তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্ব কি আসল?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল ব্যাপক সম্পদরাজি, ভূ-রাজনৈতিক গুরত্ব ও অপরিশোধিত তেলের সর্ববৃহৎ উৎসের কারণে গত একশত বছর ধরে বিভিন্ন শক্তির সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আর এখানে ইরান অবশ্যই একটি গুরত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে পরিগণিত। একারণে যে শক্তি ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করবে এই অঞ্চলের আধিপত্য তারই।
যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরাক দখলের পর থেকেই বিভিন্ন উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তাদের সমালোচনার শিকার হয়েছে ইরান এবং প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের যুদ্ধের হুমকির মুখে পড়েছে। ২০০২ সালে বুশের স্টেট অব ইউনিয়ন ভাষণে শয়তানের অক্ষশক্তি ঘোষণার পর থেকে জর্জ বুশ ইরানের সাথে যে কোন সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিল। ইরাকে জঙ্গীবাদ উস্কে দেয়া, হিজবুল্লাহকে সমর্থন প্রদান ও পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টার জন্য ইরানকে দায়ী করা হচ্ছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। তাদের লক্ষ্য ভিন্ন হওয়ায় এ অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থের জন্য ইরান বড় হুমকি। সেকারণে ইরানকে নিরস্ত্র করা দরকার, বিশেষত পারমাণবিক অস্ত্র সমৃদ্ধকরণ এবং এর ইসলামিক ভাবমূর্তিকে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার মূল্যবোধ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন।
১৯৭৯ সালে তথাকথিত ‘ইসলামিক বিপ্লব’-এর পর আসা ধারাবাহিক সরকারগুলোর মধ্যে রাফসানজানি ও খাতামির শাসনামল থেকে ইউরোপ ও ইরানের সাথে সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে ইরানের কট্টর রক্ষণশীল ভাবমূর্তি থেকে বেরিয়ে আসবার চেষ্টা করা হয়েছে। এ কারণে বেশ কিছু জায়গায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা সম্প্রসারিত হয়েছে। ১৯৮৬ সালে মার্কিনীদের কাছ থেকে অস্ত্র ক্রয়ের মাধ্যমে ইরানের আসল চেহারা বের হয়ে আসে। আমেরিকা তার স্বঘোষিত শত্রুদেরকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য অর্থায়ন করতে থাকে, যেমন: নিকারাগুয়ায় একটি কমিউনিষ্ট- বিরোধী দলকে তারা সহায়তা দেয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের মাধ্যমে ইরানের কাছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী মিসাইল ও ভূমি থেকে শূন্যে নিক্ষেপনযোগ্য মিসাইল বিক্রয় করে।
মার্কিন কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে ইরানের বিষোদগার করলেও ইরানী সরকারে অবস্থানরত সংস্কারপন্থীরা ইরান, আফগানিস্তান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে সংরক্ষণ করে আসছে। ইরাকে এস সি আই আর নেতা আয়াতুল্লাহ হাকিম ও বদর ব্রিগেডের প্রতি তেহরান সমর্থন অব্যাহত রেখেছে-যারা দক্ষিণ ইরাকে মার্কিন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রধান সূত্র হিসেবে কাজ করছে। আফগানিস্তানে কাবুল, হেরাত ও কান্দাহারে ইরান ব্যাপকহারে পূনর্গঠন ও প্রশিক্ষণ কাজে অংশ নিচ্ছে। উত্তর আফগানিস্তানে পশতুন প্রতিরোধ ঠেকানোর জন্য ইরান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাকের-হ্যামিল্টনের রিপোর্টে এ ধরণের সম্পৃক্ততার কথা পাওয়া যায়, “…ইরাক ও অন্যান্য আঞ্চলিক ইস্যুতে ইতিবাচক নীতির ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি গ্রহণের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যক্ষভাবে ইরান ও সিরিয়ার সাথে সম্পৃক্ত হতে হবে। ইরান ও সিরিয়ার সাথে সম্পৃক্ত হবার সময় ইতিবাচক ফলাফলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড় দেয়া ও ছাড় না দেয়ার বিষয়গুলো বিবেচনায় আনতে হবে বিশেষ করে মাকির্ন-ইরান সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইরানকে সম্পৃক্ত করা সমস্যাপূর্ণ। এখন আফগানিস্তানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরের সহযোগী এবং উভয় পক্ষকেই চিন্তা করে দেখতে হবে ইরাকেও একই ধরণের সহযোগিতার মডেল অনুসরণ করা যায় কিনা?“
অপরদিকে পারমাণবিক শক্তিধর হওয়ার প্রচেষ্টাকে মার্কিনীরা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে সবসময়ই ইরানকে চাপের মধ্যে রাখার কৌশল গ্রহণ করেছে। ইসরাইল একমাত্র দেশ যারা মনে করে মাসখানেকের মধ্যে ইরান পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করতে যাচ্ছে। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিলভান সেলম নিউইয়র্কে ইহুদী নেতাদের এক বৈঠকে বলেন, “আমাদের জনবল, নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে তারা পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর খুব, খুব কাছাকাছি চলে এসেছে- হয়ত বা মাত্র ছয় মাসের মধ্যে তারা এ ব্যাপারে পুরো জ্ঞান লাভ করবে।“
২০০৫ সালে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিতব্য ইন্টারন্যাশনাল এটোমিক এনার্জি এজেন্সি (আই.এ.ই.এ) এর বৈঠকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনী নিউক্লিয়ার অস্ত্র সংরক্ষণ, উৎপাদন এবং ব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি ফতোয়া জারি করেন। এই সর্বোচ্চ নেতা ২০০৩ সালে ইসরাইলের সাথে শান্তি আলোচনার প্রস্তাব দেন।
অর্ধশতাব্দীরও বেশী সময়কাল ধরে বিভিন্নক্ষেত্রে ইরান ও মার্কিন সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। বর্তমানে আমরা ওয়াশিংটনের কাছ থেকে একধরণের মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাচ্ছি। যখন কোথাও কোথাও আমরা দুটি দেশের মধ্যে সহযোগিতা ও সুসম্পর্ক দেখতে পাই। আবার অন্যদিকে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি ও ইসলামিক ভাবমূর্তির জন্য প্রকাশ্যে ইরানকে তারা তিরষ্কার করে থাকে।
ইসলামিক বিপ্লবের পেছনে মার্কিন সহযোগিতা ইরানকে আমেরিকার ক্রীড়ানক হিসেবে ব্যবহারের পথকে সুগম করেছে। যুক্তরাষ্ট্র সচেতনভাবে উদ্দেশ্য হাসিল হবার পর ইসলামিক বিপ্লবকে থামিয়ে দেবার প্রচেষ্টা চালিয়েছে যেরকমভাবে পাকিস্তানে জিহাদীদেরকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারিত্বের ব্যাপারে উস্কে দিয়ে পরে থামানোর চেষ্টা করেছে।
১৯৭৯ সালে বিপ্লবের উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন প্রভাব বলয় থেকে বের হয়ে যাওয়া শাহকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা। সেক্ষেত্রে আমেরিকার কৌশলগত প্রাধান্য ছিল ইরানী জনগণের কাছে জনপ্রিয় বিকল্পকে দিয়ে শাহকে সরিয়ে দেয়া। সুদানি নেতা সাদেক আল মেহেদীর মধ্যস্ততায় বিপ্লবকে কার্যকরী করবার জন্য খোমেনী ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বৈঠকের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়াও এখানে প্রাক্তন অ্যাটর্নী জেনারেল রামসে ক্লার্ক ১৯৭৯ সালে খোমেনীর সাথে এ ব্যাপারে সরাসরি কথা বলেন। খোমেনীর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবের মাধ্যমে রক্ষণশীলেরা কার্যকরভাবে সামরিকবাহিনী, বিচারব্যবস্থা, গোয়েন্দা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। মার্কিন বিরোধী সকল প্রচারণার পরও ইরান কখনওই আমেরিকাকে তেল সরবরাহ করা বন্ধ করেনি কিংবা এ সম্পর্কিত কোন চুক্তি স্বাক্ষর করেনি। কট্টরপন্থীদের অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্র বিপ্লবকে বিপরীত খাতে প্রবাহিত করতে সমর্থ্য হয়নি। এই কট্টরপন্থীরাই তাদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করবার জন্য পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে চায় এবং স্পর্শকাতর অস্ত্র সংগ্রহ করতে চায়।
ইরানের জনগনের ৭০ ভাগেরই বয়স ৩০ এর নীচে। তার মানে সেদেশের জনগনের অধিকাংশই ইসলামী বিপ্লবের সময় জন্মই নেয়নি। এই তরুণ জনগনের বিপ্লব সম্পর্কে কোন স্বচ্ছ ধারণা নেই। আর তারা এমন একটি অংশ দ্বারা শাসিত হচ্ছে যারা বিপ্লবের আদর্শে উদ্বুদ্ধ। মার্কিনীরা সরাসরি ইরানী সরকারের সংস্কারপন্থী অংশ এবং ছাত্রদের সাথে সম্পৃক্ত এবং তাদেরকে এই ধারণা প্রদান করে যে, আমেরিকার স্বার্থ সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনে তারা সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে।
যুক্তরাষ্ট্র এব্যাপারে নিশ্চিত নয়, কিভাবে তারা ইরানের বিরুদ্ধে লক্ষ্য অর্জন করবে- কূটনৈতিকভাবে নাকি সামরিকভাবে? জর্জ বুশ দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকে এ ব্যাপারটি বেশ তোলপাড় তুলে এবং ওয়াশিংটন মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে থাকে।
ইরানের ব্যাপারে সঠিক সমাধান কি হবে এ ব্যাপারে দ্বন্দ্বের মধ্যে আছে বাস্তববাদী (realists) এবং নব্য রক্ষণশীলদের (neoconservatives) মতবাদ। আমেরিকান সরকারের সকল অংশ এবং বিভিন্ন সংস্থা, স্টেট ডিপার্টমেন্ট, পেন্টাগণ এবং সিআইএ যুদ্ধের ব্যাপারে একমত পোষণ করে। কিন্তু মতানৈক্য দেখা দেয় ২০০৪ সালে যখন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের জাতীয় প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ড জিবিংনিউ ব্রেজিনস্কির তত্ত্বাবধানে কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্স (সি.এফ.আর) সংস্থাটি ‘ইরানঃ টাইম ফর অ্যা নিউ এপ্রোচ’-নামক রিপোর্ট প্রকাশ করে। এ রিপোর্ট দাবী করে যে, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের উপযুক্ত সময় সম্পর্কে নব্য রক্ষণশীলদের বর্তমান ধারণা মোটেও সঠিক নয়। রিপোর্টের মতে, “রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতি ও অসন্তোষ সত্ত্বেও ইরান আরেকটি বিপ্লবের সম্মুখীন নয়। যারা বর্তমান ব্যবস্থার পুরোধা তারা পুরো পরিস্থিতি এখনও ভালভাবেই নিয়ন্ত্রণ করছে।” রিপোর্টে জোর দিয়ে বলা হয় সকল সমস্যা সমাধানের জন্য তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার তুমুল বিতর্ক অবাস্তব; বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিউক্লিয়ার শক্তি হবার উচ্চাকাংখা থেকে ইরানকে বিরত রাখার জন্য প্রধান বিষয়গুলো নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ডের নিকটবর্তী নব্য রক্ষণশীলেরা এই রিপোর্টের মতামতকে মুহূর্তের মধ্যে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন। নব্য রক্ষণশীল মাইকেল লেডেন, ন্যাশনাল রিভিউ অনলাইন-এ লিখেন যে, তেহরান হল ইসলামিক সন্ত্রাসীদের রাজধানী এবং সি এফ আর সুপারিশকে অপমানজনক ও আপোষকামী বলে উল্লেখ করেন।
বুশের দ্বিতীয়বারের শাসনামলে নব্য রক্ষণশীলদের প্রভাব ব্যাপকভাবে কমতে থাকে। নব্য রক্ষণশীলদের মধ্যে পল উলফোভিচ, জন বোল্টন প্রমুখ ব্যক্তিদেরকে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিশ্ব ব্যাংক ও জাতিসংঘের নীতি বাস্তবায়নের কাজে নিযুক্ত করা হয়। অন্যদের মধ্যে ডগলাস ফেইথকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। নব্য রক্ষণশীলদের বিদায়ের মাধ্যমে বুশ প্রশাসনে বাস্তববাদীরা (realists) সুযোগ পায়। পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক ব্যাপারগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও পেন্টাগনের ভেতর সামঞ্জস্য বিধান করা হয়। অন্যান্য সহযোগী দেশকে সম্পৃক্ত করে পূর্ববতী মার্কিন প্রশাসন যৌথভাবে সুদান, লেবানন, উত্তর কোরিয়া এবং ইরানের ব্যাপারে বিতর্কিত বিষয়গুলো সমাধানের প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে বাস্তবাদীদের উপস্থিতি ইরানের ব্যাপারে নব্য রক্ষণশীলদের ভূমিকাকে পুরোপুরি স্তদ্ধ করতে পারেনি। নব্য রক্ষণশীলতাবাদের কট্টর সমর্থক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি ইরানের তেল ও গ্যাসের উপর মার্কিন আধিপত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য সেদেশের উপর প্রচন্ড চাপ প্রয়োগের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।
পরিশেষে এ কথা বলা যায় যে, ইরান এবং মার্কিনীদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব সত্যিকার অর্থেই রয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেসব দ্বন্দ্বের উর্ধ্বে উঠে গিয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্রও প্রসারিত হয়। বুশ প্রশাসনের বাস্তবাদীরা এখন এগিয়ে আছে এবং তাদের নীতি হল একক প্রচেষ্টা বা সামরিক হস্তক্ষেপকে আপাত পরিহার করে বহুজাতিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইরানের সাথে বিতর্কিত নিউক্লিয়ার সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে এগিয়ে যাওয়া। তবে ইরানে সামরিক হামলা চালানোর ব্যাপারে যারা চাপ প্রয়োগ করছিল তাদের দমানোর ব্যাপারে বুশ প্রশাসনের ব্যর্থতা বিশ্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিবে।
মুসলিম বিশ্বের জন্য দুবাই কি এখন নতুন অর্থনৈতিক মডেল ?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)
দুবাইকে মুসলিম বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় নতুন অর্থনৈতিক সফলতা হিসেবে তুলে ধরা হয়। অপেক্ষাকৃত স্বল্প সময়ের মধ্যে দুবাইয়ের ৪৬ বিলিয়ন ডলারের সৃজনশীল রিয়েল এস্টেট এবং খেলাধুলা আয়োজনের ভিত্তিতে গড়ে উঠা অর্থনীতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়। অনেক অর্থনীতিবিদ জোর দিয়ে বলেছেন, তেল থেকে আলাদা এ অর্থনীতি অত্র অঞ্চলের জন্য উন্নয়নের নতুন তত্ত্ব উপস্থাপন করেছে এবং এটা ইসলামিক ধারার অর্থনৈতিক উন্নয়ন।উপসাগরীয় যুদ্ধের পর দুবাইকে তেল থেকে উপার্জিত অর্থের মাধ্যমে মুক্ত বাণিজ্য ও পর্যটনের দিকে উৎসাহিত করা হয়। যাবিল আলী ফ্রি জোনের সাফল্যকে সামনে রেখে দুবাই ইন্টারনেট সিটি, দুবাই মিডিয়া সিটি এবং দুবাই মেরিটাইম সিটির মত অসংখ্য ফ্রি জোন গড়ে তোলা হয়। বুরজ্ আল আরবের মত বিশ্বের উচ্চতম ফ্রি স্ট্যান্ডিং হোটেল সহ অন্যান্য আবাসিক স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে পর্যটনের বড় বাজার হিসেবে দুবাইকে তুলে ধরা হয়। ২০০২ সাল থেকে দ্যা পাম আইল্যান্ডস, দ্যা ওয়ার্ল্ড আইল্যান্ডস এবং বুরজ্ দুবাইয়ের মত ব্যক্তিখাতের গৃহায়ন শিল্পে বিনিয়োগ দেখতে পাওয়া যায়। সত্যি কথা বলতে দুবাইয়ের উন্নয়ন বলতে সুরম্য আকাশচুম্বী অট্টালিকা আর বৃহৎ আকারের শপিং মল ছাড়া আর কিছুই নয়।
বিগত বিশ বছর ধরে দুবাইয়ে লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন হবার কারণে মুসলিম বিশ্বের মধ্যে এটি একটি অনন্য অবস্থান করে নিয়েছে। প্রাচুর্যেও প্রদর্শনী, যেমন- সুরম্য অট্টালিকা ও অনন্য উন্নয়নের কারণে দুবাই এখন একটি আধুনিক শহর। এটা এমন একটি শহর যেখানে শুধুমাত্র ইসলামিক দেশগুলো থেকে মুসলিমরাই আসে না বরং পৃথিবীর সব দেশ থেকে সব শ্রেণীর লোকজনই আসে। দুবাই সবার জন্য প্রাচ্যের স্বাদে পশ্চিমা জীবনধারা উপহার দেয়। স্বদেশীয় লোক সেখানে সংখ্যালঘু। জনসংখ্যার শতকরা ৮৫ ভাগণ বিদেশী। দুবাইয়ের ছোট্ট দ্বীপ- পৃথিবীবাসীর জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় হওয়ায় অনেকের কাছে এটা সাফল্যগাঁথা হলেও এর পেছনে রয়েছে অন্যরকম অর্থনৈতিক উন্নয়নের রূপকগল্প।
দুবাইয়ে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে তেলসম্পদ। একসময়কার মৎসজীবিদের ছোট্ট গ্রামটি আধুনিক শহরে পরিণত হয়েছে তেল বিক্রির আয় থেকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটন ও সেবাখাতে অর্থনীতিকে পরিচালিত করা হচ্ছে। একারণে দুবাই এখন শুধুমাত্র মধ্যপ্রাচ্য নয় পুরো বিশ্বের জন্য আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। লন্ডন এবং নিউইয়র্কের মত ব্যবসায়িক প্রাণকেন্দ্র হওয়ার উচ্চাকাংখাও দুবাইয়ের রয়েছে।
দুবাইয়ের সমস্যা এই যে, এই উন্নয়ন অন্যরা অনুসরণ করতে পারবে না বরং এর উন্নয়ন অনন্য স্বতন্ত্র্য। এর উন্নয়নের গতিপ্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে এটি একটি প্রসারমান অর্থনৈতিক বেলুন। দুবাইয়ের প্রবৃদ্ধির পেছনে এর তেল সম্পদের রয়েছে ব্যাপক ভূমিকা। আর রয়েছে সেসব কোম্পানী- যেগুলো চলে বিদেশী শ্রমিকদের দিয়ে। ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে এর অবস্থানও সম্পদ সৃষ্টির পেছনে ভূমিকা রেখেছে। সমস্যা হল তেল সম্পদ অসীম নয় এবং ইতোমধ্যে এটি শেষ হওয়া শুরু করেছে। সেবাখাতের শ্রমিকগণ যারা সেদেশের উন্নয়নে ভূমিকা পালন করছে তারা অধিকাংশই বিদেশী। মোট জনসংখ্যার খুব সামান্যই স্বদেশীয় আরব।
উপরোক্ত বাস্তবতাসমূহ প্রমাণ করে যে, দুবাইয়ের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কোনভাবেই সত্যিকারের নয়। সে তার সীমিত সম্পদকে ব্যবহার করেছে এবং অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখবার জন্য স্বল্পশিক্ষিত ও দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশী বিশেষজ্ঞ আমদানি করেছে। এছাড়া দুবাই তার শহরের লোকজন ক্রয় করতে পারে এমন কোন পণ্য উৎপাদন করে না। তার ভোগ্যপণ্যসমূহকে উৎপাদনের জন্য দেশটির কোন প্রাকৃতিক সম্পদ বা অবকাঠামো নেই বলে জাতি হিসেবে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী নয়। বিদেশী নাগরিক ও কোম্পানিসমূহের জন্য করমুক্ত অঞ্চল হওয়ায় এর উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে। এ কোম্পানিসমূহ যখন কাউকে নিয়োগ দেয় তখন কোন ধরনের প্রযুক্তিগত জ্ঞান সরবরাহ করে না। এর গৃহণির্মাণ শিল্পগুলোর দাম দিন দিন বেড়েই চলেছে এই আশায় যে, এগুলোর দাম ভবিষ্যতে আরও বাড়বে এবং বিক্রয় করে প্রচুর লাভ করা যাবে।
সেবাভিত্তিক অর্থনীতি হিসেবে দুবাই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সরকার বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর পরিচালনার জন্য অবকাঠামো, যোগাযোগ, এ্যাপার্টমেন্ট, পার্ক, দোকান এবং পর্যটনের মত সেবাসমূহ প্রদান করে আসছে। এ ধরণের উন্নয়নের ভয়াবহ দিক হচ্ছে কোম্পানিগুলো এক জায়গায় স্থির থেকে নয় বরং প্রয়োজনে স্থান পরিবর্তন করে পরিচালিত হতে পারে। আর যে কোন ধরনের অস্থিতিশীলতা এ ধরণের পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। পৃথিবীর সবচেয়ে অস্থিতিশীল অঞ্চল হওয়ায় যে কোন ধরনের যুদ্ধের সম্ভাবনা দেখা দিলেই এসব কোম্পানী যে কোন সময় দুবাই ত্যাগ করতে পারে।
এসব কারণেই দুবাই মরুভূমিতে একটি মরিচীকা ছাড়া আর কিছুই নয়।
উন্নয়ন ও অস্তিত্ত্ব রক্ষার জন্য বিদেশী মেধা এবং প্রযুক্তি নির্ভর দুবাইয়ের অর্থনীতি। এর ভবিষ্যত সুনিশ্চিত করবার জন্য পর্যটনসহ ব্যাংকিং এবং আর্থিক খাতে বিশেষজ্ঞ সেবা প্রদান করে। এসব খাত অধিকাংশ সময়েই সুনাম ও বিদেশীদের আত্মবিশ্বাসের উপর নির্ভর করে। আর দুবাইয়ের অর্থনীতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর অবস্থায় রয়েছে-কারণ যে কোন সময়েই এসব বিদেশীরা চলে যেতে পারে। এ অবস্থা অনেক কারণেই ঘটতে পারে। একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ সেখানকার শ্রমিকদের জীবনকে সংকটাপন্ন করে তুলতে পারে। হাউজিং ব্যবসার দাম পড়ে যেতে পারে এবং এ ব্যবসায় লগ্নীকৃত সকল অর্থ সরিয়ে নেয়া হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রাজনৈতিক হাল থেকে বুঝা যায় যে, এই সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। এমনকি দুবাই তার অগ্রগতি সুনিশ্চিত করবার জন্য পশ্চিমা শ্রমশক্তিকে লক্ষ্য করে মদ এবং অন্যান্য অপকর্মকে বৈধতা দানের মাধ্যমে ইসলামী মূল্যবোধকে বিকিয়ে দেয়া হয়েছে।
যদি কেউ দুবাইকে অনুসরণ করে তাহলে সেক্ষেত্রে প্রধান সীমাবদ্ধতা হল যে, পর্যটন এবং অর্থায়নের জন্য সেখানে একটি মাত্র ক্ষেত্র আছে। অর্থাৎ সংজ্ঞা অনুসারে একাধিক কেন্দ্র বা ক্ষেত্র এক জায়গায় থাকতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে দুটি আঞ্চলিক এয়ারলাইনের কথাই বিবেচনা করা যাক। এমিরেটস এমন একটি এয়ারলাইন যা দুবাইয়ের বাইরে গমন করে যখন ইতিহাদ যাত্রা করে আবু দাবী থেকে। এমিরেটস ইতোমধ্যে নিজেকে একটি ব্রান্ড হিসেবে পরিচিত করে ফেলেছে এবং এ অঞ্চলে ভ্রমণের জন্য এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। অন্যদিকে যাত্রী পাবার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার কারণে ইতিহাদ সব সময় খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে।
শিল্পায়ন উত্তর বিশ্বে সেবাখাতের বিকাশকে একুশ শতকের অর্থনীতির পূর্বশর্ত ধরে নেয়া হয়। আমেরিকা এবং ব্রিটেনের অর্থনীতির শতকরা ৭০ ভাগের উপরে হল এই সেবাখাতের অবদান। তবে দুবাই এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্ব কখনই শিল্পায়নের ভেতর দিয়ে যায়নি। সেকারণে সেবাখাতভিত্তিক অর্থনৈতিক মডেলের যৌক্তিকতা এখানে নেই। পশ্চিমা বিশ্ব যে পথ পাড়ি দিয়ে স্বাধীন অর্থনীতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে- যে কারণে তাদের উৎপাদনের একটি ভিত্তি রয়েছে, রয়েছে বৃহৎ সামরিক শক্তি এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত কৃষিখাত- তার সাথে দুবাইয়ের উন্নয়নের ধারণা পুরোপুরি দ্বান্দ্বিক। সাম্প্রতিক ‘ক্রেডিট ক্রাঞ্চ’ এর মত দুবাইয়ের অর্থনীতিও বিস্ফোরণ উন্মুখ ফেঁপে উঠা একটি বেলুন।
মুসলিম উম্মাহ্র অধঃপতনে জাতীয়তাবাদের ভূমিকা

“এক জাতি, এক ভূমি”- এই চেতনা ও আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে একদা যে মুসলিম উম্মাহ্ পরিণত হয়েছিল বিশ্বের প্রভাবশালী সভ্যতায় সেই একই জাতি সিংহাসন হারানোর পর আজ হতবিহ্বল ও দিশেহারা। মুসলিম বিশ্বের বর্তমান বাস্তবতা হলো বিভক্তি, কোন্দল, অত্যাচার আর পশ্চাৎপদতা। বিশ্বনেতৃত্বের আসন হারানোর পর এই বহুধাবিভক্ত মুসলিম উম্মাহর আর্থ সামাজিক ও রাজনৈতিক এজেন্ডা বর্তমানে নির্ধারিত হয় পুঁজিবাদী পশ্চিমা কুফর সভ্যতার দ্বারা। খিলাফতের পতন পরিবর্তীতে যতই জাতীয়তাবাদী চিন্তা চেতনা মুসলিম দেশগুলোর ভেতর প্রসারিত হচ্ছিল, ততই বিদেশী শক্তির দ্বারা পতিত এই সভ্যতা শোষিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছিল যা এখনো পর্যন্ত বর্তমান আছে। আমরা আরো দেখতে পেয়েছি সর্বব্যাপী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার তাগিদে পশ্চিমা সভ্যতা নতুন এক ব্যবস্থা চাপিয়ে ছিল বিভক্ত এই মুসলিম দেশগুলোর উপর যার নাম “জাতি রাষ্ট্র’ যা মুসলিম উম্মাহ্র রাজনৈতিক বিভক্তিকরণ এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করে আসছে। তারই ফলশ্রুতিতে আজ আমরা দেখতে পাই মুসলিমরা নিজেদের চিহ্নিত করে বাঙালী, পাকিস্তানী, আরব রূপে। এরই ধারাবাহিকতায় মুসলিম দেশগুলোতে আমরা আরও দেখতে পেয়েছি পশ্চিমা মদদপুষ্ট ”নব্য এলিট” (New Elite) জাতীয়তাবাদী শ্রেনীর যারা ছিল “জাতীয়তাবাদী” “পশ্চিমা চিন্তা চেতনা সম্পন্ন” “ধর্ম নিরপেক্ষ অথবা “ইসলামী” হলেও অরিয়েন্টালিসম (Orientalism) দ্বারা প্রভাবিত। যুগ যুগে এই জাতিয়তাবাদী Elite শ্রেণীই মুসলিম উম্মাহ্র পুনর্জাগরণে বড় বাঁধা হয়ে আসছে। জাতীয়তাবাদের এই বিষ বাষ্পই হলো বর্তমান উম্মাতে মুহাম্মদীর জন্য বিশালাকার এক চ্যালেঞ্জ। কারণ এই জাতীয়তাবাদই হলো মুসলিম বিশ্বগুলোতে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণ ও অত্যাচারের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। এই “জাতি রাষ্ট্র” ও তার বিবিধ প্রতিষ্ঠানে আজও মুসলিম ভূমিগুলোতে ঔপনৈবেশিক শাসনের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে এবং ইসলামের শক্তিকে আজও বিভক্ত রাখতে সক্ষম হচেছ। বর্তমান মুসলিম বিশ্বের মানচিত্র হলো আদতে “জাতি-রাষ্ট্রের” মানচিত্র যেখানে “জাতীয়তাবাদ” ও “জাতীয় স্বার্থ” ইসলামের ওপর প্রাধান্য পায়, এই নিবন্ধ ইসলামী প্রেক্ষাপটের আওতায় জাতীয়তাবাদ ও মুসলিম রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি আলোকপাত করবে ও তা অনুধাবনে সহায়ক হবে।
জাতীয়তাবাদের উৎপত্তি ও স্বরুপ
জাতীয়তাবাদের বর্তমান যে রুপ আমরা দেখতে পাই তা হলো মূলত সাম্রাজ্যবাদের ফসল, যদিওবা এর উৎপত্তি হয়েছিল ইউরোপে, বিশেষতঃ পশ্চিম ইউরোপে, রোমান ক্যাথলিক চার্চ এর অত্যাচার মোকাবেলায় আত্ম-রক্ষার পদ্ধতি হিসেবে। শুরুর দিকে এই সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছিল খ্রিষ্টান ধর্মের প্রটেস্টান্ট (Protestant) মতাবলম্বীদের দ্বারা, এটি নিজের শক্তি সঞ্চার করত আবেগতাড়িত প্রতিক্রিয়া থেকে যা সর্বদাই বহিঃশক্তির প্রভাব ও নিষ্পেষণের বিপরীতে ক্রিয়াশীল থাকত। বহিঃশত্রুর আক্রমণ সর্বদাই জনসাধারণদের প্রতিবাদী করে তোলে যা এক পর্যায়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে রুপ লাভ করে। অতএব জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের এই ধারণা গোড়ার দিকে ছিল বিদেশী আধিপত্য ও প্রভাব বলয় থেকে মুক্তির তাড়না যা পরবর্তীতে অন্য রুপ লাভ করে।
জাতীয়তাবাদের ধারণা সম্পূর্ণরুপে বোঝার আগে এটা বোঝা আবশ্যক যে মানুষ সমাজে কোন চিন্তার ভিত্তিতে নিজেকে চিহ্নিত করে এবং দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করে। চিন্তা ও কল্পনার এই ভিত্তিসমূহ হলো – ১) দেশপ্রেম ২) গোত্রবাদ বা জাতীয়তাবাদ ৩) ধর্ম ৪) স্বার্থ ৫) জীবন আদর্শ (Ideology)। উপরোক্ত বন্ধন সমূহের মধ্যে জাতীয়তাবাদের মূল চরিত্রই হলো এটা নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক কাঠামের আওতায় মানুষকে আলাদা সামাজিক অথবা সাংস্কৃতিক পরিচিত দান করে। এই জাতীয়তাবাদি ভিত্তি বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। একটি জাতির স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধির জন্য জাতীয়তাবাদকে অত্যাবশ্যকিয় মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জাতিয়তাবাদী হতে হলে একটা জাতির নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ অবশ্যই থাকতে হবে : একটি সুনির্দিষ্ট অঞ্চল, স্বাতন্ত্র্য আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য যেমন ভাষা ও গোষ্ঠী, জনস্বার্থ (উদাহরনস্বরূপ ট্রানজিট), সাধারন ইচ্ছা ও অনুভূতি (উদাহরণস্বরুপ, পহেলা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারী) এবং সর্বোপরি অঞ্চলের সর্বসাধারণের জন্য একটি সরকার। এছাড়াও একটি জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্য থাকতে হবে, সংক্ষেপে এটা বলা যায় যে জাতীয়তাবাদের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আছে-প্রথমত, এটি এমন একটি রাজনৈতিক চিন্তা যা জাতি-রাষ্ট্রে বসবাসরত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগনের সর্বোচ্চ আনুগত্য দাবি করে। দ্বিতীয়ত, এই চিন্তার দ্বারা একটি সার্বভৌম জাতি হিসেবে মানুষের ঐক্যবদ্ধ থাকার আকাঙ্খা প্রকাশিত হয়। তৃতীয়ত, এটি সর্বসাধারণের ইচ্ছাশক্তি ও আবেগরুপে বিদ্যমান থাকে। ঐতিহাসিকভাবে, রোমান সাম্রাজের অধিবাসীদের সমাজবদ্ধতার চূড়ান্ত ভিত্তিই ছিল গির্জা (Church)। ক্যথলিক মতবাদই ছিল রাষ্ট্রীয় ধর্ম এবং যে ক্যাথলিক ছিল না পূর্ণ নাগরিক মর্যাদা তাকে দেয়া হতো না। পোপ এর হাতেই ছিল সম্রাটদের বৈধতা দানের পূর্ণ ক্ষমতা। সেন্ট আগাষ্টিন এর সময় থেকেই চলে আসছিল এ জাতীয় রাজনৈতিক গঠন। কারো ফরাসী, ইটালিয়ান বা জার্মান পরিচিতির চেয়েও বড় বিষয় ছিল তার খ্রিষ্টান হওয়া বা না হওয়ার বিষয়টি। যখন থেকে খ্রিষ্টান রোমান সাম্রাজ্য দূর্বল হতে শুরু করল, তখন থেকেই বিভিন্ন জাতির মানুষ এই খ্রিষ্টান সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীনতা আদায়ের আন্দোলনে লিপ্ত হলো। তারা নিজেদের পুনরায় নতুন পরিচিতি দিল নাগরিকত্বের এক নতুন মাপকাঠি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। নাগরিকত্ব প্রাথমিকভাবে ধর্মীয় কোন বিষয় হিসেবে আর থাকলনা, এক নতুন সাংস্কৃতিক পরিচিতি উদ্ভাবনের তাগিদ অনুভব করল আন্দোলনকারী বুদ্ধিজীবিরা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিতে- “ফরাসী, জার্মান তথা স্প্যানিশ বলতে কি বোঝায়- ধর্ম নাকি অন্য কিছু?” এভাবেই আঠারশ শতকে ইউরোপে জাতীয়বাদ নামক এক নতুন চিন্তা ও বন্ধনের আবির্ভাব হলো যা সাম্রাজ্যবাদ থেকে জাতি রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক রুপান্তর নিশ্চিত করল। আমরা এও দেখতে পাই যে এই জাতীয়তাবাদী চেতনা মানুষের ভেতর জাগিয়ে তোলে এক প্রচন্ড আধিপত্যবাদী মনোভাব। তাই এই জাতীয়তাবাদ কখনোই মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেনা কারণ এর ভিত্তিই হলো নেতৃত্ব ও অধিপত্য বিস্তারের ক্ষুধা যা এক প্রকার ক্ষমতার সংঘাত সৃষ্টি করে সামাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে। একই ভাষাভাষী ও তথাকথিত বাঙ্গালী সাংস্কৃতির ছায়াতলে থেকেও আওয়ামী ও বিএনপির ক্ষমতা ও আধিপত্যের দ্বন্দ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় জাতীয়তবাদের ব্যর্থতার চিত্র।
জাতীয়তাবাদ তার এই দ্বন্দ ও আধিপত্যের মৌলিক চরিত্র নিয়ে কালক্রমে সাম্রাজ্যবাদের শোষণ ও অত্যাচারের সহায়ক শক্তিতে রুপান্তরিত হয়। বিদেশী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের জাতীয়তাবাদী চেতনাকে খুব সুচারুরূপে নিয়ন্ত্রন করতে সাম্রাজ্যবাদীরা সমর্থ হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ একই জাতির ভেতর ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে চলমান এই দ্বন্দ ও সংঘাতকে সর্বদাই জীবিত রাখে এবং এই প্রকারের দ্বন্দে লিপ্ত দল/গোত্র সমূহের দ্বারা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে তাদের প্রভাব বলয় অটুট রাখে। উদাহারণস্বরূপ, আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশের (উগান্ডা, রুয়ান্ডা, কঙ্গো ইত্যাদি) গৃহযুদ্ধে মার্কিনীরা উভয় পক্ষকেই অস্ত্র যোগান দিয়ে থাকে এবং বিনিময়ে অগণিত প্রাকৃতিক সম্পদ লুট নিশ্চিত করে। ইরাকেও আমরা দেখতে পাই মার্কিনীরা পুরো দেশটাকে শিয়া, সুন্নি ও কুর্দিদের দ্বারা তিনটি ভাগে বিভক্ত করে তাদের ভেতর দ্বন্দ অব্যাহত রেখেছে এবং এই দ্বন্দ নির্মূল করে দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য ইরাকের সেনাদের প্রশিক্ষনের নাম করে মার্কিনীরা শক্ত ঘাটি প্রতিষ্ঠা করেছে এবং এরই মাধ্যমে আমেরিকায় তেল সরবরাহ নিশ্চিত করে চলেছে। অতএব এ থেকেই বোঝা যায় কিভাবে জাতীয়তাবাদ সাম্রাজ্যবাদ থেকে মুক্তির কথা বলে সাম্রাজ্যবাদেরই সহায়ক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই প্রকারের জাতি রাষ্ট্রের ধারণা একারণেই করা হয়েছে যাতে জাতিসমূহ নিজেদের মধ্যে সংঘাতে লিপ্ত থাকবে এবং এরই মাধ্যমে পুজিবাদী রাষ্ট্রসমূহ তাদের সমর শিল্পের বিকাশ সাধন করবে।
মুসলিম ভূমি সমূহে জাতীয়তাবাদের বিকাশ:
পতনের অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে মুহাম্মাদ (সা) এর এই উম্মাহ্ সর্বব্যাপী ভয়াবহতম আক্রমণের শিকার হয়, তবে আক্রমণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয় চিন্তার জগৎ। ১০৯৯ খৃষ্টাব্দে ক্রুসেডারদের দ্বারা সংঘটিত বর্বরতা এই উম্মাহ্ পারি দিয়েছে ৮ লক্ষ মুসলমানের জীবনের বিনিময়ে, অতিক্রম করেছে ১২৫৮ খৃষ্টাব্দের মোঙ্গলদের বাগদাদ আক্রমণ যার পরিণতিতে আব্বাসীয় খেলাফতেরও পতন ঘটে। তা সত্ত্বেও এই উম্মাহ্ দ্বীনের সঠিক আলো তার ভেতর জ্বালিয়ে রেখেছিল এবং ইসলামকে আরো সম্প্রসারিত করার জন্য ঐক্যবদ্ধ ছিল। কিন্তু ইজতিহাদের দরজা বন্ধ, আরবী ভাষার প্রতি অবহেলা এবং মিশনারী আক্রমণের মতো সংস্কৃতিক আগ্রাসনের মুখে আল্লাহ্র প্রিয় এই উম্মাহ্ তিলে তিলে ইসলামের চিন্তা হারিয়ে ফেলতে লাগল। চিন্তার এই পতন এমন এক পর্যায়ে পৌছাল যে মুসলিম চিন্তাবিদরা আলোচনা শুরু করল সভ্যতার উৎস ও প্রকৃতি নিয়ে। ইউরোপীয়নদের ভেতর এটা খুবই প্রচলিত ছিল কার ভাষা সবচেয়ে বিশুদ্ধ, কার সাহিত্য খুবই উন্নতমানের অথবা কোন জাতি সত্যিকার অর্থে সভ্য। রুশো (Rousseau), উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বাস করত সবচেয়ে বড় ভক্তি হলো দেশের প্রতি ভালবাসা। মানুষকে অবশ্যই দেশপ্রেমের গুণ দ্বারা দীক্ষিত করতে হবে। মুসলিম দেশগুলোতে এই প্রকারের জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমের আলোচনা এমন এক সময়ে শুরু করা হয় যখন দেশগুলো স্বাধীনতা চাইতে শুরু করল। রেনেসা পরবর্তী “আলোকিত যুগের” (Age of enlightenment) চিন্তা চারিদিকে ছড়াতে লাগল এবং ১৮১৬ শতকের শুরুতে রুশো, ভলটেয়ার ও মনটেসকু প্রমুখের লেখনিতে মুসলিমদের লাইব্রেরী সমূহ ভরে গেল। সামরিক আগ্রাসনের সমান্তরালে পরিচালিত সাংস্কৃতিক ও মিশনারী আগ্রাসন (যা “শিক্ষা ও মানবতার” ছদ্মাবরনে ছিল) মূলত ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের পথকে সুগম করে দিয়েছিল মুসলিম দেশগুলোকে রাজনৈতিকভাবে দখল করে নিতে। মিশনারী স্কুলগুলো খুবই সফলতার সাথে আগামী প্রজন্মসমূহের চিন্তাধারাকে দূষিত করতে পেরেছিল। যারাই এই স্কুলগুলোতে পড়েছিলো তারাই পশ্চিমা সিলেবাস ও পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে ইতিহাস ও গবেষণাধর্মী লেখনি শুরু করে। এভাবে অনেক মুসলমানই পশ্চিমা মূল্যবোধে দীক্ষিত হয় এবং পশ্চিমা জীবন ব্যবস্থায় আলোকিত হতে থাকে। পশ্চিমা সভ্যতা দ্বারা তারা এতই মুগ্ধ হয় যে এক পর্যায়ে তারা মনে করা শুরু করে ইসলামী সংস্কৃতিই মুসলিম উম্মাহ্র পতন ও পশ্চাৎপদতার মূল কারণ। এরই পাশাপাশি চলতে থাকে ইউরোপীয়দের দ্বারা গোপনে পরিচালিত বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আন্দোলন, উদাহরণস্বরূপ, তুর্কি আল ফাতাত (অটোমান বিকেন্দ্রীকরণ সোসাইটি) Young Turks, Union & Progress, ও আল আহদ (আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলন)। জাতীয়তাবাদের বিষাক্ত এই বীজ বপনই ছিল ইউরোপীয়দের নতুন এক পরিকল্পনা। খিলাফত রাষ্ট্রের পক্ষে সবচেয়ে বড় ভুলটি ছিল এই মিশনারী সংগঠনগুলোকে মুক্তভাবে মুসলিম ভূখন্ডসমূহে কাজ করার অনুমতি দেওয়া। এই মিশনারীসমূহ যারা ছিল মূলত ব্রিটিশ, ফরাসী ও আমেরিকান এজেন্ট, তাদের প্রধান দুটি উদ্দেশ্য ছিল-
১) মুসলমানদের ইসলামের সঠিক ধারণা থেকে দূরে সরিয়ে ফেলা। ইসলামী আকীদার ব্যাপারে সন্দেহ তৈরী করে।
২) তুর্কি, পারস্য ও আরবদের মাঝে জাতীয়তাবাদী চিন্তার প্রেক্ষিতে সংঘাত তৈরী করা।তাদের প্রথম উদ্দেশ্যটি পুরোপুরি সফল হয়নি। আক্বীদা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টিতে ব্যর্থ হলেও ইসলামের সঠিক ধারণা তারা বিনষ্ট করেছিল। বৃটেনের ইহুদী প্রধান মন্ত্রী বেঞ্জামিন ডিজরাইলির উক্তিটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যখন সে কুরআন হাতে হাউস অব কমন্সে বলেছিল মুসলমানদের কখনোই হারানো সম্ভব না যতক্ষণ পর্যন্ত এই কুরআন তাদের অন্তর থেকে সরিয়ে ফেলা না যায়।
ইতিহাস স্বাক্ষী মুসলমানদের কখনোই সামরিকভাবে পরাজিত করা যেতনা কারণ তাদের লড়াই ও চিন্তা সর্বদাই ছিল আকিদার উপর প্রতিষ্ঠিত। তারা সঠিকভাবেই বুঝত “আযল” (মৃত্যুর কারণ) ও “রিযক” এর ধারণাসমূহ। তাইতো খালিদ বিন ওয়ালিদ একদা এক যুদ্ধ ক্ষেত্রে শত্রুকে বলেছিল “এই মানুষ যারা আমার সাথে আছে তারা মৃত্যুকে সেরকম ভালবাসে যেরকম তোমরা জীবনকে ভালবাস”। চিন্তার জগতের ইউরোপীয় আগ্রাসন মুসলিম উম্মাহ্র এই সাহস ও পৌরুষদীপ্ত চেতনা সবই ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছিল।
মূল ইতিহাসে আবার ফেরা যাক- ১৯০৮ সালের Young Turks বিপ্লব এবং খলীফা আব্দুল হামিদের ১৯০৯ সালের নির্বাসন পরবর্তী সময়ে ক্রমশই বুদ্ধিজীবি এবং সামরিক অফিসাররা আরব স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার হতে শুরু করে। এই অফিসাররা ছিল মূলত পশ্চিমা ট্রেনিং ও শিক্ষায় শিক্ষিত যাদের প্রধানতম রাজনৈতিক চিন্তাই ছিল জাতীয়তাবাদ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে ব্রিটেন মূলত আরব জাতীয়তাবাদের চেতনা প্রবলতার সাথে উস্কে দেয়। তারা মক্কার শরিফ হোসেনকে সেসময়কার মাসিক ২ লক্ষ পাউন্ড এর বিনিময়ে অটোমান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে লেলিয়ে দেয় যা সে শুরু করে ১৯১৬ সালে এই অযুহাতে যে অটোমান রাষ্ট্র আরবদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করছে। এই আন্দোলন প্রচুর সামরিক অফিসারদের আকর্ষণ করে যারা ছিল অটোমান সামরিক বাহিনী থেকে বহিস্কৃত এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পথিকৃৎ।
পশ্চিমা জ্ঞান ও বিজ্ঞানচর্চার সন্তান জাতীয়তাবাদ:
মুসলিম উম্মাহ্কে ছিন্ন বিছিন্ন করার পরিকল্পনায় বিষাক্ত হাতিয়ার ছিল বিভিন্ন পশ্চিমা বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষামূলক সংগঠন যাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল লুকায়িত। যেসময় পশ্চিমারা রেনেসাঁ পরবর্তীতে পুজিবাদকে তাদের জীবনের জন্য একমাত্র আদর্শ হিসেবে বেছে নিয়ে নেতৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল, সেসময় মুসলমানরা ইসলামী জীবনাদর্শকে ধীরে ধীরে ত্যাগের মাধ্যমে পশ্চিমাদের দাসে পরিণত হচ্ছিল। আর এই দাসত্বের শৃঙ্খলকে টেকসই করার তাগিদে মূলত ১ম শতকের মাঝামাঝিতে পশ্চিমারা নতুন এক পরিকল্পনা নেয় যা ইতিপূর্বে নেয়া হয়নি। মিশনারীরা তাদের বিদ্যালয়, হাসপাতাল এর মাধ্যমে যখন মুসলমানদের বেশী আকৃষ্ট করতে পারছিলনা, তখনই তারা বিভিন্ন “বৈজ্ঞানিক সংগঠনের” পরিকল্পনা নিয়ে হাজির হয় যা সফলতার মুখ দেখে। ১৮৪২ সালে আমেরিকান মিশনের ছত্রছায়ায় একটি কমিটি গঠিত হয় যার উদ্দেশ্যই ছিল বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সংগঠন তৈরীতে সহায়তা করা। পাঁচ বছরের কষ্টসাধ্য প্রচেষ্টার পর তৈরী হয় “Association of Arts & Science” যার সদস্য ছিল বুট্রোস আল বুসতানি। এই বুসতানিই সিরিসায় প্রতিষ্ঠা করেছিল বিখ্যাত বিদ্যালয় “আল মাদ্রাসা আল ওয়াতানিয়া” (জাতীয়তাবাদী বিদ্যালয়)। এই বিদ্য্যালয়টি প্রতিষ্ঠাই করা হয়েছিল আরব জাতীয়তাবাদী চেতনা সৃষ্টি করার জন্য। এই বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যই ছিল “হুব আল ওয়াতান” (দেশের প্রতি ভালবাসা) সৃষ্টি করা শিক্ষার্থীদের ভেতর, একইভাবে মিশরেও আমরা দেখতে পাই “রিফা আল তাহতাওয়ি” (১৮৭৩) Wataniya ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের দিকে আহ্বান জানাতে শুরু করে। এই পশ্চিমাদীক্ষিত মুসলিম পুর্নজাগরণবাদীর (Revivalist) মতে ভাতৃত্ববোধ কখনোই বিশ্বাস দ্বারা সৃষ্টি হয় না। এর জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট এক ভূমি, এ থেকে বোঝা যায় কিভাবে মুসলমানরা জাতীয়বাদে আস্থা আনা শুরু করল। তাদের জীবনের অর্থ বংশ, ভূমি ও ভাষার দ্বারা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হতে লাগল।
যদিও বা নতুন নতুন অনেক বৈজ্ঞানিক সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হতে লাগল, কিন্তু “সিরিয়ান সাইয়েন্টেফিক এসোসিয়েশন” এর প্রতিষ্ঠার আগে অন্যান্যগুলো সফলতা পায়নি। অন্যান্য গুলোতে শুধু খ্রিষ্টানরাই যোগাদান করতঃ আর শেষোক্তটিতে মুসলমানদের যোগদানই ছিল বেশী। এই সংস্থাটির উদ্দেশ্যই ছিল সব গোত্র, ধর্মকে এক করে আরব জাতীয়তাবাদকে প্রজ্বলিত করা। এর পরবর্তীতে ধীরে ধীরে আরব অঞ্চলের মুসলমানরা আরব জাতীয়তাবদকে নিজেদের জীবনের ভিত্তি হিসেবে নিতে শুরু করল। ঐ সময়কার এসব সংগঠন সমূহের কার্যক্রমের প্রতিফলন আমরা এখানো দেখতে পাই ইসলাম নিয়ে উম্মাহ্র সংশয় এবং মুসলিম দেশসমূহে জাতীয়তাবাদের শক্ত অবস্থান দেখে। তাইতো পুরো বিশ্বের মুসলমানরা ক্ষনিকের অশান্তির পর আবারো স্বাভাবিক বস্্তুবাদী জীবনে ফিরে যেতে পারল চোখের সামনে তাদের ফিলিস্তিনি ভাই-বোনদের অসহায়ত্ব দ্বারা আবৃত আহাজারী দেখার পরও। এই জাতীয়তাবাদী মানসিকতাই হলো সাম্রাজ্যবাদীদের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার (legacy)।
এভাবেই জাতীয়তাবাদের বিষাক্ত বীজ মুসলিমভূমিতে ইউরোপীয়ানরা বপন করেছিল। বিংশ শতকের শুরুতেই জাতীয়তাবাদের জ্বর সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল। ১ম বিশ্ব যুদ্ধের শুরুতে সর্বশেষ এবং সবচেয়ে বর্বর ও ভয়াবহ আক্রমণ সূচিত হলো খিলাফতের বিরুদ্ধে এবং ইউরোপীয়রা এক সময়কার অদম্য ও অপরাজেয় রাষ্ট্রকে গ্রাস করে নিল। কোন প্রতিরোধ ছাড়াই দূর্বল ও মৃয়মান এই উম্মাহ্ তার রাসূলের (স) আমানতকে (খিলাফত রাষ্ট্রকে) কুফফার এর হাতে তুলে দিল। তাইতো ১৯১৭ সালে (General Allenby) জেরুজালেম দখলের পর যথার্থই বলেছিল- “Only today the crusades have ended”
সাম্রাজ্যবাদ পরবর্তী জাতি রাষ্ট্র তত্ত্ব:
বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মুসলিম উম্মাহকে ধরাশায়ী করা, বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে উস্কে দেওয়া এবং পরিশেষে ১৯২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে খিলাফতের মৃত্যু সাটিফিকেট দেয়ার পরও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীরা এটা নিশ্চিত করতে চেয়েছে এই উম্মাহ্ যাতে কোনদিনও তার গৌরবজ্জল অতীতকে ফিরে না পায়। তাই আরব বিপ্লবের মাধ্যমে খিলাফত ধ্বংসের পরবর্তীতেও তারা উম্মার আরও বিভক্তি তৈরী করেছিল। Sykes-Picot চুক্তির মাধ্যমে আরব ভূমিসমূহকে আবারো খন্ডিত করা ছিল এক ভয়াবহ পরিকল্পনা। ফরাসী এবং বৃটিশ উভয়েই একমত হলো যে তারা তাদের উপনিবেশসমূহকে দু’টি ভাগে বিভক্ত করবে। একটি ভাগ সরাসরি তারা নিয়ন্ত্রণ করবে এবং অন্য ভাগটি থাকবে আধাস্বাধীন কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে ইউরোপীয়দের নিয়ন্ত্রণে। বিভক্তির এই পরিকল্পনা এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে আরব অঞ্চল সর্বদাই ভিক্ত এবং দূর্বল থাকে। এই পরিকল্পনাই পরবর্তীতে জন্ম দিয়েছিল “জাতি-রাষ্ট্র” ধারণার বিশেষত: মধ্য প্রাচ্যে।
এটা অবশ্যই বলতে হয় বিভক্ত মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের উপর রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক একচ্ছত্র অধিপত্য বিস্তারেও পশ্চিমাশক্তি সন্তুষ্ট হতে পারেনি। তাই তারা পশ্চিমা রাষ্ট্রের ধাচে মুসলিম মক্কেল জাতি রাষ্ট্র (Client Nation state) তৈরী করল। এই জাতিরাষ্ট্রসমূহ পশ্চিমা ধাচের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সামরিক, সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কাঠামো নির্মানে মনোযোগী হলো। উপনিবেশিক দেশসমূহের মানুষদের নতুন এই ব্যবস্থায় “প্রগতি”র (Modernism) সুযোগ ও অংশগ্রহণের প্রস্তাব দেয়া হলো যদি তারা ইংরেজি ভাষার শিক্ষা নেয়, ইউরোপীয় ধাচের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করে এবং সাধারণভাবে ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনব্যবস্থা মেনে নেয়। এসবের পরেও যদি তারা কঠোরভাবে ইসলাম চর্চার মাধ্যমে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ‘তাকওয়া’ অর্জন করতে চায়, তাহলে ইউরোপীয়দের এতে কোন আপত্তি নেয়। এরকম ধর্মনিরপেক্ষ, আধুনিক মুসলিম জাতি-রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখাই হলো মুসলিম উম্মাহ্কে চিরতরের জন্য শোষণ করার সবচেয়ে বড় চাবি কাঠি। ইসলামকে শুধুমাত্র কিছু নৈতিকতার সমষ্টিতে পরিণত করা এবং গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে এই রাষ্ট্রসমূহের জন্য রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে নির্বাচিত করাই হলো ইউরোপীয়দের সুদুর প্রসারী পরিকল্পনা যার চর্চা এখনো মুসলিম ভূমি সমূহতে আমরা দেখতে পাই। দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে মুসলিমরা ইউরোপীয় ধাচের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষিত ও আলোকিত হওয়া শুরু করল। যুগে যগে এই বিদ্যাপিঠ সমূহ এমন সব মুসলমান জ্ঞানীর জন্ম দিল যাদের কাজই ছিল মুসলমানদের ইসলাম নিয়ে এমনভাবে বিভ্রান্ত করা যাতে তারা উম্মাহকে একত্রিত করার চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, সমসাময়িক পশ্চিমা মুসলিম চিন্তাবিদ ডাঃ আসগার আলি ইঞ্জিনিয়ার ও ফজলুর রহমান – যারা মনে করে কুর’আন সুন্নাহর কোথাও খিলাফতের কথা উল্লেখ নেই, এসবই পরবর্তীকালের মুসলমানদের সংযোজন। এই নিবন্ধের এক পর্যায়ে আমরা এই প্রকারের মুসলিম চিন্তাবিদ ও পুনর্জাগরণকর্মীদের ব্যাপারে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করব।
ইউরোপীয় ভাবধারায় দীক্ষিত নব্য এলিট (Elite) মুসলিম নেতাদের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য যাদের উত্তরসূরি আজও আমাদের ভেতর বর্তমান, খিলাফতের পতন পরবর্তীতে এই এলিটদের হতে “স্বাধীন” হওয়া মুসলিম রাষ্ট্র সমূহের দায়িত্বভার প্রদানের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। ওসমানী খিলাফতের বিরুদ্ধে আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত “স্বাধীনতা” ছিল মূলতঃ পশ্চিমাদের পক্ষ থেকে এক ভয়ংঙ্কর প্রতারণা ও ফাঁদ। সাম্রাজ্যবাদীদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল মুসলিম এই স্বাধীন জাতি রাষ্ট্র সমূহকে নিজেদের উপনিবেশ (Colony) বানানো এসব এলিটদের দ্বারা। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে প্রথমত: উম্মাহ্র বিশ্বাস ও চেতনাকে নিস্তেজ করল এবং অবশেষে যখনই খিলাফত ধ্বংস হলো, “স্বাধীন” আরব দেশ সমূহকে এই জাতীয়তাবাদী মুসলিম এলিট নেতাদের মাধ্যমে ইউরোপীয়রা নিজেদের কবজায় নিয়ে এল। একই রকমের পরিনতি তুরস্কের জন্যও অপেক্ষা করছিল। এক সময়কার বিশ্ব নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত খিলাফতের রাজধানী তুরস্ক আজ ইউরোপীয় দেশসমূহের পদলেহন করছে ইউরোপীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্তির জন্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, আরব বিপ্লব এবং অবশেষে এরই মধ্যে দূর্বল ও নমনীয় খিলাফতকে ”তুর্কি জাতীয়তাবাদের” মাধ্যমে ১৯২৪ সালের মার্চ মাসে ধ্বংস করে দেওয়া- এসবই আমাদের দূর্ভাগ্যজনক অতীত এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
যাই হোক, যেটা আমরা বলছিলাম এই “স্বাধীন” মুসলিম রাষ্ট্র সমূহ মূলত: স্বাধীনতার পর জাতীয়তাবাদী এলিট নেতাদের মাধ্যমে ইউরোপীয় বলয়ে চলে এল। তারই নমুনা আমরা দেখতে পাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী “লিগ অব নেশনস” (League of Nations) এর “আর্টিকেল ২২” (Article 22) তে- “নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল যা পূর্বে তুর্কি সাম্রজ্যের অধীনে ছিল সেগুলোকে এখন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা যায় কিন্তু এই শর্তে যে যতক্ষণ পর্যন্ত এই দেশসমূহ নিজের পায়ে দাড়াতে পারবেনা ততক্ষণ পর্যন্ত এদের জন্য প্রশাসনিক পরামর্শ ও সহযোগীতা (Administrative advice & assistance) বাধ্যতামূলক।”
স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশাসনিক পরামর্শ ছিল সরাসরি মুসলিম ভূমি সমূহকে ইউরোপীয়দের করালগ্রাসে নিয়ে আসা। ব্রিটেন ইরাক, প্যাটেস্টাইন ও ট্রান্সজর্ডান দখল করল এবং ফ্রান্সের ভাগে পড়ল সিরিয়া এবং লেবানন। শরীফ হোসেন এর ভাগে অবশিষ্ট যেসব “স্বাধীন আরব রাষ্ট্র” রয়ে গেল যেগুলোকে বলা হতো “হিজাজ রাজ্য” (Kingdom of Hijaz), সেগুলোর নতুন নামকরণ দেয়া হলো ১৯২৫ সালে- সউদী এরাবিয়া।
এখান থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যদিওবা মুসলিম দেশসমূহ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দ্বারা বিভক্ত হয়ে গেল স্বাধীনতার নামে কিন্তু দেশসমূহের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ ঠিকই রয়ে গেল পশ্চিমাদের হাতে এই এলিটদের দ্বারা। যদিওবা বর্তমানে মুসলিম দেশসমূহ পশ্চিমাদের উপনিবেশ আর নেই কিন্তু যুগে যুগে এই রাজনৈতিক এলিটদের উত্তরসুরি আমরা এখানো মুসলিম দেশসমূহে দেখতে পাই। ইরাকের নুরী আল মালিকি এবং আফগানিস্তানের হামিদ কারজাইদের মতো অসংখ্য নেতা আজো বিদ্যামান যারা এখনো মার্কিন-বিট্রিশদের “Administrative Advice” নেওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত। মুসলিম দেশসমূহকে যারা কখনোই ঐক্যবদ্ধ হতে দিতে চায়না, মুসলিম ভূমিসমূহকে তারা পশ্চিমাদের দাস বানিয়ে রেখেছে। তাইতো আমরা অপারগতার সাথে দেখি যখন ফিলিস্তিন আক্রান্ত হয় ইয়াহুদ দ্বারা, তখন জর্ডানের বাদশা হোসেন সার্বিক সহায়তা ইয়াহুদী নাসারাদের দিয়ে থাকে। পশ্চিমা রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে এই এলিট তৈরীর সিলসিলা খিলাফতের পুনরাগমনের আগ পর্যন্ত চলতে থাকবে।
নব্য এই ইউরোপীয় শ্রেণীর হাতে ‘স্বাধীন’ মুসলিম দেশসমূহর ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে শর্তই ছিল “জাতীয়তাবাদী” হওয়া, জাতীয়তাবাদীদের উৎসাহ দেওয়া হলো ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির সাথে কিছুটা ইসলাম এর সংমিশ্রণ করা। “পশ্চাৎপদ” মুসলিম দেশসমূহের সাথে যোগাযোগের এটাই ছিল সর্বোৎকৃষ্ট উপায়। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের মতো পশ্চাৎপদ মুসলমানদেশের রাজনৈতিক মুক্তির জন্য যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সজীব ওয়াজেদ জয়দের মতো নব্য ইউরোপীয় শ্রেণীর প্রয়োজন এখনো ফুরায়নি।
ইউরোপের সাথে যোগাযোগের আরো একটি সেতুর সফল নির্মাণ সম্পন্ন হলো- “জাতির পিতা” (Father of the Nation)। যে স্বাধীনতা তারা আমাদের উপহার দিয়েছিল তা ইউরোপের উপনিবেশ রাষ্ট্র বৈকি কিছুই ছিলনা। এই জাতির পিতারা এমন জাতি রাষ্ট্র আমাদের উপহার দিল যেগুলো জাতীয় সীমানা, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত, জাতীয় দিন, জাতীয় ভাষা, জাতীয় স্বার্থে পরিপূর্ণ ছিল। প্রতিটি জাতিরই সুনির্দিষ্ট ও স্বতন্ত্র পরিচয় দেয়া হলো। কোন দু’টি জাতি রাষ্ট্রের অভিন্ন স্বার্থ থাকা চলবে না। এই জাতি রাষ্ট্রের ধারণা মুসলিম উম্মাহর জন্য ছিল খুবই ধ্বংসাত্মক। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” তথা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মুসলিম উম্মাহর মর্মান্তিক পরিণতি আমাদের আরো একটিবার এই “জাতীয়তাবাদ” নামক ষড়যন্ত্রের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। জাতীয়তাবাদ এমন এক রাজনৈতিক হাতিয়ার যা মানুষদের খুবই আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে। অতপরঃ “Divide and Rule” নীতি খুবই সফলতার সাথে আত্মকেন্দ্রিক এই মানুষদের উপর প্রয়োগ করা যায় যা ৫০ এর বেশী মুসলিম জাতি-রাষ্ট্র সমূহে স্পষ্টত: প্রতীয়মান। তাইতো ইরাক আক্রমণ হলে শক্তিশালী ইরান নিশ্চুপ থাকে, অসহায় ফিলিস্তিনেরা মুসলিম সৈন্যদের দিকে শুধুমাত্র তাকিয়েই ছিল। সাহায্য পাওয়া দূরেই থাক ফিলিস্তিনের এই জাতীয় সমস্যা নিয়ে জর্ডান, সিরিয়া নিজেকে জড়াতে চায়না, যেরকম আফগান জাতির নিজস্ব সমস্যা নিয়ে পারমানবিক ক্ষমতাধর পাকিস্তান মোটেও আগ্রহী নয়। এভাবেই ইউরোপ/আমেরিকা মুসলিম উম্মাহকে একাধিক জাতি-রাষ্ট্র বিভক্ত করে “জাতীয়তাবাদ” নামক রাজনৈতিক মারনাস্ত্র এমনসব ক্ষমতালোভী নেতাদের হাতে তুলে দিয়েছে যাদের উদ্দেশ্যই হলো মুহাম্মাদ (সা) এর উম্মাতকে যত পারা যায় বিভক্ত রাখা আর তাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের হাতে উম্মাহর সম্পদ ও সম্মান নজরানা হিসেবে উপহার দেয়া। এই “হামান” আর “কারুন”রাই উম্মাহর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা একের পর এক করেই যাচ্ছে আজকের ফেরাউন “আমেরিকার” পক্ষে। তাই আমেরিকা-বৃটেন আজ আমাদের বুকে ছুরি চালাচ্ছে আমাদের পেটের ওপরেই বসে। তারা আজ ইরাক, আফগানিস্তান আক্রমণ ও দখল করে রেখেছে মুসলিম দেশসমূহের ঘাঁটিসমূহে অবস্থানের মাধ্যমে। কাতারের আদিদ ঘাঁটি, সৌদি আরবের আমীর সুলতান ঘাঁটি, দোহার আহমেদ আল জাবির ঘাঁটি, কুয়েতের আরিফজান প্রশিক্ষণ ঘাঁটি, ওমানের মুসিরা ঘাঁটিসহ বাহরাইন, তুর্কি, পাকিস্তান্ ও উজবেকিস্তানে কুফফার সৈন্যদের অবস্থান হলো মুসলিম এই মক্কেল শাসকদের আতিথিয়তা ও উদারতার জ্বলন্ত প্রমাণ। এই দালালরাই পরাশক্তি ইউরোপ ও আমেরিকার স্বার্থে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হতে দিচ্ছেনা- একদার মুসলিম উম্মাহকে ৫০ এরও বেশী শক্তিহীন জাতি-রাষ্ট্রে পরিণত করে রেখেছে। “প্রভু” ও “মক্কেল”দের “জাতীয়তাবাদ” নামক এই হীন ষড়যন্ত্র আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় উম্মাহর বর্তমান সমস্যাই হলো রাজনৈতিক সমস্যা যার জন্য চাই উম্মাহকে পুনরায় একত্রিত করা এবং খিলাফতের পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাগুতের মুলৎপাটন এবং এর জন্য চাই বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক এক আন্দোলন যার একমাত্র উদ্দেশ্যই হবে খিলাফত ফিরিয়ে আনা।
খিলাফত পতন পরবর্তী বিভিন্ন পুনর্জাগরণী আন্দোলন:পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা ২০০ বছরেরও অধিককাল শোষিত হওয়া এবং পরিশেষে খিলাফত ধ্বংসের পরবর্তীতে বহু ইসলামী আন্দোলন ও ব্যক্তিত্ব মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল উম্মাহকে তার এই করুণ বাস্তবতা থেকে উদ্ধার করতে। উম্মাহ এমন অসংখ্য আন্দোলন দেখলো যা “মুক্তির” কথা বলে মূলত: পশ্চিমা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চিন্তাধারা গ্রহণ করেছিল। বিগত ২০০ বছরের মুসলিম রাজনৈতিক চিন্তা মুসলিমদের রাজনৈতিক শক্তির পতন ও পশ্চিমা পুজিবাদী রাজনৈতিক শক্তির ও সভ্যতার উত্থানের বিপরীতে সার্বিকভাবে প্রতিক্রিয়া বৈ আর কিছুই ছিলনা। পশ্চিমের বিজ্ঞান প্রযুক্তি আর অথনৈতিক অর্জন মুসলিম চিন্তাবিদদের এতই মোহিত করেছিল যে তারা পশ্চিমের দেয়া “প্রগতি” (Progress)’র সংজ্ঞাই নিজেদের সমাজের জন্য অত্যাবশ্যকীয় মনে করল। প্রচুর সময় ও শক্তি ব্যয় করা হলো ইসলাম ও পশ্চিমা “প্রগতির” ভেতর সেতুবন্ধন তৈরীতে। পশ্চিমা “প্রগতির” সাথে ইসলামের সমন্বয়সাধন করতে গিয়ে অবশেষে এই মুসলিম মনীষীরা ইসলামের জন্য “জাতীয়তাবাদ” “পুজিবাদ” “গণতন্ত্র” এমনকি “সমাজতন্ত্র”ও বেছে নিতে শুরু করেছিল। পশ্চিমের সাথে সেতু তৈরীর এই প্রচেষ্টা আমরা এখনো দেখতে পাই “Islamization” (ইসলামীকরণ), “Integration” ও “Interfaith dialogue” এর মাধ্যমে। পশ্চিমের এই মোহই এসব “Islamist”দের ৮০ এর দশকে বিশ্বাস করিয়েছিল যে আমেরিকা হলো “খোদাহীন (Godless) সমাজতন্ত্রের” বিরুদ্ধে মুসলমানদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু (Ismail Fargi in ARABIA, London June 1982)। আসুন এবার আমরা দেখি কিছু আলোড়ন সৃষ্টিকারী পুনজার্গরনী ইসলামী আন্দোলন ও ব্যক্তিত্বের ইতিহাস যারা পুনর্জাগরন করাতো দূরেই থাক বরং উম্মাহর বাস্তবাতা আরো করুণ করে তুলেছিল।
আরব জাতীয়তাবাদ:
খ্রিষ্টান লেভান্টিন (Levantine) লেখকদের মস্তিস্ক প্রসূত আরব জাতীয়তাবাদী চেতনা ও চিন্তাধারা যার দ্বারা ওসমানীয় খিলাফতকে ধ্বংস করা হয়েছিল, সেই একই চিন্তাধারা পরবর্তীতে আবারো মাথাচারা দিয়ে উঠেছিল আরব মুসলমানদের পুনর্জাগরিত করতে যা আজ পর্যন্ত সফলতার মুখ দেখেনি। মধ্য প্রাচ্যের মানুষ অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল আরব জাতীয়তাবাদের শূন্য স্লোগান শুনে। আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও পুনর্জাগরনী ব্যক্তিদের আবির্ভাব বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই মিশর থেকেই শুরু হয়েছিল। অতীতে জামাল আব্দুল নাসের এবং নিকট অতীতে সাদ্দাম হোসেন উপসাগরীয় অঞ্চলের সংকটকে কেন্দ্র করে উম্মাহর আবেগ জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিল। এই শাসকদের কারণেই উম্মাহ যুগে যুগে আরো বিভক্তির শিকার হয়: জাতিগত বিভাজন আরো প্রকট হয়। আরব জাতীয়তাবাদের বিবর্তীত আধুনিক রূপ আমরা দেখতে পেয়েছি “আরবলীগ” সৃষ্টির মাধ্যমে। এই লীগ মুসলিম দেশসমূহের ভেতর জাতীয়তাবাদী চেতনাকে উজ্জীবিত রেখেছে এবং দেশসমূহের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দিয়ে মূলত : বৃটেন ও ফ্রান্স দ্বারা অংকিত আরব বিশ্বের মানচিত্র অটুট রেখেছে।
আরব জাতীয়তাবাদী চেতনাকে ইতিহাসের এক চরম পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল মিশরের জামাল আব্দুল নাসের ১৯৫০ সালে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর। সে তার “Philosophy of Revolution” বইতে মিশরের ব্যাপারে তার স্বপ্ন তুলে ধরেছিল। মিশরকে সে আরব বিশ্বের নেতা, মুসলিম বিশ্বের নেতা এবং কালো আফ্রিকানদের নেতা হিসেবে দেখতে চেয়েছিল। ১৯৫৬ সালে সুয়েজ খালের রাষ্ট্রয়াত্ব করা ও তার দু’বছর পরে ১৯৫৮ সালে মিশরকে সিরিয়ার সাথে একত্রিত করে “United Arab Republic” এর গঠন আরব জাতীয়তাবাদের দাবীকে আরো শক্তিশালী করে। কিন্তু ১৯৬১ সালে সালে এই “United Arab Republic” এর ভাঙন এবং ১৯৬৭ সালে সিনাই পর্বত দখলের মাধ্যমে ইসরাইলের কাছে পরাজয় এই আরব জাতীয়তাবাদীর ইতি টানে। পরবর্তীতে সকলের কাছ এটা অজানা ছিলনা জামাল আব্দুল নাসের মূলত আমেরিকার নগণ্য এক সহচারী যার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে CIA Mukhabarat (গোয়েন্দা সংস্থা) প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছিল। এই বিখ্যাত আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলন আজ পর্যন্ত ব্যর্থতার প্রতিমা হিসেবেই রয়ে গেলে। খিলাফত ধ্বংসের আগ থেকে ধ্বংস পরবর্তী সময়ে যত বিখ্যাত আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলন মাথাচারা দিয়ে উর্ঠেছিল তার কোনটারই বুদ্ধিবৃত্তিক বা দার্শনিক ভিত্তি ছিল না। খিলাফতের পতনের প্রাক্কালে আরব জাতীয়তাবাদের নামে কিছু আরব দেশকে ওসমানী খেলাফতের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং ধ্বংস পরবর্তীতে এই উম্মাহ যাতে আবার একত্রিত হতে না পারে তাই বহু বিখ্যাত আন্দোলন ও মুসলিম চিন্তাবিদ তৈরী করা হয়েছিল যাদের পশ্চিমা বিশ্ব রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করেছিল, তাই এদের দ্বারা কখনোই মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণ সম্ভব নয়। Bathist এবং Nasirrist যারা তথাকথিত “জাতি-রাষ্ট্র” গঠন ও স্বাধীনতা লাভের সময় ক্ষমতায় আরোহন করেছিল পরিকল্পিতভাবেই তারা ধর্মনিররপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদকে মুসলিম দেশসমূহের ভেতর প্রভাবশালী করার ষড়যেেন্ত্র লিপ্ত ছিল। আরব জাতীয়তাবাদ তাই মুসলিম আরব দেশসমূহে পশ্চিমা শক্তির চিরস্থায়ী আসন গেড়ে বসার Trojan Horse এ পরিণত হয়েছিল। তাই উম্মাহ্র পুনর্জাগরণ দুরেই থাক, উম্মাহকে পশ্চিমা শক্তির অতল গহ্বরে তলিয়ে দিতে আরব জাতীয়তাবাদ হতাশাজনক ভূমিকা পালন করেছিল।
সউদী আরব ও উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশসমূহের ভূমিকাও মুসলিম পুনর্জাগরণে উল্লেখযোগ্য, ১৯২৩ সাল থেকে সউদ পরিবার আজ পর্যন্ত খুবই কড়া নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করে আসছে সউদি আরবে। তেল সমৃদ্ধ অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও কোন উন্নতি আমরা দেখতে পাইনি এই দেশে। তেল থেকে যে পরিমান মুদ্রা অর্জিত হয় তার প্রায় সবটুকুই সউদী আরব Swiss Banks এবং পশ্চিমা দেশের বিভিন্ন Investment House সমূহে ১৯৪০ সালে থেকে নিয়মিত ঢেলে আসছে।
সেই খিলাফত ধ্বংসের আগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত পশ্চিমা কুফর শক্তি সবচেয়ে বড় দোসর সউদী আরবের সউদ পরিবার উম্মাহ্র সাথে অবিরত বিশ্বাস ঘাতকতা করেই আসছে। সাইয়্যেদ কুতুব সহ ইখওয়ানুল মুসলিমীন এর বড় বড় নেতাদের জামাল আব্দুল নাসেরের সরকার দ্বারা হত্যা ও নির্যাতনের এক পর্যায়ে সউদী আরব এদের আশ্রয় দানের মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্ব নিয়ে ফেলার চেষ্টায় সফল হয় যার পরবর্তীতে ইসলামী আন্দোলন ও দাওয়া আরেক দফা বিকৃতির স্বীকার হয়। আশ্রয়দানের মাধ্যমে এক সময়কার ত্যাগী ইখওয়ান নেতাদের সউদী সরকার আরাম প্রিয় ও সুবিধাভোগী Islamist এ পরিণত করে। একই প্রকারের বাস্তবতা আমরা জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির ইতিহাসেও দেখতে পাই। একদার ত্যাগী এই ইখওয়ান ও জামাতী নেতৃত্ব এখন ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে উম্মাহকে পুনরিজ্জীবীত করার নামে মুলতঃ Pro-saudi (সৌদি ঘেষা) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় লিপ্ত রয়েছে। নিজেদের আসল এজেন্ডা গোপন করার জন্য এরা বিভিন্ন ইসলামী প্রতিষ্ঠানের নামে কুরআনের কপি বিনামূল্যে সরবরাহ করছে। বিশ্বব্যাপী মুসলিম চিন্তাকে পথভ্রষ্ট করার জন্য এরা সউদী অনুদানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও চিন্তাবিদ তৈরী করেই যাচ্ছে যার মধ্যে ISNA (Islamic Society of North America), ওয়াশিংটনের North American Islamic Trust (NAIT), International Institute of Islamic Thought (IIIT), East-West University of Chicago, বৃটেনের Federation of students’ Islamic societies, International federation of students’ organization (IFSO) এবং কুয়ালালামপুরের ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। তারা বিশ্বব্যাপী সউদী যোগ্যতাসম্পন্ন (Saudi-qualified) দাওয়াকারী, চিন্তাবিদ ও ইমামদের বেতন দিয়ে থাকে। সউদী আরবে এ বিশাল গুরু দায়িত্ব সরকার একাই সামাল দেয় না, বরং প্রধান তিনটি সউদী নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান যারা বিশ্বব্যাপী “American Islam” বিস্তারের এ মহান দায়িত্ব পালন করে যচেছ তারা হলো মক্কার- Rabita Al-Alam-Al Islami, দারুল ইফতা এবং বিয়াদ ভিত্তিক World Assembly of Muslim Youth (WAMY)। ইতিহাসের নির্মম পরিহাস ইসলামী রাজনৈতিক আন্দোলনের দুইটি বুহৎ শক্তি – ইখওয়ান ও জামাত, কিভাবে সইচ্ছায় ইসলামকে বিরাজনীতিকরণের (depoliticization) সউদী-আমেরিকার ষড়যন্ত্রের অস্ত্রে পরিণত হলো।
এভাবেই শুধু মিশর সউদী আরব সহ মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশসমূহই নয় বরং তুরস্ক, আফ্রিকান ইউনিয়ন, ইরান, পাকিস্তান, মালয়শিয়াসহ অসংখ্য দেশ মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
উম্মাহ বারে বারে শুধু তাকিয়েই ছিল নতুন আন্দোলন ও নেতৃত্বের দিকে কিন্তু কিছুতেই এসব আন্দোলন পশ্চিমা বলয় থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। নব্য-সাম্রাজ্যবাদ (Neo-colonialism) বরাবরই এসব আন্দোলনের নেতৃত্ব সরবরাহ করে আসছে। নব্য সাম্রাজ্যবাদ মূলতঃ আরো ভয়ানক এক প্রক্রিয়া ছিল যা সাম্রাজ্যবাদকে নতুন করে গঠন করেছিল। ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী দল ও আন্দোলনসমূহ প্রকৃত পক্ষে পশ্চিমা সভ্যতার জন্য আতংকের কোন বিষয়ই ছিলনা বরং সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে নতুন রূপে বিভক্ত মুসলিম দেশসমূহে পশ্চিমা প্রভাব চিরস্থায়ী করতে। পরবর্তীতে “জাতিসংঘ” প্রতিষ্ঠা করা হলো এই শোষণের প্রতিষ্ঠানিক রুপ দিতে।
জাতীয়তাবাদ জ্বরে আক্রান্ত মুসলিম পুনর্জাগরণী মনীষা:
শত বৎসরেরও অধিক কালের পশ্চিমা সভ্যতার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসণ মুসলিম উম্মাহকে এমনভাবে ধরাশায়ী করেছিল যে আমরা দেখতে পেয়েছি প্রতিটি পুনর্জাগরণ আন্দোলন পশ্চিমা ছকের ভেতর বন্দি ছিল। পশ্চাৎপদ ও বিভক্ত উম্মাহকে পুনর্জীবিত করার লক্ষে বেশ কিছু আলোড়ন সৃষ্টিকারী মনীষার অবির্ভাব হয়েছিল যারাও জাতীয়তাবাদ জ্বরে প্রবলভাবে আক্রান্ত ছিল। আমার এই প্রবন্ধের এক পর্যায়ে বলেছিলাম এই পন্ডিতদের চিন্তাসমূহ মূলতঃ পশ্চিমা সভ্যতা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষের বিপরীতে নিছক প্রতিক্রীয়া ছাড়া আর কিছুই ছিলনা। পশ্চিমা সভ্যতা মুসলিম উম্মাহকে এমনই কিছু পরাজিত মানসিকতার (Defeatist mentality) পন্ডিত উপহার দিয়েছিল যারা যদিও বা মুসলিম ঐক্যের কথা বলতেন কিন্তু খিলাফতকে সমাধান মনে করতেন না, যারা যদিও বা মনে করতেন মুসলমানদের পতনের মূলে ইজতিহাদ চর্চার বন্ধই হলো মূল কারণ, আবার সমাধান হিসেবে এও মনে করতেন ইজতিহাদ চর্চার মাধ্যমে ১৪০০ বছরের পুরনো ইসলামকে ‘সংস্কার’ (Reform) করতে হবে। ওরিয়েন্টলিসাম এবং জাতীয়তাবাদ দ্বারা প্রভাবিত এমন সব কিছু পন্ডিতদের ব্যাপারে এখন আলোচনা করব যারা পুনর্জাগরিত করার নামে মূলতঃ উম্মাহকে সাম্রাজ্যবাদের দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রেখেছেল।
আল্লাহ্র রাসূল (সা) এর একটি হাদীস দিয়েই লেখার এ পর্বটুকু শুরু করতে চাই। উরওয়া বিন আল যুবায়ের থেকে বর্ণিত আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আল আস রাসূল (সা) কে বলতে শুনেছে “আল্লাহ তোমাদের জ্ঞান দানের পর তা থেকে তোমাদের বঞ্চিত করবেন না। কিন্তু এই জ্ঞান আল্লাহ উঠিয়ে নিবেন ধার্মিক জ্ঞানী ব্যক্তিদের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে। অতঃপর কিছু মুর্খ লোক তোমাদের মাঝে বিদ্যমান থাকবে যারা নিজেরা পরামর্শ করে এমন সব ফতোয়া দিবে যা তোমাদের ভুল পথে চালিত করবে” [বুখারী]
এমনই কিছু মূর্খ মুসলিম পন্ডিত উনিশ শতকের গোড়াতে শক্তিশালী জীবনব্যবস্থা হিসেবে পুঁজিবাদের উত্থানের বিপরীতে ঘুণে ধরা খিলাফত ছাড়া আর কিছুই দেখতে পারছিলেন না। পতিত সভ্যতাকে কোন চিন্তার ভিত্তিতে পুনর্জীবিত করা যায় তারা সেটি বোঝার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। ইসলামের মৌলিক চিন্তা (Fikrah) এবং এই চিন্তাকে বাস্তবায়নের পদ্ধতি (Tareeqah) কি, কিভাবে চিন্তা ও পদ্ধতি একে অপরের সাথে সম্পর্কিত – এসবের ব্যাপারে তারা বোধশক্তি অর্জন করতে ব্যর্থ হয় এবং বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব পশ্চিমা সভ্যতাকে দিয়ে সন্তুষ্ট থাকে।
রিফা রাফি আল তাহতাওয়ি (মিশর, ১৮০১-১৮৭৩)মুসলিম উম্মাহকে পশ্চিমীকরণের অগ্রপথিক হলো এই তাহতাওয়ি যাকে পাঠানো হয়েছিল প্যারিসে যাতে ফেরত এসে সে পশ্চিমাদের গুণকীর্তন করতে পারে। তার আত্মজীবনী বই -Takhlis al Ibris ila talkhis bariz (The extraction of Gold, or overview of paris, 1834) এ সে প্যারিসের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, কাজের প্রতি ভালবাসা এবং সর্বপরি সামাজিক মুল্যবোধ দেখে বিষ্ময় প্রকাশ করেছে। ইসলামী সমাজে মহিলাদের স্বাধীনতা এবং খিলাফত ব্যবস্থায় পশ্চিমা ধাঁচের সংস্কার সাধনের পক্ষে সে মত দিয়েছিল। তাহতাওয়ির সূচিত এই সংস্কার পরিকল্পনা আজ পর্যন্ত মুসলিম দেশসমূহে বাস্তবায়নের কাজ চলছে তার উত্তরসূরিদের দ্বারা।
জামলউদ্দীন আফগানি আসাদাবাদি (ইরাক, ১৮৩৯-১৮৯)
যেসব মুসলিম পন্ডিত পশ্চিমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন দেখে মনোমুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল জামাল উদ্দীন আফগানি তাদের মধ্যে অন্যতম। সে আধুনিকতার ব্যাপারে ইসলামের অপারগতার কথা অকপটে স্বীকার করল পশ্চিমাদের কাছে। তাই তাকে চিহ্নিত করা হয় “আধুনিক মুসলিম চিন্তা”র জনক। প্রখ্যাত পশ্চিমা দার্শনিক “Ernest Renan” যখন তার লেকচার “ইসলাম ও বিজ্ঞান (La Islamime et la Science) এর মাধ্যমে ইসলামকে আক্রমণ করল এ বলে যে ইসলাম বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও দর্শন তৈরীতে অক্ষম। তখন আফগানী অপরাধস্বীকারমূলক ভঙ্গিতে Renan এর কাছে মাফ চেলেন Journal des Debats (March 27,1883) এ চিঠি পাঠিয়ে। আফগানি স্বীকার করলেন সে ইসলাম ধর্ম মানুষের যুক্তির অবাধ প্রয়োগে (Free use of Reason) বাঁধা দিয়ে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকে ব্যাহত করে।
অথচ অতীতে আমরা দেখতে পেয়েছি ইসলামী চিন্তাবিদরা “জ্ঞান” (Uloom) কে দুটিভাগে ভাগ করতেন। ইবনে খালদুন তার বিখ্যাত “আল মুকাদ্দিমা”য় স্পষ্ট করে বলেছেন “জ্ঞান দুপ্রকারের (১) প্রাকৃতিক, যা সকল জাতি তার চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে বিকশিত করতে পারে (২) ঐতিহাসিক বা পাঠসংক্রান্ত, যে ব্যাপারে হুকুম শরীয়ার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। মানুষের মন কখনোই এসবের ব্যাখ্যা দিতে পারেনা।” এই বিভাজন খিলাফত পতনের আগ থেকে পতন পরবর্তীতে কোন পন্ডিতই বুঝতে পারেনি। খিলাফত ধ্বংসের পর (Uloom) জ্ঞানের ব্যাপারে এরকম মৌলিক চিন্তা আমরা প্রথমবারের মতো দেখতে পাই শেখ তাকিউদ্দীন নাবহানী (রহ) এর লেখনিতে। তিনি “হাদারাহ” ও “মাদানিয়া”র চিন্তার দ্বারা ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সফল হয়েছেন।
মুহাম্মাদ আব্দুহ (মিশর ১৮৪৯-১৯০৫)
মুহাম্মাদ আব্দুহ হলো জামালউদ্দীন আফগানির ঘনিষ্ট সহকর্মী। উম্মাহর ক্ষতিসাধনকারী এরকম পন্ডিতের ব্যাপারে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা কিরকম আত্মবিশ্বাসী ছিল তা একটি ঘটনা থেকেই বোঝা যায়- ১৮৮৪ সালে আব্দুহ প্যারিসে বসে যে বৃটিশদের বিরুদ্ধে কথা বলত, সেই একই বৃটিশরা আব্দুহকে “শাইখুল আযহার” (Shekh ul Azher) পদে ভূষিত করেছিল যখন সে মিশরে ফেরত আসে। আব্দুহ বিশ্বাস করত “নৈতিকতা” ও “আইন” যুগে যুগে পরিবর্তন সম্ভব সাধারণ মানুষের কল্যাণ (Maslaha) কে বিবেচনায় রেখে। সে মনে করত ভাল (খায়ের) ও খারাপ (শার) নিজের ইজতিহাদী যোগ্যতা দ্বারা নির্ণয় করা সম্ভব কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই তা পারেনা।
এছাড়াও আব্দুহ ও জামাল আফগানী খিলাফতকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে উম্মাহর সব সমস্যার সমাধানে বিশ্বাস করতেন না। তারা মনে করতেন মুসলিম দেশসমূহ একত্রিত থাকুক কিন্তু সব দেশের জন্য একজন খলীফার প্রয়োজন নেই। এদের এই বিখ্যাত চিন্তাকে বলা হতো “Pan-Islamism” যা পরবর্তী “Pan-Arabism” এ রূপলাভ করে। আব্দুহর চিন্তার পতন এত নীচে তলিয়ে গিয়েছিল যে ভারতীয় মুসলিমদের আল্লাহর আইন (হুকুম শরীয়াহ) এর পরিবর্তে “British” আইন মেনে নিতে বলেছিল “মন্দের ভালো” (Lesser of two evils) এর “ইজতিহাদী” নীতির উপর ভিত্তি করে [Tafsir al-Manar, Vol 6, p. 406-409, Muhemmad Abduh]। এভাবে “মন্দের ভালো” “Take and demand” ইত্যাদি ভুয়া শরীয়া নীতির দ্বারা প্রথমত খিলাফতকে দূর্বল ও ধ্বংস করা এবং পরবর্তীতে এই ধ্বংসকে অব্যাহত রাখার জন্য বহু অবদান আব্দুহদের রয়েছে।
রাশিদ রিদা (সিরিয়া ১৮৬৫-মিশর ১৯৩৫)
রাশিদ রিদা ছিল মুহম্মাদ আব্দুহর ছাত্র ও তার সময়কার সবচেয়ে প্রভাবশালী মুসলিম আইন শাস্ত্রবিদ যে মৃয়মান খিলাফতকে পুরোপুরি ধ্বংসের জন্য “সংস্কার” প্রস্তাব দেয়। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দ্বারা মোহিত এই পন্ডিত “শুরা” (পরামর্শ) ব্যবস্থার প্রতি জোর দেন। রাশিদ রিদার বিখ্যাত যুক্তি যার দ্বারা সে খিলাফতকে “সংস্কার” করতে চেয়েছিল তা হলো- শরীয়া “ইবাদত” ও “মুয়ামালাত” (সামাজিক সম্পর্ক) দ্বারা গঠিত, মানুষের মনের তেমন কোন ক্ষমতা নেই ইবাদতের বিষয়ে পরিবর্তন আনার কিন্তু “মুয়ামালাত” বিভিন্ন প্রজন্ম ও সমাজের জন্য প্রয়োজনে পরিবর্তিত হতে পারে।
আলি আব্দুর রাযিক (১৮৮৮-১৯৬৬)
মুহাম্মাদ আব্দুহর আরেক শিষ্য যে খিলাফতের জানাযা পড়ানোর জন্য খুবই তৎপর ছিল সে হলো আলি আব্দুর রাযিক। তাকে বলা হতো “ইসলামী ধর্মনিরপেক্ষতার পিতা” (Father of Islamic secularism)। তার বিখ্যাত গ্রন্থ হলো “Islam and the principles of Government” (Al Islam wa usul Al-Hukm) যেটির মাধ্যমে সে ইসলামকে শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক আচার আচরণের সমষ্টিতে বন্দি করতে চেয়েছিল। তার দাবি হলো ইসলামে কোন সুনির্দিষ্ট সরকার ব্যবস্থার কথা বলা হয়নি, তাই খিলাফত ব্যবস্থা কখনোই বাধ্যতামূলক হতে পারেনা। তার ভাষ্য হলো ইসলামের আত্মিক উন্নতির (Personal Salvation) ধারণা সুস্পষ্টভাবে খিলাফতের আওতায় রাজনীতির ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। ইসলাম সব সময় ব্যক্তিগত ইবাদতের কথাই বলেছে, সিয়াসাহ (Politics) এবং ধর্ম কখনোই এক হতে পারেনা। সে আরো দাবি করেছিল যেহেতু সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধ দলিল নাই কুরআন ও সুন্নাহর এবং ইজমাও নেই খিলাফতের পক্ষে তাই কোন অর্থ হয় না খিলাফতকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। বরং গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থাই ইসলামকে রাজনৈতিক অপব্যবহার (Political Abuse) থেকে রক্ষা করতে পারে। মুসলিম উম্মাহকে ধ্বংসের রসাতলে নিয়ে যাওয়া এসব মনিষী পশ্চিমাদের কোন পর্যায়ের দাস ছিল তার বড় প্রমাণ আব্দুল রাযিক এর মতো ভন্ড শরীয়াহ বিচারকদের লেখনী থেকে প্রমাণিত। সে তার বই “Al Islam wa Usul al Hukm” বইয়ে সূরা নিসার ৫৯ নং আয়াত [“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্ তার রাসূল (সা) ও উলিল আমরদের অনুসরণ কর”] টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ১১৯ পৃষ্টায় উল্লেখ করে, “যদি তোমরা এ ব্যাপারে আরো বিশদ জানতে চাও তাহলে Sir Arnold Thomas এর “The Caliphate” বইটি পড়”। উল্লেখ্য Sir Arnold ছিলেন পশ্চিমা ইতিহাসখ্যাত Orientalist যার কাজই ছিল পরিকল্পিতভাবে ইসলামের ইতিহাস বিকৃত করা।
এভাবেই যুগে যুগে বেশ কিছু আলোড়নসৃষ্টিকারী পুনর্জাগরণবাদী মুসলিম চিন্তাবিদের উদয় হয়েছিল যাদের মূল কাজই সমাজ থেকে ইসলামকে পৃথক করা (Secularism)। তাদের সংস্কারের বিষয়ই ছিল মুয়ামালাত, উকুবাত এবং এমনসব ইবাদত যা ব্যক্তিগত, উদাহরণস্বরূপ জিহাদ। এরকম মনীষী ও প্রতিষ্ঠান বর্তমানেও বিদ্যমান, যেমন- ইউসুফ আল কারদাওয়ি, Islam and Democracy Institute England, সুদানের ড. হাসান আল তুরাবি প্রমুখ। বিভিন্ন একাডেমি, Activist ও Traditional Alem রা এখনো আব্দুহ, রাযিকদের ভাবশিষ্য হয়ে আছে যারা ইসলামকে বর্তমান বাস্তবতার সাথে খাপ খাওয়ানো চেষ্টায় লিপ্ত, বরং ইসলাম দ্বারা বাস্তবতাকে পরিবর্তন তাদের উদ্দেশ্য নয়। এ প্রকারের (Compromising) সমঝোতামূলক আন্দোলন যে দল, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিই করুক না কেন মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণ এদের দ্বারা সম্ভব নয়। খিলাফতের পৃথিবীব্যাপী উপস্থিতি এদের বোধগম্য নয়। পশ্চিমা সাংস্কৃতিক অগ্রাসনের ফলশ্রুতিতে তাই রাজনৈতিকভাবে তারা জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে পশ্চিমাদের স্বার্থ সংরক্ষনের রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়েই রয়ে গেল।
খিলাফত যেভাবে জাতীয়তাবাদ সমস্যার সমাধান ও উম্মাহকে একত্রিত করবে:
কোন একটি অঞ্চলে খিলাফতের পুনঃপ্রতিষ্ঠা অতঃপর অন্যান্য মুসলিম দেশসমূহকে খিলাফতের ছায়াতলে একত্রিত করা অবশ্যই মুসলিম দেশসমূহে রাজনৈতিক গতিশীলতা (Dominno effect) ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসমূহে ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি করবে। কুফর শক্তির সকল ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতার ব্যর্থতার এক পর্যায়েই মূলত: আন্তর্জাতিক রাজনীতির পট-পরিবর্তনের মাধ্যমেই কোন এক দেশে খিলাফতের পুনরাবির্ভাব হবে যা অপরাপর সকল মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের উম্মাহর ভেতর প্রাণসঞ্চার করবে। জাতীয়তাবাদের মূল্যোৎপাটন ও মুসলিম দেশসমূহের একত্রীকরণের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত কয়েকটি বিষয় আমাদের বুঝতে হবে-
১. খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার বহুকাল আগ থেকে বিশ্বের প্রতিটি মুসলিম দেশসমূহে খিলাফতের সঠিক আন্দোলন-এর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম উম্মাহকে সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত করে তোলবে এবং জাতীয়তাবাদী চিন্তা চেতনার উর্দ্ধে তুলে নিবে।
২. আমরা খুব সহজেই এটা বুঝতে পারি উম্মাহর করুণ ও শোচণীয় বাস্তবাতা এবং পশ্চাৎপদতার মূল কারণটিই হলো রাজনৈতিক। তাই রাজনীতিকে দাওয়ার একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নিয়ে উম্মাহ ও শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে ক্রমান্বয়ে বিভাজন সৃষ্টির এক পর্যায়ে যখন খিলাফত “উম্মাহর দাবী” (Popular demand) তে পরিণত হবে তখন খিলাফত প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মীরা নুসরার মাধ্যমে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে যা অন্যান্য সকল মুসলিম দেশসমূহের “আহলুল হাল্লি ওয়াল আকাদ” (ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী)দের দৃষ্টি আকর্ষণে বাধ্য করবে। ফলে খিলাফতের রাজধানীর সাথে একত্রিত হওয়ার জন্য সেসব দেশের প্রভাবশালীদের অবশ্যই দাবি জানানো হবে।
৩. উম্মাহর একত্রীকরণ মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও সামরিক- এ তিন পর্যায়ে হতে হবে। কোন এক অঞ্চলে খিলাফতের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এই তিনটি বিষয়ে উম্মাহকে একত্রিত করবে। অতঃপর, প্রতিষ্ঠিত খিলাফতের সাথে অন্যান্য মুসলিম দেশসমূহের একত্রিত হওয়া কেবলই “সামরিক” বিষয় মাত্র হবে কারণ বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক ভাবে অন্যান্য দেশসমূহের উম্মাহকে পুনর্জাগরিত করে রাখা হবে।
পরিশেষে এটা উল্লেখ করতে হবে খিলাফত যেভাবে জাতীয়তাবাদের ব্যধি থেকে উম্মাহকে বের করে এনে একে একত্রিত করবে তা বুঝতে হলে শুধুমাত্র আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচেনা করলে চলবে না। একদার সুপার পাওয়ার “খিলাফত” পুনঃপ্রতিষ্ঠা তাই বিশ্বব্যাপী সংগঠন ও আন্দোলনের (Global Movement) চোখ দিয়েই বোঝা সম্ভব।
উপসংহার:
এই নিবন্ধে দেখানোর চেষ্টা করা হলো কিভাবে পরিকল্পিতভাবে ইসলাম বহির্ভূত “জাতীয়তাবাদ” নামক ব্যধি খিলাফতের ভেতর ছড়িয়ে এর ধ্বংস করা হলো। আরো দেখতে পেলাম ধ্বংসকালীন ও পরবর্তীতে পশ্চিমা স্বার্থান্বেষী পন্ডিতদের আবির্ভাব যারা উম্মাহর ভেতর থেকেই এর বুকে ছুরি চালিয়েছে যার ক্ষতদাগ আর যন্ত্রলা আজো এই মিল্লাত বহন করে চলেছে। যত আন্দোলন জন্ম নিয়েছিল এবং এখনও টিকে আছে তার সবই জাতীয়তাবাদ এবং বিবর্তিত জাতীয়তাবাদী চিন্তা ও সাংস্কৃতিক আক্রমণের স্বীকার। রাসূলের (সা) প্রিয় এই উম্মাহর জন্য প্রয়োজন ছিল এমন একটি বৈশ্বিক (Global) দল যারা উম্মাহর এই সার্বিক পতন ঠেকাতে সক্ষম। জাতীয়তাবাদের উর্ধে উঠে সংঘটিত এই দলটিকে হতে হবে সম্পূর্ণ নতুন চিন্তার ভিত্তিতে খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আপোষহীন। উম্মাহর সমগ্রিক চিন্তা যা সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা দূষিত তা থেকে বের কের আনার জন্য এ জাতিকে তার জীবনের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। তবেই ফিরে আসবে নতুন এক শাসনব্যবস্থা ‘খিলাফত’ যা এই পুনর্জাগরিত জাতির বিষয়াদি ও স্বার্থের যত্ন নিবে।
আমাদের বুঝতে হবে উম্মাহর মূল সমস্যা অর্থনীতি, শিক্ষা, দূর্নীতি ইত্যাদি নয়, বরং খিলাফতের তত্ত্বাবধানে ইসলামী জীবন ব্যবস্থার অনুপস্থিতিই হলো মূল সমস্যা। খিলাফত ছাড়া উম্মাহকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে সাম্রাজ্যবাদীরা খেলতে পারে- প্রবন্ধে আমরা তাই দেখতে পেলাম। আজ আমাদের সম্পদ কুফরের পদতলে, আমাদের জীবনের সম্মান ও নিরাপত্তা নির্ভর করছে তাদের মর্জির উপর, আমাদের মন আজ মিথ্যা ও দ্বীন ইসলামের বিকৃতির স্বীকার। এসব সমস্যা বার বার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা হলো অতীব গুরুত্বপূর্ণ (Vital) বিষয়। আমাদের অবশ্যই অজ্ঞতার সময়কালীন দূর্নীতি ও অবিশ্বাসের শিকড়ের মূলোৎপাটন করতে হবে এবং আরো একবার উম্মাহর মুখে হাসি ফোটাতে হবে খিলাফতের পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যার কথা আল্লাহ্র রাসূল (সা) বলে গেছেন- “……. এবং এরপর আবারো আসবে নবুওয়তের আদলের খিলাফত”। পরিশেষে অবশ্যই সকলকে খলীফা আলী (রা) র একটি উক্তি স্মরন করিয়ে দিতে চাই- “তোমাদের জীবন হলো অনেক মূল্যবান; যার বিনিময়মূল্য জান্নাত ছাড়া আর কিছুই হতে পারেনা। অতএব, শুধুমাত্র জান্নাতের মূল্যের বিনিময়ে একে বিক্রি কর”।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র কাছে এ বলে দোআ করেই শেষ করব উনি যাতে আমদের জীবনের বিনিময়ে হলেও দুনিয়ার বুকে বহু প্রত্যাশিত এই খিলাফাহ এবং পরকালে আমাদের জান্নাতুল ফেরদৌস উপহার দেন। আমীন।
আবু ঈসা
১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০০৯মুক্তবাজারের কারণেই কি এশিয়ান টাইগারদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)
১৯৬০ এবং ১৯৭০ এর দশকে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং এরং তাইওয়ানের ব্যাপক ও দ্রুত শিল্পায়নকে বুঝানোর জন্য ‘টাইগার’ অর্থনীতি শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এই চার টাইগার অন্যান্য এশীয় অর্থনীতি-চীন এবং জাপানের সাথে অনেকক্ষেত্রে সাদৃশ্যপূর্ণ। যারা এশীয় ধাচের রপ্তানীমুখী অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথিকৃৎ। এই দেশসমূহ পশ্চিমা শিল্পোন্নত দেশগুলোকে লক্ষ্য করে পণ্য উৎপাদন শুরু করে এবং সরকারী নীতি গ্রহণের মাধ্যমে আভ্যন্তরীণ ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করে।
এ জাতিগুলোর দিকে ভালভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, তাদের উন্নয়ন ছিল সম্পূর্ণ কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত, সরকারী ভতুর্কি এবং রক্ষণশীল নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত।
১৯৬৫ সালে স্বাধীনতা লাভের পর সিঙ্গাপুর ছোট আভ্যন্তরীণ বাজার ও সম্পদের অপ্রতুলতা অনুভব করে। ফলশ্রুতিতে ১৯৬৮ সালে সিঙ্গাপুর ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট বোর্ড গঠন করে। এর দায়িত্ব ছিল সিঙ্গাপুরের উৎপাদিত পণ্যকে উৎসাহিত করবার জন্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন। সিঙ্গাপুরের প্রশাসন বেকারত্বকে কমিয়ে নিয়ে আসে, জীবনমান উন্নয়নের জন্য গণগৃহায়ন প্রকল্প চালু করে। সাথে সাথে ব্যবসাবান্ধব, বিদেশী বিনিয়োগ নির্ভর, রপ্তানীমুখী ব্যবসায়ী নীতি প্রণয়ন ও জাতীয় করপোরেশনগুলোতে সরাসরি সরকারী বিনিয়োগ করা হয়। সরকারী হস্তক্ষেপের কারণে সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি অনেক উন্নত হয়, বিশেষত: ইলেকট্রনিক্স, কেমিক্যাল এবং সেবাশিল্পে। সিঙ্গাপুর সরকার তার অর্থনীতিকে তেমাসে-লিংকড্ কোম্পানীর (টি.এল.সি) দিকে পরিচালিত করতে থাকে। এই কোম্পানীসমূহের রয়েছে সার্বভৌম সম্পদের তহবিল। টি.এল.সি গুলো বিশেষত উৎপাদনখাতে কাজ করে এবং এরা বাণিজ্যিক সত্ত্বা হিসেবে পরিগণিত হয়। জিডিপির শতকরা ৬০ ভাগের অবদান ছিল এ কোম্পানীসমূহের।দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর তাইওয়ানের প্রথম নেতা কমিটঙের শাসনামলে ক্ষুদ্র দ্বীপ দেশটির উন্নয়ন শুরু হয়। তখন কিছু অর্থনৈতিক নীতি ও পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়। নতুন মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা প্রচুর অর্থনৈতিক সাহায্য উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করে। সরকার প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। কৃষিখাতের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদকে কাজে লাগানো হত শিল্পখাতে। শিল্পখাতকে উন্নয়ন করবার জন্য শস্য রপ্তানীর মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করা হত কলকারখানার মেশিনারী ক্রয়ের জন্য। সরকার আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে দেয়, বিদেশের সাথে ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রন করে এবং দেশীয় শিল্পকে রক্ষার জন্য আমদানিকে নিরুৎসাহিত করে। ১৯৬০ এর মধ্যে তাইওয়ানের শিল্পসমূহ অনুধাবন করতে পারল ইতোমধ্যে আভ্যন্তরীণ বাজার সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। তখন দেশটি অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে রপ্তানি বাড়ানোর দিকে মনোনিবেশ করে। চিয়াং চিং কুয়ু’র ১০ টি প্রধান অবকাঠামোগত প্রকল্প এবং বিশ্বের সর্বপ্রথম রপ্তানী প্রক্রিয়াকরন অঞ্চলের মাধ্যমে তাইওয়ানে ব্যাপক শিল্পায়নের ভিত্তি রচিত হয়।
দক্ষিণ কোরিয়াও কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে একইভাবে এগিয়ে যায়। ১৯৬১ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে অনেকগুলো পঞ্চবার্ষিকী নীতির প্রথমটি প্রণীত হয়। আর এর মাধ্যমে অতি স্বল্প সময়ে যে উন্নয়ন হয়েছে তা মুক্তবাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে করা নিতান্তই অসম্ভব ছিল। অর্থনীতিতে আধিপত্য করত কিছু ব্যক্তিমালিকানাধীন বহুজাতিক কোম্পানী যেগুলো চায়েবল নামে পরিচিত ছিল। এছাড়াও লৌহ, ইস্পাত, শক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সার, কেমিক্যাল এবং অন্যান্য ভারী শিল্পের কিছু সরকারী কোম্পানী ছিল। সরকার ঋণের সুবিধা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্যক্তিখাতের শিল্পসমূহকে রপ্তানী লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিত, পরোক্ষভাবে চাপ প্রয়োগ করত এবং গতানুগতিক মুদ্রানীতি ও আর্থিক কৌশল প্রণয়ন করত।
১৯৬৫ সালে সরকার ব্যাংকসমূহকে জাতীয়করণের মাধ্যমে আরও নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করে এবং কৃষিভিত্তিক সমবায়কে কৃষি ব্যাংকের সাথে সমন্বিত করে ফেলে। সকল ঋণপ্রদানকারী সংস্থাসমূহের উপর নিয়ন্ত্রন আরোপের মাধ্যমে অন্যান্য ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের উপরও সরকার কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়। ১৯৬১ সালে একজন ডেপুটি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ইকোনমিক প্ল্যানিং বোর্ড গঠিত হয়-যা সম্পদ বন্টন, ঋণের প্রবাহকে সুনিশ্চিতকরণ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সব ধরণের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা প্রণয়ন করে।
এশিয়ান টাইগারদের উন্নয়ন ব্যাপকভাবে সরকারী হস্তক্ষেপের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল। আর এটাই ছিল তাদের উন্নয়নের মেরুদন্ড। তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, হংকং একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে। আর তাদের বর্তমান অবস্থার জন্য কেন্দ্রীয় বা সরকারী হস্তক্ষেপ ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে-এর জন্য কোনক্রমেই গতানুগতিক ধারার পুঁজিবাদী মুক্তবাজার ব্যবস্থা অনুসৃত হয়নি। এই টাইগারদের অর্থনীতি মূলত ভোক্তাদের অর্থনীতি যেখানে রপ্তানী হল মূল চালিকাশক্তি।ঐতিহাসিকভাবে জাপানের উন্নয়ন ও বর্তমানে চীনের উন্নয়ন কি বিশ্বায়নের ফসল?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)
কথা বলা হয় যে, ঐতিহাসিকভাবে জাপান হল উদার অর্থনৈতিক আন্দোলনের সাফল্যগাঁথা-যারা মুক্তবাজার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল ও অর্ধশতাব্দীরও কম সময়কালের মধ্যে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হয়। চীনের বর্তমান অগ্রগতির পেছনেও একই ধরণের কথা প্রচলিত আছে। যদিও সত্যিকারের ঘটনা যা বলা হচ্ছে মোটেও তা নয়।
যেসব কৌশল গ্রহণ করার কারণে জাপানের অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে তা উদারনীতি ও বিশ্বায়নের ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। জাপান সরকার তার দেশের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় খাতসমূহকে বিকাশের জন্য বিদেশী প্রতিযোগিতা থেকে মুক্ত রেখেছে। বৈদেশিক মুদ্রা বন্টনের দায়িত্ব জাপানি সরকার স্বীয় অধিকারে রাখে-যার মাধ্যমে আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রনে রাখা, জাপানি কোম্পানিগুলোর বিদেশী প্রযুক্তি সংগ্রহের ব্যবস্থা করা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের বিভিন্ন উপাদানকে নিয়ন্ত্রনে রাখা সম্ভবপর হয়। সরকার নির্দিষ্ট শিল্পসমূহেঅর্থপ্রবাহ সুনিশ্চিত করার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দ্যা এক্্রপোর্ট ব্যাংক অব জাপান এবং জাপান ডেভেলোপমেন্ট ব্যংক স্থাপন করে।
মিনিস্ট্র অব ইন্টাঃ ট্রেড এন্ড ইন্ডাস্ট্রি (এম আই টি আই) নামক মন্ত্রণালয়ের একটি বিভাগ জাপানের উন্নয়নে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। কেন্দ্রীয় সরকারের এ বিভাগটি উৎপাদন, সেবা এবং উৎপাদিত পণ্যের প্রসারতাকে নিয়ন্ত্রন করে। জাপানি শিল্প কাঠামোর জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন, বৈদেশিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রন, জাতীয় অর্থনীতিতে পণ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত এবং কাঁচামাল ও শক্তির নির্ভরযোগ্য উৎস পর্যবেক্ষণ করা ছিল এ বিভাগের দায়িত্ব। সুতরাং জাপানের অর্থনীতি ছিল কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত; কোনক্রমেই মুক্তবাজার ব্যবস্থার অধীন ছিল না।
বৈশ্বিক ব্যপারে চীন তার কয়েক দশকের পুরনো,সংকীর্ণ ও প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতা থেকে বের হয়ে এসেছে। চীন তার ১৫০ বছরের লজ্জা ও অপমানের দীর্ঘ লালিত ভিক্টিম (victim) মানসিকতাকে ঝেড়ে ফেলে বৃহত্তর শক্তির মানসিকতা গ্রহন করেছে (ডাগুয়া জিনতাই)। এর অবধারিত ফলাফল হল বৈশ্বিক বিষয়াবলিতে চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা। ভিক্টিম মানসিকতা থেকে বেরিয়ে বৃহত্তর শক্তির মানসিকতা ধারণের কারণে চীন এখন নিজেকে বিশ্বশক্তিসমূহের কাছাকাছি এক সত্ত্বা হিসেবে খুঁজে পাচ্ছে। ১৯৯০ এর দশক থেকে চীনের এ পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়ে উঠে। চীন এখন তার বৈশ্বিক দায়দায়িত্বের ব্যাপারে খোলামেলা কথা বলে থাকে এবং সেদেশের নীতিনির্ধারকেরা এ চশমা দিয়েই চীন পৃথিবীকে দেখে।
গতানুগতিক ধারার অর্থনীতিবিদ ও যারা বিশ্বাস করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানে উদার মূল্যবোধ গ্রহণ-তাদের জন্য চীন এক বিস্ময়। পশ্চিমা উন্নয়নের ধারণা-যেখানে গণতন্ত্র, মুক্ত বাজার এবং উদার মূল্যবোধ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে- চীন প্রথমেই সেগুলোকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে পুরো পৃথিবী এ ধারণা সম্পর্কে অজ্ঞ রয়েছে।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা গ্রহণ কিংবা বিশ্বায়নে অংশগ্রহণ না করেও চীনে ব্যাপক অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও শিল্পায়ন হয়েছে- যা ছিল সম্পূর্ণ কেন্দ্রনিয়ন্ত্রিত এবং উদার নীতিমালার সাথে দূরতম সম্পর্ক বিবর্জিত। চীনের প্রেসিডেন্ট হু জিন তাও ২০০৪ সালে বলেন, ‘আমরা কখনই অন্ধভাবে অন্য দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে অনুকরণ করবো না। ইতিহাস প্রমাণ করে যে নির্বিচারে পশ্চিমা রাজনৈতিক ব্যবস্থার অনুকরণ চীনের জন্য এক তিমিরাচ্ছন্ন পথ হবে’। সুতরাং একথা থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, চীন অদুর ভবিষ্যতে উদার নীতিমালা গ্রহণ করবে না এবং উন্নয়নের পশ্চিমা ধারণা ছাড়াই তাদের উন্নয়ন সুনিশ্চিত হয়েছে।
জাপান এবং জার্মানীর মত চীনও কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত অর্থনীতি নিয়ে এগিয়ে গেছে। বাজারের সব ক্ষেত্রে রয়েছে চীনা সরকারের হস্তক্ষেপ। কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দিয়ে চীন তার সম্পদকে একদিকে পরিচালিত করেছে এবং এটা তাকে আঞ্চলিক নেতৃত্ব বিধান করেছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরে সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে সমাজতান্ত্রিক ঘরানার হওয়ার কারণে চীন পশ্চিমাদের সহায়তা একেবারেই পায়নি। তবে তারা দেখিয়ে দিয়েছে যে একটি স্বাধীন, আগে দেশের স্বার্থ এবং কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত নীতিমালা অর্থনৈতিক সাফল্য এনে দেয়।
শিল্পোন্নত দেশসমূহের উন্নয়নের কারণ কি মুক্তবাজার ও মুক্ত বাণিজ্য?

বৃটেনকে লাইসেজ ফেয়ার (laissez-faire) মতবাদ গ্রহণকারী রাষ্ট্র হিসেবে এবং তারাই একমাত্র মুক্তবাণিজ্য চর্চা করে থাকে বলে মনে করা হয় । বৃটেন সরকারী হস্তক্ষেপ ছাড়া অথবা খুব সামান্য হস্তক্ষেপের কারণে উন্নত একটি দেশ। তবে একথা বললে মিথ্যাবলা হবে না যে, এ রাষ্ট্রটিই সর্বপ্রথম নতুন গড়ে উঠা শিল্প সুরক্ষার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করে। দেশীয় শিল্পকে বিদেশী শিল্পের অসম প্রতিযোগিতার হাত থেকে রক্ষার জন্যই এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়।
১৯০৭ সালে একজন ইতিহাসবেত্তা অর্থনীতিবিদ ব্রিসকো বাণিজ্য আইনের ১৭২১ সালের সংস্কারের সারমর্ম এভাবে তুলে ধরেন,‘দেশীয় উৎপাদনকারীদেরকে বিদেশী পন্য থেকে রক্ষা করতে হবে, উৎপাদিত পন্যের অবাধ রপ্তানী নিশ্চিত করতে হবে এবং যেখানে সম্ভব আর্থিক সুবিধা ও ভাতা দিয়ে উৎসাহিত করতে হবে’-এর ফলে কাঁচামালের উপর আমদানি শুল্ক কমিয়ে দেয়া হয় এবং বিদেশে উৎপাদিত পণ্যের উপর অধিক হারে করারোপ করা হয়। বিশেষত বৃটেন নিজস্ব শিল্পকে রক্ষার জন্য তার ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহ থেকে অপেক্ষাকৃত ভাল মানের পণ্য আমদানিকে নিষিদ্ধ করে।
১৮৪৬ সালে শস্য আইন বাতিলের মাধ্যমে বড় ধরণের পরিবর্তন আনা হয়। এই আইনটি ছিল বৃটিশ কৃষক ও ভূ-স্বামীদের রক্ষার জন্য কমদামে বিদেশী শস্য ক্রয় রোধকল্পে করারোপ সর্ম্পকিত। কিন্তু এটা করা হয়েছিল মহাদেশে শিল্পায়নকে ঠেকাবার লক্ষ্যে এবং বৃটিশ কৃষির রপ্তানী বাজারকে সম্প্রসারণ করবার জন্য। বৃটেনের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা মুক্ত বাণিজ্যের দ্বারকে উন্মোচিত করে এবং এর বিকাশ লাভ হয়েছিল দীর্ঘমেয়াদী করারোপের মাধ্যমে বাধা সৃষ্টি করে। বৃটিশ অর্থনীতির উদারীকরণ একটি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সুচিন্তিত পদক্ষেপ ছিল এবং এটি লাইসেজ ফেয়ার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্জিত বিষয় নয়।
শিল্পবান্ধব কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে বৃটেন ১৮০০ সালে যখন শিল্পায়নের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে যায় তখন সমুদ্র অভিযানের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সম্পদের খোঁজে নেমে পড়ে। আগ্রাসী উপনিবেশবাদের এই প্রক্রিয়া বিশ্বে বৃটেনের অবস্থানকে সুসংহত করে এবং ভূমি দখল নয় বরং উপকূলবর্তী বাজার দখলের জন্য যুদ্ধের নতুন ধারণার জন্ম হয়। ঔপনিবেশিক বিস্তৃতির জন্যই বৃটেনে তখন ব্যাপক বৈজ্ঞানিক গবেষণা, আবিষ্কার, শ্রমিক সংগ্রহের নতুন ধারণা এবং সামরিক কৌশলের তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। পুরো বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বিস্তারের পরই বৃটেন ‘উন্নয়নের জন্য উদার মূল্যবোধ’ নীতি গ্রহণ করে। প্রচন্ড প্রতাপে পুরো বিশ্বে যখন বৃটেন দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল তখন অন্য দেশের বাজার দখলের জন্য মুক্ত বাণিজ্য নীতি গ্রহণ করে। উন্নত হবার পরই মূলত মুক্তবাজার ধারণা এসেছে। কিন্তু এটা কখনই বৃটিশ সাম্রাজ্যকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য প্রভাবক হিসেবে কাজ করেনি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়নও এভাবেই হয়েছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্র তার বাণিজ্যকে উদার করেনি। কেম্ব্রিজের ইতিহাসবেত্তা অর্থনীতিবিদ ড. জুন চেঙ এর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘ যখন শিল্পক্ষেত্রে প্রাধান্যের দিক থেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠল তখনই বাণিজ্যকে উদার করল এবং মুক্ত বাণিজ্যকে ছড়িয়ে দিতে লাগল’।
রক্ষণশীল নীতির মাধ্যমে পশ্চিমা দেশসমূহ যখন শিল্পক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে সমর্থ হয় তখন মুক্তবাজারের পক্ষে তারা সাফাই গাইতে শুরু করে যাতে অন্যরা এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে না পারে এবং তাদের আধিপত্য বজায় থাকে। ঊনিশশতকের মাঝামাঝি সময়ে বৃটেনসহ পুরো ইউরোপ এ উদারনীতিমালা গ্রহণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার একশত বছর পর ঠিক একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে।
ইসলামে কি কোন সরকারব্যবস্থা নেই?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)
দীর্ঘ প্রায় চৌদ্দশত বছর ধরে এ ব্যাপারে কোন বিতর্ক ছিল না যে, ইসলামে কোন শাসনব্যবস্থা নেই। ১৯২৪ সালে যখন খিলাফত শাসনব্যবস্থা ধ্বংসের সম্মুখীন তখন এ প্রশ্নটি উত্থাপন করা হয়েছিল। এটা সে সময়ের কথা যখন অনেক ব্যক্তিই পশ্চিমা সংস্কৃতির কাছে আত্মসমর্পন করছিল এবং ইসলামে কোন শাসনব্যবস্থা থাকাকে অস্বীকার করছিল। ১৯২৫ সালে খিলাফত ধ্বংসের এক বছর পর আলী আবদুর রাজিক ‘আল ইসলাম ওয়া উসুলুল হুকুম’ বইয়ের মাধ্যমে উল্লেখ করেন, ইসলামে কোন ধরণেরই শাসন বা সরকারব্যবস্থা নেই। স্যার থমাস আরনল্ডের মত ওরিয়েন্টালিস্টও ইসলামী অনেক তথ্য প্রমাণ দ্বারা ব্যাপক সাহিত্য রচনা করে প্রমাণ করবার চেষ্টা করেন যে, ইসলামে কোন শাসনব্যবস্থা নেই।
দূর্ভাগ্যজনকভাবে আজকাল অনেক মুসলিমও ইসলামকে আধুনিকীকরণের নামে প্রমাণ করবার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে যে, ইসলামের নিজস্ব কোন সরকার ব্যবস্থা নেই। তাদের যুক্তি হচ্ছে মুসলমানরা যে কোন সমাজে বসবাস করতে পারে এবং এর মধ্যে সবচেয়ে ভালটি গ্রহণ করতে পারে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ইংল্যান্ডে ২০০৭ সালে “ইসলাম এন্ড মুসলিমস ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড টুডে” শীর্ষক সেমিনার আয়োজন করে। মিশরের প্রধান মুফতি আলী গোমাসহ অন্যান্য ‘মধ্যমপন্থি’ (মডারেট) মুসলিমের তকমা লাগানো ব্যক্তিবর্গ আলোচনা করেন কীভাবে ইসলামকে পশ্চিমাদের প্রয়োজনে পরিবর্তন করা উচিত। ইসলামে কোন শাসনব্যবস্থা নেই – এ বিষয়টি প্রমাণের জন্য আলী গোমা বলেন,
‘অনেকে মনে করেন ইসলামী শাসনব্যবস্থা মানেই খিলাফত- যেখানে খলীফা একটি নির্দিষ্ট নিয়ম পদ্ধতির মাধ্যমে শাসন করবেন। ইসলামী ঐতিহ্যের সাথে এর কোন যৌক্তিক ভিত্তি নেই। খিলাফত এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা যা মুসলিমরা একটি বিশেষ সময়ে রাজনৈতিক প্রয়োজনে গ্রহণ করেছিল। তার মানে এই নয় যখনই সরকার ব্যবস্থার প্রসঙ্গ আসবে তখনই খিলাফতের কথা ভাবতে হবে। মিশর এ ব্যাপারে যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছে তা অন্যদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। এ ব্যাপারে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলেন মুহম্মদ আলী পাশা। যার ধারবাহিকতায় খেদিব ইসমাইল একটি আধুনিক মিশর গড়বার প্রয়াস পায়। এর মানে হল ইসলামী আইনের সংস্কার। এ প্রক্রিয়ায় ইসলামিক চিন্তাবিদদের সমর্থন নিয়েই মিশর গণতান্ত্রিক শাসনের অধীনে একটি উদার রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিত হয়। মুসলমানরা তাদের প্রয়োজনমাফিক ইচ্ছেমত যে কোন ধরণের শাসনব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার রাখে।’
ইতোমধ্যে বিভিন্ন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এবং রাষ্ট্রীয় মন্ত্রীবর্গ একটি সম্ভাব্য ইসলামী শাসনব্যবস্থার উত্থানের ব্যাপারে সর্তক করে দিয়েছেন। এর মানে হল ইসলামে একটি শাসনব্যবস্থা রয়েছে এটা প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেয়া। মুসলিমদের মধ্যে সংখ্যালঘিষ্ট একটি মহল মনে করে যে ইসলামে কোন শাসনব্যবস্থা নেই। তাদের যুক্তি হল ইতিহাসে যে ইসলামী শাসনব্যবস্থা দেখতে পাই তা মূলত: একটি সাময়িক ব্যাপারমাত্র – যা বর্তমান সময়ে একেবারেই অপ্রযোজ্য। পূর্বে ইসলামে যে শাসন আমরা দেখেছি তা বস্তুত কিছু রীতিনীতির অধীন ছিল। এ ব্যাপারটি বুঝতে হলে আমাদের ইসলামী প্রামাণ্য দলিলসমূহ খুব সুক্ষ্ণভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।
কুর’আন আল্লাহ্’র আইন দ্বারা শাসিত হবার ব্যাপারে বিভিন্ন আয়াতে বেশ জোর দিয়েছেন। যেমন:
‘এবং যারা আল্লাহ্’র দেয়া বিধান ছাড়া অন্য বিধান দিয়ে বিচার ফয়সালা করে তারাই কাফের (অবিশ্বাসী)..জালেম (অত্যাচারী)..ফাসেক (মিথ্যাবাদী)।’ (সূরা মায়েদা:৪৪-৪৭)
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরও বলেন,
‘সুতরাং তাদের মধ্যে ফয়সালা করুন আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ করেছেন ও যে সত্য আপনার কাছে এসেছে তা দিয়ে এবং তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না।’ (সূরা মায়েদা: ৪৮)
তিনি আরও বলেন,
‘আর আপনি আল্লাহ্’র নির্দেশ অনুযায়ী ফায়সালা করুন এবং তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না, সাবধান থাকুন, যাতে তারা বিভ্রান্ত করতে না পারে।’ (সূরা মায়েদা: ৪৯)
এছাড়াও দ্বীন প্রতিষ্ঠা এবং শারী’আহ্ দ্বারা শাসিত হওয়া প্রত্যেক মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। এর এটা কখনওই সম্ভবপর হবে না যদি একজন শাসক না থাকেন -যিনি এই শারী’আহ্ বাস্তবায়ন করবেন। এভাবে অসংখ্য প্রমাণ পেশ করা যাবে যেসবের দ্বারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, একজন শাসক নিয়োগ করা ফরয দায়িত্ব।
একজন খলীফা নিয়োগ করবার বাধ্যবাধকতা আমরা রাসূলের সুন্নাহ ও ইজমায়ে সাহাবা থেকে পেয়ে থাকি। নাফিয়া বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘যে ব্যক্তি (খলীফার) আনুগত্য হতে হাত গুটিয়ে নিল, সে ব্যক্তি কিয়ামত দিবসে এমনভাবে উত্থিত হবে যে, তার পক্ষে কোন প্রমাণ থাকবে না এবং যে তার কাঁধে খলীফার বাই’য়াত না থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল সে যেন জাহেলিয়াতের মৃত্যুবরণ করল।’ (মুসলিম)
সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সা) সব মুসলিমের কাঁধে বাই’য়াত থাকবার প্রয়োজনীয়তা ফরয করে দিয়েছেন। তিনি বাই’য়াতহীন মৃত্যুকে জাহেলিয়াতের সময়ের মৃত্যুর সাথে তুলনা করেছেন। ‘কাঁধে বাই’য়াত থাকা’ এর অর্থ হল একজন খলীফা থাকা। খলীফা নির্বাচনের পদ্ধতিও রাসূলুল্লাহ (সা) বিবৃত করেছেন। আবু হাজিম বলেন যে, তিনি আবু হুরাইরার সাথে পাঁচ বছর অতিবাহিত করাকালীন সময়ে শুনতে পান যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘বনী ইসরাইলকে শাসন করতেন নবীগণ। একজন মারা গেলে অন্যজন তার স্থলাভিষিক্ত হতেন। আমার পরে আর কোন নবী আসবে না। এরপর আসবেন অসংখ্য খলীফা। তখন সাহাবা (রা) প্রশ্ন করলেন এ ব্যাপারে আপনি আমাদের কী করতে উপদেশ দেন? তিনি (সা) বলেন, তোমরা প্রথম একজনের পর অপর প্রথম (খলীফা)-এর প্রতি বাই’য়াত পূর্ণ করবে এবং তাদের জন্য রক্ষিত অধিকার প্রদান করবে। আল্লাহ্ অবশ্যই তাদেরকে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন।’
নবী করীম (সা) ইসলামী সরকারের রূপরেখা প্রদান করেন, এর নিয়মকানুন বাতলে দেন এবং বিস্তারিত ব্যাখা দেন। তিনি যখন মদীনাতে সপ্তম শতাব্দীতে খিলাফত রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন তখন সেটা ছিল বিবাদমান বিভিন্ন গোত্র অধ্যুষিত একটি শহরকেন্দ্রিক রাষ্ট্র। কুরাইশরা নতুন গড়া সমাজকে সমূলে উৎপাটন করার অপচেষ্টা চালায়। রাসূল (সা) অতিদ্রুত এমন এক রাষ্ট্র কায়েম করেন যা ছিল প্রতিরক্ষায় সক্ষম এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তিনি কুরাইশদের ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চলে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন এবং ব্যবসায়িক পথকে সুগম রাখবার জন্য বাণিজ্য চুক্তি ও বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপন করেন।
মদীনায় পা ফেলার মুহূর্ত থেকেই মুসলিম ও অমুসলিমদের সমস্যাসমূহ বিবেচনায় নিয়ে তিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন শাসক হয়ে উঠেছিলেন। ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মুহাম্মদ (সা) একটি কল্যাণমূলক ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। একজন যোগ্য রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি ইহুদী, বানু দামরাহ ও বানু মাদলাজের সাথে চুক্তি করেন। তিনি তারপর চুক্তি স্বাক্ষর করেন কুরাইশ, আয়লাহ, আল জারবাহ এবং উজরাহের সাথে। সেনাপ্রধান হিসেবে তিনি অনেক যুদ্ধের পরিকল্পনা ও পরিচালনা করেন। তিনি প্রত্যেক প্রদেশে একজন করে ওয়ালী (গভর্ণর) এবং প্রত্যেক অঞ্চলে একজন করে আমীল (মেয়র) নিযুক্ত করেন। যেমন: তিনি উতায়েব ইবনে উসাইদকে মক্কা বিজয়ের পর ওয়ালী এবং বাধান ইবনে সাসানকে ইয়েমেনের ইসলাম গ্রহণের পর ইয়ামেনের ওয়ালী নিযুক্ত করেন। মুয়াজ ইবনে জাবাল আল খাজরাজীকে তিনি আল জানাদের ওয়ালী এবং খালিদ ইবনে সাইদ ইবনে আল আসকে সানার আমীল নিযুক্ত করেন।
রাসুলুল্লাহ (সা) লোকদের বিবাদ নিরসনের জন্য বিচারক নিয়োগ করেন। তিনি (সা) আলী (রা) কে ইয়েমেনে কাজী নিয়োগ করেন এবং আবদুল্লাহ ইবনে নওফেলকে মদীনার বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন। রাসুল (সা) তাদের জিজ্ঞেস করতেন, “তোমরা কি দিয়ে শাসন করবে?” তখন তারা প্রত্যুত্তরে বলতেন, “কোন রায়ের জন্য সমাধান যদি আমরা কুর’আনে না পাই, তাহলে তা সুন্নাহ্’র মধ্যে খুঁজব। যদি সেখানেও না পাই তাহলে আমরা কিয়াসের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেব।” তিনি (সা) এ প্রক্রিয়াকে সমর্থন করেন। রাসুল (সা) কখনও কখনও বিচারকদের এবং উলাহ্’দের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালও গঠন করেছেন। তিনি ট্রাইব্যুনাল আসার পূর্বে বিবাদমান বিষয়সমুহ তদন্ত ও পর্যবেক্ষণ করা ও বিচারব্যবস্থার ব্যাপারে রশীদ ইবনে আবদুল্লাহকে আমীর নিযুক্ত করেন।
মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা) রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগের প্রধান হিসেবে কয়েকজন রেজিস্ট্রার নিয়োগ করেন।
– আলী ইবনে আবু তালিবকে চুক্তিপত্রের লেখক হিসেবে
– মুয়াকেব ইবনে আবু ফাতিমাকে রাজস্ব বিভাগের সচিব হিসেবে
– হুজায়ফা ইবনে আল ইয়ামানকে হিজাজ অঞ্চলের ফসল ও ফলমুলের হিসেবের দায়িত্ব
– জুবায়ের ইবনে আল আওয়ামকে সাদকার সচিব
– আল মুগীরাহ ইবনে শু’বাহকে সকল ঋণ ও চুক্তিনামা লিপিবদ্ধের দায়িত্ব
– শারহাবিল ইবনে হাসানাকে বিভিন্ন বাদশাহের কাছে প্রেরিত চিঠি লিখবার দায়িত্বএভাবে মুহম্মদ (সা) বিভিন্ন বিভাগে সচিব অথবা পরিচালকের পদে বিভিন্ন সাহাবীদের নিয়োগ দেন। এ ব্যাপারে তিনি (সা) সাহাবীদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতেন-যারা এসব বিষয়ে গভীর জ্ঞান ও চিন্তার অধিকারী ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) মুসলিম- অমুসলিমদের সম্পদ বিশেষত ভূমি, ফসল ও ফলমুলের উপর কর ধার্য করেন। এগুলোর মধ্যে ছিল যাকাত, ওশর, গণীমতের মাল, খারাজ বা ভূমিকর এবং অমুসলিমদের কাছে প্রাপ্ত জিজিয়া। আনফাল এবং গণীমতের মাল রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা থাকত। কুর’আনে বর্ণিত আটটি খাতেই জাকাতের অর্থ বন্টন করা হত।
মহানবী (সা) তাঁর জীবদ্দশাতেই এসব ব্যবস্থাদি বাস্তবায়ন করেন। তিনি (সা) রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী ছিলেন আর তাঁকে সহায়তা করবার জন্য ছিল বিভিন্ন সহযোগী, গভর্ণর, বিচারক, সেনাবাহিনী, সচিবগণ এবং পরামর্শ সভা। এ ধরণের কাঠামোকে বলা হয় খিলাফত এবং এটাই ইসলামের শাসনব্যবস্থা। ইসলামী রাষ্ট্রের এসব কাঠামো বিস্তারিতভাবে তাওয়াতুর বর্ণনার মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনাতে পৌঁছবার দিন থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। আবু বকর ও ওমর (রা) তাঁর দু’জন সহযোগী ছিলেন। সাহাবীগণ রাসূল (সা) এর মৃত্যুর পর ঐক্যমত্যে (ইজমা) পৌঁছেছিলেন যে, ইসলামী খিলাফতের প্রধান নির্বাহী হিসেবে একজন শাসক অর্থাৎ খলীফা নিয়োগ করা প্রয়োজন। অবশ্যই এই ব্যক্তি কোন নবী বা বার্তাবহনকারী হবেন না, কারণ মুহম্মদ (সা) ছিলেন শেষ নবী। একটি শাসনব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা মহানবী (সা.) তার জীবনকালেই প্রদর্শন করে গেছেন। সেকারণে তাঁর প্রদর্শিত শাসনব্যবস্থা আমাদের জন্য এখনও অণুকরণীয়।
সাহাবীগণ এ মর্মে ঐক্যমত্যে পৌঁছেছিলেন যে, রাসুলূল্লাহ (সা) এর মৃত্যুর পর একজন উত্তরসুরী নিয়োগ করা প্রয়োজন। তারা সেকারণে আবু বকর (রা) এর মৃত্যুর পর একই ধারাবাহিকতায় উত্তরসুরী হিসেবে ওমর (রা) কে খলীফা নিযুক্ত করেছিলেন। এভাবে উসমান ও আলী (রা) খলিফা নিযুক্ত হয়েছিলেন। একজন খলিফা নিযুক্ত করবার আবশ্যকতা আমরা সাহাবী (রা) ঐক্যমত্য থেকে পাই যে, রাসুলুল্লাহ (সা) এর ওফাতের পর শীঘ্রই মৃতদেহ সৎকারের বাধ্যবাধকতার চেয়ে তাঁরা খলীফা নিয়োগ করার বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। মৃতের দাফন কাফনে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য দাফন কাফন শেষ করবার আগে অন্য কোন কাজে নিজেদের নিয়োজিত করা এক অর্থে হারাম। এরপরও কিছু সংখ্যক সাহাবী রাসুলুল্লাহ (সা) এর দাফনের চেয়ে খলীফা নিয়োগ করা নিয়ে তখন ব্যস্ত ছিলেন। অন্য সাহাবীরা এই ব্যাপারে নীরব ছিলেন যদিও তাঁরা রাসূল (সা) এর দাফন সম্পূর্ণ করতে দুই রাত অপেক্ষা নাও করতে পারতেন।
অর্থাৎ তাঁর (সা) মৃত্যুর পর উম্মাহর ঐকমত্য নিয়ে সাহাবীগনের মধ্য হতে একজন খলীফা নিয়োগ করা হয়েছিল। যখন ইসলাম বিস্তার লাভ করছিল তখন বিভিন্ন জায়গায় ওয়ালী নিয়োগ করা হয়েছিল এবং এভাবে ইসলাম সুসংহত হয়েছিল। প্রত্যেক সাহাবীই পুরো জীবনভর একজন খলীফা নিয়োগ করবার ব্যাপারে একমত ছিলেন। কে খলীফা হবেন- এ ব্যাপারে মত পার্থক্য থাকলেও খলীফা নিযুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কারও ভেতর কোনরূপ দ্বিধা ছিল না। এটা রাসূল (সা) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের মৃত্যুর পর উত্তরসুরী খলীফা নিয়োগের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়েছে। একইভাবে সাহাবীদের ঐকমত্য (ইজমায়ে সাহাবা) এই যে, মুসলমানদের একজন খলীফা থাকতেই হবে।
কখনও কখনও অপপ্রয়োগ ঘটলেও রাসূলের সময় থেকে ইস্তাম্বুলে ১৯২৪ সালে ধ্বংস হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত খিলাফত ব্যবস্থা পৃথিবীতে বিদ্যমান ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা) খিলাফতের যে বিস্তারিত ও বাস্তবসম্মত রূপরেখা প্রদর্শন করে গেছেন তাতে এ কথা বলার কোন সুযোগ নেই যে, এটা কেবলমাত্র একটি ঐতিহ্যগত বিষয় ছিল। আর এটা সর্বকালের জন্য সত্য কথা যে, অবশ্যই রাজতান্ত্রিক কিংবা স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা থেকে এ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ পৃথক ছিল। সুতরাং খিলাফত ইসলাম দ্বারা পরিচালিত একটি অনন্য শাসন ব্যবস্থা। খিলাফত ইসলামকে বাস্তবায়ন করে এবং সব অঞ্চলে ইসলামকে ছড়িয়ে দেয়।
ইতিহাসে খিলাফতের শাসনব্যবস্থা ছিল সর্বজনগ্রাহ্য ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
ওরিয়েন্টালিস্ট বার্ণার্ড লুইস তার বই ‘What went wrong?’ এ বলেন:
‘পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বাধিক শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করেছিল ইসলাম..এটা ছিল অর্থনৈতিক সুপারপাওয়ার..অর্জন করেছিল মানব ইতিহাসে বিজ্ঞান ও কলায় সর্বোচ্চ উৎকর্ষমন্ডিত সভ্যতা-যা ছিল বহুজাতিক, আন্তর্জাতিক -অন্যকথায় আন্তমহাদেশীয়।’
পশ্চিমাদের কাছে জীবিত কিংবদন্তীতুল্য বুদ্ধিজীবি ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা-যিনি বিশ্বাস করেন বর্তমান পৃথিবীতে পুঁজিবাদের বিপরীতে ইসলামই একমাত্র চ্যালেঞ্জ-তাঁর মতে, ‘আদর্শের জগতে বর্তমানে গণতন্ত্রের একমাত্র যোগ্যতর প্রতিদ্বন্দ্বী হল রাজনৈতিক ইসলাম। পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়াবহ রাষ্ট্র হল ইরান-যা কট্টরপন্থী শিয়া মোল্লাদের দ্বারা পরিচালিত। সুন্নী কট্টরপন্থীরা তার সমর্থকদের কাছে সঠিকভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করতে না পারায় এখনও একটি জাতি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রনে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারছে না।’
বিভিন্ন উপদল ও দেশে বিভক্ত হওয়ার কারণে মুসলিম বিশ্বের ঐক্য কি নিতান্তই অসম্ভব?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)
অনেকে শিয়া সুন্নীর বিভক্তিকে সামনে এনে এটা প্রতিষ্ঠিত করতে চান যে আধুনিক বিশ্বে এক মুসলিম উম্মাহ্’র ধারণা আর বাস্তবসম্মত নয়। যদিও মুসলিমদের ইতিহাস ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিভক্তির পরও ঐক্যের ইতিহাস। আজকাল নতুন নতুন সীমানার মধ্যেই মুসলিমদের ঐক্য গড়ে উঠেছে। মুসলিম উম্মাহর ইসলামী ধারনাটি বহু শতাব্দির পুরোনো একটি ধারনা হিসেবে বিবেচিত হয়। শতাব্দীকাল আগে ইসলামী ধারণার মত মুসলিম বিশ্বে ঐক্য ছিল। বর্তমান বিভক্তির কারণে অনেকেই ধর্মনিরপেক্ষতাকে বিভেদ নিরসনের একমাত্র উপায় বলে মনে করছেন এবং খিলাফতের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ্’র ঐক্যের ধারণাকে তাত্ত্বিক একটি বিষয় বলে জ্ঞান করছেন।
এখন আলোচনার বিষয় হচ্ছে ইসলাম কিভাবে বিভক্তিকে দেখে? কিভাবে এত দল, উপদল, জাতিতে বিভক্ত পৃথিবীতে একটি বৈশ্বিক ইসলামী রাষ্ট্রের ধারণা সম্ভব হতে পারে?
এটি বুঝতে হলে আমাদেরকে প্রথমেই জানতে হবে যে, মুসলিম জাতিই একমাত্র জাতি নয় যাদের মধ্যে এমন ভিন্নতা রয়েছে। ১৮৬১ সালে আমেরিকার United States of America এবং Confederate States of America মধ্যে জাতিগত বিভক্তির কারণে এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ হয়। ১৮৬০ সালে আব্রাহাম লিংকন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার পর এগারটি দক্ষিণাঞ্চলীয় রাষ্ট্র ইউনিয়ন থেকে আলাদা হয়ে যেতে চায়। ২০১৩ সালের মধ্যে ব্রিটেন থেকে স্কটল্যান্ড এর পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হবার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আলোচিত দু’টি সংকটের সময়ই কেউ ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। গৃহযুদ্ধকে মার্কিন স্কুল সমূহের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পড়ানো হয়।
বিভিন্ন মানুষ, রীতিনীতি, সংস্কৃতি, ভাষা, চিন্তার কাছে ইসলাম অপরিচিত কিছু নয়। যখন ইসলামিক শাসন বিস্তৃতি লাভ করছিল তখন বিভিন্ন চিন্তা ও মূল্যবোধের লোকেরা ইসলামিক রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবেই পরিগণিত হচ্ছিল। আব্বাসীয় খিলাফতের শাসনামলে ইসলাম এমন সব ভূমিতে পৌঁছে যায় যেখানে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে ইসলামী চিন্তাবিদ ও পন্ডিত ব্যক্তিদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। আর এই দ্বন্দ্বের কারণেই ইসলামিক আক্বীদার উপর পড়াশোনা করতে গিয়ে যৌক্তিক বিজ্ঞানের উদ্ভব ঘটে। ইসলামী বিশ্বাসসমূহকে সাধারণ চিন্তা ও প্রমাণের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য এ শাখার গোড়াপত্তন হয়। এ বিষয়টি পড়ে আরও অনেক উপশাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। নতুন নতুন ভূমি জয় করবার পর এ বিষয়টি আরও সমৃদ্ধ হতে থাকে। সেকারণে অনেক মুসলমান এ বিষয়ে গবেষণা, শিক্ষালাভ, বিজ্ঞানচর্চায় নিজেদেরকে উজাড় করে দিতে থাকে। রাষ্ট্রের ভেতর একটি বহুমুখী ইসলামিক সংস্কৃতির উদ্ভদ ঘটে। বিধায় মুসলিমরা খিলাফতকে শক্তিশালী করবার জন্য এ ব্যাপারে জ্ঞানলাভে আগ্রহী হয়ে উঠে। প্রত্যেক বুদ্ধিজীবী – তিনি যে সংস্কৃতির উপরই পারদর্শীতা লাভ করুক না কেন; প্রত্যেক লেখক – যে সাহিত্য ধারায় তিনি উদ্বুদ্ধ হন না কেন; প্রত্যেক গণিতবিদ, বিজ্ঞানী, শিল্পী এ সংঘাতের কারণেই সব সময় ইসলামী বিষয় নিয়ে বিতর্ক করেছেন ও যুক্তি উপস্থাপন করেছেন।
এ কারণে মতামতের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরণের দল, উপদল ও ভিন্নতা দেখা দেয়-যাদের মধ্যে হাতেগোনা সামান্য কয়েকটি ইসলামিক পরিসরের বাইরে চলে যায়। যদিও চিন্তার এ ভিন্নতার কারণে মুসলিম উম্মাহ্ কখনওই বিভক্ত ছিল না। বরং আব্বাসীয় খিলাফতকালে বাগদাদ ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক ও বৈপ্লবিক চিন্তার পীঠস্থান। বিভিন্ন চিন্তা ও দর্শনের ব্যক্তিদের বিতর্ককে স্বাগত জানানো হত। এভাবে ইসলাম সম্পর্কে একটি স্ফটিকস্বচ্ছ ধারণা গড়ে উঠে। কেননা ইসলাম বিভিন্ন চিন্তার বিপরীতে নিজের অবস্থানে দাঁড়িয়ে শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারে। সেকারণে চিন্তার ভিত্তিতে বিভিন্ন দল, উপদলের উপস্থিতি সমস্যা সৃষ্টির বদলে ইসলামকে আরও ভালভাবে বুঝার পথকে সুগম করেছে।
মুসলিম বিশ্বে বর্তমান বিভক্তি দুটি ইস্যুর কারণে জন্ম নিয়েছে। প্রথমটি হল ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞানতা এবং দ্বিতীয়টি ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ডেভিড ফ্রমকিন তুলে ধরেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন অধিকাংশক্ষেত্রেই মুসলিমরা ঔপনিবেশিক শোষণ থেকে বেরিয়ে এসেছে। তার মতে, ‘সাবেক ওসমানিয়া খিলাফতের অধিকাংশ সম্পদই এখন বিজয়ীদের দখলে। কিন্তু এটা সবার মনে রাখা উচিত মুসলিমরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে খ্রীস্টান অধ্যুষিত ইউরোপকে পদানত করতে চেয়েছে। আর বর্তমানে বিজয়ী পশ্চিমা শক্তি সবসময় চেয়েছে তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মুসলিম উম্মাহ যাতে আর কখনওই ঐক্যবদ্ধ না হতে পারে। শতকের পর শতকের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার আলোকে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স ক্ষুদ্র, অস্থিতিশীল রাষ্ট্র জন্ম দিয়েছে যাদের শাসকেরা ক্ষমতায় থাকবার জন্য পশ্চিমাদের উপর নির্ভরশীল। ঐসব দেশের উন্নয়ন এবং বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রন করা হয়েছে এবং তারা কখনওই পশ্চিমাদের জন্য হুমকি হতে পারবে না। এই বহিঃশক্তিসমূহ পুতুল শাসকগুলোর সাথে আরবের সম্পদসমূহ সস্তায় ক্রয় করবার জন্য চুক্তি করেছে। অধিকাংশ জনগণ কে দরিদ্রতার অতল গহবরে নিক্ষেপ করে শাসকগোষ্ঠীকে ব্যাপক সম্পদশালী করা হয়েছে।’
ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীরা ক্ষুদ্র, অস্থিতিশীল রাষ্ট্র তৈরির মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বকে বিভক্ত করার পরিকল্পনা সচেতনভাবেই করেছে-যাতে করে তারা পুনরায় একত্রিত হতে না পারে। প্রথম মহাযুদ্ধের আগে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স মধ্যপ্রাচ্যকে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছে। কাগজের মানচিত্রের উপরে তারা পেন্সিল দিয়ে সীমানা এঁকে জর্ডান, সিরিয়া, সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক এবং ইরানকে তৈরি করেছে। শত শত বছর ধরে একত্রে বসবাস করে আসা জনগণকে বিভক্ত করে পাকিস্তান, ভারত ও আফগানিস্তান সৃষ্টি করা হয়েছে। এই ঊপনিবেশিক নীতি বর্তমানে অসংখ্য সমস্যার জন্ম দিয়েছে। প্রত্যেক জাতির জন্য বৃটেন ও ফ্রান্সের প্রতি অনুগত শাসক নিযুক্ত করা হয়। হিজাজ অঞ্চলের নেতৃত্ব পাবার তাগিদে সৌদ পরিবার ওসমানিয়া খিলাফতকে ধ্বংসের জন্য বৃটিশদের সাথে একত্রে কাজ করে। মুসলমানেরা বর্তমানে পৃথিবীকে এইসব কৃত্রিম সীমারেখাগুলোকে দিয়ে দেখে। ঊপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী মুসলমানদেরকে বিভিন্ন রাষ্ট্র গঠন করে দিয়ে বাহ্যিকভাবে বিভক্ত করে ফেলে। তারপর জাতীয় পতাকা, জাতীয় স্বাধীনতা দিবস এবং জাতীয় পতাকার ভিত্তিতে মুসলিমরা যাতে আর কখনওই একত্রিত হওয়ার ব্যাপারে চিন্তা করতে না পারে সে ব্যবস্থা করে।
পূর্বে উম্মাহ্ একত্রিত হয়েছিল ইসলামের ভিত্তিতেই-যা মুসলিম ভূমিসমূহে সমৃদ্ধ সমাজ বিনির্মান করেছিল। সেকারণে ইসলামের অনুপস্থিতি ও ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকদের ষড়যন্ত্রের কারণেই একসময়কার ঐক্যবদ্ধ মুসলিম উম্মাহ্ আজ ৫০ টি ক্ষুদ্র অকার্যকর রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
ইসলামের কারণে এ বিভক্তি তৈরি হয়নি বরং ইসলাম না থাকার কারণেই আজকের অনৈক্যের সৃষ্টি। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল পশ্চিমা বিশ্ব সুন্নী এবং শিয়া সমস্যা নিরসনের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতাকে সমাধান হিসেবে নিয়ে এসেছে। বিরোধপূর্ণ দুটি দলের মধ্যে এ ধরণের সমাধানের প্রস্তাব নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক। কেননা ধর্মনিরপেক্ষতার সমাধান সমস্যাটিকে সামষ্টিকভাবে সমাধানের বদলে ব্যক্তিপর্যায়ে নিয়ে এসেছে। মহানবী মুহম্মদ (সা) এর উম্মতের যে কোন সমস্যা সমাধানের জন্য ইসলামের প্রামাণ্য দলিলের কাছে আমাদেরকে আসতে হবে। মুহম্মদ (সা) এর পরিবারে বিপক্ষে কিছু মুসলমানের অবস্থান কিংবা মুয়াবিয়া (রা) কিছু কর্মকান্ড কখনই ইসলামিক সমাধান কিংবা বিচারব্যবস্থার প্রামান্য দলিল হতে পারে না। এখানে সূত্র হচ্ছে কোরআন এবং হাদীস। আর এর ব্যাখ্যায় মতানৈক্য থাকতে পারে-যা যে কোন রায়ের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। যদিও ব্যাখ্যা দেবার কিছু সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে।
বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে আসা সমাধানের ক্ষেত্রে যে কোন আদর্শের মধ্যেই মতানৈক্য দেখা দিতে পারে। গণতান্ত্রিক দেশসমূহে ব্যাখ্যার ভিন্নতার দরূন চিন্তার অনেক শাখা-প্রশাখা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এখন ডেমোক্রেট এবং রিপাবলিকানরা রয়েছে। যুক্তরাজ্যে রয়েছে লেবার, লিবারেল ডেমোক্রেট এবং কনজারভেটিভরা। পশ্চিমা বিশ্বে আরও রয়েছে নিউকনজারভেটিভ, লির্বাটেরিয়ানস, ফেবিয়ানস, ইনভারোমেন্টালিস্ট এবং খ্রীস্টান ডেমোক্রেটস। তারা সকলেই পুঁজিবাদের আক্বীদা ধর্মনিরপেক্ষতাকে ভিত্তি হিসেবে নিয়ে কতটুকু উদার হবে এই বিতর্কে মতানৈক্য পোষণ করে। মনেটারিস্টদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ক্যানসিয়ান স্কুল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের হস্তক্ষেপের স্বপক্ষে অবস্থান নেয়। যারা সমাজতান্ত্রিক বিশ্বাসের উপর অটুট রয়েছে তাদেরও অনেকগুলো শাখা রয়েছে। সমাজতন্ত্রের পক্ষ শক্তি পুঁজিবাদের ‘মালিকানার স্বাধীনতা’ ধারণার ফলে সৃষ্ট সম্পদের ব্যাপক বৈষম্যকে সকল সমস্যার মূল বলে চিহ্নিত করে এর সমাধান করতে হবে বলে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। একটি চিন্তার অনুসারীদের (কমিউনিস্ট চিন্তাধারার) মতে, ব্যক্তিপর্যায়ের মালিকানা সম্পূর্ণরূপে পরিহার করে সবক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত সাম্যতা নিশ্চিতই সবচেয়ে যুগপত সমাধান। অন্য চিন্তার অনুসারীদের (এগ্রেরিয়ান স্যোসালিস্টদের) মতে, কেবলমাত্র কৃষিজমির জন্য ব্যক্তিপর্যায়ের মালিকানা নিষিদ্ধ করতে হবে। তখন তৃতীয় একটি চিন্তার উন্মেষ ঘটে যাকে বলা হয় স্টেট্ স্যোসালিজম-যার মূল কথা হল ব্যক্তিমালিকানা থেকে জনস্বার্থে গণমালিকানা সর্বক্ষেত্রে সুনিশ্চিত করতে হবে।
পশ্চিমে অনেক পন্ডিত ও গবেষকগণ শিয়া সুন্নী বিভক্তির বিষয়ে গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, এক উম্মাহ্’র ধারণাকে হেয় করবার জন্য এ সমস্যার উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তবে এ ধরণের কর্মকান্ড মুসলিম উম্মাহ্’র ভেতরে এক ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করেছে -যা মুসলিম বিশ্বে একটি শক্তিশালী দাবী হিসেবে ত্বরান্বিত হচ্ছে।
আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি পুরো বিশ্বে মুসলিম উম্মাহ একত্রে পুঁজিবাদ ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকে প্রত্যাখ্যান করছে। এমনকি প্যালেস্টাইনের মুসলিমরা দীর্ঘদিন অবৈধ দখলদারিত্বের অধীনের থাকবার পরও ইরাক, আফগানিস্তানের মুসলমানদের প্রতি একাত্মতা ও সংহতি প্রকাশের জন্য রাস্তায় নেমে এসেছে। উম্মাহ একটি দেহের মত বিক্ষোভে ফেটে পড়ে যখন ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে মহানবী (সা) এর ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন (নায়ুজুবিল্লাহ্) ইউরোপে প্রকাশ করা হয়।
উম্মাহ পরিষ্কার বুঝতে পারছে যে, দালাল শাসকগুলো কোনভাবেই তাদের প্রতিনিধিত্ব করছে না। প্রসারিত পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল এখন উম্মাহ এবং শাসকদের মাঝামাঝি রয়েছে। দীর্ঘদিন অধঃপতিত থাকায় এখন উম্মাহ্ একসময়কার ঐক্যের কথা ভাবতে পারছে না।
আদর্শের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা একটি সরকারের অন্তর্গত সমাজ সবসময় ঐক্য সৃষ্টি করে এবং নিশ্চিত করে। সাহাবীরা খারিজিদের সাথে খুব কঠোর আচরণ করেছিলেন যখন তারা ইসলামের মধ্যে নতুন কিছু আমদানি করবার মাধ্যমে অনৈক্য সৃষ্টির পাঁয়তারা করে। খিলাফতের প্রত্যাবর্তন এখন অতি নিকটে এবং এ ব্যাপারে অনেক বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ ও সি.আই. এ’র মত জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে। একটি রাষ্ট্র ছাড়া ঐক্য নিতান্তই অসম্ভব। কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা ছাড়া উত্তর আমেরিকায় আমরা দু’টি রাষ্ট্র দেখতে পেতাম। সরকারী কাঠামো না থাকলে ইংল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডের মধ্যে ঐক্য থাকত না। রাষ্ট্র জনগনের মাঝে ঐক্য সৃষ্টি করে। এটা ছাড়া ঐক্য একেবারেই অসম্ভব। ইসলামী ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি যে, এ ব্যবস্থায় ঐক্য সৃষ্টির জন্য বিশদ প্রক্রিয়া রয়েছে এবং বিভিন্ন পরিচয় থেকে আসা লোকদের মাঝে সফলভাবে ঐক্য সৃষ্টি করা হয়েছিল। বর্তমানে যে অনৈক্য দেখি তা পশ্চিমাদের সৃষ্টি এবং ক্রমাগতভাবে এ প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।
ইসলাম কি সেঁকেলে ?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)
বিগত দুই শতক ধরে পুরো বিশ্ব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অচিন্ত্যনীয় সাফল্য অর্জন করেছে- রেলপথের উন্নয়ন, উড়োজাহাজ, পারমাণবিক প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, আই ভি এফ, জেনেটিক উপায়ে রূপান্তরিত খাদ্যদ্রব্য ইত্যাদি। এসব উন্নয়নের সাথে সাথে যুগপৎভাবে পশ্চিমারাও এগিয়েছে এবং ইতিহাসে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের একপেশে উন্নয়ন আমাদের এ ধরণের ধারণাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে যে, উন্নয়নের পূর্বশর্ত হল উদার মূল্যবোধ।
অনেক চিন্তাবিদ, বিজ্ঞানী এবং দার্শনিকের মতে বর্তমান বিশ্বে ইসলামের কোন অবস্থান নেই। মুসলিম দেশ সমূহ বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষতায় কোন ভূমিকা না রাখায় এ ধরণের ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে। পশ্চিমারা দাবী করে জ্ঞান বিজ্ঞানে তখনই তারা অগ্রগতি অর্জন করেছিল যখন তারা গীর্জা নিয়ন্ত্রিত শাসনব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধকে ধারণ করেছে। গীর্জা বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য অন্তরায়, কেননা ধর্ম কিছু অলীক বিশ্বাস ও কুসংস্কারের উপর নির্ভরশীল। ধর্ম থেকে শাসনব্যবস্থার পৃথকীকরণের কারণেই শিল্প বিপ্লব সম্ভবপর হয়েছিল এবং তারা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। উদারপন্থীদের কারণেই আজকের জ্ঞান এবং বিজ্ঞান। তাদের দাবী, জ্ঞানের ভিত্তিমূল তারাই রচনা করেছিল এবং এর বিভিন্ন শাখা প্রশাখাও তাদেরই সৃষ্টি।
পশ্চিমারা তাদের ইতিহাসকে পৃথিবীর ইতিহাস বলে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। পশ্চিমাদের ইতিহাস বর্ণনায় কখনওই মুসলিম সভ্যতার কাছ থেকে গৃহীত জ্ঞানকে কৃতজ্ঞতার সাথে স্বীকার করা হয় না। ঐতিহাসিকভাবে সকল সভ্যতারই কিছু না কিছু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ইতিহাস রয়েছে। পশ্চিমারা গ্রীক সভ্যতা থেকে গৃহীত জ্ঞানকে লিপিবদ্ধ করেছে এবং ইসলামী সভ্যতাও ৮ম-১০ম শতাব্দী পর্যন্ত গ্রীক কাজসমূহকে আরবীতে অনুবাদ করেছিল।
বিজ্ঞান হল বিশ্বব্রক্ষান্ড সম্পর্কে গবেষণা, নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত বিশেষ জ্ঞান।
প্রাথমিকভাবে দহন ইজ্ঞিনের উন্নতরূপই হল আজকের অটোমোবাইল। যেখানে দাহ্য জ্বালানী ইজ্ঞিনের পিস্টনের উপর চাপ প্রয়োগ করে এবং অটোমোবাইলকে চালনা করে। বৃটিশ সাম্রাজ্যে তৎকালীন সময়ে পিস্টন চালনা এবং যন্ত্রের মধ্যে ঘূর্ণন গতি সৃষ্টির জন্য প্রথমে বাষ্প এবং পরবর্তীতে কয়লাকে ব্যবহার করা হত। এ ধরণের উন্নয়ন সম্ভবপর ছিল ১২ শতকে আল জাজারির ক্রাঙ্কশ্যাফট আবিষ্কারের মাধ্যমে যেখানে তিনি রড এবং সিলিন্ডারের মাধ্যমে ঘূর্ণন গতি তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম যন্ত্রে এটি ব্যবহার করেন।
ড্র্যাগ (Drag) ফোর্সকে ব্যবহার করে বাতাসের মধ্যে একটি বস্তুর গতিকে ধীর করবার প্রক্রিয়ায় প্যারাসুট কাজ করে। পূর্বের নিরীক্ষালদ্ধ ফলাফল থেকে বর্তমানে প্যারাসুট ডিজাইন করা হয়েছে। ৯ম শতাব্দীতে ইবনে ফিরনাস প্যারাসুটের প্রাথমিক নকশা করেন। তিনি কর্ডোভার ম্যাজকুইটা মসজিদ থেকে বিশাল ডানা সম্বলিত আলখেল্লা পরে লাফ দিয়েছিলেন এবং সামান্য আহত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন। কাঠের কাঠামোর উপর লিনেন কাপড় জুড়ে দিয়ে এর চেয়েও ভাল নকশা সম্বলিত প্যারাসুট নির্মিত হয়। পরবর্তীতে শক্তিমত্তা ও কম ওজনের কারণে মোড়ানো সিল্ক ব্যবহার করা হয়।
এসব উদাহরণ এটাই প্রমাণ করে যে, কোন সভ্যতা বিজ্ঞানে তাদের অবদানকে নিরঙ্কুশ বলতে পারে না। বরং সার্বজনীন এ বিশাল জ্ঞান সমুদ্রের অন্যতম অংশীদার হতে পারে। যেমন অণু পরমাণু সমূহ বিশ্বব্রক্ষ্ণাণ্ডের নিয়ম অনুসারে চলে। এই নিয়মকানুনসমূহ কোন মুসলিম, হিন্দু বা খ্রিস্টান যেই আবিষ্কার করুক না কেন তা ব্যক্তিনিরপেক্ষ। এটা সার্বজনীন এবং কারো বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত নয়। সত্যিকারের বিতর্কের বিষয় হল কোন সভ্যতা জ্ঞান বিজ্ঞানে কতটুকু অবদান রেখেছে এবং কেন তারা এক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জনে তৎপর ছিলো।
৮ম থেকে ১৩শ শতাব্দীকে ইসলামের স্বর্ণযুগ বলা হয়। এসময়ে ইসলামী বিশ্বের প্রকৌশলী, পন্ডিত এবং ব্যবসায়ীরা কলা, কৃষি, অর্থনীতি, শিল্পকারখানা, আইন, সাহিত্য, নৌবিদ্যা, দর্শন, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি প্রভৃতি ক্ষেত্রে পূর্বের জ্ঞান সংরক্ষণ ও নতুন জ্ঞান অন্বেষণে বড় ভূমিকা পালন করে। মধ্যযুগের ইতিহাসের উপর বিশেষজ্ঞ একজন ঐতিহাসিক হাওয়ার্ড টার্নার তার বই ‘সায়েন্স ইন ম্যাডিভেল ইসলাম’ এ উল্লেখ করেন, ‘মুসলিম শিল্পী এবং বিজ্ঞানী, রাজপুত্রগন এবং শ্রমিকরা একত্রে এমন এক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন যে, তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সকল মহাদেশের সমাজকে প্রভাবিত করেছিল।’ ইসলামের ভেতরেই এমন কিছু বিষয় আছে যেগুলো মুসলমানদের জ্ঞান বিজ্ঞানে অনন্য ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী হতে উদ্ধুদ্ধ করেছিল।
আল্লাহ্’কে উপাসনা করা এমন একটি ব্যাপার যে তা আবিষ্কারে উদ্ধুদ্ধ করে। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, কিবলা ঠিক করা, রমযান শুরু এবং শেষ করা প্রভৃতি বিষয়ের জন্য চাঁদ এবং নক্ষত্রের সঠিক অবস্থান জানা অত্যাবশ্যকীয়। আর একারণেই মুসলমানরা দূরবীক্ষণ এবং নৌবিক্ষণ বিষয়ে গবেষণা শুরু করে। একারণে অধিকাংশ নৌবীক্ষণিক নক্ষত্রের নাম আরবীতে, যেমন: একামার, বাহাম, বাতেন কাইতোস, ক্যাফ, যাবিহ, ফুরুয, ইযার, লিসাস, মিরাক, নাশিরা, র্তাফ এবং ভেগা ইত্যাদি।
মুসলিমরা মহাকাশবিজ্ঞানে অনেক অবদান রেখেছে এবং পরবর্তীতে তারা অ্যাস্ট্রোনোমিক্যাল ঘড়ি উদ্ভাবন করেছে। ১০ম শতাব্দীতে আবু রায়হান আল বিরুণী গিয়ার হুইল সমৃদ্ধ যান্ত্রিক সৌর-চন্দ্র বর্ষপঞ্জিকা তৈরি করেন। ১৫শ শতাব্দীতে এই নকশার উপর ভিত্তি করে তাকী আল দীন যান্ত্রিক ঘড়ি আবিষ্কার করেন। কিবলা নির্ণয়ের প্রয়োজনীয়তা থেকেই কম্পাস আবিষ্কৃত হয় যা মুসলিম জ্যোতির্বিদ্যার আবিষ্কারলব্ধ জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে তৈরী হয়েছিল। মুসলিমরা কমপাস রোজ আবিষ্কার করে- যার মাধ্যমে মানচিত্রে এবং নটিক্যাল ম্যাপে পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিন প্রদর্শন করা হয়।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন:
‘তিনিই তোমাদের জন্য তারকারাজি সৃষ্টি করেছেন যেন জল-স্থলের অন্ধকারে পথের দিশা পাও‘ (সূরা আন’আম: ৯৭)
এ আয়াত মুসলমানদেরকে ভাল দূরবীক্ষণ ও নৌবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারের ব্যাপারে উদ্ধুদ্ধ করে। এ যন্ত্রপাতি পৃথিবী অভিযানে ব্যবহৃত হয়। অনেক মুসলিম ভূ-বিজ্ঞানী এগুলোকে ম্যানুয়াল হিসেবে সংগ্রহ করেন। কুরআনের আয়াত তাদের এ ব্যাপারে উৎসাহী করেছে যেখানে আল্লাহ বলেন,
‘আর আমি যমিনে পর্বত সৃষ্টি করলাম, যেন জমিন টলতে না পারে, এবং আমি তথায় তাদের চলবার জন্য প্রশস্ত পথ নির্মান করে রেখেছি।‘ (সূরা আম্বিয়া:৩১)
আগের মুসলিমরা বুঝতে সমর্থ হয়েছিল যে, ইসলাম সকল বস্তগত উন্নয়ন- যেমন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন প্রভূতিকে গ্রহণ ও উদ্বুদ্ধ করে। কেননা এতে মানুষের অবস্থা ও জীবনমানকে উন্নত করবার জন্য বস্তুর রূপান্তর ও উন্নয়ন করার জ্ঞান শেখানো হয়। যেহেতু অনেক অঞ্চল ধীরে ধীরে মুসলিম সভ্যতার আওতায় আসে সেহেতু এসব অঞ্চলে নগরায়নের মাধ্যমে উন্নয়ন শুরু হয়। আরবের অনেক মরু অঞ্চল পানির মাধ্যমে বসবাসের উপযোগী করা হয়। মুসলিম প্রকৌশলীরা ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রীস নদী থেকে অসংখ্য খাল খনন করে পানির ব্যবস্থা করেন। বাগদাদের চারিদিকের নীচু জায়গায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে শহরকে ম্যালেরিয়ামুক্ত করা হয়। মুসলিম প্রকৌশলীরা পানির চাকাকে (ওয়াটার হুইল) অধিকতর উপযোগী করে গড়ে তুলেন এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির ধারাগুলোকে বিস্তৃত করেন যাকে কানাতস্ বলা হয়। একারণে উন্নত গার্হস্থ্য পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠে। যার মধ্যে ছিল নিষ্কাশন ব্যবস্থা, গণগোসলখানা, পান উপযোগী ঝর্ণা, পাইপের মাধ্যমে পানি সরবরাহ এবং বহুলব্যবহৃত ব্যক্তিমালিকানাধীন অথবা গণশৌচাগার ও গোসলখানা।
মুসলিম চিন্তাবিদ, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং বিশেষজ্ঞগণ বিজ্ঞানসহ অন্যান্য শাখায় ব্যাপক অবদান রাখেন। এসব অবদান আজকাল পশ্চিমারা ব্যবহার করছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারাও এগুলোর উন্নয়ন বিধান করেছে। কেননা একক কোন সভ্যতা বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার কৃতিত্ব নিতে পারে না। প্রত্যেক সভ্যতাই তার আবিষ্কারসমূহকে লিপিবদ্ধ করেছে যা পরবর্তীতে একই বিষয়ের উপর চালিত গবেষণার জন্য সহায়ক (রেফারেন্স) হিসেবে কাজ করে। ইসলামের উত্থানের আগে আরব বিশ্ব বিজ্ঞানে কোন অবদান রাখেনি। এই একই জনগণ যখন ইসলাম গ্রহণ করল তখন তারা আবিষ্কার করতে শুরু করল-যা পরবর্তী প্রজন্ম সদ্ব্যবহার করেছিল। এমনকি এসব আজও আমাদের কাজে আসে। ইসলাম বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ব্যাপারে প্রতিবন্ধকতা তো নয়ই বরং এক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে।











