তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
আপনার নিকট আল্লাহ’র অস্তিত্বের স্বপক্ষে কোন প্রমাণ আছে কি?

যারা স্রষ্টাতে বিশ্বাস করেনা, তারা প্রায়ই বলে থাকে স্রষ্টাতে বিশ্বাস একটি অন্ধ বিশ্বাস অর্থাৎ স্রষ্টাতে বিশ্বাস কোন যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। আরও বলা হয় যে, স্রষ্টাতে বিশ্বাস সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক।
স্রষ্টাতে বিশ্বাস কি বিজ্ঞানভিত্তিক কি না বিচার করার আগে দেখা যাক বিজ্ঞান আসলে কী? আমাদের চারপাশে মহাবিশ্ব, তার অধ্যয়ন ও পর্যবেক্ষণই বিজ্ঞান। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের মাধ্যমে বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করে মহাবিশ্বের কর্মধারা।
এটা বিজ্ঞানের আলোচ্য বা বিবেচ্য বিষয় নয় যে, কে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন বা এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির উদ্দেশ্য কি। বিজ্ঞান শুধুমাত্র মহাবিশ্বের কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করে। সেক্ষেত্রে, স্রষ্টা আছেন কিনা তার উত্তর পেতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা ভুল। বরং এ প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ ব্যবহার করা উচিত।
সূর্য, চন্দ্র, তারা, গ্রহ, জীবজন্তু, মানুষ ইত্যাদি বস্তু দেখলেই এদের কতগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই। যেমনঃ তাদের নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধ আকৃতি আছে, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, ওজন ইত্যাদি গন্ডি আছে; এরা সকলেই নির্ভরশীল, দুর্বল এবং পরমুখাপেক্ষী। এসব কিছুই নির্দেশ করে যে এরা নিজেরা নিজেদের সৃষ্টি করেনি বা সেই যোগ্যতাও তাদের নেই। বরং তাদের উপর এসব বৈশিষ্ট্য আরোপ করা হয়েছে। এদের প্রত্যেকক্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে একজন স্রষ্টা আছেন।
ইসলাম মানুষকে যৌক্তিক প্রমাণের মাধ্যমে আল্লাহ’র অস্তিত্বের স্পষ্ট ধারণা দিয়েছে। কুর’আনের শত শত আয়াতে মানুষকে এই মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের জন্য জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহ’র অস্তিত্বের পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। সূরা আল ইমরানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“দেখুন! আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে দিবা-রাত্রির আবর্তনে অবশ্যই চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।”
আজকে আমাদের আল্লাহ’র অস্তিত্বের উপর ততটুকুই বিশ্বাস রাখি যা আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পূর্বপুরুষদের নিকট হতে পেয়েছি। আমাদের এই বিশ্বাস কোন বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। ফলে, আমাদের জীবনের উপর এই বিশ্বাসের কোন কার্যকর প্রভাব নেই। তাই আমাদেরকে ইসলামিক মৌলিক বিশ্বাস (আকীদা) সম্পর্কে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে চিন্তা করা উচিত, তা স্বাভাবিকভাবেই আমাদের জীবনকে সঠিক দিক-নির্দেশনা দান করবে।
সেনাবাহিনী ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি সমাচার !!

সেনাবাহিনী নিয়ে খালেদা জিয়ার বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। কেউ কেউ এটাকে অগণতান্ত্রিক সরকার আনার চক্রান্ত হিসেবে দেখছেন। অতীতের মতো বর্তমানেও বাংলাদেশের রাজনীতি সেনাবাহিনী নিয়ে সরগরম হয়ে ওঠছে। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী প্রভাব বিস্তার করেছে। ক্ষেত্র বিশেষে সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকা জনগণ কতৃক প্রশংসিত হয়েছে। তাই দেখা যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটে সেনাবাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা। এটাও ঠিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের মতো সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকার পেছনে ছিল মূলত এই দেশের স্বার্বভৌমের প্রতীক মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং আধিপত্যবাদী ভারতের সক্রিয় সমর্থন, বিশেষ করে ওয়ান ইলেভেনের সময় মার্কিন-ভারত-বৃটেন এর ভূমিকা ছিল দেখার মতো।
কাজে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিল সেনাবাহিনী। বিগত গণতান্ত্রিক সরকার গুলোর লুঠপাট, দূর্নীতি আর ক্ষমতার দ্বন্ধে জনগণ যখন প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতায় ভূগছে তখন সেনাবাহিনীকে সে ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য রাজনৈতিক ভূমিকায় ব্যবহার করা হয়েছে। ওয়ান ইলেভেন এর মতো আগামী দিনেও সেনাবাহিনীকে একই ভূমিকায় দেখা যেতে পারে আর তা হবে মার্কিন ভারতের সমর্থনে। দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী নিয়ে খালেদার বক্তব্য এবং এ নিয়ে সরকার প্রধান থেকে শুরু করে সরকারের মন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বক্তব্য, সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকাকে সামনে নিয়ে এসেছে । তাছাড়া পিলখানা হত্যাকান্ড নিয়ে এই দেশের সাধারণ জনগণ এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ভারত বিরোধী ক্ষোভ বিরাজ করছে। মূলত পিলখানা হত্যাকান্ড ছিল সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ভারত বিরোধী কর্মকর্তাদের প্রতি ভারতের শক্তিশালী সংকেত, যার মাধ্যমে এদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কে ধ্বংস করা হয়েছে। কাপুরুষজনোচিত এই হত্যাকান্ডের পেছনে আমেরিকার ছিল মৌন সমর্থন, আওয়ামীলীগ সরকার ও ছিল পূর্ণ সচেতন, আরেক মার্কিন দালাল বিএনপি ছিল নিশ্চুপ।
এই হত্যাকান্ড সংঘটিত করেই থেমে থাকেনি ভারত, সেনাবাহিনীর উপর তার কর্তৃত্ব কে দৃঢ় করার জন্য সেনাবাহিনীর সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে পরিকল্পনা নিয়েছে। বিগত কয়েক বৎসর ধরে সেনাবাহিনীর সাথে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘সম্প্রতি‘ নামক সামরিক মহড়া সে পরিকল্পনারই অংশ। তাছাড়া ভারতের ট্রেনিং কলেজ গুলোতে বাংলাদেশের সেনা ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। আর এটা ঘটছে দীর্ঘদিন ধরে সেনাবাহিনীর উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকারী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সমর্থনে। আমেরিকার ‘এশিয়ান পিভট‘ নীতির গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র ভারত। আমেরিকা দুইটি লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে তার নীতি কে শক্তিশালী করছে আর তা হলো চীনের উত্থান কে ঠেকানো তথা এর প্রভাবকে নিয়ন্ত্রন করা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় পুঁজিবাদ বিরোধী ইসলামের রাজনৈতিক উত্থান কে দমন করা। কাজেই আমেরিকার দক্ষিণ এশিয়া নীতি মূলত ভারত কেন্দ্রিক নীতি।
দক্ষিণ এশিয়া কে কেন্দ্র করে মার্কিন-ভারতের রাজনৈতিক সামরিক অর্থনৈতিক সমঝোতা, তারই আলোকে সেনাবাহিনীর উপর মার্কিন-ভারতের কর্তৃত্ব ও প্রভাবকে দেখতে হবে। আমেরিকা-ভারত সন্ত্রাসবাদ ঠেকানোর নামে ইসলামের রাজনৈতিক উত্থান ঠেকাতে মরিয়া হয়ে ওঠেছে। তাই সেনাবাহিনীর সাথে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ও মুশরিক আধিপত্যবাদী শক্তি ভারতের সামরিক মহড়া, সামরিক সংলাপ এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ভারত বিরোধী ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের পিলখানায় হত্যাকান্ড, গুম, খুন, গৃহবন্দী, চাকরি থেকে বহিষ্কার একিই সূত্রে গাঁথা।
সোমবার থেকে শুরু হওয়া সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার ভারত সফরকে ও ভিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। এটা নিছক কোনো সামরিক সফর বলে মনে হচ্ছে না, পত্রিকার বরাতে যতটুকু জানা গেছে তাতে সেনাপ্রধান শুধুমাত্র ভারতের সেনাপ্রধানের সাথে দেখা করবেন না সে সাথে ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে বিশেষ করে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী অ্যান্টনিওর সাথেও বৈঠক করবেন। তাছাড়া সাম্প্রতিক ভারতের আগ্রাতে দ্বিতীয় রাউন্ড “সম্প্রতি” মহড়া সম্পন্ন হয়েছে, যা গত বৎসর থেকে প্রথম বারের মতো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাথে শুরু হয়েছে। এছাড়া এপ্রিল-মে মাসে ঢাকাতে আমেরিকার সাথে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদ দমন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় পররাষ্ট্র পর্যায়ে নিরাপত্তা সংলাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যার আগে বৈঠকটি হয়েছিল আমেরিকায়। এছাড়া একের পর এক মার্কিন বাহিনীর সাথে সামরিক মহড়া ‘টাইগার শার্ক‘, নৌ মহড়া সংঘটিত হচ্ছে। খুব শীঘ্রই আমেরিকা বাংলাদেশ নৌ বাহিনী কে একটি যুদ্ধজাহাজ উপহার দিতে যাচ্ছে। আর এসব কিছু করার একটাই কারণ তা হলো সেনাবাহিনীর উপর মার্কিন নেতৃত্ব বজায় রাখা ও ভারতের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যাতে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মতো বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকেও তথাকথিত সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধে মার্কিন-ভারতের ভূকৌশলগত স্বার্থে ব্যবহার করা যায়।
নিঃসন্দেহে ভূকৌশলগত অবস্থান এবং ইসলামী আকীদার কারণে বাংলাদেশ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মার্কিন-ভারতের সমঝোতার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হবে। আর আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতায় তারাই আসবে যারা এই দুই শক্তির স্বার্থকে রক্ষা করতে পারবে। কাজেই এই দেশের মুসলিমদের সাম্রাজ্যবাদ-আধিপত্যবাদ বিরোধী লড়াই শুধু মাত্র তাদের তল্পিবাহক দালাল বিএনপি-আওয়ামী জোটের বিরুদ্ধে নয় সে সাথে এই সব দালাল তৈরির কারখানা ঔপনিবেশিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কে অপসারণ এবং সে সাথে মুসলিম ভূখন্ডের উপর সাম্রাজ্যবাদীদের কর্তৃত্বকে নিশ্চিন্ন করার জন্য খিলাফত রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার দিকে এগিয়ে নিতে হবে। আর সেনাবাহিনীর উচিত দুর্নীতিগ্রস্থ ঘুণে ধরা ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা গণতন্ত্রকে উৎখাতে নিষ্ঠাবান রাজনীতিবিদদের সহায়তা করা যাতে উম্মাহ কুফর থেকে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা খিলাফতে প্রত্যাবর্তন করতে পারে। উম্মাহ খালিদ বিন ওয়ালিদের উত্তরসূরী সেনাবাহিনীকে মার্কিন-ভারতের স্বার্থের পাহারাদার নয় বরং শাহাদাতের কালিমা বহনকারী বাহিনী হিসেবে দেখতে চায়।
এম. মোরশেদ আলম
প্রথম প্রকাশঃ ২ এপ্রিল ২০১৩
আপনি কার উপাসনা করেন?

তিটি মানব সন্তানই কোন একটি সত্ত্বার উপাসনা করতে চায় । কিন্তু মানুষ উপাসনা করতে চায় কেন? প্রকৃতিগতভাবে মানুষ দুর্বল । সে দুর্বলতা আমরা আমাদের মাঝে উপলব্ধি করতে পারি এবং কোন কিছুর উপর নির্ভর করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি । ফলে মানুষ যখন তার চেয়ে শক্তিশালী কারও অস্তিত্ব টের পায়,তখন প্রায়শঃ তারা তত্ত্বাবধান, নিরাপত্তা ও আশা পুরণের জন্য ঐ সত্ত্বার উপর নির্ভর করে । প্রাচীনকালে মানুষ সূর্য, চাদঁ, তারা, পর্বত, পশু এমনকি তার নিজ হাতে তৈরি মূর্তির সম্মুখেও মাথা নত করত।
তেমনিভাবে, বর্তমান কালে আমরা দেখতে পাই, অসংখ্য দেবতার অস্তিত্ব- যাদের সামনে মানুষ মাথা নত করে। অনেক দার্শনিক, রাজনীতিবিদ ও চিন্তাবিদকে উপদেবতা জ্ঞানে আরাধনা করা হয় । সমাজের অনেকের জন্যই তারা যাবতীয় সমস্যা সমাধানের উত্সস্বরুপ। অপরদিকে জনপ্রিয় চিত্রাভিনেতা,সংগীতশিল্পী এবং ক্রীড়াবিদরাও কারো কারো উপাস্যের আসন দখল করে নিয়েছে; এদের অনুসরণ ও সমকক্ষ হওয়ার চেষ্টাতেই অনকের পুরো জীবন ব্যপ্ত। আরো কিছু মানুষ আছে যারা নিজের কামনা-বাসনার দাসে পরিণত হয়েছে। তাদের কামনা-বাসনাই তাদের উপাস্য।
ইসলাম এসেছে মানুষকে চিন্তা করাতে যে সে কার দাসত্ব করছে । অনেক সময় মানুষ যাদের দাসত্ব করে তারা তার নিজের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয় । তারাও তারই মত সীমাবদ্দ্ব ,দুর্বল ও পরমুখাপেক্ষী । তাহলে মানুষ এসব জিনিসকে কেন উপাসনা করবে ? ইসলাম এসেছে মানুষকে সীমাবদ্ধ, দুর্বল জিনিসের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে মহান স্রষ্টা আল্লাহ’র দাসত্বে নিয়োজিত করতে । আল্লাহ’ই সকল কিছুর স্রষ্টা এবং একমাত্র তিনিই প্রার্থনার যোগ্য । আল্লাহ্ পাক সূরা আয্-যারিয়াতে বলেন ,
“আমি জ্বিন ও মানব জাতিকে একমাত্র আমার ইবাদতের উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছি।“
মানুষের সকল দিক নির্দেশনার একমাত্র উত্স আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। অর্থাত্ মানুষের সকল ধ্যান ধারনা, জীবনের যাবতীয় সমস্যার সমাধান ও সমাজ পরিচালনার নীতিমালার একমাত্র উত্স হচ্ছেন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা । দুর্ভাগ্যবশতঃ আজকের দিনে আমরা আমরা শুধুমাত্র জায়নামাযেই আল্লাহকে স্বরণ করি ।আমাদের যাবতীয় লক্ষ্য , জীবনের উদ্দেশ্য, সামাজিক রীতিনীতি ও আইন-কানুন আসে অন্যান্য দুর্বল উপাস্যের কাছ থেকে । আসুন আমরা সকলে মিলে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা)” এর প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করি, যাতে করে আমাদের সম্পুর্ণ জীবন ব্যবস্থাটাই আল্লাহ্’র ইবাদত হয়ে যায় ।ইসলাম শুধুমাত্র নামাজ, রোজা ও কয়েকটি রীতিনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়

আজকাল ইসলাম কয়েকটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান সর্বস্ব ব্যাপার হয়ে দারিয়েছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া, রমযানের রোযা রাখা, হজ্ব করা, লম্বা জামা ও টুপি পড়া এবং জুম্মার নামাজের পর লম্বা দোয়া করা ইত্যাদিকেই বর্তমানে ইসলামের বিধিবিধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমাদের প্রাত্যহিক কার্যাবলীর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। আমাদের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, আমাদের পছন্দ ও অপছন্দ ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত। টাকা, ফূর্তি এবং স্থুল বাসনা চরিতার্থ করাই এখন প্রত্যেকের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
ইসলাম প্রচলিত অন্যান্য ধর্মের মত নয়। এটি মানবজাতির জন্য একটি ব্যবহারিক ও সামগ্রিক জীবনবিধান। আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং জীবনযাপনের নিয়ম-কানুন তিনিই প্রদান করেছেন। আল্লাহ পাক সূরা আল মায়েদাহ্-তে বলেন-
“আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্য পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের উপর আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জীবনবিধান হিসেবে মনোনীত করলাম।“
ইসলাম, জীবনযাপন উপযোগী ব্যাপক সমাধান ও আইন প্রনয়ন করেছে। ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক জীবন সহ সবকিছুতেই ইসলাম সুস্পষ্ট আইন ও বিধান প্রদান করেছে। আল্লাহ আমাদের সাথে তার সম্পর্কের পদ্ধতি প্রদান করেছেন, যেমনঃ নামায, রোজা, হজ্ব ইত্যাদির; আবার ব্যক্তির নিজের সাথে নিজের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পদ্ধতি প্রদান করেছেন, যেমন: মানুষ যা খায় এবং যা পড়ে সে সম্পর্কের বিধান। এছাড়াও আল্লাহ তা’আলা সমাজে মানুষ অন্য মানুষের সাথে কিভাবে সম্পর্ক স্থাপন করবে তা নিয়ন্ত্রণ করা জন্যও বিধান প্রণয়ন করেছেন; যেমন কিভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে, কিভাবে শাসনকার্য ও বিচার ব্যবস্থা চলবে এমনকি বিপরীত লিঙ্গের সাথে আচরণ কিরূপ হবে।
সূরা আন-নাহল এ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-
“এবং আমি আপনার নিকট এমন এক পুস্তক প্রকাশ করেছি যাতে সকল বিষয়ে সবিস্তারে বর্ননা করা হয়েছে।“
যেহেতু আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবন থেকে আল্লাহর মনোনীত দ্বীন-ইসলামকে পরিত্যাগ করেছি, সেহেতু আমাদের জীবনে ধ্বংস, বিশৃঙ্খলা ও হতাশা ভয়ংকর রূপে দেখা দিয়েছে। মানুষের উদ্ভাবিত ধ্যান-ধারনা ও আইনকানুন আমাদের অবস্থার পরিবর্তন করতে সম্পূর্নরূপে ব্যর্থ হয়েছে। এখন সময় এসেছে ইসলামকে কিছু আচার সর্বস্ব ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান হিসেবে গ্রহণ করার।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির সংক্ষিপ্ত আলোচনা: পরিবর্তন নাকি সাম্রাজ্যবাদীদের ফায়দা লুটের উত্তম পরিবেশে বাংলাদেশ?

বেশ দীর্ঘ সময় যাবৎ বাংলাদেশের আভ্যন্তরীন পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। শাহবাগ রাজনীতি থেকে শুরু করে অন্যান্য সকল ইস্যুগুলোর ফলে বাংলাদেশ একরকম গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মত দিচ্ছেন অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ।
কিন্তু প্রশ্ন হল আসলেই কি বাংলাদেশ গৃহযুদ্ধের দিকে যাচ্ছে নাকি সাম্রাজ্যবাদীদের ধারাবাহিক চক্রান্তের বেড়াজালে ঘুরেফিরে আটকা পরে আছে??
একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, বর্তমানে যেসকল বিষয়সমূহ আমাদের সামনে সুনিপুণভাবে তুলে আনা হচ্ছে, তার প্রত্যেকটি সাম্রাজ্যবাদীদের সুদীর্ঘ পরিকল্পনার ক্ষুদ্র অংশবিশেষ।
বাংলাদেশে প্রতি নির্বাচন পূর্ববর্তী মৌসুমে এই ধরণের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়ে থাকে এবং নির্বাচন পর্যন্ত তা টিকিয়ে রাখা হয়। আর এর মধ্যেই জনগণের নিকট ৫ বছর যাবৎ হয়ে আসা যুলুমের সমাধান হিসেবে অপর যালিমকে পছন্দের ব্যাপারটি তুলে ধরা হয়; যে/যারা কিনা এর পূর্বে বারবার প্রতারণা করে আসছে। আর এভাবেই মার্কিন-ভারতের স্বার্থসিদ্ধির দ্বার খোলা থাকে পরবর্তী ৫ বছরের জন্যও।
আর এই চক্রান্তের ধারাবাহিকতায় মূলত এতসকল জাগরণ-আন্দোলনের বহিঃপ্রকাশ; যেখানে সমাধান একেবারেই অনুপস্থিত। আর উম্মাহকে ব্যস্ত রাখা হয়েছে এসকল নাট্যমঞ্চ দ্বারা।
কিন্তু এবার এই চক্রান্ত পূর্বের তুলনায় অধিক ভয়াবহ; কারণ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এই অঞ্চলে চীনের উত্থান এবং পুঁজিবাদের বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি খিলাফতের প্রখর সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে পেরেছে এবং সেই লক্ষ্যে তার এজেন্ডা বাস্তবায়নে তড়িঘড়ি শুরু করেছে।
কিছুদিন আগে (১১ই মার্চ, ২০১৩) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনার বক্তব্যে এই এই উপমহাদেশে বাংলাদেশকে ঘিরে মার্কিন-ভারতের ঐক্যবদ্ধ চক্রান্তের ধারাগুলো স্পষ্টরূপে ফুটে উঠে।
বাংলাদেশ এবং এই উপমহাদেশকে ঘিরে আমেরিকার পরিকল্পনা সুদীর্ঘ এবং বিগত বছরগুলোতে আমরা এর বাস্তবায়নের পাঁয়তারা দেখে আসছি।
দালাল শসক দ্বারা সামরিক মহড়া থেকে শুরু করে মার্কিন স্বার্থপন্থী চুক্তিসমূহ একের পর এক বাস্তবায়ন ঘটিয়ে যাচ্ছে এবং সেনাবাহিনীর উপর কতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে অবিরত। কারণ, নিষ্ঠাবান সেনা অফিসারদের মাঝে তাদের দালাল সৃষ্টি প্রচেষ্টা সফল হলে, তাদের কুকীর্তি সম্পাদনে সেনাবাহিনীর তরফ থেকে বাধা আসবেনা আর তারা তাদের ঘৃণ্য কার্যক্রম চালিয়ে যাবে নিশ্চিন্তে। আর সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এ বছর বাংলাদেশেই তারা আয়োজন করতে যাচ্ছে মিলিটারি-মিলিটারি কনফারেন্স।
তাছাড়া, মে মাসের মাসের ২২ তারিখ বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে আমেরিকা United States Coast Guard Cutter Jarvis নামক একটি নৌযান উপহারের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের পাঁয়তারা করে যাচ্ছে।
মজিনা বাংলাদেশে F.B.I এর উপস্থিতি সুনিশ্চিতকরণ এবং সেনাবাহিনীর সাথে বিভিন্ন যৌথ মহড়ার পাশাপাশি অন্যান্য কার্যক্রম বিস্তারণের কথাও বলেছে; যা বাংলাদেশের জন্য অশনি সংকেত বৈ আর কিছুই নয়।
আমরা যদি পাকিস্তানের দিকে তাকায়, তবে দেখব দালাল শাসকদের সাহায্যার্থে একইভাবে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সাথেও যৌথ মহড়ার নামে তাদের জাল বুনেছিল সেনাবাহিনীতে আর পাকিস্তানে “রেইমন ডেভিস” বা “ব্ল্যাক ওয়াটারের” উপস্থিতি সুনিশ্চিত করে। ফলশ্রুতিতে আজ পাকিস্তানের বাস্তবতা ভয়াবহ।
বাংলাদেশ থেকেও একইভাবে ফায়দা লুটতে তারা এই অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে; পাশাপাশি F.B.I এখানে জনগণের মাঝে মার্কিন গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাবে; যা কিনা পরবর্তীতে মার্কিনিদের অবস্থান সুনিশ্চিতকরণের দ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
পাশাপাশি তাদের অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দী চীনকে দমনে সে সাথে করে নিয়েছে ভারতকে। বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্যিক চুক্তির নামে ইনদো-প্যাসিফিক করিডোর নির্মানের ব্যবস্থা করছে; যা শুধুমাত্র ভারত-মার্কিন স্বার্থ নিশ্চিত করবে।
যদিও পরবর্তীতে ভারতকেও নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত এই সমঝোতা। আর এতসব চক্রান্ত বাস্তবায়নের ইস্যুগুলো বাংলাদেশে আমরা বর্তমান দেখতে পাচ্ছি।
মজিনা তার বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে পরবর্তী ৫ বছরে বাংলাদশের সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে তার কার্যক্রমের ব্যাপারে দৃঢ়তা প্রকাশ করেছে। অর্থ্যাৎ, পরবর্তী ৫ বছরের সরকার সম্পর্কে তারা নিশ্চিত আর জনগণকে তারা লেলিয়ে রেখেছে হাসিনা-খালেদার মত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার উচ্ছিষ্ট নিয়ে কামড়া-কামড়িতে।
অথবা, এমন কিছু তথাকথিত আবেগী আন্দোলনের সাথে যেখানে উম্মাহ’র পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা পর্যন্ত নেই; বরং লুকিয়ে আছে কাফিরগোষ্ঠী এবং তার দালাল বাহিনীর ভয়ঙ্কর চক্রান্ত।
অবশ্যই, সমধানের জন্য এসকল সাম্রাজ্যবাদী কুফর শক্তি বা তাদের দালালদের কাছে অথবা এই শাসনব্যবস্থার মাঝে ঘুরপাক খাওয়া আবর্জনার মাঝে ঘুরপাক খাওয়ার সমতুল্য।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে অবশ্যই আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে মার্কিন-ভারতের এইসব চক্রান্তের বিরুদ্ধে এবং তাদের দালালসমূহ ও দালাল তৈরির কারখানা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, ইসলামী জীবন ব্যবস্থা আলিঙ্গনে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা একমাত্র সমাধান।
আল্লাহ আমাদের সত্য উপলব্ধি এবং এর ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাওফীক দিন এবং মুসলিম উম্মাহ’র গৌরব খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যবস্থা ফিরিয়ে দিন।
ইসলামের বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা

ইসলামের বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থাকে বর্বরোচিত এবং পশ্চাদপদ হিসাবে আখ্যায়িত করে ইসলামের শত্রুরা ব্যাপকভাবে আক্রমণ করে আসছে। এই অপবাদ নিরসন করতে আজকের এই প্রবন্ধে ইসলামের বিচার এবং শাস্তির ব্যবস্থার উপর আলোকপাত করা হয়েছে এবং পশ্চিমাদের অপপ্রচার (বিকৃতি) উন্মোচন করা হয়েছে।
ইসলামের বিচার ব্যবস্থা :
যে কোন বিষয়ে ইসলামের সিদ্ধান্ত বা রায় কে বাধ্যতামূলকভাবে প্রয়োগ করাকে ইসলামের বিচার ব্যবস্থার মূলনীতি হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে। এটি নিম্নলিখিত দায়িত্বগুলো পালন করবে :
১) জনগণের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি;
২) সামাজিক অধিকারের জন্য ক্ষতিকর সবকিছু প্রতিহত করা;
৩) জনগণ এবং সরকারের (যথা- খলীফা, ওয়ালী’র ইত্যাদির) মধ্যে উদ্ভুত বিরোধ নিষ্পত্তি করা।
ইসলামের জন্মলগ্ন থেকেই আদালত এবং বিচার ব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে যা ইসলামের আইনের মৌলিক উৎস যথা- কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা এবং কিয়াস দ্বারা পরিবেষ্টিত (নিয়ন্ত্রিত)।
একজন প্রধান বিচারক নিয়োগের মাধ্যমে বিচারিক অঙ্গনের কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হয়, যিনি অন্যান্য সকল বিচারক নিয়োগ এবং স্তর/ কার্য পরিধি নির্ধারণের দায়িত্ব পালন করেন।
ইসলামের তিন ধরণের বিচারকের অস্তিত্ব বিদ্যমান। খলীফা একজন বিশ্বস্ত, যোগ্য, ও ন্যায়পরায়ন বিচারককে প্রধান বিচারপতি বা কাযী-উল্-কুযাত নিয়োগ করবেন। প্রধান বিচারপতি বিধি মোতাবেক নিন্মলিখিত বিচারকদের নিয়োগ করবেন:
১. কাযী-উল্-খুসুমাত – কাযী উল খুসুমাত পারিবারিক আইন, চুক্তি আইন, ক্রিমিনাল আইন ইত্যাদি ব্যাপারে বিচারকার্য পরিচালনা করেন।
২. কাযী-উল্-মুহতাসিব – কাযী উল মুহতাসিব ব্যবসা পরিদর্শক, অসামাজিক কার্যকলাপ বিরোধী পরিদর্শক, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য পরিদর্শক তথা জনস্বার্থ দেখাশুনাকারী বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কাযী মুহতাসিবের রায় প্রদান করার জন্য কোন বিচারালয় প্রয়োজন হয় না। তিনি যেকোন সময়ে যেকোন জায়গায় অপরাধ সনাক্ত করতে পারলে সাথে সাথে সেখানেই রায় প্রদান করে তা পুলিশের সাহায্যে বাস্তবায়ন করতে পারেন।
৩. কাযী-উল্-মাযালিম – কাযী-উল-মাযালিম খলীফা থেকে শুরু করে শাসকগোষ্ঠীর যেকোন ব্যক্তির যে কোন ধরণের অন্যায় আচরণের ব্যাপারে আইনী কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন। তিনি বাদি ছাড়াই নিজে উদ্যোগী হয়ে রাষ্ট্রের যে কোন দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে বিচারকার্য পরিচালনা করতে পারেন। খলীফার বিরুদ্ধে মামলা চলাকালীন সময়ে এই আদালতের বিচারককে পদচ্যুত করা যাবেনা।
সকল বিচারককে অবশ্যই মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক, স্বাধীন, স্বাভাবিক বুদ্ধি সম্পন্ন/ সুস্থ মস্তিস্ক/ প্রকৃতিস্থ, ন্যায়পরায়ণ/ সৎ এবং বিচারিক জ্ঞান সম্পন্ন অর্থাৎ কোন নির্দিষ্ট পরিস্থিতিকে কোন নীতি কিভাবে প্রয়োগ হবে তা জানতে হবে। সরকারের অন্যায় কাজের বিচারের জন্য নিযুক্ত বিচারকের অতিরিক্ত যোগ্যতা হলো তাঁকে অবশ্যই পুরুষ হতে হবে এবং মুজতাহিদ (যিনি ইজতিহাদের যোগ্যতা রাখেন) হতে হবে।
যে কোন শাসক, প্রশাসক, কর্মকর্তা এমনকি খলীফাকেও পদচ্যুত করবার কর্তৃত্ব রয়েছে কাজী মাযালমি এবং তা রাসূল (সা) ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সময় সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। রাসূল (সা) আব্দুল্লাহ্ ইবনে নাওকেল (রা) কে মদিনার বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন এবং রশিদ ইবনে আবদুল্লাহকে বিচার ব্যবস্থার প্রধান ও অভিযোগ সংক্রান্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ করেন। ।(ইবনু ইসহাক খণ্ড ৪ ও ইমাম শা’ফীর “সহজ আইন বিজ্ঞান”)। একজন বিচারক দিয়ে একটি আদালত গঠিত হয় এবং তিনিই রায় দেওয়ার ক্ষমতাপ্রাপ্ত। অন্য আরও বিচারক থাকতে পারেন, তবে তাঁরা কেবলমাত্র পরামর্শ দ্বারা সহযোগিতা করতে পারেন। প্রকৃত অর্থে তারা বিচারক নন। কারণ রায় নির্ধারিত হয় ইসলামের মৌলিক উৎস দ্বারা, পশ্চিমাদের মত মানব মস্তিস্ক দ্বারা নয়। যেহেতু কেবলমাত্র শতভাগ প্রমাণিত হলেই ইসলামে শাস্তি কার্যকর করার বিধান বিদ্যমান রয়েছে তাই ইসলামে আপীল আদালত নেই। সাক্ষ্য প্রমাণে কোন প্রকার সন্দেহ থাকলেই ঐ মোকদ্দমা বাতিল হয়ে যায়। যখন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়ে যায়, তখন ঐ বিষয়ে প্রদত্ত রায় স্বয়ং আল্লাহর রায় হিসাবে গণ্য হয় এবং তা ফিরিয়ে নেয়া যায় না।
বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা
– ইসলামী রাষ্ট্রে শরিয়াহ্ অনুযায়ী বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা । যেহেতু খিলাফত রাষ্ট্রে বিচার ব্যবস্থা স্বাধীন, সেহেতু বিচার বিভাগ জনগণের উপর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে করে।
– খিলাফত রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থা নিরপেক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত। বিচারকের অন্যায়ের ব্যাপারে ইসলাম কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছে। এজন্য বিচারকগণ শরীয়াহর প্রত্যেকটি আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করবেন এবং পরিপূর্ণ দায়িত্ববোধ থেকে কর্তব্য পালন করেন।
– খিলাফত রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রিতার কোন অবকাশ নাই। নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য নির্দিষ্ট আইন বিদ্যমান থাকায় দ্রুত বিচার কার্যক্রম এই শাসন ব্যবস্থার একটি গতিশীল দিক।
– বিচার প্রাপ্তি সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যূনতম সরকারী ফি নির্ধারণ ও নিশ্চিতকরণ করা হয়ে থাকে।
– বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষ্যে খিলাফত রাষ্টের বিচার ব্যবস্থা রাষ্ট্রের প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি নাগরিকের হাতের নাগালের মধ্যে নিয়ে যাওয়া খলিফার দায়িত্ব। তাই জনগণকে বিচার প্রাপ্তির জন্য অযথা হয়রানিমূলকভাবে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে আর্থিক, শারীরিক ও মানসিক কষ্ট স্বীকার করতে হয় না।
ইসলামের শাস্তির ব্যবস্থা : (নিজাম আল উকুবাত)
ইসলামের শাস্তির ব্যবস্থা তথা দন্ডবিধি হচ্ছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দয়ার প্রমাণ এবং ইসলামের সৌন্দর্য্য। দন্ডবিধির মূলনীতি সমূহ নিম্নরূপ :
১) একজন মুসলিম (পুরুষ বা নারী) তার প্রত্যেকটি কাজের জন্যই দায়িত্বশীল। শরীয়াহতে যে সকল অপরাধের শাস্তি নির্দিষ্ট করা আছে তা রাষ্ট্র কার্যকর করবে। সমাজকে রক্ষা করে শুধুমাত্র এই কারণেই এই নীতি গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং শরীয়াহ্ আদালতের মাধ্যমে কোন অপরাধের শাস্তি হয়ে গেলে ঐ একই অপরাধের জন্য আখিরাত তথা পরকালের শাস্তি থেকে পরিত্রাণ পাওযা যায়। কারণ দুনিয়ার তুলনায় আখিরাত বা জাহান্নামের শাস্তি বহুগুণ কঠিন এবং যন্ত্রণাদায়ক। রাসূল (সা) এর সময় অনেক মুসলিম তাদের নিজেদের অপরাধ নিজেরাই স্বীকার করতো, কারণ শেষ বিচারের দিন তাদের ঐ অপরাধ আমলনামায় গণ্য হোক তা তারা চাইতো না। আবু দাউদ হতে বর্ণিত, যখন একজন লোক নিজের অবৈধ যৌনাচার নিজে স্বীকার করল এবং পাথর নিক্ষেপ করে তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হলো তখন রাসূল (সা) বললেন “কস্তূরীর সুগন্ধির চেয়ে সে আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দীয়”। অপর একটি হাদীসে বর্ণিত আছে, আবু দাউদে বর্ণিত, “রাসূল (সা) এর নিকট একজন মহিলা আসলো এবং বললো, ‘আমি জেনা করেছি’। রাসূল (সা) বললেন, ‘চলে যাও’। সে ফিরে গেল এবং পরের দিন আবার আসলো এবং বললো “সম্ভবতঃ আপনি আমাকে ফিরিয়ে দিতে চান যেমনি দিয়েছিলেন মা ইয বিন মালিককে। আমি আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি আমি গর্ভবতী।” তিনি (সা) বললেন, ‘চলে যাও’, এবং শিশুর জন্মের পর আস, সে শিশুর জন্মের পর আসলো এবং বললো, “এইতো সে। আমিই তাকে জন্ম দিয়েছি।” তিনি (সা) বললেন, ‘চলে যাও এবং তাকে পান করাও যে পর্যন্ত না স্তন না ছাড়াও’। যখন মহিলাটি শিশুটিকে স্তন ছাড়াল তখন সে তাকে নিয়ে রাসূল (সা) এর নিকট আসলো। এই সময় শিশুটির হাতে কিছু ছিল যা সে খাচ্ছিল। তখন শিশুটিকে মুসলিমদের মধ্যে একজনকে দেয়া হল এবং রাসূল (সা) মহিলাটির বিষয়ে নির্দেশ দিলেন- অতঃপর তার জন্য একটি গর্ত খোড়া হল এবং তিনি (সা) তার বিষয়ে নির্দেশ দিলেন এবং মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তাকে পাথর নিক্ষেপ করা হল। যারা পাথর ছুড়েছিল তাদের মধ্যে একজন খালিদ। সে তাকে একটি পাথর নিক্ষেপ করলো। যখন মহিলাটির এক ফোঁটা রক্ত তার গালে পড়ল, তখন সে মহিলাটিকে গালি দিল। তখন রাসূল (সা) তাকে বললেন, “হে খালিদ, বিনীতভাবে। সেই স্বত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, সে এতবেশি অনুতপ্ত হয়েছে যে, যদি কোন বর জালেম ও এই ধরণের তওবা করত তবে সে ও মাফ পেয়ে যেত। ।” এরপর তার বিষয়ে নির্দেশ দেয়া হল, তিনি (সা) তার জন্য দোয়া করলেন এবং তাকে কবর দেওয়া হল। (মুসলিম)
২) দন্ডবিধির নীতি হল “শাস্তিকে যথাসম্ভব নিবৃত্ত করা”, যেহেতু শাস্তির কঠোরতা নিবৃত্তির প্রাথমিক কাজ করে। কোন প্রমাণের অংশ বিশেষ ও যদি সন্দেহজনক হয় তা শাস্তি নিবৃত্ত করবে। যখন রাসূল (সাঃ) এর নিকট কোন লোক এসে তাদের অপরাধ স্বীকার করে তাদের উপর শাস্তি কার্যকর করার আবেদন জানাতো তখন রাসূল (সা) শাস্তি প্রয়োগ করা হতে নিজেকে সরিয়ে রাখতে কিভাবে চেষ্টা করতেন তা সীরাতে বর্ণিত আছে। তিনি (সা) বলেছেন, “একজন নিরপরাধীকে শাস্তি প্রদান করার চেয়ে একজন অপরাধীকে মুক্তি দেয়া উত্তম।” একজন ইমামের জন্য ভুলক্রমে একজনকে শাস্তি দেয়ার চেয়ে ভুলক্রমে একজনকে ক্ষমা করা উত্তম।”
এরপরেও কি একজন মুসলিম ইসলামী দন্ডবিধির বিরুদ্ধে পশ্চিমা আক্রমণ কল্পনা করতে পারে। আসলে এই বিষয়ে তাদের মিথ্যা প্রচার এবং বিকৃতিতো রয়েছেই, দায়ী তাদের অজ্ঞতাও।
অধিকন্তু পশ্চিমাদের তুলনায় ইসলামের সৌন্দর্য লক্ষ্য করুন। তাদের মৌলিক দর্শন হচ্ছে কাউকে অভিযুক্ত করা বা সাজা দেয়ার জন্য সামান্য একটুকরা দলীল খোঁজা বা সাক্ষী যোগাড় করে তার মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণ করা। ষষ্ঠ বার্মিংহাম কিংবা ৪র্থ গিলফোর্ডের কথা স্মরণ করুন যারা প্রত্যেকেই জেলখানায় কয়েক বছর সাজা ভোগ করার পর নিরপরাধী প্রমাণ হয়েছিল। ইসলামের পুনরুত্থানের দুশ্চিন্তায় পশ্চিমারা আজ এতটাই বিকাররগ্রস্থ হয়ে পড়েছে যে, একজন মুসলিমকে সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করে সাজা দেয়ার জন্য তার মুখের দাঁড়ি কিংবা পরিধানের হিজাবকেই পশ্চিমারা যথেষ্ট/ পর্যাপ্ত প্রমাণ হিসাবে বিবেচনা করছে!
৩) ইসলাম পাঁচটি বিষয় সংরক্ষণ করে যা জিম্মিদের (অমুসলিম নাগরিক) ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। রাসুল (সা) বলেছেন, “যে কোন জিম্মির ক্ষতি করলো, সে যেন আমারই ক্ষতি করলো।” তাছাড়া ইসলামী রাষ্ট্রের মধ্যে সকল নাগরিককে সমান দৃষ্টিতে দেখা হয় এবং এক্ষেত্রে কোনরূপ বৈষম্য বৈধ নয়। বিষয়গুলো নিম্নরূপ :
ক) বিশ্বাস : পশ্চিমা ধর্ম নিরপেক্ষ নীতি ধর্মকে ক্রমাগত আক্রমণের বিষয়বস্তুতে পরিণত করেছে। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র ইসলাম নয়, যে কোন ধর্মীয় বিশ্বাস, এমনকি খৃষ্টাণ ধর্ম এবং আমাদের পূর্ববর্তী নবী-রাসুলগণ যথা ঈসা (আ)-কেও আক্রমণ এবং অসম্মান করার পিছনে তাদের তথাকথিত বুদ্ধিজীবিরা অপরিমিত সময় অপচয় করেছে এবং করে যাচ্ছে। পবিত্র কুরআনে আছে “দ্বীনের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি নেই” (২:২৫৬) অর্থাৎ অমুসলিমদেরকে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করা যাবে না এবং তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস লালন ও পালনের অধিকার সংরক্ষিত। কিন্তু ইসলামী আক্বীদা-ই যেহেতু দ্বীনের ভিত্তি, তাই যে কোন অমূল্য রত্নের মতই দ্বীনকে সংরক্ষণ করা হয়। আর তাই কেউ একবার ইসলাম গ্রহণ এবং উপদেশ প্রাপ্ত হবার পর ত্যাগ করতে চাইলে তার শাস্তি হচ্ছে ইসলাম বিশ্বাসকে অপমান করার শাস্তির মতই মৃত্যুদন্ড। অদ্ভূত বিষয় হচ্ছে, সালমান রুশদী কিংবা সম্প্রতি বাংলাদেশের তাসলিমা নাসরিনের বিষয়টিকে পশ্চিমারা অগ্রহণযোগ্য দাবী করে, আবার তারাই নিজেদের বিশ্বাসের নামে অন্য মানুষকে হত্যা এবং ধ্বংস করার নীতি অবলম্বন করে।
খ) সম্মান : ইসলামে নারীর সম্ভ্রমকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে দেখা হয় এবং নারীকে যে কোন প্রকার ক্ষতি, অপমান, অপবাদ থেকে কঠোরভাবে নিরাপত্তা দেয়া হয়। এটি রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক। এটি পুরোপুরিই পশ্চিমা নীতির বিপরীত, যারা নারীকে কেবলমাত্র কামনার দৃষ্টিতেই দেখে এবং নারী দেহকে বিপনন যোগ্য পণ্যের মতই ব্যবহার করে। যারা পেছনে/ অসাক্ষাতে কোন নারীর বিরুদ্ধে অপবাদ রটনা করে তাদের শাস্তি দেয়ার মাধ্যমেও ইসলাম নারীকে সুরক্ষা দিয়েছে। অধিকন্তু যারা জনসমক্ষে সঠিকভাবে নিজেদেরকে পর্দা দ্বারা আবৃত করেন না এবং যারা ব্যভিচার বা জিনা করে তাদেরকে শাস্তি প্রদানের মাধ্যমেও ইসলাম নারীর সম্ভ্রম ও মর্যাদাকে সমুন্নত করেছে।
গ) চিন্তা/মন/মস্তিস্ক : মদ পান এবং যে কোন বস্তু যা মস্তিস্ককে নেশাগ্রস্থ করে, তা ইসলামে নিষিদ্ধ। অপরদিকে পশ্চিমারা মদের উপরই জীবন-যাপন করছে, আর এখন তারা নেশাকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছে। এসব বিষয় যখন তাদের সামাজিক মূল্যবোধ এবং নৈতিকতাকে ধূলিস্মাৎ করে দিচ্ছে তারা এখন বিকল্প সমাধান সন্ধান করছে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
ঘ) সম্পদ : পশ্চিমা সরকারগুলো, তাদের ব্যাংক এবং এই ধরণের সংস্থাগুলো যেভাবে কৌশলে অত্যন্ত সভ্য চেহারা নিয়ে জনগণের সম্পদ প্রতিনিয়ত চুরি করে যাচ্ছে, ইসলাম সেখানে চুরির অপরাধ ঠেকাতে হাত কাটার মত কঠোর শাস্তির বিধান রেখে জনগণের সম্পদ সুরক্ষা করেছে। এই শাস্তিটাকে পশ্চিমারা বর্বরোচিত এবং পশ্চাদপদ আখ্যায়িত করে প্রবলভাব আক্রমণ করে আসছে। অথচ এই আক্রমণ একেবারেই ভিত্তিহীন, বরং তা ইসলামের প্রতি তার শত্রুদের প্রবল ঘৃণা এবং বিকৃতির ষড়যন্ত্র দিবালোকের মত উন্মোচন করতে সাহায্য করে। কারণ চুরির অপরাধে কারো হাত কাটতে হলেও কয়েকটি কঠিন শর্ত পূরণ করতে হয়। যথা : দুজন সাক্ষী থাকতে হবে, সম্পদ নিরাপদ স্থান হতে হস্তগত হতে হবে। এছাড়া যদি এমন কেউ চুরি করে যে নিতান্ত দরিদ্র এবং নিরুপায় ছিল, তাহলে উপরোক্ত শর্তগুলো পূরণ হলেও শাস্তি প্রযোজ্য নয়, যদি নির্দিষ্ট পরিমাণের (নিসাব) চেয়ে কম সম্পদ চুরি করে তাহলেও হাত কাটা হবে না। এগুলো এবং আরো কিছু শর্ত শাস্তির সম্ভাব্যতা হ্রাস করে অনেকাংশে।
ঙ) জীবন : রাসূল (সা) বলেছেন, “কা’বা” গৃহ এবং এর চতুর্পার্শে যা কিছু আছে তার চেয়ে একজন মুসলিমের রক্ত অধিক মূল্যবান।” আর তাই হত্যার শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদন্ড। অবশ্য নিহতের পরিবার ইচ্ছা করলে দিয়তের বিনিময়ে ক্ষমাও করতে পারে।
প্রত্যেক মানুষই এইসব নিরাপত্তা আকাঙ্খা করে যা শুধুমাত্র ইসলাম নিশ্চিত করে। যে কোন পুরুষ বা নারী জিজ্ঞেস করুন, তারা জীবন, সম্পদ, সম্ভ্রম ইত্যাদির নিরাপত্তা চায়। আর ইসলাম ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোন সমাজই এসব নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান করে না বরং পশ্চিমে প্রায়ই এসব নিরাপত্তার লংঘন এবং অপব্যবহার ঘটে থাকে। মাথার উপর ঋণের বোঝা, তার সাথে অপরাধের উচ্চতার, বিশেষত : ধর্ষন, চুরি ইত্যাদি এবং সেই সাথে এই সকল সমস্যার সমাধানহীন জীবন ব্যবস্থায় কোনভাবেই মানসিক প্রশান্তি অর্জন সম্ভব নয়।
ইসলামের দন্ডবিধি চার ভাগে বিভক্ত:
১) হুদুদ : এই শাস্তি হচ্ছে “আল্লাহর (সুবহানাহুতা ওয়া তা’আলা) অধিকার এবং তা কেউ ক্ষমা করতে পারে না।” ছয়টি ক্ষেত্র এর অন্তর্ভূক্ত:
ক) অবিবাহিত পুরুষ/ নারীর ব্যভিচার : (১০০ দোররা বা চাবুকের আঘাত), বিবাহিত পুরুষ/ নারীর ব্যভিচার : (পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা), সমকামিতা : (মৃত্যুদন্ড)।
খ) অপবাদ দেওয়া, সম্মান নষ্ট করা, মিথ্যা কথা প্রচার করা এবং উড়ো খবর রটানো (৮০ দোররা)।
গ) চুরি (হাত কাটা)
ঘ) মদ পান করা এবং নেশা করা (৮০ দোররা)
ঙ) দুই দল মুসলিম দ্বারা আইন লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘন। যথা : খলীফা আবু বকর (রা) এর সময় মুরুতাদদের যাকাত অস্বীকার করার বিষয়।
চ) মুরতাদ, অর্থাৎ কোন মুসলিম ইসলাম ত্যাগ করা (মৃত্যুদন্ড)।
২) আল-জিনায়াত: “ব্যক্তির অধিকার এবং ক্ষমা করারও অধিকারী”। মূলত : হত্যাকান্ড সংক্রান্ত ঘটনাগুলো হতে পারে তা বেআইনীভাবে কিংবা দূর্ঘটনাবশতঃ, এবং নিহত ব্যক্তির স্বজন বা পরিবারের দিয়তের বিনিময়ে ক্ষমা করার অধিকার এই ক্ষেত্রের অন্তর্ভূক্ত। উদাহরণ স্বরূপ :
ক) যে ব্যক্তি উদ্দেশ্যমূলকভাবে খুন করে তার ক্ষেত্রে দিয়ত হচ্ছে ১০০ উটের সমপরিমাণ যার মধ্যে ৪০টি হতে হবে গর্ভবতী।
খ) যদি কোন ব্যক্তি অনিচ্ছাকৃতভাবে কাউকে খুন করে সেক্ষেত্রে তার দিয়ত হচ্ছে ১০০ উটের সমপরিমাণ।
ইমাম আন-নাসায়ী তার বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ করেন যে, শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গের জন্য দিয়ত রয়েছে, যেমন চোখের জন্য রক্ত পণ হচ্ছে ৫০টি উটের সমপরিমাণ।
৩) আল-তা’জির : এটি হচ্ছে “সমাজের অধিকার”। যা কিছু সমাজের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে তা এই ক্ষেত্রের অন্তর্ভূক্ত, যেমন- রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার-চেচাঁমেচি করা বা রাস্তায় আবর্জনা ফেলা ইত্যাদি। রাষ্ট্রই এই ধরণের অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করে।
৪) আল-মুখালাফাত : এটি হচ্ছে “রাষ্ট্রের অধিকার”। এই ক্ষেত্রের অন্তর্ভূক্ত বিষয়ে রাষ্ট্র নিজেই নিয়ম/ আইন তৈরী করে থাকে। যেমন- রাস্তায় গাড়ির গতিসীমা অতিক্রম, যেখানে গাড়ি রাখার নিয়ম নেই সেখানে রাখা ইত্যাদি।
সর্বশেষ বলা যায়, বিচার করা এবং শাস্তি প্রয়োগ করার বাধ্য বাধকতার মধ্যেই বিচার এবং শাস্তির ব্যবস্থার মূল ভিত্তি নিহীত রয়েছে। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র ব্যতীত কোন ব্যক্তির জন্য কোন প্রকার শাস্তি কার্যকর করা বৈধ নয়। ইসলামি বিচার ও শাস্তি ব্যবস্তার এই সকল দায়িত্ব কার্যকর ভাবে প্রয়োগ করা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় পুরা উম্মাহ্ এর জন্য দায়ী থাকবে, যদিও তারা সালাত আদায় করে, হজ্ব করে, যাকাত দেয়। এই দায় থেকে অব্যাহতি পেতে রাসুল (সা) এর সুন্নাহর অনুসরণে ইসলামী রাষ্ট্র তথা খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজে যোগ দেয়া সকল মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক তথা ফরয। এই রাষ্ট্রই আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করবে।
“The Judicial And Punishment System” প্রবন্ধ থেকে অনূদিত
এস আহমেদঅধিকতর গণতন্ত্রচর্চা: জঙ্গলযাত্রা শুভহোক

মানুষ আর প্রাণীজগতের অন্য জন্তুগুলার মাঝে পার্থক্য কেবলই চিন্তা করিবার সামর্থ্যের উপর। প্রাণীকুলের চিন্তাশক্তি (intellect) না থাকায় ইহারা প্রবৃত্তি (instinct) দ্বারা পরিচালিত হয়। টিকিয়া থাকিবার প্রবৃত্তি তাহাদের ঐক্যবদ্ধ করে আর পারস্পরিক চাহিদা পূরণে দলবদ্ধভাবে শিকার করিয়া থাকে।
এই সময়ের রাষ্ট্রগুলা যেমন টিকিয়া থাকিবার প্রবণতা নামক জংলী নীতিতে গড়িয়া উঠিয়াছে, তেমনই মানুষের ঐক্যবদ্ধ হইবার যে বন্ধন তাহাও স্রেফ পারস্পরিক স্বার্থে। বস্তুগত লাভের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হইবার এই বন্ধনকে ডাকাতির বন্ধনও বলা যায়। কারণ ডাকাতগণ ডাকাতির মাল ভাগাভাগিতে খুব সততার পরিচয় দেয়। যদিও ইহাদের কর্মই অনৈতিক। এইখানে মুনাফাই নীতি, সর্বোচ্চ মুনাফাই বড় সাফল্য। আর এই নীতির আদর্শিক রূপকে আদর করিয়া পুঁজিবাদ নামে ডাকা হয়। যাহার রাষ্ট্রীয় শোষণ নীতির নাম হইল গণতন্ত্র।
এই রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি উপাদানের সহিত মুনাফা জড়িত। শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ, সংবাদপত্র, আইন রক্ষাকারী বাহিনী সবাই শীতের রাত্রিতে সারমেয় প্রজাতি যেমন খড়ের গাঁদা খুঁজিয়া নেয় তেমনই সুবিধা প্রদানকারী পক্ষ খুঁজিয়া নেয়। ইহারা মুনাফা অর্জনকারী যত দাবী আছে ঐগুলা নিয়া পড়িয়া থাকে এবং ইহাকেই গণদাবীরূপে উপস্থাপন করিবার প্রয়াস চালায়। যেমন করিয়া না খাইয়া মরা জনগণের প্রাণের দাবী কেয়ারটেকার সরকার বলিয়া একপক্ষ আবদার করে তো অপরপক্ষ শাসাইয়া কহে যুদ্ধাপরাধীর বিচার না করিলে এই জনগণ হার্ট অ্যাটাকে পটল তুলিবে।
এই ব্যবস্থার পরতে পরতে জংলী সৌন্দর্য প্রতিভাত হয়। গুলি করিয়া মারিবার ক্ষেত্রে যেমন মহামানবিক ধারাবাহিকতা, তেমনই শত খুনের অপরাধীকে ক্ষমা করিতে অমানবিক উদারতা। প্রতি পঞ্চবার্ষিক মেয়াদ শেষে ইহাদের নির্বাচন নামক শয়তানের আরাধনার আয়োজন করা হয় যাহার প্রস্তুতি হিসাবে কিছু মানব বলি দেওয়া লাগে পরাশক্তি নামক খোদাকে দেখাইতে যে আমরাই পরবর্তী মেয়াদে তোমার পূজার হকদার। শয়তানের কিছু প্রতিনিধি আছে যাহারা এই ব্যাপারগুলার দেখাশুনা করিয়া থাকে।
আবার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলাতেও পশুপাখির মত জংলী ঐক্য দেখা যায়। এই যেমন, কোন সাংবাদিক মরিল তো কেউ কিছু কহিবে না, খালি সাংবাদিকেরাই কাউয়াসদৃশ কা কা করিবে। পুলিশ মরিল তো কেবল পুলিশপ্রজাতি কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ করিবে, নেতা মরিল তো কেবল তাহার দলের লোকজন শুয়োরের মত ঘোঁত ঘোঁত করিবে। আর আমজনতা হইল গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগীর মত। ইহারা মরিলে কিছু আসিবে যাইবে না। কেবল চিল, শকুনের মত কিছু লোক ছুটিয়া আসিবে এই লাশগুলা নিয়া কিভাবে ফায়দা হাসিল করা যায় এই নেক মকসূদ নিয়া।
তবুও আমরা আরেকটা নির্বাচনের আশায় বসিয়া থাকি। ভাবি এইবার কোন মহাত্মা আসিয়া আমাদিগকে উদ্ধার করিয়া লইয়া যাইবে। কিন্তু চিন্তা করিয়া দেখি না সমস্যা কোথায়। রাষ্ট্র চলিবে জঙ্গলের নীতিতে অথচ আশা করিতেছি এইখান থেকে মানুষ জন্মাইবে। যখন মানব সন্তান তাহার শ্রেষ্ঠত্ব যেই চিন্তা শক্তির কারনে তাহার ব্যবহার ব্যতিত শুধুমাত্র মুনাফার ভিত্তিতে জীবন চালাইবে তখন পরিণতি তো এইটাই হইবে। অথচ এই রাজনীতিবিদ, পুলিশ, বিচারক সব এই সমাজ হইতে জন্ম নিয়া এইখানেই বাড়িয়া উঠিয়াছেন। কিন্তু কুফর সিস্টেম তাহাদের রাক্ষসে পরিণত করিয়াছে। এইটা সেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যাহা কিছু মানুষকে আইন তৈরির খোদায়ী ক্ষমতা প্রদান করে। মজার ব্যাপার হইল ঐ আইন আবার তাহাদের উপরেও কার্যকর যাহারা ইহার স্রষ্টা। মানে এই যে, একজন মানুষ নামক সীমাবদ্ধ জীব তাহার এবং তাহারই মত অন্য মানুষের জন্য বিধান তৈরি করিবে অথচ সে নিজেই জানেনা তাহার উপযোগী বিধান কোনটা।
আজকে যখন এই সিস্টেমের মারপ্যাঁচে পড়িয়া পুরা জাতি এক গভীর সঙ্কটে। তখনও কিছু মাথাচেলা বুদ্ধি প্রতিবন্ধি আলোচনার টেবিলে বসিয়া গণতন্ত্র আরও উত্তমরূপে চর্চা করিবার থিওরি কপচাইতে থাকেন। আর যখনই কেহ গণতন্ত্রের সমস্যা নিয়া কথা কহিতে যায় তাহাকে ইঙ্গ – মার্কিন পীরিতের দুশমন হিসাবে জঙ্গি ট্যাগ লাগাইয়া দেয়।
তাই যদি এখনও বুঝিবার সময় না আসে তবে অতি শীঘ্রই আমাদিগকে জঙ্গল যাত্রা করিতে হইবে আদৌ যদি সিস্টেমের চাপ সহ্য করিয়া টিকিতে পারি আরকি। আমাদের প্রত্যাবর্তন যদি ইসলামের দিকে হয়, তবে মহান খিলাফাহর আগমন শুনিব অতি শীঘ্রই ইনশাল্লাহ। অন্যথায়, জঙ্গলযাত্রা শুভহোক। ফি আমানিল্লাহ!!!!!!!!
আবদুর রহমান
সংকীর্ণ জীবন

১) সদ্য বেসরকারি নামকরা ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ পাশ করা কোন কর্মোদীপ্ত মেধাবী যুবক। ভার্সিটি থেকে বেরোনোর সাথে সাথেই চাকরি পেলো কোন নামকরা বেসরকারী ব্যাংকে; যার পে স্কেলও বেশ ভালো। বছর দুয়েক না যেতেই ব্যাংক তার জন্য অনুমোদন করলো ফ্ল্যাট আর গাড়ীর লোন। আর, ওই যুবকও সাত পাচ না ভেবে সেই সুযোগ লুফে নিলো; যদিও বাকী জীবন তাকে এই লোনের ঘানি টানতে হবে।
আমেরিকান ইসলামী সুবক্তা আর মনোবিদ ইয়াসির ফাজাগা একটি বেশ সুন্দর মন্তব্য করেছিলেন একবার, যা অনেকটা এমন:
”We buy things that we don’t need, with the money we don’t have, to impress the people we don’t like.”
অনেকেই হয়তো আপাতঃদৃষ্টিতে উপরের উদাহরণটিতে কোন গোঁজামিল খুঁজে পাবে না। আর না পাওয়ার পেছনে রয়েছে আমাদের বস্তুবাদী সমাজের পরিয়ে দেয়া রঙ্গিন চশমা। যদি সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গিতেও এগোই, তবুও ঐ যুবক এমন এক জীবনমান আর জীবনোপকরণের পিছনে ছুটছেন যার উপযুক্ততা তিনি অর্জন করেন নি অথচ তা নিজের জন্য উপযুক্ত সাব্যস্ত করার জন্য কত বছরের গতর খাটুনি আর দাসত্বের শিকলে নিজেকে বন্দী করেছেন তা তিনিই জানেন। এবার দেখি, ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে, এই জীবন কতটা ভয়াবহতা, সংকীর্ণতা আর সীমালঙ্গনের। সুদের গুনাহ্ কিংবা ভয়াবহতা নিয়ে আলোচনা করা বাহুল্যতা আর এর শোচনীয় পরিণতির কথা আমরা সবাই জানি। অথচ আমরা এমন সওদা করছি যার আদ্যোপান্ত একজনকে নিক্ষেপ করছে জীবনের সবচেয়ে উত্তুঙ্গ আর কর্মময় সময়ে আল্লাহদ্রোহিতায়!
২) কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লোকপ্রশাসণে মাস্টার্সের পাশাপাশি বিসিএস করা কোন যুবক বেশ বড় অংকের ঘুষ দিয়ে সরকারি ভূমি অফিসে চাকরি নিলো। ভূমি অফিসের দুর্নীতি আর ফাইলবন্দীত্বের সাথে যাদের পরিচয় আছে তারা জানে ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের আয়ের ফিরিস্তি; যার নব্বই শতাংশ আসে দুর্নীতি থেকে; তবে ব্যতিক্রমও থাকতে পারে। আমি কেবল প্রচলিত রেওয়াজের কথাই বলছি। এই সকল অফিসে মেধাবী অফিসার কিংবা তৃতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তারা এতটাই অর্থবুভুক্ষু হয়ে থাকেন যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভবপর নয়। এদের অনেকেই রাতারাতি বাড়ি-গাড়ীর মালিক বনছেন; অথচ তাদের অন্তরে এতটুকুন স্বস্তি নেই। কারণ, একটাই এদের আয়ের মূল উৎস ঘুষ।
৩) এক ছোটভাই বেশ কিছুদিন ধরে এক প্রবাসী মেয়ের সাথে পারিবারিকভাবে বিয়ের দর কষাকষি করছে। মেয়েপক্ষ একটু বেশী ধনাঢ্য হওয়ায় তাদের আবদারও বেশী। মাহর, উপহার আর বিয়ে পরবর্তী ওয়ালিমা বাবদ বেশ বড় অংকের টাকা চাই বৈবাহিক কার্য সম্পাদনের জন্য; যার জন্য হিমশিম খেতে হচ্ছে ওই ছোটভাইকে। এখানে, দর কষাকষি বলেছি এ জন্যই যে, এই বিয়ের মূল উদ্দেশ্য দুনিয়াবি স্বার্থ হাসিল; যার কারণে এই বিয়ের সম্ভাবনাটুকুও এই সকল আবদার-উপহারের সমানুপাতিক হয়ে পড়েছে। আর বিয়েকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনায় রীতিমতো হতাশ আর বিপর্যস্ত ওই ছোটভাই।
উপরের এমন উদাহরণ চাইলে, অসংখ্য দেয়া যায়।
সংকীর্ণতা, হতাশা আর গ্লানিতেই আশ পাশ; অথচ এই জীবনের তাড়নায় তারা গড়ছে আবাস।
কুরআনের দু’একটি আয়াহ্ দিয়ে যবনিকাপাত করতে চাই যা আমাদের বিভ্রম দুর করতে সহায়ক হবে, বি’ইদনিআল্লাহ:
“মানবকূলকে মোহগ্রস্ত করেছে নারী, সন্তান-সন্ততি, রাশিকৃত স্বর্ণ-রৌপ্য, চিহ্নিত অশ্ব, গবাদি পশুরাজি এবং ক্ষেত-খামারের মত আকর্ষণীয় বস্তুসামগ্রী। এসবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ্য বস্তু। আল্লাহর নিকটই হলো উত্তম আশ্রয়।“
[সুরা আল-ই ইমরান:১৪]
“হে মানুষ, কিসে তোমাকে তোমার মহামহিম পালনকর্তা সম্পর্কে বিভ্রান্ত করল?” [সুরা ইনফিতার: ০৬]
“এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।“ [সুরা ত্ব-হা:১২৪]সায়্যিদ মাহমূদ গজনবী
শুধু আবেগ নির্ভর আন্দোলন নয়, চাই বিবেক নিয়ন্ত্রিত সঠিক সিদ্ধান্ত

মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মানুষকে গুরুত্বপূর্ণ দু’টি বিষয় দান করেছেন। একটি হচ্ছে আবেগ, অপরটি বিবেক। আবেগ এবং বিবেক এই দু’টি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ দু’টো এমন বিষয় যার কোনো একটিকেও বাদ দেয়া সম্ভব নয়। মানুষের যে কোনো কাজে এই দু’টি বিষয়ের সমন্বিত ও পরিমিত উপস্থিতি সেই কাজ ও বিষয়কে সর্বোচ্চ সফলতায় উন্নীত করতে পারে। একইভাবে এই দু’টি বিষয়ের সমন্বয়হীনতা বা কম-বেশি যে কোনো কাজ বিশেষত আন্দোলনকে নিক্ষেপ করতে পারে অন্ধকার আস্তাকুড়ে।
আবেগ হচ্ছে গতি। দ্রুততা। চলার শক্তি। আর বিবেক হচ্ছে নিয়ন্ত্রক। এখন যদি কোনো গাড়ির গতি যত দ্রুত আর শক্তিশালীই হোক না কেন, যদি সেই গাড়ির নিয়ন্ত্রণ বা নিয়ন্ত্রক সুস্থ্য ও বিচক্ষণ না হয় তাহলে যে কোনো সময় এই গতি ও দ্রুততাই সেই গাড়ি ও তার সকল আরোহীর জন্য মৃত্যু ডেকে নিয়ে আসতে পারে।
আবার শুধু নিয়ন্ত্রক যদি একা একা বসে থাকে, যদি গতি ও চলার শক্তি না থাকে তাহলেও কিন্তু সেই গাড়ি কোনো কাজে আসবে না। এক্ষেত্রে গতি ও নিয়ন্ত্রক উভয়ের সমন্বিত সুষম ব্যবহারই একমাত্র আবশ্যক কর্তব্য।
আমাদের দেশের সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হওয়া শাহবাগ আন্দোলনের পুরোটাই আমার কাছে তরুণ প্রজন্মের আবেগকে ব্যবহার করে স্বার্থান্বেষী একটি মহলের ফায়দা লোটার অপচেষ্টা বলে মনে হয়েছে। এক্ষেত্রে বিবেকবানদের ভূমিকা ছিলো খুবই গৌন। নীরব। অনেকে নিজেদের বিবেককে ইচ্ছাকৃতভাবেই ঘুম পারিয়ে রেখেছিলেন। এই সুযোগে যৌবনের উন্মত্ত আবেগের পাগলা ঘোড়া ছুটেছে তার নিজ গতিতে। ক্ষণে ক্ষণে পাল্টেছে দাবী-দাওয়া ও চাওয়া-পাওয়া। এই আন্দোলন এতোটাই আবেগ নির্ভর ছিলো যে তারা কার কাছে চাচ্ছে? কি চাচ্ছে? কিভাবে চাচ্ছে? আর কি কি তারা চাইবে? এর কোনোটিরই সুনির্দিষ্ট কোনো ছক বা পরিকল্পনা তাদের মাথায় ছিলো না। উম্মাহর এই তরুণ-যুবকদেরকে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে এবং এখনও দিচ্ছে তারা কিছুক্ষণ পর পর রহস্যময় উৎস থেকে কিছু ওহী (নির্দেশনা) এনে পাঠ করছিলেন। কখনো কখনো উদ্দীপ্ত তারুণ্যকে শপথ পড়াচ্ছিলেন। দীক্ষা দিচ্ছিলেন। আবার তারপর তাদেরকে নাচ-গানসহ নানাবিধ বিনোদন আর নারী-পুরুষ ফ্রি-মাইন্ড সহাবস্থানের নামে বেলেল্লাপনা উসকে দিয়ে শাণিত করার নামে নির্জীব করছিলেন।
শুধু আবেগ নির্ভর হওয়ার কারণে মাত্র অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই এই আন্দোলন আজ যে কোন পর্যায়ে এসেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাদের ভবিষ্যতও বিচক্ষণ ব্যক্তিদের কাছে আজ উদ্ভাসিত হয়ে গেছে।
একইভাবে এই শাহবাগের এই আন্দোলন ও নাস্তিকদের অন্যায় আস্ফালনের বিরুদ্ধে এক পর্যায়ে দেশের আপামর আলেম-উলামা ও ইসলামী প্রতিষ্ঠান সমূহ পাল্টা আন্দোলনে নামেন। অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো দেশ জেগে উঠে। সারা দেশের ধর্মপ্রাণ তাওহীদী জনতা আলেমদের পাশে এসে দাঁড়ান। ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর সমর্থনে তারা তাদের সাধ্যানুযী প্রতিবাদ, বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেন। যার ফলে কল্পনাতীত দ্রুত গতিতে শাহবাগী নাস্তিকদের সূর পাল্টে যায়। এর চেয়েও দ্রুততার সাথে তাদের ধর্ম ও ইসলাম বিদ্বেষী সূর পরিবর্তিত হয় ধর্মকারী হিসেবে। এবার তারা নিজেদেরকে ইসলামের অনুগত ও খুবই ভক্ত একেকজন মুত্তাকী প্রমাণে মরিয়া হয়ে উঠেন। চিহ্ণিত যেই নাস্তিকগুলো গত কয়েকবছর বুক ফুলিয়ে নিজেদেরকে নাস্তিক বলে পরিচয় দিতো তারাও যেনো শেয়াল থেকে বেড়াল হয়ে গেলো। তাদের হুক্কা হুয়া আজ মিঁউ মিঁউ শব্দে প্রতিধ্বনিত হয়ে মুমিনদের হাসির খোরাক যোগাচ্ছে। তাদের এই দ্বিমুখী স্বভাব বুঝতে পেরেই গত প্রায় বছর খানেক আগে ‘দুই কেজি মুরগীর কতটুকু খাবেন’ নামক নাস্তিকদের বাস্তবতা ও স্বভাব বিষয়ক একটি লেখায় বলেছিলাম আসলে আমাদের দেশে প্রকৃত নাস্তিক নেই বললেই চলে। সারা দেশ তন্ন তন্ন করে খুঁজে দু’ই একজন প্রকৃত নাস্তিকও পাবো কিনা সন্দেহ আছে। কারণ নাস্তিকতার ভেকধারী কেউ আজ পর্যন্ত দুই কেজি মুরগীর পুরোট খেয়েছে বলে শোনা যায়নি। তারা এমনিতে সুবিধা নেয়ার জন্য নাস্তিকতার ভাব ধরলেও মুরগী খাওয়ার সময় ধর্ম এবং সামাজিক রীতি মেনেই যবেহ করে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করেই খেয়ে থাকে। এছাড়া অন্যান্য প্রায় সকল সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করে থাকে। -যাই হোক এটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। ভবিষ্যতে কখনো এ বিষয়ে আলাদা করে লেখার ইচ্ছা আছে।
নাস্তিকদের বিরুদ্ধে আজ যে বিশ্বাসী মুমিনদের আন্দোলন শুরু হয়েছে সত্য বলতে গেলে তাও মূলত: আবেগ থেকেই। এই আন্দোলনের মূল উপজীব্য বিষয় মুমিনদের অন্তরে বিদ্যমান ইসলাম ও প্রিয়নবী (সা) এর প্রতি শর্তহীন ভালোবাসা। আবেগের শক্তি ও গতি যেমন উপকারী তেমনি বিবেকের নিয়ন্ত্রণ ও সুশৃংখল পরিচালনাও অপরিহার্য বাস্তবতা। আজ উলামায়ে কিরাম যদি পুরো উম্মাহর মনের দাবী এ দেশে ইসলাম বিরোধীদের অপতৎপরতার বিষয়ে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ ও সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের মূল দাবীতে এই আন্দোলনকে প্রথিত করতে না পারেন তাহলে শুধু আবেগ নির্ভর এই আন্দোলনও যে শীঘ্রই হারিয়ে যাবে -তা এক কঠিন তিক্ত অতীত সত্য বাস্তবতা।
অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ও বাস্তব প্রমাণ হাতে থাকার পরও উলামায়ে কিরাম ও উম্মাহর নেতৃবৃন্দ যদি দেশের আপামর জনসাধারণকে সংগঠিত ও সুশৃংখল করে একটি চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিতে না পারেন তাহলে এটি হবে আমাদের এক বিশাল ব্যর্থতা।
মিডিয়াতে ইসলাম ও উলামায়ে কিরামদের অবস্থান খুবই সীমিত প্রায় নেই বললেই চলে। মিডিয়ার ব্যাপারে শ্রদ্ধেয় আলিমদের কেনো এই উদাসীনতা ও সীমাহীন নিরাসক্তি তার বোধগম্য কোনো গত বিগত এক যুগেও আমি পাইনি। অথচ যদি শীর্ষ উলামাগণ চাইতেন তাহলে আজকে আলিমদের হাতে অন্তত ১৫ টি শক্তিশালী মিডিয়া থাকতো। এই অবিবেচক নির্লিপ্ততার কারণেই আজ বিশ্বাসীদের অনেক বড় বড় অর্জন গুলোর সঠিক সংবাদও জাতি পাচ্ছে না। এ বিষয়ে উলামায়ে কিরাম ও জাতীয় নেতৃবৃন্দের সজাগ দৃষ্টি দেয়ার সময় কি এখনও আসেনি?
পাশাপাশি নাস্তিক ও সাম্রাজ্যবাদীদের দালালদের ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদী শাস্তি ও সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। কারণ আজ আমরা যাদের কাছে নাস্তিকদের শাস্তি চাচ্ছি, আসলে তারাই তো তাদেরকে গানম্যান ও প্রটেকশন দিয়ে নিরাপদে অপকর্ম করে যাবার সুযোগ দিয়ে রেখেছে। ইসলামের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি তো তারাই করছে -সুতরাং তাদের একটি মিথ্যা আশ্বাস বা আইওয়াশ মূলক কাজের ফলে বিভ্রান্ত হয়ে উলামায়ে কিরাম ও জাতীয় নেতৃবৃন্দ যদি তৃপ্তির ঢেকুর তুলেন তবে এটি হবে আমাদের জন্য খুবই দু:খজনক একটি অধ্যায়।
মহান আল্লাহ আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দকে সঠিক বিষয়টি যথাযথভাবে উপলব্ধি করার তাওফীক দিন। মানুষের স্বার্বভৌমত্ব ও গোলামীতে আটকা পরে যাওয়া, গণতন্ত্রের মড়কের নিচে চাপা পরে থাকা অসহায় মানবতার মুক্তির জন্য ইসলামকে পুনরায় সমাজ ও রাষ্ট্রে বিজয়ী হিসেবে নিয়ে আসার লক্ষ্যে সঠিক কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করার তাওফীক দিন, আমীন।
ইসহাক খান
মুমিনের কোনোদিন পরাজয় নাই…

(51) قُلْ لَنْ يُصِيبَنَا إِلا مَا كَتَبَ اللهُ لَنَا هُوَ مَوْلانَا وَعَلَى اللهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ
(52) قُلْ هَلْ تَرَبَّصُونَ بِنَا إِلا إِحْدَى الْحُسْنَيَيْنِ وَنَحْنُ نَتَرَبَّصُ بِكُمْ أَنْ يُصِيبَكُمُ اللهُ بِعَذَابٍ مِنْ عِنْدِهِ أَوْ بِأَيْدِينَا فَتَرَبَّصُوا إِنَّا مَعَكُمْ مُتَرَبِّصُونَ“হে নবী আপনি বলে দিন! আল্লাহ আমাদের জন্য যা লিখে রেখেছেন তার বাইরে আমাদের কিছুই হবে না। তিনিই আমাদের অভিভাবক, আর আল্লাহর উপরই যেন মুমিনরা তাওয়াক্কুল করে। হে নবী আপনি (অবিশ্বাসীদেরকে) বলে দিন! তোমরা কেবল আমাদের জন্য দু’টি কল্যাণের একটিরই অপেক্ষা করছ (হয়তো আমরা তোমাদের হাতে শহীদ হবো অথবা বিজয়ী হবো) আর আমরাও তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছি মহান আল্লাহর আযাবের। হয়তো এই আযাব তিনি স্বয়ং তোমাদেরকে দিবেন অথবা আমাদের মাধ্যমে তোমাদের উপর এই আযাবের বাস্তবায়ন করবেন। অতএব তোমরা অপেক্ষা কর, নিশ্চয়ই আমরাও তোমাদের সাথে অপেক্ষমাণ।” (সূরা তাওবা, আয়াত ৫১-৫২)
দেশের সাম্প্রতিক অবস্থা আমাদের সবারই জানা। আমাদের চোখের সামনেই হচ্ছে সব। কিন্তু এখানে বিশ্বাসী বা একনিষ্ঠ মুমিনরা আজ কোনঠাসা। জালিম ও তাদের দোসরদের উল্লাসই মিডিয়া ফলাও করে প্রচার করছে। একজন সম্মানিত আলিমকে অপমানিত করার ব্যর্থ চেষ্টা আজ যারা করছে তাদের পরিণতি নিঃসন্দেহে ভয়াবহ হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। অতীত ইতিহাস সাক্ষী, যারাই কোনো আলিমের সাথে দুর্ব্যবহার করেছে, অসম্মান করতে চেয়েছে কিংবা কোনো আলিমকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে -তাদের পরিণতি হয়েছে শোচনীয়।
আজকে যারা একজন আলিমের ফাঁসি দেখার জন্য জেনে না জেনে ঢোলের তালে তালে নাচছে, তারা জানেনা এদেশের ভবিষ্যত তারা কোন অন্ধকার গহ্বরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যুদ্ধাপরাধ নামক একটি খুবই ঠুনকো অজুহাতের আড়ালে আজ হারিয়ে গেছে এই দেশের সবচেয়ে বড় বড় ইস্যুগুলো। সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ও ভারতের ভয়াবহ নীল-নকশা আজ সবার অগোচরে সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পথে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশের ৮/১ (এক অষ্টমাংশ) ভূমি নিয়ে এশিয়ার নতুন ইসরাইল রাষ্ট্রগঠন আজ সময়ের ব্যাপার মাত্র। বঙ্গোপসাগরে আমেরিকার যুদ্ধ জাহাজ আসার জন্য এদেশে একটি বড় আকারের ম্যাসাকার প্রয়োজন। হানাহানি আর রক্তপাতের একটি অজুহাত দরকার। যার ফলে তারা শান্তি প্রতিষ্ঠার নাম করে এখানে তাদের সোলজারদের অনুপ্রবেশ ঘটনাতে সক্ষম হবে। গণতন্ত্র ফেরি করা কিংবা শান্তি বিতরণের মহান বাণীর আড়ালে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করবে।
আর সেই প্রেক্ষাপট রচনা ও এদেশের জনগণের সামনে ইসলামী রাজনীতি ও ইসলামী ব্যক্তিত্বদেরকে কালারিং করার জন্যই আজ তারা নানান ইস্যু ও নাটক করে চলেছে। কর্পোরেট মিডিয়াগুলোও তাদের প্রভুদের দেয়া পয়সা হালাল করার জন্য হলুদ সাংবাদিকতার সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করছে। কিন্তু তাদের সকলের জেনে রাখা প্রয়োজন চূড়ান্ত বিজয় কেবলমাত্র মুমিনদেরই। তারা যতই চক্রান্ত করুক না ইনশাআল্লাহ একবিংশ শতাব্দী ইসলামের শতাব্দী। এই উম্মাহর তরুণ-যুবকরা জেগে উঠছে। গণতন্ত্রের মড়ক আস্তাকূড়ে নিক্ষেপ করে, শোষণ নিপীড়ন আর মানব রচিত সকল তন্ত্র-মন্ত্র ছিন্ন করে এক আল্লাহর সার্বভৌমত্বের দাবী তোলা এবং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পুর্ণাঙ্গ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবী জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাবার এখনই শ্রেষ্ঠ সময়।
বিজয় অতি নিকটে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ বলেন,
(139) وَلَا تَهِنُوا۟ وَلَا تَحْزَنُوا۟ وَأَنتُمُ ٱلْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
إِن يَمْسَسْكُمْ قَرْحٌۭ فَقَدْ مَسَّ ٱلْقَوْمَ قَرْحٌۭ مِّثْلُهُۥ ۚ وَتِلْكَ ٱلْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ ٱلنَّاسِ وَلِيَعْلَمَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَيَتَّخِذَ مِنكُمْ شُهَدَآءَ ۗ وَٱللَّهُ لَا يُحِبُّ ٱلظَّـٰلِمِينَ (140)
(141) وَلِيُمَحِّصَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَيَمْحَقَ ٱلْكَـٰفِرِينَ“আর তোমরা ভয় পেয়ো না এবং দুঃখিতও হয়ো না, (কারণ সাময়িক বিপদের পরে) তোমরাই বিজয়ী হবে -যদি মুমিন হয়ে থাকো।যদি তোমাদেরকে কোন আঘাত স্পর্শ করে থাকে তবে তার অনুরূপ আঘাত উক্ত কওমকেও স্পর্শ করেছে। আর এইসব দিন আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে আবর্তন করি এবং যাতে আল্লাহ ঈমানদারদেরকে জেনে নেন এবং তোমাদের মধ্য থেকে শহীদদেরকে গ্রহণ করেন। আর আল্লাহ জালিমদেরকে ভালবাসেন না। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৯-১৪১)
সত্য মিথ্যার এই সংঘাত আল্লাহ এজন্য সংগঠিত করেন) যাতে আল্লাহ পরিশুদ্ধ করেন ঈমানদারদেরকে এবং (এই লড়াইয়ের মাধ্যমে) ধ্বংস করে দেন কাফিরদেরকে।
(142) أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا۟ ٱلْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ جَـٰهَدُوا۟ مِنكُمْ وَيَعْلَمَ ٱلصَّـٰبِرِينَ
তোমরা কি মনে করো যে, তোমরা এমনিতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনো প্রত্যক্ষ করে দেখে নেননি যে তোমাদের মধ্যে কারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং জানেননি ধৈর্যশীলদেরকে।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৪২)
ইসহাক খান


















