তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুক্তবাজারের কারণেই কি এশিয়ান টাইগারদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)
১৯৬০ এবং ১৯৭০ এর দশকে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং এরং তাইওয়ানের ব্যাপক ও দ্রুত শিল্পায়নকে বুঝানোর জন্য ‘টাইগার’ অর্থনীতি শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এই চার টাইগার অন্যান্য এশীয় অর্থনীতি-চীন এবং জাপানের সাথে অনেকক্ষেত্রে সাদৃশ্যপূর্ণ। যারা এশীয় ধাচের রপ্তানীমুখী অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথিকৃৎ। এই দেশসমূহ পশ্চিমা শিল্পোন্নত দেশগুলোকে লক্ষ্য করে পণ্য উৎপাদন শুরু করে এবং সরকারী নীতি গ্রহণের মাধ্যমে আভ্যন্তরীণ ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করে।
এ জাতিগুলোর দিকে ভালভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, তাদের উন্নয়ন ছিল সম্পূর্ণ কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত, সরকারী ভতুর্কি এবং রক্ষণশীল নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত।
১৯৬৫ সালে স্বাধীনতা লাভের পর সিঙ্গাপুর ছোট আভ্যন্তরীণ বাজার ও সম্পদের অপ্রতুলতা অনুভব করে। ফলশ্রুতিতে ১৯৬৮ সালে সিঙ্গাপুর ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট বোর্ড গঠন করে। এর দায়িত্ব ছিল সিঙ্গাপুরের উৎপাদিত পণ্যকে উৎসাহিত করবার জন্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন। সিঙ্গাপুরের প্রশাসন বেকারত্বকে কমিয়ে নিয়ে আসে, জীবনমান উন্নয়নের জন্য গণগৃহায়ন প্রকল্প চালু করে। সাথে সাথে ব্যবসাবান্ধব, বিদেশী বিনিয়োগ নির্ভর, রপ্তানীমুখী ব্যবসায়ী নীতি প্রণয়ন ও জাতীয় করপোরেশনগুলোতে সরাসরি সরকারী বিনিয়োগ করা হয়। সরকারী হস্তক্ষেপের কারণে সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি অনেক উন্নত হয়, বিশেষত: ইলেকট্রনিক্স, কেমিক্যাল এবং সেবাশিল্পে। সিঙ্গাপুর সরকার তার অর্থনীতিকে তেমাসে-লিংকড্ কোম্পানীর (টি.এল.সি) দিকে পরিচালিত করতে থাকে। এই কোম্পানীসমূহের রয়েছে সার্বভৌম সম্পদের তহবিল। টি.এল.সি গুলো বিশেষত উৎপাদনখাতে কাজ করে এবং এরা বাণিজ্যিক সত্ত্বা হিসেবে পরিগণিত হয়। জিডিপির শতকরা ৬০ ভাগের অবদান ছিল এ কোম্পানীসমূহের।দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর তাইওয়ানের প্রথম নেতা কমিটঙের শাসনামলে ক্ষুদ্র দ্বীপ দেশটির উন্নয়ন শুরু হয়। তখন কিছু অর্থনৈতিক নীতি ও পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়। নতুন মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা প্রচুর অর্থনৈতিক সাহায্য উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করে। সরকার প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। কৃষিখাতের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদকে কাজে লাগানো হত শিল্পখাতে। শিল্পখাতকে উন্নয়ন করবার জন্য শস্য রপ্তানীর মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করা হত কলকারখানার মেশিনারী ক্রয়ের জন্য। সরকার আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে দেয়, বিদেশের সাথে ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রন করে এবং দেশীয় শিল্পকে রক্ষার জন্য আমদানিকে নিরুৎসাহিত করে। ১৯৬০ এর মধ্যে তাইওয়ানের শিল্পসমূহ অনুধাবন করতে পারল ইতোমধ্যে আভ্যন্তরীণ বাজার সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। তখন দেশটি অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে রপ্তানি বাড়ানোর দিকে মনোনিবেশ করে। চিয়াং চিং কুয়ু’র ১০ টি প্রধান অবকাঠামোগত প্রকল্প এবং বিশ্বের সর্বপ্রথম রপ্তানী প্রক্রিয়াকরন অঞ্চলের মাধ্যমে তাইওয়ানে ব্যাপক শিল্পায়নের ভিত্তি রচিত হয়।
দক্ষিণ কোরিয়াও কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে একইভাবে এগিয়ে যায়। ১৯৬১ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে অনেকগুলো পঞ্চবার্ষিকী নীতির প্রথমটি প্রণীত হয়। আর এর মাধ্যমে অতি স্বল্প সময়ে যে উন্নয়ন হয়েছে তা মুক্তবাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে করা নিতান্তই অসম্ভব ছিল। অর্থনীতিতে আধিপত্য করত কিছু ব্যক্তিমালিকানাধীন বহুজাতিক কোম্পানী যেগুলো চায়েবল নামে পরিচিত ছিল। এছাড়াও লৌহ, ইস্পাত, শক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সার, কেমিক্যাল এবং অন্যান্য ভারী শিল্পের কিছু সরকারী কোম্পানী ছিল। সরকার ঋণের সুবিধা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্যক্তিখাতের শিল্পসমূহকে রপ্তানী লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিত, পরোক্ষভাবে চাপ প্রয়োগ করত এবং গতানুগতিক মুদ্রানীতি ও আর্থিক কৌশল প্রণয়ন করত।
১৯৬৫ সালে সরকার ব্যাংকসমূহকে জাতীয়করণের মাধ্যমে আরও নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করে এবং কৃষিভিত্তিক সমবায়কে কৃষি ব্যাংকের সাথে সমন্বিত করে ফেলে। সকল ঋণপ্রদানকারী সংস্থাসমূহের উপর নিয়ন্ত্রন আরোপের মাধ্যমে অন্যান্য ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের উপরও সরকার কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়। ১৯৬১ সালে একজন ডেপুটি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ইকোনমিক প্ল্যানিং বোর্ড গঠিত হয়-যা সম্পদ বন্টন, ঋণের প্রবাহকে সুনিশ্চিতকরণ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সব ধরণের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা প্রণয়ন করে।
এশিয়ান টাইগারদের উন্নয়ন ব্যাপকভাবে সরকারী হস্তক্ষেপের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল। আর এটাই ছিল তাদের উন্নয়নের মেরুদন্ড। তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, হংকং একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে। আর তাদের বর্তমান অবস্থার জন্য কেন্দ্রীয় বা সরকারী হস্তক্ষেপ ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে-এর জন্য কোনক্রমেই গতানুগতিক ধারার পুঁজিবাদী মুক্তবাজার ব্যবস্থা অনুসৃত হয়নি। এই টাইগারদের অর্থনীতি মূলত ভোক্তাদের অর্থনীতি যেখানে রপ্তানী হল মূল চালিকাশক্তি।ঐতিহাসিকভাবে জাপানের উন্নয়ন ও বর্তমানে চীনের উন্নয়ন কি বিশ্বায়নের ফসল?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)
কথা বলা হয় যে, ঐতিহাসিকভাবে জাপান হল উদার অর্থনৈতিক আন্দোলনের সাফল্যগাঁথা-যারা মুক্তবাজার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল ও অর্ধশতাব্দীরও কম সময়কালের মধ্যে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হয়। চীনের বর্তমান অগ্রগতির পেছনেও একই ধরণের কথা প্রচলিত আছে। যদিও সত্যিকারের ঘটনা যা বলা হচ্ছে মোটেও তা নয়।
যেসব কৌশল গ্রহণ করার কারণে জাপানের অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে তা উদারনীতি ও বিশ্বায়নের ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। জাপান সরকার তার দেশের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় খাতসমূহকে বিকাশের জন্য বিদেশী প্রতিযোগিতা থেকে মুক্ত রেখেছে। বৈদেশিক মুদ্রা বন্টনের দায়িত্ব জাপানি সরকার স্বীয় অধিকারে রাখে-যার মাধ্যমে আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রনে রাখা, জাপানি কোম্পানিগুলোর বিদেশী প্রযুক্তি সংগ্রহের ব্যবস্থা করা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের বিভিন্ন উপাদানকে নিয়ন্ত্রনে রাখা সম্ভবপর হয়। সরকার নির্দিষ্ট শিল্পসমূহেঅর্থপ্রবাহ সুনিশ্চিত করার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দ্যা এক্্রপোর্ট ব্যাংক অব জাপান এবং জাপান ডেভেলোপমেন্ট ব্যংক স্থাপন করে।
মিনিস্ট্র অব ইন্টাঃ ট্রেড এন্ড ইন্ডাস্ট্রি (এম আই টি আই) নামক মন্ত্রণালয়ের একটি বিভাগ জাপানের উন্নয়নে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। কেন্দ্রীয় সরকারের এ বিভাগটি উৎপাদন, সেবা এবং উৎপাদিত পণ্যের প্রসারতাকে নিয়ন্ত্রন করে। জাপানি শিল্প কাঠামোর জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন, বৈদেশিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রন, জাতীয় অর্থনীতিতে পণ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত এবং কাঁচামাল ও শক্তির নির্ভরযোগ্য উৎস পর্যবেক্ষণ করা ছিল এ বিভাগের দায়িত্ব। সুতরাং জাপানের অর্থনীতি ছিল কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত; কোনক্রমেই মুক্তবাজার ব্যবস্থার অধীন ছিল না।
বৈশ্বিক ব্যপারে চীন তার কয়েক দশকের পুরনো,সংকীর্ণ ও প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতা থেকে বের হয়ে এসেছে। চীন তার ১৫০ বছরের লজ্জা ও অপমানের দীর্ঘ লালিত ভিক্টিম (victim) মানসিকতাকে ঝেড়ে ফেলে বৃহত্তর শক্তির মানসিকতা গ্রহন করেছে (ডাগুয়া জিনতাই)। এর অবধারিত ফলাফল হল বৈশ্বিক বিষয়াবলিতে চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা। ভিক্টিম মানসিকতা থেকে বেরিয়ে বৃহত্তর শক্তির মানসিকতা ধারণের কারণে চীন এখন নিজেকে বিশ্বশক্তিসমূহের কাছাকাছি এক সত্ত্বা হিসেবে খুঁজে পাচ্ছে। ১৯৯০ এর দশক থেকে চীনের এ পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়ে উঠে। চীন এখন তার বৈশ্বিক দায়দায়িত্বের ব্যাপারে খোলামেলা কথা বলে থাকে এবং সেদেশের নীতিনির্ধারকেরা এ চশমা দিয়েই চীন পৃথিবীকে দেখে।
গতানুগতিক ধারার অর্থনীতিবিদ ও যারা বিশ্বাস করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানে উদার মূল্যবোধ গ্রহণ-তাদের জন্য চীন এক বিস্ময়। পশ্চিমা উন্নয়নের ধারণা-যেখানে গণতন্ত্র, মুক্ত বাজার এবং উদার মূল্যবোধ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে- চীন প্রথমেই সেগুলোকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে পুরো পৃথিবী এ ধারণা সম্পর্কে অজ্ঞ রয়েছে।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা গ্রহণ কিংবা বিশ্বায়নে অংশগ্রহণ না করেও চীনে ব্যাপক অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও শিল্পায়ন হয়েছে- যা ছিল সম্পূর্ণ কেন্দ্রনিয়ন্ত্রিত এবং উদার নীতিমালার সাথে দূরতম সম্পর্ক বিবর্জিত। চীনের প্রেসিডেন্ট হু জিন তাও ২০০৪ সালে বলেন, ‘আমরা কখনই অন্ধভাবে অন্য দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে অনুকরণ করবো না। ইতিহাস প্রমাণ করে যে নির্বিচারে পশ্চিমা রাজনৈতিক ব্যবস্থার অনুকরণ চীনের জন্য এক তিমিরাচ্ছন্ন পথ হবে’। সুতরাং একথা থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, চীন অদুর ভবিষ্যতে উদার নীতিমালা গ্রহণ করবে না এবং উন্নয়নের পশ্চিমা ধারণা ছাড়াই তাদের উন্নয়ন সুনিশ্চিত হয়েছে।
জাপান এবং জার্মানীর মত চীনও কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত অর্থনীতি নিয়ে এগিয়ে গেছে। বাজারের সব ক্ষেত্রে রয়েছে চীনা সরকারের হস্তক্ষেপ। কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দিয়ে চীন তার সম্পদকে একদিকে পরিচালিত করেছে এবং এটা তাকে আঞ্চলিক নেতৃত্ব বিধান করেছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরে সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে সমাজতান্ত্রিক ঘরানার হওয়ার কারণে চীন পশ্চিমাদের সহায়তা একেবারেই পায়নি। তবে তারা দেখিয়ে দিয়েছে যে একটি স্বাধীন, আগে দেশের স্বার্থ এবং কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত নীতিমালা অর্থনৈতিক সাফল্য এনে দেয়।
শিল্পোন্নত দেশসমূহের উন্নয়নের কারণ কি মুক্তবাজার ও মুক্ত বাণিজ্য?

বৃটেনকে লাইসেজ ফেয়ার (laissez-faire) মতবাদ গ্রহণকারী রাষ্ট্র হিসেবে এবং তারাই একমাত্র মুক্তবাণিজ্য চর্চা করে থাকে বলে মনে করা হয় । বৃটেন সরকারী হস্তক্ষেপ ছাড়া অথবা খুব সামান্য হস্তক্ষেপের কারণে উন্নত একটি দেশ। তবে একথা বললে মিথ্যাবলা হবে না যে, এ রাষ্ট্রটিই সর্বপ্রথম নতুন গড়ে উঠা শিল্প সুরক্ষার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করে। দেশীয় শিল্পকে বিদেশী শিল্পের অসম প্রতিযোগিতার হাত থেকে রক্ষার জন্যই এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়।
১৯০৭ সালে একজন ইতিহাসবেত্তা অর্থনীতিবিদ ব্রিসকো বাণিজ্য আইনের ১৭২১ সালের সংস্কারের সারমর্ম এভাবে তুলে ধরেন,‘দেশীয় উৎপাদনকারীদেরকে বিদেশী পন্য থেকে রক্ষা করতে হবে, উৎপাদিত পন্যের অবাধ রপ্তানী নিশ্চিত করতে হবে এবং যেখানে সম্ভব আর্থিক সুবিধা ও ভাতা দিয়ে উৎসাহিত করতে হবে’-এর ফলে কাঁচামালের উপর আমদানি শুল্ক কমিয়ে দেয়া হয় এবং বিদেশে উৎপাদিত পণ্যের উপর অধিক হারে করারোপ করা হয়। বিশেষত বৃটেন নিজস্ব শিল্পকে রক্ষার জন্য তার ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহ থেকে অপেক্ষাকৃত ভাল মানের পণ্য আমদানিকে নিষিদ্ধ করে।
১৮৪৬ সালে শস্য আইন বাতিলের মাধ্যমে বড় ধরণের পরিবর্তন আনা হয়। এই আইনটি ছিল বৃটিশ কৃষক ও ভূ-স্বামীদের রক্ষার জন্য কমদামে বিদেশী শস্য ক্রয় রোধকল্পে করারোপ সর্ম্পকিত। কিন্তু এটা করা হয়েছিল মহাদেশে শিল্পায়নকে ঠেকাবার লক্ষ্যে এবং বৃটিশ কৃষির রপ্তানী বাজারকে সম্প্রসারণ করবার জন্য। বৃটেনের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা মুক্ত বাণিজ্যের দ্বারকে উন্মোচিত করে এবং এর বিকাশ লাভ হয়েছিল দীর্ঘমেয়াদী করারোপের মাধ্যমে বাধা সৃষ্টি করে। বৃটিশ অর্থনীতির উদারীকরণ একটি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সুচিন্তিত পদক্ষেপ ছিল এবং এটি লাইসেজ ফেয়ার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্জিত বিষয় নয়।
শিল্পবান্ধব কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে বৃটেন ১৮০০ সালে যখন শিল্পায়নের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে যায় তখন সমুদ্র অভিযানের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সম্পদের খোঁজে নেমে পড়ে। আগ্রাসী উপনিবেশবাদের এই প্রক্রিয়া বিশ্বে বৃটেনের অবস্থানকে সুসংহত করে এবং ভূমি দখল নয় বরং উপকূলবর্তী বাজার দখলের জন্য যুদ্ধের নতুন ধারণার জন্ম হয়। ঔপনিবেশিক বিস্তৃতির জন্যই বৃটেনে তখন ব্যাপক বৈজ্ঞানিক গবেষণা, আবিষ্কার, শ্রমিক সংগ্রহের নতুন ধারণা এবং সামরিক কৌশলের তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। পুরো বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বিস্তারের পরই বৃটেন ‘উন্নয়নের জন্য উদার মূল্যবোধ’ নীতি গ্রহণ করে। প্রচন্ড প্রতাপে পুরো বিশ্বে যখন বৃটেন দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল তখন অন্য দেশের বাজার দখলের জন্য মুক্ত বাণিজ্য নীতি গ্রহণ করে। উন্নত হবার পরই মূলত মুক্তবাজার ধারণা এসেছে। কিন্তু এটা কখনই বৃটিশ সাম্রাজ্যকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য প্রভাবক হিসেবে কাজ করেনি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়নও এভাবেই হয়েছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্র তার বাণিজ্যকে উদার করেনি। কেম্ব্রিজের ইতিহাসবেত্তা অর্থনীতিবিদ ড. জুন চেঙ এর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘ যখন শিল্পক্ষেত্রে প্রাধান্যের দিক থেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠল তখনই বাণিজ্যকে উদার করল এবং মুক্ত বাণিজ্যকে ছড়িয়ে দিতে লাগল’।
রক্ষণশীল নীতির মাধ্যমে পশ্চিমা দেশসমূহ যখন শিল্পক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে সমর্থ হয় তখন মুক্তবাজারের পক্ষে তারা সাফাই গাইতে শুরু করে যাতে অন্যরা এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে না পারে এবং তাদের আধিপত্য বজায় থাকে। ঊনিশশতকের মাঝামাঝি সময়ে বৃটেনসহ পুরো ইউরোপ এ উদারনীতিমালা গ্রহণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার একশত বছর পর ঠিক একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে।
ইসলামে কি কোন সরকারব্যবস্থা নেই?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)
দীর্ঘ প্রায় চৌদ্দশত বছর ধরে এ ব্যাপারে কোন বিতর্ক ছিল না যে, ইসলামে কোন শাসনব্যবস্থা নেই। ১৯২৪ সালে যখন খিলাফত শাসনব্যবস্থা ধ্বংসের সম্মুখীন তখন এ প্রশ্নটি উত্থাপন করা হয়েছিল। এটা সে সময়ের কথা যখন অনেক ব্যক্তিই পশ্চিমা সংস্কৃতির কাছে আত্মসমর্পন করছিল এবং ইসলামে কোন শাসনব্যবস্থা থাকাকে অস্বীকার করছিল। ১৯২৫ সালে খিলাফত ধ্বংসের এক বছর পর আলী আবদুর রাজিক ‘আল ইসলাম ওয়া উসুলুল হুকুম’ বইয়ের মাধ্যমে উল্লেখ করেন, ইসলামে কোন ধরণেরই শাসন বা সরকারব্যবস্থা নেই। স্যার থমাস আরনল্ডের মত ওরিয়েন্টালিস্টও ইসলামী অনেক তথ্য প্রমাণ দ্বারা ব্যাপক সাহিত্য রচনা করে প্রমাণ করবার চেষ্টা করেন যে, ইসলামে কোন শাসনব্যবস্থা নেই।
দূর্ভাগ্যজনকভাবে আজকাল অনেক মুসলিমও ইসলামকে আধুনিকীকরণের নামে প্রমাণ করবার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে যে, ইসলামের নিজস্ব কোন সরকার ব্যবস্থা নেই। তাদের যুক্তি হচ্ছে মুসলমানরা যে কোন সমাজে বসবাস করতে পারে এবং এর মধ্যে সবচেয়ে ভালটি গ্রহণ করতে পারে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ইংল্যান্ডে ২০০৭ সালে “ইসলাম এন্ড মুসলিমস ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড টুডে” শীর্ষক সেমিনার আয়োজন করে। মিশরের প্রধান মুফতি আলী গোমাসহ অন্যান্য ‘মধ্যমপন্থি’ (মডারেট) মুসলিমের তকমা লাগানো ব্যক্তিবর্গ আলোচনা করেন কীভাবে ইসলামকে পশ্চিমাদের প্রয়োজনে পরিবর্তন করা উচিত। ইসলামে কোন শাসনব্যবস্থা নেই – এ বিষয়টি প্রমাণের জন্য আলী গোমা বলেন,
‘অনেকে মনে করেন ইসলামী শাসনব্যবস্থা মানেই খিলাফত- যেখানে খলীফা একটি নির্দিষ্ট নিয়ম পদ্ধতির মাধ্যমে শাসন করবেন। ইসলামী ঐতিহ্যের সাথে এর কোন যৌক্তিক ভিত্তি নেই। খিলাফত এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা যা মুসলিমরা একটি বিশেষ সময়ে রাজনৈতিক প্রয়োজনে গ্রহণ করেছিল। তার মানে এই নয় যখনই সরকার ব্যবস্থার প্রসঙ্গ আসবে তখনই খিলাফতের কথা ভাবতে হবে। মিশর এ ব্যাপারে যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছে তা অন্যদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। এ ব্যাপারে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলেন মুহম্মদ আলী পাশা। যার ধারবাহিকতায় খেদিব ইসমাইল একটি আধুনিক মিশর গড়বার প্রয়াস পায়। এর মানে হল ইসলামী আইনের সংস্কার। এ প্রক্রিয়ায় ইসলামিক চিন্তাবিদদের সমর্থন নিয়েই মিশর গণতান্ত্রিক শাসনের অধীনে একটি উদার রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিত হয়। মুসলমানরা তাদের প্রয়োজনমাফিক ইচ্ছেমত যে কোন ধরণের শাসনব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার রাখে।’
ইতোমধ্যে বিভিন্ন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এবং রাষ্ট্রীয় মন্ত্রীবর্গ একটি সম্ভাব্য ইসলামী শাসনব্যবস্থার উত্থানের ব্যাপারে সর্তক করে দিয়েছেন। এর মানে হল ইসলামে একটি শাসনব্যবস্থা রয়েছে এটা প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেয়া। মুসলিমদের মধ্যে সংখ্যালঘিষ্ট একটি মহল মনে করে যে ইসলামে কোন শাসনব্যবস্থা নেই। তাদের যুক্তি হল ইতিহাসে যে ইসলামী শাসনব্যবস্থা দেখতে পাই তা মূলত: একটি সাময়িক ব্যাপারমাত্র – যা বর্তমান সময়ে একেবারেই অপ্রযোজ্য। পূর্বে ইসলামে যে শাসন আমরা দেখেছি তা বস্তুত কিছু রীতিনীতির অধীন ছিল। এ ব্যাপারটি বুঝতে হলে আমাদের ইসলামী প্রামাণ্য দলিলসমূহ খুব সুক্ষ্ণভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।
কুর’আন আল্লাহ্’র আইন দ্বারা শাসিত হবার ব্যাপারে বিভিন্ন আয়াতে বেশ জোর দিয়েছেন। যেমন:
‘এবং যারা আল্লাহ্’র দেয়া বিধান ছাড়া অন্য বিধান দিয়ে বিচার ফয়সালা করে তারাই কাফের (অবিশ্বাসী)..জালেম (অত্যাচারী)..ফাসেক (মিথ্যাবাদী)।’ (সূরা মায়েদা:৪৪-৪৭)
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরও বলেন,
‘সুতরাং তাদের মধ্যে ফয়সালা করুন আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ করেছেন ও যে সত্য আপনার কাছে এসেছে তা দিয়ে এবং তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না।’ (সূরা মায়েদা: ৪৮)
তিনি আরও বলেন,
‘আর আপনি আল্লাহ্’র নির্দেশ অনুযায়ী ফায়সালা করুন এবং তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না, সাবধান থাকুন, যাতে তারা বিভ্রান্ত করতে না পারে।’ (সূরা মায়েদা: ৪৯)
এছাড়াও দ্বীন প্রতিষ্ঠা এবং শারী’আহ্ দ্বারা শাসিত হওয়া প্রত্যেক মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। এর এটা কখনওই সম্ভবপর হবে না যদি একজন শাসক না থাকেন -যিনি এই শারী’আহ্ বাস্তবায়ন করবেন। এভাবে অসংখ্য প্রমাণ পেশ করা যাবে যেসবের দ্বারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, একজন শাসক নিয়োগ করা ফরয দায়িত্ব।
একজন খলীফা নিয়োগ করবার বাধ্যবাধকতা আমরা রাসূলের সুন্নাহ ও ইজমায়ে সাহাবা থেকে পেয়ে থাকি। নাফিয়া বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘যে ব্যক্তি (খলীফার) আনুগত্য হতে হাত গুটিয়ে নিল, সে ব্যক্তি কিয়ামত দিবসে এমনভাবে উত্থিত হবে যে, তার পক্ষে কোন প্রমাণ থাকবে না এবং যে তার কাঁধে খলীফার বাই’য়াত না থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল সে যেন জাহেলিয়াতের মৃত্যুবরণ করল।’ (মুসলিম)
সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সা) সব মুসলিমের কাঁধে বাই’য়াত থাকবার প্রয়োজনীয়তা ফরয করে দিয়েছেন। তিনি বাই’য়াতহীন মৃত্যুকে জাহেলিয়াতের সময়ের মৃত্যুর সাথে তুলনা করেছেন। ‘কাঁধে বাই’য়াত থাকা’ এর অর্থ হল একজন খলীফা থাকা। খলীফা নির্বাচনের পদ্ধতিও রাসূলুল্লাহ (সা) বিবৃত করেছেন। আবু হাজিম বলেন যে, তিনি আবু হুরাইরার সাথে পাঁচ বছর অতিবাহিত করাকালীন সময়ে শুনতে পান যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘বনী ইসরাইলকে শাসন করতেন নবীগণ। একজন মারা গেলে অন্যজন তার স্থলাভিষিক্ত হতেন। আমার পরে আর কোন নবী আসবে না। এরপর আসবেন অসংখ্য খলীফা। তখন সাহাবা (রা) প্রশ্ন করলেন এ ব্যাপারে আপনি আমাদের কী করতে উপদেশ দেন? তিনি (সা) বলেন, তোমরা প্রথম একজনের পর অপর প্রথম (খলীফা)-এর প্রতি বাই’য়াত পূর্ণ করবে এবং তাদের জন্য রক্ষিত অধিকার প্রদান করবে। আল্লাহ্ অবশ্যই তাদেরকে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন।’
নবী করীম (সা) ইসলামী সরকারের রূপরেখা প্রদান করেন, এর নিয়মকানুন বাতলে দেন এবং বিস্তারিত ব্যাখা দেন। তিনি যখন মদীনাতে সপ্তম শতাব্দীতে খিলাফত রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন তখন সেটা ছিল বিবাদমান বিভিন্ন গোত্র অধ্যুষিত একটি শহরকেন্দ্রিক রাষ্ট্র। কুরাইশরা নতুন গড়া সমাজকে সমূলে উৎপাটন করার অপচেষ্টা চালায়। রাসূল (সা) অতিদ্রুত এমন এক রাষ্ট্র কায়েম করেন যা ছিল প্রতিরক্ষায় সক্ষম এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তিনি কুরাইশদের ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চলে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন এবং ব্যবসায়িক পথকে সুগম রাখবার জন্য বাণিজ্য চুক্তি ও বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপন করেন।
মদীনায় পা ফেলার মুহূর্ত থেকেই মুসলিম ও অমুসলিমদের সমস্যাসমূহ বিবেচনায় নিয়ে তিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন শাসক হয়ে উঠেছিলেন। ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মুহাম্মদ (সা) একটি কল্যাণমূলক ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। একজন যোগ্য রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি ইহুদী, বানু দামরাহ ও বানু মাদলাজের সাথে চুক্তি করেন। তিনি তারপর চুক্তি স্বাক্ষর করেন কুরাইশ, আয়লাহ, আল জারবাহ এবং উজরাহের সাথে। সেনাপ্রধান হিসেবে তিনি অনেক যুদ্ধের পরিকল্পনা ও পরিচালনা করেন। তিনি প্রত্যেক প্রদেশে একজন করে ওয়ালী (গভর্ণর) এবং প্রত্যেক অঞ্চলে একজন করে আমীল (মেয়র) নিযুক্ত করেন। যেমন: তিনি উতায়েব ইবনে উসাইদকে মক্কা বিজয়ের পর ওয়ালী এবং বাধান ইবনে সাসানকে ইয়েমেনের ইসলাম গ্রহণের পর ইয়ামেনের ওয়ালী নিযুক্ত করেন। মুয়াজ ইবনে জাবাল আল খাজরাজীকে তিনি আল জানাদের ওয়ালী এবং খালিদ ইবনে সাইদ ইবনে আল আসকে সানার আমীল নিযুক্ত করেন।
রাসুলুল্লাহ (সা) লোকদের বিবাদ নিরসনের জন্য বিচারক নিয়োগ করেন। তিনি (সা) আলী (রা) কে ইয়েমেনে কাজী নিয়োগ করেন এবং আবদুল্লাহ ইবনে নওফেলকে মদীনার বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন। রাসুল (সা) তাদের জিজ্ঞেস করতেন, “তোমরা কি দিয়ে শাসন করবে?” তখন তারা প্রত্যুত্তরে বলতেন, “কোন রায়ের জন্য সমাধান যদি আমরা কুর’আনে না পাই, তাহলে তা সুন্নাহ্’র মধ্যে খুঁজব। যদি সেখানেও না পাই তাহলে আমরা কিয়াসের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেব।” তিনি (সা) এ প্রক্রিয়াকে সমর্থন করেন। রাসুল (সা) কখনও কখনও বিচারকদের এবং উলাহ্’দের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালও গঠন করেছেন। তিনি ট্রাইব্যুনাল আসার পূর্বে বিবাদমান বিষয়সমুহ তদন্ত ও পর্যবেক্ষণ করা ও বিচারব্যবস্থার ব্যাপারে রশীদ ইবনে আবদুল্লাহকে আমীর নিযুক্ত করেন।
মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা) রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগের প্রধান হিসেবে কয়েকজন রেজিস্ট্রার নিয়োগ করেন।
– আলী ইবনে আবু তালিবকে চুক্তিপত্রের লেখক হিসেবে
– মুয়াকেব ইবনে আবু ফাতিমাকে রাজস্ব বিভাগের সচিব হিসেবে
– হুজায়ফা ইবনে আল ইয়ামানকে হিজাজ অঞ্চলের ফসল ও ফলমুলের হিসেবের দায়িত্ব
– জুবায়ের ইবনে আল আওয়ামকে সাদকার সচিব
– আল মুগীরাহ ইবনে শু’বাহকে সকল ঋণ ও চুক্তিনামা লিপিবদ্ধের দায়িত্ব
– শারহাবিল ইবনে হাসানাকে বিভিন্ন বাদশাহের কাছে প্রেরিত চিঠি লিখবার দায়িত্বএভাবে মুহম্মদ (সা) বিভিন্ন বিভাগে সচিব অথবা পরিচালকের পদে বিভিন্ন সাহাবীদের নিয়োগ দেন। এ ব্যাপারে তিনি (সা) সাহাবীদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতেন-যারা এসব বিষয়ে গভীর জ্ঞান ও চিন্তার অধিকারী ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) মুসলিম- অমুসলিমদের সম্পদ বিশেষত ভূমি, ফসল ও ফলমুলের উপর কর ধার্য করেন। এগুলোর মধ্যে ছিল যাকাত, ওশর, গণীমতের মাল, খারাজ বা ভূমিকর এবং অমুসলিমদের কাছে প্রাপ্ত জিজিয়া। আনফাল এবং গণীমতের মাল রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা থাকত। কুর’আনে বর্ণিত আটটি খাতেই জাকাতের অর্থ বন্টন করা হত।
মহানবী (সা) তাঁর জীবদ্দশাতেই এসব ব্যবস্থাদি বাস্তবায়ন করেন। তিনি (সা) রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী ছিলেন আর তাঁকে সহায়তা করবার জন্য ছিল বিভিন্ন সহযোগী, গভর্ণর, বিচারক, সেনাবাহিনী, সচিবগণ এবং পরামর্শ সভা। এ ধরণের কাঠামোকে বলা হয় খিলাফত এবং এটাই ইসলামের শাসনব্যবস্থা। ইসলামী রাষ্ট্রের এসব কাঠামো বিস্তারিতভাবে তাওয়াতুর বর্ণনার মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনাতে পৌঁছবার দিন থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। আবু বকর ও ওমর (রা) তাঁর দু’জন সহযোগী ছিলেন। সাহাবীগণ রাসূল (সা) এর মৃত্যুর পর ঐক্যমত্যে (ইজমা) পৌঁছেছিলেন যে, ইসলামী খিলাফতের প্রধান নির্বাহী হিসেবে একজন শাসক অর্থাৎ খলীফা নিয়োগ করা প্রয়োজন। অবশ্যই এই ব্যক্তি কোন নবী বা বার্তাবহনকারী হবেন না, কারণ মুহম্মদ (সা) ছিলেন শেষ নবী। একটি শাসনব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা মহানবী (সা.) তার জীবনকালেই প্রদর্শন করে গেছেন। সেকারণে তাঁর প্রদর্শিত শাসনব্যবস্থা আমাদের জন্য এখনও অণুকরণীয়।
সাহাবীগণ এ মর্মে ঐক্যমত্যে পৌঁছেছিলেন যে, রাসুলূল্লাহ (সা) এর মৃত্যুর পর একজন উত্তরসুরী নিয়োগ করা প্রয়োজন। তারা সেকারণে আবু বকর (রা) এর মৃত্যুর পর একই ধারাবাহিকতায় উত্তরসুরী হিসেবে ওমর (রা) কে খলীফা নিযুক্ত করেছিলেন। এভাবে উসমান ও আলী (রা) খলিফা নিযুক্ত হয়েছিলেন। একজন খলিফা নিযুক্ত করবার আবশ্যকতা আমরা সাহাবী (রা) ঐক্যমত্য থেকে পাই যে, রাসুলুল্লাহ (সা) এর ওফাতের পর শীঘ্রই মৃতদেহ সৎকারের বাধ্যবাধকতার চেয়ে তাঁরা খলীফা নিয়োগ করার বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। মৃতের দাফন কাফনে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য দাফন কাফন শেষ করবার আগে অন্য কোন কাজে নিজেদের নিয়োজিত করা এক অর্থে হারাম। এরপরও কিছু সংখ্যক সাহাবী রাসুলুল্লাহ (সা) এর দাফনের চেয়ে খলীফা নিয়োগ করা নিয়ে তখন ব্যস্ত ছিলেন। অন্য সাহাবীরা এই ব্যাপারে নীরব ছিলেন যদিও তাঁরা রাসূল (সা) এর দাফন সম্পূর্ণ করতে দুই রাত অপেক্ষা নাও করতে পারতেন।
অর্থাৎ তাঁর (সা) মৃত্যুর পর উম্মাহর ঐকমত্য নিয়ে সাহাবীগনের মধ্য হতে একজন খলীফা নিয়োগ করা হয়েছিল। যখন ইসলাম বিস্তার লাভ করছিল তখন বিভিন্ন জায়গায় ওয়ালী নিয়োগ করা হয়েছিল এবং এভাবে ইসলাম সুসংহত হয়েছিল। প্রত্যেক সাহাবীই পুরো জীবনভর একজন খলীফা নিয়োগ করবার ব্যাপারে একমত ছিলেন। কে খলীফা হবেন- এ ব্যাপারে মত পার্থক্য থাকলেও খলীফা নিযুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কারও ভেতর কোনরূপ দ্বিধা ছিল না। এটা রাসূল (সা) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের মৃত্যুর পর উত্তরসুরী খলীফা নিয়োগের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়েছে। একইভাবে সাহাবীদের ঐকমত্য (ইজমায়ে সাহাবা) এই যে, মুসলমানদের একজন খলীফা থাকতেই হবে।
কখনও কখনও অপপ্রয়োগ ঘটলেও রাসূলের সময় থেকে ইস্তাম্বুলে ১৯২৪ সালে ধ্বংস হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত খিলাফত ব্যবস্থা পৃথিবীতে বিদ্যমান ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা) খিলাফতের যে বিস্তারিত ও বাস্তবসম্মত রূপরেখা প্রদর্শন করে গেছেন তাতে এ কথা বলার কোন সুযোগ নেই যে, এটা কেবলমাত্র একটি ঐতিহ্যগত বিষয় ছিল। আর এটা সর্বকালের জন্য সত্য কথা যে, অবশ্যই রাজতান্ত্রিক কিংবা স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা থেকে এ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ পৃথক ছিল। সুতরাং খিলাফত ইসলাম দ্বারা পরিচালিত একটি অনন্য শাসন ব্যবস্থা। খিলাফত ইসলামকে বাস্তবায়ন করে এবং সব অঞ্চলে ইসলামকে ছড়িয়ে দেয়।
ইতিহাসে খিলাফতের শাসনব্যবস্থা ছিল সর্বজনগ্রাহ্য ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
ওরিয়েন্টালিস্ট বার্ণার্ড লুইস তার বই ‘What went wrong?’ এ বলেন:
‘পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বাধিক শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করেছিল ইসলাম..এটা ছিল অর্থনৈতিক সুপারপাওয়ার..অর্জন করেছিল মানব ইতিহাসে বিজ্ঞান ও কলায় সর্বোচ্চ উৎকর্ষমন্ডিত সভ্যতা-যা ছিল বহুজাতিক, আন্তর্জাতিক -অন্যকথায় আন্তমহাদেশীয়।’
পশ্চিমাদের কাছে জীবিত কিংবদন্তীতুল্য বুদ্ধিজীবি ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা-যিনি বিশ্বাস করেন বর্তমান পৃথিবীতে পুঁজিবাদের বিপরীতে ইসলামই একমাত্র চ্যালেঞ্জ-তাঁর মতে, ‘আদর্শের জগতে বর্তমানে গণতন্ত্রের একমাত্র যোগ্যতর প্রতিদ্বন্দ্বী হল রাজনৈতিক ইসলাম। পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়াবহ রাষ্ট্র হল ইরান-যা কট্টরপন্থী শিয়া মোল্লাদের দ্বারা পরিচালিত। সুন্নী কট্টরপন্থীরা তার সমর্থকদের কাছে সঠিকভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করতে না পারায় এখনও একটি জাতি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রনে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারছে না।’
বিভিন্ন উপদল ও দেশে বিভক্ত হওয়ার কারণে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য কি নিতান্তই অসম্ভব?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)
অনেকে শিয়া সুন্নীর বিভক্তিকে সামনে এনে এটা প্রতিষ্ঠিত করতে চান যে আধুনিক বিশ্বে এক মুসলিম উম্মাহ্’র ধারণা আর বাস্তবসম্মত নয়। যদিও মুসলিমদের ইতিহাস ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিভক্তির পরও ঐক্যের ইতিহাস। আজকাল নতুন নতুন সীমানার মধ্যেই মুসলিমদের ঐক্য গড়ে উঠেছে। মুসলিম উম্মাহর ইসলামী ধারনাটি বহু শতাব্দির পুরোনো একটি ধারনা হিসেবে বিবেচিত হয়। শতাব্দীকাল আগে ইসলামী ধারণার মত মুসলিম বিশ্বে ঐক্য ছিল। বর্তমান বিভক্তির কারণে অনেকেই ধর্মনিরপেক্ষতাকে বিভেদ নিরসনের একমাত্র উপায় বলে মনে করছেন এবং খিলাফতের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ্’র ঐক্যের ধারণাকে তাত্ত্বিক একটি বিষয় বলে জ্ঞান করছেন।
এখন আলোচনার বিষয় হচ্ছে ইসলাম কিভাবে বিভক্তিকে দেখে? কিভাবে এত দল, উপদল, জাতিতে বিভক্ত পৃথিবীতে একটি বৈশ্বিক ইসলামী রাষ্ট্রের ধারণা সম্ভব হতে পারে?
এটি বুঝতে হলে আমাদেরকে প্রথমেই জানতে হবে যে, মুসলিম জাতিই একমাত্র জাতি নয় যাদের মধ্যে এমন ভিন্নতা রয়েছে। ১৮৬১ সালে আমেরিকার United States of America এবং Confederate States of America মধ্যে জাতিগত বিভক্তির কারণে এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ হয়। ১৮৬০ সালে আব্রাহাম লিংকন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার পর এগারটি দক্ষিণাঞ্চলীয় রাষ্ট্র ইউনিয়ন থেকে আলাদা হয়ে যেতে চায়। ২০১৩ সালের মধ্যে ব্রিটেন থেকে স্কটল্যান্ড এর পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হবার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আলোচিত দু’টি সংকটের সময়ই কেউ ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। গৃহযুদ্ধকে মার্কিন স্কুল সমূহের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পড়ানো হয়।
বিভিন্ন মানুষ, রীতিনীতি, সংস্কৃতি, ভাষা, চিন্তার কাছে ইসলাম অপরিচিত কিছু নয়। যখন ইসলামিক শাসন বিস্তৃতি লাভ করছিল তখন বিভিন্ন চিন্তা ও মূল্যবোধের লোকেরা ইসলামিক রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবেই পরিগণিত হচ্ছিল। আব্বাসীয় খিলাফতের শাসনামলে ইসলাম এমন সব ভূমিতে পৌঁছে যায় যেখানে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে ইসলামী চিন্তাবিদ ও পন্ডিত ব্যক্তিদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। আর এই দ্বন্দ্বের কারণেই ইসলামিক আক্বীদার উপর পড়াশোনা করতে গিয়ে যৌক্তিক বিজ্ঞানের উদ্ভব ঘটে। ইসলামী বিশ্বাসসমূহকে সাধারণ চিন্তা ও প্রমাণের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য এ শাখার গোড়াপত্তন হয়। এ বিষয়টি পড়ে আরও অনেক উপশাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। নতুন নতুন ভূমি জয় করবার পর এ বিষয়টি আরও সমৃদ্ধ হতে থাকে। সেকারণে অনেক মুসলমান এ বিষয়ে গবেষণা, শিক্ষালাভ, বিজ্ঞানচর্চায় নিজেদেরকে উজাড় করে দিতে থাকে। রাষ্ট্রের ভেতর একটি বহুমুখী ইসলামিক সংস্কৃতির উদ্ভদ ঘটে। বিধায় মুসলিমরা খিলাফতকে শক্তিশালী করবার জন্য এ ব্যাপারে জ্ঞানলাভে আগ্রহী হয়ে উঠে। প্রত্যেক বুদ্ধিজীবী – তিনি যে সংস্কৃতির উপরই পারদর্শীতা লাভ করুক না কেন; প্রত্যেক লেখক – যে সাহিত্য ধারায় তিনি উদ্বুদ্ধ হন না কেন; প্রত্যেক গণিতবিদ, বিজ্ঞানী, শিল্পী এ সংঘাতের কারণেই সব সময় ইসলামী বিষয় নিয়ে বিতর্ক করেছেন ও যুক্তি উপস্থাপন করেছেন।
এ কারণে মতামতের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরণের দল, উপদল ও ভিন্নতা দেখা দেয়-যাদের মধ্যে হাতেগোনা সামান্য কয়েকটি ইসলামিক পরিসরের বাইরে চলে যায়। যদিও চিন্তার এ ভিন্নতার কারণে মুসলিম উম্মাহ্ কখনওই বিভক্ত ছিল না। বরং আব্বাসীয় খিলাফতকালে বাগদাদ ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক ও বৈপ্লবিক চিন্তার পীঠস্থান। বিভিন্ন চিন্তা ও দর্শনের ব্যক্তিদের বিতর্ককে স্বাগত জানানো হত। এভাবে ইসলাম সম্পর্কে একটি স্ফটিকস্বচ্ছ ধারণা গড়ে উঠে। কেননা ইসলাম বিভিন্ন চিন্তার বিপরীতে নিজের অবস্থানে দাঁড়িয়ে শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারে। সেকারণে চিন্তার ভিত্তিতে বিভিন্ন দল, উপদলের উপস্থিতি সমস্যা সৃষ্টির বদলে ইসলামকে আরও ভালভাবে বুঝার পথকে সুগম করেছে।
মুসলিম বিশ্বে বর্তমান বিভক্তি দুটি ইস্যুর কারণে জন্ম নিয়েছে। প্রথমটি হল ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞানতা এবং দ্বিতীয়টি ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ডেভিড ফ্রমকিন তুলে ধরেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন অধিকাংশক্ষেত্রেই মুসলিমরা ঔপনিবেশিক শোষণ থেকে বেরিয়ে এসেছে। তার মতে, ‘সাবেক ওসমানিয়া খিলাফতের অধিকাংশ সম্পদই এখন বিজয়ীদের দখলে। কিন্তু এটা সবার মনে রাখা উচিত মুসলিমরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে খ্রীস্টান অধ্যুষিত ইউরোপকে পদানত করতে চেয়েছে। আর বর্তমানে বিজয়ী পশ্চিমা শক্তি সবসময় চেয়েছে তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মুসলিম উম্মাহ যাতে আর কখনওই ঐক্যবদ্ধ না হতে পারে। শতকের পর শতকের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার আলোকে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স ক্ষুদ্র, অস্থিতিশীল রাষ্ট্র জন্ম দিয়েছে যাদের শাসকেরা ক্ষমতায় থাকবার জন্য পশ্চিমাদের উপর নির্ভরশীল। ঐসব দেশের উন্নয়ন এবং বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রন করা হয়েছে এবং তারা কখনওই পশ্চিমাদের জন্য হুমকি হতে পারবে না। এই বহিঃশক্তিসমূহ পুতুল শাসকগুলোর সাথে আরবের সম্পদসমূহ সস্তায় ক্রয় করবার জন্য চুক্তি করেছে। অধিকাংশ জনগণ কে দরিদ্রতার অতল গহবরে নিক্ষেপ করে শাসকগোষ্ঠীকে ব্যাপক সম্পদশালী করা হয়েছে।’
ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীরা ক্ষুদ্র, অস্থিতিশীল রাষ্ট্র তৈরির মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বকে বিভক্ত করার পরিকল্পনা সচেতনভাবেই করেছে-যাতে করে তারা পুনরায় একত্রিত হতে না পারে। প্রথম মহাযুদ্ধের আগে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স মধ্যপ্রাচ্যকে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছে। কাগজের মানচিত্রের উপরে তারা পেন্সিল দিয়ে সীমানা এঁকে জর্ডান, সিরিয়া, সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক এবং ইরানকে তৈরি করেছে। শত শত বছর ধরে একত্রে বসবাস করে আসা জনগণকে বিভক্ত করে পাকিস্তান, ভারত ও আফগানিস্তান সৃষ্টি করা হয়েছে। এই ঊপনিবেশিক নীতি বর্তমানে অসংখ্য সমস্যার জন্ম দিয়েছে। প্রত্যেক জাতির জন্য বৃটেন ও ফ্রান্সের প্রতি অনুগত শাসক নিযুক্ত করা হয়। হিজাজ অঞ্চলের নেতৃত্ব পাবার তাগিদে সৌদ পরিবার ওসমানিয়া খিলাফতকে ধ্বংসের জন্য বৃটিশদের সাথে একত্রে কাজ করে। মুসলমানেরা বর্তমানে পৃথিবীকে এইসব কৃত্রিম সীমারেখাগুলোকে দিয়ে দেখে। ঊপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী মুসলমানদেরকে বিভিন্ন রাষ্ট্র গঠন করে দিয়ে বাহ্যিকভাবে বিভক্ত করে ফেলে। তারপর জাতীয় পতাকা, জাতীয় স্বাধীনতা দিবস এবং জাতীয় পতাকার ভিত্তিতে মুসলিমরা যাতে আর কখনওই একত্রিত হওয়ার ব্যাপারে চিন্তা করতে না পারে সে ব্যবস্থা করে।
পূর্বে উম্মাহ্ একত্রিত হয়েছিল ইসলামের ভিত্তিতেই-যা মুসলিম ভূমিসমূহে সমৃদ্ধ সমাজ বিনির্মান করেছিল। সেকারণে ইসলামের অনুপস্থিতি ও ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকদের ষড়যন্ত্রের কারণেই একসময়কার ঐক্যবদ্ধ মুসলিম উম্মাহ্ আজ ৫০ টি ক্ষুদ্র অকার্যকর রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
ইসলামের কারণে এ বিভক্তি তৈরি হয়নি বরং ইসলাম না থাকার কারণেই আজকের অনৈক্যের সৃষ্টি। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল পশ্চিমা বিশ্ব সুন্নী এবং শিয়া সমস্যা নিরসনের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতাকে সমাধান হিসেবে নিয়ে এসেছে। বিরোধপূর্ণ দুটি দলের মধ্যে এ ধরণের সমাধানের প্রস্তাব নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক। কেননা ধর্মনিরপেক্ষতার সমাধান সমস্যাটিকে সামষ্টিকভাবে সমাধানের বদলে ব্যক্তিপর্যায়ে নিয়ে এসেছে। মহানবী মুহম্মদ (সা) এর উম্মতের যে কোন সমস্যা সমাধানের জন্য ইসলামের প্রামাণ্য দলিলের কাছে আমাদেরকে আসতে হবে। মুহম্মদ (সা) এর পরিবারে বিপক্ষে কিছু মুসলমানের অবস্থান কিংবা মুয়াবিয়া (রা) কিছু কর্মকান্ড কখনই ইসলামিক সমাধান কিংবা বিচারব্যবস্থার প্রামান্য দলিল হতে পারে না। এখানে সূত্র হচ্ছে কোরআন এবং হাদীস। আর এর ব্যাখ্যায় মতানৈক্য থাকতে পারে-যা যে কোন রায়ের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। যদিও ব্যাখ্যা দেবার কিছু সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে।
বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে আসা সমাধানের ক্ষেত্রে যে কোন আদর্শের মধ্যেই মতানৈক্য দেখা দিতে পারে। গণতান্ত্রিক দেশসমূহে ব্যাখ্যার ভিন্নতার দরূন চিন্তার অনেক শাখা-প্রশাখা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এখন ডেমোক্রেট এবং রিপাবলিকানরা রয়েছে। যুক্তরাজ্যে রয়েছে লেবার, লিবারেল ডেমোক্রেট এবং কনজারভেটিভরা। পশ্চিমা বিশ্বে আরও রয়েছে নিউকনজারভেটিভ, লির্বাটেরিয়ানস, ফেবিয়ানস, ইনভারোমেন্টালিস্ট এবং খ্রীস্টান ডেমোক্রেটস। তারা সকলেই পুঁজিবাদের আক্বীদা ধর্মনিরপেক্ষতাকে ভিত্তি হিসেবে নিয়ে কতটুকু উদার হবে এই বিতর্কে মতানৈক্য পোষণ করে। মনেটারিস্টদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ক্যানসিয়ান স্কুল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের হস্তক্ষেপের স্বপক্ষে অবস্থান নেয়। যারা সমাজতান্ত্রিক বিশ্বাসের উপর অটুট রয়েছে তাদেরও অনেকগুলো শাখা রয়েছে। সমাজতন্ত্রের পক্ষ শক্তি পুঁজিবাদের ‘মালিকানার স্বাধীনতা’ ধারণার ফলে সৃষ্ট সম্পদের ব্যাপক বৈষম্যকে সকল সমস্যার মূল বলে চিহ্নিত করে এর সমাধান করতে হবে বলে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। একটি চিন্তার অনুসারীদের (কমিউনিস্ট চিন্তাধারার) মতে, ব্যক্তিপর্যায়ের মালিকানা সম্পূর্ণরূপে পরিহার করে সবক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত সাম্যতা নিশ্চিতই সবচেয়ে যুগপত সমাধান। অন্য চিন্তার অনুসারীদের (এগ্রেরিয়ান স্যোসালিস্টদের) মতে, কেবলমাত্র কৃষিজমির জন্য ব্যক্তিপর্যায়ের মালিকানা নিষিদ্ধ করতে হবে। তখন তৃতীয় একটি চিন্তার উন্মেষ ঘটে যাকে বলা হয় স্টেট্ স্যোসালিজম-যার মূল কথা হল ব্যক্তিমালিকানা থেকে জনস্বার্থে গণমালিকানা সর্বক্ষেত্রে সুনিশ্চিত করতে হবে।
পশ্চিমে অনেক পন্ডিত ও গবেষকগণ শিয়া সুন্নী বিভক্তির বিষয়ে গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, এক উম্মাহ্’র ধারণাকে হেয় করবার জন্য এ সমস্যার উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তবে এ ধরণের কর্মকান্ড মুসলিম উম্মাহ্’র ভেতরে এক ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করেছে -যা মুসলিম বিশ্বে একটি শক্তিশালী দাবী হিসেবে ত্বরান্বিত হচ্ছে।
আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি পুরো বিশ্বে মুসলিম উম্মাহ একত্রে পুঁজিবাদ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকে প্রত্যাখ্যান করছে। এমনকি প্যালেস্টাইনের মুসলিমরা দীর্ঘদিন অবৈধ দখলদারিত্বের অধীনের থাকবার পরও ইরাক, আফগানিস্তানের মুসলমানদের প্রতি একাত্মতা ও সংহতি প্রকাশের জন্য রাস্তায় নেমে এসেছে। উম্মাহ একটি দেহের মত বিক্ষোভে ফেটে পড়ে যখন ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে মহানবী (সা) এর ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন (নায়ুজুবিল্লাহ্) ইউরোপে প্রকাশ করা হয়।
উম্মাহ পরিষ্কার বুঝতে পারছে যে, দালাল শাসকগুলো কোনভাবেই তাদের প্রতিনিধিত্ব করছে না। প্রসারিত পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল এখন উম্মাহ এবং শাসকদের মাঝামাঝি রয়েছে। দীর্ঘদিন অধঃপতিত থাকায় এখন উম্মাহ্ একসময়কার ঐক্যের কথা ভাবতে পারছে না।
আদর্শের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা একটি সরকারের অন্তর্গত সমাজ সবসময় ঐক্য সৃষ্টি করে এবং নিশ্চিত করে। সাহাবীরা খারিজিদের সাথে খুব কঠোর আচরণ করেছিলেন যখন তারা ইসলামের মধ্যে নতুন কিছু আমদানি করবার মাধ্যমে অনৈক্য সৃষ্টির পাঁয়তারা করে। খিলাফতের প্রত্যাবর্তন এখন অতি নিকটে এবং এ ব্যাপারে অনেক বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ ও সি.আই. এ’র মত জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে। একটি রাষ্ট্র ছাড়া ঐক্য নিতান্তই অসম্ভব। কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা ছাড়া উত্তর আমেরিকায় আমরা দু’টি রাষ্ট্র দেখতে পেতাম। সরকারী কাঠামো না থাকলে ইংল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডের মধ্যে ঐক্য থাকত না। রাষ্ট্র জনগনের মাঝে ঐক্য সৃষ্টি করে। এটা ছাড়া ঐক্য একেবারেই অসম্ভব। ইসলামী ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি যে, এ ব্যবস্থায় ঐক্য সৃষ্টির জন্য বিশদ প্রক্রিয়া রয়েছে এবং বিভিন্ন পরিচয় থেকে আসা লোকদের মাঝে সফলভাবে ঐক্য সৃষ্টি করা হয়েছিল। বর্তমানে যে অনৈক্য দেখি তা পশ্চিমাদের সৃষ্টি এবং ক্রমাগতভাবে এ প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।
ইসলাম কি সেঁকেলে ?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)
বিগত দুই শতক ধরে পুরো বিশ্ব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অচিন্ত্যনীয় সাফল্য অর্জন করেছে- রেলপথের উন্নয়ন, উড়োজাহাজ, পারমাণবিক প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, আই ভি এফ, জেনেটিক উপায়ে রূপান্তরিত খাদ্যদ্রব্য ইত্যাদি। এসব উন্নয়নের সাথে সাথে যুগপৎভাবে পশ্চিমারাও এগিয়েছে এবং ইতিহাসে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের একপেশে উন্নয়ন আমাদের এ ধরণের ধারণাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে যে, উন্নয়নের পূর্বশর্ত হল উদার মূল্যবোধ।
অনেক চিন্তাবিদ, বিজ্ঞানী এবং দার্শনিকের মতে বর্তমান বিশ্বে ইসলামের কোন অবস্থান নেই। মুসলিম দেশ সমূহ বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষতায় কোন ভূমিকা না রাখায় এ ধরণের ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে। পশ্চিমারা দাবী করে জ্ঞান বিজ্ঞানে তখনই তারা অগ্রগতি অর্জন করেছিল যখন তারা গীর্জা নিয়ন্ত্রিত শাসনব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধকে ধারণ করেছে। গীর্জা বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য অন্তরায়, কেননা ধর্ম কিছু অলীক বিশ্বাস ও কুসংস্কারের উপর নির্ভরশীল। ধর্ম থেকে শাসনব্যবস্থার পৃথকীকরণের কারণেই শিল্প বিপ্লব সম্ভবপর হয়েছিল এবং তারা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। উদারপন্থীদের কারণেই আজকের জ্ঞান এবং বিজ্ঞান। তাদের দাবী, জ্ঞানের ভিত্তিমূল তারাই রচনা করেছিল এবং এর বিভিন্ন শাখা প্রশাখাও তাদেরই সৃষ্টি।
পশ্চিমারা তাদের ইতিহাসকে পৃথিবীর ইতিহাস বলে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। পশ্চিমাদের ইতিহাস বর্ণনায় কখনওই মুসলিম সভ্যতার কাছ থেকে গৃহীত জ্ঞানকে কৃতজ্ঞতার সাথে স্বীকার করা হয় না। ঐতিহাসিকভাবে সকল সভ্যতারই কিছু না কিছু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ইতিহাস রয়েছে। পশ্চিমারা গ্রীক সভ্যতা থেকে গৃহীত জ্ঞানকে লিপিবদ্ধ করেছে এবং ইসলামী সভ্যতাও ৮ম-১০ম শতাব্দী পর্যন্ত গ্রীক কাজসমূহকে আরবীতে অনুবাদ করেছিল।
বিজ্ঞান হল বিশ্বব্রক্ষান্ড সম্পর্কে গবেষণা, নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত বিশেষ জ্ঞান।
প্রাথমিকভাবে দহন ইজ্ঞিনের উন্নতরূপই হল আজকের অটোমোবাইল। যেখানে দাহ্য জ্বালানী ইজ্ঞিনের পিস্টনের উপর চাপ প্রয়োগ করে এবং অটোমোবাইলকে চালনা করে। বৃটিশ সাম্রাজ্যে তৎকালীন সময়ে পিস্টন চালনা এবং যন্ত্রের মধ্যে ঘূর্ণন গতি সৃষ্টির জন্য প্রথমে বাষ্প এবং পরবর্তীতে কয়লাকে ব্যবহার করা হত। এ ধরণের উন্নয়ন সম্ভবপর ছিল ১২ শতকে আল জাজারির ক্রাঙ্কশ্যাফট আবিষ্কারের মাধ্যমে যেখানে তিনি রড এবং সিলিন্ডারের মাধ্যমে ঘূর্ণন গতি তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম যন্ত্রে এটি ব্যবহার করেন।
ড্র্যাগ (Drag) ফোর্সকে ব্যবহার করে বাতাসের মধ্যে একটি বস্তুর গতিকে ধীর করবার প্রক্রিয়ায় প্যারাসুট কাজ করে। পূর্বের নিরীক্ষালদ্ধ ফলাফল থেকে বর্তমানে প্যারাসুট ডিজাইন করা হয়েছে। ৯ম শতাব্দীতে ইবনে ফিরনাস প্যারাসুটের প্রাথমিক নকশা করেন। তিনি কর্ডোভার ম্যাজকুইটা মসজিদ থেকে বিশাল ডানা সম্বলিত আলখেল্লা পরে লাফ দিয়েছিলেন এবং সামান্য আহত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন। কাঠের কাঠামোর উপর লিনেন কাপড় জুড়ে দিয়ে এর চেয়েও ভাল নকশা সম্বলিত প্যারাসুট নির্মিত হয়। পরবর্তীতে শক্তিমত্তা ও কম ওজনের কারণে মোড়ানো সিল্ক ব্যবহার করা হয়।
এসব উদাহরণ এটাই প্রমাণ করে যে, কোন সভ্যতা বিজ্ঞানে তাদের অবদানকে নিরঙ্কুশ বলতে পারে না। বরং সার্বজনীন এ বিশাল জ্ঞান সমুদ্রের অন্যতম অংশীদার হতে পারে। যেমন অণু পরমাণু সমূহ বিশ্বব্রক্ষ্ণাণ্ডের নিয়ম অনুসারে চলে। এই নিয়মকানুনসমূহ কোন মুসলিম, হিন্দু বা খ্রিস্টান যেই আবিষ্কার করুক না কেন তা ব্যক্তিনিরপেক্ষ। এটা সার্বজনীন এবং কারো বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত নয়। সত্যিকারের বিতর্কের বিষয় হল কোন সভ্যতা জ্ঞান বিজ্ঞানে কতটুকু অবদান রেখেছে এবং কেন তারা এক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জনে তৎপর ছিলো।
৮ম থেকে ১৩শ শতাব্দীকে ইসলামের স্বর্ণযুগ বলা হয়। এসময়ে ইসলামী বিশ্বের প্রকৌশলী, পন্ডিত এবং ব্যবসায়ীরা কলা, কৃষি, অর্থনীতি, শিল্পকারখানা, আইন, সাহিত্য, নৌবিদ্যা, দর্শন, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি প্রভৃতি ক্ষেত্রে পূর্বের জ্ঞান সংরক্ষণ ও নতুন জ্ঞান অন্বেষণে বড় ভূমিকা পালন করে। মধ্যযুগের ইতিহাসের উপর বিশেষজ্ঞ একজন ঐতিহাসিক হাওয়ার্ড টার্নার তার বই ‘সায়েন্স ইন ম্যাডিভেল ইসলাম’ এ উল্লেখ করেন, ‘মুসলিম শিল্পী এবং বিজ্ঞানী, রাজপুত্রগন এবং শ্রমিকরা একত্রে এমন এক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন যে, তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সকল মহাদেশের সমাজকে প্রভাবিত করেছিল।’ ইসলামের ভেতরেই এমন কিছু বিষয় আছে যেগুলো মুসলমানদের জ্ঞান বিজ্ঞানে অনন্য ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী হতে উদ্ধুদ্ধ করেছিল।
আল্লাহ্’কে উপাসনা করা এমন একটি ব্যাপার যে তা আবিষ্কারে উদ্ধুদ্ধ করে। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, কিবলা ঠিক করা, রমযান শুরু এবং শেষ করা প্রভৃতি বিষয়ের জন্য চাঁদ এবং নক্ষত্রের সঠিক অবস্থান জানা অত্যাবশ্যকীয়। আর একারণেই মুসলমানরা দূরবীক্ষণ এবং নৌবিক্ষণ বিষয়ে গবেষণা শুরু করে। একারণে অধিকাংশ নৌবীক্ষণিক নক্ষত্রের নাম আরবীতে, যেমন: একামার, বাহাম, বাতেন কাইতোস, ক্যাফ, যাবিহ, ফুরুয, ইযার, লিসাস, মিরাক, নাশিরা, র্তাফ এবং ভেগা ইত্যাদি।
মুসলিমরা মহাকাশবিজ্ঞানে অনেক অবদান রেখেছে এবং পরবর্তীতে তারা অ্যাস্ট্রোনোমিক্যাল ঘড়ি উদ্ভাবন করেছে। ১০ম শতাব্দীতে আবু রায়হান আল বিরুণী গিয়ার হুইল সমৃদ্ধ যান্ত্রিক সৌর-চন্দ্র বর্ষপঞ্জিকা তৈরি করেন। ১৫শ শতাব্দীতে এই নকশার উপর ভিত্তি করে তাকী আল দীন যান্ত্রিক ঘড়ি আবিষ্কার করেন। কিবলা নির্ণয়ের প্রয়োজনীয়তা থেকেই কম্পাস আবিষ্কৃত হয় যা মুসলিম জ্যোতির্বিদ্যার আবিষ্কারলব্ধ জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে তৈরী হয়েছিল। মুসলিমরা কমপাস রোজ আবিষ্কার করে- যার মাধ্যমে মানচিত্রে এবং নটিক্যাল ম্যাপে পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিন প্রদর্শন করা হয়।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন:
‘তিনিই তোমাদের জন্য তারকারাজি সৃষ্টি করেছেন যেন জল-স্থলের অন্ধকারে পথের দিশা পাও‘ (সূরা আন’আম: ৯৭)
এ আয়াত মুসলমানদেরকে ভাল দূরবীক্ষণ ও নৌবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারের ব্যাপারে উদ্ধুদ্ধ করে। এ যন্ত্রপাতি পৃথিবী অভিযানে ব্যবহৃত হয়। অনেক মুসলিম ভূ-বিজ্ঞানী এগুলোকে ম্যানুয়াল হিসেবে সংগ্রহ করেন। কুরআনের আয়াত তাদের এ ব্যাপারে উৎসাহী করেছে যেখানে আল্লাহ বলেন,
‘আর আমি যমিনে পর্বত সৃষ্টি করলাম, যেন জমিন টলতে না পারে, এবং আমি তথায় তাদের চলবার জন্য প্রশস্ত পথ নির্মান করে রেখেছি।‘ (সূরা আম্বিয়া:৩১)
আগের মুসলিমরা বুঝতে সমর্থ হয়েছিল যে, ইসলাম সকল বস্তগত উন্নয়ন- যেমন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন প্রভূতিকে গ্রহণ ও উদ্বুদ্ধ করে। কেননা এতে মানুষের অবস্থা ও জীবনমানকে উন্নত করবার জন্য বস্তুর রূপান্তর ও উন্নয়ন করার জ্ঞান শেখানো হয়। যেহেতু অনেক অঞ্চল ধীরে ধীরে মুসলিম সভ্যতার আওতায় আসে সেহেতু এসব অঞ্চলে নগরায়নের মাধ্যমে উন্নয়ন শুরু হয়। আরবের অনেক মরু অঞ্চল পানির মাধ্যমে বসবাসের উপযোগী করা হয়। মুসলিম প্রকৌশলীরা ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রীস নদী থেকে অসংখ্য খাল খনন করে পানির ব্যবস্থা করেন। বাগদাদের চারিদিকের নীচু জায়গায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে শহরকে ম্যালেরিয়ামুক্ত করা হয়। মুসলিম প্রকৌশলীরা পানির চাকাকে (ওয়াটার হুইল) অধিকতর উপযোগী করে গড়ে তুলেন এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির ধারাগুলোকে বিস্তৃত করেন যাকে কানাতস্ বলা হয়। একারণে উন্নত গার্হস্থ্য পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠে। যার মধ্যে ছিল নিষ্কাশন ব্যবস্থা, গণগোসলখানা, পান উপযোগী ঝর্ণা, পাইপের মাধ্যমে পানি সরবরাহ এবং বহুলব্যবহৃত ব্যক্তিমালিকানাধীন অথবা গণশৌচাগার ও গোসলখানা।
মুসলিম চিন্তাবিদ, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং বিশেষজ্ঞগণ বিজ্ঞানসহ অন্যান্য শাখায় ব্যাপক অবদান রাখেন। এসব অবদান আজকাল পশ্চিমারা ব্যবহার করছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারাও এগুলোর উন্নয়ন বিধান করেছে। কেননা একক কোন সভ্যতা বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার কৃতিত্ব নিতে পারে না। প্রত্যেক সভ্যতাই তার আবিষ্কারসমূহকে লিপিবদ্ধ করেছে যা পরবর্তীতে একই বিষয়ের উপর চালিত গবেষণার জন্য সহায়ক (রেফারেন্স) হিসেবে কাজ করে। ইসলামের উত্থানের আগে আরব বিশ্ব বিজ্ঞানে কোন অবদান রাখেনি। এই একই জনগণ যখন ইসলাম গ্রহণ করল তখন তারা আবিষ্কার করতে শুরু করল-যা পরবর্তী প্রজন্ম সদ্ব্যবহার করেছিল। এমনকি এসব আজও আমাদের কাজে আসে। ইসলাম বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ব্যাপারে প্রতিবন্ধকতা তো নয়ই বরং এক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে।মুসলিম বিশ্ব কি ইসলাম চায় না এবং তারা কি এর জন্য প্রস্তুতও নয়?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)
বছরের পর বছর ধরে পশ্চিমারা বলে আসছে যে, মুসলিমরা গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা চায়; কিন্তু তারা ইসলাম চায় না। তারা বলে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের কিছু সংখ্যালঘু মুসলিম ইসলাম চায়। বাকীরা পশ্চিমা ব্যবস্থাকে মেনে নিয়েছে এবং পুঁজিবাদ দ্বারা জীবনকে পরিচালিত করতে চায়। তথাকথিত কিছু আধুনিক মুসলিমরাও আজকাল বলে বসেন যে, মুসলিমরা ইসলাম চায় না এবং তারা এর জন্য প্রস্তুতও নয়। যদিও পশ্চিমা বিশ্ব ঠিকই বুঝতে পেরেছে যে, মুসলিম বিশ্ব ইসলাম চায় এবং ইসলাম ও মুসলিম বিশ্বের উত্থান তাদের জন্য হুমকি।
ইউ.এস ন্যাশনাল ইন্টিলিজেন্স কাউন্সিল তাদের ‘গ্লোবাল ২০২০’ প্রজেক্টের আওতায় ‘ম্যাপিং দি গ্লোবাল ফিউচার’ শীর্ষক রিপোর্ট প্রকাশ করে। দি ন্যাশনাল ইন্টিলিজেন্স কাউন্সিল (এন.আই.সি) হল আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা কেন্দ্র। এই রিপোর্টের মাধ্যমে ২০২০ সাল নাগাদ পুরো পৃথিবীর একটি প্রতিচ্ছবি অঙ্কন করবার চেষ্টা করা হয়েছে। রিপোর্টের উপসংহারে বলা হয়, মুসলিমরা আবার ইসলামের মূল ভিত্তিভূমির দিকে ফেরত যাচ্ছে – যখন ইসলামী সভ্যতা খিলাফতের মাধ্যমে পুরো বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে। রিপোর্টে একটি কাল্পনিক দৃশ্যের অবতারণা করে বলা হয়, ‘কিভাবে একটি কট্টরপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠী কর্তৃক প্রণোদিত বিশ্বব্যাপী আন্দোলনের উত্থান সম্ভব।’ এছাড়াও বলা হয়, খিলাফতের উত্থানের দিকে দৃষ্টি রেখেই মার্কিন সব পরিকল্পনা, প্রস্তুতি নেয়া উচিত। মার্কিন অন্যান্য নীতি নির্ধারক ও থিঙ্কট্যাঙ্কদের রিপোর্টেও উল্লেখ করা হয় পুরো পৃথিবীব্যাপী একটি বৃহৎ আদর্শিক আন্দোলন খিলাফতকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবার জন্য কাজ করে আসছে। সি.আই.এ ইতোমধ্যে ঠান্ডা যুদ্ধকালীন সময়ের মত আরেকবার সাফল্য পাবার জন্য ইসলামিক মিডিয়া, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে লক্ষ্য করে গোপন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিবর্গ মুসলিম সমাজকে প্রভাবিত করবার জন্য ক্রমবর্ধমান হারে অর্থ, জনবল ও সম্পদের সরবরাহ পাচ্ছে।
একই সময়ে বিভিন্ন গবেষণা, উপাত্ত ও নীতিনির্ধারকদের রিপোর্ট এটা মেনে নিয়েছে যে, পুরো পৃথিবীব্যাপী মুসলিমরা পশ্চিমা মূল্যবোধকে প্রত্যাখান করেছে। পশ্চিমারা যখন তাদের আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে কোন ধরণের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে না, তখন এটা সত্যিই অপমানজনক এক পরাজয়। তার অর্থ মন এবং মগজের যুদ্ধে পশ্চিমারা ইতোমধ্যে পরাজিত। সেকারণে ভিন্ন একধরণের সরকার ব্যবস্থার উত্থানের পথকে রুদ্ধ করবার জন্য সরাসরি দখলদারিত্ব সর্বশেষ অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পশ্চিমাদের কর্মকান্ড দেখলে মনে হয় উম্মাহ্’র চাহিদা সম্পর্কে তারা অনেক মুসলমানের চেয়ে বেশী বিশ্বাসী। এসব কর্মকান্ড এটাও প্রমাণ করে যে, মুসলিমরা শুধুমাত্র ইসলাম চায়ই না; বরং তারা এর কাছাকাছি পৌছেও গেছে।
২০০৭ সালে ম্যারিল্যান্ড ইউনিভার্সিটি একটি ভোটের ব্যবস্থা করে, যার ফলাফল ইউনিভার্সিটি অব জর্ডানের চালানো পূর্বেকার পরিসংখ্যানের সাথে মিলে যায়। চারটি বৃহৎ মুসলিম অধ্যুষিত দেশে (মিশর, পাকিস্তান, মরক্কো এবং ইন্দোনেশিয়া) চালানো গবেষণায় বিস্ময়করভাবে খিলাফতের পক্ষে শতকরা ৭৫ ভাগেরও বেশী ভোট পড়ে। এ জাতিসমূহ মুসলিম রাষ্ট্রসমূহে শরীয়াহ্’র বাস্তবায়ন দেখতে চায়, বিভিন্ন রাষ্ট্রের ঐক্যের ভিত্তিতে সংগঠিত ইসলামী রাষ্ট্র – খিলাফত চায়-যা অবস্থান নেবে মুসলিম ভূমিসমূহে পশ্চিমাদের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে, মুসলিম ভূমিতে পশ্চিমা মূল্যবোধের বিরুদ্ধে এবং নিরপরাধ সাধারণ জনগণের উপর আরোপিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে।
Worldpublicopinion.org কর্তৃক পরিচালিত আর একটি ব্যাপক ভোটে পুরো পৃথিবীব্যাপি মুসলিমরা শতকরা ৭০ ভাগেরও বেশী সমর্থন দেয় শারী’আহ্ আইন ও খিলাফতের পক্ষে।
মুসলিম উম্মাহ্ একটি দীর্ঘ সময় ধরে পতনের পর এখন তারা ইসলামী জীবনব্যবস্থাকে সমাধান হিসেবে গ্রহণ করতে চাচ্ছে। কোন ধরণের ব্যবস্থার ভেতর না থাকায় মুসলিম উম্মাহ্’র ভেতর যে দুর্নীতি বাসা বেধেছে তা থেকে বের হয়ে আসবার জন্যই আজকে মুসলিম বিশ্বে বিশৃংখলা হচ্ছে। এর মানে এই নয় উম্মাহ্ ইসলামের জন্য প্রস্তুত নয়; বরং এই বিশৃংখলার ভেতর দিয়েই সাধারণত পরিবর্তন আসে। ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতাব্দীতে ইউরোপে উদার গণতন্ত্রের উত্থানের সময় এ অবস্থা দেখা দিয়েছিল, সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার উত্থানের সময় কিংবা চীনের বর্তমান উত্থানের সময়। মুসলিম উম্মাহের এ উচ্চাকাঙ্খা প্রতিফলিত হয় যখন ইসলাম কোনভাবে আক্রান্ত হলে তারা একত্রে প্রতিবাদে ঝাপিয়ে পড়ে তখন; যেমন: ফ্রান্সে হিজাব নিষিদ্ধ করার পর কিংবা রাসূলুল্লাহ (সা) এর ব্যঙ্গ কার্টুন অঙ্কন করবার পর। মুসলিম উম্মাহ্ ইসলামের জন্য অনেক বেশী প্রস্তুত। এখন তাদের দরকার কেবলমাত্র একটি রাষ্ট্র।
বিগত দুই শতাব্দী ধরে বিশ্ব যে নজিরবিহীন উন্নয়ন দেখেছে তা কি পুজিঁবাদের আধিপত্যের বহিঃপ্রকাশ?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)
বিগত দুই শতাব্দী ধরে বিশ্ব যে উন্নয়ন ও অগ্রগতি দেখেছে তা ইতিহাসে নজিরবিহীন এবং এটা কি পুজিঁবাদের আধিপত্যের বহিঃপ্রকাশ?২০০৭ সাল ছিল ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য বছর। এ বছর পুরো বিশ্ব ইতিহাসে রেকর্ড ৫৪ ট্রিলিয়ন ডলারের মত সম্পদ উৎপাদন করে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর বিশ্ব অর্থনীতির আকার ছিল ১ ট্রিলিয়ন ডলার। পুঁজিবাদ গ্রহণের পর ইউরোপে শিল্প বিপ্লব হয় এবং এর মধ্য দিয়ে অভূতপূর্ব উন্নয়ন ও অগ্রগতি সুচিত হয়-যা সত্যি ইতিহাসে বিরল।
পুঁজিবাদের নিজস্ব অগ্রগতি বাদ দিলেও এর বিশেষজ্ঞরা সমাজতন্ত্রের পতনের পর পুঁজিবাদ এখনও বলবৎ থাকাকে এ ব্যবস্থার শক্তিশালী দিক মনে করেন। কিছু কিছু পুঁজিবাদী ব্যক্তি বর্ণবাদের দোষে দুষ্ট হয়ে নিজেদেরকে সভ্যতাকেন্দ্রিকভাবেই অন্যান্য সভ্যতার চেয়ে অগ্রগামী বলে মনে করেন। ৯/১১ এর ঘটনার পর ইটালিয়ান প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বার্লোসকনি অত্যন্ত দাম্ভিকতার সাথে বলেন, ‘আমরা অবশ্যই আমাদের সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে সচেতন থাকব-যা আমাদের ভালভাবে বেঁচে থাকার গ্যারান্টি দিয়েছে, মানবাধিকারের প্রতি সম্মান দেখাতে শিখিয়েছে-যা ইসলামী দেশগুলোর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়-শিখিয়েছে সম্মান করতে মানুষের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অধিকারকে। এটা এমন এক ব্যবস্থা যা পরমতসহিষ্ণু ও বৈচিত্র্যপূর্ণ..পশ্চিমারা মানুষকে জয় করবে যেমনিভাবে এটা সমাজতন্ত্রকে জয় করেছে-যদিও এর অন্যান্য সভ্যতা-যেমন ইসলামের সাথে বিরোধ রয়েছে-যা ১৪০০ বছর আগের ব্যবস্থায় আটকে আছে।’
বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা ও ধ্বসের সময়েও পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদেরা মোহাচ্ছন্নের মত বলেছেন, ‘অর্থনীতি আয়তনে বেড়ে যাওয়া, ধ্বস নামা এ সবই পশ্চিমা অর্থব্যবস্থার মাধূর্য্য, এবং এর পরেও এটাই যোগ্যতর।’
পশ্চিমাদের জন্য পুঁজিবাদ হল অগ্রগতির অপর নাম। আর এ ধরণের দাম্ভিক উচ্চারণের জন্য ভিত্তি হিসেবে তারা ইতিহাসকে বেছে নিয়েছে যদিও বাকী সবকিছু একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ের এবং এগুলোর সংস্কার প্রয়োজন। আসলে এ ধরণের দর্প সেখান থেকেই শুরু হয় যেখানে সংকট নিহিত রয়েছে।
পুঁজিবাদে উন্নয়নের প্রধান সূচক হল কী পরিমাণ সম্পদ বিশ্ব উৎপাদন বা অর্জন করতে সমর্থ্য হয়েছে – যাকে তারা জি.ডি.পি (জি.ডি.পি: গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট) বলে থাকে। প্রযুক্তির উৎকর্ষতা এবং বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন সবই উৎপাদনের হাতিয়ার এবং সুদক্ষ শিল্পায়ন অতি সামান্য থেকে ব্যাপক উৎপাদন সুনিশ্চিত করবে। যাই হোক, প্রশ্ন হল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে চালিত করে কে? এর মাধ্যমে একটি সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। কারণসমূহের দিকে তাকালে আমরা বুঝতে পারি কীভাবে এ ধরণের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হয়। বৃটেনকে মনে করা হয় বিশ্বের প্রথম শিল্পোন্নত দেশ এবং এটা করা হয়েছিল পুরো বিশ্বে উপনিবেশ স্থাপনের মনবাসনা নিয়ে। সমুদ্র ব্যবহারের আলাদা সুবিধা থাকার কারণে সেখানে বিশেষ কর্মপদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। বৃটেন উপনিবেশ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে নিজের দেশে ব্যাপক সম্পদরাজি গড়ে তোলে।
প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও যুগান্তকারী আবিষ্কারের অধিকাংশই হয়েছে যুদ্ধের সময় বিশেষত বিশ্বযুদ্ধের সময়। যুক্তরাষ্ট্রের সিভিল ওয়ারের সময় সাবমেরিন আবিষ্কার করা হয়। প্রথম মহাযুদ্ধে জয়ের প্রয়োজনে রেলগাড়ির উন্নয়ন করা হয়। যদিও যুদ্ধের আগে রেলগাড়ি ছিল কিন্তু যুদ্ধের সময় অস্ত্র পরিবহনের জন্য এর উৎকর্ষতা বিধান করা হয়। অপারেশন পেপারক্লিপ-যা ছিল মূলত নাৎসী বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি অপহরনের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রকেট নিয়ে গবেষণা করার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। রকেটবিজ্ঞানের উন্নয়নের কারণে মহাকাশবিজ্ঞান, ব্যালেস্টিক মিসাইল, কৃত্রিম উপগ্রহ ও প্রাথমিক কম্পিউটার উদ্ভাবন ও উৎকর্ষতা অর্জনের পথ সুগম হয়। এ ধরণের আবিষ্কার থেকে সাধারণ ভোক্তা পণ্য এবং গৃহস্থালীর কাজে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তৈরি হয়। প্রথম মহাযুদ্ধের গতি সঞ্চারের জন্য অটোমোবাইল ও উড়োজাহাজে দহন ইজ্ঞিন ব্যবহার করা হয়। ককপিটের স্ক্রীণে বিভিন্ন তথ্য ও উপাত্ত দর্শনীয় করবার জন্য এবং জেটপাইলটদের যোগাযোগের সুবিধার জন্য টেলিভিশন, আধুনিক রেডিও প্রভৃতির উন্নয়ন সাধিত হয়। হাতে গোনা সামান্য কিছু আবিষ্কার পাওয়া যাবে যেগুলো যুদ্ধকালীন প্রয়োজনে আবিস্কৃত হয়নি।
ইতিহাসে পুঁজিবাদী পশ্চিমাদের প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে অগ্রগামী হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু সম্পদের সন্ধান, উপনিবেশবাদ এবং যুদ্ধ পশ্চিমা বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির পেছনে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
পুঁজিবাদ সম্পদ উৎপাদনের জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশী মরিয়া। কিন্তু তার এখনও আরও অনেক কিছু করার অবকাশ আছে। উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত বিশ্ব অনেক সম্পদ উৎপাদন করছে, কিন্তু পৃথিবীর অর্ধেক লোক মাত্র ২ ডলারের চেয়ে কম আয় করে বলে তারা খেতে পায় না এবং ৯৫ ভাগ জনগণ দিনে ১০ ডলারেরও কম আয় করে। পুরো বিশ্বে পুঁজিবাদের কারণে দরিদ্রতা ত্বরান্বিত হচ্ছে। অতীতে ইউরোপীয়ানরা সম্পদের জন্য পুরো বিশ্ব চষে বেড়াত-যা এখন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। উনিশ শতকে যে পরিবর্তন হয়েছে তা হল বন্দুক প্রতিস্থাপিত হয়েছে শিল্প দ্বারা, দাসপ্রথা প্রতিস্থাপিত হয়েছে ভোগের মনোবৃত্তি দিয়ে, সেনাবাহিনী প্রতিস্থাপিত হয়েছে মিডিয়া দিয়ে, কৃষি প্রতিস্থাপিত হয়েছে শেয়ার মার্কেট দিয়ে।
পুজিঁবাদের পরবর্তী সাফল্য হল বিশ্বের ইতিহাসে সম্পদের পতনের সর্বনিম্ন রেখাকে স্পর্শ করা। যখন পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ তার ভরণপোষনের জন্য মাত্র কয়েক ডলার উপার্জন করতে পারে তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে সর্বাধিক সংখ্যক বিলিওনিয়ার। একারণে পৃথিবীর অর্থনীতি ভারসাম্যহীন। ২০০৬ সালে ওয়ার্ল্ড ইন্সষ্টিটিউট ফর ডেভেলপমেন্ট ইকোনোমিঙ্ রিসার্চ অব দি ইউ.এন পৃথিবীর অর্থনীতি সম্পর্কে সর্বসাম্প্রতিক সমীক্ষা তুলে ধরে। যার প্রাপ্তিগুলো ছিল সত্যিই অদ্ভুত। পৃথিবীর সব দেশের গবেষণা পর্যালোচনা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়েছে যে, বিশ্বের শতকরা ১ ভাগ জনগণ গোটা দুনিয়ার ৪০ ভাগ সম্পদ ভোগ করে এবং মাত্র শতকরা ১০ ভাগ জনগণ ৮৫ ভাগ সম্পদের মালিক। রিচার্ড রবিন তার পুরষ্কারপ্রাপ্ত বই ‘গ্লোবাল প্রবলেম্স এন্ড দি কালচার অব ক্যাপিটালিসম’-এ উল্লেখ করেন : পুঁজিবাদের উত্থান এমন এক সংস্কৃতির জন্ম দেয় যেখানে বিভিন্ন প্রক্রিয়া প্রয়োগ করে একসাথে কিছু ব্যক্তিকে চূড়ান্ত আরাম ও আভিজাত্যের সুযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে সবচাইতে সফল। কিন্তু প্রত্যেকের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে এটি মোটেও সফল নয় এবং এ ক্ষেত্রে এর ব্যর্থতাই এর একটি বড় সমস্যা।
পুঁজিবাদ স্মরণাতীতকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশী পরিমাণে ঋণগ্রস্ত করেছে- যেখানে রাষ্ট্র এবং ব্যক্তি উভয়েরই আয়ের চেয়ে বেশী দেনা রয়েছে। পৃথিবী উৎপাদন করে ৫৪ ট্রিলিয়ন ডলার-একথা তখনই অন্তসারশূন্য হয়ে যায় যখন বুঝা যায়- এর অধিকাংশ অংশই আসে ধারদেনা থেকে। পশ্চিমা বিশ্ব ভোগে আসক্ত। তারা সবসময় যা আয় করে তার চেয়ে বেশী ভোগ করে। আর এই ভোগের যোগান আসে ঋণ থেকে। কারণ সত্যিকারের সম্পদ অর্জন করে খুব সামান্য কয়েকজন। বর্তমান পৃথিবীর একমাত্র সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-যা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ অর্থনীতি – তার পতন ও সাম্প্রতিক মন্দা ঋণনির্ভর অর্থনীতির গর্বকে খর্ব করে এবং পুঁজিবাদের করুণ পরিণতির কথা আমাদের সামনে নিয়ে আসে। ২০০৭ সালে মার্কিনীরা সম্পদ উৎপাদন করে ১৪ ট্রিলিয়ন ডলার। কিন্তু তাদের জাতীয়ভাবে ঋণের পরিমাণ- যা কেন্দ্রীয় সরকার মার্কিন জনগণ ও বিশ্বের কাছ থেকে বন্ডের মাধ্যমে ৯.৭ ট্রিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ব্যাপক পরিমাণে আমদানি পণ্য ভোগ করে ও ফ্ল্যাট ক্রয় করে। একারণে ভোক্তা ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার। মার্কিন কোম্পানিগুলোর দেনার পরিমাণ ১৮.৪ ট্রিলিয়ন ডলার। এভাবে মার্কিনীদের দেনার পরিমাণ প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার – যা পৃথিবীর মোট উৎপাদনের শতকরা ৭৫ ভাগ। ৩৭ মিলিয়ন মার্কিনী দরিদ্র সীমার নীচে বসবাস করে। পুঁজিবাদের সার্বজনীন অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিন্তা নিতান্তই অসার।
পুঁজিবাদ নামকরণের পেছনে রয়েছে এর প্রধান দিক পুঁজির ব্যাপারটি। এটা বস্তগত সম্পদকে জীবনের একমাত্র চাওয়া পাওয়ার বিষয় হিসেবে দাঁড় করায় যেন এটা ছাড়া বেঁচে থাকা অর্থহীন। একারণে অভিজাত শ্রেণী এ ব্যবস্থার শাসকদের এমনভাবে প্রভাবিত করে যাতে করে শাসকগোষ্ঠী সর্বদা পুঁজিপতিদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। পরবর্তীতে অভিজাততন্ত্র বড় বড় কোম্পানী ও তাদের প্রধানদের দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। যেমন তেলক্ষেত্রে জন রকফেলার, অটোমোবাইলে হেনরী ফোর্ড, রেলরোডে জে গোল্ড, জে. পিয়ারপন্ট মরগান ব্যংকিং-এ এবং এন্ড্রু কার্নেগী ইস্পাতশিল্পে। পশ্চিমা সরকারগুলো উপনিবেশের মাধ্যমে যে পরিমাণ সম্পদ আহরণ করতে পারেনি-এসব বড় বড় কোম্পানীগুলো তার চেয়ে বেশী সম্পদ লুট করছে। প্রাথমিকভাবে প্রথম মহাযুদ্ধের কারণে পশ্চিমা বিশ্ব তাদের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখবার জন্য, সম্পদের বৈষম্যকে কমানোর জন্য ও ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতিকে বাঁচানোর জন্য সম্পদ সংগ্রহের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। কেননা তাদের জনগনের কাছে ব্যয় করবার জন্য সম্পদ যতসামান্যই ছিল। এ চিন্তা থেকেই ভোগবাদেও উদ্ভব হয়-যেখানে ব্যয়, নতুন আবিষ্কারের স্বাদ আস্বাদন এবং নতুন ফ্যাশন হয়ে দাঁড়ায় জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য এবং এভাবে অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চারের চেষ্টা করা হয়।
পুঁজিবাদ সব সময় সম্পদ সৃষ্টি করবে। এ ধারণার ভিত্তিতেই এ ব্যবস্থা পরিচালিত-যা কখনওই বন্টনের দিকে মনোযোগী নয়। যদি তাদের এ সম্পদ সৃষ্টি করতে গিয়ে উপনিবেশ স্থাপন করে পুরো একটি মহাদেশকে দরিদ্র বানাতে হয় তাহলে তারা তাই করবে কিংবা বর্তমানে উপনিবেশবাদের নতুন সংস্করণ মুক্ত বাণিজ্য বা বিশ্বায়ন বাস্তবায়ন করবে। পুঁজিবাদ কখনওই শ্রেষ্ঠ হতে পারে না বরং এটা একটি দুর্যোগ।
পশ্চিমাদের বৈদেশিক সাহায্যই কি উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়নে ভুমিকা রাখছে?

দশকের পর দশক ধরে বৈদেশিক সাহায্যকে উন্নয়নের প্রধান নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্ব দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এ পর্যন্ত উন্নয়নশীর দেশগুলোকে দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য প্রায় ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার সাহায্য দিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে এসব সাহায্য দেয়ার পেছনে কি কোন দুরভিসন্ধি কাজ করে?
কখনও কখনও কেবলমাত্র মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই সাহায্য করা হয়। অনেক সময় আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সহযোগীকে অনুদান দেয়া হয়। আবার কখনও কখনও গ্রহণকারী রাষ্ট্রের রাজনীতিকে প্রভাবিত করবার জন্যও সাহায্য দেয়া হয়। বিংশ শতাব্দীতে সমাজতন্ত্র এবং পু্ঁজিবাদের দ্বন্দ্বের সময়, এইসব আদর্শের পুরোধা সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই অন্য দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে প্রভাবিত করা কিংবা দুর্বল সহযোগীকে সাহায্য করবার জন্য আর্থিক অনুদানকে ব্যবহার করেছে। মার্কিনীরা সবসময় ইউরোপকে সমাজতন্ত্রের হাত থেকে বাঁচিয়ে পুঁজিবাদের দিকে নিয়ে আসবার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়েছে। অনুন্নত দেশে সাহায্য সবসময় প্রদানকারী দেশের অনুকূলে যায়। এখানে আনুকূল্য বলতে সামরিক সুবিধা, বাজার সম্প্রসারণ, বিদেশী বিনিয়োগ, মিশনারী কার্যক্রম এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তার বুঝায়। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাহায্য প্রদানের পেছনে প্রাথমিকভাবে বড় বড় পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহের নতুন বাজার তৈরির হীন উদ্দেশ্য কাজ করে – যদিও এর পেছনে সাহায্য গ্রহণকারী রাষ্ট্রের জনগণের সুখ-স্বাচ্ছ্যন্দের কথা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচার করা হয় ।
বিশ্বব্যাপী বৈদেশিক সাহায্যর পরিমান ২০০৭
(বিলিয়ন ডলারে)যুক্তরাষ্ট্র ২১ বিলিয়ন জার্মানি ১১ বিলিয়ন ফ্রান্স ৮.৯ বিলিয়ন যুক্তরাজ্য ৮.৮ বিলিয়ন জাপান ৭.৮ বিলিয়ন হল্যান্ড ৫.৬ বিলিয়ন স্পেন ৫.১ বিলিয়ন সুইডেন ৩.৮ বিলিয়ন কানাডা ৩.৫ বিলিয়ন যুক্তরাষ্ট্র ২১ বিলিয়ন জার্মানি ১১ বিলিয়ন সুত্র: ও.ই.সি.ডি বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক উইলিয়াম ইস্টারলি উন্নয়ন ও বৈদেশিক সাহায্যের উপর প্রচলিত ধারার সমালোচনা করে বলেন, দাতাগোষ্ঠীর অনুদান লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। তার মতে, ‘এটা পৃথিবীর দরিদ্র মানুষের জন্য অত্যন্ত কষ্টের বিষয় যে, বিগত পাঁচ বছর ধরে পশ্চিমারা অনুদান হিসেবে ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার দেবার পরও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত শিশুদের অর্ধেককেও মাত্র বার সেন্টের ওষুধ দেয়া যাচ্ছে না। পশ্চিমারা ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করে ফেললেও দরিদ্র পরিবারগুলোতে ৪ ডলার দামের মশারির ব্যবস্থা করা যায়নি। ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হবার পরও ৫ মিলিয়ন শিশুর মৃত্যুকে ঠেকানোর জন্য তাদের মায়েদের হাতে ৩ ডলার তুলে দেয়া সম্ভব হয়নি। এটা খুবই হৃদয়বিদারক যে, বিশ্বসমাজ ধনী , বয়ঃবৃদ্ধ ও শিশুদের জন্য বিনোদনের নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে, কিন্তু দরিদ্র মৃত শিশুদের জন্য মাত্র ১২ সেন্ট যোগানো সম্ভব হচ্ছে না।’
বৈদেশিক সাহায্যের সব দিক নিয়ে আলোচনা করলে দেখা যাবে যে, এটি কোনভাবে প্রশ্নাতীত নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও দাতাগোষ্ঠী তাদের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য সিদ্ধি করবার জন্য এই অনুদানকে ব্যবহার করছে। যেমন:
১. মার্কিনীরা সেসব জায়গায় সাহায্য দেয় যেখান থেকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার উপর হুমকি আসতে পারে, যেমন: মধ্যপ্রাচ্য এবং ঠান্ডা যুদ্ধকালীন সময়ে মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারেবিয়ান দেশসমূহ।
২. সুইডেনের লক্ষ্য হল তথাকথিত “প্রগতিশীল সমাজ”।
৩. ফ্রান্স তাদের সংস্কৃতি, ভাষা এবং প্রভাব বিস্তার করবার জন্য বিশেষত পশ্চিম আফ্রিকার দেশসমূহকে সহায়তা দিয়ে থাকে। আবার যাদের সাথে ফরাসীদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে তাদেরকে অনানুপাতিক হারে অনুদান দেয়।
৪. জাপান তাদের পণ্য ক্রয়ের শর্তে পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহে সহায়তা প্রদান করে।
ঔপনিবেশিকতার অবসানের পর বিশেষ করে আফ্রিকাকে বৈদেশিক সাহায্যের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী আশ্বস্ত করা হয়। জি-৮ সম্মেলন থেকে অসংখ্যবার অনুদান ও ঋণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চল সম্পর্কে বলা হয়, ‘এটা অনস্বীকার্য যে ব্যাপক হারে অপশাসন, দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনার স্বীকার হয়েছে আফ্রিকা। এ্যাকশন ফর সাউদার্ন অফ্রিকা সম্মেলনে বলা হয় : ‘এটা অনস্বীকার্য যে, আফ্রিকায় সুশাসনের অভাব, দূর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনা রয়েছে। তবে উপনিবেশবাদের কুপ্রভাব, ঠান্ডাযুদ্ধকালীন সময়ে অবহেলিত অঞ্চলসমূহে জি ৮ এর মাধ্যমে প্রদত্ত সহায়তা, ঋণের ফাঁদ সৃষ্টি, বিশ্বব্যাংক ও আই.এম.এফ কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া কাঠামোগত পরিবর্তন কর্মসূচীর (স্ট্রাকচারাল এ্যডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম) ব্যাপক ব্যর্থতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অযথার্থ নীতিমালা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। আফ্রিকার সংকট সৃষ্টিতে জি ৮ এর ভূমিকাকে অস্বীকার করা যাবে না। সেকারণে এ সংস্থাকে সংস্কার করতে হবে এবং আফ্রিকার উন্নয়নের পথে অন্তরায় সৃষ্টিকারী অন্যায় নীতিসমূহের প্রয়োগ বন্ধ করতে হবে।’
আজকের বিশ্বে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৈদেশিক সাহায্য গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। সুশাসন নামক এক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশসমূহ উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রন ও বাজারকে বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর জন্য উন্মুক্ত করার ব্যবস্থা করে। উন্নত দেশের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশসমূহের কৃষি ও বস্ত্রখাতে পর্যন্ত বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ও ভর্তুকির সম্মুখীন করে।
বিশ্বায়ন কি মুক্তবাণিজ্যের শীর্ষ পর্যায় এবং একুশ শতকের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য?

১৯৯০ এর দশকের মাঝামাঝি আমেরিকান বড় বড় কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমকে বুঝানোর জন্য সর্বপ্রথম বিশ্বায়ন শব্দটি ব্যবহৃত হয়। ঠান্ডা যুদ্ধের সমাপ্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্র একধরণের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় ব্যয় করা অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অন্যান্য ক্ষেত্রে খরচ হওয়ায় উচ্চ উৎপাদন খরচের কারণে মার্কিন পণ্য রপ্তানি করা দুরূহ হয়ে পড়ে। নিজ গৃহে উৎপাদিত পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেসব পণ্য মার্কিনীরা বিদেশে প্রতিযোগিতামূলক দামে বিক্রি করতে পারছিল না।
সেকারণে সস্তা বিদেশী বাজার দরকার হয়ে পড়েছিল। সস্তা শ্রম, শ্রম আইনের যথেচ্ছ অবমাননা এবং শোষণের মাধ্যমে বিদেশের মাটিতে উৎপাদন সুবিধার মাধ্যমে পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ার নামই হল বিশ্বায়ন।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার পর বিশ্বায়নের শিক্ষা যে রাষ্ট্রটিকে প্রথম দেয়া হয়, সেটি হল রাশিয়া। ১৯৯০ সালে সমাজতন্ত্রের পতনের মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর এককেন্দ্রিক বাজারনির্ভর অর্থনীতির অনুপস্থিতিতে পুঁজিবাদী সংস্থাগুলো রাশিয়ায় ঢুকে পড়ে। বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল প্রায় ১২৯ বিলিয়ন ডলার নিয়ে রাশিয়ায় প্রবেশ করে। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য রাশিয়ার অর্থনীতিকে মুক্ত করে দেয়া হয়। শিল্পকারখানাগুলোকে বিদেশীদের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয় এবং অর্থনীতিকে বৈশ্বিক দরের উঠানামার কাছে স্পর্শকাতর করে তোলা হয়। ১৯৯৭ সালে বিনিয়োগকারীরা রাশিয়ার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলায় সেখান থেকে অর্থ উঠিয়ে নিতে থাকে। আর উদারনীতি গ্রহণের কারণে রাশিয়ার তখন অসহায়ের মত পরিস্থিতি অবলোকন করা ছাড়া কিছুই করবার ছিল না। দরিদ্রতা ৩০০০ ভাগ বেড়ে ২মিলিয়ন থেকে ৬০ মিলিয়নের পৌঁছায়। ইউনিসেফ পর্যবেক্ষণ করে যে এর কারণে প্রতিবছর ৫০০০০০ অতিরিক্ত মৃত্যু হয়। রাশিয়া হল বিশ্বায়নের কারণে সর্বনাশের চূড়ান্ত প্রতিচ্ছবি।
বিশ্বায়ন প্রকৃত প্রস্তাবে মুক্ত বাণিজ্যের মাধ্যমে পরাশক্তিসমূহ বিভিন্ন নীতিমালা চাপিয়ে দেয়ার অপর নাম-যা ইতিহাসে বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ার একটি অংশমাত্র। ১৭৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র বৃটেন থেকে আলাদা হলেও মার্কিনীরা উত্তরাধিকার সূত্রে উপনিবেশিক বৃটিশ নোংরামী ও অসততা বহন করে। সেকারণে বৃটিশরা একসময় অন্যদের সাথে যা করত মার্কিনীরা এখন তাই করে। ১৮১২ সালে বৃটিশ বাণিজ্য পদ্ধতির বিরুদ্ধে যুদ্ধের অল্পকিছুদিন পর মার্কিন রাজনীতিজ্ঞ হেনরী ক্লে একজন বৃটিশ নেতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আমাদের মত বিভিন্ন জাতিসমূহ জানে ‘মুক্ত বাণিজ্য’ এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে আমরা ব্যাপক সুবিধা ভোগ করি এবং তাদের বাজারে আমাদের উৎপাদনকারীরা মনোপলি ব্যবসা করে এবং তাদের উৎপাদনকারী জাতিতে পরিণত হবার স্বপ্নকে এভাবে চিরতরে বিনষ্ট করা হয়।
রিগান এবং থেচারের সময় বিশেষভাবে দেখা যায়, বিশ্বায়নের নামে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে কীভাবে মুক্ত বাণিজ্যের অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত যে কোন কিছুই ধ্বসিয়ে দিয়ে গণখাতের সব কিছুকে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ঢালাওভাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন করা হয়। ধনী দেশের বড় বড় কোম্পানীগুলো যাতে সস্তায় দরিদ্র দেশের বিভিন্ন সম্পদের মালিক বনে যেতে পারে সে কারণে অবকাঠামোগত সমন্বয় নীতি গ্রহণ করা হয়।
বিশ্বায়নের ব্যর্থতার অনেক উদাহরণ আছে। এ পর্যন্ত দরিদ্রতা নিয়ে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ গবেষণা স্কোরকার্ড অন গ্লোবালাইজেশন ১৯৮০-২০০০ এ দি সেন্টার ফর ইকোনোমিক এন্ড পলিসি রিসার্চ এর গবেষক মার্ক ওয়েসব্রট, ডীন বেকার সহ প্রমুখ গবেষকগণ উল্লেখ করেন যে, ১৯৬০-১৯৮০ তুলনায় ১৯৮০-২০০০ এর বিশ্বায়নের সময়ে গড় আয়ু, শিশু মৃত্যুহার, শিক্ষা ও স্বাক্ষরতার হার অনেক কমে গেছে। ১৯৬০-১৯৮০ সাল সময়ের মধ্যে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ তাদের দেশীয় শিল্পকারখানাকে পুষ্ট ও প্রতিযোগিতামূলক করবার জন্য এবং অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক বাজারের হাত থেকে রক্ষার জন্য রক্ষণশীল নীতিমালা গ্রহণ করত। এই ঠিক একই প্রক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বেড়ে উঠে।









