Home

  • দক্ষিণ বিশ্বের উত্থান

    দক্ষিণ বিশ্বের উত্থান

    বৈশ্বিক দক্ষিণ বা দক্ষিণ বিশ্ব একটি নতুন ট্রেন্ড, সবাই এ নিয়ে কথা বলছে। চীন ও রাশিয়া বলছে তারাই বিশ্বের ভবিষ্যত এবং পশ্চিমারা যারা এদের দীর্ঘ সময় ধরে অবহেলা করেছে তারাও একটি উদার ভবিষ্যত বজায় রাখার জন্য এদের অপরিহার্য হিসেবে দেখে। গোটা পৃথিবীর ক্ষমতার ভারসাম্যের যখন টালমাতাল অবস্থা তখন পৃথিবীর ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কাঠামোকে অবশ্যই গ্লোবাল সাউথ তথা বৈশ্বিক দক্ষিণকে বিবেচনায় নিতে হবে।

    এ পর্যন্ত ভূরাজনীতি পৃথিবীকে দেখে এসেছে পূর্ব পশ্চিম দৃষ্টিকোণ থেকে। বিশ্বের ধনী দেশ, বৃহত্তম সামরিক বাহিনী ও সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশগুলি সেখানে উপস্থিত রয়েছে। এটি বাণিজ্য ও যোগাযোগের অনুমোদন দেয় এমন জলপথে তাদের পদচারণার উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে ছিল। বৈশ্বিক উত্তরে বসবাসকারী জাতিগুলি উত্তরেই তাদের মূল সম্পর্ক ও প্রতিযোগিতাকে দেখেছে এবং এই কারণেই তাদের মধ্যে  পূর্ব-পশ্চিমের দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান ছিল।

    তাই গ্লোবাল নর্থ তথা বৈশ্বিক উত্তর বলতে শিল্পোন্নত ও ধনী দেশগুলোকে বোঝায় (ঐতিহাসিকভাবে যাদের ১ম বিশ্ব বলা হতো) যেখানে দক্ষিণ বলতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বোঝায় (ঐতিহাসিকভাবে যাদের দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিশ্ব বলা হতো) যাদের উত্তরের বিপরীতে শিল্পোন্নত এবং পরিষেবা ভিত্তিক অর্থনীতির পরিবর্তে পণ্য-ভিত্তিক অর্থনীতি রয়েছে। গত ৫০০ বছর ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতি উত্তরের পক্ষে ছিল এবং তাদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল, আর ঐতিহাসিকভাবে গ্লোবাল সাউথকে উচ্চ মাত্রার অর্থনৈতিক বৈষম্য দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে।

    গ্লোবাল সাউথ দেশগুলোকে দীর্ঘকাল ধরে ভূ-রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রান্তিক সদস্য হিসাবে বিবেচনা করা হয়ে এসেছে। তারা বৈশ্বিক ঘটনাগুলোকে পরিচালিত করার পরিবর্তে প্রতিক্রিয়া দেখাতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন দ্বি-মেরুর বিশ্বের আবির্ভাব ঘটে তখন বিশ্ব সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল, যারা উভয়ই তাদের প্রভাব বিস্তার করতে এবং বিশ্বকে তাদের বলয় কিংবা জোটে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিল। বিশ্বের অনেক জাতি এই যুদ্ধকে তাদের স্বায়ত্তশাসনের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে এসেছিল। যদিও তারা উভয় শক্তিকে অর্থ ও অস্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখেছিল, কিন্তু তারা বৈশ্বিক ব্যবস্থার বাইরে কিছু করতে পারেনি, এমনকি নিরপেক্ষও থাকতে পারেনি।

    এই প্রেক্ষাপটে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের আবির্ভাব ঘটে এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় G-77 এর আবির্ভাব ঘটে। উভয়ই খুব বেশি অর্জন করতে পারেনি কারণ বিশ্বের ঘটনাবলীর উপর তাদের সামান্যই প্রভাব ছিল। ১৯৭০-এর দশকে স্থবিরতা, বেকারত্ব ও তারল্য সংকট এর কারণে অনেককে ঋণগ্রস্ত হতে হয়েছিল এবং যখন স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হয় তখন গ্লোবাল সাউথ স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী ভূ-রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রান্তিক সদস্য হিসেবেই রয়ে যায়।

    বৈশ্বিক লিবারেল ব্যবস্থা যখন বেকায়দায় পড়েছে তখন গ্লোবাল সাউথ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শুধুমাত্র গ্লোবাল নর্থকে তাদের পণ্য ও সেবা দিয়ে পরিবেশন করার প্রেক্ষাপটে তারা তাদের অর্থনীতির ব্যাপারে একটি ভিন্ন পথ নিতে চায়। ব্রাজিল ও ভারত ময়দানে নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে রাশিয়ার জন্য এবং রাজনৈতিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভারত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাজিলের পণ্যভিত্তিক অর্থনীতি চীনের পাশাপাশি ইউরোপের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এদিকে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে রাশিয়া, তুরস্ক, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ তাদের নিজেদের প্রতি আকৃষ্ট করছে।

    বৈশ্বিক উত্তরের দেশগুলোর মধ্যে উদীয়মান প্রতিযোগিতা গ্লোবাল সাউথ তাদের নিজেদের পক্ষে দেখছে। গত ৫০০ বছরের বেশিরভাগ সময় ধরে গ্লোবাল নর্থ বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে এসেছে এবং বৈশ্বিক দক্ষিণকে এর সঙ্গে তাল মেলানোর নিয়মনীতি ঠিক করে দিয়ে এসেছে। আগামীতে বৈশ্বিক উত্তরকে জনসংখ্যাগত ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে গিয়ে অনেকাংশেই বৈশ্বিক দক্ষিণের উপর নির্ভর করতে হবে। এই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে ফ্রান্স ২০২৩ সালের আগস্টে BRICS সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য একটি ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল, কিন্তু শি জিন পিং সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন।

    জাপান ২০২৩ সালে একটি নথি প্রকাশ করেছে যা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় গ্লোবাল সাউথের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব তুলে ধরেছে। আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বাণিজ্য সম্পর্কিত এই শ্বেতপত্র বিশ্ব অর্থনীতিকে তিনটি বলয়ে বিভক্ত করেছে: পশ্চিম, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে; পূর্ব, চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্বে এবং নিরপেক্ষ দেশ। এতে বলা হয়েছে যে গ্লোবাল সাউথের সঙ্গে সহযোগিতা গড়ে তোলা এবং জোরদার করা একটি অগ্রাধিকার ছিল, ভারতের উপর বিশেষ জোর দিয়ে।

    গ্লোবাল সাউথ কি বিশ্বের নতুন মেরুতে পরিণত হতে পারবে? এটি অর্জনে বৈশ্বিক দক্ষিনকে অবশ্য বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। ‘গ্লোবাল সাউথ’ এর কোনো আইনি বা রাজনৈতিক বাস্তবতা নেই, এটি সুবিধার জন্য উঠে আসা একটি শব্দ। গ্লোবাল সাউথের বেশিরভাগ আলাপ-আলোচনা দ্বিপাক্ষিক পর্যায়ে ঘটে। বৈশ্বিক দক্ষিণের অনেক দেশ দীর্ঘস্থায়ী অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতায় ভুগছে, যা উদীয়মান সম্ভাবনাময় সুবিধাগুলো নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। গ্লোবাল সাউথ যদি উত্তরের করুণায় বেঁচে থাকার পরিবর্তে বিশ্বের উপর শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে, তবে এটি ২১ শতকে একটি বড় পরিবর্তনকে চিহ্নিত করবে।

    আবদুর রহমান খান

  • সেকুলারিজম কি একটি আকীদা?

    সেকুলারিজম কি একটি আকীদা?

    দ্বীনকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি, অর্থাৎ দুনিয়াবি জীবন থেকে দ্বীনের বিচ্ছিন্নতা অনেক সহজ হত যদি ব্যক্তি এটিকে জটিল না করত, এবং যদি সে এটিকে অস্পষ্ট না করত, তবে তা আরও পরিষ্কার হত। অতএব, রাষ্ট্র থেকে দ্বীনের বিচ্ছিন্নতার উৎস সম্পর্কিত ইতিহাসকে স্পর্শ না করেই এবং এর পরিণতির ঐতিহাসিক ও বাস্তব দিক আলোচনা ছাড়াই, আমাদের অধ্যয়নকে বরং সেই চিন্তার দিকে মনোনিবেশ করা উচিত যা আমাদের সামনে রয়েছে: এই চিন্তা কি কোনো আকিদা গঠন করে? অন্য কথায়, এই চিন্তার বাস্তবতা কি আকিদার মত হয় কিনা? সমস্যাটি হচ্ছে বাস্তবতা অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট চিন্তার অধ্যয়ন। এটা কি আকিদা নাকি না?

    চিন্তাটির বাস্তবতা অধ্যয়ন করার আগে, আমাদের উচিত প্রথমে আকিদার বাস্তবতা অধ্যয়ন করা, তারপর চিন্তাটির বাস্তবতা অধ্যয়ন করা, তারপর চিন্তার উপর আকিদার বাস্তবতা প্রয়োগ করা। এই বাস্তবতা যদি এর সাথে মানানসই হয়, তাহলে তা আকিদা হবে, অন্যথায় তা হবে না।

    আক্বীদার বিষয়টি হলো, যাতে হৃদয় নিজেকে ঘিরে রেখেছে। হৃদয় বলতে আকল বোঝানো যেতে পারে বা হৃদয় বোঝাতে যেমনটি আমরা জানি তেমন, এবং এই ক্ষেত্রে যার অর্থ আবেগ তথা ‘উইজদান’। “হৃদয় কর্তৃক চারপাশে গিঁট দেওয়া” এর অর্থ হল হৃদয় এটিকে ধারণ করেছে এবং স্বাচ্ছন্দ্য এবং স্বস্তির সাথে এটিকে সম্পূর্ণ ও দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করেছে। এর অর্থ এই যে ‘উইজদান’ এই চিন্তাটি গ্রহণ করবে এবং এটিকে এর দিকে টেনে নেবে এবং একই সাথে এর সাথে সে সম্মত হবে, এমনকি তা যদি চুক্তির স্বীকরোক্তিও হয়। অতএব, ‘ই’তিকাদ’ (বিশ্বাস) এর উৎস হচ্ছে মনের সম্মতিতে কোনো চিন্তার চারপাশে হৃদয়ের গিঁট। অন্য কথায় এর উৎস হচ্ছে হৃদয় (উইজদান) কর্তৃক দৃঢ় বিশ্বাস। তবে এই দৃঢ় বিশ্বাসের শর্ত হতে হবে মনের সম্মতি। যদি এই দুটি বিষয় ঘটে থাকে: অর্থাৎ, হৃদয়ের দৃঢ় বিশ্বাস অর্থাৎ উইজদান কর্তৃক এবং এই বিশ্বাসের সাথে মনের সম্মতি, এর অর্থ হবে হৃদয়ের গিঁট হয়ে গেছে অর্থাৎ আক্বীদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, অর্থাৎ বিশ্বাস সংঘটিত হয়েছে।

    এটাই আকিদার বাস্তবতা, তা সে যে আকিদাই হোক না কেন, তবে, আংশিক চিন্তার চারপাশে হৃদয়ের গিঁট, যে চিন্তা মৌলিক নয়, তা আকিদার স্তরে উন্নীত হবে না, কারণ কিছুই একটি আংশিক চিন্তার শাখা হবে না, এবং কোনো কিছু হতে তা বের হয়ে আসে না। যদিও শুরুতে এটি দৃঢ় বিশ্বাসের মতো হবে, তবে এটি শীঘ্রই তা দৃঢ়তার (উইজদানের) বৃত্ত থেকে বেরিয়ে যাবে, এবং তা কর্মের দিকে ধাবিত হবে কিংবা প্রত্যাখ্যানের দিকে। অতএব, হৃদয় কর্তৃক শুধুমাত্র মৌলিক চিন্তার চারপাশেই গিঁট দেওয়া যায়, অন্তত এক কিংবা তা থেকে বের হয়ে আসা একাধিক বিষয়ের ক্ষেত্রে। অতএব, ‘আকাইদ’ (মতবাদ) হবে ভিত্তি কিংবা মৌলিক চিন্তা, আর আনুষঙ্গিক চিন্তার ক্ষেত্রে, তা আকায়েদের অংশ হবে না।

    মৌলিক চিন্তাগুলি হল সেগুলি যার পূর্বে অন্য কোনও চিন্তা নেই। যদি সেগুলির পূর্বে অন্য চিন্তা থাকে তবে সেগুলি মৌলিক হবে না। অতএব, চিন্তার ভিত্তি হওয়ার জন্য, কোন চিন্তাই এর আগে থাকা উচিত নয়। অতএব, আক্বীদা হবে একটি ভিত্তি চিন্তার চারপাশে হৃদয়ের গিঁট, এই চিন্তাটি হয় মৌলিক হতে পারে, বা মৌলিক চিন্তার অংশ হতে পারে।

    এটা হল আকিদা, এটা হল সেই মৌলিক চিন্তা যা হৃদয় তার চারপাশে গেঁথে আছে, অন্য কথায় এটা সেই চিন্তা যা হৃদয়, মানে উইজদান, মনের সম্মতিতে দৃঢ়ভাবে সত্য বলে মেনে নিয়েছে।

    মৌলিক চিন্তা যার পূর্বে অন্য কোন চিন্তা নেই তা হবে সেই চিন্তা যা মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যার সমাধান করে, মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে তা করে, তা ভুল বা সঠিকভাবে সমাধান করা হোক না কেন। এই চিন্তা যা ব্যক্তির কাছে সমাধান আকারে দেয়া হয়েছে, একজন মানুষ হিসাবে, অর্থাৎ মানুষের কাছে, এটি হবে মৌলিক চিন্তা, অর্থাৎ এটি সেই চিন্তা যা মনের সম্মতিতে হৃদয় নিজেকে দিয়ে ঘিরে রেখেছে। এটিই হবে আক্বীদা, যেটি যেকোন সেই চিন্তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য যা এর অংশ বলে বিবেচিত হয়, হয় এটি থেকে উদ্ভুত কিংবা এর উপর প্রতিষ্ঠিত।

    এটি এই কারণে যে, যেকোনো মানুষ তিনটি প্রশ্ন দ্বারা তাড়িত হয়, যা উত্তর খুঁজতেই থাকে: এই অস্তিত্বের আগে কি কিছু ছিল অর্থাৎ এই অস্তিত্বের পূর্বে অন্য কোনো অস্তিত্ব যা সে উপলব্ধি করতে ও বুঝতে পারে, নাকি এই অস্তিত্ব অনাদি-অনন্ত, এর পূর্বে কিছুই ছিল না? এবং এই অস্তিত্বের পরে কি কিছু থাকবে, যেমন অন্য একটি অস্তিত্ব, কারণ বস্তু হারিয়ে যায়, বিলোপ হয়ে যায়, তাই তা কি আবার ফিরে আসবে নাকি না? আর অন্য কোন স্থানে কি তা যাবে নাকি না? আর বর্তমান অস্তিত্বের কি এর পূর্ববর্তী বাস্তবতার সাথে কোন সম্পর্ক আছে নাকি তা থেকে মুক্ত এবং এর পরে যা আসে তার সাথে কি এর কোন সম্পর্ক আছে নাকি তা থেকে তা বিচ্ছিন্ন?

    এই তিনটি প্রশ্ন সকল মানুষের মাঝেই খেলা করে। এর সূচনা হয় যখন থেকে সে তার পারিপার্শ্বিক বাস্তবতাকে বুঝতে শুরু করে।

    এভাবে সে নিজেকে এই তিনটি প্রশ্ন করে। এর অর্থ এই নয় যে মানুষ হুবহু এই তিনটি প্রশ্নই জিজ্ঞাসা করবে, তবে সে এই প্রশ্নগুলির সাথে সম্পর্কিত সমস্ত বা আংশিক কিংবা এই প্রশ্নগুলির আশেপাশের বিষয়াদি অনুসন্ধান করবে, তার এই অনুসন্ধানই মোটা দাগে এই তিনটি প্রশ্ন গঠন করে। এবং সময়ের সাথে সাথে, এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর পাবার জন্য একটি অবিরাম তাড়না তৈরি হয়। তাই সে একটি উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে, যদি সে ব্যর্থ হয়; তাহলে সে অন্যের সাহায্য চাওয়ার চেষ্টা করে এবং হয় তার কথা উড়িয়ে দেয়া হয়, অথবা সে সন্তোষজনক উত্তর খুঁজে পায় না, তাই তার মধ্যে এ সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন এড়ানোর প্রবণতা তৈরি হয় এবং সে (অসন্তোষজনক) উত্তরগুলো এড়ানোর চেষ্টা করে এবং তার এই সবচেয়ে বড় সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সে শান্তি পাবে না। সে হয়ত নিজেই এর সমাধান করতে পারে, অথবা সে অন্য লোকেদের সাথে সমাধান খুঁজে পেতে পারে। যদি তার জন্য এটি সমাধান করা হয়, তবে সে শান্ত হবে এবং একটি নির্দিষ্ট পথ অনুসারে তার জীবনযাপন করবে; আর যদি এটি সমাধান না করা হয় তবে সে বিচলিত ও অস্থির থাকবে এবং সে জীবনের একটি নির্দিষ্ট পথে স্থির হবে না।

    অতএব, মৌলিক চিন্তাই হবে সেই চিন্তা যা মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যার সমাধান করে এবং তা হচ্ছে আক্বীদা, অর্থাৎ এটি সেই চিন্তা যার চারপাশে হৃদয় গেঁথে আছে। এই কারণেই আক্বীদাকে মানব, জীবন ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে একটি সামগ্রিক চিন্তাভাবনা হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। কারণ ব্যক্তিটি এমন একজন মানুষ যে মহাবিশ্বে বাস করে, এবং মহাবিশ্বে বসবাস করার কারণে, তিনটি প্রশ্ন তার মনে উদয় হবে এবং সবচেয়ে বড় সমস্যাটি দেখা দেবে। যদি সে এর সমাধান খুঁজে পায়, যেকোন সমাধান, তাহলে সে মৌলিক চিন্তাটি অথবা একটি মৌলিক চিন্তা অর্জন করেছে, অর্থাৎ সে আক্বীদাটি বা একটি আক্বীদা অর্জন করেছে এবং এটি মানব, জীবন ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে একটি চিন্তার উপস্থিতির দ্বারা অর্জন করা হয়েছে, অর্থাৎ মহাবিশ্বে বসবাসকারী একজন মানুষ হিসাবে তার সম্পর্কে।

    অতএব, আক্বীদা হবে মহাবিশ্বে বসবাসকারী মানুষ সম্পর্কে একটি মৌলিক চিন্তা, এবং এই মৌলিক চিন্তাটি অবশ্যই সামগ্রিক হতে হবে। তাই আক্বীদা হচ্ছে মানব, জীবন ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে সামগ্রিক চিন্তাভাবনা।

    পুঁজিবাদের ক্ষেত্রে, এটি হল রাষ্ট্র থেকে দ্বীনের বিচ্ছিন্নতা, অর্থাৎ জীবন থেকে দ্বীনের বিচ্ছিন্নতা, অর্থাৎ জীবন থেকে দ্বীনের বিচ্ছিন্নতা যার মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্র থেকে দ্বীনের বিচ্ছিন্নতা; বা রাষ্ট্র থেকে দ্বীনের বিচ্ছিন্নতা, মানে জীবন থেকে দ্বীনের বিচ্ছিন্নতা। তথাপি, এই চিন্তাই হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যার সমাধান যতদূর পশ্চিমারা উদ্বিগ্ন। অন্য কথায়, এটি তিনটি প্রশ্নের উত্তর হবে। পশ্চিমে, মানুষের মুখোমুখি এই সমস্যাটি সমাধান করা হয়েছে, এবং সে এটিকে জীবনের ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করেছে, অর্থাৎ নির্দিষ্ট পথ যা অনুসারে সে জীবনে অগ্রগতি করবে। এটাই চিন্তাটির বাস্তবতা, এবং এটি একটি আক্বীদা হওয়ার বাস্তবতা। এই চিন্তার উৎপত্তির জন্য, কীভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষ সংগ্রাম করেছিল এবং হাজারো মানুষ তা অর্জনের জন্য নিহত হয়েছিল এবং কত শতাব্দী ধরে সংগ্রাম চলেছিল, এটি বিবেচ্য বিষয় নয়। যাইহোক, বাস্তবে এটি দ্বীনকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তারপরে এটিকে পৃথক করেছে, এবং এটি যে দ্বীনকে স্বীকৃতি দিয়েছে তার অর্থ এই যে এটি দ্বীন সম্পর্কে একটি মতামত দিয়েছে এবং এটি যে দ্বীনকে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে তা জীবনের একটি মতামতকে নির্ধারণ করে। এসব চিন্তাটির একটি ব্যাখ্যা এবং এটিকে বোঝার কাছাকাছি আনতে সাহায্য করে। এসব কিছু চিন্তাটির বাস্তবতাকে প্রভাবিত করবে না, বরং সহজভাবে তার কিছু দিক ব্যাখ্যা করে। এখানে মূল আলোচনার বিষয় চিন্তাটি নিজেই, অর্থাৎ দ্বীনকে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করার চিন্তা, এটাকে সবচেয়ে বড় সমস্যার সমাধান মনে করা, এটা কি আকিদা নাকি না?

    আকিদার বাস্তবতাকে জীবন থেকে দ্বীনকে বিচ্ছিন্ন করার চিন্তার বাস্তবতার সাথে মেলালে, আমরা দেখতে পাব যে এটি ঠিক এটির সাথে খাপে খাপে মিলে যায়, যেমনটি এটি বস্তুবাদের (আল-মাদ্দিয়া) সাথে মিলে যায় এবং যেমনটি এটি মিলে যায় “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুন রাসূলুল্লাহ”র সাথে; এবং এখানে ব্যাখ্যাটি নিম্নরূপ:

    প্রশ্ন: এই অস্তিত্বের আগে কি কিছু ছিল নাকি না? আক্বীদা এই বলে এর উত্তর দিয়েছে যে এটি জীবনের মুখ্য কোন বিষয় নয়, বরং এটি একটি স্বতন্ত্র বিষয় এবং এটি মানবসমাজের জন্য কোনো বিষয় নয় এবং এটি দুনিয়ার জীবনের জন্য কোনো বিষয় নয়। তাই এটি মানব হিসাবে মানুষের সাথে তার সম্পর্ককে অস্বীকার করেছে, জীবনের সাথে তার সম্পর্ক এবং মহাবিশ্বের সাথে তার সম্পর্ককে অস্বীকার করেছে।

    মানব, জীবন ও মহাবিশ্বের সাথে এর সম্পর্ককে অস্বীকার করার মাধ্যমে, এটি আর মুখ্য বিষয় হিসেবে রইল না, এভাবে প্রথম প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। প্রথম প্রশ্নের উত্তর দিয়ে, আকিদা দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে, এ বিষয়ে যে বাস্তব অনুভূতির বিবেচনায় এই অস্তিত্বের আগে কিছু ছিল কি না। অতএব, যেহেতু এটি পূর্ববর্তী বিষয়াদির সাথে বর্তমান বিষয়াদির সম্পর্ককে অস্বীকার করে থাকে তবে এটি অস্তিত্বে ছিল কি ছিল না এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া একটি অর্থহীন বিষয়, কারণ (প্রথম) প্রশ্নটি করার কারণ ছিল সম্পর্ক তৈরির জন্য অনুসন্ধান করা। এটি এই কারণে যে, অস্তিত্ব ছিল কি ছিল না এ প্রশ্নটি অনুভুত এই বাস্তবতা এবং এর আগে যা এসেছিল তার মধ্যে কোনও সম্পর্ক আছে কিনা তা প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই অবতারনা করা হয়েছিল। অতএব, যদি সম্পর্ক অস্বীকার করা হয়, তাহলে প্রশ্নটি সেখানেই শেষ হয়ে যায় এবং উত্তরও সাথে সাথে পাওয়া যায়। অতএব, অস্তিত্বের আগে ও পরে এবং তাদের মধ্যকার সম্পর্কের অস্বীকার করার মাধ্যমে অন্য দুটো প্রশ্ন বাতিল হয়ে যায় এবং প্রশ্নগুলোকে আলোচনার বিষয়ের সাথে সম্পর্কহীন করে দেয়। এভাবে তিনটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়, যাতে উত্তরটি মানুষের সামনে অবস্থিত সবচেয়ে বড় সমস্যাটির সমাধান করে দেয়। যদি কিছু ব্যক্তি এরপর জীবনের পূর্বে ও পরের বাস্তবতাকে বিশ্বাস কিংবা অস্বীকার করতে চায় তবে তারা তা করার ব্যাপারে স্বাধীন এবং তাদের এই কাজের দরূন কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত হবে না, কারণ এটি আলোচনার মুখ্য বিষয় না। একবার জীবনের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী কিছুর সাথে জীবনের সম্পর্ক অস্বীকার করা হলে, এই বিষয়গুলি অধ্যয়ন করার কোন অর্থ থাবে না, কারণ এই বিষয়সমূহ অনুসন্ধানের পিছনের উদ্দেশ্য ছিল জীবনে সাথে এদের কী সম্পর্ক তা নির্ধারণ করা। এই সম্পর্কের দিক বিবেচনায়, এবং যেহেতু সম্পর্কটির বাস্তবতা আর নেই, তাই অনুসন্ধানের বাস্তবতাও থাকছে না; তবে মানুষকে অনুসন্ধান না করার ব্যাপারে বাধ্য না করে, বরং তাদের ছেড়ে দেয়া হয়, কারণ অনুসন্ধান তাদের কোনো সমাধানের দিকে নিবে না, কারণ জীবনের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই, অর্থাৎ যেহেতু এর সাথে মানব, জীবন ও মহাবিশ্বের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

    সুতরাং, দ্বীনকে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করার চিন্তাই তিনটি প্রশ্নের উত্তর তৈরি করে, অর্থাৎ এটি মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যার সমাধান দেয়। সুতরাং এটি মহাবিশ্বে বসবাসকারী একজন মানুষের সম্পর্কে একটি মৌলিক চিন্তা আকারে দেখা হবে, অর্থাৎ এটি মানব, জীবন ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে একটি সামগ্রিক চিন্তাভাবনা হবে, এভাবে এটি একটি আকিদা ও একটি আদর্শ হবে, ঠিক কমিউনিজমের মতো এবং ঠিক ইসলামের মতো।

    ২২ জুমাদা আল-ঊলা ১৩৯০ হিজরী

    ২৫ জুলাই ১৯৭০

  • প্রশ্ন-উত্তর: ব্যাংক কিংবা ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে চাকরী করা

    প্রশ্ন-উত্তর: ব্যাংক কিংবা ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে চাকরী করা

    নিম্নোক্ত প্রশ্নটি আমরা আমাদের একজন পাঠকের কাছ থেকে পেয়েছি এবং আমাদের উত্তর দেয়া হলো:

    প্রশ্ন: অনুগ্রহ করে ব্যখ্যা করবেন, ব্যাঙ্কে কাজ করার অনুমতি আছে কি এবং যদি তা-ই হয় তাহলে কোন ধরনের পদে, যেমন ব্যাঙ্কে আইটি বা সফ্টওয়্যার এ কাজ করা কি অনুমোদিত? এছাড়াও সাধারণভাবে আর্থিক খাতের জন্য একই প্রশ্ন, যেমন স্টক মার্কেট, বীমা, ইত্যাদি।

    উত্তর: শেখ তাকিউদ্দীন আন-নাবহানী রচিত ‘ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’-এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে বিষয়টির উপর আলোকপাত করে  নিম্নে একটি নির্যাস দেওয়া হল:

    নিষিদ্ধ বিষয়ে নিয়োগ প্রদান সংক্রান্ত বিধান:

    কোনো কাজে কারো নিয়োগ আইনত বৈধ হওয়ার জন্য, বিষয়টি অবশ্যই অনুমোদিত (হালাল) হতে হবে। অর্থাৎ কর্মচারীকে নিষিদ্ধ কিছু করার জন্য নিয়োগ দেয়া বৈধ নয়। তদনুসারে, একজন কর্মীকে দিয়ে কাউকে মদ বিক্রি করানো কিংবা মদ তৈরি করানো বৈধ নয়, কিংবা তাকে শুকর বা মৃত জন্তুর গোস্ত বহন করানোর জন্য নিয়োগ দেয়া বৈধ নয়। আত-তিরমিযী আনাস বিন মালিক থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদের ব্যপারে দশ প্রকার লোককে অভিশাপ দিয়েছেন, যে তা প্রস্তুত করে, যে উৎপাদন করায়, যে তা পান করে, যে তা বহন করে, যার কাছে তা বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়, যে তা পরিবেশন করে, এর বিক্রেতা, যার জন্য তা বিক্রি করা হয়, এর ক্রেতা এবং যার জন্য তা কেনা হয়।” সুদের কোনো কাজে নিয়োগ দেওয়াও অনুমোদিত নয়, কারণ এটি একটি নিষিদ্ধ সুবিধার জন্য নিয়োগ প্রদান করা এবং কারণ ইবনে মাজাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সা) সুদ গ্রহণকারীকে, যে তা দান করে, যে দু’জন এর জন্য সাক্ষী থাকে এবং যে তা লিখে রাখে তাদের অভিশাপ দিয়েছেন। ব্যাংক ও কয়েনেজ (মিন্টিং) বিভাগ ও সুদ নিয়ে কাজ করে এমন সমস্ত সংস্থার কর্মচারীদের বিষয়ে বাস্তবতা পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। যে কাজটি করার জন্য তাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে তা যদি সুদের একটি কাজ হয়, সেক্ষেত্রে সুদ একচেটিয়াভাবে সেই কাজের পণ্য হোক কিংবা অন্যদের সাথে মিলে কাজের দ্বারা উৎপাদিত হোক না কেন, মুসলমানদের জন্য এ জাতীয় কাজ করা নিষিদ্ধ। এর মধ্যে রয়েছে ব্যবস্থাপক, হিসাবরক্ষক, নিরীক্ষক এবং প্রতিটি কাজ যা সুদের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত সুবিধা প্রদান করে। কিন্তু যে কাজগুলি সুদের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত নয়, যেমন কুলি, কুক, গার্ড, ক্লিনার এবং এর মতো – এই কাজগুলি অনুমোদিত, কারণ এটি একটি অনুমোদিত সুবিধার উপর নিয়োগ, এবং কারণ সুদলেখক ও সাক্ষীর ক্ষেত্রে যা প্রযোজ্য, তাদের উপর তা প্রযোজ্য নয়। একইভাবে, ব্যাংকের কর্মচারীদের মতোই সরকারী কর্মচারী অর্থাৎ যারা সুদের লেনদেনের সাথে জড়িত, যেমন কর্মকর্তা-কর্মচারী যারা কৃষকদের সুদে ঋণ দিতে কাজ করে এবং ট্রেজারি কর্মকর্তা-কর্মচারী যারা সুদের কাজে জড়িত এবং এতিম বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যারা সম্পত্তি সুদে ধার দেয়; এ সকল কাজ নিষিদ্ধ কাজ; যে কেউ তাদের সাথে জড়িত সে একটি মহাপাপ করছে, যদি সে সুদলেখক কিংবা সুদের সাক্ষী হয় তবে এটি তার উপর প্রযোজ্য। একইভাবে একজন মুসলমানের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কর্তৃক নিষিদ্ধ কোনো কাজে নিয়োগ প্রদান করা বৈধ নয়।

    এমন কাজ যা হতে মুনাফা অর্জিত হওয়া কিংবা যার সাথে জড়িত থাকা নিষিদ্ধ কারণ তা আইনত অবৈধ, যেমন, বীমা কোম্পানী, শেয়ার হোল্ডিং কোম্পানী এবং সমবায় সমিতি ইত্যাদি, তাদের ব্যপারটি পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। যদি বিষয়টি এমন হয়, যে কাজটি করার ব্যাপারে বলা হচ্ছে তা যদি হারাম হয়, কিংবা এর চুক্তির বাস্তবতা যদি  অবৈধ (বাতিল) বা ত্রুটিপূর্ণ (ফাসিদ) হয়, বা তাদের থেকে যে ফলাফল বের হয়ে আসে, তবে একজন মুসলিমকে এর অনুমতি দেওয়া হয় না, কারণ একজন মুসলিমকে অবৈধ কোনো কিছুর সাথে সরাসরি জড়িত হওয়ার অনুমতি নেই। এমন কোন চুক্তি বা কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয় না যা হুকম শর’ঈ (ওহীর বিধান) অনুমোদন দেয় না এমন কোনো চুক্তি কিংবা কাজের সাথে একজন মুসলিমের জড়িত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং একইভাবে এর সাথে জড়িত থাকার জন্য তাকে নিয়োগ দেওয়াও নিষিদ্ধ। এটি সেই কর্মচারীর মতো যিনি বীমা চুক্তি লিপিবদ্ধ করেন যদিও তিনি তা অপছন্দ করেন, যিনি বীমার শর্তাবলী নিয়ে আলোচনা করেন কিংবা যিনি বীমা গ্রহণ করেন। একইভাবে সেই কর্মচারীর মতো যে সদস্য হোল্ডিং অনুযায়ী সমবায় সমিতির মুনাফা বন্টন করেন, যে কর্মচারী কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে বা শেয়ার স্টক অ্যাকাউন্টিংয়ে কাজ করে, কিংবা যে সমবায় সমিতির জন্য বিজ্ঞাপন দেয়। তবে সে সকল কোম্পানির কর্মচারীগণ, যাদের কাজ বৈধভাবে সম্পাদন করার অনুমতি রয়েছে, তাদের এই ধরনের পদে নিয়োগের অনুমতি দেওয়া বৈধ। কিন্তু যদি একজন ব্যক্তির নিজের জন্য আইনত একটি কাজ করার অনুমতি না থাকে, তবে এটি করার জন্য কর্মচারী হওয়ার জন্যও কাউকে অনুমতি দেওয়া হয় না। কাজেই যে কাজগুলো করা নিষিদ্ধ, মুসলমানের জন্য তাতে অন্যকে নিয়োগ দেওয়া কিংবা তাতে নিজে নিযুক্ত হওয়াও নিষিদ্ধ।

    একটি ব্যাঙ্ক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আইটি ডিপার্টমেন্টে কাজ করার বিষয়ে এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত একটি প্রশ্নোত্তর থেকে নিম্নলিখিতগুলি পয়েন্টসগুলো দেওয়া হলো:

    এ বিষয়ে তিনটি প্রাসঙ্গিক নীতি রয়েছে,

    ১. নিষিদ্ধ কিছু করা নিষিদ্ধ।

    ২. যা প্রধানত নিষিদ্ধ কিছুর দিকে পরিচালিত করে বলে ধারণা করা হয় তাও নিষিদ্ধ।

    ৩. যা সরাসরি নিষিদ্ধ কিছুর সাথে সংযুক্ত তাও নিষিদ্ধ।

    সুতরাং একটি সুদের-চুক্তি নিষিদ্ধ। আর তা লেখা নিষিদ্ধ, যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।

    সুদ গণনা করে এমন একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম তৈরি করা নিষিদ্ধ নয়, কারণ কম্পিউটার প্রোগ্রাম তৈরি অনুমোদিত কাজ।

    যাইহোক, যখন এটি সরাসরি নিষিদ্ধ কিছুর সাথে যুক্ত থাকে (যেমন সুদ), এটিও নিষিদ্ধ। উদাহরণ স্বরূপ:

    যদি কেউ একটি ব্যাঙ্কের কাছ থেকে একটি অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করার আদেশ পায় যা (অন্যদের মধ্যে) সুদ (রিবা) গণনা করতে ব্যবহার করা হবে, তাহলে এটি সরাসরি সংযুক্ত। এই ক্ষেত্রে, এই এপ ডেভেলপ করা নিষিদ্ধ, এটি সহায়তা হিসাবে বিবেচিত হয়। যদি কেউ এই জাতীয় কম্পিউটার প্রোগ্রাম স্বাধীনভাবে ডেভেলপ করে (কোন ব্যাঙ্কের আদেশ ছাড়াই) এবং এটি বাজারে বিক্রি করে তবে এটি অনুমোদিত হবে (এমনকি যদি ক্রেতাদের মধ্যে এমন ব্যাংক থাকে যারা সফ্টওয়্যারটি কিনে এবং ব্যবহার করে)। এটি এই কারণে যে এটি নিষিদ্ধ কিছুর সাথে সরাসরি সংযুক্ত না, তাই এটিকে সহায়তা হিসাবে বিবেচনা করা যায় না।

    আরেকটি উদাহরণ: যদি কেউ ব্যাঙ্কে টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করেন, যিনি নিষিদ্ধ জিনিসগুলির জন্য ব্যবহৃত কম্পিউটারগুলি রক্ষণাবেক্ষণ করেন, তাহলে এটি নিষিদ্ধ, কারণ এটি সরাসরি সংযুক্ত, তার মানে সহায়তা। যদি তাকে ব্যাঙ্কের দ্বারা তাদের কর্মীদের কাছে পিজ্জা সরবরাহ করার আদেশ দেওয়া হয়, তবে এটি অনুমোদিত হবে, কারণ এটিকে সহায়তা হিসাবে গণ্য করা হবে না এবং নিষিদ্ধ কিছুর সাথে এর সরাসরি সংযোগ নেই।

    জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমন বিষয় নিয়ে কাজের কথা এসেছে যা সরাসরি নিষিদ্ধ কিছুর সাথে যুক্ত।

  • হাদীস সম্পর্কে কিছু বিভ্রান্তিকর সন্দেহ ও তার জবাব

    হাদীস সম্পর্কে কিছু বিভ্রান্তিকর সন্দেহ ও তার জবাব

    আমরা যেই হাদীসের বইগুলো পড়ি সেগুলো ৩০০ হিজরি বা হিজরতের তিনশত বছর পর লেখা হয়েছে। এত বছর পর কি আসলেই রাসুল (সা) এর কথা ও কাজ নিখুঁতভাবে জানা ও লিপিবদ্ধ করা সম্ভব? হাদীসগুলো লেখা হয়েছে নবী (সা) এর মৃত্যুর পর, খুলাফায়ে রাশিদিনদের পর, উমাইয়া খেলাফতের পর এবং আব্বাসীয় খেলাফতের শুরুর দিকে। এর মধ্যে কত যুগ ও প্রজন্ম গত হয়েছে কিন্তু এরপরও কিছু লেখক ও গবেষকরা কিভাবে দাবি করতে পারে এগুলো রাসুল (সা) এর হাদীস? এটা কি বাস্তব সম্মত?

    ইমাম বুখারি নাকি ছয় লক্ষ হাদীস সংগ্রহ করে এরপর বিচার বিশ্লেষণ করে সহীহ বুখারি রচনা করেছেন। এটা কি একজন ব্যক্তির পক্ষে কখনো সম্ভব যে সে ছয় লক্ষ হাদীস সংগ্রহ করতে পারবে? এত অল্প সময়ে এটা কীভাবে সম্ভব? আর সবচেয়ে বড় কথা হলো নবীজি (সা) কীভাবে ছয় লক্ষ হাদীস বর্ননা করবেন। এতো বিশাল সংখক হাদীসের সংখ্যাই বলে দিচ্ছে এর মধ্যে একটা বড় অংশ বানোয়াট। আসলে এই হাদীসের বইগুলোর উপর কোনোভাবেই আস্থা রাখা যায় না।

    উপরের এই কথাগুলো যখন সাধারণ মুসলিম একজন শুনে তখন অনেক ক্ষেত্রেই তারা বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়। আর এই কাজটাই করে যাচ্ছে কিছু ব্যক্তিরা যারা ইসলামি শরীয়তের ভিত্তি হিসাবে সুন্নাহকে মানতে চায় না। কিন্তু এই কথাটা একজন আম মুসলিমকে সরাসরি বলা সম্ভব না তাই তারা এইরকম চতুরতার আশ্রয় নিয়েছে। তারা জানে যদি হাদীসের বিশুদ্বতা নিয়ে সন্দেহ তৈরী করা যায় তাহলে স্বাভাবিকভাবেই যেকোনো ব্যক্তি সুন্নাহকে ত্যাগ করবে এবং শরীয়তে বেশিরভাগ হুকুম আহকাম অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। আসলে যারা হাদীস সম্পর্কে এই মিথ্যা সন্দেহ ছড়াচ্ছে তাদের অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত। জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুমকে তারা মানতে নারাজ। ইসলামের হুকুম আহকাম তাদের জন্য বোঝা। কারণ তারা তাদের প্রবৃত্তির দাসত্ব করতেই পছন্দ করে, আল্লাহর হুদূদগুলো যেমন- চুরি করলে হাত কাটা, ব্যভিচার করলে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা, মুরতাদের মৃত্যুদণ্ড ইত্যাদি নিয়ে তারা হীনম্মন্যতায় ভোগে এবং পশ্চিমাদের পছন্দসই ইসলামের আধুনিক ভার্সন তৈরি করে নিজেকে তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে মরিয়া হয়ে থাকে। আর এই উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য সুন্নাহকে কীভাবে বাদ দেওয়া যায় তা নিয়ে পরিকল্পনা করতে তারা ব্যস্ত।

    আসলেই কি তিনশত হিজরির পূর্বে কোনো হাদীসের বই লেখা হয় নাই? ইমাম বুখারি সত্যি সত্যি ছয় লক্ষ হাদীস সংগ্রহ করেছিলেন? এটা সত্যি যে রাসুল (সা) এর মৃত্যুর পর হাদীসের সংখ্যা অস্বাভিকভাবে বেড়েছে কিন্তু মজার বিষয় হলো এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা কিন্তু কীভাবে? আর হাদীস সংগ্রহের এই প্রক্রিয়া আসলে কতোটুকু নির্ভরযোগ্য? কীভাবে আমরা এতো বছর পরও এর উপর নির্ভর করে বিভিন্ন বিশ্লেষণ করতে পারি? এই সকল বিষয়ে নিয়ে আজকে আমি আলোচনা করবো যাতে করে শরীয়তের দ্বিতীয় উৎস হাদীস যে কতটা বিশুদ্ধ তা আমরা বুঝতে পারি।

    এক্ষেত্রে সবার শুরুতে আমাদের হাদীস কীভাবে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে তা নিয়ে আলোকপাত করতে হবে। একটি হাদীস সঠিক কিনা সেটা যাচাই করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের অবশ্যই ন্যূনতম ধারণা অর্জন করতে হবে। যে সকল ধাপ অতিক্রম করার পর একটা হাদীসকে গ্রহণ করা হয় তা হল:

    ১) সনদের ধারাবাহিকতা বা ইত্তিসাল আস সনদ (continuity of the chain)

    ২) বর্ণনাকারীর বিশ্বাসযোগ্যতা বা আদালাতুর রুউউয়াহ (Probity or trustworthiness of narrators)

    ৩) বর্ণনাকারী নির্ভুল ও সঠিক হওয়া বা দাব তার রুউউয়াহ (The precision and accuracy of narrators)

    ৪) হাদীসটি অন্য কোনো হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক হয় কিনা বা হাদীসটির মধ্যে কোনো লুক্কয়িত সমস্যা আছে কিনা সেটা খুঁজে বাহির করা। (The absence of shuzooz and al-‘illah)

    এরপর হাদীসগুলোকে গ্রেডিং বা শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। উপরের ধাপ গুলো ছাড়াও বিশুদ্ধ হাদীস নির্ণয়ে ত্রুটি এড়ানোর জন্য বা জালিয়াতি ও প্রতারণা সনাক্তকরণের জন্য আরো অসংখ্য কৌশলের অনুসরণ করা হয়। আমরা এখানে সংক্ষিপ্তভাবে প্রতিটি ধাপ নিয়ে আলোচনা করবো।

    সনদের ধারাবাহিকতা বা ইত্তিসাল আস সনদ

    সর্বপ্রথম একটি হাদীসের বর্ণনাকারীদের মধ্যে কোনো গ্যাপ বা ধারাবাহিকতার অভাব আছে কিনা তা দেখা হয়। এক্ষেত্রে সকল বর্ণনাকারীকে চিহ্নিত করা হয়। সকলের পরিচয় পাওয়া বাধ্যতামূলক। এছাড়াও বর্ণনাকারীদের জন্ম ও মৃত্যু তারিখ ও তাদের ভৌগলিক অবস্থান দিয়ে ক্রস ম্যাচ করা হয় যে আসলেই সে যার কাছ থেকে শুনেছে সেটা বাস্তবসম্মত কিনা। যদি দেখা যায় তাদের ভৌগলিক অবস্থান অনেক দূরবর্তী যে তাদের মধ্যে কখনো দেখা হওয়া সম্ভব না বা তারা একই প্রজন্মের  না তাহলে সেটা সনদের ধারাবাহিকতাকে নষ্ট করে দেয়।

    বর্ণনাকারীর বিশ্বাসযোগ্যতা বা আদালাতুর রুউউয়াহ

    বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হওয়ার পরের ধাপ হলো তাদের বিশ্বাসযোগ্যতার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া। আদিল হওয়ার শর্ত হচ্ছে যে, ব্যক্তি মিথ্যাবাদী হিসাবে পরিচিত না, হরহামেশা বা প্রকাশ্যে গুনাহ করতো না এবং অসভ্য বা অসম্মাননক আচার-আচরণ থেকে মুক্ত। এছাড়াও কোনো একজন বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি অন্য আরেকজনকে আদিল হিসাবে নিশ্চায়ন করলে সেটাও গ্রহণযোগ্য হবে।

    বর্ণনাকারী নির্ভুল ও সঠিক হওয়া বা দাবত আর রুউউয়াহ

    মানুষ ভুল করতে পারে এটা স্বাভাবিক কিন্তু দাবিত হচ্ছে সেই ব্যক্তি যিনি সাধারণত ভুল করেন না। যিনি তার বলা প্রতিটি বক্তব্যের বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকেন যেনো ভুল না হয়। এর পাশাপাশি অন্য বর্ণনাকরীদের বর্ণনার সাথে তার কথা মিলে কিনা সেটা দিয়েও নিশ্চিত হওয়া যায়। অনেকসময় কোনো একজন ভালো বর্ণনাকারী জীবনের পরবর্তী সময়ে তার সক্ষমতা হারাতে পারেন সেটাও সবসময় বিবেচনা করা হয়।

    শাজ (অস্বাভাবিক বা ব্যতিক্রম) এবং ইল্লাহ (অনিয়ম) এর অনুপস্থিতি নিশ্চিত করা

    কোনো একটি হাদীসকে শাজ বলে ধরা হয় যখন এর মতন ও সনদ অন্য আরেকটি হাদীস যা কিনা আরো বিশ্বাসযোগ্য বর্ণনাকারী দ্বারা বর্ণিত তার মতন ও সনদের সাথে সাংঘর্ষিক হয়। এর মাধ্যমে কোনো একটি ভুল বা জাল হাদীসকে চিহ্নিত  করার পাশাপাশি বর্ননাকারীর বিশ্বাসযোগ্যতা ও নির্ভুলতাকেও পুনরায় যাচাই করা যায়।

    হাদীসের মধ্যে ইলাল বা এমন ত্রুটি যা সহজে দেখা যায় সেটা খুঁজে বাহির করার কাজটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও কঠিন যা কিনা একজন অভিজ্ঞ হাদীস বিশারদ করে থাকেন। হাদীসের মতন ও সনদ উভয়ের মধ্যেই এই ধরনের ত্রুটি থাকতে পারে যা একজন মুহাদ্দিস তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও গবেষণার আলোকে করে থাকেন।

    জালিয়াতি ও প্রতারণা সনাক্তকরণ

    হাদীসের মতন ও সনদের মধ্যে জালিয়াতি বা মিথ্যার সংযোজন সনাক্তকরণের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতির অনুসরণ করা হয়ে থাকে।

    যেমন- সনদের ক্ষেত্রে অনেক সময় কোনো বর্ণনাকারী যদি স্বীকার করে যে, সে জালিয়াতি করেছে তাহলে তার নাম লিপিবদ্ধ করা হয় এবং তার দ্বারা বর্ণিত সকল হাদীস বাতিল করা হয়। কোনো বর্ণনাকারী যে স্কলারের কাছ থেকে হাদীসটি শুনেছে তার সাথে যদি সরাসরি দেখা না হয়ে থাকে বা সেই স্কলারের মৃত্যুর পর জন্ম গ্রহণকরে থাকে বা সেই এলাকায় যদি কখনো না গিয়ে থাকে যেখানে সে হাদীসটি শুনেছে সেটা জালিয়াতি বা মিথ্যাকে নির্দেশ করে। এর পাশাপাশি বর্ণনাকারীর জীবন যাপনকেও গবেষণা করে দেখা হয় যে তার এই ধরনের হাদীস বর্ণনার পেছনে কোনো বৈষয়িক স্বার্থ থাকতে পারে কিনা।  এভাবে অসংখ্য জাল হাদীসকে সহজে চিহ্নিত  করা হয়েছে।

    একইভাবে হাদীসের মতন বা বর্ণনা নিয়েও এই রকম কৌশল প্রয়োগ করে ভুল বা মিথ্যাকে খুঁজে বাহির করা হয়। যেমন যে সকল হাদীসের সত্যতা নিয়ে আমরা সুনিশ্চিত সেগুলোর বর্ণনার ধরন এবং ভাষার গুণগত মান থেকে আমরা রাসূল (সা) কথার ভঙ্গিমা সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা পাই যার সাথে আরেকটি হাদীসের ভাষাকে মিলিয়ে দেখা হয়। এভাবেও জাল হাদীস সনাক্ত করা হয়ে থাকে। এছাড়াও যে সকল বর্ণনা অর্থের দিক থেকে অতিরঞ্জিত বা বুদ্বিবৃত্তিকভাবে অসাড় সেগুলোকেও বাদ দেওয়া হয়ে থাকে। যে সকল বর্ণনা কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক সেগুলোকেও পরিত্যাগ করা হয়। এরপর কোনো একটি বর্ণনা যদি কোনো প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য এর বিপরীত হয়, বর্ণনার মধ্যে যদি গোত্রীয় দৃষ্টিভংগি বা পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গির উপস্থিতি থাকে তবে তা বাদ দেওয়া হয়।

    দ্বন্দ্বমূলক বা পরস্পর বিরোধী হাদীস সম্পর্কিত বিজ্ঞান বা মুখতালাফুল হাদীস (Science of Conflicting Hadeeth)

    এটা খুবই স্বাভাবিক যে বর্ণনার দিক থেকে বিবেচনা করলে কিছু হাদীসকে পরস্পর বিরোধী মনে হতে পারে। এর বিভিন্ন কারণ হতে পারে। যেমন- একটি হাদীস এসেছে সাধারণ পরিস্থিতিকে উদ্দেশ্য করে আবার অন্যটি এসেছে কোনো একটি সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিকে উদ্দেশ্য করে অথবা মিসকোট বা ভুলজায়গায় উদ্ধৃতি করা হয়েছে অথবা নির্দেশটি পরবর্তীতে রহিত হয়ে গিয়েছে। সুতরাং, এই ধরনের দ্বন্দ্বমূলক মনে হওয়া হাদীসগুলোকে রিকনসাইল করার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতির অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। যেকারণে মুখতালাফুল হাদীস শাস্ত্রের উৎপত্তি। এক্ষেত্রে তিনটি পদ্ধতিকে কাজে লাগানো হয়:

    ক) জাম বা সমন্বয়সাধন – দুটি হাদীসের মধ্যে সমন্বয় করার চেষ্টা করা হয় এবং কোনোটাকেই বাদ দেওয়া হয় না।

    খ) তারজিহ (যখন হাদীস দুটির কালানুক্রম অজানা থাকে) – অনেকভাবেই এটা করা হয় যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দুটি দ্বন্দ্বমূলক হাদীসের মধ্যে যেটা অন্য কোন বিশুদ্ধ হাদীস এর সাথে মিলে সেটাকে গ্রহণ করে অন্যটি বাদ দেওয়া।

    গ) নাকশ বা রহিতকরণ (যখন হাদীস দুটির কালানুক্রম জানা থাকে) – দুটি হাদীসের মধ্যে যদি সমন্বয়সাধন সম্ভব না হয় কিন্তু তাদের কালানুক্রম আমাদের জানা আছে তাহলে আগের হাদীসটিকে রহিত হয়েছে ধরে নেওয়া হয়।

    ঘ) উপরের তিন উপায়ে যদি সমাধান না হয় তাহলে পরস্পর বিরোধী দুটি হাদীসকে অস্তিত্বহীন ধরে নেওয়া হয়।

    একটি হাদীসকে গ্রহণ করার আগে মুহাদ্দিসগণ এই রকম গভীর গবেষণা করে থাকলে আর এর ফলে আমরা সহিহ বুখারি, মুসলিম, সিহাহ সিত্তাহ এর মতো বিশুদ্ধ হাদীসের কিতাব পেয়েছি। কিন্তু এরপরও যারা সন্দেহ ছড়ায় তারা আম মুসলিমদের অজ্ঞানতার সুযোগ নিয়ে সহিহ বুখারিকে নিয়েও সন্দেহ তৈরি করার চেষ্টা করছে। তারা বলে ইমাম বুখারি দাবি করেছেন যে তিনি ছয় লক্ষ হাদীস সংগ্রহ করেছিলেন এবং এর এর মধ্য থেকে যাচাই বাছাই করে তিনি সহীহ বুখারি রচনা করেছেন। তারা বলে হাদীস সংগ্রহের যে কঠিন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় সে অনুসারে একজন ব্যক্তির পক্ষে ছয় লক্ষ হাদীস সংগ্রহ করা কখনো সম্ভব না। সুতরাং এগুলো বানোয়াট।

    আসলে, ইমাম বুখারি কোথাও বলেননি যে তিনি নিজে ছয় লক্ষ হাদীস সংগ্রহ করেছিলেন বরং তার সময়ে ছয় লক্ষ হাদীস প্রচলিত ছিল। যার মধ্য থেকে তিনি হাদীসের বিভিন্ন বিশুদ্ধতার মাপকাঠি ব্যবহার করে অল্প কিছু হাদীস গ্রহণ করে সহিহ বুখারি রচনা করেছেন। কেন আমরা মনে করছি যে, ইমাম বুখারিকেই ছয় লক্ষ হাদীস নিজে থেকেই সংগ্রহ করতে হবে। এখানে একটা ভুল ধারণাছড়ানো হচ্ছে যে ইমাম বুখারির আগে কোনো হাদীস কিতাব ছিলো না বা হাদীস এর লিখিত সংকলন ছিল না। এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। বরং, সহিহহ বুখারির আগেই অনেক কিতাব লেখা হয়েছিল যা নিয়ে আমরা একটু পর বিস্তারিত আলাপ করবো।

    আরেকটা কথা বলা হয়, ছয় লক্ষ হাদীসের যে বিশাল সংখ্যা সেটাই বলে দিচ্ছে বেশিরভাগ হাদীস বানোয়াট কারণ নবীজি (সা) এর তেইশ বছরে নবুয়্যতের জীবনে এত অল্প সময়ে এত বিপুল পরিমাণ হাদীসের সংখ্যা হওয়া বাস্তবসম্মত না। এখানেও তারা জেনে-শুনে চতুরতার আশ্রয় নিচ্ছে অথবা তারা এতটাই মূর্খ যে জানেই না কিভাবে হাদীসের সংখ্যা পরিমাপ করা হয়। হাদীসের সংখ্যা কিভাবে গণণা করা হয় সেটা বুঝলে আমাদের কাছে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। প্রথমত, বেশিরবভাগ হাদীসেরই বর্ণনাকারী শুধুমাত্র তিনটি প্রজন্মের  মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ, সাহাবি, তাবেঈ এবং তাবে-তাবেঈন। হতে পারে কোনো একটা চেইনে তাবেঈ তিনজন, তাবে-তাবেঈ চারজন কিন্তু দিনশেষে তিন প্রজন্মের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ। এখন, একজন সাহাবি থেকে একজন তাবেঈ শুনলেন আর তার থেকে আরেকজন তাবে-তাবেঈ জানলেন তাহলে এটা একটা ইউনিক হাদীস। এখন যদি ঐ একই সাহাবি থেকে সেই তাবেঈ জানলেন আর তার থেকে অন্য একজন তাবে তাবেঈ জানলেন তখন কিন্তু সেটাকে আরেকটা ইউনিক হাদীস হিসাবে কাউন্ট করা হবে। এভাবে হাদীসের ইসনাদের মধ্যে যত পরিবর্তন আসবে তত সংখ্যক আলাদা আলাদা হাদীস হিসাবে গণণা করা হবে যদিওবা তা একই সাহাবা থেকে একইরকম বর্ণনা সম্বলিত হাদীস। তার মানে হাদীসের টেক্সট এর অনন্য হওয়া দিয়ে হাদীস গণণা করা হয় না বরং প্রত্যেকটা ইউনিক চেইন বা সনদকে আলাদা একটা হাদীস হিসাবে ধরা হয়। তাহলে চিন্তা করেন একটা হাদীস একজন সাহাবি থেকে অসংখ্য আলাদা আলাদা বর্ণনাকারীর মাধ্যমে তিন প্রজন্মের পর কয়েকশতে পরিণত হতে পারে। আর এভাবেই এসে নবী (সা) এর অল্প কিছু হাদীস তাবে-তাবেঈনদের যুগে এসে লক্ষ লক্ষ হাদীসে পরিণত হয়েছে। সুতরাং, হাদীসের প্রকৃত সংখ্যা বাড়েনি বরং বর্ণনা বা ইসনাদের সংখ্যা বেড়েছে।

    অতীতে আমাদের স্কলারগণ বলেছিলেন যে, সহিহ হাদীসের সংখ্যা চার হাজারের আশেপাশে হবে। যেটা খুবই বাস্তব সম্মত সংখ্যা। আধুনিক যুগেও এই বিষয়ে একটা চমৎকার গবেষণা হয়েছে যেখানেও দেখা গেছে ইউনিক হাদীসের সংখ্যা চার হাজারের কম। একজন বিখ্যাত গবেষক সালেহ আহমেদ শামি তার লেখা গ্রন্থ “ওয়াজিজ ফি আল সুন্নাহ আল নাবাউইয়্যাহ” গ্রন্থে এই বিষয়টা উপস্থাপন করেছেন। তিনি শুরুতে বর্তমান সময়ে গ্রহণযোগ্য সহিহ হাদীসের ১৪ টা বই এর সকল হাদীসকে একত্রিত করেন এবং এর মধ্য থেকে যে হাদীসগুলো পুনরাবৃত্তি হয়েছে সেগুলো বাদ দিয়ে শুধু একটিকে গণনা করেছেন। যেমন: কোনো একটি হাদীস একজন সাহাবি থেকে বর্ণিত হওয়ার পর যদি পরবর্তীতে অসংখ্য বর্ণনাকারী সংযোজনের কারণে অনেকগুলো আলদা সনদ বা চেইন লাভ করে সেক্ষেত্রে তিনি সেটাকে শুধুমাত্র একটা হাদীস হিসাবে গণনা করেছেন। কিন্তু একই রকম টেক্সট বা বর্ণনা সম্বলিত হাদীস যদি অন্য আরেকজন সাহাবির মাধ্যমে পাওয়া যায় তবে তাকে আরেকটা হাদীস হিসাবে গণনা করেছেন। ধরুন একই রকম মতন সম্বলিত একটা হাদীস তিন জন সাহাবা আলাদা আলদাভাবে বর্ণনা করেছেন তাহলে সেটা তিনটা হাদীস ধরা হয়েছিল। অর্থাৎ, এখানেও অল্প কিছু পুনরাবৃত্তিকে গ্রহণ করা হয়েছিল। এরপরও, ইউনিক হাদীসের সংখ্যা এসে দাঁড়ায় চার হাজারেরো কম। এটা খুবই বাস্তবসম্মত সংখ্যা যা সাহাবাদের মাধ্যমে হাদীস আকারে আমরা পেয়েছি।

    রাসূল (সা) এর হাদীসগুলোই কুরআনের ব্যাখ্যা স্বরূপ এবং আমাদের জন্য বিস্তারিত দিক নির্দেশনা। তাইতো নবী (সা) এর সাহাবিগণ অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন যেনো হাদীসগুলো হারিয়ে না যায়। মূলত হাদীস সংরক্ষণের জন্য চার ধরনের প্রচেষ্টা আমরা দেখতে পাই- মুখস্থকরা, আলোচনা করা, আনুশীলন করা এবং লিপিবদ্ধ করা।

    ক) মুখস্থ করা

    সাহাবাগণ(রা) হাদীসগুলোকে তাদের অন্তরে গেঁথে রাখতেন। হাদীস অনুসারে জীবন যাপন করা এবং তা মুখস্থ করে মনে রাখার জন্য তারা সর্বোচ্চ সময় ব্যয় করতেন। তাদের মধ্যে একটা বড় অংশ বাসায় না থেকে মসজিদে থাকতেন যেন সরাসরি রাসূল (সা) – এর কথা শুনতে পান। আর সেই সময়ের আরবের অধিবাসীগণের স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ। তারা খুব সহজেই কবিতার কয়েকশত লাইন মুখস্থ করে ফেলতে পারতো আর এটা ছিল তাদের নিত্যদিনের চর্চা। কয়েক হাজার কবিতা মুখস্থ ছিল এরকম লোকও আমরা আরব সাহিত্যে খুঁজে পাই। তারা তাদের বংশ পরম্পরা সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান রাখতো। শুধু তাই না তাদের উট এবং ঘোড়াগুলো বংশানুক্রমও মনে রাখতো।

    আরবরা তাদের স্মৃতিশক্তি নিয়ে অনেক গর্ব করতো এবং লেখার চেয়ে স্মৃতিশক্তির উপর বেশি আস্থা রাখতো। কবিতাকে লিপিবদ্ধ করে সংরক্ষণ করাকে তারা লজ্জাজনক মনে করতো এবং লিখলেও সেটা প্রকাশ করতো না কারণ এর মাধ্যমে তাদের স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা প্রকাশ পেতো। আর সাহাবাগণ এই চর্চাকেই কাজে লাগিয়েছিলেন। হাদীস মুখস্থ করার জন্য তাদের উৎসাহ ও উদ্দীপনা ছিল তথাকথিত এইসব কবিতা ও সাহিত্য মুখস্থ করার চাইতে অনেক গুণ বেশি।

    আবু হুরাইরা (রা) রাতকে তিনভাগে ভাগ করতেন। একভাগে ইবাদত করতেন, এক ভাগে ঘুমাতেন আর একভাগে হাদীস মুখস্থ করতেন। একদা, মদিনার গভর্নর আবু হুরাইরা (রা) এর স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা করার জন্য উনাকে তার বাসায় দাওয়াত দিলেন এবং উনাকে কিছু হাদীস শুনাতে বললেন। একইসময় মারোয়ান তার পত্রলেখককে পর্দার আড়ালে নিযুক্ত করলেন হাদীসগুলো লিখে রাখার জন্য। এরপর এক বছর পর মারোয়ান আবু হুরাইরা (রা)-কে আবারো আসতে বললেন এবং সেই হাদীসগুলো শুনাতে বললেন। এরপর আগের হাদীসের সাথে মিলেয়ে দেখা গেলো আবু হুরাইরা (রা) হুবহু একই রকমভাবে বর্ণনা করেছেন।

    হাদীস বিশেষজ্ঞগণ ‘আসমা উর রিজাল’ নামক শাস্ত্র গড়ে তুলেছিলেন যেখানে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য উপায়ে একজন বর্ণনাকারী স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা করা হতো এবং স্মৃতিশক্তি উচ্চমানসম্পন্ন না হলে তারা হাদীস গ্রহণ করতেন না।

    খ) পারস্পরিক আলোচনা

    সাহাবাগণ (রা) নিজেদের মধ্যে হাদীসগুলো নিয়ে পারস্পরিক আলোচনা করতেন। তারা যখনি রাসূল (সা) এর কাছ থেকে নতুন কোনো কিছু শিখতেন তা তারা অন্যদের সাথে আলোচনা করতেন। ইসলামে জ্ঞান অর্জন করা এবং তা প্রচার করা বাধ্যতামুলক। এই চর্চাটি হাদীস সংরক্ষণে ব্যাপক ভুমিকা রেখেছে।

    গ) বাস্তব অনুশীলন

    রাসূল (সা) হাদীসগুলো শুধুমাত্র কোন তত্ত্ব বা দর্শন না বরং এগুলো আমাদের জীবনযাপানের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বা বাস্তবজীবনে প্রয়োগের সাথে সম্পর্কিত। সুতরাং, সাহাবীগণ (রা) যাই শিখতেন সাথে সাথে তা হুবহু তাদের জীবনে প্রয়োগ করতেন। আর এইভাবে হাদীসগুলো বাস্তব জীবনে চর্চা বা অনুশীলনের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে।

    ঘ) লিপিবদ্ধকরণ

    অনেক সাহাবী (রা) হাদীস লিখে রাখতেন এবং এর মাধ্যমে অনেক হাদীস সংরক্ষণ করা হয়েছে। এটা সত্য যে শুরুর দিকে রাসূল (সা) কোরআনের আয়াত ব্যতীত অন্য কিছু লিখে রাখতে নিষেধ করেছিলেন। যার কারণ ছিল, শুরুর দিকে সাহাবারা (রা) কোরআনের ভাষাশৈলির সাথে পুরোপুরি পরিচিত ছিলেন না আর সেই সময় কোরআন বই আকারেও ছিল না তাই এই সম্ভাবনা ছিল যে হাদীসগুলো লিখে রাখলে তা কুরআনের সাথে মিশ্রিত হয়ে যেতে পারে। কিন্তু পরবর্তীতে যখন সাহাবাগিণ (রা) কোরআনের  ভাষাশৈলি সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা লাভ করলেন তখন আর হাদীস লিখে রাখলে তা মিশ্রিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলো না। এমতাবস্থায় রাসূল (সা) তার সাহাবাদের নির্দেশ দিলেন হাদীস লিখে রাখার জন্য। এইজন্যই আমরা হাজার হাজার হাদীস লিখিত অবস্থায় পেয়েছি যা রাসুল (সা) ও চার খলিফার সময়েই লেখা হয়েছিল। সুতরাং, আমাদের মধ্যে যে ভুল ধারণা ছড়ানো হচ্ছে হাদীস সংকলন শুরু হয়েছিল তিনশত হিজরি সনের পরে তা পুরোপুরি মিথ্যা। লিখিত কিছু হাদীস সংকলনের উদাহারণ নিচে দেওয়া হলো:

    • রাসূল (সা) এর নির্দেশ মোতাবেক একটি নথি লেখা হয়েছিল যেখানে যাকাত সম্পর্কিত শরিয়তের হুকুম আহকাম বিস্তারিতভাবে ছিলো। এর নাম দেওয়া হয়েছিল ”আল সাহিফাহ আল সাদাকাহ”। আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা) বলেন, “রাসূল (সা) এর নির্দেশে যাকাতের প্রতিলিপি লেখা হয়েছিল এবং তার(সা) এর ওফাতের পর তা গভর্নরদের কাছে পাঠানো হয়েছিল। তিনি (সা) এটা তার (সা) তলোয়ারের সাথে সংযুক্ত করেছিলেন। তিনি (সা) যখন মৃত্যু বরণ করেন এরপর আবু বকর (রা) আমৃত্যু এটা অনুসরণ করেন, এরপর উমর (রা) আমৃত্যু এটা অনুসরণ করেন…। (তিরমিযি)
    • দশম হিজরিতে, মুসলিমরা যখন নাজরান বিজয় করে রাসুল (সা) তখন আমর ইবন হাজম (রা) কে ইয়েমেনের গভর্নর হিসাবে নিয়োগ করেন। সে সময় রাসুল (সা) উবাই ইবন কাব (রা) কে দিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিলিপি লেখান এবং আমর ইবন হাজম (রা) কে প্রেরণ করেন। এই প্রতিলিপিতে কিছু সাধারণ উপদেশ ছাড়াও পবিত্রতা, নামায, যাকাত, উশর, হাজ্জ, উমরাহ, জিহাদ, গনিমত, ট্যাক্স, রক্তপণ, প্রশাসন, শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে শরীয়াহ হুকুম লেখা ছিল। হযরত আমর ইবন হাজম (রা) এই প্রতিলিপি অনুসারেই ইয়েমেনের শাসন কাজ পরিচালনা করতেন।
    • আবু হুরাইরা (রা) সবচেয়ে বেশি হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইসলাম গ্রহণেরর পর তিনি তার সম্পূর্ণজীবন এই হাদীস জানা ও সংরক্ষণের জন্য কাজ করে গেছেন। আবু হুরাইরা (রা) এর কাছে রাসুল (সা) হাদীস সম্বলিত অনেক বই ছিল শুধু তাই না উনার ছাত্ররা তার কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করে অনেক বই তৈরি করেছিলেন।
    • হযরত আনাম ইবন মালিক (রা) রাসূল (সা) এর সাথে দশ বছর ছিলেন। এই সময়ে তিনি বিশাল সংখ্যক হাদীস শুনেন এবং সেগুলো লিখে রাখেন।
    • হযরত আলি (রা) এর কাছেও বিশাল সংখ্যক হাদীস লিখিত ছিল যা ইমাম বুখারি সহিহ বুখারিতে যা ছয়টি জায়গায় উল্লেখ করেছেন।
    • রাসুল (সা) যখন মৃত্যু বরণ করেন তখন আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) অনেক ছোট ছিলেন। হাদীস সংরক্ষণের জন্য তিনি যেগুলো সরাসরি শুনেছেন সেগুলো লিখে রাখেন এবং অন্যান্য সাহাবিদের কাছে যেতেন ও জ্ঞান অর্জন করতেন আর সেগুলোও লিখে রাখেন। তার লেখা বই এর সংখ্যা এতো বেশি ছিলো যে সেগুলো বহন করতে একটা উটের প্রয়োজন হত। ইবন আব্বাস (রা) এর ছাত্ররাও সেই হাদীসের বই গুলো কপি করে অসংখ্য বই লিখেছেন।
    • এছাড়াও পরবর্তী সময় প্রসিদ্ধ ইমামগণ বিভিন্ন ফিকহের বই লিখেন যা মধ্যে দলিল হিসাবে অসংখ্য হাদীস লেখা ছিল। ইমাম শাফেই ২০৫ হিজরি সনে ‘আল-উম্ম’ ও ‘আর-রিসালাহ’ নামক বই লিখেন যেখানে তিনি শত শত হাদীস উল্লেখ করেছেন। আর এর মধ্যেই ইমাম মালিক তার মুয়াত্তা লিখে ফেলেছেন যা বর্তমানে হাদীসের বই হিসাবে পরিচিত হলেও এটা মূলত ফিকহের বই।

    সুতরাং, আমরা দেখতে পাচ্ছি স্বয়ং রাসুল (সা) এর সময় থেকে শুরু করে ইমাম বুখারি ও মুসলিমের আগমনের আগেই সব সময় লিখিতভাবে হাদীস সংকলনের প্রচলন ছিল। ইমাম বুখারি যেটা করেছেন সেটা হলো হাদীস গ্রহণ করার মাপকাঠিগুলোকে আরো নিখুঁত করেছেন এবং হাদীস সংগ্রহের একটি নিখুঁত প্রক্রিয়া তৈরি করেছেন যাতে করে করে বিশুদ্ধভাবে রাসুল (সা) এর হাদীসগুলো কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত হয়।

    এখানে আমরা অতি সংক্ষেপে হাদীস সংগ্রহ ও সংকলন ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করেছি। এছাড়া হাদীস এর সত্যতা নিয়ে যে সন্দেহগুলো ছড়ানো হচ্ছে সেগুলো যে ভিত্তিহীন তা তুলে ধরেছি। আশা করি, এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা যদি নিষ্ঠার সাথে চিন্তা ভাবনা করি তাহলে আমাদের ঈমান আরো শক্তিশালী হবে এবং যাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে তারা সঠিক পথে ফিরে আসতে পারবেন। আমিন।

  • ইউক্রেন যুদ্ধের ক্লান্তি

    ইউক্রেন যুদ্ধের ক্লান্তি

    ফেব্রুয়ারি ২০২৩ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ তার প্রথম বছর পূর্ণ করেছে এবং ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এর দু বছর পূর্ণ হবে। রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন আক্রমণের নির্দেশ দেওয়ার পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনকে আত্মরক্ষার জন্য গভীরভাবে জমে থাকা ক্ষোভের সদ্ব্যবহার করতে প্রয়োজনীয় সামরিক সহায়তা দিয়েছিল। সিরিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের মতো, ইউক্রেন সংঘাতেও মার্কিন পদক্ষেপে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয়ের আকাঙ্ক্ষা খুব কমই ছিল। আর এর মধ্যেই ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে আরও মেরুকরণ ঘটতে থাকে।

    যুদ্ধে আমেরিকান সম্পৃক্ততার প্রথম অংশটি ছিল ইউক্রেনকে সাহায্য-সহযোগিতা সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং একই সাথে রাশিয়ার উপর যাতে বড় ধরনের আর্থিক ব্যয় আরোপিত হয়।  যখন রাশিয়ার ব্লিটজক্রেগ (সংক্ষিপ্ত ও দ্রুত আক্রমণ) ব্যর্থ হল তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনা শুরু হয় যা ইউক্রেনকে একটি পাল্টা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত করছিল যার ফলে রাশিয়া ইউক্রেনকে কিছু ভূখণ্ড ফিরিয়ে দিবে এবং অবশেষে শক্তিশালী  অবস্থান থেকে সে রাশিয়াকে আপসের প্রস্তাব দিবে। কিন্তু আমেরিকার যুদ্ধ প্রচেষ্টার এই অংশে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। ইউক্রেন তার ২০২৩ এর পাল্টা আক্রমণে যে লক্ষ্যগুলি নির্ধারণ করেছিল তা অর্জন করতে সংগ্রাম করে যাচ্ছে, যার লক্ষ্য ছিল রাশিয়ান ফ্রন্টকে ডনবাস থেকে ক্রিমিয়া পর্যন্ত বিভক্ত করে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ভেদ করে তা ব্ল্যাক সি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া। আক্রমণের ৫ মাস পরে, ইউক্রেনে শীত শুরু হওয়ার সাথে সাথে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ভেদ করতে সে ব্যর্থ হয়েছিল।

    মার্কিন সামরিক সহায়তা একটি পরিচিত প্যাটার্ন অনুসরণ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে পদাতিক অস্ত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং এটি যুদ্ধের শুরুর দিকে হওয়ায় তাতে সামান্যই বিরোধিতা ছিল। ইউক্রেন তখন আর্টিলারি সিস্টেমের জন্য বলেছিল, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ প্রসারিত করবে কিনা এবং ইউরোপীয় মহাদেশকে আরো অস্থিতিশীল করা ঠিক হবে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল। অবশেষে, অনেক বিতর্কের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলি ইউক্রেনকে আর্টিলারি সিস্টেম সরবরাহ করে। ইউক্রেন তখন বলেছিল যে, রাশিয়ান বাহিনীর বিরুদ্ধে আরও অগ্রসর হওয়ার জন্য তাদের ট্যাঙ্ক দরকার এবং তখন কে তাদের ট্যাংক সরবরাহ করবে তা নিয়ে আরেকটি বিতর্ক শুরু হয়েছিল। ইউক্রেন আব্রামস ট্যাঙ্ক চেয়েছিল, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ইউরোপীয় মিত্রদের ইউক্রেনে ট্যাঙ্ক স্থানান্তর করার জন্য চাপ দেয় যেহেতু সেগুলো ইউরোপীয় মহাদেশে রয়েছে। অনেক বিতর্ক ও মিডিয়া সার্কাসের পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ট্যাঙ্ক সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছিল, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা প্রদান করা হয়নি বা কোন স্টক থেকে ইউক্রেনকে তা সরবরাহ করা হবে তাও বলা হয়নি। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা তখন বলেছিলেন যে, তাদের সেনাদের কভার দেওয়ার জন্য যুদ্ধবিমান দরকার। এবার আবার বিতর্ক শুরু হয় যে, কে এসব সরবরাহ করবে এবং কোথা থেকে তা আসবে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র F-16 এর ইউরোপীয় স্টক ইউক্রেনে স্থানান্তর করার ব্যাপারে সম্মত হয়, এই প্রচেষ্টার জন্য মার্কিন যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে ইউক্রেনীয় পাইলটদের প্রশিক্ষণ শিবির স্থাপন করা হয়। ইউক্রেন তখন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন দেখায় এবং আবারও অনেক ধুমধাম করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি’ সরবরাহ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ করছে এবং তারপরে পরিমাণ সীমিত করে রাখছে যার অর্থ ইউক্রেন রাশিয়াকে যে একটি গুরুতর সামরিক আঘাত দেবে এমনটি কখনই ঘটবে না।

    যুদ্ধের অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করলে দেখা যাচ্ছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা রাশিয়াকে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার দেশ বানিয়েছে। ইউরোপ কার্যত রাশিয়া থেকে জ্বালানী আমদানি বন্ধ করে দেয় এবং মার্কিন নেতৃত্বে পশ্চিমারা রাশিয়াকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করতে কাজ করে। নিষেধাজ্ঞাগুলি কেবল তখনই কার্যকর হয় যখন প্রত্যেকে তা প্রয়োগ করে। যদিও ইউরোপ তার জ্বালানী আমদানি কমিয়েছে, রাশিয়া ভারত, চীন ও তুরস্ককে তার জ্বালানী কিনতে এবং কার্যকরভাবে ইউরোপীয় বাজার প্রতিস্থাপন করতে খুবই আগ্রহী রূপে পেয়েছে। এই মুহূর্তে রাশিয়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার দিকটি অনুভব করছে না কারণ ২০১৪ সাল থেকেই সে তার ‘রাশিয়ান দুর্গ’ কৌশলের অংশ হিসেবে এমন কোনো ঘটনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মার্কিন ট্রেজারি ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়া নিষেধাজ্ঞাগুলি এড়াতে ব্যবহার করা ১৫০ জন ব্যক্তি ও সংস্থার উপর আরো  জরিমানা করার ঘোষণার মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার উপর তার স্ক্রু আরো শক্ত করছে।

    ২০২৩ সালের অক্টোবরে ফিলিস্তিনে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে আমেরিকার নজর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের দিকে চলে যায় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে রাশিয়ার সাথে শান্তি আলোচনা শুরু করার জন্য চাপ দিতে শুরু করে। এটি একটি বড় ইউ-টার্ন বিশেষ করে যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সাথে আলোচনা করতে পূর্বে অস্বীকার করেছে এবং ইউক্রেনও যাতে কখনই রাশিয়ার সাথে আলোচনা না করে তার জন্য তাকে বাধ্য করেছে। ৪ নভেম্বর ২০২৩-এ ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েনের সাথে একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলনের সময়, রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কি স্বীকার করেন যে রাশিয়ার বিরুদ্ধে তার দেশের যুদ্ধ নিয়ে পশ্চিমে ছিল ক্রমবর্ধমান ক্লান্তি এবং “এটি পরিষ্কার যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ.. …আন্তর্জাতিক মনোযোগ তাদের দিক থেকে সরিয়ে অন্যদিকে নিয়ে গিয়েছে।” এই স্বীকারোক্তি ইউক্রেনীয় জেনারেলের বক্তব্যের এক সপ্তাহ পর এলো যেখানে তিনি স্বীকার করেন যে, যুদ্ধ একটি অচলাবস্থায় রূপ নিয়েছে। রাশিয়ার প্রধান দাবি সর্বদাই ছিল ‘ইউক্রেনীয় নিরপেক্ষতা’। কিন্তু যুদ্ধের অগ্রগতির সাথে সাথে রাশিয়া খেরসন, জাপোরিঝিয়া, দোনেৎস্ক ও লুহানস্ককে দখল করে নিয়েছে এবং এখন বলছে যে কোনো শান্তি চুক্তির জন্য অবশ্যই এই অঞ্চলগুলোকে রাশিয়ার অঞ্চল হিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

    ২০২৪ নির্বাচনের বছর হওয়ায় বাইডেন প্রশাসন ঘরোয়া বিষয়গুলিতে মনোনিবেশ করবে। তবে ২০২৪ সালে একমাত্র চলক হচ্ছে যদি রাশিয়া তার নিজস্ব একটি পাল্টা আক্রমণ শুরু করার জন্য তার সংঘবদ্ধ সৈন্যদের ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয়।

    Taken from “Strategic Estimate 2024” by Adnan Khan

  • জেন্ডার, অস্পষ্ট জেন্ডার, ট্রান্সজেন্ডার ও ট্রানসেক্সুয়াল সম্পর্কিত ইসলামের বিধান

    জেন্ডার, অস্পষ্ট জেন্ডার, ট্রান্সজেন্ডার ও ট্রানসেক্সুয়াল সম্পর্কিত ইসলামের বিধান

    জেন্ডারিজম (Genderism) নিজস্ব খেয়াল-খুশি দ্বারা লিঙ্গকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য একটি পাশ্চাত্য ধারণা

    বিগত কয়েক দশকে পশ্চিমারা জেন্ডার বিষয়ে একটি নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। খৃষ্টান চার্চ এবং এর নিপীড়নমূলক মতবাদের কারণে নারীদের প্রতি শতাব্দী ধরে নিষ্ঠুর বৈষম্যের আচরণ করার ফলে পশ্চিমারা লিঙ্গকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য ‘জেন্ডারিজম’ এর দিকে ঝুঁকেছে। ফলে পশ্চিমারা (প্রাকৃতিক) লিঙ্গ ধারণা তথা বায়োলজিকাল জেন্ডারের ধারণা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, অর্থাৎ পুরুষ ও নারী জেন্ডারের পরিবর্তে ‘জেন্ডারিজম’ ধারণার দিকে ঝুঁকছে। জেন্ডারিজমের অধীনে, একজন ব্যক্তির সাংস্কৃতিক ও সামাজিক গঠন অনুসারে লিঙ্গ সংজ্ঞায়িত করা হয়। জেন্ডারিজমের অধীনে, লিঙ্গটি একজন ব্যক্তির চিন্তার দ্বারা নির্ধারিত হয়, আত্ম-উপলব্ধি দ্বারা, জীববিজ্ঞান দ্বারা নয়। যেমনটি ফরাসি অস্তিত্ববাদী দার্শনিক, সিমোন ডি বেউভোয়ার বলেছেন, “একজন (নারী) জন্মগ্রহণ করেন না, বরং একজন নারী হয়ে ওঠেন (ফরাসি: On ne naît pas femme, on le devient)” তার বই “দ্য সেকেন্ড সেক্স” (ফরাসি: Le Deuxième Sexe)।

    জেন্ডারিজম, মূলত, নারীবাদের দ্বিতীয় ঢেউয়ের অংশ হিসাবে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার প্রচেষ্টায় উদ্ভূত হয়েছিল। সুতরাং, জেন্ডারিজম নারী পুরুষের মধ্যে বৈষম্য দূর করতে চেয়েছিল। এর মাধ্যমে তারা এ বৈষম্যের পরিণতি, তথা নারী-পুরুষের ব্যপারে গদবাধা চিন্তা করা এবং সমাজে নারী-পুরুষ কে কোন কাজ করতে পারবে তা সীমাবদ্ধ করে দেওয়া, যা তারা নিপীড়নমূলক বলে মনে করছিল তা দূর করার চেষ্টা করেছিল।

    জেন্ডারিজম সমকামী আন্দোলন দ্বারা গৃহীত হয়

    মূলত, পুরুষদের দ্বারা নারীর প্রতি বৈষম্য প্রতিরোধ করার জন্য জেন্ডারিজম গৃহীত হয়েছিল। যাইহোক, জেন্ডারিজম নারীর অধিকারের সমর্থন থেকে সমকামী অধিকারের সমর্থনে প্রসারিত হয়েছে। যারা নিজেদেরকে সমকামী বলে ঘোষণা করে তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অবসান ঘটাতে সমকামিতার সমর্থকদের দ্বারা জেন্ডারবাদকে ব্যাপকভাবে সমর্থন করা হয়েছিল। এভাবে, জেন্ডারিজমের উদ্দেশ্য আর নারীর প্রতি বৈষম্যের অবসানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলো না। বায়োলজিকাল জেন্ডার যা-ই হোক না কেন, খেয়াল-খুশি দ্বারা যারা নিজেদের জন্য একটি লিঙ্গ বেছে নিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অবসান ঘটাতে জেন্ডারিজমকে অগ্রসর করানো হয়।

    ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ধারণার মাধ্যমে পশ্চিমারা নিজেদের মধ্যে লিঙ্গ নির্ধারণের অনুমতি দিয়েছে, নিজেদের তথাকথিত ‘আত্মউপলব্ধি’র মাধ্যমে। সুতরাং, জেন্ডারিজম অনুসারে, একজন পুরুষ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে তিনি একজন নারী, যদিও তিনি বায়োলজিকালি একজন পুরুষের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তিনি নিজের জন্য বেছে নেওয়া লিঙ্গে রূপান্তর করতে অস্ত্রোপচার এবং হরমোন থেরাপি নিতে পারেন। একজন তথাকথিত ‘ট্রান্সজেন্ডার’ এভাবে পুরুষের বায়োলজিকাল বৈশিষ্ট্যগুলিকে লুকিয়ে রাখতে পারে এবং নারীর জৈবিক বৈশিষ্ট্যগুলি অর্জন করতে পারে। ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিরা যারা এভাবে তাদের লিঙ্গ পরিবর্তন করার জন্য চিকিৎসা সহায়তা ব্যবহার করে, তাদেরকে ট্রান্সসেক্সুয়াল বলা হয়। একইভাবে, একজন নারী নিজেই হঠাৎ উপলব্ধি (!) করতে পারে যে সে একজন পুরুষ। একটি বিখ্যাত ঘটনা হল সেই নারী, এলেন পেইজের, যিনি অস্ত্রোপচার ও হরমোনের পরিবর্তনের পরে এলিয়ট পেজে পরিণত হন। তাই, এখন পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিতে ট্রান্সজেন্ডার মানুষ বলে কিছু মানুষ আছে, যাদের একটি লিঙ্গ পরিচয় আছে, যা জন্মের সময় তাদের জৈবিক লিঙ্গ থেকে আলাদা হতে পারে।

    ইসলামে জেন্ডার ও জেন্ডারের দায়িত্বের ব্যপারে দৃষ্টিভংগি

    আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    وَلَيْسَ الذَّكَرُ كَالْأُنثَىٰ

    “এবং পুরুষ মহিলার মত নয়।” [সূরা আলে ইমরান, TMQ 3:36]। ইসলাম অনুযায়ী মৌলিকভাবে জেন্ডার দুটো। দুটো জেন্ডারই শুধুমাত্র জৈবিক বিবেচনা দ্বারা নির্ধারিত হয়। জেন্ডার ব্যক্তির খেয়ালখুশি বা স্ব-উপলব্ধির সিদ্ধান্ত দ্বারা নির্ধারিত হয় না। অস্পষ্ট জেন্ডার বিশেষজ্ঞদের দ্বারা নির্ধারিত হয়, কারণ তা দুটি জেন্ডারের মধ্যে একটি হবে। এরপর, জেন্ডারের ভূমিকা ওহী দ্বারা প্রকাশিত শরীয়াহ আইন দ্বারা নির্ধারিত হবে। ইসলামে, সমস্ত মানুষ তথা সকল পুরুষ ও নারীর জন্য যেমন শরীয়াহ বিধিবিধান রয়েছে, তেমনি লিঙ্গ-নির্দিষ্ট শরিয়াহ বিধানও রয়েছে। যেমন ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কেই নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাতের দায়িত্ব দিয়েছে। পাশাপাশি, ইসলাম ঋতুস্রাব, গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মের বিষয়ে শুধুমাত্র নারীর জন্য কিছু শর’ঈ বিধান দিয়েছে। ইসলাম পুরুষের উপরে নারীকে সন্তানের তত্ত্বাবধান (Custodianship)-এর অধিকারও দিয়েছে। ইসলাম নারীকে উপার্জনের অধিকার দিয়েছে, যেখানে তার সম্পত্তিতে তার স্বামীর কোনো অধিকার নেই, যেখানে পুরুষকে তার স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণ দিতে বাধ্য করেছে। যুদ্ধ করা নারীদের উপর ফরয নয়, পুরুষের উপর ফরয।

    নারী বা পুরুষের উপর নিপীড়ন সৃষ্টি করাতো দুরের বিষয়, শরীয়াহ আইন নিশ্চিত করে যে পুরুষ ও নারী একে অপরকে সহযোগিতা করবে, ফলে একটি শক্তিশালী পারিবারিক কাঠামো তৈরি হবে এবং একটি স্থিতিশীল সমাজ তৈরি করতে তা সহায়তা করবে। এমনকি বর্তমানে খিলাফতবিহীন অবস্থায় যখন নিপীড়ন ও পদস্খলন দূর করবার জন্য কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা নেই, সেসময়ও মুসলিম বিশ্বের পারিবারিক জীবনগুলো আলোর বাতিঘর হয়ে আছে, বিশেষ করে তাদের জন্য যারা পাশ্চাত্যে তাদের পারিবারিক জীবন ধ্বংসের মারাত্মক পরিণতি ভোগ করছে।

    ইসলাম অস্পষ্ট জেন্ডারকে (خُنْثَى খুনছা) দুই জেন্ডার থেকে একটি জেন্ডার নির্ধারণ করে দেয়

    ‘খুঁনছা’ শব্দটি এমন একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যাকে জৈবিক বিবেচনায় পুরুষ বা নারী হিসাবে সহজে চিহ্নিত করা যায় না। এটি সেই মানুষ যার পুরুষ ও মহিলা উভয় শারীরস্থান রয়েছে, বা যার কোনটিই নেই। ইসলামে, বিশেষজ্ঞরা জৈবিক বাস্তবতা অধ্যয়নের পরে অস্পষ্ট জেন্ডারকে দুটি জেন্ডার তথা পুরুষ কিংবা নারীর মধ্যে একটি নির্ধারণ করে দেন। প্রখ্যাত আইনবিদ ইবনে কুদামাহ তার আল-মুগনি গ্রন্থে অস্পষ্ট জেন্ডারের বিষয়ে বলেছেন: “এটি পুরুষ বা নারী থেকে ভিন্ন কিছু না (অর্থাৎ, দুইয়ের মধ্যে যেকোন একটি)।” আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَأَنَّهُ خَلَقَ الزَّوْجَيْنِ الذَّكَرَ وَالأُنْثَى

    “এবং উভয়ের মাধ্যমে তিনি অগণিত পুরুষ ও নারীকে ছড়িয়ে দিয়েছেন” [সূরা আন-নিসা, TMQ 4:1] এবং তাই তৃতীয় কোনো সৃষ্টি নেই।

    সুতরাং, ইসলাম তৃতীয় লিঙ্গ নির্ধারণ করে না। একজন বিশ্বস্ত মুসলিম ডাক্তার যিনি জন্মগত ত্রুটি, লিঙ্গ, শারীরস্থান, জেনেটিক্স এবং জেন্ডার আচরণের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, তিনি জেন্ডার নিশ্চিত করবেন। তাই তিনি, সহানুভূতি সহকারে এবং সংবেদনশীলভাবে, জৈবিক, শারীরবৃত্তীয়, শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলি বিশদভাবে পরীক্ষা করবেন, প্রথমে, পুরুষ বা নারীর বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে কী প্রাধান্য রয়েছে তা দেখবেন। তিনি শারীরিক বিষয় পরীক্ষা করবেন, যেমন যৌনাঙ্গ, সেইসাথে X এবং Y যৌন ক্রোমোজোম বিবেচনা করে, যা লিঙ্গ গঠন করে। যদি, খুব বিরল ক্ষেত্রে, শুধুমাত্র শারীরবৃত্তীয় এবং জেনেটিক বৈশিষ্ট্যগুলি অস্পষ্টতার সমাধান না করে, তাহলে জেন্ডার নির্ধারণের আগে পুরুষ এবং নারীর জৈবিক, যৌন প্রবণতা এবং তাগিদগুলির বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়। এরপরে, ইসলামি বিধি-বিধানগুলি যেমন বিবাহ, জেন্ডারের ভূমিকা ও দায়িত্ব নির্ধারিত জেন্ডার অনুসারে প্রযোজ্য হবে।

    একবার জেন্ডার নির্ধারণ করা হয়ে গেলে, এটি খলিফাহর আদেশ দ্বারা অনুমোদিত হয়, মুসলমানদের কর্তৃপক্ষ হিসাবে, যাকে অবশ্যই মানতে হবে। এরপরে, কোনও বৈষম্য ছাড়াই নির্দিষ্ট জেন্ডার অনুসারে, বৃহত্তর সম্প্রদায়ের দ্বারা ব্যক্তিকে গ্রহণ করে নেয়া হবে। নারী কিংবা পুরুষকে ইসলামী সমাজের একটি মূল্যবান সদস্য হিসাবে মনে করা হয়, যাতে সমস্ত শর’ঈ দায়িত্ব সে পালন করতে পারে, যাতে সমস্ত শর’ঈ অধিকার তাকে প্রদান করা হয়।

    মেয়েলি (মুখান্নাছ) পুরুষ এবং পুরুষালী (মুতারাজ্জিলাহ) নারীদের সম্পর্কে ইসলামের বিধান

    ইবন আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন,

    «لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الْمُتَشَبِّهِينَ مِنَ الرِّجَالِ بِالنِّسَاءِ، وَالْمُتَشَبِّهَاتِ مِنَ النِّسَاءِ بِالرِّجَالِ»‏

    “আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অভিশাপ দিয়েছেন সেই সব পুরুষদের যারা নারীদের আচার-ব্যবহার করে এবং সেই সব নারীরা পুরুষদের আচার-ব্যবহার করে। [বুখারী]। ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন যে,

    «لعن الله الْمُخَنَّثِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالْمُتَرَجِّلَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَقَالَ أخرجوهم من بُيُوتكُمْ»

    “আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মেয়েলি পুরুষ (মুখান্নাস) ও পুরুষালী নারী (মুতারাজ্জিলাহ)-দের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন, এবং তিনি (সা) বলেছেন, ‘তাদেরকে ঘর থেকে বের করে দাও’।” রাসূল (সা) বলেন,

    «ثَلاَثَةٌ لاَ يَنْظُرُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْعَاقُّ لِوَالِدَيْهِ وَالْمَرْأَةُ الْمُتَرَجِّلَةُ وَالدَّيُّوثُ»

    “তিনজন আছে যাদের দিকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকাবেন না: যে তার পিতা-মাতার অবাধ্য, পুরুষালি নারী এবং দায়ূছ (পরিবারে অশ্লীলতা প্রসার হতে দেয় যে)।” [আন-নাসাঈ]

    জেন্ডারের সাদৃশ্য একটি সাধারণ অর্থে আসে, পরিচয়, চরিত্র, পোশাক ও আচরণের ক্ষেত্রে। আবার এটি কোন সীমাবদ্ধতা এবং পার্থক্য ছাড়াই একটি পরম অর্থে আসে। এই পাপ একই জেন্ডারের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দিকে ঠেলে দেয় এবং আর যা যা সেদিকে মানুষকে পরিচালিত করে। সুতরাং, ইসলামে কামনা-বাসনা বা খেয়ালখুশি দ্বারা কর্ম নির্ধারিত হয় না। বরং, শরীয়াহ বিধান পুরুষ ও নারীর মধ্যকার সম্পর্ক নির্ধারণ করে দেয় এবং সেইসাথে তাদের নিজ নিজ আচার-আচরণ ও ভূমিকা নির্ধারণ করে দেয়। ইসলামে সম্পর্কের রূপ বিশদভাবে নির্ধারণের পর, বৈবাহিক বন্ধনের মাধ্যমে পুরুষ ও নারীর মধ্যে প্রেম ও অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তৈরি হয়। খিলাফতই হলো সেই ব্যবস্থা যা এমন এক পরিবেশ তৈরি করবে যা সঠিক জেন্ডার গঠনে ভূমিকা পালন করবে। পশ্চিমা সভ্যতা স্বাধীনতা ও তার ‘জেন্ডারিজম’-এর বহিঃপ্রকাশ মাধ্যমে যে বিভ্রান্তি, দুঃখ-দুর্দশা সৃষ্টি করেছে ইসলামী সমাজ তা থেকে যোজন যোজন দুরত্বে অবস্থিত।

    ট্রান্সজেন্ডার ও ট্রান্সসেক্সুয়ালের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

    জন্মের সময়কার বায়োলজিকাল বাস্তবতা উপেক্ষা করে জেন্ডার স্ব-উপলব্ধি দ্বারা নির্ধারিত হয় না। একজন ব্যক্তির লিঙ্গ পুরুষ থেকে নারীতে পরিবর্তন করা, বা বিপরীতভাবে, আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন করা হারাম বলে বিবেচিত হয়, সেটি হরমোনাল থেরাপি হোক কিংবা প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে পরিবর্তন করা হোক। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    إِن يَدْعُونَ مِن دُونِهِ إِلَّا إِنَاثًا وَإِن يَدْعُونَ إِلَّا شَيْطَانًا مَّرِيدًا (117) لَّعَنَهُ اللَّهُ ۘ وَقَالَ لَأَتَّخِذَنَّ مِنْ عِبَادِكَ نَصِيبًا مَّفْرُوضًا (118) وَلَأُضِلَّنَّهُمْ وَلَأُمَنِّيَنَّهُمْ وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُبَتِّكُنَّ آذَانَ الْأَنْعَامِ وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُغَيِّرُنَّ خَلْقَ اللَّهِ ۚ وَمَن يَتَّخِذِ الشَّيْطَانَ وَلِيًّا مِّن دُونِ اللَّهِ فَقَدْ خَسِرَ خُسْرَانًا مُّبِينًا (119) يَعِدُهُمْ وَيُمَنِّيهِمْ ۖ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلَّا غُرُورًا

    তারা আল্লাহকে পরিত্যাগ করে শুধু নারীর আরাধনা করে এবং শুধু অবাধ্য শয়তানের পূজা করে। যার প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন। শয়তান বলল: আমি অবশ্যই তোমার বান্দাদের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট অংশ গ্রহণ করব। তাদেরকে পথভ্রষ্ট করব, তাদেরকে আশ্বাস দেব; তাদেরকে পশুদের কর্ণ ছেদন করতে বলব এবং তাদেরকে আল্লাহর সৃষ্ট আকৃতি পরিবর্তন করতে আদেশ দেব। যে কেউ আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, সে প্রকাশ্য ক্ষতিতে পতিত হয়। সে তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং তাদেরকে আশ্বাস দেয়। শয়তান তাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা সব প্রতারণা বৈ নয়। [সূরা আন-নিসা, TMQ 4:117-120]

    পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে, এটি হয় নারীর বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করা হচ্ছে কিংবা পুরুষের বৈশিষ্ট্যগুলিকে গোপন করা হচ্ছে। তবে এটি জন্মের সময় সেই ব্যক্তির বায়োলজিকাল বাস্তবতাকে পরিবর্তন করে না, যা ইসলামে জেন্ডার নির্ধারণের ভিত্তি। সুতরাং তার লিঙ্গের পরিবর্তন হলেও এর মূল উৎপত্তির উপর ভিত্তি করেই তা জেন্ডারের ব্যাপারে বিধান নির্ধারিত থাকবে। কোনো পুরুষের জন্য অন্য পুরুষ লিঙ্গ উদ্ভুত ব্যক্তির সাথে বিবাহের চুক্তি সম্পাদন করা জায়েয নয়, পরিবর্তন যাই হোক না কেন।

    উপসংহার: জেন্ডারিজমের মিথ্যার মোকাবেলা করা

    নিজ দেশে পরিবার ও পারিবারিক মূল্যবোধের ধ্বংস নিশ্চিত করে পশ্চিমারা মুসলিম শাসকদের মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক যুদ্ধ চালাতে কাজ করছে। পশ্চিমে, পশ্চিমা সরকারগুলি সহজেই তাদের জনগণকে পরিচালনা করতে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়, পরিবারের বিচ্ছিন্নতা এবং এর ফলে সংহতির অভাব, সম্প্রদায়ের অনুভুতির অভাব এবং সম্মিলিত পদক্ষেপের অভাবের কারণে। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী এখন মুসলমানদের জন্যও তাই চায়, তারা বুদ্ধিবৃত্তিক ও মতবাদের দিক থেকে ইসলামের মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই তারা এখন মুসলমানদের মধ্যে জেন্ডারিজম ছড়িয়ে দিতে চায় যাতে আমাদের চিন্তা ও আবেগকে কলুষিত করতে পারে এবং আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা ও দৃঢ় পারিবারিক বন্ধন ধ্বংস করতে চায়। এটি এ কারণে যাতে পশ্চিমারা নবুওয়াতের আদলের খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থার মাধ্যমে উম্মাহর পুনরুজ্জীবন প্রতিরোধ করতে পারে বা অন্তত কিছুটা বিলম্ব করে মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মুসলিম হিসেবে এটি আমাদের জন্য অনিবার্য হয়ে দাড়িয়েছে যাতে আমরা আমাদের প্রতিরক্ষামূলক ঢাল তথা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজ করার মাধ্যমে ইসলামী আকীদা দ্বারা পুনরিজ্জীবত হয়ে তা থেকে বের হয়ে আসা নিজেদেরকে শক্তিশালী সংস্কৃতির উপর দাড়িয়ে এ জাহিলিয়্যাতের আগ্রাসনের মোকাবিলা করতে পারি।

    Taken from the Article written by brother Mus’ab ibn Umair

  • ইসরায়েল কি অজেয়?

    ইসরায়েল কি অজেয়?

    অনেকে বলে থাকেন, চারটি যুদ্ধে ইতোমধ্যে ইসরাইল নিজেকে অপরাজেয় প্রমাণ করেছে; মুসলিম উম্মাহ্’র উচিত এর অবস্থানকে মেনে নেয়া। আসুন আমরা বিশ্লেষন করে দেখি বিষয়টি কতটুকু সত্য:

    ১৯৪৮ সালে ইসরাইল সৃষ্টির পর থেকে এর সামরিক শক্তিকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অপরাজেয় হিসেবে তুলে ধরবার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। মজার ব্যাপার হল এ ধরণের আষাঢ়ের গল্প ইসরাইল নিজে স্বপ্রণোদিত না হয়ে যতটা প্রকাশ করবার চেষ্টা করেছে তার চেয়ে বেশী কাজ করেছে বিশ্বাসঘাতক মুসলিম শাসকগুলো।

    ১৯৪৮, ১৯৫৬, ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ এর যু্দ্ধগুলোতে পারদর্শিতা সামরিকক্ষেত্রে ইসরাইলের পরিষ্কার প্রাধান্যকে প্রমাণ করে। এ পরিষ্কার প্রাধান্য ও মুসলিম ভূমির জবরদখল আরব রাষ্ট্রসমূহকে এই ধারণা দেয় যে, সামরিক নয় বরং কূটনৈতিক সমঝোতাই একমাত্র বাস্তবসম্মত বিকল্প। সেকারণে শান্তি প্রক্রিয়ার নামে বিভিন্ন পরিকল্পনায় ইসরাইলের সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করে নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।

    ইসরাইলের এই সামরিক ক্ষমতা সম্পর্কে আলোকপাত করতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে কোন স্বার্থে এ ধরণের আষাঢ়ে গল্পের প্রচলন করা হয়েছে?

    ১৯৪৮ সালের যুদ্ধ—ইসরাইলের সৃষ্টি

    ১৯৪৮ সাল ছিল ইসরাইল রাষ্ট্রের সৃষ্টির বছর। বাহ্যিকভাবে এটা বুঝা যাচ্ছে না কিভাবে ৪০ মিলিয়ন আরব মাত্র ৬০০০০০ ইহুদীর সাথে যুদ্ধে পেরে উঠল না। প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমুহের বর্তমান ও অতীত ভূমিকা ইসরাইলের প্রতিষ্ঠার পেছনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে।

    ট্রান্সজর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহ, মিশরের বাদশাহ ফারুক, প্যালেস্টাইনের মুফতিগণ সকলেই বৃটিশ নিয়ন্ত্রিত দূর্বল শাসক ছিলেন—যারা প্রাথমিকভাবে ফিলিস্তিনীদের প্রতিনিধি ছিল। বাদশাহ আবদুল্লাহ নিজেকে ফিলিস্তিনীদের রক্ষাকবচ হিসেবে দাবী করাটা ছিল ছলনা মাত্র। শোনা যায় তিনি এবং ইসরাইলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়ন একসাথে ইস্তাম্বুলে পড়াশোনা করতেন এবং একটি গোপন বৈঠকে আবদুল্লাহ আরব জনঅধ্যুষিত অঞ্চল ফিলিস্তিনের উপর জর্ডানের নিয়ন্ত্রনের বিনিময়ে ইসরাইলের প্রতিষ্ঠাকে গ্রহণ করে নেবার প্রস্তাব করা হয়।

    বাদশাহ আবদুল্লাহর বিদায়ের সময় আরব জনগণের মধ্যে ইংরেজ জেনারেল জন গ্লাবের নেতৃত্বে ৪৫০০ লোকের একটি সুপ্রশিক্ষিত ইউনিটও ছিল। গ্লাব তার স্মৃতিচারণে উলে­খ করেছেন যে, বৃটেনের পক্ষ থেকে তাকে কড়া নির্দেশ দেয়া ছিল যাতে তিনি ইহুদী নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে প্রবেশ না করেন। মিশর ইসরাইলের উপর আক্রমনের ধার কমিয়ে দেয় এবং তখন প্রধানমন্ত্রী নাকরাশি পাশা নিয়মিত সেনাবাহিনীকে আক্রমনের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে মাত্র সেবছরের জানুয়ারীতে গঠিত হওয়া স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী প্রেরণ করে। জর্ডান তার অঞ্চল দিয়ে যাবার সময় ইরাকী সেনাবাহিনীর যাত্রাকে প্রলম্বিত করে ইসরাইলে হামলার ব্যাপারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। একারনে জর্ডানের সেনাবাহিনীর মনোবল জাগিয়ে তুলবার জন্য নিয়োগ পাওয়া একজন অন্ধ ইমাম যুদ্ধে অপ্রস্তত বাদশাহ আবদুল্লাহকে এই বলে অপমানিত করেছিলেন যে, “হে সেনাবাহিনী যদি তোমরা আমাদের হতে” (আরব অঞ্চল ব্রিটিশ কর্তৃত্বের অধিনস্ত হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে)।

    ৪০০০০ মুসলিম সৈন্যের মধ্যে মাত্র ১০০০০ ছিল প্রশিক্ষিত। ইহুদীদের ৩০০০০ সশস্ত্র যোদ্ধা ছিল, ১০০০০ স্থানীয় নিরাপত্তায় নিয়োজিত এবং অন্য ২৫০০০ ছিল আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য। এছাড়াও ৩০০০ এর মত ইরগুন ও ষ্টার্ণ গ্যাং সন্ত্রাসী ছিল। সরবরাহ করা হয় সবার্ধুনিক মারণাস্ত্র এবং ব্রিটেন এবং আমেরিকার জায়নবাদী সংগঠনগুলো তাদের অর্থায়ন করে। ইহুদীদের প্রস্ততি ছাড়াও মুসলিম শাসকদের চরম বিশ্বাসঘাতকতা ফিলিস্তিনে জায়নবাদীদের আখড়া গড়তে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে।

    ১৯৫৬ সালের সুয়েজ খাল সংকট

    এ যুদ্ধটি কোনক্রমেই ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার জন্য ছিল না, বরং এটি ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সুয়েজ খালকে নিয়ন্ত্রনের জন্য আমেরিকা ও বৃটেনের মধ্যকার একটি সংঘাত।

    মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রতিপত্তিকে সুসংহত করবার জন্য মিশরকে তারা গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে দেখেছিল। সি.আই.এ—র সহায়তা নিয়ে ১৯৫২ সালে একটি অভূত্থানের মাধ্যমে বৃটিশ অনুগত বাদশাহ ফারুককে অপসারণ করে জামাল আব্দুল নাসেরের নেতৃত্বে ফ্রি অফিসার্স—কে ক্ষমতায় নিয়ে আসা হয়। “একজন মুসলিম বিলি গ্রাহাম— এর খোঁজে (The Search for a Moslem Billy Graham)” নামে ১৯৫১ সালে সি.আই.এ একটি প্রজেক্ট পরিচালনা করে। সি.আই.এ কর্মকর্তা মাইক কোপল্যান্ড ১৯৮৯ সালে ‘দি গেম প্লেয়ার’ নামক স্মারকগ্রন্থে উলে­খ করেন কিভাবে তাদের প্রত্যক্ষ মদদে বৃটিশ পুতুল শাসক বাদশাহ ফারুককে ক্যু এর মাধ্যমে অপসারণ করা হয়। এই প্রজেক্টের দায়িত্বে থাকা কোপল্যান্ড বর্ণণা করেন যে, ’অত্র অঞ্চলে আমেরিকাবিরোধী প্রচারণাকে রুখবার জন্য সি.আই.এ এর একজন অতি জনপ্রিয় তুখোড় নেতার দরকার হয়ে পড়েছিল।’ তিনি আরও উলে­খ করেন যে, সি.আই.এ এবং নাসেরের মধ্যে ইসরাইলের ব্যাপারে একটি চুক্তি হয়। যদিও নাসেরের সাথে ইসরাইলের যুদ্ধের ব্যাপারে আলোচনা করা ছিল নিতান্তই অযৌক্তিক। আলোচনার বিষয় ছিল সুয়েজ খালের উপর বৃটিশ কতৃর্ত্বকে খাটো করা। কেননা ব্রিটেন ছিল নাসেরের শত্রু“।

    ১৯৫৬ সালে নাসের আমেরিকার দাবি মোতাবেক সুয়েজ খালকে জাতীয়করণ করে। ব্রিটেনের প্রচেষ্টা ছিল এর সাথে ফ্রান্স এবং ইসরাইলকে সংযুক্ত করা। ঐতিহাসিক করেলি বার্নেট তার ‘দি কলাপ্স অব ব্রিটিশ পাওয়ার (ব্রিটিশ কর্তৃত্বের পতন)’ গ্রন্থে উলে­খ করেন, ‘ফ্রান্স নাসেরের প্রতি বিরুপ ছিল কারণ মিশর আলজেরিও বিদ্রোহের সাহায্য করছিল এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ফ্রান্স এই খালের সাথে সম্পর্কিত ছিল কেননা একজন ফরাসী এটি খনন করেছিলেন। ফিলিস্তিনের ফিদেইন হামলা এবং মিশর কর্তৃক তিরান প্রনালীর অবরোধের কারনে ইসরাঈল যেকোন উপায়ে নাসেরের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর অপেক্ষায় ছিল। সেকারণে স্যার অ্যান্থনী এডেন (ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী) ফ্রান্স এবং ইসরাইলের সাথে একটি ত্রিপক্ষীয় কূট পরিকল্পনা হাতে নেন ।’ তিনি আরও বলেন, ‘সিনাই উপদ্বীপ এলাকা দিয়ে ইসরাইল মিশরকে দখল করে নেবে। ব্রিটেন এবং ফ্রান্স তখন বিবদমান পক্ষগুলোকে যুদ্ধ বন্ধ করবার জন্য একটি সময়সীমা বেধে দেবে অথবা খালটিকে ‘রক্ষার’ জন্য হস্তক্ষেপ করবে।’

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন সরে যাবার জন্য ব্রিটেনের উপর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে। রাশিয়া— লন্ডন এবং প্যারিসকে পারমাণবিক হামলার হুমকি দেয়। ব্যাপক আন্তর্জাতিক চাপের কারণে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স মিশর থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। আইজেনহাওয়ার এর নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের মাধ্যমে ইসরাইলকে অধিকৃত মিশরের ভূমি থেকে সরে আসবার জন্য চাপ দিতে থাকে—যদিও ইসরাইলের জন্য তখন এ ধরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ছিল অসুবিধাজনক। আর এরপরই মার্কিনীরা মধ্যপ্রাচ্যে প্রাধান্য বিস্তারকারী শক্তি হিসেবে আবিভূর্ত হয়।

    ১৯৬৭ সালের ৬ দিনের যুদ্ধ

    এ যুদ্ধটিও ছিল এ অঞ্চলে ইঙ্গ—মার্কিন আধিপত্যের দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। প্রভাব বিস্তারকারী শক্তি হিসেবে ১১ বছর আগে ভূমিকা খর্ব হলেও জর্ডান, সিরিয়া ও ইসরাইলে ব্রিটেনের প্রতি অনুগত শাসকগণ তখনও ছিল। নাসেরকে দুর্বল করবার লক্ষ্যে ভবিষ্যত শান্তিপ্রক্রিয়ায় দর কষাকষির উপকরণ হিসেবে মিশরের কিছু ভূমি দখল করে নেবার জন্য ব্রিটেন ইসরাইলকে যুদ্ধে লিপ্ত হতে বাধ্য করে। ১৯৬৭ সালের ৫ জুন তারিখে ইসরাইল আক্রমণ করে মিশরের শতকরা ৬০ ভাগ ভূমিতে অবস্থানরত বিমানবাহিনী এবং সিরিয়া ও জর্ডানের শতকরা ৬৬ ভাগ যুদ্ধরত বিমানবাহিনী ধ্বসিয়ে দেয়। জর্ডান নিয়ন্ত্রিত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম ইসরাইল দখল করে নেয়। যুদ্ধের আগে বাদশাহ হোসেন তার সেনাবাহিনীকে মূল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দুরে সরিয়ে রাখে। মাত্র ৪৮ ঘন্টার মধ্যে পশ্চিম তীরের গুরুত্বপূর্ণ শহরসমূহ ইসরাইল দখল করে নেয়। যুদ্ধের ষষ্ঠ দিনের মাথায় তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গোলান মালভূমি দখল করে নেয়। গোলান মালভূমিতে অবস্থানরত সিরীয় সেনাবাহিনী তাদের নিজস্ব রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বেতারের মাধ্যমে জানতে পারে ইসরাইল গোলান মালভূমি দখল করে নিয়েছে—যদিও তখনও গোলান মালভূমি সিরিয়ার অধিকারেই ছিল। তিরানে যাবার জলপথ শার্ম—আল—শেখ দখল করে নেবার মাধ্যমে ইসরাইল মার্কিনপন্থী নাসেরকে ভয়াবহ ধাক্কা দেয়। নাসেরের ক্ষমতাকে খর্ব করার লক্ষ্য অর্জিত হয় এবং অত্র অঞ্চলে ব্রিটিশ আধিপত্য পাকাপোক্ত হয়। ইসরাইলের আরও ভূমি দখল করে নেবার সক্ষমতা ছিল এবং ১৯৪৮ সালের মত দখলের খাতিরে দখলের জন্য নয় বরং এটাকে এখন পর্যন্ত শান্তি প্রক্রিয়ায় দর কষাকষির জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ বিভাজন পরিকল্পনার (UN Partition Plan) আওতায় ইসরাইলকে শতকরা ৫৭ ভাগ ভূমি ও ফিলিস্তিনীদের শতকরা ৪২ ভাগ ভূমি প্রদান করে। কিন্তু ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের মাধ্যমে ইসরাইল এটাকে বাড়িয়ে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের ৭৮ ভাগ দখল করে নেয়।

    ১৯৭৩ সালের যুদ্ধ

    মিশর এবং সিরিয়া কতৃর্ক ইসরাইলের বিরুদ্ধে চালানো ১৯৭৩ সালের যুদ্ধ বিশে­ষণ করলে দেখা যায়—এর লক্ষ্য ছিল সীমিত এবং কখনওই এটা ফিলিস্তিনীদের মুক্ত করবার জন্য পরিচালিত হয়নি। এমনকি গোলান মালভূমিকে (যা ছিল সিরিয়া ও ইসরাইলের মধ্যকার শান্তিচুক্তির বিষয়) মুক্ত করবার জন্যও এ যুদ্ধ পরিচালিত হয়নি। এ যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল অনেকটা সেনাঅভ্যূত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা অপেক্ষাকৃত নতুন রাষ্ট্রনায়ক আনোয়ার সাদাত ও হাফিয আল আসাদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করবার জন্য। সাদাতের অবস্থান এক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ছিল। কেননা তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় নাসেরের স্থলাভিসিক্ত হয়েছিলেন।

    যুদ্ধের প্রত্যক্ষদশীর্ ও ১৯৫৭—১৯৭৪ সাল পর্যন্ত আল আহরামের সম্পাদক মুহম্মদ হেকেল তার বই ‘দি রোড টু রামাদান’—এ এই যুদ্ধে আনোয়ার সাদাতের লক্ষ্য সম্পর্কে আলোকপাত করেন। তিনি সাদাতের একজন জেনারেল মুহম্মদ ফাউজীর বরাত দিয়ে বলেন, সংঘটিত যুদ্ধকে তুলনার জন্য একটি সামুরাই চিত্র যেখানে একটি লম্বা তলোয়ার ও খাটো তলোয়ার রয়েছে সেটি উপস্থাপন করা হয়। জেনারেল ফাউজী ছোট তলোয়ারটিকে দেখিয়ে বলেন, এ যুদ্ধের উদ্দেশ্য অত্যন্ত সীমিত।

    ইসরাইলের সাথে একটি মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করবার কোন অভিলাষ আনোয়ার সাদাতের ছিল না। সেকারণে যুদ্ধ জয়ের দ্বারপ্রান্তে থাকা সত্ত্বেও ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি করা হয়। প্রথম ২৪ ঘন্টার যুদ্ধে মিশর মাত্র ৬৮ জনের প্রাণের বিনিময়ে সুয়েজ খালের পূর্বদিকে অবস্থিত বার—লেভ প্রাচীরগুলো গুড়িয়ে দেয়। ২ টি সিরীয় ডিভিশন ও ৫০০ ট্যাঙ্ক গোলান মালভূমির দিকে অগ্রসর হয়ে ১৯৬৭ সালে অধিকৃত কিছু অংশ পূর্ণদখল করে নেয়। মাত্র দু’দিনের যুদ্ধে ইসরাইল ৪৯ টি এয়ারক্রাফট ও ৫০০ টি ট্যাঙ্ক হারায়। এর মধ্যে আনোয়ার সাদাত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জারকে পাঠানো একটি খবরে যুদ্ধের উদ্দেশ্য সম্পর্কে উলে­খ করেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং কোন আংশিক সমঝোতা নয়’ এই খবরের অর্থ দাড়ায় যে, যদি ইসরাইল দখলকৃত ভূমি ছেড়ে চলে যায় তাহলে মিশর জাতিসংঘ কিংবা অন্য কোন নিরপেক্ষ কারও মধ্যস্থতায় শান্তি সম্মেলনে যোগ দিতে প্রস্তত।

    কৌশলগত দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা সত্তেও আনোয়ার সাদাত শান্তি চুক্তিতে প্রস্তত ছিল। আনোয়ার সাদাতের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে ছাড় দেবার কারণে ইসরাইল মার্কিনীদের সমর্থন নিয়ে অধিকৃত অঞ্চল ছেড়ে খুব সহজে সটকে পড়ে। আর এতে করে ১৯৭৪ সালের ২৫ অক্টোবর তারিখে যুদ্ধের অবসান ঘটে।

    ইসরাইলের সাথে সংঘটিত প্রতিটি যুদ্ধে মুসলিম প্রতারক শাসকগন ফিলিস্তিনকে স্বাধীন করবার জন্য সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আন্তরিকতার সাথে লড়েনি। উপরের যুদ্ধের ঘটনাসমূহ সঠিকভাবে না জানা থাকার কারণে ইসরাইলের ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহ ব্যাপক বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। বিশ্বাসঘাতক মুসলিম শাসকগন এ ধরণের বিভ্রান্তি সৃৃষ্টির পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে। ইসরাইলের আধিপত্যকে তারা লালন করেছে, উস্কে দিয়েছে এবং বহাল তবিয়তে বলবৎ রেখেছে। আরব বিশ্ব কখনই ইসরাইলকে উৎখাতের জন্য এককভাবে অথবা সম্মিলিতভাবে কাজ করেনি। প্রতিটি যুদ্ধের পেছনে ইসরাইলের সমূল উৎপাটন কিংবা ফিলিস্তিন মুক্ত করবার বদলে অন্য উদ্দেশ্যগুলো কাজ করেছে। সম্মিলিতভাবে ব্যাপক শক্তিশালী আরব দেশসমূহ ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতা ও বৈধতাকে কখনই আন্তরিকতার সাথে চ্যালেঞ্জ করেনি।

  • সাইফুল আজম: ইসরায়েলের সবচেয়ে বেশি বিমান গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন যে বাংলাদেশি

    সাইফুল আজম: ইসরায়েলের সবচেয়ে বেশি বিমান গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন যে বাংলাদেশি

    খবর:

    ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে বিরোধ চলছে কয়েক দশক ধরে। গোটা আরব মিলে ইসরাইলের সঙ্গে এ পর্যন্ত ৩ বার যুদ্ধ হয়েছে। তৃতীয় আরব ইসরাইল যুদ্ধ হয় ১৯৬৭ সালে। তবে এই যুদ্ধে বীরত্ব দেখায় এক বাংলাদেশী। ইসরাইলের বিমান ভূপাতিত করে রেকর্ড করেন তিনি। এমনকি ইসরাইলের ইতিহাসে কোন একক ব্যক্তির হাতে সবচেয়ে বেশি যুদ্ধ বিমান ধ্বংসের রেকর্ড এই বাংলাদেশীর। বাংলাদেশের এই আকাশ যোদ্ধার নাম সাইফুল আজম সুজা। পৃথিবীর মাত্র ২২ জন “লিভিং ইগল” খেতাব পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি একজন। আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই সাইফুল আজম একটি অনন্য রেকর্ড তৈরি করেন। ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ভূপাতিত করেছেন সর্বোচ্চ তিনটি ইসরায়েলি বিমান।  (https://www.youtube.com/watch?v=nG34intSig4

    মন্তব্য:

    মুসলিম ফাইটার পাইলট সাইফুল আজমের এই সাহসী গল্প প্রমাণ করেছে যে, মুসলিম সামরিক বাহিনী শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শারীয়াহ্‌ বাধ্যবাধকতাকে কখনোই সে যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতি/ফলাফলের (Consequences) দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না। বরং মুসলিম সেনাবাহিনী দখলকৃত ইসলামী ভূমিকে শত্রুদের কবল থেকে মুক্ত করাকে সর্বদাই শরীয়াহ বাধ্যবাধকতা (ওয়াজিব) হিসেবে বিবেচনা করেছে। যার ফলে ইসলামী উম্মাহ্‌’র এই অকুতোভয় ও সাহসী বীর সন্তান সাইফুল আজম ব্যাকডেটেড সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে উন্নতমানের সামরিক সরঞ্জামে সজ্জিত শত্রুদেরকে ধরাশায়ী এবং পরাস্ত করার রোল মডেল হয়ে উঠেছিলেন। সে সময়ে ইসরাইলি সুপারসনিকের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো সমকক্ষ বিমান আরবদের না থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধের সম্ভাব্য ফলাফল/পরিণতির দিকে চিন্তা না করে ইসরাইলিদের ঠেকাতে শুধুমাত্র সাধারণ মানের “হকার হান্টার’ জঙ্গি বিমান দিয়ে ক্ষিপ্রগতির দুটি ইসরাইলি সুপারসনিক ঘায়েল করেন সাইফুল আজম। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই সাইফুল আজম সর্বোচ্চ তিনটি ইসরাইলি বিমান ভূপাতিত করার অনন্য রেকর্ড তৈরি করেন।

    কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে সাইফুল আজমের মতো অগণিত সাহসী যোদ্ধারা এখনও মুসলিম সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিদ্যমান থাকলেও মুসলিম ভূখন্ডের দালাল শাসকরা ফিলিস্তিনকে মুক্ত করতে সামরিকভাবে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাব্য ফলাফল, সহকর্মী কিংবা উচ্চপদস্থ ও অধীনস্ত অফিসারদের প্রতিক্রিয়া এবং এই পদক্ষেপের সফলতার অনিশ্চয়তার ব্যাপারে তাদেরকে প্রতিনিয়ত ভয়-ভীতি দেখাচ্ছে। অথচ মুসলিম ভুমিতে কাফিরদের আক্রমণ ও আগ্রাসনের মুখে শারীয়াহ্‌’র স্পষ্ট ফরজ (ওয়াজিব) বিধান হল উপযুক্ত সামরিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে তাদেরকে বিতাড়িত করা। এবং এক্ষেত্রে এইকাজে যাদের ‘সক্ষমতা’ আছে তাদের উপর তথা সামরিক বাহিনীর উপর মূল দায়িত্ব বর্তায়। কিন্তু বর্তমান দালাল শাসকগোষ্ঠী তাদেরকে জাতিসংঘের অধীনে পশ্চিমা কাফিরদের কুফর যুদ্ধে অংশ নিতে ও জীবন দিতে প্রেরণ করছে আর মুসলিমদের সাহায্যের বেলায় তাদেরকে ব্যারাকে বন্দি করে রেখেছে। তাই এরাই সামরিক বাহিনীর শারীয়াহ্‌ হুকুমের দায়িত্ব পালনের পথে প্রধান বাধা।

    তাই সামরিক বাহিনীর নিষ্ঠাবান অফিসারদের মধ্যে যারা মসজিদুল আকসা ও ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিকে অবৈধ ইহুদী রাষ্ট্রের কবল মুক্ত করার চেতনায় উদ্বুদ্ধ ও ব্যাকুল হয়ে আছেন তাদেরকে অবশ্যই অনতিবিলম্বে দালাল শাসকগোষ্ঠীকে অপসারণ করে খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলিম জাহানের খলিফার নেতৃত্বে আসতে হবে। যিনি দ্রুততার সহিত আমাদের এই সুসংগঠিত ও প্রশিক্ষিত বাহিনীকে অভিযানে পাঠাবেন যাতে অবৈধ ইহুদী রাষ্ট্রটি দুনিয়া থেকে স্থায়ীভাবে বিলিন হয় এবং মাসজিদুল আক্বসা ও ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমি মুক্ত হয়। আমাদের সামরিক বাহিনীর নিষ্ঠাবান অফিসারদের তাদের পূর্বসুরী সাইফুল আজম, সালাউদ্দিন আইয়্যুবী, সাইফুদ্দিন কুতুজ এর পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে। দখলদার ইহুদী সত্ত্বার তথাকথিত অজেয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কল্পকথা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ইতিপূর্বে ফিলিস্তিনকে মুক্ত করার বীর সেনানায়ক সালাহউদ্দিন আইয়ুবিও জেরুজালেম অভিযানের সময় এর ফলাফলের চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হননি যাকে ক্রুসেডাররা সতর্ক করে বলেছিল, “জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হলে আপনার একটি চোখ নষ্ট হতে পারে। উত্তরে সালাহউদ্দিন বললেন: “আমি আল্লাহ্‌’র নামে শপথ করে বলছি, আমি জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হবোই, এমনকি যদি আমাকে জেরুজালেমে অন্ধ হয়েও প্রবেশ করতে হয়!” এমনকি যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, “আপনি মিশর, সিরিয়া এবং অন্যান্য ভূ-খণ্ডের সুলতান তবুও আমরা আপনাকে হাসতে দেখি না, তিনি উত্তর দিয়েছিলেন: যখন বায়তুল মাকদিস, জেরুজালেম ক্রুসেডারদের হাতে বন্দি তখন কীভাবে আমি হাসতে পারি?” 

    –    সিফাত নেওয়াজ 

  • ইউরোপে সেকুলারিজমের উত্থান

    ইউরোপে সেকুলারিজমের উত্থান

    পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক মুল্যবোধ চাপিয়ে দিতে প্রতিনিয়ত ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও আঘাত করে  চলেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকার রাষ্ট্রদূতগণ একের পর এক সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত মুসলিম ভুমিগুলোতে সফর শুরু করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের ইসলামী জীবনাদর্শ দূরে রাখা এবং সেকুলার পুঁজিবাদী আদর্শ মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দেওয়া। আমরা এই আর্টিকেলে ইউরোপে সেকুলার চিন্তার উত্থান নিয়ে আলোচনা করব। সেকুলার পুঁজিবাদী চিন্তা কত ঠুনকো, প্রতিক্রিয়াশীল এবং কোন স্বাভাবিক/বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নয়; আমরা তা আলোকপাত করব।

    সুদীর্ঘ সময় চার্চের জুলুম অত্যাচারের ফলে ১৮ শতকে ইউরোপের মানুষের মাঝে একধরনের চিন্তার বিপ্লব ঘটে। ফলে চার্চ সবক্ষেত্রে তার জুলুমে নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ও শাসন কর্তৃত্ব হারায়। এই উত্থান ছিল মুলতঃ চার্চের বিরুদ্ধে তৎকালীন বুদ্ধিজীবীদের দীর্ঘ সংগ্রামের ফল। তাদের এই উত্থান মানব, জীবন ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের পুর্ববর্তী দৃষ্টিভংগী পালটে দিতে থাকে। ইউরোপের জনগণ চার্চের চাপিয়ে দেওয়া সব নিয়মকানুনের বিরদ্ধে চলে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে রাজতন্ত্র; চার্চ এবং খৃষ্টানধর্মকে জনগণের উপর জুলুমের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার ফলে তৎকালীন চিন্তাবিদ ও দার্শনিকগণ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর পুরোপরি আস্থা হারিয়ে ফেলে। তারা এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমাজ থেকে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তিতে এই চিন্তাবিদগণ দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তাদের একপক্ষ চার্চকে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করার ডাক দেয় এবং অপরপক্ষ ধর্ম থেকে রাষ্ট্রকে পৃথক করার দাবি তুলে। যারা সম্পূর্ণরূপে চার্চকে বিলুপ্তির কথা বলে তাদের থেকে পরবর্তিতে কমিউনিজম এবং রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করার পক্ষ থেকে সেকুলার পুজিবাদের উত্থান ঘটে। বর্তমানে তাদের  ধর্মনিরপেক্ষ/সেকুলার গণতন্ত্রের তল্পিবাহক রুপে আমরা দেখতে পাই। সেকুলারদের উত্থান সম্পর্কে জানতে মধ্যযুগের ইউরোপে চার্চের ভুমিকা ও ইতিহাস নিয়ে আমরা আলোকপাত করব।

    চার্চের ভুমিকা:

    তৃতীয় শতকে রোমান সাম্রাজের কর্তৃত্ব কমে আশার সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডে চার্চের ভুমিকা বৃদ্ধি পেতে থাকে। রাজা কন্সটানটিনের পর থেকে চার্চ এবং রাষ্ট্র সরকারীভাবে একীভুত হয়ে পড়ে। চার্চ এবং রাজতন্ত্রের এই জোটবদ্ধ মুহুর্ত থেকে ইউরোপীয় জনগণের উপর অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা নেমে আসে। ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপের অভ্যন্তরে বিভক্তি শুরু হয় (internal divide and rule by church) ফলে নতুন নতুন দূর্বল সামন্ত রাজ্যের উত্থান ঘটে। সামন্ত রাজ্যগুলোর দূর্বলতার কারণে চার্চ আরো বেশি আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ পায়।

    খ্রিস্টান ধর্মে জনগণের কর্মকান্ড দেখাশুনা করার মত কোন পদ্ধতি নেই। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে চার্চ পুরোনো রোমান সাম্রাজ্যের নিয়মকানুনগুলো ধার করে নিয়ে আসে। চার্চ জ্ঞানের প্রচার এবং আইন-কানুন তৈরির উপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। স্বাভাবিকভাবেই নতুন নতুন উত্থান ঘটা সামন্ত রাজাগণ তাদের রাজ্যগুলো পরিচালনার নিয়মকানুন ধারণ করার ক্ষেত্রে পুরোপুরি চার্চের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

    শুরুর দিক পোপ রোমান সাম্রাজ্যের অল্প সল্প জায়গা শাসন করলেও সময়ের সাথে সাথে ইংল্যান্ড, সিসিলি ও জেরুজালেমের উপর চার্চ শাসন কতৃত্ব লাভ করে। ধীরে ধীরে চার্চ হয়ে উঠে ইউরোপের বুকে সবচেয়ে বড় কর্তৃত্বপরায়ণ সরকার; সে চাইলেই যেকোন সামন্ত রাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। একসময় চার্চের লোকাল কার্ডিনালরা (পাদ্রী) সামন্ত রাজাদের নিয়োগ দেওয়ার কর্তৃত্বও পেয়ে যায়, এমনকি সামন্ত রাজাদের নামকরণও হয়ে উঠে চার্চ প্রিন্স নামে। অন্যদিকে এইসব কার্ডিনালরা সরাসরি পোপ কর্তৃত্ব নিয়োগ প্রাপ্ত হত। চার্চ ইউরোপের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু পরিণত হয়। পোপ হয়ে উঠে শক্তির উৎস। পোপ চাইলে যেকোন বিশপদের নিয়োগ দিতে ও পাদ্রীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারত, লোকাল চার্চগুলোর উপর ট্যাক্স আরোপ করত এবং পোপ চাইলেই জীবনের সবক্ষেত্রে (আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক) যেকোন নিয়মকানুন জারী করতে পারত। বিশ্বাস করা হত পোপের সাথে সরাসরি খোদার যোগাযোগ আছে। ধর্মের নামে ও  জান্নাতের ওয়াদা করে নির্দোষ জনগণকে শোষণ করা হত। ধীরে ধীরে চার্চ সকল সীমারেখা অতিক্রম করে বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতার আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে। ইতিহাসে যা নজীরবিহীন।

    ধনী খৃষ্টানদের অর্থ-সম্পদের বিনিময়ে জান্নাতের চাবি বিক্রি ছিল চার্চের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। ইউরোপের বেশিরভাগ উর্বর জমি ও সম্পদে চার্চগুলো পুঞ্জিভুত হতে থাকে। চার্চের ঘোষণার মাধ্যমে বিশাল সংখ্যক মুক্তবুদ্ধির নারীদের ডাইনী নাম দিয়ে অত্যাচার এবং হত্যা করা হয়। চার্চের নিয়মের বিরুদ্ধে যায় এমন কোন তত্ত্ব, কোন বিজ্ঞানী প্রচার করলে তাকে হত্যা করা হত। শত অত্যচার সত্বেও চার্চের জুলুম-নিপীড়নের ভয়ে কেউ প্রতিবাদের সাহস পেত না। চার্চ দ্বারা সংঘটিত নৃশংসতা বলে শেষ করা যাবে না। এই যুগটাকেই ইউরোপিয়ানরা মধ্যযুগ বা অন্ধকার যুগ নামে চিহ্নিত করে।

    এভাবে ১৪শতকে অসন্তোষ দানা বাধার আগ পর্যন্ত চার্চের শাসন চলতে থাকে। এই যুগকে ইউরোপীয় ইতিহাসবিদ্গণ মধ্যযুগের শেষ সময় হিসেবে চিহ্নিত করে।

    দ্যা গ্রেট খিলাফত রাষ্ট্রের হাতে বারবার ক্রুসেডে হারের ফল ছিল চার্চের বিরুদ্ধে ততকালীন ইউরোপীয় চিন্তাবিদের বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান কারণ। অন্যদিকে খৃষ্টানধর্ম যেহেতু সমাজের সকল সমাধান দিতে অক্ষম ছিল, ফলে সামাজিক সমস্যাগুলো দিনদিন আরো বেশি বিপর্যয়কর হয়ে উঠে। এই সম্মিলিত কারণগুলোর ফলে ইউরোপের বুকে চার্চ এবং খৃষ্টানধর্মের পতন দেখা দিতে শুরু করে।

    ত্রিশ বছরের যুদ্ধ:

    ১৬শতকে; ইউরোপে ধর্মতাত্ত্বিক (ধর্মের ভুমিকা কী হবে) বিতর্ক তীব্র হতে থাকে। এতে চার্চ দূর্বল হয়ে পড়ে। প্রত্যেক সামন্ত রাজ্য অন্য রাজ্যগুলো নিয়ন্ত্রণ নিতে চার্চকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। ১৬১৮ খ্রিস্টাব্দে পুরো ইউরোপ পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধের তীব্রতা পূর্বে ঘটা যেকোন সামন্ত বিবাদকে ছাড়িয়ে যেতে থাকে। এই যুদ্ধে জার্মানী সহ পুরো ইউরোপ ধংসের ধারপ্রান্তে চলে যায়, শহরের পর শহর ও মিল-কারখানাগুলো ধংস হয়ে যায়। যুদ্ধের তীব্রতা, যুদ্ধের ফলে প্লেগ ও দুর্ভিক্ষের কারণে ইউরোপের এক তৃতীয়াংশ মানুষ মৃত্যু মুখে পতিত হয়। এমনকি স্পেন ও ফ্রান্সের মধ্যে ১৬৫৯ পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলমান ছিল।

    কম্প্রোমাইজ বা আপস:

    যুদ্ধটি শেষের কোন লক্ষণ দেখা না যাওয়ায় ফলে চিন্তাবিদগণ আপোষের সিদ্ধান্ত নেয়। এই আপোষের ফল ছিল ধর্মকে রাষ্ট্রের সকল কর্মকান্ড থেকে আলাদা করে ফেলা। প্রোটেন্সটেন্ট সংস্কারবাদী মার্টিন লুথার ও ক্যালভিন; চার্চের রাজনীতি করাকে লজ্জার বলে ঘোষনা দেয়। তারা আরো বলেন; খৃষ্টানদের প্রধান দ্বায়িত্ব হচ্ছে কর্তৃত্বশীলদের আনুগত্য করা। তারা এই ক্ষেত্রে ধুর্ততা অবলম্বন করে। ফলে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নের জন্ম দেয়; কার শাসন করা উচিত? মানুষের না খোদার? এবং এই প্রশ্নের উত্তর ছাড়াই অপ্রাসঙ্গিক ভাবেই কোন চিন্তা-ভাবনাহীন সম্পূর্ণ নতুন একটি মতাদর্শের জন্ম হয়।

    গ্রীক দর্শনের আবির্ভাব:

    পশ্চিমা চিন্তাশূন্য সিদ্ধান্তহীন এই অবস্থান থেকে চার্চকে মানুষের জীবন থেকে অপসারণ করা হয়। তৎকালীন চিন্তাবিদগণ অন্যকোন উৎসের সন্ধান না করে হাজার বছরের পুরোনো গ্রীক দর্শন থেকে এই সমস্যার সমাধানের পদক্ষেপ নেয় (প্রকৃত সত্য ইসলামকে তারা বর্জন করে)। পর্বরতীতে এই সব চিন্তাবিদগণ দুটি পক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একপক্ষ প্রকৃতিবাদকে ধারণ করে এবং মানুষই সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে বলে দাবি করে, অপরপক্ষ যারা চার্চের পক্ষে অবস্থান নেয় তারা বাস্তববাদীতাকে ধারণ করে এবং সৃষ্টকর্তাকে বর্জনে অক্ষমতা প্রকাশ করে। ফলে সংশয়পূর্ণ সেকুলার চিন্তার উদ্ভব ঘটে।

    ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা বা ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করার চিন্তা নিয়ে এই সমাজ আগাতে থাকে। মানুষের জীবনের সাথে মহাবিশ্বের সম্পর্কটিও অস্বচ্ছ ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। এই অস্বচ্ছ অবস্থায় ইউরোপে নতুন নতুন দার্শনিকদের উন্মেষ ঘটে। জীবনের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব নিয়ে দার্শনিকগণ নতুন নতুন তত্ত্ব নিয়ে হাযির হন। তাদের মধ্যে ফ্রান্সের দার্শনিক রেনে ডেকার্তে অভিমত দেয় যে; “জনগণের ভিন্নতার ভিত্তিতে বাস্তবতাও ভিন্ন হতে পারে। সৃষ্টিকর্তার ধারণা সম্পূর্ণরুপে ব্যাক্তির নিজস্ব চিন্তা চেতনার উপর ছেড়ে দেওয়া উত্তম।” এই চিন্তার ফলে সৃষ্টিকর্তার বিশ্বাসকে ব্যক্তি স্বাধীনতার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়। দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট দাবি করেন; “মানুষের মন হচ্ছে বস্তুর অস্তিত্বের কারণ, আর বস্তুর ভোগই ইন্দ্রীয় সুখ।”

    পুঁজিবাদের প্রাথমিক লক্ষণ:

    মধ্যযুগীয় চার্চের শাসক কর্তৃত্ব শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সেকুলারিজমের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গুলো প্রতিষ্ঠা হয় এবং ইউরোপে পুঁজিবাদী নতুন আদর্শের উত্থান ঘটে। রাষ্ট্রগুলো শুধুমাত্র তাদের নাগরিকদের কথা চিন্তা শুরু করে। বর্ণ এবং নিজস্ব জাতিগত অবস্থা, ভৌগলিকভাবে আলাদা হওয়া, নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও ভিন্নতার কারণে তারা একে অপর থেকে শ্রেষ্ঠ ও নিখুঁত জাতি দাবি করা শুরু করে। নিজ নিজ স্বাধীনতা রক্ষায় তারা সচেতন হয়। এমনকি ১৪শতকে জার্মান প্রকাশকগণ তাদের রাজাদের শাসন করার পারদর্শিতা উপস্থাপন করে দাবি করে, তারা জাতি হিসেবে বীরত্বপূর্ণ এবং জার্মানরা অন্য জাতিদের শাসন করার অধিকার রাখে। রাইন নদীর তীর নিয়ন্ত্রণ ও ফরাসী জনগণের বানিজ্য করার অধিকার পাওয়ার কারণে ফরাসী জনগণ জনপ্রিয়তা পায় ফলে তারাও শ্রেষ্ঠত্বের দাবি শুরু করে। ব্রিটেনও কম যায়না; চিন্তাবিদ জন ফরটেস এর মতে ব্রিটেনের সংবিধান ও আইন অন্যদের থেকে শ্রেষ্ঠ। মুলতঃ ইউরোপীয়রা এরিসটটলের পার্টিকুলারিজম (নিজেদের কমন স্বার্থকেন্দ্রিক) চিন্তা ধারণ করার কারণে তাদের মধ্যে জাতিয়তাবাদের প্রবণতার উদ্ভব ঘটে।

    রাজতন্ত্রের উপর চার্চ সম্পূর্ণরুপে আধিপত্য হারায়, উলটো জনগণকে নিয়ন্ত্রণে সেকুলার রাষ্ট্রগুলো চার্চকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। পুঁজিবাদের আসফালনের ফলে, সেকুলার রাষ্ট্র ও আইন কানুনের সাথে তাল মিলিয়ে চলা ছাড়া চার্চের আর কোন গতি ছিল না। যার নজির আমরা চার্চের ঘোষণার মাধ্যমে দেখতে পাই; চার্চ বলে যার সেকুলার রাষ্ট্রে সততা ও বিশ্বসতার সাথে জীবন যাপন করবে তারা সৃষ্টিকর্তার সামনে ধার্মিক হিসেবে থাকবে। তাছাড়া প্রতিনিয়ত চার্চকে সংশোধন  করে সেকুলার রাষ্ট্রের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যহত আছে।

    পুঁজিবাদের রাজনৈতিক চিন্তা:

    ইতালীর পৌত্তলিক মেকিয়্যভেলি তার The discourses on the First Ten Books of Livy এবং The Prince এই দুটি বিখ্যাত বইয়ের মাধ্যমে আধুনিক পুঁজিবাদের চিন্তা ধারা প্রতিষ্ঠা করে।

    ম্যাকেয়াভেলির মতে রাজনীতি সম্পূর্ণ একটি সেকুলার কর্মকান্ড। তার মতে রাজনীতি মানুষের ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা মাত্র। ম্যাকিয়াভেলির মতে মানুষ প্রকৃতপক্ষে বর্বর, স্বার্থপর কেন্দ্রিক রাজনীতি সবার মধ্যে বিরাজমান। তার মতে সফল শাসক জনগণকে জানার চেষ্টা করে; তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সবসময় পর্যবেক্ষণে রাখে এবং দূর্বলদের শোষণের চেষ্টা করে।

    বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজে রাজনীতিবিদরা হুবহু ম্যাকিয়াভেলীর আদর্শকে ধারণ করে রাজনীতি করে। একজন আর্টিস্ট শুধুমাত্র শিল্পের কারণে আর্ট করে, যা জনগণের কোন বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত নয়। লেখকরা সমাজের ভালোর জন্য না লিখে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা জন্য লিখে। খাচায় বন্দি বুদ্ধিজীবীরা সমাধান না দিয়ে শুধুমাত্র প্রতিশ্রুতি দেয়। পুঁজিবাদী এই সমাজে সরকারগুলোর ১% ধনীদের স্বার্থ হাসিলের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হয়, এই সমাজের মানুষগুলো পরিবার ও সমাজকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র নিজের জন্য বাঁচে।

    পরবর্তীতে ১৭৯০ সালে ফরাসী বিপ্লবের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং বর্তমান পার্লামেন্টারী পদ্ধতিকে তারা গ্রহণ করে। আমেরিকা সহ সব ইউরোপীয় দেশগুলো এই রেভুলেশন দ্বারা প্রভাবিত হয়। নেপোলিয়ানের শাসনের পর থেকে, ফ্রান্সসহ পশ্চিমা দেশগুলো সারা বিশ্বে পুঁজিবাদকে বহন করে চলেছে। অর্থনৈতিক শোষণের উদ্দেশ্যে উপনিবেশ স্থাপন করাই পুঁজিবাদের উদ্দেশ্য। বর্তমানে তারা কলোনী স্থাপন পদ্ধতিতে একটু পরিবর্তন করে পুঁজিবাদকে আরো কার্যকারীভাবে বাস্তবায়ন করে চলেছে।

    বর্তমান ইউরোপ চার্চ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। করপোরেট কোম্পানী ও ব্যাংকগুলো চার্চের স্থান দখল করেছে মাত্র। এটাই সেই পুঁজিবাদ যার দিকে পশ্চিমারা সারা বিশ্ব ও মুসলিমদের ডাকছে। বর্তমান বিশ্বও আগের মতই আরেকটি দ্বন্দ্ব শুরুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। আমরা আশা করি তারা নতুন কোন কম্প্রোমাইজের দিকে না গিয়ে তাঁদের চিন্তা শক্তিকে ব্যবহার করবে। আমরা মুসলিমরা এই সেকুলার পুঁজিবাদী জাহেলিয়াতকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করেছি। আমরা মানবজাতির জন্য আল্লাহ প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থা ইসলামকে ধারণ করি। আল্লাহর দ্বীনের জন্য কাজ করি। যেন আল্লাহর দ্বীন বাস্তবায়নের মাধ্যমে সারা বিশ্ব প্রকৃত হকের দিকে ফিরে আসে।

    উৎস: আর-রায়া ম্যাগাজিন, এপ্রিল ১৯৯৪

  • নারী কিসে আটকায়?

    নারী কিসে আটকায়?

    খবর:

    সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রেন্ডিং বা আলোচনায় আছে যে বিষয়টি তা হলো, নারী কিসে আটকায়। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টইন ট্রুডো ও তাঁর স্ত্রী সোভি গ্রেগয়ের ট্রুডোর আলাদা থাকার ঘোষণার পরই আলোচনাটির সূত্রপাত। এর জের হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইতে শুরু করে মিম, ট্রল আর পোস্ট–পাল্টা পোস্টের ঝড়। এর মধ্যে একটি পোস্টের বক্তব্য ছিল এমন, ‘জাস্টিন ট্রুডোর ক্ষমতা, বিল গেটসের টাকা, হাকিমির জনপ্রিয়তা হুমায়ুন ফরিদীর ভালোবাসা, তাহসানের কণ্ঠ কিংবা হৃত্বিক রোশানের স্মার্টনেস। কোনো কিছুই নারীকে আটকাতে পারে নাই, বলতে পারবেন নারী কিসে আটকায়?’ (https://www.prothomalo.com/onnoalo/treatise/f8o1qkyren

    মন্তব্য:

    “বিবাহবন্ধন” শব্দটি আমাদের বর্তমান সেক্যুলার সমাজে সত্যিকার অর্থেই ‘বন্ধন’ বা ‘handcuff’ এর চেয়ে অতিরিক্ত কোন তাৎপর্য বহন করছেনা। বিয়ে বর্তমানে নারী-পুরুষ উভয়ের কাছে শৃংখলার নামান্তর। ‘নারী কিসে আটকায়’ ট্রেন্ডিং এর বিপরীতে প্রথম আলোর ‘পুরুষ যেখানে আটকায়’ শীর্ষক প্রতিবেদনও আছে যেখানে বলা হচ্ছে, “আফসোস! কেউ বলছে না, পুরুষ কিসে আটকায়? কিন্তু যে কথাটা সবাই জানে এবং মানে, কিন্তু বলে না; সেটি হলো সম্পর্কের ফাটকে দীর্ঘমেয়াদে সে আটকা থাকে বটে; কিন্তু সেই থাকায় তার সায় থাকে না” অর্থাৎ, নারী ও পুরুষ উভয়েই হতাশ যে বিয়ের পর তারা পারিবারিক দ্বায়িত্ববোধের কাছে আটকা পড়ে যাচ্ছে, বৈবাহিক সম্পর্ক প্রশান্তির বদলে হয়ে যাচ্ছে এক শৃংখলাবৃত কয়েদখানা।

    একটি স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা যদি দেখি, মানুষ হিসেবে আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে আমরা সঙ্গী খুঁজি, বংশবৃদ্ধি করতে চাই; স্বামী/স্ত্রী-সন্তানসন্ততি নিয়ে পরিবার গঠন করতে চাই। এই পরিবার গঠনের মাধ্যমে একদিকে আমাদের যেমন প্রজনন প্রবৃত্তি পূরণ হয়, তেমনি একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, নির্ভরশীলতা ও দায়দায়িত্বও তৈরি হয়। একসাথে থাকতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই অনেক সময় সুবিধা-অসুবিধা, পছন্দ-অপছন্দ কিংবা মতের অমিল হয়, যার যার নিজের জায়গা থেকে কিছু বিষয় ছাড় দিতে হয়। এটা যেকোনো পরিবারের মধ্যকার স্বাভাবিক একটা বিষয়। কিন্তু বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ ‘ব্যক্তি স্বাধীনতা’ মানুষকে শেখায়, ‘প্রত্যেক ব্যক্তিই নাকি চায় তার নিজের মত করে জীবন কাটাতে, সমস্ত সিদ্ধান্ত নিজের মত করে, নিজের ইচ্ছায় নিতে’। নারী-পুরুষের সম্পর্কের উদ্দেশ্যকে এখানে শুধুমাত্র যৌন চাহিদা পূরণকে কেন্দ্র করে আবর্তিত করা হয়েছে। যার ফলস্বরূপ, বিবাহ-পরবর্তী পারিবারিক প্রত্যাশা বা দায়িত্ব নারী-পুরুষ উভয়ের কাছে স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ মনে হতে থাকে। ব্যক্তিস্বাধীনতার এই চিন্তা থেকে সংসারের, সঙ্গীর কিংবা সন্তানের প্রয়োজনে নিজের পছন্দ-অপছন্দ, চাকরি, বেড়ানো এমনকি শপিং এর মত ছোটখাট বিষয়ে ছাড় দেওয়া, একে অপরকে প্রাধান্য দেওয়া, দোষত্রুটি ক্ষমা করা, পরিবারের কল্যানে শ্রম দেওয়া ইত্যাদি স্বাভাবিক বিষয়গুলোও কঠিন হয়ে যায়। সর্বক্ষণ কি পেলাম, কি দিলাম এর হিসাব নিকাশ চলতে থাকে। নিজের মত করে জীবন কাটানোর ব্যক্তি-স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং পারিবারিক দায়িত্ববোধ – এই দুই বিষয়ে তখন দ্বৈরথ তৈরি হয়। তাছাড়া, সৃষ্টিকর্তা বিবর্জিত ধর্মনিরপেক্ষবাদ যখন সমাজের ভিত্তি অর্থাৎ আখিরাতের সাথে জীবনের কোন সম্পর্ক নাই, তখন ছোটবড় এই স্যাক্রিফাইসগুলো মানুষের জীবনে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কেননা, এর বিনিময়ে আল্লাহ্‌’র কাছ থেকে উত্তম কোন প্রতিদান পাওয়ার ব্যাপারে সে ভরসা খুঁজে পায় না। কোনকিছু নিজের পছন্দমত না হলে নিজেকে সে সবসময় বঞ্চিত মনে করে। এভাবে অনেক ‘না পাওয়া’ বা ‘করতে না পারা’র বাধা যখন পুঞ্জিভূত হয়ে বড় আকার ধারণ করে, ব্যক্তি তখন সম্পর্কের ব্যাপারে শ্বাসরুদ্ধ বা শৃঙ্খলিত বোধ করে, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায় এবং একপর্যায়ে সে সম্পর্ক থেকে মুক্তি পেতে চায়। যার কারণে আমরা দেখি, ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণার কর্ণধার ফ্রান্সে বিবাহবিচ্ছেদের হার ৫৫ শতাংশ। মার্কিন ডিভোর্স‌ এটর্নি স্কট স্ট্যাডলারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বিবাহিত দম্পতিদের মধ্যে প্রথম বিবাহে ডিভোর্সের হার ৫০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় বিয়েতে ৬৭ শতাংশ এবং তৃতীয় বিয়েতে সেটা ৭৩ শতাংশে গিয়ে ঠেকছে। আমাদের দেশেও গত এক বছরে ডিভোর্সের হার বেড়ে গেছে দ্বিগুন। ঢাকা শহরে প্রতি ৪০ মিনিটে একটা করে ডিভোর্স হচ্ছে। তাদের এই দূষিত চিন্তা গ্রহণ করার ফলে তাদের মতই আমাদের পরিবারব্যবস্থা এবং গোটা সমাজব্যবস্থায় ভাঙ্গন ধরতে শুরু করেছে।

    অথচ, একটি তাক্বওয়াভিত্তিক সমাজে ব্যক্তিস্বাধীনতা বা মানুষের নিজেদের খেয়ালখুশি দিয়ে পরিচালিত হবার সুযোগ নেই। কারণ, মুসলিম মাত্রই সে আল্লাহ্‌’র দাস এবং আল্লাহ্‌’র আদেশ-নিষেধের কাছে আত্মসমর্পনকারী। মহান আল্লাহ্‌’র আদেশ মেনে নারী ও পুরুষ বিয়ে করে, যার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র যৌন চাহিদা পূরণ নয়, বরং দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে পরিবার গঠন ও এর যত্ন করা। আল্লাহ্‌’র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তারা তখন একে-অপরের যত্ন নেয়, ছাড় দেয়, ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে, কিছু অপ্রাপ্তি থাকলেও আখিরাতের কথা ভেবে বিচলিত হয়না এবং এভাবেই স্বেচ্ছাচারিতার বদলে একটি সুস্থ সুন্দর দায়িত্বশীল পরিবার তথা সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠে। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা পবিত্র কুরআনে বলেন, “তোমরা তোমাদের সঙ্গীদের সাথে সদ্ভাবে জীবন-যাপন কর। অতঃপর, যদি তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে হয়ত তোমরা এমন এক জিনিসকে অপছন্দ করছ, যেখানে আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্য অনেক কল্যাণ রেখেছেন” (সুরা আন-নিসা, আয়াত ১৯)। সুতরাং, বিশ্বব্যাপী ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের ভিত্তিতে গড়ে উঠা সমাজগুলোতে পরিবার ভাংগনের যে সামাজিক মহামারী চলছে, তার প্রতিষেধক রয়েছে কেবলমাত্র আল্লাহ্‌’র দেয়া জীবনব্যবস্থায়। সচেতন মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত নিজেদের আক্বীদার প্রতি আত্মবিশ্বাস রাখা এবং ইসলাম প্রদত্ত ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক ব্যবস্থার পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের ডাক সমাজের সর্বত্র পৌঁছে দেওয়া। পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থা গঠনে ইসলামের নেতৃত্ব আজ শুধু মুসলিমদেরই প্রয়োজন নয়, বরং পুরো মানবজাতির একমাত্র বিকল্প। 

     –    যায়নাব মায়সূরা