তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কি আমাদের সশস্ত্র লড়াইয়ে অবতীর্ন হতে হবে?
যদিও মুসলিমরা ১৯২৪ সালে তাদের রাষ্ট্র হারিয়েছিল তাদের হৃদয়ে তাদের দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা টিকে ছিল ঠিকই এবং এর দ্বারা বিভিন্ন ইসলামী আন্দোলনের সৃষ্টি হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল খিলাফতের পুনঃআগমনের মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। এইসব আন্দোলনগুলো খিলা-ফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতির কথা বলে এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ এই মহান দায়িত্ব পালনের জন্য জিহাদকেই একমাত্র পথ দাবি করে। যারা এই পদ্ধতি অনুসরণ করেন তাদের আন্তরিকতা ও ত্যাগ সন্দেহের উর্ধ্বে। বর্তমানে যেহেতু অধিক থেকে অধিকতর মানুষের এই দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে এবং এই দায়িত্ব পালন করতে তারা সঠিক পদ্ধতির খোঁজ করছেন। তাই এই সকল পদ্ধতি কুরআন ও সূন্নাহ’র আলোকে মূল্যায়ন করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সুতরাং এই প্রবন্ধে আমি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় “জিহাদ” এই বিষয়ে আলোচনা করব।
যারা মুসলিম ভূমির বর্তমান শাসকদের অস্ত্রের মাধ্যমে সরানোর কথা বলেন তারা এইসব দেশের শাসকদের কাফির হিসেবে গণ্য করেন। কারণ তাঁরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার আইন অনুসারে শাসন করে না। তাঁরা প্রমাণ হিসেবে কুর’আনের নিচের আয়াতটি উল্লেখ করেন,
“এবং যারা আল্লাহর যা অবতীর্ণ করেছেন তা দিয়ে বিচার ফয়সালা করেনা তারা কাফের” (আল মায়িদা-৪৪)
অতঃপর তাঁরা এই শাসকদের মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) অ্যাখ্যা দেয় এবং বলেন যে মুসলিমদের অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে জিহা-দ করতে হবে কারণ রাসূল (সা) একটি হাদীসে বলেছেন “যে ধর্ম ত্যাগ করে তাকে হত্যা কর যতক্ষন না সে প্রায়শ্চিত্ত করে”। এছাড়াও তারা একটি হাদীস বলেন যা মুসলিমদের আদেশ করে তাদের শাসকদের সাথে জিহা-দ করতে যখন তাদের মধ্যে প্রকাশ্য কুফরি দেখা যায়। বুখারিতে বর্ণিত জুনাদা বিন আবি উমাইয়া এর বরাতে, তিনি বলেন, “আমরা উবাদাহ ইবনুস সামিত এর কাছে গেলাম যখন তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং আমরা বললাম আল্লাহ আপনাকে হিদায়াহ দান করুন। আপনি আমাদেরকে রাসূল (সা) এর একটি হাদীস বলুন যার মাধ্যমে আল্লাহ আপনাকে উপকৃত করবেন। তিনি বলেন, “একদা আল্লাহর রাসূল (সা) আমাদের সকলের কাছ থেকে বা’ইয়াহ (শপথ) নিলেন যে যাতে আমরা সুখে দুঃখে তার কথা শুনি এবং মানি, সহজ, কঠিন এবং খারাপ অবস্থাতেও যাতে তাঁর আনুগত্য করি। আমরা আরো শপথ করেছি যে আমরা কখনো শাসকদের সাথে বিবাদে যাবনা যতক্ষন পর্যন্ত না তাদের মাঝে সুস্পষ্ট কুফর পরিলক্ষিত হচ্ছে, আমাদের কাছে যা আল্লাহ কতৃক প্রমাণিত।
অন্য একটি হাদীসে রাসূল (সা) বলেন, “তোমাদের সর্বোত্তম নেতা (ইমাম) আমীর হচ্ছে তারা যাদের তোমরা ভালবাস এবং তারাও তোমাদের ভালবাসে, যারা তোমাদের জন্য দোয়া করে এবং তোমরা তাদের জন্য দোয়া কর। আর তোমাদের সবচেয়ে মন্দ/খারাপ নেতা হচ্ছে তারা যাদের তোমরা ঘৃণা কর এবং তারাও তোমাদেরকে ঘৃণা করে। যাদেরকে তোমরা বদ-দোয়া কর এবং তারাও তোমাদের জন্য বদ-দোয়া করে। তাকে (সা) কে জিজ্ঞেস করা হল, “হে আল্লাহর রাসূল (সা) আমরা কি তাদের তরবারী দ্বারা অপসারণ করবনা?” তিনি বলেন, “না, যতক্ষন না তারা তোমাদের মাঝে সালাত প্রতিষ্ঠিত রাখে এবং যদি তোমরা তাদেরকে এমন কাজ করতে দেখ যা তোমরা ঘৃণা কর তাহলে তার কাজকে ঘৃণা করিও এবং তার কাছ থেকে আনুগত্যের হাত সরিয়ে নিওনা” (সহীহ মুসলিম)। উপরের হাদীসটি এটাই অর্থ করে যে,ঐ শাসক যে প্রকাশ্য কুফরি করে এবং আল্লাহ ব্যাতিত অন্য আইনে শাসন করে তার সাথে অবশ্যই যুদ্ধ করতে হবে এবং তার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। তার মানে কি আমরা বর্তমানে শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব? কারণ তারা শরীয়াহ দ্বারা শাসন করছেনা।
প্রথমত, আমরা ঐ দাবী টা দেখি যে বর্তমান শাসকরা মুর্তাদ হয়ে গেছে কারণ তারা আল্লাহর আইন দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করছেনা । ইবনুল কাইয়্যিম এই ব্যাপারে যে সঠিক মতটি দিয়েছেন তা হল:
“সঠিক মত হল যে, আল্লাহ প্রদত্ত আইন ছাড়া অন্য কোনো আইনে শাসন করা বড় এবং ছোট উভয় কুফরীর অন্তর্ভূক্ত, এটা নির্ভর করে যে বিচার করে তার অবস্থানের উপর। যখন সে মনে করে যে ‘আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা দ্বারা বিচার করা বাধ্যতামূলক’ কিন্তু সে এই পথ থেকে অবাধ্যতার দরুন সরে যায় এবং এটা স্বীকার করে যে এই জন্য তাকে শাস্তি পেতে হবে তাহলে এটি হবে ছোট কুফর। কিন্তু সে যদি মনে করে যে ‘এটা বাধ্যতামূলক না’ এবং পছন্দের মালিক সে নিজে যদিও সে নিশ্চিত যে এটাই আল্লাহর আইন তাহলে এটি বড় কুফর” (মাদারীজ আস সালিকীন, ১/৩৩৬-৩৩৭)
আমরা ইবনুল কাইয়্যিম এর মতের সাথে আরো যোগ করতে পারি যে, যখন আমরা সূরা মায়িদার ঐ পরিচ্ছেদ পড়ি যেখানে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো আইন দ্বারা শাসনের কথা বলা হচ্ছে, আমরা দেখি যে যারা তাঁর আইন অনুসারে বিচার ফায়সালা করেনা তাদের তিনি কাফির, জালিম ও ফাসিক বলেছেন। তাই যদি একজন শাসক কুফর দ্বারা শাসন করে দূর্নীতির কারণে অথবা বিরোধীদলের ভয়ে অন্যায় করে যদিও স্বীকার করে যে তার এই কাজ গুনাহ এবং ঘৃণা/নিন্দাযোগ্য তবে সে হবে ফাসিক, জালিম বা কাফির নয়। অন্যদিকে সে যদি কুফর দ্বারা শাসন করে এবং এটা বিশ্বাস করে যে আল্লাহর আইন দ্বারা শাসন করা বাধ্যতামূলক নয় অথবা কুফরী আইন আল্লাহর আইনের চেয়ে ভালো তবে সে নিজেকে ইসলামের বন্ধন থেকে ছিড়ে ফেলল এবং সে মুরতাদ হয়ে গেল। পরের ভাগটিকে প্রমাণ বা প্রতিষ্ঠা করতে আমাদের কাছে স্পষ্ট যে হাদীস আছে তা হল,
“যতক্ষন আমরা স্পষ্ট কুফর দেখতে পাব যার পক্ষে আমাদের কাছে আল্লাহ কর্তৃক দলীল আছে”
তাছাড়া কাউকে কাফির তকমা লাগিয়ে দেওয়া (কোন প্রকাশ্য দলীল ছাড়া) ইসলামে জায়েজ নেই। এছাড়াও তারা যদি কাফির হয়ে থাকে আমাদের জিজ্ঞাসা করা উচিত যে ‘উম্মাহর মধ্যে থেকে কিছু মানুষ অথবা গোষ্ঠী বা দল কি খলীফা বা ইমামের অনুপস্থিতিতে এবং তার অনুমতি ছাড়া মুরতাদের শাস্তি প্রয়োগ করতে পারে? আমরা জানি যে, মুরতাদের শাস্তি সহ অন্য সব হুদুদ বাস্তবায়ন করা ইমামের একচ্ছত্র দায়িত্ব। যদিনা অন্য কোথাও বিশেষভাবে এর বর্ণনা থাকে। রাসূল (সা) এর নিচের হাদীসটি এই ব্যাপারটি পরিস্কার করে,
“ইমামের অনুপস্থিতিতে (রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ব্যতিত) কারো অধিকার নেই হুদুদ বাস্তবায়ন করা”। (বায়হাকী কর্তৃক তাঁর সুনানে বর্ণিত)
ইমাম তাহাবীও মুসলিম ইবন ইয়াসার থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেন, “যাকাত (সংগ্রহ), হুদুদ (বাস্তবায়ন), গনীমত (যুদ্ধলব্ধ দ্রব্যাদি (বন্টন), জুমা (ইমামতি), এগুলো হল ইমাম (সুলতান) আমীরের”।
দ্বিতীয়ত, আমাদেরকে যে সব শাসক প্রকাশ্যে কুফর করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যে হাদীসে আদেশ করা হয়েছে তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে বুঝা উচিত। আমরা যদি একটু সচেতনভাবে ঐ হাদীসটির দিকে তাকাই তাহলে দেখবো যে এখানে ঐ শাসকের কথা বলা হয়েছে যারা জনগণের বৈধ বা’ইয়াহ নিয়ে এসেছে এবং তারা ইসলাম অনুসারে শাসন করত কিন্তু পরবর্তীতে কুফর দ্বারা শাসন করতে থাকে। তার মানে হচ্ছে আমাদের যুদ্ধ করতে হবে খলীফার সাথে যখন খিলা-ফত প্রতিষ্ঠিত থাকবে কিন্তু খলীফা পরিস্কার কুফর করবে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট এই হাদীসের প্রেক্ষাপট থেকে ভিন্ন। বর্তমানে আমরা এমন একটা সময়ের মধ্যে আছি যেখানে খিলাফত ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তা কুফর শাসন দ্বারা পুরোপুরি প্রতিস্থাপিত হয়েছে। বর্তমান শাসকেরা কখনোই জনগন থেকে শর’ঈ বা’ইয়াহ নেয়নি। তাদের কেউই মোটেও ইসলামকে বাস্তবায়ন করেনি। এমনকি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ইসলামকে বাস্তবায়নের কোনো চেষ্টাও করেনি। তাই বর্তমানে আমাদের কাজ শুধুই বিপদগামী শাসককে প্রতিস্থাপন করার চাইতেও অনেক বড়। বরং এটি হচ্ছে সমস্ত কুফর ব্যবস্থা যা মুসলিম ভূমিগুলোতে আরোপিত আছে তাকে সমূলে উৎপাটন করা এবং খিলাফাহ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এইসব আন্দোলনগুলো যেগুলো ইসলামী খিলাফাহ কে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে জিহাদের পক্ষালম্বন করে তারা তাদের পদ্ধতিকে ঠিক প্রতিয়মান করতে শরীয়ার একটি মূলনীতি বলে থাকে যা হল-
“কোন ফরয কাজের জন্য যা করতে হয় তাও ফরয”।
কিন্তু এটি নিতান্তই ভ্রান্ত যে, কোন সাধারণ মূলনীতি দিয়ে কোন একটি বিশেষ ইস্যুর নির্দিষ্ট মত (হুকুম) দেয়া এবং এই ইস্যুকে নিয়ে অন্যান্য যা বিশেষ টেক্সট আছে তাকে বাদ দেওয়া অথবা কোন বিশেষ টেক্সট না থাকলে ইসলামের অন্যান্য মূলনীতিকে গ্রাহ্য না করা। ড. হেকাল যিনি আমাদের আলোচ্য বিষয় নিয়ে একটি থিসীস করেছিলেন। তিনি শুধুমাত্র একটি ইস্যুতে এই পদ্ধতিতে পরস্পর বিরোধী উপসংহারে আসে তা বিবৃত করেছেন। উদাহরণস্বরূপ এই ইস্যু যা হল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ‘অস্ত্রের ব্যবহার’। এটা অনেকে বলতে পারে যে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ কারণ এটা রাসূল (সা) এর হাদীস থেকে প্রমাণিত “যে আমাদের (মুসলিমদের) দিকে অস্ত্র উত্তোলন করে সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয়”। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ফরয এবং এটি প্রতিষ্ঠা কখনোও সম্ভব নয় অস্ত্র ছাড়া যা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। এখানে একই ইস্যুতে বৈধ-অবৈধ উভয়ই বিষয় চলে আসছে এবং ইসলামের একটি মূলনীতি হল “যখন কোনো একটি ইস্যুতে বৈধ-অবৈধ উভয় বিষয় চলে আসে তবে অবৈধতা বৈধতাকে অগ্রাহ্য করবে। তার মানে তখন একজনকে অবশ্যই অবৈধতার হুকুম অনুসারে কাজ করতে হবে এবং তখন অস্ত্র ব্যবহার অবৈধ হবে”। এছাড়া কিছু মানুষ বলতে পারে যে আল্লাহর আইন প্রয়োগের জন্য এই ফরয পালন/বাস্তবায়ন একটি সওয়াবের কাজ এবং যা নিষিদ্ধ তা করা মানে উম্মাহর রক্ত প্রবাহিত করা গুনাহ/ফাসিকি। ইসলামী শরীয়াহ বলে যে “ফাসিকি বা গুনাহকে বাধা দেয়া/ দমন করা আমাদের সওয়াব অর্জনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। “যে কাজ ফরয তা করতে যা করার দরকার হয় তাও ফরয” এটি তখনই নেয়া যাবে যখন এই ইস্যুতে কোন পার্থক্য থাকবেনা যে এটি অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে এবং এটি বৈধ কোনো মাধ্যম ছাড়া অর্জন করা যাবেনা। তখনই কেবল বলা যায় যে “কোন ফরয কাজের জন্য যা করতে হয় তাও ফরয”। তার মানে কোন বৈধ কাজ যা কোন ফরয কাজ করার মাধ্যম হিসেবে গণ্য হয় তখন ঐ কাজটি ফরয হয়ে যায়। কিন্তু যখনই এই ফরয কাজটি এমন কোন কাজ ছাড়া করা সম্ভব নয় যা নিজ থেকেই নিষিদ্ধ যেমনটা আমরা এই প্রবন্ধে যা নিয়ে আলোচনা করছি অস্ত্রের ব্যবহার সম্বন্ধে- অমারা কি এখন এই ফরযটি পালন করতে এই কাজটি করতে পারি শরীয়ার এই মূলনীতিকে বাদ দিয়ে? আল্লাহর শপথ না! যতক্ষন পর্যন্ত এই কাজটি অন্য আরেকটি মূলনীতি“ প্রয়োজনীয়তা নিষিদ্ধ/ অবৈধকে বৈধ করে” এর দ্বারা আচ্ছন্ন হয়। হ্যাঁ, তবে যদি এই সম্বন্ধে তথা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অস্ত্রের ব্যবহার সম্পর্কে কোন বিশেষ টেক্সট বা দলিল থেকে থাকে এবং যা অস্ত্র ব্যবহারের সাধারণ মূলনীতিতে এই বিষয়কে অন্তর্ভূক্ত করা থেকে বিরত রাখে তাহলে এই দলীলটি হবে ব্যাতিক্রম এবং এটি “যা ফরয তা পালন করতে যা করতে হয় তাও ফরয” এই মূলনীতিতে পড়ে না। সংক্ষেপে শুধুমাত্র ‘ফরয পালন করতে যা করতে হয় তাও ফরয’ এই মূলনীতিকে দলীল হিসেবে ব্যবহার করে এবং অন্যান্য যে নির্দিষ্ট দলীলগুলো আছে তা অগ্রাহ্য করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধকেই একমাত্র পন্থা হিসেবে বেছে নেওয়াকে আমরা সমর্থন করতে পারি না। এছাড়াও যারা মুসলিম ভূমিতে সশস্ত্র যুদ্ধের কথা বলে তারা আরেকটি যুক্তি দেয় যে, মুসলিম ভূমিগুলো আজ দখলকৃত এবং জিহা-দ এখন ফারদুল আইন হয়ে গেছে। সেজন্য প্রত্যেক মুসলিমকেই এই দখলকৃত ভূখন্ডগুলোকে মুক্ত এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে যুদ্ধ করতে হবে। এই যুক্তি জিহাদের বাধ্যবাধকতা ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাধ্যবাধকতা এক করে ফেলে যেখানে এই দুটি পুরোপুরি ভিন্ন কর্তব্য এবং সেগুলো সম্পাদনের কর্মপদ্ধতিও ভিন্ন। জিহা-দ প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরযে আইন হয়ে যায় যখন মুসলিমদের ভূমি দখল হয়ে যায় এবং ঐ ভূমির প্রত্যেক মুসলিমকেই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা থাক বা না থাক রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে জিহাদ করতে হয়। কিন্তু অন্যদিকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না থাকলে তা প্রতিষ্ঠা করা ফরয হয় যদিও রাষ্ট্রটি বাইরের শত্রু দ্বারা দখলকৃত থাক বা না থাক। অনেকে আবার অনেক দূরে এগিয়ে বলে বর্তমানে প্রত্যেক মুসলিম ভূমি দখলকৃত কারণ এদের শাসকেরা উম্মাহর শত্রু। তাই প্রত্যেক মুসলিমের জন্য এই উম্মাহর শত্রু“দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ভূমি মুক্ত করা আবশ্যক। তাদের এই ধারণাটি দখলের প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ ভূল। একটি ভূমি তখনই দখল হয়ে যায় যখন তা কোন অমুসলিম বাহ্যিক শক্তি দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং মুসলিমদের কাছ থেকে সব ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ফিলিস্তিন, আফগানিস্থান ও ইরাকের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। শুধুমাত্র সে ক্ষেত্রে জিহাদ করা প্রত্যেকের উপর ফরয হয়ে যায়। তাই বর্তমানে যেহেতু কোন মুসলিম দেশের শাসকেরা ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়ন করছেনা তাই সব মুসলিম দেশই দখলকৃত এটা বলা ভূল কারণ ঐসব ভূমির কর্তৃত্ব এখনও মুসলিমদের হাতে যারা তাকে বাইরের শত্রু“র আক্রমন থেকে রক্ষা করে। তাই এই অবস্থা একমাত্র কার্যকর হবে যখন বিদেশী সেনারা ঐ ভূমি দখল করবে। যখন মুহাম্মদ (সা) মক্কায় দাওয়াহ করছিলেন তখন আবদুর রহমান ইবন আউফ (রা) অন্যান্য কিছু সাহাবাদের সাথে এসে আল্লাহর রাসূল (সা) থেকে যুদ্ধের অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু রাসূল এই বলে নিষেধ করেন যে,
“প্রকৃতপক্ষে আমি ক্ষমার জন্য আদিষ্ট হয়েছি, তাই মানুষের সাথে যুদ্ধ করিওনা” (ইবনে আবি হাতিম এবং আন নাসাই ও আল হাকিম কর্তৃক বর্ণিত)।
সুতরাং আমরা মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধের জন্য আদিষ্ট হইনি। বরং আমাদেরকে রাসূল (সা) মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে যেসব কাজগুলো করেছেন তাই অনুসরণ করতে হবে। রাসূল (সা) এর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বের দাওয়াহ কে আমরা তিনটি পর্যায়ে ভাগ করতে পারি। প্রথম পর্যায় হচ্ছে গোপনে একটি নির্দিষ্ট গ্রুপ তথা সাহাবাদেরকে (রা) ইসলামী চিন্তা-ধারণা এবং আবেগ দ্বারা পরিচালিত করা এবং তাঁদেরকে ইসলামের বার্তা ছড়ানোর জন্য প্রস্তুত করা।
দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হল তখন থেকে যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা রাসূল (সা) কে প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের নির্দেশ দেন। এটি হচ্ছে তখন যখন রাসূল (সা) প্রকাশ্যে কুরাইশদের জীবন ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং তাদের সর্দারদের বিরুদ্ধে কথা বলেন। এই পর্যায়টি ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের। শেষ পর্যায়ে মুহাম্মদ (সা) বিভিন্ন আরব গোত্রের কাছে যান সামরিক সহযোগিতা (নুসরাহ) এর সন্ধানে যতক্ষন পর্যন্ত না মদীনার “আওস ও খাজরাজ” সমর্থন দিতে শপথ করে। (বিস্তারিত জানতে নবী (সা) এর দ্বীন কায়েমের পদ্ধতি দেখুন)।
পরিশেষে, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সশস্ত্র জিহাদ বা যুদ্ধের কোনো দলীল প্রমাণিত হল না। বরং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জিহা-দকে আল্লাহর রাসূল (সা) বিশেষভাবে নিষেধ করেছেন। তার পরিবর্তে রাসূল (সা) ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি সুনির্দিষ্ট পথ আমাদেরকে দেখিয়েছন এবং আমাদের কঠোরভাবে এই পদ্ধতির সাথে জুড়িয়ে থাকতে হবে ও লক্ষ্য রাখতে হবে যেহেতু এটি একটি শরয়ী বাধ্যবাধকতা তাই যেন এই পথ থেকে আমরা বিন্দুমাত্র ও সরে না যাই।
মূল: শফিউল হক
তথ্যসূত্র:
আল জিহাদ ওয়াল কিতাল ফি আস-সিয়াসা আস শারীয়া > ড. মুহাম্মদ খায়ের হেকাল।বিশ্বাসের একটি ভাষা আছে
পাকিস্তানের একজন ইসলামিক স্টাডিজের শিক্ষক অফিসিয়াল ট্যুরে ভ্যাটিকান গিয়েছিলেন। তারা সেখানে উচ্চতর একদল পাদ্রীর সাথে সাক্ষাত করেছিলেন।
ওই শিক্ষক একজন পাদ্রীকে জিজ্ঞেস করলেন: “তোমাদের কি এমন কোন উক্তি জানা আছে যা শতভাগ ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছেন তাতে নিশ্চিত?”
পাদ্রী ঈষৎ লজ্জিত বোধ করলেন কিন্তু সততার সাথে উত্তর দিলেন যে, “এমন কোন উক্তি জানা নেই যা পরিপূর্ণভাবে যাচাই করা যায়- কেননা তিনি যে ভাষায় কথা বলতেন তা হারিয়ে গেছে।”
এরপর পাদ্রী জিজ্ঞেস করলেন, “মুসলিমদের আছে কি”?
“তোমাদের কি এমন উক্তি জানা আছে যা শতভাগ মুহাম্মাদ [সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] বলেছেন নিশ্চিত?”
ওই শিক্ষক মৃদু হাসলেন। আর বললেন, “আমাদের কেবল আমাদের নবীর [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] সুনিশ্চিত আর সন্দেহাতীত কথা সম্বলিত বইয়ের সংগ্রহশালাই রয়েছে তা নয়, আমাদের একটি বিজ্ঞান [science] রয়েছে, যার নাম ‘তাজওয়ীদ’ [Tazweed]”। তাজওয়ীদ এর পড়াশুনা হচ্ছে, প্রত্যেকটি ধ্বনি আর বর্ণ যেভাবে নবী [সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] উচ্চারণ করতেন তদানুযায়ী শিক্ষা দেয়া!”
সকল প্রশংসা আল্লাহ্ তা’আলার, যিনি আমাদের দ্বীনকে এভাবে হিফাজত করেছেন।
কিন্তু, ভাই ও বোনেরা আমরা কি আল্লাহ্ এবং তার রাসূলের বাণীকে হিফাজত করায় আমাদের করণীয়টুকু করছি? রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “প্রচার করো! একটি আয়াহ্ হলেও।” কিভাবে আমরা তা করতে সমর্থ হবো যদি আমরা নিজেরাই অবতীর্ণ আয়াহ্’টি না বুঝি? কিভাবে আমরা তা জানি এমন ধারনা করতে পারি যখন আমরা যে ভাষায় তা অবতীর্ণ হয়েছে সে ভাষাটিই বুঝি না। আর আল্লাহ্ আর তার রাসূল (সা) এর মিশনকে সফল করতে হলে আমাদের উপর ইসলামের ভাষা [আরবী] শিখা আবশ্যক।
অন্যদের ইসলাম শিক্ষা দেয়া- একটি আয়াহ্ হলেও পৌছানোর পাশাপাশি আমাদের মাথায় রাখতে হবে; আমরা যেনো আরও একটি প্রজন্ম এই বিপাকে ধ্বংস না করি। দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষার হার বাড়ানো আর দ্বীনের শিক্ষাব্যবস্থা উভয়ক্ষেত্রে আমাদের জাতিগোষ্ঠীগুলো যেনো এগিয়ে আসে তা নিশ্চিত করতে হবে; যাতে আমরা সঠিক পথপ্রাপ্ত জাতি হিসেবে এগিয়ে যেতে পারি।
কুরআন হলো আল্লাহ্’র সাথে আমাদের সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম; যাতে এর মাধ্যমে তিনি আমাদের তার নির্দেশিত পথের দিশা দান করতে পারেন। কিন্তু এই যোগাযোগ [communication] কি সত্যিই ঘটছে? যোগাযোগের উপর যে কোন পাঠ্য দেখলে আমরা দেখতে পাব, যোগাযোগ [communication] হচ্ছে প্রেরিত বার্তা প্রাপকের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছা আর তা সঠিকভাবে গ্রহণ করা তেমন অর্থবহভাবে; যেমন প্রেরকের উদ্দীষ্ট ছিলো। কিন্তু তা যদি শ্রবণের সমস্যার কারণে কিংবা অমনযোগিতার কারণে কিংবা ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার কারণে যথার্থভাবে না পৌঁছে তবে সত্যিকার যোগাযোগ সম্পন্ন হয়েছে বলা যাবে না। এই ব্যাপারটি আল্লাহ্ এবং তার রাসূলের বাণীর ক্ষেত্রে ও প্রযোজ্য। আমরা কি সত্যিই আল্লাহ্’র সাথে যোগাযোগের অবকাশ রেখেছি যখন আমরা তার বাণীর মর্মার্থই উপলব্ধি করতে পারি না?
কেবল সরলীকৃত আর দুর্বল ইংরেজীতে অনূদিত কুরআন পড়ে আমরা কখনোই কুরআন পরিপূর্ণভাবে বুঝতে সমর্থ হবো না। প্রত্যেক ভাষার নিজস্ব কিছু স্বকীয়তা আর নিগূঢ়তা রয়েছে যা কখনোই অনুবাদ করা সম্ভবপর নয় আর কুরআনের আরবীর ক্ষেত্রে তা অকল্পনীয়। এ প্রসঙ্গে জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহিমাহুল্লাহ্’র একটি উক্তির ভাবার্থ উল্লেখ করতে চাই। তিনি যা বলেন তার ভাবার্থ অনেকটা এমন: “কেউ যদি আল্লাহ্’র সাথে তার সৃষ্টির দুরত্ব উপলব্ধি করতে পারে, তবে কুরআনের সাথে কুরআনের অনুবাদের পার্থক্য ও উপলব্ধি করতে পারবে।“
আজ যদি রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কারো সাথে সরাসরি কথা বলতেন- আর স্বভাবতঃই তিনি তা আরবীতে বলতেন-তবে কি সে তা বুঝতে সমর্থ হতো? কিংবা তার কি অনুবাদক এর প্রয়োজন পড়তো? অথচ সে চাইতো প্রতিটি মুহুর্ত, প্রতিটি উপদেশ বুঝতে, ধরে রাখতে কিন্তু পারতঃপক্ষে তাকে অসহায়ভাবে দাড়িয়ে থাকতে হতো, তার সাথে যোগাযোগ করা কিংবা তার প্রজ্ঞা বুঝা সম্ভবপর হতো না; আরবী না জানার কারণে।
আর যারা তার সংস্পর্শ পেয়েছিলো তারা এর [কুরআন] ছোঁয়ায় বদলে গিয়েছিলো। হাবশায় মুসলিমদের প্রথম হিজরতের পরপরই রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবার নিকটে সুরা নাজম তিলাওয়াত করেছিলেন আর তা মুসলিম-কাফির সকলেই তা সমবেতভাবে শুনেছিলো আর তাতে বিমুগ্ধ হয়ে পড়েছিলো।
আর তিনি যখন চুড়ান্ত এই আয়াহ্’য় পৌঁছলেন:
“তোমরা কি এই বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করছ? এবং হাসছ-ক্রন্দন করছ না? তোমরা ক্রীড়া-কৌতুক করছ, অতএব আল্লাহকে সেজদা কর এবং তাঁর ইবাদত কর।” [সুরা নাজম: ৫৯-৬২]
তৎক্ষনাৎ, রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিজদায় লুঠিয়ে পড়লেন আর উপস্থিত মুসলিমরা সকলেও তার অনুসরনে আল্লাহ্’র নিকট সিজদায় পড়ে গেলেন।
এখন, এ ব্যাপারখানি একটু ভাবুন যা তৎপরবর্তীতে ঘটেছিলো! সকল উপস্থিত কাফিররাও আল্লাহ্’র সামনে সিজদারত হলো। তারা কুরআনের সৌন্দর্য আর বৈচিত্র্যে এতটাই বিমোহিত হয়েছিলো এতে অন্তর্নিহিত সত্যকে অস্বীকার করতে পারে নি!
“আমি একে আরবী ভাষায় কোরআন রূপে অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পার।” [সুরা ইউসুফ:০২]
এখানে, কেবল একটি উদাহরণ দেয়া হলো যাতে এই ব্যাপারটি পরিচ্ছন্ন হয় যে, কুরআনের অনুবাদ অসম্ভব।
সুরা আবাসায় আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইয়ামুল কিয়ামাহ্’র কথা বলেছেন এভাবে:
“অতঃপর যেদিন কর্ণবিদারক নাদ আসবে,” [সুরা আবাসা:৩৩]
এখানে, বিকট শব্দের [কর্ণবিদারক নাদ] জন্য ব্যবহৃত আরবী শব্দ হলো “সাখখাহ্” [الصَّاخَّةُ]- শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া-যা পুনরুত্থানের ঘোষনা দিবে আর মানবসকলের দুনিয়ার সকল কাজের প্রতিদানের; যার ফলে অবিশ্বাস্য রকমের মোহাচ্ছন্নতার অবতারনা ঘটাবে।
الصَّاخَّةُ এই শব্দটি দেখে কেউ ভাবতে পারে এটিকে দুটি দ্বিরুক্তি কিংবা ধ্বনির মাধ্যমে উচ্চারণ করা হবে। কিন্তু আরবীতে الصَّاخَّةُ শব্দটি ছয় পর্যন্ত টেনে পড়া হয়। এর তিলাওয়াত শুনলেই ব্যাপারটি পরিচ্ছন্ন হবে। এই শব্দের তিলাওয়াত এমন যে শব্দটিই যেনো শিঙ্গায় ফুঁকদানের বিষয়টিকে প্রাণবন্ততা দেয়। কিন্তু ইংরেজীতে ‘deafening noise/deafening Blast’ [বিকট শব্দ] কে টেনে পড়ার কোন সুযোগ নেই; সুতরাং আল্লাহ্ আজ্জা ওয়া জাল যে শক্তিশালী অর্থ এখানে উদ্দেশ্য করেছেন তা আমরা কখনোই পাব না। কেবল যে আরবী ভাষা বুঝে সেই আল্লাহ্’র বাণীর সত্যিকার ক্ষমতা উপলব্ধিতে সমর্থ হবে; যা অত্যন্ত সতর্কতা আর সুগভীরতার সাথে তিনি আমাদের জন্য নির্বাচন করেছেন।
আরেকটি উদাহরণ, ধরুন আপনি একজন ইংরেজীভাষী আর একজন মনিব তার ভৃত্যকে বলছে “আমাকে পানি দাও”; আপনি বুঝে নিবেন যে মনিব স্বত্বরই পানি চেয়েছেন, দুই ঘন্টা পরে চান নি। এখানে তা বলা নেই কিন্তু নিহিত রয়েছে। আর এটাই ভাষার সূক্ষ্ন তারতম্য।
কেউ যখন বলে, “আরবী আমার নিকট ভিনদেশী ভাষা” যার ভাবার্থ হবে এমন, “কুরআনের উপলব্ধি আমার নিকট প্রকৃতিবিরুদ্ধ।” আর আরবী যখন কারো নিকট ভিনদেশী ভাষা হিসেবে পরিগনিত হয় তার অর্থ দাঁড়ায়: “রাসুলুল্লাহ্’র সুন্নাহ তার নিকট অপরিচিত।”
যে আল্লাহ্’কে ভালবাসে; সে এ ভালবাসার সুত্রে অবশ্যই রাসুলুল্লাহ্’কে ভালবাসে। আর যে আল্লাহ্ আর তার রাসূলকে ভালবাসে; সে এ ভালবাসার সূত্রে অবশ্যই ভালবাসবে আরবী ভাষাকে; যা আল্লাহ্ পছন্দ করেছেন।
এই সে ভাষা যাতে ‘পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বই’ কথা বলেছে। এই সে ভাষা যাতে পৃথিবীর সর্বশ্রষ্ঠ মানুষ কথা বলেছেন। আর এটি অন্যান্য ইসলামী বিষয়াদি উপলব্ধির জন্য প্রবেশদ্বার। আর যে কখনো আরবী শিখবে না সে কখনো কুরআন আর সুন্নাহ্ পরিপূর্ণভাবে বুঝতে সমর্থ হবে না।
আরবী শিখা আমাদের কি উপকারে আসবে?
এক: এটি আমাদের চরিত্রকে নমনীয় করবে।
ইবনে তাইমিয়াহ্ বলেন: “একটি ভাষার ব্যবহার একজনের চিন্তা, আচরণ আর দ্বীনের প্রতি নিষ্ঠায় যথার্থই প্রভাব ফেলে। এটি উম্মাহ্’র প্রথমদিকের প্রজন্ম: সাহাবী আর তাবিয়ুনদের সাদৃশ্যমান অনুকরণের ক্ষেত্রেও একজনের উপর প্রভাব ফেলে। তাদের অনুকরণের প্রচেষ্টা একজনের চিন্তা, আচরণ আর দ্বীনের প্রতি নিষ্ঠায় বিশুদ্ধতার ছাপ ফেলে।”
দুই: আর এটি ইসলামী সংস্কৃতির সাথে আমাদের যোগসূত্র। নিঃসন্দেহে, ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি; যে ভাষা শিখা হয় তার সংস্কৃতি চিন্তা আর আচরণের উপর প্রভাব বিস্তার করে। আর আরবী ভাষার মাধ্যমে ইসলামী পরিশুদ্ধ সংস্কৃতির নিকট আসতে পারা বিশাল সৌভাগ্যের ব্যাপার।
যারা ভাবে ইংরেজী শিখা দুনিয়াতে সাফল্য নিয়ে আসবে তাদের জন্য বলি, আরবী শিখা তোমার পরকালের সাফল্যের পূর্বশর্ত। আর মুসলিমরা যখন বিশ্বশাসণ করছিলো তখন অমুসলিমদের আরবী জানাটা ছিলো শিক্ষিত হওয়ার লক্ষন। আবার ও বিশ্ব ফিরে যাবে সেই গৌরবময় ইসলামী ইতিহাসে, ইনশা’আল্লাহ্।
কোন মুসলিমেরই এই ভাবনা ভাবার অবকাশ নেই যে, আরবী তার মাতৃভাষা নয়। বরং তা আমাদের দ্বীনের ভাষা, বিশ্বাসের ভাষা। আর লোকজনকে এই ভাষার দিকে আহবান করায় জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণতা নাই; বরং এই আহবানে একজন মুসলিম মাথা উচিয়ে বলবে, “আমার বিশ্বাসের একটি স্বকীয় ভাষা আছে আর তা হলো আরবী!”
কৃতজ্ঞতা: ‘Kalamullah’ এর একটি প্রবন্ধ অবলম্বনে।
সায়্যিদ মাহমূদ গজনবী
ধৈর্যের সাথে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হওয়া এবং আল্লাহ’র হুকুমে তুষ্ট থাকা
ইসলামের একদম শুরু থেকেই যখন আদি পিতা ইব্রাহীম (আ) দা’ওয়াহ করছিলেন তখন থেকেই থেকেই তিনি প্রচুর প্রতিকূল বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা) ও সাহাবাগণও (রা) একইভাবে বিভিন্ন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় আজ পর্যন্ত ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দা’য়ীরা সম্মুখীন হয়ে আসছে বিভিন্ন প্রতিকুল অবস্থার।
যুগের পরিবর্তনে হয়ত পরিবেশের পরিবর্তন ঘটেছে; কিন্তু প্রতিকূলতা আজও বর্তমান।
অর্থ্যাৎ ইসলাম প্রতিষ্ঠায় প্রতিকূলতার সম্মূখীন হওয়া দা’য়ীদের জন্য অবশ্যম্ভাবী এক বাস্তবতা।
এই প্রতিকূলতা পরিবার, সমাজ, বন্ধু-স্বজন, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি ক্ষেত্র হতে আসতে পারে।
কিন্তু একজন দা’য়ীর জন্য এটা অনুধাবন করা অত্যাবশ্যকীয় যে, এই সকল প্রতিকূলতা আসে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে।
তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করবো ভয়-ভীতি, ক্ষুধা-অনাহার, তোমাদের জান-মাল ও ফসলাদির ক্ষতিসাধন করে; কিন্তু ধৈর্য্যশীলদের জন্য সুসংবাদ।” (আল বাকারাহ: ১৫৫)
“তোমরা কি মনে করা নিয়েছ যে, তোমরা এমনিতেই জান্নাতে চলে যাবে? অথচ পূর্ববর্তীদের মতো কিছুই এখনো তোমাদের ওপর নাযিল হয়নি, তাদের ওপর বহু ধরণের বিপর্যয় ও সংকট এসেছিল, কঠোর নির্যাতনে তারা নির্যাতিত হয়েছিল, কঠিন নিপীড়নে তারা শিহরিত হয়ে উঠেছে, এমনকি স্বয়ং আল্লাহ’র নবী ও তাঁর সঙ্গীরা এই বলে আর্তনাদ করে উঠেছে, আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য কবে আসবে? হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আল্লাহ’র সাহায্য অতি নিকটে।” (আল বাকারাহ: ২১৪)
উপোরক্ত আয়াতগুলো দ্বারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মু’মিনদের বিভিন্ন প্রতিকূলতার মাধ্যমে পরীক্ষার কথা বলেছেন।
ওহীয়ে গাইরে মাতলু অর্থ্যাৎ
মাহমুদ বিন লাবিদ হতে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন:“যখন আল্লাহ আযযা ওয়া জাল কাউকে ভালোবাসেন, তিনি তাদের পরীক্ষা করেন। যে ব্যক্তি ধৈর্য্য ধারণ করে, তাকেও গ্রহণ করা হবে ধৈর্য্যশীল হিসেবে, এবং যে ক্লেশ প্রদর্শন করবে, তার জন্যও ক্লেশ সংরক্ষিত।” (আহমদ)
মুস’আব বিন সা’দ তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন,
তিনি রাসূলকে (সা) জিজ্ঞেস করেছিলেন, হে আল্লাহ’র রাসূল (সা), কোন ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়? তিনি (সা) বলেন, সর্বপ্রথম নবীগণ, এরপর সৎকর্মশীলেরা, এর পরবর্তীদের মধ্য থেকে সর্বোত্তম যারা এবং এর পরবর্তীদের মধ্যে সর্বোত্তম যারা। (এখানে পরীক্ষার কাঠিন্যতা বা পরিণাম দ্বারা বিভাগ বুঝানো হয়েছে) একজন ব্যক্তি তার দ্বীনের উপর আনুগত্যের উপর ভিত্তি করে পরীক্ষিত হয়। কেউ তার অঙ্গীকারের উপর দৃঢ় থাকলে তার পরীক্ষার পরিমাণও তীব্র হয়। এবং যদি তার অঙ্গীকারে দুর্বলতা থাকে, তবে তার পরীক্ষাও হাল্কা করা হয়। এবং একজন ব্যক্তি (যাকে আল্লাহ ভালোবাসেন) ক্রমাগতভাবে পরীক্ষিত হবে যতক্ষণ না সে পৃথিবীর বুকে কোন গুনাহ ছাড়া হাটবে।” (আহমদ)
অর্থ্যাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর বান্দাদের পরীক্ষা করেন ক্রমাগতভাবে। এবং আমাদের উচিত, এই সময়ে আল্লাহ’র উপর তাওয়াক্কুল করা; অর্থ্যাৎ ধৈর্য্যের সাথে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার উপর ভরসা করা এবং প্রতিকুলতার সম্মুখীন হওয়া। সকল ধরণের পরীক্ষাসমূহ আল্লাহ’র ইচ্ছা এবং এতে ধৈর্য্য ধারণ করে আল্লাহ’র কাছে সাহায্য চাওয়াই মু’মিনদের দায়িত্ব।
আয়িশা (রা) একবার রাসূল (সা)-কে প্লেগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি (সা) বলেন: “আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে এটি (প্লেগ) শাস্তিরূপে প্রদান করেন। এবং বিশ্ববাসীদের জন্য এটি রহমতস্বরূপ। আল্লাহ’র ইচ্ছায় যে বান্দা প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয় কিন্তু সে ধৈর্য্য ধারণ করে (আল্লাহ থেকে পুরষ্কারের আশায়) এবং বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তার জন্য যা অবধারিত করেছেন, তা ছাড়া তার কোনো ক্ষতি হবেনা, তবে সেই বান্দা শহীদের মতোই পুরস্কৃত হবে।” (বুখারী)
আবু হুরায়রা (রা) বরণনা করেন, রাসূল (সা) বলেছেন,
“আল্লাহ বলেন, ‘আমি আমার ঐ বিশ্বাসী দাসের জন্য জান্নাত পুরস্কার হিসেবে নির্ধারিত করেছি, যার কোন প্রিয় বন্ধুর (আমি) মৃত্যু ঘটায়, সে ধৈর্য্য ধারণ করে এবং আল্লাহ’র পক্ষ থেকে পুরস্কার আশা করে।” (বুখারী)
সুতরাং, প্রতিটি মুমিনের জন্য এটা আবশ্যক যে, তারা সকল প্রতিকূলতা ধৈর্য্যের সাথে আল্লাহ’র উপর ভরসা করেই সম্মুখীন হবে, এগুলো সবই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত হুকুম, যাতে অসন্তোষ প্রকাশ করা সম্পূর্নরূপে হারাম।
‘আবদ আল্লাহ কর্তৃক বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, “যখন কোন মুসলিম কোন ক্ষতি দ্বারা কষ্ট পায় না, তখন আল্লাহ তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেন যেভাবে গাছের পাতা গাছ থেকে ঝরে পড়ে।” (বুখারী ও মুসলিম)আয়িশা (রা) বলেন, রাসূল (সা) বলেছেন,
“আল্লাহ কোন মুসলিমকে বিপদ দ্বারা পরীক্ষা করেন এবং তার দ্বারা তার গুনাহ সমূহ মাফ করে দেন এবং তাকে সম্মানিত করেন। যদিও ঐ বিপদটি তার পায়ে একটি কাঁটা বিদ্ধ হওয়ার কষ্টই বা হয়ে থাকে”। (বুখারী ও মুসলিম)
এই হাদীসসমূহ এই বিষয়টিই স্পষ্ট করে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর বান্দাকে তাঁর হুকুমের প্রতি ধৈর্য্য ও কৃতজ্ঞতার ভিত্তিতেই পুরষ্কৃত করে থাকেন। এবং আল্লাহর এই হুকুমের বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ ব্যক্তিকে শুধুমাত্র আল্লাহ’র ক্রোধের পাত্র হিসেবে মনোনীত করে।
অর্থ্যাৎ, দা’ওয়াহর বার্তা বহনে এবং ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আমাদের কখনোই ধৈর্য্যহীন হওয়া সমীচীন নয়। বরং, আল্লাহ’র উপর তাওয়াক্কুল এবং তাঁর নির্ধারিত হুকুম (ক্বাদা) সন্তুষ্টির সাথে, আল্লাহকে ভালোবেসে তাঁর পক্ষ থেকে পুরস্কারের আশায় গ্রহণ করা আমাদের দায়িত্ব।
“সুতরাং, ধৈর্য্যশীলদের সুসংবাদ দাও”। (আল বাকারা: ১৫৫)
সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ এর দায়িত্ব
২০১১ সালে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার শহরে “শাসককে জবাবদিহিতা করার ফিকহ” শীর্ষক কর্মশালা আয়োজিত হয়েছিল। যেখানে ইবন কামালুদ্দিন আল হানাফি, উস্তাদ মুহাম্মদ আলি, উস্তাদ ইয়াহিয়া আবু ইয়ুসুফ, উস্তাদ কামাল আবু যাহ্রা, উস্তাদ আবু লুকমান ফাতহুল্লাহ প্রমুখ এ বিষয়ে লেকচার দেন। আমি চেষ্টা করছি লেকচারগুলোর ট্রান্সক্রিপ্ট যোগাড় করে বাংলায় আনুবাদ করতে। আপাতত দুটো লেকচার বাংলায় অনুবাদ করেছি আলহামদুলিল্লাহ এবং বাকিগুলোর কাজ চলছে, যা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হবে ইনশাল্লাহ। যেসব লেকচার গুলো অনুবাদ করা হবে বা হয়েছে তার তালিকা:
· সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ এর দায়িত্ব· ইসলামে জবাবদিহিতা
· শাসককে জবাবদিহিতা করা মুসলিমদের অত্যাবশ্যকীয় কাজ
· শাসক ইসলাম দিয়ে শাসন করতে বাধ্য
· শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা নিয়ে প্রখ্যাত আলেমদের মতামত
· বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল এর শরীআহ দলীল
সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ এর দায়িত্ব
পবিত্র কুরআনে মুমিন ব্যাক্তিদেরকে সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ এর দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে অনেক আয়াত রয়েছে, তার মধ্যে একটি হল – “বনী ইসরাইল এর মধ্যে যারা (মাসীহ এর ব্যাপারে আল্লাহের ঘোষণা) অস্বীকার করেছে তাদের উপর দাউদ ও মারিয়াম এর পুত্র ইসাহর মুখ থেকে অভিশাপ দেয়া হয়েছে, কেননা তারা আল্লাহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে এবং সীমালঙ্ঘন করেছে। তারা যেসব গর্হিত কাজ করতো, তা থেকে তারা একে অপরকে বারণ করতো না, তারা যা করতো নিঃসন্দেহে তা ছিল নিকৃষ্ট। (সুরাহ মায়িদাহ, আয়াত: ৭৮-৭৯)
আল্লাহের রাগ এবং অভিশাপ বনী ইসরাইল এর উপর আপতিত হয়েছিল কারণ পাপ, মন্দকাজ, আল্লাহের-অবাধ্যতা থেকে তারা একে অপরকে বিরত রাখত না বা বারণ করতো না।
আব্দুল্লাহ বিন আলাওয়ী হাদ্দাদ (মৃত্যু ১৭২০) বলেন: সৎ কাজে আদেশ হল ওয়াজিব, অসৎ কাজে নিষেধ হল ওয়াজিব, কিন্তু মানদুব কাজে আদেশ এবং মাকরুহ কাজে নিষেধ করা মুস্তাহাব।
তাই, বলা যায়
১) এই দায়িত্ব কে কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রমান করা যায়
২) এই দায়িত্ব কে এড়ানো যাবে না
৩) এই দায়িত্ব এড়ানোর ফলে আল্লাহের ক্রোধের কারণ হতে পারে।আল সাইয়িদ আল শারিফ আল জুরজানি (মৃত্যু ১৪১৩) তার ইসলামিক অভিধানে “সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ” এর ব্যাপারে বর্ণনা করেছেন: সৎ কাজে আদেশ এর অর্থ হল “মুক্তির পথের জন্য নির্দেশনা”, এবং “অসৎ কাজে নিষেধ” এর অর্থ হল “শরীয়াহ এর পরিপন্থি ব্যাপারে সতর্ক / সাবধান করা”।
আলেমগণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বলে থাকেন দুটো কাজের মধ্যে কোন বিভাজন নেই, অন্যভাবে বলতে গেলে দুটো কাজ আসলে একই, কেউ একটি কাজ বাদ দিয়ে অন্য কাজ করতে পারে না (যেমন অসৎ কাজে নিষেধ না করে শুধু সৎ কাজে আদেশ দেয়া)।
সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ এর গুরুত্ব:
কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সুরাহ আল-ই-ইমরানের আয়াত ১১০ এ বলেন: “তোমরাই (হচ্ছো দুনিয়ার) সর্বোত্তম জাতি, সমগ্র মানব জাতির (কল্যাণের) জন্যই তোমাদের তুলে আনা হয়েছে, (তোমাদের দায়িত্ব হচ্ছে) তোমরা দুনিয়ার মানুষদের সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে, আর তোমরা নিজেরাও আল্লাহের উপর (পুরোপুরি) ঈমান আনবে…”।
ইমাম আশ-শাওকানি (মৃত্যু ১৮৩২) এই আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, মুসলিমদের প্রতি আল্লাহ্ তায়ালার এই নতুন সম্বোধনই (সর্বোত্তম জাতি) বলে দেয় অন্যান্য সকল জাতি থেকে মুসলিম জাতি কেন উত্তম। কোন আলেম বলেনঃ লাওহে মাহফুজেই মুসলিমদেরকে উত্থিত করা হয়েছে। অন্য একজন আলেম বলেছেন – মুসলিমরা বিশ্বাস স্থাপন করার আগেই তাদেরকে সর্বোত্তম জাতি হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। মুসলিম উম্মাহ সকল জাতি (এমনকি পূর্ববর্তী নবীদের উম্মাহ) থেকেও উত্তম –এ ব্যাপারটি সাহাবাগণ বুঝতে পেরেছেন এবং তারা তাদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা করতে পেরেছেন। “সমগ্র মানব জাতির (কল্যাণের) জন্যই তোমাদের তুলে আনা হয়েছে” – এ বিষয়টি সম্পর্কেও সাহাবাদের ধারণা পরিষ্কার ছিল। এবং আয়াতে “তোমরা দুনিয়ার মানুষদের সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে” – মুসলিমদের প্রতি আল্লাহ্ তায়ালার আরেকটি নতুন সম্বোধন যা মুসলিমদের সর্বোত্তম জাতি হওয়ার জন্য পূর্বশর্ত অর্থাৎ যতক্ষণ মুসলিম জাতি একাজ করবে – তারা সর্বোত্তম জাতি হিসেবেই থাকবে। তাই মুসলিম জাতি যখন এই মহান কাজ বন্ধ করে দিবে তখনই তারা তাদের এই বিশেষ গুণ থেকে বঞ্চিত হবে।
ইবন কাসীর বলেন আল্লাহ্ তা’লা “সর্বোত্তম জাতি” বলতে মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ (সা) এর উম্মতকেই বুঝিয়েছেন। বুখারি বলেন – “সমগ্র মানব জাতির (কল্যাণের) জন্যই তোমাদের তুলে আনা হয়েছে” এ ব্যাপারে আবু হুরাইরা (রা) হতে আবু হাজিম হতে সুফিয়ান ইবন মায়সারা হতে মুহাম্মাদ ইবন ইয়ুসুফ বর্ণনা করেন – মুসলিমরা মানবজাতির মধ্যে সর্বোত্তম জাতি কারণ তাদেরকে গলায় শিকল দ্বারা বেঁধে তোলা হয়েছে এবং পরবর্তীতে তাঁরা ইসলাম গ্রহন করেছে।
একইভাবে ইবন আব্বাস, মুজাহিদ, ‘আতিয়া আল ‘আওফি, ইকরিমা, ‘আতা, আল রাবি’ ইবন আনাস বর্ণনা করেছেন – মুসলিমরা হল সমগ্র মানব জাতির মধ্যে সর্বোত্তম জাতি।
ইমাম আহমাদ বলেন, আবু লাহাবের কন্যা দুররা’র স্বামী আব্দুল্লাহ ইবন উমাইরা হতে সাম্মাক হতে শুরায়ক বলেছেন: আহমাদ ইবন আব্দুল মালিক বর্ণনা করেনঃ এক ব্যাক্তি উঠে দাঁড়িয়ে মুহাম্মাদ রাসুল্ললাহ (সাঃ) এর কাছে যায় (যখন তিনি মিম্বারে দাঁড়িয়ে ছিলেন) এবং জিজ্ঞাসা করেন, “ও রাসুলুল্লাহ, কারা সর্বোত্তম মানুষ?”; তিনি (সা:) উত্তর দিলেন, “তারাই হচ্ছে সর্বোত্তম মানুষ যারা কুরআন বেশী তিলাওয়াত করে, আল্লাহ্র ব্যাপারে সবচেয়ে সচেতন (বা হালাল/হারাম এর ব্যাপারে সতর্ক), সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করে এবং আত্মীয়স্বজনদের সাথে সম্পর্ক রাখে”।
উপরোক্ত আয়াত হতে আমরা বুঝতে পারি:
১) মুসলিম উম্মাহ কে সর্বোত্তম জাতির মর্যাদা দেওয়া হয়েছে সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করার শর্তে
২) অন্য কোন জাতি বা গোষ্ঠীকে এধরণের মর্যাদা দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ (সা) বহু হাদীসে “সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ” এর মহৎ কাজকে অনেক গুরুত্ব দিয়েছেন – যেমন:
১) মুসলিমদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম হল সে, যে এই কাজে সবচেয়ে উৎসাহী
২) যে এই কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে, তাকে আল্লাহ্র প্রতিনিধি উপাধি দেওয়া হয়েছে
৩) যে এই কাজ করে, তাকে আল্লাহ্, কোরআন এবং রসুল্লালাহ (সা) এর প্রতিনিধি বলা হয়েছে
৪) মৃত ও জীবিত মানুষের মধ্যে মূল পার্থক্য হল এই মহান কাজ
সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ এর মৌলিক বিষয়সমূহ:
একই বিষয়ে সুরাহ আল-ই-ইমরানের ১১০ আয়াতে আল্লাহ্ (আজ্জা ওয়া জ্বাল) বলেন:
“আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত যারা আহবান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভাল কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই হলো সফলকাম”।
এসকল আয়াত থেকে আমরা কিছু মৌলিক বিষয় বিবেচনা করে পারি:
· ‘আমীর (যারা কাজটা করবে) – যেকোনো মুসলিম (আল জায্যায – মা’আনি আল কোরআন ওয়া ই’রাবুহু), কিছু মুসলিম (আল জামাখশারি – আল কাশ্যাফ; আল কুরতুবি – আল জামি’লি আহকাম আল কোরআন; আল রাজি – মাফাতিহ আল গাইব; যাদের উপর থেকে এই দায়ীত্ব অব্যহতি দেওয়া হয় এ মহৎ কাজ থেকে তারা হল মহিলা, শিশু, মানসিকভাবে অসুস্থ), উলামা (ইবন কুতাইবা – তা’উইল মুশকিল আল কুরআন, আল রাজি – মাফাতিহ আল গায়েব; সামারকান্দি – আত-তাফসির), সাহাবাগণ (তাবারি – আল জামি আ’ল বায়ান)।
· মা’মুর (যাদেরকে দাওয়াহ দিতে হবে) – যেকোন মানুষ যথা মুসলিম ও অমুসলিম (মুকাতিল – আল তাফসির), শুধুমাত্র মুসলিম (মুকাতিল – আল তাফসির, আবুল ফাতহ আল জুরানি – তাফসির ই শাফি), সমগ্র পৃথিবীর সকল মানুষ (ইবন ‘আতিয়া – আল মাহর)।
· খাইর: সাধারণভাবে “ভালো কাজ” বুঝানো হয়। তবে আত-তাবারি (মৃত্যু – ৯২৩)’র সংজ্ঞা অনুযায়ী এর অর্থ দাড়ায় “ইসলামের আধ্যাত্বিক ও শরীয়াহ আইন এর পথে অন্যকে ডাকা” – (আত তাবারি, জামি’ আল বায়ান)। এর চেয়ে শ্রেয় সংজ্ঞা দিয়েছেন ইবন কাসির – “কুরআন এবং সুন্নাহ কে আঁকড়ে ধরা”। ইবন মারদাওায়হ হতে বর্ণিত, আবু জাফর আল বাকির বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আয়াতটি পড়লেন (তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত যারা আহবান জানাবে সৎকর্মের প্রতি…) এবং তারপর বললেন, “সৎকর্ম হল কোরআন এবং আমার সুন্নাহ কে আনুসরন করা’।
· মা’রুফ: মা’রুফ এর অনেক অর্থ পাওয়া যায়। ইবনুল কাইয়ুম আল জাউযিয়্যাহ (মৃত্যু ১২০১) বলেন: এই আয়াতে মা’রুফ বলতে আল্লাহ্ তা’লার উপাসনা এবং আল্লাহ্র আইনের (শরীয়াহ) এর প্রতি আনুগত থাকা, এবং মুনকার বলতে আল্লাহ্র অবাধ্যতা বুঝানো হয়েছে (ইবনুল কাইয়ুম আল জাউযিয়্যাহ – জাদ আল মাসির)। শরীয়াহ’র যেসব কাজ ভাল ও সঠিক তার সবই (আল জুরজানি – কিতাব আল তারিফাত)।
· মুনকার: মুনকারের অর্থও অনেকগুল পাওয়া যায় – যার মধ্যে অন্যতম হল – আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুল (সাঃ) কর্তৃক নিষিদ্ধ সকল কাজ (অর্থাৎ হারাম), কোরআন এবং সুন্নাহ এর আলোকে যার কোন ভিত্তি নেই, আল্লাহ্ ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ব্যাপারে মিথ্যাচার ইত্যাদি। আত-তাবারানি বলেন – শরীয়াহ এবং সুন্নাহ দ্বারা স্বীকৃত নয় এবং শিরক কেই বুঝানো হয়েছে (তাফসির আল কাবির); আত তাবারি বলেন – মুনকার বলতে আল্লাহ্র প্রতি অবিশ্বাস, মুহাম্মাদ (সা) ও তাঁর প্রতি নাযিলকৃত অহীকে আস্বিকার যেমনঃ জিহাদ বা গনীমাতের মাল ইত্যাদি, (জামি আল বায়ান)। আল জুরজানি বলেনঃ যেকোন কথা বা কাজ যা আল্লাহ্ কে সন্তুষ্টি করে না তা-ই মুনকার (কিতাব আত-তারিফাত)।
· আমর (আদেশ)
· নাহি (নিষেধ)
· দাওয়াহ
মূল: ইবন কামালুদ্দিন আল হানাফি
অনুবাদ: প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহপশ্চিমা বিশ্বে নারী নির্যাতন

পশ্চিমের নারী স্বাধীনতার অলীক ধারণা:
নারী নির্যাতনের সমাধান হিসাবে পশ্চিমা বিশ্ব সমস্ত পৃথিবীব্যাপী ফ্রিডম বা স্বাধীনতার ধ্যানধারণাকে জোরের সাথে প্রচার করলেও, প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার মিথ্যা শোগানে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে পশ্চিমের নারীরা হয়েছে এক অভিনব দাসত্বের শিকার। বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতা, সুপার হিট হলিউড মুভি, নামী-দামী ফ্যাশন ম্যাগাজিন কিংবা চোখ ধাঁধানো বিজ্ঞাপনের সাহায্যে তারা মুসলিম বিশ্বেও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করছে তাদের মুক্ত-স্বাধীন নারীদের। তাদের ইলেক্ট্রনিক আর প্রিন্ট মিডিয়াতে আধুনিকা নারীদের দেখলে মনে হয় জীবনের সবক্ষেত্রেই তারা প্রচন্ড রকম স্বাধীন। স্বাধীন সমাজে তাদের ভূমিকা নির্ধারণের ক্ষেত্রে, স্বাধীন পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রে কিংবা স্বাধীন পুরুষের সাথে সম্পর্ক তৈরীর ক্ষেত্রে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাদের শরীরের ওজন, প্রতিটি অঙ্গের মাপ, পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে সাজসজ্জা পর্যন্ত সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় ফ্যাশন, ডায়েট কিংবা কসমেটিকস ইন্ডাস্ট্রীর দ্বারা। সমাজের নির্দেশ মানতে গিয়ে তারা নিজেকে পরিণত করে সস্তা বিনোদনের পাত্রে।
আর, মুক্ত-স্বাধীন হবার জন্য বাধ্যতামূলক ভাবে কাঁধে তুলে নেয় জীবিকা উপার্জনের মতো কঠিন দায়িত্ব।
পশ্চিমা পুঁজিবাদী সভ্যতা – নারী নির্যাতনের মূল কারণ:
পুঁজিবাদ হচ্ছে মানুষের তৈরী এক জীবনব্যবস্থা, যার মূলভিত্তি ব্যক্তি স্বার্থসিদ্ধি। এ জীবনব্যবস্থায় মানুষের নেই কারো কাছে কোন জবাবদিহিতা। বরং রয়েছে লাগামহীন ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারীতার সুযোগ। তাই, পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রিত সমাজে জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি আর চূড়ান্ত ব্যক্তি স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে মানুষ, অন্যের চাওয়া-পাওয়া, আবেগঅনুভূতি, অসহায়ত্ব এমনকি নারীকেও পরিণত করে মুনাফা হাসিলের পণ্যে।
পুঁজিবাদী সমাজ নারীকে দেখে নিরেট ভোগ্যপণ্য ও মুনাফা হাসিলের উপকরণ হিসাবে। ফলে, নারী সমাজের কোন সম্মানিত সদস্য হিসাবে বিবেচিত না হয়ে, সমাজে প্রচলিত অন্যান্য পণ্যের মতোই পরিণত হয় বিকিকিনির পণ্যে। আর হীন স্বার্থ সিদ্ধির মোহে অন্ধ মানুষ নারীর দৈহিক সৌন্দর্যকে পুঁজি করে চালায় জমজমাট ব্যবসা। বস্তুতঃ নারীর প্রতি এ জঘণ্য দৃষ্টিভঙ্গীর প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসাবে স্বেচ্ছাচারী মানুষ শুধুমাত্র লাভবান হবার জন্য শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র সকল নারীকেই করে নির্যাতিত।
মুক্ত সমাজ, মুক্ত মানুষ, মুক্ত অর্থনীতি ইত্যাদি পশ্চিমা পুঁজিবাদী জীবনদর্শনের মূলমন্ত্র হলেও, মুক্ত সমাজের মুক্ত জীবনের ধারণা নারীকে মুক্তি দেয়নি বরং বহুগুনে বেড়েছে তার উপর অত্যাচার আর নির্যাতনের পরিমাণ। বাস্তবতা হলো, ফ্রিডম বা স্বাধীনতার ধারণা পশ্চিমা সমাজের মানুষকে ঠেলে দিয়েছে স্বেচ্ছাচারী ও দায়িত্বজ্ঞানহীন এক জীবনের দিকে। যেখানে স্বাধীনতার অপব্যবহারে নির্যাতিত হচ্ছে নারীসহ সমাজের অগণিত মানুষ। জবাবদিহিতার অনুপস্থিতিতে এক মানুষের স্বাধীনতা হচ্ছে অন্য মানুষের দাসত্বের কারণ। আর, ব্যক্তি স্বাধীনতার চূড়ান্ত অপপ্রয়োগে তাদের সমাজে বাড়ছে খুন, ধর্ষণ, যৌন হয়রানী ও পারিবারিক সহিংসতাসহ সকল প্রকার নারী নির্যাতন। এছাড়া, সীমাহীন স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলোও শুধুমাত্র লাভবান হবার জন্য নারীকে পরিণত করছে নিখাদ ভোগ্যপণ্যে।
এক নজরে পশ্চিমা সমাজে নারী নির্যাতন:
১. ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির নির্যাতন: পশ্চিমা সমাজে মূলতঃ তাদের ফ্যাশন, ডায়েট আর কসমেটিকস্ ইন্ডাস্ট্রিগুলোই নির্ধারণ করে নারীর পোশাক, তার সাজ-সজ্জা, এমনকি তার দেহের প্রতিটি অঙ্গের মাপ। স্বাধীনতার মিথ্যা শ্লোগানে নারীকে তারা বাধ্য করে জঘণ্যভাবে দেহ প্রদর্শন করতে। তারপর, অর্ধনগ্ন সেইসব নারীদেহকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। ১৯৮৮ সালে টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের বিউটি ইন্ডাস্ট্রিগুলো প্রতিবছর ৮.৯ বিলিয়ন পাউন্ড মুনাফা অর্জন করে থাকে। আর, সমস্ত বিশ্বব্যাপী ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিগুলো বছরে অর্জন করে মাত্র ১.৫ হাজার বিলিয়ন ডলারের মুনাফা।
অপরদিকে, নামকরা মডেল বা সুপার মডেল হতে গিয়ে নারীকে কমাতে হয় আশঙ্কাজনক পর্যায়ে তার ওজন। পরিণতিতে বন্ধ্যাত্ব, ভয়াবহ নিম্ন রক্তচাপ, অ্যানোরেক্সিয়া কিংবা বুলেমিয়ার মতো মারাত্মক রোগ হয় তার জীবনসঙ্গী।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেনটাল হেলথ এর প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ২০ জনে ১ জন নারী অ্যানোরেক্সিয়া, বুলেমিয়া কিংবা মারাত্মক ক্ষুধামন্দার শিকার হয়। আর প্রতিবছর ১০০০ জন মার্কিন নারী অ্যানোরেক্সিয়া রোগে মৃত্যুবরণ করে। (সূত্র: আমেরিকান অ্যানোরেক্সিয়া/বুলেমিয়া অ্যাসোসিয়েশন)। বস্তুতঃ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিগুলোর বেঁধে দেয়া ভাইটাল স্ট্যাটিকটিকস্ অর্জন করতে গিয়েই পশ্চিমে অকালে ঝরে যায় এ সব নারীর জীবন।
২. ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি: নারী-পুরুষের লাগামহীন মেলামেশা আর প্রবৃত্তি পূরণের অবাধ স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ ফলাফল স্বরূপ পশ্চিমা সমাজের নারীরা অহরহ হয় ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার। এমনকি এই বিকৃত আচরণ থেকে সে সমাজের নিষ্পাপ শিশুরা পর্যন্ত রেহাই পায় না। নারী স্বাধীনতার অগ্রপথিক যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৪৫ সেকেন্ডে ধর্ষিত হয় একজন নারী, আর বছরে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় সাড়ে সাত লক্ষে। (সূত্র : দি আগলি ট্রু, লেখক মাইকেল প্যারেন্টি)। আর, বৃটেনে প্রতি ২০ জনের মধ্যে একজন নারী ধর্ষিত হয় এবং মাত্র ১০০ জনের মধ্যে একজন ধর্ষক ধরা পড়ে।
৩. কর্মক্ষেত্রে হয়রানি: গণমাধ্যম গুলোতে নারীকে প্রতিনিয়ত সেক্স সিম্বল হিসাবে উপস্থাপন করার ফলে নারীর প্রতি সমাজের সর্বস্তরে তৈরী হয় অসম্মানজনক এক বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গী। আর বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গীর ফলাফল হিসাবে শিক্ষিত নারীরাও কর্মক্ষেত্রে তাদের পুরুষ সহকর্মীর কাছে প্রতিনিয়ত হয় যৌন হয়রানির শিকার।
মিডিয়া ও সরকারী তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ৪০-৬০% নারী কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হয়। আর ইউরোপিয়ান উইমেনস লবির প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাজ্যেও ৪০-৫০% নারী তার পুরুষ সহকর্মীর কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের যৌন হয়রানির শিকার হয়।
৪. পারিবারিক সহিংসতা: যে সমাজে নেই কারো কোন জবাবদিহিতা, নেই পরস্পরের প্রতি কোন শ্রদ্ধাবোধ আর সেই সাথে রয়েছে সীমাহীন স্বেচ্ছাচারীতার সুযোগ, সে সমাজে ভয়াবহ পারিবারিক সহিংসতা হয় নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। বস্তুতঃ জীবন সম্পর্কে এ ধরণের ভয়ঙ্কর ভ্রান্তিমূলক ধারণা থেকেই বিয়ের পূর্বে বা পরে সবসময়ই পশ্চিমের নারীরা হয় তার পুরুষসঙ্গীর পাশবিক নির্যাতনের শিকার। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১৮ সেকেন্ডে একজন নারী স্বামী কর্তৃক প্রহৃত হয়। ইউএস জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট এর ১৯৯৮ সালে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ৯ লক্ষ ৬০ হাজার পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। আর, প্রায় ৪০ লক্ষ নারী তার স্বামী অথবা বয়ফ্রেন্ডের দ্বারা শারীরিকভাবে হয় নির্যাতিত।
৫. কুমারী মায়েদের যন্ত্রনা: নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার প্রধান অসহায় শিকার হয় পশ্চিমের কুমারী অল্পবয়সী নারীরা। আনন্দের পর্ব শেষে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই পুরুষ সঙ্গী আর্থিক বা সামাজিক কোন দায়দায়িত্ব স্বীকার না করায় একাকী নিতে হয় তাকে অনাহুত সন্তানের দায়িত্ব। আর, অপরিণত বয়সে পর্বতসম দায়িত্ব নিয়ে গিয়ে তাকে হতে হয় ভয়ঙ্কর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার। যুক্তরাষ্ট্রের গুটম্যাচার ইনস্টিটিউট এর প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ১৫-১৭ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে প্রায় ৭ লক্ষ ৫০ হাজার অবিবাহিত নারী গর্ভবতী হয়।
আর, সেদেশের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যে বছরে ১ লক্ষ ১৩ হাজার কিশোরী মেয়ে গর্ভধারণ করে।
৬. কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক নির্যাতন: পশ্চিমা সভ্যতা পৃথিবীব্যাপী নারী-পুরুষের সমঅধিকারের বার্তা প্রচার করলেও তাদের নিজেদের সমাজেই নারীরা প্রচন্ড বৈষ্যমের শিকার। শুধু মাত্র নারী হবার জন্য একই কাজের জন্য তাকে পুরুষের চাইতে দেয়া হয় অনেক কম অর্থ। এখন থেকে প্রায় ৪০ বছর আগে প্রেসিডেন্ট কেনেডি যুক্তরাষ্ট্রে ইকুয়েল পে অ্যাক্ট আইন পাশ করলেও, এখনও ১৫ বছর ও তার উর্ধ্বে কর্মরত নারীরা একই কাজের জন্য পুরুষদের চাইতে প্রতি ডলারে ২৩ সেন্ট কম উপার্জন করে। ইউ.এস গর্ভমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিস এর জরিপ থেকে দেখা যায়, সে দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা বিভাগের মোট কর্মচারীর প্রায় ৭০ ভাগ নারী হলেও নারী ব্যবস্থাপকরা পুরুষের চাইতে অনেক কম অর্থ পেয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, ১৯৯৫-২০০০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নারী-পুরুষের উপার্জনের এই বৈষম্য ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। বস্তুতঃ পশ্চিমের দেশগুলোতে নারীরা শুধুমাত্র দুটি পেশায় পুরুষদের চাইতে বেশী উপার্জন করে, তার একটি হচ্ছে মডেলিং আর অন্যটি হচ্ছে পতিতাবৃত্তি।
৭. পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রির নির্যাতন: পশ্চিমা বিশ্বে নারীরা সবচাইতে জঘন্য ভাবে নির্যাতিত হয় পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে। যেখানে, ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির মতোই নগ্ন নারীদেহকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয়েছে পৃথিবী ব্যাপী বিস্তৃত মুনাফালোভী এক চক্র। আর, এর জঘন্য শিকার হচ্ছে লক্ষ কোটি অসহায় নারী ও শিশু। শুধু নগ্ন নারী দেহকে উপজীব্য করে এই পৃথিবীতে ৫৭ বিলিয়ন ইউ.এস ডলারের পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রির বার্ষিক রাজস্ব সে দেশের বহুল প্রচারিত ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এ.বি.সি, সি.বি.এস এবং এন.বি.সি-র প্রদত্ত মোট রাজস্বের চাইতেও বেশী (৬.২ বিলিয়ন ডলার)। প্রকৃতপক্ষে, পুঁজিবাদী মন্ত্রে দীক্ষিত মানুষের সীমাহীন লোভ আর চূড়ান্ত স্বেচ্ছাচারীতাই বিশ্বব্যাপী পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠার মূলকারণ।
প্রথম প্রকাশ: ডিসেম্বর ২০১২
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৩ (সাহাবাদের গঠন পর্যায়)
নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে
দাওয়াতের প্রাথমিক পর্যায়ে রাসুল (সা) যাদের মাঝেই ইসলাম গ্রহণ করার মতো মনমানসিকতা লক্ষ্য করতেন, জাতি, বর্ণ, বয়স, সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি ভেদাভেদে তাদের কাছেই তাঁর এ আহবান পৌঁছে দিতেন। তিনি কখনো তাঁর নির্বাচিত কিছু সংখ্যক মানুষের কাছে দ্বীনের আহবান পৌঁছে দেননি বরং সকল শ্রেনীর মানুষকে তিনি সমান ভাবে ইসলামের দিকে আহবান করেছেন এবং তারপর ইসলাম গ্রহণে তাদের মনমানসিকতা বিচারে সমর্থ হয়েছেন। এভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ঈমান আনে এবং ইসলাম গ্রহণ করে।
নও মুসলিমদের পরিপূর্ণ ভাবে দ্বীন এবং কুরআন শিক্ষা দেবার ব্যাপারে তিনি খুবই উদ্বিগ্ন থাকতেন। তিনি তাঁর সাহাবীদের মধ্য হতে একটি দল তৈরী করেন যারা পরবর্তীতে দাওয়াতের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। এ দলে নারী-পুরুষ সহ মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চল্লিশ জনে উন্নীত হয়। যদিও এরা ছিল বিভিন্ন বয়সের কিন্তু এদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই ছিল বেশী। এদের মধ্যে ছিল ধনী, গরীব, সবল এবং দূর্বল সবধরনের মানুষ।
মুসলিমদের এদলটি আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ ভাবে ঈমান এনেছিল এবং এরাই মূলতঃ দাওয়াতের কার্য পরিচালনা করেছিল। এরা হলোঃ
১. ‘আলী ইবন আবু তালিব (৮ বছর)
২. যুবাইর ইবন আল ‘আওওয়াম ( ৮ বছর)
৩. তালহাহ্ ইবন আল ‘উবাইদুল্লাহ্ (১১ বছর)
৪. আল আরকাম ইবন আবি আল আরকাম (১২ বছর)
৫. ‘আব্দুল্লাহ্ বিন মাস’উদ (১৪ বছর)
৬. সাঈদ ইবন যায়িদ (বিশ বছরের নীচে)
৭. সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (১৭ বছর)
৮. সা’উদ ইবন রবি’য়াহ্ (১৭ বছর)
৯. জা’ফর ইবন আবি তালিব (১৮ বছর)
১০. শুহাইব আল রুমি (বিশ বছরের নীচে )
১১. যায়িদ ইবন হারিছা (প্রায় বিশ)
১২. ‘উছমান বিন ‘আফফান (প্রায় বিশ)
১৩. তুলাইব বিন ‘উমায়ির (প্রায় বিশ)
১৪. খাব্বাব ইবন আল আরাত (প্রায় বিশ)
১৫. ‘আমির ইবন ফুহাইরাহ (২৩ বছর)
১৬. মুসআব ইবন উমায়ির (২৪ বছর)
১৭. আল মিকদাদ ইবন আল আসওয়াদ (২৪ বছর)
১৮. ‘আব্দুলাহ ইবন জাহস (২৫ বছর)
১৯. ‘উমর ইবন আল খাত্তাব (২৬ বছর)
২০. আবু উবাইদাহ ইবন আল জাররাহ (২৭ বছর)
২১. ‘উতবাহ ইবন গাজওয়ান (২৭ বছর)
২২. আবু হুদাইফাহ ইবন ‘উতবাহ (৩০ বছর)
২৩. বিলাল ইবন রাবাহ (প্রায় ৩০ বছর)
২৪. ‘আইইয়াস ইবন রাবি’আহ (প্রায় ৩০ বছর)
২৫. ‘আমির ইবন রাবি’আহ (প্রায় ৩০ বছর)
২৬. না’ইম ইবন ‘আব্দুলাহ (প্রায় ৩০ বছর)
২৭. ‘উছমান (৩০ বছর) এবং
২৮. ‘আব্দুলাহ (১৭ বছর) এবং
২৯. কুদামাহ্ (১৯ বছর) এবং
৩০. আল সাইব (প্রায় ২০, এরা সবাই মাজ’য়ুন ইবন হাবিব এর চার ছেলে)
৩১. আবু সালামাহ ‘আব্দুলাহ ইবন ‘আবদ আল আসাদ আল মাখযুমি (প্রায় ৩০ বছর)
৩২. ‘আবদ আর রাহমান ইবন ‘আওফ (প্রায় ৩০ বছর)
৩৩. ‘আম্মার ইবন ইয়াসির (৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে)
৩৪. আবু বকর আল সিদ্দিক (৩৭ বছর)
৩৫. হামজাহ্ ইবন ‘আবদ আল মুত্তালিব (৪২ বছর)
৩৬. ‘উবাইদাহ ইবন আল হারিছ (৫০বছর)কিছু সংখ্যক মহিলাও এদের সাথে ইসলাম গ্রহণ করে।
তিন বছর পর এ সকল সাহাবাদের হৃদয় এবং অন্তর যখন পুরোপুরি ইসলামের আদর্শ এবং ধ্যান-ধারনার ভিত্তিতে পরিপূর্ণতা লাভ করে তখন মুহাম্মদ (সা) আশ্বস্ত বোধ করেন। তিনি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হন যে, তাদের হৃদয়ে ইসলাম গভীর ভাবে প্রোথিত হয়েছে এবং ইসলামি আকীদার ভিত্তিতে তারা উচ্চমান সম্পন্ন ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে। এছাড়া, এই দলের অর্ন্তভূক্ত মুসলিমরা যখন সমাজের মানুষকে মুকাবিলা করার জন্য যথাযথ যোগ্যতা এবং দৃঢ়তা অর্জন করে তখন আল্লাহর রাসুল (সা) দুশ্চিন্তা মুক্ত হন এবং আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী কুরাইশদের মুকাবিলায় মুসলিমদের নেতৃত্ব দেন।
মৃত্যুপুরীতে বসবাস
পুরো দেশটা মনে হচ্ছে এক মৃত্যুপুরী। ঘর থেকে বাইরে বের হওয়ার আগে শতবার ভাবতে হয়। যুদ্ধের ময়দানে বেসামরিক লোকদের হেটে যাওয়ার চেয়েও কঠিন হয়ে গেছে বাসা থেকে অফিসে আসা। কখন কার আঘাতে কে আহত বা নিহত হবে সেটি আক্রান্ত ব্যক্তি যেমন জানে না, তেমনি আক্রমণকারীও জানে না সে একটু পরে কাকে খুন করবে, জখম করবে।
এ কেমন দেশ?
এ কেমন স্বাধীনতা?একটি জংগলেও বোধহয় প্রাণীরা এতোটা শংকিত ও আতংকিত থাকে না।
পুরো দেশ জুড়ে, বিশেষত ঢাকা শহরে এবং এর সড়ক পথে বর্তমান পরিস্থিতি গৃহযুদ্ধের মতো। কখন কোন চিপা গলি থেকে কে হরতাল বা অবরোধের পক্ষে আর কে বিপক্ষে মিছিল বের করবে, কে রড, চাপাতি আর বোমা-পটকা নিয়ে কার উপর কখন হামলে পড়বে, সরকারী বাহিনী কখন কোনদিকে টিয়ার শেল, রাবার বুলেট ছুড়বে আর লাঠি নিয়ে দৌঁড় দিবে তা কেউ বলতে পারছে না।রোববার ঢাকায় ঘটে যাওয়া সেই মর্মান্তিক ঘটনার কাছেই আমাকে বারবার যেতে হয়। বিশ্বজিৎ দাস নিহত হওয়ার সেদিনও সেই এলাকার পাশে দিয়েই আমাকে যেতে হয়েছে। গুলিস্তান থেকে বাসে নেমে রিকসা নিয়ে যাচ্ছিলাম। কিছুদূর যাওয়ার পরই দেখলাম সামনে মিছিলকারী ও পুলিশের সংঘর্ষ। সাথে সাথে রিকসা ঘুরিয়ে ভিন্ন পথে অনেক সময় ব্যয় করে কর্মস্থলে যেতে হয়েছিলো সেদিন। আর দুপুরেই সংবাদ পেয়েছিলাম সেই সংঘর্ষে হতাহত হতভাগ্য বিশ্বজিৎ দাসের।
এই হানাহানি আর স্বার্থের রাজনীতি আর কত নিরীহ প্রাণ কেড়ে নিবে?
আর কত মায়ের বুক খালি করবে?
আমাদের দেশের দুর্নীতিবাজ শাসক ও রাজনীতিকরা সাম্রাজ্যবাদীদের ইশারায় আর কতো বিশৃংখলা আর অরাজকতার পর মার্কিনী ও তাদের অন্য প্রভুদের হাতে এদেশ তুলে দিবে? -তা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন।তবে আমার মনে হচ্ছে খুব শীঘ্রই এই দেশ ও এই জাতীর ভাগ্যে সেই কঠিন সময় ও পরিস্থিতি আসছে। যখন ইরাক আফগানিস্তানের মতো এই দেশেও রক্ত আর লাশের বন্যা বয়ে যাবে। বঙ্গোপসাগরে যখন মার্কিন রণতরী চলে আসবে আর চীন ও ভারত যখন এদেশে বিশৃংখলা আর অশান্ত পরিস্থিতিতে শান্তির ধ্বজাধারী হিসেবে প্রকৃত গণতন্ত্রের ফেরী নিয়ে উপস্থিত হবে, তখনই এদেশের মানুষ তাদের আসল ভুলটি বুঝতে পারবে।
আজকে রাজনীতিকদের ক্রীড়নক হিসেবে যারা হানাহানি উসকে দিচ্ছে, যারা সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একনিষ্ট কর্মী সমর্থক হয়ে দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য জান-প্রাণ দিয়ে রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, সীমাহীন অশান্ত পরিস্থিতিতে যখন সাম্রাজ্যবাদীরা সুযোগ নিয়ে এদেশে চলে আসবে তখন সবার আগে এই বেকুব ছেলে গুলোই তাদের বুলেট ও বোমায় আক্রান্ত হবে। কারজাই আর মিরজাফরের মতো আমাদের শাসকরাও কেবলমাত্র সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থ চরিতার্থের জন্য টিস্যু পেপারের মতো প্রয়োজন অনুসারে ব্যবহার হবে মাত্র। এক সময় তাদের শেষ পরিণতিও হবে অত্যন্ত মর্মান্তিক। কিন্তু তখন আর শত আফসোস করেও কোনো লাভ হবে না।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে অনাগত সেই কঠিন বিপদের হাত থেকে হিফাজত করুন। সময় থাকতে রাজনীতিক ও দেশের আপামর জনসাধারণকে সঠিক বিষয়টি বোঝার তাওফীক দিন। যেনো তারা সময় থাকতে মানব রচিত মতবাদ আর মতাদর্শের বাইরে এসে মহান আল্লাহর জন্য নিবেদিত হওয়ার সুযোগ পান।
ইসহাক খান
সাহাবীগণ ও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ
সাহাবীগণ (রা) কিভাবে এই মহান কালিমাকে বুঝেছিলেন ও এর দাবিগুলো পূরণ করেছিলেন, সেটা ইমাম সুফিয়ান ইবন উয়াইনাহ (রহ) সুন্দরভাবে ব্যখ্যা করেছেন। মুহম্মদ ইবন আবদুল মালিক আল মুসাইসি বলেন:
১৭০ হিজরিতে আমরা সুফিয়ান ইবন উয়াইনাহর সাথে ছিলাম। এক ব্যক্তি তাকে ঈমান সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলো। তিনি জবাব দিলেন, ‘এটা হলো সত্যের স্বীকোরোক্তি ও আমল।’
লোকটি জিজ্ঞাসা করলো, এটা কি বাড়ে-কমে?
তিনি জবাব দিলেন, আল্লাহ ইচ্ছা করলে এটা বাড়ে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে এটা কমে; এমনভাবে কমে যে আর এতটুকুই বাকি থাকে [তিনি তার বা হাত দিয়ে তা দেখান]।
লোকটি প্রশ্ন করলো, ঈমানকে যারা আমলহীন স্বীকরোক্তি বলে তাদেরকে আমরা কিভাবে মোকাবেলা করবো? [সম্ভবত তিনি মুরজিয়্যাদের কিভাবে মোকাবেলা করতে হবে তা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছিলেন। মুরজিয়্যাগণ চিন্তা অনেকটা এরকম ছিল যে ঈমান আনলে মানুষ জান্নাতে যাবেই (শাস্তি ছাড়া) তার আমল থাকুক বা না থাকুক]
সুফিয়ান জবাব দিলেন, ঈমানের বিধিবিধান ও সীমাগুলো নির্ধারিত হওয়ার আগে তারা এই কথাটি বলতো। আসলে আল্লাহ সুবহানাহুতা’আলা আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা)-কে মানবজাতির কাছে এই কথা বলার জন্য পাঠিয়েছেন যে, আল্লাহ ছাড়া আর কারোই উপাসনা পাওয়ার অধিকার নেই এবং আমি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। মানুষ এটা বলার পর তাদের রক্ত ও সম্পদ (বৈধ কারণ ব্যতিত) নিরাপত্তা পেল এবং তাদের হিসাব হবে আল্লাহর সাথে। যখন আল্লাহ হাইয়ুল কাইয়ুম এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন তখন তিনি রাসূল (সা) কে বললেন তাদেরকে নামাজের নির্দেশ দিতে। রাসূল (সা) তাদেরকে নামাজের নির্দেশ দিলেন ও তারা তা পালন করলেন। আল্লাহর শপথ, তারা যদি এটা না করতো তাহলে তাদের প্রথম কাজটা কোনোই উপকারে আসতো না।
যখন আল্লাহ হাইয়ুল কাইয়ুম এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন তখন তিনি রাসূল (সা) কে বললেন তাদেরকে মদীনায় হিজরতের নির্দেশ দিতে। রাসূল (সা) তাদেরকে সেই নির্দেশ দিলেন ও তারা তা পালন করলো। আল্লাহর শপথ, তারা যদি এটা না করতো তাহলে তাদের প্রথম কাজ কিংবা নামাজ কোনোটাই তাদের উপকারে আসতো না।
যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন তখন তিনি রাসূল (সা) কে বললেন তাদেরকে মক্কায় ফেরার নির্দেশ দিতে যেন তারা তাদের (কাফের) পিতা ও সন্তানদের সাথে ততক্ষন পর্যন্ত যুদ্ধ করে যতক্ষন না তারা (কাফেররা) সেই কালিমাটি বলে যেটি তারা নিজেরা বলেছে, তাদের সাথে নামাজ পড়ে ও তাদের হিজরতের সাথে যুক্ত হয়। রাসূল (সা) তাদেরকে সেই নির্দেশ দিলেন ও তারা তা পালন করলো। আল্লাহর শপথ, তারা যদি এটা না করতো তাহলে প্রথম প্রথম কাজ, নামাজ কিংবা হিজরত কোনোটাই তাদের উপকারে আসতো না।
যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন তখন তিনি রাসূল (সা)-কে বললেন তাদেরকে নির্দেশ দিতে তারা যেন হিজরত করে এসে আল্লাহকে উপাসনার জন্য কারা তাওয়াফ করে ও দীনহীনভাবে মাথার চুল ছেটে ফেলে। রাসূল (সা) তাদেরকে সেই নির্দেশ দিলেন ও তারা তা পালন করলো। আল্লাহর শপথ, যদি তারা এটা না করত তাহলে তাদের প্রথম কাজ, তাদের নামাজ, তাদের হিজরত কিংবা পিতার সাথে যুদ্ধ করা কোনটাই তাদের উপকারে আসতো না।
যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন তখন তিনি রাসূল (সা)-কে বললেন তাদেরকে নির্দেশ দিতে তারা যেন হিজরত করে গিয়ে নিজেদের সম্পদ থেকে যাকাত প্রদান করে, যাতে সেই সম্পদ পবিত্রতা অর্জন করে। রাসূল (সা) তাদেরকে সেই নির্দেশ দিল এবং তারা তা পালন করলো ……..। আল্লাহর শপথ, তারা যদি এটা না করতো তাহলে তাদের প্রথম কাজ, তাদের নামাজ, তাদের হিজরত, তাদের পিতাদের সাথে যুদ্ধ কিংবা তাদের তাওয়াফ কোনোটাই তাদের উপকারে আসতো না।
যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন, যেটা ঈমানের বিধিবিধান ও সীমাগুলোর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হলো, তখন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বললেন:
আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম। [মাইদাহ:৩]
সুফিয়ান এরপর বললেন, ‘তাই কেউ যদি ঈমানের কোনো একটি অংশ বাদ দেয় তাহলে আমাদের দৃষ্টিতে সে ঈমানহীন (কাফের)। অবশ্য যদি সে আলস্য বা অবহেলার কারণে তা ত্যাগ করে থাকে, তাহলে আমরা তাকে শুধরাবো এবং আমাদের দৃষ্টিতে সে দূর্বল/অপূর্ন ঈমানের অধিকারী। এটাই সুন্নাহ। কেউ এ বিষয়ে কোনকিছু জিজ্ঞাসা করলে এই কথাগুলো আমার বরাত দিয়ে বলবে।
সূত্র: মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহ্হাব লিখিত ’আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা’ থেকে সংগৃহিত
প্রথম প্রকাশ: ২০১২ইং
খিলাফাহ কিভাবে মুসলিম বিশ্বে শিল্পায়ন ঘটাবে?

ভূমিকা
খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজ করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই যে প্রশ্নটির সম্মূখীন হই তা হলো, খিলাফাহ কিভাবে এই একবিংশ শতকে ইউরোপ ও আমেরিকার সাথে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকবে? মুসলমানদের মধ্যে এ ধারণা প্রবল যে বর্তমান পরাশক্তিগুলো শুধু সামরিকভাবেই নয় বরং অর্থনৈতিকভাবেও খুবই শক্তিশালী। উম্মাহর মধ্যে প্রচলিত এ ধারণার কারণে ‘খিলাফাহ শুধুমাত্র স্বপ্ন… আজকের দুনিয়ায় এর বাস্তবায়ন কখনোই সম্ভব নয়’ এমন বোধ অনেকাংশেই শক্তিশালী হয়েছে।
আমরা যদি উম্মাহকে খিলাফতের প্রয়োজনীয়তা তথা মুসলিম বিশ্বের যাবতীয় সমস্যা মোকাবেলায় খিলাফতের অপরিহার্যতার বিষয়টি বোঝাতে চাই তাহলে শুধুমাত্র ইসলামী শরীয়াহর দলীলই সব সময় যথেষ্ট নয়। উম্মাহর আস্থা অর্জনের জন্য আমাদেরকে খিলাফত কিভাবে বাস্তবে মুসলিম বিশ্বের সমস্যাগুলোর সমাধান করবে এবং সেই সাথে বর্তমান পরাশক্তিগুলোকে মোকাবেলা করে মাথা উঁচু দাঁড়িয়ে থাকবে সেই পরিকল্পনার কথাও জনগণকে জানাতে হবে।
আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় খিলাফতের সামরিক শক্তির আলোচনা নয় বরং আজ আমরা খিলাফতের শিল্প ও অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে চিন্তা-ভাবনা উপস্থাপন করবো ইনশাআল্লাহ।
আমরা যদি শিল্পায়নের মতো একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয় নিয়ে অর্থবহ আলোচনা করতে পারি তাহলে তা সংশয়বাদীদেরকে এমন ধারণাও দিতে পারে যে খিলাফত শুধুমাত্র শিল্পের প্রসার ঘটাবে না বরং আল্লাহর অনুগ্রহ থাকলে বিশ্বের তাবৎ জাতিসমূহের উপরেও নিজের অবস্থানকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।
শিল্পায়ন বলতে কী বোঝায়?
আজকের মুসলিম বিশ্ব শিল্পন্নোত দেশগুলো থেকে অবশ্যই অনেকদূর পিছিয়ে। যদিও পশ্চিমা দেশগুলো এখন থেকে দেড়শ দুইশ বছর আগেই শিল্পের প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে কিন্তু মুসিলম দেশগুলো এখনও প্রায় প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে এবং অনেকাংশেই উন্নত দেশগুলোর উপর নির্ভরশীল থেকে গেছে। তবে আলোচনার শুরুতে শিল্পায়ন তথা শিল্পোন্নত অর্থনীতি বলতে কি বোঝায় তা ব্যাখ্যা করা যাক। বাস্তবে যখন কোন অর্থনীতি ম্যানুফ্যাকচারিংকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এবং ম্যানুফ্যাকচারিংই অর্থনীতির অন্য সেক্টরগুলোর চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে তখন সেই অর্থনীতিকে আমরা শিল্পোন্নত অর্থনীতি হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি। আর ম্যানুফ্যাকচারিং বলতে কাঁচামালকে প্রক্রিয়াজাতকরণ করে ব্যবহার্য পণ্যে পরিণত করা বোঝায়। উদাহরণস্বরুপ আমরা বৃটিশ সম্রাজ্যের কথা বলতে পারি। ম্যানুফ্যাকচারিং ছিল তার অর্থনীতির মূল বিষয়। জাহাজ নির্মান, গোলাবারুদ উৎপাদন, খনিজ আহরনে তাদের দক্ষতা তাদেরকে পরাশক্তিতে পরিণত করেছিল। অর্থনীতির এই বৈশিষ্ট্যের কারণে তারা সহজেই যে কোন স্থানে যুদ্ধ সূচনা এবং উপনিবেশ স্থাপন করতে পারতো। শান্তিকালীন সময়ে এসব শিল্পকারখানা অসামরিক কাজে ব্যবহৃত হতো।
একটি জাতি যখন বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে দক্ষতা অর্জন করে এবং তার শিল্পভিত্তি মজবুত থাকে তখনই সেই জাতি স্বনির্ভর হয় এবং অন্য জাতির নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। কিন্তু শিল্পায়ন না ঘটলে একটি জাতিকে অবশ্যই তার প্রতিরক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে অন্য জাতির উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। আর এই অবাঞ্ছিত বাস্তবতাতেই আজকের মুসলিম বিশ্ব নিমজ্জিত।
কেন মুসলিম বিশ্বে শিল্পের প্রসার ঘটেনি?
যে কোন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকই মুসলিম বিশ্বের বর্তমান বাস্তবতায় হতাশ এবং অবাক হবেন। কেননা বিশাল খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডার নিয়েও এই দেশগুলো দরিদ্র এবং শিল্পের প্রসার ঘটাতে দারুনভাবে ব্যর্থ। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, ইরাক একাই পৃথিবীর মোট তেল রিজার্ভের ১০% এর অধিকারী। তেমনিভাবে ক্ষুদ্র কুয়েতও পৃথিবীর মোট তেলের ১০ শতাংশের মালিক। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াসহ মুসলিম বিশ্বের মানচিত্রের সর্বত্র একই দশা। সব জায়গাতেই চোখে পড়বে অব্যবস্থাপনা ও ভ্রান্তনীতির শত-সহস্র উদাহরণ।
সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং নীতি না থাকায় – মুসলিম দেশগুলোর শাসকরা সব সময়ই অদূরদর্শী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যস্ত। আর এ ধরণের প্রবণতা শুরু হয়েছে সেই ১৯২৪ সালে খিলাফত ধ্বংসের সময় থেকেই।
তুরস্কের মধ্যে যে সম্ভবনা ছিল তা বিকশিত হয়নি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ এর বিতর্কিত এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত নীতি বাস্তবায়নের কারণে। তেমনি পাকিস্তানও এমনভাবে বিশ্বব্যাংকের নীতিকে বাস্তবায়ন করছে, যার ফলাফল হলো পাকিস্তান টেঙ্টাইল পণ্য রপ্তানি করছে ঠিকই কিন্তু তার শিল্পভিত্তি গড়ে উঠছে না। একই ঘটনা ঘটছে বাংলাদেশেও। আরব দেশগুলিও পণ্য উৎপাদনের জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ কারখানা গড়ে তুলতে পারেনি। এমনকি তেল উৎপাদনের জন্য যেসব স্থাপনা গড়ে উঠেছে সেগুলোও মূলত পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলোরই অবদান। আর পুঁজিবাদী এই কোম্পানিগুলো এ কাজটি করেছে মূলত অপরিশোধিত তেল উৎপাদন এবং তা রিফাইনিং এর ক্ষেত্রে তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য। এছাড়া তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে রাজনৈতিকভাবে বশে রাখাটাও তাদের এ সেক্টরে বিনিয়োগ করার অন্যতম উদ্দেশ্য। ২০০৬ সালে মধ্যপ্রাচ্য পৃথিবীর মোট অপরিশোধিত তেলের ৩১.২ শতাংশ উৎপাদন করে। কিন্তু এসময় তারা মাত্র ৩.২ শতাংশ তেল পরিশোধন করতে সক্ষম হয়।
ইন্দোনেশিয়া পুরো ৮০ এবং ৯০ দশক জুড়ে অর্থনৈতিক উদারীকরণের নীতি বাস্তবায়ন করে এবং বিদেশী বিনিয়োগের জন্য সবকিছু উন্মুক্ত করে দেয়। কিন্তু তার ফল দাঁড়ায় ১৯৯৭ এর এশিয়া সংকট যা ইন্দোনেশিয়া এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আজ ইন্দোনেশিয়া ১৪০ বিলিয়ন ডলার ঋণের জালে বন্দী।
মুসলিম দেশগুলো রাষ্ট্রীয় জীবনে যে সব নীতি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে তার বেশিরভাগই পরস্পরবিরোধী, যার কারণে রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে জনগণের দৈনন্দিন প্রয়োজন পূরণ করা কোনভাবেই সম্ভব হয়ে উঠছে না। অর্থনৈতিক টানাপোড়ন এখানে এত প্রকট যে জনগণ শুধুমাত্র রুটি-রুজির ধান্ধা করতে গিয়েই দিন পার করে ফেলে; রাষ্ট্রকে পরাশক্তিতে পরিণত করার জন্য কাজ করার সময় তাদের হয়ে ওঠেনা। এজন্য কেউ যদি মুসলিম দেশগুলোকে শক্তিশালী তথা শিল্পোন্নত করতে চায় তাহলে তাকে অবশ্যই জনগণকে তার (শিল্পোন্নয়নের) প্রয়োজনীয়তা বুঝাতে হবে এবং এজন্য যে যে ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন হবে সে ব্যাপারে জনগণকে রাজী করাতে হবে।
২য় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ভোগ্যপণ্য বিপননের অর্থনীতিকে পাশে সরিয়ে রেখে সমরাস্ত্র উৎপাদন ভিত্তিক শিল্পের প্রসার ঘটানোর নীতিতে মার্কিন জনগণের সহযোগীতা এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
সে সময়কার মার্কিন সরকার যুদ্ধ জাহাজ ও এরোপ্লেন নির্মান এবং সমরাস্ত্র উদ্ভাবন ও উৎপাদনের জন্য বিশাল বাজেট বরাদ্দ করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এর মাধ্যমে জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করা। যুদ্ধকেন্দ্রীক এই শিল্পায়ন দ্রুত মার্কিন অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করলো। রাতারাতি বেকারত্ব কমে গেলো। ১৯৪১ এর ডিসেম্বরে যখন আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে জড়িত হলো তখন অর্থনীতির প্রত্যেকটি সেক্টর যুদ্ধের যোগান দিতে সক্ষম হলো। সে সময় এত দ্রুত শিল্প প্রবৃদ্ধি ঘটলো যে আমেরিকাতে বেকারত্বের বদলে শ্রমিক সংকট দেখা দিলো। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জনগণ ও শিল্পকে ক্রমাগত উৎসাহ দেয়ার ব্যাপারটিও সমান তালে চলতে থাকলো। ফলে ত্রিশ দশকের শেষাংশে মার্কিন ওয়ার ইন্ডাষ্ট্রি ৩ লক্ষ এরোপ্লেন, ৫ হাজার কার্গো জাহাজ, ৬০ হাজার ল্যান্ডিং ক্র্যফট এবং ৮৬ হাজার ট্যাঙ্ক তৈরী করে ফেলল। অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় মার্কিন অর্থনীতিতে নারীশ্রম সবচেয়ে বেশি পরিমাণে নিয়োজিত হলো।
যুদ্ধ সরঞ্জাম তৈরীতে মার্কিন সরকারের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করলো মার্কিন ব্যবসায়ীরা। দশক ধরে চলমান মন্দাকে উপেক্ষা করে তারা বড় বড় বিনিয়োগ করলো। ফলে বিশাল শ্রমবাজার সৃষ্টি হলো। জনগণ, পুঁজিপতি শ্রেণী এবং রাষ্ট্র সবাই একসাথে কাজ করে যুদ্ধের প্রয়োজন মেটাতে লাগলো। এই প্রথমবারের মত মার্কিন জনগণ রেশনিং ব্যবস্থা মেনে নিলো। যুদ্ধ অর্থনীতির একটি স্বাভাবিক নিয়ম হলো এখানে খরচ নয় বরং দ্রুত ও নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহই প্রাধান্য পেয়ে থাকে। ফলে কম সময়ে অনেক বেশী শ্রমের প্রয়োজন হয়। মার্কিন অর্থনীতিতেও তাই হয়েছিল, এমনকি রাস্তার ভিক্ষুক পর্যন্ত চাকরির বাজারে লাইন দিয়েছিল। সামরিক বাহিনীতে নিয়োজিত হয়েছিল ১ কোটি ১০ লক্ষ সক্ষম মানুষ। তাদের অনেকেই এর আগে বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত ছিলো; তাদের শুণ্যস্থান পূরণের জন্যও নতুন শ্রমিকের প্রয়োজন পড়লো। ওয়ার ইন্ডাষ্ট্রির টানে কৃষি, খনিজ উত্তোলণ, শিক্ষা-সংস্কৃতি সব জায়গায় নবগতির সঞ্চার হলো। যোগাযোগ ব্যবস্থায় রাতারাতি বিপ্লব সাধিত হলো, শ্রম বাজার ও সামগ্রিক বিপনন ব্যবস্থাও প্রভূত উন্নতি সাধন করলো। শিল্পে ও বাণিজ্যে দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজনে শিক্ষা ও সংস্কৃতির অঙ্গনকে দ্রুত বিকশিত হতে হলো।
এসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সেরা বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের চিন্তাকে ব্যাপকভাবে কাজে লাগিয়েছিল। মার্কিন সরকার বুঝতে পেরেছিল তারা যদি পারমানবিক বিক্রিয়ার সূত্রকে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র উদ্ভাবনে সক্ষম হয় তাহলে তা তাদেরকে কৌশলগত প্রাধান্য এনে দিতে পারবে। পরাশক্তিগুলোর সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রতিযোগীতার এ পর্যায়েই ঐতিহাসিক ‘ম্যানহাটন’ প্রকল্পের জন্ম হলো।
মুসলিম বিশ্বের বর্তমান ব্যর্থতা দিয়ে বোঝা যায় প্রাকৃতিক সম্পদের কী পর্যায়ের অব্যবস্থাপনা এখানে চলছে। আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক দূরবস্থা মূলতঃ দুটি কারণে সৃষ্ট; প্রথমত: শাসকদের আদর্শিক শূণ্যতা, দ্বিতীয়ত: আদর্শিক শূণ্যতার ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক অদূরদর্শীতা।
যতদিন পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বে এ দুটি বিষয়ে পরিবর্তন না ঘটবে ততদিন পর্যন্ত যত সম্পদই থাকুক না কেন আমরা রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উভয়ভাবেই পশ্চিমা শক্তিগুলোর আধিপত্যের শিকার হতে থাকবো। কোন শক্তিশালী আদর্শিক ভিত্তি না থাকলে কিসের উপর আমরা আমাদের অর্থনীতিকে গড়ে তুলবো? যখন কোন সুনির্দিষ্ট আদর্শিক ভিত অনুপস্থিত থাকে তখন রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় যেসব নীতি ও কৌশল গ্রহণ করা হয় তা পরস্পর সাংঘর্ষিক হতে বাধ্য এবং এমতাবস্থায় কোন সুনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে অর্থনীতিকে পরিচালনা করা কখনই সম্ভব নয়।
নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে খিলাফতের শিল্পায়ন নীতি সাজানো উচিত:
১. প্রতিরক্ষা কেন্দ্রীক অর্থনীতি গড়ে তোলা:
কোন অর্থনীতি যে সেক্টরে বেশি গুরুত্ব দেয় তার ভিত্তিতেই সে অর্থনীতির চরিত্র নির্ধারিত হয়। সেই সেক্টরটিই অন্যান্য সেক্টরের জন্য চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে। উদাহরণস্বরুপ বলা যায় ১৯৮০র দশক পর্যন্ত বৃটেনের অর্থনীতি ছিল মূলতঃ ম্যানুফ্যাকচারিং কেন্দ্রীক। কিন্তু ৮০র দশক থেকে সেখানে সেবাখাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে বৃটেনের অধিকাংশ অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বিদ্যুৎ, পানি, পয়নিস্কাশন, টেলি কম্যুনিকেশন, তথ্যপ্রযুক্তি, হোটেল ম্যানেজমেন্ট, এন্টারটেইনমেন্ট ইত্যাদি সেবাখাতকে ঘিরে আবর্তিত। এসব সেবাখাতের প্রয়োজনেই অন্যান্য অর্থনৈতিক সেক্টর নিজেকে গড়ে তুলছে। কিন্তু খিলাফতের অর্থনীতি হবে প্রতিরক্ষাশিল্প কেন্দ্রীক অর্থনীতি। উন্নত প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা ও তার ক্রমাগত প্রবৃদ্ধি ও আধুনিকায়নই হবে অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। এধরণের অর্থনীতি যে শুধুমাত্র কর্মসংস্থান ও সম্পদ সৃষ্টি করবে তা নয় বরং বৈরী পরাশক্তিগুলোর আগ্রাসী পরিকল্পনা থেকেও খিলাফতকে রক্ষা করবে।
প্রতিরক্ষা কেন্দ্রীক অর্থনীতির অপরিহার্য করণীয় হলো সমরাস্ত্র তৈরীর কারখানার পাশাপাশি সাপোর্ট ইন্ডাষ্ট্রি হিসেবে স্টীল, লোহা, কয়লা, যানবাহন নির্মান, খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ইত্যাদি শিল্প গড়ে তোলা।
রাষ্ট্রকে শিল্পোন্নত করতে হলে আরেকটি বিষয় প্রয়োজন আর তা হলো এমন একটি ফোরাম গড়ে তোলা যারা সুনির্দিষ্টভাবে শিল্পপতিদেরকে নিয়ে কাজ করবে এবং সব সময় তাদেরকে উৎসাহ যোগাবে। ভারী শিল্পের প্রয়োজনে সাপোর্ট ইন্ডাষ্ট্রি গড়ে তোলার কাজটি অনেকাংশেই শিল্প উদ্যোক্তাদেরকে করতে হবে এবং এক্ষেত্রে তাদেরকে বিশেষ সুবিধা প্রদান করার সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় পলিসি থাকতে হবে। দরকার হলে লোহা, কেমিক্যাল ইত্যাদি শিল্পের জন্য উদ্যোক্তাদেরকে বিনামূল্যে সরকারী জমি বরাদ্দ দিতে হবে। খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও অন্যান্য কেমিক্যাল নিস্কাশনের জন্য যৌথ বিনিয়োগের নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে; যেসব শিল্প রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তায় সরাসরি অংশগ্রহণ করছে তাদের ক্ষেত্রে কর রেয়াত ও ঋণ প্রদানসহ বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করতে হবে।
১৯৫২ সালে যখন জাপানে মার্কিন দখলদারিত্বের অবসান ঘটলো তখন জাপান ঠিক এ ধরণের নীতি গ্রহন করেছিল। উত্তর কোরিয়া পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া কমিউনিজমের হুমকি মোকাবেলায় জাপান তখন তার সেরা ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের কাজে লাগায়। আর স্বাভাবিকভাবেই এক্ষেত্রে তারা মার্কিনীদের কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পেয়েছিল।
শিল্পবিকাশের সুযোগ সৃষ্টির জন্য তখনকার জাপান সরকার অংশীদারী ব্যবসার শর্তসমূহ শিথিল করে এবং বড় বড় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অনুমোদন দেয়। সেসময় যে সব বিজনেস হাউসের জন্ম হয়েছিল এখনও তারা জাপানের অর্থনীতির নেতৃত্ব দিচ্ছে। বড় বড় শিল্পপতিরা তখন রাষ্ট্রের পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে বুঝেছিল যে রাষ্ট্রের নীতি অনুযায়ী বিনিয়োগ করলে তারা স্বল্প সময়েই বড় পুঁজি সৃষ্টি করতে পারবে। এদিকে মার্কিনীরাও সেসময় জাপানের কাছ থেকে সামরিক রসদ কেনা শুরু করে, ফলে বিশ্ব বাজারে জাপানী পণ্যের বিশাল চাহিদা সৃষ্টি হয়। শিল্প স্থাপনের এই কর্মযজ্ঞের কারণে অর্থনীতিতে সম্পদের প্রবাহ বেড়ে যায় এবং অনেক বিনিয়োগকারী কৃষি এবং টেক্সটাইলের মতো মন্থর প্রকৃতির অর্থনৈতিক কর্মকান্ড থেকে পুঁজি সরিয়ে এনে অত্যাধুনিক কলকারখানা গড়ে তোলে।
এভাবে উদ্যমী বিনিয়োগকারীদের প্রতিযোগীতামূলক অংশগ্রহণের ফলে জাপানের মন্থর প্রকৃতির শিল্পসমূহ এক সময় অত্যাধুনিক যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরীর শিল্প দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়ে যায়। ১৯৭০ সাল নাগাদ জাপানের শিল্পপণ্যের তালিকার প্রথম দিকে স্থান করে নেয় রঙিন টিভি, এসি, পেট্রোকেমিকেলের মতো অনেক উন্নত প্রযুক্তির পণ্য যার কোন কোনটি এর ২০ বছর আগে জাপানের মানুষ চোখেই দেখেনি।
অনুরূপ নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে খিলাফত ব্যক্তিমালিকানাধীন পুঁজিকে রাষ্ট্রের পরিকল্পনার সাথে সংযুক্ত করবে এবং প্রধান প্রধান শিল্পপতিদেরকে রাষ্ট্রের সমৃদ্ধির জন্য ঐক্যবদ্ধ করতে সচেষ্ট থাকবে। আমাদের এ কথা মনে রাখতে হবে যে এমনকি আজকের দুঃখজনক বাস্তবতায়ও মুসলিম বিশ্বে ধনাঢ্য শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীর কোন অভাব নেই। রাষ্ট্রের পরিকল্পনার মধ্যে বড় অর্থনৈতিক লাভের সম্ভাবনা দেখলে আমাদের বর্তমান সম্পদশালীরাও কৌশলগত শিল্পে বড় বিনিয়োগে অবশ্যই উৎসাহিত হবে। এছাড়া পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তাদেরকে যদি লাভের পাশাপাশি দেশ ও জনগণের কল্যাণের বিষয়টিও বোঝানো যায় তাহলে তাদের উৎসাহ ও উদ্যাম নিঃসন্দেহে আরো বৃদ্ধি পাবে।
২. রাজনৈতিক আকাংখা:
মুসলিম বিশ্ব শিল্পায়নের দিক থেকে পশ্চাৎপদ থাকার একটি মূল কারণ হচ্ছে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক আকাংখার অনুপস্থিতি। মুসলিম শাসকরা এতদিন আমাদের দেশগুলোকে শুধুমাত্র পশ্চিমা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বাজারে পরিণত করার নীতি বাস্তবায়ন করেছে। তথাকথিত মুক্তবাজার ও মুক্তবাণিজ্যের ধারণা সব সময়ই আমাদের দেশগুলোর শিল্প কারখানা ধ্বংসের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। শিল্প কারখানা বলতে যা অবশিষ্ট আছে সেগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছে মূলতঃ পশ্চিমাদের ভোগের সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে। সার্বিক আদর্শিক শূণ্যতার মাঝেও যখনই কোন মুসলিম রাষ্ট্র রাজনৈতিক পরিকল্পনাকে সম্পৃক্ত করে শিল্প স্থাপন করেছে তখনই তারা সরাসরি লভবান হয়েছে। উদাহরণস্বরুপ বলা যায় পাকিস্তান আঞ্চলিক রাজনীতিতে টিকে থাকতে গিয়ে পারমানবিক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল এবং অবশেষে সে পারমানবিক শক্তির অধিকারী হতেও সক্ষম হয়েছে; মিশরও ৫০ এর দশকে অনুরূপ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল কিন্তু ১৯৬৭ সালে ইসরাইলের কাছে পরাজিত হওয়ার পর দেশটি তার পরিকল্পনা পরিত্যাগ করে।
খিলাফাহ যখন আবার প্রতিষ্ঠিত হবে তখন তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে অভিন্ন রাজনৈতিক লক্ষ্য ও আকাংখার ভিত্তিতে সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে একতাবদ্ধ করা। যখন খিলাফাহ রাষ্ট্রের জনগণ একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্যের ব্যাপারে একমত হবে তখন তারা সবাই সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করতে থাকবে। এক সময় মুসলমানদের বাকী ভূ-খন্ডগুলোও এ ব্যাপারে একমত হবে এবং তারাও খিলাফাহ্র সাথে একাত্ম হওয়ার জন্য অগ্রসর হবে। বর্তমানে বিদ্যমান পরিকল্পনাহীনতা থেকে খিলাফাহ উম্মাহকে বের করে আনবে এবং সুনির্দিষ্ট নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রের সকল দক্ষ ও অভিজ্ঞ নাগরিককে একতাবদ্ধ করবে।
বৃহত্তর জনগণের আস্থা সৃষ্টির জন্য যা সবচেয়ে কার্যকর তা হলো যথাযথ সামরিক সক্ষমতা। নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষা এবং শত্রুকে পরাজিত করার জন্য একটি বৃহৎ ও অত্যাধুনিক সামরিক বাহিনীর কোন বিকল্প নেই। এ ধরণের একটি সামরিক শক্তির আকাঙ্খা, যা এই মুহুর্তে মুসলিম বিশ্বে অনুপস্থিত, স্বাভাবিকভাবেই খিলাফতকে দ্রুত প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিকে ধাবিত করবে যার জন্য প্রয়োজন হবে ব্যাপক শিল্পায়ন। আর শিল্পায়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে কারিগরি দক্ষতা আর কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ। এ দুটি পূর্বশর্ত কিভাবে পূরণ হবে সে জন্যও আমাদের যথাযথ নীতি ও কৌশল থাকতে হবে।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ। কমিউনিষ্টরা ক্ষমতায় আসার পর ১৯২৮ সালে ৫ বছর মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করে যার উদ্দেশ্য ছিল দেশে ভারী শিল্পের শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলা।
সে সময় গৃহীত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ছিল কতগুলো অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রার সমষ্টি মাত্র। ১৯২৮ থেকে ১৯৩২ এর মাঝামাঝি ইউএসএসআর- এর অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য এসব লক্ষমাত্রা গ্রহণ করা হয়েছিল, যেসকল পদক্ষেপগুলোর মধ্যদিয়ে জাতিটি শিল্প ও সামরিক দিক থেকে স্বনির্ভর হতে চেয়েছিল।
সেই পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনীতির পদ্ধতিগত উন্নয়নের মধ্যদিয়ে ভারি শিল্পের দিকে ধাবিত হওয়া, তথা ভারি শিল্পের মাধ্যমে আদিম কৃষিভিত্তিক জাতি থেকে শিল্পোন্নত ও সামরিক দিক থেকে একটি শক্তিশালী জাতিতে রূপান্তরিত হওয়া। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে স্টালিন তার শাসনামলে রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা ও সম্পদকে কয়লা, লোহা, স্টিল ও রেলওয়ের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি উৎপাদনে নিয়োগ করেছিলেন। ম্যাগনিটোগোর্সকের মতো ইউরালের অন্তর্গত নতুন নতুন শহরগুলোতে উৎসাহী তরুণ কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টাও চালানো হয়েছিল।
৩. খনিজ প্রক্রিয়াকরণ:
নিজস্ব খনিজ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উপর পূর্ণ নিযয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য ও অন্য জাতির উপর নির্ভশীলতা কমানোর লক্ষ্যে খিলাফত রাষ্ট্র তার খনিজদ্রব্য উত্তোলন, প্রক্রিয়াকরণ ও শোধনাগার তৈরি করবে। যেহেতু কাঁচামাল শিল্পের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, কাঁচামালকে ঘিরে আমাদের মূল উদ্দেশ্য থাকবে পরনির্ভশীলতা কমানো।
প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধশালী একটিমাত্র দেশ পাকিস্ত্মানের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সম্পদ হলো- তেল, গ্যাস, সোনা, ক্রোমিয়াম, লোহা, কয়লা, বক্সাইট, কপার, এন্টিমনি, সালফার, লাইমস্টোন, মার্বেল, বালি, রক-সল্ট এবং সিরামিকের ক্লে বা কাদামাটি। যেহেতু খিলাফত অন্যান্য মুসলিম ভূ-খণ্ডগুলোকেও একীভূত করার মধ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে, তাই অন্যান্য দেশ গুলোর সম্পদগুলোও খিলাফতের আওতায় আসবে। যার ফলে স্বাভাবিকভাবেই খিলাফতের অভ্যন্তরীণ সম্পদগুলোর উত্তোলন ও প্রক্রিয়াকরণের নীতি বিদেশী কারিগরি দক্ষতার উপর নির্ভশীল রাখা হবে না।
মুসলিমদের বেশিরভাগ সম্পদই প্রক্রিয়াকরণ করা হয় বিদেশী কম্পানিগুলোকে দিয়ে তথা আমেরিকান কম্পানিগুলোকে দিয়ে। উত্তোলনের নামে এসব সম্পদের বেশিরভাগ অংশই এসকল পশ্চিমা কম্পানিগুলোকে দিয়ে দেওয়া হয়। কখনও কখনও দেশীয় তেল কম্পানিগুলোকেও বেসরকারিকরণের নামে বিক্রি করে দেয়া হয় ঐসব কম্পানিগুলোর কাছে।
খনিজ প্রক্রিয়াকরণে স্বনির্ভশীল হওয়ার জন্য বেশকিছূ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। যেসকল সম্পদ খিলাফতের মধ্যে থাকবে না সেগুলো অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করে আনা হবে। ইদানিং চীনও একই নীতি গ্রহণ করেছে। চীন তার তেলের প্রয়োজন মেটাতে আফ্রিকান দেশগুলোতে তেলের বিনিময় প্রচুর পরিমানে অন্যান্য সাহায্য প্রদান করে চলেছে। পাশ্চাত্য নীতির অনুসরণেই চীন এখন আফ্রিকায় প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠানসহ দরকারী রাস্তা-ঘাট, স্কুল, হাসপাতাল ও অফিস-আদালত গড়ে তুলেছে। সাম্প্রতিক ইন্দো-আফ্রিকান সম্মেলনও এ নীতির একটি সুন্দর উদাহরণ। একই ধরণের নীতি খিলাফত রাষ্ট্রও প্রয়োজনে গ্রহণ করবে, যদিও আল্লাহর রহমতে মুসলিম ভূ-খণ্ডগুলো পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর।
মুসলিম বিশ্বে বিদ্যমান পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর ব্যাপারেও খিলাফতকে কিছু নীতি নির্ধারণ করতে হবে। তারা মুসলিম বিশ্বে থাকলে আমাদের কি সুবিধা, আর কি সমস্যা, তা গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। বর্তমানে তারা চরম স্বাধীনতা ভোগ করছে; বিশেষ করে খনিজ সম্পদের বিষয়টিতে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা শ্রম ও দক্ষতার মজুরি হিসেবে খনিজ সম্পদের অংশীদারিত্ব পেয়ে থাকে, এছাড়া মুসলিম বিশ্বের দূর্নীতিপরায়ন শাসকগোষ্ঠী ও অভিজাতশ্রেণী ব্যক্তিগত স্বার্থের বিনিময়ে জনগণের সম্পদ বিদেশীদের হাতে তুলে দিচ্ছে; যার কারণে খনিজ সম্পদের প্রকৃত অধিকারী হয়েও তা থেকে জনগণ তেমন কোন সুবিধা পাচ্ছে না।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এসব কোম্পানি কোন দক্ষতা বা প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর কাছে হস্তান্তর করছে না। খিলাফতের অভ্যন্তরে কোন বিদেশী কোম্পানীকে কাজ করতে হলে অবশ্যই মুসলমানদের সাথে প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি করতে হবে। পারস্পারিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ব্যবসা বানিজ্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। যদি দুটি দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বানিজ্যিক সম্পর্ক থাকে তাহলে তাদের পক্ষে সহজে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া সম্ভব হয় না। বর্তমান বিশ্বে চীন-মার্কিন সম্পর্কের দিকে তাকালে বিষয়টি সহজেই বোঝা যায়। পরস্পর বৈরী এই দুটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে একে অপরের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাদের পক্ষে হঠাৎ করে সংঘর্ষে জড়ানো খুবই কঠিন। প্রযুক্তি বিনিময়ের ক্ষেত্রে পাকিস্তান সম্প্রতি একটি ভাল নজির স্থাপন করেছে। সম্প্রতি ফ্রান্স ও পাকিস্তানের মধ্যে সাবমেরিন নির্মান ও সরবরাহের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ চুক্তি বলে ফ্রান্সের কাছ থেকে পাকিস্তান ৩টি সাবমেরিন কিনবে, কিন্তু শর্ত হলো এর একটি নির্মিত হবে ফ্রান্সে আর বাকী দুটি ফ্রান্সের তত্বাবধানে পাকিস্তানের প্রযুক্তিবিদদের হাতে তৈরী হবে। এ ধরণের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্বলিত নির্মান চুক্তি অবশ্যই উন্নত শিল্প বিকাশে সহায়ক হবে।
খিলাফাহ রাষ্ট্রকে অবশ্যই তার নিজস্ব কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা সম্পর্কে গতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে। যে সব প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি আমাদের নেই তা দ্রুত বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে সংগ্রহ করে নিজেদের সক্ষমতাকে যুগোপযোগী করে রাখতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় পাকিস্তানে বর্তমানে চিনি ও সিমেন্ট নির্মানের প্লান্ট, কৃষি যন্ত্রাংশ উৎপাদন কারখানা, সড়ক নির্মানের জন্য রোলার তৈরীর কারখানা ইত্যাদি ক্ষুদ্র ও ভারী শিল্পের কারখানা আছে। এসব কারখানাকে সামান্য পরিবর্তন করেই সেখানে ভারী লৌহ ও ইস্পাতজাত সামগ্রী তৈরী করা সম্ভব। এসব লৌহ ও ইস্পাতজাত পণ্য আবার অন্যান্য শিল্প, যেমন গাড়ী নির্মান, সমরাস্ত্র নির্মান ইত্যাদিতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
৪. খিলাফত তিনভাবে শিল্পে বিনিয়োগ করবে:
– সরাসরি বিনিয়োগ: যে সব শিল্প সাধারণত লাভজনক ভিত্তিতে চালানো সম্ভব নয়, কিন্তু রাষ্ট্রের অন্যান্য শিল্পের বিকাশ ও নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য সেগুলোকে অবশ্যই রাষ্ট্রের নিজস্ব বিনিয়োগে স্থাপন করতে ও চালু রাখতে হবে। যেমন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র, সাবমেরিন ও যুদ্ধ জাহাজ নির্মান, রেলওয়ে ইত্যাদি।
– যৌথ বিনিয়োগ: যেসব ক্ষেত্রে পরবর্তীতে রাষ্ট্র তথা জনগণ লাভবান হবে, অথবা যেসব শিল্প সরকারের অংশগ্রহণ ছাড়া গড়ে উঠতে পারবে না, যেমন তেল উত্তোলন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা ইত্যদিতে রাষ্ট্র ব্যক্তিখাতের সাথে যৌথ বিনিয়োগ করবে।
– ব্যক্তিখাতের শিল্পে ভর্তুকি বা সুবিধা প্রদান: যারা রাষ্ট্রের চাহিদা মতো পণ্য উৎপাদন করবে, যেমন কোন গাড়ি কারখানা যদি সামরিক যান বা ট্যাঙ্ক উৎপাদন করে তবে তাকে যথাযথ আর্থিক সুবিধা দিতে হবে। যারা অন্যান্য শিল্পের জন্য কাঁচামাল উৎপাদন করে তাদেরকে ভর্তুকি বা ঋণ সুবিধা দেয়া যেতে পারে। রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বৃহৎ ইন্ডাষ্ট্রি (যেমন অস্ত্র কারখানা ইত্যাদি) স্থাপনকারীদেরকে বিনামূল্যে সরকারী জমি বরাদ্দ দিতে হবে।
খিলাফতের কর্তব্য হবে প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগের জন্য সম্পদশালী উদ্যোক্তাদেরকে উৎসাহিত করা। ইতিমধ্যেই মুসলমানদের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণ পরমানু বিজ্ঞানী এবং পেট্রোলিয়াম বিশেষজ্ঞ তৈরী হয়েছে; কিন্তু রাষ্ট্রের যথাযথ রাজনৈতিক লক্ষ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় তারা বিদেশে চাকরী খুঁজে নিচ্ছে; যার কারণে মুসলিম বিশ্বে দক্ষ জনশক্তির সংকট ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ১৯৬৭ তে যখন মিশর তার পারমানবিক কর্মসূচি বন্ধ ঘোষণা করে তখন সেখানকার বিজ্ঞানীরা সাদ্দাম হোসেনের সামরিক প্রকল্পে যোগ দেয়। পাকিস্তানের পরমানু প্রকল্পের স্থপতি আব্দুল কাদির খাঁন এখন বেকার।
শিল্পায়নের গতি ধারাকে যদি অব্যাহত রাখা যায় তাহলে তা সামগ্রিক অর্থনীতিতে অবশ্যই ব্যাপক গতি সঞ্চার করবে। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, যে জন্য শিল্পে এই গতি অর্জন করা যাচ্ছে না তা হলো যথাযথ রাজনৈতিক আকাংখা ও পরিকল্পনার অভাব। মুসলিম দেশগুলোর বর্তমান অর্থনীতিতে সত্যিকারের কোন চালিকা শক্তি নেই এবং অধিকাংশ ধনী দেশ শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সম্পদ বিক্রির টাকায় ভোগ-বিলাস করছে।
আমরা যদি বিশাল আকারের প্রতিরক্ষা ইন্ডাষ্ট্রি গড়ে তোলার কাজে হাত দিই তাহলে ব্যক্তিখাত থেকে অবশ্যই বড় ধরণের বিনিয়োগ আসবে কারণ সরকারের তৈরী করা বড় ধরণের চাহিদা যে সুযোগ সৃষ্টি করবে তাকে কাজে লাগাবে প্রাইভেট সেক্টর। সবার আগে যে ভাল ফলটি দৃশ্যমান হবে তা হলো ব্যাপক কর্মসংস্থান। যদিও মুসলিম বিশ্বে দক্ষ জনবলের অভাব নেই তার পরও হঠাৎ করে শিল্পায়ন ঘটলে আমাদেরকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রশিক্ষণ সুবিধা চালু করতে হতে পারে।
কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেলে স্বাভাবিকভাবেই দৈনন্দিন পণ্যের ব্যবহার ও চাহিদা বাড়বে, কেননা অনেক মানুষের হাতে তখন খরচ করার মত টাকা আসবে। পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে অর্থনীতির অন্যান্য সেক্টরেও কাজ ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে। নিত্য পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি বিলাসী পণ্যের চাহিদা, ব্যবহার ও উৎপাদন বাড়বে, সেখানে আবার নতুন শিল্প গড়ে উঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ আরো সম্প্রসারিত হবে; বাড়বে অর্থনীতিতে সম্পদের প্রবাহ।
৫. কৃষি:
একটি টেকসই শিল্পায়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। জাতি যাতে খাদ্যের জন্য বিদেশী শক্তির উপর নির্ভরশীল না থাকে এটা নিশ্চিত করা অতীব জরুরী। সকল উন্নয়নই অর্থহীন হয়ে পড়বে যদি জনগণের মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা না থাকে। তাই খিলাফতকে স্রষ্টা প্রদত্ত বিশাল উর্বর ভূমিকে কৃষি উৎপাদনে যথাযথভাবে ব্যবহার করার জন্য একটি সুষম নীতি প্রনয়ণ করতে হবে।
২য় বিশ্বযুদ্ধের পর তুরস্ক শিল্পের পাশাপাশি একটি মোটামুটি শক্তিশালী কৃষিভিত্তি তৈরী করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু ১৯৮০ সালের পর আইএমএফ এর ধ্বংসাত্মক প্রেসক্রিপশন তার কৃষিখাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। তার পরও তুরস্ক এখনও খাদ্যপণ্য, গবাদি পশু এবং পোল্ট্রি রপ্তানীকারক দেশ।
খিলাফতের উচিত হবে কৃষি ক্ষেত্রে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও কৌশল প্রয়োগ করা। এখানে উল্লেখ্য করার মতো একটি বিষয় হলো ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর উত্তর কোরিয়া ‘যাচ্ ফিলসফি’ নামে একটি সুষম কৃষিনীতি বাস্তবায়ন করে। কমিউনিস্ট চিন্তাধারার অনুসরণে এটি ছিল একটি তিন স্তরের কর্মসূচী। উত্তর কোরিয়া এখন তার কৃষি সারঞ্জাম ও প্রযুক্তি অন্যান্য দেশে রপ্তানি করতে আগ্রহী কিন্তু ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন শর্তের কারণে তা এই মুহুর্তে সম্ভব হচ্ছে না। আগামী দিনে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হলে উত্তর কোরিয়ার সাথে কৃষি উন্নয়ন চুক্তি করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে খিলাফত নিশ্চয়ই এমন বাণিজ্য সমঝোতায় পৌঁছবে যাতে করে আমরা তাদের কৃষি প্রযুক্তি ও কৌশল থেকে লাভবান হতে পারি।
উপসংহার
এ নিবন্ধে যে আলোচনা হল তা মূলতঃ মোটাদাগের নীতি ও কৌশল। খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যে সব ভূমি খিলাফতের অন্তর্ভূক্ত থাকবে সেগুলোর বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই আসল কৌশল স্থির করতে হবে। আজকের মুসলিম বিশ্ব সম্পদ, দক্ষতা ও জনশক্তিতে সমৃদ্ধ। খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হলে আমাদের এই দক্ষ জনগোষ্ঠীই খিলাফতের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করবে।
আমাদের বর্তমান শাসকরা পশ্চিমা উপনিবেশবাদী শক্তিগুলোর এজেন্ট। এরা কখোনই রাষ্ট্রের সামর্থ ও সম্ভাবনাকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাবে না। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে জার্মানি দ্রুত শিল্পায়ন করে বাকী ইউরোপের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, যার প্রেক্ষাপটে ১ম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়। মাত্র ৬ বছরের শিল্প বিপ্লব পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্যকে জার্মানীর অনুকুলে নিয়ে এসেছিল এবং তাকে রুখতে পৃথিবীর বাদবাকি পরাশক্তিগুলোকে একতাবদ্ধ হতে হয়েছিল। মাত্র ২০ বছরের শিল্পায়ন সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরবর্তী ৫০ বছর ধরে মার্কিন পরাশক্তির মোকাবেলায় সামর্থ যুগিয়েছিল। এই উদাহরণগুলো থেকে এটা স্পষ্ট যে, যদি প্রবল ইচ্ছা শক্তি থাকে তাহলে যে কোন জাতি শিল্পোন্নত হতে পারে এবং নিজেকে রক্ষা করতে পারে। আর শিল্প ক্ষমতা না থাকলে প্রত্যেকটি জাতিকেই হতে হবে অন্যজাতির অনুগ্রহ নির্ভর।
তবে খিলাফতের শিল্প ক্ষমতা অর্জন আর এতক্ষণ ধরে আলোচিত জাতিগুলোর শিল্প ক্ষমতা অর্জনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। কুফর ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত জাতিগুলো শিল্পায়ন ঘটিয়েছে অন্য জাতিকে পদানত করা, উপনিবেশ স্থাপন ও পরাশক্তি হওয়ার আকাঙ্খা বাস্তবায়ন করার উদ্দেশ্যে।
অপরদিকে মুসলিম উম্মাহর শিল্প ক্ষমতা অর্জন ও প্রযুক্তিগত উন্নতি সাধনের যে চেষ্টা, তার পেছনের চালিকা শক্তি ও প্রেরণা হলো ইসলামী আক্বীদা। আর মুসলমানদের সকল কর্ম পরিকল্পনা অবশ্যই হবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আদেশ ও রাসূল (সা) এর মহান বাণীর আলোকে আলোকিত।
“হে ঈমানদারগণ! যখন আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল এমনভাবে তোমাদেরকে ডাকেন যা তোমাদের মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করে তখন সেই ডাকে সাড়া দাও।” [আল কুরআন ৮:২৪]
হানিফ মতিন
এপ্রিল, ২০০৮ইসলামী সমাজব্যবস্থায় নারীর সম্মান ও মর্যাদা
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য – তথা সমগ্র বিশ্বব্যাপী নারী নির্যাতন একটি সমস্যা। কিন্তু এ সম্পর্কিত সমস্ত আলোচনায় এমনভাবে এ ব্যাপারটিকে উপস্থাপন করা হয় যেন এটি শুধুমাত্র মুসলিম বিশ্বেরই একটি সমস্যা আর এর কারণ হিসেবে সব সময় দায়ী করা হয় ইসলামকে। ইসলামে নারীর অধিকার ও মর্যাদা সম্পর্কে অনেক ভ্রান্ত ধারণা সমাজে প্রচলিত আছে। যেমন:
– ইসলাম পুরুষকে দিয়েছে নারী নির্যাতন করার অধিকার।
– নারীর নেই শিক্ষা গ্রহণ, রাজনীতি কিংবা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের অধিকার।
– নারীর নেই কোন বিষয়ে নিজস্ব মত প্রকাশের অধিকার।
– নারীর নেই স্বামী নির্বাচন বা তালাকের অধিকার।
– হিজাব বা পর্দাপ্রার মূল উদ্দেশ্য নারীদের অবরুদ্ধ করা।
– হিল্লা বিয়ে, গ্রামগঞ্জের মোলাদের অন্যায় ফতোয়া, অনার কিলিং ইত্যাদি ইসলাম অনুমোদিত বিষয়।
কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, উপরোক্ত কোন প্রচারণার সাথেই নেই ইসলামের দূরতম সম্পর্ক। এখন থেকে চৌদ্দ’শত বছর আগে ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে সকল প্রকার নারী নির্যাতন। উপযুক্ত সম্মানের সাথে নিশ্চিত করেছে নারীর সুষ্পষ্ট সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার। কিন্তু, আজ সমস্ত বিশ্বব্যাপী ইসলামী রাষ্ট্রের অনুপস্থিতিতে নারী বঞ্চিত হয়েছে তার আল্লাহ্ প্রদত্ত সকল অধিকার থেকে।
ইসলাম নারীদের ভূমিকাকে যথার্থ সম্মান দিয়েছে। একটু বিশ্লেষন ও গবেষনা করলেই আমরা দেখবো মা, স্ত্রী ও কন্যা হিসেবে অথবা একজন পেশাজীবি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ভূমিকা পালনকারী হিসেবে কীভাবে ইসলাম নারীদের মর্যদাকে সুউচ্চ করেছে।
১. সম্মান ও মর্যাদার মাপকাঠি: পুঁজিবাদী সমাজে মূলতঃ নারীর সম্মান ও মর্যাদার মাপকাঠি হচ্ছে নারীর দৈহিক সৌন্দর্য ও আর্থিক প্রতিষ্ঠা। আর ইসলামী সমাজে নারীর সম্মান ও মর্যাদার মাপকাঠি হচ্ছে তার আলাহ্ভীরুতা বা তাকওয়া। রাসূল (সা) বলেছেন, “এই পৃথিবী এবং এর মধ্যস্থিত সমস্ত কিছুই মূল্যবান। কিন্তু সবচাইতে মূল্যবান হচ্ছে একজন সৎকর্মশীল নারী।” (মুসলিম)
২. মাতৃত্বের সম্মান: পুঁজিবাদী সমাজ নারীর মাতৃত্বকে দেয়নি কোন সম্মান ও মর্যাদা। আর ইসলাম নারীকে মা হিসাবে করেছে সবচাইতে বেশী সম্মানিত। রাসূল (সা) বলেছেন, “মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের জান্নাত।”
৩. গৃহকর্মের মর্যাদা: পুঁজিবাদী সমাজ নারীর গৃহকর্মের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজকে করেছে তুচ্ছতাচ্ছিল্য। আর ইসলাম নারীর গৃহের অভ্যন্তরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, সন্তান জন্মদান ও লালনপালন করাকে দিয়েছে জিহাদের মর্যাদা। মূলত এটিই একজন নারীর মৌলিক ও প্রধান কাজ। রাসূল (সা) বলেছেন, “ঘরে তোমরা (নারীরা) তোমাদের সন্তানদের যত্ন নাও আর এটাই তোমাদের জন্য জিহাদ।” (মুসনাদে আহমাদ)
৪. স্ত্রী হিসাবে সম্মান: স্ত্রী হিসাবেও নারীকে ইসলাম দিয়েছে পরিপূর্ণ সম্মান ও মর্যাদা। রাসূল (সা) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম। আর নিশ্চয়ই আমি আমার স্ত্রীর কাছে সর্বাপেক্ষা বেশী উত্তম।” (তিরমিযী)
৫. কন্যাসন্তানের সম্মান: পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক এই পৃথিবীতে এখনও কন্যাসন্তান অনাকাঙ্খিত। অথচ ইসলাম উত্তম রূপে কন্যা সন্তান লালন-পালন করাকেও ইবাদত হিসাবে গণ্য করেছে। রাসূল (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তির কোন কন্যা সন্তান থাকে এবং তাকে সে উত্তম শিক্ষা দেয়, তার জন্য জান্নাত অবধারিত হয়ে যায়।“
৬. সর্বস্তরে নারীর সম্মান: ইসলাম সমাজের সকল স্তরের মানুষকে নারীর সাথে সম্মানজনক আচরণ করার জন্য উৎসাহিত করেছে। রাসূল (সা) বলেছেন, “শুধুমাত্র সম্মানিত লোকেরাই নারীদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করে। আর যারা অসম্মানিত, নারীদের প্রতি তাদের আচরণও হয় অসম্মানজনক।” (তিরমিযী)
এই হলো ইসলামে নারীর মর্যাদা আর এটা বর্তমান বিশ্বের প্রচলিত মূল্যবোধের মতো নয় যেখানে নারীদের দেখা হয় কেবলমাত্র যৌনতার প্রতীকরূপে এবং ভোগের উপাদান হিসেবে। এর ফলশ্রুতিতে প্রতিনিয়ত নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে।
















