Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: জাগরণ নাকি চক্রান্তের বেড়াজালে বাংলাদেশ?

    বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

    সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের কিছু উল্লেখযোগ্য ইস্যুর মধ্যে একটি হল যুদ্ধপরাধ ইস্যু। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে; যদিও বিচার রায় কার্যক্রম শুরু করে ক্ষমতার মেয়াদ যখন শেষ পর্যায়ে।

    নানা জল্পনা-কল্পনা, ধ্যান-ধারণা শেষে সর্বপ্রথম আবুল কালাম আযাদের ফাঁসির রায় দেওয়া হয় এবং কয়দিন পূর্বে কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন। এই রায়ের মধ্যে চমকপ্রদ অংশ হল এই জায়গায় যে, যার (আবুল কালাম আযাদ) ফাঁসির রায় দেওয়া হয়েছে তিনি পলাতক আর যিনি হাতের নাগালে অর্থ্যাৎ রায় বাস্তবায়নে সুবিধাজনক স্থানে যিনি তাকে দেওয়া হল যাবজ্জীবন। আর এই সাজা হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদন্ড রায় দেয়ার পর ফাঁসির দাবিতে তথাকথিত বেনামী জাগরণ দেখানো হচ্ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। মিসরের তাহরীর স্কয়ারের নামানুসারে শাহবাগ স্কয়ারের আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে; যদিও তাহরীর স্কয়ারের আন্দোলন আর এই নৃত্য-গীতের মধ্যে দূর দূর পর্যন্ত কোন মিল নেই। কারণ, তাহরীর স্কয়ারের আন্দোলন ছিল অত্যাচারী শাসকের পতনের দাবিতে, বাংলাদেশের শাহবাগের মত কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়।

    সকল প্রেক্ষাপটসমূহ বিবেচনা করলে দেখা যায়, এটি কোন বিচারের দাবিতে গড়ে তোলা আন্দোলন নয়; বরং, একটি সুবিশাল চক্রান্তের স্বরূপ বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা। আর অনুধাবনের লক্ষ্যে আমাদের বেশ কিছু সময় পেছনে ফিরে যেতে হবে।

    ২০০৯ সালে হাসিনা সরকার যখন ক্ষমতায় আসীন হয়, তখন থেকে তার আমেরিকা-ভারত প্রীতির প্রেক্ষিতে কার্যক্রম শুরু হয়। নির্বাচনে জয়লাভের শর্তস্বরূপ আমেরিকার সাথে কৃত ওয়াদাসমূহ বাস্তবায়নে সচেষ্ট হয়। একে একে ACSA/TICFA থেকে শুরু করে সামরিক মহড়া যেমনঃ টাইগার শার্ক- ১,২,৩,৪ ইত্যাদির মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে আমেরিকার দালাল সৃষ্টির চেষ্টা বজায় রাখে।

    অপরদিকে, ভারতের সাথে তার চুক্তিসমূহের মধ্যে TIFA, TRANSIT ইত্যাদি বাস্তবায়ন করতে থাকে। চুক্তির ধারাবাহিকতায় চক্রান্ত বাস্তবায়নে হত্যা করে নিষ্ঠাবান সেনা অফিসারদের, আলেমদের দেওয়া হয় কুফর সমর্থনের প্রশিক্ষণ এবং তাবেদারীতে বাধ্য করা হয়।

    আর অভ্যন্তরীণ স্বার্থসিদ্ধিতে যুদ্ধপরাধের বিচারের নাটক শুরু করে। জনগণের আবেগ পুঁজি করে গড়ে তোলা এই মঞ্চ নাটক বিচারের নামে জনগণের সামনে মূলা উচিয়ে ধরে রাখা ছাড়া আর কিছুই নয়। নির্বাচনপূর্ব জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যুদ্ধপরাধের বিচার শুরু করলেও তা মূলত রাজনৈতিক দ্বন্দের এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বাস্তবায়ন।

    কিন্তু মূল সমস্যা এখানে নয়, বরং অন্যদিকে। আওয়ামী লীগ আমেরিকার ছত্রছায়ায় নির্বাচনে জয় লাভ করলেও এটি কোন ভাবেই ভুলে যাওয়া উচিত হবেনা যে, আওয়ামী লীগ কংগ্রেস তথা ভারত-বৃটেন পন্থী একটি দল। অপরদিকে, বিএনপি আমেরিকাপন্থী। বলা যেতে পারে, গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলসমূহে ভেদে প্রভুরা আমেরিকা-বৃটেন।

    ক্ষমতায় আসীনের পর থেকে আওয়ামী সরকারের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক ভালোই চলছিল। কিন্তু এই সম্পর্কের ওজন যখন ভারতের সাথে আওয়ামী লীগের তুলনায় ভারী হয়ে উঠলে বিষয়টি আওয়ামীলীগের মূল প্রভু বৃটেনের ভয় হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, আমেরিকার এই অঞ্চলে আনাগোনা ও বাংলাদেশে তাদের অবস্থানের পাঁয়তারা বৃটেনের স্বার্থসিদ্ধি এবং তার দোসর ভারতের লক্ষ্য আঞ্চলিক পরাশক্তি হওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায়। কারণ, আমেরিকা–ভারত সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক।

    প্রতিবছর সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা সংলাপে ভারত সম্পর্কে আমেরিকা বক্তব্য থাকে এইরূপ: “গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত। এই সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার মূল ভিত।” অর্থ্যাৎ তাদের সম্পর্কের ভিত্তি সুস্পষ্টভাবে স্বার্থের উপর ভিত্তি করে এবং যখন কারো স্বার্থের ওপর আঘাতের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় তখন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হয়।

    যাই হোক, আমেরিকার এই অঞ্চলের উপস্থিতি যখন ভারত-বৃটেনের স্বার্থবিরোধী অবস্থানে পৌঁছায়, তখন বৃটেন তার সরকার নিয়ন্ত্রণ কলকাঠি নাড়তে শুরু করে এবং হাসিনা সরকারের নাড়ির দড়ি টেনে ধরে; এবং আমরা এর স্বরূপ দেখতে পায় যুক্তরাজ্যের ইকোনোমিস্ট পত্রিকায় আওয়ামী সরকারের একের পর এক কঠোর সমলোচনার মাধ্যমে। যার মধ্যে আমেরিকা তোষামোদের বিষয়টিও উঠে আসে।

    এবং পরবর্তীতে হাসিনার অবস্থান পরিবর্তন হতে থাকে। বিভিন্ন বিষয়ে সে আমেরিকাকে এড়িয়ে চলতে থাকে। আমেরিকার সাথে একের পর এক রাষ্ট্রীয় বৈঠক থেকে ব্যস্ততার অজুহাতে অনুপস্থিত থাকতে শুরু করে। আর বিষয়টি সুস্পষ্ট হতেই আমেরিকা তার ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করে। আই.এম.এফ-এর মাধ্যমে পদ্মা দুর্নীতি ইস্যু উঠায় এবং বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দেয়; যা ছিল মূলত হাসিনা সরকারের মুখে চপেটাঘাত।

    কিন্তু হাসিনা সরকার প্রমাণ করল যে, এই দ্বন্দে সে একাকী খেলোয়ার নয়; বরং সে তার জন্মগত প্রভু অর্থ্যাৎ বৃটেন এবং আমেরিকার অপর স্বার্থভিত্তিক শত্রু রাশিয়ার ছত্রছায়ায় রয়েছে, আই.এম.এফ-এর ঋণ প্রত্যাখান এবং EU–এর সাথে সম্পর্কন্নোয়নের দ্বারা। এটি শুধুমাত্র ঋণ প্রত্যাখান ছিল না, বরং আমেরিকাকেই প্রত্যাখান করা।

    এমতাবস্থায় আমেরিকা ঠিক একই প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যেমনটি সে সর্বদা প্রস্তুত রাখে তার সাথে বিরুদ্ধাচরণকারীদের জন্য। পূর্বকৃত চুক্তি অনুযায়ী ACSA চুক্তির ভিত্তিতে সে ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে তার সেনা, গোয়েন্দা উপস্থিতি সক্রিয় করার পাশাপাশি বিমান, নৌ ঘাটি স্থাপন আর সেনাবাহিনী-নৌবাহিনীতে তাদের প্রভাব বিস্তারের ষড়যন্ত্র শুরু করেছে এবং রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিদের নির্যাতন, গুম, হত্যা করে চলেছে।

    আর এই পরিস্থিতিতে যখন আওয়ামী লীগ সরকার তার মেয়াদের শেষ প্রান্তে, তখন নির্বাচন ইস্যু হিসেবে পুনরায় যুদ্ধপরাধ ইস্যুটি প্রদর্শনের জন্য তড়িঘড়ি কজরে কিছু বিচারের নাটক দেখাচ্ছে এবং বাকি বিচার পরবর্তীতে নির্বাচিত হলে পরিপূর্ণ করবে, এই ধরণের ইশতেহার জারিই তাদের চক্রান্তের অংশ। হয়ত, পিলখানা হত্যাকান্ডের বিচারো এইসকল মিথ্যা ওয়াদার অন্তর্ভুক্ত হবে।

    কিন্তু বিষয়টি শুধুমাত্র আভ্যন্তরীণভাবে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এই বিচারকে পুঁজি করে মূলত আমেরিকা বৃটেনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শুরু হয়েছে। এবং হাসিনা-খালেদা-জামায়াত-বামদলগুলো এখানে শুধুমাত্র দাবার গুটির ভূমিকা পালন করছে।

    আগেই বলা হয়েছে যে, তাদের ঐক্যের মূল হল তাদের স্বার্থ। যখন কোন অবস্থা বা কার্যক্রম স্বার্থবিরোধী হয়, তারা যে কারো বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।

    আরব জাগরণের পর আরব পেনিনসুলা থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আমেরিকা-বৃটেন এখন এশিয়ার দিকে দৃষ্টি দিয়েছে। কারণ এই অঞ্চলের উপর শীঘ্রই নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারলে তা যেকোন সময় হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এতদিন যাবৎ আরবের মত এই অঞ্চলসমূহ তাদের দালাল শাসক দ্ব্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে। কিন্তু আরবের মত এই অঞ্চলেও উম্মাহ’র জাগরণের সম্ভাবনা তাদের ভাবিয়ে তুলেছে এবং এই কারণে এই অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম পূর্বের তুলনায় অধিক হার বিস্তৃত করতে উদ্যত হয়েছে। নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক কর্মসূচির নামে সেনাবাহিনীর সাথে একের পর এক সামরিক মহড়া, জঙ্গি দমনের নামে শারীরিক উপস্থিতি, অঞ্চলসমূহ অস্থিতিশীল করে রাখা ইত্যাদি অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

    এই সবের কারণ হল; আরবের মত এই অঞ্চলেও খিলাফতের জন্য দিন দিন যে আওয়াজ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে তা রুখে দেওয়া এবং চীনের অর্থনৈতিক উন্নতি, যা যুক্তরাষ্ট্র-বৃটেন উভয়ের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে হুমকিস্বরূপ। কারন চীন ইতোমধ্যে তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত হিসেবে স্বর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। চীনকে নিয়ন্ত্রন এবং অর্থনৈতিক ফায়দা হাসিলে উভয়েই (আমেরিকা-বৃটেন) উঠে পড়ে লেগেছে।

    আর বাংলাদেশে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে তাদের জন্মগত দালাল হাসিনা-খালেদা। হাসিনা বৃটেন-ভারতের স্বার্থপন্থী কাজ করে যাচ্ছে অবিরতভাবে। আর খালেদা নিজের রাজনৈতিক দুর্বল অবস্থানের কারণে এখন সরাসরি আমেরিকাকে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপের ব্যাপারে আহবান করে যাচ্ছে নির্লজ্জভাবে।

    আপনি তাদের অনেককে দেখবেন কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করে। তারা নিজেদের জন্য যা পাঠিয়েছে তা অবশ্যই মন্দ। তা এই যে, তাদের প্রতি আল্লাহ ক্রোধান্বিত আছেন এবং তারা চিরকাল আযাবে থাকবে” [আল মায়িদাহ: ৮০]

    যদি তারা আল্লাহ’র প্রতি ও রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করত, তবে কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করত না” [আল মায়িদাহ: ৮২]

    আর এরই ধারাবাহিকতায় যুদ্ধপরাধের বিচারের রায় নিয়ে এই জাগরণে শাসক নাটকের সূত্রপাত ।

    একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে অনুধাবন করা যাবে সম্পূর্ণ বিষয়টি । এই মুহূর্তে শাহাবাগ চত্বরে নাটকটির মূল ভূমিকায় রয়েছে বামদলগুলো। কিন্তু আসল ব্যাপার হল বামদলগুলো ১৪ দল অর্থাৎ আওয়ামী মহাজোটের অন্তর্ভুক্ত ।

    বিগত ৪ বছর যাবৎ আওয়ামীলীগ তার অন্যায়, জুলুমের কারণে এমনিতেই জনসমর্থন হারিয়েছে এবং জনগণের মধ্যে ক্ষোভের পাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে । অপরদিকে, বি এন পি তার রাজনৈতিক অদূরদর্শীতার কারণে দুর্বল, ভঙ্গুর অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে । তাই, শেষ সময়ে নিজ প্রভু আমেরিকার হস্তক্ষেপ কামনায় তার শেষ ভরসা ।

    আওয়ামীলীগ যখন বুঝতে পারলো, জনগণের মধ্যে তাদের প্রতি সমর্থন শূন্যের কোঠায় এবং পরবর্তী নির্বাচনে এই যুদ্ধপরাধীর ইস্যুও কাজে দিবে না । ঠিক এইসময় বিচারের নামে নাটকের সূত্রপাত ঘটায় । এবং এর নেতৃত্ব নিয়ে নেয় বামদলগুলো ।

    যাদের কিছুদিন আগে হরতালের ঘোষণা দিয়ে গান-বাজনার মাধ্যমে অহিংস বা দেশপ্রেমিক প্রমাণে উদ্যত হয়েছিল সরকার । এই বামদলগুলো আওয়ামী বিচ্ছিন্ন কোন সংঘটন না; বরং আওয়ামীলীগের সাথেই জোট বাঁধা দল ।

    অর্থাৎ এই ক্ষেত্রে কুফর এই জাগরণ দিয়ে একসাথে দুটি কাজ সারছে। ক. তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন খ. পুনরায় আওয়ামীলীগের আঁচলেই জাগরণের ভোট ।

    এই তথাকথিত জাগরণের মূল উদ্দেশ্য:-

    তথাকথিত এই জাগরণের প্রেক্ষিতে শাহবাগ চত্বরকে আজ শাহবাগ স্কয়ার বলা হয়েছে যা মূলত মিসরের ‘তাহরীর স্কয়ার’ অনুকরণে ।

    স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, মিসরের আন্দোলন ছিল অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে, কোন কুফরের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে নয়। যদিও সে জাগরণও ছিনতাই করা হয়েছে ইসলামী লেবাসধারীদের মাধ্যমে এবং সে পুনরায় জাগরণ জেগে উঠেছে ।

    বাংলাদেশের এই মঞ্চনাটকে শুক্রবারের সমাবেশে বক্তৃতায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এর উদ্দেশ্য ।

    সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন এভাবে, “আমরা যুদ্ধ করিনি বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠায়, আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়” ।

    মূলত, এটি একটি মিথ্যাচার । তৎকালীন মানুষ যুদ্ধে যাওয়ার আগে শপথ নিয়েছিল অত্যাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নয় । কিন্তু পরবর্তীতে ক্ষমতার পালাবদল হয় এক দালাল থেকে আরেক দালালের হাতে ।

    এই বক্তব্যসমূহ সুস্পষ্টভাবে ধারণা দেয় তাদের ঘৃণ্য চিন্তার, জঘন্য ষড়যন্ত্রের ।

    কাফেররাই কেবল আল্লাহ’র আয়াত সম্পর্কে বিতর্ক করে। কাজেই নগরীসমূহে তাদের বিচরণ যেন আপনাকে বিভ্রান্তিতে না ফেলে” [আল মু’মিন: ৪]

    আর তাদের মত হয়ে যেয়ো না, যারা বেরিয়ে পড়েছে নিজেদের অবস্থান থেকে গর্বিতভাবে এবং লোকদেরকে দেখাবার উদ্দেশ্যে। আর আল্লাহ’র পথে তারা বাঁধা দান করত। বস্তুত আল্লাহ’র আয়ত্তে রয়েছে সে সমস্ত বিষয় যা তারা করে” [আল আনফাল: ৪৭]

    তারা জনগণের মাঝে ইসলামের প্রতি ভালোবাসা, আবেগ মুছে দিতে চায়। কারণ দিন দিন জনমত ইসলামের দিকেই ধাবিত হচ্ছে । ইসলামের প্রতি জনসচেতনতা তাদের ভাবিয়ে তুলছে এবং এই কারণে তারা তাদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে লিপ্ত এবং বামদল! আওয়ামী-বি.এন.পি প্রত্যেকেই এখানে ননীর পুতুল; যা ইতোপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে ।

    এবং পাশাপাশি এই ষড়যন্ত্রকারীরা মানুষের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে যেমনটি করা হয়েছিল পূর্বে। অতঃপর সংঘাতের মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে নিজেদের শারীরিক অবস্থার জানান দিবে কুফর শক্তিসমূহ ; যা আমরা বর্তমানে পাকিস্তানে দেখছি ।

    অথচ এরা যদি তোমাদের কাবু করতে পারে, তাহলে এরা শত্রুতে পরিণত হবে, এরা নিজেদের হাত ও কথা দিয়ে তোমাদের অনিষ্ট সাধন করবে, এরা তো এটাই চায় যে, তোমরাও তাদের মত কাফের হয়ে যাও” [আল মুমতাহিনা: ২]

    সুতরাং আমাদের মুসলিমদের জন্য এটি কোনভাবেই সমীচীন হবে না যে, আমরা এই সকল চক্রান্তে পা দিয়ে কুফরের চক্রান্ত বাস্তবায়নে তাদের সাহায্য করব ।

    বরং, ধর্মনিরপেক্ষতার মত অসুস্থ মতবাদ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এই সকল চক্রান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কর্তব্য এবং কুফরের চক্রান্তের সমুচিত জবাব দেওয়া আমাদের দায়িত্ব আর এটি সম্ভব শুধুমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।

    ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা উম্মাহর সাথে প্রতারণাকারী প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তির নিশ্চয়তা দেয়। (ইসলামী রাষ্ট্রের খসড়া সংবিধান, ধারা-৬৮)

    ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা মুসলিমদের উপর অপর রাষ্ট্রের খবরদারিতা খর্ব করবে। (ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, ধারা-১৭৬)

    ইসলামী রাষ্ট্র এর সেনাবাহিনীকে মুক্ত রাখে বিদেশী শক্তির প্রভাব থেকে ।

    ইসলামী রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হল ইসলামের আক্বীদা । সুতরাং, ইসলামী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সকল বিষয়সমূহ ইসলামের আদলেই পরিচালিত হয়; যাতে ব্যক্তি বর্তমানে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার মত ব্যক্তি স্বার্থসিদ্ধির সুযোগ নেই ।

    আজকে বাংলাদেশসহ সারা মুসলিম বিশ্ব ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক বা স্বৈরতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা মুসলিমদের কাফিরদের অধীনস্থ করে রেখেছে। আর এই কাফিরদের হাতে ভুলুন্ঠিত হচ্ছে মুসলিমদের বিশ্বাস ও জীবন। পরিবর্তনের রাজনীতির মিথ্যা আশ্বাসে কোন পরিবর্তন আসেনা। বিভিন্ন মতবাদ-দলের ছদ্মাবরনে এরা সবাই ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের আনুগত্যকারী দালাল। এরা কখনো একটি অপরটির বিকল্প হতে পারেনা।

    মুসলিমদের জন্য একমাত্র বিকল্প, বৈধ, গ্রহণযোগ্য ও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কতৃক মনোনীত ব্যবস্থা খিলাফত শাসন ব্যবস্থা। যা রাসূল (সা) মদীনাতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। খিলাফত সরকারই মুসলিমদের একমাত্র মুক্তির উপায়। এটা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরয দায়িত্ব। খালেদা-হাসিনা বা অন্য কোন গণতান্ত্রিক বা মানবরচিত শাসন ব্যবস্থার শাসকের সাথে মুসলিমদের খলীফার কোন তুলনায় হয়না। সারা বিশ্বে মুসলিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অচিরেই আসবে খিলাফাহ . . . . . . . ইন-শা-আল্লাহ।

    “. . . অতঃপর আবারো আসবে নব্যুয়তের আদলের খিলাফত . . . . .” [মুসনাদে আহমদ]

    তথ্যসূত্র:

    http://www.globalsecurity.org/military/facility/acsa.htmhttp://www.prothom-alo.com/detail/date/2013-02-02/news/325986
    http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=e4cb439c73e474cd2ee23a9455ada295&nttl=20130115090233166321
    http://prothom-alo.com/detail/date/2013-01-30/news/325297
    http://m.washingtontimes.com/news/2013/jan/30/the-thankless-role-in-saving-democracy-in-banglade/

  • প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য্যধারণ করা

    “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমাদের অনুগ্রহকে সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সুরা মায়েদা-০৩)

    ইসলাম একটা সম্পূর্ণ ও সত্য জীবন ব্যবস্থা যা অন্যান্য সকল বিশ্বাস ব্যবস্থা বা মতবাদ থেকে পৃথক একজন ব্যক্তি যখনই লা-ইলাহা ইল্লালাহ সাক্ষ্য দেয় তখনই মৌখিকভাবে অন্যান্য সকল ব্যবস্থাকে অস্বীকার করে একজন ব্যাক্তি নামাযের জন্য কিভাবে পবিত্র হবে সেটি যেমন ইসলাম বলে তেমনি তার আকীদাকে ভ্রান্ত আকিদা থেকে কি ভাবে রিক্ষা করবে সেটা ইসলাম বলে দেয় তেমনি একটা রাষ্ট্রের অর্থনীতি কিভাবে পরিলক্ষিত হয় তাও বলে দেয়। তেমনি কোন শাসক সমাজ পরিচালনা করবে বা শাসকের জবাবদীহিতা কি রকম হবে বা জনগণের সাথে শাসকের সম্পর্ক কি হবে বা ইসলামের প্রচারকার্য কিভাবে হবে সবই ইসলামে বলা রয়েছে। তাই কোন ব্যক্তি যখন নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করে তখন তাকে ইসলামের সব হুকুম আহাকাম মেনে চলতে হবে এখানে কিছু মানব,কিছু মানব না বা সহজগুলো নিব কঠিনগুলো নিব না, এরকমটা ইসলাম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

    “হে ঈমানদারগণ তোমরা পুর্নাঙ্গভাবে ইসলামে প্রবেশ কর” (সুরা বাকারা-২০৮)

    অর্থাৎ তোমরা পরিপূর্ণভাবে মুহাম্মাদ (সা) এর দ্বীনের সমস্ত আইনের আনুগত্য কর এবং সেখান থেকে কোন কিছু পরিত্যাগ কর না।

    ইসলামী রাষ্ট্র তথা খিলাফত রাষ্ট্রবিহীন একজন মুসলিম চাইলেও সম্পূর্ণ ইসলাম পালন করতে পারবে না কারন ইসলাম শুধুমাত্র ব্যক্তিকেন্দ্রিক কিছু বিশ্বাস বা বৈশিষ্ট্যের নাম নয়। বরঞ্চ ইসলামের ইসলামের হুকুম ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রে পরিব্যপ্ত। তাই একজন মুসলিম আন্তরিকভাবে চাইলেও অর্থনিতি, সামাজিকনীতি, পররাষ্ট্র বা প্রতিরক্ষানীতি ইসলাম হুকুম অনুযায়ী পালন করতে পারে না।

    “যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে তার কাঁধে কোন খলীফার বায়আত নেই তার মৃত্যু হচ্ছে জাহেলিয়াতের মৃত্যু” (মুসলিম)

    একজন মুসলিমকে অবশ্যই খিলাফত ব্যবস্থার মধ্যে থাকতে হবে কারণ খিলাফত না থাকলে খলিফা থাকে না খলিফা না থাকলে বায়আতের প্রশ্নও আসে না।

    কিন্তু বায়আতবিহীন মৃত্যু জাহেলিয়াতের মৃত্যু, অর্থ্যাৎ ইসলাম পূর্ববর্তী সময়ের মৃত্যু যা কোন মুসলিমের কাম্য নয়। এমতাবস্থায় একজন মুসলিমের একমাত্র কাজ হল সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিয়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা। যে ব্যবস্থা মুসলিমদের জীবন, সম্পদ ও বিশ্বাসের নিরাপত্তা দিবে।

    একজন মুসলিম যখন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা প্রত্যাখান করে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কজ করবে, তখন তার উপর নেমে আসবে সীমাহীন নির্যাতন। তাকে পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ কাঁটাযুক্ত পথ, শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা। এটাই ছিল পূর্ববর্তীদের সুন্নাহ যার মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা হক থেকে বাতিলকে পৃথক করে দেন। এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য্য ও কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা ও একনষ্ঠভাবে দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাওয়া। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    “ঐসব লোকেরা কি ধারণা করেছে যে, আমরা ঈমান এনেছি, একথা বললেই তারা অব্যাহতি পাবে আর তাদেরকে পরীক্ষা করা হবেনা? আর আমি তাদেরকে পরীক্ষা করেছিলাম যারা পূর্বে অতীত হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ সেই লোকদেরকে জেনে নিবেন যারা সত্যবাদী ছিল এবং জেনে নিবেন মিথ্যাবাদীদেরও।” (সূরা আনকাবুত: ২-৩)

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরো বলেন:

    “তোমরা কি মনে কর যে, (বিনাশ্রমে) জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ তোমাদের ক্ষেত্রে এমন কিছু ঘটেনি যা তোমাদের পূর্ববর্তীদের ক্ষেত্রে ঘটেছে। তাদের উপর এমন এমন অভাব ও বিপদ-আপদ এসেছিল এবং তারা এমন প্রকম্পিত হয়েছিল যে, স্বয়ং রাসূল ও তার মুমিন সাথীরাও বলে উঠেছিল, আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? স্মরণ রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ’র সাহায্য নিকটেই।” (আল বাকারা: ১৪০)

    পূর্ববর্তীদের সকল নবী রাসূল অ তাদের অনুসারীরা ও এই পরীক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রত্যেক মুসলমানকেই এই পরীক্ষা করেন এবং সত্য থেকে মিথ্যা আলাদা করে দেন।

    হযরত আবু হুরাইরা(রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল(সা) বলেছেন, আল্লাহ যে ব্যক্তির কল্যান চান তাকে বিপদে (পরীক্ষায়) ফেলেন, হযরত আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেছেন ইমানদার নর-নারীর জান মাল ও  সন্তানাদির উপর বিপদ আপদ আস্তেই থাকে শেষ পর্যন্ত সে আল্লাহর সমীপে উপস্থীত হয় এমন অবস্থায় যে তার আর কোন গুনাহ থাকে না।

    বিশ্বাস বা কার্যের দৃঢ়তার উপর ভিত্তি করে পরীক্ষা করা হয় যুগে যুগে নবী রাসূলদের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছে দাউদ, ইউসুফ, ইউনুস, ইব্রাহীম (আ) প্রত্যককে পরীক্ষা দিতে হয়েছে।

    “আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয় কিছুটা ক্ষুধা কিছুটা জান-মালের ক্ষতি ও ফল-ফসলের বিনাস্টের মাধ্যমে আপনি ধর্য্যশীলদের সুসংবাদ দিন” (বাকারা-১৫৫)   

    “যদি তোমাদের পিতারা, তোমাদের পুত্ররা, তোমাদের ভাইরা, তোমাদের স্ত্রীরা, তোমাদের আর ঐসব সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছো আর ঐ ব্যবসায় যাতে তোমরা মন্দা পড়ার আশংকা করছো অথবা ঐ গৃহসমুহ যেখানে অতি আনন্দে বসবাস করছো, (এসব কিছু যদি) আল্লাহ ও তার রাসুলের চেয়ে এবং তার পথে সংগ্রাম করার চেয়ে তোমাদের নিকট অধিক প্রিয় হয় তবে অপেক্ষা কর যে পর্যন্ত না আল্লাহ তার (শাস্তির) নির্দেশ পাথিয়ে দেন”। (সুরা তাওবা-২৪)

    আল্লাহ সুবানাহু ওয়া তাআলা তার দাসদের পরিশুদ্ধ করার জন্য পরীক্ষা নিবেন এবং পরীক্ষার বিষয়বস্তু কি হবে সেটাও জানিয়ে দিয়েছেন যতে তের দাসের পরীক্ষা কৃতকার্য হতে পারে। 

    বর্তমানে আমাদের জন্য কুরআন-সুন্নাহ তো আছেই সেই সাথে আরো আছে হক পন্থী ব্যক্তিদের জীবন ইতিহাস যা থেকে আমরা জানতে পারি কি রকমের পরীক্ষা তাদের উপর আপতিত হয়েছে। মৌলিকতার দিক থেকে পরীক্ষাসমমূহ একই, যা অপরিবর্তনীয় কিন্তু যুগের ব্যবধানে পরীক্ষার উপায় উপকরনে শুধু পরিবর্তন আসছে। 

    একজন মুসলিম যখন ইসলাম পালন করবে এবং সেই দাওয়াত সমাজে নিয়ে যাবে সর্বপ্রথম তার বাধা আস্তে পারে পরিবার পরিজন নিকট আত্মীয় থেকে সাহাবীদের ক্ষেত্রে ও ঠিক এমনটা ঘটেছিলো উসায়েত বিন উমায়ের এর মা তাকে বাধে রেখেছিলেন,যাদের মা মাতৃত্বের দোহাই দিয়ে তাকে দ্বীন ত্যাগ করতে বলেছিলেন, ইসলাম পালন ও প্রচারে আমাদের পরিবারও বাধার প্রাচীর হিসেবে দাড়াতে পারে। দাওয়ার কাজের জন্য হয়ত তার পার্থিব স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ক্ষতি হতে পারে। তার চাকুরি চলে যেতে পারে বা হারাম চাকুরির সুজগ আস্তে পারে, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে ইসলামের ডাকে হিজরতের কারনে সাহাবীরদের ব্যবসা, বাড়ীঘর, আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে, মক্কা থেকে মদীনায় চলে যেতে হয়েছিল। দা’ওয়ার কারণে সামাজিক কিছু বাধার মুখে তাকে পড়তে হবে। তাকে সমাজে জঙ্গী, মৌলবাদী, সন্ত্রাসী ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হতে পারে।

    দা’ওয়াকারীকে রাস্ট্রীয় কিছু বাধার মুখে পড়তে হতে পারে। দা’ওয়াহে প্রচার যাতে প্রসারিত না হয় তাই পার্টিকে নিষিদ্ধ করতে পারে। পুলিশি হয়রানী, মামলা, হামলা ইত্যাদির মোকাবেলা করতে পারে। মানসিকভাবে দা’ওয়াহকারীর ওপর চাপ প্রয়োগ করা হতে পারে। তার পরিবারের ক্ষতি, তার ক্ষতি, ক্যারিয়ার নষ্ট ইত্যাদি আসতে পারে।

    দা’ওয়াহকারীর কাছে প্রলোভনও আসতে পারে। এতা সাধারণত হতে পারে পরিবার ও সমাজ থেকে।দা’ওয়াহ ছেড়ে দিলে ভালো চাকরি অথবা পছন্দ অনুযায়ী মেয়ের সাথে বিয়ে অথবা দেশের বাইরে পাঠানোর স্বপ্ন। সবকিছুর পিছনে মূল উদ্দেশ্য থাকে দা’ওয়াহকারী যেন দা’ওয়াহর পথ থেকে ফিরে আসে। 

    দা’ওয়াহকারীর উপর আসতে পারে হামলা, রিমান্ড, জেল, হাজতবাস, নির্যাতন ইত্যাদি। তাকে ভিতিকরভাবে মিডিয়াতে উপস্থাপন, মিথ্যা সিংবাদ পরিবেশন ও এলাকায় নিয়ে আসার মাধ্যমেওন্যান্য দা’ওয়াহকারীদের ওপরও মানসিক নির্যাতন আসতে পারে। এইসবকিছুই রাসূল (সা) ও সাহাবা (রা)-দের উপরও এসেছিল। উনারা অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন ও সাফল্য লাভ করেছেন। ইসলামের প্রথম শহীদ আম্মার ও সুমাইয়াকে মক্কী জীবনে হত্যা করা হয় শুধুমাত্র দা’ওয়াহর কারণে।

    এসকল পরীক্ষাসমূহ যে একজ দা’ওয়াকারীর উপরই আসবে এমন না, বিভিন্ন পরীক্ষা বা একাধিক পরীক্ষা একসাথে আসতে পারে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের প্রত্যেককে তাওফীক দেন এসব পরীক্ষার সময়ে ধৈর্য্য ধারণ করার।

    “তোমরা ধৈর্য্য ও নামাজের সাথে সাহায্য প্রার্থনা করো এবং নিশ্চয়ই এটা বিনয়ীদের ছাড়া অন্যদের জন্য কঠিন কাজ।” (সূরা বাকারা: ৪৫)

    যখন রাসূল(সা)-কে কোন কাজ চিন্তার মধ্যে নিক্ষেপ করত তখন তিনি নামায আরম্ভ করে দিতেন। এমন পরিস্থিতিতে যদি আমরাও পড়ি যেটা আমাদে৪র অনুকূলে নয় তখন আমরা ধৈর্য্য ধারণ করব এবং নামাযের মাধ্যমে আল্লাহ’র সাহায্য প্রার্থনা করব, নিশ্চয়ই আমাদের জন্য একটা উত্তম পথ বের করে দিবেন।

    “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের চিন্তা করো যখন তোমরা সৎপথে রয়েছ, তখন কেউ পথভ্রান্ত হলে তাতে তোমাদের কোন ক্ষতি নাই। তোমাদের সবাইকে আল্লাহ’র কাছে ফিরে যেতে হবে। তখন তিনি তোমাদের বলে দেবেন যা কিছু তোমরা করতে” (সূরা মায়িদা: ১০৫)

    সুতরাং, এই আয়াত থেকে অনেকে এই সিধ্বান্তে পৌছে যে, মুসলিমগণ কেবলমাত্র তার এবং তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল ও তাকে অন্য মুসলিমদের কাছে দা’ওয়াহ বহন না করলেও চলবে।

    হুযায়ফা বিন ইয়ামান (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন: “আমি বললাম যদি কোন মুসলিমের জামা’আত বা ইমাম না থাকে তাহলে কি হবে? তখন তিনি (সা) বললেন, অতঃপর তুমি সেসমস্ত দল পরিত্যাগ করবে, যদিওবা তোমাকে কোন গাছের গুঁড়ি কামড়ে ধরে রাখতে হয় যতক্ষণ না তোমার মৃত্যু এসে যায়”।

    লোকেরা এটি ধারণা করেছে যে, যখন মুসলিমদের খলীফা থাকবে না তখন মুসলমানদের জন্য খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা ফরয নয় বরং এ অবস্থায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে ফেলবে।

    এ আয়াত ও হাদীসগুলো ভুলভাবে বুঝার কারণে সবর সম্পর্কে মানুষের প্রচলিত ধারণাটি ভুল। যার কারণে আমরা দেখি বর্তমান শাসকদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা, সৎ কাজের আদেশ এবং অসত কাজের নিষেধ, খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক সংগ্রাম করা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আল্লাহ’র আনুগত্য করে যাওয়া ইত্যাদি সবর হিসেবে গণ্য হয়না। 

    বরঞ্চ ব্যক্তিগত কিছু আমল আখলাক পালন করা, সামাজিক বিষয়াদিতে হস্তক্ষেপ না করা, শাসকের বিরোধীতা না করা এবং বর্তমান কুফর ব্যবস্থায় অত্যন্ত নির্লিপ্তভাবে জীবনযাপন করাই সবর হিসেবে গণ্য করা হয়।

    প্রকৃতপক্ষে এগুলোর কোন্টাই সবর নয়। সবরের প্রকৃত শিক্ষা আমাদের নিতে হবে নবী-রাসূল ও সাহাবা এবং পূর্ববর্তী দা’ওয়াহকারীদের থেকে।

    সবর হল আল্লাহ’র প্রত্যেকটি হুকুম পালন করা এবং হুকুম পালনের ক্ষেত্রেকোন প্রতিবন্ধকতা আসলে ধৈর্য্য ধারণ করা ও কাজ চালিয়ে যাওয়া। বিলাল, মুস’আব, আম্মার, খাব্বাব ও অন্যান্য সকল সাহাবী থেকেও আমরা এই শিক্ষা পাই।

    সবর হল আনসার ও মুহাজিরদের সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যে এক ইলাহ’র সাক্ষ্য দেওয়া ও দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যাওয়া।

    সবর হল বিলাল (রা)-এর সমস্ত বাঁধার মুখেও বিশ্বাসে উপর অটল থাকা।

    সবর হল আবদুল্লাহ ইবনে মাস’উদের (রা) কাফের শাসকগোষ্ঠীর সামনে কুর’আন তিলাওয়াত করা ও এর পরিণতি ভোগ করা।

    সবর হল আবদুল্লাহ বিন হুযায়ফার (রা) অত্যাচারী-অবিশ্বাসী শাসকের সামনে আল্লাহ’র মর্যাদাকে উর্ধে তুলে ধরা।

    আমরা ইসলামের চৌদ্দশত বছরের ইতিহাসে দেখি সবর মানে আল্লাহ’র পথে দা’ওয়াত দিয়ে যাওয়া এবং কোন বাধা এলে ধৈর্য্যধারণের মাধ্যমে আল্লাহ’র সন্তুষ্টি অর্জন করা, কখনোই আনুগত্য প্রদর্শন থেকে সরে যাওয়া নয় বা ইসলাম প্রচারের কাজ বন্ধ রাখা সবর নয়।

    সবরকারীদের মর্যাদা আল্লাহ’র নিকট অত্যন্ত উঁচুতে। সবরকারীদের আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বিনা হিসেবে পুরষ্কার দান করবেন।

    ইমাম যায়নুল আবেদীন (র) বলেনঃ কিয়ামতের দিন একজন আহ্বানকারী দাক দিয়ে বলবেন- ধৈর্য্যশীলগণ কোথায়? আপনারা উঠুন এবং বিনা হিসেবে বেহেস্তে প্রবেশ করুন। একথা শুনে কিছু লোক দাঁড়িয়ে যাবেন এবং বেহেস্তের দিকে অগ্রসর হবেন, ফেরেশতাগণ তাদের দেখে জিজ্ঞেস করবেন কোথায় যাচ্ছেন? তাঁরা বলবেন, ‘বেহেস্তে’। ফেরেশতাগণ বলবেন, এখনো তো হিসেব দেয়াই হয়নি। তাঁরা বলবেন, ‘হা, হিসেব দেয়ার পূর্বেই’। ফেরেশতারা বলবেন , আপনারা কিরকম লোক? তাঁরা বলবেন আমরা ধৈর্য্যশীল লোক, আমরা সর্বদা আল্লাহ’র নির্দেশ পালনে লেগে ছিলাম, তাঁর অবাধ্যতা এবং বিরুদ্ধাচরণ হতে বেঁচে থাকতাম, মৃত্যু পর্যন্ত আমরা তাঁর উপর ধৈর্য্যধারণ করেছি এবং অটল থেকেছি। তখন ফেরেশতাগণ বলবেন, বেশ, ঠিক আছে। আপনাদের প্রতিদান অবশ্যই এটাই এবং আপনারা এর যোগ্য। যান, বেহেশতে গিয়ে আনন্দ উপভোগ করুন।

    হযরত আবু ইয়াহইয়া সুহাইর ইবনে সিনান (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেছেন: “মুমিনদের ব্যাপারটা খুবই বিস্ময়কর। (কেননা) তার সকল কাজই কল্যাণপ্রদ। মুমিন ছাড়া অন্যের ব্যাপারগুলি এরকম নয়। তার আনন্দের কিছু ঘটলে সে আল্লাহ’এ শোকরগুজারী করে, তাতে তার মঙ্গল সাধিত হয়। পক্ষান্তরে ক্ষতিকর কিছু ঘটলে সে ধৈর্য্য অবলম্বন করে। এটাও তার জন্য কল্যাণকরই প্রমাণিত হয়”। (মুসলিম)

    আবু তালিম

  • ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কি আমাদের সশস্ত্র লড়াইয়ে অবতীর্ন হতে হবে?

    যদিও মুসলিমরা ১৯২৪ সালে তাদের রাষ্ট্র হারিয়েছিল তাদের হৃদয়ে তাদের দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা টিকে ছিল ঠিকই এবং এর দ্বারা বিভিন্ন ইসলামী আন্দোলনের সৃষ্টি হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল খিলাফতের পুনঃআগমনের মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। এইসব আন্দোলনগুলো খিলা-ফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতির কথা বলে এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ এই মহান দায়িত্ব পালনের জন্য জিহাদকেই একমাত্র পথ দাবি করে। যারা এই পদ্ধতি অনুসরণ করেন তাদের আন্তরিকতা ও ত্যাগ সন্দেহের উর্ধ্বে। বর্তমানে যেহেতু অধিক থেকে অধিকতর মানুষের এই দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে এবং এই দায়িত্ব পালন করতে তারা সঠিক পদ্ধতির খোঁজ করছেন। তাই এই সকল পদ্ধতি কুরআন ও সূন্নাহ’র আলোকে মূল্যায়ন করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সুতরাং এই প্রবন্ধে আমি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় “জিহাদ” এই বিষয়ে আলোচনা করব।

    যারা মুসলিম ভূমির বর্তমান শাসকদের অস্ত্রের মাধ্যমে সরানোর কথা বলেন তারা এইসব দেশের শাসকদের কাফির হিসেবে গণ্য করেন। কারণ তাঁরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার আইন অনুসারে শাসন করে না। তাঁরা প্রমাণ হিসেবে কুর’আনের নিচের আয়াতটি উল্লেখ করেন,

    “এবং যারা আল্লাহর যা অবতীর্ণ করেছেন তা দিয়ে বিচার ফয়সালা করেনা তারা কাফের” (আল মায়িদা-৪৪)

    অতঃপর তাঁরা এই শাসকদের মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) অ্যাখ্যা দেয় এবং বলেন যে মুসলিমদের অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে জিহা-দ করতে হবে কারণ রাসূল (সা) একটি হাদীসে বলেছেন “যে ধর্ম ত্যাগ করে তাকে হত্যা কর যতক্ষন না সে প্রায়শ্চিত্ত করে”। এছাড়াও তারা একটি হাদীস বলেন যা মুসলিমদের আদেশ করে তাদের শাসকদের সাথে জিহা-দ করতে যখন তাদের মধ্যে প্রকাশ্য কুফরি দেখা যায়। বুখারিতে বর্ণিত জুনাদা বিন আবি উমাইয়া এর বরাতে, তিনি বলেন, “আমরা উবাদাহ ইবনুস সামিত এর কাছে গেলাম যখন তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং আমরা বললাম আল্লাহ আপনাকে হিদায়াহ দান করুন। আপনি আমাদেরকে রাসূল (সা) এর একটি হাদীস বলুন যার মাধ্যমে আল্লাহ আপনাকে উপকৃত করবেন। তিনি বলেন, “একদা আল্লাহর রাসূল (সা) আমাদের সকলের কাছ থেকে বা’ইয়াহ (শপথ) নিলেন যে যাতে আমরা সুখে দুঃখে তার কথা শুনি এবং মানি, সহজ, কঠিন এবং খারাপ অবস্থাতেও যাতে তাঁর আনুগত্য করি। আমরা আরো শপথ করেছি যে আমরা কখনো শাসকদের সাথে বিবাদে যাবনা যতক্ষন পর্যন্ত না তাদের মাঝে সুস্পষ্ট কুফর পরিলক্ষিত হচ্ছে, আমাদের কাছে যা আল্লাহ কতৃক প্রমাণিত।

    অন্য একটি হাদীসে রাসূল (সা) বলেন, “তোমাদের সর্বোত্তম নেতা (ইমাম) আমীর হচ্ছে তারা যাদের তোমরা ভালবাস এবং তারাও তোমাদের ভালবাসে, যারা তোমাদের জন্য দোয়া করে এবং তোমরা তাদের জন্য দোয়া কর। আর তোমাদের সবচেয়ে মন্দ/খারাপ নেতা হচ্ছে তারা যাদের তোমরা ঘৃণা কর এবং তারাও তোমাদেরকে ঘৃণা করে। যাদেরকে তোমরা বদ-দোয়া কর এবং তারাও তোমাদের জন্য বদ-দোয়া করে। তাকে (সা) কে জিজ্ঞেস করা হল, “হে আল্লাহর রাসূল (সা) আমরা কি তাদের তরবারী দ্বারা অপসারণ করবনা?” তিনি বলেন, “না, যতক্ষন না তারা তোমাদের মাঝে সালাত প্রতিষ্ঠিত রাখে এবং যদি তোমরা তাদেরকে এমন কাজ করতে দেখ যা তোমরা ঘৃণা কর তাহলে তার কাজকে ঘৃণা করিও এবং তার কাছ থেকে আনুগত্যের হাত সরিয়ে নিওনা” (সহীহ মুসলিম)। উপরের হাদীসটি এটাই অর্থ করে যে,ঐ শাসক যে প্রকাশ্য কুফরি করে এবং আল্লাহ ব্যাতিত অন্য আইনে শাসন করে তার সাথে অবশ্যই যুদ্ধ করতে হবে এবং তার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। তার মানে কি আমরা বর্তমানে শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব? কারণ তারা শরীয়াহ দ্বারা শাসন করছেনা।

    প্রথমত, আমরা ঐ দাবী টা দেখি যে বর্তমান শাসকরা মুর্তাদ হয়ে গেছে কারণ তারা আল্লাহর আইন দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করছেনা । ইবনুল কাইয়্যিম এই ব্যাপারে যে সঠিক মতটি দিয়েছেন তা হল:

    “সঠিক মত হল যে, আল্লাহ প্রদত্ত আইন ছাড়া অন্য কোনো আইনে শাসন করা বড় এবং ছোট উভয় কুফরীর অন্তর্ভূক্ত, এটা নির্ভর করে যে বিচার করে তার অবস্থানের উপর। যখন সে মনে করে যে ‘আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা দ্বারা বিচার করা বাধ্যতামূলক’ কিন্তু সে এই পথ থেকে অবাধ্যতার দরুন সরে যায় এবং এটা স্বীকার করে যে এই জন্য তাকে শাস্তি পেতে হবে তাহলে এটি হবে ছোট কুফর। কিন্তু সে যদি মনে করে যে ‘এটা বাধ্যতামূলক না’ এবং পছন্দের মালিক সে নিজে যদিও সে নিশ্চিত যে এটাই আল্লাহর আইন তাহলে এটি বড় কুফর” (মাদারীজ আস সালিকীন, ১/৩৩৬-৩৩৭)

    আমরা ইবনুল কাইয়্যিম এর মতের সাথে আরো যোগ করতে পারি যে, যখন আমরা সূরা মায়িদার ঐ পরিচ্ছেদ পড়ি যেখানে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো আইন দ্বারা শাসনের কথা বলা হচ্ছে, আমরা দেখি যে যারা তাঁর আইন অনুসারে বিচার ফায়সালা করেনা তাদের তিনি কাফির, জালিম ও ফাসিক বলেছেন। তাই যদি একজন শাসক কুফর দ্বারা শাসন করে দূর্নীতির কারণে অথবা বিরোধীদলের ভয়ে অন্যায় করে যদিও স্বীকার করে যে তার এই কাজ গুনাহ এবং ঘৃণা/নিন্দাযোগ্য তবে সে হবে ফাসিক, জালিম বা কাফির নয়। অন্যদিকে সে যদি কুফর দ্বারা শাসন করে এবং এটা বিশ্বাস করে যে আল্লাহর আইন দ্বারা শাসন করা বাধ্যতামূলক নয় অথবা কুফরী আইন আল্লাহর আইনের চেয়ে ভালো তবে সে নিজেকে ইসলামের বন্ধন থেকে ছিড়ে ফেলল এবং সে মুরতাদ হয়ে গেল। পরের ভাগটিকে প্রমাণ বা প্রতিষ্ঠা করতে আমাদের কাছে স্পষ্ট যে হাদীস আছে তা হল,

    “যতক্ষন আমরা স্পষ্ট কুফর দেখতে পাব যার পক্ষে আমাদের কাছে আল্লাহ কর্তৃক দলীল আছে”

    তাছাড়া কাউকে কাফির তকমা লাগিয়ে দেওয়া (কোন প্রকাশ্য দলীল ছাড়া) ইসলামে জায়েজ নেই। এছাড়াও তারা যদি কাফির হয়ে থাকে আমাদের জিজ্ঞাসা করা উচিত যে ‘উম্মাহর মধ্যে থেকে কিছু মানুষ অথবা গোষ্ঠী বা দল কি খলীফা বা ইমামের অনুপস্থিতিতে এবং তার অনুমতি ছাড়া মুরতাদের শাস্তি প্রয়োগ করতে পারে? আমরা জানি যে, মুরতাদের শাস্তি সহ অন্য সব হুদুদ বাস্তবায়ন করা ইমামের একচ্ছত্র দায়িত্ব। যদিনা অন্য কোথাও বিশেষভাবে এর বর্ণনা থাকে। রাসূল (সা) এর নিচের হাদীসটি এই ব্যাপারটি পরিস্কার করে,

    “ইমামের অনুপস্থিতিতে (রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ব্যতিত) কারো অধিকার নেই হুদুদ বাস্তবায়ন করা”। (বায়হাকী কর্তৃক তাঁর সুনানে বর্ণিত)

    ইমাম তাহাবীও মুসলিম ইবন ইয়াসার থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেন, “যাকাত (সংগ্রহ), হুদুদ (বাস্তবায়ন), গনীমত (যুদ্ধলব্ধ দ্রব্যাদি (বন্টন), জুমা (ইমামতি), এগুলো হল ইমাম (সুলতান) আমীরের”।

    দ্বিতীয়ত, আমাদেরকে যে সব শাসক প্রকাশ্যে কুফর করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যে হাদীসে আদেশ করা হয়েছে তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে বুঝা উচিত। আমরা যদি একটু সচেতনভাবে ঐ হাদীসটির দিকে তাকাই তাহলে দেখবো যে এখানে ঐ শাসকের কথা বলা হয়েছে যারা জনগণের বৈধ বা’ইয়াহ নিয়ে এসেছে এবং তারা ইসলাম অনুসারে শাসন করত কিন্তু পরবর্তীতে কুফর দ্বারা শাসন করতে থাকে। তার মানে হচ্ছে আমাদের যুদ্ধ করতে হবে খলীফার সাথে যখন খিলা-ফত প্রতিষ্ঠিত থাকবে কিন্তু খলীফা পরিস্কার কুফর করবে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট এই হাদীসের প্রেক্ষাপট থেকে ভিন্ন। বর্তমানে আমরা এমন একটা সময়ের মধ্যে আছি যেখানে খিলাফত ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তা কুফর শাসন দ্বারা পুরোপুরি প্রতিস্থাপিত হয়েছে। বর্তমান শাসকেরা কখনোই জনগন থেকে শর’ঈ বা’ইয়াহ নেয়নি। তাদের কেউই মোটেও ইসলামকে বাস্তবায়ন করেনি। এমনকি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ইসলামকে বাস্তবায়নের কোনো চেষ্টাও করেনি। তাই বর্তমানে আমাদের কাজ শুধুই বিপদগামী শাসককে প্রতিস্থাপন করার চাইতেও অনেক বড়। বরং এটি হচ্ছে সমস্ত কুফর ব্যবস্থা যা মুসলিম ভূমিগুলোতে আরোপিত আছে তাকে সমূলে উৎপাটন করা এবং খিলাফাহ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এইসব আন্দোলনগুলো যেগুলো ইসলামী খিলাফাহ কে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে জিহাদের পক্ষালম্বন করে তারা তাদের পদ্ধতিকে ঠিক প্রতিয়মান করতে শরীয়ার একটি মূলনীতি বলে থাকে যা হল-

    “কোন ফরয কাজের জন্য যা করতে হয় তাও ফরয”।

    কিন্তু এটি নিতান্তই ভ্রান্ত যে, কোন সাধারণ মূলনীতি দিয়ে কোন একটি বিশেষ ইস্যুর নির্দিষ্ট মত (হুকুম) দেয়া এবং এই ইস্যুকে নিয়ে অন্যান্য যা বিশেষ টেক্সট আছে তাকে বাদ দেওয়া অথবা কোন বিশেষ টেক্সট না থাকলে ইসলামের অন্যান্য মূলনীতিকে গ্রাহ্য না করা। ড. হেকাল যিনি আমাদের আলোচ্য বিষয় নিয়ে একটি থিসীস করেছিলেন। তিনি শুধুমাত্র একটি ইস্যুতে এই পদ্ধতিতে পরস্পর বিরোধী উপসংহারে আসে তা বিবৃত করেছেন। উদাহরণস্বরূপ এই ইস্যু যা হল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ‘অস্ত্রের ব্যবহার’। এটা অনেকে বলতে পারে যে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ কারণ এটা রাসূল (সা) এর হাদীস থেকে প্রমাণিত “যে আমাদের (মুসলিমদের) দিকে অস্ত্র উত্তোলন করে সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয়”। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ফরয এবং এটি প্রতিষ্ঠা কখনোও সম্ভব নয় অস্ত্র ছাড়া যা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। এখানে একই ইস্যুতে বৈধ-অবৈধ উভয়ই বিষয় চলে আসছে এবং ইসলামের একটি মূলনীতি হল “যখন কোনো একটি ইস্যুতে বৈধ-অবৈধ উভয় বিষয় চলে আসে তবে অবৈধতা বৈধতাকে অগ্রাহ্য করবে। তার মানে তখন একজনকে অবশ্যই অবৈধতার হুকুম অনুসারে কাজ করতে হবে এবং তখন অস্ত্র ব্যবহার অবৈধ হবে”। এছাড়া কিছু মানুষ বলতে পারে যে আল্লাহর আইন প্রয়োগের জন্য এই ফরয পালন/বাস্তবায়ন একটি সওয়াবের কাজ এবং যা নিষিদ্ধ তা করা মানে উম্মাহর রক্ত প্রবাহিত করা গুনাহ/ফাসিকি। ইসলামী শরীয়াহ বলে যে “ফাসিকি বা গুনাহকে বাধা দেয়া/ দমন করা আমাদের সওয়াব অর্জনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। “যে কাজ ফরয তা করতে যা করার দরকার হয় তাও ফরয” এটি তখনই নেয়া যাবে যখন এই ইস্যুতে কোন পার্থক্য থাকবেনা যে এটি অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে এবং এটি বৈধ কোনো মাধ্যম ছাড়া অর্জন করা যাবেনা। তখনই কেবল বলা যায় যে “কোন ফরয কাজের জন্য যা করতে হয় তাও ফরয”। তার মানে কোন বৈধ কাজ যা কোন ফরয কাজ করার মাধ্যম হিসেবে গণ্য হয় তখন ঐ কাজটি ফরয হয়ে যায়। কিন্তু যখনই এই ফরয কাজটি এমন কোন কাজ ছাড়া করা সম্ভব নয় যা নিজ থেকেই নিষিদ্ধ যেমনটা আমরা এই প্রবন্ধে যা নিয়ে আলোচনা করছি অস্ত্রের ব্যবহার সম্বন্ধে- অমারা কি এখন এই ফরযটি পালন করতে এই কাজটি করতে পারি শরীয়ার এই মূলনীতিকে বাদ দিয়ে? আল্লাহর শপথ না! যতক্ষন পর্যন্ত এই কাজটি অন্য আরেকটি মূলনীতি“ প্রয়োজনীয়তা নিষিদ্ধ/ অবৈধকে বৈধ করে” এর দ্বারা আচ্ছন্ন হয়। হ্যাঁ, তবে যদি এই সম্বন্ধে তথা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অস্ত্রের ব্যবহার সম্পর্কে কোন বিশেষ টেক্সট বা দলিল থেকে থাকে এবং যা অস্ত্র ব্যবহারের সাধারণ মূলনীতিতে এই বিষয়কে অন্তর্ভূক্ত করা থেকে বিরত রাখে তাহলে এই দলীলটি হবে ব্যাতিক্রম এবং এটি “যা ফরয তা পালন করতে যা করতে হয় তাও ফরয” এই মূলনীতিতে পড়ে না। সংক্ষেপে শুধুমাত্র ‘ফরয পালন করতে যা করতে হয় তাও ফরয’ এই মূলনীতিকে দলীল হিসেবে ব্যবহার করে এবং অন্যান্য যে নির্দিষ্ট দলীলগুলো আছে তা অগ্রাহ্য করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধকেই একমাত্র পন্থা হিসেবে বেছে নেওয়াকে আমরা সমর্থন করতে পারি না। এছাড়াও যারা মুসলিম ভূমিতে সশস্ত্র যুদ্ধের কথা বলে তারা আরেকটি যুক্তি দেয় যে, মুসলিম ভূমিগুলো আজ দখলকৃত এবং জিহা-দ এখন ফারদুল আইন হয়ে গেছে। সেজন্য প্রত্যেক মুসলিমকেই এই দখলকৃত ভূখন্ডগুলোকে মুক্ত এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে যুদ্ধ করতে হবে। এই যুক্তি জিহাদের বাধ্যবাধকতা ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাধ্যবাধকতা এক করে ফেলে যেখানে এই দুটি পুরোপুরি ভিন্ন কর্তব্য এবং সেগুলো সম্পাদনের কর্মপদ্ধতিও ভিন্ন। জিহা-দ প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরযে আইন হয়ে যায় যখন মুসলিমদের ভূমি দখল হয়ে যায় এবং ঐ ভূমির প্রত্যেক মুসলিমকেই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা থাক বা না থাক রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে জিহাদ করতে হয়। কিন্তু অন্যদিকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না থাকলে তা প্রতিষ্ঠা করা ফরয হয় যদিও রাষ্ট্রটি বাইরের শত্রু দ্বারা দখলকৃত থাক বা না থাক। অনেকে আবার অনেক দূরে এগিয়ে বলে বর্তমানে প্রত্যেক মুসলিম ভূমি দখলকৃত কারণ এদের শাসকেরা উম্মাহর শত্রু। তাই প্রত্যেক মুসলিমের জন্য এই উম্মাহর শত্রু“দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ভূমি মুক্ত করা আবশ্যক। তাদের এই ধারণাটি দখলের প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ ভূল। একটি ভূমি তখনই দখল হয়ে যায় যখন তা কোন অমুসলিম বাহ্যিক শক্তি দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং মুসলিমদের কাছ থেকে সব ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ফিলিস্তিন, আফগানিস্থান ও ইরাকের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। শুধুমাত্র সে ক্ষেত্রে জিহাদ করা প্রত্যেকের উপর ফরয হয়ে যায়। তাই বর্তমানে যেহেতু কোন মুসলিম দেশের শাসকেরা ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়ন করছেনা তাই সব মুসলিম দেশই দখলকৃত এটা বলা ভূল কারণ ঐসব ভূমির কর্তৃত্ব এখনও মুসলিমদের হাতে যারা তাকে বাইরের শত্রু“র আক্রমন থেকে রক্ষা করে। তাই এই অবস্থা একমাত্র কার্যকর হবে যখন বিদেশী সেনারা ঐ ভূমি দখল করবে। যখন মুহাম্মদ (সা) মক্কায় দাওয়াহ করছিলেন তখন আবদুর রহমান ইবন আউফ (রা) অন্যান্য কিছু সাহাবাদের সাথে এসে আল্লাহর রাসূল (সা) থেকে যুদ্ধের অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু রাসূল এই বলে নিষেধ করেন যে,

    “প্রকৃতপক্ষে আমি ক্ষমার জন্য আদিষ্ট হয়েছি, তাই মানুষের সাথে যুদ্ধ করিওনা” (ইবনে আবি হাতিম এবং আন নাসাই ও আল হাকিম কর্তৃক বর্ণিত)।

    সুতরাং আমরা মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধের জন্য আদিষ্ট হইনি। বরং আমাদেরকে রাসূল (সা) মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে যেসব কাজগুলো করেছেন তাই অনুসরণ করতে হবে। রাসূল (সা) এর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বের দাওয়াহ কে আমরা তিনটি পর্যায়ে ভাগ করতে পারি। প্রথম পর্যায় হচ্ছে গোপনে একটি নির্দিষ্ট গ্রুপ তথা সাহাবাদেরকে (রা) ইসলামী চিন্তা-ধারণা এবং আবেগ দ্বারা পরিচালিত করা এবং তাঁদেরকে ইসলামের বার্তা ছড়ানোর জন্য প্রস্তুত করা।

    দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হল তখন থেকে যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা রাসূল (সা) কে প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের নির্দেশ দেন। এটি হচ্ছে তখন যখন রাসূল (সা) প্রকাশ্যে কুরাইশদের জীবন ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং তাদের সর্দারদের বিরুদ্ধে কথা বলেন। এই পর্যায়টি ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের। শেষ পর্যায়ে মুহাম্মদ (সা) বিভিন্ন আরব গোত্রের কাছে যান সামরিক সহযোগিতা (নুসরাহ) এর সন্ধানে যতক্ষন পর্যন্ত না মদীনার “আওস ও খাজরাজ” সমর্থন দিতে শপথ করে। (বিস্তারিত জানতে নবী (সা) এর দ্বীন কায়েমের পদ্ধতি দেখুন)।

    পরিশেষে, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সশস্ত্র জিহাদ বা যুদ্ধের কোনো দলীল প্রমাণিত হল না। বরং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জিহা-দকে আল্লাহর রাসূল (সা) বিশেষভাবে নিষেধ করেছেন। তার পরিবর্তে রাসূল (সা) ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি সুনির্দিষ্ট পথ আমাদেরকে দেখিয়েছন এবং আমাদের কঠোরভাবে এই পদ্ধতির সাথে জুড়িয়ে থাকতে হবে ও লক্ষ্য রাখতে হবে যেহেতু এটি একটি শরয়ী বাধ্যবাধকতা তাই যেন এই পথ থেকে আমরা বিন্দুমাত্র ও সরে না যাই।

    মূল: শফিউল হক

    তথ্যসূত্র:
    আল জিহাদ ওয়াল কিতাল ফি আস-সিয়াসা আস শারীয়া > ড. মুহাম্মদ খায়ের হেকাল।

  • বিশ্বাসের একটি ভাষা আছে

    ওই শিক্ষক একজন পাদ্রীকে জিজ্ঞেস করলেন: “তোমাদের কি এমন কোন উক্তি জানা আছে যা শতভাগ ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছেন তাতে নিশ্চিত?”

    পাদ্রী ঈষৎ লজ্জিত বোধ করলেন কিন্তু সততার সাথে উত্তর দিলেন যে, “এমন কোন উক্তি জানা নেই যা পরিপূর্ণভাবে যাচাই করা যায়- কেননা তিনি যে ভাষায় কথা বলতেন তা হারিয়ে গেছে।”

    এরপর পাদ্রী জিজ্ঞেস করলেন, “মুসলিমদের আছে কি”?

    “তোমাদের কি এমন উক্তি জানা আছে যা শতভাগ মুহাম্মাদ [সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] বলেছেন নিশ্চিত?”

    ওই শিক্ষক মৃদু হাসলেন। আর বললেন, “আমাদের কেবল আমাদের নবীর [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] সুনিশ্চিত আর সন্দেহাতীত কথা সম্বলিত বইয়ের সংগ্রহশালাই রয়েছে তা নয়, আমাদের একটি বিজ্ঞান [science] রয়েছে, যার নাম ‘তাজওয়ীদ’ [Tazweed]”। তাজওয়ীদ এর পড়াশুনা হচ্ছে, প্রত্যেকটি ধ্বনি আর বর্ণ যেভাবে নবী [সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] উচ্চারণ করতেন তদানুযায়ী শিক্ষা দেয়া!”

    সকল প্রশংসা আল্লাহ্ তা’আলার, যিনি আমাদের দ্বীনকে এভাবে হিফাজত করেছেন।

    কিন্তু, ভাই ও বোনেরা আমরা কি আল্লাহ্ এবং তার রাসূলের বাণীকে হিফাজত করায় আমাদের করণীয়টুকু করছি? রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “প্রচার করো! একটি আয়াহ্ হলেও।” কিভাবে আমরা তা করতে সমর্থ হবো যদি আমরা নিজেরাই অবতীর্ণ আয়াহ্’টি না বুঝি? কিভাবে আমরা তা জানি এমন ধারনা করতে পারি যখন আমরা যে ভাষায় তা অবতীর্ণ হয়েছে সে ভাষাটিই বুঝি না। আর আল্লাহ্ আর তার রাসূল (সা) এর মিশনকে সফল করতে হলে আমাদের উপর ইসলামের ভাষা [আরবী] শিখা আবশ্যক।

    অন্যদের ইসলাম শিক্ষা দেয়া- একটি আয়াহ্ হলেও পৌছানোর পাশাপাশি আমাদের মাথায় রাখতে হবে; আমরা যেনো আরও একটি প্রজন্ম এই বিপাকে ধ্বংস না করি। দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষার হার বাড়ানো আর দ্বীনের শিক্ষাব্যবস্থা উভয়ক্ষেত্রে আমাদের জাতিগোষ্ঠীগুলো যেনো এগিয়ে আসে তা নিশ্চিত করতে হবে; যাতে আমরা সঠিক পথপ্রাপ্ত জাতি হিসেবে এগিয়ে যেতে পারি।

    কুরআন হলো আল্লাহ্’র সাথে আমাদের সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম; যাতে এর মাধ্যমে তিনি আমাদের তার নির্দেশিত পথের দিশা দান করতে পারেন। কিন্তু এই যোগাযোগ [communication] কি সত্যিই ঘটছে? যোগাযোগের উপর যে কোন পাঠ্য দেখলে আমরা দেখতে পাব, যোগাযোগ [communication] হচ্ছে প্রেরিত বার্তা প্রাপকের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছা আর তা সঠিকভাবে গ্রহণ করা তেমন অর্থবহভাবে; যেমন প্রেরকের উদ্দীষ্ট ছিলো। কিন্তু তা যদি শ্রবণের সমস্যার কারণে কিংবা অমনযোগিতার কারণে কিংবা ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার কারণে যথার্থভাবে না পৌঁছে তবে সত্যিকার যোগাযোগ সম্পন্ন হয়েছে বলা যাবে না। এই ব্যাপারটি আল্লাহ্ এবং তার রাসূলের বাণীর ক্ষেত্রে ও প্রযোজ্য। আমরা কি সত্যিই আল্লাহ্’র সাথে যোগাযোগের অবকাশ রেখেছি যখন আমরা তার বাণীর মর্মার্থই উপলব্ধি করতে পারি না?

    কেবল সরলীকৃত আর দুর্বল ইংরেজীতে অনূদিত কুরআন পড়ে আমরা কখনোই কুরআন পরিপূর্ণভাবে বুঝতে সমর্থ হবো না। প্রত্যেক ভাষার নিজস্ব কিছু স্বকীয়তা আর নিগূঢ়তা রয়েছে যা কখনোই অনুবাদ করা সম্ভবপর নয় আর কুরআনের আরবীর ক্ষেত্রে তা অকল্পনীয়। এ প্রসঙ্গে জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহিমাহুল্লাহ্’র একটি উক্তির ভাবার্থ উল্লেখ করতে চাই। তিনি যা বলেন তার ভাবার্থ অনেকটা এমন: “কেউ যদি আল্লাহ্’র সাথে তার সৃষ্টির দুরত্ব উপলব্ধি করতে পারে, তবে কুরআনের সাথে কুরআনের অনুবাদের পার্থক্য ও উপলব্ধি করতে পারবে।“

    আজ যদি রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কারো সাথে সরাসরি কথা বলতেন- আর স্বভাবতঃই তিনি তা আরবীতে বলতেন-তবে কি সে তা বুঝতে সমর্থ হতো? কিংবা তার কি অনুবাদক এর প্রয়োজন পড়তো? অথচ সে চাইতো প্রতিটি মুহুর্ত, প্রতিটি উপদেশ বুঝতে, ধরে রাখতে কিন্তু পারতঃপক্ষে তাকে অসহায়ভাবে দাড়িয়ে থাকতে হতো, তার সাথে যোগাযোগ করা কিংবা তার প্রজ্ঞা বুঝা সম্ভবপর হতো না; আরবী না জানার কারণে।

    আর যারা তার সংস্পর্শ পেয়েছিলো তারা এর [কুরআন] ছোঁয়ায় বদলে গিয়েছিলো। হাবশায় মুসলিমদের প্রথম হিজরতের পরপরই রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবার নিকটে সুরা নাজম তিলাওয়াত করেছিলেন আর তা মুসলিম-কাফির সকলেই তা সমবেতভাবে শুনেছিলো আর তাতে বিমুগ্ধ হয়ে পড়েছিলো।

    আর তিনি যখন চুড়ান্ত এই আয়াহ্’য় পৌঁছলেন:

    “তোমরা কি এই বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করছ? এবং হাসছ-ক্রন্দন করছ না? তোমরা ক্রীড়া-কৌতুক করছ, অতএব আল্লাহকে সেজদা কর এবং তাঁর ইবাদত কর।” [সুরা নাজম: ৫৯-৬২]

    তৎক্ষনাৎ, রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিজদায় লুঠিয়ে পড়লেন আর উপস্থিত মুসলিমরা সকলেও তার অনুসরনে আল্লাহ্’র নিকট সিজদায় পড়ে গেলেন।

    এখন, এ ব্যাপারখানি একটু ভাবুন যা তৎপরবর্তীতে ঘটেছিলো! সকল উপস্থিত কাফিররাও আল্লাহ্’র সামনে সিজদারত হলো। তারা কুরআনের সৌন্দর্য আর বৈচিত্র্যে এতটাই বিমোহিত হয়েছিলো এতে অন্তর্নিহিত সত্যকে অস্বীকার করতে পারে নি!

    “আমি একে আরবী ভাষায় কোরআন রূপে অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পার।” [সুরা ইউসুফ:০২]

    এখানে, কেবল একটি উদাহরণ দেয়া হলো যাতে এই ব্যাপারটি পরিচ্ছন্ন হয় যে, কুরআনের অনুবাদ অসম্ভব।

    সুরা আবাসায় আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইয়ামুল কিয়ামাহ্’র কথা বলেছেন এভাবে:

    “অতঃপর যেদিন কর্ণবিদারক নাদ আসবে,” [সুরা আবাসা:৩৩]

    এখানে, বিকট শব্দের [কর্ণবিদারক নাদ] জন্য ব্যবহৃত আরবী শব্দ হলো “সাখখাহ্” [الصَّاخَّةُ]- শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া-যা পুনরুত্থানের ঘোষনা দিবে আর মানবসকলের দুনিয়ার সকল কাজের প্রতিদানের; যার ফলে অবিশ্বাস্য রকমের মোহাচ্ছন্নতার  অবতারনা ঘটাবে।

    الصَّاخَّةُ এই শব্দটি দেখে কেউ ভাবতে পারে এটিকে দুটি দ্বিরুক্তি কিংবা ধ্বনির মাধ্যমে উচ্চারণ করা হবে। কিন্তু আরবীতে الصَّاخَّةُ শব্দটি ছয় পর্যন্ত টেনে পড়া হয়। এর তিলাওয়াত শুনলেই ব্যাপারটি পরিচ্ছন্ন হবে। এই শব্দের তিলাওয়াত এমন যে শব্দটিই যেনো শিঙ্গায় ফুঁকদানের বিষয়টিকে প্রাণবন্ততা দেয়। কিন্তু ইংরেজীতে ‘deafening noise/deafening Blast’ [বিকট শব্দ] কে টেনে পড়ার কোন সুযোগ নেই; সুতরাং আল্লাহ্ আজ্জা ওয়া জাল যে শক্তিশালী অর্থ এখানে উদ্দেশ্য করেছেন তা আমরা কখনোই পাব না। কেবল যে আরবী ভাষা বুঝে সেই আল্লাহ্’র বাণীর সত্যিকার ক্ষমতা উপলব্ধিতে সমর্থ হবে; যা অত্যন্ত সতর্কতা আর সুগভীরতার সাথে তিনি আমাদের জন্য নির্বাচন করেছেন।

    আরেকটি উদাহরণ, ধরুন আপনি একজন ইংরেজীভাষী আর একজন মনিব তার ভৃত্যকে বলছে “আমাকে পানি দাও”; আপনি বুঝে নিবেন যে মনিব স্বত্বরই পানি চেয়েছেন, দুই ঘন্টা পরে চান নি। এখানে তা বলা নেই কিন্তু নিহিত রয়েছে। আর এটাই ভাষার সূক্ষ্ন তারতম্য।

    কেউ যখন বলে, “আরবী আমার নিকট ভিনদেশী ভাষা” যার ভাবার্থ হবে এমন, “কুরআনের উপলব্ধি আমার নিকট প্রকৃতিবিরুদ্ধ।” আর আরবী যখন কারো নিকট ভিনদেশী ভাষা হিসেবে পরিগনিত হয় তার অর্থ দাঁড়ায়: “রাসুলুল্লাহ্’র সুন্নাহ তার নিকট অপরিচিত।”

    যে আল্লাহ্’কে ভালবাসে; সে এ ভালবাসার সুত্রে অবশ্যই রাসুলুল্লাহ্’কে ভালবাসে। আর যে আল্লাহ্ আর তার রাসূলকে ভালবাসে; সে এ ভালবাসার সূত্রে অবশ্যই ভালবাসবে আরবী ভাষাকে; যা আল্লাহ্ পছন্দ করেছেন।

    এই সে ভাষা যাতে ‘পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বই’ কথা বলেছে। এই সে ভাষা যাতে পৃথিবীর সর্বশ্রষ্ঠ মানুষ কথা বলেছেন। আর এটি অন্যান্য ইসলামী বিষয়াদি উপলব্ধির জন্য প্রবেশদ্বার। আর যে কখনো আরবী শিখবে না সে কখনো কুরআন আর সুন্নাহ্ পরিপূর্ণভাবে বুঝতে সমর্থ হবে না।

    আরবী শিখা আমাদের কি উপকারে আসবে?

    এক: এটি আমাদের চরিত্রকে নমনীয় করবে।

    ইবনে তাইমিয়াহ্ বলেন: “একটি ভাষার ব্যবহার একজনের চিন্তা, আচরণ আর দ্বীনের প্রতি নিষ্ঠায় যথার্থই প্রভাব ফেলে। এটি উম্মাহ্’র প্রথমদিকের প্রজন্ম: সাহাবী আর তাবিয়ুনদের সাদৃশ্যমান অনুকরণের ক্ষেত্রেও একজনের উপর প্রভাব ফেলে। তাদের অনুকরণের প্রচেষ্টা একজনের চিন্তা, আচরণ আর দ্বীনের প্রতি নিষ্ঠায় বিশুদ্ধতার ছাপ ফেলে।”

    দুই: আর এটি ইসলামী সংস্কৃতির সাথে আমাদের যোগসূত্র। নিঃসন্দেহে, ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি; যে ভাষা শিখা হয় তার সংস্কৃতি চিন্তা আর আচরণের উপর প্রভাব বিস্তার করে। আর আরবী ভাষার মাধ্যমে ইসলামী পরিশুদ্ধ সংস্কৃতির নিকট আসতে পারা বিশাল সৌভাগ্যের ব্যাপার।

    যারা ভাবে ইংরেজী শিখা দুনিয়াতে সাফল্য নিয়ে আসবে তাদের জন্য বলি, আরবী শিখা তোমার পরকালের সাফল্যের পূর্বশর্ত। আর মুসলিমরা যখন বিশ্বশাসণ করছিলো তখন অমুসলিমদের আরবী জানাটা ছিলো শিক্ষিত হওয়ার লক্ষন। আবার ও বিশ্ব ফিরে যাবে সেই গৌরবময় ইসলামী ইতিহাসে, ইনশা’আল্লাহ্।

    কোন মুসলিমেরই এই ভাবনা ভাবার অবকাশ নেই যে, আরবী তার মাতৃভাষা নয়। বরং তা আমাদের দ্বীনের ভাষা, বিশ্বাসের ভাষা। আর লোকজনকে এই ভাষার দিকে আহবান করায় জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণতা নাই; বরং এই আহবানে একজন মুসলিম মাথা উচিয়ে বলবে, “আমার বিশ্বাসের একটি স্বকীয় ভাষা আছে আর তা হলো আরবী!”

    কৃতজ্ঞতা: ‘Kalamullah’ এর একটি প্রবন্ধ অবলম্বনে।

    সায়্যিদ মাহমূদ গজনবী

  • ধৈর্যের সাথে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হওয়া এবং আল্লাহ’র হুকুমে তুষ্ট থাকা

    ইসলামের একদম শুরু থেকেই যখন আদি পিতা ইব্রাহীম (আ) দা’ওয়াহ করছিলেন তখন থেকেই থেকেই তিনি প্রচুর প্রতিকূল বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা) ও সাহাবাগণও (রা) একইভাবে বিভিন্ন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় আজ পর্যন্ত ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দা’য়ীরা সম্মুখীন হয়ে আসছে বিভিন্ন প্রতিকুল অবস্থার।

    যুগের পরিবর্তনে হয়ত পরিবেশের পরিবর্তন ঘটেছে; কিন্তু প্রতিকূলতা আজও বর্তমান।

    অর্থ্যাৎ ইসলাম প্রতিষ্ঠায় প্রতিকূলতার সম্মূখীন হওয়া দা’য়ীদের জন্য অবশ্যম্ভাবী এক বাস্তবতা।

    এই প্রতিকূলতা পরিবার, সমাজ, বন্ধু-স্বজন, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি ক্ষেত্র হতে আসতে পারে।

    কিন্তু একজন দা’য়ীর জন্য এটা অনুধাবন করা অত্যাবশ্যকীয় যে, এই সকল প্রতিকূলতা আসে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে।

    তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করবো ভয়-ভীতি, ক্ষুধা-অনাহার, তোমাদের জান-মাল ও ফসলাদির ক্ষতিসাধন করে; কিন্তু ধৈর্য্যশীলদের জন্য সুসংবাদ।” (আল বাকারাহ: ১৫৫)

    “তোমরা কি মনে করা নিয়েছ যে, তোমরা এমনিতেই জান্নাতে চলে যাবে? অথচ পূর্ববর্তীদের মতো কিছুই এখনো তোমাদের ওপর নাযিল হয়নি, তাদের ওপর বহু ধরণের বিপর্যয় ও সংকট এসেছিল, কঠোর নির্যাতনে তারা নির্যাতিত হয়েছিল, কঠিন নিপীড়নে তারা শিহরিত হয়ে উঠেছে, এমনকি স্বয়ং আল্লাহ’র নবী ও তাঁর সঙ্গীরা এই বলে আর্তনাদ করে উঠেছে, আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য কবে আসবে? হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আল্লাহ’র সাহায্য অতি নিকটে।” (আল বাকারাহ: ২১৪)

    উপোরক্ত আয়াতগুলো দ্বারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মু’মিনদের বিভিন্ন প্রতিকূলতার মাধ্যমে পরীক্ষার কথা বলেছেন।

    ওহীয়ে গাইরে মাতলু অর্থ্যাৎ

    মাহমুদ বিন লাবিদ হতে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন:

    “যখন আল্লাহ আযযা ওয়া জাল কাউকে ভালোবাসেন, তিনি তাদের পরীক্ষা করেন। যে ব্যক্তি ধৈর্য্য ধারণ করে, তাকেও গ্রহণ করা হবে ধৈর্য্যশীল হিসেবে, এবং যে ক্লেশ প্রদর্শন করবে, তার জন্যও ক্লেশ সংরক্ষিত।” (আহমদ)

    মুস’আব বিন সা’দ তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন,

    তিনি রাসূলকে (সা) জিজ্ঞেস করেছিলেন, হে আল্লাহ’র রাসূল (সা), কোন ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়? তিনি (সা) বলেন, সর্বপ্রথম নবীগণ, এরপর সৎকর্মশীলেরা, এর পরবর্তীদের মধ্য থেকে সর্বোত্তম যারা এবং এর পরবর্তীদের মধ্যে সর্বোত্তম যারা। (এখানে পরীক্ষার কাঠিন্যতা বা পরিণাম দ্বারা বিভাগ বুঝানো হয়েছে) একজন ব্যক্তি তার দ্বীনের উপর আনুগত্যের উপর ভিত্তি করে পরীক্ষিত হয়। কেউ তার অঙ্গীকারের উপর দৃঢ় থাকলে তার পরীক্ষার পরিমাণও তীব্র হয়। এবং যদি তার অঙ্গীকারে দুর্বলতা থাকে, তবে তার পরীক্ষাও হাল্কা করা হয়। এবং একজন ব্যক্তি (যাকে আল্লাহ ভালোবাসেন) ক্রমাগতভাবে পরীক্ষিত হবে যতক্ষণ না সে পৃথিবীর বুকে কোন গুনাহ ছাড়া হাটবে।” (আহমদ)

    অর্থ্যাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর বান্দাদের পরীক্ষা করেন ক্রমাগতভাবে। এবং আমাদের উচিত, এই সময়ে আল্লাহ’র উপর তাওয়াক্কুল করা; অর্থ্যাৎ ধৈর্য্যের সাথে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার উপর ভরসা করা এবং প্রতিকুলতার সম্মুখীন হওয়া। সকল ধরণের পরীক্ষাসমূহ আল্লাহ’র ইচ্ছা এবং এতে ধৈর্য্য ধারণ করে আল্লাহ’র কাছে সাহায্য চাওয়াই মু’মিনদের দায়িত্ব।

    আয়িশা (রা) একবার রাসূল (সা)-কে প্লেগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি (সা) বলেন: “আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে এটি (প্লেগ) শাস্তিরূপে প্রদান করেন। এবং বিশ্ববাসীদের জন্য এটি রহমতস্বরূপ। আল্লাহ’র ইচ্ছায় যে বান্দা প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয় কিন্তু সে ধৈর্য্য ধারণ করে (আল্লাহ থেকে পুরষ্কারের আশায়) এবং বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তার জন্য যা অবধারিত করেছেন, তা ছাড়া তার কোনো ক্ষতি হবেনা, তবে সেই বান্দা শহীদের মতোই পুরস্কৃত হবে।” (বুখারী)

    আবু হুরায়রা (রা) বরণনা করেন, রাসূল (সা) বলেছেন,

    “আল্লাহ বলেন, ‘আমি আমার ঐ বিশ্বাসী দাসের জন্য জান্নাত পুরস্কার হিসেবে নির্ধারিত করেছি, যার কোন প্রিয় বন্ধুর (আমি) মৃত্যু ঘটায়, সে ধৈর্য্য ধারণ করে এবং আল্লাহ’র পক্ষ থেকে পুরস্কার আশা করে।” (বুখারী)

    সুতরাং, প্রতিটি মুমিনের জন্য এটা আবশ্যক যে, তারা সকল প্রতিকূলতা ধৈর্য্যের সাথে আল্লাহ’র উপর ভরসা করেই সম্মুখীন হবে, এগুলো সবই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত হুকুম, যাতে অসন্তোষ প্রকাশ করা সম্পূর্নরূপে হারাম।

    ‘আবদ আল্লাহ কর্তৃক বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, “যখন কোন মুসলিম কোন ক্ষতি দ্বারা কষ্ট পায় না, তখন আল্লাহ তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেন যেভাবে গাছের পাতা গাছ থেকে ঝরে পড়ে।” (বুখারী ও মুসলিম)

    আয়িশা (রা) বলেন, রাসূল (সা) বলেছেন,

    “আল্লাহ কোন মুসলিমকে বিপদ দ্বারা পরীক্ষা করেন এবং তার দ্বারা তার গুনাহ সমূহ মাফ করে দেন এবং তাকে সম্মানিত করেন। যদিও ঐ বিপদটি তার পায়ে একটি কাঁটা বিদ্ধ হওয়ার কষ্টই বা হয়ে থাকে”। (বুখারী ও মুসলিম)

    এই হাদীসসমূহ এই বিষয়টিই স্পষ্ট করে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর বান্দাকে তাঁর হুকুমের প্রতি ধৈর্য্য ও কৃতজ্ঞতার ভিত্তিতেই পুরষ্কৃত করে থাকেন। এবং আল্লাহর এই হুকুমের বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ ব্যক্তিকে শুধুমাত্র আল্লাহ’র ক্রোধের পাত্র হিসেবে মনোনীত করে।

    অর্থ্যাৎ, দা’ওয়াহর বার্তা বহনে এবং ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আমাদের কখনোই ধৈর্য্যহীন হওয়া সমীচীন নয়। বরং, আল্লাহ’র উপর তাওয়াক্কুল এবং তাঁর নির্ধারিত হুকুম (ক্বাদা) সন্তুষ্টির সাথে, আল্লাহকে ভালোবেসে তাঁর পক্ষ থেকে পুরস্কারের আশায় গ্রহণ করা আমাদের দায়িত্ব।

    “সুতরাং, ধৈর্য্যশীলদের সুসংবাদ দাও”। (আল বাকারা: ১৫৫)

  • সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ এর দায়িত্ব

    ২০১১ সালে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার শহরে “শাসককে জবাবদিহিতা করার ফিকহ” শীর্ষক কর্মশালা আয়োজিত হয়েছিল। যেখানে ইবন কামালুদ্দিন আল হানাফি, উস্তাদ মুহাম্মদ আলি, উস্তাদ ইয়াহিয়া আবু ইয়ুসুফ, উস্তাদ কামাল আবু যাহ্‌রা, উস্তাদ আবু লুকমান ফাতহুল্লাহ প্রমুখ এ বিষয়ে লেকচার দেন। আমি চেষ্টা করছি লেকচারগুলোর ট্রান্সক্রিপ্ট যোগাড় করে বাংলায় আনুবাদ করতে। আপাতত দুটো লেকচার বাংলায় অনুবাদ করেছি আলহামদুলিল্লাহ এবং বাকিগুলোর কাজ চলছে, যা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হবে ইনশাল্লাহ। যেসব লেকচার গুলো অনুবাদ করা হবে বা হয়েছে তার তালিকা:
     
    · সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ এর দায়িত্ব

    · ইসলামে জবাবদিহিতা

    · শাসককে জবাবদিহিতা করা মুসলিমদের অত্যাবশ্যকীয় কাজ

    · শাসক ইসলাম দিয়ে শাসন করতে বাধ্য

    · শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা নিয়ে প্রখ্যাত আলেমদের মতামত

    · বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল এর শরীআহ দলীল

    সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ এর দায়িত্ব

    পবিত্র কুরআনে মুমিন ব্যাক্তিদেরকে সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ এর দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে অনেক আয়াত রয়েছে, তার মধ্যে একটি হল – “বনী ইসরাইল এর মধ্যে যারা (মাসীহ এর ব্যাপারে আল্লাহের ঘোষণা) অস্বীকার করেছে তাদের উপর দাউদ ও মারিয়াম এর পুত্র ইসাহর মুখ থেকে অভিশাপ দেয়া হয়েছে, কেননা তারা আল্লাহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে এবং সীমালঙ্ঘন করেছে। তারা যেসব গর্হিত কাজ করতো, তা থেকে তারা একে অপরকে বারণ করতো না, তারা যা করতো নিঃসন্দেহে তা ছিল নিকৃষ্ট। (সুরাহ মায়িদাহ, আয়াত: ৭৮-৭৯)

    আল্লাহের রাগ এবং অভিশাপ বনী ইসরাইল এর উপর আপতিত হয়েছিল কারণ পাপ, মন্দকাজ, আল্লাহের-অবাধ্যতা থেকে তারা একে অপরকে বিরত রাখত না বা বারণ করতো না।

    আব্দুল্লাহ বিন আলাওয়ী হাদ্দাদ (মৃত্যু ১৭২০) বলেন: সৎ কাজে আদেশ হল ওয়াজিব, অসৎ কাজে নিষেধ হল ওয়াজিব, কিন্তু মানদুব কাজে আদেশ এবং মাকরুহ কাজে নিষেধ করা মুস্তাহাব।

    তাই, বলা যায়

    ১) এই দায়িত্ব কে কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রমান করা যায়
    ২) এই দায়িত্ব কে এড়ানো যাবে না
    ৩) এই দায়িত্ব এড়ানোর ফলে আল্লাহের ক্রোধের কারণ হতে পারে।

    আল সাইয়িদ আল শারিফ আল জুরজানি (মৃত্যু ১৪১৩) তার ইসলামিক অভিধানে “সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ” এর ব্যাপারে বর্ণনা করেছেন: সৎ কাজে আদেশ এর অর্থ হল “মুক্তির পথের জন্য নির্দেশনা”, এবং “অসৎ কাজে নিষেধ” এর অর্থ হল “শরীয়াহ এর পরিপন্থি ব্যাপারে সতর্ক / সাবধান করা”।

    আলেমগণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বলে থাকেন দুটো কাজের মধ্যে কোন বিভাজন নেই, অন্যভাবে বলতে গেলে দুটো কাজ আসলে একই, কেউ একটি কাজ বাদ দিয়ে অন্য কাজ করতে পারে না (যেমন অসৎ কাজে নিষেধ না করে শুধু সৎ কাজে আদেশ দেয়া)।

    সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ এর গুরুত্ব:

    কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সুরাহ আল-ই-ইমরানের আয়াত ১১০ এ বলেন: “তোমরাই (হচ্ছো দুনিয়ার) সর্বোত্তম জাতি, সমগ্র মানব জাতির (কল্যাণের) জন্যই তোমাদের তুলে আনা হয়েছে, (তোমাদের দায়িত্ব হচ্ছে) তোমরা দুনিয়ার মানুষদের সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে, আর তোমরা নিজেরাও আল্লাহের উপর (পুরোপুরি) ঈমান আনবে…”।

    ইমাম আশ-শাওকানি (মৃত্যু ১৮৩২) এই আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, মুসলিমদের প্রতি আল্লাহ্‌ তায়ালার এই নতুন সম্বোধনই (সর্বোত্তম জাতি) বলে দেয় অন্যান্য সকল জাতি থেকে মুসলিম জাতি কেন উত্তম। কোন আলেম বলেনঃ লাওহে মাহফুজেই মুসলিমদেরকে উত্থিত করা হয়েছে। অন্য একজন আলেম বলেছেন – মুসলিমরা বিশ্বাস স্থাপন করার আগেই তাদেরকে সর্বোত্তম জাতি হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। মুসলিম উম্মাহ সকল জাতি (এমনকি পূর্ববর্তী নবীদের উম্মাহ) থেকেও উত্তম –এ ব্যাপারটি সাহাবাগণ বুঝতে পেরেছেন এবং তারা তাদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা করতে পেরেছেন। “সমগ্র মানব জাতির (কল্যাণের) জন্যই তোমাদের তুলে আনা হয়েছে” – এ বিষয়টি সম্পর্কেও সাহাবাদের ধারণা পরিষ্কার ছিল। এবং আয়াতে “তোমরা দুনিয়ার মানুষদের সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে” – মুসলিমদের প্রতি আল্লাহ্‌ তায়ালার আরেকটি নতুন সম্বোধন যা মুসলিমদের সর্বোত্তম জাতি হওয়ার জন্য পূর্বশর্ত অর্থাৎ যতক্ষণ মুসলিম জাতি একাজ করবে – তারা সর্বোত্তম জাতি হিসেবেই থাকবে। তাই মুসলিম জাতি যখন এই মহান কাজ বন্ধ করে দিবে তখনই তারা তাদের এই বিশেষ গুণ থেকে বঞ্চিত হবে।

    ইবন কাসীর বলেন আল্লাহ্‌ তা’লা “সর্বোত্তম জাতি” বলতে মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ (সা) এর উম্মতকেই বুঝিয়েছেন। বুখারি বলেন – “সমগ্র মানব জাতির (কল্যাণের) জন্যই তোমাদের তুলে আনা হয়েছে” এ ব্যাপারে আবু হুরাইরা (রা) হতে আবু হাজিম হতে সুফিয়ান ইবন মায়সারা হতে মুহাম্মাদ ইবন ইয়ুসুফ বর্ণনা করেন – মুসলিমরা মানবজাতির মধ্যে সর্বোত্তম জাতি কারণ তাদেরকে গলায় শিকল দ্বারা বেঁধে তোলা হয়েছে এবং পরবর্তীতে তাঁরা ইসলাম গ্রহন করেছে।

    একইভাবে ইবন আব্বাস, মুজাহিদ, ‘আতিয়া আল ‘আওফি, ইকরিমা, ‘আতা, আল রাবি’ ইবন আনাস বর্ণনা করেছেন – মুসলিমরা হল সমগ্র মানব জাতির মধ্যে সর্বোত্তম জাতি।

    ইমাম আহমাদ বলেন, আবু লাহাবের কন্যা দুররা’র স্বামী আব্দুল্লাহ ইবন উমাইরা হতে সাম্মাক হতে শুরায়ক বলেছেন: আহমাদ ইবন আব্দুল মালিক বর্ণনা করেনঃ এক ব্যাক্তি উঠে দাঁড়িয়ে মুহাম্মাদ রাসুল্ললাহ (সাঃ) এর কাছে যায় (যখন তিনি মিম্বারে দাঁড়িয়ে ছিলেন) এবং জিজ্ঞাসা করেন, “ও রাসুলুল্লাহ, কারা সর্বোত্তম মানুষ?”; তিনি (সা:) উত্তর দিলেন, “তারাই হচ্ছে সর্বোত্তম মানুষ যারা কুরআন বেশী তিলাওয়াত করে, আল্লাহ্‌র ব্যাপারে সবচেয়ে সচেতন (বা হালাল/হারাম এর ব্যাপারে সতর্ক), সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করে এবং আত্মীয়স্বজনদের সাথে সম্পর্ক রাখে”।

    উপরোক্ত আয়াত হতে আমরা বুঝতে পারি:

    ১) মুসলিম উম্মাহ কে সর্বোত্তম জাতির মর্যাদা দেওয়া হয়েছে সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করার শর্তে

    ২) অন্য কোন জাতি বা গোষ্ঠীকে এধরণের মর্যাদা দেওয়া হয়নি।

    অন্যদিকে মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ (সা) বহু হাদীসে “সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ” এর মহৎ কাজকে অনেক গুরুত্ব দিয়েছেন – যেমন:

    ১) মুসলিমদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম হল সে, যে এই কাজে সবচেয়ে উৎসাহী

    ২) যে এই কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে, তাকে আল্লাহ্‌র প্রতিনিধি উপাধি দেওয়া হয়েছে

    ৩) যে এই কাজ করে, তাকে আল্লাহ্‌, কোরআন এবং রসুল্লালাহ (সা) এর প্রতিনিধি বলা হয়েছে

    ৪) মৃত ও জীবিত মানুষের মধ্যে মূল পার্থক্য হল এই মহান কাজ

    সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ এর মৌলিক বিষয়সমূহ:

    একই বিষয়ে সুরাহ আল-ই-ইমরানের ১১০ আয়াতে আল্লাহ্‌ (আজ্জা ওয়া জ্বাল) বলেন:

    “আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত যারা আহবান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভাল কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই হলো সফলকাম”।

    এসকল আয়াত থেকে আমরা কিছু মৌলিক বিষয় বিবেচনা করে পারি:

    · ‘আমীর (যারা কাজটা করবে) – যেকোনো মুসলিম (আল জায্যায – মা’আনি আল কোরআন ওয়া ই’রাবুহু), কিছু মুসলিম (আল জামাখশারি – আল কাশ্যাফ; আল কুরতুবি – আল জামি’লি আহকাম আল কোরআন; আল রাজি – মাফাতিহ আল গাইব; যাদের উপর থেকে এই দায়ীত্ব অব্যহতি দেওয়া হয় এ মহৎ কাজ থেকে তারা হল মহিলা, শিশু, মানসিকভাবে অসুস্থ), উলামা (ইবন কুতাইবা – তা’উইল মুশকিল আল কুরআন, আল রাজি – মাফাতিহ আল গায়েব; সামারকান্দি – আত-তাফসির), সাহাবাগণ (তাবারি – আল জামি আ’ল বায়ান)।

    · মা’মুর (যাদেরকে দাওয়াহ দিতে হবে) – যেকোন মানুষ যথা মুসলিম ও অমুসলিম (মুকাতিল – আল তাফসির), শুধুমাত্র মুসলিম (মুকাতিল – আল তাফসির, আবুল ফাতহ আল জুরানি – তাফসির ই শাফি), সমগ্র পৃথিবীর সকল মানুষ (ইবন ‘আতিয়া – আল মাহর)।

    · খাইর: সাধারণভাবে “ভালো কাজ” বুঝানো হয়। তবে আত-তাবারি (মৃত্যু – ৯২৩)’র সংজ্ঞা অনুযায়ী এর অর্থ দাড়ায় “ইসলামের আধ্যাত্বিক ও শরীয়াহ আইন এর পথে অন্যকে ডাকা” – (আত তাবারি, জামি’ আল বায়ান)। এর চেয়ে শ্রেয় সংজ্ঞা দিয়েছেন ইবন কাসির – “কুরআন এবং সুন্নাহ কে আঁকড়ে ধরা”। ইবন মারদাওায়হ হতে বর্ণিত, আবু জাফর আল বাকির বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আয়াতটি পড়লেন (তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত যারা আহবান জানাবে সৎকর্মের প্রতি…) এবং তারপর বললেন, “সৎকর্ম হল কোরআন এবং আমার সুন্নাহ কে আনুসরন করা’।

    · মা’রুফ: মা’রুফ এর অনেক অর্থ পাওয়া যায়। ইবনুল কাইয়ুম আল জাউযিয়্যাহ (মৃত্যু ১২০১) বলেন: এই আয়াতে মা’রুফ বলতে আল্লাহ্‌ তা’লার উপাসনা এবং আল্লাহ্‌র আইনের (শরীয়াহ) এর প্রতি আনুগত থাকা, এবং মুনকার বলতে আল্লাহ্‌র অবাধ্যতা বুঝানো হয়েছে (ইবনুল কাইয়ুম আল জাউযিয়্যাহ – জাদ আল মাসির)। শরীয়াহ’র যেসব কাজ ভাল ও সঠিক তার সবই (আল জুরজানি – কিতাব আল তারিফাত)।

    · মুনকার: মুনকারের অর্থও অনেকগুল পাওয়া যায় – যার মধ্যে অন্যতম হল – আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসুল (সাঃ) কর্তৃক নিষিদ্ধ সকল কাজ (অর্থাৎ হারাম), কোরআন এবং সুন্নাহ এর আলোকে যার কোন ভিত্তি নেই, আল্লাহ্‌ ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ব্যাপারে মিথ্যাচার ইত্যাদি। আত-তাবারানি বলেন – শরীয়াহ এবং সুন্নাহ দ্বারা স্বীকৃত নয় এবং শিরক কেই বুঝানো হয়েছে (তাফসির আল কাবির); আত তাবারি বলেন – মুনকার বলতে আল্লাহ্‌র প্রতি অবিশ্বাস, মুহাম্মাদ (সা) ও তাঁর প্রতি নাযিলকৃত অহীকে আস্বিকার যেমনঃ জিহাদ বা গনীমাতের মাল ইত্যাদি, (জামি আল বায়ান)। আল জুরজানি বলেনঃ যেকোন কথা বা কাজ যা আল্লাহ্‌ কে সন্তুষ্টি করে না তা-ই মুনকার (কিতাব আত-তারিফাত)।

    · আমর (আদেশ)

    · নাহি (নিষেধ)

    · দাওয়াহ

    মূল: ইবন কামালুদ্দিন আল হানাফি
    অনুবাদ: প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ

  • পশ্চিমা বিশ্বে নারী নির্যাতন

    পশ্চিমা বিশ্বে নারী নির্যাতন

    পশ্চিমের নারী স্বাধীনতার অলীক ধারণা:

    নারী নির্যাতনের সমাধান হিসাবে পশ্চিমা বিশ্ব সমস্ত পৃথিবীব্যাপী ফ্রিডম বা স্বাধীনতার ধ্যানধারণাকে জোরের সাথে প্রচার করলেও, প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার মিথ্যা শোগানে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে পশ্চিমের নারীরা হয়েছে এক অভিনব দাসত্বের শিকার। বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতা, সুপার হিট হলিউড মুভি, নামী-দামী ফ্যাশন ম্যাগাজিন কিংবা চোখ ধাঁধানো বিজ্ঞাপনের সাহায্যে তারা মুসলিম বিশ্বেও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করছে তাদের মুক্ত-স্বাধীন নারীদের। তাদের ইলেক্ট্রনিক আর প্রিন্ট মিডিয়াতে আধুনিকা নারীদের দেখলে মনে হয় জীবনের সবক্ষেত্রেই তারা প্রচন্ড রকম স্বাধীন। স্বাধীন সমাজে তাদের ভূমিকা নির্ধারণের ক্ষেত্রে, স্বাধীন পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রে কিংবা স্বাধীন পুরুষের সাথে সম্পর্ক তৈরীর ক্ষেত্রে।

    কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাদের শরীরের ওজন, প্রতিটি অঙ্গের মাপ, পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে সাজসজ্জা পর্যন্ত সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় ফ্যাশন, ডায়েট কিংবা কসমেটিকস ইন্ডাস্ট্রীর দ্বারা। সমাজের নির্দেশ মানতে গিয়ে তারা নিজেকে পরিণত করে সস্তা বিনোদনের পাত্রে।

    আর, মুক্ত-স্বাধীন হবার জন্য বাধ্যতামূলক ভাবে কাঁধে তুলে নেয় জীবিকা উপার্জনের মতো কঠিন দায়িত্ব।

    পশ্চিমা পুঁজিবাদী সভ্যতা – নারী নির্যাতনের মূল কারণ:

    পুঁজিবাদ হচ্ছে মানুষের তৈরী এক জীবনব্যবস্থা, যার মূলভিত্তি ব্যক্তি স্বার্থসিদ্ধি। এ জীবনব্যবস্থায় মানুষের নেই কারো কাছে কোন জবাবদিহিতা। বরং রয়েছে লাগামহীন ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারীতার সুযোগ। তাই, পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রিত সমাজে জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি আর চূড়ান্ত ব্যক্তি স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে মানুষ, অন্যের চাওয়া-পাওয়া, আবেগঅনুভূতি, অসহায়ত্ব এমনকি নারীকেও পরিণত করে মুনাফা হাসিলের পণ্যে।

    পুঁজিবাদী সমাজ নারীকে দেখে নিরেট ভোগ্যপণ্য ও মুনাফা হাসিলের উপকরণ হিসাবে। ফলে, নারী সমাজের কোন সম্মানিত সদস্য হিসাবে বিবেচিত না হয়ে, সমাজে প্রচলিত অন্যান্য পণ্যের মতোই পরিণত হয় বিকিকিনির পণ্যে। আর হীন স্বার্থ সিদ্ধির মোহে অন্ধ মানুষ নারীর দৈহিক সৌন্দর্যকে পুঁজি করে চালায় জমজমাট ব্যবসা। বস্তুতঃ নারীর প্রতি এ জঘণ্য দৃষ্টিভঙ্গীর প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসাবে স্বেচ্ছাচারী মানুষ শুধুমাত্র লাভবান হবার জন্য শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র সকল নারীকেই করে নির্যাতিত।

    মুক্ত সমাজ, মুক্ত মানুষ, মুক্ত অর্থনীতি ইত্যাদি পশ্চিমা পুঁজিবাদী জীবনদর্শনের মূলমন্ত্র হলেও, মুক্ত সমাজের মুক্ত জীবনের ধারণা নারীকে মুক্তি দেয়নি বরং বহুগুনে বেড়েছে তার উপর অত্যাচার আর নির্যাতনের পরিমাণ। বাস্তবতা হলো, ফ্রিডম বা স্বাধীনতার ধারণা পশ্চিমা সমাজের মানুষকে ঠেলে দিয়েছে স্বেচ্ছাচারী ও দায়িত্বজ্ঞানহীন এক জীবনের দিকে। যেখানে স্বাধীনতার অপব্যবহারে নির্যাতিত হচ্ছে নারীসহ সমাজের অগণিত মানুষ। জবাবদিহিতার অনুপস্থিতিতে এক মানুষের স্বাধীনতা হচ্ছে অন্য মানুষের দাসত্বের কারণ। আর, ব্যক্তি স্বাধীনতার চূড়ান্ত অপপ্রয়োগে তাদের সমাজে বাড়ছে খুন, ধর্ষণ, যৌন হয়রানী ও পারিবারিক সহিংসতাসহ সকল প্রকার নারী নির্যাতন। এছাড়া, সীমাহীন স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলোও শুধুমাত্র লাভবান হবার জন্য নারীকে পরিণত করছে নিখাদ ভোগ্যপণ্যে।

    এক নজরে পশ্চিমা সমাজে নারী নির্যাতন:

    ১. ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির নির্যাতন: পশ্চিমা সমাজে মূলতঃ তাদের ফ্যাশন, ডায়েট আর কসমেটিকস্‌ ইন্ডাস্ট্রিগুলোই নির্ধারণ করে নারীর পোশাক, তার সাজ-সজ্জা, এমনকি তার দেহের প্রতিটি অঙ্গের মাপ। স্বাধীনতার মিথ্যা শ্লোগানে নারীকে তারা বাধ্য করে জঘণ্যভাবে দেহ প্রদর্শন করতে। তারপর, অর্ধনগ্ন সেইসব নারীদেহকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। ১৯৮৮ সালে টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের বিউটি ইন্ডাস্ট্রিগুলো প্রতিবছর ৮.৯ বিলিয়ন পাউন্ড মুনাফা অর্জন করে থাকে। আর, সমস্ত বিশ্বব্যাপী ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিগুলো বছরে অর্জন করে মাত্র ১.৫ হাজার বিলিয়ন ডলারের মুনাফা।

    অপরদিকে, নামকরা মডেল বা সুপার মডেল হতে গিয়ে নারীকে কমাতে হয় আশঙ্কাজনক পর্যায়ে তার ওজন। পরিণতিতে বন্ধ্যাত্ব, ভয়াবহ নিম্ন রক্তচাপ, অ্যানোরেক্সিয়া কিংবা বুলেমিয়ার মতো মারাত্মক রোগ হয় তার জীবনসঙ্গী।

    ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেনটাল হেলথ এর প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ২০ জনে ১ জন নারী অ্যানোরেক্সিয়া, বুলেমিয়া কিংবা মারাত্মক ক্ষুধামন্দার শিকার হয়। আর প্রতিবছর ১০০০ জন মার্কিন নারী অ্যানোরেক্সিয়া রোগে মৃত্যুবরণ করে। (সূত্র: আমেরিকান অ্যানোরেক্সিয়া/বুলেমিয়া অ্যাসোসিয়েশন)। বস্তুতঃ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিগুলোর বেঁধে দেয়া ভাইটাল স্ট্যাটিকটিকস্‌ অর্জন করতে গিয়েই পশ্চিমে অকালে ঝরে যায় এ সব নারীর জীবন।

    ২. ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি: নারী-পুরুষের লাগামহীন মেলামেশা আর প্রবৃত্তি পূরণের অবাধ স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ ফলাফল স্বরূপ পশ্চিমা সমাজের নারীরা অহরহ হয় ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার। এমনকি এই বিকৃত আচরণ থেকে সে সমাজের নিষ্পাপ শিশুরা পর্যন্ত রেহাই পায় না। নারী স্বাধীনতার অগ্রপথিক যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৪৫ সেকেন্ডে ধর্ষিত হয় একজন নারী, আর বছরে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় সাড়ে সাত লক্ষে। (সূত্র : দি আগলি ট্রু, লেখক মাইকেল প্যারেন্টি)। আর, বৃটেনে প্রতি ২০ জনের মধ্যে একজন নারী ধর্ষিত হয় এবং মাত্র ১০০ জনের মধ্যে একজন ধর্ষক ধরা পড়ে।

    ৩. কর্মক্ষেত্রে হয়রানি: গণমাধ্যম গুলোতে নারীকে প্রতিনিয়ত সেক্স সিম্বল হিসাবে উপস্থাপন করার ফলে নারীর প্রতি সমাজের সর্বস্তরে তৈরী হয় অসম্মানজনক এক বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গী। আর বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গীর ফলাফল হিসাবে শিক্ষিত নারীরাও কর্মক্ষেত্রে তাদের পুরুষ সহকর্মীর কাছে প্রতিনিয়ত হয় যৌন হয়রানির শিকার।

    মিডিয়া ও সরকারী তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ৪০-৬০% নারী কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হয়। আর ইউরোপিয়ান উইমেনস লবির প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাজ্যেও ৪০-৫০% নারী তার পুরুষ সহকর্মীর কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের যৌন হয়রানির শিকার হয়।

    ৪. পারিবারিক সহিংসতা: যে সমাজে নেই কারো কোন জবাবদিহিতা, নেই পরস্পরের প্রতি কোন শ্রদ্ধাবোধ আর সেই সাথে রয়েছে সীমাহীন স্বেচ্ছাচারীতার সুযোগ, সে সমাজে ভয়াবহ পারিবারিক সহিংসতা হয় নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। বস্তুতঃ জীবন সম্পর্কে এ ধরণের ভয়ঙ্কর ভ্রান্তিমূলক ধারণা থেকেই বিয়ের পূর্বে বা পরে সবসময়ই পশ্চিমের নারীরা হয় তার পুরুষসঙ্গীর পাশবিক নির্যাতনের শিকার। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১৮ সেকেন্ডে একজন নারী স্বামী কর্তৃক প্রহৃত হয়। ইউএস জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট এর ১৯৯৮ সালে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ৯ লক্ষ ৬০ হাজার পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। আর, প্রায় ৪০ লক্ষ নারী তার স্বামী অথবা বয়ফ্রেন্ডের দ্বারা শারীরিকভাবে হয় নির্যাতিত।

    ৫. কুমারী মায়েদের যন্ত্রনা: নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার প্রধান অসহায় শিকার হয় পশ্চিমের কুমারী অল্পবয়সী নারীরা। আনন্দের পর্ব শেষে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই পুরুষ সঙ্গী আর্থিক বা সামাজিক কোন দায়দায়িত্ব স্বীকার না করায় একাকী নিতে হয় তাকে অনাহুত সন্তানের দায়িত্ব। আর, অপরিণত বয়সে পর্বতসম দায়িত্ব নিয়ে গিয়ে তাকে হতে হয় ভয়ঙ্কর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার। যুক্তরাষ্ট্রের গুটম্যাচার ইনস্টিটিউট এর প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ১৫-১৭ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে প্রায় ৭ লক্ষ ৫০ হাজার অবিবাহিত নারী গর্ভবতী হয়।

    আর, সেদেশের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যে বছরে ১ লক্ষ ১৩ হাজার কিশোরী মেয়ে গর্ভধারণ করে।

    ৬. কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক নির্যাতন: পশ্চিমা সভ্যতা পৃথিবীব্যাপী নারী-পুরুষের সমঅধিকারের বার্তা প্রচার করলেও তাদের নিজেদের সমাজেই নারীরা প্রচন্ড বৈষ্যমের শিকার। শুধু মাত্র নারী হবার জন্য একই কাজের জন্য তাকে পুরুষের চাইতে দেয়া হয় অনেক কম অর্থ। এখন থেকে প্রায় ৪০ বছর আগে প্রেসিডেন্ট কেনেডি যুক্তরাষ্ট্রে ইকুয়েল পে অ্যাক্ট আইন পাশ করলেও, এখনও ১৫ বছর ও তার উর্ধ্বে কর্মরত নারীরা একই কাজের জন্য পুরুষদের চাইতে প্রতি ডলারে ২৩ সেন্ট কম উপার্জন করে। ইউ.এস গর্ভমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিস এর জরিপ থেকে দেখা যায়, সে দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা বিভাগের মোট কর্মচারীর প্রায় ৭০ ভাগ নারী হলেও নারী ব্যবস্থাপকরা পুরুষের চাইতে অনেক কম অর্থ পেয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, ১৯৯৫-২০০০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নারী-পুরুষের উপার্জনের এই বৈষম্য ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। বস্তুতঃ পশ্চিমের দেশগুলোতে নারীরা শুধুমাত্র দুটি পেশায় পুরুষদের চাইতে বেশী উপার্জন করে, তার একটি হচ্ছে মডেলিং আর অন্যটি হচ্ছে পতিতাবৃত্তি।

    ৭. পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রির নির্যাতন: পশ্চিমা বিশ্বে নারীরা সবচাইতে জঘন্য ভাবে নির্যাতিত হয় পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে। যেখানে, ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির মতোই নগ্ন নারীদেহকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয়েছে পৃথিবী ব্যাপী বিস্তৃত মুনাফালোভী এক চক্র। আর, এর জঘন্য শিকার হচ্ছে লক্ষ কোটি অসহায় নারী ও শিশু। শুধু নগ্ন নারী দেহকে উপজীব্য করে এই পৃথিবীতে ৫৭ বিলিয়ন ইউ.এস ডলারের পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রির বার্ষিক রাজস্ব সে দেশের বহুল প্রচারিত ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এ.বি.সি, সি.বি.এস এবং এন.বি.সি-র প্রদত্ত মোট রাজস্বের চাইতেও বেশী (৬.২ বিলিয়ন ডলার)। প্রকৃতপক্ষে, পুঁজিবাদী মন্ত্রে দীক্ষিত মানুষের সীমাহীন লোভ আর চূড়ান্ত স্বেচ্ছাচারীতাই বিশ্বব্যাপী পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠার মূলকারণ।

    প্রথম প্রকাশ: ডিসেম্বর ২০১২

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৩ (সাহাবাদের গঠন পর্যায়)

    নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে

    দাওয়াতের প্রাথমিক পর্যায়ে রাসুল (সা) যাদের মাঝেই ইসলাম গ্রহণ করার মতো মনমানসিকতা লক্ষ্য করতেন, জাতি, বর্ণ, বয়স, সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি ভেদাভেদে তাদের কাছেই তাঁর এ আহবান পৌঁছে দিতেন। তিনি কখনো তাঁর নির্বাচিত কিছু সংখ্যক মানুষের কাছে দ্বীনের আহবান পৌঁছে দেননি বরং সকল শ্রেনীর মানুষকে তিনি সমান ভাবে ইসলামের দিকে আহবান করেছেন এবং তারপর ইসলাম গ্রহণে তাদের মনমানসিকতা বিচারে সমর্থ হয়েছেন। এভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ঈমান আনে এবং ইসলাম গ্রহণ করে।

    নও মুসলিমদের পরিপূর্ণ ভাবে দ্বীন এবং কুরআন শিক্ষা দেবার ব্যাপারে তিনি খুবই উদ্বিগ্ন থাকতেন। তিনি তাঁর সাহাবীদের মধ্য হতে একটি দল তৈরী করেন যারা পরবর্তীতে দাওয়াতের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। এ দলে নারী-পুরুষ সহ মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চল্লিশ জনে উন্নীত হয়। যদিও এরা ছিল বিভিন্ন বয়সের কিন্তু এদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই ছিল বেশী। এদের মধ্যে ছিল ধনী, গরীব, সবল এবং দূর্বল সবধরনের মানুষ।

    মুসলিমদের এদলটি আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ ভাবে ঈমান এনেছিল এবং এরাই মূলতঃ দাওয়াতের কার্য পরিচালনা করেছিল। এরা হলোঃ

    ১. ‘আলী ইবন আবু তালিব (৮ বছর)
    ২. যুবাইর ইবন আল ‘আওওয়াম ( ৮ বছর)
    ৩. তালহাহ্‌ ইবন আল ‘উবাইদুল্লাহ্‌ (১১ বছর)
    ৪. আল আরকাম ইবন আবি আল আরকাম (১২ বছর)
    ৫. ‘আব্দুল্লাহ্‌ বিন মাস’উদ (১৪ বছর)
    ৬. সাঈদ ইবন যায়িদ (বিশ বছরের নীচে)
    ৭. সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (১৭ বছর)
    ৮. সা’উদ ইবন রবি’য়াহ্‌ (১৭ বছর)
    ৯. জা’ফর ইবন আবি তালিব (১৮ বছর)
    ১০. শুহাইব আল রুমি (বিশ বছরের নীচে )
    ১১. যায়িদ ইবন হারিছা (প্রায় বিশ)
    ১২. ‘উছমান বিন ‘আফফান (প্রায় বিশ)
    ১৩. তুলাইব বিন ‘উমায়ির (প্রায় বিশ)
    ১৪. খাব্বাব ইবন আল আরাত (প্রায় বিশ)
    ১৫. ‘আমির ইবন ফুহাইরাহ (২৩ বছর)
    ১৬. মুসআব ইবন উমায়ির (২৪ বছর)
    ১৭. আল মিকদাদ ইবন আল আসওয়াদ (২৪ বছর)
    ১৮. ‘আব্দুলাহ ইবন জাহস (২৫ বছর)
    ১৯. ‘উমর ইবন আল খাত্তাব (২৬ বছর)
    ২০. আবু উবাইদাহ ইবন আল জাররাহ (২৭ বছর)
    ২১. ‘উতবাহ ইবন গাজওয়ান (২৭ বছর)
    ২২. আবু হুদাইফাহ ইবন ‘উতবাহ (৩০ বছর)
    ২৩. বিলাল ইবন রাবাহ (প্রায় ৩০ বছর)
    ২৪. ‘আইইয়াস ইবন রাবি’আহ (প্রায় ৩০ বছর)
    ২৫. ‘আমির ইবন রাবি’আহ (প্রায় ৩০ বছর)
    ২৬. না’ইম ইবন ‘আব্দুলাহ (প্রায় ৩০ বছর)
    ২৭. ‘উছমান (৩০ বছর) এবং
    ২৮. ‘আব্দুলাহ (১৭ বছর) এবং
    ২৯. কুদামাহ্‌ (১৯ বছর) এবং
    ৩০. আল সাইব (প্রায় ২০, এরা সবাই মাজ’য়ুন ইবন হাবিব এর চার ছেলে)
    ৩১. আবু সালামাহ ‘আব্দুলাহ ইবন ‘আবদ আল আসাদ আল মাখযুমি (প্রায় ৩০ বছর)
    ৩২. ‘আবদ আর রাহমান ইবন ‘আওফ (প্রায় ৩০ বছর)
    ৩৩. ‘আম্মার ইবন ইয়াসির (৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে)
    ৩৪. আবু বকর আল সিদ্দিক (৩৭ বছর)
    ৩৫. হামজাহ্‌ ইবন ‘আবদ আল মুত্তালিব (৪২ বছর)
    ৩৬. ‘উবাইদাহ ইবন আল হারিছ (৫০বছর)

    কিছু সংখ্যক মহিলাও এদের সাথে ইসলাম গ্রহণ করে।

    তিন বছর পর এ সকল সাহাবাদের হৃদয় এবং অন্তর যখন পুরোপুরি ইসলামের আদর্শ এবং ধ্যান-ধারনার ভিত্তিতে পরিপূর্ণতা লাভ করে তখন মুহাম্মদ (সা) আশ্বস্ত বোধ করেন। তিনি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হন যে, তাদের হৃদয়ে ইসলাম গভীর ভাবে প্রোথিত হয়েছে এবং ইসলামি আকীদার ভিত্তিতে তারা উচ্চমান সম্পন্ন ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে। এছাড়া, এই দলের অর্ন্তভূক্ত মুসলিমরা যখন সমাজের মানুষকে মুকাবিলা করার জন্য যথাযথ যোগ্যতা এবং দৃঢ়তা অর্জন করে তখন আল্লাহর রাসুল (সা) দুশ্চিন্তা মুক্ত হন এবং আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী কুরাইশদের মুকাবিলায় মুসলিমদের নেতৃত্ব দেন।

  • মৃত্যুপুরীতে বসবাস

    পুরো দেশটা মনে হচ্ছে এক মৃত্যুপুরী। ঘর থেকে বাইরে বের হওয়ার আগে শতবার ভাবতে হয়। যুদ্ধের ময়দানে বেসামরিক লোকদের হেটে যাওয়ার চেয়েও কঠিন হয়ে গেছে বাসা থেকে অফিসে আসা। কখন কার আঘাতে কে আহত বা নিহত হবে সেটি আক্রান্ত ব্যক্তি যেমন জানে না, তেমনি আক্রমণকারীও জানে না সে একটু পরে কাকে খুন করবে, জখম করবে।

    এ কেমন দেশ?
    এ কেমন স্বাধীনতা?

    একটি জংগলেও বোধহয় প্রাণীরা এতোটা শংকিত ও আতংকিত থাকে না।
    পুরো দেশ জুড়ে, বিশেষত ঢাকা শহরে এবং এর সড়ক পথে বর্তমান পরিস্থিতি গৃহযুদ্ধের মতো। কখন কোন চিপা গলি থেকে কে হরতাল বা অবরোধের পক্ষে আর কে বিপক্ষে মিছিল বের করবে, কে রড, চাপাতি আর বোমা-পটকা নিয়ে কার উপর কখন হামলে পড়বে, সরকারী বাহিনী কখন কোনদিকে টিয়ার শেল, রাবার বুলেট ছুড়বে আর লাঠি নিয়ে দৌঁড় দিবে তা কেউ বলতে পারছে না।

    রোববার ঢাকায় ঘটে যাওয়া সেই মর্মান্তিক ঘটনার কাছেই আমাকে বারবার যেতে হয়। বিশ্বজিৎ দাস নিহত হওয়ার সেদিনও সেই এলাকার পাশে দিয়েই আমাকে যেতে হয়েছে। গুলিস্তান থেকে বাসে নেমে রিকসা নিয়ে যাচ্ছিলাম। কিছুদূর যাওয়ার পরই দেখলাম সামনে মিছিলকারী ও পুলিশের সংঘর্ষ। সাথে সাথে রিকসা ঘুরিয়ে ভিন্ন পথে অনেক সময় ব্যয় করে কর্মস্থলে যেতে হয়েছিলো সেদিন। আর দুপুরেই সংবাদ পেয়েছিলাম সেই সংঘর্ষে হতাহত হতভাগ্য বিশ্বজিৎ দাসের।

    এই হানাহানি আর স্বার্থের রাজনীতি আর কত নিরীহ প্রাণ কেড়ে নিবে?
    আর কত মায়ের বুক খালি করবে?
    আমাদের দেশের দুর্নীতিবাজ শাসক ও রাজনীতিকরা সাম্রাজ্যবাদীদের ইশারায় আর কতো বিশৃংখলা আর অরাজকতার পর মার্কিনী ও তাদের অন্য প্রভুদের হাতে এদেশ তুলে দিবে? -তা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন।

    তবে আমার মনে হচ্ছে খুব শীঘ্রই এই দেশ ও এই জাতীর ভাগ্যে সেই কঠিন সময় ও পরিস্থিতি আসছে। যখন ইরাক আফগানিস্তানের মতো এই দেশেও রক্ত আর লাশের বন্যা বয়ে যাবে। বঙ্গোপসাগরে যখন মার্কিন রণতরী চলে আসবে আর চীন ও ভারত যখন এদেশে বিশৃংখলা আর অশান্ত পরিস্থিতিতে শান্তির ধ্বজাধারী হিসেবে প্রকৃত গণতন্ত্রের ফেরী নিয়ে উপস্থিত হবে, তখনই এদেশের মানুষ তাদের আসল ভুলটি বুঝতে পারবে।

    আজকে রাজনীতিকদের ক্রীড়নক হিসেবে যারা হানাহানি উসকে দিচ্ছে, যারা সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একনিষ্ট কর্মী সমর্থক হয়ে দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য জান-প্রাণ দিয়ে রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, সীমাহীন অশান্ত পরিস্থিতিতে যখন সাম্রাজ্যবাদীরা সুযোগ নিয়ে এদেশে চলে আসবে তখন সবার আগে এই বেকুব ছেলে গুলোই তাদের বুলেট ও বোমায় আক্রান্ত হবে। কারজাই আর মিরজাফরের মতো আমাদের শাসকরাও কেবলমাত্র সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থ চরিতার্থের জন্য টিস্যু পেপারের মতো প্রয়োজন অনুসারে ব্যবহার হবে মাত্র। এক সময় তাদের শেষ পরিণতিও হবে অত্যন্ত মর্মান্তিক। কিন্তু তখন আর শত আফসোস করেও কোনো লাভ হবে না।

    মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে অনাগত সেই কঠিন বিপদের হাত থেকে হিফাজত করুন। সময় থাকতে রাজনীতিক ও দেশের আপামর জনসাধারণকে সঠিক বিষয়টি বোঝার তাওফীক দিন। যেনো তারা সময় থাকতে মানব রচিত মতবাদ আর মতাদর্শের বাইরে এসে মহান আল্লাহর জন্য নিবেদিত হওয়ার সুযোগ পান।

    ইসহাক খান

  • সাহাবীগণ ও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ

    সাহাবীগণ (রা) কিভাবে এই মহান কালিমাকে বুঝেছিলেন ও এর দাবিগুলো পূরণ করেছিলেন, সেটা ইমাম সুফিয়ান ইবন উয়াইনাহ (রহ) সুন্দরভাবে ব্যখ্যা করেছেন। মুহম্মদ ইবন আবদুল মালিক আল মুসাইসি বলেন:

    ১৭০ হিজরিতে আমরা সুফিয়ান ইবন উয়াইনাহর সাথে ছিলাম। এক ব্যক্তি তাকে ঈমান সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলো। তিনি জবাব দিলেন, ‘এটা হলো সত্যের স্বীকোরোক্তি ও আমল।’

    লোকটি জিজ্ঞাসা করলো, এটা কি বাড়ে-কমে?

    তিনি জবাব দিলেন, আল্লাহ ইচ্ছা করলে এটা বাড়ে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে এটা কমে; এমনভাবে কমে যে আর এতটুকুই বাকি থাকে [তিনি তার বা হাত দিয়ে তা দেখান]।

    লোকটি প্রশ্ন করলো, ঈমানকে যারা আমলহীন স্বীকরোক্তি বলে তাদেরকে আমরা কিভাবে মোকাবেলা করবো? [সম্ভবত তিনি মুরজিয়্যাদের কিভাবে মোকাবেলা করতে হবে তা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছিলেন। মুরজিয়্যাগণ চিন্তা অনেকটা এরকম ছিল যে ঈমান আনলে মানুষ জান্নাতে যাবেই (শাস্তি ছাড়া) তার আমল থাকুক বা না থাকুক]

    সুফিয়ান জবাব দিলেন, ঈমানের বিধিবিধান ও সীমাগুলো নির্ধারিত হওয়ার আগে তারা এই কথাটি বলতো। আসলে আল্লাহ সুবহানাহুতা’আলা আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা)-কে মানবজাতির কাছে এই কথা বলার জন্য পাঠিয়েছেন যে, আল্লাহ ছাড়া আর কারোই উপাসনা পাওয়ার অধিকার নেই এবং আমি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। মানুষ এটা বলার পর তাদের রক্ত ও সম্পদ (বৈধ কারণ ব্যতিত) নিরাপত্তা পেল এবং তাদের হিসাব হবে আল্লাহর সাথে। যখন আল্লাহ হাইয়ুল কাইয়ুম এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন তখন তিনি রাসূল (সা) কে বললেন তাদেরকে নামাজের নির্দেশ দিতে। রাসূল (সা) তাদেরকে নামাজের নির্দেশ দিলেন ও তারা তা পালন করলেন। আল্লাহর শপথ, তারা যদি এটা না করতো তাহলে তাদের প্রথম কাজটা কোনোই উপকারে আসতো না।

    যখন আল্লাহ হাইয়ুল কাইয়ুম এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন তখন তিনি রাসূল (সা) কে বললেন তাদেরকে মদীনায় হিজরতের নির্দেশ দিতে। রাসূল (সা) তাদেরকে সেই নির্দেশ দিলেন ও তারা তা পালন করলো। আল্লাহর শপথ, তারা যদি এটা না করতো তাহলে তাদের প্রথম কাজ কিংবা নামাজ কোনোটাই তাদের উপকারে আসতো না।

    যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন তখন তিনি রাসূল (সা) কে বললেন তাদেরকে মক্কায় ফেরার নির্দেশ দিতে যেন তারা তাদের (কাফের) পিতা ও সন্তানদের সাথে ততক্ষন পর্যন্ত যুদ্ধ করে যতক্ষন না তারা (কাফেররা) সেই কালিমাটি বলে যেটি তারা নিজেরা বলেছে, তাদের সাথে নামাজ পড়ে ও তাদের হিজরতের সাথে যুক্ত হয়। রাসূল (সা) তাদেরকে সেই নির্দেশ দিলেন ও তারা তা পালন করলো। আল্লাহর শপথ, তারা যদি এটা না করতো তাহলে প্রথম প্রথম কাজ, নামাজ কিংবা হিজরত কোনোটাই তাদের উপকারে আসতো না।

    যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন তখন তিনি রাসূল (সা)-কে বললেন তাদেরকে নির্দেশ দিতে তারা যেন হিজরত করে এসে আল্লাহকে উপাসনার জন্য কারা তাওয়াফ করে ও দীনহীনভাবে মাথার চুল ছেটে ফেলে। রাসূল (সা) তাদেরকে সেই নির্দেশ দিলেন ও তারা তা পালন করলো। আল্লাহর শপথ, যদি তারা এটা না করত তাহলে তাদের প্রথম কাজ, তাদের নামাজ, তাদের হিজরত কিংবা পিতার সাথে যুদ্ধ করা কোনটাই তাদের উপকারে আসতো না।

    যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন তখন তিনি রাসূল (সা)-কে বললেন তাদেরকে নির্দেশ দিতে তারা যেন হিজরত করে গিয়ে নিজেদের সম্পদ থেকে যাকাত প্রদান করে, যাতে সেই সম্পদ পবিত্রতা অর্জন করে। রাসূল (সা) তাদেরকে সেই নির্দেশ দিল এবং তারা তা পালন করলো ……..। আল্লাহর শপথ, তারা যদি এটা না করতো তাহলে তাদের প্রথম কাজ, তাদের নামাজ, তাদের হিজরত, তাদের পিতাদের সাথে যুদ্ধ কিংবা তাদের তাওয়াফ কোনোটাই তাদের উপকারে আসতো না।

    যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন, যেটা ঈমানের বিধিবিধান ও সীমাগুলোর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হলো, তখন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বললেন:

    আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম। [মাইদাহ:৩]

    সুফিয়ান এরপর বললেন, ‘তাই কেউ যদি ঈমানের কোনো একটি অংশ বাদ দেয় তাহলে আমাদের দৃষ্টিতে সে ঈমানহীন (কাফের)। অবশ্য যদি সে আলস্য বা অবহেলার কারণে তা ত্যাগ করে থাকে, তাহলে আমরা তাকে শুধরাবো এবং আমাদের দৃষ্টিতে সে দূর্বল/অপূর্ন ঈমানের অধিকারী। এটাই সুন্নাহ। কেউ এ বিষয়ে কোনকিছু জিজ্ঞাসা করলে এই কথাগুলো আমার বরাত দিয়ে বলবে।

    সূত্র: মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাব লিখিত ’আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা’ থেকে সংগৃহিত

    প্রথম প্রকাশ: ২০১২ইং