Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:

    ((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))

    “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    «أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»

    “আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:

    «عليك بتقوى الله ما استطعت»

    “তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:

    «فاتقوا الله ولو بشق تمرة»

    “একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।

    তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))

    “আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))

    “যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))

    “মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:

    ((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))

    “মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))

    “পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]

    এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))

    “যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))

    “এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:

    ((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))

    “হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]

  • রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন। 

    “হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩) 

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ

    রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি? 

    আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত। 

    এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।

    আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    “আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)

    وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ

    আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

    মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। 

    ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: 

    “আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩) 

    وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ

    “আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ

    “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮) 

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ

      “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)

    حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ

    আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।

  • রমজান এর শিক্ষা

    রমজান এর শিক্ষা

    সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্‌কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:

    রমজান – রহমতের মাস:

    এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।

    রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।

    সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর  মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।

    সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।

    জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।

    রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।

    ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্‌ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।

    এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।

    রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:

    রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।

    এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।

    রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্‌কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।

    তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।

    তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্‌র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্‌ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্‌কে রাগান্বিত করে।

    আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্‌ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।

    এখানে আল্লাহ্‌ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।

    উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্‌ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্‌ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”

    আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।

    তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্‌ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)

    এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)

    অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।

    এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্‌ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।

    তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।

    আর আল্লাহ্‌কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্‌র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।

    বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।

    রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।

    রমজান – কোরআনের মাস:

    একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।

    আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?

    আল্লাহ্‌ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্‌র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।

    এখানে আল্লাহ্‌ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্‌ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?

    বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।

    যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্‌ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্‌ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”

    আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”

    একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”

    তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।

    রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)

    আল্লাহ্‌ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।

    সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্‌র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।

    অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।

    যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।

    বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।

    রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:

    আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।

    রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।

    কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্‌র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।

    আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।

    তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্‌ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্‌ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।

    রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)

    আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্‌র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্‌ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্‌র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।

    পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)

    অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্‌র ক্ষমা পাওয়া যায় না।

    রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:

    পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।

    রমজান এর পর কী হবে?

    প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।

    রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্‌র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্‌র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্‌র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।



    আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
    ২৫শে শাবান, ১৪৩৩
    ১৪ই জুলাই, ২০১২ 

  • ইসলাম এসেছে সকল যুগের জন্য

    ইসলামের প্রয়োগ কোন যুগ বিশেষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, বরং ইসলাম সকল যুগেই মানুষের জন্য সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। এটা এজন্য যে, ইসলাম মানবীয় চাহিদাগুলোকে সুনিয়ন্ত্রিত করার জন্য এসেছে আর এই চাহিদাগুলো কোন যুগের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়।

    মানুষের দিকে তাকালে আমরা দেখব যে তার সুনির্দিষ্ট কিছু মানবীয় চাহিদা রয়েছে যেগুলোর উপর পৃথিবীতে তার বেঁচে থাকা ও জীবন-যাপন প্রক্রিয়া নির্ভর করে। এই চাহিদাগুলো পূরণের উপায়-উপকরণ সংগ্রহ ও এদের ক্রমোন্নতির পিছনে সে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যায় যাতে করে এসব চাহিদা পূরণের উপায় সহজ থেকে সহজতর হয়। আদিম মানুষ তার উপায়-উপকরণগুলোকে চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে উন্নত করতে করতে আজকের এই উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন অবস্থায় এসেছে যেখানে রয়েছে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, চিকিৎসা ব্যবস্থা, খাদ্য-বস্ত্র বাসস্থানের উন্নততর সংস্থান, বিনোদনের নানা উপকরণ, বস্তু-জগত সম্পর্কে আরো ব্যাপক জ্ঞান ইত্যাদি। এসবই হয়েছে একটি মাত্র কারনে; তা হলো মানবীয় চাহিদা ও প্রয়োজনগুলো মিটানোর সহজতর উপায় অনুসন্ধান আর এ চাহিদা ও প্রয়োজন সব যুগে সব মানুষেরই ছিলো। এসব চাহিদার ব্যাপারে তাদের মাঝে কোন মৌলিক পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যাবেনা। পার্থক্য কেবল এই যে, বিভিন্ন যুগে মানুষের এই চাহিদা পূরণের উপায়-উপকরণগুলো বিভিন্ন ছিলো যা একটি উপকরণগত পার্থক্য মাত্র। কাজেই সহজাত চাহিদাগুলোর ব্যাপারে প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ একই অবস্থায় রয়েছে।

    ইসলাম পৃথিবীতে এসেছে মানুষের সব ধরণের জৈবিক চাহিদাকে সর্বোচ্চ সাঠিক উপায়ে সুশৃংখল করার জন্য। ইসলাম যে ব্যবস্থা বা বিধি-বিধান দেয় তার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সমাজে মানুষের জৈবিক-চাহিদা পূরণের পদ্ধতিগুলোকে এমনভাবে নিয়মবদ্ধ করা যাতে করে এর ফলে সামগ্রিকভাবে সমাজে কোন বিশৃঙ্খলা তৈরী না হয়। ইসলাম এসব চাহিদা পূরণের বৈধ পদ্ধতিকে সুনির্দিষ্ট করেছে, উপকরণকে নয়। যুগের কারনে যে উপকরণ গত পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে তাতে ইসলামের বিধি-বিধান প্রয়োগে কোনই বাধা সৃষ্টি হয় না। ইসলাম কোথাও বলেনি যে একস্থান থেকে আরেক স্থানে যেতে হলে উটের পিঠে করে যেতে হবে, তাই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাবার জন্য গাড়ী, ষ্টীমার, উড়োজাহাজ যাই ব্যবহার করা হোক না কেন সবই একই ব্যাপার।

    আসলে মানুষ যতদিন ‘মানুষ’ থাকবে ততদিনই তার মানবীয় সব চাহিদা ও প্রয়োজন অপরিবর্তিত থাকবে। একইভাবে সেগুলোকে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালনার জন্য একটা ব্যবস্থাও লাগবে সবসময়ই। যেহেতু ইসলাম আল্লাহ্‌ তা’আলার কাছ থেকে আসা একটি ব্যবস্থা তাই কেবল এটিই পারবে উপকরণ নির্বিশেষে সব যুগে মানুষের চাহিদাগুলোকে এবং চাহিদা থেকে উৎপন্ন সামাজিক সমস্যাগুলোকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে। ইসলাম তাই সব যুগের জন্য এবং সকল সময়ের জন্য।

    আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহকে সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” [সূরা আল মায়িদা : ৩]

    “এবং তোমার রবের বাণী সত্যতা ও ইনসাফের দিক দিয়ে পরিপূর্ণ হয়েছে, তাঁর বাণী পরিবর্তনকারী কেউই নেই, তিনি সবকিছু শোনেন ও জানেন।” [সুরা আল আন’আম : ১১৫]

  • সঠিক ইসলামী দল করার অপরিহার্যতা [ইসলামী আলোচনা]

    This is a speech given by a brother in March 2008 on the topic of

    “Importance of Joining a Correct Islamic Party”

  • উপমহাদেশে খিলাফত আন্দোলন এবং ১৯৪৭ পরবর্তী বাংলাদেশে ইসলামী দলগুলোর ভূমিকা

    ভূমিকা:

    ভারত উপমহাদেশে দুই’শ বছরের বৃটিশ শাসনামলে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী ইসলামী সভ্যতা। সর্বাধিক নির্যাতন ও নিগ্রহের শিকার হয়েছে মুসলিম জনগোষ্ঠী। আর অঞ্চল হিসাবে অধিক পরিমাণে শোষিত হয়েছে মুসলিম প্রধান পূর্ববাংলা। এ সময়ে দখলদার জালিম ইংরেজ শাসকদেরকে বিতাড়নের জন্য অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। বহু প্রাণহানী ও রক্তপাতের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কোন আন্দোলনই এ অঞ্চলের মুসলমানদেরকে এতোটা ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত করতে পারেনি, যতটা পেরেছিল ‘খিলাফত আন্দোলন নামে’ পরিচিতি এক উম্মাহ্‌ কন্‌সেপ্ট থেকে উৎসারিত ঐতিহাসিক একটি আন্দোলন। অবশ্য ১৯২৪ সালে তুরস্কে উসমানী খিলাফত পতনের পর এ আন্দোলন অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। মুসলিম নেতারা খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পরিবর্তে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে ইংরেজ খেদাও আন্দোলনের প্রতি সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেন। আর এই সুযোগে চতুর ইংরেজরা স্বাধীনতার প্রশ্নে মুসলানদের মাঝে দ্বিজাতি তত্ত্ব আর অবিভক্ত ভারতের দাবীতে এক বিরাট বিভক্তি সৃষ্টি করে দেয়। ফলে গতিহারা হয়ে যায় মুসলমানদের আন্দোলন। ইসলাম প্রতিষ্ঠার মূল দাবী হারিয়ে যায় সাময়িক ইস্যুতে আন্দোলনের ডামাডোলে। যার ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলো এখনও বহন করে চলছে।

    এই নিবন্ধে আমি পুরো বিষয়টিকে বিশ্লেষণের চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ্‌। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, উপমহাদেশে ইসলামী সভ্যতা ও শিক্ষা-সংস্কৃতি রক্ষার ক্ষেত্রে আলিম-উলামাদের সীমাহীন অবদান আছে। তবে এই নিবন্ধে সেই বিষয়ে আলোকপাত না করে শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রসঙ্গকেই এর আলোচ্য বিষয় বনানো হয়েছে। আলোচনার সুবিধার্থে প্রবন্ধটিকে মোট ৪টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করা হলো।

    এক : ১৯৪৭ পূর্ববর্তী খিলাফত আন্দোলন।
    দুই : ১৯৪৭ পরবর্তী পাকিস্তান আমলে এ অঞ্চলের ইসলামী দলগুলোর ভূমিকা।
    তিন : ১৯৭১ এরপর থেকে বাংলাদেশে ইসলামী দলগুলোর অবস্থান এবং
    চার : ফলাফল বিশ্লেষণ।

    উপমহাদেশে খিলাফত আন্দোলন

    ১৯১৪ সালে ১ম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে বৃটেন তাদের বৃহত্তম উপনিবেশ ভারতবর্ষে যাতায়াতের পথ খোলা রাখার জন্য আরব দেশগুলোকে উসমানী খিলাফত থেকে ছিনিয়ে নেয়ার জোর চক্রান্ত চালাতে থাকে। এতদুদ্দেশ্যে খিলাফত বিরোধী মনোভাব উস্কে দেয়ার জন্য তারা আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের দক্ষ গুপ্তচরদেরকে নিয়োগ করে। বৃটিশদের হয়ে আরব এলাকায় খিলাফত বিরোধী চেতনা ও আরব জাতীয়তাবাদী ধারণা ছড়ানোর গোয়েন্দাবৃত্তিতে নেতৃত্ব দানকারী কর্ণেল টি.ই. লরেন্স এর প্রচেষ্টায় গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে তারা উত্তপ্ত ও বিভক্ত করে ফেলে। ভারত উপমহাদেশের উলামাগণ খিলাফতের এই বিপদ দেখে ভীষণভাবে আতংকিত হয়ে উঠেন। যে কোন মূল্যে খিলাফত শাসন বহাল রাখার জন্য তারা জোর তৎপরতা শুরু করেন। খিলাফত রক্ষার জন্য ভারতীয় উলামাদের সেই প্রাণান্তকর প্রচেষ্টাকেই ইতিহাসে ‘খিলাফত আন্দোলন’ নামে অবিহিত করা হয়।

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভারতের মুসলমানরা ব্রিটিশকে এই শর্তে সমর্থন দিয়েছিল যে, ব্রিটিশরা তুরস্কের খলীফার কোন ক্ষতি করবে না। কিন্তু এই যুদ্ধে তুরস্ক ও জার্মানি মিত্রশক্তির কাছে পরাজিত হলে ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তি তুর্কী খিলাফতকে বিভক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। পবিত্র মক্কা ও মদীনা খ্রিষ্টানদের করতলগত হবার আশস্কায় ভারতের মুসলমানরা ১৯১৯ সালের ৭ অক্টোবর খিলাফত দিবস পালন করে। খিলাফত রক্ষাকল্পে ভারতীয় মুসলমানগণ দেশব্যাপী গড়ে তোলে তীব্র আন্দোলন।

    এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন-ভারতের বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দ এর তৎকালীন মুহতামিম শায়খুলহিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহ.), মাওলানা মুহাম্মাদ আলী জাওহার এবং মাওলানা শওকত আলী ভ্রাতৃদ্বয়, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, ড. মুক্তার আহমদ আনসারী প্রমুখ।

    খিলাফত আন্দোলন হচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আন্দোলন। মাওলানা মুহাম্মাদ আলী জাওহার এবং মাওলানা শওকত আলী ভ্রাতৃদ্বয় ১৯১৯ সালে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, ড. মুক্তার আহমদ আনসারী প্রমুখকে সঙ্গে নিয়ে খিলাফত আন্দোলন নামের এই সংগঠনটির কাজ শুরু করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল : তুর্কী খিলাফতকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা। এই একটি মাত্র সংগঠন ভারতের সকল ঘরানার উলামা ও সাধারণ মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে যে, খিলাফতই হচ্ছে এক উম্মাহ্‌র ঐক্যের প্রতীক। এখানে উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী ছিলেন একজন উচ্চতর হানাফী। অথচ তার সাথে এই আন্দোলনে ঘনিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন যে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তিনি ছিলেন একজন গায়ের মুকাল্লিদ। এভাবে সকল মাসলাক, মাশরাফ ও মাযহাবের উলামাগণ খিলাফত ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন।

    ১৯২০ সালে বঙ্গ প্রদেশের আহসান মঞ্জিলে অনুষ্ঠিত খিলাফত কন্‌ফারেন্সের সভাপতির ভাষণে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ খিলাফতের গুরুত্ব বর্ণনা করে বলেছিলেন : এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলমানদেরকে সিরাতে মুস্তাকীমের উপরে চালানোর জন্য সংগঠিত করা এবং দুনিয়াতে আল্লাহ্‌’র কালামকে বুলন্দ করা। এর জন্য জরুরী হচ্ছে খলীফার হাতে যথাযথ কর্তৃত্ব থাকা। মাওলানা আজাদ বিশ্বাস করতেন মুসলমানদের খলীফা বিহীন জীবনই হচ্ছে ইসলাম বিহীন জীবন। খিলাফত বিহনে বসবাস করলে মুসলমানদেরকে আখেরাতে জবাব দিতে হবে। ‘মাসআলায়ে খিলাফত’ নামে এক গ্রন্থে তিনি লিখেছেন : “খিলাফত বিহীন ইসলামের অস্তিত্ব অসম্ভব। ভারত বর্ষের মুসলমানদের উচিত সর্বশক্তি দিয়ে খিলাফতের জন্য কাজ করা।” মাওলানা শওকত আলী কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটির পক্ষ থেকে এই ঘোষণা জারী করেছিলেন যে আমরা আশা করি ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রাণ মুসলিমগণ ভারতবর্ষে অবস্থান করে বৃটিশ রাজের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেবে। তা অসম্ভব হয়ে উঠলে খিলাফত রাষ্ট্রে হিজরত করার চিন্তা করবে। ভারতবর্ষের বিশিষ্ট উলামাগণ এই আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করেছিলেন। মাওলানা সাইয়েদ সুলায়মান নদভী জোর দিয়ে বলতেন মুসলমানদের জন্য একজন খলীফা থাকা ফরয। ১৯২০ সালে মাওলানা মুহম্মাদ আলী জাওহারের সঙ্গে এক প্রেস কন্‌ফারেন্সে উপস্থিত তার সঙ্গী সাইয়েদ হুসাইন বলেছিলেন যদি দুনিয়াতে ইসলামের অস্তিত্ত্ব বজায় রাখতে হয়, তাহলে মুসলমানদের একজন খলীফার উপস্থিতি অপরিহার্য্য।

    শায়খুলহিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান কঠিন পরিশ্রম করে খিলাফতের অধীনে যুদ্ধরত সৈনিকদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে খলীফার নিকট প্রেরণ করতেন। তিনি রাশিয়া এবং তুরস্কের যুদ্ধে উসমানী খিলাফতকে সার্বিক সহযোগীতা প্রদান করেছিলেন। খিলাফতের সাহায্যার্থে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসা বন্ধ ঘোষণা করেন। ছাত্রদের একটি বিশাল বাহিনীকে তুরস্কে প্রেরণ করে অপর আরেকটি বাহিনী নিয়ে নিজে তুরস্ক চলে যান। তিনি জানতেন সমগ্র ইউরোপ ঐক্যবদ্ধ হয়ে খিলাফত ধ্বংসের মাধ্যমে ইসলামের প্রদীপকে নিভিয়ে দিতে সংকল্পবদ্ধ হয়েছে। তাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভারত বর্ষের মসজিদগুলোতে খুতবার মাঝে খিলাফতের কথা উল্লেখ করা হতো এবং নামাজে মুসলমানদের বিজয় ও কাফেরদের পরাজয়ের জন্য দোয়া করা হতো। খিলাফত আন্দোলনের আরেক মহান ব্যক্তিত্ব মওলানা শওকত আলীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল আপনি কেন খুতবায় তুর্কী সুলতানের নাম অন্তর্ভূক্ত করেন। তিনি জবাবে বলেছিলেন, কারণ তুর্কী সুলতান এই মূহুর্তে মুসলমানদের খলীফা। বৃটিশ সামাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র থেকে খিলাফত রাষ্ট্রকে রক্ষার জন্য মাওলানা মাহমুদুল হাসান তার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। এই জন্য তিনি হিজাজ সফর করেন। গভর্নরের পক্ষ থেকে ভারতবর্ষের মুসলমানদের জন্য পত্র মারফত এই অনুরোধ নিয়ে এসেছিলেন যে তারা যেন বৃটিশ সরকারের বিরুদ্ধে খিলাফত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। এই চিঠি ইতিহাসে গালিব নামা নামে খ্যাত। খিলাফতের পক্ষে এই ধরণের তৎপরতার দরুন নিষ্ঠুর ইংরেজ শাসকরা মাওলানা মাহমুদুল হাসানের উপর কঠিন চাপ সৃষ্টি করে। সত্য ভাষণ থেকে নিবৃত করা এবং ইংরেজ সরকারের বিপক্ষে গিয়ে উসমানী খিলাফতকে সমর্থন দেয়া থেকে বিরত রাখার জন্য তাঁর উপর অনেক অত্যাচার করা হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁকে সুদূর মাল্টাদ্বীপে নির্বাসনে পাঠানো হয়। ইংরেজরা দাবী করেছিল তিনি যেন মক্কার বিশ্বাসঘাতক গভর্নর শরীফ হোসেনকে ইংরেজদের স্বার্থে সমর্থন দিয়ে খিলাফতের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারী করেন। এ জঘণ্য অন্যায় কাজটি করতে অস্বীকার করায় গাদ্দার শরীফ হোসেন তাকে এবং তার সঙ্গীদেরকে মক্কায় গ্রেফতার করে ইংরেজদের হাতে তুলে দেয়।

    অন্য সব বিষয় নিয়ে কম-বেশী মতভেদ থাকলেও খিলাফত আন্দোলন নিয়ে মুসলিম শিক্ষাবিদদের মাঝে কোন প্রকার অনৈক্য ছিল না। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তার বিখ্যাত পত্রিকা “আল হেলাল”-এ ১৯১২ সালের ২রা নভেম্বর সংখ্যায় নিজের অভিমত এভাবে ব্যক্ত করেছেন : “শুধু উসমানী খিলাফতের হাতেই এখন সেই তলোয়ার আছে যা মুসলিমদেরকে রক্ষা করতে পারে। খিলাফতই হচ্ছে শরীয়তের একমাত্র কর্তৃপক্ষ। এই ব্যবস্থা ওহির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে। এই কর্তৃপক্ষের আনুগত্য করা আল্লাহ্‌’র নির্দেশ। খিলাফতের বিধি-বিধান মেনে চলা ফরয।”

    এভাবে খিলাফত রক্ষার আন্দোলন ভারতময় ছরিয়ে পড়লেও ১৯২৪ সালে তুরস্কে উসমানী খিলাফতের পতনের পর এর ধারাবাহিকতায় এক প্রকার ভাটা পড়ে। তাছাড়া বৃটিশ শাসনের শেষের দিকে স্বাধীনতা আন্দোলনকে প্রাধান্য দেওয়া এবং দেশভাগের প্রশ্নে মতানৈক্য সৃষ্টির ফলে খিলাফতের চেতনা অনেকটাই হ্রাস পেয়ে যায়। যার কুপ্রভাবে উম্মাহ্‌ আজও ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি।

    পাকিস্তান আমলে এ অঞ্চলে ইসলামী দলগুলোর ভূমিকা

    বৃটিশদের কারসাজি এবং মুসলিম লীগের অপরিনামদর্শী তৎপরতার দরুন ভারত বিভক্তির পর পূর্ব-পাকিস্তান নামক অঞ্চলটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় দিক থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন ও অরক্ষিত হয়ে পড়ে। একই রাষ্ট্রভূক্ত দুই অংশের দূরত্ব হয়ে যায় প্রায় ১৯৩২ কিলোমিটার। মাঝখানে থেকে যায় শত্রু রাষ্ট্র ভারত। ভৌগলিকভাবে শুধুমাত্র দক্ষিণের বঙ্গোপসাগর ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের বাকী তিন দিকই রয়ে যায় ভারতের বেষ্টনীতে। রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের অধীনতা, অর্থনৈতিকভাবে শাসকদের বিমাতাসুলভ আচরণ, রাষ্ট্রের মূল নেতৃত্বের সাথে ভাষা ও সংস্কৃতিগত বৈপরিত্য ইত্যাদি সমস্যা ছাড়াও তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের ইসলামী নেতৃবৃন্দের জন্য আরো অনেক সংকট দেখা দেয়। প্রথমত, ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার আশায় পাকিস্তান সৃষ্টির যুক্তি কোনভাবেই তাদের অনুকূলে যায়নি। কারণ শাসকরা প্রথম দিন থেকেই বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে পাকিস্তানকে একটি সেক্যুলার রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যেতে শুরু করে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ইসলামী দলেরই মূল নেতৃত্ব ও কেন্দ্র পড়ে যায় পশ্চিম-পাকিস্তানে। ফলে তাদের কর্ম চেতনায় বড় ধরণের ছন্দপতন ঘটে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, পাকিস্তান সৃষ্টির সময় এ অঞ্চলে মুসলিম লীগই ছিল প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল। আরও যে কয়টি দল তখন ইসলামী দল হিসাবে পরিচিতি লাভ করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামী এবং নিখিল ভারত জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম যা পরবর্তীতে নেজামে ইসলাম পার্টি নামে পুণঃর্গঠিত হয়। তাছাড়া পরবর্তীতে খেলাফতে রব্বানী নামের একটি দলও এখানে বেশ তৎপর ছিল। বর্তমানে অবশ্য এর অস্তিত্ব বিদ্যমান নেই।

    পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথম থেকেই পশ্চিম-পাকিস্তানী নেতারা পূর্ব-পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে এ বৈষম্যের ছাপ ছিল সুস্পষ্ট। দিনে দিনে পুঞ্জীভূত এ বৈষম্যের ফলে পূর্ব পাকিস্তানে গড়ে ওঠে কতগুলো বড় বড় আন্দোলন। এগুলোর মধ্যে ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ এর ছাত্র আন্দোলন, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ এর মুক্তিসংগ্রাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব আন্দোলনের সময় পাকিস্তানপন্থী ইসলামী দলগুলোর নেতিবাচক আচরণে গণমানুষের অধিকার আদায়ে ইসলামের ভূমিকা নিয়ে জনমনে তৈরী হয় বিভ্রান্তিকর আবহ। এই প্রসঙ্গে আমি ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৯ এর অভ্যুত্থান পর্যন্ত তৎপর কয়েকটি ইসলামী দলের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করব।

    মুসলিম লীগ

    ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম লীগ। প্রধানতঃ ইংরেজ শাসকদের অনুগ্রহ ভাজন উপমহাদেশীয় তথাকথিত প্রগতিশীল মুসলিম নেতৃবৃন্দের সেই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন নবাব ভিকারুলমূলক। সভায় নবাব সলিমুল্লাহর প্রস্তাব অনুসারে সর্বসম্মতিক্রমে এই দলটির নাম রাখা হয় ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ’। ভারতবর্ষে মুসলমানদের নিয়ে ইংরেজদের নীল-নকশা বাস্তবায়নের সহযোগী শক্তি হিসাবেই এ দলটি কাজ শুরু করে। বাহ্যত ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেও এ দলের প্রধান ভূমিকা ছিল জাতীয়তাবাদ ও আঞ্চলিকতার ভিত্তিতে বিচ্ছিন্নতাবাদের চেতনাকে সংগঠিত করা।

    কংগ্রেসের মত মুসলিম লীগেরও প্রতিষ্ঠাকালীন অন্যতম ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইংরেজ শাসকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করা। নওয়াব সলিমুল্লাহ নিজে ছিলেন ইংরেজদের সাথে সহযোগিতার পক্ষপাতী। মুসলিম লীগের অন্যান্য নেতারাও দাবী-দাওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন নিবেদন জানানোর বাইরে নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রামের কথা চিন্তা করেননি। ১৯০৬ সালের যে সম্মেলনে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়, তাতে যোগদানের জন্য আমন্ত্রিত হয়েও সে আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ব্যারিষ্টার মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তাঁর বক্তব্য ছিল কংগ্রেসের বাইরে নতুন আরেকটি সংগঠন সৃষ্টি করা হলে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে অনৈক্য বাড়বে। তাঁকে বলা হত হিন্দ-মুসলমান মিলনের অগ্রদূত। পরে অবশ্য ব্যারিষ্টার জিন্নাহ কংগ্রেস ছেড়ে মুসলিম লীগে যোগ দেন। শুধু তাই নয়, একজন ইসমাঈলী শীয়া হওয়া সত্ত্বেও তিনি মুসলিম লীগের সভাপতির পদ লাভ করেন এবং তার সভাপতিত্বেই মুসলিম লীগ পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলন করে।

    বৃটিশ শাসনের শেষের দিকে পাকিস্তান সৃষ্টির প্রস্তাবকে সর্বস্তরের মুসলিমদের নিকট গ্রহণযোগ্য করার জন্য এই দলের তৎকালীন নেতারা বক্তৃতা-বিবৃতি ও প্রচার-পত্রের সাহায্যে ইসলামের বিজয়কে পাকিস্তান কায়েমের লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেন। ‘পাকিস্তানের লক্ষ্য কি, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’- এ ধরণের শ্লোগান তারা জনসম্মুখে তুলে ধরেন। তদানিন্তন প্রাদেশিক মুসলিম লীগের পক্ষে প্রচার সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদ স্বাক্ষরিত একটি প্রচারপত্রে ‘হুকুমতে ইলাহিয়া’ প্রতিষ্ঠাকে পাকিস্তান কায়েমের উদ্দেশ্য বলে ঘোষণা করা হয়। এভাবে তারা মানুষকে বুঝায় যে, পাকিস্তান কায়েম হলেই ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম হবে।

    কিন্তু দেশ ভাগের মাধ্যমে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগ ক্ষমতাসীন হয়ে ইসলাম কয়েমের ধারে কাছেও হাঁটেনি। ক্ষমতা রক্ষা করাই হয়ে যায় তাদের একমাত্র আদর্শ। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ইসলামী রাষ্ট্রের শ্লোগানে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন পাকিস্তানের প্রথম কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভাই গঠিত হয় হিন্দু ও কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের মন্ত্রীদের সমন্বয়ে।

    ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের কান্ড দেখে দলটির স্বাধীনচেতা লোকেরা বেজায় ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত হয়ে উঠে। অনেকেই নবাব-জমিদারদের মুসলিম লীগ ছেড়ে একটি ‘জনগণের মুসলিম লীগ’ গঠনে উদ্যোগী হয়। সে অনুসারে আসাম থেকে আগত মুসলিম লীগ নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও টাঙ্গাইলের জনাব শামসুল হককে যথাক্রমে সভাপতি ও সেক্রেটারী করে ১৯৪৯ সনের ২৪ জুন ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে নতুন আরেকটি দল গঠন করা হয়। পরবর্তীকালে হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী এই দলের সাথে সম্পৃক্ত হন এবং তার অনুসারী শেখ মুজিবুর রহমান নিযুক্ত হন এর অন্যতম জয়েন্ট সেক্রেটারী। মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগিশ, এডভোকেট আতাউর রহমান খান প্রমুখ ব্যক্তিত্বও এই দলের সাথে সম্পৃক্ত হন। এ দলটির মাধ্যমেই তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে অঞ্চল-ভিত্তিক রাজনীতির এক নতুন ধারা সূচিত হয়। কিন্তু এর দ্বারা ইসলামের তো কোন উপকার হয়ইনি বরং এক সময় দলটির নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটিকেই উচ্ছেদ করে (১৯৫৫সালে) সম্পূর্ণ সেক্যুলার আওয়ামী লীগের জন্ম হয়। এভাবেই মুসলিম লীগ সৃষ্টির মাধ্যমে মুসলমানদেরকে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেতনা থেকে বিরত রাখা হয়। ইংরেজ শাসনের পূর্বে ভারতবর্ষে মুসলমানদের আটশ’ বছর শাসন করার সুদীর্ঘ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও হিন্দুদের হাতে ভবিষ্যতে মুসলমানদের স্বার্থ ভুলুন্ঠিত হওয়ার কাল্পনিক ভয় দেখিয়ে উম্মাহ্‌র মধ্যে জন্ম দেয়া হয় সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের এক কূটিল চিন্তা। হুকুমতে ইলাহিয়ার নামে মনোমুগ্ধকর শ্লোগানের আবরণে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয় বিশাল মুসলিম শক্তিকে। এদের ভুল রাজনীতি চর্চার পরিণতিস্বরূপ গোটা পরিস্থিতিই চলে যায় সেক্যুলারদের হাতের মুঠোয়।

    অবশ্য ইসলামের নামে প্রতারণার দায়ে মুসলিম লীগও এ ভূখন্ডে জনগণের প্রচন্ড ক্ষোভের মুখে পড়ে। এতো জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসার মাত্র সাত বছরের মাথায় তারা একেবারে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক নির্বাচনে ৩০৯টি আসনের মধ্যে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ মাত্র ৯টি আসনে নির্বাচিত হয়। এতে মুসলিম লীগ শুধু ক্ষমতাচ্যুতই হয়নি বরং পূব-পাকিস্তানের রাজনৈতিক মঞ্চ থেকেই উৎখাত হয়ে যায়।

    জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম

    এটি মূলতঃ ভারতবর্ষকে বৃটিশ শাসনের কবল থেকে মুক্ত করার সংগ্রামে লিপ্ত বিপ্লবী উলামাদের একটি দল ছিল। যারা ছিলেন শাহ্‌ ওয়ালী উল্লাহ মোহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) এর ভাবশিষ্য। জেহাদে আযাদী নামে দীর্ঘ সংগ্রামের শেষের দিকে ১৯১৯ সালে এই দলটি সাংগঠনিক রূপ লাভ করে। প্রথমে এর নামকরণ করা হয় ‘জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ’। শায়খুলহিন্দ মাওলানা মাহমূদুল হাসান দেওবন্দীকে এই দলের সদর বা প্রধান নিযুক্ত করা হলেও তিনি তখন মাল্টা দ্বীপে বৃটিশদের হাতে বন্দী থাকায় মুফতী কেফায়েতুল্লাহকে ভারপ্রাপ্ত সদর ঘোষণা করে এর কার্যক্রম শুরু করা হয়। ইংরেজ শাসনের শেষপ্রান্তে এসে জমিয়ত নেতৃবৃন্দ বৃটিশ খেদাও আন্দোলনের পাশাপাশি মুসলমান ও ইসলামের স্বার্থে ভারতকে অখন্ড রাখার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। দেশভাগ হয়ে যাওয়ার পর এ অঞ্চলে জমিয়তের রাজনৈতিক তৎপরতা অনেকাংশে হ্রাস পায়। পশ্চিম-পাকিস্তানের তুলনায় তখন পূর্ব-পাকিস্তানে জমিয়তের শক্ত কোন সাংগঠনিক অবস্থানও ছিলনা। দলের প্রধান সারির নেতারা হয় ভারতের নাহয় পশ্চিম-পাকিস্তানের বাসিন্দা ছিলেন। এর পাশাপাশি আরো দুটি কারণে জমিয়ত এখানে দুর্বল ছিল। এক, বৃটিশ শাসন অবসানের পর এই উপমহাদেশে পুর্ণাঙ্গ ইসলাম বা খিলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাদের কোন পরিকল্পিত কর্মসূচী ছিলনা। দুই, এই অঞ্চলে মুসলিম লীগের প্রাধান্য থাকার কারণে সাধারণভাবে জনমত গড়ে উঠেছিল ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান হওয়ার পক্ষে। ফলে পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধী শক্তি হিসাবে জমিয়তের জনসম্পৃক্ততাও ছিল কম। পূর্ব-পাকিস্তানে এই দলটি অনেকটা সিলেটেই সীমাবদ্ধ থাকে। এর আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো এ দলটি শুধুমাত্র উলামা ও মাদরাসা ছাত্র-নির্ভর। জনসম্পৃক্ততা না থাকায় ‘৪৭ পরবর্তী সময়ে পূর্ব-পাকিস্তানে জমিয়ত কেবল কিছু ধর্মীয় ইস্যুতে মিটিং-মিছিল ছাড়া সার্বিক রাজনীতি ও জাতীয় ইস্যুতে প্রভাব ফেলার মত কোন ভুমিকাই পালন করতে পারেনি।

    নেজামে ইসলাম পার্টি

    ১৯৪৫ সালের ২৮ ও ২৯ অক্টোবর কলিকাতার মুহাম্মদ আলী পার্কে মুসলিম লীগের প্রত্যক্ষ সমর্থনে একটি উলামা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলন থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘নিখিল ভারত জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম’ নামে একটি নতুন সংগঠন। এই নতুন জমিয়ত পাকিস্তান প্রশ্নে মুসলিম লীগের পক্ষ নেয়। কিন্তু দেশভাগের পর মুসলীম লীগ নেতৃবৃন্দের ওয়াদা ভঙ্গের ফলে নবগঠিত পাকিস্তানে ‘নেজামে ইসলাম’ তথা ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়া সুদূর পরাহত দেখে তারা নিরাশ হয়ে পড়েন। এক প্রকার প্রতারিত হয়েই ১৯৫২ সালে নিখিল ভারত জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের নেতৃবৃন্দ মুসলিম লীগের সঙ্গ ত্যাগ করে ‘নেজামে ইসলাম পাটি’ নামে পৃথক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই লক্ষ্যে ‘৫২ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ মার্চ বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার হযরত নগরে দলটির কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত অধিবেশনেই মাওলানা আতহার আলী (রহ.) কে সভাপতি, মাওলানা সৈয়দ মুসলেহ উদ্দিনকে সাধারণ সম্পাদক এবং মাওলানা আশরাফ আলী ধর্মন্ডলীকে সহকারী সম্পাদক নির্বাচিত করে ‘নেজামে ইসলাম পার্টি’র কার্যক্রম শুরু হয়। যে কোন মূল্যে পাকিস্তানে নেজামে ইসলাম তথা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে এই পার্টির প্রধান লক্ষ্য হিসেবে স্থির করা হয়। এই একটি মাত্র কথার আকর্ষণ এবং মুসলিম লীগের তুলনায় এই দলের নেতৃতে বড় বড় উলামা থাকায় অল্পদিনেই নেজামে ইসলাম পার্টি একটি শক্তিশালী বৃহৎ দলে পরিণত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে প্রচলিত ধারায় রাজনীতি করা এবং সেক্যুলার রাজনীতির সহযোগী শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হওয়ায় এই দল নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। এর প্রতিষ্ঠাতা নেতাগণ যথেষ্ঠ যোগ্য এবং ক্ষমতা সম্পন্ন আলিম হওয়া সত্বেও পশ্চিমা ধারার গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহ বিহীন সংবিধান দ্বারা পরিচালিত সরকারে অংশ নিয়েছেন। অথচ এমনটি না করে গোটা পশ্চিমা ব্যাবস্থার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবার মত জনসমর্থন এক সময় তাদের ছিল। কিন্তু এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি তারা পরিহার করেছেন। যার ধারাবাহিকতায় বর্তমানে এটি একটি নামে মাত্র দলে পরিণত হয়েছে।

    যুক্তফ্রন্ট গঠন ও নির্বাচিত সরকারে নেজামে ইসলামের অংশ গ্রহণ

    পশ্চিমা ধারার গণতান্ত্রিক নির্বাচন নেজামে ইসলাম বা ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি না হওয়া সত্ত্বেও ১৯৫৪ সালে নেজামে ইসলাম পার্টি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়। শুধু তাই নয়, এই নির্বাচনে তাদের এককালের পৃষ্ঠপোষক ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে পরাজিত করার লক্ষ্যে অপরাপর বিরোধী দলগুলোর সমন্বয়ে একটি যুক্তফ্রন্টও গঠন করা হয়। এই ফ্রন্টে নেজামে ইসলাম পার্টি ছাড়া আরও যে সব দল ছিল সেগুলো হলো আওয়ামী লীগ, কৃষক লীগ ও কৃষক শ্রমিক পার্টি। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রতীক ছিল ‘নৌকা’। যা বর্তমানে আওয়ামী লীগের পরিচয় চিহ্নে পরিণত হয়েছে। ফ্রন্টের পক্ষ থেকে ২১-দফা দাবি সম্বলিত একটি নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করা হয়। এর ভূমিকায় শুধু বলা হয় : ‘কুরআন ও সুন্নাহ-বিরোধী কোন আইন প্রণয়ন করা হবে না।’ ব্যাস এই নেতিবাচক কথাটুকু ছাড়া পুরো ইশতেহারে ইসলামের সপক্ষে কোন ইতিবাচক বক্তব্য ছিল না। এতেই প্রমাণ হয়ে যায় যে এই নির্বাচন নেজামে ইসলাম কায়েমের নির্বাচন ছিলনা। তবু নির্বাচন পরবর্তী কুরআন-সুন্নাহ বিহীন সংবিধান দ্বারা পরিচালিত সরকারে নেজামে ইসলাম পার্টি অংশ নেয় এবং মন্ত্রিত্ব লাভের সুবাদে গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারনী ভূমিকা পালন করে। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে দলটির ৩৬ জন নেতা নির্বাচিত হন। জাতীয় পরিষদে সংসদীয় দলের নেতা ছিলেন দলীয় সভাপতি মাওলানা আতহার আলী (রহ.)। এডভোকেট মৌলভী ফরিদ ছিলেন কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রী। প্রাদেশিক পরিষদের স্পীকার ছিলেন আব্দুল ওহাব খান। এছাড়া আইন, ভূমি ও শিক্ষা মন্ত্রনালয়ও ছিল নেজামে ইসলাম পার্টির মন্ত্রীদের দায়িত্বে। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী মুহাম্মদ আলী পরবর্তীতে নেজামে ইসলাম পার্টিতে যোগ দিলে তাকে দলের সভাপতি নিযুক্ত করা হয়।

    যুক্তফ্রন্টের সরকার ছিল খুবই ক্ষণস্থায়ী, দুর্বল এবং অন্তর্কলহে জর্জরিত। মাত্র ৫৭ দিনের মাথায় এসে ১৯৫৪ সালের ৩০ মে এই সরকারের মন্ত্রীসভাকে বরখাস্ত করা হয়। এ ধরণের জোট ও সরকারে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে নেজামে ইসলাম পার্টি তাদের মূল দাবী তো পূরণ করতে পারেইনি বরং এর পর থেকে তারা দ্রুত জনগণের আস্থা হারাতে শুরু করে। তবুও পরবর্তীতে ইসলামী দলগুলোর জন্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন করা এবং সেক্যুলার সংবিধান দ্বারা পরিচালিত সরকারে অংশ নেওয়ার জন্য এসব ঘটনাবলী দলীল হয়ে দেখা দেয়।

    জামায়াতে ইসলামী

    এ দলটি গঠন করা হয় ১৯৪১ সালের ২৫ আগষ্ট। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন পাঞ্জাবের অধিবাসী মাওলানা আবুল আলা মওদুদী। এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের জায়গায় ইসলামী হুকুমত বা আল্লাহ্‌’র আইনের কথা থাকলেও জামায়াতে ইসলামী তাদের ইতিহাসে কখনও ইসলামের একমাত্র শাসন ব্যবস্থা খিলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করেনি। উল্টো তারা খিলাফতের দাবীকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে বিভিন্নভাবে। তাদের বই-পত্রে শিয়াদের মতো করে খোলাফায়ে রাশেদীন এবং পরবর্তী খলীফাদের অনেকের বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর সমালোচনা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, খিলাফত আন্দোলনকে নিরুৎসাহিত করার জন্য খিলাফত শাসন ব্যবস্থা নিয়েও তারা অনেক ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও কটাক্ষ করেছে এবং এখনও করছে।

    ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের আগে পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াতে ইসলামী’র কোন সংগঠন ছিলনা। শুধু তাই নয় মাওলানা মওদুদীর পুস্তিকাদি উর্দূ ভাষায় লিখিত হওয়ায় এ অঞ্চলে তখন জামায়াতে ইসলামীর কোন পরিচিতিই ছিল না। আইডিএল ও ইসলামী ঐক্য আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবদুর রহীমই প্রথম ব্যক্তি, যিনি জামায়াতে যোগদান করে এই অঞ্চলে দলটির ভিত্তি স্থাপনে সক্রিয়ভাবে উদ্যোগ নেন। তার প্রচেষ্টায় ১৯৪৬ সনে এই ভূখন্ডে জামায়াতের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর তিনি জীবনের যাবতীয় শক্তি একত্রিত করে জামায়াতকে এ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত করেন। অবশ্য এক পর্যায়ে তিনি জামায়াতের সাথে তার সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

    রাজনৈতিক দল হিসাবে জামায়াত প্রথম থেকেই অন্যান্য ইসলামী দলের তুলনায় একটি মজবুত সংগঠন। কিন্তু ইসলামী চিন্তা ও কর্ম পদ্ধতির দিক থেকে এর কোন স্থায়ী অবস্থান তৈরী হয়নি। দলটির আদর্শিক অস্থিতিশীলতা এবং পক্ষ পরিবর্তনের ধরণ বুঝার জন্য এতোটুকু জানাই যথেষ্ঠ যে, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপলাভের স্বার্থে এ পর্যন্ত জামায়াত মোট তেরবার গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করেছে। সর্বশেষ অক্টোবর ২০০৮ এ নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন শর্ত রক্ষা করতে গিয়ে গঠনতন্ত্র থেকে তারা اقيمواالدين এবং ‘আল্লাহু আকবার’ খঁচিত মনোগ্রামটি প্রত্যাহার করে। শুধু তাই নয়, যে শ্লোগান দিয়ে এদেশের বহু তরুণকে তারা জীবন দিতে উৎসাহিত করেছিল, সেই ‘আল্লাহর আইন চাই’ কথাটিও নিবন্ধন লাভের জন্য তাদের গঠনতন্ত্র থেকে বাদ দেয়া হয়।

    পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এ অঞ্চলে যে ধরণের ইসলামী দল আশা করে জামায়াত সব সময় নিজেকে সেই রঙে সাজাবার চেষ্টা করেছে। ইসলামী রাজনীতিকে পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের মোড়ক লাগিয়ে পরিবেশন করা এবং সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার শাসকগোষ্ঠীর সাথে আঁতাতের মাধ্যমে পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থাকে দীর্ঘায়ু করতে সব সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে এ দল। এ প্রসঙ্গে আমি তাদের ইতিহাস থেকে কিছু উদাহরণ তুলে ধরছি।

    ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা সারা পাকিস্তানে সামরিক আইন জারী করেন। এর মাত্র ২০ দিন পর সেনাপতি আইউব খান অস্ত্রের মুখে ইস্কান্দার মির্জাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে নিজে প্রেসিডেন্টের পদটি দখল করে নেন। শুরু হয় কঠোর দমন নীতি। দেশ জুড়ে নেমে আসে রাজনৈতিক নিস্তব্ধতা। ১৯৬২ সালের ১মার্চ আইউব খান আরেকটি নতুন সংবিধান জারী করে কয়েক মাসের মধ্যে সামরিক আইন তুলে নেয়। নতুন সংবিধানে দেশকে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র’ বলা হলেও কুরআন-সুন্নাহ মুতাবেক আইন রচনার কোন অঙ্গীকার তাতে ছিলনা। ফলে দেশ জুড়ে ইসলামী সংবিধানের দাবীতে আইউব বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। কিন্তু জামায়াত এই আন্দোলনের পরিবর্তে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের’ নামে এক উদ্ভট আন্দোলন শুরু করে। এমনকি, এই ক্ষেত্রে সোহ্‌রাওয়ার্দীসহ দেশের ধর্মবিমুখ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও দলগুলোর সাথেও ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে তোলে। এটিই ছিল জামায়াতের পক্ষ থেকে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের’ প্রথম আন্দোলন এবং এভাবেই ইসলামী দাওয়াতের পরিবর্তে ‘গণতন্ত্র উদ্ধার’ করা জামায়াতের প্রধান কাজ হয়ে দেখা দেয়।

    ১৯৬২ সনে ডিক্টেটর আইয়ুব খান নতুন সংবিধানের মাধ্যমে ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ (Basic Democracy) নামে দেশে এক আজব ‘গণতান্ত্রিক’ পদ্ধতি চালু করে। এর অধীনে ১৯৬৪ সনের সেপ্টেম্বর মাসে দেশে একটা প্রহসনের নির্বাচন ডাকা হয়। জামায়াতসহ অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলো আইয়ুবের পাতা এই ফাঁদে সহজেই পা দেয়। শুধু তাই নয় এই নির্বাচনে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি প্রভৃতি দলের সমন্বয়ে সম্মিলিত বিরোধী দল COP নামে একটি মোর্চা গঠন করে। এই মোর্চা থেকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র বোন ফাতেমা জিন্নাহকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসাবে আইয়ুবের বিরুদ্ধে বিরোধী দলসমূহের একমাত্র প্রার্থীরূপে মনোনয়ন দেয়া হয়। উপমহাদেশে নারী নেতৃত্বের প্রতি এই প্রথমবারের মতো জামায়াতসহ কয়েকটি ইসলামী দলের সমর্থন ইসলামী রাজনীতিকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে। এই ঐতিহাসিক ভুলটিকেই বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক ইসলামী দল নারী নেতৃত্বের অধীনে নির্বাচনী জোট ও সরকারে অংশ গ্রহণের দলীল হিসাবে ব্যাবহার করে থাকে। যদিও ইসলামে নারী নেতৃত্বের কোন অবকাশ নেই। সেদিনের সেই হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে জামায়াত ও তার শরীক দলগুলোর ইসলামী আন্দোলন যে কি তা মানুষের কাছে ম্পষ্ট হয়ে উঠে। তাই ১৯৬৫ সনের নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহ’র চরম পরাজয় ঘটে। এর মাধ্যমে জামায়াত এক প্রকার কোনঠাসা হয়ে পড়ে।

    এই পর্যায়ে এসে দলটি নতুন রূপ ধারণ করে। পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট’ (PDM) নামে পুনরায় একটি জোট গঠন করে। জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এবার আট-দফা দাবির ভিত্তিতে নতুন করে আইয়ুবের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। কিন্তু ১৯৬৭ সালে যখন ৬ দফার ভিত্তিতে আইয়ুবের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে প্রচন্ড গণআন্দোলন শুরু হয়, তখন জামায়াত ৫ দফার নামে আরেকটি আন্দোলন শুরু করে প্রকারান্তরে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনকে ব্যহত করার চেষ্টা করে। তারা বার বার অন্যায়ভাবে ইসলামকে জনস্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে। পশ্চিম পাকিস্তানের জালিম শাসকদের অনুকুলে চলে যায় তাদের অবস্থান। এটিই ছিল জামায়াতের জন্যে একটি গুরুতর রাজনৈতিক বিপর্যয়। এ থেকেই জামায়াত জনস্বার্থ বিরোধী একটি বিচ্ছিন্ন দলে পরিণত হয়। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বিষয়টিকে আরো সুস্পষ্ট করে তোলে।

    ১৯৭০ সনে জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামী দল যৌথভাবে সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদন্দ্বীতা করে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে একেবারে শূন্যের কোটায় নেমে আসে। এমনকি পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশে) দলটির অস্তিত্ব পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়ে যায়।

    ১৯৭১ সনে স্বাধীনতা আন্দোলন চলাকালে জামায়াত নেতাদের ভুমিকার দরুণ এ অঞ্চলে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের যে ক্ষতি হয়েছে তা আজও পূরণ করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তারা পূর্বের সুবিধাবাদী আন্দোলনের ধারা বর্জন করেনি। ১৯৯১ সালে নির্বাচনের পর বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে জামায়াত বেগম খালেদা জিয়াকে সমর্থন দেয়। এরপর ১৯৯৫ সালে আরেক মহিলা নেত্রী আওয়ামীলীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার সাথে ঐক্য গড়ে তাদেরই সমর্থনে গড়া খালেদা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। এভাবেই বরাবর অস্বচ্ছ ও ভুল পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে যে, মুখে ইসলামের কথা বললেও রাজনৈতিক সুবিধার বিপরীতে ইসলামী স্বার্থ কখনই তাদের কাছে মূখ্য ছিল না।

    এখানে একটি তথ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ১৯৬৪ সনের ৬ জানুয়ারী জামায়াতকে নিষিদ্ধ দল হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এর আগে ১৯৫৭ সালে জামায়াত প্রথম বারের মত ভাঙ্গনের সন্মুখীন হয়। দলের অভ্যন্তরে এক তীব্র আদর্শিক সংকট মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। ফলে মওলানা মওদূদী পদত্যাগ করেন। পরে অবশ্য তাকে পদে ফিরতে হয়। তবে ঐ সময় অনেকেই জামায়াত ছেড়ে চলে যায়।

    ১৯৭১ এর পর থেকে বাংলাদেশে ইসলামী দলগুলোর অবস্থান

    ১৯৪৭ পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানের ইসলামী সংগঠনগুলোর ইতিহাস যেমন গৌরবের নয়, তেমনি ১৯৭১ পরবর্তী বাংলাদেশের ইসলামী সংগঠনগুলোও গণ-আকাঙ্খার যথার্থ প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি। মাঝখানে শুধুমাত্র মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এর আহবানে ‘খেলাফত আন্দোলন’ নামে স্বল্প সময়ের জোয়ার ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ছাড়া আর কোন আশার আলো দেখা যায়নি এ সময়ের ইসলামী দলগুলোর আচরণ থেকে। খেলাফত আন্দোলন ভাঙ্গনের মাধ্যমে নিজেদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের জন্য ঐক্যবদ্ধ ও স্বতন্ত্র কোন গতিপথ সৃষ্টি করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এসময়ে ইসলামী দলগুলোর মাঝে ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে পুঁজিবাদী শাসনের অংশীদার হওয়ার প্রবনতা লক্ষ্য করা গেছে সবচেয়ে বেশী। এমপি-মন্ত্রী হওয়ার লোভে নিজ আদর্শ ছেড়ে দিয়ে বড় দলের পিছনে চলার নীতি চালু হয়েছে ব্যাপকভাবে। ইসলামী ইস্যুকে ব্যবহার করে স্বার্থসিদ্ধির জন্য শাসক শ্রেণীর সাথে দর কষাকষি প্রকাশ্য রূপ লাভ করেছে। এইসব আচরণে ইসলামী আন্দোলনের প্রকৃত চেহারা আজ সকলের কাছে অপরিচিত হয়ে গেছে। অথচ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের বৈরী পরিবেশে ইসলামী দলগুলো ভিন্ন এক অঙ্গীকার নিয়ে আন্দোলন শুরু করেছিল। আমাদের রাজনৈতিক সংগ্রামের সহযাত্রী হিসাবে বাংলাদেশে তৎপর ইসলামী দলগুলো সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এখানে একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা হলো।

    বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান ও ইসলামী রাজনীতি

    ১৯৭২ সনে বাংলাদেশের জন্য একটি সংবিধান রচনা করা হয়। সম্পূর্ণ সেক্যুলার দৃষ্টি ভঙ্গিতে রচিত এই সংবিধানের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার পরিকল্পিতভাবে এদেশে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করে। যদিও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জামায়াতে ইসলামী’র ভূমিকা এর জন্য অনেকাংশে দায়ী ছিল, তবুও এই অজুহাতকে ব্যবহার করে প্রথম থেকেই বাংলাদেশকে একটি ইসলামশূন্য রাষ্ট্রে পরিণত করার বিদেশী চক্রান্তের অংশ ছিল এই সংবিধান। সমাজতন্ত্রের তল্পীবাহক ডক্টর কামাল হোসেন ছিলেন এর অন্যতম রচয়িতা। মুজিব সরকারের আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী হিসাবে ১৯৭২ সালের ৩০শে মার্চ এক বিবৃতিতে ডক্টর কামাল বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধানে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ন্যায় মৌলিক নীতিসমূহ বিদ্যমান থাকিবে।’ মূলতঃ এই চার নীতিমালার ভিত্তিতেই তৈরী হয় বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান। যার মাধ্যমে সদ্য স্বাধীন মুসলিম প্রধান এই দেশটিতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজনীতি করার পথ সম্পূর্ণরূপে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়।

    সংবিধান পরিবর্তন ও বিসমিল্লাহ’র রাজনীতি

    ধর্মনিরপেক্ষতার নামে বাংলাদেশকে ইসলামী সভ্যতাশূন্য করার আওয়ামী দুঃসাহস ১৯৭৫ সালে এসে আরও ভয়াবহ রূপ লাভ করে। এক তরফা নির্যাতন চালাবার প্রয়াসে সব দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ করে চালু করা হয় এক দলীয় বাকশালী শাসন। এই জুলুম বেশী দিন টিকেনি। ‘৭৫ এর ১৫ আগষ্ট পট পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতারও পরিবর্তন হয়। দৃশ্যপটে আসেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম বারের মত চালু করা হয় সামরিক শাসন। এরপর ১৯৭৭ সনের শুরুতে জিয়াউর রহমান সংবিধানে একটি সংশোধনী আনেন। যার মধ্যে থাকে বিসমিল্লাহ’র সংযোজন। আর উল্লেখ থাকে ‘আল্লাহ্‌’র উপর পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থাই হবে সংবিধানের মূল ভিত্তি।’ এতেই তৎকালীন ইসলামী দলগুলো জিয়াউর রহমান এবং তার জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে ইসলামের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। এরপর থেকে সম্পূর্ণরূপে ইসলামী আদর্শের বিপরীত অবস্থানে থাকা এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাঁবেদার হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র একটি কুফুরী সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ জড়াবার রাজনীতি দিয়েই জিয়া ও তার বিএনপি এদেশের ইসলামী শক্তির অভিভাবকের মর্যাদা দখল করে নেয়। আর কিছু কিছু ইসলামী দল হয়ে যায় বার বার বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার বাহন। যেন এ দলগুলোর আদর্শই হচ্ছে ইসলামী রাজনীতির লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে বিএনপির জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সেবা করা।

    জামায়াত যেভাবে পুনর্বাসিত হয়

    একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, জেনারেল জিয়াউর রহমান ইসলামী রাজনীতির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়ায় ইসলামী দলগুলোর জন্য কিছুটা অনুকূল পরিবেশ তৈরী হয়। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই জামায়াত নেতারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়ার চেষ্টা শুরু করে। তবে মাওলানা আবদুর রহীম এবার আগের মতো পুরাতন দলের নামে কাজ করতে রাজী ছিলেন না। তাই তিনি আগের দলগুলোর সমন্বয়ে একটি সম্মিলিত ইসলামী দল গঠনের উদ্যোগ নিলেন। এর প্রেক্ষিতে ১৯৭৬ সালে জামায়াতসহ তৎকালীন কয়েকটি ইসলামী দলের নেতৃবৃন্দ একত্রিত হয়ে এই ভাষায় অঙ্গিকার করেন যে, “আমরা অধুনালুপ্ত কতিপয় ইসলামী দলের নেতৃবৃন্দ আল্লাহ্‌’কে হাজির নাজির জেনে এই অঙ্গীকার করছি যে, আমরা অতীতের পরিচিতি ভুলে সম্পূর্ণ নতুন নামে একটিমাত্র ইসলামী দল গঠন করব।” এই অঙ্গীকারের ভিত্তিতে সাবেক জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, খেলাফতে রব্বানী, পিডিপি, বিডিপি, আইডিপি ও ইমারত পার্টিসহ মোট সাতটি দল নিয়ে ‘ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ’ (IDL) নামে একটি নতুন দল গঠন করা হয়। কিন্তু কিছুদিন পর রাজনৈতিক দূর্দিন কেটে গেলে জামায়াত নেতারা আল্লাহ্‌’র নামে নেয়া শপথ ভঙ্গ করে পুনরায় জামায়াতে ইসলামী দলের নামে এ দেশে রাজনীতি শুরু করে। এভাবেই জামায়াত স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ইসলামী রাজনীতিতে অনৈক্যের সূচনা করে এবং ১৯৮০ সনে আইডিএল ভেঙ্গে পূর্বনামে পুনুরুজ্জীবিত হয়।

    মাওলানা আবদুর রহীম এবার আর জামায়াতের রাজনীতির সাথে একাত্ম হননি। তিনি ১৯৮৪ সালের ৩০ শে নভেম্বর আইডিএলকে ইসলামী ঐক্য আন্দোলন নাম দিয়ে নতুন গতিতে রাজনীতি শুরু করেন।

    বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন

    ১৯৮১ সনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে প্রবীণ আলেম মওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন ব্যক্তিত্ব রূপে আবির্ভুত হন। তাঁর ‘তওবার রাজনীতি’র ডাক দেশের রাজনীতি বিমূখ ইসলামী মহলে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিশেষতঃ তার ছাত্র-শিষ্যদের এক উল্লেখযোগ্য অংশ এ ডাকে সাড়া দিয়ে অচিরেই সামনে এগিয়ে আসেন। তাদেরকে নিয়েই তিনি ১৯৮১ সনের ২৯ নভেম্বর ঢাকার ঐতিহাসিক শায়েস্তা খান হলে ‘খেলাফত আন্দোলন’ নামে একটি সংগঠনের কার্যক্রম ঘোষণা করেন। প্রায় ৫০ বছর পর খেলাফত আন্দোলনের নামে এ অঞ্চলে আবার সৃষ্টি হয় এক অভাবনীয় ঐক্যের জোয়ার। স্বাধীনতার পর এই প্রথম উলামাদের মাঝে তৈরী হয় নতুন প্রাণচাঞ্চল্য। ইতি পূর্বে অনেকের মাঝে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে, ইসলামে কোন রাজনীতি নেই। তাছাড়া পাকিস্তান হওয়ার পর খিলাফত কায়েমের সুনির্দিষ্ট দাবীতে এ অঞ্চলে কোন আন্দোলন না থাকায় জাতিগতভাবে সকলেই এই গুরুত্বপূর্ণ ফরযটি তরক করার গুনায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। হজরত হাফেজ্জী হুজুর এ জন্য জাতিগত ভাবে সকলের প্রতি তওবার আহ্বান জানান। মূলতঃ গায়রুল্লাহর প্রবর্তিত প্রতারণার রাজনীতি থেকে আল্লাহ্‌’র প্রবর্তিত সততার রাজনীতিতে প্রবর্তনের নাম দেয়া হয়েছিল তওবার রাজনীতি।

    খেলাফত আন্দোলনের গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছ, খেলাফত আন্দোলন কোন পার্টি নয়, এটি একটি আন্দোলন। দল-মত ও দেশকালের উর্ধ্বে থেকে গোটা মানব মন্ডলীকে আল্লাহ্‌’র যমীনে আল্লাহ্‌’র খেলাফত কায়েমের ডাক দেয়াই ছিল এর উদ্দেশ্য।

    কয়েক বছরের মাথায় হযরত হাফেজ্জী হুজুরের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও জনপ্রিয়তার বিবেচনায় তাঁকে কেন্দ্র করেই দেশের ছোট বড় এগারটি সংগঠন ও কতিপয় বিশিষ্ট নাগরিককে নিয়ে ‘খিলাফত কায়েমের লক্ষ্যে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ’ নামে একটি বৃহত্তর মোর্চা গড়ে উঠে। হাফেজ্জী হুজুরের বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, মাওলানা আব্দুর রহীমের ইসলামী ঐক্য আন্দোলন, মেজর (অব.) এম এ জলীলের জাতীয় মুক্তি আন্দোলন প্রভৃতি সংগঠন এ মোর্চাকে জনগণের আশা-আকাঙ্খার কেন্দ্র-বিন্দুতে পরিণত করার লক্ষ্যে দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করতে থাকেন।

    ১৯৮২ সনের মার্চে সেনাপ্রধান এরশাদ বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখল করলে হাফেজ্জী হুজুর তার বিরুদ্ধে প্রচন্ড আন্দোলন গড়ে তোলেন। তবে জামায়াত এ সময় স্বৈরাচারের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। ১৯৮৬ সনে এরশাদ যখন তার স্বৈরশাসন দীর্ঘায়িত করতে পাতানো নির্বাচনের ব্যবস্থা করে, তখন এ নির্বাচনকে বৈধতা দেয়ার জন্য জামায়াত বিএনপির সঙ্গ ত্যাগ করে আওয়ামী লীগের অনুসরণে নির্বাচনে অংশ নেয়।

    বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টিকরে খিলাফত কায়েমের লক্ষ্যে গঠিত ‘সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ’ তাদের ঐক্য বেশী দিন ধরে রাখতে পারেনি। ফলে হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বে বাংলাদেশে খিলাফতের রাজনীতি যে আশার আলো ফুটিয়েছিল তাও ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। ১৯৮৫ সনে হযরত হাফেজ্জী হুজুরের জীবদ্দশায় তারই শিষ্য শায়খুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হক হাফেজ্জীর নেতৃত্বাধীন দল থেকে বের হয়ে নিজ নেতৃত্বে খেলাফত আন্দোলন (আ-গা) নামে আরেকটি দল গঠন করেন। এ দলটিই ১৯৮৯-এর ১২ অক্টোবর যুব শিবিরের সাথে একাকার হয়ে খেলাফত মজলিস নামে নতুন দল হিসাবে আত্ম প্রকাশ করে। উল্লেখ্য ১৯৮২ সনে অধ্যাপক আহমদ আবদুল কাদেরের নেতেৃত্বে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির থেকে বের হয়ে আসা একটি অংশ যুব শিবির নামে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল।

    ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন

    এই দলটি একক কোন রাজনৈতিক দল হিসেবে যাত্রা শুরু করেনি। বরং অনেকগুলো ইসলামী দলের সমন্বয়ে ইসলামী শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবীতে এর কার্যক্রম শুরু করা হয়। পরে অবশ্য এই ঐক্য বিনষ্ট হয়ে যায় এবং এটি একটি একক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়।

    ১৯৮৭ সনে তদানিন্তন সময়ের কয়েকজন বিশিষ্ট আলিম, পীর-মাশায়েখ এবং ইসলামী রাজনীতিবিদ অনুভব করলেন ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যাপকভিত্তিক ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন – চরমোনাই’র পীর মাওলানা সৈয়দ ফজলুল করিম, শায়খুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হক, ঐক্য আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আব্দুর রহীম, জামায়াতের মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী, ব্যারিস্টার মাওলানা কোরবান আলী, আওলাদে রাসূল মাওলানা আবদুল আহাদ মাদানী, তৎকালীন যুব শিবিরের সভাপতি অধ্যাপক আহম্মদ আব্দুল কাদের প্রমূখ। ঐক্যের জন্য পবিত্র কুরআন ছুঁয়ে তারা কঠিন শপথ করলেন। সিদ্ধান্ত হলো ১৯৮৭ সালের ৩ মার্চ, সকলের উপস্থিতিতে একটি সাংবাদিক সম্মেলনে এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ঘোষণা দেয়া হবে এবং এই ঐক্য প্রক্রিয়ার অন্যতম উদ্যোক্তা মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী ঘোষণাপত্র পাঠ করবেন। কিন্তু সেদিন সম্মেলনস্থলে গিয়ে জানা গেল ঐক্যবদ্ধ ইসলামী আন্দোলনের উদ্যোক্তা মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী দেশ ছেড়ে উধাও হয়ে গেছেন। তিনি নাকি নিজ দল জামায়াতের চাপে ইতিমধ্যেই পাড়ি জমিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে। কারণ জামায়াতে ইসলামীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে আরো কোন শক্তিশালী ইসলামী ব্লক গড়ে উঠুক, এটা নাকি জামায়াত নেতারা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। যাই হোক নির্ধারিত দিনেই ঢাকাস্থ মতিঝিলের হোটেল ‘শরীফস ইনে’ অনুষ্ঠিত এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের আত্মপ্রকাশ ঘটলো। ঘোষণাপত্র পাঠ করলেন পীর সাহেব চরমোনাই। ১৩ মার্চ ১৯৮৭ ছিল জনসম্মুখে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের আত্মপ্রকাশের দিন। এ উপলক্ষে আয়োজিত শাপলা চত্বরের সমাবেশে এরশাদ সরকারের পুলিশী আক্রমণ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের চেতনাকে আরো শানিত করে। কিন্তু কিছুদিন পর এরও একই পরিণতি ঘটে। অনৈক্য। ভাঙ্গন। হতাশা।

    ১৯৮৭ সনের ১ অক্টোবর মাওলানা আব্দুর রহীম ইন্তেকাল করেন (ইন্নানিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। এরপর ‘৯১এর জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়া না নেয়ার প্রশ্নে ইসলামী ঐক্য আন্দোলন দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ে। ব্যারিস্টার মাওলানা কোরবান আলীর নেতৃত্বে একটি অংশ ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনে থেকে যায়, আর হাফেজ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে আরেকটি অংশ এ ঐক্য থেকে বের হয়ে যায়। অন্য দিকে শায়খুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হকের নেতৃত্বাধীন খেলাফত আন্দোলন (আ-গা) এবং ইসলামী যুব শিবিরও এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে থাকার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ১৯৮৯-এর ১২ অক্টোবর খেলাফত আন্দোলন (আ-গা) ও যুব শিবিরের এক যৌথ বৈঠকে খেলাফত মজলিস নামে নতুন দল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। শেষ পর্যন্ত ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন চরমোনাইর পীর সাহেবের নেতৃত্বাধীন একটি একক দলে পরিণত হয়।

    ২০০১ এর নির্বাচনে জাতীয় স্বার্থের ঠুনকো দোহাই দিয়ে যখন অনেক ওলামা ও ইসলামী দল নারী নেতৃত্বের অধীনে জোটবদ্ধ নির্বাচনে অংশ নেয়, তখন ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন জামায়াত-বিএনপি’র সাথে না হলেও এরশাদের সাথে ঠিকই নির্বাচনী জোট বাঁধে। এ দলটি অন্য ইসলামী দলের তুলনায় কিছুটা স্বকীয় অবস্থানে থাকলেও প্রচলিত পদ্ধতির গণতান্ত্রিক নির্বাচনের বাহিরে থেকে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার স্বতন্ত্র ধারা অনুসরণ করতে পারেনি। অবশেষে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন লাভের জন্য ২০০৮ এর অক্টোবরে বহু ঘটনার জন্ম দিয়ে তৈরী হওয়া ‘ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন’ তাদের নাম পরিবর্তন করে ‘ইসলামী আন্দোলন’ নাম ধারণ করে।

    ইসলামী ঐক্যজোট

    ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর একটি স্মরনীয় গণআন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে ৷ এরপর ১৯৯১ সনের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামী ঘরানায় চালু হয়ে যায় ভিন্ন রকম হিসাব-নিকাশ। নতুন করে তৎপর হয়ে ওঠেন ইসলামী জগতের ঐ সকল কুশীলবগণও যারা সদ্য হযরত হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বাধীন খেলাফত আন্দোলন থেকে বের হয়ে এসেছেন। এর মাঝে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন হাফেজ্জী হুযুরের জামাতা মুফতী ফজলুল হক আমিনী। যিনি হাফেজ্জীর ইন্তেকালের পর (১৯৮৭) খেলাফত আন্দোলন ত্যাগ করে ইস্যু ভিত্তিক আন্দোলনের মাধ্যমে সকলের নজর কাড়তে সক্ষম হন। খিলাফত ব্যবস্থার পক্ষে জনমত গঠন ও গণবিপ্লব সৃষ্টির পরিবর্তে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা লাভের উচ্চাভিলাষ থেকে তিনি এবং অন্যান্য কয়েকটি ইসলামী দলের নেতৃবৃন্দ মিলে একটি ইসলামী ঐক্যজোট গঠন করেন। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, তখন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া তো সম্ভব হয়ই নি, বরং নির্বাচন চলাকালেই এই ঐক্য বিনষ্ট হয়ে যায়। অবশ্য অনেকেই নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা, দেশের মাদরাসাগুলোর উপর প্রভাব বিস্তার করা এবং ক্ষমতাসীনদের সাথে দর কষাকষির হাতিয়ার হিসাবে এই নামটিকে ব্যবহার করেছেন। এই প্রবণতা বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি ধারার জন্ম দেয়, তা হলো ইসলামী আদর্শের তোয়াক্কা না করে প্রচলিত পুঁজিবাদী রাজনীতির সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়া। এর ফলে ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্বতন্ত্র ভাবধারা এবং সঠিক রাজনীতি ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়।

    ১৯৯১ সনে গঠিত বিএনপি সরকারের দলীয় করণ ও দেশ পরিচালনায় ব্যর্থতার ফলে ১৯৯৬ এর নির্বাচনে ইসলাম বিদ্বেষী আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসে। এরপর ইসলামের উপর একের পর এক আঘাত আসতে থাকে। আওয়ামী সরকারের দুঃশাসন, ইসলাম ও ওলামা বিদ্বেষী আচরণ ইসলামী দলগুলোকে আবারও ঐক্যবদ্ধ করার পরিবেশ তৈরী করে দেয়। কিন্তু কিছু কিছু নেতার অতীত ভূমিকা অভিজ্ঞজনদেরকে এই ঐক্যে তেমন আকৃষ্ট করতে পারেনি। তদুপরি ২০০১ সনে মহিলা নেত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির অধীনে চারদলীয় জোটে থাকা না থাকাকে কেন্দ্র করে ইসলামী ঐক্যজোটে আরেক দফা ভাঙন দেখা দেয়। শাইখুল হাদীস ও আমিনীর নেতৃত্বে খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী মোর্চা প্রভৃতি দল বিএনপি ও জামায়াতের সাথে চার দলীয় জোটভূক্ত হয়ে নির্বানে অংশ নেয়। আর ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন জোট বাঁধে এক কালের স্বৈরশাসক এরশাদের সাথে। নির্বাচনোত্তর খালেদা জিয়ার সরকারে মন্ত্রিত্ব পাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে ঐক্যজোটের ঘনিষ্টতা একেবারে খানখান হয়ে যায়। মুফতী ফজলুল হক আমিনী শাইখুল হাদীস আজীজুল হকের পরিবর্তে নিজেকে ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান ঘোষণা করলে শাইখুল হাদীস খেলাফত মজলিস নিয়ে ঐক্যজোট থেকে বের হয়ে আসেন। এরপর থেকে এই দলটি একাই নিজেদেরকে ইসলামী ঐক্যজোট বলে দাবী করতে থাকে। এদিকে সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখার প্রতিযোগীতার দ্বন্দে ঐক্যজোট আমিনী অংশের নতুন মহাসচিব নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি মুফতী ইজহারুল ইসলাম চৌধুরীকে জোট থেকে বহিষ্কার করা হয়। এ নিয়ে ভেঙ্গে যায় নেজামে ইসলাম পার্টি। নতুন নেজামে ইসলাম পার্টি ঘোষণা করে মুফতী ইজহারুল ইসলামও নিজেকে ঐক্যজোটের নেতা বলে দাবী করেন। মিসবাহুর রহমান নামে এক হকার নেতাকে মহাসচিব নিযুক্ত করার কয়েকদিন যেতে না যেতে সেও বিদ্রোহ করে মুফতী ইজহারের সাথে। ইজহারের জোট ভেঙে সে তার দলের নাম দেয় বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোট। অন্যদিকে নেতৃত্বের কোন্দলে পড়ে ভেঙে যায় খেলাফত মজলিস। ২০০৫ সনের ২২ মে শাইখুল হাদীসের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে আহমদ আব্দুল কাদির তার পুরাতন যুব শিবিরের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে আরেকটি খেলাফত মজলিসের জন্ম দেয়।

    এমতাবস্থায় মুফতী আমিনী চারদলীয় জোটে ইসলামী ঐক্যজোটের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এই নব গঠিত খেলাফত মজলিসের নামই ব্যবহার করতে থাকেন। এরই মধ্যে ঘটে যায় আরেক ভয়াবহ ঘটনা। স্মরণ কালের সকল ইতিহাস ব্রেক করে মুফতী ইজহার ফুলের তোড়া দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব বরণ করে নেন। আর ২০০৬ সালের ২৩ শে ডিসেম্বর শাইখুল হাদীস নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিস পাঁচ দফা চুক্তির ভিত্তিতে চির শত্রু আওয়ামীলীগের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দেয়। এভাবে ক্ষণিকের ক্ষমতা লোভী কতিপয় নেতার আচরণ বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনকে ভাবগাম্ভীর্যহীন একটি ঠাট্টার বস্তুতে পরিণত করে।

    ফলাফল বিশ্লেষণ

    গত অর্ধ শতাব্দীর ইতিহাস একথা প্রমাণ করেছে যে, এদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ক্রমান্বেয়ে জোরদার হওয়ার পরিবর্তে অধঃগতির দিকেই ধাবিত হয়েছে বেশী। গণবিপ্লবের মাধ্যমে বস্তুবাদী রাজনীতির পশ্চিমা ধারার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবার যাবতীয় উপাদান বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও ইসলামী আন্দোলন এখানে কাঙ্খিত ফলাফল অর্জন করতে পারে নি। এর কারণ হিসেবে যে সব বিষয়কে চি‎হ্নিত করা হয়েছে তা নিন্মরূপ:-

    ক. চিন্তাগত দুর্বলতার দরুন ইসলামকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দর্শন হিসাবে তুলে ধরতে না পারা। আভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক এবং বিশ্ব রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য পূর্ববর্তী উলামাগণ খিলাফত প্রতিষ্ঠা করাকে যে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, গত ৫০ বছরের রাজনীতিতে সামগ্রিকভাবে বিষয়টির সে ধরণের গুরুত্ব বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়া।

    খ.    পদ্ধতিগত ভুলের দরুন বার বার পুঁজিবাদী শত্রুর ছকে তৈরী করা তথা কথিত গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতির স্রোতে গা ভাসিয়ে আপোষমূলক প্রবণতায় জড়িয়ে যাওয়া।

    গ.    রাজনৈতিক দর্শন হিসাবে খিলাফত শাসনের প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ ও আঞ্চলিকতার চিন্তার মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়া।

    ঘ.    ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে ইসলামের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার পরিবর্তে একটি বিশেষ শ্রেণীর মাঝে এর আংশিক চর্চা করা এবং প্রকৃত সংগঠন বলতে যা বুঝায় তা গঠন না করে শুধুমাত্র মাদরাসার ছাত্র দিয়ে অনিয়মিত আন্দোলন করা।

    ঙ.    একদিকে নিজেরা বিশ্ব রাজনীতির গতিবিধি লক্ষ্য রেখে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়া অন্যদিকে এ ধরণের যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মাঝে ইসলামী রাষ্ট্রের স্বরূপ ও ভিশন তুলে ধরতে না পারা।

    চ.    ইসলামের মূলনীতি অনুসরণ না করে ব্যক্তি কেন্দ্রীক দল গঠনের প্রবণতা এবং ব্যক্তির ইমেজ দিয়ে আবেগময়ীতার জন্ম দেয়া। পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদের তাবেদার শক্তিগুলোর বিপরীতে গণআন্দোলন গড়ে তোলার পরিবর্তে তাদের রাজনীতি অনুসরণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া।

    ছ.    গণমুখী ও ইতিবাচক রাজনীতি দিয়ে জনস্বার্থের পক্ষে শক্ত ভূমিকা পালনের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জনের পরিবর্তে বিশেষ ঘটনাবলী ও ইস্যুর মাঝে ইসলামী রাজনীতিকে সীমাবদ্ধ রাখা।

    জ.    সর্বোপরি লক্ষ্যহীন পথ চলা, অপরিনামদর্শী বাগাড়ম্বর, ক্ষণিকের সুবিধাভোগের লোভে আদর্শ বিবর্জিত হয়ে সেক্যুলার দলগুলোর সাথে গাঁটছড়া বাধা ইত্যাদি কারণে জনসমর্থন হারানো।

    এই ছিল গত অর্ধ শতাব্দী ধরে চলা এ অঞ্চলের ইসলামী রাজনীতির সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু তা’আলা আমাদেরকে এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সঠিক পথে অগ্রসর হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন

    মাওলানা মামুনুর রশীদ
    ২০০৮

  • ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা

    ইসলামের সাংস্কৃতিক জ্ঞান অথবা বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান– উভয়দিক থেকেই মুসলিম বিশ্ব বর্তমানে অনেক পিছিয়ে আছে। এমনকি কিছু মুসলিম দেশে যেমন: বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফ্রিকার কিছু দেশের অশিক্ষিতের বিস্ময়কর রকমের উচ্চহার এসব দেশকে বিপদগ্রস্ত করে তুলেছে। মুসলিম ভূখণ্ডসমূহের অবস্থা এতটা করুণ হওয়ার পেছনে অনেক ‘তথাকথিত আধুনিক মুসলিম’ ইসলামকে দায়ী করার চেষ্টা করে। ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব এবং শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলিমদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতাই মূলত এর জন্য দায়ী। এ প্রবন্ধে মূলত ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব, শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলিমদের ইতিহাস, শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা এবং ভবিষ্যৎ খিলাফত রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হবে।

    ইসলামে জীবনসম্পর্কে যে সমস্ত ধ্যান-ধারণা উপস্থাপন করে সেগুলো আমাদের পছন্দ, অপছন্দ এবং কাজকর্মকে নির্ধারণ করে। ইসলামে উপস্থাপিত ধ্যান-ধারণাসমূহকে জানা এবং এগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করার মাধ্যমেই মূলত আমাদের মাসসিকতা এবং স্বভাব গড়ে উঠে এবং এ দুটোর সমন্বয়ে আমরা ইসলামী ব্যক্তিত্বে পরিণত হই। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-

    “বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? [আল-যুমার:৯]

    রসুল (সা) বলেন, “জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরয।” [বায়হাকী]।

    আবার শিক্ষালব্ধ জ্ঞান নিয়ে চিন্তাভাবনা করাটাকেও ইসলাম যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করেছে। যেমন রাসূল (সা) বলেন- “এক ঘণ্টা চিন্তাভাবনা করা সারারাত ইবাদত করার চেয়ে উত্তম।” [আবু আনাস এবং আবু দারদা কর্তৃক বর্ণিত]

    রাসূল (সা) মুসিলমদের শিক্ষাদানে বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতেন। যেমন তিনি প্রতি দশজন মুসলিমকে পড়তে শেখানোর বিনিময়ে একজন করে বদরের যুদ্ধবন্দীকে মুক্ত করেছিলেন।

    প্রকৃতপক্ষে যে সমস্ত চিন্তাভাবনার উপর ভিত্তি করে কোন একটা সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয় সে সভ্যতার লোকজনকে ঐ নির্দিষ্ট চিন্তাভাবনায় উদ্বুদ্ধ করার প্রধান উপায় হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থা। শত শত বছর জুড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি তাদের তরুণদেরকে শিক্ষাদানের লক্ষ্যে শিক্ষাদান পদ্ধতির রূপরেখা নির্ধারিত করেছে এবং সিলেবাস প্রণয়ন করেছে। ইতিহাস থেকে দেখা যায়, যখন কোন জাতির উপর আধিপত্য বিস্তারের প্রক্রিয়া চলে তখন তার শিক্ষাব্যবস্থা বা সিলেবাস (পাঠ্যসূচি) পরিবর্তন করে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা বা সিলেবাস নির্ধারণ করা হয় যাতে সে জাতির লোকজনের ভূমি বা সম্পদের পাশাপাশি তাদের মনস্তত্বের উপরও বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য আরোপ করা সম্ভব হয়। এ ঐতিহাসিক বাস্তবতা বর্তমান পৃথিবীতেও চোখে পড়ে যখন দেখা যায় যে নিজেদের আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সামঞ্জ্যতা বিধানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র মুসলিম বিশ্বের উপর চাপ প্রয়োগ করছে মুসলিমদের শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তন করার জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের এ চাপের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে বিশেষত মুসলিম বিশ্বের আরব রাষ্ট্রসমূহ যেমন সৌদিআরব, কুয়েত, জর্দান এবং মিসর প্রভৃতি দেশ “উন্নয়ন এবং যুগের সাথে সামঞ্জস্যতা বিধান” এর অজুহাত দেখিয়ে নিজ নিজ দেশসমূহের শিক্ষার সিলেবাস নতুনভাবে বিন্যস্ত করেছে। এ তথাকথিত আধুনিকায়নের নামে ইসলামী জীবন ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয় “আনুগত্য এবং সম্পর্কচ্ছেদ” কে সৌদিআরব বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে তার স্কুলসমূহের পাঠ্যপুস্তকে; অন্যদিকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় “জিহাদ” সম্পর্কিত বিষয়সমূহকে জর্দান, মিসর এবং কুয়েত বিকৃত করেছে।

    প্রাতিষ্ঠানিক হোক অথবা অপ্রাতিষ্ঠানিক- শিক্ষা হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে উম্মাহর (জাতির) সন্তানদের অন্তরে তাদের সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করা যায়। শিক্ষা কারিকুলাম বা পাঠ্যসূচি বলতে বোঝায় সে শিক্ষা যেটা রাষ্ট্রকর্তৃক পরিচালিত এবং যা বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের অর্থাৎ রাষ্ট্র এ শিক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিক্ষাদান শুরুর বয়স, শিক্ষার বিষয় এবং শিক্ষাদান পদ্ধতি নির্ধারণ করে। অন্যদিকে অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হচ্ছে সেটা যেটা রাষ্ট্র কর্তৃক সরাসরি নির্ধারিত নয় বরং এক্ষেত্রে বাড়িতে, মসজিদে, প্রচার মাধ্যমের (মিডিয়া) সাহায্যে বা সাময়িক কোন প্রকাশনার মাধ্যমে শিক্ষাদান করাটা মুসলিমদের উপর ছেড়ে দেয়া হয়। উভয়ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে এমনসব চিন্তাভাবনা এবং জ্ঞানের শিক্ষাদান নিশ্চিত করা যেগুলো ইসলামী মতাদর্শ থেকে উৎসারিত অথবা এর উপর প্রতিষ্ঠিত।

    শিক্ষাদান সংস্কৃতির মূল লক্ষ্য থাকবে উম্মাহ্‌র তরুণদের যথাযথ উন্নয়ন ঘটানো এবং সঠিক ব্যক্তিত্বের বিকাশ নিশ্চিত করা। যে কোন জাতির প্রতিষ্ঠালাভ এবং টিকে থাকার জন্য সংস্কৃতির ভূমিকা হচ্ছে মেরুদণ্ডের মত। এ সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করেই উম্মাহ্‌র সভ্যতা গড়ে উঠে এবং জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারিত হয়। সংস্কৃতির মাধ্যমে উম্মাহ নির্দিষ্ট একটা ছাঁচে গড়ে উঠে। ফলে তাকে অন্যান্য সভ্যসমূহ থেকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করা সম্ভবপর হয়।

    সংস্কৃতি হচ্ছে এমন একটা জ্ঞান যা ইসলামী আক্বীদার উপর প্রতিষ্ঠিত। এর অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে তাওহীদ (একত্ববাদ) সম্পর্কিত জ্ঞান, আইনশাস্ত্র (ফিকহ), কুরআনের তাফসীর (ব্যাখ্যা) এবং হাদীস। এছাড়া উপর্যুক্ত বিষয়সমূহ বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন যেমন ইজতিহাদ (গবেষণার মাধ্যমে আইন বের করার প্রক্রিয়া) সম্পর্কিত জ্ঞান, আরবি ভাষা, হাদিসের শ্রেণীবিভাগ এবং আইনশাস্ত্রের ভিত্তিসমূহ (উসূল) প্রভৃতি ও সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। এ সমস্ত বিষয়ের সবগুলোই ইসলামী সংস্কৃতি কেননা এদের উৎস হচ্ছে ইসলামী আক্বীদা। অনুরূপভাবে ইসলামী উম্মাহ্‌র ইতিহাসও এই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। কেননা এতে রয়েছে ইসলামী সভ্যতার (হাদারাহ) সাথে জড়িত ঘটনাসমূহ, প্রসিদ্ধ ব্যক্তিবর্গ (রিজাল), নেতৃবৃন্দ এবং উলামাদের বিবরণ। ইসলামপূর্ব আরবি কবিতাসমূহ ইসলামী সংস্কৃতির অংশ কেননা এর অন্তর্গত বিষয়সমূহ আরবি ভাষার শব্দ (words) এবং বাক্যপ্রকরণ অর্থাৎ বাক্যে শব্দসমূহের পূর্বাপর অবস্থান (syntax) বুঝতে সহায়ক বলে এগুলো ইজতিহাদ, তাফসীর ও হাদীস বুঝতে সাহায্য করে।

    সংস্কৃতি উম্মাহ্‌র সদস্যদের চরিত্র গঠন করে। এটা যেহেতু উম্মাহ্‌র সদস্যদের ঝোঁক বা প্রবণতাকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁড়ে গঠনের মাধ্যমে তাদের মানসিকতা, স্বভাব এবং আচরণকে প্রভাবিত করে সেহেতু এটা মানুষের চিন্তাভাবনা এবং বিভিন্ন বিষয়, মন্তব্য এবং কাজ সম্পর্কে তার মতামত গঠন করে। এজন্য ইসলামী রাষ্ট্রের (খিলাফত) একটি অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে উম্মাহ্‌র সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করা এবং ছড়িয়ে দেওয়া।

    ইতিহাস থেকে দেখা যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন সেদেশের তরুণদের যেমন একদিকে সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে দীক্ষিত করেছিল তেমনি অন্যদিকে পুঁজিবাদী বা ইসলামী চিন্তাভাবনা যেন কোনভাবে তার সংস্কৃতিকে অনুপ্রবেশ করতে না পারে সে ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছিল। এদিকে পুরো পশ্চিমাবিশ্ব সমাজজীবন থেকে ধর্মকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করে রাখার যে মতবাদ তার উপর ভিত্তিশীল পুঁজিবাদী সংস্কৃতিকে দীক্ষিত করেছে তাদের সন্তানদের। এই ভিত্তির উপরই তারা তাদের জীবনকে প্রতিষ্ঠিত ও সংগঠিত করেছে এবং নিজেদের মতাদর্শ ও সংস্কৃতিকে যাতে ইসলামের অনুপ্রবেশ ঘটতে না পারে সেজন্য এমনকি যুদ্ধেও লিপ্ত হয়েছে যা আজো অব্যাহত আছে।

    অনুরূপভাবে ইসলামী রাষ্ট্রও তার সন্তানদের সংস্কৃতিতে দীক্ষিত করেছে এবং ইসলামী আক্বীদা হতে উৎসারিত নয়। এমনসব চিন্তার দিকে যারা ডাকে, তাদেরকে প্রতিরোধ করেছে। ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে অন্যান্য দেশ ও জাতির কাছে নিজেদের সাংস্কৃতিক দাওয়াত পৌঁছানো এবং এটা কিয়ামতের আগ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

    নিজেদের সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করা এবং বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার এ প্রবণতার ফলে আমরা ইসলামের ইতিহাসের প্রায় পুরোটা জুড়েই দেখতে পাই যে, খিলাফতের প্রত্যেকটা গুরুত্বপূর্ণ শহরে পাবলিক লাইব্রেরি (গণগ্রন্থাগার) এবং প্রাইভেট লাইব্রেরি (ব্যক্তিগত পাঠাগার) ছিল। কর্ডোভা এবং বাগদাদের লাইব্রেরিসমূহে চার লক্ষাধিক বই ছিল।

    এরিস্টটল, প্লেটো, পীথাগোরাস, টলেমি এবং ইউক্লিডের কাজসমূহ এবং গ্রীক জ্যোর্তিবিদ্যা প্রভৃতির অনুবাদের ফলে আরবি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞাসমৃদ্ধ ভাষায় পরিণত হয়েছিল। অবশ্য এসব মনীষীদের বিভিন্ন ধ্যান-ধারণাকে অনেক মুসলিম পণ্ডিত খণ্ডন করেছিলেন যেমন ইমাম গাজ্জালীর তাহাফুত আল ফালাসিফাহ (দার্শনিকদের প্রত্যাখ্যান) এবং ইবনে তাইমিয়ার কিতাবুল ইবতাল (ভ্রান্ত মত সম্পর্কিত গ্রন্থ)। গণিতশাস্ত্রে অনুপস্থিত ‘শূণ্য’ এর ব্যাপক ধারণা আবিষ্কারের মাধ্যমে মুসলিমরা এর ব্যাপক অগ্রগতি সাধন করে ফলে কয়েক শতাব্দী-যাবত বিদ্যমান অসমাধানকৃত সমস্যাসমূহের সমাধান সম্ভবপর হয়। মুসলিম গণিত-শাস্ত্র-বিদগণ বীজগণিতের উদ্ভাবন ও উন্নয়ন ঘটিয়েছিলেন, এসময় এলগরিদম নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হয় এবং ইসলামী রাষ্ট্রের একজন বিখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত আল-খেয়ারিজমির নামানুসারে নামকরণ করা হয়।

    ইতিহাস থেকে মুসলিমদের যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া যায়, সেগুলো হল-

    ১. আল-কাতাতিব: এটা হচ্ছে কাত্তাব যার অর্থ হচ্ছে যেখানে কুরআন লিখা এবং পরিকল্পনায় কাজ করা হয় এর বহুবচন। ইসলামী রাষ্ট্রের সময়কাল জুড়েই শহর এবং গ্রামে কাতাতিবের উপস্থিতি ছিল।

    ২. মসজিদ: বিভিন্ন উলামা এবং হাদীস বিশেষজ্ঞগণ গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় মসজিদসমূহে বসে ফিকহ, তাফসীর, ভাষা এবং হাদীস সংক্রান্ত বিষয়সমূহ নিয়ে বিতর্ক করতেন এবং শিক্ষাদান করতেন। এসময় তাদের শিক্ষার্থীগণ উপস্থিত থাকতেন।

    ৩. কুরআন সেন্টার: কুরআন শিক্ষার জন্য সর্বপ্রথম পৃথক একটি সেন্টার স্থাপিত হয়েছিল দামেস্কে হিজরি চতুর্থ শতাব্দীতে, যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রাশা ইবন নাসিফ আল দামেশ্‌কী।

    ৪. হাদীস সেন্টার: দামেস্কে আল-মালিক আল-আদিল নুরুদ্দিন মাহমুদ আল জানকি সর্বপ্রথম বিশেষত হাদীস প্রশিক্ষণের জন্য একটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন।

    ৫. স্কুল: পঞ্চম শতাব্দীতে দামেস্কে এসব স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এসব স্কুল সব ধরনের বিষয়ের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যেমন দামেস্কে পুরকৌশল (Civil Engineering) স্কুল এবং মেডিসিন স্কুল প্রভৃতি।

    ৬. বিশ্বদ্যিালয়: পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি দিকে এসমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আল হাকাম ইবনে আব্দুল রহমান কর্ডোভা ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন যেটা সে সময়কার সবচেয়ে অভিজাত শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গণ্য হতো। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যেমন বাগদাদের মুসতানসিরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। সমগ্র ইউরোপের শিক্ষার্থীরা এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ ভর্তিও জন্য আবেদন করত।

    উম্মাহ্‌র সংস্কৃতিকে সংরক্ষণের জন্য একটি প্রধানতম নিশ্চয়তা হচ্ছে একদিকে এটা উম্মাহ্‌র সদস্যদের অন্তরে ও বইয়ের পাতায় সংরক্ষণ করা এবং অন্যদিকে এ সংস্কৃতির বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ থেকে উৎসারিত নিয়মকানুন এবং মতামতের সাহায্যে রাষ্ট্র পরিচালনা করা এবং এর বিভিন্ন বিষয় দেখাশুনা করা।

    ইসলাম এবং ভবিষ্যৎ খিলাফত রাষ্ট্র কিভাবে তার শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা করতে পারবে সে ব্যাপারে নিম্নে সংক্ষিপ্ত খসড়া উপস্থাপন করা হলো-

    ১) ইসলামী আক্বীদাকে ভিত্তি করে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে হবে। পাঠ্যসূচি এবং শিক্ষাদান-পদ্ধতি এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে এ ভিত্তি থেকে যে কোন ধরনের বিচ্যুতি প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। [ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে শিক্ষা সম্পর্কিত শরিয়া নিয়মকানুন ইসলামী আক্বীদা থেকে উৎসারিত এবং এদের প্রত্যেকের শরীয়া প্রমাণাদি বিদ্যমান থাকবে। যেমন- শিক্ষার বিষয়সমূহ (subjects) এবং ছেলে বা মেয়ে শিক্ষার্থীদের পৃথক রাখা। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষাদানের পদ্ধতি (methods) হচ্ছে সে সমস্ত উপকরণ (means) এবং ধরণ (style) সেগুলোকে শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা এবং এর উদ্দেশ্যসমূহ অর্জন করার জন্য উপযোগী বলে মনে করা হয়। এগুলো হচ্ছে কিছু পার্থিব বিষয় যেগুলো শিক্ষা এবং উম্মাহ্‌র মৌলিক চাহিদার সাথে সম্পর্কিত শরীয়া নিয়মকানুন বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত বলে বিবেচিত এবং এ বিষয়সমূহ পরিবর্তনশীল বা বিবর্তনশীল। এগুলো গবেষণা বা অনুসন্ধানের মাধ্যমে অথবা কোন গবেষক বা অন্যান্য জাতির কাছ থেকে গ্রহণ করা যায়]

    ২) ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য হবে চিন্তা এবং স্বভাবগত দিক থেকে ইসলামী ব্যক্তিত্ব গঠন করা। সুতরাং এই নীতির উপর ভিত্তি করে কারিকুলামের বিষয়সমূহ নির্ধারণ করতে হবে।

    ৩) শিক্ষার লক্ষ্য হবে ইসলামী ব্যক্তিত্ব তৈরি করা এবং তাদেরকে জীবনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান সম্পর্কিত ইসলামী জ্ঞান সরবরাহ করা। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে শিক্ষাদান-পদ্ধতি ঠিক করতে হবে এবং এ লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করে ফেলে এমন যে কোনো পদ্ধতিকে প্রতিরোধ করতে হবে।

    ৪) গবেষণালব্ধ বিজ্ঞান যেমন- গণিত (বা পদার্থবিদ্যা) এবং সাংস্কৃতিক জ্ঞান (যেমন আইনশাস্ত্র, সাহিত্য, ইতিহাস)- এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য থাকতে হবে। গবেষণালব্ধ বিজ্ঞান এবং এর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়াদি প্রয়োজনের সাথে সঙ্গতি রেখে শিক্ষাদান করতে হবে এবং শিক্ষার কোন পর্যায়েই এটা বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। অন্যদিকে সাংস্কৃতিক জ্ঞানকে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে একটা নির্দিষ্ট নীতির মাধ্যমে শিক্ষাদান করতে হবে যাতে এটা ইসলামী চিন্তা এবং নিয়মকানুনের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়। এছাড়া এই সাংস্কৃতিক জ্ঞানকে বিজ্ঞানের অন্যান্য বিষয়ের মতো উচ্চশিক্ষার অন্যান্য পর্যায়েও এমনভাবে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা থাকতে হবে যাতে সেটা শিক্ষানীতির এবং শিক্ষার উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুতি প্রদর্শন না করে।

    ৫) ইসলামী সংস্কৃতিকে অবশ্যই শিক্ষাব্যবস্থার সমস্ত পর্যায়ে শিক্ষাদান করতে হবে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে চিকিৎসা, প্রকৌশল বা পদার্থবিদ্যা পাশাপাশি বিভিন্ন ইসলামী জ্ঞানের জন্য ডিপার্টমেন্ট খুলতে হবে।

    ৬) শিল্পকলা (Arts) এবং হস্তশিল্প (crafts) যদি বাণিজ্য, নৌযানবিদ্যা বা কৃষিবিদ্যার সাথে সম্পর্কিত হয়, তবে সেগুলো কোনরকম বাধা বা শর্ত ছাড়াই শিখা হবে। কিন্তু কখনো কখনো শিল্পকলা এবং হস্তশিল্প সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত হতে পারে এবং জীবন সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিও দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। যেমন- চিত্রকর্ম (painting) এবং ভাস্কর্যবিদ্যা (sculpture)। জীবন সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির সাথে যদি এই দৃষ্টিভঙ্গি সাংঘর্ষিক হয়, তবে সেক্ষেত্রে এসব শিল্পকলা বা হস্তশিল্প গ্রহণ করা যাবে না।

    ৭) রাষ্ট্রের একটিমাত্র নির্দিষ্ট শিক্ষাসূচি (কারিকুলাম) থাকবে এবং এটি বাদে অন্যকোন কারিকুলামের শিক্ষাদান অনুমোদন করা যাবেনা।

    ৮) বিদেশী রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত না হলে বেসরকারি স্কুলের অনুমোদন দেওয়া হবে যদি এসব স্কুল রাষ্ট্রের কারিকুলাম গ্রহণ করে, রাষ্ট্রেও শিক্ষানীতির আওতায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাষ্ট্রের শিক্ষানীতির লক্ষ্যকে যথাযথভাবে সম্পাদন করে। এসমস্ত স্কুলসমূহে নারী এবং পুরুষ একত্রে রাখা যাবেনা- এটা শিক্ষক বা শিক্ষার্থী উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এসমস্ত স্কুল নির্দিষ্ট কোন ধর্ম, মাযহাব, বংশ বা বর্ণের জন্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারবেনা।

    ৯) যেসমস্ত বিষয় জীবনের মূলধারার জন্য প্রয়োজনীয়, সেগুলো নারী এবং পুরুষ প্রত্যেক নাগরিককে শিক্ষাদান করা রাষ্ট্রের অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্য। প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরে বিনামূল্যে এ শিক্ষার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক। রাষ্ট্র তার সাধ্যমতো সবার জন্য বিনা বেতনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরির চেষ্টা করবে।

    ১০) স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির পাশাপাশি রাষ্ট্র জ্ঞানের বিস্তার মান্নোয়নের জন্য বিভিন্ন উপকরণ; যেমন- লাইব্রেরি এবং লাইব্রেরি সরবরাহ করবে যাতে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা যেমন ফিকহ, হাদীস, কুরআনের তাফসীর এবং চিন্তা, চিকিৎসা, প্রকৌশল ও রসায়ন প্রভৃতি নিয়ে যারা গবেষণা করতে আগ্রহী তারা যেন উদ্ভাবন এবং আবিষ্কারে সক্ষমতা লাভ করতে পারে। এর ফলে পর্যাপ্ত পরিমাণে মুজতাহিদ, মানসম্পন্ন বৈজ্ঞানিক এবং উদ্ভাবক তৈরি হবে।

    ১১) শিক্ষার উদ্দেশ্যে লিখিত কোন বিষয়ের মাধ্যমে শোষণ; যেমন- কপিরাইট যেকোন পর্যায়ে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ থাকবে। কোন বই একবার মুদ্রিত ও প্রকাশিত হবার পর গ্রন্থকারসহ অন্য কারো অধিকার থাকবে না। সেই বইটির প্রকাশনা এবং মুদ্রণের অধিকারস্বত্ব সংরক্ষণ করার। অবশ্য যদি কোন বই মুদ্রিত বা প্রকাশিত না হয়ে শুধু একটি ধারণার আকারে থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে শিক্ষাদানের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণের মতোই যে কেউ এসমস্ত ধারণা বা তথ্য প্রদানের মাধ্যমে অর্থগ্রহণ করতে পারবে।

    উপর্যুক্ত খসড়া নীতিমালার আলোকে যদি আমরা বিবেচনা করি, তাহলে বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে যেসব স্কুল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং পরিচালিত হচ্ছে সেগুলো; যেমন- এ্যাচিসন কলেজ (লাহোর), সেইন্ট যোসেফ স্কুল (ঢাকা), সেইন্ট জনস ইনস্টিটিউশন (কুয়ালালামপুর) প্রভৃতি বন্ধ করে দিতে হবে। কারণ এ সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মুসলিম তরুণদের মনে পাশ্চাত্যের অনৈসলামি ধ্যান-ধারণার প্রতি বিস্ময়, শ্রদ্ধা এবং প্রশংসাকে বদ্ধমূল করে দেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

    ইসলামী রাষ্ট্রের নিজস্ব মিডিয়া ডিপার্টমেন্ট থাকবে যেটা একদিকে ইসলাম এবং ইসলামী মূল্যবোধকে বিশ্বব্যাপী ছড়ানোর জন্য সম্ভাব্য সবধরনের উপকরণ ব্যবহার করবে এবং অন্যদিকে কাফেরদের মাধ্যমে প্রচারকৃত মিথ্যা এবং ভ্রান্ত-ধারণাসমূহকে খণ্ডণ করবে। যোগাযোগের জন্য অত্যাধুনিক সবরকমের প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক উপকরণসমূহ; যেমন- স্যাটেলাইট, ইলেকট্রনিক মেইল, টেলিকনফারেন্সিং প্রভৃতির মাধ্যমে খিলাফতের নাগরিকদের শিক্ষাদানের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক সাধ্যমতো এগুলো ধারণ করা হবে, ব্যবহার করা হবে এবং ছড়িয়ে দেওয়া হবে। বিদ্যমান ব্যাপক গণসংযোগ মাধ্যম; যেমন- টিভি, রেডিও, সংবাদপত্র, বই এবং সম্মেলন এসমস্ত উপকরণ ইসলামী রাষ্ট্রে ব্যবহার করা যাবে। উপর্যুক্ত মাধ্যমসমূহ যেসমস্ত অধিবেশন বা তথ্য সম্প্রচার করে সেগুলো যদি ইসলামের মধ্যে থাকে, তাহলে সেগুলো প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কোন অনুমোদন লাগবেনা।

    মুসলিম বিশ্বে বিদ্যমান বিভিন্ন বিদেশী মিডিয়া যেগুলো মুসলিমদেরকে দ্বিধান্বিত করে বা আক্রমণাত্মক তথ্য প্রচারের মাধ্যমে বিপথে পরিচালিত করে; যেমন বিবিসি, সিএনএন এবং ভয়েস অব আমেরিকা এগুলোর সম্প্রচার নিষিদ্ধ করতে হবে।

  • জ্ঞান অন্বেষণ করা

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    أَفَمَنْ يَعْلَمُ أَنَّمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ الْحَقُّ كَمَنْ هُوَ أَعْمَى إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ

    ‘যে ব্যক্তি জানে যে, যা কিছু আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে আপনার প্রতি অবর্তীর্ণ হয়েছে তা সত্য সে কি ঐ ব্যক্তির সমান, যে অন্ধ? তারাই বোঝে, যারা বোধশক্তি সম্পন্ন।’ [সূরা রাদ:১৯]

    طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ

    নবী (সা) বলেন, ‘জ্ঞান অন্বেষন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরয।’

    নবী (সা) বলেন, ”তোমরা এমন একটি সময়ে বাস করছ যখন প্রচুর ফকীহ (ইসলামী আইনবিদ) রয়েছে এবং সামান্য কয়েকজন বক্তা রয়েছে, অর্থাৎ প্রশ্ন করবার মত লোক কম এবং বলবার মত লোক বেশি। এসময়ে জ্ঞান অর্জনের চেয়ে আমল শ্রেয়। খুব দ্রুতই এমন একটি সময় আসবে যখন সামান্য সংখ্যক ফকীহ ও প্রচুর বক্তা থাকবে; অর্থাৎ অনেকে জানতে চাইবে এবং সামান্য জ্ঞান বিতরণকারী থাকবে। সে সময়ে আমলের চেয়ে জ্ঞান অর্জন করা শ্রেয়।”

    ইসলামের দাওয়াতের জন্য জীবন উৎসর্গকারী দা’ঈদেরকে অবশ্যই জ্ঞান আহরণ করার দিকে যথেষ্ট গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। কেবলমাত্র একটি সার্কেলে বক্তব্য দেয়া বা একজন Contact এর সাথে কনসেপ্ট আলোচনা করার জন্য যতটুকু জ্ঞান অর্জন করা জরুরী ততটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা সঠিক নয়। বরং আমাদেরকে সবসময় দ্বীনের ব্যাপারে জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করা উচিত। যেসব কারণে জ্ঞান অর্জন করা জরুরী:

    ১. আল্লাহ’র ভয় বৃদ্ধি করার জন্য
    ২. আমাদের আকলিয়া ও নাফসিয়া তৈরী করার জন্য
    ৩. কার্যকরভাবে দাওয়াত বহন করার জন্য
    ৪. পূণর্জাগরণের উদ্দেশ্যে উম্মাহ’র উপরে নেতৃত্ব নেয়ার জন্য
    ৫. জ্ঞান অর্জন করে আল্লাহ’র পুরষ্কার লাভের উদ্দেশ্যে

    যেসব বিষয়ের জ্ঞান অন্বেষণ করা ফরযে আইন

    প্রথমত, কোনরূপ সন্দেহ ব্যতিরেকে যথাযথভাবে ইসলামের উপর ঈমান আনা আমাদের সবার উপর ফরয এবং সেকারণে এ জ্ঞান আমাদের জানা থাকতে হবে। এটি হল আক্বীদার মৌলিক বিষয়ের উপর জ্ঞান।

    وَإِنَّ الظَّنَّ لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئًا

    ‘অথচ সত্যের ব্যাপারে অনুমান মোটেই ফলপ্রসূ নয়।’ [সূরা নাজম:২৮]

    সুতরাং আবেগতাড়িত ও অনুকরণসর্বস্ব আকীদা আমাদের জন্য হারাম। আমরা আমাদের নিজেদের জন্য জানব, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার অস্তিত্ব, মুহাম্মদ (সা) তাঁর সর্বশেষ রাসূল, কুর’আন আল্লাহ’র প্রেরিত বাণী এবং এর মধ্যে যাই আছে তাই সত্য, যেমন: ফেরেশতা, পূর্ববর্তী কিতাব, পূর্ববর্তী নবী, বিচার দিবস, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদি।

    দ্বিতীয়ত, নিজের জীবন ও আমল সর্ম্পকে শরী’আহ হুকুম জানা আমাদের জন্য ব্যক্তিগতভাবে বাধ্যতামূলক বা ফরয।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বিভিন্ন ক্ষেত্রে কুর’আনের বহু জায়গায় আমাদের উদ্দেশ্যে বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ

    ‘হে বিশ্বাসীগণ, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর।’

    وَمَا آَتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا

    ‘রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক।’ [সূরা হাশর:৭]

    সুতরাং আমরা আমাদের কাজের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ফরয ও মুহাররামাত বা নিষিদ্ধ বিষয়ের জ্ঞান অর্জনে সচেষ্ট হব, যেমন:

    – সালাত ও রোযার সাথে সংশ্লিষ্ট আহকাম বা হুকুম
    – মাতাপিতার (স্ত্রী, সন্তান যদি থাকে) প্রতি দায়িত্বের ব্যাপারে আহকাম বা হুকুম
    – বিপরীত লিঙ্গের সাথে সর্ম্পক স্থাপনের ক্ষেত্রে আহকাম বা হুকুম
    – ক্রয়ের আহকাম (বিক্রয়, ব্যবসা, কর্মে নিয়োগ-যদি আমরা সেসব কাজে নিয়োজিত থাকি)
    – গীবতের হুকুম
    – খিলাফতের জন্য কাজ করার আহকাম ইত্যাদি

    মূলত যে কোন কাজ সম্পাদন করার আগে এর হুকুম সর্ম্পকে আমাদের জেনে নিতে হবে। উসুলের মধ্যে একটি মূলনীতি রয়েছে: ‘প্রতিটি কাজের জন্য হুকুম প্রয়োজন’।

    সুতরাং একজন ডাক্তারের জন্য তার ক্ষেত্র সর্ম্পকে জানা ফরয, যেমন: ময়না তদন্ত অনুমোদিত কিনা, বিপরীত লিঙ্গকে চিকিৎসা দেয়া অনুমোদিত কিনা, চিকিৎসার কারণে নেশাজাতীয় পদার্থ ব্যবহার করা যাবে কিনা, ইত্যাদি।

    একজন মসজিদের ইমামের জন্য সালাতে ইমামতি করার ব্যাপারে আহকামসমূহ, খুতবার বাধ্যবাধকতা, মুসলিমদের প্রতি কর্তব্য, মিম্বার থেকে হক কথা বলার বাধ্যবাধকতা ইত্যাদি সর্ম্পকে জ্ঞান অর্জন করা ফরয।

    একজন শিক্ষককে জানতে হবে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক ও কুফর বিস্তার লাভ করে এমন কোন বিষয় পড়ানো যাবে কিনা, বিপরীত লিঙ্গের কাউকে শিক্ষা দেয়া যাবে কিনা, ছাত্রদের শৃংখলাবদ্ধ করার হুকুম ইত্যাদি।

    স্বামীর জন্য স্ত্রীর প্রতি বাধ্যবাধকতা সর্ম্পকে জানা ফরয, জানতে হবে তার সাথে কোন কাজসমূহ নিষিদ্ধ, যদি সে নির্দেশ অমান্যকারী হয় তাহলে তাকে কীভাবে শৃংখলার মধ্যে আনা যায় এবং একইভাবে স্ত্রীকে জানতে হবে তার স্বামী ও সন্তানের প্রতি কী কর্তব্য রয়েছে, সন্তানের মাতাপিতার প্রতি কী কর্তব্য রয়েছে ইত্যাদি।

    দাওয়াত বহনকারীর জন্য দাওয়াত বহন করবার ব্যাপারে আহকাম ও চিন্তা সর্ম্পকে জানা ফরয।

    মুসলিমদের খলীফাকে তার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট হুকুমের ব্যাপারে জানতে হবে ইত্যাদি।

    আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, আমরা প্রবৃত্তি থেকে উদ্ভূত কোন হুকুম নয় বরং শরী’আহ মেনে চলছি।
    ইসলাম আমাদের জ্ঞানের পথ ব্যতিরেকে অন্য কোন পথ অনুসরণ করতে নিষেধ করেছে:

    وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا

    ‘যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চক্ষু ও অন্তকরণ এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে।’ [সূরা বনী ইসরাইল:৩৬]

    এমন কি আমরা যদি কোন দলীল সর্ম্পকে সুনিশ্চিত না হই, তাহলে বৈধ ইজতিহাদের দ্বারা ইসলামী দলীল থেকে প্রাপ্ত হুকুম জেনে নিতে হবে।

    فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ

    ‘অতএব তোমরা যদি না জান তবে যারা জানে তাদেরকে জিজ্ঞেস কর’। [সূরা আম্বিয়া:৭]

    তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের মধ্যে যারা জানে না তাদেরকে যারা অধিক জ্ঞানবান তাদের কাছ থেকে জেনে নেয়ার জন্য নির্দেশ দিচ্ছেন।

    মানদুব বা উৎসাহিত জ্ঞান

    আক্বীদার মৌলিক বিষয়াবলী ও জীবনের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত আহকাম ব্যতিরেকে ইসলামের অন্য কোন ক্ষেত্রে জ্ঞান অর্জন করা মানদুব, যেমন: তাফসীর, আরবী ভাষা, হাদীসের জ্ঞান ও উসুল আল ফিকহ।

    এসব জ্ঞান অর্জন করার জন্য আমাদেরকে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

    জ্ঞান আহরণকারী ব্যক্তির মর্যাদা ও পুরষ্কার

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ

    ‘বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? নিশ্চয়ই শিক্ষা গ্রহণ করে কেবল তারাই করে, যারা গভীর চিন্তাশীল’। [সূরা যুমার:৯]

    يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آَمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ

    ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ্‌ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দিবেন। আল্লাহ্‌ খবর রাখেন যা কিছু তোমরা কর’। [সূরা মুজাদালাহ:১১]

    إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ

    বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল আল্লাহকে (সত্যিকার অর্থে) ভয় করে। [ফাতির: ২৮]

    আল বুখারী মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান থেকে বর্ণণা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    مَنْ يُرِدْ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ

    ‘আল্লাহ যার কল্যান চান, তাকে দ্বীনের ফিকহ (গভীর জ্ঞান) দান করেন।’

    আবদুল্লাহ বিন মাস’উদ (রা) বর্ণণা করেন যে, নবী (সা) বলেন, ‘দুই ব্যক্তি ছাড়া আর কারও মত হওয়ার চেষ্টা করো না, ১) প্রথমত যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন এবং সে হক পথে তা ব্যয় করে এবং ২) দ্বিতীয়ত, যাকে আল্লাহ জ্ঞান দিয়েছেন এবং সে অনুযায়ী আমল করে ও অন্যদের শিক্ষা দান করে।’ [বুখারী]

    النَّاسُ مَعَادِنُ كَمَعَادِنِ الْفِضَّةِ وَالذَّهَبِ خِيَارُهُمْ فِى الْجَاهِلِيَّةِ خِيَارُهُمْ فِى الإِسْلاَمِ إِذَا فَقُهُوا

    মানুষ স্বর্ণ ও রৌপ্যের খনির মত। জাহিলিয়্যাতের মধ্যে যারা শ্রেষ্ঠ তারা ইসলামের মধ্যেও শ্রেষ্ঠ হবে যদি তারা জ্ঞানবান হতে পারে। [মুসলিম]

    জান্নাতের পথ

    مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ

    আবু হুরাইরা বলেন যে, নবী (সা) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করার জন্য কোন পথে যাত্রা করল, তার জন্য আল্লাহে জান্নাতের রাস্তা সহজ করে দিবেন।’

    নবী (সা) বলেন, ‘যদি কেউ জ্ঞান অর্জন করার জন্য রাস্তায় বের হয়, তাহলে আল্লাহ তাকে জান্নাতের একটি রাস্তা দিয়ে ভ্রমণ করাবেন। যে জ্ঞান অন্বেষণ করে তার প্রতি ফেরেশতাগণ সানন্দ চিত্তে তাদের পাখাসমূহ নত করে দেয়। আলেম ব্যক্তির জন্য আকাশ ও পৃথিবীর অধিবাসীগণ, এমনকি গভীর পানির মাছেরাও মাগফেরাত কামনা করে। একজন ভক্তের তুলনায় একজন আলেম ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব রাতের আকাশের পূর্ণাঙ্গ চাঁদের মত যখন সে চাঁদের পাশে সব তারাগুলো ম্লান হয়ে থাকে। আলেমগণ নবীগণের উত্তরসুরী এবং নবীগণ এমন কোন কিছু উত্তরাধিকার সূত্রে রেখে যাননি যার আর্থিক মূল্য রয়েছে। তারা কেবলমাত্র জ্ঞান রেখে গেছেন এবং যে তা গ্রহণ করল সে যেন বিশাল অংশ গ্রহণ করল।’

    ইমাম হাসান আল বসরী বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    مَنْ جَاءَهُ الْمَوْتُ وَهُوَ يَطْلُبُ الْعِلْمَ لِيُحْيِىَ بِهِ الإِسْلاَمَ فَبَيْنَهُ وَبَيْنَ النَّبِيِّينَ دَرَجَةٌ وَاحِدَةٌ فِى الْجَنَّةِ

    ‘যার মৃত্যু চলে আসে এই অবস্থায় যে সে ইসলামকে পুনর্জীবিত করার জন্য জ্ঞানার্জন করে যাচ্ছে, তবে তার ও নবীগণের মধ্যে জান্নাতে মাত্র এক ধাপের ব্যবধান থাকবে।’ [সুনান আত তিরমিযী, সুনান আদ দারিমী]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে দু’আ করি যাতে তিনি আমাদেরকে সঠিক জ্ঞান অর্জন ও তা প্রয়োগ করবার সামর্থ দান করেন।

  • বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি অধিকার (Intellectual Property Rights)

    ভুমিকা

    পশ্চিমা সমাজ ব্যবস্থায় বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি অধিকার (intellectual property right) একটি বহুল আলোচিত বিষয়। WIPO (World Intellectual Property Organization) এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০০৫ সাল থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে গড়ে ৩০ লক্ষের উপর আই পি আবেদন জমা পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন কংগ্রেসে উত্থাপিত (Stop online piracy act – SOPA) এবং (Protect intellectual property act – PIPA) বিলের প্রেক্ষিতে বিষয়টি আবারো আলোচনায় উঠে আসে। অনলাইনে কপিরাইটকৃত সম্পত্তির (বই, গান, চলচ্চিত্র ইত্যাদি) আদান প্রদান রোধের উদ্দেশ্যে বিল দুটি উত্থাপিত হয়। এই আইনের আওতায় সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের যেকোন অভিযুক্ত ওয়েব সাইটের বিরুদ্ধে যেসকল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে সেগুলো হচ্ছে: অনলাইনে অর্থ লেনদেনের সেবাদানকারী অথবা বিজ্ঞাপন দানকারী সকল প্রতিষ্ঠানের সাথে সাইটির সম্পর্ক চ্ছিন্ন করা, সকল ব্লগসাইট, অনলাইন ফোরাম এবং সার্চ ইঞ্জিন গুলো থেকে সাইটটির সকল লিংক মুছে ফেলতে বাধ্য করা এবং ইন্টারনেট সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান (ISP) গুলোর মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সাইটটিতে প্রবেশ বন্ধ করা। বিলদুটি উত্থাপনের সাথে সাথে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। বিরোধিরা একে বাকস্বাধীনতা এবং সৃষ্টিশীলতার উপর আঘাত বলে প্রত্যাখ্যান করেন। wikipedia এর মতো প্রায় ৭০০০ সাইট এই আইনের প্রতিবাদে ১৮ জানুয়ারী, ২০১২ তারিখে তাদের সাইটগুলো বন্ধ রাখে অথবা এর প্রতিবাদে বিভিন্ন ছবি অথবা লিঙ্ক প্রকাশ করে।

    এই প্রবন্ধে আমরা আই.পি অধিকারের ধারনা, এর উৎপত্তি, এর অসংগতি সমুহ, মানব সভ্যতার উপর এর নেতিবাচক প্রভাব এবং সবশেষে এ ব্যাপারে ইসলামের সমাধান নিয়ে আলোচনা করবো।

    আই পি অধিকারের ধারনা:

    বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ প্রধানত: তিন ধরনের – কপিরাইট, পেটেন্ট এবং ট্রেডমার্ক।

    কপিরাইট বলতে কোন প্রকাশিত বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের উপর একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট কিছু অধিকারকে বোঝায়। এই অধিকার বলতে মুলতঃ কপি করার অধিকার হলেও তাতে আরো কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত যেমন এথেকে আর্থিক ভাবে লাভবান হওয়া, একে অন্যকোন কাজের জন্য সাহায্যকারী উপকরন হিসাবে ব্যবহার করা ইত্যাদি।

    পেটেন্ট এর মাধ্যমে কোন বৈজ্ঞানিক ধারনা, উৎপাদন প্রক্রিয়া বা আবিস্কারের উপর এর মালিকের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

    ট্রেডমার্ক হচ্ছে কোন ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ব্যবহৃত একটি বিশেষ চিহ্ন যার মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে তাদের পন্য বা সেবাকে আলাদা ভাবে চিহ্নিত করা হয়।

    কোন কাজের কপিরাইট বা পেটেন্ট অর্জন করতে হলে কিছু বিষয় প্রমানিত হতে হয়। যেমন কাজটি যথেষ্ট মৌলিক, নতুন (novelty) বা আবিস্কারযোগ্য (non-obviousness)। এখানে লক্ষনীয় যে মৌলিকত্ব বা আবিস্কারযোগ্যতা বিষয়গুলো যথেষ্ট অস্পস্ট যা অনেকসময় আদালতে বিতর্কের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় এবং আইনজীবিদের দক্ষতার উপর নির্ভর করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যাক্তি বা ছোট কোম্পানি গুলো বড় কোম্পানির সাথে আইনি লড়াইয়ে পেরে উঠে না।

    ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:

    বর্তমানে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি আইনের কারন হিসাবে আবিস্কারক বা লেখকের অধিকার রক্ষার কথা বলা হলেও তার শুরুটি হয়েছিল মধ্যযুগে বৃটিশ রাজতন্ত্রের স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে। ১৫ শতকের দিকে ছাপাখানা আবিস্কারের ফলে জনগনের মধ্যে রাজতন্ত্র এবং যাজকতন্ত্রের স্বার্থবিরোধী চিন্তাধারনা দ্রুত ছড়িয়ে পরার সম্ভাবনা দেখা দিলে ছাপাখানার উপর কঠোর নিয়ন্ত্রন আরোপ করা হয়। এর মাধ্যমে জন্ম হয় কপিরাইট প্রথার। রাজতন্ত্রের অনুমতি সাপেক্ষে নির্দিষ্ট কিছু ছাপাখানার মালিকরা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোন বই প্রকাশ করার অনুমতি পেত। পরবর্তীতে কপিরাইটের নামে অন্যান্য শিল্প যেমন লবন, চামড়া উৎপাদন, গানপাউডার, গ্লাস শিল্প ইত্যাদির উপর রাজতন্ত্র এবং তার অনুগত ব্যাক্তিদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠিত হয়।

    IP অধিকারের অসংগতি এবং সমাজের উপর এর প্রভাব:

    ব্যক্তি সম্পদের ধারনাটি মানুষের স্বভাবজাত এবং সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ এর চর্চা করেছে। অন্যদিকে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের ধারনাটি অপেক্ষাকৃত নতুন এবং তা একটি কৃত্রিম অধিকার। এই বুদ্ধিবৃত্তিক অধিকার বরং সম্পদের উপর ব্যক্তির বৈধ অধিকারকেই সীমাবদ্ধ করে ফেলে। কেউ যখন টাকার বিনিময়ে কোন যন্ত্র, বই অথবা যে কোন প্রকাশনার মালিকানা অর্জন করেন তখন স্বাভাবিক ভাবেই তিনি একে ব্যবহার করে লাভবান হবার অধিকার পান। বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের ধারনা এই মৌলিক অধিকারের প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে।

    বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি আইনের যৌক্তিকতার পিছনে শিল্প সাহিত্য এবং বিজ্ঞান চর্চায় উৎসাহের বিষয়টাকে তুলে ধরা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের ধারনা ছাড়াই যুগে যুগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চর্চা হয়েছে। কপিরাইট আইনের প্রয়োগ ছাড়াই অনেক বড় মাপের শিল্প ও সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে। বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের ধারনাটি বরং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চর্চাকে ভীষন ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

    একটি উদাহরনের মাধ্যমে আমরা তা বোঝার চেষ্টা করি:

    ১৭৬৪ সালের শেষের দিকে একটি এক সিলিন্ডার বিশিষ্ট সরল বাষ্পচালিত পাম্প মেরামতের সময় এর আরো উন্নত এবং কার্যকরি সংস্করনের কথা চিন্তা করেন স্কটল্যান্ডের কারিগর জেমস ওয়াট। পরবর্তি কয়েক মাস কঠোর পরিশ্রমের পর তিনি একটি উন্নত ইঞ্জিনের মডেল তৈরি করেন যাতে বাষ্প ঘনীভবনের জন্য একটি আলাদা চেম্বার রাখা হয়। ১৭৬৮ সালের তিনি তার নতুন উদ্ভাবিত ইঞ্জিনের পেটেন্ট এর জন্য আবেদন করেন। ১৭৭৫ সালে তিনি তার প্রভাবশালী ব্যবসায়িক অংশীদার শিল্পপতি ম্যাথু বোল্টনের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে পার্লামেন্টে একটি আইনপাশ করেন যার মাধ্যমে তার পেটেন্ট এর মেয়াদ ১৮০০ সাল পর্যন্ত বাড়াতে সক্ষম হোন। পেটেন্ট সুরক্ষিত হওয়ার পর জেমস ওয়াট তার ইঞ্জিনটিকে উন্নত করার পরিবর্তে সকল চেষ্টা ব্যয় করেন প্রতিদ্বন্দী ইঞ্জিনিয়ারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার কাজে। ১৭৮১ সালে জোনাথন হর্নব্লোয়ার নামে একজন বিজ্ঞানী আরো উন্নত এবং সম্পুর্ন স্বাধীনভাবে ডিজাইনকৃত একটি ইঞ্জিনের উৎপাদন শুরু করলে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয় এবং তিনি সর্বস্বান্ত হয়ে কারাবরন করেন। ১৮০০ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ জেমস ওয়াটের পেটেন্ট এর মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাস্পীয় ইঞ্জিনের তেমন কোন উন্নতি হয়নি। কোন বিজ্ঞানি জোনাথন সাহেবের পরিনতি বরন করার সাহস করেননি। জেমস ওয়াটের পেটেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অতি দ্রুত ইঞ্জিনের উন্নতি হতে থাকে। গড়ে প্রতিবছর ৪০০০ হর্সপাওয়ার যুক্ত হতে থাকে জেমস ওয়াটের সময় যার হার ছিল বছরে মাত্র ৭৫০ হর্সপাওয়ার। ১৮১০ থেকে ১৮৩৫ সালের মধ্যে ৫ গুন বেশি জ্বালানী দক্ষতা সম্পন্ন ইঞ্জিন উৎপাদিত হয়। শুধু তাই নয়, বাষ্পীয় ইঞ্জিনের বহুমূখি ব্যবহার শিল্প বিপ্লবের মূল চালিকা শক্তি হিসাবে কাজ করে। বাষ্পচালিত ট্রেন এবং জাহাজের উৎপাদন যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন যুগের সূচনা করে।

    মজার ব্যপার হচ্ছে জেমস ওয়াট নিজেও তার উন্নত ইঞ্জিনের ডিজাইন করার কাজে বাধাগ্রস্ত হয়েছিলেন পেটেন্ট এর কারনে। ইঞ্জিনে ক্র্যাঙ্কশ্যফট এবং ফ্লাইহুইল প্রযুক্তির ব্যবহারের পেটেন্ট ছিল ইংরেজ বিজ্ঞানী জেমস পিকার্ডের অধিনে। ফলে জেমস ওয়াট তার ইঞ্জিনে এদের ব্যাবহার করতে পারেননি এবং কম দক্ষতা সম্পন্ন সৌর গিয়ার ব্যবহারে বাধ্য হন।

    সুতরাং একথা বলা যায় যে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের ধারনাটি শিল্প বিপ্লবকে প্রায় একশতাব্দী পিছিয়ে দেয়।

    ১৯৮০ সালে European Organization for Nuclear Research বা CERN এ কর্মরত একজন তথ্যপ্রযুক্তিবিদ টিম বার্নার্স লী তার কম্পিউটারে রক্ষিত ফাইল অন্যদের সাথে শেয়ার করার একটি পদ্ধতি তৈরি করেন। এটি পরবর্তিতে ইন্টারনেটে পরিনত হয়। সাম্প্রতিক কালে তাকে ইন্টারনেট উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় মাইলফলক কোনটি এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন ইন্টারনেটকে পেটেন্ট এর বাইরে রাখতে CERN কে রাজি করানোই ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্জন।

    আজকের বিশ্বে আই পি অধিকারের সবচেয়ে বড় প্রবক্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজে কিন্তু শুরুতে আন্তর্জাতিক ভাবে এর বাস্তবায়ন মেনে নেয়নি। কপিরাইট এবং পেটেন্টকৃত কাজের প্রধানতম রপ্তানীকারক দেশে পরিনত হওয়ার পর ১৯৮৯ সালে, বার্ন কনভেনশনের ১০৩ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র এতে স্বাক্ষর করে।

    আন্তর্জাতিক ভাবে আই পি অধিকারের বাস্তবায়ন এবং অনুন্নত দেশগুলোর উপর এর প্রভাব:

    ১৮৮৩ সালে প্যারিস সম্মেলন এবং ১৮৮৬ সালে বার্ন সম্মেলনে আন্তর্জাতিক কপিরাইট চুক্তির মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্ব একটি সার্বজনীন কপিরাইট নীতির ব্যাপারে একমত হয়। ১৯৬৭ সালে বিশ্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি সংস্থা (World Intellectual Property Organization – WIPO) গঠিত হয় যা বিভিন্ন সদস্য দেশের Intellectual Property Office (IPO) গুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধনের কাজ করে। কিন্তু সংস্থাটির আইন প্রয়োগের তেমন কোন ক্ষমতা ছিলনা। ১৯৯৫ সালে বিশ্ব বানিজ্য সংস্থা (WTO) আন্তর্জাতিক ভাবে Agreements on Trade-Related Aspects of Intellectual Property Rights – TRIPS এর মাধ্যমে আই পি অধিকার আইন বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেয়। ১৫৪ টি সদস্যদেশের এই সংস্থাটি ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারি। এই ক্ষমতার প্রকাশ আমরা দেখতে পাই যখন TRIPS বাস্তবায়নের সাথে সাথে আফ্রিকার প্রায় আড়াই কোটি এইডস আক্রান্ত মানুষকে মৃত্যুর ঝুকিতে ঠেলে দেয়া হয়।

    পেটেন্ট এর মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন এখন আর শুধু সামরিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয় বরং ফল ফসল এবং গাছ গাছড়ার উপরও বিস্তৃত হয়েছে। যুগযুগ ধরে জনগনের মধ্যে প্রচলিত উৎপাদন প্রনালী গুলোতে বহুজাতীক কোম্পানিগুলোর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

    ব্রাজিল জীববৈচিত্রের দিক দিয়ে অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি দেশ যেখানে বিশ্বের ২২% উদ্ভিদের প্রজাতি জন্মে থাকে। কিন্তু এদের অর্ধেকের বেশিই এখন বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির দখলে।

    টেক্সাসের রাইসটেক নামে একটি কোম্পানী ভারত এবং পাকিস্তানে ব্যাপকভাবে চাষ হওয়া বাসমতি চালের পেটেন্টের জন্য আবেদন করে। জনমতের চাপে এর বিরুদ্ধে ভারত সরকার মামলা করতে বাধ্য হয়।

    লন্ডন অবজার্ভারের একটি রিপোর্টে বলা হয়যে ভারত উপমহাদেশের শতাধিক গাছ-গাছড়া যুক্তরাষ্ট্রের পেটেন্ট অফিসে রেজিস্ট্রেসনের অপেক্ষায় রয়েছে। ইতিমধ্যে নিম এবং হলুদের ঔষধি বিভিন্ন গুনাগুনের পেটেন্ট চলে গিয়েছে পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর হাতে। ট্রাইফোলিয়েট অরেঞ্জ নামে একধরনের কমলার চাষ বাংলাদেশে একসময় প্রচুর হতো। যুক্তরাষ্ট্রের একটি কোম্পানী এর উপর ১৫ বছর গবেষনা চালিয়ে তার ডি এন এ ফিংগার প্রিন্ট নির্নয় করে তার পেটেন্ট করে।

    উদ্ভিদের জেনেটিক বৈশিষ্টের উপর পেটেন্টের অধিকার হাইব্রিড ফসলের উপর গবেষনাকে উৎসাহিত করছে। অধিক উৎপাদনের আশায় কৃষকরা হাইব্রিড ফসলের দিকে ঝুকছে। এছাড়া সরকারি ভাবেও তাদের উপর হাইব্রিড বীজ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। এই হাইব্রিড বীজ পুনরায় উৎপাদন যোগ্য নয়। অর্থাৎ একবছরের উৎপাদিত ফসল পরের বছর বীজ হিসাবে ব্যাবহার করা যায়না। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে:

    প্রথমত: বীজের জন্য বহুজাতিক কোম্পানীর প্রতি স্থায়ী নির্ভরতা তৈরী হবে এবং একসময় তাদের নির্ধারিত দামে বীজ কিনতে বাধ্য হবে কৃষকরা। কারণ তারাই হাইব্রিড বীজের বাজার একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রন করে এবং তাদের নামেই রয়েছে পেটেন্ট।

    দ্বিতীয়ত: হাইব্রিড বীজের ব্যাবহারের ফলে একসময় দেশী প্রজাতীগুলো বিলুপ্ত হয়ে পড়বে (ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের অনেক প্রজাতীর ধান বিলুপ্ত হয়েছে অনেক প্রজাতী বিলুপ্তপ্রায়) ফলে বহুজাতিক কোম্পানীর বীজ না পাওয়া গেলে কৃষি উৎপাদন অসম্ভব হয়ে পড়বে। দেশীয় চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পুর্নতা নয় খাদ্যের জন্য বহুজাতিক কোম্পানীর প্রতি সম্পুর্ন নির্ভরশীলতা তৈরী হবে।

    ‘সবুজ বিপ্লব’ এর শ্লোগানে অধিক কৃষি উৎপাদনের নামে স্থানীয় কৃষিব্যবস্থা ধ্বংস করে বিদেশী বীজের প্রতি যে নির্ভরশীলতা তৈরী হচ্ছে তাতে লাভবান হচ্ছে বহুজাজতিক কোম্পানী, এসব বীজের পেটেন্ট শর্তে গ্যাট চুক্তির মেধাস্বত্ব আইন অনুযায়ী রয়ালিটি পাচ্ছে আমেরিকা আর ধ্বংস হচ্ছে দেশী প্রজাতি এবং পরিবেশ।

    ইসলামের দৃষ্টিতে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি:

    ইসলামে ব্যক্তিমালিকানা বলতে কোন বস্তু থেকে স্রষ্টার অনুমতি সাপেক্ষে লাভবান হওয়ার অধিকারকে বোঝায়। সুতরাং ইসলামে কোন বস্তুর মালিকানা ঐ বস্তু বা তা থেকে প্রাপ্ত লাভের উপর নির্ভর করেনা বরং ঐ বস্তুটির ব্যপারে এবং তা অর্জনের উপায়ের ব্যাপারে শরীয়ার অনুমতির উপর নির্ভর করে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কিছু বস্তুর মালিকানাকে বৈধ এবং কিছু বস্তুর মালিকানাকে অবৈধ করেছেন। তেমনি বস্তুর মালিকানা অর্জনের কিছু পদ্ধতিকে যেমন ক্রয়বিক্রয়, উপহার ইত্যাদিকে বৈধ এবং কিছু পদ্ধতি যেমন জুয়া, সূদ ইত্যাদিকে অবৈধ করেছেন।

    ইসলাম সম্পদের শরীয়া অনুমোদিত বৈধ ব্যবহারের অধিকারকে সংরক্ষন করে। কোন আবিস্কারক তার আবিস্কারকে বিক্রি বা হস্তান্তরের মাধ্যমে লাভবান হতে পারেন। একই ভাবে কোন ব্যাক্তি তার কেনা বই, সফটওয়্যার ইত্যাদি শরীয়া নির্ধারিত উপায়ে ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষন করেন যার মধ্যে রয়েছে বিক্রি, কপি তৈরি বা উপহার দেয়া ইত্যাদি। কিন্তু মূল লেখক বা উদ্ভাবকের নাম পরিবর্তন করা বৈধ হবে না কারন সেক্ষেত্রে তা হবে মিথ্যাচার যার অনুমতি নেই। এটি লেখক বা উদ্ভাবকের নৈতিক অধিকারের পর্যায়ভুক্ত। যেহেতু পুজিবাদী ব্যবস্থায় সবক্ষেত্রে বস্তুগত লাভের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়া হয় তাই এই বিষয়টিকেও আর্থিক লাভ-ক্ষতির ভিত্তিতে দেখা হয়ে থাকে। যেসকল ধর্মনিরপেক্ষ আইনের ভিত্তিতে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ যেমন বই, সফটওয়্যার বা বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের নির্দিষ্ট ব্যবহার নির্দিষ্ট কিছু ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রনে থাকে ইসলামী শরীয়াতে তার কোন ভিত্তি নেই। ইসলামের ক্র‌য় বিক্রয়ের শর্ত অনুযায়ী ক্রেতা বস্তুটির উপর সম্পুর্ন মালিকানা অর্জন করেন।

    আয়িশা (রা) হতে বর্নিত, তিনি বলেন – বারীরা এসে বললেন, আমি প্রতি বছর এক উকিয়া করে নয় উকিয়া আদায় করার শর্তে কিতাবাতের চুক্তি করেছি। এ ব্যাপারে আপনি আমাকে সাহায্য করুন। আয়িশা (রা) বললেন, তোমার মালিক পক্ষ সম্মত হলে আমি উক্ত পরিমাণ এককালীন দান করে তোমাকে আজাদ করতে পারি এবং তোমার ওয়ালা হবে আমার জন্য। তিনি তার মালিকের কাছে গেলেন, তারা তার এই শর্ত মানতে অস্বীকার করল। তখন তিনি বললেন, বিষয়টি আমি তাদের কাছে উত্থাপন করেছিলাম, কিন্তু ওয়ালা তাদেরই হবে, এ শর্ত ছাড়া তারা মানতে অসম্মতি প্রকাশ করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা) বিষয়টি শুনে এ সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন। আমি ঘটনাটি তাকে খুলে বললাম। তখন তিনি বললেন, তাকে নিয়ে নাও এবং আজাদ করে দাও। ওয়ালা তাদের হবে এ শর্ত মেনে নাও, (এতে কিছু আসে যায় না)। কেননা, যে আজাদ করবে, ওয়ালা তারই হবে। আয়িশা (রা) বলেন, এরপর রাসুলুল্লাহ (সা) সাহাবীগনের সমাবেশে দাঁড়িয়ে আল্লাহ’র হামদ ও সানা পাঠ করলেন আর বললেন, তোমাদের কিছু লোকের কি হল? এমন সব শর্ত তারা আরোপ করে, যা আল্লাহ’র কিতাবে নেই। এমন সব শর্ত, যা আল্লাহ’র কিতাবে নেই, তা বাতিল বলে গন্য হবে; এমনকি সে শর্ত শতবার আরোপ করলেও। কেননা আল্লাহ’র হুকুমই যথার্থ এবং আল্লাহ’র শর্তই নির্ভরযোগ্য। তোমাদের কিছু লোকের কি হল? তারা এমন কথা বলে যে, হে অমুক, তুমি আজাদ করে দাও, ওয়ালা (অভিভাবকত্ব) আমারই থাকবে। অথচ যে আজাদ করবে, সেই ওয়ালার অধিকারী হবে।

    এই হাদীসের শব্দচয়ন (Mantooq) এই ইঙ্গিত বহন করে যে, কোন শর্ত যা আল্লাহ’র কিতাব এবং তার রাসুলের সুন্নাহ’র সাথে সাঙ্ঘর্ষিক তা পালনীয় হবে না। এছাড়া আল্লাহ’র রাসুল (সা) বলেছেন, “মুসলমান গন তাদের চুক্তির শর্ত পালনে বাধ্য, যতক্ষন পর্যন্ত তা কোন হালালকে বাধাগ্রস্ত না করে বা হারামের অনুমতি না দেয়।”

    সুতরাং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের অধিকারের নামে যদি তার বৈধ ব্যবহারকে বাধাগ্রস্ত করা হয় তাহলে তা হবে আল্লাহ’র কিতাব এবং রাসুলের সুন্নাহ’র পরিপন্থি কারন তা শরীয়া নির্ধারিত ক্রয় বিক্রয়ের চুক্তির বিপরীত যেখানে যে কেউ তার ক্রয় কৃত বস্তু থেকে বৈধভাবে লাভবান হওয়ার অধিকার পেয়ে থাকেন।

    বাংলাদেশে পেটেন্ট আগ্রাসন – টিফা থেকে টিকফা:

    যুক্তরাষ্ট্র ২০০১ সাল থেকে প্রায় দশ বছর ধরে বাংলাদেশে টিফা (Trade and Investment Framework Agreement) বাস্তবায়নের চেষ্টা করে। অসংখ্য বার দুই দেশের মধ্য এর খসড়া আদান প্রদান হলেও কোন সরকারই তা বাস্তবায়নে সফল হয়নি। ব্যপক সমালোচিত এবং জনগনের কাছে প্রত্যাখ্যাত এই টিফা পরিবর্তিত আকারে টিকফা (Trade and Investment Cooperation Framework Agreement) নামে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয় হিলারী ক্লিনটনের সাম্প্রতিক সফরে। সরাসরি না বললেও চুক্তিটি যে প্রায় ১০ বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বাংলাদেশের উপর চাপিয়ে দিতে চাওয়া টিফা চুক্তিরই ছদ্ম নাম সেটা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এর কথা থেকে স্পষ্ট হয়: “তাড়াহুড়ো করে এ চুক্তি করা হচ্ছে না। দীর্ঘ প্রায় দশ বছর ধরে এর প্রক্রিয়া ও এ সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এর একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে”। গত ২৬-০৭-২০১১ তারিখে প্রথম আলো লিখেছে : “প্রায় ১০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ রূপরেখা চুক্তিটি (টিফা), শেষ পর্যন্ত তা করা হয়নি। এর বদলে টিইসিএফ করা হচ্ছে টিফার আদলেই। টিফা নামটি যুক্তরাষ্ট্র দিয়ে থাকলেও নতুন নামের প্রস্তাবটি দিয়েছে বাংলাদেশই। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।”

    এই সকল বানিজ্যিক চুক্তির অন্যতম দিক হচ্ছে আন্তর্জাতিক আই পি অধিকার সমূহের বাস্তবায়ন।

    টিফা চুক্তির প্রস্তাবনা ১৫ তে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির অধিকার (Agreements on Trade-Related Aspects of Intellectual Property Rights – TRIPS) বিষয়ক চুক্তি বা অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি রক্ষার প্রচলিত নীতির কার্জকর প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। অথচ ২০০৫ এ ডব্লিও টি ও এর দেয়া ঘোষণা অনুসারে বাংলাদেশ সহ অন্যান্য এলডিসি (Least Developed Countries) দেশগুলো ২০১৩ সাল পর্যন্ত ট্রেডমার্ক, কপিরাইট, পেটেন্ট ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি সম্পর্ক আইনের আওতার বাইরে থাকার সুযোগ পেয়েছে আর ফার্মাসিউটিক্যালসগুলো পেয়েছে ২০১৬ সাল পর্যন্ত। এর সুযোগে বাংলাদেশে ঔষধ কোম্পানি গুলো বিশ্বের প্রায় ৭৫ টি দেশে ঔষধ রপ্তানির সুযোগ পেয়ে থাকে।

    এ ব্যপারে সন্দেহ নেই যে এই চুক্তির অধীনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে বাধ্য করবে ট্রিপস বাস্তবায়ন করতে। এর ফলে বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস বা ঔষধ শিল্প, কম্পিউটার-সফওয়ারস সহ গোটা তথ্যপ্রযুক্তি খাত আমেরিকার কম্পানিগুলোর পেটেন্ট, কপিরাইট, ট্রেডমার্ক ইত্যাদির লাইসেন্স খরচ বহন করতে করতে দেউলিয়া হয়ে যাবে। ২০০৮ সালে Business Software Alliance (BSA) এর করা এক সমীক্ষা অনুসারে গোটা এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে সফ্টওয়ার ”পাইরেসির” হার সবচেয়ে বেশি- ৯২% আর ৯০% পাইরেসি নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে শ্রীলংকা। ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত শ্রীলংকা-আমেরিকা ৭ম টিফা বৈঠকে আমেরিকার বাণিজ্য প্রতিনিধি মাইকেল ডিলানির নেতৃত্বাধীন বাণিজ্য প্রতিনিধি দল এ বিষয়ে শ্রীলংকার উপর তীব্র চাপ প্রয়োগ করে। বৈঠকে মাইকেল ডিলানি বলেনঃ “We’d like to see a strengthened focus on intellectual property protection and strengthened enforcement.” অর্থাৎ ” আমরা দেখতে চাই মেধাসত্ত্ব সংরক্ষণের উপর জোর দেয়া হচ্ছে এবং এ আইন বাস্তবায়ন জোরদার হচ্ছে।” সফটওয়্যার পাইরেসিতে ২য় স্থান অধিকারকারী শ্রীলংকার উপর যে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে তা থেকে সহজেই অনুমেয় ১ম স্থান অধিকারী বাংলাদেশের অবস্থা কি হবে।

    উপসংহার

    বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের ধারনা মূলতঃ পুজিবাদি পরাশক্তিগুলোর সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার একটি মাধ্যম। উন্নত প্রযুক্তি এবং উৎপাদন পদ্ধতির অধিকারী হবার পর তারা এই জ্ঞানকে কুক্ষিগত করে রাখতে চায়। এর মাধ্যমে তারা চায় যেন অবশিষ্ট বিশ্ব প্রযুক্তি ও উৎপাদনের জন্য তাদের উপর নির্ভরশীল থাকে এবং তাদের উৎপাদিত পন্যের বাজারে পরিনত হয়।

    একটি পুর্নাংগ জীবন ব্যাবস্থা হিসেবে অন্য যেকোন বিষয়ের মত বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের ব্যাপারেও ইসলামের একটি সুস্পষ্ট অবস্থান রয়েছে। মুসলমানদের অবশ্যই পুঁজিবাদি শোষনের হাতিয়ার এ সকল আইন বর্জন করা উচিত। ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থার অধীনে শিল্প-সাহিত্য এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছিল তাতে কোনরকম বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ আইনের প্রয়োজন পড়েনি। ইউরোপ যখন অন্ধকার যুগ পার করছিল তখন মুসলিমগন কর্ডোভা, আলেকজান্দ্রিয়া এবং বাগদাদের মত শহর গুলোতে বিশাল লাইব্রেরী গড়ে তুলেছিল। ভবিষ্যত খিলাফত রাষ্ট্র অবশ্যই আবারো এরকম জ্ঞানভান্ডার গড়ে তুলতে সক্ষম হবে এবং তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্য একে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌছে দিবে – কোন রকম কপিরাইট বা পেটেন্ট এর বাধা ছাড়াই।

    মোঃ জাফর সাদিক

  • তফসীর – সূরা বাকারাহ: আয়াত ১৫২

    فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ

    সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ রাখবো এবং আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর; অকৃতজ্ঞ হয়ো না। [বাকারাহ: ১৫২]

    فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ এর ব্যখ্যা প্রসঙ্গে হাসান আল-বসরী বলেন, অর্থাৎ আমি তোমাদের উপর যা ফরজ করেছি তা পালনের মাধ্যমে আমাকে স্মরণ কর, এর ফলে তোমাদের জন্য আমার উপর যা ওয়াজিব হয় তা পূরণের মাধ্যমে আমি তোমাদের স্মরণ করব। অন্য বর্ণনায় আছে, আমার রহমতের মাধ্যমে স্মরণ করব।

    فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ এর ব্যখ্যা প্রসঙ্গে ইবনু আব্বাস (রা) বলেন, তোমাদের তাকে স্মরণ করা তাকে তোমাদের স্মরণ করা হতে শ্রেয়।

    সহীহ হাদীসে আছে, আল্লাহ তা’আলা বলেন, আমাকে যে মনে মনে স্মরণ করে, আমিও তাকে মনে মনে স্মরণ করি। তেমনি আমাকে যে পরিপূর্ণভাবে স্মরণ করে, আমি তাকে তার চাইতেও অধিক পরিপূর্ণভাবে স্মরণ করি।

    ইমাম আহমদ বলেন, আমাকে আবদুর রাজ্জাক, তাকে মুআম্মার কাতাদাহ হতে ও তিনি আনাস হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা বলেন, হে আদম সন্তান! আমাকে যদি তুমি মনে মনে স্মরণ কর, আমিও তোমাকে মনে মনে স্মরণ করব। আর আমাকে যদি তুমি পরিপূর্ণভাবে স্মরণ কর, তাহলে আমি তোমাকে ফেরেশতা হতেও পরিপূর্ণভাবে স্মরণ করব। অথবা তিনি বলেন, তোমার চাইতে উত্তমভাবে স্মরন করব। যদি তুমি আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হও, তাহলে আমি তোমার দিকে এক হাত অগ্রসর হব। যদি তুমি আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হও তবে আমি তোমার দিকে এক গজ অগ্রসর হব। আর যদি তুমি আমার দিকে হেটে আস, আমি তোমার দিকে দৌড়িয়ে যাব।

    হাদীসটির সনদ সহীহ। বুখারী শরীফে এটি কাতাদার সনদে উদ্ধৃত হয়েছে। ইমাম বুখারীকে কাতাদাহ বলেন- আল্লাহ অত্যন্ত মেহেরবান। তার পাক কালামে- وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা তার কৃতজ্ঞতা আদায়ের নির্দেশ দিলেন এবং কৃতজ্ঞতার বিনিময়ে অধিক কল্যাণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। যেমন, আল্লাহ বলেন:

    وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ

    যখন তোমাদের পালনকর্তা ঘোষণা করলেন যে, যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, তবে তোমাদেরকে আরও দেব এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর। [ইবরাহীম:৭]

    শাইখ আতা আবু রাশতা (রহ) বলেন, (এই আয়াতে) আল্লাহ তার বান্দাদের আদেশ দিচ্ছেন জিহ্বা, হৃদয় ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা প্রত্যেক প্রকার স্মরণের মাধ্যমে (তাদের রব) সুবহানাহু (ওয়া তা’আলা)কে স্মরণ করতে।

    আবু জা’ফর ইবন জারীর আত-তাবারী (রহ) এ আয়াতের ব্যখ্যায় বলেন, “অতপর আমাকে স্মরণ কর তোমাদের আমার আনুগত্যের মাধ্যমে আমি যা তোমাদের আদেশ করেছি ও যা নিষেধ করেছি তা হতে”

    ইমাম বাগাবী তার তাফসীরে বলেন, সাঈদ বিন জুবাইর (রহ) বলেছেন, আমাকে নিয়ামত ও প্রাচুর্যে স্মরণ কর, আমি তোমাদের কাঠিন্য ও পরীক্ষায় স্মরণ করব। এর ব্যখায় (নিম্নোক্ত আয়াতটি তুলে ধরেন):

    فَلَوْلَا أَنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُسَبِّحِينَ ~ لَلَبِثَ فِي بَطْنِهِ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ

    যদি তিনি ইতিপূর্বে আল্লাহর তসবীহ পাঠকারীদের অন্তর্ভুক্ত না হতেন, তবে তাঁকে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত মাছের পেটেই থাকতে হত। [সাফফাত: ১৪৪]

    তথ্যসূত্র:
       
    তাফসীর ইবন কাছীর
    তাফসীর তাবারী, আবু জা’ফর ইবন জারীর আত-তাবারী
    তাইসীর উল-উসূল ইলাত তাফসীর, শাইখ আতা আবু রাশতা
    তাফসীর উল-বাগাবী, আবু মুহাম্মদ আল-হুসাইন ইবন মাসউদ আল-বাগাবী

  • আত্ম-সমালোচনা-৩: সতর্কবাণী

    بسم الله الرحمن الرحيم
    السلام عليكم ورحمة الله وبركاته

    আল্লাহ্ তা’আলা কুরআনুল কারীমে বলেছেন:

    “তাদের অন্তরে ব্যাধি আছে আর আল্লাহ্ তাদের ব্যাধি আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। [সূরা বাকারাহ্: ১০]”

    “Being Heard” এবং ” Instant Gratification” এই দুইটি মারাত্মক ব্যাধি।

    আমরা সবসময় চাই, সবাই আমাদের বলা সব কথা শুনুক এবং প্রাধান্য দিক তথাপি আমাদের মুল্যায়ন করুক। আমরা খুব দ্রুত ফলাফল প্রত্যাশী। এই মন-মানসিকতা আমাদের সমাজব্যবস্থার প্রতিফলন। কিন্তু একজন সত্যিকার দ্বীনের দা’য়ী সবসময়ের কাম্য হওয়া উচিত; আল্লাহ’র সন্তুষ্টি অর্জন। যেমনটি, আমরা দেখি নুহ আ: এর বেলায়। কিংবা হাদীসে এসেছে কিয়ামাহ’র দিন এমন অনেক নবী আসবেন যাদের একজন অনুসারী ও থাকবে না। তাই, সবাইকে শুনতে হবে, মুল্যায়ন করতে হবে আর দ্রুততর ফলাফল লাভের প্রত্যাশী হওয়া যাবে না।

    আমাদের দ্বীনী ভাইদের যারা দাওয়াহ্’র কাজ করছেন; আল্লাহ্ আমাদের সকলকে এই ব্যাধিদ্বয় থেকে হিফাজত করুন।

    আমরা যা বলি তা যথার্থভাবে আমাদের অনুধাবন করতে হবে এবং তা পালনে সচেষ্ট হতে হবে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন:

    “হে মুমিনগণ! তোমরা যা কর না, তা কেন বল? তোমরা যা কর না, তা বলা আল্লাহ্’র কাছে খুবই অসন্তোষজনক।” [সূরা সাফফ্:২-৩]

    আর আমরা যে দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করছি তার উদ্দেশ্য যদি এই হয়;

    #মানুষ আপনার বাকচতুরতায় দৃষ্টি নিবন্ধ করবে আপনার দিকে,
    #আপনি লব্ধ জ্ঞান দ্বারা মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবেন,
    #আপনি বিদ্বানদের সাথে তর্কে লিপ্ত হবেন;

    তবে, এমন জ্ঞান থেকে আমাদের সকলের পানাহ্ চাওয়া উচিত।
    হে আল্লাহ্! আমাদের উপকারী জ্ঞান দাও।

    আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন:

    “এবং বোঝাতে থাকুন; কেননা, বোঝানো মুমিনদের উপকারে আসবে।” [সূরা যারিয়াত:৫৫]

    আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের বোঝার তৌফিক দিন।

    امين
    سبحانك اللهم و بحمدك أشهد أن لا إله إلا أنت أستغفرك و أتوب إليك

    সায়্যিদ মাহমুদ গজনবী

  • আল্লাহর আনুগত্যে অগ্রগামীতা

    (নিচের প্রবন্ধটি বৈরুত, লেবানন থেকে প্রকাশিত ‘মিন মুকাওয়্যামাতিন নাফসিয়্যাতিল ইসলামিয়্যাহ’ বইটির খসড়া অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

    আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,

    وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالأرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ

    ‘তোমরা ছুটে যাও তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ হতে ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার প্রশস্ততা হচ্ছে আসমান ও যমীন, যা প্রস্তুত করা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য।’ [আলে ইমরান: ১৩৩]



    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেন,

    إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ~ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَخْشَ اللَّهَ وَيَتَّقْهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ

    মুমিনদের বক্তব্য কেবল এ কথাই যখন তাদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্যে আল্লাহ্‌ ও তার রাসূলের দিকে তাদেরকে আহ্বান করা হয়, তখন তারা বলে: আমরা শুনলাম ও আদেশ মান্য করলাম। তাঁরাই সফলকাম। যারা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে আল্লাহ্‌কে ভয় করে ও তাঁর শাস্তি থেকে বেঁচে থাকে তারাই কৃতকার্য। [আন-নূর: ৫১-৫২]



    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেন,

    وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلالا مُبِينًا

    ‘আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূল কোন কাজের আদেশ করলে কোন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন এখতিয়ার নেই। যে আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের আদেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়। [আহযাব: ৩৬]

    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেন,

    فَلا وَرَبِّكَ لا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব, তোমার পালনকর্তার কসম, তারা (প্রকৃত) ঈমানদার নয়, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক বলে মনে না করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোন রকম সংকীর্ণতা পায় না এবং তা হৃষ্টচিত্তে কবুল করে নেয়।’ [নিসা: ৬৫]



    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ

    হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ। তাঁরা অমান্য করে না আল্লাহ্‌ যা তাদের আদেশ করা হয়েছে, এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করে। [তাহরীম: ৬]



    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেন,

    فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى فَمَنِ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشْقَىٰ  ~ وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَىٰ ~ قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَىٰ وَقَدْ كُنتُ بَصِيرًا ~ قَالَ كَذَٰلِكَ أَتَتْكَ آيَاتُنَا فَنَسِيتَهَا وَكَذَٰلِكَ الْيَوْمَ تُنسَىٰ

    এরপর যদি আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে হেদায়েত আসে, তখন যে আমার বর্ণিত পথ অনুসরণ করবে, সে পথভ্রষ্ট হবে না এবং কষ্টে পতিত হবে না। এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব। সে বলবে: হে আমার প্রতিপালক, আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন ? আমি তো চক্ষুষ্মান ছিলাম। আল্লাহ্‌ বলবেন: এমনিভাবে তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। তেমনিভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাব।’ [তোয়া-হা: ১২৩-১২৬]



    রাসূল (সা) বলেছেন:

    بَادِرُوا بِالْأَعْمَالِ فِتَنًا كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ يُصْبِحُ الرَّجُلُ مُؤْمِنًا وَيُمْسِي كَافِرًا أَوْ يُمْسِي مُؤْمِنًا وَيُصْبِحُ كَافِرًا يَبِيعُ دِينَهُ بِعَرَضٍ مِنْ الدُّنْيَ

    অন্ধকার রাতের ন্যায় ফিতনা আসার আগেই দ্রুত সৎকর্ম সেরে ফেল। সেসময় একজন ব্যক্তি সকালে মুসলিম ও সন্ধ্যায় কাফের বা সন্ধ্যায় মুমিন ও সকালে কাফের হয়ে যাবে এবং দুনিয়ার সামগ্রীর জন্য সে তার দ্বীনকে বিক্রি করে দেবে। [মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, ২১৩]

    নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে ছুটে যেতেন এবং সৎকর্মের দিকে ধাবিত হতেন তারা আল্লাহর রাসূল ও তার পরবর্তী যুগে বিদ্যমান ছিলেন। উম্মাহ এখনো তাদের মতো অগ্রগামী মানুষ তৈরি করে যারা তাদের রবের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল এবং নিজেদের (সত্ত্বাকে) বিক্রি করেছিল আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)র সন্তুষ্টির প্রত্যাশায়। যেমন:

    মুত্তাফাকুন আলাইহি হাদীসে এসেছে এবং জাবির (রা) বর্ণিত যে:

    قَالَ رَجُلٌ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ أُحُدٍ أَرَأَيْتَ إِنْ قُتِلْتُ فَأَيْنَ أَنَا قَالَ فِي الْجَنَّةِ فَأَلْقَى تَمَرَاتٍ فِي يَدِهِ ثُمَّ قَاتَلَ حَتَّى قُتِلَ

    এক ব্যক্তি (উহুদ যুদ্ধের দিন) রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বললেন, আপনি কী মনে করেন, আমি যদি শহীদ হয়ে যাই তাহলে আমি কোথায় অবস্থান করবো? তিনি বললেন, জান্নাতে। তারপর উক্ত ব্যক্তি হাতের খেজুরগুলো ছুড়ে ফেললেন, এরপর তিনি লড়াই করলেন। অবশেষে তিনি শহীদ হয়ে গেলেন।

    মুসলিম বর্ণিত আনাস (রা) এর হাদীসে এসেছে:

    فَانْطَلَقَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- وَأَصْحَابُهُ حَتَّى سَبَقُوا الْمُشْرِكِينَ إِلَى بَدْرٍ وَجَاءَ الْمُشْرِكُونَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- « لاَ يُقَدِّمَنَّ أَحَدٌ مِنْكُمْ إِلَى شَىْءٍ حَتَّى أَكُونَ أَنَا دُونَهُ ». فَدَنَا الْمُشْرِكُونَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- « قُومُوا إِلَى جَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَوَاتُ وَالأَرْضُ ». قَالَ يَقُولُ عُمَيْرُ بْنُ الْحُمَامِ الأَنْصَارِىُّ يَا رَسُولَ اللَّهِ جَنَّةٌ عَرْضُهَا السَّمَوَاتُ وَالأَرْضُ قَالَ « نَعَمْ ». قَالَ بَخٍ بَخٍ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- « مَا يَحْمِلُكَ عَلَى قَوْلِكَ بَخٍ بَخٍ ». قَالَ لاَ وَاللَّهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِلاَّ رَجَاءَةَ أَنْ أَكُونَ مِنْ أَهْلِهَا. قَالَ « فَإِنَّكَ مِنْ أَهْلِهَا ». فَأَخْرَجَ تَمَرَاتٍ مِنْ قَرْنِهِ فَجَعَلَ يَأْكُلُ مِنْهُنَّ ثُمَّ قَالَ لَئِنْ أَنَا حَيِيتُ حَتَّى آكُلَ تَمَرَاتِى هَذِهِ إِنَّهَا لَحَيَاةٌ طَوِيلَةٌ – قَالَ – فَرَمَى بِمَا كَانَ مَعَهُ مِنَ التَّمْرِ. ثُمَّ قَاتَلَهُمْ حَتَّى قُتِلَ

    রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর সাহাবীগণ বদরের দিকে রওয়ানা দিলেন এবং (মক্কার) মুশরিকদের আগেই সেখানে পৌছে গেলেন। যখন মুশরিকরাও সেখানে এসে পৌছল রাসূলুল্লাহ (সা) (মুসলিমদের) বললেন: “আমার আগে তোমাদের কেউ যেন সামনে অগ্রসর না হয়।” মুশরিকরা (আমাদের দিকে) অগ্রসর হল এবং রাসূলুল্লাহ (সা) (আমাদের) বললেন: “জান্নাতে প্রবেশ করার জন্য ওঠো, যার বিস্তৃতি আসমান ও জমীন পর্যন্ত।” উমাইর ইবনে হাম্মাম আনসারী বলল, হে আল্লাহর রাসূল! জান্নাত কি আসমান ও জমীন পর্যন্ত প্রশস্ত? তিনি বললেন, হ্যাঁ। একথা শুনে সে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠল: বাহ, বাহ! রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, কী তোমাকে বাহ-বাহ বলতে উদ্ধুদ্ধ করছে? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর শপথ! আর কিছুই নয়, কেবল এই জিনিস যে, আমিও তার বাসিন্দা হব। তিনি বললেন: “নিশ্চয়ই তুমি (জান্নাত) এর অধিবাসীদের অন্তুর্ভূক্ত।” অতঃপর সে তার থলি হতে খেজুর বের করে খেতে লাগল। সে বলতে লাগল, যদি আমি আমার এইসব খেজুর খাওয়া পর্যন্ত জীবিত থাকি তবে তা হবে একটা দীর্ঘজীবন। (রাবী বলেন, এ কথা বলে) সে তার সব খেজুর ফেলে দিল এবং কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে গেল।

    মুত্তাফাকুন আলাইহি হাদীসে এসেছে এবং আনাস (রা) বর্ণিত যে:

    غَابَ عَمِّي أَنَسُ بْنُ النَّضْرِ عَنْ قِتَالِ بَدْرٍ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ غِبْتُ عَنْ أَوَّلِ قِتَالٍ قَاتَلْتَ الْمُشْرِكِينَ لَئِنْ اللَّهُ أَشْهَدَنِي قِتَالَ الْمُشْرِكِينَ لَيَرَيَنَّ اللَّهُ مَا أَصْنَعُ فَلَمَّا كَانَ يَوْمُ أُحُدٍ وَانْكَشَفَ الْمُسْلِمُونَ قَالَ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعْتَذِرُ إِلَيْكَ مِمَّا صَنَعَ هَؤُلَاءِ يَعْنِي أَصْحَابَهُ وَأَبْرَأُ إِلَيْكَ مِمَّا صَنَعَ هَؤُلَاءِ يَعْنِي الْمُشْرِكِينَ ثُمَّ تَقَدَّمَ فَاسْتَقْبَلَهُ سَعْدُ بْنُ مُعَاذٍ فَقَالَ يَا سَعْدُ بْنَ مُعَاذٍ الْجَنَّةَ وَرَبِّ النَّضْرِ إِنِّي أَجِدُ رِيحَهَا مِنْ دُونِ أُحُدٍ قَالَ سَعْدٌ فَمَا اسْتَطَعْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا صَنَعَ قَالَ أَنَسٌ فَوَجَدْنَا بِهِ بِضْعًا وَثَمَانِينَ ضَرْبَةً بِالسَّيْفِ أَوْ طَعْنَةً بِرُمْحٍ أَوْ رَمْيَةً بِسَهْمٍ وَوَجَدْنَاهُ قَدْ قُتِلَ وَقَدْ مَثَّلَ بِهِ الْمُشْرِكُونَ فَمَا عَرَفَهُ أَحَدٌ إِلَّا أُخْتُهُ بِبَنَانِهِ قَالَ أَنَسٌ كُنَّا نُرَى أَوْ نَظُنُّ أَنَّ هَذِهِ الْآيَةَ نَزَلَتْ فِيهِ وَفِي أَشْبَاهِهِ {مِنْ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ}

    আমার চাচা আনাস ইবনে নযর (রা) বদরের যুদ্ধের সময় অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, মুশরিকদের সাথে আপনি প্রথম যে যুদ্ধ করেছেন, আমি সে সময় অনুপস্থিত ছিলাম। আল্লাহ যদি আমাকে মুশরিকদের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধে শরীক হওয়ার সুযোগ দেন, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ দেখতে পাবেন যে, আমি কী করি।’ তারপর উহুদের যুদ্ধে মুসলিমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে আনাস ইবনে নযর (রা) বলেন, হে আল্লাহ! এরা (অর্থাৎ তার সঙ্গীগণ) যা করেছে, তার ব্যাপারে আপনার কাছে ওজর পেশ করছি এবং তারা অর্থাৎ মুশরিকরা যা করেছে তা থেকে আমি নিজেকে সম্পর্কহীন বলে ঘোষণা করছি। তারপর তিনি এগিয়ে গেলেন এবং সাদ ইবনে মু’আয-এর সাথে তার সাক্ষাৎ হলো। তিনি বললেন, ‘জান্নাত’, হে সা’দ ইবনে মু’আয, নযরের রবের কসম, উহুদের দিক থেকে আমি এর সুগন্ধ পাচ্ছি। সা’দ (রা) বলেন, আল্লাহর রাসূল, তিনি যা করেছেন, আমি তা করতে পারিনি। আনাস (রা) বলেন, আমরা তাকে এমতবস্থায় পেয়েছি যে, তার দেহে আশিটিরও অধিক তলোয়ার, বর্শা ও তীরের জখম রয়েছে। আমরা তাকে নিহত অবস্থায় পেলাম। মুশরিকরা তার দেহ বিকৃত করে ফেলেছিল। তার বোন ছাড়া কেউ তাকে চিনতে পারেনি এবং বোন তার আঙ্গুলের ডগা দেখে চিনতে পেরেছিল। আনাস (রা) বলেন, আমরা অভিমত পোষণ করতাম বা ধারণা করতাম যে, কুরআনের এই আয়াতটি, (মুমিনদের মধ্যে কিছু পুরুষ আল্লাহর সাথে তাদের কৃত ওয়াদা র্পূণ করেছে) তার ও তার মত মুমিনদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে।

    আবু সারূআহ (রা) হতে বুখারী বর্ণনা করেন:

    صَلَّيْتُ وَرَاءَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْمَدِينَةِ الْعَصْرَ فَسَلَّمَ ثُمَّ قَامَ مُسْرِعًا فَتَخَطَّى رِقَابَ النَّاسِ إِلَى بَعْضِ حُجَرِ نِسَائِهِ فَفَزِعَ النَّاسُ مِنْ سُرْعَتِهِ فَخَرَجَ عَلَيْهِمْ فَرَأَى أَنَّهُمْ عَجِبُوا مِنْ سُرْعَتِهِ فَقَالَ ذَكَرْتُ شَيْئًا مِنْ تِبْرٍ عِنْدَنَا فَكَرِهْتُ أَنْ يَحْبِسَنِي فَأَمَرْتُ بِقِسْمَتِهِ

    আমি মদীনায় নবী (সা)-এর পিছনে আসরের সালাত আদায় করলাম। সালাম ফিরানোর পর তিনি তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়ে যান এবং দ্রুত মুসল্লীগণকে ডিঙিয়ে তাঁর সহর্ধর্মিনীগণের কোন একজনের কক্ষে গেলেন। তাঁর এই দ্রুততায় মুসল্লিগণ ঘাবড়িয়ে গেলেন। নবী (সা) তাদের কাছে ফিরে এলেন এবং দেখলেন যে, তাঁর দ্রুততার কারণে তাঁরা বিস্মিত হয়ে পড়েছেন। তাই তিনি বললেন: আমাদের কাছে রক্ষিত কিছু স্বর্ণের কথা মনে পড়ে যায়। তা আমার প্রতিবন্ধক হোক, সেটা আমার অপসন্দ হল, তাই তা বন্টন করার নির্দেশ দিয়ে দিলাম।

    আরেক বর্ণনায় আছে,

    كُنْتُ خَلَّفْتُ فِي الْبَيْتِ تِبْرًا مِنْ الصَّدَقَةِ فَكَرِهْتُ أَنْ أُبَيِّتَهُ فَقَسَمْتُهُ

    ঘরে একখণ্ড স্বর্ণ রেখে এসেছিলাম কিন্তু রাত পর্যন্ত তা ঘরে থাকা আমার অপসন্দ হল, কাজেই তা বন্টন করে দিয়ে এলাম।

    এই ঘটনা দিকনির্দেশনা দেয় যে, মুসলিমদের আল্লাহ কর্তৃক অর্পিত অবশ্য-পালনীয় কাজসমূহ পালন করার ব্যাপারে দ্রুত অগ্রসর হওয়া উচিত।

    আল-বুখারী আল-বাররা’ (রা) হতে বর্ণনা করেন যিনি বলেন,

    لَمَّا قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ صَلَّى نَحْوَ بَيْتِ الْمَقْدِسِ سِتَّةَ عَشَرَ أَوْ سَبْعَةَ عَشَرَ شَهْرًا وَكَانَ يُحِبُّ أَنْ يُوَجَّهَ إِلَى الْكَعْبَةِ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى

    যখন রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় আগমন করেন, তখন ষোল অথবা সতের মাস বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করলেন। আর তিনি কা’বার দিকে মুখ করে দাড়াতে খুবই আগ্রহী ছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা নাযিল করলেন:

    قَدْ نَرَى تَقَلُّبَ وَجْهِكَ فِي السَّمَاءِ فَلَنُوَلِّيَنَّكَ قِبْلَةً تَرْضَاهَا

    নিশ্চয়ই আমি আপনাকে বার বার আকাশের দিকে তাকাতে দেখি। অতএব, অবশ্যই আমি আপনাকে সে কেবলার দিকেই ঘুরিয়ে দেব যাকে আপনি পছন্দ করেন [বাকারা: ১৪৪]

    فَوُجِّهَ نَحْوَ الْكَعْبَةِ وَصَلَّى مَعَهُ رَجُلٌ الْعَصْرَ ثُمَّ خَرَجَ فَمَرَّ عَلَى قَوْمٍ مِنْ الْأَنْصَارِ فَقَالَ هُوَ يَشْهَدُ أَنَّهُ صَلَّى مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَّهُ قَدْ وُجِّهَ إِلَى الْكَعْبَةِ فَانْحَرَفُوا وَهُمْ رُكُوعٌ فِي صَلَاةِ الْعَصْرِ

    সুতরাং যখন তাকে কা’বার অভিমুখী করে দেয়া হয়, একজন ব্যক্তি তার সাথে আসর সালাত আদায় করছিল। অতঃপর (সালাত শেষে) সে বেরিয়ে যায় এবং (আসরের সালাতরত) আনসারদের একটি দলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সে বলল, সে সাক্ষ্য দিচ্ছে যে সে নবী (সা) এর সাথে সালাত আদায় করেছে এবং তাকে (সালাতে) কা’বার অভিমুখী করা হয়েছে। এবং (এ কথা শুনে) তারা সকলে আসরের সালাতে কা’বা অভিমুখী হয়ে গেল রুকুরত অবস্থায়।

    আল-বুখারী ইবন আবি আওফা (রা) হতে বর্ণনা করেন যিনি বলেন:

    أَصَابَتْنَا مَجَاعَةٌ لَيَالِيَ خَيْبَرَ فَلَمَّا كَانَ يَوْمُ خَيْبَرَ وَقَعْنَا فِي الْحُمُرِ الْأَهْلِيَّةِ فَانْتَحَرْنَاهَا فَلَمَّا غَلَتِ الْقُدُورُ نَادَى مُنَادِي رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَكْفِئُوا الْقُدُورَ فَلَا تَطْعَمُوا مِنْ لُحُومِ الْحُمُرِ شَيْئًا قَالَ عَبْدُ اللَّهِ فَقُلْنَا إِنَّمَا نَهَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأَنَّهَا لَمْ تُخَمَّسْ قَالَ وَقَالَ آخَرُونَ حَرَّمَهَا أَلْبَتَّةَ وَسَأَلْتُ سَعِيدَ بْنَ جُبَيْرٍ فَقَالَ حَرَّمَهَا أَلْبَتَّةَ

    খাইবার যুদ্ধের সময় আমরা ক্ষুদায় কষ্ট পাচ্ছিলাম। খাইবার বিজয়ের দিন আমরা পালিত গাধার দিকে এগিয়ে গেলাম এবং তা যবেহ করলাম। যখন তা হাড়িতে বলক আসছিল তখন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ঘোষণা দানকারী ঘোষনা দিল: তোমরা হাড়িগুলো উপুর করে ফেল। গাধার গোশত থেকে তোমরা কিছুই খাবে না। আবদুল্লাহ ইবন আবু আওফা (রা) বলেন, আমরা কেউ কেউ বললাম, রাসূলুল্লাহ (সা) এজন্য নিষেধ করেছেন, যেহেতু তা থেকে খুমুস বের করা হয়নি। রাবী বলেন, আর অন্যরা বললেন, বরং তিনি এটাকে নিশ্চিতভাবে হারাম করেছেন। (শায়বানী বলেন) আমি এ ব্যাপারে, সাঈদ ইবন জুবাইর (রা) কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, নিশ্চিতভাবে তিনি তা হারাম করেছেন।

    আল-বুখারী আনাস বিন মালিক (রা) হতে বর্ণনা করেন যিনি বলেন:
     

    كُنْتُ أَسْقِي أَبَا طَلْحَةَ الْأَنْصَارِيَّ وَأَبَا عُبَيْدَةَ بْنَ الْجَرَّاحِ وَأُبَيَّ بْنَ كَعْبٍ شَرَابًا مِنْ فَضِيخٍ وَهُوَ تَمْرٌ فَجَاءَهُمْ آتٍ فَقَالَ إِنَّ الْخَمْرَ قَدْ حُرِّمَتْ فَقَالَ أَبُو طَلْحَةَ يَا أَنَسُ قُمْ إِلَى هَذِهِ الْجِرَارِ فَاكْسِرْهَا قَالَ أَنَسٌ فَقُمْتُ إِلَى مِهْرَاسٍ لَنَا فَضَرَبْتُهَا بِأَسْفَلِهِ حَتَّى انْكَسَرَتْ

    আমি আবু তালহা আনসারী, আবু উবায়দা ইবন জাররাহ ও উবাই ইবন কা’বকে আধাপাকা খেজুরের তৈরি পানীয় (মদ) পরিবেশন করছিলাম। তখন তাদের কাছে একজন আগুন্তুক এসে বলল, নিঃসন্দেহে মদ হারাম করে দেওয়া হয়েছে। আবু তালহা (রা) বলেন, আমি উঠে গিয়ে আমাদের ঘটি দিয়ে তার তলায় আঘাত করলাম আর তা ভেঙ্গে গেল।

    আল-বুখারী আয়েশা (রা) হতে বর্ণনা করেন যিনি বলেন:

    وَبَلَغْنَا أَنَّهُ لَمَّا أَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى أَنْ يَرُدُّوا إِلَى الْمُشْرِكِينَ مَا أَنْفَقُوا عَلَى مَنْ هَاجَرَ مِنْ أَزْوَاجِهِمْ وَحَكَمَ عَلَى الْمُسْلِمِينَ أَنْ لَا يُمَسِّكُوا بِعِصَمِ الْكَوَافِرِ أَنَّ عُمَرَ طَلَّقَ امْرَأَتَيْنِ

    আমাদের বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা নাযিল করেন, মুসলিমগণ যেন মুশরিক স্বামীদের সেসব খরচ আদায় করে দেয় যা তারা তাদের হিজরতকারী স্ত্রীদের জন্য ব্যয় করেছে এবং মুসলিমদের নির্দেশ দেন যেন তারা কাফির স্ত্রীদের আটকিয়ে না রাখে। তখন উমর (রা) তাঁর দুই স্ত্রী (কুরায়বা বিনতে আবু উমাইয়্যা ও বিনতে জারওয়াল খুজায়ী)কে তালাক দিয়ে দেন।

    আল-বুখারী আয়েশা (রা) হতে বর্ণনা করেন যিনি বলেন:

    يَرْحَمُ اللَّهُ نِسَاءَ الْمُهَاجِرَاتِ الْأُوَلَ لَمَّا أَنْزَلَ اللَّهُ { وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ } شَقَّقْنَ مُرُوطَهُنَّ فَاخْتَمَرْنَ بِهَا

    আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন। যখন আল্লাহ নাযিল করলেন {তারা যেন তাদের মাথর ওড়না দিয়ে তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ ঢেকে রাখে} তারা তাদের চাদর/শাল ছিড়ে নিজেদেরকে তার দ্বারা ঢেকে নিয়েছিল।

    আবু দাউদ, সাফিয়াহ বিনতে শাইবাহ হতে, যিনি আয়েশা (রা) হতে বর্ণনা করেছেন:

    أَنَّهَا ذَكَرَتْ نِسَاءَ الأَنْصَارِ فَأَثْنَتْ عَلَيْهِنَّ وَقَالَتْ لَهُنَّ مَعْرُوفًا وَقَالَتْ لَمَّا نَزَلَتْ سُورَةُ النُّورِ عَمَدْنَ إِلَى حُجُورٍ فَشَقَقْنَهُنَّ فَاتَّخَذْنَهُ خُمُرًا

    তিনি (আয়েশা) আনসারী নারীদের কথা স্মরণ করলেন এবং তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের ব্যপারে ভালো কথা বললেন। তারপর তিনি বললেন, যখন (পর্দার আয়াতসহ) সূরা নূর নাযিল হয়, তখন তারা (আনসারী নারীগণ) তাদের পর্দার কাপড় নিয়ে তা ছিড়ে তা দিয়ে মাথা ঢাকার কাপড় বানিয়ে নেয়।

    ইবন ইসহাক বলেন:

    …  وقَدِمَ على رسول الله – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – الأشعث بن قيس في وفد كِنْدة. فحدثني الزهري أنه قدم في ثمانين راكباً من كندة، فدخلوا على رسول الله – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – مسجدَه، قد رجَّلوا جُمَمَهم (جمع جُمَّة وهي شعر الرأس الكثيف) وتكحَّلوا، عليهم جُبَبُ الحِبَرَة قد كفَّفوها بالحرير. فلما دَخَلُوا على رسول الله – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – قال لهم: أَلَمْ تسْلِمُوا؟ قالوا: بلى. قال: فَما بالُ هذا الحَرِير في أَعْناقِكُم؟ قال: فشَـقُّوه منها فألقَوْه.

    রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে কিন্দা গোত্রের প্রতিনিধির অংশ হিসেবে আল-আশআছ বিন কায়েস এসেছিলেন। আয-যুহরী আমাকে জানিয়েছেন তিনি কিন্দা থেকে ৮০ জন ঘোড়সওয়ারীসহ এসেছিলেন। তারা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মসজিদে প্রবেশ করে তাঁর নিকট যান। তাদের চুল ছিল লম্বা এবং চোখে ছিল কাজল। তারা রেশমের পাঁড়যুক্ত জুব্বা পড়েছিলেন। যখন তারা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সামনে উপস্থিত হলেন, তিনি (সা) তাদের বললেন, তোমরা কি ইসলাম কবুল করনি? তারা বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। তিনি (সা) জিজ্ঞেস করলেন, তবে, তোমাদের গলায় এইসব রেশম (কাপড়) কী কারণে? তিনি বলেন, অতঃপর তারা তাদের গলা হতে তা (রেশম বস্ত্রাদি) ছিড়ে ফেলে ও তা ছুড়ে ফেলে দেয়।

    ইবন জারীর আবু বুরাইদা হতে, যিনি তার পিতা হতে বর্ণনা করেন:

    بَيْنا نَحْنُ قُعُود على شَراب لَّنا وَنَحْنُ على رملة وَنَحْنُ ثَلاثَة أَوْ أَرْبَعَة، وَعِنْدَنا باطية لَّنا وَنَحْنُ نَشْـَرب الخَـمْـر حِـلاًّ إِذ قُـمْـتُ حَتى آتي رَسُولَ الله – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – فَأسلم عَلَيْهِ إِذ نـزل تَحْرِيم الخَمْر ]يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ [إِلى آخِر الآيتَيْن ]فَهَلْ أَنْتُمْ مُنتَهُونَ [فَجِـئْـتُ إلى أَصْـحـابي فَقَرَأتُها عَلَيْهِم إلى قَوْلِه ]فَهَلْ أَنْتُمْ مُنتَهُونَ [قال: وَبَعْضَ القَوْم شَربته في يَدَه قَدْ شرب بَعْضها وَبقي بَعْضَ في الإناء، فَقال بالإناء تَحْتَ شفته العليا، كَما يفْعَل الحجّام، ثُمَّ صبّوا ما في باطيتهم فَقالوا: اِنْتَهَيْنا رَبَّنا

    একদা আমরা আমাদের পানীয় (পান করা)র জন্য বসে ছিলাম এবং আমরা সংখ্যায় তিন বা চারজন ছিলাম। আমাদের কাছে একটি জগ ছিল এবং আমরা মদ হালাল (থাকা অবস্থায় তা) পান করছিলাম। এরপর আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট যাই তাকে সালাম জানাই। সে সময় মদকে হারাম ঘোষণা করে কুরআন নাযিল হচ্ছিল: (যাতে বলা হচ্ছিল) {হে ঈমানদারগণ, নিশ্চয়ই মদ ও জুয়া} থেকে আয়াতদ্বয়ের শেষ পর্যন্ত {তবে কি তোমরা বিরত হবে না} এরপর আমি আমার সঙ্গীদের নিকট এসে তাদের {তবে কি তোমরা বিরত হবে না} পর্যন্ত তেলাওয়াত করে শোনালাম। তিনি বলেন: তাদের কিছু লোকের হাতে পানীয় ছিল যার কিছু অংশ সে পান করেছে কিছু পাত্রে অবশিষ্ট রয়েছে। সে তার পাত্রকে তার উপরের ঠোটের নিচু অংশে উচু করে তুলে ধরল যেভাবে হাজ্জামরা করে থাকেন। অতঃপর তারা তাদের জগ হতে সব ঢেলে ফেলে দিলেন এবং বলতে লাগলেন: আমরা বিরত হয়েছি আমাদের পালনকর্তা।

    হানজালা বিন আবি আমির (রা) যাকে ফেরেশতাগণ গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদ যুদ্ধে যাবার আহ্বান শোনার সাথে সাথেই অতিদ্রুত সাড়া দিয়েছিলেন। তিনি উহুদের দিনে শহীদ হয়েছিলেন। ইবন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন,

    إِنَّ صاحِبَكُم لَتغسلَهُ المَلائِكَة فاسْأَلُوا أَهْلَهُ ما شأنُه؟

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছে, তার পরিবারকে জিজ্ঞেস কর তার অবস্থা সম্পর্কে? তার স্ত্রী ঐ রাতে নববধু ছিল। (তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো) সে বলল, তিনি যখন (যুদ্ধের) আহ্বানে সাড়া দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তিনি অপবিত্র অবস্থায় ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন,

    كَذَلِكَ غَسَلَتْهُ المَلائِكَة

    এ কারণেই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছিল।

    ইমাম আহমদ রাফি’ বিন খাদীজ (রা) হতে বর্ণনা করেন যিনি বলেন:

    حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ حَدَّثَنَا أَيُّوبُ عَنْ يَعْلَى بْنِ حَكِيمٍ عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ يَسَارٍ عَنْ رَافِعِ بْنِ خَدِيجٍ قَالَ كُنَّا نُحَاقِلُ بِالْأَرْضِ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَنُكْرِيهَا بِالثُّلُثِ وَالرُّبُعِ وَالطَّعَامِ الْمُسَمَّى فَجَاءَنَا ذَاتَ يَوْمٍ رَجُلٌ مِنْ عُمُومَتِي فَقَالَ نَهَانَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ أَمْرٍ كَانَ لَنَا نَافِعًا وَطَاعَةُ اللَّهِ وَرَسُولِهِ أَنْفَعُ لَنَا نَهَانَا أَنْ نُحَاقِلَ بِالْأَرْضِ فَنُكْرِيَهَا عَلَى الثُّلُثِ وَالرُّبُعِ وَالطَّعَامِ الْمُسَمَّى وَأَمَرَ رَبَّ الْأَرْضِ أَنْ يَزْرَعَهَا أَوْ يُزْرِعَهَا وَكَرِهَ كِرَاءَهَا وَمَا سِوَى ذَلِكَ

    রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সময় আমরা জমি আবাদ করতাম। আমরা এই জমি এক তৃতীয়াংশ, এক চতুর্থাংশ অথবা একটি নির্দিষ্ট পরিমান শস্যের বিনিময়ে ইজারা দিতাম। একদিন আমার বাবার দিকের আত্মীয় আমার কাছে এসে বললেন “রাসূলুল্লাহ আমাদের এমন কিছু করতে নিষেধ করেছেন যা আমাদের জন্য লাভজনক, (কিন্তু হারাম) বরং আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্যই আমাদের জন্য বেশি লাভজনক। তিনি (সা) আমাদের এক তৃতীয়াংশ, এক চতুর্থাংশ অথবা একটি নির্দিষ্ট পরিমান শস্যের বিনিময়ে ইজারা দিতে নিষেধ করেন এবং তিনি জমির মালিকদের আদেশ দেন তারা যেন নিজেরা জমি চাষ করে অথবা অন্যদের দিয়ে দেয় যাতে তারা তাদের নিজেদের জন্য তা চাষ করতে পারে। তিনি (সা) ইজারা দেয়া বা এ ধরনের কাজকে অপছন্দ করতেন।

  • বিনোদন কি? ইসলামে কি বিনোদনের সুযোগ নেই?

    অপসংস্কৃতি আর বেহায়াপনার বিপক্ষে কথা বলতে গেলেই, উন্মাতাল অশ্লীলতা আর অনৈতিক বেলেল্লাপনার বিরুদ্ধে লিখতে গেলেই সমাজের একটি অংশ থেকে প্রতিবাদ আসে। আসে মৌলবাদের অভিযোগ। প্রগতি বিরোধী ও প্রাচীনপন্থী খেতাব পাওয়ার বিষয়টি তো খুবই পুরনো কথা।

    তবে সহজ সরল সাধারণ মানুষ যখন বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের বক্তব্যে দ্বিধান্বিত হয়ে সত্য জানতে চান, তখন আর নিজেকে গুটিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। ইসলাম ও বিনোদনের মধ্যকার সম্পর্কটিও এমনই একটি প্রাসঙ্গিক বিষয়। অপসংস্কৃতির বিপক্ষে কথা বলতে গেলে প্রাসঙ্গিকভাবেই এ বিষয়টি এসে পরে যে, তাহলে ইসলামে কি বিনোদনের কোনো সুযোগ নেই?

    ইসলামে বিনোদনের সুযোগ আছে কি না, সে বিষয়ে আলোচনার আগে সংস্কৃতি কাকে বলে এবং বিনোদন বিষয়টি কি, তা সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তাহলে খুব সহজেই ইসলামের সাথে সংস্কৃতি ও বিনোদনের সম্পর্কটিও সহজভাবে অনুধাবন করা সম্ভব হবে।

    প্রচলিত সহজ অর্থে সংস্কৃতি হচ্ছে এমন কিছু কর্মকান্ড, যার মাধ্যমে মানুষ সভ্যতার শিক্ষা পায়। বর্বরতা ও উগ্রতা পরিহার করে ভদ্র হয়। কারো মতে, সংস্কৃতি হচ্ছে এমন বিষয়, যা মানুষের মন ও মননকে সুসভ্য করে গড়ে তোলে।

    আর বিনোদন বলতে সহজ অর্থে আমরা বুঝে থাকি এমন ক্রিয়া-কলাপ, যা মানুষকে আনন্দিত করে, প্রশান্তি এনে দেয়। অবসাদকে পেছনে ফেলে স্বচ্ছ ও প্রশান্ত হৃদয়ে নব উদ্যমে সত্য ও সুন্দরের পথে এগিয়ে যেতে বিনোদন মানুষকে সহযোগিতা করে।

    উপরোক্ত অর্থের আলোকে এবার আমরা যদি সংস্কৃতি ও বিনোদনকে পাশাপাশি রেখে বিবেচনা করি তাহলে বিষয়টি এমন দাঁড়ায় যে, ‘সাংস্কৃতিক বিনোদন’ হতে হবে এমন কিছু মৌলিক কর্মকান্ড, যা কিছু সুন্দর ক্রিয়া-কলাপের মাধ্যমে মানুষের আত্মাকে প্রশান্তি দিয়ে তাকে সুসভ্য ও ভদ্র হতে সহযোগিতা করবে। ক্লান্তি আর অবসাদকে খুবই সাবলীলভাবে ব্যক্তির অজান্তেই দূরে সরিয়ে দিবে এবং শরীর ও মন উভয়কেই এক অনাবিল, অপার্থিব শান্তি এনে দিবে।

    যদি সংস্কৃতি ও বিনোদনের অর্থ এটিই হয়ে থাকে, সংস্কৃতি ও বিনোদন বিষয়ে যদি আমার এই আত্ম উপলব্ধি ভুল না হয়ে থাকে তাহলে আমি সর্বোচ্চ দৃঢ়তার সাথে এবং চূড়ান্ত স্পষ্টভাবে বলতে পারি যে, সংস্কৃতি ও বিনোদনের মূল উৎসই হচ্ছে -একমাত্র ইসলাম। ইসলাম ছাড়া, ইসলাম সমর্থিত পন্থা ও পদ্ধতি ছাড়া সংস্কৃতি ও বিনোদন বলতে পৃথিবীতে আর কিছু নেই। ইসলাম অসমর্থিত ও বিরুদ্ধ যে কোনো পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার কার্যকলাপকেই সংস্কৃতি কিংবা বিনোদন বলে প্রচার করার চেষ্টা হোক না কেন, প্রকৃতপক্ষে তা চূড়ান্ত পর্যায়ের অসভ্যতা, অভদ্রতা আর অপসংস্কৃতির আখড়া ছাড়া কিছুই নয়।

    সংস্কৃতি ও প্রগতির উৎস একমাত্র ইসলাম কেন?

    তবে আসুন, এবার বিষয়টির আরেকটু গভীরে যাওয়া যাক। উপরের আলোচনায় সংস্কৃতি ও বিনোদনের সংজ্ঞা বা পরিচয়ের ক্ষেত্রে যদি কারো দ্বিমত না থাকে তাহলে একটু ভেবে বলুন তো, মানুষ সত্যিকার প্রশান্তি ও প্রকৃত আনন্দ কিভাবে, কিসের মাধ্যমে এবং কোথায় অনুভব করে?

    -হ্যাঁ আত্মা। রূহ বা আত্মার মাধ্যমেই কেবল প্রকৃত প্রশান্তি আর অনাবিল স্বস্তি অর্জন করা সম্ভব।

    প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যেই দু’টি বস্তু বিদ্যমান। একটি হচ্ছে তার দেহ বা শরীর। আর অপরটি হচ্ছে তার রূহ বা আত্মা। মানব দেহ বা শরীর গঠনের মূলে রয়েছে মাটি। এজন্য মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা মানব দেহের খাদ্য বা খোরাকের ব্যবস্থাও করেছেন এই মাটি হতেই। আমরা যত প্রকার খাবারই গ্রহণ করি, একটু খেয়াল করলে দেখবো যে তার সবই এই মাটি থেকেই উৎপন্ন ও সৃষ্ট। মূলগতভাবে এই মাটির মাধ্যমেই তা আপন অস্তিস্তে এসেছে।

    পক্ষান্তরে মানুষের মাঝে সদা-সর্বদা বিরাজমান রূহ বা আত্মা কিন্তু মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়নি। এই রূহ সম্পর্কে এর স্রষ্টা তথা মহান আল্লাহ তা‘আলা বেশি কিছুও আমাদেরকে জানান নি। কেবলমাত্র এতোটুকুই বলেছেন যে, ‘এটি হচ্ছে তার রবের একটি আদেশ।’ এর বাইরে রূহ সম্পর্কে কোনো তথ্য অবগত হওয়ার সুযোগ আমাদের নেই। হয়তো সে সম্পর্কে উপলব্ধি অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যাপাসিটিই আমাদের নেই। -সে যাক ভিন্ন কথা। মূল কথা ছিলো রূহ এসেছে সরাসরি মহান আল্লাহর কাছ থেকে। এর আকার আকৃতি আমাদের ধারণাতীত।

    বিষয়টি সহজে বোঝার জন্য আমরা একটি মোবাইল ফোনের উদাহরণের দেখতে পারি। একটি মোবাইল ফোনেরও কিন্তু দু’টি অংশ একটি হচ্ছে সেট, অপরটি হচ্ছে সিম। মোবাইল সেটকে সচল ও কার্যকর রাখার জন্য নিয়মানুযায়ী তাকে চার্য দিতে হয়। অপরদিকে সিমকে প্রাণবন্ত রাখার জন্য তাতে রিচার্জ করতে হয়। এই রিচার্জটিও যথেচ্ছ করলে হয় না, বরং যেই কোম্পানী থেকে সিম কেনা হয়েছে, সরাসরি সেই কোম্পানীর কাছ থেকেই বা তার নির্ভরযোগ্য প্রতিনিধির মাধ্যমেই রিচার্জ করতে হয়। এর ফলে সিম যখন তার মূল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সাথে সংযুক্ত হতে সক্ষম হয়, তখনই কিন্তু মোবাইল ফোনটি পূর্ণরূপে ব্যবহার উপযোগী হয়ে ওঠে। এই যে মোবাইল সিম এবং তার প্রস্তুত কারক প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগের বিদ্যমানতা এটিই মোবাইলের মূল প্রাণশক্তি। কিন্তু মোবাইল সেট বা সিম তন্ন তন্ন করে খুজলেও আসলে কিছুই পাওয়া যাবে না। কেননা, মূল বিষয়টি হচ্ছে সিম কোম্পানীটির একটি নির্দেশনা বা অনুমোদন। ব্যাস্। এ পর্যন্তই।

    মহান আল্লাহর সৃষ্টি হাজারো মাখলুকাতের মধ্যে একটি সৃষ্টি হচ্ছে এই মানুষ। এখন এই মানুষই যদি এমন সুক্ষ্ম বিষয়ে উদ্ভাবন ঘটাতে পারে, তাহলে এই মানুষ এবং এরকম হাজারো সৃষ্টির যিনি স্রষ্টা, তার কাজ যে কত নিখুঁত হবে, তা বলাই বাহুল্য।

    যেহেতু মানুষের আত্মাকে স্বয়ং মহান আল্লাহ নিজ কুদরতে সৃষ্টি করেছেন তাই মানুষের আত্মাকে প্রশান্ত করার জন্য এবং স্বস্তিদায়ক প্রকৃত বিনোদন লাভ করার জন্য এই মানবাত্মার সৃষ্টিকারী মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দেয়া নির্দেশনা অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। স্বয়ং মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে দেয়া মানবজাতির জন্য তার সমগ্র জীবনের যথোপযুক্ত দিক-নির্দেশনা তথা ইসলামী শারিয়া অনুযায়ী চলার মাধ্যমেই মানবাত্মা তার প্রকৃত সুখ, শান্তি আর প্রশান্তি লাভ করতে পারে। এর ব্যতিক্রম হলে সম্ভব নয়।

    এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা আবশ্যক, আর তা হচ্ছে মানুষের আত্মার তিনটি দিক বা ভাব রয়েছে যথাক্রমে:

    ‘নফসে আম্মারাহ’, ‘লাউয়ামা’ এবং ‘মুতমাইন্না’।

    ‘নাফসে আম্মারা’ সাধারণত: মানুষকে যে কোনো উপায়ে কেবলমাত্র শারীরিক ও ইন্দ্রিয়গত তুষ্টি অর্জনের জন্যই প্ররোচিত করে থাকে। একারণেই কখনো কখনো মহান আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কিছু কাজ সাময়িকের জন্য খুব মজাদার ও স্বস্তিদায়ক মনে হলেও খানিক ব্যবধানেই তার প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচিত হয়। বীষাক্ত সাপের বাহ্যিক চাকচিক্যময়তায় প্রতারিত হয়ে ফাঁদে পড়লে পরিণামে যে কি খেসারত দিতে হয়, তা খানিক পরেই বোঝা যায়।

    ‘নাফসে মুতমাইন্না’ মানবাত্মাকে সর্বদা তার স্রষ্টার সাথে সংযুক্ত করতে সচেষ্ট থাকে এবং সরাসরি স্রষ্টার কাছ থেকেই প্রকৃত প্রশান্তি ও সত্যিকার স্বস্তি অর্জন হয় এর মাধ্যমেই। এ কারণে বাহ্যিকভাবে এবং প্রাথমিক দিকে এর ভূমিকা একটু কষ্টকর মনে হলেও প্রকৃত সাফল্য ও চূড়ান্ত পর্যায়ের খাঁটি প্রশান্তি একমাত্র এর মাধ্যমেই পাওয়া যায়। ‘নাফসে লাউয়ামা’ এর ভূমিকা মাঝামাঝি। সে নিজে কোনো দিকে প্রাধান্য দিতে পারে না।

    উপরের সামগ্রিক আলোচনা হতে এটা পরিস্কার হয়ে গেলো যে, প্রকৃতপক্ষে সংস্কৃতি ও বিনোদনের মূল উৎসই হচ্ছে ইসলাম। এবার আমাদের সমাজে সংস্কৃতি ও বিনোদনের নামে প্রচলিত আচার-অনুষ্ঠান গুলোর দিকে একটু নজর দেয়া যাক। এক্ষেত্রে দেখা যাবে যে, অধিকাংশের সাথেই ইসলামের কোনো দূরতম সম্পর্কও নেই। নেই আত্মাসমূহের স্রষ্টা মহান আল্লাহর নির্দেশনার সম্পৃক্ততা। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরাসরি মহান আল্লাহর দেয়া বিধান ও দিক-নির্দেশনার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি মহান আল্লাহর সাথে বিদ্রোহ করে এবং তাকে অস্বীকার করে বিকৃত মস্তিস্কের কিছু লোক এমন কিছু উদ্ভট অনৈতিক ও অপসাংস্কৃতির ক্রিয়া-কলাপের আয়োজন করছে, যার অসারতা ও সীমাহীন ক্ষতিকর দিকসমূহ সুস্থ মস্তিস্কের যে কোনো ব্যক্তি মাত্রই অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন। কিন্তু সমস্যা হলো অনেক সময়ই বাহ্যিক চাকচিক্য ও প্রচার-প্রচারণার ফলে আমাদের বিবেকের চোখের উপর পর্দা পড়ে যায়। যার কারণে তখন আমরা রঙিন আয়নার চশমা দিকে রঙিন সব মাকাল ফলকে সুন্দর দেখলেও, চশমা সরিয়ে নিতেই আসল বাস্তবতা সামনে চলে আসে।

    সর্বশেষ যে বিষয়টি উল্লেখ না করলেই নয়, তা হচ্ছে শুধু কিছু গৎ বাঁধা নীতিকথার মধ্যেই ইসলাম মানুষকে সীমাবদ্ধ করে রাখে নি। আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি ভুল ধারণা ‘ইসলামে সামাজিক অনুষ্ঠানের তেমন কোনো সুযোগ নেই।’ বরং এটি তো সত্যের পুরোপুরি অপলাপ। বরং ইসলামে যতো সামাজিক অনুষ্ঠানের সুযোগ ও সুন্দর ব্যবস্থা আছে, অন্য কোনো মতাদর্শ, মতবাদ তো বটেই, রহিত হয়ে যাওয়া পূর্ববর্তী আসমানী ধর্ম গুলোতেও তার নজীর মিলবে না।

    জামাত বদ্ধ হয়ে নামায আদায়, রোযা, হজ্জ্ব, যাকাত, ঈদ, জুম‘আ ছাড়াও অসংখ্য সামাজিক অনুষ্ঠানাদির ইসলাম কেবল অনুমতিই দেয় নি, বরং ক্ষেত্র বিশেষে তার আবশ্যিক নির্দেশনাও প্রদান করেছে। শালীনতার পর্যায়ে থেকে এবং শরীয়তের নীতিমালার আলোকে যে শারিরীক নৈপূন্য এবং ক্রিয়া অনুষ্ঠানের ব্যাপারেও কোনো নিষেধ নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে রাসূল সা. এ ব্যাপারে উম্মতকে উদ্বুদ্ধও করেছেন।

    একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে আনন্দদায়ক ও প্রশান্তির বিষয় হচ্ছে অপর মুসলিম ভাইকে সহযোগিতা করা। অসহায় ও দুর্দশাগ্রস্থ ব্যক্তিদের সাহায্যে এগিয়ে যাওয়ার। অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো এবং গরীবকে সাহায্য করার মাধ্যমে যেই নির্মল বিনোদন ও আত্মিক প্রশান্তি লাভ হয়, অন্য কোনো ভোগ-বিলাসের মাধ্যমে তা কখনো অর্জন করা সম্ভব নয়। নফল সাদাকা, উশর, যাকাত, কুরবানী ইত্যাদির মাধ্যমে ইসলাম মুসলিমদেরকে সুন্দর সংস্কৃতি আর আত্মিক প্রশান্তিদায়ক যেই বিনোদনের সন্ধান দিয়েছে, পৃথিবীর অন্য কোনো মতবাদ আর মতাদর্শ তার বিকল্প দিতে পারে নি। এমন সুন্দর ব্যবস্থাপনার পূর্ণতার জন্য ইসলাম রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিপূর্ণ কাঠামোও প্রদান করেছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম বাস্তবায়িত হলে পুরো দেশের সংস্কৃতি আর সকল ক্রিয়া-কর্মই প্রশান্তিদায়ক হয়ে যায়। এজন্যই মুসলিম সমাজের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি উপলক্ষই বিনোদন। একজন মুসলিম তার প্রতিটি কাজের মাধ্যেই তার স্রষ্টা মহান আল্লাহর নির্দেশনা অনুভব করে। এর মাধ্যমে তার দেহ দুনিয়াতে থাকলেও তার আত্মা লাভ করে জান্নাতের অনাবিল প্রশান্তি। একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনের সকল কর্মকান্ডই সংস্কৃতিময় হয়ে থাকে। সে তার প্রতিটি কাজেই স্বর্গীয় প্রশান্তি আর আনন্দ লাভ করে থাকে।

    ইসলাম বাস্তবায়িত মুসলিম সমাজের এই চিত্র এবং অবস্থা বর্তমান কুফর শাসন ব্যবস্থার জুলুমের যাঁতাকলে আকণ্ঠ নিমজ্জিত, নিষ্পেষিত আশাহীন মানুষদেরকে বোঝানো সম্ভব নয়। বর্তমান কুফুরি সমাজ ব্যবস্থায় কেবলমাত্র শাসকশ্রেণী ও তাদের পদলেহনকারী গুটিকতেক ব্যক্তি সামান্য কিছু ইন্দ্রিয় তুষ্টিদায়ক সুখের সন্ধান পেলেও অবশিষ্ট জনগণ এবং পুরো দেশবাসী ভোগ করে জাহান্নামের আযাব। এই সকল আযাবে দিশেহারা ব্যক্তিরা যেনো বিদ্রোহ না করে এজন্যই মানবরচিত জীবন ব্যবস্থা ও এর উদ্যোক্তারা মাঝে মধ্যে কিছু দিবস পূজার আয়োজন করে, উপলক্ষ্য সৃষ্টি করে কিছু উন্মত্ত অনুষ্ঠানের। যাতে করে এই সকল অপসংস্কৃতিতে অসহায় মানুষ গুলো সামান্য হলেও বিকৃত সুখ আস্বাদন করে সন্তুষ্ট থাকে।

    পাশাপাশি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী গুলোও এই সুযোগে জনসাধারণের আবেগকে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করে লাভের অংক চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়িয়ে নিতে তৎপর হয়ে ওঠে। যেহেতু পুঁজিবাদের দৃষ্টিতে সব কিছুই সম্পদ এবং মুনাফা অর্জনের উপলক্ষ মাত্র, তাই পুঁজিবাদী আদর্শে গড়ে ওঠা বেনিয়াগোষ্ঠী গুলোও অন্যান্য জড়পদার্থের মতো মানুষকেও তাদের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। তাদের দৃষ্টিতে মানুষের আবেগ এবং অনুভূতি বিশেষত: প্রাকৃতিকভাবে মানুষের মাঝে বিদ্যমান ‘যৌনতা’ হচ্ছে তাদের ব্যবসার জন্য সবচেয়ে ‘প্রফিটেবল’ বিষয়। যৌন সূরসূরি দিয়ে কিংবা অন্য যে কোনোভাবে মানুষের মধ্যকার এই আদিমতাকে উজ্জীবিত করে নিজেদের ব্যবসায়িক রথের সাথে জুড়ে দিতে পারলে আর কি লাগে! এবার পাগলা ঘোড়ার চাইতেও দ্রুতবেগে তাদের ব্যবসা ছুটতে থাকবে সামনের দিকে।

    এই মূলনীতির আলোকেই সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী গুলো তাদের ব্যবসা পরিচালনা ও ব্যবসা সম্প্রসারণ করে আসছে। আর তাদের এই নিকৃষ্ট কর্মতৎপরতার প্রথম এবং প্রধান শিকার হচ্ছে আমাদের দেশের মুসলিম যুব-তরুণ সমাজ। এজন্যই আজ আমরা একটি ছোটো চকলেট থেকে এক বোতল পানীয় পর্যন্ত, মাথার চুলের তেল থেকে নিয়ে পায়ের নখের নেল পলিস পর্যন্ত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র যে কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপনেই নগ্ন, অর্ধনগ্ন নারীর যথেচ্ছ ব্যবহার প্রত্যক্ষ করছি। দেখতে বাধ্য হচ্ছি। নারী-পুরুষের অশ্লীল ঢলা-ঢলি আর উদ্ভট লম্ফ-ঝম্ফ ছাড়া কোনো বিজ্ঞাপনই যেনো পূর্ণতা পায় না। আর এসব ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন ও নেটওয়ার্ক সার্ভিস প্রদানকারীদের বাড়াবাড়ি তো সীমা অতিক্রম করেছে অনেক আগেই। যুব তরুণদেরকে অবৈধ প্রেম-পরকিয়ায় আসক্ত করে তাদের দিয়ে রাতদিন কানে ফোন গুঁজে গ্যাজানোর যেই বদভ্যাস রপ্ত করানো হচ্ছে, এর ফাঁকে শত-সহস্র কোটি ডলারের মুনাফা কিন্তু অপচক্রটি নিমিশেই হাতিয়ে নিচ্ছে।

    এসকল ক্ষেত্রেই ইসলামের চরম আপত্তি। বিবাহ বহির্ভুতভাবে এবং বেগানা নারী-পুরুষের অনৈতিক দেখা-সাক্ষাত ও অবাধ মেলা-মেশার গর্হিত সুযোগ ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। কেননা এই সকল ক্রিয়া-কলাপে শারীরিক কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ উত্তেজিত হলে, এর মাধ্যমে কখনই আত্মিক প্রশান্তি অর্জন করা যায় না। খুজলী-ঘামাচির চুলকানোর সময় সামান্য সুখ অনুভূত হলেও খানিক পরেই যেমন জ্বালাপোড়া শুরু হয়, তেমনি ঐসকল ঢলাঢলির ফলশ্র“তিতে যেই জ্বালাপোড়া শুরু হয়, ঘর থেকে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে যেই বীষবাষ্প ছড়িয়ে পরে, তার রেশ থেকে যায় যুগ যুগ ধরে অনন্তকাল।

    এজন্যই সামান্য ছুতা-নাতায় নারী-পুরুষের ঢলা-ঢলির আয়োজন, যৌন সূরসূরি উৎপাদক ক্রিয়া কলাপ থেকে ইসলাম তার অনুসারীদেরকে কেবল বিরত থাকতে বলেই ক্ষ্যান্ত হয় নি, বরং একে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করেছে। আর এটিই হচ্ছে বর্তমানের প্রগতির ধ্বজাধারী, ইসলাম বিরোধী অপশক্তির আক্রোশের মূল উৎস। সহজে ও কম খরচে অবাধ যৌনাচারের পথ রুদ্ধ হওয়া এবং অশ্লীলতার মাধ্যমে নাফসে আম্মারাকে তুষ্ট করার অপপ্রয়াস বাঁধাপ্রাপ্ত হওয়ার ফলেই আমাদের সুশিল সমাজ আজ ইসলামের এই নীতিমালা ও সুন্দর বিধানের উপর এতো ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ।

    কিন্তু তারা বিষয়টিকে লোক সম্মুখে তার আপন স্বরূপে বলতে লজ্জাপান বিধায় এটাকেই সংস্কৃতি ও বিনোদনের মোড়কে তুলে ধরার ব্যর্থ প্রয়াস চালান এবং অনৈতিক ও অশ্লীলতার বিপক্ষে ইসলামের অবস্থানকে সংস্কৃতি ও বিনোদনের বিপক্ষে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কৌশল হাতে নিয়ে উঠে পড়ে মাঠে নামেন। বিষয়টি সম্পর্কে আমাদের সকলের সম্যক ধারণা না থাকার কারণে আমরাও অনেক সময় দো’টানায় পড়ে যাই। বিভ্রান্ত হই।

    এই পুরো আলোচনা যদি আমাদেরকে সেই বিভ্রান্তি থেকে সমাধানেরর পথ দেখাতে পারে, অন্ধকারের মাঝে সামান্য আলোরও সন্ধান দিতে সক্ষম হয়, তবেই এই প্রচেষ্টা সফল হবে ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আমাদের সকলকে বিষয়টি সঠিকভাবে উপলব্ধি করার তাওফীক দিন। আমীন।

    ইসহাক খান