Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • খিলাফত প্রতিষ্ঠা করাই পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়

    খিলাফত প্রতিষ্ঠা করাই পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়

    মানব ইতিহাসের শুরু থেকে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মানুষের সামনে দুটি পথ খোলা রেখেছেন- আল্লাহ্‌, তাঁর নবী-রাসুল, আল্লাহ্‌’র ও’হী, আখিরাত-হাশর, জান্নাত-জাহান্নাম বিশ্বাসের পথ আর অন্যটি হচ্ছে অবিশ্বাস ও কুফরের পথ। মানব সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই ঈমান আর কুফরের এক চিরন্তন দ্বন্দ্ব ও সংঘাত চলে আসছে। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    “এবং আমি তাকে (মানুষকে) দুটো পথ (ভালো-মন্দ) দেখিয়েছি।” [সূরা আল-বালাদ:১০]

    বর্তমান সময়ে এসে এই সংঘাত বিশ্বজনীন রূপ লাভ করেছে। আজ সেই সংঘাতের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্‌ এবং পশ্চিমা বিশ্ব তথা আমেরিকার নেতৃত্বাধীন সকল অবিশ্বাসী কুফর শক্তি। মুসলমানদের উপর আমেরিকার আগ্রাসন এই উম্মাহ্‌’র উপর পশ্চিমা পুঁজিবাদী বিশ্বের ধারাবাহিক হত্যা, নির্যাতন, দখলদারিত্ব আর নগ্ন শোষণের আরেকটি নির্মম অধ্যায়। পশ্চিমা পুঁজিবাদী বিশ্ব সবসময় চায় আমাদের উপর তাদের কুফর জীবনব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়ে আমাদেরকে শোষণ করতে।

    আমরা মুসলমানরা সবাই জানি কিভাবে এই পূর্বে আমেরিকা ১০ বছরের ইরান-ইরাক যুদ্ধে সাদ্দামকে প্রকাশ্যে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে ও অস্ত্রের যোগান দিয়েছে।

    এরপর আমেরিকা ও বৃটেন ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র রাখার অজুহাতে ইরাকী জনগণের উপর চাপিয়ে দিয়েছে যাচ্ছে এক অন্যায় যুদ্ধ। যদিও তারা বিশ্বজনমতকে নিজের পক্ষে রাখার জন্য সাদ্দামের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের প্রস্তাব লংঘন এবং বিভিন্ন বিপজ্জনক অস্ত্র রাখার অভিযোগ এনেছে কিন্তু এটা সবার কাছেই স্পষ্ট যে এই যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য আরও সংহত করা ও ইরাকের বিশাল তেল সম্পদ লুঠ করা। আজ পর্যন্ত বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ যারা লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করার কাজে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আনবিক বোমা ও ভিয়েতনামে রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে। অপর দিকে ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনী ভূমি দখল ও হাজার হাজার মুসলমানকে হত্যার প্রেক্ষিতে এ পর্যন্ত আনীত অভিযোগগুলোর ব্যপারে জাতিসংঘ প্রস্তাব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষতঃ পশ্চিমা দেশগুলো ক্রমাগতভাবে উপেক্ষা করে চলেছেই। অপরদিকে উত্তর কোরিয়া যখন নিজেই পারমানবিক অস্ত্র রাখার ঘোষণা দেয় তখন আমেরিকা তার বিরুদ্ধে শুধু কুটনৈতিক ব্যবস্থার কথা বলছে। এসব আচরণ পশ্চিমা বিশ্বের দ্বৈতনীতি ও স্ব-বিরোধিতার আসল চেহারা যেমন প্রকাশ করে দিয়েছে তেমনিভাবে এটাও প্রমাণ করেছে যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ মূলতঃ মুসলিম বিশ্বের সম্পদ ভাগাভাগির জন্য পশ্চিমাদের একটি ক্লাব মাত্র।

    কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকা ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তি সবসময় চেষ্টা করেছে বিশ্বব্যাপী তাদের নিজস্ব পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থা কায়েম করতে। পুঁজিবাদী জীবনাদর্শের মূল ভিত্তি হচ্ছে দ্বীন এবং দুনিয়াকে আলাদা করা। এই জীবন দর্শন বিশ্বাস করে মানুষ হচ্ছে সার্বভৌম অর্থাৎ যা ইচ্ছা তাই করার মত স্বাধীন এবং মানুষের জীবনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজের স্বার্থকে সর্বোচ্চ মাত্রায় অর্জন করা ও চরমভাবে জীবনকে উপভোগ করা।

    মার্কিনীদের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী বিশ্বের একমাত্র প্রেরণা ও চালিকাশক্তি হচ্ছে এই ভোগবাদী জীবন দর্শন। “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের” নামে আমেরিকা, বৃটেন, ইসরায়েল, ভারত ও অন্যরা আমাদের দেশগুলোতে তাদের ঔপনিবেশিক স্বার্থকেই আরও নিরাপদ ও সুসংহত করতে চায়। তাদের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্রই হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের সম্পদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং ইসলাম যাতে জীবনব্যবস্থা হিসাবে মুসলিম বিশ্বে পুনঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করতে না পারে তা নিশ্চিত করা। আজকের বিশ্বে ইসলামই পুঁজিবাদীদের জন্য একমাত্র আদর্শগত হুমকি।

    মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বিশ্বব্যাপী প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে যাতে করে মুসলমানরা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার দেয়া জীবনব্যবস্থা ইসলামকে তাদের জীবনে গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। এটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যখন বুশ তার ২০০১ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর এর ভাষণে বলেছিল, “মার্কিন জনগণ এই ক্রুসেড কী তা বুঝতে শুরু করেছে”। এখন তারা একদিকে যে মুসলমানই আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার শরীয়াহ্‌ দিয়ে জীবন যাপন করতে চায় তাকেই “মৌলবাদী ও সন্ত্রাসী” বলে আখ্যায়িত করছে অপরদিকে নিজেদেরকে দাবী করছে শান্তিস্থাপনকারী হিসাবে। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে যে পশ্চিমা পুঁজিবাদী গোষ্ঠী নিজেদের কায়েমী স্বার্থ উদ্ধারের জন্য আর্মি-ট্যাংক-মিসাইল সজ্জিত নিজেদের সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রকেই উন্মাদের মত ইরাক, ফিলিস্তিন,কাশ্মীর থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশে নিরীহ মুসলমানদেরকে নির্বিচারে হত্যার কাজে ব্যবহার করছে – আদতে তারাই আসল সন্ত্রাসী। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    “যখন তাদেরকে বলা হয় “পৃথিবীতে বিশৃংখলা সৃষ্টি করো না” তারা বলে “আমরা তো শান্তি স্থাপনকারী”। বস্তুতঃ তারাই অশান্তি সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা বুঝতে পারে না” [সুরা-বাকারা:১১-১২]

    তারা ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের কথা বলে যাতে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা’র প্রদত্ত দিক নির্দেশনা মসজিদ, মুনাজাত আর রমাযান মাসে কিছু বিষয়ে মানা হয় আর আমাদের সমস্ত সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক জীবন চলে মানবরচিত পুঁজিবাদী চিন্তা, মূল্যবোধ, প্রথা ও আইন-কানুন দ্বারা। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও চলছে তাদের অব্যাহত প্রচার-প্রচারণা। এদেশের বিভাজনের রাজনীতিতে ইন্ধন দিয়ে আমাদের বিভক্ত রাখতে তারা অত্যন্ত সক্রিয়। তাদের এইসব কর্মকাণ্ড ও প্রচারণা সম্পর্কে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদেরকে সতর্ক করে বলছেন,

    “নিঃসন্দেহে যেসব লোক কাফের, তারা ব্যয় করে নিজেদের ধনসম্পদ, যাতে করে বাধাদান করতে পারে আল্লাহ্‌ ‘র পথে“[সূরা-আনফাল:৩৬]

    গত চল্লিশ বছর ধরে ধর্মনিরপেক্ষতা, পুঁজিবাদ, গণতন্ত্র ইত্যাদি পশ্চিমা চিন্তা-ভাবনা বারবার আমাদের সমাজে প্রয়োগ করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আমরা কি একটি সত্যিকার সভ্য ও বাসযোগ্য সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি ? বরং বর্তমানে আমাদের সমাজে যে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজী, দুর্নীতি, ধনী-গরীবের ব্যাপক বৈষম্য, অন্যান্য জাতির উপর অপমানজনক নির্ভরশীলতা ইত্যাদি অন্যায় চলছে তা এসব কুফর চিন্তা চেতনা গ্রহণ করার প্রত্যক্ষ ফল।

    ইসলাম এবং ধর্ম নিরপেক্ষ পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থা কখনোই একসাথে চলতে পারে না। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা ও তাঁর রাসূল (সাঃ) এর প্রতি আমাদের ঈমান কখনোই আমাদের এই অনুমতি দেয়না যে সমাজে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার দেয়া জীবনব্যবস্থার বদলে মানুষের তৈরী জীবনব্যবস্থা চলবে আর আমরা তা নীরবে মেনে নেব। ইসলাম আমাদেরকে মানব জীবনের সকল ক্ষেত্রে, হোক সে ব্যক্তিগত ইবাদত কিংবা সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কার্যাবলী, আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার সার্বভৌমত্বকে মেনে নেয়ার হুকুম দিয়েছে। এ ব্যাপারে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছেন ও সতর্ক করছেন,

    “রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহ্‌কে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ কঠোর শাস্তিদাতা” [সূরা আল-হাশর:৭]

    “তবে কি তোমরা কিতাবের এক অংশ বিশ্বাস কর আর অন্য অংশকে অস্বীকার কর ? তোমাদের মধ্যে যারা এরকম করবে এই পৃথিবীতে তাদের জন্য রয়েছে চরম লাঞ্ছনা আর পরকালে তারা আস্বাদন করবে সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক আযাব” [সূরা-বাকারা:৮৫]

    হে মুসলমানগণ! হে সমাজের নেতৃস্থানীয় মানুষেরা!

    এখন সময় এসেছে একটি সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেয়ার- সময় এসেছে ইসলামকে আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করার। এখন আমাদেরকে ইসলাম ও কুফর এর মধ্যকার সংগ্রামের ব্যাপকতর বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে হবে। আমাদের সমাজে কুফর চিন্তা-চেতনা, আবেগ-অনুভূতি ও কাজ-কর্মের ব্যাপক বিস্তার দেখেও আমরা যদি চুপ করে থাকি তাহলে আমরা কীভাবে দাবী করব যে আমরা আসলেই আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা ও তাঁর রাসূল (সাঃ) কে ভালবাসি ও তাঁর (সাঃ) সুন্নাহকে অনুসরণ করি ? হক-বাতিলের এই সংগ্রামে আমরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারিনা- এটা আমাদের ঈমানের প্রশ্ন। মুসলমান হিসাবে এই দায়িত্বকে অবহেলা করার মানে হচ্ছে কাফেরদের দ্বারা আমাদের সমাজ ধ্বংসের যে ষড়যন্ত্র চলছে তাতে সাহায্য-সহযোগিতা করা।

    এখন সময় এসেছে রাসূল (সাঃ), সাহাবা (রাঃ) এবং যুগে যুগে যেসব মুসলমান কুফর এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গিয়েছেন তাদের পক্ষ অবলম্বন করার; আর নিশ্চিতভাবেই এই পক্ষের মানুষেরা দুনিয়াতে ও পরকালে সফল হবেন।

    যখন সংখ্যায় মুসলমানরা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার একচর্তুাংশ, মুসলমানদের হাতে আছে ব্যাপক খনিজ সম্পদ ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিসমূহ – তখন কেন আমরা পশ্চিমা আগ্রাসনের মুখে অসহায়ভাবে মার খাচ্ছি ? এর একটাই কারণ আর তা হচ্ছে আমরা পশ্চিমা পুঁজিবাদী শক্তির চিন্তা-চেতনা, আইন-কানুন ও নিয়ম-নীতির দাসত্বের শৃংখলে বাঁধা পড়ে আছি। এখন আমরা কেবলমাত্র পশ্চিমা সামরিক শক্তির দখলদারিত্ব নয় বরং তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এমনকি বুদ্ধিবৃত্তিক দখলদারিত্বেরও শিকার। যদি আমরা সত্যিই আমাদের ইরাকী মুসলিম ভাই-বোনদের সমব্যথী হই এবং আমেরিকা আর তার জোট দেশ গুলোর আগ্রাসনের প্রতি ঘৃণা অনুভব করি তবে তা আমাদেরকে অবশ্যই সক্রিয় প্রেরণা যোগাবে যাতে করে আমরা আমাদের ভূমি থেকে তাদের সকল কুফর প্রভাব সমূলে উৎখাত করতে পারি।

    রাসুল (সাঃ) এর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে, ইসলামের আদর্শগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের মাধ্যমে সকল কুফর-পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের প্রভাব থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করাই হবে বাংলাদেশে আমাদের প্রধান দায়িত্ব। তার মানে আমাদেরকে সব ধরনের পশ্চিমা কুফর চিন্তা-চেতনাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে ইসলামকে পরিপূর্ণ আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করতে হবে আর এভাবেই আমাদের সমাজের সমস্যা-সংকট সমূহের যথার্থ ও স্থায়ী সমাধান আসবে।

    মুসলমান হিসেবে আমাদের এখন একটাই করণীয় আর তা হল আমাদের সমাজকে ইসলামি আক্বীদার ভিত্তিতে গড়ে তোলা এবং খিলাফত রাষ্ট্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা। এই খিলাফত রাষ্ট্রের নেতৃত্বেই সমস্ত মুসলিম উম্মাহ্‌ও জান-মাল, সম্মান-সম্ভ্রম এবং সহায়-সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে ইনশাআল্লাহ্‌।

    আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বিশ্বাসীদেরকে তাঁর পথে সংগ্রামের জন্য সাহায্য ও বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন,

    “হে বিশ্বাসীগণ! যদি তোমরা আল্লাহ্‌কে সাহায্য কর, আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদেরকে দৃঢ়পদে প্রতিষ্ঠিত করবেন” [সূরা-মুহম্মদ:৭]

  • মাল্টিলেভেল মার্কেটিং এর শর‌য়ী বিধান

    এমএলএম (মাল্টিলেভেল মার্কেটিং) বা নেটওয়ার্ক মার্কেটিং নামে পরিচিত ব্যবসা পদ্ধতিটি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে বিদ্যমান। অবশ্য দেশ ও এলাকাভিত্তিক এ পদ্ধতিকে বিভিন্ন নামে আখ্যায়িত করা হয়। যেমনঃ কেউ কেউ বলে ডাইরেক্ট মার্কেটিং সিস্টেম, আবার কেউ কেউ বলে টিমওয়ার্ক মার্কেটিং সিস্টেম, কেউ বা ফ্রিডম এন্টারপ্রাইজ, কেউ বলে হোম বেইজ মার্কেটিং, কেউ বলে হলিডে বিজনেস ইত্যাদি ইত্যাদি।

    এমএলএম এর আবিস্কার :

    ১৯৪০ সালে আমেরিকার একজন কেমিস্ট ডাঃ কার্ল রেইন বোর্গ কর্তৃক সর্বপ্রথম প্রবর্তিত হয় এ পদ্ধতিটি। তার কোম্পানীর নাম ছিল ক্যালিফোর্নিয়া ভিটামিন কোম্পানী। ১৯৪০ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত সারা বিশ্বে ১২৫টিরও বেশি দেশে প্রায় ১২৫০০ এর বেশি কোম্পানীর অধীনে প্রায় ৩০ কোটিরও বেশি ডিষ্ট্রিবিউটর কাজ করছে।

    বর্তমানে বাংলাদেশে এমএলএম পদ্ধতিতে পরিচালিত বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যেমনঃ ডেসটিনি-২০০০ লিঃ, সেপ প্রাঃ লিঃ, ড্রিম বাংলা, নিউওয়ে বাংলাদেশ, আল-ফালাহ কমিউনিকেশন বিজনেস, ডটকম শ্যাকলী, ট্যাংচং এফ.আই.সি, আয়্যমওয়ে কর্পোরেশন, জিজি এন, মডার্ণ হারবাল ফুডস প্রাঃ লিঃ, মেরিকে কসমেটিক ইত্যাদি। তন্মধ্যে ডেসটিনি-২০০০ লিঃ ও এফ.আই.সি. উল্লেখযোগ্য।

    নেটওয়ার্ক মার্কেটিং ইসলামের দৃষ্টিতে কতটুকু বৈধতার দাবি রাখে এ নিয়ে ইতোমধ্যে পক্ষে বিপক্ষে বিভিন্ন প্রকার প্রবন্ধ-নিবন্ধ, বই-পুস্তক প্রকাশ ও যুক্তি-তর্ক শুরু হয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় ইসলামের দৃষ্টিতে এমএলএম পদ্ধতি ব্যবসাটির বিধান সম্পর্কে কিছু লেখা সময়ের দাবি বলে মনে করি। প্রথমে বুঝা যাক এমএলএম ব্যবসাটির ধরণ বা পদ্ধতি কি? ও এমএলএম বা মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কাকে বলে?

    এমএলএম (মাল্টিলেভেল মার্কেটিং) এর রূপরেখা :

    এমএলএম (মাল্টিলেভেল মার্কেটিং) পদ্ধতি সম্পর্কে লেখা বিভিন্ন বইপত্র, কোম্পানীগুলোর নীতিমালা, ফরম ও পণ্য তালিকা, তাদের সেমিনারের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট লোকদের ব্যাখ্যাসমূহ থেকে এমএলএম (মাল্টিলেভেল মার্কেটিং) এর যে পরিচয় পাওয়া যায় তা হলোঃ-

    ১. এমএলএম (মাল্টিলেভেল মার্কেটিং)পদ্ধতির প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের মাধ্যমে পরিবেশক নিয়োগ করে থাকে।

    ২. পরিবেশক হতে হলে তাদের থেকে তাদের নির্ধারিত মূল্যে পণ্য খরিদ করতে হয়।

    ৩. পণ্য খরিদ করা ছাড়া যেহেতু তাদের ডিষ্ট্রিবিউটর (পরিবেশক) হওয়া যায় না, এজন্য তাদের কর্মীবাহিনীর উপাধি হল ক্রেতা-পরিবেশক।

    ৪. কোম্পানীর পরিবেশক হওয়ার পর সে যদি কোম্পানীর নিয়মে দু’জনকে ক্রেতা-পরিবেশক বানায় তাহলে এর বিনিময়ে সে কোম্পানী হতে কমিশনের নামে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পায়। এরপর এ দু’ব্যক্তি যদি আরো চারজনকে ক্রেতা-পরিবেশক বানায় তাহলে এ দু’ব্যক্তি ও প্রথমোক্ত ব্যক্তি কমিশন পাবে। এভাবে দু’দিকের নেটওয়ার্ক যতই দীর্ঘ হবে ততই উপরের লোকদের কমিশন বাড়তে থাকবে।

    ৫. চার নম্বরে বর্ণিত নেট সিস্টেমটিই হল এমএলএম এর মূল বৈশিষ্ট। পুঁজি ছাড়া রুজী এর উপরই তাদের প্রচারণার ভিত্তি। এ শ্রম ছাড়া বিনিময়ের আশায় লোকজন তাদের সাথে যোগ দেয়।

    ৬. মাল্টিলেভেল মার্কেটিং পদ্ধতির মূল বৈশিষ্টে সব কোম্পানী একমত। তবে কোম্পানী ভেদে প্রত্যেকের নিয়মাবলী, কমিশন বন্টনের পদ্ধতি ও কমিশনের পরিমাণ ভিন্ন রকম।

    ৭. ডান ও বাম উভয় পার্শ্বের নেট না চললে কোন ব্যক্তি কমিশন পাবে না। যেমন কেউ যদি শুধু একজন ক্রেতা-পরিবেশক বানায় তাহলে সেও কমিশন পাবে না, তার উপরের স্তরের ব্যক্তিগণও কমিশন পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হবে না।

    ডেসটিনি-২০০০ লিঃ কর্তৃক প্রকাশিত “বিক্রয় ও বিপণন পদ্ধতি” পুস্তিকা থেকে এমএলএম (মাল্টিলেভেল মার্কেটিং) এর পদ্ধতি নিম্নে তুলে ধরা ধরছি। উক্ত পুস্তিকার ১০ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে:
    মূল ধারণাটি হচ্ছে এ রকম, (ধরুণ আপনি) একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের পণ্য (৫০০-১০০০) পয়েন্ট ডেসটিনি-২০০০ লিঃ থেকে ক্রয়ের মাধ্যমে কোম্পানীর একজন সক্রিয় ক্রেতা-পরিবেশক হলেন। প্রাথমিকভাবে দু’জন ক্রেতা-পরিবেশক সৃষ্টির মাধ্যমে নিজস্ব সেলস টিম তৈরির প্রক্রিয়ায় কাজ করতে পারে। এরপর পরবর্তী ক্রেতা-পরিবেশকদ্বয়কে একইভাবে তাদের ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের ব্যাপারে সর্বাত্নক সহযোগিতা করতে পারবেন। এভাবে ১২ থেকে ১৩টি ধাপে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং টিম তৈরির কাজ করার পর ঐ সমস্ত ক্রেতা-পরিবেশকদের অধীনে গড়ে বাত্তসরিক ৪০০০ ক্রেতা-পরিবেশক সৃষ্টি করা সম্ভব।

    উপরোক্ত পুস্তিকার ৯ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে-

    যিনি ইচ্ছে করবেন তিনিই এ প্রতিষ্ঠানের একজন ক্রেতা-পরিবেশক হয়ে পণ্য ক্রয়ের মাধ্যমে এবং দলের অভ্যন্তরে প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে পণ্য বিপণনে অংশগ্রহণ করে বিক্রিত লভ্যাংশের অংশীদার হতে পারবেন। অন্তত একবার পণ্য ক্রয় করা ছাড়া কিংবা অন্য ডিষ্ট্রিবিউটর থেকে তার ডিলারশীপ যোগ্যতা ক্রয় বা হস্তান্তর করা ছাড়া আপনার পক্ষে এখানকার ডিষ্ট্রিবিউটর হওয়ার কোন সুযোগ নেই।

    সহজ করে বুঝার জন্য বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত “ইসলামের দৃষ্টিতে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং ব্যবসা” বই হতে ছক আকারে বিষয়টি তুলে ধরা হল।

    —————————————-A
    ১ম লেভেল ———-B———————————-C
    ২য় লেভেল —D———–E——————-F————-G
    ৩য় লেভেল –H-I———J-K—————–L-M———-N-O
    ৪র্থ লেভেল PQ-RS–TU-VW–XY-Z AB– BC CD– DE EF

    পূর্বের ছকটির আলোকে ধরা যাক, একটি কোম্পানী নির্ধারিত পণ্য বিক্রয়ের উপর নিম্ন হারে কমিশন দিয়ে থাকে।A নামক এক ব্যক্তি যখন B ও C নামের দু’ব্যক্তিকে ক্রেতা-পরিবেশক বানাল তখন সে পেল ৬০০ টাকা। এরপর ২য় লেভেলের ৪ জন যোগ হওয়ায় প্রথম ব্যক্তি (A) পেল ১২০০ টাকা। আর B ও C প্রত্যেকে পেল ৬০০ টাকা করে ১২০০ টাকা। এরপর ৩য় লেভেলের ৮ জন (২য় লেভেলের ব্যক্তিদের মাধ্যমে) কোম্পানীর ক্রেতা-পরিবেশক হওয়ায় প্রথম ব্যক্তি পেল আরো ৩৬০০ টাকা এবং ২য় (১ম লেভেল-B ও C ) ২ জনের প্রত্যেকে পেল ১২০০ টাকা করে ২৪০০ টাকা। আর ২য় লেভেলের ৪ জনের প্রত্যেকে পেল ৬০০ টাকা করে ২৪০০ টাকা। এরপর ৪র্থ লেভেলের ১৬ জন (৩য় লেভেলের লোকদের মাধ্যমে) ক্রেতা-পরিবেশক হওয়ায় ১ম ব্যক্তি A পাবে ৭২০০ টাকা, ২য় ২ জনের (১ম লেভেলের B ও C) প্রত্যেকে পাবে ৩৬০০ টাকা করে ৭২০০ টাকা, ২য় লেভেলের ৪ জনের প্রত্যেকে পাবে ৬০০ টাকা করে ২৪০০ টাকা, ৩য় লেভেলের ৮ জনের প্রত্যেকে পাবে ৬০০ টাকা করে ৪৮০০ টাকা।

    (উল্লেখ্য এখানে টাকার অংক উদাহরণস্বরূপ দেখানো হয়েছে যা প্রতিষ্ঠানভেদে ব্যতিক্রম হতে পারে)। সূত্র- বেফাক।

    এমএলএম পদ্ধতির ব্যবসা হারাম ও নাজায়েজ :

    এমএলএম (মাল্টিলেভেল মার্কেটিং) কারবারে শরীয়ত নিষিদ্ধ অনেকগুলো বিষয় যুক্ত হওয়ার কারণে উক্ত পদ্ধতির ব্যবসাটি সম্পূর্ণরূপে নাজায়েজ ও হারাম। যেমন এতে রয়েছেঃ-

    ১. শর্তসহ ইজারা চুক্তি
    ২. শর্তসহ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি
    ৩. ধোকা বা গারার
    ৪. শ্রমবিহীন বিনিময়
    ৫. বিনিময়বিহীন শ্রম
    ৬. জুয়া বা কেমার
    ৭. সুদের সন্দেহ
    ৮. বিদেশী পণ্য দ্বারা বাজার প্রভাবিতকরণ।

    উক্ত বিষয়গুলো শরীয়ত নিষিদ্ধ। নিম্নে এক একটি করে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করা হল।

    শর্তসহ ইজারাচুক্তি :

    উল্লিখিত বর্ণনা ও উদ্ধৃতি দ্বারা বুঝা গেল কোম্পানী শুধু পণ্য বিক্রি করছে না, সাথে সাথে ক্রেতা-পরিবেশকও হয়ে যাচ্ছ। অপরদিকে কেউ যদি পরিবেশক বা ডিলার হতে চায় তাহলে সে ডিলার হতে পারছে না। ডিলার হওয়ার জন্য পণ্য কিনা শর্ত। তাদের ভাষায় ডিলার/পরিবেশক/ডিষ্ট্রিবিউটর বা অন্য কোন নাম হলেও ফিকাহ শাস্ত্রের ভাষায় মূলত ঐ ব্যক্তি আজির বা দালাল এর অন্তর্ভুক্ত। এ ধরণের ডিষ্ট্রিবিউটর নিয়োগকে ইসলামী ফিকাহর ভাষায় “আকদে ইজারা” বা ইজারা চুক্তি বলা হয়। ইজারা চুক্তি সম্পন্ন করার জন্য পণ্য ক্রয় (عقد بيع) শর্ত করা হল। এখানে এক চুক্তির মাধ্যমে দুই চুক্তি হয়ে গেল। যাকে হাদীস ও ফেকাহ শাস্ত্রের ভাষায় “ صفقتان في صفقة “ এক চুক্তির মাঝে দুই চুক্তি” বলা হয়। এই ধরণের কারবার হাদীসের নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত হওয়ার কারণে নাজায়েজ। নিম্নে এ সংক্রান্ত কয়েকটি হাদীস অনুবাদসহ উল্লেখ করা হল।

    نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم عن صفقتين في صفقة واحدة. رواه أحمد في مسنده ج1 ص398 ، وقال الهيثمي في مجمع الزوائد ج4 ص48 رجال أحمد ثقات.

    একই চুক্তিতে দুটি চুক্তি করা থেকে নবীজী (সাঃ) নিষেধ করেছেন। মুসনাদে আহমদ, খন্ড১, পৃঃ৩৯৮।

    ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে আরেকটি হাদীসে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজী (সাঃ) ইরশাদ করেন-

    لا تحل صفقتان في صفقة. رواه الطبراني في المعجم الأوسط ج1 ص32 وابن خزيمة في صحيحه برقم 176

    একই আকদে দুই আকদ করা হালাল নয়। তাবারানী খন্ড১, পৃঃ৩২, ইবনে খুযাইমা, হাদীস নং ১৭৬।

    আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন-

    صفقتان في صفقة ربا. أخرجه ابن أبي شيبة ج8 ص192 ، وإسناده صحيح. إرواء الغليل ج5 ص148

    একই আকদে দু’টি আকদ করা এক প্রকার সুদ। ইবনে আবী শায়বা, খন্ড৮, পৃঃ১৯২।

    تفسد الإجارة بالشروط المخالفة لمقتضى العقد ، فكل ما أفسد البيع مما مر يفسدها. الدر المختار ج3 ص46

    আকদে ইজারার প্রাসঙ্গিক নয় এমন শর্তারোপে ইজারা ফাসিদ হয়। তাই পূর্বে বিবৃত যে সব বিষয় বেচাকেনা চুক্তি তথা আকদে বাইকে ফাসিদ করে দেয় সেগুলো ইজারা চুক্তিকেও ফাসিদ করে দেয়। (দুররুল মোখতার, খন্ড৩ পৃঃ৪৬)।

    একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কোম্পানী কর্তৃক ডিলার বা ডিস্ট্রিবিউটর তথা দালাল নিযুক্তির সাথে কোম্পানী থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য ক্রয়ের শর্তারোপ সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক একটি শর্ত। তাছাড়া এতে রয়েছে বিক্রেতা পক্ষ বা কোম্পানীর স্বার্থ। তাই এ শর্তের কারণে ইজারা চুক্তিটি ইসলামী শরীয়ার দৃষ্টিতে ফাসিদ বলে গণ্য হবে। এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

    শর্তসহ ক্রয়-বিক্রয়চুক্তি :

    মাল্টিলেভেল মার্কেটিং পদ্ধতিতে যেমন রয়েছে শরীয়ত নিষিদ্ধ শর্তসহ ইজারা চুক্তি (إجارة مع العقد) তেমনি রয়েছে শর্তসহ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি (بيع مع الشرط)।

    ক্রয়-বিক্রয়ের মূলনীতি হল, ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যে যদি ক্রয়-বিক্রয় প্রসঙ্গ নয় এমন কোন শর্ত লাগানো হয় যাতে ক্রেতা বা বিক্রেতার স্বার্থ জড়িত থাকে তা বিক্রিত পণ্যের (তা প্রাণী জাতীয় হলে) স্বার্থ জড়িত থাকে তাহলে ক্রয়-বিক্রয় ফাসিদ হয়ে যায়। যেমন হেদায়া গ্রন্থ প্রণেতা এ মর্মে লিখেন-

    كل شرط لا يقتضيه العقد وفيه منفعة لأحد المتعاقدين أو للمعقود عليه وهو من أهل الاستحقاق يفسده. الهداية ج3 ص34

    ” যে শর্ত ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তির প্রাসঙ্গিক নয়, অথচ এতে ক্রেতা-বিক্রেতা কোন একজনের বা বিক্রিত পণ্যের (জীবজন্তু হওয়ার ক্ষেত্রে) স্বার্থ জড়িত থাকে তাহলে এরূপ শর্ত আকদে বাইকে (ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি) ফাসিদ করে দেয়। ” হেদায়া, খন্ড৩, পৃঃ৩৪।

    এ মর্মে আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে-

    نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم عن بيع وشرط. رواه الطبراني في المعجم الأوسط والحاكم في علوم الحديث كذا في نصب الراية ج4 ص17.

    রাসূলুল্লাহ (সঃ) শর্তারোপ করে বেচা-কেনা থেকে নিষেধ করেছেন। তাবারানী আলমুজামুল আওসাত ও হাকিম উলুমুল হাদিস গ্রন্থে। নাসবুর রায়াহ গ্রন্থেও এরূপ বর্ণিত আছে। খন্ড৪ পৃঃ১৭।

    মাল্টিলেভেল মার্কেটিং এর প্রচলিত ব্যবসা পদ্ধতিতে বিক্রেতার পক্ষ থেকে ডিলারশীপ পাওয়ার শর্তটি অপ্রাসঙ্গিক হওয়ার সাথে সাথে ক্রেতার জন্য লাভজনক একটি শর্ত। তাই এ শর্তারোপের দরুণ ক্রয়-বিক্রয়টি অবশ্যই ফাসিদ, অবৈধ ক্রয়-বিক্রয় বলে গণ্য হবে।

    ধোকা বা গারার :

    এমএলএম পদ্ধতির ব্যবসা নাজায়েজ হওয়ার আরেকটি কারণ হল ধোকা যার আরবী শব্দ গারার। হাদীস নিষিদ্ধ ধোকা বা গারার সম্বলিত হওয়ার কারণে এ পদ্ধতির ব্যবসা নাজায়েজ। ধোকা বা গারার এর সংজ্ঞা নিম্নে দেয়া হল।

    ইমাম সারাখসী (রঃ) বলেন-

    الغرر ما يكون مستور العاقبة

    ” যার পরিণাম লুকায়িত (অস্পষ্ট) তাই গারার।” কিতাবুল মাবসুত, খন্ড১২ পৃঃ১৯৪।

    ইমাম কাসানী (রঃ) বলেন-

    الغرر هو الخطر الذي استوى فيه طرف الوجود والعدم بمنزلة الشك

    “গারার হচ্ছে এমন একটি অনিশ্চয়তা যাতে হওয়া এবং না হওয়া উভয় দিকই সন্দেহের সাথে বিদ্যমান থাকে।” বাদায়েউস সানায়ে, খন্ড৪, পৃঃ৩৬৬।

    ইমাম সীরাজী (রঃ) বলেন-

    الغرر من انطوى عنه أمره وخفي عليه عاقبته

    “পরিণাম অজানা থাকাই গারার।” শরহুল মুহাযযাব, খন্ড৯ পৃঃ৩১০।

    ইমাম ইবনুল আসীর জাযারী (রঃ) বলেন-

    الغرر ما له ظاهر تؤثره وباطن تكرهه ، فظاهره يغر المشتري ، وباطنه مجهول.

    “যার এমন একটি প্রকাশ্য রূপ রয়েছে যা দ্বারা মানুষ এর প্রতি আকৃষ্ট হয়, কিন্তু এর মধ্যে এমন অদৃশ্য কারণ রয়েছে যে কারণে তা অস্পষ্ট। অতএব এর প্রকাশ্য রূপ ক্রেতাকে ধোকায় ফেলে। আর এক ভিতরের রূপ অজানা।” জামেউল উসুল, খন্ড১ পৃঃ৫২৭।

    ইমাম ইবনুল কাইয়ুম জাওযী (রঃ) বলেন-

    بيع الغرر هو بيع ما لم يعلم حصوله أو لا يقدر على تسليمه أو لا يعرف حقيقة مقداره

    “বায়উল গারার ঐ কারবারকে বলা হয় যাতে পণ্য বা সেবা পাওয়া যাবে কিনা তা অনিশ্চিত অথবা চুক্তিভুক্ত ব্যক্তি নিজে তা যোগান দিয়ে অক্ষম অথবা যার পরিমাণ অজানা।” যাদুল মাআদ, খন্ড৫ পৃঃ৭২৫।

    উল্লেখিত সংজ্ঞাগুলো দ্বারা বুঝা যায়, হওয়া বা না হওয়ার অনিশ্চয়তার নামই হল ধোকা বা গারার। আর এটি যে কারবারে বিদ্যমান থাকবে সে কারবারই হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী নিষিদ্ধ হবে।

    এমএলএম পদ্ধতির ব্যবসানীতিতেও ধোকা বা গারার রয়েছে। কারণ তাদের নীতিমালা অনুযায়ী প্রথম ডিষ্ট্রিবিউটর লোকটি তার ডাউন লেভেল থেকে কমিশন লাভ করতে থাকবে। অথচ তার নিজের বানানো দু’ব্যক্তি ব্যতিত অন্যদের বিষয়টি সম্পূর্ণই অনিশ্চিত এবং অন্যের কাজের উপর নির্ভরশীল। কারণ তার নিচের নেটগুলোর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অগ্রসর না করলে লোকটি কমিশন পাবে না, যে কমিশনকে কেন্দ্র করে সে কোম্পানীর সাথে যুক্ত হয়েছে।

    نقل أبراهيم الحربي أنه سئل عن الرجل يكتري الديك ليوقظه لوقت الصلاة ، لا يجوز ، لأن ذلك يقف على فعل الديك ، ولا يمكن استخراج ذلك منه بضرب ولا غيره ، وقد يصيح ، وقد لا يصيح ، وربما صاح بعد الوقت ، نقله الإمام شمس الدين بن قدامة المقدسي في الشرح الكبير على متن المغني ج3 ص319 (باب الإجارة)
     

    ইবরাহীম হারবী (রঃ) বর্ণনা করেন, তাকে প্রশ্ন করা হলো ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে যে একটি মোরগ ভাড়া করে তাকে নামাযের সময় ঘুম থেকে সজাগ করার জন্য। তিনি উত্তর দিলেন- “জায়েজ হবে না। কারণ এটা মোরগের মরজির ওপর নির্ভরশীল। তার থেকে মারপিট বা অন্য কোন পন্থায় আওয়াজ বের করা সম্ভব না। কোন সময় আওয়াজ করবে, আবার কখনো কখনো করবে না, কখনো বা নামাজের সময়ের পরে আওয়াজ করবে।” শারহুল কাবীর, খন্ড৩ পৃঃ৩১৯।

    সুতরাং এখানে যেমন মোরগ থেকে উপর্কৃত হওয়া অনিশ্চিত হওয়ার কারণে ইজারা চুক্তিটি নাজায়েজ হয়েছে, এমএলএম কারবারেও নীচের লেভেলের মাধ্যমে কমিশন পাওয়া অনিশ্চিত হওয়ার কারণে ইজারা চুক্তিটি নাজায়েজ হবে।

    শ্রমবিহীন বিনিময় :

    এমএলএম (মাল্টিলেভেল মার্কেটিং) পদ্ধতির ব্যবসাটি নাজায়েজ হওয়ার আরেকটি কারণ হল এতে রয়েছে শ্রমবিহীন বিনিময় ও বিনিময়হীন শ্রম যা শরীয়ত সমর্থন করে না।

    এমএলএম (মাল্টিলেভেল মার্কেটিং) পদ্ধতির নীতিমালায় রয়েছে যে, কোন ব্যক্তি নির্ধারিত মূল্যের পণ্য খরিদ করে ক্রেতা-পরিবেশক হওয়ার পর সে যদি দু’জন ক্রেতা কোম্পানীর জন্য নিয়ে আসে এবং তারা প্রত্যেকে আরো চারজঙ্কে এবং এ চারজন আরো আটজনকে কোম্পানীর সাথে যুক্ত করে তবে প্রথম ব্যক্তি এবং দ্বিতীয় লেভেলের দুই ব্যক্তি নিম্ন লেভেলের আট ব্যক্তি ক্রেতা-পরিবেশকের সুবাদেও কোম্পানী থেকে কমিশন পেয়ে থাকে।
    অথচ এ আটজনের কাউকেই তারা (প্রথম ব্যক্তি এবং ২য় স্তরের দু’জন) কোম্পানীর সাথে যুক্ত করেনি, বরং সংশ্লিষ্ট কোম্পানীগুলোর আইন অনুযায়ী এরা কোম্পানীর সাথে যুক্ত হয়েছে এবং নির্ধারিত হারে কমিশন পাচ্ছে। বুঝা গেল এমএলএম কারবারে শ্রমবিহীন বিনিময় বিদ্যমান।

    বিনিময়হীন শ্রম :

    এমনিভাবে এতে রয়েছে বিনিময়হীন শ্রম। কেননা, কোম্পানীর নীতিমালা অনুযায়ী কেউ যদি নির্ধারিত পয়েন্টের একজন ক্রেতা জোগাড় করে। কিন্তু আরেকজন জোগাড় করতে না পারে অর্থাৎ ডান ও বাম উভয় দিকের নেট না চলে, সে কমিশন পায় না। এমনিভাবে কেউ যদি দু’জন ক্রেতাও কোম্পানীকে এনে দেয়, কিন্তু তারা কোম্পানীর নির্ধারিত পয়েন্ট থেকে কম পয়েন্টের মালামাল খরিদ করে তাও ঐ ব্যক্তি কমিশন পায় না। যেমন ডেসটিনি-২০০০ লিঃ এবং সেপ বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেডের নিয়ম অনুযায়ী একজন ব্যক্তিকে তার ডান এবং বাম উভয় পাশে দু’জনের নিকট নূয়নতম ৫০০ করে ১০০০ পয়েন্টের পণ্যের ক্রেতা আনতে হয়। যদি কেউ একজন ক্রেতার নিকট ৫০০ পয়েন্টের পণ্য বিক্রি করাল কিন্তু অন্যজন আনতে ব্যর্থ হল তবে এর জন্য লোকটি কোন কমিশন পাবে না। এমনিভাবে যদি কোন ক্রেতা-পরিবেশক উভয় পাশে ১০০ পয়েন্ট করে ২০০ পয়েন্ট পরিমাণ পণ্যের ২জন ক্রেতা কোম্পানীকে এনে দেয় তবে ঐ ২০০ পয়েন্ট বিক্রির জন্য লোকটি কোম্পানী থেকে কমিশন পাবে না। কিন্তু ঐ দু’জন কোম্পানীর (অন্তর্বর্তীকালীন) পরিবেশক হিসাবে যুক্ত হয়ে তাদের নেট অগ্রসর করার সুযোগ পেয়ে যায়। সুতরাং এ কারবারে রয়েছে বিনিময়হীন শ্রম।

    শ্রমবিহীন বিনিময় ও বিনিময়হীন শ্রম এ দু’টিই বাতিল পন্থায় উপার্জন। কেননা, আকদে ইজারার দু’টি মৌলিক দিক রয়েছে।

    ১ শ্রম
    ২ বিনিময়

    এই দু’টি বিষয় সুস্পষ্ট থাকা এই আকদের অপরিহার্য শর্ত। দু’টির একটিও যদি পাওয়া না যায় তাহলে তা ফাসেদ হয়ে নিষিদ্ধ তালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।

    কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

    ولا تأكلوا أموالكم بينكم بالباطل

    তোমরা বাতিল পন্থায় একে অন্যের সম্পদ খেয়ো না। (সূরা বাকারা ১৮৮, সূরা নিসা ২৯)

    বিখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং প্রখ্যাত তাবেঈ হযরত হাসান বসরী (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন

    أن يأكله بغير عوض অর্থাৎ (বিনিময়ের শর্তযুক্ত আকদে) বিনিময়হীন উপার্জনই হল বাতিল পন্থায় উপার্জন। আহকামুল কুরআন, জাসসাসঃ ২/১৭২।

    এমএলএমকারবারজুয়ারএকপ্রকার :

    এমএলএম কারবার নাজায়েজ হওয়ার আরেকটি কারণ হলো এ পদ্ধতির ব্যবসাও এক প্রকার জুয়া। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রঃ) গারার এর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন-

    الغرر هو مجهول العاقبة ، فإن بيعه من الميسر الذي هو القمار

    যে কারবারের পরিণাম অজানা সে কারবার জুয়ার শামিল। তাকে কেমার বা মাইসির (জুয়া)ও বলা হয়। কুরআন পাকে আল্লাহতায়ালা জুয়াকে হারাম করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে-

    إنما الخمر والميسر والأنصاب والأزلام رجس من عمل الشيطان فاجتنبوه

    মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্রকার্য বৈ তো আর কিছু নয়। সুতরাং এগুলো থেকে বেঁচে থাক। (সূরা মায়েদা ৯০)

    এমএলএম কারবারে যে ক্রেতা-পরিবেশক হবেন তিনি কোম্পানীর নীতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ মূল্যের দু’জন ক্রেতা যোগাড় করতে পারবেন কিনা? পরিণাম অনিশ্চিত, তাই জুয়ার সাদৃশ্য হয়ে হারাম হবে।

    বাজার প্রভাবিতকরণ :

    এমএলএম নাজায়েজ হওয়ার আরেকটি কারণ বহির্শক্তি দ্বারা বাজার প্রভাবিতকরণ। এ ধরণের ব্যবসাগুলোর মূল উদ্দেশ্য পণ্য কেনা-বেচা নয়। আসল উদ্দেশ্য হলো কোম্পানীর ডিস্ট্রিবিউটর সেজে কোম্পানী থেকে সুযোগ-সুবিধা লাভ করা। অর্থাৎ কমিশন অর্জন করা। এ ধরণের কোম্পানীর নিকট পণ্যের গুণগতমান বিবেচ্য নয়। এবং এ নিয়ে তাদের প্রতিযোগিতায়ও পড়তে হয় না। বরং কমিশনের লোভ দেখিয়ে গুণগত বিষয় থেকে পার পেয়ে যায়। তাদের এ পদ্ধতি সহজেই বাজারের সাধারণ গতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। এবং ক্রেতাগণ টাকার লোভে তাদের দিকে ঝুকে পড়ে। আর সাধারণ পদ্ধতিতে একজন ক্রেতা পণ্যের গুনাগুণ যাচাই করার সুযোগ পায় বিধায় পণ্য বিক্রেতাকে পণ্যের গুণাগুণের প্রতিযোগিতায় পড়তে হয়। এমএলএম পদ্ধতি এর বিপরীত। এ পদ্ধতিতে কমিশনের কারণে বাজার একপেশে হয়ে যায়। এবং পণ্যের গুণগতমান এবং ক্রেতার স্বাধীন যাচাই বাছাইয়ের সুবিধা হ্রাস পায় যা ইসলাম পছন্দ করে না। কারণ ক্রয়-বিক্রয় ও যাবতীয় চুক্তির ক্ষেত্রে ইসলামী নীতি হলো- বাজার নিয়ন্ত্রিত হবে পণ্যের গুণগতমান ও ক্রেতা-বিক্রেতার সরাসরি উপস্থিতিতে। অন্য কোন পন্থায় বাজার প্রভাবিত করা শরীয়তে নিষিদ্ধ। এ জন্যেই তো বাজারে প্রবেশের আগেই রাস্তায় গিয়ে বিক্রেতা থেকে পণ্য কিনে এনে বাজারে বিক্রয় করাকে এবং গ্রাম্য ব্যক্তির পক্ষ হয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করাকে শরীয়ত নিষেধ করেছে। হুজুর (সাঃ) ইরশাদ করেন-

    أن النبي صلى الله عليه وسلم نهى أن يبيع حاضر لباد

    হুজুর (সাঃ) শহুরে ব্যক্তিকে গ্রাম্য ব্যক্তির উকিল হয়ে বেচাকেনা করতে নিষেধ করেছেন। (মুসলিম)

    نهى النبي صلى الله عليه وسلم أن يتلقى الجلب

    হুজুর (সাঃ) কোন কাফেলা মালামাল নিয়ে শহরে প্রবেশ করার আগেই সেই মাল কেনার থেকে নিষেধ করেছেন। মুসলিম

    সুদের সন্দেহ ও সাদৃশ্য :

    এমএলএম পদ্ধতি কারবার নাজায়েজ হওয়ার আরেকটি কারণ হল এতে শরীয়তে নিষিদ্ধ شبهة الربا বা সুদের সন্দেহ এবং সাদৃশ্য রয়েছে। অথচ এমন কারবার বর্জন করার সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে শরীয়তে। খলীফায়ে রাশেদ হযরত উমর (রাঃ) বলেন دعوا الربا والريبة “তোমরা সুদ বর্জন কর এবং এমন জিনিসও বর্জন কর যাতে সুদের সন্দেহ রয়েছে।” মুসনাদে ইমাম আহমদ ১/৩৬,৫০ হাদীস ২৪৬, ৩৫০। সুনানে ইবনে মাজা ২/৭৬৪ হাদীস ২২৭৪। এই উক্তি এবং শরীয়তের অন্যান্য দলীলের আলোকে ফুকাহায়ে কেরাম এমন বহু কারবারকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন যেগুলোতে সুদের সন্দেহ ও সাদৃশ্য রয়েছে।

    এমএলএম এ শুবহাতুর রিবা বা সুদের সাদৃশ্য :

    আলোচিত মাল্টিলেভেল বা নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতিতে শরীয়তে নিষিদ্ধ সুদের সন্দেহ ও সাদৃশ্য পরিস্কারভাবে বিদ্যমান যার দরুণ এ কারবার নাজায়েজ ও বর্জনীয়।

    একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি বুঝা যাক। মনে করি জাকের নামের এক ব্যক্তি ডেসটিনি-২০০০ লিঃ থেকে ১০,০০০ টাকা দিয়ে একটি পণ্য নিল (যার পয়েন্ট ৫০০) এবং নিয়ম অনুযায়ী সে ডিস্ট্রিবিউটরশীপ পেল এবং সে আরো দু’জন ক্রেতা জোগাড় করার মাধ্যমে কমিশন পেল ৬০০ টাকা। এরপর এ দু’জনের বানানো চার ব্যক্তির কারণে আরো পেল ১২০০ টাকা।(এরপর তো কমিশন ও বোনাস চালু থাকছেই)। বলা বাহুল্য, এ সকল সুবিধাই জাকেরকে উদবুদ্ধ করেছে এ কোম্পানীর পণ্য কিনতে। তাহলে দেখা যাচ্ছে সে ১০,০০০ টাকা শুধু ঐ পণ্যটির জন্য দেয়নি বরং তা দেওয়ার পিছনে তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ঐ কমিশন বা বোনাসগুলো পাওয়া। আর স্বভাবতই তা (পণ্য ও কমিশন) লোকটির দেওয়া টাকা থেকে বেশি যা পরিস্কারভাবেই সুদের সন্দেহ সৃষ্টি করে।

    তাছাড়া এমএলএম প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতি ও বক্তব্য বিষয়টিকে আরো পরিস্কার করে তোলে। কোন একটি কোম্পানীর পণ্য তালিকা হাতে নিলেই দেখা যাবে তাতে পণ্যের নাম ও মূল্যের পাশাপাশি আরেকটি সংখ্যাও উল্লেখ রয়েছে যার নাম দেয়া হয়েছে পয়েন্ট। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি নির্ধারিত মূল্য প্রদান করলে সে শুধু পণ্যই পাচ্ছে না, পাচ্ছে নির্ধারিত সংখ্যার পয়েন্টও; যা তাকে পরবর্তীতে কমিশন পেতে সাহায্য করবে। এবং তার উপরের লেভেলের ব্যক্তিদেরকে প্রদান করবে নির্ধারিত কমিশন।

    এখন যদি কেউ নেট চলার কারণে কমিশন পায় তাহলে বোঝা যাবে, নির্ধারিত টাকার মোকাবেলায় নেওয়া পণ্যের সাথে যে পরিবেশক স্বত্বটি সে পেয়েছে এটির ফলেই সে কমিশন পাচ্ছে, যা সুস্পষ্ট সুদ সাদৃশ্য। অন্যদিকে যদি কারো নেট একেবারেই অগ্রসর না হয় তবে সে ক্ষেত্রেও সুদের সন্দেহ থাকছেই। কারণ, সে তো টাকা দিয়েছিল দু’টি উদ্দেশ্যে।

    ১ পণ্যের জন্য
    ২ পরিবেশক হয়ে কমিশন পাওয়ার জন্য।

    অথচ ২য়টির কোন সুবিধাই সে পায়নি। অর্থাৎ কিছু টাকা বিনিময়ের অতিরিক্ত থেকেই যাচ্ছে যা শরীয়তের দৃষ্টিতে সন্দেহমূলক সুদ এর আওয়াভুক্ত হয়ে অবশ্যই নাজায়েজ ও বর্জনীয়।

    উল্লেখ্য যে, কোন কোন এমএলএম কোম্পানী তাদের সদস্য হওয়ার জন্য পণ্য খরিদের পাশাপাশি নির্ধারিত সংখ্যক নগদ টাকা প্রদানেরও শর্ত করে থাকে। (যেমনঃ নিউওয়ে, ড্রিম বাংলা)। আর এ ক্ষেত্রে ঐ কারবারে সুদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। – সূত্র বেফাক।

    Note: This article is free from the editorial policy of this blog and does not necessarily hold the view of ‘Return of Islam’

  • হুক্‌ম শর’ঈ

    নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘নিযামুল ইসলাম’ বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে গৃহীত

    হুক্‌ম শর’ঈ হচ্ছে, বান্দা’র (‘ঈবাদ) কার্যাবলী সম্পর্কে আইনপ্রণেতা’র (আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার) বক্তব্য। বক্তব্যটি হতে পারে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত (ক্বাত’ঈ ছুবুত) অর্থাৎ কোন দ্বিমতের অবকাশ নেই যথা কুরআন ও হাদীস মুতাওয়াতির অথবা অমীমাংসিতভাবে প্রমাণিত (জন্নিঈ ছুবুত) অর্থাৎ একাধিক মতের অবকাশ রয়েছে যথা অ-মুতাওয়াতির হাদীস সমূহ। যদি বক্তব্যটি ক্বাত’ঈ ছুবুত হয়, তবে এর অর্থ নির্দিষ্ট (ক্বাত’ঈ দালালাহ) এবং হুকুমটি চূড়ান্ত, অর্থাৎ এ নিয়ে কোন দ্বিমত নেই। এরূপ একটি উদাহরণ হচ্ছে ফরজ সালাতের রাকাতের সংখ্যা, কারণ হাদীস মুতাওয়াতিরে এর উল্লেখ রয়েছে। অনুরূপভাবে রিবা নিষিদ্ধকরণ, চোরের হস্তচ্ছেদ, যিনাকারীর (ব্যভিচারকারী) শাস্তি বেত্রাঘাত, ইত্যাদি প্রত্যেকটিই চূড়ান্ত বিধান, এদের সত্যতা নির্দিষ্ট এবং চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত মতামত (দ্বিমত নেই)।

    যদি আইনপ্রণেতা’র বক্তব্য ক্বাতঈ সুবুত অথচ একটি মাত্র নির্দিষ্ট অর্থ প্রকাশক না হয় (জন্নিই দালালাহ), তবে হুকম টি অমীমাংসীত (অর্থাৎ এ নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে)। উদাহরণ স্বরূপ কুরআনে উল্লেখিত জিযিয়া সংক্রান্ত আয়াতটি উল্লেখ্য। আয়াতটি ক্বাত’ঈ ছুবুত কিন্তু তার অর্থ নির্দিষ্ট নয়। হানাফী স্কুলের শর্তানুসারে, একে জিযিয়া বলা বাধ্যতামূলক এবং তা আদায়করার সময় প্রদানকারীর অবমাননাকর অবস্থায় থাকা বাধ্যতামূলক। শাফে’ঈ স্কুলের শর্তানুযায়ী এটিকে জিযিয়া বলা বাধ্যতামূলক নয়, এবং একে দ্বৈত যাকাত বলা যায়। এই স্কুলের মতানুসারে এটি প্রদানের সময় প্রদানকারীর অবমাননাকর অবস্থাকে বাধ্যতামূলক করা হয়নি, বরং ইসলামী বিধানের অধীন হওয়াই তাদের জন্য যথেষ্ট অবমাননাকর বলে বিবেচিত হয়।

    যদি আইনপ্রণেতার বক্তব্য জন্নিই ছুবুত হয়, যেমন অ-মুতাওয়াতির হাদিস, তখন অর্থ ক্বাত’ঈ দালালাহ হোক বা না হোক, এ সংক্রান্ত হুক্‌ম চূড়ান্তভাবে মীমাংসিত হবেনা, অর্থাৎ এ বিষয়ে দ্বিমত থাকতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ, শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা (রাখা) কিংবা কৃষিভূমি ইজারা (লীজ) দেয়ার নিষিদ্ধতার বিষয়টি।

    আইন প্রণেতার বক্তব্য থেকে সঠিক ইজতিহাদের মাধ্যমে হুক্‌ম শর’ঈ কে অনুধাবন করা হয়। এভাবে একজন মুসলিম, একজন মুজতাহিদের ইজতিহাদের মাধ্যমে হুক্‌ম শরঈ সম্পর্কে অবগত হয়। সকল মুজতাহিদের ব্যপারে আল্লাহ’র হুক্‌ম হচ্ছে, মুজতাহিদ ইজতিহাদের মাধ্যমে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন এবং যা তার নিকট সর্বাধিক সঠিক বলে প্রতীয়মান হয় সেটিই তার জন্য হুক্‌ম। ঊলামাগণ এ বিষয়ে একমত যে, যদি একজন মুকাল্লাফ (শরীয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি) কোন এক বা একাধিক প্রশ্নে ইজতিহাদ করার যোগ্যতা অর্জন করেন এবং এভাবে কোন একটি বিষয়ে কোন হুক্‌ম এ উপনীত হন, তখন ঐ বিষয়ে অন্য মুজতাহিদিনদের অনুসরণ করা তার জন্য অনুমোদিত নয়। কারণ সেক্ষেত্রে তার জন্য এটি এমন একটি মতামতের তাকলীদ করা হবে, যা তার নিকট সর্বাপেক্ষা সঠিক বলে প্রতীয়মান হয়নি।

    মুকাল্লিদ মুত্তাবী হচ্ছে এমন এক ব্যক্তি যিনি ইজতিহাদ সম্পর্কে কিছু জ্ঞান অর্জন করেছেন, এবং দলীল অনুধাবন করার পর কোন হুক্‌ম অনুসরণ করেন। একজন মুত্তাবী’র জন্য তার অনুসৃত মুজতাহিদের মতামতই তার জন্য আল্লাহর হুক্‌ম। মুকাল্লিদ আম্মি হচ্ছেন এরূপ ব্যক্তি যার ইজতিহাদ সম্পর্কে তেমন কোন জ্ঞান নেই, কাজেই তিনি হুক্‌ম সংক্রান্ত দলীল অনুধাবন করা ছাড়াই একজন মুজতাহিদের মতামত অনুসরণ করেন। আম্মি মুজতাহিদের মতামত অনুসরণ করেন ও তিনি (মুজতাহিদ) যে আহকাম এ উপনীত হয়েছেন তা বাস্তবায়ন করেন। তার জন্য হুক্‌ম শর’ঈ হচ্ছে তার অনুসৃত মুজতাহিদের গৃহীত সিদ্ধান্ত ও মতামত অনুসরণ করা।

    কাজেই হুক্‌ম শর’ঈ হচ্ছে ইজতিহাদ করার যোগ্যতা সম্পন্ন কোন মুজতাহিদের ইজতিহাদ লব্ধ হুক্‌ম। এটিই তার জন্য আল্লাহর হুক্‌ম এবং তার এটি ছেড়ে অন্য মতামত গ্রহণ করার অনুমতি নেই। এটি একজন মুজতাহিদের অনুসারীর (মুকাল্লিদ) জন্যও আল্লাহর হুক্‌ম এবং এটি পরিত্যাগের অনুমতি নেই।

    যদি কোন মুকাল্লিদ একটি বিষয়ে (ইস্যুতে) হুকুমের জন্য একজন মুজতাহিদের মতামত পালন করে থাকেন তবে তার পক্ষে সেটি পরিত্যাগ করে উক্ত বিষয়ে অন্য মুজতাহিদের মতামত গ্রহণ করার অনুমতি নেই। অবশ্য একজন মুকাল্লিদের জন্য অন্য কোন বিষয়ে (ইস্যুতে) অন্য মুজতাহিদের মতামত অনুসরণ করার অনুমতি রয়েছে, কারণ ইজমা-আস-সাহাবা একজন মুকাল্লিদকে ভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন আলিমের মতামত জানবার অনুমতি দিয়েছে। যদি কোন মুকাল্লিদ একটি নির্দিষ্ট মাযহাবের যেমন শাফিঈ, এর অন্তর্গত হন এবং সম্পূর্ণ মাযহাব অনুসরণের সিদ্ধান্ত নেন, তবে তার জন্য নিম্নলিখিত বিষয় প্রযোজ্য হবে: ঐ মুকাল্লিদ ইতিমধ্যে তার মাজহাব অনুযায়ী যে বিষয়গুলো পালন করেছেন সে বিষয়গুলোতে অন্য কোন মাযহাবের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন না। যে সকল বিষয় তিনি এখনো পালন করেননি, সে বিষয়ে অন্য মুজতাহিদিনদের অনুসরণ করতে পারেন। যদি কোন মুজতাহিদ কোন বিষয়ে ইজতিহাদের মাধ্যমে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে থাকেন, গোটা মুসলিম উম্মাহর সিদ্ধান্তের ঐক্যের স্বার্থে তিনি স্বীয় ইজতিহাদ লব্ধ সিদ্ধান্তকে পরিত্যাগ করে অন্য মতামত অনুসরণ করতে পারেন, যেমনটি ঘটেছিল হযরত উসমান (রা) এর বাইয়াতের সময়।

  • বস্তু ও কর্ম সমূহের মূল হুকুমের পার্থক্য

    বস্তু ও কর্ম সমূহের মূল হুকুমের পার্থক্য

    বস্তুর জন্য শর’ঈ হুকুম:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا

    “তিনিই আল্লাহ, যিনি তোমাদের জন্য জগতের সকল বস্তু সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা বাকারা: ২৯)

    তিনি আরো বলেন:

    أَلَمْ تَرَوْا أَنَّ اللَّهَ سَخَّرَ لَكُمْ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَأَسْبَغَ عَلَيْكُمْ نِعَمَهُ ظَاهِرَةً وَبَاطِنَةً

    তোমরা কি দেখ না আল্লাহ নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলে যাকিছু আছে, সবই তোমাদের কাজে নিয়োজিত করে দিয়েছেন এবং তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নেয়ামতসমূহ পরিপূর্ন করে দিয়েছেন? (সূরা লুকমান: ২০)

    قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ قُلْ هِيَ لِلَّذِينَ آَمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا خَالِصَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآَيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ

    আপনি বলুন: কে হারাম করেছে আল্লাহর সাজ-সজ্জাকে, যা তিনি বান্দাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন এবং পবিত্র খাদ্রবস্তুসমূহকে? আপনি বলুন: এসব নেয়ামত আসলে পার্থিব জীবনে মুমিনদের জন্যে এবং কিয়ামতের দিন খাঁটিভাবে তাদেরই জন্যে। এমনিভাবে আমি আয়াতসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করি তাদের জন্যে যারা বুঝে। (সূরা আ’রাফ: ৩২)

    এসকল আয়াতের মাধ্যমে মহান আল্লাহ আমাদের জন্য ভূপৃষ্ঠের সকল বস্তুকে মুবাহ (বৈধ) করে দিয়েছেন। আর এসকল আয়াত থেকে বস্তুসমূহের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত মূলনীতি গ্রহণ করা হয়েছে:

    الاصل فى الأشياء الاباحة. مالم يرد دليل التحريم

    “সকল বস্তুই হালাল যতক্ষণ না তার মধ্য থেকে কোনটা হারাম হওয়ার দলীল পাওয়া যাবে।”

    অর্থাৎ বস্তু সমূহের বৈধ ও হালাল হওয়ার বিষয়টা আম (general)। এরপর এই বৈধতা তথা হালাল থেকে কোন বস্তুকে হারাম বা অবৈধ করতে হলে তার জন্য পৃথক প্রমাণ দিতে হবে।

    এর উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত:

    إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ وَالدَّمَ وَلَحْمَ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ

    “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু, রক্ত, শুকরের মাংস এবং ঐ সকল প্রাণী -যাকে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছে।” (সূরা নাহল: ১১৫)

    এই আয়াত দ্বারা মৃত জন্তু আমাদের জন্য হারাম সাব্যস্ত করা হয়েছে।

    মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে সকল বস্তু সমূহকে হালাল এবং হারাম এই দু’টি মানদণ্ডে ঘোষণা করেছেন। উত্তম, অপছন্দনীয় বা আবশ্যক বলে কোন ঘোষণা দেননি। যেমন বলা হয়েছে অপর আয়াতে:

    وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَذَا حَلَالٌ وَهَذَا حَرَامٌ

    “কোন বস্তু সম্পর্কে তোমরা অন্যায়ভাবে নিজেদের মুখে সেটি হালাল বা হারাম হওয়ার ঘোষণা করো না।” (সূরা নাহল: ১১৬)

    একইভাবে অন্যত্র বলা হচ্ছে:

    قُلْ أَرَأَيْتُمْ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ لَكُمْ مِنْ رِزْقٍ فَجَعَلْتُمْ مِنْهُ حَرَامًا وَحَلَالًا

    “হে নবী আপনি বলে দিন, তোমরা কি ভেবে দেখেছো যে, মহান আল্লাহ তোমাদের জন্য যেই রিযক তৈরী করে দিচ্ছেন তার মধ্যে স্বেচ্ছাচারীভাবে কতককে তোমরা হালাল আর কতককে হারাম সাব্যস্ত করে নিচ্ছ?” (সূরা ইউনূস: ৫৯)

    কর্ম সমূহের জন্য শর’ঈ হুকুম:

    কোন বস্তু জায়েজ হওয়ার অর্থ কখনই এটা নয় যে, তার সাথে সম্পৃক্ত সকল কাজ এমনি এমনিই জায়েজ ও বৈধ হয়ে যাবে। বরং প্রত্যেকটি কাজের জন্য ভিন্ন দলীল লাগবে। শরীয়তের হুকুম বান্দার কাজ সম্পর্কিত শারে’ বা বিধান দাতার সেই সম্বোধন যা তার বিভিন্ন বিষয়াবলীর সমাধানের জন্য এসেছে। আর বস্তুসমূহের কাজ তো কেবল বিভিন্ন কর্মের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হওয়া। এজন্যই শরয়ী সম্বোধনের মূল লক্ষ্য হলো যাবতীয় আফআল বা কর্ম আর বিভিন্ন বস্তুসমূহ বান্দার কর্মের অন্তর্গত বিষয়; চাই এটা শর’ঈ সম্বোধনের মধ্যে উল্লেখ থাকুক বা না থাকুক।

    উদাহরণ স্বরূপ: কাপড়, বস্তুসমূহের ক্ষেত্রে আম (general) হুকুমের কারণে মুবাহ বা বৈধ। কিন্তু এজন্য এই কাপড়ের যে কোন প্রকার ব্যবসাই স্বয়ং সম্পূর্ণভাবে বৈধ হয়ে যাবে না। বরং প্রথমে সেই ব্যবসার (তথা কাজটির) হুকুম জানতে হবে।

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    “আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (সূরা বাকারা : ২৭৫)

    আমরা এই আয়াত থেকে ব্যবসা হালাল হওয়ার প্রমাণ পেলাম। এর দ্বারা আমরা কাপড়ের ব্যবসা হালাল বলেও জানতে পারলাম। এজন্য কাপড় বেচা-কেনা করা মুবাহ বা বৈধ জানবো। আর এটাই কাপড় বিক্রির এই কাজের হুকুম।

    একইভাবে উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় ছুরি একটি বৈধ জিনিস। কেননা তার হারাম হওয়ার কোন দলীল নেই। হ্যাঁ, তবে এই ছুরি ব্যবহার করে অন্যায়ভাবে কোনো ঈমানদারের জন্য অন্য ঈমানদারকে হত্যা করা হারাম। যেমন বলা হয়েছে:

    وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ

    “আর যে কোন মুমিনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করবে তার শাস্তি হচ্ছে জাহান্নাম।” (সূরা নিসা : ৯৩)

    কর্মসমূহের ক্ষেত্রে শরীয়তের কায়দা বা মূলনীতি হলো:

    الاصل فى الافعال التقيد بالحكم الشرعى

    “কর্মসমূহের ক্ষেত্রে শরীয়তের নিয়মাবলীর অনুসরণ করতে হবে।” এজন্যই মানুষের জন্য সকল কাজ মূল থেকেই হারামও নয় আবার বৈধও নয়। বরং প্রত্যেক কাজের ক্ষেত্রে তার বাস্তবায়ন ও চুড়ান্ত পরিণতির পূর্বে প্রথমেই তার হুকুম অনুসন্ধান করতে হবে। আর এ কাজটি অত্যন্ত জরুরী।

    ‘প্রত্যেক হুকুম তার শরয়ী দলীলের উপর নির্ভরশীল।’ এই মূলনীতির প্রমাণ হচ্ছে নিন্মোক্ত আয়াত:

    فَوَرَبِّكَ لَنَسْأَلَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ ~ عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ

    “আপনার রবের শপথ! আমি অবশ্যই অবশ্যই তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবো। যা তারা দুনিয়াতে করেছে।” (সূরা হিজর: ৯২-৯৩)

    অর্থাৎ মহান আল্লাহ তা’আলা আমাদের সকল কর্মের হিসাব নিবেন। অন্যত্র আরো বলা হয়েছে:

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ

    “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ এবং তার রাসূলের আনুগত্য করো। আর আনুগত্য করো নিজেদের মধ্যকার নেতৃত্বস্থানীয়দের। এরপর যদি তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে মতভেদ দেখা দেয়, তবে তোমরা বিষয়টি আল্লাহ ও রাসূলের (নির্দেশনার) দিকে উপস্থাপন করো। যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাকো।” (সূরা নিসা: ৫৯)

    হাদীসে এসেছে:

    من عمل عملا ليس عليه امرنا فهو رد

    “যে এমন কোন আমল করবে, যাতে আমাদের নির্দেশনা নেই তবে সেই আমল বাতিল বলে গণ্য হবে।” (সহীহ মুসলিম শরীফ)

    এর দ্বারাও এটাই সাব্যস্ত হয় যে, প্রত্যেক কাজের মূল হুকুম বৈধতা নয় বরং শরীয়তের হুকুমের অনুসরণ এবং শরীয়তের নির্দেশনার অনুকরণ। এর ব্যতিক্রম হলে সেই আমলই বাতিল।

    কোন কাজকেই এমনি এমনি জায়েজ বলে সাব্যস্ত হবে না, বরং শরীয়ত প্রণেতার পক্ষ থেকে হুকুম অবগত হবার পর তার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেয়া যাবে। এরপর সেই শরয়ী নির্দেশনারই অনুসরণ করতে হবে। এর থেকেই ‘কর্মের স্বাধীনতা’ (Freedom of Acts Unless Clear Prohibitions are Stated) সম্পর্কিত নিয়ম বাতিল সাব্যস্ত হয়। একইভাবে সাহাবায়ে কিরামের আমলও নিন্মোক্ত মূলনীতির উপর অটল ছিল:

    الاصل فى الافعال التقيد بالحكم الشرعى

    “কর্মসমূহের ক্ষেত্রে শরীয়তের নিয়মাবলীর অনুসরণ করতে হবে।” এছাড়াও এ বিষয়টির প্রমাণ পবিত্র কুরআনের অসংখ্য স্থানে নিম্নোক্ত শব্দে উল্লেখ হয়েছে: يسئلونك (তারা আপনার কাছে জিজ্ঞাসা করে)।

    সাহাবায়ে কিরাম রাসূল (সা)-এর কাছে বিভিন্ন কাজ-কর্মের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করাটাই প্রমাণ করে যে, কাজ-কর্মের মূল হুকুম স্বাধীনতা বা বৈধতা নয়।

  • সাভার হত্যাকান্ড!

    সাভার হত্যাকান্ড!

    ধারাবাহিকভাবে পুনরায় আরেকটি হত্যাকান্ড!!

    এটি কোন অস্বাভাবিক বা অনাকাঙ্খিত ঘটনা নয়। একে একে ঘটানো এই হত্যাকান্ড ঘটিয়ে আসছে গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী যালিম শাসকগোষ্ঠী। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রদানে ব্যর্থ এই শাসকেরা লাগাতারভাবে প্রতারণার খেলা করে যাচ্ছে এই উম্মাহ’র সাথে। একের পর এক গার্মেন্টসে আগুন, ধ্বসের পর আশার বাণীর মূলা ঝুলানো হয় আমাদের সামনে আর আমরা তা ধরে ঝুলতে থাকি, ন্যায়ের আশায়।

    অথচ বাস্তবতা হল, না তারা আমাদের নিরাপত্তা বা অধিকার প্রদান করছে; উপরন্তু দুর্নীতির ছোবলে চালিয়ে যাচ্ছে একের পর এক হত্যাকান্ড।

    তাজরীন ফ্যাশন, চট্টগ্রামে গার্ডার ধ্বসের দ্বারা কৃত হত্যায় রক্তের গন্ধ বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার পূর্বেই দূর্নীতির ছোবলে পূরনায় আক্রান্ত এই উম্মাহ।

    রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি একজন অমুসলিম নাগরিকের ক্ষতি সাধন করলো, সে যেন আমার ক্ষতি সাধন করলো।”

    আর এখন স্বজন হারানো পরিবারকে দেওয়া হচ্ছে ২০ হাজার টাকা!!!!! যেখানে সময় মত তাদের বেতনটাই দেওয়া হত না। এসব কি লোক দেখানো মেকি নাটক নয়???

    আর কতকাল চলবে এসব নাটক?? যুলুমের পর নাটক সাজাবে, অনর্থক কথা বলে দোষ থেকে মুক্তির পাঁয়তারা করে যাবে এই যালিমেরা চিরকাল।

    আর এইসকল যুলুমের বিচারের দাবিতে আওয়াজ না তোলার পরিপ্রেক্ষিতেই ঘটবে এই ধরণের হত্যাকান্ড।

    “আর যদি সে জনপথের অধিবাসীরা ঈমান আনতো এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করতো, তবে আমি তাদের জন্য আসমান ও জমিনের সমস্ত নেয়ামতকে উন্মুক্ত করে দিতাম…” [সূরা আল-আরাফ : ৯৬]

    স্মরণ করুন সামূদ জাতির কথা যারা যুলুমের বিরুদ্ধে আওয়াজ না উঠানোর কারণেই অর্থ্যাৎ সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ থেকে বিরত থাকার কারণেই ধংস হয়ে গিয়েছিল। অথচ তাদের মধ্যে অন্যায় করেছিল মাত্র ৯ জন, আর বাকিরা তা দেখেও বাধা প্রদান করেনি।

    নবী সাঃ বলেছেন,

    “তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ দেবে ও অন্যায় কাজে নিষেধ করবে এবং লোকদের কল্যাণময় কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করবে। অন্যথায় আল্লাহ্‌ কোনো আযাবের মাধ্যমে তোমাদের ধ্বংস করে দেবেন কিংবা তোমাদের মধ্য থেকে খারাপ লোকদেরকে তোমাদের উপর শাসনকর্তা নিযুক্ত করে দেবেন। এসময় তোমাদের মধ্যকার ভালো লোকেরা আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করবে, কিন্তু তার জবাব দেয়া হবে না।” (মুসনাদে আহমাদ)

    অবশ্যই, এই যুলুমের সমাধান নয় বিএনপি বা অন্য কেউ। বি.এন.পি জোটের আমলেও চট্টগ্রামে এইরকম হত্যাকান্ড ঘটানো হয়েছিল কে.টি.এস টেক্সটাইলের কারখানায়, যার বিচার আদৌ পায়নি এই উম্মাহ। আর এই শাসনব্যবস্থায় বিচারের আশাও অনর্থক বৈ কি।

    সুতরাং, আওয়ামী-বি.এন.পির বা এই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার নিকট ধার ধরার সময় শেষ!!

    আজ মুক্তির জন্যই এইসকল হত্যাকারীদের শাস্তি সুনিশিতকরণে দাবী উঠান খিলাফতের; যা একমাত্র সমাধানের পথ। খিলাফত রাষ্ট্রই পারে দেশের ঐক্য ফিরিয়ে আনতে এবং আপনাদের আজকের করুণ পরিণতির জন্য দায়ী আওয়ামী-বিএনপির দূষিত রাজনীতির বিপরীতে দেশকে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় আসীন করাতে।

    মুক্তির একপথ, খিলাফত, খিলাফত।

  • বাংলাদেশের সম্ভাব্য রাজনৈতিক ভবিষ্যতের বিশ্লেষন

    বাংলাদেশের সম্ভাব্য রাজনৈতিক ভবিষ্যতের বিশ্লেষন

    সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতি সঙ্কটের আবর্তে ঘুরছে যদিও বা এই সঙ্কট কৃত্রিম এবং এই সঙ্কট আমেরিকা-ব্রিটেন ও ভারতের তৈরি। এবং বাংলাদেশে এটি নতুন কিছু নয় প্রতিবারই যখন নির্বাচন ঘনিয়ে আসে তখনই এই ধরণের পরিস্থিতি সাম্রাজ্যবাদীরা তৈরি করে থাকে যাতে তাদের সুযোগ্য অনুগত দালাল আগামীবার ক্ষমতায় আসে এবং তাদের স্বার্থ অনুগত দাসের মত করে রক্ষা করে। তাই বাংলাদেশের সম্ভাব্য রাজনৈতিক গতি বিধি নির্ধারণ করতে গেলে আমাদের বাংলাদেশকে ঘিরে মার্কিন, ব্রিটিশ ও ভারতের নীতি সমূহের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। যা হল:

    ১. আমেরিকা এ অঞ্চলে ইসলামী খিলাফতের পুনরুত্থান ঠেকানোর পরিকল্পনা করছে, তার নিয়ন্ত্রণাধীন রাষ্ট্রসমূহের বলয় দ্বারা চীনকে ঘীরে রাখতে চাচ্ছে এবং এ অঞ্চলের বাণিজ্য পথ (বঙ্গোপসাগর-ভারত মহাসাগর থেকে মালাক্কা প্রণালী) তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিতে চাচ্ছে । এ অঞ্চলে তার ঘনঘন সামরিক মহড়া এবং নানা অজুহাতে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি, এ পরিকল্পনারই অংশ, যা এখন তার পররাষ্ট্রনীতির প্রধান ভিত্তি, যা ‘এশিয়ান পিভট’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশের সাথে মার্কিনীদের কৌশলগত ও নিরাপত্তা সংলাপ, তার এ নীতি বাস্তবায়নের একটি অংশ।

    ২. তাছাড়া, ভারত যাতে তার হয়ে কাজ করে, এজন্য ভারতকে নিয়ে মার্কিন নীতি হচ্ছে ভারতকে তার আওতাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করা; যাকে তারা ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ বলে উল্লেখ করছে। অর্থাৎ, ভারতকে তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছাড় দেয়া কিংবা ফায়দা লুটের সুযোগ করে দেয়া, কারণ, আমেরিকা অনুধাবন করতে পেরেছে যে, এটা ছাড়া ভারতকে ঐতিহাসিকভাবে চলমান বৃটিশ প্রভাব বলয় (বিশেষত : কংগ্রেস পার্টির মাধ্যমে জারি রাখা) থেকে বের করে আনা যাবে না।

    ৩. কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং ভারতকে ফায়দা লুটের সুযোগ করে দেয়ার মার্কিন এ নীতির অর্থ হচ্ছে, ভারতের প্রতিবেশী দুই মুসলিম দেশ অর্থাৎ পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে, বশীভুত দাস রাষ্ট্রে পরিণত করা, যাতে এই দুই রাষ্ট্রের শাসকরা সবকিছু জলাঞ্জলী দিয়ে হলেও ভারতকে যেকোন সুবিধা কিংবা ছাড় দিতে কুণ্ঠাবোধ না করে। যেমন, ভারতের স্বার্থ রক্ষায় মার্কিন হুকুমে, পাকিস্তানের দালাল শাসকরা কাশ্মিরের মুসলিমদের পক্ষ ত্যাগ করেছে।

    তাই বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচনে সেই দলই ক্ষমতায় আসবে যে কিনা মার্কিন-ভারত এর জন্য কৌশলগত ভাবে উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। বিশেষ করে যে দল ক্ষমতায় আসলে ভারত নিজেকে নিরাপদ মনে করবে ও আধিপত্যবাদী আচরণ বজায় রাখতে পারবে সে দলই ক্ষমতায় আসবে। অর্থাৎ আমেরিকা ভারতকে অখুশি করে কাউকে ক্ষমতায় আনবে না। আর আমেরিকাও ভারতকে কৌশলে খুশি মনে তার নীতিতে তার পরিকল্পনার মাঝে নিয়ে আসবে অর্থাৎ ভারত আমেরিকার দেখান পথে চলবে যাতে ভারতের স্বার্থও রক্ষা হবে আবার দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে মার্কিন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে। একটি উদাহরণের সাহায্যে এই বিষয়টিকে বোঝান যাক “আমেরিকা হচ্ছে সেই পিতা যে কিনা তার সন্তান (ভারত) কে খেলার মাঠে খেলতে দিচ্ছে, এবং সন্তান যখনই চোখের বাইরে অথবা বিপদে পড়তে যাচ্ছে তখনই ধরে তাকে আবার নির্দিষ্ট খেলার জায়গায় নিয়ে আসছে”

    ভারত একটি আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র। তাই আদর্শিক দৃষ্টিকোন তার মাঝে নেই। তাই যখনই ভারত এমন কোন কিছু করছে যা আমেরিকার দক্ষিণ এশিয়া ভিত্তিক নীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে তখনই আমেরিকা তাকে নিয়ন্ত্রন করছে।

    তাই আমরা মার্কিন নীতির পরিবেষ্টনে ভারতের নীতির বাস্তবায়নের আলোকে বাংলাদেশে ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে দেখব।

    প্রথমত ভারত আওয়ামীলীগকে ক্ষমতায় আনতে চায় কারণ,

    – আওয়ামীলীগ ভারতের পরিক্ষিত বন্ধু, শেখ হাসিনা গান্ধী পরিবার ও প্রনবের একান্ত অনুগত দাস।

    – আওয়ামীলীগ ISI ও ইসলামী আবেগের প্রভাব বলয় মুক্ত। এবং আওয়ামীলীগের ইসলাম বিমুখতা ভারতের ইসলাম বিদ্বেষের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ভারত বিরোধী ইসলামী আবেগ মুক্ত।

    – ভারতের শত্রু বাংলাদেশ সেনাবাহিনকে দুর্বল করার জন্য ভাল সহযোগী।

    কিন্তু, আওয়ামীলীগের সরকার পরিচালনায় অদক্ষতা, শেয়ার মার্কেটে লুটপাট সর্বপরি অর্থনীতি ধ্বংস, আইন শৃঙ্খলার অবনতি ও ইসলামী আবেগকে নিয়ন্ত্রন করতে না পারার কারনে তার ভিত খুবই নড়বড়ে করে ফেলেছে তাই আওয়ামীলীগের আবার ক্ষমতায় আসা অনেকটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কারণ:

    – আমেরিকা প্রথম থেকেই আওয়ামীলীগকে পরামর্শ দিচ্ছিল জামাতের সাথে বসে যুদ্ধ অপরাধ বিয়ক সমস্যা সমাধানের জন্য এবং হাসিনা সেই পথে এগুচ্ছিল কিন্তু বাম পন্থিরা তাকে আশ্বস্থ করে; জামাতকে নির্মূল করা সম্ভব এবং মুক্তিযুদ্ধের আবেগ দিয়ে জামাতকে নির্মূল করে বিএনপিকে কোণঠাসা করে ত্বত্তাবধায়কের দাবি ও সরকারে সকল ব্যর্থতা ঢেকে আগামী নির্বাচনে জেতা যাবে। এবং হাসিনা সেই পথে এগুয়। কিন্তু শেখ হাসিনা বুঝতে পারেনি বামদের দিয়ে যারা কিনা ৯০ ভাগ মানুষের অনূভুতি বুঝতে অক্ষম তাদের কাধে চরে এবং ইসলামী আবেগের সাহায্য ছাড়া বাংলেদেশে রাজনীতি নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব নয়।

    – বর্তমানে আমেরিকার বিশ্বব্যাপি ইসলামের ব্যপারে নীতি হল ইসলামকে নির্মূল করা নয় ইসলামের চিন্তায় বিষ ঢুকানো, সে ইসলামী আবেগকে দবিয়ে না রেখে তাই অপব্যবহার করে এবং জামাত ও অনান্য গণতান্ত্রিক ইসলামী দল না বুঝে তার এই পরিকল্পনার অংশ। তাই তাদের নিষিদ্ধ করা মানে দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামী খিলাফতের উত্থানকে এগিয়ে দেওয়া। আমেরিকা ভারতের এই পদ্ধতিতে আওয়ামীলীগকে ক্ষমতায় আনাকে সঠিক মনে করে না, হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন তা বুঝিয়ে দিয়েছে এবং ইসলামের ফুসে ওঠা আবেগকে ঠাণ্ডা করেছে। আমেরিকা বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা পছন্দ করে না কারণ এখানে সে তার ঘাঁটি করতে চায় ও রাজনৈতিক শুন্যতা তৈরি করতে চায় না যা কিনা তার নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায় ও ইসলামের রাজনৈতিক উথান হয়ে যায়। তাই বিএনপি, জামাত ও ইসলামী দলগুলোর ব্যপারে ভারতকে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ক্রমাগত ভাবে তাগিদ দিচ্ছে।

    আওয়ামীলীগকে ক্ষমতায় আসতে হলে বামদের বুঝিয়ে বা বাদ দিয়ে ইসলামপন্থীদের তার সাথে আনতে হবে, এরশাদকে রাষ্ট্রপতি বানানোর লোভ দেখিয়ে জাপা কে হাতে রাখতে হবে, জামাতকে কোনভাবে আপোষে আনতে হবে যা কিনা মোটামুটি আসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে। কিন্তু আওয়ামীলীগ পুরনো পদ্ধতিতে দমন নিপীড়ন ও মামলা হামলা দিয়ে বিএনপি-জামাতকে ঠেকাতে যাচ্ছে যা হিতে বিপরীত হচ্ছে। তবে বর্তমানে আওয়ামীলীগ ইসলাম পন্থীদের হাতে আনার চেষ্টা করছে যাতে আবার বাম পন্থীরা ক্ষিপ্ত হচ্ছে। তাই হাসিনার ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা ক্রমাগত অনিশ্চিত হচ্ছে।

    দ্বিতীয়ত, বিএনপি জোট

    বিএনপি মূলত আমেরিকা পন্থী দল এবং যে জাতীয়তাবাদের দোহাই দিয়ে ভারত বিরোধীদের আবেগকে ও ইসলামের আবেগকে পুজি করে চলা দল। কিন্তু যত বারই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে সে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করে এগিয়েছে যতটুকু আমেরিকা তাকে করতে বলেছে। যেহেতু এখন ভারত এবং আমেরিকা কৌশলগত মিত্র তাই আমেরিকার খাস দালাল খালেদা ভারত সফরে যায় এবং ভারত বিরোধী আবেগকে না উস্কানো ও ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অর্থাৎ ভারতের নিরাপত্তা রক্ষায় বিএনপি ভারতের নীতির মত চলবে বলে দাস খত দেয় এই আশায় আগামী নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আশার জন্য যেন ভারত সহযোগিতা করে। কিন্তু বিএনপির এই দাসখতে ভারত পূর্ণ আস্থা আনতে পারে নি কারণ বিএনপির মাঝে এখনও একটি অংশ রয়েছে যারা বরাবরই ভারত বিরোধী ও ISI এর সাথে সখ্যতা রাখে এবং জামাত ই ইসলাম যারা কিনা তাদের আদী শত্রু বিএনপির সাথে জোটবদ্ধ। তাই ভারত আবার আওয়ামীলীগকে আনার ব্যপারে বেশি আগ্রহী হয় এবং আওয়ামীলীগকে না আনতে পারলেও যেন বিএনপির ভারত বিরোধী অংশ ও জামাত ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং তাদের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। কিন্তু ভারতের বামদের কাধে আওয়ামীলীগকে চড়ানো ‘৭৫ এর ভুলের পুনঃপ্রয়োগ যা কিনা ইসলামী আবেগকে উস্কে দেয়া এবং দেশকে অস্থিরতার সম্মুখীন করে ইসলামের রাজনৈতিক উথানের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। যা আমেরিকার দক্ষিণ এশিয় নীতিকে চরম ভাবে ক্ষতির সম্মুখীন করতে পারত। তাই মার্কিনীরা ইসলামের এই আবেগকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে ও ইসলামের আবেগকে গণতন্ত্রের রাজনীতির বলয়ে নিয়ে আসে ও বিএনপির হাতে তুলে দেয় যাতে আওয়ামীলীগ এখন প্রায় কোণঠাসা। এবং বিএনপি ও ইসলামী দল গুলো আরও বেশি মার্কিন অনুগত হয়।

    আগামী বছর ভারতে নির্বাচন হতে যাচ্ছে এবং বিজেপি ক্ষমতায় আসার সম্ভবনা প্রবল এবং খালেদার ভারত সফরে আমরা বিজেপির সাথে বৈঠকে দেখি এবং বিজেপি যেমন ভারতের আমেরিকা পন্থী দল বিএনপি তেমন বাংলাদেশে আমেরিকা পন্থী দল। তাই বাংলাদেশে যেমন বিএনপি ক্ষমতায় আসার সম্ভবনা প্রবল হচ্ছে তেমনি ভারতে বিজেপি। তাই আগামিতে দক্ষিণ এশিয়া নিয়ন্ত্রণে বিএনপি ও বিজেপির রসায়ন আমেরিকার ১ম পছন্দ হওয়াটাই স্বাভাবিক।

    এরশাদ নিজেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ফ্যাক্টর হিসেবে দেখাতে চায় এবং সম্প্রতি সে ভারত ও আমেরিকা সফর করে এবং সে শেষ পর্যন্ত সেদিকেই ঝুকবে যেদিকে আমেরিকা-ভারতের এক হওয়ার হওয়া বইবে।

    তৃতীয়ত, সেনাবাহিনী বা সেনা সমর্থিত সরকার। ভারত-ব্রিটেন-ইইউ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ক্ষমতায় আসা পছন্দ করে না আর সেনাবাহিনী ক্ষমতায় আসা মানে আমেরিকা বাংলাদেশে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে তার শেষ অস্ত্র ব্যবহার করেছে। আর আমেরিকাও এই মুহূর্তে সেনাবাহীনিকে ক্ষমতায় আনতে চায় না, কিন্তু খালেদা জিয়া সেনাবাহিনীকে আমন্ত্রণ জানানোতে এই অপশনটি আলোচনায় আসে। কিন্তু বর্তমানে সশস্ত্রবাহিনীর প্রতি আমেরিকার নীতি হল তাকে তার অনুগত একটি বিগ্রেডে পরিণত করা। যার জন্য দরকার সেনাবাহিনীর মাঝে শূন্যতা তৈরি ও আমেরিকার দ্বারা তা পূরণ। যেমনঃ পিলখনা হত্যা কাণ্ডের পর আমেরিকা বাংলাদেশের সেনা-বাহিনীর সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে জোর দেয় এবং প্রচুর সামরিক চুক্তি ও মহড়ার আয়োজন করে এতে করে সেনা নেতৃত্ব আরও বেশি আমেরিকা মুখি হয় এবং পেশাদার হয় যাতে তারা ভাড়ায় আমেরিকার জন্য খাটে। আবার সেনা ও নৌ বাহিনীর প্রচুর সারঞ্জাম আমেরিকা দেয় তার প্রশিক্ষণের নামে সম্পর্ক আরও পেশাদারী পর্যায়ে নিয়ে আসে। এবং এই সময়ে আমেরিকা চায়না এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হোক বরং সে খালেদার মাধ্যমে শুধু ভয় লাগিয়েছে।

    আর একটি বিষয় আলোচনা করা প্রয়োজন, যা আমেরিকা-ব্রিটেন-ভারতকে এক জায়গায় নিয়ে আসছে তা হল ইসলামী খিলাফতের উত্থানে সেনাবাহিনীর আগ্রহ, কারণ শুনা যায় গত বছর ডিসেম্বরে বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর মধ্যম সারির অফিসাররা খিলাফত প্রতিষ্ঠার একটি উদ্যোগ নিয়েছিল যা সকল সাম্রাজ্যবাদীদের ভাবিয়ে তুলেছে এবং বাংলাদেশে অস্থির পরিবেশ তৈরি হওয়া মানে সে ইচ্ছাকে আরও বেশি উস্কে দেয়া, তাই আমেরিকা বার বার তাগিদ দিচ্ছে যে ক্ষমতার পরিবর্তন আলোচনার মাধ্যমে হতে হবে কোন সংঘাতের মাধ্যমে নয় যাতে এই অঞ্চলে ইসলামের উত্থান আরও তরান্বিত না হয়। এবং ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি TIB, CPD যারা কিনা সাম্রাজ্যবাদীদের ডলার-পাউন্ড পুষ্ট তারা সংঘাত বিহীন ক্ষমতার পরিবর্তনের ফর্মুলা দিচ্ছে।

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৪ (দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা)

    [নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]

    আল্লাহর রাসুল (সা)-এর নিকট ওহী নাযিলের শুরু থেকেই ইসলামের দাওয়াত মানুষের কাছে পরিচিত ছিল। মক্কার মানুষ প্রথম থেকেই জানতো যে, মুহাম্মদ (সা) মানুষকে এক নতুন দ্বীনের দিকে আহবান জানাচ্ছেন এবং বেশ কিছু সংখ্যক মানুষ ইসলামকে দ্বীন হিসাবে গ্রহন করেছে। তারা আরও জানতো যে, তিনি এসব মুসলিমদের সাথে একত্রে মিলিত হন, তাদের দেখাশোনা করেন এবং মুসলিমরা যে কুরাইশ সমাজের লোকচক্ষুর আড়ালে একত্রিত হয়ে নতুন দ্বীন শিক্ষা করে এটাও তারা জানতো।

    মক্কার লোকেরা ইসলামি দাওয়াতের ব্যাপারে এবং যারা ইসলাম গ্রহন করছে তাদের ব্যাপারে সচেতন ছিল, কিন্তু তারা কখনো জানতে পারেনি কোথায় তারা মিলিত হয় এবং কারা মিলিত হয়। এজন্যই মুহাম্মদ (সা) যখন প্রকাশ্যে মক্কার মানুষকে নতুন এ দ্বীনের দিকে তাদের আহবান জানালেন তখন এটা তাদের কাছে আশ্চর্যজনক কোনও বিষয় ছিল না। মূলতঃ যেটা তাদেরকে বিস্মিত করেছিল সেটা হল মুসলিমদের নতুন একটি দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করা। মুসলিমদের এ নতুন দলটি আরও শক্তিশালী হয় যখন হামযাহ্‌ ইবন ‘আবদ আল মুত্তালিব এবং এর ধারাবাহিকতায় ‘উমর ইবন আল খাত্তাব ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে। এরপর আলাহ কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল করলেন,

    “অতএব তোমাকে যে বিষয়ে আদেশ করা হয়েছে, তা প্রকাশ্যে ঘোষনা কর এবং মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। বিদ্রুপকারীদের বিরুদ্ধে আমিই তোমার জন্য যথেষ্ট। যারা আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্য সাব্যস্ত করে। অতএব অতিসত্তর তারা জেনে নেবে।” [সুরা হিজর: ৯৪-৯৬]

    আলাহর রাসুল (সা) আল্লাহর এ আদেশ যথাযথ ভাবে পালন করেন এবং তার দলকে সমস্ত মক্কারবাসীদের সাথে পরিচিত করান। তিনি তাঁর সাহাবীদের দুটি লাইনে সজ্জিত করেন, একদিকের নেতৃত্বে থাকেন ‘উমর ইবন আল খাত্তাব আর একদিকের নেতৃত্বে থাকেন হামযাহ্‌ ইবন ‘আবদ আল মুত্তালিব। এবং এ দলটি নিয়ে তিনি এমন ভাবে পথ চলতে থাকেন যা মক্কাবাসীদেরকে বিস্মিত করে। এভাবে তিনি তাঁর সাহাবীদের সঙ্গে করে কাবাঘর পরিভ্রমন করেন।

    এটা ছিল এমন এক পর্যায় যখন মুহাম্মদ (সা) তাঁর সাহাবীদের সাথে গোপনীয়তা থেকে প্রকাশ্য দাওয়াতের দিকে অগ্রসর হন এবং ইসলাম গ্রহন করার মতো মনমানসিকতা সম্পন্ন লোকদের আহবানের পরিবর্তে সাধারন ভাবে সমাজের সমস্ত মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করেন। এ পর্যায়ে ইসলামি দাওয়াত এক নতুন দিকে মোড় নেয়, শুরু হয় সমাজে ঈমান আর কুফরের মধ্যে দ্বন্দ, ভ্রান্ত আর ঘুঁণে ধরা আদর্শ গুলোর সাথে সংঘর্ষ হতে থাকে সত্য আদর্শের। বস্তুতঃ এই সময় থেকেই শুরু হয় মুহাম্মদ (সা) এর দাওয়াতের দ্বিতীয় পর্যায়, যাকে বলা যায় প্রকাশ্য দাওয়াত আর সংঘাতের পর্যায়।

    ইসলামের এ আহবানকে বাঁধাগ্রস্থ করার জন্য অবিশ্বাসী মুশরিকরা রাসুল (সা) এবং তাঁর সাহাবাদের উপর সর্বপ্রকার নির্যাতন এবং অত্যাচার শুরু করে। বস্তুতঃ এটা ছিল চরমতম কঠিন একটা সময়। রাসুল (সা) এর বাসগৃহে পাথর নিক্ষেপ করা হয় এবং আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মু জামিল মুহাম্মদ (সা) এর গৃহের সামনে নানা নোংরা আর্বজনা নিক্ষেপ করে তাকে উক্ত্যক্ত করতে থাকে। তিনি (সা) এ সব কিছু নীরবে উপেক্ষা করেন এবং নিজহাতে সেগুলো পরিষ্কার করেন। একবার আবু জাহল তাঁর দিকে কাবার মূর্তিদের উদ্দেশ্যে বলিকৃত ছাগলের নাড়িভুড়ি নিক্ষেপ করে।

    মুহাম্মদ (সা) এসব সহ তাঁর কন্যা ফাতিমার বাড়ীতে উপস্থিত হলে তাঁর কন্যা সেগুলো নিজহাতে পরিষ্কার করে দেন। এ সমস্ত অত্যাচার ও নির্যাতন মুহাম্মদ (সা)-কে প্রতিনিয়ত আরও শক্তিশালী করে তুলে এবং তিনি আরও দৃঢ় ভাবে দাওয়াতী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকেন।

    ইসলাম গ্রহনকারী মুসলিমরাও হতে থাকে হুমকি আর নির্যাতনের সম্মূখীন। প্রতিটি গোত্রের লোকেরা তাদের স্বগোত্রীয় মুসলিমদের উপর অত্যাচার আর নির্যাতন শুরু করে। ইসলাম গ্রহন করার অপরাধে মক্কার এক মুশরিক তার দাস বিলাল (রা)-কে উত্তপ্ত বালির উপর শুইয়ে তার বুকের উপর পাথর চাপা দিয়ে রাখে। এতো নির্মম অত্যাচার সত্ত্বেও তিনি নিরবিচ্ছিন্নভাবে বলতে থাকেন, “আহাদ! আহাদ!”। বিলাল (রা) শুধু তার রবের জন্য অবলীলায় এ সমস্ত নির্মম অত্যাচার সহ্য করেন। আর একজন মহিলা ইসলাম ত্যাগ করে তার পূর্ব পুরুষের ধর্মে ফিরে যেতে অস্বীকার করায় তাকে নির্মম ভাবে অত্যাচার করে হত্যা করা হয়।

    মুসলিমরা তাদের রবের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে অত্যাচার, নির্যাতন, উপহাস আর বঞ্চনার এ পর্যায় ধৈর্য আর সহিঞ্চুষতার সাথে অতিক্রম করে।

  • রাসুল (সা)-এর দেখানো আদর্শ সমাজ ব্যবস্থা কিভাবে অপরাধ দূরীকরণে ভূমিকা রাখে?

    রাসুল (সা)-এর দেখানো আদর্শ সমাজ ব্যবস্থা কিভাবে অপরাধ দূরীকরণে ভূমিকা রাখে?

    আজকে আমি আলোচনা করব এমন একজন মানুষ সম্পর্কে যে মানুষ এসেছিলেন সমস্ত বিশ্বের জন্য রহমত সরূপ। তিনি হচ্ছেন আমাদের সবার প্রাণপ্রিয় রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা)। আর তিনিই যে পৃথিবীর জন্য রহমত সরূপ তা আল্লাহ্‌ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন “আমিতো তোমাকে বিশ্ব জগতের জন্য কেবল রহমত রূপেই প্রেরণ করেছি” (সূরা আম্বিয়া: ১০৭)। আমরা কি জানি রাসূল (সা) কিভাবে একটি আদর্শ সমাজ গঠন করেছিলেন এবং কিভাবে সমাজ থেকে আপরাধ নির্মূল করেছিলেন? বর্তমান সেকুলার পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কিভাবে সমাজ গঠনে ও অপরাধ নির্মূলে ভূমিকা রাখছে?

    বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায় অপরাধ একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনের সংবাদপত্র বা টিভি মিডিয়ার প্রধান শিরোনামই থাকে কোন না কোন অপরাধের খবর এই অপরাধ গুলো হলো হত্যা, খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতি, গ্যাংস্টার, পিডফিলিয়া, ড্রাগ ইত্যাদি ইত্যাদি এ তো হল পশ্চিমা বিশ্বের অপরাধের স্টাইল আর আমাদের দেশে অপরাধের বিষয়গুলো আরো ব্যাপক যেমন সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, রাহজানি, লুটতরাজ, ট্যাঁনডার বাজী, এসিড নিক্ষেপ, ইভটিজিং, ভূমী দখল, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের হল দখল ইত্যাদি ইত্যাদি। এই অপরাধের সংখ্যা দিনে দিনে বছরে বছরে আরো ব্যাপক হচ্ছে । গত বছর ২০১১-২০১২ ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে এ ৯.১ মিলিয়ন এর মত সব ধরণের crime case রেকর্ড হয়েছে। এতেই বুঝা যায় অপরাধের মাত্রা মারাত্নক আকার ধারণ করেছে। Capitalist সমাজ অপরাধের মূল উৎপাটনে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করে অপরাধের পরিসংখ্যান মেপে অপরাধ বেড়েছে না কি কমেছে তা নির্ণয় করে থাকে।

    আর যে কোন রাষ্ট্রের সামাজিক কালচার, অপরাধ তৈরী বা নির্মূলে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে। সামাজিক কালচার গড়ে উঠে সে রাষ্ট্রের আদর্শের উপর ভিত্তি করে ।

    আর সেকুলার সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠে বিভিন্ন ধরণের freedom এর উপর। এই so called freedom মানুষকে উৎসাহিত করে যে ভাবে ইচ্ছা সে ভাবে চলার। আর এ ধরণের বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে মানুষ মনে করে আমি যদি আইনকে ফাঁকি দিয়ে যে কোন ধরণের crime করি এবং যদি ধরা না পড়ি তাহলে এটা কোন সমস্যা নয়।

    আর সেকুলার পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় আপরাধ করার প্রবনতা শুধু বঞ্ছিতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বড় বড় অপরাধের সাথে এখন শিক্ষক, নার্স, ডাক্তার, পেশাজিবি, এমন কি এমপি ও মন্ত্রীরা জড়িত।

    আর বর্তমান সেকুলার সমাজে বিচার ব্যবস্থায় অপরাধীদের জন্য যে প্রতিষেধক বা প্রতিরোধক নয় তা তাদের জেলের সংখ্যার আধিক্য ও একজন মানুষের বার বার অপরাধ সংগঠনের প্রবণতায় প্রমাণিত হয়। আবার জেল থেকে বের হয়ে অপরাধী আরো বড় অপরাধী হয়ে উঠছে। ছিচকে সন্ত্রাসী হয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসীদের গডফাদার, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদরা হয়ে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় নেতা, তাদের জেল থেকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা হচ্ছে।

    এতেই প্রমাণিত হয় সেকুলারিজম ব্যবস্থা এবং তার প্রচলিত আইনের মাধ্যমে অপরাধ নির্মূল করা কখনো সম্ভব নয়। কারণ যারা আইন তৈরী করেন তারা মানুষ। আর মানুষের চিন্তা শক্তি সীমিত। আর সীমিত চিন্তা শক্তি দিয়ে কোন আইন তৈরী করলে তা সমস্যা সমাধান করতে পারেনা, আর পারবেও না। তার প্রমাণ হল দিনের পর দিন অপরাধের সংখ্যা না কমে বাড়ছে।

    তাই আমাদের বর্তমান প্রচলিত সেকুলার ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধান না খুঁজে যিনি মানব জাতিকে তৈরী করেছেন আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁর দেওয়া আইন ও নবী করীম (সা) এর দেখানো পদ্ধতি অনুযায়ী যদি আমরা সমাধান খুঁজি তাহলেই সমাধান সম্ভব।

    আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আমাদের ফিতরা বা স্বভাব তাঁর জানা। তাই তাঁর কাছ থেকে প্রেরিত ব্যবস্থা দ্বারা যদি সমাজ পরিচালিত হয় এবং আইন প্রয়োগ করা হয় তাহলেই পৃথিবীতে অপরাধ দূর করা সম্ভব। তার প্রমাণ ইসলামিক শাসন ব্যবস্তার ১৩০০ বৎসরের ইতিহাস। কারণ ইসলামি সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠে তাকওয়ার ভিত্তিতে। তারপরে এটা গড়ে উঠে ভাল কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজের নিষেধ করার ভিত্তিতে। এর ফলে মানুষের মধ্যে খোদাভীরুতা কাজ করে। সে মনে করে আমার প্রতিটি কাজের জন্য আল্লাহ্‌র কাছে জবাবদিহি করা লাগবে এবং সাথে সাথে সামাজিক ভাবে মুনকারকে খারাপ চোখে দেখা হয়। যার ফলে মানুষ খারাপ কাজ থেকে অনেক দূরে সরে থাকে। তারপর ইসলামি রাষ্ট্রের মধ্যে যথাযথ আইনের ব্যবস্থা থাকে ফলে মানুষ কোন ধরণের অন্যায় করলে তাকে অবশ্যই ইসলামি দণ্ডবিধি অনুযায়ী বিচারের ব্যবস্থা করা হয়।

    তাকওয়ার ভিত্তিতে সমাজ গড়ে উঠার কারণে মানুষের মধ্যে খোদাভিরুতা কাজ করে যার ফলে মানুষ চিন্তা করে আমি যদি অন্যায় করে আইনকে ফাঁকি দিতে পারলেও আমিতো আল্লাহ্‌র কাছ থেকে রেহাই পাব না। মৃত্যুর পর রয়েছে কঠোর শাস্তি। ফলে মানুষ এমনিতেই নিজেকে পাপাচার থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। আবার অন্যদিকে পাপাচারকে সমাজে খারাপ চোখে দেখা হয় আর এরই সাথে সাথে রাষ্টীয় ভাবে পাপাচারের সব ব্যবস্থা বন্ধ রাখা হয়। দুই একটি উদাহরণ দিলে ইনশাল্লাহ আরো পরিষ্কার হবে।

    “একদা রাসূল (সা) এর কাছে একজন মহিলা এসেছিলেন জেনা করার পর তাঁর শাস্তি ভোগ করার জন্য। রাসূল (সা) যখন শুনলেন মহিলাটি সন্তান সম্ভাবা তখন তাকে ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেন সন্তান জন্মের পর আসার জন্য। মহিলা সন্তান জন্মের পর আবার ফিরে আসল। রাসূল (সা) তাকে আবার ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেন তোমার সন্তানকে দুধ খাওয়ানোর সময় শেষ হওয়ার পর আসার জন্য। মহিলা আবার ফিরে আসলেন দুধ খাওয়ানোর সময় শেষ হওয়ার পর এরপর রাসূল (সা) ইসলামের দেওয়া বিধান অনুযায়ী জেনার শাস্তির ব্যবস্তা করলেন। আর মহিলা জানতেন জেনার শাস্তি হবে কঠোর। কিন্তু তিনি বার বার ফিরে আসছিলেন তাঁর কৃত কর্মের শাস্তি ভোগ করার জন্য।

    খলীফা উমর (রা) খিলাফতের সময়ের একটি ঘটনা- তিনি সবসময় রাতে বের হতেন নাগরিকদের সার্বিক অবস্থা দেখার জন্য। একদিন এক মহিলার ঘরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তিনি শুনতে পেলেন মহিলা কবিতা পাঠ করছে (উনার স্বামী তখন যুদ্ধের ময়দানে ছিলেন) কবিতাটি এ রকম “এ রাত অতি দীর্ঘ ও কালো এবং বীভৎস, আর আমাকে ব্যথিত করে কারণ আমার কোন খেলার সাথী বা বন্ধু নেই। আল্লাহ্‌র কসম আমি আল্লাহ্‌কে ভয় না করলে এ পালঙ্কের বিভিন্ন দিক (পর পুরুষের সাথে মিলনে) নড়াচড়া করে উটত।

    এ ধরণের উদাহরণ থেকেই প্রমাণিত হয় ইসলামি সমাজ ব্যবস্থা কিভাবে মানুষকে পাপাচার থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। অতপরও কেউ যদি পাপাচার করে থাকে তাঁর জন্য কঠোর শাস্তির বিঁধান রয়েছে। সূরা মায়েদায় আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন “যে পুরুষ ও নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃত কর্মের সাজা হিসাবে এ হল আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে দণ্ড”। এই ধরণের শাস্তি প্রয়োগে সাধারণ জনগণ আথবা ক্ষমতার অধিকারি সর্বোচ্চ ব্যাক্তির মধ্যে কোন পার্থক্য করা হয় না। সবার জন্য শাস্তি সমান। এই ব্যাপারে রাসুল (সা) বলেন “সে সত্তার শপথ যার হাতে আমি মুহাম্মদের প্রাণ নিহিত (মুহাম্মদের আপন কন্যা) ফাতেমাও যদি চুরি করতো তবে অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম।“

    খলীফা মনসুর এর সময়ে দেখি একজন সাধারণ ব্যাক্তি তখনকার কাজী ইমাম আবু ইউসুফ (র) এর কাছে অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন যে খলিফা তাঁর বাগান দখল করেছেন, এই অভিযোগ পাবার পর কাজী খলিফাকে আদালতে তলব করলেন। খলীফা মনসুর আদালতে হাজির হয়ে বিচারককে বললেন এই বাগানটি তিনি কিনেছেন, কিন্তু এর সপক্ষে কোন দলিল দেখাতে পারলেন না। ফলে বিচারক ইমাম আবু ইউসুফ (র) রায় দিলেন যে খলীফা যেন বাগানটি অভিযোগকারির নিকট বুঝিয়ে দেন।

    এই রকম হাজারো উদাহরণ ইসলামিক শাসন ব্যবস্থায় রয়েছে। আর এতেই প্রমাণিত হয় সমাজ থেকে অপরাধ দূরীকরণে একমাত্র সঠিক ব্যবস্থা হচ্ছে ইসলামি শাসন ব্যবস্থা।

    তাই সেকুলার ব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত বাংলাদেশে যে পাপাচার প্রকাশ্যে চলছে, যেমন পদ্মা সেতু দুর্নীতি, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, ডেসটেনি কেলেঙ্কারি ইত্যাদির সাথে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের রাজনীতিবিদ ও আমলারা জড়িত, ঠিক তেমনি ভাবে মাঠ পর্যায়ে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির সাথে জড়িত। অন্যদিকে ভিন্ন সংস্কৃতির ফলে আমাদের তরুণরা বেহায়াপনা, অশ্লীলতা, নাচ গান, লিভ টুগেদারের মত অমুসলিম সংস্কৃতির সাথে জড়িত।

    তাই এই অধপতিত ঘুনে ধরা সমাজ ব্যবস্থা থেকে মানুষকে বেরিয়ে আসতে হলে কুরআন এবং রাসূল (সা) কে ভালভাবে জানতে হবে। কুরআনের আইন এবং রাসূল (সা) এর দেখানো পদ্ধতি যদি আমরা ব্যাক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রিয় ভাবে পালন করি তাহলেই সম্ভব একটি সুন্দর সমাজ গঠন। আর এটি সম্ভব একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রের মাধ্যমে।

  • কেন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে অসার ? – ১ম পর্ব

    কেন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে অসার ? – ১ম পর্ব

    (১ম পর্ব)

    ১৮০২ সালে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন ডানবুরি ব্যাপিস্টদের কাছে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের নীতি ব্যাখ্যা করে একটি চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিটিকে ভিত্তি করে আমেরিকান সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করে প্রথম সংশোধন করা হয়। তিনি চিঠিতে লিখেন “Believing with you that religion is a matter which lies solely between Man and his God, that he owes account to none other for his faith or his worship, that the legitimate powers of government reach actions only & not opinions, I contemplate with sovereign reverence that act of the whole American people which declared that their legislature should “makes no law respecting an establishment of religion, or prohibiting the free exercise thereof,” thus building a wall of separation between Church & State.” অর্থাৎ থমাস জেফারসনের কথায় রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের উপর কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ না করার বিষয়টি ফুটেছে। যা ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের মুল কথা। থমাস জেফারসনের চিন্তাকে প্রতিষ্ঠার একই সূরে কথা বললেন তসলিমা নাসরীনও। গত ৫ ডিসেম্বর ০৭ বিবিসিকে তসলিমা নাসরীন বলেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার জন্য নয়, ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার জন্যই আমি লিখি। বিতর্কিত তসলিমা নাসরীনের ন্যায় এ পথের কিছু অনুসারী, লক্ষ ও আদর্শচুত বাম রাজনীতিক সাম্রাজ্যবাদীদের উচ্ছিষ্টভোগী তথাকথিত কিছু বুদ্ধিজীবী সময়ে –অসময়ে দাবি তোলে আমাদের দেশের রাজনীতি থেকে ধর্মকে বাদ দেওয়ার। যে মতবাদের উদ্ভব হয়েছিল সপ্তদশকে অন্ধকারাচ্ছন্ন ইউরোপের বাস্তবতায়। খ্রিষ্টিয় চার্চের ধর্মের (যাজকদের বানানো) নামে জনসাধারনের উপর অত্যাচার ও শোষনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীল (Reactionary) আন্দোলনের ভিত্তিতে উদ্ভব হয়েছিল যে ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদের। ইউরোপে ১৭৭৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত হয় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের (national state)। আর পশ্চিমাদের ধর্মনিরপেক্ষ জাতিরাষ্ট্রকে মডেল হিসাবে প্রতিষ্ঠার কৌশলের মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলেছে বিশ্বরাজনীতির ঘটনা প্রবাহ। তাই আমাদের দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে বারবার। বারংবার ব্যার্থতার পরেও যখন পুনরায় তা সাংবিধানিক ভাবে প্রতিষ্ঠার দাবি ওঠে একটি জনবিচ্ছিন্ন গোষ্টির কাছ থেকে, তখন বিশ্ব রাজনীতিতে মতবাদটির আবির্ভাবের বাস্তবতার নীরিখে এটির বুদ্ধিবৃত্তিক যৌক্তিকতা বিচার খুব প্রাসঙ্গিক। কারণ রাজনীতির ভিত্তি, আদর্শ ও দর্শণের মধ্যে যদি গলদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক অসারতা থাকে তাহলে সে রাজনীতি সাইত্রিশ বছর কেন সাতশ বছর চর্চা করলেও তা বিশ্ব মানবতাকে অধিকতর মঙ্গলজনক কিছু দিতে পারবে ন। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, যুদ্ধ ও অসুখকর সাংস্কৃতিক দুষণ দিয়ে বিশ্বকে বসবাসের ক্রমশ অনুপযোগী করে তুলেছে পশ্চিমের ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী রাজনীতি। নিচে আমরা এ মতাদর্শের আবির্ভাবের প্রেক্ষাপট, কারণ ও ব্যার্থতা; বাস্তবতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তির আলোকে যাচাই করার চেষ্টা করব।

    বিচ্ছিন্নভাবে প্রাচীন গ্রীক ও অন্যান্য সময়ের কিছু চিন্তাবিদদের মাঝে রাষ্ট্র ব্যাবস্থায় ধর্মীয় সমাধানের বিরোধী মনোভাবের খোঁজ পাওয়া যায়। তবে ভাষায় বা সাহিত্যে সেকুলারিজম (secularism) বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ কথাটি সর্বপ্রথম ১৮৪৬ সালে বৃটিশ লেখক জর্জ জ্যাকব হলিওয়েক ব্যাবহার করেন। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মতবাদ প্রধানত ইহজাগতিক কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কসমিন এ ব্যারি ও ইংলিশ সেকুলারিজমের কাছ থেকে পাওয়া সেকুলারিজমের সংজ্ঞা নিম্নরূপ-

    ১। একদিক থেকে বিবেচনা করলে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলে এবং রাষ্ট্র নিজে ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাপারে কোন প্রকার পক্ষপাত মূলক ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে না। সরকারও জনগণের উপর চাপিয়ে দেবেনা। অন্য দিক থেকে এটি এমন একটি বিশ্বাসকে বোঝায় যে মানুষের যাবতীয় কার্যাবলি এবং সিদ্ধান্ত সমূহ (বিশেষ করে রাজনৈতিক) গ্রহণ করা হবে তথ্য ও বাস্তবতার ভিত্তিতে, কোন প্রকার ধর্মীয় বিবেচনায় নয়।

    [Kosmin, Barry A ‘Contemporary Secularity and Secularism.‘

    Secularism & Secularity: Contemporary International Perspectives, Ed. Barry A. Kosmin and Artela Keysar. Hartford, CT: Institute for the study of Secularism in Society and Culture (ISSSC), 2007]

    ২। ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল মানুষের ইহলৌকিক দায়িত্ব সংক্রান্ত নিয়মাবলী এবং যারা ধর্মতত্ত্বকে অপূর্ণ, আস্থা স্থাপনের অযোগ্য এবং অবিশ্বাস্য মনে করে এই আদর্শ তাদের জন্য। এর মূল উপাদান তিনটিঃ ক) ইহলৌকিক জীবনের উন্নয়ন কেবল বস্তুর মাধ্যমেই হওয়া সম্ভব। খ) বিজ্ঞানই মানুষের জন্য একটি প্রাপ্তিসাধ্য ঈশ্বর। গ) যে কোনো ভালো কাজই ভালো। অন্য কোনো ভালো থাকুক বা না থাকুক বর্তমান জীবনের জন্য যা ভালো তার সন্ধানই শ্রেয়। (English Secularism, 35)

    ধর্মনিরপেক্ষতার উদ্ভবের প্রেক্ষাপট ও কারন:

    ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায় মধ্যযুগব্যাপী ইউরোপের চার্চের কর্তৃপক্ষের অত্যাচার ও শোষনের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার ফলেই এ মতবাদ বেড়ে উঠে। ঈসা (আ) এর উর্ধ্ব আরোহনের পর তার (আ) ধর্মের আসল বাণী বিকৃত করে মানবীয় চিন্তা-চেতনা, দর্শন ঢুকানো হয়। এমনকি কনসট্যানটাইন নামক এক রোমান সম্রাট খ্রিস্টবাদকে তার রাষ্ট্র ধর্ম হিসাবে ঘোষণা করে। তার তৈরি এই বিকৃত ধর্মের অনুসারী হতে সে জনসাধারণকে চাপ প্রয়োগ করে। সৃষ্টিকর্তার একত্ববাদের ধারণা থেকে সরে আসা খ্রিস্টান ধর্ম যে মানুষের মনগড়া মতবাদ তার হাজার প্রমানের মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে ৩২৫ সালের নাইসিন সম্মেলন (Nicene Council)। এই সম্মেলেনে রোমান সাম্রাজ্যের ১৮০০ বিশপ যোগ দেয়। যেখানে ইস্টার বানির (Ester Bunny) মতো রোমান সাংস্কৃতিক বিশ্বাসকে খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসের মধ্যে ঢুকানো হয়। চারটি সংশোধিত বাইবেলকে তারা এ সম্মেলনে রাষ্ট্রীয় ধর্মগ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করে; এ ভার্সনে বিশ্বাসী খ্রিষ্টানরা এখনও সারা পৃথিবীতে রয়েছে। মানুষের জ্ঞানের মত সীমাবদ্ধ জ্ঞান বাইবেলে ঢুকানোর ফলে ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতায় বাইবেল সকল সমস্যার সমাধান দিতে ব্যার্থ হয় এবং বাইবেলের মধ্যে প্রতিফলিত হয় মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, অসম্পুর্ণতা, অসামঞ্জস্যতা ও স্ববিরোধীতা। এভাবে মানুষের বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান থেকে খ্রিস্টমতবাদ অনেক দূরে সরে যায়। মুলত; খ্রিষ্টীয় যাজক সম্প্রদায় ও চার্চের কর্তৃপক্ষ তাদের মনগড়া চিন্তা-ভাবনা খ্রিস্টবাদের নামে ধর্মীয় বাণী হিসেবে চালাতে থাকে।

    মধ্যযুগব্যাপী জনসাধারণের উপর চার্চের এই প্রাধান্য ও কর্তৃত্ব বজায় থাকে। এসময় ইউরোপের সম্রাট ও রাজারা চার্চের প্রতি মানুষের এ দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করে নিজেদের মসনদকে আরো পাকা-পোক্ত রাখতে চার্চকে ব্যাবহার করে। এসময়ে ইউরোপে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আবিস্কার ও চিন্তা-ভাবনার প্রসার ঘটতে থাকে। যা খ্রিষ্টীয় যাজক সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বাণীর সঙ্গে দন্দ্বের সুত্রপাত ঘটায়। চার্চের প্রভাব হুমকির সম্মুখীন হতে থাকে। ফলে পোপ ও রাজারা বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উদ্ভাবনকে অনুৎসাহিত করতে থাকে। এমনকি গ্যালিলিও ও কপারনিকাসের মত বিজ্ঞানীকে তারা শাস্তি ও প্রদান করে তাদের আবিষ্কারের জন্য। এসব ঘটনা মানুষের কাছে খ্রিস্টবাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও বাস্তব সমস্যা সমাধানের ব্যার্থতাকে পরিস্কার করে তোলে।

    খ্রিষ্টীয় চার্চের ধর্মীয় যাজকদের শাসনে (Theocracy) সাধারন মানুষ ও চিন্তাবিদরা অতিষ্ট হয় বটে, কিন্তু ভুলে ভরা মানুষের তৈরি খ্রিস্টবাদের শোষণের তিক্ততায় তারা ভুল ক্রমে ধর্মের প্রতিই নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতে থাকে। এ সময়ে প্রধানত দুই শ্রেণীর চিন্তাবিদ ও দার্শনিকের উদ্ভব ঘটে-

    ১। নাস্তিকতাবাদী ও
    ২। আপোষবাদী।

    নাস্তিকতাবাদী দার্শনিকরা বাস্তব জীবন তথা রাষ্ট্রীয় জীবনে সৃষ্টিকর্তা ও ধর্মকেই অস্বীকার করতে শুরু করে। এদের দু-একজন হলো- বস্তুবাদী হেগেল,মার্ক্স, লেলিন। এদের চিন্তার উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে কমিউনিজম বা সোশালিজমের বিকাশ লাভ করে। আপোষবাদীরা ধর্ম বা সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করেনি। তদের আপোষটা ছিল – যদি কেউ ধর্মীয় বিশ্বাস লালন-পালন করতে চায়, তা একেবারে ব্যাক্তিগত জীবনে। চার্চের বা ধর্মের কোন প্রভাব রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকবে না। এ ঘরাণার চিন্তাবিদ বা দার্শনিকদের কয়েক জন হলেন- রুশো, ম্যাকিয়াভেলি, হবস, লক, ভলটেয়ার, মন্টেসকু প্রমুখ। আর এই আপোষবাদী (Compromise) চিন্তার ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে আজকের ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী সভ্যতা।

    এ সকল দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের আবির্ভাব কালকে পশ্চিমারা আলোকিত যুগ (Enlightenment) বলে আখ্যায়িত করে। এ সময়ে দীর্ঘকালব্যাপী খৃস্টান ধর্ম যাজক ও রাজারা বনাম দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের মধ্যে এক তুমুল সংগ্রাম ও সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। অবশেষে আপোষের মাধ্যমে চার্চের কর্তৃপক্ষরা ধর্মীয় বিধিবিধান প্রচার ও পালনকে শুধু মানুষের ব্যাক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ রাখতে সম্মত হয়।

    এ প্রেক্ষাপটেই ম্যাকিয়াভেলি তার ‘দ্যা প্রিন্স’ (The Prince) গ্রন্থে তার দেশের শাসককে ধর্মীয় রাষ্ট্রের পরিবর্তে জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “ভ্যাটিকান ইতালির মাঝখানে বসে চক্রান্তের জাল বুনে চলেছে। অতীতে সে রাজত্ব করছে। এখন তার দিন শেষ। ইতালির গৌরবের জন্য প্রয়োজন হলে ভ্যাটিকান কে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রাধীন আনতে হবে।” বস্তুতঃ শাসক গোষ্ঠির অত্যাচার ও নিপীড়নের হাত থেকে মুক্তি পেতেই স্বাধীনতার (Freedom) শক্ত দাবি তুলেছিল ম্যাকিয়াভেলি, রুশোর ও লকের মত দার্শনিকরা। এ চিন্তাবিদরা ধর্মকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন, সময়ের অনুপযোগী হিসেবে দেখতে পেলেন। বিখ্যাত দার্শনিক হবস, লক, মন্টেস্কু, রুশো ব্যাক্তিকে এই কুসংস্কার ও পশ্চাদপদতার শৃঙ্খল থেকে বেড়িয়ে আসার আহ্বান জানায়। জেইন জ্যাকস রুশো (J.J. Rousseau) বলেন, “মানুষ স্বাধীনভাবে জন্ম গ্রহণ করলেও তার পারিপার্শ্বিকতা তাকে শৃঙ্খলিত করে ফেলে (Man is born free but he is in chains everywhere.)। এই অভিব্যাক্তির মূল দাবি ছিল এমনই- নিজের ভাগ্য নিজের নির্ধারনের ক্ষমতা মানুষের হাতেই আছে। ভাগ্য ঈশ্বর কর্তৃক পূর্বনির্ধারিত নয়। অর্থাৎ মানুষ জন্মগতভাবে উত্তম এবং স্বাধীন। ফলে রুশোও অবশেষে ফরাসী বিপ্লবের (French Revolution) পক্ষে কাজ করে। আর এই বিপ্লবের মাধ্যমেই চুড়ান্তভাবে রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা হয় এবং নিষ্পেষণকারী রাজা ও চার্চেরও পতন ঘটে। সৃষ্টি হয় সকল রাষ্ট্রীয় সমস্যা সমাধানের আইন ও নীতি তৈরিকারী সংসদীয় ব্যাবস্থা (Parliamentary System)। শুরু হয় প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মনিরপেক্ষ সমাজের পথ চলা।

    ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের ব্যার্থতা:

    একটি আদর্শ ও মতবাদের সঠিকতা বিচার করতে চাইলে, আমাদেরকে দেখতে হবে এটা কোনো বাস্তবিক ভিত্তির (Rationality) উপর প্রতিষ্ঠিত কি-না। মহাজগৎ সৃষ্টি, মানুষ, এ জীবনের আগে ও পরে কী আছে; মানব জীবনের এ সকল মূল প্রশ্নের কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক সুস্পষ্ট উত্তর সেই মতবাদটি দেয় কি-না তার উপরও। কারণ প্রত্যেকটি সুস্থ্য-স্বাভাবিক মানুষের চিন্তায় এসকল মূল প্রশ্ন শৈশব থেকেই ঘোরা-ফেরা করে। এগুলোর বাস্তব সম্মত কোন উত্তর না পেলে সে সন্তুষ্ট হতে পারে না। এই চিন্তাগুলোর উত্তরের উপরই নির্ভর করে প্রতিটি মানুষের জীবন পদ্ধতি (Life Style)। যেমন; একজন নাস্তিকের জীবন পদ্ধতি এক রকম পক্ষান্তরে আস্তিকের জীবন পদ্ধতি আরেক রকমের। মতবাদের সঠিকতার আরেকটি নির্ণায়ক হলো এটি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির সাথে মানানসই কি-না।

    এবার আমরা একটু উপরিউল্লিখিত নির্ণায়ক গুলোর আলোকে ও আমাদের সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের পক্ষে যে সকল যুক্তি বিদ্যমান সেগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি ও বাস্তবায়নের ফলাফলগুলো পর্যালোচনা করবো।

    ১। পশ্চিমের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা প্রায়ই বলে থাকে, “Keep your religion to yourself, don’t bring it into politics” একই সুর ধরে আমাদের দেশের কেউ কেউ বলে , “ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার“ কিন্তু এই ধারণাটা যৌক্তিক কি-না তা সমাজের সর্বোচ্চ সংগঠনটির (রাষ্ট্র) দিকে তাকালে দেখতে পাই। আজ পর্যন্ত পৃথিবীর যত ধর্ম ও ধর্ম প্রচারক এসেছে সকলেই সমাজ সংস্কারের কাজ করেছেন। কিন্তু রাজনীতি ছাড়া সমাজ পরিবর্তন কখনো সম্ভব নয়। সকল ধর্ম প্রচারকরাই রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার নীতি গুলোকে পরিবর্তিত ও প্রভাবিত করেছিলেন এবং বিধিবিধান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাই বলা যায় সমাজে মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াই এক ধরনের রাজনৈতিক প্রচেষ্টা। যে সমাজে ধর্ম বিদ্যমান সেখানে ধর্মের চিরায়ত প্রবণতা হলো সমাজ সংস্কার করা। অর্থাৎ ধর্মের প্রবণতা থেকেই ধর্ম ও রাজনীতির সুগভীর সম্পর্ক প্রতিয়মান। উদাহরন হিসেবে বলা যায় আরবে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখানকার সমাজ ব্যাবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে যায়।

    ২। “কেউ যেন তার ধর্মীয় বিশ্বাসকে অন্যের উপর না চাপিয়ে দিতে পারে তাই ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখা উচিৎ।“ এ যুক্তিটিও একটি খোড়া যুক্তি, কারণ সমাজে বসবাস কারী একজনের চিন্তা দ্বারা সব সময়ই অন্যজন প্রভাবিত হয়। চিন্তার চরিত্রটাই এমন যে তা পূর্ববর্তী কোনো চিন্তার ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে। এছাড়া সমাজ বা রাষ্ট্রে ধর্মের প্রভাব থাকবে না, এটাকেও আমরা একটা নতুন এক ধর্মীয় মতাদর্শ বলতে পারি। যে ধর্মের নাম ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ।‘ কারণ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ সৃষ্টিকর্তা ও ধর্ম সম্পর্কে নতুন চিন্তা সহকারে এক নতুন মতাদর্শ সমাজে নিয়ে এসেছে। যা অন্যান্য ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন কোনো কর্তৃপক্ষ যদি বলে “এখানে কোনো আইন থাকবেনা।“এটাও একটা নতুন আইন সৃষ্টি করে। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায় ইসলাম রাষ্ট্রে সুদ ভিত্তিক অর্থনীতি অনুমোদন দেয় না। ফলে ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে সৃষ্টিকর্তার দেওয়া আইন মান্য করা বা ধর্ম পালন করা সম্ভব নয়। বরং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদই অন্য ধর্মের স্বাধীনতা দেয়না।

    চলবে……।।

    খান শরীফুজ্জামান সোহেল

  • বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আমাদের করণীয়

    বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আমাদের করণীয়

    বেশ দীর্ঘ সময় যাবৎ বাংলাদেশের আভ্যন্তরীন পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। শাহবাগ রাজনীতি থেকে শুরু করে হেফাজতে ইসলামীর লংমার্চ এবং অন্যান্য সকল ইস্যুগুলোর ফলে বাংলাদেশ একরকম গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মত দিচ্ছেন অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ।

    কিন্তু প্রশ্ন হল আসলেই কি বাংলাদেশ গৃহযুদ্ধের দিকে যাচ্ছে নাকি সাম্রাজ্যবাদীদের ধারাবাহিক চক্রান্তের বেড়াজালে ঘুরেফিরে আটকা পরে আছে??

    একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, বর্তমানে যেসকল বিষয়সমূহ আমাদের সামনে সুনিপুণভাবে তুলে আনা হচ্ছে, তার প্রত্যেকটি সাম্রাজ্যবাদীদের সুদীর্ঘ পরিকল্পনার ক্ষুদ্র অংশবিশেষ।

    বাংলাদেশে প্রতি নির্বাচন পূর্ববর্তী মৌসুমে এই ধরণের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়ে থাকে এবং নির্বাচন পর্যন্ত তা টিকিয়ে রাখা হয়। আর এর মধ্যেই জনগণের নিকট ৫ বছর যাবৎ হয়ে আসা যুলুমের সমাধান হিসেবে অপর যালিমকে পছন্দের ব্যাপারটি তুলে ধরা হয়; যে/যারা কিনা এর পূর্বে বারবার প্রতারণা করে আসছে। আর এভাবেই মার্কিন-ভারতের স্বার্থসিদ্ধির দ্বার খোলা থাকে পরবর্তী ৫ বছরের জন্যও।

    আর এই চক্রান্তের ধারাবাহিকতায় মূলত এতসকল জাগরণ-আন্দোলনের বহিঃপ্রকাশ; যেখানে সমাধান একেবারেই অনুপস্থিত। আর উম্মাহকে ব্যস্ত রাখা হয়েছে এসকল নাট্যমঞ্চ দ্বারা।

    কিন্তু এবার এই চক্রান্ত পূর্বের তুলনায় অধিক ভয়াবহ; কারণ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এই অঞ্চলে চীনের উত্থান এবং পুঁজিবাদের বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি খিলাফতের প্রখর সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে পেরেছে এবং সেই লক্ষ্যে তার এজেন্ডা বাস্তবায়নে তড়িঘড়ি শুরু করেছে।

    কিছুদিন আগে (১১ই মার্চ, ২০১৩) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনার বক্তব্যে এই উপমহাদেশে বাংলাদেশকে ঘিরে মার্কিন-ভারতের ঐক্যবদ্ধ চক্রান্তের ধারাগুলো স্পষ্টরূপে ফুটে উঠে।

    বাংলাদেশ এবং এই উপমহাদেশকে ঘিরে আমেরিকার পরিকল্পনা সুদীর্ঘ এবং বিগত বছরগুলোতে আমরা এর বাস্তবায়নের পাঁয়তারা দেখে আসছি।

    দালাল শসক দ্বারা সামরিক মহড়া থেকে শুরু করে মার্কিন স্বার্থপন্থী চুক্তিসমূহ একের পর এক বাস্তবায়ন ঘটিয়ে যাচ্ছে এবং সেনাবাহিনীর উপর কতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে অবিরত। কারণ, নিষ্ঠাবান সেনা অফিসারদের মাঝে তাদের দালাল সৃষ্টি প্রচেষ্টা সফল হলে, তাদের কুকীর্তি সম্পাদনে সেনাবাহিনীর তরফ থেকে বাধা আসবেনা আর তারা তাদের ঘৃণ্য কার্যক্রম চালিয়ে যাবে নিশ্চিন্তে। আর সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এ বছর বাংলাদেশেই তারা আয়োজন করতে যাচ্ছে মিলিটারি-মিলিটারি কনফারেন্স।

    তাছাড়া, মে মাসের ২২ তারিখ বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে আমেরিকা United States Coast Guard Cutter Jarvis নামক একটি নৌযান উপহারের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের পাঁয়তারা করে যাচ্ছে।আর এরই পরিকল্পনার জের ধরে গত ৭ এপ্রিল বাংলাদেশে এসেছে মার্কিন ৭ম নৌ বহরের প্রধান স্কট এইচ সুইফট, সফরের মেয়াদ কাল ৩ দিন, আলোচনা হবে সমুদ্র সীমা ও ব্যবহার চুক্তি নিয়ে, বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদ দমনে যৌথ সামরিক একাডেমী স্থাপনের চুক্তি হবে। আর মে ১৩/১৫ তারিখ হবে যৌথ সংলাপ। যার চুক্তি হয় হিলারির সফরের সময়। এর পূর্বে এ সরকারের মেয়াদে জাতিকে অন্ধকারে রেখে মার্কিনীদের সাথে দেশের সাধারণ মুসলিমদের জন্য ধ্বংসাত্মক চুক্তি ও সামরিক মহড়া করে যার কিছু উদাহরণ হল:

    – ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১১ CARAT (Cooperation Afloat Readiness & Training) নামে চট্টগ্রামে মার্কিন মেরিন ফোস ও বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর মধ্যে সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়।

    – ১৯ এপ্রিল’ ২০১২ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের রাজনৈতিক ও সামরিক বিষয়ক মন্ত্রী অ্যন্ড্রু জে শ্যাপিরোর নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সংলাপে অংশ নেয়।

    – ৫ই মে ২০১২ মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশ সফর করে।

    – ১লা জুন ২০১২ মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী লিওন প্যানেট্টা সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত একটি নিরাপত্তা সংলাপে ঘোষণা দেয় যে, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০২০ সালের মধ্য তাদের নৌবাহিনীর ৬০ শতাংশ এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সরিয়ে নিয়ে আসবে।

    – ১লা সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর মার্কিন মেরিন ফোস ENCAP (Engineering Capillitia Exercise) মহড়ায় অংশ নেয়

    – এপ্রিল মাসেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও মার্কিন প্যাসিফিক কমান্ড যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নেয়

    – ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১২ মার্কিন ৭ম নৌ বহরের কমান্ডের ভাইস অ্যাডমিরাল Scott swift ঢাকা আসে।

    – ১৭-২৪ সেপ্টেম্বর আবার ও CARAT-2 চট্টগ্রামের বনৌজ ঈশা খাঁ ঘাঁটিতে অনুষ্ঠিত হয়

    – ২৫-৩০ সেপ্টেম্বর DREE(Disaster RESPONSE Exercise & exchange) নামে ঢাকায় সামরিক মহড়া হয়

    – একই মাসে হাওয়াই দ্বীপে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য সামরিক সংলাপও অনুষ্ঠিত হয়।

    – ১০ই অক্টোবর ২০১২ যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক প্রধান অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল জে লকলিয়ারের বাংলাদেশ সফরে আসে। সফরকালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের স্বার্থ গত প্রবল আগ্রহের কথা ব্যক্ত করেন।

    – মজিনা বাংলাদেশে F.B.I এর উপস্থিতি সুনিশ্চিতকরণ এবং সেনাবাহিনীর সাথে বিভিন্ন যৌথ মহড়ার পাশাপাশি অন্যান্য কার্যক্রম বিস্তারণের কথাও বলেছে; যা বাংলাদেশের জন্য অশনি সংকেত বৈ আর কিছুই নয়।

    আমরা যদি পাকিস্তানের দিকে তাকায়, তবে দেখব দালাল শাসকদের সাহায্যার্থে একইভাবে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সাথেও যৌথ মহড়ার নামে তাদের জাল বুনেছিল সেনাবাহিনীতে আর পাকিস্তানে “রেইমন ডেভিস” বা “ব্ল্যাক ওয়াটারের” উপস্থিতি সুনিশ্চিত করে। ফলশ্রুতিতে আজ পাকিস্তানের বাস্তবতা ভয়াবহ।

    বাংলাদেশ থেকেও একইভাবে ফায়দা লুটতে তারা এই অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে; পাশাপাশি F.B.I এখানে জনগণের মাঝে মার্কিন গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাবে; যা কিনা পরবর্তীতে মার্কিনিদের অবস্থান সুনিশ্চিতকরণের দ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

    পাশাপাশি তাদের অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দী চীনকে দমনে সে সাথে করে নিয়েছে ভারতকে। বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্যিক চুক্তির নামে ইন্দো-প্যাসিফিক করিডোর নির্মানের ব্যবস্থা করছে; যা শুধুমাত্র ভারত-মার্কিন স্বার্থ নিশ্চিত করবে।

    যদিও পরবর্তীতে ভারতকেও নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত এই সমঝোতা। আর এতসব চক্রান্ত বাস্তবায়নের ইস্যুগুলো বাংলাদেশে আমরা বর্তমান দেখতে পাচ্ছি।

    মজিনা তার বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে পরবর্তী ৫ বছরে বাংলাদশের সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে তার কার্যক্রমের ব্যাপারে দৃঢ়তা প্রকাশ করেছে। অর্থ্যাৎ, পরবর্তী ৫ বছরের সরকার সম্পর্কে তারা নিশ্চিত আর জনগণকে তারা লেলিয়ে রেখেছে গত ৪২ বছর ধরে প্রতারক শাসকগোষ্ঠির মত গণতান্ত্রিক শসন ব্যবস্থার উচ্ছিষ্ট নিয়ে কামড়া-কামড়িতে। অথবা, এমন কিছু তথাকথিত আবেগী আন্দোলনের সাথে যেখানে উম্মাহ’র পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা পর্যন্ত নেই; বরং লুকিয়ে আছে কাফিরগোষ্ঠী এবং তার দালাল বাহিনীর ভয়ঙ্কর চক্রান্ত।

    অবশ্যই, সমধানের জন্য এসকল সাম্রাজ্যবাদী কুফর শক্তি বা তাদের দালালদের কাছে অথবা এই শাসনব্যবস্থার মাঝে ঘুরপাক খাওয়া আবর্জনার মাঝে ঘুরপাক খাওয়ার সমতুল্য।

    শাসক শ্রেণীর ইচ্ছার বাইরে কেউ নয়, চাবি যার তালা তার!! এমন নীতিতে গত ৪২ বছর ধরে নানা পঠপরিক্রমায় আমরা তাদের অত্যাচার নিপীড়ন দেখে আসছি। আমাদের চাওয়া পাওয়া বা দৈনন্দিন যে চাহিদা রয়েছে তার কোন অংশের প্রতি সরকার বা রাজনৈতিক কোন পদক্ষেপ নেই। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে কোথায় নিজের কর্মসংস্তান করবে তার কোন দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ রাষ্ট্রের অবিভাবকের নেই, শিক্ষার নামে বেকুব বানানোর কারখানা বা মানসিক প্রতিবন্ধী করার শিক্ষা ব্যবস্থাকে অব্যাহত রাখছে, রাষ্ট্রকে স্তিতিশীল অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী করার কোন পদক্ষেপ নেই, পৃথিবীর অন্যতম উর্বর ভূমি থাকা সত্ত্বেও আমাদেরকে কৃষি পণ্য আমদানি করতে হয়, নানা চুক্তির ছায়াতলে বাংলাদেশকে মার্কিন-ইঙ্গ-ভারতের বাফার স্টেটে পরিণত করে তাদের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করা হয়, আর রাষ্ট্র যন্ত্রের গুণে ধরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে গণতন্ত্রের প্রতারণামূলক শাসন ব্যবস্থা দ্বারা আকড়ে ধরে বাংলাদেশের কথিত রাজনীতিবীদদেরে চেষ্টা অব্যাহত রাখছে। আর এ কারণেই এক ব্রিটিশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বলেছে, – “Democracy is the system by which politicians rape the public”

    এ সমস্যার উত্তরণে সমাধান একটাই আজকের মুসলিম উম্মাহর সবচাইতে বড় সম্পদ তেল, গ্যাস, সমারস্ত্র কিংবা স্বর্ণ রৌপ্য নয় বরং তার হারানো চিন্তা যা তাকে ফিরে পেতে হবে, সে এতদিন অন্যের সাহায্যে মাগুর মাছের মত মাংশাসী হয়েছিল অথবা ফার্মের মুরগির মত নিস্তেজ হয়েছিল, তাকে যদি আবারও পৃথিবীর বুকে মাথা উচু করে দাড়াতে হয় তাহলে জালেমকে জালেম বলার সাহসিকতা গড়ে তুলতে হবে। আর সত্যকে সত্যের মত তুলে ধরতে হবে, করতে হবে বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। কারও ব্যক্তি সমালোচনা বা ছিনেপোটা বিষয় নিয়ে পড়ে থাকলে কাজের কাজ কিছুই হবে না আমার আপনার আবেগকে কেনার জন্য অনেকেই হাত বাড়িয়ে আছে, নিজের বিবেক দ্বারা তাড়িত হয়ে এ মহাবিশ্ব, জীবন ও মানুষের স্রষ্টা মহান আল্লাহ আজ্জা ওয়া জালের বিধানকে সমাজে মিশ্রণ গঠাতে হবে। আনতে হবে রাসূল (সা)-এর প্রদর্শিত ও আবু বকর, উমর ফারুখ, উসমান ইবনে আফ্ফান, আলী ইবনে আবু তালিব (রা), উমর ইবনুল আবদুল আযীযের খিলাফাহ্ আর রাশীদা। অতএব কাল বিলম্ব না করে আমরা খিলাফত ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে খলীফার প্রতি শরীয়াহ্ প্রতিষ্ঠার জন্য শপথ করার মাধ্যমে নিজেদের ফরয কাজ সম্পাদন করি।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন- “যে আনুগত্যের শপথ (বাই’য়াত) থেকে তার হাত ফিরিয়ে নেয়, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তার সাথে এমনভাবে সাক্ষাত করবেন যে, ঐ ব্যক্তির পক্ষে কোন দলিল থাকবে না এবং যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে, যখন তার কাঁধে কোন আনুগত্যের শপথ নেই, তবে তার মৃত্যু হবে জাহেলি যুগের মৃত্যু।” [সহীহ্ মুসলিম: ১৮৫১]

    এই সংকটময় পরিস্থিতিতে অবশ্যই আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে মার্কিন-ভারতের এইসব চক্রান্তের বিরুদ্ধে এবং তাদের দালালসমূহ ও দালাল তৈরির কারখানা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, ইসলামী জীবন ব্যবস্থা আলিঙ্গনে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা একমাত্র সমাধান।

    আল্লাহ আমাদের সত্য উপলব্ধি এবং এর ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাওফীক দিন এবং মুসলিম উম্মাহ’র গৌরব খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যবস্থা ফিরিয়ে দিন।