Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • জাতিসংঘ কর্তৃক আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রাখা ও সংকট নিরসনের ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানের উপযুক্ততা প্রমাণ করে না।

    জাতিসংঘ কর্তৃক আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রাখা ও সংকট নিরসনের ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানের উপযুক্ততা প্রমাণ করে না।

    ভবিষ্যতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার নিষ্ঠুরতা ও গণহত্যার মত ভয়াবহ কিছু যাতে না ঘটে সেজন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একটি বিশ্বসংস্থার ব্যাপারে ঐকমত্য গড়ে উঠেছিল। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ গঠিত হয় প্রধানত ‘পরবর্তী প্রজন্মগুলোকে যুদ্ধের উন্মাদনা থেকে রক্ষার জন্য’ এই উচ্চাভিলাষী চেতনায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে । সেসময় থেকে পুরো পৃথিবী প্রায় ২৫০ টি সংঘাতের মধ্য দিয়ে গেছে। সেকারণে এটা জোর দিয়ে বলা যায়, যে উদ্দেশ্য নিয়ে জাতিসংঘ গঠিত হয়েছিল তা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।

    পশ্চিমা বিশ্ব এমনকি তৃতীয় বিশ্বের অনেক নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন জাতিসংঘ হল ২০০টির মত সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত একটিনিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থা-যেটি আন্তর্জাতিকতাবাদ, বহুপক্ষীয় কর্মকান্ড, গণতন্ত্র, পরমতসহিষ্ণুতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, সহনশীলতা, মানবাধিকার ও স্বাধীনতার প্রেরণায় উদ্ধুদ্ধ। এর থেকে বড় মিথ্যাচার কিছু হতে পারে না।

    বাস্তবে জাতিসংঘ হল সাম্রাজ্যবাদী ও উপনিবেশবাদী নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যসমূহের শোষণ ও নিপীড়নকে আইনগত বৈধতা দেবার জন্য গড়ে তোলা একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা।

    ১৯৯৪ সালে স্থায়ী সদস্যসমূহের সামরিক হস্তক্ষেপের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হওয়ায় ১০ লক্ষ জনগণের গণহত্যার স্বীকার হয় রুয়ান্ডা। ফ্রান্স (নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য) তুতসীদের বিরুদ্ধে হুতো উপজাতীয়দের সমর্থন দিয়ে উপনিবেশকালীন সময়ের মত একটি গৃহযুদ্ধের অবতারণা করল। এ যুদ্ধকালীন সময়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীকে কেবলমাত্র রুয়ান্ডায় অবস্থিত বিদেশীদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে ব্যবহার করা হয়েছিল কিন্তু তুতসীদের সহায়তায় কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। সেসময় বেলজিয়ান শান্তি রক্ষীরা ২০০০ উদ্বাস্তুসহ একটি টেকনিক্যাল স্কুল ছেড়ে চলে যায় যখন বাইরে হুতু জঙ্গীরা অপেক্ষমান ছিল। শান্তিরক্ষীদের প্রস্থানের পরই জঙ্গীরা স্কুলে প্রবেশ করে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালায় তার শিকার হয় শত শত শিশু। এর চারদিন পরই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ তার শান্তিরক্ষী কমিয়ে ২৬০ এ নামিয়ে নিয়ে আসার পক্ষে মতামত প্রদান করে।

    এর এক বছর পর সেব্রেনিৎজার গণহত্যার সময় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল। বৃটেন এবং আমেরিকা উভয়ই চাচ্ছিল এ অঞ্চল ভেঙে টুকরো টুকরো হোক। কিন্তু আমেরিকা ন্যাটোকে একটি কার্যকরী ভূমিকায় দেখতে চেয়েছিল। জাতিসংঘ ৬০০ ডাচ শান্তিরক্ষী নিয়োগ করে সেব্রেনিৎজাকে উদ্বাস্তদের জন্য ‘নিরাপদ আশ্রয়’ ঘোষণা দেয়। পরবর্তীতে এই ডাচরা সেব্রেনিৎজার উদ্বাস্তুদের সার্ব বাহিনীর হাতে তুলে দেয় এবং তারা ইতিহাসের ন্যক্কারজনক গণহত্যা চালায়।

    জাতিসংঘ গণতান্ত্রিক রিপাবলিক কঙ্গোতে দ্বিতীয় কঙ্গো যুদ্ধেও ভূমিকা পালনে আবারো ব্যর্থ হয়। ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারীতে নিরাপত্তা পরিষদের ১২৯১ নং সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শান্তি প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের জন্য জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনী গঠন করা হয়। এই শান্তিরক্ষা বাহিনীও গৃহযুদ্ধে ৫০ লক্ষ লোকের গণহত্যা ঠেকাতে পারেনি।

    প্যালেস্টাইন-ইসরাইল ইস্যুতেও জাতিসংঘ সমানভাবে ব্যর্থ। ইসরাইলের বিরুদ্ধে ক্রমাগতভাবে এখন পর্যন্ত জাতিসংঘ আইনসম্মত উপায়ে নিরাপত্তা পরিষদে একটি নিন্দা প্রস্তাব প্রদানে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে।

    জাতিসংঘ ভীষণভাবে অকার্যকরী ও সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা পরিচালিত একটি সংস্থা হিসেবে পরিস্ফুট হয়ে উঠে দ্বিতীয় ইরাক যুদ্ধের সময়। সেসময় যুক্তরাষ্ট্র কোন রাখঢাকের দরকার মনে করেনি। জাতিসংঘে তাদের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত জন বোল্টন জাতিসংঘের সম্পর্কে ২০০৪ সালে বলেন, ‘জাতিসংঘ বলতে কোন জিনিস আসলে অস্তিত্বহীন। যা আছে তা হল একমাত্র অবশিষ্ট সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।’

    জাতিসংঘ মূলত নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যগণের (যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, বৃটেন, ফ্রান্স এবং চীন) পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের জন্য করা একটি বর্ধিত আন্তর্জাতিক সংস্থা। সমস্যা হল আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাপারে, যা বস্ততপক্ষে অস্তিত্বহীন। এখানে রয়েছে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও ঐতিহ্য কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন নয়। জাতীয়তাবাদমুক্ত একটি বিশ্বেই কেবলমাত্র আন্তর্জাতিক আইন প্রতিপালন সম্ভব। যেহেতু এ ধরণের বিশ্ব এখন নেই, সেকারণে জাতি রাষ্ট্রসমূহ তার প্রয়োজনমত আইন প্রণয়ন করে তা আবার নিজেদের ইচ্ছেমত ভাঙ্গে- নব্য বাস্তববাদ (neo realism)(সি.এফ ওয়াল্টজ.কে.১৯৭৯. ‘এ থিওরি অব ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্স’)।

  • ১৯৯০ সালে বলকান অঞ্চলে মুসলিমদের সাহায্য করবার জন্য কি পশ্চিমারা এগিয়ে এসেছিল?

    ১৯৯০ সালে বলকান অঞ্চলে মুসলিমদের সাহায্য করবার জন্য কি পশ্চিমারা এগিয়ে এসেছিল?

    (নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

    একটি যুক্তিসঙ্গত শান্তি প্রস্তাবনার আওতায় বিশেষত কসোভোতে একটি আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনায় যুগোস্লাভিয়ার একপেঁশে অস্বীকৃতি জানানোকে ১৯৯৩ সালে পশ্চিমারা ন্যাটো কর্তৃক যুগোস্লাভিয়া আক্রমণের পেছনে কারণ হিসেবে উল্লেখ করে থাকে। ন্যাটো কর্তৃক বলকান অঞ্চলে হস্তক্ষেপ এবং বোমাবর্ষনের মাধ্যমে মাধ্যমে পশ্চিমারা বর্তমান “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” কে শুধুমাত্র ইসলামের বিরুদ্ধে একটি অভিযান বলতে নারাজ; বরং তারা বলতে চায়, পৃথিবীর যেখানে মানবতা আক্রান্ত হয় সেখানেই এ অভিযান অব্যাহত থাকবে-এমনকি মুসলিমদের রক্ষার ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সাবেক উপদেষ্টা ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র জেমস রুবিন ২০০৩ সালে এ ব্যাপারে সাফাই গাইতে গিয়ে বলেন, ‘ইরাক দখল, কসোভোতে মুসলিমদের গণহত্যার হাত থেকে রক্ষা করা এবং বসনিয়ায় বিলম্বিত মার্কিন হস্তক্ষেপের মাধ্যমে আমেরিকা মানবাধিকার রক্ষায় তার দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ঘটিয়েছে।’

    বাস্তবে ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অন্যরকম। ১৯৯০ সালে বলকান অঞ্চলে সংঘটিত অস্থিরতা ছিল অত্র অঞ্চলে রাশিয়ার আধিপত্যকে বিচূর্ণ করে মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা, তার উপর ইউরোপ এর নির্ভরশীলতা বাড়ানো এবং ন্যাটোকে নতুন ক্ষমতা প্রদানের মাধ্যমে ঠান্ডা যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এর উপযোগিতা প্রমাণ করা।

    পশ্চিমারা বিশেষত মার্কিন এবং বৃটিশরা যুগোস্লাভিয়াকে টুকরো টুকরো করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল। যা যুগোস্লাভিয়ায় অবস্থিত মার্কিন দূত ওয়ারেন জিমারম্যানের কথায় ফুটে উঠে, ‘আমরা যুগোস্লাভিয়াকে স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত করার লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছি।’ ১৯৯২ এর ১৮ মার্চ তারিখে ইউরোপীয় ইউনিয়ন লিসবনে বসনিয়ান মুসলিম, ক্রোয়েট এবং সার্বিয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সার্বিয়ান প্রজাতন্ত্রকে তিনটি জাতিভিত্তিক অঞ্চলে বিভক্ত করে কনফেডারেশনের মাধ্যমে স্বাধীন দেশ হিসেবে ঘোষণা করতে চায়। মার্কিনীরা এ প্রস্তাবের ঘোর বিরোধিতা করে বসনিয়ান নেতা আলিজা ইজতবেগোভিচকে স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষণা দিয়ে বলতে বলেন, “মার্চের ১ তারিখে অনুষ্ঠিত গনভোটের মাধ্যমে এর যৌক্তিকতা প্রমানিত হয়েছে”। পশ্চিম ইউরোপীয় ইউনিয়নের সেক্রেটারী জেনারেল জোসে কিউটিলেরো বলেন, “সত্যি কথা বলতে আসলে প্রেসিডেন্ট আলিয়া এজেদবেগোভিক এবং তার সহযোগিরা এই চুক্তিটি না মেনে একক বসনিয়ো রাষ্ট্রের জন্য লড়াই করার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন পশ্চিমা মদ্ধস্ততাকারীদের কাছ থেকেই”। এভাবেই বসনিয়ান গৃহযুদ্ধের শুরু।

    আজকে বসনিয়া, কসোভো ও মেসেডোনিয়ায় শান্তিরক্ষার জন্য ১১০০০ সৈন্য উপস্থিতি রয়েছে-যা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থকে সংরক্ষণ করছে। নিউইয়র্ক টাইমসের সাথে প্রাক্তন কংগ্রেসম্যান লি হ্যামিল্টন বলেন, ‘আমরা পুরোপুরি বলকান অঞ্চলের নিয়ন্ত্রন নিয়ে নিয়েছি। মার্কিন কর্মকর্তাগণ সাবেক যুগোস্লাভিয়ার সর্বত্র ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত আছে। আমরাই মুলত; দেশ পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত।

    ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ কারেন টালবোটের মতে, ‘যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো পুরো যুগোস্লাভিয়া বিশেষত কসোভোকে অফুরান প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য দখলে রাখতে চায়। রাশিয়ার পশ্চিমে পুরো ইউরোপের মধ্যে এককভাবে কসোভোতে সবচেয়ে দামী প্রাকৃতিক সম্পদসমূহ রয়েছে।’

    নিউইয়র্ক টাইমসের মতে, ‘রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিশাল ট্রেপকা মাইনিং কমপ্লেঙ্ হল বলকানদের সবচেয়ে মূল্যবান ভূ-সম্পত্তি। এর মূল্য কমপক্ষে ৫ বিলিয়ন ডলার, এতে উৎপাদিত হয় স্বর্ণ, রৌপ্য, বিশুদ্ধ শীশা, দস্তা, ক্যাডমিয়াম এবং প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার মুনাফা হয়। কসোভোর আরও আছে ১৭ বিলিয়ন টন কয়লা ভান্ডার এবং কসোভোর (সার্বিয়া এবং আলবেনিয়ার মত) তেল বন্দরও আছে’

    প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনতো একবার বলেই বসলেন, ‘পুরো পৃথিবীব্যাপী পণ্য বিক্রয়ের মাধ্যমে আমরা যদি একটি শক্তিশালী অর্থনীতির দিকে যেতে চাই তাহলে ইউরোপকে সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দিতে হবে….আর এর জন্যই কসোভোকে দরকার।’

    বোমাবর্ষণ শেষ হওয়ার পর মার্কিনীরা বলকান অঞ্চলে অসংখ্য সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। কসোভোতে মার্কিনীরা একটি বড় সামরিক ঘাঁটি করে-যা ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর বিদেশে করা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। ন্যাটোতে মার্কিনীদের ব্যাপক প্রভাব মূলত: এ অঞ্চলে ন্যাটোর আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকেই মজবুত করেছে। ফাঁস হয়ে যাওয়া পেন্টাগণের ১৯৯৪-১৯৯৯ প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা নির্দেশনা রিপোর্টে বলা হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে, ‘ইউরোপীয়ানদের প্রাধান্য সৃষ্টির যে কোন পথ রুদ্ধ করতে হবে-যা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ন্যাটোকে চ্যালেঞ্জ করবে….একারণে পশ্চিমা নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার প্রাথমিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার এবং ইউরোপের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধিকতর প্রভাব ও অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ন্যাটোকে রক্ষা করা মৌলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।’

    সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা বলা যায় যে, রাশিয়ার প্রভাবকে ক্ষুন্ন করা, কাস্পিয়ান সাগরে তেল সম্পদ এবং ন্যাটোর মাধ্যমে মার্কিন আধিপত্যকে আরও বেশী পাকাপোক্ত করাই ছিল বলকান অঞ্চলে পশ্চিমা হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য। হাজারও নিষ্পাপ মানুষের জীবন এবং সেব্রেনিৎজায় অসংখ্য লাশ ছিল মার্কিনীদের এই আধিপত্য প্রতিষ্ঠা প্রচেষ্টার চরমমূল্য।

  • বিশ্বের তেল কি ফুরিয়ে যাচ্ছে?

    বিশ্বের তেল কি ফুরিয়ে যাচ্ছে?

    (নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

    বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্রিটেন ও জার্মানীর বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বজায় রাখার দ্বন্দ্ব তাদেরকে তাদের কয়লাভিত্তিক বৃহদাকার যুদ্ধযানগুলোর জন্য বিকল্প জ্বালানী উৎসের অনুসন্ধানের দিকে ঠেলে দেয়। আর ঐ সমসাময়িক সময়েই মধ্যপ্রাচ্যে তেলক্ষেত্রগুলোর আবিষ্কার ও নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন নতুন ধারার ভোগের সমাজব্যবস্থা ও বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্যের ক্ষেত্রে নবযুগের সূচনা করে।

    স্বাভাবিকভাবেই জীবাশ্ম জ্বালানি অপ্রতুল এবং এটা একসময় শেষ হয়ে যাবে। বিংশ শতাব্দী জুড়ে অধিকাংশ তেলক্ষেত্রগুলোর অধিকাংশ অনাবিষ্কৃত থাকায় তেলের বিষয়টি খুব একটা আলোচনায় আসেনি। পরবর্তিতে জঙ্গি বিমান, ট্যাঙ্ক, অটোমোবাইল ইত্যাদির আবিষ্কার এ জ্বালানীর উপর সবার নির্ভরশীলতা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। যদি একসময় তেল শেষ হয়ে যায় তাহলে এসব যন্ত্রপাতি ও প্রযু্ক্তি একেবারেই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে।

    ১৯৭০ সালে প্রথম ‘পিক অয়েল’ থিওরী আবির্ভূত হয়। এর মাধ্যমে দেখানো হয় তেলের সেই পরিমান যে পরিমান উত্তোলন হলে পৃথিবীর মোট তেলের অর্ধেক উত্তোলন করা হবে।

    বিশ্বের তেল মজুদের পরিমান (২০০৬)
    ==============================
    বিশ্ব                               ১.১৩ ট্রিলিয়ন
    সৌদি আরব                  ২৬০ বিলিয়ন
    কানাডা                         ১৭৯ বিলিয়ন
    ইরান                             ১৩৬ বিলিয়ন
    ইরাক                             ১১৫ বিলিয়ন
    কুয়েত                             ৯৯ বিলিয়ন
    সংযুক্ত আরব আমিরাত   ৯৭ বিলিয়ন
    ভেনিজুয়েলা                    ৮০ বিলিয়ন
    রাশিয়া                            ৬০ বিলিয়ন
    লিবিয়া                            ৪১ বিলিয়ন
    নাইজেরিয়া                     ৩৬ বিলিয়ন
    ইউ.এস.এ                      ২১ বিলিয়ন

    বিপি বিশ্বের জ্বালানীর পরিসংখ্যাগত পর্যালোচনা ২০০৭
    ===============================

    ভবিষ্যতে কতটুকু তেল উৎপাদন করা যাবে তা নিরূপনের জন্য তিনটি উপাত্ত খুব দরকার। প্রথমে দরকার হল, এ পর্যন্ত সর্বমোট কত ব্যারেল তেল উত্তোলন করা হয়েছে- যাকে সর্বমোট উৎপাদন বলা হয়। দ্বিতীয়ত দরকার হল, বিভিন্ন কোম্পানীগুলো একটি তেলক্ষেত্রকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করবার আগে কতটুকু তেল উত্তোলন করতে সমর্থ্য হবে। সবশেষে দরকার হল, একটি বিশেষজ্ঞ দল অনাবিষ্কৃত ও উত্তোলনযোগ্য তেলের পরিমাণ সম্পর্কে গবেষণা ভিত্তিক তথ্য প্রদান করবে। এই তিনটি উপাত্ত থেকে পরিষ্কার বুঝা যাবে কয়েক দশক পর থেকে এই খনিটি পরিত্যক্ত হবার পূর্ব পর্যন্ত ঠিক কতটুকু তেল উত্তোলন করা সম্ভবপর হবে- একে সর্বমোট উত্তোলন বলে।

    সর্বোচ্চ কি পরিমাণ তেল উৎপাদিত হবে তা বুঝার জন্য এ পর্যন্ত উৎপাদিত তেল আবিষ্কৃত তেলের পরিমাণকে ছাড়িয়ে গেল কিনা সেদিকে তাকাতে হবে। এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল এ পর্যন্ত তেলক্ষেত্র আবিষ্কারের দিক থেকে ১৯৬০ এর দশক ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক সময়ের সর্ববৃহৎ তেলক্ষেত্রটি ১৯৮৫ সালে মেক্সিকোতে আবিষ্কৃত হয় আর ১৯৫০ এর দশকে আবিষ্কৃত তেলক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন প্রায় শেষের দিকে। অথচ পৃথিবীতে এখন যে পরিমান তেল উৎপাদন হচ্ছে তার প্রায় চারগুন ব্যবহার হয়। ফলে তেল কোম্পানিগুলো নতুন তেলক্ষেত্র আবিষ্কারের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। কিন্তু যাই মিলছে তা আবার ছোট ছোট এবং উৎপাদনও খুবই যৎসামান্য। নতুন নতুন তেল ক্ষেত্রর আবিষ্কার নিম্নগামী হওয়ায় এবং তেলের উত্তোলন অব্যাহত থাকায় কালোসোনার বর্তমান মজুদও নিঃশেষ হবার দিকেই এগুচ্ছে।

    কোন কোন অতি উৎসাহী ভবিষ্যতদ্রষ্টা বলেন যে, ২০৬০ সাল পর্যন্ত তেলের সর্বোচ্চ (পিক) উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা হল, বর্তমান সময় থেকে ২০১২ সালের মধ্যেই তেলের উৎপাদন সর্বোচ্চ (পিক) পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছাবে।

    আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দিকে তাকাতে পারি যারা ইতোমধ্যে তেল উৎপাদনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে অথবা অতি শীঘ্রই যাবে। তেল উৎপাদনের দিক থেকে প্রথম সাতটি দেশের দিকে তাকালে দেখা যাবে হয় তাদের উৎপাদন নিম্নমুখী অথবা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭১ সালে, নরওয়ে ২০০১ সালে এবং ব্রিটেন ১৯৯৮ সালে সর্বোচ্চ উৎপাদনে পৌঁছে গেছে। রাশিয়া, মেক্সিকো ও চায়না ২০০৮ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। সৌদি আরব ২০০৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সর্বোচ্চ উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ইরানই কেবল এ উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষমতা রাখে।

    বৈশ্বিক তেল ব্যবহারের পরিমান (ব্যারেল প্রতিদিন ২০০৭)
    ========================================
    বিশ্ব                ৮৫ মিলিয়ন
    ইউ.এস.এ     ২০.৬ মিলিয়ন        ২৪%
    চীন                ৭.৮ মিলিয়ন          ৯.৩%
    রাশিয়া            ২.৬ মিলিয়ন         ৩.২%
    জার্মানী           ২.৩ মিলিয়ন         ২.৮%
    ফ্রান্স                ১.৯ মিলিয়ন         ২.৩%
    ইউকে             ১.৬ মিলিয়ন             ২%
    স্পেন               ১.৬ মিলিয়ন            ২%

    বিপি বিশ্বের জ্বালানীর পরিসংখ্যাগত পর্যালোচনা ২০০৭

    =======================================

    এছাড়াও আরও অনেক কারণ থাকতে পারে যেগুলো দ্রুত তেল উৎপাদনের শেষপ্রান্তে পৌঁছানোর জন্য দায়ী। সেকারণে বড় বড় তেল কোম্পানীগুলোর (যেমন: শেল) জন্য তেলের মজুদ সম্পর্কে করা অতিরঞ্জিত বক্তব্য মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

    বর্তমান মজুদকে সামনে নিয়ে এসে তেল উৎপাদনকারী দেশের সংগঠনগুলো তেল ঘাটতিকে ঢাকবার চেষ্টা করছে। তেল উৎপাদনকারী কোম্পানী যেমন ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম নতুন তেলক্ষেত্র আবিষ্কার নয় বরং পুরনো ক্ষেত্রগুলো থেকে তেল উত্তোলন চুক্তির ভিত্তিতে মজুদ সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছে। নতুন তেলক্ষেত্র আবিষ্কারের পেছনে বিনিয়োগ বরাবরই কমছে। সৌদি আরবের অধিকাংশ ক্ষেত্রসমূহে চালানো বিশেষজ্ঞ অনুসন্ধানে তেল প্রাপ্তির নিম্নমুখী প্রবণতা প্রকাশিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, আফগানিস্তান, ভারত, চীন ও অন্যান্য এশিয়ান দেশসমূহের প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে তেল ও গ্যাস ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে।

    এ কারণসমূহ ‘তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে’- এ ধরণের প্রচারণাকে মূল ধারায় নিয়ে এসেছে এবং এটি এখন বিশ্বশক্তিসমূহের ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও এর আড়ালে আরও কিছু রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি লুকিয়ে আছে।

    পশ্চিমাদের অতিরিক্ত তেল খরচার উপযুক্ত অজুহাত হল তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে। সীমিত মজুদের তেল সম্পদের প্রতি অন্যান্য জাতিরাষ্ট্রসমূহের চাহিদা তৈরি হোক এটা পশ্চিমারা চায় না। পশ্চিমারা মোট তেল উৎপাদনের চার ভাগের এক ভাগ করলেও প্রায় অর্ধেক তারা ভোগ করে। তাদের অতিরিক্ত ব্যয়ই তেল সম্পদ ফুরিয়ে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ-তেলের প্রাকৃতিক মজুদ নয়।

    যুক্তরাষ্ট্র মাত্র ৮ ভাগ তেল উৎপাদন করলেও প্রায় ২৫ ভাগ তেল খরচ করে। তাদের এ বিশাল খরচ বহন করা অসম্ভব। কারণ মাত্র কয়েকটি বিশাল তেলক্ষেত্রের উপরই তাদের তেলের সিংহভাগ চাহিদা পূরণের দায়ভার বর্তায়। পুরো পৃথিবী জুড়ে হাজার হাজার তেলক্ষেত্র থাকলেও মাত্র ১১৬ টি ক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন ১০০০০০ ব্যারেল উৎপাদিত হয়-যা পুরো বিশ্বের উৎপাদনের শতকরা ৫০ ভাগ। এদের হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি ছাড়া বাকীগুলো আবিষ্কৃত হয়েছে সিঁকি শতাব্দীরও আগে। যেগুলো এখন প্রায় ফুরিয়ে যাবার পথে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বড় ক্ষেত্রসমূহের মধ্যে সৌদি আরবের ঘাওয়ার, কুয়েতের বারগান, মেক্সিকোর কেণ্টারেল এবং রাশিয়ার সামোতলর-এখন উৎপাদনের দিক থেকে নিম্নমুখী। এসব বৃহৎক্ষেত্রসমূহের নিম্নমুখী উৎপাদন একটি বড় ঘটনা। এই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য ছোট ছোট ক্ষেত্রসমূহের উপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হবে। তবে এর মাধ্যমেও সমস্যার সমাধান সুদূর পরাহত। যেহেতু মার্কিন তেল খরচ বেড়েই চলেছে সেহেতু সীমিত মজুদের এ জ্বালানীশক্তিকে ঘিরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়েই চলবে। একারণে ইরাকের মত মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য অংশও এ কালো সোনার জন্য মার্কিনীদের রাহুগ্রাসের শিকার হতে পারে।

    তেল সম্পদের স্বল্পতার জন্য নয় বরং পশ্চিমা বিশ্বের তেলের অতিরঞ্জিত ব্যবহারই তেল ফুরিয়ে যাবার প্রধান কারণ।

  • চীন ও ভারতে উন্নয়নই কি বৈশ্বিক উঞ্চায়নের জন্য দায়ী?

    চীন ও ভারতে উন্নয়নই কি বৈশ্বিক উঞ্চায়নের জন্য দায়ী?

    জলবায়ু পরিবর্তন বৈজ্ঞানিক গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সব বিজ্ঞানের সাথে তুলনা করলে এটা ঠিক বিজ্ঞান নয়। জলবায়ু বিজ্ঞান সম্পর্কিত জ্ঞান প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। জলবায়ু পরিবর্তন নতুন কিছু নয়, সবসময় জলবায়ু পরিবর্তন হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। যেমন-বরফ যুগ, যখন বিশ্বের তাপমাত্রা দীর্ঘ সময়ের জন অত্যন্ত কম ছিল।

    বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন বলতে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে বুঝায়। প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট কারণ বিশ্বের গড় তাপমাত্রার এই বৃদ্ধির জন্য দায়ী বলে মনে করা হয় – আর এটাই এখন বিতর্কের বিষয়। এই উষ্ণায়নের জন্য প্রধানত দায়ী গ্রীনহাউসের বৃদ্ধি অর্থাৎ বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি। এটা হল মুলত বায়ুমন্ডলের কিছু গ্যাস কর্তৃক কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মত তাপ নির্গমনকারী গ্যাসসমূহকে আটকে ফেলার প্রক্রিয়া। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের এ সময়কাল শিল্প বিপ্লবের সমসাময়িক- যখন কার্বন-ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ। এর ফলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণের পরিমাণের সাথে উষ্ণায়নের আনুপাতিক সম্পর্কের দিকে নির্দেশ করে। আরও অনেকের মত আল গোরও বলেন, এই গ্যাসটিই বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য প্রধানত দায়ী। কার্বন-ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণকেই বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রধানতম কারণ হিসেবে গন্য করা হয়। যদিও এটিই শেষ কথা নয় এবং এ সিদ্ধান্তে পৌছানোর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত নমুনাগুলোর বিষয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে।

    প্রতি কয়েক বছর পর পর, জাতিসংঘের জলবাযু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তসরকার প্যানেল (আই.পি.সি.সি) এর বিখ্যাত জলবায়ু বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে গবেষণার অগ্রগতি সর্ম্পকিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। উষ্ণায়ন হ্রাসের জন্য নিঃসরণ কমানো উচিত বলে তারা শুরু থেকেই সুপারিশ করে আসছেন। সারা বিশ্বের শত শত বিজ্ঞানীদের নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি গঠিত। আই.পি.সি.সি-এর চতুর্থ তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিবেদন জানুয়ারী ২০০৭ অনুসারে, “তৃতীয় মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে জলবায়ুর উষ্ণায়ন এবং শীতলীকরণের নৃতাত্বিক প্রভাবকগুলো সম্পর্কিত জ্ঞান যথেষ্ট অগ্রগতি লাভ করেছে। ফলাফল ̄স্বরূপ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে ১৭৫০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী মানুষের কর্মকান্ডের গড় নীট পরিণতি হল উষ্ণায়ন- এই সম্ভাবনাই অতি প্রবল।’ তাদের সংজ্ঞা অনুযায়ী “অতি প্রবল সম্ভাবনা” এবং “খুব সম্ভব” এর ধারণা ৯০ ভাগ সঠিক হওয়ার সম্ভাবনাকে অন্তর্ভূক্ত করে (যদিও ২০০১ এর রিপোর্ট অনুসারে ৬৬ ভাগ সঠিক হওয়ার সম্ভাবনাকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল)।

    বিশ্বের দূষণকারী দেশসমূহ (২০০৪)
    মানব কর্মকান্ডের মাধ ̈মে কার্বন -ডাই-অক্সাইড নিঃসরনকে
    মোট নিঃসরেেনর শতকরা ভাগ হিসেবে গণনা করে
    ১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২২%
    ২. চীন ১৮%
    ৩. রাশিয়া ৫%
    ৪. ভারত ৪.৯%
    ৫. জাপান ৪.৬%
    ৬. জার্মানী ৩.১%
    ৭. কানাডা ২.৩%
    ৮.যুক্তরাজ্য ২.২%
    ৯. দক্ষিন কোরিয়া ১.৭%
    ১০. ইতালী ১.৬%

    ইতিহাস বলে যে, আজ পর্যন্ত শতকরা ৮০ ভাগ নিঃসরণের জন শিল্পোন্নত বিশ্ব দায়ী। ১৯৫০ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সর্বসাকুল্যে এ পর্যন্ত ৫০.৭ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ করেছে। একই সময়ে চীন করেছে ১৫.৭ বিলিয়ন টন (যেখানে আমেরিকার তুলনায় চীনের জনসংখ্যা ৪.৬ গুন বেশী) এবং ভারত করেছে ৪.২ বিলিয়ন টন (যেখানে আমেরিকার তুলনায় ভারতের জনসংখ্যা ৩.৫ গুন বেশী)। শিল্পোন্নত বিশ্বে যেখানে পৃথিবীর ২০ ভাগ লোক বসবাস করে সেখানে ৬০% ভাগ কার্বন নিঃসরণ হয়।

    শিল্প বিপ্লবের শুরুর দিক থেকেই শিল্পোন্নত বিশ্ব ব্যপক পরিমাণে কার্বন নিঃসরণ করে আসছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ১৪ ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থনীতি নিয়ে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ দূষণকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। শুধু তাই নয়, যে কোন ধরণের নিঃসরণ হ্রাসকারী চুক্তির ব্যাপারে বাধাদানকারী দেশ হিসেবেও এ দেশটির ভূমিকা রয়েছে। নিঃসরণ কমানোর অর্থ হচ্ছে পশ্চিমাদের উৎপাদন কমাতে হবে-যা তাদের অর্থনীতি-পুঁজিবাদকে সংকুচিত করবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহার কার্বন নিঃসরণের আরও একটি প্রধান কারণ। মার্কিনীদের মাত্রাতিরিক্ত ভোগের কারণেই পরিবেশ দূষণ বেড়েই চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার বৈশ্বিক গড় ব্যবহারের প্রায় পাঁচ গুন।

    বৈশ্বিক উষ্ণায়ন পশ্চিমাদের ব্যপক শিল্পায়নের মাধ্যমে অধিক মুনাফা করার হীন প্রবৃত্তি থেকে সৃষ্টি হচ্ছে। নিঃসরণ কমানোর উন্নত প্রযুক্তি থাকলেও এর সাথে প্রচুর ব্যয় যুক্ত থাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এতে রাজী নয়। কেননা এতে করে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বাজারে মার্কিন পণ্য কম মূল্যে বিক্রি হবে না । মাত্র ২০ বছর আগে চীন এবং ভারত উন্নয়নের ব্য়পক ধারায় সংযুক্ত হয়। কিন্তু বিশ্ব উষ্ণায়নের সমস্যাটি আরও পুরনো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরাশক্তি হিসেবে ভারত ও চীনের উন্নয়নের গতিতে পরশ্রীকাতর হয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন তাদেরকে দোষারোপ করে আসছে।

  • পৃথিবী কি জনসংখ্যার আধিক্যে ভারাক্রান্ত?

    পৃথিবী কি জনসংখ্যার আধিক্যে ভারাক্রান্ত?

    (নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

    জিনের গঠন নিয়ে বর্তমান আধুনিক গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে যে, ১৫০০০ বছর আগে পৃথিবীর জনসংখ্যার পরিমাণ ছিল মাত্র ১৫ মিলিয়ন (বর্তমান ঢাকা ও দিল্লীর সমান)। যীশু খ্রীস্টের সময় অর্থাৎ আজ থেকে ২০০০ বছর আগে পৃথিবীর জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫০ মিলিয়ন (বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার সমান)। শিল্প বিপ্লবের শুরুর দিকে অর্থাৎ ১৮০০ শতকের দিকে জনসংখ্যা তিনগুন বেড়ে দাঁড়ায় ৭০০ মিলিয়ন (বর্তমান ইউরোপের সমান)। গত দুই শতাব্দীতে বার্ষিক ৬ ভাগ হারে বৃদ্ধিতে ১৯৫০ সালে জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২.৫ বিলিয়ন। আর ২১ শতকের শুরুর দিকে বিগত ৫০ বছরে শতকরা ১৮ ভাগ হারে জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ বিলিয়ন। যদিও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে গেছে এবং কিছু কিছু এলাকায় প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটেছে, তারপরেও ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৯ বিলিয়ন। সেপ্টেম্বর ২০০৮ অনুসারে পৃথিবীর জনসংখ্যা ৬.৭২ বিলিয়ন।

    বিগত শতাব্দীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এমন মাত্রায় এসে পৌঁছেছে যে, একেই দেখানো হয় পৃথিবী এখন বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনিত হবার মূল কারন হিসেবে। যু্ক্তি দেখানো হয় যে, আমরা এখন এই বিশাল জনসংখ্যাকে যোগান দেয়ার মত খাদ্যেও অপ্রতুলতার সম্মুখীন। এছাড়াও বলা হয় এ ব্যাপক জনসংখ্যা বৃদ্ধি দরিদ্রতা, পরিবেশ বিপর্যয়, সামাজিক অস্থিরতা এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশ সমূহের অনুন্নয়নের জন্য দায়ী। এ কারণে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা এবং সরকারসমূহ জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধকল্পে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে নানাবিধ কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।

    তথাকথিত এই অতিরিক্ত জনসংখ্যাকে এমন কোন কিছুর সাথে তুলনা করতে হবে যা সীমিত। আর তা হল পৃথিবীর মোট সম্পদের পরিমাণ।

    বিশ্বের জনসংখ্যা ২০০৭
    ১. সমগ্র বিশ্ব৬.৭ বিলিয়ন
    ২. এশিয়া৩.৯ বিলিয়ন
    ৩. চীন১.৩ বিলিয়ন
    ৪. ভারত১.১ বিলিয়ন
    ৫. আফ্রিকা৮৮৭ মিলিয়ন
    ৬. ইউরোপ৭৭৪ মিলিয়ন
    ৭. লাতিন আমেরিকা৫৫৮ মিলিয়ন
    ৮. উত্তর আমেরিকা৩৩২ মিলিয়ন
    ৯. যুক্তরাষ্ট্র৩০৪ মিলিয়ন
    ১০. ইন্দোনেশিয়া২৩১ মিলিয়ন
    ১১. ব্রাজিল১৮৭ মিলিয়ন
    ১২. পাকিস্তান১৬৩ মিলিয়ন
    ১৩. বাংলাদেশ১৫৮ মিলিয়ন
    জাতিসংঘের অর্থনীতি ও সামাজিক বিষয় সংক্রান্ত বিভাগ জনসংখ্যা বিভাগ

    কিন্তু খুব সূক্ষভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, পৃথিবীর অনেক বড় বড় সমস্যা – যেগুলোর দায়ভার জনসংখ্যা বৃদ্ধির উপর চাপানো হয়েছে-তা আদৌ সঠিক নয়। বরং এগুলোর পেছনে রয়েছে স্পষ্ট রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্য। মূল সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রাখবার জন্যই জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টিকে সামনে তুলে ধরা হয়েছে। মূল সমস্যা হল জীবনযাপন প্রণালী, ভোগবাদী মনোবৃত্তির স্ববিনাশী প্রবণতা, দরিদ্রতা এবং নিজেদের স্বাচ্ছন্দের স্বার্থে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো কর্তৃক তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে শোষণ করবার হীন মানসিকতা।

    উন্নত বিশ্ব বিশেষত: জাপান, রাশিয়া, জার্মানী, সুইজারল্যান্ড এবং পূর্ব ইউরোপের কিছু দেশ আরেকটি বড় সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে-যা হল জনসংখ্যা বৃদ্ধি হারের নিম্নগতি। পশ্চিমের অন্যান্য অংশেও এ নিম্ন হার অব্যাহত রয়েছে। তবে অভিবাসনের মাধ্যমে সেটা কিছুটা ঠেকানো হয়েছে। যদি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোসহ পুরো মুসলিম বিশ্বে পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চ হার অব্যাহত থাকে, তাহলে তথাকথিত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব আনুপাতিক হারে বেড়ে যাবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঠেকানো ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার ভিত্তিতে শক্তিশালী হওয়া জাতিকে পদানত করবার এক হীন প্রক্রিয়া। এ ব্যাপারটি স্পষ্ট ফুটে উঠবে তুরষ্কের ইউরোপীয় ইউনিয়নে অংশগ্রহণের মাধ্যমে। প্রায় ৭০ মিলিয়ন জনসংখ্যার অনুপাতে ইউরোপীয়ান পার্লামেন্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক সদস্য রয়েছে তুরষ্কের। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এটা প্রমাণ করে ২০২০ সালের মধ্যে পার্লামেন্টে এ দেশটি জার্মানীকে ছাড়িয়ে যাবে। তুরষ্কের অন্তর্ভুক্তি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা ফেলবে। সে কারণে ফ্রান্সের ভ্যালেরি গিসকার্ড ডি’এস্টাইং তুরষ্কের অন্তর্ভুক্তিতে আপত্তি তুলেন। ডি’এস্টাইং- এর মতে তুরষ্কের অন্তর্ভুক্তি মরক্কোর অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে চাপ প্রয়োগ করবে।

    যদিও এ ব্যাপারে কোন ঐকমত্য নেই যে, কেন ব্রিটেন পৃথিবীর প্রথম শিল্পোন্নত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। তারপরেও যে আটটি পূর্বশর্তের দিকে দৃষ্টিনিবদ্ধ করা হয়; তার মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধি একটি। ১৭০৭ সালে স্কটল্যান্ডের সাথে সংযুক্তির পর ব্রিটেনের জনসংখ্যা দাঁড়ায় ৬.৫ মিলিয়ন। এক শতাব্দী পর সেটি প্রায় দ্বিগুন হয়ে দাঁড়ায় ১৬ মিলিয়ন। ১৭৫০ এর পরে এ বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ-যা ব্রিটেনের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ জনসংখ্যা বিস্ফোরণ। এ জনসংখ্যা বৃদ্ধি থেকে তৈরি হয় দক্ষ শ্রমিক এবং ভোক্তা।

    চীন এবং ভারত ইতোমধ্যে প্রমাণ করতে সমর্থ্য হয়েছে যে, বিরাট জনসংখ্যা এক বড় আর্শীবাদ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারকে সংকুচিত করবার অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকলেও চীন ও ভারত জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের দিক থেকে অন্যতম বৃহৎ দু’টি দেশ। এই জনসংখ্যার উচ্চ বৃদ্ধি হারের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাদের অর্থনীতি। যা জনসংখ্যা বৃদ্ধির কুফলতার দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সম্পূর্ণরূপে সাংঘর্ষিক।

    পৃথিবী কখনই জনসংখ্যা ভারক্রান্ত নয়। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার তুলনায় এখনও অতিরিক্ত সম্পদ রয়ে গেছে। যদিও তার সিংহভাগ পশ্চিমারা একা ভোগ করছে।

  • গণতন্ত্র উন্নয়নের পূর্বশর্ত নয়

    গণতন্ত্র উন্নয়নের পূর্বশর্ত নয়

    (নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

    প্রায় সব গবেষণায় ধরে নেয়া হয় যে, গণতন্ত্র উন্নয়নের পূর্বশর্ত – হোক সেটা অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত কিংবা বৈজ্ঞানিক উন্নয়ন। মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির জগৎবিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ম্যানকার ওলসেন তার পুরষ্কারপ্রাপ্ত Power & Prosperity (2000)- গ্রন্থে উল্লেখ করেন, অন্যান্য যে কোন সরকার ব্যবস্থার চেয়ে গণতন্ত্রে উন্নয়ন ও অগ্রগতি বেশী হয়ে থাকে। ওলসেন যুক্তি প্রদান করেন যে, সাংঘর্ষিক পরিবেশ সবসময় ধ্বংসপ্রবণতা ও দুর্নীতিকে উষ্কে দেয়, অন্যদিকে একনায়কতন্ত্রে শাসককে বেশী সময় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে লুটপাটের প্রবনতা দেখা যায়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তিনি পর্যবেক্ষণ করেন, ব্যক্তি এবং তার উন্নয়নকে এ ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়-কেননা শাসককে ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায়। ওলসেন গণতন্ত্রের পথে অগ্রযাত্রার মধ্যে সভ্যতার উম্মেষ দেখতে পান যা অগ্রগতির পথকে সুগম করে। এর ফলে জনগণের ইচ্ছার সাথে আরও নিবিড় সম্পর্কের মাধ্যমে সুশাসন ফলপ্রসু হয়ে উঠতে পারে।

    অন্যান্য গবেষণায়ও এটা বেরিয়ে এসেছে যে, গণতন্ত্র হল উন্নয়নের পূর্বশর্ত। এমনকি ইলিয়নয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইভান রডরিক যুক্তি প্রদান করেন যে, “‘বৃহত্তর প্রতিষ্ঠান’ (মেটা ইনস্টিটিউশন) হিসেবে গণতন্ত্র অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সাহায্য করে এবং গণতন্ত্রই হল সাফল্যের একমাত্র পূর্বশর্ত”।

    গণতন্ত্রে প্রবেশ
    সার্বজনীন ভোটাধিকার অর্জনের বছর
    নিউজিল্যান্ড১৯০৭
    ডেনমার্ক১৯১৫
    সুইডেন১৯১৮
    যুক্তরাজ্য১৯২৮
    ফ্রান্স১৯৪৬
    জার্মানী১৯৪৬
    ইতালী১৯৪৬
    বেলজিয়াম১৯৪৮
    যুক্তরাষ্ট্র১৯৬৫


    যদিও গণতন্ত্রের কোন সর্বসম্মত সংজ্ঞা নেই; তারপরও গণতন্ত্রের যে কোন সংজ্ঞায় দু’টি মৌলিক নীতি থাকতে হবে। প্রথম নীতিটি হল ক্ষমতায় সমাজের সকলের সমান অধিকার থাকতে হবে এবং সকলে সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত স্বাধীনতা ও মুক্তি ভোগ করবে।

    যেসব রাষ্ট্র গণতন্ত্রের পক্ষে ওকালতি করে এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের বিস্তার চায় তাদেরকে উপরের উপাত্তের সাথে মিলিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে বুঝা যায় যে, গণতন্ত্রের পক্ষে উপরে উল্লেখিত যুক্তিসমূহ মেলে না। অধিকাংশ উন্নত দেশসমূহে উন্নয়ন সুনিশ্চিত হয়েছে অগণতান্ত্রিক নীতিমালার কারণে এবং গণতন্ত্রের অনুপস্থিতিই উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছে। পশ্চিমে যখন সর্বপ্রথম ভোটকে কার্যকরী করা হয়-তখন এ সুযোগ কেবলমাত্র কিছু ধনী ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল এবং ভোটের গুরুত্বের দিক থেকে সম্পদ, শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রভৃতিকে প্রাধান্য দেয়া হত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের পর ভোটাধিকার আইন ১৯৬৫ এর মাধ্যমে শুধুমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৭০ সালে মার্কিন সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকলের ভোটের অধিকার সংরক্ষণ করা হলেও কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারা দক্ষিণের রাজ্যসমূহ ভোট কর প্রদানের মাধ্যমে বৈষম্যের স্বীকার হয়।

    ফ্রান্স ১৮৩০ সালে ত্রিশোর্ধ ব্যক্তিদের ৩০০ ফ্রাঙ্ক প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে ভোট প্রদানের সুবিধা প্রদান করে – যারা ৩২ মিলিয়ন জনসংখ্যার মাত্র ০.০২% ছিল। ১৮৪৮ সালে পুরুষদের ভোট প্রদান সার্বজনীন হয় এবং শিল্পায়ন হওয়ার পর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় নারীদের ভোটাধিকার দেয়া হয়। জাপান ব্যাপক সামরিক শক্তি অর্জনের পর যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের ব্যাপারে চাপ দেয় তখনই ভোটদানকে সার্বজনীন করে। মার্কিনীরা জাপানকে ১৯৫২ সালে ভোট প্রদানের ক্ষমতা দিতে সম্মত হলেও তার নিজের দেশের জনগণকে পুরোপুরিভাবে তা দিতে আরও ১৩ বছর সময় নেয়।

    ১৮০০ সালে যখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশবাদের স্বর্ণযুগ-তখন সেখানে মাত্র ৩ ভাগ জনগণ ভোটের অধিকার পায়। মধ্যযুগ থেকে প্রতি জেলায় বড় বড় ভূমিস্বামীরা কেবলমাত্র হাউস অব কমনসের সদস্য নির্বাচিত করতে পারত। এই ব্যবস্থা ভূমিহীন ব্যবসায়ী এবং দক্ষ শ্রমিকদের ভোটদানকে অস্বীকার করত। শত শত বছর ধরে সমৃদ্ধ অঞ্চলসমূহকে সংসদে বারংবার গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করা হত। অথচ নতুন গড়ে উঠা শহরসমূহ সেভাবে উল্লেখ করা হত না। সংসদের কিছু কিছু আসন কিছু ব্যক্তির জন্য সবসময় সংরক্ষিত থাকত। ১৮৬৭ সালে জনসংখ্যার শতকরা ১৩ ভাগ লোক ভোট দিতে পারত। ৬১বছর পর ১৯২৮ সালে পুরুষ মহিলা উভয়ের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত হয়। সুতরাং গণতন্ত্র এসেছে উন্নয়নের পর এবং বৃটেনের উন্নয়নে এর কোন ভূমিকা ছিল না।

    উন্নত বিশ্বকে অনুসরণ করে বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশগুলো অনেক বেশী পরিমাণে জনগণকে ভোটার অধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ করে দিয়েছে। অথচ গণতন্ত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে-এ ধারণা গ্রহণ করার আগে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

    চীন, রাশিয়া (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন) এবং জার্মানী কার্যতই প্রমাণ করেছে যে, গণতন্ত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত নয়। রাশিয়া এবং চীন পশ্চিমা উদারপন্থী গণতন্ত্রকে অনুসরণ না করে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বেশ এগিয়ে গেছে। সেকারণে এখন প্রশ্ন করার সময় এসেছে, গণতন্ত্রের সাথে অর্থনৈতিক অগ্রগতির আদৌ কি কোন সম্পর্ক আছে?

    অর্থনৈতিক অগ্রগতি বলতে একটি দেশের নিজস্ব স্বার্থে জনগণকে সাথে নিয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে শিল্পোন্নত হওয়াকে বুঝায়। এর জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা দরকার যা পুরো দেশকে একটি লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যাবে। আর না হয় তা হবে দ্বান্দ্বিক। ব্রিটেনের মূল প্রণোদনা আসে গীর্জার আধিপত্য খর্ব করে উদার মূল্যবোধ গ্রহণ করার মাধ্যমে। মূলত: এর ভিত্তিতে তারা একত্রিতও হয়েছিল। অভিজাত শ্রেনী কর্তৃক সম্পদ ও ভূমির মালিক হবার সুযোগ লাভ এবং এর মাধ্যমে ঔপনিবেশিকতার গতিপথ নির্ধারনের ক্ষমতা তাদের উন্নতি সুনিশ্চিত করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন জারদের ব্যর্থতা থেকে প্রণোদনা লাভ করে এবং পরবর্তীতে সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতে একত্রিত হয়। পরবর্তীতে তাদের অর্থনীতিবিদেরা সমাজতান্ত্রিক জীবনদর্শন থেকে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করে। মার্কিনীরা ব্রিটেনের কাছ থেকে মুক্ত হবার পর একত্রিত হয়ে কাজ শুরু করে। আর জাপানীরা যখন বুঝতে পারল তারা উন্নত বিশ্বব্যবস্থা থেকে কতটা পিছিয়ে আছে, তখনই অর্থনীতিকে উন্নত করার যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ল। চীন একমাত্র দেশ-যার উন্নয়ন কেবলমাত্র আদর্শিক নয়। তবে সেদেশের নীতি নির্ধারকরা জনগণের ভেতর ‘চীনারা একটি মহান জাতি’ এ চেতনাবোধ জাগ্রত করতে সমর্থ হয়েছে। জার্মানীর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। এমনকি তারা বর্ণবাদকে উন্নয়নের জন্য ব্যবহার করে।

    প্রকৃত প্রস্তাবে গণতন্ত্র উন্নয়নের জন্য কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি। সেকারণে উপরে উল্লেখিত দেশসমূহ কখনই জনগণের রায়ের জন্য অপেক্ষমান থাকেনি। উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের সম্পর্ক খুবই দুর্বল। বর্তমানে যারা গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলে তারা গণতান্ত্রিক হয়েছে উন্নত হবার পর। আর চীন প্রমাণ করে উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র কোন বিষয়ই নয়।

  • ইসলাম এসেছে সকল যুগের জন্য

    ইসলামের প্রয়োগ কোন যুগ বিশেষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, বরং ইসলাম সকল যুগেই মানুষের জন্য সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। এটা এজন্য যে, ইসলাম মানবীয় চাহিদাগুলোকে সুনিয়ন্ত্রিত করার জন্য এসেছে আর এই চাহিদাগুলো কোন যুগের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়।

    মানুষের দিকে তাকালে আমরা দেখব যে তার সুনির্দিষ্ট কিছু মানবীয় চাহিদা রয়েছে যেগুলোর উপর পৃথিবীতে তার বেঁচে থাকা ও জীবন-যাপন প্রক্রিয়া নির্ভর করে। এই চাহিদাগুলো পূরণের উপায়-উপকরণ সংগ্রহ ও এদের ক্রমোন্নতির পিছনে সে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যায় যাতে করে এসব চাহিদা পূরণের উপায় সহজ থেকে সহজতর হয়। আদিম মানুষ তার উপায়-উপকরণগুলোকে চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে উন্নত করতে করতে আজকের এই উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন অবস্থায় এসেছে যেখানে রয়েছে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, চিকিৎসা ব্যবস্থা, খাদ্য-বস্ত্র বাসস্থানের উন্নততর সংস্থান, বিনোদনের নানা উপকরণ, বস্তু-জগত সম্পর্কে আরো ব্যাপক জ্ঞান ইত্যাদি। এসবই হয়েছে একটি মাত্র কারনে; তা হলো মানবীয় চাহিদা ও প্রয়োজনগুলো মিটানোর সহজতর উপায় অনুসন্ধান আর এ চাহিদা ও প্রয়োজন সব যুগে সব মানুষেরই ছিলো। এসব চাহিদার ব্যাপারে তাদের মাঝে কোন মৌলিক পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যাবেনা। পার্থক্য কেবল এই যে, বিভিন্ন যুগে মানুষের এই চাহিদা পূরণের উপায়-উপকরণগুলো বিভিন্ন ছিলো যা একটি উপকরণগত পার্থক্য মাত্র। কাজেই সহজাত চাহিদাগুলোর ব্যাপারে প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ একই অবস্থায় রয়েছে।

    ইসলাম পৃথিবীতে এসেছে মানুষের সব ধরণের জৈবিক চাহিদাকে সর্বোচ্চ সাঠিক উপায়ে সুশৃংখল করার জন্য। ইসলাম যে ব্যবস্থা বা বিধি-বিধান দেয় তার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সমাজে মানুষের জৈবিক-চাহিদা পূরণের পদ্ধতিগুলোকে এমনভাবে নিয়মবদ্ধ করা যাতে করে এর ফলে সামগ্রিকভাবে সমাজে কোন বিশৃঙ্খলা তৈরী না হয়। ইসলাম এসব চাহিদা পূরণের বৈধ পদ্ধতিকে সুনির্দিষ্ট করেছে, উপকরণকে নয়। যুগের কারনে যে উপকরণ গত পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে তাতে ইসলামের বিধি-বিধান প্রয়োগে কোনই বাধা সৃষ্টি হয় না। ইসলাম কোথাও বলেনি যে একস্থান থেকে আরেক স্থানে যেতে হলে উটের পিঠে করে যেতে হবে, তাই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাবার জন্য গাড়ী, ষ্টীমার, উড়োজাহাজ যাই ব্যবহার করা হোক না কেন সবই একই ব্যাপার।

    আসলে মানুষ যতদিন ‘মানুষ’ থাকবে ততদিনই তার মানবীয় সব চাহিদা ও প্রয়োজন অপরিবর্তিত থাকবে। একইভাবে সেগুলোকে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালনার জন্য একটা ব্যবস্থাও লাগবে সবসময়ই। যেহেতু ইসলাম আল্লাহ্‌ তা’আলার কাছ থেকে আসা একটি ব্যবস্থা তাই কেবল এটিই পারবে উপকরণ নির্বিশেষে সব যুগে মানুষের চাহিদাগুলোকে এবং চাহিদা থেকে উৎপন্ন সামাজিক সমস্যাগুলোকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে। ইসলাম তাই সব যুগের জন্য এবং সকল সময়ের জন্য।

    আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহকে সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” [সূরা আল মায়িদা : ৩]

    “এবং তোমার রবের বাণী সত্যতা ও ইনসাফের দিক দিয়ে পরিপূর্ণ হয়েছে, তাঁর বাণী পরিবর্তনকারী কেউই নেই, তিনি সবকিছু শোনেন ও জানেন।” [সুরা আল আন’আম : ১১৫]

  • সঠিক ইসলামী দল করার অপরিহার্যতা [ইসলামী আলোচনা]

    This is a speech given by a brother in March 2008 on the topic of

    “Importance of Joining a Correct Islamic Party”

  • উপমহাদেশে খিলাফত আন্দোলন এবং ১৯৪৭ পরবর্তী বাংলাদেশে ইসলামী দলগুলোর ভূমিকা

    ভূমিকা:

    ভারত উপমহাদেশে দুই’শ বছরের বৃটিশ শাসনামলে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী ইসলামী সভ্যতা। সর্বাধিক নির্যাতন ও নিগ্রহের শিকার হয়েছে মুসলিম জনগোষ্ঠী। আর অঞ্চল হিসাবে অধিক পরিমাণে শোষিত হয়েছে মুসলিম প্রধান পূর্ববাংলা। এ সময়ে দখলদার জালিম ইংরেজ শাসকদেরকে বিতাড়নের জন্য অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। বহু প্রাণহানী ও রক্তপাতের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কোন আন্দোলনই এ অঞ্চলের মুসলমানদেরকে এতোটা ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত করতে পারেনি, যতটা পেরেছিল ‘খিলাফত আন্দোলন নামে’ পরিচিতি এক উম্মাহ্‌ কন্‌সেপ্ট থেকে উৎসারিত ঐতিহাসিক একটি আন্দোলন। অবশ্য ১৯২৪ সালে তুরস্কে উসমানী খিলাফত পতনের পর এ আন্দোলন অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। মুসলিম নেতারা খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পরিবর্তে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে ইংরেজ খেদাও আন্দোলনের প্রতি সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেন। আর এই সুযোগে চতুর ইংরেজরা স্বাধীনতার প্রশ্নে মুসলানদের মাঝে দ্বিজাতি তত্ত্ব আর অবিভক্ত ভারতের দাবীতে এক বিরাট বিভক্তি সৃষ্টি করে দেয়। ফলে গতিহারা হয়ে যায় মুসলমানদের আন্দোলন। ইসলাম প্রতিষ্ঠার মূল দাবী হারিয়ে যায় সাময়িক ইস্যুতে আন্দোলনের ডামাডোলে। যার ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলো এখনও বহন করে চলছে।

    এই নিবন্ধে আমি পুরো বিষয়টিকে বিশ্লেষণের চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ্‌। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, উপমহাদেশে ইসলামী সভ্যতা ও শিক্ষা-সংস্কৃতি রক্ষার ক্ষেত্রে আলিম-উলামাদের সীমাহীন অবদান আছে। তবে এই নিবন্ধে সেই বিষয়ে আলোকপাত না করে শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রসঙ্গকেই এর আলোচ্য বিষয় বনানো হয়েছে। আলোচনার সুবিধার্থে প্রবন্ধটিকে মোট ৪টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করা হলো।

    এক : ১৯৪৭ পূর্ববর্তী খিলাফত আন্দোলন।
    দুই : ১৯৪৭ পরবর্তী পাকিস্তান আমলে এ অঞ্চলের ইসলামী দলগুলোর ভূমিকা।
    তিন : ১৯৭১ এরপর থেকে বাংলাদেশে ইসলামী দলগুলোর অবস্থান এবং
    চার : ফলাফল বিশ্লেষণ।

    উপমহাদেশে খিলাফত আন্দোলন

    ১৯১৪ সালে ১ম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে বৃটেন তাদের বৃহত্তম উপনিবেশ ভারতবর্ষে যাতায়াতের পথ খোলা রাখার জন্য আরব দেশগুলোকে উসমানী খিলাফত থেকে ছিনিয়ে নেয়ার জোর চক্রান্ত চালাতে থাকে। এতদুদ্দেশ্যে খিলাফত বিরোধী মনোভাব উস্কে দেয়ার জন্য তারা আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের দক্ষ গুপ্তচরদেরকে নিয়োগ করে। বৃটিশদের হয়ে আরব এলাকায় খিলাফত বিরোধী চেতনা ও আরব জাতীয়তাবাদী ধারণা ছড়ানোর গোয়েন্দাবৃত্তিতে নেতৃত্ব দানকারী কর্ণেল টি.ই. লরেন্স এর প্রচেষ্টায় গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে তারা উত্তপ্ত ও বিভক্ত করে ফেলে। ভারত উপমহাদেশের উলামাগণ খিলাফতের এই বিপদ দেখে ভীষণভাবে আতংকিত হয়ে উঠেন। যে কোন মূল্যে খিলাফত শাসন বহাল রাখার জন্য তারা জোর তৎপরতা শুরু করেন। খিলাফত রক্ষার জন্য ভারতীয় উলামাদের সেই প্রাণান্তকর প্রচেষ্টাকেই ইতিহাসে ‘খিলাফত আন্দোলন’ নামে অবিহিত করা হয়।

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভারতের মুসলমানরা ব্রিটিশকে এই শর্তে সমর্থন দিয়েছিল যে, ব্রিটিশরা তুরস্কের খলীফার কোন ক্ষতি করবে না। কিন্তু এই যুদ্ধে তুরস্ক ও জার্মানি মিত্রশক্তির কাছে পরাজিত হলে ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তি তুর্কী খিলাফতকে বিভক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। পবিত্র মক্কা ও মদীনা খ্রিষ্টানদের করতলগত হবার আশস্কায় ভারতের মুসলমানরা ১৯১৯ সালের ৭ অক্টোবর খিলাফত দিবস পালন করে। খিলাফত রক্ষাকল্পে ভারতীয় মুসলমানগণ দেশব্যাপী গড়ে তোলে তীব্র আন্দোলন।

    এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন-ভারতের বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দ এর তৎকালীন মুহতামিম শায়খুলহিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহ.), মাওলানা মুহাম্মাদ আলী জাওহার এবং মাওলানা শওকত আলী ভ্রাতৃদ্বয়, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, ড. মুক্তার আহমদ আনসারী প্রমুখ।

    খিলাফত আন্দোলন হচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আন্দোলন। মাওলানা মুহাম্মাদ আলী জাওহার এবং মাওলানা শওকত আলী ভ্রাতৃদ্বয় ১৯১৯ সালে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, ড. মুক্তার আহমদ আনসারী প্রমুখকে সঙ্গে নিয়ে খিলাফত আন্দোলন নামের এই সংগঠনটির কাজ শুরু করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল : তুর্কী খিলাফতকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা। এই একটি মাত্র সংগঠন ভারতের সকল ঘরানার উলামা ও সাধারণ মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে যে, খিলাফতই হচ্ছে এক উম্মাহ্‌র ঐক্যের প্রতীক। এখানে উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী ছিলেন একজন উচ্চতর হানাফী। অথচ তার সাথে এই আন্দোলনে ঘনিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন যে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তিনি ছিলেন একজন গায়ের মুকাল্লিদ। এভাবে সকল মাসলাক, মাশরাফ ও মাযহাবের উলামাগণ খিলাফত ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন।

    ১৯২০ সালে বঙ্গ প্রদেশের আহসান মঞ্জিলে অনুষ্ঠিত খিলাফত কন্‌ফারেন্সের সভাপতির ভাষণে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ খিলাফতের গুরুত্ব বর্ণনা করে বলেছিলেন : এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলমানদেরকে সিরাতে মুস্তাকীমের উপরে চালানোর জন্য সংগঠিত করা এবং দুনিয়াতে আল্লাহ্‌’র কালামকে বুলন্দ করা। এর জন্য জরুরী হচ্ছে খলীফার হাতে যথাযথ কর্তৃত্ব থাকা। মাওলানা আজাদ বিশ্বাস করতেন মুসলমানদের খলীফা বিহীন জীবনই হচ্ছে ইসলাম বিহীন জীবন। খিলাফত বিহনে বসবাস করলে মুসলমানদেরকে আখেরাতে জবাব দিতে হবে। ‘মাসআলায়ে খিলাফত’ নামে এক গ্রন্থে তিনি লিখেছেন : “খিলাফত বিহীন ইসলামের অস্তিত্ব অসম্ভব। ভারত বর্ষের মুসলমানদের উচিত সর্বশক্তি দিয়ে খিলাফতের জন্য কাজ করা।” মাওলানা শওকত আলী কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটির পক্ষ থেকে এই ঘোষণা জারী করেছিলেন যে আমরা আশা করি ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রাণ মুসলিমগণ ভারতবর্ষে অবস্থান করে বৃটিশ রাজের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেবে। তা অসম্ভব হয়ে উঠলে খিলাফত রাষ্ট্রে হিজরত করার চিন্তা করবে। ভারতবর্ষের বিশিষ্ট উলামাগণ এই আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করেছিলেন। মাওলানা সাইয়েদ সুলায়মান নদভী জোর দিয়ে বলতেন মুসলমানদের জন্য একজন খলীফা থাকা ফরয। ১৯২০ সালে মাওলানা মুহম্মাদ আলী জাওহারের সঙ্গে এক প্রেস কন্‌ফারেন্সে উপস্থিত তার সঙ্গী সাইয়েদ হুসাইন বলেছিলেন যদি দুনিয়াতে ইসলামের অস্তিত্ত্ব বজায় রাখতে হয়, তাহলে মুসলমানদের একজন খলীফার উপস্থিতি অপরিহার্য্য।

    শায়খুলহিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান কঠিন পরিশ্রম করে খিলাফতের অধীনে যুদ্ধরত সৈনিকদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে খলীফার নিকট প্রেরণ করতেন। তিনি রাশিয়া এবং তুরস্কের যুদ্ধে উসমানী খিলাফতকে সার্বিক সহযোগীতা প্রদান করেছিলেন। খিলাফতের সাহায্যার্থে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসা বন্ধ ঘোষণা করেন। ছাত্রদের একটি বিশাল বাহিনীকে তুরস্কে প্রেরণ করে অপর আরেকটি বাহিনী নিয়ে নিজে তুরস্ক চলে যান। তিনি জানতেন সমগ্র ইউরোপ ঐক্যবদ্ধ হয়ে খিলাফত ধ্বংসের মাধ্যমে ইসলামের প্রদীপকে নিভিয়ে দিতে সংকল্পবদ্ধ হয়েছে। তাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভারত বর্ষের মসজিদগুলোতে খুতবার মাঝে খিলাফতের কথা উল্লেখ করা হতো এবং নামাজে মুসলমানদের বিজয় ও কাফেরদের পরাজয়ের জন্য দোয়া করা হতো। খিলাফত আন্দোলনের আরেক মহান ব্যক্তিত্ব মওলানা শওকত আলীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল আপনি কেন খুতবায় তুর্কী সুলতানের নাম অন্তর্ভূক্ত করেন। তিনি জবাবে বলেছিলেন, কারণ তুর্কী সুলতান এই মূহুর্তে মুসলমানদের খলীফা। বৃটিশ সামাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র থেকে খিলাফত রাষ্ট্রকে রক্ষার জন্য মাওলানা মাহমুদুল হাসান তার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। এই জন্য তিনি হিজাজ সফর করেন। গভর্নরের পক্ষ থেকে ভারতবর্ষের মুসলমানদের জন্য পত্র মারফত এই অনুরোধ নিয়ে এসেছিলেন যে তারা যেন বৃটিশ সরকারের বিরুদ্ধে খিলাফত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। এই চিঠি ইতিহাসে গালিব নামা নামে খ্যাত। খিলাফতের পক্ষে এই ধরণের তৎপরতার দরুন নিষ্ঠুর ইংরেজ শাসকরা মাওলানা মাহমুদুল হাসানের উপর কঠিন চাপ সৃষ্টি করে। সত্য ভাষণ থেকে নিবৃত করা এবং ইংরেজ সরকারের বিপক্ষে গিয়ে উসমানী খিলাফতকে সমর্থন দেয়া থেকে বিরত রাখার জন্য তাঁর উপর অনেক অত্যাচার করা হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁকে সুদূর মাল্টাদ্বীপে নির্বাসনে পাঠানো হয়। ইংরেজরা দাবী করেছিল তিনি যেন মক্কার বিশ্বাসঘাতক গভর্নর শরীফ হোসেনকে ইংরেজদের স্বার্থে সমর্থন দিয়ে খিলাফতের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারী করেন। এ জঘণ্য অন্যায় কাজটি করতে অস্বীকার করায় গাদ্দার শরীফ হোসেন তাকে এবং তার সঙ্গীদেরকে মক্কায় গ্রেফতার করে ইংরেজদের হাতে তুলে দেয়।

    অন্য সব বিষয় নিয়ে কম-বেশী মতভেদ থাকলেও খিলাফত আন্দোলন নিয়ে মুসলিম শিক্ষাবিদদের মাঝে কোন প্রকার অনৈক্য ছিল না। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তার বিখ্যাত পত্রিকা “আল হেলাল”-এ ১৯১২ সালের ২রা নভেম্বর সংখ্যায় নিজের অভিমত এভাবে ব্যক্ত করেছেন : “শুধু উসমানী খিলাফতের হাতেই এখন সেই তলোয়ার আছে যা মুসলিমদেরকে রক্ষা করতে পারে। খিলাফতই হচ্ছে শরীয়তের একমাত্র কর্তৃপক্ষ। এই ব্যবস্থা ওহির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে। এই কর্তৃপক্ষের আনুগত্য করা আল্লাহ্‌’র নির্দেশ। খিলাফতের বিধি-বিধান মেনে চলা ফরয।”

    এভাবে খিলাফত রক্ষার আন্দোলন ভারতময় ছরিয়ে পড়লেও ১৯২৪ সালে তুরস্কে উসমানী খিলাফতের পতনের পর এর ধারাবাহিকতায় এক প্রকার ভাটা পড়ে। তাছাড়া বৃটিশ শাসনের শেষের দিকে স্বাধীনতা আন্দোলনকে প্রাধান্য দেওয়া এবং দেশভাগের প্রশ্নে মতানৈক্য সৃষ্টির ফলে খিলাফতের চেতনা অনেকটাই হ্রাস পেয়ে যায়। যার কুপ্রভাবে উম্মাহ্‌ আজও ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি।

    পাকিস্তান আমলে এ অঞ্চলে ইসলামী দলগুলোর ভূমিকা

    বৃটিশদের কারসাজি এবং মুসলিম লীগের অপরিনামদর্শী তৎপরতার দরুন ভারত বিভক্তির পর পূর্ব-পাকিস্তান নামক অঞ্চলটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় দিক থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন ও অরক্ষিত হয়ে পড়ে। একই রাষ্ট্রভূক্ত দুই অংশের দূরত্ব হয়ে যায় প্রায় ১৯৩২ কিলোমিটার। মাঝখানে থেকে যায় শত্রু রাষ্ট্র ভারত। ভৌগলিকভাবে শুধুমাত্র দক্ষিণের বঙ্গোপসাগর ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের বাকী তিন দিকই রয়ে যায় ভারতের বেষ্টনীতে। রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের অধীনতা, অর্থনৈতিকভাবে শাসকদের বিমাতাসুলভ আচরণ, রাষ্ট্রের মূল নেতৃত্বের সাথে ভাষা ও সংস্কৃতিগত বৈপরিত্য ইত্যাদি সমস্যা ছাড়াও তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের ইসলামী নেতৃবৃন্দের জন্য আরো অনেক সংকট দেখা দেয়। প্রথমত, ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার আশায় পাকিস্তান সৃষ্টির যুক্তি কোনভাবেই তাদের অনুকূলে যায়নি। কারণ শাসকরা প্রথম দিন থেকেই বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে পাকিস্তানকে একটি সেক্যুলার রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যেতে শুরু করে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ইসলামী দলেরই মূল নেতৃত্ব ও কেন্দ্র পড়ে যায় পশ্চিম-পাকিস্তানে। ফলে তাদের কর্ম চেতনায় বড় ধরণের ছন্দপতন ঘটে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, পাকিস্তান সৃষ্টির সময় এ অঞ্চলে মুসলিম লীগই ছিল প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল। আরও যে কয়টি দল তখন ইসলামী দল হিসাবে পরিচিতি লাভ করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামী এবং নিখিল ভারত জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম যা পরবর্তীতে নেজামে ইসলাম পার্টি নামে পুণঃর্গঠিত হয়। তাছাড়া পরবর্তীতে খেলাফতে রব্বানী নামের একটি দলও এখানে বেশ তৎপর ছিল। বর্তমানে অবশ্য এর অস্তিত্ব বিদ্যমান নেই।

    পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথম থেকেই পশ্চিম-পাকিস্তানী নেতারা পূর্ব-পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে এ বৈষম্যের ছাপ ছিল সুস্পষ্ট। দিনে দিনে পুঞ্জীভূত এ বৈষম্যের ফলে পূর্ব পাকিস্তানে গড়ে ওঠে কতগুলো বড় বড় আন্দোলন। এগুলোর মধ্যে ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ এর ছাত্র আন্দোলন, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ এর মুক্তিসংগ্রাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব আন্দোলনের সময় পাকিস্তানপন্থী ইসলামী দলগুলোর নেতিবাচক আচরণে গণমানুষের অধিকার আদায়ে ইসলামের ভূমিকা নিয়ে জনমনে তৈরী হয় বিভ্রান্তিকর আবহ। এই প্রসঙ্গে আমি ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৯ এর অভ্যুত্থান পর্যন্ত তৎপর কয়েকটি ইসলামী দলের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করব।

    মুসলিম লীগ

    ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম লীগ। প্রধানতঃ ইংরেজ শাসকদের অনুগ্রহ ভাজন উপমহাদেশীয় তথাকথিত প্রগতিশীল মুসলিম নেতৃবৃন্দের সেই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন নবাব ভিকারুলমূলক। সভায় নবাব সলিমুল্লাহর প্রস্তাব অনুসারে সর্বসম্মতিক্রমে এই দলটির নাম রাখা হয় ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ’। ভারতবর্ষে মুসলমানদের নিয়ে ইংরেজদের নীল-নকশা বাস্তবায়নের সহযোগী শক্তি হিসাবেই এ দলটি কাজ শুরু করে। বাহ্যত ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেও এ দলের প্রধান ভূমিকা ছিল জাতীয়তাবাদ ও আঞ্চলিকতার ভিত্তিতে বিচ্ছিন্নতাবাদের চেতনাকে সংগঠিত করা।

    কংগ্রেসের মত মুসলিম লীগেরও প্রতিষ্ঠাকালীন অন্যতম ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইংরেজ শাসকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করা। নওয়াব সলিমুল্লাহ নিজে ছিলেন ইংরেজদের সাথে সহযোগিতার পক্ষপাতী। মুসলিম লীগের অন্যান্য নেতারাও দাবী-দাওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন নিবেদন জানানোর বাইরে নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রামের কথা চিন্তা করেননি। ১৯০৬ সালের যে সম্মেলনে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়, তাতে যোগদানের জন্য আমন্ত্রিত হয়েও সে আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ব্যারিষ্টার মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তাঁর বক্তব্য ছিল কংগ্রেসের বাইরে নতুন আরেকটি সংগঠন সৃষ্টি করা হলে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে অনৈক্য বাড়বে। তাঁকে বলা হত হিন্দ-মুসলমান মিলনের অগ্রদূত। পরে অবশ্য ব্যারিষ্টার জিন্নাহ কংগ্রেস ছেড়ে মুসলিম লীগে যোগ দেন। শুধু তাই নয়, একজন ইসমাঈলী শীয়া হওয়া সত্ত্বেও তিনি মুসলিম লীগের সভাপতির পদ লাভ করেন এবং তার সভাপতিত্বেই মুসলিম লীগ পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলন করে।

    বৃটিশ শাসনের শেষের দিকে পাকিস্তান সৃষ্টির প্রস্তাবকে সর্বস্তরের মুসলিমদের নিকট গ্রহণযোগ্য করার জন্য এই দলের তৎকালীন নেতারা বক্তৃতা-বিবৃতি ও প্রচার-পত্রের সাহায্যে ইসলামের বিজয়কে পাকিস্তান কায়েমের লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেন। ‘পাকিস্তানের লক্ষ্য কি, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’- এ ধরণের শ্লোগান তারা জনসম্মুখে তুলে ধরেন। তদানিন্তন প্রাদেশিক মুসলিম লীগের পক্ষে প্রচার সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদ স্বাক্ষরিত একটি প্রচারপত্রে ‘হুকুমতে ইলাহিয়া’ প্রতিষ্ঠাকে পাকিস্তান কায়েমের উদ্দেশ্য বলে ঘোষণা করা হয়। এভাবে তারা মানুষকে বুঝায় যে, পাকিস্তান কায়েম হলেই ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম হবে।

    কিন্তু দেশ ভাগের মাধ্যমে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগ ক্ষমতাসীন হয়ে ইসলাম কয়েমের ধারে কাছেও হাঁটেনি। ক্ষমতা রক্ষা করাই হয়ে যায় তাদের একমাত্র আদর্শ। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ইসলামী রাষ্ট্রের শ্লোগানে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন পাকিস্তানের প্রথম কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভাই গঠিত হয় হিন্দু ও কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের মন্ত্রীদের সমন্বয়ে।

    ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের কান্ড দেখে দলটির স্বাধীনচেতা লোকেরা বেজায় ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত হয়ে উঠে। অনেকেই নবাব-জমিদারদের মুসলিম লীগ ছেড়ে একটি ‘জনগণের মুসলিম লীগ’ গঠনে উদ্যোগী হয়। সে অনুসারে আসাম থেকে আগত মুসলিম লীগ নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও টাঙ্গাইলের জনাব শামসুল হককে যথাক্রমে সভাপতি ও সেক্রেটারী করে ১৯৪৯ সনের ২৪ জুন ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে নতুন আরেকটি দল গঠন করা হয়। পরবর্তীকালে হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী এই দলের সাথে সম্পৃক্ত হন এবং তার অনুসারী শেখ মুজিবুর রহমান নিযুক্ত হন এর অন্যতম জয়েন্ট সেক্রেটারী। মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগিশ, এডভোকেট আতাউর রহমান খান প্রমুখ ব্যক্তিত্বও এই দলের সাথে সম্পৃক্ত হন। এ দলটির মাধ্যমেই তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে অঞ্চল-ভিত্তিক রাজনীতির এক নতুন ধারা সূচিত হয়। কিন্তু এর দ্বারা ইসলামের তো কোন উপকার হয়ইনি বরং এক সময় দলটির নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটিকেই উচ্ছেদ করে (১৯৫৫সালে) সম্পূর্ণ সেক্যুলার আওয়ামী লীগের জন্ম হয়। এভাবেই মুসলিম লীগ সৃষ্টির মাধ্যমে মুসলমানদেরকে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেতনা থেকে বিরত রাখা হয়। ইংরেজ শাসনের পূর্বে ভারতবর্ষে মুসলমানদের আটশ’ বছর শাসন করার সুদীর্ঘ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও হিন্দুদের হাতে ভবিষ্যতে মুসলমানদের স্বার্থ ভুলুন্ঠিত হওয়ার কাল্পনিক ভয় দেখিয়ে উম্মাহ্‌র মধ্যে জন্ম দেয়া হয় সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের এক কূটিল চিন্তা। হুকুমতে ইলাহিয়ার নামে মনোমুগ্ধকর শ্লোগানের আবরণে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয় বিশাল মুসলিম শক্তিকে। এদের ভুল রাজনীতি চর্চার পরিণতিস্বরূপ গোটা পরিস্থিতিই চলে যায় সেক্যুলারদের হাতের মুঠোয়।

    অবশ্য ইসলামের নামে প্রতারণার দায়ে মুসলিম লীগও এ ভূখন্ডে জনগণের প্রচন্ড ক্ষোভের মুখে পড়ে। এতো জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসার মাত্র সাত বছরের মাথায় তারা একেবারে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক নির্বাচনে ৩০৯টি আসনের মধ্যে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ মাত্র ৯টি আসনে নির্বাচিত হয়। এতে মুসলিম লীগ শুধু ক্ষমতাচ্যুতই হয়নি বরং পূব-পাকিস্তানের রাজনৈতিক মঞ্চ থেকেই উৎখাত হয়ে যায়।

    জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম

    এটি মূলতঃ ভারতবর্ষকে বৃটিশ শাসনের কবল থেকে মুক্ত করার সংগ্রামে লিপ্ত বিপ্লবী উলামাদের একটি দল ছিল। যারা ছিলেন শাহ্‌ ওয়ালী উল্লাহ মোহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) এর ভাবশিষ্য। জেহাদে আযাদী নামে দীর্ঘ সংগ্রামের শেষের দিকে ১৯১৯ সালে এই দলটি সাংগঠনিক রূপ লাভ করে। প্রথমে এর নামকরণ করা হয় ‘জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ’। শায়খুলহিন্দ মাওলানা মাহমূদুল হাসান দেওবন্দীকে এই দলের সদর বা প্রধান নিযুক্ত করা হলেও তিনি তখন মাল্টা দ্বীপে বৃটিশদের হাতে বন্দী থাকায় মুফতী কেফায়েতুল্লাহকে ভারপ্রাপ্ত সদর ঘোষণা করে এর কার্যক্রম শুরু করা হয়। ইংরেজ শাসনের শেষপ্রান্তে এসে জমিয়ত নেতৃবৃন্দ বৃটিশ খেদাও আন্দোলনের পাশাপাশি মুসলমান ও ইসলামের স্বার্থে ভারতকে অখন্ড রাখার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। দেশভাগ হয়ে যাওয়ার পর এ অঞ্চলে জমিয়তের রাজনৈতিক তৎপরতা অনেকাংশে হ্রাস পায়। পশ্চিম-পাকিস্তানের তুলনায় তখন পূর্ব-পাকিস্তানে জমিয়তের শক্ত কোন সাংগঠনিক অবস্থানও ছিলনা। দলের প্রধান সারির নেতারা হয় ভারতের নাহয় পশ্চিম-পাকিস্তানের বাসিন্দা ছিলেন। এর পাশাপাশি আরো দুটি কারণে জমিয়ত এখানে দুর্বল ছিল। এক, বৃটিশ শাসন অবসানের পর এই উপমহাদেশে পুর্ণাঙ্গ ইসলাম বা খিলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাদের কোন পরিকল্পিত কর্মসূচী ছিলনা। দুই, এই অঞ্চলে মুসলিম লীগের প্রাধান্য থাকার কারণে সাধারণভাবে জনমত গড়ে উঠেছিল ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান হওয়ার পক্ষে। ফলে পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধী শক্তি হিসাবে জমিয়তের জনসম্পৃক্ততাও ছিল কম। পূর্ব-পাকিস্তানে এই দলটি অনেকটা সিলেটেই সীমাবদ্ধ থাকে। এর আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো এ দলটি শুধুমাত্র উলামা ও মাদরাসা ছাত্র-নির্ভর। জনসম্পৃক্ততা না থাকায় ‘৪৭ পরবর্তী সময়ে পূর্ব-পাকিস্তানে জমিয়ত কেবল কিছু ধর্মীয় ইস্যুতে মিটিং-মিছিল ছাড়া সার্বিক রাজনীতি ও জাতীয় ইস্যুতে প্রভাব ফেলার মত কোন ভুমিকাই পালন করতে পারেনি।

    নেজামে ইসলাম পার্টি

    ১৯৪৫ সালের ২৮ ও ২৯ অক্টোবর কলিকাতার মুহাম্মদ আলী পার্কে মুসলিম লীগের প্রত্যক্ষ সমর্থনে একটি উলামা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলন থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘নিখিল ভারত জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম’ নামে একটি নতুন সংগঠন। এই নতুন জমিয়ত পাকিস্তান প্রশ্নে মুসলিম লীগের পক্ষ নেয়। কিন্তু দেশভাগের পর মুসলীম লীগ নেতৃবৃন্দের ওয়াদা ভঙ্গের ফলে নবগঠিত পাকিস্তানে ‘নেজামে ইসলাম’ তথা ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়া সুদূর পরাহত দেখে তারা নিরাশ হয়ে পড়েন। এক প্রকার প্রতারিত হয়েই ১৯৫২ সালে নিখিল ভারত জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের নেতৃবৃন্দ মুসলিম লীগের সঙ্গ ত্যাগ করে ‘নেজামে ইসলাম পাটি’ নামে পৃথক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই লক্ষ্যে ‘৫২ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ মার্চ বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার হযরত নগরে দলটির কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত অধিবেশনেই মাওলানা আতহার আলী (রহ.) কে সভাপতি, মাওলানা সৈয়দ মুসলেহ উদ্দিনকে সাধারণ সম্পাদক এবং মাওলানা আশরাফ আলী ধর্মন্ডলীকে সহকারী সম্পাদক নির্বাচিত করে ‘নেজামে ইসলাম পার্টি’র কার্যক্রম শুরু হয়। যে কোন মূল্যে পাকিস্তানে নেজামে ইসলাম তথা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে এই পার্টির প্রধান লক্ষ্য হিসেবে স্থির করা হয়। এই একটি মাত্র কথার আকর্ষণ এবং মুসলিম লীগের তুলনায় এই দলের নেতৃতে বড় বড় উলামা থাকায় অল্পদিনেই নেজামে ইসলাম পার্টি একটি শক্তিশালী বৃহৎ দলে পরিণত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে প্রচলিত ধারায় রাজনীতি করা এবং সেক্যুলার রাজনীতির সহযোগী শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হওয়ায় এই দল নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। এর প্রতিষ্ঠাতা নেতাগণ যথেষ্ঠ যোগ্য এবং ক্ষমতা সম্পন্ন আলিম হওয়া সত্বেও পশ্চিমা ধারার গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহ বিহীন সংবিধান দ্বারা পরিচালিত সরকারে অংশ নিয়েছেন। অথচ এমনটি না করে গোটা পশ্চিমা ব্যাবস্থার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবার মত জনসমর্থন এক সময় তাদের ছিল। কিন্তু এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি তারা পরিহার করেছেন। যার ধারাবাহিকতায় বর্তমানে এটি একটি নামে মাত্র দলে পরিণত হয়েছে।

    যুক্তফ্রন্ট গঠন ও নির্বাচিত সরকারে নেজামে ইসলামের অংশ গ্রহণ

    পশ্চিমা ধারার গণতান্ত্রিক নির্বাচন নেজামে ইসলাম বা ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি না হওয়া সত্ত্বেও ১৯৫৪ সালে নেজামে ইসলাম পার্টি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়। শুধু তাই নয়, এই নির্বাচনে তাদের এককালের পৃষ্ঠপোষক ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে পরাজিত করার লক্ষ্যে অপরাপর বিরোধী দলগুলোর সমন্বয়ে একটি যুক্তফ্রন্টও গঠন করা হয়। এই ফ্রন্টে নেজামে ইসলাম পার্টি ছাড়া আরও যে সব দল ছিল সেগুলো হলো আওয়ামী লীগ, কৃষক লীগ ও কৃষক শ্রমিক পার্টি। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রতীক ছিল ‘নৌকা’। যা বর্তমানে আওয়ামী লীগের পরিচয় চিহ্নে পরিণত হয়েছে। ফ্রন্টের পক্ষ থেকে ২১-দফা দাবি সম্বলিত একটি নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করা হয়। এর ভূমিকায় শুধু বলা হয় : ‘কুরআন ও সুন্নাহ-বিরোধী কোন আইন প্রণয়ন করা হবে না।’ ব্যাস এই নেতিবাচক কথাটুকু ছাড়া পুরো ইশতেহারে ইসলামের সপক্ষে কোন ইতিবাচক বক্তব্য ছিল না। এতেই প্রমাণ হয়ে যায় যে এই নির্বাচন নেজামে ইসলাম কায়েমের নির্বাচন ছিলনা। তবু নির্বাচন পরবর্তী কুরআন-সুন্নাহ বিহীন সংবিধান দ্বারা পরিচালিত সরকারে নেজামে ইসলাম পার্টি অংশ নেয় এবং মন্ত্রিত্ব লাভের সুবাদে গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারনী ভূমিকা পালন করে। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে দলটির ৩৬ জন নেতা নির্বাচিত হন। জাতীয় পরিষদে সংসদীয় দলের নেতা ছিলেন দলীয় সভাপতি মাওলানা আতহার আলী (রহ.)। এডভোকেট মৌলভী ফরিদ ছিলেন কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রী। প্রাদেশিক পরিষদের স্পীকার ছিলেন আব্দুল ওহাব খান। এছাড়া আইন, ভূমি ও শিক্ষা মন্ত্রনালয়ও ছিল নেজামে ইসলাম পার্টির মন্ত্রীদের দায়িত্বে। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী মুহাম্মদ আলী পরবর্তীতে নেজামে ইসলাম পার্টিতে যোগ দিলে তাকে দলের সভাপতি নিযুক্ত করা হয়।

    যুক্তফ্রন্টের সরকার ছিল খুবই ক্ষণস্থায়ী, দুর্বল এবং অন্তর্কলহে জর্জরিত। মাত্র ৫৭ দিনের মাথায় এসে ১৯৫৪ সালের ৩০ মে এই সরকারের মন্ত্রীসভাকে বরখাস্ত করা হয়। এ ধরণের জোট ও সরকারে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে নেজামে ইসলাম পার্টি তাদের মূল দাবী তো পূরণ করতে পারেইনি বরং এর পর থেকে তারা দ্রুত জনগণের আস্থা হারাতে শুরু করে। তবুও পরবর্তীতে ইসলামী দলগুলোর জন্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন করা এবং সেক্যুলার সংবিধান দ্বারা পরিচালিত সরকারে অংশ নেওয়ার জন্য এসব ঘটনাবলী দলীল হয়ে দেখা দেয়।

    জামায়াতে ইসলামী

    এ দলটি গঠন করা হয় ১৯৪১ সালের ২৫ আগষ্ট। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন পাঞ্জাবের অধিবাসী মাওলানা আবুল আলা মওদুদী। এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের জায়গায় ইসলামী হুকুমত বা আল্লাহ্‌’র আইনের কথা থাকলেও জামায়াতে ইসলামী তাদের ইতিহাসে কখনও ইসলামের একমাত্র শাসন ব্যবস্থা খিলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করেনি। উল্টো তারা খিলাফতের দাবীকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে বিভিন্নভাবে। তাদের বই-পত্রে শিয়াদের মতো করে খোলাফায়ে রাশেদীন এবং পরবর্তী খলীফাদের অনেকের বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর সমালোচনা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, খিলাফত আন্দোলনকে নিরুৎসাহিত করার জন্য খিলাফত শাসন ব্যবস্থা নিয়েও তারা অনেক ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও কটাক্ষ করেছে এবং এখনও করছে।

    ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের আগে পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াতে ইসলামী’র কোন সংগঠন ছিলনা। শুধু তাই নয় মাওলানা মওদুদীর পুস্তিকাদি উর্দূ ভাষায় লিখিত হওয়ায় এ অঞ্চলে তখন জামায়াতে ইসলামীর কোন পরিচিতিই ছিল না। আইডিএল ও ইসলামী ঐক্য আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবদুর রহীমই প্রথম ব্যক্তি, যিনি জামায়াতে যোগদান করে এই অঞ্চলে দলটির ভিত্তি স্থাপনে সক্রিয়ভাবে উদ্যোগ নেন। তার প্রচেষ্টায় ১৯৪৬ সনে এই ভূখন্ডে জামায়াতের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর তিনি জীবনের যাবতীয় শক্তি একত্রিত করে জামায়াতকে এ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত করেন। অবশ্য এক পর্যায়ে তিনি জামায়াতের সাথে তার সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

    রাজনৈতিক দল হিসাবে জামায়াত প্রথম থেকেই অন্যান্য ইসলামী দলের তুলনায় একটি মজবুত সংগঠন। কিন্তু ইসলামী চিন্তা ও কর্ম পদ্ধতির দিক থেকে এর কোন স্থায়ী অবস্থান তৈরী হয়নি। দলটির আদর্শিক অস্থিতিশীলতা এবং পক্ষ পরিবর্তনের ধরণ বুঝার জন্য এতোটুকু জানাই যথেষ্ঠ যে, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপলাভের স্বার্থে এ পর্যন্ত জামায়াত মোট তেরবার গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করেছে। সর্বশেষ অক্টোবর ২০০৮ এ নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন শর্ত রক্ষা করতে গিয়ে গঠনতন্ত্র থেকে তারা اقيمواالدين এবং ‘আল্লাহু আকবার’ খঁচিত মনোগ্রামটি প্রত্যাহার করে। শুধু তাই নয়, যে শ্লোগান দিয়ে এদেশের বহু তরুণকে তারা জীবন দিতে উৎসাহিত করেছিল, সেই ‘আল্লাহর আইন চাই’ কথাটিও নিবন্ধন লাভের জন্য তাদের গঠনতন্ত্র থেকে বাদ দেয়া হয়।

    পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এ অঞ্চলে যে ধরণের ইসলামী দল আশা করে জামায়াত সব সময় নিজেকে সেই রঙে সাজাবার চেষ্টা করেছে। ইসলামী রাজনীতিকে পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের মোড়ক লাগিয়ে পরিবেশন করা এবং সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার শাসকগোষ্ঠীর সাথে আঁতাতের মাধ্যমে পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থাকে দীর্ঘায়ু করতে সব সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে এ দল। এ প্রসঙ্গে আমি তাদের ইতিহাস থেকে কিছু উদাহরণ তুলে ধরছি।

    ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা সারা পাকিস্তানে সামরিক আইন জারী করেন। এর মাত্র ২০ দিন পর সেনাপতি আইউব খান অস্ত্রের মুখে ইস্কান্দার মির্জাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে নিজে প্রেসিডেন্টের পদটি দখল করে নেন। শুরু হয় কঠোর দমন নীতি। দেশ জুড়ে নেমে আসে রাজনৈতিক নিস্তব্ধতা। ১৯৬২ সালের ১মার্চ আইউব খান আরেকটি নতুন সংবিধান জারী করে কয়েক মাসের মধ্যে সামরিক আইন তুলে নেয়। নতুন সংবিধানে দেশকে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র’ বলা হলেও কুরআন-সুন্নাহ মুতাবেক আইন রচনার কোন অঙ্গীকার তাতে ছিলনা। ফলে দেশ জুড়ে ইসলামী সংবিধানের দাবীতে আইউব বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। কিন্তু জামায়াত এই আন্দোলনের পরিবর্তে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের’ নামে এক উদ্ভট আন্দোলন শুরু করে। এমনকি, এই ক্ষেত্রে সোহ্‌রাওয়ার্দীসহ দেশের ধর্মবিমুখ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও দলগুলোর সাথেও ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে তোলে। এটিই ছিল জামায়াতের পক্ষ থেকে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের’ প্রথম আন্দোলন এবং এভাবেই ইসলামী দাওয়াতের পরিবর্তে ‘গণতন্ত্র উদ্ধার’ করা জামায়াতের প্রধান কাজ হয়ে দেখা দেয়।

    ১৯৬২ সনে ডিক্টেটর আইয়ুব খান নতুন সংবিধানের মাধ্যমে ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ (Basic Democracy) নামে দেশে এক আজব ‘গণতান্ত্রিক’ পদ্ধতি চালু করে। এর অধীনে ১৯৬৪ সনের সেপ্টেম্বর মাসে দেশে একটা প্রহসনের নির্বাচন ডাকা হয়। জামায়াতসহ অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলো আইয়ুবের পাতা এই ফাঁদে সহজেই পা দেয়। শুধু তাই নয় এই নির্বাচনে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি প্রভৃতি দলের সমন্বয়ে সম্মিলিত বিরোধী দল COP নামে একটি মোর্চা গঠন করে। এই মোর্চা থেকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র বোন ফাতেমা জিন্নাহকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসাবে আইয়ুবের বিরুদ্ধে বিরোধী দলসমূহের একমাত্র প্রার্থীরূপে মনোনয়ন দেয়া হয়। উপমহাদেশে নারী নেতৃত্বের প্রতি এই প্রথমবারের মতো জামায়াতসহ কয়েকটি ইসলামী দলের সমর্থন ইসলামী রাজনীতিকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে। এই ঐতিহাসিক ভুলটিকেই বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক ইসলামী দল নারী নেতৃত্বের অধীনে নির্বাচনী জোট ও সরকারে অংশ গ্রহণের দলীল হিসাবে ব্যাবহার করে থাকে। যদিও ইসলামে নারী নেতৃত্বের কোন অবকাশ নেই। সেদিনের সেই হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে জামায়াত ও তার শরীক দলগুলোর ইসলামী আন্দোলন যে কি তা মানুষের কাছে ম্পষ্ট হয়ে উঠে। তাই ১৯৬৫ সনের নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহ’র চরম পরাজয় ঘটে। এর মাধ্যমে জামায়াত এক প্রকার কোনঠাসা হয়ে পড়ে।

    এই পর্যায়ে এসে দলটি নতুন রূপ ধারণ করে। পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট’ (PDM) নামে পুনরায় একটি জোট গঠন করে। জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এবার আট-দফা দাবির ভিত্তিতে নতুন করে আইয়ুবের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। কিন্তু ১৯৬৭ সালে যখন ৬ দফার ভিত্তিতে আইয়ুবের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে প্রচন্ড গণআন্দোলন শুরু হয়, তখন জামায়াত ৫ দফার নামে আরেকটি আন্দোলন শুরু করে প্রকারান্তরে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনকে ব্যহত করার চেষ্টা করে। তারা বার বার অন্যায়ভাবে ইসলামকে জনস্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে। পশ্চিম পাকিস্তানের জালিম শাসকদের অনুকুলে চলে যায় তাদের অবস্থান। এটিই ছিল জামায়াতের জন্যে একটি গুরুতর রাজনৈতিক বিপর্যয়। এ থেকেই জামায়াত জনস্বার্থ বিরোধী একটি বিচ্ছিন্ন দলে পরিণত হয়। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বিষয়টিকে আরো সুস্পষ্ট করে তোলে।

    ১৯৭০ সনে জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামী দল যৌথভাবে সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদন্দ্বীতা করে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে একেবারে শূন্যের কোটায় নেমে আসে। এমনকি পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশে) দলটির অস্তিত্ব পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়ে যায়।

    ১৯৭১ সনে স্বাধীনতা আন্দোলন চলাকালে জামায়াত নেতাদের ভুমিকার দরুণ এ অঞ্চলে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের যে ক্ষতি হয়েছে তা আজও পূরণ করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তারা পূর্বের সুবিধাবাদী আন্দোলনের ধারা বর্জন করেনি। ১৯৯১ সালে নির্বাচনের পর বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে জামায়াত বেগম খালেদা জিয়াকে সমর্থন দেয়। এরপর ১৯৯৫ সালে আরেক মহিলা নেত্রী আওয়ামীলীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার সাথে ঐক্য গড়ে তাদেরই সমর্থনে গড়া খালেদা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। এভাবেই বরাবর অস্বচ্ছ ও ভুল পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে যে, মুখে ইসলামের কথা বললেও রাজনৈতিক সুবিধার বিপরীতে ইসলামী স্বার্থ কখনই তাদের কাছে মূখ্য ছিল না।

    এখানে একটি তথ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ১৯৬৪ সনের ৬ জানুয়ারী জামায়াতকে নিষিদ্ধ দল হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এর আগে ১৯৫৭ সালে জামায়াত প্রথম বারের মত ভাঙ্গনের সন্মুখীন হয়। দলের অভ্যন্তরে এক তীব্র আদর্শিক সংকট মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। ফলে মওলানা মওদূদী পদত্যাগ করেন। পরে অবশ্য তাকে পদে ফিরতে হয়। তবে ঐ সময় অনেকেই জামায়াত ছেড়ে চলে যায়।

    ১৯৭১ এর পর থেকে বাংলাদেশে ইসলামী দলগুলোর অবস্থান

    ১৯৪৭ পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানের ইসলামী সংগঠনগুলোর ইতিহাস যেমন গৌরবের নয়, তেমনি ১৯৭১ পরবর্তী বাংলাদেশের ইসলামী সংগঠনগুলোও গণ-আকাঙ্খার যথার্থ প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি। মাঝখানে শুধুমাত্র মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এর আহবানে ‘খেলাফত আন্দোলন’ নামে স্বল্প সময়ের জোয়ার ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ছাড়া আর কোন আশার আলো দেখা যায়নি এ সময়ের ইসলামী দলগুলোর আচরণ থেকে। খেলাফত আন্দোলন ভাঙ্গনের মাধ্যমে নিজেদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের জন্য ঐক্যবদ্ধ ও স্বতন্ত্র কোন গতিপথ সৃষ্টি করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এসময়ে ইসলামী দলগুলোর মাঝে ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে পুঁজিবাদী শাসনের অংশীদার হওয়ার প্রবনতা লক্ষ্য করা গেছে সবচেয়ে বেশী। এমপি-মন্ত্রী হওয়ার লোভে নিজ আদর্শ ছেড়ে দিয়ে বড় দলের পিছনে চলার নীতি চালু হয়েছে ব্যাপকভাবে। ইসলামী ইস্যুকে ব্যবহার করে স্বার্থসিদ্ধির জন্য শাসক শ্রেণীর সাথে দর কষাকষি প্রকাশ্য রূপ লাভ করেছে। এইসব আচরণে ইসলামী আন্দোলনের প্রকৃত চেহারা আজ সকলের কাছে অপরিচিত হয়ে গেছে। অথচ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের বৈরী পরিবেশে ইসলামী দলগুলো ভিন্ন এক অঙ্গীকার নিয়ে আন্দোলন শুরু করেছিল। আমাদের রাজনৈতিক সংগ্রামের সহযাত্রী হিসাবে বাংলাদেশে তৎপর ইসলামী দলগুলো সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এখানে একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা হলো।

    বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান ও ইসলামী রাজনীতি

    ১৯৭২ সনে বাংলাদেশের জন্য একটি সংবিধান রচনা করা হয়। সম্পূর্ণ সেক্যুলার দৃষ্টি ভঙ্গিতে রচিত এই সংবিধানের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার পরিকল্পিতভাবে এদেশে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করে। যদিও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জামায়াতে ইসলামী’র ভূমিকা এর জন্য অনেকাংশে দায়ী ছিল, তবুও এই অজুহাতকে ব্যবহার করে প্রথম থেকেই বাংলাদেশকে একটি ইসলামশূন্য রাষ্ট্রে পরিণত করার বিদেশী চক্রান্তের অংশ ছিল এই সংবিধান। সমাজতন্ত্রের তল্পীবাহক ডক্টর কামাল হোসেন ছিলেন এর অন্যতম রচয়িতা। মুজিব সরকারের আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী হিসাবে ১৯৭২ সালের ৩০শে মার্চ এক বিবৃতিতে ডক্টর কামাল বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধানে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ন্যায় মৌলিক নীতিসমূহ বিদ্যমান থাকিবে।’ মূলতঃ এই চার নীতিমালার ভিত্তিতেই তৈরী হয় বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান। যার মাধ্যমে সদ্য স্বাধীন মুসলিম প্রধান এই দেশটিতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজনীতি করার পথ সম্পূর্ণরূপে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়।

    সংবিধান পরিবর্তন ও বিসমিল্লাহ’র রাজনীতি

    ধর্মনিরপেক্ষতার নামে বাংলাদেশকে ইসলামী সভ্যতাশূন্য করার আওয়ামী দুঃসাহস ১৯৭৫ সালে এসে আরও ভয়াবহ রূপ লাভ করে। এক তরফা নির্যাতন চালাবার প্রয়াসে সব দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ করে চালু করা হয় এক দলীয় বাকশালী শাসন। এই জুলুম বেশী দিন টিকেনি। ‘৭৫ এর ১৫ আগষ্ট পট পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতারও পরিবর্তন হয়। দৃশ্যপটে আসেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম বারের মত চালু করা হয় সামরিক শাসন। এরপর ১৯৭৭ সনের শুরুতে জিয়াউর রহমান সংবিধানে একটি সংশোধনী আনেন। যার মধ্যে থাকে বিসমিল্লাহ’র সংযোজন। আর উল্লেখ থাকে ‘আল্লাহ্‌’র উপর পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থাই হবে সংবিধানের মূল ভিত্তি।’ এতেই তৎকালীন ইসলামী দলগুলো জিয়াউর রহমান এবং তার জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে ইসলামের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। এরপর থেকে সম্পূর্ণরূপে ইসলামী আদর্শের বিপরীত অবস্থানে থাকা এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাঁবেদার হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র একটি কুফুরী সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ জড়াবার রাজনীতি দিয়েই জিয়া ও তার বিএনপি এদেশের ইসলামী শক্তির অভিভাবকের মর্যাদা দখল করে নেয়। আর কিছু কিছু ইসলামী দল হয়ে যায় বার বার বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার বাহন। যেন এ দলগুলোর আদর্শই হচ্ছে ইসলামী রাজনীতির লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে বিএনপির জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সেবা করা।

    জামায়াত যেভাবে পুনর্বাসিত হয়

    একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, জেনারেল জিয়াউর রহমান ইসলামী রাজনীতির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়ায় ইসলামী দলগুলোর জন্য কিছুটা অনুকূল পরিবেশ তৈরী হয়। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই জামায়াত নেতারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়ার চেষ্টা শুরু করে। তবে মাওলানা আবদুর রহীম এবার আগের মতো পুরাতন দলের নামে কাজ করতে রাজী ছিলেন না। তাই তিনি আগের দলগুলোর সমন্বয়ে একটি সম্মিলিত ইসলামী দল গঠনের উদ্যোগ নিলেন। এর প্রেক্ষিতে ১৯৭৬ সালে জামায়াতসহ তৎকালীন কয়েকটি ইসলামী দলের নেতৃবৃন্দ একত্রিত হয়ে এই ভাষায় অঙ্গিকার করেন যে, “আমরা অধুনালুপ্ত কতিপয় ইসলামী দলের নেতৃবৃন্দ আল্লাহ্‌’কে হাজির নাজির জেনে এই অঙ্গীকার করছি যে, আমরা অতীতের পরিচিতি ভুলে সম্পূর্ণ নতুন নামে একটিমাত্র ইসলামী দল গঠন করব।” এই অঙ্গীকারের ভিত্তিতে সাবেক জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, খেলাফতে রব্বানী, পিডিপি, বিডিপি, আইডিপি ও ইমারত পার্টিসহ মোট সাতটি দল নিয়ে ‘ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ’ (IDL) নামে একটি নতুন দল গঠন করা হয়। কিন্তু কিছুদিন পর রাজনৈতিক দূর্দিন কেটে গেলে জামায়াত নেতারা আল্লাহ্‌’র নামে নেয়া শপথ ভঙ্গ করে পুনরায় জামায়াতে ইসলামী দলের নামে এ দেশে রাজনীতি শুরু করে। এভাবেই জামায়াত স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ইসলামী রাজনীতিতে অনৈক্যের সূচনা করে এবং ১৯৮০ সনে আইডিএল ভেঙ্গে পূর্বনামে পুনুরুজ্জীবিত হয়।

    মাওলানা আবদুর রহীম এবার আর জামায়াতের রাজনীতির সাথে একাত্ম হননি। তিনি ১৯৮৪ সালের ৩০ শে নভেম্বর আইডিএলকে ইসলামী ঐক্য আন্দোলন নাম দিয়ে নতুন গতিতে রাজনীতি শুরু করেন।

    বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন

    ১৯৮১ সনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে প্রবীণ আলেম মওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন ব্যক্তিত্ব রূপে আবির্ভুত হন। তাঁর ‘তওবার রাজনীতি’র ডাক দেশের রাজনীতি বিমূখ ইসলামী মহলে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিশেষতঃ তার ছাত্র-শিষ্যদের এক উল্লেখযোগ্য অংশ এ ডাকে সাড়া দিয়ে অচিরেই সামনে এগিয়ে আসেন। তাদেরকে নিয়েই তিনি ১৯৮১ সনের ২৯ নভেম্বর ঢাকার ঐতিহাসিক শায়েস্তা খান হলে ‘খেলাফত আন্দোলন’ নামে একটি সংগঠনের কার্যক্রম ঘোষণা করেন। প্রায় ৫০ বছর পর খেলাফত আন্দোলনের নামে এ অঞ্চলে আবার সৃষ্টি হয় এক অভাবনীয় ঐক্যের জোয়ার। স্বাধীনতার পর এই প্রথম উলামাদের মাঝে তৈরী হয় নতুন প্রাণচাঞ্চল্য। ইতি পূর্বে অনেকের মাঝে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে, ইসলামে কোন রাজনীতি নেই। তাছাড়া পাকিস্তান হওয়ার পর খিলাফত কায়েমের সুনির্দিষ্ট দাবীতে এ অঞ্চলে কোন আন্দোলন না থাকায় জাতিগতভাবে সকলেই এই গুরুত্বপূর্ণ ফরযটি তরক করার গুনায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। হজরত হাফেজ্জী হুজুর এ জন্য জাতিগত ভাবে সকলের প্রতি তওবার আহ্বান জানান। মূলতঃ গায়রুল্লাহর প্রবর্তিত প্রতারণার রাজনীতি থেকে আল্লাহ্‌’র প্রবর্তিত সততার রাজনীতিতে প্রবর্তনের নাম দেয়া হয়েছিল তওবার রাজনীতি।

    খেলাফত আন্দোলনের গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছ, খেলাফত আন্দোলন কোন পার্টি নয়, এটি একটি আন্দোলন। দল-মত ও দেশকালের উর্ধ্বে থেকে গোটা মানব মন্ডলীকে আল্লাহ্‌’র যমীনে আল্লাহ্‌’র খেলাফত কায়েমের ডাক দেয়াই ছিল এর উদ্দেশ্য।

    কয়েক বছরের মাথায় হযরত হাফেজ্জী হুজুরের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও জনপ্রিয়তার বিবেচনায় তাঁকে কেন্দ্র করেই দেশের ছোট বড় এগারটি সংগঠন ও কতিপয় বিশিষ্ট নাগরিককে নিয়ে ‘খিলাফত কায়েমের লক্ষ্যে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ’ নামে একটি বৃহত্তর মোর্চা গড়ে উঠে। হাফেজ্জী হুজুরের বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, মাওলানা আব্দুর রহীমের ইসলামী ঐক্য আন্দোলন, মেজর (অব.) এম এ জলীলের জাতীয় মুক্তি আন্দোলন প্রভৃতি সংগঠন এ মোর্চাকে জনগণের আশা-আকাঙ্খার কেন্দ্র-বিন্দুতে পরিণত করার লক্ষ্যে দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করতে থাকেন।

    ১৯৮২ সনের মার্চে সেনাপ্রধান এরশাদ বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখল করলে হাফেজ্জী হুজুর তার বিরুদ্ধে প্রচন্ড আন্দোলন গড়ে তোলেন। তবে জামায়াত এ সময় স্বৈরাচারের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। ১৯৮৬ সনে এরশাদ যখন তার স্বৈরশাসন দীর্ঘায়িত করতে পাতানো নির্বাচনের ব্যবস্থা করে, তখন এ নির্বাচনকে বৈধতা দেয়ার জন্য জামায়াত বিএনপির সঙ্গ ত্যাগ করে আওয়ামী লীগের অনুসরণে নির্বাচনে অংশ নেয়।

    বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টিকরে খিলাফত কায়েমের লক্ষ্যে গঠিত ‘সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ’ তাদের ঐক্য বেশী দিন ধরে রাখতে পারেনি। ফলে হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বে বাংলাদেশে খিলাফতের রাজনীতি যে আশার আলো ফুটিয়েছিল তাও ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। ১৯৮৫ সনে হযরত হাফেজ্জী হুজুরের জীবদ্দশায় তারই শিষ্য শায়খুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হক হাফেজ্জীর নেতৃত্বাধীন দল থেকে বের হয়ে নিজ নেতৃত্বে খেলাফত আন্দোলন (আ-গা) নামে আরেকটি দল গঠন করেন। এ দলটিই ১৯৮৯-এর ১২ অক্টোবর যুব শিবিরের সাথে একাকার হয়ে খেলাফত মজলিস নামে নতুন দল হিসাবে আত্ম প্রকাশ করে। উল্লেখ্য ১৯৮২ সনে অধ্যাপক আহমদ আবদুল কাদেরের নেতেৃত্বে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির থেকে বের হয়ে আসা একটি অংশ যুব শিবির নামে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল।

    ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন

    এই দলটি একক কোন রাজনৈতিক দল হিসেবে যাত্রা শুরু করেনি। বরং অনেকগুলো ইসলামী দলের সমন্বয়ে ইসলামী শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবীতে এর কার্যক্রম শুরু করা হয়। পরে অবশ্য এই ঐক্য বিনষ্ট হয়ে যায় এবং এটি একটি একক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়।

    ১৯৮৭ সনে তদানিন্তন সময়ের কয়েকজন বিশিষ্ট আলিম, পীর-মাশায়েখ এবং ইসলামী রাজনীতিবিদ অনুভব করলেন ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যাপকভিত্তিক ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন – চরমোনাই’র পীর মাওলানা সৈয়দ ফজলুল করিম, শায়খুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হক, ঐক্য আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আব্দুর রহীম, জামায়াতের মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী, ব্যারিস্টার মাওলানা কোরবান আলী, আওলাদে রাসূল মাওলানা আবদুল আহাদ মাদানী, তৎকালীন যুব শিবিরের সভাপতি অধ্যাপক আহম্মদ আব্দুল কাদের প্রমূখ। ঐক্যের জন্য পবিত্র কুরআন ছুঁয়ে তারা কঠিন শপথ করলেন। সিদ্ধান্ত হলো ১৯৮৭ সালের ৩ মার্চ, সকলের উপস্থিতিতে একটি সাংবাদিক সম্মেলনে এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ঘোষণা দেয়া হবে এবং এই ঐক্য প্রক্রিয়ার অন্যতম উদ্যোক্তা মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী ঘোষণাপত্র পাঠ করবেন। কিন্তু সেদিন সম্মেলনস্থলে গিয়ে জানা গেল ঐক্যবদ্ধ ইসলামী আন্দোলনের উদ্যোক্তা মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী দেশ ছেড়ে উধাও হয়ে গেছেন। তিনি নাকি নিজ দল জামায়াতের চাপে ইতিমধ্যেই পাড়ি জমিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে। কারণ জামায়াতে ইসলামীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে আরো কোন শক্তিশালী ইসলামী ব্লক গড়ে উঠুক, এটা নাকি জামায়াত নেতারা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। যাই হোক নির্ধারিত দিনেই ঢাকাস্থ মতিঝিলের হোটেল ‘শরীফস ইনে’ অনুষ্ঠিত এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের আত্মপ্রকাশ ঘটলো। ঘোষণাপত্র পাঠ করলেন পীর সাহেব চরমোনাই। ১৩ মার্চ ১৯৮৭ ছিল জনসম্মুখে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের আত্মপ্রকাশের দিন। এ উপলক্ষে আয়োজিত শাপলা চত্বরের সমাবেশে এরশাদ সরকারের পুলিশী আক্রমণ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের চেতনাকে আরো শানিত করে। কিন্তু কিছুদিন পর এরও একই পরিণতি ঘটে। অনৈক্য। ভাঙ্গন। হতাশা।

    ১৯৮৭ সনের ১ অক্টোবর মাওলানা আব্দুর রহীম ইন্তেকাল করেন (ইন্নানিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। এরপর ‘৯১এর জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়া না নেয়ার প্রশ্নে ইসলামী ঐক্য আন্দোলন দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ে। ব্যারিস্টার মাওলানা কোরবান আলীর নেতৃত্বে একটি অংশ ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনে থেকে যায়, আর হাফেজ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে আরেকটি অংশ এ ঐক্য থেকে বের হয়ে যায়। অন্য দিকে শায়খুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হকের নেতৃত্বাধীন খেলাফত আন্দোলন (আ-গা) এবং ইসলামী যুব শিবিরও এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে থাকার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ১৯৮৯-এর ১২ অক্টোবর খেলাফত আন্দোলন (আ-গা) ও যুব শিবিরের এক যৌথ বৈঠকে খেলাফত মজলিস নামে নতুন দল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। শেষ পর্যন্ত ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন চরমোনাইর পীর সাহেবের নেতৃত্বাধীন একটি একক দলে পরিণত হয়।

    ২০০১ এর নির্বাচনে জাতীয় স্বার্থের ঠুনকো দোহাই দিয়ে যখন অনেক ওলামা ও ইসলামী দল নারী নেতৃত্বের অধীনে জোটবদ্ধ নির্বাচনে অংশ নেয়, তখন ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন জামায়াত-বিএনপি’র সাথে না হলেও এরশাদের সাথে ঠিকই নির্বাচনী জোট বাঁধে। এ দলটি অন্য ইসলামী দলের তুলনায় কিছুটা স্বকীয় অবস্থানে থাকলেও প্রচলিত পদ্ধতির গণতান্ত্রিক নির্বাচনের বাহিরে থেকে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার স্বতন্ত্র ধারা অনুসরণ করতে পারেনি। অবশেষে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন লাভের জন্য ২০০৮ এর অক্টোবরে বহু ঘটনার জন্ম দিয়ে তৈরী হওয়া ‘ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন’ তাদের নাম পরিবর্তন করে ‘ইসলামী আন্দোলন’ নাম ধারণ করে।

    ইসলামী ঐক্যজোট

    ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর একটি স্মরনীয় গণআন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে ৷ এরপর ১৯৯১ সনের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামী ঘরানায় চালু হয়ে যায় ভিন্ন রকম হিসাব-নিকাশ। নতুন করে তৎপর হয়ে ওঠেন ইসলামী জগতের ঐ সকল কুশীলবগণও যারা সদ্য হযরত হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বাধীন খেলাফত আন্দোলন থেকে বের হয়ে এসেছেন। এর মাঝে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন হাফেজ্জী হুযুরের জামাতা মুফতী ফজলুল হক আমিনী। যিনি হাফেজ্জীর ইন্তেকালের পর (১৯৮৭) খেলাফত আন্দোলন ত্যাগ করে ইস্যু ভিত্তিক আন্দোলনের মাধ্যমে সকলের নজর কাড়তে সক্ষম হন। খিলাফত ব্যবস্থার পক্ষে জনমত গঠন ও গণবিপ্লব সৃষ্টির পরিবর্তে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা লাভের উচ্চাভিলাষ থেকে তিনি এবং অন্যান্য কয়েকটি ইসলামী দলের নেতৃবৃন্দ মিলে একটি ইসলামী ঐক্যজোট গঠন করেন। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, তখন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া তো সম্ভব হয়ই নি, বরং নির্বাচন চলাকালেই এই ঐক্য বিনষ্ট হয়ে যায়। অবশ্য অনেকেই নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা, দেশের মাদরাসাগুলোর উপর প্রভাব বিস্তার করা এবং ক্ষমতাসীনদের সাথে দর কষাকষির হাতিয়ার হিসাবে এই নামটিকে ব্যবহার করেছেন। এই প্রবণতা বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি ধারার জন্ম দেয়, তা হলো ইসলামী আদর্শের তোয়াক্কা না করে প্রচলিত পুঁজিবাদী রাজনীতির সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়া। এর ফলে ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্বতন্ত্র ভাবধারা এবং সঠিক রাজনীতি ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়।

    ১৯৯১ সনে গঠিত বিএনপি সরকারের দলীয় করণ ও দেশ পরিচালনায় ব্যর্থতার ফলে ১৯৯৬ এর নির্বাচনে ইসলাম বিদ্বেষী আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসে। এরপর ইসলামের উপর একের পর এক আঘাত আসতে থাকে। আওয়ামী সরকারের দুঃশাসন, ইসলাম ও ওলামা বিদ্বেষী আচরণ ইসলামী দলগুলোকে আবারও ঐক্যবদ্ধ করার পরিবেশ তৈরী করে দেয়। কিন্তু কিছু কিছু নেতার অতীত ভূমিকা অভিজ্ঞজনদেরকে এই ঐক্যে তেমন আকৃষ্ট করতে পারেনি। তদুপরি ২০০১ সনে মহিলা নেত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির অধীনে চারদলীয় জোটে থাকা না থাকাকে কেন্দ্র করে ইসলামী ঐক্যজোটে আরেক দফা ভাঙন দেখা দেয়। শাইখুল হাদীস ও আমিনীর নেতৃত্বে খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী মোর্চা প্রভৃতি দল বিএনপি ও জামায়াতের সাথে চার দলীয় জোটভূক্ত হয়ে নির্বানে অংশ নেয়। আর ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন জোট বাঁধে এক কালের স্বৈরশাসক এরশাদের সাথে। নির্বাচনোত্তর খালেদা জিয়ার সরকারে মন্ত্রিত্ব পাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে ঐক্যজোটের ঘনিষ্টতা একেবারে খানখান হয়ে যায়। মুফতী ফজলুল হক আমিনী শাইখুল হাদীস আজীজুল হকের পরিবর্তে নিজেকে ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান ঘোষণা করলে শাইখুল হাদীস খেলাফত মজলিস নিয়ে ঐক্যজোট থেকে বের হয়ে আসেন। এরপর থেকে এই দলটি একাই নিজেদেরকে ইসলামী ঐক্যজোট বলে দাবী করতে থাকে। এদিকে সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখার প্রতিযোগীতার দ্বন্দে ঐক্যজোট আমিনী অংশের নতুন মহাসচিব নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি মুফতী ইজহারুল ইসলাম চৌধুরীকে জোট থেকে বহিষ্কার করা হয়। এ নিয়ে ভেঙ্গে যায় নেজামে ইসলাম পার্টি। নতুন নেজামে ইসলাম পার্টি ঘোষণা করে মুফতী ইজহারুল ইসলামও নিজেকে ঐক্যজোটের নেতা বলে দাবী করেন। মিসবাহুর রহমান নামে এক হকার নেতাকে মহাসচিব নিযুক্ত করার কয়েকদিন যেতে না যেতে সেও বিদ্রোহ করে মুফতী ইজহারের সাথে। ইজহারের জোট ভেঙে সে তার দলের নাম দেয় বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোট। অন্যদিকে নেতৃত্বের কোন্দলে পড়ে ভেঙে যায় খেলাফত মজলিস। ২০০৫ সনের ২২ মে শাইখুল হাদীসের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে আহমদ আব্দুল কাদির তার পুরাতন যুব শিবিরের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে আরেকটি খেলাফত মজলিসের জন্ম দেয়।

    এমতাবস্থায় মুফতী আমিনী চারদলীয় জোটে ইসলামী ঐক্যজোটের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এই নব গঠিত খেলাফত মজলিসের নামই ব্যবহার করতে থাকেন। এরই মধ্যে ঘটে যায় আরেক ভয়াবহ ঘটনা। স্মরণ কালের সকল ইতিহাস ব্রেক করে মুফতী ইজহার ফুলের তোড়া দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব বরণ করে নেন। আর ২০০৬ সালের ২৩ শে ডিসেম্বর শাইখুল হাদীস নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিস পাঁচ দফা চুক্তির ভিত্তিতে চির শত্রু আওয়ামীলীগের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দেয়। এভাবে ক্ষণিকের ক্ষমতা লোভী কতিপয় নেতার আচরণ বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনকে ভাবগাম্ভীর্যহীন একটি ঠাট্টার বস্তুতে পরিণত করে।

    ফলাফল বিশ্লেষণ

    গত অর্ধ শতাব্দীর ইতিহাস একথা প্রমাণ করেছে যে, এদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ক্রমান্বেয়ে জোরদার হওয়ার পরিবর্তে অধঃগতির দিকেই ধাবিত হয়েছে বেশী। গণবিপ্লবের মাধ্যমে বস্তুবাদী রাজনীতির পশ্চিমা ধারার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবার যাবতীয় উপাদান বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও ইসলামী আন্দোলন এখানে কাঙ্খিত ফলাফল অর্জন করতে পারে নি। এর কারণ হিসেবে যে সব বিষয়কে চি‎হ্নিত করা হয়েছে তা নিন্মরূপ:-

    ক. চিন্তাগত দুর্বলতার দরুন ইসলামকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দর্শন হিসাবে তুলে ধরতে না পারা। আভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক এবং বিশ্ব রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য পূর্ববর্তী উলামাগণ খিলাফত প্রতিষ্ঠা করাকে যে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, গত ৫০ বছরের রাজনীতিতে সামগ্রিকভাবে বিষয়টির সে ধরণের গুরুত্ব বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়া।

    খ.    পদ্ধতিগত ভুলের দরুন বার বার পুঁজিবাদী শত্রুর ছকে তৈরী করা তথা কথিত গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতির স্রোতে গা ভাসিয়ে আপোষমূলক প্রবণতায় জড়িয়ে যাওয়া।

    গ.    রাজনৈতিক দর্শন হিসাবে খিলাফত শাসনের প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ ও আঞ্চলিকতার চিন্তার মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়া।

    ঘ.    ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে ইসলামের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার পরিবর্তে একটি বিশেষ শ্রেণীর মাঝে এর আংশিক চর্চা করা এবং প্রকৃত সংগঠন বলতে যা বুঝায় তা গঠন না করে শুধুমাত্র মাদরাসার ছাত্র দিয়ে অনিয়মিত আন্দোলন করা।

    ঙ.    একদিকে নিজেরা বিশ্ব রাজনীতির গতিবিধি লক্ষ্য রেখে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়া অন্যদিকে এ ধরণের যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মাঝে ইসলামী রাষ্ট্রের স্বরূপ ও ভিশন তুলে ধরতে না পারা।

    চ.    ইসলামের মূলনীতি অনুসরণ না করে ব্যক্তি কেন্দ্রীক দল গঠনের প্রবণতা এবং ব্যক্তির ইমেজ দিয়ে আবেগময়ীতার জন্ম দেয়া। পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদের তাবেদার শক্তিগুলোর বিপরীতে গণআন্দোলন গড়ে তোলার পরিবর্তে তাদের রাজনীতি অনুসরণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া।

    ছ.    গণমুখী ও ইতিবাচক রাজনীতি দিয়ে জনস্বার্থের পক্ষে শক্ত ভূমিকা পালনের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জনের পরিবর্তে বিশেষ ঘটনাবলী ও ইস্যুর মাঝে ইসলামী রাজনীতিকে সীমাবদ্ধ রাখা।

    জ.    সর্বোপরি লক্ষ্যহীন পথ চলা, অপরিনামদর্শী বাগাড়ম্বর, ক্ষণিকের সুবিধাভোগের লোভে আদর্শ বিবর্জিত হয়ে সেক্যুলার দলগুলোর সাথে গাঁটছড়া বাধা ইত্যাদি কারণে জনসমর্থন হারানো।

    এই ছিল গত অর্ধ শতাব্দী ধরে চলা এ অঞ্চলের ইসলামী রাজনীতির সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু তা’আলা আমাদেরকে এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সঠিক পথে অগ্রসর হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন

    মাওলানা মামুনুর রশীদ
    ২০০৮

  • ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা

    ইসলামের সাংস্কৃতিক জ্ঞান অথবা বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান– উভয়দিক থেকেই মুসলিম বিশ্ব বর্তমানে অনেক পিছিয়ে আছে। এমনকি কিছু মুসলিম দেশে যেমন: বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফ্রিকার কিছু দেশের অশিক্ষিতের বিস্ময়কর রকমের উচ্চহার এসব দেশকে বিপদগ্রস্ত করে তুলেছে। মুসলিম ভূখণ্ডসমূহের অবস্থা এতটা করুণ হওয়ার পেছনে অনেক ‘তথাকথিত আধুনিক মুসলিম’ ইসলামকে দায়ী করার চেষ্টা করে। ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব এবং শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলিমদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতাই মূলত এর জন্য দায়ী। এ প্রবন্ধে মূলত ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব, শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলিমদের ইতিহাস, শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা এবং ভবিষ্যৎ খিলাফত রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হবে।

    ইসলামে জীবনসম্পর্কে যে সমস্ত ধ্যান-ধারণা উপস্থাপন করে সেগুলো আমাদের পছন্দ, অপছন্দ এবং কাজকর্মকে নির্ধারণ করে। ইসলামে উপস্থাপিত ধ্যান-ধারণাসমূহকে জানা এবং এগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করার মাধ্যমেই মূলত আমাদের মাসসিকতা এবং স্বভাব গড়ে উঠে এবং এ দুটোর সমন্বয়ে আমরা ইসলামী ব্যক্তিত্বে পরিণত হই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-

    “বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? [আল-যুমার:৯]

    রসুল (সা) বলেন, “জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরয।” [বায়হাকী]।

    আবার শিক্ষালব্ধ জ্ঞান নিয়ে চিন্তাভাবনা করাটাকেও ইসলাম যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করেছে। যেমন রাসূল (সা) বলেন- “এক ঘণ্টা চিন্তাভাবনা করা সারারাত ইবাদত করার চেয়ে উত্তম।” [আবু আনাস এবং আবু দারদা কর্তৃক বর্ণিত]

    রাসূল (সা) মুসিলমদের শিক্ষাদানে বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতেন। যেমন তিনি প্রতি দশজন মুসলিমকে পড়তে শেখানোর বিনিময়ে একজন করে বদরের যুদ্ধবন্দীকে মুক্ত করেছিলেন।

    প্রকৃতপক্ষে যে সমস্ত চিন্তাভাবনার উপর ভিত্তি করে কোন একটা সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয় সে সভ্যতার লোকজনকে ঐ নির্দিষ্ট চিন্তাভাবনায় উদ্বুদ্ধ করার প্রধান উপায় হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থা। শত শত বছর জুড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি তাদের তরুণদেরকে শিক্ষাদানের লক্ষ্যে শিক্ষাদান পদ্ধতির রূপরেখা নির্ধারিত করেছে এবং সিলেবাস প্রণয়ন করেছে। ইতিহাস থেকে দেখা যায়, যখন কোন জাতির উপর আধিপত্য বিস্তারের প্রক্রিয়া চলে তখন তার শিক্ষাব্যবস্থা বা সিলেবাস (পাঠ্যসূচি) পরিবর্তন করে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা বা সিলেবাস নির্ধারণ করা হয় যাতে সে জাতির লোকজনের ভূমি বা সম্পদের পাশাপাশি তাদের মনস্তত্বের উপরও বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য আরোপ করা সম্ভব হয়। এ ঐতিহাসিক বাস্তবতা বর্তমান পৃথিবীতেও চোখে পড়ে যখন দেখা যায় যে নিজেদের আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সামঞ্জ্যতা বিধানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র মুসলিম বিশ্বের উপর চাপ প্রয়োগ করছে মুসলিমদের শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তন করার জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের এ চাপের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে বিশেষত মুসলিম বিশ্বের আরব রাষ্ট্রসমূহ যেমন সৌদিআরব, কুয়েত, জর্দান এবং মিসর প্রভৃতি দেশ “উন্নয়ন এবং যুগের সাথে সামঞ্জস্যতা বিধান” এর অজুহাত দেখিয়ে নিজ নিজ দেশসমূহের শিক্ষার সিলেবাস নতুনভাবে বিন্যস্ত করেছে। এ তথাকথিত আধুনিকায়নের নামে ইসলামী জীবন ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয় “আনুগত্য এবং সম্পর্কচ্ছেদ” কে সৌদিআরব বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে তার স্কুলসমূহের পাঠ্যপুস্তকে; অন্যদিকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় “জিহাদ” সম্পর্কিত বিষয়সমূহকে জর্দান, মিসর এবং কুয়েত বিকৃত করেছে।

    প্রাতিষ্ঠানিক হোক অথবা অপ্রাতিষ্ঠানিক- শিক্ষা হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে উম্মাহর (জাতির) সন্তানদের অন্তরে তাদের সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করা যায়। শিক্ষা কারিকুলাম বা পাঠ্যসূচি বলতে বোঝায় সে শিক্ষা যেটা রাষ্ট্রকর্তৃক পরিচালিত এবং যা বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের অর্থাৎ রাষ্ট্র এ শিক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিক্ষাদান শুরুর বয়স, শিক্ষার বিষয় এবং শিক্ষাদান পদ্ধতি নির্ধারণ করে। অন্যদিকে অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হচ্ছে সেটা যেটা রাষ্ট্র কর্তৃক সরাসরি নির্ধারিত নয় বরং এক্ষেত্রে বাড়িতে, মসজিদে, প্রচার মাধ্যমের (মিডিয়া) সাহায্যে বা সাময়িক কোন প্রকাশনার মাধ্যমে শিক্ষাদান করাটা মুসলিমদের উপর ছেড়ে দেয়া হয়। উভয়ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে এমনসব চিন্তাভাবনা এবং জ্ঞানের শিক্ষাদান নিশ্চিত করা যেগুলো ইসলামী মতাদর্শ থেকে উৎসারিত অথবা এর উপর প্রতিষ্ঠিত।

    শিক্ষাদান সংস্কৃতির মূল লক্ষ্য থাকবে উম্মাহ্‌র তরুণদের যথাযথ উন্নয়ন ঘটানো এবং সঠিক ব্যক্তিত্বের বিকাশ নিশ্চিত করা। যে কোন জাতির প্রতিষ্ঠালাভ এবং টিকে থাকার জন্য সংস্কৃতির ভূমিকা হচ্ছে মেরুদণ্ডের মত। এ সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করেই উম্মাহ্‌র সভ্যতা গড়ে উঠে এবং জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারিত হয়। সংস্কৃতির মাধ্যমে উম্মাহ নির্দিষ্ট একটা ছাঁচে গড়ে উঠে। ফলে তাকে অন্যান্য সভ্যসমূহ থেকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করা সম্ভবপর হয়।

    সংস্কৃতি হচ্ছে এমন একটা জ্ঞান যা ইসলামী আক্বীদার উপর প্রতিষ্ঠিত। এর অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে তাওহীদ (একত্ববাদ) সম্পর্কিত জ্ঞান, আইনশাস্ত্র (ফিকহ), কুরআনের তাফসীর (ব্যাখ্যা) এবং হাদীস। এছাড়া উপর্যুক্ত বিষয়সমূহ বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন যেমন ইজতিহাদ (গবেষণার মাধ্যমে আইন বের করার প্রক্রিয়া) সম্পর্কিত জ্ঞান, আরবি ভাষা, হাদিসের শ্রেণীবিভাগ এবং আইনশাস্ত্রের ভিত্তিসমূহ (উসূল) প্রভৃতি ও সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। এ সমস্ত বিষয়ের সবগুলোই ইসলামী সংস্কৃতি কেননা এদের উৎস হচ্ছে ইসলামী আক্বীদা। অনুরূপভাবে ইসলামী উম্মাহ্‌র ইতিহাসও এই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। কেননা এতে রয়েছে ইসলামী সভ্যতার (হাদারাহ) সাথে জড়িত ঘটনাসমূহ, প্রসিদ্ধ ব্যক্তিবর্গ (রিজাল), নেতৃবৃন্দ এবং উলামাদের বিবরণ। ইসলামপূর্ব আরবি কবিতাসমূহ ইসলামী সংস্কৃতির অংশ কেননা এর অন্তর্গত বিষয়সমূহ আরবি ভাষার শব্দ (words) এবং বাক্যপ্রকরণ অর্থাৎ বাক্যে শব্দসমূহের পূর্বাপর অবস্থান (syntax) বুঝতে সহায়ক বলে এগুলো ইজতিহাদ, তাফসীর ও হাদীস বুঝতে সাহায্য করে।

    সংস্কৃতি উম্মাহ্‌র সদস্যদের চরিত্র গঠন করে। এটা যেহেতু উম্মাহ্‌র সদস্যদের ঝোঁক বা প্রবণতাকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁড়ে গঠনের মাধ্যমে তাদের মানসিকতা, স্বভাব এবং আচরণকে প্রভাবিত করে সেহেতু এটা মানুষের চিন্তাভাবনা এবং বিভিন্ন বিষয়, মন্তব্য এবং কাজ সম্পর্কে তার মতামত গঠন করে। এজন্য ইসলামী রাষ্ট্রের (খিলাফত) একটি অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে উম্মাহ্‌র সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করা এবং ছড়িয়ে দেওয়া।

    ইতিহাস থেকে দেখা যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন সেদেশের তরুণদের যেমন একদিকে সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে দীক্ষিত করেছিল তেমনি অন্যদিকে পুঁজিবাদী বা ইসলামী চিন্তাভাবনা যেন কোনভাবে তার সংস্কৃতিকে অনুপ্রবেশ করতে না পারে সে ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছিল। এদিকে পুরো পশ্চিমাবিশ্ব সমাজজীবন থেকে ধর্মকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করে রাখার যে মতবাদ তার উপর ভিত্তিশীল পুঁজিবাদী সংস্কৃতিকে দীক্ষিত করেছে তাদের সন্তানদের। এই ভিত্তির উপরই তারা তাদের জীবনকে প্রতিষ্ঠিত ও সংগঠিত করেছে এবং নিজেদের মতাদর্শ ও সংস্কৃতিকে যাতে ইসলামের অনুপ্রবেশ ঘটতে না পারে সেজন্য এমনকি যুদ্ধেও লিপ্ত হয়েছে যা আজো অব্যাহত আছে।

    অনুরূপভাবে ইসলামী রাষ্ট্রও তার সন্তানদের সংস্কৃতিতে দীক্ষিত করেছে এবং ইসলামী আক্বীদা হতে উৎসারিত নয়। এমনসব চিন্তার দিকে যারা ডাকে, তাদেরকে প্রতিরোধ করেছে। ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে অন্যান্য দেশ ও জাতির কাছে নিজেদের সাংস্কৃতিক দাওয়াত পৌঁছানো এবং এটা কিয়ামতের আগ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

    নিজেদের সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করা এবং বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার এ প্রবণতার ফলে আমরা ইসলামের ইতিহাসের প্রায় পুরোটা জুড়েই দেখতে পাই যে, খিলাফতের প্রত্যেকটা গুরুত্বপূর্ণ শহরে পাবলিক লাইব্রেরি (গণগ্রন্থাগার) এবং প্রাইভেট লাইব্রেরি (ব্যক্তিগত পাঠাগার) ছিল। কর্ডোভা এবং বাগদাদের লাইব্রেরিসমূহে চার লক্ষাধিক বই ছিল।

    এরিস্টটল, প্লেটো, পীথাগোরাস, টলেমি এবং ইউক্লিডের কাজসমূহ এবং গ্রীক জ্যোর্তিবিদ্যা প্রভৃতির অনুবাদের ফলে আরবি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞাসমৃদ্ধ ভাষায় পরিণত হয়েছিল। অবশ্য এসব মনীষীদের বিভিন্ন ধ্যান-ধারণাকে অনেক মুসলিম পণ্ডিত খণ্ডন করেছিলেন যেমন ইমাম গাজ্জালীর তাহাফুত আল ফালাসিফাহ (দার্শনিকদের প্রত্যাখ্যান) এবং ইবনে তাইমিয়ার কিতাবুল ইবতাল (ভ্রান্ত মত সম্পর্কিত গ্রন্থ)। গণিতশাস্ত্রে অনুপস্থিত ‘শূণ্য’ এর ব্যাপক ধারণা আবিষ্কারের মাধ্যমে মুসলিমরা এর ব্যাপক অগ্রগতি সাধন করে ফলে কয়েক শতাব্দী-যাবত বিদ্যমান অসমাধানকৃত সমস্যাসমূহের সমাধান সম্ভবপর হয়। মুসলিম গণিত-শাস্ত্র-বিদগণ বীজগণিতের উদ্ভাবন ও উন্নয়ন ঘটিয়েছিলেন, এসময় এলগরিদম নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হয় এবং ইসলামী রাষ্ট্রের একজন বিখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত আল-খেয়ারিজমির নামানুসারে নামকরণ করা হয়।

    ইতিহাস থেকে মুসলিমদের যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া যায়, সেগুলো হল-

    ১. আল-কাতাতিব: এটা হচ্ছে কাত্তাব যার অর্থ হচ্ছে যেখানে কুরআন লিখা এবং পরিকল্পনায় কাজ করা হয় এর বহুবচন। ইসলামী রাষ্ট্রের সময়কাল জুড়েই শহর এবং গ্রামে কাতাতিবের উপস্থিতি ছিল।

    ২. মসজিদ: বিভিন্ন উলামা এবং হাদীস বিশেষজ্ঞগণ গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় মসজিদসমূহে বসে ফিকহ, তাফসীর, ভাষা এবং হাদীস সংক্রান্ত বিষয়সমূহ নিয়ে বিতর্ক করতেন এবং শিক্ষাদান করতেন। এসময় তাদের শিক্ষার্থীগণ উপস্থিত থাকতেন।

    ৩. কুরআন সেন্টার: কুরআন শিক্ষার জন্য সর্বপ্রথম পৃথক একটি সেন্টার স্থাপিত হয়েছিল দামেস্কে হিজরি চতুর্থ শতাব্দীতে, যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রাশা ইবন নাসিফ আল দামেশ্‌কী।

    ৪. হাদীস সেন্টার: দামেস্কে আল-মালিক আল-আদিল নুরুদ্দিন মাহমুদ আল জানকি সর্বপ্রথম বিশেষত হাদীস প্রশিক্ষণের জন্য একটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন।

    ৫. স্কুল: পঞ্চম শতাব্দীতে দামেস্কে এসব স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এসব স্কুল সব ধরনের বিষয়ের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যেমন দামেস্কে পুরকৌশল (Civil Engineering) স্কুল এবং মেডিসিন স্কুল প্রভৃতি।

    ৬. বিশ্বদ্যিালয়: পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি দিকে এসমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আল হাকাম ইবনে আব্দুল রহমান কর্ডোভা ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন যেটা সে সময়কার সবচেয়ে অভিজাত শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গণ্য হতো। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যেমন বাগদাদের মুসতানসিরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। সমগ্র ইউরোপের শিক্ষার্থীরা এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ ভর্তিও জন্য আবেদন করত।

    উম্মাহ্‌র সংস্কৃতিকে সংরক্ষণের জন্য একটি প্রধানতম নিশ্চয়তা হচ্ছে একদিকে এটা উম্মাহ্‌র সদস্যদের অন্তরে ও বইয়ের পাতায় সংরক্ষণ করা এবং অন্যদিকে এ সংস্কৃতির বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ থেকে উৎসারিত নিয়মকানুন এবং মতামতের সাহায্যে রাষ্ট্র পরিচালনা করা এবং এর বিভিন্ন বিষয় দেখাশুনা করা।

    ইসলাম এবং ভবিষ্যৎ খিলাফত রাষ্ট্র কিভাবে তার শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা করতে পারবে সে ব্যাপারে নিম্নে সংক্ষিপ্ত খসড়া উপস্থাপন করা হলো-

    ১) ইসলামী আক্বীদাকে ভিত্তি করে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে হবে। পাঠ্যসূচি এবং শিক্ষাদান-পদ্ধতি এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে এ ভিত্তি থেকে যে কোন ধরনের বিচ্যুতি প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। [ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে শিক্ষা সম্পর্কিত শরিয়া নিয়মকানুন ইসলামী আক্বীদা থেকে উৎসারিত এবং এদের প্রত্যেকের শরীয়া প্রমাণাদি বিদ্যমান থাকবে। যেমন- শিক্ষার বিষয়সমূহ (subjects) এবং ছেলে বা মেয়ে শিক্ষার্থীদের পৃথক রাখা। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষাদানের পদ্ধতি (methods) হচ্ছে সে সমস্ত উপকরণ (means) এবং ধরণ (style) সেগুলোকে শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা এবং এর উদ্দেশ্যসমূহ অর্জন করার জন্য উপযোগী বলে মনে করা হয়। এগুলো হচ্ছে কিছু পার্থিব বিষয় যেগুলো শিক্ষা এবং উম্মাহ্‌র মৌলিক চাহিদার সাথে সম্পর্কিত শরীয়া নিয়মকানুন বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত বলে বিবেচিত এবং এ বিষয়সমূহ পরিবর্তনশীল বা বিবর্তনশীল। এগুলো গবেষণা বা অনুসন্ধানের মাধ্যমে অথবা কোন গবেষক বা অন্যান্য জাতির কাছ থেকে গ্রহণ করা যায়]

    ২) ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য হবে চিন্তা এবং স্বভাবগত দিক থেকে ইসলামী ব্যক্তিত্ব গঠন করা। সুতরাং এই নীতির উপর ভিত্তি করে কারিকুলামের বিষয়সমূহ নির্ধারণ করতে হবে।

    ৩) শিক্ষার লক্ষ্য হবে ইসলামী ব্যক্তিত্ব তৈরি করা এবং তাদেরকে জীবনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান সম্পর্কিত ইসলামী জ্ঞান সরবরাহ করা। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে শিক্ষাদান-পদ্ধতি ঠিক করতে হবে এবং এ লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করে ফেলে এমন যে কোনো পদ্ধতিকে প্রতিরোধ করতে হবে।

    ৪) গবেষণালব্ধ বিজ্ঞান যেমন- গণিত (বা পদার্থবিদ্যা) এবং সাংস্কৃতিক জ্ঞান (যেমন আইনশাস্ত্র, সাহিত্য, ইতিহাস)- এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য থাকতে হবে। গবেষণালব্ধ বিজ্ঞান এবং এর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়াদি প্রয়োজনের সাথে সঙ্গতি রেখে শিক্ষাদান করতে হবে এবং শিক্ষার কোন পর্যায়েই এটা বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। অন্যদিকে সাংস্কৃতিক জ্ঞানকে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে একটা নির্দিষ্ট নীতির মাধ্যমে শিক্ষাদান করতে হবে যাতে এটা ইসলামী চিন্তা এবং নিয়মকানুনের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়। এছাড়া এই সাংস্কৃতিক জ্ঞানকে বিজ্ঞানের অন্যান্য বিষয়ের মতো উচ্চশিক্ষার অন্যান্য পর্যায়েও এমনভাবে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা থাকতে হবে যাতে সেটা শিক্ষানীতির এবং শিক্ষার উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুতি প্রদর্শন না করে।

    ৫) ইসলামী সংস্কৃতিকে অবশ্যই শিক্ষাব্যবস্থার সমস্ত পর্যায়ে শিক্ষাদান করতে হবে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে চিকিৎসা, প্রকৌশল বা পদার্থবিদ্যা পাশাপাশি বিভিন্ন ইসলামী জ্ঞানের জন্য ডিপার্টমেন্ট খুলতে হবে।

    ৬) শিল্পকলা (Arts) এবং হস্তশিল্প (crafts) যদি বাণিজ্য, নৌযানবিদ্যা বা কৃষিবিদ্যার সাথে সম্পর্কিত হয়, তবে সেগুলো কোনরকম বাধা বা শর্ত ছাড়াই শিখা হবে। কিন্তু কখনো কখনো শিল্পকলা এবং হস্তশিল্প সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত হতে পারে এবং জীবন সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিও দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। যেমন- চিত্রকর্ম (painting) এবং ভাস্কর্যবিদ্যা (sculpture)। জীবন সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির সাথে যদি এই দৃষ্টিভঙ্গি সাংঘর্ষিক হয়, তবে সেক্ষেত্রে এসব শিল্পকলা বা হস্তশিল্প গ্রহণ করা যাবে না।

    ৭) রাষ্ট্রের একটিমাত্র নির্দিষ্ট শিক্ষাসূচি (কারিকুলাম) থাকবে এবং এটি বাদে অন্যকোন কারিকুলামের শিক্ষাদান অনুমোদন করা যাবেনা।

    ৮) বিদেশী রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত না হলে বেসরকারি স্কুলের অনুমোদন দেওয়া হবে যদি এসব স্কুল রাষ্ট্রের কারিকুলাম গ্রহণ করে, রাষ্ট্রেও শিক্ষানীতির আওতায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাষ্ট্রের শিক্ষানীতির লক্ষ্যকে যথাযথভাবে সম্পাদন করে। এসমস্ত স্কুলসমূহে নারী এবং পুরুষ একত্রে রাখা যাবেনা- এটা শিক্ষক বা শিক্ষার্থী উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এসমস্ত স্কুল নির্দিষ্ট কোন ধর্ম, মাযহাব, বংশ বা বর্ণের জন্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারবেনা।

    ৯) যেসমস্ত বিষয় জীবনের মূলধারার জন্য প্রয়োজনীয়, সেগুলো নারী এবং পুরুষ প্রত্যেক নাগরিককে শিক্ষাদান করা রাষ্ট্রের অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্য। প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরে বিনামূল্যে এ শিক্ষার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক। রাষ্ট্র তার সাধ্যমতো সবার জন্য বিনা বেতনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরির চেষ্টা করবে।

    ১০) স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির পাশাপাশি রাষ্ট্র জ্ঞানের বিস্তার মান্নোয়নের জন্য বিভিন্ন উপকরণ; যেমন- লাইব্রেরি এবং লাইব্রেরি সরবরাহ করবে যাতে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা যেমন ফিকহ, হাদীস, কুরআনের তাফসীর এবং চিন্তা, চিকিৎসা, প্রকৌশল ও রসায়ন প্রভৃতি নিয়ে যারা গবেষণা করতে আগ্রহী তারা যেন উদ্ভাবন এবং আবিষ্কারে সক্ষমতা লাভ করতে পারে। এর ফলে পর্যাপ্ত পরিমাণে মুজতাহিদ, মানসম্পন্ন বৈজ্ঞানিক এবং উদ্ভাবক তৈরি হবে।

    ১১) শিক্ষার উদ্দেশ্যে লিখিত কোন বিষয়ের মাধ্যমে শোষণ; যেমন- কপিরাইট যেকোন পর্যায়ে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ থাকবে। কোন বই একবার মুদ্রিত ও প্রকাশিত হবার পর গ্রন্থকারসহ অন্য কারো অধিকার থাকবে না। সেই বইটির প্রকাশনা এবং মুদ্রণের অধিকারস্বত্ব সংরক্ষণ করার। অবশ্য যদি কোন বই মুদ্রিত বা প্রকাশিত না হয়ে শুধু একটি ধারণার আকারে থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে শিক্ষাদানের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণের মতোই যে কেউ এসমস্ত ধারণা বা তথ্য প্রদানের মাধ্যমে অর্থগ্রহণ করতে পারবে।

    উপর্যুক্ত খসড়া নীতিমালার আলোকে যদি আমরা বিবেচনা করি, তাহলে বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে যেসব স্কুল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং পরিচালিত হচ্ছে সেগুলো; যেমন- এ্যাচিসন কলেজ (লাহোর), সেইন্ট যোসেফ স্কুল (ঢাকা), সেইন্ট জনস ইনস্টিটিউশন (কুয়ালালামপুর) প্রভৃতি বন্ধ করে দিতে হবে। কারণ এ সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মুসলিম তরুণদের মনে পাশ্চাত্যের অনৈসলামি ধ্যান-ধারণার প্রতি বিস্ময়, শ্রদ্ধা এবং প্রশংসাকে বদ্ধমূল করে দেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

    ইসলামী রাষ্ট্রের নিজস্ব মিডিয়া ডিপার্টমেন্ট থাকবে যেটা একদিকে ইসলাম এবং ইসলামী মূল্যবোধকে বিশ্বব্যাপী ছড়ানোর জন্য সম্ভাব্য সবধরনের উপকরণ ব্যবহার করবে এবং অন্যদিকে কাফেরদের মাধ্যমে প্রচারকৃত মিথ্যা এবং ভ্রান্ত-ধারণাসমূহকে খণ্ডণ করবে। যোগাযোগের জন্য অত্যাধুনিক সবরকমের প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক উপকরণসমূহ; যেমন- স্যাটেলাইট, ইলেকট্রনিক মেইল, টেলিকনফারেন্সিং প্রভৃতির মাধ্যমে খিলাফতের নাগরিকদের শিক্ষাদানের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক সাধ্যমতো এগুলো ধারণ করা হবে, ব্যবহার করা হবে এবং ছড়িয়ে দেওয়া হবে। বিদ্যমান ব্যাপক গণসংযোগ মাধ্যম; যেমন- টিভি, রেডিও, সংবাদপত্র, বই এবং সম্মেলন এসমস্ত উপকরণ ইসলামী রাষ্ট্রে ব্যবহার করা যাবে। উপর্যুক্ত মাধ্যমসমূহ যেসমস্ত অধিবেশন বা তথ্য সম্প্রচার করে সেগুলো যদি ইসলামের মধ্যে থাকে, তাহলে সেগুলো প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কোন অনুমোদন লাগবেনা।

    মুসলিম বিশ্বে বিদ্যমান বিভিন্ন বিদেশী মিডিয়া যেগুলো মুসলিমদেরকে দ্বিধান্বিত করে বা আক্রমণাত্মক তথ্য প্রচারের মাধ্যমে বিপথে পরিচালিত করে; যেমন বিবিসি, সিএনএন এবং ভয়েস অব আমেরিকা এগুলোর সম্প্রচার নিষিদ্ধ করতে হবে।