Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ এশিয়া

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ এশিয়া

    ১. ভুমিকা

    ভারতীয় উপমহাদেশ নামে সুপরিচিত এই দক্ষিণ এশিয়া বরাবরই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক মঞ্চ। সংখ্যায় বিপুল এ অঞ্চলের অধিবাসীরা বিশেষ ধরণের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী আর ভৌগোলিকভাবে এ অঞ্চল দূর্গম পাহাড়বেষ্টিত। যেজন্য অতীতের অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে কেবল সুনির্দিষ্ট কয়েকটি পথেই এ অঞ্চলে প্রবেশ করা যেত। কখনো সফলতা, কখনো ব্যর্থতা ইত্যাদি মিলিয়ে বিভিন্ন সময় শীর্ষস্থানীয় দিগ্বিজয়ীরা এসব পথেই এ অঞ্চলে প্রবেশ করেছে এবং এ অঞ্চলসীমায় নিজ নিজ ক্ষমতার পরিধি বিস্তারের চেষ্টা করেছে। সেই ধারাবাহিকতাতেই একসময় মোঘলদের মাধ্যমে এ অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার লাভ ঘটে। তবে নিকট অতীতে ভৌগলিক এই সীমাবদ্ধতা থেকে অনেকেই শিক্ষা নিয়েছে এবং এককভাবে কারো পক্ষে পুরো উপমহাদেশের কর্তৃত্ব ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ফলশ্রুতিতে, উপমহাদেশ বিভক্ত হয়েছে একাধিক অংশে এবং একক কোন ব্যবস্থায় এটা আর পরিচালিত হচ্ছেনা।

    ২. সাম্প্রতিক পরিস্থিতি (বিংশ ও একবিংশ শতাব্দী)

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে আমেরিকার আবির্ভাব ঘটে। সে নতুন উদ্যম, হিংস্রতা ও গোটা পৃথিবীর সম্পদ লুটপাটের সর্বগ্রাসী লোভ নিয়ে নয়া উপনিবেশবাদ শুরু করে। অতি অল্প সময়ে আমেরিকা বৃটিশ সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ করে এবং প্রায় প্রতিটি স্থানে তাদেরকে বিতাড়িত করে। এ ক্ষেত্রে আমেরিকা শুধু ব্রিটিশদেরকেই নয় বরং সমান লক্ষ্যে অগ্রসর অন্যসব শক্তিগুলোকেও ছাড়িয়ে যায়। এটাই হচ্ছে গত শতাব্দীর সব আঞ্চলিক ও দেশীয় রাজনীতির পেছনে কার্যকর অপ্রকাশ্য কারণ। এভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে বিশ্বে নিজের ভিত তৈরী করে এবং এই ভিতকে আরো মজবুত ও স্থায়ী করার লক্ষ্যে সুগভীর পরিকল্পনার জাল বিস্তার করে।

    দক্ষিণ এশিয়ার প্রতি মার্কিন নীতি মূলত মধ্য এশিয়ায় মার্কিন স্বার্থ, চীন নিয়ন্ত্রণ নীতি (Policy of Containing China) এবং ইসলামিক আন্দোলন দমনের ভিত্তিতে আবর্তিত, যা নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

    ৩. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্য এশিয়া

    ভূ-কৌশলগত দিক থেকে মধ্য এশিয়া মূলত রাশিয়ার বর্ধিত অংশ, যা মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। মধ্য এশিয়ার সাথে রাশিয়ার কোন প্রকৃতিগত স্বাভাবিক সীমানা নেই, নেই কোন সাগর-মহাসাগর ইত্যাদি। একই কথা চীনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, চীন মধ্যএশিয়াকে তার পেছনের দরজা মনে করে। যেহেতু মধ্য এশিয়ার বেশিরভাগ জনগোষ্ঠী মুসলিম, সেহেতু চীন ও পূর্ব তুর্কমেনিস্তানে অবস্থানরত মুসলিমদের উপর মধ্য এশিয়ার মুসলিমদের প্রভাব সম্পর্কে চীন খুবই ভীত-সন্ত্রস্ত। এই কৌশলগত গুরুত্বের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মধ্য এশিয়াকে নিয়ে নিজস্ব পরিকল্পনা সাজায়। এই পরিকল্পনার একদিকে রয়েছে রাশিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা আর আরেকদিকে রয়েছে চীনকে অবরোধ করে রাখা এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের উপর চীনের প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনাকে খর্ব করা।

    অধিকন্তু, মধ্য এশিয়া এবং বিশেষ করে কাস্পিয়ান সাগর তেল সমৃদ্ধ অঞ্চল। এছাড়াও এই অঞ্চলে স্বর্ণসহ বহু মূল্যবান ধাতব পদার্থের খনি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের মতই এই অঞ্চল পৃথিবীর খনিজ সম্পদের প্রাচুর্যের দিক থেকে অন্যতম ধনী অঞ্চল। এই বিশাল সম্পদের প্রতি মার্কিন বিশালকায় পুঁজিবাদী কোম্পানিগুলো আকৃষ্ট এবং বিনিয়োগের নামে কোম্পানিগুলো এই অঞ্চলে প্রবেশ করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের মতই এই অঞ্চলের দুর্ভোগের জন্য ঔপনিবেশবাদীরাই দায়ী আর এই অঞ্চলের মানুষের সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ঔপনিবেশবাদীরা।

    ২০০৪ সালে পারভেজ মোশার্র‌ফ আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন একটি ধারণা উপস্থাপন করে। তার প্রদত্ত ধারণাটি হচ্ছে – পাকিস্তান তিনটি অঞ্চলের বাণিজ্য ও জ্বালানী পাইপলাইনের মধ্যে সংযোগ রাস্তা হতে পারে। এই তিনটি অঞ্চল হচ্ছে: মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া (ভারত) এবং পশ্চিম এশিয়া (তথা মধ্যপ্রাচ্য)। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে পাকিস্তান এই তিন অঞ্চলের সংযোগস্থলে অবস্থিত বলে এর সুযোগ নিতে চায়। এজন্য পাকিস্তান আরব সাগরের উপকূল জুড়ে আফগানিস্তান সীমান্ত পর্যন্ত অসংখ্য বিশালাকার সমুদ্র বন্দর তৈরী করেছে এবং এই সমুদ্র বন্দরগুলো আমেরিকার অনুকরণে মহাসড়ক দ্বারা পরস্পর সংযুক্ত।

    মার্কিন সিনেটের সামরিক ব্যয় সংক্রান্ত কমিটিতে তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রী কলিন পাওয়েল এ সম্পর্কে ২৭শে মার্চ, ২০০৪ সালে বিস্তারিত বিবরণ দেয় এভাবে, “বাণিজ্য ও সড়ক নেটওয়ার্কের মধ্যে আনা গেলে ককেশাস, মধ্য এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার অঞ্চল সমূহের অমিত সম্ভাবনা রয়েছে। এটা তখনই সম্ভব যখন আমরা এতদঅঞ্চলে নিরাপত্তা দিতে সক্ষম হব। … পাকিস্তান এই বিষয়টি নিরীক্ষা করছে এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো ও সমুদ্র বন্দরগুলো ঢেলে সাজিয়েছে… আর আমরা আফগানিস্তানে আমাদের সহযোগী, সৌদী ও জাপানিদের সহায়তায় মহাসড়ক তৈরি অব্যাহত রাখব”।

    মার্কিন কূটনীতি এই অঞ্চলে (সামরিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক) জোট প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। এই সম্ভাব্য জোট পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত থেকে শুরু হয়ে কাবুল হয়ে তেহরান পর্যন্ত বিস্তৃত। এর ফলে পাকিস্তানকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে কৌশলগত মিত্রতার মানচিত্র নতুন করে সাজানো সম্ভব। ইসলামাবাদে অবস্থিত কিছু রাজনৈতিক সূত্র ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে নতুন জোট তৈরি হওয়ার ভবিষ্যৎবাণী করছে। পরিকল্পিত এই জোট বিদ্যমান ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত মিত্রতার তুলনায় ব্যাপকতর। এরকম আলোচনাও আছে যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপিয়ান ন্যাটোর অনুকরণে এই অঞ্চলেও একটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন এশিয়ান ন্যাটো তৈরী করার স্বপ্ন দেখছে মার্কিনরা। যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত বন্ধু রাষ্ট্রের পাশাপাশি এতে আরো অংশ নিবে ওয়াশিংটনের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কাজাখস্তান ও আজারবাইজান। এই আঞ্চলিক জোটের উদ্দেশ্য হচ্ছে জ্বালানী পাইপলাইনসমূহের নিরাপত্তা বিধান ও সামরিক সুরক্ষা প্রদান করা এবং চীনা বা রাশিয়ান প্রভাব প্রতিহত করা।

    ৪. আমেরিকা এবং চীন

    চীন তার সুবিশাল জনসংখ্যা ও সুবিস্তৃত ভূমির জন্য সবসময়ই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং একই সাথে ভয়েরও কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রথমদিকে বৃটেনই এ অঞ্চলকে নিজেদের বাণিজ্য সম্প্রসারণের বাজার হিসেবে উন্মুক্ত করার পদক্ষেপ নেয়। চীনকে তারা কোন হুমকি হিসেবে দেখেনি বরং এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতাই তারা চেয়েছিলো যাতে করে দূরপ্রাচ্যে তাদের বাকী উপনিবেশগুলো নিয়ে সমস্যায় পড়তে না হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে আমেরিকার সাথে চীনের সম্পর্ক ছিলো মূলতঃ বন্ধুত্বসূলভ। আমেরিকা ও জাপানের মধ্যে অস্থিতিশীল সম্পর্ক এবং চীনের প্রতি জাপানের আক্রমণাত্মক অবস্থা, আমেরিকা ও চীনকে নিকটতর করে। উদাহরণস্বরূপ, যখন পার্ল হারবার আক্রান্ত হয়েছিলো, চীন তখন জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলো।

    সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর চীনের ব্যবস্থা যখন কমিউনিজমে রূপান্তরিত হলো তারপর থেকে তারা অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন চিন্তা বাদ দিয়ে নিজেদের সীমানার বাইরের বিষয় নিয়ে খুব কমই মাথা ঘামিয়েছে। এ ব্যাপারে একমাত্র ব্যতিক্রম হচ্ছে উত্তর ভিয়েতনাম ও উত্তর কোরিয়ার কিছু বিষয়ে তার সংশ্লিষ্টতা এবং ভারতের সাথে সামান্য বিরোধ। চীনের এই আচরণ রাশিয়ার সাম্রাজ্য বিস্তারের উচ্চাভিলাষের সাথে কোন ক্রমেই তুলনীয় নয়। ফলে, মতাদর্শগতভাবে পুঁজিবাদের বিরোধী হওয়ার কথা বাদ দিলে, এটা ইঙ্গ-মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে কোন প্রত্যক্ষ হুমকি ছিল না। বরং সময় সময় বিভিন্ন বিষয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে চীনকে ব্যবহার করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু, কমিউনিজমকে বাদ দেয়ার পর থেকে নিজের সীমানার বাইরেও চীন দৃষ্টি দিতে শুরু করেছে। চীন যখন নিজেকে ক্ষমতাধর এক অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে এবং পারমাণবিক অস্ত্রে সুসজ্জিত করে গড়ে তুলছিলো, আমেরিকার তখন এটাকে সহ্য করা এবং পর্যবেক্ষণ করা ছাড়া উপায় ছিল না। বর্তমানে চীনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমগ্র এশিয়া এমনকি সমগ্র বিশ্বে স্বীয় প্রভাব বিস্তারের পথে অন্যতম হুমকি মনে করে। “সাধারণভবে ধারণা করা যায় যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের স্বরূপ কেমন হবে তার উপর একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতি বহুলাংশে নির্ভর করবে”।

    মেডিলিন অলব্রাইট (পররাষ্ট্র মন্ত্রী) ২০০০ সালে প্রদত্ত “U.S. , China & India in the 21st Century” শীর্ষক এক ভাষণে এশিয়া ও ইউরোপে বাজার হারানোর ভয়ে চীনকে ডব্লিও. টি.ও.ভূক্ত করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বার বার তাগিদ দেন। তিনি যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, চীনের অর্থনৈতিক বিস্ফোরণ থামানোর জন্য এই চুক্তিই একমাত্র পথ, কেননা তখন চীনকে W.T.O এর কঠিন বিধিমালা মেনে চলতে হবে। তিনি তার বক্তব্যে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উল্লেখ করেন যা চীনের উপর চাপ সৃষ্টিতে সহায়তা করবে। যেমন:

    · পরমাণু প্রযুক্তি-সমৃদ্ধিকরণ নিষেধাজ্ঞা

    · তাইওয়ান প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দক্ষিণ চীন সাগরে সহযোগীতা

    · তিব্বতের ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং দালাইলামার সাথে সংলাপ শুরু করা

    · কোরিয়ার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা

    · মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন

    এখানে মূল বিষয় হলো, আমেরিকা চীনের ক্রমাগত একটি পরাশক্তি হয়ে উঠার সম্ভাবনার ভয়ে ভীত এবং সেজন্যই সে বিভিন্ন উপায় উপকরণ ব্যবহার করে চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে, যাতে চীনকে নিজের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানেই ব্যস্ত রাখা যায়।

    এর পাশাপাশি, আমেরিকা আরেকটি কৌশলও চালিয়ে যাচ্ছে। তা হলো, চীনের চারপাশ ঘিরে যে রাষ্ট্রগুলো আছে, সেগুলোকে আরো শক্তিশালী করা কিংবা আমেরিকার প্রভাবাধীনে আনা অথবা যথেষ্ট পরিমাণে অস্থিতিশীল রাখা যাদেরকে দিয়ে চারপাশ থেকে চীনকে অবরুদ্ধ করে রাখা যাবে। ফলশ্রুতিতে, চীন নিজের সীমানার বাইরে প্রভাব বিস্তারের কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ পাবেনা এবং চীন নিজেকে নিজের সীমানার মাঝেই আবদ্ধ রাখবে। উত্তর দিকে চীনকে নিয়ন্ত্রণের জন্য রাশিয়া রয়েছে, অতএব ওইদিক নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। পূর্বদিকে রয়েছে জাপান, তাইওয়ান এবং দক্ষিণ কোরিয়া। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণাধীন ইন্দোচীন, ফিলিপাইন এবং ইন্দোনেশিয়া। পশ্চিমদিকে (যেটাকে সচরাচর ‘চীনের পিছনের দরজা’ বলে অভিহিত করা হয়) রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন মধ্য এশিয়া, বিশেষ করে উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান। ‘এশিয়ান ন্যাটো’ তৈরি করার যে পরিকল্পনা নিয়ে কথা চলছে, তা হবে আমেরিকা নিয়ন্ত্রিত এবং এতে উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের পাশাপাশি কাজাখস্তান ও আজারবাইজানকে অন্তর্ভূক্ত করা হবে। চীনের চতুর্দিকের দেশগুলিকে আমেরিকা বল প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের বাধ্য করছে যাতে তারা চীনের দিকে সর্বদা কঠোর দৃষ্টি রাখে। চীন এই অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বের হবার কোন চেষ্টা করছে না। চীনের প্রতি বার্মার আনুগত্য এই অবরোধ প্রাচীর অতিক্রম করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে, যদিও অবরোধ পুরোপুরি ভেঙ্গে ফেলার জন্য এটা যথেষ্ট নয়। মায়ানমারের মাধ্যমে চীন সরাসরি ভারত মহাসাগরে যেতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও আমেরিকা বার্মার সামরিক জান্তার উপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করে রেখেছে এবং অং সান সু কীকে গণতন্ত্র (!) প্রতিষ্ঠায় ইন্ধন দিচ্ছে।

    চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, আমেরিকা ও তার মিত্রদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক হুমকি ছাড়াও, সে তার সীমানা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোতে বিশেষ করে মধ্য এশিয়ায় ইসলামের ক্রম উত্থানে চিন্তিত। এ ক্ষেত্রে চীনের দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে তার সীমানার অভ্যন্তরস্থ মুসলিমরা বিশেষ করে পূর্ব তুর্কমেনিস্তানের মুসলিমরা এ অঞ্চলে ইসলামের এই উত্থানে প্রভাবিত হতে পারে। বিষয়টির আরো জটিলতা হচ্ছে আমেরিকাও পূর্ব তুর্কমেনিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন দিচ্ছে। চীন এখন বাধ্য হচ্ছে ‘সাংহাই-৬ সন্ত্রাসবিরোধী সম্মেলন’ এ অংশ নিতে, এটা জানা সত্বেও যে এটা আমেরিকার তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

    ৫. আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়া

    ভারতের সাথে কৌশলগত বন্ধুত্ব

    ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজমুকুটে একটি উজ্জ্বল মুক্তা যা শতাব্দীকাল ধরে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি। এতদসত্ত্বেও এখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের বলশেভিক আন্দোলনের প্রভাবে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মানোভাবের ছোঁয়া লাগে। এটা ব্রিটিশদেরকে মধ্যপ্রাচ্যের মতোই ব্যাপক সমস্যায় ফেলে দিয়েছিলো, এমনকি এখানে বরং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনা আরো বেশী প্রাণবন্ত ছিল। তথাপি, বৃটেন ধূর্ততার সাথে এ অঞ্চলের স্বাধীনতা এবং দেশ-বিভাগ সৃষ্টি করে ঠিকই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হয়। এ সময় দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মঞ্চে পশ্চিম পাকিস্তানের হাত ধরে আমেরিকার আগমন ঘটে, এটা সম্ভব হয়েছিল আইয়ুব খানের আমেরিকা প্রীতির কারণে। যদিও পরবর্তীতে ভারতের কাছে (এবং বৃটেনের কাছে) ১৯৭১ সালে তাদেরকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে হারাতে হয়।

    ইঙ্গ-মার্কিন বিরোধের অংশ হিসেবেই আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্ক ছিল তিক্ত (কিসিঞ্জার ভারতকে “বাস্টার্ড” বলেছিল)। নিক্সন-কিসিঞ্জার শাসনকালে আমেরিকা এ সম্পর্ক উন্নয়নে কোন পদক্ষেপ দেয়নি। ঐ সময় ভারত আমেরিকার কাছে খুব বেশী গুরুত্ব পায়নি, কেননা তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে গাঁট বেধে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলো দক্ষিণ-পূর্ব দিকে থেকে। এর পাশাপাশি ভারত হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং এর সোশালিজম সংস্করণের প্রতি বন্ধুপ্রতিম, যা ছিল আমেরিকা কর্তৃক ভারতকে অপছন্দ করার আরেকটি কারণ। ভারতের প্রতি পাকিস্তানের বৈরি মনোভাবকে আমেরিকা ঔদাসিন্যের দৃষ্টি নিয়েই দেখতো, মাঝে মাঝে উৎসাহ দিত।

    ঐ সময়গুলোতো ভারত তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ হিসেবে নিজেকে সামলাতেই বেশী ব্যস্ত ছিলো। বাইরের প্রতি তার দৃষ্টি সীমাবদ্ধ ছিলো মূলত নীচের বিষয়গুলোতে:

    · নেপাল, ভূটান ও শ্রীলংকা এসব ছিলো ভারতেরই উপরাষ্ট্রের মতো। এখানে সবকিছু ভারতের নির্দেশনা মতোই চলতো এবং ভারতের জন্য এগুলো তেমন কোন সমস্যা ছিল না।

    · বাংলাদেশ – সবসময়ই ভারতের জন্য একটা সম্ভাব্য হুমকি (মুসলিম, ভারত-বিরোধী এবং পাকিস্তান-মার্কিন পন্থী)। বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে ভারতের জন্য বিপদজনক কারণ বাংলাদেশ ভারতের শরীরের মধ্যে এবং ভারতকে ‘সেভেন সির্স্টা‌স’ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।

    · চীন – সীমান্ত সংঘাত চলছেই এবং ১৯৬২ সালে সংঘটিত হয়েছে চীন-ভারত যুদ্ধ। এছাড়াও, আরেকটি সত্য হচ্ছে ভারত চীনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিল, যেখানে পাকিস্তান রাশিয়ার বিরুদ্ধে চীনের সাথে সুসম্পর্ক তৈরী করেছিল।

    · পাকিস্তান – যাদের সাথে মূল বিরোধ হচ্ছে ইসলামী ভূ-খন্ড কাশ্মীর নিয়ে। এই উভয়মুখী সমস্যার মিল রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাঈল সমস্যার সাথে। অর্থাৎ ইসরাঈলের অস্তিত্ব মধ্যপ্রাচ্যের বুকে ছুরি বসানোর মত কিন্তু প্রকারান্তরে তা ঐ অঞ্চলে ইসলামী চেতনাকেই আরো উজ্জীবিত করেছে। এসবের ফলশ্রুতিতে কাশ্মীরে পাকিস্তান ও আমেরিকার সহায়তায় জিহাদী ক্যাম্প প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যারা পুরো উপমহাদেশেই প্রভাব বিস্তার করেছে যদিও তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ভারত।

    সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও চীনের উত্থানের মাধ্যমে উপরোক্ত অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে অবরোধ সৃষ্টি করার আমেরিকার পুরোনো কৌশলগুলো চীনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ শুরু হয় যেহেতু চীন এখন একটা নতুন টার্গেট। এ অবস্থায়, প্রতি পদক্ষেপেই মার্কিনীরা ভারতকে সাথী হিসাবে পেতে আগ্রহী যেহেতু ভারত ঐতিহ্যগতভাবে চীন বিরোধী। কংগ্রেসম্যান হেনরী হাইড মন্তব্য করেছেন, “ভারতের সাথে আরো নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে চীনের উত্থানকে ঠেকানো যায়” (Proceedings of the House of Representatives to Pass House Resolution, “The United States and India Nuclear Cooperation Promotion Act”, July 2006) । কংগ্রেসম্যান ওনা রহরাবেচার বলেছেন, “আমি এদিকে দৃষ্টি দিতে চাই যে, ভারত বৃটেনের কাছ থেকে স্বাধীন হবার পরবর্তী সময়গুলোতে মার্কিন-ভারত সম্পর্ক ছিলো খুবই খারাপ। স্নায়ুযুদ্ধের সময় ভারতের অবস্থান ছিলো রাশিয়ার পক্ষে। তা হোক, কিন্তু এখন তো স্নায়ু যুদ্ধ শেষ। এখন আমাদের উচিত ঐ সময় আমরা যা হারিয়েছি তা পুনরুদ্ধার করা”। তাছাড়া, চীনকে সামাল দিতে ভারত অধিকতর সক্ষম একটি শক্তি যেহেতু সে আকৃতি ও জনসংখ্যার দিক থেকে চীনের কাছাকাছি এবং দুই দেশ পাশাপাশি অবস্থিত। দক্ষিণ এশিয়ার আর কোন রাষ্ট্রেরই এককভাবে এই যোগ্যতা নেই।

    অতএব, কার্যত আমেরিকা চায় দক্ষিণ এশিয়া বিশেষতঃ ভারতকে এ অঞ্চলে একটি আঞ্চলিক মহাশক্তি বানিয়ে তাদেরকে চীনের উত্থান দমনের শক্তিশালী হাতিয়াররূপে ব্যাহার করা। আমেরিকা স্বয়ং একাজে মাঠে নেমে পড়েছে। ভারতের সাথে পরমাণু প্রযুক্তি বিনিময়ের সাম্প্রতিক চুক্তি একটা উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত যে এ পরিকল্পনা সফল করতে আমেরিকা কতটুকু এগিয়ে গেছে। কংগ্রেসম্যান গ্রে একারম্যান বলেছেন, “একবিংশ শতাব্দীতে ভারত নীতি তৈরীর এখনই সময়, যা ভারতকে বিশ্বের একটি অন্যতম ও দায়িত্বশীল শক্তি হিসেবে গড়ে উঠার বিষয়কে সমর্থন করবে ও উৎসাহ দিবে, যাতে করে আগামী দশকগুলোতে মার্কিন-ভারত সম্পর্ক আরো সুসংহত হয়”।

    একটি শক্তিশালী ভারত গঠনের লক্ষ্যে মার্কিনীরা চায় এর চারপাশের দেশগুলোতে স্থিতিশীলতা আনয়ন করতে। চীনের চারদিকে অস্থিরতা তৈরী করার নীতির সম্পূর্ণ বিপরীতে মার্কিনীরা ভারতকে স্থিতিশীলতার আবরণে ঢেকে দিতে চাইছে। ভারতকে এভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিলে তা অবশ্যই পাকিস্তান ও বাংলাদেশের উপর নানামুখী প্রভাব ফেলবে। মার্কিন পরিকল্পনায় ভারত হচ্ছে মূল বিবেচ্য আর ভারতের স্বার্থ রক্ষা করতে যেয়ে মার্কিনীরা এর প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পূর্ণ শঠতার সাথে খেলছে এবং তাদেরকে মার্কিন পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন ভূমিকা পালন করতে বাধ্য করছে। এ ব্যাপারে মার্কিনীরা চরম স্বার্থপর। মার্কিনীদের স্বার্থপরতার খোলামেলা প্রকাশ ঘটেছে কংগ্রেসম্যান জি. একারম্যান -এর কথায়, “সময় এসেছে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতি যথাযথ মনোযোগ দেয়ার, বিষয়টিকে এখন আর হালকাভাবে নেয়া যাবেনা। পাকিস্তানের মতই ভারতও বেশ কিছু জটিল প্রতিবেশী দ্বারা বেষ্টিত। প্রতিবেশি পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পরমাণু অস্ত্র উৎপাদন করে চলেছে; চীন পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধের ক্ষেত্রে সন্দেহজনক আচরণ করছে… ভারত যদি ঐ দেশগুলোর প্রতিবেশী না হত, আমরা এরই মধ্যে সেগুলোকে আক্রমণ করতাম… আপনি পাকিস্তান, ইরান ও উত্তর কোরিয়াকে কি বলবেন? আপনি হয়তো তাদেরকে বলতে পারেন তোমরা যদি ভারতের মতো থাকতে চাও, তাহলে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র (Weapons of mass destruction) প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন কর। এগুলোকে উচ্চমূল্যের বিনিময়ে বিক্রি কর না, এগুলোকে সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দিও না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কর, ভারতের মত প্রকৃত গণতন্ত্র… গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নীতি ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমাদের পক্ষে কাজ কর এবং কখনো আমাদের বিপক্ষে যেওনা।” অবশ্য চীনের বিপক্ষে পাকিস্তানের ভূমিকাকে খাট করে দেখা ঠিক হবে না। আমেরিকা মনে করে শেষ পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্তানকে ঐক্যবদ্ধ করে চীনের মোকাবেলায় শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি হিসাবে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো যাবে। এজন্য মার্কিনীরা সার্কের মত বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতার নীতিকে উৎসাহ দেয়।

    পাকিস্তান ও ইসলামী আন্দোলন

    পাকিস্তান নিউক্লিয়ার ক্লাবে অন্তর্ভূক্ত হওয়ায় মার্কিনীদের উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলে তা সমভাবে ভারতের উপরেও সমভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যা মার্কিনীরা চায় না, আর এজন্যই তারা উভয় দেশের ব্যাপারেই চুপচাপ। অবশ্য কাশ্মিরের ঘটনাবলীতে এই অঞ্চলের সমস্ত মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধুমায়িত অসন্তোষ এবং তাদের পরমাণু অস্ত্রের কাছাকাছি থাকাটা মার্কিনীদের যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসে এক শুনানিতে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্র সচিব ক্রিশ্চিনা রোকা উল্লেখ করেছে, “দক্ষিণ এশিয়ায় উদারতা, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পাকিস্তান এবং ভারতের মধ্যে প্রধানত কাশ্মিরকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা”।

    অতএব, আমেরিকা কর্তৃক আফগানিস্তানে নয়া ক্রুসেডের অন্যতম কারণ ছিল কাশ্মিরের মুসলমানদের সমর্থনকারী ইসলামী আন্দোলনগুলোকে দমন করা। মার্কিনীরা মোশাররফকে বাধ্য করেছিল কাশ্মিরী জনগণের স্বশাসনের অধিকারের প্রতি পাকিস্তানের অব্যাহত সমর্থন প্রত্যাহার করতে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন-এর ভাষায়, “শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী হিসাবে মোশাররফ অনেক দুর এগিয়ে গেছেন… তিনি বুঝতে পেরেছেন যে সন্ত্রাসবাদ, সীমিত যুদ্ধ কিংবা পারমানবিক হুমকি দিয়ে ভারতকে কাশ্মির থেকে হটানো যাবেনা… পাকিস্তান যতক্ষণ পর্যন্ত কাশ্মিরী গ্রুপগুলোর সাথে যুক্ত থাকবে, ততক্ষণ সন্ত্রাসবাদের মদদ দেয়ার অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতে পারে না”।

    মোশাররফ তার মার্কিন প্রভুর নির্দেশে এবং ভারতের প্রিয়ভাজন হতে গিয়ে পাকিস্তানে অবস্থিত ইসলামিক ট্রেনিং ক্যাম্পগুলোকে তছনছ করে দিয়েছে। এছাড়া তাকে বাধ্য করা হয়েছে ভারতের সাথে সমঝোতায় আসতে এবং দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলো সমাধান করতে। আর এ সমাধানের শুরু হয়েছে কাশ্মিরের উপর হিন্দুদের অধিকার স্বীকার করে নেয়ার মধ্য দিয়ে। আর এটিকে বলা হয়েছিল দু’দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের পূর্বশর্ত। এসব কিছুই শেষ পর্যন্ত ভারতকে ঘিরে মার্কিন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথকে প্রশস্ত করেছে।

    আমেরিকা ও বাংলাদেশ

    প্রেক্ষিত: ভারত

    একথা পূর্বেই বলা হয়েছে যে ভারতের জন্য বাংলাদেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সোজা কথায় বলতে গেলে বাংলাদেশে রয়েছে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এবং এই জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে ভারতবিরোধী। বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে ভারতের পেটের ভিতরে। বাংলাদেশ তার সীমান্তের ৮০ ভাগই ভারতের সাথে ভাগাভাগি করে। বাংলাদেশ তার অবস্থানগত কারণে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যকে (সেভেন সিস্টারস্‌, যারা ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদের মূল যোগানদার) মূল ভারতীয় ভূখন্ড থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে আসার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে বাংলাদেশের উপর দিয়ে যাওয়া।

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত মিত্রতার ফলে ভারত আনন্দে আত্মহারা। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন ‘স্থিতিশীলতার পরিকল্পনা’র (stabilization plan) উপর যুক্তিভিত্তিক আস্থা ও প্রত্যয় স্থাপন এবং সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়া ভারতের পক্ষে খুবই কঠিন। যার ফলে বাংলাদেশের উপর প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা পরিত্যাগ করা ভারতের জন্য প্রায় অসম্ভব। বাংলাদেশে পরিপূর্ণ স্থিতিশীলতা ভারতের স্বার্থের অনুকুলে নয়। বাংলাদেশ স্থিতিশীল থাকলে ভারতের বঞ্চিত সেভেন সিস্টারস এর রাজ্যগুলোর মধ্যে স্বাধীন হবার বাসনা তীব্রতর হবে। স্বাধীনতার সংগ্রামে তারা স্থিতিশীল ও উন্নত বাংলাদেশকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করবে। তাই ভারত বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে, যা মাঝে মাঝে বাংলাদেশকে ঘিরে মার্র্কিনী পরিকল্পনা ওলট পালট করে দেয়। ভারতের এই আচরণ অনেকটা প্রতিবেশীদের প্রতি ইসরাঈলের আচরণের মতই।

    প্রেক্ষিত: চীন

    চীনের জন্য ভারত মহাসাগরে পৌঁছার স্বল্পতম দূরত্বের পথ হচ্ছে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে, তাই চীনের কাছে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। যদিও দক্ষিণ চীন সাগরের উপর চীনের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রতিষ্ঠিত, ভারত মহাসাগরের উপর তার কোন কর্তৃত্ব নেই। চট্টগ্রাম বন্দর চীনের স্বার্থে ব্যবহৃত হতে দিলে চীনের এই সমস্যার একটি সমাধান হত। তবে চীন মায়ানমারে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরী করছে। যেহেতু মায়ানমারের সরকার চীনের অনুগত, তাই এই গভীর সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে চীন ভারত মহাসাগরে আংশিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। চীনের এই ইচ্ছা ও পরিকল্পনা বুঝতে পেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার দালালদের মাধ্যমে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠার মন্ত্রণা দিয়ে আসছে। পরিকল্পিত এই গভীর সমুদ্রবন্দরে মার্কিন যুদ্ধ বিমানবাহী রণতরী এসে ভিড়তে পারবে এবং একে তারা একটি সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। ফলে পুরো ভারত মহাসাগর মার্কিনীদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং দক্ষিণ এশিয়া ও দূরপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ সংরক্ষণ সহজতর হবে।

    দক্ষিণ এশিয়ায় ‘শান্তি ও স্থিতি’ বজায় রাখার অর্থ হচ্ছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ইসলামিক চরিত্র ও উদ্দেশ্য পরিত্যাগ করা এবং পরিশেষে ‘মডারেট ইসলামিক গণতন্ত্রের’ লেবাস ধারণ করা (ক্রিস্টিনা রোকা)। বর্তমানে দু’টি দেশেই সামরিক শাসন (আড়ালে বা প্রকাশ্যে) থাকা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় এই দুই দেশের ভবিষ্যত নির্ধারিত হবে তার পরিকল্পনা অনুযায়ী। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে বাংলাদেশে বর্তমান সামরিক শাসন প্রয়োজনীয় কিন্তু তা একটি স্বল্পমেয়াদী অন্তর্বর্তীকালীন সমাধান।

    ৬. উপসংহার

    উপরোক্ত বিষয়গুলোই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে। চীনের উত্থান এবং ইসলামী জাগরণ এই অঞ্চলকে কোন দিকে নিয়ে যাবে তা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। এর ভিত্তিতেই (Criteria) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সব ঘটনা বিশ্লেষণ করে এবং রাজনৈতিক কর্মকান্ডের পরিকল্পনা করে। ডিসেম্বর ২০০৪ সালে জাতীয় গোয়েন্দা কাউন্সিল (National Intelligence Council) কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্টে চীনের উত্থান এবং ২০২০ সালের মধ্যে সম্ভাব্য শক্তিশালী খিলাফতের আবির্ভাবের মোকাবেলায় মার্কিন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়। এ কারণে বুশ ও তার সহযোগীদের মুখ থেকে বারে বারে সাবধান বাণী উচ্চারিত হয়েছে, “একটি ব্যাপক ও মৌলিক পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী সাম্রাজ্য যার বিস্তৃতি স্পেন থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত … এটি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার বৈধ সরকারের প্রতি চরম হুমকি”।

    আবু উমর
    জানুয়ারী ২০০৮

  • বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগ্রামের ইতিহাস

    বাংলাদেশের এই ভূখন্ডে রাজনৈতিক সংগ্রাম ও আন্দোলনের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সেই ইতিহাসকে সামনে রেখে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি ও তার সম্ভাব্য বাধাসমূহ আলোচনা করাই এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের বিচারে এই প্রবন্ধে চারটি সময়কালকে (Period) আলাদা আলাদা ভাবে ভাগ করা হয়েছে।

    ১.    প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে ব্রিটিশদের আসার আগপর্যন্ত সময় কাল। (?….১৭৫৭)
    ২.    ব্রিটিশ শাসনামলে রাজনৈতিক আন্দোলন (১৭৫৭-১৯৪৭)
    ৩.    পাকিস্তান আমলে রাজনৈতিক সংগ্রাম। (১৯৪৮-১৯৭১)
    ৪.    বাংলাদেশ আমল ( ১৯৭১-২০০৭)

    Pre-historical period এর আলোচনায় যাওয়ার আগে এই অঞ্চলের ভৌগলিক ও সাধারণ মানুষের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ঠ্যর একটি পর্যালোচনা প্রয়োজন। যে ভূখন্ডটাকে আজকে আমরা বাংলাদেশ বলি, গত ২ হাজার বছর বা তার অধিক কাল সময় ধরে এই অঞ্চলটি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছে। এই অংশের আদি নাম ছিলো রাঢ় বা বঙ্গ। বঙ্গের মানুষের নৃতাত্বিক পরিচয় হলো জাতিগতভাবে এর দ্রাবিড় বা অনার্য। এই অনার্যরা হাজার হাজার বছর ধরে এই ভূখন্ডে বাস করে আসছে এবং এরাই এখানকার আদিবাসী। পরবর্তীতে ভারতীয় উপমাহাদেশে আর্যদের আগমনের (মূলতঃ পারস্য ও মধ্য এশিয়া থেকে) ফলে বৃহত্তর ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ধরণ দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে। আর্যরাই প্রথম এসে প্রতিষ্ঠানিক অর্থে হিন্দু ধর্মের প্রবর্তন ঘটায় ও জাতিভেদ প্রথার (Caste) প্রচলন করে। ভারতীয় উপমহাদেশে সেই থেকে ব্রা‏হ্মন্যবাদের শুরু। ব্রা‏হ্মনরা ধর্মীয়ভাবে ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠার সাথে সাথে তারা উপমহাদেশের অনার্যদের উপর অত্যাচার ও শোষণ শুরু করে। দক্ষিণ ভারত ও বঙ্গে যেহেতু অধিক সংখ্যক দ্রাবিড় বা অনার্য জনগোষ্ঠীর বাস ছিলো- সেকারণে এই দুই অঞ্চলের মানুষের সাথে আর্যদের দীর্ঘ মেয়াদী লড়াই ও সংগ্রাম শুরু হয়। বঙ্গের দ্রাবিড় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠী শুরু থেকেই লড়াকু ও সংগ্রামী জাতি হিসাবে পরিচিত ছিলো। আর্যদের এই জাতিভেদ প্রথা ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই বঙ্গের এই অংশের মানুষ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার চেষ্টা করেছে এবং রাজনৈতিকভাবে তাদেরকে ঠেকিয়ে রেখেছে। যে কারণে উত্তর ও পশ্চিম ভারতে ব্রা‏হ্মন্যবাদের প্রসার ঘটানো সম্ভব হলেও বঙ্গে আর্যরা কখনোই তাদের ঘাঁটি স্থাপন করতে পারেনি। এরই ধারাবাহিকতায় এক পর্যায়ে যখন এই অঞ্চলে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে তখন দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে ছিলো এই কারনে যে, ইসলাম এই সকল মানুষদেরকে আর্যদের আধিপত্য ও শোষণ থেকে মুক্ত করে (emancipation from all kinds of oppression) এক নতুন জীবনের সন্ধান দিয়েছিলো। যে হারে ও গতিতে এই অঞ্চলের মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে ঐতিহাসিকদের কাছে তা এক বিস্ময়কর ব্যাপার। বলা হয়ে থাকে আরব পেনুনসুল্যার (উপদ্বীপ) বাইরে পৃথিবীর আর কোথাও এত বেশী সংখ্যক মানুষ এত অল্প সময়ের মধ্যে ইসলাম গ্রহণ করেনি। বঙ্গের এই অংশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ ইসলামের পতাকা তলে সমবেত হয়েছিলো।

    ইসলামকে তারা দেখেছে জাতিভেদ প্রথা ও শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সহায়ক এক শক্তিশালী মতাদর্শ হিসাবে। যেই মতাদর্শ তাদেরকে মুক্ত করেছে অসাম্য ও ভেদাভেদ থেকে এবং পরিচয় করিয়ে দিয়েছে এক পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার সাথে। এর পরবর্তী ১১শ বছরে যতবারই বিদেশী শাসন ও দেশী শোষণের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলের মুসলমান বা অমুসলিমরা লড়াই করেছে, তার বেশীভাগ সময়েই তাদেরকে সাহস ও শক্তি যুগিয়েছে ইসলামের রাজনৈতিক আদর্শ। বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের মধ্য দিয়েই অত্যাচারী ব্রা‏হ্মন্যবাদের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলের মানুষের রাজনৈতিক সংগ্রামের বিজয়ের শুভ সূচনা হয়েছিলো। ১৭ জন অশ্বারোহী নিয়ে রক্তপাতহীনভাবে বাংলা দখল করা ও লক্ষণ সেনের পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ব্যাপক রাজনৈতিক অর্থ বহন করে। অল্প কিছু সাহসী মানুষের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর সংগ্রামী চেতনা যে অত্যাচারী শাসকদের মসনদ তছনছ করে দিতে পারে তা পরবর্তীতে বাংলার ইতিহাসে বহুবার প্রমানিত হয়েছে। ব্রিটিশ শাসনের আমল পর্যন্ত এমনকি দীর্ঘ ৮০০ বছরের মুসলিম শাসন আমলেও বহুবার এখানকার জনগণ অত্যাচারী মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছে। দুঃখ জনক হলেও সত্যি মুসলমানদের এই রাজনৈতিক ইতিহাস চেপে রাখা হয়েছে প্রচলিত ইতিহাসের বই সমুহে। এমন কি অনেক সূফী সাধকের রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসকেও ইচ্ছাকৃত ভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। তার অন্যতম প্রধান উদাহরণ হলো হযরত শাহ জালাল (রহ.), যিনি কিনা মূলত এক অত্যাচারী হিন্দু রাজার বিরুদ্ধে জিহাদের কাফেলায় শরীক হয়েই এই অঞ্চলে প্রবেশ করেছিলেন। সূফীদের রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসকে পাশ কাটিয়ে শুধুমাত্র তাদের আধ্যাত্মবাদের বিষয়টিকে পরবর্তীতে আমলে নিয়ে আসা হয়েছে মূলত ইসলামের রাজনৈতিক সংগ্রামের শক্তিকে দুর্বল করার জন্য।

    ব্রিটিশদের হাতে ক্ষমতা হারানোর পর, বাংলা সহ সারা ভারতের মুসলমানদের মধ্যে এক তীব্র প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে উঠেছিলো। একটি সংখ্যালঘিষ্ট জাতি হিসাবে মুসলমানরা প্রায় ৮০০ বছর ভারত শাসন করেছে এবং ভারতের ইতিহাসের অন্য যে কোন সময়ের তুলনায় এই সময়কালে ভারতীয় উপমহাদেশের অবস্থা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশী উন্নত ছিলো। যে কারণে সূদুর ইউরোপ থেকে পুর্তুগীজ, ফরাসী ও ইংরেজরা একের পর এক ভারতে এসেছে সম্পদ লুন্ঠন ও দেশ দখলের উদ্দেশ্য নিয়ে। মুসলমানদের শাসনের সময়েই ভারত সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে একটি ঐক্যবদ্ধ দেশ হিসাবে অবস্থান করেছে।

    ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের শুরু থেকেই মুসলমানেরা এই রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ফকির বিদ্রোহ, হাজী শরীয়তুল্লাহ ও তিতুমীরের আন্দোলন সব পর্যায়েই এই অঞ্চলে মানুষ ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম করেছে এবং বহু অত্যাচার ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে। ১৯২০-২১ এর খিলাফত আন্দোলন এর ইতিহাসও অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত। মহাত্মা গান্ধীও এক পর্যায়ে খিলাফত আন্দোলনকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। একদিকে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন ও মুসলমানদের খিলাফত আন্দোলন যুগপৎভাবে বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামের দুটি প্রধান স্তম্ভ হয়ে উঠেছিলো। হাজার হাজার বাংলাদেশের আলেম সেই সময় জেল খেটেছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ও অনাহারে অর্ধাহারে মৃত্যুবরণ করেছেন। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের একটা বিশেষ পর্যায়ে এসে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের হাত থেকে চলে গিয়ে আবার ব্রা‏হ্মন্যবাদী হিন্দু নেতৃবৃন্দ ও কিছু ব্রিটিশভক্ত এলিট মুসলমানদের হাতে চলে যায়। যার ধারাবাহিকতায় মুসলমাদের অন্যান্য অঞ্চলের মতোই ভারতও বিভক্ত হয়ে যায় পাকিস্তান ও ভারত নামক দুটি আলাদা রাষ্ট্রে।

    পাকিস্তান রাষ্ট্র তৈরীতে সেই অঞ্চলের মানুষের ব্যাপক অবদান ছিলো, ১৯৪৭ এ এখানকার ৯৫ শতাংশ মানুষই আন্তরিকভাবে পাকিস্তান চেয়েছিলো একটি সত্যিকার অর্থে ইসলামিক ব্যবস্থার মধ্যে বসবাসের আকাঙ্খা থেকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এলিট শ্রেণীর পাকিস্তানী শাসকরা যেহেতু ইসলামের নাম ব্যবহার করে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের উপর ব্রিটিশদের মতো একই ধরণের ঔপনিবেশিক শাসন চাপিয়ে দিয়েছিলো, সে কারণে এই অঞ্চলের মানুষ তার প্রতিবাদ করতে বাধ্য হয়েছিলো এবং দুর্ভাগ্য হলো ৮০০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম আন্দোলন আর সংগ্রামের নেতৃত্ব মুসলমানদের হাত থেকে সরে গিয়ে ধর্মনিরপেক্ষদের হাতে চলে যেতে শুরু করলো। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংগ্রামে মাওলানা ভাসানীর এর বিশাল অবদান থাকা সত্ত্বেও ধীরে ধীরে আন্দোলনের মূল নেতৃত্ব চলে গেলো ধর্মনিরপেক্ষদের হাতে। ধর্মীয় রাজনীতির বলয় থেকে বেরিয়ে মুসলিম লীগ ভেঙ্গে প্রথম তৈরী হলো আওয়ামী মুসলিম লীগ ও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ। পরবর্তী ১৫ বছরের (১৯৬০-১৯৭৫) এই অঞ্চলের আন্দোলন সংগ্রামের মূল নেতৃত্ব দান করেছে এই ধর্মনিরপেক্ষ অংশই। বাংলাদেশ রাষ্ট্র তৈরীতে আওয়ামী লীগের ও অন্যান্য বামপন্থী সংগঠনের আন্দোলন ও সংগ্রামের ইতিহাস আমাদের মোটামুটি জানা, বিশেষ করে এই আন্দোলন পর্যায়ে আদর্শবাদী বামপন্থী সংগঠন সমূহ ব্যাপকভাবে জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৬ এর ৬ দফা দাবী, ৬৯ এর গণভ্যুত্থান ও ৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই আন্দোলনের মূল বুদ্ধি কৌশল ও শক্তি যোগান দিয়েছে বামপন্থীরা, কিন্তু এর সুফল পুরোটাই ভোগ করেছে আওয়ামী লীগাররা।

    স্বাধীনতা পরবর্তী রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস মূলতঃ আওয়ামী লীগ বিরোধিতার ইতিহাস, ১৯৭২-৭৭ সালে পর্যন্ত জাসদের অভ্যুদয় মূলতঃ বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন ইতিহাসে এক চমকপ্রদ অধ্যায়। সবচেয়ে নূণ্যতম সময়ে একটি একক শক্তিশালী বিরোধী দলের হিসাবে জাসদের আবির্ভাব আওয়ামী বিরোধী আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। এর জন্য মূল্যও দিতে হয়েছে অনেক। এই সময়কালে রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের এক ভয়াবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে ছিলো। জাসদের প্রায় ৩০,০০০ কর্মী রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের শিকার হয়। আওয়ামী লীগের প্রায় মারা যায় ১০,০০০ কর্মী। এছাড়া সর্বহারা পার্টিরও অসংখ্য কর্মী সরকারি পুলিশ ও রক্ষী বাহিনীর হাতে নিহত হয়।

    ৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক আন্দোলনে, ধর্ম নিরপেক্ষ শক্তির পাশা পাশি জাতিয়তাবাদী শক্তির আবির্ভাব ঘটে। ৯০ এর এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে রাস্তায় যুগপৎ ভাবে এই দুই শক্তির অবস্থান আমরা লক্ষ্য করি। এর পাশাপাশি জামায়াতও কিছুটা আন্দোলনের দলে পরিনিত হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো এই যে, ১৯৭১ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে ধর্ম নিরপেক্ষ ও জাতিয়তাবাদী শক্তির তুলনায় ইসলামি দলগুলির উপস্থিতি একবারেই সামান্য। শুধুমাত্র কয়েকটি ইসলামি ইস্যুতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদেরকে রাজপথের আন্দোলনে দেখা গেছে। যেমন তাসলিমা নাসরীন ইস্যু, বাবরী মসজিদ ইস্যু, আওয়ামী লীগের আমলে ব্রাহ্মন বাড়িয়া ইস্যু ইত্যাদি। ২০০০ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা আশা কারি এ অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। গত ৪ বছরে আমরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি যে, এই অঞ্চলের আন্দোলন সংগ্রামের নেতৃত্ব আবার নতুন করে ধর্ম নিরপেক্ষদের হাত থেকে সরে গিয়ে ইসলামিকদের হাতে চলে আসার পক্রিয়া শুরু হয়েছে ইনশাআল্লাহ। 

    আন্দোলনের সম্ভাব্য পরিনতি হিসাবে জেল জুলুমের পর্যায় এখন আমরা অতিক্রম করছি। এই পর্যায় কত দীর্ঘস্থায়ী হবে তা হিসাব করে বলা মুশকিল। এর ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ পর্যায়ে আল্লাহ্‌’কে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে জীবন উৎসর্গের জন্যও আমাদেরকে প্রস্তুত থাকতে হবে। ধারাবাহিকভাবে জেল-জুলুম হত্যার মধ্য দিয়ে খিলাফতের সংগ্রাম জনগেণের সংগ্রামে পরিনত হবে ইনশাআল্লাহ্‌। শুধু তত্ত্বীয় কারণে নয়, আত্মত্যাগের মাধ্যমে আন্দোলনের কর্মীরা সমাজের মধ্যে তাদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। আন্দোলন গড়ে তোলা ও আন্দোলনের নেতৃত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার এটাই একমাত্র পরীক্ষিত রাস্তা।

    সর্বশেষে একথা মনে রাখা দরকার ঐতিহাসিকভাবে এ কথা প্রমাণিত যে, এই অঞ্চলের মানুষের ইতিহাস আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস, এবং আন্দোলন সংগ্রামের জন্য সাধারন মানুষ সবসময়ই প্রস্তুত। আপোষকামী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অরাজনৈতিক মানসিকতা যেনো আমাদের বিভ্রান্ত না করে। সমাজে পরগাছা মধ্যবিত্ত মানসিকতার অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের গুরুত্ব না দিয়ে সাধারন জনগণের রাজনৈতিক চাহিদা বা Pulse বোঝা ও সেই অনুযায়ী অন্দোলনকে চালিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। আর তা করতে পারলে ইনশাআল্লাহ ৮০০ বছর ধরে যেভাবে আমরা আন্দোলন সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছি সেভাবে আবারও এই দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব আমাদের হাতে নিয়ে এসে এই জমিনে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে পারব ইনশাআল্লাহ্‌। আমিন

    ড. শেখ তৌফিক

    নভেম্বর, ২০০৭

  • সত্য গ্রহণে প্রধান বাধাসমূহ ও আত্মপর্যালোচনা

    بسم الله الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله

    সত্য জেনে তা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে যেসব প্রধান বাধাসমূহ কাজ করে তার একটি ক্ষুদ্র পর্যালোচনায় এই প্রয়াস।

    পূর্ববর্তীদের অন্ধ অনুসরন: অধিকাংশ মানুষেরই সত্য গ্রহণে অন্যতম প্রধান বাধা হচ্ছে তাদের পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুসরন। রাসূল (صلى الله عليه وسلم) এর সত্যের আহবানে মক্কার মুশরিকদের তা গ্রহণে অন্যতম অন্তরায় ছিলো তাদের পূর্ববর্তীদের সুন্নাতে জাহিলিয়াহ্’র অন্ধ অনুসরন। বর্তমান প্রেক্ষাপট ও এর ব্যত্যয় নয়।

    কুরআন কারীমে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন:

    وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ قَالُواْ بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لاَ يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَلاَ يَهْتَدُونَ

    “আর যখন তাদেরকে কেউ বলে যে, সেই হুকুমেরই আনুগত্য কর যা আল্লাহ্ তা’আলা নাযিল করেছেন, তখন তারা বলে কখনো না, আমরা তো সে বিষয়ের অনুসরণ করব। যাতে আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে দেখেছি। যদি ও তাদের বাপ দাদারা কিছু জানতো না, জানতো না সরল পথও।”

    وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنزَلَ اللَّهُ وَإِلَى الرَّسُولِ قَالُواْ حَسْبُنَا مَا وَجَدْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لاَ يَعْلَمُونَ شَيْئًا وَلاَ يَهْتَدُونَ

    “যখন তাদেরকে বলা হয় যে, আল্লাহ্’র নাযিলকৃত বিধান এবং রসূলের দিকে এস, তখন তারা বলে, আমাদের জন্য তাই যথেষ্ট, যার উপর আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে পেয়েছি। যদি তাদের বাপ-দাদারা কোন জ্ঞান না রাখে এবং হেদায়েত প্রাপ্ত না হয় তবুও কি তারা তাই করবে?”

    এভাবে, করআনের বিভিন্ন সূরায় এই ধরনের মানুষের কথা বিধৃত হয়েছে।

    বস্তুগত উন্নত সম্প্রদায়ের অনুকরণ: বস্তুগত উন্নত সম্প্রদায়ের অনুকরন সত্য গ্রহণে মানুষকে বাধা দেয়। বস্তুগতভাবে যেসব জাতিকে মানুষ উন্নত দেখে তাদের অনুকরনে লিপ্ত হয় এই ভেবে যে, তাদের অনুকরনে তারা ও উন্নতি সাধনে সফলতা লাভ করবে। কিন্তু, আমাদেরকে এটা মনে রাখতে হবে যে ইসলামের উন্নয়ন বস্তুগত নয় আত্মিক। রাসূল (صلى الله عليه وسلم) এবং খুলাফায়ে রাশিদা যে মসজিদ থেকে বিশ্বশাসণের প্রয়াস পেয়েছিলেন তার ছালা ছিলো খেজুর পাতার অথচ কর্ডোভার সুরম্য মসজিদ আমাদের দী্র্ঘশ্বাসকে প্রলম্বিত করে বৈকি! তাই, বস্তুগত উন্নয়নের এই ভ্রমও মরিচিকার ন্যায় ধোকায় ফেলছে মানুষকে।

    কুরআন কারীমে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন:

    “وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلاَّ مَتَاعُ الْغُرُورِ”

    “আর পার্থিব জীবন ধোকা ছাড়া আর কোন সম্পদ নয়।“

    বর্তমান, তৃতীয় বিশ্বে অধিকাংশ মানুষের বিভ্রান্তি এটাই।

    প্রবৃত্তির অনুসরণ: প্রবৃত্তির অনুসরণ সত্য গ্রহণে অন্যতম প্রধান অন্তরায়। মানুষের বস্তুবাদী এবং ভোগবাদী চাহিদা প্রবৃত্তিজাত। মানুষ তার এই নিম্নগামী তাড়নার বশবর্তী হয়ে পড়লে তার স্বভাবজাত নৈতিকতা এবং বিবেকবোধ হারিয়ে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নিরুপণের যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে।তাই, বর্তমান বিশ্ব নৈতিকতার ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে।

    কুরআন কারীমে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন:

    أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَن يَهْدِيهِ مِن بَعْدِ اللَّهِ أَفَلا تَذَكَّرُونَ

    “আপনি কি তার প্রতি লক্ষ্য করেছেন, যে তার প্রবৃত্তিকে (খেয়াল-খুশীকে) স্বীয় উপাস্য স্হির করেছে? আল্লাহ্ জেনে শুনে তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তার কান ও অন্তরে মহর এটে দিয়েছেন এবং তার চোখের উপর রেখেছন পর্দা। অতএব, আল্লাহ্’র পর কে তাকে পথ প্রদর্শন করবে? তোমরা কি চিন্তাভাবনা কর না?”

    এছাড়াও, মানুষ আত্মপক্ষ সমর্থন, অজ্ঞতা, অহংবোধ, পারিপার্শ্বিকতার কারণে সৃষ্ট স্নায়ু-অবসাদগ্রস্হতা; সর্বোপরি সৃষ্টির প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে উদাসীনতার এবং উন্নাসিকতার কারণে সত্য গ্রহণে ব্যর্থ হয়।

    বর্তমান সময়ের নাস্তিকতা, নারীবাদী, বস্তুবাদ, ভোগবাদ, পূজিবাদ প্রভৃতি এসব কারণের ফলমাত্র।
    বর্তমান সময়ের অস্হিরতায় পূজিবাদী সমাজব্যবস্থায় তরুণ কিংবা বার্ধক্যে উপনীত মানুষ নিজের অস্তিত্ব নিয়ে যে উন্নাসিকতায় মেতেছে তার প্রলেপ হচ্ছে ভোগে মত্ত থাকার প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটানো।
    এটা মরুভূমির উটের সে রোগের মত যাতে সে অতিরিক্ত পিপাসার্ত হয়ে মাত্রাতিরিক্ত পানি পান করে মারা যায়।

    তাই, বর্তমান সময়ের যে কোন তরুণের জীবন দৈনন্দিনকতার ভিত্তিতে নিজেকে প্রবৃত্তির কাছে সমর্পনে কাটে; যেখানে তার জীবন বিভ্রান্তির বেড়াজালে আবদ্ধ। এক বিভ্রান্তি ধাবিত করছে অন্যটির দিকে। আর, যারা এর সাথে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হচ্ছে তারা আত্মাহুতি কিংবা মাদকে সেবছে নিজেদেরকে।

    তাই, বিশ্বমানবতার মুক্তি কেবল সৃষ্টির প্রকৃত উদ্দেশ্য অনুধাবণ করে, সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজেকে আত্মসমর্পনে। আল্লাহ্’র এই সৃষ্টি অনর্থক নয়। তবে, এটা অনুধাবণ করে কেবল বোধ-সম্প্ন লোকেরাই।

    কুরআন কারীমে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন:

    . إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ وَاخْتِلافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِّأُولِي الأَلْبَابِ
    الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَىَ جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلاً سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ .

    “নিশ্চয়ই আসমান ও যমীনের সৃষ্টিতে এবং দিবা-রাত্রির আবর্তনে নিদর্শন রয়েছে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্য। যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহ্’কে স্মরণ করে এবং চিন্তা ও গবেষণা করে আসমান ও জমিন সৃষ্টির বিষযে, (তারা বলে) হে আমাদের প্রতিপালক! এসব তুমি অনর্থক সৃষ্টি করনি। সকল পবিত্রতা তোমারই, আমাদেরকে তুমি দোযখের (আগুনের) শাস্তি থেকে বাচাও।“

    আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের বোঝার তাওফীক দিন।

    امين .
    سبحانك اللهم و بحمدك أشهد أن لا إله إلا أنت أستغفرك و أتوب إليك

    সায়্যিদ মাহমুদ গজনবী

    ____________________________
    [১] সূরা বাকারাহ্: ১৭০
    [২] সূরা মায়িদাহ্: ১০৪
    [৩] সূরা আল-ই-ইমরান: ১৮৫
    [৪] সূরা জাছিয়াহ্: ২৩
    [৫] সূরা আল-ই-ইমরান: ১৯০-১৯১

  • স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির কিছু উপায়

    بسم الله الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله

    ইসলামী জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্মৃতিশক্তির গুরুত্ব সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠে যখন সহীহ হাদীস সংকলনে তা একটি মানদন্ড। তথাপি কুরআন হিফজ করা, হাদীস বর্ণনা করা এবং দ্বীনের প্রয়োজনীয় আরকান-আহকাম ধারন করার জন্য স্মৃতিশক্তির প্রখরতা অতীব প্রয়োজনীয়।

    স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির কিছু করণীয় নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

    -পরিপূর্ণ ইখলাস (اخلاص) অর্থ্যাৎ জ্ঞানর্জনের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি লাভের জন্য নির্ধারণ করা। দুনিয়াবী কোন মোহ্ কিংবা জাহির করা যেনো একে কলুষিত না করে; তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিনিয়ত নিজের নিষ্ঠাকে প্রশ্ন করা।

    -গুনাহ্ থেকে বিরত থাকা। বিশেষ করে কবীরা গুণাহ্সমূহ থেকে। কেননা, দ্বীনী ইলম আল্লাহ্’র এক অশেষ অনুগ্রহ। আর, আল্লাহ’র অনুগ্রহ সীমালঙ্গনকারীদের জন্য নয়।

    -যা শিখা হয়েছে তার উপর আমল করা। কারণ, ইলমের (علم) দাবী আমল (عمل)।

    -শিখা পাঠসমূহ পুনরাবৃত্তি করা। অত্যন্ত পুরনো হলেও এই পদ্ধতি বেশ কার্যকরী।

    -অন্যকে শিক্ষাদান করা এবং দাওয়া’র মাধ্যমে অন্যের কাছে পৌছে দেয়া।

    -মধু, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

    -এছাড়া ও সুন্নাহ্’ভিত্তিক আরো পদ্ধতি রয়েছে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির জন্য।

    কিছু দোয়া আমরা সবসময় পাঠ করতে পারি। নিম্নে কিছু দোয়া উল্লেখ করা হলো:

    – “رب زدني علما” –‘হে আল্লাহ্1 আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দাও’।[১]

    -“رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِّسَانِي يَفْقَهُوا قَوْلِي”

    ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দাও।আমার কাজকে সহজ করে দাও। আমার জিহ্বা’র জড়তা (বচনের ত্রুটি) দূর করে দাও।যাতে তারা আমার বলা কথা বুঝতে পারে’।[২]

    আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের আমল করার তৌফিক দিন।

    امين .
    سبحانك اللهم و بحمدك أشهد أن لا إله إلا أنت أستغفرك و أتوب إليك


    সায়্যিদ মাহমুদ গজনবী

    তথ্যসূত্র:

    [১] সূরা ত্ব-হা: ১১৪
    [২] সূরা ত্ব-হা: ২৫-২৮

  • বিররুল ওয়ালিদাইন – একটি ঘটনা

    অনেক অনেক দিন আগে,

    এক বৃদ্ধ বাবা ও তার সন্তান উটের পিঠে চড়ে এক কাফেলার সাথে হাজ্জ পালনের উদ্দেশে রওনা দিলেন । মাঝ পথে হঠাৎ বাবা তার ছেলে কে বললেন”

    ”তুমি কাফেলার সাথে চলে যাও, আমি আমার প্রয়োজন সেরেই তোমাদের সাথে আবার যোগ দিব, আমাকে নিয়ে ভয় পেয়না”

    এই বলে বাবা নেমে পরলেন উটেরর পিঠ থেকে, ছেলেও চলতে লাগল কাফেলার সাথে, কিছুক্ষন পর সন্ধ্যা হয়ে এল ,ছেলে আশে পাশে কোথাও বাবা কে খুজে পেলনা, সে ভয়ে উটের পিঠ থেকে নেমে উল্টা পথে হাটা শুরু করল, অনেক দূর যাওয়ার পর দেখল তার বৃদ্ধ বাবা অন্ধকারে পথ হারিয়ে বসে আছেন,

    ছেলে দৌড়ে বাবার কাছে গিয়ে বাবাকে জরিয়ে ধরলেন, অনেক আদর করে বাবা কে নিজ কাঁধে চড়ালেন, তার পর আবার কাফেলার দিকে হাটা শুরু করলেন, 

    বাবা বললেন: আমাকে নামিয়ে দাও আমি হেটেই যেতে পারব,

    ছেলে বললেন: বাবা আমার সমস্যা হচ্ছে না,

    এমন সময় বাবা কেদে দিলেন ও ছেলের মুখে বাবার চোখের পানি গড়িয়ে পরল…

    ছেলে বলল: বাবা কাদছ কেন?? বললাম না আমার কষ্ট হচ্ছে না,

    বাবা বললেন: আমি সে জন্য কাদছি না, আজ থেকে ৫০ বছর আগে ঠিক এই ভাবে এই রাস্তা দিয়ে আমার বাবা কে আমি কাঁধে করে নিয়ে গিয়েছিলাম, আর বাবা আমার জন্য দোয়া করেছিলেন এই বলে যে, ”তোমার সন্তান ও তোমাকে এরকম করে ভালবাসবে। আজ বাবার দোয়ার বাস্তব রূপ দেখে চোখে পানি এসে গেল’

    বৃদ্ধ মা বাবা কে আপনি যেমন করে ভালবাসবেন, ঠিক তেমনটাই আপনি ফেরত পাবেন আপনার সন্তানদের মাধ্যমে ! তাই বলছি , নিজের সুখের জন্য হলেও মা বাবার সেবা যত্ন করো ! 

    এই ছিল ইসলামী খিলা-ফত ব্যবস্থার চিত্র। আজ থেকে শত বছর পূর্বে এমন এক সমাজে আমরা বসবাস করতাম যে সমাজ এ ধরনেরই বাবা ও সন্তান তৈরি করত। কারণ সে সমাজে ইসলাম বাস্তবায়ন ছিল। যদিও এখনও সমাজে কিছু সুন্দর মানুষ রয়েছে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে আজ আমরা সেই ধরনের সমাজ থেকে অনেক দূরে সরে এসেছি। পুজিবাদী-ভোগবাদী স্বার্থপর সমাজের কষাঘাতে আমরা আজ অনেক নিচে নেমে যাচ্ছি। একমাত্র ইসলামী খিলা-ফত ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই আমরা সত্যিকার অর্থে আবার সমাজে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সেই চিন্তাকে ফিরিয়ে আনতে পারবো আমাদের মাঝে যখন তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তাকে ছাড়া অন্য কারও এবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সবচেয়ে সুন্দর ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; তবে তাদেরকে ‘উফ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না এবং তাদের সাথে সম্মানজনকভাবে কথা বল। তাদের উপর রহমত (ভালবাসা/স্নেহ/দয়া/মমতা/করুনা) দিয়ে তোমার নতজানু হয়ে থাকা বিনয়ের ডানা মেলে দাও এবং বল: হে প্রতিপালক, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।” [বনী ইসরাঈল: ২৩-২৪]

  • ইসলামে আরবী ভাষা, এর গুরুত্ব ও উম্মতের পুনর্জাগরণে এর ভূমিকা

    ভাষা

    তাঁর আরও এক নিদর্শন হচ্ছে আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্যে নিদর্শনাবলি রয়েছে। [রূম: ২২]

    ভাষা একে অপরের সাথে চিন্তা, ভাবনা ও ধারনার যোগাযোগের মাধ্যম। এর মাধ্যমে চিন্তা-ভাবনা একজন থেকে অন্যজনে প্রবাহিত হয়, এক স্থান হতে অন্য স্থানে প্রবাহিত হয়। লিখিত হোক বা অলিখিত, এটাই মানুষের জন্য চিন্তা-চেতনা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে প্রাচীনকাল হতে। ভাষা অবশ্যই আমাদের চিন্তা প্রক্রিয়ার অংশ নয় বরং এর ফলাফল। এ বিষয়টি Rational ও Empirical উভয় চিন্তার পদ্ধতি দ্বারাই প্রমাণ করা সম্ভব। এটা আমরা বুঝতে পারি যখন আমরা দেখি বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে একই চিন্তা-চেতনা একই ভাবে বিরাজ করে কিন্তু তা প্রকাশ করার সময় বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশ করে। উদাহরনসরূপ, একজন ইংরেজ, একজন চাইনিজ, একজন জার্মান কিংবা একজন বাঙ্গালী ভিন্ন ভাষাভাষী হওয়া সত্ত্বেও কমিউনিজমকে তাদের আদর্শ হিসেবে নিতে পারে। ভিন্ন ভাষা তাদের আদর্শিক চিন্তার মধ্যে কোনো পার্থক্য ঘটায় না।

    ভাষা অনেকটা মানুষের মতোই। এর উদ্ভব হয়, বিবর্তন হয়, উন্নতি হয়, দূর্বলতা দেখা দেয় এবং কখনো কখনো ভাষার মৃত্যু তথা বিলুপ্তিও দেখা দিতে পারে। ভাষার উৎপত্তি মূলত কথ্য রুপে শুরু হয়, পরবর্তীতে তা লিখিত রুপে আসে এবং কোনো প্রতিষ্ঠিত ভাষার পন্ডিতগণ সাধারণত তখনই ভাষার নিয়মনীতি তথা ব্যকরণ রচনা করেন যখন তারা ভাষার বিকৃতির আশঙ্কা করেন।

    আরবী ভাষা

    অন্য সকল ভাষার মতোই আরবীও পৃথিবীর একটি প্রচলিত ভাষা। এটি একটি সেমিটিক ভাষা এবং পৃথিবীর বৃহত্তম সেমিটিক ভাষা। পৃথিবীর প্রায় ২৮০ মিলিয়ন মানুষের জন্য এটি তাদের প্রধান ভাষা। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার প্রায় ২২টি দেশের রাষ্ট্রভাষা এটি। ধারণা করা হয়ে থাকে যে প্রায় তিন হাজার বছর পূর্বে এ ভাষা অস্তিত্বে আসে যদিও এর লিখন প্রক্রিয়ার শুরু আরো অনেক পরে। কেউ কেউ এ ভাষার উৎপত্তি আরো আগে মনে করেন। কোনো কোনো আলেম এটাও মনে করেন যে এ ভাষাটি আল্লাহর পক্ষ হতে আদম (আ) নিয়ে এসেছিলেন, তবে এ মতটি বিতর্কিত।

    ইসলামের সাথে আরবী ভাষার সম্পর্ক

    যদি আমি একে অনারব ভাষার কুরআন করতাম, তবে অবশ্যই তারা বলত, এর আয়াতসমূহ পরিষ্কার ভাষায় বিবৃত হয়নি কেন ? কি আশ্চর্য যে, কিতাব অনারব ভাষার আর রাসূল আরবীভাষী। বলুন, এটা বিশ্বাসীদের জন্য হেদায়েত ও রোগের প্রতিকার। যারা ঈমান আনয়ন করে না, তাদের কানে আছে ছিপি, আর কুরআন তাদের জন্যে অন্ধত্ব। তাদেরকে যেন দূরবর্তী স্থান থেকে আহ্বান করা হয়। [হা মীম আস-সাজদাহ: ৪৪]

    আরবী ভাষার সাথে ইসলামের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ও অবিচ্ছিন্ন। পবিত্র কুরআন মুহাম্মদ (সা)-এর উপর নাযিল হয়েছে আরবী ভাষায়। এবং পুরো কুরআনই আরবী ভাষায় নাযিলকৃত। এটি সম্পূর্ন আরবী এবং এতে কোনো বিদেশী শব্দ নেই। ইমাম শাফেঈ’ তার আর-রিসালাহ গ্রন্থে বলেন: “কুরআন এই দিক নির্দেশনা দেয় যে আল্লাহর কিতাবের কোনো অংশই আরবী ভাষার বাইরে নয়…।” আল্লাহর কিতাবের ১১টি আয়াত হতে এ নির্দেশনা পাওয়া যায় যে কুরআন সম্পূর্ন আরবী ভাষায় নাযিলকৃত। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “বিশ্বস্ত রূহ একে নিয়ে অবতরন করেছে। আপনার হৃদয়ে, যাতে আপনি ভীতি প্রদর্শনকারীদের অন্তর্ভূক্ত হন। সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়।” [সূরা শু’আরা: ১৯৩-১৯৫]

    “এমনিভাবে আমি এ কুরআনকে আরবী নির্দেশরুপে নাযিল করেছি।” [সূরা রাদ: ৩৭]

    “এমনিভাবে আমি আপনার প্রতি আরবী ভাষায় কুরআন নাযিল করেছি।” [সূরা শুরা: ৭]

    “আরবী ভাষায় এ কুরআন বক্রতামুক্ত, যাতে তারা সাবধান হয়ে চলে।” [সূরা যুমার: ২৮]

    “এবং এ কুরআন পরিষ্কার আরবী ভাষায়।” [সূরা নাহল: ১০৩]

    ইসলামী আদর্শের সাথে আরবী ভাষার সম্পর্ক ও এর গুরুত্বকে তিনটি অংশে ভাগ করা যায়।

    মৌলিক বিশ্বাস: এক্ষেত্রে ভাষা তেমন প্রাসঙ্গিক নয়। কোনো ব্যক্তি বুদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতিতে ঈমান এনে আল্লাহ, তার ফেরেশতা, রাসূল, ওহী, বিচার দিবস ও কদর-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে মুসলিম হতে পারে। এক্ষেত্রে ভাষার জ্ঞান থাকা অনিবার্য নয়।

    পালন: ইসলাম পালন করার জন্য কিছু পরিমান আরবী জানা অবশ্যই দরকার। উদাহরণসরূপ, নামায আদায় ইত্যাদি।

    ইসলামী জ্ঞান ও আইনবিদ্যা: ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে প্রকৃতভাবে জানতে হলে ও ইসলামী শরীয়াহর আইনসমূহ অধ্যয়ন করতে হলে আরবী ভাষার জ্ঞান অত্যাবশ্যকীয়। উদাহরণসরূপ, হকুম শরঈ’, উসূল আল ফিকহ ইত্যাদি। সকল যুগেই মুসলিম পন্ডিতগণ ইজতিহাদের জন্য আবশ্যক আরবীভাষা, এর নাহু-সরফের জ্ঞান, শব্দভান্ডার, ব্যকরণ, অলঙ্কারশাস্ত্র ইত্যাদি সম্পর্কে যথেষ্ট পরিমানে জ্ঞান রাখতেন।

    শাইখ তাকী (রহ) বলেন, “ঈমান ও আহকাম বোঝার বিষয়টি ইসলামে দুটি ভিন্ন বিষয়। ইসলামে ঈমান প্রতিষ্ঠিত হয় বুদ্ধিবৃত্তি বা আকলী দলীল দ্বারা। যাতে করে কোনো সন্দেহের অবকাশ না থাকে। কিন্তু আহকাম বোঝার বিষয়টি শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তির উপর নির্ভর করে না, বরং আরবী ভাষা জানার উপর, হুকুম বের করে আনার যোগ্যতা, দূর্বল হাদীস হতে সহীহ হাদীস পৃথক করার উপরও নির্ভর করে।” [১]

    যেহেতু ইসলামী শরী’য়াহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে তথা ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হয় এবং যেহেতু কুরআন ও সুন্নাহ ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি সেহেতু ইসলাম নিয়ে যেকোনো গভীর অধ্যয়ন-এর সাথে আরবী ভাষার অধ্যয়ন থাকা অত্যন্ত আবশ্যক। এখানে আরবী ভাষা বলতে প্রাচীন (Classical) আরবী ভাষা ও তার কাঠামোকে বোঝানো হচ্ছে। কথ্য ও আঞ্চলিক ভাষার চর্চা এক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক। এছাড়াও ইসলামী সভ্যতাকে শক্তিশালীভাবে টিকিয়ে রাখার জন্য আরবী ভাষাকে বিকৃতির হাত রক্ষা করাও আবশ্যক।

    আমাদের সালাফ তথা পূর্ববর্তীগণ এ বিষয়গুলো খুব ভালোভাবেই বুঝতেন। বিশেষ করে খোলাফায়ে রাশিদীনের আমলেও এ বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

    উমর (রা) আবু মূসা আশ’আরী (রা)-কে চিঠিতে লিখেছিলেন, “সুন্নাহর জ্ঞান অর্জন ও আরবীর জ্ঞান অর্জন কর এবং কুরআন আরবীতে অধ্যয়ন কর কারণ এটা আরবী।” [২]

    আরেকটি বর্ণনায় উমর (রা) বলেন, “আরবী শেখ কারণ এটি তোমাদের দ্বীনের অংশ”। তিনি আরো বলেছেন, “কারো কুরআন পড়া উচিত নয় ভাষার জ্ঞান ছাড়া”।

    উবাই বিন কা’ব (রা) বলেছেন, “আরবী ভাষা শেখ ঠিক যেভাবে তোমরা কুরআন হিফজ করা শেখ”। [৩]

    আলী (রা) যখন কুফায় তার রাজধানী স্থানান্তরিত করেন তখন সেখানে তিনি নতুন একধরনের আরবীর চর্চা দেখতে পান। এতে তিনি বেশ চিন্তিত হন এবং তিনি তৎকালীন আরবী পন্ডিত আবুল আসওয়াদ আদ-দুয়ালীর সাথে বৈঠক করেন এবং তাকে আরবী ভাষার মৌলিক নীতিসমূহ বিশ্লেষন করেন। ইবনু কাছীর (রহ) তার আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে লিখেছেন,

    “আবুল আসওয়াদ হচ্ছে তিনি যাকে নাহুজ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত করা হয়। এবং বলা হয়, যারা এ বিষয়ে কথা বলেছেন তাদের মধ্যে তিনি প্রথমদিককার একজন। তিনি তা আমীর-উল-মু’মিনীন আলী ইবনে আবী তালিব (রা) হতে গ্রহণ করেছেন।” [৪]

    ইমাম শাফেঈ’ আরবী ভাষার জ্ঞান থাকাকে ফরজে আইন মনে করতেন এবং তিনি তার আরব ছাত্রদের আরবী ভাষা ভালোভাবে রপ্ত করার তাগিদ দিতেন। তিনি তার ছাত্রদের বলতেন, “নিশ্চয়ই আমি জ্ঞান অন্বেষনকারীদের ব্যপারে এই ভয় পাই যে তারা আরবী ভাষার নাহু (ব্যকরণ) সঠিকভাবে জানবে না এবং এভাবে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সেই হাদীসের (বাস্তবতার) মধ্যে প্রবেশ করবে, ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার উপর মিথ্যারোপ করল, সে যেন (জাহান্নামের) আগুনের মধ্যে তার আসন খুজে নেয়’”। ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহও ইমাম শাফেঈ’র মতো অনেকটা একই মত পোষন করতেন। তার মতে যেহেতু একজন মুসলিমের জন্য কুরআন সুন্নাহ বোঝাটা আবশ্যক সেহেতু “অত্যবশ্যকীয় কিছু পালন করার জন্য যা প্রয়োজন তাও অত্যাবশ্যক”-এই নীতি অনুযায়ী আরবী ভাষা শেখাও আবশ্যক। তিনি আরো বলতেন, “আরবী ভাষা ইসলাম ও এর অনুসারীদের প্রতীক এবং যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি দ্বারা জাতিসমূহ নিজেদের পৃথক করে ভাষা তাদের মধ্যে অন্যতম।” [৫]

    মু’জিযা

    ২৮ টি হরফ। এ কটি হরফ ও এর দ্বারা গঠিত শব্দ দিয়েই পৃথিবীতে পবিত্র কুরআন নাযিল হয়। আমরা জানি, কুরআন একটি মু’জিযা যা মানবজাতির জন্য একটি চ্যালেঞ্জসরূপ। এবং অন্যান্য নবী-রাসূলদের মু’জিযার সাথে কুরআনের পার্থক্য হচ্ছে, অন্যান্য নবী-রাসূলদের সময় শেষ হলে তাদের মু’জিযারও সমাপ্তি ঘটত, কিন্তু কুরআন একটি চলমান মু’জিযা যার সমাপ্তি হয়নি। যদিও কুরআনের মু’জিযা হওয়াটা আমাদের কাছে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রমাণিত। কিন্তু এ বিষয়টি শুধু জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ, অভিজ্ঞতা দ্বারা নয় (But this is only through knowledge, not through experience) । একমাত্র আরবী ভাষা শেখা ছাড়া এ অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি অর্জন করা সম্ভব নয়।

    ঐতিহাসিকভাবে এ ভাষার অবহেলা ও এর পরিনাম

    মুসলিমদের পতনের পেছনে যেভাবে কাফেরদের চক্রান্ত ছিল, ঠিক একইভাবে মুসলিমদের মধ্যেও বেশ কিছু দূর্বলতা দেখা দিয়েছিল। এবং এসব কারণসমূহের মধ্যে অন্যতম এক কারণ হলো আরবী ভাষার প্রতি অবহেলা। যদিও মুসলিমরা এ ভাষার গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল, কাফেররা ঠিকই এ ভাষার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিল। এ জন্যই তারা আরব-তুর্কিদের মধ্যে বিভেদ লাগানোসহ আরো অনেক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল। শাইখ তাকী (রহ) তার বই “ইসলামী রাষ্ট্র”-তে বলেন:

    “এরপর ইসলামের শত্রুরা আরবী ভাষার উপর আক্রমণ চালায়। কারণ, এই ভাষাতেই ইসলাম এবং এর হুকুম আহকামকে প্রচার করা হয়। তাই, তারা ইসলামের সাথে আরবী ভাষার সম্পর্ককে ছিন্ন করতে ব্যাপক তৎপরতা চালায়। কিন্তু, প্রথমদিকে তারা সফলতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। কারণ, প্রথমদিকে মুসলিমরা যে দেশই জয় করেছে সেখানেই তারা কোরআন, সুন্নাহ ও আরবী ভাষাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছে এবং জনগণকে তারা এ তিনটি জিনিসই শিক্ষা দিয়েছে। বিজিত জনগোষ্ঠীর মানুষেরা ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং আরবী ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলেছে। কিছু কিছু অনারব এ ব্যাপারে এতো পারদর্শীতা অর্জন করেছে যে, তারা ইসলামের প্রখ্যাত মুজতাহিদও হয়েছে। যেমন, ইমাম আবু হানিফা। কেউ কেউ বা হয়েছে অত্যন্ত উচুঁ মাপের কবি, যেমন, বাশার ইবন বুরদ। আবার, কেউ বা হয়েছে প্রখ্যাত লেখক, যেমন, ইবন আল-মুকাফফা’। এভাবেই, মুসলিমরা (প্রথমদিকে) আরবী ভাষাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছিল। ইমাম শাফেঈ’ কুরআনের কোন ধরনের অনুবাদ বা অন্য কোন ভাষায় সালাত আদায় করাকে অগ্রহণযোগ্য বলেছেন। আবার, যারা কুরআন অনুবাদের অনুমতি দিয়েছেন, যেমন, ইমাম আবু হানিফা, তারা অনুবাদকে কুরআন হিসাবে স্বীকৃতি দিতেও অস্বীকার করেছেন। সুতরাং, দেখা যাচ্ছে আরবী ভাষা সবসময় মুসলিমদের মনোযোগ ও গুরুত্বের কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। বস্তুতঃ এ ভাষা হচ্ছে ইসলামের মৌলিক অংশ এবং ইজতিহাদের জন্য এক অপরিহার্য বিষয়। আরবী ভাষা ব্যতীত উৎস থেকে ইসলামকে বোঝা অসম্ভব এবং এ ভাষা ব্যতীত শরীয়াহ্‌ থেকে নির্ভুল ভাবে হুকুম-আহকাম বের করাও সম্ভব নয়। কিন্তু, হিজরী ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ দিকে, আরবী ভাষার গুরুত্ব ধীরে ধীরে হৃাস পেতে থাকে। কারণ, এ সময় এমন সব শাসকেরা ক্ষমতায় আসে যারা আরবী ভাষার প্রকৃত গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝতে ব্যর্থ হয় এবং এ বিষয়টিকে তারা ক্রমাগত অবহেলা করতে থাকে। ফলশ্রুতিতে, রাষ্ট্রের নাগরিকদের আরবী ভাষার উপর দখল কমে যায় এবং ইজতিহাদের প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে যায়। এখানে মনে রাখা দরকার যে, যেকোনো বিষয়ে শরীয়াহ্‌র হুকুম খুঁজে বের করতে হলে, যতগুলো উপাদান অপরিহার্য তার মধ্যে আরবী ভাষা একটি। বস্তুতঃ ইতিহাসের এই পর্যায়ে, আরবী ভাষা ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে, রাষ্ট্রের শরীয়াহ্‌ সম্পর্কিত ধ্যানধারণাও অস্পষ্ট হয়ে যায় এবং সেইসাথে, অস্পষ্ট হয়ে যায় শরীয়াহ্‌ আইনকানুন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া। ইসলামী রাষ্ট্রকে দূর্বল ও রুগ্ন করে ফেলতে এ বিষয়টি ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের পক্ষে নতুন নতুন সমস্যা সমূহকে বোঝা এবং সে সমস্যাগুলোর মুকাবিলা করা কঠিন হতে থাকে। একসময় রাষ্ট্র উদ্ভুত সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয় কিংবা সমাধানের লক্ষ্যে ভ্রান্ত পদ্ধতির আশ্রয় নেয়। এভাবে, সময়ের সাথে সাথে রাষ্ট্রের সমস্যা ঘনীভূত হতে থাকে এবং ইসলামী রাষ্ট্র একসময় অন্তহীন সমস্যার সাগরে হাবুডুবু খেতে থাকে।” [৬]

    সুতরাং এ থেকে বোঝা যায় এ ভাষা অবহেলার পরিনাম কতটা মারাত্মক ছিল।

    এ ভাষার শক্তি ও সৌন্দর্য

    আরবী একটি অত্যন্ত চমৎকার ভাষা। এর কাঠামো অত্যন্ত দৃঢ়, সংগঠিত ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে খুবই জটিল। অনেক ভাষাবিদই এ চিন্তা করে হতবাক হন যে কিভাবে এ ভাষা প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভব হলো।

    নিম্নে আরবী ভাষার (Grammatical Structure) সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেয়া হল,

    পদ বা শব্দের শ্রেণীবিভাগ (اجزاء الكلام): শব্দকে তিনভাগে ভাগ করা হয় আরবীতে

    ১. বিশেষ্য/Noun (اسم) ২. ক্রিয়া/Verb (فعل) ৩. অব্যয়/Particle (حرف)

    লিঙ্গ (الجنس): আরবী ভাষায় লিঙ্গ মূলত দু’টি, পুংলিঙ্গ (المذكر) ও স্ত্রীলিঙ্গ (المئنث)। উদাহরনসরূপ, (زيد، خالد، احمد) এগুলো পুংলিঙ্গবাচক শব্দ আবার (فاطمة، داكا، ريح، نار، يد) এগুলো স্ত্রীলিঙ্গবাচক শব্দ। এছাড়াও এ ভাষায় কিছু সংখ্যক উভয় লিঙ্গের শব্দও রয়েছে যাদের (الجنس المشترك) বলা হয়। এ ভাষায় কোনো ক্লীবলিঙ্গ নেই।

    বচন (العدد): আরবী ভাষায় বচন মূলত তিনটি।

    ১. একবচন (واحد) ২. দ্বিবচন (تثنية) ৩. বহুবচন (جمع)

    এছাড়াও আরবী ভাষায় বহুবচনের বহুবচন-এর প্রচলন রয়েছে, যেমন- (فتح، فتوح، فتوحات)। এ বৈশিষ্ট সমূহের ফিকহী গুরুত্ব অপরিসীম। এর ফলে ফিকহ-এর কোনো মাসআলাকে অত্যন্ত নির্দিষ্ট করে বর্ণনা করা যায়।

    ক্রিয়া (الفعل): নিম্নোক্তভাবে আরবী ক্রিয়াকে ভাগ করা হয়,

    ১. অতীতকাল (الفِعْلُ الْماضِي)      ২. বর্তমান/ভবিষ্যৎ কাল (الفِعْلُ الْمُضارِي)
    ৩. নির্দেশবাচক (فِعْلُ الأَمْر)  

    এ ভাষায় বর্তমান ও ভবিষ্যৎকালের জন্য একটিই Structure রয়েছে। যদিও কখনো কখনো ভবিষ্যৎকে আলাদা করে বোঝানোর জন্য (فعل)-এর আগে একটি (س) যুক্ত করা হয়, যেমন, (بَدَأَ الإِسْلاَمُ غَرِيبًا وَسَيَعُودُ كَمَا بَدَأَ غَرِيبًا)। [৭] এছাড়াও বচন, লিঙ্গ, কাল ইত্যাদি ভেদে ক্রিয়ার শাব্দিক রূপান্তর ঘটে যাকে (صَرْفُ الفِعْل) বলা হয়। এ বৈশিষ্ট্যের কারণেও ফিকহ-এর কোনো মাসআলাকে অত্যন্ত নির্দিষ্ট করে বর্ণনা করা যায়।

    ই’রাব (الإعرَب): সাধারণত বাক্যে প্রতি (مُعْرَب) শব্দের শেষ হরফের স্বর-চিহ্ন হলো ই’রাব। এ স্বর-চিহ্ন পরিবর্তনশীল, অবস্থার পরিবর্তনভেদে একটি শব্দের শেষ হরফ যবর (فَتْحَة), যের (كَسْرَة), পেশ (ضَمَّة) বা সুকূন গ্রহণ করতে পারে। যেমন, সাধারণত শব্দটি কর্তা (فاعِل) হলে পেশ গ্রহণ করে, কর্ম (مَفْعُول) হলে যবর গ্রহণ করে ইত্যাদি। পৃথিবীতে এ ধরনের স্বর-চিহ্ন বর্তমানে আরবী ছাড়া হাবশী ও জার্মান ভাষায় কিছুটা রয়েছে। স্বর-চিহ্ন প্রাচীন সভ্যতার একটি নিদর্শন। [৮] উদাহরণসরূপ, (جَاءَ زَيْدٌ، ضَرَبَ زيدً، قَلَمُ زَيْدٍ)

    আরবী ভাষা প্রধানত একটি মূলশব্দ তাড়িত ভাষা (root-driven language)। এ ভাষায় বিভিন্ন Pattern (وزن)-এ অসংখ্য মূল শব্দ (مَصْدَر বা فِعْل) রয়েছে। উদাহরণসরূপ, (فَعَلَ، سَمِعَ، نَصْرٌ، ذَكَّرَ، تَعْلِيْم)। এসব মূল শব্দ হতে অসংখ্য শব্দ বের হয়ে আসে যাদের (مُشْتَقات) বলা হয়। উদাহরণসরূপ, (عِلْمٌ) এ শব্দের উপাদান (مادة) হচ্ছে (ع ل م) যা থেকে বের হয়ে আসে, (عَلِمَ، مَعْلُوم، عَلَّمَ، تَعْلِيم، مُعَلِّم، مُتَعَلِّم، عَلّامَة)।

    কোনো ভাষার শক্তি পরিমাপ করতে হলে সে ভাষার শব্দভান্ডার-এর পরিমান দেখতে হয়। ভাষার শব্দ যত বেশি তত বেশি শক্তিশালী সে ভাষা। আরবী ভাষা এক্ষেত্রে এগিয়ে অর্থাৎ এ ভাষার বিশাল শব্দ ভান্ডার রয়েছে। যেখানে বাংলায় সব মিলিয়ে রয়েছে মাত্র ১ লক্ষ এবং ইংরেজীর রয়েছে ২ লক্ষাধিক শব্দ।

    আরবী ভাষায় অনেক শব্দ রয়েছে যা বিভিন্ন অর্থে প্রকাশ পায়। উদাহরণসরূপ, (قضاء، قدر)। এ বৈশিষ্ট্য আরবী ভাষাকে আরো শক্তিশালী করেছে।

    অল্প কথায় বা বাক্যে অনেক অর্থ প্রকাশ আরবীতে যেমন সম্ভব অন্য ভাষায় তেমন সম্ভব নয়। আরবীতে প্রবাদ রয়েছে (خَيْرُ الكَلامِ ما قَلَّ وَدَلَّ) অর্থাৎ “উত্তম কথা হলো সংক্ষিপ্ত অথচ অর্থপূর্ণ”। কুরআন ও হাদীস এমনি সব সংক্ষিপ্ত অর্থপূর্ণ বাক্যে পরিপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা)ও বলেছেন, ‘আমাকে (جَوَامِعَ الْكَلِم) দেওয়া হয়েছে’ [৯] অর্থাৎ সংক্ষিপ্ত কথায় গভীর জ্ঞান দেবার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তাকে। এ বিষয়টির উদাহরণ হিসেবে নিম্নোক্ত হাদীসটি উল্লেখ করা যেতে পারে,

    تَهَادَوْا تَحَابُّوا

    “উপহার বিনিময় কর, একে অপরকে ভালোবাসতে পারবে।” [১০] অর্থাৎ উপহার বিনিময় করলে পারস্পরিক ভালোবাসা-সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে।

    এ ভাষার বর্ণনাশৈলী এত চমৎকার যে তা শ্রোতার কাছে ছবির মতো ধরা দেয়। এবং পবিত্র কুরআনে এ রকম অসংখ্য আয়াত রয়েছে। উদাহরণসরূপ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا ~ وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا

    “তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তাকে ছাড়া অন্য কারও এবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সবচেয়ে সুন্দর ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; তবে তাদেরকে ‘উফ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না এবং তাদের সাথে সম্মানজনকভাবে কথা বল। তাদের উপর রহমত (ভালবাসা/স্নেহ/দয়া/মমতা/করুনা) দিয়ে তোমার নতজানু হয়ে থাকা বিনয়ের ডানা মেলে দাও এবং বল: হে প্রতিপালক, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।” [বনী ইসরাঈল: ২৩-২৪]

    এ ভাষার এক অসামান্য সামর্থ্য রয়েছে অন্যান্য ভাষাকে গ্রাস করে ফেলার যখন তারা এর নিকটে আসে। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাহাবীগণ দাওয়া নিয়ে যে অঞ্চলেই গেছেন, কিছুদিনের মধ্যেই সে অঞ্চলের লোকজনের ভাষা সহজেই আরবীতে পরিনত হয়েছে। এর ফলে খিলাফতের অভ্যন্তরে অনেক অনারব আরবীতে অত্যন্ত পারদর্শী ব্যক্তিত্বে পরিনত হয়েছে। এমনকি আরবী ভাষার ব্যকরণের পথিকৃত সিবাওয়েও একজন অনারব ছিলেন। পরবর্তীতেও অনেক যুগ পর্যন্ত এ ধারা বজায় ছিল। কোনো অঞ্চলে অবহেলার কারণে এ ভাষা প্রতিষ্ঠা না হতে পারলেও সে অঞ্চলের বিদ্যমান ভাষার উপর ব্যপক প্রভাব বিস্তার করে গেছে এ ভাষা যা এখনও বিদ্যমান।

    এ ভাষার আরো একটি সামর্থ্য হচ্ছে, এ ভাষা বিদেশী কোনো ভাষার শব্দকে আরবী শব্দতে রূপান্তর করতে পারে। অন্যকথায়, এ ভাষা অন্য ভাষার শব্দ Arabize তথা (مُعَرَّب) মু’আর্রাব করতে পারে। এ ভাষায় শব্দ ও এর আরবী রূপান্তর নিয়ে ইজতিহাদ করার জন্য জ্ঞানের আলাদা শাখা রয়েছে।

    ইজতিহাদ

    ইজতিহাদের জন্য শর্তাবলী রয়েছে যা উসূলের আলেমগণ ব্যখ্যা করে গিয়েছেন। এর জন্য দরকার বিস্তৃত জ্ঞান, কুরআন-সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান ও যথেষ্ঠ পরিমান আরবী ভাষাতত্ত্বের জ্ঞান… [শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানী, মাফাহীম, পৃষ্ঠা ৪৬]

    আরবী ভাষার অনেকগুলো বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি হচ্ছে ইল্লত আহরণ অর্থাৎ একজন মুজতাহিদ কোনো নস (نص) থেকে হুকুমের পেছনের ‘ইল্লাহ’ বের করতে পারেন এবং অন্য পরিস্থিতিতে এর প্রয়োগ করতে পারেন। এছাড়াও আইনগত দিক থেকে, আরবী ভাষায় কোনো বাক্যে বিভিন্ন শব্দের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি বাক্যেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ প্রদান করে। উদাহরণসরূপ, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ইমাম হচ্ছে রাখাল (দায়িত্বশীল) এবং সে-ই তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। এখানে ‘সে-ই‘ শব্দটি আরবী ব্যকরণের পরিপ্রেক্ষিতে সীমিতকরণ (اداة حصر)-এর হুকুম পায় এবং এটি একটি আলাদা সর্বনাম। এভাবেই তাঁর (সা) বক্তব্য, ‘এবং সে-ই জিজ্ঞাসিত হবে তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে’ (রাষ্ট্রের) জন্য দায়িত্বশীলতাকে ইমামের জন্য সীমিত করে। সুতরাং, রাষ্ট্রের মধ্যে মূলত খলীফা ছাড়া আর কেউই শাসন করবার কোনো ক্ষমতা রাখেনা, হোক ব্যক্তি অথবা দল। [১১]

    ইসলাম মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে সর্বশেষ জীবনব্যবস্থা। দুনিয়ার সমাপ্তি পর্যন্ত এ দ্বীন দিয়েই সমাজ পরিচালনা করতে হবে। আর এ কাজ করতে গিয়ে যুগে যুগে মুসলিম জাতিকে অসংখ্য নতুন সমস্যার সম্মুক্ষীন হতে হয়েছে এবং স্বাভাবিকভাবে ভবিষ্যতেও হতে হবে। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য একমাত্র উপায় হচ্ছে ইজতিহাদ। ইজতিহাদ হচ্ছে সেই ইঞ্জিন যা ইসলামকে চালিত করে। এটি না থাকলে উম্মাহর মধ্যে জলাবদ্ধ অবস্থার সৃষ্টি হবে এবং উম্মাহর সমৃদ্ধি থমকে যাবে। এবং ঐতিহাসিকভাবেও এ বিষয়টির সত্যতা আমরা দেখেছি। শাইখ তাকী (রহ) বলেন,

    “(মুসলিম উম্মাহ্‌র) এ অধ:পতনের পেছনে একমাত্র একটি কারণই ছিল, (মুসলিমদের) প্রচন্ড দূর্বলতা যা তাদের ইসলামকে বোঝার জন্য চিন্তা করার যোগ্যতা ধ্বংস করে দিয়েছিল। এ দূর্বলতার পেছনের কারণ ছিল ৭ম শতাব্দী হিজরীর প্রথম থেকে শুরু করে ইসলাম ও আরবী ভাষার বিচ্ছিন্নকরন যখন আরবী ভাষা ও ইসলামের প্রসার অবহেলিত হয়েছে। সুতরাং, যতক্ষন পর্যন্ত আরবী ভাষাকে ইসলামের সাথে এর এক অবিচ্ছেদ্য মৌলিক অংশ হিসেবে মিশ্রিত না করা হবে, ততক্ষন পর্যন্ত এ অধ:পতন মুসলিমদের আরো অবনতির দিকে নিয়ে যাবে। এটা এ কারণে যে, এই ভাষার ভাষাগত ক্ষমতা ইসলামের শক্তিকে এমনভাবে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছে যে একে ছাড়া ইসলামকে বহন করা সম্ভব নয়, এবং যদি একে অবহেলা করা হয়, তবে শরীয়াহ্‌র মধ্যে ইজতিহাদ করা আর সম্ভবপর হবে না। (আর) আরবী ভাষার জ্ঞান ইজতিহাদের জন্য একটি মৌলিক শর্ত। এছাড়াও ইজতিহাদ উম্মতের জন্য অপরিহার্য যেহেতু এর সদ্ব্যবহার ছাড়া উম্মাহর উন্নয়ন সম্ভব নয়।” [১২]

    সুতরাং, বোঝা যাচ্ছে উম্মাহর সমৃদ্ধির সাথে আরবী ভাষার সম্পর্ক কত গভীর।

    উম্মাহ্‌র পূনর্জাগরণ

    নিশ্চয়ই আল্লাহ এ কিতাবের দ্বারা বিভিন্ন জাতিকে উচ্চকিত করেন আর অন্যান্যদের করে দেন নিচু। [মুসলিম]

    পূনর্জাগরণ বস্তুগত বা বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের মধ্যে নিহিত নেই। বরং চিন্তাগত ও মতাদর্শিক উন্নয়নই পূনর্জাগরনের সঠিক ভিত্তি আর বস্তুগত উন্নয়ন হচ্ছে এর ফলাফল। আমরা যখন উম্মতের পূনর্জাগরনের কথা বলি তখন আমাদের মনে রাখতে হবে যে এ পুনর্জাগরণ ইসলামী আকীদাহ ও তা থেকে বের হয়ে আসা ব্যবস্থার সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। কারণ আমাদেরকে পৃথিবীতে এ আকীদাহ প্রতিষ্ঠা ও এর ব্যবস্থাকে বাস্তবায়ন করতে হবে। এবং এ ব্যবস্থাটি রয়েছে কুরআন ও সুন্নাহ্‌র মধ্যে আরবী ভাষায়। অতীতে আরবরা পৃথিবীর শ্রেষ্ট জাতিতে পরিনত হয়েছিল কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা এ ভাষায় পবিত্র কুরআন নাযিল করেছিলেন। এবং এ ভাষাতেই তারা শরীয়াহ বুঝেছিলেন এবং তা বাস্তবায়ন করেছিলেন। এবং আরবী ভাষার কোনো কিছু সবচেয়ে ভালোভাবে আরবীতেই বোঝা যাবে। এক্ষেত্রে অনুবাদ গ্রহণযোগ্য নয় যেহেতু ভাষার অর্থ ও আকুতি অনেকটাই অনুবাদে হারিয়ে যায়। অন্য যেকোনো ভাষার সাহিত্য অধ্যয়নের ক্ষেত্রেও এটি সত্য। উদাহরণসরূপ, আমরা শেক্সপিয়ারকে ইংরেজি, ইকবালকে উর্দূ, নজরুলকে বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষাতেই পূর্নাঙ্গরূপে বুঝতে পারবো না। সুতরাং ইসলামী ব্যবস্থার খুটিনাটি বিশ্লেষন বুঝতে হলে আরবী ভাষার জ্ঞানও থাকতে হবে।

    আমরা যারা হুকুম শরঈ’ নিয়ে পড়াশুনা করেছি তারা জানি যে, ফরয-এ-কিফায়া ও আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বাধ্যতামূলক ফরয দায়িত্ব এবং ফরয হিসেবে ফরয-এ-আইন হতে কোনো অংশে এটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। শুধুমাত্র পার্থক্য হল, ফরয-এ-কিফায়াকে পালন করার জন্য আল্লাহ পুরো উম্মতকে একসাথে দায়িত্ব দিয়েছেন, উম্মতের প্রত্যেকটি সদস্যকে আলাদা আলাদা চিহ্নিত করে দায়িত্ব দেয়া হয়নি। কিন্তু উম্মাহর মধ্যে যথেষ্ঠ পরিমান সদস্য যদি সন্তোষজনকভাবে এ দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে কাজটি সম্পন্ন করাটা পূরো উম্মতের জন্য ফরজে আইন হিসেবে ঝুলে থাকে। আমরা জানি ইজতিহাদ করাটা ফরযে কিফায়া এবং ইজতিহাদ করার জন্য আরবী ভাষা জানাটাও আবশ্যক। এবং উম্মতের মধ্যে প্রত্যেক যুগে অবশ্যই যথেষ্ঠ পরিমানে মুজতাহিদ থাকতে হবে। কিন্তু বর্তমান পৃথিবীর দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে কি আমরা সে পরিমান মুজতাহিদ ও সেরকম ইজতিহাদ চর্চা দেখতে পাবো ? এখন আমরা একটু চিন্তা করলেই উপলব্ধি করতে পারবো যে বর্তমানে আরবী ভাষার জ্ঞান অর্জন করা আমাদের জন্য কতটা জরুরী। এছাড়াও খিলাফত প্রতিষ্ঠার দা’য়ী হিসেবে উম্মতের কাছ থেকে আস্থা ও নেতৃত্ব অর্জন করার জন্য আরবী ভাষা জানাটা খুবই জরুরী।

    উপসংহার

    “আল্লাহ তাঁর সেই বান্দার মুখ উজ্জ্বল করুন যে আমার কথা শুনেছে, সেগুলো মনে রেখেছে, বুঝেছে এবং অন্যের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। কারণ কেউ নিজে ফকীহ্‌ (জ্ঞানী) না হয়েও ফিকহ্‌ (জ্ঞান) বহনকারী হতে পারে। আবার কেউ তার নিজের চাইতে বড় ফকীহ (জ্ঞানী) এর নিকটও ফিকহ্‌ পৌঁছে দিতে পারে।” [আবু দাউদ, তিরমিযী এবং আহমদ থেকে বর্ণিত]

    আমরাই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং আমাদেরকেই পৃথিবীকে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সুন্নাহ দিয়ে শাসন করতে হবে। জনগণ আমাদের কাছেই আসবে ইসলাম শিখতে। আমরাই তারা যাদেরকে পৃথিবী বিভিন্ন প্রান্তে প্রেরণ করা হবে আমিল, ওয়ালী কিংবা মুজাহিদ হিসেবে। ঠিক সেভাবেই যেভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) সাহাবীদের প্রেরণ করতেন। আমরা জানি, মু’আজ বিন জাবাল যখন ইয়েমেনে প্রেরিত হয়েছিলেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ্‌ (সা)-এর প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন যে তিনি আল্লাহর কিতাব, রাসূলের সুন্নত ও তার ইজতিহাদের দ্বারা রায় দেবেন। সুতরাং, আমরা যদি সেই আলী, মু’আজ, আমর ইবনুল আস (রা)-দের সত্যিকার উত্তরসূরী হয়ে থাকি এবং আমরা যদি কিছুদিনের মধ্যে তাদের মতো দায়িত্বপ্রাপ্ত হই তখন কিভাবে আমরা উত্তমরুপে খিলাফতের অফিসকে চালাবো যখন আমরা আরবী ভাষার জ্ঞান রাখি না।

    সুতরাং আমাদের আরবী ভাষা শিখতে হবে। শুধুমাত্র সাধারণ নিত্যনৈমিত্তিক যোগাযোগের আরবী ভাষা নয় যা আমাদের দেশের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা একাডেমি শিক্ষা দেয়, বরং আমাদের আরবী শিখতে হবে দ্বীনকে বোঝার জন্য। ভাষা শিক্ষাকে আমাদের কঠিন কোনো কিছু মনে করা উচিত নয়। আর কেন আমরা আরবী ভাষা শেখাটা কঠিন মনে করব যখন আমরা জানি যে যাইদ (রা)-কে যখন রাসূলুল্লাহ (সা) হিব্রু ভাষা শিখতে বলেছিলেন তখন তিনি তা মাত্র ১৫ দিনে সম্পন্ন করেছিলেন। তার সময়ে কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা একাডেমি ছিল না অথচ আমাদের সময়ে তা আছে। তার সময়ে কোনো টেকনোলজিও ছিল না তাকে এ বিষয়ে সাহায্য করার জন্য অথচ আমাদের সময়ে তা আছে। আমরা দুনিয়ার বিভিন্ন কাজের জন্য ইংরেজি বা ফ্রেঞ্চ শিখতে পারলে আরবী কেন পারবো না। আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা নিয়ে আমাদের প্রত্যেকের এ কাজে অগ্রসর হওয়া উচিত। আল্লাহ্‌র কাছে দু’আ করি যাতে তিনি আমাদের তাঁর কিতাবের ভাষার সঠিক জ্ঞান দান করেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “আর যারা আমার পথে চেষ্টা সংগ্রাম করে তাদের আমি অবশ্যই আমার পথ দেখিয়ে দেব। আর আল্লাহ অবশ্যই রয়েছেন তাদের সাথে যারা সবচেয়ে উত্তমরুপে কাজ সম্পাদন করে।” [আনকাবুত: ৬৯]

    আবু মুহাম্মাদ

  • মিডিয়ার ইসলাম-বিদ্বেষ: বাস্তবতা বিবর্জিত মস্তিষ্ক ধোলাই

    بسم الله الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله

    বর্তমান বিশ্বে মিডিয়ার ইসলাম-বিদ্বেষ নিয়ে নতুনভাবে অবতারণার কোন প্রয়োজন নেই। আমি শুধু কিছু বিষয়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষন করতে চাই; হয়তো বা তা আপনার বিশ্বদর্শন [worldview] পরিবর্তনে সহায়ক হবে।

    এটি এমন একটি রূপক, একজন মিথ্যেবাদী শিকারি যে প্রতিনিয়ত মিথ্যে গল্প সাজায় তার বীরত্বের বহিঃপ্রকাশের জন্য; যদি ও সে অধিকাংশ সময় সে নিজে শিকার হওয়ার ভয়ে জবুথবু থাকে।

    Let’s try listen it from horse’s mouth; as they say.

    আপনি যদি Hollywood মুভির দর্শক হন, তবে আপনি একটা বিষয় নিঃসন্দেহে বুঝতে পারবেন যে US যখন যাদের সাথে শত্রুতাভাবাপন্ন অবস্থায় থাকে তখন তাদেরকে তথাকথিত ভিলেইন [Villain] হিসেবে তুলে ধরে। যখন জাপানের সাথে তাদের দ্বন্ধ ছিলো তখন তারা ছিলো তাদের মুভিগুলোর প্রধান ভিলেইন। তারা স্প্যানিশদেরকেও একইভাবে ফুটিয়ে তুলতো। এরপর, স্নায়ুযুদ্ধের সময় রাশানদেরকে। এছাড়া কালোবর্ণের নিগ্রোদেরকে, জ্যামাইকানদের, মেক্সিকানদের এইভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। এইভাবে, ঢালাওভাবে stereotyping করার কারনটা ছিলো তাদের status quo বজায় রাখা।

    আর, বর্তমান মিডিয়ার সবচেয়ে সহজপাচ্য ভিলেইন হলো মুসলিমরা।

    এর কারন হলো, ইসলামের সাথে পশ্চিমাদের আদর্শিক দ্বন্দ্বের কারনে।

    “The war against Islam raised by US is a pre-emptive strike so that they can potentially eliminate the threat within….”

    কি সেই potential threat? ইসলামের পুনর্জাগরণ এবং স্পেন থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এক খিলাফত।

    নোয়াম চমস্কির একটি বইয়ে পড়ছিলাম।তার বইয়ে তিনি তুলে ধরেছেন তাদের তৈরী করা যুদ্ধ-আইন তারা কিভাবে লঙ্ঘন করছে। যে পরিমান সাধারন লোক এবং শিশু এসব আক্রমনে প্রাণ হারিয়েছে তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই।

    এইখানে তাদের নীতি হচ্ছে, “If you refused to become victim then you are rebellious i.e. terrorist.”

    অনুরূপভাবে, ৯/১১, ৭/৭ এইসব ঘটনাকে মিডিয়া যেভাবে iconic বানিয়েছে, অনুরুপ ঘটনা প্রতিদিন ঘটছে ইরাক, আফগানিস্তানে,ফিলিস্তিনে কিন্তু তাদের তো BBC, CNN, CBS, ABC, FOX এর মতো মিথ্যাচারী ইহুদিপুষ্ট মিডিয়া নেই। এইসব মিডিয়াই বর্তমান সময়ের ওয়ালিদ ইবন মুগীরাহ্, উতবা ইবন রবী’আ, উমাইয়া বিন খালাফ’ দের প্রতিনিধি।

    মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা হচ্ছে, ‘If you consistently keep broadcasting lies, it will appear as truth.’

    আর, একটি ব্যাপার হলো, আমাদের দেশে ও ইসলাম-বিদ্বেষকে জ্বালানি দিচ্ছে কিছু পশ্চিমাদের দোসর। বাংলাদেশে তৈরী হচ্ছে ইসলামবিদ্বেষী ছবি। আমাদেরকে এই বিষয়ে গাফেল থাকলে চলবে না।

    এমনিতেই, অধিকাংশ লোকই স্নায়ু-অবসাদগ্রস্থতার কারনে নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা দিয়ে সত্য উদঘাটনে তৎপর নয়।

    তবে, যারা করে তারা সত্য জেনে ইসলাম পালনে ব্রতী হচ্ছে।

    আল্লাহ্ তা’আলা কুরআনুল কারীমে বলেছেন:

    يُرِيدُونَ لِيُطْفِؤُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَاللَّهُ مُتِمُّ نُورِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ

    “তারা মুখের ফুৎকারে আল্লাহ্’র আলো নিভিয়ে দিতে চায়। আল্লাহ্ তার আলোকে পূর্ণরূপে বিকশিত করবেন যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে।“ [সুরা সাফফ্: ৮]

    আসুন আমরা সত্য জানায় ব্রতী হই।

    আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের অনুধাবন করার তাওফীক দিন।

    امين .

    سبحانك اللهم و بحمدك أشهد أن لا إله إلا أنت أستغفرك و أتوب إليك

    সায়্যিদ মাহমুদ গজনবী

  • মুসলিম উম্মাহ্‌র অধঃপতনের বিশ্লেষণ

    ভূমিকা

    অধঃপতন উন্নতির বিপরীত। উন্নতি = বুদ্ধিবৃত্তিক উত্থান। তারাই একটি উন্নত জাতি যারা সমাজে সকল সমস্যার সমাধানের জন্য একটি দর্শন বা আদর্শকে চিন্তার ভিত্তি হিসেবে বেছে নেয় এবং তাতে ঐক্যবদ্ধ থাকে। অর্থাৎ একটি উন্নত সমাজের মানুষেরা তাদের সকল প্রবৃত্তিগত ও জৈবিক চাহিদা মেটানোর জন্য জীবন সম্পর্কে একটি আদর্শের উপর ভিত্তি করে চলে, এই আদর্শটি আবার একটি বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থকে। এটাই উন্নত সমাজ, কেননা এটি একটি যুক্তিসঙ্গত (Rational) ও যাচাই বাছাইকৃত (Justified) মৌলিক বিশ্বাসের উপর সংগঠিত এবং সমাজের প্রতিটি ধ্যান-ধারণাই এই মৌলিক বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। অতএব, সেই সমাজই অধঃপতিত, যা কোন মৌলিক বিশ্বাসকে তার সকল চিন্তার উৎস হিসেবে বেছে নেয় না, অথবা তাতে ঐক্যবদ্ধ থাকেনা।

    বুদ্ধিবৃত্তিক উত্থান

    কোনও জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক উত্থান ঘটতে পারে দু’টি বিষয়ে ঐক্যমতের ভিত্তিতে। বিষয়ে দু’টি হলো:-

    ১.    কোন একটি আদর্শের মূল বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা।
    ২.    রাষ্ট্রের সকল মতবিরোধ ঐ মূল বিশ্বাসের ভিত্তিতে সমাধান করা যাতে জনগণের মাঝে ঐক্য টিকে থাকে।

    মূল বিশ্বাসের উপর জাতিকে ঐক্য:

    উন্নত সমাজের একটি সুন্দর উদাহরণ হচ্ছে মদীনা। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মদীনার সমাজ আওস, খাযরাজ ও ইহুদীদের মাঝে তিন ভাগে বিভক্ত ছিল। তাদের পারস্পরিক স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে সেখানে যুদ্ধ-কলহ লেগে থাকত এবং তারা ছিল একটি দুর্বল জাতি। ইসলাম গ্রহণের পর তারা সমাজের সকল ধ্যান-ধারণা ও সমস্যা সমাধানের মূলভিত্তি হিসেবে ইসলামী জীবনাদর্শকে বেছে নেয়। যদিও ইহুদীরা অনিচ্ছাসত্ত্বে তা মেনে নেয় কিন্তু সামগ্রিকভাবে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের বিষয়ে সকলেই ঐক্যবদ্ধ থাকে। সমাজের পারস্পরিক স্বার্থগুলোকে তারা ইসলাম অনুযায়ী হালাল হিসেবে গ্রহণ করে অথবা হারাম হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে।

    যদিও সে সমাজে মুনাফিকেরা ছিল, তবুও কেউ কখনও ইসলামের মূল বিশ্বাস ও তার উপযোগিতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেনি। ফলে মুনাফিকেরা যখন ‘মসজিদে দিরার’ প্রতিষ্ঠা করে ইসলামের মূল বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করে, তখন রাষ্ট্র এর সমুচিত জবাব দেয় এবং ‘মসজিদে দিরারকে’ ধ্বংস করে। রাসূল (সাঃ) জীবদ্দশায় মুসলিম উম্মাহ্‌র অভ্যন্তরে ইসলামের মূল বিশ্বাস নিয়ে নূন্যতম সন্দেহের নিদর্শন পাওয়া যায়নি। অতএব সেসময় মুসলিমদের অধঃপতনের প্রশ্নই আসে না। উপরন্তু ইসলামের মূল বিশ্বাসে ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় মুসলিম উম্মাহ্‌ আরবের বর্বর জাতি থেকে অত্যন্ত দ্রুত শক্তিশালী একটি জাতিতে পরিণত হয়েছিল।

    সমাজের মতবিরোধ নিরসনে মৌলিক আদর্শের ভূমিকা

    রাষ্ট্র যখন সমাজের পারস্পরিক স্বার্থ নির্ধারণকারী মৌলিক বিশ্বাসকে সংরক্ষণ, প্রতিষ্ঠা ও প্রচার করে তখন কোনও কোনও ক্ষেত্রে কিছু লোক অসন্তুষ্ট হলেও রাষ্ট্রীয় বিধি-নিষেধকে সকলেই মেনে নেয়। ফলে সমাজে কখনও কোনও বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে জনগণ তার মৌলিক বিশ্বাস, জীবনাদর্শ এবং মূল্যবোধের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ থাকে। জনগণ সরকারকে এই মৌলিক বিশ্বাসের সংরক্ষক হিসেবে নিয়োগ করে।

    মৌলিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে মতবিরোধ নিরসন করে এমন সমাজের উদাহরণ:

    ১৮৬১ সালে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বিভক্তির কারণে গৃহযুদ্ধ (Civil War) শুরু হয় যা কিনা তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ ছিল। প্রায় ৬,২০,০০০ সৈন্য এতে নিহত হয় এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষ আহত হয়। আব্রাহাম লিংকন এসে সকল জাতিগুলোকে গণতন্ত্রের মূল বিশ্বাসের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করে। এই ঐক্যের ঠিক পরপরই আমেরিকা বিশ্বের রাজনীতেতে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্ররূপে আবির্ভূত হয়। আজ পর্যন্ত তারা গণতন্ত্রকে তাদের সকল মতবিরোধ সমাধানের উৎস হিসেবে মেনে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আছে।

    ৯/১১ এর পর মার্কিন সরকার যখন আফগানিস্তান আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন আমেরিকান জাতির মাঝে বড় কোনও বিভক্তি দেখা দেয়নি, বরং তারা রাষ্ট্রের দেয়া সিদ্ধান্তের প্রতি ঐক্যবদ্ধ ছিল। এমনকি সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারণাতেও বারাক ওবামা ও ম্যাককেইন দুজনই ইসরাইলকে অবৈধ সমর্থনের ব্যাপারে একমত রয়েছেন। দুজনই ইরাক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত, একজন ভাবছেন এই দখলদারীত্ব দীর্ঘসময় থাকবে, অপরজন ভাবছেন তুলনামূলকভাবে কিছুটা দ্রুততর হবে। দুজনই আফগানিস্তানে দখলদারীত্ব টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে একমত।

    মতবিরোধ নিরসনে মৌলিক কোন বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে না এমন সমাজের উদাহরণ:

    – ১৯৪৫ সলে জোসেফ টিটো যুগোস্লভিয়ায় ঐ অঞ্চলের সার্বিয়ান, ক্রোয়েশিয়ান, বসনিয়ান ও অন্য জাতিগুলোকে একত্রে শাসন করেন। তিনি তাদেরকে সামাজতন্ত্রের কথা বললেও, প্রত্যেক জাতির জাতীয়তাবাদ বহাল রাখেন এবং তাদেরকে পারস্পরিক স্বার্থের সমঝোতার ভিত্তিতে শাসন করেন। কিন্তু ঐ অঞ্চলের জাতিগুলো কখনই সমাজতন্ত্রের মোলিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়নি। ফলে সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পরপরই এই জাতিগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত শুরু হয়ে যায় যা আজোবধি চলছে।

    – বাংলাদেশে ১/১১ এর আগে ও পরে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলাও ঐ একই কারণে ঘটেছে। এদেশের পুরো জাতি বিএনপি ও আওয়ামীলীগে বিভক্ত হয়ে আছে। পুরো দেশবাসী কোন একটি মৌলিক জীবনাদর্শকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেনি। ফলে এদেশে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা (Anarchy) এখনও চলছে।

    কখন একটি জাতির অধঃপতন ঘটে

    অতএব রাষ্ট্রের ভিত্তি হচ্ছে একটি মৌলিক বিশ্বাস যা থেকে একটি জীবনাদর্শ আসে এবং যা সমাজের সব ধরণের পারস্পরিক স্বার্থকে সংজ্ঞায়িত করে এবং তাকে প্রতিষ্ঠিত করে। যে রাষ্ট্র তার মৌলিক বিশ্বাসের প্রতি যতবেশী দৃঢ় ও ঐক্যবদ্ধ সে রাষ্ট্র তত বেশী শক্তিশালী।

    যদি শক্তিশালী জাতি বলতে আমরা এমন একটি জাতিকে বুঝি যে প্রতিটি সমস্যার সমাধান করে তার মূল বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে, তবে অধঃপতিত জাতি বলতে আমরা সে জাতিকেই বুঝবো যে সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে তার মৌলিক বিশ্বাসের উপযোগিতার উপর সন্দেহ পোষণ শুরু করে।

    সমাজের এই অধঃপতন দুইভাবে ঘটতে পারে।

    প্রথমত : কোন আন্দোলন বা অন্য কোন আদর্শিক রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ আসলে অধঃপতন ঘটতে পারে।
    দ্বিতীয়ত : সমাজের যে কেউ মূল বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা শুরু করলেই অধঃপতন ঘটে না। যেমন আবদুল্লাহ্‌ ইবনে উবাই ইবনে সালুল ইসলামকে মেনে না নিলেও সমাজে এর প্রভাব পড়েনি। আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে কোনও কমিউনিষ্টপন্থীর মতামত মার্কিন রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনও ভূমিকা রাখে না।

    সমাজে যারা বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে কাজ করেন যেমন – বুদ্ধিজীবি, রাজনৈতিক দল বা কোনও রাজনীতিবিদ, তারা যদি সমাজের মূল বিশ্বাসের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়ে প্রশ্ন করা শুরু করেন তখন তার প্রভাব সমাজে পড়ে। অর্থাৎ সমাজের প্রভাবশালী লোকেরা যখন রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিকে নিয়ে প্রশ্ন করা শুরু করে তখনই ঐ জাতি অধঃপতনের মুখে পড়ে।

    মুসলিম উম্মাহ্‌র অধঃপতন

    আলী (রা.) ও মু’আবিয়া (রা.) এর বিরোধকাল:

    মু’আবিয়া (রা.) ও আলী (রা.)-এর বিরোধকালে ইসলামের মূল বিশ্বাস, আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার একত্ববাদ বা ইসলাম কি যুগোযোগী কিনা – এ ধরণের কোনও মৌলিক বিষয়ে তাদের মাঝে মতানৈক্য হয়নি। তারা খলীফার বিশেষ একটি বিষয়ে নির্দিষ্ট একটি আহকাম নিয়ে বিরোধের মুখোমুখি হন। উসমান (রা.) এর হত্যার বিচার ও খলীফা নির্বাচনের মাঝে কোনটি আগে হবে তা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। মু’আবিয়া (রা.) এর মতামত ছিল আগে উসমান (রা.) এর হত্যাকারীর বিচার করতে হবে, তিনি আলী (রা.) কে খলীফা হিসেবে বাই’আত দিতে অস্বীকৃতি জানান। আলী (রা.), পক্ষান্তরে, খলীফা নির্বাচন ও হত্যাকারীর বিচারের বিষয় দুটিকে আলাদা দুইটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন যা কিনা সঠিক ছিল। ফলে মু’আবিয়া (রা.) এর বাই’আতের অস্বীকৃতিকে তিনি রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে দেখেন। এখানে লক্ষণীয় যে, খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা বা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস নিয়ে তাদের মাঝে কোনও প্রশ্ন উঠেনি। ফলে রোমনরা যখন মু’আবিয়া (রা.) কে সাহায্যের আহ্বান করে, তখন তিনি কেবল তা প্রত্যাখ্যানই করেননি বরং এই বিরোধ শেষে রোমানদের সাম্রাজ্য ধ্বংস করে তা ইসলামের পতাকাতলে নিয়ে আসার বার্তা পাঠিয়েছিলেন। যদিও এটা বড় ধরণের একটি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ছিল, তথাপি ইসলামের মূল বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে উম্মাহ্‌র মাঝে কোনও প্রশ্ন উঠেনি। অতএব, এসময়ে মুসলিম উম্মাহ্‌র অধঃপতন ঘটেনি।

    ইয়াজীদ এর খলীফা মনোনয়ন:

    ইয়াজীদকে খলীফা হিসেবে বাই’আত দেয়ার বিষয়টি একটি ভুল ইজতিহাদ ছিল। এই ইজতিহাদ বায়াত প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে ফেলে, যার প্রভাব পরবর্তিতে ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই। যাই হোক, এটা ছিল একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে ভুল। কিন্তু ইসলামের মূল বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে তখন উম্মাহ্‌র মাঝে কোন সন্দেহ দেখা দেয়নি। অর্থাৎ সে সময়ও উম্মাহ্‌র কোনও অধঃপতন ঘটেনি।

    ইজতিহাদের দরজা বন্ধ করা:

    হিজরী চারশত সালের দিকে ‘আল কাফফাল’ ইজতিহাদ প্রক্রিয়া বন্ধ করার ফতোয়া ঘোষণা করেন। এতে যে কোন নতুন বিষয়ের উদ্ভব হলে অথবা অন্য কোন আদর্শ থেকে আঘাত আসলে করণীয় বিষয় নির্ধারণে ইসলামের মূল উৎসে ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।

    এই প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়ার পর সর্বত্র পূর্ববর্তী মুজতাহিদগণ কর্তৃক ইজতিহাদকৃত ফতোয়াগুলো লিপিবদ্ধ করে পুস্তকাকারে সংরক্ষণের প্রবনতা দেখা যায়। যেমন উসমানী খিলাফতকালে হানাফি মাযহাবের ফতোয়াগুলো লিপিবদ্ধ করা হয় এবং উম্মাহ্‌ এর বাইরে ইজতিহাদ করা থেকে দূরে সরে আসে। উল্লেখ্য এ অঞ্চলে মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব ইসলাম প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকলেও তার শাসনামলেই হানাফি মাযহাবের সব হুকুমগুলোকে ‘ফতোয়া-ই-আলমগীরি’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হয়।

    ইজতিহাদ বন্ধ করার উদ্দেশ্য ছিল মূলত দু’টি।

    প্রথমত : উম্মাহ্‌ ইজতিহাদের বিষয়ে নিয়মনীতি মানার কঠোরতার বিষয়ে অসতর্ক হয়ে পড়েছিল, ফলে খুবই দুর্বল ধরণের ইজতিহাদ করা হচ্ছিল।

    দ্বিতীয়ত : পূর্ববর্তী ফকীহ্‌গণ এত ব্যাপক ও সুনির্দিষ্ট বিষয়ে ইজতিহাদের বিশাল জ্ঞানভান্ডার রেখে গিয়েছিলেন যে অনেকের ধারণা ছিল ভবিষ্যতে সকল পরিস্থিতির জন্যই হয়তো ইজতিহাদ করা হয়ে গেছে।

    এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে উম্মাহ্‌ তখনও অধঃপতিত হয়ে পড়েনি। কেননা উম্মাহ্‌ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন জীবনদর্শকে বেছে নেয়ার জন্য ইজতিহাদ করা বন্ধ করেনি। উম্মাহ্‌র জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসলামকে সমস্যার সমাধানের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছে, ইসলামের মূল বিশ্বাসকে নিয়ে সন্দেহ করার প্রশ্নই আসেনি।

    উসমানি খিলাফতকাল:

    উসমানী খিলাফতের শুরুর দিকে মুসলিম সেনাবাহিনী দূর্দমনীয় একটি শক্তি ছিল। ইউরোপিয়ানরা সে সময় সুলায়মান আল কানুনীকে ‘সুলায়মান দি ম্যাগনিফিসেন্ট’ নামে আখ্যায়িত করত। কিন্তু আমরা যদি একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করি তবে দেখতে পাব যে, মুসলিম উম্মাহ্‌র মাঝে তখন অনেকগুলো উলাইয়া (প্রদেশ) ছিল। এসব উলাইয়াগুলো অনেকটা স্বাধীন ও বিচ্ছিন্ন ছিল। উসমানী খিলাফত কর্তৃক ইউরোপ বিজয়কে প্রথম দিকে সাহাবা (রা.) কর্তৃক আরব বিজয়ের সাথে তুলনা করা যায় না। সাহাবারা (রা.) বিভিন্ন অঞ্চল বিজয়ের সাথে সাথে সে অঞ্চলের জনগণের মাঝে ইসলামের মূল বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সচেষ্ট ছিলেন। ফলে খিলাফত ধ্বংসের পর আজও আরব জাতিতে ইসলামের মূল বিশ্বাস অটুট আছে। রাজনৈতিকভাবে ইসলামী শাসন না থাকলে আরবের জনগণ আজও জীবনাদর্শ হিসেবে ইসলামকে প্রত্যাখ্যান করেনি।

    পক্ষান্তরে উসমানী খিলাফত ইউরোপ বিজয়ের পর কেবলমাত্র সামরিক শক্তিতে নিজেদেরকে শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগী ছিল। ইসলামের মূল বিশ্বাস ইউরোপে প্রচার ও প্রতিষ্ঠার বিষয়ে এবং সে অঞ্চলের জনগণকে এর ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাদের উল্লেখযোগ্য কোন প্রচেষ্টা ছিল না। ফলে খিলাফত ধ্বংসের পর এসব অঞ্চলের বেশিরভাগ রাষ্ট্রই ইসলামী জীবনাদর্শ পরিত্যাগ করে।

    এ অঞ্চলেও একই ঘটনা ঘটেছিল। ভারত উপমহাদেশে মুসলিম শাসকেরা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায় থাকলেও এ অঞ্চলের সাধারণ জনগণকে ইসলামের মূল বিশ্বাসে ঐক্যবদ্ধ করে আদর্শিক জাতিতে পরিণত করার উল্লেখযোগ্য কোনও চেষ্টা তারা করেননি। ফলে হিন্দু ও মুসলমানদের মাঝে বিভেদ সমাজে সুপ্ত অবস্থায় ছিল। একমাত্র আওরঙ্গজেব তার শাসনামলে এব্যাপারে কিছুটা সচেষ্ট হন। কিন্তু বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহ্‌র অধঃপতনের কারণে তিনি ইসলামের ভিত্তিতে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় ততটা সফল হতে পারেননি। পরবর্তীতে ব্রিটিশরা এ অঞ্চল জয় করার জন্য হিন্দু-মুসলিম বিভেদকে ব্যবহার করে, যা কিনা ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ নামে পরিচিত। বিট্রিশ শাসনামলে এ অঞ্চলে মুসলিমরা সাধারণভাবে শোষিত ছিল, কিন্তু হিন্দুরা অনেক বেশী পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল। সেই জাতিগত বিভেদ থেকে এখনকার ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সৃষ্টি। অর্থাৎ এ অঞ্চলে কোন ধরণের ঐক্য কখনই প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

    এখানে উল্লেখ্য যে, যদিও সামরিক দিক থেকে ইউরোপের তুলনায় উসমানী খিলাফত শক্তিশালী ছিল, তথাপি মুসলিম উম্মাহ্‌ ভুল মাপকাঠি দিয়ে ইউরোপের সাথে নিজেকে তুলনা করত। তারা কেবল সামরিক শক্তিতে ইউরোপের চেয়ে এগিয়ে থাকার দিকে মনোযোগী ছিল, কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিতে নিজেদের উৎকর্ষ সাধনে সচেষ্ট ছিল না। যাই হোক, উসমানী খিলাফতের শুরুকে আমরা অধঃপতন বলতে পারি না। কেননা রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে ইসলামের মূল বিশ্বাসকে নিয়ে তাদের মাঝে তখনও কোনও প্রশ্ন ছিল না।

    শিল্প বিপ্লব:

    শিল্প বিপ্লবের পর পুঁজিবাদী আদর্শে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইউরোপের জাতিগুলো সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক উন্নতি লাভ করে। তাদের সমাজের এই অগ্রগতি মুসলিম উম্মাহ্‌র প্রভাবশালীদের মাঝে আদর্শিক আঘাত হানে। তারা রাষ্ট্রের ভিত্তি ইসলাম হবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন করা শুরু করে। এ সময় মুসলিম উম্মাহ্‌র রাজনৈতিক পরিমন্ডলে পশ্চিমাদের সংবিধান নিয়ে আলোচনা শুরু হয় এবং ইসলামের যুগোপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। ইসলাম সংস্কারের দাবীতে অনেক আন্দোলনই তখন দানা বেঁধে উঠে। অনেকে পশ্চিমা সংবিধানের বিভিন্ন অংশ মুসলিম সমাজেও বাস্তবায়নের চেষ্টা চালায়। এটাতেই মুসলিম উম্মাহ্‌র অধঃপতনের লক্ষণ প্রকাশ পায়। পুঁজিবাদী আদর্শের পক্ষ থেকে যখন এই চ্যালেঞ্জ আসে তখন মুসলিম উম্মাহ্‌র অধঃপতন ঘটে।

    অতএব, খ্রীস্টিয় আঠার শতকের দিকেই মুসলিম উম্মাহ্‌র অধঃপতন ঘটে। কেননা এ সময়ে মুসলিম উম্মাহ্‌ ইসলামের মূল বিশ্বাসকে রাষ্ট্রের ভিত্তি করা নিয়ে প্রশ্ন করা শুরু করে। আলী (রা.) ও মু’আবিয়া (রা.) যেমন খলীফা কোন কাজটি প্রথমে করবেন সেটা নিয়ে বিতর্ক করেছিলেন, এসময়ে উম্মাহ্‌ সে ধরণের বিতর্ক না করে খলীফা পদটি থাকবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন করা শুরু করে। গণতন্ত্র ও ইসলামের মাঝে তফাৎ নিয়ে আলোচনা না করে, সেটাকে ইসলামী সমাজে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দুর্বল ব্যাখ্যা দেয়া শুরু হয়। খিলাফত রাষ্ট্রের ওয়ালী এবং রাষ্ট্রের সম্পর্ক আলোচনা না করে, কি করে confederacy of states করা যায় তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার এই যে, যদিও ইসলামের উদার ব্যাখ্যা রোধের জন্য ইজতিহাদের প্রক্রিয়া বন্ধ করা হয়েছিল, অথচ এসময়ে মুসলিম উম্মাহ্‌র অনেক বুদ্ধিজীবী প্রচুর উদার ব্যাখ্যা দেওয়া শুরু করেন। তারা পশ্চিমা ধ্যান-ধারণাকে ইসলামের ভেতর প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু করেন, যদিও সেগুলো ইসলামের মূল বিশ্বাসের বিরোধী ছিল।

    ফলে, ইসলামের মূল বিশ্বাস রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে কিনা – উম্মাহ্‌র এই প্রশ্ন করার এই প্রবণতার মাধ্যমেই তার অধঃপতনের শুরু প্রমাণিত হয়। কেননা যার ভিত্তিতে সমাজে উদ্ভুত সমস্যার সমাধান করা হবে, তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। ইসলামের সমাধান বা রাজনৈতিক পরিমন্ডলে যারা এই সমাধান দেন (অর্থাৎ খলীফা, ওয়ালী) তাদের উপর উম্মাহ্‌ আস্থাহীন হয়ে পড়ে।

    সারাংশ

    মুসলিম উম্মাহ্‌র মাঝে এই ব্যাপক অধঃপতনের মূল কারণ এটাই ছিল যে নতুন নতুন পরিস্থিতিতে ইজতিহাদ করার প্রক্রিয়া তখন সমাজে প্রচলিত ছিল না। ফলে সমস্যার সমাধান ও ইসলামের মূল বিশ্বাসের মাঝে কোনও যোগসূত্র ছিল না। এক পর্যায়ে মুসলিম উম্মাহ্‌ ইসলামকে কেন জীবনাদর্শ হিসেবে বেছে নিয়েছে তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা থেকে দূরে সরে যায়। শিল্প বিপ্লব, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার বিষয়গুলো গ্রহণযোগ্য কিনা তার সিদ্ধান্ত উম্মাহ্‌ নিতে পারছিল না। প্রিন্টিং মেশিনের ব্যবহার বর্জন করা অথবা গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টাই প্রমাণ করে যে উম্মাহ্‌র কাছে কোনও মাপকাঠি ছিল না।

    অতএব কোনও সমাজে উদ্ভূত সমস্যার সমাধানে যদি সেখানকার মূল বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন উঠে, তবে সেটাই হবে অধঃপতনের প্রথম লক্ষণ। আর সে সমাজে যদি অন্য কোনও আদর্শ থেকে আঘাত আসে, তবে সে সমাজ অধঃপতিত হয়।

    মুস্তফা মিনহাজ

  • অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষের উপর নারীকে অগ্রাধিকার দিয়েছে ইসলাম

    পূর্ব প্রকাশের পরঃ

    পিতা-মাতার সম্মান ও মর্যাদা বর্ণনার ক্ষেত্রেও ইসলাম নারীদেরকে অগ্রাধিকার ও অধিক সম্মান দিয়েছে। পিতার থেকে মাতার সম্মান ও মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। নিম্নোক্ত হাদীস থেকে যা পরিস্কারভাবে ফুটে উঠেছে।

    عن أبي هريرة رضي الله عنه قال : جاء رجل إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال : يا رسول الله من أحق الناس بحسن صحابتي ؟ قال : أمك ,, قال : ثم من ؟ قال : أمك, قال : ثم من ؟ قال : أمك, قال : ثم من ؟ قال : أبوك . (متفق عليه)

    “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে একবার জিজ্ঞাসা করা হলো যে ইয়া রাসূলাল্লাহ! পিতা-মাতার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে বেশি সম্মান ও মর্যাদার হকদার কে? প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন, তোমার মা। সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন, তোমার মা। সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন, তোমার মা। এরপর সাহাবী চতুর্থ বার যখন জিজ্ঞেস করলেন যে, তারপর কে? তখন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন, তোমার বাবা।” (বুখারী ও মুসলিম)

    এই হাদীসের দ্বারা এটা পরিস্কার হয়ে গেলো যে, নারী জাতিকে ইসলাম মাতৃত্বের উচ্চাসনে বসিয়েছে। তাদেরকে সম্মান ও মর্যাদার সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন করেছে।

    এছাড়াও অনেক হাদীস আছে যেখানে শুধু মাতার কথাই বলা হয়েছে। যেমন এক হাদীসে রাসূল সা. বলেন,
     

    عن معاوية بن جاهمة أنه جاء النبي صلى الله عليه وسلم فقال : يا رسول الله أردت أن أغزو، وجئت أستشيرك ؟ فقال: “هل لك من أم”؟ قال نعم: قال: “فالزمها فإن الجنة تحت رجليها” رواه النسائي


    হযরত মুয়াবিয়া বিনতে জাহিমা নবীজীর সা. এর কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি যুদ্ধে যেতে চাচ্ছি। আপনার কাছে পরামর্শের জন্য এসেছি। তিনি বললেন, তোমার মা আছে কি? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাহলে তাঁকে সঙ্গ দাও। কেননা জান্নাত তাঁর দুই পায়ের নিচে।” (সুনানে নাসাঈ )

    সমাজে কেউ যেনো নারী জাতির অবমাননা করতে না পারে সেটিও ইসলাম নিশ্চিত করেছে। অন্যায়ভাবে কেউ কোনো নারীকে অপবাদ দিলে তার জন্য শাস্তির বিধান দিয়েছে। ইরশাদ হয়েছে,

    وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ


    “আর যারা সচ্চরিত্রা নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে আসে না, তবে তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত কর এবং তোমরা কখনই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। আর এরাই হলো ফাসিক।” (সুরা আন-নূর: আয়াত ৪)

    আমল ও সওয়াবের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষকে সমান করেছে ইসলামঃ

    এভাবে নারীদেরকে দুনিয়ার জীবনে নিশ্চিত, নিরাপদ করার পর পরকালীন জীবনেও তাদের জন্য কল্যাণ ও মঙ্গলের কথা ঘোষণা করেছে। এক্ষেত্রে পুরুষ-নারী বলে কাউকে আলাদা করা হয় নি। ইরশাদ হয়েছে,
     

    مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ


    “যে মুমিন অবস্থায় নেক আমল করবে, পুরুষ হোক বা নারী, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তারা যা করত তার তুলনায় অবশ্যই আমি তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেব।” (সুরা আন-নাহল: আয়াত ৯৭)
     

    আরো ইরশাদ হয়েছে,

    مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ. وَمَنْ يَعْمَلْ مِنَ الصَّالِحَاتِ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ نَقِيرًا


    “আর পুরুষ কিংবা নারীর মধ্য থেকে যে নেককাজ করবে এমতাবস্থায় যে, সে মুমিন, তাহলে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি খেজুরবীচির আবরণ পরিমাণ যুল্ম   ও করা হবে না।” (সুরা নিসা: আয়াত ১২৪)

    أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِنْكُمْ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى بَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ

    أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِنْكُمْ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى بَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ

    অন্যত্র আরো ইরশাদ হয়েছে,


    ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের কোন পুরুষ অথবা মহিলা আমলকারীর আমল নষ্ট করব না। তোমাদের একে অপরের অংশ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৯৫)



    সুরা আল আহযাব এর ৩৫নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:

    أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِنْكُمْ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى بَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ. إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْخَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُمْ مَغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا


    “নিশ্চয় মুসলিম পুরুষ ও নারী, মুমিন পুরুষ ও নারী, অনুগত পুরুষ ও নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও নারী, বিনয়াবনত পুরুষ ও নারী, দানশীল পুরুষ ও নারী, সিয়ামপালনকারী পুরুষ ও নারী, নিজদের লজ্জাস্থানের হিফাযতকারী পুরুষ ও নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও নারী, তাদের জন্য আল্লাহ মাগফিরাত ও মহান প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন।” (সুরা আহযাব: আয়াত ৩৫)

    নারী জীবনের প্রত্যেক পর্যায় সম্পর্কে উপরে বর্ণিত সুন্দর ও সুনিপুন ব্যবস্থাপনা দিয়ে ইসলাম নারী জাতির পুরো জীবনটিকেই একেবারে সহজ, সুন্দর, নিরাপদ ও নির্ভাবনার করে দিয়েছে। কন্যা সন্তানের জন্য বিবাহের আগ পর্যন্ত যাবতীয় ব্যবস্থাপনা ইসলাম তার পিতার উপর ন্যস্ত করেছে। বিবাহের মাধ্যমে তার দায়িত্ব অর্পন করেছে স্বামীর উপর। এরপর মাতা হিসেবে তার দায়িত্ব দিয়েছে সন্তানের উপর।

    এমন সুন্দর ব্যবস্থা কারো ক্ষেত্রে কোনো পর্যায়ে বিঘ্নিত হলে সেজন্য আগে থেকেই রিজার্ভ ফান্ডেরও ব্যবস্থা রেখেছে পিতা-মাতার কাছ থেকে ওয়ারিশ হিসেবে প্রাপ্ত সম্পদ, স্বামীর কাছ থেকে প্রাপ্য মোহরানা এবং নিজের উপার্জিত যাবতীয় সম্পদ স্বাধীনভাবে ব্যবহারের অধিকার দিয়েছে। স্বামীদের উপর নিজ স্ত্রীদের জন্য মহরানা প্রদান বাধ্যতামূলক করে ঘোষণা করেছে,

    وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً

    “আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও।” (সূরা নিসা: আয়াত ৪)

    ইসলাম নারীর আর্থিক স্বাবলম্বীতা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ প্রয়োজনে শরীয়তের সীমা ঠিক রেখে নারীকে কর্মস্থলে যাওয়ারও অনুমতি দিয়েছে। ইসলাম নারীর নিজের প্রয়োজন পূরণের দায়িত্ব পিতা, স্বামী, সন্তানের উপর ন্যস্ত করলেও; নারীর নিজের আয়, নিজের সম্পত্তি কোনো ব্যবসায় বিনিয়োগ করে সেখান থেকে অর্জিত মুনাফা ইত্যাদির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতা দিয়েছে নারীর হাতে। এক্ষেত্রে জোর করে অন্য কারো জন্য সম্পদ গ্রাস করাকেও হারাম করেছে।

    চলবে…

    পরবর্তী পর্ব: পৈত্রিক সম্পত্তিতেও নারীর অধিকার নিশ্চিত করেছে ইসলাম


    ইসহাক খান

  • ইসলামে অর্থনৈতিক নীতিমালা

    ইসলামী অর্থনীতি প্রতিটি নাগরিকের সকল মৌলিক চাহিদা পূরনের গ্যারান্টি দেয়। এছাড়া অতিরিক্ত কিছু চাহিদা পূরণের পথও সুগম করে। তবে একথা প্রত্যেক নাগরিককে মেনে নিতে হবে যে, সে ইসলামী সমাজে বাস করছে এবং এর একটি বিশেষ জীবন পদ্ধতি আছে। সামগ্রিকভাবে বলা যায় যে, শরঈ আইন প্রতিটি ব্যক্তির মৌলিক চাহিদা তথা অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করার গ্যারান্টি দেয়। এর প্রক্রিয়া হলো এই যে, কোন ব্যক্তি যদি কর্মক্ষম হয় তাহলে ইসলাম তার নিজের এবং তার উপর যাদের ভরণ পোষনের দায়িত্ব রয়েছে, তাদের জীবিকা উপার্জনার্থে কাজ করা তার জন্য আবশ্যক করে দেয়। তাই পিতার উপর ফরয হয়ে যায়, তার সন্তানের জীবিকার ব্যবস্থা করা। যদি কোন ব্যক্তি কাজ করতে অক্ষম হয়, তখন তার দায়িত্ব অর্পন করা হয় তার ওয়ারিশদের উপর। তবে যদি তার দায়িত্ব পালন করার মত উপযুক্ত কাউকে না পাওয়া যায়, তখন তার দায়িত্ব ন্যাস্ত হয় বাইতুল মালের উপর। এভাবেই ইসলাম সব মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের দায়িত্ব পালন করে।

    ইসলামের দৃষ্টিতে অর্থনৈতিক মূল সমস্যা

    এটা হচ্ছে সম্পদ ও সেবা সকল নাগরিকের মাঝে বন্টন করার বিষয়। অর্থাৎ ইসলামের দৃষ্টিতে মূল সমস্যা সম্পদের উৎপাদন নয় বরং সমস্যা হচ্ছে সম্পদের বন্টন।

    মালিকানার উৎস

    মৌলিকভাবে সম্পদের প্রকৃত মালিক হচ্ছেন আল্লাহ্‌ তা’আলা। তিনিই মানুষকে এই সম্পদ দান করেছেন এবং এভাবেই মানুষ এক ধরনের সত্ত্বাধিকার লাভ করেছে। আল্লাহ্‌ নিজেই ব্যক্তিকে সম্পদের উপর অধিকার লাভের অনুমতি দিয়েছেন। এটা একটা বিশেষ অনুমতি। এই বিশেষ অনুমোদনের কারনেই কার্যত মানুষকে সম্পদের মালিক বলে ধরে নেয়া হয়। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইরশাদ করেন,

    “তোমরা ঐ সম্পদ থেকে তাদেরকে দান কর, যা আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে দিয়েছেন।” [নূর, ৩৩]

    এখানে সম্পদকে আল্লাহ্‌র বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি অন্যত্র ইরশাদ করেন,

    “এবং আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে যা কিছুর উত্তরাধিকারী করেছেন তা থেকে ব্যয় কর।” [হাদীদ, ৭]

    এ আয়াতে আল্লাহ্‌ মানুষকে সম্পদের উত্তরাধিকার দান করেছেন এবং তা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন।

    মালিকানার প্রকার (انواع الملكية)

    মালিকানা তিন প্রকার। যথা,

    ১- ব্যক্তি মালিকানা,
    ২- গণ মালিকানা ও
    ৩- রাষ্ট্রীয় মালিকানা।

    ১. ব্যক্তি মালিকানা

    শরীআতের পক্ষ থেকে মানুষকে মূল সম্পদ, সম্পদ থেকে প্রাপ্ত সুবিধা (মানফা’আত) কিংবা এর বিনিময়কে খরচ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ইসলাম সম্পদের ব্যক্তিমালিকানাকে মানুষের জন্য শরঈ অধিকার হিসাবে নির্ধারন করেছে। ব্যক্তিগত ভাবে মানুষ অস্থাবর সম্পত্তি- যেমন পশু, নগদ অর্থ, যান বাহন, কাপড় ইত্যাদি এবং স্থাবর সম্পত্তি-যেমন জমীন, ঘর-বাড়ী, কারখানা ইত্যাদি সব কিছুর মালিক হতে পারে। শরীআত ব্যক্তিকে নিজের মালিকানা হস্তান্তর করার অধিকারও দিয়েছে। তবে শরীআত ঐসব উপায়গুলোও নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, যে উপায়ে ব্যক্তি সম্পদের মালিকানা লাভ করতে পারে এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে মালের প্রবৃদ্ধি সাধন করতে পারে। এমনি ভাবে সম্পদ খরচ করার ব্যাপারেও শরীআত নির্দিষ্ট কিছু উপায় ঠিক করে দিয়েছে।

    মালিকানা লাভের উপায় সমূহ

    শরীআত প্রনেতা ( شارع ) ঐসমস্ত উপায়-উপকরণ নির্ধারন করে দিয়েছেন, যার মাধ্যমে মানুষ সম্পদের মালিকানা লাভ কিংবা সম্পদ বিনিয়োগ করতে পারে। শরীআত বিভিন্ন ধরনের পরিশ্রমকে যেমন-নিজের কাজ নিজে কিংবা অন্যের কাজ নিজে করা বা কাউকে দিয়ে করিয়ে দেওয়াকে সম্পদের মালিকানা লাভের একটি উপায় হিসাবে নির্ধারন করেছে। অনাবাদী জমিন আবাদ করা, শিকার করা, ভূগর্ভস্থ খনিজ সম্পদ উত্তোলন, দালালী, ইত্যাদির মাধ্যমেও সম্পদের মালিক হওয়া যায়। এমনি ভাবে মুযারাবা (এক ধরনের অংশীদারী কারবার) ও মুসাকাতকেও (সেচ) মালিকানা হাসিলের উপায় হিসাবে নির্ধারন করা হয়েছে। অধিকন্তু মীরাস, জীবন রক্ষাকারী সাহায্য গ্রহন, সরকারী অনুদান, এমন সম্পদ, যা বিনা পরিশ্রম বা বিনা বিনিময়ে লাভ হয়- যেমন হেবা, অসিয়ত, দিয়্যত, মোহর ইত্যাদিকেও মালিকানার উপায় সাব্যস্ত করা হয়েছে। এছাড়া কৃষি কাজ, ব্যবসা ও শিল্পকেও সম্পদ উপার্জন ও বিনিয়োগের উপায় হিসাবে ধার্য্য করা হয়েছে। শরীআত যেমনিভাবে সম্পদ উপার্জন ও বিনিয়োগের পন্থাসমূহ নির্ধারন করে দিয়েছে, তেমনিভাবে সেসব পন্থাও চিহ্নিত করে দিয়েছে, যেগুলোকে একজন মুসলমান কখনও সম্পদ উপার্জন বা বিনিয়োগের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করতে পারেনা। নিম্ন বর্ণিত উপায়ে সম্পদ উপার্জন ও বিনিয়োগ করা নিষিদ্ধ।

    দুই ব্যক্তি কিংবা এক ব্যক্তির শ্রম ও অন্য ব্যক্তির সম্পদের মধ্যে। কিন্তু ব্যক্তি ছাড়া শুধু সম্পত্তির মাঝে অংশিদারিত্ব জায়েয নেই। পুঁজিবাদী অংশিদারিত্ব কোম্পানী ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিকভাবে গঠিত নয় কেননা এ ক্ষেত্রে চুক্তির মৌলিক শর্তগুলোই পূরণ হয়না। এধরনের শেয়ার কোম্পানী যেহেতু বাতিল চুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত তাই এটা হারাম। অর্থাৎ শরীআত বর্ণিত নীতি মোতাবেক না হওয়ায় এধরনের ব্যবসায়িক চুক্তি আল্লাহ্‌র নিষেধের মধ্যে গণ্য। উপরন্ত যেহেতু আল্লাহ্‌ তা’আলা চুক্তির শর্ত পুরা করতে নির্দেশ দিয়েছেন আর তা পুরা না করার দরুন এ ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র হুকুমের বিরোধিতাও পরিলক্ষিত হয়।

    পুঁজিবাদী অংশিদারিত্ব কম্পানী (শেয়ার হোল্ডার কোম্পানী)

    পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কর্তৃক উদ্ভাবিত শেয়ার হোল্ডার কোম্পানী করার অনুমোদন ইসলাম দেয়না। বরং এটা হারাম। কারন চুক্তি ও বেচা-কেনা শুদ্ধ হওয়ার যেসব শর্ত শরীআত উল্লেখ করেছে, তা উপরোক্ত ক্ষেত্রে পাওয়া যায়না। এসব কোম্পানীর শেয়ারে চুক্তির রোকন তথা ইজাব-কবুলও পাওয়া যায়না, এটা এক পক্ষ থেকে এক তরফা ভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকে। কারন কেউ যদি কোম্পানীর পক্ষ থেকে নির্ধারিত শর্ত পুরা করে, তাহলেই সে শরীক বলে গণ্য হয়। এমনি ভাবে, যে শুধু মাত্র একটি শেয়ার খরীদ করে সেও কোম্পানীর অংশীদার বনে যায়। এখানে প্রকৃত কোন দুই পক্ষ থাকেনা। বরং একতরফাভাবে এক পক্ষ কোম্পানী পরিচালনা করে। এই পদ্ধতিতে ইজাব কবুলের বিষয়টিও পাওয়া যায়না। বরং শুধু ইজাব পাওয়া যায়। এতে সম্পদ ও ব্যক্তি একত্র হয়না। বরং শুধু সম্পদের অস্তিত্বই দৃশ্যমান হয়।

    শরীআতের পক্ষ থেকে কোম্পানীর জন্য এই শর্ত আরোপ করা আছে যে, আকেদাইন অর্থাৎ ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের পক্ষ থেকে ইজাব ও কবুল পাওয়া যেতে হবে। যেমন ব্যবসা, ভাড়া ইত্যাদি আরো যত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি আছে। তাছাড়া অংশিদারিত্ব হতে পারে দুই ব্যক্তি কিংবা এক ব্যক্তির শ্রম ও অন্য ব্যক্তির সম্পদের মধ্যে। কিন্তু ব্যক্তি ছাড়া শুধু সম্পত্তির মাঝে অংশিদারিত্ব জায়েয নেই। পুঁজিবাদী অংশিদারিত্ব কোম্পানী ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিকভাবে গঠিত নয় কেননা এ ক্ষেত্রে চুক্তির মৌলিক শর্তগুলোই পূরণ হয়না। এধরনের শেয়ার কোম্পানী যেহেতু বাতিল চুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত তাই এটা হারাম। অর্থাৎ শরীআত বর্ণিত নীতি মোতাবেক না হওয়ায় এধরনের ব্যবসায়িক চুক্তি আল্লাহ্‌র নিষেধের মধ্যে গণ্য। উপরন্ত যেহেতু আল্লাহ্‌ তা’আলা চুক্তির শর্ত পুরা করতে নির্দেশ দিয়েছেন আর তা পুরা না করার দরুন এ ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র হুকুমের বিরোধিতাও পরিলক্ষিত হয়।

    আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,

    “সুতরাং যারা তাঁর (মুহাম্মদ) আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা এ বিষয়ে সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদেরকে স্পর্শ করবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে।” [নুর, ৬৩]

    এমনি ভাবে ইসলামে সুদ, ঘুষ, মজুতদারী, জুয়া, একচেটিয়াত্ব, ধোঁকাবাজী, প্রতারনা, বিশ্বাস ঘাতকতা, মদের ক্রয়-বিক্রয়, শুকরের ব্যবসা, মৃত পশু-পাখির গোস্ত বিক্রি, ক্রুশ বিক্রি ক্রিসমাস ট্রি (জন্মোৎসব বৃক্ষ) বিক্রি, মূর্তি বিক্রি, চুরি, ছিনতাই, লুটতরাজ, ইত্যাদির মাধ্যমে সম্পদ উপার্জন করাও নিষেধ করা হয়েছে।

    ২. গণ মালিকানা

    মালিকানার দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে গণ মালিকানা। গণ মালিকানা হয় ঐসব সম্পদের যেগুলোকে ইসলামিক শরীআ’হ সমস্ত মুসলমানের মালিকানায় দিয়ে দিয়েছে এবং একে মুসলমানদের যৌথ মালিকানাধীন সম্পত্তি বলে স্থির করেছে। শরীআতে এগুলো ব্যবহার করা ব্যক্তির জন্য বৈধ করা হয়েছে ঠিক, কিন্তু ব্যক্তিগত মালিকানায় নিয়ে নিতে নিষেধ করা হয়েছে। মৌলিক ভাবে এই সম্পত্তি মোট তিন ধরনের।

    ক. সমাজের মানুষের বেঁচে থাকার নিত্য প্রয়োজনীয় উপকরন, যা ছাড়া মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাপন অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং যেগুলোর অভাবে মানুষ তার এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হয় যেমন- পানি। রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) ইরশাদ করেন,

    “তিন জিনিষের মাঝে সকল মানুষ শরীক। এগুলো হচ্ছে পানি, ঘাস (চারণ ভূমি) এবং আগুন।”

    এই হাদীসের আবেদন উক্ত তিন বস্তুর মাঝেই সীমিত নয়, বরং এর আওতায় প্রত্যেক ঐ সমস্ত বস্তুও শামিল, যা সমাজের সকল মানুষের সমান ভাবে প্রয়োজন। একারনে ঐ সমস্ত যন্ত্রপাতি এবং উপকরনও এর মধ্যে শামীল, যা মানুষের নিত্য দিনের প্রয়োজনে ব্যবহার হয়। যেমন-পানি উত্তোলনের পাম্প, পানি সরবরাহের পাইপ লাইন, পানি-বিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্ট, বিদ্যুতের খুটি, সরবরাহ তার ইত্যাদি।

    খ. এমন সম্পত্তি যা তার স্বাভাবিক সৃষ্টিগত কারনেই ব্যক্তি মালিকানার কবজায় যাওয়ার উপযুক্ত নয়। যেমন নদী, বড় ময়দান, মসজিদ, মহা সড়ক ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে রাসূল (সাঃ) বলেন, (مني مناخ من سبق) “যে আগে আসে, আমার দিক থেকে পরিবেশ তার অনুকুলে” (অর্থাৎ আগে আসলে আগে পাবে)। এছাড়া আরো জিনিস আছে, যেমন- রেলগাড়ী, বিদ্যুতের খুটি, পানির পাইপ, মহা সড়কের সাথে সংযুক্ত পয়:প্রনালী ইত্যাদিও গণ মালিকানার মধ্যে গন্য। কারন এগুলো জন সাধারনের পথের সাথে সংযুক্ত। আর এমন পথ গণ মালিকানারই অন্তর্ভুক্ত। কোন মানুষ এসব জিনিসকে নিজের মালিকানায় নিয়ে নিতে পারেনা এবং এর থেকে উপকৃত হতে জন সাধারণকে বাধা দিতে পারেনা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,  (لا حمى الا لله ورسوله) “আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূল ছাড়া চারণ ভুমি আর কারো নয়”। অতএব, এক মাত্র সরকার ছাড়া আর কেউ এগুলো থেকে মানুষকে বারণ করার অধিকার রাখেনা।

    গ. এমন খনি, যাতে বিপুল পরিমান সম্পদ মজুদ আছে। এধরনের অনেক খনি আছে, যা বিভিন্ন রকম মুল্যবান খনিজ সম্পদে ভরপুর। এগুলো সকল মুসলমানের মালিকানাধীন সম্পত্তি। কোন কোম্পানী কিংবা ব্যক্তি বিশেষের পক্ষে এগুলোর মালিকানা দাবি করা জায়েয নেই। একারনে এগুলো থেকে সম্পদ উত্তোলন করা, মজুদ করে রাখা এবং বন্টন করার জন্য কোন কোম্পানী কিংবা ব্যক্তি বিশেষকে এর মালিকানা দিয়ে দেওয়া বৈধ নয়। বরং এগুলোকে সমস্ত মুসলমানদের মালিকানায় রাখা জরুরী। এতে সকল মুসলমান শরীক। রাষ্ট্র নিজে এসব সম্পত্তি উত্তোলন করবে কিংবা কাউকে ঠিকাদার নিয়োগ করবে অথবা সকল মুসলমানের প্রতিনিধি হওয়ার ভিত্তিতে এসব খনিজ দ্রব্য বিক্রি করে এর রাজস্ব বাইতুল মালে গচ্ছিত রাখবে। এসমস্ত খনি ভূগর্ভস্থ হউক বা ভূপৃষ্টে হউক তাতে হুকুমের ক্ষেত্রে কোন তারতম্য হবেনা। ভূপৃষ্টের খনি যেমন-লবন, সুরমা ইত্যাদির খনি। ভূগর্ভস্থ খনি (যার সম্পদ উত্তোলন করা খুবই কষ্ট সাধ্য ব্যাপার) যেমন- সোনা, রূপা, পিতল, তামা, ইউরেনিয়াম, পেট্রোল ইত্যাদির খনি। এর দলীল হচ্ছে ইবনে হাম্মাল আল মাযূনী (রা) এর বর্ণিত হাদীস,

    “ইবনে হাম্মাল (রা) বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসূল (সাঃ) এর নিকট মারিব নামক স্থানের কিছু সম্পত্তি অনুদান হিসাবে তাকে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। রাসূল (সা) তা তাকে দিয়ে দিলেন। যখন তিনি চলে গেলেন তখন লোকেরা বলল- ইয়া রাসূলাল্লাহ্‌! আপনি কি জানেন আপনি তাকে কি দিয়েছেন? আপনি তাকে অফুরন্ত পানির উৎস দিয়ে দিয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন- এরপর রাসূল (সা) এটা ফেরত নিয়ে নিলেন।”

    ছোট এবং পরিমানে সীমিত খনি গুলোর হুকুম অবশ্য ভিন্ন। কোন ব্যক্তি বিশেষও এ ধরনের খনির মালিক হতে পারে। যেমন আল্লাহ্‌র রাসূল (সা) হযরত বিলাল বিন হারিস আল-মাযূনীকে (রা) হিজাজে-“মাআদিনুল কবিলা” নামক খনিটির মালিক বানিয়ে দিয়েছিলেন।

    গণ মালিকানাধীন সম্পত্তি ব্যবহারের উপায়

    যেহেতু গণ মালিকানাধীন সম্পত্তিতে যৌথ ভাবে সকল নাগরিকের মালিকানা রয়েছে, সেহেতু প্রত্যেক ব্যক্তিই এই সম্পদ ব্যবহার করতে পারে। যদি এর ধরন এমন হয় যে, প্রত্যেকে সরাসরি এটা ব্যবহার করতে পারে – যেমন- পানি, ঘাস, আগুন, জনপথ ইত্যাদি; তাহলে ব্যক্তিগত ভাবে তারা এগুলো থেকে উপকৃত হতে পারে। আর যদি এমনটা সম্ভব না হয়, যেমন পেট্রোল বা অন্যান্য প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পত্তির ক্ষেত্রে, তাহলে ইসলামী রাষ্ট্র এগুলো উত্তোলনের ব্যবস্থা করবে, এগুলো থেকে উপার্জিত অর্থ বাইতুল মালে জমা রাখবে। খলীফা প্রয়োজন অনুযায়ী মুসলমানদের কল্যানার্থে উপযুক্ত খাতে এগুলো ব্যয় করবেন। নিম্ন বর্নিত পদ্ধতিতে খলীফা তা বন্টনও করে দিতে পারেন।

    ক. খনিজ সম্পদ সংক্রান্ত বিভাগে এগুলোর অর্থ ব্যয় করা অর্থাৎ এ বিভাগের জন্য ভবন নির্মান, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, উপদেষ্টা, বিশেষজ্ঞ, যন্ত্র পাতি এবং কারখানা ইত্যাদি খাতে ব্যয় করা যাবে।

    খ. এই সম্পত্তির মালিক অর্থাৎ মুসলমানদের জন্য তা সরাসরি ব্যয় করা যাবে অর্থাৎ খলীফা সরাসরি এগুলো মানুষের মাঝে বিতরন করে দিতে পারবেন। যেমন পেট্রোল, পানি, বিদ্যুৎ ইত্যাদি বিনা মূল্যে সরবরাহ করবেন কিংবা এর আয় থেকে উপার্জিত অর্থ মুসলমানদের কল্যাণ মূলক খাতে ব্যয় করবেন।

    গ. যখন বাইতুল মালে পর্যাপ্ত অর্থ থাকবেনা তখন জিহাদ কিংবা এর জন্য অস্ত্র ও সৈন্য প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এধরনের সম্পদ ব্যয় করা হবে। প্রনিধান যোগ্য যে, বাইতুল মালে কোন সম্পত্তি না থাকলেও জিহাদের জন্য খরচ করা মুসলমানদের জন্য ফরয।

    ৩. রাষ্ট্রীয় মালিকানা

    মালিকানার তৃতীয় প্রকার হচ্ছে রাষ্ট্রীয় মালিকানা। এর মাঝে এমন প্রত্যেক সম্পদ শামীল, যা ভূমি বা ইমারাত হওয়ার দিক থেকে যদিও সাধারন জনগনের সাথে সংশ্লিষ্ট, কিন্তু গণমালিকনার অন্তর্ভূক্ত নয়। এ ধরনের সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানারও উপযুক্ত। যেমন ভূমি, অট্টালিকা, স্থাবর সম্পত্তি ইত্যাদি। কিন্তু যেহেতু এগুলো সাধারন জনগনের ব্যবহারের সাথে সংশ্লিষ্ট সেহেতু এগুলোর রক্ষনাবেক্ষন ও নিয়ন্ত্রন করার দায়িত্ব খলীফার উপর ন্যাস্ত। কেননা জনগনের অধিকার সংরক্ষনের স্বার্থে যেকোন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা কেবলমাত্র খলীফারই রয়েছে। মরুভূমি, পাহাড়, বন্দর এলাকা, বিশেষ কোন ব্যক্তির মালিকনাধীন নয়- এমন অনাবাদী জমিন, অট্টালিকা এবং পানি পানের স্থান (কুপ ইত্যাদি), এমন সম্পত্তি-যা রাষ্ট্র কর্তৃক খরীদ করা, কিংবা রাষ্ট্র যা নির্মান করেছে, অথবা যুদ্ধ করে শত্রু থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে, বিভিনড়ব অফিসের জন্য ব্যবহৃত বাড়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ইত্যাদি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সম্পদ।

    খলীফা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিকে ব্যক্তির মালিকানায়ও দিতে পারে। যেমন ভূমি, বাড়ী ইত্যাদি। এটা মুনাফার ব্যাপারেও হতে পারে আবার মূল সম্পত্তির বেলায়ও হতে পারে। অথবা খলীফা তাদেরকে এমন অনুমতি দিতে পারে যে, ব্যক্তি কোন অনাবাদী জমীন আবাদ করে তার মালিক হয়ে যাবে। মোট কথা যেভাবেই এটা ব্যবহার করা হোকনা কেন তা অবশ্যই মুসলমানদের উপকারার্থে হতে হবে।

    ভূমি সমহূ  (الاراضى)

    ভূমির ক্ষেত্রে একটি বিষয় হচ্ছে ভূমির মূল ( رقبة ) এর মালিকানা। আরেকটি বিষয় হচেছ ভূমির মুনাফা বা রাকাবাহ থেকে প্রাপ্ত সুবিধা ( منفعة )। ইসলাম উভয়কে মানুষের জন্য মুবাহ (বৈধ) করেছে। তবে উভয়ের জন্য বিশেষ বিশেষ বিধি-বিধানও রেখেছে।

    ভূমির প্রকার সমূহ

    ভূমি দুই প্রকার উশরী ও খারাজী।

    ক. উশরী জমিন বলা হয় এমন ভূমিকে, যেখানকার বাসিন্দারা নিজে থেকেই মুসলমান হয়েছে। যেমন হিজাজ ও ইন্দোনিশিয়ার মুসলমান। এমন অনাবাদী জমিনকেও উশরী জমিন বলা হয়, যা মানুষ নিজে আবাদ করে।

    উশরী জমীনের ক্ষেত্রে খোদ ভূমি বা তার আয় উভয়েরই মালিক হওয়া যায়। উশরী জমিনের উৎপাদিত ফসলের উপর যাকাত দিতে হয়। যে ভূমি সেচের জন্য বৃষ্টি কিংবা জোয়ারের পানি ছাড়া অন্য উপায় অবলম্বন করার প্রয়োজন হয় না, সেভূমির ফসলের দশ ভাগের এক ভাগ যাকাত (উশর) হিসাবে প্রদান করতে হয়। যদি তা সেচ করার জন্য অন্য উপায় অবলম্বন করতে হয়, তাহলে উৎপন্ন ফসলের বিশ ভাগের এক ভাগ (নিসফে উশর) যাকাত হিসাবে প্রদান করতে হয়।

    খ. খারাজী জমিন হচ্ছে হিজাজ ব্যতীত এমন ভূমি, যা জিহাদ কিংবা সন্ধির মাধ্যমে হস্তগত হয়েছে। যেমন ইরাক, সিরিয়া ও মিশরের ভূমি। এমন জমিনের ক্ষেত্রে রাকাবা তথা মূল ভূমি সমস্ত মুসলমানের মালিকানাধীন থাকে, তবে রাষ্ট্র থাকে এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের নায়েব বা প্রতিনিধি। ব্যক্তি শুধু এর মুনাফার মালিক হতে পারে। খেরাজি জমিনের ক্ষেত্রে খারাজ আদায় করতে হয়। এর পরিমান সেটাই হবে, যেটা রাষ্ট্র নির্ধারন করবে। খারাজ আলাদা করার পর যদি এ জমিনের উৎপন্ন ফসল নেসাব পরিমান হয়, তাহলে তা থেকে যাকাত আদায় করতে হবে।

    মোট কথা ব্যক্তি উশরী জমিন থেকে লাভবান হতে পারে এই অর্থে যে, সে তা বিক্রি করতে পারে, মিরাছ বা হেবা হিসাবে প্রদান বা গ্রহন করতে পারে। এ হুকুম খারাজী জমির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

    শিল্প কারখানা (المصانع)

    শিল্প কারখানাও ব্যক্তি মালিকানায় থাকা জায়েয আছে। যেমন গাড়ীর কারখানা, ফার্নিচার, গার্মেন্টস সামগ্রী ইত্যাদির কারখানা। এমনি ভাবে রাষ্ট্রের মালিকানায়ও বিভিন্ন কল- কারখানা থাকতে পারে। যেমন-অস্ত্র কারখানা, তেল উত্তোলন ও শোধনাগার, বিভিন্ন খনিজ সম্পদ উত্তোলন কেন্দ্র ইত্যাদি। এ ছাড়া গণমালিকানায়ও কল কারখানা থাকতে পারে। যেমন লোহা, ইস্পাত, স্বর্ন-রৌপ্য, পেট্রোল ইত্যাদি খনিজ সম্পদের ফ্যাক্টরী।

    এধরনের কল কারখানার মালিকানা এগুলো থেকে উৎপাদিত পন্যের মালিকানার অনুরূপ হবে। কারণ মূলনীতি হলো ان المصنع يأخذ حكم ما ينتج অর্থাৎ ” উৎপাদিত পন্যের হুকুমই কারখানার হুকুম”।

    বাইতুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার)

    বাইতুল মালের আয়ের উৎস সমূহ

    ১- আনফাল, গনিমত, মালে ফায় এবং খুমুছ
    ২- খারাজ
    ৩- জিযিয়া
    ৪- গণ মালিকানাধীন সম্পত্তি থেকে উপার্জিত বিভিন্ন প্রকার আয়; এগুলো রাখা হয় বিশেষ বিভাগে
    ৫- রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সম্পদ থেকে অর্জিত রাজস্ব
    ৬- বিভিন্ন সীমান্তে সংগৃহীত শুল্ক
    ৭- গুপ্তধন এবং ছোট খনির এক পঞ্চমাংশ (খুমুছ)
    ৮- বিভিন্ন প্রকার কর (ضرائب)
    ৯- যাকাত বাবত আদায়কৃত সম্পদ। এটিও বিশেষ বিভাগে রাখা হয়

    নগদ অর্থের ব্যাপারে স্বর্ন- রৌপ্যকে মূল ভিত্তি বানানোর-বাধ্যবাধকতা (وجوب ان يكون النقد ذهبا وفضة)

    রাসূল (সা) এর যুগে মানুষ স্বর্ন ও রৌপ্যকেই তাদের লেন-দেনের জন্য বিনিময় মূদ্রা বা নগদ অর্থের মানদন্ড হিসাবে মনে করতো এবং পাশাপাশি উভয়টিই ব্যবহার করতো। এছাড়া প্রাথমিক যুগে পার্সী ও রোমান দেরহাম দীনারই নগদ অর্থ হিসাবে আরবদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। রাসূল (সা) এর যুগ থেকে খলীফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ান পর্যন্ত মুসলমানরা নিজেরা কোন মুদ্রা তৈরী করেনি। খলীফা আবদুল মালেক বিন মারওয়ান তার যুগে এক ধরনের বিশেষ আকৃতির মুদ্রা বানিয়ে ছিলেন, যা ছিল ইসলামী কারূকার্য দ্বারা সুশোভিত। আর তার ভিত্তিও রাখা হয়েছিল স্বর্ন রূপার মানদন্ডের উপর। অর্থাৎ শরঈ দীনার ও দেরহামের মাপের উপর।

    ইসলাম স্বর্ন-রৌপ্যের সাথে অনেক বিধি-বিধানকে সংশ্লিষ্ট করে রেখেছে। যেমন এগুলো সোনা-রূপা হওয়ার দিক থেকে অর্থাৎ ব্যবহার্য্য মূল্যবান ধাতু হিসাবে, নগদ অর্থ ও মুদ্রা হওয়ার দিক থেকে, পণ্য সামগ্রীর মুল্য হওয়ার দিক থেকে এবং শ্রমের বিনিময় হওয়ার দিক থেকে। শরীআত সোনা-রূপার মুদ্রা মজুত করে রাখাকে হারাম করে দিয়েছে। এগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট এমন মাসআলাও আছে, যা সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয়। ইসলাম সোনা ও রূপা এই দুই প্রকার মুদ্রা হওয়ার কথা বলেছে। এগুলোর উপর যাকাত ফরয হয়েছে এবং এসব মুদ্রাকে পন্য সামগ্রীর মূল্য হিসাবে বিবেচনা করেছে। সোনার দীনার আর রূপার দিরহামের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন বিষয়ের (যেমন যাকাত) নেসাব নির্ণয় করা হয়েছে। যদি দিয়্যাত (রক্ত পন) ওয়াজিব হয়, তখনও এই মুদ্রার হিসাবে তা পরিশোধ করার কথা বলা হয়েছে। এর জন্য সোনা রূপার একটি নির্দিষ্ট পরিমান নির্ধারন করা হয়েছে। যার বিবরণ হচ্ছে এই যে, স্বর্নের ক্ষেত্রে একহাজার দীনার। আর রূপার ক্ষেত্রে ১২ হাজার দিরহাম। যখন চুরি করলে হাত কাটা ফরয করা হয়েছে, তখন এর জন্য একটি ন্যুনতম সীমাও নির্ধারন করা হয়েছে। অর্থাৎ কি পরিমান সম্পদ চুরি করলে হাত কাটা যাবে, সেটিও নির্ধারিত হয়েছে সোনা রূপার পরিমাণের ভিত্তিতে।

    দুই প্রকার মুদ্রা, বিনিময় মাধ্যম, জিনিষপত্রের মূল্য ইত্যাদি হিসাবে সোনা-রূপার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি রাসূল (সাঃ) এর কাছ থেকেই গৃহীত হয়েছে। এটা খোদ রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)ই নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন যে, শুধু সোনা-রূপাই হবে নগদ অর্থ নির্ণয়ের মাপ কাঠি। যার মাধ্যমে জিনিস পত্রের দাম নির্ধারন করা হবে এবং শ্রমের বিনিময় দেওয়া হবে। এটাই হচ্ছে এ কথার বড় দলীল যে ইসলাম সোনা রূপাকেই নগদ অর্থের মান দন্ড নির্ণয় করেছে। কারণ নগদ অর্থের সাথে সম্পর্কিত যত হুকুম আহকাম আছে, সবই সোনা রূপার মানে আবদ্ধ।

    এই ভিত্তির উপর নির্ভর করেই মুসলমানদের নগদ লেনদেনের মাপকাঠি সোনা-রূপা হওয়াই অপরিহার্য্য। খলীফারও করনীয় হলো সোনা-রূপাকেই নগদ অর্থের ভিত্তি নির্ধারণ করা, আর সোনা-রূপার ঐ নিয়মের উপর চলা, যা রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে প্রচলিত ছিল। খিলাফত ভিত্তিক সরকারের আরো দায়িত্ব হলো একটি নির্দিষ্ট ও বিশেষ রূপের মুদ্রা চালু করা, দীনারের পরিমাপ শরঈ দীনারের মাপে নির্ধারণ করা অর্থাৎ এক দীনার সমান ৪.২৫ গ্রাম। এটা হচ্ছে মিছকালের ( مثقال ) ওজন। রূপার দেরহামের ওজনও হবে শরঈ দেরহাম বরাবর। যাকে وزن بيع ও বলা হয়। অথার্ৎ প্রতি দশ দেরহামের ওজন হবে সাত মিছকাল বরাবর। দেরহামের মুদ্রা হবে- ২.৯৭৫ গ্রাম বরাবর। সোনা-রূপার মুদ্রার প্রচলনকে ফিরিয়ে আনাই মুদ্রা সম্পর্কিত অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধানের একমাত্র উপায়। এছাড়া বিশ্বব্যাপী বিরাজমান তীব্র মূল্য স্ফীতি নিয়ন্ত্রনের উপায়ও এটিই। মুদ্রা বিনিময় হারের ক্ষেত্রে স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উন্নয়ন সাধন করাও এর মাধ্যমে সম্ভব হবে। এই সোনা-রূপার নীতি অবলম্বন করেই আর্ন্তজাতিক বাণিজ্যের উপর মার্কিন প্রাধান্য এবং বিশ্ব অর্থনীতির উপর ডলারের প্রভাব ও কর্তৃত্ব খর্ব করে দেয়া সম্ভব।