Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:

    ((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))

    “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    «أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»

    “আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:

    «عليك بتقوى الله ما استطعت»

    “তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:

    «فاتقوا الله ولو بشق تمرة»

    “একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।

    তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))

    “আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))

    “যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))

    “মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:

    ((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))

    “মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))

    “পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]

    এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))

    “যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))

    “এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:

    ((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))

    “হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]

  • রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন। 

    “হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩) 

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ

    রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি? 

    আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত। 

    এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।

    আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    “আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)

    وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ

    আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

    মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। 

    ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: 

    “আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩) 

    وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ

    “আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ

    “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮) 

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ

      “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)

    حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ

    আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।

  • রমজান এর শিক্ষা

    রমজান এর শিক্ষা

    সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্‌কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:

    রমজান – রহমতের মাস:

    এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।

    রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।

    সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর  মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।

    সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।

    জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।

    রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।

    ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্‌ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।

    এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।

    রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:

    রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।

    এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।

    রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্‌কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।

    তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।

    তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্‌র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্‌ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্‌কে রাগান্বিত করে।

    আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্‌ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।

    এখানে আল্লাহ্‌ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।

    উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্‌ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্‌ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”

    আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।

    তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্‌ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)

    এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)

    অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।

    এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্‌ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।

    তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।

    আর আল্লাহ্‌কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্‌র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।

    বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।

    রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।

    রমজান – কোরআনের মাস:

    একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।

    আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?

    আল্লাহ্‌ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্‌র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।

    এখানে আল্লাহ্‌ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্‌ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?

    বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।

    যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্‌ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্‌ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”

    আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”

    একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”

    তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।

    রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)

    আল্লাহ্‌ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।

    সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্‌র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।

    অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।

    যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।

    বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।

    রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:

    আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।

    রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।

    কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্‌র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।

    আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।

    তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্‌ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্‌ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।

    রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)

    আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্‌র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্‌ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্‌র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।

    পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)

    অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্‌র ক্ষমা পাওয়া যায় না।

    রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:

    পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।

    রমজান এর পর কী হবে?

    প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।

    রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্‌র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্‌র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্‌র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।



    আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
    ২৫শে শাবান, ১৪৩৩
    ১৪ই জুলাই, ২০১২ 

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ২ (শুরুর কথা)

    [নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]

    শুরুর কথাঃ

    রাসূল হিসাবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হবার পর মুহাম্মদ (সা) সর্বপ্রথম আহবান জানালেন তার সহধর্মিনী খাদিজা (রা)কে এবং তিনি তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করলেন। তারপর তিনি তাঁর চাচাতো ভাই আলী (রা) কে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং তিনিও তাঁর উপর বিশ্বাস আনেন। এরপর তিনি তাঁর ক্রীতদাস যায়েদ (রা) কে আহবান করলে যায়েদ (রা)ও তাঁর উপর ঈমান আনেন। তারপর তিনি তাঁর বন্ধু আবু বকর (রা) কে আহবান জানান এবং তিনিও বিশ্বাস স্থাপন করেন। এরপর তিনি জনসাধারনকে ইসলামের দিকে আহবান করতে থাকেন, এদের মধ্যে কিছু মানুষ ঈমান আনে আর বাকীরা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে।

    আবু বকর (রা) ইসলাম গ্রহন করার পর তার কাছের মানুষদেরকে তার বিশ্বাসের কথা জানান এবং তাদের আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসুলের (সা) দিকে আহবান করেন। আবু বকর ছিলেন তার আপন লোকদের মধ্যে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন। লোকেরা তার সাহচার্য উপভোগ করত এবং বিভিন্ন বিষয়ে তার সাথে পরামর্শ করত। সমাজে তার এ সমস্ত প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি উসমান ইবনে ‘আফফান (রা)কে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসেন। এভাবে পরবর্তীতে যুবাইর ইবন আল-‘আওওয়াম (রা), ‘আবদুর রহমান ইবন ‘আওফ (রা), সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা), তালহা ইবন ‘উবাইদুল্লাহ ইসলাম গ্রহন করেন। এদের সকলকে তিনি মুহাম্মদ (সা) এর কাছে নিয়ে আসেন, তারা সকলে তাদের ঈমান আনার ঘোষনা দেন এবং নামাজ আদায় করেন। এরপর, ‘আমির ইবন আল-যাররাহ্‌ (আবু উবাইদাহ নামে পরিচিত) ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ‘আব্দুলাহ্‌ ইবন ‘আবদ আল-আসাদ (আবু সালামাহ্‌ নামে পরিচিত) ও তার সাথে আল-আরকাম ইবন আবি আল-আরকাম, ‘উসমান ইবন মাজ’য়ুন এবং আরও অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেন। এভাবে একের পর এক বহুসংখ্যক মানুষ ইসলামের ছায়াতলে চলে আসে যে পর্যন্ত না এ বিষয়টি কুরাইশ সম্প্রদায়ের মাঝে আলোচনার বস্তুতে পরিণত হয়।

    প্রথম দিকে মুহাম্মদ (সা) বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। তাদের বলতেন যে, আল্লাহতায়ালা তাদের তাঁর ইবাদত করতে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করার জন্য আদেশ দিয়েছেন। এরপর তিনি কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে মক্কার মানুষকে প্রকাশ্যে ইসলামের দিকে আহবান করতে শুরু করেন, যেখানে আল্লাহ আদেশ করছেন,

    “হে বস্ত্রাবৃত! উঠো এবং সতর্ক করো।” [সুরা আল-মুদ্দাছির: ১-২]

    পরবর্তীতে আল্লাহর রাসুল (সা) দ্বীন ইসলামের দলভুক্ত মানুষেদের নিয়ে গোপনে একত্রিত হতেন এবং তাদের দ্বীন শিক্ষা দিতেন। প্রথমদিকে রাসুল (সা) এর সাহাবীরা কুরাইশদের আড়ালে মক্কার প্রান্তসীমায় অবস্থিত পাহাড়ে নামাজ আদায় করতেন। যখনই নতুন কেউ ইসলাম গ্রহণ করতো, আলাহর রাসুল (সা) তাকে কুরআন শেখানোর জন্য পূর্বে ইসলাম গ্রহনকারী একজনকে পাঠাতেন। তিনি (সা) ফাতিমা বিনত আল-খাত্তাব ও তার স্বামী সা’ঈদ কে কুরআন শেখানোর কাজে খাব্বাব ইবনে আল-আরাতকে নিযুক্ত করেছিলেন। একদিন যখন তারা দু’জন এভাবে খাব্বাব (রা) এর কাছে কুরআন শিখছিলেন, তখন সেখানে ওমর ইবন আল-খাত্তাব আকষ্মিক ভাবে উপস্থিত হন এবং সাথে সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে আল্লাহর রাসুল (সা) অনুভব করেন এভাবে শিক্ষা দান যথেষ্ঠ নয়, তাই তিনি আরকাম ইবনে আল আরকামের বাসগৃহকে তাঁর দাওয়াতের কেন্দ্র হিসাবে মনোনীত করেন এবং এখান থেকেই তিনি মুসলিমদের কুরআন শিক্ষা দিতেন, ইসলাম সম্মন্ধে আলোচনা করতেন, তাদেরকে কুরআন তিলওয়াত ও কুরআন নিয়ে চিন্তা করার জন্য উৎসাহ দিতেন। যখন কেউ ইসলাম গ্রহন করতো, আলাহর রাসুল (সা) তার সাথে দার-উল-আরকামে সাক্ষাৎ করতেন। তিন বছর পর্যন্ত তিনি এভাবে মুসলিমদের শিক্ষা দেন, নামাজে ইমামতি করেন, শেষ রাত্রে তাদেও সাথে তাহাজ্জুদ আদায় করেন, তাদের চিন্তা চেতনাকে উদ্দীপ্ত করেন, নামাজ এবং কুরআন তিলওয়াতের মাধ্যমে তাদের ঈমানকে আরও মজবুত করেন। কুরআনের আয়াত ও আল্লাহর সৃষ্টিকে গভীর ভাবে পর্যালোচনার মাধ্যমে নও মুসলিমদের চিন্তাধারাকে আলোকিত করেন। এছাড়াও তিনি তাদেরকে আল্লাহর কাছে নিজেকে পরিপূর্ণ ভাবে সর্মপনের মাধ্যমে সকল কষ্ট ও বাধাঁ অতিক্রমের উপায় শেখান।

    মুহাম্মদ (সা) তাঁর দলভুক্ত মুসলিমদের সাথে এভাবে দার-উল-আরকামে সময় অতিবাহিত করতে থাকেন যে পর্যন্ত না আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন,

    “অতএব তোমাকে যে বিষয়ে আদেশ করা হয়েছে, তা প্রকাশ্যে ঘোষণা কর এবং মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও।” [সুরা হিজরঃ ৯৪]

  • সম্পদ যথেষ্ট, সম্পদের বিতরণই মূল অর্থনৈতিক সমস্যা

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং জীবন পরিচালনা করার জন্য সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা প্রদান করেছেন। পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ তিনি সৃষ্টি করে তা মানুষের ব্যবহারের জন্য অর্পণ করেছেন। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন,

    “তিনিই সে সত্তা যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য যা কিছু জমিনে রয়েছে সেই সমস্ত।” [সূরা বাকারা : ২৯]

    “এবং আয়ত্ত্বাধীন করে দিয়েছে তোমাদের, যা আছে নভোমন্ডলে ও যা আছে ভূমন্ডলে; তার পক্ষ থেকে।” [সূরা আল জাসিয়া : ১৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরো বলেছেন,

    “যেন সম্পদ তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যে আবর্তিত না হয়” [সূরা হাশর: ৭]

    আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থা বাদ দিলে তার পরিণতি কি হবে সে সম্পর্কেও তিনি সমগ্র মানব জাতিকে সতর্ক করে দিয়েছেন,

    “যে আমার বাণী (কুরআন) প্রত্যাখ্যান করবে, তার জীবনসামগ্রী সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে পুনরুত্থান দিবসে অন্ধভাবে তুলব।” [সূরা তোয়াহা : ১২৪]

    উন্নততর জীবনের পথ প্রদর্শনের লক্ষ্যে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য কুরআন প্রেরণ করেছেন। তিনি পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমস্যাসহ মানব জীবনের সকল সমস্যার বিস্তারিত সমাধান তুলে ধরেছেন। ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি তথা খিলা-ফত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশ ও নিষেধ। এই ব্যবস্থা মানবরচিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সকল ভ্রান্তি আর পক্ষপাতদুষ্টতা থেকে মুক্ত। আর একমাত্র খিলা-ফত সরকারই অত্যন্ত দ্রুত ও কার্যকরভাবে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির সমস্যা সমাধান করার সাথে সাথে গণমানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি নিশ্চিত করতে পরে।

    ইসলাম মানুষের চাহিদাগুলোকে সামষ্টিকভাবে না দেখে প্রত্যেক ব্যক্তির চাহিদাগুলোকে স্বতন্ত্রভাবে বিচার করে। স্বতন্ত্রভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক চাহিদা পূরণ না করে সামগ্রিকভাবে পুরো সমাজের জীবন যাত্রার মান বৃদ্ধি করা তথা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ইসলামিক রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নয়। ইসলাম প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত না করে সবাইকে সমাজ থেকে যেনতেনভাবে তা অর্জন করার জন্য বিচ্ছিন্নবভাবে ছেড়ে দেয়না। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা খিলা-ফত রাষ্ট্রের উপর জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকটি নাগরিকের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা – এইসব মৌলিক চাহিদা পূরণকে ফরয বা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। রাসূল (সা) বলেন, “বাস করার জন্য একটি গৃহ, আব্রু রক্ষার জন্য এক টুকরা কাপড়, আর খাওয়ার জন্য এক টুকরা রুটি ও একটু পানি এসবের চেয়ে অধিকতর জরুরী কোন অধিকার আদম সন্তানের থাকতে পারে না।” (তিরমিযী)

    রাষ্ট্রের নাগরিকের এই মৌলিক চাহিদা পূরণে খলীফা বাধ্য। যদি খলীফা এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তবে তার জন্যে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন রাসূলুল্লাহ (সা)। রাসূল (সা) বলেছেন: “সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্বন্ধে জবাবদিহি করতে হবে।” ইমাম (তথা খলীফা যিনি সর্বসাধারণের উপর শাসক হিসেবে নিয়োজিত তিনি)ও দায়িত্বশীল, তাকেও তার দায়িত্ব সম্বন্ধে জবাবদিহি করতে হবে।

    মা’কিল (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    “এমন আমীর যার উপর মুসলিমদের শাসনভার অর্পিত হয় অথচ এরপর সে তাদের কল্যাণ সাধনে চেষ্টা না করে বা তাদের মঙ্গল কামনা না করে; আল্লাহ্‌ তাকে তাদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না।” (মুসলিম)

    সুতরাং খিলা-ফত রাষ্ট্রে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ বা স্থিতিশীল রাখা কোন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়। এটি প্রত্যেক খলীফার সার্বক্ষণিক দায়িত্ব। তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জনগণের এইসব মৌলিক চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করবেন।

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ১ (ভূমিকা)

    [নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]

    ভূমিকা:

    বর্তমান প্রজন্ম সেই ইসলামী রাষ্ট্রের স্মরণ থেকে বিস্মৃত হয়েছে, যা সত্যিকার ভাবে ইসলাম কায়েম করেছিল। আর ইসলামী রাষ্ট্রের (উসমানী খিলাফত-এর) সমাপনী বছর গুলোতে যারা এখানে বসবাস করেছে, যখন পশ্চিমা বিশ্ব এ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষনা করে, তারা মূলতঃ একটি ক্ষয়ে যাওয়া ধ্বংসোম্মুখ রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাক্ষী যেখানে ইসলামী বিধিবিধানের খুব ক্ষুদ্র একটি অংশই কার্যকর ছিল। তাই আজ অধিকাংশ মুসলিমদের পক্ষেই ইসলামী শাসন-ব্যবস্থার সত্যিকারের স্বরূপ নির্নয় করা খুবই কঠিন। সমস্ত মুসলিম জাতির মনমগজ আজ বর্তমানে বিরাজমান পরিস্থিতির বেড়াজালে বন্দী। আর তাই, রাষ্ট্র-ব্যবস্থা বলতে কেবলই তাদের মানসপটে ভেসে উঠে নীতি বিবর্জিত হীন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বরূপ, যা মূলতঃ মুসলিমদের উপর জোরপূর্বক চাপানো হয়েছিল।

    বস্তুতঃ মুসলিম জাতির এই দূর্ভাগ্যজনক অধ্যায়ের এটিই একমাত্র সমস্যাযুক্ত দিক নয়। বরং এর চাইতেও কঠিনতম সমস্যা হলো সেইসব মুসলিমদের মন-মানসিকতার আমূল পরিবর্তন ঘটানো, যা পশ্চিমা সংস্কৃতির মোহে আবিষ্ট। আর পশ্চিমা সংস্কৃতি হচ্ছে পশ্চিমা বিশ্ব কর্তৃক প্রয়োগকৃত এমন এক অস্ত্র, যা দ্বারা তারা ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থাকে করেছে ভয়ংকর ভাবে রক্তাক্ত আর ক্ষতবিক্ষত। তারপর সেই রক্তাক্ত খঞ্জর হাতে গর্বিত ভঙ্গিমায় এ রাষ্ট্রের সন্তানদের ডেকে বলেছে, ”আমি তোমাদের রুগ্ন জননীকে হত্যা করেছি। যার ব্যবস্থাপনা আর অভিভাবকত্ব অতিশয় দূর্বল, তারতো নিহত হওয়াই উচিত। এছাড়া আমি তোমাদের জন্য সংরক্ষিত করেছি এমন এক জীবন ধারা, যেখানে তোমরা পাবে সুখ আর সমৃদ্ধির নাগাল।” তারপর তারা সেই দূর্ভাগা জননীর সন্তানদের উদ্বুদ্ধ করেছে সেইসব খুনীদের সাথে হাত মিলাতে যাদের খঞ্জর তখনও ছিল তাদের জননীর রক্তে রঞ্জিত। এ যেন হিংস্র হায়েনার ইপ্সিত শিকারের সাথে আচরন সদৃশ। শিকার যেখানে নিশ্চল, হতবিহবল আর কিংকর্তব্যবিমূঢ়। এক প্রচন্ড রক্তক্ষয়ী আঘাত কিংবা ভোজের জন্য কোন উপত্যকার পাদপ্রান্তে টেনে হিচঁড়ে নিয়ে যাবার পূব পর্যন্ত সে যেন চেতনায় ফিরে আসে না।

    সুতরাং কিভাবে এইসব মোহাবিষ্ট হতবিহবল মানুষেরা অনুভব করবে, যে বিষাক্ত খঞ্জর তাদের জননীকে হত্যা করেছে, সেই একই মারনাস্ত্রেও মুখে আজ তাদের অস্তিত্বও বিপন্ন। এই একই অস্ত্র তাদের জীবনও নাশ করবে যদি না তারা এর থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারে। জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা (ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করা) সহ আরো অনেক ইসলাম বিরোধী ধ্যান ধারনা যা আজ মুসলিমরা বয়ে বেড়াচ্ছে, এসবই হচ্ছে বিষাক্ত গরল যা পশ্চিমা সংস্কৃতি মুসলিমদের ধমনীতে প্রবাহিত করেছে। এই বইয়ের মিশনারীদের আগ্রাসন সম্পর্কে আলোচিত অধ্যায়ে উপযুক্ত তথ্য প্রমান সহ এ সকল হত্যাকারীদের প্রকৃত উদ্দেশ্য, তাদের অপরাধের পেছনের কারন এবং উদ্দেশ্য সাধনে গৃহীত পদ্ধতি ও উপায় উপকরন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। বস্তুতঃ তাদের সকল কার্যক্রমের এক ও একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ইসলামকে এই পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা। আর এ লক্ষ্যে তাদের সবচাইতে কার্যকরী অস্ত্র ছিল পশ্চিমা বিশ্বের সংস্কৃতি, যা তারা ঢালাও ভাবে প্রচার করেছিল এবং এর ফলে মুসলিমরা ক্রমশঃ পরিণত হয়েছিল তাদের স্বেচ্ছা প্রনোদিত শিকারে।

    মুসলিম জনগোষ্ঠি ভিন্নবধর্মী এ সংস্কৃতির সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে ছিল সম্পূর্ন অজ্ঞ। তাই যদিও তারা একদিকে পশ্চিমাদের সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তুলেছিল, কিন্তু অপরদিকে তাদের সংস্কৃতিকেই সাদরে বরণ করে নিয়েছিল, যা ছিল পশ্চিমাদের দখলদারিত্ব শেকড় গেড়ে বসার মূল কারন। নির্মম বাস্তবতা হলো, মুসলিমরা কোনও গভীর পর্যালোচনা বা যুক্তি প্রমান ছাড়াই বিদেশীদের পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছিল ও তাদের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাচ্ছিল এবং একই সাথে তাদের আলিঙ্গন করতেই নিজ বাহু উন্মুক্ত করে দিয়েছিল, পান করছিল তাদেরই এগিয়ে দেয়া বিষের পেয়ালা থেকে যে পর্যন্ত না তারা প্রাণহীন, নির্জীব আর ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। কেউ কেউ হয়তো ভেবে থাকবে, এসবই হচ্ছে যুদ্ধের স্বভাব সুলভ ধ্বংসাত্মক ফলাফল, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মুসলিমরা ছিল অজ্ঞানতা আর ভ্রান্ত নির্দেশনার অসহায় শিকার।

    কিন্তু প্রশ্ন হলো, আসলে মুসলিমরা কি চেয়েছিল? তারা কি চেয়েছিল এমন একটি রাষ্ট্র যার ভিত্তি হবে ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু? নাকি তারা চেয়েছিল মুসলিম ভূখন্ডে বহু সংখ্যক রাষ্ট্রের উপস্থিতি? পশ্চিমা বিশ্ব মুসলিম ভূখন্ডে শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী হবার পর, ইতিমধ্যেই মুসলিমদের উপহার দিয়েছে অনেকগুলো রাষ্ট্র। তারপর এ রাষ্ট্রগুলোর সরকারকে প্রকৃত ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে, মুসলিম ভূখন্ড গুলোকে খন্ডে খন্ডে বিভক্ত করে এবং সর্বোপরি ইসলামী শাসনকে প্রয়োজনহীনতায় পর্যবসিত করে তারা তাদের পরিকল্পনার চূড়ান্ত বাস্তব রূপ দান করেছে। এভাবে যতই সময় যেতে থাকে, তারা মুসলিম বিশ্বে তৈরী করতে থাকে নতুন নতুন রাষ্ট্র। এবং এ প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে যতদিন পর্যন্ত মুসলিমরা তাদের প্রস্তাবিত নীতি এবং ধ্যান-ধারনার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে।

    বস্তুতঃ এখানে মূল বিষয় বহু সংখ্যক রাষ্ট্র নয় বরং সমস্ত মুসলিম বিশ্বে একটি একক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। আবার শুধুমাত্র একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাও নয়, এবং নয় প্রতিষ্ঠা করা একটি নাম সর্বস্ব ইসলামী রাষ্ট্র – যার শাসন ব্যবস্থা আল্লাহতায়ালার নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী পরিচালিত নয়। কিংবা এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাও নয়, যা ইসলামী বিধিবিধান বাস্তবায়ন করে কিন্তু একটি বুদ্ধিবৃত্তিক বলিষ্ঠ ইসলামী নেতৃত্ব ছাড়াই যা সমস্ত বিশ্বে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেবে। বরং সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে, এমন একটি একক রাষ্ট্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যা ইসলামী আকীদার (বিশ্বাস) ভিত্তিতে পুনরায় ফিরিয়ে নিয়ে আসবে ইসলামী জীবন-ব্যবস্থা, মানুষের হৃদয় এবং মানষিকতার গভীরে ইসলাম প্রোথিত করে সমাজের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত করবে ইসলাম, এ বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে দেবে ইসলামের আহবান।

    ইসলামী রাষ্ট্র কোনও স্বপ্ন নয়, নয় এটা কারও মগজ প্রসূত আকাশ কুসুম কল্পনা। বরং এটা এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যা পৃথিবী শাসন করেছে দাপটের সাথে আর দীর্ঘ তেরশত বছর ধরে প্রভাবিত করেছে এ বিশ্বের ইতিহাস। এটা এমন এক বাস্তবতা, যা সব সময় ছিল এবং থাকবে। ইসলামী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব প্রমাণের অপরিহার্য উপাদানগুলো কোনও ব্যক্তি বা অন্য কোনকিছুর উপেক্ষা অথবা আক্রমনের বহু ঊর্ধ্বে। আলোকিত মানুষেরা এটাকে তাদের জীবনে বাস্তবায়িত করেছে এবং সমস্ত মুসলিম উম্মাহ্‌ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেদিনের, যেদিন ফিরে আসবে ইসলামের সেই হারানো গৌরবমন্ডিত অধ্যায়। ইসলামী রাষ্ট্র কোনও ব্যক্তির আপন খেয়ালের অভিলাষ নয় বরং এটা আল্লাহতায়ালার পক্ষ হতে মুসলিমদের উপর অর্পিত দায়িত্ব, যা পালনে তারা অঙ্গীকারাবদ্ধ। এ দায়িত্ব পালনে অবহেলাকারীদের জন্য অপেক্ষা করছে শাস্তি। আর যারা নিষ্ঠার সাথে পালন করবে এ দায়িত্ব, তাদের জন্য রয়েছে প্রতিশ্রুত উত্তম পুরস্কার।

    কিভাবে এই মুসলিম উম্মাহ্‌ তাদের রবের সন্তুষ্টি অর্জন করবে, যদি না তাদের রাষ্ট্রে সম্মান ও মর্যাদা না আল্লাহতায়ালা, না তাঁর রাসুল (সাঃ), না ঈমানদারদের জন্য নির্দিষ্ট হয়? কিভাবে তারা তাঁর শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করবে যদি না তারা এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, যা প্রস্তুত করবে এর সামরিক শক্তি, রক্ষা করবে এর সীমানা, বাস্তবায়িত করবে আলাহ্‌ প্রদত্ত আইন কানুন এবং শাসন করবে আলাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী? সুতরাং, মুসলিমদের অবশ্যই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে, কারন ইসলামী রাষ্ট্র ব্যতীত দ্বীন ইসলাম প্রভাবশালী অস্তিত্ব হিসাবে আত্মপ্রকাশ করবে না এবং তাদের ভূখন্ড কখনোই দার-উল-ইসলাম হিসাবে বিবেচিত হবে না, যদি না তা শাসিত হয় আলাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী।

    ইসলামী রাষ্ট্র কোনও অবস্থাতেই একটি সহজলব্ধ প্রচেষ্টা নয়। তাই এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটি সুবিধাবাদীদের মনে জ্বালায় না মিথ্যা আশার আলো (রাষ্ট্র ক্ষমতায় আরোহন করাই যাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য)। প্রচেষ্টার এ পথে বিছানো রয়েছে কন্টক, অপেক্ষা করছে ভয়াবহ বিপদ, রয়েছে শত বাঁধা এবং কঠিন কষ্ট। এছাড়া ইসলাম বর্হিভূত সংস্কৃতি, অগভীর চিন্তাধারা এবং পশ্চিমা বিশ্বের তাঁবেদার শাসন-ব্যবস্থা যা তৈরী করেছে লক্ষ্য অর্জনে ভয়ংকর বাঁধা, এগুলোর কথা বলাই বাহুল্য। ইসলামী রাষ্ট্র পূর্নগঠনে যারা সত্যিকার ভাবে এ আহবানের পথে পা বাড়িয়েছে, তাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক শাসন ব্যবস্থা যা মুসলিম ভূখন্ড গুলোতে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসবে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা এবং ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেবে সমস্ত বিশ্বে। আর এজন্যই তারা শত প্রলোভনের পরও প্রত্যাখান করবে অন্য কারও সাথে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব। ততক্ষন পর্যন্ত তারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আরোহনও করবে না, যতক্ষন পর্যন্ত না তারা ইসলামকে মৌলিক, তাৎক্ষনিক এবং সর্বতোভাবে প্রয়োগ করতে পারে।

    পরিশেষে এটা বলা যায় যে, ইসলামী রাষ্ট্র সর্ম্পকিত এই বইটির উদ্দেশ্য নয় এ রাষ্ট্রের অতীত ইতিহাস বর্ণনা করা। বরং, আলাহর রাসুল (সা) কিভাবে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং অবিশ্বাসী সাম্রাজ্যবাদীরা কিভাবে এটাকে ধ্বংস করেছিল,তা ব্যাখ্যা করাই এর মূল উদ্দেশ্য। এই বইটি পরিস্কার ভাবে বর্ণনা করেছে মুসলিম জনগোষ্ঠি কিভাবে তাদের রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে, যেন যে আলো গভীরতম অন্ধকারে একসময় তাবৎ বিশ্বকে পথপ্রর্দশন করেছিল, সেই একই আলো যেন প্রত্যাবর্তিত হয় আবারও সমগ্র মানবতাকে আলোকিত করতে।

  • উম্মু শুরাইক (রা)-এর ঈমানী দৃঢ়তা

    উম্মু শুরাইক (রা) মক্কার একজন মহিলা। ইসলামের কথা পৌঁছালো তাঁর কানে। তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। অতঃপর নেমে পড়লেন দাওয়াতি কাজে। তিনি বিভিন্ন বাড়িতে যেতেন। আলাপ করতেন বাড়ির মহিলাদের সঙ্গে। সুযোগ বুঝে ইসলামের মর্মকথা তুলে ধরতেন তাদের কাছে।

    একসময় বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। মুশরিক নেতারা তাঁকে গ্রেফতার করে। তুলে দেয় তাঁর গোত্রের লোকদের হাতে। তাঁকে শাস্তি দিতে বলে। তাঁর গোত্রের লোকেরা তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। তাঁকে শুকনো রুটি ও মধু খেতে বাধ্য করে। অতঃপর তাঁকে প্রচণ্ড রোদে গরম বালুর ওপর শুইয়ে দেয়।

    প্রচণ্ড রোদ আর গরম বালুর উত্তাপে তিনি ছটফট করতে থাকেন। পিপাসায় কাঁতারাতে থাকেন। একটু পানি দেবার জন্য লোকদেরকে বারবার অনুরোধ করতে থাকেন। কেউ তাঁর অনুরোধে সাড়া দিলো না। কেউ তাঁকে একটু পানি দিলো না। এইভাবে কেটে যায় তিনটি দিন। প্রচণ্ড উত্তাপ ও পিপাসায় তিনি মুমূর্ষ হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে এসে তিনি বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেন। জালিমরা তাঁকে ইসলাম ত্যাগ করতে বলতো। কিন্তু বোধশক্তি হারিয়ে ফেলায় তিনি তাদের কথা বুঝে ওঠতে পারতেন না। তৃতীয় দিন একব্যক্তি আসমানের দিকে ইশারা করে তাঁকে এক আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান ত্যাগ করতে বলে। অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে যে যা বুঝাতে চেয়েছিল তিনি তা বুঝতে সক্ষম হন। চিৎকার দিয়ে তিনি বলে ওঠেন, 

    “আল্লাহর কসম, আমি তো এখনো সেই ঈমানের ওপরই অটল আছি।”

    [আল্লাহর প্রতি তাঁর নিখাদ ঈমান দেখে তাঁর গোত্রের লোকেরা খুবই প্রভাবিত হয়। তারা তাঁকে ছেড়ে দেয়। একসময় তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁর গোত্রের বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করে।]

    মূল: এ কে এম নাজির আহমেদ কর্তৃক লিখিত আসহাবে রাসূলের জীবনধারা

    প্রথম প্রকাশ: ৯ ডিসেম্বর ২০১২

  • বাংলাদেশকে ঘিরে সাম্রাজ্যবাদীদের পরিকল্পনার সার সংক্ষেপ ও খিলাফতের সমাধান

    বাংলাদেশকে ঘিরে সাম্রাজ্যবাদীদের সমস্ত পরিকল্পনা আজ জাতির সামনে দিবালোকের মতো স্পষ্ট। আমাদের অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে এসব পরিকল্পনার মুখোশ জাতির সামনে উন্মোচন করতে হবে। এর সার সংক্ষেপ নিম্নরুপ:

    ১. ক্রুসেডারদের মোড়ল আমেরিকা এ অঞ্চলে ইসলামী খিলাফতের পুনরুত্থান ঠেকানোর পরিকল্পনা করছে এবং তার নিয়ন্ত্রণাধীন রাষ্ট্রসমূহের বলয় দ্বারা চীনকে ঘীরে রাখতে চাচ্ছে। এ অঞ্চলে তার ঘনঘন সামরিক মহড়া এবং নানা অজুহাতে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি, এ পরিকল্পনারই অংশ, যা এখন তার পররাষ্ট্রনীতির প্রধান ভিত্তি, যা “এশিয়ান পিভট” (Asian pivot) নামে পরিচিত। বাংলাদেশের সাথে মার্কিনীদের কৌশলগত ও নিরাপত্তা সংলাপ, তার এ নীতি বাস্তবায়নের একটি অংশ।

    ২. তাছাড়া, ভারত যাতে তার হয়ে কাজ করে, এজন্য ভারতকে নিয়ে মার্কিন নীতি হচ্ছে – ভারতকে তার আওতাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করা; যাকে তারা “কৌশলগত অংশীদারিত্ব” বলে উল্লেখ করছে। অর্থাৎ, ভারতকে তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছাড় দেয়া কিংবা ফায়দা লুটের সুযোগ করে দেয়া, কারণ, আমেরিকা অনুধাবন করতে পেরেছে যে, এটা ছাড়া ভারতকে ঐতিহাসিকভাবে চলমান বৃটিশ প্রভাব বলয় (বিশেষতঃ কংগ্রেস পার্টির মাধ্যমে জারি রাখা) থেকে বের করে আনা যাবে না।

    ৩. কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং ভারতকে ফায়দা লুটের সুযোগ করে দেয়ার মার্কিন এ নীতির অর্থ হচ্ছে, ভারতের প্রতিবেশী দুই মুসলিম দেশ অর্থাৎ পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে, বশীভুত দাস রাষ্ট্রে পরিণত করা, যাতে এই দুই রাষ্ট্রের শাসকরা সবকিছু জলাঞ্জলী দিয়ে হলেও ভারতকে যেকোন সুবিধা কিংবা ছাড় দিতে কুণ্ঠাবোধ না করে। যেমন, ভারতের স্বার্থ রক্ষায় মার্কিন হুকুমে, পাকিস্তানের দালাল শাসকরা কাশ্মিরের মুসলিমদের পক্ষ ত্যাগ করেছে।

    ৪. এই নীতির বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই মার্কিনীরা, বৃটেন ও ভারতের সমঝোতায়, হাসিনাকে ক্ষমতায় বসায়। পাশাপাশি মার্কিনীরা এদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে পুনর্গঠনের এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করে যাতে তা এই নীতি কার্যকরে সহায়ক হয়, তারা নির্বিঘ্নে তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে পারে, ভারতকেও তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুবিধা কিংবা ছাড় দিতে পারে এবং এর মাধ্যমে মার্কিন-ভারত কৌশলগত সম্পর্ক সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারে।

    মার্কিন-ভারত ষড়যন্ত্রে হাসিনার ভূমিকা:

    আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “তারা যদি তোমাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে, তাহলে তারা তোমাদের বিরুদ্ধে শত্রুতায় লিপ্ত হবে, এবং তাদের হস্ত ও রসনাসমূহ প্রসারিত করে তোমাদের ক্ষতি সাধন করবে, এবং তাদের আকাংখা, তোমরা যেন কাফিরদের কাতারে শামিল হও।” [সূরা আল-মুমতাহিনা : ২]

    আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সত্যই বলেছেন। হাসিনাকে ক্ষমতায় বসানোর পর, ইসলাম ও মুসলিমদের শত্রু, মার্কিন-ভারত, তাদের ঘৃণ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অনেক অগ্রসর হয়েছে। এবং দেশের সাথে গাদ্দারীতে কোনরকম সীমা ছাড়াই, হাসিনা এ ঘৃণ্য কাজে তাদের পূর্ণ সহযোগীতা করেছে। তার কিছু নমূনা হচ্ছে:

    – পিলখানায় সেনাঅফিসারদেরকে নৃশংস হত্যাকান্ডে হাসিনা সহযোগীতা করেছে; এবং তারপর মার্কিন-ভারতের নির্দেশে ইসলাম, দেশ ও জাতীয় স্বার্থের পক্ষে অবস্থানকারী সেনাঅফিসারদেরকে নিশ্চিহ্ন করার নীতি বাস্তবায়ন করেছে।

    – বাংলাদেশকে, নরঘাতক মার্কিন সেনাদের এমন ঘাঁটিতে রুপান্তর করেছে, যাতে তারা নির্দ্বিধায় নিজের মাটি মনে করে, যখন-তখন এদেশে সামরিক মহড়ার আয়োজন করতে পারে। এবং ACSA চুক্তি (সামরিক ব্যক্তি, মালামাল ও অস্ত্রের সরবরাহ, মজুদ, চলাচল ও বিনিময় চুক্তি) সইয়ের ব্যাপারে মার্কিনীদের সাথে গোপন সন্ধি করেছে, যাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি ডিভিশনে পরিণত হয় এবং মার্কিন যুদ্ধে নিজেদের আত্মনিয়োগ করে, যার নমূনা আমরা ইতোমধ্যে পাকিস্তানে দেখেছি যেখানে ঠিক এই রকমই একটি চুক্তির কারণে আজ পাকিস্তানের মুসলিম সেনাবাহিনী নিজ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধে নিজেদের আত্মনিয়োগ করেছে।

    – বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনায় না রেখে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্য, “সেভেন সিস্টারস্‌”-এর স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের নেতাদেরকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে, যা ভারতের জন্য অত্যন্ত এক গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সংশিষ্ট বিষয়।

    – ট্রানজিট প্রদান করেছে, যা ভারতের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

    – সীমান্ত হত্যা ও টিপাইমুখ বাঁধ-এর ব্যাপারে শুন্য-প্রতিরোধ (zero-resistance) বা কোন বাঁধা না দেয়ার নীতি গ্রহণ করেছে।

    – গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনের প্রকল্পে সাম্রাজ্যবাদীদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে, যা ভবিষ্যতে তাদের হীন স্বার্থে ব্যবহৃত হবে।

    – মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানীর কর্তৃক দেশের তেল ও গ্যাস লুট করার রাস্তা সহজ করতে তাদের সাথে বিভিন্ন চুক্তি সম্পাদন করেছে, এবং দেশের ব্যবসাবাণিজ্যের উপর মার্কিন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায়, TICFA চুক্তি সম্পাদনের সন্ধি করেছে।

    – রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে ইসলামের বিরম্নদ্ধে এবং রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে ইসলামী খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শামীল হয়েছে, যা মার্কিন, বৃটেন ও ভারতের এক নম্বর এজেন্ডা।

    সুতরাং, মার্কিন ও ভারতের সেবায় বিশ্বাসঘাতক হাসিনা চেষ্টার কোন কমতিই রাখেনি। কিন্তু তারপরও, যা আমরা ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি, সাম্রাজ্যবাদীদের নিকট এটা কোন মূখ্য বিষয়ই নয়, কে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলো, বরং, তাদের কাছে মূখ্য বিষয় হলো, পুরো শাসনব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজানো, যা তাদের নীতি বাস্তবায়নে সহায়ক হয়; এজন্য প্রয়োজনে সে তার এক দালাল শাসককে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আরেক দালালকে ক্ষমতায় বসাবে, যারাও একইভাবে তাদের সেবায় ব্যস্ত থাকবে।

    মার্কিন-ভারতের দাসত্বে খালেদা জিয়ার ভূমিকা একই:

    একথা কারও অজানা নয় যে, খালেদা জিয়া হচ্ছে, বহু বছর ধরে পুষে রাখা মার্কিনীদের বিশ্বস্ত এক দালাল, যার ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। আর এজন্যই অর্থাৎ, মার্কিন স্বার্থের কারণেই, তার ভারতবিরোধী ছদ্দবেশ, “দেশের প্রতি ভালবাসার” মুখোশ। তার সাম্প্রতিক ভারত সফরে তা আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যেখানে সে ভারতের স্বার্থ হাসিলে সব রকম সেবা প্রদানের অঙ্গীকার করেছে, যা সে মূলতঃ মার্কিন হুকুমেই, মার্কিন নীতির কারণেই করেছে যাতে ভারতের সাথে মার্কিনীদের কৌশলগত সম্পর্ক আরও এগিয়ে যায়। খালেদা জিয়া বলেছে, সে অতীত ভুলে যেতে চায়! সে কোন অতীত ভুলে যেতে চায়, এই মুশরিক শত্রুরাষ্ট্রের কোন কুকর্ম সে ভুলে যেতে চায়? সেনাঅফিসারদের বীভৎস লাশ? নাকি ফেলানীর ঝুলন্ত লাশ? নাকি ফারাক্কা?…

    এবং তাকে যদি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা হয়, তবে ভবিষ্যতে সে কোন পথে হাটবে?

    – সে পিলখানা হত্যাকান্ড ভুলে যাবে এবং সেনাহত্যাকারীরা পার পেয়ে যাবে। এবং মার্কিন-ভারতের স্বার্থের বিপক্ষে অবস্থানকারী এবং ইসলাম ও জাতীয় স্বার্থের পক্ষে অবস্থানকারী নিষ্ঠাবান অফিসারগণের জন্য সামরিকবাহিনীতে কোন জায়গা থাকবে না।

    – সে দেশের সেনাবাহিনীর উপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ আরও সুদৃঢ় করতে সহায়তা অব্যাহত রাখবে, যেমনটি সে পূর্বে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ও করেছিল।

    – “সেভেন সিস্টারস্‌”-এর স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের ইস্যুতে তার অবস্থান জানিয়ে দিল্লী সফরে খালেদা জিয়া, হাসিনার মতো একই ভাষায় বলেছে, “বাংলাদেশের মাটিকে আমি ভারতের বিরম্নদ্ধে ব্যবহার হতে দিব না।”

    – ট্রানজিট ইস্যুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার অবস্থান জানাতে গিয়ে খালেদা জিয়া, হাসিনার ভাষাই ব্যবহার করেছে, “আমরা আঞ্চলিক সংযোগের অংশ হিসেবে ট্রানজিটকে সমর্থন করি।”

    – সীমান্ত হত্যাকান্ড এবং টিপাইমুখ বাঁধ ইস্যুতেও তার অবস্থান একই অর্থাৎ হাসিনার মতো শুন্য-প্রতিরোধ (zero-resistance) বা কোন বাঁধা না দেয়ার নীতি গ্রহণ করবে, যা তার সফরসঙ্গীর এই বক্তব্যে পরিষ্কার: “তিনি [খালেদা জিয়া] এসব বিষয় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নিকট উপস্থাপন করেছেন!”

    – আন্তর্জাতিক শক্তিসমুহের অংশগ্রহণে গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরির ব্যাপারেও খালেদা জিয়া একমত হয়েছে।

    – মার্কিন তেল এবং গ্যাস কোম্পানীর সাথে চুক্তি সই করার ব্যাপারে ও TICFA চুক্তির ব্যাপারেও তার গৃহীত নীতি হাসিনার মতোই।

    – এবং রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া তার প্রভুদের সন্তুষ্টির লক্ষে যুদ্ধ অব্যাহত রেখে হাসিনার পথই অনুসরণ করবে।

    সুতরাং, খালেদা জিয়া যে হাসিনার মতোই অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদীদের একনিষ্ট দাস, তা দিবালোকের মতো পরিষ্কার। এদেশের মানুষ বহুপূর্বে এই আশা ছেড়ে দিয়েছে যে, হাসিনা-খালেদা কোনদিন দেশের আভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান করবে। কিন্তু তারপরও, কিছু লোক খালেদা জিয়ার আড়ম্বরপূর্ণ ভারতবিরোধী বক্তব্যে বিশ্বাস করার কারণে ভাবতো যে, খালেদা এইক্ষেত্রে অন্ততঃ হাসিনা থেকে ভিন্ন। কিন্তু, তারা এটা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, হাসিনা এবং খালেদা হচ্ছে একই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ফসল, যা এমন শাসকের জন্ম দেয় যারা একদিকে দেশের ভিতরে মানুষের জন্য দুঃখ-কষ্ট বয়ে আনে এবং অপরদিকে বিদেশের মাটিতে তাদের প্রভুদের দালাল হিসেবে কাজ করে।

    গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হচ্ছে সেই কারখানা যা এমন দালালদের তৈরি করে

    আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “নিশ্চয়ই, আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকের নিকট ফিরিয়ে দিবে; এবং যখন শাসনকার্য পরিচালনা করবে তখন অবশ্যই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে।” [সূরা আন-নিসা : ৫৮]

    এই হচ্ছে শাসকদের উপর আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত হুকুম। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তি হচ্ছে তার ঠিক উল্টো অর্থাৎ আল্লাহ্‌’র হুকুম অমান্য করা। এতে শাসক প্রতিনিয়ত জনগণের বিরুদ্ধে অন্যায় শাসন ও বিশ্বাসঘাতক কর্মকান্ড পরিচালনা করে। ঔপনিবেশিকতাবাদ আগমণের পূর্ব পর্যন্ত, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা মুসলিমদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। খিলাফতের বিলুপ্তির পর, কাফির সাম্রাজ্যবাদীরা মুসলিম উম্মাহ্‌’কে নিজেদের মধ্যে টুকরো-টুকরো করে ভাগ করে নিয়ে, সরাসরি মুসলিম দেশগুলোকে শাসন করতে থাকে। যখন অবস্থার প্রেক্ষিতে তারা সরাসরি শাসন থেকে বিদায় নেয়, তখন তাদের দালালদের সে স্থানে বসিয়ে যায়, যাতে তাদের স্বার্থ হাসিলের পথ অব্যাহত থাকে। বেশিরভাগ দেশে তারা রাজাবাদশা ও স্বেচ্ছাচারী শাসকদের শাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়, যেমন মধ্যপ্রাচ্যে। যখন এসব দালালদের অন্যায়-অবিচার এবং বিশ্বাসঘাতক কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ হয়ে, জনগণ পরিবর্তনের দাবীতে সোচ্চার হয়, তখন এই পশ্চিমা শক্তিরা গণতন্ত্রের শ্লোগাণ নিয়ে হাজির হয়ে নতুন দালালদের ক্ষমতায় বসায়, আরববিশ্বে যার সুস্পষ্ট কিছু নমূনা এখন আমাদের চোখের সামনেই বিদ্যমান। কিছু কিছু জায়গায় উপনিবেশবাদী শক্তিরা বিদায় নেয়ার সময়ই স্বেচ্ছাচারী শাসক নিয়োগের পন্থা অবলম্বন না করে “গণতান্ত্রিক” ব্যবস্থা রেখে গেছে, কিন্তু এই বিষয়ে নিশ্চিত হবার পরই যে, এর দ্বারা ক্ষমতা তার দালালদের হাতেই কুক্ষিগত থাকবে, ঠিক যেমনটি ঘটেছিল ভারতে নেহরু এবং পাকিস্তানে জিন্নাহ্‌’র মাধ্যমে। কখনওবা সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের নিজেদের পারস্পরিক প্রতিযোগীতার কারণে, গণতন্ত্রের শ্লোগাণকে ব্যবহার করেছে ও করছে, প্রতিদ্বন্দ্বীর দালালকে অপসারণ করে নিজেদের দালালকে ক্ষমতায় বসানোর কাজে। কোথাও কোথাও তারা “ই৫২” বোমা মেরেও গণতন্ত্রের ফেরী করেছে, যেমন ইরাক ও আফগানিস্তান।

    সুতরাং, মুসলিম দেশগুলোতে (এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে) সবসময়ই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা আর পশ্চিমা দালালদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া পারস্পরিকভাবে সম্পর্কিত, যা পূর্বেও ঘটেছে, এখনও ঘটছে এবং ভবিষ্যতেও ঘটবে। এটা হচ্ছে নব্য-উপনিবেশকতাবাদের ধোঁকাবাজীর এমন এক ঘৃণ্য উপকরণ, যেখানে জনগণ মনে করে সে তারা শাসককে ভোট দ্বারা নির্বাচিত করেছে, অথচ প্রকৃতপক্ষে শাসক হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদীদের একনিষ্ঠ দালাল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও, তার চিত্র একই রকম। স্বাধীনতার পর তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ, যারা ছিল বৃটেনের দালাল, তারাই দেশের শাসক হয়েছিল। তারপর জিয়াউর রহমান, যে ছিল মার্কিন দালাল এবং তারপর এরশাদ, যে ছিল বৃটেন-ভারতের দালাল, তারা দেশ শাসন করেছে। এরপর এরশাদের পতনের পর, মার্কিনীদের মদদপুষ্ট খালেদা এবং বৃটিশ-ভারতের মদদপুষ্ট হাসিনা তথাকথিক গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশ নেয় এবং তারপর থেকে আজ পর্যন্ত এই দুই দালালের মধ্যে ক্ষমতার হাত বদল হচ্ছে, আর তাদের সাথে থাকছে তাদের জোটভুক্ত বড় মিত্ররা।

    হে মুসলিমগণ! কতবার আমরা প্রতারিত হব? মুজিব, জিয়া এবং এরশাদের ধোকাবাজীর কথা না হয় বাদই দিলাম; শুধুমাত্র হাসিনা-খালেদার কথাই ধরুন, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮; মাত্র ২০ বছরে ৪ বার! একই ব্যক্তিদের কাছে!!

    রাসূল (সা) বলেছেন,

    “মুমিনগণ কখনও একই গর্তে দুইবার পড়ে আঘাত প্রাপ্ত হয় না।”

    ৫ম বারের মতো প্রতারিত হবেন না। হাসিনা ও খালেদাকে প্রত্যাখ্যান করুন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অপসারণ করুন এবং খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করুন। খিলাফত, আপনাদের মা, বোন, স্ত্রী ও কন্যাদের গার্মেন্টস্‌ ফ্যাক্টরীর ভেতরে তালাবদ্ধ অবস্থায় পুড়ে মরতে দেবে না। খিলাফত, নিম্নমানের ফ্লাইওভারের মতো মৃত্যুফাঁদ নির্মাণ হতে দিবে না। খিলাফত, আপনাদের সকল বিষয়কে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখবে, আপনাদের উপর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে এবং আপনাদের আস্থার মর্যাদা রাখবে; এবং দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, সম্পদ এবং সেনাবাহিনীর উপর মার্কিন-বৃটেনভারতের নিয়ন্ত্রণের পথ চিরতরে রুদ্ধ করবে।

    হে ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিবর্গ! আপনাদের চোখের সামনে সংঘটিত, হাসিনা-খালেদার অপরাধমূলক কর্মকান্ডের ব্যাপারে আপনারা নিশ্চয়ই সচেতন আছেন। দ্বিতীয়ত, আপনারা এটাও ভালো করে জানেন যে, তথাকথিত গণতান্ত্রিক নির্বাচন হচ্ছে এদেরকে কিংবা এদের মতো কাউকে ক্ষমতায় বসানো এবং নিষ্ঠাবান ও সচেতন রাজনীতিবিদদের ক্ষমতা হতে দূরে রাখার এক প্রক্রিয়া মাত্র। মুসলিম হিসেবে এ বাস্তবতা উপেক্ষ করে চোখ বন্ধ করে রাখার কোন সুযোগ নাই। কারণ, আপনাদের রয়েছে বস্তুগত সামর্থ্য, যার দ্বারা আপনারা নিষ্ঠাবান ও সচেতন রাজনীতিবিদদের নুসরাহ্‌ প্রদান করতে পারেন, যাতে এসব শাসকরা অপসারিত হয় এবং খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

    ইসলামী খিলাফত বিশ্বে এক নম্বর রাষ্ট্রের অবস্থান অর্জন ও উম্মাহ্‌’র হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করে কিভাবে আঞ্চলিক ও বিশ্বমন্ডলে শক্তির ভারসাম্যের মধ্যে স্থায়ী পরিবর্তন আনবে, তার রোডম্যাপ তৈরিতে সক্ষম। সুতরাং সাড়া দিন, আল্লাহ্‌’র হুকুম পালনে সবচেয়ে অগ্রগামী হউন এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য নুসরাহ্‌ প্রদান করুন।

    “এবং (বিশ্বাস ও সৎকর্মে) অগ্রবর্তীগণ তো অগ্রবর্তীই হবে (জান্নাতে)। তারাই (আল্লাহ্‌’র) নৈকট্য পাবে। আহ্লাদপূর্ণ উদ্যানসমূহে। তাদের (অগ্রবর্তীগণ) অধিকাংশ হবে পূর্ববর্তীদের (মুসলিমদের) মধ্য থেকে; এবং অল্পসংখ্যক পরবর্তীদের মধ্যে থেকে।” [সূরা আল-ওয়াক্বি’য়া : ১০-১৪]

  • মানুষ হতে হতাশ হয়ে পড়ার মারাত্মক পরিনতি

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুমিনদের প্রতি উত্তম ধারণা রাখার প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলছেন,

    তোমরা যখন একথা শুনলে, তখন ঈমানদার পুরুষ ও নারীগণ কেন নিজেদের লোক সম্পর্কে উত্তম ধারণা করনি এবং বলনি যে, এটা তো নির্জলা অপবাদ? [সূরা আন-নূর: ১২]

    এছাড়াও আবু হুরাইরা (রা) হতে বর্ণিত যে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    যদি কোনো ব্যক্তি বলে যে, মানুষ ধ্বংস হয়ে গেছে, তবে সেই (ব্যক্তিই) মানুষকে ধ্বংস করে দিল (আরেক ভাষ্য অনুযায়ী – ‘সেই ব্যক্তিই মানুষের মধ্যে সবচেয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত’) [মুসলিম]

    মুসলিমদের মধ্যে যে কল্যাণ রয়েছে এর গুরুত্ব আমাদের অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে। আর যদি তা না করে আমরা উম্মাহকে কল্যাণের তালিকা হতে বাদ দিয়ে দেই তবে তা আমাদের দাওয়ার ব্যর্থতার উপলক্ষে পরিনত হবে এবং দাওয়ার ফরযিয়্যাত অবহেলিত হবে। এবং তা আমাদের ভগ্ন হৃদয় ও সংকীর্ন দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন ব্যক্তিতে পরিনত করবে। ফলে আমরা বিজয় অর্জন করার ব্যপারে হাল ছেড়ে দিব যদিওবা বিজয় হয়তো আমাদের কল্পনার চেয়েও কাছাকাছি অবস্থান করছে। আমরা আমাদের দাওয়ার জীবন হতে ছিটকে পড়ব এবং শূন্য তরী হয়ে নিজেদের মধ্যেই ঘুরপাক খেতে থাকবো।

    সুতরাং এটি আমাদের জন্য একটি অনিবার্য দায়িত্ব যে আমরা উম্মাহর মধ্যে কল্যাণের উপস্থিতি ও সাধারন মানুষের বাস্তবতা উপলব্ধি করব। আমরা জানি যে মানুষ তার কাছে থাকা চিন্তা (concept for life) অনুযায়ী কাজ করে। সুতরাং যদি তার চিন্তা কলুষিত হয় তবে তার কাজও ভূলভাবে পরিচালিত হবে। আবার যদি তার চিন্তা ন্যায়নিষ্ঠ হয়, তবে তার কাজও এমনভাবে পরিচালিত হবে যা তাকে নিয়ামতের জান্নাতের দিকে নিয়ে যার যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয় জলধারাসমূহ যেভাবে কুরআনে ওয়াদা করা হয়েছে।

    আমরা যদি একইভাবে সারা ‍বিশ্বের অসংখ্য উম্মতের দিকে লক্ষ্য করি তবে দেখতে পাব যে তাদের ভুল কাজগুলো মূলত তাদের অধঃপতিত চিন্তারই ফলাফল। তবুও আমাদের বুঝতে হবে এই অসংখ্য উম্মত আল্লাহ তরফ হতে আসা নিয়ামতসরূপ ইসলামী আকীদাকে ধারণ করে এবং তাদের অধিকাংশই জেনে বুঝে কখনোই ইসলামী আকীদাকে অস্বীকার বা পরিত্যাগ করে না। মুসলিম জনগোষ্ঠির অভ্যন্তরে ইসলামের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস (শুধুমাত্র আবেগের কারণে হলেও তা) তাদের মধ্যে কল্যাণের উপস্থিতি নিশ্চিত করে এবং তা আমাদের উম্মতের মধ্যে অফুরন্ত সম্ভাবনার উপলব্ধিকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। এবং এ কারণে আমাদের তাদের থেকে নিজেদের পৃথক করা উচিত নয়। আমাদের চেষ্টায় রত থাকা উচিত তাদের আবেগি উত্থান-পতনের ইসলামকে গভীর চিন্তার ইসলামে পরিনত করার জন্য। এমনকি কেউ যদি ইসলামকে গভীরভাবে বুঝে থাকার পরও কোনো পরিস্থিতিতে এসে জীবনকে অন্য কোনোভাবে সাজিয়ে নেন, তাকেও আবার সঠিকভাবে বোঝালে তার মধ্যে ইসলামী গভীর চিন্তা ও আবেগের পূনঃর্সূচনা করা সম্ভব। এভাবে ক্রমান্বয়ে তার চিন্তার দিগন্তের ব্যপ্তি আমরা ঘটাতে পারব।

    যেসব মুসলিম জীবনের কোনো প্রান্তে এসে আজ শক্তিশালীভাবে ইসলাম পালন করছেন তাদের অনেকেরই উপলব্ধি করা উচিত যে তা নিজেরাও একসময় এই অধঃপতিত অবস্থার একটি অংশ ছিলেন এবং তাদের আকস্মিক উত্থানও উম্মতের অভ্যন্তরে থাকা অফুরন্ত সম্ভাবনারই একটি ফলাফল।

    পরিবর্তনের সম্ভাবনা উম্মতের মধ্যে সন্দেহাতীতভাবে রয়েছে। সুতরাং আমাদের ভুল-ভ্রান্তির দিকে বেশি চক্ষুপাত না করে উম্মাহর সম্ভাবনা অন্বেষন করা উচিত। সুতরাং যদি কোনো ভাই যদি ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ না করে কিন্তু সালাত আদায় করে এবং তার ভাইয়ের দিকে হাসিমুখে তাকায় তবে তা আমাদের ইসলামের অংশ হিসেবেই দেখতে হবে। পাশাপাশি এটাও দেখতে হবে যে কোন চিন্তার উপর ভিত্তি করে ভাইটি জীবনের অন্যান্য বিষয়গুলো সাজান এবং তার ভুলগুলো কী এবং কিভাবে সংশোধন করা যায়।

    যদি কেউ একরোখা ও অহংকারী প্রকৃতির হয় কিন্তু আবার শিশুদের প্রতি কোমল আচরন করে, তাহলে আমাদের উপলব্ধি করা উচিত যে এটিও তার মধ্যে নিহিত সুপ্ত সম্ভাবনার দিকে আমাদের নির্দেশনা দেয় এবং এর মাধ্যমে তাকে তার অহংকার হতে সংশোধিত করে দেয়ার সুযোগ অন্বেষন করা উচিত আমাদের যা তাকে ইসলামের আরো কাছে নিয়ে আসবে।

    এই মানসিকতা আমাদের ফলপ্রসু মানসিকতার চিন্তাশীল ব্যক্তিতে পরিনত করবে। ফলে আমরা সমাজের কোনো অবক্ষয় ও নৈতিক অধঃপতনের মোকাবেলায় পরাজিত হব না। বরং আমরা সমাজের প্রচলিত চিন্তা ও আবেগকে পরিবর্তন করার দিকে দৃষ্টিপাত করব এবং সমাজে সমস্যার আধিক্য হতাশার পরিবর্তে আমাদের জন্য একটি সুযোগে পরিনত হবে মানুষকে বোঝানোর জন্য যে পরিবর্তন কতটা প্রয়োজন। বাংলাদেশসহ মুসলিম দেশগুলোর জনগণের দিকে লক্ষ্য করলে আমরা ইসলামের জন্য তাদের সম্ভাবনার বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করি। এমনকি এসব দেশের দুর্নীতিগ্রস্থ রাজনীতিবিদরাও জনগণের মধ্যে বিদ্যমান ইসলামী আবেগকে তাদের হীন রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে অত্যন্ত অগ্রসর। এসব দেশের সেনাবাহিনীর মুসলিম সদস্যদের অনেকের মধ্যেও ইসলামের প্রতি আবেগ লক্ষ্য করা যায়।

    যথার্থই, ইসলামী আকীদা বহনকারী না হলেও একজনের পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। যদি এরকম না হতো তবে ইসলামের প্রসার ঘটতো না এবং তা রাসূল (সা) এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো। ঐতিহাসিকভাবে লক্ষ-কোটি মানুষের ইসলামে প্রবেশ করাটা মানুষের পরিবর্তনের প্রবল সম্ভাবনাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা)ও দু’আ করেছিলেন যাতে দুই উমরের এক উমর তথা উমর বিন আল-খাত্তাব ও আমর বিন আল-হিশাম ইসলাম গ্রহণ করেন। আমরা সকলেই জানি যে উমর (রা) ইসলাম কবুল করেন এবং প্রচন্ড ইসলাম বিরোধী ব্যক্তি হতে পরিবতন হয়ে অত্যন্ত উঁচুমাপের একজন সাহাবী ও মুসলিমদের রক্ষকে পরিনত হন তিনি। যার ব্যপারে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছিলেন, যখন উমর রাস্তার এক দিয়ে হাটে, শয়তান তার উল্টো পথে হাটে

    যদিওবা আবু জাহল কখনোই ইসলাম গ্রহণ করে নি, রাসূল (সা) নিশ্চয়ই তার মধ্যে কোনো সম্ভাবনা দেখেছিলেন নয়তো তিনি তাকে দাওয়াতও দিতেননা এবং তার জন্য দুআও করতেন না।

    ইসলামী দাওয়াতের শক্তি এবং সমাজ ও মানুষের জীবনে দ্রুত আমূল পরিবর্তন আনার উপর এর প্রভাবের এরকম আরো অসংখ্য জলন্ত উদাহরন রয়েছে ইতিহাসে।

    ইন শা আল্লাহ, এ বিষয়গুলো আমাদের বুঝলে আমরা আল্লাহর অনুমতিক্রমে মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোয়  বের করে নিয়ে আসতে পারব। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দিন। আমীন।

  • হারিস (রা) ও ইকরিমা (রা)-এর আত্মত্যাগ

    মুহাম্মদুর রাসূল (সা)-এর শাসনকালেই খ্রিস্টান রোমানরা মুসলিমদের সঙ্গে শত্রুতা শুরু করে। মুহাম্মদুর রাসূল (সা)-এর ইন্তিকালের পর তাদের শত্রুতার মাত্রা বেড়ে যায়।

    আবু বকর আস্‌ সিদ্দিক (রা)-এর শাসনকালে মুসলিম বাহিনী সিরিয়ার বহু জনপদ থেকে রোমানদেরকে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। রোমানরা বিশাল সেনাবাহিনী সংগঠিত করে সিরিয়ার অন্তর্গত ইয়ারমুক উপত্যকায় মুসলিমদের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এই যুদ্ধে এক লাখ বিশ হাজার খ্রিস্টান রোমানদের মুকাবিলা করেন মাত্র ছাব্বিশ হাজার মুসলিম।

    যুদ্ধ চলাকালেই আল-মদিনায় আবু বকর আস্‌ সিদ্দিক (রা) ইন্তিকাল করেন। আমিরুল মুমিনীন হন উমর বিন আল-খাত্তাব (রা) বিপুল সংখ্যক রোমান সৈন্য মুসলিমদের হাতে নিহত হয়। যুদ্ধে মুসলিমরা বিজয়ী হন। তবে বেশ কিছু নামীদামী মুসলিমও এই যুদ্ধে শহীদ হন।

    এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন হারিস ইবনু হিশাম, ইকরিমা বিন আবী জাহেল এবং আইয়াশ বিন আবী রাবিয়া (রা)। যুদ্ধের পূর্বে ইকরিমা (রা) বক্তব্য ছিল: আমার ইতিপূর্বের জীবনে আমি রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রচন্ড বিরোধিতা করেছি। সুতরাং আজকে আমি এই (যুদ্ধ করতে করতে শত্রুদের) ভীড়ে ঢুকে পড়ব এবং আর বের হব না। কে আছো যে রাসূলুল্লাহ (সা) কে কোনো বার্তা দিতে চাও।

    যুদ্ধের পূর্বে এই তিন বীর একে অপরের কাছ হতে মৃত্যুর বা’য়াত গ্রহণ করে অর্থাৎ আমৃত্যু তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন।

    পরে যুদ্ধে আহত হয়ে ময়দানে পাশাপাশি পড়ে ছিলেন এই তিন মুসলিম বীর: হারিস ইবনু হিশাম, ইকরিমা বিন আবী জাহেল এবং আইয়াশ বিন আবী রাবিয়া (রা)। জখম থেকে অনবরত রক্ত গড়িয়ে পড়তে থাকে। তাঁরা নিস্তেজ হয়ে পড়েন। বাঁচার কোনো আশাই ছিল না।

    “পানি, পানি” বলে চিৎকার করছিলেন হারিস ইবনু হিশাম (রা)। একজন মুসলিম সৈনিক এক পেয়ালা পানি নিয়ে ছুটে আসেন তাঁর কাছে। তিনি পানি পান করতে যাবেন, এমন সময় দেখেন ইকরিমা (রা) তাকিয়ে আছেন পেয়ালার দিকে। হারিস ইবনু হিশাম (রা) পেয়ালাধারী সৈনিককে বললেন, “আগে ইকরিমাকে পানি পান করাও।”

    সৈনিকটি পেয়ালা হাতে ছুটে আসেন তাঁর কাছে। ইকরিমা পানি পান করতে যাবেন, এমন সময় দেখতে পান আইয়াশ ইবনু আবী রাবিয়া (রা) তাকিয়ে আছেন পেয়ালার দিকে। ইকরিমা (রা) বললেন, “আগে আইয়াশকে পানি পান করাও।” পেয়ালা হাতে সৈনিকটি আইয়াশ বিন আবী রাবিয়া (রা)-এর কাছে পৌঁছার আগেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। সেনিকটি পেয়ালা হাতে ইকরিমা (রা)-এর কাছে। দেখেন ইকরিমা (রা) শহীদ হয়ে গেছেন। এবার পেয়ালা নিয়ে সৈনিকটি ছুটে আসেন হারিস বিন হিশাম (রা)-এর কাছে। দেখেন, তিনিও আর বেঁচে নেই।

    ইন্তিকালের পূর্বে প্রচণ্ড পিপাসায় ছটফট করাকালেও অপর ভাইয়ের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা তারা ভূলে যান নি যদি প্রত্যেকেই অত্যন্ত বেদনা ও পিপাসায় কাতর ছিলেন। আসহাবে রাসূল এমন কঠিন মুহূর্তেও স্থাপন করে আত্ম-ত্যাগের অনন্য উদাহরণ।

    মূল: এ কে এম নাজির আহমেদ কর্তৃক লিখিত আসহাবে রাসূলের জীবনধারা

  • রিয্‌ক ও জীবনকাল একমাত্র আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে

    রিয্‌ক-এর আভিধানিক অর্থ এমন বস্তু যা কোনো প্রাণী খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে, যা দ্বারা সে দৈহিক শক্তি সঞ্চয়, প্রবৃদ্ধি সাধন ও জীবন রক্ষা করে থাকে। রিয্‌কের জন্য মালিকানা-স্বত্ব শর্ত নয়। সকল জীবজন্তুই রিয্‌ক ভোগ করে থাকে, কিন্তু তারা এর মালিক হয় না। কারণ মালিক হওয়ার যোগ্যতাই তাদের নেই। অনুরূপভাবে ছোট শিশুরাও মালিক নয়, কিন্তু ওদের রিয্‌ক অব্যাহতভাবে তাদের কাছে পৌঁছতে থাকে। কুরআনের বহু আয়াত থেকে একথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ হয় যে, রিয্‌ক একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। যেমন:

    নিশ্চয়ই আল্লাহই আমার রিয্‌কদাতা, অসীম শক্তিধর। [সূরা যারিয়াত: ৫৮]

    আর জমিনে বিচরণশীল প্রাণীর জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর। [সূরা হুদ: ৬]

    আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের উপাসনা করছ, নিঃসন্দেহে তারা তোমাদেরকে রিয্‌ক দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। সুতরাং তোমরা আল্লাহর কাছেই রিয্‌ক প্রার্থনা কর। [সূরা আনকাবুত: ১৭]

    আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পর্যাপ্ত রিয্‌ক প্রদান করেন, আর যাকে ইচ্ছা কমিয়ে দেন। [সূরা রাদ:২৬]

    আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অগণিত রিয্‌ক দান করেন। [সূরা আলে-ইমরান: ৩৭]

    মুসনাদে আহমদ, ইবনে মাজাহ ও দারিমীতে আবু যার (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন,

    কুরআনের এমন একটি আয়াত আমি জানি, যদি লোকেরা ওই আয়াতের উপর আমল করত, তবে সেটাই তাদের জন্য যথেষ্ট হতো: ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে চলে তিনি তার মুক্তির রাস্তা তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিয্‌ক দেন, যা সে ধারণাও করতে পারে না।’ [সূরা তালাক: ২]

    অপর হাদীসে আছে, বান্দার রিয্‌ক তাকে এভাবে খুঁজে বেড়ায় যেমন তার মৃত্যুকাল তাকে খোঁজ করে। [মিশকাত]

    বুখারী ও মুসলিম শরীফে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) একখানি দীর্ঘ হাদিস বর্ণনা করেন যার সারমর্ম হল – মানুষ তার জন্মের পূর্বে বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে আসে। মাতৃগর্ভে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠিত হওয়ার পর আল্লাহ তা’লার নির্দেশ মুতাবিক একজন ফেরেশতা তার সম্পর্কে চারটি বিষয় লিপিবদ্ধ করেন। প্রথম, ভালো-মন্দ তার যাবতীয় কার্যকলাপ, যা সে জীবনভর করবে। দ্বিতীয়, তার আয়ুষ্কালের বর্ষ, মাস, দিন, ঘণ্টা, মিনিট ও শ্বাস-প্রশ্বাস। তৃতীয়, কোথায় তার মৃত্যু হবে এবং কোথায় সমাধিস্থ হবে। চতুর্থ, তার রিয্‌ক কী পরিমাণ হবে এবং কোন্‌ পথে তার কাছে পৌঁছবে।

    কোনো কোনো রেওয়াতে আছে যে, হযরত মুসা (আ) আগুনের খোঁজে তূর পাহাড়ে পৌঁছে আগুনের পরিবর্তে যখন সেখানে আল্লাহর নূরের তাজাল্লী দেখতে পেলেন, নবুয়ত ও রিসালাত লাভ করলেন এবং ফিরাউন ও তার কওমকে হিদায়তের জন্য মিশর গমনের নির্দেশ প্রাপ্ত হলেন, তখন তাঁর মনের কোণে উদয় হল যে, আমি স্বীয় স্ত্রীকে জনহীন-মরুপ্রান্তরে একাকিনী রেখে এসেছি, তার দায়িত্ব কে গ্রহণ করবে? তখন আল্লাহ পাক হযরত মুসা (আ)-এর সন্দেহ নিরসনের জন্য আদেশ করলেন যে, “তোমার সম্মুখে পতিত প্রস্তরখানির উপর লাঠি দ্বারা আঘাত হান।” তিনি আঘাত করলেন। তখন উক্ত প্রস্তরখানি বিদীর্ণ হয়ে তার মধ্য হতে আরেকখানি পাথর বের হল। দ্বিতীয় পাথরখানির উপর আঘাত করার জন্য পুনরায় আদেশ হল। হযরত মুসা (আ) আদেশ পালন করলেন। তখন তা ফেটে গিয়ে আরেকখানি প্রস্তর বের হল। তৃতীয় পাথরখানি উপর আঘাত হানার জন্য আবার নির্দেশ দেওয়া হল। তিনি আঘাত করলেন। তা বিদীর্ণ হল এবং এর অভ্যন্তর হতে একটি জীবিত কীট বেরিয়ে এল, যার মুখে ছিল একটি তরু-তাজা তৃণ। আল্লাহতা’লার অসীম কুদরতের বিশ্বাস হযরত মুসা (আ)-র পূর্বেও ছিল। তবে বাস্তব দৃষ্টান্ত প্রত্যক্ষ করার প্রতিক্রিয়া স্বতন্ত্র হয়ে থাকে। তাই এ দৃশ্য দেখার পর হযরত মুসা (আ) সরাসরি মিশরের দিকে রওয়ানা হলেন। সহধর্মীকে এটা বলা প্রয়োজন মনে করেননি যে, মিশর যাওয়ার জন্য আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। [তাফসীরে মা’রেফুল কোরআন]

    এগুলোসহ কুরআনের আরো বহু আয়াত ও বহু হাদীস দ্বারা একথাই প্রমাণিত হয় যে, রিয্‌কের নিয়ন্ত্রণ কেবল আল্লাহর হাতে। অবশ্য আল্লাহ তাঁর বান্দাকে রিয্‌ক উপার্জন করার কাজ করার আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু বান্দার ওই ‘কাজ’ তার রিয্‌কের ‘কারণ’ নয়। বরং এটা রিয্‌কের মাধ্যম মাত্র। এই মাধ্যম হালাল বা হারাম দুই রকমের হতে পারে। রিয্‌ক উপার্জনের মাধ্যম হালাল বা হারাম যা-ই হোক না কেন, রিয্‌কটি আসে আল্লাহর পক্ষ থেকেই। তবে ইসলাম মানুষকে রিয্‌ক অর্জনের হালাল পথগুলো দেখিয়ে দিয়েছে এবং হারাম পথগুলোও চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে। একজন মুমিন রিয্‌ক অর্জনের জন্য কেবল হালাল পন্থাগুলোই ব্যবহার করবে। অবশ্য কেউ হারাম পথ অবলম্বন করলেও সে-ই রিয্‌ক আল্লাহই প্রদান করেন। যখন কোনো ব্যক্তি অবৈধভাবে অন্যের মাল হস্তগত ও উপভোগ করে, তখন উক্ত বস্তু তার রিয্‌ক হওয়া সাব্যস্ত হয়, তবে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করার কারণে তা তার জন্য হারাম হয়েছে। যদি সে লোভের বশবর্তী হয়ে অবৈধ পন্থা অবলম্বন না করত; তাহলে তার জন্য নির্ধারিত রিয্‌ক বৈধ পন্থায়ই তার নিকট পৌঁছে যেত।

    জীবনকাল

    পবিত্র কুরআনের বহু আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, জীবনকাল (আজল)-এর পরিসমাপ্তিই মৃত্যুর কারণ এবং একমাত্র আল্লাহই মৃত্যু ঘটান।

    আর আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারো মৃত্যু হতে পারে না, যেহেতু প্রত্যেকের মেয়াদ নির্ধারিত। [সূরা আলে ইমরান: ১৪৫]

    আল্লাহই জীবের প্রাণসমূহ তাদের মৃত্যুর সময় হরণ করে থাকেন। [সূরা যুমার: ৪২]

    রব তিনি যিনি জীবন ও মৃত্যু প্রদান করেন। [সূরা বাকারা: ২৫৮]

    আল্লাহই বাঁচান ও মারেন। [সূরা আলে ইমরান: ১৫৬]

    তোমরা যেখানেই থাক না কেন, মৃত্যু তোমাদের অবধারিত, যদি তোমরা সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান কর তবুও। [সূরা নিসা: ৭৮]

  • ফিলিস্তিন: বর্তমান পরিস্থিতি, প্রতিক্রিয়া ও করণীয়

    بسم الله الرحمن الرحيم

    ১) ইয়াকুব আলাইহি সালামেরই অপর নাম ইসরাইল। হিব্রু ইসরাইল শব্দটি আরবী আবদুল্লাহ্’র সমার্থক হলেও; আজ ইসরাইলীরা হচ্ছে আদু’আল্লাহ্ [আল্লাহ্’র শত্রু]। তিনি মৃত্যুশয্যায় তার সন্তানদের জিজ্ঞেস করেছিলেন:

    “তোমরা কি উপস্থিত ছিলে, যখন ইয়াকুবের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়? যখন সে সন্তানদের বলল: আমার পর তোমরা কার এবাদত করবে? তারা বললো, আমরা তোমার পিতৃ-পুরুষ ইব্রাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাকের উপাস্যের এবাদত করব। তিনি একক উপাস্য।” [সুরা বাকারাহ: ১৩৩]

    অথচ তাদের সীমালঙ্গন আর বিধিবিধান না মানার কারনে তাদের উপর আরোপিত হয়েছে লাঞ্ছনা ও পরমুখাপেক্ষিতা:

    “আর তাদের উপর আরোপ করা হল লাঞ্ছনা ও পরমুখাপেক্ষিতা। তারা আল্লাহর রোষানলে পতিত হয়ে ঘুরতে থাকল। এমন হলো এ জন্য যে, তারা আল্লাহর বিধি বিধান মানতো না এবং নবীগনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করত। তার কারণ, তারা ছিল নাফরমান সীমালংঘকারী।” [সুরা বাকারাহ: ৬১]

    আর এই সীমালঙ্গনকারীদের সীমালঙ্গনের বর্তমান শিকার ফিলিস্তিন। ফিলিস্তিনি ভূমিতে তাদের দখলদারিত্ব আর আগ্রাসনের ইতিহাস সুদীর্ঘ। অথচ যেখানে ইসরাইলের অস্তিত্বের ভিতই *দখলদারিত্ব*; সেখানে আজ তারাই শোর তুলছে ফিলিস্তিনিদের *সন্ত্রাস* বলে। এ যেন বাড়ীতে অতিথিকে থাকতে দেয়া গৃহকর্তা; যাকে তার অতিথি নিজ গৃহ থেকে *বহিষ্কার* করতে চায় জবরদখলকারী বলে। কিংবা পকেটমার ধরা পরার পর ভুক্তভোগীকে চোর সাজানোর মত প্রহসন। ঔপনৈবেশিকদের সহায়তায়, জার্মান ইহুদী নিধন পরবর্তী সময়ে এই প্রহসন মঞ্চস্থ হয়। আর নিঃসন্দেহে এই প্রহসনকারীদের জন্য অপেক্ষা করছে লাঞ্ছনা।

    ২) ফিলিস্তিনের বর্তমান পরিস্থিতি সম্বন্ধে হামাস নেতা খালিদ মিশালের মন্তব্যটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ:

    “আজ ইসরাইল স্নায়ু পরীক্ষা করছে এই জাতির, তারা মিশরকে পরীক্ষা করছে, আরব আর মুসলিমদের পরীক্ষা করছে…যে তারা পূর্বের মত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করতে পারে কিনা নাকি বর্তমান নেতৃবৃন্দের অন্য কোন লক্ষ্য আছে।”

    এই মন্তব্যটিই ফিলিস্তিনের দীর্ঘদিনের পরিস্থিতির সারাংশ। তাই, এই আলোচনা টেনে দীর্ঘ করতে চাই না আর মুসলিম দেশসমূহের পশ্চিমাদের মদদপুষ্ট নেতৃবৃন্দের পরচর্চায় ও লিপ্ত হতে চাই না।

    ৩) তবে, এই চিত্র খুবই হতাশার যে, যখন দেখি গঁৎবাধা আর একই ধরনের প্রতিক্রিয়া: ফিলিস্তিনে ইসরাইলী হামলার পরিপ্রক্ষিতে। ফেসবুকে ফিলিস্তিনি পতাকার বন্যা বইয়ে দেয়া হচ্ছে। আর অনেক ভাই ফিলিস্তিনকে তালিকাভুক্ত দেশের অন্তর্ভুক্তির পিটিশান সাইন আর শেয়ার করছেন। আর প্রতিবাদকারীরা রাস্তায় প্রতিবাদ করছে সমাজতন্ত্রীদের সাথে এই ধ্বনিতে: “ফিলিস্তিন মুক্ত করো” আর মুসলিমরা বলছে: “ও ফিলিস্তিন…”।

    ইয়াহুদীরা ফিলিস্তিনের বর্ণবাদী-জাতীয়তাবাদী পতাকাকে ভয় করে না। তারা ইসলামের পতাকাকে ভয় করে। আমরা এটা জানার চেষ্টা করি না কেন যে ফিলিস্তিনি পতাকার ভিত্তি কি? এর ডিজাইনটি নেয়া হয়েছে আরব বিদ্রোহের পতাকা [প্রায় অন্যান্য আরব জাতীয় পতাকার মত] যা খিলাফহ্’র বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়ছিলো আর যার হোতা ছিলো ব্রিটিশরা। এটি হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আর “আরব” জাতীয়তাবাদের প্রতীক। আর আমরা রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস থেকে জানতে পারি, জাতীয়তাবাদের অসারতা আর এর পরিত্যাগের নির্দেশ। এই চিন্তা আমাদের মাথায় আসা উচিত না যে, ফিলিস্তিনি পতাকাতো যেকোনভাবে ইসলামিক; বস্তুতঃ তা হচ্ছে উম্মাহ্’র দুর্বলতা আর বিভাজনের প্রতীক আর যার বিরুদ্ধে আমাদের নিরন্তর সংগ্রাম করতে হবে, সমর্থন নয়।

    এই পতাকাগুলো ছুড়ে ফেলতে হবে আর তার পরিবর্তে ধারন করতে হবে তাওহীদের পতাকা। কমিউনিস্ট কিংবা সমাজতন্ত্রী কাফিরদের সাথে বিক্ষোভ পরিহার করতে হবে; যারা ইসলামেরই বিরুদ্ধাচরণ করে আর তাদের কোন চেতনা নাই ফিলিস্তিনকে সাহায্য করার আর না তারা চায় কোন মুসলিম ভূমি ইসলামি বিধিবিধান দ্বারা শাসিত হোক।

    আমাদেরকে এটাও মাথায় রাখতে হবে প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা, ফিলিস্তিন অনেকগুলো আক্রান্ত মুসলিম ভূমির একটি ভূমি; একমাত্র ভূমি নয়। নিঃসন্দেহে এই ভুমি সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্’র জন্য পবিত্র ভূমি। এর সাথে জড়িয়ে আছে মুসলিমদের প্রথম কিবলা আল-আকসা, রাসুলুল্লাহ’র ইসরা আর অসংখ্য আন্বিয়াদের স্মৃতি। তাই কেবল ফিলিস্তিনি মুসলিম ভাইদের নিকট নয় বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্’র ভাইদের কাছে এর তাৎপর্য অপরিসীম। কেননা,মিডিয়ার সবসময়ের প্রচেষ্টা একে ফিলিস্তিনি ইস্যু কিংবা আরব ইস্যু বলে তুলে ধরা। আমাদের দেখতে হবে, আমরা কি মিডিয়ার এই কাজে অজান্তে সাহায্য করছি কিনা? সাথে সাথে আমাদের সামগ্রিক বিশ্ব-পরিস্থিতিও অনুধাবন করতে হবে। এই আক্রান্ত ভূমির তালিকায় রয়েছে মালি, ইয়েমেন, সোমালিয়া, চেচনিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক, আরাকান, কাশ্মীর, মিন্ডানো এবং আরো অনেক। তাদের জন্য দু’আ করা আর সত্যিকারের তাগাদা অনুভব করতে হবে সমগ্র উম্মাহ্’র জন্য; আর এটাই প্রকৃত ভালবাসার নিদর্শণ।

    আমাদের গৌরবোজ্জল ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হবে; আর সাথে সাথে এই উপলব্ধি ও শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে, গতকালের ঘটনাপ্রবাহ থেকে যার মধ্যে নিহিত রয়েছে আজকের সমস্যার উত্তর। আমাদের বুঝা উচিত, আল-কুদসের জন্য জাতিসংঘের সমর্থন আদায়, এর জন্য কোন সমাধান নয়। এর সমাধান হচ্ছে, উম্মাহ্’র সমস্ত ভূমিকে একত্রীকরণ আর সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্’র একক নেতৃত্বের অধীনে একক জাতি হিসেবে সম্মলিত বাহিনী প্রেরণ এই দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে; যেভাবে তা করেছিলেন সালাহউদ্দীন আইয়ুবী রহিমাহুল্লাহ। আর তা শরীয়াহ্’য় প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে; আরব, সমাজতান্ত্রিক, গনতান্ত্রিক আর অন্য যে কোন পন্থায় নয়: যা ইসলাম বহির্ভূত।

    ৪) ইসরাইল আর হামাস বর্তমানে ইঁদুর-বিড়ালের খেলায় রয়েছে। ইসরাইল এখনো তার প্রকৃত শত্রুর মুকাবিলায় অবতীর্ণ হয়নি। কিন্তু, শীঘ্রই তারা ইসলামের সত্যিকার সিংহের সন্মূখীন হবে, যখন তারা জীবন ভিক্ষা চাইবে আর বৃক্ষ আর পাথরের আড়ালে গিয়ে লুকোবে। আর পাথর বলে উঠবে আমার পিছনে লুকায়িত ইহুদীকে হত্যা কর, ইনশা’আল্লাহ্।

    আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

    “আমি বনী ইসরাঈলকে কিতাবে পরিষ্কার বলে দিয়েছি যে, তোমরা পৃথিবীর বুকে দুবার অনর্থ সৃষ্টি করবে এবং অত্যন্ত বড় ধরনের অবাধ্যতায় লিপ্ত হবে।অতঃপর যখন প্রতিশ্রুতি সেই প্রথম সময়টি এল, তখন আমি তোমাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করলাম আমার কঠোর যোদ্ধা বান্দাদেরকে। অতঃপর তারা প্রতিটি জনপদের আনাচে-কানাচে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। এ ওয়াদা পূর্ণ হওয়ারই ছিল। অতঃপর আমি তোমাদের জন্যে তাদের বিরুদ্ধে পালা ঘুয়িয়ে দিলাম, তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও পুত্রসন্তান দ্বারা সাহায্য করলাম এবং তোমাদেরকে জনসংখ্যার দিক দিয়ে একটা বিরাট বাহিনীতে পরিণত করলাম।তোমরা যদি ভাল কর, তবে নিজেদেরই ভাল করবে এবং যদি মন্দ কর তবে তাও নিজেদের জন্যেই। এরপর যখন দ্বিতীয় সে সময়টি এল, তখন অন্য বান্দাদেরকে প্রেরণ করলাম, যাতে তোমাদের মুখমন্ডল বিকৃত করে দেয়, আর মসজিদে ঢুকে পড়ে যেমন প্রথমবার ঢুকেছিল এবং যেখানেই জয়ী হয়, সেখানেই পুরোপুরি ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। হয়ত তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন। কিন্তু যদি পুনরায় তদ্রূপ কর, আমিও পুনরায় তাই করব। আমি জাহান্নামকে কাফেরদের জন্যে কয়েদখানা করেছি।” [সুরা বনী ইসরাইল:০৪-০৮]

    আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেন:

    আর তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মুমিন হও তবে, তোমরাই জয়ী হবে। [সুরা আল-ই-ইমরান: ১৩৯]

    মুসলিম উম্মাহ সর্বত্র আজ যে নির্যাতন, নিপীড়ন আর হত্যার মুখোমুখি হচ্ছে তার মাধ্যমে আল্লাহ্ তা’আলা উম্মাহ্’কে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা থেকে বিচ্যুতি, জাতীয়তাবাদ, মানব-রচিত বিধান, ঔপনৈবেশিক দাসত্বের মনন, অনৈক্য আর পরাজিত মানসিকতার কলুষতা থেকে মুক্তি দান করুন। আর আমাদেরকে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষায় ফিরে যাওয়ার তাওফীক দিন। আল্লাহ্ তা’আলা বিশ্বাসীদের বিজয় দান করুন এবং ঐক্য দান করুন। আমাদের বিশ্বাস আর জ্ঞানকে পরিশুদ্ধ করুন আর আমাদের একনিষ্ঠতা দান করুন। আল্লাহ্ তা’আলা ফিলিস্তিনি ভাই-বোনদের ধৈর্য ধারন করার তাওফীক দিন আর দৃঢ়পদ করুন। আমীন।

    সায়্যিদ মাহমূদ গজনবী

  • সালাফিবাদ ও সুফিবাদের মাঝে..

    দুঃখজনক হলেও সত্য বর্তমান সময়ে উম্মাহর মধ্যে এমন কিছু দল আছে যারা উম্মাহর মধ্যে অতীতকাল থেকে আক্বীদার শাখা, উসুল আল ফিক্বহ কিংবা ফিক্বহ নিয়ে বিদ্যমান বিভেদগুলোকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। প্রতিটি দলই বাকি দলগুলোকে বর্জন করার জন্য সর্বোচ্চ প্রচারণা চালায় এবং একে অপরকে ভীষণ শত্রু মনে করে অথচ তারা ভুলে যায় আমাদের মুসলিম ভুমিগুলো শত্রুদের দখলে, উদাহরণস্বরূপ – ইসরা এবং মিরাজের ভুমি প্যালেস্টাইন। তারা ভুলে যায় মুসলিম ভূমিগুলোত প্রতিদিন রক্তে রঞ্জিত হয় সাম্রাজ্যবাদী কিংবা এদের দালাল দ্বারা কিংবা তারা ভুলে যায় ইসলামের শত্রুরা ধ্বংস করতে ব্যস্ত আমাদের দ্বীনের মূল শিক্ষা, শরীয়াহ আইন এমন কি আক্বীদার অনেক বিষয় পর্যন্তও।

    সালাফি কিংবা সুফি দুই পক্ষেরই চরম্পন্থীদের কথা আমরা বাদ দিচ্ছি যারা সম্পূর্ণ ভুল পথে চলে গেছে। এ সব চরমপন্থীদের মধ্যে রয়েছে সে সব সূফি যারা ওয়াহদাতুল উজুদ অর্থাৎ আল্লাহ নিজেও সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত এ ধরনের ভ্রান্ত মতবাদে বিশ্বাসী কিংবা সে সব অতি জাহেরী (কেবল কুরআন ও হাদিসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণকারী) সালাফি যারা নিজেরা ছাড়া সবাইকে কাফির বলে আখ্যা দেয়। আমরা যদি আজকে শুধু মূলধারার সালাফি কিংবা সূফিদের দিকে তাকাই তাহলে আমরা দেখতে পাবো উভয় দলই তাদের মতের প্রতিষ্ঠাতা এবং তাদের ক্লাসিকাল স্কলারদের দেখানো পথ থেকে দূরে চলে গেছে।

    আশ’আরি মতবাদ ও সূফিবাদের উল্লেখযোগ্য কিছু স্কলাররা তারা জাহেরীদের সাথে অনেক বিষয় নিয়ে মতবিরোধ করেছে কিন্তু কখনই তাদেরকে শত্রু মনে করে নি। তারা কখনই ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়্যিম কিংবা ইবনে কাছির কে ভ্রান্ত মনে করেন নি যদিও তারা ঈমানের সংজ্ঞা থেকে শুরু করে আল্লাহর সিফাত বোঝা, তাক্বলিদ করা যাবে কিনা, ক্বিয়াসের ব্যবহার এর মত বিষয়গুলোতে দ্বিমত পোষন করেছে। এমনকি তারা একে অপরকে মুতাজিলা কিংবা আল খারেজিদের মত ভ্রান্তও মনে করে নি। উল্টো বিভিন্ন বইএ তারা জাহেরি স্কলারদের যথেষ্ট সম্মান এবং তাদের রেফারেন্স ব্যবহার করেছে। এটা সত্য তারা একে অপরের সমলোচনা করেছে কিন্তু এটা আমাদের মনে রাখতে হবে সমালোচনাগুলো ছিলো জ্ঞান এবং বিচক্ষণতার দিক দিয়ে অতি উচ্চ পর্যায়ের। আমাদের সালাফে সালেহীনদের মধ্যেও এই বৈশিষ্ট পরিলক্ষিত হয়েছিলো, যেমন ইমাম শাফেঈ (রহ) ইমাম আবু হানিফা (রহ) এর ইহতিহসান (আইনগত অগ্রাধিকার যা হানাফি মাজহাবে আইনগ্রহণের গৌণ মাধ্যম ধরা হয়েছে) এর নীতিমালা এর সমালোচনা করেছিলেন এবং তার মতে যারা ইহতিহসান করে তারা নিজের মনকে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী মনে করে (অধ্যায়: ইবতাল উল ইসতিহসান, গ্রন্থ: কিতাবুল উম্ম)। কিন্তু তিনি কখনই ইমাম আবু হানিফাকে ভ্রান্ত মনে করেন নি, উপরন্তু তিনি তার শিক্ষক মুহাম্মদ ইবনে আল হাসান আল শায়বানি (রহ) যিনি আবু হানিফার ছাত্র ছিলেন তাকে খুব সম্মান করতেন।

    একি ভাবে সালাফি স্কলাররাও আশআরি স্কলারদের অনেক সমালোচনা করেছেন বিশেষত আল্লাহর গুণ, কুরআনের সংজ্ঞা, তাকলিদ এর গ্রহণযোগ্যতা, ইমানের সংজ্ঞা এই বিষয়গুলোতে। তদুপরি তাদেরকে ভ্রান্ত কিংবা মুরতাদ মনে না করে যথাযথ সম্মান করেছেন। ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেছেন,

    “এটা ভাবার কোন অবকাশ নেই আক্বীদার বিষয়গুলোত যারা ভুল করে তারা ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা জাহিল। সম্ভবত যে মুজতাহিদ ভুল করেছেন তাকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন। বিষয়টা এমনও হতে পারে তার কাছে হয়ত পর্যাপ্ত তথ্য পোছায়নি যা দ্বারা বোঝা যাবে সে ভুল।” [ইবনে তাইয়্যিমিয়াহ, মাজমু আল ফাতোয়াহ, ভলিউম ৩, পৃষ্ঠা ২৩৯-২৪০]

    তিনি এটাও বলেছেন সালাফ এ সালেহরাও আক্বীদার বিষয়গুলো নিয়ে মতবিরোধ করেছেন। তিনি বলেন,

    “সালাফরা আক্বীদার বেশ কিছু বিষয় নিয়ে মতবিরোধ করেছেন, কিন্তু কেউই কাউকে কাফির, ফাসেক কিংবা শয়তান নামে আখ্যায়িত করেন নি। শুরাইহ (রহ) এই আয়াত পাঠ করতে অস্বীকৃতি জানান, “আমি অবাক হই, যখন তারা বিদ্রুপ করে”, তার মতে আল্লাহ অবাক হন না। এ খবর যখন ইব্রাহিম আল নাখাই এর কাছে পৌছালো তিনি বললেন, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ শুরাইহ এর চেয়ে জ্ঞানী লোক ছিলো এবং তাকে আমরা “আমি অবাক হই” পাঠ করতে দেখেছি। আবার আয়েশা (রা) অন্যান্য সাহাবিদের সাথে রাসুলুল্লাহ (সা) এর আল্লাহকে দেখা নিয়ে মতবিরোধ হয়েছিলো। আয়েশা (রা) এর মতে যে বলবে রাসুলুল্লাহ (সা) আল্লাহ কে দেখেছিলেন বলবে সে আল্লাহর সম্পর্কে মিথ্যা বলবে, যদিও বাকি সাহাবিরা এর সাত্থে এক মত ছিলেননা, কিন্তু কেউ কাউকে ভ্রান্ত বলে নি। আবার মৃত জীবিতদের কথা শুনতে পায় কিনা, স্বজনদের কান্নার জন্য মৃতকে শাস্তি দেয়া হয় কিনা বিষয়গুলো নিয়ে মতবিরোধ হয়েছিলো।” [ইবনে তাইমিয়্যাহ, মাজমু আল ফাতাওয়াহ, ভলিউম ৩, পৃষ্ঠা ২৩৯-২৪০]

    তারা মনে মনে এ ধারণা রাখতেন যে আল্লাহ তার অনুগত বান্দাদের ক্ষমা করবেন। রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “আল্লাহ আমার উম্মাহকে সে সব অপরাধ ক্ষমা করেছেন, যা ভুলে হয়, ভুলে যাওয়ার দরুন কিংবা জবরদস্তির কারণে হয়”

    ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে আবুল হাসান আল-আশআরি (রহ) (মৃত্যু- ৯৩৬ খ্রীষ্টাব্দ) কিংবা জাহেরি স্কলার যেমন ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ) (মৃত্যু- ১৩২৮ খ্রীষ্টাব্দ) যখনই আক্বীদার শাখা সম্পর্কিত কোন বিতর্কে অংশগ্রহণ করেছেন তারা তা শুধুমাত্র করেছিলেন মহৎ উদ্দ্যেশে। যেমন আবুল হাসান আল-আশআরি (রহ) সচেষ্ট ছিলেন মুতাজিলা নামক ভ্রান্ত সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করতে যারা ইসলামে অনেক বিভ্রান্তি তৈরি করছিলো। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ) মোকাবেলা করেছেন তদানিন্তন সময়ের কিছু চরম্পন্থি সূফিদের।

    সুতরাং বর্তমান সময়ে একে অপরকে শত্রু ভাবা সালাফি এবং সূফিদের উচিত হবে তাদের বিখ্যাত আলেমদের পথ অনুসরণ করা। তাদের উচিত “সৎ কাজে আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ” এর আলোকে বর্তমান সময়ে কুফফার দ্বারা আমাদের দ্বীন, তার মূল শিক্ষা, আইন এমনকি আক্বীদার উপর বুদ্ধিবৃত্তিক ধ্বংসযজ্ঞ চলছে তার দিকে অধিক মনোযোগী হওয়া। আজকে কুফফারদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মুসলিমরা আধুনিকতার নামে আল্লাহ নির্ধারিত হুদুদকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, আজকে তারা কুফফারদের সাথে মিলিত হয়ে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ধারণাকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালাচ্ছে, তারা আজকে মহিলাদের খিমার (headscarf) এবং জিলবাবকে জনজীবন থেকে বিলুপ্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে, আজকে তারা মানবরচিত আইন সমাজে প্রণয়ন করে “আল্লাহ সার্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী” এ আক্বীদাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত সেকুলার লিবারেলিজম মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি, কখনই আক্বীদার শাখা (ফুরু আল আক্বীদা) কিংবা উসুল আল ফিক্বহের মতবিরোধগুলো নয়। সুফি এবং সালাফিদের কেউ কেউ একে অপরের সাথে নেহাৎ বিতর্কের উদ্দেশে নিজেদের মতকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ইসলামের অনেক মূল বিষয়গুলোর বিরুদ্ধে কথা বলে।

    এখানে একটি বিষয় সম্পুর্ণ পরিস্কার যে, এ উভয় পক্ষের কিছু কিছু লোকদিগকে মুসলিমদের মূল বিষয়গুলোতে বিভ্রান্তি তৈরি করার উদ্দেশে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিছু লোক আছেন যারা নিজেদেরকে আবুল হাসান আল-আশআরির অনুসরণকারি বলে দাবি করেন কিন্তু শরীয়ার অনেক ক্বাতঈ (নিশ্চিত) বিষয় গুলো অস্বীকার করে, ক্বাতাঈ দলিল তাদেরকেই বলা হয় যেগুলো অর্থ এবং দলিল বিশুদ্ধ। তারা চার ইমাম সহ অনেক আশআরি স্কলার যেমন কাযি ইয়াদ, আল গাজালি, ইমাম আল হারামাইন আল জুয়াইনি, আল সুয়ূতি, আন নববি, আল রাজি, ইবন হাজর আল আসকালানি যেসব বিষয়ে একমত সেসব বিষয়গুলোকে পরিত্যাগ করে।

    তাদের মতে হুদুদ কায়েম যেমন চোরের হাত কাটা কিংবা অবিবাহিত জিনাকারীকে চাবুক মারা এ বিষয়গুলো সময় কিংবা স্থানভেদে পরিবর্তন হতে পারে। এ ধরনের ব্যক্তিবর্গ মাসালিহ আল মুরসালা (Public Interest), জরুরাত, দুটি মন্দের মধ্যে অপেক্ষাকৃত ভালো এ ধারণাগুলোর অপব্যবহার করেন। তারা সুদ গ্রহণ কিংবা ইসলাম ছাড়া অন্য পদ্ধতিতে শাসক নির্বাচনকে বৈধ মনে করেন। অথচ আশআরি ক্লাসিকাল স্কলাররা এগুলোকে কখনো অনুমোদন দেয় নি, এ ধরনের দাবি তাদের প্রতি অপবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়।

    প্রকৃতপক্ষে মডার্নিস্ট স্কলারদের ভুল মূলত আশআরি হবার জন্য নয় বরং হালাল কে হারাম কিংবা হারামকে হালাল করার প্রবণতা। তাদের এ ধরনের হীনমন্যতা আশআরি এবং ভিন্নমত পোষণকারী সকল আলোচনাকারীর সামনে তুলে ধরা উচিত।

    অনুরূপভাবে বর্তমান সালাফি আলেমরা অনৈতিকভাবে সৌদি আরবের অনৈসলামিক সরকারকে বৈধতা দিয়েছে এমনকি তাদের অনেক অনৈসলামিক কার্যক্রম যেমন আমেরিকার সাথে মৈত্রীকেও তারা জায়েজ করে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে যারা এমনটি করে তারা সালাফদের অনুসরন করে না বরং সালাফের পথ থেকে সরে আসে। তাদের এ ধরনের মনোভাব সালাফি স্কলার যেমন ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়্যিম, ইবনে কাছির, এর মতবাদের সাথে চরম বিরোধী। জাহেরি স্কলাররা শরীয়াহ আইন ছাড়া অন্য আইন দ্বারা শাসনকে কেবল নিষেধই বলেন নি বরং কুফর বলে দাবি করেছেন, ইবনে তাইমিয়্যাহর মতে,

    “যে ব্যক্তি মনে করে না যে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা দ্বারা শাসন করা ফরয সে ব্যক্তি কাফের। আর যে ব্যক্তি মনে করে যে, তার নিজের মতামত দিয়ে শাসন করা বৈধ এবং আল্লাহর আইন থেকে সরে যায় এবং অনুসরণ করে না, সে ব্যক্তিও কাফের। সুতরাং সমগ্র উম্মাহর জন্য সাধারণ নিয়ম হলো, কুরআন-সুন্নাহ ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে শাসন করা বা রায় দেয়া বৈধ নয়। কোনো জ্ঞানী বা নেতার আবার শায়খ বা রাজার আদেশ মানতে জনগনকে বাধ্য করানোর অধিকার কোনো ব্যক্তিরই নেই। যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে, সে ওইরূপ কোন কিছু দিয়ে বিচার করতে পারবে এবং কুরআন সুন্নাহ দিয়ে বিচার করবে না সেও কাফের।” [মিনহাজুস সুন্নাহ, ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা ১৩০-১৩২]

    তাই সালাফি মডার্নিস্টদের হীনমন্যতা সালাফি এবং অন্যান্য স্কলার দ্বারা সকলের সামনে তুলে ধরা উচিত।

    শুধু তাই নয় সালাফি এবং সূফি স্কলারদের উচিত তাদের সকল আইনের মূল উৎস কুরআন অনুসরণ করে তাদের কিছু পরস্পরবিরোধী কিছু বিষয় পরিবর্তন করা যেগুলো ভুল কিংবা দূর্বল হিসেবে গণ্য। তাদের উচিত তাদের মূল মতবাদে উল্লেখিত উসুল গ্রহণ করা। যেমন কিছু আশআরিদের মতে ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইজতিহাদ করা ফরজে কিফায়া। ঠিক তেমনি সালাফি মতাবলম্বিরা তাকলিদ বিষয়ে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা উচিত কারণ তাকলিদ না করাতে সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে, যেখানে কুরআনে বলা হয়েছে, “যদি না জানো তবে জ্ঞানী লোকদের জিজ্ঞেস কর” (২১:৭)। রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “অজ্ঞানতার প্রতিকার হচ্ছে জিজ্ঞেস করা” এ ছাড়াও আরো অনেক দলীল রয়েছে। আমরা যদি নিরপেক্ষ ভাবে আমাদের মূল উৎসসমুহ যাচাই করি তাহলে আমরা দেখতে পাবো, সালাফিবাদ কিংবা সূফিবাদ, আশআরি কিংবা জাহেরি কোন মতবাদই প্রকৃত পথ নয় বরং এ দুই এর মধ্যে।

    বর্তমানে আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য, ফিক্বহী কিংবা স্কলারদের ভেদাভেদ দূরে ঠেলে সেকুলার লিবারেলিজমের কুফর এর বিরুদ্ধে উম্মাহর এক হওয়া এবং আল্লাহর নির্দেশের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করা, আল্লাহ বলছেন,

    আর কাফেররা একে অপরের বন্ধু, তোমরাও যদি অনুরূপ না কর তাহলে জমিনে ফিতনা এবং জুলুম ছড়িয়ে পরবে” [আনফাল: ৭৩]

    আমরা এমন এক সময়ে বাস করি যখন ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রবল, তাই আমাদের পুরাতন মতবিরোধ নিয়ে পরে থাকাটা আমাদের বোকামি হবে, এর থেকে কোন সমাধান আসবে না। সুনিশ্চিতভাবে ঈমানের সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্কের থেকে জীবন থেকে রাজনীতিকে আলাদা করে ফেলায় উম্মাহ যে ক্ষতির সম্মুক্ষীন হচ্ছে তা সমাধান করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্কলারদের আল্লাহর গুণ আক্ষরিক না রূপক এ নিয়ে হাজার হাজার ঘন্টা গবেষণায় অতিবাহিত না করে তাগুতি আইন বর্জন করে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকা উচিত। আমাদের মতবিরোধ থাকা স্বত্ত্বেও ইসলামের মূল বিশ্বাসের ভিত্তেতে এক হতে হবে যাতে কালিমা সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হতে পারে।

    আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদিগকে দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে, এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুন্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ নিজের নিদর্শনসমুহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা হেদায়েত প্রাপ্ত হতে পার। [সুরা আল ইমরান: ১০৩]

    আবু ইসমাঈল