Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা

    ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা

    নিম্মোক্ত প্রবন্ধটি সামাজিক ব্যবস্থা সম্বন্ধে মনোনিবেশ করা হয়েছে যা সমাজে সকল নারী পুরুষের মধ্যে সকল ব্যক্তিগত (ঘরে) ও সার্বজনিক (বাহিরে) সম্পর্ক ও একে অপরের সাথে মিথস্ক্রিয়াকে সুগঠিত করে। যদিও এটা বুঝা যায় যে ইসলামে সমাজের জন্য ব্যবস্থা সমূহ প্রতিটি একে অপরের সাথে পারস্পরিকভাবে সম্পর্কিত তাই একটি ব্যবস্থা ছাড়া আরেকটি ব্যবস্থা প্রয়োগের চেষ্টা করাটা শুধুমাত্র দুনিয়াবী জীবনে সর্বনাশা পরিনতির সৃষ্টি করেনা বরং আখিরাতেও দূর্দশার কারন হয় এবং এভাবে প্রয়োগ অনৈসলামিক এবং আল্লাহকে রাগান্বিত করে। উদাহারন স্বরুপ সমাজের ভারসাম্য এবং ইসলামী মূল্যবোধকে নিশ্চত করতেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বিচার ব্যবস্থা নির্দিৃষ্ট করে দিয়েছেন এবং তার উপর ভিত্তি করে শাস্তি দিতে বলেছেন। এ কারণেই, নিম্মোক্ত আয়াতের প্রয়োগটি হদ্দের কঠিন শাস্তির সাথে সম্পর্কিত যা সমাজে গভীর প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে সামাজিক ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন:

    “এবং যারা অভিযুক্ত করে একজন সম্মানী নারীকে কিন্তু তার পক্ষে চারজন স্বাক্ষী আনতে পারে না তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত করবে এবং আবার কখনও তাদের স্বাক্ষ্য গ্রহণ করা হবেনা। প্রকৃতপক্ষে তারাই হচ্ছে নাফরমান। কিন্তু যারা এরপর তওবা করে এবং সংশোধিত হয়, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম মেহেরবান”। [আন নূরঃ ৪-৫]

    এই আয়াতটি যথেষ্ট প্রমান ছাড়া কোন নারীর চরিত্রে কালিমা লেপন করে অভিযুক্ত করা সম্বন্ধে আলোকপাত করেছে। এটা সমাজে নারী যে সম্মানজনক সত্ত্বা সেই চিন্তাকে সু-প্রতিষ্ঠিত করে। যদিও তথাকথিত প্রগতিশীল স্বাধীনতাকামী এই সমাজে নারিদের সম্মান রক্ষা সম্বন্ধে কোনো ধারনা আমরা দেখিনা। এই সমাজে নারীর সত্ত্বাগত কোনো মূল্য নেই, আছে বানিজ্যিক মূল্য। নারীদের মর্যাদা আজ ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে পশ্চিমা গণমাধ্যমের পর্দায় এবং মা, কন্যা, বোন অথবা স্ত্রী হিসাবে তাদের ভূমিকা আজ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। আরেকটি উদাহারনের মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই যে, সমগ্র বিশ্বে আপাত প্রতীয়মান এই যে ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা না থাকার কারনে সমাজে মানুষের মৌলিক চাহিদা গুলো পূরণ করা যাচ্ছে না, তাই পুরুষের পক্ষে তার পরিবারের ভরণ পোষণ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাই বর্তমান সমাজের অবস্থা হচ্ছে স্বামী-স্ত্রী উভয়কে আজ তাদের পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য কাজ করতে হচ্ছে। তাই পরিবারে প্রত্যেকের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে একে অপরের সাথে সমঝোতা করে নিতে হচ্ছে।

    খিলাফত ধবংস হওয়ার প্রায় এক শতাব্দী পরও আমরা আজও মুসলিম বিশ্বে ইসলামি সমাজ ব্যবস্থার ছোঁয়া দেখতে পাই। কিন্তু অনৈসলামিক রাষ্ট্র কাঠামোর মাঝে ইসলামের এই সামাজিক মূল্যবোধ গুলো ফিকে হয়ে যাচ্ছে ও তার খাপ খাওয়ানো ব্যবস্থা সবাইকে সুবিধা দিতে পারছে না। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো ইসলামের সম্মানের চোখে নারীকে দেখার বিষয়টাকে ধ্বংস করে নারীকে অপব্যবহারের তীব্র চেষ্ঠা চালাচ্ছে। প্রতিটি ঘরে ঘরে তাদের স্যাটেলাইট নামক আগ্রাসী দানবের মাধ্যমে এই প্রচন্ড আক্রমনের জলন্ত স্বাক্ষী আরব বিশ্বের দেশগুলো। এটা হয় আমাদেরকে যৌন হতাশার দিকে ঠেলে দেয় অথবা তথাকথিত স্বাধীনতা চর্চাকে উৎসাহিত করে। কিছু দেশে দুটিই সহবস্থান করে, যেমন: তুরস্ক, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান।

    নারী পুরুষের সম্পর্কের অব্যবস্থাপনার কারনে সমাজের সামাজিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে যে অপরাধ, অসৎ কাজ সমাজে আমরা দেখতে পাই তার কারন হচ্ছে সেই দূষিত ভিত্তি যার উপর ভিত্তি করে দাড়িয়েছে সামাজিক ব্যবস্থা, আর অন্য সকল ব্যবস্থা। প্রকৃতপক্ষে পুরো ব্যবস্থাই এই দূষিত ভিত্তির উপর দাড়িয়ে আছে। “সামাজিক অপরাধ” এটা আমরা প্রত্যেক সমাজ বইয়ে দেখতে পাই। এই সমস্যা যতই হোকনা কেন এটাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা হয় এবং কখনও এর কারন হিসেবে ভিত্তিতে যাওয়া হয়না । আমাদের বুঝা উচিত যদি ভিত্তিই খারাপ হয় তাহলে এই ভিত্তি থেকে যা কিছু আসবে সবই খারাপ হবে। এই ধারনাটা সমাজে আমরা দেখিনা। ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, পর্ণোগ্রাফি, ব্যভিচার, অজাচার, বিচ্ছেদের হার বৃদ্ধি, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া ও নির্যাতন এই সব কিছুই হচ্ছে মৌলিক সমস্যার উপসর্গ মাত্র।

    সকল মুসলিমেরই আজ এই প্রশ্ন করা উচিত যে, আমাদের সমাজ কিসের উপর ভিত্তি করে তৈরি হচ্ছে?

    মুসলমানদের অবশ্যই এ ক্ষেত্রে তার বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করে এটি বুজতে হবে যে ধর্ম নিরপেক্ষতার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই জীবণ ব্যবস্থা ভ্রান্ত এবং খুঁজে বের করতে হবে ইসলামের সত্যতাকে এবং শুধু মাত্র সেই সমাজ তৈরি করতে হবে যা ইসলামী আকীদার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এবং যেখানে সামাজিকভাবে ইসলামী শরীয়াহর প্রয়োগ হয় যা আমাদেরকে দুনিয়াতে ও আখিরাতে উভয় জায়গায় সাফল্য ও উন্নতি দান করবে।

    একজন মুসলিম এর জীবনে উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর প্রেরিত সকল আইন অনুসরন করে আল্লাহর ইবাদত করা। অন্যদিকে একজন অমুসলিমের জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজের খেয়াল খুশির ও প্রবৃত্তিকে অনুসরন করে যতটুকু সম্ভব আত্মতুষ্টি অর্জন করা। উদ্দেশ্যের এই ভিন্নতা থেকে আমাদের নির্দেশ করে এই দুজনের কাজ এবং সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি উভয়ই ভিন্ন হবে এবং সেই সাথে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে নারী-পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ভিন্নতা দেখা দিবে। সামাজিক ব্যবস্থা সমগ্র মানবজাতির উপকারের জন্য এবং মানবজাতির উন্নয়ন ও উৎপাদনকে নিশ্চিত করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নারী ও পুরুষের সম্পর্ককে সাজিয়েছেন। এইরুপ কোন ব্যবস্থা ছাড়া আমরা সন্যাসীপনার দিকে ধাবিত হতে পারি এবং নারী পুরুষের সম্পর্কে রক্ষার ক্ষেত্রে দুঃখ দূর্দশা দেখা দিতে পারে। মানুষের মধ্যে আমরা তিন ধরনের সহজাত প্রবৃদ্ধকে দেখতে পাই, এগুলো হল- অসীম কোন কিছুর আরাধনা করার তাড়না, বেচেঁ থাকার তাড়না এবং প্রজননের তাড়না। যদি এই সহজাত প্রবৃত্তি সমুহকে সঠিক ভিত্তি ব্যবহার করে কোন ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রন ও নির্দেশনা দেয়া না যায় তাহলে এইগুলো আমাদের বিভিন্ন সমস্যার দিকে নিয়ে যাবে যা আমরা বর্তমান সমাজে দেখতে পাচ্ছি। প্রজনন প্রবৃত্তি নিজেই মানুষকে বিভিন্ন সম্পর্কের দিকে নিয়ে যায় এবং যা নির্ভর করে নারী পুরুষের ভুমিকার উপর যেমন- মাতা/পিতা, স্বামী/স্ত্রী, পুত্র/কন্যার ভূমিকা। এখানে এদের সম্পর্ক ইসলামী শরীয়াহ দ্বারা সংজ্ঞায়িত হবে।

    এটা খুবই কৌতূহলজনক যে, ইসলাম মুসলমানদেরকে তাদের প্রত্যেকের ভূমিকার উপর ভিত্তি করে যে অবস্থার পার্থক্য করে দিয়েছে সেই অবস্থান এখনও সমগ্র মানবজাতি ধরে রেখেছে তবে এই কুফর ব্যবস্থা তাকে স্তব্ধ করে রাখতে চাছে । সন্তান ও পিতা মাতার সম্পর্ক, ভাই ও বোনের সম্পর্ক, স্বামী ও স্ত্রীদের সম্পর্ক সব সম্পর্কই আজ দুটি ভিত্তির উপর দাড়িয়ে আছে,

    ১। ধর্মনিরেপেক্ষতার ভ্রান্ত ভিত্তির উপর এবং
    ২। স্বাধীনতা এবং আত্মকেন্দ্রিকতা নামক ভ্রান্ত ধারনার উপর।

    সব সম্পর্কই আজ তৈরি হচ্ছে প্রয়োজন ও প্রবৃত্তির তাড়না এবং ব্যক্তির সীমাবদ্ধ চিন্তার উপর ভিত্তি করে। সমাজের বিভিন্ন মাধ্যম ব্যক্তিকে আহ্বান করছে কিভাবে সে আরেকজনের সাথে আচরণ করবে। যেমন- টেলিভিশন বকতৃতা, সিনেমা, গান, ম্যাগাজিন ইত্যাদির মাধ্যমে বিপরীত লিঙ্গের সাথে কিভাবে আচরন করতে হবে সেই সম্বন্ধে পুঁজিবাদীরা একটি নির্দিষ্ঠ বার্তা দিচ্ছে কারন তারা সমাজে একটি নির্দিষ্ঠ আবহ তৈরি করতে চায়। যেমন Mr Macho অথবা Mr Sensitive আবার একজন নারীর কি ঘরে মনোযোগী হবে নাকি পেশাগত উন্নতির দিকে। এই সকল বার্তা সব সময় সমাজকে একটা সন্দেহজনক অবস্থান এবং অশান্তিতে রাখে। কারন এই বার্তা সব সময় পরিবর্তন হতে থাকে এবং বারবার একটির সাথে আরেকটির সাংঘর্ষ হয়। সরকারেরও হস্তক্ষেপ করতে হয় যখন এইরকম পরিস্থিতি দেখা দেয়। এটা বুঝা যায় যখন কোন একটি পরিস্থিতিতে সরকার পরিকল্পিত প্রচার অভিযান চালায়। যেমন- এইডস্ আতংক। নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশার করণে যখন এটা ভীতিকর হয়ে যায় তখন সরকার একজনের সাথে দীর্ঘ সম্পর্কের কথা বলে এবং সরকারের এই নীতি সিনেমা গুলোতে দেখা যায় অর্থাৎ অবাধ সম্পর্কের সিনেমার সংখ্যা কমে যায়।

    পশ্চিমা সরকারগুলো সন্তান/পিতা-মাতার সম্পর্কের বিষয়েও আজ হস্তক্ষেপ করে দেখিয়ে দেয় কে সন্তানকে পিটাতে পারবে, সম্প্রতি পিতা-মাতাকে এ সুবিধা দিয়ে একটি আইন পাস হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বে বিবাহ বিচ্ছেদের হার তুলনামুকভাবে বাড়ার পর একটি আইন পাস হয় যাতে বিচ্ছেদিত দম্পতিদের মধ্যে কোন পিতা যদি সন্তানের ভরন পোষন না দেয় তবে শিশু সহযোগী সংস্থার তার পিতাকে দৌড়ের উপর রাখবে যদি সে ভরণ পোষণ না দেয়। এই আইন তাদের টক-শো গুলোর একটি প্রধান আলোচনার বিষয়। আবার নারীদের পেশাগত উন্নতি ও পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতায় নামানোতে মাতৃত্বের প্রতি নারীদের অনিহার কারনে সরকার আবার অধিক সন্তানধারি মাকে অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়ে শিশু জন্মহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এইসব বিকল্প অস্থায়ী ও অনুপযোগী সমাধান আমাদেরকে নির্দেশ করে মানুষ তৈরি এই ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা এবং অসম্পূর্ণতা বিরাজ করেছে। যা হচ্ছে, মানুষ যে সীমাবদ্ধ জীব তারই প্রতিফলন।

    নারী-পুরুষের ভুমিকা:
    নারীরা সব সময় সম্মানের পাত্র এবং অবশ্যই মর্যাদাপূর্ণ। পুরুষের জন্য বাধ্যতামূলক নারীদেরকে মিথ্যা কলংক বা অপবাদ, শোষণ এবং আক্রমন থেকে রক্ষা করা। একজন নারীর প্রধান ভুমিকাই হচ্ছে স্ত্রী এবং মা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা। তার দায়িত্ব হচ্ছে সন্তানদের দেখাশুনা করা এবং স্বামীর প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া। যদিও, এই দায়িত্ব স্বামীকে সন্তানদের দেখাশুনা করা এবং স্ত্রীদের সামাজিক ভূমিকা ও পেশাগত উন্নয়ণকে অস্বীকার করে না। বরঞ্চ ইসলাম উৎসাহিত করে নারীদেরকে সামাজিক ভূমিকা পালনে। যেমন একজন চিকিৎসক হিসেবে, একজন শিক্ষিকা হিসেবে অথবা একজন বিচারক হিসেবে এবং তাকে অনুমতি দেয় সকল প্রকার পেশাগত কাজ করতে যেমন- ব্যবসা, যতক্ষন পর্যন্ত না তা তার প্রাথমিক কর্তব্য ও দায়িত্বের সাথে সাংঘার্ষিক না হয়। নারীরা পরিবারকে দেখভাল করতে পারবে এবং অর্থায়নও করতে পারবে তবে স্ত্রীদেরকে এবং পরিবারকে খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান দেয়া এটা মূলত ফরজ হচ্ছে স্বামীর এবং পিতাদের উপর কোন নারীর নয়।

    রাজনৈতিক জীবনে নারী ও পুরুষের ভূমিকা:
    নারীরা পুরুষের মতই রাষ্ট্রের চলমান কার্যক্রমের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য রাজনীতিতে অংশগ্রহন করতে পারবে। অনুরূপভাবে, বর্তমানে ইসলামী রাষ্ট্রের অনুপস্থিতিতে মুসলমান নারীদের উপর ফরজ দায়িত্ব হল দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা এবং দাওয়াত দেওয়া (অমুসলিমদেরকে ইসলাম গ্রহণের জন্য এবং মুসলিমদেরকে ইসলাম বুঝার জন্য এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের জন্য দাওয়াত দেয়া) এই কারনে আমরা আকাবার বা’আত এ দুইজন মহিলাকে অংশগ্রহন করতে দেখি।

    আবার একজন নারী কখনও শাসক হতে অনুমোদন পাবেনা যেমন-খলীফা। অথবা শাসকের পদও দখল করে রাখতে পারবেনা যেমন-প্রদেশ সমূহের ওয়ালী। এটার প্রমান পাই আমরা ইমাম বুখারী কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে আবি বাকরা এর বর্ণনায়, তিনি বললেন “যখন রাসূল (সা) উপর খবর পৌছল পারস্যের ব্যপারে যে তারা রাজার (কিসরা) কণ্যাকে তাদের শাসক হিসাবে নির্বাচিত করেছিল, তিঁনি বললেন “যে লোকেরা নারী দ্বারা শাসিত হয় তারা কখনও উন্নতি করতে পারবেনা।”

    নারী-পুরুষ এক নয়:
    এটা দৃষ্টত কিছু লোক বলে এটা ইসলামের লিঙ্গ বৈষম্য আচরণ। এটা শুধুমাত্রই ভ্রান্ত নয় এবং এটা পরিপূর্ণ ভাবেই ভুল এবং মূর্খতার একটি চিহ্ন। এটা মুসলমানদের উপরে পশ্চিমা আক্রমণকে আরও স্পষ্ট করে। সমতার পুরো ধারনাটিই একটি ভুল ধারনা যেহেতু প্রকৃতিগতভাবেই নারী-পুরুষ উভয়ই ভিন্ন। ইসলামে একজনকে আরেকজন থেকে অধ:স্তন হিসেবে দেখা হয় না। অন্যদিকে যেটা বিদ্যমান খিষ্ট্রধর্মের মধ্যে। এটাও নয় যে পশ্চিমাদের মত নারীদেরকে অর্থনৈতিক পন্য হিসেবে দেখা হবে। ইসলামের মধ্যে নারী এবং পুরুষের উভয়েরই দায়িত্ব ও ভুমিকা কিছু ক্ষেত্রে একই এবং অন্য কিছু ক্ষেত্রে দায়িত্ব ও ভূমিকা আবার ভিন্ন, যেমন- পুরুষদের উপর ফরয জিহাদ করা এবং পরিবারকে অর্থায়ন করা কিন্তু এটা নারীদের উপর ফরয নয়।

    তাই কেউ যদি ইসলামে সমতার ধারনাকে আনতে চায় তাহলে এই সমতা আসবে পুরষ্কার এবং শাস্তির বিষয়ে। যেমন- যদি নারী ও পুরুষ উভয়ই কোন ফরয দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে অথবা কোন হারাম কাজ করে তারা অবশ্যই শাস্তি প্রাপ্ত হবে আল্লাহ তা’আলার কাছ থেকে অথবা ইসলামী রাষ্ট্র থেকে।

    “প্রত্যেকেই যারা অণু পরিমান সৎ কাজ অথবা অসৎ কাজ করবে তারা তা দেখতে পাবে” (সূরা আল-জিলজাল: ৭-৮)

    নারী-পুরুষ এক সাথে জড়ো হবার আইন (জনজীবনে এবং ব্যক্তিগত জীবনে) (Public Place and Private Place):
    পশ্চিমা বিশ্বে প্রতিদিনই অশালীনতার ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে আর ইসলাম সমাজে বৈধ বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে নারী ও পুরুষের শালীনতাকে নিশ্চিত করে। তাই ইসলামী রাষ্ট্রের মধ্যে অথবা বর্তমানে ইসলামী রাষ্ট্র ছাড়া অবস্থায় নারী এবং পুরুষ যদি না তারা মাহরাম (বিবাহ্যোগ্য নয় একজন আরেকজনকে) হয় তবে একসাথে জড়ো হতে পারবেনা জনজীবনে ও ব্যক্তিগত জীবনে।

    তবে শরিয়াহ (ইসলামি আইন) জড়ো হবার অনুমোদন দেয় যেমন- শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, ক্রয়-বিক্রয় এবং হজ্ব ইত্যাদি জনবহুল জায়গায়। যদিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জমায়েত হওয়া অনুমোদন করে কোন সুনির্দিষ্ট শিক্ষা এবং কোন বিষয় সম্বন্ধে জানার জন্য। বিনোদনের জন্য একত্রিত হওয়া (বিদ্যালয়,কলেজে,বিশ্ববিদ্যালয়ে) সম্পূর্ণ নিষেধ। অনুরুপভাবে কর্মক্ষেত্রে এবং বাজারেও। ইসলাম জনজীবন ও ব্যক্তিগত জীবন উভয়কেই সংজ্ঞায়িত ও নিয়ন্ত্রন করে। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য ফরয নিজের দৃষ্ঠিকে সংযত রাখা।

    “মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ্ তা অবহিত আছেন”। (সূরা আন-নূর আয়াত-৩০-৩১)

    জনজীবনে (Public Place) ও ব্যক্তিগত জীবনে (Private Place) উভয় জায়গায় একজন পুরুষ এবং নারীর জন্য এটা হারাম যে একাকী একটি কক্ষে বসবে সাথে কাউকে নিয়ে যে তাদের মাহরাম নয়।

    মুহাম্মদ (সঃ) বলেন, “একজন মহিলার উচিত না একজন পুরুষের সাথে দেখা এবং মেলামেশা করা যদি তার সাথে কোন মাহরাম না থাকে” । এটা পুরুষদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

    এই দৃষ্ঠি ভঙ্গি পুরো সমাজের চেহারা পাল্টে দেবে যেমন-ইসলামী রাষ্ট্রের গণপরিবহনে নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকবে তেমনি শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রেও নারী ও পুরুষকে আলাদা করা হবে।

    মহিলাদের পোশাক পরিধানের আইন:
    শরিয়াহ অনুযায়ী নারী পুরুষ উভয়েরই শরীরের নির্দিষ্ঠ অংশ ঢেকে রাখা ফরয যাকে বলে আল-আওরাহ। খোলামেলা ভাবে আকর্ষণ করানোর পশ্চিমা ধারনা সম্পূর্ণ এর বিপরীত এবং যা মানুষকে যৌন হতাশার দিকে ঠেলে দেয়।

    ব্যক্তিগত জীবনে একজন নারী তার স্বামীর সামনে তার আওরাহ ঢেকে না রাখলেও হবে। যেমন- বুক থেকে হাটু পর্যন্ত ঢেকে রাখলে হবে। অতটুকু পর্যন্ত ঢেকে রাখা মহিলার মাহরাম এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

    আল্লাহর নির্দেশ মানার জন্য জনজীবনে (Public Place) একজন নারীর উপর ফরয তার আওরাহ কে পরিপূর্ণভাবে ঢেকে ফেলা যেমন-(তার পুরো শরীর, ঘাড়, গলা এবং চুল), তবে মুখ এবং হাত ব্যতীত।

    “হে নবী। আপনি আপনার পত্নীগণকে ও কণ্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবেনা”। (৩৩: ৫৯)

    জনজীবনের পোশাকটি মাথা ও গলা সমন্নিত একটি রুমাল দ্বারা আবৃত (খিমার) থাকবে এবং একটি অতিরিক্ত কাপড় (জিলবাব) যেটা সে ঘরে পরিহিত কাপড়ের উপর পড়বে। জিলবাব অবশ্যই ঢিলেঢালা হতে হবে, পাতলা হতে পারবেনা যার ভিতরে সব দেখা যায় এবং অতি উজ্জল/চোখ ধাঁধানো (তাবার্রুজ) হতে পারবেনা।

    মহিলাদের সৌন্দর্য্য প্রকাশের ক্ষেত্রে চোখ ধাঁধানো এবং পুরুষদের মনোযোগ আকর্ষণ করে এমন কোন কিছু সুগন্ধিযুক্ত এমন যার সুগন্ধ আরেকজন অনুভব করতে পারে এমন কোন কিছু জনজীবনে (Public Place) ব্যবহার করা হারাম। রাসূল (সঃ) বলেন “ কোন মহিলা যে এমন সুগন্ধি ব্যবহার করল এবং কোন পুরুষ তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সে সুগন্ধি পেল, তাহলে সে মহিলা জেনাহ কারির সমতুল্য হবে”।

    বিবাহ:
    মানব জাতির মধ্যে ভালবাসা এবং প্রজননের আকাংখা প্রবৃত্তিগতভাবে বিদ্যমান। অ-সাদৃশ্য বিপদগামী ভ্রান্তচিন্তার পশ্চিমারা কোন নিয়ম বা বাধা রাখেনি এই সহজাত প্রবৃত্তিকে ব্যবহার করার জন্য। ইসলাম মানব জাতিকে একটি ব্যবস্থা দিয়েছে এই সহজাত প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ ও প্রকাশ করার জন্য যেমন-বিবাহ।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন,

    “আর এক নিদর্শণ এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সংঙ্গীনিকে সৃষ্ঠি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারষ্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শণ রয়েছে। (৩০:২১)

    “তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিবাহ সম্পাদন করে দাও এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ, তাদেরও। তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ্ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছল করে দেবেন। আল্লাহ্ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ”। (আন নুরঃ ৩২)

    ইসলামে কৌমার্য বা চির কুমার বলে কিছু নেই এবং মহিলাদের বিয়ের জন্য জোর করা যাবে বলে বর্তমান সংস্কৃতিতে ও পশ্চিমারা ইসলামের ব্যপারে যে মিথ্যা অপপ্রচারের ছবি আমাদের সামনে অংকন করেছে তা ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত। কোন নারীর ইচ্ছা বা সম্মতি ব্যতিত কোন বিবাহ ইসলামে বৈধ নয়।

    পবিত্র কুরআনে বলেছেন যে পুরুষরা নারীদের আদেশ করবে, এইটা তাদেরকে রক্ষা ও আশ্রয়ের বিষয়ে বুঝানো হয়েছে। তাকে শোষণ করার জন্য বুঝানো হয়নি অথবা প্রভু-ভৃত্তের সম্পর্কের মতো বুঝানো হয়নি। বরং স্বামীকে মান্য করা মানে স্বামী যতক্ষণ আল্লাহর আইন মান্য করে আদেশ করবে তা মান্য করার কথা বলা হয়েছে।

    প্রকৃতপক্ষে মূলসত্য এই যে তাদের মধ্যে ভাল সম্পর্ক থাকতে হবে। রাসূল (সঃ) বলেন “তোমাদের মধ্যে উত্তম সে, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম”।

    সে কারণে স্বামীর ভূমিকাও হবে স্ত্রীর প্রতি সন্তোসজনক, তাকে বোঝা, যত্ন করা এবং সম্মান দেয়া। তাই যদি স্বামী স্ত্রীকে এমন কোন কিছূ করার নির্দেশ দেয় যা আল্লাহ এবং শরীআহ আইনের বিরুদ্ধে (যা তার উপর ফরয) তখন তার অবশ্যই স্বামীকে অমান্য করতে হবে।

    অন্য সভ্যতায় যেখানে কিছু দূষিত চর্চার কারনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অবনতির দিকে যাচ্ছে সেখানে ইসলামে স্ত্রীকে স্বামী মোহরানা দিচ্ছে এবং ঘরের কাজে স্ত্রীকে সাহায্য করতে হলে স্বামী সেই সাহায্য করতে বাধ্য করেছে, যদি না পারে তাহলে গৃহ পরিচারিকা রেখে সাহায্য করার ব্যবস্থা করতে হবে।

    ভালবাসা নিয়ে ইসলামি ও পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি:
    বর্তমান ভ্রান্ত সমাজ ব্যবস্থায় নারী-পুরুষের সম্পর্ক পরিস্কার ভাবে গড়ে উঠেছে মানুষের শারীরিক চাহিদা এবং আবেগের তাড়নার ভিত্তিতে । ভালবাসা একটা জনপ্রিয় শব্দে পরিণত হয়েছে সকল ভাষাগুলোতে, সকল সম্পর্ক গুলো গড়ে উঠে এটার উপর ভিত্তে করে, কিন্তু কারো কাছে পরিস্কার কোর ধারনা নেই যে এটা কোন মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে। এই অসংজ্ঞায়িত আবেগের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা সম্পর্কের ফলাফল আজকে আমাদের কাছে পরিস্কার হয় যখন আমরা দেখি সমাজে বিবাহের বিচ্ছেদের পরিমান বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মানুষ বিবাহ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। স্বামী এবং স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন হবে এবং পরস্পরের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা কি হবে এই সব কিছুই মানুষের মনগড়া নিয়মে চলছে যা তাদেরকে চরম দুঃখ দূর্দশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইসলাম স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের গুরুত্বকে তুলে ধরেছে এবং স্বামী-স্ত্রী প্রত্যেকের সাথে সম্পর্ক কেমন হবে তার একটি পরিস্কার রুপরেখা দিয়েছে। ইসলাম সকল প্রকার সন্দেহকে দূরে রেখে এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়কে সঙ্গত রেখে কাজ করার অনুমতি দেয়, তাদের মধ্যে ভালবাসার বৃদ্ধির জন্য একটি মূলকাঠামো দেয়, যেখানে এই সব কিছুই পশ্চিমারা অসাদৃশ্যভাবে দেয়।

    আল্লাহ সুবহানহু তা’আলা পবিত্র কুরআনে এটাও বলেছেন “স্ত্রীর প্রতি স্বামীর যে অধিকার আছে স্ত্রীরও স্বামীর প্রতি একই অধিকার রয়েছে নিয়ম অনুযায়ী।” (আল-কুরআন ২:২২৮)

    পবিত্র কুরআনে বিশেষ করে সূরা আন-নিসা এবং সূরা নূর এ, রাসূল (সঃ) এর প্রচুর হাদীসে এবং এ সব হতে অনুসৃত ফকীহদের গ্রন্থ সমূহে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা আছে যা সমাজের মৌলিক নীতি হওয়া উচিত এবং পরবর্তী প্রজন্মের উচিত এখান থেকে শুরু করা।

    মাতা-পিতার প্রতি দায়িত্ব:
    বাবা-মার ভূমিকা বর্তমান সমাজে প্রতিনিয়ত অবনতির দিকে যাচ্ছে। সন্তানরা বলতে শুরু করেছে তারা স্বতন্ত্র এবং তাদেরও অধিকার আছে নিজের ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করার, আর সন্তানদের শিষ্ঠাচার শেখানোর জন্য বাবা-মা খুবই ছোট ভূমিকা রাখে। স্বাধীনতার নামে সন্তানরা অহংকারী ও অস্থির হয়ে যাচ্ছে, নিজের আচার ব্যবহারকে নিজেই নিয়ন্ত্রন করতে পারছে না। সাম্প্রতিক সংবাদ পত্রের সংবাদ দেখলেই আমরা বুঝতে পারি শুধু মাত্র অর্থের জন্য সন্তানরা তাদের পিতা মাতাকে মেরে ফেলছে।

    আবার সন্তান বড় হয়ে মাতা-পিতার ভরণ-পোষণ দিচ্ছেনা বরং বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিচ্ছে অথবা খবরও নিচ্ছেনা পিতা মাতা কোথায় আছে কেমন আছে।

    ইসলামে বাবা-মা এর প্রতি সন্তানদের আচরণ শরীয়াহ এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। যেমন- নিম্মোক্ত হাদীসগুলো দেখলে আমরা বুঝতে পারবো বাবা-মায়ের প্রতি আচরণ কেমন হওয়া উচিত।

    আবু বাকরা কর্তৃক বণিত রাসূল (সঃ) বলেন “আল্লাহ চাইলে সব গুনাহ (মানুষের গুনাহ) ক্ষমা করে দিতে পারেন শুধু মাত্র পিতা মাতাকে অমান্য করার গুনাহ ছাড়া।”

    মৃত্যু আগ পর্যন্ত কেউ যদি এই গুনাহ করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ভাবে তার কাছ থেকে প্রতিশোধ নেবেন।

    আল-মুগীরা থেকে বর্ণিত রাসূল (সা.) বলেন “খুব শীঘ্রই আল্লাহ তোমাদেরকে শাস্তি দেবেন মাতাকে অমান্য করার জন্য”।

    আবদুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত রাসূল (সা) বলেন “আল্লাহর সন্তুষ্টি নির্ভর করে পিতার সন্তুষ্টির উপর এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি নির্ভর করে পিতার অসন্তুষ্টির উপরে” (তিরমিজি)

    উপসংহার:

    আরও অনেক আইন আছে ইসলামি সমাজ ব্যবস্থাকে ঘিরে, যা এখানে আলোচনা করা হয়নি, এখানে শুধুমাত্র তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে। ইসলামের সমাজ ব্যবস্থার আলোচনা অনেক বৃহৎ কারন নারী-পুরুষের সম্পর্ক ও এর ফলাফল থেকে উঠে আসা প্রতিটি বিষয়েও ইসলামের নির্দেশ রয়েছে।

    ভ্রান্ত এবং নষ্ট চিন্তার চর্চা যা পশ্চিমাদের মধ্যে এবং বর্তমানে আমাদের সভ্যতা ও ঐত্যেহ্যের মধ্যে বিদ্যমান তা থেকে বাঁচার জন্য মুসলিম উম্মাহর একান্ত প্রয়োজন ইসলামিক সভ্যতাকে অধ্যায়ন করা ও আকরে ধরা।

    পশ্চিমারা যে ব্যধির দিকে আমাদেকে ডাকছে তা থেকে আমাদের নিজেদের কে গুরুত্বের সাথে বের হয়ে আসতে হবে, এবং তাদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে ইসলাম কে একমাত্র বিকল্প হিসেবে আহবান করার মাধ্যমে, তাই আমাদের একটা প্রজন্ম তৈরি করতে হবে যারা পুনঃর্জাগরিত হওয়ার আকাংখা রাখে এবং খিলাফতকে চালিয়ে নিয়ে যাবে।

    অতএব, পশ্চিমাদের দেয়া ব্যধিগ্রস্থ ব্যবস্তা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে আর তা না হলে বর্তমান প্রজন্মই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের ভাবতে হবে কোন ধরনের ভবিষৎ তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এই বিকৃত ও অপরাধে ঘেরা সমাজে???

    যদিও আমাদের সংগ্রামের ক্ষেত্র বহু তবে এই কাজ গুলো সমাধান করার পদ্ধতি কেবলমাত্র একটি-ই যা কুরআন এবং সুন্নাহর বাস্তবায়ন অর্থাৎ খিলাফত। উম্মাহর খিলাফতের জন্য সংগ্রাম করা প্রয়োজন আল্লাহ সুবহনাহু ওয়া তায়ালা থেকে বিজয় নেওয়ার জন্য এবং ইসলামিক ব্যবস্তকে দেখা জন্য । আল-খিলাফাহ শুধু মাত্র সামাজিক ব্যবস্থাই প্রতিষ্ঠিত করবেনা অন্য সব ব্যবস্থাকেও প্রতিষ্ঠিত করবে যা মুসলিম উম্মাহকে বাধ্য করবে ইসলামি আইন গ্রহণ করতে, ইসলামি বিধি-বিধান রক্ষা করতে এবং তা প্রচার করার জন্য।

    আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,

    আল্লাহর নির্দেশে তারা ওদের হেফাযত করে নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আল্লাহ্ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। (সুরা আর রাদঃ ১১)

    আল্লাহ্‌ উম্মাহকে ইসলাম দিয়ে সম্মানিত করুক এবং দুনিয়াতে উম্মাহকে দৃঢ় পদে প্রতিষ্টিত করুক এবং দুনিয়া ও আখিরাতে এই দ্বীন প্রতিষ্টার মাধ্যমে সফলতা দান করুক। আমীন।

    “The Social System” প্রবন্ধ থেকে অনূদিত
    এফ রহমান

  • প্রশ্ন-উত্তর: খলীফা নির্বাচনের জন্য সময়সীমা বেধে দেয়ার দলীল কী?

    প্রশ্ন-উত্তর: খলীফা নির্বাচনের জন্য সময়সীমা বেধে দেয়ার দলীল কী?

    নিচের অনুবাদটি সম্মানিত মুজতাহিদ ও মুফাচ্ছির শাইখ আতা ইবন খলীল আবু রাশতা (আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন) কর্তৃক দেয়া এক প্রশ্নের জবাব

    প্রশ্ন:

    আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

    হে শায়খ, পূর্ববর্তী খলীফার অব্যাহতির পর তিনদিনের মধ্যে নতুন খলীফা নিয়োগ দেয়া সম্পর্কে একটি প্রশ্ন করতে চাই। ‘আজহিযাহ’ বইটিতে উল্লেখ রয়েছে যে এই সময়সীমা উমর (রা) সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে নেয়া হয়েছে যেখানে তিনি (রা) তিনদিনের মধ্যে ঐক্যমতে পৌছাতে না পারলে ছয় সাহাবীর মধ্যে অনৈক্যকারীকে হত্যার নির্দেশ দেন। আমার প্রশ্ন হলো কেউ কেউ বলেন, এই রেওয়ায়াত তারীখ আত-তাবারি হতে নেয়া হয়েছে যা দূর্বল (জয়ীফ) শ্রেনীর (বর্ণনার) মধ্যে পড়ে। এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন? আল্লাহ আপনাকে বরকত ও উত্তম প্রতিদান দান করুন।

    আহমাদ নাযিফ

    উত্তর:

    খলীফা নির্বাচন করার ব্যপারে উমর (রা)-এর তিনদিনের সময়সীমা নির্ধারন করে দেয়া – এ হুকুমুটি একদল সাহাবীর সম্মুখে ঘটেছে এবং একদল সাহাবীর সম্মুখে উমর (রা) সুহাইব (রা) কে বলেন,
     

    صَلِّ بِالنَّاسِ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ، وَأَدْخِلْ عَلِيًّا وَعُثْمَانَ وَالزُّبَيْرَ وَسَعْدًا وَعَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ عَوْفٍ وَطَلْحَةَ إِنْ قَدِمَ… وَقُمْ عَلَى رُءُوسِهِمْ، فَإِنِ اجْتَمَعَ خَمْسَةٌ وَرَضُوا رَجُلًا وَأَبَى وَاحِدٌ فَاشْدَخْ رَأْسَهُ أَوِ اضْرِبْ رَأْسَهُ بِالسَّيْف

    জনগনকে তিনদিনের জন্য নামাজে নেতৃত্ব দাও এবং আলী, উছমান, আয-যুবাইর, সা’দ, আবদুর রহমান বিন আউফ যদি সে ফেরত আসে ও তালহা – এদেরকে একত্রিত কর। তাদের গর্দানের উপর দন্ডায়মান থাকো এবং যদি পাচজন কারো ব্যাপারে ঐক্যমতে পৌছায় এবং একজন বিরোধিতা করে তবে তার মাথা গুড়িয়ে দাও কিংবা তরবারী দিয়ে তার গর্দান উড়িয়ে দাও।

    এটি ইবন সাহাবাহ কর্তৃক তারীখ আল-মদীনাতে বর্ণিত হয়েছে, তাবারী তার তারীখ-এ বর্ণনা করেছেন এবং ইবন সা’দ তার আত-তাবাকাত আল-কুবরাতে একই ধরনের বর্ণনা করেছেন। তারা সকলে শুরা সদস্য ও প্রবীন সাহাবী হওয়া সত্ত্বেও এটি ঘটেছে। এটি সাহাবীদের দৃষ্টি ও শ্রবনের সম্মুখেই সংঘটিত হয়েছে এবং কোনো বর্ণনায় আসেনি যে তারা এর বিরোধিতা করেছেন। তাই এটি ইজমা আস-সাহাবাহ রূপে গণ্য হবে এবং এর ভিত্তিতে মুসলিমদের জন্য তিনদিন ও এর রাত্রিসমূহের অধিক সময় খলীফাবিহীন অবস্থায় থাকা বৈধ নয়। এবং ইজমা আস-সাহাবাহ কিতাব ও সুন্নাহর মতোই দলীলের উৎস।

    এ কারণে পূর্ববর্তী খলীফার পর তার পদ শূন্য হয়ে পড়লে মুসলিমদের জন্য তিনদিনের বেশি সময় দেয়া হয়নি যদি না অনিবার্য কোনো পরিস্থিতিতে এ লক্ষ্য অর্জনের পরিপন্থি অবস্থাকে প্রতিহত করা সম্ভব না হয়। সেক্ষেত্রে নিজেদেরকে এ কাজে ব্যস্ত রাখার মাধ্যমে অনিবার্য পরিস্থিতিতে অক্ষমতার দরুন এই ফরজ (পরিত্যাগ)-এর অপরাধ হতে পরিত্রান পাওয়া যাবে। ইবন হিব্বান ও ইবন মাজাহ ইবন আব্বাস হতে বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন: 

    «إن الله وضع عن أمتي الخطأ، والنسيان، وما استُكْرِهوا عليه»

    নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মত হতে তুলে নিয়েছেন – ভুল, ভুলে যাওয়া ও যা তাদের উপর জোর করে আপতিত করা হয়েছে।

    আর যদি তারা নিজেদের একাজে ব্যস্ত ও জড়িত না রাখে তবে তারা গুনাহগার হবে যতক্ষন না তারা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করছে এবং তখনই তাদের উপর হতে ফরজিয়্যাতের দায়িত্ব অপসারিত হবে। আর খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজ না করে তারা যে অপরাধ করেছে তা তাদের উপর হতে অপসারিত হবে না, বরং তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট থাকবে এবং তিনি সে ব্যাপারে তাদের হিসাব নিবেন, অন্য সকল সেই অবাধ্যতার মতোই যা মুসলিম করে যখন সে ফরজ কাজ পরিত্যাগ করে।

    আপনাদের ভাই

    আতা’ ইবনু খলীল আবু আল-রাশতা

    ২৫ রজব ১৪৩৪ হিজরী

    ৪ জুন ২০১৩ খৃষ্টাব্দ

    Source: https://www.facebook.com/photo.php?fbid=177555205745898

  • সামর্থ্য অর্জন ব্যতিত শরী’আহর দায়িত্ব অর্পিত হয় না

    সামর্থ্য অর্জন ব্যতিত শরী’আহর দায়িত্ব অর্পিত হয় না

    আল্লাহ্‌ তা’আলা কাউকে তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন না, আল্লাহ্‌ তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন,

    আমি কাউকে তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব অর্পন করি না। আমার এক কিতাব আছে, যা সত্য ব্যক্ত করে এবং তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না। [আল মুমিনুন: ৬২]

    আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না। [বাকারা: ২৮৬]

    আল্লাহ্‌ তা’আলা প্রতিটি দায়িত্বের একটি উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেছেন এবং সেই উদ্দেশ্য পালনের সাথে সামর্থ্যকে সংযুক্ত করেছেন। আমরা যদি নিন্মোক্ত আয়াত গুলোর দিকে তাকাই তাহলে বিষয়টি দেখব এবং প্রতিটি কাজের সামর্থ্যকে আইনপ্রনেতা আল্লাহ তা’আলা নিজেই নির্ধারণ করেছেন,

    আর সন্তানবতী নারীরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ন দুবছর দুধ খাওয়াবে, যদি দুধ খাওয়াবার পূর্ণ মেয়াদ সমাপ্ত করতে চায়। আর সন্তানের অধিকারী অর্থাৎ, পিতার উপর হলো সে সমস্ত নারীর খোরপোষের দায়িত্ব প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী। কাউকে তার সামর্থাতিরিক্ত চাপের সম্মুখীন করা হয় না। আর মাকে তার সন্তানের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। এবং যার সন্তান তাকেও তার সন্তানের কারণে ক্ষতির সম্মুখীন করা যাবে না। আর ওয়ারিসদের উপরও দায়িত্ব এই। তারপর যদি পিতামাতা ইচ্ছা করে, তাহলে দুবছরের ভিতরেই নিজেদের পারস্পরিক পরামর্শক্রমে দুধ ছাড়িয়ে দিতে পারে, তাতে তাদের কোন পাপ নেই, আর যদি তোমরা কোন ধাত্রীর দ্বারা নিজের সন্তানদেরকে দুধ খাওয়াতে চাও, তাহলে যদি তোমরা সাব্যস্তকৃত প্রচলিত বিনিময় দিয়ে দাও তাতেও কোন পাপ নেই। আর আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রেখো যে, আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ অত্যন্ত ভাল করেই দেখেন। [বাকারা: ২৩৩]

    স্ত্রীদেরকে স্পর্শ করার আগে এবং কোন মোহর সাব্যস্ত করার পূর্বেও যদি তালাক দিয়ে দাও, তবে তাতেও তোমাদের কোন পাপ নেই। তবে তাদেরকে কিছু খরচ দেবে। আর সামর্থ্যবানদের জন্য তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী এবং কম সামর্থ্যবানদের জন্য তাদের সাধ্য অনুযায়ী। যে খরচ প্রচলিত রয়েছে তা সৎকর্মশীলদের উপর দায়িত্ব। [বাকারা: ২৩৬]

    আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করেন না তোমাদের অনর্থক শপথের জন্যে; কিন্তু পাকড়াও করেন শপথের জন্যে যা তোমরা মজবুত করে বাধ। অতএব, এর কাফফরা এই যে, দশজন দরিদ্রকে খাদ্য প্রদান করবে; মধ্যম শ্রেনীর খাদ্য যা তোমরা স্বীয় পরিবারকে দিয়ে থাক। অথবা, তাদেরকে বস্তু প্রদান করবে অথবা, একজন ক্রীতদাস কিংবা দাসী মুক্ত করে দিবে। যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে না, সে তিন দিন রোযা রাখবে। এটা কাফফরা তোমাদের শপথের, যখন শপথ করবে। তোমরা স্বীয় শপথসমূহ রক্ষা কর এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বীয় নির্দেশ বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর। [মায়িদা: ৮৯]তিনি বললেন: আমার পালনকর্তা আমাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন, তাই যথেষ্ট। অতএব, তোমরা আমাকে শ্রম দিয়ে সাহায্য কর। আমি তোমাদের তাদের মধ্যে একটি সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করে দেব। [কাহফ: ৯৫]


    তারা এমন লোক যাদেরকে আমি পৃথিবীতে শক্তিসামর্থ্য¸ দান করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজে আদেশ অসৎকাজে নিষেধ করবে। প্রত্যেক কর্মের পরিণাম আল্লাহর এখতিয়ারভূক্ত। [হাজ্জ: ৪১]তারা (শয়তান) কাজের উপযুক্ত নয় এবং তারা এর সামর্থ্যও রাখে না। [আশ শু’আরা: ২১১]


    তার কথা শুনে সুলায়মান মুচকি হাসলেন এবং বললেন, হে আমার পালনকর্তা, তুমি আমাকে সামর্থ্য¸ দাও যাতে আমি তোমার সেই নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি, যা তুমি আমাকে আমার পিতামাতাকে দান করেছ এবং যাতে আমি তোমার পছন্দনীয় সৎকর্ম করতে পারি এবং আমাকে নিজ অনুগ্রহে তোমার সৎকর্মপরায়ন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত কর। [আন নামল: ১৯]


    তারা আল্লাহর প্রতি ও কিয়ামত দিবসের প্রতি ঈমান রাখে এবং কল্যাণকর বিষয়ের নির্দেশ দেয়; অকল্যাণ থেকে বারণ করে এবং সৎকাজের জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করতে থাকে। আর এরাই হল সৎকর্মশীল [আলে ইমরান: ১১৪]

    অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর, শুন, আনুগত্য কর এবং ব্যয় কর। এটা তোমাদের জন্যে কল্যাণকর। যারা মনের কার্পন্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম [আত তাগাবুন: ১৬]

    আবার নিন্মোক্ত আয়াতগুলোতে মানুষের নিজ বুদ্ধিতে সামর্থ্যের নির্ধারণকে প্রত্যাখান করেছেন,

    যদি আশু লাভের সম্ভাবনা থাকতো এবং যাত্রাপথও সংক্ষিপ্ত হতো, তবে তারা অবশ্যই আপনার সহযাত্রী হতো, কিন্তু তাদের নিকট যাত্রাপথ সুদীর্ঘ মনে হল। আর তারা এমনই শপথ করে বলবে, আমাদের সাধ্য থাকলে অবশ্যই তোমাদের সাথে বের হতাম, এরা নিজেরাই নিজেদের বিনষ্ট করছে, আর আল্লাহ জানেন যে, এরা মিথ্যাবাদী। [আত তওবা: ৪২]

    তিনি তোমাদের জন্যে দ্বীনের ক্ষেত্রে সে পথই নিধারিত করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নূহকে, যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না। আপনি মূশরেকদেরকে যে বিষয়ের প্রতি আমন্ত্রণ জানান, তা তাদের কাছে দুঃসাধ্য বলে মনে হয়। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন এবং যে তাঁর অভিমুখী হয়, তাকে পথ প্রদর্শন করেন। [আশ শূরা: ১৩]


    তাই আমরা ফিকহের বই গুলতে দেখতে পাই মুজতাহিদগণ প্রতিটি হুকুম পালনের সাথে যোগ্যতাকে সংযুক্ত করেছেন এবং এ যোগ্যতার বিষয়টিকে দালিলিক ভাবে নির্ধারণ করেছেন।

    যেমনঃ শারীরিক ভাবে অক্ষম ব্যক্তিকে বিবাহের জন্য অযগ্য বিবেচনা করেছেন, নিসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকলে যাকাতের ফারজিয়াত থেকে মুক্ত করেছেন, হজ্জের সামর্থ্য না থকলে হজ্জের ফারজিয়াত থেকে মুক্ত করেছেন, মেয়েদের অনেক শারীরিক কারণে রোজা পালন কে নিষিদ্ধ করেছেন, নাবালককে চুক্তির জন্য অযোগ্য বিবেচিত করেছেন ইত্যাদি।

    এখন কেউ যদি শরীয়াহর নির্ধারিত পন্থায় যোগ্য না হন এবং সেই কাজ করার চেষ্টা করেন তাহলে শরিয়াহর দৃষ্টিতে তিনি অন্যায় করেছেন কারন রাসূল (সাঃ) বলেন,

    যেই এমন কোনো কাজ করল যে ব্যপারে আমাদের পক্ষ হতে কোনো নির্দেশ নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।


    যেমনঃ কেউ যদি নাবালকের সাথে চুক্তি করে তাহলে তা শরিয়াহর দৃষ্টিতে প্রত্যাখাত। কারণ শরীয়াহ নাবালককে চুক্তির জন্য অযোগ্য বিবেচিত করেছে।

    আবার আমাদের জন্য কখনোই এটা বলা উচিত হবেনা যে শরীয়াহর অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা নির্ধারণে নিশ্চুপ রয়েছে এবং এটা আমাদের উপর ছেড়ে দিয়েছে এবং এটা আমাদের বুদ্ধি দিয়ে নির্ধারণ আমাদের জন্য অনুমোদিত। ইসলাম হছে এমন একটি জীবন ব্যবস্থা যাতে প্রতিটি বিষয়ের সমাধান আছে। কারণ আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেছেন,

    আমি আপনার প্রতি গ্রন্থ নাযিল করেছি যেটি এমন যে তা প্রত্যেক বস্তুর সুস্পষ্ট বর্ণনা[আন-নাহল: ৮৯]

    আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম। [মায়িদা: ৩]

  • ইসলামি আহকাম অনুযায়ী রাজনৈতিক দলের স্বরূপ

    ইসলামি আহকাম অনুযায়ী রাজনৈতিক দলের স্বরূপ

    সুরা আল ইমরানের ১০৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে- “তোমাদের মধ্য হতে এমন একটি (অথবা একাধিক দল হোক, যারা আল খায়ের (অর্থাৎ ইসলাম)-এর দিকে আহবান করে, সৎকাজের আদেশ করে এবং অসৎকাজের নিষেধ করে এবং তারাই সফলকাম।”

    এই আয়াতের দুটি আলোচনা পর্যায় রয়েছে যা আমরা অনুসন্ধান করব। প্রথম পর্যায়ে আমাদের উপর্যুক্ত আয়াতের তাফসীর অর্থাৎ আয়াতের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত আলোচনা করব। দ্বিতীয় পর্যায়ে ‘তাশরি’ সংক্রান্ত অর্থাৎ আয়াতের শার’আ ও হুকুম সংক্রান্ত আলোচনা।

    আমরা অনেকেই তাফসীর ও তাশরি-এর ব্যাপারদ্বয়কে গুলিয়ে ফেলি। অনেক ভাইয়েরাই যারা তাফসীর শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন, তা থেকে আহকাম নেয়ার চেষ্টা করেন; বিশেষ করে সেই সকল মুফাস্‌সিরিনের তাফসীর থেকে যারা মুজতাহিদ পর্যায়ের। কেননা অনেক মুজতাহিদ মুফাস্‌সির তাদের তাফসীরে আহকাম উল্লেখ করে থাকেন যা তার নিজস্ব। তাফসীর হচ্ছে শুধুমাত্র আয়াতের ব্যাখ্যা। অন্যদিকে ‘তাশরি‘ ইজতিহাদ হচ্ছে মুফাস্‌সিরের নিজস্ব মতামত। কেননা মুজতাহিদ মুফাস্‌সিরের বিশেষ আয়াতের ব্যাখ্যায় নিজস্ব মত ও আহকাম সংক্রান্ত অভিমত থাকতেই পারে।

    (Text of the Quran)-এর ব্যাখ্যাকে তাফসীর এবং (Text of the Hadith)-এর ব্যাখ্যাকে শারহ বলে। এই সম্বোধনগুলো ফুকাহা ও উলামারা ব্যবহার করে থাকেন। তাফসীর কুরআনের অর্থ বোঝাতে এবং শারহ রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর হাদীসের অর্থ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তাই তাফসীর বা শারহ হচ্ছে কুরআন ও হাদিসের অর্থ বা ব্যাখ্যা। কিন্তু ‘তাশরি’ হচ্ছে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে হুকুম বের করে নিয়ে আসা বুঝায়।

    এখন প্রশ্ন হতে পারে, তাফসীরের প্রয়োজনীয়তা কী? যে কেউ ইজতিহাদ করতে চায় অথবা আহকাম জানতে চায় তার অবশ্যই আয়াতের তাফসীর বা ব্যাখ্যা জানতে হবে। কারণ তাফসীরের উপর নির্ভর করেই তাশরি’ করা হয়। কিন্তু আমাদের অবশ্যই আয়াতের তাফসীর এবং মুফাস্‌সিরের নিজস্ব মতামতের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। মুজতাহিদের ইজতিহাদকে তাফসীর বলে ভুল করা যাবে না। কারণ নতুন করে কোনো ইজতিহাদ করার জন্য শুধুমাত্র তাফসীর বা ব্যাখ্যা নেয়া প্রয়োজন, মুফাস্‌সিরের নিজস্ব মতামত নয়। অথবা আমরা সংযোজন করতে পারি মুজতাহিদের ইজতিহাদকৃত আহকাম।

    সুতরাং প্রথমেই আমাদের আলোচনার বিষয় আয়াতের ব্যাখ্যা অর্থাৎ তাফসীর উপরিউক্ত আয়াতের প্রথম শব্দটি হচ্ছে ‘ওয়ালতাকুন’। এই আয়াতের প্রথমবর্ণ হলো ‘ওয়াও’ [‘The Waw al Atf’]। ওয়াও এটি একটি সংযোগ বর্ণ। এই বর্ণের মাধ্যমে উল্লেখিত আয়াতের পূর্বে বর্ণিত অনেকগুলো আয়াত উক্ত আয়াতের সাথে সংযুক্ত হয়েছে। এখন প্রশ্ন দাঁড়ায় পূর্বের আয়াতগুলো কেমন? কারণ আয়াতসমূহের সংযুক্তি বোঝার জন্য পূর্বের আয়াতগুলোর পর্যালোচনা প্রয়োজন।

    সুরা আল ইমরানের ১০৪ নং আয়াত থেকে শুরু করে পরবর্তী অনেকগুলো আয়াতে আল্লাহ মুমিনদের লক্ষ্য করে কথা বলেছেন-

    হে মানুষ, তোমরা যারা ঈমান এনেছ তোমরা যদি আহলে কিতাবদের কোনো একটি দলের কথা মেনে চলো, তাহলে (মনে রেখো), ঈমান আনার পর এরা (ধীরে ধীরে) তোমাদের কাফির বানিয়ে দেবে।” [সূরা আলে ইমরান ৩:১০০]

    পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ্‌ বলেছেন-“তোমরা কীভাবে কুফরি করবে যখন তোমাদের সামনে (বার বার) আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হচ্ছে। তাছাড়া এ আয়াতের বাহক স্বয়ং তাঁর রাসূল যখন তোমাদের মধ্যেই মজুদ রয়েছে, যে ব্যক্তিই আল্লাহ ও তাঁর বিধানকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে, তাকে অবশ্যই সোজা পথে পরিচালিত করা হয়েছে। [সূরা আলে ইমরান ৩:১০১]

    এইখানে আল্লাহ মুমিনদের সম্বোধন করে বলেছেন যে তোমরা তাদের (কাফির) মতো হয়োনা যেহেতু তোমাদের মাঝে কুরআন ও হাদীস [অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ্ (সা.)-এর বাণী] বিদ্যমান। “তোমাদের মাঝে” কথাটির অর্থ কী? তা লাইব্রেরির মাঝে নয়, ঘরের মাঝে নয়; বরং তা আপনি ও আপনার কর্মের মাঝে বিদ্যমান। অর্থাৎ আপনি কুরআন ও সুন্নাহ অধ্যয়ন করছেন এবং সেই অনুযায়ী কাজ করছেন।

    এর পরের আয়াতে আল্লাহ বলেন: “হে মানুষ, তোমরা যারা ঈমান এনেছ, আল্লাহকে ভয় করে (তার ক্রোধ হতে) বেঁচে থাকো, সত্যিকার অর্থে (তা করো) যেভাবে ভয় করা উচিত। এবং মুসলিম (তাঁর কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণকারী) না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।”

    এইরূপ কুরআনের অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ বলছেন- “এবং পালনকর্তার এবাদত করুন, যে র্পযন্ত আপনার কাছে ইয়াকীন (নিশ্চয়তা) না আসে (অর্থ: মৃত্যু)” [১৫:৯৯] এখানে নিশ্চয়তার কথা বলতে মৃত্যু বোঝানো হচ্ছে। সুতরাং আল্লাহর ইবাদত, আল্লাহর কাছে এস্তগেফার এভং আল্লাহকে সঠিকভাবে ভয় করতে হবে মৃত্যু র্পযন্ত।”

    আল ইমরানের ১০৩নং আয়াতে বলা হচ্ছে- “তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরো।” এখানে রজ্জু বলতে কুরআন ও সুন্নাহকে বোঝানো হচ্ছে।

    একই আয়াতে আল্লাহ আরো বলেছেন- “আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদেরকে দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে, এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ।” যেমন- হিজরতের পর আনসার সাহাবিরা মুহাজিরদেরকে নিজেদের অর্থ এমনকি স্ত্রীও বণ্টন করে দিতে চেয়েছিলেন ভ্রাতৃত্বের কারণে।

    একই আয়াতের শেষে আল্লাহ বলেছেন- “তোমরা এক অগ্নিকুন্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদের মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ নিজের নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা হেদায়েতপ্রাপ্ত হতে পারো।” [সূরা আলে ইমরান ৩:১০৩]

    সুতরাং, ১০৪নং আয়াতের পূর্বের সবগুলো আয়াতে বলা হয়েছে কাফের না হওয়ার কথা, কাফেরদের অনুসরণ না করার কথা, আল্লাহকে মান্য করার কথা, আল্লাহকে সঠিকভাবে ভয় করার কথা, ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের কথা এবং ঐক্যের কথা যার প্রত্যেকটিই ইসলামে ফরয বিষয়। যা মানা বাধ্যতামূলক।

    সুতরাং, ১০৪নং আয়াতে উল্লিখিত (ওয়াও) সংযুক্তি বর্ণটি উপরের আয়াতসমূহে বর্ণিত সকল বাধ্যতামূলক কাজের সাথে সংযোগ তৈরি করেছে। এই বিষয়টি আমাদের মনে রাখতে হবে ‘তাশরি’ সংক্রান্ত আলোচনায়।

    ১০৪নং আয়াতে প্রথমেই বলা হয়েছে- ‘ওয়ালতাকুন‘। এখানে ‘লাম‘ (ل) হচ্ছে ‘Laam of Amr’ তথা নির্দেশসূচক লাম। এই বর্ণের মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের বিশেষ বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।

    ওয়ালতাকুন‘ বলতে এখানে ‘ফে’ল‘ বা ক্রিয়া বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহ পক্ষ থেকে ‘ফে’ল আমর‘ বা নির্দেশসূচক ক্রিয়া বোঝানো হচ্ছে। এর পরে বলা হয়েছে- ‘মিন‘। এর দুটি অর্থ হতে পারে-

    ১) প্রথম অর্থ হতে পারে ‘তোমাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক‘ যাকে তাব’ঈদ বলা হয়।

    ২) দ্বিতীয় অর্থ হতে পারে, ‘জিন্‌স’ যার দ্বারা প্রকার বোঝায়। যেমন- ইংরেজিতে বলা হয় from (হতে বা থেকে)। যদি বলা হয় give me your son and I will make from him a good fighter (অর্থ- আপনার ছেলেকে দিন, আমি তার হতে বা থেকে বা দ্বারা ভালো যোদ্ধা বানাব।) সুতরাং হতে বা থেকে বলতে পরিপূর্ণতা বোঝানো হচ্ছে, অংশবিশেষ নয়। অর্থাৎ পরিপূর্ণরূপেই ভালো যোদ্ধা, অংশবিশেষ ভালো যোদ্ধা আর অংশবিশেষ খারাপ এমন নয়। ‘হতে‘ বা ‘থেকে‘ বলতে সম্পূর্ণতা বোঝানো হয়। এটাকে ‘বয়ান আল জিন্‌স‘ বলা হয়।

    সুতরাং উপরের দুটি অর্থের যে কোনোটি হতে পারে। অর্থাৎ আল্লাহ সমগ্র উম্মতকে নির্দেশ দিয়েছেন। এটাকে বলা হয় ‘লি’ইল তাব’ঈদ ওয়া বয়ান আল জিন্‌স‘। দুটি সম্ভাব্য অর্থের যেকোনো একটি হতে পারে। যা আমাদের ‘তাশ্‌রি’ সংক্রান্ত আলোচনায় মনে রাখতে হবে।

    এরপর বলা হয়েছে- ‘কুম‘। এখানে ‘কুম‘ হচ্ছে (ضمير) বা সর্বনাম। সুতরাং এখানে কাদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে? এখানে সম্বোধন করা হয়েছে ‘হে ঈমানদারগণ‘ বলে। সেভাবে এর পূর্ববর্তী আয়াতাগুলোতেও পাশাপাশি সম্বোধন করা হয়েছে ‘হে মুসলিম’ বলে। যা আমাদের ‘তাশরি’ সংক্রান্ত আলোচনায় মনে রাখতে হবে।

    পরবর্তীতে বলা হয়েছে- ‘উম্মাতুন‘ অর্থাৎ এক বা একাধিক দল যারা খায়র (ইসলামের) দিকে আহবান করে। এই আহবানকারীদেরকে অর্থাৎ ‘সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নির্দেশ করতে হবে। এবং তখনই ‘ওয়া উলাইকা হুমুহুল মুফলিহুন‘ অর্থাৎ তারা হবে সফলকাম।

    এখন আপনারা যে কোনো তাফসীর বইতে এরূপ ব্যাখ্যা দেখবেন তা হবে শুধুই তাফসীর। এর বাইরে বা অতিরিক্ত যা কিছুই দেখবেন তা হচ্ছে ‘তাশ্‌রি’ এবং মুফাস্‌সিরের নিজস্ব মতামত। [মুফাস্‌সিরের ইজতিহাদ]। সুতরাং, এই পার্থক্যাদির ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। এবার আপনারা সকল তাফসীর, বই যেমন- ইমাম কুরতুবী, ইমাম ইবন জরীর, আত্‌ তাবারী, ইবন কাসীর এবং অন্য যে কোনো কিতাবে আপনি এইরূপ তাফসীর বা ব্যাখ্যা দেখতে পাবেন। পাশাপাশি অনেক পার্থক্য দেখতে পবেন ‘তাশরি’ সংক্রান্ত বিষয়ে।

    এখন আমরা নিজেদেরকেই প্রশ্ন করি কীভাবে আমরা আহকাম বের করে নিব। আজকাল আয়াত থেকে আহকাম বের করে আনা একটি কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীতে এটা অনেকটাই সহজ ছিল। আমরা দেখি, আরব বেদুঈন, যারা ছিল অশিক্ষিত, তারা যখনই কোনো হুকুম সম্বন্ধে জনতে চাইত তৎক্ষণাৎ মদীনায় চলে আসত যেখানে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) উপস্থিত ছিলেন। তারা সেখানে বাজারে, দোকানে মানুষের সাথে সাক্ষাৎ করে বলত, আমাকে এই মাসআলা বা বিষয়টির ক্ষেত্রে সাহায্য করুন। তারা জিজ্ঞেস করত না আপনার পরিচয় কী? অথবা জানতে চাইত না কে আবু বকর (রা.), কে উমর (রা.)। কেননা ইসলাম ওখানে বাস্তবায়িত অবস্থায় ছিল। প্রত্যেকেরই আহকাম বের করে আনার [অর্থাৎ ইজতিহাদ করার জন্য যা প্রয়োজন তার সবই তাদের মধো বিদ্যমান ছিল] দক্ষতা ছিল। কারণ প্রত্যেকেই আহকাম (কুরআন ও সুন্নাহ) এবং আরবি ভাষায় পারদর্শী ছিল। আজকাল অনেক ভাইয়ের সুন্দর সব ডিগ্রি ও পি.এইচ.ডি থাকা সত্ত্বেও তারা ইসলামের সাধারণ আহকাম বের করতে অপারগ। কেন মুসলিম উম্মাহর ‘হুকুম বের করার মানসিকতা’ নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে? কারণ বাস্তবে ইসলাম নেই এবং মুসলিম উম্মাহ ইসলাম বাস্তবায়নে এগিয়ে আসছে না। তাই ব্যাপারটি আমাদের কাছে অতীব কঠিন যেহেতু ‘হুকুম বাস্তবায়ন’ আমাদের বাস্তবতা নয় এবং খিলাফত ব্যবস্থাও আর বর্তমান নেই।

    এখন এই আয়াতের ‘তাশরি’ করার ক্ষেত্রে আমরা প্রথমেই আয়াতের তাফসীর (অর্থাৎ আরবি ভাষার সাধারণ অর্থ) দেখব। উপরের বিশ্লেষণটি হচ্ছে আরবি ভাষার এক সাধারন বুঝ। এছাড়াও আলোচনা সংশ্লিষ্ট হাদীসও তুলে আনা হবে।

    আয়াতের মধ্যে ‘ওয়াও’ হচ্ছে প্রথম নির্দেশনা (কারীনা)। যদিও একটি নিশ্চিত নির্দেশনা নয়। হুকুমটি জানার জন্য আমরা অন্যান্য নির্দেশনাগুলো পর্যালোচনা করব। কারীনা বলতে সাধারণভাবে বোঝানো হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশনা সম্বলিত নির্দেশ হতে পারে তা ফরজ অর্থাৎ যা পালন করলে পুরস্কার আছে না করলে আছে শাস্তি অথবা হতে পারে মানদুব/মুস্তাহাব/নফল অর্থাৎ যা পালন করলে আছে পুরস্কার কিন্তু পালন না করলে শাস্তি নেই। অথবা হতে পারে শুধুই মুবাহ।

    যেমন আল্লাহ বলেন- নামায প্রতিষ্ঠা কর। [২৪:৫৬]। এটি হচ্ছে নির্দেশসূচক বা ‘আমর’। অর্থাৎ সালাত আদায় করলে পুরস্কৃত হবে এবং সালাত আদায় করা থেকে বিরত হলে শাস্তি পাবে।

    আবার রাসূলুল্লাহ্ (সা.) দুই রাকায়াত ফজরের পূর্বে এবং মাগরিবের পরে সালাত আদায় করতে বলেছেন, যা হলো সুন্নাহ।

    এছাড়া আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরো বলেছেন- ‘যখন তোমরা এহরাম থেকে বের হয়ে এসো, তখন শিকার করো (যদি চাও)’। [৫:২] হাজীগণ হজ্বরত অবস্থায় শিকার করতে পারে না। তবে ‘মানাসিক’ (আনুষ্ঠানিকতা) শেষ হওয়ার পর শিকার করা যায় যেভাবে আয়াতে বলা হয়েছে। কিন্তু ফরয বা মানদুব নয়। সুতরাং আল্লাহর নির্দেশ ও রাসুলুল্লাহ্ (সা.) এর নির্দেশ হতে পারে ফরয, মানদুব, মুবাহ ইত্যাদি।

    সুতরাং ১০৪নং আয়াতের শুরুতে ‘ওয়াও’ দ্বারা এর পূর্ববর্তী যেসকল আয়াতের সাথে সংযোগ ঘটেছে তার প্রত্যেকটিই ইসলামের অতীব গুরুত্বপূর্ণ ফরয বিষয় ব্যক্ত করেছে যেমন- জাহান্নামের আগুন থেকে দূরে থাকা, ঐক্য, কাফিরদের অনুসরণ না করা, ইসলামকে আঁকড়ে ধরা ইত্যাদি। তাই এই সংযুক্তি ফরযের দিকে নির্দেশনা ইঙ্গিত করে। যেমনিভাবে আগেই বলা হযেছে এখানে ‘লাম’ হচ্ছে নির্দেশসূচক ‘Laam of Amr’। এই বর্ণের মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের বিশেষ বিষয় সম্পাদনের দিকে ইঙ্গিত করেছেন এবং তাই বিষয়টি ফরয হয়ে গিয়েছে।

    আমরা আগেই উল্লেখ করেছি ‘মিন‘ দ্বারা আরবি ভাষায় দুটি সম্ভাব্য অর্থ হতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো কোন্‌ অর্থটি আমর নিব? এটা কি আমাদের প্রবৃত্তির উপর ছেড়ে দিব অথবা এটি কি কোনো আবেগের বিষয়? না। আমাদের অবশ্যই আয়াতটি বুঝতে হবে এবং সবচেয়ে উপযুক্ত অর্থই বেছে নিতে হবে।

    সমগ্র উম্মতের পক্ষে খায়র অর্থাৎ ইসলামের দিকে আহবান করা এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করা সম্ভব নয়। এর প্রথম কারণ হচ্ছে সমগ্র উম্মত কখনই একই উপলব্ধিতে এবং একই দলের ব্যানারে কাজ করবে না। এছাড়াও দ্বিতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হলো উম্মাহর অনেকেই সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করতে সমর্থ নয়। কিছু ব্যক্তি ইসলামের হুকুমের ব্যাপারে জাহেল। আবার কিছু ব্যক্তি সৎকাজের আদেশ করার জন্য চিন্তাগতভাবে দুর্বল বা অযোগ্য এবং এর পাশপাশি অন্যান্যদের বিভিন্ন ওজর বিবেচনায় রাখতে হবে। সুতরাং প্রাসঙ্গিক ভাবেই আমরা ‘লিই’ল তাব’ঈদ’ অর্থাৎ ‘তোমাদের মধ্যে অংশবিশেষ’।

    এরপর বলা হয়েছে ‘কুম‘ যার অর্থ ‘তোমরা‘ অর্থাৎ ‘মুসলিমেরা’। সুতরাং এই দলটি অমুসলিমদের মধ্যে হলে তা হারাম হবে। এর সদস্যরা কেউ কাফির হতে পারবে না। শুধুমাত্র ইসলামি আকীদার ভিত্তিতে মুসলমানরাই হতে পারবে।

    একইভাবে ‘উম্মাতুন‘ দ্বারা বোঝানো হচ্ছে এটিকে অবশ্যই উম্মাহর মধ্যে হতে হবে। হবে না কোনো জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে যেমনিভাবে বর্তমানে অনেক ইসলামি নাম রয়েছে পাশাপাশি তাদের অমুসলিম সদস্যও রয়েছে অথবা এমন কিছু পলিসির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে যা সম্পূর্ণ হারাম। এর প্রত্যেকটিই ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম।

    এখন প্রশ্ন হচ্ছে যেহেতু এখানে ‘উম্মাতুন’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, এখানে কি অন্য শব্দ ব্যবহার করা যাবে? উক্ত দলের নাম কি অবশ্যই ‘উম্মাহ’ হতে হবে। যেমন- ‘উম্মাহ ইসলামিয়া’ উম্মাহর পরিবর্তে হিযব বা জামাআত বা কুতলা বা ফিরকাহ ইত্যাদি শব্দ কি ব্যবহার করা যাবে? নাকি এর বাইরে যাওয়া হারাম হবে? ‘উম্মাহ’ শব্দটি কি শর’ঈ অর্থ বহন করছে? শর’ঈ অর্থ বলতে বুঝায় যখন আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) কোনো সাধারণ আরবি শব্দকে বিশেষ অর্থ প্রদান করেন। যেমন: ‘সালাত’ শব্দটির আরবি পরিভাষা হচ্ছে দু’আ। কিন্তু যখন তা মাগরিবের দু’আ হয় তখন তা হয়ে যায় সালাত। এমননিভাবে বলা যায় জিহাদ, যাকাত ইত্যাদির কথা যেগুলোকে পরিবর্তন করা সম্পূর্ণরূপে হারাম। কিন্তু, যদি এটি শুধুই পারিভাষিক অর্থ বহন করে সেক্ষেত্রে শব্দ পরিবর্তনে সমস্যা নেই। সুতরাং যেহেতু এখানে শুধুই পারিভাষিক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তাই এই দলটিকে ‘জামা’আত’ বললেও সমস্যা হবে না। বর্তমানে আপনি যদি জামাআত শব্দটি দলের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন তবে আপনার কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে না। এবং একই কথা ‘কুতলার’ ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিন্তু আপনি যদি ‘হিযব’ শব্দটি ব্যবহার করেন তাহলে সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে।

    অনেকেই প্রশ্ন করবে কীভাবে আপনারা নিজেদেরকে হিযব বলতে পারেন? অনেকেই এই ধারণাটিকে পছন্দ করেন না। তাদের জন্য কুরআনের এই আয়াতটিই যথেষ্ট যেখানে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেছেন- “তোমাদের কাছে হয় তো কোনো একটি বিষয় পছন্দসই নয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হয়তবা কোনো একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয় অথচ তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। বস্তুত; আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না। [২:২১৬]। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) ‘হিযব’ শব্দটি কুরআনে নবী ও সাহাবীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন। যেমন- আল্লাহ বলেন-“তারাই আল্লাহর দল। জেনে রেখ, আল্লাহর দলই সফলকাম।” [৫৫:২২] আল্লাহ হিযব শব্দটি ব্যবহারে নিষেধ করেননি। হিযব শব্দটির দুইটি অর্থ হতে পারে। পারিভাষিক অর্থটি হচ্ছে ‘মানুষের দল’। যেমন- কোনো সেনাবাহিনী বা কোনো গোত্রকেও হিযব বলা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বর্পূণ রাজনৈতিক অর্থটি হচ্ছে এমন একটি দল যার সদস্যরা একই আদর্শ ও মতে বিশ্বাস করে, তা চর্চা করে এবং সমাজে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে।

    এই দলটিকে সম্বোধন করে আল্লাহ বলেছেন- (يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ) অর্থাৎ, তারা অবশ্যই ইসলামের দিকে আহবান করবে।’ সুতরাং প্রথমে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এই দলের সদস্যদের মুসলিম হতে বলেছেন এবং এরপর তাদেরকে আহবান করতে বলেছেন এর ‘কনসেপ্ট’-এর দিকে। অর্থাৎ এই দলটির সদস্যরা হবে মুসলিম এবং ‘ইসলাম’ হবে তাদের কনসেপ্ট। এ থেকে বুঝা যায় যে, দলটিতে কোনো অমুসলিম সদস্য থাকা যেমনি হারাম তেমনিভাবে হারাম হবে কোনো অনৈসলামিক আহবানের ভিত্তিতে দল করা যেমন- সমাজতান্ত্রিক দল, কম্যুনিস্ট দল, গণতান্ত্রিক দল অথবা পুঁজিবাদী দল যার প্রত্যেকটিই সম্পূর্ণরূপে হারাম। ‘ওয়া ইয়া‘মুরুনা বিল মা’রূফ ওয়া ইয়ানহাওনা আনিল মুনকার’ অর্থাৎ আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রথমেই আল্লাহ দলটিকে ইসলামের দিকে আহবান করতে বলেছেন এবং বিশেষভাবে বলেছেন সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করতে।

    আমরা সবাই জানি, সাধারণভাবেই সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করা ইসলামে ফরয এবং ইসলামের অংশ। তারপরও এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ কী?

    এখানে ‘আল খায়র’ হচ্ছে সাধারণ (আম) এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ হচ্ছে বিশেষ (খাস্‌)। সুতরাং আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) সাধারণ নির্দেশের পর বিশেষ নির্দেশ কেন দিলেন? আলেমদের মতে, একটি আম এর পর যদি একটি খাস্‌ থাকে এবং একে অপরের সাথে সংযুক্ত থাকে, সেক্ষেত্রে খাস্‌ বিষয়টি অতিরিক্ত অর্থ বহন করে। যেমন- আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা.) বলেন- “যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা ও রাসূলগণ এবং জিবরাইল ও মিকাইলের শত্রু হয়, নিশ্চিতই আল্লাহ সেসব কাফেরদের শত্রু। (২:৯৮)।

    এখানে আল্লাহ বলছেন যারা আল্লাহর রাসূল ও ফেরেশতাগণ এবং জিবরাইল ও মিকাইল এর শত্রু হয়, আল্লাহও তাদের শত্রু হন। এখানে জিবরাইল ও মিকাইল ফেরেশতাদের মধ্য হতে হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে বিশেষভাবে উল্লখে করা হয়েছে। এখানে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) সেইসব ইহুদিদের কথা বলছেন যারা নিজেদের নিরাপদ দাবি করে। কিন্তু জিবরাইল ও মিকাইলের প্রতি ঘৃণা পোষণ করে। এক্ষেত্রে আলেমগণ দুটি অর্থ করেন- একটি হতে পারে আল্লাহ বিশেষ মর্যাদাস্বরূপ জিবরাইল ও মিকাইল-এর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন অথবা এর কারণ হতে পারে যে ইহুদিদের জিবরাইলের প্রতি ঘৃণা কারণ তারা মনে করত জিবারইল (আ:) ভুল করে নবুয়্যত নিয়ে রাসূল (স.)-এর কাছে গমন করেছিলেন, কোনো ইহুদির কাছে না গিয়ে। (আল্লাহ তাদের অভিশপ্ত করুক)। সুতরাং আমরা দেখলাম সাধারণ বিষয়ের পর বিশেষ বিষয় উল্লেখ থাকলে তার অর্থও অতিরিক্ত হয়।

    এখন আমরা মূল আয়াতে ফিরে যাই, যেখানে আল্লাহ সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের কথা বলেছেন। যা অতিরিক্ত অর্থ বহন করে।

    প্রথম অর্থ হতে পারে, ইসলামে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের গুরুত্ব তুলে ধরা কেননা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আল খায়র (ইসলাম) এর পর এর উল্লখে করেছেন যেমনিভাবে আগের উদাহরণে আমরা দেখেছি।

    দ্বিতীয় অর্থ হতে পারে, ‘আদেশ’ ও ‘নিষেধের’ আরবি পারিভাষিক অর্থ যেমন-‘লিসান আল আরব’ (আরবি ভাষার অভিধান) এবং ক্লাসিক্যাল আরবি ভাষার অভিধান (আল ফায়রুজ আবাদি আল-কামূস আল মুহিত-এ এবং ইবন মানজুর-এর লিসান আল-আরব-এ) এই দুই জায়গায় আমরা দেখতে পাই, এখানে মানুষকে নির্দেশ দেয়া এবং আদেশ এবং নিষেধ করাকে (সিয়াসাহ বা রাজনীতি) বলা হয়েছে। সুতরাং মানুষকে কিছু করতে বলা এবং কিছু থেকে বিরত থাকেত বলা হচ্ছে রাজনীতি। তাই আল্লাহ যখন বলেন- ‘ইয়াদ’উনা ইলাল খাইর ওয়া ইয়া‘মুরূনা বিল মারূফে ওয়া ইয়ানহাওনা আনিল মুনকার’ তখন আল্লাহ আমাদেরকে রাজনৈতিক উপায়ে ইসলামের আহবান করার কথা বলছেন। এবং এটাই হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ যা তিনি সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের মাধ্যমে উল্লেখ করেছেন। এটাই হল একমাত্র পথ যার মাধ্যমে ইসলামের দিকে আহবান করা যায়।

    এখন প্রশ্ন হলো রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার অর্থ কী? আমরা ইসলামের দিকে আহবান করতে পারি রাজনৈতিকভাবে অথবা অরাজনৈতিক ভাবে। যেমন- আমরা মানুষকে বলতে পারি- ‘ভাই, ‘সালাত’ আদায় করুন কারণ এটি একটি ফরয ইবাদত ইত্যাদি। অথবা কাউকে মিথ্যে বলতে দেখলে বলত পারি ‘ভাই মিথ্যে বলা হারাম’। যেমননিভাবে রাসূল (সা.) বলেছেন- ” যখন কেউ মিথ্যে কথা বলে, তখন ফেরেশতারা ব্যক্তিটি থেকে নির্গত হওয়া দুর্গন্ধের কারণে অনেক দূরে সরে যায়” [আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত]। অর্থাৎ আপনি কোনো ব্যক্তিকে হারাম করতে দেখলে নিষেধ করুন এবং ফরয ত্বরক করলে আদায়ের নির্দেশ দেন, কিন্তু সমাজ, রাষ্ট্র এবং শাসকদের ব্যাপারে আপনার দায়িত্ব কী? আমরা যখন সৌদি-আরবের বাদশাহদেরকে হারামের মধ্যে নিয়োজিত দেখি তখন নিশ্চুপ থাকি। অথচ উম্মাহ্‌র সাধারণ মানুষেরা হারাম করলে নিষেধ করি। এক্ষেত্রে আপনি ইসলামের দিকে আহবান করছেন এটা কেউই অস্বীকার করবে না কিন্তু আপনি রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন না। এর অর্থ হচ্ছে, আপনি সাধারণ মানুষদের ব্যাপারে কথা বলছেন অথচ শাসকবর্গকে ছেড়ে দিচ্ছেন। এভাবে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়। আর এটা সমস্যার সমাধানও নয়।

    আল ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল বলেছেন- “আমি যদি জানি যে আল্লাহ আমার একটিমাত্র দাওয়াহ্‌ কবুল করবেন। তবে আমি দাওয়াহ্‌ করব। আমি দাওয়াহ্‌ করব না কোনো মুজাহিদদেরকে যারা জিহাদ করছে, কাফিরদের কাছে ইসলাম পৌঁছে দিচ্ছে এবং মুসলিম উম্মাহ্‌কে রক্ষা করছে, না কোনো গরিব মানুষদেরকে, না কোনো মাকে, না কোনো শিশুকে না কোনো অসুস্থকে বরং শুধুমাত্র শাসকবর্গকে (দাওয়াহ্‌ করব)।” শাসক যদি সৎ হয়, আল্লাহর ইচ্ছায় তার মানুষগুলোও হবে সৎ। যেমন: উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর সময়।

    একবার এক ব্যক্তি আলি ইবনে আবি তালিব (রা.)- এর কাছে এসে বললেন, “এটা কেন যে, আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.)-এর খিলাফত আমল ছিল অনেক বেশি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ? তখন আলি (রা.) বললেন- ‘কারণ ওনাদের সময় আমার মতো মান্যকারীরা ছিল আর আজ আমার সাথে আছে তোমাদের মতো মান্যকারীরা।” এরপরও আলি (রা.) মানুষের দেখাশোনা করেছেন এবং রাষ্ট্রের বিদ্রোহীদের শাস্তি দিয়েছেন। আর এটাই হল রাজনৈতিক পন্থা এবং এই অতিরিক্ত অর্থের কথাই বলা হয়েছে।

    ওয়া উলা ইকা হুমুল মুফলিহুন“- অর্থ: ‘তারাই হবে সফলকাম।’ ‘তারা’ বলতে উম্মাহ্‌কে বুঝানো হয়েছে এবং ‘ফালাহ্‌‘ বলতে বোঝানো হয়েছে দুনিয়া ও আখিরাত। অর্থাৎ, তাদের দুনিয়ার জীবন হবে সুন্দর এবং আল্লাহ আখিরাতে তাদেরকে পুরস্কৃত করবেন ও জান্নাতে দাখিল করবেন।

    এই হুকুমটি সাধারণভাবে ফরযে কিফায়া। ইমাম ইবনে কাসির, ইমাম আল কুরতুবী, ইমাম আল গাজ্জালি তাঁর বই ‘আল মুসতাসফা’-তে, ইমাম ইবনে হাযম তাঁর বই ‘আল ইহকাম ফি উসুল আল আহকাম’-এ এবং ইমাম জারীর আত্‌ তাবারি প্রত্যেকেই এই বিষয়টি ইজতিহাদ করেছেন এবং বলেছেন এটি উম্মাহ্‌র জন্য ‘ফরযে কিফায়া’ এবং সমষ্টিগতভাবে এটি আদায় করা উচিত। তখন এই ফরযটিকে আমরা কীভাবে বুঝব? প্রথম ‘নির্দেশনাটি’ (কারীনা) ছিল ‘ওয়াও’ যদিও তা নিশ্চিত নয় তথাপি যে সকল আয়াতের সাথে এর সংযোগ ঘটেছে তা ফরযের দিকেই নির্দেশনা প্রদান করে। আবার আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) ইসলামের দিকে আহবান করতে বলেছেন যা একটি ফরয বিষয়। একই ভাবে আল্লাহ সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করতে বলেছেন এবং আমরা সকলেই জানি এটি ফরয। আল্লাহ বলেছেন- “আর ঈমানদার পুরুষ, ইমানদার নারী একে অপরের সহায়ক। তারা ভালো কাজের আদেশ দেয় এবং মন্দ কাজে নিষেধ করে।” [৯:৭১] আবার আল্লাহ বলেছেন- “বনী ইসরাইলের মধ্যে যারা কাফের তাদেরকে দাউদ ও মরিয়ম তনয় ইসার মুখে অভিসম্পাত করা হয়েছে। এটা এ কারণে যে, তারা অবাধ্যতা করত এবং সীমা লঙ্ঘন করত। তারা পরস্পরকে মন্দ কাজে নিষেধ করত না, যা তারা করত, তা অবশ্যই মন্দ ছিল।” অর্থাৎ পূর্ববর্তী কাফের সম্প্রদায়ের উপর অভিসম্পাত করা হয়েছিল তাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ না করার কারণে। আর যেহেতু মুসলমানদের জন্য ইহুদি অথবা খ্রিস্টানদের অনুসরণ হারাম তাই এটি ফরয বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে।

    রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-” তোমরা সৎকাজের আদেশ কর এবং অসৎকাজের নিষেধ কর। নতুবা আল্লাহ তোমাদের মধ্যে এমন কিছু ব্যক্তিকে ক্ষমতায় চাপিয়ে দিবেন। যারা তোমাদের উপর জঘন্যসব শাস্তি চাপিয়ে দিবে, এরপর তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সৎ লোকেরা দোয়া করবে কিন্তু সে দোয়ার উত্তর দেয়া হবে না।”

    “তোমরা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ কর নতুবা আল্লাহ তোমাদের বিপরীতে এমন কাউকে দাঁড় করাবেন যাদের অন্তরে থাকবে না তরুনদের জন্য কোনো দয়া এবং বৃদ্ধদের জন্য কোনো শ্রদ্ধা।” [ইবনুল কাইয়্যুম]

    তাই যেহেতু সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করা ফরয এবং উক্ত আয়াতে দলটির এই কাজকে সরাসরি সংযুক্ত করা হয়েছে সুতরাং এই দলটি থাকাও ফরয হয়ে গিয়েছে।

    সর্বশেষ নির্দেশনাটি (কারীনাহ) এই আয়াতে উল্লখে করা হয়েছে তা হলো- এই কাজটিকে সংযুক্ত করা হয়েছে ‘মুফলিহুন‘ অর্থাৎ সফলতার সাথে অর্থাৎ যারা কাজটি আদায় করবে তারাই সফল অন্যরা নয়। এইসকল কারীনাহ আয়াতটির ফরয হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করছে। এছাড়াও সাধারণভাবে একটি উসুল (নীতি) আমরা সবাই জানি যে, ‘যা কিছু ফরযের দিকে নিয়ে যায় তা নিজেই ফরয।’ [মা লা ইয়াতিম্মুল ওয়াজিবু ইলা বিহী ফা-হুয়া ওয়াজিব]।

    বর্তমানে এই উম্মাহ্‌র অভ্যন্তরে সবচেয়ে বড় যে মুনকার (অসৎকাজ) সাধিত হচ্ছে তা হল মুসলিম শাসকগুলো কুফর আইন দ্বারা শাসন করছে। কুফর ও পুঁজিবাদের প্রচার-প্রসারই হচ্ছে সবচেয়ে বড় ‘মুনকার’ (অসৎকাজ) আর তাই সবচেয়ে বড় মা’রূফ (সৎকাজ) হচ্ছে ইসলামকে সকল দ্বীন/জীবন ব্যবস্থার উপর বিজয়ী করা, পৃথিবীর বুক থেকে কুফরকে সরিয়ে ইসলাম বাস্তবায়ন করা, কাফেরদের কাছে ইসলামকে পৌঁছে দেয়া। হয় তারা ইসলাম গ্রহণ করবে অথবা জিজিয়া দিয়ে ইসলামি শাসনের ছায়াতলে আসবে। এই সর্বোচ্চ পর্যায়ের মা’রূফটি আমরা কীভাবে আদায় করব? এটা ততক্ষণ আদায় হবে না যতক্ষণ না আমরা একটি ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থার মাধ্যমে ইসলামকে সমাজে বাস্তবায়িত না করছি। সুতরাং ইসলামি খিলাফত ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় যদি না আমাদের মধ্যে একটি রাজনৈতিক দল থাকে, যারা রাজনৈতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে এগিয়ে যায়। সুতরাং এই সব নির্দেশনাই ফরযের দিকে ইঙ্গিত করে। এবং এটি একটি সমষ্টিগত ফরয। কেননা বলা হয়েছে-‘ তোমাদের মধ্য হতে এমন একটি দল হোক’।

    এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারে ইসলামে একের অধিক দল থাকা কি জায়েজ? একাধিক দল থাকা বা দুটি দল থাকা কি হারাম? ইত্যাদি।

    এই আয়াতে আল্লাহ যদি একটি দল থাকা নির্দিষ্ট করে দিতেন তাহলে ‘উম্মাহ’ শব্দটির পর ‘ওয়াহিদা’ শব্দটিও উল্লেখ থাকত যার অর্থ ‘এক’। উসূলের পরিভাষায় একে ‘আল মাফহুম’ বলে এবং এটি ‘আল মাফহুম আল-আদাদ’ শ্রেনিতে পড়ে। সুতরাং উক্ত আয়াতে একটি দলের কথা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয় নি বরং সাধারণভাবে ‘উম্মাহ্‌’ বলা হয়েছে তাই একাধিক দল থাকা জায়েজ। এবং এটি একটি সমষ্টিগত ফরয ইবাদত।

    এখন প্রশ্ন হচ্ছে সমষ্টিগত ইবাদত (ফরয কিফায়া) এবং ব্যক্তিগত ইবাদত (ফরযে আইন)-এর মধ্যে পার্থক্য কী? নিচের উদ্ধৃতিটি ইমাম আল গাজ্জালির বই ‘আল মুসতাসফা’ থেকে। যেখানে তিনি বলেছেন- “ব্যক্তিগত ইবাদত ও সমষ্টিগত ইবাদতের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে এটি কীভাবে আদায় করা হয় তার ভিত্তিতে এবং কীভাবে গুনাহের দায়ভার সরানো হবে তার ভিত্তিতে। উভয়ে শর’ঈ অর্থের দিক থেকে সকল মুসলিমের জন্য ফরয, কিফায়া হোক বা আইন হোক। যদিও ব্যক্তিগত ইবাদত প্রত্যেক মুসলমানে উপর ফরয আর সমষ্টিগত ইবাদত মুসলমানদের মধ্যে একটি দলের উপর ফরয। কিন্তু এই পার্থক্যটি শুধুমাত্র ‘হুকুমি’ পার্থক্য। সুতরাং ব্যক্তিগত ইবাদত প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয এবং তা আদায় করলে গুনাহ্‌ থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু কিছু ব্যক্তি যদি তা আদায় না করে তবে গুনাহর দায়ভার এড়াতে পারবে না। যেমন: ‘সালাহ’। অন্যদিকে সমষ্টিগত ইবাদতও প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয। কিন্তু কিছু ব্যক্তি যদি তা আদায় করে তবে তারা যেমনি গুনাহ থেকে মুক্তি পাবে এবং পুরস্কৃত হবে তেমনিভাবে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্‌ই ফরয আদায়ের দায়ভার হতে মুক্তি পাবে।

    এখন ‘ফরয কিফায়া’ সংক্রান্ত বিষয়ে ভুল বুঝাবুঝি হতে পারে। অনেক মুসলিমই বলে থাকেন, যেহেতু এটি ফরযে কিফায়া, তাই তুমি যাও আদায় কর এবং আমি আমার কাজ করি। ‘ফরয কিফায়া’ একটি ফরয। পার্থক্যটি শুধু ‘হুকুমি’।

    তাই প্রত্যেক মুসলমানের এই ফরয দায়িত্বে অংশগ্রহণ করা আবশ্যক। যেমনিভাবে আবশ্যক খিলাফত (ইসলামি রাষ্ট্র) ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণ নতুবা এই গুনাহের দায়ভার থেকেই যায় যেমনি করে দায়ভার থেকে যায় ‘সালাত’ আদায়ের ক্ষেত্রে যতক্ষণ না তা আদায় করা হচ্ছে। আর তাই সমগ্র উম্মাহ্‌র উপর খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা ফরয যতক্ষণ র্পযন্ত না তা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। আর তা না করলে সমগ্র উম্মাহ্‌ই গুনাহগার হবে শুধুমাত্র তারা ছাড়া যারা খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। অন্য সকল সমষ্টিগত ফরযের জন্য যেমন জানাজা, মৃতের গোসল জিহাদ ইত্যাদি সকল ফরযের ক্ষেত্রে একই ‘হুকুম’ প্রযোজ্য হবে।

    বর্তমানে মুসলমানরা ‘ফরয’ শব্দটি এড়িয়ে সরাসরি ‘কিফায়া’ শব্দটি বেছে নেয়। আমাদের বুঝতে হবে ফরয হচ্ছে তাই যা আদায় করলে পুরস্কৃত হবে আর আদায় না করলে গুনাহগার হবে। তবে কেউ আদায় করে ফেললে আমার কাঁধ থেকে গুনাহের ভার নেমে যাবে। এই বিষয়টি ঠিক একইভাবে বর্ণিত হয়েছে ইবনে বাদরানের বইতে এবং ইবনে কুদামাহ আল মাকদিসির বই ‘রাওয়াদাত আল নাযির ওয়া সুন্নাত আল-মুনাযিরে।’ আমাদেরকে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিই মনে রাখতে হবে।

    এভাবেই আমাদের আয়াত থেকে আহ্‌কাম বের করতে জানতে হবে এবং আহকাম সম্বন্ধে জ্ঞান রাখতে হবে যেন আমরা ‘মুকাল্লদি মুত্তাবি’ হতে পারি। মুকাল্লদি আম্মী (দলীল না বুঝেই অনুসারী) নয়। মুকাল্লদি আম্মী কোনো হুকুম সম্বন্ধে দলীল না জেনেই অনুসরণ করে। উদাহরণস্বরূপ, একজন মুকাল্লদি আম্মী কোনো বিষয়ের হালাল অথবা হারাম সম্পর্কে জানতে চাইতে পারে, কিন্তু সে জানতে চায় না হুকুমটির পক্ষে দলীলটি কী অথবা হুকুমটি বের করার ক্ষেত্রে কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে কিনা। আমাদেরকে তাদের মত নয় বরং এক ধাপ এগিয়ে ‘মুকাল্লদি মুত্তাব’ হতে হবে। আমাদেরকে দলীল জানতে হবে এবং হুকুম বের করার ক্ষেত্রে দলীলসমূহের বিস্তারিত জানতে হবে। ইনশাআল্লাহ, আমরা শুধু এখানেই থেমে যাব না; আমরা মুজতাহিদ হওয়ার চেষ্টা করব এবং সকল দলীল ও হুকুম জানার চেষ্টা করব। আর তাহলেই আমরা নিজেরাই কুরআন ও সুন্নাহর দলীল থেকে হুকুম বের করে নিয়ে আসতে পারব।

    যাযাকাল্লাহু খায়রান, সকল প্রশংসা ও ইবাদত আল্লাহ তা’আলার জন্য যিনি দুনিয়া ও আখেরাতের মালিক।

    মূল প্রবন্ধ থেকে অনুবাদ: সোহান ইয়াসির ইকবাল

  • মুহাম্মদ ইবনে কাশিম এবং ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের আগমন

    মুহাম্মদ ইবনে কাশিম এবং ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের আগমন

    খিলাফত হচ্ছে ইসলামি শাসন ব্যবস্থার নাম। আর খিলাফত রাষ্ট্র দিয়ে বুঝায় ইসলামি রাষ্ট্রকে যেই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যাবস্থা থেকে সামাজিক ও পারিবারিক সকল বিষয় আল্লাহর নিকট একমাত্র জীবন ব্যাবস্থা ইসলাম দিয়ে পরিচালনা করা হয়। ৬২২ খৃষ্টাব্দে রাসূল (সাঃ) মদিনাতে হিজরতের পর সেখানে ইসলামের সর্বপ্রথম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন যা যুগের পর যুগ ধরে রাসুলের (সাঃ)  পর থেকে খলীফাদের মাধ্যমে পৃথিবীর কিছু অঞ্চল ব্যাতিত অধিকাংশ অঞ্চলেই বিস্তৃতি লাভ করে। খলীফাগণ রাসূল (সাঃ)-এর দেখানো পথ অনুসারে দাওয়া ও জিহাদের মাধ্যমে ইসলামি খিলাফত রাষ্ট্রের বিস্তৃতি ঘটান। এই দাওয়া ও জিহাদের পেছনে রয়েছে বহু বীর সেনা মুজাহিদদের একান্ত প্রচেষ্টা। যারা নিজের জীবনের মায়াকে উপেক্ষা করে শহীদের মর্যাদা লাভের চেতনায় বছরের পর বছর পরিবার-পরিজন ছেড়ে দূর দূর দেশে ইসলামের সুশীতল শান্তির বার্তা পৌঁছে দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং সেখানে তা রাষ্ট্রীয় ভাবে প্রতিষ্ঠা করে শান্তি স্থাপনের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন।  মুহম্মদ ইবন কাশিম তেমনি একজন বীর মুজাহিদ যিনি সিন্ধু দেশের একজন মজলুম মুসলিম বোনের একটিমাত্র  চিঠি হাতে পেয়েই খলীফার অনুমতি ক্রমে এক এক করে ভারতীয় উপমহাদেশের সিন্ধু প্রদেশের প্রত্যেকটি অঞ্চল হতে জুলুমের শেষ চিহ্ন পর্যন্ত ধ্বংস করে সেখানে ইসলামের সর্বকালের শান্তির বার্তা  পৌঁছে দেন এবং অল্পতেই উক্ত অঞ্চলের সমগ্র মজলুম অধিবাসীর হৃদয় জয় করেন।

    হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ছিলেন বসরার গভর্নর, তখন ইসলামি খিলাফত রাষ্ট্রের সাথে তুরস্ক ও আফ্রিকার যুদ্ধ চলছিল। খলীফা ওলীদ ছিলেন মুসলিমদের খলীফা। তুরস্কের জিহাদের সেনাপতি  কুতায়বা যুদ্ধ বিষয়ে পরামর্শ করতে তার পক্ষ থেকে একজন দূত পাঠিয়েছেন হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাছে। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ খিলাফতের সকল জিহাদ বিষয়ে নকশা তৈরি ও বিশ্লেষণ করতেন। তিনি মানচিত্র নিয়ে গবেষণা করার সময় এক দূতের আগমন শুনে তাকে তার নিকট আসতে বলেন। কিছুক্ষণ পর বর্ম পরিহিত পনের-ষোল বছরের এক যুবক প্রবেশ করল, তার মস্তকে তাম্র নির্মিত এক শিরস্রান সোভা পাচ্ছিল। দৃঢ় গঠন, দীপ্ত নয়ন এবং হালকা অথচ বদ্ধ ওষ্ঠ এক অসাধারণ দৃঢ়টা ও মনোবলের পরিচয় দিচ্ছিল।

    যুবককে দেখে তিনি কুতায়বার পরিহাস করে বললেন আমি কুতায়বাকে একজন অভিজ্ঞ সেনাপতি প্রেরণ করতে বলেছিলাম, আর সে আমাকে আট বছরের বালককে পাঠিয়ে দিয়েছে। যুবক জবাব দিল,আমার বয়স ১৬ বছর ৮ মাস। আপনি যাকে পাঠাতে বলেছেন আমি সেই। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ বললেন, তুমি কুতায়বার শ্রেষ্ঠতম সেনাপতি? কুতায়বার সাথে তোমার সম্পর্ক কী? যুবক জবাব দিল আমরা উভয়েই মুসলমান।

    হাজ্জাজ বিন ইউসুফ বললেন, আমাকে বুঝিয়ে দাও যে সৈন্য বাহিনী হিরাতের ন্যায় সামান্য নগর জয় করতে অক্ষম, সে বোখরার মত দৃঢ় ও শক্তিশালী শহর কিভাবে জয়ের আসা করে? ওহ আগে বল তুমি মানচিত্র পাঠ করতে জান তো?

    যুবক কোন প্রশ্নের জবাব না দিয়েই সম্পূর্ণ যুদ্ধ কৌশল এমন ভাবে মানচিত্র ধরে ধরে বুঝালেন যে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ বিস্ময়ের সাথে চুপ করে তার দিকে তাকিয়েই  রইলেন। পরে জিজ্ঞাস করলেন তুমি কোন উপজাতির লোক? যুবক উত্তর দিল, আমি সাকাফি। হাজ্জাজ বললেন, তুমি সাকাফি?? তোমার নাম কী? যুবক উত্তর দিল, মুহম্মদ ইবনে কাশিম। হাজ্জাস চমকে বললেন, কাশিমের পুত্রের কাছে আমি এটাই আশা করেছিলাম। তুমি আমাকে চিন? ……. তুমি আমার ভাতুস্পুত্র।

    আসলে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ যখন মক্কায় আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়রকে হত্যা করে মদিনায় ফিরে আসেন তখন থেকেই মদিনায় মুহম্মদ বিন কাশিমের পিতা, তার ভাই তাকে দেখতে পারতো না। আর এই কারনে মুহম্মদ বিন কাশিমের মা তাকে কখনো চাচা হাজ্জাজ বিন ইউসুফের সাথে দেখা করতে দেন নি।

    পরে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ মুহম্মদ বিন কাশিমের সাথে তার নিজ কন্যা যুবায়দার বিয়ে দেন এবং তাকে দামেস্কে খলীফা ওলীদের নিকট যুদ্ধ বিষয়ক বিশ্লেষকের পদে নিযুক্ত করে প্রেরণ করেন। যাতে খলীফা  আফ্রিকার সাথে জিহাদের কৌশল ও বিশ্লেষনের জন্য   মুহম্মদ বিন কাশিমকে দায়িত্ব দেন। মুলত হাজ্জাজ  এই কাজে তাকে নিযুক্ত করেন নিজের ভাতুস্পুত্র হওয়ার কারণে নয় বরং তার যুদ্ধ কৌশলের উপর মুগ্ধ হয়েই।

    মুহম্মদ ইবনে কাশিম দামিস্কে খলীফার কাছে যাওয়ার পূর্বেই হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাছে মকরণ থেকে এক দূত আসে। দূত হাজ্জাজের কাছে এক মুসলিম বালিকার রক্তে লিখা এক চিঠি দিয়ে সিন্দু রাজ্যে কিছু মুসলিম এতিম ও নারী-পুরুষের উপর সেখানকার রাজার অত্যাচারের কথা বর্ণনা করেন। মুহম্মদ বিন কাশিমও তা শুনার পর সিদ্ধান্ত নেন দ্রুত দামিস্কে যেয়ে তিনি সবার আগে খলীফাকে সিন্দুর বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করার জন্য বলবেন। কিন্তু খিলাফত রাষ্ট্র তখন আফ্রিকা ও তুরস্কের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত এবং স্পেনের সাথে যুদ্ধ শুরু হবে হবে ভাব থাকায় খলীফা নতুন করে সিন্ধুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে কিনা তা নিয়ে সবাই চিন্তিত থাকেন। সৈন্য সংখ্যার সল্পতাই এই চিন্তার মুল কারন।

    সিন্ধুতে মুসলিমদের উপর অত্যাচারের কাহিনির সুত্রপাত:

    অনেক আগে থেকেই লংকা দেশের সাথে আরব, রোম ও ইরানের ব্যবসা ছিল। লংকা দেশে কিছু আরব তাই প্রায় জন্ম থেকেই বসবাস করত। তখন রোম ও পারস্য (ইরান) ছিল সুপার পাওয়ার। তারা আরবদের উপর ক্ষমতা দেখিয়ে অন্য দেশের সাথে জোর পূর্বক ব্যবসা করত, এতে যে দেশের সাথে তারা ব্যবসা করত তারা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা রোম ও পারস্যের সাথে ব্যবসা করতে বাধ্য হত। ইতিমধ্যে আরবে এক বিশাল জাগরণের কারনে সেখানে এক নতুন আদর্শের ও জীবন ব্যাবস্থার উদ্ভব হয়েছে। সে ক্ষমতাধর আদর্শের সুবাদে  তারা রোম ও পারস্যকে পরাজিত করে নতুন সুপার পাওয়ার হয়।  এতে ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্যগুলো খুবই খুশি হয়। তারা অনায়াসেই তাই আরবদের সাথে ব্যাবসা করতে ইচ্ছা প্রকাশ করে। সে সুবাদে কিছু উপটৌকন দিয়ে লংকার রাজা আব্দুস শামস নামক এক লংকান আরবকে আরব দেশে প্রেরণ করেন। কিন্তু  লংকান আরবের জাহাজ ডুবে যাওয়ায় সে ফিরে আসে। সেই লংকান আরবের এক কন্যা ছিল।

    পরে একদিন আবুল হাসান নামক এক ব্যাক্তি তার জাহাজ নিয়ে লংকাতে ব্যবসা করার জন্য ৫০ টি ঘোড়া নিয়ে আসে। উপকূলে এসে তার সেই লংকান আরবের সাথে দেখা হয় ও পরে ভাল সম্পর্ক গড়ে উঠে। একদিন ঘটনা ক্রমে সকল লঙ্কান আরবই ইসলামের দাওয়াত পেয়ে একে একে   ইসলাম গ্রহণ করে।  ঘটনা ক্রমে আব্দুস শামসের কন্যার সাথে আবুল হাসানের বিয়ে হয়। তাদের ঘরে দুই সন্তান হয়। তারা লংকাতেই থেকে যায়। আবুল হাসানের সন্তানদের নাম  খালেদ ও তার ২ বছর ছোট মেয়ে নাহিদ।

    একদিন আবুল হাসানকে লংকার রাজা আবারও কিছু উপহার দিয়ে আরবের বসরার গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ও দামেস্কের খলীফার নিকট প্রেরণ করে। লংকার রাজার সাথে আবুল হাসানের খুবই ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে ওঠায় তাকেই রাজা বিশ্বাস করে এই দায়িত্ব দেয়। কিন্তু আবুল হাসানের নৌকা সিন্ধুর কাছা কাছি এলে সিন্ধুর রাজা তা লুটপাট করে আবুল হাসানকে বন্দী করে রাখে। লংকায় সবাই ভাবে আবুল হাসান পানিতে ডুবে ইন্তেকাল করেছেন। 

    পরে সেখবর খলীফা পেয়ে যুবায়ের নামক এক দূতকে সেখানকার এতিম শিশু ও নারীদেরকে আরবে নিতে পাঠান এবং তার সাথে লংকার রাজার কাছে কিছু উপহার পাঠান। যুবায়র লংকার রাজাকে একথা বললে রাজার ছেলে-মেয়েরা কান্নায় ভেঙ্গে পরে। কারন আবুল হাসানের ছেলে খালিদ ও মেয়ে নাহিদের সাথে রাজার ছেলে ও মেয়ের ঘনিষ্ট বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। কিন্তু খালিদ বলে সে যেহেতু একজন  মুসলিম মুজাহিদের সন্তান তাই সে আরবে যেয়ে স্বজাতির সাথে কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে চায়। তাই পরে আর রাজা তাদের বারন না করে যুবায়রের সাথে পাঠিয়ে দেয়। রাজা তাদের সাথে খলীফার নিকট নিজের সেনাপতিকে দিয়ে কিছু উপহার  আরেক জাহাজে করে  পাঠায়। জাহাজ দুটি আরবের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
     

    পথে জাহাজ দুটো ডাকাতদের পাল্লায় পরে। সেখান থেকে মুসলিমরা দাকাতের সরদার গন্সুকে আটক করে এবং জয়রাম ও মায়াদেবী নামে দুই ভাই-বোনকে ডাকাত থেকে মুক্ত করে। পরে একদিন যুবায়র গন্সু ডাকাতের কাছে তার ডাকাতি পেশায় ঢুকার করুন কাহিনী শুনে আর কখনো ডাকাতি করবেনা এই প্রতিশ্রুতিতে তাকে ক্ষমা করে দেয়। জয়রাম জাহাজ দেবলের উপকূলে থামিয়ে দেবলের গভর্নর প্রতাপ রায়ের কাছে মেহমান হিসেবে আসা জাহাজ দুটোর খবর দিলে প্রতাপ রায় জাহাজ দুটোর সকল উপহার ছিনিয়ে নিয়ে মুসলিম নারী-পুরুষদের সিন্দুর অত্যাচারী রাজা দাহির-এর কাছে নিয়ে যায়। রাজা উপহার সহ সকলকে বন্দী করে।

    জাহাজ আটক করার আগেই গন্সু খালিদ, নাহিদ ও মায়াকে জোর করে এক নৌকায় তুলে তাদের উদ্ধার করে পালিয়ে গভির জঙ্গলে নিজের কেল্লায় নিয়ে যায়। পরে গন্সু ও তার দল জুবায়র ও জয়রামকে রাজার কাছ থেকে পালিয়ে উদ্ধার করে। জুবায়র কেল্লায় ফিরে এলে নাহিদ তার রাক্তে লিখা এক চিঠি দিয়ে তাকে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাছে পাঠায়।

    জুবায়র হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নিকট সব ঘটনা খুলে বলে, হাজ্জাজ খুবই রাগান্বিত হয়ে বলেন, “ছাগল তাহলে সিংহকে শিং দেখাতে শুরু করেছে।” পরে জুবায়র হাজ্জাজকে সেই চিঠিটি দেয়, হাজ্জাজ পড়তে থাকে …………..
     

    “দূতের মুখে মুসলমান শিশু ও নারীদের বিপদের কথা শুনে আমার দৃঢ় বিশ্বাস বসরার শাসনকর্তা স্বীয় সৈন্য বাহিনীর আত্মমর্যাদা সম্পন্ন সৈনিককে অশ্ব প্রস্তুত করার আদেশ দিয়েছন। সংবাদ বাহককে আমার এ পত্র দেখাবার প্রয়োজন হবে না। হাজ্জাজ বিন ইউসুফের রক্ত যদি শীতল হয়ে জমে গিয়ে থাকে তবে হয়ত আমার এ পত্রও বিফল হবে। আমি আবুল হাসানের কন্যা। আমি ও আমার ভাই এখনো শত্রুর নাগালের বাইরে। কিন্তু আমার অন্য সকল সঙ্গী শত্রু হাতে বন্দী – যার বিন্দু মাত্র দয়া নাই। বন্দীশালার সেই অন্ধকার কুঠুরির কথা কল্পনা করুন – যেখানে বন্দীরা মুসলিম মুজাহিদদের অশ্বের ক্ষুরের শব্দ শুনার জন্য উৎকর্ণ ও অস্থির হয়ে আছে। আমাদের জন্য অহরহ সন্ধান চলছে। সম্ভবতঃ অচিরেই আমাদেরকেও কোন অন্ধকার কুঠুরিতে  বন্দী করা হবে। এও সম্ভব যে, তার পূর্বেই আবার যখন আমাকে মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে দেয়া হবে এবং আমি সেই দুরদৃষ্ট হতে বেঁচে যাব। কিন্তু মরবার সময় আমার দুঃখ থেকে যাবে যে, যেসব ঝাঞ্চাগতি অশ্ব তুর্কিস্তান ও আফ্রিকার দরজা ঘা মেরেছে, স্বজাতির এতীম ও অসহায় শিশুদের সাহায্যের জন্য তারা পৌছাতে পারল না। এও কি সম্ভব যে তলোয়ার রোম ও পারস্যের গর্বিত নরপতিদের মস্তকে বজ্ররূপে আপতিত হয়েছিল, সিন্ধুর উদ্ধত রাজার সামনে তা ভোঁতা প্রমাণিত হল। আমি মৃত্যুকে ভয় করি না। কিন্তু হাজ্জাজ, তুমি যদি বেঁচে থাক, তবে আমার আত্মমর্যাদাশীল জাতির এতীম ও বিধবাদের সাহায্যে ছুটে এস।”


    নাহীদ
    আত্মমর্যাদাশীল জাতির এক অসহায় কন্যা


    হাজ্জাজ বিন ইউসুফ চিঠির অর্ধেকটা পড়েই আরও ক্রোধান্নিত হয়ে জুবায়র ও মুহম্মদ বিন কাশিমকে দামেস্কে খলীফার কাছে পাঠান, এই বলে যে তারা যেন যেভাবেই হোক খলীফাকে জিহাদের জন্য উদ্বুদ্ধ করে। পথে বিভিন্ন ক্যাম্পে সবচেয়ে তাজা ঘোড়াগুলো নিয়ে যেতে বলেন তাদের।

    পথে মুহম্মদ বিন কাশিম ও জুবায়র এক ক্যাম্পে ৫ টি ঘোড়া দেখে ২ টি নিতে চাইলে খাদেম বলে, এগুলো সুলায়মান ইবনে আব্দিল মালিকের ঘোড়া, যিনি খলীফার ভাই এবং পরবর্তী খলীফা হয়ার দাবি করেন। উনি কাল দামিস্কে যুদ্ধবিদ্যার প্রদর্শনীতে আনন্দ ভ্রমণে যাবেন। মুলতঃ সুলায়মান ছিলেন খুবই আরাম প্রিয় লোক। পরে সুলায়মানের কাছে মুহম্মদ বিন কাশিম ঘোড়া চাইলে সে ও তার বন্ধুরা এতে অস্বীকৃতি জানায় ও তার বন্ধু সালেহ মুহম্মদ বিন কাশিমের সাথে মারামারি করতে চায়। বিন কাশিম তার কথায় পাত্তা না দিয়ে জোর করে ২টি ঘোড়া নিয়ে যায়, তারা তার বীরত্ব দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।

    মুহম্মদ বিন কাশিম দামিস্কে পৌছলে খলীফাও চিঠি পড়ে রেগে জান ও মজলিশের  সবাই ঘটনা শুনে জিহাদ জিহাদ ধ্বনি তুলে। খলীফা মুহাম্মদ বিন কাশিমকে বলেন, যেহেতু আমাদের সকল সৈন্য এখন তুরস্কে ও আফ্রিকায় ব্যাস্ত তাই তোমাকে এই যুদ্ধের জন্য নতুন করে সাধারন জনগন থেকে সৈন্য নিতে হবে। আর এ ব্যাপারে কোন মুসলিমই জিহাদে না যেতে রাজি হবে না। তাই খলীফা পরের দিন যুদ্ধাস্ত্র প্রদর্শনীতে মুহাম্মদ বিন কাশিমকে তার আপন ভাই সুলায়মানের সাথে লাগতে বলেন যাতে মুহম্মদ বিন কাশিম জিতলে তিনি সাধারন জনতাকে বক্তব্য দিয়ে তখনি জিহাদের জন্য উৎবুদ্ধ করতে পারেন।

    পরের দিন খেলার মাঠে জুবায়র সোলায়মানের বন্ধু সালিহ ও মুহাম্মদ বিন কাশিম সোলায়মানকে পরাজিত করলে সবাই তাদের ২ জনের প্রতি অবিভুত হয়ে যায়। কারন সোলায়মান আর সালিহ ছিল সে সময়ের চাম্পিয়ন। সকলে মুহম্মদ বিন কাশিমকে ঘিরে ধরলে তিনি জনসাধারণকে সিন্দুর ঘটনা বলেন। জনসাধারণ ঘটনা শুনে জিহাদ জিহাদ ধ্বনি দিয়ে চারিদিক মুখরিত করে তোলে। খলীফা ওয়ালীদ তখনি সিন্ধুর বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে ফেলেন।  বিন কাশিম জনগন থেকে সৈন্য রিক্রুট করেন। এসময় উমর ইবনে আব্দিল আযীয  তাকে যুদ্ধের পরে সেখানকার রাজার অত্যাচারিত সাধারণ  জনতার সাথে ভাল  আচরনের উপদেশ দেন, তাদের আহত ব্যাক্তিদের সেবা-চিকিৎসা করার পরামর্শ দেন।

    ফজরের নামাজ পরে মুহম্মদ বিন কাশিম ৫ হাজার সৈন্য নিয়ে বসরার উদ্দেশ্যে রওনা হন। দামেস্কে তার সৈন্য সংখ্যা ৫ হাজার হলেও বসরায় এসে বসরার আরও সৈন্য মিলে মোট ১২ হাজার সৈন্য হয়। তার স্বীয় স্ত্রী জুবায়দা ও তার মা  বসরার প্রতিটি ঘরে নারীদের মাঝে নাহিদের করুন কাহিনী প্রচার করে এবং সকল নারীই নিজেকে এক একজন নাহিদ ভাবতে শুরু করেন। আর এই জন্যই নারীরা পুরুষদের উৎসাহ দেয়ায় বসরাতে আরও সৈন্য যোগ হয়। ১২ হাজার সৈন্যের মধ্যে ৬ হাজার অশ্বারোহী, ৩ হাজার পদাতিক ও ৩ হাজার রসদ বাহী উটের সাথে ছিল।

    তখন ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র মকরণ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মকরনের পরেই ছিল সিন্ধু। উক্ত ঘটনার পর মকরনের শাসক সিন্ধুতে বন্দীদের ছাড়িয়ে আনার জন্য ২০ জন দূত সহ প্রেরণ করে।  কিন্তু মকরনে ২০ জনের  মধ্যে মাত্র ২ জনকে সিন্ধুর রাজা ফেরত পাঠায়। এই খবরও মুসলিমদের মাঝে আগুনে আরও তেল যোগ করে।

    মুহম্মদ বিন কাশিমের সৈন্য যখন মকরন সীমান্ত অতিক্রম করে সিন্দুর পাহাড়ি অঞ্চল লাসবেলায় প্রবেশ করে তখনি সিন্ধু রাজার তরুন সেনাপতি ভীম সিংহ ২০ হাজার সৈন্য সহ তাদের প্রতিরোধ করে। তারা পাহাড় থেকে বড় বড় পাথর নিক্ষেপ করে মুসলিমদের ক্ষতি করতে থাকে। এভাবে তারা তাদের যাত্রা কয়েক দিন শ্লথ করে দেয়। একদিন মুহম্মদ বিন কাশিম গোয়েন্দা যোগে খবর পেলেন যে ২০ মাইল দুরের এক কেল্লা থেকে এই হামলা চালানো হচ্ছে। তাই তিনি রাতে এশার নামাজ পরে ৫০০ সৈন্য নিয়ে সেই কিল্লা আক্রমণ করতে যান। তিনি বাকি সৈন্য মুহম্মদ ইবনে হারুনের নেতৃত্বে রেখে কিল্লার দিকে যান। কিল্লায় খবর পৌঁছে যে, মুহম্মদ ইবনে কাশিম তাদের কিল্লা দখল করতে আসছে। তাই ভীম সিংহ ৩০০ সৈন্য নিয়ে কিল্লার বাইরে তাদের ঠেকাতে যান। তারা বিন হারুনের সৈন্যকে আক্রমণাত্মক সৈন্য ভেবে তাদের পিছু নেয়। অপর দিকে মুহম্মদ ইবনে কাশিম ৫০০ সৈন্য নিয়ে পাহাড়ের আড়াল থেকে খালি কিল্লায় ঢুকে পরেন। কিল্লা দখল করে তিনি সব সৈন্যকে চলে যেতে অনুমতি দেন। সৈন্যরা এটাকে প্রতারণা ভেবে জিজ্ঞেস করে, আপনি আমাদের সাথে এমন কেন করছেন? বিন কাশিম উত্তর দেন, “শত্রুকে ধ্বংস করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়, বরং তাদের শান্তির পথ দেখানোই আমাদের উদ্দেশ্য”।

    এদিকে ৫০ জনের অশ্বারোহী  বাহিনী  নিয়ে খালিদ, নাহিদ, মায়া ও জয়রাম কেল্লা বিজয়ের খবর পেয়ে কেল্লায় প্রবেশ করে। তারা সকলে সকলকে পরিচয় করিয়ে দেন। ইতি মধ্যে মায়াদেবী ও তার ভাই জয়রাম ইসলাম গ্রহণ করে তাদের নাম যূহরা ও নাসিরুদ্দীন রেখেছে। গন্সুও ইসলাম গ্রহণ করে তার নাম সা’আদ রেখেছে।

    এদিকে ভীম সিংহ তার সৈন্য বাহিনী নিয়ে হারুনের সৈন্যের উপর আক্রমণ করলে মুহম্মদ বিন কাশিম কেল্লা থেকে বের হয়ে উল্টো দিক দিয়ে ভীম সিংহের উপর আক্রমণ করে তার সৈন্য নিয়ে হারুনের সৈন্যের সাথে মিশে  যায়। ভীম সিংহের সৈন্যরা সবাই ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে কেল্লার দিকে সরে গেলে কেল্লার প্রাকারের উপর থেকে তাদের উপর তীর নিক্ষেপ করে মুসলিম বাহিনী। এতে অনেক সৈন্য মারা যায় ভীম সিংহের। পরে তারা আত্মসমর্পণ করে মুহম্মদ বিন কাশিমের কাছে। মুহম্মদ বিন কাশিম শহীদদের জানাজার পরে আহত সিন্ধু সৈন্যদের সেবা-চিকিৎসা করা শুরু করে। তিনি শল্য চিকিৎসকের পাশাপাশি নিজেও আহতদের শল্য চিকিৎসা করতে থাকে। তিনি নিজেও শল্যচিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তিনি নিজ হাতে সিন্দু সেনাপতি ভীম সিংহের চিকিৎসা করে তার মন জয় করে ফেলেন। ভীম সিংহ সুস্থ হলে তাকে মুক্তি দিলে সে সিন্ধু রাজ্যে ফিরে যায়।

    লাসবেলা জয়ের পর মুহম্মদ বিন কাশিম নিজে জুবায়রের সাথে নাহিদের এবং খালিদের সাথে জুহরার (মায়াদেবী) বিয়ে দেন। এদিকে সেবা চিকিৎসার কারণে সিন্ধু সৈন্যরা দলে দলে মুহম্মদ বিন কাশিমের প্রতি অবিভুত হয়ে তার দলে যোগ দিতে লাগল। তারা এযাবতকাল সিন্ধু রাজার যে অত্যাচার সহ্য করছিল তার পরিত্রাণ পেল। তারা মুহম্মদ বিন কাশিমকে তাদের নতুন দেবতা ভাবতে লাগল।

    মুহম্মদ বিন কাশিম এবার দেবল অবরোধ করলেন। তিনি দববাবা (সেকালের অত্যাধুনিক যুদ্ধ কামান, যা দিয়ে বড় বড় পাথর মারা যেত) ও মিনজানিকের সাহায্যে দেবলের প্রাচীর ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করলে রাজা পালিয়ে যায়, আর বাকি সৈন্যরা আল্লাহু আকবর বলে মুসলিমদের কাছে  আত্মসমর্পণ করে। দেবল বাঁচাতে সিন্ধুরাজা দাহির নিজেই সিন্দু থেকে চলে আসে। সে যতদিন সেখানে থাকে তত দিন সে সেখানকার  অনেক নারীর সম্মান হরণ করে, এতে সেই নারীরা মুহম্মদ বিন কাশিম  এর কাছে রাজার ব্যাপারে নালিশ করে ও মুহম্মদ বিন কাশিমকে তাদের দেবতা ভাবতে থাকে, যিনি অত্যাচার থেকে তাদের রেহাই দিয়েছেন। রাজা পালিয়ে নীরুন দুর্গে আশ্রয় নেয়।

    মুহম্মদ বিন কাশিম নিরুন দুর্গ ও পরে সয়ুন ও পরে সবিস্তান দুর্গ জয় করেন। জয় করার পর এ স্থানের মানুষদের মনও  তিনি  পূর্বের মত জয় করেন। তারা সবাই মুসলিমদের সাথে যুক্ত হয়ে মুসলিমদের পাল্লা ভারী করতে থাকে। 

    রাজা মনে করেছিলেন মুহম্মদ বিন কাশিম প্রচণ্ড খরস্রোতী সিন্ধু নদী পার হয়ে ওপারে যেয়ে ব্রাক্ষণাবাদ আক্রমণ করতে পারবেন না। তাই তিনি সেখানে যেয়ে অন্য রাজাদের সাথে মিলে শেষ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। কিন্তু নদীর জেলে ও মাঝিরাই মুহম্মদ বিন কাশিমকে ওপারে যেতে সাহায্য করে। ৭১৩ সালের জুন মাসে মুহম্মদ বিন কাশিম বিনা বাধায় নদী পার হয়ে ব্রাক্ষণাবাদ এর নিকটে রাজা দাহিরের সৈন্যের উপর আক্রমণ করেন। এ যুদ্ধে রাজা নিহত হয়।

    পরে মুহম্মদ বিন কাশিম ব্রাক্ষণাবাদ আক্রমণ করলে রাজপুত্র জয় সিংহ সেখান থেকে পলায়ন করে । পরে মুহম্মদ বিন কাশিম মুলতান ও আরোর জয় করেন। একদিন আরোরের এক পুরহিত মুহম্মদ বিন কাশিমের মূর্তি বানিয়ে শহরে ঘুরান। মুহম্মদ বিন কাশিম এই অবস্থা দেখে ইসলামে মূর্তি পূজা হারাম তা সকলকে বুঝিয়ে দেন ও মূর্তিটি ধ্বংস করেন। তাদের বুঝিয়ে বলেন মানুষ কখনো মানুষকে ইবাদত করতে পারে না। ইবাদত পাওয়ার মালিক কেবল আল্লাহ।  মুলতান অবরোধের সময় মুহম্মদ বিন কাশিম হাজ্জাজ বিন ইউসুফের ইনেকালের খবর  পেয়েছিলেন।

    একদিন ইয়াজিদ নামক এক সেনাপতির নেতৃত্বে ৫০ জন অশ্বারোহীর এক দল এসে মুহম্মদ বিন কাশিমকে এক পত্র দিয়ে বলেন এটি খলীফা সুলায়মান এর পত্র। মুহম্মদ বিন কাশিম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন খলীফা সুলায়মান??  তিনি উত্তর দেন, খলীফা ওলীদ ইন্তেকালের পর সুলায়মান খিলাফতের মসনদে বসে। চিঠি পড়ে মুহম্মদ বিন কাশিম বলেন, “আমি সুলায়মানের কাছে এমনটাই আশা করেছিলাম”।  সুলায়মান ছিল হাজ্জাজ বিন ইউসুফের চরম শত্রু। মুহম্মদ বিন কাশিম হাজ্জাজের জামাতা হয়ায় সে শত্রুতা বসত  তাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। তাই সে মুহম্মদ বিন কাশিমকে বন্দী করতে ৫০ জনের ঐ দলকে পাঠায়। খালিদ, ভীম সিংহ ও জুবায়র সহ সমগ্র সিন্দুবাসী এর বিরধিতা করে। তখন সমগ্র মুসলিম বাহিনীর সৈন্য ১২ হাজার থেকে ১ লক্ষ্যে পৌছায়, যদিও সবাই তখনো মুসলিম ছিল না, কিন্তু তারা সমগ্র ভারত থেকে অত্যাচার  দূর করার জন্য তাদের সেনাপতি মুহম্মদ বিন কাশিমের সাথে আগুনেও ঝাপ দিতেও প্রস্তুত ছিল।
     

    মুহম্মদ বিন কাশিম মুসলিমদের বাধাকে উপেক্ষা করে বললেন, এটি আমিরুল মুমিনিন খলীফার আদেশ,  যা আমাকে পালন করতেই হবে। মুলতঃ উনি জানতেন যে সুলায়মান কখনোই তাকে ছেড়ে দিবে না। তবুও তিনি স্বেচ্ছায় এরূপ করেছেন যেন, সমগ্র ইসলামী খিলাফত  দুভাগে ভেঙ্গে না যায় এবং নতুন জয়ী  সিন্দুর মুসলিমরা যেন তার জন্য খলীফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করে বসে। তিনি বলতেন, আমি মরে গেলে শুধু একজন মুহম্মদ বিন কাশিম মারা যাবে, আর আমি খলীফার কথা না শুনলে সমগ্র খিলাফত দুভাগে ভেঙ্গে যাবে। ইয়াজিদও তাকে বলেছিলেন আপনি দয়া করে যাবেন না, উনি যা করার আমাকে করবেন। পরে ইয়াজিদ সকলকে আশ্বাস দেন এই বলে যে, তিনি মুহম্মদ বিন কাশিমকে খলীফার সাথে দেখা করিয়ে নিজ দায়িত্বে সিন্ধুতে এনে দিবেন।

    অবশেষে মুহম্মদ বিন কাশিম তাদের সাথে যাত্রা করলেন। শহরের প্রত্যেকটা নারী-পুরুষ  তার জন্য কান্নার রোল ছেড়ে দেয়, তারা যেন তাদের সেনাপতি, তাদের অত্যাচার হতে রাক্ষাকারীকে শেষ বারের মত বিদায় দিচ্ছে।   সুলায়মানের ইচ্ছা ছিল তাকে শিকল পড়িয়ে বন্দী বেশে নিয়ে আসা। কিন্তু মুসলিমদের মন ভেঙ্গে যাবে বিধায় ইয়াজিদ এমনটা করেন নি। এদিকে ইয়াজিদ যুবায়েরকে উমর ইবনে আব্দিল আযীযের নিকট পাঠায় এই বলে যে, তিনি যেন  সুলায়ামানের নিকট যেয়ে এই ব্যাপারে কথা বলে সিন্দু বিজয়ী মুহম্মদ বিন কাশিমকে রক্ষা করে। যুবায়ের সাথে সাথে ঘোড়া নিয়ে রওনা হয় মদিনার দিকে। পরে সে উমার ইবনে আব্দিল আযীযকে বললে উনি দ্রুত দামেস্কে সোলাইমানের কাছে যেয়ে তাকে হুশিয়ার করে বলেন, এরূপ করলে তিনি সোলায়মানের বিরুদ্ধে সমগ্র খিলাফতকে এক করে তার পতন ঘটাবেন। 

    এদিকে সুলায়মান মুহম্মদ বিন কাশিম ও হাজ্জাজকে চরম শত্রু ভাবাপন্ন ব্যাক্তি তার বন্ধু সালেহকে মুহম্মদ বিন কাশিমের গর্দান কাটতে ওয়াসিত পাঠায়। ওয়াসিত ছিল এমন এক যায়গা যেখানে খুব কম লোক একাজে বাধা দিবে। কারন সেখানকার বেশির ভাগ লোকই মুহম্মদ বিন কাশিমের বংশের শত্রু। সুলায়মান মুহম্মদ বিন কাশিমকে বসরায় নিতে বারন করেন কারন সেখানে বসরার প্রত্যেকটা নারী-পুরুষ সিন্দু বিজয়ীকে দেখার জন্য অধীর আগ্রহে পথ চেয়েছিল। কিন্তু এক রাতে মুহম্মদ বিন কাশিম ইয়াজিদের অনুমতি ক্রমে গোপনীয়তার সাথে তার স্ত্রী যুবায়দার সঙ্গে  শেষ সাক্ষাৎ করেন।

    অবশেষে সুলায়মান উমার ইবনে আব্দিল আযীযের কথায় লজ্জিত হয়ে যুবায়রকে দিয়ে সালেহ এর কাছে পত্র পাঠায়। যুবায়র আবারো দ্রুত ঘোড়া নিয়ে ওয়াসিতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ওয়াসিত এসে তিনি এক ভিড় দেখতে পেয়ে জনগণকে জিজ্ঞাস করেন এটি কিসের ভিড় ? তারা জবাবদেয় এটি সিন্দু বিজয়ী মুহম্মদ বিন কাশিমের জানাজার ভিড়!! … জুবায়র তখনই বেহুশ হয়ে ঘোড়া থেকে পরে যায়। লোক-জন তার হাতে একটি চিঠি দেখে তা পড়া শুরু করে,  সেখানে সালেহকে উদ্দেশ্য করে লিখা ছিল, সে যেন সসম্মানে মুহম্মদ বিন কাশিমকে দামিস্কে পাঠিয়ে দেয়। তখনই  শহরের ৫০ জন ক্ষুদ্ধ যুবক নগ্ন তরবারি নিয়ে সালিহের ঘর অভিমুখে রওনা হয়ে তার উপর ঝাপিয়ে পরে। 

    ৬২২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৭১৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মাত্র ৯১ বছরে ইসলামি খিলাফত ব্যাবস্থা মদিনা থেকে পশ্চিমে ইউরোপ, দক্ষিণে আফ্রিকা, পূর্বে ভারত ও চীন এবং উত্তরে রাশিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পরে। মুহম্মদ বিন কাশিমকে এভাবে শত্রুতা বশত হত্যা করা না হলে হয়ত তখনই সেটা সমগ্র চীন-রাশিয়া- অস্ট্রেলিয়া  ছাড়িয়ে আমেরিকাতেও ছড়িয়ে পরত। মূলত ঘটনা তো এই যে বিশ্বজগতের প্রতিপালক যা লিখে রেখেছেন তার বিন্দু মাত্রও পরিবর্তন যোগ্য নয় আর তাইতো এক সময় সেই খিলাফত ব্যাবস্থাও রাষ্ট্রীয় ভাবে ধ্বংস হয়ে গেল। তবে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) আমাদের নিশ্চিত করে গেছেন সেই খিলাফত আবার আসবে, নবুওতের আদলে। এবার আসলে এটি আর কখনোই ধ্বংস হবে না, পৃথিবীর প্রত্যেকটা ঘরে ঘরে পৌছিয়ে দিবে ইসলাম এবং চলবে কিয়ামত পর্যন্ত।

    [রেফারেন্স: মুহম্মদ ইবন কাশিম — নসীম হিজাযী]

  • ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রের পরাশক্তি রোম ও পারস্য বিজয়

    ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রের পরাশক্তি রোম ও পারস্য বিজয়

    বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

    ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে  রাসূল (সাঃ) মদিনাতে  হিজরত করার পর সেখানে ইসলামি রাষ্ট্র  প্রতিষ্ঠা করেন যার পরিচালনা হতো এমন এক আদর্শ দিয়ে যেটা মহান আল্লাহর নিকট একমাত্র জীবনব্যবস্থা। রাসুল (সাঃ) – এর সময় থেকেই সেই আদর্শের ধারক ও বাহকগন দাওয়াত ও জিহাদের মাধ্যমে সেই মানবতার আদর্শকে পৌঁছে দেয়া শুরু করেন মদিনার বাইরে নতুন নতুন অঞ্চলে, যেসব অঞ্চলের শাসকগণ সেই অঞ্চলের সাধারণ জনগনের উপর খোদা হয়ে বসে ছিল, প্রতিষ্ঠা করত সেথায় সীমাবদ্ধ জ্ঞানে আবদ্ধ মানব তৈরি শাসন, অত্যাচারে অত্যাচারে নিষ্পেষিত করত নাগরিকদের জীবন, বঞ্চিত করত তাদের প্রাপ্য ন্যায্য অধিকার। হয়ত কোন কোন শাসক রাসুল (সা) ও তার উত্তরসূরি  খিলাফতের শাসকদের  দাওয়াত গ্রহন করে স্বানন্দে ইসলামক গ্রহন করত, নয়ত কেউ কেউ শান্তির আদর্শ ইসলাম গ্রহন না করে  জিযয়া কর দেয়ার মাধ্যমে অন্য রাষ্ট্র থেকে নিরাপত্তার সন্ধি করত, নয়ত বা কেউ কেউ দুটোই অস্বীকার করে যুদ্ধে লিপ্ত হতো।  এভাবেই আল্লাহ তায়ালা মানবতার আদর্শের ধারক ও বাহকদের সুযোগ করে দিতেন  একের পর এক রাষ্ট্রে ইসলামকে পৌঁছে দিতে। ফলশ্রুতিতে মুসলিমরা একের পর এক ক্ষমতাধর রাষ্ট্র বিজয়ের মাধ্যমে খিলাফত রাষ্ট্রকে নিয়ে যায় দূর বহু দূর।  


    ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনের আগে থেকেই পৃথিবীর পরাশক্তি হিসেবে রোম সাম্রাজ্য (বাইজেণ্টাইন) ও পারস্য সাম্রাজ্য (বর্তমান ইরান) নিজেদেরকে আত্মপ্রকাশ করে। রোমের সীমানা ছিল সিরিয়া  থেকে পশ্চিমে  স্পেন পর্যন্ত, আর পারস্যের সীমানা ছিল ইরাক থেকে পূর্বে খোরাসান (আফগানিস্তান) পর্যন্ত। রোম আর পারস্য উভয়েই যুগের পর যুগ ধরে পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত থাকত।  রাসুল (সাঃ) -এর সময় থকেই  রোমের সাথে সদ্য প্রতিষ্ঠিত  ইসলামিক রাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হয়। একবার রাসুল (সাঃ) হারেস ইবনে ওমায়র আযদী (রাঃ) কে এক চিঠি দিয়ে  বসরার গভর্নরের কাছে দূত হিসেবে পাঠালে রোমের কায়সারের নিযুক্ত  ‘বালাকা’ এলাকার গভর্নর শোরাহবিল ইবনে আমর গাসসানি সেই দূতকে হত্যা করে। তখন দূতকে হত্যা করা যুদ্ধ ঘোষণার শামিল ছিল, তাই রাসুল (সাঃ) ৩০০০ মুজাহিদ সেনাবাহিনী নিয়ে রোমানদের ২ লক্ষ সেনাবাহিনীর উপর হামলা করেন, এটিই মুতারযুদ্ধ হিসেবে প্রসিদ্ধ। খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) -এর বুদ্ধিমত্তায় সে জিহাদে মুসলিমরা জয় লাভ করে। পরে মুতার যুদ্ধ ও তাবুকের অভিযানের পরে রাসুল (সাঃ) সবশেষে  ওসামা (রাঃ) কে সেনাপতি নিযুক্ত করে  সর্বশেষ বাহিনী প্রেরন করেন রোমদের বিরুদ্ধে।  আবু বকর (রাঃ) -এর খিলাফত কালে  তিনি সে বাহিনীর নেতৃত্ব অপরিবর্তনীয় রেখেই সামনে অগ্রসর হতে বলেন।  রাসুল (সাঃ) –এর  ওফাতের পরে যখন ইরাকে বিভিন্ন গোত্র বিদ্রোহ করে বসে, তখন আবু বকর (রাঃ) হযরত  মুছান্না (রাঃ) কে দিয়ে সুকৌশলে সেই বিদ্রোহ দূর করে ইরাকেই মুসলিমদের এক বিশাল  বাহিনী গড়ে তোলেন, যারা ইরাকের মুসলিমদের বিদ্রোহ থেকে শান্তির পথে একীভূত করে ইরানের দিকে ধাবিত হন।

    পারস্যের কাহিনী:

    খলীফা আবু বকর (রাঃ) মদিনা থেকে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) –এর সেনাপতিত্তে ১০ হাজার মুজাহিদদের এক সেনা বাহিনী মুছান্নার (রাঃ) সাহায্যে ইরাকে পাঠান। সে বাহিনীতে কা’কা বিন আমর তমিমীকে (রাঃ) পাঠানো হয়, যার ব্যাপারে খলীফা বলেন, কা’কা যে বাহিনীতে থাকবে তারা কখনো পরাজিত হবে না’। মাত্র ১৮ হাজার মুজাহিদ নিয়ে ইরাকের সীমান্তে পারস্য বাহিনীর সেনাপতি হরমুজের বিশাল বাহিনীর সাথে জিহাদে লিপ্ত হয় মুসলিম বাহিনী। হরমুজের বাহিনীতে মুসলিমদের ২.৫ গুন সৈন্য ছিল, আরও ২০,০০০ সৈন্য পথে আসছিল সেই বাহিনীর সাহায্যার্থে। মুসলিমরা পারস্যদের  ধরাসয়ি করতে শুরু করলে প্রচণ্ড যুদ্ধের পর পালিয়ে যায় পারস্যরা, হরমুজ নিহত হয় এ যুদ্ধে। মুছান্না (রাঃ) পরাজিত সৈন্যদের  ধাওয়া করে তাদের সাহায্যার্থে আগত কারেনের সৈন্যবাহিনীকে মাযারের নিকট আক্রমন করলে  তারাও পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়। খালিদ (রাঃ) সেসব এলাকার পরাজিত বন্দী  নাগরিকদের ছেড়ে দেন, কারণ সেনাপতি  হরমুজ সেইসব গরীব কৃষকদের জোরপূর্বক যুদ্ধে এনেছিল। পরে সেই কৃষকরা একে একে ইসলাম গ্রহন করে তাদের এলাকায় থাকতে শুরু করে।

    হীরা বিজয়ঃ  ফোরাতের তীরে বিশাল বন্দর ইমপেশিয়া  দখল করলেন খালিদ (রাঃ), কিছু ফৌজ নিয়ে সন্ধির বিনিময়ে ‘হীরা’  বিজয় করলেন,  হীরার গভর্নর আজাদবাহ পালিয়ে গেল। ইরাকের খৃস্টান কবিলাগুলোর কেন্দ্র ছিল হীরা। হীরাবাসি মনে করেছিল সাধারণত বিজয়ী সৈন্য যেমন পরাজিতের এলাকায় এসে সন্ধি  ভেঙ্গে তাদের উপর অত্যাচার করে, মুসলিমরা হয়ত তেমনি করবে। কিন্তু তারা মুসলিমদের  কাছে ভিন্ন আচরন দেখে অভিভূত হয়ে গেল, মুসলিমদের কাছে আনুগত্য স্বীকার করল।  হীরার পর খালিদ (রাঃ) ‘আম্মারায়‘ জমায়েত হওয়া  ইরানী ফৌজের মোকাবেলা করলেন, পরে ‘আইনুত্তামরে আক্রমণ করলেন। আইনুত্তামরের সেনাপতিছিল মেহরান, ইরানীরা এবারো পরাজিত হল।


    দুমাতুল জন্দল জিহাদঃ  খলীফা আবু বকর (রাঃ) খালিদ (রাঃ) কে ইরাকে পাঠানোর পরেই আয়াজ বিন গনমকে দুমাতুল জন্দলে পাঠান। রাসুল (সাঃ) তাবুকের যুদ্ধে খালিদ (রাঃ) কে দুমাতুল জন্দলে রোমানদের উপর হামলা করতে বলেছিলেন। সেসময় খালিদ (রাঃ)  মাত্র ৫ শত জানবাজ  নিয়ে  সেখানকার খৃস্টান শাসক ওকিদর বিন আব্দুল মালিককে গ্রেপ্তার করে মদিনায় পাঠায়, সে মদিনায় এসে ইসলাম  কবুল করলে রাসুল (সাঃ) তাকে পুনরায় তার এলাকার শাসনভার দিয়ে দেন। কিন্তু রাসুলের (সাঃ) ইন্তিকালের পর সে আবার বিদ্রোহ করে বসে। তাই খালিদ (রাঃ) আয়াজ বিন গনমকে  সাহায্যের জন্য আইনুত্তামর থেকে ৩০০ মাইল দূরে দুমাতুল জান্দালে আক্রমণ করেন। সেখান থেকে  ইরানে যুদ্ধরত মুসলিম বাহিনীর উপর এবং মদিনাতেও  হামলার সম্ভাবনা ছিল। আবার উত্তরে আলজারিয়ার খৃস্টানদের   থেকেও হামলার সম্ভাবনা ছিল, যা খালিদ (রাঃ) দুমাতুল জন্দল জয় করে মিটিয়ে দেন।

    ফেরাজে রোম পারস্যের সম্মিলিত বাহিনীর সাথে জিহাদঃ  খালিদ (রাঃ) দুমাতুল জন্দল থেকে আবারও  আইনুত্তামরে ফিরে এসে ফোরাতের তীরধরে  ‘ফেরাজে’ পৌঁছেন। ফেরাজের পশ্চিমে রোম ও পূর্বে পারস্য, ফেরাজ এই দু দেশের সীমানার ন্যায় ছিল।  সেখানে খালিদ (রাঃ) এর অবস্থানের খবর পেয়ে রোম আর পারস্য প্রথম বারের  মত একত্রে মুসলিমদের উপর হামলার সিদ্ধান্ত নেয়। কিছুদিন পূর্বে রোমানদের কাছে পারস্যরা  হারার কারনে রোমানদের মুল সেনাপতিত্তে  তারা মুসলিমদের হামলা করে। কিন্তু মুসলিমদের তিব্র হামলার মুখে টিকতে না পেরে ইরানীরা  রোমদের অনুমতির অপেক্ষা না করেই পূর্ব দিকে পালিয়ে যায়। তাদের দেখে রোমরাও পশ্চিম দিকে পালায়। তাদের লাশের স্তূপ পরে থাকে  ফেরাজের ময়দানে। এতে সাথে সাথেই রোম-পারস্যের  ঐক্যের ভিত্তি শেষ হয়ে গেল  যেটা ভবিষ্যতে  হুমকি হয়ে দাড়াতে পারতো। এযুদ্ধে পরাজিত হয়ে রোম ও ইরান একে ওপরকে দোষারোপ করতে থাকে।


    এদিকে সিরিয়ায় রোমদের সাথে নিয়মিত যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় খলীফা আবু বকর (রাঃ) খালিদ (রাঃ) কে ইরানের জিহাদ থেকে সিরিয়াতে যাওয়ার আদেশ দেন। তাই তিনি ইরাকে মুছান্না (রাঃ) কে সেনাপতি রেখে ৯ হাজার অভিজ্ঞ মুজাহিদ ও সিপাহ সালার নিয়ে সিরিয়াতে চলে যান। এদিকে পারস্যের রাজা ও তার পুত্র উভয়ই মৃত্যুবরণ করলে তারা পারস্য শাহানশাহ হিসেবে শাহরিয়ারকে খমতায় বসায়। শাহরিয়ার ভেবেছিল মুছান্না (রাঃ) খালিদ (রাঃ) চলে যাওয়ায় তাদের বিশাল সেনাবাহিনীর আগমন দেখে পালাবে, তাই সে জেনারেল হরমুজকে ১০ হাজার সৈন্য সহ এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে মুছান্না (রাঃ) কে হামলা করতে ‘ব্যাবিলন’ পাঠায়। কিন্তু কিছুদিনপরেই সে শুনেন হরমুজ পরাজিত হয়ে ফিরছে, পাছে ব্যাবিলন ময়দানে হাজার হাজার ইরানী সৈন্যের লাশ পরে আছে।

    রোমের কাহিনী:

    এদিকে খালিদ (রাঃ) কে মদিনা থেকে ইরাকের দিকে অভিযানে প্রেরণের পরই খলীফা আবু বকর (রাঃ)  সেনাপতিদের পতাকা বেধে দিয়ে দায়িত্ব প্রাপ্ত  নিজ নিজ এলাকার দিকে প্রেরন করেন। তিনি  খালিদ ইবনে  সাইদ (রাঃ) কে তায়মার দিকে (এখানে ওমর (রাঃ) খালিদ ইবনে সাইদকে সিরিয়াতে পাঠাতে খলীফাকে নিষেধ করেন, কারণ সে রেশমের জুব্বা  পরার ব্যাপারে ওমর (রাঃ) এর সাথে তর্ক করেছিল), ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান (রাঃ) কে দামেশকের দিকে,  আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রাঃ) কে হিমসের  (হোমস)  দিকে এবং আমরইবনুল আস  (রাঃ) কে ফিলিস্তিনে‘র দিকে দায়িত্ব দিয়ে পাঠান।  পথে বালাকা অঞ্চলে আবু উবায়দা (রাঃ) সে এলাকার জনগনের সাথে জিহাদে সেটা সন্ধির মাধ্যমে জয় করেন, এটাই সিরিয়ায়  প্রথম  সন্ধি চুক্তি।

    ইয়ারমুকের জিহাদঃ  মুসলিম মুজাহিদরা যখন  সিরিয়ার দিকে আগমন করেন তখন  রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস ভয় পেয়ে যায়, সে জানত রাসুল (সাঃ) শেষ নবী আর তাদের খৃস্টান ধর্মের সময় শেষ হয়ে গেছে। হিরাক্লিয়াস তখন হিমসে (হোমস) অবস্থান করছিল।   আবু   বকর (রাঃ) এর মোট সৈন্য সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ও তাদের সাহায্যার্থে ছিল ইকরিমা ইবনে আবু জেহেল এর ৬ হাজার সৈন্য। হিরাক্লিয়াসের সম্মুখ বাহিনীর দায়িত্বে ছিল জুরজা যিনি পরে ইসলাম গ্রহনের পরই ইয়ারমুকের জিহাদে শহীদ হন (তার খালিদ (রাঃ) এর সাথে এই প্রসিদ্ধ ঘটনা  আমি আমার আরেক নোটে বর্ণনা করেছি);  হিরাক্লিইয়াসের  ২ লাখ  সৈন্যের বিরুদ্ধে  মুজাহিদদের  সংখ্যা কম হয়ায় তারা খলীফার কাছে সাহায্য চাইলে খলীফা  খালিদ বিন ওয়ালিদ  (রাঃ) কে ইরাক থেকে সিরিয়া যেতে নির্দেশ দেন। তিনি ৫ দিন পর তার ৯ হাজার মুজাহিদ নিয়ে ইয়ারমুকের জিহাদে মুল সেনাপতির দায়িত্বে এসে নিযুক্ত হন। খালিদ (রাঃ) সেখানে যেয়ে দেখেন মুজাহিদগণ রোমানদের সাথে জিহাদে লিপ্ত, অতপর খালিদ (রাঃ) এর আগমনের সংবাদ শুনে রোমানরা মুসলিমদের সাথে সন্ধি করতে চায়। সিরিয়াই ছিল মুজাহিদদের প্রথম বিজিত এলাকা। 

    বর্ণিত আছে যে, যখন ইয়ারমুকের যুদ্ধে দুই বাহিনী প্রচণ্ড লড়াই করছিল, তখন আরব থেকে এক পত্র বাহক এসে খালিদ বিন ওয়ালিদের (রাঃ) কাছে খলীফার একটি চিঠি দেন। পত্র বাহক খালিদ (রাঃ) কে একান্তে নিয়ে গিয়ে বলেন, খলীফা আবু বকর ইন্তেকাল করেছেন, ওমর (রাঃ) পরবর্তী খলীফা নিযুক্ত হয়েছেন। ওমর (রাঃ) আপনার স্থলে মুল সেনাপতির দায়িত্বে আবু উবায়দা আমির ইবনে জাররাহ (রাঃ) কে নিযুক্ত করেছেন। খালিদ (রাঃ) এই সংবাদ যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত গোপন রাখেন, যেন এতে মুজাহিদদের মনবল ভেঙ্গে না যায়। 

    আজনাদায়নের জিহাদঃ “মা’ওয়ারের আরবা” অঞ্চলে আমর ইবনে আস (রাঃ) এর সাথে রোমানরা যুদ্ধে লিপ্ত ছিল,  সেখানে তার সাহায্যার্থে খালিদ (রাঃ), আবু উবায়দা (রাঃ), শুরাহবিল (রাঃ) ও মুরছাদ (রাঃ) মুজাহিদদের নিয়ে এলেই আজনাদায়নের জিহাদ শুরু হয়। এযুদ্ধে রোমানরা ছিল ২ লক্ষ ৪০ হাজার। আর মুসলিম মুজাহিদরা ছিলেন মাত্র ৪০ হাজার। অবশেষে মুসলিম মুজাহিদরাই কাফিরদের পরাজিত করেন। সেনাপতি কায়কালান নিহত হয়।

    পারস্যের কাহিনী:

     রাজা-রানীর ঝামেলার কারনে পারস্য থেকে চাপ অনেকটাই কম ছিল মুছান্না (রাঃ) এর উপর। তিনি একদিন নিজেই খলীফা আবু বকরের (রাঃ) কাছে সাহায্যের জন্য গেলেন। সেখানে যেয়ে তিনি আবু বকর (রাঃ) কে মৃত্যু মুখে দেখলেন। আবু বকর (রাঃ) তখনি ওমর (রাঃ) কে পারস্যের দিকে সৈন্য প্রেরণ করতে বলেন এবং সেদিনই (সোমবার) তিনি মুছান্না (রাঃ) ও অন্যান্য সাহাবাদের সাথে শেষ সাক্ষাৎ করে ইন্তিকাল করেন। 


    আবু বকর (রাঃ) এর ইন্তিকালের পর ওমর (রাঃ) ও মুছান্না (রাঃ) মদিনাতে ইরাকের ব্যাপারে বক্তৃতা দিয়ে মুজাহিদদের সংগ্রহ করতে থাকেন, প্রথমে কেউ রাজি না হলেও পরে আবু উবায়দ ইবনে মাসউদ ছাকাফির (র) রাজি হলে একে একে অনেকেই রাজি হয়। আবু উবায়দা  প্রথম রাজি হয়ায় তাকে সেনাপতি বানিয়ে ওমর (রাঃ) ৭ হাজার মুজাহিদকে ইরাকে পাঠায়। এদিকে খালিদ (রাঃ) এর সাথে যে বাহিনী ইরাক থেকে সিরিয়া  এসেছিল তাদেরকেও ওমর (রাঃ) আবার ইরাক পাঠাতে বলেন।

    নামারিকের জিহাদঃ  নামারিক হোল হীরাও কাদেসিয়ার মধ্যবর্তী স্থান। সম্রাট রুস্তম,  বাহমানকে সেনাপতি করে আবু উবায়দ  কে হামলা করার জন্য নামারিক পাঠায়। তারা পরাজিত হয় ও মাদায়েন (পারস্যের সেকালের রাজধানী) পালিয়ে যায়।

    সেতুর জিহাদঃ  পারসিকরা  হাতী সহ এক বিশাল বাহিনী নিয়ে ফোরাতের পারে জমা হয়। মুসলিমরা ছিল মাত্র ১০ হাজার। পারসিকরা মুসলিমদের বলে তোমরা নদী পার হয়ে আসবে না আমরা যাব? অভিজ্ঞ মুসলিম সালাররা বলছিলেন তাদের পার হয়ে আসতে, কিন্তু আবু উবায়দ বললেন, “আমরা মৃত্যুর ব্যাপারে যতটা নির্ভীক ওরা ততটা নির্ভীক নয়”,  এই বলে তিনি নদী পার হয়ে গেলেন। কিন্তু অধিকাংশ মুসলিম পাড় না হতেই পারসিকরা  তীর নিক্ষেপ করে, এবং মুসলিমদের ওপাড়ে দাঁড়ানোর জন্য সংকীর্ণ জায়গা দেয়, যেটা যুদ্ধের নিয়মের পরিপন্থী। তারা হাতীগুলো ছেড়ে দিলে মুজাহিদদের ঘোরাগুলো ভয়ে পালাতে থাকে, এতে তারা অনেক মুজাহিদদের তীর মেরে শহীদ করে। আবু উবায়দ ও কয়েকজন   কয়েকটা হাতী মেরে ফেলে, একটা হাতী সেনাপতি আবু উবায়দকে পায়ে পিসে শহীদ করে দেয়, এভাবে পর পর ৭ জন সেনাপতি শহীদ হলে মুছান্না (রাঃ) সেতুর মুখে দাড়িয়ে সকল মুজাহিদদের ধীরে সুস্থে  নদী পার হয়ে চলে যেতে বলেন। এর আগেই ৪ হাজার মুজাহিদ সেতু ভেঙ্গে ফোরাত নদীতে পরে শহীদ হন। অবশেষে বাকিরা পাড় হয়ে জীবন রক্ষাকরে। এযুদ্ধে পারসিকরা জয় লাভ করে, তবুও মুজাহিদরা ৬ হাজার পারসিক ও অনেক হাতীকে হত্যা করে।
     

    এযুদ্ধের পর পারসিকদের রাজা-রানি সমস্যা আবার দেখা দেয়, তারা রুস্তমকে পদচ্যুত করে, পরে আবার ক্ষমতা দিয়ে ফিরুজানের সাথে ক্ষমতা দু ভাগ করে বসায়। এতে  তারা দু ভাগে বিভক্ত হয়ে পরে।


    বুওয়ায়ব এর জিহাদপারসিকদের উপর মুসলিমদের প্রতিশোধঃ  বুওয়ায়ব  হচ্ছে  কুফার নিকটবর্তী স্থান। পারসিকরা  মুসলিমদের আগের মত বলে, তোমরা এপারে এসবে না আমরা  ওপাড়ে যাব? সেনাপতি মুছান্না (রাঃ) তাদের আসতে বলেন এবং  তাদের জন্য  অনেক জায়গা ছেড়ে দেন, যদিও তারা সেতুর যুদ্ধে কম জায়গা ছেড়েছিল ও সব মুসলিম পার না হতেই আক্রমণ করেছিল, কিন্তু মুছান্না তারা আসার ও সারি বদ্ধ ভাবে দাঁড়ানোর অনেক পরে আক্রমনের  সিদ্ধান্ত নেন। পারসিকরাই পরে মুসলিমদের আগে আক্রমণ করে, প্রচণ্ড যুদ্ধের পর তাদের  সেনাপতি মেহরান মারা যায় ও তারা পরাজিত হয়। এযুদ্ধে ১ লক্ষ পারসিক সৈন্য নিহত হয়।


    রোমের কাহিনিঃ

    দামেশক বিজয়ঃ  আবু  উবায়দা (রাঃ) ‘ইয়ারমুক’ থেকে ‘মারজ সাকর‘ এ আসলেন, সম্রাট হিরাক্লিয়াস ছিল হিমস-এ (হোমস)। রোমানরা ফিলিস্তিনের সিংহল –এ ৮০ হাজার সৈন্য নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তাই খলীফা ওমর (রাঃ) আবু উবায়দা (রাঃ) কে বললেন হিমসের দিকে এক দল ও ফিলিস্তিনের পথে ফিহল –এর দিকে একদল মুজাহিদ  পাঠাতে যেন তারা হিরাক্লিয়াস ও ফিলিস্তিনের সৈন্যদের বাধা দিতে পারে। পরে আবু উবায়দা (রাঃ) দামেশক অবরোধ করলেন।  একদিন দামেশকবাসী ফুর্তিতে মত্ত থাকলে খালিদ (রাঃ) কা’কা (রাঃ) ও অন্যান্য মুজাহিদদের নিয়ে দামেশকের উপর ঝাপিয়ে পড়েন  ও দামেশকের কিছু অংশ যুদ্ধ ও কিছু সন্ধি করে জয় করলেন।

    ফিহলএর জিহাদঃ  দামেশক বিজয়ের পর শুরাহবীল ইবনে হাসানা (রাঃ) এর সেনাপতিত্বে মুজাহিদগন ফিহল-এর দিকে যাত্রা করেন। এ যুদ্ধে ৮০ হাজার রোমান মারা যায়। আবু উবায়দা (রাঃ) শুরাহবীল (রাঃ) কে জর্ডানের শাসক বানিয়ে খালিদ (রাঃ) ও অন্যান্যদের নিয়ে হিমস-এর দিকে যাত্রা করেন। পরে শুরাহবীল (রাঃ) জর্ডান থেকে গিয়ে বীসান জয় করেন।
     

    পারস্যের কাহিনীঃ

    এদিকে খলীফা ওমর (রাঃ) নিজেই ইরাক যুদ্ধে যেতে চাইলে সাহাবাগন তাকে নিষেধ করেন এবং সা’দ (রাঃ) কে সেনাপতি নিযুক্ত করে ইরাক পাঠাতে বলেন।  ফলে ওমর (রাঃ) সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ)-এর সেনাপতিত্বে মুজাহিদের এক বাহিনী ইরাকে পাঠান, সা’দ (রাঃ) এসে পৌছার আগেই মুছান্না (রাঃ) ইন্তিকাল করেন।

    কাদেসিয়ার জিহাদঃ  সেনাপতি সা’দ (রাঃ) কাদেসিয়ায় পৌঁছালে পারসিকরা তাদের মহাবীর সাবেক রাজা রুস্তম কে মুসলিমদের মুকাবিলার জন্য মুল ৮০ হাজার  মতান্তরে ১ লক্ষ ২০ হাজার সৈন্য ও আরও ৮০ হাজার সৈন্য  সাহায্যার্থে পাঠায়। তাদের সাথে ৩৩ টি জঙ্গি হাতী ছিল।  এ যুদ্ধে  রুস্তম নিহত হয় ও পারসিকদের বাকি সৈন্য রাজধানী মাদায়েন পালায়।

    রোমের কাহিনীঃ 

    হিমস জিহাদঃ আবু উবায়দা (রাঃ) রোমান সৈন্যদের তারা করে হিমসে নিয়ে যান। সেখানে  হিরাক্লিয়াস অবস্থান করছিল। পরে খালিদ (রাঃ) তার সৈন্য নিয়ে সেখানে পৌছলে অবরোধ দৃঢ় হয়, হিমসবাসী সন্ধি করে। হিমস জয় হয়।

    কিন্নাসরীনের জিহাদঃ  হিমস জয়ের পর আবু উবায়দা (রাঃ) খালিদ (রাঃ) কে কিন্নাসরীনে পাঠান, খালিদ (রাঃ) সেখানে যেয়ে সব রোমান সৈন্যদের হত্যা করে। পরে গ্রামবাসী সন্ধি করে। কিন্নাসরীন জয় হয়। 

    এবছরই হিরাক্লিয়াস সিরিয়া ছেড়ে ‘কন্সটাণ্টিনোপল’ চলে যায়।


    কায়সারিয়্যার জিহাদঃ  খলীফা ওমর (রাঃ) মুয়াবিয়া ইবনে আবী সুফিয়ান (রাঃ) কে সেনাপতি নিযুক্ত করে তাকে কায়সারিয়্যা আক্রমণ করতে বলেন। মুয়াবিয়া (রাঃ) সেখানে পৌছলে রোমানরা যুদ্ধ শুরু করে, প্রচণ্ড  যুদ্ধের পর তাদের ৮০ হাজার সৈন্য নিহত হয় এবং ১ লাখ পলায়ন করে। মুসলিমরা জয়লাভ করেন।

     রোমান সেনাপতি আরতাবুন বায়তুল মুকাদ্দাস (জেরুজালেম) ও রামাল্লার কাছে বিশাল বিশাল দুটি সেনাবাহিনী প্রস্তুত করে রেখেছিল। তাই আমর ইবনুল আস (রাঃ)  বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করতে চাইলে বায়তুল মুকাদ্দাসের বাসিন্দারা তাকে ওমর (রাঃ) কে এসে সন্ধি করে জয় করতে বলে। 

    হযরত ওমর (রাঃ) এর হাতে বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়ঃ  সন্ধির মাধ্যমে বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে ওমর (রাঃ) ‘সাখরা’  নামক এক পাথরের উপর থেকে ময়লা আবর্জনা সরান। এটি ইহুদীদের একটি পবিত্র পাথর যেটিকে কিবলা বানিয়ে তারা ইবাদাত করত, পরে রোমান  খৃস্টানরা বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে এটির উপর সবচেয়ে নোংরা আবর্জনা ফেলত। রাসুল (সাঃ) একদিন রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে  চিঠির মাধ্যমে সে পাথর থেকে আবর্জনা সরাতে বললে হিরাক্লিয়াস সেখান থেকে ময়লা সরানো শুরু করে, ১/৩ অংশ সরানোর পরেই ওমর (রাঃ) বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করেন। রোমানরা রাসুল (সাঃ) এর ৩০০ বছর আগে বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে। ইহুদীরা বায়তুল মুকাদ্দাসে খৃস্টানদের ‘আল কামামা’ নামক স্থানকে ডাস্টবিন বানিয়ে ছিল। ‘আল কামামা’ হল এমন একস্থান যেখানে ইহুদীরা ইসা (আঃ) ভেবে এক লোককে ক্রুশ বিদ্ধ করে হত্যা করার পর সেখানে কবর দেয়। তাই খৃস্টানরাও এর প্রতিশোধসরূপ ‘সাখরা’ পাথরে ময়লা ফেলে সেটাকে ডাস্টবিন বানায়। 

    পারস্যের কাহিনী:


    ব্যাবিলনের জিহাদঃ   কাদেসিয়ার পরাজয়ের পর লক্ষাধিক সৈন্য ব্যাবিলনে আশ্রয় নেয়। এঘটনা সা’দ (রাঃ) জানার পরে ব্যাবিলনে আক্রমণ করেন। পারসিকরা ব্যাবিলন ছেড়ে মাদায়েন ও নিহাওয়ান্দের দিকে পালিয়ে যায়।

    নাহারশীরের জিহাদঃ  সা’দ (রাঃ) সালমান ফারসী (রাঃ) কে  নাহারশীরের জন্য সেনাপতি করে পাঠায়। সেখানে পারসিকরা এক সিংহকে মুসলিমদের চলাচলের রাস্তায় বেধে রাখে, সা’দ (রাঃ) এর ভাতিজা হাশেম সেটিকে হত্যা করে। অবশেষে, প্রচণ্ড অবরোধের পর মুসলিমরা এযুদ্ধে জয় লাভ করেন।

    মাদায়েন বিজয়ঃ   সা’দ (রাঃ) সেনাবাহিনী নিয়ে মাদায়েন যাত্রা করেন। তারা দজলা নদীর তীরে যেয়ে দেখেন সেখানে কোন নৌকা নেই, সব নৌকা পারসিকরা অপর পারে নিয়ে গেছে, সেতুও ভেঙ্গে ফেলেছে। তাই সা’দ (রাঃ) মুজাহিদদের নিয়ে ঘোড়া সহই  পানিতে নেমে পরেন, নদীর পানি কূলে কূলে ভরা  ছিল। এদেখে অপর পাড়ে দাঁড়ানো পারসিক সেনারা পাগল-পাগল, জীন-ভুত বলে ভয়ে পালিয়ে যায়। সেখানে পারস্যের রাজা-বাদশার প্রচুর ধন সম্পদ পড়েছিল, কিছুই তারা নিতে পারেনি। ৩  কোটি স্বর্ণ মুদ্রা ফেলে রেখে ইয়াযদগিরদ ‘হুলওয়ানে’ পালিয়ে যায়। এ যুদ্ধে  ‘ফাই’  সম্পদ অনেক বেশি ছিল। 


    জলুলার জিহাদঃ  ইয়াযদগিরদ  ‘জলুলা’তে  মাহরানের নেতৃত্বে বিশাল বাহিনী রেখে হুলওয়ান পালায়। জলুলাতে সা’দ (রাঃ) এর সাথে তাদের যুদ্ধ হয়। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর মাহরান পালায়, পারসিকদের ১ লক্ষ সৈন্য নিহত হয়। পরে কা’কা (রাঃ) তারা করে মাহরানকে হত্যা করেন।

    পরে মুসলিমরা  হুলওয়ানের  তিকরীত ও মুসেল এবং মাসিবযান বিজয় করেন।

    রোমের কাহিনী:


    কিরকিসিয়্যাহ হীত বিজয়ঃ  জাযীরার অধিবাসিগন হিমসের অধিবাসীদের খালিদ (রাঃ) ও উবায়দা (রাঃ) এর বিরুদ্ধে উস্কানি দিলে তারা হীত এসে জমা হয়। তখন খলীফা উমর ইবনে মালিককে হীত আক্রমণ করতে পাঠালে  তিনি হারিস ইবনে ইয়াজিদকে হীত অবরোধ করতে দিয়ে কিরকিসিয়্যাহ জয় করেন। পরে হীতবাসীরা ও আত্মসমর্পণ করে।জাযীরা বিজয়ঃ  ইয়ায ইবনে গানামের নেতৃত্বে  একদল মুজাহিদ জাযীরা বিজয় করেন। ইয়ায ইবনে গানাম পরে  রাহা  বিজয় করেন। পরে  হাররান  বিজয় করেন। ‘হাররান’ থেকে উমর ইবনে যাদ  ‘রাসুল আয়ন,  আবু মুসা আসআরী  নসীবীনইয়ায ইবনে গানাম  দারা  এবং উসমান ইবনে আবদিল আস  আরমিনিয়া  বিজয়করেন।

    পারস্যের কাহিনিঃ  

    আহওয়ায, মানাযির নাহার তায়রী বিজয়ঃ  মুসলিমরা ‘তুসতার’ পর্যন্ত সকল রাজ্য পারসিকদের থেকে ছিনিয়ে নেন। তুসতারে সম্রাট ইয়াযদগিরদ জোর করে সাধারণ জনগন থেকে সৈন্য জমা করে। খলীফা ‘কূফা’ ও ‘বসরা’ থেকে ‘আহওয়াযে’ সৈন্য পাঠায়, তারা হরমুজানকে পরাজিত করে, হরমুজান ‘তুসতার’ পালায়। তুসতারে যুদ্ধে প্রত্যেক মুসলিম ১০০ জন করে পারসিক সৈন্য হত্যা করে। হরমুজান বন্দী হয়, পরে তাকে খলীফার কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সে ইসলাম গ্রহন করলে খলীফা তাকে কিছু জায়গা ও ভাতা দিয়ে মুক্ত করে দেন। বলা হয় খলীফা ওমর (রাঃ) এর হত্যাকারীর সাথে  এই হরমুজানের হাত ছিল। 

        
    সুইস (সুস) বিজয়ঃ  তুসতারের পর  সাবরা আবু মুসা আসআরি ও অন্যদের নিয়ে সুইস অবরোধ করলে সেখানকার বিজ্ঞজনেরা বলে  দাজ্জাল ছাড়া এটি কেউ জয় করতে পারবে না। তখন সাফ ইবনে সায়াদ এক লাত্থি দিয়ে দরজার তালা ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকে পরলে মুসলিমরা সুইস জয় করেন। এদিকে পারস্য সম্রাট ইয়াযদগির্দ ইস্পাহানে পালিয়ে যায়।

    মিসর ইসকান্দারীয়া বিজয়ঃ  সিরিয়া বিজয়ের পর খলীফা ওমর (রাঃ) আমর ইবনে আস (রাঃ) কে মিসর ও ইসকান্দারীয়ার উদ্দেশ্যে পাঠান। তারা সেখানে গেলে ক্যাথলিক নেতা মারইয়াম ও পাদ্রী মিরইয়াম তাদের সাথে দেখা করলে তারা তাদেরকে ইসলাম গ্রহন করতে বলেন। কিন্তু ইসকান্দারীয়ার শাসক মুকাওকাস  তাদের মুসলিমদের আক্রমণ করতে বলেন এতে বুদ্ধিমান জনগন বলেন, “যে সম্প্রদায় দুটি বিশাল  সাম্রাজ্য রোম ও পারস্য বিজর করল তোমরা তাদের বিরুদ্ধে কিভাবে যুদ্ধ করবে”? পরে সিদ্ধান্তের বেধে দেয়া সময় শেষ হলে মুসলিমরা তাদের উপর আক্রমণ করে, এতে কিছু পাদ্রী ভয়ে মদিনাতে যেয়ে সন্ধি  করে মিসর মুসলিমদের দিয়ে দেয়। এরপর আমর (রাঃ) ইসকান্দারীয়াতে সৈন্য পাঠালে মুকাওকাস জিযিয়া করের বিনিময়ে সন্ধি করলে ইসকান্দারীয়াও বিজিত হয়।

    নিহাওয়ান্দ বিজয়ঃ   একটার পর একটা পরাজয়ের পর সম্রাট ইয়াযদগির্দ আসে পাশের সব এলাকায় সাহায্য চাইলে ১ লাখ ৫০ হাজার সৈন্য নিয়ে ফিরযান এক বাহিনী তৈরি করে নিহাওয়ান্দের কাছে সমাগত হয়। এদি কে কূফাবাসী  সা’দ (রাঃ) বিরুদ্ধে সংগ্রাম করলে কোন কারণ ছাড়াই ওমর (রাঃ) তাকে পদচ্যুত করে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহকে কূফায় শাসনভার দিয়ে পাঠান। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ খলীফা  ওমর (রাঃ)  এর কাছে সাহায্য চাইলে তিনি আন-নূমান ইবনে মুকরিন কে সেনাপতি করে নিহাওয়ান্দে প্রেরণ করেন। এক প্রচণ্ড যুদ্ধের পর আন-নূমান ঘোড়া থেকে পরে গেলে তার কোমরে তীর লাগলে তিনি শহীদ হন। হুযাইফা পতাকা তুলে নেন ও পরে তার ভাই নুয়াইমকে পতাকা তুলে দিয়ে শহীদ হয়ে যান। এ যুদ্ধে  মুসলিমদের জন্য তৈরি পরিখায় নিজেরাই পড়ে ১ লক্ষ  পারসিক নিহত হয়।

    নুয়াইম ইবনে মুকরিম হামাদান দখল করেন। নুয়াইম ইবনে মুকরিম এর যখন ১২ হাজার সৈন্য তখন রোম, দাইলাম, রাই ও আজারবাইজানের সৈন্যরা একত্রে ‘ওয়াজরুয’ এ হামলা করতে চাইলে  নুয়াইম একা সবগুলকে পরাজিত করেন।

    রাই, কোমাস, জুরজান, আজারবাইজান, আলবাব, আরমানিয়া বিজয়ঃ নুয়াইম ইবনে মুকরিম নিজে ও সেনাবাহিনী পাঠিয়ে রাই, কোমাস ও জুরজান বিজয় করেন। আজারবাইজানের শাসক ছিল রুস্তমের ভাই ইসকান্দিয়ায সে সন্ধির মাধ্যমে আজারবাইজান মুসলিমদের কাছে সমর্পণ করে।  ওমর (রাঃ) সুরাকাহ ইবনে আমর (রাঃ) কে আল-বাবে পাঠান। সুরাকাহ নিজে ও সেনাবাহিনী পাঠিয়ে আল-বাব ও পরে আরমানিয়া সহ আশে-পাশের অনেক অঞ্চল জয় করেন। সুরাকাহ সেখানে ইন্তিকাল করলে আব্দুর রাহমান ইবনে  রাবীয়াহ কে ওমর (রাঃ) সে এলাকার দায়িত্ব দিয়ে তুর্কিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য রেখে দেন।

    তুর্কিদের বিরুদ্ধে প্রথম জিহাদঃ আব্দুর রাহমান ইবনে রাবীয়াহ কে ওমর (রাঃ) তুর্কিদের বিরুদ্ধে অভিযানে যেতে বললে তিনি ৬৫০ মাইল দূরে ‘বানাঞ্জারে অভিযান পরিচালনা করেন এবং কয়েকবার যুদ্ধ করেন। পরে উসমান (রাঃ) এর খিলাফত কালেও অনেক বার প্রচণ্ড যুদ্ধ হয় তুর্কিদের সাথে।

    খোরাসান (আফগানিস্তান) বিজয়ঃ  সম্রাট ইয়াযদগির্দ খোরাসানে পলায়ন করে। আহনাফ (রাঃ) খোরাসান বিজয় করেন। সম্রাট চিনের বাদশাকে সাহায্য করতে বললে চিনের বাদশা মুসলিমদের ভয় পেয়ে তাকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে আর যুদ্ধ করতে নিষেধ করে।

    কিরমান, সিজিস্তান মাকরন বিজয়ঃ  ওমর (রাঃ) এর শাসনামলেই কিরমান, সিজিস্তানের পর মাকরনের নদী পর্যন্ত বিজয় হয় মুসলিমদের দ্বারা।

    কুর্দীদের বিরুদ্ধে বিজয়ঃ  ওমর (রাঃ) এর খিলাফত কালে সর্বশেষ কুর্দীদের সাথে মুসলিমদের যুদ্ধ হয়। পরে ওমর (রাঃ) ১০ বছর ৫ মাস ২১ দিনের খিলাফতে সবচেয়ে বেশি রাজ্য জয়করে সেখানে ইসলামের শান্তির বানী পৌঁছে পরলোক গমন করেন।

    রাসুল (সাঃ) যখন মক্কায় ইসলাম প্রচার শুরু করেছিলেন, তখন মক্কার মুশরিক-কাফিররা সাহাবাদের এই বলে উত্যোক্ত করত যে, এরা নাকি রোম বিজয় করবে? এরা নাকি পারস্য বিজয়  করবে? ওই দেখ দেখ রোম বিজয়ী যায়, পারস্য বিজয়ী যায়, ওই দেখ দেখ পাগল যায় …….ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এই  বাপ-দাদার  ধর্ম ত্যাগকারী,  কথিত পাগলরাই মাত্র ২০-২৫ বছরের মধ্যেই একত্রে   রোম-পারস্যের মত দুইটা পরাশক্তিকে ধ্বংস করে দিয়ে আফ্রিকা এবং হিন্দুস্তান, চিন ও রাশিয়ার সীমানায় ইসলামকে নিয়ে গিয়েছিল। তার কিছুদিন পরেই মাত্র ১০০ বছরের ভিতর মদিনা থেকে পশ্চিমে স্পেইন, পূর্বে  হিন্দুস্তান (ভারতীয় উপমহাদেশ), চিনের অনেক অঞ্চল, উত্তরে রাশিয়ার  অনেক অঞ্চল এবং দক্ষিনে আফ্রিকাকে পরাজয় করে সেখানে ইসলাম পৌঁছে দিয়ে ইসলামিক খিলাফত রাষ্ট্রকে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। ১৩০০ বছর ধরে সেই রাষ্ট্রকে পরিচালিত করে সবচেয়ে স্থায়ীরাষ্ট্র হিসেবে রেকর্ড গড়েছিল। আজও ক্রুসেডাররা সেই খিলাফত রাষ্ট্রের নাম শুনলে জামা-কাপড় ভিজিয়ে দেয়ার মত অবস্থা করে। হ্যাঁ,  তবে আবার আসছে সেই রাষ্ট্র, খুবই নিকটে, তবে এবার আসলে এটি আর পৃথিবীর সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র হবে না, এটি সমগ্র পৃথিবী নিয়েই গঠিত হবে, আর স্থায়ী হবে কিয়ামত পর্যন্ত।

    [সূত্রঃ ১. আল বিদায় ওয়ান নিহায়া  (৬ ষ্ঠ ও ৭ম খণ্ড) …… আবুল ফিদা হাফিজ  ইবনে কাসির আল-দামেশকি (তাফসীরে ইবনে কাসির -এর লেখক)।
    ২. আর রাহীকুল মাখতূম ……. আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপূরী।
    ৩. আসহাবে রাসুলের জীবনকথা ….  আবু বকর (রাঃ) ও ওমর (রাঃ) এর জীবনী …. ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ।
    ৪. হেজাজের কাফেলা …… নসীম হিজাযী।]




  • সালাহুদ্দীন আইয়ুউবী

    সালাহুদ্দীন আইয়ুউবী

    মহান আল্লাহ এই মহাজগতের সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা। আল্লাহ মানুষ সহ বহু প্রকারের প্রাণী, জীবজন্তু সৃষ্টি করেছেন। তাদের মধ্যে মানুষকে করেছেন সৃষ্টির সেরা জীব। আর তাদের হাতেই ন্যাস্ত করেছেন পৃথিবীর পরিচালনার ভার। আর সঠিক উপায়ে পরিচালনার জন্য পৃথিবীর ঊষালগ্ন থেকেই সেখানে প্রেরণ করেছেন নবী-রাসুল যারা  মানুষের মাঝে আল্লাহর আইন-কানুন ও জীবন চলার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়ে সে অনুযায়ী চলতে মানুষকে সাহায্য করেছেন। আর নবী-রাসুলদের এই কাজের সাহায্যার্থে আল্লাহ তাদের অনেকের উপর প্রেরণ করেছেন আসমানি কিতাব এবং তাদের দিয়েছেন সর্বযুগের চিরন্তন আদর্শ ইসলাম। রাসূল (সাঃ) ছিলেন সেই নবী – রাসুলদের মধ্যে শেষ রাসুল যার পর আর কোন নবী বা রাসূল আসবেন না। কিন্তু মানুষের মাঝে আল্লাহর আইন-কানুন ও জীবন চলারপদ্ধতি পৌছিয়ে দিতে এবং সেগুলো সূক্ষ্মরূপে – সুশৃঙ্খল উপায়ে পালনের উদ্দেশ্যে সমগ্র পৃথিবীতে একক রাষ্ট্রীয় ভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের মধ্য থেকে নির্বাচিত খলীফাদের  দায়িত্ব দিয়েছেন। আর সেই ক্রমধারায় নবী-রাসুলের পর খলিফাগণ দাওয়া ও জিহাদের মাধ্যমে একের পর এক অঞ্চলে ইসলামকে পৌছিয়ে দিয়েছেন। সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি ছিলেন তেমনি একজন সুলতান যিনি ইসলামিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি বায়তুল মুকাদ্দাস ( ইহুদী-খৃষ্টানদের কথ্য মতে জেরুজালেম) ক্রুসেডারদের দ্বারা দখলের  প্রায় ৯০ বছর পর পুনরায় (হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) এর খিলাফতের সময়  সেটি ইসলামিক রাষ্ট্রের ছায়াতলে আসে) তাদের হাত থেকে মুক্ত করেন, এবং সেখানকার মুসলিম নাগরিকদের তাদের অত্যাচারের  হাত  থেকে  রক্ষাকরেন।

    ১১৬৯ সালের ২৩ মার্চ। সালাহুদ্দিন আইউবি গভর্নর ও সেনাপ্রধান হয়ে মিসর আগমন করেন। ফাতেমি খিলাফতের কেন্দ্রীয় খলীফা তাকে এ-পদে নিয়োগ দিয়ে বাগদাদ থেকে প্রেরণ করেন।তার (দ্বাদশ শতাব্দীর) আগে থেকেই ইউরোপ, ফ্রান্স ও জার্মানি ইসলামিক রাষ্ট্র ভাঙ্গার  জন্য  ক্রুশ ছুঁয়ে শপথ করে, ইসলামের নাম নিশানা মুছে দিয়ে বিশ্ব জুড়ে ক্রুশের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শুরু করে নানা চক্রান্ত। সেই সঙ্গে তারা চালায় সশস্র অভিযান। মুসলিমদের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে দখল করে রাখে ইসলামের মহান স্মৃতি চিহ্ন প্রথম কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাস।  

    সালাহুদ্দীন আইয়ুবি ছোটবেলায় গভর্নর নিজামুল মূলক এর মাদরাসায় জাগতিক ও আদর্শিক  পড়াশুনা ও যুদ্ধ বিদ্যায় জ্ঞান লাভ করেন। রাজনীতি, কূটনীতি, ভূগোল, ইতিহাস ও প্রত্যক্ষ যুদ্ধ কৌশলের উপর গভীর জ্ঞান ও আগ্রহের কারণে চাচা শেরেকাহ ও নুরুদ্দীন জঙ্গী তাকে স্পেশাল প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। প্রশিক্ষণটি মূলত তৈরি হয় এক যুদ্ধের ময়দানে, যেখানে সালাহুদ্দিন আইউবি দীর্ঘকাল আবরোধের মধ্যে যুদ্ধ করেও হতাশ না হয়ে সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা মাথায় সৈন্যদের নিয়ে যুদ্ধ করে ফিরে আসেন। এর পরই নুরুদ্দীন জঙ্গী  তাকে মিশরের গভর্নরের পদের জন্য মনোনীত করেন।


    সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গীও চিন্তা চেতনায় ছিলেন সালাহুদ্দীন আইউবির মতই। সেসময় যেখানে ইসলামিক খিলাফতের সব আমির, গভর্নর ও  উজিররা খৃষ্টানদের চক্রান্তে পা দিয়ে তাদের থেকে সুন্দরি মেয়ে ও প্রচুর ধন-সম্পদ নিত এবং মূলত ক্ষমতার লোভে ইসলামিক রাষ্ট্র থেকে স্বাধীন হয়ার স্বপ্ন দেখত, ঠিক তখনই সালাহুদ্দীন আইয়ুবি ও নুরুদ্দীন জঙ্গী ইসলামিক খিলাফত রাষ্ট্রকে ইহুদী–খৃষ্টানদের চক্রান্ত থেকে মুক্ত করে বাইতুল মুকাদ্দাস কে সেই ক্রুসেডারদের থেকে মুক্ত করার জন্য একের পর এক জিহাদ করে গেছেন।

    সালাহুদ্দীন আইয়ুবি মিশরের গভর্নর হয়ার পরই সর্ব প্রথম  সেখান থেকে খৃষ্টানদের চক্রান্তে পা দেয়া আমির-উজিরদের সুকৌশলে সরকারী দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দেন। এজন্য তাকে মারার জন্য ক্রুসেডারদের দালালরা অনেক ফন্দি আটার পরও তারা ব্যর্থ হয়। দালালরা অনেক সুন্দরী মেয়ে ব্যবহার করেও পাথরের মত সালাহুদ্দীনকে গলাতে পারেনি। যেখানে অন্যান্য আমিররা সানন্দেই তাদের গ্রহণ করত।

    দালালরা সালাহুদ্দীনকে গলাতে না পেরে তাকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে নিজেরা ক্ষমতায় বসার জন্য মিশরের সেনাবাহিনির মধ্যে থাকা সুদানি সেনাদের মধ্যে বিদ্রোহ করার চেষ্টা করে এই বলে যে তোমরা সুদানি তারা মিসরি। সুদানের বর্ডার মিশরের কাছে থাকাতে  বিদ্রোহের পর সেখান থেকে আক্রমণ করাও সহজ ছিল। কিন্তু সালাহুদ্দীন আইয়ুবি তার চৌকস গোয়েন্দা প্রধান আলি বিন সুফিয়ান কে দিয়ে সব তথ্য আগেই পেয়ে যান । আর খুবই কৌশলে তাদের বিদ্রোহ দমন করেন। এদিকে সেনা বিদ্রোহ করিয়ে দালালরা সম্রাট ফ্রাঙ্ককে আক্রমণ করার আগমনও জানায়। কিন্তু সালাহুদ্দীন আইউবি আগেই বিদ্রোহ দমন করেন, আর যখন পরে ফ্রাঙ্ক-এর সেনাবাহিনী আসে তারা পুরোপুরিভাবে সালাহুদ্দীনের কাছে পরাজিত হয়। এই দিকে ফ্রাঙ্ক মিসরে আক্রমণ করলে সিরিয়া থেকে নুরুদ্দীন জঙ্গিও ফ্রাঙ্ক-এর দেশে আক্রমণ করে বসেন। তাতে আক্রমনের খবর পেয়েই ফ্রাঙ্ক তার দেশে ফিরে যেয়ে দেখেন সেখানের চিত্রই বদলে গেছে। সব দিক দিয়েই ফ্রাঙ্কের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। 

    ফাতেমি খিলাফতের খলীফা আজেদ ও যখন ক্রুসেডারদের চক্রান্তে পা দেন তখন সালাহুদ্দীন আইউবি তাকে সুকৌশলে খিলাফতের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে মিশরকে বাগদাদের কেন্দ্রীয় খিলাফতের অধীনে  দিয়ে দেন , এতে করে খিলাফত রাষ্ট্র আবারো একটি রাষ্ট্রে পরিনত হয়। মূলত ক্রুসেডাররা  ফাতেমি খলীফাকে মদ আর নারীতে ব্যাস্ত রেখে তাকে অধমে পরিণত করে, এমনকি সে সালাহুদ্দীন আইয়ুবিকে হত্যারও  পরিকল্পনা করে। আর খলীফা হওয়া সত্ত্বেও তিনি সালাহুদ্দিন আইউবির উপর কথা বলতে ভয় পেতেন। চরিত্রের অধপতনের কারণেই মূলত এমনটি অনুভব করতেন তিনি। তাই তাকে সরিয়ে খিলাফতের দায়িত্ব একজনকে দেয়া ও একমুখী করা সালাহুদ্দীন আইয়ুবির পক্ষে সহজ হয়।

    সেকালে মাসজিদে জুময়ার খুৎবাতে আল্লাহর ও রাসুলের নামের পর খলীফার নাম উচ্চারন করতে হতো। সালাহুদ্দীন আইয়ুবি জুময়ার খুৎবা থেকে খলীফার নাম উচ্চারন করা বাদ দিয়ে দেন।

    সুলতান আইয়ুবি যেখানে ক্রুসেডারদে আক্রমণ করে করে তাদের ইসলামিক রাষ্ট্রের দখলকৃত অঞ্চল থেকে বিতারিত করবেন, সেখানকার মুসলিমদের তাদের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিবেন, সেখানে ক্রুসেডাররা সারাক্ষণই তাদের গয়েন্দাদের ব্যবহার করে  মিসরে কোন না কোন সমস্যা তৈরি করে রাখত।  যাতে করে সালাহুদ্দীন আইয়ুবি নতুন করে তাদের আক্রমনের সময় না পান, তিনি যেন মিসর ঠিক করতেই তার সকল সময় পার করে দেন। তারা প্রায়ই চেষ্টা করত সুদানি বাহিনী দিয়ে সুদান থেকে মিসরে আক্রমণ করাতে, যাতে সালাহুদ্দীন শুধু তাদের নিয়েই ব্যাস্ত থাকেন। তারা মিসরের বিভিন্ন মাসজিদে তাদের প্রশিক্ষিত গোয়েন্দা ইমাম পাঠাত যারা সেখানে জিহাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে মানুষের ভিতর থেকে জিহাদের চেতনাকে ধ্বংস করতে চাইত। ক্রুসেডাররা মুসলিমদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করত মেয়েদের দিয়ে। তারা প্রায় সব আমিরদের কাছেই তাদের সুন্দরী মেয়েদের প্রেরণ করত, তাদের দিয়ে সেই আমির দের চরিত্র ধ্বংস করার পায়তারা করত। তারা জানত মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে তাদের ঈমানী শক্তি  যেটা দিয়ে তারা ক্রুসেডারদের  সাথে লড়ে । আর সে শক্তির কাছেই তারা বার বার হারে, আর সে শক্তির বলেই তাদের চেয়েও অনেক কম পরিমাণ সৈন্য নিয়ে মুসলিমরা বার বার জয় লাভ করে।

    ক্রুসেডাররা তাদের নিজেদের মেয়েদের কে মুসলিমদের চরিত্র হরণের প্রশিক্ষণ দিত। তারা এ কাজে সেসকল মেয়েদেরও ব্যবহার করত যাদেরকে তারা মুসলিমদের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অপহরণ করে এনেছিল তাদের বাল্যকালে। তারা ক্রুশের স্বার্থে  এরূপ করাকে পুণ্য মনে করত।
     

    সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবি মিশরের স্থায়িত্ব আনার পরই আবার তার সেই বায়তুল মুকাদ্দাসকে মুক্ত করার সপথ পুরন করার জন্য বের হয়ে যান।  তিনি সর্ব প্রথম খৃষ্টানদের ফিলিস্তিনের শোবক দুর্গ অবরোধ করে সেটা জয় করে ফেলেন। পরে নুরুদ্দীন জঙ্গীর সহায়তায় কার্ক দুর্গও জয়করেন। কার্ক দুর্গ অবরোধ করার সময় সুদানিরা আবারো মিসরে সমস্যা তৈরি করতে চায় ক্রুসেডারদের সাহায্যে। পরে সুলতান আইয়ুবি কার্কের অবরোধ নুরুদ্দীন জঙ্গীকে  দিয়ে মিসরে চলে আসেন। পরে নুরুদ্দীন জঙ্গী কার্ক দুর্গ সহ ফিলিস্তিনের আরও কিছু জায়গা দখল সম্পন্ন করেন। 

    ফিলিস্তিনের শোবক ও কার্ক দুর্গ পরাজয়ের প্রতিশোধ স্বরূপ ক্রুসেডাররা পাল্টা আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নেয়। স্পেনের পূর্ণ নৌ বহর  এতে যুক্ত হয়। ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়ামও যুক্ত হয়। গ্রিস ও সিসিলির জঙ্গি কিশতিগুলোও যুক্ত হয়। ব্রিটিশরা ভাবতো তারা চাইলে একাই মুসলিমদের পরাজয় করতে পারে তাই তারা যুক্ত হতে চায় নি। কিন্তু তাদের পোপের অনুরধে তাদের কিছু যুদ্ধ জাহাজগুলোও যুক্ত করে। …… এদিকে  সুলতান আইয়ুবি গোয়েন্দা মারফত তাদের আগমনের খবর পেয়ে যান, তিনি এও জেনে যান যে তারা আগে এসে মিসরের উপকুলের আলেকজান্দ্রিয়া অঞ্চল দখল করবে। তাই সুলতান আলেকজান্দ্রিয়া থেকে সকল জনগণকে  সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যান এবং সেখানে ঘরগুলোতে মুসলিম সৈন্য দিয়ে ভরে রাখেন। ক্রুসেডাররা যখন উপকুলে এসে ভিরে তারা সেখানে আক্রমণের জন্য কোন সৈন্য না দেখে খুশি হয়, এবং পরে হেসে খেলে উপকূলের আলেকজান্দ্রিয়া দখল করতে যায়। রাতে যখন তারা নগরীতে প্রবেশ করে তখনই আইউবির সৈন্যরা ঘর থেকে বেরিয়ে তাদের উপর আক্রমণ করে নিষ্পেষিত করে দেয়। ওই দিকে তাদের জাহাজগুলোতে যেই সৈন্যদেরকে রেখে এসেছিল তাদের উপর হঠাৎ পেছন থেকে সুলতান আইয়ুবির যুদ্ধ জাহাজ আক্রমণ করা শুরু করে। তারা মিনজানিকের  সাহায্যে বড় বড় আগুনের গোলা ও পাথর মারতে শুরু করে ক্রুসেডারদের জাহাজের উপর। ক্রুসেডাররা পালাতে থাকে জাহাজ নিয়ে এবং ধ্বংস হতে থাকে। ক্রুসেডারদের আরেকটা অংশ ফিলিস্তিন থেকে আক্রমনের জন্য আসলে সুলতান নুরুদ্দীন  জঙ্গী তাদের উপর আক্রমণ করে তাদের পরাজয় করে দেন। এই যুদ্ধ শেষে নুরুদ্দীন জঙ্গী সুলতান আইয়ুবিকে তার অধিকৃত অঞ্চল দিয়ে সিরিয়ায় নিজ এলাকায় চলে যান।

    সালাহুদ্দীন আইয়ুবির যুদ্ধ কৌশলের সবচেয়ে ভয়ানক কৌশল ছিল তার গেরিলা হামলা। তার সৈন্যরা গেরিলা বাহিনী দিয়ে শত্রুদের সেনা বহরের পেছনের অংশে আঘাত হরে নিমিষেই হারিয়ে যেত। তার এই কৌশল আজো সামরিক বিশ্লেষকরা প্রশংসা করে।

    ১১৭৪ সালের মে মাসে নুরুদ্দীন জঙ্গী মৃত্যু বরন করেন। তার মৃত্যুতে নেমে আসে শোকের ছায়া। সালাহুদ্দীন আইয়ুবি হারান তার প্রান প্রিয় অভিভাবককে, যিনি বরাবরই তাকে সাহায্য দিয়ে আসতেন বিভিন্ন সময়ে। ক্রুসেডাররা এতে  খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়। কারন তারা এখন সালাহুদ্দীন আইয়ুবির সাথে আগের চেয়ে কম কষ্টে লড়তে পারবে।  জঙ্গীর মৃত্যুর পর তার মাত্র ১১ বছরের  নাবালেক  ছেলেকে ক্রুসেডারদের গাদ্দাররা ক্ষমতার লোভে খিলাফতের মসনদে বসায়। যদিও মাত্র ১১ বছরের নাবালেগ ছেলেকে খলীফা হিসেবে মসনদে বসানো সকলের জন্য হারাম, তবুও তারা ক্ষমতার জন্য এটা করে। এতে নুরুদ্দীন জঙ্গীর স্ত্রী রোজি খাতুন অনেক বাধা দিলেও তারা তা অমান্য করে। রোজি খাতুনও ছিলেন মুলত তার স্বামীর মতোই একজন খাটি ইমানদার। যিনি এই অন্যায় মেনে নিতে না পেরে সালাহুদ্দীন আইয়ুবিকে চিঠি লিখেন এই বলে যে, উনি যেন এসে সিরিয়া দখল করেন।

    এদিকে সালাহুদ্দীন আইয়ুবি আসবেন জেনে রোজি খাতুন সেখানকার জনগণকে  বুঝাতে থাকেন যে একজন নাবালেগকে  খলীফা হিসেবে মানা হারাম। আর এ কাজ গাদ্দাররা একারনে করেছে যাতে করে তারা তার নাবালক  ছেলেকে  ভুল বুদ্ধি দিয়ে সব করিয়ে নিতে পারে।

    একদিন সালাহুদ্দীন  আইয়ুবি মাত্র ৭০০ সৈন্য নিয়েই সিরিয়ার মুল দুর্গ অবরোধ করেন। এতে সিরিয়ার জনগন খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায় এবং তারা সালাহুদ্দীন আইয়ুবিকে ভিতরে আসতে দেয়ার জন্য নগরীর মুল ফটক খুলে দিতে বলে। তারা বাধ্য হয়ে ফটক খুলে দিলে সালাহুদ্দীন আইয়ুবি ভিতরে প্রবেশ করে। সকলে তাকে স্বাগত জানায়।

    এদিকে  সুলতান আইয়ুবির  আগমনের খবর পেয়ে সকল আমলা- উজিররা  দামেস্ক ছেড়ে পালিয়ে যায়। নুরুদ্দীন জঙ্গীর ছেলেও পালিয়ে যায়। সাথে করে তারা প্রচুর মূল্যবান সম্মত্তি ও প্রচুর দিরহাম নিয়ে যায় আর সাথে করে খৃষ্টানদের দেয়া মেয়েগুলোও নিয়ে যায়।  তারা সিরিয়ার অদূরে হালব, হাররান ও মাশুল দুর্গে যেয়ে আশ্রয় নেয়। সেখানে খৃষ্টানদের প্রভাব থাকায় তারা নিরাপদেই থাকতে শুরু করে।

    হালব ও মাসুলে আশ্রয় নেয়া আমিররা ক্রুসেডারদের সাথে আতত করে সুলতান আইয়ুবিকে পরাজিত করে পুনরায় সিরিয়া দখল করার ফন্দি আটে।  এতে ক্রুসেডাররাও তাদের সাহায্য করতে থাকে। সুলতান আইয়ুবি যেন নিজেদের মুসলিম ভাইদের সাথেই যুদ্ধ করতে করতে শেষ হয়ে যান সেই লক্ষ্যে ক্রুসেডাররা হালব, মাসুল ও আশে-পাসের  আমিরদের সালাহুদ্দীন এর বিরুদ্ধে উদবু‍‌দ্ধ করতে থাকে। তাদের সাহায্য করতে থাকে। তারা সেখানকার মুসলিম জনগণদের গোয়েন্দা মারফত বিভ্রান্ত করতে থাকে। তাদের বুঝাতে থাকে সুলতান সালাহুদ্দীন অত্যাচারী, নির্দয় শাসক।

    পরে বহু দিন যাবত সুলতান আইয়ুবি বায়তুল মুকাদ্দাসের বাঁধা স্বরূপ সেই কথিত মুসলিম আমিরদের  সাথেই যুদ্ধ করতে থাকেন। ক্রুসেডাররা সেই আমিরদের প্রচুর ধন-সম্পত্তি ও সুন্দরী মেয়ে দিয়ে রেখেছিল। আর ক্ষমতার নেশা সে সকল আমিরদের জেকে বসেছিল।

    একদিন মরহুম সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গীর ছেলে প্রচুর মদ্য পানের ফলে ভুগে ভুগে মৃত্যুবরন করে। তাকে দেখার জন্য তার মা রোজি খাতুন আর কখনো যান নি।

     অতঃপর অনেক দিন পর অনেক যুদ্ধ ও অনেক কষ্টের পর সুলতান আইয়ুবি হালব, মাসুল ও হাররান দখল করে নেন।  তখন সেখানকার মুসলিমরাই তাদের আমিরদের বিরুদ্ধে সালাহুদ্দীন এর জন্য দরজা খুলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করতে বলে, পরে তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এতে সুলতানের নিজেদের সাথে যুদ্ধ করেই প্রচুর মুসলিম সৈন্য শেষ হয়ে যায়। ক্রুসেডারদের গাদ্দার আমিরগুলোও তাদের সৈন্যদের এই বলে যুদ্ধে নিত যে, সালাহুদ্দীন ক্রুসেডারদের সাথে আতত করেছে , আর আমরাই প্রকৃত ইসলামের পথে আছি।

    হালব, হাররান আর মাসুল দুর্গ জয়  করার পর সালাহুদ্দীন আইয়ুবির সামনে বাইতুল মুকাদ্দাসের পথে আর কোন বাধা রইলনা।

    সুলতান আইয়ুবির এইবার বাইতুল মুকাদ্দাস এরদিকে আগমনের পালা। ক্রুসেডাররা এইবার আর মুসলিমদের থেকে সাহায্য পাবে না। কারন সব আমিরই এখন সালাহুদ্দীন আইয়ুবির আনুগত্য শিকার করেছে।  সুলতান আইয়ুবি এইবার সর্ব প্রথম কার্ক আক্রমণ করেন। সালাহুদ্দীন আইয়ুবি এর আগেও একবার কার্ক দখল করেন, কিন্তু ১ মাস পর সেটা আবারো ক্রুসেডারদের হাতে চলে যায়। কার্কের শাসনভার ছিল  অরনাত এর উপর। অরনাত একজন নাস্তিক ছিল যে রাসুল (সাঃ) কে নিয়ে বিদ্রুপ করত, তাই সুলতান তাকে ঘৃণা করতেন আর তাকে কাছে  পেলেই হত্যা করবেন   বলে শপথ নিয়েছিলেন। অরনাত মিসর আর সিরিয়ার হজ্ব কাফেলাগুলোর উপর হামলা করে তাদের সম্পত্তি ডাকাতি করত, আর মেয়েদের তুলে নিত।

    সুলতান আইয়ুবি কার্ক আক্রমণ করলেন। কিন্তু তিনি সেটা অবরোধ না করে শত্রু যেন তার ইচ্ছা মত এলাকায় এসে যুদ্ধ করতে বাধ্য হয় সেই পরিবেশ তৈরি করলেন। তিনি শত্রুর সকল রসদ বন্ধ করে তাদের পানির উৎস গুলো দখল করলেন আর তাদের পানির তৃষ্ণায় যুদ্ধ ক্ষেত্রে পাগল করে ফেললেন। ক্রুসেডাররা বর্ম পরে যুদ্ধে আসতো, আর তিনি যুদ্ধের জন্য সময় ঠিক করলেন জুন-জুলাই মাস, এতে তারা বর্মের ভিতর উত্তাপে জ্বলে-পুড়ে মরতে লাগলো। তাদের পরাজয় হল। সুলতান কার্ক ও আশে পাসের দুর্গ জয় করে নিলেন। সেই যুদ্ধে অরনাত সহ মোট ছয় জন সম্রাট ধরা পরে। সুলতান পরে তার শপথ মত অরনাত কে হত্যা করে বাকিদের ক্ষমা করে দেন।

    এই যুদ্ধে ক্রুসেডাররা তাদের সবচেয়ে বড় ক্রুশটা (তারা ভাবে এইটাতেই ইসা (আঃ) কে শূলে চড়ানো হয়েছিল) যুদ্ধের ময়দানে এনেছিল। তাদের সবচেয়ে বড় পাদ্রি (পোপ)  এটা আনে। পরে পোপ মৃত্যু বরণ করে আর বড় ক্রুশটি মুসলিমদের হাতে চলে আসে। পরে সুলতান বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করার পর  ক্রুসেডারদেরকে তাদের ক্রুশটি দিয়ে দেন। 

    এরপর পালা আক্রার দুর্গের । ক্রুসেডাররা ভেবেছিল সুলতান আগে বায়তুল মুকাদ্দাস আক্রমণ করবেন। তাই তারা বুঝে উঠার আগেই সুলতান আগে আক্রা আক্রমণ করলেন। ২-৩ দিন অবরোধের পর সেটা জয় করে ফেলেন।

    তারপর সুলতান আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ আসকালান অবরোধ করেন। প্রায় ৩৪ টি বছর পর এই অঞ্চলটি আবার স্বাধীন হল। ১১৫৩ সালের ১৯  সেপ্টেম্বর সম্রাট ফ্রাংক এটি দখলকরে নেয়। আসকালান থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার পূর্বে বায়তুল মুকাদ্দাস অবস্থিত।

    এইবার পালা বায়তুল মুকাদ্দাসের ………. 

    ক্রুসেডারদের দ্বারা বায়তুল মুকাদ্দাসের দখল হয় ১০৯৯ সালের ১৫ জুলাই মোতাবেক ৪৯২ হিজরীর ২৩ শাবান মাসে ।  ক্রুসেডাররা বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করে মুসলিম শাসকদের সহায়তায়। সেসময় মুসলিম শাসকরা নিজেদের রাজ্য চলে যাবে বিধায় সকলেই একে একে ক্রুসেডারদের পথ ছেড়ে দেয়, কেউই তাদের বাধা দেয় না। বরং অনেকেই তাদের সাহায্য করে, রসদ দেয়।

    শুধু আরাকার আমির ছিলেন একজন  ইমানদার পুরুষ, যার সামরিক শক্তি খৃষ্টানদের তুলনায় কিছুই ছিল না। তবু তিনি খৃষ্টানদের দাবি পুরন করতে অস্বীকৃতি জানান। খৃষ্টান বাহিনি আরাকা ১০৯৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ মে পর্যন্ত অবরোধ করে রাখে। মুসলিমরা এমন প্রান-পন লড়াই করে যে বিপুল ক্ষতির পর ক্রুসেডাররা পথ পরিবর্তনকরে চলে যায়।

    মুসলিম আমিরগনই সে সময়য় ক্রুসেডারদের নিরাপদে বায়তুল মুকাদ্দাস পৌঁছে দিয়েছিল। পরে ১০৯৯ সালের ৭ জুন মাসে তারা বায়তুল মুকাদ্দাস আবরোধ করে এবং ১৫ জুলাই বায়তুল মুকাদ্দাসের ভিতরে প্রবেশ করে। সে সময় বায়তুল মুকাদ্দাসের গভর্নর ছিলেন ইফতেখারুদ্দৌলাহ, তিনি প্রানপন লড়াই করেছিলেন ক্রুসেডারদের সাথে। কিন্তু তাদের রসদ ও সৈন্য অগণিত হয়ায় তিনি ব্যার্থ হয়েছিলেন। পরে ক্রুসেডাররা নগরীতে ঢুকে সব মুসলিমদের হত্যা করে, তাদের নারীদের অত্যাচার করে, শিশুদের মাথা কেটে সেটা দিয়ে ফুটবল খেলে। মুসলিমরা আস্রয়ের জন্য মাসজিদুল আকসা ও অন্যান্য মাসজিদে যায় তারা ভাবে মাসজিদুল আকসা উভয়ের নিকট সম্মানিত হয়ায় তারা তাদের ছেড়ে দিবে। কিন্তু না ক্রুসেডাররা সেখানে ঢুকে মুসলিমদের  হত্যা করে,  তাদের রক্ত  মাসজিদ গড়িয়ে গড়িয়ে বাইরে পরছিল, রক্তে খৃষ্টানদের ঘোরার পা ডুবে গিয়েছিল। খৃষ্টান ঐতিহাসিকদের মতে উদ্বাস্তু মুসলিমের সংখ্যা ছিল ৭০ হাজার।

    সুলতান আইয়ুবি বায়তুল মুকাদ্দাসের সেই অবমাননার কাহিনী তার পিতা নাজমুদ্দিন আইউব থেকে শুনতেন, নাজমুদ্দিন তার পিতার কাছ থেকে শুনতেন। পরে সুলতান এই কাহিনী তার নিজের ছেলেদের বলতেন।

    ১১৮৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রবিবার মোতাবেক  ৫৮৩ সনের ১৫ রজব  সুলতান আইয়ুবি দ্রুত বায়তুল মুকাদ্দাস পৌঁছে যান, অবরোধ করেন বায়তুল মুকাদ্দাস। এদিকে খৃষ্টানরাও তাদের পবিত্র ভুমি ছাড়তে নারাজ। তারাও আমরন লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। সেখানকার প্রায় সব মুসলিমই বন্দি। তারা জেলের ভিতর থেকেই আজান আর তাকবীর ধ্বনি দিচ্ছেন। অনুরূপ খৃষ্টানরাও গির্জায় গান গাইছে ও প্রার্থনা করছে। শুরু হয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। দুই পক্ষই দুই পক্ষকে আহত নিহত করে চলছে। শহিদদের সংখ্যা গোনে সুলতান আইয়ুবি টাস্কি খেয়ে যান। পরে অনেক ত্যাগের বিনিময়ে ৫৮৩ হিজরীর ২৭ রজব মোতাবেক ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দ ২ অক্টোবর শুক্র বার সালাহুদ্দীন আইয়ুবি বিজয়ী বেশে বায়তুল মুকাদ্দাস প্রবেশ করেন। এটিই ছিল সেই রাত যেদিন আমাদের প্রিয় নবী রাসুল (সাঃ) বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে মিরাজে গমন করেন। 🙂

    বায়তুল মুকাদ্দাস মুক্ত হয়ার পর সেখানকার মুসলিমরা প্রায়  ৯০ বছর পর ক্রুসেডারদের অত্যাচার থেকে রেহাই পেল।

    ইংল্যান্ডের সম্রাট রিচার্ড যাকে ”ব্লাক প্রিন্স” বলা হত সে এর প্রতিশোধ নিতে  ৫২০ যুদ্ধ জাহাজ ও অনেকগুলো মালবাহী বড় জাহাজ নিজে রোম সাগর আসে। তখনই  ঝড়ের কবলে পরে প্রায় অনেক জাহাজ তলিয়ে যায়। যা বাকি থাকে তা দিয়েই সে বায়তুল মুকাদ্দাস আবার দখল করতে আসে। তখন তার সৈন্য ছিল ২লাখ।

    সুলতান চাচ্ছিলেন তারা যেন আগে উপকূলীয় অঞ্চল আক্রা অবরোধ করে, এতে করে তাদের সেখানেই ব্যস্ত রেখে শেষ করে দিতে পারলে বায়তুল মুকাদ্দাস রক্ষা করা যাবে।

    রিচার্ড যখন আক্রা আগমন করে  তারও আগেই তার জোট ভুক্ত রাষ্ট্ররা আক্রা অবরোধ করে। রক্ত ক্ষয়ী ও দীর্ঘ যুদ্ধের পর সকলে মিলে প্রায় ৬ লাখেরও বেশি সৈন্য নিয়ে আক্রা দখল করে নেয়। এতে তারা দখলের পর আক্রার প্রায় ৩ হাজার নিরস্র মুসলিমের  হাত পা বেধে তাদের উপর পিচাশের মত ঝাপিয়ে পরে হত্যা করে।

    রিচার্ড আক্রা দখলের পর উপকূলীয় বাকি অঞ্চল আসকালান ও হিফা দখল করতে যায়, যেন সেগুলোকে দখল করে ক্যাম্প বানিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করা সম্ভব হয়। কিন্ত তারা যেন সেটা করতে না পারে তার জন্য সুলতান আইয়ুবি আগেই সেখান থেকে জনগনকে  সরিয়ে সেগুলোকে পোড়ে  ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেন। পড়ে ক্রুসেডাররা সেখানে যেয়ে আর কিছু পায় নি। শেষে একসময় রিচার্ড অসুস্থ হয়ে পরলে সে যুদ্ধ ত্যাগকরে নিজ দেশে চলে যায়, আর বলে যায় সে আবার আসবে বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করতে। কিন্তু পরে আর কেউ পারেনি বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করতে। ……

    কিন্তু না, ইসলামিক খিলাফতের শেষের দিকে যখন মুসলিম আমিররা ক্রুসেডারদের সাথে বন্ধুত্বের কথা বলে মূলত তাদের দাসত্বকে গ্রহণ করল। তখনই ক্রুসেডাররা আবারো তুচ্ছ ও সংকীর্ণমনা  জাতীয়তাবাদের নীতিতে ইসলামিক রাষ্ট্রকে ভেঙ্গে টুকরা টুকরা করে দিল। আবারো ক্রুসেডাররা ফিলিস্তিনে ইহুদীদের প্রবেশের মাধ্যমে মূলত নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করল। সেখানে মুসলিমদের হত্যা করল, তাদের নিজ ভুমি থেকে ছাড়া করল, গঠন করল সেখানে ইসরাইল রাষ্ট্র, আর সেটা কতিপয় নাম ধারি মুসলিম শাসকদের কারনেই সম্ভব হয়েছিল।

    সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবি তার জীবনে দুটো ইচ্ছা করেছিলেন এক বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করা আর  দুই হজ্ব করা। যদিও তিনি প্রথম ইচ্ছা  পুরন করতে পেরেছিলেন কিন্তু তার দ্বিতীয় ইচ্ছা অর্থের  অভাবে পুরন হয়নি। মিসরি কাহিনীকার মুহাম্মদ ফরিদ আবু হাদীদ লিখেছেন, মৃত্যুর সময় সালাহুদ্দীন  আইউবির মাত্র ৪৭ দিরহাম রূপা আর এক টুকরো সোনা ছিল। তার নিজস্ব কোন বাসগৃহ ছিল না। তিনি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে কোন অর্থ নিয়ে হজ্ব করতে চান নি।

    ১১৯৩ সালের ৪ মার্চে অবশেষে ইসলামের মহান নেতা সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবি ইন্তিকাল করেন। সেদিন সমগ্র ফিলিস্তিনের নারী-পুরুষ তাদের ঘর থেকে রাস্তায় বেরিয়ে তাদের সুলতানের জন্য মাতম করছিল। নগরীর অলিতে-গলিতে  কান্নার রোল বয়ে যাচ্ছিল। আজও সেই কান্নার রোল শোনা যায় সেই ফিলিস্তিনের অলিতে গলিতে আজও তারা তাদের সেই সালাহুদ্দীন আইউবিকেই খুজছে ক্রুসেডারদের অত্যাচার থেকে তাদের মুক্তির জন্য।

    অবশেষে ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ ক্রুসেডাররা ইসলামের সর্বশেষ খিলাফত থাকা অঞ্চল তুরস্ক থেকেও রাষ্ট্রীয় ভাবে থাকা খিলাফতকে ধ্বংস করল। লর্ড কার্জন বলল, আমরা মুসলিমদের মেরুদণ্ড খিলাফতকে ধ্বংস করে দিয়েছি, তারা আর দাড়াতে পারবে না । তারা সেই সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবির কবরে  লাথি মেরে বলল, উঠো সালাহুদ্দীন, তোমার বায়তুল মুকাদ্দাসকে রক্ষা কর। ……. আর আমরা কি করলাম?  পেরেছি কি সেই খিলাফতকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করতে?  পেরেছি কি সেই বায়তুল মুকাদ্দাস কে রক্ষা করতে?

    [রেফারেন্সঃ ইমানদীপ্ত দাস্তান …… এনায়াতউল্লাহ আলতামাশ, প্রখ্যাত উর্দু উপন্যাসিক এর লিখা। বইটি ৮ খণ্ডে এবং ৮#২৪০= ১৯২০ পৃষ্ঠা সম্বলিত।]

    লেখকঃ রাশেদুল ইসলাম

  • ইসলাম কি সাম্প্রদায়িক?

    ইসলাম কি সাম্প্রদায়িক?

    “সাম্প্রদায়িকতা” শব্দের ব্যবহারিক অর্থ হলো রাষ্ট্রের কোন সাম্প্রদায়ের উপর বিশেষ করে সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়ের উপর কোন বিশেষ গোষ্ঠী বা দল (কতৃক) জুলুম, নির্যাতন ইত্যাদি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিতর সাম্প্রদায়িকতা বলতে আমরা সচরাচর হিন্দু সাম্প্রদায়ের উপর অত্যাচার-নির্যাতনকে বুঝে থাকি। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হবার পর থেকে হিন্দুদের জমি ও ঘর বাড়ী দখল, ব্যবসা বা সম্পত্তি থেকে উৎখাতের প্রক্রিয়া কাদের দ্বারা সূচিত হয়েছিলো তা আমরা সকলেই জানি। আওয়ামী দাঙ্গাবাজদের দ্বারা শুধু যে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর অত্যাচার-নির্যাতন হয়েছিলো তাই নয়, পার্বত্য চট্রগ্রামের পাহাড়ী জনগোষ্ঠীকে জোর করে বাঙ্গালী বানানোর প্রক্রিয়ায় তাদের উপরও বৈষম্যের সূচনা হয়েছিলো। ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতির ভারতে যেভাবে কংগ্রেস মুসলমানের উপর বছরের পর বছর অত্যাচার চালিয়ে এসেছে সেই একই চেতনায় বাংলাদেশেও কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় বন্ধু আওয়ামী লীগ সংখ্যালঘুদের উপর জুলুম করেছে। আর এই স্বার্থান্বেষী রাজনীতির ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগের পর যত দল ক্ষমতায় এসেছে জাতীয় পার্টি, বি.এন.পি সকলেই সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন চালিয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে ’৯০ এর পর থেকে তথাকথিত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় আওয়ামী লীগ-বি,এন,পি এর হাতে একই ভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। পরিহাসের বিষয় হলো এই যে, বি.এন.পি আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের অত্যাচারে ভিটে-বাড়ী থেকে উচ্ছেদ হওয়া থেকে শুরু করে, ধর্ষণের শিকার হয়েছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন আর এর দোষ চাপানো হয়েছে ইসলামী শক্তি আর ইসলাম পছন্দ মানুষদের উপর। অথচ আমরা চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি গত ৩০ বছরে ইসলামি শক্তির দ্ধারা কোন হিন্দু নির্যাতিত হয়েছেন এমন উদাহরণ কেউ দেখাতে পারবেন না। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক শক্তি হিসেবে বি,এন,পি আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা একের পর এক হিন্দুদের বাড়ী দখল করেছে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্ছেদ করেছে। নারী নির্যাতন করেছে অথচ এর জন্য দোষারোপ করা হয়েছে ইসলাম ও ইসলামী শক্তিগুলোকে। অথচ ইসলামী শক্তিগুলো উল্টো কাজটাই নিরলসভাবে করে গিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের ছাদ ভেঙ্গে যখন শত শত হিন্দু ছাত্র মৃত্যুর সাথে লড়ছিলো, তখন ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার ছেলেরা প্রথম ছুটে গিয়েছিলো তাদেরকে রক্ত দিয়ে বাচাঁনোর জন্য। ভারতে যখন বাবরী মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছিলো আর গুজরাটে হাজার হাজার মুসলমানকে পুঁড়িয়ে মারা হয়েছিলো তখন এদেশের সাধারণ ইমাম ও ইসলামি নেতৃবৃন্দ জনগণকে তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার, ও হিন্দুদের মন্দিররে নিরাপত্তা রক্ষার আহবান জানিয়েছিলেন। দুঃখের বিষয়ে হলো এই যে আওয়ামী লীগ- বি,এন,পির স্বার্থের রাজনীতির বলির পাঠা হয়েছে হিন্দু সাম্প্রদায়, অথচ তাদেরকে বুঝানো হয়েছে এর জন্য দায়ী ইসলাম ও ইসলামি শক্তি সমূহ। কিন্তু মিথ্যার এই বেসাতি বেশীদিন টিকবেনা। বামপন্থীরা এবং আওয়ামী লীগ মিলে যখনই সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন নামে ইসলামি শক্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা করুকনা কেন জনগণ ঠিকই জানে এই দেশে সাম্প্রদায়িক সস্প্রীতি রক্ষা করার সবচেয়ে বড় ঢাল হিসাবে হাজার বছর ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে ইসলামি ধারণা ও মূল্যবোধ। ব্রিটিশ আসার পূর্বে এই অঞ্চলের হিন্দু ও মুসলমানরা শত শত বছর ধরে পাশাপাশি শান্তি শান্তিপূর্ণ ভাবে বসবাস করেছে ইসলামের সহনশীলতা ও সহমর্মিতার শিক্ষার কারণেই। ভারতবর্ষে মুঘলদের ৮০০ বছর শাসন আমলে একটিও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটেনি। ব্রিটিশরা তাদের নিজেদর স্বার্থ সিদ্ধির জন্য যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কৌশল শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছে তা গত ৫০ বছর ধরেই ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের শাসকরা সময় সুযোগ মত ব্যবহার করেছেন ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য। এই ধর্মনিরপেক্ষ স্বার্থান্বেষী রাজনীতি ও রাষ্ট্রের বিপরীতে সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়ের ব্যাপারে ইসলামের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও শরীয়ার অদেশ নির্দেশ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ইসলামী হুকুমত বা রাষ্ট্রই একমাত্র স্থান যেখানে সকল সাম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে। ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের জান-মাল হিফাযতের অধিকার এবং ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও নাগরিক অধিকার স্বীকৃত। অমুসলিমদের অধিকার সমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তাদের জীবন রক্ষার অধিকার।

    রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) বলেন:

    “যদি কোন ব্যক্তি কোন মু’আহিদ (যিম্মী)-কে হত্যা করে তবে জান্নাতের ঘ্রাণ তার নসীবে হবে না। অথচ চল্লিশ বছরের দূরত্ব থেকেও জান্নাতের ঘ্রাণ পাওয়া যাবে। এমন কি যিম্মীদের প্রতি জুলুম করা থেকে বিরত থাকা প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) ইরশাদ করেন: সাবধান! কেউ যদি কোন মু’আহিদ প্রতি জুলুম করে অথবা তাকে তার অধিকার থেকে কম দেয় কিংবা ক্ষমতা বহির্ভূত কোন কাজ তার উপর চাপিয়ে দেয় বা জোরপূর্বক তার থেকে কোন মালামাল নিয়ে যায় তাহলে কিয়ামতের দিন আমি তার পক্ষ অবলম্বন করবো। যিম্মী হত্যা করা নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কোন মুসলিম ব্যক্তি যদি কোন যিম্মীকে হত্যা করে তবে বিনিময়ে তাকেও হত্যা করা হবে।

    এতে এ কথা প্রতীয়মাণ হয় যে, ইসলামী রাষ্ট্রে একজন অমুসলিম নাগরিকের প্রাণের মর্যাদা একজন মুসলিমের সমান। এ কারণেই একজন অমুসলিম নাগরিকের রক্তপণ একজন মুসলিম নাগরিকের রক্তপণের সমান ধার্য করা হয়েছে। ইসলামের অমুসলিম যিম্মীদের সম্পদের অধিকার স্বীকৃত। এ কারণেই যিম্মীদের সম্পদের (আত্বস্বাতকারীর) প্রতি রাসূলুল্লাহ্‌ (ﷺ) কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন।

    ইসলাম মুসলিম রাষ্ট্রের অমুসলিম যিম্মীদেরকে তাদের ধর্ম ও কৃষ্টি-কালচার রক্ষার ব্যাপারেও পূর্ণ স্বাধীনতা দান করেছে। ইসলামের স্বর্ণ যুগের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যে সকল বিজিত দেশে অমুসলিম লোকদেরকে বসবাসের অধিকার দেওয়া হয়েছিল, সে সকল দেশে তাদের ধর্ম পালন এবং কৃষ্টি রক্ষার অধিকারও দেওয়া হয়েছিল। আবূ উবায়দ (রা) “কিতাবুল আমওয়াল” গ্রন্থে পরাজিত কয়েক দেশের নাম উল্লেখ করে বলেন, এ সকল দেশের অধিবাসীগণ মুসলমানদের নিকট পরাজিত হয়ে তাদের বশ্যতা স্বীকার করেছিল। অথচ এ সকল দেশের অমুসলিম অধিবাসীদেরকে তাদের ধর্মীয় ব্যাপারে পূর্ববৎ বহাল রাখা হয়েছে। ভারতবর্ষ এর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহারণ, যেখানে মুসলিম শাসন আমলে হিন্দুদের সকল প্রকার ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছিলো।

    অমুসলিম ব্যক্তির সামাজিক ও নাগরিক অধিকারও ইসলামী রাষ্ট্রে স্বীকৃত। ইসলামী রাষ্ট্রের যেসব অমুসলিম অধিবাসী জীবিকা উপার্যনে অক্ষম তাদেরকে ভাতা দানের ব্যবস্থা ইসলামে রয়েছে। হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-খিলাফতের কালে সেনাপতি খালিদ (রা) হিরার অধিবাসীদের সাথে যে চুক্তি করেছিলেন, তাতে ছিল: তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বৃদ্ধ হয়ে কর্মে অক্ষম হয়ে যাবে অথবা অন্য কোন কারণে বিপদগ্রস্ত হবে অথবা দরিদ্র হয়ে যাবে তাদের জিযি্য়া মওকূফ করে দেয়া হবে। অধিকন্তু বায়তুল মাল হতে তাদেরকে এবং তাদের পরিবারবর্গকে ভাতা প্রদান করা হবে। আমীরুল মু’মিনীন হযরত উমর (রা) একদা এক বৃদ্ধ ইয়াহুদীকে ভিক্ষা করতে দেখে তাকে বায়তুল মালের খাযাঞ্চির নিকট পাঠিয়ে আদেশ দিলেন, তাকে এবং তার মত অন্যান্য ব্যক্তিদের জন্য বায়তুল মাল থেকে ভাতার ব্যবস্থা করে দাও। যৌবনে তাদের থেকে জিযি্য়া উসূল করে বার্ধক্যে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতে দেয়া ন্যায় বিচার নয়। ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের চাকুরী লাভ করারও অধিকার রয়েছে। খুলাফায়ে রাশিদীনের যমানায় এর বহু উদাহারণ পাওয়া যায়।

    সুতরাং আজকের বাংলাদেশের স্বার্থবাদী রাজনীতিবিদদের দ্ধারা হিন্দু ও পাহাড়ী সাম্প্রদায়ের উপর যে অত্যাচার সংঘঠিত হচ্ছে তা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো ইসলামের হুকুম তথা রাষ্ট্রের অধীনে এই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা। একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রই পারে এদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ ও খৃষ্টানদের শারিরীক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। কারণ আল্লাহ্‌ তৈরী এই পৃথিবীতে তার ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এই বিশ্বে কোন ধর্ম বা সাম্প্রদায়ের মানুষকেই যেমন তিনি আলো, বাতাস, পানি ও রিযিক থেকে বঞ্চিত করেন না বা কারো ব্যাপারে বৈষম্য করেন না। ঠিক সেই একই আল্লাহ্‌র দেয়া বিধান অনুযায়ী পরিচালিত ইসলামী রাষ্ট্রও ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের অধিকার নিশ্চিত করতে নিরলস ভাবে কাজকরে যায়। আল্লাহ্‌ আমাদেরকে সকল মানুষের মুক্তির অবলম্বন সেই রাষ্ট্র ফেরৎ নিয়ে আসার তৌফিক দান করুন। (আমিন)।

    শেখ তৌফিক

  • প্রশ্ন-উত্তর: দিয়তের অর্থ নিরুপন

    প্রশ্ন-উত্তর: দিয়তের অর্থ নিরুপন

    প্রশ্ন: মানুষের জন্য সহজ করবার উদ্দেশ্যে ১২০০০ রৌপ্য দিরহামকে দিয়তের অর্থরূপে হিসেব করলে কি বৈধ হবে, যদিও ফুকাহারা দিয়ত উটের হিসেবে নির্ধারন করেছেন যারা উট ব্যবহার করে, স্বর্ণ দ্বারা যারা স্বর্ণ ব্যবহার করে এবং ব্যাংক নোট দ্বারা যারা ব্যাংক নোট ব্যবহার করে।

    উত্তর: যারা উট ব্যবহার করে তাদের জন্য দিয়ত ১০০ উট, এবং যারা স্বর্ণ ব্যবহার করে তাদের জন্য ১০০০ দিনার, এবং যারা রৌপ্য ব্যবহার করে তাদের জন্য ১২,০০০ দিরহামই সঠিক।

    তথাপি, বর্তমান যুগে ব্যাংকনোট আর স্বর্ণ ও রৌপ্য দ্বারা সংরক্ষিত নয়, তাই তারা ঐসকল লোকদের মধ্যে পরিগনিত হবে না যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য ব্যবহার করে।

    কিয়াস করে এটি অর্থ দ্বারা গণনা করা হয় কারণ এর ইল্লত নস হতে প্রাপ্ত এবং তা হচ্ছে অর্থ, যেভাবে এটি ‘খিলাফত রাষ্ট্রে তহবিল’ বইটিতে ও আমাদের অন্যান্য বইতে আলোচনা করা হয়েছে। দিয়তের অর্থের বিষটি এ বিষয়ে ইজতিহাদের উপর নির্ভরশীল, এবং আমার মতামত হচ্ছে অনিচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রে রৌপ্য দ্বারা দিয়ত পরিমাপ করতে কোনো সমস্যা নেই, কারণ যে ব্যক্তি অনিচ্ছাকৃত হত্যায় জড়িত সে গুনাহগার নয়। তার দিয়ত এজন্য নয় যে অপরাধ করেছে। বরং, দিয়ত (এর মূল কারণ) আল্লাহর জ্ঞানের মধ্যে রয়েছে। তাই, অনিচ্ছাকৃত হত্যার সবচেয়ে লঘু শাস্তিতে অপরাধ না করায় দিয়ত যথোপযুক্ত অর্থ প্রদান।

    তথাপি, ইচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রে আমি দেখছি দিয়ত স্বর্ণ দ্বারা পরিমাপ করা হয়। কারণ, যে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করেছে সে হারাম কাজ করেছে, তাই সবচেয়ে গুরু শাস্তি আরোপ করা হয়।

    তথাপি যদি এই কাগুজে অর্থ স্বর্ণ ও রৌপ্যের প্রতিস্থাপনযোগ্য হয়, তবে ব্যক্তি এই কাগুজে অর্থকে ধাতব অর্থের মতোই বিবেচনা করবে যেক্ষেত্রে প্রতিস্থাপন করতে হবে।

    আমি আল্লাহ সর্বশক্তিমানের কাছে সঠিক হবার প্রার্থনা করি।

    ১৬ই রমজান, ১৪৩৩ হি
    ৪/৮/২০১২

  • প্রশ্ন-উত্তর: গণতন্ত্র নামক ভ্রান্ত চিন্তা হতে কিভাবে পরিত্রান পেতে পারি?

    প্রশ্ন-উত্তর: গণতন্ত্র নামক ভ্রান্ত চিন্তা হতে কিভাবে পরিত্রান পেতে পারি?

    নিচের অনুবাদটি সম্মানিত মুজতাহিদ ও মুফাচ্ছির শাইখ আতা ইবন খলীল আবু রাশতা (আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন) কর্তৃক দেয়া এক প্রশ্নের জবাব

    প্রশ্ন:

    বর্তমান (যুগ)-এ বিপজ্জনক ধারনাসমূহ উম্মাহর অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে এবং আমাদের বিশুদ্ধ দ্বীন হতে পৃথক ভ্রান্ত বিশ্বাস আমাদের আক্বীদাকে আহত ও আক্রমন করেছে। এবং এসকল বিপজ্জনক চিন্তাদির মধ্যে একটি চিন্তা হলো গণতন্ত্র। আমাদের জন্য একটি মারাত্মক সমস্যা হলো যে ইন্দোনেশিয়ার মুসলিমগণ দাবী করে গণতন্ত্র ইসলামের একটি অংশ এবং তারা কুরআন ও সুন্নাহ হতে দলীল ব্যবহার করে তাদের এই ভ্রান্ত ধারনাকে ন্যায্যতা প্রদানের জন্য।

    ১. শাইখ, গণতন্ত্রের ব্যপারে আপনার মতামত কী?
    ২. আমরা কিভাবে এ সমস্যা হতে পরিত্রান পেতে পারি?
    ৩. আপনার মতামত কী হে শাইখ? আপনার কাছে এ ব্যপারে নসীহত চাচ্ছি।

    জবাব:

    ওয়া আলাইকুম আস-সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

    গণতন্ত্রের অর্থ ‘সার্বভৌমত্ব জনগণের’ (السيادة للشعب) যার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ যে আইন প্রণয়ন করেছেন তার বাইরে অন্য কোনো আইন প্রণয়ন করা। অন্য কথায়, এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর বাইরে অন্য কিছু দিয়ে বৈধ (হালাল) ও অবৈধ (হালাল) নিরুপন করা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    শাসনকর্তৃত্ব তো কেবল আল্লাহর, তিনিই সত্য প্রকাশ বর্ণনা করেন আর তিনিই শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী

    আত-তাবারানির আল-মু’জাম আল-কাবির-এ আদী বিন হাতেম হতে এক সম্মানিত হাদীসে বর্ণিত:

    “আমি নবী (সা) এর কাছে স্বর্ণ দ্বারা তৈরি ক্রূশ পরিহিত অবস্থায় আসলে তিনি আমাকে বলেন, হে আদী, তোমার গলা হতে এই মুর্তিকে সরাও! সুতরাং আমি তা সরিয়ে ফেলি। এটি করার পর তিনি (সা) সূরা বারাআত (তওবা)-এর আয়াত তেলাওয়াত করলেন: তারা তাদের ধর্মযাজক ও সাধুদের আল্লাহর পরিবর্তে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম: হে আল্লাহর রাসূল, আমরা তো তাদের উপাসনা করি না। তিনি (সা) বললেন, (কিন্তু) তারা কি যা আল্লাহ হালাল করেছে তাকে হারাম সাব্যস্ত করে না আর আল্লাহ যা হারাম করেছে তা হালাল সাব্যস্ত করে না? আমি উত্তর দিলাম: হ্যা। তিনি (সা) বললেন, সেটাই তাদের উপাসনা (করা)।”

    সুতরাং, আল্লাহকে বাদ দিয়ে আইন প্রণয়ন করা একটি মারাত্মক অপরাধ (কবীরা গুনাহ)। সুতরাং, গণতন্ত্র এই দিক হতে একটি কুফরি ব্যবস্থা যেহেতু এটি মানুষকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেয়, মানুষের রবকে নয়।

    আরেক দিক হতে, গণতন্ত্র চার ধরনের স্বাধীনতার কথা বলে: বিশ্বাসের স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, মালিকানার স্বাধীনতা ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা। এর অর্থ মানুষ যা খুশি তা করতে পারবে। এর অর্থ এটাও যে, যে কোনো ব্যক্তি যে কোনো সময়ে তার দ্বীন পরিবর্তন করতে পারবে। এর অর্থ এটাও যে, যে কেউ তার খুশি অনুযায়ী যে কোনো দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করতে পারবে এমনকি যদি তা ধর্মদ্রোহীতাও হয়…হালাল বা হারাম, যেকোনো সম্পদের মালিক হতে পারাটাও এর অর্থ। যার মানে পারস্পরিক সম্মতিতেও কেউ চাইলে ব্যভিচারও করতে পারবে। (অথচ) এগুলো সবই ইসলামে অবৈধ। মুরতাদ হওয়া হারাম, ব্যভিচার হারাম, অবৈধভাবে সম্পদের মালিক হওয়া হারাম এবং দ্বীনকে গালি দেয়া ও এর কুৎসা রটনা করাও হারাম। সুতরাং, গণতন্ত্র এধরনের স্বাধীনতার দিক দিয়ে একটি কুফরী ব্যবস্থা কারণ এটি শরীআহকে পরিত্যাগ করারই শামিল। “গণতন্ত্র – একটি কুফরি ব্যবস্থা” নামক একটি বই আপনার দেশে দলের ওয়েবসাইটটিতে পাবেন যা গণতন্ত্র কেন একটি কুফরি ব্যবস্থা তা বিস্তারিত বর্ণনা করেছে।

    সবশেষে, আপনার জন্য রইল সালাম, দুআ করি যাতে আল্লাহ আপনাকে সাহায্য ও তওফীক দান করেন যে ব্যপারে আপনি লিখেছেন, এছাড়াও ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য কল্যাণ কামনা করছি।

    আপনাদের ভাই,
    আতা ইবনু খলীল আবু আল-রাশতা

    Arabic Text:

    السؤال:

    لقد غزت الأمة الإسلامية في عصرنا الحاضر المفاهيم الخاطئة والمعتقدات الباطلة الدخيلة على ديننا الحنيف والتي تضاد وتصادم العقيدة الإسلامية من كل وجه وجانب، ومنها الديمقراطية الباطلة. المشكلة الخطيرة عندنا، أن بعض المسلمين في إندونيسيا يزعمون أن الديمقراطية من الإسلام، وهم يستدلون عليها بأدلة شرعية من القرآن الكريم والسنة النبوية بالمفاهيم الضالة، بالتكلف في استعمال هذه الأدلة.

    فما هو رأيك يا شيخنا في الديمقراطية؟

    وكيف يمكن التخلص من هذه المشكلة الخطيرة؟أريد أن أكتب كتابا حول هذا الأمر.

    ما رأيك يا شيخنا؟ وأطلب منك النصيحة المتعقلة بهذا الأمر.

    الجواب:

    وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

    الديمقراطية تعني السيادة للشعب، فهو يشرع من دون الله، أي يحلل ويحرم من دون الله، والله سبحانه يقول: (إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ يَقُصُّ الْحَقَّ وَهُوَ خَيْرُ الْفَاصِلِينَ)، وفي الحديث الشريف الذي أخرجه الطبراني في الكبير عن عَدِيِّ بْنِ حَاتِمٍ قَالَ: أَتَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَفِي عُنُقِي صَلِيبٌ مِنْ ذَهَبٍ، فَقَالَ: «يَا عَدِيُّ اطْرَحْ هَذَا الْوَثَنَ مِنْ عُنُقِكَ»، فَطَرَحْتُهُ فَانْتَهَيْتُ إِلَيْهِ وَهُوَ يَقْرَأُ سُورَةَ بَرَاءَةَ فَقَرَأَ هَذِهِ الْآيَةَ (اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللهِ) حَتَّى فَرَغَ مِنْهَا، فَقُلْتُ: إنَّا لَسْنَا نَعْبُدُهُمْ، فَقَالَ: «أَلَيْسَ يُحَرِّمُونَ مَا أَحَلَّ اللهُ فَتُحَرِّمُونُهُ، ويُحِلُّونَ مَا حَرَّمَ اللهُ فَتَسْتَحِلُّونَهُ؟» قُلْتُ: بَلَى، قَالَ: «فَتِلْكَ عِبَادَتُهُمْ»، ولذلك فإن من يشرع من دون الله إثمه كبير كبيرفالديمقراطية من هذا الباب نظام كفر لأنها تجعل التشريع للبشر وليس لرب البشر.

    ومن باب آخر فهي تقول بالحريات الأربع: العقيدة، والفكر، والملكية، والشخصية.فتجيز أن يعتقد المرء ما يشاء، فله أن يبدل دينه كما يشاء، وله أن يقول الرأي الذي يريد حتى لو طعن في المقدسات… وله أن يملك بالحلال والحرام، وله أن يعاشر بالزنا ما دام يرضي الطرفين. وهذا أمر محرم في الإسلام، فالردة حرام، والزنا حرام، والتملك

    بوسائل غير مشروعة حرام، والقول بالسب والشتم كذلك حرام.وهكذا فإن الديمقراطية بإطلاقها للحريات كذلك هي نظام كفر لأنها تعني التحلل من الأحكام الشرعية.

    وهناك كتاب “الديمقراطية نظام كفر” اطلبه من مكتب الحزب في بلدك، ففيه تفصيل مسألة الديمقراطية وكيف أنها نظام كفر .وفي الختام أقرئك السلام، وأدعو لك بالعون والتوفيق فيما تكتبه من خير للإسلام والمسلمين.

    أخوكم عطاء بن خليل أبو الرشتة