তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২কেন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে অসার? (২য় পর্ব)

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের ব্যার্থতা:
১। পশ্চিমের ধর্মনিরপেক্ষ বাদীরা প্রায়ই বলে থাকে, “keep your religion to yourself, don’t bring it into politics” একই সুর ধরে আমাদের দেশের কেউ কেউ বলে, “ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার” কিন্তু এই ধারণাটা যৌক্তিক কিনা তা সমাজের সর্বোচ্চ সংগঠনটির (রাষ্ট্র) দিকে তাকালে দেখতে পাই। আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত ধর্ম ও ধর্ম প্রচারক এসেছে সকলেই সমাজ সংস্কারের কাজ করেছেন। কিন্তু রাজনীতি ছাড়া সমাজের পরিবর্তন কখনো সম্ভব নয়। সকল ধর্ম প্রচারকরাই রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার নীতি গুলোকে পরিবর্তিত ও প্রভাবিত করেছিলেন এবং বিধিবিধান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাই বলা যায় সমাজে মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াই এক ধরনের রাজনৈতিক প্রচেষ্টা। যে সমাজে ধর্ম বিদ্যমান সেখানে ধর্মের চিরায়ত প্রবনতা হলো সমাজ সংস্কার করা। অর্থাৎ ধর্মের প্রবনতা থেকেই ধর্ম ও রাজনীতির সুগভীর সম্পর্ক প্রতীয়মান। উদাহরন হিসেবে বলা যায় আরবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা হবার পর সেখানকার সমাজ ব্যাবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে যায়।
২। “কেউ যেন তার ধর্মীয় বিশ্বাস কে অন্যের উপর না চাপিয়ে দিতে পারে তাই ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখা উচিৎ।” এ যুক্তিটি ও একটি খোড়া যুক্তি কারণ সমাজে বসোবাসকারী এক জনের চিন্তা দ্বারা সব সময়ই অন্যে প্রভাবিত হয়। চিন্তার চরিত্রটাই এমন যে তা পূর্ববর্তী কোনো চিন্তার ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে। এছাড়া সমাজ বা রাষ্ট্রে ধর্মের প্রভাব থাকবে না, এটাকেও আমরা একটা নতুন এক ধর্মীয় মতাদর্শ বলতে পারি। যে ধর্মের নাম ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’। কারণ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ সৃষ্টিকর্তা ও ধর্ম সম্পর্কে নতুন চিন্তা সহকারে এক নতুন মতাদর্শ সমাজে নিয়ে এসেছে। যা অন্যান্য ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন কোন কর্তৃপক্ষ যদি বলে ‘এখানে কোন আইন থাকবে না’। এটাও একটা নতুন আইন সৃষ্টি করে। উদাহরন স্বরুপ ইসলাম রাষ্ট্রে সুদ ভিত্তিক অর্থনীতির অনুমোদন দেয় না। ফলে ধর্মনিরপেক্ষ পুজিবাদী রাষ্ট্রে সৃষ্টিকর্তার দেওয়া আইন মান্য করা বা ধর্ম পালন করা সম্ভব নয়। বরং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদই অন্য ধর্মের স্বাধীনতা দেয় না।
৩। কেউ কেউ বলে, “ এই আধুনিক যুগে সৃষ্টিকর্তার আইন বা ধর্মীয় আইন অচল। ধর্মীয় আইন এখন সেকেলে”। কিন্তু বাস্তবতা হলো মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি (instinct) সব সময় স্থির ও অপরিবর্তনশীল। সব কালেই মানুষের শারীরিক ও মানসিক ক্ষুধা ছিল, আছে ও থাকবে। তাই মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি অপরিবর্তনশীল হওয়ায় অতীতে যা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি ও মনুষ্য সমাজের জন্য ক্ষতিকর ছিল ভবিষ্যতেও তা একই রকম থাকবে। অতীতেও নারী-পুরুষের মধ্যে জৈবিক ক্ষুধা, সন্তান উৎপাদন ও সম্পদের মালিকানার আকাঙ্ক্ষা, আধ্যাত্মিক ক্ষুধা (Spiritual instinct)/বড় শক্তির আনুগত্য করা/সৃষ্টিকর্তার উপাসনা করার বিষয়গুলো বিদ্যমান ছিল, বর্তমানেও আছে ভবিষ্যতেও থাকবে। আর এ সকল চাহিদাগুলো সুষ্ঠুভাবে পূরণের মধ্যেই সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিদ্যমান। তাই এ চাহিদাগুলো পূরণের জন্য একটি সার্বজনীন সর্বযুগ উপযোগী নীতি ও আইন থাকাটাই ব্যাঞ্জনীয় ও যৌক্তিক। যেহেতু সৃষ্টিকর্তা মানুষের এসকল প্রবৃত্তির স্রষ্টা, তাই সব যুগের উপযোগী,সব জাতি, বর্ণের মানুষের সবচেয়ে সুন্দর ভাবে এগুলো পূরণ করার বিধান তিনিই (আল্লাহ তায়ালা) শুধু ঠিক ভাবে দিতে সক্ষম। সুতরাং সৃষ্টিকর্তার আইনের ক্ষেত্রে একাল-সেকাল বা আধুনিক-অনাধুনিক বলা অযৌক্তিক। তাছাড়া আমাদের সুখ-দুঃখের অনুভুতি, হাসি-কান্না, ছোটদের স্নেহকরা, সত্যবাদীকে পছন্দ করার মত বিষয়গুলো তো সৃষ্টির শুরু থেকেই চলে আসছে। পুরাতন বলে কি এগুলো আমরা পরিহার করি? অথবা নতুন রোগ বলে কেউ কি এইডসকে স্বাগতম জানায়? তাই পুরাতন কোন কিছু বর্তমান যুগের জন্য ভাল নয় এবং নতুন বলে কোন কিছু ভালো হবে এরও কোন যৌক্তিক ভিত্তি নেই।
এবার আসা যাক আরো কিছু বাস্তবিক যুক্তির আলোচনায়। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের উদ্ভব হয়েছিল চার্চের শোষণ নির্যাতনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার (Negative Reaction) ফল স্বরুপ। কিন্তু কোনো ঠিক বা শুদ্ধ মতবাদ কখনো পরিবেশের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া থেকে জন্ম নিতে পারে না। কারন ঐ পরিবেশ-পরিস্থিতি যদি সরিয়ে ফেলা হয় বা ভিন্ন রকম হয় তাহলে ঐ মতবাদের সমস্ত ধারনা (Concept) অগ্রহনযোগ্য বা বাতিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ ধরা যাক চার্চের শাসনে যদি ইউরোপে শান্তি বিরাজ করতো তাহলে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা সেখানকার মানুষের কাছে থাকত সম্পূর্ণ অগ্রহনযোগ্য। অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ কোন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠেনি।
সর্বজন স্বীকৃত ও প্রমানিত ঈসা (আঃ) এর উর্ধ্ব আরোহণের পর ঈঞ্জিলের বার বার সংস্করণ করা হয়। ফলে এর মধ্যে খ্রিস্টান যাজকেরা তাদের মনগড়া মতবাদ, চিন্তা-ভাবনা ঢুকিয়ে এর মৌলিকত্ব নষ্ট করে ফেলে। ফলে এটি হয়ে ওঠে আরেকটি মানুষের তৈরি রাষ্ট্র বা সমাজ পরিচালনার দলিল। তাই ধর্মনিরপেক্ষবাদী বিপ্লবের পর আরেকটি মানুষের তৈরি ব্যাবস্থাই গ্রহন করা হয়। নতুন উৎসও সেই মানব সৃষ্ট মতবাদ। যার মধ্যে ভুল ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ইউরোপে মূলতঃ কোন পরিবর্তন আসেনি। কারণ একটি মানুষের তৈরি ব্যাবস্থা পরিবর্তিত হয়ে আর একটি মানুষের তৈরি ব্যাবস্থা এসেছে। এছাড়া খ্রিষ্টান ধর্মের অভিজ্ঞতা দিয়ে সব ধর্মকে বিচার করা যৌক্তিক নয়। এবং বাকি সব ধর্মে সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত বাণী বিকৃত হয়েছে এ ধারণাও ঠিক নয়। কারণ ইসলাম ধর্মের কুরআনই তার বাস্তব প্রমাণ। কুরআনের আদর্শ বাস্তবায়নের ফলে ইউরোপের মতো অন্ধকারাচ্ছন্ন আরব ঐ সমকালীন সময়েই ১৪০০ বছরের এক স্বর্ণালী সভ্যতার নিদর্শন হয়ে আছে। খিলাফতের শাসনামলে এ রাষ্ট্র জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সাংস্কৃতিক উতকর্ষতার অনবদ্য এক উদাহরণ। কিন্তু আজকের মুসলিম বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায় কুরআন-সুন্নাহর আদর্শ ভিত্তিক সেই রাষ্ট্র ব্যাবস্থার অনুপস্থিতিতে পর্যাপ্ত সম্পদ হাতে থাকা সত্ত্বেও মুসলিমরা আজ দরিদ্র পীড়িত, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-অর্থনীতির দিক থেকে পিছিয়ে পরা এক জাতি। তাই আবারো সারা বিশ্বের মুসলিমরা ইসলামী আদর্শিক রাষ্ট্র ব্যাবস্থা ফিরিয়ে আনতে সোচ্চার।
আমেরিকা বা ব্রিটেনে প্রথম সংবিধান প্রণয়ন ও গ্রহণকালে সেখানকার সমাজে সমকামিতা প্রচন্ডভাবে ঘৃনা করা হতো, আর পর্ণগ্রাফির কথা তো কল্পনাই করা যেত না। কিন্তু সে সময়ের সংবিধান প্রনেতারা যদি আজকে দেখতেন, তাদের সংবিধান অনুসরণ করে সমকামীরাই আজ সহজে পার্লামেন্ট সদস্য হচ্ছে। পর্ণগ্রাফি বিস্তরভাবে ছড়ানো হচ্ছে সমাজে। এবং ব্রিটেনে দশ লক্ষেরও বেশি নাগরিক বিভিন্ন অপরাধে জেলের মধ্যে রয়েছে। এসব অনুধাবন করার ক্ষমতা তাদের থাকলে তারা এ সংবিধান ভিন্নভাবেই লিখতেন। অর্থাৎ এ থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় মানুষের সীমিত জ্ঞানের পরিধি দিয়ে এবং ভবিষ্যৎ বাস্তবতা বিশদ ও ঠিক ভাবে বুঝতে পারার অক্ষমতার কারণে মানুষের তৈরী জীবন বিধান দিয়ে সমাজ কখনো সর্বযুগোপযোগী ব্যাবস্থা সহকারে শান্তিপূর্ণভাবে চলতে পারে না।
ধর্মনিরপেক্ষতা মানুষের সহজাত প্রকৃতি বা স্বভাব বুঝতেও ব্যার্থ হয়েছে। একটু লক্ষ করলেই বোঝা যায় পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের যে কোন মানুষ বড় কোন শক্তি বা তার চেয়ে চিন্তা-ভাবনার দিক থেকে অধিকতর শ্রেষ্ঠ মনে করে তার আনুগত্য প্রকাশ করতে চায় যেমন- কেউ সূর্য, চন্দ্র, বৃহৎ গাছ, আগুন। আবার কেউ কেউ তার চেয়ে উন্নত কোন মানুষের চিন্তার পুজারী যেমন মার্কস ও লেলিনবাদীরা। কিন্তু সমস্যাটি ঘটে তখন, যখন বস্তু ও মহাজগতের প্রকৃত সৃষ্টিকর্তার উপাসনা না করে মানুষ কোন সৃষ্ট বস্তুর আনুগত্য করে। সৃষ্টিকর্তার উপাসনা করার তার সহজাত প্রবৃত্তিকে ভুলভাবে নিবৃত করতে চায়। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মানুষের কাছে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও তার উপাসনা করা বা না-করার ব্যাপারে কোন ঠিক ও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি। পশ্চিমের মানুষের আধ্যাত্মিক চিন্তার খোরাক যোগাতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ চুড়ান্তভাবে ব্যর্থ। তাই দেখা যায় অনেক অর্থ-বিত্তের মাঝেও বিষণ্নতা ও মানসিক রোগ পশ্চিমে মহামারি আকার ধারন করছে। সর্বোপরি সবচেয়ে বড় শক্তিধর সৃষ্টিকর্তার উপর মানুষের যে নির্ভরতা বা তার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার মানুষের যে সহজাত আকাঙ্ক্ষা তা মূলতঃ সৃষ্টিকর্তার হুকুম বা সামগ্রীক জীবন বিধান মান্য করারই নির্ভরতা বা মনস্ত্বাত্ত্বিক ক্ষুধা। তাই মানুষ সহজাতভাবেই সৃষ্টিকর্তার জীবন ব্যাবস্থা ব্যাক্তিগত জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ও মানতে চায়। এবং তা মান্য করেই প্রশান্তি লাভ করতে পারে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মানুষের জীবনের এই সকল মৌলিক চাহিদার যোগান দিতে সম্পূর্ণরুপে ব্যার্থ হয়েছে।
ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বিপ্লবে সৃষ্টিকর্তার ধর্মকে অস্বীকারকারী গোষ্টির সঙ্গে ধর্মকে বা সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাসকারী চিন্তাবিদদের যে কম্প্রমাইজ বা আপোষ হয়েছিল সেটিও ছিল ভিত্তিহীন ও অযৌক্তি। কেননা দুটি সাংঘর্ষিক বা বিপরীতমূখী বিষয়ের মধ্যে কখনো আপোষ হওয়া অসম্ভব। উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। যেমন এক দল লোক বলল, ঢাকা নামে একটি শহর আছে। আরেক দল লোক বলল, ঢাকা নামে কোন শহর নাই। তখন তাদের মধ্যে কম্প্রমাইজ হয়ে এর মাঝামাঝি কোন মতে পৌছান হয়, তাহলে সে সমাধান হবে সত্য বিবর্জিত। তাই সৃষ্টিকর্তা আছে, না সৃষ্টিকর্তা নেই এ দুটির মাঝে কম্প্রমাইজও কোন ঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। কারণ এ দুটোর যে কোন একটি বাস্তবতা সত্য ধারণ করে। তাই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মহাজগতের সাথে সম্পৃক্ত, মানুষ ও সমাজের সাথে সম্পৃক্ত এই সত্যকে বা এই বিষয়টিকে যখন মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও রাষ্ট্র থেকে আলাদা রাখতে চায় অযৌক্তিকভাবে। সৃষ্টিকর্তা কি শুধু মানুষের ব্যাক্তিগত জীবনের সমস্যা সমাধান দিতে পারেন, তিনি কি সমষ্টিগত জীবনের সমাধান দিতে পারেন না? প্রত্যেকটি মানুষকে সৃষ্টিকর্তার বিষয়ক এ মৌলিক প্রশ্নের ঠিক উত্তর না দিলে, তা মানুষের জীবনে ও সমাজে অসঙ্গতি, অসামঞ্জস্যতা, স্ব-বিরোধীতা ও অনিয়ম ছাড়া কিছুই দিতে পারেনা। কারণ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা মানুষ এবং সমাজের ব্যাপারে কোনটি ভালো কোনটি খারাপ চুড়ান্তভাবে বলতে পারেনা। সুখ, প্রশান্তি ও তৃপ্তির ধারণায় থাকেনা কোন ঐক্য। ফলে সৃষ্টি হয় দিধা-দ্বন্দ্ব (confusion) ও অসামঞ্জস্যতা (contradiction)। সত্য ও মিথ্যার কম্প্রমাইজ তাদের জীবনে নিয়ে আসে চুড়ান্ত বিভ্রান্তি। এর প্রতিফলন আমরা ধর্মনিরপেক্ষ জাতিগুলোর নীতি প্রণয়ন ও জীবন পদ্ধতি (life style) এর মধ্যেও স্পষ্ট দেখতে পাই। পাশাপাশি আমরা দেখতে পাই মানুষের স্বভাবের সঙ্গে মানানসই ব্যাক্তিগত জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সৃষ্টিকর্তার আদেশ নিষেধ মেনে জীবন যাপনের ব্যাবস্থা (System) শুধু ইসলামই দেয়। এখানে ভালো-মন্দ শরিয়া আইনের মাধ্যমে স্থায়ী ভাবে নির্দিষ্ট, সুস্পষ্ট এবং যা বাস্তবায়ন যোগ্য। এর প্রমাণ হলো ইসলামী খিলাফতের ১৪০০ বছরের ইতিহাস।
রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করার পরই সেখানে বিপ্লব (Industrial Revolution) ঘটার পর অর্থনৈতিক ও টেকনোলজির উন্নয়ন ঘটেছে। এই উদাহরন পশ্চিমারা অনেক মুসলিমকে বোঝানোর চেষ্টা করছে এখনো। কেউ কেউ ভুল করে এ মতবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে। কিন্তু আসল কথা হলো যে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার স্লোগান নিয়ে যে উন্নয়নের কথা তারা বলেছিল তার বাস্তবায়ন কি আজও ঘটেছে? যতটুকু ঘটেছে সে বস্তুবাদী উন্নয়ন তাদের আজ কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছে? ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ধারণ করার পর যে পুঁজিবাদী ও ভোগবাদী জীবন যাপনের দিকে তারা ধাবিত হয়েছে সে কারণে সারা বিশ্ব থেকে অন্যান্য জাতির সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়ার কৌশল তারা অবলম্বন করেছে। সৃষ্ট হয়েছে উপনিবেশবাদ, নব্য উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের। অন্যান্য জাতিগুলোকে অসাম্য ও পরাধীনতার মধ্যে ঠেলে দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা কি নিজেদের সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে? পৃথিবীর অধিকাংশ পুঁজির মালিক এখন গুটি কয়েক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী। সম্পদশালী পুজীর মালিকরাই তাদের স্বার্থরক্ষাকারীদের তাদের শাসন ক্ষমতায় বসায়। চার্চের শাসনামলের মতো ইউরোপের মানুষ এখনো প্রচন্ড রক্ষণশীল। অভিজাত শ্রেণীর সামাজিক কাঠামোর (Aristocratic Social Class Structure) কারণে এখনো এ অভিজাত শ্রেণীর মানুষেরা জনগণের কোন ম্যানডেট ছাড়াই বৃটেনের লর্ডসভার সদস্য পদ লাভ করে। শ্রমিক শ্রেণীর মানুষেরা এখনো প্রচন্ড ভোগান্তি ও বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষবাদী এই বিপ্লব সংখ্যা গরিষ্ট মনুষের এই দুর্ভোগ কোন উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে পারেনি। এখনো সংখ্যা গরিষ্ট মানুষ অর্থনৈতিক দাসত্বের মধ্যেই রয়েছে। এর উদাহরন হলো- ২০০৭ সালে ও আমেরিকাতে আড়াই (2.5) কোটি ভাসমান মানুষ বসবাস করে।
অপর পক্ষে পশ্চিমের মানুষের সামগ্রীক জীবনের চিন্তা চেতনা ও সংস্কৃতিক কাঠামো আজ সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বে জর্জরিত। ধর্মনিরপেক্ষবাদ তাদের সমাজে সীমাহীন বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। শুধু বস্তুর মাঝে সুখ তথা ভোগের মাঝে সুখ এই মিথ্যা ধারণা, হতাশা ও বিভ্রান্তি ছাড়া কিছু দেয়নি। তাই আমরা যখন দেখি পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৪% এর ও কম আমেরিকায় বাস করে কিন্তু তারা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৩৫% এর ও বেশী সম্পদ ভোগ কর। এমনকি আমেরিকার মধ্যেও সেখানকার ১০% মানুষ সে দেশের ৯০% এরও বেশি সম্পদের মালিক। এবং সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই দারিদ্র সীমার নিচে বাস করে। আর সে দেশেরই পুঁজিবাদী শাসকগোষ্ঠি শুধু সম্পদ লুটের নেশায় পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতের প্রতি বৃদ্ধা আঙ্গুলি উচিয়ে গুচ্ছ বোমার আঘাতে হত্যা করে আফগানিস্তান ও ইরাকের লক্ষ লক্ষ আবাল বৃদ্ধ-বনিতাকে। এ দৃশ্য দেখে সচেতন মানুষেরা সত্যিই বিষ্ময়াভিভূত হয় না। দুঃখ ও শোকে এ ভ্রান্ত চিন্তা বহনকারীদের নিবারণের জন্য ফেটে পড়ে রাজপথে। যখন দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রে তরুণ রবার্ট হক্সিন্স বিখ্যাত হবার আশায় ৮ জনকে গুলি করে আত্মহত্যা করে, তখন সুস্পষ্ট জীবন ব্যাবস্থা পাওয়া জনগোষ্টি মোটেই অবাক হয়না। যখন দেখা যায় ব্যাক্তি স্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলে তারা মুখে ফেনা তুলে ফেলে অথচ ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদের সুতিকাগার রাষ্ট্রে (ফ্রান্স) ‘হিজাব’ নিষিদ্ধ করা হয় আইন করে; তখনও মোটেও আশ্চার্যান্বিত হওয়ার কিছু থাকেনা। যখন দেখা যায় ইউরোপ আমেরিকার নারীরা নিজের বাচ্চা ও স্বামীর চেয়ে পোষা কুকুরের প্রতি যত্নশীল তখন হতবাক হবার কিছুই নেই। কারন বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ভিত্তিহীন ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদী অযৌক্তিক চিন্তাই তাদের চিন্তা-ভাবনা ও জীবন পরিচালনার ভিত্তি। এই ভুল মতবাদের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা চিন্তা, ধারণা ও জীবন দর্শনই আজ তাদের পতনের শেষ প্রান্তে নিয়ে এসেছে।
খান শরীফুজ্জামান সোহেল
সমাজ পরিবর্তনের জন্য কাজ করা মুসলিমদের অন্যতম দায়িত্ব

সমাজ পরিবর্তনের জন্য কাজ করা মুসলিমদের অন্যতম দায়িত্ব। ইসলাম একজন মুসলিমকে কেবল কিছু ব্যক্তিগত ইবাদাতের দায়িত্ব দিয়ে ছেড়ে দেয়নি বরং সমাজের প্রতি তার দায়িত্বগুলোও সুস্পষ্ট করে দিয়েছে। তাই যখন সমাজে ইসলাম থাকেনা বরং মানবরচিত শাসনব্যাবস্থার ফলাফল হিসেবে সমাজের সর্বত্র বৈষম্য, জুলুম, বিশৃংখলা ছড়িয়ে পড়ে তখন এই সমাজ পরিবর্তন করে ইসলামিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ না করে একজন মুসলিমের চুপচাপ বসে থাকার অনুমতি নেই।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:
“তোমাদের মধ্যে কোন ব্যাক্তি অন্যায় কাজ হতে দেখলে সে যেন তার হাত দ্বারা তা প্রতিহত করে। তার এই সামর্থ্য না থাকলে সে যেন তার মুখ দ্বারা তা প্রতিহত করে। তার এই সামর্থ্যও না থাকলে সে যেন তার অন্তর দ্বারা তা প্রতিহত করে (ঘৃণার মাধ্যমে), আর এটা হলো দূর্বলতম ঈমান।” (মুসলিম, তিরমিযী)
রাসূলুল্লাহ (সা) আরও বলেন:
“যারা আল্লাহ’র হুকুম মেনে চলে আর যারা সেগুলোকে নিজের প্রবৃত্তির খেয়ালে লঙ্গন করে, (উভয়ে) যেন তাদের মত যারা একই জাহাজে আরোহণ করে। তাদের একাংশ জাহাজের উপরের তলায় নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে এবং অন্যরা এর নিচের তলায় নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। যখন নিচের লোকদের পিপাসা মেটানোর প্রয়োজন হয় তখন তাদেরকে জাহাজের উপরের অংশের লোকদের অতিক্রম করে যেতে হয়। (তাই) তারা (নিচতলার লোকেরা) নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে নিল, ‘আমরা যদি জাহাজের নিচের দিকে একটা ফুটো করে নিই তাহলে জাহাজের উপরের তলার লোকদের কোন সমস্যা করবোনা।’ এখন যদি উপরের তলার লোকেরা নিচতলার লোকদেরকে একাজ করতে দেয় তবে নিশ্চিতভাবেই তারা ধংসপ্রাপ্ত হবে। আর তারা যদি তাদেরকে একাজ থেকে বিরত রাখে, (তবে) তারা (উপরতলা) রক্ষা পাবে এবং এভাবে (জাহাজের) সবাই রক্ষা পাবে।” (বুখারী)
তাই কেউ ব্যক্তিগত ইবাদত ঠিকমতো চালিয়ে গেলো আর সমাজে যেসব অব্যাবস্থাপনা চলছে সে ব্যাপারে কিছু করলো না বা বলল না এটা কোন ইসলামী চিন্তা নয়। উপরোক্ত হাদীসদ্বয় থেকে এটা পরিষ্কার যে, সমাজে যখন জুলুম, অনাচার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে তখন ঐ সমাজে বসবাসরত মুসলিমদের জন্য ঐ সমাজের পরিবর্তন করার জন্য কাজ করা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। আর এ দায়িত্ব পালনে এগিয়ে না আসলে সবাই একসাথে শাস্তিযোগ্য হবে।
রাসূললুল্লাহ (সা) বলেন:
“এক শহরের অধিবাসীদের উপর আল্লাহ তা’আলা শাস্তি প্রদান করেন। তাদের মধ্যে আঠারো হাজার লোক এমন ছিল যাদের আমল ছিল নবীদের আমলের সমতুল্য।” জিজ্ঞেস করা হলো। ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা)! কেন তবে তাদের উপর শাস্তি এসেছিল?’ রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন: “এই কারণে যে, (বাকিদের পাপ কাজ করতে দেখেও) তারা আল্লাহ’র উদ্দেশ্যে বাকিদের উপর ক্রুদ্দ্বহতো না এবং তাদেরকে (পাপ কাজ থেকে) বারণ করত না।“
কায়েস ইবনে আবি হাযমের বরাত দিয়ে আবুদাউদে বর্ণিতঃ আল্লাহ’র প্রশংসা এবং গুণগান গাওয়ার পর আবু বকর(রা) বললেন,’হে মানুষ! তোমরা এই আয়াতটি পড় কিন্তু এর মর্মার্থ বোঝ না’, “হে ইমানদারগণ! তোমরা নিজেদের অন্তরকে পাহারা দাও; তোমরা যদি সঠিক পথে নিজেদের পরিচালিত করতে পার, তাহলে যারা বিপথে গেছে তারা তোমাদের ক্ষতি করতে পারবেনা।” (সূরা আল মায়িদাঃ ১০৫) আমি রাসূল(সা)-কে বলতা শুনেছি: “যখন কোন জাতি পাপাচারে লিপ্ত হয় এবং কেউই তাদের প্রতিরোধ করেনা তখন আল্লাহ গোটা জাতির উপর শাস্তি নাযিল করেন যা তাদের সকলকে ছেয়ে ফেলে।” (আবু দাউদ/৩৭৭৫)
রাসূলুল্লাহ (সা) এর পবিত্র সীরাতের দিকে তাকালে দেখা যায় তিনি এমন একটি সমাজে এসেছিলেন যা ছিলো পুরোপুরি অন্ধকারাচ্ছন্ন, সব ধরণের অন্যায়, অত্যাচার, অনাচারে পরিপূর্ণ। ওই সমাজের লোকেরা মিথ্যা ইলাহদের পূজা করতো, ওজনে কম দিতো, এতিম ও দাসদের অধিকার বঞ্চিত করতো, কথায় কথায় যুদ্ধ আর হানাহানিতে মেতে উঠতো ইত্যাদি। এমনি এক পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর সাহাবীদের সাথে নিয়ে ঐ সমাজকে পরিবর্তনের কাজে ঝাপিয়ে পড়েন এবং সমাজের এসব অনাচারের বিরুদ্ধে কথা বলে সমাজকে ইসলামের দিকে জোরালোভাবে আহবান করেন। তিনি কেবল ব্যক্তিদেরকে সংশোধনে ব্যস্ত থাকেননি বরং পুরো সমাজ দেহটাকেই সুস্থ করার লক্ষ্যে সমাজের সব প্রচলিত মিথ্যা ধ্যান-ধারণা ও অনাচারের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম পরিচালনা করেছিলেন।
অতএব, তাঁর অনুসরণে আমাদেরকেও বর্তমান ধ্বংসন্মুখ সমাজকে পরিবর্তন করার কাজে অংশগ্রহণ করতে হবে।ইসলামের জন্য আন্দোলনকারী ভাইদের প্রতি

ইসলামের জন্য আন্দোলনকারী ভাইদের প্রতি,
সৎপথের পথিকদের প্রতি আল্লাহ’র রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।
সন্দেহাতীতভাবে আজকে মুসলিম উম্মাহ’র বজ্রকন্ঠ কাফির-যালিমসহ ইসলামের বিরুদ্ধবাদীদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরিয়ে দিয়েছে। তাকবীর ধ্বনিতে বার বার কেঁপে উঠছে তাদের মসনদসমূহ।
দেরিতে হলেও এই আন্দোলনে তারা ভীত, প্রকম্পিত। মুসলিম উম্মাহ’র আল্লাহ (سبحانه و تعالى) ও তাঁর রাসূলের (صلى الله عليه و سلم) প্রতি ভালোবাসা এবং ইসলামের দুশমনদের প্রতি ঘৃণার প্রবলতায় আতঙ্কে আছে তারা।
কিন্তু, আমাদের যে বিষয়টি বুঝতে হবে তা হল, ইসলাম এবং উম্মাহ’র স্বার্থে জ্বলে উঠা এই আগুন যেন কোনভাবেই যালিম সাম্রাজ্যের ফায়দার উৎস হয়ে না দাঁড়ায়।
আমাদের বুঝতে হবে দীর্ঘ সময় পর পাওয়া এই আন্দোলনের সূচনা আমাদের নিকট আল্লাহ (سبحانه و تعالى) কর্তৃক রহমতস্বরূপ; যা কোনভাবেই যাতে ইসলামের শত্রুদের পক্ষে চলে না যায়।
আপনারা ইতিমধ্যেই দেখেছেন, সরকার লং-মার্চের অনুমতি দেওয়ার নাটক দেখিয়ে আবার লং-মার্চে উপস্থিতদের বাধা প্রদানে হরতালের আয়োজন করে এবং তাঁর গুন্ডা বাহিনী দ্বারা তারা কিভাবে দ্বি-মুখি ব্যবহার দেখিয়েছে। এটা সুস্পষ্টভাবে এই উম্মাহ’র আন্দোলনকে ছিনতাইয়ের ঘৃণ্য চক্রান্ত ছাড়া আর কিছুই না।
সুতরাং, এই সকল যালিমের কাছে ১৩/১৪ দফা দাবি জানানো অযাচিত নয় কি?
প্রাণপ্রিয় রাসূল (صلى الله عليه و سلم) -এর অবমাননার বিচার এই উম্মাহ‘র অধিকার। কিন্তু যারা এই উম্মাহ’র দৈনিক বিষয়সমূহ নিয়েই এতটুকু চিন্তিত থাকেনা, তাদের কাছ থেকে এই ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক।
এইরকম অপমান এই প্রথম নয়; এর পূর্বেও রাসূল (صلى الله عليه و سلم) -কে অপমান করা হয়েছে এবং এই গণতান্ত্রিক শাসনব্যাবস্থা দ্বারা এর শাসকরা এই ধরণের জঘন্য অন্যায়কারীদের বাক-স্বাধীনতার নামে প্রশ্রয় দিয়ে যায়।
এই কুফর শাসনব্যাবস্থার মাঝে ন্যায়-বিচার দাবি করা, ময়লা কাঁদার মাঝে পরিষ্কার পানযোগ্য পানি অনুসন্ধানের মতই বোকামী বৈ আর কিছুই নয়।
হাসিনা-খালেদা বা অন্যান্য পুতুল শাসক দ্বারা গণতান্ত্রিক এই শাসনব্যাবস্থা ক্রমাগতভাবে আমাদের ন্যায়-বিচারের নামে কাঁচকলা দেখিয়ে যাচ্ছে এবং জেনেশুনে এই কুফরের মাঝে প্রবেশ অবশ্যই ইসলামে সম্মত নয়।
সুতরাং, যালিমের কাছে যুলুমের বিচার না চেয়ে; আমেরিকা-ভারত কর্তৃক এই আন্দোলন ছিনতাইয়ের পূর্বেই দালাল শাসক ও এসব দালাল তৈরির কারখানা গণতান্ত্রিক শাসনব্যাবস্থা উৎখাত করুন।
মরক্কো থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত জেগে উঠা খিলাফতের দাবিই মুসলিম উম্মাহ’র একমাত্র ও যৌক্তিক দাবি।
সুতরাং, ১৩/১৪টি দাবি নয়, ইসলামী রাস্ট্রব্যাবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটিমাত্র দাবিই আজ মুসলিম উম্মাহ’র প্রাণের দাবি।
একটাই দাবি,
একটাই যুদ্ধ,
একটাই লক্ষ্য,
খিলাফাহ রাস্ট্রব্যাবস্থা।“যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ তাদের অভিভাবক। তাদেরকে তিনি বের করে আনেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে। আর যারা কুফরী করে তাদের অভিভাবক হচ্ছে তাগুত। তারা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। এরাই হলো দোযখের অধিবাসী, চিরকাল তারা সেখানেই থাকবে।” (আল বাকারাঃ ২৫৭)
প্রথম প্রকাশঃ ৬ই এপ্রিল ২০১৩
রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রতি ভালোবাসা ও নাস্তিকতার মূল উৎপাটন

আল্লাহ্ তা’আলা রাসূল (সা) সম্পর্কে বলেন,
হে নবী! আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি। (আহজাব: ৪৫)
রাসূল (সা) এর প্রতি ভালবাসা বলতে বোঝায় তাকে মান্য করা এবং তাকে সৃষ্টি কূলের মাঝে সর্বশ্রেষ্ট মনে করা। আল বাইদাওয়ী বলেন “ভালবাসা হচ্ছে মান্য করার ইচ্ছা করা”। আরবি ভাষায় ভালবাসা মানে কাউকে সু-উচ্চে তুলে ধরার ইচ্ছা করা।
ভালোবাসা হচ্ছে কোন কিছুর প্রতি তাড়না যা মানুষের সেই বিষয়ের প্রতি আচরণ নির্ধারণ করে। এই তাড়না হতে পারে প্রবৃত্তিগত যার সাথে কোন দৃষ্টিভঙ্গীর সম্পর্ক নেই, যেমন: মানুষের তাড়না মালিকানার প্রতি, বেঁচে থাকার জন্য, ন্যায়ের জন্য, পরিবার-সন্তানের জন্য ইত্যাদি।
আবার তাড়না হতে পারে কোন নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গীর ভিত্তিতে যা তার আচরণকে সুগঠিত করবে। তাই ইসলাম রাসূল (সা) এর প্রতি ভালবাসাকে ফরয করেছে। এবং এই ব্যপারে দলীল হল:
আল্লাহ্ বলেন,
বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের পরিবার, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান- যাকে তোমরা পছন্দ কর – আল্লাহ্, তার রাসূল ও তার রাহে জেহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর, আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ্ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না। (তাওবা: ২৪)
ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে তার সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
“শপথ ঐ সত্ত্বার যার হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের কেউই ঈমানদার হবে না যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা ও সন্তান হতে অধিকতর প্রিয় হব”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩]
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“তোমাদের কেউই ঈমানদার হবে না যতক্ষণ আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান ও সকল মানুষ হতে প্রিয় না হই”।
[সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৭৮]হযরত ওমর (রা) একবার বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আপনি আমার নিকট আমার জীবন ব্যতীত অন্য সমস্ত বস্তু হতে অধিক প্রিয়।” হুযুর (সা) বললেন, “কোন ব্যাক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবেনা যতক্ষণ পর্যন্ত আমার মহব্বত তার নিকট তার জীবনের চাইতেও বেশী না হইবে । হযরত উমর (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! এখন আপনি আমার নিকট আমার জীবনের চাইতেও বেশী প্রিয়”। (বুখারী)
রাসূল (সা) বলেছেন, মানুষের হাশর হবে তার সাথে যার সাথে তার মহব্বত রয়েছে । (মুসনাদে আহমাদ)
উপরোক্ত আয়াত ও হাদীস থেকে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি মহব্বত ও ভালোবাসা পোষণ না করলে ঈমানদার বলে কেউ বিবেচিত হবে না। অতএব ঈমানের অনিবার্য দাবী হল- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসা।
আমরা যদি সাহাবাদের (রা) রাসূলের প্রতি ভালবাসার দিকে তাকাই তাহলে দেখব তারা কতটা উৎসাহী ছিলেন রাসূল (সা)-এর প্রতি ভালবাসা দেখাতে, তার (সা) আদেশ মানতে, তারা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করতেন ভালবাসার এই দায়িত্ব পালন করতে।
উহুদের যুদ্ধের বর্ণনা দিতে গিয়ে আনাস (রা) বর্ণনা করেন, “যখন সকলে রাসুল (সা) কে রেখে চলে যাচ্ছিল, আবু তালহা (রা) তখন বর্মের মত রাসুল (সা) এর সামনে দাড়িয়ে ছিল। আবু তালহা ছিলেন একজন অভিজ্ঞ এবং শক্তিশালী তীরন্দাজ যার ধনুক ছিল শক্ত ও প্রসারিত। সেদিন তিনি দু থকে তিনটি ধনুক ভেঙে ফেলেন। যখন কেউ রাসুল (সা) এর সামনে দিয়ে পাত্র ভর্তি তীর নিয়ে যেত রাসুল (সা) তা আবু তালহার জন্য দিয়ে যেতে বলছিলেন। যখন রাসুল (সা) শত্রুদের দেখার জন্য মাথা তুলছিলেন আবু তালহা বলেন “আমার পিতা মাতা আপনার উপর কুরবান হোক, আপনার মাথা শত্রুদের দেখতে দিবেন না, আমার গলা এবং বুক আহাত হোক তার পরও যেন আপনার গায়ে একটি তীরও না লাগে।” (বুখারী ও মুসলিম)
সাহাবারা রাসূলকে (সা) এত ভালবাসতেন এবং তার রক্ষা করার জন্য জীবন দিয়ে দিতেন এমনকি তাদের শিশুদেরকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে বলতেন যাতে রাসুলের (সা) গায়ে যেন নুন্যতম আঘাত না লাগে। মুসলিমরা রাসুল (সা) কে সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন কারন তিনিই হচ্ছেন হাশরের ময়দানে শাফায়েত কারী।
আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন: “আমি রোজ কিয়ামতে মানুষের সরদার-নেতা হব। যে দিন মানব মণ্ডলী আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে এবং সূর্য থাকবে মাথার খুব কাছে। মানুষের দুশ্চিন্তা ও বিপদের চরম পর্যায়ে পৌঁছবে। এমন বিপদ যা তাদের শক্তির বাহিরে এবং সহ্য করাও বড় কঠিন হয়ে পড়বে। ওরা একে অপরকে বলবে: তোমরা একজনকে পাওনা যিনি তোমাদের প্রতিপালকের নিকট তোমাদের জন্য সুপারিশ করবেন? তারা একে অপরকে বলবে: চল আদম (আ) এর নিকট। সকলে আদম (আ) এর নিকটে গিয়ে বলবে: হে আদম (আ) আপনি মানুষের পিতা। আল্লাহ আপনাকে তাঁর নিজ হাতে সৃষ্টি করে আপনার মাঝে তাঁর রুহ ফুঁকেছেন। ফেরেশতাগণকে নির্দেশ করেছেন আর তাঁরা আপনাকে সেজদা করেছেন। আপনার রবের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আমরা কি অবস্থায় আপনি দেখেন না!? আমরা কী চরম পর্যায় পৌঁছেছি দেখেন না? বাবা আদম (আ) বলবেন: নিশ্চয়ই আমার রব-প্রতিপালক আজ এমন রাগ হয়েছেন যা ইতিপূর্বে কখনো রাগ হননি। আর এর পরেও কখনও এরূপ রাগ হবেন না। আল্লাহ তা‘য়ালা আমাকে গাছের ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন আর আমি তার নাফরমানি করেছিলাম। নাফসী নাফসী (আমি নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত আছি) তোমরা অন্য কারো নিকটে যাও। তারা যথাক্রমে: নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা (আ)- এর নিকটে যাবে। কিন্তু সকলে ওজর পেশ করবেন। তাঁরা সকলে বলবেন: নিশ্চয়ই আমার রব আজ এমন রাগ হয়েছেন যা ইতিপূর্বে কখনো রাগ হন নাই এবং এরপরেও কখনো এরূপ রাগ হবেন না। নাফসী নাফসী (আমি নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত আছি)। অত:পর ঈসা (আ) বলবেন: তোমরা মুহাম্মাদ (সা)-এর নিকটে যাও। তারা সকলে আমার নিকটে আসবে। অত:পর বলবে: হে মুহাম্মাদ (সা) আপনি আল্লাহর রাসূল, শেষ নবী, আল্লাহ আপনার আগের-পরের সকল পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন। আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে সুপারিশ করুন। তখন আমি অগ্রসর হয়ে আরশের নীচে যেয়ে আমার রবের জন্যে দীর্ঘ সেজদায় পড়ে যাব। অত:পর আল্লাহ আমার প্রতি তাঁর প্রশংসা ও শুকরিয়া করার জন্য অন্তর খুলে দিবেন ও এমন ইলহাম (আল্লাহ কর্তৃক অন্তরে প্রদত্ত জ্ঞান) দান করবেন যা আমার পূর্বে আর কারো জন্য খুলে দেননি। অত:পর বলা হবে: হে মুহাম্মাদ (সা)! তোমার মাথা উঠাও। চাও দেয়া হবে। সুপারিশ কর গ্রহণ করা হবে। তখন আমি মাথা উঠাব এবং বলব: হে আমার প্রতিপালক! আমার উম্মত! আমার উম্মত! বলা হবে: হে মুহাম্মাদ (সা)! তোমার উম্মতের যাদের কোন হিসাব নেই তাদেরকে জান্নাতের ডান দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাও। তারা মানুষের সঙ্গে অন্য সকল দরজায় অংশীদার। যাঁর হাতে মুহাম্মাদের জীবন! নিশ্চই জান্নাতের দরজার দূ পাল্লার মধ্যের দূরত্ব মক্কা ও হাজার বা মক্কা ও বুছরার দূরত্বের সমান।” (বূখারী হাদীস নং ৪৭১২; মুসলিম হাদীস নং ১৯৪ শব্দ তারই)
যে রাসূল তার উম্মতকে ছাড়া জান্নাতে যাবেন না মুসলিমরা তাকে (সা) প্রাণের চেয়ে বেশি ভালবাসবে না তো কাকে ভালবাসবে। তাই প্রত্যেক মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক হল রাসূল (সা) নাম শুনলে তার উপর সালাম নিবেদন করা কারণ, তিরমিযীর একটি বর্ণনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
“ঐ ব্যক্তির নাক ধুলি ধুসরিত হোক যার কাছে আমার উল্লেখ করা হয় কিন্তু সে আমার উপর সালাত পাঠ করেনি”।
কিন্তু বর্তমানে বাংলার মাটিতে কী জঘন্য ভাবে দশকের পর দশক কিছু কুলাঙ্গার আমাদের প্রাণ প্রিয় রাসুল (সা) কে নিয়ে, তার পরিবার কে নিয়ে, সাহাবা (রা) কে নিয়ে, ইসলামের বিধি বিধান ও মুসলিমদের নিয়ে একের পর এক কুৎসা রটাচ্ছে।
(সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে অবশ্যই সবচেয়ে নীচ সৃষ্টি হচ্ছে যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচারন করে)
[সূরা আল-মুজাদিলাহ্: ২০]এবং এটা পানির মত পরিষ্কার যে আমাদের শাসকরা প্রতিনিয়ত এদের রক্ষা করার কলাকৌশল ব্যবহার করছে এবং নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ব্যবহার করছে। বস্তুত এই শাসকরাই আমেরিকা-ব্রিটেন-ভারতের সুস্পষ্ট মদদে তাদের মতাদর্শে মোহিত হয়ে এই কুলাঙ্গারদের তৈরি করছে আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্তার মাধ্যমে। যেখানে ইসলামকে শুধু মাত্র ধর্মীয় রীতিনীতি বানিয়ে ইসলামকে সমাজের, রাষ্ট্রের সমস্যা সমাধানের জন্য অক্ষম হিসেবে দেখান হচ্ছে এবং সকল নাস্তিক কুলাঙ্গারদের এর জন্য লেলিয়ে দেয়া হয়েছে। আর তাদের একের পর এক আক্রমণে মুসলিম উম্মাহর ভালবাসার হৃদয় একের পর এক ক্ষত বিক্ষত হচ্ছে। আজ আবারও আমেরিকা-ব্রিটেন-ভারতের সুস্পষ্ট মদদে এই নাস্তিকরা আস্ফালন দেখাচ্ছিল।
মুলতঃ তাদের মুখ থেকে যা বাহির হয় তাই ঘৃণ্য; তারা যাই বলে তাই মিথ্যা।
(সূরা আল-কাহ্ফ)আজ মুসলিম উম্মাহর তরুণ-বৃদ্ধ সকলে যখন আমেরিকা-ব্রিটেন-ভারতের সুস্পষ্ট মদদপুষ্ট এই নাস্তিকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ঠিক তখনই হাসিনা-খালেদারা আবার ইসলামের এই আন্দোলনকে নিজেদের পকেটে ভরে গণতন্ত্রের নষ্ট নির্বাচনের রাজনীতির মাধ্যমে রাসুল (সা) এর প্রতি আমাদের ভালবাসাকে কলুষিত করতে চেষ্টা করছে।
হে মুসলিম উম্মাহ,
এই হাসিনা-খালেদারা কখনই ইসলামের ভাল চায়নি তারা সবসময় বাক-স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ইত্যাদি কুফরি মতবাদের নামে আমেরিকা-ব্রিটেন-ভারতের সুস্পষ্ট মদদপুষ্ট এই সব নাস্তিকদের লালন করেছে। তাই আজ আপনাদের এই আন্দোলনকে তাদের স্বার্থে ব্যবহৃত হতে দিবেন না। বরং এরাই হচ্ছে আমেরিকা-ব্রিটেন-ভারতের সুস্পষ্ট মদদপুষ্ট নাস্তিকদের রক্ষক বা নাস্তিকদের মাওলা। তাই আজ আপনাদের আন্দোলন হতে হবে আমেরিকা-ব্রিটেন-ভারতের সুস্পষ্ট মদদপুষ্ট হাসিনা-খালেদার বিরুদ্ধে এবং খিলাফত প্রতিষ্টার পক্ষে যাতে বাংলার মাটিতে আর কেউ যেন রাসুল (সা)-এর অপমান করতে না পারে।
হযরত উমর (রা) বলেন, “আল্লাহর শপথ! কুরআন দিয়ে আল্লাহ যতটুকু রক্ষা ও প্রতিহত করেন, রাষ্ট্রশক্তির (খিলাফতের) মাধ্যমে আল্লাহ তার চেয়েও বেশি রক্ষা ও প্রতিহত করেন।” [কানজুল উম্মাল, হাদীস নং: ১৪২৮৪, তারিখে ইমাম আল-খাত্তাবি]
যদি আজ বাংলাদেশে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত থাকতো তাহলে মুসলিমদের এমন অপমানজনক ও দুর্দশাগ্রস্ত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না, নাস্তিকরা উম্মাহর রাসূল (সা) এর বিরুদ্ধে এমন ঘৃণ্য কর্মকান্ড করার দুঃসাহস দেখাতে পারতো না এবং হুঙ্কার দিয়ে শাহবাগে তাদের উপস্থিতি দেখাতে পারতনা, কারণ খিলাফত, ইসলাম ও মুসলিমদের রক্ষাকারী নয় বরং এটা হচ্ছে ঢালস্বরুপ ও দূর্ভেধ্য নিরাপদ এক দূর্গ। প্রিয় মুসলিমগণ! উনিশ শতকের শেষদিকে, ১৮৯০ সালে, ফরাসী লেখক “মারসী ডি বোরেজ” একটি নাটক তৈরি করে ফ্রেঞ্চ কমেডি থিয়েটারে প্রচারের জন্য, যার সমস্ত কাহিনীই রচনা করা হয়েছিল আল্লাহ্ রাসূল (সা) কে অবমাননা করে। বিষয়টি যখন খলীফা সুলতান ২য় আব্দুল হামিদ (রহ) এর কানে গেল, তখন তিনি সাথে সাথে ফরাসী সরকারকে সাবধান করে দিলেন যাতে এ নাটকটি নিষিদ্ধ করা হয় এবং কোন থিয়েটারে যেন মঞ্চস্থ না হয়। সুতরাং, ফরাসী সরকার তা করতে বাধ্য হয় এবং খলীফার কথামত নাটকটি প্রচার নিষিদ্ধ করে এবং খলীফার নিকট চিঠিতে উত্তর পাঠায়: “মহামান্য সুলতানের ইচ্ছামত আমরা যে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি, তাতে বিশ্বাস আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও উন্নত হবে”, এবং যখন নাটকটির নির্মাতা ফ্রান্সে সুযোগ না পেয়ে ইংল্যান্ডের অ্যালসিওম থিয়েটারে মঞ্চস্থ করার প্রস্তুতি নেয়, এবং যখন বিষয়টি সুলতান আব্দুল হামিদের কানে পৌঁছায়, তিনি সাথে সাথে নাটকটি নিষিদ্ধ করার হুমকি দেন এবং তা নিষিদ্ধ করা হয়। শুধু তাই নয় তৎকালীন পরাশক্তি বৃটেন এ ঘটনার জন্য খলীফার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে।
দেখুন যেখানে বিশ্বের পরাশক্তিরা খলীফার ভয়ে থাকত সেখানে নাস্তিকরাতো চুনোপুটি।
তাই আমি আপনাদের সজাগ করছি যে,
হাসিনা-খালেদার দলীয় স্বার্থে ইসলামের এই আবেগকে ব্যবহার করবেন না, হাসিনা বা খালেদার বিজয় কখনই ইসলামের বিজয় নয় বরং তাদের বিজয় আমেরিকা-ব্রিটেন-ভারতের বিজয়। কারণ তারা উভয়ে একই মুদ্রার দুই পিঠ এবং তারা উভয়েই বাংলাদেশে আমেরিকা-ব্রিটেন-ভারতের স্বার্থের রক্ষক এবং মুসলিমদের শত্রুদের বন্ধু। আল্লাহ্ বলেন,
হে মুমিনগণ, তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ্ জালেমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না। (মায়েদা: ৫১)
তাই মুসলিমদের এই জাগরণ হতে হবে খিলাফতের উত্থান। পশ্চিমারা ক্রসেড ঘোষণা করেছে এবং এই ক্রসেড ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে; সুতরাং দ্বীন ইসলাম, রাসূল (সা) এবং উম্মাহ্’র পক্ষে অবস্থান নিন এবং জেনে রাখুন এ অবস্থার পরিবর্তন ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয় যতক্ষণ পর্যন্ত না পূর্বে যেভাবে সমাধান হয়েছিল ঠিক একইভাবে সমাধান না করা হয় অর্থাৎ নবুয়্যতের আদলে খিলাফায়ে রাশেদাহ্ প্রতিষ্ঠিত না হয়। সুতরাং খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগকারীদের সাথে যোগ দিন, তাদের সমর্থন করুন, একমাত্র খিলাফত উম্মাহ্ ও তার সম্মান রক্ষা করবে এবং যালিমদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
হে ঈমানদারগণ, আল্লাহ্ ও তার রাসূলের ডাকে সাড়া দাও, যখন তোমাদের সে কাজের প্রতি আহবান করা হয়, যা তোমাদের মাঝে জীবনের সঞ্চার করে। (আনফাল: ২৪)
আপনার নিকট আল্লাহ’র অস্তিত্বের স্বপক্ষে কোন প্রমাণ আছে কি?

যারা স্রষ্টাতে বিশ্বাস করেনা, তারা প্রায়ই বলে থাকে স্রষ্টাতে বিশ্বাস একটি অন্ধ বিশ্বাস অর্থাৎ স্রষ্টাতে বিশ্বাস কোন যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। আরও বলা হয় যে, স্রষ্টাতে বিশ্বাস সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক।
স্রষ্টাতে বিশ্বাস কি বিজ্ঞানভিত্তিক কি না বিচার করার আগে দেখা যাক বিজ্ঞান আসলে কী? আমাদের চারপাশে মহাবিশ্ব, তার অধ্যয়ন ও পর্যবেক্ষণই বিজ্ঞান। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের মাধ্যমে বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করে মহাবিশ্বের কর্মধারা।
এটা বিজ্ঞানের আলোচ্য বা বিবেচ্য বিষয় নয় যে, কে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন বা এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির উদ্দেশ্য কি। বিজ্ঞান শুধুমাত্র মহাবিশ্বের কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করে। সেক্ষেত্রে, স্রষ্টা আছেন কিনা তার উত্তর পেতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা ভুল। বরং এ প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ ব্যবহার করা উচিত।
সূর্য, চন্দ্র, তারা, গ্রহ, জীবজন্তু, মানুষ ইত্যাদি বস্তু দেখলেই এদের কতগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই। যেমনঃ তাদের নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধ আকৃতি আছে, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, ওজন ইত্যাদি গন্ডি আছে; এরা সকলেই নির্ভরশীল, দুর্বল এবং পরমুখাপেক্ষী। এসব কিছুই নির্দেশ করে যে এরা নিজেরা নিজেদের সৃষ্টি করেনি বা সেই যোগ্যতাও তাদের নেই। বরং তাদের উপর এসব বৈশিষ্ট্য আরোপ করা হয়েছে। এদের প্রত্যেকক্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে একজন স্রষ্টা আছেন।
ইসলাম মানুষকে যৌক্তিক প্রমাণের মাধ্যমে আল্লাহ’র অস্তিত্বের স্পষ্ট ধারণা দিয়েছে। কুর’আনের শত শত আয়াতে মানুষকে এই মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের জন্য জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহ’র অস্তিত্বের পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। সূরা আল ইমরানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“দেখুন! আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে দিবা-রাত্রির আবর্তনে অবশ্যই চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।”
আজকে আমাদের আল্লাহ’র অস্তিত্বের উপর ততটুকুই বিশ্বাস রাখি যা আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পূর্বপুরুষদের নিকট হতে পেয়েছি। আমাদের এই বিশ্বাস কোন বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। ফলে, আমাদের জীবনের উপর এই বিশ্বাসের কোন কার্যকর প্রভাব নেই। তাই আমাদেরকে ইসলামিক মৌলিক বিশ্বাস (আকীদা) সম্পর্কে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে চিন্তা করা উচিত, তা স্বাভাবিকভাবেই আমাদের জীবনকে সঠিক দিক-নির্দেশনা দান করবে।
সেনাবাহিনী ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি সমাচার !!

সেনাবাহিনী নিয়ে খালেদা জিয়ার বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। কেউ কেউ এটাকে অগণতান্ত্রিক সরকার আনার চক্রান্ত হিসেবে দেখছেন। অতীতের মতো বর্তমানেও বাংলাদেশের রাজনীতি সেনাবাহিনী নিয়ে সরগরম হয়ে ওঠছে। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী প্রভাব বিস্তার করেছে। ক্ষেত্র বিশেষে সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকা জনগণ কতৃক প্রশংসিত হয়েছে। তাই দেখা যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটে সেনাবাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা। এটাও ঠিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের মতো সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকার পেছনে ছিল মূলত এই দেশের স্বার্বভৌমের প্রতীক মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং আধিপত্যবাদী ভারতের সক্রিয় সমর্থন, বিশেষ করে ওয়ান ইলেভেনের সময় মার্কিন-ভারত-বৃটেন এর ভূমিকা ছিল দেখার মতো।
কাজে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিল সেনাবাহিনী। বিগত গণতান্ত্রিক সরকার গুলোর লুঠপাট, দূর্নীতি আর ক্ষমতার দ্বন্ধে জনগণ যখন প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতায় ভূগছে তখন সেনাবাহিনীকে সে ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য রাজনৈতিক ভূমিকায় ব্যবহার করা হয়েছে। ওয়ান ইলেভেন এর মতো আগামী দিনেও সেনাবাহিনীকে একই ভূমিকায় দেখা যেতে পারে আর তা হবে মার্কিন ভারতের সমর্থনে। দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী নিয়ে খালেদার বক্তব্য এবং এ নিয়ে সরকার প্রধান থেকে শুরু করে সরকারের মন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বক্তব্য, সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকাকে সামনে নিয়ে এসেছে । তাছাড়া পিলখানা হত্যাকান্ড নিয়ে এই দেশের সাধারণ জনগণ এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ভারত বিরোধী ক্ষোভ বিরাজ করছে। মূলত পিলখানা হত্যাকান্ড ছিল সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ভারত বিরোধী কর্মকর্তাদের প্রতি ভারতের শক্তিশালী সংকেত, যার মাধ্যমে এদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কে ধ্বংস করা হয়েছে। কাপুরুষজনোচিত এই হত্যাকান্ডের পেছনে আমেরিকার ছিল মৌন সমর্থন, আওয়ামীলীগ সরকার ও ছিল পূর্ণ সচেতন, আরেক মার্কিন দালাল বিএনপি ছিল নিশ্চুপ।
এই হত্যাকান্ড সংঘটিত করেই থেমে থাকেনি ভারত, সেনাবাহিনীর উপর তার কর্তৃত্ব কে দৃঢ় করার জন্য সেনাবাহিনীর সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে পরিকল্পনা নিয়েছে। বিগত কয়েক বৎসর ধরে সেনাবাহিনীর সাথে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘সম্প্রতি‘ নামক সামরিক মহড়া সে পরিকল্পনারই অংশ। তাছাড়া ভারতের ট্রেনিং কলেজ গুলোতে বাংলাদেশের সেনা ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। আর এটা ঘটছে দীর্ঘদিন ধরে সেনাবাহিনীর উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকারী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সমর্থনে। আমেরিকার ‘এশিয়ান পিভট‘ নীতির গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র ভারত। আমেরিকা দুইটি লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে তার নীতি কে শক্তিশালী করছে আর তা হলো চীনের উত্থান কে ঠেকানো তথা এর প্রভাবকে নিয়ন্ত্রন করা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় পুঁজিবাদ বিরোধী ইসলামের রাজনৈতিক উত্থান কে দমন করা। কাজেই আমেরিকার দক্ষিণ এশিয়া নীতি মূলত ভারত কেন্দ্রিক নীতি।
দক্ষিণ এশিয়া কে কেন্দ্র করে মার্কিন-ভারতের রাজনৈতিক সামরিক অর্থনৈতিক সমঝোতা, তারই আলোকে সেনাবাহিনীর উপর মার্কিন-ভারতের কর্তৃত্ব ও প্রভাবকে দেখতে হবে। আমেরিকা-ভারত সন্ত্রাসবাদ ঠেকানোর নামে ইসলামের রাজনৈতিক উত্থান ঠেকাতে মরিয়া হয়ে ওঠেছে। তাই সেনাবাহিনীর সাথে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ও মুশরিক আধিপত্যবাদী শক্তি ভারতের সামরিক মহড়া, সামরিক সংলাপ এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ভারত বিরোধী ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের পিলখানায় হত্যাকান্ড, গুম, খুন, গৃহবন্দী, চাকরি থেকে বহিষ্কার একিই সূত্রে গাঁথা।
সোমবার থেকে শুরু হওয়া সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার ভারত সফরকে ও ভিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। এটা নিছক কোনো সামরিক সফর বলে মনে হচ্ছে না, পত্রিকার বরাতে যতটুকু জানা গেছে তাতে সেনাপ্রধান শুধুমাত্র ভারতের সেনাপ্রধানের সাথে দেখা করবেন না সে সাথে ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে বিশেষ করে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী অ্যান্টনিওর সাথেও বৈঠক করবেন। তাছাড়া সাম্প্রতিক ভারতের আগ্রাতে দ্বিতীয় রাউন্ড “সম্প্রতি” মহড়া সম্পন্ন হয়েছে, যা গত বৎসর থেকে প্রথম বারের মতো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাথে শুরু হয়েছে। এছাড়া এপ্রিল-মে মাসে ঢাকাতে আমেরিকার সাথে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদ দমন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় পররাষ্ট্র পর্যায়ে নিরাপত্তা সংলাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যার আগে বৈঠকটি হয়েছিল আমেরিকায়। এছাড়া একের পর এক মার্কিন বাহিনীর সাথে সামরিক মহড়া ‘টাইগার শার্ক‘, নৌ মহড়া সংঘটিত হচ্ছে। খুব শীঘ্রই আমেরিকা বাংলাদেশ নৌ বাহিনী কে একটি যুদ্ধজাহাজ উপহার দিতে যাচ্ছে। আর এসব কিছু করার একটাই কারণ তা হলো সেনাবাহিনীর উপর মার্কিন নেতৃত্ব বজায় রাখা ও ভারতের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যাতে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মতো বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকেও তথাকথিত সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধে মার্কিন-ভারতের ভূকৌশলগত স্বার্থে ব্যবহার করা যায়।
নিঃসন্দেহে ভূকৌশলগত অবস্থান এবং ইসলামী আকীদার কারণে বাংলাদেশ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মার্কিন-ভারতের সমঝোতার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হবে। আর আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতায় তারাই আসবে যারা এই দুই শক্তির স্বার্থকে রক্ষা করতে পারবে। কাজেই এই দেশের মুসলিমদের সাম্রাজ্যবাদ-আধিপত্যবাদ বিরোধী লড়াই শুধু মাত্র তাদের তল্পিবাহক দালাল বিএনপি-আওয়ামী জোটের বিরুদ্ধে নয় সে সাথে এই সব দালাল তৈরির কারখানা ঔপনিবেশিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কে অপসারণ এবং সে সাথে মুসলিম ভূখন্ডের উপর সাম্রাজ্যবাদীদের কর্তৃত্বকে নিশ্চিন্ন করার জন্য খিলাফত রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার দিকে এগিয়ে নিতে হবে। আর সেনাবাহিনীর উচিত দুর্নীতিগ্রস্থ ঘুণে ধরা ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা গণতন্ত্রকে উৎখাতে নিষ্ঠাবান রাজনীতিবিদদের সহায়তা করা যাতে উম্মাহ কুফর থেকে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা খিলাফতে প্রত্যাবর্তন করতে পারে। উম্মাহ খালিদ বিন ওয়ালিদের উত্তরসূরী সেনাবাহিনীকে মার্কিন-ভারতের স্বার্থের পাহারাদার নয় বরং শাহাদাতের কালিমা বহনকারী বাহিনী হিসেবে দেখতে চায়।
এম. মোরশেদ আলম
প্রথম প্রকাশঃ ২ এপ্রিল ২০১৩
আপনি কার উপাসনা করেন?

তিটি মানব সন্তানই কোন একটি সত্ত্বার উপাসনা করতে চায় । কিন্তু মানুষ উপাসনা করতে চায় কেন? প্রকৃতিগতভাবে মানুষ দুর্বল । সে দুর্বলতা আমরা আমাদের মাঝে উপলব্ধি করতে পারি এবং কোন কিছুর উপর নির্ভর করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি । ফলে মানুষ যখন তার চেয়ে শক্তিশালী কারও অস্তিত্ব টের পায়,তখন প্রায়শঃ তারা তত্ত্বাবধান, নিরাপত্তা ও আশা পুরণের জন্য ঐ সত্ত্বার উপর নির্ভর করে । প্রাচীনকালে মানুষ সূর্য, চাদঁ, তারা, পর্বত, পশু এমনকি তার নিজ হাতে তৈরি মূর্তির সম্মুখেও মাথা নত করত।
তেমনিভাবে, বর্তমান কালে আমরা দেখতে পাই, অসংখ্য দেবতার অস্তিত্ব- যাদের সামনে মানুষ মাথা নত করে। অনেক দার্শনিক, রাজনীতিবিদ ও চিন্তাবিদকে উপদেবতা জ্ঞানে আরাধনা করা হয় । সমাজের অনেকের জন্যই তারা যাবতীয় সমস্যা সমাধানের উত্সস্বরুপ। অপরদিকে জনপ্রিয় চিত্রাভিনেতা,সংগীতশিল্পী এবং ক্রীড়াবিদরাও কারো কারো উপাস্যের আসন দখল করে নিয়েছে; এদের অনুসরণ ও সমকক্ষ হওয়ার চেষ্টাতেই অনকের পুরো জীবন ব্যপ্ত। আরো কিছু মানুষ আছে যারা নিজের কামনা-বাসনার দাসে পরিণত হয়েছে। তাদের কামনা-বাসনাই তাদের উপাস্য।
ইসলাম এসেছে মানুষকে চিন্তা করাতে যে সে কার দাসত্ব করছে । অনেক সময় মানুষ যাদের দাসত্ব করে তারা তার নিজের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয় । তারাও তারই মত সীমাবদ্দ্ব ,দুর্বল ও পরমুখাপেক্ষী । তাহলে মানুষ এসব জিনিসকে কেন উপাসনা করবে ? ইসলাম এসেছে মানুষকে সীমাবদ্ধ, দুর্বল জিনিসের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে মহান স্রষ্টা আল্লাহ’র দাসত্বে নিয়োজিত করতে । আল্লাহ’ই সকল কিছুর স্রষ্টা এবং একমাত্র তিনিই প্রার্থনার যোগ্য । আল্লাহ্ পাক সূরা আয্-যারিয়াতে বলেন ,
“আমি জ্বিন ও মানব জাতিকে একমাত্র আমার ইবাদতের উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছি।“
মানুষের সকল দিক নির্দেশনার একমাত্র উত্স আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। অর্থাত্ মানুষের সকল ধ্যান ধারনা, জীবনের যাবতীয় সমস্যার সমাধান ও সমাজ পরিচালনার নীতিমালার একমাত্র উত্স হচ্ছেন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা । দুর্ভাগ্যবশতঃ আজকের দিনে আমরা আমরা শুধুমাত্র জায়নামাযেই আল্লাহকে স্বরণ করি ।আমাদের যাবতীয় লক্ষ্য , জীবনের উদ্দেশ্য, সামাজিক রীতিনীতি ও আইন-কানুন আসে অন্যান্য দুর্বল উপাস্যের কাছ থেকে । আসুন আমরা সকলে মিলে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা)” এর প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করি, যাতে করে আমাদের সম্পুর্ণ জীবন ব্যবস্থাটাই আল্লাহ্’র ইবাদত হয়ে যায় ।ইসলাম শুধুমাত্র নামাজ, রোজা ও কয়েকটি রীতিনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়

আজকাল ইসলাম কয়েকটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান সর্বস্ব ব্যাপার হয়ে দারিয়েছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া, রমযানের রোযা রাখা, হজ্ব করা, লম্বা জামা ও টুপি পড়া এবং জুম্মার নামাজের পর লম্বা দোয়া করা ইত্যাদিকেই বর্তমানে ইসলামের বিধিবিধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমাদের প্রাত্যহিক কার্যাবলীর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। আমাদের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, আমাদের পছন্দ ও অপছন্দ ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত। টাকা, ফূর্তি এবং স্থুল বাসনা চরিতার্থ করাই এখন প্রত্যেকের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
ইসলাম প্রচলিত অন্যান্য ধর্মের মত নয়। এটি মানবজাতির জন্য একটি ব্যবহারিক ও সামগ্রিক জীবনবিধান। আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং জীবনযাপনের নিয়ম-কানুন তিনিই প্রদান করেছেন। আল্লাহ পাক সূরা আল মায়েদাহ্-তে বলেন-
“আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্য পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের উপর আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জীবনবিধান হিসেবে মনোনীত করলাম।“
ইসলাম, জীবনযাপন উপযোগী ব্যাপক সমাধান ও আইন প্রনয়ন করেছে। ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক জীবন সহ সবকিছুতেই ইসলাম সুস্পষ্ট আইন ও বিধান প্রদান করেছে। আল্লাহ আমাদের সাথে তার সম্পর্কের পদ্ধতি প্রদান করেছেন, যেমনঃ নামায, রোজা, হজ্ব ইত্যাদির; আবার ব্যক্তির নিজের সাথে নিজের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পদ্ধতি প্রদান করেছেন, যেমন: মানুষ যা খায় এবং যা পড়ে সে সম্পর্কের বিধান। এছাড়াও আল্লাহ তা’আলা সমাজে মানুষ অন্য মানুষের সাথে কিভাবে সম্পর্ক স্থাপন করবে তা নিয়ন্ত্রণ করা জন্যও বিধান প্রণয়ন করেছেন; যেমন কিভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে, কিভাবে শাসনকার্য ও বিচার ব্যবস্থা চলবে এমনকি বিপরীত লিঙ্গের সাথে আচরণ কিরূপ হবে।
সূরা আন-নাহল এ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-
“এবং আমি আপনার নিকট এমন এক পুস্তক প্রকাশ করেছি যাতে সকল বিষয়ে সবিস্তারে বর্ননা করা হয়েছে।“
যেহেতু আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবন থেকে আল্লাহর মনোনীত দ্বীন-ইসলামকে পরিত্যাগ করেছি, সেহেতু আমাদের জীবনে ধ্বংস, বিশৃঙ্খলা ও হতাশা ভয়ংকর রূপে দেখা দিয়েছে। মানুষের উদ্ভাবিত ধ্যান-ধারনা ও আইনকানুন আমাদের অবস্থার পরিবর্তন করতে সম্পূর্নরূপে ব্যর্থ হয়েছে। এখন সময় এসেছে ইসলামকে কিছু আচার সর্বস্ব ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান হিসেবে গ্রহণ করার।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির সংক্ষিপ্ত আলোচনা: পরিবর্তন নাকি সাম্রাজ্যবাদীদের ফায়দা লুটের উত্তম পরিবেশে বাংলাদেশ?

বেশ দীর্ঘ সময় যাবৎ বাংলাদেশের আভ্যন্তরীন পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। শাহবাগ রাজনীতি থেকে শুরু করে অন্যান্য সকল ইস্যুগুলোর ফলে বাংলাদেশ একরকম গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মত দিচ্ছেন অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ।
কিন্তু প্রশ্ন হল আসলেই কি বাংলাদেশ গৃহযুদ্ধের দিকে যাচ্ছে নাকি সাম্রাজ্যবাদীদের ধারাবাহিক চক্রান্তের বেড়াজালে ঘুরেফিরে আটকা পরে আছে??
একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, বর্তমানে যেসকল বিষয়সমূহ আমাদের সামনে সুনিপুণভাবে তুলে আনা হচ্ছে, তার প্রত্যেকটি সাম্রাজ্যবাদীদের সুদীর্ঘ পরিকল্পনার ক্ষুদ্র অংশবিশেষ।
বাংলাদেশে প্রতি নির্বাচন পূর্ববর্তী মৌসুমে এই ধরণের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়ে থাকে এবং নির্বাচন পর্যন্ত তা টিকিয়ে রাখা হয়। আর এর মধ্যেই জনগণের নিকট ৫ বছর যাবৎ হয়ে আসা যুলুমের সমাধান হিসেবে অপর যালিমকে পছন্দের ব্যাপারটি তুলে ধরা হয়; যে/যারা কিনা এর পূর্বে বারবার প্রতারণা করে আসছে। আর এভাবেই মার্কিন-ভারতের স্বার্থসিদ্ধির দ্বার খোলা থাকে পরবর্তী ৫ বছরের জন্যও।
আর এই চক্রান্তের ধারাবাহিকতায় মূলত এতসকল জাগরণ-আন্দোলনের বহিঃপ্রকাশ; যেখানে সমাধান একেবারেই অনুপস্থিত। আর উম্মাহকে ব্যস্ত রাখা হয়েছে এসকল নাট্যমঞ্চ দ্বারা।
কিন্তু এবার এই চক্রান্ত পূর্বের তুলনায় অধিক ভয়াবহ; কারণ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এই অঞ্চলে চীনের উত্থান এবং পুঁজিবাদের বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি খিলাফতের প্রখর সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে পেরেছে এবং সেই লক্ষ্যে তার এজেন্ডা বাস্তবায়নে তড়িঘড়ি শুরু করেছে।
কিছুদিন আগে (১১ই মার্চ, ২০১৩) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনার বক্তব্যে এই এই উপমহাদেশে বাংলাদেশকে ঘিরে মার্কিন-ভারতের ঐক্যবদ্ধ চক্রান্তের ধারাগুলো স্পষ্টরূপে ফুটে উঠে।
বাংলাদেশ এবং এই উপমহাদেশকে ঘিরে আমেরিকার পরিকল্পনা সুদীর্ঘ এবং বিগত বছরগুলোতে আমরা এর বাস্তবায়নের পাঁয়তারা দেখে আসছি।
দালাল শসক দ্বারা সামরিক মহড়া থেকে শুরু করে মার্কিন স্বার্থপন্থী চুক্তিসমূহ একের পর এক বাস্তবায়ন ঘটিয়ে যাচ্ছে এবং সেনাবাহিনীর উপর কতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে অবিরত। কারণ, নিষ্ঠাবান সেনা অফিসারদের মাঝে তাদের দালাল সৃষ্টি প্রচেষ্টা সফল হলে, তাদের কুকীর্তি সম্পাদনে সেনাবাহিনীর তরফ থেকে বাধা আসবেনা আর তারা তাদের ঘৃণ্য কার্যক্রম চালিয়ে যাবে নিশ্চিন্তে। আর সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এ বছর বাংলাদেশেই তারা আয়োজন করতে যাচ্ছে মিলিটারি-মিলিটারি কনফারেন্স।
তাছাড়া, মে মাসের মাসের ২২ তারিখ বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে আমেরিকা United States Coast Guard Cutter Jarvis নামক একটি নৌযান উপহারের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের পাঁয়তারা করে যাচ্ছে।
মজিনা বাংলাদেশে F.B.I এর উপস্থিতি সুনিশ্চিতকরণ এবং সেনাবাহিনীর সাথে বিভিন্ন যৌথ মহড়ার পাশাপাশি অন্যান্য কার্যক্রম বিস্তারণের কথাও বলেছে; যা বাংলাদেশের জন্য অশনি সংকেত বৈ আর কিছুই নয়।
আমরা যদি পাকিস্তানের দিকে তাকায়, তবে দেখব দালাল শাসকদের সাহায্যার্থে একইভাবে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সাথেও যৌথ মহড়ার নামে তাদের জাল বুনেছিল সেনাবাহিনীতে আর পাকিস্তানে “রেইমন ডেভিস” বা “ব্ল্যাক ওয়াটারের” উপস্থিতি সুনিশ্চিত করে। ফলশ্রুতিতে আজ পাকিস্তানের বাস্তবতা ভয়াবহ।
বাংলাদেশ থেকেও একইভাবে ফায়দা লুটতে তারা এই অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে; পাশাপাশি F.B.I এখানে জনগণের মাঝে মার্কিন গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাবে; যা কিনা পরবর্তীতে মার্কিনিদের অবস্থান সুনিশ্চিতকরণের দ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
পাশাপাশি তাদের অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দী চীনকে দমনে সে সাথে করে নিয়েছে ভারতকে। বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্যিক চুক্তির নামে ইনদো-প্যাসিফিক করিডোর নির্মানের ব্যবস্থা করছে; যা শুধুমাত্র ভারত-মার্কিন স্বার্থ নিশ্চিত করবে।
যদিও পরবর্তীতে ভারতকেও নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত এই সমঝোতা। আর এতসব চক্রান্ত বাস্তবায়নের ইস্যুগুলো বাংলাদেশে আমরা বর্তমান দেখতে পাচ্ছি।
মজিনা তার বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে পরবর্তী ৫ বছরে বাংলাদশের সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে তার কার্যক্রমের ব্যাপারে দৃঢ়তা প্রকাশ করেছে। অর্থ্যাৎ, পরবর্তী ৫ বছরের সরকার সম্পর্কে তারা নিশ্চিত আর জনগণকে তারা লেলিয়ে রেখেছে হাসিনা-খালেদার মত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার উচ্ছিষ্ট নিয়ে কামড়া-কামড়িতে।
অথবা, এমন কিছু তথাকথিত আবেগী আন্দোলনের সাথে যেখানে উম্মাহ’র পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা পর্যন্ত নেই; বরং লুকিয়ে আছে কাফিরগোষ্ঠী এবং তার দালাল বাহিনীর ভয়ঙ্কর চক্রান্ত।
অবশ্যই, সমধানের জন্য এসকল সাম্রাজ্যবাদী কুফর শক্তি বা তাদের দালালদের কাছে অথবা এই শাসনব্যবস্থার মাঝে ঘুরপাক খাওয়া আবর্জনার মাঝে ঘুরপাক খাওয়ার সমতুল্য।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে অবশ্যই আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে মার্কিন-ভারতের এইসব চক্রান্তের বিরুদ্ধে এবং তাদের দালালসমূহ ও দালাল তৈরির কারখানা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, ইসলামী জীবন ব্যবস্থা আলিঙ্গনে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা একমাত্র সমাধান।
আল্লাহ আমাদের সত্য উপলব্ধি এবং এর ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাওফীক দিন এবং মুসলিম উম্মাহ’র গৌরব খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যবস্থা ফিরিয়ে দিন।
ইসলামের বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা

ইসলামের বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থাকে বর্বরোচিত এবং পশ্চাদপদ হিসাবে আখ্যায়িত করে ইসলামের শত্রুরা ব্যাপকভাবে আক্রমণ করে আসছে। এই অপবাদ নিরসন করতে আজকের এই প্রবন্ধে ইসলামের বিচার এবং শাস্তির ব্যবস্থার উপর আলোকপাত করা হয়েছে এবং পশ্চিমাদের অপপ্রচার (বিকৃতি) উন্মোচন করা হয়েছে।
ইসলামের বিচার ব্যবস্থা :
যে কোন বিষয়ে ইসলামের সিদ্ধান্ত বা রায় কে বাধ্যতামূলকভাবে প্রয়োগ করাকে ইসলামের বিচার ব্যবস্থার মূলনীতি হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে। এটি নিম্নলিখিত দায়িত্বগুলো পালন করবে :
১) জনগণের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি;
২) সামাজিক অধিকারের জন্য ক্ষতিকর সবকিছু প্রতিহত করা;
৩) জনগণ এবং সরকারের (যথা- খলীফা, ওয়ালী’র ইত্যাদির) মধ্যে উদ্ভুত বিরোধ নিষ্পত্তি করা।
ইসলামের জন্মলগ্ন থেকেই আদালত এবং বিচার ব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে যা ইসলামের আইনের মৌলিক উৎস যথা- কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা এবং কিয়াস দ্বারা পরিবেষ্টিত (নিয়ন্ত্রিত)।
একজন প্রধান বিচারক নিয়োগের মাধ্যমে বিচারিক অঙ্গনের কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হয়, যিনি অন্যান্য সকল বিচারক নিয়োগ এবং স্তর/ কার্য পরিধি নির্ধারণের দায়িত্ব পালন করেন।
ইসলামের তিন ধরণের বিচারকের অস্তিত্ব বিদ্যমান। খলীফা একজন বিশ্বস্ত, যোগ্য, ও ন্যায়পরায়ন বিচারককে প্রধান বিচারপতি বা কাযী-উল্-কুযাত নিয়োগ করবেন। প্রধান বিচারপতি বিধি মোতাবেক নিন্মলিখিত বিচারকদের নিয়োগ করবেন:
১. কাযী-উল্-খুসুমাত – কাযী উল খুসুমাত পারিবারিক আইন, চুক্তি আইন, ক্রিমিনাল আইন ইত্যাদি ব্যাপারে বিচারকার্য পরিচালনা করেন।
২. কাযী-উল্-মুহতাসিব – কাযী উল মুহতাসিব ব্যবসা পরিদর্শক, অসামাজিক কার্যকলাপ বিরোধী পরিদর্শক, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য পরিদর্শক তথা জনস্বার্থ দেখাশুনাকারী বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কাযী মুহতাসিবের রায় প্রদান করার জন্য কোন বিচারালয় প্রয়োজন হয় না। তিনি যেকোন সময়ে যেকোন জায়গায় অপরাধ সনাক্ত করতে পারলে সাথে সাথে সেখানেই রায় প্রদান করে তা পুলিশের সাহায্যে বাস্তবায়ন করতে পারেন।
৩. কাযী-উল্-মাযালিম – কাযী-উল-মাযালিম খলীফা থেকে শুরু করে শাসকগোষ্ঠীর যেকোন ব্যক্তির যে কোন ধরণের অন্যায় আচরণের ব্যাপারে আইনী কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন। তিনি বাদি ছাড়াই নিজে উদ্যোগী হয়ে রাষ্ট্রের যে কোন দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে বিচারকার্য পরিচালনা করতে পারেন। খলীফার বিরুদ্ধে মামলা চলাকালীন সময়ে এই আদালতের বিচারককে পদচ্যুত করা যাবেনা।
সকল বিচারককে অবশ্যই মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক, স্বাধীন, স্বাভাবিক বুদ্ধি সম্পন্ন/ সুস্থ মস্তিস্ক/ প্রকৃতিস্থ, ন্যায়পরায়ণ/ সৎ এবং বিচারিক জ্ঞান সম্পন্ন অর্থাৎ কোন নির্দিষ্ট পরিস্থিতিকে কোন নীতি কিভাবে প্রয়োগ হবে তা জানতে হবে। সরকারের অন্যায় কাজের বিচারের জন্য নিযুক্ত বিচারকের অতিরিক্ত যোগ্যতা হলো তাঁকে অবশ্যই পুরুষ হতে হবে এবং মুজতাহিদ (যিনি ইজতিহাদের যোগ্যতা রাখেন) হতে হবে।
যে কোন শাসক, প্রশাসক, কর্মকর্তা এমনকি খলীফাকেও পদচ্যুত করবার কর্তৃত্ব রয়েছে কাজী মাযালমি এবং তা রাসূল (সা) ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সময় সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। রাসূল (সা) আব্দুল্লাহ্ ইবনে নাওকেল (রা) কে মদিনার বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন এবং রশিদ ইবনে আবদুল্লাহকে বিচার ব্যবস্থার প্রধান ও অভিযোগ সংক্রান্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ করেন। ।(ইবনু ইসহাক খণ্ড ৪ ও ইমাম শা’ফীর “সহজ আইন বিজ্ঞান”)। একজন বিচারক দিয়ে একটি আদালত গঠিত হয় এবং তিনিই রায় দেওয়ার ক্ষমতাপ্রাপ্ত। অন্য আরও বিচারক থাকতে পারেন, তবে তাঁরা কেবলমাত্র পরামর্শ দ্বারা সহযোগিতা করতে পারেন। প্রকৃত অর্থে তারা বিচারক নন। কারণ রায় নির্ধারিত হয় ইসলামের মৌলিক উৎস দ্বারা, পশ্চিমাদের মত মানব মস্তিস্ক দ্বারা নয়। যেহেতু কেবলমাত্র শতভাগ প্রমাণিত হলেই ইসলামে শাস্তি কার্যকর করার বিধান বিদ্যমান রয়েছে তাই ইসলামে আপীল আদালত নেই। সাক্ষ্য প্রমাণে কোন প্রকার সন্দেহ থাকলেই ঐ মোকদ্দমা বাতিল হয়ে যায়। যখন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়ে যায়, তখন ঐ বিষয়ে প্রদত্ত রায় স্বয়ং আল্লাহর রায় হিসাবে গণ্য হয় এবং তা ফিরিয়ে নেয়া যায় না।
বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা
– ইসলামী রাষ্ট্রে শরিয়াহ্ অনুযায়ী বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা । যেহেতু খিলাফত রাষ্ট্রে বিচার ব্যবস্থা স্বাধীন, সেহেতু বিচার বিভাগ জনগণের উপর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে করে।
– খিলাফত রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থা নিরপেক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত। বিচারকের অন্যায়ের ব্যাপারে ইসলাম কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছে। এজন্য বিচারকগণ শরীয়াহর প্রত্যেকটি আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করবেন এবং পরিপূর্ণ দায়িত্ববোধ থেকে কর্তব্য পালন করেন।
– খিলাফত রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রিতার কোন অবকাশ নাই। নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য নির্দিষ্ট আইন বিদ্যমান থাকায় দ্রুত বিচার কার্যক্রম এই শাসন ব্যবস্থার একটি গতিশীল দিক।
– বিচার প্রাপ্তি সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যূনতম সরকারী ফি নির্ধারণ ও নিশ্চিতকরণ করা হয়ে থাকে।
– বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষ্যে খিলাফত রাষ্টের বিচার ব্যবস্থা রাষ্ট্রের প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি নাগরিকের হাতের নাগালের মধ্যে নিয়ে যাওয়া খলিফার দায়িত্ব। তাই জনগণকে বিচার প্রাপ্তির জন্য অযথা হয়রানিমূলকভাবে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে আর্থিক, শারীরিক ও মানসিক কষ্ট স্বীকার করতে হয় না।
ইসলামের শাস্তির ব্যবস্থা : (নিজাম আল উকুবাত)
ইসলামের শাস্তির ব্যবস্থা তথা দন্ডবিধি হচ্ছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দয়ার প্রমাণ এবং ইসলামের সৌন্দর্য্য। দন্ডবিধির মূলনীতি সমূহ নিম্নরূপ :
১) একজন মুসলিম (পুরুষ বা নারী) তার প্রত্যেকটি কাজের জন্যই দায়িত্বশীল। শরীয়াহতে যে সকল অপরাধের শাস্তি নির্দিষ্ট করা আছে তা রাষ্ট্র কার্যকর করবে। সমাজকে রক্ষা করে শুধুমাত্র এই কারণেই এই নীতি গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং শরীয়াহ্ আদালতের মাধ্যমে কোন অপরাধের শাস্তি হয়ে গেলে ঐ একই অপরাধের জন্য আখিরাত তথা পরকালের শাস্তি থেকে পরিত্রাণ পাওযা যায়। কারণ দুনিয়ার তুলনায় আখিরাত বা জাহান্নামের শাস্তি বহুগুণ কঠিন এবং যন্ত্রণাদায়ক। রাসূল (সা) এর সময় অনেক মুসলিম তাদের নিজেদের অপরাধ নিজেরাই স্বীকার করতো, কারণ শেষ বিচারের দিন তাদের ঐ অপরাধ আমলনামায় গণ্য হোক তা তারা চাইতো না। আবু দাউদ হতে বর্ণিত, যখন একজন লোক নিজের অবৈধ যৌনাচার নিজে স্বীকার করল এবং পাথর নিক্ষেপ করে তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হলো তখন রাসূল (সা) বললেন “কস্তূরীর সুগন্ধির চেয়ে সে আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দীয়”। অপর একটি হাদীসে বর্ণিত আছে, আবু দাউদে বর্ণিত, “রাসূল (সা) এর নিকট একজন মহিলা আসলো এবং বললো, ‘আমি জেনা করেছি’। রাসূল (সা) বললেন, ‘চলে যাও’। সে ফিরে গেল এবং পরের দিন আবার আসলো এবং বললো “সম্ভবতঃ আপনি আমাকে ফিরিয়ে দিতে চান যেমনি দিয়েছিলেন মা ইয বিন মালিককে। আমি আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি আমি গর্ভবতী।” তিনি (সা) বললেন, ‘চলে যাও’, এবং শিশুর জন্মের পর আস, সে শিশুর জন্মের পর আসলো এবং বললো, “এইতো সে। আমিই তাকে জন্ম দিয়েছি।” তিনি (সা) বললেন, ‘চলে যাও এবং তাকে পান করাও যে পর্যন্ত না স্তন না ছাড়াও’। যখন মহিলাটি শিশুটিকে স্তন ছাড়াল তখন সে তাকে নিয়ে রাসূল (সা) এর নিকট আসলো। এই সময় শিশুটির হাতে কিছু ছিল যা সে খাচ্ছিল। তখন শিশুটিকে মুসলিমদের মধ্যে একজনকে দেয়া হল এবং রাসূল (সা) মহিলাটির বিষয়ে নির্দেশ দিলেন- অতঃপর তার জন্য একটি গর্ত খোড়া হল এবং তিনি (সা) তার বিষয়ে নির্দেশ দিলেন এবং মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তাকে পাথর নিক্ষেপ করা হল। যারা পাথর ছুড়েছিল তাদের মধ্যে একজন খালিদ। সে তাকে একটি পাথর নিক্ষেপ করলো। যখন মহিলাটির এক ফোঁটা রক্ত তার গালে পড়ল, তখন সে মহিলাটিকে গালি দিল। তখন রাসূল (সা) তাকে বললেন, “হে খালিদ, বিনীতভাবে। সেই স্বত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, সে এতবেশি অনুতপ্ত হয়েছে যে, যদি কোন বর জালেম ও এই ধরণের তওবা করত তবে সে ও মাফ পেয়ে যেত। ।” এরপর তার বিষয়ে নির্দেশ দেয়া হল, তিনি (সা) তার জন্য দোয়া করলেন এবং তাকে কবর দেওয়া হল। (মুসলিম)
২) দন্ডবিধির নীতি হল “শাস্তিকে যথাসম্ভব নিবৃত্ত করা”, যেহেতু শাস্তির কঠোরতা নিবৃত্তির প্রাথমিক কাজ করে। কোন প্রমাণের অংশ বিশেষ ও যদি সন্দেহজনক হয় তা শাস্তি নিবৃত্ত করবে। যখন রাসূল (সাঃ) এর নিকট কোন লোক এসে তাদের অপরাধ স্বীকার করে তাদের উপর শাস্তি কার্যকর করার আবেদন জানাতো তখন রাসূল (সা) শাস্তি প্রয়োগ করা হতে নিজেকে সরিয়ে রাখতে কিভাবে চেষ্টা করতেন তা সীরাতে বর্ণিত আছে। তিনি (সা) বলেছেন, “একজন নিরপরাধীকে শাস্তি প্রদান করার চেয়ে একজন অপরাধীকে মুক্তি দেয়া উত্তম।” একজন ইমামের জন্য ভুলক্রমে একজনকে শাস্তি দেয়ার চেয়ে ভুলক্রমে একজনকে ক্ষমা করা উত্তম।”
এরপরেও কি একজন মুসলিম ইসলামী দন্ডবিধির বিরুদ্ধে পশ্চিমা আক্রমণ কল্পনা করতে পারে। আসলে এই বিষয়ে তাদের মিথ্যা প্রচার এবং বিকৃতিতো রয়েছেই, দায়ী তাদের অজ্ঞতাও।
অধিকন্তু পশ্চিমাদের তুলনায় ইসলামের সৌন্দর্য লক্ষ্য করুন। তাদের মৌলিক দর্শন হচ্ছে কাউকে অভিযুক্ত করা বা সাজা দেয়ার জন্য সামান্য একটুকরা দলীল খোঁজা বা সাক্ষী যোগাড় করে তার মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণ করা। ষষ্ঠ বার্মিংহাম কিংবা ৪র্থ গিলফোর্ডের কথা স্মরণ করুন যারা প্রত্যেকেই জেলখানায় কয়েক বছর সাজা ভোগ করার পর নিরপরাধী প্রমাণ হয়েছিল। ইসলামের পুনরুত্থানের দুশ্চিন্তায় পশ্চিমারা আজ এতটাই বিকাররগ্রস্থ হয়ে পড়েছে যে, একজন মুসলিমকে সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করে সাজা দেয়ার জন্য তার মুখের দাঁড়ি কিংবা পরিধানের হিজাবকেই পশ্চিমারা যথেষ্ট/ পর্যাপ্ত প্রমাণ হিসাবে বিবেচনা করছে!
৩) ইসলাম পাঁচটি বিষয় সংরক্ষণ করে যা জিম্মিদের (অমুসলিম নাগরিক) ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। রাসুল (সা) বলেছেন, “যে কোন জিম্মির ক্ষতি করলো, সে যেন আমারই ক্ষতি করলো।” তাছাড়া ইসলামী রাষ্ট্রের মধ্যে সকল নাগরিককে সমান দৃষ্টিতে দেখা হয় এবং এক্ষেত্রে কোনরূপ বৈষম্য বৈধ নয়। বিষয়গুলো নিম্নরূপ :
ক) বিশ্বাস : পশ্চিমা ধর্ম নিরপেক্ষ নীতি ধর্মকে ক্রমাগত আক্রমণের বিষয়বস্তুতে পরিণত করেছে। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র ইসলাম নয়, যে কোন ধর্মীয় বিশ্বাস, এমনকি খৃষ্টাণ ধর্ম এবং আমাদের পূর্ববর্তী নবী-রাসুলগণ যথা ঈসা (আ)-কেও আক্রমণ এবং অসম্মান করার পিছনে তাদের তথাকথিত বুদ্ধিজীবিরা অপরিমিত সময় অপচয় করেছে এবং করে যাচ্ছে। পবিত্র কুরআনে আছে “দ্বীনের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি নেই” (২:২৫৬) অর্থাৎ অমুসলিমদেরকে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করা যাবে না এবং তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস লালন ও পালনের অধিকার সংরক্ষিত। কিন্তু ইসলামী আক্বীদা-ই যেহেতু দ্বীনের ভিত্তি, তাই যে কোন অমূল্য রত্নের মতই দ্বীনকে সংরক্ষণ করা হয়। আর তাই কেউ একবার ইসলাম গ্রহণ এবং উপদেশ প্রাপ্ত হবার পর ত্যাগ করতে চাইলে তার শাস্তি হচ্ছে ইসলাম বিশ্বাসকে অপমান করার শাস্তির মতই মৃত্যুদন্ড। অদ্ভূত বিষয় হচ্ছে, সালমান রুশদী কিংবা সম্প্রতি বাংলাদেশের তাসলিমা নাসরিনের বিষয়টিকে পশ্চিমারা অগ্রহণযোগ্য দাবী করে, আবার তারাই নিজেদের বিশ্বাসের নামে অন্য মানুষকে হত্যা এবং ধ্বংস করার নীতি অবলম্বন করে।
খ) সম্মান : ইসলামে নারীর সম্ভ্রমকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে দেখা হয় এবং নারীকে যে কোন প্রকার ক্ষতি, অপমান, অপবাদ থেকে কঠোরভাবে নিরাপত্তা দেয়া হয়। এটি রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক। এটি পুরোপুরিই পশ্চিমা নীতির বিপরীত, যারা নারীকে কেবলমাত্র কামনার দৃষ্টিতেই দেখে এবং নারী দেহকে বিপনন যোগ্য পণ্যের মতই ব্যবহার করে। যারা পেছনে/ অসাক্ষাতে কোন নারীর বিরুদ্ধে অপবাদ রটনা করে তাদের শাস্তি দেয়ার মাধ্যমেও ইসলাম নারীকে সুরক্ষা দিয়েছে। অধিকন্তু যারা জনসমক্ষে সঠিকভাবে নিজেদেরকে পর্দা দ্বারা আবৃত করেন না এবং যারা ব্যভিচার বা জিনা করে তাদেরকে শাস্তি প্রদানের মাধ্যমেও ইসলাম নারীর সম্ভ্রম ও মর্যাদাকে সমুন্নত করেছে।
গ) চিন্তা/মন/মস্তিস্ক : মদ পান এবং যে কোন বস্তু যা মস্তিস্ককে নেশাগ্রস্থ করে, তা ইসলামে নিষিদ্ধ। অপরদিকে পশ্চিমারা মদের উপরই জীবন-যাপন করছে, আর এখন তারা নেশাকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছে। এসব বিষয় যখন তাদের সামাজিক মূল্যবোধ এবং নৈতিকতাকে ধূলিস্মাৎ করে দিচ্ছে তারা এখন বিকল্প সমাধান সন্ধান করছে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
ঘ) সম্পদ : পশ্চিমা সরকারগুলো, তাদের ব্যাংক এবং এই ধরণের সংস্থাগুলো যেভাবে কৌশলে অত্যন্ত সভ্য চেহারা নিয়ে জনগণের সম্পদ প্রতিনিয়ত চুরি করে যাচ্ছে, ইসলাম সেখানে চুরির অপরাধ ঠেকাতে হাত কাটার মত কঠোর শাস্তির বিধান রেখে জনগণের সম্পদ সুরক্ষা করেছে। এই শাস্তিটাকে পশ্চিমারা বর্বরোচিত এবং পশ্চাদপদ আখ্যায়িত করে প্রবলভাব আক্রমণ করে আসছে। অথচ এই আক্রমণ একেবারেই ভিত্তিহীন, বরং তা ইসলামের প্রতি তার শত্রুদের প্রবল ঘৃণা এবং বিকৃতির ষড়যন্ত্র দিবালোকের মত উন্মোচন করতে সাহায্য করে। কারণ চুরির অপরাধে কারো হাত কাটতে হলেও কয়েকটি কঠিন শর্ত পূরণ করতে হয়। যথা : দুজন সাক্ষী থাকতে হবে, সম্পদ নিরাপদ স্থান হতে হস্তগত হতে হবে। এছাড়া যদি এমন কেউ চুরি করে যে নিতান্ত দরিদ্র এবং নিরুপায় ছিল, তাহলে উপরোক্ত শর্তগুলো পূরণ হলেও শাস্তি প্রযোজ্য নয়, যদি নির্দিষ্ট পরিমাণের (নিসাব) চেয়ে কম সম্পদ চুরি করে তাহলেও হাত কাটা হবে না। এগুলো এবং আরো কিছু শর্ত শাস্তির সম্ভাব্যতা হ্রাস করে অনেকাংশে।
ঙ) জীবন : রাসূল (সা) বলেছেন, “কা’বা” গৃহ এবং এর চতুর্পার্শে যা কিছু আছে তার চেয়ে একজন মুসলিমের রক্ত অধিক মূল্যবান।” আর তাই হত্যার শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদন্ড। অবশ্য নিহতের পরিবার ইচ্ছা করলে দিয়তের বিনিময়ে ক্ষমাও করতে পারে।
প্রত্যেক মানুষই এইসব নিরাপত্তা আকাঙ্খা করে যা শুধুমাত্র ইসলাম নিশ্চিত করে। যে কোন পুরুষ বা নারী জিজ্ঞেস করুন, তারা জীবন, সম্পদ, সম্ভ্রম ইত্যাদির নিরাপত্তা চায়। আর ইসলাম ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোন সমাজই এসব নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান করে না বরং পশ্চিমে প্রায়ই এসব নিরাপত্তার লংঘন এবং অপব্যবহার ঘটে থাকে। মাথার উপর ঋণের বোঝা, তার সাথে অপরাধের উচ্চতার, বিশেষত : ধর্ষন, চুরি ইত্যাদি এবং সেই সাথে এই সকল সমস্যার সমাধানহীন জীবন ব্যবস্থায় কোনভাবেই মানসিক প্রশান্তি অর্জন সম্ভব নয়।
ইসলামের দন্ডবিধি চার ভাগে বিভক্ত:
১) হুদুদ : এই শাস্তি হচ্ছে “আল্লাহর (সুবহানাহুতা ওয়া তা’আলা) অধিকার এবং তা কেউ ক্ষমা করতে পারে না।” ছয়টি ক্ষেত্র এর অন্তর্ভূক্ত:
ক) অবিবাহিত পুরুষ/ নারীর ব্যভিচার : (১০০ দোররা বা চাবুকের আঘাত), বিবাহিত পুরুষ/ নারীর ব্যভিচার : (পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা), সমকামিতা : (মৃত্যুদন্ড)।
খ) অপবাদ দেওয়া, সম্মান নষ্ট করা, মিথ্যা কথা প্রচার করা এবং উড়ো খবর রটানো (৮০ দোররা)।
গ) চুরি (হাত কাটা)
ঘ) মদ পান করা এবং নেশা করা (৮০ দোররা)
ঙ) দুই দল মুসলিম দ্বারা আইন লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘন। যথা : খলীফা আবু বকর (রা) এর সময় মুরুতাদদের যাকাত অস্বীকার করার বিষয়।
চ) মুরতাদ, অর্থাৎ কোন মুসলিম ইসলাম ত্যাগ করা (মৃত্যুদন্ড)।
২) আল-জিনায়াত: “ব্যক্তির অধিকার এবং ক্ষমা করারও অধিকারী”। মূলত : হত্যাকান্ড সংক্রান্ত ঘটনাগুলো হতে পারে তা বেআইনীভাবে কিংবা দূর্ঘটনাবশতঃ, এবং নিহত ব্যক্তির স্বজন বা পরিবারের দিয়তের বিনিময়ে ক্ষমা করার অধিকার এই ক্ষেত্রের অন্তর্ভূক্ত। উদাহরণ স্বরূপ :
ক) যে ব্যক্তি উদ্দেশ্যমূলকভাবে খুন করে তার ক্ষেত্রে দিয়ত হচ্ছে ১০০ উটের সমপরিমাণ যার মধ্যে ৪০টি হতে হবে গর্ভবতী।
খ) যদি কোন ব্যক্তি অনিচ্ছাকৃতভাবে কাউকে খুন করে সেক্ষেত্রে তার দিয়ত হচ্ছে ১০০ উটের সমপরিমাণ।
ইমাম আন-নাসায়ী তার বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ করেন যে, শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গের জন্য দিয়ত রয়েছে, যেমন চোখের জন্য রক্ত পণ হচ্ছে ৫০টি উটের সমপরিমাণ।
৩) আল-তা’জির : এটি হচ্ছে “সমাজের অধিকার”। যা কিছু সমাজের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে তা এই ক্ষেত্রের অন্তর্ভূক্ত, যেমন- রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার-চেচাঁমেচি করা বা রাস্তায় আবর্জনা ফেলা ইত্যাদি। রাষ্ট্রই এই ধরণের অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করে।
৪) আল-মুখালাফাত : এটি হচ্ছে “রাষ্ট্রের অধিকার”। এই ক্ষেত্রের অন্তর্ভূক্ত বিষয়ে রাষ্ট্র নিজেই নিয়ম/ আইন তৈরী করে থাকে। যেমন- রাস্তায় গাড়ির গতিসীমা অতিক্রম, যেখানে গাড়ি রাখার নিয়ম নেই সেখানে রাখা ইত্যাদি।
সর্বশেষ বলা যায়, বিচার করা এবং শাস্তি প্রয়োগ করার বাধ্য বাধকতার মধ্যেই বিচার এবং শাস্তির ব্যবস্থার মূল ভিত্তি নিহীত রয়েছে। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র ব্যতীত কোন ব্যক্তির জন্য কোন প্রকার শাস্তি কার্যকর করা বৈধ নয়। ইসলামি বিচার ও শাস্তি ব্যবস্তার এই সকল দায়িত্ব কার্যকর ভাবে প্রয়োগ করা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় পুরা উম্মাহ্ এর জন্য দায়ী থাকবে, যদিও তারা সালাত আদায় করে, হজ্ব করে, যাকাত দেয়। এই দায় থেকে অব্যাহতি পেতে রাসুল (সা) এর সুন্নাহর অনুসরণে ইসলামী রাষ্ট্র তথা খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজে যোগ দেয়া সকল মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক তথা ফরয। এই রাষ্ট্রই আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করবে।
“The Judicial And Punishment System” প্রবন্ধ থেকে অনূদিত
এস আহমেদ
























