তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২অধিকতর গণতন্ত্রচর্চা: জঙ্গলযাত্রা শুভহোক

মানুষ আর প্রাণীজগতের অন্য জন্তুগুলার মাঝে পার্থক্য কেবলই চিন্তা করিবার সামর্থ্যের উপর। প্রাণীকুলের চিন্তাশক্তি (intellect) না থাকায় ইহারা প্রবৃত্তি (instinct) দ্বারা পরিচালিত হয়। টিকিয়া থাকিবার প্রবৃত্তি তাহাদের ঐক্যবদ্ধ করে আর পারস্পরিক চাহিদা পূরণে দলবদ্ধভাবে শিকার করিয়া থাকে।
এই সময়ের রাষ্ট্রগুলা যেমন টিকিয়া থাকিবার প্রবণতা নামক জংলী নীতিতে গড়িয়া উঠিয়াছে, তেমনই মানুষের ঐক্যবদ্ধ হইবার যে বন্ধন তাহাও স্রেফ পারস্পরিক স্বার্থে। বস্তুগত লাভের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হইবার এই বন্ধনকে ডাকাতির বন্ধনও বলা যায়। কারণ ডাকাতগণ ডাকাতির মাল ভাগাভাগিতে খুব সততার পরিচয় দেয়। যদিও ইহাদের কর্মই অনৈতিক। এইখানে মুনাফাই নীতি, সর্বোচ্চ মুনাফাই বড় সাফল্য। আর এই নীতির আদর্শিক রূপকে আদর করিয়া পুঁজিবাদ নামে ডাকা হয়। যাহার রাষ্ট্রীয় শোষণ নীতির নাম হইল গণতন্ত্র।
এই রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি উপাদানের সহিত মুনাফা জড়িত। শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ, সংবাদপত্র, আইন রক্ষাকারী বাহিনী সবাই শীতের রাত্রিতে সারমেয় প্রজাতি যেমন খড়ের গাঁদা খুঁজিয়া নেয় তেমনই সুবিধা প্রদানকারী পক্ষ খুঁজিয়া নেয়। ইহারা মুনাফা অর্জনকারী যত দাবী আছে ঐগুলা নিয়া পড়িয়া থাকে এবং ইহাকেই গণদাবীরূপে উপস্থাপন করিবার প্রয়াস চালায়। যেমন করিয়া না খাইয়া মরা জনগণের প্রাণের দাবী কেয়ারটেকার সরকার বলিয়া একপক্ষ আবদার করে তো অপরপক্ষ শাসাইয়া কহে যুদ্ধাপরাধীর বিচার না করিলে এই জনগণ হার্ট অ্যাটাকে পটল তুলিবে।
এই ব্যবস্থার পরতে পরতে জংলী সৌন্দর্য প্রতিভাত হয়। গুলি করিয়া মারিবার ক্ষেত্রে যেমন মহামানবিক ধারাবাহিকতা, তেমনই শত খুনের অপরাধীকে ক্ষমা করিতে অমানবিক উদারতা। প্রতি পঞ্চবার্ষিক মেয়াদ শেষে ইহাদের নির্বাচন নামক শয়তানের আরাধনার আয়োজন করা হয় যাহার প্রস্তুতি হিসাবে কিছু মানব বলি দেওয়া লাগে পরাশক্তি নামক খোদাকে দেখাইতে যে আমরাই পরবর্তী মেয়াদে তোমার পূজার হকদার। শয়তানের কিছু প্রতিনিধি আছে যাহারা এই ব্যাপারগুলার দেখাশুনা করিয়া থাকে।
আবার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলাতেও পশুপাখির মত জংলী ঐক্য দেখা যায়। এই যেমন, কোন সাংবাদিক মরিল তো কেউ কিছু কহিবে না, খালি সাংবাদিকেরাই কাউয়াসদৃশ কা কা করিবে। পুলিশ মরিল তো কেবল পুলিশপ্রজাতি কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ করিবে, নেতা মরিল তো কেবল তাহার দলের লোকজন শুয়োরের মত ঘোঁত ঘোঁত করিবে। আর আমজনতা হইল গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগীর মত। ইহারা মরিলে কিছু আসিবে যাইবে না। কেবল চিল, শকুনের মত কিছু লোক ছুটিয়া আসিবে এই লাশগুলা নিয়া কিভাবে ফায়দা হাসিল করা যায় এই নেক মকসূদ নিয়া।
তবুও আমরা আরেকটা নির্বাচনের আশায় বসিয়া থাকি। ভাবি এইবার কোন মহাত্মা আসিয়া আমাদিগকে উদ্ধার করিয়া লইয়া যাইবে। কিন্তু চিন্তা করিয়া দেখি না সমস্যা কোথায়। রাষ্ট্র চলিবে জঙ্গলের নীতিতে অথচ আশা করিতেছি এইখান থেকে মানুষ জন্মাইবে। যখন মানব সন্তান তাহার শ্রেষ্ঠত্ব যেই চিন্তা শক্তির কারনে তাহার ব্যবহার ব্যতিত শুধুমাত্র মুনাফার ভিত্তিতে জীবন চালাইবে তখন পরিণতি তো এইটাই হইবে। অথচ এই রাজনীতিবিদ, পুলিশ, বিচারক সব এই সমাজ হইতে জন্ম নিয়া এইখানেই বাড়িয়া উঠিয়াছেন। কিন্তু কুফর সিস্টেম তাহাদের রাক্ষসে পরিণত করিয়াছে। এইটা সেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যাহা কিছু মানুষকে আইন তৈরির খোদায়ী ক্ষমতা প্রদান করে। মজার ব্যাপার হইল ঐ আইন আবার তাহাদের উপরেও কার্যকর যাহারা ইহার স্রষ্টা। মানে এই যে, একজন মানুষ নামক সীমাবদ্ধ জীব তাহার এবং তাহারই মত অন্য মানুষের জন্য বিধান তৈরি করিবে অথচ সে নিজেই জানেনা তাহার উপযোগী বিধান কোনটা।
আজকে যখন এই সিস্টেমের মারপ্যাঁচে পড়িয়া পুরা জাতি এক গভীর সঙ্কটে। তখনও কিছু মাথাচেলা বুদ্ধি প্রতিবন্ধি আলোচনার টেবিলে বসিয়া গণতন্ত্র আরও উত্তমরূপে চর্চা করিবার থিওরি কপচাইতে থাকেন। আর যখনই কেহ গণতন্ত্রের সমস্যা নিয়া কথা কহিতে যায় তাহাকে ইঙ্গ – মার্কিন পীরিতের দুশমন হিসাবে জঙ্গি ট্যাগ লাগাইয়া দেয়।
তাই যদি এখনও বুঝিবার সময় না আসে তবে অতি শীঘ্রই আমাদিগকে জঙ্গল যাত্রা করিতে হইবে আদৌ যদি সিস্টেমের চাপ সহ্য করিয়া টিকিতে পারি আরকি। আমাদের প্রত্যাবর্তন যদি ইসলামের দিকে হয়, তবে মহান খিলাফাহর আগমন শুনিব অতি শীঘ্রই ইনশাল্লাহ। অন্যথায়, জঙ্গলযাত্রা শুভহোক। ফি আমানিল্লাহ!!!!!!!!
আবদুর রহমান
সংকীর্ণ জীবন

১) সদ্য বেসরকারি নামকরা ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ পাশ করা কোন কর্মোদীপ্ত মেধাবী যুবক। ভার্সিটি থেকে বেরোনোর সাথে সাথেই চাকরি পেলো কোন নামকরা বেসরকারী ব্যাংকে; যার পে স্কেলও বেশ ভালো। বছর দুয়েক না যেতেই ব্যাংক তার জন্য অনুমোদন করলো ফ্ল্যাট আর গাড়ীর লোন। আর, ওই যুবকও সাত পাচ না ভেবে সেই সুযোগ লুফে নিলো; যদিও বাকী জীবন তাকে এই লোনের ঘানি টানতে হবে।
আমেরিকান ইসলামী সুবক্তা আর মনোবিদ ইয়াসির ফাজাগা একটি বেশ সুন্দর মন্তব্য করেছিলেন একবার, যা অনেকটা এমন:
”We buy things that we don’t need, with the money we don’t have, to impress the people we don’t like.”
অনেকেই হয়তো আপাতঃদৃষ্টিতে উপরের উদাহরণটিতে কোন গোঁজামিল খুঁজে পাবে না। আর না পাওয়ার পেছনে রয়েছে আমাদের বস্তুবাদী সমাজের পরিয়ে দেয়া রঙ্গিন চশমা। যদি সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গিতেও এগোই, তবুও ঐ যুবক এমন এক জীবনমান আর জীবনোপকরণের পিছনে ছুটছেন যার উপযুক্ততা তিনি অর্জন করেন নি অথচ তা নিজের জন্য উপযুক্ত সাব্যস্ত করার জন্য কত বছরের গতর খাটুনি আর দাসত্বের শিকলে নিজেকে বন্দী করেছেন তা তিনিই জানেন। এবার দেখি, ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে, এই জীবন কতটা ভয়াবহতা, সংকীর্ণতা আর সীমালঙ্গনের। সুদের গুনাহ্ কিংবা ভয়াবহতা নিয়ে আলোচনা করা বাহুল্যতা আর এর শোচনীয় পরিণতির কথা আমরা সবাই জানি। অথচ আমরা এমন সওদা করছি যার আদ্যোপান্ত একজনকে নিক্ষেপ করছে জীবনের সবচেয়ে উত্তুঙ্গ আর কর্মময় সময়ে আল্লাহদ্রোহিতায়!
২) কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লোকপ্রশাসণে মাস্টার্সের পাশাপাশি বিসিএস করা কোন যুবক বেশ বড় অংকের ঘুষ দিয়ে সরকারি ভূমি অফিসে চাকরি নিলো। ভূমি অফিসের দুর্নীতি আর ফাইলবন্দীত্বের সাথে যাদের পরিচয় আছে তারা জানে ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের আয়ের ফিরিস্তি; যার নব্বই শতাংশ আসে দুর্নীতি থেকে; তবে ব্যতিক্রমও থাকতে পারে। আমি কেবল প্রচলিত রেওয়াজের কথাই বলছি। এই সকল অফিসে মেধাবী অফিসার কিংবা তৃতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তারা এতটাই অর্থবুভুক্ষু হয়ে থাকেন যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভবপর নয়। এদের অনেকেই রাতারাতি বাড়ি-গাড়ীর মালিক বনছেন; অথচ তাদের অন্তরে এতটুকুন স্বস্তি নেই। কারণ, একটাই এদের আয়ের মূল উৎস ঘুষ।
৩) এক ছোটভাই বেশ কিছুদিন ধরে এক প্রবাসী মেয়ের সাথে পারিবারিকভাবে বিয়ের দর কষাকষি করছে। মেয়েপক্ষ একটু বেশী ধনাঢ্য হওয়ায় তাদের আবদারও বেশী। মাহর, উপহার আর বিয়ে পরবর্তী ওয়ালিমা বাবদ বেশ বড় অংকের টাকা চাই বৈবাহিক কার্য সম্পাদনের জন্য; যার জন্য হিমশিম খেতে হচ্ছে ওই ছোটভাইকে। এখানে, দর কষাকষি বলেছি এ জন্যই যে, এই বিয়ের মূল উদ্দেশ্য দুনিয়াবি স্বার্থ হাসিল; যার কারণে এই বিয়ের সম্ভাবনাটুকুও এই সকল আবদার-উপহারের সমানুপাতিক হয়ে পড়েছে। আর বিয়েকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনায় রীতিমতো হতাশ আর বিপর্যস্ত ওই ছোটভাই।
উপরের এমন উদাহরণ চাইলে, অসংখ্য দেয়া যায়।
সংকীর্ণতা, হতাশা আর গ্লানিতেই আশ পাশ; অথচ এই জীবনের তাড়নায় তারা গড়ছে আবাস।
কুরআনের দু’একটি আয়াহ্ দিয়ে যবনিকাপাত করতে চাই যা আমাদের বিভ্রম দুর করতে সহায়ক হবে, বি’ইদনিআল্লাহ:
“মানবকূলকে মোহগ্রস্ত করেছে নারী, সন্তান-সন্ততি, রাশিকৃত স্বর্ণ-রৌপ্য, চিহ্নিত অশ্ব, গবাদি পশুরাজি এবং ক্ষেত-খামারের মত আকর্ষণীয় বস্তুসামগ্রী। এসবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ্য বস্তু। আল্লাহর নিকটই হলো উত্তম আশ্রয়।“
[সুরা আল-ই ইমরান:১৪]
“হে মানুষ, কিসে তোমাকে তোমার মহামহিম পালনকর্তা সম্পর্কে বিভ্রান্ত করল?” [সুরা ইনফিতার: ০৬]
“এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।“ [সুরা ত্ব-হা:১২৪]সায়্যিদ মাহমূদ গজনবী
শুধু আবেগ নির্ভর আন্দোলন নয়, চাই বিবেক নিয়ন্ত্রিত সঠিক সিদ্ধান্ত

মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মানুষকে গুরুত্বপূর্ণ দু’টি বিষয় দান করেছেন। একটি হচ্ছে আবেগ, অপরটি বিবেক। আবেগ এবং বিবেক এই দু’টি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ দু’টো এমন বিষয় যার কোনো একটিকেও বাদ দেয়া সম্ভব নয়। মানুষের যে কোনো কাজে এই দু’টি বিষয়ের সমন্বিত ও পরিমিত উপস্থিতি সেই কাজ ও বিষয়কে সর্বোচ্চ সফলতায় উন্নীত করতে পারে। একইভাবে এই দু’টি বিষয়ের সমন্বয়হীনতা বা কম-বেশি যে কোনো কাজ বিশেষত আন্দোলনকে নিক্ষেপ করতে পারে অন্ধকার আস্তাকুড়ে।
আবেগ হচ্ছে গতি। দ্রুততা। চলার শক্তি। আর বিবেক হচ্ছে নিয়ন্ত্রক। এখন যদি কোনো গাড়ির গতি যত দ্রুত আর শক্তিশালীই হোক না কেন, যদি সেই গাড়ির নিয়ন্ত্রণ বা নিয়ন্ত্রক সুস্থ্য ও বিচক্ষণ না হয় তাহলে যে কোনো সময় এই গতি ও দ্রুততাই সেই গাড়ি ও তার সকল আরোহীর জন্য মৃত্যু ডেকে নিয়ে আসতে পারে।
আবার শুধু নিয়ন্ত্রক যদি একা একা বসে থাকে, যদি গতি ও চলার শক্তি না থাকে তাহলেও কিন্তু সেই গাড়ি কোনো কাজে আসবে না। এক্ষেত্রে গতি ও নিয়ন্ত্রক উভয়ের সমন্বিত সুষম ব্যবহারই একমাত্র আবশ্যক কর্তব্য।
আমাদের দেশের সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হওয়া শাহবাগ আন্দোলনের পুরোটাই আমার কাছে তরুণ প্রজন্মের আবেগকে ব্যবহার করে স্বার্থান্বেষী একটি মহলের ফায়দা লোটার অপচেষ্টা বলে মনে হয়েছে। এক্ষেত্রে বিবেকবানদের ভূমিকা ছিলো খুবই গৌন। নীরব। অনেকে নিজেদের বিবেককে ইচ্ছাকৃতভাবেই ঘুম পারিয়ে রেখেছিলেন। এই সুযোগে যৌবনের উন্মত্ত আবেগের পাগলা ঘোড়া ছুটেছে তার নিজ গতিতে। ক্ষণে ক্ষণে পাল্টেছে দাবী-দাওয়া ও চাওয়া-পাওয়া। এই আন্দোলন এতোটাই আবেগ নির্ভর ছিলো যে তারা কার কাছে চাচ্ছে? কি চাচ্ছে? কিভাবে চাচ্ছে? আর কি কি তারা চাইবে? এর কোনোটিরই সুনির্দিষ্ট কোনো ছক বা পরিকল্পনা তাদের মাথায় ছিলো না। উম্মাহর এই তরুণ-যুবকদেরকে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে এবং এখনও দিচ্ছে তারা কিছুক্ষণ পর পর রহস্যময় উৎস থেকে কিছু ওহী (নির্দেশনা) এনে পাঠ করছিলেন। কখনো কখনো উদ্দীপ্ত তারুণ্যকে শপথ পড়াচ্ছিলেন। দীক্ষা দিচ্ছিলেন। আবার তারপর তাদেরকে নাচ-গানসহ নানাবিধ বিনোদন আর নারী-পুরুষ ফ্রি-মাইন্ড সহাবস্থানের নামে বেলেল্লাপনা উসকে দিয়ে শাণিত করার নামে নির্জীব করছিলেন।
শুধু আবেগ নির্ভর হওয়ার কারণে মাত্র অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই এই আন্দোলন আজ যে কোন পর্যায়ে এসেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাদের ভবিষ্যতও বিচক্ষণ ব্যক্তিদের কাছে আজ উদ্ভাসিত হয়ে গেছে।
একইভাবে এই শাহবাগের এই আন্দোলন ও নাস্তিকদের অন্যায় আস্ফালনের বিরুদ্ধে এক পর্যায়ে দেশের আপামর আলেম-উলামা ও ইসলামী প্রতিষ্ঠান সমূহ পাল্টা আন্দোলনে নামেন। অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো দেশ জেগে উঠে। সারা দেশের ধর্মপ্রাণ তাওহীদী জনতা আলেমদের পাশে এসে দাঁড়ান। ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর সমর্থনে তারা তাদের সাধ্যানুযী প্রতিবাদ, বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেন। যার ফলে কল্পনাতীত দ্রুত গতিতে শাহবাগী নাস্তিকদের সূর পাল্টে যায়। এর চেয়েও দ্রুততার সাথে তাদের ধর্ম ও ইসলাম বিদ্বেষী সূর পরিবর্তিত হয় ধর্মকারী হিসেবে। এবার তারা নিজেদেরকে ইসলামের অনুগত ও খুবই ভক্ত একেকজন মুত্তাকী প্রমাণে মরিয়া হয়ে উঠেন। চিহ্ণিত যেই নাস্তিকগুলো গত কয়েকবছর বুক ফুলিয়ে নিজেদেরকে নাস্তিক বলে পরিচয় দিতো তারাও যেনো শেয়াল থেকে বেড়াল হয়ে গেলো। তাদের হুক্কা হুয়া আজ মিঁউ মিঁউ শব্দে প্রতিধ্বনিত হয়ে মুমিনদের হাসির খোরাক যোগাচ্ছে। তাদের এই দ্বিমুখী স্বভাব বুঝতে পেরেই গত প্রায় বছর খানেক আগে ‘দুই কেজি মুরগীর কতটুকু খাবেন’ নামক নাস্তিকদের বাস্তবতা ও স্বভাব বিষয়ক একটি লেখায় বলেছিলাম আসলে আমাদের দেশে প্রকৃত নাস্তিক নেই বললেই চলে। সারা দেশ তন্ন তন্ন করে খুঁজে দু’ই একজন প্রকৃত নাস্তিকও পাবো কিনা সন্দেহ আছে। কারণ নাস্তিকতার ভেকধারী কেউ আজ পর্যন্ত দুই কেজি মুরগীর পুরোট খেয়েছে বলে শোনা যায়নি। তারা এমনিতে সুবিধা নেয়ার জন্য নাস্তিকতার ভাব ধরলেও মুরগী খাওয়ার সময় ধর্ম এবং সামাজিক রীতি মেনেই যবেহ করে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করেই খেয়ে থাকে। এছাড়া অন্যান্য প্রায় সকল সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করে থাকে। -যাই হোক এটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। ভবিষ্যতে কখনো এ বিষয়ে আলাদা করে লেখার ইচ্ছা আছে।
নাস্তিকদের বিরুদ্ধে আজ যে বিশ্বাসী মুমিনদের আন্দোলন শুরু হয়েছে সত্য বলতে গেলে তাও মূলত: আবেগ থেকেই। এই আন্দোলনের মূল উপজীব্য বিষয় মুমিনদের অন্তরে বিদ্যমান ইসলাম ও প্রিয়নবী (সা) এর প্রতি শর্তহীন ভালোবাসা। আবেগের শক্তি ও গতি যেমন উপকারী তেমনি বিবেকের নিয়ন্ত্রণ ও সুশৃংখল পরিচালনাও অপরিহার্য বাস্তবতা। আজ উলামায়ে কিরাম যদি পুরো উম্মাহর মনের দাবী এ দেশে ইসলাম বিরোধীদের অপতৎপরতার বিষয়ে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ ও সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের মূল দাবীতে এই আন্দোলনকে প্রথিত করতে না পারেন তাহলে শুধু আবেগ নির্ভর এই আন্দোলনও যে শীঘ্রই হারিয়ে যাবে -তা এক কঠিন তিক্ত অতীত সত্য বাস্তবতা।
অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ও বাস্তব প্রমাণ হাতে থাকার পরও উলামায়ে কিরাম ও উম্মাহর নেতৃবৃন্দ যদি দেশের আপামর জনসাধারণকে সংগঠিত ও সুশৃংখল করে একটি চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিতে না পারেন তাহলে এটি হবে আমাদের এক বিশাল ব্যর্থতা।
মিডিয়াতে ইসলাম ও উলামায়ে কিরামদের অবস্থান খুবই সীমিত প্রায় নেই বললেই চলে। মিডিয়ার ব্যাপারে শ্রদ্ধেয় আলিমদের কেনো এই উদাসীনতা ও সীমাহীন নিরাসক্তি তার বোধগম্য কোনো গত বিগত এক যুগেও আমি পাইনি। অথচ যদি শীর্ষ উলামাগণ চাইতেন তাহলে আজকে আলিমদের হাতে অন্তত ১৫ টি শক্তিশালী মিডিয়া থাকতো। এই অবিবেচক নির্লিপ্ততার কারণেই আজ বিশ্বাসীদের অনেক বড় বড় অর্জন গুলোর সঠিক সংবাদও জাতি পাচ্ছে না। এ বিষয়ে উলামায়ে কিরাম ও জাতীয় নেতৃবৃন্দের সজাগ দৃষ্টি দেয়ার সময় কি এখনও আসেনি?
পাশাপাশি নাস্তিক ও সাম্রাজ্যবাদীদের দালালদের ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদী শাস্তি ও সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। কারণ আজ আমরা যাদের কাছে নাস্তিকদের শাস্তি চাচ্ছি, আসলে তারাই তো তাদেরকে গানম্যান ও প্রটেকশন দিয়ে নিরাপদে অপকর্ম করে যাবার সুযোগ দিয়ে রেখেছে। ইসলামের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি তো তারাই করছে -সুতরাং তাদের একটি মিথ্যা আশ্বাস বা আইওয়াশ মূলক কাজের ফলে বিভ্রান্ত হয়ে উলামায়ে কিরাম ও জাতীয় নেতৃবৃন্দ যদি তৃপ্তির ঢেকুর তুলেন তবে এটি হবে আমাদের জন্য খুবই দু:খজনক একটি অধ্যায়।
মহান আল্লাহ আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দকে সঠিক বিষয়টি যথাযথভাবে উপলব্ধি করার তাওফীক দিন। মানুষের স্বার্বভৌমত্ব ও গোলামীতে আটকা পরে যাওয়া, গণতন্ত্রের মড়কের নিচে চাপা পরে থাকা অসহায় মানবতার মুক্তির জন্য ইসলামকে পুনরায় সমাজ ও রাষ্ট্রে বিজয়ী হিসেবে নিয়ে আসার লক্ষ্যে সঠিক কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করার তাওফীক দিন, আমীন।
ইসহাক খান
মুমিনের কোনোদিন পরাজয় নাই…

(51) قُلْ لَنْ يُصِيبَنَا إِلا مَا كَتَبَ اللهُ لَنَا هُوَ مَوْلانَا وَعَلَى اللهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ
(52) قُلْ هَلْ تَرَبَّصُونَ بِنَا إِلا إِحْدَى الْحُسْنَيَيْنِ وَنَحْنُ نَتَرَبَّصُ بِكُمْ أَنْ يُصِيبَكُمُ اللهُ بِعَذَابٍ مِنْ عِنْدِهِ أَوْ بِأَيْدِينَا فَتَرَبَّصُوا إِنَّا مَعَكُمْ مُتَرَبِّصُونَ“হে নবী আপনি বলে দিন! আল্লাহ আমাদের জন্য যা লিখে রেখেছেন তার বাইরে আমাদের কিছুই হবে না। তিনিই আমাদের অভিভাবক, আর আল্লাহর উপরই যেন মুমিনরা তাওয়াক্কুল করে। হে নবী আপনি (অবিশ্বাসীদেরকে) বলে দিন! তোমরা কেবল আমাদের জন্য দু’টি কল্যাণের একটিরই অপেক্ষা করছ (হয়তো আমরা তোমাদের হাতে শহীদ হবো অথবা বিজয়ী হবো) আর আমরাও তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছি মহান আল্লাহর আযাবের। হয়তো এই আযাব তিনি স্বয়ং তোমাদেরকে দিবেন অথবা আমাদের মাধ্যমে তোমাদের উপর এই আযাবের বাস্তবায়ন করবেন। অতএব তোমরা অপেক্ষা কর, নিশ্চয়ই আমরাও তোমাদের সাথে অপেক্ষমাণ।” (সূরা তাওবা, আয়াত ৫১-৫২)
দেশের সাম্প্রতিক অবস্থা আমাদের সবারই জানা। আমাদের চোখের সামনেই হচ্ছে সব। কিন্তু এখানে বিশ্বাসী বা একনিষ্ঠ মুমিনরা আজ কোনঠাসা। জালিম ও তাদের দোসরদের উল্লাসই মিডিয়া ফলাও করে প্রচার করছে। একজন সম্মানিত আলিমকে অপমানিত করার ব্যর্থ চেষ্টা আজ যারা করছে তাদের পরিণতি নিঃসন্দেহে ভয়াবহ হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। অতীত ইতিহাস সাক্ষী, যারাই কোনো আলিমের সাথে দুর্ব্যবহার করেছে, অসম্মান করতে চেয়েছে কিংবা কোনো আলিমকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে -তাদের পরিণতি হয়েছে শোচনীয়।
আজকে যারা একজন আলিমের ফাঁসি দেখার জন্য জেনে না জেনে ঢোলের তালে তালে নাচছে, তারা জানেনা এদেশের ভবিষ্যত তারা কোন অন্ধকার গহ্বরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যুদ্ধাপরাধ নামক একটি খুবই ঠুনকো অজুহাতের আড়ালে আজ হারিয়ে গেছে এই দেশের সবচেয়ে বড় বড় ইস্যুগুলো। সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ও ভারতের ভয়াবহ নীল-নকশা আজ সবার অগোচরে সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পথে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশের ৮/১ (এক অষ্টমাংশ) ভূমি নিয়ে এশিয়ার নতুন ইসরাইল রাষ্ট্রগঠন আজ সময়ের ব্যাপার মাত্র। বঙ্গোপসাগরে আমেরিকার যুদ্ধ জাহাজ আসার জন্য এদেশে একটি বড় আকারের ম্যাসাকার প্রয়োজন। হানাহানি আর রক্তপাতের একটি অজুহাত দরকার। যার ফলে তারা শান্তি প্রতিষ্ঠার নাম করে এখানে তাদের সোলজারদের অনুপ্রবেশ ঘটনাতে সক্ষম হবে। গণতন্ত্র ফেরি করা কিংবা শান্তি বিতরণের মহান বাণীর আড়ালে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করবে।
আর সেই প্রেক্ষাপট রচনা ও এদেশের জনগণের সামনে ইসলামী রাজনীতি ও ইসলামী ব্যক্তিত্বদেরকে কালারিং করার জন্যই আজ তারা নানান ইস্যু ও নাটক করে চলেছে। কর্পোরেট মিডিয়াগুলোও তাদের প্রভুদের দেয়া পয়সা হালাল করার জন্য হলুদ সাংবাদিকতার সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করছে। কিন্তু তাদের সকলের জেনে রাখা প্রয়োজন চূড়ান্ত বিজয় কেবলমাত্র মুমিনদেরই। তারা যতই চক্রান্ত করুক না ইনশাআল্লাহ একবিংশ শতাব্দী ইসলামের শতাব্দী। এই উম্মাহর তরুণ-যুবকরা জেগে উঠছে। গণতন্ত্রের মড়ক আস্তাকূড়ে নিক্ষেপ করে, শোষণ নিপীড়ন আর মানব রচিত সকল তন্ত্র-মন্ত্র ছিন্ন করে এক আল্লাহর সার্বভৌমত্বের দাবী তোলা এবং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পুর্ণাঙ্গ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবী জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাবার এখনই শ্রেষ্ঠ সময়।
বিজয় অতি নিকটে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ বলেন,
(139) وَلَا تَهِنُوا۟ وَلَا تَحْزَنُوا۟ وَأَنتُمُ ٱلْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
إِن يَمْسَسْكُمْ قَرْحٌۭ فَقَدْ مَسَّ ٱلْقَوْمَ قَرْحٌۭ مِّثْلُهُۥ ۚ وَتِلْكَ ٱلْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ ٱلنَّاسِ وَلِيَعْلَمَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَيَتَّخِذَ مِنكُمْ شُهَدَآءَ ۗ وَٱللَّهُ لَا يُحِبُّ ٱلظَّـٰلِمِينَ (140)
(141) وَلِيُمَحِّصَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَيَمْحَقَ ٱلْكَـٰفِرِينَ“আর তোমরা ভয় পেয়ো না এবং দুঃখিতও হয়ো না, (কারণ সাময়িক বিপদের পরে) তোমরাই বিজয়ী হবে -যদি মুমিন হয়ে থাকো।যদি তোমাদেরকে কোন আঘাত স্পর্শ করে থাকে তবে তার অনুরূপ আঘাত উক্ত কওমকেও স্পর্শ করেছে। আর এইসব দিন আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে আবর্তন করি এবং যাতে আল্লাহ ঈমানদারদেরকে জেনে নেন এবং তোমাদের মধ্য থেকে শহীদদেরকে গ্রহণ করেন। আর আল্লাহ জালিমদেরকে ভালবাসেন না। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৯-১৪১)
সত্য মিথ্যার এই সংঘাত আল্লাহ এজন্য সংগঠিত করেন) যাতে আল্লাহ পরিশুদ্ধ করেন ঈমানদারদেরকে এবং (এই লড়াইয়ের মাধ্যমে) ধ্বংস করে দেন কাফিরদেরকে।
(142) أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا۟ ٱلْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ جَـٰهَدُوا۟ مِنكُمْ وَيَعْلَمَ ٱلصَّـٰبِرِينَ
তোমরা কি মনে করো যে, তোমরা এমনিতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনো প্রত্যক্ষ করে দেখে নেননি যে তোমাদের মধ্যে কারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং জানেননি ধৈর্যশীলদেরকে।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৪২)
ইসহাক খান
নারী, ফুটন্ত কড়াই থেকে জলন্ত উনুনে
বাঙ্গালী নারীর অতীত অবস্থা:
আমরা যদি মাত্র দুই প্রজন্ম আগে ফিরে যাই,আমাদের দাদী-নানীদের যে চিত্র দেখব তা কম-বেশী একই রকমের। শৈশব পেরোতে না পেরোতে সংসার, কিছু বুঝে উঠার আগে মা, তার পর কোল জুরে একের পর এক সন্তান, বিরাট সংসারের ঝক্কি এক হাতে সামলানো সেই সাথে ক্ষেত-খামারে কাজ করা মানুষের খাদ্য যোগান দেয়া। তার উপর আছে শ্বাশুড়ীর গঞ্জনা। সবার উপরে আছে স্বামীর অবহেলা। কবে যে পৌড়া থেকে বৃদ্ধায় পরিনত হয়, নারী টের পায় না। এক সময় সে তার নিজ সন্তানের বোঝা বলে গন্য হয়। জন্মের সময় পরিবারে ভ্রুকুন্ঠনের উদ্রেককারী এই নারী মৃত্যুর মাধ্যমে পৃথিবীর বিরাট উপকার সাধন করে চলে যায়। বেগম রোকেয়া তাই আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা ভুমিষ্ঠ হইয়াই শুনিয়াছি যে আমরা জন্মিয়াছি দাসী, চিরকাল দাসী, থাকিব দাসী,”এ অবস্থা অবশ্যই কাম্য নয়। কী করা যায়? নারী হৃদয় কেঁদে উঠে। তোদেরি কল্যানে, বোন! কিন্তু কী করিব? কাঁদিতে শক্তি আছে, কাঁদিয়া মরিব”
না আর কান্না নয়। দেখা গেল পুরুষ নামের অপর শক্তি শুধু মাত্র অর্থ-উপার্জন করে বলে সব ব্যাপারে মেয়েদের দাসী জ্ঞান করে। তাই নারীর এই বিপুল কর্মযজ্ঞ, নিরব ত্যাগ কিছুই তার চোখে পরে না। তাই মেয়েরা যদি তার গন্ডি ছেড়ে বেড়িয়ে এসে ঘড়-সংসার এর সাথে সাথে আর্থিক ভাবে সক্ষম হয়ে উঠতে পারে তবে তার স্বীকৃতি সে আদায় করে নিতে পারবে। পরগাছা জীবনই তার দুরগতির কারণ।
বেগম রোকেয়ার ভাষায়, “ভগীনিগন, চক্ষু রাঙ্গাইয়া জাগিয়া উঠুন- অগ্রসর হউন। বুক ঠুকিয়া বল মা! আমরা পশু নই; বল কন্যে। আমরা জড় অলঙ্কার রুপে লোহার সিন্দুকে আবদ্ধ থাকিবার বস্তু নই; সকলে সমস্বরে বল, আমরা মানুষ। আর কার্যত: দেখাও যে আমরা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ অংশের অর্ধেক।”
কিন্তু আসলেই কি অর্থ উপার্জন না করাটাই মেয়েদের অপরাধ ছিল? অন্য কথায় টাকা দিয়ে কি সম্মান কেনা যায়? এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তরের পিছনে সময় নষ্ট করা হলো না। শুরু হলো আরেক কালো অধ্যায়ের। সেই প্রসঙ্গে পরে আসি, আগে দেখা যাক সমাধানের প্রয়োগ।
সমাধান:
আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে। এতে এক ঢিলে দুই পাখি মরবে। মেয়েরা প্রকৃত কর্তৃত্ব ফিরে পাবে। দেশের অর্থনৈতিক গতি প্রবল হবে। তাই রাষ্ট্র অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নীতি প্রনয়ণ করল। BCWD (National Council For Women’s Development)-১৯৯৭ এর ফেব্রুয়ারীতে সরকার নীতি চুড়ান্ত করে যা ঐ বছর মার্চে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি সাপেক্ষে প্রয়োগ শুরু হয়ে যায়।
নীতিমালার লক্ষ্য ছিলঃ সর্বক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ের সম অধিকার। মেয়ে ও নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্য দুরীকরণ। নারীকুলের মানবাধিকার নিশ্চিত করা। নারীদের মানব সম্পদে পরিণত করা। অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিমন্ডলে মেয়েদের স্বীকৃতি দেয়া। প্রশাসন, রাজনীতি, শিক্ষা, খেলাধুলাসহ সকল আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে নারী পুরুষের অংশ গ্রহনে সমতা আনয়ন এবং নারীর ক্ষমতায়ণ। নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে ইতিবাচক ভাবমূর্তি উপস্থাপন। প্রচার মাধ্যমে মেয়েদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি উপস্থাপন। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, আশ্রয় নিশ্চিতকরণ।
এই নীতির আলোকে আমরা সেখানে পাই নারী শিক্ষাকার্যক্রমের আওতায় প্রথমে ৮ম শ্রেনী পরে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত নারী শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়েছে। চালু হয়েছে বৃত্তি, উপবৃত্তির ব্যবস্থা। ফলাফল হিসাবে আমরা দেখি যে ১৯৯০ সালে যেখানে নারী সাক্ষরতার হার ছিল ১৩.৪% বর্তমানে তা ৩০% ছাড়িয়ে গেছে। একই ভাবে চাকুরীতে কোটা পদ্ধতির প্রবর্তন, নারী কর্মী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ, ক্ষুদ্র-মাঝারী ঋণের আওতায় মেয়েদের সংখ্যা বাড়ানো, উদ্যোক্তা হিসেবে উৎসাহ প্রদান সহ মিডিয়াতে ব্যাপক উপস্থিতি, গৃহীত নীতির বাস্তব প্রয়োগেরই সাক্ষ্য বহন করে। অধিক সন্তান এবং তাড়িতাড়ি বিয়ে মেয়েদের অর্থনৈতিক কাজের অন্তরায়। তাই ব্যাপক প্রচার ও মাঠ কর্মের মাধ্যমে অল্পসন্তান ও দেরীতে বিবাহ উৎসাহিত করা হচ্ছে। জন্ম নিয়ন্ত্রনের উপকরণের ব্যাবহার ৪৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। গড় বিয়ের বয়স ১৩.৫ থেকে বেড়ে ১৯.৫ এ ঠেকেছে। Total Fertility Rate ৪.৫ থেকে কমে ৩.৪ এ নেমেছে। চাকুরী ক্ষেত্রে মেয়েদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়। প্রাথমিক, মাধ্যমিক,উচ্চ মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যথাক্রমে শতকরা ২০,৭৪,৯ এবং ১৪জন নারী শিক্ষক শিক্ষা দানে নিয়োজিত আছেন। ২য় শ্রেনীর অফিস কর্মী হিসাবে যেখানে ১৯৯০ সালে ৯% নারী নিয়োজিত ছিল তা ২০০৪ সালে এসে ৩৭.১%এ দাঁড়ায়।উচ্চতর পেশার ২৬০৬টি পদের মধ্যে নারীদের দখলে আছে ১১১৮টি। কৃষিক্ষেত্রে মালিক হিসাবে আছে ২২.৩% নারী এবং কর্মী হিসেবে আছে ২৫.৩% নারী। প্রায় ২০০০টি ছোট বড় গার্মেন্টসে নিয়োজিত কর্মীদের শতকরা ৯০ভাগই নারী। বর্তমানে ১৫মিলিয়ন নারী ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পের অন্তর্ভূক্ত।
কেমন আছে আজকের নারীঃ সাফল্য এসেছে। পরিসংখ্যান তাই বলে। অনেক মেয়েই আজ পরগাছা নয়। কিন্তু গোড়ার সেই গলদ, পুরুষদের প্রশ্ন না করা, “মেয়েদের প্রভু হবার হুকুম তোমাদের কে দিয়েছে ?”- আজকে পর্বত আকারে দেখা দিয়েছে। নারীকে সুরক্ষিত করতে যেয়ে করা হয়েছে অরক্ষিত। পূর্বে স্বামী তাকে অসম্মান করত, বর্তমানে গলির মোড়ের চা বিক্রেতা, বাসের হেল্পার, ফুটপাথের ছেলে, অফিসের বস, স্বামীর বন্ধু, যতো শ্রেনীর পূরুষ লোক আছে সকলে তাকে অসম্মান করে। মেয়েদের স্কুলে যাবার সংখ্যার সাথে তাল মিলিয়ে বেড়েছে বখাটে ছেলেদের গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে অশ্লীল মন্তব্য করার মাত্রা। শুধুমাত্র নারীদের চিহ্ন শরীরে ধারণ করার জন্য গিলতে হয় এই অশ্রাব্য কথাবার্তা। সহ্য করতে না পেরে পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় সিমি, রুমি, তৃষার মত কোমলমতি উজ্জল মেয়েরা। প্রতি ২১ মিনিটে একটি মেয়েকে আজকে এই জাতীয় লাঞ্চনার শিকার হতে হচ্ছে। প্রতিদিন প্রত্রিকার পাতায় কমপক্ষে ৩জন নারীর ধর্ষনের রিপোর্ট ছাপা থাকে। ১৯৯৭ সালে ধর্ষিত হয়েছিল ৭৫৩ জন, ১৯৯৯ সালে যা বেড়ে হয় ১২৩৮ জন। আমরা জানি প্রকৃত সংখ্যা আরো আনেক বেশী। ১২০০০০ গার্মেন্টস নারী কর্মীদের একটি বিরাট অংশ এই যৌণ নিপীড়ণের শিকার। বর্তমানে বাংলাদেশে ৬০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ পতিতা রয়েছে। যাদের মধ্যে ৬৫%এর বয়স ১১ থেকে ১৩ এর মধ্যে। ৩৩%এর বয়স ১৩ থেকে ১৫ এর মধ্যে। মেয়েরা তো স্বাবলম্বী হচ্ছে, প্রস্টিটিউটের সংখ্যা এত বাড়ছে কেন?
অন্ততঃ ৬০ বছর আগেও তো পরিস্থিতি এরকম জঘন্য ছিল না! মিডিয়ার নারীকে একটি মুখরোচক পন্য ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না পাবলিকের কাছে। সব চেয়ে মর্মান্তিক অবস্থা মায়েদের। সন্তানের সংখ্যা একটি বা দুইটি। তাও একটি বিড়াট মাথা ব্যাথার কারন। কে দেখবে এই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। পরিবারে শিশু বেড়ে উঠে গৃহকর্মীর কাছে। যাদের আর্থিক সংগতি নেই তারা শিশুদের শেকলবন্দী করে রাখে, যার ছবি আমরা পত্রিকায় দেখেছি। পিতা-মাতা জীবিত থাকার পরও এতিম এই অসহায় শিশুগুলো হতে থাকে যৌণ নিপীড়ণের শিকার। ঘরে, বস্তিতে, পথে। কী মর্মান্তিক!
গ্রামের নারীদের অবস্থা পাল্টে গেছে। তাদের বেশীর ভাগ শহরে চলে আসছে, বরণ করছে ভাসমান জীবন। বাকিরা ক্ষুদ্র ঋণের কল্যানে সন্তান পালন আর ব্যাবসা পরিচালনা, এক হাতে সব কাজ করছে। স্বামীরা পুজীর অভাবে হাওয়া খায় আর বৌ পেটায়। আসলে সুবিধা হয়েছে তাদেরই।
ঠিক এরকম একটা ভবিষ্যতের চিত্র কি আমাদের পুর্ব প্রজন্ম চেয়েছিল?
পৃথিবীর সব চেয়ে সস্তা বস্তুতে পরিনত হয়েছে এমন এক প্রানী যার সম্মান সৃষ্টিকর্তার কাছে সবচেয়ে বেশী। আমাদের নানী যদি আমাকে প্রশ্ন করেন “কেমন আছিস তোরা?” কী উত্তর দিব আমরা! তারা লাঞ্চিত হয়েছে নিজ পরিবারে। আমরা লাঞ্চিত হচ্ছি সমস্ত সমাজে – এই পার্থক্যটাই শুধু হয়েছে।
কেন এমন হলো ? আসলে আমরা এমন এক সমাজকে গড়ে তুলেছি সেখানে এমনটাই তো হওয়া স্বাভাবিক। এমনই হবার কথা। আসলে সমস্যা ছিল নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে। বিখ্যাত কবি বায়রন বলেছিলেন, “পুরুষদের সাথে এক টেবিলে বসে খাবার অধিকার মেয়েদের নেই। তাদের জন্য উপযুক্ত স্থান হল ঘরের মধ্যে রান্না ঘর।”
দাইমাস্তিন অপর এক স্থানে বলেছেন, “আমরা নারীদের মধ্যে দেহপসারিনীদের উপভোগের জন্য ব্যাবহার করি, আর প্রেমিকদের মনোরঞ্জনের জন্য রাখি এবং স্ত্রীদের রাখি সন্তান উৎপাদনের জন্য।”
সমাজের এক অংশ যখন অন্য অংশের প্রতি এমন দৃষ্টিভঙ্গী লালন করে, তখন অর্থ কেন অন্য কোনভাবেই নারী তার প্রকৃত সম্মান ধারন করতে পারবে না। আজকে ঘরে যে পুরুষরা তার পরিবারের প্রতি অন্যায় করে, সেই পুরুষই সমাজের কোন না কোন পেশায় নিয়োজিত রয়েছে। কেন সে অন্য নারীর প্রতি মহানুভবের দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে? খুবই অযৌক্তিক কথা। বরং যৌক্তিক হল সে তার পরিবারের সাথে যা করতে পারে নি, অন্য নারীর সাথে তাই করবে, তাই করছে। মানুষ তার রচিত নিয়মে এমন কোন পরিবর্তন আনবে না যে পরিবর্তন তাদের স্বার্থের পরিপন্থী। আর তাদের রচিত এই অন্যায় সমাধান ধংস করে প্রজন্মের পর প্রজন্মের জীবন। অন্ধকার থেকে বের করার নামে ঠেলে দেয় ঘোর অন্ধকারে।
কী করা উচিত ছিলো? আমাদের পরিবার গুলোতে যদি ইসলাম ঠিকমত থাকতো তাহলে আসলে এই পরিস্থিতির উদ্ভব হতো না। আল্লাহ (সূবহানাহু ওয়া তায়ালা) পুরুষদের নারীর অভিভাবক রুপে সৃষ্টি করেছেন, প্রভু হিসাবে নয়। ঠিক যেমন রাষ্ট্রের অভিভাবক রাষ্ট্রনায়ক। যখন নারীদের উপর অন্যায় হচ্ছিল, তখন যেমন কুরআনের আয়াত, রাসূল (সা) হাদীস বিদ্যমান ছিল। এখনও আছে। ভূল যেটা হয়েছে যে আমরা অনুসন্ধান করি নি, এ ব্যাপারে সৃষ্টিকর্তা কী রায় দিয়েছেন। কিন্তু নিজেদের নীতি যখন ব্যার্থ হয়েছে তখন আবার সুকৌশলে ইসলামের উপর দোষ চাপাতে পিছ পা হয় না অনেকে। রাসূল (সা) বলেছেন, যে ব্যাক্তি ২জন বা তার অধিক কন্যা সন্তান লালন পালন করে সৎ পাত্রস্থ করার আগ পর্যন্ত আল্লাহর আমানত হিসাবে রাখবে, জান্নাতে ওই ব্যক্তি এবং আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এর মধ্যে ২ আঙ্গুলের ব্যাবধান থাকবে। এই বলে তিনি তার আঙ্গুল তুলে ধরেন। এই হাদীসের চর্চা পরিবারে থাকলে কেউ কন্যা সন্তানের জন্মকে বোঝা ভাবতে পারত না। দাসী তো অনেক পরের কথা।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“……… নারীদের সাথে সদ্ভাবে জীবন যাপন কর। অতঃপর যদি তাকে অপছন্দ কর তবে হয়তো এমন কিছু অপছন্দ করছ যাতে আল্লাহ তোমাদের জন্য প্রভুত কল্যান রেখেছেন।” [সূরা নিসা: ১৯]
রাসূল (সা) বলেছেন “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যাক্তি উত্তম যে তার পরিবারের নিকট উত্তম। নিশ্চয়ই আমি আমার পরিবারের জন্য সর্বোত্তম।” তিনি (সা) আরো বলেছেন, “গোটা দুনিয়া হলো সম্পদ। আর সৎ কর্মশীল স্ত্রী হল তার মধ্যে শ্রেষ্ট।”
আরাফাহর ময়দানে বিদায় হজ্জের গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে রাসূল (সা) স্ত্রীর প্রতি যত্নশীল হতে বলেছিলেন। সন্তান পালনের কষ্টকর কাজের জন্য আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) নারীকে যথার্থ পারিশ্রমিক দিয়েছেন। সন্তান জন্ম দান, স্তন্যদান এবং বড় করা প্রতিটির জন্য আলাদা করা নেকী। সেই সাথে রয়েছে মাতৃত্বের অনন্য স্বাদ। সন্তানের হক আছে তার পিতা মাতার কাছে। সে শেকল বন্দী হবার বস্তু নয়, নিপীড়নের পাত্র নয়। পিতামাতার হক আছে সন্তানের কাছে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেছেন, তাদের মধ্যে একজন বা উভয়ে বৃদ্ধ হলে আমরা যেন তাদের প্রতি এমনকি উহ শব্দটিও উচ্চারণ না করি। আল্লাহ এবং রাসুল (সা) এর পর আমাদের কাছে সবচেয়ে সম্মানের বস্তু আমাদের মা-বাবা।
মেয়েরা কর্তৃত্ব চায় না, মেয়েরা সম্মান চায়, স্বস্তি চায়। যা শুধু তার সৃষ্টিকর্তা প্রণীত নিয়মই তাকে দিতে পারে। অথচ নারীর সে চাওয়া ভুল খাতে প্রবাহিত করে চরম লাঞ্চনার মুখোমুখি দাড় করিয়ে, নারীর অনুভুতির গলা টিপে মারে সৃষ্টিকর্তার উপর দোষ চাপানোর ষড়যন্ত্র চলছে পুরোদমে।
মেয়েদের ক্ষুব্ধ প্রশ্নের মুখে তার সামনে শত্রু হিসেবে তার প্রভুকে দাড় করিয়ে দেওয়ার হীন চেষ্টাও আমরা প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করছি।
যেমন আন্দদা শংকর রায় বলেন, “প্রকৃতির অবিচার নারীকে মেরে রেখেছে- বিদ্রোহ নিষ্ফল। এই দেখনা প্রতি মাসে কয়দিন বর্ষাকাল। পুরুষের এমন ঝঞ্ঝাট আছে? কিংবা এক যাত্রায় পৃথক ফল। পুরুষের কাছে যা ৫মিনিটের সুখ, নারীর কাছে তাই ১০মাসের অসুখ। প্রকৃতির এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে নারীর করার কিছুই নেই।” (নাউযুবিল্লাহ)। সৃষ্টিকর্তার দেয়া নিয়ামত ‘সন্তান’ আমাদের কাছে ঝামেলা হিসাবে উপস্থাপন কারার স্পর্ধা তারা কোথায় পায়?
শেষ কথাঃ মেয়েরা তাদের অবস্থা পরিবর্তন করতে যেয়ে গরম কড়াই থেকে ঝাপিয়ে উনুনে পড়েছে। আসলে তাকে সুকৌশলে ফেলা হয়েছে। এতে তাকে যথেচ্ছ ব্যাবহার করা সুধাজনক হয়। নারী সমস্যার সমাধানের সত্যিকারের চেষ্টা থাকল এতোবড় ভুল হবার কথা নেই। মেয়েদের উপর অন্য মেয়ে কিংবা পুরুষের সমাধান চাপিয়ে নেয়ার দিন শেষ করতে হবে। এই মানব রচিত সুবিধাবাদী সমাধানের পরিণতি আমরা স্বচক্ষে দেখেছি। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আমাদের মধ্যে চাহিদা,প্রয়োজন দিয়েছেন, আমাদের চাওয়া পাওয়া তিনিই (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) ভালো জানেন। সে হিসাবেই তিনি নিয়ম নির্ধারন করেছেন। যার মাধ্যমে সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহ যা হক দিয়েছে তার চেয়ে বেশী নেয়ার কথা যে বলবে তার অন্য উদ্দেশ্য থাকবে। সে অধিকার আমাদের ধ্বংসের দিকেই নিয়ে যাবে দুনিয়া ও আখিরাতে। তাই চলুন সমাজ, রাষ্ট্র এবং পরিবারের ইসলাম কায়েম করি, যা আমাদেরকে শুধু নয় প্রত্যেককে, প্রতিটি বস্তুকে, ন্যায় বিচার তথা আলোর দিকে চালিত করবে।
নুসরাত জাহান
চট্টগ্রামে ইসলামের বিজয়: আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ তার এক জ্বলন্ত নিদর্শন

আজকাল ইসলাম ও রাজনীতি এ দুটিকে এক করে দেখতে চান না। এটি সম্ভবত কয়েক শতকের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার শাসন তারপর তাদের ষড়যন্ত্রে ভারত পাকিস্তান নামে অখণ্ড ভারতের বিভক্তি, পাকিস্তানের জালেম শাসকদের দ্বারা শোষণ, পরবর্তী বাংলাদেশের একের পর এক ব্রিটিশ আমেরিকার দালাল শাসকদের দ্বারা জুলুম অত্যাচারের শিকার হেতু তারা ইসলামকে স্বরূপে দেখতে না পাওয়ার কারণে হয়েছে। তায় এটি অনেক ধর্ম প্রাণ মুসলিমো আজকাল ইসলামকে রাজনীতিতে দেখতে চান না। তায় বাংলাদেশের শহর গ্রাম মফস্বল সর্বস্তরের জনগণ অসচেতনতার সহিত Secularism ধারণ করে যাচ্ছে। ইসলামকে ব্যক্তিগত ইবাদত বন্দেগির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই। যদি এমনই হত ইসলামের Approach তবে আপনি মুসলিম হিসাবে যে গর্ববোধ করেন তার ছিটেফোটাও আপনি পেতেন না যদি আপনার কাছে ইসলাম রাজনৈতিকভাবে Approach না করত। আপনি হয়ত ‘জীব হত্যা মহাপাপ’ বলে মুসলিম হত্যা করার ধর্মে দীক্ষিত হতেন, অথবা মুসলিম থাকলে মগদের শোষণের শিকার হতেন। তায় আপনার Root সম্পর্কে জানাটা অত্যাবশ্যক। কিভাবে আপনাকে ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র মোগল শাসকদের দ্বারা মগদের অত্যাচার হতে রক্ষা করেছিল। আপনারা আজ অনেকে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে জুমার নামায বা ওয়াক্তিয়া নামায পড়তে আসেন। কিন্তু জানেন কি এই মসজিদের প্রতিটা ইট কিসের ইতিহাস ধারণ করে।
এই কিল্লা বা কেল্লায় মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের আস্তানা ছিলো। বর্তমানে যেখানে জেনারেল হাসপাতাল অবস্তিত ঔ পাহাড়ে মগদের দুর্গ ছিল। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর এর শাসনামলে তাঁর নির্দেশে চট্টগ্রামের জনসাধারণকে বিশেষ করে নির্যাতিত, নিপীড়িত মুসলমানদের পর্তূগীজ জলদস্যূ ও আরাকানী মগদের নিষ্ঠুর লুন্ঠন ও অত্যাচার থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে তৎকালীন বাংলার শাসনকর্তা নওয়াব শায়েস্তা খাঁন তাঁর ছেলে উমেদ খানকে মগ লুটেরা ও পর্তূগীজ জলদস্যূদের কবল হতে চট্টগ্রামকে পুনরূদ্ধারের আদেশ দেন। এ আদেশের প্রেক্ষিতে উমেদ খাঁন ১৩ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে ফেনী নদী পার হয়ে বীর বিক্রম হুসেন বেগের সহায়তায় চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় প্রবেশ করেন এবং শত্রু সৈন্যদের পরাজিত ও বিতাড়িত করেন। সম্রাট আওরঙ্গজেব এই মহান বিজয়ের সংবাদ পেয়ে খুবই খুশী হন। ঐ সময় (২৭-০১-১৬৬৭ খ্রি: তারিখ) হতে চট্টগ্রামে মুসলমান রাজত্বের সূচনা হয় এবং এক শাহী ফরমানে চট্টগ্রামের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘‘ইসলামাবাদ’’। সম্রাটের নির্দেশে এই মহান বিজয়ের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য উমেদ খাঁন হিজরী ১০৭৮ সালে (১৬৬৭ খ্রি:) ‘আন্দরকিল্লা শাহী মসজিদ’ প্রতিষ্ঠা করেন। নিরাপত্তা পায় মুসলিমরা, সুরক্ষিত হয় ইসলাম।
ইসলাম যদি রাষ্ট্র দ্বারা সুরক্ষা না পায় তাহলে মুসলিমদের অবস্থা হবে আজ আপনার আমার মত কোটি মুসলিমদের মতই, যারা কিনা নিজ ভূখন্ডেই নির্বাসিত। একমাত্র রাষ্ট্রই পারে ইসলামকে সুরক্ষা দিতে। উমর ফারুক (রা) বলেন
“আল্লাহ কুরআন দিয়ে ইসলামকে যতটা সুরক্ষা দেন, রাষ্ট্র দ্বারা তার চেয়ে বেশী দেন” [কানযুল উম্মাল]
তাই ২০১৩ সালে এসে যে মুসলিমরা বলে ইসলামে কিসের রাজনীতি তাকে ধরেই নিতে হবে সে তার অস্তিত্বকে অস্বীকারকারী।আসিফ রহমান আতিক
শাহবাগে রাজনীতি
শাহবাগের আন্দোলন আজ দু সপ্তাহ হতে যাচ্ছে। কিন্তু এর পরিণতি কি বা কারা এর দ্বারা লাভবান হতে যাচ্ছে এ নিয়ে জনগণের মাঝে সচ্ছ ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না তাই আজকের এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা।
এই আন্দোলন প্রথম শুরু হয় যখন বাংলাদেশের সেকুলার ব্লককে আশাহত করে বাংলাদেশের সেকুলার দল আওয়ামীলীগ যুদ্ধ অপরাধের বিচারকে পরবর্তী নির্বাচনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে যেয়ে কাদের মোল্লাহ কে সরকার দলীয় প্রসিকিউসনের মাধ্যমে তাকে ফাসির হাত হতে বাঁচিয়ে দেয়, এবং পরবর্তীদেরও বাঁচানোর রাস্তা খুলে দেয়। পরবর্তী নির্বাচনে যাতে বিএনপি না আসলেও জামাত অংশগ্রহণ করে এবং আওয়ামীলীগের বিজয় নিশ্চিত হয় এবং আরও বছর ক্ষণেক আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকতে পারে । যা ভারত পন্থি সেকুলার ও বস্তুবাদী ব্লক বুঝে যায় এবং আন্দোলন শুরু করে পরবর্তীতে এটিএন নিউজের মুন্নি শাহার বদৌলতের পুর ভারত পন্থী মিডিয়া এটিকে সফল আন্দোলনের দিকে নিয়ে যায়।
আমদের এই আন্দোলন দেখে মনে করার কোন কারণ নেই যে এই আন্দোলন এই দেশে মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী। বা হাসিনার, ভারতের সাথে মার্কিনীদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেছে।
শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে যে ছক একেছিল তা সফল হয়নি বরং এতে তার দল ও সেকুলার ব্লকের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা কমেছে এবং খালেদাও তার দল ও জাতীয়তাবাদীদের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। বরং এই বিষয়টি মাইনাস ২ ফর্মুলাকে আরও শক্তিশালি করেছে, হাছিনা ও খালেদাকে আরও বেশি আমেরিকার দিকে আনুগত্যশীল করেছে।
ভারত এই আন্দোলন মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী ইসলাম পন্থীদের এক হাতে শায়েস্তা করছে এবং তাদের ভারতের প্রতি আনুগত্যশীল করতে চাচ্ছে অথবা তাদের নিষিদ্ধ করতে চাচ্ছে যাতে বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ বাস্তবায়নে আর কেউ বাধা হয়ে না দাড়ায়। যেটি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সালমান খুরশিদের বক্তব্য এবং এই সফরে ২০০৯ এর প্রোটকল বাস্তবানের সফল প্রচেষ্টা, ও ইসলাম পন্থী জাতায়তাবাদী পত্রিকা নিষিদ্ধের দাবি দেখে বোঝা যায়। যদিও আমেরিকা গণতান্ত্রিক ইসলামী রাজনীতি বন্ধের দাবি বাস্তবায়িত হতে দিবে না এতে আদর্শিক ইসলামী রাজনীতি ও মিলিট্যান্ট ইসলামের উদ্ভব ঘটে।
সর্বোপরি এই আন্দোলনের মাঝে সাম্রাজ্যবাদীরা বাংলাদেশের জনগণের দৃষ্টিকে দুটি মেরুর দিকে নিয়ে গেছে বস্তুবাদী সেকুলার ব্লক এবং তাদের বিরোধী জাতীয়তাবাদী ইসলাম। যাতে বাংলাদেশে আদর্শিক ইসলামী রাজনীতি বাধা গ্রস্ত হয় এবং উম্মাহ যাতে এমন কিছু আবেগ ও স্বার্থকে নিজের স্বার্থ ও আবেগ মনে করে যার সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। এবং উম্মাহর সম্পদ এবং ভুমিকে সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে।
দাওয়ার আমানত ও আল্লাহ্র সাথে কৃত ওয়াদা
আমরা যারা দুনিয়াতে দাওয়ার কাজ করছি আমদের মনে হতে পারে যে দুনিয়াতে আমরা সবচেয়ে উত্তম কারণ আমরা আমাদের জীবন সম্পদ সব কিছু দিয়ে দাওয়ার কাজ করছি। কিন্তু আমরা যদি গভীর ভাবে আমাদের কাজ গুলো পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখব যে আমরা প্রায়শয় দুনিয়াবি (বস্তুগত মূল্যের দিকে জড়িয়ে পড়া) কাজের মাঝে আল্লাহ্র দেওয়া আমানত এবং তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) সাথে কৃত ওয়াদা সম্পর্কে ভূলে যাই। এবং যা আমাদের আমানতের খেয়ানত এবং ওয়াদা ভঙ্গের মত গর্হিত কাজের দিকে নিয়ে যায়। তাই আল্লাহ্র আমানত ও তার (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) ওয়াদা সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টি ভঙ্গি গভীর করার জন্য নিম্নোক্ত আলোচনাটি করা হল।
আল্লাহ্ তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন,
আমি আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতমালার সামনে এই আমানত পেশ করেছিলাম, অতঃপর তারা একে বহন করতে অস্বীকার করল এবং এতে ভীত হল; কিন্তু মানুষ তা বহন করল। নিশ্চয় সে ছিল জালেম-অজ্ঞ। (আল আহযাব: ৭২)
আমানত বলতে সাধারণত বোঝায় গুরুদায়িত্ব অর্থাৎ এমন কাজ যার জন্য কোন ব্যক্তিকে দায়ী থাকতে হয়। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের মতে এটি হল আল্লাহ্র আনুগত্য, তাফসীরে মাযহারী তে উল্লেখ করা হয়েছে শরীয়তের যাবতীয় আদেশ নিষেধের সমষ্টি।
আল্লাহ্ তালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন,
আর যখন তোমার পালনকর্তা বনী আদমের পৃষ্টদেশ থেকে বের করলেন তাদের সন্তানদেরকে এবং নিজের উপর তাদেরকে প্রতিজ্ঞা করালেন, আমি কি তোমাদের পালনকর্তা নই? তারা বলল, অবশ্যই, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি। আবার না কেয়ামতের দিন বলতে শুরু কর যে, এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। (আল আরাফ: ১৭২)
উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহকে রব মানা বলতে আল্লাহ্র আদেশ নিষেধ গুলো বোঝাচ্ছে।
তাই আল্লাহ্র আমানতের হক আদায় এবং তাকে রব মানা তখনই সম্ভব হবে যখন দুনিয়াতে খিলাফত থাকবে কারণ খিলাফত হচ্ছে সেই তরীকাহ যার মাধ্যমে আল্লাহ্র আমানতের হক আদায় করা যায় এবং তাকে (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) কে রব হিসেবে যে মানা হচ্ছে তার প্রমাণ দেওয়া যায়। এবং আমাদের ভূলে যাওয়া উচিত নয় আমরা আল্লাহ্র নামে শপথ করেছে যে আমরা খিলাফতকে ফিরিয়ে আনার জন্য যান এবং মাল দিয়ে সর্বাত্নক চেষ্টা করব।
আল্লাহ্ তা’আলা পবিত্র কোরআনে বলেছেন,
যারা আল্লাহ্ নামে কৃত অঙ্গীকার এবং প্রতিজ্ঞা সামান্য মূল্যে বিক্রয় করে, আখেরাতে তাদের কোন অংশ নেই। আর তাদের সাথে কেয়ামতের দিন আল্লাহ্ কথা বলবেন না, তাদের প্রতি (করুণার) দৃষ্টিও দেবেন না। আর তাদেরকে পরিশুদ্ধও করবেন না। বস্তুত তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। (আল ইমরান: ৭৭)
আল্লাহ্ তা’আলা পবিত্র কোরআনে বলেছেন,
হে ঈমানদারগণ, খেয়ানত করো না আল্লাহ্র সাথে ও রসূলের সাথে এবং খেয়ানত করো না নিজেদের পারস্পরিক আমানতে জেনে-শুনে। (আনফাল: ২৭)
রাসুল (সা) বলেছেন, মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য তিনটি ১। আমানতের খেয়ানত করে ২। ওয়াদা ভঙ্গ করে ৩। মিথ্যা বলে।
উপরক্ত আয়াত ও হাদীস গুলো নিশ্চিতভাবে আমাদের দাওয়ার আমানত ও আল্লাহ্র সাথে কৃত ওয়াদার বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে, যাতে এমন না হয়ে যায় গুরাবা (যারা দ্বিতীয়বার খিলাফত প্রতিষ্টার জন্য আল্লাহ্র কাছে থেকে মর্যাদা প্রাপ্ত হবে) হতে যেয়ে মুনাফিক জাহান্নামী না হয়ে যাই।
তাই আমাদের দাওয়াহর ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ের প্রতি অধিক যত্নবান হতে হবে। আল্লাহ্ তার প্রতিশ্রুত ওয়াদা “খিলাফত” আমাদের দিবেন কিন্তু আমরা যারা পরিকল্পনা মাফিক কাজ না করে শিথিলতা দিয়ে কাজ করেছি, ইসলামের জ্ঞান অর্জন না করে ওলট পালট বুজাচ্ছি এবং এক দুটি কর্মসূচী সফল হওয়ার কারণে আনন্দ বোধ করছি তাদের ব্যপারে আল্লাহ্ বলছেন,
তুমি মনে করো না, যারা নিজেদের কৃতকর্মের ওপর আনন্দিত হয় এবং না করা বিষয়ের জন্য প্রশংসা কামনা করে, তারা আমার নিকট থেকে অব্যাহতি লাভ করেছে। বস্তুত তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব। (আল ইমরান: ১৮৮)
অতীতে অনেক জাতি আল্লাহ্র সাথে অঙ্গীকার রক্ষা না করার করার কারণে আল্লাহ্ তাদের শাস্তি দিয়েছেন যদিও বা প্রথমে তারা আল্লাহ্র মনোনীত ছিল। যেমন আল্লাহ্ আমাদের ইয়াহুদি ও নাছারাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের দরুন তাদের পরিত্যাগ করেছেন।
আল্লাহ্ বনী-ইসরাঈলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন এবং আমি তাদের মধ্য থেকে বার জন সর্দার নিযুক্ত করেছিলাম। আল্লাহ্ বলে দিলেন: আমি তোমাদের সঙ্গে আছি। যদি তোমরা নামায প্রতিষ্ঠিত কর, যাকাত দিতে থাক, আমার পয়গম্বরদের প্রতি বিশ্বাস রাখ, তাদের সাহায্য কর এবং আল্লাহ্কে উত্তম পন্থায় ঋণ দিতে থাক, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের গোনাহ্ দূর করে দিব এবং অবশ্যই তোমাদেরকে উদ্যানসমূহে প্রবিষ্ট করাব, যেগুলোর তলদেশ দিয়ে নির্ঝরিণীসমূহ প্রবাহিত হয়। অতঃপর তোমাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি এরপরও কাফের হয়, সে নিশ্চিতই সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। অতএব, তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের দরুন আমি তাদের ওপর অভিসম্পাত করেছি এবং তাদের অন্তরকে কঠোর করে দিয়েছি। তারা কালামকে তার স্থান থেকে বিচ্যুত করে দেয় এবং তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল, তারা তা থেকে উপকার লাভ করার বিষয়টি বিস্মৃত হয়েছে। (মায়িদা: ১২-১৩)
যারা বলে: আমরা নাছারা, আমি তাদের কাছ থেকেও তাদের অঙ্গীকার নিয়েছিলাম। অতঃপর তারাও যে উপদেশ প্রাপ্ত হয়েছিল, তা থেকে উপকার লাভ করা ভুলে গেল। অতঃপর আমি কেয়ামত পর্যন্ত তাদের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিয়েছি। অবশেষে আল্লাহ্ তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করবেন। (মায়িদা: ১৪)
তাই আমাদের প্রতিনিয়ত সতর্ক থাকতে হবে যাতে আমরা ইয়াহুদি ও নাসারাদের মত যেন আমাদের অঙ্গীকার ভূলে না যাই এবং আল্লাহ্র লা’নত প্রাপ্ত না হয়ে যাই।
আমরা যদি রাসূল (সা) এর সেই মহান হাদীসের দিকে তাকাই যেখানে রাসূল (সা) বলেছেন, যার কাঁধে খলীফার বাইয়্যাত নেই, তার মৃত্যু জাহিলিয়াতের মৃত্যু। (মুসলিম)
এই হাদীসে খিলাফতের বিদ্যমান থাকাকে ফারজিইয়্যাত আদায় হওয়ার শর্ত বোঝাচ্ছে, তাই শুধু খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কোন দলে থকলে ফারজিয়াত আদায় হয়ে যাবে মনে করলে তা ভুল হবে। তবে যদি অবিরাম পরিকল্পনা ও দৃঢ়তার সাথে কাজ করা যায় তাহলে আশা করা যায় যে আল্লাহ্ হয়ত মাফ করতে পারেন। তাই আমরা যারা নিশ্চিন্ত মনে বসে বসে আসা করছি যে আমরা ত আল্লাহ্র দেয়া সব দায়িত্ব পালন করে ফেলেছি তাহলে আমাদের বিষয়টা নিয়ে দ্বিতীয়বার চিন্তা করা প্রয়োজন কারণ আমরা আসলে এখন জাহিলিয়্যাতেই আছি।
নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হল যা আমাদের এই অঙ্গীকার ও ওয়াদা পূরণে আরও সাবধান করবে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
আর যদি আমি তাদের নির্দেশ দিতাম যে, নিজেদের প্রাণ ধ্বংস করে দাও কিংবা নিজেদের নগরী ছেড়ে বেরিয়ে যাও, তবে তারা তা করত না; অবশ্য তাদের মধ্যে অল্প কয়েকজন। যদি তারা তাই করে যা তাদের উপদেশ দেয়া হয়, তবে তা অবশ্যই তাদের জন্য উত্তম এবং তাদেরকে নিজের ধর্মের ওপর সুদৃঢ় রাখার জন্য তা উত্তম হবে। (নিসা: ৬৬)
আমাদের প্রতিনিয়ত সর্বোচ্চ ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে কারণ দ্বীন প্রতিষ্টার কাজে অতীতে জীবন দিতে হয়েছে, ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়েছে এবং তারা অল্পই ছিল।
আল্লাহ্ বলেন,
আর তোমাদের মধ্যে এমনও কেউ কেউ রয়েছে, যারা অবশ্য বিলম্ব করবে এবং তোমাদের ওপর কোন বিপদ উপস্থিত হলে বলবে, আল্লাহ্ আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন যে, আমি তাদের সাথে যাইনি। (নিসা: ৭২)
আমদের সময়ানুবর্তী হতে হবে, আমাদের অধিকাংশই সময়ের ব্যপারে গাফিল। উপরোক্ত আয়াতটি তাবুকের যুদ্ধে সেই সকল সাহাবীদের ব্যপারে বলা হয়েছে যারা সময় মত প্রস্তুতি না নিতে পারার কারণে তাবুক যুদ্ধে যেতে পারানি এবং তাদের উপর আল্লাহ্ ও তার রাসূল ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন এবং তাদের মুনাফিক মনে করা হচ্ছিল যদিওবা তারা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবী ছিলেন। তাই আমারা যারা সময় মত সার্কেলে, পাঠচক্রে, মিছিলে, লিফলেটিং এ আসিনা তাদের আসলেই চিন্তা করা উচিত আমরা মুনাফিকের আচরণ করছি কিনা।
আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,
পেছনে থেকে যাওয়া লোকেরা আল্লাহর রাসূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসে থাকতে পেরে আনন্দ লাভ করেছে; আর জান ও মালের দ্বারা আল্লাহ্ রাহে জেহাদ করতে অপছন্দ করেছে এবং বলেছে, এই গরমের মধ্যে অভিযানে বের হয়ো না। বলে দাও, উত্তাপে জাহান্নামের আগুন প্রচণ্ডতম। যদি তাদের বিবেচনা শক্তি থাকত। (আত তাওবা: ৮১)
আমরা যারা দাওয়ার কঠিন কাজগুলো করতে চাই না তাদের উপরের আয়াতটি ভালভাবে চিন্তা করে দেখা উচিত।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
আর যখনই কোন সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন তারা একে অন্যের দিকে তাকায় যে, কোন মুসলমান তোমাদের দেখছে কি-না- অতঃপর সরে পড়ে। আল্লাহ্ ওদের অন্তরকে সত্য বিমুখ করে দিয়েছেন। নিশ্চয়ই তারা নির্বোধ সম্প্রদায়। (আত তাওবা: ৩৮)
আমরা যারা কোন কাজ আসলে নিজেকে বাঁচিয়ে নেয়ার চেষ্টা করি এবং তা অন্যের হাতে তুলে দিতে চাই উপরের আয়াতটি আমাদের জন্য সতর্কতা সরূপ।
মাঝে মাঝে আমরা দুনিয়ার মায়ার কারণে দাওয়াতে কম সময় দেই তাই আল্লাহ ত ‘আলা আমাদের বলছেন,
হে ঈমানদারগণ, তোমাদের কী হল, যখন আল্লাহর পথে বের হবার জন্যে তোমাদের বলা হয়, তখন মাটি জড়িয়ে ধর, তোমরা কি আখেরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনে পরিতুষ্ট হয়ে গেলে? অথচ আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনের উপকরণ অতি অল্প। (আত তাওবা: ৩৮)
আমারা যারা দীর্ঘকাল ধরে দাওয়াহ করছি আল্লাহ তা’আলা তাদের সতর্ক করে বলছেন,
যারা মুমিন, তাদের জন্যে কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে, তার কারণে হৃদয় বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি? তারা তাদের মত যেন না হয়, যাদেরকে পূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছিল। তাদের ওপর সূদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে, অতঃপর তাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে গেছে। তাদের অধিকাংশই পাপাচারী। (হাদীদ: ১৬)
তাই আমাদের প্রতিনিয়ত অন্তরকে জাগ্রত ও শিক্ত রাখতে হবে যাতে আমাদের অন্তর কঠিন হয়ে না যায়, আর এটি সম্ভব যদি আমরা পাঁচটি বিষয় খেয়াল রাখি তা হল,
প্রথমত: প্রতিদিনই আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) সাথে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে আমাদের সদা সচেষ্ট থাকতে হবে। এর মানে হচ্ছে, ব্যক্তিগত জীবনে শারী’আহ্’র সমস্ত ফরযগুলো নিষ্ঠার সাথে পালন করা, হারামগুলো পুরোপুরি বর্জন করা এবং যথাসাধ্য নফল ইবাদত করা। অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি কাজের সাথে আল্লাহ্র সম্পর্ক অনুধাবনের চেষ্টা করা ।
দ্বিতীয়ত: আমাদের প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কুর’আন তেলাওয়াত করতে হবে। এই কুর’আনের বাণী যা অন্যের কাছে বহন করে নিয়ে যাচ্ছি, যাকে আমরা সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছি, আর আমরা নিজেই যদি কুর’আন পাঠ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকি তাহলে কীভাবে হবে? এছাড়াও দাওয়া-বহন করতে গিয়ে সমাজে যে বাধা, অপমান ইত্যাদির সম্মুখীন হতে হয়, যে মানসিক যাতনা তৈরী হয় কুর’আন পাঠে তা অপসারিত হয়। কুর’আন অন্তরকে প্রশান্ত করে। ব্যাটারির যেমন নির্দিষ্ট সময় পর চার্জের প্রয়োজন হয় তেমনি মুমিনেরও চার্জের প্রয়োজন হয়। তাই আমাদের উচিত হবে কুরআনকে অর্থসহ পড়া, এর অর্থ নিয়ে চিন্তা করা ও তাফসীর অধ্যয়ন করা।
তৃতীয়তঃ আমাদের দৈনন্দিন কাজের একটি অংশ থাকবে ইসলামী জ্ঞানবৃদ্ধির জন্য। কেননা ইসলামী জ্ঞান ছাড়া ইসলামকে নিজের জীবনে প্রয়োগ ও অন্যের কাছে সঠিকভাবে ইসলামকে পৌঁছানো অসম্ভব। আমাদের অবশ্যই দলের সকল গৃহীত বই পরতে হবে এবং ইসলামের বিভিন্ন শাখায় নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে আমাদের প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জনের চেষ্টা করতে হবে এবং এটা দিয়ে আমাদের দাওয়াত ও প্রচারকে সমৃদ্ধ করতে হবে।
চতুর্থতঃ আমাদের অবশ্যই প্রতিদিনকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খবরাখবর জানতে হবে এবং এর ভিত্তিতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ দাঁড় করাতে হবে এবং প্রতিটি ঘটনাকে একটি দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখতে হবে। এটা এজন্য যে, আমাদের পুরো কাজটাই রাজনৈতিক কাজ যার অংশ হচ্ছে জালেম শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করে তাদের দূর্বল করে ফেলা এবং ইসলামের শত্রুদের মুখোশ উম্মোচন করে দেয়া। এই কাজ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবেনা যদি না আমারা তাদের প্রতিদিনকার নিত্য নতুন অপকর্ম, জুলুম এবং জনগণের ব্যাপারে তাদের ক্ষতিকর পরিকল্পনা সমূহের ব্যাপারে সর্বশেষে সংবাদের খোঁজ না রাখি। ফলশ্রুতিতে, আমরা জনগণের সাথে ঐভাবে জনসংযোগ করতে পারবোনা যা দিয়ে আমরা জনগণকে শাসকদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারি এবং তাদেরকে দ্রুত আন্দোলনে নামাতে পারি। উপরন্তু, এর ফলে আমরা যথা সময়ে যথোচিত কাজ সমাধা করতেও ব্যর্থ হব এবং এমন সব সুযোগ হারিয়ে ফেলব যার সদ্ব্যবহার করতে পারলে অল্প সময়েই আমরা তার দাওয়াত ও আন্দোলনকে এক ধাপে অনেকদূর এগিয়ে নিতে পারতাম। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, রাজনীতিতে একটা মাত্র দিনও অনেক লম্বা সময় যাতে পিছিয়ে পড়া যাবেনা কখনোই।
পঞ্চমতঃ এবং সবচে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। অবশ্যই আমাদের দৈনন্দিন কাজের অন্যতম অংশ হবে বাস্তবে এই দাওয়াতকে আরেকজনের কাছে পৌঁছে দেয়া, আরো কার কাছে নেয়া যায় তার সুযোগ অনুসন্ধান করা। পরিচিত-অপরিচিত, বন্ধু, আত্মীয়, কর্মস্থলের সহকর্মী প্রত্যেকের কাছে কীভাবে এই দাওয়াত নিয়ে যাওয়া যায় এ সুযোগ খুঁজে বের করতে আমাদের সদা সচেষ্ট থাকতে হবে। ইসলামের আহ্বানকে সমাজের কাছে নানা উপায়ে পৌঁছে দেয়ার চিন্তাই আমাদের সারাদিনের প্রধান চিন্তা হওয়া উচিত। আমাদের একটা বিষয় মাথায় গেথে ফেলতে হবে “হয় আমি ইসলামের দাওয়াত নিয়ে কারো কাছে যাব অথবা মানুষ আমার কাছে আসবে”।
উপরোক্ত কাজগুলো আমাদের সর্বদা ইসলামের ভিতর নিমজ্জিত রাখবে তাই শয়তান আর আমাদের আর তার কু মন্ত্রনা দিতে পারবে না এবং আমাদের অন্তর জাগ্রত ও শিক্ত থাকবে। আর যদি আমারা তা না করি তাহলে আমাদের পরিণতি হবে তার মত যার ব্যপারে আল্লাহ্ বলেন,
তাদের অবস্থা সে ব্যক্তির মত, যে লোক কোথাও আগুন জ্বালালো এবং তার চার দিকের সবকিছুকে যখন আগুন স্পষ্ট করে তুললো, ঠিক এমনি সময় আল্লাহ্ তার চারদিকের আলোকে উঠিয়ে নিলেন এবং তাদেরকে অন্ধকারে ছেড়ে দিলেন। ফলে তারা কিছুই দেখতে পায় না। (বাকারা: ১৭)
এবং ফলশ্রুতিতে আমরা বিছিন্ন হয়ে পড়ব ইসলাম থেকে আল্লাহ্র রহমত থেকে এবং ভঙ্গ হয়ে যাবে সে অঙ্গীকার যা আল্লাহ্র সাথে আমরা করেছিলাম, আল্লাহ তা’আলা বলেন,
অথচ তারা পূর্বে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে না। আল্লাহর অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। (আল আহযাব: ১৫)
আমারা যারা এই অঙ্গীকার ভঙ্গের দরুন দাওয়া হতে ছিটকে পড়ব তাদের মনে রাখা উচিত এতে এই দাওয়ার কোন ক্ষতি হবে না আল্লাহ্ অন্যদের এর জন্য মনোনীত করবেন কিন্তু আমরা হয়ে যাব ধ্বংস। আল্লাহ্ বলেন,
যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করবেন, এরপর তারা তোমাদের মত হবে না। (মুহাম্মাদ: ৩৮)
অতএব আমরা নিজেদের সংশধন করে নেই কারণ আল্লাহ্র রাস্তা যারা তওবা কারী তাদের জন্য সব সময় খোলা। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,
তবে যারা তওবা করে এবং বর্ণিত তথ্যাদির সংশোধন করে মানুষের কাছে তা বর্ণনা করে দেয়, সে সমস্ত লোকের তওবা আমি কবুল করি এবং আমি তওবা কবূলকারী পরম দয়ালু। (বাকারা: ১৬০)
আমরা এখন থেকে প্রতিজ্ঞা করি আমরা তাদের মত হব যারা এই আমানত রক্ষায় সর্বচ্চ চেষ্টা করেছেন। এজন্য আমাদের দয়াওয়ার অগ্রবর্তীদের সম্পর্কে জানতে হবে এবং তাদের অনুসরণ করতে হবে। সর্ব প্রথম আমরা যদি আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এর জীবনের দিকে তাকাই, তিনি যখন প্রথম ওহী পেলেন তখন বলেছিলেন “আজ হতে আমার আর বিশ্রাম নেই” আসলেও তিনি (সা) আর কোন বিশ্রাম নেননি তার ওফাতের আগপর্যন্ত।
সাহাবাদের ত্যাগের ব্যপার আমাদের সবার জানা তাই আমরা যদি বর্তমানে যারা ইসলামকে পুনরায় প্রতিষ্টাকারী নিষ্টাবান ব্যক্তিদের দিকে তাকাই যারা সর্ব প্রথম এই দাওয়াহকে শুরু করেছিলেন ফিলিস্তিন হতে আজ যা মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পরেছে তাহলে দেখব তারা কত কষ্ট করেছেন এর জন্য। ইন-শা-আল্লাহ তাদের ব্যপারেই আল্লাহ তা’আলা বলেছেন,
মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষা করছে। তারা তাদের সংকল্প মোটেই পরিবর্তন করেনি। (আল আহযাব: ২৩)
হে আল্লাহ্ আপনি আমাদের তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন যারা প্রতীক্ষা করছে ওয়াদা পূরণ করে মৃত্যুবরণ করার জন্য।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ শোন। (হা মিম আস সাজদা: ৩০)
হে আল্লাহ্ আপনি আমাদের তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন যারা আপনাকে রব মেনে দৃঢ় থকবে এবং আমাদের মৃত্যুর পূর্বে ফেরেস্তাহ দিয়ে জান্নাতের সুসংবাদ দান করুন। আমীন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: জাগরণ নাকি চক্রান্তের বেড়াজালে বাংলাদেশ?
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের কিছু উল্লেখযোগ্য ইস্যুর মধ্যে একটি হল যুদ্ধপরাধ ইস্যু। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে; যদিও বিচার রায় কার্যক্রম শুরু করে ক্ষমতার মেয়াদ যখন শেষ পর্যায়ে।
নানা জল্পনা-কল্পনা, ধ্যান-ধারণা শেষে সর্বপ্রথম আবুল কালাম আযাদের ফাঁসির রায় দেওয়া হয় এবং কয়দিন পূর্বে কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন। এই রায়ের মধ্যে চমকপ্রদ অংশ হল এই জায়গায় যে, যার (আবুল কালাম আযাদ) ফাঁসির রায় দেওয়া হয়েছে তিনি পলাতক আর যিনি হাতের নাগালে অর্থ্যাৎ রায় বাস্তবায়নে সুবিধাজনক স্থানে যিনি তাকে দেওয়া হল যাবজ্জীবন। আর এই সাজা হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদন্ড রায় দেয়ার পর ফাঁসির দাবিতে তথাকথিত বেনামী জাগরণ দেখানো হচ্ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। মিসরের তাহরীর স্কয়ারের নামানুসারে শাহবাগ স্কয়ারের আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে; যদিও তাহরীর স্কয়ারের আন্দোলন আর এই নৃত্য-গীতের মধ্যে দূর দূর পর্যন্ত কোন মিল নেই। কারণ, তাহরীর স্কয়ারের আন্দোলন ছিল অত্যাচারী শাসকের পতনের দাবিতে, বাংলাদেশের শাহবাগের মত কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়।
সকল প্রেক্ষাপটসমূহ বিবেচনা করলে দেখা যায়, এটি কোন বিচারের দাবিতে গড়ে তোলা আন্দোলন নয়; বরং, একটি সুবিশাল চক্রান্তের স্বরূপ বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা। আর অনুধাবনের লক্ষ্যে আমাদের বেশ কিছু সময় পেছনে ফিরে যেতে হবে।
২০০৯ সালে হাসিনা সরকার যখন ক্ষমতায় আসীন হয়, তখন থেকে তার আমেরিকা-ভারত প্রীতির প্রেক্ষিতে কার্যক্রম শুরু হয়। নির্বাচনে জয়লাভের শর্তস্বরূপ আমেরিকার সাথে কৃত ওয়াদাসমূহ বাস্তবায়নে সচেষ্ট হয়। একে একে ACSA/TICFA থেকে শুরু করে সামরিক মহড়া যেমনঃ টাইগার শার্ক- ১,২,৩,৪ ইত্যাদির মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে আমেরিকার দালাল সৃষ্টির চেষ্টা বজায় রাখে।
অপরদিকে, ভারতের সাথে তার চুক্তিসমূহের মধ্যে TIFA, TRANSIT ইত্যাদি বাস্তবায়ন করতে থাকে। চুক্তির ধারাবাহিকতায় চক্রান্ত বাস্তবায়নে হত্যা করে নিষ্ঠাবান সেনা অফিসারদের, আলেমদের দেওয়া হয় কুফর সমর্থনের প্রশিক্ষণ এবং তাবেদারীতে বাধ্য করা হয়।
আর অভ্যন্তরীণ স্বার্থসিদ্ধিতে যুদ্ধপরাধের বিচারের নাটক শুরু করে। জনগণের আবেগ পুঁজি করে গড়ে তোলা এই মঞ্চ নাটক বিচারের নামে জনগণের সামনে মূলা উচিয়ে ধরে রাখা ছাড়া আর কিছুই নয়। নির্বাচনপূর্ব জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যুদ্ধপরাধের বিচার শুরু করলেও তা মূলত রাজনৈতিক দ্বন্দের এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বাস্তবায়ন।
কিন্তু মূল সমস্যা এখানে নয়, বরং অন্যদিকে। আওয়ামী লীগ আমেরিকার ছত্রছায়ায় নির্বাচনে জয় লাভ করলেও এটি কোন ভাবেই ভুলে যাওয়া উচিত হবেনা যে, আওয়ামী লীগ কংগ্রেস তথা ভারত-বৃটেন পন্থী একটি দল। অপরদিকে, বিএনপি আমেরিকাপন্থী। বলা যেতে পারে, গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলসমূহে ভেদে প্রভুরা আমেরিকা-বৃটেন।
ক্ষমতায় আসীনের পর থেকে আওয়ামী সরকারের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক ভালোই চলছিল। কিন্তু এই সম্পর্কের ওজন যখন ভারতের সাথে আওয়ামী লীগের তুলনায় ভারী হয়ে উঠলে বিষয়টি আওয়ামীলীগের মূল প্রভু বৃটেনের ভয় হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, আমেরিকার এই অঞ্চলে আনাগোনা ও বাংলাদেশে তাদের অবস্থানের পাঁয়তারা বৃটেনের স্বার্থসিদ্ধি এবং তার দোসর ভারতের লক্ষ্য আঞ্চলিক পরাশক্তি হওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায়। কারণ, আমেরিকা–ভারত সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক।
প্রতিবছর সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা সংলাপে ভারত সম্পর্কে আমেরিকা বক্তব্য থাকে এইরূপ: “গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত। এই সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার মূল ভিত।” অর্থ্যাৎ তাদের সম্পর্কের ভিত্তি সুস্পষ্টভাবে স্বার্থের উপর ভিত্তি করে এবং যখন কারো স্বার্থের ওপর আঘাতের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় তখন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হয়।
যাই হোক, আমেরিকার এই অঞ্চলের উপস্থিতি যখন ভারত-বৃটেনের স্বার্থবিরোধী অবস্থানে পৌঁছায়, তখন বৃটেন তার সরকার নিয়ন্ত্রণ কলকাঠি নাড়তে শুরু করে এবং হাসিনা সরকারের নাড়ির দড়ি টেনে ধরে; এবং আমরা এর স্বরূপ দেখতে পায় যুক্তরাজ্যের ইকোনোমিস্ট পত্রিকায় আওয়ামী সরকারের একের পর এক কঠোর সমলোচনার মাধ্যমে। যার মধ্যে আমেরিকা তোষামোদের বিষয়টিও উঠে আসে।
এবং পরবর্তীতে হাসিনার অবস্থান পরিবর্তন হতে থাকে। বিভিন্ন বিষয়ে সে আমেরিকাকে এড়িয়ে চলতে থাকে। আমেরিকার সাথে একের পর এক রাষ্ট্রীয় বৈঠক থেকে ব্যস্ততার অজুহাতে অনুপস্থিত থাকতে শুরু করে। আর বিষয়টি সুস্পষ্ট হতেই আমেরিকা তার ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করে। আই.এম.এফ-এর মাধ্যমে পদ্মা দুর্নীতি ইস্যু উঠায় এবং বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দেয়; যা ছিল মূলত হাসিনা সরকারের মুখে চপেটাঘাত।
কিন্তু হাসিনা সরকার প্রমাণ করল যে, এই দ্বন্দে সে একাকী খেলোয়ার নয়; বরং সে তার জন্মগত প্রভু অর্থ্যাৎ বৃটেন এবং আমেরিকার অপর স্বার্থভিত্তিক শত্রু রাশিয়ার ছত্রছায়ায় রয়েছে, আই.এম.এফ-এর ঋণ প্রত্যাখান এবং EU–এর সাথে সম্পর্কন্নোয়নের দ্বারা। এটি শুধুমাত্র ঋণ প্রত্যাখান ছিল না, বরং আমেরিকাকেই প্রত্যাখান করা।
এমতাবস্থায় আমেরিকা ঠিক একই প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যেমনটি সে সর্বদা প্রস্তুত রাখে তার সাথে বিরুদ্ধাচরণকারীদের জন্য। পূর্বকৃত চুক্তি অনুযায়ী ACSA চুক্তির ভিত্তিতে সে ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে তার সেনা, গোয়েন্দা উপস্থিতি সক্রিয় করার পাশাপাশি বিমান, নৌ ঘাটি স্থাপন আর সেনাবাহিনী-নৌবাহিনীতে তাদের প্রভাব বিস্তারের ষড়যন্ত্র শুরু করেছে এবং রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিদের নির্যাতন, গুম, হত্যা করে চলেছে।
আর এই পরিস্থিতিতে যখন আওয়ামী লীগ সরকার তার মেয়াদের শেষ প্রান্তে, তখন নির্বাচন ইস্যু হিসেবে পুনরায় যুদ্ধপরাধ ইস্যুটি প্রদর্শনের জন্য তড়িঘড়ি কজরে কিছু বিচারের নাটক দেখাচ্ছে এবং বাকি বিচার পরবর্তীতে নির্বাচিত হলে পরিপূর্ণ করবে, এই ধরণের ইশতেহার জারিই তাদের চক্রান্তের অংশ। হয়ত, পিলখানা হত্যাকান্ডের বিচারো এইসকল মিথ্যা ওয়াদার অন্তর্ভুক্ত হবে।
কিন্তু বিষয়টি শুধুমাত্র আভ্যন্তরীণভাবে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এই বিচারকে পুঁজি করে মূলত আমেরিকা বৃটেনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শুরু হয়েছে। এবং হাসিনা-খালেদা-জামায়াত-বামদলগুলো এখানে শুধুমাত্র দাবার গুটির ভূমিকা পালন করছে।
আগেই বলা হয়েছে যে, তাদের ঐক্যের মূল হল তাদের স্বার্থ। যখন কোন অবস্থা বা কার্যক্রম স্বার্থবিরোধী হয়, তারা যে কারো বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
আরব জাগরণের পর আরব পেনিনসুলা থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আমেরিকা-বৃটেন এখন এশিয়ার দিকে দৃষ্টি দিয়েছে। কারণ এই অঞ্চলের উপর শীঘ্রই নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারলে তা যেকোন সময় হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এতদিন যাবৎ আরবের মত এই অঞ্চলসমূহ তাদের দালাল শাসক দ্ব্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে। কিন্তু আরবের মত এই অঞ্চলেও উম্মাহ’র জাগরণের সম্ভাবনা তাদের ভাবিয়ে তুলেছে এবং এই কারণে এই অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম পূর্বের তুলনায় অধিক হার বিস্তৃত করতে উদ্যত হয়েছে। নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক কর্মসূচির নামে সেনাবাহিনীর সাথে একের পর এক সামরিক মহড়া, জঙ্গি দমনের নামে শারীরিক উপস্থিতি, অঞ্চলসমূহ অস্থিতিশীল করে রাখা ইত্যাদি অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
এই সবের কারণ হল; আরবের মত এই অঞ্চলেও খিলাফতের জন্য দিন দিন যে আওয়াজ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে তা রুখে দেওয়া এবং চীনের অর্থনৈতিক উন্নতি, যা যুক্তরাষ্ট্র-বৃটেন উভয়ের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে হুমকিস্বরূপ। কারন চীন ইতোমধ্যে তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত হিসেবে স্বর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। চীনকে নিয়ন্ত্রন এবং অর্থনৈতিক ফায়দা হাসিলে উভয়েই (আমেরিকা-বৃটেন) উঠে পড়ে লেগেছে।
আর বাংলাদেশে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে তাদের জন্মগত দালাল হাসিনা-খালেদা। হাসিনা বৃটেন-ভারতের স্বার্থপন্থী কাজ করে যাচ্ছে অবিরতভাবে। আর খালেদা নিজের রাজনৈতিক দুর্বল অবস্থানের কারণে এখন সরাসরি আমেরিকাকে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপের ব্যাপারে আহবান করে যাচ্ছে নির্লজ্জভাবে।
“আপনি তাদের অনেককে দেখবেন কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করে। তারা নিজেদের জন্য যা পাঠিয়েছে তা অবশ্যই মন্দ। তা এই যে, তাদের প্রতি আল্লাহ ক্রোধান্বিত আছেন এবং তারা চিরকাল আযাবে থাকবে” [আল মায়িদাহ: ৮০]
“যদি তারা আল্লাহ’র প্রতি ও রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করত, তবে কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করত না” [আল মায়িদাহ: ৮২]
আর এরই ধারাবাহিকতায় যুদ্ধপরাধের বিচারের রায় নিয়ে এই জাগরণে শাসক নাটকের সূত্রপাত ।
একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে অনুধাবন করা যাবে সম্পূর্ণ বিষয়টি । এই মুহূর্তে শাহাবাগ চত্বরে নাটকটির মূল ভূমিকায় রয়েছে বামদলগুলো। কিন্তু আসল ব্যাপার হল বামদলগুলো ১৪ দল অর্থাৎ আওয়ামী মহাজোটের অন্তর্ভুক্ত ।
বিগত ৪ বছর যাবৎ আওয়ামীলীগ তার অন্যায়, জুলুমের কারণে এমনিতেই জনসমর্থন হারিয়েছে এবং জনগণের মধ্যে ক্ষোভের পাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে । অপরদিকে, বি এন পি তার রাজনৈতিক অদূরদর্শীতার কারণে দুর্বল, ভঙ্গুর অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে । তাই, শেষ সময়ে নিজ প্রভু আমেরিকার হস্তক্ষেপ কামনায় তার শেষ ভরসা ।
আওয়ামীলীগ যখন বুঝতে পারলো, জনগণের মধ্যে তাদের প্রতি সমর্থন শূন্যের কোঠায় এবং পরবর্তী নির্বাচনে এই যুদ্ধপরাধীর ইস্যুও কাজে দিবে না । ঠিক এইসময় বিচারের নামে নাটকের সূত্রপাত ঘটায় । এবং এর নেতৃত্ব নিয়ে নেয় বামদলগুলো ।
যাদের কিছুদিন আগে হরতালের ঘোষণা দিয়ে গান-বাজনার মাধ্যমে অহিংস বা দেশপ্রেমিক প্রমাণে উদ্যত হয়েছিল সরকার । এই বামদলগুলো আওয়ামী বিচ্ছিন্ন কোন সংঘটন না; বরং আওয়ামীলীগের সাথেই জোট বাঁধা দল ।
অর্থাৎ এই ক্ষেত্রে কুফর এই জাগরণ দিয়ে একসাথে দুটি কাজ সারছে। ক. তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন খ. পুনরায় আওয়ামীলীগের আঁচলেই জাগরণের ভোট ।
এই তথাকথিত জাগরণের মূল উদ্দেশ্য:-
তথাকথিত এই জাগরণের প্রেক্ষিতে শাহবাগ চত্বরকে আজ শাহবাগ স্কয়ার বলা হয়েছে যা মূলত মিসরের ‘তাহরীর স্কয়ার’ অনুকরণে ।
স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, মিসরের আন্দোলন ছিল অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে, কোন কুফরের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে নয়। যদিও সে জাগরণও ছিনতাই করা হয়েছে ইসলামী লেবাসধারীদের মাধ্যমে এবং সে পুনরায় জাগরণ জেগে উঠেছে ।
বাংলাদেশের এই মঞ্চনাটকে শুক্রবারের সমাবেশে বক্তৃতায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এর উদ্দেশ্য ।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন এভাবে, “আমরা যুদ্ধ করিনি বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠায়, আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়” ।
মূলত, এটি একটি মিথ্যাচার । তৎকালীন মানুষ যুদ্ধে যাওয়ার আগে শপথ নিয়েছিল অত্যাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নয় । কিন্তু পরবর্তীতে ক্ষমতার পালাবদল হয় এক দালাল থেকে আরেক দালালের হাতে ।
এই বক্তব্যসমূহ সুস্পষ্টভাবে ধারণা দেয় তাদের ঘৃণ্য চিন্তার, জঘন্য ষড়যন্ত্রের ।
“কাফেররাই কেবল আল্লাহ’র আয়াত সম্পর্কে বিতর্ক করে। কাজেই নগরীসমূহে তাদের বিচরণ যেন আপনাকে বিভ্রান্তিতে না ফেলে” [আল মু’মিন: ৪]
“আর তাদের মত হয়ে যেয়ো না, যারা বেরিয়ে পড়েছে নিজেদের অবস্থান থেকে গর্বিতভাবে এবং লোকদেরকে দেখাবার উদ্দেশ্যে। আর আল্লাহ’র পথে তারা বাঁধা দান করত। বস্তুত আল্লাহ’র আয়ত্তে রয়েছে সে সমস্ত বিষয় যা তারা করে” [আল আনফাল: ৪৭]
তারা জনগণের মাঝে ইসলামের প্রতি ভালোবাসা, আবেগ মুছে দিতে চায়। কারণ দিন দিন জনমত ইসলামের দিকেই ধাবিত হচ্ছে । ইসলামের প্রতি জনসচেতনতা তাদের ভাবিয়ে তুলছে এবং এই কারণে তারা তাদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে লিপ্ত এবং বামদল! আওয়ামী-বি.এন.পি প্রত্যেকেই এখানে ননীর পুতুল; যা ইতোপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে ।
এবং পাশাপাশি এই ষড়যন্ত্রকারীরা মানুষের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে যেমনটি করা হয়েছিল পূর্বে। অতঃপর সংঘাতের মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে নিজেদের শারীরিক অবস্থার জানান দিবে কুফর শক্তিসমূহ ; যা আমরা বর্তমানে পাকিস্তানে দেখছি ।
“অথচ এরা যদি তোমাদের কাবু করতে পারে, তাহলে এরা শত্রুতে পরিণত হবে, এরা নিজেদের হাত ও কথা দিয়ে তোমাদের অনিষ্ট সাধন করবে, এরা তো এটাই চায় যে, তোমরাও তাদের মত কাফের হয়ে যাও” [আল মুমতাহিনা: ২]
সুতরাং আমাদের মুসলিমদের জন্য এটি কোনভাবেই সমীচীন হবে না যে, আমরা এই সকল চক্রান্তে পা দিয়ে কুফরের চক্রান্ত বাস্তবায়নে তাদের সাহায্য করব ।
বরং, ধর্মনিরপেক্ষতার মত অসুস্থ মতবাদ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এই সকল চক্রান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কর্তব্য এবং কুফরের চক্রান্তের সমুচিত জবাব দেওয়া আমাদের দায়িত্ব আর এটি সম্ভব শুধুমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা উম্মাহর সাথে প্রতারণাকারী প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তির নিশ্চয়তা দেয়। (ইসলামী রাষ্ট্রের খসড়া সংবিধান, ধারা-৬৮)
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা মুসলিমদের উপর অপর রাষ্ট্রের খবরদারিতা খর্ব করবে। (ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, ধারা-১৭৬)
ইসলামী রাষ্ট্র এর সেনাবাহিনীকে মুক্ত রাখে বিদেশী শক্তির প্রভাব থেকে ।
ইসলামী রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হল ইসলামের আক্বীদা । সুতরাং, ইসলামী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সকল বিষয়সমূহ ইসলামের আদলেই পরিচালিত হয়; যাতে ব্যক্তি বর্তমানে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার মত ব্যক্তি স্বার্থসিদ্ধির সুযোগ নেই ।
আজকে বাংলাদেশসহ সারা মুসলিম বিশ্ব ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক বা স্বৈরতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা মুসলিমদের কাফিরদের অধীনস্থ করে রেখেছে। আর এই কাফিরদের হাতে ভুলুন্ঠিত হচ্ছে মুসলিমদের বিশ্বাস ও জীবন। পরিবর্তনের রাজনীতির মিথ্যা আশ্বাসে কোন পরিবর্তন আসেনা। বিভিন্ন মতবাদ-দলের ছদ্মাবরনে এরা সবাই ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের আনুগত্যকারী দালাল। এরা কখনো একটি অপরটির বিকল্প হতে পারেনা।
মুসলিমদের জন্য একমাত্র বিকল্প, বৈধ, গ্রহণযোগ্য ও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কতৃক মনোনীত ব্যবস্থা খিলাফত শাসন ব্যবস্থা। যা রাসূল (সা) মদীনাতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। খিলাফত সরকারই মুসলিমদের একমাত্র মুক্তির উপায়। এটা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরয দায়িত্ব। খালেদা-হাসিনা বা অন্য কোন গণতান্ত্রিক বা মানবরচিত শাসন ব্যবস্থার শাসকের সাথে মুসলিমদের খলীফার কোন তুলনায় হয়না। সারা বিশ্বে মুসলিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অচিরেই আসবে খিলাফাহ . . . . . . . ইন-শা-আল্লাহ।
“. . . অতঃপর আবারো আসবে নব্যুয়তের আদলের খিলাফত . . . . .” [মুসনাদে আহমদ]
তথ্যসূত্র:
http://www.globalsecurity.org/military/facility/acsa.htmhttp://www.prothom-alo.com/detail/date/2013-02-02/news/325986
http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=e4cb439c73e474cd2ee23a9455ada295&nttl=20130115090233166321
http://prothom-alo.com/detail/date/2013-01-30/news/325297
http://m.washingtontimes.com/news/2013/jan/30/the-thankless-role-in-saving-democracy-in-banglade/প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য্যধারণ করা
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমাদের অনুগ্রহকে সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সুরা মায়েদা-০৩)
ইসলাম একটা সম্পূর্ণ ও সত্য জীবন ব্যবস্থা যা অন্যান্য সকল বিশ্বাস ব্যবস্থা বা মতবাদ থেকে পৃথক একজন ব্যক্তি যখনই লা-ইলাহা ইল্লালাহ সাক্ষ্য দেয় তখনই মৌখিকভাবে অন্যান্য সকল ব্যবস্থাকে অস্বীকার করে একজন ব্যাক্তি নামাযের জন্য কিভাবে পবিত্র হবে সেটি যেমন ইসলাম বলে তেমনি তার আকীদাকে ভ্রান্ত আকিদা থেকে কি ভাবে রিক্ষা করবে সেটা ইসলাম বলে দেয় তেমনি একটা রাষ্ট্রের অর্থনীতি কিভাবে পরিলক্ষিত হয় তাও বলে দেয়। তেমনি কোন শাসক সমাজ পরিচালনা করবে বা শাসকের জবাবদীহিতা কি রকম হবে বা জনগণের সাথে শাসকের সম্পর্ক কি হবে বা ইসলামের প্রচারকার্য কিভাবে হবে সবই ইসলামে বলা রয়েছে। তাই কোন ব্যক্তি যখন নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করে তখন তাকে ইসলামের সব হুকুম আহাকাম মেনে চলতে হবে এখানে কিছু মানব,কিছু মানব না বা সহজগুলো নিব কঠিনগুলো নিব না, এরকমটা ইসলাম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
“হে ঈমানদারগণ তোমরা পুর্নাঙ্গভাবে ইসলামে প্রবেশ কর” (সুরা বাকারা-২০৮)
অর্থাৎ তোমরা পরিপূর্ণভাবে মুহাম্মাদ (সা) এর দ্বীনের সমস্ত আইনের আনুগত্য কর এবং সেখান থেকে কোন কিছু পরিত্যাগ কর না।
ইসলামী রাষ্ট্র তথা খিলাফত রাষ্ট্রবিহীন একজন মুসলিম চাইলেও সম্পূর্ণ ইসলাম পালন করতে পারবে না কারন ইসলাম শুধুমাত্র ব্যক্তিকেন্দ্রিক কিছু বিশ্বাস বা বৈশিষ্ট্যের নাম নয়। বরঞ্চ ইসলামের ইসলামের হুকুম ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রে পরিব্যপ্ত। তাই একজন মুসলিম আন্তরিকভাবে চাইলেও অর্থনিতি, সামাজিকনীতি, পররাষ্ট্র বা প্রতিরক্ষানীতি ইসলাম হুকুম অনুযায়ী পালন করতে পারে না।
“যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে তার কাঁধে কোন খলীফার বায়আত নেই তার মৃত্যু হচ্ছে জাহেলিয়াতের মৃত্যু” (মুসলিম)
একজন মুসলিমকে অবশ্যই খিলাফত ব্যবস্থার মধ্যে থাকতে হবে কারণ খিলাফত না থাকলে খলিফা থাকে না খলিফা না থাকলে বায়আতের প্রশ্নও আসে না।
কিন্তু বায়আতবিহীন মৃত্যু জাহেলিয়াতের মৃত্যু, অর্থ্যাৎ ইসলাম পূর্ববর্তী সময়ের মৃত্যু যা কোন মুসলিমের কাম্য নয়। এমতাবস্থায় একজন মুসলিমের একমাত্র কাজ হল সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিয়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা। যে ব্যবস্থা মুসলিমদের জীবন, সম্পদ ও বিশ্বাসের নিরাপত্তা দিবে।
একজন মুসলিম যখন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা প্রত্যাখান করে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কজ করবে, তখন তার উপর নেমে আসবে সীমাহীন নির্যাতন। তাকে পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ কাঁটাযুক্ত পথ, শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা। এটাই ছিল পূর্ববর্তীদের সুন্নাহ যার মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা হক থেকে বাতিলকে পৃথক করে দেন। এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য্য ও কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা ও একনষ্ঠভাবে দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাওয়া। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:“ঐসব লোকেরা কি ধারণা করেছে যে, আমরা ঈমান এনেছি, একথা বললেই তারা অব্যাহতি পাবে আর তাদেরকে পরীক্ষা করা হবেনা? আর আমি তাদেরকে পরীক্ষা করেছিলাম যারা পূর্বে অতীত হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ সেই লোকদেরকে জেনে নিবেন যারা সত্যবাদী ছিল এবং জেনে নিবেন মিথ্যাবাদীদেরও।” (সূরা আনকাবুত: ২-৩)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরো বলেন:
“তোমরা কি মনে কর যে, (বিনাশ্রমে) জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ তোমাদের ক্ষেত্রে এমন কিছু ঘটেনি যা তোমাদের পূর্ববর্তীদের ক্ষেত্রে ঘটেছে। তাদের উপর এমন এমন অভাব ও বিপদ-আপদ এসেছিল এবং তারা এমন প্রকম্পিত হয়েছিল যে, স্বয়ং রাসূল ও তার মুমিন সাথীরাও বলে উঠেছিল, আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? স্মরণ রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ’র সাহায্য নিকটেই।” (আল বাকারা: ১৪০)
পূর্ববর্তীদের সকল নবী রাসূল অ তাদের অনুসারীরা ও এই পরীক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রত্যেক মুসলমানকেই এই পরীক্ষা করেন এবং সত্য থেকে মিথ্যা আলাদা করে দেন।
হযরত আবু হুরাইরা(রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল(সা) বলেছেন, আল্লাহ যে ব্যক্তির কল্যান চান তাকে বিপদে (পরীক্ষায়) ফেলেন, হযরত আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেছেন ইমানদার নর-নারীর জান মাল ও সন্তানাদির উপর বিপদ আপদ আস্তেই থাকে শেষ পর্যন্ত সে আল্লাহর সমীপে উপস্থীত হয় এমন অবস্থায় যে তার আর কোন গুনাহ থাকে না।বিশ্বাস বা কার্যের দৃঢ়তার উপর ভিত্তি করে পরীক্ষা করা হয় যুগে যুগে নবী রাসূলদের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছে দাউদ, ইউসুফ, ইউনুস, ইব্রাহীম (আ) প্রত্যককে পরীক্ষা দিতে হয়েছে।
“আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয় কিছুটা ক্ষুধা কিছুটা জান-মালের ক্ষতি ও ফল-ফসলের বিনাস্টের মাধ্যমে আপনি ধর্য্যশীলদের সুসংবাদ দিন” (বাকারা-১৫৫)
“যদি তোমাদের পিতারা, তোমাদের পুত্ররা, তোমাদের ভাইরা, তোমাদের স্ত্রীরা, তোমাদের আর ঐসব সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছো আর ঐ ব্যবসায় যাতে তোমরা মন্দা পড়ার আশংকা করছো অথবা ঐ গৃহসমুহ যেখানে অতি আনন্দে বসবাস করছো, (এসব কিছু যদি) আল্লাহ ও তার রাসুলের চেয়ে এবং তার পথে সংগ্রাম করার চেয়ে তোমাদের নিকট অধিক প্রিয় হয় তবে অপেক্ষা কর যে পর্যন্ত না আল্লাহ তার (শাস্তির) নির্দেশ পাথিয়ে দেন”। (সুরা তাওবা-২৪)
আল্লাহ সুবানাহু ওয়া তাআলা তার দাসদের পরিশুদ্ধ করার জন্য পরীক্ষা নিবেন এবং পরীক্ষার বিষয়বস্তু কি হবে সেটাও জানিয়ে দিয়েছেন যতে তের দাসের পরীক্ষা কৃতকার্য হতে পারে।
বর্তমানে আমাদের জন্য কুরআন-সুন্নাহ তো আছেই সেই সাথে আরো আছে হক পন্থী ব্যক্তিদের জীবন ইতিহাস যা থেকে আমরা জানতে পারি কি রকমের পরীক্ষা তাদের উপর আপতিত হয়েছে। মৌলিকতার দিক থেকে পরীক্ষাসমমূহ একই, যা অপরিবর্তনীয় কিন্তু যুগের ব্যবধানে পরীক্ষার উপায় উপকরনে শুধু পরিবর্তন আসছে।
একজন মুসলিম যখন ইসলাম পালন করবে এবং সেই দাওয়াত সমাজে নিয়ে যাবে সর্বপ্রথম তার বাধা আস্তে পারে পরিবার পরিজন নিকট আত্মীয় থেকে সাহাবীদের ক্ষেত্রে ও ঠিক এমনটা ঘটেছিলো উসায়েত বিন উমায়ের এর মা তাকে বাধে রেখেছিলেন,যাদের মা মাতৃত্বের দোহাই দিয়ে তাকে দ্বীন ত্যাগ করতে বলেছিলেন, ইসলাম পালন ও প্রচারে আমাদের পরিবারও বাধার প্রাচীর হিসেবে দাড়াতে পারে। দাওয়ার কাজের জন্য হয়ত তার পার্থিব স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ক্ষতি হতে পারে। তার চাকুরি চলে যেতে পারে বা হারাম চাকুরির সুজগ আস্তে পারে, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে ইসলামের ডাকে হিজরতের কারনে সাহাবীরদের ব্যবসা, বাড়ীঘর, আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে, মক্কা থেকে মদীনায় চলে যেতে হয়েছিল। দা’ওয়ার কারণে সামাজিক কিছু বাধার মুখে তাকে পড়তে হবে। তাকে সমাজে জঙ্গী, মৌলবাদী, সন্ত্রাসী ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হতে পারে।
দা’ওয়াকারীকে রাস্ট্রীয় কিছু বাধার মুখে পড়তে হতে পারে। দা’ওয়াহে প্রচার যাতে প্রসারিত না হয় তাই পার্টিকে নিষিদ্ধ করতে পারে। পুলিশি হয়রানী, মামলা, হামলা ইত্যাদির মোকাবেলা করতে পারে। মানসিকভাবে দা’ওয়াহকারীর ওপর চাপ প্রয়োগ করা হতে পারে। তার পরিবারের ক্ষতি, তার ক্ষতি, ক্যারিয়ার নষ্ট ইত্যাদি আসতে পারে।দা’ওয়াহকারীর কাছে প্রলোভনও আসতে পারে। এতা সাধারণত হতে পারে পরিবার ও সমাজ থেকে।দা’ওয়াহ ছেড়ে দিলে ভালো চাকরি অথবা পছন্দ অনুযায়ী মেয়ের সাথে বিয়ে অথবা দেশের বাইরে পাঠানোর স্বপ্ন। সবকিছুর পিছনে মূল উদ্দেশ্য থাকে দা’ওয়াহকারী যেন দা’ওয়াহর পথ থেকে ফিরে আসে।
দা’ওয়াহকারীর উপর আসতে পারে হামলা, রিমান্ড, জেল, হাজতবাস, নির্যাতন ইত্যাদি। তাকে ভিতিকরভাবে মিডিয়াতে উপস্থাপন, মিথ্যা সিংবাদ পরিবেশন ও এলাকায় নিয়ে আসার মাধ্যমেওন্যান্য দা’ওয়াহকারীদের ওপরও মানসিক নির্যাতন আসতে পারে। এইসবকিছুই রাসূল (সা) ও সাহাবা (রা)-দের উপরও এসেছিল। উনারা অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন ও সাফল্য লাভ করেছেন। ইসলামের প্রথম শহীদ আম্মার ও সুমাইয়াকে মক্কী জীবনে হত্যা করা হয় শুধুমাত্র দা’ওয়াহর কারণে।
এসকল পরীক্ষাসমূহ যে একজ দা’ওয়াকারীর উপরই আসবে এমন না, বিভিন্ন পরীক্ষা বা একাধিক পরীক্ষা একসাথে আসতে পারে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের প্রত্যেককে তাওফীক দেন এসব পরীক্ষার সময়ে ধৈর্য্য ধারণ করার।“তোমরা ধৈর্য্য ও নামাজের সাথে সাহায্য প্রার্থনা করো এবং নিশ্চয়ই এটা বিনয়ীদের ছাড়া অন্যদের জন্য কঠিন কাজ।” (সূরা বাকারা: ৪৫)
যখন রাসূল(সা)-কে কোন কাজ চিন্তার মধ্যে নিক্ষেপ করত তখন তিনি নামায আরম্ভ করে দিতেন। এমন পরিস্থিতিতে যদি আমরাও পড়ি যেটা আমাদে৪র অনুকূলে নয় তখন আমরা ধৈর্য্য ধারণ করব এবং নামাযের মাধ্যমে আল্লাহ’র সাহায্য প্রার্থনা করব, নিশ্চয়ই আমাদের জন্য একটা উত্তম পথ বের করে দিবেন।
“হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের চিন্তা করো যখন তোমরা সৎপথে রয়েছ, তখন কেউ পথভ্রান্ত হলে তাতে তোমাদের কোন ক্ষতি নাই। তোমাদের সবাইকে আল্লাহ’র কাছে ফিরে যেতে হবে। তখন তিনি তোমাদের বলে দেবেন যা কিছু তোমরা করতে” (সূরা মায়িদা: ১০৫)
সুতরাং, এই আয়াত থেকে অনেকে এই সিধ্বান্তে পৌছে যে, মুসলিমগণ কেবলমাত্র তার এবং তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল ও তাকে অন্য মুসলিমদের কাছে দা’ওয়াহ বহন না করলেও চলবে।
হুযায়ফা বিন ইয়ামান (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন: “আমি বললাম যদি কোন মুসলিমের জামা’আত বা ইমাম না থাকে তাহলে কি হবে? তখন তিনি (সা) বললেন, অতঃপর তুমি সেসমস্ত দল পরিত্যাগ করবে, যদিওবা তোমাকে কোন গাছের গুঁড়ি কামড়ে ধরে রাখতে হয় যতক্ষণ না তোমার মৃত্যু এসে যায়”।
লোকেরা এটি ধারণা করেছে যে, যখন মুসলিমদের খলীফা থাকবে না তখন মুসলমানদের জন্য খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা ফরয নয় বরং এ অবস্থায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে ফেলবে।
এ আয়াত ও হাদীসগুলো ভুলভাবে বুঝার কারণে সবর সম্পর্কে মানুষের প্রচলিত ধারণাটি ভুল। যার কারণে আমরা দেখি বর্তমান শাসকদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা, সৎ কাজের আদেশ এবং অসত কাজের নিষেধ, খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক সংগ্রাম করা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আল্লাহ’র আনুগত্য করে যাওয়া ইত্যাদি সবর হিসেবে গণ্য হয়না।
বরঞ্চ ব্যক্তিগত কিছু আমল আখলাক পালন করা, সামাজিক বিষয়াদিতে হস্তক্ষেপ না করা, শাসকের বিরোধীতা না করা এবং বর্তমান কুফর ব্যবস্থায় অত্যন্ত নির্লিপ্তভাবে জীবনযাপন করাই সবর হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্রকৃতপক্ষে এগুলোর কোন্টাই সবর নয়। সবরের প্রকৃত শিক্ষা আমাদের নিতে হবে নবী-রাসূল ও সাহাবা এবং পূর্ববর্তী দা’ওয়াহকারীদের থেকে।
সবর হল আল্লাহ’র প্রত্যেকটি হুকুম পালন করা এবং হুকুম পালনের ক্ষেত্রেকোন প্রতিবন্ধকতা আসলে ধৈর্য্য ধারণ করা ও কাজ চালিয়ে যাওয়া। বিলাল, মুস’আব, আম্মার, খাব্বাব ও অন্যান্য সকল সাহাবী থেকেও আমরা এই শিক্ষা পাই।
সবর হল আনসার ও মুহাজিরদের সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যে এক ইলাহ’র সাক্ষ্য দেওয়া ও দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যাওয়া।
সবর হল বিলাল (রা)-এর সমস্ত বাঁধার মুখেও বিশ্বাসে উপর অটল থাকা।
সবর হল আবদুল্লাহ ইবনে মাস’উদের (রা) কাফের শাসকগোষ্ঠীর সামনে কুর’আন তিলাওয়াত করা ও এর পরিণতি ভোগ করা।
সবর হল আবদুল্লাহ বিন হুযায়ফার (রা) অত্যাচারী-অবিশ্বাসী শাসকের সামনে আল্লাহ’র মর্যাদাকে উর্ধে তুলে ধরা।আমরা ইসলামের চৌদ্দশত বছরের ইতিহাসে দেখি সবর মানে আল্লাহ’র পথে দা’ওয়াত দিয়ে যাওয়া এবং কোন বাধা এলে ধৈর্য্যধারণের মাধ্যমে আল্লাহ’র সন্তুষ্টি অর্জন করা, কখনোই আনুগত্য প্রদর্শন থেকে সরে যাওয়া নয় বা ইসলাম প্রচারের কাজ বন্ধ রাখা সবর নয়।
সবরকারীদের মর্যাদা আল্লাহ’র নিকট অত্যন্ত উঁচুতে। সবরকারীদের আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বিনা হিসেবে পুরষ্কার দান করবেন।
ইমাম যায়নুল আবেদীন (র) বলেনঃ কিয়ামতের দিন একজন আহ্বানকারী দাক দিয়ে বলবেন- ধৈর্য্যশীলগণ কোথায়? আপনারা উঠুন এবং বিনা হিসেবে বেহেস্তে প্রবেশ করুন। একথা শুনে কিছু লোক দাঁড়িয়ে যাবেন এবং বেহেস্তের দিকে অগ্রসর হবেন, ফেরেশতাগণ তাদের দেখে জিজ্ঞেস করবেন কোথায় যাচ্ছেন? তাঁরা বলবেন, ‘বেহেস্তে’। ফেরেশতাগণ বলবেন, এখনো তো হিসেব দেয়াই হয়নি। তাঁরা বলবেন, ‘হা, হিসেব দেয়ার পূর্বেই’। ফেরেশতারা বলবেন , আপনারা কিরকম লোক? তাঁরা বলবেন আমরা ধৈর্য্যশীল লোক, আমরা সর্বদা আল্লাহ’র নির্দেশ পালনে লেগে ছিলাম, তাঁর অবাধ্যতা এবং বিরুদ্ধাচরণ হতে বেঁচে থাকতাম, মৃত্যু পর্যন্ত আমরা তাঁর উপর ধৈর্য্যধারণ করেছি এবং অটল থেকেছি। তখন ফেরেশতাগণ বলবেন, বেশ, ঠিক আছে। আপনাদের প্রতিদান অবশ্যই এটাই এবং আপনারা এর যোগ্য। যান, বেহেশতে গিয়ে আনন্দ উপভোগ করুন।
হযরত আবু ইয়াহইয়া সুহাইর ইবনে সিনান (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেছেন: “মুমিনদের ব্যাপারটা খুবই বিস্ময়কর। (কেননা) তার সকল কাজই কল্যাণপ্রদ। মুমিন ছাড়া অন্যের ব্যাপারগুলি এরকম নয়। তার আনন্দের কিছু ঘটলে সে আল্লাহ’এ শোকরগুজারী করে, তাতে তার মঙ্গল সাধিত হয়। পক্ষান্তরে ক্ষতিকর কিছু ঘটলে সে ধৈর্য্য অবলম্বন করে। এটাও তার জন্য কল্যাণকরই প্রমাণিত হয়”। (মুসলিম)
আবু তালিম



















