তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২কৃষিতে ইসলামের অবদান

কৃষি হচ্ছে মূলত উদ্ভিদ ও প্রাণী থেকে খাদ্য এবং তন্তু উৎপাদনের বা সংগ্রহের সুসংগঠিত পদ্ধতি। মানবসভ্যতার ইতিহাসে কৃষি সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে, কারণ বিশ্বব্যাপী আর্থসামাজিক অবস্থা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কৃষিব্যবস্থার অগ্রগতি অন্যতম প্রধান নিয়ামক। শিল্পবিপ্লবের আগ পর্যন্ত পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজে নিয়োজিত ছিল। নিত্যনতুন কলাকৌশল উদ্ভাবন এবং প্রয়োগের ফলে কৃষিজ উৎপাদন বহুগুনে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এ সমস্ত কলাকৌশল নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
বর্তমানে অনেক বিষয় কৃষির অন্তর্ভুক্ত, এর প্রধান বিষয়গুলো হচ্ছে-
– কৃষিবিদ্যা (চারা উৎপাদন, রোপণ এবং ফসল সংগ্রহ)
– পশুপালন বিদ্যা
– মৎস্যবিজ্ঞান
– উদ্যানপালন বিদ্যা (স্বল্প পরিসরে ফুল, ফল, সবজি চাষ)
এ সমস্ত বিষয়ের প্রত্যেকটিরই আবার অনেকগুলো শাখা রয়েছে; যেমন কৃষিবিদ্যার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে প্রাকৃতিক এবং কৃত্রিম চাষাবাদ পদ্ধতি, পশুপালনবিদ্যার অন্তর্ভুক্ত রেঞ্ছিং (নির্দিষ্ট একটি প্রজাতির পশুপালন পদ্ধতি)। কৃষিবিদ্যার উন্নয়ন এবং বিবর্তনের ফলে নতুন অনেক কৃষিপন্য তৈরি হয়েছে যেমন: পশুখাদ্য (স্টার্চ, স্যুগার, এলকোহল ও রেজিন), তন্তু (তুলা, পশম, শন) , ফ্লাক্স (লিলেন কাপড় তৈরিতে ব্যবহৃত) এবং রেশম জ্বালানি (জৈবপণ্যজাত মিথেন, ইথানল, বায়োডিজেল), পাতাবাহার, কাটফ্লাওয়ার (কাটার অনেকক্ষণ পরেও সতেজ থাকে এমন ফুল) এবং অন্যান্য নার্সারীর উদ্ভিদ।
১৯৯৬ সালের এক হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীর প্রায় ৪২% শ্রমিক কৃষিকাজে নিয়োজিত ছিল যা ২০০৬ সাল নাগাদ কমে ৩৬% এ দাঁড়ায়। শিল্পায়নের ব্যাপক প্রসারের ফলে পৃথিবীর সর্বাধিক পরিচিত এ পেশার আপেক্ষিক গুরুত্ব দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে এবং নিয়োজিত শ্রমিকের সংখার দিক থেকে ২০০৬ সালে ইতিহাসে প্রথমবারের মত পৃথিবীতে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে কৃষিখাতকে টপকে যায় সেবাখাত। বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিতে মোট জিডিপির পাঁচ শতাংশেরও কম আসে কৃষিখাত থেকে।
ইতিহাস: কৃষিক্ষেত্রে ইসলাম
অনেক ঐতিহাসিকের মতে বৈশ্বিক অর্থনীতির সূচনা হয় মুসলিম ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে; যার ফলে অনেক খাদ্যশস্য এবং কৃষি প্রযুক্তি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে; পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের বাইরে থেকেও অনেক খাদ্যশস্য এবং কৃষিপ্রযুক্তি মুসলিম বিশ্বে আসে। আফ্রিকা, চীন এবং ভারত থেকে প্রচুর খাদ্যশস্য মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অংশে আনা হতো। এই সময়ে বিপুল পরিমান খাদ্যশস্যের যে স্থানান্তর ঘটে সেটাকে অনেক লেখক খাদ্যশস্যের বিশ্বায়ন বলে অভিহিত করেছেন।
৭৫০ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয়রা যখন খিলাফতের শাসনভার গ্রহণ করেন তখন তারা দামেস্ক থেকে মধ্য মেসোপটেমিয়ার ছোট্ট সাসানিয় শহর (মুসলিমদের অধীনে আসার আগে পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত) বাগদাদে খিলাফতের রাজধানী স্থানান্তর করেন। ইউরোপের শহর, নগর এবং অন্যান্য স্থাপনাগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে সেগুলো ডাকাত এবং অন্য সাম্রাজ্যের সেনা অভিযান থেকে সুরক্ষিত থাকে, কিন্তু বাস্তবে সেগুলো চার কোনায় খুব দুর্বল ছিল। যদি দেয়ালের এই চার কোণায় পর্যাপ্ত চাপ প্রয়োগ করা যায়, তাহলে সেগুলো ভেঙ্গে যাবে এবং যোদ্ধারা সহজেই সেই ফাটল দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে। সর্বপ্রথম বৃত্তাকার শহরে বাগদাদকে রূপান্তরিত করে আব্বাসীয়রা এই সমস্যার সমাধান করেছিলেন।
আব্বাসীয় খলিফা আল মানসুর (৭৫৪-৭৫ খ্রিঃ) নতুন রাজধানীকে বৃত্তাকার দেয়াল দিয়ে পরিবেষ্টিত করে ফেলেন। খিলাফতের বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন সরকারী কাজের জন্য এবং ব্যবসার তাগিদে রাজধানীতে আস্তে লাগলো, যার ফলে ৫০ বছরের মধ্যে বাগদাদের জনসংখ্যা প্রচন্ড পরিমাণে বেড়ে যায়। এশিয়া ও ভূমধ্যসাগরের সংযোগকারী একটি বৃহৎ ব্যবসাকেন্দ্রে রূপান্তরিত হয় বাগদাদ। খলীফা হারুন-আর রশীদের (খলিফা মনসুরের দৌহিত্র) সময়কালে (৭৮৬-৮০৬) বাগদাদ কন্সটান্টিনোপলের পরে দ্বিতীয় বৃহৎ নগরীতে পরিণত হয়।
বাগদাদের নিরপত্তা নিশ্চিত করার পর আব্বাসীয়রা ভাবতে লাগলো কিভাবে খিলাফতের বিপুল পরিমাণ জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। আব্বাসীয়দের সময়ে কৃষিব্যবস্থার উন্নতি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কারণ পানির অভাবে মরুভূমিতে পরিণত হওয়া শুষ্ক আরব ভূমিতে কখনোই পর্যাপ্ত পরিমাণ ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি। নিজেদের ভূখন্ডে উৎপাদিত খেজুর এবং সামান্য পরিমাণ খাদ্যশস্য পর্যাপ্ত ছিলনা বলে খাদ্যের পরিমাণ পর্যাপ্ত করতে বাইরে থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করতে হতে। সেসময় আরবের চাষাবাদ শুধুমাত্র সেসব জায়গাতেই সীমাবদ্ধ ছিল যেখানে পানির প্রাকৃতিক উৎস বিদ্যমান ছিল। তাছাড়া চাষাবাদ হতো অত্যন্ত প্রাচীন পদ্ধতিতে। এই বিস্তৃত মরুভূমিতে কেবলমাত্র মদীনাই ছিল ঝরণা এবং কূপসমৃদ্ধ সবুজ অঞ্চল। তাইগ্রিস এবং ইউফ্রেতিস নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আব্বাসীয়রা এই সমস্যার সমাধান করেছিল। অসংখ খাল খননের ফলে জমিসেচ পদ্ধতির প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছিল। এসমস্ত খালের মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ ছিল তাইগ্রিস এবং ইউফ্রিতিসের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত নহরে ইসা (ইসা খাল) যা ইরাক এবং সিরিয়ার মধ্যে নৌ-যোগাযোগের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এর ফলে ভারত এবং পারস্য উপসাগরের সাথে নৌ যোগাযোগের পথ সুগম হয়। ৭০২ খ্রিস্টাব্দে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের সময়ে নির্মিত খাল, হ্রদ এবং অন্যান্য জলাধারগুলোর সংস্কার সাধন করে আব্বাসীয়রা।
এরপরে তারা বাগদাদের চারপাশের জলাশয়গুলোকে পরিষ্কারের মাধ্যমে নগরীকে ম্যালেরিয়ামুক্ত করল। মুসলিম প্রকৌশলীরা জলচাকার (পানির গতিশক্তিকে ঘূর্ণায়মান শক্তিতে রুপান্তরকারী যা পূর্বে জমিসেচের জন্য ব্যবহৃত পানি উত্তোলনকারী যন্ত্রে প্রয়োগ করা হত) উৎকর্ষ সাধন করল এবং কানাত নামের অনেকগুল বৃহদাকারের ভূ নিন্মস্থ পানির চ্যানেল তৈরি করল। অত্যন্ত উঁচুমানের প্রকৌশলবিদ্যা প্রয়োগ করে কানাতগুলো তৈরি করা হয়েছিল যেগুলো সামান্য কোণে হেলানো অবস্থায় অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল মাটির প্রায় পঞ্চাশ ফুট গভীর পর্যন্ত; যার মধ্যে ভূ-গর্ভস্থ পানি সংগ্রহ করা হতো। এগুলোকে পরিষ্কার এবং সংস্কার করার জন্য ম্যানহোলও সরবরাহ করা হয়েছিল।
এসমস্ত উন্নয়নের ফলে আব্বাসীয়দের সময়ে কৃষিব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটল যার সুফল অন্যান্য অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সঞ্চারিত হল। তখন ব্যবসা এবং জমির খাজনা থেকে প্রচুর সম্পদ আয় করেছিল আব্বাসীয় খিলাফত। আব্বাসীয়দের অধীনে ব্যবসায়ীক কর্মকান্ডের যে বিস্তৃতি ঘটেছিল তার প্রভাব অন্যান্য ক্ষেত্রেও সঞ্চারিত হয়েছিল; যেমন ব্যবসায়িক চাহিদার কারণে হস্তশিল্পের প্রসার ঘটেছিল। জনবহুল বাগদাদ নগরীতে বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্পী যেমন ধাতুর কাজ, চামড়ার কাজ, বই বাঁধাই করা, কাগজ তৈরি করা, স্বর্ণকার, দর্জি, ঔষধ প্রস্তুত করা, বেকারীর কাজ এবং আরো অনেক ধরনের কাজের জন্য প্রচুর হস্তশিল্পীর উদ্ভব ঘটেছিল। যেহেতু এ সমস্ত হস্তশিল্পীর কাজ অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাই তারা নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে সামাজিকভাবে সংগঠিত হয়েছিল যা পরবর্তীতে পাশ্চাত্যে গিল্ডের (সংঘ) জন্ম দেয়।
কৃষিতে উন্নয়নের ফলে উদ্যানপালনবিদ্যায় ও ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়। ১০০ বছরের মধ্যে বাগদাদ এবং তার পার্শবর্তী অঞ্চলগুলো প্রকৃত বাগানের রূপধারণ করল; বাগদাদ এবং কুফার মধ্যবর্তী অঞ্চল, উন্নয়নশীল শহর, উন্নত গ্রাম এবং সুন্দর উপত্যকায় পরিণত হল। বার্লি, ধান, গম, খেজুর, তুলা, তিল এবং শন প্রভৃতি ছিল ইরাকের প্রধান শস্য। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ফলের চাষ হতো এবং ভিন্ন ভিন্ন আবহাওয়ায় বিভিন্ন ধরনের ফলের উৎপাদন হতো।
আব্বাসীয়দের সময়ে ভূমধ্যসাগরের ব্যবহার দেখে মনে হতো যেন এটি একটি ইসলামী হ্রদ। ভূমধ্যসাগর এবং এর গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপসমূহ যেমন সিসিলি, ক্রীট, সাইপ্রাস এবং ব্যালেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ যেগুলো ইসলামী ভূখন্ড দ্বারা তিনদিক থেকে পরিবেষ্টিত ছিল, সেগুলো মুসলিম ওয়ালীদের (খিলাফতের বিভিন্ন প্রদেশের শাসকবর্গ) দ্বারা শাসিত হতো। তিউনিস, আলেকজান্দ্রিয়া, কাদিস এবং বার্সিলোনা প্রভৃতি বন্দর পাশ্চাত্যের সাথে আব্বাসীয়দের সম্প্রসারণশীল ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল।
ইসলামের অবদান:
চারটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে মুসলিমদের অবদান কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লবের সুচনা করেছিল:
১) বিভিন্ন মেশিনে যেমন নোরিয়াস, পানির মিল, পানি উত্তোলনকারী যন্ত্র, বাঁধ এবং জলাধার প্রভৃতি ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নত জমিসেচ পদ্বতির সূচনা। এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মুসলিমরা একদিকে জমির উৎকর্ষ সাধন করেছিল এবং অন্যদিকে অনেক নতুন ভুমিকে কৃষিকার্যের আওতায় নিয়ে এসেছিল।
২) সমগ্র পৃথিবী থেকে কৃষি সম্পর্কিত জ্ঞান সংগ্রহ এবং তুলনামুলক যাচাইয়ের মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সূচনা করে মুসলিমরা, যার ফলে উন্নত কৃষিপ্রযুক্তির প্রয়োগ শুরু হয়। বিভিন্ন খাদ্যশস্য কোথায়, কখন এবং কিভাবে উৎপাদন বা রোপণ করতে হবে সে সম্পর্কিত বিস্তারিত কৃষি নির্দেশনার অনুসরণ মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র শুরু হয়। উন্নত কৃষি প্রযুক্তি দ্বারা বিভিন্ন মুসলিম বিজ্ঞানী যেমন ইবন আল বাইতারকে নতুন শস্য, বীজ এবং গৃহপালিত পশুর নতুন প্রজাতির উদ্ভাবনে সাহায্য করে, যেগুলো আগে অপরিচিত ছিল। উদ্ভিদবিদ্যার উপর প্রচুর এন্সাইক্লোপিডিয়া রচিত হয় যেগুলো অত্যন্ত উচ্চমানের এবং বিস্তারিত বর্ণনাসংবলিত। আরবীয় রন্ধনপ্রণালীর উপরেও প্রাথমিক বই রচিত হয়েছিল যেমন ইবন সাইয়ি আল-ওয়ারাক (১০ম শতাব্দি) রচিত কিতাব আল তারিখ (বিশেষ খাদ্যের বই) এবং মুহাম্মদ ইবন হাসান আল বাগদাদী (১২২৬ খ্রিঃ) রচিত কিতাব আল তারিখ।
৩) ব্যক্তিমালিকানার স্বীকৃতির পাশাপাশি জমির মালিকানার, শ্রমআইন এবং বর্গাচাষের সূচনা হয় যার ফলে কৃষিক্ষেত্রে নিয়োজিত হওয়ার মত অনেক বড় ক্ষেত্রের সুযোগ হয়। অথচ ইউরোপে তখন সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল যেখানে ক্ষুদ্র চাষীরা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সামান্য আশা নিয়ে দাসের মত কঠোর পরিশ্রম করত।
৪) খিলাফতের অধীনে প্রচুর নতুন শস্যের প্রচলন ঘটেছিল যেগুলো ব্যক্তিগত পর্যায়ের কৃষিকে একটি আন্তর্জাতিক শিল্পে পরিবর্তিত করে। কৃষিপণ্য তখন ইউরোপসহ অন্যান্য জায়গায় রপ্তানি হতো, ইউরোপের কৃষিকার্য তখন মধ্য এশিয়া হয়ে আসা গমের কিছু প্রজাতির মধ্যেই মূলত সীমাবদ্ধ ছিল। ইসলামী স্পেন তখন অনেক নতুন গাছ, ফল ও সবজির পাশাপাশি প্রচুর কৃষি ও ফল উৎপাদন পদ্ধতি ও ইউরোপে রপ্তানি করে। এসমস্ত নতুন শস্যের মধ্যে ছিল আখ, ধান, সাইট্রাস ফলসমূহ (কমলা, লেবু, লাইম, আংগুর প্রভৃতি ফলসমূহ) এপ্রিকট (কুলজাতীয় ফলবিশেষ যা সবজি হিসেবে খাওয়া যায়) এবং স্যাফ্রন। ইউরোপে বিভিন্ন দেশীয় লেবু, কমলা, তুলা, বাদাম, ডুমুর এবং সাব-ট্রপিক্যাল (প্রায় গ্রীষ্মপ্রধান) ফলসমূহ যেমন কলা ও আখ প্রভৃতি শস্যের পরিচিতি ঘটায় মুসলিমরা।
আজকের মুসলিম বিশ্ব:
দারিদ্র্যসীমার নিচে জনসংখ্যা, বিশ্বব্যাংক ২০০৬
বাংলাদেশ ৫০% ইরান ৪০% পাকিস্তান ৩৩% জর্দান ৩০% ইন্দোনেশিয়া ২৭% তুর্কী ২০% মিশর ২০% সিরিয়া ১২% প্রযুক্তিগত দিক থেকে এবং মুসলিম উম্মাহ্ চাহিদা পূরণের দিক থেকে যে মুসলিম বিশ্ব ছিল সর্বাগ্রে, দুর্ভাগ্যবশত সেই মুসলিম বিশ্ব হচ্ছে আজ কিছু দরিদ্রতম রাষ্ট্রের সমষ্টি। এমনকি জনগনের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করার মত প্রয়োজনীয় কাঠামোও আজ মুসলিমদের হাতে নেই। মুসলিম বিশ্বের সম্পদ চরম অব্যবস্থাপনা এবং প্রচন্ড অসম বন্টনের শিকার। মধ্যপ্রাচ্য পৃথিবীর সবচাইতে বড় তেল মজুদক্ষেত্র হওয়া সত্বেও এর বিপুল রাজস্ব আয়ের মাত্র সামান্য অংশই জনগন ভোগ করে থাকে। এখনো আরব বিশ্বের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনের দৈনিক মাথাপিছু আয় ২ ডলারের কম। এমনকি গত ২০ বছরে গড় মাথাপিছু বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ০.৫% যা আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চল ছাড়া পৃথিবীর অন্য যে কোন অংশের চাইতে কম। পাকিস্তানে মাত্র ২৩ টি পরিবারের হাতে দেশের ৪০% জমির মালিকানা। মুসলিম বিশ্বের বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় অবকাঠামোগত এবং জনসেবা খাতে সরকারী বিনিয়োগের পরিমান খুবই কম।
আজকের বিস্ময়কর বাস্তবতা হচ্ছে তুরস্ক পৃথিবীর দশম বৃহৎ কৃষি উৎপাদনকারী (৪০ বিলিয়ন ডলার), পাকিস্তান পঞ্চদশতম বৃহৎ (১৫ বিলিয়ন ডলার), ইরান একবিংশতম বৃহৎ (২১ বিলিয়ন ডলার) এবং বাংলাদেশ সপ্তবিংশতম বৃহৎ (১৩ বিলিয়ন ডলার) বার্ষিক কৃষি উৎপাদনকারী দেশ। যে সমস্ত কৃষিপন্য উৎপাদনে মুসলিম বিশ্ব শীর্ষস্থানে আছে সেগুলো হল:
আলজেরিয়া শিম/বরবটি বাংলাদেশ ছাগদুগ্ধ মিশর খেজুর ইন্দোনেশিয়া দারুচিনি, নারিকেল, লবঙ্গ, জায়ফল এবং এলাচি ইরান বেরীফল এবং পেস্তা মালয়েশিয়া হাঁসের গোশ্ত পাকিস্তান ঘি সৌদি আরব ঊটদুগ্ধ সুদান ঊটের গোশ্ত তুরস্ক হেজেল্বাদাম, দুমুরফল, এপ্রিকট, (কুলজাতীয় ফলবিশেষ), চেরিফল, কুইন্সফল এবং ডালিম এইসমস্ত দেশগুলি যদি তাদের অতীত ইতিহাস দেখে, তাহলে বুঝতে পারবে যে কিভাবে সম্পদ এবং পণ্যের সুষম বন্টনের মাধ্যমে ইসলাম অতীতে দারিদ্র্যকে ইতিহাসের জাদুঘরে নিক্ষেপ করেছিল।
ইসলাম কি বর্তমানে অঁচল?
গত দেড়শ বছরে মুসলিম বিশ্ব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে তেমন কোন অবদান রাখতে পারেনি। পাশ্চাত্যজগৎ একদিকে নিজেদেরকে শিল্পায়ীত করেছে এবং অন্যদিকে মুসলিম বিশ্ব ছিল অত্যন্ত পশ্চাদপদ এবং পাশ্চাত্যের সাথে তাল মিলিয়ে উন্নতি করতে পুরোপুরি ব্যর্থ। মুসলিম বিশ্বের এই ব্যর্থতার কারণ অনেক চিন্তাবিদের মতে ইসলামী শরীয়া তখনকার যুগেই সামঞ্জস্যপূর্ন ছিল যখন অর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর এবং আজকের শিল্পযুগে ইসলাম অকার্যকর। তাদের মতে আধুনিক বিশ্বে ইসলামের পক্ষে অবদান রাখার অসম্ভব এবং এর ফলে মুসলিমরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে।
এ ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই যে অতীতে ইসলাম প্রচন্ড অগ্রগতি লাভ করেছিল এবং প্রায় চার শতাব্দীজুড়ে পৃথিবিতে একক পরাশক্তিরূপে বিদ্যমান ছিল। খিলাফতের প্রসারের ফলে কৃষিক্ষেত্রে প্রচুর উন্নতি সাধিত হয়েছিল যা ছিল সেসময় অধিকাংশ অর্থনীতিরই প্রধান ক্ষেত্র। যে বিষয়টা লক্ষণীয় সেটা হচ্ছে ইসলামকে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের পথ ধরেই মুসলিমরা শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছিল পৃথিবীতে, কিন্তু উসমানীয় খিলাফতকালে ইসলামকে বোঝার ক্ষেত্রে মুসলিমদের অধোগতির ফলে মুসলিমরা প্রযুক্তির ব্যাপারে ভুল ধারণা পোষণ করেছিল।
এ থেকেই প্রমাণিত হয় যে, ইসলাম নয় বরং ইসলামের অনপস্থিতিই সমস্যার সূচনা করেছিল এর, যার ফলে মুসলিমরা পশ্চাৎপদ হতে শরু করল। ইসলাম আধুনিক উন্নয়নের ধ্যান-ধারণার বিরোধী নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকে ধারণ করতে অধিক সক্ষম।
সবধরনের পদার্থ যার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং শিল্প প্রভৃতির বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে এগুলো নিছকই বাস্তবতা এবং এবমস্ত বাস্তব বিষয়ের জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে কিভাবে মানুষের অবস্থা এবং জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো যায় সেটা নিশ্চিত করা। বিজ্ঞান এবং এর অন্যান্য শাখার ব্যাপারে এটাই ইসলামের মত।
ইসলামী শরীয়াহ বিষয়টিকে অনেকবার উপস্থাপন করেছে:
“তিনিই সেই সত্তা যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য যা কিছু যমীনে রয়েছে সে সমস্ত।” [সূরা বাকারাহ: ২৯]
“তোমরা কি দেখনা আল্লাহ নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে যা কিছু আছে, সবই তোমাদের কাজে নিয়োজিত করে দিয়েছেন এবং তোমাদের প্রতি তার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নেয়ামতসমূহ পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন।” [সূরা লোকমান: ২০]
“যে পবিত্রসত্তা তোমাদের জন্য ভূমিকে বিছানা এবং আকাশকে ছাদস্বরূপ করে দিয়েছেন, আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তোমাদের জন্য ফল-ফসল উৎপাদন করেছেন তোমাদের খাদ্য হিসেবে।” [সূরা বাক্কারাহ: ২২]
“আমি আকাশ থেকে কল্যাণময় বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং এর দ্বারা বাগান ও শস্য উদগত করি, যেগুলোর ফসল আহরণ করা হয় এবং লম্বমান খর্জুর বৃক্ষ যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ খর্জুর, বান্দাদের জীবিকাস্বরূপ এবং বৃষ্টি দ্বারা আমি মৃত জনপদকে সঞ্জীবিত করি……।” [সূরা ক্বাফ: ৯-১১]
এই দলীলগুলো পৃথিবীর উপরে এবং অভ্যন্তরে যে সমস্ত বস্তু আছে সেগুলো ব্যবহারের সাধারণ অনুমোদন দেয়। এখান থেকে যে ইসলামী নীতিটি গ্রহণ করা হয় সেটা হল: “সমস্ত বস্তুই (things) অনুমোদিত যতক্ষন না শরীয়াহ দ্বারা সেটা নিষিদ্ধ প্রমাণিত হচ্ছে।”
ইসলামের প্রথমিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে সমস্ত বস্তুই অনুমোদিত যদিও সেগুলোর ব্যবহার সীমাবদ্ধ কারণ প্রত্যেক কাজ (action) এর জন্যই শরীয়া প্রমাণ থাকা প্রয়োজন। উদাহরনস্বরুপ আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালাস্টিক মিসাইল (ICBM)। ইসলামে অনুমোদিত, কিন্তু এর ব্যবহারের জন্য শরীয়তের জ্ঞান থাকা আবশ্যক। ICBM এর ব্যবহার কেবল তখনই বৈধ বলে অনুমোদিত হবে যখন ইসলাম নিষেধ করেছে এমন নিরীহ লোকজনকে মিসাইল থেকে বাঁচানোর মতপ্রতিরোধক ব্যবস্থা থাকবে। চিকিৎসাশাস্ত্র, প্রকৌশল, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, কৃষি, শিল্প, যোগাযোগ ব্যবস্থা যেগুলোর অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে ইন্টারনেট, জলযানবিদ্যা ও ভূগোল প্রভৃতি বিষয়, পাশাপাশি এগুলো থেকে উদ্ভূত যন্ত্রপাতি, ফ্যাক্টরী ও শিল্প তা সামরিক হোক বা বেসামরিক, হাল্কা বা ভারী শিল্প যেমন ট্যাংক, এরোপ্লেন, রকেট, স্যাটেলাইট, পারমাণবিক প্রযুক্তি, হাইড্রোজেন, ইলেক্ট্রনিক বা কেমিক্যাল বোমা, ট্রাক্টর, ট্রেন এবং বাষ্পচালিত জাহাজ প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞানলাভ এবং এ জ্ঞানকে প্রয়োগ করার অধিকার দিয়েছে ইসলাম। এ সমস্ত জিনিসের মধ্যে সাধারণ ভোক্তাদের জন্য নির্মিত শিল্প কারখানা, হালকা অস্ত্র, ল্যাবরেটরীর যন্ত্রপাতির উপাদান, মেডিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টস, কৃষি যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, কার্পেট এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্য যেমন টিভি, ডিভিডি ইত্যাদিও অন্তর্ভুক্ত। এখানে যে বিষয়টা বর্ণিত হায়েছে সেটা হচ্ছে যতক্ষণনা শরীয়াহ প্রমাণাদি থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে অমুক বস্তুটা গ্রহণযোগ্য নয় (যদিও এ ধরনের বস্তু সংখ্যায় খুবই কম) ততক্ষণ পর্যন্ত অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যতের সমস্ত বস্তুই অনুমোদিত।
প্রকৃত সত্য হচ্ছে বর্তমান যুগে ইসলাম কোনভাবেই অচল নয় বরং যদি পরিপূর্ণ ভাবে ইসলাম বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে মুসলিম বিশ্বের অবস্থা প্রকৃত অর্থেই পরিবর্তিত হবে।
কৃষি সম্পর্কে ইসলামের বিধানসমূহ:
ইসলামের অর্থনৈতিক নীতি তথা ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সার্বিক লক্ষ্য হচ্ছে প্রত্যেক মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর পূরণ করা এবং যতটুকু সম্ভব তাদের আভিজাত্যপূর্ণ চাহিদাগুলো পূরণে সহায়তা করা। অর্থাৎ শুধুমাত্র বাজারের আন্তক্রিয়ার উপরে চাহিদা পূরণকে ছেড়ে না দিয়ে বরং সবার মৈলিক চাহিদা পূরণের চেষ্টা চালানো হবে ইসলামী অর্থনৈতিক নীতিমালার উদ্দেশ্য।
এজন্যই দেখা যায় খিলাফতের প্রত্যেক নাগরিকের সধরনের মৌলিক চাহিদা (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা) সার্বিকভাবে পূরণের বিষয়টিকে ইসলামী শরীয়াহ নিশ্চিত করেছে। এই বিষয়টি অর্জন করা হয় প্রত্যেক সক্ষম ব্যক্তিকে কাজে নিয়োগদানের মাধ্যমে যার ফলে সে তার নিজের ও তার উপর নির্ভরশীলদের মৌলিক চাহিদা পূরণে সমর্থ হয়; এ বিষয়টি সেসব প্রমাণাদির উপর ভিত্তি করে নেয়া হয়েছে যেখানে মুসলিমদেরকে কাজ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে, যেমন:
“যে ব্যক্তি হালাল এবং উপযুক্ত উপায়ে জীবিকা আহরণের চেষ্টা করল, সে আল্লাহর সাথে এমনভাবে দেখা করবে যেন তার মুখ পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় হবে; এবং যে ব্যক্তি ঔধ্যত্বের সাথে ও সীমালংঘনের মাধ্যমে তা চাইবে সে এমন অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে যেন তিনি (আল্লাহ) তার প্রতি রাগান্বিত।” (বুখারী)
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:
“হে আদম সন্তান, তোমাদের সম্পদের মধ্যে তোমরা যা কিছু খেয়েছ বা করেছ, যা কিছু পরিধান করেছ বা ব্যয় করেছ এবং যা কিছু দান করেছ বা নিজের জন্য রেখেছ সেগুলো বাদে তোমাদের আর কী আছে?” (বুখারী)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন:
“তোমরা ইসরাফ (অপব্যয় অর্থাৎ খরচের ক্ষেত্রে ইসলামের সীমা অতিক্রম করে ফেলা) করোনা। তিনি ইসরাফকারীদের পছন্দ করেন না।” [সুরা আরাফ: ৩১]
“আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন, তদ্বারা পরকালের গৃহ অনুসন্ধান কর এবং ইহকাল থেকে তোমার অংশ ভুলে যেওনা। তুমি অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হয়োনা।” [সুরা কাসাস:৭৭]
ইসলাম চায় প্রত্যেক মানুষ তার নিজের এবং তার উপর নির্ভরশীলদের মৌলিক চাহিদা তথা পর্যাপ্ত খাদ্য, পোশাক ও বাসস্থান নিশ্চিত করুক। এবপর যতটুকু সম্ভব অন্যান্য আভিজাত্যপূর্ণ চাহিদা পূরণ করার স্বাধীনতা ইসলাম দিয়েছে। যদি কেউ এরূপ সংস্থান করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ইসলামী রাষ্ট্র তাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ করতে বাধ্য। ইসলামের দৃষ্টিতে যে কোন মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা হল খাদ্যের চাহিদা এবং এজন্য লোকজনের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কৃষি উন্নয়ন একটি অপরিহার্য বিষয়। এই বিষয়টি নিশ্চিত করতেই ইসলাম শ্রম এবং জমির মালিকানা নিশ্চিত করেছে।
শ্রম এবং জমির মালিকানা:
জীবিকা অর্জন ও মৌলিক খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে শ্রম ও জমির মালিকানা সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় আইনকানুনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে ইসলাম। ইসলামের দৃষ্টিতে চাকুরি হচ্ছে কোন মানুষ থেকে সুবিধা নেওয়া অর্থাৎ কারো দক্ষতা এবং শ্রমের বিনিময়ে পারিশ্রমিক প্রদান। চাকুরির সংজ্ঞানুযায়ী কাজের ধরন, কর্মঘন্টা, বেতন ও শ্রমের ব্যাপারে চাকুরির শর্তসমূহে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা জরুরী। ইসলামে অন্যান্য চুক্তির মত চাকুরিক্ষেত্রেও দু’পক্ষের বয়স বয়ঃসন্ধিকালের চেয়ে বেশি থাকাটা জরুরী যার ফলে শিশুশ্রম কার্যকরভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।
ইসলাম বর্গাচাষকেও অনুমোদন দিয়েছে। এক্ষেত্রে কোন ব্যক্তি জমিসেচ করা, চারা রোপণ এবং ফসল ফলানোর জন্য নিজের জমি অন্যের কাছে হস্তান্তর করে এবং বিনিময় উৎপাদিত পণ্যের একটি নির্দিষ্ট অংশ গ্রহণ করে। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বলেন,
“রাসুল (সা) খাইবারের লোকজনের সাথে এই মর্মে চুক্তি করেছিলেন যে তারা উৎপাদিত গাছ বা ফল-ফসলের অর্ধেক দিয়ে দিবে” (মুসলিম)
জমিকে অলসভাবে ফেলে না রেখে বরং এর ব্যবহারকে নিশ্চিত করে ইসলাম। সমাজতন্ত্রীদের মত জমির মালিকানাকে ইসলাম সমস্যা হিসেবে দেখেনা বরং সামন্তবাদ যার ফলে কৃষিকার ব্যাহত হয় এবং জমির ব্যবহার হয়না বলে ইসলাম একে সমস্যা হিসেবে দেখে। কারণ এর ফলে বিপুল পরিমাণ জমি অলস পড়ে থাকে এবং অর্থনীতিতে কোন অবদান তা রাখতে পারেনা। জমি চাষ সংক্রান্ত অনেকগুলো নিয়ম ইসলাম নির্দেশ করে যার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে:
তিন বছর ধরে যদি কেউ জমিচাষ না করে তাহলে তাদের কাছ থেকে তা বাজেয়াপ্ত করা হবে। এর ভিত্তি হচ্ছে হাদীস বিশষজ্ঞগণ কর্তৃক সংগৃহীত অনেকগুলো বর্ণনা যা উমর (রা) থেকে বর্ণিত এবং যা ইজমা হিসেবে বিবেচিত:
“যদি কেউ তিনবছর জমি ফেলে রাখে এবং অন্য কেউ এসে তাতে চাষাবাদ করে তাহলে সে জমির মালিকানা তার”
“কেউ যদি তিনবছর ধরে কোন জমি ব্যবহার না করে ফেলে রাখে এবং অন্যকোন লোক এসে সেটা ব্যবহার করে তাহলে এটা তার”
উমর (রা) বর্ণনা করেন “তিন বছর পর বেড়া নির্মাণকারীর কোন অধিকার থাকেনা”
জমি ব্যবহার পদ্ধতির ব্যাপারে ইসলাম সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ স্পষ্টভাবে জমি ব্যবহারের পদ্ধতিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। জমির সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য ইসলাম বাধ্য করেছে যার ফলে জমির মালিকেরা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, বীজ, পশু এবং মজুরির বিনিময়ে শ্রমিক নিয়োগদানের মাধ্যমে নিজেদের জমিতে চাষাবাদ করতে বাধ্য। জমি লিজ দেয়াকে ইসলাম স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছে, যেখানে মালিকপক্ষ কোন ম্যানেজারের মাধ্যমে লোকজনের কাছে কাজ করার জন্য জমি দেয় এবং পরবর্তীতে লাভের একটি নির্দিষ্ট অংশ মালিককে দিতে হয়। এর ভিত্তি হচ্ছে রাসূল (সা) এর বাণী:
“যার জমি আছে সে যেন তাতে রোপণ করে অথবা তার ভাইকে দান করে দেয়। যদি সে তা না করে তাহলে তার হাত ধরে ফেল” (বুখারী)
রাসুল (সা) জমি ভাড়া দেওয়া বা জমির লভ্যাংশ নেওয়াকে নিষেধ করেছেন (মুসলিম)
“রাসুল (সা) জমি লিজ দেওয়াকে নিষেধ করেছেন। আমরা বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল, তাহলে কি আমরা কিছু শস্যের বিনিময়ে জমি লিজ দিতে পারি?” তিনি (সা) বললেন “না”। আমরা বললাম, “আমরা এটাকে খড়ের জন্য লিজ দিতাম”। তিনি (সা) বললেন, “না”। আমরা বললাম, “আমরা রাবিয়া (ছোট্ট নদী) থেকে জলসেচের বিনিময়ে লিজ দিতাম”। তিনি বললেন “না, হয় তোমরা চারা রোপণ করবে নয়তো তোমাদের ভাইকে দিয়ে দিবে” (সুনানে নাসাঈ)
খাদ্য সামগ্রী:
কোন ধরনের খাদ্যদ্রব্য ভোগ করা যাবে এবং কোনগুলো যাবেনা সে ব্যাপারে ইসলাম বিস্তারিত নিয়ম বর্ণনা করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে খাদ্য হচ্ছে উদ্ভিদ এবং প্রাণী। ইসলাম কিছ স্থলজ এবং কিছ জলজ প্রাণীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। নিষিদ্ধ ধরন সমূহের মধ্যে একটি হচ্ছে সেই ধরনের প্রাণী যেগুলো সবসময়ই হারাম এবং অন্যধরনের মধ্যে আছে সেগুলো, যেগুলো কিছু শর্তের উপস্থিতিতে হারাম হয়। এরকম দশ ধরনের হারামের ব্যাপারে কুরআনে বর্ণিত রয়েছে:
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জীব, রক্ত, শূকরের মাংস, যেসব জন্তু আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গকৃত হয়, যা কন্ঠরোধে মারা যায়, যা আঘাত লেগে মারা যায়, যা উচ্চস্থান থেকে পতনের ফলে মারা যায়, যা শিং এর আঘাতে মারা যায় এবং যাকে হিংস্র জন্তু ভক্ষণ করেছে সেগুলো ব্যতীত যেগুলোকে তোমরা যবেহ করেছ। যে জন্তু যজ্ঞবেদীতে যবেহ করা হয়…… [সুরা মায়িদাহ:৩]
এই আয়াত থেকে যে নিয়মটি বের হয়, সেটি হচ্ছে সবধরনের খাদ্যই জায়েয যতক্ষণনা নির্দিষ্ট দলীলের মাধ্যমে কোন কিছু হারাম সাব্যস্ত হবে। এই আয়াতের মাধ্যমে কোন ফল বা সবজিকে ষ্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি বলে সেসবই খাওয়া জায়েয।
ইসলাম পশুদের সাথে দয়ার্দ্র হতে এবং তাদেরকে অপব্যবহার করতে নিষেধ করে। অন্যসব সৃষ্ট জীবের মত প্রাণীরাও আল্লাহর প্রশংসা করে। কুরআনে প্রাণীদের সাথে সম্পর্কিত দু’শতাধিক আয়াত আছে এবং ছয়টি সুরার নামকরণ হয়েছে বিভিন্ন প্রাণীর নামে। কিছু ব্যতিক্রম যেমন শুকর ছাড়া অন্যান্য প্রাণীর গোস্ত খাওয়ার স্পষ্ট অনুমতি দিয়েছে কুরআন। যে সমস্ত প্রাণীর গোশ্ত হালাল সেগুলোকে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে যবেহ করতে হয়; প্রথমে অস্ত্রকে ধারালো করতে হবে এবং তারপর ধারালো ছুরি দিয়ে দ্রত গলা এমনভাবে কাটতে হবে যাতে জুগুলার শিরা এবং ক্যারোটিড ধমনী কেটে যায় কিন্তু স্পাইনাল কর্ড অক্ষত থাকে।
এর ফলে মৃত্যুযন্ত্রণা কম হয় এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে সঠিকভাবে রক্ত প্রবাহিত হয়ে যায়। এই পদ্ধতি অনুসরণের ফলে গোশ্তে রক্ত থাকার আশঙ্কা থাকেনা, যা ভোগ করা ইসলামে হারাম।
তিহাত্তর ফিরকা সংক্রান্ত হাদীসসমূহের অর্থ

রাসূল (সা) বলেছেন:
বনী ইসরাইল (আহলে কিতাবীরা/ইহুদী-খ্রীস্টানরা) বাহাত্তরটি ফিরকায় বিভক্ত হয়েছিল। আমার উম্মত তিহাত্তরটি ফিরকায় বিভক্ত হবে। তার মধ্যে এই জামা’আত ছাড়া বাকি সবাই জাহান্নামে যাবে। [আবু দাউদ, মুসনাদে আহমদ, হাকিম]
তিরমিযির অপর বর্ণনা হতে জানা যায়, এই জামা’আত হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর সাহাবীগণের পদ্ধতির উপর যারা রয়েছেন তারা।
এই সম্মানিত হাদীসে বর্ণিত ‘ফিরকা’ শব্দটি নিয়ে অনেকে বিভ্রান্ত হয় আছেন। ‘ফিরকা’-কে এরা মাযহাব, রাজনৈতিক দল ইত্যাদি নানা অর্থে বুঝে থাকেন। তাই ‘ফিরকা’ শব্দের প্রকৃত অর্থ বোঝা খুবই প্রয়োজন।
আরবি ভাষায় ‘ফিরকা’ শব্দটি ‘লাফ্জ মুশতারাক’ অর্থাৎ বহু ধরনের অর্থ প্রকাশকারী শব্দ। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ‘ফিরকা’ শব্দটি ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিতে ব্যবহার করেছেন। যেমন:وَمَا كَانَ ٱلْمُؤْمِنُونَ لِيَنفِرُواْ كَآفَّةً فَلَوْلاَ نَفَرَ مِن كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَآئِفَةٌ لِّيَتَفَقَّهُواْ فِى ٱلدِّينِ وَلِيُنذِرُواْ قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوۤاْ إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ
আর সমস্ত মুমিনের একত্রে অভিযানে বের হওয়া সঙ্গত নয়। তাই তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ (ফিরকা) কেন বের হলো না, যাতে তারা দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করে এবং সংবাদ দান করে স্বজাতিকে, যখন তারা তাদের কাছে প্রত্যাবর্তন করবে, যেন তারা বাঁচতে পারে? [সূরা তওবা: ১২২]
এই আয়াতে ‘ফিরকা’ অর্থ দলের অংশবিশেষ।
وَإِنَّ مِنْهُمْ لَفَرِيقاً يَلْوُونَ أَلْسِنَتَهُمْ بِٱلْكِتَابِ لِتَحْسَبُوهُ مِنَ ٱلْكِتَابِ وَمَا هُوَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَقُولُونَ هُوَ مِنْ عِنْدِ اللًّهِ وَمَا هُوَ مِنْ عِندِ ٱللَّهِ وَيَقُولُونَ عَلَى ٱللَّهِ ٱلْكَذِبَ وَهُمْ يَعْلَمُونَ
নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে এক দল (ফিরকা) রয়েছে, যারা বিকৃত উচ্চারণে মুখ বাঁকিয়ে কিতাব পাঠ করে, যাতে তোমরা মনে কর যে, তারা কিতাব থেকেই পাঠ করছে। অথচ তা আদৌ কিতাব হতে নয়। এবং তারা বলে যে, এসব কথা আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত। অথচ এসব আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত নয়। আর তারা জেনে শুনে আল্লাহরই প্রতি মিথ্যা আরোপ করে। [সূরা আলে-ইমরান: ৭৮]
এই আয়াতে ‘ফিরকা’ নিন্দাসূচক অর্থে দল-কে বুঝিয়েছে, কেননা ওই দলটি ওহীকে বিকৃত করতো।
সুতরাং ‘ফিরকা’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ বোঝার জন্য শব্দটি কোন প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়েছে, সেটির দিকে লক্ষ রাখা জরুরি। উপরে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) ব্যাখ্যা করেছেন যে, ইহুদীরা একাত্তরটি ও খ্রীস্টানরা বাহাত্তরটি ফিরকায় বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। তারপর তিনি জানান, এই উম্মতও তিয়াত্তরটি ফিরকায় বিভক্ত হবে। রাসূল (সা) ও তার সাহাবাদের অনুসারী দলটি ছাড়া বাকি সবাই জাহান্নামে যাবে। এভাবে এই হাদীসে ইহুদী-খ্রীস্টানদের মতো করে মুসলিমদের বিভক্ত হওয়াকে নিন্দা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে ইহুদী-খ্রীস্টানদের এই ধরনের ফিরকার অনুসরণ করতে মুসলিমদেরকে নিষেধ করা হয়েছে:يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تُطِيعُوا فَرِيقًا مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ يَرُدُّوكُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ كَافِرِينَ
হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আহলে কিতাবদের কোনো ফিরকাকে অনুসরণ কর, তাহলে ঈমান আনার পর তারা তোমাদেরকে কাফেরে পরিণত করে দেবে। [সূরা আলে ইমরান: ১০০]
তাই হাদীসে বর্ণিত ‘ফিরকা’ শব্দের প্রকৃত অর্থ বুঝতে হলে ইহুদী-খ্রীস্টানরা কোন ধরনের ইস্যুতে মতভেদ করে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল, সেটি বিবেচনায় রাখতে হবে।
পবিত্র কুরআন বারবার আমাদেরকে ইহুদী-খ্রীস্টানদের মতো মতভেদ করেতে নিষেধ করেছে। কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, যেসব ইস্যুতে তারা বিভক্ত হয়েছিল, সেগুলো হলো:
১. তারা নবী-রাসূলদের ব্যাপারে মতভেদ করেছিল। আল্লাহ বলেন:وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَقَفَّيْنَا مِنْ بَعْدِهِ بِالرُّسُلِ وَآتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ وَأَيَّدْنَاهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ أَفَكُلَّمَا جَاءَكُمْ رَسُولٌ بِمَا لا تَهْوَى أَنْفُسُكُمُ اسْتَكْبَرْتُمْ فَفَرِيقًا كَذَّبْتُمْ وَفَرِيقًا تَقْتُلُونَ
আমি মুসাকে কিতাব প্রদান করলাম, তারপর পর্যায়ক্রমে অনেক রাসূল পাঠালাম। আর মরিয়মের পুত্র ঈসাকে প্রকাশ্য প্রমাণাদি দিলাম এবং ‘রুহুল কুদুস’ (জিবারইল) দিয়ে তাঁকে সাহায্য করলাম, তবে কি যখনই কোনো রাসূল তোমাদের মনঃপুত নয় এমন বিধান নিয়ে আগমন করেছেন তখন তোমরা অহংকার করেছ, কতককে মিথ্যাবাদী বলেছ, আর কতককে হত্যা করেছ। [সূরা বাকারা: ৮৭]
وَآتَيْنَا عِيسَى ٱبْنَ مَرْيَمَ ٱلْبَيِّنَاتِ … وَلَـٰكِنِ ٱخْتَلَفُواْ فَمِنْهُمْ مَّنْ آمَنَ وَمِنْهُمْ مَّن كَفَرَ ..
আর মরিয়মের পুত্র ঈসাকে প্রকাশ্য প্রমাণ দান করেছি… … … কিন্তু তারা মতভেদ করলো, ফলে কেউ ঈমান আনলো, কেউ কুফরী করলো.. .. [সূরা বাকারা: ২৫৩]
২. তারা আল্লাহর কিতাবের ব্যাপারে মতভেদ করেছে:
وَمَا اخْتَلَفَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ إِلا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْعِلْمُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ وَمَنْ يَكْفُرْ بِآيَاتِ اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ
… এবং যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের নিকট প্রকৃত জ্ঞান আসার পরও তারা মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে, শুধুমাত্র পরস্পর বিদ্বেষবশত। কেউ আল্লাহর আয়াতকে প্রত্যাখ্যান করলে নিশ্চয়ই আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণে তৎপর। [সূরা আলে ইমরান: ১৯]
৩. তারা নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে একে অপরকে ‘কাফির’ ডাকতো:
وَقَالَتِ ٱلْيَهُودُ لَيْسَتِ ٱلنَّصَارَىٰ عَلَىٰ شَيْءٍ وَقَالَتِ ٱلنَّصَارَىٰ لَيْسَتِ ٱلْيَهُودُ عَلَىٰ شَيْءٍ وَهُمْ يَتْلُونَ ٱلْكِتَابَ كَذٰلِكَ قَالَ ٱلَّذِينَ لاَ يَعْلَمُونَ مِثْلَ قَوْلِهِمْ فَٱللَّهُ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ يَوْمَ ٱلْقِيَامَةِ فِيمَا كَانُواْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ
ইহুদীরা বলে, খ্রীস্টানরা কোনো ভিত্তির উপরেই নয় এবং খ্রীস্টানরা বলে, ইহুদীরা কোনো ভিত্তির নয়। অথচ ওরা সবাই কিতাব পাঠ করে। এমনিভাবে যারা মূর্খ, তারাও ওদের মতো উক্তি করে। অতএব, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাদের মধ্যে ফয়সালা দেবেন, যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছিল। [সূরা বাকারা: ১১৩]
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ইহুদী-খ্রীস্টানরা দ্বীনের বুনিয়াদী বিষয়গুলো নিয়ে মতভেদ করেছিল। নবী-রাসূল, কিয়ামত দিবস, আল্লাহর একত্ব, পুনরুত্থান, জান্নাত-জাহান্নামের মতো ঈমানের ভিত্তিসমূহ নিয়ে তারা মতভেদে জড়িয়ে পড়েছিল। রাসূল (সা) আলোচ্য ‘ফিরকা’ বিষয়ক হাদীসে আমাদেরকে ইহুদী-খ্রীস্টানদের মতো মতভেদ করতে নিষেধ করেছেন। এর মানে হলো, দ্বীনের ভিত্তিসমূহ নিয়ে মতভেদ করা এই হাদীস মোতাবেক নিষিদ্ধ। যেমন, পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:
وَٱعْتَصِمُواْ بِحَبْلِ ٱللَّهِ جَمِيعاً وَلاَ تَفَرَّقُواْ
তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। [সূরা আলে ইমরান: ১০৩]
এই আয়াতের প্রসঙ্গে ইমাম কুরতুবী (রহ) বলেন, ইহুদী-খ্রীস্টানদের মতো দ্বীনের ব্যাপারে বিভক্ত হয়ো না … … … এবং এর অর্থ এটাও হতে পারে যে, নিজের বাসনা ও স্বার্থের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ো না। [তাফসীরে কুরতুবী]
অতএব দ্বীনের মৌলিক বিষয়াদি নিয়ে যারা মতভেদ করবে, তারাই ‘ফিরকা’। এধরনের বিষয় নিয়ে মতভেদ ইসলামে বৈধ নয়। কিন্তু দ্বীনের মৌলিক বিষয়ের বাইরের শাখা-প্রশাখায় মতভেদ করলে সেটা জাহান্নামী ফিরকা বলে গণ্য হবে না, কেননা দ্বীনের শাখা-প্রশাখামূলক বিষয়গুলোতে মতভেদ বৈধ।
ইমাম শাফী (রহ) বলেন, মতভেদ দুই ধরনের: এক ধরনের মতভেদ হারাম এবং অন্যটি হারাম নয়। যেসব বিষয়ে আল্লাহ তাঁর কিতাবে নিশ্চিত প্রমাণ (হুজ্জত) দিয়েছেন বা যেসব বিষয়ে রাসূল (সা) সুস্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন, সেসব বিষয়ে জেনেশুনে মতভেদ করা হারাম। ওইসব সুস্পষ্ট বক্তব্যের বাইরের বিষয়গুলোতে যেখানে ভিন্নার্থ প্রকাশ হয় বা কিয়াস করা যায়, সেক্ষেত্রে মতভেদের সুযোগ আছে। [আর রিসালাহ]
শায়খ তাকিউদ্দিন আন-নাবাহানী (রহ) বলেন,
“[আইনপ্রণেতার] বক্তব্যটি হতে পারে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত (ক্বাতঈ উসুবুত) অর্থাৎ কোনো মতভেদের অবকাশ নেই, যথা কুরআন ও মুতাওয়াতির হাদীস। অথবা বক্তব্যটি হতে পারে অমীমাংসিতভাবে প্রমাণিত (জন্নিঈ উসুবুত) অর্থাৎ মতভেদের অবকাশ রয়েছে, যথা অ-মুতাওয়াতির হাদীসসমূহ। যদি বক্তব্যটি ক্বাতঈ উসুবুত হয় তবে এর অর্থ নির্দিষ্ট (ক্বাতঈ উদালালাহ) ও হুকুমটি চূড়ান্ত অর্থাৎ এ নিয়ে কোনো মতভেদ নেই। এরূপ উদাহরণ হচ্ছে, ফরয সালাতের রাকাতের সংখ্যা – কারণ তা মুতাওয়াতির হাদীসে উল্লেখ রয়েছে… …।
যদি আইনপ্রণেতার বক্তব্য ক্বাতঈ উসুবুত অথচ একটিমাত্র নির্দিষ্ট অর্থ প্রকাশক না হয় (জন্নিই উদালালাহ), তবে হুকুমটি অমীমাংসীত (অর্থাৎ এ নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে)। উদাহরণস্বরূপ, কুরআনে উল্লেখিত জিযিয়াসংক্রান্ত আয়াতটি উল্লেখ্য। আয়াতটি ক্বাতঈ উসুবুত কিন্তু তার অর্থ নির্দিষ্ট নয়। হানাফী মাযহাবের শর্তানুসারে, একে জিযিয়া বলা বাধ্যতামূলক… …। শাফঈ মাযহাবের শর্তানুযায়ী এটিকে জিযিয়া বলা বাধ্যতামূলক নয় এবং একে দ্বৈত যাকাত বলা যায়… …।
যদি আইনপ্রণেতার বক্তব্য জন্নিই উসুবুত হয়, যেমন অ-মুতাওয়াতির হাদীস, তখন অর্থ ক্বাতঈ উদালালাহ হোক বা না হোক, এ-সংক্রান্ত হুকুম চূড়ান্তভাবে মীমাংসিত হবে না, অর্থাৎ এ বিষয়ে মতভেদ থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা কিংবা কৃষিভূমি ইজারা (লীজ) দেয়ার নিষিদ্ধতার বিষয়টি।” [নিযামুল ইসলাম]
সুতরাং হানাফী, মালিকী, শাফেঈ, হাম্বলী ইত্যাদি মাযহাবগুলোকে ‘ফিরকা’ ভাবার কোনো সুযোগ নেই। মাযহাবগুলোর মতভেদ কেবল শাখা-প্রশাখায়। একইভাবে রাসূল (সা) ও সাহাবাগণের পথ অনুসরণকারী কোনো রাজনৈতিক দলকেও ‘ফিরকা’ ভাবার ন্যূনতম কোনো কারণ নেই।
তবে যারা মুহাম্মদ (সা)-কে শেষ নবী হিসেবে অস্বীকার করেছে [কাদিয়ানী], যারা হযরত আলী (রা)-কে আল্লাহর অংশ মনে করে [আলাওয়ি শিয়া], যারা আখিরাতের শাস্তিকে অস্বীকার করে, তারা অবশ্যই জাহান্নামী ‘ফিরকা’। কেননা তারা দ্বীনের সুনিশ্চিত (ক্বাতঈ) বিষয়ে মতভেদ করেছে। কোনো দল যদি কুরআনের যে কোনো আয়াতের সুনিশ্চিত অর্থকে অস্বীকার করে, তবে তারা জাহান্নামী ফিরকায় পরিণত হবে। একইভাবে কোনো দল যদি কোনো সুস্পষ্ট হারামকে হালাল মনে করে তারা অবশ্যই জাহান্নামী ফিরকা – তাদের আকৃতি যত বড়ই হোক না কেন। কেননা রাসূল (সা) বলেন,سَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى بِضْعٍ وَسَبْعِيْنَ فِرْقَةً أَعْظَمُهَا فِرْقَة قَوْمٌ يَقِيْسُوْنَ الأُمُوْرَ بِرَأْيِهِمْ فَيُحَرِّمُوْنَ الْحَلالَ وَيحللون الْحَرَامَ
সত্ত্বরই আমার উম্মত ৭০-এরও কিছু বেশি ফিরকায় বিভক্ত হবে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফিরকা হবে একদল যারা বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মনগড়া সিদ্ধান্ত দেবে এবং তারা হালালকে হারাম করবে ও হারামকে হালাল করবে। [হাকিম]
তরীকাহ (পদ্ধতি), উসলূব (ধরন) ও ওয়াসীলা (উপকরণ)
(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত আলেম শাইখ আহমাদ মাহমুদ কর্তৃক লিখিত ‘Dawah to Islam’ বইটির বাংলা অনুবাদের একটি অংশ হতে গৃহীত)
আলজেরিয়া রাসূল (সা) তাঁর দাওয়াতী কাজ পরিচালনার জন্য মক্কায় যেসব কথা বলেছিলেন এবং যেসব কাজ করেছিলেন তার সবই কি ছিল আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তরফ থেকে ওহী – যেগুলোর আনুগত্য করা আমাদের জন্য ফরয? নাকি এখানে এমন কিছু কথা এবং কাজও রয়েছে যেগুলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার তরফ থেকে ওহী হিসেবে আসেনি বলে সেগুলোর আনুগত্য করা আমাদের জন্য ফরয নয়?
এই প্রেক্ষাপট থেকেই এখন আমরা তরীকাহ (পদ্ধতি), উসলূব (ধরন) এবং ওয়াসিলা (উপকরণ) নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করতে যাচ্ছি।
এখানে অন্য একটি প্রশ্নও সামনে চলে আসে: কোনো শরঈ তরীকাহ নিয়ে পরীক্ষা (experiment) করার পরে এর যথার্থতার ব্যাপারে মতামত দেওয়া কি যুক্তিসঙ্গত? বিষয়টি কি এমন যে পরীক্ষার পরে যদি দেখা যায় যে এর মাধ্যমে কাক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে তাহলে তা সঠিক, অন্যথায় ভুল।
এবার প্রথম বিষয়ের আলোচনায় আসি:
প্রথম প্রশ্নের জবাব হচ্ছে: রাসূল (সা) যা কিছু বলেছেন বা করেছেন তার সব কিছুকেই অনুসরণ করতে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) মুসলিমদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى ~ إِنْ هُوَ إِلا وَحْيٌ يُوحَى
“তিনি প্রবৃত্তির তাড়নায় কিছু বলেননা। এটি ওহী যা প্রত্যাদেশ হয়।” [৫৩:৩-৪]وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
“রাসূল তোমাদেরকে যা কিছু (মা) দেন তা গ্রহণ কর এবং যা কিছু (মা) নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক” [৫৯:৭]এখানে ‘মা’ শব্দটি সাধারণ অর্থে (সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ রাসূল (সা) আমাদের জন্য কোন কিছু নিয়ে এসেছেন কিন্তু তা আমাদের পালন করা লাগবে না এমন কিছুই নেই; যতক্ষণ না শরী’য়াহ কোন ব্যতিক্রম নির্দেশ করে।
নির্দিষ্ট রকমের কিছু কথা এবং কাজের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে যেসব ক্ষেত্রে রাসূল (সা) কে অনুসরণ না করলেও চলে বলে প্রমাণ রয়েছে। যেমন:
রাসূল (সা) এর একটি হাদীস:
أَنْتُمْ أَعْلَمُ بِأُمُورِ دُنْياكُمْ
“দুনিয়ার ব্যাপারে তোমরা আমার চাইতে অধিক জ্ঞানী”
বিভিন্ন পার্থিব বিষয় যেমন কৃষি, শিল্প, উদ্ভাবন, চিকিৎসা বা প্রকৌশলবিদ্যা প্রভৃতি বিষয়ে ওহী আসেনি। অতএব এ সমস্ত বিষয়ে তিনি আমাদের মতই একজন মানুষ এবং এক্ষেত্রে তাঁকে ভিন্ন চোখে দেখার কোন অবকাশ নেই। খেজুর গাছের পরাগায়ন সম্পর্কিত তাঁর ঘটনাটির মধ্য দিয়েই বিষয়টি আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়।
কিছু কাজ কেবলমাত্র তাঁর জন্যই নির্দিষ্ট বলে প্রমাণিত যেগুলো অন্য কেউ পালন করতে পারবে না। যেমন তাহাজ্জুদের সালাত আদায় রাসূল (সা) এর উপর ফরয হওয়া, রাতের বেলায়ও তাঁর জন্য সিয়াম (রোজা – সাওমে উইসাল) চালিয়ে যাবার অনুমতি থাকা অথবা একসাথে চারের অধিক স্ত্রী রাখার অনুমতি থাকা। এ বিষয়গুলো অন্যান্য বিষয় থেকে আলাদা যেগুলো কেবলমাত্র তাঁর জন্যই নির্দিষ্ট। অতএব এ সমস্ত বিষয়ে তাঁর অনুসরণ করা জায়েয না।
যেসব কাজ রাসূল (সা) স্বাভাবিক মানবীয় আচরণ হিসেবে সম্পাদন করতেন যেমন: উঠা-বসা, হাঁটা-চলা, পানাহার করা প্রভৃতি বিষয় তাঁর এবং উম্মাহর জন্য মুবাহ (অনুমোদিত)-এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই।
বিভিন্ন শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের জন্য রাসূল (সা) উপযুক্ত ধরন (উসলূব) এবং উপকরণ (ওয়াসীলা) ব্যবহার করতেন। শরঈ হুকুম হচ্ছে আল্লাহর হুকুম যা অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু এই শরঈ হুকুম কিভাবে অর্থাৎ কোন ধরন এবং উপকরণের সাহায্যে বাস্তবায়ন করতে হবে তা একজন মানুষ হিসেবে রাসূল (সা) এর ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়; যাতে সে ধরন (style) এবং উপকরণ (means) বাস্তবসম্মত হয় এবং কোন হারামের দিকে পরিচালিত না করে।
উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যখন বলেন:
فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ
“অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয় এবং মুশরিকদের পরোয়া করবেন না।” [১৫:৯৪] তখন তা একটি শরঈ হুকুম যা অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু কিভাবে তা বাস্তবায়ন করতে হবে সে বিষয়টিকে শরী’য়াহ স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করেনি। আল্লাহর সুবহানাহু ওয়া তা’আলার হুকুমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাসূল (সা) প্রকাশ্যে ঘোষণার কাজটি সম্পাদন করেছিলেন, কারণ এই হুকুমের বিরুদ্ধে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু যে উপায়ে তিনি (সা) প্রকাশ্যে ঘোষণার কাজটি সম্পাদন করেছিলেন সেটা তাঁর জন্য বাধ্যতামূলক ছিলনা। অতএব ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাসূল (সা) কে অনুসরণকারী দলের জন্যও এই কাজটি বাধ্যতামূলক নয়। রাসূল (সা) সাফা পাহাড়ের উপরে উঠেছিলেন, লোকজনকে খাবারের দাওয়াত দিয়েছিলেন, মুসলিমদেরকে সাথে নিয়ে দুটো সারিতে করে কাবা প্রদক্ষিণ করেছিলেন-এগুলো ছিল মূলত শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের সাথে সম্পর্কিত কিছু ধরন অর্থাৎ এগুলো ছিল প্রকৃত (আসল) হুকুম ‘প্রকাশ্যে ঘোষণা দানের’র সাথে সম্পর্কিত কিছু সহায়ক কাজ। নীতিগতভাবে এ জাতীয় ধরনসমূহ অনুমোদিত। বিষয়টিকে শরী’য়াহ স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত না করে দলের হাতে ছেড়ে দিয়েছে যাতে তারা সবচেয়ে উপযুক্ত ধরনসমূহকে বেছে নিতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যখন বলেন:
وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ
“আর প্রস্তুত করো তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যা কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজেদের শক্তি-সামর্থ্যের মধ্য থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে যাতে আল্লাহ এবং তোমাদের শত্রুদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করতে পার…।” [৮:৬০]
তখন প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য তাঁর এই নির্দেশ হচ্ছে একটি শরঈ হুকুম যার আনুগত্য করতে হবে অর্থাৎ বিষয়টি হচ্ছে ফরয এবং এর বিরুদ্ধে যাওয়া হারাম। এই আয়াতে প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তার ইল্লাহ (শরঈ কারণ) হচ্ছে শত্রুদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলা। কিন্তু উপকরণের (ঘোড়া) বিষয়টি এখানে বাধ্যতামূলক নয়। যেকোনো উপকরণ যা এই উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারবে সেটাই এক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হবে। জিহাদের জন্য উপযুক্ত উপকরণ যুগের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়ে এসেছে। এজন্য শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপকরণ বেছে নিতে হবে। জিহাদের জন্য বা আল্লাহর শত্রু এবং মুনাফিকদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলার জন্য বর্তমান সময়ে প্রয়োজন হচ্ছে আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের (শরীয়ার নির্ধারিত সীমার মধ্যে)। অতএব শরঈ হুকুম হচ্ছে আল্লাহর হুকুম অর্থাৎ নির্দিষ্ট বিষয়টিতে আল্লাহর সরাসরি মন্তব্য রয়েছে বলে এটিই হচেছ প্রকৃত (আসল) হুকুম। আর ধরন (উসলূব) হচ্ছে প্রকৃত (আসল) হুকুমকে বাস্তবায়নের সাথে সম্পর্কিত আংশিক (partial) হুকুম। এ বিষয়টি হচ্ছে মুবাহ এবং উপযুক্ত ধরনকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
উপকরণ (ওয়াসিলা) হচ্ছে সেই বস্তু যার সাহায্যে শরঈ হুকুম বাস্তবায়ন করা হয়। নীতিগতভাবে বিষয়টি মুবাহ (অনুমোদিত) এবং উপযুক্ত উপকরণ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
অতএব উপরোক্ত ব্যতিক্রমসমূহ এবং এ জাতীয় অন্যান্য বিষয় ছাড়া মতাদর্শ বা শরঈ হুকুম বাস্তবায়ন সংক্রান্ত অন্য যেকোনো বিষয় যা রাসূল (সা) এর সাথে সম্পর্কিত সেটা মক্কায় নাযিল হোক অথবা মদীনায়, সেটা আক্বীদার সাথে সম্পর্কিত হোক অথবা ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত সবকিছুকেই ওহী হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং এগুলোকে তা’আসসী (অনুসরণীয়) বিষয় হিসেবে মেনে নিতে হবে।
যদি কেউ রাসূল (সা) এর মক্কী জীবনের দাওয়াতকে ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করে তাহলে দেখতে পাবে তিনি শরঈ হুকুম হিসেবে বিভিন্ন কাজ সম্পাদন করেছিলেন যেগুলোকে বর্তমানে বাদ দেওয়ার কোন সুযোগ নেই বরং এগুলোকে অবশ্যই আদায় করতে হবে। অনুরুপভাবে তিনি (সা) এমন অনেক কাজ করেছেন যেগুলোকে ধরনের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে গণ্য করা যায়। পাশাপাশি তিনি (সা) শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন উপযুক্ত উপকরণও ব্যবহার করেছেন। অতএব কোন বিষয়গুলো পদ্ধতি (তরীকাহ) এবং কোন বিষয়গুলো ধরন (উসলূব) বা উপকরণ (ওয়াসিলা)- এ দু’ধরণের বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য বোঝা প্রয়োজন, যাতে দল বুঝতে পারে কোন বিষয়টি তাকে আবশ্যই পালন করতে হবে এবং কোন বিষয়টি তার সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পুরো পদ্ধতিকে (তরীকাহ) ধরন হিসেবে গণ্য করার কোন সুযোগ নেই যার ফলে মনে হবে পরিস্থিতির আলোকে দল যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কারণ এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির ফলে পদ্ধতির সাথে সম্পর্কিত শরঈ হুকুমকে তাচ্ছিল্য করা হবে এবং শরঈ হুকুমকে মনগড়া কার্যক্রম দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা হবে। বিষয়টিকে আরো ভালভাবে পরিষ্কার করার জন্য নিচে কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয়” [১৫:৯৪] প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়ার জন্য এটি আল্লাহর তরফ থেকে রাসূল (সা) এর প্রতি একটি নির্দেশ। এই নির্দেশটি দুটো শরঈ হুকুমকে উপস্থাপন করছে। প্রথমটি হচ্ছে এই আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত প্রকাশ্য দাওয়াতের অনুপস্থিতি এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে এই আয়াত নাযিল হওয়ার সাথে সাথে প্রকাশ্য দাওয়াতের সূচনা। প্রকাশ্যে দাওয়াতের ঘোষণা দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়টিকে রাসূল (সা) এর ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি। বরং প্রকাশ্যে দাওয়াতের ঘোষণা দেওয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম মান্য করা ছিল রাসূল (সা) এর জন্য বাধ্যতামূলক। এটিই হচ্ছে শরঈ হুকুম, যাকে শরীয়াহ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে। এই কাজটি করার সিদ্ধান্ত রাসূল (সা) তাঁর নিজস্ব ইচ্ছার কারণে গ্রহণ করেননি, অতএব এই কাজের অনুসরণ করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার এই কথা “যা আপনাকে আদেশ করা হয়” এর মাধ্যমে বুঝা যাচ্ছে বিষয়টি আল্লাহর তরফ থেকে এসেছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ قِيلَ لَهُمْ كُفُّوا أَيْدِيَكُمْ وَأَقِيمُوا الصَّلاةَ
“তুমি কি সেসব লোককে দেখনি, যাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, তোমরা নিজেদের হাতকে সংযত রাখ (যুদ্ধ করা থেকে) এবং সালাত কায়েম কর…” [৪:৭৭]
আবার কাফিরদের দুর্ব্যবহারের জবাবে অস্ত্রের মাধ্যমে তাদের মোকাবেলা করার অনুমতি প্রার্থনা করলে আবদুর রহমান বিন আল-আওফ (রা) কে রাসূল (সা) বলেন:
أِنِّي أُمِرْتُ بِالْعَفْو، فَلا تُقَاتِلُوا الْقَوْم
“প্রকৃতপক্ষে আমি ক্ষমার জন্য আদিষ্ট অতএব তোমরা লোকজনের সাথে যুদ্ধ করোনা।” [ইবনে আবি হাতিম, আন-নাসাঈ এবং আল-হাকিম থেকে বর্ণিত] পরবর্তীতে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের সময় আল্লাহর তরফ থেকে ওহী হয়;
أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا وَإِنَّ اللَّهَ عَلَى نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ
“যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হল তাদেরকে যাদের সাথে কাফিররা যুদ্ধ করে; কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে (মুমিনদেরকে) সাহায্য করতে অবশ্যই সক্ষম।” [২২:৩৯]
উপরোক্ত দলীলগুলো থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে প্রথমে যুদ্ধের অনুমতি ছিলনা, কিন্তু পরবর্তীতে তা দেওয়া হয়; যেহেতু এই অনুমতি আল্লাহর তরফ থেকে দেওয়া হয়েছে, সেহেতু এটি একটি শরঈ হুকুম যার আনুগত্য করা আবশ্যক। স্বেচ্ছায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে রাসূল (সা) সশস্ত্র পন্থা অবলম্বন করা থেকে বিরত ছিলেন-বিষয়টি এরকম কিছু ছিলনা বরং বিষয়টি ছিল ওহীর মাধ্যমে নির্ধারিত যার আনুগত্য করা ছিল অবশ্য কর্তব্য। রাসূল (সা) যেভাবে একাজ করা থেকে বিরত ছিলেন ঠিক তেমনিভাবে তাঁর অনুসরণে নিজেদেরকে বিরত রাখাটা আমাদের জন্যও বাধ্যতামূলক।
অনুরূপভাবে রাসূল (সা) যখন বিভিন্ন গোত্রের নিকট নুসরাহ (খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় পার্থিব সাহায্য) খুঁজতে যেতেন তখন তিনি (সা) বলতেন: “হে অমুক এবং অমুক গোত্র, প্রকৃতপক্ষে আমি আল্লাহর তরফ থেকে প্রেরিত একজন রাসূল। তিনি তোমাদেরকে আদেশ করছেন যাতে তোমরা তাঁর ইবাদত কর এবং এ ব্যাপারে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না কর, তোমরা তাঁকে ব্যতীত অন্য যেসব মূর্তির পূজা কর সেগুলোকে পরিত্যাগ কর, আমার উপর তোমরা ঈমান আন এবং আমাকে তোমরা রক্ষা কর (অন্য এক বর্ণনায় ‘সমর্থন কর’) যাতে আল্লাহ আমাকে যা দিয়ে প্রেরণ করেছেন তা আমি তোমাদের নিকট পৌঁছে দিতে পারি।” [সীরাতে ইবনে হিশাম]
এই হাদীসের মাধ্যমে রাসূল (সা) পরিষ্কার করে দিচেছন যে বিষয়টি ছিল আল্লাহর তরফ থেকে একটি হুকুম; অর্থাৎ এক্ষেত্রে রাসূল (সা) ওহীর অনুসরণ করছিলেন মাত্র। গোত্রগুলোর কাছ থেকে অসংখ্যবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরও এবং অত্যন্ত রূঢ় ও কর্কশ ব্যবহার পাওয়া সত্ত্বেও নুসরাহ খোঁজার ক্ষেত্রে রাসূল (সা) এর অটল থাকাটাই প্রমাণ করে যে এ বিষয়টি ছিল আল্লাহর তরফ থেকে একটি হুকুম।
এগুলো হচ্ছে পদ্ধতির সাথে সম্পৃক্ত শরঈ হুকুমের কিছু উদাহরণ। যেসব উপকরণ এবং ধরনের সাহায্যে শরঈ হুকুম বাস্তবায়ন করা হয় সেগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে অনুসরণ করার ব্যাপারে নীতিগতভাবে কোন বাধ্যবাধকতা নেই। বরং এক্ষেত্রে শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত ধরন এবং উপকরণ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আমরা স্বাধীন।
অনুরূপভাবে দাওয়াতী কাজের উপযুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য রাসূল (সা) মুমিনদেরকে নিয়ে দারুল আরকামে অথবা তাঁদের কারো বাসায় অথবা উপত্যকায় গিয়ে বসতেন এবং তাঁদেরকে ইসলামের শিক্ষা খুব ভালভাবে বুঝাতেন। একটি শরঈ হুকুম হিসেবে আমাদেরকেও অবশ্যই এই দায়িত্বটি পালন করতে হবে এবং এজন্য উপযুক্ত ধরন প্রয়োগ করতে হবে। এ কাজের জন্য উপযুক্ত ধরন হিসেবে একদল লোক অথবা কোন পরিবারকে বেছে নিতে হবে যাতে তাদেরকে ইসলামের সুষ্ঠু শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা যায়। তাদের জন্য সাপ্তাহিক একটি সময় নির্ধারিত করতে হবে এবং সেই নির্দিষ্ট সময়ে পরিবার অথবা দলটির নির্দিষ্ট লোকজনকে একত্রে জড়ো হতে হবে। দাওয়াতী কাজে নিযুক্ত তরুণদের মনে যাতে ইসলামের শিক্ষা সুষ্ঠুভাবে গেঁথে দেওয়া যায় সেজন্য উপযুক্ত ধরন বেছে নিতে হবে। এ সমস্ত বিষয়গুলো নির্ধারণের দায়িত্ব আমাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। শরঈ হুকুমের বাস্তবতার আলোকে আমরা এ বিষয়গুলো নির্ধারণ করব যাতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।
রাসূল (সা) নিজেকে এবং তাঁর দাওয়াতকে মক্কার বাজারে প্রকাশ্যে উপস্থাপন করতেন। এ কাজটি করার সময় আমাদেরকে উপযুক্ত ধরন বেছে নিতে হবে; যেমন যথার্থ বক্তব্য উপস্থাপন করতে হবে অথবা বিভিন্ন সামাজিক সমাবেশ, উৎসব বা আনন্দ-বেদনার সময় জনগণের কাছে নিজেদের ধ্যান-ধারণাগুলোকে ছড়িয়ে দিতে হবে। বই, ম্যাগাজিন, লিফলেট, ক্যাসেট অথবা সরাসরি কথা বলার মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন করা যায়-এসমস্ত ধরন বা উপকরণের প্রত্যেকটাই জায়েয।
অনুরূপভাবে রাসূল (সা) যখন নুসরাহ খোঁজার জন্য তায়েফে গিয়েছিলেন তখন তিনি পায়ে হেঁটে গিয়েছিলেন, নাকি ঘোড়ার পিঠে চড়েছিলেন নাকি অন্য কোন উপায় অবলম্বন করেছিলেন সেগুলোর অনুসরণ করাটা আমাদের জন্য আবশ্যক কিছুনা। এ জাতীয় উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ কোন স্পষ্ট নির্দেশনা না দিয়ে বরং আমাদের সিদ্ধান্তের উপর তা ছেড়ে দিয়েছে।
আমাদের জানা আবশ্যক যে রাসূল (সা) এর তরীকাহ ছিল মূলত ওহী দ্বারা নির্ধারিত অনেকগুলো শরঈ হুকমের সমষ্টি যা থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত হওয়াও তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিলনা। শরঈ হুকুমের প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে যে বিষয়গুলো পরিবর্তিত হয় সেগুলো হল ধরন বা উপকরণ। এ বিষয়গুলোকে নির্ধারণ করা যেমন রাসূল (সা) এর সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, বর্তমানে ঠিক তেমনিভাবে এ বিষয়গুলোকে নির্ধারণ করাটা আমাদের সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।প্রকৃতপক্ষে দারুল ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করা একটি শরঈ হুকুম। এমন অনেক লোক আছে যারা ভাবে যে দারুল ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারটি ধরনের অর্ন্তভুক্ত এবং এজন্য তারা যে কোন ধরনের কাজ করার ব্যাপারে স্বাধীন। উদাহরণস্বরূপ দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার উপায় হিসেবে তারা গরীবদেরকে সাহায্য করে, মানুষের আখলাক ঠিক করার কথা বলে, হাসপাতাল বা স্কুল তৈরি করে, ভাল কাজ করার কথা বলে, কেউ শাসকদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক দেয় আবার কেউ বিদ্যমান শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের দাবী তোলে। এ সমস্ত কাজের প্রত্যেকটাই হচ্ছে খিলাফত প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আল্লাহর সরাসরি নির্দেশনার মাধ্যমে পরিচালিত রাসূল (সা) এর কর্মকাণ্ডের অনুসরণ থেকে সুস্পষ্ট বিচ্যুতি। আল্লাহর হুকুমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাসূল (সা) যেভাবে প্রকাশ্যে ঘোষণা দানের কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন ঠিক তেমনিভাবে প্রকাশ্যে ঘোষণাদানের কাজ করাটা আমাদের জন্যও ফরয; যদি তা না করি তাহলে আমরা পথভ্রষ্টদের অর্ন্তভূক্ত হব। রাসূল (সা) যেভাবে অস্ত্র ব্যবহার করা থেকে বিরত ছিলেন এবং মুসলিমদেরকে অস্ত্র বহনের অনুমতি দেননি ঠিক তেমনিভাবে আমাদেরকেও তা মেনে চলতে হবে। পরিস্থিতি যদি ভিন্নও হয় তবু আমাদেরকে ঠিক তেমনিভাবে নুসরাহ খুঁজতে হবে যেমনভাবে রাসূল (সা) তা খুঁজেছিলেন। সাধারণভাবে বলা যায় পদ্ধতির ধাপসমূহ যেভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর রাসূলকে নির্ধারিত করে দিয়েছিলেন সেগুলো আমাদের জন্যও অপরিবর্তিত থাকবে। সেগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক কাজ করা অথবা সেগুলোর অনুসরণ না করা হবে শরঈ হুকুমের লঙ্ঘন।
তরীকাহ্র ব্যাপারে নিজেদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো সুযোগ আমাদেরকে দেওয়া হয়নি। উদ্দেশ্য কী হবে এবং সেই উদ্দেশ্যে পৌঁছার জন্য তরীকাহ কী হবে – দুটো বিষয়ই শরীয়াহ নির্ধারিত করে দিয়েছে ; অতএব এসব বিষয়ে আনুগত্য করা ছাড়া আমাদের অন্য কোনো বিকল্প নেই।
পদ্ধতির ধাপসমূহ নিধারণ করার ইখতিয়ার কেবলমাত্র শরঈ দলীলসমূহেরই (কুরআন ও সুন্নাহ) রয়েছে। এ ধাপসমূহ নির্ধারণ করার জন্য আমরা নিজেদের মন, পরিস্থিতি অথবা জনস্বার্থকে বিবেচনা করার অধিকার রাখিনা।
মানুষের খেয়াল-খুশী বা ইচ্ছা-অনিচ্ছা থেকে নয়, বরং শরঈ দলীলসমূহের অর্থ বুঝতে হয় তার ভাষাগত নির্দেশনা থেকে। আমাদের ইচ্ছাগুলোকে শরঈ হুকুমের অনুসরণে সাজাতে হবে; কারণ বাধ্যতামূলকভাবে সেগুলো অনুসরণের মধ্য দিয়েই কেবল আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারব।
রাসূল (সা) এর তরীকাহকে বোঝা, এ তরীকাহ নিয়ে তিনি (সা) যেভাবে অগ্রসর হয়েছিলেন, সেই পদ্ধতির পুরো আনুগত্য করা এবং তাঁর কাজের ধাপসমূহকে এবং প্রত্যেকটি ধাপে কৃত কাজগুলোকে সঠিকভাবে আদায় করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক।
দল গঠনের পর্যায়ে রাসূল (সা) বিভিন্ন কাজ সম্পাদন (ব্যক্তিগতভাবে লোকজনের সাথে দেখা করা,তাঁর উপর যারা ঈমান আনতেন তাঁদেরকে গোপনে একত্রে জড়ো করে তাঁদের চিন্তা-চেতনা গঠনের দিকে মনোযোগ দেওয়া) করেছিলেন। এ সমস্ত কাজের ভিত্তিকে (আসল) অনুসরণ করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক; কারণ শরঈ হুকুম হিসেবে তা আল্লাহর তরফ থেকে এসেছে। পাশাপাশি এ সমস্ত কাজ বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত ধরন এবং উপকরণ আমাদেরকে বেছে নিতে হবে।একইভাবে জনমত গঠনের পর্যায়ে রাসূল (সা) বিভিন্ন কাজ সম্পাদন (প্রকাশ্যে দাওয়াতের ঘোষণাদান, কুফরী চিন্তা এবং প্রথার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক শতশত আয়াত নাযিল হওয়া, নাম সহকারে অথবা পরোক্ষ বর্ণনার মাধ্যমে কুরাইশ নেতাদেরকে আক্রমণ (মৌখিকভাবে) করা এবং বিভিন্ন গোত্রের কাছে নিজেকে উপস্থাপন করা) করেছিলেন। এক্ষেত্রেও শরঈ হুকুম হিসেবে এসব কাজের ভিত্তিকে (আসল) অনুসরণ করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। দ্বিতীয় পর্যায়ে আমাদেরকে প্রথম পর্যায় অর্থাৎ দল গঠনের পর্যায়ের কর্মকাণ্ডের সাথে আরো নতুন কিছু কর্মকাণ্ড যোগ করতে হবে যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের সূচনা করা, ইসলামের ভিত্তিতে উম্মাহর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে জোরালো অবস্থান গ্রহণ, ঔপনিবেশিক বা সাম্রাজ্যবাদী কাফির শক্তিসমূহ এবং তাদের আস্থাভাজন দালাল শাসকদের ষড়যন্ত্রগুওলাকে উম্মাহর সামনে তুলে ধরা প্রভৃতি; কারণ রাসূল (সা) ঠিক এরূপই করেছিলেন। এ সমস্ত কর্মকাণ্ড সম্পাদনের জন্য তখন আমরা প্রয়োজনীয় ধরন ও উপকরণ বেছে নিব।
একইভাবে জনমত গঠনের পর্যায়ে রাসূল (সা) বিভিন্ন কাজ সম্পাদন (প্রকাশ্যে দাওয়াতের ঘোষণাদান, কুফরী চিন্তা এবং প্রথার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক শতশত আয়াত নাযিল হওয়া, নাম সহকারে অথবা পরোক্ষ বর্ণনার মাধ্যমে কুরাইশ নেতাদেরকে আক্রমণ (মৌখিকভাবে) করা এবং বিভিন্ন গোত্রের কাছে নিজেকে উপস্থাপন করা) করেছিলেন। এক্ষেত্রেও শরঈ হুকুম হিসেবে এসব কাজের ভিত্তিকে (আসল) অনুসরণ করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। দ্বিতীয় পর্যায়ে আমাদেরকে প্রথম পর্যায় অর্থাৎ দল গঠনের পর্যায়ের কর্মকাণ্ডের সাথে আরো নতুন কিছু কর্মকাণ্ড যোগ করতে হবে; যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের সূচনা করা, ইসলামের ভিত্তিতে উম্মাহর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে জোরালো অবস্থান গ্রহণ, ঔপনিবেশিক বা সাম্রাজ্যবাদী কাফির শক্তিসমূহ এবং তাদের আস্থাভাজন দালাল শাসকদের ষড়যন্ত্রগুওলাকে উম্মাহর সামনে তুলে ধরা প্রভৃতি; কারণ রাসূল (সা) ঠিক এরূপই করেছিলেন। এ সমস্ত কর্মকাণ্ড সম্পাদনের জন্য তখন আমরা প্রয়োজনীয় ধরন ও উপকরণ বেছে নিব।
প্রকৃতপক্ষে, খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদেরকে রাসূল (সা) এর মক্কী জীবনের (শরঈ তরীকাহর) অনুসরণ করতে হবে। রাসূল (সা) যখন তাঁর এই তরীকাহর সূচনা করেছিলেন এবং এই তরীকাহর আলোকে কর্মকাণ্ড শুরু করেছিলেন তখন তিনি অনেক অপমান, দুর্বলতা, সন্ত্রাস এবং ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। তবুও তিনি দৃঢ় সংকল্পের সাথে অবিরাম কাজ করে গিয়েছিলেন। রাসূল (সা) এর নিকট আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার এর হুকুম আসত এবং তা বাস্তবায়নের জন্য তিনি কঠোর সংগ্রাম করতেন। সেই ব্যক্তি নবীর (সা) সঠিক পথের অনুসরণ থেকে অনেক দূরে সরে যায় যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার এর এই আয়াত সে শুনে – “অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয়” [১৫:৯৪]; যেখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর রাসূল (সা) কে নির্দেশ দিচ্ছেন যাতে তিনি শুধুমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার এর আদেশ অনুযায়ী প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন এবং সেই ব্যক্তি দেখে যে রাসূল (সা) তাঁর নিজের ইচ্ছানুসারে নয় বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশ অনুযায়ী প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন; তারপরও সে বলে: “এই তরীকাহর অনুসরণ করাটা বাধ্যতামূলক কিছুনা।” যদি এই তরীকাহর অনুসরণ করাটা বাধ্যতামূলক কিছু না-ই হতো তবে রাসূল (সা) কেন সেই অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন যেখানে তিনি (সা) কাফিরদেরকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন এবং তাদের উপাস্য দেব-দেবীদের, তাদের নেতৃবৃন্দের, তাদের প্রথার এবং তাদের চিন্তাসমূহের বিরোধিতা প্রকাশ্যে করেছিলেন যার প্রত্যেকটা বিষয়ই কুরআনের নির্দেশনার মাধ্যমে সম্পাদিত হয়েছে। অথচ তিনি চাইলে তোষামোদের মাধ্যমে শাসকদের সন্তুষ্ট করতে পারতেন অথবা বিদ্যমান প্রথায় নিজেকে সমর্পণ করতে পারতেন যার ফলে তাদের কাছ থেকে তিনি মর্যাদা লাভ করতে পারতেন। যদি তিনি (সা) তা করতেন তাহলে প্রকৃতপক্ষে তিনি (সা) তাঁর রবের হুকুমের অবাধ্য হতেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে কুরআন নাযিল হতো এবং রাসূল (সা) নিজেকে তার মধ্যে সমর্পণ করতেন। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন;قُمْ فَأَنْذِرْ
“উঠুন এবং সতর্ক করুন!” [৭৪:২]
তিনি (সা) নেতৃবৃন্দকে আক্রমণ (মৌখিকভাবে) করলেন যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।
تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ
“আবু লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে!” [১১১:১]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে রাসূল (সা) এর পক্ষাবলম্বন করলেন:
مَا أَنْتَ بِنِعْمَةِ رَبِّكَ بِمَجْنُونٍ
“আপনার পালনকর্তার অনুগ্রহে আপনি পাগল নন।” [৬৮:২]
কুরআনে কাফিরদের মানসিক অবস্থার কথা বর্ণনা করা হয়েছে:
وَدُّوا لَوْ تُدْهِنُ فَيُدْهِنُونَ
“তারা চায় যদি আপনি নমনীয় হন তবে তারাও নমনীয় হবে।” [৬৮:৯]
তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর রাসূলকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন এবং উম্মুল-কুরা অর্থাৎ মক্কা এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের লোকজনকে সতর্ক করেন। পাশাপাশি তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর রাসূল (সা) কে এবং যাঁরা তাঁর (সা) সাথে ছিলেন তাঁদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন দাওয়াতের কাজে অস্ত্র বহন না করতে। আমাদেরকে বুঝতে হবে যে তখন কুরআন নাযিল হচ্ছিল এবং রাসূল (সা) সে অনুযায়ী আমল করছিলেন মাত্র। যে বলে এই তরীকাহর অনুসরণ করাটা বাধ্যতামূলক কিছু না তার জন্য কি এর চেয়ে বেশি প্রমাণের প্রয়োজন আছে?
কেউ যদি বলে এই তরীকাহর অনুসরণ করাটা বাধ্যতামূলক কিছু না বরং ঐচ্ছিক তাহলে তার মানে দাঁড়াবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নাযিলকৃত আয়াতের মাধ্যমে যা কিছু হুকুম করছিলেন রাসূল (সা) সম্পূর্ণরূপে অথবা আংশিকভাবে সেসব আয়াতের অবাধ্য হয়েছিলেন। কারণ সেক্ষেত্রে যা কিছু নাযিল হচ্ছিল তিনি তাঁর অনুগত ছিলেন না। অতএব তখন বিষয়টি আমাদের জন্যও ঐচ্ছিক বলে বিবেচিত হবে – যে আমরা কি রাসূল (সা) এর তরীকাহ অনুসরণ করব নাকি অন্য কোন তরীকাহ? প্রকৃতপক্ষে এটি হচ্ছে এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি যা রাসূল (সা) এর কর্মকাণ্ড এবং তাঁর সমাজ পরিবর্তনের পদ্ধতির সঠিক বুঝ থেকে অনেক দূরে।
বর্তমান যুগে তরীকাহ ও উসলূবের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণে কিছু মুসলিমের ব্যর্থতা
বর্তমানে বিদ্যমান পরিস্থিতি রাসূল (সা) এর সময়কার চেয়ে ভিন্ন- এরূপ একটি ধারণা থেকে কিছু মুসলিমের মনে এ ব্যাপারে সন্দেহ দানা বেধে উঠেছে যে রাসূল (সা)-এর পদ্ধতির হুবহু অনুসরণ কি বর্তমানে প্রযোজ্য? কারণ রাসূল (সা)-এর সময়ে সামাজিক বিভক্তি ছিল আদি প্রকৃতির (গোত্র ও বংশ), কিন্তু বর্তমানে এই বিভক্তি অনেক জটিল ও আন্তঃসম্পর্কিত। একটি গোত্রকে তখন রাষ্ট্রের সমপর্যায়ে বিবেচনা করা হতো এবং এর লোকসংখ্যা ছিল কয়েক হাজার, কিন্তু আজকে একেকটি রাষ্ট্রের লোকসংখ্যা কোটির উপরে। তখন কাফিরদেরকে ঈমানের দাওয়াত দেয়া হতো কিন্তু বর্তমানে ইসলামী জীবনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মূলত মুসলিমদেরকে দাওয়াত দেওয়া হয়। তখনকার পরাশক্তিগুলো যেমন রোম ও পারস্য মক্কায় রাসূল (সা)-এর দাওয়াতে হস্তক্ষেপ করেনি কিন্তু বর্তমানে পরাশক্তিগুলোর রাজনীতির সঙ্গে অন্যান্য রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দ শৃঙ্খলিত অবস্থায় আছে, প্রকৃতপক্ষে তারা বর্তমানে পুতুল হিসেবে আচরণ করছে। বর্তমানে পরাশক্তিগুলোই ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে এবং অন্যান্যদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
সুতরাং যারা সন্দেহ পোষণ করে তারা বলে : “রাসূল (সা)-এর তরীকাহ’কে আমরা কীভাবে গ্রহণ করতে পারি যেখানে অনেক বিষয় পরিবর্তিত হয়ে গেছে? এরকম কঠোরতা ও অনমনীয়তা বর্তমানে প্রযোজ্য নয় এবং এর আনুগত্য করতে আমরা বাধ্য নই। বরং যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হল দাওয়াতের বৃহত্তর উদ্দেশ্যকে অনুভব করা যা হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামের বাস্তবায়ন এবং আল্লাহর উবুদিয়্যাহ (দাসত্ব)-কে অনুভব করা।”
এ সম্পর্কিত সঠিক আলোচনার ব্যাখ্যায় আমরা বলি, কোনো প্রাসঙ্গিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে শরঈ হুকুম নাযিল হতো যার জন্যই শরঈ হুকুমটি প্রযোজ্য। যখন বাস্তবতা পরিবর্তিত হয় তখন এ সম্পর্কিত শরঈ হুকুমও পরিবর্তিত হয়ে যায়। যদি বাস্তবতা পরিবর্তিত না হয়, তাহলে শরঈ হুকুম পূর্বের অবস্থায়ই বিদ্যমান থাকে। বাস্তবতাকে বুঝতে হলে এর বাহ্যিক রূপ নয় বরং মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ পর্যবেক্ষণ করতে হয়।
কিছু সাধারণ চিন্তায় (common thoughts) বিশ্বাসী লোকজনের সমষ্টি হচ্ছে সমাজ, যা থেকে এই চিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয়ের প্রতি গ্রহণ ও অনুমোদনের আবেগ সৃষ্টি হয় এবং এর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয়ের প্রতি অসন্তুষ্টি ও ক্রোধের আবেগ সৃষ্টি হয়। এগুলোর উপর ভিত্তি করে তখন একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠে, যা এসব চিন্তাকে বাস্তবায়ন করে এবং এদের লঙ্ঘনকে প্রতিরোধ করে। ফলে লোকজন সেখানে এমন একটি জীবন অতিবাহিত করে যার প্রতি তারা সন্তুষ্ট এবং যারা ব্যাপারে তারা দৃঢ় বিশ্বাসী।
সমাজের বাস্তবতা বিভিন্ন রূপ ধারণ করে। এটি আদিম অথবা জটিল প্রকৃতির হতে পারে, কিন্তু প্রত্যেক সমাজের লোকই কিছু সাধারণ চিন্তা ও আবেগের মাধ্যমে সংগঠিত হয়, যারা এসব চিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা দ্বারা শাসিত হয়- চাই এসব লোক গোত্রের আকারে থাকুক অথবা আধুনিক রাষ্ট্রের আকারে থাকুক এবং লোকসংখ্যা হাজার হাজার থাকুক অথবা কোটি কোটি থাকুক। এসব পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এটি একটি সমাজ, কারণ সমাজ গঠনের মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ এতে বিদ্যমান এবং এগুলো পরিবর্তিত হয়নি।
রাসূল (সা) একটি ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন এবং এটি সম্ভব হয়েছিল ইসলামী চিন্তা, আবেগ ও ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে। তিনি (সা) সেই শরঈ তরীকাহ’র অনুসরণ করেছিলেন যা ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য নির্ধারিত। তাঁর (সা) সমস্ত কর্মকাণ্ড এ লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়েছিল। মদীনায় তিনি (সা) মুমিনদেরকে একটি সাধারণ ছাঁচে গড়ে তুলেছিলেন যারা সংখ্যার দিক থেকে মদীনার অধিবাসীদের সিংহভাগ হয়ে উঠেছিলেন। তিনি (সা) তাদের মনে ইসলামের মৌলিক চিন্তাগুলোকে প্রোথিত করে দিলেন যা থেকে জন্ম হয় বিভিন্ন আবেগের একটি সুষম মিশ্রণ। যখন তিনি তাদের নিকট হিজরত করলেন এবং ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করলেন তখনই ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হল। শুরুতে এর রূপ ছিল সাদামাটা ধরনের এবং পরবর্তীতে তা এমন একটি সমাজে রূপান্তরিত হল যার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রয়োজন দেখা দিল।
এবার তাদের এই দাবীর ব্যাপারে আসা যাক যে, তৎকালীন পরাশক্তিগুলো তাঁর (সা) সময়ে কোনো হস্তক্ষেপ করত না। কিন্তু বর্তমানে ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তারা হস্তক্ষেপ করে ও প্রতিরোধ করে। এর জবাবে আমরা বলতে চাই, এতে তরীকাহ পরিবর্তিত হয়না বরং তরীকাহ’র বাস্তবায়ন তুলনামূলকভাবে কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে এক্ষেত্রে বিদ্যমান নতুন বাস্তবতার আলোকে যথার্থরূপে অধিকতর প্রশিক্ষণদান ও দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজন। ফলে দলটিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে যাতে পরাশক্তিগুলোর নীতিসমূহ জানা যায় এবং সেসব পরিকল্পনা বোঝা যায় যেগুলো আমাদের বিরুদ্ধে দালাল ও পুতুল শাসকদেরকে দিয়ে তারা বাস্তবায়ন করছে, যাতে সেগুলো আমরা প্রতিহত করতে পারি।
এবার তাদের এই দাবীর ব্যাপারে আসা যাক যে, তারা বলে মক্কায় রাসূল (সা) প্রধানত ঈমান সম্পর্কিত বিষয়াদিতেই ব্যস্ত ছিলেন এবং অল্পকিছু আহকাম নিয়ে কাজ করেছিলেন। এর জবাবে আমরা বলতে চাই অল্পসংখ্যক হলেও বিদ্যমান সমস্ত আহকাম নিয়েই তিনি কাজ করেছিলেন। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে দাওয়াতী কাজের ক্ষেত্রে আমাদেরকে বিদ্যমান সমস্ত শরঈ আহকাম নিয়েই ভাবতে হবে। উপরন্তু,আমাদেরকে এ বিষয়টিও লক্ষ্য রাখতে হবে যে মক্কায় কাজ ছিল মূলত লোকজনকে ইসলাম গ্রহণের জন্য আহ্বান করা। কিন্তু বর্তমানে দাওয়াত হচ্ছে মুসলিমদের মধ্যে যারা ইসলামী আক্বীদাহ’কে ধারণ করে এবং তাদের জন্য সমস্ত শরঈ আহকাম নাযিল হয়ে গেছে। এখন আল্লাহর সামনে তারা শুধু ঈমান নয় বরং পুরো ইসলামের ব্যাপারেই দায়িত্বশীল। সুতরাং মক্কায় যে লোক মারা গিয়েছিল সে শুধুমাত্র ততটুকুর জন্যই দায়িত্বশীল ছিল, তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইসলামের যতটুকু নাযিল হয়েছিল। কিন্তু এখন যদি কেউ মারা যায় তাহলে আল্লাহ তাকে পুরো ইসলামের জন্যই জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। এজন্যই বর্তমানে দাওয়াত হতে হবে পরিপূর্ণ এবং ইসলামী জীবনব্যবস্থার পুনর্জাগরণের জন্য আমাদেরকে আহ্বান করতে হবে কারণ আমরা নতুন কোনো আহ্বানের সূচনা করছিনা অথবা নতুন কোনো দ্বীনের দিকেও ডাকছিনা।
অনুরূপভাবে যদি কেউ বর্তমানে মুসলিমদের বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করে তাহলে দেখতে পাবে যে আজকে সমস্যা এটা নয় যে লোকজনের ইসলামী আক্বীদাহ নেই বরং সম্যষা হচ্ছে জীবনের চিন্তাসমূহ এবং শাসনব্যবস্থার সঙ্গে ইসলামী আক্বীদাহ’র সম্পর্কহীনতা। ফলে আক্বীদাহ তার মাহাত্ম্য হারিয়েছে। আর এসবের মূল কারণ হল মুসলিমদের উপরে পাশ্চত্য চিন্তাসমূহের প্রভাব, সেসব চিন্তা যেগুলোকে পাশ্চাত্যের কুফরী রাষ্ট্রগুলো সংরক্ষণ করে, টিকিয়ে রাখার জন্য এবং আরো প্রসারিত করার জন্য কাজ করে এবং এ উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তারা তাদের প্রতি অনুগত শাসকদেরকে ক্ষমতায় বসায়, পাঠ্যসূচী প্রণয়ন করে এবং মিডিয়া ব্যবহার করে।
সুতরাং, ইসলামকে সঠিকভাবে, পূর্ণাঙ্গরূপে ও স্বয়ংস্পূর্ণ আকারে উপস্থাপন করাটা আমাদের জন্য অপরিহার্য যাতে আমাদের আক্বীদাহ ও ঈমানের তাৎপর্য একটি মৌলিক চিন্তা হিসেবে সামনে আসে যা থেকে আহকাম বের হবে এবং যার উপরে ভিত্তি করে জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারিত হবে; ফলে তখন আমরা এই আক্বীদাহ’র মাধ্যমে জীবনের চিন্তাগুলোকে উপস্থাপন করতে পারব। এই কাজটি সম্পন্ন করতে হবে সেই সত্যকে প্রচারণার মাধ্যমে যে আল্লাহই হচ্ছেন সৃষ্টিকর্তা ও মুদাব্বির (সমস্তকিছুর পালনকর্তা), বিচার-ফয়সালা করার অধিকার একমাত্র তাঁর এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত বিষয়ই তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। যখন কোনো মুসলিমের নিকট ঈমান ও আহকামগুলোকে অপরিহার্যরূপে উপস্থাপন করা হবে তখন সত্যের শক্তি ও মাহাত্ম্য, ইসলামকে বোঝা ও এর দিকে আহ্বানের ক্ষেত্রে দলটির শক্তি এবং পরিবর্তন সূচিত করার জন্য দলটির যোগ্যতা তার কাছে স্পষ্ট হবে।
এজন্যই বর্তমানে মুসলিমদেরকে দাওয়াত দেয়া হচ্ছে যাতে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামী জীবনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এই দাওয়াতের ভিত্তি হবে ইসলামী আক্বীদাহ’র রাজনৈতিক দিক এবং এই ভিত্তির দ্বারাই আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ অনুযায়ী সমস্ত কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রিত হতে হবে।
অতএব যা পরিবর্তিত হয়েছে তা হচ্ছে সমাজের বাহ্যিক রূপ। কিন্তু অস্তিত্বের দিক দিয়ে মৌলিকভাবে বিবেচনা করতে গেলে এটি কোনোরকম পরিবর্তন ছাড়া আগের মতই রয়ে গেছে। সুতরাং, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালিত কর্মকাণ্ডের হুকুম পরিবর্তিত হয়নি এবং একইভাবে এই লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতিও পরিবর্তিত হয়নি।সুন্নত এর প্রকৃত অর্থ

সুন্নাহ কথাটির শাব্দিক অর্থ পদ্ধতি (ত্বরীকা)। এ শব্দটি এসেছে ‘সান আল শাই’ আরবী মূল শব্দ হতে। যার অর্থ কোন কিছুকে ধারালো বা উজ্জল করা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন:
سُنَّةَ مَنْ قَدْ أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ مِنْ رُسُلِنَا وَلا تَجِدُ لِسُنَّتِنَا تَحْوِيلا
“আপনার পুর্বে আমি যত রাসূল প্রেরণ করেছি, তাদের ক্ষেত্রেও এরূপ সুন্নত ছিল, আপনি আমার সুন্নত এর কোন ব্যতিক্রম পাবেন না।“ [সূরা আল-ইসরা: ৭৭]
سُنَّةَ اللَّهِ فِي الَّذِينَ خَلَوْا مِنْ قَبْلُ وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلا
“যারা পুর্বে অতীত হয়ে গেছে তাদের ব্যাপারে এটাই ছিল আল্লাহর সুন্নত, আপনি আল্লাহর সুন্নত-এ কখনো পরিবর্তন পাবেন না।“ [সূরা আহযাব: ৬২]
إِلا سُنَّةَ الأوَّلِينَ فَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلا وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَحْوِيلا
“তারা কেবল পুর্ববর্তীদের (ক্ষেত্রে আল্লাহ্র) সুন্নত এর অপেক্ষা করছে। অতএব আপনি আল্লাহর সুন্নত-এ পরিবর্তন পাবেন না এবং আল্লাহর সুন্নত-এ কোনরকম বিচ্যুতিও পাবেন না।“ [সূরা আল-ফাতির: ৪৩]
রাসূলুল্লাহ (সা) হাদীসেও এ শব্দটি একাধিকবার ব্যবহার করেছেন। যেমন:
أُوصِيكُمْ بِتَقْوَى اللَّهِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَإِنْ عَبْدٌ حَبَشِيٌّ فَإِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ يَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّهَا ضَلَالَةٌ فَمَنْ أَدْرَكَ ذَلِكَ مِنْكُمْ فَعَلَيْهِ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ عَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ
“আমি তোমাদের তাকওয়ার উপদেশ দিচ্ছি এবং (ইসলামী নেতৃত্বের) শ্রবণ ও আনুগত্য করার উপদেশ দিচ্ছি যদি কোন হাবশী গোলামও (তোমাদের আমীর নিযুক্ত হয়)। কেননা তোমাদের মধ্যে যারা (ভবিষ্যতে) জীবিত থাকবে তারা অসংখ্য ব্যাপারে মতবিভেদ দেখতে পাবে। এরূপ অবস্থায় নতুন উদ্ভাবিত বিষয়াদি থেকে তোমরা নিজেদের বাঁচিয়ে রাখ, কারণ সেগুলো পথভ্রষ্টতা। সুতরাং, তোমাদের যে কেউ সেই (যুগ) কে পাবে, সে যেন আমার সুন্নত ও হেদায়াতদিশারী খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নত দাঁত দ্বারা শক্ত করে কামড়িয়ে ধরে। “[তিরমিযি]
অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেন:
فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتي فَلَيْسَ مِنّي
“…যে আমার সুন্নত অনুসরন করলো না, সে আমার অন্তর্ভূক্ত নয়। “[বুখারী, মুসলিম]
সুন্নতের শরয়ী অর্থ:
ফিকহ্-এর আলেমগণের নিকট:
সুন্নাহ বলতে রাসূলুল্লাহ (সা) হতে বর্ণিত নাফিলাহ বা নফল (অতিরিক্ত) কে বোঝানো হয়েছে; যেমন ফরয (বাধ্যতামূলক) ছাড়া উৎসাহিত রাকাত (রাকাত আস সুন্নাহ) সংখ্যা। যদিও সুন্নাহ রাসূলুল্লাহ (সা) হতে বিবৃত হয়েছে, কিন্তু একে উৎসাহিত কাজ বা নাফিলাহ করা হয়েছে বলে একে সুন্নাহ বলা হয়। একই ভাবে ফরয-কে বাধ্যতামূলক কাজ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এভাবে ফজরের দুই রাকাত বাধ্যতামূলক (ফরয) নামাজের বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট হতে মুতাওয়াতির বিবরণের মাধ্যমে ফরয হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে।
কাজেই ইবাদতের ক্ষেত্রে আদেশ (আম্র) ফরয বা নাফিলাহ হতে পারে। এবং
অন্য কাজের ক্ষেত্রে ফরয, মানদুব কিংবা মুবাহ হতে পারে। অন্য কথায় নাফিলাহ মানদুবের সমার্থক হলেও একে নাফিলাহ বা সুন্নাহ বলা হয়।
এক্ষেত্রে এমন ধারণা পোষণ অনুচিত যে, ফরয আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং সুন্নাহ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-র পক্ষ থেকে। সুন্নাহ এবং ফরয উভয়েই আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা) আল্লাহর পক্ষ থেকে এর বহনকারী মাত্র। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) নিজের খেয়াল খুশী অনুযায়ী একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি, তিনি তা-ই বলেছেন যা তার উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ করা হয়েছে, অর্থাৎ ওহী হিসাবে প্রেরণ করা হয়েছে।
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى ~ إِنْ هُوَ إِلا وَحْيٌ يُوحَى
“তিনি নিজের খেয়ালখুশী অনুযায়ী কিছু উচ্চারণ করেন না। (বরং) এটি ওহী যা প্রত্যাদেশ হয়।“ [সূরা নাজম: ৩-৪]
সকল সুন্নাহ্র নির্দেশই এসেছে আল্লাহ’র পক্ষ থেকে, রাসূলুল্লাহ (সা) এর পক্ষ থেকে নয়।
হাদীসের আলেমগণের নিকট:
অপর অর্থে সুন্নাহ বলতে কুরআন ব্যতীত রাসূলুল্লাহ (সা) এর পক্ষ থেকে আগত সকল শরঈ’ তথ্য-প্রমাণকেও বোঝানো হয়। এর মাঝে তার কথা, কাজ এবং সম্মতিও (তার সম্মুখে সম্পন্ন কোন কাজে নীরব থাকা) অন্তর্ভূক্ত।
উসুল আল ফিকহ্-এর আলেমগণের নিকট:
সুন্নাহ হচ্ছে কুরআনের পাশাপাশি ইসলামী শরীয়তের অপর এক উৎস। উদাহরনসরূপ, যখন বলা হয় রমজান মাসের বহির্ভূত রোযা রাখা সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত, তখন এটা বোঝানো হয় যে এটি সুন্নাহ হতে প্রমানিত।
এছাড়াও আক্বীদার আলেমগণের দ্বারা কখনো কখনো এটি ব্যবহার হতে দেখা যায়। সেক্ষেত্রে এটি সঠিক আক্বীদা অর্থে ব্যবহৃত হবে। যেমন: ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের আক্বীদার উপর একটি বইয়ের নাম হচ্ছে – উসুল আস-সুন্নাহ।
সুন্নাহ সম্পর্কে সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন বিভ্রান্তি:
আমাদের সমাজে অনেকেই সুন্নাহ বলতে কিছু নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠান ও কাজকর্ম বুঝেন এবং যারা সমাজে সেসব বিষয়াদি পালন করেন না, তাদের ব্যাপারে বলা হয় যে তারা নবীর সুন্নত পালন করে না। কিন্তু সুন্নাহ’র প্রকৃত অর্থ তা নয়। কুরআনে সুন্নাহ শব্দটি শাব্দিক অর্থে আসলেও, রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাদীসে সুন্নাহ শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ হিসেবে এসেছে। হাদীসে সুন্নাহ শব্দটি রাসূলুল্লাহ (সা) এর সম্পূর্ন জীবন পদ্ধতি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং আমরা যখন ফজর-এর দুই রাকআত ফরজ নামাজ পড়ছি, তখন মূলত আমরা নবীজীর সুন্নতই (জীবনপদ্ধতি, এক্ষেত্রে ফরজ ইবাদত) অনুসরন করছি। রাসূলুল্লাহ (সা) এর পরবর্তী কয়েক যুগ পরে বিভিন্ন মুজতাহিদীনরা ইসলামের নফল (ফরজের বাইরে অতিরিক্ত) কাজ সমূহকে সুন্নত নামকরন করেছিলেন (যেমন: সুন্নতে মু’আক্কাদা, সুন্নতে জায়েদা)। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তারা এর বাইরে অন্য বিষয়গুলোকে অনুসরন করাকে নবীর সুন্নাহ অনুসরন করা বলতেন না। অন্যকথায়, ইসলামের যেকোনো হুকুম পালন করা আসলে নবীর সুন্নতই পালন করা। আরবী ভাষা ও ইসলামী জ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে আজকে সমাজে এ ধরনের কথা প্রচলিত আছে।
এছাড়াও ফিকহী সুন্নত বা ফরজের বাইরে অতিরিক্ত সুন্নত আমল হচ্ছে এমন ধরনের আমল যা করলে সওয়াব রয়েছে আর না করলে সওয়াব নেই। এ ধরনের আমল কেউ না করলে তাকে ফরজ আমল তরককারীদের মতো তিরস্কৃত করা হয় না। ফিকহী সুন্নত মূলত পালনের জন্য উৎসাহিত করা হয়। বর্তমান সমাজে ইসলামী চিন্তা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা বাস্তবায়িত না থাকায় ফিকহী সুন্নত পালনের সঠিক উৎসাহ সমাজে বাস্তবায়িত নেই। শুধুমাত্র ফিকহী সুন্নত নয়, বরং মুনকারে পরিপূর্ণ বর্তমান সমাজে হারাম থেকে বেচে থাকা ও ফরজ দায়িত্বসমূহ পালনের তাগিদেরও যথেষ্ঠ অভাব রয়েছে।
বর্তমান সময়ে এই পৃথিবীতে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর রেখে যাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র মৃত অবস্থায় রয়েছে যাকে পুনর্জীবিত করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হচ্ছে অনেকক্ষেত্রেই আমরা এমন সুন্নতের আলোচনায় বিভোর হয়ে উঠি যা একটি ফিকহী সুন্নত (অর্থাৎ উৎসাহিত আমল যা করলে সাওয়াব রয়েছে কিন্তু না করলে গুনাহ নেই) অথবা এমন আমল যা ফিকহী সুন্নত না ফরজ তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে আলেমদের মাঝে। অথচ যে সুন্নতের ফরযিয়্যাতের ব্যপারে কোনো বিতর্ক নেই সেই গুরুত্বপূর্ণ খিলাফত ব্যবস্থা নিয়ে খুব কমই আলোচনায় রত হই আমরা। খিলাফত ব্যতিত রাসূলুল্লাহ (সা) সকল সুন্নাহ (যা খিলাফতের উপর নির্ভর করে না) আমরা কোনো না কোনোভাবে পৃথিবীতে বাস্তবায়িত অবস্থায় দেখব, কিন্তু খিলাফত ১৯২৪ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত অনুপস্থিতি যেখানে ইজমা আস-সাহাবাহ অনুযায়ী তিন দিন দুই রাত্রির অধিক খিলাফত অনুপস্থিত থাকা হারাম। সুতরাং আমাদের উচিত গুরুত্বপূর্ন আলোচনাকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন।
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ এর প্রকৃত অর্থ

ইসলামের আকীদা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ ইসলামী জীবনাদর্শের মূল ভিত্তি। বর্তমান সমাজে এই আকীদা চিন্তা-ভাবনা না করে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কিছু বিশ্বাস হিসেবে গৃহীত হচ্ছে। কিন্তু ইসলামের প্রাথমিক অনুসারীরা অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সাহাবীরা (রা) তাঁদের চিন্তাকে ব্যবহার করে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ এর সত্যতা বুঝতে পেরেছিলেন। তাঁরা (রা) ইসলামকে বুঝে শুনে নিয়েছিলেন বলেই তাঁরা এর দায়িত্ব বহনে বলিষ্ঠ ছিলেন এবং ইসলামকে পৃথিবীতে একটি বিজয়ী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। আজ যদি আমরা মুসলমানদের পুনর্জাগরণ চাই তাহলে আমাদের মাঝে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ এর বাস্তব উপলব্ধি তৈরী করতে হবে।
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ এরা সত্যিকার মানে বুঝতে হলে আমাদের দুটো জিনিস বুঝতে হবে। প্রথমত: আল্লাহ্’র অস্তিত্বের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ এবং দ্বিতীয়ত: ‘ইলাহ’ শব্দের মানে। প্রথমটি অর্থাৎ আল্লাহ্’র অস্তিত্বের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ খুব সহজ কেননা যে কোন মানুষই একটু চিন্তা করলেই আল্লাহ্’র অস্তিত্বের সত্যতা উপলব্ধি করতে পারবে। এজন্য দরকার কেবল বুদ্ধির একটু ব্যবহার। আল্লাহ্’র অস্তিত্ব প্রমাণে বিপুল বৈজ্ঞানিক গবেষনা কিংবা গভীর দার্শনিক তত্ত্বালোচনার প্রয়োজন নেই।
আমাদের চার পাশের জগত যেমন: মানুষ, জীবজন্তু, চাঁদ, সূর্য, গ্রহ, গাছপালা, পাহাড় এসব কিছুকে পর্যবেক্ষণ করলে একটা জিনিস স্পষ্টতই বুঝা যায় যে এরা প্রত্যেকে দৈর্ঘ্য-প্রস্থ, আকার, জীবনকাল ইত্যাদি নানা দিক থেকে সীমাবদ্ধ এবং নানাভাবেই পরনির্ভরশীল। এই সীমাবদ্ধ দূর্বল সত্তাগুলো কখনোই নিজেরা নিজেদের অস্তিত্বে আনতে পারেনা, অথচ বাস্তবে এরা অস্তিত্বে রয়েছে। অতএব, অবশ্যই একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন যিনি এদের সবাইকে অস্তিত্বে এনেছেন; তিনিই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা), একক এবং সর্বশক্তিমান সত্ত্বা, যিনি অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে সকল কিছুকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিবা-রাত্রির আবর্তনে অবশ্যই চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” [সূরা আলি-ইমরান : ১৯০]
‘ইলাহ’ বলতে বোঝায় এমন কিছু বা এমন কেউ যার কাছে মানুষ নিজেকে সমর্পন করে এবং যার অনুসরণ করে। যেমন: আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“আপনি কি তাকে দেখেছেন যে নিজের প্রবৃত্তিকে নিজের ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে।” [সূরা আল ফুরক্বান : ৪৩]
এখানে তাদের কথা বলা হচ্ছে যারা তাদের খেয়ালখুশীর অনুসরণে জীবনযাপন করে, এজন্যই প্রবৃত্তিকে তাদের ইলাহ বলা হয়েছে।
এছাড়াও আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) ফেরাউন তার লোকদের কাছে নিজের ব্যাপারে কী দাবী করতো সে সম্পর্কে বলেন,
“ফেরাউন বললো: হে পারিষদবর্গ! আমি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন ইলাহ আছে বলে আমার জানা নেই।” [সূরা ক্বাসাস : ৩৮]
এর কারণ হাচ্ছে সে তাদের শাসক ছিল এবং জনগণ তার শাসনের অনুগত ছিলো।
ইহুদী এবং খ্রীস্টানদের ব্যাপারে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“তারা আল্লাহ্’র পরিবর্তে তাদের ধর্মযাজক ও সাধুদেরকে নিজেদের প্রভূ বানিয়ে নিয়েছে।” [সূরা তাওবা : ৩১]
এর কারণ হচ্ছে এসব সাধু ও ধর্মযাজকরা তাদের জন্য বিধান তৈরী করতো এবং কোনটি বৈধ, কোনটি অবৈধ তা নির্ধারণ করতো, আর তারাও তা মেনে নিতো।
এ সকল আয়াত থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, আল্লাহ্’কে একমাত্র ‘ইলাহ’ হিসেবে গ্রহণ করা মানে কেবন মূর্তিপূজা ত্যাগ করা নয় বরং এ জাতীয় আরো সকল ইলাহ’কে বর্জন করা। অতএব, যদি আমরা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ উচ্চারণ করি আর আল্লাহ্’র উদ্দেশ্যে কিছু ইবাদত-বন্দেগী করি, কিন্তু অন্যদিকে আমাদের ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নিজেদের প্রবৃত্তির খেয়ালখুশীকে অনুসরণ করি তাহলে এর মানে হচ্ছে ইবাদতের ক্ষেত্রে আমরা ইলাহ হিসেবে নিয়েছি আল্লাহকে কিন্তু ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইলাহ হিসেবে নিয়েছি আমাদের প্রবৃত্তিকে। যদি আমরা রমযানে রোযা রাখি কিন্তু এমন শাসকদের আনুগত্য ও অনুসরণ করি যারা ফেরাউনের মতো নিজেদের খেয়াল-খুশী দিয়ে আমাদের পরিচালনা করে তাহলে আমরা রোযার ক্ষেত্রে আল্লাহ্’কে ইলাহ মানছি কিন্তু শাসনকার্যে ইলাহ মানছি ঐ শাসকবর্গকে। এভাবেই, যদি আমরা নামায, রোযা আর যাকাতের ব্যাপারে আল্লাহ্’কে মানি আর একইসাথে ঐ রাজনীতিবিদদেরও মানি যারা আমাদের জন্য নিজেদের ইচ্ছেমতো আইন-কানুন তৈরী করে তার মানে দাঁড়ায়, আমরা ধর্মীয় ও আধ্যাত্বিক ব্যাপারে আল্লাহ্’কে ইলাহ মানলেও রাজনৈতিক বিষয়ে ইলাহ মানছি আমাদের রাজনীতিবিদদেরকে। অতএব বোঝা গেল যে, ইলাহ শব্দের মানে অনেক ব্যাপক এবং আল্লাহ্’কে একমাত্র ইলাহ মানার অর্থ এই ব্যাপক অর্থেই তাকে মানা।
অতএব, একজন মুসলিম আল্লাহ্’কে নিজের ইলাহ হিসেবে বিশ্বাস করলে তাকে তার জীবনের সকল ক্ষেত্রে অর্থাৎ: ধর্মীয়, পার্থিব, রাজনৈতিক সব ব্যাপারে আল্লাহ্’কেই কেবল মানতে হবে। কাজেই, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ এর উপর আকীদা বা বিশ্বাস – যা কিনা ইসলামের মূলভিত্তি – তা একই সাথে একটি আধ্যাত্বিক ও রাজনৈতিক আকীদা।
এই আকীদা দাবী করে একমাত্র মহান আল্লাহ্ তা’আলাই সকল ইবাদতের উপযুক্ত এবং কেবল তার সামনেই প্রকাশ করা হবে সকল প্রকার বিনয় ও বশ্যতা। তিনিই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, বিধান দাতা, ফায়সালাকারী, যখন যা ইচ্ছা তা করার ক্ষমতার অধিকারী, হেদায়েতদাতা, রিযিক দাতা, জীবন দাতা, মৃত্যু দাতা এবং সাহায্যকারী। তিনিই একমাত্র সত্ত্বা যার হাতে সকল রাজত্ব, ক্ষমতা এবং তিনিই যাবতীয় বিষয়ে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,
“তিনিই আল্লাহ্, তিনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই, তিনিই রাজা, তিনিই পবিত্র, তিনিই শান্তি, তিনিই নিরাপত্তা-বিধায়ক, তিনিই রক্ষক, তিনিই পরাক্রমশালী, তিনিই প্রবল, তিনিই অহংকারের অধিকারী; ওরা যাকে শরীক করে আল্লাহ্ তা হতে পবিত্র, মহান।” [সূরা হাশর : ২৩]
“সৃষ্টি করা এবং আদেশ দান তাঁর জন্যই (সংরক্ষিত)।” [সূরা আ’রাফ : ৫৪]
“কর্তৃত্বতো শুধুমাত্র আল্লাহ্’র।” [আল আন’আম: ৫৭]
ইসলামী আকীদা জীবনের সব বিষয়েই চিন্তা ও বিধি-বিধান নিয়ে এসেছে। এটা এমন আকীদা, যা থেকে ব্যাপক ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে, যে ব্যবস্থা মানুষের আমল-আখলাক ছাড়াও রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক তথা জীবনের সকল ক্ষেত্রে উদ্ভুত প্রয়োজন ও সমস্যাগুলোর সমাধান দিয়ে থাকে। ইসলামের এই আকীদা রাষ্ট্র, সংবিধান, সমস্ত আইন-কানুন এবং ঐ সমস্ত বিষয়েরও মূল ভিত্তি, যা এই আকীদা থেকে উৎসারিত হয়। এমনি ভাবে এই আকীদা ইসলামের সমস্ত চিন্তা, আহ্কাম এবং ধ্যান-ধারনারও বুনিয়াদ। মোটকথা, এটা মানুষের বাস্তব বিষয়াদি সমাধান করার আকীদা। এই আকীদা সমাজ ও রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত বিধায় এটি রাজনৈতিক আকীদাও বটে। এজন্যই এই আকীদা ইসলামের দাওয়াতকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া, এর হেফাযত করা, একে রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করা, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এর পৃষ্ঠপোষকতা করা, একে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা, অব্যাহত রাখা এবং সরকারের পক্ষ থেকে তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অবহেলা দেখা দিলে তার প্রতিকারের ব্যবস্থা করা ইত্যাদির বাস্তবায়ন দাবী করে। অতএব, ইসলামের রাজনৈতিক আকীদা হচ্ছে পরিপূর্ণ ও ব্যাপক যা জীবনের সকল ক্ষেত্রকেই বেষ্টন করে। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“আমি আপনার প্রতি এমন কিতাব নাযিল করেছি যা প্রত্যেক বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা।” [সূরা নাহল : ৮৯]
এসব কিছু থেকেই এটা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইসলামের এই মূল কালেমাটি একইসাথে আধ্যাত্বিক এবং রাজনৈতিক। একদিকে এটা আল্লাহ্’র সাথে মানুষের সম্পর্কের রূপরেখা দেয় এবং ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে মানুষকে জান্নাতে যাবার পথ দেখায় আর অন্যদিকে একই সাথে আল্লাহ্ ছাড়া আর সব নেতৃত্ব-কতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে, ফেরাউনের মতো শাসকদের উৎখাতের ডাক দেয়। এই কালেমা অত্যাচারী, খোদাদ্রোহী, জালেম শাসকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রাম চালিয়ে তাদেরকে উৎখাতের মাধ্যমে শাসন ব্যবস্থায় আল্লাহ্’র একক কতৃত্ব তথা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’র সামগ্রিক অর্থের বাস্তবায়ন দাবী করে।
ইসলাম পৃথিবীতে এসেছে এই সত্যটি প্রতিষ্ঠিত করতে যে ব্যক্তিগত ইবাদত, সামাজিক ব্যবস্থাপনা এবং রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি সমস্ত ব্যাপারে আর সব মিথ্যা ইলাহ’কে প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহ্’কেই (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) একমাত্র ‘ইলাহ’ বলে মানতে হবে এবং তাঁর কাছে থেকে আসা জীবন ব্যবস্থা ইসলামের মাধ্যমেই সব কিছু পরিচালনা করতে হবে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এই একটি মাত্র বাক্য নিয়েই মক্কার পুরো নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। মক্কার কাফেররা এই কালেমার অর্থ বুঝতে পেরেছিল বলেই এটাকে তাদের কতৃত্বের অবসান হিসেবে দেখেছিল এবং সর্বশক্তি দিয়ে এই কালেমার প্রতিষ্ঠা প্রতিহত করতে চেয়েছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের বলেছিলেন – “আমার এক হাতে সূর্য, অন্য হাতে চন্দ্র এনে দিলেও এর প্রচার বন্ধ হবে না।” আবু তালিবের মৃত্যুশয্যায় আবু জেহেলসহ সমস্ত কুরাইশ নেতৃবৃন্দ তার কাছে এসে মুহাম্মদ (সা) এর সাথে শেষ আপোষ-রফা করতে চাইলে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তাদের বলেন, “তোমরা আমাকে একটা মাত্র কথা দাও, যার ফলে তোমরা আরব জাহানের অধিকর্তা হয়ে যাবে এবং অনারব বিশ্ব তোমাদের বশ্যতা মেনে নেবে।” আবু জেহেল তখন বললো; “বেশ! তোমার পিতার কসম এরূপ হলে একটা কেন আমরা দশটা কথা দিতে রাজী।” তিনি বললেন : “তা হলে তোমরা বল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। তিনি (আল্লাহ্) ছাড়া আর যাদের উপাসনা তোমরা করো তাদের সবাইকে পরিত্যাগ করো।” একথা শুনে তারা এই বলে চলে গেলো যে, “হে মুহাম্মদ (সা)! তুমি সব ইলাহ’কে এক ইলাহে পর্যবসিত করতে চাও।”কেননা কাফের নেতৃবৃন্দ বুঝতে পেরেছিলো যে এই বাণীর কছে নিজেদের সমর্পণ করলে তাদের বর্তমান কতৃত্ব আর থাকবে না বরং সব বিষয় ইসলামের কতৃত্বে পরিচালিত হবে। আর তাদের প্রতি রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর এই আহ্বানের মাধ্যমে এটাও সুস্পষ্ট যে এই কালেমার চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে আরব অনারব তথা সমগ্র বিশ্বের উপর ইসলামের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা। তৎকালীন বিশ্বের বিভিন্ন রাজন্যবর্গের প্রতি তাঁর পত্রেও কালেমার এই আহ্বানের মর্মার্থ সুস্পষ্ট। আবিসিনিয়ার রাজা নাজ্জাশীর কাছে তিনি (সা) লিখেছেন, “আমি আপনাকে সেই একক অদ্বিতীয় উপাস্যের দিকে আহ্বান করছি। আপনি আমার আনুগত্য স্বীকার করুন। আমি আপনাকে এবং আপনার বাহিনীসমূহকে মহান আল্লাহ্’র দিকে আহ্বান করছি।” রোম সম্রাটের কাছে তিনি লিখেন, “আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করে নিন, নিরাপত্তা লাভ করবেন।” পারস্য সম্রাটকেও অনুরূপ পত্র লিখেন। মিশরের শাসক মুকাওকিসকে লিখেন, “আমি তোমাকে আল্লাহ্’র একত্বে বিশ্বাসের দাওয়াত দিচ্ছি। যদি তুমি স্বীকার করে নাও, তবে এ হবে তোমার সৌভাগ্য, আর যদি তুমি তা প্রত্যাখ্যান কর তবে এ হবে তোমার দূর্ভাগ্য।” বাহরাইনের শাসক মুনযিরকে লিখেন, “যদি ইসলাম গ্রহণ কর, তবে শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করবে এবং তোমার হাতে যা কিছু আছে আল্লাহ্ তা তোমারই হাতে ছেড়ে দেবেন। জেনে রেখো, অচিরেই আমার দ্বীন ভূ-ভাগের সেই প্রান্ত অবধি পৌঁছবে যতদূর ঘোড়া ও উট পৌঁছাতে পারে।” সিরিয়ার বাদশাহ্কে লিখেন “আমি আপনাকে লা শরীক আল্লাহ্’র প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। আপনি যদি ঈমান আনেন, তবে আপনার রাজত্ব বহাল থাকবে।” ওমানের রাজন্যদ্বয়কে লিখেন, “…যদি তোমরা আমার আহ্বানকে অস্বীকার কর তবে অচিরেই আমার নবুয়্যাত তোমাদের রাজত্বের উপর প্রভাব বিস্তার করবে।” এভাবে তিনি তৎকালীন পুরো বিশ্বকে এই বাণীর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে ইসলামের কতৃত্বকে মেনে নেয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছিলেন।
আজ আবার মুসলিম উম্মাহ’কে পুনর্জাগরিত করতে হলে আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর উদাহরণ অনুসরণ করে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’কে আমাদের জীবনের ভিত্তি বানানো এবং এই কালেমার ভিত্তিতেই শাসন ও কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য সংগ্রাম শুরু করতে হবে। এই সংগ্রাম অবশ্যই হতে হবে সুসংগঠিত যা শাসন কতৃপক্ষের পাঁজরকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিবে, তাদেরকে সম্মানের আসন থেকে নামিয়ে জনগণের সামনে লাঞ্ছিত-অপদস্থ করবে, জনগণকে উদ্বুদ্ধ করবে ঐ সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হতে এবং প্রতিবাদী হাত ও আঙ্গুলের সংখ্যা এমনভাবে বাড়াবে যেটা শাসন কর্তৃপক্ষের গলার চারপাশে চেপে বসে তাদের শ্বাসরুদ্ধ করে তাদের ক্ষমতা পুরোপুরি শেষ করে দিবে। এই সংগ্রাম চালিয়ে যাবার ক্ষেত্রে আমাদেরকে শাসন কতৃপক্ষের পক্ষ হতে ক্ষুধা, দারিদ্র, কারাবাস, নির্যাতন ইত্যাদির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে এবং সেই সাথে প্রস্তুত থাকতে হবে আমাদের সময়, প্রচেষ্টা, সম্পদ এমনকি জীবনকে উৎসর্গ করার জন্য।
সমাজ ও এর উপাদানসমূহ

সমাজ বলা হয় মানুষের এমন সমষ্টিকে যা একই চিন্তা, একই অনুভূতি-এবং একই ব্যবস্থার বন্ধনে আবদ্ধ। সমাজ হচ্ছে অনেক ব্যক্তির এমন সমন্বয়ের নাম, যেখানে বিভিন্ন প্রকার সম্পর্ক বিদ্যমান। শুধু কতিপয় মানুষ একত্রিত হওয়াকেই সমাজ বলেনা। কারন অনেক মানুষ কোথাও একত্রিত হলে তাকে একটি দল বা সমাবেশ বলা যেতে পারে, একে সমাজ বলা যায় না। যে সব উপাদান একটি সমাজকে সংগঠিত করে, সে গুলো হচ্ছে কতিপয় সম্পর্ক তথা রীতি নীতি। অন্য কথায় বলা যায় সমাজ হচ্ছে ব্যক্তি, চিন্তা, আবেগ-অনুভূতি এবং নিয়ম পদ্ধতিগুলোর সমষ্টির নাম। তাই কোন সমাজকে পরিশুদ্ধ করতে হলে সে সমাজে বসবাসকারী ব্যক্তিদের চিন্তা, অনুভূতি এবং সেখানে প্রচলিত নিয়ম-নীতি, শাসনব্যবস্থা ইত্যাদির শুদ্ধতা সাধনের মাধ্যমেই কেবল তা করা সম্ভব। বিভিন্ন সমাজে প্রচলিত বিশ্বাস, আবেগ-অনুভূতি, সমস্যা সমাধানের নিয়ম-পদ্ধতিগুলো ভিন্ন ভিন্ন। ঠিক এ কারণেই সমাজও হয় ভিন্ন ভিন্ন। যেমন ইসলামী সমাজ, সমাজতান্ত্রিক সমাজ, পুঁজিবাদী সমাজ ইত্যাদি।
পশ্চিমা সভ্যতা জীবনের সব বিষয়কে হালকাভাবে দেখে তাই সমাজ সম্পর্কে পশ্চিমা পূঁজিবাদী দৃষ্টিভঙ্গিও অগভীর হওয়াই স্বাভাবিক। তারা সমাজকে শুধুমাত্র কিছু ব্যক্তিমানুষের সমষ্টি বলেই মনে করে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় মার্গারেট থ্যাচার একবার এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতায় বলেছিলেন, “সমাজ হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে কিছু ব্যক্তি ও পরিবারের সমষ্টি মাত্র।”
মুসলিম উম্মাহ্র অধঃপতনের এই দীর্ঘ সময়কালে অনেক সৎ সংস্কারক ও অনেক সাহসী আন্দোলনের আবির্ভাব ঘটেছে। তারা আন্তরিকভাবেই উম্মাহ্র এই খারাপ অবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন বা করছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের মধ্যে অনেকেই সমাজ সম্পর্কে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা অনেকাংশেই প্রভাবিত হয়েছেন- অর্থাৎ তারাও মনে করেছেন সমাজ হলো আসলে অনেকগুলো ব্যক্তি। তাই তাঁরা চেষ্টা করেছেন ব্যক্তিকে ভাল মুসলমানে পরিণত করতে; তাকে ভাল আদব কায়দা, ধর্মীয় রীতি নীতি শেখাতে এবং চিন্তা করেছেন যে অনেকগুলো ব্যক্তি যখন ভাল হয়ে যাবে তখন সমাজ ঠিক হয়ে যাবে। যদিও তাদের আন্তরিক চেষ্টার ফলে অনেক মানুষ সে সব আন্দোলন ও কর্মসূচীতে অন্তর্ভূক্ত হয়েছেন কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো সমাজের বাস্তব অবস্থা অর্থাৎ সমাজে বিদ্যমান অপরাধ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, নিরাপত্তাহীনতা, বিশৃংখলা, নৈরাজ্য ইত্যাদির তো কোনও পরিবর্তনই হয়নি বরং এগুলো দিন দিন বেড়েই চলেছে।
সমাজ সর্ম্পকে গভীরতর বিশ্লেষণ:আমরা যদি সমাজের সামগ্রিক ও গভীরতর বিশ্লেষণ পেতে চাই তাহলে বাস্তবে মানুষ বলতে কী বোঝায় তা নিয়ে শুরু করতে হবে। আমরা মানুষের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখব যে প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই কিছু জৈবিক চাহিদা ও প্রবৃত্তি আছে। যেমন, তাকে খাদ্য গ্রহণ ও পানীয় পান করতে হয় (জৈবিক চাহিদা); তার মধ্যে অধিকতর সম্পদ ও অর্থ উপার্জন করার ও তা দিয়ে জীবনমান উন্নত করার আকাংখা আছে; তার স্বভাবগত প্রবণতা হচ্ছে বৈরী পরিবেশে নিজেকে রক্ষা করা এবং বেঁচে থাকা (টিকে থাকার প্রবৃত্তি)। এছাড়াও বিপরীত লিঙ্গের প্রতি তার স্বাভাবিক আকর্ষণ আছে এবং সে সংসার করতে চায় (জনন প্রবৃত্তি)। নারী-পুরুষ, যুবক-বৃদ্ধ, মুসলমান- অমুসলমান সবার জন্যই এগুলো অনস্বীকার্য বাস্তবতা।
জৈবিক চাহিদা ও প্রবৃত্তিগুলো পূরণের প্রয়োজন ও তাড়নাই মানুষকে পারস্পরিক সম্পর্ক ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসে। মানুষ একা বিচ্ছিন্নভাবে এসব চাহিদা ও প্রবৃত্তি পূরণ করতে পারে না। তাই মানুষ একটা সমাজের মধ্যে থাকে যাতে করে তারা পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সমঝোতার ভিত্তিতে এসব চাহিদা পূরণ করতে পারে।
মানুষ যখন পরস্পরের সাথে ক্রিয়া করে বা সম্পর্ক স্থাপন করে তখন বাকী প্রাণীজগতের তুলনায় সে মৌলিকভাবে ভিন্ন। মানুষের চিন্তা করার এক অনন্য ক্ষমতা আছে যার সাহায্যে সে বিভিন্ন ধারণায় (concept) উপনীত হতে পারে যেগুলো তার জৈবিক চাহিদা ও প্রবৃত্তিগুলো পূরণের উপায় বা পদ্ধতি ঠিক করে দেয়। অর্থাৎ এই ধারণা বা বিশ্বাসগুলো তার চাহিদা ও প্রবৃত্তিগুলোকে কিছু শৃংখলা ও নিয়মের অধীনে নিয়ে আসে।
তাই মানুষ যখন কোথাও দলবদ্ধ হয়ে সমাজ প্রতিষ্ঠা করে তখন তার ভিত্তি হিসাবে কাজ করে এমন কিছু ধারণা, বিশ্বাস ও আবেগ-অনুভূতি যা তাদের সবার মধ্যে বিদ্যমান। সেই সাথে তারা কিছু নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে তাদের চাহিদা ও প্রবৃত্তিগুলো পূরণের পারস্পরিক সমঝোতায় উপনীত হয় যা তাদের বিশ্বাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ অথবা বিশ্বাস থেকে উৎসারিত। তারপর তারা একটি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করে যা বাস্তবে এসব নিয়ম-পদ্ধতি প্রয়োগ ও রক্ষা করার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এই কর্তৃপক্ষটিই রাষ্ট্র বা সরকার।
অতএব সমাজ নিম্নোক্ত উপাদানগুলোর সমন্বয়ে গঠিত:
১. ব্যক্তি
২. ব্যক্তিবর্গের (জনসাধারণের) মধ্যে প্রচলিত বা লালিত সাধারণ (common) ধ্যানধারনা বা বিশ্বাস
৩. জনগণের সাধারণ (common) বিশ্বাস প্রসূত আবেগ-অনুভূতি
৪. তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের নিয়ম পদ্ধতি এবং তা বাস্তবায়ন ও রক্ষা করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ (রাষ্ট্র/সরকার/সামাজিক নেতৃত্ব ইত্যাদি)।
সমাজে ব্যক্তিদের মধ্যে প্রচলিত সাধারণ (common) বিশ্বাসগুলোই সামাজিক চিন্তা ও অনুভূতি হিসেবে প্রকাশ পায়, যা জীবনের প্রতিক্ষেত্রে ব্যক্তির আচরণ এবং বিভিনড়ব মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ককে কতগুলো নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসে। এই চিন্তা ও বিশ্বাসগুলো তাদের কাজের মানদন্ড ঠিক করে এবং সমাজ ব্যবস্থার সাথে তাদের সম্পর্ককেও বিন্যস্ত করে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, আমরা কিভাবে অস্তিত্বে এলাম? আমাদের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য কি? আমাদের মৃত্যুর পরে কি ঘটবে? ইত্যাদি মৌলিক প্রশ্নের জবাবে যখন বলা হয় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ্র ইবাদত করা আর মৃত্যুর পর আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে বিচার দিবস আর জান্নাত অথবা জাহান্নাম এবং জনগণ যখন চিন্তা-ভাবনা করে বুঝেশুনে এই বিষয়গুলো ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করে তখন তা তাদের জীবনের কার্যাবলীর ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ধরনের সর্বজনগ্রাহ্য মানদন্ডের জন্ম দেয়। সে ক্ষেত্রে জনগণ মহান স্রষ্টা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুল (সা) এর আদেশ ও নিষেধকেই তাদের কাজের মাপকাঠি হিসেবে গ্রহন করে। কেননা রাসুল (সা) বলেছেন,
“তোমাদের কেউই (সত্যিকারভাবে) বিশ্বাস করে না, যতক্ষণ না আমি যা নিয়ে এসেছি সে অনুসারে তার প্রবণতা তৈরী হয়“। এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন,
“(আমরা) আল্লাহ্র কাছ থেকে আমাদের রং নিই, রঞ্জিত করার ক্ষেত্রে কে আল্লাহ্’র চাইতে বেশী উত্তম? আমরা তাঁরই ইবাদতকারী।” [সূরা বাকারা:১৩৮]সমাজের কোন বড় কিংবা প্রভাবশালী জনগোষ্ঠী যে সাধারণ (common) চিন্তা ভাবনাগুলো ধারণ করে, ব্যাপকতর পরিসরে সেগুলো দ্বারাই গোটা সমাজের সাধারণ অনুভূতিগুলো তৈরী হয়। একটি ইসলামিক সমাজের পছন্দ- অপছন্দ, এর লোকাচার ও অনুরাগ-অনুভূতি কুরআন ও সুন্নাহ’র রঙে রঞ্জিত হবে। এসব সাধারণ চিন্তা ও অনুভূতিগুলোই সাধারণত জনমত হিসেবে পরিচিত।
জনগণের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার এই বন্ধন ও নিয়ন্ত্রক সমূহের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল সরকার, যাকে অবশ্যই জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। সরকার সরাসরি জনমতকে নতুনভাবে ছাঁচ দিতে পারে, রাষ্ট্রের ভিতরে জনগণের কার্যাবলী এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে ইসলামিক রাষ্ট্রের সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবিত করতে পারে। সরাসরি আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এবং অন্যান্যভাবে, যেমন বিশেষ কোন মতবাদের প্রচার ও মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে এ কাজগুলো হয়ে থাকে। সমাজে প্রভাবশালী জনগোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানের (যেমন সরকারের) ভূমিকা কি হওয়া উচিত তা একটি বিখ্যাত হাদীসে বিবৃত হয়েছে,
যেখানে রাসূল (সা) বলেছেন,
“যারা আল্লাহ্র হুকুম মেনে চলে তাদের সাথে থেকে যারা সেগুলো (আল্লাহ্’র হুকুম)-কে নিজেদের প্রবৃত্তির খেয়ালে লঙ্ঘন করে, (এরা উভয়ই) যেন তাদের মত যারা একই জাহাজে আরোহণ করে। তাদের একাংশ জাহাজের উপরের অংশে তাদের জায়গা করে নিয়েছে এবং অন্যরা এর নীচের অংশে নিজেদের জায়গা করে নেয়। যখন নিচের লোকদের পিপাসা নিবৃত্ত করার প্রয়োজন হয় তখন তাদেরকে জাহাজের উপরের অংশের লোকদের অতিক্রম করে যেতে হয়। (তাই) তারা (নিচের অংশের লোকেরা) নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে নিল, ‘আমরা যদি জাহাজের নীচের দিকে একটা ফুটো করে নিই তাহলে জাহাজের উপরের অংশের লোকদের কোন সমস্যা করব না।’ এখন যদি উপরের অংশের অধিকারীরা নিচের ডেক-এর লোকদেরকে এ কাজ করতে দেয় তবে নিশ্চিতভাবেই তারা সবাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। অবশ্য তারা (উপরের অংশের লোক) যদি তাদের (নীচের লোকদের)কে এ কাজ থেকে বিরত রাখে, (তবে) তারা (উপরের অংশের লোক) রক্ষা পাবে এবং এভাবে (জাহাজের) সবাই রক্ষা পাবে। ” (বুখারী )
সুতরাং সমাজ ব্যবস্থার একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে, সমাজকে এমন সব নির্দিষ্ট কার্যাবলী থেকে বিরত রাখা, যা ঘটলে তা হবে পুরো জাতির জন্য ক্ষতিকর। এ ধরণের কার্যাবলীর মধ্যে মদ্যপান, ব্যাভিচার, চুরি, ধর্মত্যাগ উল্লেখযোগ্য। এসব ক্ষেত্রে অপরাধীকে শাস্তি দেয়া শুধুমাত্র ব্যক্তিকে পরিশুদ্ধ করার জন্যই যে প্রয়োজন তা নয় বরং গোটা জাতি ও সমাজকে টিকিয়ে রাখার জন্যও এ ব্যবস্থা অত্যাবশ্যক। হয়রত ওসমান ইবনে আফ্ফান (রাঃ) এর উক্তিতেও বলা হয়েছে, “যারা কুরআনের শিক্ষা দ্বারা বিরত হয় না, আল্লাহ্ তাদেরকে সুলতানের ক্ষমতা দিয়ে বিরত করেন”।
যেহেতু ব্যক্তি, জনগণের সাধারণ (common) চিন্তা-অনুভূতি-আবেগ, তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের নিয়ম পদ্ধতি এবং তা বাস্তবায়ন ও রক্ষা করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ ইত্যাদির সমন্বয়ে সমাজ গঠিত হয়, সেহেতু কোন সমাজের বেশীরভাগ লোক মুসলমান হলেও যে চিন্তাভাবনা তারা নিজেদের ভেতর লালন করে সেগুলো যদি পুঁজিবাদী তথা ভোগবাদী ও স্বেচ্ছাচারী হয়; যে অনুভূতি তারা বহন করে তা যদি হয় সংকীর্ণ দেশতান্ত্রিক বা বর্ণ/ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাবাদী অথবা যে রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা তাদের সম্পর্কগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে তা যদি হয় পুঁজিবাদী-তথা আল্লাহ্র বদলে মানুষের সার্বভৌমত্ব ভিত্তিক তবে সে সমাজকে ইসলামি সমাজ বলা যাবে না।জিহাদ নিয়ে বিভিন্ন বিভ্রান্তি ও এর জবাব

‘জিহাদ’ শব্দটি এসেছে ‘জাহাদা’ শব্দ থেকে যার অর্থ ‘দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া’। আরবদের কাছে শাব্দিকভাবে ‘জিহাদ’- এর অর্থ হলো ‘কোনো কাজ বা মত প্রকাশ করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা বা কঠোর সাধনা করা’। আরো যেসব অর্থে জিহাদ শব্দটি ব্যবহার হয়:
১. اَلْجَد বা প্রচেষ্টা ব্যয় করা
২. الطَّاقَةُ বা কঠোর সাধনা করা
৩. السَّعْىُ বা চেষ্টা করা
৪. اَلْمُشَقَّةُ বা কষ্ট বহন করা
৫. بَذْلُ القُوَّةِ বা শক্তি ব্যয় করা
৬. النِهايَةُ والغايَةُ বা শেষ পর্যায়ে পৌঁছা
৭. الارْضُ الصلبة বা শক্তভূমি
৮. الكفاح বা সংগ্রাম করাইমাম নিশাপুরী (রহ)-এর তাফসীরে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, ‘আল-জিহাদ অর্থ হলো কোনো উদ্দেশ্য বা ইচ্ছা বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা চালানো’।
মোট কথা, শাব্দিক অর্থে ‘জিহাদ’-এর সংজ্ঞা হলো, অন্তত দুটি পক্ষের মধ্যে সর্বাত্মক চেষ্টা ও সক্ষমতার প্রকাশ ঘটানো।
শাব্দিক অর্থ মোতাবেক, এই সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সশস্ত্র কিংবা নিরস্ত্র উভয়ই হতে পারে; অর্থ ব্যয় করেও হতে পারে, ব্যয় না করেও হতে পারে। একইভাবে, দুটো পরস্পরবিরোধী প্রবৃত্তির মধ্যেও পরস্পরকে দমানোর জিহাদ (সর্বাত্মক প্রচেষ্টা) হতে পারে। এই জিহাদ (সর্বাত্মক প্রচেষ্টা) কেবল কথার মাধ্যমেও হতে পারে, অথবা কোনো একটি কাজ না করা বা কোনো একটি বিশেষ কথা না বলার মাধ্যমেও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, কোনো ব্যক্তিকে যদি তার পিতামাতা আদেশ করে আল্লাহকে অমান্য করার জন্য আর সেই ব্যক্তি যদি পিতামাতার নির্দেশ অমান্য করে ও সবর অবলম্বন করে, তবে তা-ও জিহাদ। আবার কোনো ব্যক্তি যদি প্রবৃত্তির তাড়নাকে অগ্রাহ্য করে হারাম কাজ থেকে বিরত থাকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, তবে তা-ও জিহাদ।
জালালাইন শরীফ-এর হাশিয়াতুন জামাল-এ আছে: ‘জিহাদ হলো প্রতিকূলতার মুখে সবর করা। এটা যুদ্ধের সময়ও হতে পারে, নফসের মধ্যেও হতে পারে।’
‘জিহাদ’ শব্দের এই শাব্দিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী মুসলিমদের জিহাদের প্রতিপক্ষ হতে পারে নিজের প্রবৃত্তি, শয়তান, দখলদার কিংবা কাফের শক্তি। পাশাপাশি, এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জিহাদ হতে পারে আল্লাহর পথেও (জিহাদ ফি সাবীলিল্লাহ)। তাই এই জিহাদ হতে পারে আল্লাহকে খুশি করার জন্য, আবার হতে পারে শয়তানকে খুশি করার জন্যও। যেমন: কাফেরদের জিহাদ হলো শয়তানকে খুশি করার জন্য। ইমাম নিশাপুরী (রহ) বলেন, ‘এটি [জিহাদ] হলো কোনো উদ্দেশ্য বা ইচ্ছাকে অর্জন করার জন্য প্রচেষ্টা চালানো, উদ্দেশ্যকারীর উদ্দেশ্যের ধরন যা-ই হোক না কেন।’ কাফের পিতারা তাদের মুমিন সন্তানদের সত্য বিশ্বাসকে পরিত্যাগ করানোর জন্য যেসব কাজ করতো, সেগুলোকে কুরআনে জিহাদ বলা হয়েছে:
وَإِن جَاهَدَاكَ عَلَىٰ أَن تُشْرِكَ بِى مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلاَ تُطِعْهُمَا
“তোমার পিতামাতা যদি জিহাদ (সর্বাত্মক প্রচেষ্টা) করে যে, তুমি আমার সাথে এমন কিছু শরীক কর যে সম্বন্ধে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তাদেরকে অমান্য কর।” [সূরা লুকমান: ১৫]
ইসলামী শরীয়াতে ‘জিহাদ’ শব্দটিকে এর সাধারণ শাব্দিক অর্থে না রেখে কুরআন-হাদীসে ব্যবহৃত নির্দিষ্ট অর্থে সীমিত করা হয়েছে। শরীয়াতের পরিভাষায় জিহাদের অর্থ হচ্ছে ‘আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার জন্য সরাসরি বা আর্থিকভাবে বা মুখ দিয়ে বা অন্য কোনোভাবে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো’। এই বিশেষ অর্থটি প্রদান করা হয়েছে মদীনায়, যেখানে সশস্ত্র যুদ্ধকে ফরয করা হয়েছিল। মক্কায় সশস্ত্র যুদ্ধের অনুমতি ছিল না, তাই মাক্কী সূরাসমূহে ‘জিহাদ’ শব্দটি শরয়ী অর্থে নয়, বরং শাব্দিক অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন: সূরা লুকমানের ১৫নং আয়াত, যেটি ইতোমধ্যে উদ্ধৃত হয়েছে। এরূপ আরো উদাহরণ হলো:
وَمَن جَاهَدَ فَإِنَّمَا يُجَاهِدُ لِنَفْسِهِ إِنَّ ٱللَّهَ لَغَنِيٌّ عَنِ ٱلْعَالَمِينَ
“আর যে ব্যক্তি সাধনা (জিহাদ) করে, সে তো নিজেরই জন্য সাধনা করে। আল্লাহ্ তো বিশ্বজগত থেকে অমুখাপেক্ষী।” [সূরা আনকাবুত: ৬]
وَوَصَّيْنَا ٱلإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْناً وَإِن جَاهَدَاكَ لِتُشْرِكَ بِى مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلاَ تُطِعْهُمَآ
“আমি মানুষকে স্বীয় মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে আদেশ দিয়েছি, তবে তারা যদি তোমার উপর চাপ (জিহাদ) দেয়, আমার সাথে এমন কিছু শরীক করতে যে সম্বন্ধে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, এক্ষেত্রে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না।” [সূরা আনকাবুত: ৮]
وَٱلَّذِينَ جَاهَدُواْ فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ ٱللَّهَ لَمَعَ ٱلْمُحْسِنِينَ
আর যারা আমার উদ্দেশ্যে কষ্ট সহ্য (জিহাদ) করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয় আল্লাহ নেককারদের সাথে আছেন। [সূরা আনকাবুত: ৬৯]
فَلاَ تُطِعِ ٱلْكَافِرِينَ وَجَاهِدْهُمْ بِهِ جِهَاداً كَبيراً
“অতএব আপনি কাফেরদের আনুগত্য করবেন না এবং তাদের সঙ্গে কুরআনের সাহায্যে কঠোর সংগ্রাম (জিহাদ) চালিয়ে যান।” [সূরা ফুরকান: ৫২]
মদীনায় অবতীর্ণ ২৬টি আয়াতে জিহাদের বিষয়টি এসেছে এবং এগুলোর অধিকাংশই সুস্পষ্টভাবে ‘যুদ্ধ’ (কিতাল) অর্থ বহন করে। যেমন:
لاَّ يَسْتَوِى ٱلْقَاعِدُونَ مِنَ ٱلْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُوْلِى ٱلضَّرَرِ وَٱلْمُجَاهِدُونَ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فَضَّلَ ٱللَّهُ ٱلْمُجَاهِدِينَ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ عَلَى ٱلْقَاعِدِينَ دَرَجَةً وَكُـلاًّ وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلْحُسْنَىٰ وَفَضَّلَ ٱللَّهُ ٱلْمُجَاهِدِينَ عَلَى ٱلْقَاعِدِينَ أَجْراً عَظِيماً
“সমান নয় সেসব মুমিন যারা বিনা ওজরে ঘরে বসে থাকে এবং ওইসব মুমিন যারা আল্লাহর পথে নিজেদের জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করে। যারা স্বীয় জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন তাদের ওপর যারা ঘরে বসে থাকে। আর প্রত্যেককেই আল্লাহ কল্যাণের ওয়াদা করেছেন। আল্লাহ মুজাহিদীনদের মহান পুরস্কারের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন যারা ঘরে বসে থাকে তাদের ওপর।” [সূরা নিসা: ৯৫]
এই আয়াতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, জিহাদ মানে যুদ্ধের জন্য বের হওয়া এবং ঘরে থাকার চেয়ে সেটা উত্তম। সূরা তওবায় রয়েছে:
ٱنْفِرُواْ خِفَافاً وَثِقَالاً وَجَاهِدُواْ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ
“তোমরা অভিযানে বের হয়ে পড়, হালকা অথবা ভারী অবস্থায়; এবং জিহাদ করো আল্লাহর পথে নিজেদের মাল দিয়ে এবং নিজেদের জান দিয়ে। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা জানতে।” [সূরা তাওবা: ৪১]
ঐতিহাসিক তাবুক যুদ্ধের সময় প্রেক্ষাপটে এই আয়াত নাযিল হয়। তাবুক যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল খেজুর কাটার মৌসুমে। তখন গরমও ছিল খুব বেশি। তাই কেউ কেউ ক্ষেত-খামার, ধন-সম্পদ নষ্ট হয়ে যাওয়ার অজুহাতে, কেউ পারিবারিক কাজের অজুহাতে, কেউ বা অসুস্থতার বাহানা তুলে যুদ্ধ না যাওয়ার অনুমতি চাইলো। আল্লাহর তখন এই আয়াত নাযিল করে তাদের প্রার্থনা বাতিল করে দিলেন এবং ইচ্ছুক-অনিচ্ছুক, খুশি-অখুশি, সশস্ত্র-নিরস্ত্র, ধনী-গরিব সবার জন্য যে কোনো অবস্থায় যুদ্ধে যাওয়া ফরয করে দিলেন। এখানে ‘জিহাদ’ শব্দটি পরিষ্কারভাবে ‘যুদ্ধ’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। একই অর্থ রয়েছে এই সূরার ৮৮ নাম্বার আয়াতে:
لَـٰكِنِ ٱلرَّسُولُ وَٱلَّذِينَ آمَنُواْ مَعَهُ جَاهَدُواْ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ وَأُوْلَـٰئِكَ لَهُمُ ٱلْخَيْرَاتُ وَأُوْلَـٰئِكَ هُمُ ٱلْمُفْلِحُونَ
“কিন্তু রাসূল ও যারা তাঁর সঙ্গে ঈমান এনেছে, তারা জিহাদ করেছে নিজেদের মাল ও নিজেদের জান দিয়ে, তাদেরই জন্য রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ এবং তারাই প্রকৃত সফলকাম।” [সূরা তাওবা: ৮৮]
সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, মাদানী আয়াতসমূহে ‘জিহাদ’ বলতে যুদ্ধ/লড়াইকে বোঝানো হয়েছে। যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ, সাজ-সরঞ্জাম ইত্যাদিও এর অন্তর্ভুক্ত। এই আয়াতসমূহ জিহাদের পূর্বশর্ত বা জিহাদের বৈধতার শর্তও স্পষ্ট করে দেয়। আর এই শর্তগুলো হলো: অমুসলিমদেরকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দেওয়া এবং/অথবা ইসলামী রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব মেনে নেওয়া।
রাসূল (সা)-এর শতশত হাদীসে ‘জিহাদ’-কে শরয়ী অর্থে অর্থাৎ যুদ্ধ ও যুদ্ধের উপায়-উপকরণ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন: আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা) বলেছেন,
مَثَلُ الْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ الصَّائِمِ الْقَائِمِ الْقَانِتِ بِآيَاتِ اللَّهِ لَا يَفْتُرُ مِنْ صِيَامٍ وَلَا صَلَاةٍ حَتَّى يَرْجِعَ الْمُجَاهِدُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ تَعَالَى
“আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদের তুলনা ওইরূপ রোযাদার, যে নামাযে দাঁড়িয়ে আল্লাহর আয়াত তিলাওয়াত করে যাচ্ছে – যে তার রোযা ও নামায আদায়ে বিন্দুমাত্র ক্লান্তি প্রকাশ করে না; (সে এরূপ সওয়াব পেতেই থাকবে) যতক্ষণ না আল্লাহ তা’আলার রাস্তায় মুজাহিদ ফিরে আসে।” [বুখারী, মুসলিম]
এই হাদীসে পরিষ্কারভাবেই ‘মুজাহিদ’ বলতে যোদ্ধাকে বোঝানো হয়েছে – যে যোদ্ধা ‘যতক্ষণ না ফিরে আসে’ ততক্ষণ পর্যন্ত হাদীসে বর্ণিত সওয়াবসমূহ পেতেই থাকে। অন্য হাদীসে, আবদুল্লাহ বিন হুবশী (রা) বলেন,
قِيلَ فَأَيُّ الْجِهَادِ أَفْضَلُ قَالَ مَنْ جَاهَدَ الْمُشْرِكِينَ بِمَالِهِ وَنَفْسِهِ قِيلَ فَأَيُّ الْقَتْلِ أَشْرَفُ قَالَ مَنْ أُهَرِيقَ دَمُهُ وَعُقِرَ جَوَادُهُ
“লোকেরা রাসূল (সা)-কে জিজ্ঞেস করলো, ‘কোন জিহাদ উত্তম?’ তিনি (সা) জবাব দেন, জীবন ও সম্পদ দিয়ে মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করা। আবার জিজ্ঞেস করা হলো, কী ধরনের মৃত্যুবরণ করা উত্তম? তিনি (সা) জবাব দিলেন, ওই ব্যক্তি যার রক্ত প্রবাহিত করা হয় এবং সাথে তার সওয়ারী ঘোড়ার পাও কেটে ফেলা হয়।” [আবু দাউদ]
মুসনাদে আহমদ-এ বর্ণিত আরেকটি হাদীসে আছে,
… أَيُّ الْجِهَادِ أَفْضَلُ قَالَ مَنْ عَقَرَ جَوَادَهُ وَأُهْرِيقَ دَمُهُ
“রাসূল (সা)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল] কোন জিহাদ উত্তম? তিনি (সা) বললেন, যে (যুদ্ধরত অবস্থায়) তার ঘোড়ার পা কর্তন করে ফেলল এবং তার রক্তও প্রবাহিত হয়েছে (তার জিহাদ)।”
আরেক হাদীসে ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, রাসূল (সা) বলেছেন,
لَمَّا أُصِيبَ إِخْوَانُكُمْ بِأُحُدٍ جَعَلَ اللَّهُ أَرْوَاحَهُمْ فِي جَوْفِ طَيْرٍ خُضْرٍ تَرِدُ أَنْهَارَ الْجَنَّةِ تَأْكُلُ مِنْ ثِمَارِهَا وَتَأْوِي إِلَى قَنَادِيلَ مِنْ ذَهَبٍ مُعَلَّقَةٍ فِي ظِلِّ الْعَرْشِ فَلَمَّا وَجَدُوا طِيبَ مَأْكَلِهِمْ وَمَشْرَبِهِمْ وَمَقِيلِهِمْ قَالُوا مَنْ يُبَلِّغُ إِخْوَانَنَا عَنَّا أَنَّا أَحْيَاءٌ فِي الْجَنَّةِ نُرْزَقُ لِئَلَّا يَزْهَدُوا فِي الْجِهَادِ وَلَا يَنْكُلُوا عِنْدَ الْحَرْبِ فَقَالَ اللَّهُ سُبْحَانَهُ أَنَا أُبَلِّغُهُمْ عَنْكُمْ
“যখন উহুদ যুদ্ধে তোমাদের ভাইয়েরা নিহত হলো, আল্লাহ তাদের রুহগুলোকে সুবজ পাখির পালকের ভিতরে স্থাপন করে মুক্ত করে দেন। তাঁরা জান্নাতের ঝরণা ও উদ্যাসমূহ থেকে নিজেদের রিযিক আহরণ করেন এবং অতঃপর তাঁরা সেই আলোকধারায় ফিরে আসেন, যা তাঁদের জন্য আল্লাহর আরশের নিচে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। যখন তাঁরা নিজেদের আনন্দ ও শান্ত্মিময় জীবন প্রত্যক্ষ করলেন, তখন বললেন, ‘আমাদের আত্মীয়-স্বজনরা পৃথিবীতে আমাদের মৃত্যুতে শোকার্ত; আমাদের অবস্থা সম্পর্কে কি কেউ তাদের জানিয়ে দিতে পারে, যাতে তারা আমাদের জন্য দুঃখ না করে এবং তারাও যাতে জিহাদে (অংশগ্রহণের) চেষ্টা করে।’ তখন আল্লাহ বললেন, ‘তোমাদের এ সংবাদ তাদেরকে পৌঁছে দিচ্ছি।” এরই প্রেক্ষিতে সূরা আলে ইমরানের ১৬৯ নং আয়াত নাযিল হয়:
وَلاَ تَحْسَبَنَّ ٱلَّذِينَ قُتِلُواْ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ أَمْوَاتاً بَلْ أَحْيَاءٌ عِندَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ
“আর যারা আল্লার পথে শহীদ হয়, তাদেরকে তুমি মৃত মনে করো না। বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার নিকট জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত।” [আবু দাউদ, তাফসীরে কুরতুবী]
প্রকৃতপক্ষে সশস্ত্র যুদ্ধে অর্থাৎ জিহাদে মৃত্যুবরণ করা খোদ রাসূল (সা)-এরই একান্ত বাসনা ছিল:
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْلَا أَنَّ رِجَالًا مِنْ الْمُؤْمِنِينَ لَا تَطِيبُ أَنْفُسُهُمْ أَنْ يَتَخَلَّفُوا عَنِّي وَلَا أَجِدُ مَا أَحْمِلُهُمْ عَلَيْهِ مَا تَخَلَّفْتُ عَنْ سَرِيَّةٍ تَغْزُو فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوَدِدْتُ أَنِّي أُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ثُمَّ أُحْيَا ثُمَّ أُقْتَلُ ثُمَّ أُحْيَا ثُمَّ أُقْتَلُ ثُمَّ أُحْيَا ثُمَّ أُقْتَلُ
“সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, যদি কিছু মুমিন এমন না হতো যারা আমার সাথে জিহাদে অংশগ্রহণ না করাকে আদৌ পছন্দ করবে না, অথচ তাদের সবাইকে আমি সওয়ারী দিতে পারছি না, এই অবস্থা না হলে আল্লাহর পথে যুদ্ধরত কোনো ক্ষুদ্র সেনাদল হতেও দূরে থাকতাম না। সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, আমার কাছে অত্যন্ত পছন্দনীয় হলো, আমি আল্লাহর পথে নিহত হই, অতঃপর জীবন লাভ করি। আবার নিহত হই আবার জীবন লাভ করি এবং আবার নিহত হই তারপর আবার জীবন লাভ করি। আবার নিহত হই।” [বুখারী, মুসলিম]
শরয়ী অর্থ ও শাব্দিক অর্থের পার্থক্য
শাব্দিক অর্থ ও শরয়ী অর্থের এ পার্থক্য ইসলামের প্রত্যেকটি পরিভাষার ক্ষেত্রে রয়েছে। সুতরাং এ পার্থক্যকে না জানা অথবা না জানার ভান করা কোনো মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এরূপ পার্থক্যের কিছু উদাহরণ:
সালাত এর শাব্দিক অর্থ হলো, আগুনে পুড়ে বাঁশ বা সরু গাছ সোজা বা বাঁকা করে (ধনুক তৈরি বা অন্য কাজের) ব্যবহার উপযোগী করা। এছাড়া ব্যবহারিকভাবেও সালাত শব্দটি চার অর্থে প্রয়োগ হয়। যথা: ১. দরুদ ২. তাসবীহ ৩. রহমত ৪. ইস্তিগফার।
কিন্তু আমরা সালাত বলতে বুঝি নির্ধারিত সময়ে, বিশেষ নিয়মে, নির্দিষ্ট কিছু ইবাদত করাকে।
সাওম এর আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। কিন্তু সাওম বলতে আমরা বুঝি, নির্ধারিত সময়ে বিশেষ নিয়মে, নির্দিষ্ট কিছু ইবাদত করাকে।
হজ্জ এর আভিধানিক অর্থ ইচ্ছা করা। কিন্তু হজ্জ বলতে আমরা বুঝি, নির্ধারিত সময়ে বিশেষ স্থানে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম বিশিষ্ট ইবাদত পালন করাকে।
যাকাত এর আভিধানিক অর্থ পবিত্র করা, বৃদ্ধি করা। কিন্তু যাকাত বলতে আমরা বুঝি, বিশেষ শর্তে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ, নির্ধারিত খাতে ব্যয় করা।
একইভাবে জিহাদ শব্দের আভিধানিক অর্থ কষ্ট করা, চেষ্টা করা হলেও জিহাদ বলতে আমরা বুঝবো ইসলামী খিলাফতের পক্ষ থেকে, খলীফার নির্দেশে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে।
আমরা জানি হযরত মুহাম্মদ (সা) ও সাহাবায়ে কিরামের মক্কী জীবনে দাওয়াত-তাবলীগ ছিল, আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকারসহ যিকির-ফিকির ও জালিমের সামনে হক কথা বলা ছিল, ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। কিন্তু এতসব কর্মকাণ্ডকে মক্কী জীবনে জিহাদ বলা হয়নি। সাহাবায়ে কিরামও দাবি করেননি এসব সর্বাত্মক প্রচেষ্টা বা প্রাণান্তকর চেষ্টার নাম জিহাদ ছিল।
শরয়ী অর্থে জিহাদের প্রয়োগ
কুরআন-সুন্নাহর এসব উদাহরণ থেকে বোঝা যায় যে, আল্লাহ ‘জিহাদ’ শব্দটিকে সাধারণ অর্থ থেকে বিশেষ অর্থ ‘কিতাল’ বা যুদ্ধ ও যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট প্রত্যক্ষ পরোক্ষ বিষয়াদিতে রূপান্ত্মর করেছেন। উল্লিখিত আয়াত ও হাদীস-সহ আরো বিপুল সংখ্যক আয়াত-হাদীসে ‘জিহাদ’-কে যুদ্ধ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। এজন্যই দেখা যায় যে, ইসলামী আইনশাস্ত্রের গ্রন্থসমূহে আইবিদগণ ‘জিহাদ’-কে শরয়ী অর্থে তথা যুদ্ধ অর্থেই ব্যবহার করেছেন।
হানাফী মাযহাবের আইন গ্রন্থ ‘বাদাইস সানায়ী’-হতে জানা যায়, ‘জিহাদের শাব্দিক অর্থ চেষ্টা করা। শরয়ী অর্থে জিহাদ হলো নফস, অর্থ ইত্যাদি সবকিছু দিয়ে যুদ্ধের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ও শক্তি খাটানো।’ অপর হানাফী গ্রন্থ شَرْحُ الْوِقَايَةِ -এর গ্রন্থকার বলেন:
اَلْجِهَادُ هُوَ الدُّعَاءُ إِلَى الدِّيْنِ الْحَقِ وَالْقِتَالُ مَنْ لَمْ يَقْبَلْهُ
“অর্থাৎ جِهَاد হচ্ছে সত্য দ্বীনের প্রতি আহ্বান করা এবং তা অগ্রাহ্যকারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা।”
শাফেই মাযহাবের আইনগ্রন্থ আল ইকনা-তে বলা হয়েছে, ‘জিহাদ হলো আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করা।’ আল-শিরাজী তার আল মুহাজাব-এ বলেন, ‘জিহাদ হলো কিতাল (যুদ্ধ)’।
বুখারী শরীফ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইমাম ইবন হাজার (রহ) ফাতহুল বারী-তে বলেন, জিহাদ-এর শরঈ অর্থ হলো وَشَرْعًا بَذْل الْجَهْد فِي قِتَال الْكُفَّار কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা-সংগ্রাম করা।
মালিকী মাযহাবের আইনগ্রন্থ মানহুল জালীল-এ জিহাদকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এভাবে –
قِتَالُ مُسْلِمٍ كَافِرًا غَيْرَ ذِي عَهْدٍ لِإِعْلَاءِ كَلِمَةِ اللَّهِ
“আল্লাহর কালিমাকে সর্বোচ্চ করার জন্য কাফেরদের (যাদের সঙ্গে মুসলিমদের চুক্তি নেই) সঙ্গে মুসলিমদের লড়াই… …।”
হাম্বলী মাযহাবের আইনগ্রন্থ আল-মুগনী-তে ইবনে কুদামা-ও ভিন্ন কোনো সংজ্ঞা দেননি। “কিতাবুল জিহাদ’ অধ্যায়ে তিনি বলেন, যা কিছুই যুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত সেটা ফরয-ই-আইন বা ফরয-ই-কিফায়া যা-ই হোক না কেন, অথবা এটা মুমিনদেরকে শত্রু থেকে রক্ষা করা হোক বা সীমান্ত রক্ষা হোক – সবকিছুই জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। তিনি আরো বলেন, ‘শত্রুরা এলে সীমান্তরক্ষীদের ওপর জিহাদ করা ফরয-ই-আইন হয়ে যায়। যদি শত্রুদের আগমন স্পষ্ট হয়ে যায়, তাহলে আমীরের নির্দেশ ছাড়া সীমান্তরক্ষীরা তাদেরকে মোকাবেলা না করে আসতে পারবে না। কারণ একমাত্র আমীরই যুদ্ধের ব্যাপারে নির্দেশ দিতে পারেন।”
এছাড়া বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, মিশকাতসহ সকল হাদীস গ্রন্থে ‘কিতাবুল জিহাদ’ অধ্যায় কেবল সশস্ত্র যুদ্ধ বিষয়ক হাদীসই স্থান পেয়েছে।
অতএব এটা নিশ্চিত যে, ইসলামী শরীয়াতে ‘জিহাদ’ শব্দটিকে সাধারণ শাব্দিক অর্থ থেকে সুনির্দিষ্ট অর্থে রূপান্তর করা হয়েছে আর সেই অর্থটি যুদ্ধ/লড়াই ছাড়া অন্য কিছুই নয়। কিন্তু আজ অজ্ঞানতা, মূর্খতা, কাফেরদের ষড়যন্ত্র ও তাদের তাবেদার শাসকদের সহায়তায় জিহাদের মতো সুস্পষ্ট ব্যাপারকেও ধোঁয়াটে করে ফেলা হয়েছে।
বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীরা বলছে যে, জিহাদ দুই রকম: জিহাদ-আল-আকবর (বড় জিহাদ) যা নফসের বিরুদ্ধে করা হয় এবং জিহাদ-আল-আসগর (ছোট জিহাদ) যা কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ময়দানে করা হয়।
নিজেদের বক্তব্যের সমর্থনে তারা ‘তারীখে বাগদাদ’ গ্রন্থে উদ্ধৃত একটি হাদীস ব্যবহার করে, যেখানে দাবি করা হয় যে, রাসূল (সা) বলেছেন: ‘আমরা ছোট জিহাদ থেকে বড় জিহাদে প্রবেশ করলাম।’ তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো: বড় জিহাদ কী? তিনি (সা) বললেন, ‘নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ’।
যদিও এটা সত্য যে, নফস বা শয়তানের বিরুদ্ধেও জিহাদ রয়েছে, কিন্তু এই জিহাদ কখনোই আল্লাহর দৃষ্টিতে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জিহাদের চেয়ে বড় নয়। কেননা, প্রথমত, কুরআন-হাদীসের শত শত আয়াত ময়দানের জিহাদকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করে। দ্বিতীয়ত, বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের ব্যবহৃত হাদীসটিকে ইমাম জালালউদ্দিন সুয়ূতী তাঁর আল-জামী’ আস-সাগীর গ্রন্থে ‘জায়িফ’ বলে চিহ্নিত করেছেন। ইমাম জাহাবী, দারা কুতনী, আহমদ ইবনে হাম্বলসহ বহু মুহাদ্দিস এই কথিত হাদীসটি বাতিল করে দিয়েছেন। একটি ‘জায়িফ’ হাদীস দিয়ে বিপুল সংখ্যক মুতাওয়াতির বর্ণনাকে অগ্রাহ্য করাটা মূর্খতা, গোঁড়ামির পরিচায়ক।জিহাদ কি শুধু রক্ষণাত্মক?
কাফেরদের চক্রান্তে পা দেয়া আরেক দল জ্ঞানপাপী প্রচার করে যে, জিহাদ শুধুমাত্র রক্ষাণাত্মক – এটি আক্রমণাত্মক নয়। এদের এই বক্তব্য আল্লাহর কুরআন, রাসূল (সা)-এর সুন্নাহ ও মুসলিমদের গৌরবময় ইতিহাসের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন:
قَاتِلُواْ ٱلَّذِينَ لاَ يُؤْمِنُونَ بِٱللَّهِ وَلاَ بِٱلْيَوْمِ ٱلآخِرِ وَلاَ يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ ٱللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلاَ يَدِينُونَ دِينَ ٱلْحَقِّ مِنَ ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلْكِتَابَ حَتَّىٰ يُعْطُواْ ٱلْجِزْيَةَ عَن يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ
“তোমরা যুদ্ধ করতে থাক আহলে কিতাবের ঐ লোকদের বিরুদ্ধে, যারা ঈমান আনে না আল্লাহর প্রতি এবং শেষ দিনের প্রতি, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তা হারাম মনে করে না, এবং অনুসরণ করে না প্রকৃত সত্য দ্বীন, যে পর্যন্ত না তারা বশ্যতা স্বীকার করে, স্বহস্তে জিযিয়া প্রদান করে।” [সূরা তাওবা: ২৯]
রাসূল (সা) বলেন:
أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ …
“আমি ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ করতে আদেশপ্রাপ্ত হয়েছি যতক্ষণ না তার সাক্ষ্য দেয় যে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ এবং তারা নামায কায়েম করে ও যাকাত আদায় করে…।” [বুখারী]
রাসূল (সা) হুনায়নের যুদ্ধে হাওয়াজিন আক্রমণ করতে গিয়েছিলেন এবং মুতার যুদ্ধে রোমানদের আক্রমণ করতে সৈন্যদল পাঠিয়েছিলেন। এগুলো সবই আক্রমণাত্মক যুদ্ধ। বস্তুত রাসূল (সা)-এর জীবনে সংগঠিত ২য় হিজরীর বদর থেকে শুরু ৯ম হিজরীর তাবুক পর্যন্ত অধিকাংশ যুদ্ধই ছিল আক্রমণাত্মক।
হযরত আল্লামা ইদরিস কান্দলভী (রহ) এ সম্পর্কে অভিমত প্রকাশ করেন যে, “রাসূলে কারীম (সা) কর্তৃক সরাসরি পরিচালিত অধিকাংশ যুদ্ধসমূহ ছিল আক্রমণাত্মক (offensive) এবং প্রতিরোধাত্মক (defensive) ছিল কম। অনুরূপভাবে ইসলামী খলীফা ও রাষ্ট্রপ্রধানগণের অধিকাংশ অভিযান ছিল আক্রমণাত্মক এবং তাৎক্ষণিক। যেসব লোক বলে যে ইসলামে আক্রমণাত্মক জিহাদ নেই, শুধু প্রতিরোধাত্মক জিহাদ আছে, তারা হল কুরআন ও সুন্নাহর বিকৃতকারী এবং বুজুর্গদের অতীত ইতিহাস গোপনকারী। বাতিলের ভয়ে মানসিক বিকারগ্রস্ত্র এসব মানুষের কোনো বক্তৃতা বা লেখার ওপর আস্থা রাখা উচিত নয়। [আল্লামা মোহাম্মদ ইদরিস কান্দলভী, ‘দসতুর-ই-ইসলাম’, লাহোর, পৃষ্ঠা: ৩০]
সাহাবীদের যুগেও আক্রমণাত্মক জিহাদের মাধ্যমেই ইরাক, পারস্য, শাম, মিশর ও উত্তর আফ্রিকা বিজয় হয়েছে। তাই আক্রমণাত্মক জিহাদের বিষয়ে সাহাবীদের ইজমাও সুস্পষ্ট। স্পেন, ভারতবর্ষ, এমন কি বাংলাদেশও সাহাবীদের পরবর্তী যুগের আক্রমণাত্মক জিহাদের মাধ্যমেই ইসলামের পতাকাতলে এসেছিল।
ইনশাআল্লাহ পরবর্তী খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আক্রমণাত্মক জিহাদের যাত্রা আবার সত্যিকার অর্থে শুরু হবে। পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে শাহাদাতের পতাকা উড়বে ইনশাআল্লাহ।
أَنَّ الْجَنَّةَ تَحْتَ ظِلَالِ السُّيُوفِ
“জান্নাত তরবারীসমূহের ছায়ার নিচে।” [বুখারী]
إِنَّ أَبْوَابَ الْجَنَّةِ تَحْتَ ظِلَالِ السُّيُوفِ
“জান্নাতের দরজাগুলো তরবারীসমূহের ছায়ার নিচে।” [মুসলিম]
مَنْ مَاتَ وَلَمْ يَغْزُ وَلَمْ يُحَدِّثْ بِهِ نَفْسَهُ مَاتَ عَلَى شُعْبَةٍ مِنْ نِفَاقٍ
“যে ব্যক্তি যুদ্ধে কখনো অংশ নেয়নি এবং মনে মনে তার আকাঙ্ক্ষাও পোষণ না করে মারা যায়, সে মুনাফিকত্বের একটি শাখায় মৃত্যুবরণ করলো।” [মুসলিম]
রবিউল আউয়াল মাস – মহানবীর আদর্শ ও মানুষের প্রকৃত বিকাশ

আমাদের মাঝে বছর ঘুরে আবার এসে উপস্থিত হয়েছে পবিত্র রবিউল আউয়াল মাস, যে মাসে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এর জন্ম ও ওফাত হয়েছে। সাধারনত, রাসূলুল্লাহ (সা) এর জন্ম ও ওফাত এর কারণেই এ মাসটি সুপরিচিত। কিন্তু, এ মাসের আরো অন্যান্য তাৎপর্যও রয়েছে। এই মাসেই রাসূলুল্লাহ (সা) মদিনায় হিজরত করে এসে পৌছান এবং তার উপর নাযিলকৃত পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা ইসলাম-এর আলোকে যুদ্ধবিদ্ধস্ত মদিনা শহরটিকে তিনি নতুন করে গড়ে তোলেন। শুরু হয় ইসলামের পদযাত্রা। এবং পরবর্তীতে এই হিজরতের তাৎপর্যকে কেন্দ্র করেই ইসলামী হিজরী সালের গননা শুরু হয়। এছাড়াও এই রবিউল আউয়াল মাসেই রাসূলুল্লাহ সর্বাপেক্ষা প্রিয় সাহাবী হযরত আবু বকর (রা) মুসলিমদের দ্বারা খলীফা নির্বাচিত হন এবং রাসূলের বিদায়ে শোকাহত মুসলিম জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করে ইসলামের পতাকা নিয়ে সামনে এগিয়ে যান। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে ইসলামের ইতিহাসে এ মাসের গুরুত্ব অপরিসীম।
রাসূলুল্লাহ (সা) এমন এক সময়ে পৃথিবীতে আসেন যখন সমগ্র পৃথিবী ছিল অন্ধকারে নিমজ্জিত। গোটা পৃথিবী জুড়ে ছিল নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা। পৌত্তলিকতার অভিশাপে আক্রান্ত ছিল সমগ্র আরব সমাজ। মানুষে মানুষে বিভক্তি, হানাহানি, গোত্রীয়বাদ, সাম্প্রদায়িকতাতে পরিপূর্ণ ছিল পুরো বিশ্ব। সে ছিল এমন এক সময় যখন মানুষ দাস বা পন্য হিসেবে বাজারে বিক্রী হতো, কন্যাসন্তানদের দেয়া হতো জীবন্ত কবর। নারীদের ছিল না সম্পত্তিতে কোনো অধিকার বরং নারীদেরকে মানুষ হিসেবেই গন্য করা হতো না। সে সময়ের সমাজে ধনী গরীবের ব্যবধান বেড়েই চলেছিল, বাজার ছিল প্রতারনা ও হঠকারিতার স্বর্গরাজ্য এবং সমাজ ছিল মদ ও জুয়ায় সয়লাব। সমগ্র পৃথিবী ছিল ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। আকাশ থেকে এক ফোটা রহমতের বৃষ্টির জন্য গোটা মানবকুল যেন তৃষ্ণার্ত ও ব্যকুল হয়ে ছিল। ঠিক এমন সময় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পৃথিবীতে তার রহমতের নবীকে প্রেরণ করলেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন:
(হে নবী), আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজাহানের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছি। (সূরা আম্বিয়া ২১:১০৭)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে আরো বলেন:
হে নবী, নিশ্চয়ই আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী হিসেবে। এবং আল্লাহর আদেশক্রমে তাঁর দিকে একজন আহ্বায়ক এবং এক উজ্জল প্রদীপ রুপে। (সূরা আহযাব ৩৩:৪৫-৪৬)
রাসূলুল্লাহ (সা) পৃথিবীতে এলেন এবং মানুষকে জানালেন যে, তাদের একমাত্র উপাস্য হচ্ছে মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা। সেই আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। নবীজী ঘোষনা করলেন: প্রত্যেকটি মানুষ সমান যেরকম চিরুনির দাতগুলো সমান। বংশ বা গায়ের রঙ এর কারণে কেউ শ্রেষ্ঠ নয়। নবীজী আরো ঘোষনা করলেন যে, কন্যা সন্তানদের জীবন্ত কবর দেয়া বন্ধ করতে হবে। তিনি ব্যবসায় প্রতারণা ও হঠকারিতার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানালেন। তিনি পৃথিবীকে আরো জানালেন যে একজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যার শামিল। তিনি উপদেশ দিলেন যে সে প্রকৃত ঈমানদার নয় যে নিজে পেটপুরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী অভুক্ত থাকে। এবং তিনি এসকল সমস্যার মূল উৎস তৎকালীন সমাজের কায়েমী স্বার্থবাদী শাসকগোষ্ঠীর শোষণের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন। শুরু হয় তার সংগ্রামী জীবন। নব্যুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে সেই ব্যক্তি সমাজে আল-আমিন বা বিশ্বাসভাজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন সেই ব্যক্তিই সমাজের অনেক স্বার্থান্বেষী মহলের চোখের কাটায় পরিণত হন। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমাদের প্রিয় নবী মানুষকে শোষণ অত্যাচার থেকে মুক্ত করবার এ সংগ্রাম চালিয়ে যান। রাসূলুল্লাহ (সা) ও তার সাহাবাদের ১৩ বছরের অক্লান্ত দাওয়াত ও পরিশ্রমের পরে তারা ইসলামের সাহায্যার্থে পার্শ্ববর্তী শহর ইয়াসরিব হতে সাড়া পান যা পরবর্তীতে মদিনা নাম লাভ করে। ৬২২ খৃষ্টাব্দে হিজরত করে এই রবিউল আউয়াল মাসেই তিনি মদিনায় প্রবেশ করেন। মদিনার আনসারগণ আকাবার দ্বিতীয় বায়াতে কৃত ওয়াদা অনুযায়ী মুহাম্মদ (সা) কে তাদের শাসক হিসেবে বরন করে নেয়। নব্য গঠিত ইসলামী রাষ্ট্র মদিনাকে তিনি সোনার মদিনায় রূপান্ত্মরিত করেন। তিনি মদিনা সনদ লিপিবদ্ধ করেন এবং মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সকল জনগণকে মদিনার ‘নাগরিক’ হিসেবে ঘোষনা দেন এবং ঘোষনা দেন যে প্রত্যেকে প্রত্যেকের সাহায্যে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসবে। পৃথিবীতে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয়ভাবে মানুষের মৌলিক অধিকার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের নিশ্চয়তা বিধান করেন নবীজী এবং নারীদের দেন তাদের ন্যায্য অধিকার।
পরবর্তীতে বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে গোটা আরবে ইসলামের দাওয়াত পৌছে যায়। নবী মুহাম্মদ (সা) সমগ্র আরব জাতিকে ইসলামের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং আরবের বাইরেও ইসলামের দাওয়াত পৌছানোর পদক্ষেপ নেন। অবশেষে পালা আসে মহানবীর বিদায়ের। এই রবিউল আউয়াল মাসেই বিদায় নেন নবীজী। কিন্তু প্রিয় সাহাবীগণ বিষয়টি যেন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। এমন একজন অসাধারন মানুষের বিচ্ছেদ তারা কল্পনা করতে পারছিলেন না। কোনো কোনো সাহাবী বাস্ত্মবতার মুখোমুখি হবার ভয়ে ঘরে লুকিয়ে ছিলেন, কোনো কোনো সাহাবীর মুখ থেকে কোনো কথা বের হচ্ছিল না। আর ওমরের মতো সাহাবী পাগলপাড়া হয়ে তলোয়ার উচিয়ে সবাইকে সাবধান করে বলছিলেন যে, যে বলবে মুহাম্মদ (সা) মারা গেছে তাকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে। এমন সময় সর্বশ্রেষ্ট সাহাবী হযরত আবু বকর (রা) সবাইকে জড়ো করে এক সংক্ষিপ্ত ভাষন দেন এবং বলেন: যারা মুহাম্মদ (সা) এর পূজা করতো তারা জেনে রাখুক, মুহাম্মদ (সা) পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, আর যারা আল্লাহর ইবাদত করতো তারা জানুক যে আল্লাহ চিরজীবি এবং কখনো মৃত্যুবরন করেন না। এরপর তিনি কুরআন এর একটি আয়াত তেলাওয়াত করেন যেখানে বলা হচ্ছে:
মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর রাসূল ব্যতিত আর কিছু নন, তার পূর্বে অনেক রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন। তিনি যদি মারা যান অথবা নিহত হন তবে কি তোমরা পেছনের দিকে ফিরে যাবে? আর যারাই পেছনের দিকে ফিরে যাবে তারা আল্লাহর কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না বরং আল্লাহ শীঘ্রই কৃতজ্ঞদের পুরষ্কৃত করবেন। (সূরা আলে ইমরান ৩:১৪৪)
এভাবেই সাহাবীগণ কঠিন বাস্তবতায় ফিরে আসেন। তারা বুঝে ওঠেন যে নবীজী আসলেই তাদের ছেড়ে চলে গেছেন। পুরো মদিনা জুড়ে কান্নার রোল পড়ে যায় এবং নেমে আসে শোকের ছায়া।
কিন্তু তারপরও রাসূলের এ বিদায়ে ইসলামের পদযাত্রা থেমে থাকেনি। তাঁর বিদায়ের পর সাহাবা (রা) গণ ও পরবর্তী যুগের ইসলামী ব্যক্তিবর্গ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে যান ইসলাম-এর শাশ্বত বানী পৌছিয়ে দেবার নিমিত্তে। প্রায় পুরোটা পৃথিবী ইসলামের শান্তির ছায়াতলে আশ্রয় নিতে শুরু করে এবং যার ফলশ্রুতিতে আজ আমরা মুসলমান। শুরু হয় মানুষের প্রকৃত বিকাশের যুগ, শুরু হয় জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতার যুগ। ইসলাম-এর ইতিহাসে যার উদাহরন সুস্পষ্ট। পুরো পৃথিবী জুড়ে শুরু হয় জাগরন, সমগ্র পৃথিবীকে আলোকিত করবার জন্য সংকল্পাবদ্ধ হয় মুসলমানগণ। বিশ্বজুড়ে উদ্ভব ঘটে আলোকিত চিন্তুায় গঠিত নতুন এক সভ্যতার। যার ব্যপারে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক বলেন:
তোমরাই হলে শ্রেষ্ঠতম জাতি। মানবকুলের কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। যাতে তোমরা সৎ কাজের আদেশ করো এবং অসৎ কাজের নিষেধ করো এবং আল্লাহর উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখো। (সূরা আলে ইমরান ৩:১০৪)
কিন্তু আজ ১৪শ বছর পর এই রবিউল মাসে দাড়িয়ে আমরা আজ নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলতে পারছিনা। পারছিনা পৃথিবীকে আলো দেখাতে বরং আমরা নিজেরাই ডুবে আছি অন্ধকারে। আজ সেই শ্রেষ্ঠ জাতি বিশ্বে তাদের যথাযথ ভুমিকা রাখতে পারছেনা, দিতে পারছেনা পৃথিবীকে সঠিক নেতৃত্ব। নজরুল তার ভাষায় যেভাবে বর্ণনা করেছেন:
ভিখারির সাজে খলিফা যাদের শাসন করিল আধা জাহান,
তারা আজ পড়ে ঘুমায় বেহুশ, বাহিরে বইছে ঝড় তুফানএর কারণ আমরা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা হতে দূরে সরে এসেছি। ভূলে গেছি আমাদের দায়িত্বের কথা। বছর ঘুরে রবিউল আউয়াল মাস এলে আমরা নবীর জীবন নিয়ে আলোচনা করি কিন্তু তা আমাদের জীবনে প্রতিফলিত হয়না। আজ যখন সারা পৃথিবী জুড়ে শোষণ, হানাহানি এবং রক্তপাত চলছে তখন মহানবীর আদর্শ ছাড়া আমাদের আর কোনো সমাধান নেই। বস্তুগত উন্নতির দিক দিয়ে এগিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও আজ সমগ্র পৃথিবী যেন মক্কার সেই জাহেলী যুগের রূপ লাভ করেছে। যেখানে গর্ভপাতের মাধ্যমে কন্যাসন্তানদের মায়ের পেটে কবর দেয়া হচ্ছে, নারী মুক্তির নামে নারীর দেহ পন্য হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছে, আকাশ সংস্কৃতির নামে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে অশ্লীলতা এবং পুজিবাদের কষাঘাত ও অনন্ত ভোগবাদী চিন্তার মাধ্যমে ধনী গরীবের ব্যবধান আরো বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এইসব সমস্যায় জর্জরিত আজকের বিশৃঙ্খল পৃথিবীতে যখন থমকে দাড়িয়েছে মানুষের প্রকৃত বিকাশ এবং যখন হুমকির মুখে পড়েছে বিশ্বশান্তি ও মানুষের মৌলিক অধিকার অর্জনের প্রত্যাশা তখন আবার যেন গোটা পৃথিবী ব্যকুল হয়ে উঠেছে মহানবীর আদর্শের জন্য।
সুতরাং আজ সময় এসেছে পরিবর্তনের। আজ আবার সময় এসেছে ইসলামের – পুরো পৃথিবীকে আলো দেখাবার, পুরো পৃথিবীকে নেতৃত্ব দেবার। সেই নিমিত্তে আজ সময় এসেছে নবীজীর আদর্শ ইসলামকে তথা কুরআন-সুন্নাহকে আরো গভীরভাবে অধ্যয়ন করবার। সময় এসেছে নিজেদেরকে হেদায়েতের আলোয় আলোকিত করে পুরো সমাজকে আলোকিত করবার। এবং এর জন্য শুধু রবিউল আউয়াল মাস নয়, বরং প্রতিটি মাসই হতে হবে আমাদের পুনর্জাগরণের মাস। এবং এটাই রবিউল আউয়াল মাসের প্রকৃত শিক্ষা। আসুন আমরা এই চেষ্টায় শরীক হই এবং নিজেদের জীবন আল্লাহর রহমতে ধন্য করি। আমি পবিত্র কুরআনের সূরা ইবরাহিমের একটি আয়াতের তরজমা বলে শেষ করবো, যেখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন:
আলিফ লাম রা, (এটি) এক কিতাব আমি আপনার উপর নাযিল করেছি (হে নবী), যাতে আপনি সমগ্র মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসতে পারেন তাদের রবের ইচ্ছা অনুযায়ী, পরাক্রান্ত, প্রশংসার যোগ্য (রব)-এর পথের দিকে … (সূরা ইবরাহিম ১৪:১)
ইসলামী রাজনীতি: ময়দান ছেড়ে ঘরে

কিছুদিন আগে পল্টন গিয়েছিলাম। আজাদ প্রডাক্টস এর থেকে খানিকটা সামনে এগোতেই দেখা গেলো সমাবেশ হচ্ছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর উদ্যোগে নারীনীতি ও আনুসাঙ্গিক বিষয়ে ডাকা বিক্ষোভ সমাবেশ হচ্ছে। নোয়াখালী টাওয়ারের নিচ থেকে শুরু করে বেশ অনেকদূর পর্যন্ত নেত-কর্মীদের ভীর লক্ষ্য করার মতো। এখানে সমাবেশের কারণ জিজ্ঞেস করলে জানা গেলো, অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা ছিলো মুক্তাঙ্গনে। কিন্তু সরকার মুক্তাঙ্গনে ১৪৪ ধারা জারি করার কারণে বাধ্য হয়ে এখানে সমাবেশ করতে হচ্ছে। এর কয়েকদিন আগে মুক্তাঙ্গনে সমাবেশ করতে অনেকে পুলিশের লাঠিচার্জ ও গণগ্রেফতারের শিকার হয়েছেন। তাই বাধ্য হয়েই এখানে সমাবেশ করতে হচ্ছে।
গত ০৪ মে জাতীয় প্রেসক্লাবে পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচী পালনের জন্য আসতে চাইলে মুফতী ফজলুল হক আমিনীকে লালবাগে নিজ বাসার নিচেই তাকে বাঁধা দেয়া হয়। বিকালে সংবাদ সম্মেলন করে মুফতী আমিনী অভিযোগ করেন তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হচ্ছে। স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মসূচী পালনে বাঁধা দেয়া হচ্ছে। তবে মুফতী আমিনীকে অবরুদ্ধ করার কথা অস্বীকার করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়, তিন দিন আগে আমিনীর মেয়ের জামাই জনাব জুবায়ের আহমাদ পরিবারের সদস্যদের জীবনের নিরাপত্ত চেয়ে লালবাগ থানায় জিডি করেছেন। সুতরাং আমিনীর নিরাপত্তার দায়িত্ব এখন তাদের উপর। তাই তারা আমিনীর নিরাপত্তার স্বার্থেই তাকে বের হতে দিচ্ছেন না।
উপরোক্ত বাস্তবতা বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং শীর্ষ ইসলামী রাজনৈতিক দলের। যারা বর্তমান সময়ে বিভিন্ন ইসলামিক ইস্যুতে কিছুটা সক্রিয় আন্দোলন করার চেষ্টা করছেন তাদেরই এই অবস্থা। এর বাইরে বাকি যেই ইসলামী দল আছে তাদের অবস্থাও এর চেয়ে ভালো নয়।
ইসলামী আন্দোলনের যেই উত্তাল ঢেউ এক সময় মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে পল্টন ময়দান পর্যন্ত লাখো জনতাকে আলোড়িত করতো, লংমার্চের ঘোষণায় সারা দেশ জুড়ে ইসলামী রাজনীতির যেই সুবাতাস বয়ে যেতো, বর্তমান আমলে সেটি বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট তারপর মুক্তাঙ্গন হয়ে এখন নিজ দলের অফিসের সিঁড়িতে এসে ঠেকেছে। এটি কি ইসলামী দল, নেতৃবৃন্দ আর ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী লাখো লাখো তৌহিদী জনতার জন্য সুখবর না দু:সংবাদ, তা আজ ভেবে দেখার সময় এসেছে। ইসলামী দল গুলো এবং তাদের আন্দোলন যদি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে ইসলামী দল গুলো যে প্রেসরিলিজ সর্বস্ব দলে পরিণত হবে না, তার কি গ্যারান্টি কে দিবে?
ইসলামী দল ও তাদের জনসম্পৃক্ততা : বয়স্ক মুরুব্বীদের অনেক সময় গল্প করতে শোনা যায় যে, আমাদের ছোট বেলায় নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিষ এতো এতো সস্তা ছিলো। গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, আর গোয়াল ভরা গরু ছিলো… ইত্যাদি ইত্যাদি। আজ যখন ইসলামী দলের অতীত ও বর্তমান আন্দোলন সম্পর্কে আমার নিজের অল্প কয়েক বছরের দেখা প্রেক্ষাপট গুলোর পর্যালোচনা করছি তখন নিজেকে নিজের কাছেই সেই বৃদ্ধের মতো মনে হচ্ছে। লাখো লাখো মানুষের স্বতস্ফূর্ত অংশ গ্রহণে পল্টন ময়দানের সেই জোয়ার কিংবা মানিক মিয়া এভিনিউতে কাদিয়ানী বিরোধী উত্তাল সেই আন্দোলন গুলো আজ যেন স্বপ্নের মতো। প্রশ্ন জাগছে, ইসলামী আন্দোলনের প্রতি গণ মানুষের সেই সমর্থন ও সহমর্মিতা কি আজও আছে? ইসলাম দল গুলোর প্রতি ধর্মপ্রাণ দেশবাসীর আকাঙ্খা কি ইসলামী নেতৃবৃন্দ অনুভব করতে পারেন? তাহলে কেন তারা দিন দিন ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হচ্ছেন। কেন তারা জাতির আন্তরিক কামনা একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধভাবে সুনির্দিষ্ট কর্ম পদ্ধতি ও কর্মসূচি দিতে পারছেন না? কেন তাদের আন্দোলনে জনগণের গণসম্পৃক্ততা দিন দিন কমে যাচ্ছে?
একথা অনস্বীকার্য যে আগে এদেশে যেভাবে এবং যেই ব্যাপক সংখ্যক গণমানুষের সম্পৃক্ততা নিয়ে ইসলামী আন্দোলন গড়ে উঠতো, ইসলামী নেতৃবৃন্দের ডাকে লাখো লাখো মানুষ ঘর ছেড়ে রাজপথে নেমে আসতো, অনেক ক্ষেত্রেই আজ আর তেমনটি দেখা যায় না। বর্তমান সময়ে ইসলামী দল গুলোর কর্মসূচীতে নেতৃবৃন্দের নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-শিক্ষক কিংবা সামান্য ভক্ত-মুরীদই মূল দর্শক স্রোতা হিসেবে পরিলক্ষিত হয়। কেন এমনটি হচ্ছে? দিন দিন কেন ইসলামী দলগুলো তাদের আন্দোলনে গণমানুষের ব্যাপক অংশকে সম্পৃক্ত করতে পারছে না। দিন দিন তাদের সক্রিয় অনুসারীদের সংখ্যা কমার পরিবর্তে বাড়ছে না?
নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর পেছনে যে সকল কারণ দেখা যায় তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে:
১. সুনির্দিষ্ট চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণে অপারগতা।
২. গণমানুষের দৈনন্দিন সমস্যার ইস্যু গুলোকে এড়িয়ে যাওয়া।
৩. আভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ভাঙ্গন।
৪. বিভিন্ন ইস্যুতে উত্তাল আন্দোলনের চূড়ান্ত মুহূর্তে হঠাৎ খেই হারানো।
৫. নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রাখার পরিবর্তে কখনো বিএনপি বা কখনো আওয়ামীলীগের শরণাপন্ন হওয়া।
৬. অনেক ক্ষেত্রে অনেকের বিরুদ্ধে আঁতাতের অভিযোগ।আমাদেরকে অবশ্যই বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে। নিজেদের মূল সমস্যা চিহ্নিত করে তাকে দূর করার জন্য আন্তরিক হতে হবে। বাংলাদেশের ইসলামী দলসমূহের জন্ম এবং তাদের আন্দোলনের ইতিহাস বলে, এদেশে ইসলামী সংগঠনের সৃষ্টি হয় কেবলমাত্র এক দু’জন বরেণ্য ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি কেন্দ্রিক আর তাদের আন্দোলন হয় ছোট খাটো ইস্যু ভিত্তিক। সেই ইস্যু শেষ হয়ে গেলে বা বরেণ্য ও শ্রদ্ধেয় সেই ব্যাক্তি ইন্তেকাল করলে বিলুপ্তি ঘটে সেই দলের ও তাদের ইস্যুভিত্তিক রাজনীতির।
অনেক সময় সেই বরেণ্য ব্যক্তির ইন্তেকাল বা তার বার্ধক্যেই সংগঠনে সৃষ্টি হয় বিভক্তি ও সীমাহীন মতপার্থক্যের। একটি দল ভেঙ্গে একই নামে সৃষ্টি হয় ২, ৩, ৪ টি দলের। অনেক সময় এই সংখ্যা গাণিতিক হারে বাড়তে থাকে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো প্রত্যেকটি দলই পূর্বের সেই একটি নামই ব্যবহার করে এবং প্রত্যেকেই তাদেরকে মূল দল ও সংগঠনের লোক বলে দাবী করতে থাকে।
এর মূল কারণ হচ্ছে, এদেশের ইসলামী দলগুলো ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে ও ইসলামী জীবন ব্যবস্থা পুন:প্রতিষ্ঠার মহান ও চূড়ান্ত ইস্যূ নিয়ে মাঠে নামে না। জনগণের সামনে তারা জনগণের প্রত্যাহিক সমস্যার ইসলাম সম্মত সমাধান তুলে ধরতে পারে না। প্রচলিত গণতান্ত্রিক পুজিবাদী শাসনব্যবস্থার বাইরে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ং সম্পূর্ণ একটি মডেল জাতির সামনে তুলে ধরতে তারা অক্ষমতার পরিচয় দেন। কখোনো এ দলে কখনো বা ও দলে কেবলমাত্র কয়েকটি আসন লাভের জন্য ভীড় জমান। ফলে জনগণ তাদেরকে আওয়ামীলীগ বা বিএনপির বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করার কোন কারণ খুঁজে পায় না। অনেকেই হয়তো আমার সাথে এই ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করবেন, তবুও সত্যের জন্য বলতে হচ্ছে যে, রাজনীতির ময়দানে ইসলামী দলগুলো যেই সকল ইস্যু নিয়ে সরব হয়, জনগণ তাদের প্রত্যাহিক কাজের ক্ষেত্রে সেই ইস্যুর কোন প্রয়োজন মনে করে না বা অনুভব করতে পারে না। উদাহরণত: ইসলামী দলগুলো যখন ফতোয়া নিয়ে আন্দোলনে নেমেছিলো তখন এই আন্দোলনে কওমী মাদ্রাসাসমূহের ছাত্র, ইমাম-খতীব ও আলেম-উলামা ছাড়া ব্যাপক জনগোষ্ঠীর খুব সামান্য অংশই অংশগ্রহণ করেছিল।
একইভাবে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের বিতর্কিত খতীব নিয়োগের পর সারাদেশের সকল হক্কানী উলামায়ে কিরাম যেভাবে এর প্রতিবাদে সরব হয়েছিলেন আমার জ্ঞাতসারে নিকট অতীতে আর কোন ইস্যুতে তারা সকলে এমন সরব ও সক্রিয় হননি। কিন্তু ফলাফল কি?
অবশ্যই শূন্য। কারণ আলেম-উলামা ও ইসলামী সংগঠনগুলোর আন্দোলনের সাথে জনগণের সম্পৃক্ততা একেবারে ছিলো না বললেই চলে। দেশের আপামর জনসাধারণের বড় একটি অংশ ফতোয়ার প্রয়োজনীয়তা এবং ইসলামী শরীয়া সম্পর্কেই অবগত নয়। আর বায়তুল মোকাররমের ইমাম পরিবর্তন নিয়ে তাদের কোনো মাথা ব্যাথাই নেই। কারণ এটি তাদের প্রত্যাহিক সমস্যার কোন অংশ নয়।
এক্ষেত্রে ইসলামী দলসমূহের ব্যর্থতা হলো তারা এই সকল ইস্যুকে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা ও খিলাফত রাষ্ট্রের শাসন তথা কুরআন-সুন্নাহর মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের দিকে জনগণকে আহ্বান করে তার সাথে এই ফতোয়া বা খতীব সমস্যার লিঙ্ক করতে পারেন নি। এরচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে অতীতের বাংলাদেশ আর বর্তমানের বাংলাদেশ এর মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আগে এদেশের গণমানুষের কাছে ইসলামের দাবী ও দরদ যতটা প্রকট ছিলো, দিন দিন কিন্তু তার পরিমাণ কমছে। অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তির এই আধুনিক যুগে অপসংস্কৃতি আর অশ্লীলতার ছয়লাবে যুব-তরুণ সমাজের এক বিশাল অংশ আজ ইসলামী আদর্শ থেকে অনেক দূরে। টিভি-সিনেমা আর নাটক-গান খুবই সহজলভ্য হওয়ার কারণে ধর্ম-কর্মের প্রতি তাদের আকর্ষণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। যার কারণে আগের মতো এখন আর তাদেরকে খুব সহজেই ইসলামী আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট করা সহজ নয়। বর্তমান সময়ের আধুনিক তরুণ সমাজের কাছে এবং শিক্ষিত পরিবারকে ইসলামী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত করতে হলে অত্যন্ত যুক্তিগ্রাহ্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে যেতে হবে। মানব জীবনের প্রতিটি সমস্য বিশেষত: বর্তমান জনগণের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাবলীর ইসলাম সম্মত সহজ সমাধান এবং ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার মাধ্যমে কত সহজে যে দেশ ও জাতির উন্নয়ন সম্ভব তার যৌক্তিক বাস্তবতা তুলে ধরতে হবে। বর্তমান সময়ে ইসলামী আন্দোলনকে বেগবান করতে হলে এর কোন বিকল্প নেই।
ইসলামী দলগুলোকে ভাবতে হবে নিজেদের বাস্তবতা নিয়ে। তাদের আন্দোলনের ভবিষ্যত ও বর্তমান কর্মপন্থা নিয়ে। ইসলামী নেতৃবৃন্দকে অবশ্যই ভেবে দেখতে হবে নিজেদের মধ্যকার কোন্দল আর আভ্যন্তরীন সমস্যা গুলো নিয়ে। পুরো জাতীর সামনে আজকে ইসলামী দলসমূহের যেই ভবিষ্যত পরিকল্পনা দেয়া প্রয়োজন, তাহলো ইসলামিক জীবন ব্যবস্থার জন্য, ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র পুন:প্রতিষ্ঠার জন্য গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদ বা বোমা হামলা ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ কুরআন ও সুন্নাহ সমর্থিত পদ্ধতি নয়। এক্ষেত্রে ইসলাম সমর্থিত একমাত্র পদ্ধতি হচ্ছে ব্যাপক গণদাওয়াত, খিলাফতের লক্ষ্যে গণসচেতনতা তৈরী, সমাজের নেতৃস্থানীয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের নুসরাহ বা সাহায্য প্রার্থনা এবং এই দুটি অর্থাৎ গণসম্পৃক্ততা ও নেতৃস্থানীয়দের সহযোগিতা নিয়ে এক আদর্শিক গণবিপ্লব। যেই বিপ্লব গণতান্ত্রিক পুজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সমূলে উৎপাটিত করে এদেশে ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বা খিলাফত পদ্ধতির শাসন কায়েম করবে। মহান আল্লাহ আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দকে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ইসলামী দল সমূহকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা এবং জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার তাওফীক দিন। আমীন।
ইসহাক খান
খিলাফত এর ১৩শ বছরের ইতিহাসে ইসলামের বাস্তবায়ন

বর্তমানে আমরা যে বিশ্বে বসবাস করছি সে বিশ্বে এমন কোনো রাষ্ট্র নেই যাকে ইসলামী রাষ্ট্র বলা যায়। কারণ ইসলামী রাষ্ট্র হওয়ার যে শর্ত বা বিষয়গুলো থাকা দরকার তা বর্তমান বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোতে অনুপস্থিত। এ অবস্থায় আমরা যখন পুনর্জাগরণের মাধ্যমে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলি তখন কিছু প্রশ্ন এসে যায়। যেমন – খিলাফত কী? খিলাফত প্রতিষ্ঠিত ছিল কিনা? খিলাফত কত বছর টিকে ছিল? ইত্যাদি।
এ পর্যায়ে প্রথমে আমি খিলাফত কী এবং ৬২২ খৃস্টাব্দে রাসূল (সা) মদিনায় যে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা ঔপনিবেশবাদী শক্তি ইসলামী ভূমিগুলো দখল করার পূর্ব পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯২৪ সালের ৩রা মার্চ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত ছিল – খিলাফতের এই সুদীর্ঘ সময় আদৌ ইসলাম বাস্তবায়িত হয়েছিল কিনা, এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
খিলাফত হচ্ছে ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে বাস্তবায়িত রাষ্ট্র ব্যবস্থার নাম। যে ব্যবস্থা পৃথিবীতে মানুষের তৈরি আইন বাস্তবায়িত না করে, আল্লাহর আইন বাস্তবায়িত এবং যে ব্যবস্থার মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়।
এছাড়া খিলাফত ব্যবস্থা সারা বিশ্বের মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করে রাখে এবং সকল মানুষের মৌলিক চাহিদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে – খিলাফত কত বছর প্রতিষ্ঠিত অবস্থায় ছিল? এ বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদেরকে প্রথমে জানতে হবে কোন বিষয়গুলো বিদ্যমান থাকলে আমরা বলতে পারব খিলাফত প্রতিষ্ঠিত ছিল। আর বিষয়গুলো হচ্ছে-
১. বিচার ব্যবস্থা ও
২. আহকাম শরীয়াহ-এর বাস্তবায়নঅর্থাৎ আমরা যদি বুঝতে পারি রাষ্ট্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর বিচার ইসলামী শরীয়াহ আনুসারে সম্পন্ন এবং শাসক ইসলামী নিয়মানুসারে শাসন করে থাকেন তখনই বুঝবো ইসলামী রাষ্ট্র তথা খিলাফত প্রতিষ্ঠিত ছিল। এখন আমি ১৯২৪ সালে খিলাফত ধ্বংস হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিচার ব্যবস্থা ও শাসন ব্যবস্থা যে ইসলামী ছিল এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব:
১. বিচার ব্যবস্থা:
এক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায় যে, ১৯২৪ সালের পূর্ব পর্যন্ত বিচারকগণ একমাত্র শরীয়াহ্ দ্বারাই জনগণের মধ্যে বিদ্যমান বিবাদগুলো মীমাংসা করতেন। বিচার ব্যবস্থার বিচার প্রক্রিয়ায় শুধু যে মুসলমানরা উপকৃত হয়েছে তা না, অনেক অমুসলিমরাও উপকৃত হয়েছিল। যা তখনকার সময়ের বিভিন্ন ইসলামী বিশেষজ্ঞ ও আলেমদের লিখা ইতিহাসগ্রন্থগুলো থেকে জানা যায়। ইসলামী বিচার ব্যবস্থার সুফল দেখে অনেক অমুসলিমও ইসলামী শরীয়াহ নিয়ে গবেষণা করতেন। এর অন্যতম প্রমাণ হচ্ছে “আল মাজাল্লা”-র ধারাবহিক একজন লেখক ছিলেন অমুসলিম। যার নাম ছিল সেলিম আল বাজ। মূলত “আল মাজাল্লা” ছিল একটি ম্যাগাজিন যেটাতে ইসলামী আইন নিয়ে লেখা হত। তাছাড়া যে সকল ইসলামী ভূখণ্ড ঔপনিবেশবাদীদের দ্বারা দখল হয়েছিল তারপরও অই সব ভূখণ্ডে ইসলামী আইন দ্বারা বিচারকার্য সম্পন্ন করা হত, যা আজ পর্যন্ত বজায় আছে। যেমন_ বাংলাদেশে উত্তরাধিকার আইন, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে ব্যভিচারের শাস্তি, চুরি করার শাস্তি ইত্যাদি । সুতরাং, আমরা বলতে পারি খিলাফত রাষ্ট্রের ইতিহাসে ইসলামী শরীয়াহ ভিত্তিক বিচার ব্যবস্থা চালু ছিল।
এ থেকেই প্রমাণিত হয় যে, সে সময় বিচার ব্যবস্থা অবশ্যই ইসলাম অনুযায়ী ছিল।
২. আহকাম শরীয়াহ-এর বাস্তবায়ন:
মূলত পাঁচটি ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে ইসলাম বাস্তবায়িত হয়েছিল। ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে – ১. সামাজিক ২. অর্থনৈতিক ৩. শিক্ষা ৪. পররাষ্ট্রনীতি এবং ৫. শাসন ব্যবস্থা। নিচে এই ক্ষেত্রগুলোতে ইসলাম বাস্তবায়িত ছিল তার একটা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করব।
১) সামাজিক: সামাজিক অবস্থা এমন ছিল যে, ঔপনিবেশবাদীরা ইসলামী ভূখণ্ডগুলো দখল করে নিলেও অন্যান্য ক্ষেত্রের তুলনায় সামাজিক ক্ষেত্রে তারা তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারে নি। যা আজ পর্যন্ত বিভিন্ন মুসলিম অধ্যুষিত দেশে লক্ষ করা যায়। এখনও শহর-বন্দর বা পল্লীগ্রামে আভ্যন্তরীণ ব্যাপারসমূহের মীমাংসা জনসাধারণ নিজেদের মধ্যেই রেখেছেন। তারা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে আপোষ-নিষ্পত্তি এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি পালন করে থাকেন। যেমন- বিয়ে-শাদির ক্ষেত্রে মুসলমানরা এখনও ইসলামী নিয়ম-কানুন পালন করে থাকে।
পরিবারের দেখাশুনার বিষয়টি এখনও সাধারনত পিতাই পালন করে থাকে। তাছাড়া মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্রগুলোতে মহিলাদের হিজাব পরার অভ্যাসটিও প্রমাণ করে সামাজিক ক্ষেত্রে ঔপনিবেশবাদীদের তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি এবং সঙ্গে সঙ্গে এটাও প্রমাণ করে যে, নিশ্চয়ই ইসলামী রাষ্ট্র তথা খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত ছিল। অন্যথায় মুসলমানরা এই বিষয়গুলো কীভাবে পালন করছে।
২) অর্থনৈতিক: অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা হত। বিষয় দুটি হচ্ছে – রাজস্ব সংগ্রহ ও রাজস্ব ব্যয়। রাজস্ব সংগ্রহ মূলত ভূমির উপর আরোপিত খারাজ ও উশর, অমুসলিমদের থেকে জিজিয়া আদায়, গনীমত, ফাই ইত্যাদি।
এছাড়া বিত্তবান মুসলমানদের নিকট থেকে যাকাত আদায় করা হতো। যদিও যাকাতের অর্থ কোরআনে উল্লিখিত ৮টি খাত ছাড়া অন্য কোনো ব্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হত না। ব্যয়ের ক্ষেত্রে রাজস্বের একটা বিরাট অংশ সামরিক বাহিনীর জন্য ব্যয় করা হতো। যুদ্ধাবস্থায় সৈন্যবাহিনীর প্রয়োজনীয় আহার্য, অন্যান্য দ্রব্যাদি, তাদের পরিবারবর্গকে নগদ অর্থ বা খাদ্যদ্রব্যাদি রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আয় থেকে সরবরাহ করা হতো। তাছাড়া শহর-নগর, কেল্লা নির্মাণ ছাড়াও মাদ্রাসা, সরাইখানা, পুল, খাল, কুয়ো, মসজিদ ইত্যাদি নির্মাণেও রাজস্ব থেকে প্রাপ্ত অর্থ ব্যয় করা হতো। আবিষ্কারক, কারিগর, হাকিম, কবি, চিকিৎসক, সাহিত্যিক এবং শাস্ত্রবিদদেরকে বেতন-ভাতা দেয়া হতো। ফলে দেখা গেছে যে, বেশ কিছু খ্রিস্টান ও ইহুদী চিকিৎসক বাগদাদে অত্যন্ত বিত্তবানও প্রচুর প্রাচুর্যের অধিকারী হয়েছিল। এছাড়াও রাজস্ব আয়-ব্যয়ের মাধ্যমে কারিগর তৈরি, ঔষধ তৈরি করার জন্য উৎসাহ প্রদান করা হতো। রাজস্ব ব্যয়ের ক্ষেত্রে আরো একটি গুরত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সেটা হচ্ছে – নাফাকাহ ব্যবস্থা (অর্থনৈতিক সহায়তা), যেখানে অসমর্থ, বিভিন্ন দিক থেকে অক্ষম, বিকলাঙ্গ এদেরকে সহায়তা এবং হজ্জ যাত্রাপথে দরিদ্র, দুঃস্থ ও ভ্রমণকারী পথিকদেরও সহায়তা করা হতো। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এরকম সুষ্ঠু নীতিমালার ফলে দেখা যেত যাকাত দেওয়ার মতো লোক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যেমন- খিলাফতের শেষের দিকের শাসনামলে আয়ারল্যান্ডে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তৎকালীন খলীফা বৃটেনের রাণীর আপত্তি সত্ত্বেও তিনটি জাহাজ ভর্তি ত্রানসামগ্রী আয়ারল্যান্ডকে দিয়ে সহায়তা করেছিল। তবে কিছু সময় রাজস্ব সংগ্রহ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা অবহেলা দেখা গেছে। এর অর্থ এই নয় যে, খিলাফত ছিল না; বরং এর অর্থ হলো রাজস্ব সংগ্রহ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা অনিয়ম হয়েছিল, কিন্তু শরীয়াহ অনুপস্থিত ছিল না। যেমন: বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সরকার মানুষ থেকে বিভিন্নরকম কর নির্ধারণ করলেও সঠিকভাবে আদায় করে না। এ অবস্থায় আমরা যদি বলি পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নাই তাহলে তা অনুচিত হবে। যেহেতু কর সংগ্রহ ও বণ্টনের অনিয়মের ক্ষেত্রে আমরা বলি না পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নাই, সেহেতু রাজস্ব সংগ্রহ ও করের ক্ষেত্রে অনিয়ম হলেও আমাদের বলা উচিত নয় যে খিলাফত ছিল না।
৩) শিক্ষা: শিক্ষা ক্ষেত্রে ইসলাম শিক্ষার পাঠ্যক্রম এমনভাবে তৈরি করেছিল যে, যাতে শিক্ষার্থীরা ইসলামী আক্বীদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো সংস্কৃতি বহন করতে না পারে। শিক্ষার্থীদেরকে এমনভাবে শিক্ষা দান করা হতো যাতে তারা ইসলামী আক্বীদা সঠিকভাবে বুঝে ইসলামী জীবনাদর্শের মাধ্যমে রাষ্ট্রের উন্নতি করতে পারে। যদিও উসমানীয় শাসনামলে শেষের দিকে নতুন স্কুল শুরুর ব্যাপারে কিছু অবহেলা করা হয়েছিল। তারপরও ইসলাম বাস্তবায়িত থাকার কারণেই গোটা বিশ্ব শিক্ষা ক্ষেত্রে এক অতুলনীয় সাফল্য এসেছিল যার প্রমাণ কর্ডোভা, বাগদাদ, দামেস্ক-এর মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠা এবং এদের পাঠ্যক্রম থেকে বুঝা যায়। শিক্ষা ক্ষেত্রে সফলতার ফলে দেখা গেছে, কাফের-মুশরিকরাও উপর্যুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ালেখা করার স্বপ্ন দেখতো এবং করতো। যেমন- বর্তমানে হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করা কিছু মানুষের কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়। যদিও তারা মুসলমান এবং জানে না পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সুফল কিংবা কুফল। ঠিক তেমনি মন থেকে ইসলাম মেনে না নিলেও ইসলামী রাষ্ট্র ছিল তৎকালীন মুসলিম-অমুসলিম পন্ডিত ও শিক্ষার্থীদের প্রাণকেন্দ্র স্বরূপ। অতএব, উপরিউক্ত বিষয়গুলো থেকে বুঝা যায় ইসলাম অবশ্যই বাস্তবায়িত ছিল।
৪) পররাষ্ট্রনীতি: বর্তমানে একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ চারপাশে শত্রু দ্বারা বেষ্টিত থাকা সত্ত্বেও বলা হয়- “Friendship to all, malice to none” অর্থাৎ ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়।’ কিন্তু এ ধরনের হাস্যকর পররাষ্ট্রনীতি খিলাফত রাষ্ট্রে ছিল না। বরং খিলাফত ব্যবস্থার পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে ইসলামের বাণী ও ন্যায়বিচার পৃথিবীতে অন্যান্য জাতির সামনে তুলে ধরা। শক্তিশালী নেতৃত্বও দূরদর্শী চিন্তার মাধ্যমে সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ ইসলামকে পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া ছিল পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম কাজ। এই নীতির ভিত্তিতেই ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি ভারতবর্ষে ইসলামকে নিয়ে এসেছিল। পররাষ্ট্রনীতির সফল বাস্তবায়নের কারণেই দুটি পরাশক্তি পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যকে হারিয়ে মুসলমানরা বিশ্বের নেতৃত্ব নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিল।
৫) শাসন ব্যবস্থা: শাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থার ৮টি স্তম্ভ ছিল। এগুলো হচ্ছে – খলীফা, প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী (মু’আউইন আত-তাফউইদ বা ওয়াযির), খলীফার নির্বাহী সহকারী (মু’আউইন আত-তানফীয), আমীরুল জিহাদ, গভর্নর, বিচারক মণ্ডলী, প্রশাসনিক বিভাগ ও পরামর্শ বা শুরা পরিষদ (মজলিস-আল-উম্মাহ)। এই কাঠামোটি ১৯২৪ সালের ৩রা মার্চ খিলাফত ধ্বংসের পূর্ব পর্যন্ত ছিল। যদিও ১৯১৮ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত খলীফা পদটি শধুমাত্র ১টি পদ হিসেবে ছিল। কিন্তু ১৯১৮ সাল পর্যন্ত খলীফার হাতে ছিল সকল নির্বাহী ক্ষমতা। তাছাড়া খলীফা যেমন-গোটা মুসলিম জাহানের শাসক ছিলেন, তেমনি দুনিয়ার নেতা বলে বিবেচিত হতেন। এজন্য রাষ্ট্রে শাসন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা ছিল খুবই সহজসাধ্য। গভর্নর, বিচারক, প্রশাসনিক বিভাগের লোকজন নিজেদের পদে আসীন ছিলেন এবং দায়িত্ব পালন করছিলেন, যদিও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ইসলামী বিভিন্ন ভূমি দখল করে নিয়েছিল। আমীরুল জিহাদের অন্যতম কাজ ছিল সৈন্যবাহিনীকে পরিচালনা করা, শত্রুর আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। তার নেতৃত্বে থাকার কারণে বিশ্বব্যাপী সেনাবাহিনী ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল। গভর্নরের কাজ ছিল জনগণের দেখাশোনা করা এবং রাজস্ব আদায় করে বায়তুল মালে অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা রাখা। কাজী অর্থাৎ বিচারকের কাজ ছিল শরীয়তের দন্ডবিধি জারি করা, বিচার-মীমাংসাদি করা ইত্যাদি। খুলাফা আর-রাশিদীন এর পরের দিকে মজলিস-আল-উম্মাহ প্রতিষ্ঠানটির প্রতি তেমন গুরুত্ব দেয়া হয়নি। যদিও শুরা হচ্ছে জনগণের অধিকার। তবে খলীফাগণ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার সমূহে পরামর্শ গ্রহণ করতেন। কিন্তু সে পরামর্শ গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। আবার বিনা তলবেও লোকে খলীফাকে পরামর্শ দান করতো এবং অনেক সময় সে পরামর্শ তাকে মঞ্জুর করতে হয়েছে। অতএব, খলীফা যদি পরামর্শ বা মতামত নেয়ার ব্যাপারে অবহেলা করেন, এর অর্থ এই নয় যে, তিনি খিলাফত কাঠামোকে এবং খিলাফত ব্যবস্থাকে অস্বীকার করেছেন। কারণ শুরা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সে রকম কোনো অংশ নয় যা না থাকলে খিলাফত ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে যায়। কাজেই এটা অবহেলা করলে খলীফা অবহেলাকারী হবেন কিন্তু ব্যবস্থা হিসেবে খিলাফত ব্যবস্থাই টিকে থাকবে। শুরা-র ক্ষেত্রে কিছুটা অবহেলার পরও দেখা গেছে মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের মাধ্যমে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সফলতার মাধ্যমে ব্যবস্থা হিসেবে খিলাফত ব্যবস্থাই প্রতিষ্ঠিত ছিল। খলীফার বায়’আত নেয়ার ব্যাপারে বায়’আত গ্রহণের পদ্ধতিতে কিছুটা অপপ্রয়োগ হয়েছিল। একজন খলীফা মৃত্যুর পূর্বে তার ছেলেকে যোগ্য মনে করে তার জন্য বায়’আত নিয়ে রাখতেন এবং তার মৃত্যুর পর বায়’আত পুনরায় নবায়ন করা হতো। তাই বলে এটা মনে করা উচিত না যে, রাজতন্ত্রের ন্যায় বংশানুক্রমিক শাসন ছিল। বরং খিলাফত শাসনামলের পুরো ইতিহাসে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি যে, বায়’আত ছাড়া কেউ খলীফা নির্বাচিত হয়েছেন। যেমন, বর্তমান ব্যবস্থার নির্বাচনে অনিয়ম বা কারচুপি হলেও সেটাকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নির্বাচনই বলি। তাছাড়া বর্তমানে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রের শাসকগণ কিছু পরিবার কেন্দ্রিক হওয়ার পরও সেসব রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা হয়। তাই বায়’আতের কিছুটা অপপ্রয়োগের কারণে খিলাফত ছিল না, তা বলা অনুচিত হবে। এছাড়াও আমরা জানি খিলাফতের সময়ের কোনো আলেমই খিলাফত ব্যবস্থাকে অন্য কোনো নামে আখ্যায়িত করেননি বরং খিলাফত ব্যবস্থাই বলেছিলেন। সে সময়কালের আলেমদের মধ্যে অন্যতম একজন আলেম ছিলেন জালালুদ্দিন সুয়ূতি যিনি রাসূলুলস্নাহ (সা)-এর প্রায় ৯০০ বছর পরের একজন আলেম এবং যিনি তার সময় পর্যন্ত খলীফাদের ইতিহাস নিয়ে ‘তারিখুল খুলাফা’ নামক একটি গ্রন্থ রচনা যেখানে তিনি অসংখ্য খলীফাদের নিয়ে আলোচনা করেছেন।
তাই আমাদের বুঝা উচিত বায়’আতের ব্যাপারে সমস্যা হলেও মূলত ইসলাম অর্থাৎ খিলাফত ব্যবস্থাই বাস্তবায়িত ছিল। তাছাড়া ইসলাম যে বাস্তবায়িত ছিল তা ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের সফলতা থেকে বুঝা যায় – ইসলামী জীবনাদর্শ তখনকার অন্ধকারাচ্ছন্ন দুর্বল আরব জাতিকে উন্নত চিন্তাশক্তি সম্পন্ন বুদ্ধিমান জাতিতে পরিণত করেছিল। ফলে, তৎকালীন যুগে আরবদেরকে বিজয়ী জাতি এবং অন্যান্য জাতিকে বিজিত জাতি বলে বিবেচনা করা হতো। জনগণের মধ্যে ধর্মীয় প্রেরণা প্রবলভাবে থাকায় কুরআনুল করীম ও সুন্নতে রাসূল (সা) ছাড়া অন্য কোনো আইন মেনে চলার বিষয়টি তারা বিবেচনাও করতো না। যদিও মুসলমানদের মধ্যে কিছু আত্মকলহ ছিল, তারপরও মুসলমানরা আরব থেকে ইসলামকে বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে নেয়ার ফলে পারস্য, ইরাক, মিশর, সিরিয়া প্রভৃতি ভূমিগুলো নিজেদের অধীনে নিয়ে এসেছিল। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অভিন্ন ধর্ম, জাতীয়তা, ভাষা, সংস্কৃতি থাকলেও ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের ফলে এরা সকলে এক জাতি অর্থাৎ এক ইসলামী উম্মাহতে পরিণত হয়েছিল। বিভিন্ন ধরনের অত্যাচার, হত্যা, আক্বীদাকে কলুষিত করার চেষ্টা সত্ত্বেও আজো এসকল মানুষ মুসলিম রয়ে গেছে। তাছাড়া ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের ফলে মুসলমানরা বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, চিকিৎসা প্রভৃতি ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় সাফল্য এনেছিল। খিলাফতের প্রথম দিকে আরবি ব্যাকরণের নাহুশাস্ত্রের প্রচলন শুরু হয়।
উপরিউক্ত বিষয়গুলো থেকে এটা স্পষ্ট যে, মুসলমানরা খিলাফত-এর মাধ্যমে ইসলাম বাস্তবায়িত করেছিল এবং তা ১৯২৪ সালে মুস্তফা কামাল পাশা (আল্লাহ তার উপর লানত করুক)-এর মাধ্যমে তুরস্কে ধ্বংস হয়েছিল। কাজেই আমরা বলতে পারি, যে শাসন ব্যবস্থা সারা বিশ্বে প্রায় দীর্ঘ ১৩০০ বছর শাসন করেছিল সেটাই একমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব এবং পুনর্জাগরণের জন্য উপযুক্ত। কিন্তু বর্তমানে বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের অভাবের কারণে মুসলমানরা অধঃপতিত ও নির্যাতিত অবস্থায় আছে। অতএব, বর্তমানে আবার সময় এসেছে সেই খিলাফত ব্যবস্থার গুরুত্ব বুঝার এবং খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করার। কারণ রাসূল (সা) বলেছেন-
“যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে তার কাঁধে (কোনো খলীফার) বায়’আত (আনুগত্যের শপথ) নেই তবে তার মৃত্যু হচ্ছে জাহিলিয়্যাতের (জাহেলি যুগের) মৃত্যু।” [মুসলিম]
উক্ত হাদীসে জাহেলি যুগ বলতে ‘ইসলাম ছিল না’-এমন যুগকে বুঝানো হয়েছে। হাদীসটিতে খলীফার বায়’আত ছাড়া মৃত্যুবরণকে জাহেলি যুগ অর্থাৎ ইসলামবিহীন অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। কিন্তু মুসলমান মাত্রই কেউই কখনোই চাইব না বা আশা করব না আমাদের মৃত্যু জাহেলি অবস্থায় মৃত্যুর মতো হোক। অথচ গত ৮০ বছরেরও বেশি সময় আমরা খলীফাবিহীন অবস্থায় আছি। শুধু তাই নয় খলীফা না থাকার কারণে কাফের মুশরিকরা আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে নিয়ে ব্যঙ্গ করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে, আমাদের উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা)-কে নিয়েও ব্যঙ্গাত্মক বই রচনা করছে, আমাদের পবিত্র কুরআনকে অবমাননা করার মতো এসকল ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করছে। কিন্তু আমরা জাতি খিলাফত দুর্বল অবস্থায় থাকার সময়েও (১৯০৩ সাল) তৎকালীন খলীফা (আবদুল হামিদ ২য়) জিহাদে আকবর ঘোষণা করায় বৃটেন সরকার রাসূল (সা)-কে নিয়ে নির্মিত নাটক বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল। খলীফা মু’তাসিম বিল্লাহর খিলাফতকালে একজন রোমান সৈন্য একজন মুসলিম দাসীকে অপহরণ করার কারণে মু’তাসিম বিল্লাহ ওই অঞ্চল দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই রকম খলীফা না থাকায় বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে কাফেররা মুসলিমদের হত্যা করছে, বাংলাদেশের মতো মুসলিম অধু্যষিত দেশে মুসলিম মেয়েদের পতিতাবৃত্তির মতো ঘৃণ্য কাজকে পেশা হিসেবে নিতে সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। সারা পৃথিবীকে নেতৃত্বদানকারী মুসলিম সভ্যতা আজ অধঃপতিত, লাঞ্চিত, অবহেলিত। এক সময় যে মুসলিম যুব সমাজ পৃথিবীকে আলো দেখিয়েছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানে, সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে আজ সেই মুসলিম যুব সমাজকে আখ্যায়িত করা হচ্ছে মোল্লা, জঙ্গী, মৌলবাদী, চরমপন্থী, উগ্রবাদী ইত্যাদি নানা রকম উপাধিতে।
কিন্তু সেই দিন আর বেশি দূরে নয় যখন মুসলিম উম্মাহ আবারো ফিরে পাবে হারানো গৌরব। আজ দিকে দিকে জেগে উঠছে মুসলমানরা। পূর্ব থেকে পশ্চিমে সর্বত্রই আজ সোচ্চার দাবি উঠছে শোষণ বঞ্চনামুক্ত একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার। আর মানুষের সার্বিক মুক্তির একমাত্র পথ হচ্ছে ইসলাম এবং একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থাই নিশ্চিত করতে পারে ইসলামের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন। বিশ্বব্যাপী আজ খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে আন্দোলন জেগে ওঠছে সে থেকে স্পষ্টতই বুঝা যায় খিলাফত খুব সন্নিকটে। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) তাঁর হাদিসে আমাদের সুসংবাদ দিয়েছেন”………… অতঃপর পুনরায় ফিরে আসবে নবুয়্যতের আদলের খিলাফত” [মুসনাদে আহমদ]। খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনার মহান আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা প্রতিটি মুসলমানের উপর একটি ফরয দায়িত্ব। আমরা যদি সঠিকভাবে ইসলাম নির্দেশিত পথে আমাদের দায়িত্বগুলো ঠিকমতো পালন করি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদেরকে শীঘ্রই খিলাফত দান করবেন যা মুসলিম উম্মাহকে আবারো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন করবে। আল্লাহ সুবহানাহুতা’য়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও নেক কাজ করে, আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, অবশ্যই তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে নেতৃত্ব দান করবেন,যেমন তিনি নেতৃত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীগণকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের জন্য তাদের দ্বীনকে যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং অবশ্যই তিনি তাদের ভয়-ভীতির পরে তা পরিবর্তিত করে দেবেন নিরাপত্তায়। তারা আমারই ইবাদত করবে, আমার সঙ্গে কোনো শরীক সাব্যস্ত করবে না। আর যারা এরপরও কুফরী করবে, তারাই তো ফাসেক। [সূরা আন-নূর: ৫৫]
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার তৌফিক দান করুন – আমিন।
আবু সুমাইয়া
২৯ জুন ২০০৯























