Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:

    ((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))

    “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    «أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»

    “আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:

    «عليك بتقوى الله ما استطعت»

    “তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:

    «فاتقوا الله ولو بشق تمرة»

    “একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।

    তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))

    “আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))

    “যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))

    “মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:

    ((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))

    “মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))

    “পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]

    এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))

    “যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))

    “এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:

    ((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))

    “হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]

  • রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন। 

    “হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩) 

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ

    রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি? 

    আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত। 

    এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।

    আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    “আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)

    وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ

    আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

    মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। 

    ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: 

    “আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩) 

    وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ

    “আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ

    “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮) 

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ

      “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)

    حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ

    আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।

  • রমজান এর শিক্ষা

    রমজান এর শিক্ষা

    সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্‌কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:

    রমজান – রহমতের মাস:

    এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।

    রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।

    সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর  মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।

    সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।

    জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।

    রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।

    ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্‌ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।

    এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।

    রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:

    রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।

    এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।

    রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্‌কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।

    তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।

    তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্‌র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্‌ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্‌কে রাগান্বিত করে।

    আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্‌ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।

    এখানে আল্লাহ্‌ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।

    উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্‌ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্‌ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”

    আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।

    তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্‌ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)

    এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)

    অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।

    এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্‌ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।

    তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।

    আর আল্লাহ্‌কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্‌র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।

    বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।

    রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।

    রমজান – কোরআনের মাস:

    একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।

    আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?

    আল্লাহ্‌ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্‌র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।

    এখানে আল্লাহ্‌ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্‌ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?

    বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।

    যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্‌ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্‌ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”

    আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”

    একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”

    তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।

    রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)

    আল্লাহ্‌ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।

    সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্‌র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।

    অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।

    যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।

    বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।

    রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:

    আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।

    রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।

    কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্‌র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।

    আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।

    তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্‌ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্‌ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।

    রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)

    আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্‌র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্‌ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্‌র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।

    পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)

    অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্‌র ক্ষমা পাওয়া যায় না।

    রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:

    পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।

    রমজান এর পর কী হবে?

    প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।

    রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্‌র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্‌র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্‌র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।



    আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
    ২৫শে শাবান, ১৪৩৩
    ১৪ই জুলাই, ২০১২ 

  • আত্ম-সমালোচনা-২: চিন্তার সামান্য খোরাক


    بسم الله الرحمن الرحيم
    السلام عليكم ورحمة الله وبركاته

    আলহামদুলিল্লাহ্; বর্তমান প্রজন্মে মুসলিম হিসেবে আমরা সকলেই দাওয়াহ্’ ও ইসলাহ্’র প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি এবং সেই তাড়নায় আমরা সকলেই সচেষ্ট হচ্ছি আপন পরিমন্ডলে দাওয়াহ্’র জন্য।

    অনেকেই Online এ বিভিন্ন Platform এ দাওয়াহ্ করছেন। প্রতিনিয়ত কুরআন, হাদীসের বাণী, ছোট ছোট Article তথাপি আবেগপ্রবণ status দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব সারছি।এখানে, প্রশ্ন হলো আমরা যাদেরকে Prospect হিসেবে নিয়েছি তারা সকলেই সমমনা; অর্থ্যাৎ সকলেই একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ের জ্ঞান রাখেন এইসব evaluate করার জন্য। তাই, online এ দাওয়াহ্ বড়জোর ইসলাহ্’র পর্যায়ে উন্নীত হয়। তাদের তুলনায় দাওয়াহ্’র অধিক হকদার; আমাদের সমাজের সেই সকল মানুষ যারা মনে করছে; ‘they are Muslim for granted’; অথচ তারা ইসলামের প্রকৃত বাণী উপলব্ধি করে না।

    আরেকটি, ব্যাপারে হলো এটা পক্ষান্তরে ক্ষতি করছে নিষ্ঠাবান ত্বলিবুল ইলম’দের যারা অন্যের status এ like আর commenting অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট করছে। এইসব status সাময়িকভাবে ইন্দীয় তাড়না সৃষ্টিকারী ছাড়া আর কিছু নয়। দ্বীনী ইলম পদ্ধতিগতভাবে শিখা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। একজন মুসলিম হিসেবে আমি ইলমে বেড়ে উঠছি কিনা তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

    আরেকটি ব্যাপার হলো, আমরা উম্মাহ্ হিসেবে যার অভিযোগ সবচেয়ে বেশী করি, তা হলো ‘আল-ওয়ালা ওয়াল বারা’। এখানে, আমি একটা বিষয় টানতে চাই, আমাদের দেশের বাতিল রাজনৈতিক মতাদর্শে বেড়ে উঠা দলগুলোর কর্মীরা তাদের এই মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য রাজপথে জীবন দিতে পিছপা করছেনা ; অথচ আমি মুসলিম হিসেবে কতবার ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন, সিরিয়া, চেচনিয়া, কাশ্মীরের মুসলিম ভাইয়ের জন্য কেঁদেছি। দেশের সর্বত্র আল্লাহ্ এবং তার রাসূল সাঃ কে নিয়ে কটুক্তি শুনতে শুনতে কান ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে; অথচ আমাদের ভাবান্তর নেই! পক্ষান্তরে, আমাদের ঈমান’ই ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। কেননা, নিজের জীবনের চেয়ে রাসূল সাঃ কে ভালবাসা ঈমানের দাবী। হে আল্লাহ্! আমাদের ক্ষমা করো আর আমাদের সমস্ত কাপুরুষতা দুর করে দাও।

    যে ব্যাপারটি, সকল মুসলিমকে ভ্রাতৃত্ববোধে আবদ্ধ করে তা হলো :

    ‘، أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له وأن محمدا عبده ورسوله’

    আর, একজন মুসলিমের আল্লাহ্’র জন্য ভালবাসা আর আল্লাহ্’র জন্য ঘৃণা করা ঈমানের পরিপূর্ণতার পরিচায়ক। আমাদের online দাওয়াহ্ সেই ভালবাসা আর ঘৃণার কিয়দংশও পূরণ করেনা; পূরণ করেনা সেই সুন্নাহ’র যার কারণে আবু উবায়দাহ্ ইবনুল জাররাহ্ তার পিতাকে হত্যা করেছিলেন কিংবা মুসাইয়াব ইবন উমায়ের’এর তার বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে দ্বীনের দা’য়ী হওয়া এবং শাহাদাহ্ বরন করে দাফনের কাপড় না পাওয়া।

    প্রশ্ন আমার নিজের কাছে, আমি কি প্রবৃত্তির অনুসরন করছি?

    দ্বীনের পথে একসাথে সংগ্রামে করা, ত্যাগ স্বীকার করা, নির্যাতিত হওয়া মক্কার মুহাজিরদের দৃঢ়ত্ব দান করেছিলো; যার ফলশ্রুতিতে তারা লাভ করেছিলো চুড়ান্ত সাফল্য।

    আল্লাহ্ তা’আলা কুরআনুল কারীমে বলেছেন:

    أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُواْ الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُم مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلِكُم مَّسَّتْهُمُ الْبَأْسَاء وَالضَّرَّاء وَزُلْزِلُواْ حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُواْ مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللَّهِ أَلا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ

    “তোমাদের কি এই ধারণা যে, তোমরা জান্নাহ্’য় চলে যাবে, অথচ সে লোকদের অবস্থা অতিক্রম করনি- যারা তোমাদের পূর্বে অতীত হয়েছে। তাদের উপর এসেছে বিপদ ও কষ্ট। আর এমনিভাবে শিহরিত হতে হয়েছে যাতে নবী ও তার প্রতি যারা ঈমান এনেছিলো তাদেরেকে পর্যন্ত একথা বলতে হয়েছে যে, কখন আসবে আল্লাহ্’র সাহায্য! তোমরা শোনে নাও, আল্লাহ্’র সাহায্য একান্তই নিকটবর্তী।“ [সুরা বাকারাহ্: ২১৪]

    আমি যা বলতে চেয়েছি তার সারমর্ম হলো এই:

    “Living in mental diaspora and communicating through social networks and blogs doesn’t bind us as compassionate; some specific shares intrigue our psyche for an instance. But, we are wasting most of our times here; thus, we are abandoning community Dawah and acquiring knowledge in coherent manner.”

    আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের বোঝার তৌফিক দিন।

    امين .

    سبحانك اللهم و بحمدك أشهد أن لا إله إلا أنت أستغفرك و أتوب إليك

    সায়্যিদ মাহমুদ গজনবী

  • আত্ম-সমালোচনা: চিন্তার সামান্য খোরাক

    আলহামদুলি’ল্লাহ্; বর্তমান প্রজন্মে মুসলিম হিসেবে আমরা সকলেই দাওয়াহ্’ ও ইসলাহ্’র প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি এবং সেই তাড়নায় আমরা সকলেই সচেষ্ট হচ্ছি আপন পরিমন্ডলে দাওয়াহ্’র জন্য। অনেকেই Online এ বিভিন্ন Platform এ দাওয়াহ্ করছেন। প্রতিনিয়ত কুরআন, হাদীসের বাণী, ছোট ছোট Article তথাপি আবেগপ্রবণ status দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব সারছি। এখানে, প্রশ্ন হলো আমরা যাদেরকে Prospect হিসেবে নিয়েছি তারা সকলেই সমমনা; অর্থাৎ সকলেই একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ের জ্ঞান রাখেন এইসব evaluate করার জন্য। তাই, online এ দাওয়াহ্ বড়জোর ইসলাহ্’র পর্যায়ে উন্নীত হয়। তাদের তুলনায় দাওয়াহ্’র অধিক হকদার; আমাদের সমাজের সেই সকল মানুষ যারা মনে করছে; ‘they are Muslim for granted’; অথচ তারা ইসলামের প্রকৃত বাণী উপলব্ধি করে না।

    আরেকটি, ব্যাপারে হলো এটা পক্ষান্তরে ক্ষতি করছে নিষ্ঠাবান ত্বলিবুল ইলম’দের যারা অন্যের status এ like আর commenting অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট করছে। এইসব status সাময়িকভাবে ইন্দীয় তাড়না সৃষ্টিকারী ছাড়া আর কিছু নয়। দ্বীনী ইলম পদ্ধতিগতভাবে শিখা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। একজন মুসলিম হিসেবে আমি ইলমে বেড়ে উঠছি কিনা তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

    আরেকটি ব্যাপার হলো, আমরা উম্মাহ্ হিসেবে যার অভিযোগ সবচেয়ে বেশী করি, তা হলো ‘আল-ওয়ালা ওয়াল বারা’। এখানে, আমি একটা বিষয় টানতে চাই, আমাদের দেশের বাতিল রাজনৈতিক মতাদর্শে বেড়ে উঠা দলগুলোর কর্মীরা তাদের এই মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য রাজপথে জীবন দিতে পিছপা করছেনা ; অথচ আমি মুসলিম হিসেবে কতবার ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন, সিরিয়া, চেচনিয়া, কাশ্মীরের মুসলিম ভাইয়ের জন্য কেঁদেছি। দেশের সর্বত্র আল্লাহ্ এবং তার রাসূল সাঃ কে নিয়ে কটুক্তি শুনতে শুনতে কান ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে; অথচ আমাদের ভাবান্তর নেই! পক্ষান্তরে, আমাদের ঈমান’ই ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। কেননা, নিজের জীবনের চেয়ে রাসূল সাঃ কে ভালবাসা ঈমানের দাবী। হে আল্লাহ্! আমাদের ক্ষমা করো আর আমাদের সমস্ত কাপুরুষতা দুর করে দাও।

    যে ব্যাপারটি, সকল মুসলিমকে ভ্রাতৃত্ববোধে আবদ্ধ করে তা হলো :

    “আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহ”

    আর, একজন মুসলিমের আল্লাহ্’র জন্য ভালবাসা আর আল্লাহ্’র জন্য ঘৃণা করা ঈমানের পরিপূর্ণতার পরিচায়ক। আমাদের online দাওয়াহ্ সেই ভালবাসা আর ঘৃণার কিয়দংশও পূরণ করেনা; পূরণ করেনা সেই সুন্নাহ’র যার কারণে আবু উবায়দাহ্ ইবনুল জাররাহ্ তার পিতাকে হত্যা করেছিলেন কিংবা মুসাইয়াব ইবন উমায়ের’এর তার বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে দ্বীনের দা’য়ী হওয়া এবং শাহাদাহ্ বরন করে দাফনের কাপড় না পাওয়া।

    প্রশ্ন আমার নিজের কাছে, আমি কি প্রবৃত্তির অনুসরন করছি?

    দ্বীনের পথে একসাথে সংগ্রামে করা, ত্যাগ স্বীকার করা, নির্যাতিত হওয়া মক্কার মুহাজিরদের দৃঢ়ত্ব দান করেছিলো; যার ফলশ্রুতিতে তারা লাভ করেছিলো চুড়ান্ত সাফল্য।

    আল্লাহ্ তা’আলা কুরআনুল কারীমে বলেছেন:

    “তোমাদের কি এই ধারণা যে, তোমরা এমনিতেই জান্নাহ্’য় চলে যাবে, অথচ সে লোকদের অবস্থা অতিক্রম করনি- যারা তোমাদের পূর্বে অতীত হয়েছে। তাদের উপর এসেছে বিপদ ও কষ্ট। আর এমনিভাবে শিহরিত হতে হয়েছে যাতে নবী ও তার প্রতি যারা ঈমান এনেছিলো তাদেরেকে পর্যন্ত একথা বলতে হয়েছে যে, কখন আসবে আল্লাহ্’র সাহায্য! তোমরা শোনে নাও, আল্লাহ্’র সাহায্য একান্তই নিকটবর্তী। [সুরা বাকারাহ্: ২১৪]

    আমি যা বলতে চেয়েছি তার সারমর্ম হলো এই:

    “Living in mental diaspora and communicating through social networks and blogs doesn’t bind us as compassionate; some specific shares intrigue our psyche for an instance. But, we are wasting most of our times here; thus, we are abandoning community Dawah and acquiring knowledge in coherent manner.”

    আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের বোঝার তৌফিক দিন।

    امين 

  • বাংলা নববর্ষ উদযাপন: ইসলামী দৃষ্টিকোণ ও মুসলিমদের করণীয়

    বাংলা নববর্ষ উদযাপন: ইসলামী দৃষ্টিকোণ ও মুসলিমদের করণীয়

    بسم الله الرحمن الرحيم

    ভূমিকা

    নববর্ষ, বর্ষবরণ, পহেলা বৈশাখ – এ শব্দগুলো বাংলা নতুন বছরের আগমন এবং এ উপলক্ষে আয়োজিত উৎসব-অনুষ্ঠানাদিকে ইঙ্গিত করে। এই উৎসবকে প্রচার মাধ্যমসমূহে বাঙালির ঐতিহ্য হিসেবে রঞ্জিত করা হয়ে থাকে। তাই জাতিগত একটি ঐতিহ্য হিসেবে এই উৎসবকে এবং এর সাথে সম্পৃক্ত কর্মকান্ডকে সমর্থন যোগানোর একটা বাধ্যবাধকতা অনুভূত হয় সবার মনেই – এ যে বাঙালি জাতির উৎসব! তবে বাংলাদেশে বসবাসরত বাঙালি জাতির শতকরা ৮৫ ভাগ [১] লোক আবার মুসলিমও বটে, তাই স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে: নববর্ষ উদযাপন এবং সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানাদি যেমন: রবীন্দ্রসংগীতের মাধ্যমে বর্ষবরণ, বৈশাখী মেলা, রমনার বটমূলে পান্তা-ইলিশের ভোজ, জীবজন্তু ও রাক্ষস-খোক্কসের প্রতিকৃতি নিয়ে গণমিছিল – এবং এতদুপলক্ষে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, হাসিঠাট্টা ও আনন্দ উপভোগ, সাজগোজ করে নারীদের অবাধ বিচরণ ও সৌন্দর্যের প্রদর্শনী, সহপাঠী সহপাঠিনীদের একে অপরের দেহে চিত্রাংকন – এসবকিছু কতটা ইসলাম সম্মত? ৮৫ ভাগ মুসলিম যে আল্লাহতে বিশ্বাসী, সেই আল্লাহ কি মুসলিমদের এইসকল আচরণে আনন্দ-আপ্লুত হন, না ক্রোধান্বিত হন? নববর্ষকে সামনে রেখে এই নিবন্ধে এই বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।

    ইসলাম ধর্মে উৎসবের রূপরেখা

    অনেকেই উপলব্ধি না করলেও উৎসব সাধারণত একটি জাতির ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে সম্পৃক্ত হয়। উৎসবের উপলক্ষগুলো খোঁজ করলে পাওয়া যাবে উৎসব পালনকারী জাতির ধমনীতে প্রবাহিত ধর্মীয় অনুভূতি, সংস্কার ও ধ্যান-ধারণার ছোঁয়া। উদাহরণস্বরূপ খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের বড়দিন তাদের বিশ্বাসমতে স্রষ্টার পুত্রের জন্মদিন। মধ্যযুগে ইউরোপীয় দেশগুলোতে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নববর্ষ পালিত হত ২৫শে মার্চ, এবং তা পালনের উপলক্ষ এই ছিল যে, ঐ দিন খ্রীস্টীয় মতবাদ অনুযায়ী মাতা মেরীর নিকট ঐশী বাণী প্রেরিত হয় এই মর্মে যে, মেরী ঈশ্বরের পুত্রের জন্ম দিতে যাচ্ছেন।[২] পরবর্তীতে ১৫৮২ সালে গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডারের সূচনার পর রোমক ক্যাথলিক দেশগুলো পয়লা জানুয়ারী নববর্ষ উদযাপন করা আরম্ভ করে। ঐতিহ্যগতভাবে এই দিনটি একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবেই পালিত হত।[৩] ইহুদীদের নববর্ষ ‘রোশ হাশানাহ’ ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্ণিত ইহুদীদের ধর্মীয় পবিত্র দিন সাবাত হিসেবে পালিত হয়।[৪] এমনিভাবে প্রায় সকল জাতির উৎসব-উপলক্ষের মাঝেই ধর্মীয় চিন্তা-ধারা খুঁজে পাওয়া যাবে। আর এজন্যই ইসলাম ধর্মে নবী মুহাম্মাদ (সা) পরিষ্কারভাবে মুসলিমদের উৎসবকে নির্ধারণ করেছেন, ফলে অন্যদের উৎসব মুসলিমদের সংস্কৃতিতে প্রবেশের কোন সুযোগ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:

    إن لكل قوم عيدا، وهذا عيدنا

    “প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঈদ রয়েছে, আর এটা আমাদের ঈদ।”[৫]

    বিখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ এ সম্পর্কে বলেন:

    “উৎসব-অনুষ্ঠান ধর্মীয় বিধান, সুস্পষ্ট পথনির্দেশ এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেরই একটি অংশ, যা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:

    ‘তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই আমি একটি নির্দিষ্ট বিধান এবং সুস্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি।’ (আল-মায়িদাহ, ৫:৪৮) 

    ‘প্রতিটি জাতির জন্য আমি ধর্মীয় উপলক্ষ নির্দিষ্ট করে দিয়েছি যা তাদেরকে পালন করতে হয়।’ (আল-হাজ্জ্ব, ২২:৬৭)

    যেমনটি কিবলাহ, সালাত এবং সাওম ইত্যাদি। সেজন্য তাদের [অমুসলিমদের] উৎসব-অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া আর তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এই উৎসব-অনুষ্ঠানের সাথে একমত পোষণ করা অর্থ কুফরের সাথে একমত পোষণ করা। আর এসবের একাংশের সাথে একমত পোষণ করা অর্থ কুফরের শাখাবিশেষের সাথে একমত হওয়া। উৎসব-অনুষ্ঠানাদি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যার দ্বারা ধর্মগুলোকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায়।…নিঃসন্দেহে তাদের সাথে এসব অনুষ্ঠান পালনে যোগ দেয়া একজনকে কুফরের দিকে নিয়ে যেতে পারে। আর বাহ্যিকভাবে এগুলোতে অংশ নেয়া নিঃসন্দেহে পাপ। উৎসব অনুষ্ঠান যে প্রতিটি জাতির স্বকীয় বৈশিষ্ট্য, এর প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা) ইঙ্গিত করেছেন, যখন তিনি বলেন: ‘প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঈদ রয়েছে, আর এটা আমাদের ঈদ।’ (বুখারী, মুসলিম)”[৬]

    এছাড়া আনাস ইবনে মালিক (রা) বর্ণিত:

    قدم رسول اللّه صلى اللّه عليه وسلم المدينة ولهم يومان يلعبون فيهما، فقال: “ما هذان اليومان”؟ قالوا: كنا نلعب فيهما في الجاهلية، فقال رسول اللّه صلى اللّه عليه وسلم: “إنَّ اللّه قد أبدلكم بهما خيراً منهما: يوم الأضحى، ويوم الفطر”

    “রাসূলুল্লাহ (সা) যখন [মদীনায়] আসলেন, তখন তাদের দুটো উৎসবের দিন ছিল। তিনি (সা) বললেন, ‘এ দুটো দিনের তাৎপর্য কী?’ তারা বলল, ‘জাহিলিয়াতের যুগে আমরা এ দুটো দিনে উৎসব করতাম।’ রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে এদের পরিবর্তে উত্তম কিছু দিয়েছেন: ইয়াওমুল আদহা[৭] ও ইয়াওমুল ফিতর[৮]।’”[৯]

    এ হাদীস থেকে দেখা যাচ্ছে যে ইসলাম আগমনের পর ইসলাম বহির্ভূত সকল উৎসবকে বাতিল করে দেয়া হয়েছে এবং নতুনভাবে উৎসবের জন্য দুটো দিনকে নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই সাথে অমুসলিমদের অনুসরণে যাবতীয় উৎসব পালনের পথকে বন্ধ করা হয়েছে।

    ইসলামের এই যে উৎসব – ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা – এগুলো থেকে মুসলিম ও অমুসলিমদের উৎসবের মূলনীতিগত একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট হয়, এবং এ বিষয়টির প্রতি আমাদের খুব গুরুত্বসহকারে লক্ষ্য করা উচিৎ, তা হচ্ছে:

    অমুসলিম, কাফির কিংবা মুশরিকদের উৎসবের দিনগুলো হচ্ছে তাদের জন্য উচ্ছৃঙ্খল আচরণের দিন, এদিনে তারা নৈতিকতার সকল বাঁধ ভেঙ্গে দিয়ে অশ্লীল কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়, আর এই কর্মকান্ডের অবধারিত রূপ হচ্ছে মদ্যপান ও ব্যভিচার। এমনকি খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের বহুলোক তাদের পবিত্র বড়দিনেও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে মদ্যপ হয়ে ওঠে, এবং পশ্চিমা বিশ্বে এই রাত্রিতে কিছু লোক নিহত হয় মদ্যপ অবস্থায় গাড়ী চালানোর কারণে।

    অপরদিকে মুসলিমদের উৎসব হচ্ছে ইবাদতের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। এই বিষয়টি বুঝতে হলে ইসলামের সার্বিকতাকে বুঝতে হবে। ইসলাম কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়, বরং তা মানুষের গোটা জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী বিন্যস্ত ও সজ্জিত করতে উদ্যোগী হয়। তাই একজন মুসলিমের জন্য জীবনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে ইবাদত, যেমনটি কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা দিচ্ছেন:

    “আমি জ্বিন ও মানুষকে আমার ইবাদত করা ছাড়া অন্য কোনো কারণে সৃষ্টি করিনি।”[১০]

    সেজন্য মুসলিম জীবনের আনন্দ-উৎসব আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ ও অশ্লীলতায় নিহিত নয়, বরং তা নিহিত হচ্ছে আল্লাহর দেয়া আদেশ পালন করতে পারার মাঝে, কেননা মুসলিমের ভোগবিলাসের স্থান ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী নয়, বরং চিরস্থায়ী জান্নাত। তাই মুসলিম জীবনের প্রতিটি কাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে থাকবে তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, তাদের ঈমান, আখিরাতের প্রতি তাদের অবিচল বিশ্বাস, আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালবাসা।

    তাইতো দেখা যায় যে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা – এ দুটো উৎসবই নির্ধারণ করা হয়েছে ইসলামের দুটি স্তম্ভ পালন সম্পন্ন করার প্রাক্কালে। ইসলামের চতুর্থ স্তম্ভ সাওম পালনের পর পরই মুসলিমরা পালন করে ঈদুল ফিতর, কেননা এই দিনটি আল্লাহর আদেশ পালনের পর আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার ও ক্ষমার ঘোষণা পাওয়ার দিন বিধায় এটি সাওম পালনকারীর জন্য বাস্তবিকই উৎসবের দিন – এদিন এজন্য উৎসবের নয় যে এদিনে আল্লাহর দেয়া আদেশ নিষেধ কিছুটা শিথিল হতে পারে, যেমনটি বহু মুসলিমদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, তারা এই দিনে আল্লাহর আদেশ নিষেধ ভুলে গিয়ে অশ্লীল কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়, বরং মুসলিমের জীবনে এমন একটি মুহূর্তও নেই, যে মুহূর্তে তার ওপর আল্লাহর আদেশ নিষেধ শিথিলযোগ্য। তেমনিভাবে ঈদুল আযহা পালিত হয় ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ হাজ্জ পালনের প্রাক্কালে। কেননা ৯ই জিলহজ্জ হচ্ছে ইয়াওমুল আরাফা, এদিনটি আরাফাতের ময়দানে হাজী সাহেবদের ক্ষমা লাভের দিন, আর তাই ১০ই জিলহজ্জ হচ্ছে আনন্দের দিন – ঈদুল আযহা। এমনিভাবে মুসলিমদের উৎসবের এ দুটো দিন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকে বেশী করে স্মরণ করার দিন, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন এবং শরীয়তসম্মত বৈধ আনন্দ উপভোগের দিন – এই উৎসব মুসলিমদের ঈমানের চেতনার সাথে একই সূত্রে গাঁথা।

    নতুন বছরের সাথে মানুষের কল্যাণের সম্পর্ক

    নতুন বছর নতুন কল্যাণ বয়ে আনে, দূরীভূত হয় পুরোনো কষ্ট ও ব্যর্থতার গ্লানি – এধরনের কোন তত্ত্ব ইসলামে আদৌ সমর্থিত নয়, বরং নতুন বছরের সাথে কল্যাণের শুভাগমনের ধারণা আদিযুগের প্রকৃতি-পুজারী মানুষের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধ্যান-ধারণার অবশিষ্টাংশ। ইসলামে এ ধরনের কুসংস্কারের কোন স্থান নেই। বরং মুসলিমের জীবনে প্রতিটি মুহূর্তই পরম মূল্যবান হীরকখন্ড, হয় সে এই মুহূর্তকে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করে আখিরাতের পাথেয় সঞ্চয় করবে, নতুবা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে শাস্তির যোগ্য হয়ে উঠবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বছরের প্রথম দিনের কোনো বিশেষ তাৎপর্য নেই। আর তাই তো ইসলামে হিজরী নববর্ষ পালনের কোনো প্রকার নির্দেশ দেয়া হয়নি। না কুরআনে এর কোনো নির্দেশ এসেছে, না হাদীসে এর প্রতি কোনো উৎসাহ দেয়া হয়েছে, না সাহাবীগণ এরূপ কোনো উপলক্ষ পালন করেছেন। এমনকি পয়লা মুর্হা‌রামকে নববর্ষের সূচনা হিসেবে গণনা করা শুরুই হয় নবীজীর (সা) মৃত্যুর বহু পরে উমর ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর আমলে। এ থেকে বোঝা যায় যে, নববর্ষ ইসলামের দৃষ্টিতে কতটা তাৎপর্যহীন, এর সাথে জীবনে কল্যাণ-অকল্যাণের গতিপ্রবাহের কোন দূরতম সম্পর্কও নেই, আর সেক্ষেত্রে বাংলা নববর্ষের কিই বা তাৎপর্য থাকতে পারে ইসলামে?

    কেউ যদি এই ধারণা পোষণ করে যে নববর্ষের প্রারম্ভের সাথে কল্যাণের কোন সম্পর্ক রয়েছে, তবে সে শিরকে লিপ্ত হল, অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থির করল। যদি সে মনে করে যে আল্লাহ এই উপলক্ষের দ্বারা মানবজীবনে কল্যাণ বর্ষণ করেন, তবে সে ছোট শিরকে লিপ্ত হল। আর কেউ যদি মনে করে যে নববর্ষের আগমনের এই ক্ষণটি নিজে থেকেই কোনো কল্যাণের অধিকারী, তবে সে বড় শিরকে লিপ্ত হল, যা তাকে ইসলামের গন্ডীর বাইরে নিয়ে গেল। আর এই শিরক এমন অপরাধ যে, শিরকের ওপর কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে চিরতরে হারাম করে দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন:

    “নিশ্চয়ই যে কেউই আল্লাহর অংশীদার স্থির করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে হারাম করে দিয়েছেন, আর তার বাসস্থান হবে অগ্নি। এবং যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।”[১১]

    বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সাথে মঙ্গলময়তার এই ধারণার সম্পর্ক রয়েছে বলে কোনো কোনো সূত্রে দাবী করা হয়[১২], যা কিনা অত্যন্ত দুশ্চিন্তার বিষয়। মুসলিমদেরকে এ ধরনের কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে ইসলামের যে মূলতত্ত্ব সেই তাওহীদ বা একত্ববাদের ওপর পরিপূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।

    নববর্ষের অনুষ্ঠানাদি: শয়তানের পুরোনো কূটচালের নবায়ন

    আমাদের সমাজে নববর্ষ যারা পালন করে, তারা কি ধরনের অনুষ্ঠান সেখানে পালন করে, আর সেগুলো সম্পর্কে ইসলামের বক্তব্য কি? নববর্ষের অনুষ্ঠানাদির মধ্যে রয়েছে: বৈশাখী মেলা, যাত্রা, পালাগান, কবিগান, জারিগান, গম্ভীরা গান প্রভৃতি বিভিন্ন লোকসঙ্গীতের ব্যবস্থা, প্রভাতে উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানান, নতুন সূর্যকে প্রত্যক্ষকরণ, নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে শিল্পীদের সংগীত, পান্তা-ইলিশ ভোজ, চারুশিল্পীদের শোভাযাত্রা, রমনার বটমূলে ছায়ানটের উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথের আগমনী গান “এসো হে বৈশাখ…”, এছাড়া রেডিও টিভিতে বিশেষ অনুষ্ঠান ও পত্রপত্রিকার বিশেষ ক্রোড়পত্র।[১৩]

    এবারে এ সকল অনুষ্ঠানাদিতে অনুষ্ঠিত মূল কর্মকান্ড এবং ইসলামে এগুলোর অবস্থান সম্পর্কে পর্যালোচনা করা যাক:

    সূর্যকে স্বাগত জানানো ও বৈশাখকে সম্বোধন করে স্বাগত জানানো: এ ধরনের কর্মকাণ্ড মূলত সূর্য-পূজারী ও প্রকৃতি-পূজারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অনুকরণ মাত্র, যা আধুনিক মানুষের দৃষ্টিতে পুনরায় শোভনীয় হয়ে উঠেছে। তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সমাজের অনেকেরই ধর্মের নাম শোনামাত্র গাত্রদাহ সৃষ্টি হলেও প্রকৃতি-পূজারী আদিম ধর্মের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নকল করতে তাদের অন্তরে অসাধারণ পুলক অনুভূত হয়। সূর্য ও প্রকৃতির পূজা বহু প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন জাতির লোকেরা করে এসেছে। যেমন খ্রীস্টপূর্ব ১৪ শতকে মিশরীয় “অ্যাটোনিসম” মতবাদে সূর্যের উপাসনা চলত। এমনি ভাবে ইন্দো-ইউরোপীয় এবং মেসো-আমেরিকান সংস্কৃতিতে সূর্য পূজারীদেরকে পাওয়া যাবে। খ্রীস্টান সম্প্রদায় কর্তৃক পালিত যীশু খ্রীস্টের তথাকথিত জন্মদিন ২৫শে ডিসেম্বরও মূলত এসেছে রোমক সৌর-পূজারীদের পৌত্তলিক ধর্ম থেকে, যীশু খ্রীস্টের প্রকৃত জন্মতারিখ থেকে নয়।[১৪] ১৯ শতাব্দীর উত্তর-আমেরিকায় কিছু সম্প্রদায় গ্রীষ্মের প্রাক্কালে পালন করত সৌর-নৃত্য এবং এই উৎসব উপলক্ষে পৌত্তলিক প্রকৃতি পূজারীরা তাদের ধর্মীয়-বিশ্বাসের পুনর্ঘোষণা দিত।[১৫] মানুষের ভক্তি ও ভালবাসাকে প্রকৃতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টির প্রতি আবদ্ধ করে তাদেরকে শিরক বা অংশীদারিত্বে লিপ্ত করানো শয়তানের সুপ্রাচীন “ক্লাসিকাল ট্রিক” বলা চলে। শয়তানের এই কূটচালের বর্ণনা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুরআনে তুলে ধরেছেন:

    “আমি তাকে ও তার জাতিকে[১৬] দেখেছি, তারা আল্লাহকে ছেড়ে সূর্যকে সিজদা করছে এবং শয়তান তাদের কার্যাবলীকে তাদের জন্য শোভনীয় করেছে…”[১৭]

    আজকের বাংলা নববর্ষ উদযাপনে গান গেয়ে বৈশাখী সূর্যকে স্বাগত জানানো, আর কুরআনে বর্ণিত প্রাচীন জাতির সূর্যকে সিজদা করা, আর উত্তর আমেরিকার আদিবাসীদের সৌর-নৃত্য – এগুলোর মধ্যে চেতনাগত কোন পার্থক্য নেই, বরং এ সবই স্রষ্টার দিক থেকে মানুষকে অমনোযোগী করে সৃষ্টির আরাধনার প্রতি তার আকর্ষণ জাগিয়ে তোলার শয়তানী উদ্যোগ।

    নববর্ষে মুখোশ নৃত্য, গম্ভীরা গান ও জীবজন্তুর প্রতিকৃতি নিয়ে মিছিল: গম্ভীরা উৎসবের যে মুখোশ নৃত্য, তার উৎস হচ্ছে কোচ নৃগোষ্ঠীর প্রাচীন কৃত্যানুষ্ঠান এবং পরবর্তীতে ভারতীয় তান্ত্রিক বৌদ্ধগণ এই নৃত্য আত্তীকরণ করে নিজস্ব সংস্করণ তৈরী করে।[১৮] জন্তু-পূজার উৎস পাওয়া যাবে প্রাচীন গ্রীক ও রোমান সভ্যতার কিছু ধর্মীয় মতবাদে, যেখানে দেবতাদেরকে জন্তুর প্রতিকৃতিতে উপস্থাপন করা হয়েছে।[১৯] এমনিভাবে নববর্ষের কিছু অনুষ্ঠানে প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্মীয় মতবাদের ছোঁয়া লেগেছে, যা যথারীতি ইসলামবিদ্বেষীদের নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়, এগুলো তাদের আধ্যাত্মিক আবেগ-অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর জন্য সত্য ধর্মের বিকল্প এক বিকৃত পথ মাত্র। ইসলামের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সকল প্রকার মিথ্যা দেবতার অবসান ঘটিয়ে একমাত্র প্রকৃত ইলাহ, মানুষের স্রষ্টা আল্লাহর ইবাদতকে প্রতিষ্ঠিত করা, যেন মানুষের সকল ভক্তি, ভালবাসা, ভয় ও আবেগের কেন্দ্রস্থলে তিনি আসীন থাকেন। অপরদিকে শয়তানের ষড়যন্ত্র হচ্ছে বিবিধ প্রতিকৃতির দ্বারা মানুষকে মূল পালনকর্তার ইবাদত থেকে বিচ্যুত করা। আর তাই তো ইসলামে প্রতিকৃতি কিংবা জীবন্ত বস্তুর ছবি তৈরী করাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাস’উদ (রা) থেকে বর্ণিত যে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:

    إن أشد الناس عذابا يوم القيامة المصورون

    “কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে [জীবন্ত প্রাণীর – Animate Beings] ছবি তৈরীকারীরা।”[২০]

    ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত হাদীস থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:

    من صور صورة فإن الله معذبه حتى ينفخ فيها الروح، وليس بنافخ فيها أبدا

    “যে কেউই ছবি তৈরী করল, আল্লাহ তাকে [কিয়ামতের দিন] ততক্ষণ শাস্তি দিতে থাকবেন যতক্ষণ না সে এতে প্রাণ সঞ্চার করে, আর সে কখনোই তা করতে সমর্থ হবে না।”[২১]

    নারীকে জড়িয়ে বিভিন্ন অশ্লীলতা: শিরকপূর্ণ আচার-অনুষ্ঠানের পরেই নববর্ষের অনুষ্ঠানাদির মধ্যে সমাজ-বিধ্বংসী যে বিষয়গুলো পাওয়া যাবে, তা হচ্ছে নারীকে জড়িয়ে বিভিন্ন ধরনের অশ্লীলতা। বৈশাখী মেলা, রমনার বটমূল, চারুকলার মিছিল, এর সবর্ত্রই সৌন্দর্য প্রদর্শনকারী নারীকে পুরুষের সাথে অবাধ মেলামেশায় লিপ্ত দেখা যাবে। পৃথিবীতে আল্লাহ মানুষকে যে সকল আকষর্ণীয় বস্তু দ্বারা পরীক্ষা করে থাকেন, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নারী। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:
       

    ما تركت بعدي فتنة أضر على الرجال من النساء

    “আমি পুরুষের জন্য নারীর চেয়ে ক্ষতিকারক কোনো ফিতনা রেখে যাচ্ছি না।”[২২]

    সমাজ নারীকে কোন অবস্থায়, কি ভূমিকায়, কি ধরনের পোশাকে দেখতে চায় – এ বিষয়টি সেই সমাজের ধ্বংস কিংবা উন্নতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত অতীব গুরুত্বপূর্ণ এক বিষয়। নারীর বিচরণক্ষেত্র, ভূমিকা এবং পোশাক এবং পুরুষের সাপেক্ষে তার অবস্থান – এ সবকিছুই ইসলামে সরাসরি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ দ্বারা নির্ধারিত, এখানে ব্যক্তিগত বা সামাজিক প্রথা, হালের ফ্যাশন কিংবা ব্যক্তিগত শালীনতাবোধের কোন গুরুত্বই নেই। যেমন ইসলামে নারীদের পোশাকের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেয়া আছে, আর তা হচ্ছে এই যে একজন নারীর চেহারা[২৩] ও হস্তদ্বয় ছাড়া দেহের অন্য কোনো অঙ্গই বহিরাগত পুরুষেরা দেখতে পারবে না। বহিরাগত পুরুষ কারা? স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীদের পুত্র, ভাই, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নীপুত্র, মুসলিম নারী, নিজেদের মালিকানাধীন দাসী, যৌনকামনাহীন কোনো পুরুষ এবং এমন শিশু যাদের লজ্জাস্থান সম্পর্কে সংবেদনশীলতা তৈরী হয়নি, তারা বাদে সবাই একজন নারীর জন্য বহিরাগত।[২৪] এখানে ব্যক্তিগত শালীনতাবোধের প্রশ্ন নেই। যেমন কোনো নারী যদি বহিরাগত পুরুষের সামনে চুল উন্মুক্ত রেখে দাবী করে যে তার এই বেশ যথেষ্ট শালীন, তবে তা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হলেও ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা শালীনতা-অশালীনতার সামাজিক মাপকাঠি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়, আর তাই সমাজ ধীরে ধীরে নারীর বিভিন্ন অঙ্গ উন্মুক্তকরণকে অনুমোদন দিয়ে ক্রমান্বয়ে এমন পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারে যে, যেখানে বস্তুত দেহের প্রতিটি অঙ্গ নগ্ন থাকলেও সমাজে সেটা গ্রহণযোগ্য হয় – যেমনটা পশ্চিমা বিশ্বের ফ্যাশন শিল্পে দেখা যায়। মার্কিন-যুক্তরাষ্ট্রে কিংবা ভারতবর্ষে যা শালীন, বাংলাদেশে হয়ত এখনও সেটা অশালীন – তাহলে শালীনতার মাপকাঠি কি? সেজন্য ইসলামে এধরনের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে মানুষের কামনা-বাসনার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়নি, বরং তা কুরআন ও হাদীসের বিধান দ্বারা নির্ধারণ করা হয়েছে। তেমনি নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও অবাধ কথাবার্তা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেননা এই অবাধ মেলামেশা ও অবাধ কথাবার্তাই ব্যভিচারের প্রথম ধাপ। যিনা-ব্যভিচার ইসলামী শরীয়াতের আলোকে কবীরাহ গুনাহ, এর পরিণতিতে হাদীসে আখিরাতের কঠিন শাস্তির বর্ণনা এসেছে। এর প্রসারে সমাজ জীবনের কাঠামো ভেঙ্গে পড়ে, ছড়িয়ে পড়ে অশান্তি ও সন্ত্রাস এবং কঠিন রোগব্যাধি। আল্লাহর রাসূলের হাদীস অনুযায়ী কোন সমাজে যখন ব্যভিচার প্রসার লাভ করে তখন সে সমাজ আল্লাহর শাস্তির যোগ্য হয়ে ওঠে। আর নারী ও পুরুষের মাঝে ভালবাসা উদ্রেককারী অপরাপর যেসকল মাধ্যম, তা যিনা-ব্যভিচারের রাস্তাকেই প্রশস্ত করে। এ সকল কিছু রোধ করার জন্য ইসলামে নারীদেরকে পর্দা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, নারী ও পুরুষের বিচরণ ক্ষেত্র পৃথক করা এবং দৃষ্টি অবনত রাখার বিধান রাখা হয়েছে। যে সমাজ নারীকে অশালীনতায় নামিয়ে আনে, সেই সমাজ অশান্তি ও সকল পাপকাজের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়, কেননা নারীর প্রতি আকর্ষণ পুরুষের চরিত্রে বিদ্যমান অন্যতম অদম্য এক স্বভাব, যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখাই সামাজিক সমৃদ্ধির মূলতত্ত্ব। আর এজন্যই ইসলামে সুনির্দিষ্ট বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে যে কোন প্রকার সৌন্দর্য বা ভালবাসার প্রদর্শনী ও চর্চা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শনের ফলাফল দেখতে চাইলে পশ্চিমা বিশ্বের দিকে তাকানোই যথেষ্ট, গোটা বিশ্বে শান্তি, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ঝান্ডাবাহী খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ছয় মিনিটে একজন নারী ধর্ষিত হয়।[২৫] মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত তথাকথিত সভ্য দেশে মানুষের ভিতরকার এই পশুকে কে বের করে আনল? অত্যন্ত নিম্নবুদ্ধিসম্পন্ন লোকেও সহজেই বুঝতে পারে যে স্রষ্টার বেঁধে দেয়া শালীনতার সীমা যখনই শিথিল করা শুরু হয়, তখনই মানুষের ভিতরকার পশুটি পরিপুষ্ট হতে শুরু করে। পশ্চিমা বিশ্বের অশালীনতার চিত্রও কিন্তু একদিনে রচিত হয়নি। সেখানকার সমাজে নারীরা একদিনেই নগ্ন হয়ে রাস্তায় নামেনি, বরং ধাপে ধাপে তাদের পোশাকে সংক্ষিপ্ততা ও যৌনতা এসেছে, আজকে যেমনিভাবে দেহের অংশবিশেষ প্রদর্শনকারী ও সাজসজ্জা গ্রহণকারী বাঙালি নারী নিজেকে শালীন বলে দাবী করে, ঠিক একইভাবেই বিভিন্ন পশ্চিমা দেশে দেহ উন্মুক্তকরণ শুরু হয়েছিল তথাকথিত “নির্দোষ” পথে।

    নারীর পোশাক-পরিচ্ছদ ও চাল-চলন নিয়ে ইসলামের বিধান আলোচনা করা এই নিবন্ধের আওতা বহির্ভূত, তবে এ সম্পর্কে মোটামুটি একটা চিত্র ইতিমধ্যেই তুলে ধরা হয়েছে। এই বিধি-নিষেধের আলোকে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, নববর্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নারীর যে অবাধ উপস্থিতি, সৌন্দর্য প্রদর্শন এবং পুরুষের সাথে মেলামেশা – তা পরিপূর্ণভাবে ইসলামবিরোধী, তা কতিপয় মানুষের কাছে যতই লোভনীয় বা আকর্ষণীয়ই হোক না কেন। এই অনুষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের ধ্বংসের পূর্বাভাস দিচ্ছে। ৫ বছরের বালিকা ধর্ষণ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মত বিদ্যাপীঠে ধর্ষণের সেঞ্চুরি উদযাপন, পিতার সম্মুখে কন্যা এবং স্বামীর সম্মুখে স্ত্রীর শ্লীলতাহানি – বাংলাদেশের সমাজে এধরনের বিকৃত ঘটনা সংঘটনের প্রকৃত কারণ ও উৎস কি? প্রকৃতপক্ষে এর জন্য সেইসব মা-বোনেরা দায়ী যারা প্রথমবারের মত নিজেদের অবগুন্ঠনকে উন্মুক্ত করেও নিজেদেরকে শালীন ভাবতে শিখেছে এবং সমাজের সেইসমস্ত লোকেরা দায়ী, যারা একে প্রগতির প্রতীক হিসেবে বাহবা দিয়ে সমর্থন যুগিয়েছে।

    ব্যভিচারের প্রতি আহবান জানানো শয়তানের ক্লাসিকাল ট্রিকগুলোর অপর একটি, যেটাকে কুরআনে “ফাহিশাহ” শব্দের আওতায় আলোচনা করা হয়েছে, শয়তানের এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেন:

    “হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র বস্তু আছে তা থেকে তোমরা আহার কর আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। সে তো তোমাদের নির্দেশ দেয় মন্দ ও অশ্লীল কাজ [ব্যভিচার, মদ্যপান, হত্যা ইত্যাদি][২৬] করতে এবং আল্লাহ সম্বন্ধে এমন সব বিষয় বলতে যা তোমরা জান না।”[২৭]

    এছাড়া যা কিছুই মানুষকে ব্যভিচারের দিকে প্রলুব্ধ ও উদ্যোগী করতে পারে, তার সবগুলোকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে কুরআনের নিম্নলিখিত আয়াতের দ্বারা:

    “তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। অবশ্যই এটা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট পন্থা।”[২৮]

    ব্যভিচারকে উৎসাহিত করে এমন বিষয়, পরিবেশ, কথা ও কাজ এই আয়াত দ্বারা নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে।

    বিভিন্ন সাজে সজ্জিত পর্দাবিহীন নারীকে আকর্ষণীয়, প্রগতিশীল, আধুনিক ও অভিজাত বলে মনে হতে পারে, কেননা, শয়তান পাপকাজকে মানুষের দৃষ্টিতে শোভনীয় করে তোলে। যেসব মুসলিম ব্যক্তির কাছে নারীর এই অবাধ সৌন্দর্য প্রদর্শনকে সুখকর বলে মনে হয়, তাদের উদ্দেশ্যে আমাদের বক্তব্য:

    ক. ছোট শিশুরা অনেক সময় আগুন স্পর্শ করতে চায়, কারণ আগুনের রং তাদের কাছে আকর্ষণীয়। কিন্তু আগুনের মূল প্রকৃতি জানার পর কেউই আগুন ধরতে চাইবে না। তেমনি ব্যভিচারকে আকর্ষণীয় মনে হলেও পৃথিবীতে এর ধ্বংসাত্মক পরিণতি এবং আখিরাতে এর জন্য যে কঠিন শাস্তি পেতে হবে, সেটা স্মরণ করলে বিষয়টিকে আকর্ষণীয় মনে হবে না।

    খ. প্রত্যেকে নিজেকে প্রশ্ন করে দেখি, একজন নারী যখন নিজের দেহকে উন্মুক্ত করে সজ্জিত হয়ে বহু পুরুষের সামনে উপস্থিত হয়ে তাদের মনে যৌন-লালসার উদ্রেক করে, তখন সেই দৃশ্য দেখে এবং সেই নারীকে দেখে বহু-পুরুষের মনে যে কামভাবের উদ্রেক হয়, সেকথা চিন্তা করে এই নারীর বাবার কাছে তার কন্যার নগ্নতার দৃশ্যটি কি খুব উপভোগ্য হবে? এই নারীর সন্তানের কাছে তার মায়ের জনসম্মুখে উন্মুক্ততা কি উপভোগ্য? এই নারীর ভাইয়ের কাছে তার বোনের এই অবস্থা কি আনন্দদায়ক? এই নারীর স্বামীর নিকট তার স্ত্রীর এই অবস্থা কি সুখকর? নিশ্চয়ই নয়। তাহলে কিভাবে একজন ব্যক্তি পরনারীর সৌন্দর্য প্রদর্শনকে পছন্দ করতে পারে? এই পরনারী তো কারও কন্যা কিংবা কারও মা, কিংবা কারও বোন অথবা কারও স্ত্রী? এই লোকগুলোর কি পিতৃসুলভ অনুভূতি নেই, তারা কি সন্তানসুলভ আবেগশূন্য, তাদের বোনের প্রতি ভ্রাতৃসুলভ স্নেহশূন্য কিংবা স্ত্রীর প্রতি স্বামীসুলভ অনুভূতিহীন? নিশ্চয়ই নয়। বরং আপনি-আমি একজন পিতা, সন্তান, ভাই কিংবা স্বামী হিসেবে যে অনুভূতির অধিকারী, রাস্তার উন্মুক্ত নারীটির পরিবারও সেই একই অনুভূতির অধিকারী। তাহলে আমরা আমাদের কন্যা, মাতা, ভগ্নী কিংবা স্ত্রীদের জন্য যা চাই না, তা কিভাবে অন্যের কন্যা, মাতা, ভগ্নী কিংবা স্ত্রীদের জন্য কামনা করতে পারি? তবে কোন ব্যক্তি যদি দাবী করে যে সে নিজের কন্যা, মাতা, ভগ্নী বা স্ত্রীকেও পরপুরুষের যথেচ্ছ লালসার বস্তু হতে দেখে বিচলিত হয় না, তবে সে তো পশুতুল্য, নরাধম। বরং অধিকাংশেরই এধরনের সংবেদনশীলতা রয়েছে। তাই আমাদের উচিৎ অন্তর থেকে এই ব্যভিচারের চর্চাকে ঘৃণা করা। এই ব্যভিচার বিভিন্ন অঙ্গের দ্বারা হতে পারে, যেমনটি নবীজী (সা) বর্ণনা করেছেন:

    فزنا العين النظر، وزنا اللسان المنطق، والنفس تتمنى وتشتهي، والفرج يصدق ذلك كله أو يكذبه

    “…চোখের যিনা হচ্ছে তাকানো, জিহ্বার যিনা হচ্ছে কথা বলা, অন্তর তা কামনা করে এবং পরিশেষে যৌনাঙ্গ একে বাস্তবায়ন করে অথবা প্রত্যাখ্যান করে।“[২৯]

    দৃষ্টি, স্পর্শ, শোনা ও কথার দ্বারা সংঘটিত যিনাই মূল ব্যভিচার সংঘটিত হওয়াকে বাস্তব রূপ দান করে, তাই জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য সে সকল স্থান থেকে শতহস্ত দূরে থাকা, যে সকল স্থানে দৃষ্টি, স্পর্শ, শোনা ও কথার ব্যভিচারের সুযোগকে উন্মুক্ত করা হয়।

    সঙ্গীত ও বাদ্য: নববর্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সাথে জড়িত থাকে সংগীত ও বাদ্য। যে সকল স্থানে এসব হারাম সংগীত উপস্থাপিত হয়, যেমন রমনার বটমূল, বৈশাখী মেলা এবং নববর্ষের অন্যান্য অনুষ্ঠানাদি, সে সকল স্থানে যাওয়া, এগুলোতে অংশ নেয়া, এগুলোতে কোন ধরনের সহায়তা করা কিংবা তা দেখা বা শোনা সকল মুসলিমের জন্য হারাম। তাছাড়া অনর্থক কথা ও গল্প-কাহিনী যা মানুষকে জীবনের মূল লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, তা নিঃসন্দেহে মুসলিমের জন্য বর্জনীয়। অনর্থক কথা, বানোয়াট গল্প-কাহিনী এবং গান-বাজনা মানুষকে জীবনের মূল লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য শয়তানের পুরোনো কূটচালের একটি, আল্লাহ এ কথা কুরআনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন:

    “‘এবং তাদের মধ্যে যাদেরকে পার পর্যায়ক্রমে বোকা বানাও তোমার গলার স্বরের সাহায্যে, … “[৩০]

    যে কোন আওয়াজ, যা আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে আহবান জানায়, তার সবই এই আয়াতে বর্ণিত আওয়াজের অন্তর্ভুক্ত।[৩১]

    আল্লাহ আরও বলেন:

    “এবং মানুষের মাঝে এমন কিছু লোক আছে যারা আল্লাহর পথ থেকে [মানুষকে] বিচ্যুত করার জন্য কোন জ্ঞান ছাড়াই অনর্থক কথাকে ক্রয় করে, এবং একে ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে, এদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।”[৩২]

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:

    “আমার উম্মাতের মধ্যে কিছু লোক হবে যারা ব্যভিচার, রেশমী বস্ত্র, মদ এবং বাদ্যযন্ত্রকে হালাল বলে জ্ঞান করবে।”[৩৩]

    এছাড়াও এ ধরনের অনর্থক ও পাপপূর্ণ অনুষ্ঠান সম্পর্কে বহু সতর্কবাণী এসেছে কুরআনের অন্যান্য আয়াতে এবং আল্লাহর রাসূলের হাদীসে। উপরন্তু নববর্ষ উপলক্ষে যে গানগুলো গাওয়া হয়, সেগুলোর কোনো কোনোটির কথাও শিরকপূর্ণ, যেমনটি আগেই বর্ণনা করা হয়েছে।

    যেসকল মুসলিমদের মধ্যে ঈমান এখনও অবশিষ্ট রয়েছে, তাদের উচিৎ এসবকিছুকে সর্বাত্মকভাবে পরিত্যাগ করা।

    আমাদের করণীয়

    সুতরাং ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলা নববর্ষ সংক্রান্ত যাবতীয় অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এজন্য যে এতে নিম্নোলিখিত চারটি শ্রেণীর ইসলাম বিরোধী বিষয় রয়েছে:

    ১. শিরকপূর্ণ অনুষ্ঠানাদি, চিন্তাধারা ও সংগীত

    ২. নগ্নতা, অশ্লীলতা, ব্যভিচারপূর্ণ অনুষ্ঠান

    ৩. গান ও বাদ্যপূর্ণ অনুষ্ঠান

    ৪. সময় অপচয়কারী অনর্থক ও বাজে কথা এবং কাজ

    এ অবস্থায় প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব হচ্ছে নিজে এগুলো থেকে সম্পূর্ণরূপে দূরে থাকা এবং বাঙালি মুসলিম সমাজ থেকে এই প্রথা উচ্ছেদের সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো নিজ নিজ সাধ্য ও অবস্থান অনুযায়ী। এ প্রসঙ্গে আমাদের করণীয় সম্পর্কে কিছু দিকনির্দেশনা দেয়া যেতে পারে:

    – এ বিষয়ে দেশের শাসকগোষ্ঠীর দায়িত্ব হবে আইন প্রয়োগের দ্বারা নববর্ষের যাবতীয় অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ ঘোষণা করা।

    – যেসব ব্যক্তি নিজ নিজ ক্ষেত্রে কিছুটা ক্ষমতার অধিকারী, তাদের কর্তব্য হবে অধীনস্থদেরকে এ কাজ থেকে বিরত রাখা। যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান এই নির্দেশ জারি করতে পারেন যে তার প্রতিষ্ঠানে নববর্ষকে উপলক্ষ করে কোন ধরনের অনুষ্ঠান পালিত হবে না, নববর্ষ উপলক্ষে কেউ বিশেষ পোশাক পরতে পারবে না কিংবা শুভেচ্ছা বিনিময় করতে পারবে না।

    – মসজিদের ইমামগণ এ বিষয়ে মুসল্লীদেরকে সচেতন করবেন ও বিরত থাকার উপদেশ দেবেন।

    – পরিবারের প্রধান এ বিষয়টি নিশ্চিত করবেন যে তার পুত্র, কন্যা, স্ত্রী কিংবা অধীনস্থ অন্য কেউ যেন নববর্ষের কোন অনুষ্ঠানে যোগ না দেয়।

    – এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকে তার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, সহপাঠী, সহকর্মী ও পরিবারের মানুষকে উপদেশ দেবেন এবং নববর্ষ পালনের সাথে কোনভাবে সম্পৃক্ত হওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবেন।

    – এছাড়াও আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে সমাজের মধ্যে আমাদের সকল সমস্যার মূল সমাধান খিলাফত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবী তুলতে হবে, সেই ব্যবস্থা, যে ব্যবস্থা মুসলমানদের ঈমান ও আকীদা সংরক্ষণ করবে ও সমাজের মানুষকে অধঃপতনের হাত হতে রক্ষা করবে।

    আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর আনুগত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফীক দান করুন, এবং কল্যাণ ও শান্তি বর্ষিত হোক নবীজী (সা) – এঁর ওপর, তাঁর পরিবার ও সাহাবীগণের ওপর।

    “দ্রুত ধাবিত হও তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে, যার পরিধি আসমান ও জমীনব্যাপী, যা প্রস্তুত করা হয়েছে আল্লাহভীরুদের জন্য।” (আলে-ইমরান, ৩:১৩৩)

    তথ্যসূত্র:
    [১] বাংলাপিডিয়া, খন্ড ৫, পৃ.৫০২
    [২] মাইক্রোসফট এনকার্টা রেফারেন্স লাইব্রেরী, ২০০৩
    [৩] প্রাগুক্ত
    [৪] প্রাগুক্ত
    [৫] বুখারী ও মুসলিম
    [৬] আল-ইক্বতিদা
    [৭] ঈদুল আযহা
    [৮] ঈদুল ফিতর
    [৯] সুনানে আবু দাঊদ
    [১০] সূরা আয যারিয়াত, ৫১:৫৬
    [১১] আল-মায়িদাহ, ৫:৭২
    [১২] “এ দিনটিতে ভালো খাওয়া, ভালো থাকা এবং ভাল পরতে পারাকে তারা ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক বলে মনে করে।” – বাংলাপিডিয়া, খন্ড ৫, পৃ.২৯৭
    [১৩] বাংলাপিডিয়া, খন্ড ৫, পৃ.২৯৭-২৯৮
    [১৪] ব্রিটানিকা ২০০৩ আল্টিমেট রেফারেন্স সুইট সিডিরম
    [১৫] প্রাগুক্ত
    [১৬] রাণী বিলকিস ও তার জাতি
    [১৭] সূরা আন নামল, ২৭:২৪
    [১৮] বাংলাপিডিয়া, খন্ড ৫, পৃ.৩৭
    [১৯] ব্রিটানিকা ২০০৩ আল্টিমেট রেফারেন্স সুইট সিডিরম
    [২০] বুখারী ও মুসলিম
    [২১] বুখারী ও মুসলিম
    [২২] বুখারী ও মুসলিম
    [২৩] কোনো কোনো পণ্ডিতের মতে চেহারাও আবৃত রাখতে হবে
    [২৪] সূরা আন নূর, ২৪:৩১
    [২৫] মাইক্রোসফট এনকার্টা রেফারেন্স লাইব্রেরী, ২০০৩
    [২৬] ফাহিশাহ হচ্ছে কিছু বড় ধরনের অন্যায় কাজ, যেমন: যিনা, মদ্যপান… ইত্যাদি। – দেখুন: তায়সীরুল কারীমির রাহমান ফি তাফসীরি কালামিল মান্নান
    [২৭] সূরা আল-বাক্বারাহ, ২:১৬৮-১৬৯
    [২৮] সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৩২
    [২৯] বুখারী ও মুসলিম
    [৩০] সূরা আল ইসরা, ১৭:৬৪
    [৩১] তাফসীরে ইবন কাসীর
    [৩২] সূরা লুকমান, ৩১:৬
    [৩৩] বুখারী

  • ইসলামী দাওয়াহ বহন করার পদ্ধতি

    নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘নিযামুল ইসলাম’ বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে গৃহীত

    ইসলাম অনুসরণ করার কারণে মুসলিমরা বিশ্ব থেকে পিছিয়ে পড়েনি, বরং তাদের অধঃপতন শুরু হয়েছে যখন থেকে তারা ইসলামকে অনুসরণ করা ছেড়ে দিয়েছে, তাদের ভুমিতে বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশের সুযোগ দিয়েছে এবং তাদের মন পশ্চিমা ধ্যান ধারণায় আচ্ছন্ন হতে দিয়েছে। তাদের অধঃপতন শুরু হয়েছে যখন তারা ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বকে পরিত্যাগ করেছে, এর দাওয়াহকে অবহেলা করেছে এবং এর নিয়মকানুন (আহকাম) গুলোর অপপ্রয়োগ করেছে। কাজেই পুনর্জাগরণের জন্য মুসলিমদের ইসলামী জীবন যাত্রা পুনরায় শুরু করতে হবে। অবশ্য তাদের এ ইসলামী জীবন যাত্রার পুনরাবৃত্তি সম্ভব হবেনা যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের মাধ্যমে পুনরায় ইসলামী দাওয়াহ শুরু করবে এবং এই দাওয়াহর মাধ্যমে একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সম্ভব হবে যে রাষ্ট্র ইসলামের প্রতি আহবানের মাধ্যমে ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব বহন করবে।

    এক্ষেত্রে পরিস্কার থাকা জরুরী যে মুসলিমদের পুনর্জাগরণের জন্য ইসলামী দাওয়াহ’র মাধ্যমে ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বকে বহন করতে হবে, এটা একারনে যে একমাত্র ইসলামই সমগ্র বিশ্বকে পরিশুদ্ধ করতে পারে এবং এ কারনেও যে প্রকৃত পুনর্জাগরণ ইসলাম ব্যতিত সম্ভব নয়, তা মুসলিমদের জন্যই হোক কিংবা অমুসলিমদের জন্যই হোকনা কেন। এরই ভিত্তিতে ইসলামী দাওয়াহর কাজটি সামনে এগিয়ে নিতে হবে।

    বিশ্বের কাছে দাওয়াহ কে নিয়ে যেতে হবে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব হিসেবে যা থেকে সকল ব্যবস্থা বিকশিত হয় এবং এই বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের উপর ভিত্তি করেই সকল চিন্তাধারা গঠিত, এবং কোন ব্যতিক্রম ছাড়াই, এইসব চিন্তাধারা থেকেই জীবনের প্রতিটি দৃষ্টিভঙ্গীর উপর প্রভাববিস্তারকারী ব্যক্তির সকল ধারণা বিকশিত হয়।

    বর্তমানে দাওয়াহ করতে হবে ঠিক যেমনি ভাবে অতীতে দাওয়াহ হয়েছিল এবং তা রাসূলুল্লাহ (সা) এর দৃষ্টান্তের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। এক্ষেত্রে তার পদ্ধতি (Method) থেকে সাধারণভাবে কিংবা সূক্ষাতিসূক্ষ বিষয়গুলোতে সামান্যতম বিচ্যূতিরও সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে যুগের পার্থক্য কোনরূপ গুরুত্ব বহন করেনা, কারণ এ পার্থক্য শুধুমাত্র উপায় ও ধরণেই (Means & Style) সীমাবদ্ধ। কিন্তু যুগ কিংবা স্থান পরিবর্তনের ফলে মানব জীবনের মৌলিক বিষয়াদি (essence) ও বাস্তবতা (reality) পরিবর্তিত হয়নি, এবং কোন দিন তা পরিবর্তিত হবেওনা।

    কাজেই দাওয়াহর জন্য প্রয়োজন স্পষ্টবাদিতা, সাহস, শক্তিমত্তা, চিন্তাধারা ও ইসলামী ফিকরাহ ও তরীকাহর (আদর্শ ও পদ্ধতি) সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ যে কোন কিছুর মুখোমুখি হয়ে তার অসারতা কে চ্যালেঞ্জ করার মনোভাব, এক্ষেত্রে পরিস্থিতি ও এর পরিনতি যাই হোক না কেন।

    চূড়ান্ত সার্বভৌমত্ব (সিয়াদা) যে ইসলামী আদর্শের জন্য, ইসলামী দাওয়াহ এ বিষয়টির অপরিহার্যতাই তুলে ধরে, তা অধিকাংশ লোকের পছন্দ হোক বা না হোক, তাদের নিকট গৃহীত হোক বা প্রত্যাখ্যাত হোক কিংবা তারা এর বিরুদ্ধাচারণ করুক, প্রচলিত প্রথার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হোক বা না হোক (এগুলোর কোনটাই বিবেচ্য বিষয় নয়)।

    দাওয়াহকারীগণ (হামিলুদ দাওয়াহ) মানুষকে তোষামোদ করেনা, কর্তৃপক্ষের প্রতি সৌজন্য প্রদর্শন করেনা, কিংবা মানুষের প্রচলিত ঐতিহ্য ও রীতি নীতিকে গ্রাহ্য করেনা, এবং মানুষ তাকে গ্রহণ করবে কি করবে না তার প্রতিও মনোযোগ দেয়না। বরং সে শুধুমাত্র আদর্শের প্রতি অনুগত থাকে এবং অন্য কোন কিছুর প্রতি মনোযোগ না দিয়ে জীবনাদর্শটি প্রচার করে। তার জন্য অন্য আদর্শের অনুসারীদের তাদের স্বীয় আদর্শে অনুগত থাকার কথা বলা অনুমোদিত নয়। বরং তাদের প্রতি কোনরূপ বল প্রয়োগ ছাড়াই ইসলামী জীবনাদর্শ গ্রহণ করার আহ্বান জানানো হয়, কারণ দাওয়াহর দাবী হচ্ছে, ইসলামের পাশাপাশি অন্য কোন জীবনাদর্শ থাকবেনা এবং সার্বভৌমত্ব কেবল ইসলামেরই জন্য।

    “তিনিই প্রেরণ করেছেন রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দ্বীন সহ যাতে তা অন্য সকল ব্যবস্থার উপর জয়যুক্ত হতে পারে যদিও বা মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।” (সুরা তাওবা: আয়াত ৩৩)

    রাসূলুল্লাহ (সা) এ পৃথিবীতে এসেছিলেন তার সত্যবাণী (রিসালাত) সহ এবং তিনি সমগ্র বিশ্বের প্রতি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন। তিনি (সা) যে সত্যের প্রতি মানুষকে আহ্বান করতেন তা তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন এবং তিনি সকল লাল কালো (মানুষের) অর্থাৎ সবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, এক্ষেত্রে ঐতিহ্য, প্রথা, ধর্ম, আদর্শ, শাসক ও জনগণ ইত্যাদি কোন বিষয়কেই তিনি গ্রাহ্য করেননি। রাসুলুল্লাহ (সা) ইসলামের বাণী ব্যতিত আর কোন কিছুর প্রতিই মনোযোগ দেননি। তিনি কুরাইশদের মিথ্যা উপাস্যগুলোকে উপেক্ষা করে ইসলামের দাওয়াহ শুরু করেন। তিনি তাদের আদর্শকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, তাদের অস্বীকার করেছিলেন অথচ তিনি ছিলেন একা, বিচ্ছিন্ন, তার কোন সাহায্যকারী ছিলনা, তার অস্ত্রও ছিলনা, শুধুমাত্র ছিল ইসলামের প্রতি দৃঢ় ও গভীর আস্থা ও বিশ্বাস এবং এর প্রতিই তিনি আহ্বান করেছিলেন। তিনি (সা) তৎকালীন আরবদের প্রথা, ঐতিহ্য, ধর্ম ও আদর্শের প্রতি মনোযোগ দেননি। এ বিষয়ে তিনি সৌজন্যতা দেখাননি কিংবা তাদের গ্রাহ্য করেননি।

    একই ভাবে, দাওয়াহ বাহকদের সবকিছুকেই চ্যালেঞ্জ করতে হবে। তন্মধ্যে প্রতিকূলতার শিকার হতে হলেও, প্রচলিত প্রথা, ঐতিহ্য, ক্ষয়িষ্ণূ চিন্তাধারা, ধারণা, জনমত, ইত্যাদি যা কিছু ভ্রান্ত সবকিছুর বিরুদ্ধেই চ্যালেঞ্জ করতে হবে। তাকে অপরাপর আদর্শ ও ধর্মকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে যদিও বা এতে সে ঐসব আদর্শ ও ধর্মের অনুসারীদের গোঁড়ামী ও উগ্রবাদের শিকার হতে পারে কিংবা ভ্রান্ত মতাবলম্বীদের শত্রুতার শিকার হতে পারে।

    দাওয়াহর ক্ষেত্রে কোনরূপ ছাড় না দিয়ে (তা যতই ছোট হোক না কেন) ইসলামী আইনের পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের মানসিকতা থাকতে হবে। দাওয়াহকারী কোন রূপ আপোসরফা, ছাড় দেয়া, অবহেলা, স্থগিতকরণ বা বিলম্বন মেনে নেয় না। বরং সে দাওয়াহ’র বিষয়টিকে সামগ্রিকভাবে নিয়ে নিশ্চিতভাবে এর তাৎক্ষণিক সমাধানে সচেষ্ট হয়। সে সত্যের ক্ষেত্রে (বাধাদানকারী) কোন মধ্যস্থতাকারী গ্রহণ করেনা। রাসূলুল্লাহ (সা) সাকিফ গোত্রের প্রতিনিধিত্বকারী দলের তাদের মূর্তি আল-লাত-এর ধ্বংসের পূর্বে তিন বছর অক্ষত রাখার অনুরোধ গ্রহণ করেননি; তিনি তাদের ইসলাম গ্রহণের পূর্বশর্ত হিসাবে সালাত থেকে অব্যহতি দেননি। তিনি তাদের অনুরোধ অনুযায়ী আল-লাত কে দুবছর এমনকি একমাসের জন্যও রাখাও মেনে নেননি। তিনি এ অনুরোধগুলো দৃঢ়ভাবে ও চূড়ান্তভাবে, কোনরূপ দ্বিধা ও পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই অস্বীকার করেন। কারণ খুব সহজভাবে, মানুষ হয় বিশ্বাস করবে অথবা করবেনা এবং চূড়ান্ত পরিণতি হয় জান্নাত অথবা জাহান্নাম। অবশ্য রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের একটি অনুরোধ রেখেছিলেন, তা হচ্ছে তিনি তাদের নিজহাতে মূর্তিগুলো ধ্বংস করতে বাধ্য করেননি, বরং আবু সুফিয়ান ও আল মুগীরাহ ইবনে শু’বাহ কে মূর্তিগুলোকে ধ্বংস করার আদেশ দিয়েছিলেন। তিনি সুনিশ্চিতভাবেই পরিপূর্ণ আকীদা ও তা বাস্তবায়নে যা কিছু প্রয়োজন তা থেকে কম কিছুই গ্রহণ করেননি। এই বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনি (সা) বিভিন্ন উপায় ও ধরণ গ্রহণ করেছিলেন কারণ তা সরাসরি ইসলামী আকীদা’র প্রকৃতির সাথে সম্পর্কিত নয়। কাজেই ইসলামী দাওয়াহ প্রচারের ক্ষেত্রে ইসলামী ধারণার (ফিকরাহ) এবং এর প্রয়োগের পরিপূর্ণতার ব্যাপারে যত্নশীল হতে হবে। ইসলামী ফিকরাহ ও তরীকাহ’য় কোনরূপ আপোষ করা যাবেনা। এর দাবী অনুযায়ী যে কোন ওয়াসীলা (উপায়) ব্যবহারে কোন ক্ষতি নেই।

    ইসলামী দাওয়াহর ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এর প্রতিটি কাজই দাবি করে যে তার একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য (objective) থাকবে। এবং এটাও দাবি করে যে দাওয়াহ কারী সর্বদা লক্ষ্য ও তা অর্জনের জন্য (গৃহীত) কাজগুলো সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন থাকবে এবং এ লক্ষ্য অর্জনে বিরামহীনভাবে চেষ্টা করে যাবে। কাজেই দাওয়াহকারী কখনোই কাজ ছাড়া শুধুমাত্র চিন্তায়ই সন্তুষ্ট থাকবেনা, নয়তো এটি একটি ইন্দ্রিয়-অবসাদগ্রস্থ কল্পনাপ্রসূত দর্শনে পরিনত হবে (فلسفة خيالية مخدرة)। তেমনি সে কোন লক্ষ্য ছাড়া শুধুমাত্র চিন্তা ও কাজেও সন্তুষ্ট থাকবেনা, নয়তো এটি তার জন্য একপ্রকার (ফলাফলবিহীন) বৃত্তাকার গতিতে (حركة لولبية) পর্যবসিত হবে যা চূড়ান্ত ভাবে ক্লান্তি ও হতাশা বয়ে আনে। বরং দাওয়াহকারীকে সার্বক্ষণিকভাবে, তার চিন্তার সাথে কাজের একটি যোগসূত্র স্থাপন করতে হবে এবং এ দুয়ের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে সে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে অর্জনে কাজ করবে যা সম্পন্ন করার একটি ব্যবহারিক উপায় থাকবে এবং পরিশেষে বাস্তব রূপ লাভ করবে।

    রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব বহন করেছিলেন। তিনি যখন বুঝতে পারলেন, মক্কার অধিবাসীরা ইসলামকে ব্যবস্থা হিসাবে গ্রহণ করবেনা, তখন তিনি মদীনায় ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি মদীনায় রাষ্ট্র স্থাপন করেছিলেন, এভাবে ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এর বাণী পৌঁছিয়েছিলেন, এবং উম্মাহ কে তার অবর্তমানে ইসলাম প্রচারের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন এবং ঠিক তার অনুসৃত পদ্ধতিতেই অগ্রসর হবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। কাজেই মুসলিমদের খলীফার অবর্তমানে ইসলামের দাওয়াহ করার ক্ষেত্রে ইসলামের প্রতি আহ্বান ও ইসলামী জীবন ধারা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজটিও অন্তর্ভূক্ত হতে হবে, যে রাষ্ট্রের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে এবং বিশ্ববাসীর কাছে প্রচারিত হবে। এভাবেই ইসলামী রাষ্ট্রের মাধ্যমে দাওয়াহ উম্মাহর মধ্যে ইসলামী জীবনধারা ফিরিয়ে আনা থেকে শুরু করে সমগ্র বিশ্ববাসীর নিকট একটি আহ্বানে পরিণত হবে এবং শুধুমাত্র ইসলামী বিশ্বে সীমাবদ্ধ স্থানীয় দাওয়াহর পরিবর্তে তা বিশ্বজনীন এক সার্বিক দাওয়াহতে পরিণত হবে।

    ইসলামের প্রতি আহ্বানের মধ্যে পরিষ্কারভাবে বিদ্যমান মতাদর্শগুলোর সংশোধন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করণ থাকতে হবে, এবং একে অবশ্যই জনগণের সমস্যার সমাধান দিতে হবে। যাতে করে জীবনের সর্বস্তরে দাওয়াহ স্বীয় ঔজ্জ্বল্যে স্পষ্ট হয়ে উঠে। রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কার লোকদের নিকট নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করে শোনাতেন,

    “ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও।” (সুরা লাহাব: আয়াত ১)

    “নিশ্চয়ই এগুলো এক সম্মানিত রাসূলের কথা, এগুলো কোন কবির কথা নয়, তোমরা খুব সামান্যই তা বিশ্বাস কর।” (সুরা হাক্কাহ: আয়াত ৪০-৪১)

    “ধ্বংস হোক যারা ওজনে কম দেয়, যারা নিজেরা বুঝে নেয়ার সময় পরিপূর্ণ পরিমাণ অনুযায়ী বুঝে নেয় কিন্তু অন্যকে দেয়ার সময় কম দেয়।” (সুরা মুতাফফিফিন: আয়াত ১-৩)

    “এবং যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত যার তলদেশে নহর প্রবাহিত হয়, এটিই সর্বোত্তম সাফল্য।” (সুরা আল বুরূজ: আয়াত ১১)

    মদীনায় তিনি তিলাওয়াৎ করে শোনান,

    “সালাত প্রতিষ্ঠা কর এবং যাকাত আদায় কর।” (সুরা বাক্বারাহ: আয়াত ৪৩)

    “তোমরা অভিযানে বের হয়ে পড় হালকা বা ভারী (রণসম্ভার) অবস্থায়, এবং জিহাদ কর আল্লাহর পথে নিজেদের জান দিয়ে, সম্পদ দিয়ে, এটিই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা তা বুঝতে।” (সুরা আত-তাওবা: আয়াত ৪১)

    “হে ঈমানদারগণ যখন তোমরা নিজেদের মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণের লেনদেন কর তখন তা লিপিবদ্ধ কর, তোমাদের মধ্য থেকে কোন ন্যায় সঙ্গত লেখক তা লিপিবদ্ধ করবে।” (সুরা আল বাক্বারাহ: আয়াত ৮২)

    “সম্পদ যেন শুধুমাত্র তোমাদের মধ্যে ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।” (সুরা হাশর: আয়াত ৭)

    “আগুনের অধিবাসীর ও জান্নাতের অধিবাসীরা সমান নয়, জান্নাতের অধিবাসীরাই সফলকাম।” (সুরা হাশর: আয়াত ২০)

    এভাবেই ইসলামী দাওয়াহ’র মাধ্যমে মানুষের কাছে ইসলামী ব্যবস্থা নিয়ে যাওয়া উচিৎ যার মাধ্যমে তারা তাদের প্রতিদিনের সমস্যার সমাধান করতে পারে। কারণ ইসলামী দাওয়াহ সফল হওয়ার পেছনের রহস্য হচ্ছে এটি খুবই স্পষ্ট এবং মানুষের কাছে তার জীবনের সমাধান দেয়ার সময় সমস্যাগুলো মানবীয় সমস্যা (human problem) হিসেবে দেখে, এবং এর মাধ্যমে যাবতীয় সমস্যার আমূল পরিবর্তন ঘটায়।

    দাওয়াহকারীদের পক্ষে দাওয়াহর দায়িত্ব পালন ও যথাযথভাবে তার কর্তব্য পালনের বিষয়টি অত্যন্ত দুরূহ যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের মনের অন্তঃস্থলে পরিপূর্ণতা অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রোথিত হয়। তাদের অবিরাম সত্যের সন্ধান ও তাদের লব্ধ জ্ঞানকে ক্রমাগত নিরীক্ষার মাধ্যমে স্বীয় উপলব্ধিকে বিজাতীয় চিন্তাধারা থেকে পরিশুদ্ধ করতে হবে এবং এধরণের বিজাতীয় চিন্তাধারা অর্থের দিক থেকে আপাত গ্রহণ যোগ্য মনে করে তাতে সংশ্লিষ্ট হয়ে যাওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে। এটি তাদের চিন্তা ধারণা কে পরিচ্ছন্ন ও বিশুদ্ধ রাখতে সাহায্য করবে। শুধুমাত্র চিন্তার বিশুদ্ধতা ও পরিচ্ছন্নতা ইসলামের সাফল্য ও তা অব্যাহত রাখার নিশ্চয়তা প্রদান করে।

    দাওয়াহকারীদের আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে এই বাধ্যতামূলক দায়িত্ব অবশ্যই পালন করতে হবে। তাদের উৎসাহ ও উদ্দীপনার মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সন্তুষ্টি অর্জনের প্রত্যাশায় এ কাজে অগ্রসর হতে হবে। তাদের কাজের মাঝে কোন বৈষয়িক লাভ বা মানুষের প্রশংসা প্রত্যাশা করা উচিত নয়। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ব্যতিত তাদের অন্য কিছুর পিছনেই ধাবিত হওয়া উচিৎ নয়।

    Please note that this is not an official translation, rather a draft one. So, we would suggest not to spread this widely or publish this anywhere online for the time being.

    Link for English translation of the book ‘System of Islam

    For original meaning, please refer to the original Arabic book

  • গণঅভ্যূত্থান তৈরীর উপায়

    ১. সূচনা

    এ প্রবন্ধে আমরা রাজনৈতিক সংগ্রামের লক্ষ্যে জনগণকে সংগঠিত করার বিষয়ে আলোচনা করবো। একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় একটি সফল রাজনৈতিক সংগ্রামের অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে জালেম শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত করা। এখানে আমরা শুধুমাত্র আমাদের সংগঠনে একজন মানুষের অন্তর্ভূক্তি, ক্রমান্বয়ে তাকে সমর্থক, কর্মী, সদস্য ইত্যাদি স্তর অতিক্রমের কথা বলছি না। হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে সরকার বিরোধী আন্দোলন, জুলুমের বিরুদ্ধে আন্দোলন তথা খিলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ফেলার কথা বলছি। মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরী করা, আন্দোলনের জন্যে সমাজে একটি গণভিত্তি তৈরী করা, ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনা করা ও সব শেষে গণঅভ্যূত্থানের মাধ্যমে সরকার ও সরকার ব্যবস্থার পতন ঘটানো – ধাপে ধাপে এই কাজগুলোই আমাদেরকে করতে হবে।

    ২. গণঅভ্যুত্থানের স্বরূপ

    আমাদের মনে রাখা দরকার যে একটা ইস্যুতে একটা কর্মসূচী দেয়া মানেই আন্দোলন নয়। এটা শুধু একটি কর্মসূচী হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকে। যখন কোন ইস্যুতে ধারাবাহিকভাবে কর্মসূচী দেয়া হয়, তখনই তা আন্দোলনে রূপ লাভ করে। আর ইস্যুর পর ইস্যুতে ধারাবাহিকভাবে একনাগাড়ে আন্দোলন পরিচালনা করলে এবং এতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকলে তবেই তা গণআন্দোলনে রূপ লাভ করে। এখন ধারাবাহিক গণআন্দোলনের ফসল – গণঅভ্যুত্থানের একটি চিত্র সবার সামনে তুলে ধরতে চাই। গণঅভ্যুত্থান মানেই হচ্ছে রাজপথে লক্ষ লক্ষ জনতার ঢল। এই জনতার মধ্যে সামিল থাকে পুরুষ, নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ সকল বয়স, সকল পেশার মানুষ। এখানে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা থাকে; কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর, হকার, মুদির দোকানী, বস্তিবাসী, রিক্সাচালক, খেটে খাওয়া মানুষ থাকে; আলেম সমাজ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ী শিক্ষকসহ পেশাজীবীরা থাকে; অর্থাৎ এই বিশাল জনতার মধ্যে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ থাকবে এবং এই বিপুল জনতা শুধু ঢাকাতে নয়; সকল বিভাগীয় শহরে, এমনকি জেলা শহরেও থাকতে হবে। বিশাল বিক্ষুব্ধ জনতার তীব্র শক্তি দিয়ে যখন একের পর এক আঘাত করে চুরমার করা হবে সরকারের মসনদ, তখন তাকে আমরা বলবো একটি সফল গণঅভ্যুত্থান।

    এরকম একটি গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য আমরা কাজ করছি। এটি আমাদের পথ পরিক্রমার একদম শেষ প্রান্তে, যেখানে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সক্রিয়ভাবে রাজপথের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। আর আমরা আজ দাড়িয়ে আছি এই পথের শুরুতে, যেখানে আমরা সবেমাত্র আন্দোলন করা আরম্ভ করেছি । এই শুরু ও শেষের মাঝে আছে রাজনৈতিক সংগ্রাম। রাজনৈতিক সংগ্রামের তিনটি দিক আছে:

    ১. রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করা
    ২. সরকার বিরোধী আন্দোলন
    ৩. গণঅভ্যূত্থানের লক্ষ্যে তথা সরকারের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করা।

    ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনার স্বাভাবিক পরিণতি হচ্ছে সরকার বিরোধী আন্দোলন। আমরা জানি আমাদের প্রতিটি আন্দোলন – হয় দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষার্থে নতুবা সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে। এখন দেখা যাক, কোন কোন উপাদান আন্দোলনে গণমানুষের অংশগ্রহণ বাড়ায়। নিম্নে আলোচিত প্রতিটি পয়েন্টের দুইটি দিক রয়েছে – ১. রাজনৈতিক দিক ২. সাংগঠনিক দিক। আর উদাহরণ হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ের দুটি সফল অভ্যুত্থানের ঘটনাসমূহ আলোচনা করব: একটি ইরানের ১৯৭৯ এবং আরেকটি বাংলাদেশের ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান।

    ৩. গণঅভ্যূত্থানে গণমানুষের অংশগ্রহণের নিয়ামকসমূহ

    ১. সরকারে ব্যর্থতা- সুষ্ঠু দেশ পরিচালনায় ব্যর্থতা, জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যর্থতা, বিদেশীদের সাথে আঁতাত ও তাদের বশ্যতা স্বীকার ইত্যাদি গণআন্দোলনের অন্যতম ইস্যু। সরকার ও সরকার ব্যবস্থার প্রতি মানুষ যত বেশী বিরক্ত ও ক্ষুদ্ধ হবে, প্রচলিত ব্যবস্থা পরিবর্তনের আন্দোলনে মানুষ তত বেশী আকৃষ্ট হবে। এখানে ইস্যু নির্বাচন, আমাদের বক্তব্য বা মেসেজ ইত্যাদি হচ্ছে রাজনৈতিক দিক।

    আর সাংগঠনিক দিক থেকে আমাদের চিন্তা করতে হবে কিভাবে মানুষের ক্ষোভকে আরো উস্কে দেয়া যায়। সংগঠন সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকবে প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি মানুষের হতাশা বাড়িয়ে তোলার কাজে, মানুষের বঞ্চনার অনুভূতিকে তীক্ষ্ন করার কাজে। এ কাজ সংগঠন যত দক্ষতার সাথে করতে পারবে, আন্দোলনের গতি, তীব্রতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ তত বাড়বে।

    (উদাহরণ – বাংলাদেশের দুইটি ঐতিহাসিক ঘটনা – শেখ মুজিব কর্তৃক ১৯৬৫ এর যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ এবং ‘৭০ এর ঘূর্ণিঝড়ের পর শেখ মুজিব ও মাওলানা ভাসানীর ভূমিকা বনাম তৎকালীন পাকিস্তানের শাসক জে. ইয়াহিয়ার ভূমিকা

    সাম্প্রতিক কিছু উদাহরণ – ২০০১-২০০৬ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে কানসাট, ফুলবাড়ী ও শনির আখড়ার ঘটনাসমূহ। বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের্ র‌্যাংগস ভবন দূর্ঘটনা এরকম একটি আন্দোলনের ইস্যু হতে পারত।

    ইরান – ১৯৬৪ সালের অপমানজনক ইরান-মার্কিন চুক্তির সুযোগ গ্রহণ করেছিল খোমেনি, গণঅভ্যুত্থানের পূর্বে ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের ব্যর্থতা যার সুযোগ আন্দোলনকারীরা নিয়েছিল)

    ২. নেতৃত্ব – নেতৃত্ব গণআন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আমরা ভাল করেই উপলব্ধি করছি যে সাধারণ মানুষ শুধুমাত্র উন্নত চিন্তার বদৌলতে আন্দোলনে শরীক হয়না। তারা বাস্তবতায় এই উন্নত চিন্তার ধারককে দেখতে চায়। আর এক্ষেত্রে তারা যতটা না কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে কাছে পায়, তার চেয়ে বেশী প্রতিদিন দেখতে পায় স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে। আর স্বাভাবিকভাবেই তারা দেখতে চায় সাহসী ও উন্নত চরিত্রের ব্যক্তিত্বদেরকে, যাদের উপর উম্মাহ্‌ আস্থা রাখতে পারে। উম্মাহ্‌র আস্থা অর্জন করার ফল হচ্ছে সরকার ও সাম্রাজ্যবাদীদের অনুগত মিডিয়া যত অপপ্রচার করুক না কেন, জনগণ বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্বের কাছেই ছুটে আসবে।

    সাংগঠনিক দিক থেকে আমাদের সর্বদা খেয়াল রাখতে হবে যেন আমরা আন্দোলনের জন্য সঠিক ব্যক্তিত্বকে চিহ্নিত করতে পারি এবং তাদেরকে জয় করে আমাদের সাথী করে নিতে পারি। গণমানষের দৈনন্দিন হাজারো সমস্যার সমাধান বা সঠিক পরামর্শ প্রদান স্থানীয় নেতৃত্ব গঠনের চাবিকাঠি। আমাদের নিজেদের ব্যক্তিত্ব এভাবে গড়ে তুলতে হবে এবং পাশাপাশি যারা এই ব্যক্তিত্বের অধিকারী তাদেরকে আমাদের সাথে জড়াতে হবে। এরা এমন ধরনের ব্যক্তিত্ব যারা শত শত বা ক্ষেত্র বিশেষে হাজার হাজার মানুষকে মবিলাইজ করার ক্ষমতা রাখে।

    (উদাহরণ- বাংলাদেশ – ১৯৬৭-৬৯ সময়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং আওয়ামী লীগের শত শত কর্মী গ্রেফতার সত্ত্বেও ছয় দফার আন্দোলনের দেশব্যাপী বিস্তার লাভ।

    ইরান- খোমেনির নির্বাসন সত্ত্বেও সমগ্র ইরানে আন্দোলন বিস্তার লাভ, রেজা শাহের বাহিনী কর্তৃক সিনেমা হল পুড়িয়ে তার দায় আন্দোলনকারীদের উপর চাপানো সত্ত্বেও ব্যাপক গণসম্পৃক্ততা থাকার ফলে সকল অপপ্রচার ব্যর্থ)

    ৩. সমাজের সকল পর্যায়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক: সমাজের সকল পর্যায়ে আমাদের নেটওয়ার্ক থাকা খুবই জরুরী। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে যদি আমাদের নেটওয়ার্ক না থাকে, তাহলে আন্দোলনের সময় সমাজের বৃহত্তর অংশকে আমরা আমাদের সাথে পাব না। আমাদের স্মরণ রাখা দরকার যে কোন আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে ১. ছাত্র ২. শ্রমিক ৩. কৃষক।

    বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছাত্রদের ভূমিকা সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। শুধু একটা কথা বলাই যথেষ্ট যে গত একশ বছরে যে কোন আন্দোলন বা রাজনৈতিক কর্মকান্ডের দিকে আমরা তাকাই না কেন, আমরা ছাত্রদেরকে সর্বত্র মূল চালিকা শক্তি হিসেবে দেখতে পাব। সুতরাং সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা যেখানেই ছাত্ররা থাকে, সেখানেই আমাদের নেটওয়ার্ক থাকতে হবে। আর কৃষক ও শ্রমিকদেরকে মধ্যে আমাদের নেটওয়ার্ক তৈরীর বিষয়টি গভীরভাবে ভাবতে হবে। আমাদের দেশের দুই তৃতীয়াংশ মানুষ কৃষিকাজ করে এবং আরও একটি বিরাট অংশ শ্রমিক। মাওলানা ভাসানি শুধু কৃষকদেরকে সংগঠিত করে এত বড় নেতা হয়েছিলেন। আর শিল্প এলাকায় আমাদের অবস্থান দৃঢ় হলে স্বাভাবিকভাবেই রাজনীতিতে আমাদের প্রভাব অনেক বেড়ে যাবে। অতীতে আমরা দেখেছি দেশের রাজনীতিতে পাট শিল্প শ্রমিকদের গুরুত্ব। বর্তমানে আমরা দেখছি গার্মেন্টস্‌ ও পরিবহন শ্রমিকদের গুরুত্ব। সার্বিকভাবে এটাই বলতে চাই ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক-ইমামসহ সমাজের সর্বস্তরে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তৈরীতে আমাদেরকে আরও সৃজনশীল হতে হবে, নতুন নতুন চিন্তা ও পদ্ধতি বের করতে হবে ও কাজে লাগাতে হবে।

    (উদাহরণ – বাংলাদেশ – ‘৫২-‘৫৪ দুই বছরের মধ্যে আওয়ামী লীগের ব্যাপক বিস্তৃতি ও জনগণের সমর্থন লাভ, ১৯৬৯ আন্দোলনে ছাত্র ও শ্রমিকদের ভূমিকা ও গণমানুষের সমর্থন লাভ, মাওলানা ভাসানীর কৃষকদের নিয়ে আন্দোলন, বামপন্থিদের গ্রামে গ্রামে লাল টুপি বিতরণ ও গ্রামবাসীদের খুব সাধারণ কাজ দিয়ে সম্পৃক্ত করা, শ্রমিক ও নিম্ন শ্রেণীর কর্মচারী হিসেবে বামপন্থি ছাত্রদের যোগদান।

    ইরান – সামগ্রিক গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র ও শ্রমিকদের ব্যপক অংশগ্রহণ ও জোরালো ভূমিকা, খোমেনির বক্তব্য সম্বলিত ক্যাসেট বিতরণে সমাজের প্রায় সবাইকে সম্পৃক্ত করে ফেলা, দেশের মসজিদগুলো আন্দোলনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল এবং সব জায়গায় মসজিদের ইমামরা স্বতঃস্ফুর্তভাবে আন্দোলনে শরীক হয়েছিল, গণঅভ্যুত্থানের সময় ইরানের তেল শিল্প শ্রমিকদের ধর্মঘটের ফলে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে রেজা শাহ তেল কারখানাগুলো সীমিত আকারে চালু রাখার জন্য খোমেনিকে অনুরোধ করতে বাধ্য হয়)

    ৪. সরকারের দমননীতি – সরকারের সাথে সংঘর্ষের সময় আত্মরক্ষার্থে সরকারের একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হচ্ছে ব্যাপক নিপীড়নের মাধ্যমে প্রতিবাদী কন্ঠকে স্তব্ধ করে দেয়া। এভাবে দমননীতি অবলম্বনের মাধ্যমে সরকার নিজের দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। নিজের দুর্বলতা ঢাকার জন্যই সরকার পেশিশক্তির আশ্রয় নেয়, সকল আইন-কানুন-মানবতার বুলি উপেক্ষা করে জুলুম নির্যাতনের আশ্রয় নেয়। আন্দোলন যে সঠিক পথে আছে, এই দমননীতি শুধু তাই প্রমাণ করে। সকল নবী-রাসূলকে এই পথ অতিক্রম করতে হয়েছে।

    সাংগঠনিকভাবে আমাদের কাজ সবসময়ই এই দমন নিপীড়নের খবর জনগণের কাছে যথাসম্ভব অত্যন্ত দ্রুত তুলে ধরা। শুধুমাত্র দেশের জন্য, জনগণের জন্য বা ইসলামের পক্ষাবলম্বনের জন্য আমাদেরকে এই নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হচ্ছে – এই বিষয়টি যত মানুষের কাছে আমরা নিয়ে যেতে পারবো, তত বেশী মানুষের সমবেদনা এবং আন্দোলনে মানুষের শরীক হবার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।

    (উদাহারণ- বাংলাদেশ – ১৯৬৯-এ ২০শে জানুয়ারী আসাদ হত্যাকান্ড, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যাকান্ড, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা হত্যাকান্ড।
    ইরান – প্রতিটি শোক সভা ও বিক্ষোভ মিছিলে গুলির রেকর্ড ও প্রচার)

    ৫. আন্দোলনের সময়কাল- আন্দোলনের সময় একটা বিতর্ক আমাদেরকে প্রায়শই করতে হয় যে একটা ইস্যু আমরা কম সময় বা বেশী সময় ধরে আঁকড়ে আছি। যেমন: ডেনিশ কার্টুন ইস্যুর সময়কাল অল্প আর তার তুলনায় প্রথম আলো ইস্যু অনেক বেশী সময় ধরে করা হয়েছে। একটা ইস্যুকে যত বেশী সময় ধরে আমরা রাজপথে রাখবো, ততবেশী উক্ত ইস্যুর মাধ্যমে জনগণের কাছে যাওয়া যাবে। এতে অনেকে মনে করে যে মানুষ ক্লান্ত হয়ে যাবে বা জনমত আমাদের বিপক্ষে চলে যেতে পারে। আমাদের মনে রাখা দরকার ব্যাপক ও মৌলিক ইস্যু দীর্ঘমেয়াদে রাজপথে রাখার মাধ্যমেই সমাজ ও রাষ্ট্রে তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া গভীরতর হয়।

    একটা ইস্যুতে আন্দোলন চলাকালে সাংগঠনিক দিক থেকে আমাদের সর্বাত্মকভাবে উক্ত ইস্যুকে জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়া জরুরী। আগেই বলেছি যেকোন ইস্যু নির্বাচনে আমরা দেশের/জনগণের স্বার্থ বা দেশ/জনগণ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্রকে অগ্রাধিকার দেই। সুতরাং, আমাদের কাজ হচ্ছে এমনভাবে জনগণকে সংগঠিত করা যেন এক আন্দোলন থেকে অন্য আন্দোলনে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। এটা আমরা যখন করতে পারব তখনই প্রকৃত অর্থে আমাদের আন্দোলন গণআন্দোলনে পরিণত হবে।

    এবার আমরা বাংলাদেশের ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান ও ইরানের ১৯৭৯ এর গণঅভ্যুত্থানের দিকে তাকাই। এই দুইটি গণঅভ্যুত্থানের সংক্ষিপ্ত চিত্র থেকে উপরোক্ত আলোচনার সত্যতা উপলব্ধি করা যায়।

    ৪. বাংলাদেশে ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান

    ১৯৪৮শেখ মুজিব ভাষা আন্দোলনে গ্রেফতার ও মুক্তি আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ধর্মঘটে গ্রেফতার
    ১৯৪৯আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম, শেখ মুজিবের যুগ্ম সম্পাদক পদ লাভ, কারাগার থেকে মুক্তি, ঢাবি থেকে বহিষ্কার, ভুখা মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ার অপরাধে আবার গ্রেফতার।
    ১৯৫২কারাগার থেকে মুক্তি – দলের অস্থায়ী সাধারণ সম্পাদক
    ১৯৫৩যুক্তফ্রন্ট গঠন
    ১৯৫৪যুক্তফ্রন্টের কাছে মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয়
    ১৯৫৫যুক্তফ্রন্টের কাছে মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয়
    ১৯৫৭কাগমারী সম্মেলন
    ১৯৫৮আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখল, ইস্কান্দার মির্জার পলায়ন, সামরিক শাসন জারি, শেখ মুজিব আটক
    ১৯৫৯কারাগার থেকে মুক্তি
    ১৯৬২সামরিক শাসন অবসান, শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন
    ১৯৬৪আওয়ামী লীগের পুনরায় রাজনীতি শুরু
    ১৯৬৬ছয় দফা প্রস্তাব পেশ, পাঁচ সপ্তাহ্‌ দেশব্যাপী গণসংযোগ, গ্রেফতার
    ১৯৬৭প্রায় ৮০০ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা কর্মী গ্রেফতার
    ১৯৬৮আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা
    ১৯৬৯২০শে জানুয়ারী – ছাত্র ধর্মঘট (আসাদ হত্যাকান্ড)
    ২১ শে ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯ – মুক্তি
    ২৩ শে ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯ – বিশাল গণজমায়েত
    ২৪ শে মার্চ – আইউব খানের পদত্যাগ
    ১৯৭০নির্বাচন, ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে নির্বাচনী প্রচারনা ছেড়ে উপদ্রুত এলাকায় ত্রাণ বিতরণে ঝাপিয়ে পড়া

    শিক্ষা:
    ১. গণভিত্তি প্রতিষ্ঠার সময়কাল – প্রথম দফা ১৯৫২ – ১৯৫৪, দ্বিতীয় দফা – ১৯৬৪ – ১৯৬৬
    ২. স্বউদ্যোগে ১৯৬৬ এ ছয় দফা পেশ, যা গণঅভ্যুত্থানের ভিত রচনা করে (অনেকে ছয় দফাকে সি.আই.এর দলিল বলেছিল)
    ৩. সকল নেতা-কর্মী গ্রেফতার সত্ত্বেও সারাদেশে আন্দোলন বিস্তার লাভ করে, তিন বছর স্থায়ী আন্দোলন
    ৪. ২০শে ফেব্রুয়ারী পাঁচ লক্ষ মানুষের জমায়েতের সম্ভাবনা দেখে শেখ মুজিবকে মুক্তি প্রদান
    ৫. ১৯৬৯-৭০ এক বছরের মধ্যে সারা দেশে সফর, নির্বাচনে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা
    ৬. ব্যাপক জনগণের অংশগ্রহণ – ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক, কৃষক, চাকুরীজীবি

    ৫. ইরানের ১৯৭৯ এর গণঅভ্যুত্থান

    ১৯৬১থেকে শুরু
    ১৯৬২সরকারী বিলের সফল প্রতিবাদ
    ১৯৬৩২৬ জানুয়ারী – ৬ দফার ভিত্তিতে গণভোট, খোমেনির গণভোট বর্জন
    ২১শে মার্চ নববর্ষের দিন নওরোজ – আনন্দের বদলে শোক পালন
    পরের দিন খোমেনির মাদ্রাসায় সরকারী হামলা ও হত্যাকান্ড
    আশুরা – ব্যাপক জনসমাগম ও সরকারবিরোধী বক্তব্য
    ৫ই জুন খোমেনি গ্রেফতার – সারা দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ সমাবেশ
    সমাবেশগুলোতে ব্যপক গুলি বর্ষণ – শুধু তেহরানেই ১৫,০০০ নিহত
    এক বছর পর মুক্তি
    ১৯৬৪পার্লামেন্টে বিল পাশ- মার্কিন সৈন্যদের ইরানী আদালতে বিচার করা যাবে না
    ব্যাপক লিফলেট বিতরণ – উদাহরণ দশ মিনিটে তেহরানে ৪০,০০০ বিতরণ
    ৪ নভেম্বর দেশ থেকে নির্বাসন
    ১৯৬৪খোমেনির বক্তব্য ধারণকৃত ক্যাসেট ব্যাপকভাবে বিলি
    ১৯৭৬মার্কিন সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রকাশ্য রাজনীতি ধীরে ধীরে শুরু
    ১৯৭৭খোমেনির পুত্র হত্যা
    ১৯৭৮৭ই জানুয়ারী – পত্র-পত্রিকায় খোমেনি বিরোধী আপত্তিকর প্রবন্ধ
    শহরে শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ – ২০০ জনের মৃত্যু
    ৪০ দিনের শোক – শহরে শহরে
    শোক সভা – বক্তৃতা – গুলি- রেকর্ড করে জনগণের মধ্যে বিলি
    ৪ই সেপ্টেম্বর – ঈদুল ফিতর, নামাজ শেষে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশ
    ৮ই সেপ্টেম্বর – শুক্রবার, আবারো লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশ
    ৯/১০ই মহর্র‌ম, ১০/১১ই ডিসেম্বর – আবারও বিশাল গণজমায়েত
    ১৯৭৯১৬ই জানুয়ারী – রেজা শাহ্‌ এর দেশত্যাগ
    ফেব্রুয়ারী – খোমেনির দেশে প্রত্যাবর্তন

    শিক্ষা:
    ১. আন্দোলনের সময়কাল – প্রথম দফা ১৯৬১ – ১৯৬৩, দ্বিতীয় দফা – ১৯৭৮- ১৯৭৯
    ২. গণঅভ্যুত্থানের ট্রিগার – খোমেনির পুত্রকে হত্যা ও ১৯৭৮ এ সরকারের খোমেনি বিরোধী বক্তব্য প্রচার
    ৩. হাজার হাজার নেতা কর্মী গ্রেফতার, নির্যাতন, হত্যা সত্ত্বেও সারাদেশে আন্দোলন বিস্তার লাভ ১৯৬৪-৭৬
    ৪. শেষের দিকের সমাবেশে ৩০ লক্ষাধিক জনসমাগম, ব্যাপক নারী-শিশুর অংশগ্রহণ
    ৫. মসজিদভিত্তিক ব্যপক কাজ, সর্বত্র ইমামদেরকে সম্পৃক্ত করে ফেলা হয়েছিল

    ৬. উপসংহার

    আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দের জীবনী, জাতির সংগ্রামের ইতিহাস ইত্যাদি সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা থাকতে হবে। অতীতে এই নেতৃবৃন্দ লক্ষ লক্ষ মানুষকে মবিলাইজ করতে সক্ষম হয়েছিল। একই সাথে আমাদেরকে জনগণের সাথে ভালভাবে মিশতে হবে। জনগণ যেন তাদের সকল দুঃখ-কষ্টের সময় আমাদেরকে পাশে পায়। আমরা শুধূ আমাদের রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে তাদের কাছে যাব আর তাদের দৈনন্দিন আনন্দ-বেদনার অংশীদার হব না – এটা হতে পারে না। এখন থেকে আমাদের প্রত্যেকের গ্রামে নিজের ভিত্তি তৈরী করতে হবে। মসজিদে মসজিদে আমাদের অবস্থান দৃঢ় করতে হবে। আমাদের নিজস্ব ইসলামিক জ্ঞান বাড়াতে হবে এবং দাওয়ার ক্ষেত্রে কুর’আন-হাদীসের ব্যবহার বাড়াতে হবে। এটা আমাদের ব্যক্তিত্ব গঠনে যেমন সাহায্য করবে তেমনি মানুষের উপর নেতৃত্ব প্রদানের যোগ্যতাও বৃদ্ধি করবে। আমরা সহজেই মানুষের গ্রহণযোগ্যতা পাব। আমাদের মনে রাখতে হবে যে শেষ পর্যন্ত জনগণ খিলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শরীক হবে এবং সর্বোচ্চ আত্নত্যাগ করতেু প্রস্তুত হবে শুধুমাত্র ইসলামের ভিত্তিতে। আমরা এভাবে সমাজের সর্বস্তরে আমাদের নেটওয়ার্কের বিস্তার ঘটাতে পারি তবে খুব শীঘ্রই ঢাকা শহরে লক্ষাধিক জনসমাগম ঘটানো সম্ভব হবে, ইনশাআল্লাহ্‌। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে কবুল করুন। আমিন।

    আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন,

    যারা ঈমান এনেছে ও নেক আমল করেছে তাদেরকে আল্লাহ্‌ তা’আলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদেরকে যমীনে খিলাফত দান করবেন, যেমনিভাবে তাদের পূর্ববর্তীদেরকে খিলাফত দান করেছেন। [সূরা : আন নূর-৫৫]

    মহিউদ্দীন আহমেদ
    ডিসেম্বর, ২০০৭, ঢাকা

  • সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের অপরিহার্যতা

    ইসলামের জন্মলগ্ন থেকেই ঈমান ও কুফরের মধ্যে আপোষহীন দ্বন্দ ও সংগ্রাম চলে আসছে। আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) পবিত্র কুর’আনের মাধ্যমে ইসলাম ও কুফরের দ্বন্দের বিষয়টি সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ করে দিয়েছেন এবং মুসলমানদেরকে এ মর্মে সতর্ক করে দিয়েছেন যে তারা যেন কখনই কাফের শক্তিকে নিজেদের বন্ধু বা মিত্র হিসাবে না নেয়। আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    “হে ইমানদারগণ, তোমরা নিজেদেরকে ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করোনা। তারা তোমাদের সাথে শত্রুতা করতে বিন্দুমাত্র ত্রুটি করেনা; তারা শুধুমাত্র তোমাদের ধ্বংসই কামনা করে। বাস্তবে শত্রুতা তাদের মুখ হতে প্রকাশ হয়ে পড়েছে আর তাদের অন্তরে যা আছে তা আরও ভয়াবহ।” [সুরা আল ইমরান : ১১৮]

    খিলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকারীদের এটা সুস্পষ্টরূপে বুঝে নেয়া প্রয়োজন যে, বর্তমান পৃথিবীতে ইসলাম ও মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শত্রু হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী কাফের রাষ্ট্রসমূহ। এরাই সংঘবদ্ধ হয়ে মুসলামানদেরকে বিভক্ত করার জন্য, তাদের ভূমিতে নিজেদের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য এবং পৃথিবীতে ইসলামের নেতৃত্ব মাথা তুলে না দাঁড়াতে দেয়ার জন্য ১৯২৪ সালে খিলাফত ব্যবস্থার পতন ঘটিয়েছে। এদেরই পূর্বপূরুষরা শতকের পর শতক ইসলাম ও মুসলমানদের নিশ্চি‎হ্ন করার জন্য ক্রুসেড পরিচালনা করেছে। ইসলামের আবির্ভাবকালে ইসলামবিরোধী যে শক্তিগুলো ছিলো, যথা- মক্কার কাফের নেতৃত্ব এবং তৎকালীন পরাশক্তি রোম ও পারস্য – বর্তমান যুগে সাম্রাজ্যবাদী কাফের রাষ্ট্রসমূহ হচ্ছে তাদেরই আরো শক্তিশালী ও সংঘবদ্ধ প্রতিরূপ। এসব কাফের শক্তি ও রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রধান হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, ইসরাইল, রাশিয়া এবং ফ্রান্স।

    এই সাম্রাজ্যবাদীরা বিশেষতঃ তাদের মোড়ল আমেরিকা ব্যাপক প্রচারাভিযান চালিয়ে যাচ্ছে যাতে শুধুমাত্র পুঁজিবাদকেই মুসলিম ভূমিসমূহের উপর চাপিয়ে দিতে পারে। তারা মুসলিম উম্মাহ’র পুনর্জাগরণ এবং খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে অন্যান্য জাতি থেকে স্বতন্ত্র্য একটি একক ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে মুসলিমদের পুনরাবির্ভাবের ভয়ে ভীত। সাম্রাজ্যবাদীরা এই ভেবে আতংকিত যে বিশ্বের নেতৃত্বে মুসলিমরা হয়তো আবারো ফিরে আসবে এবং শুধু মুসলিম ভূমিগুলোতেই নয় বরং পুরো বিশ্বের উপরই তাদের বর্তমান প্রভাব ও স্বার্থের অবসান ঘটাবে। এই সত্যটি বুঝতে পেরে আমেরিকাসহ বাকী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো মুসলিম উম্মাহ’কে সুস্পষ্ট লক্ষ্য বানিয়ে পুঁজিবাদকে মুসলিম ভূমিগুলোতে প্রতিষ্ঠিত করার মিশনে নেমেছে। এর পাশাপাশি এই মিশনের আরো যা উদ্দেশ্য তা হলো, প্রাকৃতিক ও বিবিধ সম্পদে সমৃদ্ধ মুসলিম ভূমিগুলোর সম্পদ লাভে আমেরিকা ও অন্যান্য পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর অন্তহীন লোভ ও উচ্চাভিলাষ, মুসলিম ভূমিগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান ও কৌশলগত সুবিধাকে করায়ত্ত করা, মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর বিশাল মার্কেটে পরিণত করা এবং নিজেদের শিল্পকারখানা পরিচালনার জন্য মুসলিমদের বিশাল তেল সম্পদ ও অন্যান্য কাঁচামাল হস্তগত করা।

    এসব সাম্র্রাজ্যবাদী কাফের রাষ্ট্রগুলো নিজেরা সরাসরি অথবা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জোট, অর্থনৈতিক ও সামরিক সংস্থাকে ব্যবহার করে সম্ভাব্য সকল উপায়ে পৃথিবীতে মুসলমানদের ক্রমাগত শক্তিহীন করার চেষ্টা করছে। একের পর এক তাদের ভূমিগুলোতে হানা দিচ্ছে, রক্তের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে, তাদের সম্পদ লুটে নিয়ে যাচ্ছে। আর তাদের এ সকল কাজে তাদেরকে সাহায্য করে যাচ্ছে বর্তমান মুসলিম ভূমিগুলোতে তাদেরই বসানো তাঁবেদার শাসকবর্গ।

    এসব জালেম শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের বংশধরেরা যুগ যুগ ধরে যেমন সাম্রাজ্যবাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তাদের ক্রীড়নক হয়ে কাজ করছে অন্যদিকে তারা নিজেদের মুসলিম জনগণকে সব ধরণের অধিকার বঞ্চিত করছে। মুসলিমদের সম্পদ বিদেশী দখলদারদের হাতে তুলে দিয়ে তাদের উপর শোষণ নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। তারা সাম্রাজ্যবাদীদের ক্রীড়নক হিসেবে মুসলিমদেরকে তাদের দ্বীন থেকে সরিয়ে পুঁজিবাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে; মুসলিমদের উপর কাফেরদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য বিশ্ব জুড়ে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে কাফেরদের অনুকূলে একের পর এক দাসত্বের চুক্তিতে আবদ্ধ করছে, মুসলিম উম্মাহ’কে দূর্বল ও ধ্বংস করার জন্য কাফেরদের সব চক্রান্ত বাস্তবায়ন করছে, এবং জনগণের মধ্যে মুখ বুঝে সয়ে নেয়া বা মেনে নেয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করে যাচ্ছে যাতে করে কেউ মুখ খুলে সত্য উচ্চারণের সাহস না করে। এতসব বৈরী আচরণের একটাই উদ্দেশ্য আর তা হলো উম্মাহ’কে কুফর ও কাফেরদের কাছে মাথা নত করতে বাধ্য করা।

    অতএব, খিলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকারীদের জন্য সাম্রাজ্যবাদী কাফেরদের এবং তাদের তাঁবেদার শাসকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রাম করা অপরিহার্য যেন এর মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলো থেকে সাম্রাজ্যবাদী কাফেরদের চিন্তাগত, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক ভিতগুলোর মূলোৎপাটন করা সম্ভব হয়।

    এই আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদেরকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং তাদের দেশীয় রাষ্ট্রদূত বা কূটনৈতিক কতৃক সংলাপকে উৎসাহিত করা, রাজনৈতিক সংস্কার সাধন, সুশাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির নামে মুসলিম দেশগুলোর আভ্যন্তরীন রাজনীতিতে যেকোন ধরণের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। একই সাথে ভারত-মার্কিন-ইইউ-ইসরাইল তথা কোন শত্রু রাষ্ট্রের সাথে যখন কোন অযৌক্তিক বা মুসলমানদের স্বার্থবিরোধী চুক্তি সম্পাদিত হয় সেগুলো বাতিল করার জন্য রাজনৈতিক সংগ্রাম চালাতে হবে। ভারত-মার্কিন-ইইউ-ইসরাইল তথা কোন শত্রু রাষ্ট্রের সাথে কোন ধরনের সামরিক চুক্তি কিংবা ট্রানজিট ইত্যাদির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। কেননা এসব হস্তক্ষেপ, চুক্তি বা সমঝোতার একটা মাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদেও দেশের উপর সাম্রাজ্যবাদী কাফেরদের প্রভাবকে প্রতিষ্ঠা করা এবং তা চালিয়ে যাওয়া অথচ আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) স্পষ্টতই মুসলমানদেরকে এটা অনুমোদন করতে নিষেধ করেছেন এই বলে যে,

    “আল্লাহ্‌ কখনোই মু’মিনদের বিরুদ্ধে কাফেরদের জন্য কোন পথ রাখবেন না।” [সূরা নিসা : ১৪১]

    আন্দোলনকারীদেরকে এই সংগ্রামে দেশীয় অর্থনীতির উপর সম্রাজ্যবাদী কাফেরদের অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপকে প্রত্যাখ্যানের জোরালো আহ্বান জানাতে হবে। তাদের মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে মুসলিমদের উপর। মুক্তবাজার অর্থনীতি আমাদের নিজস্ব অর্থনীতিকে উৎপাদনমুখী অর্থনীতিতে পরিণত হতে বাধা দেয় বৃহৎ শিল্প স্থাপনে বাধা সৃষ্টি করে যার পরিপ্রেক্ষিতে সাম্রাজ্যবাদী ধনী রাষ্ট্রগুলো আমাদের দেশের উপর তাদের অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক আধিপত্য বজায় রাখে, আমাদেরকে তাদের পণ্যের বাজারে পরিনত করে এবং পরিণামে মুসলিম জনগণ ও তাদের ভূমির উপর কাফেরদের নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠিত হয়।

    মুসলমানদের অর্থনীতিতে সাম্রাজ্যবাদী প্রতিষ্ঠানসমূহের (যেমন আই.এম.এফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, এ.ডি.বি. ইত্যাদি) যে কোন ধরণের খবরদারী সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করার জন্য শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও চাপ সৃষ্টি করতে হবে। সকল প্রকার অসম বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক চুক্তি বাতিল করার জন্য শাসকদের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করে আন্দোলনে নামাতে হবে। একইভাবে মুসলমানদের জ্বালানী সম্পদ তেল-গ্যাস-কয়লা-ইউরেনিয়াম ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ কখনোই বিদেশী কোম্পানীর হাতে তুলে দেয়া যাবেনা। রাসূলুলাহ্‌ (সা) ইরশাদ করেন, “তিনটি জিনিষের মাঝে সকল মানুষ শরীক। এগুলো হচ্ছে পানি, চারণ ভূমি এবং আগুন।” সুতরাং, জ্বালানী হচ্ছে গণমালিকানাধীন একটি সম্পদ এবং এ সম্পদ বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে হবে। মোটকথা, আন্দোলনকে এমনভাবে সুসংগঠিত করতে হবে যেন সাম্রাজ্যবাদী এসব কোম্পানীকে এদেশ থেকে চিরতরে বের করে দেয়া যায় এবং আমাদের নিজেদের সম্পদের উপর নিজেদের পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত হয়।

    এভাবে খিলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অন্যতম কর্মসূচী হতে হবে জনগণকে সাম্রাজ্যবাদী কাফের শক্তির বিরুদ্ধে সচেতন করা ও তাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা এবং তাদের দেশীয় তাঁবেদার শাসকদের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করে গণআন্দোলন ও গণপ্রতিরোধের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে তাদেরকে অপসারণ করা। সেমিনার, লিফলেট, পোস্টার, বক্তৃতা, সমাবেশ, মিছিল, ইত্যাদি সম্ভাব্য সকল উপায়ে নিজ দেশের অভ্যন্তরে সাম্রাজ্যবাদীদের সব নতুন নতুন পরিকল্পনা ও চুক্তির মুখোশ উম্মোচন করে তা তুলে ধরতে হবে জনগণের সামনে, দেখিয়ে দিতে হবে কীভাবে অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে তারা, কীভাবে তাদের ঈমান ও ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে, কীভাবে তাদের উপর সাম্রাজ্যবাদীদের থাবা বিস্তার করছে ক্রমান্বয়ে। একই সাথে জনগণকে আহ্বান করতে হবে এসবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার, নিজেদের ভূমিতে তাঁবেদার শাসকদের প্রত্যাখ্যান করার, তাদের যে কোন দেশবিরোধী-গণবিরোধী-ইসলামবিরোধী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার।

    যখন সাম্রাজ্যবাদীদের সকল ষড়যন্ত্র ও তাদের বসানো তাঁবেদার শাসকদেরকে জনগণ নিজেদের ও ইসলামের চরম শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে পারবে এবং এদের বিরুদ্ধে বিক্ষুদ্ধ ও সংগঠিত হয়ে এদের কাছ থেকে মুক্তির পথ খুঁজবে তখনই সেই জনগণকে নিয়ে একটি গণ-আন্দোলন পরিচালনা করে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে তাদের নিয়ে যেতে হবে। এই খিলাফত তাদেরকে জালেম শাসকদের হাত থেকে মুক্ত করবে, তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেবে এবং একই সাথে ঐ শক্তিশালী খিলাফত রাষ্ট্র পৃথিবীতে ইসলাম ও মুসলামানদের চিরশত্রু সাম্রাজ্যবাদী কাফের রাষ্ট্র ও শক্তিগুলোর বিদায় ঘন্টা বাজাবে যাতে করে পৃথিবীতে ইসলামই একমাত্র বিজয়ী জীবনব্যবস্থা হিসেবে কতৃত্ব করতে পারে।

  • ইসলাম-বিদ্বেষীদের উদ্দেশ্যে বলছি

    بسم الله الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله

    তাদের প্রকৃতি:

    আপেক্ষিক নৈতিকতার মর্মর ভিত্তিপ্রস্তরে স্থাপিত পূজিবাদী সমাজের তথাকথিত প্রগতিশীলরা কেবলই সংস্কারের বুলি আওড়ায় আর ইসলামের বিরুদ্ধ বিদ্বেষ ছড়ায়।

    আল্লাহ্ তা’আলা এই ধরনের লোকদের মনস্তত্ত্ব ও প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করে, সতর্কবাণী উল্লেখ করে বলেছেন :

    وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لاَ تُفْسِدُواْ فِي الأَرْضِ قَالُواْ إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ

    أَلا إِنَّهُمْ هُمُ الْمُفْسِدُونَ وَلَكِن لاَّ يَشْعُرُونَ

    “আর যখন তাদেরকে বলা হয় দুনিয়ার বুকে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করোনা, তখন তারা বলে, আমরা তো মীমাংসার পথ অবলম্বন করছি। মনে রেখো, (বস্তুতঃ) তারাই হাঙ্গামা সৃষ্টকারী, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করেনা।” [সূরা বাকারাহ্: ১১-১২]

    তোমাদের বিদ্বেষপ্রসূততা সম্পর্কে:

    আল্লাহ্ তা’আলা কুরআনুল কারীমে বলেছেন:

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ لاَ تَتَّخِذُواْ بِطَانَةً مِّن دُونِكُمْ لاَ يَأْلُونَكُمْ خَبَالاً وَدُّواْ مَا عَنِتُّمْ قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَاء مِنْ أَفْوَاهِهِمْ وَمَا تُخْفِي صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الآيَاتِ إِن كُنتُمْ تَعْقِلُونَ

    “হে ঈমানদারগণ! তোমরা মুমিন ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করো না, তারা তোমাদের ক্ষতি-সাধনে কোন ত্রুটি করে না; তোমরা কষ্টে থাক, তাতই তাদের আনন্দ। শত্রুতাপ্রসুত বিদ্বেষ তাদের মুখেই ফুটে বেরোয়। আর যা কিছু তাদের মনে লুকিয়ে রয়েছে তা আরো অনেকগুণ বেশী জঘন্য। তোমাদের জন্য নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করে দেয়া হলো, যদি তোমরা তা অনুধাবন করতে সমর্থ হও।” [সূরা আলে-ইমরান: ১১৮]

    আর তোমরা যা চাও , তাতে সফল হবে না:

    আল্লাহ্ তা’আলা কুরআনুল কারীমে বলেছেন:

    يُرِيدُونَ لِيُطْفِؤُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَاللَّهُ مُتِمُّ نُورِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ

    “তারা মুখের ফুৎকারে আল্লাহ্’র আলো নিভিয়ে দিতে চায়। আল্লাহ্ তার আলোকে পূর্ণরূপে বিকশিত করবেন যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে।“ [সুরা সাফফ্: ৮]

    তোমরা পরিকল্পনা কর কিন্তু:

    আল্লাহ্ তা’আলা কুরআনুল কারীমে বলেছেন:

    وَمَكَرُواْ وَمَكَرَ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ

    “এবং কাফেররা চক্রান্ত করেছে আর আল্লাহ্ ও কৌশল অবলম্বন করেছেন। বস্তুতঃ আল্লাহ হচ্ছেন সর্বোত্তম কুশলী।”

    তাদের অর্জন:

    أُوْلَئِكَ الَّذِينَ اشْتَرُوُاْ الضَّلالَةَ بِالْهُدَى فَمَا رَبِحَت تِّجَارَتُهُمْ وَمَا كَانُواْ مُهْتَدِينَ

    “তারা সে সমস্ত লোক যারা হিদায়া’র বিপরীতে ভ্রান্তি ক্রয় করে।বস্তুতঃ তারা তাদের এই ব্যবসায় লাভবান হতে পারেনি এবং তারা হিদায়া’ ও লাভ করতে পারেনি।” [সূরা বাকারাহ্: ১৬]

    অতএব, তোমরা কোথায় যাচ্ছ?

    فَأَيْنَ تَذْهَبُونَ

    إِنْ هُوَ إِلاَّ ذِكْرٌ لِّلْعَالَمِينَ

    لِمَن شَاء مِنكُمْ أَن يَسْتَقِيمَ

    وَمَا تَشَاؤُونَ إِلاَّ أَن يَشَاء اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ

    “অতএব, তোমরা কোথায় যাচ্ছ?
    এটা তো কেবল বিশ্ববাসীদের জন্য উপদেশ,
    তার জন্য, যে তোমাদের মধ্যে সোজা চলতে চায়।
    তোমরা আল্লাহ্’র ইচ্ছার বাইরে অন্যকিছুই ইচ্ছা করতে পার না।”

    [সূরা তাকভীর: ২৬-২৯]

    سبحانك اللهم و بحمدك أشهد أن لا إله إلا أنت أستغفرك و أتوب إليك

    সায়্যিদ মাহমুদ গজনবী

  • সঠিক বন্ধনের ভিত্তি

    একটি দাওয়াকারী দলে যোগ দেয়ার একমাত্র কারণ ঈমান।

    এখন বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, এই দলের সদস্যদের মধ্যকার বন্ধনটি কীসের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে? এর উত্তর হচ্ছে, এই দলের সদস্যদের বন্ধনের একমাত্র ভিত্তিও ঈমান।

    হাদীস শরিফে আছে, কিয়ামতের দিন যে সাত ধরনের ব্যক্তি আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া পাবে তাদের মধ্যে এক ধরনের ব্যক্তি হচ্ছে তারা যারা একত্রিত হয় পরস্পরকে আল্লাহর ভালোবাসার উদ্দেশ্যে। [বুখারী ও মুসলিম]

    আবু হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূল (সা) বলেছেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা বলবেন: ‘আমার সুমহান ইজ্জতের খাতিরে যারা পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা স্থাপন করেছে তারা কোথায়? আজ আমি তাদেরকে আমার বিশেষ ছায়ায় স্থান দিব। আজ এমন দিন, আমার ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া নেই।’ [মুসলিম]

    রাসূল (সা) আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি জানো ঈমানের কোন বন্ধন সবচেয়ে শক্তিশালী? ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) ভালো জানেন। রাসূল (সা) বললেন, সবচেয়ে শক্তিশালী ঈমান হচ্ছে, আল্লাহর উদ্দেশ্য আনুগত্য করা, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালোবাসা ও আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঘৃণা করা। [মুসতাদরাক-ই-হাকিম]

    যেসব বাস্তবতার কারণে দলের মধ্যে ঈমানের বন্ধন ক্ষতিগ্রস্ত হয়-

    ১. দাওয়ার প্রতি নিষ্ঠাহীনতা
    ২. নিরর্থক কথাবার্তা
    ৩. ক্রোধ
    ৪. দলীয় নেতৃত্ব ও পরিচালনায় দুর্বলতা

    দাওয়াকারী দলের কোনো সদস্য যদি তার নির্ধারিত কাজটি সঠিক গুরুত্ব ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন না করে তাহলে এতে অন্যরা বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হতে পারে। যদিও এই বিরক্তি ও ক্ষোভের প্রকাশ অবশ্যই সংযত হওয়া উচিত; কিন্তু মূলত এই বিরক্তি ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে কোনো সদস্যের নিষ্ঠাহীনতার কারণে। আল্লাহর দাওয়াত বহনকারীর জন্য নিষ্ঠাহীনতা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

    নিরর্থক কথাবার্তা বলা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। আল্লাহ বলেন,

    মুমিনগণ সফলকাম হয়ে গেছে যারা নিজেদের নামাযে বিনীত-নম্র, যারা অনর্থক কথাবার্তায় নির্লিপ্ত… [সূরা আল মুমিনুন: ১-৩]

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেন, বান্দা কখনো কখনো এমন কথা বলে যাতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি রয়েছে অথচ সে ওই কথার অনিষ্টতা জানে না, কিন্তু ওই কথায় তাকে জাহান্নামের এতটা গভীরে নিক্ষেপ করে যতটা দূরত্ব রয়েছে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে। [বুখারী ও মুসলিম]

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেন, কোনো বান্দা এমন একটি কথা উচ্চারণ করে, আর তা শুধু লোকজনকে হাসানোর উদ্দেশ্যেই বলে। এই কথার দরুন সে (জাহান্নামের মধ্যে) এতটা দূরে নিক্ষিপ্ত হবে যতটা দূরত্ব রয়েছে আসমান ও জমিনের মধ্যে। বস্তুত বান্দার পায়ের পিছলানো থেকে তার মুখের পিছলানো অধিক হয়ে থাকে। [বায়হাকী]

    রাসূল (সা) বলেন, মানুষ যখন অনর্থক বিষয়গুলো ত্যাগ করে তখন তার ইসলাম সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে। [তিরমিযী, মুয়াত্তা, মুসনাদে আহমদ, ইবনে মাযা ও বায়হাকী]

    ক্রোধ দাওয়াকারীদের মধ্যে ঈমানের বন্ধনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। রাসূল (সা) বলেন, ক্রোধ ঈমানকে এমনভাবে নষ্ট করে যেভাবে মুসাব্বির মধুকে নষ্ট করে। [বায়হাকী]

    অপর হাদীসে আছে, ক্রোধ শয়তানের পক্ষ থেকে আসে.. ..। [আবু দাউদ]

    সদস্যদের দলকে নেতৃত্বদান ও পরিচালনার দুর্বলতা দলের ঈমানের বন্ধনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দলের মধ্যে অহেতুক উঁচ-নিচু শ্রেণীভেদ প্রকাশ ঘটানো হয়। অথচ রাসূল (সা) বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। [বুখারী ও মুসলিম]

    ঈমানের বন্ধন সুদৃঢ় রাখার উপায়:

    ১. নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা। দাওয়াত ছোট-বড় প্রত্যেকটি কাজকে রাসূল (সা)-এর দাফনকাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে হবে।

    ২. অর্থহীন কথাবার্তা থেকে দূরে থাকতে হবে। দল থেকে বিতরণ করে দেয়া বই-নিবন্ধ-বক্তব্যগুলো ভালোভাবে পড়ে সেগুলো নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলে অর্থহীন কথা সুযোগ থাকবে না।

    ৩. ক্রোধকে শয়তানের বন্ধু ও নিজের শত্রু মনে করা। আল্লাহ বলেন,

    (তাদের বৈশিষ্ট্য হলো) তারা রাগকে হজম করে এবং মানুষকে ভালবেসে ক্ষমা করে দেয়। আল্লাহ ও এ ধরনের মুহসীন তথা সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। [সূরা আলে-ইমরান:১৩৪]

    হযরত আলী (রা)-এর উপদেশ, “অহঙ্কারের প্রতি দুর্বলতা, ক্রোধ ও ঔদ্ধত্য প্রবণতার উপর কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ কর।”

    ৪. নেতৃত্বের ব্যাপারে রাসূল (সা) ও সাহাবীগণের দৃঢ়তা, নিষ্ঠা ও একাগ্রতা দাওয়াকারীদের জন্য সর্বকালীন আদর্শ। সেধরনের নেতৃত্ব দলের মধ্যে ঈমানের বন্ধনকে সুদৃঢ় করে। দায়িত্বশীলদের উচিত ঘন ঘন কর্মীদের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া। রাসূল (সা) বলেন, যখন কোনো ব্যক্তি তার ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে নিজের ঘর থেকে বের হয় তখন তার পেছনে সত্তর হাজার ফেরেশতা থাকে। তারা সবাই তার জন্য দোয়া করে এবং বলে, হে আমাদের রব, এই ব্যক্তি শুধুমাত্র তোমার সন্তুষ্টির জন্য (তার ভাইয়ের সঙ্গে) মিলিত হয়েছে। অতএব, তুমিও তাকে তোমার অনুগ্রহের অন্তর্ভুক্ত কর। [বায়হাকী]

    সুতরাং সর্বান্তকরণে ঈমানের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়াই দাওয়ার সঙ্গে টিকে থাকার একমাত্র পথ। ইনশাআল্লাহ, আমরা তাদের অংশ হতে চাই যাদের সম্বন্ধে রাসূল (সা) বলেছেন, আল্লাহতায়ালা বলেন, আমার মর্যাদার খাতিরে যারা পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা স্থাপন করে, তাদের জন্য (পরকালে) নূরের এমন সুউচ্চ মিনার হবে যে, তাদের জন্য নবী এবং শহীদগণও ঈর্ষা করবেন। [তিরমিযি]

  • মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ এশিয়া

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ এশিয়া

    ১. ভুমিকা

    ভারতীয় উপমহাদেশ নামে সুপরিচিত এই দক্ষিণ এশিয়া বরাবরই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক মঞ্চ। সংখ্যায় বিপুল এ অঞ্চলের অধিবাসীরা বিশেষ ধরণের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী আর ভৌগোলিকভাবে এ অঞ্চল দূর্গম পাহাড়বেষ্টিত। যেজন্য অতীতের অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে কেবল সুনির্দিষ্ট কয়েকটি পথেই এ অঞ্চলে প্রবেশ করা যেত। কখনো সফলতা, কখনো ব্যর্থতা ইত্যাদি মিলিয়ে বিভিন্ন সময় শীর্ষস্থানীয় দিগ্বিজয়ীরা এসব পথেই এ অঞ্চলে প্রবেশ করেছে এবং এ অঞ্চলসীমায় নিজ নিজ ক্ষমতার পরিধি বিস্তারের চেষ্টা করেছে। সেই ধারাবাহিকতাতেই একসময় মোঘলদের মাধ্যমে এ অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার লাভ ঘটে। তবে নিকট অতীতে ভৌগলিক এই সীমাবদ্ধতা থেকে অনেকেই শিক্ষা নিয়েছে এবং এককভাবে কারো পক্ষে পুরো উপমহাদেশের কর্তৃত্ব ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ফলশ্রুতিতে, উপমহাদেশ বিভক্ত হয়েছে একাধিক অংশে এবং একক কোন ব্যবস্থায় এটা আর পরিচালিত হচ্ছেনা।

    ২. সাম্প্রতিক পরিস্থিতি (বিংশ ও একবিংশ শতাব্দী)

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে আমেরিকার আবির্ভাব ঘটে। সে নতুন উদ্যম, হিংস্রতা ও গোটা পৃথিবীর সম্পদ লুটপাটের সর্বগ্রাসী লোভ নিয়ে নয়া উপনিবেশবাদ শুরু করে। অতি অল্প সময়ে আমেরিকা বৃটিশ সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ করে এবং প্রায় প্রতিটি স্থানে তাদেরকে বিতাড়িত করে। এ ক্ষেত্রে আমেরিকা শুধু ব্রিটিশদেরকেই নয় বরং সমান লক্ষ্যে অগ্রসর অন্যসব শক্তিগুলোকেও ছাড়িয়ে যায়। এটাই হচ্ছে গত শতাব্দীর সব আঞ্চলিক ও দেশীয় রাজনীতির পেছনে কার্যকর অপ্রকাশ্য কারণ। এভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে বিশ্বে নিজের ভিত তৈরী করে এবং এই ভিতকে আরো মজবুত ও স্থায়ী করার লক্ষ্যে সুগভীর পরিকল্পনার জাল বিস্তার করে।

    দক্ষিণ এশিয়ার প্রতি মার্কিন নীতি মূলত মধ্য এশিয়ায় মার্কিন স্বার্থ, চীন নিয়ন্ত্রণ নীতি (Policy of Containing China) এবং ইসলামিক আন্দোলন দমনের ভিত্তিতে আবর্তিত, যা নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

    ৩. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্য এশিয়া

    ভূ-কৌশলগত দিক থেকে মধ্য এশিয়া মূলত রাশিয়ার বর্ধিত অংশ, যা মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। মধ্য এশিয়ার সাথে রাশিয়ার কোন প্রকৃতিগত স্বাভাবিক সীমানা নেই, নেই কোন সাগর-মহাসাগর ইত্যাদি। একই কথা চীনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, চীন মধ্যএশিয়াকে তার পেছনের দরজা মনে করে। যেহেতু মধ্য এশিয়ার বেশিরভাগ জনগোষ্ঠী মুসলিম, সেহেতু চীন ও পূর্ব তুর্কমেনিস্তানে অবস্থানরত মুসলিমদের উপর মধ্য এশিয়ার মুসলিমদের প্রভাব সম্পর্কে চীন খুবই ভীত-সন্ত্রস্ত। এই কৌশলগত গুরুত্বের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মধ্য এশিয়াকে নিয়ে নিজস্ব পরিকল্পনা সাজায়। এই পরিকল্পনার একদিকে রয়েছে রাশিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা আর আরেকদিকে রয়েছে চীনকে অবরোধ করে রাখা এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের উপর চীনের প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনাকে খর্ব করা।

    অধিকন্তু, মধ্য এশিয়া এবং বিশেষ করে কাস্পিয়ান সাগর তেল সমৃদ্ধ অঞ্চল। এছাড়াও এই অঞ্চলে স্বর্ণসহ বহু মূল্যবান ধাতব পদার্থের খনি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের মতই এই অঞ্চল পৃথিবীর খনিজ সম্পদের প্রাচুর্যের দিক থেকে অন্যতম ধনী অঞ্চল। এই বিশাল সম্পদের প্রতি মার্কিন বিশালকায় পুঁজিবাদী কোম্পানিগুলো আকৃষ্ট এবং বিনিয়োগের নামে কোম্পানিগুলো এই অঞ্চলে প্রবেশ করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের মতই এই অঞ্চলের দুর্ভোগের জন্য ঔপনিবেশবাদীরাই দায়ী আর এই অঞ্চলের মানুষের সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ঔপনিবেশবাদীরা।

    ২০০৪ সালে পারভেজ মোশার্র‌ফ আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন একটি ধারণা উপস্থাপন করে। তার প্রদত্ত ধারণাটি হচ্ছে – পাকিস্তান তিনটি অঞ্চলের বাণিজ্য ও জ্বালানী পাইপলাইনের মধ্যে সংযোগ রাস্তা হতে পারে। এই তিনটি অঞ্চল হচ্ছে: মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া (ভারত) এবং পশ্চিম এশিয়া (তথা মধ্যপ্রাচ্য)। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে পাকিস্তান এই তিন অঞ্চলের সংযোগস্থলে অবস্থিত বলে এর সুযোগ নিতে চায়। এজন্য পাকিস্তান আরব সাগরের উপকূল জুড়ে আফগানিস্তান সীমান্ত পর্যন্ত অসংখ্য বিশালাকার সমুদ্র বন্দর তৈরী করেছে এবং এই সমুদ্র বন্দরগুলো আমেরিকার অনুকরণে মহাসড়ক দ্বারা পরস্পর সংযুক্ত।

    মার্কিন সিনেটের সামরিক ব্যয় সংক্রান্ত কমিটিতে তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রী কলিন পাওয়েল এ সম্পর্কে ২৭শে মার্চ, ২০০৪ সালে বিস্তারিত বিবরণ দেয় এভাবে, “বাণিজ্য ও সড়ক নেটওয়ার্কের মধ্যে আনা গেলে ককেশাস, মধ্য এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার অঞ্চল সমূহের অমিত সম্ভাবনা রয়েছে। এটা তখনই সম্ভব যখন আমরা এতদঅঞ্চলে নিরাপত্তা দিতে সক্ষম হব। … পাকিস্তান এই বিষয়টি নিরীক্ষা করছে এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো ও সমুদ্র বন্দরগুলো ঢেলে সাজিয়েছে… আর আমরা আফগানিস্তানে আমাদের সহযোগী, সৌদী ও জাপানিদের সহায়তায় মহাসড়ক তৈরি অব্যাহত রাখব”।

    মার্কিন কূটনীতি এই অঞ্চলে (সামরিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক) জোট প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। এই সম্ভাব্য জোট পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত থেকে শুরু হয়ে কাবুল হয়ে তেহরান পর্যন্ত বিস্তৃত। এর ফলে পাকিস্তানকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে কৌশলগত মিত্রতার মানচিত্র নতুন করে সাজানো সম্ভব। ইসলামাবাদে অবস্থিত কিছু রাজনৈতিক সূত্র ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে নতুন জোট তৈরি হওয়ার ভবিষ্যৎবাণী করছে। পরিকল্পিত এই জোট বিদ্যমান ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত মিত্রতার তুলনায় ব্যাপকতর। এরকম আলোচনাও আছে যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপিয়ান ন্যাটোর অনুকরণে এই অঞ্চলেও একটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন এশিয়ান ন্যাটো তৈরী করার স্বপ্ন দেখছে মার্কিনরা। যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত বন্ধু রাষ্ট্রের পাশাপাশি এতে আরো অংশ নিবে ওয়াশিংটনের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কাজাখস্তান ও আজারবাইজান। এই আঞ্চলিক জোটের উদ্দেশ্য হচ্ছে জ্বালানী পাইপলাইনসমূহের নিরাপত্তা বিধান ও সামরিক সুরক্ষা প্রদান করা এবং চীনা বা রাশিয়ান প্রভাব প্রতিহত করা।

    ৪. আমেরিকা এবং চীন

    চীন তার সুবিশাল জনসংখ্যা ও সুবিস্তৃত ভূমির জন্য সবসময়ই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং একই সাথে ভয়েরও কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রথমদিকে বৃটেনই এ অঞ্চলকে নিজেদের বাণিজ্য সম্প্রসারণের বাজার হিসেবে উন্মুক্ত করার পদক্ষেপ নেয়। চীনকে তারা কোন হুমকি হিসেবে দেখেনি বরং এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতাই তারা চেয়েছিলো যাতে করে দূরপ্রাচ্যে তাদের বাকী উপনিবেশগুলো নিয়ে সমস্যায় পড়তে না হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে আমেরিকার সাথে চীনের সম্পর্ক ছিলো মূলতঃ বন্ধুত্বসূলভ। আমেরিকা ও জাপানের মধ্যে অস্থিতিশীল সম্পর্ক এবং চীনের প্রতি জাপানের আক্রমণাত্মক অবস্থা, আমেরিকা ও চীনকে নিকটতর করে। উদাহরণস্বরূপ, যখন পার্ল হারবার আক্রান্ত হয়েছিলো, চীন তখন জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলো।

    সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর চীনের ব্যবস্থা যখন কমিউনিজমে রূপান্তরিত হলো তারপর থেকে তারা অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন চিন্তা বাদ দিয়ে নিজেদের সীমানার বাইরের বিষয় নিয়ে খুব কমই মাথা ঘামিয়েছে। এ ব্যাপারে একমাত্র ব্যতিক্রম হচ্ছে উত্তর ভিয়েতনাম ও উত্তর কোরিয়ার কিছু বিষয়ে তার সংশ্লিষ্টতা এবং ভারতের সাথে সামান্য বিরোধ। চীনের এই আচরণ রাশিয়ার সাম্রাজ্য বিস্তারের উচ্চাভিলাষের সাথে কোন ক্রমেই তুলনীয় নয়। ফলে, মতাদর্শগতভাবে পুঁজিবাদের বিরোধী হওয়ার কথা বাদ দিলে, এটা ইঙ্গ-মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে কোন প্রত্যক্ষ হুমকি ছিল না। বরং সময় সময় বিভিন্ন বিষয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে চীনকে ব্যবহার করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু, কমিউনিজমকে বাদ দেয়ার পর থেকে নিজের সীমানার বাইরেও চীন দৃষ্টি দিতে শুরু করেছে। চীন যখন নিজেকে ক্ষমতাধর এক অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে এবং পারমাণবিক অস্ত্রে সুসজ্জিত করে গড়ে তুলছিলো, আমেরিকার তখন এটাকে সহ্য করা এবং পর্যবেক্ষণ করা ছাড়া উপায় ছিল না। বর্তমানে চীনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমগ্র এশিয়া এমনকি সমগ্র বিশ্বে স্বীয় প্রভাব বিস্তারের পথে অন্যতম হুমকি মনে করে। “সাধারণভবে ধারণা করা যায় যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের স্বরূপ কেমন হবে তার উপর একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতি বহুলাংশে নির্ভর করবে”।

    মেডিলিন অলব্রাইট (পররাষ্ট্র মন্ত্রী) ২০০০ সালে প্রদত্ত “U.S. , China & India in the 21st Century” শীর্ষক এক ভাষণে এশিয়া ও ইউরোপে বাজার হারানোর ভয়ে চীনকে ডব্লিও. টি.ও.ভূক্ত করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বার বার তাগিদ দেন। তিনি যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, চীনের অর্থনৈতিক বিস্ফোরণ থামানোর জন্য এই চুক্তিই একমাত্র পথ, কেননা তখন চীনকে W.T.O এর কঠিন বিধিমালা মেনে চলতে হবে। তিনি তার বক্তব্যে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উল্লেখ করেন যা চীনের উপর চাপ সৃষ্টিতে সহায়তা করবে। যেমন:

    · পরমাণু প্রযুক্তি-সমৃদ্ধিকরণ নিষেধাজ্ঞা

    · তাইওয়ান প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দক্ষিণ চীন সাগরে সহযোগীতা

    · তিব্বতের ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং দালাইলামার সাথে সংলাপ শুরু করা

    · কোরিয়ার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা

    · মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন

    এখানে মূল বিষয় হলো, আমেরিকা চীনের ক্রমাগত একটি পরাশক্তি হয়ে উঠার সম্ভাবনার ভয়ে ভীত এবং সেজন্যই সে বিভিন্ন উপায় উপকরণ ব্যবহার করে চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে, যাতে চীনকে নিজের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানেই ব্যস্ত রাখা যায়।

    এর পাশাপাশি, আমেরিকা আরেকটি কৌশলও চালিয়ে যাচ্ছে। তা হলো, চীনের চারপাশ ঘিরে যে রাষ্ট্রগুলো আছে, সেগুলোকে আরো শক্তিশালী করা কিংবা আমেরিকার প্রভাবাধীনে আনা অথবা যথেষ্ট পরিমাণে অস্থিতিশীল রাখা যাদেরকে দিয়ে চারপাশ থেকে চীনকে অবরুদ্ধ করে রাখা যাবে। ফলশ্রুতিতে, চীন নিজের সীমানার বাইরে প্রভাব বিস্তারের কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ পাবেনা এবং চীন নিজেকে নিজের সীমানার মাঝেই আবদ্ধ রাখবে। উত্তর দিকে চীনকে নিয়ন্ত্রণের জন্য রাশিয়া রয়েছে, অতএব ওইদিক নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। পূর্বদিকে রয়েছে জাপান, তাইওয়ান এবং দক্ষিণ কোরিয়া। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণাধীন ইন্দোচীন, ফিলিপাইন এবং ইন্দোনেশিয়া। পশ্চিমদিকে (যেটাকে সচরাচর ‘চীনের পিছনের দরজা’ বলে অভিহিত করা হয়) রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন মধ্য এশিয়া, বিশেষ করে উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান। ‘এশিয়ান ন্যাটো’ তৈরি করার যে পরিকল্পনা নিয়ে কথা চলছে, তা হবে আমেরিকা নিয়ন্ত্রিত এবং এতে উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের পাশাপাশি কাজাখস্তান ও আজারবাইজানকে অন্তর্ভূক্ত করা হবে। চীনের চতুর্দিকের দেশগুলিকে আমেরিকা বল প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের বাধ্য করছে যাতে তারা চীনের দিকে সর্বদা কঠোর দৃষ্টি রাখে। চীন এই অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বের হবার কোন চেষ্টা করছে না। চীনের প্রতি বার্মার আনুগত্য এই অবরোধ প্রাচীর অতিক্রম করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে, যদিও অবরোধ পুরোপুরি ভেঙ্গে ফেলার জন্য এটা যথেষ্ট নয়। মায়ানমারের মাধ্যমে চীন সরাসরি ভারত মহাসাগরে যেতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও আমেরিকা বার্মার সামরিক জান্তার উপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করে রেখেছে এবং অং সান সু কীকে গণতন্ত্র (!) প্রতিষ্ঠায় ইন্ধন দিচ্ছে।

    চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, আমেরিকা ও তার মিত্রদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক হুমকি ছাড়াও, সে তার সীমানা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোতে বিশেষ করে মধ্য এশিয়ায় ইসলামের ক্রম উত্থানে চিন্তিত। এ ক্ষেত্রে চীনের দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে তার সীমানার অভ্যন্তরস্থ মুসলিমরা বিশেষ করে পূর্ব তুর্কমেনিস্তানের মুসলিমরা এ অঞ্চলে ইসলামের এই উত্থানে প্রভাবিত হতে পারে। বিষয়টির আরো জটিলতা হচ্ছে আমেরিকাও পূর্ব তুর্কমেনিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন দিচ্ছে। চীন এখন বাধ্য হচ্ছে ‘সাংহাই-৬ সন্ত্রাসবিরোধী সম্মেলন’ এ অংশ নিতে, এটা জানা সত্বেও যে এটা আমেরিকার তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

    ৫. আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়া

    ভারতের সাথে কৌশলগত বন্ধুত্ব

    ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজমুকুটে একটি উজ্জ্বল মুক্তা যা শতাব্দীকাল ধরে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি। এতদসত্ত্বেও এখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের বলশেভিক আন্দোলনের প্রভাবে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মানোভাবের ছোঁয়া লাগে। এটা ব্রিটিশদেরকে মধ্যপ্রাচ্যের মতোই ব্যাপক সমস্যায় ফেলে দিয়েছিলো, এমনকি এখানে বরং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনা আরো বেশী প্রাণবন্ত ছিল। তথাপি, বৃটেন ধূর্ততার সাথে এ অঞ্চলের স্বাধীনতা এবং দেশ-বিভাগ সৃষ্টি করে ঠিকই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হয়। এ সময় দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মঞ্চে পশ্চিম পাকিস্তানের হাত ধরে আমেরিকার আগমন ঘটে, এটা সম্ভব হয়েছিল আইয়ুব খানের আমেরিকা প্রীতির কারণে। যদিও পরবর্তীতে ভারতের কাছে (এবং বৃটেনের কাছে) ১৯৭১ সালে তাদেরকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে হারাতে হয়।

    ইঙ্গ-মার্কিন বিরোধের অংশ হিসেবেই আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্ক ছিল তিক্ত (কিসিঞ্জার ভারতকে “বাস্টার্ড” বলেছিল)। নিক্সন-কিসিঞ্জার শাসনকালে আমেরিকা এ সম্পর্ক উন্নয়নে কোন পদক্ষেপ দেয়নি। ঐ সময় ভারত আমেরিকার কাছে খুব বেশী গুরুত্ব পায়নি, কেননা তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে গাঁট বেধে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলো দক্ষিণ-পূর্ব দিকে থেকে। এর পাশাপাশি ভারত হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং এর সোশালিজম সংস্করণের প্রতি বন্ধুপ্রতিম, যা ছিল আমেরিকা কর্তৃক ভারতকে অপছন্দ করার আরেকটি কারণ। ভারতের প্রতি পাকিস্তানের বৈরি মনোভাবকে আমেরিকা ঔদাসিন্যের দৃষ্টি নিয়েই দেখতো, মাঝে মাঝে উৎসাহ দিত।

    ঐ সময়গুলোতো ভারত তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ হিসেবে নিজেকে সামলাতেই বেশী ব্যস্ত ছিলো। বাইরের প্রতি তার দৃষ্টি সীমাবদ্ধ ছিলো মূলত নীচের বিষয়গুলোতে:

    · নেপাল, ভূটান ও শ্রীলংকা এসব ছিলো ভারতেরই উপরাষ্ট্রের মতো। এখানে সবকিছু ভারতের নির্দেশনা মতোই চলতো এবং ভারতের জন্য এগুলো তেমন কোন সমস্যা ছিল না।

    · বাংলাদেশ – সবসময়ই ভারতের জন্য একটা সম্ভাব্য হুমকি (মুসলিম, ভারত-বিরোধী এবং পাকিস্তান-মার্কিন পন্থী)। বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে ভারতের জন্য বিপদজনক কারণ বাংলাদেশ ভারতের শরীরের মধ্যে এবং ভারতকে ‘সেভেন সির্স্টা‌স’ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।

    · চীন – সীমান্ত সংঘাত চলছেই এবং ১৯৬২ সালে সংঘটিত হয়েছে চীন-ভারত যুদ্ধ। এছাড়াও, আরেকটি সত্য হচ্ছে ভারত চীনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিল, যেখানে পাকিস্তান রাশিয়ার বিরুদ্ধে চীনের সাথে সুসম্পর্ক তৈরী করেছিল।

    · পাকিস্তান – যাদের সাথে মূল বিরোধ হচ্ছে ইসলামী ভূ-খন্ড কাশ্মীর নিয়ে। এই উভয়মুখী সমস্যার মিল রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাঈল সমস্যার সাথে। অর্থাৎ ইসরাঈলের অস্তিত্ব মধ্যপ্রাচ্যের বুকে ছুরি বসানোর মত কিন্তু প্রকারান্তরে তা ঐ অঞ্চলে ইসলামী চেতনাকেই আরো উজ্জীবিত করেছে। এসবের ফলশ্রুতিতে কাশ্মীরে পাকিস্তান ও আমেরিকার সহায়তায় জিহাদী ক্যাম্প প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যারা পুরো উপমহাদেশেই প্রভাব বিস্তার করেছে যদিও তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ভারত।

    সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও চীনের উত্থানের মাধ্যমে উপরোক্ত অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে অবরোধ সৃষ্টি করার আমেরিকার পুরোনো কৌশলগুলো চীনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ শুরু হয় যেহেতু চীন এখন একটা নতুন টার্গেট। এ অবস্থায়, প্রতি পদক্ষেপেই মার্কিনীরা ভারতকে সাথী হিসাবে পেতে আগ্রহী যেহেতু ভারত ঐতিহ্যগতভাবে চীন বিরোধী। কংগ্রেসম্যান হেনরী হাইড মন্তব্য করেছেন, “ভারতের সাথে আরো নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে চীনের উত্থানকে ঠেকানো যায়” (Proceedings of the House of Representatives to Pass House Resolution, “The United States and India Nuclear Cooperation Promotion Act”, July 2006) । কংগ্রেসম্যান ওনা রহরাবেচার বলেছেন, “আমি এদিকে দৃষ্টি দিতে চাই যে, ভারত বৃটেনের কাছ থেকে স্বাধীন হবার পরবর্তী সময়গুলোতে মার্কিন-ভারত সম্পর্ক ছিলো খুবই খারাপ। স্নায়ুযুদ্ধের সময় ভারতের অবস্থান ছিলো রাশিয়ার পক্ষে। তা হোক, কিন্তু এখন তো স্নায়ু যুদ্ধ শেষ। এখন আমাদের উচিত ঐ সময় আমরা যা হারিয়েছি তা পুনরুদ্ধার করা”। তাছাড়া, চীনকে সামাল দিতে ভারত অধিকতর সক্ষম একটি শক্তি যেহেতু সে আকৃতি ও জনসংখ্যার দিক থেকে চীনের কাছাকাছি এবং দুই দেশ পাশাপাশি অবস্থিত। দক্ষিণ এশিয়ার আর কোন রাষ্ট্রেরই এককভাবে এই যোগ্যতা নেই।

    অতএব, কার্যত আমেরিকা চায় দক্ষিণ এশিয়া বিশেষতঃ ভারতকে এ অঞ্চলে একটি আঞ্চলিক মহাশক্তি বানিয়ে তাদেরকে চীনের উত্থান দমনের শক্তিশালী হাতিয়াররূপে ব্যাহার করা। আমেরিকা স্বয়ং একাজে মাঠে নেমে পড়েছে। ভারতের সাথে পরমাণু প্রযুক্তি বিনিময়ের সাম্প্রতিক চুক্তি একটা উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত যে এ পরিকল্পনা সফল করতে আমেরিকা কতটুকু এগিয়ে গেছে। কংগ্রেসম্যান গ্রে একারম্যান বলেছেন, “একবিংশ শতাব্দীতে ভারত নীতি তৈরীর এখনই সময়, যা ভারতকে বিশ্বের একটি অন্যতম ও দায়িত্বশীল শক্তি হিসেবে গড়ে উঠার বিষয়কে সমর্থন করবে ও উৎসাহ দিবে, যাতে করে আগামী দশকগুলোতে মার্কিন-ভারত সম্পর্ক আরো সুসংহত হয়”।

    একটি শক্তিশালী ভারত গঠনের লক্ষ্যে মার্কিনীরা চায় এর চারপাশের দেশগুলোতে স্থিতিশীলতা আনয়ন করতে। চীনের চারদিকে অস্থিরতা তৈরী করার নীতির সম্পূর্ণ বিপরীতে মার্কিনীরা ভারতকে স্থিতিশীলতার আবরণে ঢেকে দিতে চাইছে। ভারতকে এভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিলে তা অবশ্যই পাকিস্তান ও বাংলাদেশের উপর নানামুখী প্রভাব ফেলবে। মার্কিন পরিকল্পনায় ভারত হচ্ছে মূল বিবেচ্য আর ভারতের স্বার্থ রক্ষা করতে যেয়ে মার্কিনীরা এর প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পূর্ণ শঠতার সাথে খেলছে এবং তাদেরকে মার্কিন পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন ভূমিকা পালন করতে বাধ্য করছে। এ ব্যাপারে মার্কিনীরা চরম স্বার্থপর। মার্কিনীদের স্বার্থপরতার খোলামেলা প্রকাশ ঘটেছে কংগ্রেসম্যান জি. একারম্যান -এর কথায়, “সময় এসেছে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতি যথাযথ মনোযোগ দেয়ার, বিষয়টিকে এখন আর হালকাভাবে নেয়া যাবেনা। পাকিস্তানের মতই ভারতও বেশ কিছু জটিল প্রতিবেশী দ্বারা বেষ্টিত। প্রতিবেশি পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পরমাণু অস্ত্র উৎপাদন করে চলেছে; চীন পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধের ক্ষেত্রে সন্দেহজনক আচরণ করছে… ভারত যদি ঐ দেশগুলোর প্রতিবেশী না হত, আমরা এরই মধ্যে সেগুলোকে আক্রমণ করতাম… আপনি পাকিস্তান, ইরান ও উত্তর কোরিয়াকে কি বলবেন? আপনি হয়তো তাদেরকে বলতে পারেন তোমরা যদি ভারতের মতো থাকতে চাও, তাহলে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র (Weapons of mass destruction) প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন কর। এগুলোকে উচ্চমূল্যের বিনিময়ে বিক্রি কর না, এগুলোকে সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দিও না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কর, ভারতের মত প্রকৃত গণতন্ত্র… গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নীতি ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমাদের পক্ষে কাজ কর এবং কখনো আমাদের বিপক্ষে যেওনা।” অবশ্য চীনের বিপক্ষে পাকিস্তানের ভূমিকাকে খাট করে দেখা ঠিক হবে না। আমেরিকা মনে করে শেষ পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্তানকে ঐক্যবদ্ধ করে চীনের মোকাবেলায় শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি হিসাবে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো যাবে। এজন্য মার্কিনীরা সার্কের মত বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতার নীতিকে উৎসাহ দেয়।

    পাকিস্তান ও ইসলামী আন্দোলন

    পাকিস্তান নিউক্লিয়ার ক্লাবে অন্তর্ভূক্ত হওয়ায় মার্কিনীদের উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলে তা সমভাবে ভারতের উপরেও সমভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যা মার্কিনীরা চায় না, আর এজন্যই তারা উভয় দেশের ব্যাপারেই চুপচাপ। অবশ্য কাশ্মিরের ঘটনাবলীতে এই অঞ্চলের সমস্ত মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধুমায়িত অসন্তোষ এবং তাদের পরমাণু অস্ত্রের কাছাকাছি থাকাটা মার্কিনীদের যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসে এক শুনানিতে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্র সচিব ক্রিশ্চিনা রোকা উল্লেখ করেছে, “দক্ষিণ এশিয়ায় উদারতা, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পাকিস্তান এবং ভারতের মধ্যে প্রধানত কাশ্মিরকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা”।

    অতএব, আমেরিকা কর্তৃক আফগানিস্তানে নয়া ক্রুসেডের অন্যতম কারণ ছিল কাশ্মিরের মুসলমানদের সমর্থনকারী ইসলামী আন্দোলনগুলোকে দমন করা। মার্কিনীরা মোশাররফকে বাধ্য করেছিল কাশ্মিরী জনগণের স্বশাসনের অধিকারের প্রতি পাকিস্তানের অব্যাহত সমর্থন প্রত্যাহার করতে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন-এর ভাষায়, “শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী হিসাবে মোশাররফ অনেক দুর এগিয়ে গেছেন… তিনি বুঝতে পেরেছেন যে সন্ত্রাসবাদ, সীমিত যুদ্ধ কিংবা পারমানবিক হুমকি দিয়ে ভারতকে কাশ্মির থেকে হটানো যাবেনা… পাকিস্তান যতক্ষণ পর্যন্ত কাশ্মিরী গ্রুপগুলোর সাথে যুক্ত থাকবে, ততক্ষণ সন্ত্রাসবাদের মদদ দেয়ার অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতে পারে না”।

    মোশাররফ তার মার্কিন প্রভুর নির্দেশে এবং ভারতের প্রিয়ভাজন হতে গিয়ে পাকিস্তানে অবস্থিত ইসলামিক ট্রেনিং ক্যাম্পগুলোকে তছনছ করে দিয়েছে। এছাড়া তাকে বাধ্য করা হয়েছে ভারতের সাথে সমঝোতায় আসতে এবং দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলো সমাধান করতে। আর এ সমাধানের শুরু হয়েছে কাশ্মিরের উপর হিন্দুদের অধিকার স্বীকার করে নেয়ার মধ্য দিয়ে। আর এটিকে বলা হয়েছিল দু’দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের পূর্বশর্ত। এসব কিছুই শেষ পর্যন্ত ভারতকে ঘিরে মার্কিন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথকে প্রশস্ত করেছে।

    আমেরিকা ও বাংলাদেশ

    প্রেক্ষিত: ভারত

    একথা পূর্বেই বলা হয়েছে যে ভারতের জন্য বাংলাদেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সোজা কথায় বলতে গেলে বাংলাদেশে রয়েছে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এবং এই জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে ভারতবিরোধী। বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে ভারতের পেটের ভিতরে। বাংলাদেশ তার সীমান্তের ৮০ ভাগই ভারতের সাথে ভাগাভাগি করে। বাংলাদেশ তার অবস্থানগত কারণে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যকে (সেভেন সিস্টারস্‌, যারা ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদের মূল যোগানদার) মূল ভারতীয় ভূখন্ড থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে আসার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে বাংলাদেশের উপর দিয়ে যাওয়া।

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত মিত্রতার ফলে ভারত আনন্দে আত্মহারা। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন ‘স্থিতিশীলতার পরিকল্পনা’র (stabilization plan) উপর যুক্তিভিত্তিক আস্থা ও প্রত্যয় স্থাপন এবং সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়া ভারতের পক্ষে খুবই কঠিন। যার ফলে বাংলাদেশের উপর প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা পরিত্যাগ করা ভারতের জন্য প্রায় অসম্ভব। বাংলাদেশে পরিপূর্ণ স্থিতিশীলতা ভারতের স্বার্থের অনুকুলে নয়। বাংলাদেশ স্থিতিশীল থাকলে ভারতের বঞ্চিত সেভেন সিস্টারস এর রাজ্যগুলোর মধ্যে স্বাধীন হবার বাসনা তীব্রতর হবে। স্বাধীনতার সংগ্রামে তারা স্থিতিশীল ও উন্নত বাংলাদেশকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করবে। তাই ভারত বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে, যা মাঝে মাঝে বাংলাদেশকে ঘিরে মার্র্কিনী পরিকল্পনা ওলট পালট করে দেয়। ভারতের এই আচরণ অনেকটা প্রতিবেশীদের প্রতি ইসরাঈলের আচরণের মতই।

    প্রেক্ষিত: চীন

    চীনের জন্য ভারত মহাসাগরে পৌঁছার স্বল্পতম দূরত্বের পথ হচ্ছে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে, তাই চীনের কাছে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। যদিও দক্ষিণ চীন সাগরের উপর চীনের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রতিষ্ঠিত, ভারত মহাসাগরের উপর তার কোন কর্তৃত্ব নেই। চট্টগ্রাম বন্দর চীনের স্বার্থে ব্যবহৃত হতে দিলে চীনের এই সমস্যার একটি সমাধান হত। তবে চীন মায়ানমারে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরী করছে। যেহেতু মায়ানমারের সরকার চীনের অনুগত, তাই এই গভীর সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে চীন ভারত মহাসাগরে আংশিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। চীনের এই ইচ্ছা ও পরিকল্পনা বুঝতে পেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার দালালদের মাধ্যমে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠার মন্ত্রণা দিয়ে আসছে। পরিকল্পিত এই গভীর সমুদ্রবন্দরে মার্কিন যুদ্ধ বিমানবাহী রণতরী এসে ভিড়তে পারবে এবং একে তারা একটি সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। ফলে পুরো ভারত মহাসাগর মার্কিনীদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং দক্ষিণ এশিয়া ও দূরপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ সংরক্ষণ সহজতর হবে।

    দক্ষিণ এশিয়ায় ‘শান্তি ও স্থিতি’ বজায় রাখার অর্থ হচ্ছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ইসলামিক চরিত্র ও উদ্দেশ্য পরিত্যাগ করা এবং পরিশেষে ‘মডারেট ইসলামিক গণতন্ত্রের’ লেবাস ধারণ করা (ক্রিস্টিনা রোকা)। বর্তমানে দু’টি দেশেই সামরিক শাসন (আড়ালে বা প্রকাশ্যে) থাকা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় এই দুই দেশের ভবিষ্যত নির্ধারিত হবে তার পরিকল্পনা অনুযায়ী। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে বাংলাদেশে বর্তমান সামরিক শাসন প্রয়োজনীয় কিন্তু তা একটি স্বল্পমেয়াদী অন্তর্বর্তীকালীন সমাধান।

    ৬. উপসংহার

    উপরোক্ত বিষয়গুলোই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে। চীনের উত্থান এবং ইসলামী জাগরণ এই অঞ্চলকে কোন দিকে নিয়ে যাবে তা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। এর ভিত্তিতেই (Criteria) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সব ঘটনা বিশ্লেষণ করে এবং রাজনৈতিক কর্মকান্ডের পরিকল্পনা করে। ডিসেম্বর ২০০৪ সালে জাতীয় গোয়েন্দা কাউন্সিল (National Intelligence Council) কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্টে চীনের উত্থান এবং ২০২০ সালের মধ্যে সম্ভাব্য শক্তিশালী খিলাফতের আবির্ভাবের মোকাবেলায় মার্কিন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়। এ কারণে বুশ ও তার সহযোগীদের মুখ থেকে বারে বারে সাবধান বাণী উচ্চারিত হয়েছে, “একটি ব্যাপক ও মৌলিক পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী সাম্রাজ্য যার বিস্তৃতি স্পেন থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত … এটি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার বৈধ সরকারের প্রতি চরম হুমকি”।

    আবু উমর
    জানুয়ারী ২০০৮

  • বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগ্রামের ইতিহাস

    বাংলাদেশের এই ভূখন্ডে রাজনৈতিক সংগ্রাম ও আন্দোলনের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সেই ইতিহাসকে সামনে রেখে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি ও তার সম্ভাব্য বাধাসমূহ আলোচনা করাই এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের বিচারে এই প্রবন্ধে চারটি সময়কালকে (Period) আলাদা আলাদা ভাবে ভাগ করা হয়েছে।

    ১.    প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে ব্রিটিশদের আসার আগপর্যন্ত সময় কাল। (?….১৭৫৭)
    ২.    ব্রিটিশ শাসনামলে রাজনৈতিক আন্দোলন (১৭৫৭-১৯৪৭)
    ৩.    পাকিস্তান আমলে রাজনৈতিক সংগ্রাম। (১৯৪৮-১৯৭১)
    ৪.    বাংলাদেশ আমল ( ১৯৭১-২০০৭)

    Pre-historical period এর আলোচনায় যাওয়ার আগে এই অঞ্চলের ভৌগলিক ও সাধারণ মানুষের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ঠ্যর একটি পর্যালোচনা প্রয়োজন। যে ভূখন্ডটাকে আজকে আমরা বাংলাদেশ বলি, গত ২ হাজার বছর বা তার অধিক কাল সময় ধরে এই অঞ্চলটি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছে। এই অংশের আদি নাম ছিলো রাঢ় বা বঙ্গ। বঙ্গের মানুষের নৃতাত্বিক পরিচয় হলো জাতিগতভাবে এর দ্রাবিড় বা অনার্য। এই অনার্যরা হাজার হাজার বছর ধরে এই ভূখন্ডে বাস করে আসছে এবং এরাই এখানকার আদিবাসী। পরবর্তীতে ভারতীয় উপমাহাদেশে আর্যদের আগমনের (মূলতঃ পারস্য ও মধ্য এশিয়া থেকে) ফলে বৃহত্তর ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ধরণ দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে। আর্যরাই প্রথম এসে প্রতিষ্ঠানিক অর্থে হিন্দু ধর্মের প্রবর্তন ঘটায় ও জাতিভেদ প্রথার (Caste) প্রচলন করে। ভারতীয় উপমহাদেশে সেই থেকে ব্রা‏হ্মন্যবাদের শুরু। ব্রা‏হ্মনরা ধর্মীয়ভাবে ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠার সাথে সাথে তারা উপমহাদেশের অনার্যদের উপর অত্যাচার ও শোষণ শুরু করে। দক্ষিণ ভারত ও বঙ্গে যেহেতু অধিক সংখ্যক দ্রাবিড় বা অনার্য জনগোষ্ঠীর বাস ছিলো- সেকারণে এই দুই অঞ্চলের মানুষের সাথে আর্যদের দীর্ঘ মেয়াদী লড়াই ও সংগ্রাম শুরু হয়। বঙ্গের দ্রাবিড় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠী শুরু থেকেই লড়াকু ও সংগ্রামী জাতি হিসাবে পরিচিত ছিলো। আর্যদের এই জাতিভেদ প্রথা ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই বঙ্গের এই অংশের মানুষ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার চেষ্টা করেছে এবং রাজনৈতিকভাবে তাদেরকে ঠেকিয়ে রেখেছে। যে কারণে উত্তর ও পশ্চিম ভারতে ব্রা‏হ্মন্যবাদের প্রসার ঘটানো সম্ভব হলেও বঙ্গে আর্যরা কখনোই তাদের ঘাঁটি স্থাপন করতে পারেনি। এরই ধারাবাহিকতায় এক পর্যায়ে যখন এই অঞ্চলে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে তখন দলে দলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে ছিলো এই কারনে যে, ইসলাম এই সকল মানুষদেরকে আর্যদের আধিপত্য ও শোষণ থেকে মুক্ত করে (emancipation from all kinds of oppression) এক নতুন জীবনের সন্ধান দিয়েছিলো। যে হারে ও গতিতে এই অঞ্চলের মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে ঐতিহাসিকদের কাছে তা এক বিস্ময়কর ব্যাপার। বলা হয়ে থাকে আরব পেনুনসুল্যার (উপদ্বীপ) বাইরে পৃথিবীর আর কোথাও এত বেশী সংখ্যক মানুষ এত অল্প সময়ের মধ্যে ইসলাম গ্রহণ করেনি। বঙ্গের এই অংশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ ইসলামের পতাকা তলে সমবেত হয়েছিলো।

    ইসলামকে তারা দেখেছে জাতিভেদ প্রথা ও শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সহায়ক এক শক্তিশালী মতাদর্শ হিসাবে। যেই মতাদর্শ তাদেরকে মুক্ত করেছে অসাম্য ও ভেদাভেদ থেকে এবং পরিচয় করিয়ে দিয়েছে এক পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার সাথে। এর পরবর্তী ১১শ বছরে যতবারই বিদেশী শাসন ও দেশী শোষণের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলের মুসলমান বা অমুসলিমরা লড়াই করেছে, তার বেশীভাগ সময়েই তাদেরকে সাহস ও শক্তি যুগিয়েছে ইসলামের রাজনৈতিক আদর্শ। বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের মধ্য দিয়েই অত্যাচারী ব্রা‏হ্মন্যবাদের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলের মানুষের রাজনৈতিক সংগ্রামের বিজয়ের শুভ সূচনা হয়েছিলো। ১৭ জন অশ্বারোহী নিয়ে রক্তপাতহীনভাবে বাংলা দখল করা ও লক্ষণ সেনের পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ব্যাপক রাজনৈতিক অর্থ বহন করে। অল্প কিছু সাহসী মানুষের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর সংগ্রামী চেতনা যে অত্যাচারী শাসকদের মসনদ তছনছ করে দিতে পারে তা পরবর্তীতে বাংলার ইতিহাসে বহুবার প্রমানিত হয়েছে। ব্রিটিশ শাসনের আমল পর্যন্ত এমনকি দীর্ঘ ৮০০ বছরের মুসলিম শাসন আমলেও বহুবার এখানকার জনগণ অত্যাচারী মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছে। দুঃখ জনক হলেও সত্যি মুসলমানদের এই রাজনৈতিক ইতিহাস চেপে রাখা হয়েছে প্রচলিত ইতিহাসের বই সমুহে। এমন কি অনেক সূফী সাধকের রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসকেও ইচ্ছাকৃত ভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। তার অন্যতম প্রধান উদাহরণ হলো হযরত শাহ জালাল (রহ.), যিনি কিনা মূলত এক অত্যাচারী হিন্দু রাজার বিরুদ্ধে জিহাদের কাফেলায় শরীক হয়েই এই অঞ্চলে প্রবেশ করেছিলেন। সূফীদের রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসকে পাশ কাটিয়ে শুধুমাত্র তাদের আধ্যাত্মবাদের বিষয়টিকে পরবর্তীতে আমলে নিয়ে আসা হয়েছে মূলত ইসলামের রাজনৈতিক সংগ্রামের শক্তিকে দুর্বল করার জন্য।

    ব্রিটিশদের হাতে ক্ষমতা হারানোর পর, বাংলা সহ সারা ভারতের মুসলমানদের মধ্যে এক তীব্র প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে উঠেছিলো। একটি সংখ্যালঘিষ্ট জাতি হিসাবে মুসলমানরা প্রায় ৮০০ বছর ভারত শাসন করেছে এবং ভারতের ইতিহাসের অন্য যে কোন সময়ের তুলনায় এই সময়কালে ভারতীয় উপমহাদেশের অবস্থা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশী উন্নত ছিলো। যে কারণে সূদুর ইউরোপ থেকে পুর্তুগীজ, ফরাসী ও ইংরেজরা একের পর এক ভারতে এসেছে সম্পদ লুন্ঠন ও দেশ দখলের উদ্দেশ্য নিয়ে। মুসলমানদের শাসনের সময়েই ভারত সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে একটি ঐক্যবদ্ধ দেশ হিসাবে অবস্থান করেছে।

    ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের শুরু থেকেই মুসলমানেরা এই রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ফকির বিদ্রোহ, হাজী শরীয়তুল্লাহ ও তিতুমীরের আন্দোলন সব পর্যায়েই এই অঞ্চলে মানুষ ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম করেছে এবং বহু অত্যাচার ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে। ১৯২০-২১ এর খিলাফত আন্দোলন এর ইতিহাসও অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত। মহাত্মা গান্ধীও এক পর্যায়ে খিলাফত আন্দোলনকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। একদিকে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন ও মুসলমানদের খিলাফত আন্দোলন যুগপৎভাবে বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামের দুটি প্রধান স্তম্ভ হয়ে উঠেছিলো। হাজার হাজার বাংলাদেশের আলেম সেই সময় জেল খেটেছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ও অনাহারে অর্ধাহারে মৃত্যুবরণ করেছেন। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের একটা বিশেষ পর্যায়ে এসে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব সাধারণ মানুষের হাত থেকে চলে গিয়ে আবার ব্রা‏হ্মন্যবাদী হিন্দু নেতৃবৃন্দ ও কিছু ব্রিটিশভক্ত এলিট মুসলমানদের হাতে চলে যায়। যার ধারাবাহিকতায় মুসলমাদের অন্যান্য অঞ্চলের মতোই ভারতও বিভক্ত হয়ে যায় পাকিস্তান ও ভারত নামক দুটি আলাদা রাষ্ট্রে।

    পাকিস্তান রাষ্ট্র তৈরীতে সেই অঞ্চলের মানুষের ব্যাপক অবদান ছিলো, ১৯৪৭ এ এখানকার ৯৫ শতাংশ মানুষই আন্তরিকভাবে পাকিস্তান চেয়েছিলো একটি সত্যিকার অর্থে ইসলামিক ব্যবস্থার মধ্যে বসবাসের আকাঙ্খা থেকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এলিট শ্রেণীর পাকিস্তানী শাসকরা যেহেতু ইসলামের নাম ব্যবহার করে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের উপর ব্রিটিশদের মতো একই ধরণের ঔপনিবেশিক শাসন চাপিয়ে দিয়েছিলো, সে কারণে এই অঞ্চলের মানুষ তার প্রতিবাদ করতে বাধ্য হয়েছিলো এবং দুর্ভাগ্য হলো ৮০০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম আন্দোলন আর সংগ্রামের নেতৃত্ব মুসলমানদের হাত থেকে সরে গিয়ে ধর্মনিরপেক্ষদের হাতে চলে যেতে শুরু করলো। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংগ্রামে মাওলানা ভাসানীর এর বিশাল অবদান থাকা সত্ত্বেও ধীরে ধীরে আন্দোলনের মূল নেতৃত্ব চলে গেলো ধর্মনিরপেক্ষদের হাতে। ধর্মীয় রাজনীতির বলয় থেকে বেরিয়ে মুসলিম লীগ ভেঙ্গে প্রথম তৈরী হলো আওয়ামী মুসলিম লীগ ও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ। পরবর্তী ১৫ বছরের (১৯৬০-১৯৭৫) এই অঞ্চলের আন্দোলন সংগ্রামের মূল নেতৃত্ব দান করেছে এই ধর্মনিরপেক্ষ অংশই। বাংলাদেশ রাষ্ট্র তৈরীতে আওয়ামী লীগের ও অন্যান্য বামপন্থী সংগঠনের আন্দোলন ও সংগ্রামের ইতিহাস আমাদের মোটামুটি জানা, বিশেষ করে এই আন্দোলন পর্যায়ে আদর্শবাদী বামপন্থী সংগঠন সমূহ ব্যাপকভাবে জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৬ এর ৬ দফা দাবী, ৬৯ এর গণভ্যুত্থান ও ৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই আন্দোলনের মূল বুদ্ধি কৌশল ও শক্তি যোগান দিয়েছে বামপন্থীরা, কিন্তু এর সুফল পুরোটাই ভোগ করেছে আওয়ামী লীগাররা।

    স্বাধীনতা পরবর্তী রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস মূলতঃ আওয়ামী লীগ বিরোধিতার ইতিহাস, ১৯৭২-৭৭ সালে পর্যন্ত জাসদের অভ্যুদয় মূলতঃ বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন ইতিহাসে এক চমকপ্রদ অধ্যায়। সবচেয়ে নূণ্যতম সময়ে একটি একক শক্তিশালী বিরোধী দলের হিসাবে জাসদের আবির্ভাব আওয়ামী বিরোধী আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। এর জন্য মূল্যও দিতে হয়েছে অনেক। এই সময়কালে রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের এক ভয়াবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে ছিলো। জাসদের প্রায় ৩০,০০০ কর্মী রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের শিকার হয়। আওয়ামী লীগের প্রায় মারা যায় ১০,০০০ কর্মী। এছাড়া সর্বহারা পার্টিরও অসংখ্য কর্মী সরকারি পুলিশ ও রক্ষী বাহিনীর হাতে নিহত হয়।

    ৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক আন্দোলনে, ধর্ম নিরপেক্ষ শক্তির পাশা পাশি জাতিয়তাবাদী শক্তির আবির্ভাব ঘটে। ৯০ এর এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে রাস্তায় যুগপৎ ভাবে এই দুই শক্তির অবস্থান আমরা লক্ষ্য করি। এর পাশাপাশি জামায়াতও কিছুটা আন্দোলনের দলে পরিনিত হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো এই যে, ১৯৭১ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে ধর্ম নিরপেক্ষ ও জাতিয়তাবাদী শক্তির তুলনায় ইসলামি দলগুলির উপস্থিতি একবারেই সামান্য। শুধুমাত্র কয়েকটি ইসলামি ইস্যুতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদেরকে রাজপথের আন্দোলনে দেখা গেছে। যেমন তাসলিমা নাসরীন ইস্যু, বাবরী মসজিদ ইস্যু, আওয়ামী লীগের আমলে ব্রাহ্মন বাড়িয়া ইস্যু ইত্যাদি। ২০০০ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা আশা কারি এ অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। গত ৪ বছরে আমরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি যে, এই অঞ্চলের আন্দোলন সংগ্রামের নেতৃত্ব আবার নতুন করে ধর্ম নিরপেক্ষদের হাত থেকে সরে গিয়ে ইসলামিকদের হাতে চলে আসার পক্রিয়া শুরু হয়েছে ইনশাআল্লাহ। 

    আন্দোলনের সম্ভাব্য পরিনতি হিসাবে জেল জুলুমের পর্যায় এখন আমরা অতিক্রম করছি। এই পর্যায় কত দীর্ঘস্থায়ী হবে তা হিসাব করে বলা মুশকিল। এর ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ পর্যায়ে আল্লাহ্‌’কে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে জীবন উৎসর্গের জন্যও আমাদেরকে প্রস্তুত থাকতে হবে। ধারাবাহিকভাবে জেল-জুলুম হত্যার মধ্য দিয়ে খিলাফতের সংগ্রাম জনগেণের সংগ্রামে পরিনত হবে ইনশাআল্লাহ্‌। শুধু তত্ত্বীয় কারণে নয়, আত্মত্যাগের মাধ্যমে আন্দোলনের কর্মীরা সমাজের মধ্যে তাদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। আন্দোলন গড়ে তোলা ও আন্দোলনের নেতৃত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার এটাই একমাত্র পরীক্ষিত রাস্তা।

    সর্বশেষে একথা মনে রাখা দরকার ঐতিহাসিকভাবে এ কথা প্রমাণিত যে, এই অঞ্চলের মানুষের ইতিহাস আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস, এবং আন্দোলন সংগ্রামের জন্য সাধারন মানুষ সবসময়ই প্রস্তুত। আপোষকামী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অরাজনৈতিক মানসিকতা যেনো আমাদের বিভ্রান্ত না করে। সমাজে পরগাছা মধ্যবিত্ত মানসিকতার অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের গুরুত্ব না দিয়ে সাধারন জনগণের রাজনৈতিক চাহিদা বা Pulse বোঝা ও সেই অনুযায়ী অন্দোলনকে চালিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। আর তা করতে পারলে ইনশাআল্লাহ ৮০০ বছর ধরে যেভাবে আমরা আন্দোলন সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছি সেভাবে আবারও এই দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব আমাদের হাতে নিয়ে এসে এই জমিনে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে পারব ইনশাআল্লাহ্‌। আমিন

    ড. শেখ তৌফিক

    নভেম্বর, ২০০৭