Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:

    ((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))

    “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    «أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»

    “আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:

    «عليك بتقوى الله ما استطعت»

    “তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:

    «فاتقوا الله ولو بشق تمرة»

    “একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।

    তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))

    “আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))

    “যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))

    “মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:

    ((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))

    “মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))

    “পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]

    এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))

    “যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))

    “এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:

    ((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))

    “হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]

  • রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন। 

    “হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩) 

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ

    রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি? 

    আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত। 

    এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।

    আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    “আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)

    وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ

    আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

    মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। 

    ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: 

    “আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩) 

    وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ

    “আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ

    “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮) 

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ

      “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)

    حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ

    আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।

  • রমজান এর শিক্ষা

    রমজান এর শিক্ষা

    সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্‌কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:

    রমজান – রহমতের মাস:

    এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।

    রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।

    সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর  মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।

    সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।

    জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।

    রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।

    ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্‌ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।

    এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।

    রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:

    রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।

    এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।

    রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্‌কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।

    তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।

    তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্‌র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্‌ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্‌কে রাগান্বিত করে।

    আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্‌ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।

    এখানে আল্লাহ্‌ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।

    উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্‌ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্‌ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”

    আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।

    তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্‌ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)

    এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)

    অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।

    এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্‌ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।

    তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।

    আর আল্লাহ্‌কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্‌র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।

    বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।

    রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।

    রমজান – কোরআনের মাস:

    একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।

    আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?

    আল্লাহ্‌ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্‌র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।

    এখানে আল্লাহ্‌ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্‌ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?

    বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।

    যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্‌ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্‌ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”

    আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”

    একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”

    তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।

    রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)

    আল্লাহ্‌ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।

    সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্‌র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।

    অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।

    যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।

    বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।

    রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:

    আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।

    রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।

    কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্‌র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।

    আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।

    তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্‌ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্‌ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।

    রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)

    আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্‌র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্‌ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্‌র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।

    পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)

    অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্‌র ক্ষমা পাওয়া যায় না।

    রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:

    পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।

    রমজান এর পর কী হবে?

    প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।

    রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্‌র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্‌র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্‌র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।



    আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
    ২৫শে শাবান, ১৪৩৩
    ১৪ই জুলাই, ২০১২ 

  • ইসলামের দৃষ্টিতে শেয়ার বাজার

    ইসলামের দৃষ্টিতে শেয়ার বাজার

    বর্তমানে শেয়ার বাজার বা তথাকথিত পুজিবাজার এর অবস্থা নাজুক। গ্রামের জমিজমা বেঁচে বা বাবার সমগ্র জীবনের জমানো টাকা অথবা ভাইয়ের বিদেশ থেকে পাঠানো ঘাম ঝরানো টাকা পুজিবাজারে খাটিয়ে ধরা খেয়ে ৯০% মুসলিমের দেশে তরুনরা আজ দিশেহারা। ইসলাম পূর্ণ জীবন ব্যাবস্থা হওয়ার পরও মুসলিমরা ইসলাম থেকে অর্থনৈতিক ব্যাবস্থা না নিয়ে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদীদের দেয়া ঘুনে ধরা পুঁজিবাদি অর্থনৈতিক ব্যাবস্থা (capitalism) নিয়েছে। শেয়ারকেলেংকারী নতুন কিছু না, ১৯৯৬ সালেও এ ধরণের ঘটনায় সরকার তদন্ত-কমিটি (!) গঠন করে অপরাধীদের চিহ্নিত করেছিলো কিন্তু শাস্তি দিতে পারে নি। আমরা জানি এবারও এই বস্তাপঁচা গনতান্ত্রিক ব্যাবস্থার মাধ্যমে রাঘব বোয়াল দুর্নীতিবাজরা ধরাছোয়ার বাইরে থাকবে এবং ৩০ লক্ষ্য পুঁজিহারা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ২ টাকার ক্ষতিপুরণও হবে না। পুঁজিবাজারে ধ্বসের পিছনে বেশ কিছু বড় বড় কোম্পানি দায়ী। সবচেয়ে বড় কথা এই পুঁজিবাদি ব্যাবস্থার স্বরূপটাই এ রকম। বড় কোম্পানি গুলো অকল্পনীয় লাভবান হবে এবং ক্ষুদ্র-বিনিয়োগকারীরা (small-investor) তাদের পুঁজি হারাবে, এটাই নিয়ম। পুঁজিবাদী ব্যাবস্থার শেয়ারবাজার যে হারাম (পুঁজিবাদী ব্যাবস্থা নিজেই হারাম) তা বোঝার আগে ইসলামে কোম্পানি বলতে কি বোঝায় এবং কি কি ধরনের কোম্পানি হালাল তা জানার দরকার।

    ইসলামী শরীয়াহ কোম্পানি (আশ-শারিকা, company) মানে হল লাভের উদ্দেশ্যে আর্থিক কাজের জন্য দুই বা ততোধিক পক্ষ্যের মধ্যে চুক্তি (contract)। চুক্তি বলতে অবশ্যই প্রস্তাব (offer) এবং গ্রহন (acceptance) থাকাটা জরুরী। চুক্তির অংশীদারিত্ব বলতে আসলে এমন কিছুর ব্যাপারে সম্মতি যাতে উভয়ের নিজের ইচ্ছামত ব্যাবহারের ক্ষমতা থাকে (right of disposal over property) এবং অর্জিত জিনিষের অংশ সবাই পাবে। তাহলে অংশীদারিত্ব দুই ধরনের– ১) সম্পত্তির অংশীদারিত্ব (partnership of properties) এবং ২) চুক্তির অংশীদারিত্ব (partnership of contract) বা কোম্পানি (company) – যা ক্রমবর্ধমান সম্পত্তির মালিকানার ব্যাপারে আলোচনার বিষয়বস্তু।

    ইসলামী শরীয়াহ চুক্তির অংশীদারীত্ত বা কোম্পানি ৫ ধরনের:

    ১) আল-ইনান (Company of equal / সমতার কোম্পানি) – দুই জন ব্যক্তি তাদের সম্পত্তি নিয়ে এ ধরনের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে। সমস্ত সম্পত্তি একত্রে একটি অস্তিত্বে পরিণত হয় এবং দুজনের নিজের ইচ্ছামত ব্যাবহারের ক্ষমতা থাকে (right of disposal)। দুজনই কাজের ক্ষেত্রে লাভের অংশ পাবে। পণ্যদ্রব্য কে প্রচলিত অর্থের সমমান মূল্যায়ন করতে হবে। বিনিয়গকারী সম্পত্তি অবশ্যই সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট হতে হবে এবং তা ঋণগ্রস্ত (property of debt) হতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে কোন অংশীদারী সে নিজের জন্য প্রতিনিধিরূপে কাউকে প্রেরণ করতে পারবে না। লাভ তারা নিজেদের মধ্যে নিজেদের ইচ্ছামত ভাগ করতে পারবে তবে তা আগে থেকেই নির্ধারিত করে রাখতে হবে (এটা বিনিয়গের (share) আনুপাতিক হারে হতে পারে বা অন্যকিছু)। কিন্তু লোকসানের ভাগ হবে বিনিয়োগের আনুপাতিক হারে।

    ২) আল-আব্দান (The company of bodies / শ্রমের কোম্পানি) – দুই বা ততোধিক ব্যাক্তি এ ধরনের কোম্পানিতে শ্রম দিয়ে বিনিয়োগ করে, অর্থ বা সম্পত্তি নয়। তারা মেধা বা শারীরিক শ্রম এর বিনিময়ে যা অর্জন করে তা তারা নিজেদের মধ্যে যেকোনো অনুপাতে ভাগ করে নেয়, তবে তা কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় নির্ধারণ করে নিতে হবে। অংশীদাররা (partner) সবসময় একই পেশার হতে হবে তা জরুরী নয়। কোম্পানিতে তারা নির্দিষ্ট কাজ তাদের মধ্যে ভাগ করে নিতে পারে, তবে কাজ গুলো হালাল হতে হবে। একজনের কাজ হারাম হলে কোম্পানি হারাম হয়ে যাবে। তারা যদি একসাথে কোনো ফ্যাক্টরিতে কাজ করে তবে তাদের একজন বাকিদের সবার পক্ষ থেকে বেতন নিতে পারবে। একই ভাবে তারা যদি অন্য কারো কাছে তাদের পন্য বিক্রি করে তবে ক্রেতা তাদের একজনের কাছে সমস্ত মূল্য পরিশোধ করতে পারবে। তাদের একজন কাজ করলেও সবাই লাভের অংশীদার হবেন কারণ কাজটি করে দেওয়া সবার পক্ষ্য থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া। তারা নিজের জন্য কাউকে প্রতিনিধিস্বরূপ নিয়োগ দিতে পারবে না। তবে কোম্পানির জন্য তারা বা তাদের একজন কোম্পানির পক্ষ থেকে কাউকে ভাড়া করতে পারবে।

    ৩) আল-মুদারাবা ( The company of body and capital / শ্রম ও অর্থের সমন্নয়ের কোম্পানি) – একজনের পুঁজি বা অর্থ এবং আরেকজনের শ্রম এর সমন্নয়ের কোম্পানি কে আল-মুদারাবা কোম্পানি বলে। এখানে লাভ তারা নিজেদের মধ্যে নির্ধারণ করে ভাগ করে নেয়। কিন্তু ক্ষতি সর্বদাই তার উপর বর্তাবে, যে অর্থ দিয়ে বিনিয়োগ করেছে। কারণ শ্রমিকের ক্ষতি তো সেটাই যে শ্রম সে বৃথা খরচ করলো। আল-মুদারাবা তখনই পূর্ণ হবে যখন অর্থ বা সম্পত্তি শ্রমিকের (মুদারিবের) হাতে যায় এবং সে এটা তার নিজের মত করে খাটাতে পারে (right of disposal of property), তবে তা কোম্পানির স্বার্থে এবং সে ততোটুকুই ব্যাবহার বা খরচ করতে পারবে যতটুকুর অনুমতি সে তার পার্টনার এর কাছ থেকে পাবে। যে অর্থ বা সম্পত্তি বিনিয়োগ করা হয়েছে সেটা অবশ্যই সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট হতে হবে এবং মুদারিবের অংশও সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিতে হবে। যে অর্থ বা সম্পত্তি বিনিয়োগ করে সে মুদারিবের সাথে শ্রম দিতে পারবে না এবং সে তার নিজের ইচ্ছামত সম্পত্তি ব্যবহার করতে পারবে না (no right of disposal of property)।

    ৪) আল-উজোহ (The company of faces / খ্যাতি বা দক্ষতা বা বিশ্বাসের কোম্পানি) – আল-আব্দান এবং আল-মুদারাবার সমন্বয়ের কোম্পানি হচ্ছে আল-উজোহ। এ ধরণের কোম্পানিতে দুজনের শ্রমের সাথে একজনের অর্থ বা সম্পত্তি বিনিয়োগ করা হয়। তারা নিজেদের মধ্যে যেকোনো অংশে লাভ করে নিতে পারে যা আগে থেকে নির্ধারিত। মুদারিবগণ নিজেদের মধ্যে দক্ষতা বা খ্যাতির উপর ভিত্তিকরে লাভ ভাগ করতে পারে। মুদারিবগণ তাদের খ্যাতি বা বিশ্বাসের কারণে যে পণ্য কিনে মালিক হয় তা তারা নিজেদের মধ্যে অর্ধেক, একতৃতীয়াংশ বা এরকম করে ভাগ করতে পারে। এবং তারা যখন বিক্রি করে লাভ অর্জন করে তখন তারা নিজেদের মধ্যে অর্ধেক, একতৃতীয়াংশ বা এরকম করে ভাগ করতে পারে (যা মালিকানার অংশীদারীত্বের অনুপাতে নয়), কিন্তু ক্ষতি হবে মালিকানার অংশীদারীত্বের অনুপাতে (নিজেদের ইচ্ছামত নয় বা লাভের অনুপাতে নয়)। এখানে একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে “উজোহ” বা খ্যাতি’র যে ব্যাপার বলা হচ্ছে তা কোন উচ্চ বংশ বা সম্মান বা গণ্য-মান্য ব্যাক্তি বলে কথা না, এটা বিশ্বাসের কারণে। একজন মন্ত্রী কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর হতে পারে কিন্তু সে কোম্পানির জন্য কোনো পণ্যের মূল্য দিতে প্রস্তুত নয়, এই প্রতিষ্ঠান ইসলামে হারাম। এখানে মন্ত্রীকে রাখা হয়েছে শুধুমাত্র তার ফেসভেলুর জন্য এবং সে কোম্পানির প্রতি দুর্নীতির ক্ষেত্রে দুর্বল থাকে। সে এই কোম্পানির লাভ নিতে পারবে না।

    ৫) আল-মুফাওয়াদা (The company of negotiation ) – এই কোম্পানিটি আসলে উপরে বর্ণিত ৪ ধরণের কোম্পানির সমন্বয়।

    জয়েন্ট স্টক কোম্পানি বা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি বা শেয়ার কোম্পানির বাস্তবতা: এ ধরণের কোম্পানি কিছু পার্টনারদের দ্বারা গঠিত যারা সর্বপ্রথম প্রাথমিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে (এরাই কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা) এবং যাদের সর্বসাধারণ চিনে না। প্রাথমিক চুক্তি কোম্পানির সূত্রপাত ঘটায় একটি সম্মতির মাধ্যমে যা কিছু সাধারণ লক্ষে পৌছার জন্য কাজ করে। কোম্পানিতে যে কেউ একটি শেয়ার কিনে (অর্থের বিনিময়ে) প্রবেশ করে (subscription) অন্য কেউ রাজি হোক আর নাই হোক। Subscription দুই ধরণের হয় – ১) শেয়ার কিছু প্রতিষ্ঠাতাদের জন্য সংরক্ষিত থাকে এবং সর্বসাধারণের কাছে উন্মুক্ত নয়। একটি সংবিধান লিখা হয় যাতে শর্তাবলি লিপিবদ্ধ করা হয় যা দ্বারা কোম্পানি পরিচালিত হয়। যারা সংবিধানে স্বাক্ষর করেন তারা সবাই কোম্পানির পার্টনার। ২) কিছু ব্যাক্তি মিলে একটি কোম্পানি দাড় করায় এবং শেয়ার সর্বসাধারণের জন্য বাজারে ছেড়ে দেয়া হয়। প্রত্যেক শেয়ারহোল্ডার একটি মিটিং এ মিলিত হয় এবং সংবিধান রচিত হয় যা দ্বারা কোম্পানি পরিচালিত হবে এবং তারা ভোটের মাধ্যমে তাদের বোর্ড অফ ডিরেক্টর নির্বাচিত করে। ২য় ধরণের শেয়ার কোম্পানি বেশি প্রচলিত। উভয় প্রকার কোম্পানিতেই একটা বিষয় লক্ষ্য করা যায় যে subscription না করা পর্যন্ত কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাই বলা যায় কোম্পানির চুক্তি আসলে সম্পত্তির চুক্তি। এখানে কোন ব্যাক্তিত্বের কোন মূল্য নেই। ব্যাক্তি ছাড়াই সম্পত্তিগুলো চুক্তিবদ্ধ হয়। একজন শেয়ারহোল্ডারের বা পার্টনারের কোন ক্ষমতাই নাই। যার ক্ষমতা আছে সে হল এমডি যিনি সব কর্মকাণ্ড করেন, দেখেন, বুঝে নেন ইত্যাদি। এমডি নির্বাচিত হন বোর্ড অফ ডিরেক্টরদের দ্বারা, আর বোর্ড অফ ডিরেক্টরগণ নির্বাচিত হন সাধারণ সভার মাধ্যমে যেখানে প্রত্যেক শেয়ারহল্ডারের ভোটের অধিকার আছে, তবে তা তার শেয়ারের সমান। যার একটি শেয়ার তার একটি ভোট, যার একশতটি শেয়ার, তার একশতটি ভোট। তাহলে বলা যায় আসল পার্টনার হল শেয়ার বা ক্যাপিটাল (সম্পত্তি), ব্যাক্তি নয়। শেয়ার কোম্পানি কে আজীবন অস্তিত্বের অধিকারী ধরা হয় কারণ কোনো শেয়ারহোল্ডারের মৃত্যু হলে কোম্পানি বিলুপ্ত (dissolve) হয় না। পার্টনাররা ক্ষতির দিকে কোনো ধরণের সীমিত না। একজন পার্টনারের তার শেয়ার হাতবদল করার অধিকার আছে, তাই সে এটা বিক্রি করে বা অন্য কাউকে শরীক করে, বাকি সকল শেয়ারহোল্ডারের অনুমতি থাক বা নাই থাক। প্রত্যেক বিনিয়গকারীরা শেয়ার কিনে মুদ্রা, বন্ড বা সিকিউরিটির বিনিময়ে – সোজাকথা মূলধন। কোম্পানি শেয়ারহোল্ডারের কাছে শেয়ারের প্রকৃত মূল্যের (nominal value) জন্য দায়বদ্ধ। কোম্পানি যদি দেউলিয়া হয়ে যায় তাহলে শুধুমাত্র তার মূলধন দিতে বাধ্য। তাই বলা যায় স্টক বা শেয়ার হল কোম্পানির অবিচ্ছেদ্য অংশ কিন্তু মূলধনের অংশ নয়। স্টক কে ধরা যায় শেয়ারের রেজিস্ট্রেশন পেপার তার দাম সবসময় একই থাকে না, কোম্পানির লাভলোকসানের সাথে পরিবর্তিত হয়। লাভ বা লোকসান প্রত্যেক বছর একই রকম ও হবে, তাও না। তাই বলা যায়, “স্টক” কোম্পানির প্রতিষ্ঠিত-লগ্নে বিনিয়োগকৃত মূলধনকে প্রতিনিধিত্ব করে না বরং কোন নির্দিষ্ট সময়ে কোম্পানি বিক্রি করে দেয়ার মুহূর্তের মূলধন কে বোঝায়। স্টক হল কাগজের নোটের মত যার দাম উঠানামা করে স্টক মার্কেট উঠানামার সাথে, কিংবা কোম্পানির লাভলোকসানের সাথে, অথবা মার্কেটের মূর্খ (!) ক্রেতাদের চাহিদার (demand of people) উপর (ঠিক পণ্যের মত)।

    যেসব কারণে স্টক কোম্পানি বা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিকে ইসলামী শারীয়াহ হারাম করেছে:

    ১) জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে বা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে দুই বা ততোধিক ব্যাক্তি মূলধন বিনিয়োগ করে লাভের উদ্দেশ্যে একটি প্রকল্প হাতে নিতে একটি সম্মতিতে (contract) পৌঁছায়। তারা (প্রতিষ্ঠাতারা) আসলে অংশিদারীত্বের শর্তাবলীর উপর ভিত্তি করে একটি সম্মতিতে আসে। এখানে স্পষ্টতই দুটি পৃথক পক্ষ্য(party) অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ইসলামে অবশ্যই আলাদা দুটি পক্ষ্য থাকা বাধ্যতামূলক যেখানে এক পক্ষ্য প্রস্তাব করবে এবং আরেক পক্ষ্য গ্রহন করবে যা ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। এ ধরণের কোম্পানিতে বরং একটি পক্ষ্যই থাকে যারা কিছু শর্তাবলিতে একটি মতৈক্যে পৌঁছায়। যেকেউ শেয়ার কিনতে পারে যখন তখন অন্য শেয়ারহোল্ডারদের জানানোর প্রয়োজন হয় না, যা ইসলামের দৃষ্টিতে “চুক্তি”র শর্ত পুরণ করে না। তাছাড়া চুক্তিতে কোন ধরণের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কথা বলা থাকে না, বরং প্রতিষ্ঠাতারা বা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শুধুমাত্র একটি প্রকল্প বা ব্যাবসা শুরু করতে বিনিয়োগের কথা উল্লেখ থাকে। ইসলামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একটি কোম্পানির মূল লক্ষ্য, শুধুমাত্র মূলধন বিনিয়োগ করা নয়। তাই বলা যায় ইসলামে এ ধরণের কোম্পানি অগ্রহণযোগ্য (বাতিল)। অনেকসময় কোম্পানিতে কাজের কথা বলা থাকলেও কে বা কারা আসলে কাজ করবে তা উল্লেখ থাকে না। কোম্পানিতে Disposing Person (বাদান) থাকা আবশ্যিক। Disposing Person বা বাদান হল সেই ব্যক্তি যে কোম্পানি চালানো বা রক্ষণাবেক্ষণ এর জন্য সরাসরি দায়ী থাকবে। স্টক কোম্পানিতে এ ধরণের ব্যাক্তি থাকে না, যারা দায়িত্ব নেয় তারা বোর্ড অফ ডিরেক্টর, কিন্তু বোর্ড অফ ডিরেক্টর বিনিয়োগকারীদের দ্বারা নির্বাচিত। এখানে আসলে বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধি হিসেবে বোর্ড অফ ডিরেক্টর ধরা যায় না কারণ বিনিয়োগকারীদেররা তাদের শেয়ারের সমপরিমাণ ভোট দিতে পারে, যার ১টা শেয়ার সে ১টা ভোট, যার ১০০টা শেয়ার তার ১০০টা ভোট, তাই বলা যায় বোর্ড অফ ডিরেক্টর বিনিয়োগকারীদের “মূলধনে”র প্রতিনিধি, বিনিয়োগকারীদের নয়।

    ২) ইসলামে কোম্পানি হল এক ধরণের চুক্তি যার ভিত্তি মূলধনের উপর কর্তৃত্বের (contract over disposal of property)। প্রত্যেক বিনিয়গকারীর বা শেয়ারহোল্ডারের Disposal over property (মূলধনের উপর কর্তৃত্বের) অধিকার থাকে, সে কর্তৃত্ব খাটায় অন্যান্য শেয়ারহোল্ডারের অনুমতি নিয়ে। কিন্তু স্টক কোম্পানিতে বিনিয়গকারীর বা শেয়ারহোল্ডারের Disposal over property থাকে না। বরং তা থাকে corporate personality নামক একটি কাল্পনিক আইনগত সত্ত্বার হাতে। এটা বলা ভুল হবে যে কোম্পানির Disposal বা প্রশাসনিক কাজ কোম্পানির ডিরেক্টররা করে থাকে যারা পার্টনার বা শেয়ারহোল্ডারদের প্রতিনিধিত্ব করে, কারণ আগেই আলোচনা করা হয়েছে ডিরেক্টর পার্টনার নয় বরং পার্টনারদের মূলধনএর প্রতিনিধিত্ব করে।

    ৩) পুঁজিবাদী ব্যাবস্থায় স্টক কোম্পানি চিরস্থায়ী, কিন্তু ইসলামে এটা অসম্ভব। কারণ কোন পার্টনার মৃত্যু বরণ করলে অথবা পাগল বা অক্ষম হয়ে যায় তাহলে কোম্পানি ভেঙ্গে যায়। কিন্তু স্টক কোম্পানিতে কোন বিনিইয়োগকারী মৃত্যুবরণ করলে কোম্পানি কোন খোজ-খবর তো দূরে থাক, কোম্পানী তার আপন গতিতে চলতে থাকে।

    এছাড়াও স্টক কোম্পানি ইসলামে হারাম হওয়ার অনেক কারণ আছে, যেমন: স্টক কোম্পানি সুদি ব্যাংক এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শেয়ার বাজারে যখন ধ্বস নামে, তখন সরকার বা রিজার্ভ ব্যাংক অবিনিময়যোগ্য কাগুজে মুদ্রা ছাপিয়ে বাজার চাঙ্গা করার চেষ্টা করে যা ইসলাম সমর্থন করে না, বরং ইসলামে মুদ্রার ভিত্তি হল ধাতব মুদ্রা, যেমন – সোনা, রুপা ইত্যাদি। শেয়ার বাজার হল মিথ্যা ভাওতাবাজির বাজার, যেখানে দুর্নীতি-অনিয়মই যেন নিয়ম। তাছাড়া পুজিবাজারে সুদ-ঘুষ-চাঁদাবাজি-দুর্নীতির কালো টাকা বিনিয়োগ করা যায়, যা ইসলামে হারাম।

    ইসলামে একটি সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক ব্যাবস্থা আছে এবং ইসলামে ব্যাবসাকে হালাল করা হয়েছে কিছু নির্দিষ্ট সীমারেখা দিয়ে, যেখানে টাকা কিছু মানুষের হাতে ঘুরপাক খাবে না। শেয়ার বাজার গুটিকয়েক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করে। শেয়ার বাজার যে হারাম তা বোঝার জন্য যেমন অর্থনীতিবিদ হওয়ার দরকার নাই, ঠিক তেমনি মাদ্রাসার ডিগ্রিও দরকার নাই। মুসলিমদের উচিৎ পুঁজিবাদী ব্যাবস্থা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করে ইসলামী ব্যবস্থার পূর্ণ বাস্তবায়ন করা। খিলাফত রাষ্ট্রে শাসকশ্রেণীর যেমন থাকবে কড়া জবাবদিহিতা ঠিক তেমনি থাকবে অর্থনৈতিক ভারসাম্য।

    যেসব বই, ব্লগ বা কলামের সাহায্য নেয়া হয়েছে:

    ১) ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা – শায়ক তাকিউদ্দিন আন-নাবাহানি
    ২) www.islamicsystem.blogspot.com 
    ৩) কিছু জাতীয় দৈনিক পত্রিকা

    প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ

  • রমজান ও ঐক্য

    রমজান ও ঐক্য

    একইদিনে সিয়াম পালন শুরু করা এবং একইদিনে ঈদ উদযাপন করা বিশ্বের সমস্ত মুসলিমের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে প্রদত্ত একটি দায়িত্ব এবং এটি তাদের ঐক্যবদ্ধ থাকারও বিশেষ একটি দিক। রমযান ও ঈদের দিনকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা স্পষ্ট এবং সুনির্দিষ্টভাবে শরঈ দলীলসমূহে চিহ্নিত করে দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ

    অতএব, যেই এই (রমযান) মাস প্রত্যক্ষ করবে, সে যেন এতে সিয়াম পালন করে। [বাকারা: ১৮৫]

    আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) এর বরাত দিয়ে বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) রমযানের ব্যাপারে বলেন:

    لَا تَصُومُوا حَتَّى تَرَوْا الْهِلَالَ وَلَا تُفْطِرُوا حَتَّى تَرَوْهُ فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَاقْدُرُوا لَهُ

    “নতুন চাঁদ না দেখা পর্যন্ত তোমরা সিয়াম পালন শুরু করবে না এবং একে না দেখা পর্যন্ত সিয়াম পালন বন্ধও করবে না; আর আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে গণণা করে নিবে।”

    আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) এর বরাত দিয়ে মুসলিম বর্ণনা করেন যে,

    الشَّهْرُ هَكَذَا وَهَكَذَا وَهَكَذَا ثُمَّ عَقَدَ إِبْهَامَهُ فِي الثَّالِثَةِ فَصُومُوا لِرُؤْيَتِهِ وَأَفْطِرُوا لِرُؤْيَتِهِ فَإِنْ أُغْمِيَ عَلَيْكُمْ فَاقْدِرُوا لَهُ ثَلَاثِينَ

    রাসূল (সা) রমযানের কথা উল্লেখ করে নিজের হাত দিয়ে ইশারা করলেন এবং বললেন: “চাঁদ হচ্ছে এরকম এবং এরকম। (তারপরে তিনি তৃতীয়বারের সময় নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলিকে সরিয়ে নিলেন এবং ২৯-এর ইঙ্গিত করলেন)। তারপর তিনি বললেন: যখন একে দেখবে তখন সিয়াম পালন শুরু করবে এবং আবার যখন একে দেখবে তখন সিয়াম পালন বন্ধ করবে, যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তাহলে (শা’বান ও শাওয়্যাল মাস) ত্রিশ (দিন) ধরে নিবে।”

    আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের (রা) বরাত দিয়ে বুখারী বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন: 

    الشَّهْرُ تِسْعٌ وَعِشْرُونَ لَيْلَةً فَلَا تَصُومُوا حَتَّى تَرَوْهُ فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا الْعِدَّةَ ثَلَاثِينَ

    “এই মাসে ২৯ টি রাত (হতে পারে), অতএব একে (নতুন চাঁদ) না দেখা পর্যন্ত সিয়াম পালন শুরু করবে না। আর যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তাহলে ত্রিশ (দিনে মাস) পূর্ণ করবে।”

    মুসলিম থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন: 

    إِنَّمَا الشَّهْرُ تِسْعٌ وَعِشْرُونَ فَلَا تَصُومُوا حَتَّى تَرَوْهُ وَلَا تُفْطِرُوا حَتَّى تَرَوْهُ فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَاقْدِرُوا لَهُ

    “ঊনত্রিশ দিনেই (রমযান) মাসটি (পূর্ণ হয়ে যেতে পারে)। অতএব একে (নতুন চাঁদ) না দেখা পর্যন্ত সিয়াম পালন শুরু করবে না এবং যতক্ষণ না একে (শাওয়্যালের নতুন চাঁদ) দেখবে সিয়াম পালন বন্ধও করবে না; আর যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তবে গণণা করে নিবে।”

    আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের বরাত দিয়ে মুসলিমে আরো বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন:

    الشَّهْرُ تِسْعٌ وَعِشْرُونَ فَإِذَا رَأَيْتُمْ الْهِلَالَ فَصُومُوا وَإِذَا رَأَيْتُمُوهُ فَأَفْطِرُوا فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَاقْدِرُوا لَهُ

    “ঊনত্রিশ দিনেই (রমযান) মাসটি (পূর্ণ হয়ে যেতে পারে); অতএব যখন নতুন চাঁদ দেখবে তখন থেকেই তোমরা সিয়াম পালন শুরু করবে এবং যখন একে (শাওয়্যাল মাসের শুরুতে যে নতুন চাঁদ উঠে) দেখবে তখন তোমরা সিয়াম পালন বন্ধ করবে, যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন পাও তবে গণণা কর (এবং ত্রিশ দিনে মাস পূর্ণ কর)।”

    এই হাদীসগুলো খুবই স্পষ্ট এবং সন্দেহমুক্ত। হাদীসগুলোতে রাসূল (সা) আমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন রমযানের নতুন চাঁদ দেখার বিষয়টি নিশ্চিত হলে সিয়াম পালন শুরু করতে এবং শাওয়্যালের নতুন চাঁদ দেখার বিষয়টি নিশ্চিত হলে সিয়াম পালন বন্ধ করতে; এই নির্দেশগুলো আমাদের জন্য বাধ্যবাধকতা এবং অন্য যেকোনো দায়িত্ব পরিত্যাগ করা বা কোনো অপরাধে লিপ্ত হওয়ার মতোই এই নির্দেশগুলোর লঙ্ঘনও গোনাহের কারণ। 

    সিয়াম পালন শুরু করা এবং বন্ধ করার নির্দেশটি সার্বজনীন (general): “একে না দেখা পর্যন্ত সিয়াম পালন শুরু করবে না এবং একে না দেখা পর্যন্ত সিয়াম পালন বন্ধও করবে না”, “যখন একে দেখবে তখন সিয়াম পালন শুরু করবে এবং যখন একে দেখবে তখন সিয়াম পালন বন্ধ করবে”_এই নির্দেশগুলো পৃথিবীর সমস্ত মুসলিমের জন্যই প্রযোজ্য। উপরন্তু বর্ণনাতে ‘দেখা’ শব্দটিও সার্বজনীনভাবে এসেছে: “যখন একে দেখবে” অথবা “যতক্ষণ না একে দেখবে” এর মানে হচ্ছে: যে কারো ‘দেখা’ ই অন্যদের জন্য পর্যাপ্ত বলে বিবেচতি হবে। এবং বিষয়টি এমন কিছুনা যে, যে দেখেছে কেবলমাত্র তার জন্যই প্রযোজ্য অথবা কেবলমাত্র তার দেশের লোকজনের জন্যই প্রযোজ্য। সিয়াম পালন শুরু করা এবং বন্ধ করার যে নির্দেশটি বর্ণনাতে এসেছে তার আহ্বান হচ্ছে সার্বজনীন এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ; ‘দেখা’র আহ্বানটিও অনুরূপ। অতএব সন্দেহাতীতভাবেই হুকুমটি সার্বজনীন অর্থাৎ সকলের উপর প্রযোজ্য। 

    অতএব, নতুন চাঁদ দেখার সাথে সিয়াম পালন শুরু এবং সিয়াম পালন বন্ধের নির্দেশটি হচ্ছে এমন একটি নির্দেশ যা পৃথিবীর সমস্ত মুসলিমের জন্যই সমভাবে প্রযোজ্য। ফলে যদি শুক্রবার রাতে মরক্কোর রাজধানী রাবাতে রমযানের নতুন চাঁদ দেখা যায় কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় সেটা শুক্রবার রাতের পরিবর্তে শনিবার রাতে দেখা যায় তাহলে ইন্দোনেশিয়ার লোকজনকে এক্ষেত্রে মরক্কোর চাঁদ অনুযায়ীই আমল করতে হবে অর্থাৎ তাদেরকে অবশ্যই শুক্রবার থেকে সিয়াম পালন শুরু করতে হবে। যদি তারা এরূপ না করে তাহলে ঐ দিনের সিয়ামের জন্য তাদেরকে অবশ্যই আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে, কারণ পৃথিবীর যেকোনো জায়গার যেকোনো মুসলিম কর্তৃক চাঁদ দেখার মাধ্যমেই ফরয দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে গেছে। অনুরূপভাবে, শাওয়্যালের নতুন চাঁদ দেখা যাওয়ার খবর যদি তাদের কানে পৌছায় তাহলে নিজেরা চাঁদ না দেখা সত্ত্বেও তাদেরকে অবশ্যই সিয়াম পালন বন্ধ করতে হবে; কারণ যে মুহূর্তে চাঁদ দেখা যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে সে মুহূর্তেই সিয়াম পালন থেকে বিরত থাকা বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে এবং তখন সিয়াম অব্যাহত রাখা তাদের জন্য গোনাহের কারণ বলে বিবেচিত হবে। 

    অতএব, শরঈ নিয়ম অনুযায়ী যদি কোনো দেশের লোক নতুন চাঁদ দেখে, তাহলে সেটা সমস্ত মুসলিম দেখেছে বলে গণ্য করতে হবে; অতএব নতুন চাঁদটি যদি রমযানের হয় তবে তাদের সবাইকে সিয়াম পালন শুরু করতে হবে এবং নতুন চাঁদটি যদি শাওয়্যালের হয় তবে তাদের সবাইকে সিয়াম পালন বন্ধ করতে হবে। শরঈ দলীল অনুযায়ী এটিই আল্লাহর হুকুম। 

    রাসূল (সা)-এর জীবদ্দশায় মুসলিমরা বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করা সত্ত্বেও একই দিনে সিয়াম পালন শুরু করতেন এবং একইদিনে তা বন্ধও করতেন। এই বিষয়টি আমাদের জন্য আরেকটি শরঈ প্রমাণ যে, যেকোনো জায়গায় নতুন চাঁদ দেখা গেলেই এবং তা যদি একজন মুসলিমের সাক্ষ্যেও ভিত্তিতেও হয়, সেক্ষেত্রে সমস্ত মুসলিমরা একইদিনে সিয়াম পালন শুরু করতে এবং একইদিনে সিয়াম পালন বন্ধ করতে বাধ্য। এবং নিম্নোক্ত হাদীসগুলো সেটাই প্রমাণ করে: 

    একবার মহানবী (সা) কিংবা তার সাহাবীরা কেউই রমজানের চাঁদ দেখেননি। সেই প্রেক্ষিতে আবু দাউদ শরীফে ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত আছে,

    جَاءَ أَعْرَابِيٌّ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ إِنِّي رَأَيْتُ الْهِلَالَ قَالَ الْحَسَنُ فِي حَدِيثِهِ يَعْنِي رَمَضَانَ فَقَالَ أَتَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ قَالَ نَعَمْ قَالَ أَتَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ قَالَ نَعَمْ قَالَ يَا بِلَالُ أَذِّنْ فِي النَّاسِ فَلْيَصُومُوا غَدًا

    “একজন বেদুইন এসে নবী (সা)-কে বললো, ‘আমি চাঁদ দেখেছি।’ নবী (সা) বেদুঈনটিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর রাসূল?’ লোকটি বলল, হ্যাঁ। এরপর তিনি (সা) বলেন, হে বিলাল, লোকসকলের মাঝে ঘোষণা দাও যাতে আগামীকাল তারা সিয়াম পালন করে”। অর্থাৎ স্বয়ং আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সা) কেবলমাত্র একজন মুসলিমের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। 


    শাওয়্যাল মাসের চাঁদ অর্থাৎ ঈদের চাঁদ মেঘে ঢাকা থাকায় মদিনার মুসলিমরা পরদিন রোযা রেখে ফেললেন। এই প্রেক্ষিতে আবু দাউদ শরীফে আবু উমাইর বিন আনাস হতে বর্ণিত আছে,

    … أَنَّ رَكْبًا جَاءُوا إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَشْهَدُونَ أَنَّهُمْ رَأَوْا الْهِلَالَ بِالْأَمْسِ فَأَمَرَهُمْ أَنْ يُفْطِرُوا وَإِذَا أَصْبَحُوا أَنْ يَغْدُوا إِلَى مُصَلَّاهُمْ

    (দিনের শেষভাগে) একদল যাত্রী মদিনায় প্রবেশ করলেন। তারা নবী (সা)-কে সাক্ষ্য দিলেন যে, তারা (ভ্রমণরত অবস্থায়) আগের সন্ধ্যায় চাঁদ দেখে এসেছেন। অতঃপর নবী (সা) মদিনার মুসলিমদেরকে রোযা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন এবং পরদিন সকালে (ঈদের নামাজ আদায় করতে) তাদের নামাজের স্থানে যেতে বলেন। 

    ইমাম আহমদ-এর মুসনাদ-এর বর্ণনায়, তিনি (সা) নির্দেশ দিলেন,

    … أَنْ يُفْطِرُوا مِنْ يَوْمِهِمْ وَأَنْ يَخْرُجُوا لِعِيدِهِمْ مِنْ الْغَدِ

    “… সেইদিন রোযা ভেঙ্গে ফেলতে এবং পরদিন তাদের ঈদের জন্য বের হতে।”

    যারা দাবী করে সিয়াম শুরুর দিন এবং শেষ হওয়া অর্থাৎ ঈদের দিন ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, সংক্ষেপে তাদের সেসব শুবহাকে (দাবিকৃত বিতর্কিত দলীল) মূলত দুটো ভাগে বিভক্ত করা যায়: 

    ১) প্রথম শুবহা: তারা দাবী করে যে, সালাতের ওয়াক্তের মতোই কোনো দেশে বসবাসরত লোকজন তাদের নিজেদের চাঁদ দেখাকে অনুসরণ করবে; এজন্যই তারা বলে: মাতালি’ অর্থাৎ (মহাশূন্যের বস্তুসমূহের) উদয়ের সময়ের উপরই আল্লাহর আদেশ নির্ভরশীল। এই দাবিটির জবাবে হচ্ছে এই যে: সালাতের ওয়াক্ত তাদের নির্ধারিত সময়ে আদায় করতে হয় এবং এই সময়টা একই অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে; কারণ সালাতের জন্য শরীয়াহ যেসব আলামতকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে সেগুলো ভিন্ন ভিন্ন সময়ে হতে পারে। সিয়ামের ক্ষেত্রেও ভোরবেলা ইমসাক (সিয়ামের ওয়াক্ত শুরু)-এর সময় ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে; কারণ শরঈ দলিল থেকেই এরূপ ভিন্নতার নির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে: আল্লাহ (সুবনাহুতা ওয়া তা’আলা) বলেন: 

    وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الأبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الأسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ

    “আর পানাহার করো যতক্ষণ না কালো রেখা থেকে (ভোরের) শুভ্র রেখা পরিষ্কার হয়ে যায়। অতঃপর রোযা পূর্ণ কর রাত পর্যন্ত।” [আল কুরআন ২:১৮৭] 

    সালাতের ওয়াক্ত যেমন স্থানভেদে ভিন্ন হয়, ইমসাক এবং ইফতারের সময়ও অনুরূপভাবে স্থানভেদে ভিন্ন হয়। তবে এ ভিন্নতা কোনো একটা দিনের মধ্যেই আবর্তিত হয়; যাইহোক, কোনো একটা দিনে একসাথেই সারা পৃথিবীতে রমযান মাস শুরু হবে এবং যেটুকু ভিন্নতা থাকবে তা কোনো একটা নির্দিষ্ট দিনের মধ্যেই আবর্তিত হবে। এই বিষয়টিই পরিষ্কারভাবেই বর্ণিত হয়েছে হাদীসের বর্ণনাগুলোতে এবং এটিই হচ্ছে শরঈ দলিল থেকে বের করা প্রকৃত জ্ঞান। পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী দুটি বিন্দুর মধ্যে নতুন চাঁদ উঠার যে ভিন্নতা সেটা কখনোই বার ঘণ্টার বেশি হয় না; প্রথমযুগের মুজতাহিদগণ এ ব্যাপারে রেহাইপ্রাপ্ত কারণ তারা এই বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝতে সক্ষম হন নি; কারণ তখন তারা এমন কোনো সুবিধা পান নি যার ফলে পৃথিবী, সূর্য ও নতুন চাঁদের আবর্তনকে সঠিকভাবে বুঝতে পারবেন। তাই তাদের মধ্যে অল্পসংখ্যক ভিন্নমতে উপনীত হয়েছিলেন। অবশ্য চাঁদের বাস্তবতা না জানতে পারার অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও তাদের অধিকাংশই সঠিক মতের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন কারণ এ ব্যাপারে হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নির্দেশনা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। বর্তমানে যেহেতু চাঁদের বাস্তবতা ও দলীল থেকে সঠিক জ্ঞানটি অর্জিত হয়েছে, সেহেতু যারা দাবি করে সময়ের ভিন্নতা একদিনের চেয়ে বেশি হতে পারে তাদের কাছে এখন আর কোনো যুক্তি বা অজুহাত অবশিষ্ট থাকছে না; আর যারা মনে করে এ ভিন্নতা কয়েকদিন পর্যন্ত হতে পারে তাদের কথাতো বলাই বাহুল্য। অতএব, সারা বিশ্বজুড়ে পুরো ইসলামী উম্মতের জন্য রমযান মাস একদিনেই শুরু হয় এবং শেষ হয় অর্থাৎ ঈদ শুরু হয় একইদিনে। 

    ২) দ্বিতীয় শুবহা: সিয়াম শুরুর দিন এবং শেষ হওয়ার দিন ভিন্ন হতে পারে বলে যারা দাবি করে তাদের দ্বিতীয় শুবহাটির উৎপত্তি হচ্ছে মুসলিম শরীফের এক বর্ণনা থেকে; এতে বর্ণিত আছে: উম্মুল ফাযল বিনতুল হারিছ তাকে (কুরাইব) আশ-শামে মুয়াবিয়ার কাছে প্রেরণ করলেন; তিনি বলেন: আমি আশ-শামে গেলাম এবং তার (উম্মুল ফাযল বিনতুল হারিছ)-এর পক্ষ থেকে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সম্পাদন করলাম। আশ-শামে তখন রমযান মাস শুরু হয়ে গিয়েছিল। সেখানে আমি শুক্রবারেই রমযানের নতুন চাঁদ দেখেছিলাম। মাসের শেষদিকে আমি তখন মদিনায় ফিরে এলাম, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) আমকে রমযানের নতুন চাঁদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন: “তুমি এটা কখন দেখেছ? আমি বললাম: শুক্রবার রাতে আমরা এটা দেখেছি। তিনি বললেন: তুমি কি এটা নিজে দেখেছ? আমি বললাম: হ্যাঁ, আমি দেখেছি এবং অন্যান্য লোকজনও দেখেছে এবং সিয়াম পালন করেছে, মুয়াবিয়া (রা) ও সিয়াম পালন করেছেন; একথা শুনে তিনি বললেন: কিন্তু আমরা এটা দেখেছি শনিবার রাতে। অতএব আমাদেরকে ত্রিশ পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অথবা এটি শাওয়্যালের (নতুন চাঁদ) না দেখা পর্যন্ত সিয়াম পালন অব্যাহত রাখতে হবে। আমি বললাম: মুয়াবিয়ার চাঁদ দেখা কি আপনার জন্য যথেষ্ট না? তিনি বললেন: না, কারণ এভাবেই আল্লাহর রাসূল আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন।” 

    সিয়াম শুরু হওয়ার দিন এবং শেষ হওয়ার দিন ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে বলে যারা দাবি করে তারা এই বর্ণনাটিকে একটি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে থাকে; তারা এরূপ যুক্তি দেখায় যে, ইবন আব্বাস আল-শাম অঞ্চলের লোকদের চাঁদ দেখাকে বিবেচনা করেননি এবং বর্ণনাটির শেষাংশে বলেছেন: এভাবেই আল্লাহর রাসূল আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে ইবন আব্বাস (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে থেকে শিখেছেন যে, এক অঞ্চলের লোকজন চাঁদ দেখলে অন্যান্য অঞ্চলের লোকজন সে অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য না; এক্ষেত্রে তারা একথাও বলে থাকে যে বর্ণনাটির বক্তব্য সুনির্দিষ্ট এবং চাঁদ দেখার ব্যাপারে এটি একটি ব্যাখ্যাও ধারণ করছে। এজন্য তারা এরূপ দাবি করে যে, কোনো অঞ্চলের লোকজন চাঁদ দেখা অনুযায়ী আমল করতে কেবলমাত্র তখনই বাধ্য যখন তারা নিজেদের এলাকায় নতুন চাঁদ দেখবে, অন্য এলাকায় নয়। ফলে তখন স্থানভেদে এবং উদয় সময় অনুযায়ী সিয়াম শুরু এবং ঈদ শুরুর সময়ে ভিন্নতা আসে। 

    এই দাবির জবাব হচ্ছে যে উপরিউক্ত বর্ণনাটি কোনো হাদীস নয় বরং একজন সাহাবীর ইজতিহাদ; আর কোনো সাহাবীর ইজতিহাদ কখনোই রাসূল (সা)-এর হাদীসের সাথে তুলনীয় হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে, শাম অঞ্চলের লোকজনের চাঁদ দেখা অনুযায়ী ইবন আব্বাস (রা) আমল না করার বিষয়টি একটি ইজতিহাদকে উপস্থাপন করে মাত্র এবং একে কোনো শরঈ দলিল হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। সাধারণ শরঈ দলিলের আলোকে সবসময়ই এধরনের ইজতিহাদ বাতিল বলে গণ্য হয় এবং ইজতিহাদটি পরিত্যাগ করে হাদীস অনুযায়ী আমল করতে হয়। উপরন্তু কোনো হাদীসের সার্বজনীন (general) অর্থে ব্যবহৃত শব্দের সুনির্দিষ্টকরণ (specification) করার জন্য কোনো সাহাবীর ইজতিহাদকে ব্যবহার করার সুযোগ নেই। বর্ণনাটির শেষদিকে ইবন আব্বাস (রা)-এর মন্তব্য: “এভাবে পালন করতেই রাসূল (সা) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন” – এটি কোনো হাদীস নয় বরং রাসূল (সা)-এর হাদীস “যখন একে দেখবে তখন সিয়াম পালন শুরু করবে এবং যখন একে দেখবে তখন সিয়াম পালন বন্ধ করবে” থেকে ইবন আব্বাস (রা) যা বুঝেছিলেন তারই উল্লেখ মাত্র। 

    এজন্যই তিনি এরকম বলেন নি যে, রাসূল (সা) এভাবেই বিষয়টি বর্ণনা করেছেন অথবা রাসূল (সা)-এর কাছ থেকে আমরা এরূপই শিখেছি বরং তিনি বলেছেন: এভাবে পালন করতেই রাসূল (সা) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। হাদীসটির ব্যাখায় ইমাম শাওকানী (রহ) তাঁর নাইল উল-আওতার কিতাবে লিখেছেন:

    وَاعْلَمْ أَنَّ الْحُجَّةَ إنَّمَا هِيَ فِي الْمَرْفُوعِ مِنْ رِوَايَةِ ابْنِ عَبَّاسٍ لَا فِي اجْتِهَادِهِ الَّذِي فَهِمَ عَنْهُ النَّاسُ وَالْمُشَارُ إلَيْهِ بِقَوْلِهِ : ” هَكَذَا أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ” هُوَ قَوْلُهُ : فَلَا نَزَالُ نَصُومُ حَتَّى نُكْمِلَ ثَلَاثِينَ ، وَالْأَمْرُ الْكَائِنُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هُوَ مَا أَخْرَجَهُ الشَّيْخَانِ وَغَيْرُهُمَا بِلَفْظِ : { لَا تَصُومُوا حَتَّى تَرَوْا الْهِلَالَ ، وَلَا تُفْطِرُوا حَتَّى تَرَوْهُ فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا الْعِدَّةَ ثَلَاثِينَ } وَهَذَا لَا يَخْتَصُّ بِأَهْلِ نَاحِيَةٍ عَلَى جِهَةِ الِانْفِرَادِ بَلْ هُوَ خِطَابٌ لِكُلِّ مَنْ يَصْلُحُ لَهُ مِنْ الْمُسْلِمِينَ

    জেনে রাখ, (আমাদের কাছে) হুজ্জত (সুস্পষ্ট প্রমাণ) সাব্যস্ত হয় ইবন আব্বাস (রা)-এর মারফু’ রেওয়ায়াত থেকে, তার ইজতিহাদ থেকে নয় যা লোকজন তার থেকে বুঝেছে এবং তাঁর বর্ণনায় যেটি এসেছে “এভাবে রাসূল (সা) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন” সেটি তারই মন্তব্য; (এজন্যই তিনি বলেছেন): “আমরা সিয়াম পালন করে যাচ্ছি ত্রিশদিন পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত”। রাসূল (সা)-এর নির্দেশটি নিহিত রয়েছে সেই হাদীসটিতে যা শায়খাইন (বুখারী ও মুসলিম) ও অন্যান্যদের কর্তৃক সংকলিত হয়েছে: “নতুন চাঁদ না দেখা পর্যন্ত সিয়াম পালন শুরু করবে না এবং তা না দেখা পর্যন্ত সিয়াম পালন বন্ধ করবে না; যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তাহলে ত্রিশ দিনে (গণণা) পূর্ণ করবে”; এবং এই বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে কোনো একটি অঞ্চলের লোকজনকে বুঝাচ্ছেন না বরং সমস্ত মুসলিমদেরকেই বুঝাচ্ছে।

    ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ তার মাজমু’ আল ফাতওয়া গ্রন্থে বলেন,

    مُخَالِفٌ لِلْعَقْلِ وَالشَّرْعِ

    “এ বিষয়টি (চাঁদ দেখাকে কোনো একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বা দেশের মধ্যে সীমিত করাটা) যুক্তি এবং শরীয়ত উভয়েরই পরিপন্থি।”

    ‘ফতওয়া-ই আলমগিরি’-তে বলা হয়েছে,

    لَوْ رَأَى أَهْلُ مَغْرِبٍ هِلَالَ رَمَضَانَ يَجِبُ الصَّوْمُ عَلَى أَهْلِ مَشْرِقٍ

    “পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্তের অধিবাসীদের কেউ রমজানের চাঁদ দেখলে পৃথিবীর পূর্ব প্রান্তের অধিবাসীদের ওপরও ওই রোজা ফরজ হবে।”

    অতএব, কুরাইব যা বর্ণনা করেছেন সেটি কোনো হাদীস নয় বরং ইবন আব্বাসের মত; এটি দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য না এবং একে দলীল হিসেবে ব্যবহারও করা যাবে না; হাদীসের কোনো সার্বজনীন অর্থকে সুনির্দিষ্ট করার জন্যও একে ব্যবহার করা যাবে না। অতএব, শুবহাটি বাতিল বলে গণ্য হচ্ছে এবং একে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা ভুল হবে। এক্ষেত্রে আরো উল্লেখ্য যে, যারা বর্তমানে অনেকেই যারা ইবন আব্বাসের মতটির বরাত দেন তারা মূল মতটি অনুসরণ করার জন্য তা করেন না। বরং তারা জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট জাতি-রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে দেখা চাঁদকে প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে তা করে থাকেন। কিন্তু আমরা জানি, জাতীয়তাবাদ ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلا تَفَرَّقُوا

    তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্ত করে আকড়ে ধর এবং পরস্পর বিভক্ত হয়ো না। [সূরা আলে ইমরান: ১০৩]

    রাসূল (সা) বলেন,

    لَيْسَ مِنَّا مَنْ دَعَا إلى عَصَبِيةٍ

    ‘যে জাতীয়তাবাদের দিকে আহ্বান করে সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়’। [আবু দাউদ]

    তিনি (সা) আরো বলেন,

    دَعُوْهَا فَإِنَّهَا مُنْتِنَةٌ

    ‘এটা (জাতীয়তাবাদ) ছেড়ে দাও, নিশ্চয়ই এটা পঁচে গেছে’। [বুখারী] 

    সুতরাং, কোনো জাতি-রাষ্ট্রের সীমানা মুসলিম উম্মতের মধ্যে কোনো বিভেদ সৃষ্টি করেনা। শরীয়তের দৃষ্টিতে পৃথিবীর প্রত্যেক মুসলিম পরস্পর ভাই-ভাই এবং তাদের ভুমিগুলো একটি ভুমি হিসেবেই বিবেচিত হয়।

    যেহেতু দুটি শুবহার কোনোটিই আর বৈধ বলে বিবেচিত সেহেতু কোনো শুবহাই আর অবশিষ্ট থাকছে না। অতএব, দলিলের প্রকৃত অর্থ থেকে পাওয়া প্রমাণই একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিষয় এবং সে অনুযায়ী পৃথিবীর কোনো অংশে নতুন চাঁদ দেখা গেলে সমস্ত মুসলিমকে একইসঙ্গে সিয়াম পালন শুরু করতে হবে; কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাদীসে পরিষ্কারভাবে এই বিষয়টিই বর্ণিত হয়েছে; “যখন তা দেখবে তখন সিয়াম পালন শুরু করবে।”

    একইভাবে পৃথিবীর যেকোনো অংশে নতুন চাঁদ দেখা গেলে সমস্ত মুসলিমকে একইসঙ্গে সিয়াম পালন বন্ধ করতে হবে এবং ঐ দিনটিকে ঈদের দিন হিসেবে পালন করতে হবে; কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাদীসে পরিষ্কারভাবে এই বিষয়টিই বর্ণিত হয়েছে: “যখন একে দেখবে তখন সিয়াম পালন বন্ধ করবে।”

    এখানে একথা বলা গুরুত্বপূর্ণ যে, রমযান কখন শুরু হবে এবং কখন শেষ হবে তা জ্যোতির্বিদ্যার সাহায্যে গণনার মাধ্যমে অগ্রিম নির্ধারণ করার বিষয়টি কখনোই প্রকৃত চাঁদ দেখার বিকল্প হতে পারে না। কারণ রাসূল (সা) বলেছেন,

    … لَا نَحْسُبُ الشَّهْرُ هَكَذَا وَهَكَذَا يَعْنِي مَرَّةً تِسْعَةً وَعِشْرِينَ وَمَرَّةً ثَلَاثِينَ

    “আমরা (মাস গণণার ক্ষেত্রে) হিসাব করি না, (বরং) মাস হচ্ছে এরকম এরকম”। অর্থাৎ ২৯ বা ৩০ দিনে। [বুখারী] 

    যেসব সরকার চাঁদ দেখার পরিবর্তে এসব গণনাকে ব্যবহার করছে তাদের কর্মকাণ্ড স্পষ্ট দলিলের সাথে সাংঘর্ষিক, এজন্য তাদের কার্যক্রম অবৈধ এবং তাদের ঘোষণার উপর নির্ভর করা মুসলিমদের জন্য হারাম। 

    হে মুসলিমগণ! আপনারা যখন শুনবেন পৃথিবীর কোনো মুসলিম প্রান্ত সেটা যে অঞ্চলই হোকনা কেন, আপনাদের যত কাছের হোক অথবা যত দূরের হোক _ রমযানের নতুন চাঁদ দেখার বিষয়টি বৈধ উপায়ে নিশ্চিত করছে, তখনই আমাদেরকে সিয়াম পালন শুরু করতে হবে এবং এক্ষেত্রে সিয়াম পালন শুরু করার জন্য আমাদের অঞ্চলের শাসক বা মুফতির অনুমতির জন্য অপেক্ষা করা হারাম। একইভাবে আপনারা যখন শুনবেন বিশ্বের কোনো মুসলিম প্রান্ত, সেটা যত কাছের হোক অথবা দূরের – শাওয়্যালের নতুন চাঁদ দেখার বিষয়টি শরীয়তসম্মত পদ্ধতির সাহায্যে নিশ্চিত করছে তখনই আমাদেরকে সিয়াম পালন বন্ধ করে ঈদ উদ্যাপন করতে হবে এবং ঈদ উদ্যাপনের ক্ষেত্রে নিজ অঞ্চলের শাসক বা মুফতির অনুমতির জন্য অপেক্ষা করা আমাদের জন্য হারাম। যারা পথভ্রষ্ট যালিম শাসকদের সন্তুষ্ট করতে বেশি উদ্বিগ্ন তাদের নির্দেশে আমাদের সিয়াম পালন এবং সিয়াম পালন বন্ধ করা উচিৎ নয় বরং আমাদের সিয়াম পালন করতে হবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও তাঁর রাসূল (সা)-এর নির্দেশেই। এছাড়াও কোনো দেশের অধিকাংশ মানুষ কোন নিয়মে সিয়াম পালন করছে তাও আমাদের জন্য কোনো ভিত্তি হতে পারে না। এ ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الأرْضِ يُضِلُّوكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ إِنْ يَتَّبِعُونَ إِلا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلا يَخْرُصُونَ

    আর যদি আপনি পৃথিবীর অধিকাংশের অনুসরণ করেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহ পথ থেকে বিপথগামী করে দেবে। তারা শুধু অলীক কল্পনার অনুসরণ করে এবং সম্পুর্ণ অনুমানভিত্তিক কথাবার্তা বলে থাকে। [আন’আম: ১১৬] 

    সুতরাং, আল্লাহর বেধে দেয়া সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির মোকাবেলায় অধিকাংশ মানুষকে অনুসরণ করবার কোনো অবকাশ নেই। 

    হে মুসলিমগণ! সিয়াম পালন করার দিন এবং সিয়াম পালন বন্ধের সময়ের ব্যপারে ঐক্যবদ্ধ থাকার যে শরঈ বিধান রয়েছে তা বাস্তবায়নের জন্য আমরা আপনাদেরকে আহবান করছি। এই উপলক্ষ্যে আমরা আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি মুসলিম উম্মাহর জন্য খলীফা নিয়োগের দায়িত্বের ব্যাপারে যা আল্লাহ আমাদের উপরে অর্পণ করেছেন; যিনি আমাদের ভিন্নমত এবং ভিন্ন অবস্থানকে এক করবেন, যিনি সমস্ত শরঈ আহকাম বাস্তবায়ন করবেন, ইসলামের আহ্বানকে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিবেন এবং আল্লাহর বাণীকে সুউচ্চে তুলে ধরবেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ

    হে ঈমানদারগণ, যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এমন কোনো কিছুর দিকে তোমাদেরকে আহ্বান করেন যা তোমাদের মধ্যে জীবনের সঞ্চার করে তখন সেই আহ্বানে সাড়া দাও। [আনফাল: ২৪]

  • Ideology (মতাদর্শ)

    Ideology (মতাদর্শ)

    আরবি ভাষাগত দিক থেকে বিবেচনা করলে মতাদর্শ (মাবদা’) শব্দটি ‘সূচনাবিন্দু’ বা ‘মৌলিক নীতিমালা’র সমার্থক৷ সাধারণ মানুষ অবশ্য এই শব্দটিকে ব্যবহার করে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাকে বুঝাতে যার উপর ভিত্তি করে অন্যান্য চিন্তা প্রতিষ্ঠত হয়; সুতরাং একজন মানুষ বলতে পারে – আমার নীতি হচ্ছে সত্যবাদিতা, আরেকজন বলতে পারে আমার নীতি হচ্ছে বিশ্বস্ততা এবং এর মাধ্যমে সে বোঝাতে চায় যে বিশ্বস্ততার ভিত্তিতে সে লোকজনের সাথে লেনদেন করে ইত্যাদি৷ প্রকৃতপক্ষে লোকজন কিছু খন্ডিত বা আংশিক চিন্তা যেগুলোর উপর ভিত্তি করে অন্যকিছু চিন্তা গড়ে উঠতে পারে সেগুলোকে মৌলিক চিন্তা বলে থাকে কারণ এগুলো অন্যকিছু চিন্তার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে৷ তাই তারা বলে সত্যবাদিতা একটি মৌলিক নীতি, উত্তম প্রতিবেশীসুলভ আচরণ একটি মৌলিক নীতি, সহযোগিতা একটি মৌলিক নীতি প্রভৃতি৷ এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তারা বলে থাকে যে নৈতিকতার নীতি, অর্থনৈতিক নীতি, আইন-কানুন সম্পর্কিত নীতি, সামাজিক নীতি প্রভৃতি; অর্থনীতি সম্পর্কিত কিছু র্নিদিষ্ট চিন্তা এবং আইনশাস্ত্রের কিছু র্নিদিষ্ট চিন্তাকে তারা অর্থনৈতিক নীতি এবং আইনশাস্ত্রীয় নীতি বলে মনে করার কারণ হচ্ছে এগুলোর উপর ভিত্তি করে আরো কিছু চিন্তার জন্ম হয়েছে৷ প্রকৃতপক্ষে এগুলো মৌলিক নীতি নয় বরং কিছু অন্যান্য চিন্তার ভিত্তি৷ কারণ মৌলিক নীতি হচ্ছে একান্তই মৌলিক অথচ এগুলো মৌলিক নয় বরং আংশিক৷ অতএব এসব চিন্তাকে শুধুমাত্র একারণে মৌলিক বলা চলে না যে এরা অন্যকিছু চিন্তার ভিত্তি হিসাবে কাজ করছে বা এদের থেকে অন্যকিছু চিন্তার উদ্ভব হয়েছে কারণ এরা নিজেরা চিন্তা হিসাবে মৌলিক নয় বরং অন্যান্য চিন্তা থেকে এদের উদ্ভব হয়েছে অথবা এরা সবাই একটি চিন্তা থেকে উদ্ভূত হয়েছে৷ এজন্য সত্যবাদিতা, সহযোগিতা এবং এরকম অন্যান্য বিষয়ের কোনটাই মৌলিক নয় বরং আংশিক; কারণ এরা অন্য একটি মৌলিক চিন্তা থেকে এসেছে এবং নিজেরা নিজেদের ভিত্তি হিসাবে কাজ করেনি৷ উদাহরণস্বরূপ সত্যবাদিতা হচ্ছে এমন একটি বিষয় যাকে একটি শরঈ নিয়ম হিসেবে মুসলিমরা গ্রহণ কবেছে কুরআন থেকে এবং অন্যান্য অমুসলিমরা একে গ্রহণ করেছে পুঁজিবাদী চিন্তার একটি কার্যকর ও সুন্দর উপাদান হিসাবে৷ 

    অতএব কোনো চিন্তাকে ততক্ষণ পর্যন্ত মৌলিক চিন্তা (মতাদর্শ) বলা চলেনা যতক্ষণনা এটি এমন একটি মৌলিক চিন্তা হচ্ছে যা থেকে বাকি সব চিন্তার উদ্ভব হবে৷ মৌলিক চিন্তা হবে এমন একটি বিষয় যার পূর্বে অন্যকোনো চিন্তা বিদ্যমান থাকতে পারবেনা৷ মৌলিক চিন্তা সীমাবদ্ধ থাকবে কেবল মহাবিশ্ব, মানুষ ও জীবন সম্পর্কিত বিষয়ে এবং এটি ছাড়া কোনো মৌলিক চিন্তা থাকা সম্ভব নয় কারণ এসব চিন্তাই হচ্ছে জীবনের সমস্ত কর্মকান্ডের মৌলিক ভিত্তি৷ 

    অতএব, মহাবিশ্ব, মানুষ ও জীবন সম্পর্কে সামগ্রিক চিন্তাই হচ্ছে মৌলিক চিন্তা এবং এটিই হচ্ছে আক্বীদাহ৷ কিন্তু এই আক্বীদাহ থেকে কোনো চিন্তার উদ্ভব হবেনা অথবা এর ভিত্তিতে অন্যকোনো চিন্তা উত্‍সারিতও হবেনা যদি এটি নিজে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ চিন্তা না হয় অর্থাৎ এটি কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার ফসল না হয়৷ এটি যদি কেবলই গ্রহণ ও আত্মসমর্পণের বিষয় হয় তাহলে এটি কোনো চিন্তা হিসাবে গণ্য হবেনা এবং একে কখনো স্বয়ংসম্পূর্ণ চিন্তা হিসেবে গণ্য করা যাবেনা বরং তখন এটি নিছকই একটি আক্বীদাহ হিসেবে গণ্য করতে হবে৷ অতএব স্বয়ংসম্পূর্ণ চিন্তা কেবল বিবেক থেকেই আসতে পারে অর্থাৎ এটি হবে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার ফসল৷ শুধুমাত্র তখনই এটি হবে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ যার উপর ভিত্তি কবে অন্যান্য চিন্তার জন্ম হবে৷ এসব চিন্তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমস্ত সমস্যার সমাধান করবে অথ মানুষের যাবতীয় কর্মকান্ডকে সুসংগঠিত করবে৷ মতাদর্শ কেবল তখনই বিদ্যমান থাকে যখন কোন বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ এবং সেই আক্বীদাহ থেকে উত্‍সারিত জীবন পরিচালনাকারী বিভিন্ন আহকাম বিদ্যমান থাকে৷ অতএব, মতাদর্শ হচ্ছে এমন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ যা থেকে কোনো ব্যবস্থা উদ্ভূত হয়৷ এইদিক থেকে বিবেচনা করলে ইসলাম একটি মতাদর্শ, কারণ এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ এবং এ থেকে একটি ব্যবস্থা উদ্ভূত হয়েছে যার মধ্যে সমস্ত আহকাম বিদ্যমান রয়েছে যেগুলো জীবনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করে৷ অনুরূপভাবে সাম্যবাদ একটি মতাদর্শ কারণ এর রয়েছে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ যা থেকে একটি ব্যবস্থা উদ্ভূত হয়েছে এবং এগুলো জীবনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দিয়ে থাকে৷ একইভাবে পুঁজিবাদও একটি মতাদর্শ কারণ এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ যা থেকে এমনসব চিন্তা উদ্ভূত হয়েছে যেগুলো জীবনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করে৷ 

    আলোচনা থেকে এটাও স্পষ্ট যে জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম, নাৎসীবাদ বা অস্তিত্ববাদ কোনোটাই মতাদর্শ নয়, কারণ এদের কোনোটাই বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ নয় এবং এগুলো থেকে কোনো ব্যবস্থার উদ্ভব হয়নি অথবা জীবনের সমস্যাসমূহের সমাধান দিতে পারে এমন কোনো চিন্তারও উদ্ভব হয়নি৷ 

    এবার আসা যাক ধর্মের ব্যাপারে৷ কোনো ধর্ম যদি এমন হয় যার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ আছে এবং এ থেকে এমন ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে অথবা এর ভিত্তিতে এমনসব চিন্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যেগুলো জীবনের সমস্যাসমূহের সমাধান করে তাহলে মতাদর্শের সংজ্ঞা অনুযায়ী সেই ধর্ম একটি মতাদর্শ৷ কিন্তু বারবার শ্রবণ এবং অনুসরণের ফলে যদি কোনো ধর্মের আক্বীদাহর প্রতি আবেগ জন্ম হয় অথচ এর পেছনে কোনো পর্যাপ্ত বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা না থাকে অথবা এ থেকে কোনো ব্যবস্থার জন্ম না হয় অথবা এর ভিত্তিতে অন্যকোনো চিন্তারও উদ্ভব না হয় তাহলে এ ধরনের কোনো ধর্মই মতাদর্শ নয় কারণ এর আক্বীদাহর কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি নেই এবং এ থেকে জীবনের জন্য কোনো ব্যবস্থারও উদ্ভব হওয়া সম্ভব নয়৷ 

    ফুটনোট: আমরা যদি বর্তমান পৃথিবীর দিকে তাকাই তবে মূলত তিনটি মতাদর্শ দেখতে পাবো। সাম্যবাদ, পুঁজিবাদ ও ইসলাম। এর মধ্যে ইসলামই হচ্ছে একমাত্র Rational মতাদর্শ।  

    Taken from the Book “Islamic Thought”

  • উসূল আল ফিকহ

    উসূল আল ফিকহ

    শাব্দিকভাবে, ‘আসল’ হলো এমন কিছু যার উপর কিছু নির্মাণ করা যায়, সেই নির্মাণ বস্তুগত হতে পারে, উদাহরনসরূপ, একটি ভবন, অথবা সেই নির্মাণ চিন্তাগতও হতে পারে যেমন, শরয়ী ইল্লাহ (কারণ) এর উপরে মা’লুল (ফলাফল) এর নির্মান কিংবা শরয়ী কোনো দলীলের ভিত্তির উপর একটি সিদ্ধান্ত নির্মাণ বা প্রতিষ্ঠা করা। ‘আসল’ শব্দটির বহুবচন হল ‘উসূল’। আর উসূল আল ফিকহ হল সে সকল নীতিমালা (কাওয়াঈদ) যার উপর ফিকহ প্রতিষ্ঠিত। আর ফিকহ-এর শাব্দিক অর্থ হল, কোনো কিছু বোঝা (ফাহম)।

    ফিকহ অর্জনের পদ্ধতির সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন নীতিমালার সমষ্টিকে উসূল আল ফিকহ বলে। ইবন আল হাজিব এর সংজ্ঞায় বলেন, (উসূল আল ফিকহ হচ্ছে) সেইসব নীতিমালা যার মাধ্যমে মুজতাহিদ নির্দিষ্ট প্রমাণাদি হতে শর’ঈ আহকাম আহরণ করেন।

    উসূল আল ফিকহ-এর আলোচ্য বিষয় হল শরীয়তের উৎস তথা আহকামের বিস্তারিত দলিলাদির ভিত্তি। কাজেই উসূল আল ফিকহে কুরআন, হাদীস, ইজমা, কিয়াস কেন শরীয়তের দলীল হবে, হাদীসের কোন বক্তব্য হতে কোন ধরনের হুকুম পাওয়া যাবে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে। উদাহরণসরূপ বলা যায় আল কুরআন হলো ইসলামী শরীয়তের বিধি-বিধানের প্রথম উৎস। বস্তুত কোরআন মজিদের সব ধরণের বক্তব্য এক ধরণের নয়। বরং তার কোনো কোনো বক্তব্য আদেশ হিসেবে আর কোনো কোনো নিষেধ হিসেবে, আবার কোনো বক্তব্য শর্ত সাপেক্ষ, কোনো বক্তব্য শর্তহীনভাবেও এসেছে। এসকল বিচার-বিশ্লেষনসমূহ মূলত উসূলী আলেমগণ করে থাকেন। উসূল আল ফিকহের লক্ষ্য হল, শরীয়তের বিধি-বিধান জানার জন্য তার তফসিলী দলিলের উপর উসূল আল ফিকহের মূলনীতি সমূহ বাস্তবায়ন করা। এসব মূলনীতির আলোকে শরীয়তের বিধানসমূহ বোঝার চেষ্ঠা করা। নস (text) এর মধ্যে কোনো অস্পষ্টতা থাকলে তা দূর করার উপায় জানা এবং কোনো নস অপর কোনো নস এর সাথে সাংঘর্ষিক হলে তার নিরসন বা অগ্রাধিকার দানের উপায় বের করা। অথবা কোনো বিষয় সম্পর্কে কোনো নস না পাওয়া গেলে সে ব্যাপারে শরীয়তের অন্য কোনো উৎস (উদাহরণসরূপ, কিয়াস) হতে হুকুম বের করা।

    উসূল আল ফিকহের আলোচ্য বিষয়সমূহের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘কায়েদা’ (মূলনীতি)। যেমন:

    ১. প্রতিটিই বস্তুই মূলত হালাল, যদি না তার বিপরীতে কিছু বলা থাকে।
    ২· কাজ মূলত হালালও নয় বা হারামও নয় বরং প্রত্যেক কাজের জন্য দলীল প্রয়োজন।
    ৩· যা ওয়াজিব তার জন্য যা যা দরকার তাও ওয়াজিব।

    একটি কায়েদার ব্যাখ্যা: “প্রতিটিই বস্তুই মূলত হালাল, যদি না তার বিপরীতে কিছু বলা থাকে”

    এটি একটি বৈধ কায়েদা যা বিভিন্ন দলীলাদি হতে আহরিত।

    আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা বলেন,

    هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الأرْضِ جَمِيعًا

    “তিনিই সেই সত্তা যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য যা কিছু জমীনে রয়েছে সে সমস্ত।” [সূরা বাকারা ২:২৯]

    الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الأرْضَ فِرَاشًا وَالسَّمَاءَ بِنَاءً وَأَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَكُمْ

    “যে পবিত্র সত্তা তোমাদের জন্য ভূমিকে বিছানা এবং আকাশকে ছাদসরূপ স্থাপন করে দিয়েছেন এবং আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে ফল-ফসল উৎপাদন করেছেন তোমাদের খাদ্য হিসেবে···” [সূরা বাকারা ২:২২]

    أَلَمْ تَرَوْا أَنَّ اللَّهَ سَخَّرَ لَكُمْ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الأرْضِ وَأَسْبَغَ عَلَيْكُمْ نِعَمَهُ ظَاهِرَةً وَبَاطِنَةً

    “তোমরা কি দেখ না আল্লাহ নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে সবই তোমাদের কাজে নিয়োজিত করে দিয়েছেন এবং তোমাদের প্রতি তার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নিয়ামতসমূহ পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন।” [সূরা লুকমান ৩১:২০]

    اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالأرْضَ وَأَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَكُمْ

    “তিনিই আল্লাহ যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে অতঃপর তা দ্বারা তোমাদের জন্য ফলের রিযিক উৎপন্ন করেছেন···” [সূরা ইবরাহীম ১৪:৩২]

    এ সকল আয়াত এই দিক নির্দেশনাই দেয় যে আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা সকল কিছু (বস্তু)-কে হালাল করেছেন। এ সকল হালাল বস্তুর মধ্যে কিছু আবার হারাম করা হয়েছে যা বিভিন্ন নস-এর দ্বারা সাব্যস্ত, যেমন:

    قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ قُلْ هِيَ لِلَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا

    “বল: কে হারাম করেছে আল্লাহ-র সাজ-সজ্জা যা তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং পবিত্র রিযকসমূহকে? বল: এসব নিয়ামত আসলে দুনিয়ার জীবনে মুমিনদের জন্য···” [সূরা আ’রাফ ৭:৩২]

    এ সকল আয়াত এই দিক নির্দেশনাই দেয় যে আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা সকল কিছু (বস্তু)-কে হালাল করেছেন। এ সকল হালাল বস্তুর মধ্যে কিছু আবার হারাম করা হয়েছে যা বিভিন্ন নস-এর দ্বারা সাব্যস্ত, যেমন:


    حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلا مَا ذَكَّيْتُمْ وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ وَأَنْ تَسْتَقْسِمُوا بِالأزْلامِ ذَلِكُمْ فِسْقٌ

    “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জীব, রক্ত, শুকরের মাংস, যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য উৎসর্গিত করা হয়েছে, যা কণ্ঠরোধে মারা যায়, যা আঘাত লেগে মারা যায়, যা উচ্চস্থান হতে পতনের ফলে মারা যায়, যা শিং এর আঘাতে মারা যায় এবং যাকে হিংস্র জন্তু ভক্ষন করেছে, কিন্তু যাকে তোমরা জবেহ করেছ। যে জন্তু যজ্ঞবেদীতে জবেহ করা হয় এবং যাকে ভাগ্য নির্ধারক শর দ্বারা বণ্টন করা হয়। এসব ফাসেকী ···” [সূরা মায়েদা ৫:৩]

    এই আয়াত ও আরো অন্যান্য আয়াতসমূহ পূর্বে বর্ণিত যে আয়াতগুলোর মাধ্যমে সকল বস্তুকে হালাল ঘোষনা দেয়া হয়েছে তার থেকে কিছু জিনিস বাদ দিচ্ছে। এসকল আয়াতের উপর ভিত্তি করে একজন মুজতাহিদ সেসকল বস্তুর বৈধতা দিতে পারেন যে সকল বস্তুর ব্যবহার রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ক্ষেত্রে দেখা যায় না। উদাহরণসরূপ, বিভিন্ন ফলফলাদি যেমন, আম। অপরদিকে, যখন কোনো মুজতাহিদ মদ সম্পর্কে ইসলামের কী হুকুম, তা নিয়ে আলোচনা করেন তখন তিনি সেসব আয়াত ও হাদীস নিয়ে আসেন যেখানে মদকে হারাম ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

  • A Notice

    A Notice

    We would like inform you with great pleasure that “Return of Islam” blog will be updated more frequently than before. We would be updating writings on various issues like international, political, economical etc. So, please visit us time to time.  

  • The West’s Scientific Obsession

    The West’s Scientific Obsession

    Science, since the industrial revolution era, has risen to such a stature that today it is the deen of many in the Western world. For many, questions such as creation, God and life can only be accurately studied, concluded and deduced through the scientific method of experimentation and deduction. Western thinkers today use science to explain many problems and issues and only accept conclusions when scientific studies have proved so. Whilst science has existed since the dawn of the world, its reverence as seen in the West is unprecedented.

    Whilst the West’s expansion of science initially began with the application of chemicals, metals and weapons, this today has expanded to human behaviour (psychology), society, (sociology) and then legislation and even thought itself.

    Science against certainty

    The West’s embracement of science and almost fundamentalist defence of it, is due to the historical situation Europe faced. The Christian Church was Fidel – in that religious beliefs must be based on faith rather than the mind. A direct reaction to this was the development of the scientific method, which launched what has come to be known as the Enlightenment in the late 17th Century. The ultimate aim of the Enlightenment was freedom, in particular the liberation of people from the influence of religion. It was widely known that the Church had hindered progress in all fields of life socially, economically and scientifically via the intolerance to inquiry it had imposed upon the continent. The intellectual elite of Europe saw this as backward superstition and hoped their own project would smash the domination of the Church and lead to ‘modernity’. The European scientists and philosophers felt reason was the most central human faculty so they argued to be allowed to exercise it by questioning everything through scientific endeavour. They sought to challenge ideas that were held in a dogmatic manner i.e. were questioning was not allowed. This led them to clash directly with Church leaders and the political establishment who both maintained that some things were absolutely certain, sacred and should not be questioned.

    Whilst modernists were determined to replace emotion with reason the ‘modernist’ trend went further. Anything that was claimed to be certain (i.e. claimed to be divine), had to be confronted and opposed via reason, questioning and scientific enquiry. The commitment to use reason in all cases was hostile to any idea on life that did not originate from the human mind, this included issues from religion. Enlightenment philosophers refused to give anything an amnesty from the debate and called for people to be brave enough to do without ‘belief’.

    Enlightenment philosophers felt being certain was never a possibility. They equated certainty with dogma and felt compelled to fight it. After they won their intellectual clash in Europe, they set about introducing secularism at state level. Secularism is not the absolute denial of religion, as long as religion is prevented from taking part in societal decisions and denied a role in public life. When this was done, the secular liberal democratic nation state had a new model for organising society.

    This gave rise to empiricists such as Locke, Berkeley and Hume They saw Science as the height of knowledge since it never left itself open to dogma. Science challenged everything and never ‘lapsed’ into certainty and absolute truths.

    Hence from this brief timeline we witness the development of an agenda deep within the modernist project that has filtered through to today’s scientific and philosophical establishments; there is a hatred for absolute certainty. The secular fear of certainty does not prize certainty and as a result it asks an unending, ever-increasing list of questions instead.

    The scientific method

    The scientific method in its simplest is a hypothesis followed by the design for an experiment, then through testing and observation a conclusion can be deduced. This also means that subjectivity cannot be completely eliminated e.g. linguists argue that the words with which we set out a scientific project reveal inevitable preconceptions. Also any result is speculative due to the probability of error, this is why ensuring samples are representative was exist to minimise such possibilities. Also it is a requirement for identifying a variable so it can be isolated from other variables, subjected to new conditions and observed.

    The fundamental issue here is that the scientific model cannot be applicable in all times and places, where no single variable can be identified, isolated, manipulated or observed? This would conclusively disprove that the scientific model is capable of answering every query or even that science is the most evolved form of thinking. This would necessarily lead us to conclude that science is a branch of thinking applicable only in certain instances.

    We could ask, for example, how to construct experiments based on the scientific model, was Islamic Spain the most tolerant place on Earth during the 13th Century? To answer this query a single variable that leads to tolerance would have to be identified and scientifically defined. We would then need to be capable of subjecting other societies during the period to laboratory conditions in order to isolate the variable leading to tolerance. A criterion for evaluation, comparison and measurement would be required and the experiment would have to conclude objectively. The scientific model is clearly not built for such types of enquiry.

    Scientific theories or laws are formed through repeated observations to predict some as yet unobserved events. Such a process (of making inferences from the particular to the general) is known as induction. An example is to repeatedly observe that the sun rises and sets daily and to conclude that the sun will rise tomorrow.

    This means that a scientific idea could never be proven true, because no matter how many observations seem to agree with it, it may still be wrong, If it is never possible to infer the course of the future by examining past regularities then the very basis of the scientific method is in doubt.

    The Scientific Question
    It is also important to note that the scientific model is concerned with questions of how things work rather than why. So science would be interested in answering how the universe began, not why the universe began. How does a scientist begin to answer why the universe began? The questions of how and why are completely different but scientists unable to answer why often answer how instead. They then expect it to be sufficient.

    Science can answer how things rust, not why and how we see the colour orange. Take an example of grass. Why is it green not bright blue or deep red? The scientific answer is that chlorophyll absorbs blue and red light while reflecting green. Of course, this is an answer for how but we are expected to accept it as the answer for why as well.

    All of this shows that science has a place and cannot be used to answer every question. The scientific method is fantastic when dealing with technology which must always be challenged. Imagine no entrepreneur ever sought to build safer motorcars since they were certain they had the safest or if attempts to eradicate all known diseases ended in hopelessness and despair. The scientific model provides us with the framework necessary to deal with these and other inconclusive matters. However it has definite limitations that render it incapable of tackling other questions. Science could never answer why we are here why are we here? The scientific model cannot apply in a discussion of “why we exist?”

    Rational Method
    Emotional faith and the scientific model have both been found wanting when answering the greatest question. This is since emotion confirms absolutely nothing and the scientific method does not apply to questions of why things happen, only how and only in instances where the subject matter is tangible, variables can be isolated, manipulated and repeated testing can take place.

    What is needed is an alternative method of thinking. If anyone looks around themselves the images of what you see transfer into your head. Reach out and touch an inanimate object such as a wall, a chair, a desk, a PC, a book. Your senses are transferring impressions into you so you can ponder over them.

    What stages of the process of thought can we determine from this?
    Sensation took place, without which one could not ponder over things. There is also a need for reality as our senses can only be aware of things if they exist in a tangible form. There is definitely some transfer of the sensed reality, as the sensation must get to your mind so you can ‘think’ about the sensed reality. Lastly, there’s a judgement.

    However, something intrinsic is missing from the steps outlined thus far. This is so as sensation alone is not enough to understand a reality. One could sense a new reality forever and still move no closer to comprehension if one had no information on the issue to explain the reality. Both sensation and some degree of information are necessary.

    The following examples should illustrate this. Let us begin within an example of language. If one were to pick up a book in classical (fusHa) Arabic and stare at the letters, word after word, page after page without having some understanding of Arabic (the previous information) it would not matter how much sensation took place. Reading and understanding Arabic would be impossible if one did not have the slightest appreciation of the Arabic language. Sensation alone is not enough.

    Let us imagine one who had never left a primitive village and had absolutely no idea of life outside of the rural sphere. What would a complete newcomer to a big city make of simple things like road double yellow lines, zebra crossings and post boxes using sensation alone (i.e. without having any previous information on them)? Completely alone on the street at night a set of traffic lights could be sensed but would make no sense. The sensation of the sequence (red man, green man for pedestrians and red, amber, green, amber, red for vehicles) would take place but what next? In order to comprehend them the villager would be forced to look elsewhere for information either by asking others or by attempting to collect some information. Observing (sensing) the response of pedestrians and traffic to the lights would provide the information. What happens when the lights go red? Why do some stop and others go? What was the flashing light when a car speeds through a red light? What was that loud, beeping sound from that angry driver?

    Once the information was collected the villager could face the reality (lights go green), sense (see the green light), transfer the sensation to the brain, link it to the information already held (green man means walk as the vehicles are not free to go) and would lead to judgement (the villager would cross the road).

    What about a grown man who had been kept in a cave from birth, had never even seen daylight and only been subjected to the most rudimentary ideas and information on life. He would surely struggle in the cockpit of a Boeing 747 or operating the safety controls of a nuclear power plant as without previous information no thought could take place.

    What is missing from all the examples above is the previous information that explains the reality. Linking this previous information to the sensation is what leads to thinking. Sensation alone is not enough. This is also solves the problematic question of what the mind is. The mind is the previous information. From this, we can now place the five stages of the method of thinking in correct order.

    1. Reality
    2. Sensation of the reality
    3. Transference of the sensed reality to the brain
    4. Linking the sensation with the previous information, this is the mind. The linking is the actual process of thinking leading to thought
    5. Judgement upon the reality

    This is the process we use to think about things. We would not utilise emotion or the scientific model to read a magazine, visit the WC or work out if the car was out of petrol. We would use the five-stage process outlined above and it is necessary to use this rational method to answer the greatest question.

    The rational method is the basis of all thinking, even science. No experiment could be constructed without previous information (e.g. how to operate a bunsen burner, how to read and write etc.). In fact, the rational method can be found directly in many of the social sciences such as sociology and psychology. Science is incapable of testing human behaviour, as it requires tangible matter to experiment on. Social scientists either resort to prescribing Prozac for depression or follow a model of observation. Psychologists and sociologists make multiple observations of subjects over set periods without attempting to scientifically subject them to new conditions. An example of how to do so would be to take the human being out of the natural environment into a controlled environment and attempt to isolate what makes the human behave in certain ways. Periodic observation leading to a conclusion, without any manipulation, is a part of the rational method not the scientific. This coincidentally solves the issue of induction mentioned earlier and proves why we assume the sun will rise tomorrow. Specific elements of the social sciences are also not scientific. Psychoanalysis (studying dreams etc.) fails as a science as its answers can never be verified and depend upon repeated observation.

    The rational method is clearly the natural thinking process at the base of other forms of thought (logical, philosophical, legislative etc.). It is the only method of thought that leads to certain knowledge, definite answers and truth.

    Creation
    When we examine everything within the range of our sensations we come to the following two conclusions:

    1. We cannot sense (see, touch, hear, smell or taste) a Creator

    2. Everything we can sense is dependent on something else and has a limit of some kind that it cannot surpass

    We must be clear on the first point. We cannot sense a Creator. Some would have us believe in aliens or in ‘mother nature’ but this cannot be accepted as we have already denied emotion and blind imitation a role in this endeavour. Others would have us end the discussion here since no Creator can be sensed. Such people cite the phrase ‘seeing is believing’. The predicament with this is that this implies the opposite (i.e. ‘not seeing equals nothing to believe in’). This is blank, vacuous and weak.

    Sensing a Creator is not a prerequisite to prove a Creator exists and never has been. We see many things in our daily lives without knowing who exactly is responsible but the result leads us to believe something definitely was responsible e.g. a sculpture requires a sculptor etc. The material cause of the sculpture would be clay but the efficient cause of the artwork would be the sculptor.

    The proof of a Creator is in whether we can find evidence of creation.

    This can only be proved or disproved by applying rational thought. So far the first conclusion (cannot sense a Creator) is of little help. So any answer will have to come from the second conclusion which is the enlightened view on all we sense i.e. everything is limited and dependent.

    Something is limited if it is contingent and requires something peripheral to it in order to bring it into existence i.e. a cause. It is limited if it depends on something else. Whatever is limited has a dependency somewhere or how. It cannot sustain itself forever and deteriorates accordingly. We can find or deduce either a beginning or end point or both. The space it occupied can be measured. It has boundaries it cannot exceed and obstacles it cannot overcome. It is conditional; unable to prevent itself from being affected and swayed by external factors. It can be contained and is subject to constraints and thresholds. It is limited since its constituent parts are limited as they can be measured. In addition it can produce or reproduce but cannot create something else out of nothing. It can be increased and/or reduced. In short, it is finite since its restrictions are inherent and unavoidable. Such a thing can be marked out as limited.

    We human beings are limited as there are actions we cannot undertake (e.g. we cannot fly), see into the future or escape death. Space, and the entire universe, consists of limited things such as planets, stars and comets which themselves are measurable and we know the sum of limited things must be limited.

    This leaves us with the conclusion that that limited things were bought into existence by an unlimited first cause (Creator). This cause has to be eternal, without bounds otherwise it would be limited and dependent. The Creator is something unlimited and independent that every other thing ultimately depends upon. For this independent force to exist then it must be other than limited, i.e. other than quantifiable and definable. Therefore this independent thing must be unlimited. This necessitates that this unlimited, independent force chose to create and was not forced to create. Choice signifies will and intelligence. As a result we come to the rational conclusion that a limitless, infinite, intelligent force created the universe.

    This is the proof that there is a Creator. Which is can only be proven through the rational method, which is the only method that gives decisive results on creation. Whilst science is a very useful model of thought, its lacks the certainty provided by the rational method.

    Adnan Khan

  • Q&A: The Ousting of President Bakiyev in Kyrgyzstan

    Q&A: The Ousting of President Bakiyev in Kyrgyzstan

    Question:

    Many things have quickly materialised in Kyrgyzstan. The Opposition moved to oust Bakiyev on 08/04/2010 and succeeded in doing so. They seized authority and Bakiyev fled to his hometown in the south of the country. Then today, the 16/04/2010, he forwarded his resignation and left for Kazakhstan.
    At the same time one of the first countries to recognize the revolution and ‘bless’ it was Russia such that the interim Prime Minister Roza Otunbayeva engaged in official (phone) talks between herself and the Russian Prime Minister Vladmir Putin on Thursday 08/04/2010, the very day the interim government took control. This means that Russia is behind what has occurred. If this is correct then how is it that Russia has ousted Bakiyev whilst she herself brought him to power in the revolution against Akayev in 2005, and supported his most recent election on 23/07/2009? Was his not closing the American military based in Manas the cause which provoked Russia to oust him?

    Answer:

    Yes, all indicators point to Russia being behind the fall of Bakiyev, but not because he renewed the American lease of the Manas base instead of closing it. This is because Russia was in agreement with the base remaining whilst Bakiyev was in power. In fact Russia supported his election on 23/07/2009 after he had renewed the lease contract for the base on 15/07/2009, which was before his election and Russia’s supporting him therein. Further, Russia’s support for his election was of a remarkable nature, such that the Russian President Medvedev himself came on 02/08/2009 to Kyrgyzstan to partake in the ceremonies of appointment which were held for Bakiyev!

    Thus Russia was not provoked by the renewal of the lease for the base. Even the new government which Russia has brought is in agreement with the base remaining, a matter explicitly mentioned by the leaders of the revolution. Hence Russia is okay with the renewal of the lease for the base in origin, and that is for the purpose of placating America and preventing her evil from Russia in the region. Russia considers the Manas base as a ‘transit’, that is, as passage to and from Afghanistan, an Islamic land and an enemy to both Russia and America. Further, there is no role for this base in internal affairs which affects the influence of Russia.

    What actually provoked Russia to remove Bakiyev, their former agent, is another matter, to appreciate which we mention the following occurrences:

    Richard Holbrooke, the American envoy to Afghanistan, undertook a visit to Uzbekistan and Kyrgyzstan on 19/02/2010 and met with the presidents of both nations. The webpage “Russia Today” reported from “Interfax Russia” on 19/02/2010 that Holbrooke discussed with President Bakiyev, “prospects of bilateral relations and the situation in Afghanistan, and the two sides exchanged of views about the situation in Afghanistan away from spotlight, and discussed ways to activate mutual cooperation of interest between both nations.” It also mentioned that the press office of the presidency of Kyrgyzstan reported from Bakiyev that he announced that, “his nation attaches importance and priority to developing Kyrgyz-American relations and the activation of bi-lateral cooperation. The Interfax Russia Agency which reported the news was thought to have added the phrase, “away from spotlight”, that is, in a secret manner away from Russian eyes so that Russia does not know what her agent Bakiyev has agreed to with the Americans. This is a hint from Russia that something significant has occurred between the Kyrgyz President and the Americans.

    On 17/03/2010 ‘Russia Today’ reported that “the United States has recently announced the allocation of $5.5 million to assist Kyrgyzstan in building a training centre for special units to combat terrorism in Batken.” ‘Russia Today’ asked Alexander Kniazev, director of the regional Bishkek branch of the CIS Institute think-tank about the centre, to which he replied, “The United States could use this centre to meet its needs in Central Asia. The slogan of fighting terrorism is only a pretext to achieve American goals as is the case in Iraq and Afghanistan”. He added, “The United States is seeking through these projects in Central Asia to challenge and compete with Russia and China in the region.”

    The Russians had misgivings about Holbrooke’s visit to Kyrgyzstan, his meeting with President Bakiyev away from the spotlight, the secret agreements between the two sides – which culminated in the establishment of an American centre in Kyrgyzstan for the training of special forces – and the recruitment of clients under the pretext of so-called counter-terrorism, in order to strengthen American influence in Kyrgyzstan, from where it can then move to other regions.

    The agreement to establish an American centre for the training of special forces, or in other words, to train agents of America in Kyrgyzstan, was the matter which hit the alarm bells for Russia and meant that the red lines were being approached. Therefore Russia hastened to the coup to prevent the persistence of Bakiyev and his relationship with America, and it was clear that Russia was ecstatic with its victory in implementing the coup against Bakiyev.

    As for America, she was shocked. The official spokesman of the Ministry of Foreign Affairs, Philip Crowley, announced “deep concern over the unrest in Kyrgyzstan,” and said, “We believe that the government is still in power, and the United States does not have information that the opposition has taken over” (News of the World, 04/07/2010). This indicates that America was concerned about what was going on and did not support the opposition, but rather was with the Government of Bakiyev. America closed its base in Kyrgyzstan for three days and then re-opened after the leader of the interim Kyrgyz government Rosa Otunbayeva announced that the U.S. base will not be affected and will remain on according to previous agreements.

    Submitting to reality, the United States recognized the new government implicitly such that it sent an envoy, Assistant Secretary of State Robert Blake, to hold talks with the new government in Kyrgyzstan. He announced that the United States was satisfied with the promises of the new authorities to ensure the survival of American Manas base, and described this is being appreciable. America now wants to deal with the new reality, particularly as it has ensured the survival of the Manas air base, and that it has become evident that she cannot do anything against this new reality, whereby Bakiyev has fled to his village in the south of the country, and from there has left for Kazakhstan.

    Thus, America has no alternative than to deal with the new reality, even if only temporarily. For Russia has negotiated on the current situation in Kyrgyzstan. The Deputy Minister of Foreign Affairs of Russia, Gregory Karasin, met with the US ambassador in Moscow, John Beyrle, on 13/04/2010. The two discussed the situation in Kyrgyzstan, and showed that they had agreed, such that they both called for “a return to normality in the country!” Notwithstanding all this, the conflict will continue between Russia and America in that region, and will manifest in various actions and forms, and in political, economic and social turmoil.

    02 Jumada al-Awwal 1431 AH
    16 April 2010 CE

  • আবদুর রাকীব খান – রমজান ২০০৯

    আবদুর রাকীব খান – রমজান ২০০৯ – আলোচনা ১

    আবদুর রাকীব খান – রমজান ২০০৯ – আলোচনা ২

    আবদুর রাকীব খান – রমজান ২০০৯ – আলোচনা ৩

    আবদুর রাকীব খান – রমজান ২০০৯ – আলোচনা ৪

    আবদুর রাকীব খান – রমজান ২০০৯ – আলোচনা ৫

    আবদুর রাকীব খান – রমজান ২০০৯ – আলোচনা ৬

    আবদুর রাকীব খান – রমজান ২০০৯ – আলোচনা ৭

    আবদুর রাকীব খান – রমজান ২০০৯ – আলোচনা ৮

    আবদুর রাকীব খান – রমজান ২০০৯ – আলোচনা ৯

    আবদুর রাকীব খান – রমজান ২০০৯ – আলোচনা ১০

    আবদুর রাকীব খান – রমজান ২০০৯ – আলোচনা ১১

  • আল কুরআন এর সংজ্ঞা

    আল কুরআন এর সংজ্ঞা

    কুরআনের সংজ্ঞা নিম্নরূপ,

    এটি আল্লাহর কালাম যা তাঁর বান্দা মুহাম্মদ (সা) এর উপর আরবী ভাষায় নাযিল হয়েছে। এটি একটি মু’জিযা এর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সূরার ক্ষেত্রেও। এটি লিপিবদ্ধ আছে এবং আমাদের কাছে এটি মুতাওয়াতির বর্ণনায় এসে পৌছেছে। এর পঠন এর মাধ্যমে আমরা আল্লাহর ইবাদত করি এবং সূরা ফাতেহা দিয়ে এর শুরু এবং সূরা নাস দিয়ে এর সমাপ্তি।

    উপরোক্ত সংজ্ঞা থেকে বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। প্রথমত এটি আল্লাহ-র কালাম। এবং সেই কালাম যা হচ্ছে অলৌকিক (এ’জাজ)। কোরআনের এ’জাজ হচ্ছে এর অতি উচ্চমাত্রার বাগ্মীতা বা বাকশৈলিতা। এবং আল্লাহর অন্য কোনো কথা এ কোরআনের অংশ হবে না, উদাহরনসরূপ: হাদিসে কুদসী।

    দ্বিতীয়ত সম্পূর্ণ কোরআনই আরবী ভাষায় নাযিলকৃত। এটি সম্পূর্ন আরবী এবং এতে কোনো বিদেশী শব্দ নেই। ইমাম শাফী’ তার আর-রিসালাহ গ্রন্থে বলেন: ‘‌আল কোরআন এই দিক নির্দেশনা দেয় যে আল্লাহর কিতাবের কোনো অংশই আরবী ভাষার বাইরে নয়…।’ যারা এ ধরনের মতামত ব্যক্ত করেন যে কোরআনে অনারব শব্দ বিদ্যমান, তারা হয়তো কিছু শব্দ পেয়েছেন যা কিছু আরবের কাছে অপরিচিত। কিন্তু যেহেতু শব্দগুলো কোরআনে এসেছে, তাই সেসব শব্দ আরবী শব্দ হিসেবেই বিবেচিত হবে। অসংখ্য আয়াত এ নির্দেশনা দেয় যে কোরআন সম্পূর্ন আরবী ভাষায় নাযিলকৃত। যেমন:

    نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الأمِينُ ~ عَلَى قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنْذِرِينَ ~ بِلِسَانٍ عَرَبِيٍّ مُبِينٍ

    “বিশ্বস্ত রুহ একে নিয়ে অবতরন করেছে। আপনার হৃদয়ে, যাতে আপনি ভীতি প্রদর্শনকারীদের অন্তর্ভূক্ত হন। সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়”। [সূরা শু’আরা: ১৯৩-১৯৫]

    وَكَذَلِكَ أَنْزَلْنَاهُ حُكْمًا عَرَبِيًّا

    “এমনিভাবে আমি এ কোরআনকে আরবী ভাষায় নির্দেশরুপে নাযিল করেছি”। [সূরা রাদ: ৩৭]

    وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ قُرْآنًا عَرَبِيًّا

    “এমনিভাবে আমি আপনার প্রতি আরবী ভাষায় কোরআন নাযিল করেছি”। [সূরা শুরা: ৭]

    قُرْآنًا عَرَبِيًّا غَيْرَ ذِي عِوَجٍ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ

    “আরবী ভাষায় এ কোরআন বক্রতামুক্ত, যাতে তারা সাবধান হয়ে চলে”। [সূরা যুমার: ২৮]

    وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّهُمْ يَقُولُونَ إِنَّمَا يُعَلِّمُهُ بَشَرٌ لِسَانُ الَّذِي يُلْحِدُونَ إِلَيْهِ أَعْجَمِيٌّ وَهَذَا لِسَانٌ عَرَبِيٌّ مُبِينٌ

    “আমরা তো ভালোভাবেই জানি যে, তারা বলে: তাকে জনৈক ব্যাক্তি শিক্ষা দেয়। যার দিকে তারা ইঙ্গিত দেয় তার ভাষাতো আরবী নয়, এবং এ কোরআন পরিষ্কার আরবী ভাষায়।” [সূরা নাহল: ১০৩]

    কোরআনের অনুবাদও কোরআন বলে গন্য হবে না তা যতই বিশুদ্ধ হোক না কেন। এ কারণেই আমরা অনুবাদ হতে আহকাম আহরন করতে পারি না, অনুবাদ দিয়ে নামাযও পড়া যায়না এবং অনুবাদ পঠনে ইবাদতও হয়না।

    তৃতীয়ত, কোরআন আমাদের মাঝে মুতাওয়াতির বর্ণনার মাধ্যমে এছে পৌছেছে যা একে নিশ্চিত বিশুদ্ধতা দান করে। এটি আমাদের কাছে রাসূলুল্লাহ (সা) এর সময় হতে মুখস্থ ও লিখিতরূপে আজকের দিন পর্যন্ত এসে পৌছেছে।

  • মুসলিম উম্মাহর ঐক্য

    মুসলিম উম্মাহর ঐক্য

    ঐক্যবদ্ধ থাকা মুসলিম উম্মাহ-র জন্য ফরয এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়া হারাম। আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা বলেন,

    وَٱعْتَصِمُواْ بِحَبْلِ ٱللَّهِ جَمِيعاً وَلاَ تَفَرَّقُواْ

    তোমরা আল্লাহ-র রজ্জু শক্তভাবে আকড়ে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। [সূরা আলে ইমরান ৩:১০২]

    আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালার আয়াত ও রাসূল (সা) এর বহু হাদীস থেকে একথা স্পষ্ট যে, বিশ্বের মুসলিমরা এক উম্মত। ভাষা, বর্ণ, অঞ্চল, জাতিয়তাবাদ ইত্যাদির ভিত্তিতে মুসলিমদের বিভক্ত করা আল্লাহ ও তার রাসূল (সা)-এর আদেশ এর সম্পূর্ণ পরিপন্থি। যেমন আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা বলেন,

    وَكَذٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطاً لِّتَكُونُواْ شُهَدَآءَ عَلَى ٱلنَّاسِ وَيَكُونَ ٱلرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيداً

    “আর এভাবেই আমরা তোমাদেরকে একটি ন্যায়পরায়ণ উম্মত করেছি, যাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষী হতে পারো এবং রাসূল হবে তোমাদের জন্য সাক্ষী।” [সূরা বাকারাহ ২:১৪৩]

    إِنَّمَا ٱلْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    “নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই-ভাই…” [সূরা হুজুরাত : ১০]

    রাসূল (সা) বলেন,

    ألمسلم أخو ألمسلم

    মুসলিমরা পরস্পর ভাই-ভাই … [বুখারী]

    এছাড়াও আমরা জানি,

    ألمسلم أمة واحدة و بلادهم واحدة و حربهم واحدة

    “মুসলিমরা একটাই উম্মত, তাদের একটাই দেশ, তাদের একটাই যুদ্ধ …”

    * [হাদীসটির উপরোক্ত আরবী text ও বানান-এ ভূল থাকতে পারে, যদিও মর্মগত দিক দিয়ে এ কথার ব্যাপারে কোনো ভূল নেই]

    মুসলিম শরীফের হাদীসে রয়েছে,

    من اتاكم و أمركم جميع يريد أن يشق عصاكم او يفرق جماعتكم فاقتلوه
    “তোমরা ঐক্যবদ্ধ থাকা অবস্থায় কেউ এসে যদি তোমাদের সারিতে ফাটল সৃষ্টি করতে চায় কিংবা তোমাদের দলে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করতে চায়, তাকে হত্যা কর।” [মুসলিম]

    তিনি আরো বলেছেন,

    من خرج من الجماعة فقد خلع ربقة الاسلام من عنقه حتى يراجعه

    “যে ব্যাক্তি জাম’য়াত (উম্মাহ) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, সে তার গলদেশ থেকে ইসলামের হার খুলে ফেলেছে, (এ অবস্থা অব্যাহত থাকবে) যতক্ষন না সে ফেরত আসে।”