Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • খলিফা ও রাজার মধ্যে পার্থক্য

    খলিফা ও রাজার মধ্যে পার্থক্য

    খলিফা ও রাজার মধ্যে পার্থক্য: যখন শাসক মানুষকে ভয় পাওয়ার আগে আল্লাহকে ভয় করেন

    ক্ষমতার মসনদে বসা শাসকের নাম কী, তা এখানে মূল বিষয় নয়, এমনকি তার নামের আগে যে উপাধি লেখা থাকে তা তার শাসনের ধরন নির্দেশ করলেও নয়; বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তিনি শাসনকাজে যে পদ্ধতি অবলম্বন করেন, যে উদ্দেশ্যে তিনি প্রতিষ্ঠিত এবং আল্লাহর আইন ও জনগণের অধিকারের সামনে তার ক্ষমতার সীমা কোথায় গিয়ে থামে।

    এখানে আমিরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর জীবনী থেকে একটি মহান ঘটনা আমাদের সামনে উঠে আসে। ইবনে সাদ (রহ.) যাদান থেকে এবং তিনি সালমান (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, উমর (রা.) সালমান (রা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন: “আমি কি রাজা, নাকি খলিফা?” উত্তরে সালমান (রা.) বলেছিলেন: “আপনি যদি মুসলমানদের ভূমি থেকে এক দিরহাম বা তার চেয়ে কম বা বেশি কর আদায় করেন, অতঃপর তা অনুচিত খাতে ব্যয় করেন, তবে আপনি রাজা, খলিফা নন।” এ কথা শুনে উমর (রা.) কেঁদে ফেললেন।

    একই অর্থে তার (রা.) থেকে আরেকটি উক্তি বর্ণিত হয়েছে, যা ইমাম ইবনে সাদ তার ‘আত-তাবাকাতুল কুবরা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: “আল্লাহর কসম! আমি জানি না, আমি কি খলিফা, নাকি রাজা।” তখন তাকে বলা হলো: “উভয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে; খলিফা শুধু ন্যায়সঙ্গত সম্পদই গ্রহণ করেন এবং তা সঠিক খাতেই ব্যয় করেন, আর আলহামদুলিল্লাহ, আপনি তেমনই। অন্যদিকে, রাজা মানুষের ওপর জুলুম করেন, এর কাছ থেকে কেড়ে নেন এবং ওকে দান করেন।”

    এই গভীর অনুধাবনের দিকে একবার লক্ষ্য করুন! উমর ইবনুল খাত্তাব, যার সামনে আরবরা বশ্যতা স্বীকার করেছিল, অনারবরা এবং পৃথিবীর এক বিশাল ভূখণ্ড যার অধীনস্ত হয়েছিল এবং যার রাষ্ট্র পারস্য থেকে শুরু করে সিরিয়া ও মিশর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল—তিনি ক্ষমতাকে কখনো ব্যক্তিগত বিশেষাধিকার মনে করতেন না, কিংবা এমন কোনো গনিমত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) মনে করতেন না যা তিনি নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারেন। বরং তিনি মুসলমানদের প্রতিটি দিরহাম, প্রতিটি প্রাণ এবং প্রতিটি অধিকারের ব্যাপারে নিজেকে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে বাধ্য মনে করতেন। আর এটাই হলো মূল বিষয়। সমস্যা মুকুট নিয়ে নয়… বরং ক্ষমতার উৎস এবং শাসন পদ্ধতির মধ্যে।

    ইসলাম কোনো শাসককে মানুষের ওপর ইলাহ বা খোদা বানিয়ে দেয় না, সত্য ও ন্যায়ের জবাবদিহিতা থেকে তাকে কোনো দায়মুক্তি দেয় না এবং উম্মাহ বা জাতিকে তার ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করে না। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে:

    নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারের কাছে পৌঁছে দিতে এবং তোমরা যখন মানুষের মাঝে বিচার করবে, তখন ন্যায়ভিত্তিক বিচার করবে [সূরা আন-নিসা: ৫৮]।

    সুতরাং, ইসলামে ক্ষমতা হলো একটি আমানত, শাসন হলো একটি দায়িত্ব, রাষ্ট্রীয় সম্পদ শাসকের নিজস্ব সম্পদ নয়, জাতি কোনো ব্যক্তিগত খামার নয় এবং প্রজারা কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা দলের সম্পত্তি নয়।

    এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা প্রয়োজন: কেবল রাজা হওয়ার কারণেই প্রতিটি রাজা নিন্দনীয় নন। যেমন আল্লাহ তায়ালা দাউদ (আ.) সম্পর্কে বলেছেন:

    আর আল্লাহ তাকে রাজত্ব ও প্রজ্ঞা দান করেছেন [সূরা আল-বাকারাহ: ২৫১]।

    এবং সুলাইমান (আ.) সম্পর্কে বলেছেন:

    আমাকে এমন রাজত্ব দান করুন, যা আমার পরে আর কারও জন্যই শোভনীয় হবে না [সূরা সোয়াদ: ৩৫]।

    বরং এখানে সেই রাজতন্ত্রের কথা বলা হচ্ছে, যেখানে শাসনব্যবস্থা রূপ নেয় স্বৈরতন্ত্র, জবরদস্তি, আধিপত্য এবং একচেটিয়া কর্তৃত্বে, যাকে হাদিসের ভাষায় ‘আঁকড়ে ধরা রাজতন্ত্র’ (মুলকান আদদ্বান) বলা হয়েছে।

    উমরের আদর্শ থেকে আজ আমরা কোথায়? উমর (রা.) মুসলমানদের সম্পদের একটি দিরহামের ব্যাপারেও আল্লাহর দরবারে হিসাব দেওয়ার ভয় করতেন। আর আমাদের যুগে, জাতির সম্পদ বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, প্রকল্প ও বিশেষ সুবিধার নামে বিশাল অঙ্কে পরিণত হয়, তারপর জনগণকে চুপ থাকতে বলা হয়। শাসকের কাছে জবাবদিহিতা চাওয়াকে রাষ্ট্রের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং ক্ষমতার সমালোচনা করাকে অপরাধে পরিণত করা হয়, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যেন তা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তির নিজস্ব সম্পত্তি।

    সেই খলিফা যিনি একটি দিরহাম অনুচিত খাতে ব্যয় করার ভয় করতেন, আর সেই শাসক যিনি রাষ্ট্র এবং এর অন্তর্ভুক্ত ভূমি, সম্পদ, প্রতিষ্ঠান ও সম্ভাবনাকে নিজের ও তার চারপাশের লোকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে মনে করেন—এই দুজনের মাঝে কতই না পার্থক্য! এটি কেবল স্লোগানের বিষয় নয়। এটি আমানত, ন্যায়বিচার এবং আল্লাহর আইনে শাসন পরিচালনার বিষয়।

    আর সেসব জাতির কী হবে, যারা এর জন্য চরম মূল্য চুকিয়েছে? বিগত দশকগুলোতে আমরা দেখেছি, বহু জাতি স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর বহু শাসনব্যবস্থার পতন ঘটেছে, শহরগুলো ধ্বংস হয়েছে, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং এর জন্য বিশাল মূল্য দিতে হয়েছে। জুলুম যখন পুঞ্জীভূত হয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ে এবং ন্যায়বিচার যখন হারিয়ে যায়, তখন স্বৈরতন্ত্র ও সশস্ত্র সংঘাত কী পরিণতি ডেকে আনতে পারে, সিরিয়া তার একটি বেদনাদায়ক উদাহরণ। তবে কেবল এক ব্যক্তির বদলে অন্য ব্যক্তিকে, এক স্লোগানের বদলে অন্য স্লোগানকে, অথবা এক অভিজাত শ্রেণির বদলে অন্য অভিজাত শ্রেণিকে বসানোই কোনো সমাধান নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো: জুলুমের পতনের পর জনগণকে কোন ব্যবস্থা শাসন করবে? যদি এক স্বৈরশাসক বিদায় নেয় এবং আরেকজন স্বৈরশাসক আসে, তবে পরিবর্তনটা কোথায় হলো? যদি কেবল মুখগুলোই বদলায় কিন্তু স্বৈরতন্ত্র উৎপাদনকারী নিয়মগুলো একই থাকে, তবে কি সমস্যার সমাধান হলো?

    মূলত চাওয়াটা কেবল ক্ষমতার চেয়ারে বসা ব্যক্তির পরিবর্তন নয়, বরং শাসনপদ্ধতির পরিবর্তন; যাতে ক্ষমতা শরিয়তের দ্বারা সীমাবদ্ধ থাকে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ সুরক্ষিত থাকে, অধিকার সংরক্ষিত থাকে এবং শাসক তার প্রজাদের জন্য আল্লাহ ও জাতির কাছে দায়বদ্ধ থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককে তার অধীনস্তদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।” সুতরাং শাসক একজন দায়িত্বশীল রক্ষক, তিনি জনগণের মালিক নন। আসুন, আমরা নিজেদেরকে মূল্যায়ন করি, আমাদের জন্য এখন এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ানোর সময় এসেছে, কেবল এই প্রশ্ন করার জন্য নয় যে: কে আমাদের শাসন করছে? বরং এই প্রশ্ন করার জন্য যে: সে কোন বিধান দিয়ে আমাদের শাসন করছে? কার স্বার্থে সে শাসন করছে? সে তার ক্ষমতার উৎস কোথা থেকে পাচ্ছে? তার কাছে কি জাতির সম্পদ আমানত, নাকি গনিমত? একজন মজলুম কি তার শাসনামলে নিজের অধিকার ফিরে পায়? শরিয়ত অনুমোদিত পন্থায় জনগণ কি তাদের ওপর জুলুমকারীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে? শাসক কি জাতির সেবক, নাকি তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তারকারী? বুদ্ধিমান ও দূরদর্শী মানুষদের এই প্রশ্নগুলো নিয়েই ভাবা উচিত।

    উম্মাহর আজ এক স্বৈরশাসকের বদলে আরেক স্বৈরশাসকের কোনো প্রয়োজন নেই, এবং নতুন নামে জুলুমের পুনরুৎপাদনেরও দরকার নেই। তাদের এমন একটি শাসনব্যবস্থা প্রয়োজন, যা ন্যায়বিচার, শরিয়ত, জবাবদিহিতা এবং মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান সুরক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর এ কারণেই মুসলমানদের কর্তব্য হলো, শরিয়তসম্মত পন্থায় ও বৈধ উপায়ে আল্লাহর আইনের শাসন দাবি করা, এবং এমন একটি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা, যা বিশৃঙ্খলা, প্রতিশোধস্পৃহা এবং রক্তপাত থেকে দূরে থেকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে, অধিকার রক্ষা করবে এবং ইসলামের বিধানসমূহ বাস্তবায়ন করবে। কেবল ‘খিলাফত’-এর স্লোগান তোলাই বড় কথা নয়, বরং বড় কথা হলো এর অর্থকে—দায়িত্ব, ন্যায়বিচার, আমানত এবং আল্লাহর আইনে শাসন হিসেবে অনুধাবন করা।

    আসুন, উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর কথা স্মরণ করি, যিনি নিজেকে প্রশ্ন করতেন: “আমি কি রাজা, নাকি খলিফা?” তিনি সবসময় এই ভয়ে থাকতেন যে, হয়তো তিনি মুসলমানদের সম্পদ থেকে এক দিরহাম নিয়ে ফেলেছেন এবং তা অন্যায়ভাবে ব্যয় করেছেন।

    হে ক্ষমতাপ্রত্যাশীরা এবং হে যারা মানুষের বিষয়াবলির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন: আপনারা কি উমরের (রা.) মতো করে নিজেদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারবেন?

    আর হে মুসলিম উম্মাহ: আমরা কি এতেই সন্তুষ্ট থাকব যে, মুসলিম দেশগুলো স্বৈরতন্ত্র ও দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি থাকুক, নাকি আমরা এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ার জন্য কাজ করব যা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে, জাতিকে রক্ষা করবে এবং শাসককে তার অধীনস্তদের বিষয়ে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিমূলক করবে?

    শরিয়তসম্মত পথ হলো শরিয়তসম্মত পরিবর্তন; বিশৃঙ্খলা, রক্তপাত বা নিরীহ মানুষের ওপর আক্রমণের মাধ্যমে নয়। বরং সচেতনতা, ন্যায়বিচার, সুশৃঙ্খল বৈধ কার্যক্রম এবং ইসলামের ভিত্তিতে জাতিকে গড়ে তোলার মাধ্যমেই এই পরিবর্তন সম্ভব। যাতে শাসনক্ষমতা পরিণত হয় একটি আমানতে—কোনো গনিমতের মালে নয়, এবং এটি হয় একটি দায়িত্ব—কোনো আধিপত্য নয়।

    বিধান দেওয়ার অধিকার কেবল আল্লাহরই [সূরা ইউসুফ: ৪০]।

    হে আল্লাহ! আপনি মুসলমানদের অবস্থা সংশোধন করে দিন। আমাদের সামনে সত্যকে সত্য হিসেবে তুলে ধরুন এবং তা অনুসরণ করার তৌফিক দিন; আর বাতিলকে বাতিল হিসেবে দেখিয়ে দিন এবং তা থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দিন। আমাদের উম্মাহর মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করুন, তাদের থেকে জুলুম, স্বৈরতন্ত্র ও পরাধীনতা দূর করে দিন। আর তাদের মাঝে এমন শাসনব্যবস্থা কায়েম করুন, যা আপনার আনুগত্য, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের সুরক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।

  • সেমিকন্ডাক্টরের ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্বব্যাপী চিপ নিয়ন্ত্রণের লড়াই

    সেমিকন্ডাক্টরের ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্বব্যাপী চিপ নিয়ন্ত্রণের লড়াই

    ভূমিকা (Introduction)

    আধুনিক মানব সভ্যতার প্রতিটি স্তরে সেমিকন্ডাক্টর বা মাইক্রোচিপের প্রভাব আজ অনস্বীকার্য। স্মার্টফোন থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডেটা সেন্টার, মহাকাশযান এবং সামরিক সরঞ্জাম—সবকিছুর মূলেই রয়েছে এই ক্ষুদ্র প্রযুক্তি। কিন্তু একটি নখের চেয়েও ছোট এই বস্তুটিই বর্তমানে বিশ্ব ভূ-রাজনীতির অন্যতম প্রধান নির্ধারণীতে পরিণত হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মূল কারণ হলো, বিশ্বের কোনো একক দেশ সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বরং, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করেছে।

    একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক সভ্যতার মূল চালিকাশক্তি বলা যায় সেমিকন্ডাক্টর বা মাইক্রোচিপকে। আধুনিক জীবনের ক্ষুদ্রতম ইঞ্জিন হিসেবে পরিচিত এই চিপগুলো আমাদের স্মার্টফোন, অটোমোবাইল শিল্প, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডেটা সেন্টার, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা এবং স্যাটেলাইট প্রযুক্তির প্রাণভোমরা। আরও বিস্তৃত পরিসরে বলতে গেলে, একটি দেশের সামরিক সক্ষমতা এবং অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের কার্যকারিতাও আজ সেমিকন্ডাক্টরের ওপর নির্ভরশীল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) যে বিশাল বিপ্লব বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চলছে, তার ভিত্তিপ্রস্তর হলো আরও শক্তিশালী ও সক্ষম চিপ তৈরি করার প্রতিযোগিতা।

    কিন্তু এখানেই একটি বিশাল ভূ-রাজনৈতিক সমস্যার উৎপত্তি ঘটে। একটি দেশ চাইলেই নিজেদের মাটিতে বসে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে একটি অত্যাধুনিক সেমিকন্ডাক্টর তৈরি করতে পারে না। এর উৎপাদন ব্যবস্থা এতোটাই বিভক্ত এবং জটিল যে, এটি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে স্পর্শকাতর সাপ্লাই চেইনে পরিণত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তাইওয়ান, নেদারল্যান্ডস, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া একটি উন্নত চিপ তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।

    ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ভ্যাকুয়াম টিউব থেকে সিলিকন ট্রানজিস্টর (Historical Evolution)

    সেমিকন্ডাক্টর বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। আধুনিক ট্রানজিস্টর আবিষ্কারের আগে, ইলেকট্রনিক সিস্টেমগুলো চলতো মূলত ভ্যাকুয়াম টিউবের (Vacuum Tubes) মাধ্যমে। কিন্তু এই টিউবগুলোর অনেকগুলো সীমাবদ্ধতা ছিল। এগুলো আকারে অনেক বড় ছিল, প্রচুর তাপ উৎপন্ন করত, প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ হতো এবং এগুলো মোটেও নির্ভরযোগ্য ছিল না; প্রায়শই বিকল হয়ে যেত।

    ভ্যাকুয়ম টিউব

    ইতিহাসের পাতায় তাকালে আমরা দেখতে পাই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানদের এনক্রিপ্ট করা গোপন যোগাযোগ বার্তার পাঠোদ্ধার করার জন্য যুক্তরাজ্যের ব্লেচলি পার্কে তৈরি করা হয়েছিল বিখ্যাত ‘ব্রিটিশ কলোসাস কম্পিউটার’ (British Colossus Computer)। এই কম্পিউটারে প্রায় ২,৫০০টি ভ্যাকুয়াম টিউব ব্যবহার করা হয়েছিল, যা একটি আস্ত ঘরের সমান জায়গা দখল করে রাখত।

    ১৯৪৭ সালে প্রযুক্তি বিশ্বে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য বেল ল্যাবস (Bell Labs) সেই বিশাল আকৃতির ভ্যাকুয়াম টিউবের বিকল্প হিসেবে আবিষ্কার করে ‘সিলিকন ট্রানজিস্টর’। একটি ট্রানজিস্টর মূলত ভ্যাকুয়াম টিউবের মতোই সুইচিংয়ের কাজ করে, কিন্তু এটি ছিল নাটকীয়ভাবে ছোট, দ্রুতগামী, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী এবং অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। প্রকৌশলীরা সময়ের সাথে সাথে যখন এক টুকরো সিলিকনের ওপর আরও বেশি সংখ্যক ট্রানজিস্টর বসানোর কৌশল আয়ত্ত করতে শুরু করলেন, তখন কম্পিউটিং পাওয়ার বা কম্পিউটারের প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা ক্রমান্বয়ে সস্তা, ছোট এবং সূচকীয় হারে (Exponentially) শক্তিশালী হতে শুরু করল।

    প্রাথমিকভাবে কেবল সামরিক সরঞ্জাম এবং মেইনফ্রেম কম্পিউটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, ধীরে ধীরে চিপ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি যন্ত্রে প্রবেশ করতে শুরু করে। ১৯৬৯ সালে চাঁদের বুকে পা রাখা ঐতিহাসিক ‘অ্যাপোলো ১১’ (Apollo 11) মিশনের যে গাইডেন্স কম্পিউটার ছিল, তাতে মাত্র ১২,০০০ ট্রানজিস্টর ব্যবহৃত হয়েছিল। অন্যদিকে, আজকের দিনে আমাদের পকেটে থাকা একটি সাধারণ আইফোনে (iPhone) ট্রানজিস্টরের সংখ্যা ২০ বিলিয়ন বা ২,০০০ কোটিরও বেশি! এটি মানবজাতির প্রযুক্তিগত অগ্রগতির এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক।

    চিপের কার্যপ্রণালী: বালুকণা থেকে কৃত্রিম মস্তিষ্ক (The Mechanics of Chips)

    সেমিকন্ডাক্টর এবং অত্যাধুনিক চিপগুলো ঠিক কীভাবে কাজ করে, তা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ট্রানজিস্টর হলো একটি বৈদ্যুতিক সুইচ, যা বিদ্যুৎ চলাচল করতে পারে (On) অথবা বন্ধ করতে পারে (Off)। যখন এটি অন বা অফ হয়, তখন এটি একটি সিগন্যাল বা সংকেত পাঠায়, যার ফলাফল হলো একটি ‘১’ (One) অথবা ‘০’ (Zero)।

    একটি মাত্র ট্রানজিস্টর যখন কেবল একটি ১ বা ০ সিগন্যাল পাঠায়, তখন তা অত্যন্ত সাধারণ এবং খুব একটা কাজের বলে মনে হয় না। কিন্তু যখন কোটি কোটি ট্রানজিস্টরকে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নে সাজিয়ে একসঙ্গে কাজ করানো হয়, তখন এটি অনেকটা মানব মস্তিষ্কের মতো আচরণ করতে শুরু করে। কোটি কোটি সুইচ একসঙ্গে সঠিক ক্রমে সিগন্যাল আদান-প্রদানের মাধ্যমে যৌক্তিক (Logical) ও গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে পারে এবং তথ্য সংরক্ষণ বা মনে রাখতে পারে। এভাবেই একটি নির্জীব বালুকণা বা সিলিকন পরিণত হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মস্তিষ্কে।

    উৎপাদন প্রক্রিয়ার চরম প্রযুক্তিগত জটিলতা (The Complexity of Semiconductor Manufacturing)

    একটি সেমিকন্ডাক্টর তৈরি করা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল এবং ব্যয়বহুল উৎপাদন প্রক্রিয়াগুলোর একটি। একটি আধুনিক চিপ কারখানায় (যাকে ‘ফ্যাব’ বা Fab বলা হয়) উৎপাদন সম্পন্ন হতে প্রায় ৩০০টিরও বেশি ধাপে কাজ করতে হয়। এই কারখানাগুলো নির্মাণ করতে ২০ বিলিয়ন (২,০০০ কোটি) ডলারের বেশি খরচ হয়। চিপ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ‘ডাস্ট-ফ্রি’ বা সম্পূর্ণ ধূলিকণামুক্ত পরিবেশ (Cleanroom) নিশ্চিত করতে হয়, কারণ একটি ক্ষুদ্র ধূলিকণাও পুরো চিপের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দিতে পারে।

    সিলিকন পরিশোধন ও ওয়েফার তৈরি:

    উৎপাদন প্রক্রিয়ার শুরু হয় কোয়ার্টজ (Quartz) থেকে সংগৃহীত সাধারণ সিলিকন দিয়ে। এই সিলিকনকে ৯৯.৯৯% বিশুদ্ধ করা হয়। এরপর সেই বিশুদ্ধ সিলিকনকে গলিয়ে স্ফটিক বা ক্রিস্টালে রূপান্তর করা হয় এবং অত্যন্ত পাতলা, গোলাকার চাকতিতে কাটা হয়। এই চাকতিগুলোকে বলা হয় ‘ওয়েফার’ (Wafers)।

    ফটোলিথোগ্রাফি (Photolithography):

    পরবর্তী ধাপে এই ওয়েফারের ওপর চিপের নকশা বা ডিজাইন বসানো হয়, যে প্রক্রিয়াটির নাম ফটোলিথোগ্রাফি। এখানেই বিশ্বের সবচেয়ে অত্যাধুনিক মেশিনগুলোর ব্যবহার দেখা যায়। লিথোগ্রাফি মেশিনের মাধ্যমে ‘ডিপ আল্ট্রাভায়োলেট’ (Deep Ultraviolet) অথবা ‘এক্সট্রিম আল্ট্রাভায়োলেট’ (EUV) লেজার রশ্মি ব্যবহার করা হয়। এই আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য (Wavelength) এতটাই ক্ষুদ্র যে তা মানুষের খালি চোখে দেখা একেবারেই অসম্ভব।

    এই লেজার রশ্মি ব্যবহার করে সিলিকনের ওপর অবিশ্বাস্য রকম জটিল নকশা তৈরি করা হয়। বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের আস্তরণ দেওয়া, নির্দিষ্ট অংশ ক্ষয় করা (Etching) এবং রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে কোটি কোটি মাইক্রোস্কোপিক ট্রানজিস্টর এবং তাদের মধ্যকার সংযোগ স্থাপন করা হয়।

    প্যাকেজিং ও টেস্টিং:

    ফ্যাব্রিকেশন বা ফ্যাব-এর কাজ শেষ হলে সম্পূর্ণ ওয়েফারটিকে পরীক্ষা করা হয় এবং প্রতিটি চিপকে আলাদাভাবে কেটে নেওয়া হয়। কাটার পর এই ক্ষুদ্র চিপগুলোকে বলা হয় ‘ডাই’ (Dies)। এরপর এগুলোকে বাহ্যিক আঘাত থেকে রক্ষা করতে এবং বাইরের জগতের সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য প্যাকেজিং করা হয়। এভাবেই সম্পূর্ণ প্রস্তুত হওয়ার পর চিপগুলো স্মার্টফোন, গাড়ি, ডেটা সেন্টার বা উন্নত সামরিক অস্ত্রে ব্যবহারের জন্য তৈরি হয়।

    গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন: কে কোন ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করছে? (The Global Supply Chain of Semiconductors)

    সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের সাপ্লাই চেইন মূলত তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত:

    ১. ডিজাইন (Design),
    ২. ফ্যাব্রিকেশন বা উৎপাদন (Fabrication) এবং
    ৩. অ্যাসেম্বলি, টেস্টিং ও প্যাকেজিং (Assembly, Testing, and Packaging)।

    পুরো পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন দেশ এর একেকটি অংশে নিজেদের একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে আছে।

    ক. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য: চিপ ডিজাইন ও সফটওয়্যার

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেমিকন্ডাক্টর চিপের ডিজাইন, সফটওয়্যার তৈরি এবং উৎপাদন যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। এনভিডিয়া (Nvidia), এএমডি (AMD), কোয়ালকম (Qualcomm) এবং অ্যাপল (Apple)-এর মতো আমেরিকান কোম্পানিগুলো বিশ্বের সবচেয়ে অত্যাধুনিক চিপগুলোর নকশা তৈরি করে। তবে, ডিজাইন করার অর্থ এই নয় যে তারা নিজেরাই চিপগুলো তৈরি বা উৎপাদন করতে পারে।

    খ. জাপান ও নেদারল্যান্ডস: কাঁচামাল এবং মেশিনারিজ

    একটি চিপ বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন হয় অতি-বিশুদ্ধ সিলিকন ওয়েফার এবং বিশেষায়িত রাসায়নিক পদার্থের। এই ক্ষেত্রটিতে জাপানের অবস্থান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। টোকিও ইলেক্ট্রন (Tokyo Electron)-এর মতো জাপানি কোম্পানিগুলো এই উপাদানগুলোর প্রধান সরবরাহকারী।

    অন্যদিকে, উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সবচেয়ে জটিল মেশিনগুলো আসে হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানির কাছ থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপ্লাইড ম্যাটেরিয়ালস (Applied Materials) ও ল্যাম রিসার্চ (Lam Research) এবং নেদারল্যান্ডসের এএসএমএল (ASML) এখানে প্রধান ভূমিকা পালন করে। এর মধ্যে নেদারল্যান্ডসের এএসএমএল-এর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি সংকটপূর্ণ। বিশ্বে এএসএমএল-ই একমাত্র কোম্পানি যারা ‘এক্সট্রিম আল্ট্রাভায়োলেট (EUV) লিথোগ্রাফি’ সিস্টেম সরবরাহ করে। সর্বাধুনিক চিপ তৈরি করতে এই মেশিনের কোনো বিকল্প নেই।

    গ. তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়া: ফ্যাব্রিকেশন এবং প্যাকেজিং

    চিপের ডিজাইন এবং মেশিন প্রস্তুত হওয়ার পর, এর মূল ফ্যাব্রিকেশন বা উৎপাদনের কাজটি হয় এশিয়া মহাদেশে, বিশেষ করে তাইওয়ান এবং দক্ষিণ কোরিয়ায়। দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং (Samsung) এবং এসকে হাইনিক্স (SK Hynix) মেমরি চিপ উৎপাদন ও আধুনিক ফ্যাব্রিকেশনের ক্ষেত্রে দৈত্যাকার প্রতিষ্ঠান।

    তবে পুরো বিশ্বের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তাইওয়ান। তাইওয়ানের কোম্পানি ‘টিএসএমসি’ (TSMC – Taiwan Semiconductor Manufacturing Company) বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও প্রধান ডেডিকেটেড সেমিকন্ডাক্টর ফাউন্ড্রি। সর্বাধুনিক চিপের উৎপাদনের ক্ষেত্রে টিএসএমসি একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রেখেছে। উৎপাদন শেষে চিপগুলোর টেস্টিং ও প্যাকেজিংয়ের সিংহভাগ কাজও এশিয়ার বিভিন্ন দেশেই সম্পন্ন হয়।

    এই বিভক্ত সাপ্লাই চেইন এমন একটি ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র তৈরি করেছে যা একে অপরের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল।

    ভূ-রাজনৈতিক ফাটল রেখা: তাইওয়ান সংকট (Taiwan: The Geopolitical Fault Line)

    সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ে যে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি দ্বীপরাষ্ট্র—তাইওয়ান। তাইওয়ান এবং এর টিএসএমসি কারখানায় উন্নত চিপ উৎপাদনের কেন্দ্রীভবন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বিশাল দুর্বলতা বা ‘Choke point’ তৈরি করেছে। এর প্রধান কারণ হলো তাইওয়ানের ভৌগোলিক অবস্থান।

    দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ান মূল ভূখণ্ড চীন থেকে মাত্র ১০০ মাইলেরও কম দূরত্বে অবস্থিত। বেইজিং সরকার তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও দ্বীপটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার হুমকি দিয়ে রেখেছে।

    যদি চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে কোনো সামরিক সংঘাত বা যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তা শুধুমাত্র একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প কেন্দ্রকে সম্পূর্ণ অচল করে দেবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি তাইওয়ানে কোনো ধরনের অবরোধ (Blockade) আরোপ করা হয় এবং টিএসএমসি-এর সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তবে এর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব হবে ধ্বংসাত্মক। হিসাব অনুযায়ী, এই অবরোধের ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন (৬ হাজার কোটি) ডলার থেকে ১ ট্রিলিয়ন (১ লক্ষ কোটি) ডলার পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে।

    তাইওয়ান প্রণালী (Taiwan Strait) শুধুমাত্র একটি ভৌগোলিক সমুদ্রপথ নয়, বরং সেমিকন্ডাক্টরের কল্যাণে এটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং উত্তেজনাকর ভূ-রাজনৈতিক ফাটল রেখায় (Geopolitical Fault Line) পরিণত হয়েছে।

    সেমিকন্ডাক্টর যুদ্ধ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বনাম চীন (The Semiconductor War)

    পরাশক্তিগুলোর মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর যুদ্ধ বা ‘চিপ যুদ্ধ’ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা গভীরভাবে শঙ্কিত যে, চীনের হাতে যদি অত্যাধুনিক চিপের সরবরাহ অব্যাহত থাকে, তবে বেইজিং তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং সামরিক সক্ষমতাকে অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে যাবে। উন্নত চিপের সাহায্যে চীন অত্যাধুনিক হাইপারসনিক মিসাইল, সাইবার যুদ্ধাস্ত্র এবং স্বয়ংক্রিয় সামরিক ব্যবস্থা তৈরি করতে সক্ষম হবে।

    এই সামরিক ও প্রযুক্তিগত উত্থান ঠেকাতে ওয়াশিংটন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ (Export Controls) আইনের ব্যাপক প্রয়োগ শুরু করেছে। এই নীতিমালার আওতায় চীন যাতে সর্বাধুনিক চিপ উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং সরঞ্জাম (বিশেষ করে এএসএমএল-এর ইইউভি লিথোগ্রাফি মেশিন) কোনোভাবেই লাভ করতে না পারে, তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমেরিকার লক্ষ্য হলো চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করা। এই সরবরাহ ব্যবস্থা সুরক্ষিত করতে মার্কিন সরকার ‘বাইডেন প্রশাসনের’ অধীনে ‘চিপস অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাক্ট’ (CHIPS and Science Act) প্রণয়ন করেছে। এই আইনের মাধ্যমে আমেরিকার মাটিতেই চিপ উৎপাদনের কারখানা গড়ে তুলতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে, যাতে আমেরিকার সাপ্লাই চেইন আমেরিকার ভেতরেই থাকে।

    অন্যদিকে, চীনও বসে নেই। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে চীন নিজেদের সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম তৈরি করতে বিশাল অংকের অর্থ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনিয়োগ করছে। তারা চাইছে বিদেশনির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের মাটিতেই সর্বাধুনিক চিপ তৈরি করার সক্ষমতা অর্জন করতে।

    অতএব, পরাশক্তিগুলোর মধ্যে বর্তমান সংগ্রাম কেবল চিপ বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এই সংগ্রাম হলো চিপ তৈরির পেছনের প্রযুক্তি, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ (Intellectual Property) এবং মেশিনারিগুলোর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিশ্চিত করার সংগ্রাম।

    পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োজনীয়তা (The Weakness of Capitalism and the Need for State Power)

    সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বর্তমান অবস্থা বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি অন্তর্নিহিত দুর্বলতা প্রকাশ করে। একটি দৃঢ় পুঁজিবাদী দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সবসময় খরচ কমানো এবং মুনাফা বাড়ানোর দিকে মনোনিবেশ করেছে। এর ফলে, তারা চিপ ডিজাইনে তাদের দক্ষতা বজায় রাখলেও উৎপাদন বা ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের কাজ এশিয়ার দেশগুলোতে আউটসোর্স করে। এই সিদ্ধান্তটি প্রথমে লাভজনক মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন ক্ষমতার ৩৭% থাকলেও বর্তমানে তা প্রায় ১২%-এ নেমে এসেছে।

    পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় প্রাইভেট কোম্পানিগুলো তাদের বাণিজ্যিক লক্ষ্যকেই প্রধান্য দেয়, যা অনেক সময় রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ (DARPA)-এর গবেষণা বাজেট অনেক প্রাইভেট চিপ কোম্পানির গবেষণা বাজেটের চেয়ে কম। অ্যাপলের (Apple) মতো একটি প্রাইভেট কোম্পানির সিইও (CEO) পেন্টাগনের (Pentagon) যে কোনো কর্মকর্তার চেয়ে চিপ শিল্পের ওপর বেশি প্রভাব রাখেন। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলোর ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের অভাব কতটা মারাত্মক হতে পারে।

    এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতেই বাইডেন প্রশাসন ‘CHIPS Act’ প্রণয়ন করেছে এবং চিপ কারখানায় বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিচ্ছে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ছাড়া একটি দেশের পক্ষে কৌশলগত প্রযুক্তি রক্ষা করা সম্ভব নয়।

    ইসলামি রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ (The Islamic State Perspective on Technology)

    সেমিকন্ডাক্টরের এই বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ইসলামি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার একটি শক্তিশালী দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে। ইসলামি রাষ্ট্রে (খিলাফত) অর্থনীতি এবং কৌশলগত শিল্পগুলোর ওপর রাষ্ট্রের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ থাকা অপরিহার্য।

    ক. কৌশলগত স্বাধীনতার গুরুত্ব:

    ইসলামি নীতি অনুযায়ী, মুসলিম উম্মাহর স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। বর্তমান বিশ্বে সামরিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা সরাসরি প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সাথে জড়িত। একটি ইসলামি রাষ্ট্র কখনোই তার সামরিক সরঞ্জাম, টেলিযোগাযোগ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর জন্য অন্য কোনো দেশ বা শক্তির ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। সেমিকন্ডাক্টর বা চিপের মতো প্রযুক্তি, যা একটি দেশের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য, তা অবশ্যই রাষ্ট্রের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ এবং সীমানার মধ্যে উৎপাদিত হতে হবে।

    খ. প্রাইভেট কোম্পানির ওপর নির্ভরশীলতা রোধ:

    পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর মুনাফামুখী মনোভাব প্রায়ই রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামি রাষ্ট্রে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং উৎপাদন শুধুমাত্র বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং উম্মাহর কল্যাণ এবং নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং মনোযোগ এমনভাবে বিনিয়োগ করতে হবে যেন গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত খাতে রাষ্ট্রীয় স্বনির্ভরতা (Self-reliance) অর্জিত হয়।

    গ. গবেষণা এবং উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ:

    চীনের মতো দেশগুলো যেভাবে তাদের প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বিপুল বিনিয়োগ করছে, ঠিক তেমনি একটি ইসলামি রাষ্ট্রকেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণায় (R&D) রাষ্ট্রীয় কোষাগার (বায়তুল মাল) থেকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে। শুধুমাত্র অন্য দেশের প্রযুক্তি আমদানি করে একটি শক্তিশালী এবং স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়।

    উপসংহার (Conclusion)

    আধুনিক সেমিকন্ডাক্টরের গল্পটি মানুষের বুদ্ধিমত্তা এবং প্রকৌশলগত উৎকর্ষের এক অসাধারণ আখ্যান। কিন্তু বর্তমানে এটি সেই গণ্ডি পেরিয়ে ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। সেমিকন্ডাক্টরের ভূ-রাজনীতির মূল কথা হলো—যেই দেশ উন্নত চিপ তৈরির প্রযুক্তি, সর্বাধুনিক মেশিন এবং বিশাল কারখানাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে পারবে, একবিংশ শতাব্দীতে সেই দেশই বিশ্ব অর্থনীতি ও সামরিক ক্ষমতার মূল ভিত্তি নিয়ন্ত্রণ করবে।

    ভবিষ্যতের যুদ্ধগুলো হয়তো ভূখণ্ড বা খনিজ তেলের দখলের জন্য হবে না, বরং ভবিষ্যতের ক্ষমতার লড়াই নির্ধারিত হবে সিলিকনের অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি চিপের ওপর কার কতটুকু নিয়ন্ত্রণ রয়েছে তার ওপর। তাইওয়ানের ভাগ্য, আমেরিকার প্রযুক্তিগত আধিপত্য এবং চীনের পরাশক্তি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা—সবকিছুই এখন আটকে আছে একটি নখের চেয়েও ছোট সেমিকন্ডাক্টরের অন্দরমহলে।

    এই চিপ যুদ্ধ আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—কৌশলগত শিল্পের ওপর নির্ভরশীলতা একটি জাতির জন্য কতটা ভয়ংকর হতে পারে। একটি শক্তিশালী এবং স্বাধীন রাষ্ট্র—বিশেষ করে ইসলামি রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে—প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা অর্জন শুধুমাত্র একটি ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি রাষ্ট্রীয় এবং ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা। চিপ শিল্পের এই জটিল সাপ্লাই চেইন মানবজাতির অগ্রগতি যেমন ত্বরান্বিত করেছে, ঠিক তেমনি এটি নিয়ন্ত্রণ করার রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থা নির্ধারণ করবে।

    আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,

    وَاللَّهُ غَالِبٌ عَلَىٰ أَمْرِهِ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ

    আল্লাহ তাঁর নিজ কাজে প্রবল থাকেন, কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না [ইউসূফ: ২১]

  • রবিউল আউয়াল: নবীর জন্ম, ইসলামি রাষ্ট্র এবং খিলাফত

    রবিউল আউয়াল: নবীর জন্ম, ইসলামি রাষ্ট্র এবং খিলাফত

    بسم الله الرحمن الرحيم

    ১২ই রবিউল আউয়াল মুসলমানদের যথাযথভাবে স্মরণ করা উচিত, এমনকি যদি তা পালন করা কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা (ফরজ) নাও হয়। এটি মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবের জন্মতারিখ (মাওলিদ) নির্দেশ করে, যাকে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) সর্বশেষ নবী হিসেবে মর্যাদাবান করেছেন। তিনি হলেন মুহাম্মদ (সা.), যার জন্ম এবং সমগ্র জীবন ছিল সত্যিই অসাধারণ, যা তাকে শুধু এই পৃথিবীতেই নয় বরং পরকালেও সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ও অনন্য মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

    রবিউল আউয়ালের স্বাতন্ত্র্য কেবল তাঁর (সা.) জন্মের মাস হওয়ার মধ্যেই নিহিত নয়, বরং এটি তাঁর রাসূল হিসেবে প্রেরিত হওয়ারও সময়, যদিও এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে পূর্ণ ঐকমত্য নেই। আবুল হাসান আলী বিন হুসাইন বিন আলী আল-মাসউদী (মৃত্যু ৩৪৬ হিজরি) তার রচিত গ্রন্থ ‘আত-তানবীহ ওয়াল-ইশরাফ’-এ নিম্নরূপ লিপিবদ্ধ করেছেন:

    فَلَمَّا بَلَغَ أَرْبَعِينَ سَنَةً بَعَثَهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ إِلَى النَّاسِ كَافَّةً يَوْمَ الِاثْنَيْنِ لِعَشْرٍ خَلَوْنَ مِنْ شَهْرِ رَبِيعٍ الْأَوَّلِ… وَلَهُ ﷺ يَوْمَئِذٍ أَرْبَعُونَ سَنَةً وَتُنُوزِعَ فِي أَوَّلِ مَنْ آمَنَ بِهِ مِنَ الذُّكُورِ، بَعْدَ إِجْمَاعِهِمْ عَلَى أَنَّ أَوَّلَ مَنْ آمَنَ بِهِ مِنَ الْإِنَاثِ خَدِيجَةُ

    “অতঃপর, যখন তিনি চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হলেন, তখন আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা তাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি রাসূল হিসেবে প্রেরণ করলেন, দিনটি ছিল সোমবার, রবিউল আউয়াল মাসের দশ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর… সে সময় আল্লাহর রাসূলের (সা.) বয়স ছিল চল্লিশ বছর। তাঁর প্রতি ঈমান আনয়নকারী প্রথম পুরুষ কে ছিলেন তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে, তবে এই বিষয়ে তাদের ইজমা (ঐকমত্য) রয়েছে যে, নারীদের মধ্যে তাঁর প্রতি ঈমান আনয়নকারী প্রথম নারী ছিলেন খাদিজা।”

    একইভাবে, আহমদ ইবনে মুহাম্মদ আল-কাসতাল্লানি (মৃত্যু ৯২৩ হিজরি) তার ‘আল-মাওয়াহিব আল-লাদুননিয়্যাহ বিল-মিনাহ আল-মুহাম্মাদিয়্যাহ’ গ্রন্থে নবুওয়াতের সূচনার বিষয়ে বেশ কয়েকটি মতামত লিপিবদ্ধ করেছেন। এগুলোর মধ্যে, তিনি ইবনে আবদুল বারর এর মতটি উল্লেখ করেছেন যে, নবী (সা.)-কে সোমবার, রবিউল আউয়ালের আট তারিখে প্রেরণ করা হয়েছিল, অন্যদিকে আরেকটি মতামত অনুসারে এটি রবিউল আউয়ালের শুরুতে হয়েছিল:

    وَلَمَّا بَلَغَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَرْبَعِينَ سَنَةً… وَقَالَ ابْنُ عَبْدِ الْبَرِّ: يَوْمَ الِاثْنَيْنِ لِثَمَانٍ مِنْ رَبِيعٍ الْأَوَّلِ سَنَةَ إِحْدَى وَأَرْبَعِينَ مِنَ الْفِيلِ. وَقِيلَ: فِي أَوَّلِ رَبِيعٍ: بَعَثَهُ اللَّهُ رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ، وَرَسُولًا إِلَى كَافَّةِ الثَّقَلَيْنِ أَجْمَعِينَ

    “এবং যখন আল্লাহর রাসূল (সা.) চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হলেন… ইবনে আবদুল বারর বলেছেন: (তাঁকে প্রেরণ করা হয়েছিল) সোমবার, হস্তী বর্ষের ৪১তম বছরের রবিউল আউয়ালের আট তারিখে। এ কথাও বলা হয়েছে যে: রবিউল আউয়ালের শুরুতে, আল্লাহ তাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ এবং সমগ্র মানব ও জিন জাতির (সাকালাইন) প্রতি রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন।”

    এমনি হলো রবিউল আউয়াল মাসের গভীর তাৎপর্য। এটি কেবল নবী (সা.)-এর জন্মের মাসই নয়, বরং এটি সেই মাস যেটিতে তিনি (সা.) নবুওয়াতের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছিলেন।

    রবিউল আউয়াল: হিজরত এবং ইসলামি রাষ্ট্রের জন্ম

    হয়তো অনেকেই অবগত নন যে রবিউল আউয়াল হলো নবী (সা.)-এর হিজরতেরও (দেশত্যাগের) মাস, যা মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছিল। অন্যভাবে বলা যায়, রবিউল আউয়াল হলো ইসলামি রাষ্ট্রের জন্মের মাস, এমন একটি রাষ্ট্র যা পূর্বে রোমান এবং পারসিক সাম্রাজ্য দ্বারা আধিপত্য বিস্তারকারী বিশ্ব সভ্যতার গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছিল। আত-তাবারী তার রচিত গ্রন্থ ‘তারীখুর রুসুল ওয়াল-মুলূক’-এ উল্লেখ করেছেন:

    حَدَّثَنَا ابْنُ حُمَيْدٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا سَلَمَةُ، عَنِ ابْنِ إِسْحَاقَ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، قَالَ: قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ يَوْمَ الاِثْنَيْنِ، لِاثْنَتَيْ عَشْرَةَ لَيْلَةً خَلَتْ مِنْ شَهْرِ رَبِيعٍ الأَوَّلِ

    “আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন ইবনে হুমাইদ, যিনি বলেছেন: আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন সালামাহ, ইবনে ইসহাক থেকে, আজ-যুহরী থেকে, যিনি বলেছেন: আল্লাহর রাসূল (সা.) সোমবার মদিনায় পৌঁছেছিলেন, রবিউল আউয়াল মাসের বারো রাত অতিবাহিত হওয়ার পর।”

    আল-বুখারি তার ‘সহিহ’ গ্রন্থে ইবনে শিহাব থেকে, উরওয়াহ ইবনে জুবায়ের থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি বলেছেন:

    وَسَمِعَ المُسْلِمُونَ بِالْمَدِينَةِ مَخْرَجَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ مِنْ مَكَّةَ… فَتَلَقَّوْا رَسُولَ اللَّهِ ﷺ بِظَهْرِ الحَرَّةِ، فَعَدَلَ بِهِمْ ذَاتَ اليَمِينِ، حَتَّى نَزَلَ بِهِمْ فِي بَنِي عَمْرِو بْنِ عَوْفٍ، وَذَلِكَ يَوْمَ الِاثْنَيْنِ مِنْ شَهْرِ رَبِيعٍ الأَوَّلِ

    “এবং মদিনার মুসলিমরা মক্কা থেকে আল্লাহর রাসূলের (সা.) প্রস্থানের সংবাদ শুনতে পেল… তাই তারা আল্লাহর রাসূলকে (সা.) অভ্যর্থনা জানাতে যাহর আল-হাররাহ নামক স্থানে বেরিয়ে পড়ল, এবং এরপর তিনি তাদের সাথে ডান দিকে মোড় নিলেন যতক্ষণ না তিনি তাদের সাথে বনি আমর বিন আউফের মহল্লায় অবতরণ করেন বা অবস্থান নেন। এটি ঘটেছিল রবিউল আউয়াল মাসের একটি সোমবারে…”

    এছাড়াও, ইবনে হিব্বান তার ‘সহিহ’ গ্রন্থে আল-বারা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি বলেছেন:

    أَنَّ قُدُومَهُ ﷺ الْمَدِينَةَ كَانَ يَوْمَ الِاثْنَيْنِ لِاثْنَتَيْ عَشْرَةَ لَيْلَةً خَلَتْ مِنْ رَبِيعٍ الْأَوَّلِ

    “মদিনায় তাঁর (সা.) আগমন ঘটেছিল সোমবার, রবিউল আউয়ালে বারো রাত অতিবাহিত হওয়ার পর।”

    অতএব, রবিউল আউয়ালের মর্যাদা আরও বহুগুণ বেড়ে যায় কারণ এটি সেই মাসটিকে চিহ্নিত করে যে মাসে প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যার ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত মর্যাদা ও সমৃদ্ধির সাথে ইসলামি শরিয়ার বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছিল।

    রবিউল আউয়াল: রাসূলের ওফাত এবং খিলাফতের জন্ম

    মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম এবং রাসূল হিসেবে নিযুক্তির মাস হওয়ার পাশাপাশি, রবিউল আউয়াল হলো তাঁর (সা.) ওফাতেরও মাস। বেশ কয়েকজন ইতিহাসবিদের প্রসিদ্ধ মতানুসারে, নবী (সা.) ঠিক যে তারিখে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই একই তারিখেই ইন্তেকাল করেন: হিজরি ১১ সনের ১২ই রবিউল আউয়াল, সোমবার, ঠিক সেদিনের পূর্বাহ্নে বা চাশতের (দোহা) সময়ে।

    ঠিক সেই সোমবারেই, বনি সাঈদার সাকিফায় একটি সভার মাধ্যমে আবু বকর আস-সিদ্দিক মুসলমানদের প্রথম খলিফা হিসেবে নির্বাচিত হন। সেদিন ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল-আকদ’ দ্বারা তাকে আনুগত্যের শপথ (বাইয়াত আল-ইনকাদ) দেওয়া হয়েছিল, এবং পরের দিন (মঙ্গলবার), মসজিদে সাধারণ মুসলিম জনতার কাছ থেকে তিনি আনুগত্যের শপথ (বাইয়াত আত-তাআহ) গ্রহণ করেছিলেন। যখন এই প্রক্রিয়াগুলো নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয়, তখন আবু বকর সেই রাতে রাসূলের (সা.) পবিত্র দেহের দাফন কার্যাবলীতে নেতৃত্ব দেন।

    এভাবে, রবিউল আউয়াল রাসূলের (সা.) ওফাতের তারিখ হিসেবে কাজ করে, পাশাপাশি একই সাথে নবী (সা.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ইসলামি রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা হিসেবে খিলাফতের জন্মকেও চিহ্নিত করে। আবু বকর ছিলেন খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রথম খলিফা, যিনি খিলাফতের ছত্রছায়ায় সমগ্র মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন – এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা পরবর্তীতে উমাইয়া, আব্বাসীয় এবং সবশেষে উসমানীয়দের দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল।

    সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্নাহ হিসেবে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা

    সংঘটিত অসংখ্য যুগান্তকারী ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, ১২ই রবিউল আউয়াল উদ্‌যাপনকে কেবল আল্লাহর রাসূলের (সা.) জন্ম স্মরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। এর মধ্যে অবশ্যই ইসলামি রাষ্ট্র এবং খিলাফতের জন্মকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা সমস্ত মুসলমানদের এর পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করার জন্য একটি স্মরণিকা বা রিমাইন্ডার হিসেবে কাজ করবে।

    যদি রাসূলের (সা.) জন্ম স্মরণযোগ্য হয়, তবে ইসলামি রাষ্ট্র এবং খিলাফতের জন্ম কেবল স্মরণযোগ্যই নয়, বরং এটি এমন এক বাধ্যবাধকতা (ফরজ) যার জন্য সংগ্রাম করা এবং তা পুনরায় বহাল করা আবশ্যক। কারণ ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজই ছিল নবীর (সা.) মিশনের মূল নির্যাস, যা এইভাবে তাঁর (সা.) সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্নাহ হিসেবে গঠিত।

    ইসলামি রাষ্ট্র যদি একটি ফরজ না হতো, তবে নিঃসন্দেহে আল্লাহর রাসূল (সা.) এটি প্রতিষ্ঠা করতেন না; খোলাফায়ে রাশেদীন এর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেন না; উমাইয়া, আব্বাসীয় এবং উসমানীয় খলিফাগণ এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করতেন না।

    ২৮শে রজব ১৩৪২ হিজরিতে (৩রা মার্চ, ১৯২৪) খিলাফতের পতনের অর্থ হলো নবী (সা.)-এর যুগ থেকে গড়ে ওঠা একটি ইসলামি শাসন ব্যবস্থার পতন, যা ফলশ্রুতিতে এটিকে পুনরুজ্জীবিত করার বাধ্যবাধকতার বিষয়ে একটি আইনি বা শর’ঈ তাৎপর্য আরোপ করে।

    অধিকন্তু, অধিকাংশ আলেমের মতে খিলাফত হলো সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ফরজ (আহাম্মুল ওয়াজিবাত), যা এটি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাকে এমন এক সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্নাহ হিসেবে সাব্যস্ত করে, যা পালনে প্রতিটি মুসলিম বাধ্য।

    একমাত্র খিলাফতের মাধ্যমেই আল্লাহর দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গরূপে (কাফফাহ) বাস্তবায়ন করা সম্ভব; মুসলিমরা একক নেতৃত্বের অধীনে ঐক্যবদ্ধ হয়; মুসলমানদের মর্যাদা, সম্পদ, রক্ত এবং জীবন সুরক্ষিত থাকে; আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা)-এর শত্রুরা পরাজিত হয়, এবং নতুন নতুন ভূখণ্ড বিজয়ের (ফুতুহাত) উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়; মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে পরিচালিত করা যায়; একটি চমৎকার ইসলামি সভ্যতা গড়ে ওঠে; এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) রহমত মহাবিশ্বের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

    এই দৃষ্টিকোণ থেকেই মাওলিদ এবং রবিউল আউয়ালকে দেখা উচিত। আল্লাহর রাসূল (সা.) মক্কায় ১৩ বছর এবং মদিনায় ১০ বছর সংগ্রাম করেছিলেন, এবং এটি অকল্পনীয় যে তাঁর ২৩ বছরের কাজ কেবলমাত্র সালাহ, সাওম, জাকাত এবং হজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। স্পষ্টভাবে, তিনি (সা.) কেবল ব্যক্তিগত নৈতিকতারই বিকাশ ঘটাননি; তিনি একটি সমাজ ও একটি রাষ্ট্র গঠন করেছিলেন, এবং সত্যিকার অর্থেই ইসলাম দিয়ে বিশ্বকে রূপদান করেছিলেন। এগুলোর সবই তাঁর সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত এবং প্রতিটি মুসলমানের অবশ্যই এগুলো অনুকরণ করা উচিত।

    এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে যখন নবীর (সা.) মাওলিদ ব্যাপক পরিসরে উদযাপিত হয়, তবুও তাঁর (সা.) সুন্নাহ শুধুমাত্র ইবাদত বা বিবাহের (মুনাকাহাত) ক্ষেত্রেই গ্রহণ করা হয়, যেখানে লেনদেন (মুয়ামালাত), সামাজিক মিথস্ক্রিয়া, রাজনীতি, অর্থনীতি, শাসনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, দণ্ডবিধি (উকুউবাত), আন্তর্জাতিক চুক্তি, জিহাদ এবং বৈদেশিক নীতির বিষয়গুলো বর্জন করা হয় এবং উপনিবেশবাদীদের দ্বারা প্রদত্ত মতবাদ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। আজ মুসলিম ভূখণ্ডজুড়ে এটিই এক মর্মান্তিক বাস্তবতা হিসেবে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

    এর ভিত্তিতে, প্রতিটি মুসলিম যে সত্যিই নবীকে (সা.) ভালোবাসে, সে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামি জীবনব্যবস্থা পুনরায় শুরু করার জন্য সংগ্রাম করতে বাধ্য – যা প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নবীর (সা.) কাজেরই প্রতিফলন। কেবল এই পথেই আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) দ্বীন পূর্ণাঙ্গরূপে (কাফফাহ) প্রয়োগ করা যেতে পারে, যার ফলে এটি নিশ্চিত হয় যে একজন মুসলিম সত্যিই আল্লাহর রাসূলের (সা.) সুন্নাহর ওপর চলছেন।

    উপসংহার

    নিশ্চয়ই, নবীর (সা.) জন্মের ঘটনাকে ইসলামি রাষ্ট্রের জন্ম, হিজরত এবং খিলাফতের জন্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। প্রতিটি ঘটনা তাঁর (সা.) মহান সংগ্রামের একটি নিরবচ্ছিন্ন সুতোর প্রতিনিধিত্ব করে, যা পরবর্তীতে তাঁর সাহাবীদের দ্বারা আরও স্থায়ী হয়েছিল। ১৯২৪ সালে খিলাফতের পতন নিঃসন্দেহে মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি চরম বিপর্যয় ছিল, তবে একই সাথে এটি আমাদের জন্য ঠিক আল্লাহর রাসূলের (সা.) মতোই সংগ্রাম করার একটি সুযোগ ও ক্ষেত্র উন্মুক্ত করে দেয়, বিশেষ করে সর্বশ্রেষ্ঠ ইসলামি রাষ্ট্র পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে – এমন একটি সুযোগ যা আমাদের কারোই হাতছাড়া করা উচিত নয়।

  • ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে: নবুওয়াতের আদলে খিলাফতে রাশিদাহ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কিতাব ও সুন্নাহকে পুনরুজ্জীবিত করুন

    ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে: নবুওয়াতের আদলে খিলাফতে রাশিদাহ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কিতাব ও সুন্নাহকে পুনরুজ্জীবিত করুন

    বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

    রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে: নবুওয়াতের আদলের খিলাফতে রাশিদাহ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কিতাব ও সুন্নাহকে পুনরুজ্জীবিত করুন

    মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যখন ইসলামকে সর্বশেষ দ্বীন বা বার্তা হিসেবে নির্ধারণ করেছেন, আমাদের নেতা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বশেষ রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন এবং আমাদের জন্য এই দ্বীনকে সংরক্ষণ করে এতে যেকোনো ধরনের বিকৃতি ও পরিবর্তনের পথ বন্ধ করে দিয়েছেন… তার অর্থ হলো, আল্লাহ ইসলামকে মানবজাতির জন্য সর্বকাল ও সর্বস্থানের এবং কিয়ামত পর্যন্ত প্রযোজ্য একমাত্র সত্য দ্বীন হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তিনি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নিয়ে আসা কিতাব ও সুন্নাহকে আল্লাহর দ্বীনের একমাত্র মানদণ্ড ও সূত্র বানিয়েছেন… এর মানে হলো, একজন মুসলিম আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী থেকে এটাই বুঝবে যে:

    (وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى (3) إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى )

    “তিনি মনগড়া কথা বলেন না। এতো ওহী, যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ হয়।” [সূরা আন-নাজম: ৩-৪]

    এবং আল্লাহর এই বাণী থেকে বুঝবে:

    (وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا)

    “রাসূল তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।” [সূরা হাশর: ৭]

    এবং মহিমান্বিত আল্লাহর এই বাণী থেকে বুঝবে:

    (وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ)

    “আমি কোনো রাসূলকেই পাঠাইনি এ উদ্দেশ্য ছাড়া যে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর আনুগত্য করা হবে।” [সূরা নিসা: ৬৪]

    অর্থাৎ, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সে এই আদেশে আদিষ্ট যে, তাকে সর্বকালে, সর্বস্থানে এবং কিয়ামত পর্যন্ত এই দ্বীনের অনুসরণ করতে হবে, ঠিক যেমনটি এই উম্মতের পূর্বসূরিগণ করেছিলেন… এর অর্থ হলো, তাকে সালাত আদায় করতে হবে, যাকাত দিতে হবে, সাওম পালন করতে হবে এবং হজ করতে হবে… ঠিক সেভাবেই যেভাবে রাসূল (সা.) সালাত, যাকাত, সাওম ও হজ পালন করেছেন। তাকে ক্রয়-বিক্রয় ও বিবাহ সেভাবেই করতে হবে যেভাবে রাসূল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন এবং দাওয়াতের পথে ঠিক সেভাবেই চলতে হবে যেভাবে রাসূল (সা.) চলেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই ধরনের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ দ্বীনের একটি অকাট্য ও স্বতঃসিদ্ধ বিষয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

    (كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا )

    “তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালের আশা রাখে এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে, তাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” [সূরা আহযাব: ২১]

    আর এ ব্যাপারে কোনো মুসলিমের নিজস্ব কোনো পছন্দ বা ছাড়ের সুযোগ নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

    (فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا)

    “অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তারা তাদের মধ্যকার বিরোধের ক্ষেত্রে তোমাকে বিচারক না মানে, এরপর তুমি যে ফয়সালা করবে সে ব্যাপারে নিজেদের মনে কোনো দ্বিধা না রাখে এবং তা পূর্ণাঙ্গরূপে মেনে নেয়।” [সূরা নিসা: ৬৫]

    আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন:

    (فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ)

    “সুতরাং যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা যেন ভয় করে যে, তাদের উপর কোনো ফিতনা (বিপর্যয়) আপতিত হবে কিংবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদের গ্রাস করবে।” [সূরা নূর: ৬৩]

    এ কারণেই সমগ্র সৃষ্টির সরদার (সা.) যা নিয়ে এসেছেন তা-ই হলো সিরাতুল মুস্তাকিম (সরল পথ) এবং এই পথে চলার জন্য তা-ই আমাদের জন্য নূর ও আলো। প্রতি বছর রাসূল (সা.)-এর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আমাদের সর্বপ্রথম এই শিক্ষার ওপরই আলোকপাত করা উচিত… এরপর আমাদের স্মরণ করা উচিত যে সত্যিকার অর্থে ইসলাম ছাড়া মুসলিমদের কোনো সম্মান নেই, স্মরণ করা উচিত কীভাবে ইসলাম মরুভূমির বেদুঈনদের মধ্য থেকে মানবজাতির জন্য শ্রেষ্ঠ উম্মত বের করে এনেছিল, এবং কীভাবে যতদিন তারা ইসলামকে আঁকড়ে ধরেছিল ও এর পথ অনুসরণ করেছিল ততদিন বিজয় তাদের সাথী ছিল। নবীর নেতৃত্বে কীভাবে তারা মানবজাতির পথপ্রদর্শক ও রক্ষক হয়েছিল এবং শত শত বছর ধরে তারা এই অবস্থানে অটুট ছিল। ইসলাম অনুসরণের শক্তির কারণেই তারা শক্তিশালী ছিল এবং ইসলাম অনুসরণ থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণেই তারা দুর্বল হয়েছে; এমনকি হযরত উমর (রা.)-এর সেই বিখ্যাত উক্তিটি পূর্ববর্তী মুসলিমদের জন্য একটি ধ্রুব সত্যে পরিণত হয়েছিল:

    « نحن قوم أعزنا الله بالإسلام. فإن ابتغينا العزة بغيره أذلنا الله»

    “আমরা এমন এক জাতি যাদেরকে আল্লাহ ইসলামের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন। আমরা যদি ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুর মাধ্যমে সম্মান খুঁজি, তবে আল্লাহ আমাদের অপদস্থ করবেন।”

    আমাদের স্মরণ করা উচিত, কীভাবে মক্কায় রাসূল (সা.)-এর প্রধান কাজ ছিল আকীদা প্রচারের পাশাপাশি প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্ঠা চালানো।

    মক্কায় তিনি তাঁর জাতিকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকতেন এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে নিয়ে একটি দল গঠন করেছিলেন। দারুল আরকামে তিনি:

    ( يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ )

    “তিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন।” [সূরা জুমুআহ: ২]

    অতঃপর আল্লাহর নির্দেশে তিনি প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়া শুরু করেন:

    (فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ )

    “সুতরাং আপনাকে যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা প্রকাশ্যে প্রচার করুন এবং মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন।” [সূরা হিজর: ৯৪]

    তিনি মুশরিকদের বলেছিলেন:

    «كلمة واحدة تعطونيها تملكون بها العرب، وتدين لكم بها العجم»

    “তোমরা আমাকে একটিমাত্র বাক্য দাও, যার মাধ্যমে তোমরা আরবদের আধিপত্য লাভ করবে এবং অনারবরা তোমাদের বশ্যতা স্বীকার করবে।”

    তিনিই সেই ব্যক্তি যিনি আরব গোত্রগুলোর শক্তিমানদের কাছে ‘নুসরাহ’ (সাহায্য ও ক্ষমতা) চেয়েছিলেন। মদীনার যে শক্তিমানরা তাঁকে সাহায্য করেছিলেন, আল্লাহ সম্মানসূচকভাবে তাঁদের নাম দিয়েছিলেন ‘আনসার’ এবং তাঁদের প্রশংসা করে আল্লাহ তায়ালা বলেন:

    (وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ )

    “মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম ও অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন জান্নাত, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই হলো মহাসাফল্য।” [সূরা তাওবাহ: ১০০]

    এই আনসারদের মাধ্যমেই মহান আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করেছিলেন এবং প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এরপর মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর, রাসূল (সা.) ইসলামের ভিত্তিতে শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন, ইসলামের দ্বারা মুসলিমদের বিষয়াদি দেখাশোনা করেছেন এবং আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করার জন্য জিহাদ কায়েম করেছেন। ফলে এই রাষ্ট্র সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করেছিল এবং ইসলামকে চারিদিকে ছড়িয়ে দিয়েছিল… আর আজ আমরাও রাসূল (সা.)-এর সেই একই পথ অনুসরণ করতে আদিষ্ট। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি যে কাজগুলো করেছিলেন, আমাদেরও সেই কাজগুলো করতে হবে এবং তিনি যে পর্যায়গুলো পার করেছিলেন, আমাদেরও ঠিক সেই পর্যায়গুলো পার করতে হবে…

    সত্য দ্বীন ইসলামের জন্মের (রাসূলের জন্মের সাথে) এত দীর্ঘ সময় পর আজ আমাদের ওপর বর্তানো পবিত্র আমানত হলো ইসলামের সেই সুবাসিত জীবনীর দিকে ফিরে যাওয়া এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূল (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করা। আর এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই জীবনে দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়ন করা, যা মুসলিমদেরকে এমন একটি জীবনযাপনে সক্ষম করবে যা তাদের রবের সন্তুষ্টি অর্জন করবে এবং তাদেরকে সম্মানিত ও পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

    আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রাসূল (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে এবং আল্লাহর শরীয়তের শাসন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কারণে মুসলিম উম্মাহ তাদের সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থায় জীবনযাপন করছে। যখনই তারা তাদের উজ্জ্বল অতীতের কথা স্মরণ করে, পুনরায় ইসলামের শাসনে ফিরে আসতে চায়, ইসলামের ছায়াতলে বাঁচতে চায় এবং এর বার্তা বহন করতে চায়; তখনই তাদেরকে বাঁধা দেওয়ার ও যুদ্ধ করার জন্য কেউ না কেউ দাঁড়িয়ে যায়। হ্যাঁ, উম্মাহ আজ জেগে উঠেছে, তারা তাদের বর্তমান বাস্তবতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে এবং ফিরে আসতে চাচ্ছে… কিন্তু পাশ্চাত্যের শাসক ও তাদের লেজুড়বৃত্তি করা মুসলিম বিশ্বের নিকৃষ্ট শাসকরা শয়তানি কায়দায় তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে, চরম চক্রান্ত, হীনতা ও অপরাধের মাধ্যমে তাদেরকে প্রতিহত করতে চাচ্ছে। তারা উম্মাহর বিরুদ্ধে এক বৈশ্বিক যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে যেন উম্মাহ পৃথিবীতে আল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারে।

    যখন বিপ্লবগুলো «هي لله هي لله» (সবকিছুই আল্লাহর জন্য, আল্লাহর জন্য) স্লোগান তুলল, তখন তা পাশ্চাত্যের বুকে কাঁপুনি ধরিয়ে দিল। মুসলিমদের « محمد رسول الله قائدنا» (মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল আমাদের নেতা) এবং «الأمة تريد خلافة من جديد» (উম্মাহ পুনরায় খিলাফত চায়) স্লোগান শুনে তাদের হৃদয় কেঁপে উঠল। জুমার দিনের স্লোগানগুলো যখন কুরআনের আয়াতের রূপ নিল, যেমন:

    (إِنْ تَنْصُرُوا اللَّهَ يَنْصُرْكُمْ )

    “যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য করো, তবে তিনিও তোমাদের সাহায্য করবেন।” [সূরা মুহাম্মদ: ৭]

    এবং সশস্ত্র দলগুলো যখন সাহাবী, জিহাদ ও প্রথম যুগের বিজয়ী মুসলিম সেনাপতিদের নামে নিজেদের নামকরণ করতে শুরু করল… বিশেষ করে সিরিয়ায় যখন এই পরিস্থিতি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠল, তখন কাফির পশ্চিমা বিশ্ব এবং তাদের লেজুড় শাসকরা মুসলিমদের এই পথে এগিয়ে যাওয়া রোধ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। আর এটি প্রতিরোধের জন্যই তারা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও সামরিক জোট গঠন করেছে।

    পাশ্চাত্য যখন ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জীবনের আঙিনায় ইসলামের প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে কাজ করে, তখন তারা খুব ভালো করেই জানে যে এই রাষ্ট্রটি কেমন হবে। তারা জানে যে এই রাষ্ট্রটি সভ্যতা ও শক্তির দিক থেকে বিশ্বের এক নম্বর রাষ্ট্র হবে। তারা জানে যে, ইসলামকে সুন্দরভাবে প্রয়োগ, দাওয়াত এবং জিহাদের মাধ্যমে সম্প্রসারণ, প্রভাব বিস্তার ও ছড়িয়ে পড়ার বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই রাষ্ট্রের রয়েছে, যা তাদের সমস্ত অর্জনকে ধ্বংস করে দেবে। শুধু তাই নয়, তারা দেখতে পাচ্ছে যে এটি তাদের অস্তিত্বকেই নিশ্চিহ্ন করে দেবে এবং তাদের আদর্শকে সমূলে উৎপাটন করবে… পাশ্চাত্য ভালো করেই জানে যে পুঁজিবাদের পতন আসন্ন। অন্যদের আগে তাদের নিজেদের কাছেই স্পষ্ট হয়ে গেছে যে এই ব্যবস্থা শান্তি দিতে পারে না, বরং এটি সংকট তৈরির কারখানামাত্র। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষের ঘামে মুষ্টিমেয় কিছু লোভী মানুষ (যাদের সংখ্যা কয়েক হাজারের বেশি নয়) লাভবান হয়। এই ব্যবস্থা জুলুম, হত্যা এবং যুদ্ধের ব্যবসার ওপর দাঁড়িয়ে আছে… পাশ্চাত্য এই উপসংহারে পৌঁছেছে যে তাদের মতাদর্শের বিদায় নেওয়ার সময় এসে গেছে এবং জীবনের মঞ্চে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মঞ্চে ও বৈশ্বিক নেতৃত্বের মঞ্চে ইসলামের পুনরায় ফিরে আসার সময় ঘনিয়ে এসেছে।

    এ কারণেই এই প্রতারক ও অপরাধী পাশ্চাত্য- যাদের শাসনামলে মানবতা কেবল যুদ্ধ, দুর্দশা, গণহত্যা, শোষণ, জাতির সম্পদ লুণ্ঠন ও দারিদ্র্য ছাড়া আর কিছুই দেখেনি; এমনকি তারা জাতিগুলোকে শত শত বিলিয়ন ডলারের ঋণে জর্জরিত করে প্রতি বছর হাজার হাজার বিলিয়ন ডলার সুদ দিতে বাধ্য করেছে… তারা খিলাফত পুনরায় প্রতিষ্ঠা হওয়া ঠেকাতে মরণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে… ইসলামের প্রত্যাবর্তনের বিরুদ্ধে এই হিংস্র আক্রমণের মাধ্যমে মূলত পাশ্চাত্য নিজেদেরকে রক্ষা করছে এবং তাদের মতাদর্শের পতনের ঝুঁকি থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছে…

    আর একারণেই ইসলামের প্রতি এবং খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রকল্প বহনকারীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী এই পাশ্চাত্য বিপ্লবগুলোকে ছিনতাই করার ষড়যন্ত্র করেছে। তারা মিশরে সিসিকে নিয়ে এসেছে যে মোবারকের চেয়ে কোনো অংশে কম অপরাধী নয়, তিউনিসিয়ায় বেন আলীর সবচেয়ে কাছের মানুষ সিবসিকে নিয়ে এসেছে এবং ইয়েমেনে স্বৈরশাসক আলী আবদুল্লাহ সালেহের ডেপুটি মনসুর হাদি আবদে রাব্বুকে বসিয়েছে… লিবিয়াতে পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে আনার জন্য তারা এখনো চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে। আর সিরিয়া! সিরিয়া তো বিপ্লবগুলোর কেন্দ্রবিন্দু; সেখানে পাশ্চাত্য ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণহত্যা চালানো হয়েছে এবং এখন বাশারমুক্ত হবার পর তা আমেরিকার বলয়ে নেবার জন্য বড় ষড়যন্ত্রের জাল বুনন করা হচ্ছে; কারণ সিরিয়া নিজেকে একটি ইসলামি বিপ্লব হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং এর জনগণ খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মহান আল্লাহ কতই না সত্য বলেছেন:

    (وَمَا نَقَمُوا مِنْهُمْ إِلَّا أَنْ يُؤْمِنُوا بِاللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ )

    “তারা তো তাদের সাথে কেবল এ কারণেই শত্রুতা করেছিল যে, তারা মহাপরাক্রমশালী, প্রশংসিত আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল।” [সূরা বুরুজ: ৮]

    আজকের দিনে একজন মুসলিম যখন বাস্তবতার দিকে তাকায়, তখন সে দেখতে পায় যে ইসলামকে বিকৃত করার এবং মুসলিমদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার ও তাদের অবলীলায় হত্যা করার এক তীব্র ষড়যন্ত্র চলছে। সে দেখতে পায় যে চারপাশ থেকে ظالمين (অত্যাচারীরা) তাকে ঘিরে রেখেছে এবং সত্যের পক্ষে কোনো সাহায্যকারী নেই… যখন সে আমেরিকা, রাশিয়া ও ইউরোপীয় দেশগুলোর শক্তির দিকে তাকায় এবং তাদের অনুগত দালাল শাসকদের সমর্থন দেখে, তখন তার মধ্যে হতাশা আসতে পারে। কিন্তু যখন সে ঈমানের দৃষ্টিতে তাকায়, যখন সে স্মরণ করে রাসূল (সা.) এবং পূর্ববর্তী নবীদের সাথে কী ঘটেছিল, তারা কী পরিমাণ অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, এবং কীভাবে তারা আল্লাহর হুকুম যথাযথভাবে পালনের মাধ্যমে, অনুসরণ ও একমাত্র আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করার মাধ্যমে সেই পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছিলেন; তখন সে বুঝতে পারে যে এই বাস্তবতার চেয়ে সে অনেক বেশি শক্তিশালী। সে আল্লাহর সঙ্গ, তাঁর সুরক্ষা এবং তাঁর সাহায্যের অনুভূতি লাভ করে; ফলে তার হিসাব-নিকাশ পাল্টে যায়। সে বুঝতে পারে যে, এই অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হলো সেই পথ, যে পথে রাসূল (সা.) চলেছিলেন। সে বুঝতে পারে যে বিজয় একমাত্র আল্লাহর হাতে, পাশ্চাত্যের হাতে নয় বা তাদের দালাল শাসকদের হাতেও নয়। সে দেখতে পায় যে আল্লাহ তাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং তিনি তাঁর মুমিন বান্দাদের সাহায্য করেন, তারা যতই দুর্বল হোক না কেন বা তাদের ওপর যতই বিপদ আসুক না কেন। কুফরী রাষ্ট্রগুলোর শক্তি সম্পর্কে যতই বড়াই করা হোক না কেন— অতীতেও এমন বড়াই করা হয়েছিল— কিন্তু আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.)-কে নমরূদ থেকে, মূসা (আ.)-কে ফেরাউন থেকে, এবং হুদ, সালেহ, লূত (আ.) সহ অন্যান্য নবীদেরকে তাদের সম্প্রদায়ের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। হ্যাঁ, আজ মুসলিমদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে তাদের মুক্তি কেবল তাদের দ্বীনের মধ্যেই নিহিত। পাশ্চাত্য মূলত তাদের দ্বীনের কারণেই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে এবং তাদেরকে একই তীর ধনুক থেকে আঘাত করছে, তাই মুসলিমদেরও উচিত সকলে মিলে নিজেদের দ্বীন দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা।

    আজ রাসূল (সা.)-এর জন্মবার্ষিকী বা ইসলামের জন্মবার্ষিকীতে আমরা তাঁকে যে সবচেয়ে বড় উপহার দিতে পারি, তা হলো তাঁর দেখানো পরিবর্তনের পদ্ধতি অনুসরণ করা। তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড় কৃতজ্ঞতা হলো তাঁর সেই সুবাসিত জীবনীর দিকে ফিরে যাওয়া এবং সেই পথে চলার পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করা। মুসলিমদের জেনে রাখা উচিত যে, তাদের ওপর বিপদ, কষ্ট ও দুর্দশা যতই আসুক না কেন, তারা এমন এক ফিতনার সম্মুখীন হয়েছে যেখান থেকে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উদ্ধারকর্তা নেই, এবং তাকওয়া ছাড়া কোনো মুক্তি নেই। তা না হলে তাদের দুর্দশা কেবল বাড়তেই থাকবে এবং সেই সংকীর্ণ জীবন তাদের তাড়া করবে, যে সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

    (وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا )

    “আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন-জীবিকা হবে অত্যন্ত সংকীর্ণ।” [সূরা ত্বোয়া-হা: ১২৪]

    আজ মুসলিমদের সামনে একটিই সমাধান আছে, দ্বিতীয় কোনো পথ নেই। আর তা হলো একমাত্র আল্লাহর ওপর ঈমানের ভিত্তিতে তাদের সমস্যার সমাধানের জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং তাদের সামনে একটিমাত্র লক্ষ্য নির্ধারণ করা: তা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকারী খিলাফতে রাশিদাহ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যা প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সুস্পষ্ট ও অকাট্য নির্দেশ দিয়েছেন। আর এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় কেবল তাঁরই সাহায্য চাওয়া, পূর্ব-পশ্চিম কারো দিকে না ঝুঁকা। কারণ আল্লাহ কখনোই শাসন ও আনুগত্যে অন্য কাউকে শরিক করা পছন্দ করেন না। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

    (مَا لَهُمْ مِنْ دُونِهِ مِنْ وَلِيٍّ وَلَا يُشْرِكُ فِي حُكْمِهِ أَحَدًا )

    “তিনি ছাড়া তাদের কোনো অভিভাবক নেই এবং তিনি তাঁর কর্তৃত্বে (হুকুমে) কাউকে শরীক করেন না।” [সূরা কাহফ: ২৬]

    সত্য কেবল এই দ্বীনের মাঝেই নিহিত, আর এছাড়া যা কিছু আছে সবই ভ্রষ্টতা ও মূর্খতা (জাহেলিয়াত)। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

    (فَذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمُ الْحَقُّ فَمَاذَا بَعْدَ الْحَقِّ إِلَّا الضَّلَالُ فَأَنَّى تُصْرَفُونَ )

    “তিনিই আল্লাহ, তোমাদের সত্য রব। সুতরাং সত্যের পর ভ্রষ্টতা ছাড়া আর কী থাকতে পারে? অতএব তোমাদের কোথায় ফেরানো হচ্ছে?” [সূরা ইউনূস: ৩২]

    মহান আল্লাহ আরও বলেন:

    (أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ )

    “তারা কি তবে জাহেলিয়াতের বিচার-ফয়সালা কামনা করে? নিশ্চিত বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য ফয়সালা প্রদানে আল্লাহর চেয়ে কে বেশি উত্তম?” [সূরা মায়েদাহ: ৫০]

    যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর কিতাবের দিকে দৃষ্টিপাত করবে, সে দেখতে পাবে যে আজ মুসলিমরা এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যা আমাদের প্রিয় রাসূল (সা.) এবং পূর্ববর্তী সম্মানিত নবীগণের (আ.) জীবনের পরিস্থিতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। আল্লাহ তাদেরকে আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ বানিয়েছেন; যাতে আমরা তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করি, তাদের কাজের অনুকরণ করি এবং তাদের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিই… হযরত ইব্রাহিম (আ.)-ও এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন যখন তিনি একাই তাঁর সম্প্রদায়ের মোকাবিলা করেছিলেন এবং তাদের মূর্তি ভেঙে তাদের চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তখন আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করেছিলেন এবং তাদের শাসকের আগুনকে তাঁর জন্য শীতল ও শান্তিদায়ক করে দিয়েছিলেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

    (قُلْنَا يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ )

    “আমি বললাম, হে আগুন! তুমি ইব্রাহিমের জন্য শীতল ও শান্তিদায়ক হয়ে যাও।” [সূরা আম্বিয়া: ৬৯]

    হযরত মূসা (আ.) এবং তাঁর সঙ্গী দুর্বল মুমিনরাও অনুরূপ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন, যখন তারা অস্ত্রে সজ্জিত ফেরাউনের শক্তিশালী বাহিনীর মুখোমুখি হয়েছিলেন। আল্লাহ অত্যন্ত অন্ধকার পরিস্থিতিতে তাঁকে দেওয়া বিজয়ের প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছিলেন এবং কীলক বিশিষ্ট ফেরাউনকে ধ্বংস করেছিলেন। মহিমান্বিত আল্লাহ বলেন:

    (فَلَمَّا تَرَاءَى الْجَمْعَانِ قَالَ أَصْحَابُ مُوسَى إِنَّا لَمُدْرَكُونَ (61) قَالَ كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ (62) فَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنِ اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْبَحْرَ فَانْفَلَقَ فَكَانَ كُلُّ فِرْقٍ كَالطَّوْدِ الْعَظِيمِ )

    “অতঃপর যখন উভয় দল পরস্পরকে দেখল, মূসার সঙ্গীরা বলল, আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম। মূসা বলল, কখনোই নয়! নিশ্চয়ই আমার সাথে আমার রব আছেন, তিনি আমাকে পথ দেখাবেন। অতঃপর আমি মূসাকে ওহী করলাম, তোমার লাঠি দিয়ে সাগরে আঘাত করো। ফলে তা বিভক্ত হয়ে গেল এবং প্রতিটি ভাগ এক বিশাল পর্বতের মতো হয়ে গেল।” [সূরা শুআরা: ৬১-৬৩]

    আর এই যে আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ, যিনি রহমত ও যুদ্ধের নবী, খন্দক (আহযাব) যুদ্ধের সময় যখন কুফরের সমস্ত নেতারা রাসূল (সা.) এবং তাঁর সাথে থাকা মুমিনদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল দাওয়াতকে সমূলে উৎপাটন করার উদ্দেশ্যে- ঠিক যেমনটি আজ মুসলিমদের ক্ষেত্রে ঘটছে। তখন তাঁর রব মুমিনদের অবস্থা কতটা কঠিন ছিল তা বর্ণনা করে সূরা আহযাবে বলেন:

    ( يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَاءَتْكُمْ جُنُودٌ فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا وَجُنُودًا لَمْ تَرَوْهَا وَكَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرًا (9) إِذْ جَاءُوكُمْ مِنْ فَوْقِكُمْ وَمِنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَبَلَغَتِ الْقُلُوبُ الْحَنَاجِرَ وَتَظُنُّونَ بِاللَّهِ الظُّنُونَا (10) هُنَالِكَ ابْتُلِيَ الْمُؤْمِنُونَ وَزُلْزِلُوا زِلْزَالًا شَدِيدًا)

    “হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের ওপর চড়াও হয়েছিল। তখন আমি তাদের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলাম ঝঞ্ঝাবায়ু এবং এমন বাহিনী, যা তোমরা দেখোনি। তোমরা যা কিছু করো, আল্লাহ তা দেখেন। যখন তারা তোমাদের ওপর ও নিচ থেকে আক্রমণ করেছিল, যখন তোমাদের চোখ স্থির হয়ে গিয়েছিল, প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়েছিল এবং তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানা ধারণা পোষণ করছিলে। সেখানে মুমিনগণ পরীক্ষিত হয়েছিল এবং তারা ভীষণভাবে প্রকম্পিত হয়েছিল।” [সূরা আহযাব: ৯-১১]

    অতঃপর আল্লাহ তায়ালা এই সূরার মাঝখানে বলেন:

    (لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا )

    “তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালের আশা রাখে এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে, তাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” [সূরা আহযাব: ২১]

    এরপর মহান সত্তা আরও বলেন:

    (وَلَمَّا رَأَى الْمُؤْمِنُونَ الْأَحْزَابَ قَالُوا هَذَا مَا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَصَدَقَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَمَا زَادَهُمْ إِلَّا إِيمَانًا وَتَسْلِيمًا (22) مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ فَمِنْهُمْ مَنْ قَضَى نَحْبَهُ وَمِنْهُمْ مَنْ يَنْتَظِرُ وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِيلًا (23) لِيَجْزِيَ اللَّهُ الصَّادِقِينَ بِصِدْقِهِمْ وَيُعَذِّبَ الْمُنَافِقِينَ إِنْ شَاءَ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَحِيمًا (24) وَرَدَّ اللَّهُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِغَيْظِهِمْ لَمْ يَنَالُوا خَيْرًا وَكَفَى اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ الْقِتَالَ وَكَانَ اللَّهُ قَوِيًّا عَزِيزًا (25) وَأَنْزَلَ الَّذِينَ ظَاهَرُوهُمْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ مِنْ صَيَاصِيهِمْ وَقَذَفَ فِي قُلُوبِهِمُ الرُّعْبَ فَرِيقًا تَقْتُلُونَ وَتَأْسِرُونَ فَرِيقًا (26) وَأَوْرَثَكُمْ أَرْضَهُمْ وَدِيَارَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ وَأَرْضًا لَمْ تَطَئُوهَا وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرًا )

    “আর মুমিনরা যখন সম্মিলিত বাহিনীকে দেখল, তখন তারা বলে উঠল, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তো আমাদেরকে এরই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্যই বলেছেন।’ আর এতে তাদের ঈমান ও আত্মসমর্পণ কেবল বৃদ্ধিই পেয়েছিল। মুমিনদের মধ্যে এমন কিছু মানুষ রয়েছে, যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার সত্যে পরিণত করেছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের লক্ষ্য পূরণ করেছে (শাহাদাত বরণ করেছে), আর কেউ কেউ অপেক্ষায় আছে। তারা তাদের অঙ্গীকারে সামান্যতমও পরিবর্তন করেনি। যাতে আল্লাহ সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদিতার জন্য পুরস্কৃত করেন এবং মুনাফিকদেরকে ইচ্ছা করলে শাস্তি দেন অথবা তাদের তওবা কবুল করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর আল্লাহ কাফিরদেরকে তাদের ক্রোধসহ ফিরিয়ে দিয়েছেন, তারা কোনো কল্যাণ লাভ করতে পারেনি। মুমিনদের যুদ্ধের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট হয়েছেন এবং আল্লাহ চরম শক্তিধর, মহাপরাক্রমশালী। আর কিতাবীদের মধ্যে যারা তাদেরকে (কাফিরদের) সাহায্য করেছিল, তাদেরকে তিনি তাদের দুর্গ থেকে নামিয়ে আনলেন এবং তাদের অন্তরে আতঙ্ক ঢুকিয়ে দিলেন। ফলে তোমরা তাদের একদলকে হত্যা করছ এবং আরেক দলকে বন্দি করছ। আর তিনি তোমাদেরকে তাদের ভূমি, ঘরবাড়ি ও সম্পদের উত্তরাধিকারী করেছেন এবং এমন এক ভূমিরও (অধিকারী করেছেন) যেখানে তোমরা এখনো পা রাখোনি। আর আল্লাহ সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।” [সূরা আহযাব: ২২-২৭]

    হুনায়নের যুদ্ধে আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূল এবং মুমিনদের উদ্দেশ্য করে বলেন:

    (لَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ فِي مَوَاطِنَ كَثِيرَةٍ وَيَوْمَ حُنَيْنٍ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنْكُمْ شَيْئًا وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَّيْتُمْ مُدْبِرِينَ (25) ثُمَّ أَنْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَى رَسُولِهِ وَعَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَأَنْزَلَ جُنُودًا لَمْ تَرَوْهَا وَعَذَّبَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَذَلِكَ جَزَاءُ الْكَافِرِينَ )

    “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে বহু ক্ষেত্রে সাহায্য করেছেন এবং হুনায়নের দিনেও, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে উৎফুল্ল করেছিল; কিন্তু তা তোমাদের কোনো কাজেই আসেনি এবং পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের জন্য তা সঙ্কুচিত হয়ে গিয়েছিল। এরপর তোমরা পিঠ দেখিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলে। তারপর আল্লাহ তাঁর রাসূল ও মুমিনদের ওপর তাঁর প্রশান্তি নাজিল করলেন এবং এমন বাহিনী পাঠালেন যা তোমরা দেখতে পাওনি। আর তিনি কাফিরদের শাস্তি দিলেন; এটাই কাফিরদের প্রতিফল।” [সূরা তাওবাহ: ২৫-২৬]

    বদরের যুদ্ধ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন:

    (وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ بِبَدْرٍ وَأَنْتُمْ أَذِلَّةٌ فَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ (123) إِذْ تَقُولُ لِلْمُؤْمِنِينَ أَلَنْ يَكْفِيَكُمْ أَنْ يُمِدَّكُمْ رَبُّكُمْ بِثَلَاثَةِ آلَافٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ مُنْزَلِينَ (124) بَلَى إِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا وَيَأْتُوكُمْ مِنْ فَوْرِهِمْ هَذَا يُمْدِدْكُمْ رَبُّكُمْ بِخَمْسَةِ آلَافٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ مُسَوِّمِينَ (125) وَمَا جَعَلَهُ اللَّهُ إِلَّا بُشْرَى لَكُمْ وَلِتَطْمَئِنَّ قُلُوبُكُمْ بِهِ وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ )

    “আর আল্লাহ বদরের যুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করেছিলেন যখন তোমরা ছিলে হীনবল। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারো। যখন তুমি মুমিনদের বলছিলে, ‘তোমাদের জন্য কি এটা যথেষ্ট নয় যে, তোমাদের রব তিন হাজার ফেরেশতা অবতীর্ণ করে তোমাদের সাহায্য করবেন?’ হ্যাঁ, যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, আর তারা (শত্রুরা) এখনই তোমাদের ওপর চড়াও হয়, তবে তোমাদের রব সুনির্দিষ্ট চিহ্নধারী পাঁচ হাজার ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের সাহায্য করবেন। আর আল্লাহ এটি কেবল তোমাদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ করেছেন, যাতে তোমাদের অন্তর প্রশান্তি লাভ করে। আর সাহায্য তো কেবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।” [সূরা আলে ইমরান: ১২৩-১২৬]

    যুগে যুগে মুমিনদের প্রতি আল্লাহর সাহায্যের সম্পূর্ণ চিত্রটি সংক্ষেপে তুলে ধরে এমন আয়াতও রয়েছে, আল্লাহ তায়ালা বলেন:

    (أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِعَادٍ (6) إِرَمَ ذَاتِ الْعِمَادِ (7) الَّتِي لَمْ يُخْلَقْ مِثْلُهَا فِي الْبِلَادِ (8) وَثَمُودَ الَّذِينَ جَابُوا الصَّخْرَ بِالْوَادِ (9) وَفِرْعَوْنَ ذِي الْأَوْتَادِ (10) الَّذِينَ طَغَوْا فِي الْبِلَادِ (11) فَأَكْثَرُوا فِيهَا الْفَسَادَ (12) فَصَبَّ عَلَيْهِمْ رَبُّكَ سَوْطَ عَذَابٍ (13) إِنَّ رَبَّكَ لَبِالْمِرْصَادِ )

    “তুমি কি দেখোনি তোমার রব আদ জাতির সাথে কী আচরণ করেছিলেন? সুউচ্চ স্তম্ভবিশিষ্ট ইরাম গোত্রের সাথে? যাদের মতো অন্য কাউকে কোনো দেশে সৃষ্টি করা হয়নি? এবং সামূদ জাতির সাথে, যারা উপত্যকায় পাথর কেটে গৃহ নির্মাণ করত? এবং কীলক বিশিষ্ট (বিশাল বাহিনীর অধিকারী) ফেরাউনের সাথে? যারা দেশে সীমালঙ্ঘন করেছিল। এবং সেখানে প্রচুর ফাসাদ (বিপর্যয়) সৃষ্টি করেছিল। অতঃপর তোমার রব তাদের ওপর শাস্তির কশাঘাত হানলেন। নিশ্চয়ই তোমার রব সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।” [সূরা ফজর: ৬-১৪]

    অতএব, আমরা যদি চাই যে আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন— আর আল্লাহ ছাড়া কোনো সাহায্যকারী নেই— তবে আমাদের অবশ্যই তাঁর শর্ত পূরণ করতে হবে: শক্তিশালী ঈমান, সঠিক আনুগত্য, একমাত্র তাঁর ওপর উত্তম তাওয়াক্কুল (নির্ভরতা), একমাত্র তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা এবং তাঁর নির্দেশের ওপর সুন্দর ধৈর্য ধারণ করা… আর একইসাথে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও দিকে হাত না বাড়ানো।

    পরিশেষে আমরা বলব: এই দাওয়াত ততদিন বিজয়ী হবে না, যতদিন না ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা (আহলে কুওয়াহ) একে সাহায্য করবে, ঠিক যেমনটি মদীনার আনসারগণ রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সাহায্য করেছিলেন। আর এর জন্য প্রয়োজন সশস্ত্র দলগুলোর নেতাদের কেবল বিদ্রোহী না হয়ে ‘আহলে নুসরাহ’ বা সাহায্যকারীতে পরিণত হওয়া, এবং সামরিক বাহিনীর অফিসারদের (যারা দলত্যাগ করেছেন অথবা যারা এখনও চাকরিতে বহাল আছেন) আল্লাহর হুকুম কায়েমের জন্য দাওয়াতি দলের সাথে যুক্ত হওয়া, যাতে উভয়ের সমন্বয়ে কাজটি পূর্ণতা পায়। এই পূর্ণতা শরিয়তের দৃষ্টিতে অত্যাবশ্যকীয়, তা সিরিয়াতে হোক বা অন্য কোথাও… আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যদি আমাদের বিজয় দান করেন, তবে সমগ্র বিশ্ব বদলে যাবে। এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সাধারণ মুসলিমরা এর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এবং আমরা আজ যা নিয়ে কথা বলছি তাতেই পশ্চিমা বিশ্ব চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। অতএব, আসুন আমরা এই মহৎ কাজের দিকে মুসলিমদেরকে আহ্বান জানাই, যে কাজে মহান আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন, যাতে পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়।

  • কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সার্বভৌম সাইবার নিরাপত্তা

    কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সার্বভৌম সাইবার নিরাপত্তা

    আমি এই কথাগুলো লিখছি এবং আমি জানি যে এর বেশিরভাগই খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সবার কাছে পরিচিত বলে মনে হবে; কারণ এই ক্ষেত্রে পরিবর্তনের গতি আমাদের নথিভুক্ত করার সক্ষমতার চেয়েও অনেক দ্রুত। এটি এখন আর কেবল গবেষণার বিষয় হয়ে থাকেনি, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রকৃতপক্ষে সাইবার যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশ করেছে এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়ের সাথে জড়িয়ে গেছে। আজ যে রাষ্ট্র নিজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিলম্ব করবে, সে কেবল একটি বা দুটি ব্যবস্থা হারাবে না, বরং যে মুহূর্তে তার সার্বভৌম সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে, ঠিক তখনই সে তার কৌশলগত অবস্থান ও সক্ষমতার পুরো পরিধিটাই হারিয়ে ফেলবে। যদিও এর প্রস্তুতির ব্যয় অনেক বেশি, তবুও সময়মতো প্রস্তুতি না নেওয়ার অনুশোচনা ভবিষ্যতে অত্যন্ত চড়া মূল্যে পরিশোধ করতে হবে।

    কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে খেলার নিয়ম বদলে দিয়েছে?

    কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রকারভেদ নিয়ে একটি সাধারণ বিভ্রান্তি রয়েছে, যা সম্ভাব্য হুমকিগুলো বোঝার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। সাধারণ মানুষের বোঝার সুবিধার্থে আমরা এদের মধ্যে পার্থক্য এভাবে করতে পারি:

    – ডিসক্রিমিনেটিভ বা বিভেদক এআই (Discriminative AI): এটি তুলনামূলকভাবে পুরোনো এবং সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত। এর কাজ হলো বিভিন্ন বিষয় বাছাই ও শ্রেণিবদ্ধ করা। এটি ইনবক্সের সেই ফিল্টারগুলোর মতো, যা অনাকাঙ্ক্ষিত স্প্যাম ইমেইল শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলাদা করে দেয়।

    – জেনারেটিভ এআই (Generative AI): সাম্প্রতিক মডেলগুলোতে আমরা যা দেখতে পাই, যেমন চ্যাটজিপিটি (ChatGPT)। এটি নতুন বিষয় উদ্ভাবনে সক্ষম এবং যেসব ডেটা দিয়ে একে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তা থেকে সম্পূর্ণ নতুন কনটেন্ট বা উপাদান তৈরি করতে পারে।

    জেনারেটিভ মডেলের পূর্বে সাইবার হামলার জন্য নজরদারি ও অনুসন্ধানের কাজে সুসংগঠিত দল এবং বিপুল বাজেটের প্রয়োজন হতো। ফলে আক্রমণের সক্ষমতা কেবল পরাশক্তি রাষ্ট্রগুলো এবং হাতে গোনা কয়েকটি নির্দিষ্ট দলের হাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে এআই আক্রমণাত্মক কাজের খরচ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দিয়েছে। ফলে সামান্য খরচেই মাঝারি দক্ষতার ছোট কোনো দল বা একক কোনো ব্যক্তির পক্ষেও মারাত্মক ক্ষতিসাধন করা সম্ভব হয়ে উঠেছে।

    আক্রমণাত্মক কৌশলের প্রধান পরিবর্তনসমূহ:

    – স্মার্ট নজরদারি (Intelligent Reconnaissance): ভুক্তভোগীর তথ্য সংগ্রহ এবং হামলার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরিতে আগে মানুষের যেখানে কয়েক সপ্তাহ লাগত, এখন ডিজিটাল এজেন্টরা মাত্র কয়েক ঘণ্টায় তা সম্পন্ন করে ফেলছে, যা বর্তমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়।

    – স্বয়ংক্রিয়ভাবে ত্রুটি ও দুর্বলতা তৈরি (Automated Vulnerability Generation): এআই টুলগুলো সফটওয়্যারের দুর্বলতা খুঁজে বের করে এবং লক্ষ্যবস্তু প্রতিষ্ঠানটি তাদের সিস্টেম মেরামতের সুযোগ পাওয়ার আগেই রেকর্ড সময়ের মধ্যে সেই দুর্বলতাকে কার্যকর হ্যাকিং কোডে রূপান্তর করে ফেলে।

    – স্মার্ট টার্গেটেড ফিশিং (Smart Spear-Phishing): দুর্বল ও অপরিপক্ব প্রতারণামূলক বার্তার দিন শেষ। এআই এখন লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তির ডিজিটাল পদচিহ্ন (Digital Footprint) এবং তার বার্তা আদান-প্রদানের ধরন বিশ্লেষণ করে এমন নিখুঁত বার্তা তৈরি করে, যা শনাক্ত করা অত্যন্ত অভিজ্ঞদের পক্ষেও কঠিন।

    – ডিপফেক (Deepfake): এটি এখন আর পরীক্ষামূলক প্রদর্শনের পর্যায়ে নেই। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের অডিও নমুনা নিয়েই কারও কণ্ঠ অবিকল নকল করা যায় এবং ভুক্তভোগীদের বিভ্রান্ত করে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন করাতে ভুয়া অডিও বা ভিডিও কল করা সম্ভব হচ্ছে।

    – বহুরূপী ম্যালওয়্যার (Polymorphic Malware): এমন ক্ষতিকর সফটওয়্যার যা প্রতিবার স্থানান্তরের সাথে সাথে নিজের রূপ ও কোড বদলে ফেলে। এটি চিরাচরিত শনাক্তকরণ ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করে এবং কোনো ধরনের ধরা পড়া ছাড়াই সিস্টেমের ভেতরে টিকে থাকতে সাহায্য করে।

    কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার “মস্তিষ্কে” হামলা

    এখানে একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে; এখন আর কেবল নেটওয়ার্ক সিস্টেম মূল লক্ষ্য নয়, বরং খোদ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মস্তিষ্কই লক্ষ্যবস্তু। এই আক্রমণগুলো মূলত তিনটি রূপ নেয়:

    ১. ইচ্ছাকৃতভাবে এআই-কে ভুল তথ্য সরবরাহ করা বা ডেটা পয়জনিং (Data Poisoning): আক্রমণকারী প্রশিক্ষণ পর্যায়েই বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রবেশ করিয়ে দেয়। ফলে কেউ কিছু বোঝার আগেই সিস্টেমটি একটি ত্রুটিপূর্ণ যুক্তি বা সিদ্ধান্তে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ: নির্মাণ চুক্তি নিরীক্ষার একটি সিস্টেমকে গোপনে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো যাতে নির্দিষ্ট কিছু চুক্তিতে বিলম্বজনিত জরিমানা উপেক্ষা করা হয়।

    ২. স্মার্ট বানোয়াট ইনপুট দিয়ে সিস্টেমকে বিভ্রান্ত করা বা অ্যাডভারসেরিয়াল অ্যাটাক (Adversarial Attacks): প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হওয়ার পর, আক্রমণকারী অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিবর্তিত ইনপুট নিয়ে আসে যা মডেলকে ধোঁকা দেয়। যেমন—একটি ভাইরাস ফাইলের সামান্য পরিবর্তন করা যাতে সুরক্ষা ব্যবস্থা একে সাধারণ টেক্সট ফাইল হিসেবে রিড করে, অথবা কোনো ছবিতে এমন সামান্য পরিবর্তন আনা যা ফেস রিকগনিশন সিস্টেমকে বিভ্রান্ত করে দেয়।

    ৩. সিস্টেমের গোপনীয়তা ও অভ্যন্তরীণ ডেটা চুরি বা মডেল এক্সট্রাকশন (Model Extraction): সংবেদনশীল ডেটা পুনরুদ্ধার করা বা স্বয়ং অ্যালগরিদম চুরি করা। সিস্টেমটি যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক গোপনীয়তার ওপর প্রশিক্ষিত হয়ে থাকে, তবে আক্রমণকারী চতুর অনুসন্ধানের (Smart Queries) মাধ্যমে কৌশল খাটিয়ে সেই গোপনীয়তা ফাঁস করিয়ে নিতে পারে।

    ঝড়ের মুখে গুরুত্বপূর্ণ খাতসমূহ: বিপর্যয়ের রূপ কেমন হতে পারে?

    সব সিস্টেমের গুরুত্ব সমান নয়। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষাই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। এখানে চারটি বাস্তবসম্মত দৃশ্যপট তুলে ধরা হলো যা দেখায় কীভাবে এআই বিপদের রূপ বদলে দিতে পারে:

    দৃশ্যপট ১: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি গ্রিডের বিপর্যয়

    শিল্প নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার (Industrial Control Systems) দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে এআই-এর সমন্বয়ে একই সাথে একাধিক সাবস্টেশনে সমন্বিত হামলা চালানো হলো। কয়েক মিনিটের মধ্যে একের পর এক ব্যর্থতা শুরু হবে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো দেশ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়বে। হাসপাতাল ও ডেটা সেন্টারের ব্যাকআপ ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়ে যাবে। আসল দুর্যোগ কেবল অন্ধকারে নয়, বরং এর ফলে যোগাযোগ, ব্যাংকিং এবং ইলেকট্রনিক পেমেন্ট সিস্টেম তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়বে। এআই-নির্ভর সংস্করণে এই লড়াই ২০১৫ সালে ইউক্রেনে ঘটা “পয়েন্ট বনাম পয়েন্ট“-এর মতো নয়, বরং এটি হলো “অ্যালগরিদম বনাম অ্যালগরিদম”, যা রিয়েল-টাইমে প্রতিরক্ষার সাথে খাপ খাইয়ে একাধিক আঘাতের সমন্বয় ঘটাতে পারে।

    দৃশ্যপট ২: ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থার স্থবিরতা

    উচ্চপদস্থ আর্থিক কর্মকর্তার কণ্ঠে ডিপফেক কল দিয়ে শুরু হওয়া একটি বহুমাত্রিক আক্রমণ, যার সাথে যুক্ত হয় ব্যাংক সেটেলমেন্ট সিস্টেমে আঘাত হানা র‍্যানসমওয়্যার। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাৎক্ষণিক লেনদেন বন্ধ হয়ে যাবে এবং এক দিনের মধ্যে মানুষ এটিএম-এর সামনে লাইন দিয়ে টাকা তুলতে শুরু করবে (Bank Run)। একই সাথে স্বয়ংক্রিয় বট অ্যাকাউন্টগুলো থেকে জাতীয় মুদ্রার ওপর আস্থা নষ্ট করার মতো গুজব ছড়ানো হবে। এটি আমাদের ২০২২ সালের কোস্টারিকার কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন একটি র‍্যানসমওয়্যার আক্রমণ পুরো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে অচল করে দিয়েছিল এবং জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু এআই-এর উপস্থিতিতে এটি কেবল পরিচালনগত স্থবিরতা থাকে না, বরং পূর্ণাঙ্গ মুদ্রা সার্বভৌমত্বের সংকটে রূপ নেয়।

    দৃশ্যপট ৩: সামাজিক আস্থা ও তথ্যক্ষেত্রের ক্ষয়সাধন

    এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক দৃশ্যপট; কারণ এতে কোনো প্রযুক্তিগত হ্যাকিংয়ের প্রয়োজন হয় না, বরং ইন্টারনেটের উন্মুক্ত প্রকৃতির সুযোগ নেওয়া হয়। এআই হাজার হাজার সমন্বিত বট অ্যাকাউন্ট তৈরি করে, যা কর্মকর্তাদের নিখুঁত ভুয়া ডিপফেক ভিডিও এবং সুপরিচিত গণমাধ্যমের আদলে লেখা নিবন্ধ প্রচার করে। এর উদ্দেশ্য সবাইকে বিশ্বাস করানো নয়, বরং একটি সর্বজনীন সন্দেহের পরিবেশ তৈরি করা—যেখানে নাগরিকরা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে সংকট মোকাবিলার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পঙ্গু হয়ে যায় এবং যেকোনো সরকারি বিবৃতিই সন্দেহের মুখে পড়ে। গবেষকরা একে “মিথ্যাবাদীর মুনাফা” (Liar’s Dividend) বলে থাকেন এবং এর ঘটার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।

    দৃশ্যপট ৪: অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ

    ড্রোন এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার বিস্তারের সাথে সাথে ড্রোন বহরকে অচল করে দেওয়া বা এটিকে তার মালিকের বিরুদ্ধেই পরিচালনা করার হুমকি তৈরি হয়েছে। এর জন্য সফটওয়্যার সাপ্লাই চেইনে অনুপ্রবেশ বা লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ ডেটায় বিষপ্রয়োগ (Data Poisoning) করতে হয়। বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে নেভিগেশন সিস্টেমে জ্যামিংয়ের কারণে ড্রোন নিজ বাহিনীর ওপরই ফিরে আসার ঘটনা দেখা গেছে। এআই হামলার অগ্রগতির সাথে সাথে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া সম্ভব যেখানে রাডার নিজের বাহিনীকে শত্রু এবং শত্রুকে মিত্র হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করতে শুরু করবে।

    একটি রাষ্ট্র কি সত্যিই এভাবে ভেঙে পড়তে পারে?

    পতনের ধরনের ওপর ভিত্তি করে এর উত্তর ভিন্ন হয়:

    – হঠাৎ ও সম্পূর্ণ পতন: এর সম্ভাবনা কম; কারণ আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর একাধিক স্তরের ব্যাকআপ ব্যবস্থা রয়েছে যা সব খাতকে একবারে ধসে পড়া থেকে রক্ষা করে। সামরিক বাহিনী বিচ্ছিন্ন নেটওয়ার্কে কাজ করে এবং অবকাঠামোগুলোতে ম্যানুয়াল বা হস্তচালিত ব্যবস্থা থাকে।

    – ধাপে ধাপে বহুমুখী স্থবিরতা: এর সম্ভাবনা অনেক বেশি। একটি সমন্বিত আক্রমণ যদি কয়েক দিনের ব্যবধানে ধারাবাহিকভাবে তিন বা চারটি খাতে আঘাত হানে এবং তার সাথে গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক প্রচার চালানো হয়, তবে তা রাষ্ট্রকে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। এ দুইয়ের পার্থক্য হলো বিস্ফোরণ ও নিরব ক্ষয়কারী আগুনের মধ্যকার পার্থক্যের মতো। একটি রাষ্ট্র হয়তো ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কয়েক মাসে কাটিয়ে উঠতে পারে, কিন্তু সাইবার আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে বছরের পর বছর সময় লাগে।

    ত্রিমুখী সুরক্ষাপ্রাচীর: রাষ্ট্র কীভাবে তার সার্বভৌমত্ব ও সিদ্ধান্ত রক্ষা করবে?

    কার্যকর প্রতিরক্ষা বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে গড়ে ওঠে না, বরং একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে গড়ে ওঠে যা তিনটি মৌলিক স্তম্ভের সমন্বয় ঘটায়:

    স্তম্ভমূল ক্ষেত্রদায়িত্ব ও বাস্তবায়ন
    ১. শাসন ও আইন প্রণয়নসংগঠন (Organization)একটি স্বাধীন সাইবার নিরাপত্তা ও এআই কর্তৃপক্ষ গঠন করা, যার অধীনে একটি সাইবার কমান্ড থাকবে এবং যা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকবে। এর কাজ হবে সংবেদনশীল খাতের জন্য ন্যূনতম মান ও সুরক্ষানীতি বাধ্যতামূলক করা।
    ২. প্রযুক্তিগত সক্ষমতাযন্ত্র (Machine)সার্বভৌমত্বের অর্থ হলো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। এর মধ্যে রয়েছে স্পর্শকাতর সরকারি ডেটা সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য নিজস্ব স্বাধীন ক্লাউড অবকাঠামো, বিশেষায়িত কম্পিউটিং কেন্দ্র এবং স্থানীয় তথ্যে প্রশিক্ষিত এআই মডেল তৈরি।
    ৩. মানবসম্পদমানুষ (Human)দক্ষ জনবল ছাড়া প্রযুক্তি একটি ফাঁকা কাঠামোর মতো। সফল পরিকল্পনা মানুষকে সামনে রাখে; যেখানে গোয়েন্দা, প্রকৌশল, মনোবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মতো বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞ গড়ে তুলে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা ও আক্রমণাত্মক ব্যবস্থা তৈরি করা হয়।

    রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা ও বিশেষ প্রোটোকল

    “প্রতিরক্ষামূলক এআই বাহিনী”র মূল ভিত্তি হলো এই বাস্তবতা যে—শুধু মানুষের ধীরগতির মস্তিষ্ক দিয়ে দ্রুতগতির যন্ত্রের মোকাবিলা করা অসম্ভব। আক্রমণগুলো বিদ্যুৎগতিতে ঘটে, পর্দার পেছনের সাধারণ কর্মীদের পক্ষে তা ঠেকানো সম্ভব নয়; বরং এমন প্রতিরক্ষামূলক “অটোমেশন” প্রয়োজন যা সেকেন্ডের ভগ্নাংশে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। এই কাঠামোটি তিনটি ভাগে বিভক্ত:

    প্রথমত: স্মার্ট ডিজিটাল সিস্টেম

    – স্মার্ট অপারেশন সেন্টার: এমন একটি নজরদারি কেন্দ্র যা হাজার হাজার অপ্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা ফিল্টার করে ছোটখাটো সমস্যা নিজে থেকেই সমাধান করবে এবং কেবল বড় ও সংবেদনশীল সিদ্ধান্তগুলো মানব পরিচালকের কাছে পাঠাবে।

    – প্রোঅ্যাকটিভ হান্টার (পূর্বসতর্ক শিকারি): সিস্টেমে আক্রমণ শুরুর আগেই অনুপ্রবেশকারীদের কোনো লুকানো চিহ্নের সন্ধানে ডিজিটাল এজেন্ট পাঠানো; কারণ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ সবসময় কম ব্যয়বহুল।

    – এথিক্যাল অফেনসিভ টেস্টিং টিম: এমন সফটওয়্যার ও হ্যাকারদের দল যাদের কাজ হবে শত্রুর আগেই দুর্বলতা খুঁজে বের করে তা মেরামতের জন্য রাষ্ট্রের সিস্টেমগুলোতে ক্রমাগত আক্রমণ পরিচালনা করা।

    দ্বিতীয়ত: ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব ও কনটেন্ট সুরক্ষা

    – ডিজিটাল সিল: গুজব এবং তথ্যের অস্পষ্টতা থেকে সমাজকে রক্ষা করতে অফিসিয়াল তথ্যের ওপর অদৃশ্য ডিজিটাল প্রমাণীকরণ রাখা; ফলে এই সিল ছাড়া যেকোনো বিবৃতি সরাসরি ভুয়া বলে গণ্য হবে।

    – প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা: এমন দেশীয় এআই তৈরি করা যা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি বোঝে এবং রাষ্ট্রের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করে; বাইরের কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভরশীল না হওয়া, যারা তথ্য ফাঁস করে দিতে পারে।

    তৃতীয়ত: রাষ্ট্র ও ব্যক্তির কৌশল

    – সার্বিক সাইবার মহড়া: ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করতে এবং ডিজিটাল জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেতাদের প্রস্তুত করতে কেবল টেকনিক্যাল দল নয়, বরং পুরো সরকারের যৌথ মহড়া।

    – জরুরি বিজনেস কন্টিনিউইটি পরিকল্পনা: প্রতিটি খাতের জন্য একটি বাৎসরিক পরীক্ষিত পরিকল্পনা রাখা, যার মধ্যে থাকবে সিস্টেম পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার পর ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে রূপান্তর ও বিকল্প যোগাযোগের স্পষ্ট রূপরেখা।

    – বহু উৎসভিত্তিক প্রযুক্তির রিজার্ভ: কেবল একটি প্রযুক্তি সরবরাহকারী বা একক কোনো দেশের ওপর নির্ভর না করা; কারণ এই ধরনের পরনির্ভরশীলতা একটি মারাত্মক কৌশলগত দুর্বলতা।

    – পূর্বনির্ধারিত স্থানীয় প্রতিক্রিয়া প্রোটোকল: পূর্বেই অনুমোদিত সাইবার জরুরি আইন বাস্তবায়নে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নির্দিষ্ট ক্ষমতার বিন্যাস রাখা; কারণ সংকটের মুহূর্ত কোনো প্রোটোকল লেখার উপযুক্ত সময় নয়।

    – সামাজিক নিরাপত্তা সংস্কৃতি: নিরবচ্ছিন্ন সচেতনতামূলক প্রচারণা, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষাক্রমে মৌলিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে প্রতিটি নাগরিকের সচেতনতাই হয় প্রথম প্রতিরক্ষা প্রাচীর।

    পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি (কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-পরবর্তী এনক্রিপশন)

    প্রচলিত সাইবার ধারণার বাইরে একটি আসন্ন হুমকি হলো অতিক্ষমতাধর “কোয়ান্টাম কম্পিউটার”। এগুলো পূর্ণতা পেলে সরকারি ডেটা সুরক্ষায় ব্যবহৃত বর্তমানের প্রায় সব এনক্রিপশন অ্যালগরিদম ভেঙে ফেলতে সক্ষম হবে। এর মারাত্মক ঝুঁকিটি ভবিষ্যতের জন্য তোলা নেই, বরং এখনই শত্রুদের এই কৌশলের মাধ্যমে ঘটছে: “এখন ফসল তোল, পরে ডিক্রিপ্ট করো” (Harvest Now, Decrypt Later)।

    শত্রুপক্ষ আজ সাবমেরিন কেবল ও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে প্রবাহিত এনক্রিপ্ট করা ডেটা রেকর্ড করে সংরক্ষণ করছে, ভবিষ্যতের সেই মুহূর্তটির অপেক্ষায়—যখন সুপার কোয়ান্টাম ডিভাইস দিয়ে সেই এনক্রিপশন ভেঙে ফেলা যাবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিকভাবে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন:

    ১. গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সিস্টেমে ব্যবহৃত অ্যালগরিদমগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা।

    ২. “সার্বভৌম বয়স” (যে সময় পর্যন্ত ডেটা সংবেদনশীল থাকে এবং সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য) অনুযায়ী তথ্যের শ্রেণিবিন্যাস করা।

    ৩. অনুমোদিত কোয়ান্টাম-নিরাপদ মানে ধাপে ধাপে রূপান্তর শুরু করা এবং প্রথম দিন থেকেই যেকোনো নতুন প্রযুক্তিকে ক্রিপ্টোগ্রাফিক স্থিতিস্থাপকতা (Crypto-agility) সমর্থনযোগ্য করে গড়ে তোলা।

    উপসংহার ও কৌশলগত সুপারিশ

    আজকের দিনে আসল হুমকি কোনো রাষ্ট্রের হঠাৎ পতন নয়, বরং সংকটকালে তার কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সংকুচিত করা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা নষ্ট করা। এই পরিবেশে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র ও পিছিয়ে পড়া রাষ্ট্রের মধ্যকার পার্থক্য তাদের সম্পদের পরিমাণে নয়, বরং তাদের ব্যবস্থাপনা ও মানসিকতার মধ্যে।

    যে রাষ্ট্র সাইবার নিরাপত্তা ও এআই-কে কেবল একটি প্রযুক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় বা আইটি বিভাগের ওপর ছেড়ে দেয়, তারা বহু প্রজন্ম পিছিয়ে পড়বে। পক্ষান্তরে, যে রাষ্ট্র এটিকে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায় থেকে পরিচালিত একটি সার্বভৌম বিষয় হিসেবে বিবেচনা করবে, তারাই প্রস্তুতি ও প্রভাব বিস্তারের অবস্থানে থাকবে। সুযোগের জানালাটি এখনই খোলা, কিন্তু যন্ত্রের দ্রুততম গতির কারণে এই ক্ষেত্রে মাত্র এক বছর পিছিয়ে পড়ার অর্থ অন্য যেকোনো ক্ষেত্রে পুরো এক দশক পিছিয়ে যাওয়া।

  • মক্কা চুক্তি: মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের মায়াজাল নাকি আমেরিকার কৌশলগত আধিপত্যের হাতিয়ার?

    মক্কা চুক্তি: মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের মায়াজাল নাকি আমেরিকার কৌশলগত আধিপত্যের হাতিয়ার?

    ১. প্রস্তাবনা: আবেগ বনাম বাস্তবতা

    সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক রাজনীতি এবং মুসলিম বিশ্বের জন্য অন্যতম একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা হলো পাকিস্তান, তুরস্ক এবং সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তি, যা ‘মক্কা প্যাক্ট’ বা ‘মক্কা চুক্তি’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। মক্কার পবিত্র ভূমিতে বসে, এহরাম পরিহিত অবস্থায় এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার ছবি যখন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন বিশ্বের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মনে আশার সঞ্চার হয়েছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো এবার ফিলিস্তিন, কাশ্মীর বা সিরিয়ার মজলুম মুসলিমদের রক্ষার্থে মুসলিম বিশ্ব এক হচ্ছে। পাকিস্তানের পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত রাস্তায় রাস্তায় এই চুক্তির সমর্থনে বিলবোর্ড টানানো হয়েছে। কিন্তু এই বাহ্যিক ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য এবং অপটিক্সের আড়ালে লুকিয়ে আছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা। এটি মূলত উম্মাহর ঐক্যের কোনো পদক্ষেপ নয়, বরং এটি পরাশক্তি আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদী বৈশ্বিক কৌশল বাস্তবায়নের একটি সুনিপুণ হাতিয়ার মাত্র।

    ২. সামরিক জোট গঠনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান স্ববিরোধিতা

    আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দুটি বা ততোধিক দেশের মধ্যে সামরিক জোট বা চুক্তি সাধারণত তখনই হয়, যখন তারা কোনো শক্তিশালী ও অভিন্ন শত্রুর সম্মুখীন হয়।

    – ইতিহাসের শিক্ষা: প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির আগ্রাসন ঠেকাতে ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং পরবর্তীতে রাশিয়া ও আমেরিকা মিত্রশক্তি গঠন করেছিল। বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের বৈশ্বিক সমাজতান্ত্রিক বিস্তৃতি ঠেকানোর জন্য আমেরিকা ও ইউরোপ মিলে তৈরি করেছিল ‘ন্যাটো’ (NATO)। এর জবাবে সোভিয়েত ব্লক তৈরি করেছিল ‘ওয়ারশ প্যাক্ট’ (Warsaw Pact)। অর্থাৎ, জোট গঠনের প্রধান শর্তই হলো একটি দৃশ্যমান, শক্তিশালী অভিন্ন হুমকি।

    – উম্মাহর সংকট ও জোটের অনুপস্থিতি: পাকিস্তান, তুরস্ক এবং সৌদি আরব আজ যে চুক্তি করল, তাদের সামনে সেই অভিন্ন শত্রুটি কে? গত ৬০-৭০ বছর ধরে ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমি ইহুদিবাদীদের দখলে, কাশ্মীর প্রায় সাত দশক ধরে দখলদারিত্বের শিকার। সেখানে তো কোনো জোট হয়নি! সিরিয়ায় ২০২১ সাল থেকে নতুন করে ইসরাইলি আগ্রাসন চলছে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে গত দুই বছর ধরে প্রতিনিয়ত বোমাবর্ষণ হচ্ছে, গাজাকে গত তিন বছর ধরে আক্ষরিক অর্থেই একটি উন্মুক্ত গোরস্থানে পরিণত করা হয়েছে। এর আগে আফগানিস্তানে ২০ বছর ধরে বোমাবর্ষণ করে লাখো মানুষ মারা হয়েছে, ইরাকে আগ্রাসন চালিয়ে সভ্যতা ধ্বংস করা হয়েছে। তখন এই তথাকথিত স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর শাসকরা কোথায় ছিলেন? কেন তখন ফিলিস্তিন বা আফগানিস্তানকে বাঁচানোর জন্য কোনো ‘মক্কা চুক্তি’ হয়নি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই এই চুক্তির আসল উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে যায়।

    ৩. চুক্তির নেপথ্যে আমেরিকার ‘বার্ডেন শেয়ারিং’ (বোঝা ভাগাভাগি) নীতি

    এর শেকড় খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ২০১১-২০১২ সালের ওবামা প্রশাসনের দিকে।

    – আমেরিকার সাম্রাজ্যিক ক্লান্তি: আফগানিস্তান ও ইরাকের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ আমেরিকার অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছিল। একদিকে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়, অন্যদিকে কফিনে মোড়ানো মার্কিন সৈন্যদের লাশ—আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছিল। ওবামা প্রশাসন তখন সিদ্ধান্ত নেয় “No further boots on ground” অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে আর কোনো মার্কিন সৈন্য সরাসরি যুদ্ধে নামবে না।

    – চীনের উত্থান ও আমেরিকার পলিসি শিফট: আমেরিকা যখন মধ্যপ্রাচ্যের অন্তহীন যুদ্ধে আটকে ছিল, সেই সুযোগে চীন প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তিতে নিজেদের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে গড়ে তোলে। আমেরিকার নীতি-নির্ধারকরা বুঝতে পারেন, মধ্যপ্রাচ্যে আটকে থাকলে তারা চীনের কাছে বৈশ্বিক নেতৃত্ব হারাবে।

    – ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’: আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চরম মেরুকরণ শুরু হয়। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (MAGA) আন্দোলন প্রশ্ন তোলে—কেন আমেরিকার জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পুরো বিশ্বের পুলিশিং করা হবে? কেন আমেরিকা ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে?

    – বার্ডেন শেয়ারিং বা বোঝা ভাগাভাগি: এই প্রেক্ষাপটেই জন্ম নেয় আমেরিকার নতুন নীতি ‘Burden Sharing’। এই নীতির মূল কথা হলো—আমেরিকা আর নিজে রক্ত বা অর্থ ব্যয় করবে না। তারা শুধুমাত্র গোয়েন্দা তথ্য (Intelligence), প্রযুক্তি (Technology) এবং কৌশলগত পরিকল্পনা (Strategic Planning) নিয়ন্ত্রণ করবে। আর যুদ্ধক্ষেত্রে রক্ত (Human Cost) দেবে তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা, ট্যাঙ্ক ও অস্ত্র কিনবে মিত্ররা এবং যুদ্ধের পুরো অর্থনৈতিক ব্যয়ভার (Financial Cost) বহন করবে মিত্র রাষ্ট্রগুলো।

    এই চুক্তির মাধ্যমে মূলত আমেরিকা তার অনুগত তিন মিত্র—পাকিস্তান, তুরস্ক এবং সৌদি আরবকে মধ্যপ্রাচ্যের পাহারাদারের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছে। আমেরিকা চাইছে এরা যেন তাদের হয়ে ইরানের প্রভাব ঠেকায় এবং অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখে, যাতে আমেরিকা নিশ্চিন্তে এশিয়া-প্যাসিফিকে চীনের দিকে মনোযোগ দিতে পারে।

    ৪. ধর্মীয় অনুভূতির নিপুণ ব্যবহার বনাম বাস্তবতার ভণ্ডামি

    চুক্তির নাম দেওয়া হয়েছে ‘মক্কা প্যাক্ট’। নেতারা এহরাম পরে ছবি তুলছেন। কিন্তু চুক্তির মূল খসড়া বা দলিলে কোথাও আল্লাহ বা রাসুল (সা.)-এর নাম নেই, নেই ইসলামি ভ্রাতৃত্বের কোনো উল্লেখ। সেখানে লেখা হয়েছে দেশগুলোর ‘ঐতিহাসিক সম্পর্কের’ কথা।

    এটি একটি নিছক রাজনৈতিক অপটিক্স বা জনসংযোগ কৌশল। আলোচকরা স্মরণ করিয়ে দেন যে, যদি এই শাসকরা সত্যিই তওবা করে উম্মাহর স্বার্থে এক হতেন, তবে ৬ আগস্ট রাতে চুক্তি স্বাক্ষরের পর ৭ আগস্ট তাদের ঘোষণা দেওয়ার কথা ছিল যে—”আমাদের যৌথ বাহিনী গাজা বা কাশ্মীরের দিকে মার্চ করছে।” কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে?

    – সৌদি আরব: তারা এখনও ইয়েমেনে বোমাবর্ষণ করছে। আমেরিকার নির্দেশে পেট্রো-ডলার টিকিয়ে রেখেছে।

    – তুরস্ক: তারা এখনও ইসরাইলের সাথে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরাইলি নাগরিকদের তুরস্কে প্রবেশের জন্য কোনো ভিসার প্রয়োজন হয় না। ন্যাটো সদস্য হিসেবে তারা পশ্চিমাদের অন্যতম প্রধান মিত্র।

    – পাকিস্তান: ‘ওয়ার অন টেরর’-এ আমেরিকার মিত্র হয়ে নিজ দেশের মানুষের ওপরই অভিযান চালিয়েছে। আমেরিকার সিগন্যাল পেয়ে কাশ্মীর নীতি থেকে সরে এসেছে।

    সুতরাং, এই চুক্তি উম্মাহর স্বার্থে নয়, বরং যেটুকু ইসলামি মোড়ক দিলে জনগণ খুশি থাকে এবং আমেরিকাও নারাজ হয় না, ঠিক ততটুকুই করা হয়েছে।

    ৫. ইসরাইল-ইরান সমীকরণ এবং ব্যালেন্স অফ পাওয়ার

    আমেরিকার কাছে ইসরাইল হলো মধ্যপ্রাচ্যের বুকে বসানো তাদের একটি বিশাল সামরিক ঘাঁটি (Military Base), যা আগে ব্রিটেনের ছিল। আমেরিকার মূল লক্ষ্য এই ঘাঁটিকে টিকিয়ে রাখা। কিন্তু অনেক সময় উগ্র ইসরাইলি নেতারা আমেরিকার বেঁধে দেওয়া সীমানা পার করে অতি-উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে ওঠে (যেমন গ্রেটার ইসরাইল গড়ার স্বপ্ন)। ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও মাঝে মাঝে ইসরাইলি নেতাদের ধমক দিয়ে লাইনে রাখতে হয়েছে।

    অন্যদিকে, ইরান সরাসরি আমেরিকার আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করেছে। আমেরিকা চাইছে মধ্যপ্রাচ্যে একটি ‘ব্যালেন্স অফ পাওয়ার’ বা ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করতে। একদিকে পাকিস্তান-তুরস্ক-সৌদি জোট, অন্যদিকে ইসরাইল, গ্রিস, সাইপ্রাস, আরব আমিরাত ও ভারতের আরেকটি অঘোষিত অক্ষ। আমেরিকা এই দুই পক্ষকে এমনভাবে ব্যালেন্স করতে চায়, যাতে কেউ মাত্রাতিরিক্ত শক্তিশালী না হয়, আবার কেউ ধ্বংসও না হয়। এতে করে আমেরিকাকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে হবে না, শুধু দূর থেকে কলকাঠি নাড়লেই চলবে।

    ৬. অতীতের ব্যর্থ জোটগুলোর করুণ ইতিহাস

    মুসলিম বিশ্বের নামে এর আগেও বহু জোট হয়েছে, যার প্রতিটিই চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

    – আরব লীগ (১৯৫০): তাদেরও মূলনীতি ছিল “একজনের ওপর আক্রমণ সবার ওপর আক্রমণ”। কিন্তু ১৯৬৭ ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধে এই জোট পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।

    – বাগদাদ প্যাক্ট (১৯৫৫): পশ্চিমা এজেন্ডায় তৈরি এই জোট ইরাকে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।

    – ওআইসি (OIC): বায়তুল মুকাদ্দাস রক্ষার প্রতিশ্রুতি নিয়ে তৈরি হলেও, ইসরাইল শত শত বার রেড লাইন ক্রস করার পরও ওআইসি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি।

    – ৩৪ দেশের সামরিক জোট: কয়েক বছর আগে জেনারেল রাহিল শরীফের নেতৃত্বে সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে যে জোট হয়েছিল, তার পেছনের সত্যটি ছিল ভয়াবহ। ওয়াশিংটন ডিসি থেকে একটি ফ্যাক্স আসে এবং কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই, রূপরেখা বা মেনিফেস্টো তৈরি হওয়ার আগেই পাকিস্তান ও সৌদি আরব তাতে স্বাক্ষর করে দেয়। অর্থাৎ, হুকুম এসেছিল আমেরিকা থেকে।

    এই ন্যাশন-স্টেট বা জাতিরাষ্ট্রভিত্তিক জোটগুলো ব্যর্থ হওয়ার মূল কারণ হলো ‘কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট’ বা স্বার্থের দ্বন্দ্ব। যখনই তুরস্ক বা সৌদি আরবের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ (যেমন ভারতের সাথে বাণিজ্য বা ন্যাটোর সাথে সম্পর্ক) সামনে আসবে, তখনই এই জোটগুলো অকার্যকর হয়ে যাবে।

    ৭. যুদ্ধের পরিবর্তিত সমীকরণ: প্রযুক্তির নতুন রূপ

    বিংশ শতাব্দীতে পরাশক্তি হওয়ার মাপকাঠি ছিল বিশাল বিমানবাহী রণতরী (Aircraft Carrier), অত্যাধুনিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এবং পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার জেট। আমেরিকা এই শক্তি দিয়েই পুরো বিশ্বকে ভয় দেখিয়ে রাখত। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এই ‘ইনভিন্সিবিলিটি’ বা অজেয় হওয়ার মিথ ভেঙে গেছে।

    ইরান বা ইয়েমেনের মতো দেশগুলো প্রমাণ করেছে যে, সস্তা কিন্তু নিখুঁত ড্রোন এবং হাইপারসনিক মিসাইল দিয়ে বিলিয়ন ডলারের মার্কিন বা ইসরাইলি এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম অকার্যকর করে দেওয়া সম্ভব।

    এখানে একটি বড় প্রশ্ন জাগে—যদি সীমিত সামরিক ক্ষমতা নিয়েও কেউ আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে, তবে তুরস্কের মতো ড্রোন পরাশক্তি, পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক শক্তি এবং সৌদি আরবের মতো অত্যাধুনিক বিমানবাহিনীর অধিকারী দেশগুলো কেন গাজাকে বাঁচাতে পারছে না? তাদের তো সক্ষমতার অভাব নেই। অভাব শুধু সদিচ্ছার। তারা চাইলেই আমেরিকার আধিপত্যকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে চিরতরে মুছে দিতে পারে, কিন্তু তারা তাদের বিদেশি প্রভুদের নির্দেশনার বাইরে যেতে নারাজ।

    ৮. ইসলামি শরীয়ত ও ফিকহের দৃষ্টিকোণ: উম্মাহর একটিমাত্র পরিচয়

    যদি প্রশ্ন করা হয়—তিন-চারটি মুসলিম রাষ্ট্র মিলে জোট করা ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে কেমন?

    ইসলামি ফিকহ বা আইনশাস্ত্রের কোথাও এরকম একাধিক মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে জোট গঠনের কোনো অধ্যায় নেই। কেন নেই? কারণ ইসলাম মুসলিম বিশ্বকে একাধিক রাষ্ট্রে বিভক্ত হওয়াকেই স্বীকৃতি দেয় না।

    – একক সত্তা: ইসলাম পুরো উম্মাহকে একটি একক শরীর বা রাষ্ট্র (খিলাফত) হিসেবে দেখে। যেমন, পাকিস্তানের পেশোয়ার কোর এবং লাহোর কোরের মধ্যে যুদ্ধ লাগলে কী হবে বা তারা একে অপরকে সাহায্য করবে কি না—এমন প্রশ্ন যেমন অবান্তর (কারণ তারা একই সেনাপ্রধানের অধীনে), তেমনি মক্কা, কায়রো, দামেস্ক বা বাগদাদের মধ্যে জোট গঠনের ধারণাও ইসলামের কাছে অবান্তর। কারণ তারা সকলেই এক নেতার (খলিফা) অধীনে থাকার কথা।

    – বিভাজনকে বৈধতা দান: যখন স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরব জোট করে এবং বলে যে “আমরা ভাই ভাই”, তখন তারা মূলত এই পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেওয়া কৃত্রিম সীমানা এবং বিভাজনকেই স্থায়ী রূপ দেয়।

    – কাফিরদের সাথে জোট সম্পূর্ণ হারাম: ইসলামি শরীয়তে কুফফার বা অমুসলিম পরাশক্তির (যেমন আমেরিকা) এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য তাদের সাথে বা তাদের ইশারায় সামরিক জোট করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে আমাদের জানিয়েছেন যে মুসলিমরা কাফিরদের আগুন থেকে আলো গ্রহণ করে না।

    ৯. বর্তমান সুযোগ, নেতৃত্বের শূন্যতা এবং উম্মাহর ভবিষ্যৎ

    বর্তমানে আমেরিকা বিশ্বমঞ্চে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে পালাতে চাইছে। মুসলিম বিশ্বের সামনে আজ এক বিশাল সুযোগ (Opportunity) উপস্থিত হয়েছে।

    চারটি পুঁজি: মুসলিম বিশ্বের হাতে আজ ৪টি বিশাল পুঁজি রয়েছে:

    ১. সামরিক পুঁজি (Military Capital): বিশাল সেনাবাহিনী, ড্রোন, মিসাইল ও পারমাণবিক অস্ত্র।
    ২. রাজনৈতিক পুঁজি (Political Capital): পুরো বিশ্বের জনমত আজ ফিলিস্তিনের পক্ষে।
    ৩. আধ্যাত্মিক পুঁজি (Spiritual Capital): আল্লাহর সাহায্য এবং উম্মাহর কোটি কোটি মানুষের দোয়া।
    ৪. আর্থিক পুঁজি (Financial Capital): আরব বিশ্বের ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ।

    – কী করতে হবে? মুসলিম বিশ্বের সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক কর্মকর্তাদের প্রতি একটি উদাত্ত আহ্বান জানান। তাদের বয়স এখন ৬০-এর কোঠায়। আখেরাতে আল্লাহর সামনে তাদের একা দাঁড়াতে হবে। চাকরির মায়া ত্যাগ করে তাদের উচিত এই পশ্চিমা দালাল শাসকদের উৎখাত করে প্রকৃত ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করা। যদি আজ তারা গাজা মুক্তির জন্য এই বিশাল সামরিক শক্তি নিয়ে অগ্রসর হয়, তবে পুরো উম্মাহ তাদের পেছনে এসে দাঁড়াবে।

    – সাহাবিদের শিক্ষা: সাহাবি সাদ ইবনে মুয়ায (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর মাত্র ৬ বছর বেঁচে ছিলেন। কিন্তু তিনি মদীনার ক্ষমতা রাসূল (সা.)-এর হাতে তুলে দিয়ে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যে ভূমিকা রেখেছিলেন, তার মৃত্যুর পর স্বয়ং আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠেছিল এবং ৭০ হাজার ফেরেশতা তার জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন। আজকের মুসলিম সেনাপতিদের সামনেও ঠিক একই সুযোগ রয়েছে ইতিহাস রচনা করার।

    উপসংহার

    পরিশেষে, ‘মক্কা চুক্তি’ কোনোভাবেই মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক নয়; এটি কেবলই আমেরিকার ‘বার্ডেন শেয়ারিং’ নীতির একটি সফল প্রয়োগ। যতক্ষণ না মুসলিম বিশ্ব এই জাতিরাষ্ট্রের বিভাজন থেকে বেরিয়ে এসে, পশ্চিমা আধিপত্যের শৃঙ্খল ভেঙে একটি একক ইসলামি নেতৃত্বের (খিলাফত) অধীনে সংঘবদ্ধ হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ ধরনের শত শত চুক্তি গাজার একটি শিশুর রক্তপাতও ঠেকাতে পারবে না। ফিলিস্তিন বা কাশ্মীরের মুক্তি আসবে তখন, যখন মুসলিম সেনাবাহিনী আমেরিকার এজেন্ডা নয়, বরং কেবলই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত পথে মজলুমের ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে যাবে।

  • মুসলিম নারী ও দাওয়াহ বহনের গুরুত্ব

    মুসলিম নারী ও দাওয়াহ বহনের গুরুত্ব

    আল্লাহ তায়ালা নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমগ্র মানবজাতির প্রতি প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

    قل يا أيها الناس إني رسول اللـه إليكم جميعاً…

    (বলো: হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর রাসূল…) [সূরা আল-আরাফ: ১৫৮]

    يا أيها الناس اعبدوا ربكم الذي خلقكم..

    (হে মানবমন্ডলী! তোমরা তোমাদের রবের ইবাদত করো, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন…) [সূরা আল-বাকারাহ: ২১]

    يا أيها الناس اتقوا ربكم الذي خلقكم من نفس واحدة، وخلق منها زوجها، وبثّ منهما رجالاً كثيراً ونساءً…

    (হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন, আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী…) [সূরা আন-নিসা: ১]

    সুতরাং ইসলাম নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই শর’ঈ বিধান (দায়িত্ব) নিয়ে এসেছে। ইসলাম যেমন পুরুষের জন্য কিছু অধিকার নির্ধারণ করেছে এবং তার ওপর কিছু দায়িত্ব অর্পণ করেছে, তেমনি নারীর জন্যও কিছু অধিকার নির্ধারণ করেছে এবং তার ওপর কিছু দায়িত্ব অর্পণ করেছে।

    নারী ও পুরুষের বিধানের সমতা এবং ভিন্নতা

    যখন এই অধিকার ও কর্তব্যগুলো ‘মানুষ’ হিসেবে সাধারণ মানুষের সাথে সংশ্লিষ্ট বিধান হয়, তখন নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য তা অভিন্ন হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

    وما كان لمؤمن ولا مؤمنة إذا قضى اللـه ورسوله أمراً أن يكون لهم الخيرة من أمرهم…

    (আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ে ফয়সালা দিলে কোনো মুমিন পুরুষ বা মুমিন নারীর সে বিষয়ে নিজেদের কোনো পছন্দ বা এখতিয়ার থাকার অধিকার নেই…) [সূরা আল-আহজাব: ৩৬]।

    তিনি আরও বলেন:

    ومن يعمل من الصالحات من ذكر أو أنثى وهو مؤمن، فأولئك يدخلون الجنة ولا يُظلمون نقيراً

    (মুমিন অবস্থায় পুরুষ বা নারীর মধ্য থেকে যে কেউ সৎকাজ করবে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি অণু পরিমাণও জুলুম করা হবে না) [সূরা আন-নিসা: ১২৪]।

    আর যখন এই বিধানগুলো নারীর ‘নারী’ হওয়ার কারণে অথবা পুরুষের ‘পুরুষ’ হওয়ার কারণে তাদের নিজ নিজ অবস্থার সাথে নির্দিষ্ট হয়, তখন তা ভিন্ন ভিন্ন হয়। কারণ, এগুলো সাধারণ মানুষের জন্য নয়, বরং সুনির্দিষ্ট মানুষের সুনির্দিষ্ট কাজ সমাধানের জন্য এসেছে। আর এই কারণেই, পুরুষদের জমায়েতে সংঘটিত কাজের ক্ষেত্রে ইসলাম একজন পুরুষের সাক্ষ্যকে দুজন নারীর সাক্ষ্যের সমতুল্য করেছে। আবার যেসব বিষয়ে কেবল নারীরাই অবগত থাকে— যেমন দুধপানের প্রমাণ— সেখানে একজন নারীর সাক্ষ্যকেই যথেষ্ট সাব্যস্ত করেছে। এছাড়া পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব কেবল পুরুষের ওপর ফরজ করেছে, নারীর ওপর নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

    الرجال قوامون على النساء بما فضل اللـه بعضهم على بعض، وبما أنفقوا من أموالهم…

    (পুরুষেরা নারীদের রক্ষক ও তত্ত্বাবধায়ক, কারণ আল্লাহ তাদের একজনকে অপরজনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং তারা নিজেদের ধন-সম্পদ থেকে ব্যয় করে…) [সূরা আন-নিসা: ৩৪]।

    এভাবেই ইসলাম বিভিন্ন ধরনের বিধান নিয়ে এসেছে, যার কিছু অংশ পুরুষের জন্য নির্দিষ্ট এবং কিছু অংশ নারীর জন্য নির্দিষ্ট। কারণ নারীর বাস্তবতা পুরুষের বাস্তবতার চেয়ে ভিন্ন। নারী ঋতুবতী হয়, গর্ভধারণ করে এবং স্তন্যপান করায়। তার এমন কিছু শারীরিক ও জন্মগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা পুরুষের নেই। তাই পুরুষকে এই নির্দিষ্ট রূপে সৃষ্টি করার কারণে তার জন্য বিশেষ কিছু বিধান এসেছে, আবার নারীকে ভিন্ন রূপে সৃষ্টি করার কারণে তার জন্যও বিশেষ বিধান এসেছে; কারণ এই দিক থেকে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বাস্তবতা।

    এই নির্দিষ্টকরণের অর্থ বৈষম্য বা অসমতা নয়, বরং এটি তাদের প্রত্যেকের বাস্তবতার সঠিক সমাধান। আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রত্যেককে তাদের নিজ নিজ বিধানের ওপর সন্তুষ্ট থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাদের একে অপরের প্রতি ঈর্ষা করতে ও একে অপরকে দেওয়া আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের আকাঙ্ক্ষা করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

    ولا تتمنوا ما فضل اللـه به بعضكم على بعض، للرجال نصيب مما اكتسبوا، وللنساء نصيب مما اكتسبن…

    (আর তোমরা তার আকাঙ্ক্ষা কোরো না, যার মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের একজনকে অপরজনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। পুরুষরা যা অর্জন করবে তা তাদের অংশ এবং নারীরা যা অর্জন করবে তা তাদের অংশ…) [সূরা আন-নিসা: ৩২]

    আল্লাহ তাদের প্রত্যেককে শারীরিক ও জন্মগত বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে একে অপরের সাদৃশ্য গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। নবী (সা.) বলেছেন:

    لعن رسول اللـه المتشبهين من الرجال بالنساء، والمتشبهات من النساء بالرجال

    «রাসূলুল্লাহ (সা.) সেসব পুরুষকে অভিশাপ দিয়েছেন যারা নারীদের বেশ ধারণ করে এবং সেসব নারীকে অভিশাপ দিয়েছেন যারা পুরুষদের বেশ ধারণ করে» (বুখারি)

    দাওয়াহ বহনের দায়িত্ব সর্বজনীন

    নারী ও পুরুষের কিছু বিধানের এই ভিন্নতা, নারীকে ইসলামি জীবনব্যবস্থা (সমাজে) পুনরায় শুরু করার জন্য ‘দাওয়াহ বহনের’ দায়িত্ব এবং বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে মুসলমানরা যে শোচনীয় বাস্তবতায় বসবাস করছে তা পরিবর্তনের কাজে অংশগ্রহণের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয় না। কারণ এই কাজের নির্দেশটি নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য সাধারণভাবে এসেছে, যেহেতু এটি মানুষ হিসেবে মানুষের সাথে সম্পৃক্ত, কেবল পুরুষ বা নারী হিসেবে নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

    إنَّ اللـه لا يغيّر ما بقوم حتى يغيروا ما بأنفسهم…

    (নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে…) [সূরা আর-রাদ: ১১]

    এখানে «قوم» (জাতি বা সম্প্রদায়) শব্দটি নারী ও পুরুষ উভয়কেই সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করে। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন:

    ولتكن منْكم أمة يدعون إلى الخير ويأمرون بالمعروف وينهون عن المنكر…

    (তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত যারা কল্যাণের দিকে ডাকবে, সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে…) [সূরা আল-ইমরান: ১০৪]

    এখানে «أمّـة» (দল বা উম্মাহ) শব্দটি নারী ও পুরুষ উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে।

    পরিবর্তনের এই ফরজ দাওয়াহ বহনের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার শাস্তি অত্যন্ত ভয়াবহ, যা এমন সব শর’ঈ দলিলে বর্ণিত হয়েছে যার শব্দগুলো প্রমাণ করে যে, এই সম্বোধন নারী-পুরুষ উভয়ের প্রতিই করা হয়েছে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:

    واتقوا فتنة لا تصيبنّ الذين ظلموا منكم خاصّة، واعلموا أنَّ اللـه شديد العقاب

    (আর তোমরা এমন ফিতনাকে ভয় করো, যা কেবল তোমাদের মধ্যকার জালেমদেরই বিশেষভাবে আক্রান্ত করবে না। আর জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা) [সূরা আল-আনফাল: ২৪]

    নবী (সা.) বলেছেন:

    والذي نفسي بيده، لتأمرنّ بالمعروف، ولتنهوُنّ عن المنكر، أو ليوشكنَّ اللـه أن يبعث عليكم عقاباً منه، ثم تدعونه، فلا يستجاب لكم

    «যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম! তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে; অন্যথায় আল্লাহ শীঘ্রই তোমাদের ওপর তাঁর পক্ষ থেকে শাস্তি পাঠাবেন। তখন তোমরা তাঁর কাছে দোয়া করবে, কিন্তু তোমাদের দোয়া কবুল করা হবে না» (তিরমিজি)

    তিনি (সা.) আরও বলেছেন:

    … ومن مات وليس في عنقه بيعة مات ميتة جاهلية

    «…আর যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মারা গেল যে তার ঘাড়ে কোনো (খলিফার) বাইয়াত নেই, সে জাহেলিয়ার মৃত্যু বরণ করল» (মুসলিম)

    এগুলো হলো এমন সাধারণ শব্দ, যা মুকাল্লাফ (প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী এবং শরীয়তের বিধানে বাধ্য) সকল মুসলিম নারী-পুরুষকে অন্তর্ভুক্ত করে। সুতরাং মুসলমানদের মধ্যে যে ব্যক্তি এই দায়িত্ব ছেড়ে মারা যাবে, আল্লাহর কাছে তার শাস্তি হবে অত্যন্ত কঠোর এবং তার মৃত্যু হবে জাহেলি মৃত্যু। যে মুসলমান মুসলমানদের জন্য একজন খলিফা প্রতিষ্ঠার কাজ করল না— যাতে করে তার ঘাড়ে সেই খলিফার বাইয়াত থাকে— সে তার ওপর বর্তানো এই ভয়াবহ পাপের কারণে কাফেরের মতো মৃত্যুবরণ করল, যদিও বাস্তবে সে কাফের নয়।

    খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজে নারীর ভূমিকা

    এই কাজটি যেমন পুরুষের ওপর ফরজ, ঠিক তেমনি নারীর ওপরও ফরজ। নারী হওয়ার কারণে ইসলাম তাকে এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়নি, যেমনটি তাকে পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। এই দায়িত্বটি— অর্থাৎ ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা— সবচেয়ে জরুরি ও মহান ফরজগুলোর একটি। কারণ এর ওপরই অধিকাংশ শর’ঈ বিধানের বাস্তবায়ন নির্ভরশীল; যেমন— ইসলামের মাধ্যমে মানুষের বিষয়াদির দেখাশোনা করা এবং সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে এর বার্তা পৌঁছে দেওয়া। এটি ছাড়া ইসলামি উম্মাহর কোনো রাজনৈতিক অস্তিত্ব বা জাতিগুলোর মাঝে কোনো উল্লেখযোগ্য অবস্থান থাকে না। আজকে মুসলমানরা যে বিভক্তি, দুর্বলতা, লাঞ্ছনা এবং কুফর ও স্বৈরাচারী শক্তির কাছে আত্মসমর্পণের শিকার, তা মুসলমানদের একজন খলিফা না থাকারই ফলস্বরূপ। এমন একজন খলিফা, যিনি ইসলামের আলোকে তাদের দেখাশোনা করবেন এবং খিলাফত রাষ্ট্রে (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ) পতাকার নিচে তাদের ঐক্যবদ্ধ করবেন।

    আরবের নারী-পুরুষ উভয়েই এই দলিলগুলো অনুধাবন করেছিল। ফলে পুরুষদের মতো নারীরাও ঈমান এনেছিল এবং পুরুষদের মতোই দাওয়াত বহনের দায়িত্ব পালন করেছিল।

    খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.): রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর সর্বপ্রথম ঈমান এনেছিলেন তাঁর স্ত্রী খাদিজা (রা.)। তিনি তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁকে সমর্থন যুগিয়েছিলেন এবং তাঁর হাতকে শক্তিশালী করেছিলেন। রাসূল (সা.) তাঁর জাতির কাছ থেকে এমন কিছু শোনেননি বা এমন কোনো কষ্টদায়ক পরিস্থিতির সম্মুখীন হননি, যেখানে খাদিজা (রা.) তাঁর জন্য উত্তম সাহায্যকারী হননি। যখন তাঁর ওপর প্রথমবারের মতো ওহী নাজিল হলো, তখন তিনি কাঁপতে কাঁপতে খাদিজার কাছে এসে বললেন:

    زملوني.. زملوني..

    “আমাকে (কম্বল) আবৃত করো.. আমাকে (কম্বল) আবৃত করো..।”

    তখন তিনি তাঁকে বলেছিলেন:

    فواللـه لا يخزيك اللـه أبداً، واللـه إنك لتصل الرحم، وتصدق الحديث، وتحمل الكَلَّ، وتكسب المعدوم، وتقري الضيف، وتعين على نوائب الحقّ

    “আল্লাহর কসম, আল্লাহ আপনাকে কখনোই অপদস্ত করবেন না। আল্লাহর কসম! আপনি তো আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন, সত্য কথা বলেন, অসহায়দের বোঝা বহন করেন, নিঃস্বদের উপার্জন করে দেন, মেহমানদের আপ্যায়ন করেন এবং সত্যের পথে আসা বিপদে সাহায্য করেন।”

    এরপর তিনি তাঁকে নিয়ে তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা বিন নওফলের কাছে গেলেন, যাতে তিনি তাঁর স্বামীর সাথে ঘটে যাওয়া বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পারেন। এরপর তিনি তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেন:

    أبشر يا ابن عم واثبت، فوالذي نفس خديجة بيده، أرجو أن تكون نبيّ هذه الأمة المنتظر

    “হে আমার চাচাতো ভাই! সুসংবাদ গ্রহণ করুন এবং অবিচল থাকুন। যার হাতে খাদিজার প্রাণ তাঁর কসম, আমি আশা করি আপনিই হবেন এই উম্মতের প্রতীক্ষিত নবী।”

    কুরাইশরা যখন বয়কট করেছিল, তখন খাদিজা (রা.) আরামদায়ক বাড়ি ছেড়ে শিআবে আবি তালিবে অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করেছিলেন। রাসূল (সা.) তাঁর মৃত্যুর পর বলতেন:

    واللـه ما أبدلني خيراً منها، آمنت حين كفر الناس، وصدقتني إذ كذبني الناس، وواستني بمالها إذ حرمني الناس..

    “আল্লাহর কসম, আল্লাহ আমাকে তার চেয়ে উত্তম কাউকে দেননি। সে আমার ওপর তখন ঈমান এনেছিল যখন লোকেরা কুফরি করেছিল… সে আমাকে তার সম্পদ দিয়ে সাহায্য করেছিল যখন লোকেরা আমাকে বঞ্চিত করেছিল।”

    সাওদা বিনতে জামআহ (রা.): তিনি নিজের পরিবারের চেয়ে দ্বীনকে প্রাধান্য দিয়ে স্বামীর সাথে হাবশায় হিজরত করেছিলেন। প্রবাসে স্বামী মারা গেলে তিনি মক্কায় ফিরে আসেন এবং পরিবারের অত্যাচার সহ্য করেন। পরে রাসূল (সা.) তাঁকে বিয়ে করে তাঁর ভাঙা মন জোড়া লাগান।

    সুমাইয়া “উম্মু আম্মার” (রা.): তিনি ছিলেন আল্লাহর পথে প্রথম শহীদ। তিনি নিজ বিশ্বাসের ওপর অবিচল থেকে আবু জেহেলের হাতে প্রাণ বিসর্জন দেন।

    আসমা বিনতে আবু বকর (রা.): হিজরতের পথে সাওর গুহায় তিনি অশেষ কষ্ট সহ্য করে রাসূল (সা.) ও আবু বকর (রা.)-কে সাহায্য করেছিলেন এবং আবু জেহেলের চড় খেয়েও অবিচল ছিলেন।

    ফাতিমা বিনতে খাত্তাব (রা.): তিনি ভাই উমর বিন খাত্তাবের প্রহার সহ্য করেও ধর্মে অবিচল ছিলেন, যা দেখে উমর (রা.) নিজেই ইসলাম গ্রহণ করেন।

    এই নারীরা এবং অন্যান্য সাহাবীরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে দাওয়াত বহন করেছিলেন, হিজরত করেছিলেন এবং চরম কষ্ট সহ্য করেছিলেন, কারণ তাঁরা জানতেন এ ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই।

    আকাবার বাইয়াত ও নারী সাহাবীদের অংশগ্রহণ

    পুরুষরা যেমন রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সাহায্য করেছিলেন, নারীরাও তাঁকে একইভাবে সাহায্য করেছিলেন। নবুওয়তের ত্রয়োদশ বর্ষে আকাবার বাইয়াতে তেহাত্তর জন পুরুষের পাশাপাশি দুজন নারী— উম্মু আম্মারাহ নুসায়বা বিনতে কা’ব এবং উম্মু মানি আসমা বিনতে ‘আমর অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা সকলেই যুদ্ধের বাইয়াত গ্রহণ করেছিলেন, যেখানে অঙ্গীকার ছিল:

    تبايعوني على السمع والطاعة في النشاط والكسل، وعلى النفقة في العسر واليسر، وعلى الأمر بالمعروف والنهي عن المنكر، وعلى أن تقولوا في اللـه، لا تأخذكم لومة لائم، وعلى أن تنصروني إذا قدمت إليكم، وتمنعوني مما تمنعون منه أنفسكم وأزواجكم وأبناءَكم، ولكم الجنة

    “…সক্রিয় ও অলস উভয় অবস্থায় শোনা ও আনুগত্য করা; সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতায় সম্পদ ব্যয় করা; সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করা; আল্লাহর ব্যাপারে সত্য কথা বলা এবং এ ক্ষেত্রে কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া না করা; এবং রাসূলকে নিজেদের পরিবার ও সন্তানের মতো রক্ষা করা…”

    সুতরাং নারীদের কাছেও দাবি করা হয়েছে যে, তাঁরা সৎকাজের আদেশ দেবেন, অসৎকাজে নিষেধ করবেন, সত্য কথা বলবেন এবং কোনো নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করবেন না; আর তাঁদের কাছেও দাবি করা হয়েছে দাওয়াত বহনকারীদের সাহায্য করার। আর এগুলোই হলো ইসলামি খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামি জীবনব্যবস্থা পুনরায় শুরু করার জন্য দাওয়াত বহনের মূল ভিত্তি। উম্মু আম্মারাহ (রা.) বাইয়াতে রিদওয়ানে উপস্থিত ছিলেন এবং মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়ে নিজের হাত হারিয়েছিলেন।

    কুরআন ও সুন্নাহর এই দলিলগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, মুসলিম নারী দাওয়াতের প্রতিটি পর্যায়ে তা বহনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। তাঁরা ‘তাছকীফ’ (শিক্ষাদান) পর্যায়ে পুরুষদের সাথে অংশ নিয়েছেন, ‘তাফা’উল’ (জনসম্পৃক্ততা ও সংগ্রাম) পর্যায়ে কষ্ট সহ্য করেছেন এবং ক্ষমতা গ্রহণের পর্যায়ে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণ করেছেন।

    উপসংহার: বর্তমান যুগে মুসলিম নারীর করণীয়

    অতএব, বর্তমান যুগের মুসলিম নারীদের উপলব্ধি করতে হবে যে, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য দাওয়াহ বহন করা পুরুষদের মতো তাঁদের ওপরও ফরজ। আল্লাহ তা’য়ালা যেমন তাঁদের ওপর নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাত ফরজ করেছেন, ঠিক তেমনি শর’ঈ পন্থায় খিলাফত রাষ্ট্র ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে ইসলামি জীবনব্যবস্থা পুনরায় শুরু করার জন্য দাওয়াহ বহন করাকেও তাঁদের ওপর ফরজ করেছেন। তাঁরাও আল্লাহর এই বাণীর মধ্যে সম্বোধিত:

    ولتكن منكم أمة يدعون إلى الخير…

    (তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত যারা কল্যাণের দিকে ডাকবে…)

    এবং তারা রাসূল (সা.)-এর বাণীর মধ্যে সম্বোধিত:

    من رأى منكم منكراً فليغيره…

    «তোমাদের কেউ কোনো অন্যায় দেখলে সে যেন তা পরিবর্তন করে…»

    এবং

    ومن مات وليس في عنقه بيعة مات ميتة جاهلية

    «যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মারা গেল যে তার ঘাড়ে কোনো বাইয়াত নেই, সে জাহেলিয়ার মৃত্যু বরণ করল»।

    রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য দাওয়াহ বহন করা যদিও ‘ফরজে কিফায়া’, কিন্তু যে পর্যন্ত এর দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এটি প্রতিষ্ঠা করতে না পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটি প্রত্যেক মুকাল্লাফ (বুদ্ধিসম্পন্ন ও বালেগ) মুসলিমের ওপর واجب (ফরজ) হয়েই থাকবে। কারণ, ‘ফরজে কিফায়া’ যদি কেউ আদায় না করে, তবে এটি প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর এই কাজে অংশ নেওয়া ফরজ হয়ে যায়, যাতে সে জাহেলি মৃত্যু থেকে বাঁচতে পারে। আর যেসকল মুকাল্লাফ নারী বা পুরুষ এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা করবে, তাদের ওপর নবী (সা.)-এর এই বাণীটিই প্রযোজ্য হবে:

    ومن مات وليس في عنقه بيعة مات ميتة جاهلية

    «আর যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মারা গেল যে তার ঘাড়ে কোনো বাইয়াত নেই, সে জাহেলিয়ার মৃত্যু বরণ করল»।

  • রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা শরঈ দৃষ্টিকোন থেকে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়

    রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা শরঈ দৃষ্টিকোন থেকে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়
    শর’ঈ দৃষ্টিকোণ থেকে দলীয় বা রাজনৈতিক কাজ (العمل الحزبي)
    ‘হিযব’ (حزب) শব্দের আভিধানিক অর্থ:

    আরবি ভাষায় ভাষাবিদদের (অর্থাৎ প্রাচীন অভিধান প্রণেতা ও ভাষাবিদদের) নিকট ‘হিযব’ (حِزْب) শব্দের বেশ কয়েকটি অর্থ ও তাৎপর্য রয়েছে। তা নিচে স্পষ্ট করা হলো:

    মূল আভিধানিক অর্থ: ‘হিযব’ (الحِزْب) বলতে মূলত এমন একদল মানুষকে বোঝায় যারা কোনো এক মত বা লক্ষ্যের ওপর একত্রিত হয়।

    ইবনে ফারিস তাঁর ‘মাকায়িসুল লুগাহ’ গ্রন্থে বলেছেন: “হিযব: মানুষের দল, আর এর মূল অর্থ হলো একত্রিত হওয়া এবং মিলিত হওয়া।”

    আল-জাওহারী তাঁর ‘আস-সিহাহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: “হিযব: মানুষের একটি গোষ্ঠী বা দল, এর বহুবচন হলো ‘আহযাব’ (أحْزاب)।”

    ‘হিযব’ শব্দের অন্যান্য অর্থ:

    অংশ বা ভাগ (القِسْم والنصيب): বলা হয়, “এই বিষয়ে এটি আমার হিযব” অর্থাৎ এটি আমার অংশ।

    সময় বা নির্দিষ্ট মেয়াদ: বলা হয়, “আমি রাতের একটি হিযবে কুরআন তিলাওয়াত করেছি”, অর্থাৎ রাতের একটি অংশে।

    নির্ধারিত বই বা অংশ: বলা হয়, “কুরআনের হিযব” অর্থাৎ পড়ার জন্য বিভক্ত অংশ।

    ‘হিযব’ (حِزْب) ও ‘হাযাবা’ (حَزَبَ) এর মধ্যে পার্থক্য:

    حِزْب (হিযব – হা-এর নিচে কাসরা এবং যা-এর ওপর সুকুন): এর অর্থ মানুষের দল বা গোষ্ঠী।

    حَزَبَ (হাযাবা – হা এবং যা-এর ওপর ফাতহা): এটি একটি ক্রিয়াপদ, যার অর্থ একত্রিত হওয়া বা কোনো বিষয় সংঘটিত হওয়া।

    ‘হিযব’ শব্দের পারিভাষিক অর্থ:

    পরিভাষায় ‘হিযব’ শব্দের বিভিন্ন তাৎপর্য রয়েছে যা ক্ষেত্রভেদে (রাজনৈতিক, শর’ঈ, সুফি, সামাজিক) ভিন্ন হয়। পরিভাষাবিদদের মতে এর বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

    আধুনিক রাজনৈতিক পরিভাষায় হিযব:

    সংজ্ঞা: একটি যৌথ সংগঠন যার একটি সাধারণ আদর্শ (Ideology) বা কর্মসূচি রয়েছে এবং যার লক্ষ্য হলো ক্ষমতায় অংশগ্রহণ করা বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করা।

    বৈশিষ্ট্য: এর একটি সাংগঠনিক কাঠামো ও নেতৃত্ব থাকে। এটি শাসন ক্ষমতায় পৌঁছানোর বা ক্ষমতার ওপর নজরদারি করার চেষ্টা করে।

    সুফিবাদ ও ইবাদতের ক্ষেত্রে হিযব:

    সুফি আহযাব: নির্দিষ্ট কোনো সুফি তরিকার সাথে সম্পৃক্ত সামষ্টিক যিকির ও ওযিফা (যেমন- শাযিলী তরিকার ‘হিযবুল বাহর’)। এগুলোকে রাজনৈতিক সংগঠনের চেয়ে আত্মিক সমাবেশ হিসেবে বেশি বিবেচনা করা হয়।

    মানব সমাজের ক্ষেত্রে হিযব:

    ইবনে খালদুন-এর মতে: তিনি তাঁর ‘মুকাদ্দামাহ’ গ্রন্থে ‘হিযব’কে এমন একটি দল হিসেবে বর্ণনা করেছেন যারা বংশ বা স্বার্থের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ, যেমন উপজাতীয় বা সামরিক হিযব (দল)।

    শর’ঈ পরিভাষায় হিযব (الحزب في الاصطلاح الشرعي)

    এটি এমন কোনো দল বা গোষ্ঠীকে বোঝায় যারা কোনো নির্দিষ্ট মানহাজ বা পদ্ধতির ভিত্তিতে দলবদ্ধ হয়, তা হক (সত্য) হোক বা বাতিল। এর উদ্দেশ্য এবং শরিয়তের সাথে এর সামঞ্জস্যের ওপর ভিত্তি করে এর হুকুম (বিধান) ভিন্ন হয়।

    শরিয়তের দৃষ্টিতে হিযবের সংজ্ঞা: শর’ঈ পরিভাষায় ‘হিযব’ বলতে বোঝায়: এমন একটি সুসংগঠিত দল যারা নির্দিষ্ট কোনো মানহাজ বা মতাদর্শের দিকে সম্পৃক্ত থাকে, তা শরিয়তের অনুকূলে হোক বা পরিপন্থী। এই সংজ্ঞাটি কুরআন-সুন্নাহর শর’ঈ দলিল (নস) এবং সালাফে সালেহীনের উপলব্ধির ওপর ভিত্তি করে প্রণীত।

    শরিয়তে আহযাব (দলসমূহ)-এর প্রকারভেদ:

    ১. হিযবুল্লাহ (حزب الله – আল্লাহর দল বা হকের অনুসারী): এরা হলেন সেই সকল মুমিন যারা আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসারী এবং বিদআত ও গোমরাহী (পথভ্রষ্টতা) থেকে দূরে অবস্থানকারী।*
    তাদের বৈশিষ্ট্য: ইত্তেবা (অনুসরণ) করা, ইবতিদা (বিদআত বা নতুন কিছু তৈরি) নয়। হকের ওপর ঐক্যবদ্ধ হওয়া, বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়। আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনদের প্রতি ওয়ালা (আনুগত্য ও ভালোবাসা) পোষণ করা।*
    দলিল: মহান আল্লাহর বাণী: (وَمَن يَتَوَلَّ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ فَإِنَّ حِزۡبَ ٱللَّهِ هُمُ ٱلۡغَٰلِبُونَ ٥٦) “আর যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মুমিনদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহর দলই (হিযবুল্লাহ) বিজয়ী হবে।” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৫৬)।
    ২. হিযবুশ শয়তান (حزب الشيطان – শয়তানের দল বা বাতিলের অনুসারী): এরা হলো এমন প্রত্যেকটি দল যারা কিতাব ও সুন্নাহর বিরোধিতা করে; যেমন- বিদআতি, প্রবৃত্তির পূজারী (আহলুল আহওয়া) এবং পথভ্রষ্ট দলসমূহ।*
    তাদের বৈশিষ্ট্য: দ্বীনের মধ্যে বিদআত তৈরি করা। বিচ্ছিন্নতা ও মতানৈক্য সৃষ্টি করা। দ্বীনের শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব করা।*
    দলিল: মহান আল্লাহর বাণী: (ٱسۡتَحۡوَذَ عَلَيۡهِمُ ٱلشَّيۡطَٰنُ فَأَنسَىٰهُمۡ ذِكۡرَ ٱللَّهِۚ أُوْلَٰٓئِكَ حِزۡبُ ٱلشَّيۡطَٰنِۚ) “শয়তান তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে, ফলে তাদেরকে আল্লাহর যিকির (স্মরণ) ভুলিয়ে দিয়েছে। তারাই হলো শয়তানের দল (হিযবুশ শয়তান)।” (সূরা আল-মুজাদালাহ: ১৯)।

    শরিয়তসম্মত হিযবের শর্তাবলী (ضوابط):

    • কিতাব ও সুন্নাহর ওপর অটল থাকা (ইস্তিকামাত)।
    • সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করা (আমর বিল মারুফ ওয়া নাহী আনিল মুনকার)।
    • বিচ্ছিন্ন না হওয়া বা কোনো বিদআতের মাধ্যমে নিজেদের আলাদা না করা।
    • পুণ্য ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করা, পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে নয়।
    • অন্ধ দলীয় গোঁড়ামি বা জঘন্য দলাদলি থেকে দূরে থাকা।
    ‘হিযব’ শব্দটি উল্লিখিত আয়াতসমূহ:

    পবিত্র কুরআনে ‘হিযব’ ও এর সমগোত্রীয় শব্দগুলো বিভিন্ন স্থানে এসেছে। সাধারণত এগুলো জোটবদ্ধ বা প্রতিযোগী দলগুলোর আলোচনায় ব্যবহৃত হয়েছে, তা হকের দল হোক বা বাতিলের। নিচে সে আয়াতগুলো উল্লেখ করা হলো যেখানে সরাসরি শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে:

    সূরা আল-মায়িদাহ (আয়াত ৫৬):

    (وَمَن يَتَوَلَّ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ فَإِنَّ حِزۡبَ ٱللَّهِ هُمُ ٱلۡغَٰلِبُونَ ٥٦)

    তাৎপর্য: এটি স্পষ্ট করে যে, হিযবুল্লাহ (মুমিনগণ) আল্লাহকে অনুসরণ করার কারণেই বিজয়ী।

    সূরা আল-মুজাদালাহ (আয়াত ১৯):

    (ٱسۡتَحۡوَذَ عَلَيۡهِمُ ٱلشَّيۡطَٰنُ فَأَنسَىٰهُمۡ ذِكۡرَ ٱللَّهِۚ أُوْلَٰٓئِكَ حِزۡبُ ٱلشَّيۡطَٰنِۚ أَلَآ إِنَّ حِزۡبَ ٱلشَّيۡطَٰنِ هُمُ ٱلۡخَٰسِرُونَ١٩)

    তাৎপর্য: হিযবুশ শয়তান (কাফির ও মুনাফিক)-দের ব্যাপারে সতর্কবাণী এবং তাদের চূড়ান্ত ক্ষতির ঘোষণা।

    সূরা আর-রুম (আয়াত ৩২):

    (مِنَ ٱلَّذِينَ فَرَّقُواْ دِينَهُمۡ وَكَانُواْ شِيَعٗاۖ كُلُّ حِزۡبِۢ بِمَا لَدَيۡهِمۡ فَرِحُونَ)

    তাৎপর্য: এটি ওইসব বিবাদমান দলের (আহযাব) প্রতি সমালোচনা যারা দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং কোনো সত্য প্রমাণ ছাড়াই নিজেদের মতবাদ নিয়ে আনন্দিত।

    সূরা আল-মুমিনুন (আয়াত ৫৩):

    (فَتَقَطَّعُوٓاْ أَمۡرَهُم بَيۡنَهُمۡ زُبُرٗاۖ كُلُّ حِزۡبِۢ بِمَا لَدَيۡهِمۡ فَرِحُون٥٣)

    তাৎপর্য: এটি সূরা আর-রুমের আয়াতের মতই, যেখানে বিভক্তি এবং বাতিল দলাদলির নিন্দা করা হয়েছে।

    সূরা আল-আম্বিয়া (আয়াত ৯২):

    (إِنَّ هَٰذِهِۦٓ أُمَّتُكُمۡ أُمَّةٗ وَٰحِدَةٗ وَأَنَا۠ رَبُّكُمۡ فَٱعۡبُدُونِ ٩٢)

    প্রেক্ষাপট: এটি বিবাদমান দলগুলোর নিন্দা সম্বলিত আয়াতের পরে এসেছে, যেখানে উম্মাহর ঐক্যের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

    সূরা আল-আহযাব (সম্পূর্ণ সূরা): খন্দকের যুদ্ধে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত দলগুলোর (কুরাইশ, গাতফান এবং ইহুদি) জোটবদ্ধ হওয়ার কারণে এই সূরার নাম রাখা হয়েছে ‘আল-আহযাব’ (الأحزاب)। যেমন আল্লাহর বাণী:

    (وَإِذۡ زَاغَتِ ٱلۡأَبۡصَٰرُ وَبَلَغَتِ ٱلۡقُلُوبُ ٱلۡحَنَاجِرَ وَتَظُنُّونَ بِٱللَّهِ ٱلظُّنُونَا۠١٠ هُنَالِكَ ٱبۡتُلِيَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ وَزُلۡزِلُواْ زِلۡزَالٗا شَدِيدٗا)
    [আয়াত ১০-১১]

    আয়াতসমূহের তাফসির (تفسير الآيات):

    ১. সূরা আল-মায়িদাহ: ৫৬ এর তাফসির:

    আয়াতের মূলভাব: আয়াতটি ঘোষণা করছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনদেরকে বন্ধু (আউলিয়া) হিসেবে গ্রহণ করবে, তাদের বিজয় সুনিশ্চিত। কারণ তারা হলো ‘হিযবুল্লাহ’। আর যারা আল্লাহর শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব করবে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। এটি মূলত মুনাফিক ও ইহুদিদের জবাব দেয়, যারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হয়েছিল।

    বিস্তারিত তাফসির:

    তাবারী: আয়াতটি মুনাফিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে যারা ইহুদিদের সাথে বন্ধুত্ব করত। হিযবুল্লাহ হলো তারা যারা আল্লাহর আনুগত্যের ওপর একত্রিত, আর এ কারণেই তারা শত্রুদের ওপর বিজয়ী।

    ইবনে কাসীর: মুমিনদের সাথে বন্ধুত্ব করার এবং কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব ত্যাগ করার নির্দেশ। ‘বিজয়’ (আল-গালাবাহ) বলতে দুনিয়ার বিজয় ও আখিরাতের জান্নাত উভয়ই বোঝায়।

    কুরতুবী: আল্লাহর বন্ধুত্বের জন্য তাঁর শরিয়তের অনুসরণ জরুরি। রাসূল (সা.)-এর বন্ধুত্ব হলো তাঁর সুন্নাহর অনুসরণের মাধ্যমে। হিযবুল্লাহ হলো ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’, পথভ্রষ্ট দলগুলো নয়।

    আস-সাদি: আয়াতটি মুমিনদের প্রবৃত্তি নয়, বরং হকের ভিত্তিতে আনুগত্য বেছে নেওয়ার শিক্ষা দেয়।

    বিজয় (الغلبة) এখানে দুটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে: আত্মিক বিজয় (প্রমাণ ও হিদায়াতের মাধ্যমে), বস্তুগত বিজয় (শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে)।

    শিক্ষণীয় দিক: মুমিনদের সাথে বন্ধুত্বের বাধ্যবাধকতা এবং কাফিরদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা (এমনকি তারা পিতা বা সন্তান হলেও)। প্রকৃত বিজয় মুমিনদের জন্যই (দেরি হলেও), কারণ এটি আল্লাহর ওয়াদা। ইসলাম বিরোধী জোটের ব্যাপারে সতর্কতা।

    ২. সূরা আল-মুজাদালাহ: ১৯ এর তাফসির:

    আয়াতের মূলভাব: শয়তানের প্রভাবে আল্লাহর স্মরণ ভুলে যাওয়া দলের বর্ণনা, যারা শয়তানের দলে (হিযবুশ শয়তান) পরিণত হয়েছে এবং যাদের পরিণতি চরম ক্ষতি।

    বিস্তারিত তাফসির:

    ইবনে কাসীর: ‘ইস্তাহওয়াযা’ (استحواذ) মানে শয়তান তাদের অন্তর এমনভাবে দখল করেছে যে তারা বন্দীর মতো হয়ে গেছে। এরা হলো মুনাফিক যারা ইসলাম প্রকাশ করে আর কুফর গোপন রাখে।

    তাবারী: যে ব্যক্তি প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং আল্লাহর অবাধ্য হয়, সে-ই হিযবুশ শয়তানের অন্তর্ভুক্ত।

    কুরতুবী: পাপ ও গাফিলতির সুযোগেই শয়তান মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ পায়।

    আস-সাদি: আল্লাহর যিকির থেকে গাফেল হওয়ার বিষয়ে সতর্কতা। ক্ষতি বলতে ঈমান, সুখ এবং জান্নাত হারানোর ক্ষতি বোঝানো হয়েছে।

    ইবনে আশুর: এটি পর্যায়ক্রমিক নিয়ন্ত্রণ যা প্ররোচনা দিয়ে শুরু হয়ে দাসত্বে শেষ হয়। হিযবুশ শয়তানের অন্তর্ভুক্ত হলো সকল মুশরিক, মুনাফিক এবং বিদআতিরা।

    ৩. সূরা আর-রুম: ৩২ এর তাফসির:

    আয়াতের মূলভাব: মুশরিকদের মতো দ্বীনকে খণ্ডিত করে বিভিন্ন দলে (شِيَعًا – শিয়া’আন) বা আহযাবে বিভক্ত হওয়ার বিষয়ে মুসলিমদের সতর্ক করা হয়েছে। প্রত্যেক দল তাদের বাতিল মতবাদ নিয়ে আনন্দিত। এটি উম্মাহর ঐক্য ধ্বংসকারী ধর্মীয় বিভক্তির নিন্দা করে।

    বিস্তারিত তাফসির:

    তাবারী: মুশরিকদের মতো হয়ো না, যারা দ্বীনকে বদলেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে। প্রত্যেক দল তাদের নিজ নিজ বিদআত নিয়ে আনন্দিত (فرحون) এবং মনে করে তারাই সঠিক।

    ইবনে কাসীর: এটি সকল বাতিল ধর্মের অনুসারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মুসলিমদের মধ্যকার বিভক্ত দলগুলোর ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য, তবে ‘নাজাতপ্রাপ্ত দল’ (আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ)-এর বাইরে যারা কিতাব ও সুন্নাহ আঁকড়ে আছে।

    আস-সাদি: এটি দ্বীনের মধ্যে বিভক্তিকে নিন্দা করে। শাখাগত বিষয়ে (ফুরু’আত) অন্ধ অনুকরণ করতে নিষেধ করেছেন, যা মুসলিমদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে।

    কুরতুবী ও বাগবী: ‘শিয়া’আন’ মানে বিবাদমান দল, যেমন ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা বিভক্ত হয়েছিল।

    সায়্যিদ কুতুব: এটি জাহিলিয়াতের সমাজের বাস্তবতা তুলে ধরে। ইসলাম ঐক্যের ডাক দেয়, আর দল-উপদলগুলো সংকীর্ণ স্বার্থ নিয়ে আনন্দিত থাকে।

    আত-তাফসির আল-ওয়াসিত: দ্বীনে বিদআত আবিষ্কার করাকে বোঝায়, যা বিভক্তির দিকে নিয়ে যায়।

    ৪. সূরা আল-মুমিনুন: ৫৩ এর তাফসির:

    আয়াতের মূলভাব: পূর্ববর্তী জাতিগুলো এক দ্বীনের অনুসারী হওয়ার পরও কীভাবে নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়েছিল তার বর্ণনা। প্রত্যেক দল নিজেদের মত নিয়ে গোঁড়ামি করে। মুসলিম উম্মাহকেও এই বিভক্তি থেকে সতর্ক করা হয়েছে।

    বিস্তারিত তাফসির:

    ইবনে কাসীর: ‘যুবুরান’ (زُبُرًا) মানে দ্বীনকে বিভক্ত করে বিভিন্ন মাযহাব বা মতে পরিণত করা, যেমন ইহুদি-নাসারারা করেছে। প্রত্যেক দল তাদের বিদআত নিয়ে প্রতারিত।

    তাবারী: ‘যুবুরান’ মানে বিভিন্ন খণ্ডিত কিতাব (যেমন বিকৃত তাওরাত/যাবুর), তারা দ্বীনকে সাংঘর্ষিক অংশে পরিণত করেছে।

    আস-সাদি: শরয়ি দলিল ছাড়া নিজের মত নিয়ে আনন্দিত হওয়া গোমরাহীর লক্ষণ।

    মাওদুদী: নবীগণের দাওয়াতের ঐক্যের বিপরীতে অনুসারীদের বিভক্তি।

    কুরতুবী: ‘ফারিহুন’ (فَرِحُونَ) মানে এখানে আনন্দ করা নিন্দনীয়, কারণ তা অজ্ঞতাপ্রসূত।

    সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কিরামের কথায় ‘হিযব’ শব্দের উল্লেখ:

    ১. সুন্নাহতে নিন্দনীয় পথভ্রষ্ট দলীয়করণের উল্লেখ: নবী (সা.) বলেছেন: “জেনে রাখো, তোমাদের নবী তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন যে তার দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং দলে দলে বিভক্ত (ইহতাজাবা – احْتَزَبَ) হয়েছে।” (আবু দাউদ)

    অর্থ: কুফরি ও বিদআতি দলের মতো যারা দ্বীনকে খণ্ডিত করে অন্ধ দলীয়করণ করেছে, নবী (সা.) তাদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন।

    ২. হিযবুল্লাহর প্রশংসনীয় বর্ণনা: কুরআনে হিযবুল্লাহর গুণাবলি বর্ণিত হয়েছে:

    (أَلَآ إِنَّ حِزۡبَ ٱللَّهِ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ)
    (সূরা মুজাদালাহ: ২২)

    তারা হলেন মুত্তাকি মুমিন, যারা আল্লাহর দ্বীনের সাহায্যকারী।

    ৩. সাহাবায়ে কিরামের বক্তব্য:

    বিলাল ইবনে রাবাহ (রা.): ইন্তেকালের সময় বলেছিলেন, “আগামীকাল আমরা আমাদের প্রিয়জনদের সাথে মিলিত হবো, মুহাম্মাদ এবং তাঁর দলের (হিযব – حِزْب) সাথে।” উদ্দেশ্য: সুন্নাহর অনুসারী সাহাবি ও তাবিঈগণ।

    আয়িশা (রা.): নবী (সা.)-এর স্ত্রীদের দুটি ‘হিযব’ (দল)-এ ভাগ করেছিলেন: এক দলে তিনি নিজে ও হাফসা, অন্য দলে উম্মে সালামা ও অন্যান্য স্ত্রীগণ।

    উমর ইবনে আল-খাত্তাব (রা.): ‘আল-জামাআহ’ (الجماعة – ঐক্যবদ্ধ মুসলিম সমাজ) আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বিভক্তি থেকে নিষেধ করেছেন। যা প্রমাণ করে নিন্দনীয় দলীয়করণ হলো তা-ই যা ইসলামী ঐক্যকে বিনষ্ট করে।

    দল (হিযব) গঠনের বৈধতা সম্পর্কে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহর ফতোয়া:

    শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন: “আর ‘দলের প্রধান’ (رأس الحزب) হলো সেই গোষ্ঠীর প্রধান যারা দলবদ্ধ হয়। তারা যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশের ওপর কোনো কিছু কমানো বা বাড়ানো ছাড়া একত্রিত হয়, তবে তারা মুমিন, তাদের প্রাপ্য অধিকার ও দায়িত্ব অন্যদের মতোই। আর যদি তারা এতে কমবেশি করে, যেমন- সত্য বা মিথ্যা যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন, যে তাদের দলে প্রবেশ করবে তার প্রতি অন্ধ পক্ষপাতি হওয়া এবং যে তাদের দলে প্রবেশ করবে না তাকে এড়িয়ে চলা—তা সে হকের ওপর থাকুক বা বাতিলের ওপর—তবে এটি হলো সেই বিভক্তি যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল নিন্দা করেছেন। কারণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ঐক্যবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বিচ্ছিন্ন হতে নিষেধ করেছেন। তাঁরা পুণ্য ও তাকওয়ার কাজে সহযোগিতা করতে বলেছেন এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছেন।” (মাজমুউল ফাতাওয়া ১১/৯২)।

    ফতোয়ার ওপর মন্তব্য: ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) এখানে স্পষ্ট করেছেন যে, সব দলই বিচ্ছিন্নতা নয় এবং সব দলই হারাম নয়; শর্ত হলো তাদের আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশের ওপর অটুট থাকতে হবে। তাঁর মতে দল হারাম হওয়ার মানদণ্ড হলো: হকের তোয়াক্কা না করে নিজ দলের লোকদের প্রতি অন্ধ পক্ষপাতিত্ব করা, দলের বাইরের লোকদের এড়িয়ে চলা এবং অন্যদের কাছ থেকে হক বা সত্য গ্রহণ না করা।

    ইমাম আবু হানিফা আন-নুমান এর অভিমত:

    ইমাম আজম আবু হানিফা (রা.) থেকে বর্ণিত, যা জাসসাস প্রমুখের ‘আহকামুল কুরআন’-এ এসেছে: আল-হিম্মানি বলেন, আমি ইবনে মুবারককে বলতে শুনেছি: যখন আবু হানিফার কাছে ইব্রাহিম আস-সায়িগকে হত্যার খবর পৌঁছায়, তিনি এত কাঁদলেন যে আমরা ভাবলাম তিনি মারা যাবেন। আমি নির্জনে তাঁর কাছে গেলে তিনি বললেন: “আল্লাহর কসম! তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমান মানুষ ছিলেন, আর আমি তাঁর ব্যাপারে এই পরিণতিরই আশঙ্কা করছিলাম।” আমি বললাম: এর কারণ কী ছিল? তিনি বললেন: “তিনি আমার কাছে আসতেন এবং প্রশ্ন করতেন। তিনি আল্লাহর আনুগত্যে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন এবং অত্যন্ত পরহেজগার ছিলেন।… একপর্যায়ে তিনি আমাকে ‘সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ’ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা একমত হলাম যে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ফরজ বিধান। তখন সে আমাকে বলল: আপনার হাত বাড়ান, আমি আপনার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করব। তখন আমার সামনে দুনিয়া অন্ধকার হয়ে গেল। আমি বললাম: কেন? তিনি বললেন: তিনি আমাকে আল্লাহর একটি হকের দিকে ডাকলেন কিন্তু আমি তা প্রত্যাখ্যান করলাম এবং আমি তাকে বললাম, যদি একজন ব্যক্তি একাকী এই কাজে দাঁড়ায় তবে সে নিহত হবে, এবং মানুষের কোনো বিষয়ের সংস্কার হবে না। তবে যদি সে সৎ সাহায্যকারী এবং আল্লাহর দ্বীনের ওপর বিশ্বস্ত এমন একজন নেতা পায় যাকে পরিবর্তন করা যাবে না… (তবে তা সম্ভব)। এটি এমন কাজ যা একজন ব্যক্তি করতে পারে না, নবীরাও আকাশ থেকে চুক্তি হওয়ার আগে তা একা বহন করতে পারেননি। এটি অন্যান্য ফরজের মতো নয় যা একা আদায় করা যায়। এই কাজে একা নামলে সে তার রক্ত ঝরাবে এবং নিজেকে হত্যার মুখে ঠেলে দেবে।” এরপর ইব্রাহিম মার্ভ শহরে যান, আবু মুসলিমের সাথে কঠোর ভাষায় কথা বলেন, তাকে আটক করা হয়। পরে তিনি আবার তাকে সতর্ক করেন এবং বলেন, “আল্লাহর রাস্তায় তোমার বিরুদ্ধে জিহাদ করার চেয়ে উত্তম কোনো কাজ আমি দেখি না, আমি আমার জিহ্বা দিয়ে তোমার বিরুদ্ধে লড়ব…।” ফলে সে তাকে হত্যা করে।

    সারসংক্ষেপ (الخلاصة):

    খিলাফতের অনুপস্থিতি এবং আল্লাহর আইন পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ার বর্তমান প্রেক্ষাপটে, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় দলীয় কাজ (العمل الحزبي) এর ভূমিকা ও বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। নিচে কুরআন-সুন্নাহ ও আলেমদের মতামতের ভিত্তিতে এর একটি শরয়ি ও বাস্তবিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হলো:

    খিলাফত প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিত কাজের বাধ্যবাধকতা:

    শর’ঈ দলিল:

    (وَلۡتَكُن مِّنكُمۡ أُمَّةٞ يَدۡعُونَ إِلَى ٱلۡخَيۡرِ وَيَأۡمُرُونَ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِۚ)

    “আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল (উম্মাহ) থাকা উচিত যারা কল্যাণের দিকে ডাকবে, সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে।” (সূরা আল ইমরান: ১০৪)

    এখানে ‘উম্মাহ’ বলতে একক ব্যক্তির পরিবর্তে সামষ্টিক সংগঠনকে বোঝানো হয়েছে, যা সুসংগঠিত রাজনৈতিক/দলীয় কাজের (العمل الحزبي المنظم) বৈধতা প্রমাণ করে।

    হাদিস: নবী (সা.) বলেছেন: “ইমাম (খলিফা) হলেন ঢালস্বরূপ, যার পেছনে থেকে লড়াই করা হয় এবং যার দ্বারা আত্মরক্ষা করা হয়।” (মুত্তাফাক আলাইহি)। এটি মুসলিমদের রক্ষাকারী একটি রাজনৈতিক সত্তার প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করে।

    এটি স্পষ্ট যে, দলীয় কাজ একটি ‘ফরজে কিফায়া’, কেউ আদায় করলে অন্যদের ওপর থেকে দায়িত্ব মওকুফ হয়। আজকে ইসলামী রাষ্ট্রের অনুপস্থিতিতে ইসলামী জীবনব্যবস্থা পুনরায় শুরু করার জন্য খিলাফত রাশিদাহ প্রতিষ্ঠায় দলীয় কাজ অবশ্যই থাকতে হবে।

    এই দলের কাজ হবে: ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে বোঝার জন্য উম্মাহর রাজনৈতিক মনন তৈরি করা, ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ ও মানবসৃষ্ট আইনের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম করা, এবং মানবসৃষ্ট আইন দিয়ে শাসনকারী দালাল শাসকদের উৎখাত করার জন্য তাদের ওপর শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা। উম্মাহর প্রকৃত স্বার্থ ধারণ করা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ জায়েয নেই, কারণ তা মানবসৃষ্ট আইনের বৈধতা স্বীকার করে নেওয়ার নামান্তর, যা শরিয়তে হারাম।

    আজকে উম্মাহর করণীয়:

    রাজনৈতিক সচেতনতা: খিলাফতের অনুপস্থিতিই যে সমস্ত সংকটের (দুর্বলতা, বিভক্তি, দখলদারিত্ব) মূল, তা অনুধাবন করা।

    সুসংগঠিত কাজে সমর্থন: এমন ইসলামী দলে (আহযাব) যোগদান করা যা শরিয়ত মেনে চলে, ইসলামকে তাদের আদর্শিক নেতৃত্ব হিসেবে গ্রহণ করে এবং মূলনীতির ক্ষেত্রে আপোস করে না।

    ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করা: কারণ এতে অংশগ্রহণ বর্তমান অবস্থাকেই পাকাপোক্ত করে।

    সাহায্যের জন্য প্রস্তুতি: রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তা পরিচালনার যোগ্য জনশক্তি (ক্যাডার) তৈরি করা।

    চূড়ান্ত সারসংক্ষেপ: রাজনৈতিক দলীয় কাজ কি ওয়াজিব? হ্যাঁ, যদি লক্ষ্য হয় শরিয়ত প্রতিষ্ঠা করা, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার সাথে মানিয়ে নেওয়া নয়।

    সুতরাং এমন একটি হিযব (দল) থাকতে হবে যারা ইসলামকে ধারণ করে এবং পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নববী পদ্ধতি (মানহাজ আন-নুবুওয়াহ) অনুসরণ করে। বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে উম্মাহকে রাজি করানো এবং শক্তিমানদের কাছ থেকে নুসরাহ (সাহায্য) চাওয়ার ওপর জোর দিতে হবে।

    “খিলাফত হলো সকল ফরজের মুকুট (تَاج الفُرُوض)। আল্লাহর ওয়াদা কখনো খেলাফ হয় না। কিন্তু প্রশ্ন হলো: আমরা কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার মতো কাজ করব নাকি অপমান মেনে নেব?” বিষয়টি একাকী কাজ আর দলীয় কাজের মধ্যে পছন্দের নয়, বরং এটি হলো কঠোর পরিশ্রম অথবা বাস্তবতার কাছে আত্মসমর্পণ করার মধ্যকার একটি বিষয়।

    এমন কোনো আদর্শিক দল কি আছে যারা ইসলামকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে ধারণ করে?

    হ্যাঁ, শীর্ষস্থানীয় দল ‘হিযবুত তাহরীর’ (حزب التحرير), যারা তার অনুসারীদের সাথে মিথ্যা বলে না। দলীয়করণ (হিযবিয়্যাহ) সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কী এবং যারা দলীয়করণকে হারাম বলে তাদের তারা কীভাবে খণ্ডন করে?

    হিযব’ হলো “একটি রাজনৈতিক দল যা খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামী জীবনব্যবস্থা পুনরায় শুরু করার জন্য কাজ করে।”

    তাহাযযুব (تحزب – ইসলামী রাজনৈতিক দলে যোগদান করা) হারাম নয়, বরং তা ওয়াজিব যদি দলটি একটি হারানো ফরজ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে।

    দলিল:

    (وَلۡتَكُن مِّنكُمۡ أُمَّةٞ يَدۡعُونَ إِلَى ٱلۡخَيۡرِ)
    (সূরা আল ইমরান: ১০৪)

    তারা বলেন যে, এখানে ‘উম্মাহ’ বলতে সুসংগঠিত দল (হিযব)-কে বোঝানো হয়েছে।

    কেন কিছু ইসলামী গোষ্ঠী ‘তাহাযযুব’ বা দলীয়করণ হারাম বলে?

    কিছু দল (যেমন ঐতিহ্যবাহী সালাফিরা) নিম্নলিখিত কারণে এটি হারাম বলে:

    বিভক্তির ভয়: তারা “আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে” হাদিস দিয়ে দলিল দেয় এবং মনে করে দলগুলো বিভক্তির কারণ।

    বিদআত মনে করা: তারা দাবি করে যে সালাফদের যুগে রাজনৈতিক দল ছিল না।

    ‘হিযব’ এবং ‘ফিরকাহ দাল্লাহ’ (الفرقة الضالة – পথভ্রষ্ট দল)-এর মধ্যে পার্থক্য গুলিয়ে ফেলা: কারণ কুরআন মাঝে মাঝে ‘আহযাব’ শব্দটি বিভ্রান্ত দলের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছে, যেমন: (كُلُّ حِزۡبِۢ بِمَا لَدَيۡهِمۡ فَرِحُونَ)।

    এই দাবিগুলোর খণ্ডন:

    কুরআন ও সুন্নাহ থেকে প্রমাণ: তারা নিশ্চিত করে যে ‘হিযব’ শব্দটি কুরআনে ইতিবাচক অর্থেও এসেছে। যেমন: (أُوْلَٰٓئِكَ حِزۡبُ ٱللَّهِۚ) (সূরা মুজাদালাহ: ২২)। হাদিস: “আল্লাহর কাছে সহনশীল একনিষ্ঠ দ্বীন (হানিফিয়্যাহ সামহাহ) সবচেয়ে প্রিয়” (বুখারি)। তারা বলেন যে এর মধ্যে সুসংগঠিত দলীয় কাজও অন্তর্ভুক্ত।

    ‘হিযব’ এবং ‘ফিরকাহ’ এর মধ্যে পার্থক্য: হিযব শরয়ি দলিল অনুযায়ী কাজ করে এবং উম্মাহকে বিভক্ত করে না। আর ‘ফিরকাহ দাল্লাহ’ কুরআন-সুন্নাহর বিরোধিতা করে।

    ‘তাহাযযুব’ এবং ‘তাফাররুক’ (বিচ্ছিন্নতা)-এর মধ্যে পার্থক্য: সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক দলীয়করণ (التحزب السياسي المنضبط) কোনো বিভক্তি নয়, বরং এটি ইসলামী কাজের একটি সুশৃঙ্খল রূপ। কিছু গোষ্ঠী শরয়ি নস বুঝতে না পারার কারণে একে হারাম বলে, তা সদিচ্ছায় হোক বা মন্দ ইচ্ছায়।

    অগ্রাধিকারযোগ্য মতামত (الرأي الراجح):

    শরয়ি দলিলসমূহ ঢালাওভাবে ‘তাহাযযুব’ বা দল গঠনকে হারাম করে না, বরং বাতিল বা ফিতনা সৃষ্টিকারী দল গঠনকে হারাম করে। শরিয়তের সীমারেখার ভেতরে সুসংগঠিত কাজ দলীয় কাজের উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তি করে ওয়াজিব, মানদুব (মুস্তাহাব) বা মুবাহ হতে পারে। যদি এই কাজ কোনো ফরজ আদায়ের জন্য হয়, তবে তা ওয়াজিব। আর বর্তমানে ইসলাম দ্বারা শাসনকারী রাষ্ট্রের অনুপস্থিতিতে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা কেবল ফরজই নয়, বরং তা হলো ‘তাজ আল-ফুরুজ’ (সকল ফরজের মুকুট)।


    হিযবুত তাহরীর-এর শায়খ ইউসূফ মাখারাজি বলেন,

    আমরা বিশ্বাস করি না যে সত্য কেবল আমাদের মাঝেই সীমাবদ্ধ, আর আমরা কেবল দলের (হিযব – حزب) স্বার্থেও কাজ করি না।”

    বরং, আমরা আমাদের রব আল্লাহ ﷻ-এর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করি, সেই উপলব্ধি ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে যার ওপর আমাদের দলটি প্রতিষ্ঠিত এবং যা কিতাব (কুরআন) ও সুন্নাহ থেকে উৎসারিত। আমরা দাবি করি না যে আমরাই সামগ্রিক উম্মাহ (أمة), কিংবা যে আমাদের হিযব (حزب) ত্যাগ করল সে উম্মাহ থেকে বের হয়ে গেল এমনটিও বলি না। বরং আল্লাহ ﷻ যদি কোনো ব্যক্তি বা মুসলিমদের কোনো দলকে সঠিক পথের সন্ধান দেন, তবে আমরা আনন্দিত হই।

    আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে কোনো জাতি, রাষ্ট্র বা গোত্রের প্রতি অন্ধ পক্ষপাতিত্ব (عصبية – আসাবিয়্যাহ) করতে নিষেধ করেছেন। তাই, আমরা জাতীয়তাবাদ, গোত্রবাদ বা অন্ধ দলীয়করণের অনুসরণ করি না।

    তা সত্ত্বেও, আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে আমাদের বংশ, গোত্র, জাতি বা দল (হিযব) ত্যাগ করার নির্দেশ দেননি। আল্লাহ ﷻ বলেছেন,

    ﴿يا أَيُّهَا النّاسُ إِنّا خَلَقناكُم مِن ذَكَرٍ وَأُنثى وَجَعَلناكُم شُعوبًا وَقَبائِلَ لِتَعارَفوا إِنَّ أَكرَمَكُم عِندَ اللَّهِ أَتقاكُم إِنَّ اللَّهَ عَليمٌ خَبيرٌ﴾

    “হে মানবজাতি! নিশ্চয়ই আমরা তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক মর্যাদাবান, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।” [সূরা আল-হুজুরাত: ১৩]।

    সুতরাং, আল্লাহ ﷻ-ই আমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছেন এবং তিনিই আমাদেরকে নর ও নারী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। তবে, কোনো পুরুষের জন্য তার পুরুষত্ব নিয়ে অন্ধ অহংকার করা বৈধ নয়, যার ফলে সে নারীদের মূল্যহীন মনে করবে; তেমনি কোনো নারীর জন্যও তার নারীত্ব নিয়ে অন্ধ অহংকার করা বৈধ নয়, যার ফলে সে পুরুষদের অভিশাপ বা আপদ মনে করবে। একইভাবে, কারো জন্য তার জাতি, গোত্র বা দেশ নিয়ে অন্ধ পক্ষপাতিত্ব করাও বৈধ নয়, কারণ তা হারাম (حرام)।

    তবে, কেউ যদি তার ভাইয়ের প্রতি অবিচার করে, তখন একজন মানুষ তার ভাইয়ের পক্ষে দাঁড়ায় বা সাহায্য করে, আর এটি কোনো অন্ধ পক্ষপাতিত্ব নয়।

    একইভাবে, আল্লাহ ﷻ আমাদের একটি হিযব (حزب) বানিয়েছেন এবং তিনি হিযবকে নিজের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। কারণ, হিযব যদি নিন্দনীয় কিছু হতো, তবে তিনি তাঁর অলি (বন্ধু বা প্রিয়জন)-দের সম্পর্কে একথা বলতেন না, ﴿أُوْلَئِكَ حِزْبُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ﴾ “তারাই আল্লাহর দল (হিযবুল্লাহ)। জেনে রেখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর দলই সফলকাম।” [সূরা আল-মুজাদালাহ: ২২]।

    সুতরাং, আল্লাহর বাণী শোনার পর, যেখানে তিনি তাঁর বন্ধুদের একটি ‘হিযব’ (দল) হিসেবে গণ্য করেছেন, আপনার জন্য এটি বৈধ নয় যে আপনি দলীয়করণকে বিভক্তির সমার্থক বানাবেন এবং ঢালাওভাবে তার নিন্দা করবেন। বরং, দলীয়করণ শয়তানের জন্যও হতে পারে, আবার তা পরম করুণাময়ের জন্যও হতে পারে। তাই, আপনি এমন কোনো গোত্রের নিন্দা করতে পারেন না যারা তাদের সন্তানদের রক্তের বিচার চাইতে সংঘবদ্ধ হয়, কিন্তু আপনি অবশ্যই সেই গোত্রের নিন্দা করবেন যারা আগ্রাসনের জন্য সংঘবদ্ধ হয়। নিন্দনীয় বিষয় গোত্রের সংঘবদ্ধ হওয়া নয়, বরং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ওপর তাদের সংঘবদ্ধ হওয়াই নিন্দনীয়।

    আর ফরজে কিফায়া (فروض الكفاية – সামষ্টিক আবশ্যিক দায়িত্ব)-এর ক্ষেত্রে মুসলিমদের একটি দলের জন্য শরয়ি দায়িত্ব পালনার্থে সংঘবদ্ধ হওয়ার বিস্তৃত সুযোগ রয়েছে। কোনো শহরের প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর মৃতকে দাফন করার দায়িত্ব থাকে না; বরং একদল মানুষ পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে এই কাজটি সম্পন্ন করতে এগিয়ে আসে। একইভাবে, দ্বীন (دين) প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা ও সম্মিলিত কাজের প্রয়োজন, এবং সাধারণত একজন ব্যক্তির পক্ষে একাকী দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। ফলে, এই ফরজ দায়িত্বটি আদায় করার জন্য কিছু মুসলিমের সংঘবদ্ধ হওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে। আর তাদের এই সংঘবদ্ধ হওয়া মুসলিমদের বিভক্তি নয়, বরং এটি তাদের ঐক্যবদ্ধ করারই একটি মাধ্যম।

    আর আপনি দেখতে পাচ্ছেন যে, শাসকগোষ্ঠী বা রাষ্ট্রব্যবস্থাগুলো অন্যায়-অবিচার চালিয়ে যাচ্ছে, অথচ অধিকাংশ উলামা (علماء – আলেমগণ) এর প্রতিবাদ করতে অক্ষম।

    আর যখনই আপনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন, লোকেরা মনে করে আপনি ‘হিযবুত তাহরীর’ (حزب التحرير)-এর লোক। কারণ তারা অধিকাংশ সময় দেখতে পায় যে, এই দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন ছাড়াই একাকী দাঁড়িয়ে আছে এবং মানুষ বিষয়টিকে তাদের (দলের) ব্যক্তিগত ইস্যু বলে মনে করে।

    আর যখন গোত্রগুলো সোচ্চার হয়, লোকেরা বলে, “হিযব তাদের সোচ্চার করেছে।” কারণ মানুষ জানে যে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এমন একটি বৈশিষ্ট্য যা এই হিযব থেকে অবিচ্ছেদ্য।

    তাহলে আমরা যা করেছি তা কি উম্মাহর মধ্যে ভাঙন ও বিভক্তি সৃষ্টির কোনো রূপ?

    বস্তুত, আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ-এর বিরুদ্ধেও পিতাকে তার সন্তান থেকে এবং স্বামীকে তার স্ত্রী থেকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ আনা হয়েছিল।

    আর মানুষ হলো জলের বিন্দুর মতো: যখন তারা একত্রিত হয়, তখন তাদের নিয়ে উপত্যকা প্রবাহিত হয়, ফলে লোকেরা সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করে এবং ভূমি উপকৃত হয়; কিন্তু যখন তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়, তখন তারা শুকিয়ে যায়।

    দ্বীনের শত্রুরা ছাড়া আর কেউই একথা বলে না যে হিযব বিভক্ত করে। কারণ, তারা চায় আমরা যেন বিচ্ছিন্ন একাকী ব্যক্তিতে পরিণত হই।

    সর্বশক্তিমান আল্লাহ ﷻ চান আমরা যেন প্রতিটি কল্যাণকর কাজের জন্য ঐক্যবদ্ধ হই।

    আর সামগ্রিকভাবে সকল মুসলিমের পক্ষে কোনো একটি ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ বাস্তবে নেই। এমনকি জিহাদের (جهاد) ক্ষেত্রেও প্রথমে সীমান্তবাসীরা একত্রিত হয়, তারপর শহরের লোকেরা, এরপর দ্বীনের অন্যান্য লোকেরা। সম্পূর্ণ উম্মাহর একসাথে জড়ো হওয়া একটি বিরল ঘটনা।

    সুতরাং, আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার উদ্দেশ্যে মুসলিমদের জন্য হিযব (حزب) বা দল গঠন করা সম্পূর্ণ বৈধ।

    আর এটি এমন একটি বিষয় যা জবরদস্তিমূলক, স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী প্রত্যাখ্যান করে; যারা এমনকি দুজন মানুষকেও কোনো ভালো কাজের জন্য একত্রিত হতে বাধা দেয়।

    ফিলিস্তিনের তামিমি গোত্রের দিওয়ানে (পরিষদে) যখন লোকেরা অনৈতিকতা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা (اختلاط – ইখতিলাত), বেপর্দা (تبرج – তাবাররুজ) এবং অশ্লীলতা প্রত্যাখ্যান করে একত্রিত হয়েছিল, তখন কেউ কেউ একে গোত্রবাদ ও দলীয়করণ আখ্যা দিয়ে এর নিন্দা করেছিল। অথচ এটি একটি মহৎ উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। তাই চরম অন্ধ—শারীরিক ও রূপক উভয় অর্থেই সত্যের প্রতি অন্ধ—অথবা বাতিলের সাথে বন্ধুত্বকারী কোনো জঘন্য সীমালঙ্ঘনকারী ছাড়া আর কেউই এর নিন্দা করতে পারে না।

    তাহলে, আপনি যখন দেখতে পাচ্ছেন যে হিযব অন্যায়ের মোকাবিলা করছে, তখন এই হিযব থেকে নিজেকে নির্দোষ বা সম্পর্কহীন প্রমাণের জন্য তাড়াহুড়ো করার অর্থ কী?

    বরং, আপনার শর’ঈ দায়িত্ব হলো হকের (সত্যের) পক্ষে সমর্থক হওয়া এবং যারা এর খাতিরে কারাবরণ করছে ও নির্যাতিত হচ্ছে তাদের প্রশংসা করা। এমন এক সময়ে যখন উলামারা যেন মৃতদের মতো নীরব রয়েছেন, অথচ আল্লাহ ﷻ স্বয়ং হিযবের ধারণাকে নিজের দিকে সম্পৃক্ত করার পরও তারা একে হারাম (حرام) ঘোষণা করার জন্য নিজেদের কণ্ঠ উঁচু করেছেন। আর আল্লাহর বন্ধুরাও হিযব হতে চেয়েছিলেন।

    বস্তুত, মুসলিমরা ছিলেন মুহাজির (مهاجرين) এবং আনসার (أنصار)। তাদের কেউ কেউ এর ভিত্তিতে একে অপরের বিরুদ্ধে নিজ পক্ষের লোকদের সমর্থন করতেন। রাসূল ﷺ তাদেরকে জাহিলিয়াতের (جاهلية – অজ্ঞতার যুগ) এই প্রথা থেকে নিষেধ করেছিলেন, তবে তিনি তাদের প্রতি তাঁর সন্তুষ্টি নিশ্চিত করেছিলেন, এই সাক্ষ্য দিয়ে যে আল্লাহ মুহাজির ও আনসারদের প্রতি সন্তুষ্ট।

    এরপরও এমন অনেকে আছেন যারা এই ধরনের নামযুক্ত গোষ্ঠীগুলো পছন্দ করেন না এবং দাবি করেন যে আল্লাহ ﷻ আমাদের যে নাম দিয়েছেন অর্থাৎ ‘মুসলিম’, আমাদের কেবল তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত।

    অথচ, তারা নিজেরাই এর সীমা অতিক্রম করে নিজেদেরকে ওয়াহাবি, সালাফি, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ এবং নাজাতপ্রাপ্ত দল (ফিরকাহ নাজিয়াহ) হিসেবে আখ্যায়িত করে, অথচ অন্যদেরকে ইসলামের বাইরে কোনো পরিচয় ধারণ করতে নিষেধ করে।


    شؤون الأمة: التكتل الحزبي بدعة عصرية أم ضرورة شرعية؟

  • প্রশ্ন-উত্তর: সূরা আন-নিসার ৭৮ ও ৭৯ নং আয়াতে ভালো (হাসানাহ) ও মন্দের (সাইয়্যিআহ) ধারণা

    প্রশ্ন-উত্তর: সূরা আন-নিসার ৭৮ ও ৭৯ নং আয়াতে ভালো (হাসানাহ) ও মন্দের (সাইয়্যিআহ) ধারণা

    বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম
    প্রশ্ন-উত্তর

    সূরা আন-নিসার ৭৮ ও ৭৯ নং আয়াতে ভালো (হাসানাহ) ও মন্দের (সাইয়্যিআহ) ধারণা
    (অনূদিত)
    প্রাপক: মাহমুদ সুন্নুকরুত

    প্রশ্ন:

    পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে।

    সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, আর দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূল, তাঁর পরিবারবর্গ, তাঁর সাহাবীবৃন্দ এবং তাঁর অনুসরণকারীদের ওপর। আপনার ওপর আল্লাহর শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। হে আমাদের সম্মানিত শায়খ, আল্লাহ আপনাকে রক্ষা করুন, আপনার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ বৃদ্ধি করুন এবং তিনি যা ভালোবাসেন ও যাতে সন্তুষ্ট হন সেই পথে আপনাকে পরিচালিত করুন। আমরা মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদের জন্য খুব দ্রুত বিজয় এবং ক্ষমতা ত্বরান্বিত করেন এবং অদূর ভবিষ্যতে আপনার মাধ্যমে তা নিয়ে আসেন… তিনিই এর অভিভাবক এবং এর জন্য সক্ষম।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) তাঁর পবিত্র গ্রন্থের সূরা আন-নিসার ৭৮ ও ৭৯ নং আয়াতে বলেছেন:

    (أَيْنَمَا تَكُونُوا يُدْرِكْكُمُ الْمَوْتُ وَلَوْ كُنْتُمْ فِي بُرُوجٍ مُشَيَّدَةٍ وَإِنْ تُصِبْهُمْ حَسَنَةٌ يَقُولُوا هَذِهِ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَإِنْ تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ يَقُولُوا هَذِهِ مِنْ عِنْدِكَ قُلْ كُلٌّ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ فَمَالِ هَؤُلَاءِ الْقَوْمِ لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ حَدِيثاً * مَا أَصَابَكَ مِنْ حَسَنَةٍ فَمِنَ اللَّهِ وَمَا أَصَابَكَ مِنْ سَيِّئَةٍ فَمِنْ نَفْسِكَ وَأَرْسَلْنَاكَ لِلنَّاسِ رَسُولاً وَكَفَى بِاللَّهِ شَهِيداً)

    “তোমরা যেখানেই থাক না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, এমনকি যদিও তোমরা সুউচ্চ সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করো।” আর যদি তাদের কোনো কল্যাণ হয়, তবে তারা বলে, “এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে”, আর যদি তাদের কোনো অকল্যাণ হয়, তবে তারা বলে, “এটি আপনার কারণে।” ˹হে নবী,˺ বলে দিন, “সবকিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত।” তবে এ সম্প্রদায়ের কী হলো যে, তারা কোনো কথাই বুঝতে চায় না? * আপনার যে কল্যাণ হয় তা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর আপনার যে অকল্যাণ হয় তা আপনার নিজের কারণে। আর ˹হে নবী˺ আমরা আপনাকে ˹সকল˺ মানুষের জন্য রাসূলরূপে প্রেরণ করেছি। আর সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।” [আন-নিসা: ৭৮-৭৯]।

    প্রথম আয়াতের বক্তব্য অনুযায়ী কল্যাণ ও অকল্যাণ উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, এর সাথে দ্বিতীয় আয়াতের বক্তব্য অনুযায়ী (শুধুমাত্র) কল্যাণ আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে আর অকল্যাণ নিজের কারণে আসে, এই দুটির মধ্যে আমরা কীভাবে সমন্বয় করব? বিশেষ করে প্রথম আয়াতের শেষে যারা অকল্যাণের বিষয়ে বলেছিল “এটি আপনার কারণে”, তাদেরকে ভর্ৎসনা করা হয়েছে:

    (فَمَالِ هَؤُلَاءِ الْقَوْمِ لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ حَدِيثاً)

    “তবে এ সম্প্রদায়ের কী হলো যে, তারা কোনো কথাই বুঝতে চায় না?”

    আপনার কাছ থেকে একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা পেলে আমি কৃতজ্ঞ থাকব, কারণ বেশ কয়েকজন সমসাময়িক শায়খের ভিডিও ক্লিপ দেখার পরও আমি যা খুঁজছিলাম তা পাইনি। তাদের কথাগুলো মূলত সাধারণ ও অস্পষ্ট ছিল, বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা ছিল না। আল্লাহ আমাদের পক্ষ থেকে আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

    উত্তর:

    ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

    প্রথমত, আমার ভাই, আপনার প্রশ্নের বিষয়টি হলো মহান আল্লাহর নিম্নোক্ত দুটি পবিত্র আয়াতের বাণী:

    প্রথমটি:

    (وَإِنْ تُصِبْهُمْ حَسَنَةٌ يَقُولُوا هَذِهِ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَإِنْ تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ يَقُولُوا هَذِهِ مِنْ عِنْدِكَ قُلْ كُلٌّ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ فَمَالِ هَؤُلَاءِ الْقَوْمِ لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ حَدِيثاً)

    “আর যদি তাদের কোনো কল্যাণ হয়, তবে তারা বলে, “এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে”, আর যদি তাদের কোনো অকল্যাণ হয়, তবে তারা বলে, “এটি আপনার কারণে।” ˹হে নবী,˺ বলে দিন, “সবকিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত।” তবে এ সম্প্রদায়ের কী হলো যে, তারা কোনো কথাই বুঝতে চায় না?” [আন-নিসা: ৭৮]।

    এবং দ্বিতীয়টি:

    (مَا أَصَابَكَ مِنْ حَسَنَةٍ فَمِنَ اللَّهِ وَمَا أَصَابَكَ مِنْ سَيِّئَةٍ فَمِنْ نَفْسِكَ وَأَرْسَلْنَاكَ لِلنَّاسِ رَسُولاً وَكَفَى بِاللَّهِ شَهِيداً)

    “আপনার যে কল্যাণ হয় তা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর আপনার যে অকল্যাণ হয় তা আপনার নিজের কারণে। আর ˹হে নবী˺ আমরা আপনাকে ˹সকল˺ মানুষের জন্য রাসূলরূপে প্রেরণ করেছি। আর সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।” [আন-নিসা: ৭৯]।

    প্রথম আয়াতটি ইহুদি ও মুনাফিকদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছিল, কারণ যখন আল্লাহর রাসূল (সা.) মদিনায় আগমন করেন, তখন তারা বলেছিল: “এই লোকটি এবং তার সঙ্গীরা আমাদের কাছে আসার পর থেকে আমাদের ফল ও ফসলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।” তারা এই ঘাটতি ও খরাকে অকল্যাণ (সাইয়্যিআহ) হিসেবে আখ্যায়িত করে রাসূল (সা.)-এর প্রতি আরোপ করত… কিন্তু যদি ফসল ও ফলের ভালো ফলন হতো (যাকে তারা কল্যাণ বা হাসানাহ বলত), তখন তারা তা আল্লাহর প্রতি আরোপ করে বলত, “এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে।” তাই এই পবিত্র আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এটা স্পষ্ট করার জন্য যে, শস্য ও ফলের প্রতিটি ভালো ফলন বা শস্য ও ফলের প্রতিটি খরা ও ঘাটতি—সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে। এরপর আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) তাদের মূর্খতা স্পষ্ট করে দিয়ে বলেন:

    (فَمَالِ هَؤُلَاءِ الْقَوْمِ لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ حَدِيثاً)

    “তবে এ সম্প্রদায়ের কী হলো যে, তারা কোনো কথাই বুঝতে চায় না?” [আন-নিসা: ৭৮]।

    দ্বিতীয় আয়াতটি মানুষের কর্মের সাথে সম্পর্কিত। যদি কেউ ভালো কাজ করে এবং কল্যাণ, বরকত ও সফলতা লাভ করে, তবে তা হলো (হাসানাহ), তখন সে যেন আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা)-এর প্রশংসা করে, কারণ এটি তার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও বদান্যতা। আর যদি সে মন্দ কাজ করে এবং ক্ষতির সম্মুখীন হয় বা কোনো বিপদে (সাইয়্যিআহ) পতিত হয়, তবে সে যেন বুঝতে পারে যে এটি তার নিজেরই মন্দ কাজের পরিণতি, যেমন আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) অন্য একটি আয়াতে বলেছেন:

    (وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ)

    “তোমাদের ওপর যে বিপদই নেমে আসে তা তোমাদের নিজেদের হাতের কামাই। আর তিনি তো অনেক কিছুই ক্ষমা করে দেন।” [আশ-শূরা: ৩০]।

    আর এর মধ্যে প্রজ্ঞা নিহিত রয়েছে, কারণ আল্লাহ, আল-আযীয (মহাপরাক্রমশালী), আল-হাকীম (মহামহিম প্রজ্ঞাময়), মুমিনদের অন্তর থেকে শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর করার জন্যই দ্বিতীয় আয়াতে বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। প্রথম আয়াতটি ইঙ্গিত করে যে (সুফলন ও সমৃদ্ধি, এবং খরা ও দুর্ভিক্ষ) আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা)-এর পক্ষ থেকেই আসে। কাজেই, শয়তান মানুষের অন্তরে এই কুমন্ত্রণা দিতে পারে যে, তোমাদের কর্ম—তা ভালো হোক বা মন্দ—তোমাদের নিজেদের পছন্দের নয়, বরং তোমরা তা করতে বাধ্য, কারণ (তোমাদের ভালো কাজ এবং মন্দ কাজ) সবই আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা)-এর পক্ষ থেকেই নির্ধারিত, তাই এসব বিষয়ে তোমাদের জবাবদিহি করতে হবে না। তাই, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) দ্বিতীয় আয়াতটি অবতীর্ণ করেছেন এটি স্পষ্ট করার জন্য যে, একজন মানুষ তার নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় যে কাজগুলো করে তার জন্য সে নিজেই দায়ী। যদি সে ভালো কাজ করে এবং এর ফলে দুনিয়া বা আখেরাতে কল্যাণ লাভ করে, তবে তা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অনুগ্রহ ও কৃপা। আর যদি সে মন্দ কাজ করে এবং এর ফলে দুনিয়া বা আখেরাতে কোনো বিপদ বা শাস্তি ভোগ করে, তবে তা তার কৃত মন্দ কাজের কারণেই হয়ে থাকে।

    এবং এভাবেই, বিষয়গুলোর মীমাংসা হয় যে, সুফলন ও খরা অর্থাৎ রিজিক (রিজক)—তা কম হোক বা বেশি, সুফলন হোক বা বন্ধ্যাত্ব—সবই আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা)-এর পক্ষ থেকে আসে। এবং একজন ব্যক্তির নিজস্ব পছন্দের কারণে তার ওপর যা আপতিত হয়: যদি তা কল্যাণকর কিছু হয়, তবে সে দুনিয়া বা আখেরাতে পুরস্কৃত হবে, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অনুগ্রহ, বদান্যতা এবং রহমত (অর্থাৎ, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে), আর যদি তার ওপর যা আপতিত হয় তা অকল্যাণকর কিছু হয়, দুনিয়া বা আখেরাতে শাস্তি হিসেবে, তবে তা তার নিজের করা মন্দের কারণেই হয় (অর্থাৎ, তা তার নিজের কারণে)।

    দ্বিতীয়ত, বিষয়টি আরও স্পষ্ট করার জন্য, কিছু তাফসির গ্রন্থে এই দুটি পবিত্র আয়াত সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা আমি নিচে উদ্ধৃত করছি:

    ১- তাফসিরে ইবনে কাসীরে বলা হয়েছে:

    [অতঃপর আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেন:

    (مَا أَصَابَكَ مِنْ حَسَنَةٍ فَمِنَ اللَّهِ)

    “আপনার যে কল্যাণ হয় তা আল্লাহর পক্ষ থেকে।”

    অর্থাৎ, আল্লাহর কৃপা, অনুগ্রহ, দয়া ও রহমতের কারণে।

    (وَمَا أَصَابَكَ مِنْ سَيِّئَةٍ فَمِنْ نَفْسِكَ)

    “…আর আপনার যে অকল্যাণ হয় তা আপনার নিজের কারণে।”

    অর্থাৎ: আপনার নিজের কৃতকর্মের কারণে, যেমন আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    (وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ)

    “তোমাদের ওপর যে বিপদই নেমে আসে তা তোমাদের নিজেদের হাতের কামাই। আর তিনি তো অনেক কিছুই ক্ষমা করে দেন।” [আশ-শূরা: ৩০]।

    আস-সুদ্দি, আল-হাসান আল-বসরী, ইবনে জুরাইজ এবং ইবনে জায়েদ বলেছেন:

    (فَمِنْ نَفْسِكَ)

    “তা আপনার নিজের কারণে”

    অর্থাৎ: আপনার পাপের কারণে। কাতাদা বলেছেন:

    (مَا أَصَابَكَ مِنْ حَسَنَةٍ فَمِنَ اللهِ وَمَا أَصَابَكَ مِنْ سَيِّئَةٍ فَمِنْ نَفْسِكَ)

    “আপনার যে কল্যাণ হয় তা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর আপনার যে অকল্যাণ হয় তা আপনার নিজের কারণে।” হে আদম সন্তান, তুমি তোমার পাপের কারণেই শাস্তি পাও।

    আর তিনি আমাদের কাছে উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহর নবী (সা.) বলতেন:

    “لا يصيب رجلا خَدْش عود، ولا عثرة قدم، ولا اختلاج عِرْق، إلا بذنب، وما يعفو الله أكثر”

    “লাঠির আঁচড়, পায়ের হোঁচট বা শিরার (পেশীর) খিঁচুনির মতো কোনো বিষয়ও কোনো মানুষকে আক্রান্ত করে না, কেবল কোনো পাপের কারণ ছাড়া। আর আল্লাহ যা ক্ষমা করে দেন, তা তো আরও অনেক বেশি।”

    কাতাদা যা বর্ণনা করেছেন, তা আস-সাহিহ-এ সংযুক্ত সনদসহ বর্ণিত হয়েছে:

    “والذي نفسي بيده، لا يصيب المؤمن هَمٌّ ولا حَزَنٌ، ولا نَصَبٌ، حتى الشوكة يشاكها إلا كَفَّر الله عنه بها من خطاياه”

    “সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ, মুমিনের ওপর কোনো উদ্বেগ, কোনো শোক বা কোনো ক্লান্তি আপতিত হয় না, এমনকি একটি কাঁটা বিঁধলেও না, তবে তার বিনিময়ে আল্লাহ তার কিছু পাপ মোচন করে দেন।”]

    ২- তাফসিরে আল-কুরতুবিতে বলা হয়েছে:

    (أَيْنَما تَكُونُوا يُدْرِكْكُمُ الْمَوْتُ وَلَوْ كُنْتُمْ فِي بُرُوجٍ مُشَيَّدَةٍ وَإِنْ تُصِبْهُمْ حَسَنَةٌ يَقُولُوا هذِهِ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَإِنْ تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ يَقُولُوا هذِهِ مِنْ عِنْدِكَ قُلْ كُلٌّ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ فَمالِ هؤُلاءِ الْقَوْمِ لَا يَكادُونَ يَفْقَهُونَ حَدِيثاً)

    “তোমরা যেখানেই থাক না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, এমনকি যদিও তোমরা সুউচ্চ সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করো।” আর যদি তাদের কোনো কল্যাণ হয়, তবে তারা বলে, “এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে”, আর যদি তাদের কোনো অকল্যাণ হয়, তবে তারা বলে, “এটি আপনার কারণে।” ˹হে নবী,˺ বলে দিন, “সবকিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত।” তবে এ সম্প্রদায়ের কী হলো যে, তারা কোনো কথাই বুঝতে চায় না?” [আন-নিসা: ৭৮]।

    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেন:

    (وَإِنْ تُصِبْهُمْ حَسَنَةٌ يَقُولُوا هذِهِ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ)

    “আর যদি তাদের কোনো কল্যাণ হয়, তবে তারা বলে, ‘এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে।’” অর্থাৎ, যদি মুনাফিকরা সমৃদ্ধি লাভ করে, তবে তারা বলে:

    এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে।

    (وَإِنْ تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ)

    “আর যদি তাদের কোনো অকল্যাণ হয়” অর্থাৎ: বন্ধ্যাত্ব বা খরা, তখন তারা বলে, “এটি আপনার কারণে,” যার অর্থ, “এটি আপনার ও আপনার সঙ্গীদের অশুভ লক্ষণের কারণে আমাদের ওপর পতিত হয়েছে।”

    আর এটি অবতীর্ণ হয়েছিল ইহুদি ও মুনাফিকদের সম্পর্কে, কারণ যখন আল্লাহর রাসূল (সা.) মদিনায় আসেন, তখন তারা বলেছিল, “এই লোকটি এবং তার সঙ্গীরা আমাদের কাছে আসার পর থেকে আমাদের ফল ও ফসলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।” ইবনে আব্বাস বলেছেন, “আর (مِنْ عِنْدِكَ)-এর অর্থ হলো: ‘এটি আপনার কারণে’ অর্থাৎ, আপনার দুর্বল পরিকল্পনার কারণে।” এবং এ কথাও বলা হয়েছে: (مِنْ عِنْدِكَ) “এটি আপনার কারণে” আপনার অশুভ লক্ষণের কারণে, যেমনটি আমরা উল্লেখ করেছি, যার অর্থ আমাদের ওপর আপতিত অশুভ লক্ষণের কারণে।

    তারা কুসংস্কারের প্রকাশ হিসেবে এটি বলেছিল। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেন:

    (قُلْ كُلٌّ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ)

    “˹হে নবী,˺ বলে দিন, ‘সবকিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত।’”

    অর্থাৎ, কষ্ট ও স্বস্তি, জয় ও পরাজয় আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে, অর্থাৎ আল্লাহর বিধান ও নির্ধারণ অনুযায়ী।

    (فَمَالِ هَؤُلَاءِ الْقَوْمِ)

    “তবে এ সম্প্রদায়ের কী হলো” অর্থ মুনাফিকদের কী হলো।

    (لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ حَدِيثاً)

    “যে, তারা কোনো কথাই বুঝতে চায় না” অর্থাৎ; তাদের কী সমস্যা যে তারা বোঝে না সবকিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে…]

    আশা করি এটিই যথেষ্ট, আর আল্লাহই সর্বাধিক পরিজ্ঞাত এবং প্রজ্ঞাময়।

    আপনাদের ভাই,
    আতা বিন খলিল আবু আর-রাশতা

    ৪ সফর ১৪৪৮ হিজরি
    ১৮/০৭/২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

  • বিয়ন্ড দ্যা সিমুলেশন

    বিয়ন্ড দ্যা সিমুলেশন

    Beyond the Simulation

    ২০১৬ সালে কোড কনফারেন্সে টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ককে একটি প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হলে তিনি বললেন, যদি আমাকে একটিই প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে আমি জিজ্ঞেস করতাম: “What is outside the simulation?” অর্থাৎ, এই সিমুলেশনের বাইরে কী আছে? মাস্কের বিশ্বাস ছিল, আমরা যে বাস্তবতায় বাস করছি সেটি অনেকটাই একটি উন্নত সিমুলেশন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এই প্রশ্নটি নিয়ে যদি আমরা গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করি, তাহলে আমরা হয়তো এর উত্তর পেতেও পারি। আজকে আমরা এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজবো।

    ১৯৯৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘The Matrix’ মুভিতে দেখানো হয়, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ আসলে এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি ডিজিটাল জগতে বন্দি। তারা নিজেদের মুক্ত মনে করে, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয় বলে ভাবে। অথচ বাস্তবে তাদের প্রতিটি চিন্তা, ইচ্ছা এবং অনুভূতি একটি সুনির্দিষ্ট কোড দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। মরফিয়াস যখন নিওকে সত্যিকারের পৃথিবী দেখায়, তখন নিও প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারে না। কারণ সে যে জগতকে ‘বাস্তব’ বলে জেনে এসেছে, সেটাই আসলে ছিল সবচেয়ে বড় মিথ্যা। যদিও এই মুভিতে পুরো বিষয়টা রুপক অর্থে বুঝিয়েছে কিন্তু এটি আমাদের বর্তমান জীবনের সাথে অনেকটাই মিলে যায়।

    বর্তমান Capitalist World Order ঠিক এমনই একটি সিমুলেশন তৈরি করে রেখেছে, যেখানে মানুষ নিজেকে স্বাধীন মনে করে এগিয়ে চলে। কিন্তু একটু গভীরে গেলে দেখা যায়, একজন মানুষকে স্বপ্ন কে দেখিয়েছে, তার চাহিদা কে তৈরি করেছে, তার সাফল্যের সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করেছে, উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যাবে এসবের কোনোটিই সে নিজে করে নি।

    ফরাসি দার্শনিক Jean Baudrillard তাঁর বিখ্যাত বই ‘Simulacra and Simulation’-এ এই ঘটনাকে ‘হাইপার-রিয়েলিটি‘ বলেছেন। তাঁর মতে, আধুনিক যুগে মানুষ মূল বাস্তবতার সংস্পর্শ হারিয়ে ফেলেছে। মানুষ এখন বিজ্ঞাপন, মিডিয়া এবং কর্পোরেট সংস্কৃতির তৈরি করা ‘নকল বাস্তবতা’ কেই সত্য ভাবতে শুরু করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার ফিল্টার দেওয়া ছবি বা বাস্তবের চেয়েও আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের জগত আমাদের মস্তিষ্কে যে অনুভূতির তৈরি করে, তা হলো এই হাইপার-রিয়েলিটির অংশ।

    এখন প্রশ্ন এই সিমুলেশন ঠিক কীভাবে কাজ করে? আর এর বাইরে কি আসলেই কোনো জগৎ আছে?

    এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পেতে হলে আমাদের আগে পুঁজিবাদ (Capitalism) এর লুপহোল গুলো সম্পর্কে জানতে হবে। এটি একটি আইডিওলজি বা মতাদর্শ যা থেকে একটি জীবনব্যবস্থা উঠে আসে। পুঁজিবাদের ভিত্তি হচ্ছে জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে ধর্মের পৃথকীকরণ যা সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতা নামে পরিচিত। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রফিট ম্যাক্সিমাইজেশন এবং সর্বোচ্চ মাত্রার ঈন্দ্রিয়গত পরিতুষ্টি বা উপভোগ। এবং এর ভিত্তিতেই সকল কাজ সম্পন্ন হয়।

    পুঁজিবাদ অনেক সূক্ষ্ম কৌশলে তার উদ্দেশ্য হাসিল করে নেয়। সে আপনাকে বন্দি না রেখে, আপনার ইচ্ছাশক্তিকেই তার নিজের স্বার্থে পরিচালিত করে।

    মানুষের কিছু জৈবিক চাহিদা (Organic needs) ও সহজাত প্রবৃত্তি (Instinct) রয়েছে। মানুষ এসব চাহিদা ও প্রবৃত্তি সঠিকভাবে পরিতুষ্ট করতে পারলেই সন্তুষ্ট থাকে, যা মানুষকে আনন্দ ও স্বস্তি দেয় । পুঁজিবাদ মানুষের এসব বৈশিষ্ট্য কে ব্যবহার করে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে। এসব কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করার জন্য বাহ্যিক উদ্দীপনার প্রয়োজন, যা পুঁজিবাদ কৃত্রিমভাবে তৈরি করে। যেমন, বিজ্ঞাপনের মূল কাজ হলো আমাদের বোঝানো যে, আমরা এখন যেখানে আছি সেটা ‘যথেষ্ট’ নয়। আমাদের স্মার্টফোনটি পুরনো হয়ে গেছে, আমাদের গাড়িটি ততটা ‘আধুনিক’ নয়, আমাদের পোশাকটি এই সিজনে ‘আউট অব ফ্যাশন’। এই ক্রমাগত অতৃপ্তির বোধ মানুষকে একটা অসীম ভোগচক্রে আটকে রাখে। ২০২৪ সালে সারা পৃথিবীতে বিজ্ঞাপন খাতে খরচ হয়েছে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি, অর্থাৎ প্রতিটি মানুষের মাথাপিছু গড়ে প্রায় ১৩৯ ডলার শুধু তাকে ‘আরও কিছু কিনতে’ রাজি করানোর জন্য ব্যয় হয়েছে।

    The Matrix-এ এজেন্ট স্মিথ বলে, ম্যাট্রিক্সের প্রথম ভার্সন ছিল একটা পারফেক্ট দুনিয়া। কোনো কষ্ট নেই, কোনো অভাব নেই। কিন্তু মানুষ সেটা টিকিয়ে রাখতে পারেনি। কারণ মানুষ তৃপ্ত থাকা সহ্য করতে পারে না। তার দরকার সমস্যা, তুলনা, আর অতৃপ্তি। পুঁজিবাদও ঠিক এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগায়।

    আমাদেরকে কেউ জোর করে কিছু বলেনি, কিন্তু আমরা জানি জীবন কীভাবে কাটাতে হয়।  ভালো রেজাল্ট করা, নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া, কর্পোরেট চাকরি পাওয়া, বাড়ি-গাড়ি করা, এসবই সুখ। এটা যে আসলে আজীবন দাসত্ব ও ভোগের ফাঁদ সেটা আমরা খুব সহজে বুঝতে পারি না।

    এই ‘লাইফস্ক্রিপ্ট’ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন এটি সবচেয়ে বড় কর্পোরেশনগুলোর জন্য সবচেয়ে বেশি উৎপাদনশীল কর্মী এবং সবচেয়ে বেশি ভোক্তা তৈরি করে। মানুষ এই স্ক্রিপ্টের মধ্যে এতটাই আটকে যায় যে, জীবনের গভীর প্রশ্নগুলো তার মনে আর আসেই না: আমি কে? কেন এসেছি? কোথায় যাচ্ছি? বিশ্বব্যাপী পারিবারিক ঋণের পরিমাণ ২০২৩ সালে ৫৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। মানুষ যে স্বপ্নের জীবন ‘কিনতে’ গিয়েছে, সেই জীবনের বোঝাই এখন তার মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।

    আধুনিক ডিজিটাল যুগে পুঁজিবাদ একটি নতুন সম্পদ আবিষ্কার করেছে মানুষের মনোযোগ (Attention)। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো বিনামূল্যে ব্যবহার করা যায়, কারণ এখানে পণ্য আমরা নিজেরাই। আমাদের মনোযোগ বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি হচ্ছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম ইচ্ছাকৃতভাবে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন আমরা বেশিক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমাদের মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ রিলিজ হয় প্রতিটি নতুন নোটিফিকেশনে, প্রতিটি ‘লাইক’-এ। ধীরে ধীরে আমরা এই চক্রের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ি। ঠিক যেভাবে ম্যাট্রিক্সের মানুষেরা নকল আনন্দে বুঁদ ছিল। Data Reportal-এর ২০২৪ সালের গ্লোবাল রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের গড় মানুষ প্রতিদিন ৬ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট স্ক্রিনের সামনে কাটায় অর্থাৎ জীবনের জেগে থাকা সময়ের প্রায় ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশের মানুষ প্রতিদিন গড়ে ৯ ঘণ্টারও বেশি সময় ইন্টারনেটে ব্যয় করে, যা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয়দের মধ্যে একটি।

    পুঁজিবাদের সবচেয়ে চতুর কৌশলটি হলো, এর বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টাকেও সে পণ্যে পরিণত করে ফেলে। পরিবেশ আন্দোলন হয়ে যায় ‘গ্রিন প্রোডাক্ট’ বিক্রির সুযোগ। বিপ্লবীদের মুখ ছাপা হয় টি-শার্টে। ওটিটি প্ল্যাটফর্মে পুঁজিবাদ-বিরোধী সিরিজ তৈরি হয়, যা থেকে কর্পোরেশনরা কোটি কোটি টাকা আয় করে। এই সিস্টেম আমাদেরকে ‘বিদ্রোহ’ করার অনুমতি দেয়, যতক্ষণ সেই বিদ্রোহ তাদের মুনাফার পথে বাধা না হয়।

    এই পুরো সিমুলেশনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো পরিচয়ের সংকট (Identity Crisis)। মানুষ নিজেকে তার ব্র্যান্ড দিয়ে, তার পদমর্যাদা দিয়ে, তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দিয়ে পরিচয় দেয়। সে ভুলে যায় যে, সে আসলে কি উদ্দেশ্যে এই পৃথিবীতে এসেছে। দুনিয়ার বাহ্যিক সিমুলেশনকেই সে চিনে, আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনে এই অবস্থার সুনির্দিষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন:

    يَعْلَمُونَ ظَاهِرًا مِّنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ

    তারা পার্থিব জীবনের বাহ্যিক দিক জানে এবং আর পরকাল সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ বেখেয়াল [সূরা আর-রূম: ৭]

    أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ

    “তোমরা কি মনে করেছ যে, আমি তোমাদের অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না?”  (সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত: ১১৫)

    এই আয়াতটি মানুষকে একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি করে দেয়: যদি জীবনের কোনো উদ্দেশ্য না-ই থাকে, তাহলে এই চাকরি-টাকা-ভোগের দৌড় কিসের জন্য?

    মানুষ যখন নিজেই নিজের জীবনের অর্থ তৈরি করে, তখন একটাই সমস্যা হয়। সে নিজেই জানে না সে আসলে কী চায়। কারণ মানুষ স্বভাবতই একটা সীমাবদ্ধ ও নির্ভরশীল সত্তা। সে যখন নিজের ইচ্ছা বা প্রবৃত্তিকে জীবনের মানদণ্ড বানায়, তখন ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়াটা অনিবার্য। অনেকে ভাবে সাকসেস মানে ভালো চাকরি, আবার অনেকে ভাবে সাকসেস মানে ফ্রিডম, ভাইরাল হওয়া ইত্যাদি। প্রতিটা উদ্দেশ্য কিছুদিন পর ফাঁকা লাগে, তখন নতুন একটা খোঁজে। এই দৌড়ের কোনো শেষ নেই।

    পুঁজিবাদ এখানেই কাজ করে। মানুষ যখন নিজের মত করে বিভিন্ন রকম উদ্দেশ্য সেট করবে তখন সে ভোগ করা বা বিনোদন কে সুখ মনে করে। এবং একেই জীবনের আল্টিমেট উদ্দেশ্য বানিয়ে ফেলে। এর ফলে পুঁজিবাদীরা তাদের প্রোডাক্ট সেল করে। কিন্তু এতো ভোগের পরও কেন মানুষ শুন্যতা অনুভব করে? কারণ, মানুষ সীমাবদ্ধ সত্তা হওয়ায় সে যদি নিজের উদ্দেশ্য নিজে সেট করে, তাহলে সেটা অবশ্যই ভুল হবে। তাই, আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য নিতে হবে মানুষ, জীবন ও মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এর কাছ থেকে। তিনি বলেন,

    وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

    “আমি জিন ও মানুষকে কেবল এই উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার ইবাদত করবে।” 
    (সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৬)

    এখানে ‘ইবাদত’ বা দাসত্ব মানে শুধু নামাজ-রোজা বা ব্যক্তিগত ইবাদত নয়। ইসলামের পরিভাষায় ইবাদত বা আল্লাহর দাসত্ব বা বন্দেগি মানে জীবনের প্রতিটি কাজকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা, তাঁর আদেশ নিষেধ মেনে তা করা। ঘুমানো, খাওয়া, ব্যবসা করা, সংসার চালানো, রাষ্ট্র পরিচালনা করা। যখন একজন মানুষ বুঝতে পারে যে, তার প্রতিটি মুহূর্তের একটি অর্থ আছে  যা তার সৃষ্টিকর্তা নির্ধারণ করেছেন, তখন সে পুঁজিবাদী সিমুলেশনের বাইরে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পায়।

    অনেকেই ইসলামকে কেবল একটি ‘ধর্মতত্ত্ব’ হিসেবে বোঝেন। নামাজ, রোজা, হজ্বের কিছু আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি। কিন্তু ইসলাম মূলত একটি সম্পূর্ণ আইডিওলজি বা জীবনাদর্শ, যা শুধু ব্যক্তির আধ্যাত্মিক জীবন নয়, বরং সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট বিধান দেয়।

    পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় যে ব্যক্তির কাছে অর্থ আছে সে কোনো পরিশ্রম না করেই সুদের মাধ্যমে আরও ধনী হয়, আর যে ঋণ নেয় সে ক্রমাগত গরিব হতে থাকে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনে অত্যন্ত কঠোরভাবে সুদকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন:

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    “আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৭৫)

    ইসলামী অর্থনীতিতে সুনির্দিষ্ট বন্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পদের একটি অংশ প্রতি বছর সমাজের দরিদ্র শ্রেণির কাছে পৌঁছে দেওয়া বাধ্যতামূলক। এটি গরিবের অধিকার। কুরআনে সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করার কারণটি সরাসরি বলে দেওয়া হয়েছে:

    كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنكُمْ

    “যাতে সম্পদ তোমাদের মধ্যে কেবল ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।” (সূরা আল-হাশর, আয়াত: ৭)

    আজকের পৃথিবীতে Oxfam-এর ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের মাত্র পাঁচজন ধনীর মোট সম্পদ গত চার বছরে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬৯ বিলিয়ন ডলারে, আর একই সময়ে পাঁচ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ আরও গরিব হয়েছে। শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর কাছে পৃথিবীর মোট সম্পদের প্রায় ৮০  শতাংশ কেন্দ্রীভূত।

    রাসূলুল্লাহ (সা.) এর আগমনের আগে আরবের সমাজ ছিল একটি জাহেলি সমাজ। তারা নিজের হাতে পাথর কেটে মূর্তি বানাতো, তারপর সেই মূর্তির সামনে মাথা নত করতো। গোত্রপ্রধান যা বলছে সেটাই সত্য, বাপ-দাদা যা করে এসেছে সেটাই চিরন্তন নিয়ম। মেয়ে সন্তান জন্ম নিলে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে দেওয়া হতো। আর এই পুরো ব্যবস্থাটাকে সবাই “স্বাভাবিক” মনে করেছিল তারা। এটাই ছিল সেই সময়ের সিমুলেশন। কেউ প্রশ্ন করেনি, কারণ সিস্টেমটা এতটাই গভীরে গেঁথে গিয়েছিল যে বিকল্প কল্পনাও করা যাচ্ছিল না।

    ইসলাম এসে সমাজের এই সাধারন চিন্তাকে পরিবর্তন করে। তারা যেটাকে “বাস্তবতা” মনে করতো, সেটা আসলে একটা ধোঁকা।

    وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ 

    “আর পার্থিব জীবন ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়।” (সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৮৫)

    আরবরা যখন এটা বুঝল, তখন তাদের পুরো পৃথিবীটা বদলে গেল। গোত্রের নেতার ভয় চলে গেল, মূর্তির ভয় চলে গেল। কারণ তারা বুঝে গেল আসল ক্ষমতা কোথায়।

    রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কার একটি জাহেলি সমাজ পরিবর্তন করে ইনসাফভিত্তিক ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। মদিনায় হিজরতের পর তিনি এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলেন যেখানে আইনের উৎস ছিল আল্লাহর বিধান, শাসক ছিলেন জনগণের কাছে জবাবদিহিযোগ্য এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা ছিল। সেটাই ছিল খিলাফত ব্যবস্থা, যা দীর্ঘ ১৩০০ বছর পৃথিবীতে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে গেছে। যাতে ধোঁকাবাজির কোনো সিমুলেশন ছিল না।

    মদিনায় সেই সময় একটি সুদভিত্তিক বাজারব্যবস্থা কিছু ইহুদী ব্যবসায়ীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। রাসূল (সা.) বিকল্প একটি স্বতন্ত্র বাজার প্রতিষ্ঠা করলেন, যেখানে অন্যায় মুনাফা ও কৃত্রিম সংকট তৈরি নিষিদ্ধ। সাহাবী আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) সেই বাজারে প্রমাণ করলেন যে, সুদ ও শোষণ ছাড়াও বড় ব্যবসা সম্ভব।

    খলিফা উমর (রা.) এর শাসনামালে তিনি একবার খুতবা দেওয়ার সময় এক সাধারণ নাগরিক উঠে দাঁড়িয়ে খলিফার পরনের কাপড়ের হিসাব চাইলেন। পুঁজিবাদী বা রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই সাহসী নাগরিককে শাস্তি দেওয়া হতো। কিন্তু উমর (রা.) বিনয়ের সাথে তাঁর ছেলেকে ডেকে হিসাব দিলেন।

    জেরুজালেম বিজয়ের সময় উমর (রা.) যখন সেখানে পৌঁছান, তখন দেখা গেল উটের লাগাম তাঁর হাতে, আর উটের পিঠে বসা তাঁর দাস। রোমান কর্তৃপক্ষ এই দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল। তাদের সমস্ত রাজকীয় জাঁকজমকের কৃত্রিম সিমুলেশন এই সত্যের সামনে মূল্যহীন হয়ে পড়ল।

    শুধু রাষ্ট্রকাঠামো নয়, ব্যক্তিজীবনেও ইসলাম পুঁজিবাদী সিমুলেশন থেকে বের হওয়ার পথ দেখায়। মানুষ যখন তার জীবনের সকল কাজ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য তার গাইডেন্স অনুযায়ী করবে, তখন তার অন্তর প্রশান্ত হয়। পুঁজিবাদের এই কৃত্রিম পরিচয় থেকে বের করে তার আসল পরিচয় খুঁজে পায়।

    إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي

    “নিশ্চয়ই আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। সুতরাং আমার ইবাদত করো এবং আমার স্মরণে সালাত কায়েম করো।” (সূরা ত্বহা, আয়াত: ১৪)

    মানুষের ভেতরে থাকা জৈবিক চাহিদা ও সহজাত প্রবৃত্তিগুলোকে ইসলাম এমনভাবে বিন্যস্ত করেছে, যাতে প্রতিটির যথাযথ পরিতৃপ্তি নিশ্চিত হয়। এই চাহিদাগুলোর মধ্যে একটি সুচিন্তিত ভারসাম্য গড়ে তুলে ইসলাম প্রতিটিকেই যথাযথ স্থান দিয়েছে, ফলে মানুষ প্রকৃত তৃপ্তি ও মানসিক প্রশান্তি অনুভব করে। পাশাপাশি এই ব্যবস্থা মানুষকে সেই বিপদ থেকেও নিরাপদ রাখে, যেখানে প্রবৃত্তিকে অবাধ ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলতে দিলে সে পশুতুল্য অবস্থায় নেমে যেতে পারত।

    ইসলামের ‘জুহদ’ (দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তিহীনতা) এবং ‘কানাআত মিন কালীল’ (অল্পে তুষ্টি) সরাসরি ভোগবাদী সংস্কৃতির বিপরীতে দাঁড়ায়। এর মানে এই নয় যে, মুসলমান গরিব থাকবে বা ধনী হওয়ার চেষ্টা করবে না। এর মানে হলো, সে তার সাফল্যকে পুঁজিবাদীদের দেওয়া মানদণ্ডে মাপবে না। সে সত্যিকারের সাফল্যের দিকে ছুটবে, যা হলো চিরস্থায়ী জান্নাত, যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত।

    রাসূল (সা.) বলেছেন: “দুনিয়া মুমিনের কারাগার এবং কাফিরের বেহেশত।” এই হাদিসটি মুমিনকে মনে করিয়ে দেয়, এই পার্থিব জীবন তার চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। পুঁজিবাদের পুরো সিমুলেশন ‘দুনিয়াই সব’ এই বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে। যেদিন মানুষ বিশ্বাস করে যে, এই পৃথিবীর বাইরেও একটি চিরস্থায়ী জীবন আছে, সেদিন থেকেই সিমুলেশনের দেয়ালে ফাটল ধরতে শুরু করে।

    রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    আল্লাহর কসম! আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার উদাহরণ তো ঠিক ওইরূপ, যেমন তোমাদের কেউ নিজের এই আঙুলটি (হাদিসের রাবী ইয়াহইয়া শাহাদাত আঙুল দিয়ে ইশারা করে দেখালেন) সমুদ্রে ডুবিয়ে দিল। এরপর সে যেন লক্ষ্য করে দেখে যে, আঙুলটি কী পরিমাণ পানি নিয়ে ফিরে এসেছে। (সহীহ মুসলিম- ২৮৫৮)

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন:

    اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ

    “জেনে রেখো, পার্থিব জীবন তো কেবল খেলা, কৌতুক, সাজসজ্জা এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যে গর্ব করা ও ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।” (সূরা আল-হাদিদ, আয়াত: ২০)

    এই আয়াত আধুনিক ভোগবাদী সমাজের একটি নিখুঁত চিত্র। এটি আজকের ইনস্টাগ্রাম ফিড, ব্র্যান্ডের প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক স্ট্যাটাসের দৌড়কে এক কথায় সংজ্ঞায়িত করে দেয়।

    The Matrix-এ মরফিয়াস নিওকে দুটো অপশন দিয়েছিল। Blue pill মানে সব ভুলে ম্যাট্রিক্সের আরামদায়ক মিথ্যায় ফিরে যেতে বলেছিল, জীবন চলতে থাকুক। Red pill মানে সত্য দুনিয়া, সেটা যতটাই কঠিন হোক। ইসলাম আমাদের সত্যের পথ দেখায়, সেতা যতটাই কঠিন হোক। কারণ, এই পথেই আছে সত্যিকারের মুক্তি।

    পারস্যের সেনাপতি রুস্তমের বিশাল দরবারে সাহাবি রিবঈ ইবনে আমের (রা.) দাঁড়িয়ে বলেছিলেন: “আল্লাহ আমাদের পাঠিয়েছেন মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে বের করে আল্লাহর দাসত্বে নিয়ে আসতে, পার্থিব জীবনের সংকীর্ণতা থেকে বের করে এর প্রশস্ততার দিকে নিয়ে যেতে।”

    এই কথাটি আজও ততটাই প্রাসঙ্গিক। পুঁজিবাদী সিমুলেশন মানুষকে ‘মানুষের দাসত্বে’ রেখেছে। ইসলাম সেই দাসত্ব থেকে মুক্তির পথ দেখায়।

    প্রাথমিক যুগের মুসলমানরা যখন ইসলামী জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল, তখন মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে তারা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও ন্যায়পরায়ণ সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। এই সাফল্যের রহস্য ছিল একটাই, তারা দুনিয়াকে লক্ষ্য হিসেবে নয়, বরং উপায় হিসেবে দেখত।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন, যারা তাঁর পথে দৃঢ় থাকে তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ প্রতিশ্রুতি:

    إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ

    “নিশ্চয় যারা বলে, ‘আল্লাহই আমাদের রব’ অতঃপর অবিচল থাকে, ফেরেশতারা তাদের কাছে নাযিল হয় (এবং বলে,) ‘তোমরা ভয় পেয়ো না, দুশ্চিন্তা করো না এবং সেই জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ কর তোমাদেরকে যার ওয়াদা দেয়া হয়েছিল’।” (সূরা ফুস্সিলাত, আয়াত: ৩০)

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনে আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন:

    وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا

    “যে ব্যক্তি আমার স্মরণ থেকে বিমুখ থাকে, তার জীবন হবে সংকুচিত।” (সূরা ত্বহা, আয়াত: ১২৪)

    এই আয়াতটি অসাধারণভাবে ব্যাখ্যা করে কেন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং আত্মহত্যা। WHO-এর ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ২৮০ কোটিরও বেশি মানুষ বিষণ্নতায় আক্রান্ত। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় ৫০,০০০+ মানুষ আত্মহত্যা করে, যা যেকোনো যুদ্ধে আমেরিকার বার্ষিক মৃত্যুর চেয়ে বেশি। বস্তুগত সমৃদ্ধি যখন সর্বোচ্চে পৌঁছায়, তখন আত্মার শূন্যতাও সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। কারণ মানুষের ভেতরে এমন একটি শূন্যতা আছে, যা শুধু তার স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক দিয়েই পূরণ হয়। কোনো গাড়ি বা পদমর্যাদা দিয়ে নয়।

    এই সিমুলেশনের বাইরে আছে একটি জীবন যেখানে প্রতিটি মুহূর্তের অর্থ আছে, প্রতিটি কাজের একটি চুড়ান্ত উদ্দেশ্য আছে। ইসলাম হলো সেই “রিয়েল ওয়ার্ল্ড” বা প্রকৃত সত্য, যা এই সিমুলেশনের বাইরে নিয়ে যায়।

    The Matrix-এর নিও যখন প্রথমবার Red pill খেয়ে ম্যাট্রিক্সের বাইরের বাস্তবতা দেখে, তখন সে অবাক হয়ে যায়। বাস্তবতা তার কল্পনার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন, কিন্তু অনেক বেশি সত্যিও। আমাদের সামনেও একই পছন্দ আছে। পুঁজিবাদী সিমুলেশনের মিষ্টি মিথ্যায় ডুবে থাকা, নাকি ইসলামের দেখানো মুক্তির পথ বেছে নেওয়া। ইসলাম একটি পূর্ণ জীবনব্যবস্থা যা ব্যক্তির মন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের কাঠামো পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে একটি বিকল্প সিস্টেম প্রস্তাব করে। যে সিস্টেম মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এবং তার আসল পরিচয় ও উদ্দেশ্যের সাথে পুনরায় সংযুক্ত করে।

    পুঁজিবাদের ডিজিটাল ম্যাট্রিক্স থেকে সম্পূর্ণ ‘ডিসকানেক্ট’ হয়ে মানুষ, জীবন ও মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এর সাথে ‘কানেক্ট’ হলেই আমরা এই সিমুলেশনের বাইরে আসতে পারবো। এই বৈষম্যপূর্ণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে আমাদের চ্যালেঞ্জ করতে হবে। রাসূল (সা.) ও সাহাবিদের সুন্নাহ অনুযায়ী সমাজে ইসলামের সামাজিক, অর্থনৈতিক (সুদমুক্ত) ও রাজনৈতিক ইনসাফ অর্থাৎ খিলাফত ব্যবস্থার পুনর্জাগরণের জন্য নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজ করে যেতে হবে।