Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • কেন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে অসার ? – ১ম পর্ব

    কেন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে অসার ? – ১ম পর্ব

    (১ম পর্ব)

    ১৮০২ সালে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন ডানবুরি ব্যাপিস্টদের কাছে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের নীতি ব্যাখ্যা করে একটি চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিটিকে ভিত্তি করে আমেরিকান সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করে প্রথম সংশোধন করা হয়। তিনি চিঠিতে লিখেন Believing with you that religion is a matter which lies solely between Man and his God, that he owes account to none other for his faith or his worship, that the legitimate powers of government reach actions only & not opinions, I contemplate with sovereign reverence that act of the whole American people which declared that their legislature should “makes no law respecting an establishment of religion, or prohibiting the free exercise thereof,” thus building a wall of separation between Church & State. অর্থাৎ থমাস জেফারসনের কথায় রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের উপর কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ না করার বিষয়টি ফুটেছে। যা ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের মুল কথা। থমাস জেফারসনের চিন্তাকে প্রতিষ্ঠার একই সূরে কথা বললেন তসলিমা নাসরীনও। গত ৫ ডিসেম্বর ০৭ বিবিসিকে তসলিমা নাসরীন বলেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার জন্য নয়, ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার জন্যই আমি লিখি। বিতর্কিত তসলিমা নাসরীনের ন্যায় এ পথের কিছু অনুসারী, লক্ষ ও আদর্শচুত বাম রাজনীতিক সাম্রাজ্যবাদীদের উচ্ছিষ্টভোগী তথাকথিত কিছু বুদ্ধিজীবী সময়ে –অসময়ে দাবি তোলে আমাদের দেশের রাজনীতি থেকে ধর্মকে বাদ দেওয়ার। যে মতবাদের উদ্ভব হয়েছিল সপ্তদশকে অন্ধকারাচ্ছন্ন ইউরোপের বাস্তবতায়। খ্রিষ্টিয় চার্চের ধর্মের (যাজকদের বানানো) নামে জনসাধারনের উপর অত্যাচার ও শোষনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীল (Reactionary) আন্দোলনের ভিত্তিতে উদ্ভব হয়েছিল যে ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদের। ইউরোপে ১৭৭৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত হয় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের (national state)। আর পশ্চিমাদের ধর্মনিরপেক্ষ জাতিরাষ্ট্রকে মডেল হিসাবে প্রতিষ্ঠার কৌশলের মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলেছে বিশ্বরাজনীতির ঘটনা প্রবাহ। তাই আমাদের দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে বারবার। বারংবার ব্যার্থতার পরেও যখন পুনরায় তা সাংবিধানিক ভাবে প্রতিষ্ঠার দাবি ওঠে একটি জনবিচ্ছিন্ন গোষ্টির কাছ থেকে, তখন বিশ্ব রাজনীতিতে মতবাদটির আবির্ভাবের বাস্তবতার নীরিখে এটির বুদ্ধিবৃত্তিক যৌক্তিকতা বিচার খুব প্রাসঙ্গিক। কারণ রাজনীতির ভিত্তি, আদর্শ ও দর্শণের মধ্যে যদি গলদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক অসারতা থাকে তাহলে সে রাজনীতি সাইত্রিশ বছর কেন সাতশ বছর চর্চা করলেও তা বিশ্ব মানবতাকে অধিকতর মঙ্গলজনক কিছু দিতে পারবে ন। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, যুদ্ধ ও অসুখকর সাংস্কৃতিক দুষণ দিয়ে বিশ্বকে বসবাসের ক্রমশ অনুপযোগী করে তুলেছে পশ্চিমের ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী রাজনীতি। নিচে আমরা এ মতাদর্শের আবির্ভাবের প্রেক্ষাপট, কারণ ও ব্যার্থতা; বাস্তবতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তির আলোকে যাচাই করার চেষ্টা করব।

    বিচ্ছিন্নভাবে প্রাচীন গ্রীক ও অন্যান্য সময়ের কিছু চিন্তাবিদদের মাঝে রাষ্ট্র ব্যাবস্থায় ধর্মীয় সমাধানের বিরোধী মনোভাবের খোঁজ পাওয়া যায়। তবে ভাষায় বা সাহিত্যে সেকুলারিজম (secularism) বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ কথাটি সর্বপ্রথম ১৮৪৬ সালে বৃটিশ লেখক জর্জ জ্যাকব হলিওয়েক ব্যাবহার করেন। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মতবাদ প্রধানত ইহজাগতিক কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কসমিন এ ব্যারি ও ইংলিশ সেকুলারিজমের কাছ থেকে পাওয়া সেকুলারিজমের সংজ্ঞা নিম্নরূপ-

    ১। একদিক থেকে বিবেচনা করলে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলে এবং রাষ্ট্র নিজে ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাপারে কোন প্রকার পক্ষপাত মূলক ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে না। সরকারও জনগণের উপর চাপিয়ে দেবেনা। অন্য দিক থেকে এটি এমন একটি বিশ্বাসকে বোঝায় যে মানুষের যাবতীয় কার্যাবলি এবং সিদ্ধান্ত সমূহ (বিশেষ করে রাজনৈতিক) গ্রহণ করা হবে তথ্য ও বাস্তবতার ভিত্তিতে, কোন প্রকার ধর্মীয় বিবেচনায় নয়।

    [Kosmin, Barry AContemporary Secularity and Secularism.

    Secularism & Secularity: Contemporary International Perspectives, Ed. Barry A. Kosmin and Artela Keysar. Hartford, CT: Institute for the study of Secularism in Society and Culture (ISSSC), 2007]

    ২। ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল মানুষের ইহলৌকিক দায়িত্ব সংক্রান্ত নিয়মাবলী এবং যারা ধর্মতত্ত্বকে অপূর্ণ, আস্থা স্থাপনের অযোগ্য এবং অবিশ্বাস্য মনে করে এই আদর্শ তাদের জন্য। এর মূল উপাদান তিনটিঃ ক) ইহলৌকিক জীবনের উন্নয়ন কেবল বস্তুর মাধ্যমেই হওয়া সম্ভব। খ) বিজ্ঞানই মানুষের জন্য একটি প্রাপ্তিসাধ্য ঈশ্বর। গ) যে কোনো ভালো কাজই ভালো। অন্য কোনো ভালো থাকুক বা না থাকুক বর্তমান জীবনের জন্য যা ভালো তার সন্ধানই শ্রেয়। (English Secularism, 35)

    ধর্মনিরপেক্ষতার উদ্ভবের প্রেক্ষাপট ও কারন:

    ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায় মধ্যযুগব্যাপী ইউরোপের চার্চের কর্তৃপক্ষের অত্যাচার ও শোষনের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার ফলেই এ মতবাদ বেড়ে উঠে। ঈসা (আ) এর উর্ধ্ব আরোহনের পর তার (আ) ধর্মের আসল বাণী বিকৃত করে মানবীয় চিন্তা-চেতনা, দর্শন ঢুকানো হয়। এমনকি কনসট্যানটাইন নামক এক রোমান সম্রাট খ্রিস্টবাদকে তার রাষ্ট্র ধর্ম হিসাবে ঘোষণা করে। তার তৈরি এই বিকৃত ধর্মের অনুসারী হতে সে জনসাধারণকে চাপ প্রয়োগ করে। সৃষ্টিকর্তার একত্ববাদের ধারণা থেকে সরে আসা খ্রিস্টান ধর্ম যে মানুষের মনগড়া মতবাদ তার হাজার প্রমানের মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে ৩২৫ সালের নাইসিন সম্মেলন (Nicene Council)। এই সম্মেলেনে রোমান সাম্রাজ্যের ১৮০০ বিশপ যোগ দেয়। যেখানে ইস্টার বানির (Ester Bunny) মতো রোমান সাংস্কৃতিক বিশ্বাসকে খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসের মধ্যে ঢুকানো হয়। চারটি সংশোধিত বাইবেলকে তারা এ সম্মেলনে রাষ্ট্রীয় ধর্মগ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করে; এ ভার্সনে বিশ্বাসী খ্রিষ্টানরা এখনও সারা পৃথিবীতে রয়েছে। মানুষের জ্ঞানের মত সীমাবদ্ধ জ্ঞান বাইবেলে ঢুকানোর ফলে ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতায় বাইবেল সকল সমস্যার সমাধান দিতে ব্যার্থ হয় এবং বাইবেলের মধ্যে প্রতিফলিত হয় মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, অসম্পুর্ণতা, অসামঞ্জস্যতা ও স্ববিরোধীতা। এভাবে মানুষের বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান থেকে খ্রিস্টমতবাদ অনেক দূরে সরে যায়। মুলত; খ্রিষ্টীয় যাজক সম্প্রদায় ও চার্চের কর্তৃপক্ষ তাদের মনগড়া চিন্তা-ভাবনা খ্রিস্টবাদের নামে ধর্মীয় বাণী হিসেবে চালাতে থাকে।

    মধ্যযুগব্যাপী জনসাধারণের উপর চার্চের এই প্রাধান্য ও কর্তৃত্ব বজায় থাকে। এসময় ইউরোপের সম্রাট ও রাজারা চার্চের প্রতি মানুষের এ দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করে নিজেদের মসনদকে আরো পাকা-পোক্ত রাখতে চার্চকে ব্যাবহার করে। এসময়ে ইউরোপে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আবিস্কার ও চিন্তা-ভাবনার প্রসার ঘটতে থাকে। যা খ্রিষ্টীয় যাজক সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বাণীর সঙ্গে দন্দ্বের সুত্রপাত ঘটায়। চার্চের প্রভাব হুমকির সম্মুখীন হতে থাকে। ফলে পোপ ও রাজারা বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উদ্ভাবনকে অনুৎসাহিত করতে থাকে। এমনকি গ্যালিলিও ও কপারনিকাসের মত বিজ্ঞানীকে তারা শাস্তি ও প্রদান করে তাদের আবিষ্কারের জন্য। এসব ঘটনা মানুষের কাছে খ্রিস্টবাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও বাস্তব সমস্যা সমাধানের ব্যার্থতাকে পরিস্কার করে তোলে।

    খ্রিষ্টীয় চার্চের ধর্মীয় যাজকদের শাসনে (Theocracy) সাধারন মানুষ ও চিন্তাবিদরা অতিষ্ট হয় বটে, কিন্তু ভুলে ভরা মানুষের তৈরি খ্রিস্টবাদের শোষণের তিক্ততায় তারা ভুল ক্রমে ধর্মের প্রতিই নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতে থাকে। এ সময়ে প্রধানত দুই শ্রেণীর চিন্তাবিদ ও দার্শনিকের উদ্ভব ঘটে-

    ১। নাস্তিকতাবাদী ও
    ২। আপোষবাদী।

    নাস্তিকতাবাদী দার্শনিকরা বাস্তব জীবন তথা রাষ্ট্রীয় জীবনে সৃষ্টিকর্তা ও ধর্মকেই অস্বীকার করতে শুরু করে। এদের দু-একজন হলো- বস্তুবাদী হেগেল,মার্ক্স, লেলিন। এদের চিন্তার উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে কমিউনিজম বা সোশালিজমের বিকাশ লাভ করে। আপোষবাদীরা ধর্ম বা সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করেনি। তদের আপোষটা ছিল – যদি কেউ ধর্মীয় বিশ্বাস লালন-পালন করতে চায়, তা একেবারে ব্যাক্তিগত জীবনে। চার্চের বা ধর্মের কোন প্রভাব রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকবে না। এ ঘরাণার চিন্তাবিদ বা দার্শনিকদের কয়েক জন হলেন- রুশো, ম্যাকিয়াভেলি, হবস, লক, ভলটেয়ার, মন্টেসকু প্রমুখ। আর এই আপোষবাদী (Compromise) চিন্তার ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে আজকের ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী সভ্যতা।

    এ সকল দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের আবির্ভাব কালকে পশ্চিমারা আলোকিত যুগ (Enlightenment) বলে আখ্যায়িত করে। এ সময়ে দীর্ঘকালব্যাপী খৃস্টান ধর্ম যাজক ও রাজারা বনাম দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের মধ্যে এক তুমুল সংগ্রাম ও সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। অবশেষে আপোষের মাধ্যমে চার্চের কর্তৃপক্ষরা ধর্মীয় বিধিবিধান প্রচার ও পালনকে শুধু মানুষের ব্যাক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ রাখতে সম্মত হয়।

    এ প্রেক্ষাপটেই ম্যাকিয়াভেলি তার দ্যা প্রিন্স (The Prince) গ্রন্থে তার দেশের শাসককে ধর্মীয় রাষ্ট্রের পরিবর্তে জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ভ্যাটিকান ইতালির মাঝখানে বসে চক্রান্তের জাল বুনে চলেছে। অতীতে সে রাজত্ব করছে। এখন তার দিন শেষ। ইতালির গৌরবের জন্য প্রয়োজন হলে ভ্যাটিকান কে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রাধীন আনতে হবে। বস্তুতঃ শাসক গোষ্ঠির অত্যাচার ও নিপীড়নের হাত থেকে মুক্তি পেতেই স্বাধীনতার (Freedom) শক্ত দাবি তুলেছিল ম্যাকিয়াভেলি, রুশোর ও লকের মত দার্শনিকরা। এ চিন্তাবিদরা ধর্মকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন, সময়ের অনুপযোগী হিসেবে দেখতে পেলেন। বিখ্যাত দার্শনিক হবস, লক, মন্টেস্কু, রুশো ব্যাক্তিকে এই কুসংস্কার ও পশ্চাদপদতার শৃঙ্খল থেকে বেড়িয়ে আসার আহ্বান জানায়। জেইন জ্যাকস রুশো (J.J. Rousseau) বলেন,মানুষ স্বাধীনভাবে জন্ম গ্রহণ করলেও তার পারিপার্শ্বিকতা তাকে শৃঙ্খলিত করে ফেলে (Man is born free but he is in chains everywhere.)। এই অভিব্যাক্তির মূল দাবি ছিল এমনই- নিজের ভাগ্য নিজের নির্ধারনের ক্ষমতা মানুষের হাতেই আছে। ভাগ্য ঈশ্বর কর্তৃক পূর্বনির্ধারিত নয়। অর্থাৎ মানুষ জন্মগতভাবে উত্তম এবং স্বাধীন। ফলে রুশোও অবশেষে ফরাসী বিপ্লবের (French Revolution) পক্ষে কাজ করে। আর এই বিপ্লবের মাধ্যমেই চুড়ান্তভাবে রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা হয় এবং নিষ্পেষণকারী রাজা ও চার্চেরও পতন ঘটে। সৃষ্টি হয় সকল রাষ্ট্রীয় সমস্যা সমাধানের আইন ও নীতি তৈরিকারী সংসদীয় ব্যাবস্থা (Parliamentary System)। শুরু হয় প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মনিরপেক্ষ সমাজের পথ চলা।

    ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের ব্যার্থতা:

    একটি আদর্শ ও মতবাদের সঠিকতা বিচার করতে চাইলে, আমাদেরকে দেখতে হবে এটা কোনো বাস্তবিক ভিত্তির (Rationality) উপর প্রতিষ্ঠিত কি-না। মহাজগৎ সৃষ্টি, মানুষ, এ জীবনের আগে ও পরে কী আছে; মানব জীবনের এ সকল মূল প্রশ্নের কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক সুস্পষ্ট উত্তর সেই মতবাদটি দেয় কি-না তার উপরও। কারণ প্রত্যেকটি সুস্থ্য-স্বাভাবিক মানুষের চিন্তায় এসকল মূল প্রশ্ন শৈশব থেকেই ঘোরা-ফেরা করে। এগুলোর বাস্তব সম্মত কোন উত্তর না পেলে সে সন্তুষ্ট হতে পারে না। এই চিন্তাগুলোর উত্তরের উপরই নির্ভর করে প্রতিটি মানুষের জীবন পদ্ধতি (Life Style)। যেমন; একজন নাস্তিকের জীবন পদ্ধতি এক রকম পক্ষান্তরে আস্তিকের জীবন পদ্ধতি আরেক রকমের। মতবাদের সঠিকতার আরেকটি নির্ণায়ক হলো এটি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির সাথে মানানসই কি-না।

    এবার আমরা একটু উপরিউল্লিখিত নির্ণায়ক গুলোর আলোকে ও আমাদের সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের পক্ষে যে সকল যুক্তি বিদ্যমান সেগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি ও বাস্তবায়নের ফলাফলগুলো পর্যালোচনা করবো।

    ১। পশ্চিমের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা প্রায়ই বলে থাকে,Keep your religion to yourself, don’t bring it into politics একই সুর ধরে আমাদের দেশের কেউ কেউ বলে ,ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার কিন্তু এই ধারণাটা যৌক্তিক কি-না তা সমাজের সর্বোচ্চ সংগঠনটির (রাষ্ট্র) দিকে তাকালে দেখতে পাই। আজ পর্যন্ত পৃথিবীর যত ধর্ম ও ধর্ম প্রচারক এসেছে সকলেই সমাজ সংস্কারের কাজ করেছেন। কিন্তু রাজনীতি ছাড়া সমাজ পরিবর্তন কখনো সম্ভব নয়। সকল ধর্ম প্রচারকরাই রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার নীতি গুলোকে পরিবর্তিত ও প্রভাবিত করেছিলেন এবং বিধিবিধান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাই বলা যায় সমাজে মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াই এক ধরনের রাজনৈতিক প্রচেষ্টা। যে সমাজে ধর্ম বিদ্যমান সেখানে ধর্মের চিরায়ত প্রবণতা হলো সমাজ সংস্কার করা। অর্থাৎ ধর্মের প্রবণতা থেকেই ধর্ম ও রাজনীতির সুগভীর সম্পর্ক প্রতিয়মান। উদাহরন হিসেবে বলা যায় আরবে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখানকার সমাজ ব্যাবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে যায়।

    ২।কেউ যেন তার ধর্মীয় বিশ্বাসকে অন্যের উপর না চাপিয়ে দিতে পারে তাই ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখা উচিৎ। এ যুক্তিটিও একটি খোড়া যুক্তি, কারণ সমাজে বসবাস কারী একজনের চিন্তা দ্বারা সব সময়ই অন্যজন প্রভাবিত হয়। চিন্তার চরিত্রটাই এমন যে তা পূর্ববর্তী কোনো চিন্তার ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে। এছাড়া সমাজ বা রাষ্ট্রে ধর্মের প্রভাব থাকবে না, এটাকেও আমরা একটা নতুন এক ধর্মীয় মতাদর্শ বলতে পারি। যে ধর্মের নাম ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। কারণ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ সৃষ্টিকর্তা ও ধর্ম সম্পর্কে নতুন চিন্তা সহকারে এক নতুন মতাদর্শ সমাজে নিয়ে এসেছে। যা অন্যান্য ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন কোনো কর্তৃপক্ষ যদি বলেএখানে কোনো আইন থাকবেনা।এটাও একটা নতুন আইন সৃষ্টি করে। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায় ইসলাম রাষ্ট্রে সুদ ভিত্তিক অর্থনীতি অনুমোদন দেয় না। ফলে ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে সৃষ্টিকর্তার দেওয়া আইন মান্য করা বা ধর্ম পালন করা সম্ভব নয়। বরং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদই অন্য ধর্মের স্বাধীনতা দেয়না।

    চলবে……।।

    খান শরীফুজ্জামান সোহেল

  • বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আমাদের করণীয়

    বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আমাদের করণীয়

    বেশ দীর্ঘ সময় যাবৎ বাংলাদেশের আভ্যন্তরীন পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। শাহবাগ রাজনীতি থেকে শুরু করে হেফাজতে ইসলামীর লংমার্চ এবং অন্যান্য সকল ইস্যুগুলোর ফলে বাংলাদেশ একরকম গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মত দিচ্ছেন অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ।

    কিন্তু প্রশ্ন হল আসলেই কি বাংলাদেশ গৃহযুদ্ধের দিকে যাচ্ছে নাকি সাম্রাজ্যবাদীদের ধারাবাহিক চক্রান্তের বেড়াজালে ঘুরেফিরে আটকা পরে আছে??

    একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, বর্তমানে যেসকল বিষয়সমূহ আমাদের সামনে সুনিপুণভাবে তুলে আনা হচ্ছে, তার প্রত্যেকটি সাম্রাজ্যবাদীদের সুদীর্ঘ পরিকল্পনার ক্ষুদ্র অংশবিশেষ।

    বাংলাদেশে প্রতি নির্বাচন পূর্ববর্তী মৌসুমে এই ধরণের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়ে থাকে এবং নির্বাচন পর্যন্ত তা টিকিয়ে রাখা হয়। আর এর মধ্যেই জনগণের নিকট ৫ বছর যাবৎ হয়ে আসা যুলুমের সমাধান হিসেবে অপর যালিমকে পছন্দের ব্যাপারটি তুলে ধরা হয়; যে/যারা কিনা এর পূর্বে বারবার প্রতারণা করে আসছে। আর এভাবেই মার্কিন-ভারতের স্বার্থসিদ্ধির দ্বার খোলা থাকে পরবর্তী ৫ বছরের জন্যও।

    আর এই চক্রান্তের ধারাবাহিকতায় মূলত এতসকল জাগরণ-আন্দোলনের বহিঃপ্রকাশ; যেখানে সমাধান একেবারেই অনুপস্থিত। আর উম্মাহকে ব্যস্ত রাখা হয়েছে এসকল নাট্যমঞ্চ দ্বারা।

    কিন্তু এবার এই চক্রান্ত পূর্বের তুলনায় অধিক ভয়াবহ; কারণ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এই অঞ্চলে চীনের উত্থান এবং পুঁজিবাদের বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি খিলাফতের প্রখর সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে পেরেছে এবং সেই লক্ষ্যে তার এজেন্ডা বাস্তবায়নে তড়িঘড়ি শুরু করেছে।

    কিছুদিন আগে (১১ই মার্চ, ২০১৩) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনার বক্তব্যে এই উপমহাদেশে বাংলাদেশকে ঘিরে মার্কিন-ভারতের ঐক্যবদ্ধ চক্রান্তের ধারাগুলো স্পষ্টরূপে ফুটে উঠে।

    বাংলাদেশ এবং এই উপমহাদেশকে ঘিরে আমেরিকার পরিকল্পনা সুদীর্ঘ এবং বিগত বছরগুলোতে আমরা এর বাস্তবায়নের পাঁয়তারা দেখে আসছি।

    দালাল শসক দ্বারা সামরিক মহড়া থেকে শুরু করে মার্কিন স্বার্থপন্থী চুক্তিসমূহ একের পর এক বাস্তবায়ন ঘটিয়ে যাচ্ছে এবং সেনাবাহিনীর উপর কতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে অবিরত। কারণ, নিষ্ঠাবান সেনা অফিসারদের মাঝে তাদের দালাল সৃষ্টি প্রচেষ্টা সফল হলে, তাদের কুকীর্তি সম্পাদনে সেনাবাহিনীর তরফ থেকে বাধা আসবেনা আর তারা তাদের ঘৃণ্য কার্যক্রম চালিয়ে যাবে নিশ্চিন্তে। আর সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এ বছর বাংলাদেশেই তারা আয়োজন করতে যাচ্ছে মিলিটারি-মিলিটারি কনফারেন্স।

    তাছাড়া, মে মাসের ২২ তারিখ বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে আমেরিকা United States Coast Guard Cutter Jarvis নামক একটি নৌযান উপহারের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের পাঁয়তারা করে যাচ্ছে।আর এরই পরিকল্পনার জের ধরে গত ৭ এপ্রিল বাংলাদেশে এসেছে মার্কিন ৭ম নৌ বহরের প্রধান স্কট এইচ সুইফট, সফরের মেয়াদ কাল ৩ দিন, আলোচনা হবে সমুদ্র সীমা ও ব্যবহার চুক্তি নিয়ে, বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদ দমনে যৌথ সামরিক একাডেমী স্থাপনের চুক্তি হবে। আর মে ১৩/১৫ তারিখ হবে যৌথ সংলাপ। যার চুক্তি হয় হিলারির সফরের সময়। এর পূর্বে এ সরকারের মেয়াদে জাতিকে অন্ধকারে রেখে মার্কিনীদের সাথে দেশের সাধারণ মুসলিমদের জন্য ধ্বংসাত্মক চুক্তি ও সামরিক মহড়া করে যার কিছু উদাহরণ হল:

    – ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১১ CARAT (Cooperation Afloat Readiness & Training) নামে চট্টগ্রামে মার্কিন মেরিন ফোস ও বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর মধ্যে সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়।

    – ১৯ এপ্রিল’ ২০১২ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের রাজনৈতিক ও সামরিক বিষয়ক মন্ত্রী অ্যন্ড্রু জে শ্যাপিরোর নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সংলাপে অংশ নেয়।

    – ৫ই মে ২০১২ মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশ সফর করে।

    – ১লা জুন ২০১২ মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী লিওন প্যানেট্টা সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত একটি নিরাপত্তা সংলাপে ঘোষণা দেয় যে, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০২০ সালের মধ্য তাদের নৌবাহিনীর ৬০ শতাংশ এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সরিয়ে নিয়ে আসবে।

    – ১লা সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর মার্কিন মেরিন ফোস ENCAP (Engineering Capillitia Exercise) মহড়ায় অংশ নেয়

    – এপ্রিল মাসেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও মার্কিন প্যাসিফিক কমান্ড যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নেয়

    – ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১২ মার্কিন ৭ম নৌ বহরের কমান্ডের ভাইস অ্যাডমিরাল Scott swift ঢাকা আসে।

    – ১৭-২৪ সেপ্টেম্বর আবার ও CARAT-2 চট্টগ্রামের বনৌজ ঈশা খাঁ ঘাঁটিতে অনুষ্ঠিত হয়

    – ২৫-৩০ সেপ্টেম্বর DREE(Disaster RESPONSE Exercise & exchange) নামে ঢাকায় সামরিক মহড়া হয়

    – একই মাসে হাওয়াই দ্বীপে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য সামরিক সংলাপও অনুষ্ঠিত হয়।

    – ১০ই অক্টোবর ২০১২ যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক প্রধান অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল জে লকলিয়ারের বাংলাদেশ সফরে আসে। সফরকালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের স্বার্থ গত প্রবল আগ্রহের কথা ব্যক্ত করেন।

    – মজিনা বাংলাদেশে F.B.I এর উপস্থিতি সুনিশ্চিতকরণ এবং সেনাবাহিনীর সাথে বিভিন্ন যৌথ মহড়ার পাশাপাশি অন্যান্য কার্যক্রম বিস্তারণের কথাও বলেছে; যা বাংলাদেশের জন্য অশনি সংকেত বৈ আর কিছুই নয়।

    আমরা যদি পাকিস্তানের দিকে তাকায়, তবে দেখব দালাল শাসকদের সাহায্যার্থে একইভাবে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সাথেও যৌথ মহড়ার নামে তাদের জাল বুনেছিল সেনাবাহিনীতে আর পাকিস্তানে “রেইমন ডেভিস” বা “ব্ল্যাক ওয়াটারের” উপস্থিতি সুনিশ্চিত করে। ফলশ্রুতিতে আজ পাকিস্তানের বাস্তবতা ভয়াবহ।

    বাংলাদেশ থেকেও একইভাবে ফায়দা লুটতে তারা এই অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে; পাশাপাশি F.B.I এখানে জনগণের মাঝে মার্কিন গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাবে; যা কিনা পরবর্তীতে মার্কিনিদের অবস্থান সুনিশ্চিতকরণের দ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

    পাশাপাশি তাদের অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দী চীনকে দমনে সে সাথে করে নিয়েছে ভারতকে। বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্যিক চুক্তির নামে ইন্দো-প্যাসিফিক করিডোর নির্মানের ব্যবস্থা করছে; যা শুধুমাত্র ভারত-মার্কিন স্বার্থ নিশ্চিত করবে।

    যদিও পরবর্তীতে ভারতকেও নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত এই সমঝোতা। আর এতসব চক্রান্ত বাস্তবায়নের ইস্যুগুলো বাংলাদেশে আমরা বর্তমান দেখতে পাচ্ছি।

    মজিনা তার বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে পরবর্তী ৫ বছরে বাংলাদশের সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে তার কার্যক্রমের ব্যাপারে দৃঢ়তা প্রকাশ করেছে। অর্থ্যাৎ, পরবর্তী ৫ বছরের সরকার সম্পর্কে তারা নিশ্চিত আর জনগণকে তারা লেলিয়ে রেখেছে গত ৪২ বছর ধরে প্রতারক শাসকগোষ্ঠির মত গণতান্ত্রিক শসন ব্যবস্থার উচ্ছিষ্ট নিয়ে কামড়া-কামড়িতে। অথবা, এমন কিছু তথাকথিত আবেগী আন্দোলনের সাথে যেখানে উম্মাহ’র পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা পর্যন্ত নেই; বরং লুকিয়ে আছে কাফিরগোষ্ঠী এবং তার দালাল বাহিনীর ভয়ঙ্কর চক্রান্ত।

    অবশ্যই, সমধানের জন্য এসকল সাম্রাজ্যবাদী কুফর শক্তি বা তাদের দালালদের কাছে অথবা এই শাসনব্যবস্থার মাঝে ঘুরপাক খাওয়া আবর্জনার মাঝে ঘুরপাক খাওয়ার সমতুল্য।

    শাসক শ্রেণীর ইচ্ছার বাইরে কেউ নয়, চাবি যার তালা তার!! এমন নীতিতে গত ৪২ বছর ধরে নানা পঠপরিক্রমায় আমরা তাদের অত্যাচার নিপীড়ন দেখে আসছি। আমাদের চাওয়া পাওয়া বা দৈনন্দিন যে চাহিদা রয়েছে তার কোন অংশের প্রতি সরকার বা রাজনৈতিক কোন পদক্ষেপ নেই। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে কোথায় নিজের কর্মসংস্তান করবে তার কোন দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ রাষ্ট্রের অবিভাবকের নেই, শিক্ষার নামে বেকুব বানানোর কারখানা বা মানসিক প্রতিবন্ধী করার শিক্ষা ব্যবস্থাকে অব্যাহত রাখছে, রাষ্ট্রকে স্তিতিশীল অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী করার কোন পদক্ষেপ নেই, পৃথিবীর অন্যতম উর্বর ভূমি থাকা সত্ত্বেও আমাদেরকে কৃষি পণ্য আমদানি করতে হয়, নানা চুক্তির ছায়াতলে বাংলাদেশকে মার্কিন-ইঙ্গ-ভারতের বাফার স্টেটে পরিণত করে তাদের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করা হয়, আর রাষ্ট্র যন্ত্রের গুণে ধরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে গণতন্ত্রের প্রতারণামূলক শাসন ব্যবস্থা দ্বারা আকড়ে ধরে বাংলাদেশের কথিত রাজনীতিবীদদেরে চেষ্টা অব্যাহত রাখছে। আর এ কারণেই এক ব্রিটিশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বলেছে, – “Democracy is the system by which politicians rape the public”

    এ সমস্যার উত্তরণে সমাধান একটাই আজকের মুসলিম উম্মাহর সবচাইতে বড় সম্পদ তেল, গ্যাস, সমারস্ত্র কিংবা স্বর্ণ রৌপ্য নয় বরং তার হারানো চিন্তা যা তাকে ফিরে পেতে হবে, সে এতদিন অন্যের সাহায্যে মাগুর মাছের মত মাংশাসী হয়েছিল অথবা ফার্মের মুরগির মত নিস্তেজ হয়েছিল, তাকে যদি আবারও পৃথিবীর বুকে মাথা উচু করে দাড়াতে হয় তাহলে জালেমকে জালেম বলার সাহসিকতা গড়ে তুলতে হবে। আর সত্যকে সত্যের মত তুলে ধরতে হবে, করতে হবে বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। কারও ব্যক্তি সমালোচনা বা ছিনেপোটা বিষয় নিয়ে পড়ে থাকলে কাজের কাজ কিছুই হবে না আমার আপনার আবেগকে কেনার জন্য অনেকেই হাত বাড়িয়ে আছে, নিজের বিবেক দ্বারা তাড়িত হয়ে এ মহাবিশ্ব, জীবন ও মানুষের স্রষ্টা মহান আল্লাহ আজ্জা ওয়া জালের বিধানকে সমাজে মিশ্রণ গঠাতে হবে। আনতে হবে রাসূল (সা)-এর প্রদর্শিত ও আবু বকর, উমর ফারুখ, উসমান ইবনে আফ্ফান, আলী ইবনে আবু তালিব (রা), উমর ইবনুল আবদুল আযীযের খিলাফাহ্ আর রাশীদা। অতএব কাল বিলম্ব না করে আমরা খিলাফত ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে খলীফার প্রতি শরীয়াহ্ প্রতিষ্ঠার জন্য শপথ করার মাধ্যমে নিজেদের ফরয কাজ সম্পাদন করি।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন- “যে আনুগত্যের শপথ (বাই’য়াত) থেকে তার হাত ফিরিয়ে নেয়, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তার সাথে এমনভাবে সাক্ষাত করবেন যে, ঐ ব্যক্তির পক্ষে কোন দলিল থাকবে না এবং যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে, যখন তার কাঁধে কোন আনুগত্যের শপথ নেই, তবে তার মৃত্যু হবে জাহেলি যুগের মৃত্যু।” [সহীহ্ মুসলিম: ১৮৫১]

    এই সংকটময় পরিস্থিতিতে অবশ্যই আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে মার্কিন-ভারতের এইসব চক্রান্তের বিরুদ্ধে এবং তাদের দালালসমূহ ও দালাল তৈরির কারখানা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, ইসলামী জীবন ব্যবস্থা আলিঙ্গনে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা একমাত্র সমাধান।

    আল্লাহ আমাদের সত্য উপলব্ধি এবং এর ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাওফীক দিন এবং মুসলিম উম্মাহ’র গৌরব খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যবস্থা ফিরিয়ে দিন।

  • কেন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে অসার? (২য় পর্ব)

    কেন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে অসার? (২য় পর্ব)

    ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের ব্যার্থতা:

    ১। পশ্চিমের ধর্মনিরপেক্ষ বাদীরা প্রায়ই বলে থাকে, “keep your religion to yourself, don’t bring it into politics” একই সুর ধরে আমাদের দেশের কেউ কেউ বলে, “ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার” কিন্তু এই ধারণাটা যৌক্তিক কিনা তা সমাজের সর্বোচ্চ সংগঠনটির (রাষ্ট্র) দিকে তাকালে দেখতে পাই। আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত ধর্ম ও ধর্ম প্রচারক এসেছে সকলেই সমাজ সংস্কারের কাজ করেছেন। কিন্তু রাজনীতি ছাড়া সমাজের পরিবর্তন কখনো সম্ভব নয়। সকল ধর্ম প্রচারকরাই রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার নীতি গুলোকে পরিবর্তিত ও প্রভাবিত করেছিলেন এবং বিধিবিধান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাই বলা যায় সমাজে মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াই এক ধরনের রাজনৈতিক প্রচেষ্টা। যে সমাজে ধর্ম বিদ্যমান সেখানে ধর্মের চিরায়ত প্রবনতা হলো সমাজ সংস্কার করা। অর্থাৎ ধর্মের প্রবনতা থেকেই ধর্ম ও রাজনীতির সুগভীর সম্পর্ক প্রতীয়মান। উদাহরন হিসেবে বলা যায় আরবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা হবার পর সেখানকার সমাজ ব্যাবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে যায়।

    ২। “কেউ যেন তার ধর্মীয় বিশ্বাস কে অন্যের উপর না চাপিয়ে দিতে পারে তাই ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখা উচিৎ।” এ যুক্তিটি ও একটি খোড়া যুক্তি কারণ সমাজে বসোবাসকারী এক জনের চিন্তা দ্বারা সব সময়ই অন্যে প্রভাবিত হয়। চিন্তার চরিত্রটাই এমন যে তা পূর্ববর্তী কোনো চিন্তার ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে। এছাড়া সমাজ বা রাষ্ট্রে ধর্মের প্রভাব থাকবে না, এটাকেও আমরা একটা নতুন এক ধর্মীয় মতাদর্শ বলতে পারি। যে ধর্মের নাম ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’। কারণ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ সৃষ্টিকর্তা ও ধর্ম সম্পর্কে নতুন চিন্তা সহকারে এক নতুন মতাদর্শ সমাজে নিয়ে এসেছে। যা অন্যান্য ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন কোন কর্তৃপক্ষ যদি বলে ‘এখানে কোন আইন থাকবে না’। এটাও একটা নতুন আইন সৃষ্টি করে। উদাহরন স্বরুপ ইসলাম রাষ্ট্রে সুদ ভিত্তিক অর্থনীতির অনুমোদন দেয় না। ফলে ধর্মনিরপেক্ষ পুজিবাদী রাষ্ট্রে সৃষ্টিকর্তার দেওয়া আইন মান্য করা বা ধর্ম পালন করা সম্ভব নয়। বরং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদই অন্য ধর্মের স্বাধীনতা দেয় না।

    ৩। কেউ কেউ বলে, “ এই আধুনিক যুগে সৃষ্টিকর্তার আইন বা ধর্মীয় আইন অচল। ধর্মীয় আইন এখন সেকেলে”। কিন্তু বাস্তবতা হলো মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি (instinct) সব সময় স্থির ও অপরিবর্তনশীল। সব কালেই মানুষের শারীরিক ও মানসিক ক্ষুধা ছিল, আছে ও থাকবে। তাই মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি অপরিবর্তনশীল হওয়ায় অতীতে যা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি ও মনুষ্য সমাজের জন্য ক্ষতিকর ছিল ভবিষ্যতেও তা একই রকম থাকবে। অতীতেও নারী-পুরুষের মধ্যে জৈবিক ক্ষুধা, সন্তান উৎপাদন ও সম্পদের মালিকানার আকাঙ্ক্ষা, আধ্যাত্মিক ক্ষুধা (Spiritual instinct)/বড় শক্তির আনুগত্য করা/সৃষ্টিকর্তার উপাসনা করার বিষয়গুলো বিদ্যমান ছিল, বর্তমানেও আছে ভবিষ্যতেও থাকবে। আর এ সকল চাহিদাগুলো সুষ্ঠুভাবে পূরণের মধ্যেই সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিদ্যমান। তাই এ চাহিদাগুলো পূরণের জন্য একটি সার্বজনীন সর্বযুগ উপযোগী নীতি ও আইন থাকাটাই ব্যাঞ্জনীয় ও যৌক্তিক। যেহেতু সৃষ্টিকর্তা মানুষের এসকল প্রবৃত্তির স্রষ্টা, তাই সব যুগের উপযোগী,সব জাতি, বর্ণের মানুষের সবচেয়ে সুন্দর ভাবে এগুলো পূরণ করার বিধান তিনিই (আল্লাহ তায়ালা) শুধু ঠিক ভাবে দিতে সক্ষম। সুতরাং সৃষ্টিকর্তার আইনের ক্ষেত্রে একাল-সেকাল বা আধুনিক-অনাধুনিক বলা অযৌক্তিক। তাছাড়া আমাদের সুখ-দুঃখের অনুভুতি, হাসি-কান্না, ছোটদের স্নেহকরা, সত্যবাদীকে পছন্দ করার মত বিষয়গুলো তো সৃষ্টির শুরু থেকেই চলে আসছে। পুরাতন বলে কি এগুলো আমরা পরিহার করি? অথবা নতুন রোগ বলে কেউ কি এইডসকে স্বাগতম জানায়? তাই পুরাতন কোন কিছু বর্তমান যুগের জন্য ভাল নয় এবং নতুন বলে কোন কিছু ভালো হবে এরও কোন যৌক্তিক ভিত্তি নেই।

    এবার আসা যাক আরো কিছু বাস্তবিক যুক্তির আলোচনায়। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের উদ্ভব হয়েছিল চার্চের শোষণ নির্যাতনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার (Negative Reaction) ফল স্বরুপ। কিন্তু কোনো ঠিক বা শুদ্ধ মতবাদ কখনো পরিবেশের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া থেকে জন্ম নিতে পারে না। কারন ঐ পরিবেশ-পরিস্থিতি যদি সরিয়ে ফেলা হয় বা ভিন্ন রকম হয় তাহলে ঐ মতবাদের সমস্ত ধারনা (Concept) অগ্রহনযোগ্য বা বাতিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ ধরা যাক চার্চের শাসনে যদি ইউরোপে শান্তি বিরাজ করতো তাহলে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা সেখানকার মানুষের কাছে থাকত সম্পূর্ণ অগ্রহনযোগ্য। অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ কোন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠেনি।

    সর্বজন স্বীকৃত ও প্রমানিত ঈসা (আঃ) এর উর্ধ্ব আরোহণের পর ঈঞ্জিলের বার বার সংস্করণ করা হয়। ফলে এর মধ্যে খ্রিস্টান যাজকেরা তাদের মনগড়া মতবাদ, চিন্তা-ভাবনা ঢুকিয়ে এর মৌলিকত্ব নষ্ট করে ফেলে। ফলে এটি হয়ে ওঠে আরেকটি মানুষের তৈরি রাষ্ট্র বা সমাজ পরিচালনার দলিল। তাই ধর্মনিরপেক্ষবাদী বিপ্লবের পর আরেকটি মানুষের তৈরি ব্যাবস্থাই গ্রহন করা হয়। নতুন উৎসও সেই মানব সৃষ্ট মতবাদ। যার মধ্যে ভুল ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ইউরোপে মূলতঃ কোন পরিবর্তন আসেনি। কারণ একটি মানুষের তৈরি ব্যাবস্থা পরিবর্তিত হয়ে আর একটি মানুষের তৈরি ব্যাবস্থা এসেছে। এছাড়া খ্রিষ্টান ধর্মের অভিজ্ঞতা দিয়ে সব ধর্মকে বিচার করা যৌক্তিক নয়। এবং বাকি সব ধর্মে সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত বাণী বিকৃত হয়েছে এ ধারণাও ঠিক নয়। কারণ ইসলাম ধর্মের কুরআনই তার বাস্তব প্রমাণ। কুরআনের আদর্শ বাস্তবায়নের ফলে ইউরোপের মতো অন্ধকারাচ্ছন্ন আরব ঐ সমকালীন সময়েই ১৪০০ বছরের এক স্বর্ণালী সভ্যতার নিদর্শন হয়ে আছে। খিলাফতের শাসনামলে এ রাষ্ট্র জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সাংস্কৃতিক উতকর্ষতার অনবদ্য এক উদাহরণ। কিন্তু আজকের মুসলিম বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায় কুরআন-সুন্নাহর আদর্শ ভিত্তিক সেই রাষ্ট্র ব্যাবস্থার অনুপস্থিতিতে পর্যাপ্ত সম্পদ হাতে থাকা সত্ত্বেও মুসলিমরা আজ দরিদ্র পীড়িত, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-অর্থনীতির দিক থেকে পিছিয়ে পরা এক জাতি। তাই আবারো সারা বিশ্বের মুসলিমরা ইসলামী আদর্শিক রাষ্ট্র ব্যাবস্থা ফিরিয়ে আনতে সোচ্চার।

    আমেরিকা বা ব্রিটেনে প্রথম সংবিধান প্রণয়ন ও গ্রহণকালে সেখানকার সমাজে সমকামিতা প্রচন্ডভাবে ঘৃনা করা হতো, আর পর্ণগ্রাফির কথা তো কল্পনাই করা যেত না। কিন্তু সে সময়ের সংবিধান প্রনেতারা যদি আজকে দেখতেন, তাদের সংবিধান অনুসরণ করে সমকামীরাই আজ সহজে পার্লামেন্ট সদস্য হচ্ছে। পর্ণগ্রাফি বিস্তরভাবে ছড়ানো হচ্ছে সমাজে। এবং ব্রিটেনে দশ লক্ষেরও বেশি নাগরিক বিভিন্ন অপরাধে জেলের মধ্যে রয়েছে। এসব অনুধাবন করার ক্ষমতা তাদের থাকলে তারা এ সংবিধান ভিন্নভাবেই লিখতেন। অর্থাৎ এ থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় মানুষের সীমিত জ্ঞানের পরিধি দিয়ে এবং ভবিষ্যৎ বাস্তবতা বিশদ ও ঠিক ভাবে বুঝতে পারার অক্ষমতার কারণে মানুষের তৈরী জীবন বিধান দিয়ে সমাজ কখনো সর্বযুগোপযোগী ব্যাবস্থা সহকারে শান্তিপূর্ণভাবে চলতে পারে না।

    ধর্মনিরপেক্ষতা মানুষের সহজাত প্রকৃতি বা স্বভাব বুঝতেও ব্যার্থ হয়েছে। একটু লক্ষ করলেই বোঝা যায় পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের যে কোন মানুষ বড় কোন শক্তি বা তার চেয়ে চিন্তা-ভাবনার দিক থেকে অধিকতর শ্রেষ্ঠ মনে করে তার আনুগত্য প্রকাশ করতে চায় যেমন- কেউ সূর্য, চন্দ্র, বৃহৎ গাছ, আগুন। আবার কেউ কেউ তার চেয়ে উন্নত কোন মানুষের চিন্তার পুজারী যেমন মার্কস ও লেলিনবাদীরা। কিন্তু সমস্যাটি ঘটে তখন, যখন বস্তু ও মহাজগতের প্রকৃত সৃষ্টিকর্তার উপাসনা না করে মানুষ কোন সৃষ্ট বস্তুর আনুগত্য করে। সৃষ্টিকর্তার উপাসনা করার তার সহজাত প্রবৃত্তিকে ভুলভাবে নিবৃত করতে চায়। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মানুষের কাছে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও তার উপাসনা করা বা না-করার ব্যাপারে কোন ঠিক ও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি। পশ্চিমের মানুষের আধ্যাত্মিক চিন্তার খোরাক যোগাতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ চুড়ান্তভাবে ব্যর্থ। তাই দেখা যায় অনেক অর্থ-বিত্তের মাঝেও বিষণ্নতা ও মানসিক রোগ পশ্চিমে মহামারি আকার ধারন করছে। সর্বোপরি সবচেয়ে বড় শক্তিধর সৃষ্টিকর্তার উপর মানুষের যে নির্ভরতা বা তার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার মানুষের যে সহজাত আকাঙ্ক্ষা তা মূলতঃ সৃষ্টিকর্তার হুকুম বা সামগ্রীক জীবন বিধান মান্য করারই নির্ভরতা বা মনস্ত্বাত্ত্বিক ক্ষুধা। তাই মানুষ সহজাতভাবেই সৃষ্টিকর্তার জীবন ব্যাবস্থা ব্যাক্তিগত জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ও মানতে চায়। এবং তা মান্য করেই প্রশান্তি লাভ করতে পারে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মানুষের জীবনের এই সকল মৌলিক চাহিদার যোগান দিতে সম্পূর্ণরুপে ব্যার্থ হয়েছে।

    ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বিপ্লবে সৃষ্টিকর্তার ধর্মকে অস্বীকারকারী গোষ্টির সঙ্গে ধর্মকে বা সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাসকারী চিন্তাবিদদের যে কম্প্রমাইজ বা আপোষ হয়েছিল সেটিও ছিল ভিত্তিহীন ও অযৌক্তি। কেননা দুটি সাংঘর্ষিক বা বিপরীতমূখী বিষয়ের মধ্যে কখনো আপোষ হওয়া অসম্ভব। উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। যেমন এক দল লোক বলল, ঢাকা নামে একটি শহর আছে। আরেক দল লোক বলল, ঢাকা নামে কোন শহর নাই। তখন তাদের মধ্যে কম্প্রমাইজ হয়ে এর মাঝামাঝি কোন মতে পৌছান হয়, তাহলে সে সমাধান হবে সত্য বিবর্জিত। তাই সৃষ্টিকর্তা আছে, না সৃষ্টিকর্তা নেই এ দুটির মাঝে কম্প্রমাইজও কোন ঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। কারণ এ দুটোর যে কোন একটি বাস্তবতা সত্য ধারণ করে। তাই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মহাজগতের সাথে সম্পৃক্ত, মানুষ ও সমাজের সাথে সম্পৃক্ত এই সত্যকে বা এই বিষয়টিকে যখন মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও রাষ্ট্র থেকে আলাদা রাখতে চায় অযৌক্তিকভাবে। সৃষ্টিকর্তা কি শুধু মানুষের ব্যাক্তিগত জীবনের সমস্যা সমাধান দিতে পারেন, তিনি কি সমষ্টিগত জীবনের সমাধান দিতে পারেন না? প্রত্যেকটি মানুষকে সৃষ্টিকর্তার বিষয়ক এ মৌলিক প্রশ্নের ঠিক উত্তর না দিলে, তা মানুষের জীবনে ও সমাজে অসঙ্গতি, অসামঞ্জস্যতা, স্ব-বিরোধীতা ও অনিয়ম ছাড়া কিছুই দিতে পারেনা। কারণ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা মানুষ এবং সমাজের ব্যাপারে কোনটি ভালো কোনটি খারাপ চুড়ান্তভাবে বলতে পারেনা। সুখ, প্রশান্তি ও তৃপ্তির ধারণায় থাকেনা কোন ঐক্য। ফলে সৃষ্টি হয় দিধা-দ্বন্দ্ব (confusion) ও অসামঞ্জস্যতা (contradiction)। সত্য ও মিথ্যার কম্প্রমাইজ তাদের জীবনে নিয়ে আসে চুড়ান্ত বিভ্রান্তি। এর প্রতিফলন আমরা ধর্মনিরপেক্ষ জাতিগুলোর নীতি প্রণয়ন ও জীবন পদ্ধতি (life style) এর মধ্যেও স্পষ্ট দেখতে পাই। পাশাপাশি আমরা দেখতে পাই মানুষের স্বভাবের সঙ্গে মানানসই ব্যাক্তিগত জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সৃষ্টিকর্তার আদেশ নিষেধ মেনে জীবন যাপনের ব্যাবস্থা (System) শুধু ইসলামই দেয়। এখানে ভালো-মন্দ শরিয়া আইনের মাধ্যমে স্থায়ী ভাবে নির্দিষ্ট, সুস্পষ্ট এবং যা বাস্তবায়ন যোগ্য। এর প্রমাণ হলো ইসলামী খিলাফতের ১৪০০ বছরের ইতিহাস।

    রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করার পরই সেখানে বিপ্লব (Industrial Revolution) ঘটার পর অর্থনৈতিক ও টেকনোলজির উন্নয়ন ঘটেছে। এই উদাহরন পশ্চিমারা অনেক মুসলিমকে বোঝানোর চেষ্টা করছে এখনো। কেউ কেউ ভুল করে এ মতবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে। কিন্তু আসল কথা হলো যে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার স্লোগান নিয়ে যে উন্নয়নের কথা তারা বলেছিল তার বাস্তবায়ন কি আজও ঘটেছে? যতটুকু ঘটেছে সে বস্তুবাদী উন্নয়ন তাদের আজ কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছে? ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ধারণ করার পর যে পুঁজিবাদী ও ভোগবাদী জীবন যাপনের দিকে তারা ধাবিত হয়েছে সে কারণে সারা বিশ্ব থেকে অন্যান্য জাতির সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়ার কৌশল তারা অবলম্বন করেছে। সৃষ্ট হয়েছে উপনিবেশবাদ, নব্য উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের। অন্যান্য জাতিগুলোকে অসাম্য ও পরাধীনতার মধ্যে ঠেলে দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা কি নিজেদের সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে? পৃথিবীর অধিকাংশ পুঁজির মালিক এখন গুটি কয়েক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী। সম্পদশালী পুজীর মালিকরাই তাদের স্বার্থরক্ষাকারীদের তাদের শাসন ক্ষমতায় বসায়। চার্চের শাসনামলের মতো ইউরোপের মানুষ এখনো প্রচন্ড রক্ষণশীল। অভিজাত শ্রেণীর সামাজিক কাঠামোর (Aristocratic Social Class Structure) কারণে এখনো এ অভিজাত শ্রেণীর মানুষেরা জনগণের কোন ম্যানডেট ছাড়াই বৃটেনের লর্ডসভার সদস্য পদ লাভ করে। শ্রমিক শ্রেণীর মানুষেরা এখনো প্রচন্ড ভোগান্তি ও বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষবাদী এই বিপ্লব সংখ্যা গরিষ্ট মনুষের এই দুর্ভোগ কোন উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে পারেনি। এখনো সংখ্যা গরিষ্ট মানুষ অর্থনৈতিক দাসত্বের মধ্যেই রয়েছে। এর উদাহরন হলো- ২০০৭ সালে ও আমেরিকাতে আড়াই (2.5) কোটি ভাসমান মানুষ বসবাস করে।

    অপর পক্ষে পশ্চিমের মানুষের সামগ্রীক জীবনের চিন্তা চেতনা ও সংস্কৃতিক কাঠামো আজ সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বে জর্জরিত। ধর্মনিরপেক্ষবাদ তাদের সমাজে সীমাহীন বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। শুধু বস্তুর মাঝে সুখ তথা ভোগের মাঝে সুখ এই মিথ্যা ধারণা, হতাশা ও বিভ্রান্তি ছাড়া কিছু দেয়নি। তাই আমরা যখন দেখি পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৪% এর ও কম আমেরিকায় বাস করে কিন্তু তারা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৩৫% এর ও বেশী সম্পদ ভোগ কর। এমনকি আমেরিকার মধ্যেও সেখানকার ১০% মানুষ সে দেশের ৯০% এরও বেশি সম্পদের মালিক। এবং সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই দারিদ্র সীমার নিচে বাস করে। আর সে দেশেরই পুঁজিবাদী শাসকগোষ্ঠি শুধু সম্পদ লুটের নেশায় পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতের প্রতি বৃদ্ধা আঙ্গুলি উচিয়ে গুচ্ছ বোমার আঘাতে হত্যা করে আফগানিস্তান ও ইরাকের লক্ষ লক্ষ আবাল বৃদ্ধ-বনিতাকে। এ দৃশ্য দেখে সচেতন মানুষেরা সত্যিই বিষ্ময়াভিভূত হয় না। দুঃখ ও শোকে এ ভ্রান্ত চিন্তা বহনকারীদের নিবারণের জন্য ফেটে পড়ে রাজপথে। যখন দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রে তরুণ রবার্ট হক্সিন্স বিখ্যাত হবার আশায় ৮ জনকে গুলি করে আত্মহত্যা করে, তখন সুস্পষ্ট জীবন ব্যাবস্থা পাওয়া জনগোষ্টি মোটেই অবাক হয়না। যখন দেখা যায় ব্যাক্তি স্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলে তারা মুখে ফেনা তুলে ফেলে অথচ ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদের সুতিকাগার রাষ্ট্রে (ফ্রান্স) ‘হিজাব’ নিষিদ্ধ করা হয় আইন করে; তখনও মোটেও আশ্চার্যান্বিত হওয়ার কিছু থাকেনা। যখন দেখা যায় ইউরোপ আমেরিকার নারীরা নিজের বাচ্চা ও স্বামীর চেয়ে পোষা কুকুরের প্রতি যত্নশীল তখন হতবাক হবার কিছুই নেই। কারন বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ভিত্তিহীন ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদী অযৌক্তিক চিন্তাই তাদের চিন্তা-ভাবনা ও জীবন পরিচালনার ভিত্তি। এই ভুল মতবাদের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা চিন্তা, ধারণা ও জীবন দর্শনই আজ তাদের পতনের শেষ প্রান্তে নিয়ে এসেছে।

    খান শরীফুজ্জামান সোহেল

  • সমাজ পরিবর্তনের জন্য কাজ করা মুসলিমদের অন্যতম দায়িত্ব

    সমাজ পরিবর্তনের জন্য কাজ করা মুসলিমদের অন্যতম দায়িত্ব

    সমাজ পরিবর্তনের জন্য কাজ করা মুসলিমদের অন্যতম দায়িত্ব। ইসলাম একজন মুসলিমকে কেবল কিছু ব্যক্তিগত ইবাদাতের দায়িত্ব দিয়ে ছেড়ে দেয়নি বরং সমাজের প্রতি তার দায়িত্বগুলোও সুস্পষ্ট করে দিয়েছে। তাই যখন সমাজে ইসলাম থাকেনা বরং মানবরচিত শাসনব্যাবস্থার ফলাফল হিসেবে সমাজের সর্বত্র বৈষম্য, জুলুম, বিশৃংখলা ছড়িয়ে পড়ে তখন এই সমাজ পরিবর্তন করে ইসলামিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ না করে একজন মুসলিমের চুপচাপ বসে থাকার অনুমতি নেই।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:

    তোমাদের মধ্যে কোন ব্যাক্তি অন্যায় কাজ হতে দেখলে সে যেন তার হাত দ্বারা তা প্রতিহত করে। তার এই সামর্থ্য না থাকলে সে যেন তার মুখ দ্বারা তা প্রতিহত করে। তার এই সামর্থ্যও না থাকলে সে যেন তার অন্তর দ্বারা তা প্রতিহত করে (ঘৃণার মাধ্যমে), আর এটা হলো দূর্বলতম ঈমান।(মুসলিম, তিরমিযী)

    রাসূলুল্লাহ (সা) আরও বলেন:

    যারা আল্লাহ’র হুকুম মেনে চলে আর যারা সেগুলোকে নিজের প্রবৃত্তির খেয়ালে লঙ্গন করে, (উভয়ে) যেন তাদের মত যারা একই জাহাজে আরোহণ করে। তাদের একাংশ জাহাজের উপরের তলায় নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে এবং অন্যরা এর নিচের তলায় নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। যখন নিচের লোকদের পিপাসা মেটানোর প্রয়োজন হয় তখন তাদেরকে জাহাজের উপরের অংশের লোকদের অতিক্রম করে যেতে হয়। (তাই) তারা (নিচতলার লোকেরা) নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে নিল, ‘আমরা যদি জাহাজের নিচের দিকে একটা ফুটো করে নিই তাহলে জাহাজের উপরের তলার লোকদের কোন সমস্যা করবোনা।’ এখন যদি উপরের তলার লোকেরা নিচতলার লোকদেরকে একাজ করতে দেয় তবে নিশ্চিতভাবেই তারা ধংসপ্রাপ্ত হবে। আর তারা যদি তাদেরকে একাজ থেকে বিরত রাখে, (তবে) তারা (উপরতলা) রক্ষা পাবে এবং এভাবে (জাহাজের) সবাই রক্ষা পাবে।(বুখারী)

    তাই কেউ ব্যক্তিগত ইবাদত ঠিকমতো চালিয়ে গেলো আর সমাজে যেসব অব্যাবস্থাপনা চলছে সে ব্যাপারে কিছু করলো না বা বলল না এটা কোন ইসলামী চিন্তা নয়। উপরোক্ত হাদীসদ্বয় থেকে এটা পরিষ্কার যে, সমাজে যখন জুলুম, অনাচার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে তখন ঐ সমাজে বসবাসরত মুসলিমদের জন্য ঐ সমাজের পরিবর্তন করার জন্য কাজ করা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। আর এ দায়িত্ব পালনে এগিয়ে না আসলে সবাই একসাথে শাস্তিযোগ্য হবে।

    রাসূললুল্লাহ (সা) বলেন:

    এক শহরের অধিবাসীদের উপর আল্লাহ তা’আলা শাস্তি প্রদান করেন। তাদের মধ্যে আঠারো হাজার লোক এমন ছিল যাদের আমল ছিল নবীদের আমলের সমতুল্য।” জিজ্ঞেস করা হলো। ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা)! কেন তবে তাদের উপর শাস্তি এসেছিল?’ রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন: এই কারণে যে, (বাকিদের পাপ কাজ করতে দেখেও) তারা আল্লাহ’র উদ্দেশ্যে বাকিদের উপর ক্রুদ্দ্বহতো না এবং তাদেরকে (পাপ কাজ থেকে) বারণ করত না।

    কায়েস ইবনে আবি হাযমের বরাত দিয়ে আবুদাউদে বর্ণিতঃ আল্লাহ’র প্রশংসা এবং গুণগান গাওয়ার পর আবু বকর(রা) বললেন,’হে মানুষ! তোমরা এই আয়াতটি পড় কিন্তু এর মর্মার্থ বোঝ না’, “হে ইমানদারগণ! তোমরা নিজেদের অন্তরকে পাহারা দাও; তোমরা যদি সঠিক পথে নিজেদের পরিচালিত করতে পার, তাহলে যারা বিপথে গেছে তারা তোমাদের ক্ষতি করতে পারবেনা।” (সূরা আল মায়িদাঃ ১০৫) আমি রাসূল(সা)-কে বলতা শুনেছি: যখন কোন জাতি পাপাচারে লিপ্ত হয় এবং কেউই তাদের প্রতিরোধ করেনা তখন আল্লাহ গোটা জাতির উপর শাস্তি নাযিল করেন যা তাদের সকলকে ছেয়ে ফেলে।(আবু দাউদ/৩৭৭৫)

    রাসূলুল্লাহ (সা) এর পবিত্র সীরাতের দিকে তাকালে দেখা যায় তিনি এমন একটি সমাজে এসেছিলেন যা ছিলো পুরোপুরি অন্ধকারাচ্ছন্ন, সব ধরণের অন্যায়, অত্যাচার, অনাচারে পরিপূর্ণ। ওই সমাজের লোকেরা মিথ্যা ইলাহদের পূজা করতো, ওজনে কম দিতো, এতিম ও দাসদের অধিকার বঞ্চিত করতো, কথায় কথায় যুদ্ধ আর হানাহানিতে মেতে উঠতো ইত্যাদি। এমনি এক পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর সাহাবীদের সাথে নিয়ে ঐ সমাজকে পরিবর্তনের কাজে ঝাপিয়ে পড়েন এবং সমাজের এসব অনাচারের বিরুদ্ধে কথা বলে সমাজকে ইসলামের দিকে জোরালোভাবে আহবান করেন। তিনি কেবল ব্যক্তিদেরকে সংশোধনে ব্যস্ত থাকেননি বরং পুরো সমাজ দেহটাকেই সুস্থ করার লক্ষ্যে সমাজের সব প্রচলিত মিথ্যা ধ্যান-ধারণা ও অনাচারের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম পরিচালনা করেছিলেন।
    অতএব, তাঁর অনুসরণে আমাদেরকেও বর্তমান ধ্বংসন্মুখ সমাজকে পরিবর্তন করার কাজে অংশগ্রহণ করতে হবে।

  • ইসলামের জন্য আন্দোলনকারী ভাইদের প্রতি

    ইসলামের জন্য আন্দোলনকারী ভাইদের প্রতি

    ইসলামের জন্য আন্দোলনকারী ভাইদের প্রতি,

    সৎপথের পথিকদের প্রতি আল্লাহ’র রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।

    সন্দেহাতীতভাবে আজকে মুসলিম উম্মাহ’র বজ্রকন্ঠ কাফির-যালিমসহ ইসলামের বিরুদ্ধবাদীদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরিয়ে দিয়েছে। তাকবীর ধ্বনিতে বার বার কেঁপে উঠছে তাদের মসনদসমূহ।

    দেরিতে হলেও এই আন্দোলনে তারা ভীত, প্রকম্পিত। মুসলিম উম্মাহ’র আল্লাহ (سبحانه و تعالى) ও তাঁর রাসূলের (صلى الله عليه و سلم) প্রতি ভালোবাসা এবং ইসলামের দুশমনদের প্রতি ঘৃণার প্রবলতায় আতঙ্কে আছে তারা।

    কিন্তু, আমাদের যে বিষয়টি বুঝতে হবে তা হল, ইসলাম এবং উম্মাহ’র স্বার্থে জ্বলে উঠা এই আগুন যেন কোনভাবেই যালিম সাম্রাজ্যের ফায়দার উৎস হয়ে না দাঁড়ায়।

    আমাদের বুঝতে হবে দীর্ঘ সময় পর পাওয়া এই আন্দোলনের সূচনা আমাদের নিকট আল্লাহ (سبحانه و تعالى) কর্তৃক রহমতস্বরূপ; যা কোনভাবেই যাতে ইসলামের শত্রুদের পক্ষে চলে না যায়।

    আপনারা ইতিমধ্যেই দেখেছেন, সরকার লং-মার্চের অনুমতি দেওয়ার নাটক দেখিয়ে আবার লং-মার্চে উপস্থিতদের বাধা প্রদানে হরতালের আয়োজন করে এবং তাঁর গুন্ডা বাহিনী দ্বারা তারা কিভাবে দ্বি-মুখি ব্যবহার দেখিয়েছে। এটা সুস্পষ্টভাবে এই উম্মাহ’র আন্দোলনকে ছিনতাইয়ের ঘৃণ্য চক্রান্ত ছাড়া আর কিছুই না।

    সুতরাং, এই সকল যালিমের কাছে ১৩/১৪ দফা দাবি জানানো অযাচিত নয় কি?

    প্রাণপ্রিয় রাসূল (صلى الله عليه و سلم) -এর অবমাননার বিচার এই উম্মাহর অধিকার। কিন্তু যারা এই উম্মাহ’র দৈনিক বিষয়সমূহ নিয়েই এতটুকু চিন্তিত থাকেনা, তাদের কাছ থেকে এই ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক।

    এইরকম অপমান এই প্রথম নয়; এর পূর্বেও রাসূল (صلى الله عليه و سلم) -কে অপমান করা হয়েছে এবং এই গণতান্ত্রিক শাসনব্যাবস্থা দ্বারা এর শাসকরা এই ধরণের জঘন্য অন্যায়কারীদের বাক-স্বাধীনতার নামে প্রশ্রয় দিয়ে যায়।

    এই কুফর শাসনব্যাবস্থার মাঝে ন্যায়-বিচার দাবি করা, ময়লা কাঁদার মাঝে পরিষ্কার পানযোগ্য পানি অনুসন্ধানের মতই বোকামী বৈ আর কিছুই নয়।

    হাসিনা-খালেদা বা অন্যান্য পুতুল শাসক দ্বারা গণতান্ত্রিক এই শাসনব্যাবস্থা ক্রমাগতভাবে আমাদের ন্যায়-বিচারের নামে কাঁচকলা দেখিয়ে যাচ্ছে এবং জেনেশুনে এই কুফরের মাঝে প্রবেশ অবশ্যই ইসলামে সম্মত নয়।

    সুতরাং, যালিমের কাছে যুলুমের বিচার না চেয়ে; আমেরিকা-ভারত কর্তৃক এই আন্দোলন ছিনতাইয়ের পূর্বেই দালাল শাসক ও এসব দালাল তৈরির কারখানা গণতান্ত্রিক শাসনব্যাবস্থা উৎখাত করুন।

    মরক্কো থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত জেগে উঠা খিলাফতের দাবিই মুসলিম উম্মাহ’র একমাত্র ও যৌক্তিক দাবি।

    সুতরাং, ১৩/১৪টি দাবি নয়, ইসলামী রাস্ট্রব্যাবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটিমাত্র দাবিই আজ মুসলিম উম্মাহ’র প্রাণের দাবি।

    একটাই দাবি,
    একটাই যুদ্ধ,
    একটাই লক্ষ্য,
    খিলাফাহ রাস্ট্রব্যাবস্থা।

    “যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ তাদের অভিভাবক। তাদেরকে তিনি বের করে আনেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে। আর যারা কুফরী করে তাদের অভিভাবক হচ্ছে তাগুত। তারা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। এরাই হলো দোযখের অধিবাসী, চিরকাল তারা সেখানেই থাকবে।” (আল বাকারাঃ ২৫৭)

    প্রথম প্রকাশঃ ৬ই এপ্রিল ২০১৩

  • রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রতি ভালোবাসা ও নাস্তিকতার মূল উৎপাটন

    রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রতি ভালোবাসা ও নাস্তিকতার মূল উৎপাটন

    আল্লাহ্ তা’আলা রাসূল (সা) সম্পর্কে বলেন,

    হে নবী! আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি। (আহজাব: ৪৫)

    রাসূল (সা) এর প্রতি ভালবাসা বলতে বোঝায় তাকে মান্য করা এবং তাকে সৃষ্টি কূলের মাঝে সর্বশ্রেষ্ট মনে করা। আল বাইদাওয়ী বলেন “ভালবাসা হচ্ছে মান্য করার ইচ্ছা করা”। আরবি ভাষায় ভালবাসা মানে কাউকে সু-উচ্চে তুলে ধরার ইচ্ছা করা।

    ভালোবাসা হচ্ছে কোন কিছুর প্রতি তাড়না যা মানুষের সেই বিষয়ের প্রতি আচরণ নির্ধারণ করে। এই তাড়না হতে পারে প্রবৃত্তিগত যার সাথে কোন দৃষ্টিভঙ্গীর সম্পর্ক নেই, যেমন: মানুষের তাড়না মালিকানার প্রতি, বেঁচে থাকার জন্য, ন্যায়ের জন্য, পরিবার-সন্তানের জন্য ইত্যাদি।

    আবার তাড়না হতে পারে কোন নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গীর ভিত্তিতে যা তার আচরণকে সুগঠিত করবে। তাই ইসলাম রাসূল (সা) এর প্রতি ভালবাসাকে ফরয করেছে। এবং এই ব্যপারে দলীল হল:

    আল্লাহ্ বলেন,

    বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের পরিবার, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান- যাকে তোমরা পছন্দ কর – আল্লাহ্, তার রাসূল ও তার রাহে জেহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ্ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না। (তাওবা: ২৪)

    ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে তার সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

    “শপথ ঐ সত্ত্বার যার হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের কেউই ঈমানদার হবে না যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা ও সন্তান হতে অধিকতর প্রিয় হব”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩]

    সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

    “তোমাদের কেউই ঈমানদার হবে না যতক্ষণ আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান ও সকল মানুষ হতে প্রিয় না হই”।
    [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৭৮]

    হযরত ওমর (রা) একবার বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আপনি আমার নিকট আমার জীবন ব্যতীত অন্য সমস্ত বস্তু হতে অধিক প্রিয়।” হুযুর (সা) বললেন, “কোন ব্যাক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবেনা যতক্ষণ পর্যন্ত আমার মহব্বত তার নিকট তার জীবনের চাইতেও বেশী না হইবে । হযরত উমর (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! এখন আপনি আমার নিকট আমার জীবনের চাইতেও বেশী প্রিয়”। (বুখারী)

    রাসূল (সা) বলেছেন, মানুষের হাশর হবে তার সাথে যার সাথে তার মহব্বত রয়েছে । (মুসনাদে আহমাদ)

    উপরোক্ত আয়াত ও হাদীস থেকে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি মহব্বত ও ভালোবাসা পোষণ না করলে ঈমানদার বলে কেউ বিবেচিত হবে না। অতএব ঈমানের অনিবার্য দাবী হল- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসা।

    আমরা যদি সাহাবাদের (রা) রাসূলের প্রতি ভালবাসার দিকে তাকাই তাহলে দেখব তারা কতটা উৎসাহী ছিলেন রাসূল (সা)-এর প্রতি ভালবাসা দেখাতে, তার (সা) আদেশ মানতে, তারা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করতেন ভালবাসার এই দায়িত্ব পালন করতে।

    উহুদের যুদ্ধের বর্ণনা দিতে গিয়ে আনাস (রা) বর্ণনা করেন, “যখন সকলে রাসুল (সা) কে রেখে চলে যাচ্ছিল, আবু তালহা (রা) তখন বর্মের মত রাসুল (সা) এর সামনে দাড়িয়ে ছিল। আবু তালহা ছিলেন একজন অভিজ্ঞ এবং শক্তিশালী তীরন্দাজ যার ধনুক ছিল শক্ত ও প্রসারিত। সেদিন তিনি দু থকে তিনটি ধনুক ভেঙে ফেলেন। যখন কেউ রাসুল (সা) এর সামনে দিয়ে পাত্র ভর্তি তীর নিয়ে যেত রাসুল (সা) তা আবু তালহার জন্য দিয়ে যেতে বলছিলেন। যখন রাসুল (সা) শত্রুদের দেখার জন্য মাথা তুলছিলেন আবু তালহা বলেন “আমার পিতা মাতা আপনার উপর কুরবান হোক, আপনার মাথা শত্রুদের দেখতে দিবেন না, আমার গলা এবং বুক আহাত হোক তার পরও যেন আপনার গায়ে একটি তীরও না লাগে।” (বুখারী ও মুসলিম)

    সাহাবারা রাসূলকে (সা) এত ভালবাসতেন এবং তার রক্ষা করার জন্য জীবন দিয়ে দিতেন এমনকি তাদের শিশুদেরকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে বলতেন যাতে রাসুলের (সা) গায়ে যেন নুন্যতম আঘাত না লাগে। মুসলিমরা রাসুল (সা) কে সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন কারন তিনিই হচ্ছেন হাশরের ময়দানে শাফায়েত কারী।

    আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন: “আমি রোজ কিয়ামতে মানুষের সরদার-নেতা হব। যে দিন মানব মণ্ডলী আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে এবং সূর্য থাকবে মাথার খুব কাছে। মানুষের দুশ্চিন্তা ও বিপদের চরম পর্যায়ে পৌঁছবে। এমন বিপদ যা তাদের শক্তির বাহিরে এবং সহ্য করাও বড় কঠিন হয়ে পড়বে। ওরা একে অপরকে বলবে: তোমরা একজনকে পাওনা যিনি তোমাদের প্রতিপালকের নিকট তোমাদের জন্য সুপারিশ করবেন? তারা একে অপরকে বলবে: চল আদম (আ) এর নিকট। সকলে আদম (আ) এর নিকটে গিয়ে বলবে: হে আদম (আ) আপনি মানুষের পিতা। আল্লাহ আপনাকে তাঁর নিজ হাতে সৃষ্টি করে আপনার মাঝে তাঁর রুহ ফুঁকেছেন। ফেরেশতাগণকে নির্দেশ করেছেন আর তাঁরা আপনাকে সেজদা করেছেন। আপনার রবের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আমরা কি অবস্থায় আপনি দেখেন না!? আমরা কী চরম পর্যায় পৌঁছেছি দেখেন না? বাবা আদম (আ) বলবেন: নিশ্চয়ই আমার রব-প্রতিপালক আজ এমন রাগ হয়েছেন যা ইতিপূর্বে কখনো রাগ হননি। আর এর পরেও কখনও এরূপ রাগ হবেন না। আল্লাহ তা‘য়ালা আমাকে গাছের ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন আর আমি তার নাফরমানি করেছিলাম। নাফসী নাফসী (আমি নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত আছি) তোমরা অন্য কারো নিকটে যাও। তারা যথাক্রমে: নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা (আ)- এর নিকটে যাবে। কিন্তু সকলে ওজর পেশ করবেন। তাঁরা সকলে বলবেন: নিশ্চয়ই আমার রব আজ এমন রাগ হয়েছেন যা ইতিপূর্বে কখনো রাগ হন নাই এবং এরপরেও কখনো এরূপ রাগ হবেন না। নাফসী নাফসী (আমি নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত আছি)। অত:পর ঈসা (আ) বলবেন: তোমরা মুহাম্মাদ (সা)-এর নিকটে যাও। তারা সকলে আমার নিকটে আসবে। অত:পর বলবে: হে মুহাম্মাদ (সা) আপনি আল্লাহর রাসূল, শেষ নবী, আল্লাহ আপনার আগের-পরের সকল পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন। আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে সুপারিশ করুন। তখন আমি অগ্রসর হয়ে আরশের নীচে যেয়ে আমার রবের জন্যে দীর্ঘ সেজদায় পড়ে যাব। অত:পর আল্লাহ আমার প্রতি তাঁর প্রশংসা ও শুকরিয়া করার জন্য অন্তর খুলে দিবেন ও এমন ইলহাম (আল্লাহ কর্তৃক অন্তরে প্রদত্ত জ্ঞান) দান করবেন যা আমার পূর্বে আর কারো জন্য খুলে দেননি। অত:পর বলা হবে: হে মুহাম্মাদ (সা)! তোমার মাথা উঠাও। চাও দেয়া হবে। সুপারিশ কর গ্রহণ করা হবে। তখন আমি মাথা উঠাব এবং বলব: হে আমার প্রতিপালক! আমার উম্মত! আমার উম্মত! বলা হবে: হে মুহাম্মাদ (সা)! তোমার উম্মতের যাদের কোন হিসাব নেই তাদেরকে জান্নাতের ডান দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাও। তারা মানুষের সঙ্গে অন্য সকল দরজায় অংশীদার। যাঁর হাতে মুহাম্মাদের জীবন! নিশ্চই জান্নাতের দরজার দূ পাল্লার মধ্যের দূরত্ব মক্কা ও হাজার বা মক্কা ও বুছরার দূরত্বের সমান।” (বূখারী হাদীস নং ৪৭১২; মুসলিম হাদীস নং ১৯৪ শব্দ তারই)

    যে রাসূল তার উম্মতকে ছাড়া জান্নাতে যাবেন না মুসলিমরা তাকে (সা) প্রাণের চেয়ে বেশি ভালবাসবে না তো কাকে ভালবাসবে। তাই প্রত্যেক মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক হল রাসূল (সা) নাম শুনলে তার উপর সালাম নিবেদন করা কারণ, তিরমিযীর একটি বর্ণনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

    “ঐ ব্যক্তির নাক ধুলি ধুসরিত হোক যার কাছে আমার উল্লেখ করা হয় কিন্তু সে আমার উপর সালাত পাঠ করেনি”।

    কিন্তু বর্তমানে বাংলার মাটিতে কী জঘন্য ভাবে দশকের পর দশক কিছু কুলাঙ্গার আমাদের প্রাণ প্রিয় রাসুল (সা) কে নিয়ে, তার পরিবার কে নিয়ে, সাহাবা (রা) কে নিয়ে, ইসলামের বিধি বিধান ও মুসলিমদের নিয়ে একের পর এক কুৎসা রটাচ্ছে।

    (সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে অবশ্যই সবচেয়ে নীচ সৃষ্টি হচ্ছে যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচারন করে)
    [সূরা আল-মুজাদিলাহ্: ২০]

    এবং এটা পানির মত পরিষ্কার যে আমাদের শাসকরা প্রতিনিয়ত এদের রক্ষা করার কলাকৌশল ব্যবহার করছে এবং নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ব্যবহার করছে। বস্তুত এই শাসকরাই আমেরিকা-ব্রিটেন-ভারতের সুস্পষ্ট মদদে তাদের মতাদর্শে মোহিত হয়ে এই কুলাঙ্গারদের তৈরি করছে আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্তার মাধ্যমে। যেখানে ইসলামকে শুধু মাত্র ধর্মীয় রীতিনীতি বানিয়ে ইসলামকে সমাজের, রাষ্ট্রের সমস্যা সমাধানের জন্য অক্ষম হিসেবে দেখান হচ্ছে এবং সকল নাস্তিক কুলাঙ্গারদের এর জন্য লেলিয়ে দেয়া হয়েছে। আর তাদের একের পর এক আক্রমণে মুসলিম উম্মাহর ভালবাসার হৃদয় একের পর এক ক্ষত বিক্ষত হচ্ছে। আজ আবারও আমেরিকা-ব্রিটেন-ভারতের সুস্পষ্ট মদদে এই নাস্তিকরা আস্ফালন দেখাচ্ছিল।

    মুলতঃ তাদের মুখ থেকে যা বাহির হয় তাই ঘৃণ্য; তারা যাই বলে তাই মিথ্যা।
    (সূরা আল-কাহ্ফ)

    আজ মুসলিম উম্মাহর তরুণ-বৃদ্ধ সকলে যখন আমেরিকা-ব্রিটেন-ভারতের সুস্পষ্ট মদদপুষ্ট এই নাস্তিকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ঠিক তখনই হাসিনা-খালেদারা আবার ইসলামের এই আন্দোলনকে নিজেদের পকেটে ভরে গণতন্ত্রের নষ্ট নির্বাচনের রাজনীতির মাধ্যমে রাসুল (সা) এর প্রতি আমাদের ভালবাসাকে কলুষিত করতে চেষ্টা করছে।

    হে মুসলিম উম্মাহ,

    এই হাসিনা-খালেদারা কখনই ইসলামের ভাল চায়নি তারা সবসময় বাক-স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ইত্যাদি কুফরি মতবাদের নামে আমেরিকা-ব্রিটেন-ভারতের সুস্পষ্ট মদদপুষ্ট এই সব নাস্তিকদের লালন করেছে। তাই আজ আপনাদের এই আন্দোলনকে তাদের স্বার্থে ব্যবহৃত হতে দিবেন না। বরং এরাই হচ্ছে আমেরিকা-ব্রিটেন-ভারতের সুস্পষ্ট মদদপুষ্ট নাস্তিকদের রক্ষক বা নাস্তিকদের মাওলা। তাই আজ আপনাদের আন্দোলন হতে হবে আমেরিকা-ব্রিটেন-ভারতের সুস্পষ্ট মদদপুষ্ট হাসিনা-খালেদার বিরুদ্ধে এবং খিলাফত প্রতিষ্টার পক্ষে যাতে বাংলার মাটিতে আর কেউ যেন রাসুল (সা)-এর অপমান করতে না পারে।

    হযরত উমর (রা) বলেন, “আল্লাহর শপথ! কুরআন দিয়ে আল্লাহ যতটুকু রক্ষা ও প্রতিহত করেন, রাষ্ট্রশক্তির (খিলাফতের) মাধ্যমে আল্লাহ তার চেয়েও বেশি রক্ষা ও প্রতিহত করেন।” [কানজুল উম্মাল, হাদীস নং: ১৪২৮৪, তারিখে ইমাম আল-খাত্তাবি]

    যদি আজ বাংলাদেশে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত থাকতো তাহলে মুসলিমদের এমন অপমানজনক ও দুর্দশাগ্রস্ত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না, নাস্তিকরা উম্মাহর রাসূল (সা) এর বিরুদ্ধে এমন ঘৃণ্য কর্মকান্ড করার দুঃসাহস দেখাতে পারতো না এবং হুঙ্কার দিয়ে শাহবাগে তাদের উপস্থিতি দেখাতে পারতনা, কারণ খিলাফত, ইসলাম ও মুসলিমদের রক্ষাকারী নয় বরং এটা হচ্ছে ঢালস্বরুপ ও দূর্ভেধ্য নিরাপদ এক দূর্গ। প্রিয় মুসলিমগণ! উনিশ শতকের শেষদিকে, ১৮৯০ সালে, ফরাসী লেখক “মারসী ডি বোরেজ” একটি নাটক তৈরি করে ফ্রেঞ্চ কমেডি থিয়েটারে প্রচারের জন্য, যার সমস্ত কাহিনীই রচনা করা হয়েছিল আল্লাহ্ রাসূল (সা) কে অবমাননা করে। বিষয়টি যখন খলীফা সুলতান ২য় আব্দুল হামিদ (রহ) এর কানে গেল, তখন তিনি সাথে সাথে ফরাসী সরকারকে সাবধান করে দিলেন যাতে এ নাটকটি নিষিদ্ধ করা হয় এবং কোন থিয়েটারে যেন মঞ্চস্থ না হয়। সুতরাং, ফরাসী সরকার তা করতে বাধ্য হয় এবং খলীফার কথামত নাটকটি প্রচার নিষিদ্ধ করে এবং খলীফার নিকট চিঠিতে উত্তর পাঠায়: “মহামান্য সুলতানের ইচ্ছামত আমরা যে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি, তাতে বিশ্বাস আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও উন্নত হবে”, এবং যখন নাটকটির নির্মাতা ফ্রান্সে সুযোগ না পেয়ে ইংল্যান্ডের অ্যালসিওম থিয়েটারে মঞ্চস্থ করার প্রস্তুতি নেয়, এবং যখন বিষয়টি সুলতান আব্দুল হামিদের কানে পৌঁছায়, তিনি সাথে সাথে নাটকটি নিষিদ্ধ করার হুমকি দেন এবং তা নিষিদ্ধ করা হয়। শুধু তাই নয় তৎকালীন পরাশক্তি বৃটেন এ ঘটনার জন্য খলীফার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে।

    দেখুন যেখানে বিশ্বের পরাশক্তিরা খলীফার ভয়ে থাকত সেখানে নাস্তিকরাতো চুনোপুটি।

    তাই আমি আপনাদের সজাগ করছি যে,

    হাসিনা-খালেদার দলীয় স্বার্থে ইসলামের এই আবেগকে ব্যবহার করবেন না, হাসিনা বা খালেদার বিজয় কখনই ইসলামের বিজয় নয় বরং তাদের বিজয় আমেরিকা-ব্রিটেন-ভারতের বিজয়। কারণ তারা উভয়ে একই মুদ্রার দুই পিঠ এবং তারা উভয়েই বাংলাদেশে আমেরিকা-ব্রিটেন-ভারতের স্বার্থের রক্ষক এবং মুসলিমদের শত্রুদের বন্ধু। আল্লাহ্‌ বলেন,

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ্ জালেমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না। (মায়েদা: ৫১)

    তাই মুসলিমদের এই জাগরণ হতে হবে খিলাফতের উত্থান। পশ্চিমারা ক্রসেড ঘোষণা করেছে এবং এই ক্রসেড ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে; সুতরাং দ্বীন ইসলাম, রাসূল (সা) এবং উম্মাহ্’র পক্ষে অবস্থান নিন এবং জেনে রাখুন এ অবস্থার পরিবর্তন ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয় যতক্ষণ পর্যন্ত না পূর্বে যেভাবে সমাধান হয়েছিল ঠিক একইভাবে সমাধান না করা হয় অর্থাৎ নবুয়্যতের আদলে খিলাফায়ে রাশেদাহ্ প্রতিষ্ঠিত না হয়। সুতরাং খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগকারীদের সাথে যোগ দিন, তাদের সমর্থন করুন, একমাত্র খিলাফত উম্মাহ্ ও তার সম্মান রক্ষা করবে এবং যালিমদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।

    আল্লাহ তা’আলা বলেন,

    হে ঈমানদারগণ, আল্লাহ্ ও তার রাসূলের ডাকে সাড়া দাও, যখন তোমাদের সে কাজের প্রতি আহবান করা হয়, যা তোমাদের মাঝে জীবনের সঞ্চার করে। (আনফাল: ২৪)

  • আপনার নিকট আল্লাহ’র অস্তিত্বের স্বপক্ষে কোন প্রমাণ আছে কি?

    আপনার নিকট আল্লাহ’র অস্তিত্বের স্বপক্ষে কোন প্রমাণ আছে কি?

    যারা স্রষ্টাতে বিশ্বাস করেনা, তারা প্রায়ই বলে থাকে স্রষ্টাতে বিশ্বাস একটি অন্ধ বিশ্বাস অর্থাৎ স্রষ্টাতে বিশ্বাস কোন যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। আরও বলা হয় যে, স্রষ্টাতে বিশ্বাস সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক।

    স্রষ্টাতে বিশ্বাস কি বিজ্ঞানভিত্তিক কি না বিচার করার আগে দেখা যাক বিজ্ঞান আসলে কী? আমাদের চারপাশে মহাবিশ্ব, তার অধ্যয়ন ও পর্যবেক্ষণই বিজ্ঞান। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের মাধ্যমে বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করে মহাবিশ্বের কর্মধারা।

    এটা বিজ্ঞানের আলোচ্য বা বিবেচ্য বিষয় নয় যে, কে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন বা এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির উদ্দেশ্য কি। বিজ্ঞান শুধুমাত্র মহাবিশ্বের কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করে। সেক্ষেত্রে, স্রষ্টা আছেন কিনা তার উত্তর পেতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা ভুল। বরং এ প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ ব্যবহার করা উচিত।

    সূর্য, চন্দ্র, তারা, গ্রহ, জীবজন্তু, মানুষ ইত্যাদি বস্তু দেখলেই এদের কতগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই। যেমনঃ তাদের নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধ আকৃতি আছে, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, ওজন ইত্যাদি গন্ডি আছে; এরা সকলেই নির্ভরশীল, দুর্বল এবং পরমুখাপেক্ষী। এসব কিছুই নির্দেশ করে যে এরা নিজেরা নিজেদের সৃষ্টি করেনি বা সেই যোগ্যতাও তাদের নেই। বরং তাদের উপর এসব বৈশিষ্ট্য আরোপ করা হয়েছে। এদের প্রত্যেকক্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে একজন স্রষ্টা আছেন।

    ইসলাম মানুষকে যৌক্তিক প্রমাণের মাধ্যমে আল্লাহ’র অস্তিত্বের স্পষ্ট ধারণা দিয়েছে। কুর’আনের শত শত আয়াতে মানুষকে এই মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের জন্য জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহ’র অস্তিত্বের পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। সূরা আল ইমরানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “দেখুন! আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে দিবা-রাত্রির আবর্তনে অবশ্যই চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন রয়েছে

    আজকে আমাদের আল্লাহ’র অস্তিত্বের উপর ততটুকুই বিশ্বাস রাখি যা আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পূর্বপুরুষদের নিকট হতে পেয়েছি। আমাদের এই বিশ্বাস কোন বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। ফলে, আমাদের জীবনের উপর এই বিশ্বাসের কোন কার্যকর প্রভাব নেই। তাই আমাদেরকে ইসলামিক মৌলিক বিশ্বাস (আকীদা) সম্পর্কে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে চিন্তা করা উচিত, তা স্বাভাবিকভাবেই আমাদের জীবনকে সঠিক দিক-নির্দেশনা দান করবে।

  • সেনাবাহিনী ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি সমাচার !!

    সেনাবাহিনী ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি সমাচার !!

    সেনাবাহিনী নিয়ে খালেদা জিয়ার বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। কেউ কেউ এটাকে অগণতান্ত্রিক সরকার আনার চক্রান্ত হিসেবে দেখছেন। অতীতের মতো বর্তমানেও বাংলাদেশের রাজনীতি সেনাবাহিনী নিয়ে সরগরম হয়ে ওঠছে। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী প্রভাব বিস্তার করেছে। ক্ষেত্র বিশেষে সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকা জনগণ কতৃক প্রশংসিত হয়েছে। তাই দেখা যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটে সেনাবাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা। এটাও ঠিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের মতো সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকার পেছনে ছিল মূলত এই দেশের স্বার্বভৌমের প্রতীক মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং আধিপত্যবাদী ভারতের সক্রিয় সমর্থন, বিশেষ করে ওয়ান ইলেভেনের সময় মার্কিন-ভারত-বৃটেন এর ভূমিকা ছিল দেখার মতো।

    কাজে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিল সেনাবাহিনী। বিগত গণতান্ত্রিক সরকার গুলোর লুঠপাট, দূর্নীতি আর ক্ষমতার দ্বন্ধে জনগণ যখন প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতায় ভূগছে তখন সেনাবাহিনীকে সে ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য রাজনৈতিক ভূমিকায় ব্যবহার করা হয়েছে। ওয়ান ইলেভেন এর মতো আগামী দিনেও সেনাবাহিনীকে একই ভূমিকায় দেখা যেতে পারে আর তা হবে মার্কিন ভারতের সমর্থনে। দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী নিয়ে খালেদার বক্তব্য এবং এ নিয়ে সরকার প্রধান থেকে শুরু করে সরকারের মন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বক্তব্য, সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকাকে সামনে নিয়ে এসেছে । তাছাড়া পিলখানা হত্যাকান্ড নিয়ে এই দেশের সাধারণ জনগণ এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ভারত বিরোধী ক্ষোভ বিরাজ করছে। মূলত পিলখানা হত্যাকান্ড ছিল সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ভারত বিরোধী কর্মকর্তাদের প্রতি ভারতের শক্তিশালী সংকেত, যার মাধ্যমে এদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কে ধ্বংস করা হয়েছে। কাপুরুষজনোচিত এই হত্যাকান্ডের পেছনে আমেরিকার ছিল মৌন সমর্থন, আওয়ামীলীগ সরকার ও ছিল পূর্ণ সচেতন, আরেক মার্কিন দালাল বিএনপি ছিল নিশ্চুপ।

    এই হত্যাকান্ড সংঘটিত করেই থেমে থাকেনি ভারত, সেনাবাহিনীর উপর তার কর্তৃত্ব কে দৃঢ় করার জন্য সেনাবাহিনীর সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে পরিকল্পনা নিয়েছে। বিগত কয়েক বৎসর ধরে সেনাবাহিনীর সাথে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সম্প্রতি নামক সামরিক মহড়া সে পরিকল্পনারই অংশ। তাছাড়া ভারতের ট্রেনিং কলেজ গুলোতে বাংলাদেশের সেনা ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। আর এটা ঘটছে দীর্ঘদিন ধরে সেনাবাহিনীর উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকারী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সমর্থনে। আমেরিকারএশিয়ান পিভট নীতির গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র ভারত। আমেরিকা দুইটি লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে তার নীতি কে শক্তিশালী করছে আর তা হলো চীনের উত্থান কে ঠেকানো তথা এর প্রভাবকে নিয়ন্ত্রন করা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় পুঁজিবাদ বিরোধী ইসলামের রাজনৈতিক উত্থান কে দমন করা। কাজেই আমেরিকার দক্ষিণ এশিয়া নীতি মূলত ভারত কেন্দ্রিক নীতি।

    দক্ষিণ এশিয়া কে কেন্দ্র করে মার্কিন-ভারতের রাজনৈতিক সামরিক অর্থনৈতিক সমঝোতা, তারই আলোকে সেনাবাহিনীর উপর মার্কিন-ভারতের কর্তৃত্ব ও প্রভাবকে দেখতে হবে। আমেরিকা-ভারত সন্ত্রাসবাদ ঠেকানোর নামে ইসলামের রাজনৈতিক উত্থান ঠেকাতে মরিয়া হয়ে ওঠেছে। তাই সেনাবাহিনীর সাথে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ও মুশরিক আধিপত্যবাদী শক্তি ভারতের সামরিক মহড়া, সামরিক সংলাপ এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ভারত বিরোধী ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের পিলখানায় হত্যাকান্ড, গুম, খুন, গৃহবন্দী, চাকরি থেকে বহিষ্কার একিই সূত্রে গাঁথা।

    সোমবার থেকে শুরু হওয়া সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার ভারত সফরকে ও ভিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। এটা নিছক কোনো সামরিক সফর বলে মনে হচ্ছে না, পত্রিকার বরাতে যতটুকু জানা গেছে তাতে সেনাপ্রধান শুধুমাত্র ভারতের সেনাপ্রধানের সাথে দেখা করবেন না সে সাথে ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে বিশেষ করে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী অ্যান্টনিওর সাথেও বৈঠক করবেন। তাছাড়া সাম্প্রতিক ভারতের আগ্রাতে দ্বিতীয় রাউন্ড “সম্প্রতি” মহড়া সম্পন্ন হয়েছে, যা গত বৎসর থেকে প্রথম বারের মতো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাথে শুরু হয়েছে। এছাড়া এপ্রিল-মে মাসে ঢাকাতে আমেরিকার সাথে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদ দমন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় পররাষ্ট্র পর্যায়ে নিরাপত্তা সংলাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যার আগে বৈঠকটি হয়েছিল আমেরিকায়। এছাড়া একের পর এক মার্কিন বাহিনীর সাথে সামরিক মহড়া টাইগার শার্ক, নৌ মহড়া সংঘটিত হচ্ছে। খুব শীঘ্রই আমেরিকা বাংলাদেশ নৌ বাহিনী কে একটি যুদ্ধজাহাজ উপহার দিতে যাচ্ছে। আর এসব কিছু করার একটাই কারণ তা হলো সেনাবাহিনীর উপর মার্কিন নেতৃত্ব বজায় রাখা ও ভারতের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যাতে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মতো বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকেও তথাকথিত সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধে মার্কিন-ভারতের ভূকৌশলগত স্বার্থে ব্যবহার করা যায়।

    নিঃসন্দেহে ভূকৌশলগত অবস্থান এবং ইসলামী আকীদার কারণে বাংলাদেশ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মার্কিন-ভারতের সমঝোতার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হবে। আর আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতায় তারাই আসবে যারা এই দুই শক্তির স্বার্থকে রক্ষা করতে পারবে। কাজেই এই দেশের মুসলিমদের সাম্রাজ্যবাদ-আধিপত্যবাদ বিরোধী লড়াই শুধু মাত্র তাদের তল্পিবাহক দালাল বিএনপি-আওয়ামী জোটের বিরুদ্ধে নয় সে সাথে এই সব দালাল তৈরির কারখানা ঔপনিবেশিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কে অপসারণ এবং সে সাথে মুসলিম ভূখন্ডের উপর সাম্রাজ্যবাদীদের কর্তৃত্বকে নিশ্চিন্ন করার জন্য খিলাফত রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার দিকে এগিয়ে নিতে হবে। আর সেনাবাহিনীর উচিত দুর্নীতিগ্রস্থ ঘুণে ধরা ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা গণতন্ত্রকে উৎখাতে নিষ্ঠাবান রাজনীতিবিদদের সহায়তা করা যাতে উম্মাহ কুফর থেকে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা খিলাফতে প্রত্যাবর্তন করতে পারে। উম্মাহ খালিদ বিন ওয়ালিদের উত্তরসূরী সেনাবাহিনীকে মার্কিন-ভারতের স্বার্থের পাহারাদার নয় বরং শাহাদাতের কালিমা বহনকারী বাহিনী হিসেবে দেখতে চায়।

    এম. মোরশেদ আলম

    প্রথম প্রকাশঃ ২ এপ্রিল ২০১৩

  • আপনি কার উপাসনা করেন? 

    আপনি কার উপাসনা করেন? 

    তিটি মানব সন্তানই কোন একটি সত্ত্বার উপাসনা করতে চায় । কিন্তু মানুষ উপাসনা করতে চায় কেন? প্রকৃতিগতভাবে মানুষ দুর্বল । সে দুর্বলতা আমরা আমাদের মাঝে উপলব্ধি করতে পারি এবং কোন কিছুর উপর নির্ভর করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি । ফলে মানুষ যখন তার চেয়ে শক্তিশালী কারও অস্তিত্ব টের পায়,তখন প্রায়শঃ তারা তত্ত্বাবধান, নিরাপত্তা ও আশা পুরণের জন্য ঐ সত্ত্বার উপর নির্ভর করে । প্রাচীনকালে মানুষ সূর্য, চাদঁ, তারা, পর্বত, পশু এমনকি তার নিজ হাতে তৈরি মূর্তির সম্মুখেও মাথা নত করত। 
     
    তেমনিভাবে, বর্তমান কালে আমরা দেখতে পাই, অসংখ্য দেবতার অস্তিত্ব- যাদের সামনে মানুষ মাথা নত করে। অনেক দার্শনিক, রাজনীতিবিদ ও চিন্তাবিদকে উপদেবতা জ্ঞানে আরাধনা করা হয় । সমাজের অনেকের জন্যই তারা যাবতীয় সমস্যা সমাধানের উত্‍সস্বরুপ। অপরদিকে জনপ্রিয় চিত্রাভিনেতা,সংগীতশিল্পী এবং ক্রীড়াবিদরাও কারো কারো উপাস্যের আসন দখল করে নিয়েছে; এদের অনুসরণ ও সমকক্ষ হওয়ার চেষ্টাতেই অনকের পুরো জীবন ব্যপ্ত। আরো কিছু মানুষ আছে যারা নিজের কামনা-বাসনার দাসে পরিণত হয়েছে। তাদের কামনা-বাসনাই তাদের উপাস্য। 
     
    ইসলাম এসেছে মানুষকে চিন্তা করাতে যে সে কার দাসত্ব করছে । অনেক সময় মানুষ যাদের দাসত্ব করে তারা তার নিজের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয় । তারাও তারই মত সীমাবদ্দ্ব ,দুর্বল ও পরমুখাপেক্ষী । তাহলে মানুষ এসব জিনিসকে কেন উপাসনা করবে ? ইসলাম এসেছে মানুষকে সীমাবদ্ধ, দুর্বল জিনিসের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে মহান স্রষ্টা আল্লাহ’র দাসত্বে নিয়োজিত করতে । আল্লাহ’ই সকল কিছুর স্রষ্টা এবং একমাত্র তিনিই প্রার্থনার যোগ্য । আল্লাহ্ পাক সূরা আয্-যারিয়াতে বলেন , 
     
    “আমি জ্বিন ও মানব জাতিকে একমাত্র আমার ইবাদতের উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছি 
     
    মানুষের সকল দিক নির্দেশনার একমাত্র উত্‍স আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। অর্থাত্‍ মানুষের সকল ধ্যান ধারনা, জীবনের যাবতীয় সমস্যার সমাধান ও সমাজ পরিচালনার নীতিমালার একমাত্র উত্‍স হচ্ছেন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা । দুর্ভাগ্যবশতঃ আজকের দিনে আমরা আমরা শুধুমাত্র জায়নামাযেই আল্লাহকে স্বরণ করি ।আমাদের যাবতীয় লক্ষ্য , জীবনের উদ্দেশ্য, সামাজিক রীতিনীতি ও আইন-কানুন আসে অন্যান্য দুর্বল উপাস্যের কাছ থেকে । আসুন আমরা সকলে মিলে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা)” এর প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করি, যাতে করে আমাদের সম্পুর্ণ জীবন ব্যবস্থাটাই আল্লাহ্’র ইবাদত হয়ে যায় । 

  • ইসলাম শুধুমাত্র নামাজ, রোজা ও কয়েকটি রীতিনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়

    ইসলাম শুধুমাত্র নামাজ, রোজা ও কয়েকটি রীতিনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়

    আজকাল ইসলাম কয়েকটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান সর্বস্ব ব্যাপার হয়ে দারিয়েছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া, রমযানের রোযা রাখা, হজ্ব করা, লম্বা জামা ও টুপি পড়া এবং জুম্মার নামাজের পর লম্বা দোয়া করা ইত্যাদিকেই বর্তমানে ইসলামের বিধিবিধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমাদের প্রাত্যহিক কার্যাবলীর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। আমাদের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, আমাদের পছন্দ ও অপছন্দ ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত। টাকা, ফূর্তি এবং স্থুল বাসনা চরিতার্থ করাই এখন প্রত্যেকের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

    ইসলাম প্রচলিত অন্যান্য ধর্মের মত নয়। এটি মানবজাতির জন্য একটি ব্যবহারিক ও সামগ্রিক জীবনবিধান। আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং জীবনযাপনের নিয়ম-কানুন তিনিই প্রদান করেছেন। আল্লাহ পাক সূরা আল মায়েদাহ্-তে বলেন-

    “আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্য পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের উপর আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জীবনবিধান হিসেবে মনোনীত করলাম

    ইসলাম, জীবনযাপন উপযোগী ব্যাপক সমাধান ও আইন প্রনয়ন করেছে। ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক জীবন সহ সবকিছুতেই ইসলাম সুস্পষ্ট আইন ও বিধান প্রদান করেছে। আল্লাহ আমাদের সাথে তার সম্পর্কের পদ্ধতি প্রদান করেছেন, যেমনঃ নামায, রোজা, হজ্ব ইত্যাদির; আবার ব্যক্তির নিজের সাথে নিজের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পদ্ধতি প্রদান করেছেন, যেমন: মানুষ যা খায় এবং যা পড়ে সে সম্পর্কের বিধান। এছাড়াও আল্লাহ তা’আলা সমাজে মানুষ অন্য মানুষের সাথে কিভাবে সম্পর্ক স্থাপন করবে তা নিয়ন্ত্রণ করা জন্যও বিধান প্রণয়ন করেছেন; যেমন কিভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে, কিভাবে শাসনকার্য ও বিচার ব্যবস্থা চলবে এমনকি বিপরীত লিঙ্গের সাথে আচরণ কিরূপ হবে।

    সূরা আন-নাহল এ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-

    “এবং আমি আপনার নিকট এমন এক পুস্তক প্রকাশ করেছি যাতে সকল বিষয়ে সবিস্তারে বর্ননা করা হয়েছে

    যেহেতু আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবন থেকে আল্লাহর মনোনীত দ্বীন-ইসলামকে পরিত্যাগ করেছি, সেহেতু আমাদের জীবনে ধ্বংস, বিশৃঙ্খলা ও হতাশা ভয়ংকর রূপে দেখা দিয়েছে। মানুষের উদ্ভাবিত ধ্যান-ধারনা ও আইনকানুন আমাদের অবস্থার পরিবর্তন করতে সম্পূর্নরূপে ব্যর্থ হয়েছে। এখন সময় এসেছে ইসলামকে কিছু আচার সর্বস্ব ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান হিসেবে গ্রহণ করার।