Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • সম্মান ও মর্যাদায় নারী-পুরুষকে সমান ঘোষণা করেছে ইসলাম

    পূর্ব প্রকাশের পর:

    মানব সমাজে নারী জন্মের অধিকার প্রতিষ্ঠা, কন্যা সন্তানের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার পর ইসলাম সম্মান ও মর্যাদার ক্ষেত্রেও নারী- পুরুষকে সমান ঘোষণা করেছে। জন্মগতভাবে নারী-পুরুষ আল্লাহর কাছে সমান বলে, নারীকে সম্মান ও মর্যাদার দিক থেকে পুরুষের সমকক্ষ ঘোষণা করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ঘোষণা করেছে,

    يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا


    “হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক উৎস থেকে। আর তা থেকে তোমাদের স্ত্রীদেরকেও সৃষ্টি করেছেন। এরপর তা থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে চাও। আর ভয় কর রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক।” (সূরা নিসা, আয়াত ০১)


    অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,

    يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ


    হে মানুষ, আমি তোমাদেরকে এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি। যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন। (সুরা আল-হুজরাত: ১৩)

    আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ ও সফল হওয়ার মানদন্ড নির্ধারণ করা হয়েছে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতিকে। তাই একজন নারী একজন পুরুষ হতেও শ্রেষ্ঠ হতে পারে। উপরের আয়াতে এ বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করে পুরুষদেরকে সতর্ক করা হয়েছে।

    স্ত্রী হিসেবে নারীর সম্মান-মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ইসলাম:

    নারী-পুরুষ বালেগ হওয়ার পর উভয়েই উভয়ের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করে। কিন্তু এটি যেনো তেনোভাবে না করে এজন্য ইসলাম বিবাহের মতো সুন্দর একটি বিধান দিয়েছে। আর এই বিবাহের মাধ্যমে আসলে মূলত: ইসলাম নারীদেরকেই লাভবান করেছে। দিয়েছে সম্মান ও মর্যাদার এক শীর্ষ চূড়া। বিবাহ সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে,

    هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا


    “তিনিই সে সত্তা যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক ব্যক্তি থেকে এবং তার থেকে বানিয়েছেন তার সঙ্গিনীকে, যাতে সে তার নিকট প্রশান্তি লাভ করে।” (সূরা আরাফ, আয়াত ১৮৯)

    বিবাহের মাধ্যমে মানুষ তাদের প্রাকৃতিক চাহিদা বৈধ পন্থায় পূর্ণ করে। পারিবারিক জীবনে প্রশান্তি লাভ করে। ইরশাদ হয়েছে:

    وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ


    আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে। (সুরা রূম: আয়াত ২১)

    আরো ইরশাদ হয়েছে,

    وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلًا مِنْ قَبْلِكَ وَجَعَلْنَا لَهُمْ أَزْوَاجًا وَذُرِّيَّةً


    “আর অবশ্যই তোমার পূর্বে আমি রাসূলদের প্রেরণ করেছি এবং তাদেরকে দিয়েছি স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি। (সুরা রা’দ: আয়াত ৩৮)

    অন্যত্র আরো ইরশাদ হয়েছে:

    هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ


    “তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের জন্যে পরিধেয় আর তোমরা তাদের জন্যে পরিধেয়।” (সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৭)



    বিবাহের মাধ্যমে দুটি পরিবারের মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নারী পুরুষের ইজ্জত-সম্ভ্রম হিফাজত হয়। পারিবারিক শান্তি ও সুন্দর জীবন লাভ করা যায়। এছাড়াও বিবাহের মাধ্যমে সামাজিক পর্যায়ে অনেক সুফল পাওয়া যায়। এজন্যেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্ত্রীর ভরু-পোষণ দিতে সক্ষম সকল যুবককে বিবাহের নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে:

    عن عبد الله بن مسعود قال لنا رسول الله صلى الله عليه و سلم ( يا معشر الشباب من استطاع الباءة فليتزوج فإنه أغض للبصر وأحصن للفرج ومن لم يستطع فعليه بالصوم فإنه له وجاء


    “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রীদের ভরু-পোষণের সক্ষমতা রাখে তারা যেন বিয়ে করে ফেলে। কেনন এটা চোখের প্রশান্তি দানকারী ও লজ্জাস্থানের হিফাজতকারী। আর যারা স্ত্রীদের ভরু-পোষণের সামর্থ্য রাখে না, তারা যেন রোজা রাখে, কেননা এটা তাদের উত্তেজনাকে হ্রাস করবে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৭৭৮)

    যুবকদেরকে বিবাহের ব্যাপারে উৎসাহিত করার জন্য বিবাহের ফজীলত সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেন,

    إذا تزوج العبد فقد استكمل نصف الدين فليتق الله في النصف الباقي


    “হযরত আনাস রা. থেকেব বর্ণিত, যখন কোন ব্যক্তি বিবাহ করে, তখন সে যেন তার অর্ধেক ঈমানকে পূর্ণ করে ফেললো। এখন বাকি অর্ধেকের ব্যাপারে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।” (মিশকাত শরীফ: হাদীস নং ৩০৯৭)

    স্ত্রীদের গুরুত্ব সম্পর্কে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:

    المرأة الصالحة من السعادة


    “উত্তম স্ত্রী সৌভাগ্যর পরিচায়ক।” (মুসলিম শরীফ)

    বৈরাগী জীবনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে,

    تَزَوَّجُوا فَإِنِّى مُكَاثِرٌ بِكُمُ الأُمَمَ وَلاَ تَكُونُوا كَرَهْبَانِيَّةِ النَّصَارَى


    “আবু উমামা রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: তোমরা বিবাহ কর, কেননা আমি তোমাদের নিয়ে উম্মতের আধিক্যের উপর গর্ববোধ করব। এবং তোমরা খৃষ্টান বৈরাগ্যদের মত হয়ো না।” (সুনানে কুবরা লিল বায়হাকী)

    পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ পুরুষদেরকে নেককার স্ত্রী ও নেক সন্তান কামনা করা শিখিয়েছেন এভাবে,

    وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ


    “আর যারা বলে, ‘হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে।” (সুরা ফুরক্বান, আয়াত ৭৪)

    অধিক খরচের গ্যারাকলে পরে পুরুষরা যেনো বিবাহ বিমুখ না হয়, সেজন্য ইসলাম বিবাহের ক্ষেত্রে বাহুল্য খরচ বর্জনের কথা বলেছে। বাহুল্য খরচ বর্জিত বিবাহকেই সবচেয়ে বেশী বরকতপূর্ণ ও উত্তম বিবাহ বলে ঘোষণা করা হয়েছে হাদীসের মাঝে। ইরশাদ হয়েছে,

    إن أعظم النكاح بركة أيسره مؤنة

    হযরত আয়শা রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয়ই সবচেয়ে বেশি বরকত ও কল্যাণময় বিবাহ হচ্ছে সেটি, যেখানে খরচ কম হয় (অহেতুক খরচ হয় না)।” (বায়হাকী, ঈমান অধ্যায়)

    বিবাহের মাধ্যমে নারী-পুরুষ উভয়েই নিজেদের প্রয়োজন পূর্ণ করলেও ইসলাম নারীদের জন্য বোনাস পাওয়ার ব্যবস্থা রেখেছে। পুরুষের উপর বিবাহের সময় স্ত্রীদের জন্য মহর দেয়া ফরজ করেছে। ঘোষণা করেছে,

    انْكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ وَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ


    “সুতরাং তোমরা তাদেরকে তাদের অভিভাবকদের অনুমতিক্রমে বিবাহ কর এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে তাদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও।” (সূরা নিসা: আয়াত ২৫)

    অন্যত্র আরো ইরশাদ হয়েছে,

    وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً


    “আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও।” (সূরা নিসা: আয়াত ৪)



    বিবাহের পর স্ত্রীদের সাথে সর্বদা সদাচারণ বজায় রাখার নির্দেশ দিয়ে ইসলাম ঘোষণা করেছে,

    وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ


    “আর তোমরা তাদের সাথে সদাচারণ করো।” (সূরা নিসা: আয়াত ১৯)



    নিজে ভালো খাবে, উত্তম পোষাক পড়বে আর স্ত্রীদেরকে নিম্ন মানের জীবন ধারণে বাধ্য করার জাহেলি মানসিকতাকে সমূলে বিনাশ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে,

    أَسْكِنُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ سَكَنْتُمْ مِنْ وُجْدِكُمْ


    “তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বসবাস কর সেখানে তাদেরকেও বাস করতে দাও।” (সূরা তালাক, আয়াত ৬)

    নারীর নিজের ভরণ-পোষণের পাশাপাশি সন্তানের দায়িত্বও স্বামীর কাঁধে তুলে দেয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে,

    لِيُنْفِقْ ذُو سَعَةٍ مِنْ سَعَتِهِ وَمَنْ قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ فَلْيُنْفِقْ مِمَّا آتَاهُ اللَّهُ

    “বিত্তশালীরা যেনো সামর্থানুযায়ী স্ত্রী-সন্তানের উপর ব্যয় করে। সীমিত উপার্জনকারীরা আল্লাহর দেয়া অর্থানুপাতে ব্যয় করবে।” (সূরা তালাক, আয়াত ৭)

    পুরুষদের উপর নারীদের অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে ঘোষণা করেছে,

    وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِى عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكُيمٌ


    “নারীদের উপর যেমন তোমাদের কিছু অধিকার রয়েছে ঠিক তেমনি তোমাদের উপরও তাদের কিছু অধিকার রয়েছে। স্ত্রীর উপর পুরুষের মর্যাদা। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।” (সূরা বাকারা : আয়াত ২২৮)

    নারীদেরকে দূর্বল ও অসহায় পেয়ে যাতে করে কেউ তাঁদের উপর জুলুম ও অত্যাচার না করে সেজন্যে ইসলাম ঘোষণা করেছে,

    وَلاَ تُمْسِكُوهُنَّ ضِرَارًا لِّتَعْتَدُواْ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ


    “আর তোমরা স্ত্রীদেরকে কষ্ট দেয়ার জন্যে আটকে রেখো না। আর যারা এ ধরণের জঘন্যতম অন্যায় করবে তারা নিজেদের উপরই জুলুম করবে।” (সূরা বাকারা : আয়াত ২৩১)

    বার্ধক্যেও নারীর সম্মান-মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে ইসলাম:

    বার্ধক্যে নারীদের দায়িত্ব সন্তানদের উপর অর্পন করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, 

    وَوَصَّيْنَا الإِنْسَـٰنَ بِوَالِدَيْهِ حُسْناً


    “আর আমি মানুষদেরকে তাদের পিতা-মাতার সাথে সদাচারণের নির্দেশ দিয়েছি।” (সূরা আনকাবুত : আয়াত ৮)

    অন্যত্র আরো ইরশাদ হয়েছে,

    وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا


    “আর তুমি তাদের (তোমার পিতা-মাতার) সামনে দীনতার পক্ষপুটকে বিছিয়ে দাও। আর বলো যে, হে আমার রব! আপনি তাদের উপর রহম করুন, যেমন তারা আমার উপর বাল্যকালে রহম করেছেন। ” (সূরা বনী ইসরাঈল : আয়াত ২৪)

    অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,

    وَإِن جَـٰهَدَاكَ عَلَىٰ أَن تُشْرِكَ بِى مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلاَ تُطِعْهُمَا وَصَـٰحِبْهُمَا فِى الدُّنْيَا مَعْرُوفاً

    “আর তাঁরা যদি তোমাকে আমার সাথে শিরক করার এমন বিষয়ের বাধ্য করে তোমাদের কাছে যার জ্ঞান নেই, তবে (সেক্ষেত্রে) তুমি তাঁদের অনুসরণ করো না। তবে তাঁদের সাথে দুনিয়াতে সৎব্যবহার এবং সদাচারণ বজায় রাখো।” (সূরা লুকমান, আয়াত ১৫)

    চলবে…

    পরবর্তী পর্ব: অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষের উপর নারীকে অগ্রাধিকার দিয়েছে ইসলাম

    ইসহাক খান

  • বর্তমান বিশ্বে বিদ্যমান মতাদর্শ সমূহ

    বর্তমান বিশ্বে তিন ধরনের মতাদর্শ বিদ্যমান আছে।

    ১- ইসলাম।
    ২- গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদ।
    ৩- সমাজতন্ত্র।

    গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদ (الديمقراطية الرأسمالية)

    এটি পশ্চিমা বিশ্ব এবং মার্কিনীদের মতবাদ। এই মতবাদ ধর্মকে রাষ্ট্র এবং জীবন থেকে আলাদা রাখার মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত।

    “Render unto Caeser what is Caesar’s and unto God what is God’s”

    বলা হচ্ছে “যা কিছু সিজারের (রাজার) তা তার মত কর, আর যা কিছু খোদার তা তার (খোদার) ইচ্ছার উপর ছেড়ে দাও।” এ কারনে এই মতবাদে মানুষের জীবন ব্যবস্থার প্রবর্তক মানুষ নিজেই। এটি কুফুরী দৃষ্টি ভঙ্গি এবং ইসলামের সম্পূর্ন বিপরীত মতবাদ। কারণ বিধান প্রবর্তক এক মাত্র আল্লাহ তা’আলা এবং তিনি সম্পূর্ন এককভাবেই মানুষের জীবনব্যবস্থা প্রনয়নকারী। তিনি রাষ্ট্রকে ইসলামী বিধি-বিধানের অংশে পরিনত করেছেন এবং জীবনের প্রতিটি বিষয়কে শরীআতের নীতি মোতাবেক যাপন করা বাধ্যতামূলক করেছেন। গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদকে জীবন ব্যবস্থা হিসাবে গ্রহন করা কিংবা এর চিন্তা-ভাবনাকে অবলম্বন করা মুসলমানদের জন্য হারাম। কারণ এর আদর্শ ও আইন-কানুন সবই কুফুরী এবং ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক।

    অধিকার বা স্বাধীনতা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

    পুঁজিবাদী জীবনাদর্শে যে বিষয়গুলোর উপর সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দেয়া হয়, তার অন্যতম হচ্ছে ব্যক্তির বিভিন্ন প্রকার স্বাধীনতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি। এই স্বাধীনতাগুলো হল বিশ্বাসের স্বাধীনতা, মতামতের স্বাধীনতা, মালিকানার স্বাধীনতা এবং ব্যক্তি স্বাধীনতা। স্বার্থসর্বস্ব পুঁজিবাদী অর্থনীতির গোড়াপত্তনই হয়েছে মলিকানার স্বাধীনতার ফল স্বরূপ। এর ফলশ্রুতিতেই পশ্চিমা ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন জাতিকে উপনিবেশে পরিনত করে তাদের ধন-সম্পদ লুট করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে একচেটিয়াত্বের সুযোগ তৈরী করে নিচ্ছে।

    উপরোক্ত চার প্রকার স্বাধীনতাই ইসলামী আকীদার সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ কোন মুসলমান আকীদা ও বিশ্বাসগতভাবে স্বাধীন নয়। তাই কেউ যদি মুরতাদ হয়ে যায় অর্থাৎ ইসলাম ত্যাগ করে, তাহলে ইসলামের বিধান হচ্ছে তাকে বন্দি করে রাখা এবং সে যদি তওবা না করে, তাহলে তাকে হত্যা করা। রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) ইরশাদ করেন, “যে তার দ্বীন পরিবর্তন করে, তাকে হত্যা কর।”

    এমনিভাবে মত প্রকাশের ব্যাপারেও মুসলমানরা স্বাধীন নয়। বরং ইসলামের মতই একজন মুসলমানের মত। ইসলাম পরিপন্থী কোন মত পোষণ করা মুসলমানের জন্য জায়েয নয়।

    কোন মুসলমান মালিকানার ব্যাপারেও স্বাধীন নয়। সে শুধু শরঈ ভিত্তিতেই কোন কিছুর মালিক হতে পারে। নিজের ইচ্ছা মতো কোন কিছুর মালিকানা দাবী করতে পারেনা।

    শরীয়ত মালিকানা লাভের যে সব উপায় নির্ধারণ করে দিয়েছে, তা ব্যতীত অন্য কোন মাধ্যমে সে কোন বস্তুর মালিক হতে পারেনা। শরীয়তের নিষিদ্ধ পথে মালিকানা অর্জন করা কখনও মুসলমানের জন্য বৈধ নয়। তাই একজন মুসলমানের জন্য সুদ, একচেটিয়াত্ব, মজুতদারী অথবা মদ, শুকর বিক্রি করে বা অন্য কোন নিষিদ্ধ উপায়ে মালিকানা লাভ করা নিষিদ্ধ।

    ইসলামে ব্যক্তি স্বাধীনতারও কোন অস্তিত্ব নেই। কোন মুসলমান ব্যক্তিজীবনে স্বাধীন নয়। বরং প্রত্যেকেই শরীয়তের অধীন। সুতরাং কেউ যদি নামায পড়া ছেড়ে দেয় কিংবা রোযা না রাখে অথবা নেশা করতে শুরু করে কিংবা ব্যাভিচারে লিপ্ত হয়,তাহলে তাকে শাস্তি দিতে হবে। এমনি ভাবে মহিলারা যদি বেপর্দায় বাইরে চলা ফেরা করে,তাহলে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে। অতএব, পশ্চিমা পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে সব স্বাধীনতার কথা বলা হয় ইসলামে এমন স্বাধীনতার কোন অবকাশ নেই। এই লাগামহীন স্বাধীনতার চিন্তা সম্পূর্ন ভাবে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক।

    পুঁজিবাদী মতাদর্শের অন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হচ্ছে গণতন্ত্র

    গণতন্ত্র সম্পর্কে ইসলামের মতামত

    গণতন্ত্রের সংজ্ঞা হচ্ছে “জনগণের কর্তৃত্বাধীন, জনগণের জন্য, জনগণ দ্বারা পরিচালিত শাসন ব্যবস্থা।” গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বুনিয়াদি কথা হচ্ছে- সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে মানুষই সকল ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের অধিকারী। সকল বিধি-বিধিান কার্যকর করার ক্ষমতাও মানুষের। মানুষ নিজেই নিজের ইচ্ছা মত বিধি-বিধিান প্রনয়ন করবে। সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে তাদের উপর কর্তৃত্ব করার আর কেউ নেই। তারা যে ভাবে ইচ্ছা সে ভাবে আইন প্রনয়ন ও প্রয়োগ করার অধিকারী। যদি কোন আইন রহিত করার ইচ্ছা হয়, তাও মানুষ করতে পারে। এ কাজে যদি মানুষ সরাসরি নিজে অংশ নিতে না পারে, তাহলে তারা এমন প্রতিনিধি নির্বাচন করবে, যে তাদের পক্ষ থেকে আইন প্রনয়ণ করার অধিকার রাখবে। যেহেতু দেশের সকল জনগণের পক্ষে একযোগে সরকার পরিচালনা করা বড়ই দুরূহ ব্যাপার, তাই মানুষ নিজেদের প্রণীত আইনগুলো কার্যকর করার জন্য (অর্থাৎ শাসনকার্য পরিচালনার জন্য) জন প্রতিনিধি নির্বাচন করে থাকে। মোট কথা পশ্চিমা পুঁজিবাদী গণতন্ত্রে জনগণই ক্ষমতার মূল উৎস। জনগণই শাসক এবং জনগণই আইন প্রবর্তক।

    গণতন্ত্র নামী এ ব্যবস্থাটি কুফুরী। কারন এটি মানুষের নিজের বানানো ব্যবস্থা, ইসলামী শরীআতী ব্যবস্থা নয়। সুতরাং এই ব্যবস্থা দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা করার অর্থ হচ্ছে কুফুর দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা করা। তাই এই ব্যবস্থার প্রতি মানুষকে আহ্বান করার অর্থ কুফুরী ব্যবস্থার প্রতি মানুষকে আহ্বান করা। অতএব কোন অবস্থাতেই গণতন্ত্রের প্রতি আহ্বান করা বা তা অবলম্বন করা জায়েয নেই। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ইসলামী শরীয়তের বিপরীত।

    কেননা মুসলমান মাত্রই সকল কাজের ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র আহ্‌কাম মেনে চলতে বাধ্য। মুসলমান আল্লাহ্‌র গোলাম। সে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র আদেশ ও নিষেধানুযায়ী সকল কাজ সম্পাদন করবে।

    মুসলিম উম্মাহ্‌’র জন্য এই বৈধতা নেই যে, তারা নিজেদের খেয়াল খুশীমত আচরণ করবে। কারণ তাদের এই সার্বভৌমত্ব নেই। সকল সার্বভৌমত্ব শরীআতের তথা আল্লাহ্‌র। তাই উম্মাহ্‌র আইন প্রবর্তন করার কোন অধিকার নেই। আইন প্রণেতা হলেন একমাত্র আল্লাহ্‌ তা’আলা। সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্‌ একত্রিত হয়েও যদি আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে হারাম করা কোন কিছুকে হালাল করতে চায়, তবু তারা তা করার অধিকার রাখেনা।

    যেমন সুদ, মজুতদারী, ব্যাভিচার, মদপান ইত্যাদি হারামগুলোর কোন একটিকে হালাল করার জন্য যদি সমগ্র উম্মাহ মিলেও আইন প্রনয়ণ করে, তবু তাকে হালাল বলা যাবে না।

    কোন মুসলমান যদি অব্যাহত ভাবে এ ধরনের কোন কিছু করার চেষ্টা করে, তাহলে প্রয়োজনে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। তবে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বান্দাকে শাসনের দায়িত্ব তথা তাঁর বিধান কার্যকর করা ও তা সমাজে প্রচলন ঘটানোর অধিকার অর্পন করেছেন। উম্মাহ্‌’র অধিকার রয়েছে নিজের শাসক (খলীফা) নির্বাচন বা নিয়োগ করার। এটা এ জন্য করা হয় যেন শাসক আল্লাহ্‌র হুকুম কার্যকর করার ব্যাপারে উম্মাহ’র প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। শাসক নিযুক্ত করার পদ্ধতিও (বাই’আত) আল্লাহ্‌ তা’আলা মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেন। এই পদ্ধতি দ্বারাই সার্বভৌমত্ব, অধিকার ও কর্তৃত্বের পার্থক্য নির্ণয় হয়ে যায়। উম্মাহ্‌র অধিকার হচ্ছে শাসক নির্বাচন করা। কর্তৃত্বের দায়িত্ব হচ্ছে খলীফার আর শাসনের মালিকানা এবং সার্বভৌমত্ব হচ্ছে আল্লাহ্‌র।

    সমাজতন্ত্র (الشيوعية)

    সমাজতন্ত্র তথা কমিউনিজম হচ্ছে একটি বস্তুবাদী মতবাদ। যা বস্তু ছাড়া সব কিছুকেই অস্বীকার করে। এই মতবাদের দাবী হলো বস্তুই জগতের মূল উৎস; বস্তুর কোন আদি অন্ত নেই; এই বস্তু কোন স্রষ্টার সৃষ্টি নয় এবং সৃষ্টিকর্তা বলতে কিছুই নেই; এমনি ভাবে কেয়ামত দিবসেরও কোন বাস্তবতা নেই। এই মতবাদ ধর্মকে জনগণ ও জাতির জন্য আফিমের মত ক্ষতিকর মনে করে।

    এই বস্তুবাদী মতাদর্শ বস্তু ও ইতিহাসের বিবর্তন তত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই তত্ত্বানুসারে বস্তু নিজেই সকল সৃষ্টির মূল উৎস। আর বস্তুর বিবর্তনের মাধ্যমেই জগতের সব কিছু উৎপত্তি লাভ করে। কমিউনিজমের তত্ত্ব অনুসারে সমাজব্যবস্থা উৎপাদনের হাতিয়ার থেকে উৎসারিত আর উৎপাদনের হাতিয়ারের উন্নয়নের সাথে সাথে সমাজ ব্যবস্থারও উন্নতি ঘটে। এ মতবাদে সমাজ বলা হয় একটা ব্যাপক সমষ্টিকে, যা ভুমি, উৎপাদনের হাতিয়ার, প্রকৃতি এবং মানুষের সমন্বয়ে গঠিত। এই সব একই জিনিষ এবং তা হচ্ছে বস্তু। যখন প্রকৃতি ও প্রকৃতির মধ্যস্থিত বস্তুর উন্নতি সাধিত হয়, তখন তার সাথে সাথে মানুষ এবং সমাজেরও উন্নতি সাধিত হয়।

    একারনেই বস্তুবাদী মতাদর্শানুযায়ী সমাজ সদা বিবর্তনশীল। যদি সমাজের বিবর্তন ঘটে, তাহলে মানুষেরও বিবর্তন ঘটে। সমাজের সাথে সাথে মানুষও এমন ভাবে এগিয়ে যায় যেমনি ভাবে চাকার সাথে স্পোকগুলোও এগুতে বাধ্য হয়। কমিউনিজম উৎপাদন উপাদানের ব্যক্তি মালিকানাকে স্বীকার করেনা। এই মতবাদে সব কিছুর মালিকানা রাষ্ট্রের। কমিউনিজম একটি কুফুরী মতবাদ। এর চিন্তা কুফুরী, এর-ব্যবস্থা কুফুরী এবং সামগ্রিক ভাবেই তা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক।

    ইসলাম বলেছে ও দলিল দ্বারা প্রমান করেছে যে, বস্তু হচ্ছে সৃষ্টি। এটা আদৌ “আযালী” বা অনাদি-অনন্ত নয়। একে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তা এক সময় শেষ হয়ে যাবে। মানুষ, জগত-সমূহ এবং এতে যা কিছু আছে সবকিছু একমাত্র সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ্‌ তা’আলার মাখলূক বা সৃষ্টি। জীবন ব্যবস্থা আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকেই আসবে, বস্তুর উন্নতি কিংবা উৎপাদন উপাদান বা কোন মানুষের পক্ষ থেকে নয়। ইসলাম সমাজের যে ব্যাখ্যা দিয়েছে সে অনুযায়ী সমাজ হলো মানুষ, মানুষের চিন্তা, অনুভূতি এবং ব্যবস্থাদির সমষ্টি। সমাজের পরিচয় নির্ণীত হয় সেখানে প্রচলিত মতাদর্শের পরিচয় অনুযায়ী। যদি কোন সমাজে ইসলামী মতাদর্শের প্রচলন এবং কর্তৃত্ব থাকে, তাহলে সে সমাজকে বলা হবে ইসলামী সমাজ; এখন সেখানকার উৎপাদন ব্যবস্থায় যে ধরনের হাতিয়ারেরই প্রাধান্য থাকুকনা কেন। অনুরূপ ভাবে যে সমাজে পুঁজিবাদী গণতন্ত্র কার্যকর থাকে, তাকে বলা হয় পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক সমাজ। যে সমাজে কমিউনিজম কার্যকর থাকে, তাকে বলা হয় কমিউনিষ্ট সমাজ যদিও সে সমাজে প্রচলিত উৎপাদন যন্ত্রপাতি হুবহু সেগুলোই থাকে, যে গুলো হয়তো বিদ্যমান আছে কোন পুঁজিবাদী সমাজে।

  • একমাত্র ইসলামই দিয়েছে ‌’নারীর সম্মান, মর্যাদা ও অধিকার’

    বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যে বিষয়টি নিয়ে পাশ্চাত্য খুবই শোর গোল করছে। যার সূত্র ধরে ইসলাম বিরোধী অপশক্তি গুলোও ইসলামের উপর কালিমা লেপনের অপচেষ্টায় আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছে, পশ্চিমাদের এজেন্ট, কুফরী শক্তির দালালরা ইসলাম ও মুসলিমদের তাহযীব-তামাদ্দুনকে সমূলে ধ্বংস করে মুসলিম উম্মাহকে চিরতরে পঙ্গু করার জন্য যেই ভয়ংকর মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে তার নাম হচ্ছে -নারী অধিকার, নারী স্বাধীনতা। আর এ বিষয়টির ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী কি সে সম্পর্কে অনেকেই অনেকভাবে, অনেক আঙ্গিকে লিখেছেন। আমি আমার এই লেখায় কুরআন-সুন্নাহ এবং বাস্তবতার আলোকে আমার উপলব্ধি টুকু শেয়ার করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

    বর্তমান পাশ্চাত্য এবং ইসলাম বিদ্বেষী অপশক্তি আজ অত্যন্ত কৌশলে মুসলিম উম্মাহর নারীদেরকে টার্গেট করেছে। তারা মুসলিম পারিবারিক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে দেয়ার নীল নকশা বাস্তবায়নের জন্য নারীদেরকে রাস্তায় নামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। অধিকার কিংবা আর্থিক স্বনির্ভরতার টোপ ফেলে তারা সহজ-সরল মুসলিম রমণীদেরকে হিজাব ও পর্দার সবচেয়ে নিরাপদ স্থান তাদের ঘর থেকে তাদেরকে মাঠে ময়দানে টেনে আনার অপচেষ্টা করছে।

    বাস্তবতার মাথা খেয়ে স্বার্থান্ধ একদল অপরদিকে বলে চলেছে যে, ইসলাম নারীকে শেকল পরিয়ে চার দেয়ালের মাঝে বন্দী করে রেখেছে। ইসলাম নারীকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। তাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে জুলুমের বোঝা -নাউযুবিল্লাহ।

    নারী সম্পর্কিত এধরণের হাজারো অভিযোগ আজ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে ইসলামের উপর। বাঁধ ভাঙ্গা স্রোতের মতো বিষোদ্গারের ঢল নামানো হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা হলো এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমি বলবো, কেবলমাত্র ইসলামই এমন এক দীন বা জীবন ব্যবস্থা, যা নারী জাতিকে তাদের ন্যায্য অধিকার দিয়েছে। তাদেরকে সমাসীন করেছে সম্মান ও মর্যাদার সর্বোচ্চ আসনে। আর হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ই একমাত্র ব্যক্তিত্ব যিনি নারীদের সকল অধিকার আদায় করে দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। সমাজের বুকে নারীদের সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে দেখিয়ে দিয়েছেন। যদি আমরা ইসলাম পূর্ব আইয়্যামে জাহেলিয়াত ও ইসলাম পরবর্তী সময়ের নারীদের অবস্থা ও অবস্থানের দিকে তাকাই তাহলে বিষয়টি দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট হয়ে যাবে।

    নারী জন্মের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলাম:ইসলাম আসার পূর্বে সেই আইয়ামে জাহেলিয়াতে নারীদেরকে সামাজিক মর্যাদা দেয়া তো দূরের কথা তাদের বেঁচে থাকার অধিকার পর্যন্ত ছিলো না। কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণের কথা শ্রবণ করার সাথে সাথেই সকলের মুখ কালো হয়ে যেতো। তাকে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলার জন্য সকলে আয়োজনে ব্যতি ব্যস্ত হয়ে উঠতো এবং এই কন্যা সন্তানকে মাটিতে জীবন্ত প্রোথিত করাকেই নিজেদের জন্য সম্মান, মর্যাদা ও পুন্যের কাজ বলে মনে করতো। জাহেলী যুগের সেই সময়কার ভয়বহ এই অবস্থার কথা তুলে ধরে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,

    وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُمْ بِالْأُنْثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًّا وَهُوَ كَظِيمٌ. يَتَوَارَى مِنَ الْقَوْمِ مِنْ سُوءِ مَا بُشِّرَ بِهِ أَيُمْسِكُهُ عَلَى هُونٍ أَمْ يَدُسُّهُ فِي التُّرَابِ أَلَا سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ

     “আর যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়; তখন তার চেহারা কালো হয়ে যায়। আর সে থাকে দুঃখ ভারাক্রান্ত। তাকে যে সংবাদ দেয়া হয়েছে, সে দুঃখে সে কওমের থেকে আত্মগোপন করে। আপমান সত্ত্বেও কি একে রেখে দেবে, না মাটিতে পুঁতে ফেলবে? জেনে রেখ, তারা যা ফয়সালা করে, তা কতই না মন্দ!” (সুরা নাহল: আয়াত ৫৮, ৫৯)

    ইসলাম পূর্ব আরব সমাজে নারীদের অবস্থা এমনই ছিলো। এমনকি ইসলাম ব্যতীত অন্য সকল ধর্মে আজ পর্যন্ত নারী জাতির অধিকারের কোনো স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।

    হিন্দুধর্মে নারী জাতিকে মৃত্যু, নরক, সর্প, বীষ ও আগুন থেকেও মারাত্মক বলা হয়েছে। স্বামী ছাড়া নারী জাতির আলাদা কোনো অস্তিত্বকে স্বীকার করা হয় নি। যার কারণে স্বামী মারা গেলে স্ত্রীকেও তার স্বামীর সাথে সহমরণে যেতে বাধ্য করার কথা বলা হয়েছে।

    খৃষ্টান ধর্মে নারী জাতিকে চরম লাঞ্চনার বস্তু বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাই তো খৃষ্টান পাদ্রী মি: সেন্ট টার্টুলিয়ামের মতে, নারী হচ্ছে বন্য জন্তুর চেয়েও অধিক বিপদজনক। অন্য আরেক পাদ্রী সেন্ট ক্রিয়ান নারীকে বীষধর সাপের সাথে তুলনা করে তার থেকে দূরে সরে থাকতে বলেছেন। সপ্তদশ শতকে খৃষ্টধর্মের রাজধানী রোমে বিত্তবানদের একটি কাউন্সিল সমবেত সকল শীর্ষ ব্যক্তি এই মর্মে সর্বসম্মতিক্রমে একমত হয়েছিল যে, নারীর কোন আত্মা নেই।

    ইহুদী ধর্মে নারীকে পুরুষের জন্য প্রতারক বলা হয়েছে। তাদের মতে একজন সতী নারীর চেয়ে একজন পাপিষ্ট পুরুষ বহু গুণে শ্রেষ্ঠ।

    বৌদ্ধধর্মে কন্যা সন্তান জন্ম লাভ করাকে অলক্ষণীয় বলে মনে করা হয়। নারীর কোনো অধিকার আছে বলে স্বীকৃতি দেয় না।

    এভাবে ইসলাম ছাড়া অন্য সকল ধর্মেই নারী জাতিকে পাপিষ্ট, অলুক্ষুণে, অপয়া ও ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদেরকে কোনো অধিকার দেয়া তো দূরের কথা, তাদেরকে মানুষ বলেই স্বীকার করা হয়নি। তারা নারীদেরকে কেবলমাত্র ভোগের পণ্য হিসেবেই গণনা করতো। -এমনিভাবে সর্বত্রই যখন নারী জাতির এমন লাঞ্চনা-গঞ্জনা আর অসম্মান ঠিক সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তে ইসলাম এসে তৎকালীন সেই বর্বর যুগের অমানুষিক জুলুম থেকে নারীকে মুক্ত করেছে। ইসলামই একমাত্র দীন -যা নারী জাতিকে ফিরিয়ে দিয়েছে তাদের যথাযথ অধিকার।

    ইসলাম এসে ধাপে ধাপে নারী জাতিকে তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, সম্মান ও মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। যেই সমাজে নারী জন্মই পাপ বলে গণ্য হতো সেখানে ইসলাম সর্বপ্রথমই নারীজন্মের অধিকার নিশ্চিত করেছে। নারী সন্তানকে হত্যাকারীদের জন্য কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছে। ঘোষণা করেছে,

    وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُئِلَتْ. بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ

    “আর স্মরণ করো সেই দিনের কথা! যখন জীবন্ত কবরস্থ কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে?” (সুরা তাকউইর, আয়াত ৮-৯)

    কন্যা সন্তানের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় ইসলাম:

    সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে হবে এটি নির্ধারণ করেন স্বয়ং মহান আল্লাহ। তিনি যাকে চান তাকেই নির্দিষ্ট লিঙ্গের সন্তান দান করেন। কাউকে আবার নি:সন্তান করে রাখেন। সুতরাং নি:সন্তানদের তুলনায় কন্যা সন্তানের অভিভাবকগণ যে কতো অকল্পনীয় মর্যাদার অধিকারী এবং কন্যা সন্তানও যে সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান হতে পারে সে সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে, 

    لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُورَ. أَوْ يُزَوِّجُهُمْ ذُكْرَانًا وَإِنَاثًا وَيَجْعَلُ مَنْ يَشَاءُ عَقِيمًا إِنَّهُ عَلِيمٌ قَدِيرٌ

    “আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে পুত্র ও কন্যা উভয়ই দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করেন। তিনি তো সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।” (সুরা শু’রা: আয়াত ৪৯, ৫০)

    কুরআনের পাশাপাশি হাদীসের মাঝেও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কন্যা সন্তানদেরকে খুবই সম্মান ও মর্যাদার উপলক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, “ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত; তিনি বলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন;

    যে ব্যক্তির একটি মেয়ে আছে আর সে তাকে তুচ্ছ মনে করে নাই, অপমানিত করে নাই এবং ছেলেদের উপর প্রাদান্য দেয় নাই। আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।” (সুনানে আবু দাউদ)

    আরো ইরশাদ হয়েছে, “আনাস ইবনে মালেক রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন;

    যে ব্যক্তি দুটি কন্যা সন্তান সাবালক হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করল সে কেয়ামতের দিবসে আমার সাথে থাকবে।” (সহীহ মুসলিম)

    অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, “উকবা ইবনে আমের হতে বর্ণিত: তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেন;

    عن عقبة بن عامر يقول : سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول ” من كان له ثلاث بنات ، فصبر عليهن وأطعمهن وسقاهن وكساهن من جدته ، كن له حجابا من النار يوم القيامة ” (سنن ابن ماجة)

    যে ব্যক্তির তিনটি কন্যা সন্তান আছে অত:পর সে তাদের নিয়ে ধৈর্য্য ধারন করে এবং তাদেরকে ভরণ-পোষণ দিয়ে খাওয়ায় পান করায় তার নিজ সম্পদ থেকে, ক্বিয়ামতের দিবসে ঐ কন্যা সন্তানগুলো তার জন্য জাহান্নাম থেকে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)

    আরো ইরশাদ হয়েছে,

    عن أبى سعيد الخدرى ، قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : (من عال ثلاث بنات فأدبهن وزوجهن وأحسن إليهن فله الجنة) (سنن أبي داود)

    “আবু সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত: তিনি বলেল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন; যে ব্যক্তির তিনটি কন্যা সন্তান আছে, সে তাদেরকে আদব শিক্ষা দিয়েছে এবং বিবাহ দিয়েছে এবং তাদের সাথে সদাচরন করেছে, তার জন্য রয়েছে জান্নাত।” (সুনানে আবু দাউদ)

    অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,

    أكمل المؤمنين إيمانا أحسنهم خلقا. وخياركم خيار لنسائه وبناته

     “পরিপূর্ণ মু’মিন হলো সেই ব্যক্তি, যার আখলাক-চরিত্র উত্তম। আর তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রী-কন্যাদের কাছে উত্তম।””

    সম্মান ও মর্যাদায় নারী-পুরুষকে সমান ঘোষণা করেছে ইসলাম

    মানব সমাজে নারী জন্মের অধিকার প্রতিষ্ঠা, কন্যা সন্তানের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার পর ইসলাম সম্মান ও মর্যাদার ক্ষেত্রেও নারী- পুরুষকে সমান ঘোষণা করেছে। জন্মগতভাবে নারী-পুরুষ আল্লাহর কাছে সমান বলে, নারীকে সম্মান ও মর্যাদার দিক থেকে পুরুষের সমকক্ষ ঘোষণা করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ঘোষণা করেছে,

    يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا

    “হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক উৎস থেকে। আর তা থেকে তোমাদের স্ত্রীদেরকেও সৃষ্টি করেছেন। এরপর তা থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে চাও। আর ভয় কর রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক।” (সূরা নিসা, আয়াত ০১)

    অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,

    يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ

    হে মানুষ, আমি তোমাদেরকে এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি। যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন। (সুরা আল-হুজরাত: ১৩)

    আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ ও সফল হওয়ার মানদন্ড নির্ধারণ করা হয়েছে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতিকে। তাই একজন নারী একজন পুরুষ হতেও শ্রেষ্ঠ হতে পারে। উপরের আয়াতে এ বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করে পুরুষদেরকে সতর্ক করা হয়েছে।

    স্ত্রী হিসেবে নারীর সম্মান-মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ইসলাম:

    নারী-পুরুষ বালেগ হওয়ার পর উভয়েই উভয়ের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করে। কিন্তু এটি যেনো তেনোভাবে না করে এজন্য ইসলাম বিবাহের মতো সুন্দর একটি বিধান দিয়েছে। আর এই বিবাহের মাধ্যমে আসলে মূলত: ইসলাম নারীদেরকেই লাভবান করেছে। দিয়েছে সম্মান ও মর্যাদার এক শীর্ষ চূড়া। বিবাহ সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে,

    هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا

    “তিনিই সে সত্তা যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক ব্যক্তি থেকে এবং তার থেকে বানিয়েছেন তার সঙ্গিনীকে, যাতে সে তার নিকট প্রশান্তি লাভ করে।” (সূরা আরাফ, আয়াত ১৮৯)

    বিবাহের মাধ্যমে মানুষ তাদের প্রাকৃতিক চাহিদা বৈধ পন্থায় পূর্ণ করে। পারিবারিক জীবনে প্রশান্তি লাভ করে। ইরশাদ হয়েছে:

    وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ

    আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে। (সুরা রূম: আয়াত ২১)

    আরো ইরশাদ হয়েছে,

    وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلًا مِنْ قَبْلِكَ وَجَعَلْنَا لَهُمْ أَزْوَاجًا وَذُرِّيَّةً

    “আর অবশ্যই তোমার পূর্বে আমি রাসূলদের প্রেরণ করেছি এবং তাদেরকে দিয়েছি স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি। (সুরা রা’দ: আয়াত ৩৮)

    অন্যত্র আরো ইরশাদ হয়েছে:

    هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ

    “তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের জন্যে পরিধেয় আর তোমরা তাদের জন্যে পরিধেয়।” (সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৭)

    বিবাহের মাধ্যমে দুটি পরিবারের মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নারী পুরুষের ইজ্জত-সম্ভ্রম হিফাজত হয়। পারিবারিক শান্তি ও সুন্দর জীবন লাভ করা যায়। এছাড়াও বিবাহের মাধ্যমে সামাজিক পর্যায়ে অনেক সুফল পাওয়া যায়। এজন্যেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্ত্রীর ভরু-পোষণ দিতে সক্ষম সকল যুবককে বিবাহের নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

    عن عبد الله بن مسعود قال لنا رسول الله صلى الله عليه و سلم ( يا معشر الشباب من استطاع الباءة فليتزوج فإنه أغض للبصر وأحصن للفرج ومن لم يستطع فعليه بالصوم فإنه له وجاء

    হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রীদের ভরু-পোষণের সক্ষমতা রাখে তারা যেন বিয়ে করে ফেলে। কেনন এটা চোখের প্রশান্তি দানকারী ও লজ্জাস্থানের হিফাজতকারী। আর যারা স্ত্রীদের ভরু-পোষণের সামর্থ্য রাখে না, তারা যেন রোজা রাখে, কেননা এটা তাদের উত্তেজনাকে হ্রাস করবে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৭৭৮)

    যুবকদেরকে বিবাহের ব্যাপারে উৎসাহিত করার জন্য বিবাহের ফজীলত সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেন, “হযরত আনাস রা. থেকেব বর্ণিত,

    إذا تزوج العبد فقد استكمل نصف الدين فليتق الله في النصف الباقي

    যখন কোন ব্যক্তি বিবাহ করে, তখন সে যেন তার অর্ধেক ঈমানকে পূর্ণ করে ফেললো। এখন বাকি অর্ধেকের ব্যাপারে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।” (মিশকাত শরীফ: হাদীস নং ৩০৯৭)

    স্ত্রীদের গুরুত্ব সম্পর্কে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:

    المرأة الصالحة من السعادة

    “উত্তম স্ত্রী সৌভাগ্যর পরিচায়ক।” (মুসলিম শরীফ)

    বৈরাগী জীবনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, “আবু উমামা রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

    تَزَوَّجُوا فَإِنِّى مُكَاثِرٌ بِكُمُ الأُمَمَ وَلاَ تَكُونُوا كَرَهْبَانِيَّةِ النَّصَارَى

    তোমরা বিবাহ কর, কেননা আমি তোমাদের নিয়ে উম্মতের আধিক্যের উপর গর্ববোধ করব। এবং তোমরা খৃষ্টান বৈরাগ্যদের মত হয়ো না।” (সুনানে কুবরা লিল বায়হাকী)

    পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ পুরুষদেরকে নেককার স্ত্রী ও নেক সন্তান কামনা করা শিখিয়েছেন এভাবে,

    وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ

    “আর যারা বলে, ‘হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে।” (সুরা ফুরক্বান, আয়াত ৭৪)

    অধিক খরচের গ্যারাকলে পরে পুরুষরা যেনো বিবাহ বিমুখ না হয়, সেজন্য ইসলাম বিবাহের ক্ষেত্রে বাহুল্য খরচ বর্জনের কথা বলেছে। বাহুল্য খরচ বর্জিত বিবাহকেই সবচেয়ে বেশী বরকতপূর্ণ ও উত্তম বিবাহ বলে ঘোষণা করা হয়েছে হাদীসের মাঝে। ইরশাদ হয়েছে,

    إن أعظم النكاح بركة أيسره مؤنة

    হযরত আয়শা রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

    “নিশ্চয়ই সবচেয়ে বেশি বরকত ও কল্যাণময় বিবাহ হচ্ছে সেটি, যেখানে খরচ কম হয় (অহেতুক খরচ হয় না)।” (বায়হাকী, ঈমান অধ্যায়)

    বিবাহের মাধ্যমে নারী-পুরুষ উভয়েই নিজেদের প্রয়োজন পূর্ণ করলেও ইসলাম নারীদের জন্য বোনাস পাওয়ার ব্যবস্থা রেখেছে। পুরুষের উপর বিবাহের সময় স্ত্রীদের জন্য মহর দেয়া ফরজ করেছে। ঘোষণা করেছে,

    انْكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ وَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ

    “সুতরাং তোমরা তাদেরকে তাদের অভিভাবকদের অনুমতিক্রমে বিবাহ কর এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে তাদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও।” (সূরা নিসা: আয়াত ২৫)

    অন্যত্র আরো ইরশাদ হয়েছে,

    وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً

    “আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও।” (সূরা নিসা: আয়াত ৪)

    বিবাহের পর স্ত্রীদের সাথে সর্বদা সদাচারণ বজায় রাখার নির্দেশ দিয়ে ইসলাম ঘোষণা করেছে,

    وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ

    “আর তোমরা তাদের সাথে সদাচারণ করো।” (সূরা নিসা: আয়াত ১৯)

    নিজে ভালো খাবে, উত্তম পোষাক পড়বে আর স্ত্রীদেরকে নিম্ন মানের জীবন ধারণে বাধ্য করার জাহেলি মানসিকতাকে সমূলে বিনাশ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে,

    أَسْكِنُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ سَكَنْتُمْ مِنْ وُجْدِكُمْ

    “তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বসবাস কর সেখানে তাদেরকেও বাস করতে দাও।” (সূরা তালাক, আয়াত ৬)

    নারীর নিজের ভরণ-পোষণের পাশাপাশি সন্তানের দায়িত্বও স্বামীর কাঁধে তুলে দেয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে,

    لِيُنْفِقْ ذُو سَعَةٍ مِنْ سَعَتِهِ وَمَنْ قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ فَلْيُنْفِقْ مِمَّا آتَاهُ اللَّهُ

    “বিত্তশালীরা যেনো সামর্থানুযায়ী স্ত্রী-সন্তানের উপর ব্যয় করে। সীমিত উপার্জনকারীরা আল্লাহর দেয়া অর্থানুপাতে ব্যয় করবে।” (সূরা তালাক, আয়াত ৭)

    পুরুষদের উপর নারীদের অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে ঘোষণা করেছে,

    وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِى عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكُيمٌ

    “নারীদের উপর যেমন তোমাদের কিছু অধিকার রয়েছে ঠিক তেমনি তোমাদের উপরও তাদের কিছু অধিকার রয়েছে। স্ত্রীর উপর পুরুষের মর্যাদা। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।” (সূরা বাকারা : আয়াত ২২৮)

    নারীদেরকে দূর্বল ও অসহায় পেয়ে যাতে করে কেউ তাঁদের উপর জুলুম ও অত্যাচার না করে সেজন্যে ইসলাম ঘোষণা করেছে,

    وَلاَ تُمْسِكُوهُنَّ ضِرَارًا لِّتَعْتَدُواْ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ

    “আর তোমরা স্ত্রীদেরকে কষ্ট দেয়ার জন্যে আটকে রেখো না। আর যারা এ ধরণের জঘন্যতম অন্যায় করবে তারা নিজেদের উপরই জুলুম করবে।” (সূরা বাকারা : আয়াত ২৩১)

    বার্ধক্যেও নারীর সম্মান-মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে ইসলাম:

    বার্ধক্যে নারীদের দায়িত্ব সন্তানদের উপর অর্পন করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, 

    وَوَصَّيْنَا الإِنْسَـٰنَ بِوَالِدَيْهِ حُسْناً

    “আর আমি মানুষদেরকে তাদের পিতা-মাতার সাথে সদাচারণের নির্দেশ দিয়েছি।” (সূরা আনকাবুত : আয়াত ৮)

    অন্যত্র আরো ইরশাদ হয়েছে,

    وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا

    “আর তুমি তাদের (তোমার পিতা-মাতার) সামনে দীনতার পক্ষপুটকে বিছিয়ে দাও। আর বলো যে, হে আমার রব! আপনি তাদের উপর রহম করুন, যেমন তারা আমার উপর বাল্যকালে রহম করেছেন।” (সূরা বনী ইসরাঈল : আয়াত ২৪)

    অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,

    وَإِن جَـٰهَدَاكَ عَلَىٰ أَن تُشْرِكَ بِى مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلاَ تُطِعْهُمَا وَصَـٰحِبْهُمَا فِى الدُّنْيَا مَعْرُوفاً

    “আর তাঁরা যদি তোমাকে আমার সাথে শিরক করার এমন বিষয়ের বাধ্য করে তোমাদের কাছে যার জ্ঞান নেই, তবে (সেক্ষেত্রে) তুমি তাঁদের অনুসরণ করো না। তবে তাঁদের সাথে দুনিয়াতে সৎব্যবহার এবং সদাচারণ বজায় রাখো।” (সূরা লুকমান, আয়াত ১৫)

    অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষের উপর নারীকে অগ্রাধিকার দিয়েছে ইসলাম:

    পিতা-মাতার সম্মান ও মর্যাদা বর্ণনার ক্ষেত্রেও ইসলাম নারীদেরকে অগ্রাধিকার ও অধিক সম্মান দিয়েছে। পিতার থেকে মাতার সম্মান ও মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। নিম্নোক্ত হাদীস থেকে যা পরিস্কারভাবে ফুটে উঠেছে।

    عن أبي هريرة رضي الله عنه قال : جاء رجل إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال : يا رسول الله من أحق الناس بحسن صحابتي ؟ قال : أمك ,, قال : ثم من ؟ قال : أمك, قال : ثم من ؟ قال : أمك, قال : ثم من ؟ قال : أبوك . (متفق عليه)

    “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে একবার জিজ্ঞাসা করা হলো যে ইয়া রাসূলাল্লাহ! পিতা-মাতার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে বেশি সম্মান ও মর্যাদার হকদার কে? প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন, তোমার মা। সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন, তোমার মা। সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন, তোমার মা। এরপর সাহাবী চতুর্থ বার যখন জিজ্ঞেস করলেন যে, তারপর কে? তখন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন, তোমার বাবা।” (বুখারী ও মুসলিম)

    এই হাদীসের দ্বারা এটা পরিস্কার হয়ে গেলো যে, নারী জাতিকে ইসলাম মাতৃত্বের উচ্চাসনে বসিয়েছে। তাদেরকে সম্মান ও মর্যাদার সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন করেছে।

    এছাড়াও অনেক হাদীস আছে যেখানে শুধু মাতার কথাই বলা হয়েছে। যেমন এক হাদীসে রাসূল সা. বলেন,

    عن معاوية بن جاهمة أنه جاء النبي صلى الله عليه وسلم فقال : يا رسول الله أردت أن أغزو، وجئت أستشيرك ؟ فقال: “هل لك من أم”؟ قال نعم: قال: “فالزمها فإن الجنة تحت رجليها” رواه النسائي

    হযরত মুয়াবিয়া বিনতে জাহিমা নবীজীর সা. এর কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি যুদ্ধে যেতে চাচ্ছি। আপনার কাছে পরামর্শের জন্য এসেছি। তিনি বললেন, তোমার মা আছে কি? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাহলে তাঁকে সঙ্গ দাও। কেননা জান্নাত তাঁর দুই পায়ের নিচে।” (সুনানে নাসাঈ )

    সমাজে কেউ যেনো নারী জাতির অবমাননা করতে না পারে সেটিও ইসলাম নিশ্চিত করেছে। অন্যায়ভাবে কেউ কোনো নারীকে অপবাদ দিলে তার জন্য শাস্তির বিধান দিয়েছে। ইরশাদ হয়েছে,

    وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ

    “আর যারা সচ্চরিত্র নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে আসে না, তবে তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত কর এবং তোমরা কখনই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। আর এরাই হলো ফাসিক।” (সুরা আন-নূর: আয়াত ৪)

    আমল ও সওয়াবের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষকে সমান করেছে ইসলাম:

    এভাবে নারীদেরকে দুনিয়ার জীবনে নিশ্চিত, নিরাপদ করার পর পরকালীন জীবনেও তাদের জন্য কল্যাণ ও মঙ্গলের কথা ঘোষণা করেছে। এক্ষেত্রে পুরুষ-নারী বলে কাউকে আলাদা করা হয় নি। ইরশাদ হয়েছে,

    مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

    “যে মুমিন অবস্থায় নেক আমল করবে, পুরুষ হোক বা নারী, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তারা যা করত তার তুলনায় অবশ্যই আমি তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেব।” (সুরা আন-নাহল: আয়াত ৯৭)

    আরো ইরশাদ হয়েছে,

    مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ. وَمَنْ يَعْمَلْ مِنَ الصَّالِحَاتِ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ نَقِيرًا

    “আর পুরুষ কিংবা নারীর মধ্য থেকে যে নেককাজ করবে এমতাবস্থায় যে, সে মুমিন, তাহলে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি খেজুরবীচির আবরণ পরিমাণ যুল্ম   ও করা হবে না।” (সুরা নিসা: আয়াত ১২৪)

    অন্যত্র আরো ইরশাদ হয়েছে,

    أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِنْكُمْ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى بَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ

    ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের কোন পুরুষ অথবা মহিলা আমলকারীর আমল নষ্ট করব না। তোমাদের একে অপরের অংশ। (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৯৫)

    সুরা আল আহযাব এর ৩৫নং আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:

    أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِنْكُمْ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى بَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ. إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْخَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُمْ مَغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا

    “নিশ্চয় মুসলিম পুরুষ ও নারী, মুমিন পুরুষ ও নারী, অনুগত পুরুষ ও নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও নারী, বিনয়াবনত পুরুষ ও নারী, দানশীল পুরুষ ও নারী, সিয়ামপালনকারী পুরুষ ও নারী, নিজদের লজ্জাস্থানের হিফাযতকারী পুরুষ ও নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও নারী, তাদের জন্য আল্লাহ মাগফিরাত ও মহান প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন।” (সুরা আহযাব: আয়াত ৩৫)

    নারী জীবনের প্রত্যেক পর্যায় সম্পর্কে উপরে বর্ণিত সুন্দর ও সুনিপুন ব্যবস্থাপনা দিয়ে ইসলাম নারী জাতির পুরো জীবনটিকেই একেবারে সহজ, সুন্দর, নিরাপদ ও নির্ভাবনার করে দিয়েছে। কন্যা সন্তানের জন্য বিবাহের আগ পর্যন্ত যাবতীয় ব্যবস্থাপনা ইসলাম তার পিতার উপর ন্যস্ত করেছে। বিবাহের মাধ্যমে তার দায়িত্ব অর্পন করেছে স্বামীর উপর। এরপর মাতা হিসেবে তার দায়িত্ব দিয়েছে সন্তানের উপর।

    এমন সুন্দর ব্যবস্থা কারো ক্ষেত্রে কোনো পর্যায়ে বিঘ্নিত হলে সেজন্য আগে থেকেই রিজার্ভ ফান্ডেরও ব্যবস্থা রেখেছে পিতা-মাতার কাছ থেকে ওয়ারিশ হিসেবে প্রাপ্ত সম্পদ, স্বামীর কাছ থেকে প্রাপ্য মোহরানা এবং নিজের উপার্জিত যাবতীয় সম্পদ স্বাধীনভাবে ব্যবহারের অধিকার দিয়েছে। স্বামীদের উপর নিজ স্ত্রীদের জন্য মহরানা প্রদান বাধ্যতামূলক করে ঘোষণা করেছে,

    وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً

    “আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও।” (সূরা নিসা: আয়াত ৪)

    ইসলাম নারীর আর্থিক স্বাবলম্বীতা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ প্রয়োজনে শরীয়তের সীমা ঠিক রেখে নারীকে কর্মস্থলে যাওয়ারও অনুমতি দিয়েছে। ইসলাম নারীর নিজের প্রয়োজন পূরণের দায়িত্ব পিতা, স্বামী, সন্তানের উপর ন্যস্ত করলেও; নারীর নিজের আয়, নিজের সম্পত্তি কোনো ব্যবসায় বিনিয়োগ করে সেখান থেকে অর্জিত মুনাফা ইত্যাদির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতা দিয়েছে নারীর হাতে। এক্ষেত্রে জোর করে অন্য কারো জন্য সম্পদ গ্রাস করাকেও হারাম করেছে।

    চলবে…

    পরবর্তী পর্ব: পৈত্রিক সম্পত্তিতেও নারীর অধিকার নিশ্চিত করেছে ইসলাম

     
    ইসহাক খান

  • সংবাদ বিশ্লেষন: বাংলাদেশে মার্কিন সেনাসদস্যদের বিশেষ টিম

    (নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি, মার্চ ০৪, ২০১২ এ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ প্রকাশিত বাংলাদেশে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সংক্রান্ত একটি সংবাদের প্রতি প্রতিক্রিয়া ও বিশ্লেষন – the underlined part is the comment and analysis)
     

    সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে ‘সহযোগিতার’ অংশ হিসেবে প্রশিক্ষণ দিতে মার্কিন বাহিনীর কিছু সংখ্যক সদস্য থাকলেও বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ঘাঁটি নেই বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা।

    তিনি রোববার এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, “বাংলাদেশে কোনো ঘাঁটি থাকার প্রশ্নই আসে না।”

    মজিনার কথা শুনে মনে হয় বাংলাদেশে ঘাটি করার কোনো ইচ্ছাই নেই আমেরিকার। অথচ এই আমেরিকাই মুসলিম বিশ্বসহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের ঘাটি তৈরি করে রেখেছে। সৌদি বাদশাহদের দালালির সহায়তায় তারা পবিত্র ভুমি মক্কা-মদীনার খুব কাছেই তাদের ঘাটি করেছে যেখানে মার্কিন নারী-পূরুষ সেনা সদস্যরা জীবনকে মার্কিনী কায়দায় উপভোগ করতে পারে। শুধু এই নয়, এইসব ঘাটি থেকে তারা অন্য মুসলিম অঞ্চলে আগ্রাসন চালায় এবং নিরীহ মুসলিম নারী-শিশু-বৃদ্ধসহ অগনিত সাধারন নাগরিকদের হত্যা করে। সুতরাং মজিনার বড়গলা করে বলার কিছু নেই।

    তাদের ইতিহাস বলে যে তারা সুযোগ পেলেই এ দেশে তাদের পুর্নাঙ্গ ঘাটি তৈরি করবে। এবং তারই রিহার্সেল চালাচ্ছে তারা বর্তমানে দালাল হাসিনা সরকারের মাধ্যমে। আমরা দেখেছি কিভাবে আমেরিকা সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যুদ্ধজাহাজ আসা থেকে নিয়ে পরবর্তীতে টাইগার শার্ক ১-৪ দিয়ে এবং এখন তথাকথিত ৭ সদস্য বিশিষ্ট সেনা সদস্যদের বিশেষ ট্রেনিং টিম পাঠিয়ে তাদের সেই অভিষ্ঠ লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

    যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান অ্যাডমিরাল রবার্ট উইলার্ড বৃহস্পতিবার কংগ্রেস কমিটিকে জানান, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ‘সহযোগিতা দিতে’ বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশে অবস্থান করছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্পেশাল ফোর্সের’ সদস্যরা।

    সহযোগীতা?? মার্কিনিদের সহযোগিতায় (?) পৃথিবী যেন আজ ফুলে-ফলে সজ্জিত। বরং পৃথিবী আজ রক্তে রঞ্জিত তাদের সামরিক হস্তক্ষেপে। এই সেই মার্কিন বাহিনী যারা এই কয়েকদিন আগেও আফগানিস্তানে আমাদের পবিত্র কুরআনকে অবমাননা করেছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا بِطَانَةً مِنْ دُونِكُمْ لَا يَأْلُونَكُمْ خَبَالًا وَدُّوا مَا عَنِتُّمْ قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَاءُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ وَمَا تُخْفِي صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الْآَيَاتِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْقِلُونَ


    হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করো না, তারা তোমাদের অমঙ্গল সাধনে কোন ক্রটি করে না-তোমরা কষ্টে থাক, তাতেই তাদের আনন্দ। শত্রুতাপ্রসুত বিদ্বেষ তাদের মুখেই ফুটে বেরোয়। আর যা কিছু তাদের মনে লুকিয়ে রয়েছে, তা আরো অনেকগুণ বেশী জঘন্য। তোমাদের জন্যে নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করে দেয়া হলো, যদি তোমরা তা অনুধাবন করতে সমর্থ হও। [আলে ইমরান: ১১৮]

    এই সংবাদ প্রকাশের পর দেশের বামপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, যার মধ্যে ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিক দলও রয়েছে।


    বামপন্থীদের আদর্শিক বিচ্যুতি এখানে খুবই স্পষ্ট। তারা সরকারের কাছে জবাব চায়। কোন সরকারের কাছে? তারা নিজেরাই তো অনেকে সরকারের অংশ। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতা কোথায় আজ তাদের। তাদের জবাব দরকার হয় কেন? তারা জানে না মার্কিনি পরিকল্পনা? সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন মুখীতা কোথায় তাদের আজ? কেন দেখা যায় না তাদের আজ রাজপথে এই নব্য ঔপনিবেশকতাবাদের বিরুদ্ধে?

    এ বিষয়ে ঢাকায় ওয়াশিংটনের রাষ্ট্রদূত মজিনা বলেন, “তারা প্রশিক্ষণ দিতে এসেছেন এবং চলেও যাবেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে আমরা কাজ করছি।”

    কয়েকটি সংবাদপত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়টি পড়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং কল্পিত।

    যৌথ কর্মসূচির অংশ হিসেবেই বিশেষ বাহিনীর সদস্যদের বাংলাদেশে আসা জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সুদীর্ঘকালের এবং এই বন্ধন অত্যন্ত দৃঢ়।

    এই প্রসঙ্গে মজিনা বলেন, বাংলাদেশে কিছু মানুষ ‘সোনালী ভবিষ্যৎ’ গড়ার স্বপ্ন দেখার বিরোধী।

    হ্যা। ঠিকই বলেছে মজিনা। এবং সেই কিছু মানুষের মধ্যে মজিনা তার মার্কিনি দোসররা রয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, তারা (কাফেররা) চায় যে, তারা যেমন কাফের, তোমরাও তেমনি কাফের হয়ে যাও, যাতে তোমরা এবং তারা সব সমান হয়ে যাও। অতএব, তাদের মধ্যে কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না [নিসা:৮৯]

    إِن يَثْقَفُوكُمْ يَكُونُوا لَكُمْ أَعْدَاءً وَيَبْسُطُوا إِلَيْكُمْ أَيْدِيَهُمْ وَأَلْسِنَتَهُم بِالسُّوءِ وَوَدُّوا لَوْ تَكْفُرُونَ


    তোমাদেরকে করতলগত করতে পারলে তারা তোমাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং মন্দ উদ্দেশ্যে তোমাদের প্রতি বাহু ও রসনা প্রসারিত করবে এবং চাইবে যে, কোনরূপে তোমরা ও কাফের হয়ে যাও। [মুমতাহিনা:২]

    “আসলে তারা বাংলাদেশে শান্তি, সৌহার্দ্য, গণতন্ত্র নস্যাৎ করতে চায়। আমরা তাদের সন্ত্রাসী বলে থাকি। এই সব সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশের শত্র“, আমেরিকার এবং বিশ্বের প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশের শত্র“। একসঙ্গে মিলে আমরা এইসব সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়তে পারি এবং আমরা অবশ্যই তা করব,” বলেন তিনি।


    সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের নামে কী পরিমান শান্তি ও সৌহার্দ বজায় রেখেছে মার্কিনিরা তা সবার কাছেই পরিষ্কার। গণতন্ত্রের নামে সারা বিশ্বে চলছে গণহত্যা। গণতন্ত্রের সাথে গণহত্যা – একটা কিনলে আরেকটা ফ্রি। এই হচ্ছে মানবরচিত আদর্শের পরিনতি। এবং একসঙ্গে মিলে অবশ্যই আমরা সন্ত্রাসীদের রুখব। অবশ্যই। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী রাষ্ট্র আমেরিকাকে রুখতে আজ আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতেই হবে।

    সকালে গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা হয় রাষ্ট্রদূতের। বাংলাদেশ পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে বিগত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্র ১ কোটি ৯০ লাখ ডলারেরও বেশি সহায়তা দিয়েছে বলে জানান তিনি।


    মজিনা বলেন, সোয়াত বাহিনীর ৪৮ সদস্য ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছে। আরো ৪৮ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, 

    إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ لِيَصُدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ فَسَيُنْفِقُونَهَا ثُمَّ تَكُونُ عَلَيْهِمْ حَسْرَةً ثُمَّ يُغْلَبُونَ وَالَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى جَهَنَّمَ يُحْشَرُونَ


    নিঃসন্দেহে যারা কুফরি করেছে, তারা ব্যয় করে নিজেদের ধন-সম্পদ, যাতে করে বাধাদান করতে পারে আল্লাহর পথে। বস্তুতঃ এখন তারা আরো ব্যয় করবে। তারপর তাই তাদের জন্য আক্ষেপের কারণ হয়ে এবং শেষ পর্যন্ত তারা হেরে যাবে। আর যারা কাফের তাদেরকে দোযখের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। [আনফাল: ৩৬]



    অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার বেনজির আহমেদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা বাংলাদেশের প্রয়োজন এবং সরকারও এই ক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে কাজ করছে।

    এসব লোকদের আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
     

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِم بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُم مِّنَ الْحَقِّ 

    হে ঈমানদারগণ!, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদেরকে বন্ধরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ তারা যে সত্য তোমাদের কাছে আগমন করেছে, তা অস্বীকার করছে। [মুমতাহিনা:১]

  • হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়্যতের প্রমাণ

    এটি সর্বজনবিদিত যে, কুরআন একটি আরবি গ্রন্থ যা মুহাম্মদ (সা)-এর মাধ্যমে এসেছে। কাজেই এটি হয় আরবদের নিকট থেকে, অথবা মুহাম্মদ (সা)-এর নিকট থেকে কিংবা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পক্ষ থেকে এসেছে। যেহেতু কুরআনের ভাষা ও রচনাশৈলী আরবি, কাজেই এ তিন উৎস ছাড়া অন্য কোনো উৎস থেকে এর আগমন অসম্ভব।

    কুরআন আরবদের নিকট থেকে এসেছে একথা বলা মিথ্যাচার। কারণ কুরআন তাদের প্রতি অনুরূপ রচনার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।

    “বলুন, এরূপ দশটি সুরা নিয়ে আস।” (সুরা হুদ: আয়াত ১৩)

    “বলুন, এরূপ একটি সুরা নিয়ে আস।” (সুরা ইউনুস: আয়াত ৩৮)

    তারা অনুরূপ রচনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল। সুতরাং এটি তাদের বক্তব্য নয়।

    কুরআন মুহাম্মদ (সা)-এর রচনা – এরূপ দাবি করাও হবে মিথ্যাচার। কারণ তিনি যত উন্নত মেধারই অধিকারী হোন না কেন, তিনি ছিলেন একজন মানুষ ও একজন আরব। যেহেতু আরবরা এরূপ কিছু আনতে ব্যর্থ হয়েছে এবং মুহাম্মদ (সা)-ও ছিলেন একজন আরব, তাই আরব হিসেবে একথা তার জন্যও প্রযোজ্য এবং তিনি এটি রচনা করেননি। উপরন্তু মুহাম্মদ (সা)-এর অসংখ্য সহিহ ও মুতাওয়াতির হাদিস রয়েছে, যাদের সত্যতা সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই। এ হাদীসগুলোর সঙ্গে কুরআনের আয়াতগুলোর তুলনা করা হলে দেখা যায়, তাদের বর্ণনা শৈলীর মধ্যে কোনো মিল নেই। তিনি একই সময়ে কুরআনের আয়াতগুলো পড়েছেন ও তার হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের বর্ণনাশৈলীর মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। মানুষ যদি কখনো তার কথাকে পরিবর্তন করতে চেষ্টা করে, তবু তার ভাষা ও শৈলী একই রকম থাকে, কারণ এটি তারই একটি অংশ। যেহেতু কুরআনের আয়াত ও হাদীসগুলোর মধ্যে ভাষা ও শৈলীর মিল নেই, সেহেতু অবশ্যই কুরআন মুহাম্মদ (সা)-এর বক্তব্য নয়। এছাড়া আরবের ভাষা ও শৈলীতে সুদক্ষ কোনো আরবই দাবি করেননি যে কুরআন মুহাম্মদ (সা)-এর বক্তব্য কিংবা তার বক্তব্যের সঙ্গে এর কোনো মিল আছে। তারা শুধুমাত্র যে অভিযোগ করেছে তা হচ্ছে মুহাম্মদ (সা) এটি জাবর নামক এক খ্রিষ্টান যুবক থেকে নিয়ে এসেছেন। আল্লাহ তাদের এ অসার দাবিকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছেন। তিনি বলেন:

    “তারা বলে, এক ব্যক্তি তাকে এটি শিক্ষা দেয়। তারা যার কথা বলে তার ভাষা অনারবি অথচ এটি সুস্পষ্ট আরবি ভাষায় রচিত।” (সুরা আন-নাহল:১০৩)

    যেহেতু এথেকে প্রমাণিত হয় যে, কুরআন আরবদের রচনা নয় কিংবা মুহাম্মদ (সা)-এর রচনাও নয়, সেহেতু এটি অবশ্যই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণী এবং যিনি এটি নিয়ে এসেছেন তার জন্য এটি একটি অলৌকিক নিদর্শন (মু’জিযা)।

    যেহেতু মুহাম্মদ (সা) কুরআন এনেছেন এবং কুরআন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণী এবং যেহেতু নবী-রাসুলগণ ছাড়া আর কেউ আল্লাহর শরিয়াহ (বিধান) আনতে পারেন না, কাজেই যুক্তিসঙ্গতভাবে মুহাম্মদ (সা) অবশ্যই একজন নবী ও রাসুল।

    এটিই মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়্যতের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ।

  • চিন্তা ও চিন্তার পদ্ধতি

    চিন্তা (فكر), বুদ্ধি (عقل), উপলব্ধি (ادراك) ইত্যাদি সব কিছু প্রায় একই অর্থবোধক। অর্থাৎ কোন বাস্তবতাকে যথা সম্ভব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষন করার জন্য ইন্দ্রিয়গুলোর মধ্য দিয়ে তাকে মানুষের মস্তিষ্কে পাঠানো এবং  পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা (previous information) ও জ্ঞানের সাথে তুলনা ও সমন্বয় করার যে প্রক্রিয়া মানুষের মধ্যে বিদ্যমান তাকেই বলা হয় ফিকর ( فكر ) বা চিন্তা। চিন্তা করার জন্য নিন্মোক্ত চারটি বিষয় বিদ্যমান থাকতে হয়।

    (১) বাস্তব অবস্থা (A Reality)
    (২) সুস্থ মস্তিষ্ক (A sane distinguishing mind)
    (৩) ইন্দ্রিয়সমূহ (Senses) ও
    (৪) পূর্ব অভিজ্ঞতা/জ্ঞান (Previous information)

    বিবেক-বিবেচনা ভিত্তিক তথা বুদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতি (Rational Method)

    এটি হচ্ছে এমন পদ্ধতি যার মাধ্যমে মানুষ চিন্তা-ভাবনা করে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে উপলব্ধিতে পৌঁছে। এ প্রক্রিয়ায় মানুষের মন তার স্বাভাবিক ক্ষমতা ব্যবহার করে চিন্তা সৃষ্টি করে। বস্তুত এটিই মানুষের চিন্তা করার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

    প্রকৃতপক্ষে বিবেক-বিবেচনা ভিত্তিক পদ্ধতি (Rational Method) হচ্ছে কোন বিবেচ্য বিষয় সম্পর্কে অবগতি লাভের জন্য একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় চিন্তা-ভাবনার নাম। এই প্রক্রিয়ায় প্রথমে ইন্দ্রিয় সমূহের মাধ্যমে বাস্তবতা সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্যাদি চিন্তাক্ষম মস্তিষ্কে নেয়া হয়;

    অতঃপর মস্তিষ্কে ও স্মৃতি ভান্ডারে রক্ষিত পূর্বেকার তথ্যের সাথে বর্তমান তথ্যের তুলনা, যাচাই-বাছাই ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হয়। অবশেষে মানব-মন বিবেচ্য বিষয় সম্পর্কে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছে। এই সিদ্ধান্ত বা রায়টিই হচ্ছে বুদ্ধি প্রসূত এই বিশেষ চিন্তা প্রক্রিয়াটি ভৌত বস্তু (যেমন পদার্থ বিদ্যা) সম্পর্কে গবেষণার ক্ষেত্রে যেমন ব্যবহৃত হতে পারে অপরদিকে শুধু মাত্র চিন্তা-ভাবনার বিষয় যেমন আকীদা, আইন ইত্যাদি আলোচনায় অথবা ফিক্‌হ শাস্ত্র, সাহিত্য ইত্যাদি বুঝার ক্ষেত্রে এটিই একমাত্র উপায়। কোন বিষয় সম্পর্কে উপলব্ধি লাভ করার ক্ষেত্রে এটি হচ্ছে মৌলিক এবং মানুষের একান্ত স্বভাবজাত পদ্ধতি। কেননা এটি হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে মানুষ তার ভাবনা সমূহ এবং বস্তু সম্পর্কে তার জ্ঞানকে বুঝতে পারে। এটা মানুষের এক অনন্য ক্ষমতা যার মাধ্যমে মানুষ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ধারনায় পৌঁছে।

    বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (Empirical or Scientific Method)

    এটি হচ্ছে কোন কিছুর উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে ঐ জিনিষটির কিছু বাস্তব অবস্থা জানার পদ্ধতি। আর এই প্রক্রিয়া শুধু ভৌত বিষয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। চিন্তা বা মনের উপর এর কোন প্রয়োগ নেই। তাই এই প্রক্রিয়া শুধু পরীক্ষণযোগ্য বিষয়ের জন্য নির্দিষ্ট।

    এই প্রক্রিয়াটি নির্ভর করে পরীক্ষাধীন বস্তুর উপর কিছু নতুন পরিবেশ ও অবস্থা আরোপ করার পর বস্তুর পরিবর্তিত অবস্থার সাথে প্রাথমিক তথা মূল অবস্থার তুলনামূলক বিচারের উপর। এই প্রক্রিয়ায় পরীক্ষণ শেষে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও পরিমাপযোগ্য কিছু ফলাফলে উপনীত হতে হয়। আর তা সাধারণত গবেষণাগারেই সম্পন্ন হয়ে থাকে। বৈজ্ঞানিক এই প্রক্রিয়ায় গবেষক যে ফলাফলে উপনীত হন তা কখনোই চুড়ান্ত (Absolute) নয় বরং সব সময়ই আপেক্ষিক। তাই এই ফলাফল সর্বদা ত্রুটিপূর্ণ অথবা ভুলের সম্ভাবনাযুক্ত। বস্তুত: ভুলের সম্ভাবনাকে সব সময় বিবেচনার মধ্যে রাখা বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় গবেষণার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি।

    আসলে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া বিবেক-বিবেচনা ভিত্তিক প্রক্রিয়ার একটি শাখা মাত্র। এটা কখনোই চিন্তার মৌলিক ভিত্তি নয়। এটাকে ভিত্তি হিসাবে নেয়া সম্ভব নয় কেননা এটা থেকে চিন্তা উৎসারিত হয়না বরং অনুভূতি-বুদ্ধি-বিবেচনা দ্বারা সৃষ্ট চিন্তাই এই প্রক্রিয়ার সূচনা করে, তাই এটি একটি উৎসের শাখা মাত্র। উপরন্ত বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াকে মূল উৎস হিসাবে ধরে নিলে বেশীর ভাগ তথ্য ও বাস্তব ঘটনা গবেষণার বাইরে থেকে যাবে এবং জ্ঞানের এমন অনেকগুলো শাখা বাদ পড়ে যাবে যেগুলো নিয়ে যথেষ্ঠ চিন্তা-ভাবনা করা হয়েছে আর এগুলোর সত্যিকার বাস্তবতাও বিদ্যমান। অধিকন্তু এ সব বিষয়ের অস্তিত্ব সুস্পষ্ট এবং আমরা আমাদের অনুভূতি ও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে এগুলোর অস্তিত্ব অনুভব করতে পারি।

    বিবেক বিবেচনা ভিত্তিক পদ্ধতি, বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া ইত্যাদি কিছু অতি আলোচিত বাস্তব বিষয়। কিন্তু ইসলাম বিরোধী চিন্তাবিদদের অনেকে এ বিষয়গুলোকে অপব্যাখ্যা করে এবং ক্ষেত্র বিশেষে অপপ্রয়োগ করে ইসলামের মৌলিক আকীদা সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া শুধু মাত্র সসীম বিষয়ের জন্য প্রয়োগযোগ্য হওয়া সত্বেও তারা অসীম স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমানের ক্ষেত্রে কেবলই এই প্রক্রিয়াকেই ব্যবহার করার কথা বলেছেন। যে প্রক্রিয়ায় যেকোন সুস্থ চিন্তাক্ষম মানুষ সহজেই স্রষ্টার অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে অর্থাৎ বিবেক-বিবেচনা ভিত্তিক পদ্ধতিটিকে তারা এক্ষেত্রে এড়িয়ে গেছেন। একারণেই বিষয়গুলোর মৌলিক দিক এখানে তুলে ধরা হলো।

  • আল্লাহর অস্তিত্বের বৃুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ

    প্রতিটি জিনিসের পেছনে একজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন – এ সিদ্ধান্ত পৌঁছানোর কারণ হচ্ছে আমাদের অনুধাবনযোগ্য প্রতিটি বিষয়, যেমন: মানুষ, জীবন ও মহাবিশ্ব ইত্যাদি সীমাবদ্ধ, দুর্বল, অসম্পূর্ণ এবং তাদের অস্তিত্বের জন্য তারা অপরের উপর নির্ভরশীল। মানুষ সীমাবদ্ধ, কারণ সকল ক্ষেত্রেই সে একটি সীমার মধ্যে বেড়ে ওঠে এবং কখনোই এ সীমাবদ্ধতার বাইরে যেতে পারে না। জীবন সীমাবদ্ধ, কারণ আমরা অনুভব করতে পারি যে এটি স্বতন্ত্র প্রাণীসত্তার মধ্যেই প্রকাশিত হয় এবং তার মধ্যেই বিলুপ্ত হয়। কাজেই এটিও সীমাবদ্ধ।

    মহাবিশ্বও সীমাবদ্ধ, কারণ এটি কতগুলো মহাজাগতিক বস্তুর সমষ্টিমাত্র। প্রতিটি মহাজাগতিক বস্তু সীমাবদ্ধ এবং দৃশ্যতই অনেকগুলো সীমাবদ্ধ বস্তুর সমষ্টিও সীমাবদ্ধ। কাজেই নিশ্চিতভাবেই মানুষ, জীবন ও মহাবিশ্ব সীমাবদ্ধ। যখন আমরা সীমাবদ্ধ বস্তুগুলো নিয়ে চিন্তা করি, তখন আমরা দেখতে পাই, এগুলো কোনোটিই আজালী (চিরন্তন- আদি, অন্তহীন ও অসীম) নয়। নইলে এগুলোর কোনোটিই সীমাবদ্ধ হত না। আর একারণেই অবশ্যই একজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন যিনি মানুষ, জীবন ও মহাবিশ্বসহ সকল কিছুকে সীমা প্রদান করেছেন, এগুলোকে সৃষ্টি করেছেন।

    এই সৃষ্টিকর্তাকে হয় কেউ সৃষ্টি করেছে, অথবা তিনি নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেছেন, অথবা তিনি চিরন্তন, আদি অন্তহীন (আজালী) এবং যার অস্তিত্ব অপরিহার্য। তাকে কেউ সৃষ্টি করেছে এ ধারণাটি চরম মিথ্যা, কারণ তাহলে তিনি সীমাবদ্ধ হয়ে যান। আর কেউ যদি বলেন, তিনি নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেছেন, তবে এ যুক্তিটিও সম্পূর্ণ অসার, কারণ স্বাভাবিক যুক্তির বিচারে তখন তাকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এধরনের যুক্তির অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে, তিনি সৃষ্টি হবার সময় নিজেকেই সৃষ্টি করছিলেন! এরূপ ধারণা অসম্ভব ও অলীক কল্পনামাত্র। কাজেই সৃষ্টিকর্তা অবশ্যই আজালী (চিরন্তন- আদি, অন্তহীন ও অসীম)। তিনিই মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা।

    ন্যূনতম চিন্তা-ভাবনার অধিকারী যে কেউ তার পারিপার্শ্বিকতা থেকে অনুধাবন করতে পারেন যে, সবকিছুর পিছনে একজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন। কারণ সবকিছু থেকে যে সত্যটি বের হয়ে আসে তা হচ্ছে এগুলোর প্রত্যেকটিই অসম্পূর্ণ, দুর্বল ও নির্ভরশীল। কাজেই তারা অবশ্যই সৃষ্ট। বস্তুত মানুষ, জীবন বা মহাবিশ্বের যে কোনো বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিলেই কোনো ব্যক্তি সহজে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন যে, এগুলোর পিছনে একজন সৃষ্টিকর্তা ও একজন সংগঠক রয়েছেন। মহাবিশ্বের যে কোনো বস্তুর প্রতি লক্ষ্য করলে, জীবনের যে কোনো দিকের প্রতি গভীর মনোযোগ দিলে, কিংবা মানুষের যে কোনো বিষয় অনুধাবন করলে প্রতিটি বিষয়ই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার অস্তিত্ব সম্পর্কে সুনিশ্চিত নিদর্শন বহন করে। মহাগ্রন্থ কুরআনে এ বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে এবং মানুষকে তার পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছতে বলা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় মানুষ লক্ষ্য করে কীভাবে একটি বস্তু অপর বস্তুর উপর নির্ভরশীল এবং সুনিশ্চিত সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, নিশ্চয়ই আল্লাহর অস্তিত্ব সত্য – যিনি সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা। কুরআনে বহু আয়াতে এ ধরনের অসংখ্য উদাহরণ লক্ষ্য করা যায়। সুরা আলি ইমরানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেছেন,

    “নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিবা-রাত্রির পরিবর্তনে নিদর্শন রয়েছে চিন্তাশীল ব্যক্তিদের জন্য।” (সুরা আলি ইমরান: ১৯০)

    এবং তিনি সুরা আর-রুম-এ বলেছেন,

    “এবং তার নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি, এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয়ই এ সমস্ত কিছুর মধ্যে জ্ঞানী ব্যক্তিদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” (সুরা আর-রুম, আয়াত ২২)

    তিনি সুরা আল-গাশিয়াহতে বলেছেন,

    “তবে কি তারা উটের প্রতি লক্ষ করে না যে, কীভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে? এবং আকাশের প্রতি যে, কীভাবে তাকে ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে এবং পর্বতমালার প্রতি যে কীভাবে তাকে স্থাপন করা হয়েছে? এবং ভূ-পৃষ্ঠের প্রতি, কীভাবে তাকে বিস্তৃত করা হয়েছে? (সুরা আল-গাশিয়াহ, আয়াত ১৭-২০)

    এবং সুরা আত-ত্বরিকে বলেছেন,

    “সুতরাং মানুষ লক্ষ্য করুক তাকে কি হতে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সবেগে স্খলিত পানি থেকে যা নির্গত হয় মেরুদণ্ড ও পাঁজরের মধ্য থেকে।” (সুরা আত-ত্বরিক, আয়াত ৫-৭)

    এবং সুরা আল-বাকারাহতে বলেছেন,

    “নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, রাত ও দিনের পরিবর্তনে, যা মানুষের কল্যাণ করে তা-সহ সমুদ্রে বিচরণশীল নৌযানসমূহে, আল্লাহ আকাশ থেকে যে বারিবর্ষণে ধরিত্রীকে পুনর্জীবিত করেন তাতে এবং তার মধ্যে যাবতীয় জীবজন্তুর বিস্তারণে, বায়ুর দিক পরিবর্তনে, আকশে ও পৃথিবীর মধ্যে নিয়ন্ত্রিত মেঘমালাতে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” (সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত ১৬৪)

    এরূপ আরও অসংখ্য আয়াত রয়েছে যেখানে মানুষকে তার পারিপার্শ্বিকতার বিভিন্ন বস্তু ও তাদের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার আহবান জানানো হয়েছে এবং স্রষ্টার অস্তিত্ব সম্পর্কে বুদ্ধিবৃত্তিক সিদ্ধান্তে উপনীত হবার কথা বলা হয়েছে। এভাবেই সুনির্দিষ্ট বিচার-বিবেচনা ও স্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে আল্লাহর উপর সুদৃঢ় বিশ্বাস স্থাপিত হয়।

  • দারুল ইসলাম ও দারুল কুফর

    ‘দার’ শব্দটি আরবি ভাষায় বহু অর্থে ব্যবহার হয়, যেমন: এলাকা/মহল্লা, ঘর, বসতবাড়ি, ভূমি ইত্যাদি। শরীয়াতের পরিভাষায়, দারুল ইসলাম বলতে এমন ভূমিকে বোঝায় যেটি ইসলামের আইন দ্বারা শাসিত হয় এবং যার নিরাপত্তা রক্ষিত হয় ইসলাম দ্বারা অর্থাৎ মুসলিমদের কর্তৃত্ব ও প্রতিরক্ষা দ্বারা। এমন কি, যদি সেই ভূমির অধিকাংশ অধিবাসী অমুসলিমও হয়, তবুও সেটি দারুল ইসলাম।

    দারুল কুফর বলতে এমন ভূমিকে বোঝায় যেটি কুফরের আইন দ্বারা শাসিত হয় এবং যার নিরাপত্তা ইসলাম দ্বারা রক্ষিত হয় না অর্থাৎ মুসলিমদের কর্তৃত্ব ও প্রতিরক্ষা দ্বারা এর নিরাপত্তা রক্ষিত হয় না। এমন কি, যদি সেই ভূমির অধিকাংশ অধিবাসী মুসলিমও হয়, তবুও সেটি দারুল কুফর।

    মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠ আলেমগণ দারুল ইসলাম ও দারুল কুফরকে এভাবেই সংজ্ঞায়িত করেছেন।

    ইমাম আল-কাসানী (রহ) বলেন, হানাফী আলেমগণের মধ্যে এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই যে, ইসলামের আইন কর্তৃত্বশীল হলে দারুল কুফর দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হয়। আমাদের ইমাম (আবু হানিফা) বলেন, তিনটি ক্ষেত্রে দারুল ইসলাম দারুল কুফরে পরিণত হয়: যখন আইনগুলো কুফরের আইনে পরিণত হয়, যখন কুফর রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি ছাড়াই ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত থাকে অথবা যখন মুসলিম কিংবা যিম্মিদের জন্য আর কোনো নিরাপত্তা অবশিষ্ট থাকে না। [বাদাইস সানাই, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩১]

    ইমাম আল-সারখাসী (রহ) বলেন, ইসলামী আইনসমূহ কর্তৃত্বশীল হলে একটি ভূমি দারুল ইসলামে পরিণত হয়। [শরহে সীরাতুল কাবীর, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২১৯৭]

    কাজি আবু ইয়া’লা (রহ) বলেন, যে দেশে ইসলামের পরিবর্তে কুফর বাস্তবায়িত হয়, তা দারুল কুফর। [আল-মু’তামাদ ফী উসুলিদ-দ্বীন, পৃষ্ঠা ২৭৬]

    ইবনুল কাইয়্যিম (রহ) বলেন, জমহুর (অধিকাংশ) আলিমদের মতে, দারুল ইসলাম হলো সেই ভূমি যেখানে মুসলিমরা বসবাস করে ও ইসলামের আইনসমূহ কর্তৃত্বশীল। …. ইসলাম কর্তৃত্বশীল না হলে সেটি দারুল ইসলাম নয়। [কিতাব আহকাম আহলিল জিম্মাহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬৬]

    শায়খ তাকিউদ্দিন আন-নাবাহানী (রহ) বলেন,

    والحق أن اعتبار الدار دار إسلام أو دار كفر، لا بد أن ينظر فيه إلى أمرين: أحدهما الحكم بالإسلام، والثاني الأمان بأمان المسلمين أي بسلطانهم، فإن توفر في الدار هذان العنصران، أي أن تحكم بالإسلام، وأن يكون أمانها بأمان المسلمين، أي بسلطانهم كانت دار إسلام، وتحولت من دار كفر إلى دار إسلام، أما إذا فقدت أحدهما فلا تصير دار إسلام

    দারুল ইসলাম বা দারুল কুফর বিবেচনা করার ক্ষেত্রে শুদ্ধ পদ্ধতি হলো দুটো বিষয়ের দিকে দৃষ্টি রাখা: এক. ইসলামী আইনের শাসন, দুই. মুসলিমদের কর্তৃত্ব দ্বারা নিরাপত্তা। কোনো দেশ যদি এ দুটো উপাদান অর্জন করে অর্থাৎ ইসলামী শাসন ও মুসলিমদের কর্তৃত্বে নিরাপত্তা লাভ করে, তাহলে দেশটি দারুল কুফর থেকে দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হয়। আবার যদি দেশটিতে এ দুটো উপাদানের কোনো একটি না থাকে, তাহলে সেটি আর দারুল ইসলাম থাকে না। [আশ-শাকসিয়্যাহ আল-ইসলামীয়াহ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৯]

    বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীর কোথাও বর্তমানে ইসলামী আইনের পরিপূর্ণ শাসন বা ইসলামী কর্তৃত্বে নিরাপত্তার বিধান নেই। সুতরাং নিঃসন্দেহে বাংলাদেশসহ প্রতিটি মুসলিম দেশ তথা সারা পৃথিবী বর্তমানে দারুল কুফর। বর্তমান বিশ্বে বিপর্যয়ের মূল কারণও হলো এই ইসলামী আইনের অনুপস্থিতি। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ) যথার্থই বলেছেন,

    الْفِتْنَةُ إذَا لَمْ يَكُنْ إمَامٌ يَقُومُ بِأَمْرِ النَّاسِ

    জনগণের কাজকর্ম তত্ত্বাবধান করার জন্য কোনো ইমাম না থাকলে ফিতনা [বিপর্যয় ও পাপাচার] সৃষ্টি হয়। [আল ফুরু’ লি ইবনে মুফলিহ]

    বিপর্যয় ও পাপাচারপূর্ণ এই অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদেরকে সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করে দারুল ইসলামে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।

  • বইমেলা ২০১২ – কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা

    অনেক ব্যস্ততা সত্ত্বেও আজ গিয়েছিলাম একুশে বই মেলায়। সেই মেলার শুরু দিন থেকে যাবো যাবো করে আর যাওয়া হচ্ছিলো না। আগামীকাল শেষ হয়ে যাবে ভেবে শেষে জরুরী কিছু কাজ বাদ রেখেই আজকে গেলাম। ঘুরে আসলাম আমাদের জাতীয় জীবনের খুবই উল্লেখযোগ্য একটি বিশেষ অনুষ্ঠান, মাসব্যপী অনুষ্ঠিত একুশে বই মেলায়। পুরো মেলা ঘুরে বেশ কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা ও খানিকটা সুখস্মৃতি নিয়ে অবশেষে ফিরে এলাম নিজ গন্তব্যে। প্রিয় পাঠকদের সাথে তা শেয়ার করার লোভ সংবরণ করতে না পেরে শেয়ার করছি। লেখক এবং প্রকাশক হিসেবে খুব বেশি না হলেও প্রায় ১২ বছরের সামান্য কিছু অভিজ্ঞতার আলোকে এবারের বই মেলা সম্পর্কে সংক্ষেপে আমার মূল্যায়ন।

    প্রথমেই মেলার ভালো দিক এবং সুখকর বিষয়

    ১. গত কয়েক বছরের তুলনায় এবারই সম্ভবত: সর্বাধিক সংখ্যক ষ্টলের সমন্বয়ে বই মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এটি খুবই ভালো একটি দিক। এর ফলে অধিক পরিমাণে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছে।

    ২. এবারের মেলায় অংশগ্রহণকারী অনেক নতুন প্রকাশনা ও প্রতিষ্ঠান মান সম্মত অনেক গুলো নতুন বই প্রকাশ করেছে। এটা খুবই ভালো একটি দিক। এজন্য উদ্যেগ নেয়া ও এগিয়ে আসা সকলকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। জাতীয় পর্যায়ে এমন উদ্যোগের আরো ব্যাপকতা প্রয়োজন।

    ৩. বাংলা একাডেমি চত্বর ও মেলার ভেতরের পরিবেশ বেশ সাজানো গোছানো। সব গুলো ষ্টলই খুব সুন্দর লাগছিলো। তবে ফুটপাতে হকারদের উৎপাত রাস্তার পাশের ষ্টল গুলোর সৌন্দর্য্য ম্লান করছিলো। এগুলোকে প্রবেশ পথের আরেকটু দূরে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিলো।

    কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা

    আমাদের দেশে ‘ডান পন্থী’ এবং ‘বামপন্থী’ বলে দু’টি মেরুকরণ রয়েছে। প্রকাশনার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। দেশে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, একুশে বই মেলায় সাধারণত: ‘বামপন্থী’ ঘরানার লোকজনই নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। তারা অত্যন্ত পরিস্কারভাবেই ‘ডানপন্থী’ বা ইসলামী প্রকাশনাকে একুশে বই মেলায় আসতে সর্বাত্মকভাবে বাঁধা দিয়ে থাকেন। অনেক কষ্টে দু’ চারটি প্রকাশনী ‘তদবিরে’র জোড়ে ঢুকে পরে। এই যা।

    আমি নিজেও ২০০৮ সালে বই মেলায় আমার প্রকাশনীর জন্য ষ্টলের আবেদন জমা দিয়েছিলাম। সে বছর এ ব্যাপারে অনেক প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সুযোগ হয়েছে। বাংলাবাজারের সম্ভ্রান্ত অনেক ইসলামী প্রকাশনীকেই প্রথম বাছাইতেই বাদ দেয়া হয়। আমারটিরও একই অবস্থা হয়েছিলো। এমনকি অতীতে যারা ষ্টল পেয়েছিলো তাদের অনেকেও ‘মান সম্মত’ ও ‘সৃজনশীল’ বই না থাকার অভিযোগে বঞ্চিত হন। ডজন ডজন গবেষণাধর্মী গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী প্রকাশনা বাদ পড়লেও ‘মান সম্মত’ ও ‘সৃজনশীল’ বইয়ের সংজ্ঞায় বামপন্থী এবং রামপন্থী ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অনেকেই ষ্টল পান যথারীতি।

    জাতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত একটি বই মেলায় এই বিভক্তি দু:খজনক। ‘বামপন্থী’ ঘরানার মহামান্য ব্যক্তিরা অন্য ক্ষেত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগীতা ও মেধা বিকাশের কথা বললেও, মুসলিম সন্তানদেরকে নাস্তিকতার সবক দেয়ার সময়, রামপন্থী লেখকদের যৌন সুরসুরি মূলক ফালতু বইয়ের বিশাল সরবরাহকে মেনে নিলেও; ঈমান ও তাওহীদের এবং মানসম্মত ইসলামী প্রকাশনার অনুপ্রবেশ কিছুতেই সহ্য করতে পারেন না। এটা সুস্পষ্টভাবেই তাদের নৈতিক পরাজয়ের প্রমাণ বহন করে। তাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, সৎ সাহস থাকলে মান সম্মত ইসলামী প্রকাশনা গুলোকে আপনারা সুযোগ দিন। তারপর একসাথে প্রতিযোগিতায় আসুন। দেখা যাক, জনগণ কাকে গ্রহণ করে!

    এবারের বই মেলায় সবচেয়ে বাজে এবং দুঃখজনক যেই বিষয়টি দৃষ্টিকটু পর্যায়ে চোখে লেগেছে সেটি হচ্ছে বিভিন্ন অযাচিত সংগঠনের নামে অহেতুক অনেক গুলো ষ্টল অপচয়। প্রায় অর্ধশত ষ্টল ফালতু দলীয়করণ, ও বিভিন্ন নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহ করা হয়েছে। এসকল ষ্টল বরাদ্দপ্রাপ্তদের অধিকাংশই সরকারী দলের সাথে সম্পৃক্ত। তাদের ষ্টল গুলোতে বিক্রি হচ্ছে মানহীন একেবারেই ফালতু বই-পুস্তক। পরিচিত প্রকাশনীর মালিক ও বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম এগুলো যারা বরাদ্দ নিয়েছেন তারা ষ্টলপ্রতি বেশ মোটা অংকের টাকা নিয়ে ষ্টল গুলো অধিকাংশই হকারদেরকে দিয়ে দিয়েছেন। তারা এখানে মানহীন সস্থা বই এনে ২৫% কমিশনের চড়া মূল্যে বিক্রি করে নিজেদের পুঁজি উঠিয়ে লাভ নিশ্চিত করছেন। অথচ একই বই বাইরে ৫০-৫৫% কমিশনে বিক্রি হচ্ছে।

    ইসহাক খান

  • ইসলামী আকীদা

    আকীদা (عقيدة):
     
    ইসলামের বিশ্বাস বিষয়ক সর্বশেষ ও প্রসিদ্ধতম পরিভাষা ‘আকীদা’। হিজরি চতুর্থ শতকের পূর্বে এ শব্দটির প্রয়োগ লক্ষ্য করার মত নয়। হিজরী চতুর্থ শতক থেকে এ পরিভাষাটি প্রসিদ্ধি লাভ করে। এর পরবর্তী যুগে এটিই একমাত্র পরিভাষা হয়ে যায়।

    আকীদা ও ই’তিকাদ শব্দদ্বয় আরবি এবং উভয়ই ‘আকদ’ (عقد) ধাতু থেকে গৃহীত। এর মূল অর্থ সন্ধান করা, গিরা দেয়া, চুক্তি করা, জমাট হওয়া, শক্ত হওয়া ইত্যাদি। যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন:

    وَمِنْ شَرِّ النَّفَّاثَاتِ فِي الْعُقَدِ

    (আশ্রয় গ্রহণ করছি) গ্রন্থিতে ফুৎকার দিয়ে (জাদুকারিণীদের) অনিষ্ট হতে [সূরা ফালাক ১১৩:৪]

    وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِنْ لِسَانِي

    এবং আমার জিহ্বা থেকে জড়তা দুর করে দিন। [সূরা তোয়া-হা: ২৭]

    ‘দ্বীনের বিশ্বাস’ বুঝাতে আকীদা শব্দের ব্যবহার পরবর্তী যুগে ব্যাপক হলেও প্রাচীন আরবি ভাষায় এর ব্যবহার লক্ষ্য করার মত নয়। বাহ্যত হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে এই পরিভাষার প্রচলন শুরু হয়।

    ‘আকীদা’ ও ‘ই’তিকাদ’ শব্দের ব্যবহার কুরআনুল কারীম ও হাদীস শরিফে দেখা যায় না। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর যুগ বা তাঁর পূর্বের যুগে আরবি ভাষায় ‘বিশ্বাস’ অর্থে বা অন্য কোনো অর্থে ‘আকীদা’ শব্দের ব্যবহার ছিল বলে জানা যায় না। তবে ‘দৃঢ় হওয়া’ বা ‘জমাট হওয়া’ অর্থে ই’তিকাদ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এছাড়া অন্তরের বিশ্বাস অর্থেও ‘ই’তিকাদ’ শব্দটির প্রচলন ছিল।

    দ্বিতীয় শতাব্দীর কোনো কোনো ইমাম ও আলেমের কথায় ই’তিকাদ বা ‘আকীদা’ শব্দ সুদৃঢ় ধর্ম বিশ্বাস অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে বলে দেখা যায়। ফিকহুল আকবর-এ ইমাম আবু হানীফা (রহ)-এর বক্তব্যে দৃঢ়বিশ্বাস অর্থে ‘ই’তিকাদ’ শব্দটি দেখা যায়, যদিও ‘আকীদা’ শব্দটি তিনি ব্যবহার করেননি। চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে লিখিত প্রাচীন আরবি অভিধানগুলোতে ‘আকীদা’ শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায় না। পরবর্তী সময়ের অভিধানবিশারদরা এই শব্দটির অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন। ৮ম শতকের প্রসিদ্ধ অভিধানবেত্তা আহমদ ইবনে মুহাম্মদ আল-ফাইউমী (মৃত্যু ৭৭০ হিজরী) বলেন, “মানুষ দ্বীন (বিশ্বাস) হিসেবে যা গ্রহণ করে, তাকে ‘আকীদা’ বলা হয়।”

    আধুনিক ভাষাবিদ ড. ইবরাহীম আনীস ও তাঁর সঙ্গীগণ সম্পাদিত ‘আল-মু’জামুল ওয়াসীত’ গ্রন্থে বলা হয়েছে-

    الحكم الذي لا يقبل الشك فيه لدى معتقده

    “আকীদা অর্থ এমন বিধান বা নির্দেশ, যার বিশ্বাসীর (আকীদা ধারনকারীর) নিকট কোনোরূপে সন্দেহের অবকাশ থাকে না।”

    ইসলামী আকীদা ও শরীয়তের মূল উৎস হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী। ওহীর জ্ঞান থেকেই ইসলামী আকীদার উদ্ভব ও উৎপত্তি ঘটে। ওহীর জ্ঞান ব্যতিরেকে যে কোনো ইলমই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। একারণে আল্লাহ তা’য়ালা যুগে যুগে ওহীসহকারে নবী-রাসূল প্রেরণ করেন।

    ওহীর প্রকারভেদ – কুরআন ও সুন্নাহ : রাসুলুল্লাহ (সা)-এর প্রতি দুই প্রকারের ওহী প্রেরণ করা হয়েছে। এক. ওহীয়ে মাতলু তথা কুরআন মাজিদ; দুই. ওহীয়ে গায়ের মাতলু তথা রাসুল (সা)-এর হাদীস।

    ক. কুরআন মাজিদ: কুরআনুল কারিম মানব জাতির কাছে প্রেরিত আল্লাহর সর্বশেষ বাণী। এর প্রতিটি অক্ষর, শব্দ ও বাক্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত।

    খ. হাদীস: আল্লাহ তা’য়ালা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট যে ওহী পাঠাতেন, তা ছিল দু’প্রকারের। প্রথম প্রকার ওহী কুরআন, যা তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো শব্দ ও অর্থসহ আক্ষরিকভাবে মুখস্থ করতেন। সাহাবীদেরকে মুখস্থ করাতেন ও লিখাতেন। দ্বিতীয় প্রকার ওহী তিনি নিজের ভাষায় সাহাবীদেরকে বলতেন, শিক্ষা দিতেন, মুখস্থ করাতেন এবং কখনো কখনো লিখাতেন। এই দ্বিতীয় প্রকারের ওহী ‘হাদীস’ বা ‘সুন্নত’ নামে পৃথকভাবে সংকলিত ও সংরক্ষিত হয়েছে।

    হাদীস শব্দের আভিধানিক অর্থ সংবাদ, কথা বা নতুন বিষয়। (ইবনে মানযূর, লিসানুল আরব ২/১৩১-১৩৪; ফাইউমী, মুখতারুস সিহাহ ১/১৫৩)।

    ইসলামী পরিভাষায় হাদীস বলতে সাধারণত রাসুলুল্লাহ (সা) যা বলেছেন, করেছেন বা অনুমোদন দিয়েছেন, তাকে হাদীস বলা হয়। মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায়, যে কথা, কর্ম ও অনুমোদনকে রাসুলুল্লাহ (সা)-এর বলে প্রচার বা দাবি করা হয়েছে তাই ‘হাদীস’ বলে পরিচিত। এছাড়া সাহাবীগণ ও তাবেয়ীগণের কথা, কর্ম ও অনুমোদনকেও হাদিস বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা)-এর কর্ম, কথা বা অনুমোদন হিসেবে বর্ণিত হাদীসকে ‘মারফু’ হাদীস বলা হয়। সাহাবীগণের কর্ম, কথা বা অনুমোদন হিসেবে বর্ণিত হাদিসকে ‘মাওকুফ হাদীস’ বলা হয়। আর তাবেয়ীগণের কর্ম, কথা বা অনুমোদন হিসেবে বর্ণিত হাদীসকে ‘মাকতু’ হাদীস বলা হয়।

    বস্তুত কুরআনুল কারিমের ব্যাখ্যা ও বাস্তব প্রয়োগই হাদীস নামে অভিহিত। কুরআনের পাশাপাশি অতিরিক্ত যে ওহীর জ্ঞান বা প্রজ্ঞা মহান আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (সা)-কে প্রদান করেছিলেন, তার ভিত্তিতে তিনি কুরআনের বিভিন্ন বক্তব্যের ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন এবং বাস্তব জীবনের র্সবক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করেছেন। কুরআন ও হাদীসই আমাদের সকল জ্ঞান ও কর্মের মূল উৎস। ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা) বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেন- “আমি তোমাদের মধ্যে যা রেখে যাচ্ছি, তা যদি তোমরা আঁকড়ে ধরে থাকো, তাহলে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না; তা হলো আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নত।”

    বর্ণনাকরীদের সংখ্যার দিক থেকে মুহাদ্দিসগণ বিশুদ্ধ বা সহীহ হাদীসকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। যথা-

    ১. মুতাওয়াতির ২. আহাদ।

    ১. যে হাদীস সাহাবগীণের যুগ থেকে সংকলন পর্যন্ত সব স্তরে অনেক সংখ্যক রাবি বর্ণনা করেছেন তাকে মুতওয়াতির বা অতি-প্রসিদ্ধ হাদীস বলে। অর্থাৎ যে হাদীস রাসুলুল্লাহ (সা) অন্তত পাঁচজন সাহাবী বর্ণনা করেছেন, প্রত্যেক সাহাবী থেকে অনেক তাবে’য়ী বর্ণনা করেছেন এবং প্রত্যেক তাবে’য়ী থেকে অনেক তাবে-তাবে’য়ী বর্ণনা করেছেন, এভাবে রাসুলুল্লাহ (সা) থেকে সংকলন পর্যন্ত প্রত্যেক পর্যায়ে বহু সংখ্যক ব্যক্তি যে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাকে মুতাওয়াতির হাদীস বলা হয়। প্রতি স্তরে রাবিদের সংখ্যা এত বেশি হওয়া যে, তারা সকলে একত্রিত হয়ে মিথ্যা কথা বানানোর কোনো সম্ভাবনা থাকে না। যেমন – সালাতের ওয়াক্ত ও রাকা’য়াত সংখ্যা, যাকাতের পরিমাণ ইত্যাদি বিষয় বর্ণনা সম্পর্কিত হাদীসের রাবি সংখ্যা।

    ২. যে হাদীসকে পাঁচজনের কম সংখ্যক সাহাবী বর্ণনা করেছেন, তাকে ‘আহাদ’ বা খবরে ওয়াহিদ হাদীস বলা হয়। খবরে ওয়াহিদ হাদীসকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়-

    ক. গরীব: যে হাদীসের সনদের মধ্যে কোনো এক পর্যায়ে মাত্র একজন রাবি বা বর্ণনাকারী রয়েছেন, তাকে গরীব হাদীস বলা হয়।
    খ. আযীয: যে হাদীসের সনদের মধ্যে কোনো পর্যায়ে মাত্র দুজন রাবি রয়েছেন, সে হাদীসকে আযীয হাদিস বলা হয়।
    গ. মুসতাফিয: যে হাদীসের রাবির সংখ্যা সব পর্যায়ে দুজনের বেশি, তবে অনেক নয় সে হাদীসকে মুসতাফীয হাদীস বলা হয়।

    এছাড়াও, বিভিন্ন মুহাদ্দিসের মতে, যে হাদীস সাহাবীগণের যুগে আহাদ বর্ণনা ছিল, কিন্তু তাবে’য়ীগণের যুগ থেতে তা মুতাওয়াতির পর্যায়ে পৌঁছেছে তাকে মাশহুর হাদীস বলা হয়।

    মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা সুনিশ্চিত জ্ঞান (ইলম কাত’য়ী) এবং দৃঢ় বিশ্বাস (ইয়াকীন) লাভ করা যায়। কুরআনুল কারীমের পাশাপাশি এই প্রকারের হাদীসই মূলত ‘আকীদা’র ভিত্তি। এই প্রকারের হাদীস দ্বারা প্রমাণিত তথ্য অস্বীকার করলে তা ধর্মত্যাগ বা অবিশ্বাস (কুফরী) বলে বিবেচিত হয়।

    খবরে ওয়াহিদ বা একক বর্ণনার সহিহ হাদীস আকীদার ফুরু’ এর ক্ষেত্রে গৃহীত। তবে সাধারণভাবে ফকীহগণের নিকট খবরে ওয়াহিদ সুনিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করে না। বরং তা কার্যকর ধারণা প্রদান করে। কর্মের ক্ষেত্রে বা কর্ম বিষয়ক হালাল, হারাম ইত্যাদি বিধিবিধানের ক্ষেত্রে এরূপ হাদীসের ওপরে নির্ভর করা হয়। আকীদার মূল বিষয় প্রমাণের জন্য সাধারণত এরূপ হাদীসের ওপর নির্ভর করা হয় না। তবে মূল বিষয়ের ব্যাখ্যায় ও প্রাসঙ্গিক বিষয়ে তা উল্লেখ করা হয়। [আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কিরানবী, ইযহারুল হাক্ব, ৩/৯২০]

    সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত সবই আমরা সহজ ও স্বাভাবিক অর্থে গ্রহণ করি এবং বিশ্বাস করি। পার্থক্য এই যে, কুরআনে উল্লিখিত বা মুতাওয়াতির হাদীসের মাধ্যমে পরিজ্ঞাত কোনে বিষয় অস্বীকার করলে তা কুফরি বলে গণ্য হয়। আর খবরে ওয়াহিদের মাধ্যমে পরিজ্ঞাত বিষয় অস্বীকার করলে তা বিভ্রান্তি (ফাসেকী) বলে গণ্য হয়।

    আকীদার ক্ষেত্রে ‘মুতাওয়াতির’ হাদীসের ওপর গুরুত্ব প্রদানের দ্বিবিধ কারণ রয়েছে –

    আক্বীদা অবশ্যই নিশ্চিত জ্ঞান হতে হবে। নিশ্চিত জ্ঞান ছাড়া কোনো বিষয়কে দৃঢ় বিশ্বাস হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    যে কেউ আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যকে ডাকে যার ব্যাপারে তার কাছে কোনো প্রমাণ নেই, তার হিসাব তার পালনকর্তার কাছে। নিশ্চয়ই কাফেররা সফলকাম হবে না। [২৩:১১৭]

    প্রত্যেকে সম্প্রদায় থেকে আমি একজন সাক্ষী আলাদা করব; অতঃপর বলব, তোমাদের প্রমাণ আন। তখন তারা জানতে পারবে যে সত্য আল্লাহর এবং তারা যা গড়ত, তা তাদের কাছ থেকে উধাও হয়ে যাবে। [২৮:৭৫]

    রেওয়ায়াতের যথার্থতার দিক থেকে বর্ণনা দু ধরনের হতে পারে। সুনিশ্চিত (কাত’ঈ) ও অনিশ্চিত (যন্নী)। সুনিশ্চিত ও কাত’ঈ বর্ণনা পাওয়া যায় কুরআন ও মুতাওয়াতির হাদীস হতে। যেসব আহাদ হাদীস বর্ণনার দিক হতে মুতাওয়াতির পর্যন্ত পৌছায় না তা আক্বীদার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    আর যদি আপনি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের অনুসরণ করেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামী করে দেবে। তারা শুধু অলীক কল্পনার অনুসরণ করে এবং সর্ম্পূণ অনুমানভিত্তিক কথার্বাতা বলে থাকে। [আন’আম:১১৬]

    বস্তুতঃ তাদের অধিকাংশই শুধু আন্দাজ-অনুমানের উপর চলে, অথচ আন্দাজ-অনুমান সত্যের বেলায় কোনো কাজেই আসে না। আল্লাহ ভাল করইে জানেন, তারা যা কিছু করে। [ইউনুস:৩৬]

    যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, তারাই ফেরেশতাদের নারীবাচক নাম দিয়ে থাকে অথচ এ বিষয়ে তাদের কেনো জ্ঞান নইে। তারা কেবল অনুমানের উপর চলে অথচ সত্যরে ব্যাপারে অনুমান মোটেই ফলপ্রসূ নয়। [নাজম:২৭-২৮]

    সুতরাং, আকীদা অনিশ্চিত (যন্নী) উৎস থেকে গ্রহণ করা যাবে না। তবে যেকোনো অ-মুতাওয়াতির প্রমানিত গ্রহনযোগ্য হাদীসকে সত্যায়ন (তাসদীক) করা হবে তবে নিশ্চিত সত্যায়ন (তাসদীক যাজিম) করা হবে না। অর্থাৎ গ্রহণযোগ্য হাদীসের বক্তব্যে বিশ্বাস করা হবে তবে আকীদার ভিত্তি হিসেবে শুধুমাত্র সুনিশ্চিত (কাত’ঈ) জ্ঞান গ্রহণ করা হবে।

    হাদীসের এই শ্রেণীবিভাগ বুঝতে নিচের উদাহরণটি আলোচনা করা যায়। তা হলো যে কোনো বিচারালয়ে উত্থাপিত মামলার প্রদত্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে বিচারক একটি ‘ধারণা’ লাভ করেন। তিনি মোটামুটি বুঝতে পারেন যে, এ সম্পদটি সত্যি সত্যি এই লোকের বলে মনে হচ্ছে, অথবা এ লোকটি সত্যই এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল বলে বুঝা যাচ্ছে। তিনি এও জানেন যে, তার এই ‘ধারণা’র মধ্যে ভুল হতে পারে। সকল বিচারকেরই কিছু রায় ভুল হয়। সামগ্রিকভাবে সনদ ও অর্থ যাচাইয়েরর পর ‘এককভাবে বর্ণিত’ সহীহ হাদিসের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিস অনুরূপ ‘কার্যকর ধারণা’ লাভ করেন যে, কথাটি সত্যিই রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন। তবে বর্ণনার মধ্যে সামান্য হেরফের থাকার ক্ষীণ সম্ভাবনা তিনি অস্বীকার করেন না। তবে সম্ভাবনা প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত একে কার্যত নির্ভুল বলে গণ্য করা হয়। যখন এরূপ বর্ণনা মুতাওয়াতির পর্যায়ের হয়, তখন ভুল-ভ্রান্তির সামান্য সম্ভাবনাও রহিত হয়।
     
    কুরআন পুরোপুরিই ‘মুতাওয়াতিরভাবে বর্ণিত। যেভাবে রাসুলুল্লাহ (সা)-এর উপরে তা অবতীর্ণ হয়েছে, অবিকল সেভাবেই শতশত সাহাবী তা লিখিত ও মৌখিকভাবে বর্ণনা করেছেন, তাদের থেকে হাজার হাজার তাবেয়ী তা সেভাবে গ্রহণ করেছেন এবং প্রচার করেছেন। কেউ একটি শব্দকে সমার্থক কোনো শব্দ দিয়ে পরিবর্তন করেননি। সহীহ হাদিস তদ্রূপ নয়। হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে সাহাবী-তাবেয়ীগণ অর্থের দিকে বেশি লক্ষ্য রাখতেন। আরবি ভাষা ও বর্ণনাশৈলীর বিষয়ে অভিজ্ঞ সাহাবী-তাবেয়ীগণ প্রয়োজনে একটি শব্দের পরিবর্তে সমার্থক অন্য শব্দ ব্যবহার করতেন। মূল হাদীসের অর্থ ঠিক রেখে শব্দ পরিবর্তনের প্রচলন তাদের মধ্যে ছিল।

    আকীদা বা দৃঢ় বিশ্বাস মূলত প্রতিটি মুসলমানের ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন, অর্থাৎ আকীদার ভিত্তিসমূহ (উসূল) এর ক্ষেত্রে। এছাড়া আকীদার খুটিনাটির (ফুরু’) ক্ষেত্রে কিছু মতবিভেদ থাকতে পারে। উদাহরনসরূপ, মিরাজ-এর খুটিনাটি যেমন এটি দৈহিকভাবে হয়েছে না আত্মিকভাবে হয়েছে এ নিয়ে সাহাবীদের মধ্যে মতবিভেদ ছিল যদিও মিরাজ সংঘটিত হওয়া নিয়ে কোনো মতবিভেদ নেই।

    বিশুদ্ধ আকীদা ও আমল শেখাতেই আল্লাহ নবী-রাসূল প্রেরণ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা) তার উম্মতকে বিশুদ্ধতম আকীদা ও আমল শিখিয়ে গিয়েছেন। আমলের ক্ষেত্রে বিকল্প আছে। সব মুসলিমের উপর ফরয কিছু কাজ ব্যতীত বিভিন্ন ফযীলতমূলক নেক কাজে একটি না করলে অন্যটি করা যায়। কিন্তু আকীদার ক্ষেত্রে বিকল্প নেই। আকীদা সবার জন্য একই রূপে সর্বপ্রথম ফরয। আকীদা রাসুলুল্লাহ (সা) সকল সাহাবীকে সমানভাবে শিখিয়েছেন। যে বিষয়টি বিশ্বাস করা মুমিনের জন্য প্রয়োজন, সে বিষয়টি অবশ্যই রাসুলুল্লাহ (সা) তাঁর সকল সাহাবীকে জানিয়েছেন। এতে আমরা বুঝতে পারি যে, আকীদার বিষয়ে হয় কুরআনে স্পষ্ট আয়াত থাকবে অথবা অগণিত সাহাবী থেকে মুতাওয়াতির হাদিস বর্ণিত থাকবে। প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আকীদার উৎস হতে জেনে বুঝে সঠিক আকীদা গ্রহণ করা এক অবশ্য কর্তব্য। এক্ষেত্রে ইজতিহাদের কোনো অবকাশ নেই। আকীদার উৎস হতে আকীদা সেভাবেই নিতে হবে যেভাবে দেয়া আছে।

    আকীদা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের মধ্যে রয়েছে-

    ১. ফিকহুল আকবর – ইমাম আবু হানিফা
    ২. আল আকীদা আল ওয়াসিতয়্যাহ – ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ
    ৩. উসূল আস সুন্নাহ – ইমাম আহমদ বিন হাম্বল
    ৪. বায়ানু ই’তিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামা’য়াহ – ইমাম আত তাহাবী
    ৫. আকীদা আন নাসাফী – ইমাম আন নাসাফী