তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
সালাহুদ্দীন আইয়ুউবী

মহান আল্লাহ এই মহাজগতের সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা। আল্লাহ মানুষ সহ বহু প্রকারের প্রাণী, জীবজন্তু সৃষ্টি করেছেন। তাদের মধ্যে মানুষকে করেছেন সৃষ্টির সেরা জীব। আর তাদের হাতেই ন্যাস্ত করেছেন পৃথিবীর পরিচালনার ভার। আর সঠিক উপায়ে পরিচালনার জন্য পৃথিবীর ঊষালগ্ন থেকেই সেখানে প্রেরণ করেছেন নবী-রাসুল যারা মানুষের মাঝে আল্লাহর আইন-কানুন ও জীবন চলার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়ে সে অনুযায়ী চলতে মানুষকে সাহায্য করেছেন। আর নবী-রাসুলদের এই কাজের সাহায্যার্থে আল্লাহ তাদের অনেকের উপর প্রেরণ করেছেন আসমানি কিতাব এবং তাদের দিয়েছেন সর্বযুগের চিরন্তন আদর্শ ইসলাম। রাসূল (সাঃ) ছিলেন সেই নবী – রাসুলদের মধ্যে শেষ রাসুল যার পর আর কোন নবী বা রাসূল আসবেন না। কিন্তু মানুষের মাঝে আল্লাহর আইন-কানুন ও জীবন চলারপদ্ধতি পৌছিয়ে দিতে এবং সেগুলো সূক্ষ্মরূপে – সুশৃঙ্খল উপায়ে পালনের উদ্দেশ্যে সমগ্র পৃথিবীতে একক রাষ্ট্রীয় ভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের মধ্য থেকে নির্বাচিত খলীফাদের দায়িত্ব দিয়েছেন। আর সেই ক্রমধারায় নবী-রাসুলের পর খলিফাগণ দাওয়া ও জিহাদের মাধ্যমে একের পর এক অঞ্চলে ইসলামকে পৌছিয়ে দিয়েছেন। সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি ছিলেন তেমনি একজন সুলতান যিনি ইসলামিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি বায়তুল মুকাদ্দাস ( ইহুদী-খৃষ্টানদের কথ্য মতে জেরুজালেম) ক্রুসেডারদের দ্বারা দখলের প্রায় ৯০ বছর পর পুনরায় (হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) এর খিলাফতের সময় সেটি ইসলামিক রাষ্ট্রের ছায়াতলে আসে) তাদের হাত থেকে মুক্ত করেন, এবং সেখানকার মুসলিম নাগরিকদের তাদের অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষাকরেন।
১১৬৯ সালের ২৩ মার্চ। সালাহুদ্দিন আইউবি গভর্নর ও সেনাপ্রধান হয়ে মিসর আগমন করেন। ফাতেমি খিলাফতের কেন্দ্রীয় খলীফা তাকে এ-পদে নিয়োগ দিয়ে বাগদাদ থেকে প্রেরণ করেন।তার (দ্বাদশ শতাব্দীর) আগে থেকেই ইউরোপ, ফ্রান্স ও জার্মানি ইসলামিক রাষ্ট্র ভাঙ্গার জন্য ক্রুশ ছুঁয়ে শপথ করে, ইসলামের নাম নিশানা মুছে দিয়ে বিশ্ব জুড়ে ক্রুশের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শুরু করে নানা চক্রান্ত। সেই সঙ্গে তারা চালায় সশস্র অভিযান। মুসলিমদের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে দখল করে রাখে ইসলামের মহান স্মৃতি চিহ্ন প্রথম কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাস।
সালাহুদ্দীন আইয়ুবি ছোটবেলায় গভর্নর নিজামুল মূলক এর মাদরাসায় জাগতিক ও আদর্শিক পড়াশুনা ও যুদ্ধ বিদ্যায় জ্ঞান লাভ করেন। রাজনীতি, কূটনীতি, ভূগোল, ইতিহাস ও প্রত্যক্ষ যুদ্ধ কৌশলের উপর গভীর জ্ঞান ও আগ্রহের কারণে চাচা শেরেকাহ ও নুরুদ্দীন জঙ্গী তাকে স্পেশাল প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। প্রশিক্ষণটি মূলত তৈরি হয় এক যুদ্ধের ময়দানে, যেখানে সালাহুদ্দিন আইউবি দীর্ঘকাল আবরোধের মধ্যে যুদ্ধ করেও হতাশ না হয়ে সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা মাথায় সৈন্যদের নিয়ে যুদ্ধ করে ফিরে আসেন। এর পরই নুরুদ্দীন জঙ্গী তাকে মিশরের গভর্নরের পদের জন্য মনোনীত করেন।
সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গীও চিন্তা চেতনায় ছিলেন সালাহুদ্দীন আইউবির মতই। সেসময় যেখানে ইসলামিক খিলাফতের সব আমির, গভর্নর ও উজিররা খৃষ্টানদের চক্রান্তে পা দিয়ে তাদের থেকে সুন্দরি মেয়ে ও প্রচুর ধন-সম্পদ নিত এবং মূলত ক্ষমতার লোভে ইসলামিক রাষ্ট্র থেকে স্বাধীন হয়ার স্বপ্ন দেখত, ঠিক তখনই সালাহুদ্দীন আইয়ুবি ও নুরুদ্দীন জঙ্গী ইসলামিক খিলাফত রাষ্ট্রকে ইহুদী–খৃষ্টানদের চক্রান্ত থেকে মুক্ত করে বাইতুল মুকাদ্দাস কে সেই ক্রুসেডারদের থেকে মুক্ত করার জন্য একের পর এক জিহাদ করে গেছেন।
সালাহুদ্দীন আইয়ুবি মিশরের গভর্নর হয়ার পরই সর্ব প্রথম সেখান থেকে খৃষ্টানদের চক্রান্তে পা দেয়া আমির-উজিরদের সুকৌশলে সরকারী দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দেন। এজন্য তাকে মারার জন্য ক্রুসেডারদের দালালরা অনেক ফন্দি আটার পরও তারা ব্যর্থ হয়। দালালরা অনেক সুন্দরী মেয়ে ব্যবহার করেও পাথরের মত সালাহুদ্দীনকে গলাতে পারেনি। যেখানে অন্যান্য আমিররা সানন্দেই তাদের গ্রহণ করত।
দালালরা সালাহুদ্দীনকে গলাতে না পেরে তাকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে নিজেরা ক্ষমতায় বসার জন্য মিশরের সেনাবাহিনির মধ্যে থাকা সুদানি সেনাদের মধ্যে বিদ্রোহ করার চেষ্টা করে এই বলে যে তোমরা সুদানি তারা মিসরি। সুদানের বর্ডার মিশরের কাছে থাকাতে বিদ্রোহের পর সেখান থেকে আক্রমণ করাও সহজ ছিল। কিন্তু সালাহুদ্দীন আইয়ুবি তার চৌকস গোয়েন্দা প্রধান আলি বিন সুফিয়ান কে দিয়ে সব তথ্য আগেই পেয়ে যান । আর খুবই কৌশলে তাদের বিদ্রোহ দমন করেন। এদিকে সেনা বিদ্রোহ করিয়ে দালালরা সম্রাট ফ্রাঙ্ককে আক্রমণ করার আগমনও জানায়। কিন্তু সালাহুদ্দীন আইউবি আগেই বিদ্রোহ দমন করেন, আর যখন পরে ফ্রাঙ্ক-এর সেনাবাহিনী আসে তারা পুরোপুরিভাবে সালাহুদ্দীনের কাছে পরাজিত হয়। এই দিকে ফ্রাঙ্ক মিসরে আক্রমণ করলে সিরিয়া থেকে নুরুদ্দীন জঙ্গিও ফ্রাঙ্ক-এর দেশে আক্রমণ করে বসেন। তাতে আক্রমনের খবর পেয়েই ফ্রাঙ্ক তার দেশে ফিরে যেয়ে দেখেন সেখানের চিত্রই বদলে গেছে। সব দিক দিয়েই ফ্রাঙ্কের শোচনীয় পরাজয় ঘটে।
ফাতেমি খিলাফতের খলীফা আজেদ ও যখন ক্রুসেডারদের চক্রান্তে পা দেন তখন সালাহুদ্দীন আইউবি তাকে সুকৌশলে খিলাফতের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে মিশরকে বাগদাদের কেন্দ্রীয় খিলাফতের অধীনে দিয়ে দেন , এতে করে খিলাফত রাষ্ট্র আবারো একটি রাষ্ট্রে পরিনত হয়। মূলত ক্রুসেডাররা ফাতেমি খলীফাকে মদ আর নারীতে ব্যাস্ত রেখে তাকে অধমে পরিণত করে, এমনকি সে সালাহুদ্দীন আইয়ুবিকে হত্যারও পরিকল্পনা করে। আর খলীফা হওয়া সত্ত্বেও তিনি সালাহুদ্দিন আইউবির উপর কথা বলতে ভয় পেতেন। চরিত্রের অধপতনের কারণেই মূলত এমনটি অনুভব করতেন তিনি। তাই তাকে সরিয়ে খিলাফতের দায়িত্ব একজনকে দেয়া ও একমুখী করা সালাহুদ্দীন আইয়ুবির পক্ষে সহজ হয়।
সেকালে মাসজিদে জুময়ার খুৎবাতে আল্লাহর ও রাসুলের নামের পর খলীফার নাম উচ্চারন করতে হতো। সালাহুদ্দীন আইয়ুবি জুময়ার খুৎবা থেকে খলীফার নাম উচ্চারন করা বাদ দিয়ে দেন।
সুলতান আইয়ুবি যেখানে ক্রুসেডারদে আক্রমণ করে করে তাদের ইসলামিক রাষ্ট্রের দখলকৃত অঞ্চল থেকে বিতারিত করবেন, সেখানকার মুসলিমদের তাদের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিবেন, সেখানে ক্রুসেডাররা সারাক্ষণই তাদের গয়েন্দাদের ব্যবহার করে মিসরে কোন না কোন সমস্যা তৈরি করে রাখত। যাতে করে সালাহুদ্দীন আইয়ুবি নতুন করে তাদের আক্রমনের সময় না পান, তিনি যেন মিসর ঠিক করতেই তার সকল সময় পার করে দেন। তারা প্রায়ই চেষ্টা করত সুদানি বাহিনী দিয়ে সুদান থেকে মিসরে আক্রমণ করাতে, যাতে সালাহুদ্দীন শুধু তাদের নিয়েই ব্যাস্ত থাকেন। তারা মিসরের বিভিন্ন মাসজিদে তাদের প্রশিক্ষিত গোয়েন্দা ইমাম পাঠাত যারা সেখানে জিহাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে মানুষের ভিতর থেকে জিহাদের চেতনাকে ধ্বংস করতে চাইত। ক্রুসেডাররা মুসলিমদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করত মেয়েদের দিয়ে। তারা প্রায় সব আমিরদের কাছেই তাদের সুন্দরী মেয়েদের প্রেরণ করত, তাদের দিয়ে সেই আমির দের চরিত্র ধ্বংস করার পায়তারা করত। তারা জানত মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে তাদের ঈমানী শক্তি যেটা দিয়ে তারা ক্রুসেডারদের সাথে লড়ে । আর সে শক্তির কাছেই তারা বার বার হারে, আর সে শক্তির বলেই তাদের চেয়েও অনেক কম পরিমাণ সৈন্য নিয়ে মুসলিমরা বার বার জয় লাভ করে।
ক্রুসেডাররা তাদের নিজেদের মেয়েদের কে মুসলিমদের চরিত্র হরণের প্রশিক্ষণ দিত। তারা এ কাজে সেসকল মেয়েদেরও ব্যবহার করত যাদেরকে তারা মুসলিমদের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অপহরণ করে এনেছিল তাদের বাল্যকালে। তারা ক্রুশের স্বার্থে এরূপ করাকে পুণ্য মনে করত।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবি মিশরের স্থায়িত্ব আনার পরই আবার তার সেই বায়তুল মুকাদ্দাসকে মুক্ত করার সপথ পুরন করার জন্য বের হয়ে যান। তিনি সর্ব প্রথম খৃষ্টানদের ফিলিস্তিনের শোবক দুর্গ অবরোধ করে সেটা জয় করে ফেলেন। পরে নুরুদ্দীন জঙ্গীর সহায়তায় কার্ক দুর্গও জয়করেন। কার্ক দুর্গ অবরোধ করার সময় সুদানিরা আবারো মিসরে সমস্যা তৈরি করতে চায় ক্রুসেডারদের সাহায্যে। পরে সুলতান আইয়ুবি কার্কের অবরোধ নুরুদ্দীন জঙ্গীকে দিয়ে মিসরে চলে আসেন। পরে নুরুদ্দীন জঙ্গী কার্ক দুর্গ সহ ফিলিস্তিনের আরও কিছু জায়গা দখল সম্পন্ন করেন।
ফিলিস্তিনের শোবক ও কার্ক দুর্গ পরাজয়ের প্রতিশোধ স্বরূপ ক্রুসেডাররা পাল্টা আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নেয়। স্পেনের পূর্ণ নৌ বহর এতে যুক্ত হয়। ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়ামও যুক্ত হয়। গ্রিস ও সিসিলির জঙ্গি কিশতিগুলোও যুক্ত হয়। ব্রিটিশরা ভাবতো তারা চাইলে একাই মুসলিমদের পরাজয় করতে পারে তাই তারা যুক্ত হতে চায় নি। কিন্তু তাদের পোপের অনুরধে তাদের কিছু যুদ্ধ জাহাজগুলোও যুক্ত করে। …… এদিকে সুলতান আইয়ুবি গোয়েন্দা মারফত তাদের আগমনের খবর পেয়ে যান, তিনি এও জেনে যান যে তারা আগে এসে মিসরের উপকুলের আলেকজান্দ্রিয়া অঞ্চল দখল করবে। তাই সুলতান আলেকজান্দ্রিয়া থেকে সকল জনগণকে সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যান এবং সেখানে ঘরগুলোতে মুসলিম সৈন্য দিয়ে ভরে রাখেন। ক্রুসেডাররা যখন উপকুলে এসে ভিরে তারা সেখানে আক্রমণের জন্য কোন সৈন্য না দেখে খুশি হয়, এবং পরে হেসে খেলে উপকূলের আলেকজান্দ্রিয়া দখল করতে যায়। রাতে যখন তারা নগরীতে প্রবেশ করে তখনই আইউবির সৈন্যরা ঘর থেকে বেরিয়ে তাদের উপর আক্রমণ করে নিষ্পেষিত করে দেয়। ওই দিকে তাদের জাহাজগুলোতে যেই সৈন্যদেরকে রেখে এসেছিল তাদের উপর হঠাৎ পেছন থেকে সুলতান আইয়ুবির যুদ্ধ জাহাজ আক্রমণ করা শুরু করে। তারা মিনজানিকের সাহায্যে বড় বড় আগুনের গোলা ও পাথর মারতে শুরু করে ক্রুসেডারদের জাহাজের উপর। ক্রুসেডাররা পালাতে থাকে জাহাজ নিয়ে এবং ধ্বংস হতে থাকে। ক্রুসেডারদের আরেকটা অংশ ফিলিস্তিন থেকে আক্রমনের জন্য আসলে সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গী তাদের উপর আক্রমণ করে তাদের পরাজয় করে দেন। এই যুদ্ধ শেষে নুরুদ্দীন জঙ্গী সুলতান আইয়ুবিকে তার অধিকৃত অঞ্চল দিয়ে সিরিয়ায় নিজ এলাকায় চলে যান।
সালাহুদ্দীন আইয়ুবির যুদ্ধ কৌশলের সবচেয়ে ভয়ানক কৌশল ছিল তার গেরিলা হামলা। তার সৈন্যরা গেরিলা বাহিনী দিয়ে শত্রুদের সেনা বহরের পেছনের অংশে আঘাত হরে নিমিষেই হারিয়ে যেত। তার এই কৌশল আজো সামরিক বিশ্লেষকরা প্রশংসা করে।
১১৭৪ সালের মে মাসে নুরুদ্দীন জঙ্গী মৃত্যু বরন করেন। তার মৃত্যুতে নেমে আসে শোকের ছায়া। সালাহুদ্দীন আইয়ুবি হারান তার প্রান প্রিয় অভিভাবককে, যিনি বরাবরই তাকে সাহায্য দিয়ে আসতেন বিভিন্ন সময়ে। ক্রুসেডাররা এতে খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়। কারন তারা এখন সালাহুদ্দীন আইয়ুবির সাথে আগের চেয়ে কম কষ্টে লড়তে পারবে। জঙ্গীর মৃত্যুর পর তার মাত্র ১১ বছরের নাবালেক ছেলেকে ক্রুসেডারদের গাদ্দাররা ক্ষমতার লোভে খিলাফতের মসনদে বসায়। যদিও মাত্র ১১ বছরের নাবালেগ ছেলেকে খলীফা হিসেবে মসনদে বসানো সকলের জন্য হারাম, তবুও তারা ক্ষমতার জন্য এটা করে। এতে নুরুদ্দীন জঙ্গীর স্ত্রী রোজি খাতুন অনেক বাধা দিলেও তারা তা অমান্য করে। রোজি খাতুনও ছিলেন মুলত তার স্বামীর মতোই একজন খাটি ইমানদার। যিনি এই অন্যায় মেনে নিতে না পেরে সালাহুদ্দীন আইয়ুবিকে চিঠি লিখেন এই বলে যে, উনি যেন এসে সিরিয়া দখল করেন।
এদিকে সালাহুদ্দীন আইয়ুবি আসবেন জেনে রোজি খাতুন সেখানকার জনগণকে বুঝাতে থাকেন যে একজন নাবালেগকে খলীফা হিসেবে মানা হারাম। আর এ কাজ গাদ্দাররা একারনে করেছে যাতে করে তারা তার নাবালক ছেলেকে ভুল বুদ্ধি দিয়ে সব করিয়ে নিতে পারে।
একদিন সালাহুদ্দীন আইয়ুবি মাত্র ৭০০ সৈন্য নিয়েই সিরিয়ার মুল দুর্গ অবরোধ করেন। এতে সিরিয়ার জনগন খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায় এবং তারা সালাহুদ্দীন আইয়ুবিকে ভিতরে আসতে দেয়ার জন্য নগরীর মুল ফটক খুলে দিতে বলে। তারা বাধ্য হয়ে ফটক খুলে দিলে সালাহুদ্দীন আইয়ুবি ভিতরে প্রবেশ করে। সকলে তাকে স্বাগত জানায়।
এদিকে সুলতান আইয়ুবির আগমনের খবর পেয়ে সকল আমলা- উজিররা দামেস্ক ছেড়ে পালিয়ে যায়। নুরুদ্দীন জঙ্গীর ছেলেও পালিয়ে যায়। সাথে করে তারা প্রচুর মূল্যবান সম্মত্তি ও প্রচুর দিরহাম নিয়ে যায় আর সাথে করে খৃষ্টানদের দেয়া মেয়েগুলোও নিয়ে যায়। তারা সিরিয়ার অদূরে হালব, হাররান ও মাশুল দুর্গে যেয়ে আশ্রয় নেয়। সেখানে খৃষ্টানদের প্রভাব থাকায় তারা নিরাপদেই থাকতে শুরু করে।
হালব ও মাসুলে আশ্রয় নেয়া আমিররা ক্রুসেডারদের সাথে আতত করে সুলতান আইয়ুবিকে পরাজিত করে পুনরায় সিরিয়া দখল করার ফন্দি আটে। এতে ক্রুসেডাররাও তাদের সাহায্য করতে থাকে। সুলতান আইয়ুবি যেন নিজেদের মুসলিম ভাইদের সাথেই যুদ্ধ করতে করতে শেষ হয়ে যান সেই লক্ষ্যে ক্রুসেডাররা হালব, মাসুল ও আশে-পাসের আমিরদের সালাহুদ্দীন এর বিরুদ্ধে উদবুদ্ধ করতে থাকে। তাদের সাহায্য করতে থাকে। তারা সেখানকার মুসলিম জনগণদের গোয়েন্দা মারফত বিভ্রান্ত করতে থাকে। তাদের বুঝাতে থাকে সুলতান সালাহুদ্দীন অত্যাচারী, নির্দয় শাসক।
পরে বহু দিন যাবত সুলতান আইয়ুবি বায়তুল মুকাদ্দাসের বাঁধা স্বরূপ সেই কথিত মুসলিম আমিরদের সাথেই যুদ্ধ করতে থাকেন। ক্রুসেডাররা সেই আমিরদের প্রচুর ধন-সম্পত্তি ও সুন্দরী মেয়ে দিয়ে রেখেছিল। আর ক্ষমতার নেশা সে সকল আমিরদের জেকে বসেছিল।
একদিন মরহুম সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গীর ছেলে প্রচুর মদ্য পানের ফলে ভুগে ভুগে মৃত্যুবরন করে। তাকে দেখার জন্য তার মা রোজি খাতুন আর কখনো যান নি।
অতঃপর অনেক দিন পর অনেক যুদ্ধ ও অনেক কষ্টের পর সুলতান আইয়ুবি হালব, মাসুল ও হাররান দখল করে নেন। তখন সেখানকার মুসলিমরাই তাদের আমিরদের বিরুদ্ধে সালাহুদ্দীন এর জন্য দরজা খুলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করতে বলে, পরে তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এতে সুলতানের নিজেদের সাথে যুদ্ধ করেই প্রচুর মুসলিম সৈন্য শেষ হয়ে যায়। ক্রুসেডারদের গাদ্দার আমিরগুলোও তাদের সৈন্যদের এই বলে যুদ্ধে নিত যে, সালাহুদ্দীন ক্রুসেডারদের সাথে আতত করেছে , আর আমরাই প্রকৃত ইসলামের পথে আছি।
হালব, হাররান আর মাসুল দুর্গ জয় করার পর সালাহুদ্দীন আইয়ুবির সামনে বাইতুল মুকাদ্দাসের পথে আর কোন বাধা রইলনা।
সুলতান আইয়ুবির এইবার বাইতুল মুকাদ্দাস এরদিকে আগমনের পালা। ক্রুসেডাররা এইবার আর মুসলিমদের থেকে সাহায্য পাবে না। কারন সব আমিরই এখন সালাহুদ্দীন আইয়ুবির আনুগত্য শিকার করেছে। সুলতান আইয়ুবি এইবার সর্ব প্রথম কার্ক আক্রমণ করেন। সালাহুদ্দীন আইয়ুবি এর আগেও একবার কার্ক দখল করেন, কিন্তু ১ মাস পর সেটা আবারো ক্রুসেডারদের হাতে চলে যায়। কার্কের শাসনভার ছিল অরনাত এর উপর। অরনাত একজন নাস্তিক ছিল যে রাসুল (সাঃ) কে নিয়ে বিদ্রুপ করত, তাই সুলতান তাকে ঘৃণা করতেন আর তাকে কাছে পেলেই হত্যা করবেন বলে শপথ নিয়েছিলেন। অরনাত মিসর আর সিরিয়ার হজ্ব কাফেলাগুলোর উপর হামলা করে তাদের সম্পত্তি ডাকাতি করত, আর মেয়েদের তুলে নিত।
সুলতান আইয়ুবি কার্ক আক্রমণ করলেন। কিন্তু তিনি সেটা অবরোধ না করে শত্রু যেন তার ইচ্ছা মত এলাকায় এসে যুদ্ধ করতে বাধ্য হয় সেই পরিবেশ তৈরি করলেন। তিনি শত্রুর সকল রসদ বন্ধ করে তাদের পানির উৎস গুলো দখল করলেন আর তাদের পানির তৃষ্ণায় যুদ্ধ ক্ষেত্রে পাগল করে ফেললেন। ক্রুসেডাররা বর্ম পরে যুদ্ধে আসতো, আর তিনি যুদ্ধের জন্য সময় ঠিক করলেন জুন-জুলাই মাস, এতে তারা বর্মের ভিতর উত্তাপে জ্বলে-পুড়ে মরতে লাগলো। তাদের পরাজয় হল। সুলতান কার্ক ও আশে পাসের দুর্গ জয় করে নিলেন। সেই যুদ্ধে অরনাত সহ মোট ছয় জন সম্রাট ধরা পরে। সুলতান পরে তার শপথ মত অরনাত কে হত্যা করে বাকিদের ক্ষমা করে দেন।
এই যুদ্ধে ক্রুসেডাররা তাদের সবচেয়ে বড় ক্রুশটা (তারা ভাবে এইটাতেই ইসা (আঃ) কে শূলে চড়ানো হয়েছিল) যুদ্ধের ময়দানে এনেছিল। তাদের সবচেয়ে বড় পাদ্রি (পোপ) এটা আনে। পরে পোপ মৃত্যু বরণ করে আর বড় ক্রুশটি মুসলিমদের হাতে চলে আসে। পরে সুলতান বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করার পর ক্রুসেডারদেরকে তাদের ক্রুশটি দিয়ে দেন।
এরপর পালা আক্রার দুর্গের । ক্রুসেডাররা ভেবেছিল সুলতান আগে বায়তুল মুকাদ্দাস আক্রমণ করবেন। তাই তারা বুঝে উঠার আগেই সুলতান আগে আক্রা আক্রমণ করলেন। ২-৩ দিন অবরোধের পর সেটা জয় করে ফেলেন।
তারপর সুলতান আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ আসকালান অবরোধ করেন। প্রায় ৩৪ টি বছর পর এই অঞ্চলটি আবার স্বাধীন হল। ১১৫৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সম্রাট ফ্রাংক এটি দখলকরে নেয়। আসকালান থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার পূর্বে বায়তুল মুকাদ্দাস অবস্থিত।
এইবার পালা বায়তুল মুকাদ্দাসের ……….
ক্রুসেডারদের দ্বারা বায়তুল মুকাদ্দাসের দখল হয় ১০৯৯ সালের ১৫ জুলাই মোতাবেক ৪৯২ হিজরীর ২৩ শাবান মাসে । ক্রুসেডাররা বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করে মুসলিম শাসকদের সহায়তায়। সেসময় মুসলিম শাসকরা নিজেদের রাজ্য চলে যাবে বিধায় সকলেই একে একে ক্রুসেডারদের পথ ছেড়ে দেয়, কেউই তাদের বাধা দেয় না। বরং অনেকেই তাদের সাহায্য করে, রসদ দেয়।
শুধু আরাকার আমির ছিলেন একজন ইমানদার পুরুষ, যার সামরিক শক্তি খৃষ্টানদের তুলনায় কিছুই ছিল না। তবু তিনি খৃষ্টানদের দাবি পুরন করতে অস্বীকৃতি জানান। খৃষ্টান বাহিনি আরাকা ১০৯৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ মে পর্যন্ত অবরোধ করে রাখে। মুসলিমরা এমন প্রান-পন লড়াই করে যে বিপুল ক্ষতির পর ক্রুসেডাররা পথ পরিবর্তনকরে চলে যায়।
মুসলিম আমিরগনই সে সময়য় ক্রুসেডারদের নিরাপদে বায়তুল মুকাদ্দাস পৌঁছে দিয়েছিল। পরে ১০৯৯ সালের ৭ জুন মাসে তারা বায়তুল মুকাদ্দাস আবরোধ করে এবং ১৫ জুলাই বায়তুল মুকাদ্দাসের ভিতরে প্রবেশ করে। সে সময় বায়তুল মুকাদ্দাসের গভর্নর ছিলেন ইফতেখারুদ্দৌলাহ, তিনি প্রানপন লড়াই করেছিলেন ক্রুসেডারদের সাথে। কিন্তু তাদের রসদ ও সৈন্য অগণিত হয়ায় তিনি ব্যার্থ হয়েছিলেন। পরে ক্রুসেডাররা নগরীতে ঢুকে সব মুসলিমদের হত্যা করে, তাদের নারীদের অত্যাচার করে, শিশুদের মাথা কেটে সেটা দিয়ে ফুটবল খেলে। মুসলিমরা আস্রয়ের জন্য মাসজিদুল আকসা ও অন্যান্য মাসজিদে যায় তারা ভাবে মাসজিদুল আকসা উভয়ের নিকট সম্মানিত হয়ায় তারা তাদের ছেড়ে দিবে। কিন্তু না ক্রুসেডাররা সেখানে ঢুকে মুসলিমদের হত্যা করে, তাদের রক্ত মাসজিদ গড়িয়ে গড়িয়ে বাইরে পরছিল, রক্তে খৃষ্টানদের ঘোরার পা ডুবে গিয়েছিল। খৃষ্টান ঐতিহাসিকদের মতে উদ্বাস্তু মুসলিমের সংখ্যা ছিল ৭০ হাজার।
সুলতান আইয়ুবি বায়তুল মুকাদ্দাসের সেই অবমাননার কাহিনী তার পিতা নাজমুদ্দিন আইউব থেকে শুনতেন, নাজমুদ্দিন তার পিতার কাছ থেকে শুনতেন। পরে সুলতান এই কাহিনী তার নিজের ছেলেদের বলতেন।
১১৮৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রবিবার মোতাবেক ৫৮৩ সনের ১৫ রজব সুলতান আইয়ুবি দ্রুত বায়তুল মুকাদ্দাস পৌঁছে যান, অবরোধ করেন বায়তুল মুকাদ্দাস। এদিকে খৃষ্টানরাও তাদের পবিত্র ভুমি ছাড়তে নারাজ। তারাও আমরন লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। সেখানকার প্রায় সব মুসলিমই বন্দি। তারা জেলের ভিতর থেকেই আজান আর তাকবীর ধ্বনি দিচ্ছেন। অনুরূপ খৃষ্টানরাও গির্জায় গান গাইছে ও প্রার্থনা করছে। শুরু হয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। দুই পক্ষই দুই পক্ষকে আহত নিহত করে চলছে। শহিদদের সংখ্যা গোনে সুলতান আইয়ুবি টাস্কি খেয়ে যান। পরে অনেক ত্যাগের বিনিময়ে ৫৮৩ হিজরীর ২৭ রজব মোতাবেক ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দ ২ অক্টোবর শুক্র বার সালাহুদ্দীন আইয়ুবি বিজয়ী বেশে বায়তুল মুকাদ্দাস প্রবেশ করেন। এটিই ছিল সেই রাত যেদিন আমাদের প্রিয় নবী রাসুল (সাঃ) বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে মিরাজে গমন করেন। 🙂
বায়তুল মুকাদ্দাস মুক্ত হয়ার পর সেখানকার মুসলিমরা প্রায় ৯০ বছর পর ক্রুসেডারদের অত্যাচার থেকে রেহাই পেল।
ইংল্যান্ডের সম্রাট রিচার্ড যাকে ”ব্লাক প্রিন্স” বলা হত সে এর প্রতিশোধ নিতে ৫২০ যুদ্ধ জাহাজ ও অনেকগুলো মালবাহী বড় জাহাজ নিজে রোম সাগর আসে। তখনই ঝড়ের কবলে পরে প্রায় অনেক জাহাজ তলিয়ে যায়। যা বাকি থাকে তা দিয়েই সে বায়তুল মুকাদ্দাস আবার দখল করতে আসে। তখন তার সৈন্য ছিল ২লাখ।
সুলতান চাচ্ছিলেন তারা যেন আগে উপকূলীয় অঞ্চল আক্রা অবরোধ করে, এতে করে তাদের সেখানেই ব্যস্ত রেখে শেষ করে দিতে পারলে বায়তুল মুকাদ্দাস রক্ষা করা যাবে।
রিচার্ড যখন আক্রা আগমন করে তারও আগেই তার জোট ভুক্ত রাষ্ট্ররা আক্রা অবরোধ করে। রক্ত ক্ষয়ী ও দীর্ঘ যুদ্ধের পর সকলে মিলে প্রায় ৬ লাখেরও বেশি সৈন্য নিয়ে আক্রা দখল করে নেয়। এতে তারা দখলের পর আক্রার প্রায় ৩ হাজার নিরস্র মুসলিমের হাত পা বেধে তাদের উপর পিচাশের মত ঝাপিয়ে পরে হত্যা করে।
রিচার্ড আক্রা দখলের পর উপকূলীয় বাকি অঞ্চল আসকালান ও হিফা দখল করতে যায়, যেন সেগুলোকে দখল করে ক্যাম্প বানিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করা সম্ভব হয়। কিন্ত তারা যেন সেটা করতে না পারে তার জন্য সুলতান আইয়ুবি আগেই সেখান থেকে জনগনকে সরিয়ে সেগুলোকে পোড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেন। পড়ে ক্রুসেডাররা সেখানে যেয়ে আর কিছু পায় নি। শেষে একসময় রিচার্ড অসুস্থ হয়ে পরলে সে যুদ্ধ ত্যাগকরে নিজ দেশে চলে যায়, আর বলে যায় সে আবার আসবে বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করতে। কিন্তু পরে আর কেউ পারেনি বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করতে। ……
কিন্তু না, ইসলামিক খিলাফতের শেষের দিকে যখন মুসলিম আমিররা ক্রুসেডারদের সাথে বন্ধুত্বের কথা বলে মূলত তাদের দাসত্বকে গ্রহণ করল। তখনই ক্রুসেডাররা আবারো তুচ্ছ ও সংকীর্ণমনা জাতীয়তাবাদের নীতিতে ইসলামিক রাষ্ট্রকে ভেঙ্গে টুকরা টুকরা করে দিল। আবারো ক্রুসেডাররা ফিলিস্তিনে ইহুদীদের প্রবেশের মাধ্যমে মূলত নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করল। সেখানে মুসলিমদের হত্যা করল, তাদের নিজ ভুমি থেকে ছাড়া করল, গঠন করল সেখানে ইসরাইল রাষ্ট্র, আর সেটা কতিপয় নাম ধারি মুসলিম শাসকদের কারনেই সম্ভব হয়েছিল।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবি তার জীবনে দুটো ইচ্ছা করেছিলেন এক বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করা আর দুই হজ্ব করা। যদিও তিনি প্রথম ইচ্ছা পুরন করতে পেরেছিলেন কিন্তু তার দ্বিতীয় ইচ্ছা অর্থের অভাবে পুরন হয়নি। মিসরি কাহিনীকার মুহাম্মদ ফরিদ আবু হাদীদ লিখেছেন, মৃত্যুর সময় সালাহুদ্দীন আইউবির মাত্র ৪৭ দিরহাম রূপা আর এক টুকরো সোনা ছিল। তার নিজস্ব কোন বাসগৃহ ছিল না। তিনি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে কোন অর্থ নিয়ে হজ্ব করতে চান নি।
১১৯৩ সালের ৪ মার্চে অবশেষে ইসলামের মহান নেতা সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবি ইন্তিকাল করেন। সেদিন সমগ্র ফিলিস্তিনের নারী-পুরুষ তাদের ঘর থেকে রাস্তায় বেরিয়ে তাদের সুলতানের জন্য মাতম করছিল। নগরীর অলিতে-গলিতে কান্নার রোল বয়ে যাচ্ছিল। আজও সেই কান্নার রোল শোনা যায় সেই ফিলিস্তিনের অলিতে গলিতে আজও তারা তাদের সেই সালাহুদ্দীন আইউবিকেই খুজছে ক্রুসেডারদের অত্যাচার থেকে তাদের মুক্তির জন্য।
অবশেষে ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ ক্রুসেডাররা ইসলামের সর্বশেষ খিলাফত থাকা অঞ্চল তুরস্ক থেকেও রাষ্ট্রীয় ভাবে থাকা খিলাফতকে ধ্বংস করল। লর্ড কার্জন বলল, আমরা মুসলিমদের মেরুদণ্ড খিলাফতকে ধ্বংস করে দিয়েছি, তারা আর দাড়াতে পারবে না । তারা সেই সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবির কবরে লাথি মেরে বলল, উঠো সালাহুদ্দীন, তোমার বায়তুল মুকাদ্দাসকে রক্ষা কর। ……. আর আমরা কি করলাম? পেরেছি কি সেই খিলাফতকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করতে? পেরেছি কি সেই বায়তুল মুকাদ্দাস কে রক্ষা করতে?[রেফারেন্সঃ ইমানদীপ্ত দাস্তান …… এনায়াতউল্লাহ আলতামাশ, প্রখ্যাত উর্দু উপন্যাসিক এর লিখা। বইটি ৮ খণ্ডে এবং ৮#২৪০= ১৯২০ পৃষ্ঠা সম্বলিত।]
লেখকঃ রাশেদুল ইসলাম
ইসলাম কি সাম্প্রদায়িক?

“সাম্প্রদায়িকতা” শব্দের ব্যবহারিক অর্থ হলো রাষ্ট্রের কোন সাম্প্রদায়ের উপর বিশেষ করে সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়ের উপর কোন বিশেষ গোষ্ঠী বা দল (কতৃক) জুলুম, নির্যাতন ইত্যাদি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিতর সাম্প্রদায়িকতা বলতে আমরা সচরাচর হিন্দু সাম্প্রদায়ের উপর অত্যাচার-নির্যাতনকে বুঝে থাকি। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হবার পর থেকে হিন্দুদের জমি ও ঘর বাড়ী দখল, ব্যবসা বা সম্পত্তি থেকে উৎখাতের প্রক্রিয়া কাদের দ্বারা সূচিত হয়েছিলো তা আমরা সকলেই জানি। আওয়ামী দাঙ্গাবাজদের দ্বারা শুধু যে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর অত্যাচার-নির্যাতন হয়েছিলো তাই নয়, পার্বত্য চট্রগ্রামের পাহাড়ী জনগোষ্ঠীকে জোর করে বাঙ্গালী বানানোর প্রক্রিয়ায় তাদের উপরও বৈষম্যের সূচনা হয়েছিলো। ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতির ভারতে যেভাবে কংগ্রেস মুসলমানের উপর বছরের পর বছর অত্যাচার চালিয়ে এসেছে সেই একই চেতনায় বাংলাদেশেও কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় বন্ধু আওয়ামী লীগ সংখ্যালঘুদের উপর জুলুম করেছে। আর এই স্বার্থান্বেষী রাজনীতির ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগের পর যত দল ক্ষমতায় এসেছে জাতীয় পার্টি, বি.এন.পি সকলেই সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন চালিয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে ’৯০ এর পর থেকে তথাকথিত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় আওয়ামী লীগ-বি,এন,পি এর হাতে একই ভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। পরিহাসের বিষয় হলো এই যে, বি.এন.পি আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের অত্যাচারে ভিটে-বাড়ী থেকে উচ্ছেদ হওয়া থেকে শুরু করে, ধর্ষণের শিকার হয়েছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন আর এর দোষ চাপানো হয়েছে ইসলামী শক্তি আর ইসলাম পছন্দ মানুষদের উপর। অথচ আমরা চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি গত ৩০ বছরে ইসলামি শক্তির দ্ধারা কোন হিন্দু নির্যাতিত হয়েছেন এমন উদাহরণ কেউ দেখাতে পারবেন না। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক শক্তি হিসেবে বি,এন,পি আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা একের পর এক হিন্দুদের বাড়ী দখল করেছে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্ছেদ করেছে। নারী নির্যাতন করেছে অথচ এর জন্য দোষারোপ করা হয়েছে ইসলাম ও ইসলামী শক্তিগুলোকে। অথচ ইসলামী শক্তিগুলো উল্টো কাজটাই নিরলসভাবে করে গিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের ছাদ ভেঙ্গে যখন শত শত হিন্দু ছাত্র মৃত্যুর সাথে লড়ছিলো, তখন ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার ছেলেরা প্রথম ছুটে গিয়েছিলো তাদেরকে রক্ত দিয়ে বাচাঁনোর জন্য। ভারতে যখন বাবরী মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছিলো আর গুজরাটে হাজার হাজার মুসলমানকে পুঁড়িয়ে মারা হয়েছিলো তখন এদেশের সাধারণ ইমাম ও ইসলামি নেতৃবৃন্দ জনগণকে তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার, ও হিন্দুদের মন্দিররে নিরাপত্তা রক্ষার আহবান জানিয়েছিলেন। দুঃখের বিষয়ে হলো এই যে আওয়ামী লীগ- বি,এন,পির স্বার্থের রাজনীতির বলির পাঠা হয়েছে হিন্দু সাম্প্রদায়, অথচ তাদেরকে বুঝানো হয়েছে এর জন্য দায়ী ইসলাম ও ইসলামি শক্তি সমূহ। কিন্তু মিথ্যার এই বেসাতি বেশীদিন টিকবেনা। বামপন্থীরা এবং আওয়ামী লীগ মিলে যখনই সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন নামে ইসলামি শক্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা করুকনা কেন জনগণ ঠিকই জানে এই দেশে সাম্প্রদায়িক সস্প্রীতি রক্ষা করার সবচেয়ে বড় ঢাল হিসাবে হাজার বছর ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে ইসলামি ধারণা ও মূল্যবোধ। ব্রিটিশ আসার পূর্বে এই অঞ্চলের হিন্দু ও মুসলমানরা শত শত বছর ধরে পাশাপাশি শান্তি শান্তিপূর্ণ ভাবে বসবাস করেছে ইসলামের সহনশীলতা ও সহমর্মিতার শিক্ষার কারণেই। ভারতবর্ষে মুঘলদের ৮০০ বছর শাসন আমলে একটিও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটেনি। ব্রিটিশরা তাদের নিজেদর স্বার্থ সিদ্ধির জন্য যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কৌশল শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছে তা গত ৫০ বছর ধরেই ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের শাসকরা সময় সুযোগ মত ব্যবহার করেছেন ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য। এই ধর্মনিরপেক্ষ স্বার্থান্বেষী রাজনীতি ও রাষ্ট্রের বিপরীতে সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়ের ব্যাপারে ইসলামের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও শরীয়ার অদেশ নির্দেশ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ইসলামী হুকুমত বা রাষ্ট্রই একমাত্র স্থান যেখানে সকল সাম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে। ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের জান-মাল হিফাযতের অধিকার এবং ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও নাগরিক অধিকার স্বীকৃত। অমুসলিমদের অধিকার সমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তাদের জীবন রক্ষার অধিকার।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:
“যদি কোন ব্যক্তি কোন মু’আহিদ (যিম্মী)-কে হত্যা করে তবে জান্নাতের ঘ্রাণ তার নসীবে হবে না। অথচ চল্লিশ বছরের দূরত্ব থেকেও জান্নাতের ঘ্রাণ পাওয়া যাবে। এমন কি যিম্মীদের প্রতি জুলুম করা থেকে বিরত থাকা প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইরশাদ করেন: সাবধান! কেউ যদি কোন মু’আহিদ প্রতি জুলুম করে অথবা তাকে তার অধিকার থেকে কম দেয় কিংবা ক্ষমতা বহির্ভূত কোন কাজ তার উপর চাপিয়ে দেয় বা জোরপূর্বক তার থেকে কোন মালামাল নিয়ে যায় তাহলে কিয়ামতের দিন আমি তার পক্ষ অবলম্বন করবো। যিম্মী হত্যা করা নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কোন মুসলিম ব্যক্তি যদি কোন যিম্মীকে হত্যা করে তবে বিনিময়ে তাকেও হত্যা করা হবে।“
এতে এ কথা প্রতীয়মাণ হয় যে, ইসলামী রাষ্ট্রে একজন অমুসলিম নাগরিকের প্রাণের মর্যাদা একজন মুসলিমের সমান। এ কারণেই একজন অমুসলিম নাগরিকের রক্তপণ একজন মুসলিম নাগরিকের রক্তপণের সমান ধার্য করা হয়েছে। ইসলামের অমুসলিম যিম্মীদের সম্পদের অধিকার স্বীকৃত। এ কারণেই যিম্মীদের সম্পদের (আত্বস্বাতকারীর) প্রতি রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন।
ইসলাম মুসলিম রাষ্ট্রের অমুসলিম যিম্মীদেরকে তাদের ধর্ম ও কৃষ্টি-কালচার রক্ষার ব্যাপারেও পূর্ণ স্বাধীনতা দান করেছে। ইসলামের স্বর্ণ যুগের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যে সকল বিজিত দেশে অমুসলিম লোকদেরকে বসবাসের অধিকার দেওয়া হয়েছিল, সে সকল দেশে তাদের ধর্ম পালন এবং কৃষ্টি রক্ষার অধিকারও দেওয়া হয়েছিল। আবূ উবায়দ (রা) “কিতাবুল আমওয়াল” গ্রন্থে পরাজিত কয়েক দেশের নাম উল্লেখ করে বলেন, এ সকল দেশের অধিবাসীগণ মুসলমানদের নিকট পরাজিত হয়ে তাদের বশ্যতা স্বীকার করেছিল। অথচ এ সকল দেশের অমুসলিম অধিবাসীদেরকে তাদের ধর্মীয় ব্যাপারে পূর্ববৎ বহাল রাখা হয়েছে। ভারতবর্ষ এর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহারণ, যেখানে মুসলিম শাসন আমলে হিন্দুদের সকল প্রকার ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছিলো।
অমুসলিম ব্যক্তির সামাজিক ও নাগরিক অধিকারও ইসলামী রাষ্ট্রে স্বীকৃত। ইসলামী রাষ্ট্রের যেসব অমুসলিম অধিবাসী জীবিকা উপার্যনে অক্ষম তাদেরকে ভাতা দানের ব্যবস্থা ইসলামে রয়েছে। হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-খিলাফতের কালে সেনাপতি খালিদ (রা) হিরার অধিবাসীদের সাথে যে চুক্তি করেছিলেন, তাতে ছিল: তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বৃদ্ধ হয়ে কর্মে অক্ষম হয়ে যাবে অথবা অন্য কোন কারণে বিপদগ্রস্ত হবে অথবা দরিদ্র হয়ে যাবে তাদের জিযি্য়া মওকূফ করে দেয়া হবে। অধিকন্তু বায়তুল মাল হতে তাদেরকে এবং তাদের পরিবারবর্গকে ভাতা প্রদান করা হবে। আমীরুল মু’মিনীন হযরত উমর (রা) একদা এক বৃদ্ধ ইয়াহুদীকে ভিক্ষা করতে দেখে তাকে বায়তুল মালের খাযাঞ্চির নিকট পাঠিয়ে আদেশ দিলেন, তাকে এবং তার মত অন্যান্য ব্যক্তিদের জন্য বায়তুল মাল থেকে ভাতার ব্যবস্থা করে দাও। যৌবনে তাদের থেকে জিযি্য়া উসূল করে বার্ধক্যে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতে দেয়া ন্যায় বিচার নয়। ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের চাকুরী লাভ করারও অধিকার রয়েছে। খুলাফায়ে রাশিদীনের যমানায় এর বহু উদাহারণ পাওয়া যায়।
সুতরাং আজকের বাংলাদেশের স্বার্থবাদী রাজনীতিবিদদের দ্ধারা হিন্দু ও পাহাড়ী সাম্প্রদায়ের উপর যে অত্যাচার সংঘঠিত হচ্ছে তা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো ইসলামের হুকুম তথা রাষ্ট্রের অধীনে এই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা। একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রই পারে এদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ ও খৃষ্টানদের শারিরীক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। কারণ আল্লাহ্ তৈরী এই পৃথিবীতে তার ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এই বিশ্বে কোন ধর্ম বা সাম্প্রদায়ের মানুষকেই যেমন তিনি আলো, বাতাস, পানি ও রিযিক থেকে বঞ্চিত করেন না বা কারো ব্যাপারে বৈষম্য করেন না। ঠিক সেই একই আল্লাহ্র দেয়া বিধান অনুযায়ী পরিচালিত ইসলামী রাষ্ট্রও ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের অধিকার নিশ্চিত করতে নিরলস ভাবে কাজকরে যায়। আল্লাহ্ আমাদেরকে সকল মানুষের মুক্তির অবলম্বন সেই রাষ্ট্র ফেরৎ নিয়ে আসার তৌফিক দান করুন। (আমিন)।
শেখ তৌফিক
প্রশ্ন-উত্তর: দিয়তের অর্থ নিরুপন

প্রশ্ন: মানুষের জন্য সহজ করবার উদ্দেশ্যে ১২০০০ রৌপ্য দিরহামকে দিয়তের অর্থরূপে হিসেব করলে কি বৈধ হবে, যদিও ফুকাহারা দিয়ত উটের হিসেবে নির্ধারন করেছেন যারা উট ব্যবহার করে, স্বর্ণ দ্বারা যারা স্বর্ণ ব্যবহার করে এবং ব্যাংক নোট দ্বারা যারা ব্যাংক নোট ব্যবহার করে।
উত্তর: যারা উট ব্যবহার করে তাদের জন্য দিয়ত ১০০ উট, এবং যারা স্বর্ণ ব্যবহার করে তাদের জন্য ১০০০ দিনার, এবং যারা রৌপ্য ব্যবহার করে তাদের জন্য ১২,০০০ দিরহামই সঠিক।
তথাপি, বর্তমান যুগে ব্যাংকনোট আর স্বর্ণ ও রৌপ্য দ্বারা সংরক্ষিত নয়, তাই তারা ঐসকল লোকদের মধ্যে পরিগনিত হবে না যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য ব্যবহার করে।
কিয়াস করে এটি অর্থ দ্বারা গণনা করা হয় কারণ এর ইল্লত নস হতে প্রাপ্ত এবং তা হচ্ছে অর্থ, যেভাবে এটি ‘খিলাফত রাষ্ট্রে তহবিল’ বইটিতে ও আমাদের অন্যান্য বইতে আলোচনা করা হয়েছে। দিয়তের অর্থের বিষটি এ বিষয়ে ইজতিহাদের উপর নির্ভরশীল, এবং আমার মতামত হচ্ছে অনিচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রে রৌপ্য দ্বারা দিয়ত পরিমাপ করতে কোনো সমস্যা নেই, কারণ যে ব্যক্তি অনিচ্ছাকৃত হত্যায় জড়িত সে গুনাহগার নয়। তার দিয়ত এজন্য নয় যে অপরাধ করেছে। বরং, দিয়ত (এর মূল কারণ) আল্লাহর জ্ঞানের মধ্যে রয়েছে। তাই, অনিচ্ছাকৃত হত্যার সবচেয়ে লঘু শাস্তিতে অপরাধ না করায় দিয়ত যথোপযুক্ত অর্থ প্রদান।
তথাপি, ইচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রে আমি দেখছি দিয়ত স্বর্ণ দ্বারা পরিমাপ করা হয়। কারণ, যে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করেছে সে হারাম কাজ করেছে, তাই সবচেয়ে গুরু শাস্তি আরোপ করা হয়।
তথাপি যদি এই কাগুজে অর্থ স্বর্ণ ও রৌপ্যের প্রতিস্থাপনযোগ্য হয়, তবে ব্যক্তি এই কাগুজে অর্থকে ধাতব অর্থের মতোই বিবেচনা করবে যেক্ষেত্রে প্রতিস্থাপন করতে হবে।
আমি আল্লাহ সর্বশক্তিমানের কাছে সঠিক হবার প্রার্থনা করি।
১৬ই রমজান, ১৪৩৩ হি
৪/৮/২০১২প্রশ্ন-উত্তর: গণতন্ত্র নামক ভ্রান্ত চিন্তা হতে কিভাবে পরিত্রান পেতে পারি?

নিচের অনুবাদটি সম্মানিত মুজতাহিদ ও মুফাচ্ছির শাইখ আতা ইবন খলীল আবু রাশতা (আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন) কর্তৃক দেয়া এক প্রশ্নের জবাব
প্রশ্ন:
বর্তমান (যুগ)-এ বিপজ্জনক ধারনাসমূহ উম্মাহর অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে এবং আমাদের বিশুদ্ধ দ্বীন হতে পৃথক ভ্রান্ত বিশ্বাস আমাদের আক্বীদাকে আহত ও আক্রমন করেছে। এবং এসকল বিপজ্জনক চিন্তাদির মধ্যে একটি চিন্তা হলো গণতন্ত্র। আমাদের জন্য একটি মারাত্মক সমস্যা হলো যে ইন্দোনেশিয়ার মুসলিমগণ দাবী করে গণতন্ত্র ইসলামের একটি অংশ এবং তারা কুরআন ও সুন্নাহ হতে দলীল ব্যবহার করে তাদের এই ভ্রান্ত ধারনাকে ন্যায্যতা প্রদানের জন্য।
১. শাইখ, গণতন্ত্রের ব্যপারে আপনার মতামত কী?
২. আমরা কিভাবে এ সমস্যা হতে পরিত্রান পেতে পারি?
৩. আপনার মতামত কী হে শাইখ? আপনার কাছে এ ব্যপারে নসীহত চাচ্ছি।জবাব:
ওয়া আলাইকুম আস-সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
গণতন্ত্রের অর্থ ‘সার্বভৌমত্ব জনগণের’ (السيادة للشعب) যার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ যে আইন প্রণয়ন করেছেন তার বাইরে অন্য কোনো আইন প্রণয়ন করা। অন্য কথায়, এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর বাইরে অন্য কিছু দিয়ে বৈধ (হালাল) ও অবৈধ (হালাল) নিরুপন করা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:শাসনকর্তৃত্ব তো কেবল আল্লাহর, তিনিই সত্য প্রকাশ বর্ণনা করেন আর তিনিই শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী।
আত-তাবারানির আল-মু’জাম আল-কাবির-এ আদী বিন হাতেম হতে এক সম্মানিত হাদীসে বর্ণিত:
“আমি নবী (সা) এর কাছে স্বর্ণ দ্বারা তৈরি ক্রূশ পরিহিত অবস্থায় আসলে তিনি আমাকে বলেন, হে আদী, তোমার গলা হতে এই মুর্তিকে সরাও! সুতরাং আমি তা সরিয়ে ফেলি। এটি করার পর তিনি (সা) সূরা বারাআত (তওবা)-এর আয়াত তেলাওয়াত করলেন: তারা তাদের ধর্মযাজক ও সাধুদের আল্লাহর পরিবর্তে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করেছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম: হে আল্লাহর রাসূল, আমরা তো তাদের উপাসনা করি না। তিনি (সা) বললেন, (কিন্তু) তারা কি যা আল্লাহ হালাল করেছে তাকে হারাম সাব্যস্ত করে না আর আল্লাহ যা হারাম করেছে তা হালাল সাব্যস্ত করে না? আমি উত্তর দিলাম: হ্যা। তিনি (সা) বললেন, সেটাই তাদের উপাসনা (করা)।”
সুতরাং, আল্লাহকে বাদ দিয়ে আইন প্রণয়ন করা একটি মারাত্মক অপরাধ (কবীরা গুনাহ)। সুতরাং, গণতন্ত্র এই দিক হতে একটি কুফরি ব্যবস্থা যেহেতু এটি মানুষকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেয়, মানুষের রবকে নয়।
আরেক দিক হতে, গণতন্ত্র চার ধরনের স্বাধীনতার কথা বলে: বিশ্বাসের স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, মালিকানার স্বাধীনতা ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা। এর অর্থ মানুষ যা খুশি তা করতে পারবে। এর অর্থ এটাও যে, যে কোনো ব্যক্তি যে কোনো সময়ে তার দ্বীন পরিবর্তন করতে পারবে। এর অর্থ এটাও যে, যে কেউ তার খুশি অনুযায়ী যে কোনো দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করতে পারবে এমনকি যদি তা ধর্মদ্রোহীতাও হয়…হালাল বা হারাম, যেকোনো সম্পদের মালিক হতে পারাটাও এর অর্থ। যার মানে পারস্পরিক সম্মতিতেও কেউ চাইলে ব্যভিচারও করতে পারবে। (অথচ) এগুলো সবই ইসলামে অবৈধ। মুরতাদ হওয়া হারাম, ব্যভিচার হারাম, অবৈধভাবে সম্পদের মালিক হওয়া হারাম এবং দ্বীনকে গালি দেয়া ও এর কুৎসা রটনা করাও হারাম। সুতরাং, গণতন্ত্র এধরনের স্বাধীনতার দিক দিয়ে একটি কুফরী ব্যবস্থা কারণ এটি শরীআহকে পরিত্যাগ করারই শামিল। “গণতন্ত্র – একটি কুফরি ব্যবস্থা” নামক একটি বই আপনার দেশে দলের ওয়েবসাইটটিতে পাবেন যা গণতন্ত্র কেন একটি কুফরি ব্যবস্থা তা বিস্তারিত বর্ণনা করেছে।
সবশেষে, আপনার জন্য রইল সালাম, দুআ করি যাতে আল্লাহ আপনাকে সাহায্য ও তওফীক দান করেন যে ব্যপারে আপনি লিখেছেন, এছাড়াও ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য কল্যাণ কামনা করছি।
আপনাদের ভাই,
আতা ইবনু খলীল আবু আল-রাশতাArabic Text:
السؤال:
لقد غزت الأمة الإسلامية في عصرنا الحاضر المفاهيم الخاطئة والمعتقدات الباطلة الدخيلة على ديننا الحنيف والتي تضاد وتصادم العقيدة الإسلامية من كل وجه وجانب، ومنها الديمقراطية الباطلة. المشكلة الخطيرة عندنا، أن بعض المسلمين في إندونيسيا يزعمون أن الديمقراطية من الإسلام، وهم يستدلون عليها بأدلة شرعية من القرآن الكريم والسنة النبوية بالمفاهيم الضالة، بالتكلف في استعمال هذه الأدلة.فما هو رأيك يا شيخنا في الديمقراطية؟
وكيف يمكن التخلص من هذه المشكلة الخطيرة؟. أريد أن أكتب كتابا حول هذا الأمر.
ما رأيك يا شيخنا؟ وأطلب منك النصيحة المتعقلة بهذا الأمر.
الجواب:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
الديمقراطية تعني السيادة للشعب، فهو يشرع من دون الله، أي يحلل ويحرم من دون الله، والله سبحانه يقول: (إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ يَقُصُّ الْحَقَّ وَهُوَ خَيْرُ الْفَاصِلِينَ)، وفي الحديث الشريف الذي أخرجه الطبراني في الكبير عن عَدِيِّ بْنِ حَاتِمٍ قَالَ: أَتَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَفِي عُنُقِي صَلِيبٌ مِنْ ذَهَبٍ، فَقَالَ: «يَا عَدِيُّ اطْرَحْ هَذَا الْوَثَنَ مِنْ عُنُقِكَ»، فَطَرَحْتُهُ فَانْتَهَيْتُ إِلَيْهِ وَهُوَ يَقْرَأُ سُورَةَ بَرَاءَةَ فَقَرَأَ هَذِهِ الْآيَةَ (اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللهِ) حَتَّى فَرَغَ مِنْهَا، فَقُلْتُ: إنَّا لَسْنَا نَعْبُدُهُمْ، فَقَالَ: «أَلَيْسَ يُحَرِّمُونَ مَا أَحَلَّ اللهُ فَتُحَرِّمُونُهُ، ويُحِلُّونَ مَا حَرَّمَ اللهُ فَتَسْتَحِلُّونَهُ؟» قُلْتُ: بَلَى، قَالَ: «فَتِلْكَ عِبَادَتُهُمْ»، ولذلك فإن من يشرع من دون الله إثمه كبير كبير. فالديمقراطية من هذا الباب نظام كفر لأنها تجعل التشريع للبشر وليس لرب البشر.
ومن باب آخر فهي تقول بالحريات الأربع: العقيدة، والفكر، والملكية، والشخصية.فتجيز أن يعتقد المرء ما يشاء، فله أن يبدل دينه كما يشاء، وله أن يقول الرأي الذي يريد حتى لو طعن في المقدسات… وله أن يملك بالحلال والحرام، وله أن يعاشر بالزنا ما دام يرضي الطرفين. وهذا أمر محرم في الإسلام، فالردة حرام، والزنا حرام، والتملك
بوسائل غير مشروعة حرام، والقول بالسب والشتم كذلك حرام.وهكذا فإن الديمقراطية بإطلاقها للحريات كذلك هي نظام كفر لأنها تعني التحلل من الأحكام الشرعية.
وهناك كتاب “الديمقراطية نظام كفر” اطلبه من مكتب الحزب في بلدك، ففيه تفصيل مسألة الديمقراطية وكيف أنها نظام كفر .وفي الختام أقرئك السلام، وأدعو لك بالعون والتوفيق فيما تكتبه من خير للإسلام والمسلمين.
أخوكم عطاء بن خليل أبو الرشتة
প্রশ্ন-উত্তর: খিলাফত ছাড়া কি জুমার সালাত ফরয?

নিচের অনুবাদটি সম্মানিত মুজতাহিদ ও মুফাচ্ছির শাইখ আতা ইবন খলীল আবু রাশতা (আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন) কর্তৃক দেয়া এক প্রশ্নের জবাব
প্রশ্ন:
একজনের সাথে আলোচনার সময় (আমরা প্রত্যক্ষ করি), একজন ব্যক্তি সময় মতোই সালাত আদায় করে কিন্তু সবার সাথে জুমা সালাত আদায় করে না। বরং, তিনি যুহর সালাত আদায় করেন। সে যা করছে সে ব্যপারে যখন আমি প্রশ্ন তুললাম তখন সে জবাবে বলল, জুমা সালাতের জন্য সহীহ হওয়ার শর্তের মধ্যে খিলাফতের উপস্থিতিও একটি শর্ত। ফুকাহারা কেউ কি এধরনের মতামত পোষন করেছেন? এ ব্যপারে দলের মতামত কী? আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।জবাব:
জুমার সালাত ফরয কোনো খিলাফত থাকুক বা না থাকুক। এর দলীল সুপরিচিত আর তার মধ্যে রয়েছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বানী:
মুমিনগণ, জুমআর দিনে যখন নামাযের আযান দেয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের পানে ত্বরা কর এবং বেচাকেনা বন্ধ কর। এটা তোমাদের জন্যে উত্তম যদি তোমরা বুঝ। [সূরা জুমুআ ৬২:৯]
আল-হাকিম তার মুসতাদরাক-এ আবু মুসার বরাতে বলেছেন যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “জুমার সালাত প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরয চার জন ছাড়া: কর্তৃত্বাধীন দাস, নারী, শিশু ও রোগাক্রান্ত।” আল-হাকিম বলেন, বর্ণনাটি বুখারি ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহীহ যদিও তাদের কেউই তা বর্ণনা করেননি। আন-নাসা’ঈ ইবন উমর এর বরাতে যিনি নবী (ﷺ)-এর স্ত্রী হাফসা (রা) হতে বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন: “জুমার সালাতে গমন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরয যে প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে।” এসব থেকে (বিষয়টি) পরিষ্কার যে দলীলে শাসক (খলীফার) বাধ্যবাধকতা অনুপস্থিত।
এ বর্ণনাসমূহের উপর ভিত্তি করে তিন মাযহাব (মালিক, শাফেঈ, ইবন হাম্বল)-এর মতামত এসেছে। আর আহনাফ (হানাফী) জুমার সালাতের একটি শর্তের মধ্যে উল্লেখ করেন: শাসকের অনুমতি, অথবা তার উপস্থিতি অথবা তার নিয়োগপ্রাপ্ত প্রতিনিধির উপস্থিতি। আর এরকমই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও খুলাফায়ে রাশিদীনের আমলে ছিল। এভাবেই (বাস্তবায়িত) হবে যদি কোনো শাসক কিংবা তার প্রতিনিধি কোনো অঞ্চলে থাকে যেখানে সালাত আদায় হয়। কিন্তু যদি দুজনের কেউই মৃত্যু কিংবা কোনো ফিতনা বা অনুরূপ কোনো কারণে উপস্থিত না থাকে এবং জুমার সালাতের সময় হয়ে গিয়ে থাকে, তবে জনগণের উচিত সালাতের নেতৃত্ব দেবার জন্য কাউকে সামনে ঠেলে দেয়া। পূর্বে উল্লিখিত দলীলের কারণে, শাসকের উপস্থিত থাকার শর্ত আমাদের কাছে শক্তিশালী মতামত হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।
সংক্ষেপে, জুমার সালাত একটি ফরযে আইন (ব্যক্তিগত ফরয) সেক্ষেত্রে কোনো প্রকৃত খিলাফত থাকুক অথবা কোনো খিলাফত নাই থাকুক।
আর আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন
Arabic Text:السؤال:
في نقاش مع أحد الأشخاص، وهو يصلي الأوقات… لكنه لا يصلي الجمعة مع الناس، بل يصليها ظهراً، فلما أنكرت عليه ذلك قال إن وجود الخليفة شرط في صحة صلاة الجمعة، فهل يقول بهذا أحد من الفقهاء؟ وما هو رأي الحزب في ذلك؟ وجزاكم الله خيراً.الجواب:
إن صلاة الجمعة فرض سواء أوُجِد الخليفة أم لم يوجد، والأدلة على ذلك مشهورة، ومنها:
قوله سبحانه: (( يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ)) وأخرج الحاكم في مستدركه عن أبي موسى، عن النبي صلى الله عليه وسلم، قال: «الجمعة حق واجب على كل مسلم في جماعة إلا أربعة: عبد مملوك، أو امرأة، أو صبي، أو مريض» وقال الحاكم: “هذا حديث صحيح على شرط الشيخين ولم يخرجاه”. وكذلك أخرج النسائي عن عَنْ ابْنِ عُمَرَ عَنْ حَفْصَةَ زَوْجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: “رَوَاحُ الْجُمُعَةِ وَاجِبٌ عَلَى كُلِّ مُحْتَلِمٍ”.وواضح من هذه الأدلة عدم تقييدها بالإمام (الخليفة)
وبهذا يقول كذلك أصحاب المذاهب الثلاثة (مالك والشافعي وابن حنبل)، وأما الأحناف فقد ذكروا من شروط الجمعة: (إذن السّلطان بذلك، أو حضوره، أو حضور نائب رسميّ عنه، إذ هكذا كان شأنها على عهد رسول اللّه صلى الله عليه وسلم وفي عهود الخلفاء الرّاشدين. هذا إذا كان ثمّة إمام أو نائب عنه في البلدة الّتي تقام فيها الجمعة، فإذا لم يوجد أحدهما، لموت أو فتنة أو ما شابه ذلك، وحضر وقت الجمعة كان للنّاس حينئذ أن يجتمعوا على رجل منهم ليتقدّمهم فيصلّي بهم الجمعة.) وشرط إذن السلطان هو رأي مرجوح عندنا للأدلة السابقة.
والخلاصة أن صلاة الجمعة فرض، سواء أكان الخليفة موجوداً أم لم يكن هناك خليفة
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অধিকার

পুরুষতান্ত্রিক চেতনার সমাজে কোনো আইনই নারীকে তার সঠিক প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে পারবে না, হয়তো মিডিয়ার চোখে কিছু সফল মামলা দেখে আমরা পুলকিত হব, হাততালি দেব, কিন্তু অন্তরালে নারীরা ঠিকই বৈষম্যের শিকার হবে। শুধুমাত্র সম্পত্তিতে অধিকারের ক্ষেত্রেই বৈষম্যের শিকার হবে না, বরং শিকার হবে ঘরোয়া সহিংসতা, যৌন নির্যাতন ও এসিড-সন্ত্রাসের মত বিভিন্নমুখী বৈষম্য ও নির্যাতনের।
অনেক প্রাচীনকাল থেকেই মানব সমাজে পুরুষতান্ত্রিকতা দেখা গিয়েছে। এ বিষয়টি মানবচরিত্রের সাথেও অনেকটা সম্পর্কিত। যেহেতু অধিকাংশক্ষেত্রেই পুরুষ তুলনামূলকভাবে নারী হতে বেশি পেশী শক্তি বহন করে, তাই উন্নত চিন্তাবিহীন সমাজে পুরুষতান্ত্রিকতা বিস্তার করে। সমাজের এ বাস্তবতায় ধর্ম অনেকক্ষেত্রে ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় । আর সে ধর্ম যদি আলোকিত না হয় তবে তো কথাই নেই, অনেকটা সোনায় সোহাগা হয় তা পুরুষের জন্য। উপমহাদেশে ব্রাক্ষন্যবাদের প্রভাব আমাদের কারো অজানা নয়, জীবন সম্পর্কে এ দৃষ্টিভঙ্গি শুধুমাত্র পুরুষতান্ত্রিকই নয়, বরং caste বা জাততান্ত্রিক ও সাম্প্রদায়িক। উপমহাদেশের সমাজে এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব উল্লেখযোগ্য।
ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখব, প্রাচীন বাংলায় যখন ইসলাম এসেছিল, তখন নিম্নবর্ণের সনাতন ধর্মাবলম্বী ও বৌদ্ধরাই মূলত ইসলামে প্রবেশ করেছিল। ব্রাক্ষণ্যবাদী আর্য সম্প্রদায়ের নিপীরন ও বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে ইসলামকে তারা দেখেছিল মুক্তির বার্তাবাহকরূপে। আমরা জানি ইতিহাসে ইসলামই প্রথম নারীকে দিয়েছিল তার উত্তরাধিকার। আর এটি এমন এক সময়ে ঘটেছিল যখন অনেকেই দ্বিধায় ছিল নারীর মধ্যে আদৌ প্রাণ রয়েছে কিনা নাকি নারী মানুষের বাইরে প্রাণীজগতের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে আরেক প্রজাতি।
ইসলামী আইনে পুরুষতান্ত্রিকতার কোনো ছোয়া নেই কারণ ইসলাম মানুষকে আলাদাভাবে নারী বা পুরুষরূপে দেখে না। বরং সমানভাবে আল্লাহর বান্দা হিসেবে দেখে। তাই পুরুষতান্ত্রিকতার বালাই ইসলামে কোনো কালেই ছিল না। ইসলাম একটি নির্দিষ্ট সমাজ গড়ার জন্য তার আইনগুলোকে সাজিয়েছে। তাই ইসলামী আইনগুলো একে অপর হতে বিচ্ছিন্ন নয়। বরং ইসলামের ‘আইনী অধিকারের সাথে’ পরিবার ও সমাজে একজন মুসলিমের ‘দায়িত্বের’ সম্পর্ক একই সুতোয় গাথা। উদাহরনসরূপ, ইসলামী সমাজে একজন পুরুষকে বাধ্যতামূলক দায়িত্ব দেয়া হয়েছে পরিবারের ভরনপোষনের জন্য, আর নারীকে এখতিয়ার দেয়া হয়েছে অর্থাৎ, সে চাইলে contribute করতেও পারে, আবার নাও পারে। সুতরাং, এ দায়িত্বশীলতার সাথে আমরা অন্যান্য আইনী অধিকারে correlation খুজে পাব বিশেষ করে ইসলামী উত্তরাধিকার আইনে। ইসলামী উত্তরাধিকার আইনে নারীদের রয়েছে নির্দিষ্ট অংশ। কোনো ক্ষেত্রে কোনো নারী পুরুষ হতে কম পেলেও আবার দেখা যাবে আরেক ক্ষেত্রে নারী পুরুষ হতে বেশি পাচ্ছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, সার্বিক দিক দিয়ে নারীই বেশি লাভবান হয়।
এটি সত্য যে আমাদের সমাজে অনেক উত্তরাধিকারীই (বিশেষ করে নারী) তাদের সম্পত্তি সঠিক ভাগ পায় না। ধর্মনিরপেক্ষ বা secular সমাজে public domain এ ধর্মের অনুপস্থির দরুন রাষ্ট্রযন্ত্রের ধর্মের প্রতি নির্বিকার হয়ে যাওয়ার প্রভাবেই সৃষ্টি হয় এই জটিলতা। সম্পত্তির ভাগ ইসলামী আইন অনুযায়ী হলেও, সমাজের কার্যাবলীতে ধর্মীয় চিন্তার অনুপস্থিতি সমাজকে ইসলামী থেকে চিন্তাহীন পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পরিনত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। কেউ হয়তো বলবেন আইনের শাসনের অভাবেই এটি হয়। কিন্তু এটাও তো ঠিক যে আইন এর philosophical ভিত্তি সমাজে কিরুপে আছে তা-ই অনেকটা নির্ধারন করে সে আইনের সচলতা কতটুকু হবে। Secular সমাজে ইসলামী আইনের ব্যক্তি ও পরিবার সংক্রান্ত কিছু আইনের উপস্থিতি থাকলেও তার সচলতা খুবই সংকটময় অবস্থানে থাকে। কারণ সমাজের কেন্দ্রীয় চিন্তার বলয়ে ইসলামী চিন্তা অবহেলিত। তাই সমাজের চিন্তার ভিত্তি না পরিবর্তন করে secular framework এ ইসলামী আইন বাস্তবায়ন করলে কখনোই উন্নত ফলাফল পাওয়া যাবে না।
আর সমাজের চিন্তার ভিত্তি পরিবর্তন করতে হলে চাই সমাজে ব্যপক বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা। সমাজকে ইসলামী করতে হলে সমাজের বিদ্যমান চিন্তাগুলোকে address করতে হবে এবং সেগুলোর দুর্বলতা চিহ্নিত করে ইসলামের চিন্তা দ্বারা তার পরিবর্তন করতে হবে। এক্ষেত্রে ইসলামকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে উপস্থাপন করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ন। এর ফলে সমাজের চিন্তাশীল অংশ আলোচনায় স্পৃহা পাবে, অংশগ্রহণ করবে এবং অনেকেই ফলাফলসরূপ ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বকে গ্রহণ করবে। এতে ইসলামী চিন্তা সমাজে দ্রুত বিস্তার লাভ করবে এবং ফলশ্রুতিতে তা সত্যিকারের ইসলামী চেতনাকে সমাজে আরো প্রবল করে তুলবে। এভাবে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের পথ আরো সুগম হবে এবং মুসলিম সমাজ তার পুনর্জাগরণের পথে তীব্রভাবে এগিয়ে যাবে।
খিলাফত প্রতিষ্ঠা করাই পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়

মানব ইতিহাসের শুরু থেকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মানুষের সামনে দুটি পথ খোলা রেখেছেন- আল্লাহ্, তাঁর নবী-রাসুল, আল্লাহ্’র ও’হী, আখিরাত-হাশর, জান্নাত-জাহান্নাম বিশ্বাসের পথ আর অন্যটি হচ্ছে অবিশ্বাস ও কুফরের পথ। মানব সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই ঈমান আর কুফরের এক চিরন্তন দ্বন্দ্ব ও সংঘাত চলে আসছে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
“এবং আমি তাকে (মানুষকে) দুটো পথ (ভালো-মন্দ) দেখিয়েছি।” [সূরা আল-বালাদ:১০]
বর্তমান সময়ে এসে এই সংঘাত বিশ্বজনীন রূপ লাভ করেছে। আজ সেই সংঘাতের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্ এবং পশ্চিমা বিশ্ব তথা আমেরিকার নেতৃত্বাধীন সকল অবিশ্বাসী কুফর শক্তি। মুসলমানদের উপর আমেরিকার আগ্রাসন এই উম্মাহ্’র উপর পশ্চিমা পুঁজিবাদী বিশ্বের ধারাবাহিক হত্যা, নির্যাতন, দখলদারিত্ব আর নগ্ন শোষণের আরেকটি নির্মম অধ্যায়। পশ্চিমা পুঁজিবাদী বিশ্ব সবসময় চায় আমাদের উপর তাদের কুফর জীবনব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়ে আমাদেরকে শোষণ করতে।
আমরা মুসলমানরা সবাই জানি কিভাবে এই পূর্বে আমেরিকা ১০ বছরের ইরান-ইরাক যুদ্ধে সাদ্দামকে প্রকাশ্যে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে ও অস্ত্রের যোগান দিয়েছে।
এরপর আমেরিকা ও বৃটেন ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র রাখার অজুহাতে ইরাকী জনগণের উপর চাপিয়ে দিয়েছে যাচ্ছে এক অন্যায় যুদ্ধ। যদিও তারা বিশ্বজনমতকে নিজের পক্ষে রাখার জন্য সাদ্দামের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের প্রস্তাব লংঘন এবং বিভিন্ন বিপজ্জনক অস্ত্র রাখার অভিযোগ এনেছে কিন্তু এটা সবার কাছেই স্পষ্ট যে এই যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য আরও সংহত করা ও ইরাকের বিশাল তেল সম্পদ লুঠ করা। আজ পর্যন্ত বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ যারা লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করার কাজে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আনবিক বোমা ও ভিয়েতনামে রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে। অপর দিকে ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনী ভূমি দখল ও হাজার হাজার মুসলমানকে হত্যার প্রেক্ষিতে এ পর্যন্ত আনীত অভিযোগগুলোর ব্যপারে জাতিসংঘ প্রস্তাব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষতঃ পশ্চিমা দেশগুলো ক্রমাগতভাবে উপেক্ষা করে চলেছেই। অপরদিকে উত্তর কোরিয়া যখন নিজেই পারমানবিক অস্ত্র রাখার ঘোষণা দেয় তখন আমেরিকা তার বিরুদ্ধে শুধু কুটনৈতিক ব্যবস্থার কথা বলছে। এসব আচরণ পশ্চিমা বিশ্বের দ্বৈতনীতি ও স্ব-বিরোধিতার আসল চেহারা যেমন প্রকাশ করে দিয়েছে তেমনিভাবে এটাও প্রমাণ করেছে যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ মূলতঃ মুসলিম বিশ্বের সম্পদ ভাগাভাগির জন্য পশ্চিমাদের একটি ক্লাব মাত্র।
কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকা ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তি সবসময় চেষ্টা করেছে বিশ্বব্যাপী তাদের নিজস্ব পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থা কায়েম করতে। পুঁজিবাদী জীবনাদর্শের মূল ভিত্তি হচ্ছে দ্বীন এবং দুনিয়াকে আলাদা করা। এই জীবন দর্শন বিশ্বাস করে মানুষ হচ্ছে সার্বভৌম অর্থাৎ যা ইচ্ছা তাই করার মত স্বাধীন এবং মানুষের জীবনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজের স্বার্থকে সর্বোচ্চ মাত্রায় অর্জন করা ও চরমভাবে জীবনকে উপভোগ করা।
মার্কিনীদের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী বিশ্বের একমাত্র প্রেরণা ও চালিকাশক্তি হচ্ছে এই ভোগবাদী জীবন দর্শন। “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের” নামে আমেরিকা, বৃটেন, ইসরায়েল, ভারত ও অন্যরা আমাদের দেশগুলোতে তাদের ঔপনিবেশিক স্বার্থকেই আরও নিরাপদ ও সুসংহত করতে চায়। তাদের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্রই হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের সম্পদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং ইসলাম যাতে জীবনব্যবস্থা হিসাবে মুসলিম বিশ্বে পুনঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করতে না পারে তা নিশ্চিত করা। আজকের বিশ্বে ইসলামই পুঁজিবাদীদের জন্য একমাত্র আদর্শগত হুমকি।
মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বিশ্বব্যাপী প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে যাতে করে মুসলমানরা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার দেয়া জীবনব্যবস্থা ইসলামকে তাদের জীবনে গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। এটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যখন বুশ তার ২০০১ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর এর ভাষণে বলেছিল, “মার্কিন জনগণ এই ক্রুসেড কী তা বুঝতে শুরু করেছে”। এখন তারা একদিকে যে মুসলমানই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার শরীয়াহ্ দিয়ে জীবন যাপন করতে চায় তাকেই “মৌলবাদী ও সন্ত্রাসী” বলে আখ্যায়িত করছে অপরদিকে নিজেদেরকে দাবী করছে শান্তিস্থাপনকারী হিসাবে। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে যে পশ্চিমা পুঁজিবাদী গোষ্ঠী নিজেদের কায়েমী স্বার্থ উদ্ধারের জন্য আর্মি-ট্যাংক-মিসাইল সজ্জিত নিজেদের সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রকেই উন্মাদের মত ইরাক, ফিলিস্তিন,কাশ্মীর থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশে নিরীহ মুসলমানদেরকে নির্বিচারে হত্যার কাজে ব্যবহার করছে – আদতে তারাই আসল সন্ত্রাসী। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
“যখন তাদেরকে বলা হয় “পৃথিবীতে বিশৃংখলা সৃষ্টি করো না” তারা বলে “আমরা তো শান্তি স্থাপনকারী”। বস্তুতঃ তারাই অশান্তি সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা বুঝতে পারে না” [সুরা-বাকারা:১১-১২]
তারা ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের কথা বলে যাতে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা’র প্রদত্ত দিক নির্দেশনা মসজিদ, মুনাজাত আর রমাযান মাসে কিছু বিষয়ে মানা হয় আর আমাদের সমস্ত সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক জীবন চলে মানবরচিত পুঁজিবাদী চিন্তা, মূল্যবোধ, প্রথা ও আইন-কানুন দ্বারা। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও চলছে তাদের অব্যাহত প্রচার-প্রচারণা। এদেশের বিভাজনের রাজনীতিতে ইন্ধন দিয়ে আমাদের বিভক্ত রাখতে তারা অত্যন্ত সক্রিয়। তাদের এইসব কর্মকাণ্ড ও প্রচারণা সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদেরকে সতর্ক করে বলছেন,
“নিঃসন্দেহে যেসব লোক কাফের, তারা ব্যয় করে নিজেদের ধনসম্পদ, যাতে করে বাধাদান করতে পারে আল্লাহ্ ‘র পথে“[সূরা-আনফাল:৩৬]
গত চল্লিশ বছর ধরে ধর্মনিরপেক্ষতা, পুঁজিবাদ, গণতন্ত্র ইত্যাদি পশ্চিমা চিন্তা-ভাবনা বারবার আমাদের সমাজে প্রয়োগ করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আমরা কি একটি সত্যিকার সভ্য ও বাসযোগ্য সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি ? বরং বর্তমানে আমাদের সমাজে যে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজী, দুর্নীতি, ধনী-গরীবের ব্যাপক বৈষম্য, অন্যান্য জাতির উপর অপমানজনক নির্ভরশীলতা ইত্যাদি অন্যায় চলছে তা এসব কুফর চিন্তা চেতনা গ্রহণ করার প্রত্যক্ষ ফল।
ইসলাম এবং ধর্ম নিরপেক্ষ পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থা কখনোই একসাথে চলতে পারে না। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা ও তাঁর রাসূল (সাঃ) এর প্রতি আমাদের ঈমান কখনোই আমাদের এই অনুমতি দেয়না যে সমাজে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার দেয়া জীবনব্যবস্থার বদলে মানুষের তৈরী জীবনব্যবস্থা চলবে আর আমরা তা নীরবে মেনে নেব। ইসলাম আমাদেরকে মানব জীবনের সকল ক্ষেত্রে, হোক সে ব্যক্তিগত ইবাদত কিংবা সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কার্যাবলী, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার সার্বভৌমত্বকে মেনে নেয়ার হুকুম দিয়েছে। এ ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছেন ও সতর্ক করছেন,
“রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহ্কে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ্ কঠোর শাস্তিদাতা” [সূরা আল-হাশর:৭]
“তবে কি তোমরা কিতাবের এক অংশ বিশ্বাস কর আর অন্য অংশকে অস্বীকার কর ? তোমাদের মধ্যে যারা এরকম করবে এই পৃথিবীতে তাদের জন্য রয়েছে চরম লাঞ্ছনা আর পরকালে তারা আস্বাদন করবে সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক আযাব” [সূরা-বাকারা:৮৫]
হে মুসলমানগণ! হে সমাজের নেতৃস্থানীয় মানুষেরা!
এখন সময় এসেছে একটি সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেয়ার- সময় এসেছে ইসলামকে আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করার। এখন আমাদেরকে ইসলাম ও কুফর এর মধ্যকার সংগ্রামের ব্যাপকতর বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে হবে। আমাদের সমাজে কুফর চিন্তা-চেতনা, আবেগ-অনুভূতি ও কাজ-কর্মের ব্যাপক বিস্তার দেখেও আমরা যদি চুপ করে থাকি তাহলে আমরা কীভাবে দাবী করব যে আমরা আসলেই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা ও তাঁর রাসূল (সাঃ) কে ভালবাসি ও তাঁর (সাঃ) সুন্নাহকে অনুসরণ করি ? হক-বাতিলের এই সংগ্রামে আমরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারিনা- এটা আমাদের ঈমানের প্রশ্ন। মুসলমান হিসাবে এই দায়িত্বকে অবহেলা করার মানে হচ্ছে কাফেরদের দ্বারা আমাদের সমাজ ধ্বংসের যে ষড়যন্ত্র চলছে তাতে সাহায্য-সহযোগিতা করা।
এখন সময় এসেছে রাসূল (সাঃ), সাহাবা (রাঃ) এবং যুগে যুগে যেসব মুসলমান কুফর এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গিয়েছেন তাদের পক্ষ অবলম্বন করার; আর নিশ্চিতভাবেই এই পক্ষের মানুষেরা দুনিয়াতে ও পরকালে সফল হবেন।
যখন সংখ্যায় মুসলমানরা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার একচর্তুাংশ, মুসলমানদের হাতে আছে ব্যাপক খনিজ সম্পদ ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিসমূহ – তখন কেন আমরা পশ্চিমা আগ্রাসনের মুখে অসহায়ভাবে মার খাচ্ছি ? এর একটাই কারণ আর তা হচ্ছে আমরা পশ্চিমা পুঁজিবাদী শক্তির চিন্তা-চেতনা, আইন-কানুন ও নিয়ম-নীতির দাসত্বের শৃংখলে বাঁধা পড়ে আছি। এখন আমরা কেবলমাত্র পশ্চিমা সামরিক শক্তির দখলদারিত্ব নয় বরং তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এমনকি বুদ্ধিবৃত্তিক দখলদারিত্বেরও শিকার। যদি আমরা সত্যিই আমাদের ইরাকী মুসলিম ভাই-বোনদের সমব্যথী হই এবং আমেরিকা আর তার জোট দেশ গুলোর আগ্রাসনের প্রতি ঘৃণা অনুভব করি তবে তা আমাদেরকে অবশ্যই সক্রিয় প্রেরণা যোগাবে যাতে করে আমরা আমাদের ভূমি থেকে তাদের সকল কুফর প্রভাব সমূলে উৎখাত করতে পারি।
রাসুল (সাঃ) এর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে, ইসলামের আদর্শগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের মাধ্যমে সকল কুফর-পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের প্রভাব থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করাই হবে বাংলাদেশে আমাদের প্রধান দায়িত্ব। তার মানে আমাদেরকে সব ধরনের পশ্চিমা কুফর চিন্তা-চেতনাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে ইসলামকে পরিপূর্ণ আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করতে হবে আর এভাবেই আমাদের সমাজের সমস্যা-সংকট সমূহের যথার্থ ও স্থায়ী সমাধান আসবে।
মুসলমান হিসেবে আমাদের এখন একটাই করণীয় আর তা হল আমাদের সমাজকে ইসলামি আক্বীদার ভিত্তিতে গড়ে তোলা এবং খিলাফত রাষ্ট্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা। এই খিলাফত রাষ্ট্রের নেতৃত্বেই সমস্ত মুসলিম উম্মাহ্ও জান-মাল, সম্মান-সম্ভ্রম এবং সহায়-সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে ইনশাআল্লাহ্।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বিশ্বাসীদেরকে তাঁর পথে সংগ্রামের জন্য সাহায্য ও বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন,
“হে বিশ্বাসীগণ! যদি তোমরা আল্লাহ্কে সাহায্য কর, আল্লাহ্ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদেরকে দৃঢ়পদে প্রতিষ্ঠিত করবেন” [সূরা-মুহম্মদ:৭]
মাল্টিলেভেল মার্কেটিং এর শরয়ী বিধান
এমএলএম (মাল্টিলেভেল মার্কেটিং) বা নেটওয়ার্ক মার্কেটিং নামে পরিচিত ব্যবসা পদ্ধতিটি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে বিদ্যমান। অবশ্য দেশ ও এলাকাভিত্তিক এ পদ্ধতিকে বিভিন্ন নামে আখ্যায়িত করা হয়। যেমনঃ কেউ কেউ বলে ডাইরেক্ট মার্কেটিং সিস্টেম, আবার কেউ কেউ বলে টিমওয়ার্ক মার্কেটিং সিস্টেম, কেউ বা ফ্রিডম এন্টারপ্রাইজ, কেউ বলে হোম বেইজ মার্কেটিং, কেউ বলে হলিডে বিজনেস ইত্যাদি ইত্যাদি।
এমএলএম এর আবিস্কার :
১৯৪০ সালে আমেরিকার একজন কেমিস্ট ডাঃ কার্ল রেইন বোর্গ কর্তৃক সর্বপ্রথম প্রবর্তিত হয় এ পদ্ধতিটি। তার কোম্পানীর নাম ছিল ক্যালিফোর্নিয়া ভিটামিন কোম্পানী। ১৯৪০ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত সারা বিশ্বে ১২৫টিরও বেশি দেশে প্রায় ১২৫০০ এর বেশি কোম্পানীর অধীনে প্রায় ৩০ কোটিরও বেশি ডিষ্ট্রিবিউটর কাজ করছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে এমএলএম পদ্ধতিতে পরিচালিত বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যেমনঃ ডেসটিনি-২০০০ লিঃ, সেপ প্রাঃ লিঃ, ড্রিম বাংলা, নিউওয়ে বাংলাদেশ, আল-ফালাহ কমিউনিকেশন বিজনেস, ডটকম শ্যাকলী, ট্যাংচং এফ.আই.সি, আয়্যমওয়ে কর্পোরেশন, জিজি এন, মডার্ণ হারবাল ফুডস প্রাঃ লিঃ, মেরিকে কসমেটিক ইত্যাদি। তন্মধ্যে ডেসটিনি-২০০০ লিঃ ও এফ.আই.সি. উল্লেখযোগ্য।
নেটওয়ার্ক মার্কেটিং ইসলামের দৃষ্টিতে কতটুকু বৈধতার দাবি রাখে এ নিয়ে ইতোমধ্যে পক্ষে বিপক্ষে বিভিন্ন প্রকার প্রবন্ধ-নিবন্ধ, বই-পুস্তক প্রকাশ ও যুক্তি-তর্ক শুরু হয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় ইসলামের দৃষ্টিতে এমএলএম পদ্ধতি ব্যবসাটির বিধান সম্পর্কে কিছু লেখা সময়ের দাবি বলে মনে করি। প্রথমে বুঝা যাক এমএলএম ব্যবসাটির ধরণ বা পদ্ধতি কি? ও এমএলএম বা মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কাকে বলে?
এমএলএম (মাল্টিলেভেল মার্কেটিং) এর রূপরেখা :
এমএলএম (মাল্টিলেভেল মার্কেটিং) পদ্ধতি সম্পর্কে লেখা বিভিন্ন বইপত্র, কোম্পানীগুলোর নীতিমালা, ফরম ও পণ্য তালিকা, তাদের সেমিনারের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট লোকদের ব্যাখ্যাসমূহ থেকে এমএলএম (মাল্টিলেভেল মার্কেটিং) এর যে পরিচয় পাওয়া যায় তা হলোঃ-
১. এমএলএম (মাল্টিলেভেল মার্কেটিং)পদ্ধতির প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের মাধ্যমে পরিবেশক নিয়োগ করে থাকে।
২. পরিবেশক হতে হলে তাদের থেকে তাদের নির্ধারিত মূল্যে পণ্য খরিদ করতে হয়।
৩. পণ্য খরিদ করা ছাড়া যেহেতু তাদের ডিষ্ট্রিবিউটর (পরিবেশক) হওয়া যায় না, এজন্য তাদের কর্মীবাহিনীর উপাধি হল ক্রেতা-পরিবেশক।
৪. কোম্পানীর পরিবেশক হওয়ার পর সে যদি কোম্পানীর নিয়মে দু’জনকে ক্রেতা-পরিবেশক বানায় তাহলে এর বিনিময়ে সে কোম্পানী হতে কমিশনের নামে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পায়। এরপর এ দু’ব্যক্তি যদি আরো চারজনকে ক্রেতা-পরিবেশক বানায় তাহলে এ দু’ব্যক্তি ও প্রথমোক্ত ব্যক্তি কমিশন পাবে। এভাবে দু’দিকের নেটওয়ার্ক যতই দীর্ঘ হবে ততই উপরের লোকদের কমিশন বাড়তে থাকবে।
৫. চার নম্বরে বর্ণিত নেট সিস্টেমটিই হল এমএলএম এর মূল বৈশিষ্ট। পুঁজি ছাড়া রুজী এর উপরই তাদের প্রচারণার ভিত্তি। এ শ্রম ছাড়া বিনিময়ের আশায় লোকজন তাদের সাথে যোগ দেয়।
৬. মাল্টিলেভেল মার্কেটিং পদ্ধতির মূল বৈশিষ্টে সব কোম্পানী একমত। তবে কোম্পানী ভেদে প্রত্যেকের নিয়মাবলী, কমিশন বন্টনের পদ্ধতি ও কমিশনের পরিমাণ ভিন্ন রকম।
৭. ডান ও বাম উভয় পার্শ্বের নেট না চললে কোন ব্যক্তি কমিশন পাবে না। যেমন কেউ যদি শুধু একজন ক্রেতা-পরিবেশক বানায় তাহলে সেও কমিশন পাবে না, তার উপরের স্তরের ব্যক্তিগণও কমিশন পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হবে না।
ডেসটিনি-২০০০ লিঃ কর্তৃক প্রকাশিত “বিক্রয় ও বিপণন পদ্ধতি” পুস্তিকা থেকে এমএলএম (মাল্টিলেভেল মার্কেটিং) এর পদ্ধতি নিম্নে তুলে ধরা ধরছি। উক্ত পুস্তিকার ১০ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে:
মূল ধারণাটি হচ্ছে এ রকম, (ধরুণ আপনি) একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের পণ্য (৫০০-১০০০) পয়েন্ট ডেসটিনি-২০০০ লিঃ থেকে ক্রয়ের মাধ্যমে কোম্পানীর একজন সক্রিয় ক্রেতা-পরিবেশক হলেন। প্রাথমিকভাবে দু’জন ক্রেতা-পরিবেশক সৃষ্টির মাধ্যমে নিজস্ব সেলস টিম তৈরির প্রক্রিয়ায় কাজ করতে পারে। এরপর পরবর্তী ক্রেতা-পরিবেশকদ্বয়কে একইভাবে তাদের ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের ব্যাপারে সর্বাত্নক সহযোগিতা করতে পারবেন। এভাবে ১২ থেকে ১৩টি ধাপে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং টিম তৈরির কাজ করার পর ঐ সমস্ত ক্রেতা-পরিবেশকদের অধীনে গড়ে বাত্তসরিক ৪০০০ ক্রেতা-পরিবেশক সৃষ্টি করা সম্ভব।উপরোক্ত পুস্তিকার ৯ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে-
যিনি ইচ্ছে করবেন তিনিই এ প্রতিষ্ঠানের একজন ক্রেতা-পরিবেশক হয়ে পণ্য ক্রয়ের মাধ্যমে এবং দলের অভ্যন্তরে প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে পণ্য বিপণনে অংশগ্রহণ করে বিক্রিত লভ্যাংশের অংশীদার হতে পারবেন। অন্তত একবার পণ্য ক্রয় করা ছাড়া কিংবা অন্য ডিষ্ট্রিবিউটর থেকে তার ডিলারশীপ যোগ্যতা ক্রয় বা হস্তান্তর করা ছাড়া আপনার পক্ষে এখানকার ডিষ্ট্রিবিউটর হওয়ার কোন সুযোগ নেই।
সহজ করে বুঝার জন্য বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত “ইসলামের দৃষ্টিতে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং ব্যবসা” বই হতে ছক আকারে বিষয়টি তুলে ধরা হল।
—————————————-A
১ম লেভেল ———-B———————————-C
২য় লেভেল —D———–E——————-F————-G
৩য় লেভেল –H-I———J-K—————–L-M———-N-O
৪র্থ লেভেল PQ-RS–TU-VW–XY-Z AB– BC CD– DE EFপূর্বের ছকটির আলোকে ধরা যাক, একটি কোম্পানী নির্ধারিত পণ্য বিক্রয়ের উপর নিম্ন হারে কমিশন দিয়ে থাকে।A নামক এক ব্যক্তি যখন B ও C নামের দু’ব্যক্তিকে ক্রেতা-পরিবেশক বানাল তখন সে পেল ৬০০ টাকা। এরপর ২য় লেভেলের ৪ জন যোগ হওয়ায় প্রথম ব্যক্তি (A) পেল ১২০০ টাকা। আর B ও C প্রত্যেকে পেল ৬০০ টাকা করে ১২০০ টাকা। এরপর ৩য় লেভেলের ৮ জন (২য় লেভেলের ব্যক্তিদের মাধ্যমে) কোম্পানীর ক্রেতা-পরিবেশক হওয়ায় প্রথম ব্যক্তি পেল আরো ৩৬০০ টাকা এবং ২য় (১ম লেভেল-B ও C ) ২ জনের প্রত্যেকে পেল ১২০০ টাকা করে ২৪০০ টাকা। আর ২য় লেভেলের ৪ জনের প্রত্যেকে পেল ৬০০ টাকা করে ২৪০০ টাকা। এরপর ৪র্থ লেভেলের ১৬ জন (৩য় লেভেলের লোকদের মাধ্যমে) ক্রেতা-পরিবেশক হওয়ায় ১ম ব্যক্তি A পাবে ৭২০০ টাকা, ২য় ২ জনের (১ম লেভেলের B ও C) প্রত্যেকে পাবে ৩৬০০ টাকা করে ৭২০০ টাকা, ২য় লেভেলের ৪ জনের প্রত্যেকে পাবে ৬০০ টাকা করে ২৪০০ টাকা, ৩য় লেভেলের ৮ জনের প্রত্যেকে পাবে ৬০০ টাকা করে ৪৮০০ টাকা।
(উল্লেখ্য এখানে টাকার অংক উদাহরণস্বরূপ দেখানো হয়েছে যা প্রতিষ্ঠানভেদে ব্যতিক্রম হতে পারে)। সূত্র- বেফাক।
এমএলএম পদ্ধতির ব্যবসা হারাম ও নাজায়েজ :
এমএলএম (মাল্টিলেভেল মার্কেটিং) কারবারে শরীয়ত নিষিদ্ধ অনেকগুলো বিষয় যুক্ত হওয়ার কারণে উক্ত পদ্ধতির ব্যবসাটি সম্পূর্ণরূপে নাজায়েজ ও হারাম। যেমন এতে রয়েছেঃ-
১. শর্তসহ ইজারা চুক্তি
২. শর্তসহ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি
৩. ধোকা বা গারার
৪. শ্রমবিহীন বিনিময়
৫. বিনিময়বিহীন শ্রম
৬. জুয়া বা কেমার
৭. সুদের সন্দেহ
৮. বিদেশী পণ্য দ্বারা বাজার প্রভাবিতকরণ।উক্ত বিষয়গুলো শরীয়ত নিষিদ্ধ। নিম্নে এক একটি করে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করা হল।
শর্তসহ ইজারাচুক্তি :
উল্লিখিত বর্ণনা ও উদ্ধৃতি দ্বারা বুঝা গেল কোম্পানী শুধু পণ্য বিক্রি করছে না, সাথে সাথে ক্রেতা-পরিবেশকও হয়ে যাচ্ছ। অপরদিকে কেউ যদি পরিবেশক বা ডিলার হতে চায় তাহলে সে ডিলার হতে পারছে না। ডিলার হওয়ার জন্য পণ্য কিনা শর্ত। তাদের ভাষায় ডিলার/পরিবেশক/ডিষ্ট্রিবিউটর বা অন্য কোন নাম হলেও ফিকাহ শাস্ত্রের ভাষায় মূলত ঐ ব্যক্তি আজির বা দালাল এর অন্তর্ভুক্ত। এ ধরণের ডিষ্ট্রিবিউটর নিয়োগকে ইসলামী ফিকাহর ভাষায় “আকদে ইজারা” বা ইজারা চুক্তি বলা হয়। ইজারা চুক্তি সম্পন্ন করার জন্য পণ্য ক্রয় (عقد بيع) শর্ত করা হল। এখানে এক চুক্তির মাধ্যমে দুই চুক্তি হয়ে গেল। যাকে হাদীস ও ফেকাহ শাস্ত্রের ভাষায় “ صفقتان في صفقة “ এক চুক্তির মাঝে দুই চুক্তি” বলা হয়। এই ধরণের কারবার হাদীসের নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত হওয়ার কারণে নাজায়েজ। নিম্নে এ সংক্রান্ত কয়েকটি হাদীস অনুবাদসহ উল্লেখ করা হল।
نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم عن صفقتين في صفقة واحدة. رواه أحمد في مسنده ج1 ص398 ، وقال الهيثمي في مجمع الزوائد ج4 ص48 رجال أحمد ثقات.
একই চুক্তিতে দুটি চুক্তি করা থেকে নবীজী (সাঃ) নিষেধ করেছেন। মুসনাদে আহমদ, খন্ড১, পৃঃ৩৯৮।
ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে আরেকটি হাদীসে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজী (সাঃ) ইরশাদ করেন-
لا تحل صفقتان في صفقة. رواه الطبراني في المعجم الأوسط ج1 ص32 وابن خزيمة في صحيحه برقم 176
একই আকদে দুই আকদ করা হালাল নয়। তাবারানী খন্ড১, পৃঃ৩২, ইবনে খুযাইমা, হাদীস নং ১৭৬।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন-
صفقتان في صفقة ربا. أخرجه ابن أبي شيبة ج8 ص192 ، وإسناده صحيح. إرواء الغليل ج5 ص148
একই আকদে দু’টি আকদ করা এক প্রকার সুদ। ইবনে আবী শায়বা, খন্ড৮, পৃঃ১৯২।
تفسد الإجارة بالشروط المخالفة لمقتضى العقد ، فكل ما أفسد البيع مما مر يفسدها. الدر المختار ج3 ص46
আকদে ইজারার প্রাসঙ্গিক নয় এমন শর্তারোপে ইজারা ফাসিদ হয়। তাই পূর্বে বিবৃত যে সব বিষয় বেচাকেনা চুক্তি তথা আকদে বাইকে ফাসিদ করে দেয় সেগুলো ইজারা চুক্তিকেও ফাসিদ করে দেয়। (দুররুল মোখতার, খন্ড৩ পৃঃ৪৬)।
একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কোম্পানী কর্তৃক ডিলার বা ডিস্ট্রিবিউটর তথা দালাল নিযুক্তির সাথে কোম্পানী থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য ক্রয়ের শর্তারোপ সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক একটি শর্ত। তাছাড়া এতে রয়েছে বিক্রেতা পক্ষ বা কোম্পানীর স্বার্থ। তাই এ শর্তের কারণে ইজারা চুক্তিটি ইসলামী শরীয়ার দৃষ্টিতে ফাসিদ বলে গণ্য হবে। এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
শর্তসহ ক্রয়-বিক্রয়চুক্তি :
মাল্টিলেভেল মার্কেটিং পদ্ধতিতে যেমন রয়েছে শরীয়ত নিষিদ্ধ শর্তসহ ইজারা চুক্তি (إجارة مع العقد) তেমনি রয়েছে শর্তসহ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি (بيع مع الشرط)।
ক্রয়-বিক্রয়ের মূলনীতি হল, ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যে যদি ক্রয়-বিক্রয় প্রসঙ্গ নয় এমন কোন শর্ত লাগানো হয় যাতে ক্রেতা বা বিক্রেতার স্বার্থ জড়িত থাকে তা বিক্রিত পণ্যের (তা প্রাণী জাতীয় হলে) স্বার্থ জড়িত থাকে তাহলে ক্রয়-বিক্রয় ফাসিদ হয়ে যায়। যেমন হেদায়া গ্রন্থ প্রণেতা এ মর্মে লিখেন-
كل شرط لا يقتضيه العقد وفيه منفعة لأحد المتعاقدين أو للمعقود عليه وهو من أهل الاستحقاق يفسده. الهداية ج3 ص34
” যে শর্ত ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তির প্রাসঙ্গিক নয়, অথচ এতে ক্রেতা-বিক্রেতা কোন একজনের বা বিক্রিত পণ্যের (জীবজন্তু হওয়ার ক্ষেত্রে) স্বার্থ জড়িত থাকে তাহলে এরূপ শর্ত আকদে বাইকে (ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি) ফাসিদ করে দেয়। ” হেদায়া, খন্ড৩, পৃঃ৩৪।
এ মর্মে আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে-
نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم عن بيع وشرط. رواه الطبراني في المعجم الأوسط والحاكم في علوم الحديث كذا في نصب الراية ج4 ص17.
রাসূলুল্লাহ (সঃ) শর্তারোপ করে বেচা-কেনা থেকে নিষেধ করেছেন। তাবারানী আলমুজামুল আওসাত ও হাকিম উলুমুল হাদিস গ্রন্থে। নাসবুর রায়াহ গ্রন্থেও এরূপ বর্ণিত আছে। খন্ড৪ পৃঃ১৭।
মাল্টিলেভেল মার্কেটিং এর প্রচলিত ব্যবসা পদ্ধতিতে বিক্রেতার পক্ষ থেকে ডিলারশীপ পাওয়ার শর্তটি অপ্রাসঙ্গিক হওয়ার সাথে সাথে ক্রেতার জন্য লাভজনক একটি শর্ত। তাই এ শর্তারোপের দরুণ ক্রয়-বিক্রয়টি অবশ্যই ফাসিদ, অবৈধ ক্রয়-বিক্রয় বলে গণ্য হবে।
ধোকা বা গারার :
এমএলএম পদ্ধতির ব্যবসা নাজায়েজ হওয়ার আরেকটি কারণ হল ধোকা যার আরবী শব্দ গারার। হাদীস নিষিদ্ধ ধোকা বা গারার সম্বলিত হওয়ার কারণে এ পদ্ধতির ব্যবসা নাজায়েজ। ধোকা বা গারার এর সংজ্ঞা নিম্নে দেয়া হল।
ইমাম সারাখসী (রঃ) বলেন-
الغرر ما يكون مستور العاقبة
” যার পরিণাম লুকায়িত (অস্পষ্ট) তাই গারার।” কিতাবুল মাবসুত, খন্ড১২ পৃঃ১৯৪।
ইমাম কাসানী (রঃ) বলেন-
الغرر هو الخطر الذي استوى فيه طرف الوجود والعدم بمنزلة الشك
“গারার হচ্ছে এমন একটি অনিশ্চয়তা যাতে হওয়া এবং না হওয়া উভয় দিকই সন্দেহের সাথে বিদ্যমান থাকে।” বাদায়েউস সানায়ে, খন্ড৪, পৃঃ৩৬৬।
ইমাম সীরাজী (রঃ) বলেন-
الغرر من انطوى عنه أمره وخفي عليه عاقبته
“পরিণাম অজানা থাকাই গারার।” শরহুল মুহাযযাব, খন্ড৯ পৃঃ৩১০।
ইমাম ইবনুল আসীর জাযারী (রঃ) বলেন-
الغرر ما له ظاهر تؤثره وباطن تكرهه ، فظاهره يغر المشتري ، وباطنه مجهول.
“যার এমন একটি প্রকাশ্য রূপ রয়েছে যা দ্বারা মানুষ এর প্রতি আকৃষ্ট হয়, কিন্তু এর মধ্যে এমন অদৃশ্য কারণ রয়েছে যে কারণে তা অস্পষ্ট। অতএব এর প্রকাশ্য রূপ ক্রেতাকে ধোকায় ফেলে। আর এক ভিতরের রূপ অজানা।” জামেউল উসুল, খন্ড১ পৃঃ৫২৭।
ইমাম ইবনুল কাইয়ুম জাওযী (রঃ) বলেন-
بيع الغرر هو بيع ما لم يعلم حصوله أو لا يقدر على تسليمه أو لا يعرف حقيقة مقداره
“বায়উল গারার ঐ কারবারকে বলা হয় যাতে পণ্য বা সেবা পাওয়া যাবে কিনা তা অনিশ্চিত অথবা চুক্তিভুক্ত ব্যক্তি নিজে তা যোগান দিয়ে অক্ষম অথবা যার পরিমাণ অজানা।” যাদুল মাআদ, খন্ড৫ পৃঃ৭২৫।
উল্লেখিত সংজ্ঞাগুলো দ্বারা বুঝা যায়, হওয়া বা না হওয়ার অনিশ্চয়তার নামই হল ধোকা বা গারার। আর এটি যে কারবারে বিদ্যমান থাকবে সে কারবারই হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী নিষিদ্ধ হবে।
এমএলএম পদ্ধতির ব্যবসানীতিতেও ধোকা বা গারার রয়েছে। কারণ তাদের নীতিমালা অনুযায়ী প্রথম ডিষ্ট্রিবিউটর লোকটি তার ডাউন লেভেল থেকে কমিশন লাভ করতে থাকবে। অথচ তার নিজের বানানো দু’ব্যক্তি ব্যতিত অন্যদের বিষয়টি সম্পূর্ণই অনিশ্চিত এবং অন্যের কাজের উপর নির্ভরশীল। কারণ তার নিচের নেটগুলোর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অগ্রসর না করলে লোকটি কমিশন পাবে না, যে কমিশনকে কেন্দ্র করে সে কোম্পানীর সাথে যুক্ত হয়েছে।
نقل أبراهيم الحربي أنه سئل عن الرجل يكتري الديك ليوقظه لوقت الصلاة ، لا يجوز ، لأن ذلك يقف على فعل الديك ، ولا يمكن استخراج ذلك منه بضرب ولا غيره ، وقد يصيح ، وقد لا يصيح ، وربما صاح بعد الوقت ، نقله الإمام شمس الدين بن قدامة المقدسي في الشرح الكبير على متن المغني ج3 ص319 (باب الإجارة)
ইবরাহীম হারবী (রঃ) বর্ণনা করেন, তাকে প্রশ্ন করা হলো ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে যে একটি মোরগ ভাড়া করে তাকে নামাযের সময় ঘুম থেকে সজাগ করার জন্য। তিনি উত্তর দিলেন- “জায়েজ হবে না। কারণ এটা মোরগের মরজির ওপর নির্ভরশীল। তার থেকে মারপিট বা অন্য কোন পন্থায় আওয়াজ বের করা সম্ভব না। কোন সময় আওয়াজ করবে, আবার কখনো কখনো করবে না, কখনো বা নামাজের সময়ের পরে আওয়াজ করবে।” শারহুল কাবীর, খন্ড৩ পৃঃ৩১৯।
সুতরাং এখানে যেমন মোরগ থেকে উপর্কৃত হওয়া অনিশ্চিত হওয়ার কারণে ইজারা চুক্তিটি নাজায়েজ হয়েছে, এমএলএম কারবারেও নীচের লেভেলের মাধ্যমে কমিশন পাওয়া অনিশ্চিত হওয়ার কারণে ইজারা চুক্তিটি নাজায়েজ হবে।শ্রমবিহীন বিনিময় :
এমএলএম (মাল্টিলেভেল মার্কেটিং) পদ্ধতির ব্যবসাটি নাজায়েজ হওয়ার আরেকটি কারণ হল এতে রয়েছে শ্রমবিহীন বিনিময় ও বিনিময়হীন শ্রম যা শরীয়ত সমর্থন করে না।
এমএলএম (মাল্টিলেভেল মার্কেটিং) পদ্ধতির নীতিমালায় রয়েছে যে, কোন ব্যক্তি নির্ধারিত মূল্যের পণ্য খরিদ করে ক্রেতা-পরিবেশক হওয়ার পর সে যদি দু’জন ক্রেতা কোম্পানীর জন্য নিয়ে আসে এবং তারা প্রত্যেকে আরো চারজঙ্কে এবং এ চারজন আরো আটজনকে কোম্পানীর সাথে যুক্ত করে তবে প্রথম ব্যক্তি এবং দ্বিতীয় লেভেলের দুই ব্যক্তি নিম্ন লেভেলের আট ব্যক্তি ক্রেতা-পরিবেশকের সুবাদেও কোম্পানী থেকে কমিশন পেয়ে থাকে।
অথচ এ আটজনের কাউকেই তারা (প্রথম ব্যক্তি এবং ২য় স্তরের দু’জন) কোম্পানীর সাথে যুক্ত করেনি, বরং সংশ্লিষ্ট কোম্পানীগুলোর আইন অনুযায়ী এরা কোম্পানীর সাথে যুক্ত হয়েছে এবং নির্ধারিত হারে কমিশন পাচ্ছে। বুঝা গেল এমএলএম কারবারে শ্রমবিহীন বিনিময় বিদ্যমান।বিনিময়হীন শ্রম :
এমনিভাবে এতে রয়েছে বিনিময়হীন শ্রম। কেননা, কোম্পানীর নীতিমালা অনুযায়ী কেউ যদি নির্ধারিত পয়েন্টের একজন ক্রেতা জোগাড় করে। কিন্তু আরেকজন জোগাড় করতে না পারে অর্থাৎ ডান ও বাম উভয় দিকের নেট না চলে, সে কমিশন পায় না। এমনিভাবে কেউ যদি দু’জন ক্রেতাও কোম্পানীকে এনে দেয়, কিন্তু তারা কোম্পানীর নির্ধারিত পয়েন্ট থেকে কম পয়েন্টের মালামাল খরিদ করে তাও ঐ ব্যক্তি কমিশন পায় না। যেমন ডেসটিনি-২০০০ লিঃ এবং সেপ বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেডের নিয়ম অনুযায়ী একজন ব্যক্তিকে তার ডান এবং বাম উভয় পাশে দু’জনের নিকট নূয়নতম ৫০০ করে ১০০০ পয়েন্টের পণ্যের ক্রেতা আনতে হয়। যদি কেউ একজন ক্রেতার নিকট ৫০০ পয়েন্টের পণ্য বিক্রি করাল কিন্তু অন্যজন আনতে ব্যর্থ হল তবে এর জন্য লোকটি কোন কমিশন পাবে না। এমনিভাবে যদি কোন ক্রেতা-পরিবেশক উভয় পাশে ১০০ পয়েন্ট করে ২০০ পয়েন্ট পরিমাণ পণ্যের ২জন ক্রেতা কোম্পানীকে এনে দেয় তবে ঐ ২০০ পয়েন্ট বিক্রির জন্য লোকটি কোম্পানী থেকে কমিশন পাবে না। কিন্তু ঐ দু’জন কোম্পানীর (অন্তর্বর্তীকালীন) পরিবেশক হিসাবে যুক্ত হয়ে তাদের নেট অগ্রসর করার সুযোগ পেয়ে যায়। সুতরাং এ কারবারে রয়েছে বিনিময়হীন শ্রম।
শ্রমবিহীন বিনিময় ও বিনিময়হীন শ্রম এ দু’টিই বাতিল পন্থায় উপার্জন। কেননা, আকদে ইজারার দু’টি মৌলিক দিক রয়েছে।
১ শ্রম
২ বিনিময়এই দু’টি বিষয় সুস্পষ্ট থাকা এই আকদের অপরিহার্য শর্ত। দু’টির একটিও যদি পাওয়া না যায় তাহলে তা ফাসেদ হয়ে নিষিদ্ধ তালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।
কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
ولا تأكلوا أموالكم بينكم بالباطل
তোমরা বাতিল পন্থায় একে অন্যের সম্পদ খেয়ো না। (সূরা বাকারা ১৮৮, সূরা নিসা ২৯)
বিখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং প্রখ্যাত তাবেঈ হযরত হাসান বসরী (রঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন
أن يأكله بغير عوض অর্থাৎ (বিনিময়ের শর্তযুক্ত আকদে) বিনিময়হীন উপার্জনই হল বাতিল পন্থায় উপার্জন। আহকামুল কুরআন, জাসসাসঃ ২/১৭২।
এমএলএমকারবারজুয়ারএকপ্রকার :
এমএলএম কারবার নাজায়েজ হওয়ার আরেকটি কারণ হলো এ পদ্ধতির ব্যবসাও এক প্রকার জুয়া। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রঃ) গারার এর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন-
الغرر هو مجهول العاقبة ، فإن بيعه من الميسر الذي هو القمار
যে কারবারের পরিণাম অজানা সে কারবার জুয়ার শামিল। তাকে কেমার বা মাইসির (জুয়া)ও বলা হয়। কুরআন পাকে আল্লাহতায়ালা জুয়াকে হারাম করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে-
إنما الخمر والميسر والأنصاب والأزلام رجس من عمل الشيطان فاجتنبوه
মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্রকার্য বৈ তো আর কিছু নয়। সুতরাং এগুলো থেকে বেঁচে থাক। (সূরা মায়েদা ৯০)
এমএলএম কারবারে যে ক্রেতা-পরিবেশক হবেন তিনি কোম্পানীর নীতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ মূল্যের দু’জন ক্রেতা যোগাড় করতে পারবেন কিনা? পরিণাম অনিশ্চিত, তাই জুয়ার সাদৃশ্য হয়ে হারাম হবে।
বাজার প্রভাবিতকরণ :
এমএলএম নাজায়েজ হওয়ার আরেকটি কারণ বহির্শক্তি দ্বারা বাজার প্রভাবিতকরণ। এ ধরণের ব্যবসাগুলোর মূল উদ্দেশ্য পণ্য কেনা-বেচা নয়। আসল উদ্দেশ্য হলো কোম্পানীর ডিস্ট্রিবিউটর সেজে কোম্পানী থেকে সুযোগ-সুবিধা লাভ করা। অর্থাৎ কমিশন অর্জন করা। এ ধরণের কোম্পানীর নিকট পণ্যের গুণগতমান বিবেচ্য নয়। এবং এ নিয়ে তাদের প্রতিযোগিতায়ও পড়তে হয় না। বরং কমিশনের লোভ দেখিয়ে গুণগত বিষয় থেকে পার পেয়ে যায়। তাদের এ পদ্ধতি সহজেই বাজারের সাধারণ গতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। এবং ক্রেতাগণ টাকার লোভে তাদের দিকে ঝুকে পড়ে। আর সাধারণ পদ্ধতিতে একজন ক্রেতা পণ্যের গুনাগুণ যাচাই করার সুযোগ পায় বিধায় পণ্য বিক্রেতাকে পণ্যের গুণাগুণের প্রতিযোগিতায় পড়তে হয়। এমএলএম পদ্ধতি এর বিপরীত। এ পদ্ধতিতে কমিশনের কারণে বাজার একপেশে হয়ে যায়। এবং পণ্যের গুণগতমান এবং ক্রেতার স্বাধীন যাচাই বাছাইয়ের সুবিধা হ্রাস পায় যা ইসলাম পছন্দ করে না। কারণ ক্রয়-বিক্রয় ও যাবতীয় চুক্তির ক্ষেত্রে ইসলামী নীতি হলো- বাজার নিয়ন্ত্রিত হবে পণ্যের গুণগতমান ও ক্রেতা-বিক্রেতার সরাসরি উপস্থিতিতে। অন্য কোন পন্থায় বাজার প্রভাবিত করা শরীয়তে নিষিদ্ধ। এ জন্যেই তো বাজারে প্রবেশের আগেই রাস্তায় গিয়ে বিক্রেতা থেকে পণ্য কিনে এনে বাজারে বিক্রয় করাকে এবং গ্রাম্য ব্যক্তির পক্ষ হয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করাকে শরীয়ত নিষেধ করেছে। হুজুর (সাঃ) ইরশাদ করেন-
أن النبي صلى الله عليه وسلم نهى أن يبيع حاضر لباد
হুজুর (সাঃ) শহুরে ব্যক্তিকে গ্রাম্য ব্যক্তির উকিল হয়ে বেচাকেনা করতে নিষেধ করেছেন। (মুসলিম)
نهى النبي صلى الله عليه وسلم أن يتلقى الجلب
হুজুর (সাঃ) কোন কাফেলা মালামাল নিয়ে শহরে প্রবেশ করার আগেই সেই মাল কেনার থেকে নিষেধ করেছেন। মুসলিম
সুদের সন্দেহ ও সাদৃশ্য :
এমএলএম পদ্ধতি কারবার নাজায়েজ হওয়ার আরেকটি কারণ হল এতে শরীয়তে নিষিদ্ধ شبهة الربا বা সুদের সন্দেহ এবং সাদৃশ্য রয়েছে। অথচ এমন কারবার বর্জন করার সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে শরীয়তে। খলীফায়ে রাশেদ হযরত উমর (রাঃ) বলেন دعوا الربا والريبة “তোমরা সুদ বর্জন কর এবং এমন জিনিসও বর্জন কর যাতে সুদের সন্দেহ রয়েছে।” মুসনাদে ইমাম আহমদ ১/৩৬,৫০ হাদীস ২৪৬, ৩৫০। সুনানে ইবনে মাজা ২/৭৬৪ হাদীস ২২৭৪। এই উক্তি এবং শরীয়তের অন্যান্য দলীলের আলোকে ফুকাহায়ে কেরাম এমন বহু কারবারকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন যেগুলোতে সুদের সন্দেহ ও সাদৃশ্য রয়েছে।
এমএলএম এ শুবহাতুর রিবা বা সুদের সাদৃশ্য :
আলোচিত মাল্টিলেভেল বা নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতিতে শরীয়তে নিষিদ্ধ সুদের সন্দেহ ও সাদৃশ্য পরিস্কারভাবে বিদ্যমান যার দরুণ এ কারবার নাজায়েজ ও বর্জনীয়।
একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি বুঝা যাক। মনে করি জাকের নামের এক ব্যক্তি ডেসটিনি-২০০০ লিঃ থেকে ১০,০০০ টাকা দিয়ে একটি পণ্য নিল (যার পয়েন্ট ৫০০) এবং নিয়ম অনুযায়ী সে ডিস্ট্রিবিউটরশীপ পেল এবং সে আরো দু’জন ক্রেতা জোগাড় করার মাধ্যমে কমিশন পেল ৬০০ টাকা। এরপর এ দু’জনের বানানো চার ব্যক্তির কারণে আরো পেল ১২০০ টাকা।(এরপর তো কমিশন ও বোনাস চালু থাকছেই)। বলা বাহুল্য, এ সকল সুবিধাই জাকেরকে উদবুদ্ধ করেছে এ কোম্পানীর পণ্য কিনতে। তাহলে দেখা যাচ্ছে সে ১০,০০০ টাকা শুধু ঐ পণ্যটির জন্য দেয়নি বরং তা দেওয়ার পিছনে তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ঐ কমিশন বা বোনাসগুলো পাওয়া। আর স্বভাবতই তা (পণ্য ও কমিশন) লোকটির দেওয়া টাকা থেকে বেশি যা পরিস্কারভাবেই সুদের সন্দেহ সৃষ্টি করে।
তাছাড়া এমএলএম প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতি ও বক্তব্য বিষয়টিকে আরো পরিস্কার করে তোলে। কোন একটি কোম্পানীর পণ্য তালিকা হাতে নিলেই দেখা যাবে তাতে পণ্যের নাম ও মূল্যের পাশাপাশি আরেকটি সংখ্যাও উল্লেখ রয়েছে যার নাম দেয়া হয়েছে পয়েন্ট। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি নির্ধারিত মূল্য প্রদান করলে সে শুধু পণ্যই পাচ্ছে না, পাচ্ছে নির্ধারিত সংখ্যার পয়েন্টও; যা তাকে পরবর্তীতে কমিশন পেতে সাহায্য করবে। এবং তার উপরের লেভেলের ব্যক্তিদেরকে প্রদান করবে নির্ধারিত কমিশন।
এখন যদি কেউ নেট চলার কারণে কমিশন পায় তাহলে বোঝা যাবে, নির্ধারিত টাকার মোকাবেলায় নেওয়া পণ্যের সাথে যে পরিবেশক স্বত্বটি সে পেয়েছে এটির ফলেই সে কমিশন পাচ্ছে, যা সুস্পষ্ট সুদ সাদৃশ্য। অন্যদিকে যদি কারো নেট একেবারেই অগ্রসর না হয় তবে সে ক্ষেত্রেও সুদের সন্দেহ থাকছেই। কারণ, সে তো টাকা দিয়েছিল দু’টি উদ্দেশ্যে।
১ পণ্যের জন্য
২ পরিবেশক হয়ে কমিশন পাওয়ার জন্য।অথচ ২য়টির কোন সুবিধাই সে পায়নি। অর্থাৎ কিছু টাকা বিনিময়ের অতিরিক্ত থেকেই যাচ্ছে যা শরীয়তের দৃষ্টিতে সন্দেহমূলক সুদ এর আওয়াভুক্ত হয়ে অবশ্যই নাজায়েজ ও বর্জনীয়।
উল্লেখ্য যে, কোন কোন এমএলএম কোম্পানী তাদের সদস্য হওয়ার জন্য পণ্য খরিদের পাশাপাশি নির্ধারিত সংখ্যক নগদ টাকা প্রদানেরও শর্ত করে থাকে। (যেমনঃ নিউওয়ে, ড্রিম বাংলা)। আর এ ক্ষেত্রে ঐ কারবারে সুদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। – সূত্র বেফাক।
Note: This article is free from the editorial policy of this blog and does not necessarily hold the view of ‘Return of Islam’
হুক্ম শর’ঈ
নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘নিযামুল ইসলাম’ বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে গৃহীত
হুক্ম শর’ঈ হচ্ছে, বান্দা’র (‘ঈবাদ) কার্যাবলী সম্পর্কে আইনপ্রণেতা’র (আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার) বক্তব্য। বক্তব্যটি হতে পারে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত (ক্বাত’ঈ ছুবুত) অর্থাৎ কোন দ্বিমতের অবকাশ নেই যথা কুরআন ও হাদীস মুতাওয়াতির অথবা অমীমাংসিতভাবে প্রমাণিত (জন্নিঈ ছুবুত) অর্থাৎ একাধিক মতের অবকাশ রয়েছে যথা অ-মুতাওয়াতির হাদীস সমূহ। যদি বক্তব্যটি ক্বাত’ঈ ছুবুত হয়, তবে এর অর্থ নির্দিষ্ট (ক্বাত’ঈ দালালাহ) এবং হুকুমটি চূড়ান্ত, অর্থাৎ এ নিয়ে কোন দ্বিমত নেই। এরূপ একটি উদাহরণ হচ্ছে ফরজ সালাতের রাকাতের সংখ্যা, কারণ হাদীস মুতাওয়াতিরে এর উল্লেখ রয়েছে। অনুরূপভাবে রিবা নিষিদ্ধকরণ, চোরের হস্তচ্ছেদ, যিনাকারীর (ব্যভিচারকারী) শাস্তি বেত্রাঘাত, ইত্যাদি প্রত্যেকটিই চূড়ান্ত বিধান, এদের সত্যতা নির্দিষ্ট এবং চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত মতামত (দ্বিমত নেই)।
যদি আইনপ্রণেতা’র বক্তব্য ক্বাতঈ সুবুত অথচ একটি মাত্র নির্দিষ্ট অর্থ প্রকাশক না হয় (জন্নিই দালালাহ), তবে হুকম টি অমীমাংসীত (অর্থাৎ এ নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে)। উদাহরণ স্বরূপ কুরআনে উল্লেখিত জিযিয়া সংক্রান্ত আয়াতটি উল্লেখ্য। আয়াতটি ক্বাত’ঈ ছুবুত কিন্তু তার অর্থ নির্দিষ্ট নয়। হানাফী স্কুলের শর্তানুসারে, একে জিযিয়া বলা বাধ্যতামূলক এবং তা আদায়করার সময় প্রদানকারীর অবমাননাকর অবস্থায় থাকা বাধ্যতামূলক। শাফে’ঈ স্কুলের শর্তানুযায়ী এটিকে জিযিয়া বলা বাধ্যতামূলক নয়, এবং একে দ্বৈত যাকাত বলা যায়। এই স্কুলের মতানুসারে এটি প্রদানের সময় প্রদানকারীর অবমাননাকর অবস্থাকে বাধ্যতামূলক করা হয়নি, বরং ইসলামী বিধানের অধীন হওয়াই তাদের জন্য যথেষ্ট অবমাননাকর বলে বিবেচিত হয়।
যদি আইনপ্রণেতার বক্তব্য জন্নিই ছুবুত হয়, যেমন অ-মুতাওয়াতির হাদিস, তখন অর্থ ক্বাত’ঈ দালালাহ হোক বা না হোক, এ সংক্রান্ত হুক্ম চূড়ান্তভাবে মীমাংসিত হবেনা, অর্থাৎ এ বিষয়ে দ্বিমত থাকতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ, শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা (রাখা) কিংবা কৃষিভূমি ইজারা (লীজ) দেয়ার নিষিদ্ধতার বিষয়টি।
আইন প্রণেতার বক্তব্য থেকে সঠিক ইজতিহাদের মাধ্যমে হুক্ম শর’ঈ কে অনুধাবন করা হয়। এভাবে একজন মুসলিম, একজন মুজতাহিদের ইজতিহাদের মাধ্যমে হুক্ম শরঈ সম্পর্কে অবগত হয়। সকল মুজতাহিদের ব্যপারে আল্লাহ’র হুক্ম হচ্ছে, মুজতাহিদ ইজতিহাদের মাধ্যমে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন এবং যা তার নিকট সর্বাধিক সঠিক বলে প্রতীয়মান হয় সেটিই তার জন্য হুক্ম। ঊলামাগণ এ বিষয়ে একমত যে, যদি একজন মুকাল্লাফ (শরীয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি) কোন এক বা একাধিক প্রশ্নে ইজতিহাদ করার যোগ্যতা অর্জন করেন এবং এভাবে কোন একটি বিষয়ে কোন হুক্ম এ উপনীত হন, তখন ঐ বিষয়ে অন্য মুজতাহিদিনদের অনুসরণ করা তার জন্য অনুমোদিত নয়। কারণ সেক্ষেত্রে তার জন্য এটি এমন একটি মতামতের তাকলীদ করা হবে, যা তার নিকট সর্বাপেক্ষা সঠিক বলে প্রতীয়মান হয়নি।
মুকাল্লিদ মুত্তাবী হচ্ছে এমন এক ব্যক্তি যিনি ইজতিহাদ সম্পর্কে কিছু জ্ঞান অর্জন করেছেন, এবং দলীল অনুধাবন করার পর কোন হুক্ম অনুসরণ করেন। একজন মুত্তাবী’র জন্য তার অনুসৃত মুজতাহিদের মতামতই তার জন্য আল্লাহর হুক্ম। মুকাল্লিদ আম্মি হচ্ছেন এরূপ ব্যক্তি যার ইজতিহাদ সম্পর্কে তেমন কোন জ্ঞান নেই, কাজেই তিনি হুক্ম সংক্রান্ত দলীল অনুধাবন করা ছাড়াই একজন মুজতাহিদের মতামত অনুসরণ করেন। আম্মি মুজতাহিদের মতামত অনুসরণ করেন ও তিনি (মুজতাহিদ) যে আহকাম এ উপনীত হয়েছেন তা বাস্তবায়ন করেন। তার জন্য হুক্ম শর’ঈ হচ্ছে তার অনুসৃত মুজতাহিদের গৃহীত সিদ্ধান্ত ও মতামত অনুসরণ করা।
কাজেই হুক্ম শর’ঈ হচ্ছে ইজতিহাদ করার যোগ্যতা সম্পন্ন কোন মুজতাহিদের ইজতিহাদ লব্ধ হুক্ম। এটিই তার জন্য আল্লাহর হুক্ম এবং তার এটি ছেড়ে অন্য মতামত গ্রহণ করার অনুমতি নেই। এটি একজন মুজতাহিদের অনুসারীর (মুকাল্লিদ) জন্যও আল্লাহর হুক্ম এবং এটি পরিত্যাগের অনুমতি নেই।
যদি কোন মুকাল্লিদ একটি বিষয়ে (ইস্যুতে) হুকুমের জন্য একজন মুজতাহিদের মতামত পালন করে থাকেন তবে তার পক্ষে সেটি পরিত্যাগ করে উক্ত বিষয়ে অন্য মুজতাহিদের মতামত গ্রহণ করার অনুমতি নেই। অবশ্য একজন মুকাল্লিদের জন্য অন্য কোন বিষয়ে (ইস্যুতে) অন্য মুজতাহিদের মতামত অনুসরণ করার অনুমতি রয়েছে, কারণ ইজমা-আস-সাহাবা একজন মুকাল্লিদকে ভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন আলিমের মতামত জানবার অনুমতি দিয়েছে। যদি কোন মুকাল্লিদ একটি নির্দিষ্ট মাযহাবের যেমন শাফিঈ, এর অন্তর্গত হন এবং সম্পূর্ণ মাযহাব অনুসরণের সিদ্ধান্ত নেন, তবে তার জন্য নিম্নলিখিত বিষয় প্রযোজ্য হবে: ঐ মুকাল্লিদ ইতিমধ্যে তার মাজহাব অনুযায়ী যে বিষয়গুলো পালন করেছেন সে বিষয়গুলোতে অন্য কোন মাযহাবের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন না। যে সকল বিষয় তিনি এখনো পালন করেননি, সে বিষয়ে অন্য মুজতাহিদিনদের অনুসরণ করতে পারেন। যদি কোন মুজতাহিদ কোন বিষয়ে ইজতিহাদের মাধ্যমে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে থাকেন, গোটা মুসলিম উম্মাহর সিদ্ধান্তের ঐক্যের স্বার্থে তিনি স্বীয় ইজতিহাদ লব্ধ সিদ্ধান্তকে পরিত্যাগ করে অন্য মতামত অনুসরণ করতে পারেন, যেমনটি ঘটেছিল হযরত উসমান (রা) এর বাইয়াতের সময়।
বস্তু ও কর্ম সমূহের মূল হুকুমের পার্থক্য

বস্তুর জন্য শর’ঈ হুকুম:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا
“তিনিই আল্লাহ, যিনি তোমাদের জন্য জগতের সকল বস্তু সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা বাকারা: ২৯)
তিনি আরো বলেন:
أَلَمْ تَرَوْا أَنَّ اللَّهَ سَخَّرَ لَكُمْ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَأَسْبَغَ عَلَيْكُمْ نِعَمَهُ ظَاهِرَةً وَبَاطِنَةً
তোমরা কি দেখ না আল্লাহ নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলে যাকিছু আছে, সবই তোমাদের কাজে নিয়োজিত করে দিয়েছেন এবং তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নেয়ামতসমূহ পরিপূর্ন করে দিয়েছেন? (সূরা লুকমান: ২০)
قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ قُلْ هِيَ لِلَّذِينَ آَمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا خَالِصَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآَيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ
আপনি বলুন: কে হারাম করেছে আল্লাহর সাজ-সজ্জাকে, যা তিনি বান্দাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন এবং পবিত্র খাদ্রবস্তুসমূহকে? আপনি বলুন: এসব নেয়ামত আসলে পার্থিব জীবনে মুমিনদের জন্যে এবং কিয়ামতের দিন খাঁটিভাবে তাদেরই জন্যে। এমনিভাবে আমি আয়াতসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করি তাদের জন্যে যারা বুঝে। (সূরা আ’রাফ: ৩২)
এসকল আয়াতের মাধ্যমে মহান আল্লাহ আমাদের জন্য ভূপৃষ্ঠের সকল বস্তুকে মুবাহ (বৈধ) করে দিয়েছেন। আর এসকল আয়াত থেকে বস্তুসমূহের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত মূলনীতি গ্রহণ করা হয়েছে:
الاصل فى الأشياء الاباحة. مالم يرد دليل التحريم
“সকল বস্তুই হালাল যতক্ষণ না তার মধ্য থেকে কোনটা হারাম হওয়ার দলীল পাওয়া যাবে।”
অর্থাৎ বস্তু সমূহের বৈধ ও হালাল হওয়ার বিষয়টা আম (general)। এরপর এই বৈধতা তথা হালাল থেকে কোন বস্তুকে হারাম বা অবৈধ করতে হলে তার জন্য পৃথক প্রমাণ দিতে হবে।
এর উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত:
إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ وَالدَّمَ وَلَحْمَ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ
“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু, রক্ত, শুকরের মাংস এবং ঐ সকল প্রাণী -যাকে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছে।” (সূরা নাহল: ১১৫)
এই আয়াত দ্বারা মৃত জন্তু আমাদের জন্য হারাম সাব্যস্ত করা হয়েছে।
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে সকল বস্তু সমূহকে হালাল এবং হারাম এই দু’টি মানদণ্ডে ঘোষণা করেছেন। উত্তম, অপছন্দনীয় বা আবশ্যক বলে কোন ঘোষণা দেননি। যেমন বলা হয়েছে অপর আয়াতে:
وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَذَا حَلَالٌ وَهَذَا حَرَامٌ
“কোন বস্তু সম্পর্কে তোমরা অন্যায়ভাবে নিজেদের মুখে সেটি হালাল বা হারাম হওয়ার ঘোষণা করো না।” (সূরা নাহল: ১১৬)
একইভাবে অন্যত্র বলা হচ্ছে:
قُلْ أَرَأَيْتُمْ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ لَكُمْ مِنْ رِزْقٍ فَجَعَلْتُمْ مِنْهُ حَرَامًا وَحَلَالًا
“হে নবী আপনি বলে দিন, তোমরা কি ভেবে দেখেছো যে, মহান আল্লাহ তোমাদের জন্য যেই রিযক তৈরী করে দিচ্ছেন তার মধ্যে স্বেচ্ছাচারীভাবে কতককে তোমরা হালাল আর কতককে হারাম সাব্যস্ত করে নিচ্ছ?” (সূরা ইউনূস: ৫৯)
কর্ম সমূহের জন্য শর’ঈ হুকুম:
কোন বস্তু জায়েজ হওয়ার অর্থ কখনই এটা নয় যে, তার সাথে সম্পৃক্ত সকল কাজ এমনি এমনিই জায়েজ ও বৈধ হয়ে যাবে। বরং প্রত্যেকটি কাজের জন্য ভিন্ন দলীল লাগবে। শরীয়তের হুকুম বান্দার কাজ সম্পর্কিত শারে’ বা বিধান দাতার সেই সম্বোধন যা তার বিভিন্ন বিষয়াবলীর সমাধানের জন্য এসেছে। আর বস্তুসমূহের কাজ তো কেবল বিভিন্ন কর্মের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হওয়া। এজন্যই শরয়ী সম্বোধনের মূল লক্ষ্য হলো যাবতীয় আফআল বা কর্ম আর বিভিন্ন বস্তুসমূহ বান্দার কর্মের অন্তর্গত বিষয়; চাই এটা শর’ঈ সম্বোধনের মধ্যে উল্লেখ থাকুক বা না থাকুক।
উদাহরণ স্বরূপ: কাপড়, বস্তুসমূহের ক্ষেত্রে আম (general) হুকুমের কারণে মুবাহ বা বৈধ। কিন্তু এজন্য এই কাপড়ের যে কোন প্রকার ব্যবসাই স্বয়ং সম্পূর্ণভাবে বৈধ হয়ে যাবে না। বরং প্রথমে সেই ব্যবসার (তথা কাজটির) হুকুম জানতে হবে।
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
“আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (সূরা বাকারা : ২৭৫)
আমরা এই আয়াত থেকে ব্যবসা হালাল হওয়ার প্রমাণ পেলাম। এর দ্বারা আমরা কাপড়ের ব্যবসা হালাল বলেও জানতে পারলাম। এজন্য কাপড় বেচা-কেনা করা মুবাহ বা বৈধ জানবো। আর এটাই কাপড় বিক্রির এই কাজের হুকুম।
একইভাবে উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় ছুরি একটি বৈধ জিনিস। কেননা তার হারাম হওয়ার কোন দলীল নেই। হ্যাঁ, তবে এই ছুরি ব্যবহার করে অন্যায়ভাবে কোনো ঈমানদারের জন্য অন্য ঈমানদারকে হত্যা করা হারাম। যেমন বলা হয়েছে:
وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ
“আর যে কোন মুমিনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করবে তার শাস্তি হচ্ছে জাহান্নাম।” (সূরা নিসা : ৯৩)
কর্মসমূহের ক্ষেত্রে শরীয়তের কায়দা বা মূলনীতি হলো:
الاصل فى الافعال التقيد بالحكم الشرعى
“কর্মসমূহের ক্ষেত্রে শরীয়তের নিয়মাবলীর অনুসরণ করতে হবে।” এজন্যই মানুষের জন্য সকল কাজ মূল থেকেই হারামও নয় আবার বৈধও নয়। বরং প্রত্যেক কাজের ক্ষেত্রে তার বাস্তবায়ন ও চুড়ান্ত পরিণতির পূর্বে প্রথমেই তার হুকুম অনুসন্ধান করতে হবে। আর এ কাজটি অত্যন্ত জরুরী।
‘প্রত্যেক হুকুম তার শরয়ী দলীলের উপর নির্ভরশীল।’ এই মূলনীতির প্রমাণ হচ্ছে নিন্মোক্ত আয়াত:
فَوَرَبِّكَ لَنَسْأَلَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ ~ عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ
“আপনার রবের শপথ! আমি অবশ্যই অবশ্যই তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবো। যা তারা দুনিয়াতে করেছে।” (সূরা হিজর: ৯২-৯৩)
অর্থাৎ মহান আল্লাহ তা’আলা আমাদের সকল কর্মের হিসাব নিবেন। অন্যত্র আরো বলা হয়েছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ এবং তার রাসূলের আনুগত্য করো। আর আনুগত্য করো নিজেদের মধ্যকার নেতৃত্বস্থানীয়দের। এরপর যদি তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে মতভেদ দেখা দেয়, তবে তোমরা বিষয়টি আল্লাহ ও রাসূলের (নির্দেশনার) দিকে উপস্থাপন করো। যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাকো।” (সূরা নিসা: ৫৯)
হাদীসে এসেছে:
من عمل عملا ليس عليه امرنا فهو رد
“যে এমন কোন আমল করবে, যাতে আমাদের নির্দেশনা নেই তবে সেই আমল বাতিল বলে গণ্য হবে।” (সহীহ মুসলিম শরীফ)
এর দ্বারাও এটাই সাব্যস্ত হয় যে, প্রত্যেক কাজের মূল হুকুম বৈধতা নয় বরং শরীয়তের হুকুমের অনুসরণ এবং শরীয়তের নির্দেশনার অনুকরণ। এর ব্যতিক্রম হলে সেই আমলই বাতিল।
কোন কাজকেই এমনি এমনি জায়েজ বলে সাব্যস্ত হবে না, বরং শরীয়ত প্রণেতার পক্ষ থেকে হুকুম অবগত হবার পর তার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেয়া যাবে। এরপর সেই শরয়ী নির্দেশনারই অনুসরণ করতে হবে। এর থেকেই ‘কর্মের স্বাধীনতা’ (Freedom of Acts Unless Clear Prohibitions are Stated) সম্পর্কিত নিয়ম বাতিল সাব্যস্ত হয়। একইভাবে সাহাবায়ে কিরামের আমলও নিন্মোক্ত মূলনীতির উপর অটল ছিল:
الاصل فى الافعال التقيد بالحكم الشرعى
“কর্মসমূহের ক্ষেত্রে শরীয়তের নিয়মাবলীর অনুসরণ করতে হবে।” এছাড়াও এ বিষয়টির প্রমাণ পবিত্র কুরআনের অসংখ্য স্থানে নিম্নোক্ত শব্দে উল্লেখ হয়েছে: يسئلونك (তারা আপনার কাছে জিজ্ঞাসা করে)।
সাহাবায়ে কিরাম রাসূল (সা)-এর কাছে বিভিন্ন কাজ-কর্মের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করাটাই প্রমাণ করে যে, কাজ-কর্মের মূল হুকুম স্বাধীনতা বা বৈধতা নয়।
















