তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২একমাত্র ইসলামই দিয়েছে ’নারীর সম্মান, মর্যাদা ও অধিকার’
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যে বিষয়টি নিয়ে পাশ্চাত্য খুবই শোর গোল করছে। যার সূত্র ধরে ইসলাম বিরোধী অপশক্তি গুলোও ইসলামের উপর কালিমা লেপনের অপচেষ্টায় আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছে, পশ্চিমাদের এজেন্ট, কুফরী শক্তির দালালরা ইসলাম ও মুসলিমদের তাহযীব-তামাদ্দুনকে সমূলে ধ্বংস করে মুসলিম উম্মাহকে চিরতরে পঙ্গু করার জন্য যেই ভয়ংকর মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে তার নাম হচ্ছে -নারী অধিকার, নারী স্বাধীনতা। আর এ বিষয়টির ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী কি সে সম্পর্কে অনেকেই অনেকভাবে, অনেক আঙ্গিকে লিখেছেন। আমি আমার এই লেখায় কুরআন-সুন্নাহ এবং বাস্তবতার আলোকে আমার উপলব্ধি টুকু শেয়ার করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।
বর্তমান পাশ্চাত্য এবং ইসলাম বিদ্বেষী অপশক্তি আজ অত্যন্ত কৌশলে মুসলিম উম্মাহর নারীদেরকে টার্গেট করেছে। তারা মুসলিম পারিবারিক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে দেয়ার নীল নকশা বাস্তবায়নের জন্য নারীদেরকে রাস্তায় নামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। অধিকার কিংবা আর্থিক স্বনির্ভরতার টোপ ফেলে তারা সহজ-সরল মুসলিম রমণীদেরকে হিজাব ও পর্দার সবচেয়ে নিরাপদ স্থান তাদের ঘর থেকে তাদেরকে মাঠে ময়দানে টেনে আনার অপচেষ্টা করছে।
বাস্তবতার মাথা খেয়ে স্বার্থান্ধ একদল অপরদিকে বলে চলেছে যে, ইসলাম নারীকে শেকল পরিয়ে চার দেয়ালের মাঝে বন্দী করে রেখেছে। ইসলাম নারীকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। তাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে জুলুমের বোঝা -নাউযুবিল্লাহ।
নারী সম্পর্কিত এধরণের হাজারো অভিযোগ আজ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে ইসলামের উপর। বাঁধ ভাঙ্গা স্রোতের মতো বিষোদ্গারের ঢল নামানো হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা হলো এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমি বলবো, কেবলমাত্র ইসলামই এমন এক দীন বা জীবন ব্যবস্থা, যা নারী জাতিকে তাদের ন্যায্য অধিকার দিয়েছে। তাদেরকে সমাসীন করেছে সম্মান ও মর্যাদার সর্বোচ্চ আসনে। আর হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ই একমাত্র ব্যক্তিত্ব যিনি নারীদের সকল অধিকার আদায় করে দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। সমাজের বুকে নারীদের সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে দেখিয়ে দিয়েছেন। যদি আমরা ইসলাম পূর্ব আইয়্যামে জাহেলিয়াত ও ইসলাম পরবর্তী সময়ের নারীদের অবস্থা ও অবস্থানের দিকে তাকাই তাহলে বিষয়টি দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট হয়ে যাবে।
নারী জন্মের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলাম:ইসলাম আসার পূর্বে সেই আইয়ামে জাহেলিয়াতে নারীদেরকে সামাজিক মর্যাদা দেয়া তো দূরের কথা তাদের বেঁচে থাকার অধিকার পর্যন্ত ছিলো না। কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণের কথা শ্রবণ করার সাথে সাথেই সকলের মুখ কালো হয়ে যেতো। তাকে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলার জন্য সকলে আয়োজনে ব্যতি ব্যস্ত হয়ে উঠতো এবং এই কন্যা সন্তানকে মাটিতে জীবন্ত প্রোথিত করাকেই নিজেদের জন্য সম্মান, মর্যাদা ও পুন্যের কাজ বলে মনে করতো। জাহেলী যুগের সেই সময়কার ভয়বহ এই অবস্থার কথা তুলে ধরে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِالْأُنْثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًّا وَهُوَ كَظِيمٌ. يَتَوَارَى مِنَ الْقَوْمِ مِنْ سُوءِ مَا بُشِّرَ بِهِ أَيُمْسِكُهُ عَلَى هُونٍ أَمْ يَدُسُّهُ فِي التُّرَابِ أَلَا سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ
“আর যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়; তখন তার চেহারা কালো হয়ে যায়। আর সে থাকে দুঃখ ভারাক্রান্ত। তাকে যে সংবাদ দেয়া হয়েছে, সে দুঃখে সে কওমের থেকে আত্মগোপন করে। আপমান সত্ত্বেও কি একে রেখে দেবে, না মাটিতে পুঁতে ফেলবে? জেনে রেখ, তারা যা ফয়সালা করে, তা কতই না মন্দ!” (সুরা নাহল: আয়াত ৫৮, ৫৯)
ইসলাম পূর্ব আরব সমাজে নারীদের অবস্থা এমনই ছিলো। এমনকি ইসলাম ব্যতীত অন্য সকল ধর্মে আজ পর্যন্ত নারী জাতির অধিকারের কোনো স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।
হিন্দুধর্মে নারী জাতিকে মৃত্যু, নরক, সর্প, বীষ ও আগুন থেকেও মারাত্মক বলা হয়েছে। স্বামী ছাড়া নারী জাতির আলাদা কোনো অস্তিত্বকে স্বীকার করা হয় নি। যার কারণে স্বামী মারা গেলে স্ত্রীকেও তার স্বামীর সাথে সহমরণে যেতে বাধ্য করার কথা বলা হয়েছে।
খৃষ্টান ধর্মে নারী জাতিকে চরম লাঞ্চনার বস্তু বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাই তো খৃষ্টান পাদ্রী মি: সেন্ট টার্টুলিয়ামের মতে, নারী হচ্ছে বন্য জন্তুর চেয়েও অধিক বিপদজনক। অন্য আরেক পাদ্রী সেন্ট ক্রিয়ান নারীকে বীষধর সাপের সাথে তুলনা করে তার থেকে দূরে সরে থাকতে বলেছেন। সপ্তদশ শতকে খৃষ্টধর্মের রাজধানী রোমে বিত্তবানদের একটি কাউন্সিল সমবেত সকল শীর্ষ ব্যক্তি এই মর্মে সর্বসম্মতিক্রমে একমত হয়েছিল যে, নারীর কোন আত্মা নেই।
ইহুদী ধর্মে নারীকে পুরুষের জন্য প্রতারক বলা হয়েছে। তাদের মতে একজন সতী নারীর চেয়ে একজন পাপিষ্ট পুরুষ বহু গুণে শ্রেষ্ঠ।
বৌদ্ধধর্মে কন্যা সন্তান জন্ম লাভ করাকে অলক্ষণীয় বলে মনে করা হয়। নারীর কোনো অধিকার আছে বলে স্বীকৃতি দেয় না।
এভাবে ইসলাম ছাড়া অন্য সকল ধর্মেই নারী জাতিকে পাপিষ্ট, অলুক্ষুণে, অপয়া ও ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদেরকে কোনো অধিকার দেয়া তো দূরের কথা, তাদেরকে মানুষ বলেই স্বীকার করা হয়নি। তারা নারীদেরকে কেবলমাত্র ভোগের পণ্য হিসেবেই গণনা করতো। -এমনিভাবে সর্বত্রই যখন নারী জাতির এমন লাঞ্চনা-গঞ্জনা আর অসম্মান ঠিক সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তে ইসলাম এসে তৎকালীন সেই বর্বর যুগের অমানুষিক জুলুম থেকে নারীকে মুক্ত করেছে। ইসলামই একমাত্র দীন -যা নারী জাতিকে ফিরিয়ে দিয়েছে তাদের যথাযথ অধিকার।
ইসলাম এসে ধাপে ধাপে নারী জাতিকে তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, সম্মান ও মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। যেই সমাজে নারী জন্মই পাপ বলে গণ্য হতো সেখানে ইসলাম সর্বপ্রথমই নারীজন্মের অধিকার নিশ্চিত করেছে। নারী সন্তানকে হত্যাকারীদের জন্য কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছে। ঘোষণা করেছে,وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُئِلَتْ. بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ
“আর স্মরণ করো সেই দিনের কথা! যখন জীবন্ত কবরস্থ কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে?” (সুরা তাকউইর, আয়াত ৮-৯)
কন্যা সন্তানের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় ইসলাম:
সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে হবে এটি নির্ধারণ করেন স্বয়ং মহান আল্লাহ। তিনি যাকে চান তাকেই নির্দিষ্ট লিঙ্গের সন্তান দান করেন। কাউকে আবার নি:সন্তান করে রাখেন। সুতরাং নি:সন্তানদের তুলনায় কন্যা সন্তানের অভিভাবকগণ যে কতো অকল্পনীয় মর্যাদার অধিকারী এবং কন্যা সন্তানও যে সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান হতে পারে সে সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে,لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُورَ. أَوْ يُزَوِّجُهُمْ ذُكْرَانًا وَإِنَاثًا وَيَجْعَلُ مَنْ يَشَاءُ عَقِيمًا إِنَّهُ عَلِيمٌ قَدِيرٌ
“আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে পুত্র ও কন্যা উভয়ই দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করেন। তিনি তো সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।” (সুরা শু’রা: আয়াত ৪৯, ৫০)
কুরআনের পাশাপাশি হাদীসের মাঝেও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কন্যা সন্তানদেরকে খুবই সম্মান ও মর্যাদার উপলক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, “ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত; তিনি বলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন;
যে ব্যক্তির একটি মেয়ে আছে আর সে তাকে তুচ্ছ মনে করে নাই, অপমানিত করে নাই এবং ছেলেদের উপর প্রাদান্য দেয় নাই। আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।” (সুনানে আবু দাউদ)
আরো ইরশাদ হয়েছে, “আনাস ইবনে মালেক রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন;
যে ব্যক্তি দুটি কন্যা সন্তান সাবালক হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করল সে কেয়ামতের দিবসে আমার সাথে থাকবে।” (সহীহ মুসলিম)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, “উকবা ইবনে আমের হতে বর্ণিত: তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেন;
عن عقبة بن عامر يقول : سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول ” من كان له ثلاث بنات ، فصبر عليهن وأطعمهن وسقاهن وكساهن من جدته ، كن له حجابا من النار يوم القيامة ” (سنن ابن ماجة)
যে ব্যক্তির তিনটি কন্যা সন্তান আছে অত:পর সে তাদের নিয়ে ধৈর্য্য ধারন করে এবং তাদেরকে ভরণ-পোষণ দিয়ে খাওয়ায় পান করায় তার নিজ সম্পদ থেকে, ক্বিয়ামতের দিবসে ঐ কন্যা সন্তানগুলো তার জন্য জাহান্নাম থেকে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)
আরো ইরশাদ হয়েছে,
عن أبى سعيد الخدرى ، قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : (من عال ثلاث بنات فأدبهن وزوجهن وأحسن إليهن فله الجنة) (سنن أبي داود)
“আবু সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত: তিনি বলেল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন; যে ব্যক্তির তিনটি কন্যা সন্তান আছে, সে তাদেরকে আদব শিক্ষা দিয়েছে এবং বিবাহ দিয়েছে এবং তাদের সাথে সদাচরন করেছে, তার জন্য রয়েছে জান্নাত।” (সুনানে আবু দাউদ)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,
أكمل المؤمنين إيمانا أحسنهم خلقا. وخياركم خيار لنسائه وبناته
“পরিপূর্ণ মু’মিন হলো সেই ব্যক্তি, যার আখলাক-চরিত্র উত্তম। আর তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রী-কন্যাদের কাছে উত্তম।””
সম্মান ও মর্যাদায় নারী-পুরুষকে সমান ঘোষণা করেছে ইসলাম
মানব সমাজে নারী জন্মের অধিকার প্রতিষ্ঠা, কন্যা সন্তানের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার পর ইসলাম সম্মান ও মর্যাদার ক্ষেত্রেও নারী- পুরুষকে সমান ঘোষণা করেছে। জন্মগতভাবে নারী-পুরুষ আল্লাহর কাছে সমান বলে, নারীকে সম্মান ও মর্যাদার দিক থেকে পুরুষের সমকক্ষ ঘোষণা করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ঘোষণা করেছে,يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
“হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক উৎস থেকে। আর তা থেকে তোমাদের স্ত্রীদেরকেও সৃষ্টি করেছেন। এরপর তা থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে চাও। আর ভয় কর রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক।” (সূরা নিসা, আয়াত ০১)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ
হে মানুষ, আমি তোমাদেরকে এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি। যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন। (সুরা আল-হুজরাত: ১৩)
আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ ও সফল হওয়ার মানদন্ড নির্ধারণ করা হয়েছে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতিকে। তাই একজন নারী একজন পুরুষ হতেও শ্রেষ্ঠ হতে পারে। উপরের আয়াতে এ বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করে পুরুষদেরকে সতর্ক করা হয়েছে।
স্ত্রী হিসেবে নারীর সম্মান-মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ইসলাম:
নারী-পুরুষ বালেগ হওয়ার পর উভয়েই উভয়ের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করে। কিন্তু এটি যেনো তেনোভাবে না করে এজন্য ইসলাম বিবাহের মতো সুন্দর একটি বিধান দিয়েছে। আর এই বিবাহের মাধ্যমে আসলে মূলত: ইসলাম নারীদেরকেই লাভবান করেছে। দিয়েছে সম্মান ও মর্যাদার এক শীর্ষ চূড়া। বিবাহ সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে,هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا
“তিনিই সে সত্তা যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক ব্যক্তি থেকে এবং তার থেকে বানিয়েছেন তার সঙ্গিনীকে, যাতে সে তার নিকট প্রশান্তি লাভ করে।” (সূরা আরাফ, আয়াত ১৮৯)
বিবাহের মাধ্যমে মানুষ তাদের প্রাকৃতিক চাহিদা বৈধ পন্থায় পূর্ণ করে। পারিবারিক জীবনে প্রশান্তি লাভ করে। ইরশাদ হয়েছে:
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে। (সুরা রূম: আয়াত ২১)
আরো ইরশাদ হয়েছে,
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلًا مِنْ قَبْلِكَ وَجَعَلْنَا لَهُمْ أَزْوَاجًا وَذُرِّيَّةً
“আর অবশ্যই তোমার পূর্বে আমি রাসূলদের প্রেরণ করেছি এবং তাদেরকে দিয়েছি স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি। (সুরা রা’দ: আয়াত ৩৮)
অন্যত্র আরো ইরশাদ হয়েছে:
هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ
“তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের জন্যে পরিধেয় আর তোমরা তাদের জন্যে পরিধেয়।” (সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৭)
বিবাহের মাধ্যমে দুটি পরিবারের মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নারী পুরুষের ইজ্জত-সম্ভ্রম হিফাজত হয়। পারিবারিক শান্তি ও সুন্দর জীবন লাভ করা যায়। এছাড়াও বিবাহের মাধ্যমে সামাজিক পর্যায়ে অনেক সুফল পাওয়া যায়। এজন্যেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্ত্রীর ভরু-পোষণ দিতে সক্ষম সকল যুবককে বিবাহের নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
عن عبد الله بن مسعود قال لنا رسول الله صلى الله عليه و سلم ( يا معشر الشباب من استطاع الباءة فليتزوج فإنه أغض للبصر وأحصن للفرج ومن لم يستطع فعليه بالصوم فإنه له وجاء
হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রীদের ভরু-পোষণের সক্ষমতা রাখে তারা যেন বিয়ে করে ফেলে। কেনন এটা চোখের প্রশান্তি দানকারী ও লজ্জাস্থানের হিফাজতকারী। আর যারা স্ত্রীদের ভরু-পোষণের সামর্থ্য রাখে না, তারা যেন রোজা রাখে, কেননা এটা তাদের উত্তেজনাকে হ্রাস করবে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৭৭৮)
যুবকদেরকে বিবাহের ব্যাপারে উৎসাহিত করার জন্য বিবাহের ফজীলত সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেন, “হযরত আনাস রা. থেকেব বর্ণিত,
إذا تزوج العبد فقد استكمل نصف الدين فليتق الله في النصف الباقي
যখন কোন ব্যক্তি বিবাহ করে, তখন সে যেন তার অর্ধেক ঈমানকে পূর্ণ করে ফেললো। এখন বাকি অর্ধেকের ব্যাপারে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।” (মিশকাত শরীফ: হাদীস নং ৩০৯৭)
স্ত্রীদের গুরুত্ব সম্পর্কে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
المرأة الصالحة من السعادة
“উত্তম স্ত্রী সৌভাগ্যর পরিচায়ক।” (মুসলিম শরীফ)
বৈরাগী জীবনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, “আবু উমামা রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
تَزَوَّجُوا فَإِنِّى مُكَاثِرٌ بِكُمُ الأُمَمَ وَلاَ تَكُونُوا كَرَهْبَانِيَّةِ النَّصَارَى
তোমরা বিবাহ কর, কেননা আমি তোমাদের নিয়ে উম্মতের আধিক্যের উপর গর্ববোধ করব। এবং তোমরা খৃষ্টান বৈরাগ্যদের মত হয়ো না।” (সুনানে কুবরা লিল বায়হাকী)
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ পুরুষদেরকে নেককার স্ত্রী ও নেক সন্তান কামনা করা শিখিয়েছেন এভাবে,
وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ
“আর যারা বলে, ‘হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে।” (সুরা ফুরক্বান, আয়াত ৭৪)
অধিক খরচের গ্যারাকলে পরে পুরুষরা যেনো বিবাহ বিমুখ না হয়, সেজন্য ইসলাম বিবাহের ক্ষেত্রে বাহুল্য খরচ বর্জনের কথা বলেছে। বাহুল্য খরচ বর্জিত বিবাহকেই সবচেয়ে বেশী বরকতপূর্ণ ও উত্তম বিবাহ বলে ঘোষণা করা হয়েছে হাদীসের মাঝে। ইরশাদ হয়েছে,
إن أعظم النكاح بركة أيسره مؤنة
হযরত আয়শা রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“নিশ্চয়ই সবচেয়ে বেশি বরকত ও কল্যাণময় বিবাহ হচ্ছে সেটি, যেখানে খরচ কম হয় (অহেতুক খরচ হয় না)।” (বায়হাকী, ঈমান অধ্যায়)
বিবাহের মাধ্যমে নারী-পুরুষ উভয়েই নিজেদের প্রয়োজন পূর্ণ করলেও ইসলাম নারীদের জন্য বোনাস পাওয়ার ব্যবস্থা রেখেছে। পুরুষের উপর বিবাহের সময় স্ত্রীদের জন্য মহর দেয়া ফরজ করেছে। ঘোষণা করেছে,
انْكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ وَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“সুতরাং তোমরা তাদেরকে তাদের অভিভাবকদের অনুমতিক্রমে বিবাহ কর এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে তাদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও।” (সূরা নিসা: আয়াত ২৫)
অন্যত্র আরো ইরশাদ হয়েছে,
وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً
“আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও।” (সূরা নিসা: আয়াত ৪)
বিবাহের পর স্ত্রীদের সাথে সর্বদা সদাচারণ বজায় রাখার নির্দেশ দিয়ে ইসলাম ঘোষণা করেছে,
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“আর তোমরা তাদের সাথে সদাচারণ করো।” (সূরা নিসা: আয়াত ১৯)
নিজে ভালো খাবে, উত্তম পোষাক পড়বে আর স্ত্রীদেরকে নিম্ন মানের জীবন ধারণে বাধ্য করার জাহেলি মানসিকতাকে সমূলে বিনাশ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে,
أَسْكِنُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ سَكَنْتُمْ مِنْ وُجْدِكُمْ
“তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বসবাস কর সেখানে তাদেরকেও বাস করতে দাও।” (সূরা তালাক, আয়াত ৬)
নারীর নিজের ভরণ-পোষণের পাশাপাশি সন্তানের দায়িত্বও স্বামীর কাঁধে তুলে দেয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে,
لِيُنْفِقْ ذُو سَعَةٍ مِنْ سَعَتِهِ وَمَنْ قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ فَلْيُنْفِقْ مِمَّا آتَاهُ اللَّهُ
“বিত্তশালীরা যেনো সামর্থানুযায়ী স্ত্রী-সন্তানের উপর ব্যয় করে। সীমিত উপার্জনকারীরা আল্লাহর দেয়া অর্থানুপাতে ব্যয় করবে।” (সূরা তালাক, আয়াত ৭)
পুরুষদের উপর নারীদের অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে ঘোষণা করেছে,
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِى عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكُيمٌ
“নারীদের উপর যেমন তোমাদের কিছু অধিকার রয়েছে ঠিক তেমনি তোমাদের উপরও তাদের কিছু অধিকার রয়েছে। স্ত্রীর উপর পুরুষের মর্যাদা। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।” (সূরা বাকারা : আয়াত ২২৮)
নারীদেরকে দূর্বল ও অসহায় পেয়ে যাতে করে কেউ তাঁদের উপর জুলুম ও অত্যাচার না করে সেজন্যে ইসলাম ঘোষণা করেছে,
وَلاَ تُمْسِكُوهُنَّ ضِرَارًا لِّتَعْتَدُواْ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ
“আর তোমরা স্ত্রীদেরকে কষ্ট দেয়ার জন্যে আটকে রেখো না। আর যারা এ ধরণের জঘন্যতম অন্যায় করবে তারা নিজেদের উপরই জুলুম করবে।” (সূরা বাকারা : আয়াত ২৩১)
বার্ধক্যেও নারীর সম্মান-মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে ইসলাম:
বার্ধক্যে নারীদের দায়িত্ব সন্তানদের উপর অর্পন করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে,وَوَصَّيْنَا الإِنْسَـٰنَ بِوَالِدَيْهِ حُسْناً
“আর আমি মানুষদেরকে তাদের পিতা-মাতার সাথে সদাচারণের নির্দেশ দিয়েছি।” (সূরা আনকাবুত : আয়াত ৮)
অন্যত্র আরো ইরশাদ হয়েছে,
وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
“আর তুমি তাদের (তোমার পিতা-মাতার) সামনে দীনতার পক্ষপুটকে বিছিয়ে দাও। আর বলো যে, হে আমার রব! আপনি তাদের উপর রহম করুন, যেমন তারা আমার উপর বাল্যকালে রহম করেছেন।” (সূরা বনী ইসরাঈল : আয়াত ২৪)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,
وَإِن جَـٰهَدَاكَ عَلَىٰ أَن تُشْرِكَ بِى مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلاَ تُطِعْهُمَا وَصَـٰحِبْهُمَا فِى الدُّنْيَا مَعْرُوفاً
“আর তাঁরা যদি তোমাকে আমার সাথে শিরক করার এমন বিষয়ের বাধ্য করে তোমাদের কাছে যার জ্ঞান নেই, তবে (সেক্ষেত্রে) তুমি তাঁদের অনুসরণ করো না। তবে তাঁদের সাথে দুনিয়াতে সৎব্যবহার এবং সদাচারণ বজায় রাখো।” (সূরা লুকমান, আয়াত ১৫)
অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষের উপর নারীকে অগ্রাধিকার দিয়েছে ইসলাম:
পিতা-মাতার সম্মান ও মর্যাদা বর্ণনার ক্ষেত্রেও ইসলাম নারীদেরকে অগ্রাধিকার ও অধিক সম্মান দিয়েছে। পিতার থেকে মাতার সম্মান ও মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। নিম্নোক্ত হাদীস থেকে যা পরিস্কারভাবে ফুটে উঠেছে।عن أبي هريرة رضي الله عنه قال : جاء رجل إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال : يا رسول الله من أحق الناس بحسن صحابتي ؟ قال : أمك ,, قال : ثم من ؟ قال : أمك, قال : ثم من ؟ قال : أمك, قال : ثم من ؟ قال : أبوك . (متفق عليه)
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে একবার জিজ্ঞাসা করা হলো যে ইয়া রাসূলাল্লাহ! পিতা-মাতার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে বেশি সম্মান ও মর্যাদার হকদার কে? প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন, তোমার মা। সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন, তোমার মা। সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন, তোমার মা। এরপর সাহাবী চতুর্থ বার যখন জিজ্ঞেস করলেন যে, তারপর কে? তখন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন, তোমার বাবা।” (বুখারী ও মুসলিম)
এই হাদীসের দ্বারা এটা পরিস্কার হয়ে গেলো যে, নারী জাতিকে ইসলাম মাতৃত্বের উচ্চাসনে বসিয়েছে। তাদেরকে সম্মান ও মর্যাদার সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন করেছে।
এছাড়াও অনেক হাদীস আছে যেখানে শুধু মাতার কথাই বলা হয়েছে। যেমন এক হাদীসে রাসূল সা. বলেন,عن معاوية بن جاهمة أنه جاء النبي صلى الله عليه وسلم فقال : يا رسول الله أردت أن أغزو، وجئت أستشيرك ؟ فقال: “هل لك من أم”؟ قال نعم: قال: “فالزمها فإن الجنة تحت رجليها” رواه النسائي
হযরত মুয়াবিয়া বিনতে জাহিমা নবীজীর সা. এর কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি যুদ্ধে যেতে চাচ্ছি। আপনার কাছে পরামর্শের জন্য এসেছি। তিনি বললেন, তোমার মা আছে কি? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাহলে তাঁকে সঙ্গ দাও। কেননা জান্নাত তাঁর দুই পায়ের নিচে।” (সুনানে নাসাঈ )
সমাজে কেউ যেনো নারী জাতির অবমাননা করতে না পারে সেটিও ইসলাম নিশ্চিত করেছে। অন্যায়ভাবে কেউ কোনো নারীকে অপবাদ দিলে তার জন্য শাস্তির বিধান দিয়েছে। ইরশাদ হয়েছে,
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
“আর যারা সচ্চরিত্র নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে আসে না, তবে তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত কর এবং তোমরা কখনই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। আর এরাই হলো ফাসিক।” (সুরা আন-নূর: আয়াত ৪)
আমল ও সওয়াবের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষকে সমান করেছে ইসলাম:
এভাবে নারীদেরকে দুনিয়ার জীবনে নিশ্চিত, নিরাপদ করার পর পরকালীন জীবনেও তাদের জন্য কল্যাণ ও মঙ্গলের কথা ঘোষণা করেছে। এক্ষেত্রে পুরুষ-নারী বলে কাউকে আলাদা করা হয় নি। ইরশাদ হয়েছে,مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
“যে মুমিন অবস্থায় নেক আমল করবে, পুরুষ হোক বা নারী, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তারা যা করত তার তুলনায় অবশ্যই আমি তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেব।” (সুরা আন-নাহল: আয়াত ৯৭)
আরো ইরশাদ হয়েছে,
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ. وَمَنْ يَعْمَلْ مِنَ الصَّالِحَاتِ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ نَقِيرًا
“আর পুরুষ কিংবা নারীর মধ্য থেকে যে নেককাজ করবে এমতাবস্থায় যে, সে মুমিন, তাহলে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি খেজুরবীচির আবরণ পরিমাণ যুল্ম ও করা হবে না।” (সুরা নিসা: আয়াত ১২৪)
অন্যত্র আরো ইরশাদ হয়েছে,
أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِنْكُمْ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى بَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ
‘নিশ্চয় আমি তোমাদের কোন পুরুষ অথবা মহিলা আমলকারীর আমল নষ্ট করব না। তোমাদের একে অপরের অংশ। (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৯৫)
সুরা আল আহযাব এর ৩৫নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:
أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِنْكُمْ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى بَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ. إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْخَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُمْ مَغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا
“নিশ্চয় মুসলিম পুরুষ ও নারী, মুমিন পুরুষ ও নারী, অনুগত পুরুষ ও নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও নারী, বিনয়াবনত পুরুষ ও নারী, দানশীল পুরুষ ও নারী, সিয়ামপালনকারী পুরুষ ও নারী, নিজদের লজ্জাস্থানের হিফাযতকারী পুরুষ ও নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও নারী, তাদের জন্য আল্লাহ মাগফিরাত ও মহান প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন।” (সুরা আহযাব: আয়াত ৩৫)
নারী জীবনের প্রত্যেক পর্যায় সম্পর্কে উপরে বর্ণিত সুন্দর ও সুনিপুন ব্যবস্থাপনা দিয়ে ইসলাম নারী জাতির পুরো জীবনটিকেই একেবারে সহজ, সুন্দর, নিরাপদ ও নির্ভাবনার করে দিয়েছে। কন্যা সন্তানের জন্য বিবাহের আগ পর্যন্ত যাবতীয় ব্যবস্থাপনা ইসলাম তার পিতার উপর ন্যস্ত করেছে। বিবাহের মাধ্যমে তার দায়িত্ব অর্পন করেছে স্বামীর উপর। এরপর মাতা হিসেবে তার দায়িত্ব দিয়েছে সন্তানের উপর।
এমন সুন্দর ব্যবস্থা কারো ক্ষেত্রে কোনো পর্যায়ে বিঘ্নিত হলে সেজন্য আগে থেকেই রিজার্ভ ফান্ডেরও ব্যবস্থা রেখেছে পিতা-মাতার কাছ থেকে ওয়ারিশ হিসেবে প্রাপ্ত সম্পদ, স্বামীর কাছ থেকে প্রাপ্য মোহরানা এবং নিজের উপার্জিত যাবতীয় সম্পদ স্বাধীনভাবে ব্যবহারের অধিকার দিয়েছে। স্বামীদের উপর নিজ স্ত্রীদের জন্য মহরানা প্রদান বাধ্যতামূলক করে ঘোষণা করেছে,وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً
“আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও।” (সূরা নিসা: আয়াত ৪)
ইসলাম নারীর আর্থিক স্বাবলম্বীতা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ প্রয়োজনে শরীয়তের সীমা ঠিক রেখে নারীকে কর্মস্থলে যাওয়ারও অনুমতি দিয়েছে। ইসলাম নারীর নিজের প্রয়োজন পূরণের দায়িত্ব পিতা, স্বামী, সন্তানের উপর ন্যস্ত করলেও; নারীর নিজের আয়, নিজের সম্পত্তি কোনো ব্যবসায় বিনিয়োগ করে সেখান থেকে অর্জিত মুনাফা ইত্যাদির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতা দিয়েছে নারীর হাতে। এক্ষেত্রে জোর করে অন্য কারো জন্য সম্পদ গ্রাস করাকেও হারাম করেছে।
চলবে…
পরবর্তী পর্ব: পৈত্রিক সম্পত্তিতেও নারীর অধিকার নিশ্চিত করেছে ইসলাম
ইসহাক খানসংবাদ বিশ্লেষন: বাংলাদেশে মার্কিন সেনাসদস্যদের বিশেষ টিম
(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি, মার্চ ০৪, ২০১২ এ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ প্রকাশিত বাংলাদেশে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সংক্রান্ত একটি সংবাদের প্রতি প্রতিক্রিয়া ও বিশ্লেষন – the underlined part is the comment and analysis)
সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে ‘সহযোগিতার’ অংশ হিসেবে প্রশিক্ষণ দিতে মার্কিন বাহিনীর কিছু সংখ্যক সদস্য থাকলেও বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ঘাঁটি নেই বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা।
তিনি রোববার এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, “বাংলাদেশে কোনো ঘাঁটি থাকার প্রশ্নই আসে না।”
মজিনার কথা শুনে মনে হয় বাংলাদেশে ঘাটি করার কোনো ইচ্ছাই নেই আমেরিকার। অথচ এই আমেরিকাই মুসলিম বিশ্বসহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের ঘাটি তৈরি করে রেখেছে। সৌদি বাদশাহদের দালালির সহায়তায় তারা পবিত্র ভুমি মক্কা-মদীনার খুব কাছেই তাদের ঘাটি করেছে যেখানে মার্কিন নারী-পূরুষ সেনা সদস্যরা জীবনকে মার্কিনী কায়দায় উপভোগ করতে পারে। শুধু এই নয়, এইসব ঘাটি থেকে তারা অন্য মুসলিম অঞ্চলে আগ্রাসন চালায় এবং নিরীহ মুসলিম নারী-শিশু-বৃদ্ধসহ অগনিত সাধারন নাগরিকদের হত্যা করে। সুতরাং মজিনার বড়গলা করে বলার কিছু নেই।
তাদের ইতিহাস বলে যে তারা সুযোগ পেলেই এ দেশে তাদের পুর্নাঙ্গ ঘাটি তৈরি করবে। এবং তারই রিহার্সেল চালাচ্ছে তারা বর্তমানে দালাল হাসিনা সরকারের মাধ্যমে। আমরা দেখেছি কিভাবে আমেরিকা সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যুদ্ধজাহাজ আসা থেকে নিয়ে পরবর্তীতে টাইগার শার্ক ১-৪ দিয়ে এবং এখন তথাকথিত ৭ সদস্য বিশিষ্ট সেনা সদস্যদের বিশেষ ট্রেনিং টিম পাঠিয়ে তাদের সেই অভিষ্ঠ লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান অ্যাডমিরাল রবার্ট উইলার্ড বৃহস্পতিবার কংগ্রেস কমিটিকে জানান, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ‘সহযোগিতা দিতে’ বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশে অবস্থান করছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্পেশাল ফোর্সের’ সদস্যরা।
সহযোগীতা?? মার্কিনিদের সহযোগিতায় (?) পৃথিবী যেন আজ ফুলে-ফলে সজ্জিত। বরং পৃথিবী আজ রক্তে রঞ্জিত তাদের সামরিক হস্তক্ষেপে। এই সেই মার্কিন বাহিনী যারা এই কয়েকদিন আগেও আফগানিস্তানে আমাদের পবিত্র কুরআনকে অবমাননা করেছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا بِطَانَةً مِنْ دُونِكُمْ لَا يَأْلُونَكُمْ خَبَالًا وَدُّوا مَا عَنِتُّمْ قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَاءُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ وَمَا تُخْفِي صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الْآَيَاتِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْقِلُونَ
হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করো না, তারা তোমাদের অমঙ্গল সাধনে কোন ক্রটি করে না-তোমরা কষ্টে থাক, তাতেই তাদের আনন্দ। শত্রুতাপ্রসুত বিদ্বেষ তাদের মুখেই ফুটে বেরোয়। আর যা কিছু তাদের মনে লুকিয়ে রয়েছে, তা আরো অনেকগুণ বেশী জঘন্য। তোমাদের জন্যে নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করে দেয়া হলো, যদি তোমরা তা অনুধাবন করতে সমর্থ হও। [আলে ইমরান: ১১৮]
এই সংবাদ প্রকাশের পর দেশের বামপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, যার মধ্যে ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিক দলও রয়েছে।
বামপন্থীদের আদর্শিক বিচ্যুতি এখানে খুবই স্পষ্ট। তারা সরকারের কাছে জবাব চায়। কোন সরকারের কাছে? তারা নিজেরাই তো অনেকে সরকারের অংশ। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতা কোথায় আজ তাদের। তাদের জবাব দরকার হয় কেন? তারা জানে না মার্কিনি পরিকল্পনা? সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন মুখীতা কোথায় তাদের আজ? কেন দেখা যায় না তাদের আজ রাজপথে এই নব্য ঔপনিবেশকতাবাদের বিরুদ্ধে?
এ বিষয়ে ঢাকায় ওয়াশিংটনের রাষ্ট্রদূত মজিনা বলেন, “তারা প্রশিক্ষণ দিতে এসেছেন এবং চলেও যাবেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে আমরা কাজ করছি।”
কয়েকটি সংবাদপত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়টি পড়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং কল্পিত।
যৌথ কর্মসূচির অংশ হিসেবেই বিশেষ বাহিনীর সদস্যদের বাংলাদেশে আসা জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সুদীর্ঘকালের এবং এই বন্ধন অত্যন্ত দৃঢ়।
এই প্রসঙ্গে মজিনা বলেন, বাংলাদেশে কিছু মানুষ ‘সোনালী ভবিষ্যৎ’ গড়ার স্বপ্ন দেখার বিরোধী।
হ্যা। ঠিকই বলেছে মজিনা। এবং সেই কিছু মানুষের মধ্যে মজিনা তার মার্কিনি দোসররা রয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, তারা (কাফেররা) চায় যে, তারা যেমন কাফের, তোমরাও তেমনি কাফের হয়ে যাও, যাতে তোমরা এবং তারা সব সমান হয়ে যাও। অতএব, তাদের মধ্যে কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না [নিসা:৮৯]إِن يَثْقَفُوكُمْ يَكُونُوا لَكُمْ أَعْدَاءً وَيَبْسُطُوا إِلَيْكُمْ أَيْدِيَهُمْ وَأَلْسِنَتَهُم بِالسُّوءِ وَوَدُّوا لَوْ تَكْفُرُونَ
তোমাদেরকে করতলগত করতে পারলে তারা তোমাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং মন্দ উদ্দেশ্যে তোমাদের প্রতি বাহু ও রসনা প্রসারিত করবে এবং চাইবে যে, কোনরূপে তোমরা ও কাফের হয়ে যাও। [মুমতাহিনা:২]
“আসলে তারা বাংলাদেশে শান্তি, সৌহার্দ্য, গণতন্ত্র নস্যাৎ করতে চায়। আমরা তাদের সন্ত্রাসী বলে থাকি। এই সব সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশের শত্র“, আমেরিকার এবং বিশ্বের প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশের শত্র“। একসঙ্গে মিলে আমরা এইসব সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়তে পারি এবং আমরা অবশ্যই তা করব,” বলেন তিনি।
সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের নামে কী পরিমান শান্তি ও সৌহার্দ বজায় রেখেছে মার্কিনিরা তা সবার কাছেই পরিষ্কার। গণতন্ত্রের নামে সারা বিশ্বে চলছে গণহত্যা। গণতন্ত্রের সাথে গণহত্যা – একটা কিনলে আরেকটা ফ্রি। এই হচ্ছে মানবরচিত আদর্শের পরিনতি। এবং একসঙ্গে মিলে অবশ্যই আমরা সন্ত্রাসীদের রুখব। অবশ্যই। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী রাষ্ট্র আমেরিকাকে রুখতে আজ আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতেই হবে।
সকালে গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা হয় রাষ্ট্রদূতের। বাংলাদেশ পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে বিগত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্র ১ কোটি ৯০ লাখ ডলারেরও বেশি সহায়তা দিয়েছে বলে জানান তিনি।
মজিনা বলেন, সোয়াত বাহিনীর ৪৮ সদস্য ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছে। আরো ৪৮ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ لِيَصُدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ فَسَيُنْفِقُونَهَا ثُمَّ تَكُونُ عَلَيْهِمْ حَسْرَةً ثُمَّ يُغْلَبُونَ وَالَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى جَهَنَّمَ يُحْشَرُونَ
নিঃসন্দেহে যারা কুফরি করেছে, তারা ব্যয় করে নিজেদের ধন-সম্পদ, যাতে করে বাধাদান করতে পারে আল্লাহর পথে। বস্তুতঃ এখন তারা আরো ব্যয় করবে। তারপর তাই তাদের জন্য আক্ষেপের কারণ হয়ে এবং শেষ পর্যন্ত তারা হেরে যাবে। আর যারা কাফের তাদেরকে দোযখের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। [আনফাল: ৩৬]
অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার বেনজির আহমেদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা বাংলাদেশের প্রয়োজন এবং সরকারও এই ক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে কাজ করছে।
এসব লোকদের আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِم بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُم مِّنَ الْحَقِّ
হে ঈমানদারগণ!, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদেরকে বন্ধরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ তারা যে সত্য তোমাদের কাছে আগমন করেছে, তা অস্বীকার করছে। [মুমতাহিনা:১]
হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়্যতের প্রমাণ
এটি সর্বজনবিদিত যে, কুরআন একটি আরবি গ্রন্থ যা মুহাম্মদ (সা)-এর মাধ্যমে এসেছে। কাজেই এটি হয় আরবদের নিকট থেকে, অথবা মুহাম্মদ (সা)-এর নিকট থেকে কিংবা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পক্ষ থেকে এসেছে। যেহেতু কুরআনের ভাষা ও রচনাশৈলী আরবি, কাজেই এ তিন উৎস ছাড়া অন্য কোনো উৎস থেকে এর আগমন অসম্ভব।
কুরআন আরবদের নিকট থেকে এসেছে একথা বলা মিথ্যাচার। কারণ কুরআন তাদের প্রতি অনুরূপ রচনার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।“বলুন, এরূপ দশটি সুরা নিয়ে আস।” (সুরা হুদ: আয়াত ১৩)
“বলুন, এরূপ একটি সুরা নিয়ে আস।” (সুরা ইউনুস: আয়াত ৩৮)তারা অনুরূপ রচনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল। সুতরাং এটি তাদের বক্তব্য নয়।
কুরআন মুহাম্মদ (সা)-এর রচনা – এরূপ দাবি করাও হবে মিথ্যাচার। কারণ তিনি যত উন্নত মেধারই অধিকারী হোন না কেন, তিনি ছিলেন একজন মানুষ ও একজন আরব। যেহেতু আরবরা এরূপ কিছু আনতে ব্যর্থ হয়েছে এবং মুহাম্মদ (সা)-ও ছিলেন একজন আরব, তাই আরব হিসেবে একথা তার জন্যও প্রযোজ্য এবং তিনি এটি রচনা করেননি। উপরন্তু মুহাম্মদ (সা)-এর অসংখ্য সহিহ ও মুতাওয়াতির হাদিস রয়েছে, যাদের সত্যতা সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই। এ হাদীসগুলোর সঙ্গে কুরআনের আয়াতগুলোর তুলনা করা হলে দেখা যায়, তাদের বর্ণনা শৈলীর মধ্যে কোনো মিল নেই। তিনি একই সময়ে কুরআনের আয়াতগুলো পড়েছেন ও তার হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের বর্ণনাশৈলীর মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। মানুষ যদি কখনো তার কথাকে পরিবর্তন করতে চেষ্টা করে, তবু তার ভাষা ও শৈলী একই রকম থাকে, কারণ এটি তারই একটি অংশ। যেহেতু কুরআনের আয়াত ও হাদীসগুলোর মধ্যে ভাষা ও শৈলীর মিল নেই, সেহেতু অবশ্যই কুরআন মুহাম্মদ (সা)-এর বক্তব্য নয়। এছাড়া আরবের ভাষা ও শৈলীতে সুদক্ষ কোনো আরবই দাবি করেননি যে কুরআন মুহাম্মদ (সা)-এর বক্তব্য কিংবা তার বক্তব্যের সঙ্গে এর কোনো মিল আছে। তারা শুধুমাত্র যে অভিযোগ করেছে তা হচ্ছে মুহাম্মদ (সা) এটি জাবর নামক এক খ্রিষ্টান যুবক থেকে নিয়ে এসেছেন। আল্লাহ তাদের এ অসার দাবিকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছেন। তিনি বলেন:“তারা বলে, এক ব্যক্তি তাকে এটি শিক্ষা দেয়। তারা যার কথা বলে তার ভাষা অনারবি অথচ এটি সুস্পষ্ট আরবি ভাষায় রচিত।” (সুরা আন-নাহল:১০৩)
যেহেতু এথেকে প্রমাণিত হয় যে, কুরআন আরবদের রচনা নয় কিংবা মুহাম্মদ (সা)-এর রচনাও নয়, সেহেতু এটি অবশ্যই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণী এবং যিনি এটি নিয়ে এসেছেন তার জন্য এটি একটি অলৌকিক নিদর্শন (মু’জিযা)।
যেহেতু মুহাম্মদ (সা) কুরআন এনেছেন এবং কুরআন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণী এবং যেহেতু নবী-রাসুলগণ ছাড়া আর কেউ আল্লাহর শরিয়াহ (বিধান) আনতে পারেন না, কাজেই যুক্তিসঙ্গতভাবে মুহাম্মদ (সা) অবশ্যই একজন নবী ও রাসুল।
এটিই মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়্যতের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ।চিন্তা ও চিন্তার পদ্ধতি
চিন্তা (فكر), বুদ্ধি (عقل), উপলব্ধি (ادراك) ইত্যাদি সব কিছু প্রায় একই অর্থবোধক। অর্থাৎ কোন বাস্তবতাকে যথা সম্ভব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষন করার জন্য ইন্দ্রিয়গুলোর মধ্য দিয়ে তাকে মানুষের মস্তিষ্কে পাঠানো এবং পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা (previous information) ও জ্ঞানের সাথে তুলনা ও সমন্বয় করার যে প্রক্রিয়া মানুষের মধ্যে বিদ্যমান তাকেই বলা হয় ফিকর ( فكر ) বা চিন্তা। চিন্তা করার জন্য নিন্মোক্ত চারটি বিষয় বিদ্যমান থাকতে হয়।
(১) বাস্তব অবস্থা (A Reality)
(২) সুস্থ মস্তিষ্ক (A sane distinguishing mind)
(৩) ইন্দ্রিয়সমূহ (Senses) ও
(৪) পূর্ব অভিজ্ঞতা/জ্ঞান (Previous information)
বিবেক-বিবেচনা ভিত্তিক তথা বুদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতি (Rational Method)
এটি হচ্ছে এমন পদ্ধতি যার মাধ্যমে মানুষ চিন্তা-ভাবনা করে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে উপলব্ধিতে পৌঁছে। এ প্রক্রিয়ায় মানুষের মন তার স্বাভাবিক ক্ষমতা ব্যবহার করে চিন্তা সৃষ্টি করে। বস্তুত এটিই মানুষের চিন্তা করার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
প্রকৃতপক্ষে বিবেক-বিবেচনা ভিত্তিক পদ্ধতি (Rational Method) হচ্ছে কোন বিবেচ্য বিষয় সম্পর্কে অবগতি লাভের জন্য একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় চিন্তা-ভাবনার নাম। এই প্রক্রিয়ায় প্রথমে ইন্দ্রিয় সমূহের মাধ্যমে বাস্তবতা সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্যাদি চিন্তাক্ষম মস্তিষ্কে নেয়া হয়;
অতঃপর মস্তিষ্কে ও স্মৃতি ভান্ডারে রক্ষিত পূর্বেকার তথ্যের সাথে বর্তমান তথ্যের তুলনা, যাচাই-বাছাই ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হয়। অবশেষে মানব-মন বিবেচ্য বিষয় সম্পর্কে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছে। এই সিদ্ধান্ত বা রায়টিই হচ্ছে বুদ্ধি প্রসূত এই বিশেষ চিন্তা প্রক্রিয়াটি ভৌত বস্তু (যেমন পদার্থ বিদ্যা) সম্পর্কে গবেষণার ক্ষেত্রে যেমন ব্যবহৃত হতে পারে অপরদিকে শুধু মাত্র চিন্তা-ভাবনার বিষয় যেমন আকীদা, আইন ইত্যাদি আলোচনায় অথবা ফিক্হ শাস্ত্র, সাহিত্য ইত্যাদি বুঝার ক্ষেত্রে এটিই একমাত্র উপায়। কোন বিষয় সম্পর্কে উপলব্ধি লাভ করার ক্ষেত্রে এটি হচ্ছে মৌলিক এবং মানুষের একান্ত স্বভাবজাত পদ্ধতি। কেননা এটি হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে মানুষ তার ভাবনা সমূহ এবং বস্তু সম্পর্কে তার জ্ঞানকে বুঝতে পারে। এটা মানুষের এক অনন্য ক্ষমতা যার মাধ্যমে মানুষ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ধারনায় পৌঁছে।
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (Empirical or Scientific Method)
এটি হচ্ছে কোন কিছুর উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে ঐ জিনিষটির কিছু বাস্তব অবস্থা জানার পদ্ধতি। আর এই প্রক্রিয়া শুধু ভৌত বিষয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। চিন্তা বা মনের উপর এর কোন প্রয়োগ নেই। তাই এই প্রক্রিয়া শুধু পরীক্ষণযোগ্য বিষয়ের জন্য নির্দিষ্ট।
এই প্রক্রিয়াটি নির্ভর করে পরীক্ষাধীন বস্তুর উপর কিছু নতুন পরিবেশ ও অবস্থা আরোপ করার পর বস্তুর পরিবর্তিত অবস্থার সাথে প্রাথমিক তথা মূল অবস্থার তুলনামূলক বিচারের উপর। এই প্রক্রিয়ায় পরীক্ষণ শেষে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও পরিমাপযোগ্য কিছু ফলাফলে উপনীত হতে হয়। আর তা সাধারণত গবেষণাগারেই সম্পন্ন হয়ে থাকে। বৈজ্ঞানিক এই প্রক্রিয়ায় গবেষক যে ফলাফলে উপনীত হন তা কখনোই চুড়ান্ত (Absolute) নয় বরং সব সময়ই আপেক্ষিক। তাই এই ফলাফল সর্বদা ত্রুটিপূর্ণ অথবা ভুলের সম্ভাবনাযুক্ত। বস্তুত: ভুলের সম্ভাবনাকে সব সময় বিবেচনার মধ্যে রাখা বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় গবেষণার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি।
আসলে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া বিবেক-বিবেচনা ভিত্তিক প্রক্রিয়ার একটি শাখা মাত্র। এটা কখনোই চিন্তার মৌলিক ভিত্তি নয়। এটাকে ভিত্তি হিসাবে নেয়া সম্ভব নয় কেননা এটা থেকে চিন্তা উৎসারিত হয়না বরং অনুভূতি-বুদ্ধি-বিবেচনা দ্বারা সৃষ্ট চিন্তাই এই প্রক্রিয়ার সূচনা করে, তাই এটি একটি উৎসের শাখা মাত্র। উপরন্ত বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াকে মূল উৎস হিসাবে ধরে নিলে বেশীর ভাগ তথ্য ও বাস্তব ঘটনা গবেষণার বাইরে থেকে যাবে এবং জ্ঞানের এমন অনেকগুলো শাখা বাদ পড়ে যাবে যেগুলো নিয়ে যথেষ্ঠ চিন্তা-ভাবনা করা হয়েছে আর এগুলোর সত্যিকার বাস্তবতাও বিদ্যমান। অধিকন্তু এ সব বিষয়ের অস্তিত্ব সুস্পষ্ট এবং আমরা আমাদের অনুভূতি ও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে এগুলোর অস্তিত্ব অনুভব করতে পারি।
বিবেক বিবেচনা ভিত্তিক পদ্ধতি, বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া ইত্যাদি কিছু অতি আলোচিত বাস্তব বিষয়। কিন্তু ইসলাম বিরোধী চিন্তাবিদদের অনেকে এ বিষয়গুলোকে অপব্যাখ্যা করে এবং ক্ষেত্র বিশেষে অপপ্রয়োগ করে ইসলামের মৌলিক আকীদা সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া শুধু মাত্র সসীম বিষয়ের জন্য প্রয়োগযোগ্য হওয়া সত্বেও তারা অসীম স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমানের ক্ষেত্রে কেবলই এই প্রক্রিয়াকেই ব্যবহার করার কথা বলেছেন। যে প্রক্রিয়ায় যেকোন সুস্থ চিন্তাক্ষম মানুষ সহজেই স্রষ্টার অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে অর্থাৎ বিবেক-বিবেচনা ভিত্তিক পদ্ধতিটিকে তারা এক্ষেত্রে এড়িয়ে গেছেন। একারণেই বিষয়গুলোর মৌলিক দিক এখানে তুলে ধরা হলো।আল্লাহর অস্তিত্বের বৃুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ
প্রতিটি জিনিসের পেছনে একজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন – এ সিদ্ধান্ত পৌঁছানোর কারণ হচ্ছে আমাদের অনুধাবনযোগ্য প্রতিটি বিষয়, যেমন: মানুষ, জীবন ও মহাবিশ্ব ইত্যাদি সীমাবদ্ধ, দুর্বল, অসম্পূর্ণ এবং তাদের অস্তিত্বের জন্য তারা অপরের উপর নির্ভরশীল। মানুষ সীমাবদ্ধ, কারণ সকল ক্ষেত্রেই সে একটি সীমার মধ্যে বেড়ে ওঠে এবং কখনোই এ সীমাবদ্ধতার বাইরে যেতে পারে না। জীবন সীমাবদ্ধ, কারণ আমরা অনুভব করতে পারি যে এটি স্বতন্ত্র প্রাণীসত্তার মধ্যেই প্রকাশিত হয় এবং তার মধ্যেই বিলুপ্ত হয়। কাজেই এটিও সীমাবদ্ধ।
মহাবিশ্বও সীমাবদ্ধ, কারণ এটি কতগুলো মহাজাগতিক বস্তুর সমষ্টিমাত্র। প্রতিটি মহাজাগতিক বস্তু সীমাবদ্ধ এবং দৃশ্যতই অনেকগুলো সীমাবদ্ধ বস্তুর সমষ্টিও সীমাবদ্ধ। কাজেই নিশ্চিতভাবেই মানুষ, জীবন ও মহাবিশ্ব সীমাবদ্ধ। যখন আমরা সীমাবদ্ধ বস্তুগুলো নিয়ে চিন্তা করি, তখন আমরা দেখতে পাই, এগুলো কোনোটিই আজালী (চিরন্তন- আদি, অন্তহীন ও অসীম) নয়। নইলে এগুলোর কোনোটিই সীমাবদ্ধ হত না। আর একারণেই অবশ্যই একজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন যিনি মানুষ, জীবন ও মহাবিশ্বসহ সকল কিছুকে সীমা প্রদান করেছেন, এগুলোকে সৃষ্টি করেছেন।
এই সৃষ্টিকর্তাকে হয় কেউ সৃষ্টি করেছে, অথবা তিনি নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেছেন, অথবা তিনি চিরন্তন, আদি অন্তহীন (আজালী) এবং যার অস্তিত্ব অপরিহার্য। তাকে কেউ সৃষ্টি করেছে এ ধারণাটি চরম মিথ্যা, কারণ তাহলে তিনি সীমাবদ্ধ হয়ে যান। আর কেউ যদি বলেন, তিনি নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেছেন, তবে এ যুক্তিটিও সম্পূর্ণ অসার, কারণ স্বাভাবিক যুক্তির বিচারে তখন তাকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এধরনের যুক্তির অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে, তিনি সৃষ্টি হবার সময় নিজেকেই সৃষ্টি করছিলেন! এরূপ ধারণা অসম্ভব ও অলীক কল্পনামাত্র। কাজেই সৃষ্টিকর্তা অবশ্যই আজালী (চিরন্তন- আদি, অন্তহীন ও অসীম)। তিনিই মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা।
ন্যূনতম চিন্তা-ভাবনার অধিকারী যে কেউ তার পারিপার্শ্বিকতা থেকে অনুধাবন করতে পারেন যে, সবকিছুর পিছনে একজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন। কারণ সবকিছু থেকে যে সত্যটি বের হয়ে আসে তা হচ্ছে এগুলোর প্রত্যেকটিই অসম্পূর্ণ, দুর্বল ও নির্ভরশীল। কাজেই তারা অবশ্যই সৃষ্ট। বস্তুত মানুষ, জীবন বা মহাবিশ্বের যে কোনো বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিলেই কোনো ব্যক্তি সহজে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন যে, এগুলোর পিছনে একজন সৃষ্টিকর্তা ও একজন সংগঠক রয়েছেন। মহাবিশ্বের যে কোনো বস্তুর প্রতি লক্ষ্য করলে, জীবনের যে কোনো দিকের প্রতি গভীর মনোযোগ দিলে, কিংবা মানুষের যে কোনো বিষয় অনুধাবন করলে প্রতিটি বিষয়ই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার অস্তিত্ব সম্পর্কে সুনিশ্চিত নিদর্শন বহন করে। মহাগ্রন্থ কুরআনে এ বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে এবং মানুষকে তার পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছতে বলা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় মানুষ লক্ষ্য করে কীভাবে একটি বস্তু অপর বস্তুর উপর নির্ভরশীল এবং সুনিশ্চিত সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, নিশ্চয়ই আল্লাহর অস্তিত্ব সত্য – যিনি সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা। কুরআনে বহু আয়াতে এ ধরনের অসংখ্য উদাহরণ লক্ষ্য করা যায়। সুরা আলি ইমরানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেছেন,
“নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিবা-রাত্রির পরিবর্তনে নিদর্শন রয়েছে চিন্তাশীল ব্যক্তিদের জন্য।” (সুরা আলি ইমরান: ১৯০)
এবং তিনি সুরা আর-রুম-এ বলেছেন,
“এবং তার নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি, এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয়ই এ সমস্ত কিছুর মধ্যে জ্ঞানী ব্যক্তিদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” (সুরা আর-রুম, আয়াত ২২)
তিনি সুরা আল-গাশিয়াহতে বলেছেন,
“তবে কি তারা উটের প্রতি লক্ষ করে না যে, কীভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে? এবং আকাশের প্রতি যে, কীভাবে তাকে ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে এবং পর্বতমালার প্রতি যে কীভাবে তাকে স্থাপন করা হয়েছে? এবং ভূ-পৃষ্ঠের প্রতি, কীভাবে তাকে বিস্তৃত করা হয়েছে? (সুরা আল-গাশিয়াহ, আয়াত ১৭-২০)
এবং সুরা আত-ত্বরিকে বলেছেন,
“সুতরাং মানুষ লক্ষ্য করুক তাকে কি হতে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সবেগে স্খলিত পানি থেকে যা নির্গত হয় মেরুদণ্ড ও পাঁজরের মধ্য থেকে।” (সুরা আত-ত্বরিক, আয়াত ৫-৭)
এবং সুরা আল-বাকারাহতে বলেছেন,
“নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, রাত ও দিনের পরিবর্তনে, যা মানুষের কল্যাণ করে তা-সহ সমুদ্রে বিচরণশীল নৌযানসমূহে, আল্লাহ আকাশ থেকে যে বারিবর্ষণে ধরিত্রীকে পুনর্জীবিত করেন তাতে এবং তার মধ্যে যাবতীয় জীবজন্তুর বিস্তারণে, বায়ুর দিক পরিবর্তনে, আকশে ও পৃথিবীর মধ্যে নিয়ন্ত্রিত মেঘমালাতে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” (সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত ১৬৪)
এরূপ আরও অসংখ্য আয়াত রয়েছে যেখানে মানুষকে তার পারিপার্শ্বিকতার বিভিন্ন বস্তু ও তাদের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার আহবান জানানো হয়েছে এবং স্রষ্টার অস্তিত্ব সম্পর্কে বুদ্ধিবৃত্তিক সিদ্ধান্তে উপনীত হবার কথা বলা হয়েছে। এভাবেই সুনির্দিষ্ট বিচার-বিবেচনা ও স্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে আল্লাহর উপর সুদৃঢ় বিশ্বাস স্থাপিত হয়।
দারুল ইসলাম ও দারুল কুফর
‘দার’ শব্দটি আরবি ভাষায় বহু অর্থে ব্যবহার হয়, যেমন: এলাকা/মহল্লা, ঘর, বসতবাড়ি, ভূমি ইত্যাদি। শরীয়াতের পরিভাষায়, দারুল ইসলাম বলতে এমন ভূমিকে বোঝায় যেটি ইসলামের আইন দ্বারা শাসিত হয় এবং যার নিরাপত্তা রক্ষিত হয় ইসলাম দ্বারা অর্থাৎ মুসলিমদের কর্তৃত্ব ও প্রতিরক্ষা দ্বারা। এমন কি, যদি সেই ভূমির অধিকাংশ অধিবাসী অমুসলিমও হয়, তবুও সেটি দারুল ইসলাম।
দারুল কুফর বলতে এমন ভূমিকে বোঝায় যেটি কুফরের আইন দ্বারা শাসিত হয় এবং যার নিরাপত্তা ইসলাম দ্বারা রক্ষিত হয় না অর্থাৎ মুসলিমদের কর্তৃত্ব ও প্রতিরক্ষা দ্বারা এর নিরাপত্তা রক্ষিত হয় না। এমন কি, যদি সেই ভূমির অধিকাংশ অধিবাসী মুসলিমও হয়, তবুও সেটি দারুল কুফর।
মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠ আলেমগণ দারুল ইসলাম ও দারুল কুফরকে এভাবেই সংজ্ঞায়িত করেছেন।
ইমাম আল-কাসানী (রহ) বলেন, হানাফী আলেমগণের মধ্যে এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই যে, ইসলামের আইন কর্তৃত্বশীল হলে দারুল কুফর দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হয়। আমাদের ইমাম (আবু হানিফা) বলেন, তিনটি ক্ষেত্রে দারুল ইসলাম দারুল কুফরে পরিণত হয়: যখন আইনগুলো কুফরের আইনে পরিণত হয়, যখন কুফর রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি ছাড়াই ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত থাকে অথবা যখন মুসলিম কিংবা যিম্মিদের জন্য আর কোনো নিরাপত্তা অবশিষ্ট থাকে না। [বাদাইস সানাই, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩১]
ইমাম আল-সারখাসী (রহ) বলেন, ইসলামী আইনসমূহ কর্তৃত্বশীল হলে একটি ভূমি দারুল ইসলামে পরিণত হয়। [শরহে সীরাতুল কাবীর, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৯৭]
কাজি আবু ইয়া’লা (রহ) বলেন, যে দেশে ইসলামের পরিবর্তে কুফর বাস্তবায়িত হয়, তা দারুল কুফর। [আল-মু’তামাদ ফী উসুলিদ-দ্বীন, পৃষ্ঠা ২৭৬]
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ) বলেন, জমহুর (অধিকাংশ) আলিমদের মতে, দারুল ইসলাম হলো সেই ভূমি যেখানে মুসলিমরা বসবাস করে ও ইসলামের আইনসমূহ কর্তৃত্বশীল। …. ইসলাম কর্তৃত্বশীল না হলে সেটি দারুল ইসলাম নয়। [কিতাব আহকাম আহলিল জিম্মাহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬৬]
শায়খ তাকিউদ্দিন আন-নাবাহানী (রহ) বলেন,والحق أن اعتبار الدار دار إسلام أو دار كفر، لا بد أن ينظر فيه إلى أمرين: أحدهما الحكم بالإسلام، والثاني الأمان بأمان المسلمين أي بسلطانهم، فإن توفر في الدار هذان العنصران، أي أن تحكم بالإسلام، وأن يكون أمانها بأمان المسلمين، أي بسلطانهم كانت دار إسلام، وتحولت من دار كفر إلى دار إسلام، أما إذا فقدت أحدهما فلا تصير دار إسلام
দারুল ইসলাম বা দারুল কুফর বিবেচনা করার ক্ষেত্রে শুদ্ধ পদ্ধতি হলো দুটো বিষয়ের দিকে দৃষ্টি রাখা: এক. ইসলামী আইনের শাসন, দুই. মুসলিমদের কর্তৃত্ব দ্বারা নিরাপত্তা। কোনো দেশ যদি এ দুটো উপাদান অর্জন করে অর্থাৎ ইসলামী শাসন ও মুসলিমদের কর্তৃত্বে নিরাপত্তা লাভ করে, তাহলে দেশটি দারুল কুফর থেকে দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হয়। আবার যদি দেশটিতে এ দুটো উপাদানের কোনো একটি না থাকে, তাহলে সেটি আর দারুল ইসলাম থাকে না। [আশ-শাকসিয়্যাহ আল-ইসলামীয়াহ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৯]
বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীর কোথাও বর্তমানে ইসলামী আইনের পরিপূর্ণ শাসন বা ইসলামী কর্তৃত্বে নিরাপত্তার বিধান নেই। সুতরাং নিঃসন্দেহে বাংলাদেশসহ প্রতিটি মুসলিম দেশ তথা সারা পৃথিবী বর্তমানে দারুল কুফর। বর্তমান বিশ্বে বিপর্যয়ের মূল কারণও হলো এই ইসলামী আইনের অনুপস্থিতি। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ) যথার্থই বলেছেন,
الْفِتْنَةُ إذَا لَمْ يَكُنْ إمَامٌ يَقُومُ بِأَمْرِ النَّاسِ
জনগণের কাজকর্ম তত্ত্বাবধান করার জন্য কোনো ইমাম না থাকলে ফিতনা [বিপর্যয় ও পাপাচার] সৃষ্টি হয়। [আল ফুরু’ লি ইবনে মুফলিহ]
বিপর্যয় ও পাপাচারপূর্ণ এই অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদেরকে সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করে দারুল ইসলামে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।
বইমেলা ২০১২ – কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা
অনেক ব্যস্ততা সত্ত্বেও আজ গিয়েছিলাম একুশে বই মেলায়। সেই মেলার শুরু দিন থেকে যাবো যাবো করে আর যাওয়া হচ্ছিলো না। আগামীকাল শেষ হয়ে যাবে ভেবে শেষে জরুরী কিছু কাজ বাদ রেখেই আজকে গেলাম। ঘুরে আসলাম আমাদের জাতীয় জীবনের খুবই উল্লেখযোগ্য একটি বিশেষ অনুষ্ঠান, মাসব্যপী অনুষ্ঠিত একুশে বই মেলায়। পুরো মেলা ঘুরে বেশ কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা ও খানিকটা সুখস্মৃতি নিয়ে অবশেষে ফিরে এলাম নিজ গন্তব্যে। প্রিয় পাঠকদের সাথে তা শেয়ার করার লোভ সংবরণ করতে না পেরে শেয়ার করছি। লেখক এবং প্রকাশক হিসেবে খুব বেশি না হলেও প্রায় ১২ বছরের সামান্য কিছু অভিজ্ঞতার আলোকে এবারের বই মেলা সম্পর্কে সংক্ষেপে আমার মূল্যায়ন।
প্রথমেই মেলার ভালো দিক এবং সুখকর বিষয়
১. গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারই সম্ভবত: সর্বাধিক সংখ্যক ষ্টলের সমন্বয়ে বই মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এটি খুবই ভালো একটি দিক। এর ফলে অধিক পরিমাণে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছে।
২. এবারের মেলায় অংশগ্রহণকারী অনেক নতুন প্রকাশনা ও প্রতিষ্ঠান মান সম্মত অনেক গুলো নতুন বই প্রকাশ করেছে। এটা খুবই ভালো একটি দিক। এজন্য উদ্যেগ নেয়া ও এগিয়ে আসা সকলকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। জাতীয় পর্যায়ে এমন উদ্যোগের আরো ব্যাপকতা প্রয়োজন।
৩. বাংলা একাডেমি চত্বর ও মেলার ভেতরের পরিবেশ বেশ সাজানো গোছানো। সব গুলো ষ্টলই খুব সুন্দর লাগছিলো। তবে ফুটপাতে হকারদের উৎপাত রাস্তার পাশের ষ্টল গুলোর সৌন্দর্য্য ম্লান করছিলো। এগুলোকে প্রবেশ পথের আরেকটু দূরে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিলো।
কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা
আমাদের দেশে ‘ডান পন্থী’ এবং ‘বামপন্থী’ বলে দু’টি মেরুকরণ রয়েছে। প্রকাশনার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। দেশে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, একুশে বই মেলায় সাধারণত: ‘বামপন্থী’ ঘরানার লোকজনই নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। তারা অত্যন্ত পরিস্কারভাবেই ‘ডানপন্থী’ বা ইসলামী প্রকাশনাকে একুশে বই মেলায় আসতে সর্বাত্মকভাবে বাঁধা দিয়ে থাকেন। অনেক কষ্টে দু’ চারটি প্রকাশনী ‘তদবিরে’র জোড়ে ঢুকে পরে। এই যা।
আমি নিজেও ২০০৮ সালে বই মেলায় আমার প্রকাশনীর জন্য ষ্টলের আবেদন জমা দিয়েছিলাম। সে বছর এ ব্যাপারে অনেক প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সুযোগ হয়েছে। বাংলাবাজারের সম্ভ্রান্ত অনেক ইসলামী প্রকাশনীকেই প্রথম বাছাইতেই বাদ দেয়া হয়। আমারটিরও একই অবস্থা হয়েছিলো। এমনকি অতীতে যারা ষ্টল পেয়েছিলো তাদের অনেকেও ‘মান সম্মত’ ও ‘সৃজনশীল’ বই না থাকার অভিযোগে বঞ্চিত হন। ডজন ডজন গবেষণাধর্মী গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী প্রকাশনা বাদ পড়লেও ‘মান সম্মত’ ও ‘সৃজনশীল’ বইয়ের সংজ্ঞায় বামপন্থী এবং রামপন্থী ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অনেকেই ষ্টল পান যথারীতি।
জাতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত একটি বই মেলায় এই বিভক্তি দু:খজনক। ‘বামপন্থী’ ঘরানার মহামান্য ব্যক্তিরা অন্য ক্ষেত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগীতা ও মেধা বিকাশের কথা বললেও, মুসলিম সন্তানদেরকে নাস্তিকতার সবক দেয়ার সময়, রামপন্থী লেখকদের যৌন সুরসুরি মূলক ফালতু বইয়ের বিশাল সরবরাহকে মেনে নিলেও; ঈমান ও তাওহীদের এবং মানসম্মত ইসলামী প্রকাশনার অনুপ্রবেশ কিছুতেই সহ্য করতে পারেন না। এটা সুস্পষ্টভাবেই তাদের নৈতিক পরাজয়ের প্রমাণ বহন করে। তাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, সৎ সাহস থাকলে মান সম্মত ইসলামী প্রকাশনা গুলোকে আপনারা সুযোগ দিন। তারপর একসাথে প্রতিযোগিতায় আসুন। দেখা যাক, জনগণ কাকে গ্রহণ করে!
এবারের বই মেলায় সবচেয়ে বাজে এবং দুঃখজনক যেই বিষয়টি দৃষ্টিকটু পর্যায়ে চোখে লেগেছে সেটি হচ্ছে বিভিন্ন অযাচিত সংগঠনের নামে অহেতুক অনেক গুলো ষ্টল অপচয়। প্রায় অর্ধশত ষ্টল ফালতু দলীয়করণ, ও বিভিন্ন নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহ করা হয়েছে। এসকল ষ্টল বরাদ্দপ্রাপ্তদের অধিকাংশই সরকারী দলের সাথে সম্পৃক্ত। তাদের ষ্টল গুলোতে বিক্রি হচ্ছে মানহীন একেবারেই ফালতু বই-পুস্তক। পরিচিত প্রকাশনীর মালিক ও বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম এগুলো যারা বরাদ্দ নিয়েছেন তারা ষ্টলপ্রতি বেশ মোটা অংকের টাকা নিয়ে ষ্টল গুলো অধিকাংশই হকারদেরকে দিয়ে দিয়েছেন। তারা এখানে মানহীন সস্থা বই এনে ২৫% কমিশনের চড়া মূল্যে বিক্রি করে নিজেদের পুঁজি উঠিয়ে লাভ নিশ্চিত করছেন। অথচ একই বই বাইরে ৫০-৫৫% কমিশনে বিক্রি হচ্ছে।
ইসহাক খানইসলামী আকীদা
আকীদা (عقيدة):
ইসলামের বিশ্বাস বিষয়ক সর্বশেষ ও প্রসিদ্ধতম পরিভাষা ‘আকীদা’। হিজরি চতুর্থ শতকের পূর্বে এ শব্দটির প্রয়োগ লক্ষ্য করার মত নয়। হিজরী চতুর্থ শতক থেকে এ পরিভাষাটি প্রসিদ্ধি লাভ করে। এর পরবর্তী যুগে এটিই একমাত্র পরিভাষা হয়ে যায়।
আকীদা ও ই’তিকাদ শব্দদ্বয় আরবি এবং উভয়ই ‘আকদ’ (عقد) ধাতু থেকে গৃহীত। এর মূল অর্থ সন্ধান করা, গিরা দেয়া, চুক্তি করা, জমাট হওয়া, শক্ত হওয়া ইত্যাদি। যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন:وَمِنْ شَرِّ النَّفَّاثَاتِ فِي الْعُقَدِ
(আশ্রয় গ্রহণ করছি) গ্রন্থিতে ফুৎকার দিয়ে (জাদুকারিণীদের) অনিষ্ট হতে [সূরা ফালাক ১১৩:৪]
وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِنْ لِسَانِي
এবং আমার জিহ্বা থেকে জড়তা দুর করে দিন। [সূরা তোয়া-হা: ২৭]
‘দ্বীনের বিশ্বাস’ বুঝাতে আকীদা শব্দের ব্যবহার পরবর্তী যুগে ব্যাপক হলেও প্রাচীন আরবি ভাষায় এর ব্যবহার লক্ষ্য করার মত নয়। বাহ্যত হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে এই পরিভাষার প্রচলন শুরু হয়।
‘আকীদা’ ও ‘ই’তিকাদ’ শব্দের ব্যবহার কুরআনুল কারীম ও হাদীস শরিফে দেখা যায় না। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর যুগ বা তাঁর পূর্বের যুগে আরবি ভাষায় ‘বিশ্বাস’ অর্থে বা অন্য কোনো অর্থে ‘আকীদা’ শব্দের ব্যবহার ছিল বলে জানা যায় না। তবে ‘দৃঢ় হওয়া’ বা ‘জমাট হওয়া’ অর্থে ই’তিকাদ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এছাড়া অন্তরের বিশ্বাস অর্থেও ‘ই’তিকাদ’ শব্দটির প্রচলন ছিল।
দ্বিতীয় শতাব্দীর কোনো কোনো ইমাম ও আলেমের কথায় ই’তিকাদ বা ‘আকীদা’ শব্দ সুদৃঢ় ধর্ম বিশ্বাস অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে বলে দেখা যায়। ফিকহুল আকবর-এ ইমাম আবু হানীফা (রহ)-এর বক্তব্যে দৃঢ়বিশ্বাস অর্থে ‘ই’তিকাদ’ শব্দটি দেখা যায়, যদিও ‘আকীদা’ শব্দটি তিনি ব্যবহার করেননি। চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে লিখিত প্রাচীন আরবি অভিধানগুলোতে ‘আকীদা’ শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায় না। পরবর্তী সময়ের অভিধানবিশারদরা এই শব্দটির অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন। ৮ম শতকের প্রসিদ্ধ অভিধানবেত্তা আহমদ ইবনে মুহাম্মদ আল-ফাইউমী (মৃত্যু ৭৭০ হিজরী) বলেন, “মানুষ দ্বীন (বিশ্বাস) হিসেবে যা গ্রহণ করে, তাকে ‘আকীদা’ বলা হয়।”
আধুনিক ভাষাবিদ ড. ইবরাহীম আনীস ও তাঁর সঙ্গীগণ সম্পাদিত ‘আল-মু’জামুল ওয়াসীত’ গ্রন্থে বলা হয়েছে-
الحكم الذي لا يقبل الشك فيه لدى معتقده
“আকীদা অর্থ এমন বিধান বা নির্দেশ, যার বিশ্বাসীর (আকীদা ধারনকারীর) নিকট কোনোরূপে সন্দেহের অবকাশ থাকে না।”
ইসলামী আকীদা ও শরীয়তের মূল উৎস হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী। ওহীর জ্ঞান থেকেই ইসলামী আকীদার উদ্ভব ও উৎপত্তি ঘটে। ওহীর জ্ঞান ব্যতিরেকে যে কোনো ইলমই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। একারণে আল্লাহ তা’য়ালা যুগে যুগে ওহীসহকারে নবী-রাসূল প্রেরণ করেন।
ওহীর প্রকারভেদ – কুরআন ও সুন্নাহ : রাসুলুল্লাহ (সা)-এর প্রতি দুই প্রকারের ওহী প্রেরণ করা হয়েছে। এক. ওহীয়ে মাতলু তথা কুরআন মাজিদ; দুই. ওহীয়ে গায়ের মাতলু তথা রাসুল (সা)-এর হাদীস।
ক. কুরআন মাজিদ: কুরআনুল কারিম মানব জাতির কাছে প্রেরিত আল্লাহর সর্বশেষ বাণী। এর প্রতিটি অক্ষর, শব্দ ও বাক্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত।
খ. হাদীস: আল্লাহ তা’য়ালা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট যে ওহী পাঠাতেন, তা ছিল দু’প্রকারের। প্রথম প্রকার ওহী কুরআন, যা তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো শব্দ ও অর্থসহ আক্ষরিকভাবে মুখস্থ করতেন। সাহাবীদেরকে মুখস্থ করাতেন ও লিখাতেন। দ্বিতীয় প্রকার ওহী তিনি নিজের ভাষায় সাহাবীদেরকে বলতেন, শিক্ষা দিতেন, মুখস্থ করাতেন এবং কখনো কখনো লিখাতেন। এই দ্বিতীয় প্রকারের ওহী ‘হাদীস’ বা ‘সুন্নত’ নামে পৃথকভাবে সংকলিত ও সংরক্ষিত হয়েছে।
হাদীস শব্দের আভিধানিক অর্থ সংবাদ, কথা বা নতুন বিষয়। (ইবনে মানযূর, লিসানুল আরব ২/১৩১-১৩৪; ফাইউমী, মুখতারুস সিহাহ ১/১৫৩)।ইসলামী পরিভাষায় হাদীস বলতে সাধারণত রাসুলুল্লাহ (সা) যা বলেছেন, করেছেন বা অনুমোদন দিয়েছেন, তাকে হাদীস বলা হয়। মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায়, যে কথা, কর্ম ও অনুমোদনকে রাসুলুল্লাহ (সা)-এর বলে প্রচার বা দাবি করা হয়েছে তাই ‘হাদীস’ বলে পরিচিত। এছাড়া সাহাবীগণ ও তাবেয়ীগণের কথা, কর্ম ও অনুমোদনকেও হাদিস বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা)-এর কর্ম, কথা বা অনুমোদন হিসেবে বর্ণিত হাদীসকে ‘মারফু’ হাদীস বলা হয়। সাহাবীগণের কর্ম, কথা বা অনুমোদন হিসেবে বর্ণিত হাদিসকে ‘মাওকুফ হাদীস’ বলা হয়। আর তাবেয়ীগণের কর্ম, কথা বা অনুমোদন হিসেবে বর্ণিত হাদীসকে ‘মাকতু’ হাদীস বলা হয়।
বস্তুত কুরআনুল কারিমের ব্যাখ্যা ও বাস্তব প্রয়োগই হাদীস নামে অভিহিত। কুরআনের পাশাপাশি অতিরিক্ত যে ওহীর জ্ঞান বা প্রজ্ঞা মহান আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (সা)-কে প্রদান করেছিলেন, তার ভিত্তিতে তিনি কুরআনের বিভিন্ন বক্তব্যের ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন এবং বাস্তব জীবনের র্সবক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করেছেন। কুরআন ও হাদীসই আমাদের সকল জ্ঞান ও কর্মের মূল উৎস। ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা) বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেন- “আমি তোমাদের মধ্যে যা রেখে যাচ্ছি, তা যদি তোমরা আঁকড়ে ধরে থাকো, তাহলে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না; তা হলো আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নত।”
বর্ণনাকরীদের সংখ্যার দিক থেকে মুহাদ্দিসগণ বিশুদ্ধ বা সহীহ হাদীসকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। যথা-১. মুতাওয়াতির ২. আহাদ।
১. যে হাদীস সাহাবগীণের যুগ থেকে সংকলন পর্যন্ত সব স্তরে অনেক সংখ্যক রাবি বর্ণনা করেছেন তাকে মুতওয়াতির বা অতি-প্রসিদ্ধ হাদীস বলে। অর্থাৎ যে হাদীস রাসুলুল্লাহ (সা) অন্তত পাঁচজন সাহাবী বর্ণনা করেছেন, প্রত্যেক সাহাবী থেকে অনেক তাবে’য়ী বর্ণনা করেছেন এবং প্রত্যেক তাবে’য়ী থেকে অনেক তাবে-তাবে’য়ী বর্ণনা করেছেন, এভাবে রাসুলুল্লাহ (সা) থেকে সংকলন পর্যন্ত প্রত্যেক পর্যায়ে বহু সংখ্যক ব্যক্তি যে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাকে মুতাওয়াতির হাদীস বলা হয়। প্রতি স্তরে রাবিদের সংখ্যা এত বেশি হওয়া যে, তারা সকলে একত্রিত হয়ে মিথ্যা কথা বানানোর কোনো সম্ভাবনা থাকে না। যেমন – সালাতের ওয়াক্ত ও রাকা’য়াত সংখ্যা, যাকাতের পরিমাণ ইত্যাদি বিষয় বর্ণনা সম্পর্কিত হাদীসের রাবি সংখ্যা।
২. যে হাদীসকে পাঁচজনের কম সংখ্যক সাহাবী বর্ণনা করেছেন, তাকে ‘আহাদ’ বা খবরে ওয়াহিদ হাদীস বলা হয়। খবরে ওয়াহিদ হাদীসকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়-
ক. গরীব: যে হাদীসের সনদের মধ্যে কোনো এক পর্যায়ে মাত্র একজন রাবি বা বর্ণনাকারী রয়েছেন, তাকে গরীব হাদীস বলা হয়।
খ. আযীয: যে হাদীসের সনদের মধ্যে কোনো পর্যায়ে মাত্র দুজন রাবি রয়েছেন, সে হাদীসকে আযীয হাদিস বলা হয়।
গ. মুসতাফিয: যে হাদীসের রাবির সংখ্যা সব পর্যায়ে দুজনের বেশি, তবে অনেক নয় সে হাদীসকে মুসতাফীয হাদীস বলা হয়।
এছাড়াও, বিভিন্ন মুহাদ্দিসের মতে, যে হাদীস সাহাবীগণের যুগে আহাদ বর্ণনা ছিল, কিন্তু তাবে’য়ীগণের যুগ থেতে তা মুতাওয়াতির পর্যায়ে পৌঁছেছে তাকে মাশহুর হাদীস বলা হয়।মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা সুনিশ্চিত জ্ঞান (ইলম কাত’য়ী) এবং দৃঢ় বিশ্বাস (ইয়াকীন) লাভ করা যায়। কুরআনুল কারীমের পাশাপাশি এই প্রকারের হাদীসই মূলত ‘আকীদা’র ভিত্তি। এই প্রকারের হাদীস দ্বারা প্রমাণিত তথ্য অস্বীকার করলে তা ধর্মত্যাগ বা অবিশ্বাস (কুফরী) বলে বিবেচিত হয়।
খবরে ওয়াহিদ বা একক বর্ণনার সহিহ হাদীস আকীদার ফুরু’ এর ক্ষেত্রে গৃহীত। তবে সাধারণভাবে ফকীহগণের নিকট খবরে ওয়াহিদ সুনিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করে না। বরং তা কার্যকর ধারণা প্রদান করে। কর্মের ক্ষেত্রে বা কর্ম বিষয়ক হালাল, হারাম ইত্যাদি বিধিবিধানের ক্ষেত্রে এরূপ হাদীসের ওপরে নির্ভর করা হয়। আকীদার মূল বিষয় প্রমাণের জন্য সাধারণত এরূপ হাদীসের ওপর নির্ভর করা হয় না। তবে মূল বিষয়ের ব্যাখ্যায় ও প্রাসঙ্গিক বিষয়ে তা উল্লেখ করা হয়। [আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কিরানবী, ইযহারুল হাক্ব, ৩/৯২০]
সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত সবই আমরা সহজ ও স্বাভাবিক অর্থে গ্রহণ করি এবং বিশ্বাস করি। পার্থক্য এই যে, কুরআনে উল্লিখিত বা মুতাওয়াতির হাদীসের মাধ্যমে পরিজ্ঞাত কোনে বিষয় অস্বীকার করলে তা কুফরি বলে গণ্য হয়। আর খবরে ওয়াহিদের মাধ্যমে পরিজ্ঞাত বিষয় অস্বীকার করলে তা বিভ্রান্তি (ফাসেকী) বলে গণ্য হয়।
আকীদার ক্ষেত্রে ‘মুতাওয়াতির’ হাদীসের ওপর গুরুত্ব প্রদানের দ্বিবিধ কারণ রয়েছে –
আক্বীদা অবশ্যই নিশ্চিত জ্ঞান হতে হবে। নিশ্চিত জ্ঞান ছাড়া কোনো বিষয়কে দৃঢ় বিশ্বাস হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
যে কেউ আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যকে ডাকে যার ব্যাপারে তার কাছে কোনো প্রমাণ নেই, তার হিসাব তার পালনকর্তার কাছে। নিশ্চয়ই কাফেররা সফলকাম হবে না। [২৩:১১৭]
প্রত্যেকে সম্প্রদায় থেকে আমি একজন সাক্ষী আলাদা করব; অতঃপর বলব, তোমাদের প্রমাণ আন। তখন তারা জানতে পারবে যে সত্য আল্লাহর এবং তারা যা গড়ত, তা তাদের কাছ থেকে উধাও হয়ে যাবে। [২৮:৭৫]
রেওয়ায়াতের যথার্থতার দিক থেকে বর্ণনা দু ধরনের হতে পারে। সুনিশ্চিত (কাত’ঈ) ও অনিশ্চিত (যন্নী)। সুনিশ্চিত ও কাত’ঈ বর্ণনা পাওয়া যায় কুরআন ও মুতাওয়াতির হাদীস হতে। যেসব আহাদ হাদীস বর্ণনার দিক হতে মুতাওয়াতির পর্যন্ত পৌছায় না তা আক্বীদার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
আর যদি আপনি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের অনুসরণ করেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামী করে দেবে। তারা শুধু অলীক কল্পনার অনুসরণ করে এবং সর্ম্পূণ অনুমানভিত্তিক কথার্বাতা বলে থাকে। [আন’আম:১১৬]
বস্তুতঃ তাদের অধিকাংশই শুধু আন্দাজ-অনুমানের উপর চলে, অথচ আন্দাজ-অনুমান সত্যের বেলায় কোনো কাজেই আসে না। আল্লাহ ভাল করইে জানেন, তারা যা কিছু করে। [ইউনুস:৩৬]
যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, তারাই ফেরেশতাদের নারীবাচক নাম দিয়ে থাকে অথচ এ বিষয়ে তাদের কেনো জ্ঞান নইে। তারা কেবল অনুমানের উপর চলে অথচ সত্যরে ব্যাপারে অনুমান মোটেই ফলপ্রসূ নয়। [নাজম:২৭-২৮]
সুতরাং, আকীদা অনিশ্চিত (যন্নী) উৎস থেকে গ্রহণ করা যাবে না। তবে যেকোনো অ-মুতাওয়াতির প্রমানিত গ্রহনযোগ্য হাদীসকে সত্যায়ন (তাসদীক) করা হবে তবে নিশ্চিত সত্যায়ন (তাসদীক যাজিম) করা হবে না। অর্থাৎ গ্রহণযোগ্য হাদীসের বক্তব্যে বিশ্বাস করা হবে তবে আকীদার ভিত্তি হিসেবে শুধুমাত্র সুনিশ্চিত (কাত’ঈ) জ্ঞান গ্রহণ করা হবে।
হাদীসের এই শ্রেণীবিভাগ বুঝতে নিচের উদাহরণটি আলোচনা করা যায়। তা হলো যে কোনো বিচারালয়ে উত্থাপিত মামলার প্রদত্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে বিচারক একটি ‘ধারণা’ লাভ করেন। তিনি মোটামুটি বুঝতে পারেন যে, এ সম্পদটি সত্যি সত্যি এই লোকের বলে মনে হচ্ছে, অথবা এ লোকটি সত্যই এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল বলে বুঝা যাচ্ছে। তিনি এও জানেন যে, তার এই ‘ধারণা’র মধ্যে ভুল হতে পারে। সকল বিচারকেরই কিছু রায় ভুল হয়। সামগ্রিকভাবে সনদ ও অর্থ যাচাইয়েরর পর ‘এককভাবে বর্ণিত’ সহীহ হাদিসের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিস অনুরূপ ‘কার্যকর ধারণা’ লাভ করেন যে, কথাটি সত্যিই রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন। তবে বর্ণনার মধ্যে সামান্য হেরফের থাকার ক্ষীণ সম্ভাবনা তিনি অস্বীকার করেন না। তবে সম্ভাবনা প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত একে কার্যত নির্ভুল বলে গণ্য করা হয়। যখন এরূপ বর্ণনা মুতাওয়াতির পর্যায়ের হয়, তখন ভুল-ভ্রান্তির সামান্য সম্ভাবনাও রহিত হয়।
কুরআন পুরোপুরিই ‘মুতাওয়াতিরভাবে বর্ণিত। যেভাবে রাসুলুল্লাহ (সা)-এর উপরে তা অবতীর্ণ হয়েছে, অবিকল সেভাবেই শতশত সাহাবী তা লিখিত ও মৌখিকভাবে বর্ণনা করেছেন, তাদের থেকে হাজার হাজার তাবেয়ী তা সেভাবে গ্রহণ করেছেন এবং প্রচার করেছেন। কেউ একটি শব্দকে সমার্থক কোনো শব্দ দিয়ে পরিবর্তন করেননি। সহীহ হাদিস তদ্রূপ নয়। হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে সাহাবী-তাবেয়ীগণ অর্থের দিকে বেশি লক্ষ্য রাখতেন। আরবি ভাষা ও বর্ণনাশৈলীর বিষয়ে অভিজ্ঞ সাহাবী-তাবেয়ীগণ প্রয়োজনে একটি শব্দের পরিবর্তে সমার্থক অন্য শব্দ ব্যবহার করতেন। মূল হাদীসের অর্থ ঠিক রেখে শব্দ পরিবর্তনের প্রচলন তাদের মধ্যে ছিল।আকীদা বা দৃঢ় বিশ্বাস মূলত প্রতিটি মুসলমানের ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন, অর্থাৎ আকীদার ভিত্তিসমূহ (উসূল) এর ক্ষেত্রে। এছাড়া আকীদার খুটিনাটির (ফুরু’) ক্ষেত্রে কিছু মতবিভেদ থাকতে পারে। উদাহরনসরূপ, মিরাজ-এর খুটিনাটি যেমন এটি দৈহিকভাবে হয়েছে না আত্মিকভাবে হয়েছে এ নিয়ে সাহাবীদের মধ্যে মতবিভেদ ছিল যদিও মিরাজ সংঘটিত হওয়া নিয়ে কোনো মতবিভেদ নেই।
বিশুদ্ধ আকীদা ও আমল শেখাতেই আল্লাহ নবী-রাসূল প্রেরণ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা) তার উম্মতকে বিশুদ্ধতম আকীদা ও আমল শিখিয়ে গিয়েছেন। আমলের ক্ষেত্রে বিকল্প আছে। সব মুসলিমের উপর ফরয কিছু কাজ ব্যতীত বিভিন্ন ফযীলতমূলক নেক কাজে একটি না করলে অন্যটি করা যায়। কিন্তু আকীদার ক্ষেত্রে বিকল্প নেই। আকীদা সবার জন্য একই রূপে সর্বপ্রথম ফরয। আকীদা রাসুলুল্লাহ (সা) সকল সাহাবীকে সমানভাবে শিখিয়েছেন। যে বিষয়টি বিশ্বাস করা মুমিনের জন্য প্রয়োজন, সে বিষয়টি অবশ্যই রাসুলুল্লাহ (সা) তাঁর সকল সাহাবীকে জানিয়েছেন। এতে আমরা বুঝতে পারি যে, আকীদার বিষয়ে হয় কুরআনে স্পষ্ট আয়াত থাকবে অথবা অগণিত সাহাবী থেকে মুতাওয়াতির হাদিস বর্ণিত থাকবে। প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আকীদার উৎস হতে জেনে বুঝে সঠিক আকীদা গ্রহণ করা এক অবশ্য কর্তব্য। এক্ষেত্রে ইজতিহাদের কোনো অবকাশ নেই। আকীদার উৎস হতে আকীদা সেভাবেই নিতে হবে যেভাবে দেয়া আছে।
আকীদা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের মধ্যে রয়েছে-
১. ফিকহুল আকবর – ইমাম আবু হানিফা
২. আল আকীদা আল ওয়াসিতয়্যাহ – ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ
৩. উসূল আস সুন্নাহ – ইমাম আহমদ বিন হাম্বল
৪. বায়ানু ই’তিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামা’য়াহ – ইমাম আত তাহাবী
৫. আকীদা আন নাসাফী – ইমাম আন নাসাফীপরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করাই কি সব?
বর্তমান সমাজে আমরা সব সময়ই পরীক্ষার সম্মুখীন এবং অনেক ছাত্ররা তাদের সমস্থ সময় ব্যয় করছে পরীক্ষায় ভালোভাবে পাশ করার জন্য। প্রাতিষ্ঠানিক চাপ, সমকক্ষদের চাপ ছাড়াও মা-বাবাদের পক্ষ থেকে থাকবে উৎসাহমূলক চাপ যাতে তাদের সন্তানরা অবসর সময়টাকেও পড়ালেখার পিছনে ব্যয় করে একটা ভাল ফলাফল করতে পারে। ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গঠনের উপর খুব বেশী জোর দেয়া হয় যেন অন্য সব কিছুই তার কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।
পরীক্ষাগুলোর বাস্তবতা: পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় পরীক্ষা পাশটাকে প্রধান বিষয় হিসেবে জোর দেয়া হয়। ভাল ক্যারিয়ার অর্জনের মাধ্যমে এবং নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার মধ্যে দিয়ে বস্তুতান্ত্রিক মূল্যেবোধ খোঁজার মধ্যে এই ধরনের সাফল্যের একটা যোগসূত্র আছে। এই ধরনের জীবন ব্যবস্থায় প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে আনন্দ উপভোগ করা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত এই আনন্দটাকে পুরুস্কার হিসেবে উপস্থাপন করা। খুব কম বয়সেই শিশুদেরকে পরীক্ষা প্রস্তুতির কঠোর পরিশ্রমের সম্মুখীন হতে হয়। পাঁচ বছর বয়স থেকে পনের বছর বয়স পর্যন্ত অনেকগুলো পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। অল্প কিছু সিটের জন্য হাজার হাজার কচি শিশুদের স্কুলের ভর্তি পরীক্ষার জন্য অভিভাবকদের লাইনের পর লাইনে দাড়িয়ে থাকা আমাদের বর্তমান সমাজের একটি পরিচিত ও বিব্রতকর চিত্র। এছাড়াও বিভিন্ন সমাপনী পরীক্ষার পর তাকে পনের-ষোল বছর বয়সে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করতে হয় এবং যদি সে আরও পড়াশুনা করতে চায় তাহলে তার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে এ লেভেল এবং ডিগ্রি পরীক্ষা। খুব কম বয়সেই শিশুদের পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কিত একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে যা আমাদের সমাজে এখন একটি বিতর্কের বিষয়।
এই সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যের পিছনে রয়েছে একটি পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা যেখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতাবাদের চর্চা করা হয় এবং যেখানে ব্যক্তিকে কঠিন পরিশ্রম করতে হয় বস্তুতান্ত্রিক মূল্যেবোধ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সুযোগ সুবিধা খোঁজার জন্য। এই ধরনের ব্যবস্থা করা হয় একটি ভোগবাদী সমাজের জন্য যেখানে পুঁজিবাদীরা একটি লক্ষ্য মাত্রা অর্জন করতে পারে।
স্কুলে শিশুদের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর শেখানো হয়, কিন্তু আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য এবং আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো এখনও পর্যন্ত উত্তরহীন এবং এসব বিষয়কে গুরুত্বহীন আলোচনা বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হচ্ছে। এটি নির্দেশ করে দ্বীনকে জীবন থেকে আলাদা করে ফেলার এবং একটি ধর্মরিপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে ব্যক্তি তার আকাঙ্খাকে সন্তুষ্ট করার জন্য স্বাধীনভাবে যে কোন কাজ করে থাকে। তাই ব্যক্তি এই দৃষ্টিভঙ্গিটাকে অনুমোদন করার মাধ্যমে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতাবাদের দিকে ঝুঁকে এবং প্রাথমিক উদ্দেশ্য হিসেবে ব্যক্তিগত সুযোগ সুবিধা এবং আনন্দ উপভোগের অনুসন্ধান করে।
জীবনটা একটা পরীক্ষা: নিজের জীবনের পরীক্ষাই হচ্ছে জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। মানুষ হিসেবে আমদের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা করতে হবে এবং আমদের অস্তিত্ব ও জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার অস্তিত্বের সাথে আমাদের জীবনের বাস্তবতা সন্দেহাতীতভাবে জড়িত এবং তাই ইসলাম বাণী হয়ে এসেছে সমস্থ মানবজাতির জন্য।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আল কুরআনে বলেন:
আমি জিন এবং মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুধুমাত্র আমারই ইবাদত করার জন্য।” [৫১:৫৬]
যখন কোন একজন এটা গ্রহণ করবে যে, সর্বোত্তম কাজ হচ্ছে আল্লাহর দাসত্ব করা এবং তাকে সৃষ্টির উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর ইবাদত করা তখন সে জীবনকে পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করবে যেখানে ব্যর্থতা ও সফলতা নির্ভর করবে ইসলামের উপর। পরীক্ষা শুরু হবে যখন সে বয়ঃসন্ধিকালে উপনীত হবে এবং শেষ হবে যখন সে মরে যাবে। সে পাশ করেছে নাকি ফেল করেছে তার ফলাফল দেয়া হবে বিচার দিবসে। কৃতকার্যের ফল স্বরূপ তাকে দেয়া হবে জান্নাত এবং অকৃতকার্যের ফল স্বরূপ দেয়া হবে জাহান্নাম। হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম) আমাদের জন্য অনুসরণ করতে কুরআন এবং তার সুন্নাহকে রেখে গেছেন। আমরা যদি সেই আদেশ ও নিষেধগুলো মেনে চলি তাহলে ইহকালে এবং পরকালে সাফল্য অর্জন করতে পারব।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করাটা হতে হবে প্রত্যেক মুসলমানের জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ইসলাম নির্দেশ করে মানুষের জীবনের উদ্দেশ্যে হিসেবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার ইবাদত করার। এই ইবাদতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে জীবনে যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যমে সাফল্য অর্জন করতে হয় এবং ইসলামী জীবন ব্যবস্থা অনুসারে ক্যারিয়ার খুঁজতে হয়। সভ্য নাগরিক হওয়ার জন্য নিজের যত্ন নেয়ার পাশাপাশি পরিবারের যত্ন নেয়াটা একটা কর্তব্য। একজন মুসলমান হিসেবে অন্য সব বাধ্যবাধকতাকে অবহেলা না করে এসব কর্তব্য অবশ্যই পালন করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় পিতামাতা সন্তানদেরকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার- এর মতো ভাল পেশা অর্জনের জন্য চাপ প্রয়োগ করে থাকে। কিন্তু জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ইসলামকে ধরে রাখার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত পরিপূর্ণভাবে করার ও ইসলামিক পরিচিতি রক্ষা করার গুরুত্ব অনুধাবন করতে তারা ব্যর্থ হয়।
যদি আমরা ইতিহাসের দিকে তাকাই, মুসলিমগণ ইসলামী শিক্ষার অধীনে অন্যদের চেয়ে অনেক ভাল করত। মুসলিমরা গণিতবিদ্যা, ভূ-বিদ্যা, আলোকবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসা বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, প্রকৃতি বিজ্ঞান, প্রকৌশল বিদ্যা ইত্যাদি আরোও বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে গিয়েছিল। তাই ভাল পড়ালেখা করে সাফল্যের সাথে কৃতকার্য হওয়া মুসলমানদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম আমাদের আল্লাহর সন্তুষ্টির অর্জনের মধ্যে দিয়ে অধ্যয়ণ করা ও পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার এবং ইসলামকে সমুন্নত রাখার সঠিক প্রেরণা যোগায়।
হযরত মুহম্মদ সাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম সমস্ত মুসলমানদের উপর জ্ঞান অর্জন ফরজ করেছেন, এবং এই জ্ঞান অর্জন করার জন্য যদি সাধনা করতে হয় তাহলে তা অর্জন করার ব্যাপারে সবসময়ে উৎসাহ দিয়েছেন। এসব আদেশ এবং ঐতিহ্যে অনুসরণ করে মুসলিম শাসকরা প্রত্যেক মুসলিম শিশুদের উপর বিদ্যা অর্জন করার গুরুত্ব আরোপ করেন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এবং অন্যান্য শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলেন। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) সন্তানদের প্রতি যত্নবান হওয়ার ওপর জোর দিয়ে বলেছিলেন, একজন পিতা তার সন্তানকে যেসব শিক্ষা দিতে পারে সেগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে উত্তম শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ।
শিক্ষিত জনগণের গুরুত্ব: একজন জ্ঞানহীন ব্যক্তি এমন একজনের মতো যে সম্পূর্ণ অন্ধকার পথে হাঁটে; যার কোন লক্ষ্য নেই যে সে কোথায় যাচ্ছে যার ফলে সে সহজে শয়তান দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই ধরনের বড় বিপদ দেখা যায় কারণ ইসলামী শিক্ষার অভাব এবং কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশের প্রতি অসতর্কতা থাকার দরুণ। যদি কেউ আলোকিত জ্ঞান দ্বারা হেদায়েতপ্রাপ্ত হয় তাহলে সে তার জীবনের প্রত্যেক মুহূর্তে একটি সহজ সরল পথ খুঁজে নিতে পারবে। সে অবশ্যই কুফর এবং শিরককে চিহ্নিত করে এসব বিপদজনক রাস্তা পরিহার করতে পারবে, যা সেটা সহজে অতিক্রম করতে পারে। এই ধরনের জ্ঞানে দৃঢ় সংকল্প থাকা যায় যদি সে সত্যিকারের মুসলিম হিসেবে আচরণ করে এবং সহজ সরল পথে অবস্থান করে। তাই এটি একটি তুচ্ছ বিষয় নয় যা অবহেলা করা যায়। কেউ-ই ব্যবসা বাণিজ্য, পেশাগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য অর্জনের লক্ষ্যে যা যা গুরুত্বপূর্ণ সেইসব প্রয়োজনীয় কাজগুলোকে অবহেলা করে না। তাহলে কেন ঐ জ্ঞান অর্জন করার জন্য অমনোযোগী হওয়া উচিত যার উপর নির্ভর করে আছে চূড়ান্ত পরীক্ষার সাফল্য। ইসলাম সবসময় শিক্ষা এবং জ্ঞান অন্বেষণের জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করেছে এবং উৎসাহ যুগিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে খিলাফত যখন প্রতিষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ তখন মুসলিম উম্মাহকে জ্ঞান ও শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ যাতে অন্য রাষ্ট্রের সাথে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নেতৃত্ববান শক্তিশালী রাষ্ট্র হতে পারে। সুতরাং প্রত্যেককে দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া এবং অন্যকে শিক্ষিত করে তোলার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হবে যেন প্রত্যেকেই ইসলামের জন্য দাওয়াত বহন করতে পারে; যা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচিত।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আল কুরআনে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন:
বল, তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভ্রাতা, তোমাদের পত্নী, তোমাদের স্বগোষ্ঠী, তোমাদের অর্জিত সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য যার মন্দার পড়ার আশংকা কর ও তোমাদের বাসস্থান যা তোমরা ভালবাস, (এসব) তোমাদের নিকট যদি আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করা অপেক্ষা অধিক প্রিয় হয় তবে অপেক্ষা কর আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত। আর আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না। [তওবা:২৪]
রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে প্রেরণের উদ্দেশ্য

‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ এর উপর বিশ্বাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি না এর সাথে ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্’-অর্থাৎ ‘মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ্’র রাসূল’ এটি যোগ করা না হয়। কেননা তাঁর মাধ্যমেই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর বাণী আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে। একজন মুসলমানকে অবশ্যই হযরত মুহাম্মদ (সা) এর শ্রেষ্ঠতম ও সর্বশেষ নবী হওয়ার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে এবং তাঁর নবুয়্যাত তথা তাঁকে প্রেরণ করার উদ্দেশ্য পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে।
একটি সুনির্দিষ্ট মিশন দিয়ে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাঁর রাসূল (সা) কে মানব জাতির কাছে পাঠিয়েছেন, আর তা হলো আল্লাহ্র প্রেরিত জীবন ব্যবস্থা – ইসলামকে পৃথিবীতে মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত আর সব বাতিল জীবন ব্যবস্থার উপর অধিষ্ঠিত করতে, তাদের শক্তিকে খর্ব করতে ও ইসলামকে একমাত্র বিজয়ী দ্বীন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ উপর আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে নাযিলকৃত গ্রন্থ আল-কুর’আন তাঁর মিশনকে নিম্নের আয়াতদ্বয়ে স্পষ্ট বলে দিচ্ছে:
“নিশ্চয়ই আমরা তোমাকে পাঠিয়েছি সত্যসম্বলিত গ্রন্থ দিয়ে যাতে করে আল্লাহ্ তোমাকে যা দেখিয়েছেন তা দিয়ে তুমি মানবজাতিকে শাসন করতে পারো।” [সূরা নিসা : ১০৫] এবং
“তিনিই আল্লাহ্, যিনি তাঁর রাসূলকে পাঠিয়েছেন হেদায়েত ও সত্য দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) সহ, যাতে করে তা আর সব দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) এর উপর বিজয় লাভ করতে পারে যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।” [সূরা তাওবা : ৩৩]
ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
“আমি (আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে) আদিষ্ট হয়েছি যেন মানুষের সাথে যুদ্ধ করতে থাকি যতক্ষণ না তারা “আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং আমি মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ্’র রাসূল” – একথার স্বীকৃতি দেয় এবং নামাজ কায়েম করে আর যাকাত আদায় করে। অতএব, যদি তারা তা করে তবে তাদের জীবন ও সম্পদ আমার কাছ থেকে নিরাপদ, তবে যেটা আল্লাহ্’র আইন (অর্থাৎ শারী’আহ্ লঙ্ঘনে প্রাপ্য শাস্তি) তা ব্যতীত। আর তাদের হিসাব নিকাশ আল্লাহ্’র কাছে।” (বুখারী)
মানবজাতির প্রতি রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর বৃহত্তর আহ্বান ছিল এই যে, তারা যেন আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্বে কোন প্রকার শরীক না করে আর পুরোপুরি আল্লাহ্’র কতৃত্বকে মেনে নেয়। এর অর্থ হচ্ছে সমগ্র মানবজাতি তাঁকে স্বীকার করে নিতে এবং তাঁর আনীত জীবন ব্যবস্থা ইসলামকে মেনে নিতে বাধ্য। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন,
“সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে (আমি) মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর জীবন! বর্তমান মানব গোষ্ঠীর কোন ইহুদী বা নাসারা আমার আবির্ভাবের সংবাদ শোনার পর যে দ্বীন নিয়ে আমি প্রেরিত হয়েছি তার প্রতি ঈমান না এনে মৃত্যুবরণ করলে সে নিশ্চিতই জাহান্নামীদের অন্তর্ভূক্ত হবে।” (মুসলিম)
অর্থাৎ, তাঁর আগমনের পর থেকে শুরু করে সব যুগের সমগ্র মানবজাতির জন্যই তাঁকে একমাত্র পদপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করা এবং ইসলামের মাধ্যমে পৃথিবীতে মানবজাতির সকল কর্মকান্ড পরিচলনা করা আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে মানবজাতির প্রতি একটি বাধ্যতামূলক বিষয়। কেননা, রাসূল এই উদ্দেশ্যেই প্রেরণ করা হয় যেন তাঁর প্রদর্শিত পথে আল্লাহ্’র পূর্ণ আনুগত্য করা হয়। তাই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র জীবনের প্রতিটি ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর নির্দেশিত পথেই চলতে হবে। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“আমি রাসূল এ জন্যই প্রেরণ করেছি যে, আল্লাহ্’র নির্দেশ অনুসারে তাঁর আনুগত্য করা হবে।” [সূরা নিসা : ৬৪]















