছেনা এর ফলে কোন ব্যাক্তি বা উপার্জন করবে তাইযে ব্যবহার, বিনিয়োগ বা ভোগ করতে পারে। পশ্চিমা দেশে, VAT, Federal tax, state tax, municipal tax এর সাথে সাথে বিভিন্ন ধরণের income tax দেবার ফলে একজন ব্যাক্তি ১০০ টাকা উপার্জন করলে প্রায় ৪০-৫০ টাকা এসব খাতে চলে যায় এবং তার কাছে বাকী থাকে মাত্র ৫৫-৬০ টাকা। ফলে পশ্চিমা অর্থনীতিতে একজন ব্যাক্তি যা উপার্জন করছে তার পুরোটাই অর্থনীতিতে ব্যবহার করা যাচ্ছেনা। সে সমস্যা খিলাফত ব্যবস্থায় থাকছে না।
তাছাড়া পশ্চিমা বিশ্বে একজন ব্যাক্তি যেহেতু তার সমস্ত প্রকার অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে বিনিয়োগ, সঞ্চয় এবং ভোগ সুদ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, ফলে তাদের জীবন যাত্রার ব্যায় অসম্ভব হারে বেড়ে যায়। আর তাই আগামী খিলাফাত একদিকে সুদ ভিত্তিক ব্যাংক ব্যবস্থা বন্ধ করে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অন্যদিকে মানুষের উপর বিভিন্ন নামে ট্যাক্স চার্জ না করে জনগণের consumptions এর সামর্থ্যকে বাড়াবে। ফলে খিলাফত অর্থনীতি হবে একমাত্র অর্থনীতি যা বিনিয়োগ উৎসায়িত করবে, উৎপাদন বাড়াবে, প্রচুর উদ্যোক্তা তৈরী করবে, কর্মসংস্থান বাড়াবে এবং সর্বোপুরি ভোগ (consumption) বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিকে সচল রাখবে। আর এটিই হবে একমাত্র টেকসই ও সুপারপাওয়ার অর্থনীতি।
৬ষ্ঠ ধাপ : বর্তমান সংকটে আমাদের ভূমিকা- (আবার আসবে খিলাফত)
বিশ্বব্যাপী পূঁজিবাদী অর্থনীতির দেউলিয়াত্ব এর আদর্শিক দেউলিয়াত্বকে স্পষ্ট ভাবে প্রমাণ করেছে, BBC-তে Washington Post এর Economic Editor-কে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছে Is the American Capitalism Dead? সে উত্তরে বলেছে, not really just tell me, what is the alternative we have? ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট সারকোজি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের রাষ্ট্রপ্রধানদের পূঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থাকে পাল্টাতে বলেছেন। বুশ ও ব্রাউনের শতশত বিলিয়ন ডলার উদ্ধার তৎপরতার পর, পূঁজি বাজার অব্যাহত পতন পশ্চিমা বিশ্বের সকল মানুষকে আক্রান্ত করেছে। রাশিয়ার একদিনে ৭০,০০০ শ্রমিক ছাঁটাই, শতশত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন, ইউরোপের ১২% এর মত বেকারত্বের হার, ১ বছরে মার্কিন অর্থনীতির একতৃতীয়াংশ পতন তাদের অবদা স্বাধীন অর্থব্যবস্থার প্রবর্তকদের বিশ্বাসকে নষ্ট করে দিয়েছে।
পূঁজিবাদীরা তাদের অর্থ ব্যবস্থা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছে। আর যে সভ্যতা তাদের বিশ্বাসের ব্যাপারে সন্দিহান তারা অবশ্যই অধঃপতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। পশ্চিমারা তাদের মুক্তবাজার অর্থনীতির উচিত জবাব পাচ্ছে।
আর তাই আমাদের উচিত বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে সুদ বিহীন, স্বর্ণমান মুদ্রা ব্যবস্থার পক্ষে জনমত তৈরী করা। জনমত তৈরী করা সেই অর্থব্যবস্থার পক্ষে যে অর্থ ব্যবস্থা ১৩০০ বছরের অধিকাল কোন উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সংকট ব্যাতিত বিশ্ব অর্থনীতেকে রাজত্ব করেছে। আজ সারা বিশ্বের মানুষ তাকিয়ে আছে। আমরা যারা খিলাফত পুনঃ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আন্দোলনরত, তাদের জন্য সময় এসেছে বিশ্বের তাকিয়ে থাকা মানুষের কাছে পশ্চিমা অর্থব্যবস্থার ভন্ডামী ও লালসার আগ্রাসণকে উন্মোচন করা। যাতে মানুষ পশ্চিমাজীবন ব্যবস্থাকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে এবং খিলাফত ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করে। খিলাফত ফিরিয়ে আনার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে কবুল করুন। আমিন।
“নিশ্চয়ই আল্লাহ্র পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, সমস্ত বিষয়ের উপর, যদিও বেশির ভাগ মানুষই এ বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ।” [সুরা ইউসুফ : ২১]
প্রথম ড্রাফট
মোঃ আল মামুন।
৩০ শাওয়াল, ১৪২৯
৩১ অক্টোবর, ২০০৮ইংইসলামের জন্য রাজনৈতিক সংগ্রাম
১. সূচনা
খিলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমাদেরকে অবশ্যই রাজনৈতিক সংগ্রাম (Political Struggle) করতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যায়ের (Cultural stage) কাজের স্বাভাবিক এবং অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হচ্ছে রাজনৈতিক সংগ্রামের পর্যায়। যেহেতু বাংলাদেশে আমাদের এই সংগ্রামের পর্ব শুরু হয়েছে, তাই আমাদেরকে এই বিষয় সম্পর্কে সুগভীর ধারণা থাকা প্রয়োজন। এই নিবন্ধ রাজনৈতিক সংগ্রাম সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা দিবে এবং পরবর্তীতে আমরা ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক সংগ্রামের অন্যান্য দিক নিয়ে আরো আলোচনা করবো। সবার সুবিধার্থে আমার আলোচনাকে আমি চারটি ভাগে ভাগ করেছি:
১. রাজনৈতিক সংগ্রাম কি? (Definition of Political Struggle)
২. রাজনৈতিক সংগ্রামের বিভিন্ন দিক (Aspects of Political Struggle)
৩. ইসলামে রাজনৈতিক সংগ্রাম (Political Struggle in Islam)৪. রাজনৈতিক সংগ্রামে অংশগ্রহণকারীদের বৈশিষ্ট্য (Characteristics of Those who Struggle for Islam)
২. রাজনৈতিক সংগ্রাম কী?
রাজনৈতিক সংগ্রামের মানে হচ্ছে শাসক বা যাদের হাতে ক্ষমতা আছে, তাদের বিরোধিতা করা তথা সরকারের সাথে বিরোধে লিপ্ত হওয়া। পরিপূর্ণ বা আংশিক পরির্বতনের লক্ষ্যে সরকারের বিরুদ্ধে রক্তপাতহীন বিরোধিতার নামই রাজনৈতিক সংগ্রাম। এই সংগ্রাম প্রাণঘাতী বা সশস্ত্র সংগ্রাম ব্যতীত বিভিন্ন কর্মকান্ড বা কথার মাধ্যমে পরিচলনা করা হয়। একটি দেশের নাগরিকদের একটি অংশ সরকারের বিরুদ্ধে এই সংগ্রাম পরিচালনা করে থাকে।
মানব সভ্যতা যত পুরনো, রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসও তত পুরনো। মানুষ যখনই সমাজবদ্ধ বা গোত্রবদ্ধ বা একটি দেশের মধ্যে বসবাস করা শুরু করেছে, তখন থেকেই রাজনৈতিক সংগ্রামের উৎপত্তি। পরিপূর্ণ বা আংশিক পরিবর্তন কামনাকারী মানুষ একটি সমাজে সব সময়ই থাকে। সমাজের একটি অংশ হয়তো পুরনো রীতিনীতি বা সামাজিক প্রথার মুলোৎপাটন চায়। অন্যরা হয়তো অবিচার, জুলুম ও নিপীড়নের অবসান চায়। আরও কোন গোষ্ঠী হয়তো ক্ষমতায় আরোহণ করতে চায়। এদের মধ্যে কেউ হয়তো সশস্ত্র পন্থার আশ্রয় নেয়, কেউ হয়তো অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগে বিশ্বাস করে। আবার কেউ হয়তো রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করে।
যেকোন রাজনৈতিক সংগ্রামের দুটি পক্ষ থাকে। একটি পক্ষে থাকে বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রধান তথা সরকার, যার হাতে থাকে ক্ষমতা, সশস্ত্র বাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় সকল যন্ত্র, যারা রাষ্ট্রীয় নীতি ও অবকাঠামোর রক্ষায় সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। আর অন্য পক্ষে থাকে নবীন ও দুর্বলেরা, যারা সরকার বিরোধী পক্ষ। এরা জনগণকে সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কাজ করে। এই পক্ষ একটি আদর্শের ভিত্তিতে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত করার মাধ্যমে একটি কাংখিত পরিবর্তেনের স্বপ্ন দেখে।
৩. রাজনৈতিক সংগ্রামের বিভিন্ন দিক
রাজনৈতিক সংগ্রাম পরিচালনা করার তিনটি দিক রয়েছে:-
১. রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করা
২. সরকার বিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করা
৩. গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্যে তথা সরকারের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ করা
৩.১ রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করারাজনৈতিক সংগ্রামের প্রথম ধাপ হচ্ছে রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করা। রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করার মাধ্যমেই ‘খিলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন’ রাজনীতির ময়দানে নিজের জন্য অবস্থান তৈরী করে নেয় এবং ধীরে ধীরে একটি দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠে। ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী সব সময় রাজনৈতিক ক্রিয়া কর্মকে তার ক্ষমতার জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখে। লেখক, কলামিস্ট ও বু্দ্ধিজীবিদের লেখালেখি ও সমালোচনায় একটি সরকার তেমন উদ্বিগ্ন হয়না।
রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করতে হলে রাজনীতির অবস্থা সম্পর্কে সার্বক্ষণিক সচেতনতা থাকতে হবে এবং রাজনীতির ময়দানের আলোচিত ইস্যু সম্পর্কে অত্যন্ত সজাগ থাকতে হবে। একটি দেশে প্রতিদিন অসংখ্য ঘটনা ঘটে এবং অসংখ্য ইস্যু জন্ম নেয়। এইসব ঘটনা আর ইস্যুই একজন রাজনীতিবিদের লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার। তাই রাজনীতিবিদকে সার্বক্ষনিকভাবে নিচের কাজগুলো করতে হয়-
১. নিরবিচ্ছিন্নভাবে ঘটনা প্রবাহ পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করতে হবে।
২. গভীর রাজনৈতিক চিন্তা চেতনার অধিকারী হতে হয়, যাতে রাজনৈতিক সংগ্রামের উপযোগী ইস্যু নির্বাচন করা যায় অথবা সংগ্রামের জন্য ইস্যু তৈরী করা যায়।নিয়মিত ঘটনা প্রবাহ পর্যালোচনায় ব্যর্থ হলে সঠিক ইস্যু নির্ধারণে আমরা ব্যর্থ হবো। এর ফলে অনেক সুযোগ হাতছাড়া হবে এবং আন্দোলনের অগ্রগতি শ্লথ হয়ে পড়বে। আন্দোলন যদি বারে বারে সঠিক ইস্যু নির্ধারণে ব্যর্থ হয়, তবে সে তার উদ্দেশ্য হাসিলেও ব্যর্থ হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে রাজনীতির ময়দানে বিদ্যমান ইস্যুর প্রতিক্রিয়ায় রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করা একজন রাজনীতিবিদদের আসল কাজ নয়। বরং প্রকৃত রাজনীতিবিদ রাজনীতির মাঠে নতুন ইস্যু তৈরী করে এবং ইস্যুকে সংগ্রামের জন্য উপযোগী করে দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করে। ইস্যু নির্ধারণের পর রাজনীতিবিদের কাজ দু’টি:
১. ইস্যু সম্পর্কে নিজস্ব আঙ্গিকে বক্তব্য তুলে ধরা
২. ক্ষমতাসীন সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে রাজনৈতিক কর্মসূচী প্রদানের মাধ্যমে সরকার বিরোধী আন্দোলন করা। সরকারকে চ্যালেঞ্জ করা যায় দু’ভাবে – প্রত্যক্ষভাবে (direct) অথবা পরোক্ষভাবে (indirect).
পরোক্ষ আন্দোলন হচ্ছে সরকারের সহযোগী শক্তি বা শাসক গোষ্ঠীর একাংশের বিরুদ্ধে পরিচালিত আন্দোলন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় (কয়েক বছর আগে ইসলামবিরোধী কার্টুন ছাপার প্রতিবাদে) প্রথম আলো বিরোধী আন্দোলনে সকল কর্মসূচী শুধুমাত্র পত্রিকাটিকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছিল। এটি সরকারের বিরুদ্ধে একটি পরোক্ষ আন্দোলন। এটা প্রত্যক্ষ আন্দোলন হতো যদি দাবি আদায়ের জন্য মনোযোগ সরকারের প্রতি নিবদ্ধ করা হতো।
আমাদের সবারই জন্য খুবই জরুরী বিষয় হচ্ছে রাজনৈতিক কর্মকান্ড (Political Action) আর কর্মপদ্ধতির (Method) মধ্যে পার্থক্য অনুধাবন করা। কর্মপদ্ধতি একটি স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় বাধ্যতামূলক (ফরজ) দায়িত্ব। কর্মপদ্ধতি সুনিদিষ্ট কিছু স্তরে বিন্যস্ত। কর্মপদ্ধতির প্রতিটি পর্যায় বা স্তরের নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারিত আছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক কর্মকান্ড কিছু রাজনৈতিক কর্মসূচীর সমন্বিত রূপ। এর উদ্দেশ্য সরকারকে চ্যলেঞ্জ করা এবং জবাবদিহি করতে বাধ্য করা। রাজনৈতিক কর্মকান্ড বাস্তবতার নিরীখে পরিবর্তনীয়। তাই সুনির্দিষ্ট বাস্তবতার দিকে গভীর মনোনিবেশ করে তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন হয়। উক্ত বাস্তবতার ঘটনা পরম্পরা ও কার্যকারণ পর্যালোচনায় কোন যৌক্তিক অনুমান, তুলনা বা সাধারনিকীরণের (সাধারণশ্রেণী ভুক্তিকরণ) আশ্রয় নেয়া যাবে না। অর্থাৎ রাজনৈতিক ঘটনা বিশ্লেষনের ক্ষেত্রে শুধু অতীত ধারণা, বা যৌক্তিক অনুমানের উপর নির্ভর করা যাবে না। এছাড়া রাজনৈতিক ইস্যুকে গড়পড়তা (Generalization) হিসাবের মধ্যেও ফেলা যাবে না। প্রত্যেকটি ঘটনা সুনির্দিষ্ট এবং এদের আঙ্গিকগুলোও ভিন্ন ভিন্ন। সব কিছুকে বর্তমান বাস্তবতার নিরীখে পর্যালোচনা করেই কর্মসূচী নির্ধারণ করতে হবে এবং ময়দানে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
৩.২ সরকার বিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করা
জনগণের মধ্যে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা করা একান্ত জরুরী। সব রাজনৈতিক কর্মসূচী সরকার বিরোধী আন্দোলনে রূপ লাভ করবে না। আন্দোলন রাজনীতির ময়দানে যত বেশী গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টরে পরিণত হবে, তত বেশী এর কর্মসূচীকে সরকার হুমকি হিসেবে গণ্য করবে। এর ফলে স্বাভাবিক ভাবে খিলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও সরকার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়বে। একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সরকার জনবিচ্ছিন্ন থাকে, যার ফলে সামান্য সমালোচনাও সরকার হুমকি হিসেবে গণ্য করে। এর বিপরীতে উম্মুক্ত সমাজে (যেমন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায়) সরকারের কিছুটা জনসমর্থন বা গণভিত্তি থাকে। এ ধরণের সমাজে সরকারকে নানা জন নানা ভাবে সমালোচনা ও সমর্থন করে থাকে। তাই সরকারের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়ার মতো অবস্থান তৈরী করতে আন্দোলনমুখী দলটিকে অনেক বেশী পরিশ্রম করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে অধিক সংখ্যক জনগণের কাছে পৌছে অধিকতর জনসমর্থন এবং ব্যাপক ও গভীরতর গণভিত্তি তৈরীর প্রয়োজন হয়। এভাবে সরকারের মনোযোগ আকর্ষণ বা উদ্বিগ্ন করার মাধ্যমে আন্দোলনটিকে সরকারের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরতে হয়।
সমাজ পরিবর্তনের জন্য খিলাফত প্রতিষ্ঠাকামী দলটিকে বারে বারে তীব্র ভাবে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে – তা উম্মুক্ত বা অবরুদ্ধ সমাজ, যাই হোক না কেন। সরকার বিরোধী আন্দোলনের স্বরূপ অবশ্যই তীব্র ও প্রায় যুদ্ধংদেহী (Fierce and Combative in Style) হতে হবে। এই আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পাঁজর ক্ষতবিক্ষত হবে, সরকারের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ভক্তি ধুলোর সাথে মিশে যাবে এবং গণমানুষ এমনভাবে জাগ্রত হবে যেন দিনের পর দিন বিক্ষুদ্ধ মানুষের হাত ও আঙ্গুলের সংখ্যা বাড়তে থাকবে, যারা সরকারের গলা টিপে ধরবে এবং সরকারকে চিরতরে ধরাশয়ী করবে। এই সংগ্রামে অংশগ্রহণকারীকে অবশ্যই সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষুধা, ভয়ভীতি, জেল-জুলুম, অত্যাচার নির্যাতনের জন্য এবং নিজের সময়, শ্রম, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করার জন্য সার্বিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। রাজনৈতিক সংগ্রামে দলের গভীর আন্তরিকতা, স্থির সংকল্প ও অবিরাম প্রচেষ্টার ফলে জনগণ খিলাফত প্রতিষ্ঠার দলটিকে নিজের পক্ষের শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করবে এবং তা জনগণের হৃদয় জয় করতে সমর্থ হবে।
সরকার বিরোধী আন্দোলনে দু’ধরণের কর্মসূচী গ্রহণ করা প্রয়োজন-
১. জনগণের স্বার্থ রক্ষার কর্মসূচী
২. সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম৩.২.১ জনগণের স্বার্থ রক্ষার কর্মসূচী
জনগণের স্বার্থ রক্ষা করার মানে হচ্ছে সরকারের প্রজা প্রতিপালনকে চ্যালেঞ্জ করা এবং এই বিষয়ে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে কর্মসূচী দেয়া। যখনই সরকার জনগণকে অধিকার বঞ্চিত করবে অথবা সরকার জনগণের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালনে অবহেলা করবে অথবা কোন জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে উদাসীন থাকবে, তখনই সরকারকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে এবং সরকারের গণবিরোধী চেহারা জনগণের সামনে উম্মোচিত করতে হবে। জনস্বার্থের বিষয়টি দু’রকম হতে পারে-
১. স্বল্প মেয়াদী সুযোগ সুবিধা বিষয়ক স্বার্থ (যেমন – দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি)
২. স্বল্প মেয়াদী রাজনীতি বিষয়ক স্বার্থ (যেমন- ড. ইউনুসের রাজনীতিতে নামার প্রচেষ্টা)স্বল্প মেয়াদী জনগণের সুযোগ সুবিধা বিষয়ক স্বার্থ লংঘিত ও অবহেলিত হলে বাস্তবতার বর্ণনা করে যে ধরণের কর্মসূচী গ্রহণ করা যায় তাহলো-
– জুলুমের বিষয়টি জনসমক্ষে তুলে ধরা এবং শরীয়াহ্ হুকুমের বর্ণনা না দিয়ে জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা অথবা
– বিদ্যমান সমাধানের মন্দ দিক তুলে ধরা, জনগণকে ক্ষেপিয়ে তোলা এবং শরীয়াহ হুকুম ব্যাখ্যা করে সমাধানের পথ বাতলে দেয়া।আর স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক স্বার্থের ক্ষেত্রে যে ধরণের কর্মসূচী গ্রহণ করা যায় তা হলো-
– চলমান বা প্রস্তাবিত সরকার গঠন পদ্ধতিকে সমালোচনার ইস্যু বানানো
– সংসদের কার্যকরিতাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা
– সরকারের উপর পুঁজিবাদী ব্যবসায়ী কোম্পানীর প্রভাবকে জনসমক্ষে তুলে ধরা
– দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশী দূতাবাসসমূহের হস্তক্ষেপের বিষয়টি জনগণকে জানানো ইত্যাদি।৩.২.২ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম
রাজনৈতিক সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে স্বতন্ত্রভাবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে এই সাম্রাজ্যবাদীরাই জনগণের আসল শত্রু।
সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার অর্থ হচ্ছে তাদের আগ্রাসণের প্রতিবাদ করা, বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করা, তাদের ষড়যন্ত্র ও কূটচালের স্বরূপ জনগণের সামনে তুলে ধরা যাতে করে উম্মাহ্কে সাম্রাজ্যবাদীদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা যায় এবং দেশে তাদের প্রভাবের মুলোৎপাটন করা যায়। এই সংগ্রামের জন্য আমাদেরকে নিম্নলিখিত বিষয়ের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
– সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের সকল দালালদের গতিবিধির দিকে খেয়াল রাখতে হবে এবং বিশ্লেষণ করতে হবে।
– তাদের দালালদের মুখোশ উম্মোচিত করতে হবে।
– তাদের তৎপরতা ও ষড়যন্ত্র আগে থেকেই বিশ্লেষণ ও অনুমান করে তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।
– তাদেরকে রাজনৈতিক ভাবে প্রতিহত করতে হবে।
– তাদের সকল অর্থনৈতিক প্রযুক্তিগত বা সামরিক অনুদান বর্জন করতে হবে।
– তাদের অনুগত সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে দেশ থেকে বিতাড়িত করতে হবে। ইত্যাদি।৩.৩ গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্যে তথা সরকারের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ করা
সরকার বিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করার উদ্দেশ্য হচ্ছে শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করা। আর জনগণকে সংগঠিত করে গণআন্দোলন পরিচালনা করার মাধ্যমেই এই উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভব। শাসকগোষ্ঠীর শক্তি বা সমর্থনের ভিত্তি হয় স্বাভাবিক সমর্থন (Natural support) বা অস্বাভাবিক সমর্থন (Unnatural support)।
স্বাভাবিক সমর্থন হচ্ছে জনগণের সমর্থন আর অস্বাভাবিক সমর্থন হচ্ছে বিদেশী শক্তির সমর্থন। এছাড়াও একজন শাসকের শাসনকার্জে সহায়তা করার জন্য থাকে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী। যদি শাসকের ক্ষমতার ভিত্তি হয় জনগণের সমর্থন, তবে আমাদের কাজ হবে শাসককে গণবিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে ক্ষমতার ভিত্তির সাথে শাসকের সম্পর্ক কেটে ফেলা। আর শাসক অস্বাভাবিক সমর্থন তথা বিদেশী শক্তির সমর্থনে ক্ষমতায় থাকলে জনগণই শাসকের বিরুদ্ধে সর্বোৎকৃষ্ট হাতিয়ার। এছাড়া সরকার যেসব উপায়কে অবলম্বন করে ক্ষমতায় টিকে থাকে সেগুলোকে দূর্বল করে ফেলার জন্যও জনগণের সহায়তা একান্ত প্রয়োজন। সুতরাং সরকার বিরোধী আন্দোলন পরিচালনার অর্থ হচ্ছে একটি গণআন্দোলন পরিচালনা করা। এক্ষেত্রে খিলাফত প্রতিষ্ঠাকামী দলটির কাজ হচ্ছে দলের সাথে সরকারের বিরোধিতাকে জনগণের সাথে সরকার বিরোধিতায় পরিণত করা।
গণআন্দোলনের অর্থ হচ্ছে জনগণকে সংগঠিত করে রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রদান করা। জনগণকে শাসকদের ক্ষতিকর কার্যকলাপ সম্পর্কে সতর্ক করা, শাসকের অপকর্মের বিরুদ্ধে জনগণকে বিক্ষুদ্ধ করে তোলা এবং শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য কর্মসূচী প্রদান ইত্যাদির মাধ্যমে দলটি জনগণের নেতৃত্বের আসন অর্জন করবে। গণআন্দোলন তৈরীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু হাতিয়ার হচ্ছে –
১. হালাকার (পাঠচক্র) মাধ্যমে জনগণকে রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা। এছাড়াও বিভিন্ন পদ্ধতিতে ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক দীক্ষা দিতে হবে।
২. উম্মুক্ত জায়গায় সরাসরি, পরিস্কার ভাষায়, খোলামেলাভাবে ও সাহসিকতার সাথে জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে হবে। একজনের সাথে হলেও এভাবেই কথা বলতে হবে এবং একাজ কোন গোপন স্থানে করলে হবে না।
৩. জনগণের সাথে গভীর সম্পর্ক থাকতে হবে এবং মানুষের সাথে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সম্পর্ক থাকতে হবে। লিফলেট, পোষ্টার ইত্যাদির চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কের গুরুত্ব বেশী। খিলাফত প্রতিষ্ঠা আন্দোলন-এর সকল সদস্য ও কর্মীকে জনগণের সাথে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সার্বক্ষণিক সম্পর্ক স্থাপন ও তা বজায় রাখতে হবে। মসজিদ, দোকানপাট, চায়ের ষ্টল এবং জনসমাগম হয় এরকম যেকোন স্থানই জনগণের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের উপযুক্ত স্থান।গণআন্দোলন পরিচালনা করার আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যা স্বতন্ত্রভাবে প্রণিধানযোগ্য তা হলো জনগণকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের (Strong Personality) প্রয়োজনীয়তা। গণআন্দোলনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে শাসকের বিরুদ্ধে জনগণ রাজনৈতিক কর্মসূচীতে অংশ নিবে। জনগণ শুধু উন্নততর চিন্তার ভিত্তিতে রাজনৈতিক কর্মসূচীতে অংশ নেয় না। জনগণকে নেতৃত্ব দিতে হলে বলিষ্ঠ ও শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রয়োজন। সুতরাং দলের সদস্য ও কর্মীবৃন্দকে শক্তিশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত করার জন্য গভীর মনোযোগ দিতে হবে এবং যত্নশীল হতে হবে। দলের সদস্যদেরকে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করার প্রচেষ্টার পাশাপাশি ইতিমধ্যে সমাজে প্রতিষ্ঠিত তথা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদেরকে দলের চিন্তা চেতনার প্রতি অনুরাগী করে তুলতে হবে; সম্ভব হলে তাদেরকে দলের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। এটা সামগ্রিকভাবে দলের ব্যাক্তিত্বকেও শানিত করবে এবং দলটিকে একটি ব্যাপক প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করবে। এমন একটি দলের নেতৃত্বেই জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য এগিয়ে আসবে। রাসূল (সাঃ) দুই ওমরের এক ওমরকে (ওমর ইবনে খাত্তাব বা ওমর ইবনে হাকাম অর্থাৎ আবু জাহেল) ইসলামের সমর্থক হিসেবে চেয়ে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার নিকট দোয়া করেছিলেন। এর একটি অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণের দৃষ্টিতে ইসলামের দাওয়াতকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়া।
শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব মানে হচ্ছে জনগণকে সংগঠিত ও নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা। একজন ব্যক্তি তখনই শক্তিশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হয় যখন সে জনগণের সমস্যা সমাধানে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে। এধরণের কাজ একজন ব্যক্তির মধ্যে তীব্র দায়িত্ববোধের জন্ম দেয় এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষার্থে সব ধরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার যোগ্যতা তৈরী হয়। আর এইসব কাজ করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই জনগণকে সংগঠিত করার ও নেতৃত্ব দেয়ার গুণাবলী অর্জিত হয়। জনগণের জন্য কাজ করতে গিয়ে সমাজে বন্ধুর পাশাপাশি শত্রু ও প্রতিযোগী তৈরী হয়। এই বন্ধুত্ব, শত্রুতা বা প্রতিযোগিতা করতে গিয়েই ব্যক্তিত্ব শক্তিশালী হয়। সুতরাং দলের কর্মীদেরকে এধরণের কাজ দিতে হবে যাতে করে গণমানুষের সাথে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি ও ধারাবাহিকভাবে জনগণের জন্য কাজ করার মাধ্যমে তার ব্যক্তিত্ব শক্তিশালী হতে পারে। সমাজে বিদ্যমান এধরনের ব্যক্তিত্বকে দলের সাথে জড়িয়ে ফেলার বিষয়টিও গভীরভাবে ভাবতে হবে। আমাদের সংগঠনে এই ধরনের ব্যক্তিত্বদের ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনে সাংগঠনিক প্রক্রিয়া মানানসই করে সাজিয়ে নিতে হবে।
৪. ইসলামে রাজনৈতিক সংগ্রাম
ইসলামের সুচনালগ্ন থেকেই মুসলিমরা রাজনৈতিক সংগ্রাম করে আসছে। এটি ইসলামের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এই বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ ফরজ দায়িত্ব যে প্রয়োজনে নিজের জীবন উৎসর্গ করার জন্য আদেশ করা হয়েছে। খিলাফত পূণঃপ্রতিষ্ঠা বা খলীফার প্রকাশ্য কুফরীর বিরোধিতার মতো বিষয়ে এ ধরণের তাগিদ দেয়া হয়েছে।
ইসলামি আকীদার দিকে গভীর মনোযোগ দিলে যে কারো কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে যাবে যে ইসলাম ও রাজনৈতিক সংগ্রামকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন করে দেখার কোনো সুযোগই নেই। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের মধ্যেই ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক-রাজনৈতিক সংগ্রাম নিহিত। একজন মুসলিমের বিশ্বাস তাকে একজন সংগ্রামী মানুষ হিসেবে তৈরী করে। পৃথিবীতে মাত্র একজন মুসলিমও যদি বেঁচে থাকে তবে স্থান-কাল নির্বিশেষে তার উপর ফরজ দায়িত্ব হবে ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে দেয়ার জন্য সংগ্রাম করা।
পবিত্র কুরআনের অসংখ্য আয়াত এবং রাসূল (সা) এর বাণীসমূহ রাজনৈতিক সংগ্রামকে গৌরবদীপ্ত ও সম্মানিত কাজ হিসেবে মহিমান্বিত করেছে। এই সমস্ত আয়াত ও হাদীসসমূহ একজন মুসলিমকে তার দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করে এবং শাসককে তার কাজের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য করে। ইসলামে শাসকের জবাবদিহিতার বিষয়টি মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে এমনভাবে তুলে ধরতে হবে যাতে এ কাজ করার ফল উচ্চ মর্যাদা ও পুরস্কার আর একাজ করতে ব্যর্থ হলে বা অবহেলা করলে ফলাফল গুরুতর ক্ষতি ডেকে আনবে। রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা বলা হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ।” রাসুল (সাঃ) শুধুমাত্র রাজনৈতিক সংগ্রামের মহত্ত্ব ও উচ্চতর মর্যাদাকে তুলে ধরেননি। সংগ্রামরত রাজনৈতিক কর্মী যে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা)’র পথে জীবন বিলিয়ে দেয় তার মর্যাদার ও পুরস্কার সম্পর্কেও রাসুল (সাঃ) নিশ্চিত করেছেন। রাসুল (সাঃ) বলেছেন “শহীদদের সর্দার হামযা (রাঃ) আর ঐ ব্যক্তি যে অত্যাচারী শাসকের সামনে দাড়িয়ে তার কর্মের জবাবদিহি করতে বাধ্য করে এবং একারণে তাকে হত্যা করা হয়।” এই দুইটি হাদীস রাজনৈতিক সংগ্রামের উচ্চমর্যাদা শুধু নিশ্চিতই করেনা বরং বলিষ্ঠভাবে অত্যাচারী শাসককে মোকাবেলা করতে উদ্বুদ্ধ করে। হাদীসে উল্লেখিত ‘অত্যাচারী শাসক’ বলতে তার মুখের উপর এবং তার শক্তিশালী অবস্থানে গিয়ে বিরোধিতার কথা বলা হয়েছে। আর ‘অত্যাচারী শাসকের সামনে দাড়িয়ে’ বলতে মুখোমুখি দাড়িয়ে তাকে সাবধান করা, পরামর্শ দেয়া এবং জবাবদিহি করতে বাধ্য করার কথা বলা হয়েছে।
৫. রাজনৈতিক সংগ্রামে অংশগ্রহণকারীদের বৈশিষ্ট্য
এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যারা ইসলামের জন্য রাজনৈতিক সংগ্রাম করবে তাদেরকে ইস্পাত কঠিন মনোবলের অধিকারী হতে হবে। এর কারণ হচ্ছে সংগ্রামরত কর্মীকে অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সরাসরি রাজনৈতিক সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিতে হবে। অথচ শাসক ও তার অনুগত চক্রের হাতে রয়েছে সার্বিক রাষ্ট্রযন্ত্র এবং স্বাভাবিকভাবেই সমগ্র শাসকচক্রের ক্ষোভ গিয়ে সংগ্রামরত মানুষের উপরই নিপতিত হবে। সত্যিকথা হচ্ছে রাজনৈতিক সংগ্রাম মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক ও ইচ্ছাশক্তির সংগ্রাম। আর ইচ্ছাশক্তি বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। উন্নত চিন্তাশক্তির মানুষ দুর্বল চিত্ত হলে এর কোনো ফলাফল নেই। একই ভাবে প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকা সত্ত্বেও যদি উন্নত ধ্যান-ধারণা না থাকে এবং সমাজ পরিবর্তনের জন্য সঠিক বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো না থাকে তবে সেই ইচ্ছাশক্তি থাকাটা হবে অর্থহীন। প্রবল ইচ্ছাশক্তির মানে হচ্ছে সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্খার দৃঢ়তা ও বলিষ্ঠ মনোভাব এবং ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে সংগ্রামের ময়দানে সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়া। এটা খুবই স্বাভাবিক যে শাসক তার সমস্ত শক্তি ও সম্পদ ব্যবহার করে আন্দোলন দমন করতে চাইবে বা আন্দোলনের শিকড় উপড়ে ফেলতে চাইবে। শাসক ঘুষ দিবে, লোভ দেখাবে, ভয় দেখাবে, অত্যাচার নির্যাতন করবে, ক্ষুধার্ত রাখবে; এমনকি এসব বিষয়ে শাসক রীতিমত দক্ষ হয়ে যেতে পারে। সুতরাং সংগঠনের কর্মীদেরকে এই অত্যাচার নিপীড়ন সহ্য করতে হবে এবং নিজেদের ইচ্ছাশক্তির পরীক্ষা দিতে হবে। যদি তারা দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে আন্দোলন স্তিমিত ও নিঃশেষ হয়ে যাবে আর যদি তারা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং ধৈর্য্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে, তবে তারা লক্ষ্য অর্জনে সমর্থ হবে। যারা এই সংগ্রামে দৃঢ় পদে দাড়িয়ে থাকতে ব্যর্থ হবে, তারাই আন্দোলনের প্রকৃত হতাহত।
সুতরাং, উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য রাজনৈতিক সংগ্রামে অংশগ্রহণকারীদের বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:
১. উদ্দেশ্যের প্রতি শক্ত ও অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস
২. প্রবল ইচ্ছা শক্তির অধিকারী হওয়া
৩. উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য সর্বাবস্থায় স্থিরসংস্কল্প ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞা থাকা
৪. সাহসিকতা ও দৃঢ়তা
৫. গৃহীত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মূলনীতির প্রতি পরিপূর্ণ আস্থা এবং সার্বিকভাবে তা অনুসরণ বা মেনে চলা
৬. রাজনৈতিক সংগ্রামে কোন ধরণের নমনীয়তা, আপসকামিতা, প্রতারণা, আত্মপ্রসাদ লাভ বা অবহেলার সুযোগ নেইএভাবেই একটি ইসলামি সংগঠনের সদস্যদেরকে রাজনৈতিক সংগ্রাম পরিচালনা করতে হবে। এই বৈশিষ্ট্যসমূহ শুধুমাত্র দল-এর বৈশিষ্ট্য নয় বরং দলের সকল সদস্যের বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত। একটি জাতিকে শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নেতৃত্ব দেয়া যায়না কারণ উম্মাহ দলের উন্নত চিন্তা বা তত্ত্ব দ্বারা সন্তুষ্ট নয়। উম্মাহ দলকে তার নেতাদের ব্যক্তিত্বকে দিয়ে পরিমাপ বা বিচার করে। জাতি সংগ্রাম ও সাহসিকতার আকাঙ্ক্ষী। দুঃসাহসী ও বীরত্বপূর্ণ কাজ গল্পের মতো এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে যায় তা চোর ডাকাত যারই হোকনা কেন। সুতরাং দল এবং এর নেতৃত্বকে জনগণ সূক্ষাতিসূক্ষ পরীক্ষার পরই সমগ্র জাতির নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করবে। জাতি কখনোই কাপুরুষ, দুর্বল, প্রতারক বা আত্মতুষ্টিতে নিমগ্ন কাউকে নেতৃত্ব দেয়না।
যেহেতু ইসলামের দাওয়াকে বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য উপরোক্ত গুণাবলী অপরিহার্য এবং এই গুণাবলীগুলো অর্জনের স্বাভাবিক অনুসঙ্গ হচ্ছে হয় মৃত্যু, নয় নির্যাতন নতুবা ক্ষুধা ও দারিদ্রের কষ্ট। আর এর জন্য আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা তার পবিত্র কিতাবে এবং রাসূল (সাঃ) তার বর্ণনায় এ দায়িত্ব পালনে অপারগ ব্যক্তিদের তীব্র শাস্তির কথা ঠিক তেমনিভাবেই বলেছেন যেমনিভাবে মুমিন ও দৃঢ় ব্যক্তিদের আশ্বস্ত করেছেন সেই জান্নাতের ব্যাপারে যা এই বিশ্বজগতের মতই বিশাল কুর’আনের এই আয়াতগুলো জাহান্নাম এবং তার ভয়াবহ শাস্তির বর্ণনার ক্ষেত্রে ঠিক তেমনটাই বিস্তারিত যেমনিভাবে বিস্তারিত জান্নাত ও তার ঐশ্বর্যের ব্যাপারে। আর এভাবেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) মুমিন বান্দাদের আশ্বস্ত করেন উত্তম প্রতিদানের।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন:
আলিফ-লাম-মীম, মানুষ কি মনে করে যে তারা একথা বলেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে যে, ‘আমরা বিশ্বাস করি এবং তাদের কে পরীক্ষা করা হবে না ? আমি তাদেরকেও পরীক্ষা করেছি, যারা তাদের পূর্বে ছিল। আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন যারা সত্যবাদী এবং নিশ্চয়ই জেনে নেবেন মিথ্যুকদেরকে। [সূরা- আনকাবূত ১-৩]
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন:
তোমাদের কি এই ধারণা যে, তোমরা জান্নাতে চলে যাবে, অথচ সেই লোকদের অবস্থা অতিক্রম করনি যারা তোমাদের পূর্বে অতীত হয়েছে। তাদের উপর এসেছে বিপদ ও কষ্ট। আর এমনিভাবে শিহরিত হতে হয়েছে যাতে নবী ও তাঁর প্রতি যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে পূর্যন্ত একথা বলতে হয়েছে যে, কখন আসবে আল্লাহ্র সাহায্য ! তোমরা জেনে নাও, আল্লাহ্র সাহায্য একান্তই নিকটবর্তী। [ সূরা- আল বাকারা ২১৪]
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন:
তোমাদের কি ধারণা, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, অথচ আল্লাহ্ এখনো দেখেননি তোমাদের মধ্যে কারা জেহাদ করেছে এবং কারা ধৈয্যশীল? [সূরা আল ইমরান-১৪২]
মুসলমান হোক বা না হোক যে কারও জন্যই সমাজের জীবনধারাকে বদলে দেয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হচ্ছে শাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবর্তীণ হয়ে তাতে জয়লাভ করে নিজেরা ক্ষমতায় আসীন হওয়া। তবে কম্যুনিষ্ট পার্টির কর্মীরা জারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে কীভাবে নির্যাতিত হয়েছিল কিংবা ‘স্বাধীনতা’ ‘সাম্য’ এবং ‘মুক্তচিন্তা’র প্রচারকরা ফরাসী বিপ্লবের পূর্বে বাস্তিল দূর্গে কিভাবে লাঞ্ছনা ভোগ করেছিল অথবা যারা ইউরোপের রাজাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে রুখে দাঁড়িযেছিল বা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল তার গৌরব গাঁথা বর্ণনা করার কোন প্রয়োজন আমাদের নেই। বরং আমাদেরকে তুলে ধরতে হবে আমাদের পূর্বপুরুষ সেইসব সংগ্রামী বীর মুসলিমদের কথা, যারা এই ইসলামের দাওয়াতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অবর্ণনীয় শারীরিক নির্যাতন, হত্যা, সম্মানহানি ও দারিদ্র্য- দুর্দশার শিকার হয়েছিলেন।
আবু জুবাইদা
অক্টোবর, ২০০৭বরফের মতোই গলে যাওয়া…
আজকে অফিসে আসার সময় দেখলাম অনেক গুলো বড় বড় বরফের খন্ড একটি পিকআপে করে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের গন্তব্য সম্ভবত কাওরানবাজার। গাড়ি থেকে প্রতি মূহুর্তে বরফ গলে গলে পরছে। পথিমধ্যে জ্যামে পরলো গাড়ি। এবার প্রায় অঝোর ধারায় পানি পরছে। মোটা মোটা বরফের খন্ড গুলো ধীরে ধীরে চিকন আর পাতলা হয়ে আসছে।
কয়েকদিন আগে ইফতার কেনার জন্য বাইরে বের হয়েছি ঠিক ইফতারের আগ মুহূর্তে। ইফতারের বিভিন্ন পসরা সাজিয়ে রাস্তার দু’ধারে অনেক দোকান। এর পাশে ছোট দু’টি দোকানী দেখলাম বরফও বিক্রি করছে। প্রচন্ড গরমের দিনে রোজা এলে তখন বরফের বিক্রিও বেড়ে যায়। অবশ্য গরম এবার অতো বেশি না হওয়ায় তাদের বরফ অতো বিক্রি হচ্ছে না। ভীড় পাশের দোকান গুলোতেই। বরফ বিক্রেতাদের মুখ তাই খুবই মলিন। একদিকে ইফতারের সময় ঘনিয়ে আসছে, অপর দিকে তাদের বরফও গলে যাচ্ছে। যে কোনো মূল্যে ইফতারের আগেই তাদের সব বরফ বিক্রি করতে হবে। না হলে অনেক লস হবে!
বরফের গলে যাওয়ার বিষয়টি আমাদের কাছে খুবই বাস্তব এবং চাক্ষুস মনে হলেও এই বরফের মতোই আমাদের জীবনও যে ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে। জীবনের মূল্যবান সময় চলে যাচ্ছে। একটি নিশ্চিত পরিণতি ও গন্তব্যের দিকে যে আমরা প্রতি মূহুর্তে ধাবিত হচ্ছি তীব্র থেকে তীব্রভাবে, সেটি কিন্তু আমাদের আর মনে আসে না। স্মরণেও থাকে না।
বরফটুকু গলে যাওয়ার আগেই যে তাকে বিক্রি করে দিতে হবে, কাজে লাগাতে হবে; না হলে সমূহ বিপদ আর ভীষণ লস এটি সকলে খুব ভালো করে জানলেও, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মূহুর্ত গুলো যে অহেতুক কাজে কেটে যাচ্ছে, সেদিকে আমাদের কারো ভ্রুক্ষেপ নেই।
আমরা খুবই নিশ্চিতভাবে একটি মহাসত্যের দিকে ধাবিত হচ্ছি। সেটি হচ্ছে আমাদের জীবনের পরিসমাপ্তি তথা মৃত্যু। মৃত্যুর মাধ্যমে এ জীবনের বরফতুল্য হায়াতটি শেষ হয়ে যাবার পরই আমাদের সম্মুখীন হতে হবে এমন এক কঠিন বাস্তবতার, যার কোনো প্রস্তুতি নেই আমাদের অনেকেরই। বরফ বিক্রেতার জন্য একবার ব্যবসায় লস হলেও আরেকবার লাভের সুযোগ থাকে। কিন্তু আমাদের জীবনের এই সময়টুকু একবার চলে গেলে, এরপর শত আফসোস করলেও যে আর কাজ হবে না। বরং মৃত্যুর সাথে সাথেই আমরা সম্মুখীন হবো এক কঠিন জিজ্ঞাসাবাদের। যেখানে আমাদেরকে হিসাব দিতে হবে আমাদের এই জীবনের। হিসাব দিতে হবে প্রতিটি মূহুর্তের। এ বিষয়টিই কত সুন্দরভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন মহান রাব্বুল আলামীন। ঘোষণা করেছেন-
خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ
অর্থ: “তিনিই সেই মহান স্বত্ত্বা, যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু এবং জীবন। যেনো তিনি এর মাধ্যমে তোমাদের পরীক্ষা নিতে পারেন, (দেখে নিতে পারেন) কে তার কাজে সৎকর্মশীল। আর তিনি তো পরাক্রমশালী, ক্ষমাকারী।” (সূরা মুলক, আয়াত ২)
সেই কঠিন দিন শীঘ্রই আমাদের সবার সামনে উপস্থিত হবে। সেদিনের সেই কঠিন অবস্থায় মুক্তি লাভের জন্য আজ জীবনের এই ক্ষয়ে যাওয়া মূহুর্তগুলোকেই কাজে লাগাতে হবে। যেটুকু সময় অবশিষ্ট্য আছে সেই সময়ের মধ্যেই পরকালের জন্য সম্বল তৈরী করতে হবে। দীনের জন্য, ইসলামের বিজয়ের জন্য এবং মানব রচিত মতবাদ আর মতাদর্শের জুলুম নির্যাতন থেকে বিশ্ব মানবতাকে মুক্ত করার জন্য কিছু করে যেতে হবে।
দুনিয়ার চাকচিক্য আর বিলাসিতার মোহে পরে, পরকালকে যেনো আমরা ভুলে না যাই। অবশ্যম্ভাবী সেই কঠিন বাস্তবতা যেনো আমাদের চিন্তা থেকে হারিয়ে না যায়। আল্লাহ আমাদেরকে সেই তাওফীক দিন।
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ وَاخْشَوْا يَوْمًا لا يَجْزِي وَالِدٌ عَنْ وَلَدِهِ وَلا مَوْلُودٌ هُوَ جَازٍ عَنْ وَالِدِهِ شَيْئًا إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ فَلا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَلا يَغُرَّنَّكُمْ بِاللَّهِ الْغَرُورُ (33)
অর্থ: “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর এবং সেই দিনকে ভয় কর, যেদিন পিতা তার সন্তানের কোন উপকার করতে পারবে না এবং সন্তানও তার পিতার কোন উপকারে আসবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহর ওয়াদা সত্য। সুতরাং দুনিয়ার জীবন যেন কিছুতেই তোমাদেরকে ধোকা দিতে না পারে এবং মহাপ্রতারক (শয়তান) যেন তোমাদেরকে আল্লাহ সম্পর্কে ধোকায় ফেলতে না পারে।” (সূরা লুকমান, আয়াত ৩৩)
ইসহাক খান














