Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • ধর্ষণের কারণ ও সমাধান কী?

    ধর্ষণের কারণ ও সমাধান কী?

    রেইপ কেবল একটি সামাজিক অপরাধ নয়; বরং আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার গভীর অসুস্থতার একটি ভয়ংকর লক্ষণ। আমরা এমন এক সময় অতিক্রম করছি, যখন বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ, নারী ধর্ষণ, এমনকি ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যার ঘটনাগুলো মানুষকে আতঙ্কিত, ক্ষুব্ধ ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে।

    প্রায় প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ করলে, কিংবা টেলিভিশনের সংবাদ দেখলে আমরা নতুন নতুন বিভীষিকার মুখোমুখি হচ্ছি। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই ঘটনাগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হয় না। বরং এগুলো ধীরে ধীরে সমাজের ভেতরে নিয়মিত আতঙ্কে পরিণত হচ্ছে।

    আমরা আজ যে প্রশ্নের মুখোমুখি, তা হলো: কেন এই অপরাধগুলো বারবার ঘটছে? কেন প্রতিবার মানুষের ক্ষোভ, প্রতিবাদ, মানববন্ধন, টকশো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও সমাজের বাস্তবতা পরিবর্তিত হচ্ছে না?

    আমরা মনে করি, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদেরকে শুধু আবেগ দিয়ে নয়, চিন্তা দিয়েও বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করতে হবে। কারণ, কেবল ক্ষোভ কোনো জাতিকে বাঁচাতে পারে না। একটি জাতিকে বাঁচাতে হলে তাকে নিজের সংকটকে সঠিকভাবে বুঝতে হয়।

    দুঃখজনকভাবে, আমাদের সমাজে ধর্ষণের কারণ নিয়ে যেসব ব্যাখ্যা সবচেয়ে বেশি প্রচলিত, তার অধিকাংশই আংশিক সত্য, কিন্তু পূর্ণ সত্য নয়। আমরা লক্ষণ নিয়ে কথা বলি, কিন্তু রোগ নিয়ে কথা বলি না। আমরা ফলাফল দেখি, কিন্তু শেকড় দেখতে চাই না।

    রেইপের কারণ হিসেবে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি বলা হয়, সেটি হলো বিচারহীনতা ও বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা। নিঃসন্দেহে এটি একটি বাস্তব সমস্যা। যখন অপরাধী দ্রুত ও নিশ্চিত শাস্তি পায় না, তখন অপরাধের প্রবণতা বাড়ে। যখন মানুষ দেখে ক্ষমতা, অর্থ বা রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে অপরাধী পার পেয়ে যেতে পারে, তখন মানুষ আইনের ভয় হারাতে শুরু করে।

    কিন্তু আমাদেরকে একটি কঠিন প্রশ্ন করতেই হবে: এই বিচারহীনতা কেন তৈরি হয়েছে? বিচারব্যবস্থা কি আকাশ থেকে নেমে এসেছে? রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো যন্ত্র?

    না। বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা নিজেই সমাজের বৃহত্তর নৈতিক ও আদর্শিক সংকটের ফলাফল। যে সমাজে সত্যের মূল্য কমে যায়, যেখানে ক্ষমতা ন্যায়বিচারের ওপরে উঠে যায়, যেখানে রাজনীতিতে ইনসাফের ছিটেফোঁটা থাকে না, যেখানে রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, সেখানে বিচারব্যবস্থা কখনোই ধারাবাহিকভাবে ন্যায়ভিত্তিক হতে পারে না। একটি দোতলা নৌকার তলায় যখন ফুটো হয়, তাতে নৌকার নিচতলাই কেবল ডুবে না। দোতলা-সহ পুরো নৌকাটিই ডুবে যায়। রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তিতে ফুটো থাকলে, যত মেধাবী লোকদেরই বিচারক বানানো হোক না কেন, বিচার বিভাগও ডুবে যাবে। অর্থাৎ বিচারহীনতা একটি কারণ হলেও, সেটি আবার আরও গভীর একটি রোগের লক্ষণও বটে।

    একইভাবে আমরা মাদকের কথা বলি। আমরা বলি, মাদকাসক্তি বেড়ে গেছে, তাই অপরাধ বেড়েছে। সন্দেহ নেই, মাদক বহু অপরাধকে উসকে দেয়। মাদক মানুষের বিবেক দুর্বল করে, আত্মনিয়ন্ত্রণ ধ্বংস করে, সহিংসতা বৃদ্ধি করে। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন হলো: কেন মাদক এত সহজলভ্য হয়ে উঠেছে?

    এটি কি কেবল কিছু মাদকাসক্ত ব্যক্তি আর কিছু অসৎ ব্যবসায়ীর কারণে? নাকি এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রের দুর্বলতা, আন্তর্জাতিক মাদক অর্থনীতি, সীমান্ত দুর্নীতি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং একটি আদর্শহীন সমাজব্যবস্থা? মাদক কেবল একটি ব্যক্তিগত পাপ নয়; কেবল পারিবারিক সমস্যাই নয়। এটি একটি বিশাল পুঁজির আন্তর্জাতিক ব্যবসা। কোটি কোটি ডলারের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের সাথে এটি জড়িত। ফলে সমস্যাটি শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়; এটি সভ্যতাগত ও নৈতিক সংকটের অংশ।

    একই কথা পর্নোগ্রাফির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আজকের পৃথিবীতে শারীরিক চাহিদাকে শুধু ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয় না; বরং এটিকে একটি বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। মানুষের প্রবৃত্তি, কল্পনা, দৃষ্টি ও মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি বিশাল বৈশ্বিক শিল্প কাজ করছে। এই শিল্প মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে এমন একটি মানসিকতা তৈরি করে, যেখানে নারীকে, এমনকি শিশুদেরকেও পূর্ণ মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন সত্তা হিসেবে নয়, বরং ভোগের বস্তু হিসেবে দেখতে শেখানো হয়।

    এখানেও আমরা একই প্রশ্ন করি: এই পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো? কেন রাষ্ট্র, সমাজ ও বৈশ্বিক সংস্কৃতি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করলো, যেখানে অশ্লীলতা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে, কিন্তু লজ্জাবোধকে আনস্মার্টনেস মনে করা হচ্ছে?

    প্রকৃত সত্য হলো ধর্ষণ, মাদক, পর্নোগ্রাফি, সহিংসতা — এগুলোর কোনোটিই মূল রোগ নয়। এগুলো আরও গভীর একটি সংকটের উপসর্গ। আর সেই সংকট হলো — আদর্শিক পতন। চিন্তার পতন। আদর্শিক ভিত্তির পতন। আল্লাহভীতির পতন। মানুষের আত্মিক ও নৈতিক সত্তার পতন।

    যে সমাজে মানুষ নিজেকে কেবল প্রবৃত্তির প্রাণীতে পরিণত করে, সেখানে আইন একা সমাজকে রক্ষা করতে পারে না। কারণ আইন মানুষকে কিছু সময়ের জন্য থামাতে পারে, কিন্তু চিন্তা মানুষকে ভেতর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে।

    একটি সমাজ তখনই স্থিতিশীল থাকে, যখন সেখানে মানুষ শুধু আইন বা পুলিশের ভয়ে নয়, বিবেকের কারণেও অপরাধ থেকে বিরত থাকে। যখন মানুষ বিশ্বাস করে যে, সে কেবল রাষ্ট্রের কাছেই নয়, আল্লাহর কাছেও জবাবদিহি করবে।

    আজকের সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো — আমরা এমন একটি সমাজে প্রবেশ করছি, যেখানে স্বাধীনতার কথা বলা হয়, কিন্তু আত্মসংযমের কথা বলা হয় না; অধিকারের কথা বলা হয়, কিন্তু দায়িত্বের কথা বলা হয় না; ভোগের কথা বলা হয়, কিন্তু চরিত্রের কথা বলা হয় না। ফলে সমাজের ভেতরে ধীরে ধীরে একটি নৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়। পরিবারিক শিক্ষা ও বন্ধন দুর্বল হয়। লজ্জাবোধ দুর্বল হয়। আত্মিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়। আর এই শূন্যতার মধ্য দিয়েই ধর্ষণের মতো অপরাধগুলো আরও ভয়ংকরভাবে বিস্তার লাভ করে।

    অতএব, আমরা যদি সত্যিই এই সংকটের সমাধান চাই, তাহলে আমাদেরকে শুধু অপরাধীর বিচার নিয়ে কথা বললে হবে না; আমাদেরকে সেই সমাজ, সেই সংস্কৃতি, সেই চিন্তা ও সেই রাষ্ট্রিক কাঠামো নিয়েও কথা বলতে হবে, যেগুলো এই ধরনের অপরাধ জন্ম নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করছে। কারণ, যে সমাজ তার আদর্শিক ভিত্তি হারায়, সে সমাজ একসময় তার মানবিক ভিত্তিও হারিয়ে ফেলে।

    আমরা যদি আজকের সংকটকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে চাই, তাহলে আমাদেরকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। প্রশ্নটি হলো: রাষ্ট্র কি আদর্শনিরপেক্ষ হতে পারে? আজকের পৃথিবীতে অনেকেই এমনভাবে কথা বলেন, যেন রাষ্ট্র কেবল একটি প্রশাসনিক যন্ত্র; যেন রাষ্ট্রের নিজস্ব কোনো আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে নিরপেক্ষ নয়। প্রত্যেক রাষ্ট্রই কোনো না কোনো মূল্যবোধ, কোনো না কোনো সংস্কৃতি, কোনো না কোনো জীবনদর্শনকে রক্ষা করে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের মধ্যে তা ছড়িয়ে দেয়।

    কিছু রাষ্ট্র ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ মূল্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। কিছু রাষ্ট্র জাতীয়তাবাদকে সর্বোচ্চ মূল্য হিসেবে দাঁড় করায়। কিছু রাষ্ট্র ভোগবাদী সংস্কৃতিকে উৎসাহ দেয়। আবার কিছু রাষ্ট্র ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধকে সমাজের কেন্দ্রে স্থাপন করতে চায়। অতএব, প্রশ্নটি আসলে এটি নয় যে রাষ্ট্রের আদর্শ থাকবে, কি থাকবে না। বরং প্রশ্ন হলো: রাষ্ট্র কোন আদর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে?

    বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ দেশের মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি, আবেগ, নৈতিকতা ও সামাজিক চেতনার একটি বড় অংশ ইসলামী আকিদা ও মূল্যবোধ দ্বারা গঠিত। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সাধারণ মানুষ এখনো পরিবার, লজ্জাবোধ, নৈতিকতা, আল্লাহভীতি ও ধর্মীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু একই সময়ে রাষ্ট্রের বহু নীতি, শিক্ষা কাঠামো, সাংস্কৃতিক প্রবাহ ও প্রশাসনিক দর্শন এমন এক আদর্শিক কাঠামোর প্রভাব বহন করে, যার শিকড় উপনিবেশিক ও পাশ্চাত্য সেক্যুলার চিন্তায় নিহিত।

    ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে একটি আদর্শিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে। দেশের মানুষ চারপাশের সমাজের প্রভাবে এক ধরনের নৈতিক চেতনা নিয়ে বড় হয়, কিন্তু রাষ্ট্র তাকে ভিন্ন এক জীবনদর্শনের দিকে ঠেলে দেয়। পরিবার এক ধরনের মূল্যবোধ শেখায়, কিন্তু মিডিয়া ও সংস্কৃতি ভিন্ন বার্তা দেয়। ধর্ম আত্মসংযম শেখায়, কিন্তু বৈশ্বিক ভোগবাদী সংস্কৃতি তার প্রবৃত্তিকে উসকে দেয়। এই দ্বৈততার ভেতরেই সমাজ ধীরে ধীরে বিভ্রান্ত, দুর্বল ও নৈতিকভাবে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।

    বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গেছে যে, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ইসলামী আইন ও ইসলামী নৈতিকতার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রাখে। যেমন: রিজলভ নেটওয়ার্ক নামে গবেষক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একটি বৈশ্বিক কনসোর্টিয়ামের ২০১৭ সালের জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ মনে করেন, শরিয়াহ আইন মৌলিক সেবা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দুর্নীতিকে নিরুৎসাহিত করে। ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপেও এসেছিল, বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যে ৮২ শতাংশই শরিয়াহ আইনের পক্ষে। অর্থাৎ, এই সমাজের মানুষের নৈতিক আকাঙ্ক্ষা এখনো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়নি। জনগণের ভেতরে ইসলামী আকিদার ভিত্তিতে সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। কিন্তু চলমান রাজনীতি ও রাষ্ট্রকাঠামো সেই আকাঙ্ক্ষাকে ধারাবাহিকভাবে ধারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

    এখানে আরেকটি বিষয়ও অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বলা দরকার। ইসলাম কেবল দ্রুত শাস্তির কথা বলে না। ইসলাম শুধু অপরাধীকে দমন করতে চায় না; ইসলাম এমন একটি সমাজ গঠন করতে চায়, যেখানে অপরাধ জন্ম নেওয়ার পরিবেশই দুর্বল হয়ে পড়ে।

    আজ অনেকেই ইসলামী সমাধান বলতে শুধু দ্রুত বিচার ও প্রকাশ্য শাস্তির বিষয়টি সামনে আনেন। কিন্তু ইসলামি সভ্যতার শক্তি শুধু আইনের কঠোরতায় ছিল না; বরং মানুষের চরিত্র গঠনে ছিল। আদর্শিকভাবে ইসলামের সার্বিক বাস্তবায়ন ছাড়া ওই আউটকাম সম্ভব ছিল না।

    ইসলাম প্রথমে মানুষের অন্তরে ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ড (ফুরকান) গঠন করে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বযুগে ওহীর মাধ্যমে মানুষের কাছে এই ফুরকান পাঠাতেন:

    “রমজান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে—মানুষের জন্য পথনির্দেশক ও সৎপথের সুস্পষ্ট প্রমাণ এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী মানদণ্ড (ফুরকান) হিসেবে।”[সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৫]

    “তিনি আপনার প্রতি সত্যের সাথে কিতাব নাযিল করেছেন, যা এর আগের কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী। আর তিনি তাওরাত ও ইঞ্জিল নাযিল করেছেন—এর আগে মানুষের জন্য পথনির্দেশ হিসেবে। আর তিনি ফুরকান (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী মানদণ্ড) নাযিল করেছেন।”[সূরা আলে ইমরান, ৩:৩-৪]

    “আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ পাঠিয়েছি এবং তাদের সঙ্গে কিতাব ও মীযান (ন্যায়বিচারের মানদণ্ড) নাযিল করেছি, যাতে মানুষ ন্যায়ের ওপর দাঁড়ায়।”[সূরা আল-হাদীদ, ৫৭:২৫]

    ইসলাম মানুষের অন্তরে তাকওয়ার দ্বারা এই ফুরকান সৃষ্টি করে:

    “হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তিনি তোমাদের জন্য ফুরকান (সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার ক্ষমতা) সৃষ্টি করে দেবেন, তোমাদের পাপসমূহ মুছে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন।”[সূরা আল-আনফাল, ৮:২৯]

    এভাবে ইসলাম সমাজের মধ্যে আল্লাহর প্রতি জবাবদিহির অনুভূতি সৃষ্টি করে। মানুষকে শেখায়, ক্ষমতা থাকলেও অন্যায় করা হারাম; সুযোগ পেলেও জুলুম হারাম; গোপনে হলেও পাপ আল্লাহর দৃষ্টির বাইরে নয়।

    যে সমাজে এই আকিদা, এই ফুরকান, এই ইসলামী বিবেক শক্তিশালী হয়, সেই সমাজে আইন একা পাহারা দেয় না; মানুষের বিবেকও সমাজকে পাহারা দেয়।

    একই সঙ্গে ইসলাম পরিবারকে গুরুত্ব দেয়। কারণ পরিবার শুধু অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি নৈতিক ও মানসিক নিরাপত্তার কেন্দ্র। পরিবার দুর্বল হয়ে গেলে সমাজের নৈতিক প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে যায়।

    ইসলাম শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু চাকরি বা অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখে না। শিক্ষা মানুষের চরিত্র, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক চেতনা গঠনের মাধ্যম। আজ আমরা ডিগ্রিধারী মানুষ তৈরি করছি, কিন্তু চরিত্রবান মানুষ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছি। ফলে প্রযুক্তি বাড়ছে, কিন্তু আত্মনিয়ন্ত্রণ বাড়ছে না।

    একইভাবে ইসলামী রাষ্ট্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচারব্যবস্থা কেবল শাস্তি দেওয়ার যন্ত্র নয়; এটি ইনসাফ প্রতিষ্ঠার প্রতিষ্ঠান। দ্রুত বিচার, নিশ্চিত বিচার, ক্ষমতার প্রভাবমুক্ত বিচার—এগুলো ছাড়া কোনো সমাজে স্থিতিশীলতা আসতে পারে না।

    ইসলাম এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশও চায়, যেখানে অশ্লীলতা ব্যবসায় পরিণত না হয়, যেখানে মানুষের প্রবৃত্তিকে ক্রমাগত উসকে দেওয়া না হয়, যেখানে নারী ও শিশুর মর্যাদা বাজারের পণ্যে পরিণত না হয়।

    অতএব, ইসলামী সমাধান বলতে আমরা শুধু কোনো নির্দিষ্ট আইনের ধারা বুঝি না। এটা একটা টোটাল প্যাকেজ। ইসলামী সমাধান বলতে আমরা বুঝি — আকিদার ভিত্তিতে গঠিত একটি সমাজ, একটি জনমুখী ও কার্যকর রাষ্ট্র, ইনসাফপূর্ণ বিচার, শক্তিশালী পুলিসিং, একটি চরিত্রভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা, একটি দায়িত্বশীল সংস্কৃতি এবং এমন একটি সভ্যতা, যেখানে মানুষ কেবল আইনের ভয়ে নয়, আল্লাহর ভয়েও অন্যায় থেকে বিরত থাকে।

    আজ আমাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে — আমরা কি কেবল প্রতিটি ঘটনার পরে ক্ষোভ প্রকাশ করব, নাকি সমাজের গভীর রোগ নিরাময়ের চেষ্টাও করব? আমরা কি শুধু শাস্তির দাবি জানিয়ে থেমে যাব, নাকি সেই চিন্তা, সেই সংস্কৃতি ও সেই রাষ্ট্রিক কাঠামো নিয়েও কথা বলব, যা ধীরে ধীরে মানুষকে নৈতিকভাবে শূন্য করে তুলছে?

    আমরা যদি সত্যিই শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ চাই, যদি সত্যিই নারীর মর্যাদা রক্ষা করতে চাই, যদি সত্যিই ধর্ষণের মতো অপরাধ কমিয়ে আনতে চাই, তাহলে আমাদেরকে সমাজের আদর্শিক ভিত্তি পুনর্গঠনের দিকে ফিরতে হবে। আমাদেরকে এমন একটি সমাজ গড়তে হবে, যেখানে মানুষ স্বাধীনতা পাবে, কিন্তু সীমাহীন প্রবৃত্তির দাস হবে না। যেখানে আইন থাকবে, কিন্তু আইনকে টিকিয়ে রাখার জন্য আদর্শিক প্রেরণাও থাকবে। যেখানে রাষ্ট্র থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্র জনগণের বিশ্বাস ও মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না।

    কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় — কোনো সমাজ কেবল আইন, পুলিশ বা প্রযুক্তি দিয়ে টিকে থাকে না, কেবল অর্থনীতি দিয়েও টিকে থাকে না। সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে তার আদর্শিক ভিত্তির ওপর। আর যে সমাজে আল্লাহর দাসত্ব হারিয়ে যায়, সে সমাজের মানুষগুলো প্রবৃত্তির দাস হয়ে পড়ে। জঘন্য সেই সমাজে নিকৃষ্ট সব অপরাধ ঘটতেই থাকবে।

  • আপনজনদের সাথে ‘স্বল্প যোগাযোগ’ বজায় রাখা: এক উপেক্ষিত সংকট

    আপনজনদের সাথে ‘স্বল্প যোগাযোগ’ বজায় রাখা: এক উপেক্ষিত সংকট

    আমাদের আধুনিক বিশ্বে এটা একটা সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, আমরা সন্তানেরা প্রায়শই আমাদের বাবা-মায়ের সাথে যোগাযোগ কমিয়ে রাখার চেষ্টা করি। এটি শুধু পরিবারের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, আমাদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবসহ সকল নিকট সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে এ প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং পুরো সমাজে এটি মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর-১১ এলাকার একটি প্রায় পরিত্যক্ত বাসা থেকে ৭৫ বছর বয়সী নুরজাহান বেগমের গলিত মরদেহ উদ্ধার হবার এ বিষয়টি আবারো আলোচনায় এসেছে।

    কখনও কখনও এই যোগাযোগ একটি সাধারণ ‘হাই’ এবং ‘হ্যালো’-র মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং কেবল সেইসব প্রয়োজনীয় কথাবার্তা হয়, যা ছাড়া আমরা আমাদের জীবন চালাতে পারি না। এভাবে অনেক পরিবার হোস্টেলের মতো হয়ে গেছে, যেখানে বাবা-মা, সন্তানেরা আসে, খায়, ঘুমায় এবং তারপর আবার নিজেদের কাজের জন্য বেরিয়ে যায়। আত্মীয়-স্বজনদের ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদে সোশাল মিডিয়ায় কিছু লাইক, রিএকশন দেয়া ছাড়া, আর দীর্ঘমেয়াদে আনুষ্ঠানিকতা ও বাৎসরিক মিলনমেলা ছাড়া অনেকক্ষেত্রেই আর তেমন ইন্টারেকশন হচ্ছে না।

    যদিও কেউ কেউ মনে করতে পারেন যে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি তথা ঝগড়া-বিবাদ ভুল বোঝাবুঝির ক্ষেত্রে স্বল্প যোগাযোগ (LC) একটি সমাধান হিসেবে কাজ করে, তবে এটি প্রায়শই মানসিক বিপর্যয় এবং টানাপোড়েন সৃষ্টি করে। আমাদের প্রায়শই এমন কাউকে প্রয়োজন হয় যার সাথে আমরা নিজেদের ভাবনাগুলো ভাগ করে নিতে পারি এবং যার কাছ থেকে পরামর্শ চাইতে পারি। পরামর্শ দেওয়া এবং নেওয়া আমাদের দৈনন্দিন জীবনের চ্যালেঞ্জগুলো আরও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে সাহায্য করে।

    সোশাল মিডিয়ায় নিজেকে গুটিয়ের নেবার বিষয়ে লক্ষাধিক পোস্ট, যার মধ্যে “নিজের ক্ষমতা ফিরিয়ে নাও!” এবং “যোগাযোগহীনতাই আত্মসম্মান”-এর মতো বিভিন্ন উক্তি আমাদের ফিডে ঘুরাফিরা করতে থাকে, অনেকের তা শুনতেও ভালো লাগে, তবে এটি একটি ক্রমবর্ধমান ইঙ্গিত যে সন্তান ও আপনজন উদ্বেগজনক হারে তাদের বাবা-মা ও আপনজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

    ক্যাথরিন ক্যাভালো, একজন আমেরিকান পরিবার ও দম্পতি মনোচিকিৎসক, যাঁর ২৫ বছরেরও বেশি ক্লিনিকাল অভিজ্ঞতা রয়েছে, তিনি প্রায়শই পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার শিকার ক্লায়েন্টদের সাথে কাজ করেন। তিনি বলেন যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কম বা কোনো যোগাযোগ না থাকার প্রবণতা আরও বেশি দেখা যাচ্ছে, এবং কিছু পরিসংখ্যান এই দাবিকে সমর্থন করে। সম্প্রতি ইউগভ (YouGov)-এর একটি জরিপে দেখা গেছে যে ৩৮% আমেরিকান প্রাপ্তবয়স্করা পরিবারের কোনো সদস্যের সাথে বিচ্ছিন্ন। বাংলাদেশে এ বিষয়ে আদৌ কোনো জরিপ আছে কিনা জানা নেই, তবে এ বাস্তবতা যে রয়েছে এবং বৃদ্ধি পাচ্ছে তা পরিষ্কার।

    এটা ঠিক যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যেখানে আপনজন দুর্ব্যবহার করে এবং সহিংস আচরণ প্রদর্শন করে। এ ধরনের ক্ষেত্রে, স্বল্প মেয়াদে যোগাযোগ কিছুটা কমিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত হতে পারে, তবে এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিস্থিতি অবশ্যই গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।

    তবে, অনেকক্ষেত্রে সন্তানেরা অভিযোগ করে যে তাদের অনেকের বাবা-মা প্রকৃত আবেগ এবং ভালোবাসা প্রকাশ করেন না। আন্তরিক অনুভূতি, সহানুভূতি এবং কোমলতারও অভাব থাকতে পারে। কিছু বাবা-মায়ের জন্য, প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে খাবার, পোশাক এবং কম্পিউটার, ট্যাবলেট ও মোবাইল ফোনের মতো আধুনিক ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী সরবরাহ করা। আবার অনেকের তাদের সন্তানের আদর্শিক সন্তান তৈরি স্পৃহা থেকে তারা সন্তানদের পড়াশুনাসহ বিভিন্ন পার্থিব ক্যাপাসিটি তৈরির একটি যান্ত্রিকতায় অভ্যস্ত করেই দায়িত্ব শেষ করেন। প্রায়শই তাদের সন্তানদের সাথে কথা বলার, তাদের সাথে বসার বা তাদের কথা শোনার সময় থাকে না। সহানুভূতিশীল পারিবারিক বন্ধন লালন করা ছাড়া, সবাই যেন বিভিন্ন কাজ শেষ করার জন্য সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটছে।

    একইভাবে যারা বৃদ্ধ বাবা-মার সাথে থাকেন তারাও অনেকসময় তাদের ক্যারিয়ার, কাজের চাপ ও নিজস্ব সার্কেলে সময় দেবার পর তাদের মা-বাবার জন্য আর সময় খুঁজে পান না। তাদের সাথে কিছুটা সময় অতিবাহিত করা, তাদের নিয়ে কোথাও বেড়িয়ে আসার তাগিদ অনুভব করেন না। শুধুমাত্র তাদের সারভাইভাল তথা বেঁচে থাকার জন্য যা যা দরকার তা প্রদান করেই দায়মুক্তি খোঁজেন।

    সুতরাং, যদিও সন্তান ও বাবা-মা একই বাড়িতে বাস করে, সেই চার দেয়ালের মধ্যে হয়তো কোনো প্রকৃত বন্ধন অবশিষ্ট থাকে না—থাকে কেবল শিথিলভাবে কানেকটেড কিছু ব্যক্তি, যারা শুধু খায়, ঘুমায় এবং ঘর ভাগাভাগি করে। এর বেশি কিছু নয়। আমরা আমাদের আপনজনদের সত্যিকার অর্থে বোঝার চেষ্টা করি না; আবার আমাদের আপনজনেরাও প্রায়শই আমাদের আবেগিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাহিদার প্রতি মনোযোগ দেন না।

    মার্কিন মনোবিজ্ঞানী এবং সামাজিক সম্পর্ক বিষয়ক গবেষক ড. সেথ মেয়ার্স মনে করেন যে, যেসব প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে উদ্বেগ ও কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হন, তারা প্রায়শই নিজেদের শৈশবে আবেগিক ও সামাজিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এর কারণ হতে পারে বাবা-মায়ের অবহেলা, কিংবা এমন কোনো সমস্যাসংকুল পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা—যেখানে সদস্যদের মেজাজ-মর্জির মধ্যে তীব্র সংঘাত বিদ্যমান ছিল। আবার অনেক বাবা-মা-কেই এমন সন্তানের লালন-পালনে হিমশিম খেতে হয়, যার স্বভাব-চরিত্র বেশ কঠিন বা দুরন্ত প্রকৃতির। তাদের এই তিক্ত অভিজ্ঞতার পেছনে হয়তো এই বিষয়টিই কাজ করে থাকে।

    পারিবারিক ভাঙনের পেছনে বহুবিধ কারণ দায়ী। পারিবারিক বিষয়াবলি পরিচালনার ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের মধ্যকার পারস্পরিক প্রতিযোগিতার ফলে সৃষ্ট অবিরাম ও পুনরাবৃত্ত কলহ-বিবাদ হলো এমনই একটি কারণ। কারো কারো মতে, সেকুলার-উদারনৈতিক মূল্যবোধগুলো বাবা ও মায়ের ভূমিকা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করতে ব্যর্থ হয়েছে; বরং উল্টো তাদের একে অপরের প্রতিযোগী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

    চরম মাত্রার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ অর্থাৎ “আমি আমার নিজের জগৎ নিয়েই থাকি” এ ধরণের দৃষ্টিভংগির চর্চাও এই ভাঙনের পেছনে আরেকটি বড় কারণ; কারণ এই মানসিকতা পরিবারের অভ্যন্তরীণ স্তরবিন্যাস ও কাঠামোগত শৃঙ্খলকে উপেক্ষা করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি সন্তানদের বাবা-মায়ের প্রতি বিদ্রোহী আচরণ করতে উৎসাহিত করতে পারে, যার ফলে তারা পরিবারের অভ্যন্তরে প্রচলিত ছোটখাটো নিয়মকানুন মেনে চলার ক্ষেত্রেও অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে, দায়িত্বশীলতার প্রতি তাদের তীব্র বিতৃষ্ণা কাজ করে।

    এরই ফলস্বরূপ, পারিবারিক কলহ-বিবাদ সন্তানদের মনে উদ্বেগ ও মানসিক যন্ত্রণার সৃষ্টি করে। এর ফলে ঘরটি আর প্রশান্তি, নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও স্নেহ-মমতার উৎস হিসেবে টিকে থাকে না; বরং তা ঘৃণা ও স্বার্থপরতায় আচ্ছন্ন এক ভীতিকর স্থানে পরিণত হয়। সম্পর্কের গতিপথ বদলে যায় এবং তা পারস্পরিক মতপার্থক্যে পূর্ণ হয়ে ওঠে—যা কখনো কখনো বিবাহবিচ্ছেদ ও আলাদা হয়ে যাওয়ার মতো দূরত্ব সৃষ্টিকারী চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।

    ইসলামের দৃষ্টিতে, আমাদের ঘর বা গৃহ হলো আমাদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এটি কোনো ‘ফাইভ-স্টার হোটেল’ নয়, বরং তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু—এমন একটি স্থান যেখানে আমরা নির্দ্বিধায় নিজেদের প্রকৃত সত্তা নিয়ে বসবাস করতে পারি; যেখানে পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, পরিবারের সদস্যরা সর্বদা আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। ইসলাম এই অবস্থাকেই অভিহিত করে ‘সাকিনাহ’ (প্রশান্তি) হিসেবে। এটি কেবল একটি শ্রুতিমধুর শব্দই নয়, বরং এটি হলো সেই বিশেষ আবহ বা পরিবেশ—যা আল্লাহ চান আমাদের পরিবারে সর্বদা বিরাজমান থাকুক।

    একটু ভেবে দেখুন: আপনার বাবা-মা কেবল আপনার পড়াশোনা বা ঘরের কাজকর্ম নিয়ে সারাক্ষণ বকাবকি করার জন্যই সেখানে উপস্থিত নেই। ইসলামের বিধান অনুযায়ী, পরিবারে তাদের সুনির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে—যার মূল উদ্দেশ্য আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং আপনাকে সঠিক পথের দিশা দেওয়া বা পথপ্রদর্শন করা। আপনার বাবা? তিনি হলেন পরিবারের রক্ষাকর্তা; তিনিই সেই ব্যক্তি যিনি পরিবারের সবার ভরণপোষণ জোগাতে এবং সবাইকে নিরাপদে রাখতে গিয়ে নির্ঘুম রাত কাটান। আর আপনার মা? তিনি হলেন পরিবারের প্রাণকেন্দ্র; যিনি অকৃপণভাবে ভালোবাসা বিলিয়ে যান এবং মানুষ গড়ার মহান দায়িত্ব পালন করে চলেন (বিষয়টি মোটেও সামান্য কিছু নয়, তাই না?)। আর আপনি? আপনিও তো এই পরিবারেরই অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ। ইসলামের যে বিষয়টি সঠিক—যা বিশ্বের বাকি অংশ প্রায়শই উপেক্ষা করে—তা হলো: এই ভূমিকাগুলো ক্ষমতা বা প্রতিযোগিতার বিষয় নয়। আপনার বাবা-মা এমন কোনো ‘বস’ নন, যার বিরুদ্ধে আপনাকে বিদ্রোহ করতে হবে; বরং তাঁরাই আপনার অবলম্বন। আর আপনি কেবল ‘সন্তান’ নন—আপনিই ভবিষ্যৎ। আপনাকে যেভাবে গড়ে তোলা হয়—যেখানে ভালোবাসা ও সীমানার (নিয়ম-কানুনের) এক অপূর্ব সমন্বয় থাকে—তার মূল উদ্দেশ্যই হলো আপনাকে এমনভাবে শক্তিশালী করে তোলা, যাতে আপনি অহংকারী না হয়ে ওঠেন; এবং এমনভাবে দয়ালু করে তোলা, যাতে আপনি কারো দ্বারা সহজেই প্রভাবিত বা পদদলিত না হন।

    আর হ্যাঁ, বাবা-মা কখনোই নিখুঁত হন না। কখনো কখনো তাঁরা বেশ কঠোর হন। কখনো কখনো তাঁদের আচরণ বেশ ক্লান্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু ইসলাম এই প্রচলিত ধারণাকেই বদলে দেয়: এটি বাবা-মাকে শিক্ষা দেয় যেন তাঁরা নিষ্ঠুর বা রূঢ় না হন; কারণ এমন আচরণের ফলে সন্তানরা বড় হয়ে কেবল তিক্তমনা ও ক্ষুব্ধই হয়ে ওঠে। আবার এটি তাঁদের এ ব্যাপারেও সতর্ক করে যে, সন্তানকে যেন অতিরিক্ত প্রশ্রয় দিয়ে একেবারে নষ্ট করে না ফেলা হয়; কারণ এমন মানুষ হতে কেউ-ই চায় না, যে কি না বাস্তব জীবনের কঠিন পরিস্থিতিগুলো সামলাতেই অক্ষম। মূল লক্ষ্য হলো ভারসাম্য বজায় রাখা।

    পরিবার কোনো পাবলিক ক্যাফে বা রেস্টুরেন্ট না, যেখানে একদল মানুষ, যারা কেবল একটি ওয়াই-ফাই সংযোগ ভাগ করে নিচ্ছে, যেখানে সবাই যার যার মতো আলাদা আলাদা স্ক্রিনে চোখ আটকে রেখে নিজেদের কাজে ব্যস্ত। একটি প্রকৃত পরিবার হলো একটি দল। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন, তোমরা একে অপরের সাথে সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করো, একে অপরের দুর্বলতাগুলো ঢেকে রাখো এবং একে অপরকে আল্লাহর কথা, আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দাও—কেন আল্লাহই তোমাদের অস্তিত্বে এনেছেন এবং তোমাদের সূচনা করেছে এবং পরিবারে একত্রিত করেছেন।

    তাই যখন আমাদের মা পঞ্চম বারের মতো আমাদের খোঁজখবর নেন, কিংবা আমার আপনার বাবা আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সেই “বিশেষ আলোচনাটি” শুরু করেন—তখন হয়তো সেটা কেবলই বিরক্তিকর বকাবকি নয়। হয়তো তাঁরা ঠিক সেটাই করছেন, যা করার নির্দেশ আল্লাহ তাঁদের দিয়েছেন: তোমাকে এমন একজন দৃঢ়চেতা মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা—এমন একজন, যার অন্তরে প্রকৃত মমতা রয়েছে; এমন একজন, যে বড় হয়ে নিজেই বাস্তব জীবনে অর্থবহ কিছু গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

    এটাই হলো সেই কাঙ্ক্ষিত রূপকল্প। এমন একটি পরিবার, যার সদস্যদের সম্পর্ক কেবল রক্তের বন্ধনেই আবদ্ধ নয়, বরং একটি অভিন্ন আদর্শিক উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য দ্বারাও গাঁথা থাকবে। এটি এমন একটি দুর্গ হবে, যা আমাদের বাইরের কোলাহল ও বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করে; যাতে আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে এসে এমন একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি—যার অস্তিত্ব ও অবদান সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ—আল্লাহর কাছে, আমাদের সমাজের কাছে এবং সেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে, যাদের আমরা একদিন গড়ে তুলবো।

    এভাবেই গড়ে উঠতে পারে একটি শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন—যা লালন ও পুষ্ট করবে একটি শক্তিশালী মুসলিম উম্মাহকে। আল্লাহ আমাদের জন্য তা সহজ করে দিন।

    ঈষৎ পরিমার্জিত

  • জিলহজের প্রথম দশ দিন ও আকাবার বাইয়াত

    জিলহজের প্রথম দশ দিন ও আকাবার বাইয়াত
    জিলহজের প্রথম দশ দিন ও আকাবার বাইয়াত: যখন এই বিশেষ সময়ের মর্যাদার সাথে যুক্ত হয়েছিল নুসরাহ প্রদাণের মর্যাদা, আর তখনই জন্ম হয়েছিল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রের

    সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য এবং সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নেতা, সর্বশেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মদ (ﷺ), তাঁর পরিবার-পরিজন, সাহাবায়ে কেরাম এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর দেখানো পথের অনুসারীদের ওপর।

    প্রতি বছর মুসলমানদের জীবনে যে মহান ঈমানী মৌসুমগুলো আসে, তার মধ্যে অন্যতম হলো জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন। এগুলো এমন দিন, আল্লাহ তাঁর কিতাবে যার মর্যাদা ঘোষণা করেছেন, যার কসম খেয়েছেন এবং দুনিয়ার অন্যান্য সব দিনের চেয়ে যার মর্যাদা সমুন্নত করেছেন। এমনকি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, নেক আমলের জন্য এগুলোই সর্বশ্রেষ্ঠ দিন। এই বরকতময় দিনগুলো কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের মৌসুমই নয়, বরং তা ইসলামের ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া এক মহান ঘটনার সাথে যুক্ত। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো: আকাবার প্রথম ও দ্বিতীয় বাইয়াত (শপথ), যা ছিল মদিনা মুনাওয়ারায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রকৃত ভিত্তি।

    জিলহজের প্রথম দশক এবং আকাবার বাইয়াতের মধ্যকার সম্পর্কের প্রতি গভীরভাবে চিন্তা করলে মুসলমানদের জন্য ‘নুসরাহ’ (সাহায্য), ইসলামের জন্য কাজ করা, উম্মাহ গঠন এবং একটি ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে পথ অনুসরণ করেছিলেন, তা অনুধাবনের এক বিশাল দ্বার উন্মোচিত হয়।

    পবিত্র কুরআনে জিলহজের প্রথম দশ দিনের ফজিলত

    মহান আল্লাহ এই দিনগুলোর শপথ করে বলেছেন:

    وَالْفَجْرِ * وَلَيَالٍ عَشْرٍ

    “শপথ ফজরের, এবং দশ রাতের।” [সূরা আল-ফাজর: ১-২]

    অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, “দশ রাত” বলতে জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনকে বোঝানো হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), ইবনে কাসির, তাবারী এবং কুরতুবি।

    ইবনে কাসির বলেন: “এর দ্বারা জিলহজের দশ দিন উদ্দেশ্য… আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যখন কোনো কিছুর শপথ করেন, তখন তা সেই জিনিসের বিশালত্ব ও উচ্চ মর্যাদাকেই প্রমাণ করে। তাহলে ভেবে দেখুন, যে দিনগুলো দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ দিন, তার শপথের মর্যাদা কত মহান!”

    আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন:

    وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَعْلُومَاتٍ

    “এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে যেন তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করে।” [সূরা আল-হাজ্জ: ২৮]

    আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: “নির্দিষ্ট দিনগুলো বলতে জিলহজের প্রথম দশ দিনকে বোঝানো হয়েছে।”

    তাফসিরে তাবারীতে উল্লেখ রয়েছে: “সুন্নাহ বা হাদিসে জিলহজের প্রথম দশকের ফজিলত: নবী (ﷺ) থেকে প্রমাণিত, তিনি বলেছেন: ‘এমন কোনো দিন নেই, যে দিনগুলোর নেক আমল আল্লাহর কাছে এই দিনগুলোর (জিলহজের প্রথম দশ দিন) নেক আমলের চেয়ে বেশি প্রিয়।’ (সহিহ বুখারি)। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে: ‘এমন কোনো দিন নেই, যা আল্লাহর কাছে এই দশ দিনের চেয়ে বেশি মহান এবং যে দিনগুলোর নেক আমল তাঁর কাছে বেশি প্রিয়।’ (মুসনাদে আহমাদ)।”

    এই দিনগুলোতে রয়েছে: হজ, তাকবির, জিকির, সিয়াম (রোজা) এবং কোরবানি। এ কারণেই ইবনে হাজার আসকালানি বলেছেন: “জিলহজের প্রথম দশকের এই বৈশিষ্ট্যের কারণ হলো, মৌলিক সব ইবাদতের সমন্বয় এই দিনগুলোতে ঘটে।”

    আকাবার বাইয়াত… ইতিহাস বদলে দেওয়া মুহূর্ত

    হজের মৌসুমে এবং জিলহজের রাতগুলোতে ইসলামি দাওয়াতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাঁক বদলের ঘটনা ঘটেছিল।

    প্রথম আকাবার বাইয়াত নবুওয়াতের দ্বাদশ বছরে, আওস ও খাজরাজ গোত্রের বারোজন ব্যক্তি আসেন এবং নবী (ﷺ)-এর কাছে ইসলাম গ্রহণ, আনুগত্য এবং পাপ কাজ বর্জনের শপথ (বাইয়াত) গ্রহণ করেন। এই বাইয়াত ছিল মূলত ঈমানের বাইয়াত এবং ইয়াসরিবে (মদিনা) ইসলামের বিস্তারের সূচনা। নবী (ﷺ) মানুষকে ইসলাম শেখানোর জন্য তাদের সাথে মুসআব ইবনে উমায়েরকে পাঠান, ফলে মদিনার ঘরে ঘরে ইসলাম প্রবেশ করে।

    দ্বিতীয় আকাবার বাইয়াত পরবর্তী বছর, সেই হজের মৌসুমেই, সংঘটিত হয় বৃহত্তর বাইয়াত। যেখানে তেহাত্তর জন পুরুষ এবং দুইজন নারী উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে সাহায্য, নিরাপত্তা প্রদান, কথা শোনা ও আনুগত্য করা এবং নিজেদের পরিবারের মতো তাঁকে রক্ষা করার বাইয়াত গ্রহণ করেন।

    এখানেই ইসলাম দুর্বলতার পর্যায় থেকে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর্যায়ে উন্নীত হয়। নবী (ﷺ) তাদের বলেছিলেন: “আমি তোমাদের কাছে এই শর্তে বাইয়াত নিচ্ছি যে, তোমরা তোমাদের নারী ও সন্তানদের যেভাবে রক্ষা করো, আমাকেও সেভাবেই রক্ষা করবে।”

    এই বাইয়াত নিছক কোনো সাধারণ সাক্ষাৎ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চুক্তি, সাহায্যের অঙ্গীকার এবং রাজনৈতিকভাবে উম্মাহর জন্মের ঘোষণা। এখান থেকেই হিজরত শুরু হয়, অতঃপর মদিনা মুনাওয়ারায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

    আনসাররা কেন মহান ছিলেন?

    কারণ তারা কেবল অন্তরের বিশ্বাসের ওপর সন্তুষ্ট থাকেননি; বরং তারা দ্বীনকে সাহায্য করেছেন, এর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন, সমগ্র আরবের মোকাবিলা করেছেন এবং দাওয়াতের জন্য নিরাপত্তা ও ক্ষমতা প্রদান করেছেন। তাই আল্লাহ তা’আলা তাদের প্রশংসা করে বলেছেন:

    وَالَّذِينَ تَبَوَّؤُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِن قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ

    “আর যারা মুহাজিরদের আসার আগেই এ নগরীতে (মদিনায়) বসবাস স্থাপন করেছে এবং ঈমান এনেছে, তারা মুহাজিরদের ভালোবাসে।” [সূরা আল-হাশর: ৯]

    আনসাররা বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের নাম নয়, বরং এটি একটি বার্তা, শাসনব্যবস্থা, সমাজ এবং রাষ্ট্র।

    সময়ের মর্যাদার সাথে কাজের মর্যাদার সমন্বয়

    মুসলমানদের জন্য চিন্তার একটি বড় বিষয় হলো, আকাবার বাইয়াত এমন এক মৌসুমে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যাকে আল্লাহ সম্মানিত করেছেন এবং এমন দিনগুলোতে হয়েছিল, যা দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ দিন। ফলে, সময়ের মর্যাদা, সাহায্যের মর্যাদা, সাহচর্যের মর্যাদা এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার মর্যাদার এক অপূর্ব মিলন ঘটেছিল। আর এর ফলাফল ছিল: ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।

    এ কারণেই জিলহজের প্রথম দশ দিন শুধু জিকির ও সিয়ামের দিন নয়, বরং এটি ত্যাগের তাৎপর্য, নুসরাহ (সাহায্য), দাওয়াতের দায়িত্ব বহন, সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং বাস্তব জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার একটি ব্যবহারিক স্মরণ।

    আজকের দিনে মুসলমানদের এই অর্থগুলো অনুধাবন করা কতই না প্রয়োজন! আজ মুসলিম উম্মাহ বিভেদ, স্বৈরাচার, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য, পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ, পবিত্র স্থানগুলোর হারানো অবস্থা এবং মুসলিম ঐক্যের খণ্ড-বিখণ্ডতায় জর্জরিত। হিজরতের আগে মক্কায় মুসলমানদের যে অবস্থা ছিল, আজকের মুসলমানদের অবস্থার সাথে তার কতই না মিল! দুর্বলতা, নিপীড়ন, কুফরি শক্তির আধিপত্য এবং একটি ঐক্যবদ্ধ ইসলামি শাসন ব্যবস্থার অনুপস্থিতি।

    কিন্তু সিরাতে নববী মুসলমানদের শিক্ষা দেয় যে, পরিবর্তন কোনো বিশৃঙ্খলা বা আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে আসে না, বরং তা আসে সচেতনতা, দাওয়াত, ধৈর্য, বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিকভাবে উম্মাহ গঠন এবং শক্তি ও প্রভাবশালীদের কাছে সাহায্য চাওয়ার মাধ্যমে; ঠিক যেভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) করেছিলেন, যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর জন্য আনসারদের প্রস্তুত করে দেন।

    প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবানদের দায়িত্ব

    আনসাররা ছিলেন সাহায্যকারীদের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাই আজকের উম্মাহর প্রয়োজন একনিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ, সত্যনিষ্ঠ আলেম সমাজ, প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাবানদের, যারা সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় এবং উম্মাহর ওপর থেকে জুলুম দূর করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবেন।

    আল্লাহ তা’আলা বলেন:

    وَلَيَنصُرَنَّ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ

    “আর আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করেন, যে তাঁকে সাহায্য করে। নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী।” [সূরা আল-হাজ্জ: ৪০]

    অতএব, সাহায্য কেবল মুখের কথা নয়, বরং এটি একটি অবস্থান গ্রহণ, ত্যাগ স্বীকার এবং দায়িত্ব গ্রহণের নাম।

    মুসলমানদের জন্য নবী (ﷺ)-এর সুসংবাদ

    নবী (ﷺ) থেকে প্রমাণিত, তিনি বলেছেন:

    “অতঃপর নবুওয়াতের আদলে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে।” (মুসনাদে আহমাদ)।

    এই সুসংবাদ উম্মাহর মনে আশা জাগায় যে, দুঃখ-কষ্ট যতই তীব্র হোক এবং জুলুমের শক্তি যতই বৃদ্ধি পাক না কেন, ভবিষ্যত এই দ্বীনেরই।

    তবে এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নির্ভর করে অবিচল থাকা, কাজ করা এবং পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নবী (ﷺ)-এর সঠিক পদ্ধতি অনুসরণের ওপর।

    উপসংহার

    জিলহজের প্রথম দশ দিন মুসলমানদের স্মৃতিতে নিছক অতিবাহিত হয়ে যাওয়া কোনো দিন নয়; বরং এটি একটি মহান ঈমানী ও ঐতিহাসিক বিদ্যালয়। এটি উম্মাহকে আনুগত্যের ফজিলত, সাহায্যের মহত্ত্ব, ত্যাগের তাৎপর্য এবং কীভাবে ইসলামের প্রথম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই বরকতময় দিনগুলোতেই আনসাররা বাইয়াত গ্রহণ করেছিলেন, দাওয়াহ’র কাজকে সাহায্য করা হয়েছিল, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং ইতিহাসের চেহারা পালটে গিয়েছিল।

    আর আজ, মুসলমানদের আকাবার সেই চেতনাকে জাগ্রত করা কতই না প্রয়োজন: নুসরাহ’র চেতনা, ইসলামের জন্য কাজ করার চেতনা, ঐক্যের চেতনা এবং দায়িত্ব বহনের চেতনা; যাতে উম্মাহ তার হারানো সম্মান ফিরে পায় এবং ইসলাম জীবনের চালিকাশক্তি হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়, যেমনটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা চেয়েছেন।

    আজ উম্মাহ এবং সমগ্র মানবজাতি যে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং বিশ্বাসগত সমস্যায় ভুগছে, তার সবচেয়ে বড় শর’ঈ সমাধান হলো— মুসলমানদের আল্লাহর আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে ফিরে আসা এবং মুসলমানদের জন্য এমন এক ঐক্যবদ্ধ সত্তা প্রতিষ্ঠায় কাজ করা, যা দ্বীন প্রতিষ্ঠা করবে এবং ন্যায়বিচার, রহমত ও হেদায়েতের মাধ্যমে বিশ্বের বুকে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেবে।

    هَٰذَا بَلَاغٌ لِّلنَّاسِ وَلِيُنذَرُوا بِهِ وَلِيَعْلَمُوا أَنَّمَا هُوَ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ وَلِيَذَّكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ

    “এটি মানুষের জন্য এক বার্তা, যাতে এর দ্বারা তাদেরকে সতর্ক করা যায় এবং তারা জানতে পারে যে, তিনিই একমাত্র ইলাহ, আর যাতে বুদ্ধিমান লোকেরা উপদেশ গ্রহণ করে।” [সূরা ইবরাহিম: ৫২]

  • হজ্জ – উম্মাহর বিশালত্ব, শক্তি ও ঐক্যের প্রতীক

    হজ্জ – উম্মাহর বিশালত্ব, শক্তি ও ঐক্যের প্রতীক

    প্রতি বছর, বিশ্বজুড়ে বিশ লাখেরও বেশি মুসলিম পবিত্র এক খণ্ড ভূমিতে সমবেত হন সম্মিলিত ইবাদতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি কাজ পালন করার জন্য: আর তা হলো হজ। হজযাত্রীরা একই সাদা পোশাক পরিধান করে, একই বাক্য উচ্চারণ করে এবং একই আচার-অনুষ্ঠান পালন করে সেখানে উপস্থিত হন – যা এমন এক দ্বীনের জীবন্ত প্রমাণ, যা জাতীয়তা, ভাষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক মর্যাদাকে ছাড়িয়ে যায় – আর এই সবকিছুর একমাত্র উদ্দেশ্য হলো: আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-র ইবাদত।

    হজ হলো ইসলামের অন্যতম মহান স্তম্ভ; এটি একটি ইবাদত – অনেকটা প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মতোই, যা আমাদের পরিশুদ্ধ করতে এবং আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-এর সাথে বান্দার সম্পর্ককে নবায়ন করতে কাজ করে। নবী (সা.) বলেছেন:

    «مَنْ حَجَّ لِلَّهِ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ»

    “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজ করে এবং কোনো অশ্লীল কাজ (রাফাস) বা পাপ কাজ (ফুসুক) করে না, সে এমনভাবে নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে যেন সেদিনই তার মা তাকে জন্ম দিয়েছে।” (সহীহ বুখারী)

    এই বিপুল পুরস্কারের বাইরেও, হজ মূল ইসলামী মূল্যবোধগুলোর বার্ষিক নবায়ন হিসেবে কাজ করে, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ঐক্য এবং ত্যাগ।

    ঐক্য: উম্মাহর শক্তি

    এমন এক সময়ে যখন মুসলিম বিশ্ব নিরলস উপনিবেশবাদ, গণহত্যা এবং জাতীয়তাবাদের মুখোমুখি, যা মুসলিম উম্মাহর অনেক অংশকেই খণ্ডিত করেছে, তখন হজ প্রতি বছর একটি সময়োপযোগী অনুস্মারক হিসেবে আসে যে, মুসলিম ঐক্য একটি শর’ঈ বাধ্যবাধকতা এবং রাজনৈতিক অপরিহার্যতা। দূর থেকেও হাজীদের নিছক দৃশ্যটি বিস্ময়ের অনুভূতি জাগায়: লক্ষ লক্ষ মানুষ একটি অভিন্ন দেহের মতো চলাফেরা করছে, যাদের বৈশিষ্ট্য হলো শৃঙ্খলা, ভক্তি এবং একটি অভিন্ন অংশীদারি উদ্দেশ্য।

    নানা দিক দিয়েই এই জমায়েতটি শক্তি এবং সমন্বয়ের এক বিশাল সমাবেশের মতো – এটি একটি দৃশ্যমান প্রমাণ যে, মুসলিমরা যখন একটি তালবিয়া ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ এবং একটি সাধারণ উদ্দেশ্যের অধীনে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন এর ফলাফল হয় বিস্ময়কর।

    নবী (সা.) একবার আমাদের বর্তমান যুগের বর্ণনা দিয়েছিলেন – এমন এক সময় যখন মুসলিম উম্মাহ সংখ্যায় বিশাল হবে কিন্তু “সমুদ্রের ফেনার মতো” দুর্বল হবে। বর্তমান সময়ের এই দুর্বলতার বেশিরভাগই রাজনৈতিক বিভাজন থেকে উদ্ভূত: প্রকৃতপক্ষে, এটি এমন এক উম্মাহ যা ৫৭টি জাতিরাষ্ট্রে ছড়িয়ে আছে, যার প্রতিটিতে রয়েছে পৃথক সরকার, সেনাবাহিনী এবং পররাষ্ট্র নীতি।

    কিন্তু একটি ঐক্যবদ্ধ মুসলিম বিশ্বের সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করুন:

    ভৌগোলিক বিস্তৃতি: মুসলিম দেশগুলোর সম্মিলিত ভূখণ্ড প্রায় ১২ মিলিয়ন (১ কোটি ২০ লাখ) বর্গমাইল জুড়ে বিস্তৃত, যা রাশিয়ার আয়তনের প্রায় দ্বিগুণ, যুক্তরাষ্ট্রের আয়তনের তিনগুণেরও বেশি এবং বিশ্বের মোট স্থলভাগের প্রায় ২১ শতাংশ গঠন করে, যা তাদেরকে নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা প্রদান করে।

    কৃষিজ প্রাচুর্য: এই বিশাল এবং পরিবেশগতভাবে বৈচিত্র্যময় ভূমি বিশ্বের প্রধান শস্যগুলোর বেশিরভাগই উৎপাদনের সুযোগ দেয়, পাশাপাশি রয়েছে বিশাল পশুসম্পদ যা খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

    তরুণ এবং গতিশীল জনসংখ্যা: মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি), যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৬ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে, যাদের মধ্যক বয়স (median age) প্রায় ২৪ বছর – যা বিশ্বের বৃহত্তম শ্রমশক্তি এবং সবচেয়ে গতিশীল শ্রমশক্তিগুলোর মধ্যে একটি গঠন করে।

    কৌশলগত সামুদ্রিক প্রভাব: ইউ.এস. এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের চিহ্নিত বিশ্বের প্রধান সাতটি তেল চলাচলের সংকীর্ণ পথ (chokepoint)-এর পাঁচটিরই সীমান্তে মুসলিম দেশগুলোর অবস্থান, যার মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালী, বাব আল-মান্দেব, সুয়েজ খাল, মালাক্কা প্রণালী এবং বসফরাস প্রণালী। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোর উপর প্রভাব বিশাল আর্থিক এবং ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা প্রদান করবে।

    জ্বালানিতে আধিপত্য: বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বিরল খনিজ পদার্থ ছাড়াও বৈশ্বিক তেলের মজুতের প্রায় ৬০-৬৫% ইসলামী দেশগুলোর হাতে রয়েছে।

    সামরিক সক্ষমতা: একটি ঐক্যবদ্ধ উম্মাহ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক শক্তির নেতৃত্ব দেবে, যাদের আনুমানিক সম্মিলিত সক্রিয় ও সংরক্ষিত সেনাসদস্যের সংখ্যা হবে ২০-২৫ মিলিয়ন (২ কোটি থেকে ২ কোটি ৫০ লাখ)।

    ত্যাগ: হজের প্রাণকেন্দ্র

    ত্যাগ হলো হজের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপিত দ্বিতীয় মহান মূল্যবোধ – এমন এক মূল্যবোধ যা যুগ যুগ ধরে প্রতিধ্বনিত হয়ে আসছে।

    ইসলামে ত্যাগের এই ঐতিহ্য নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর সময় থেকে চলে আসছে, যিনি ত্যাগ ও ভক্তির সর্বোচ্চ রূপ প্রদর্শন করেছিলেন: দীর্ঘ এবং কষ্টকর অপেক্ষার পর জন্ম নেওয়া নিজের প্রিয় পুত্রকে কোরবানি করার সদিচ্ছা; তাঁর স্ত্রী হাজর (হাজেরা) এবং তাদের নবজাতককে এক অনুর্বর মরুভূমির উপত্যকায় রেখে আসা, আল্লাহর রিজিকের উপর পূর্ণ আস্থা রেখে; এবং নিজের রবের আনুগত্যের খাতিরে স্বাচ্ছন্দ্য, পরিবার এবং নিশ্চয়তাকে পরিত্যাগ করা।

    হাজীদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য; মক্কায় পৌঁছানোর অনেক আগেই হজের ত্যাগ শুরু হয়ে যায়, কারণ তারা তাদের ব্যবসা, জীবিকা এবং পরিবারকে পেছনে ফেলে আসেন এবং উল্লেখযোগ্য আর্থিক বোঝা কাঁধে তুলে নেন।

    পৌঁছানোর পরও এই ত্যাগ অব্যাহত থাকে। কেবল আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-এর প্রতি ভালোবাসা এবং শুধুমাত্র তাঁর প্রতি আনুগত্যের বশবর্তী হয়ে হাজীরা প্রখর রোদের নিচে পবিত্র আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন। হজ সম্পন্ন করার পর, হাজীরা পশু কোরবানি করেন এবং মাথা মুণ্ডন করেন – এসব হলো বাহ্যিক কাজ, যা আল্লাহর প্রতি তাদের আনুগত্যের অভ্যন্তরীণ নবায়ন এবং অন্য সবকিছু বর্জন করার প্রতীক।

    সুতরাং, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-এর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যখন কোনো ত্যাগের প্রয়োজন হয়, তখন মুসলিমদের কখনোই দ্বিধা করা উচিত নয়।

    হজের মৌসুম ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে, আমরা আমাদের পূর্বসূরিদের ত্যাগের কথা স্মরণ করি: বনু হাশিমের বয়কটের সময় নবী (সা.)-এর কথা আমরা স্মরণ করি; ইসলামের প্রথম শহীদ সুমাইয়া (রা.)-এর কথা, খন্দকের যুদ্ধের সময় সাহাবীদের অবিচলতার কথা; এবং আবু আইয়ুব আল-আনসারী (রা.)-এর কথা, যাকে কনস্টান্টিনোপলের দেয়ালের কাছে সমাহিত করা হয়েছিল।

    এগুলো তো কেবল কয়েকটি উদাহরণ মাত্র। তবে, তাদের বার্তা তাদের মৃত্যু বা শাহাদাতের সাথেই শেষ হয়ে যায়নি; বরং এটি আমাদের সাথে অব্যাহত রয়েছে, যা নিশ্চিত করে যে এই বার্তার বাস্তবায়নের জন্য একই মাত্রার ত্যাগের প্রয়োজন হবে।

    উদাহরণস্বরূপ, উম্মাহকে পঙ্গু করে দেওয়া রাজনৈতিক বিভেদ ত্যাগ ছাড়া দূর হবে না। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর আঁকা কৃত্রিম সীমানাগুলো ত্যাগ ছাড়া ভেঙে পড়বে না। স্বৈরশাসকদের ত্যাগ ছাড়া অপসারণ করা যাবে না। এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠা—যা সমস্ত বাধ্যবাধকতার মুকুট—ত্যাগ ছাড়া আসবে না।

    হজ একটি বার্ষিক অনুস্মারক হিসেবে কাজ করে যে, আমরা বিভক্ত হওয়ার জন্য সৃষ্ট হইনি, বরং এক উম্মাহ গঠনের জন্য সৃষ্ট হয়েছি—যাঁরা এক রব, এক দ্বীন এবং এক উম্মাহতে বিশ্বাসী। সেই ঐক্যে ফিরে যাওয়ার পথ এই ত্যাগের মাধ্যমেই প্রশস্ত হয়।

    পুনর্জাগরণের পথ

    যে প্রশ্নগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা দরকার তা হলো: মুসলিম উম্মাহ যদি রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়, যেমনটা তারা প্রতি বছর হজে আধ্যাত্মিকভাবে করে, তাহলে কী হবে? উম্মাহ কি ঐক্য এবং স্বাধীনতার সক্ষমতা রাখে? আমরা কি ঐক্যবদ্ধ হতে এবং ত্যাগ স্বীকার করতে ইচ্ছুক?

    উত্তরটি দ্ব্যর্থহীন: একটি আধুনিক, সার্বভৌম এবং সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি সম্পদ, প্রতিটি জনসংখ্যাগত সুবিধা এবং প্রতিটি ভৌগোলিক সম্পদ এই উম্মাহর রয়েছে – এমন একটি রাষ্ট্র যা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এবং তাঁর রাসূল (সা.)-কে সন্তুষ্ট করে এমন একটি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য তার বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাবে। ঐশী প্রত্যাদেশের উপর ভিত্তি করে তৈরি একটি ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থার অধীনে, নিপীড়ন কোনো আশ্রয় পাবে না, এবং মুসলমানদের পবিত্রতার কোনো লঙ্ঘন – তাদের জীবন, সম্পদ বা সম্মান – অনুমোদিত হবে না। এমন একটি রাষ্ট্র বিশ্বের কাছে ইসলামকে তুলে ধরবে একদিকে ইসলামের অধীনে ন্যায়বিচার ও শাসনের অখণ্ডতা এবং অন্যদিকে প্রচলিত ধর্মনিরপেক্ষ-পুঁজিবাদী ব্যবস্থার লোভ, বৈষম্য এবং নৈতিক অবক্ষয়ের মধ্যে অনস্বীকার্য পার্থক্যের মাধ্যমে।

    পুনর্জাগরণের পথটি কেবল রাজনৈতিক সংস্কার বা অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয় নয়; বরং এটি ইসলামী জীবনব্যবস্থার পুনরারম্ভ এবং আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সেই অনুযায়ী নবুয়তের আদলে একটি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাকে বোঝায়: একটি খিলাফত যা উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করে, এর মর্যাদা পুনরুদ্ধার করে এবং এটিকে সেই মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে যা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) ঘোষণা করেছেন – মানবজাতির কল্যাণের জন্য উদ্ভূত শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে।

    উম্মাহকে অবশ্যই ত্যাগ স্বীকার করতে হবে এবং এই পুনর্জাগরণের সন্ধানে ও আল্লাহর সন্তুষ্টির অবিচল অনুসন্ধানে আন্তরিকতা প্রদর্শন করতে হবে। নিঃসন্দেহে, যারা এই ডাকে সাড়া দেয় তাদের জন্য এই দুনিয়ার বিজয় এবং আখেরাতের ঐশী পুরস্কার অপেক্ষা করছে।

    [وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْناً يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئاً وَمَنْ كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ]

    “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে এই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি অবশ্যই পৃথিবীতে তাদেরকে শাসনকর্তৃত্ব দান করবেন, যেমন তিনি শাসনকর্তৃত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের দ্বীনকে, যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমারই ইবাদত করবে, আমার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করবে না। এরপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারাই তো অবাধ্য (ফাসিক)।” [আন-নূর: ৫৫]

  • শেয়ার বাজারের বাস্তবতা ও এর শর’ঈ বিধান

    শেয়ার বাজারের বাস্তবতা ও এর শর’ঈ বিধান

    এই প্রবন্ধটি ১৯৯৭ সালে রচিত “The turbulence of the stock markets: Their cause & the Shariah rule pertaining to the causes” নামক বই থেকে নেওয়া হয়েছে।

    পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক চিন্তাধারা হলো একটি সুবিধাবাদী চিন্তাধারা যা মানুষকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিয়ে যায়, কারণ এটি মানুষের নিকৃষ্টতম প্রবৃত্তির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। যেসব সমাজ এই চিন্তাধারা গ্রহণ করেছে তাদের বাস্তবতা হলো, তারা কেবল জীবিকা, উৎপাদন ও ভোগের পেছনে ছুটতে থাকে এবং বস্তুগত মূল্যবোধই তাদের একমাত্র চিন্তার বিষয়। এর বাস্তবতা আরও দেখায় যে, মুষ্টিমেয় কিছু পুঁজিপতি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে, যারা কঠোর পরিশ্রম করে এবং প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন পার করে। এদের বেশিরভাগই চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে এবং কোনোমতে বেঁচে থাকার মতো উপার্জন করতে (তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে) অক্ষম। তবে, পাশ্চাত্যের শেয়ার বাজারগুলোতে বড় কোনো অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের জন্য মুসলমানদের অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই, কেবল এটি উপলব্ধি করার জন্য যে তারা পুঁজিবাদী চিন্তাধারা ও শেয়ার বাজার দ্বারা প্রতারিত হয়েছে এবং এগুলো আসলে মাকড়সার জালের চেয়ে বেশি কিছু নয়। এখনই এগুলোর বাস্তবতা তুলে ধরা, এগুলোর দুর্নীতি উন্মোচন করা এবং ইসলাম যে এসব চিন্তাধারা ও চর্চাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে তা ব্যাখ্যা করা অপরিহার্য।

    পুঁজিবাদী অর্থনীতির তিনটি মৌলিক ব্যবস্থা না থাকলে পাশ্চাত্যে শেয়ার বাজারগুলো কখনোই অস্তিত্ব লাভ করতে পারত না। এগুলো হলো:

    – পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি ব্যবস্থা
    – সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা
    – অপরিবর্তনযোগ্য কাগুজে মুদ্রা ব্যবস্থা

    এই তিনটি ব্যবস্থা একত্রিত হয়ে পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে দুটি অর্থনীতি বা দুই ধরনের বাজারে বিভক্ত করেছে: প্রথমটি হলো প্রকৃত অর্থনীতি (Real Economy), যেখানে উৎপাদন, বিপণন এবং বাস্তব সেবামূলক কাজ সম্পন্ন হয়; আর দ্বিতীয়টি হলো আর্থিক অর্থনীতি (Financial Economy), যাকে অনেকেই পরজীবী অর্থনীতি (Parasite Economy) বলে থাকেন, যেখানে বিভিন্ন আর্থিক কাগজের উদ্ভাবন ও কেনাবেচা হয়। এগুলোকে বাধ্যতামূলক চুক্তি, চেক বা সিকিউরিটিজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা কোনো এক পক্ষের হস্তান্তরযোগ্য অধিকারের প্রতিনিধিত্ব করে এবং যা কেনাবেচা করা যায়—তা কোম্পানির সম্পত্তিতে হোক, তার ঋণে, সরকারি বন্ডে, রিয়েল এস্টেটে অথবা হস্তান্তরযোগ্য আর্থিক কাগজ দ্বারা প্রত্যয়িত অন্য কোনো অধিকারে হোক। এছাড়া, এগুলোকে বর্তমান বাজার দরের চেয়ে ভিন্ন কোনো মূল্যে অন্য একটি নির্দিষ্ট অধিকার কেনা বা বেচার অস্থায়ী বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয় (যেমন: অপশন চুক্তি)। এর কোনোটির সাথেই প্রকৃত অর্থনীতির কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। এই পরজীবী আর্থিক অর্থনীতি এতটাই ফুলেফেঁপে উঠেছে যে এর লেনদেনের মূল্য প্রকৃত অর্থনীতিতে হওয়া লেনদেনকে বহুগুণে ছাড়িয়ে গেছে।

    পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বলা যায়, এটি প্রাথমিকভাবে এমনভাবে গঠন করা হয় যাতে ব্যবসায়ী এবং তাদের ব্যবসাগুলো কোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে পাওনাদার ও ব্যবসায় স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের হাত থেকে নিজেদের বিশাল পুঁজি রক্ষা করতে পারে। এটি তাদের ওইসব সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগও দেয় যারা এসব ব্যবসায় বিনিয়োগ করে। একটি পাবলিক কোম্পানির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো এর দায়বদ্ধতা থাকে সীমিত; সুতরাং, যদি এর ব্যবসা ব্যর্থ হয় এবং লোকসান হয়, তবে যাদের কোম্পানির ওপর অধিকার বা পাওনা রয়েছে, তারা বিনিয়োগকারীদের পুঁজির (শেয়ারহোল্ডিং) পরিমাণ যাই হোক না কেন, তাদের কাছ থেকে কোনো কিছু দাবি করতে পারবে না। তারা কেবল কোম্পানির নিজস্ব মূলধন হিসেবে যা অবশিষ্ট আছে তা-ই দাবি করতে পারবে।

    পাশ্চাত্যে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত প্রথা যে, একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি রাষ্ট্রের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং ঘোষিত হয়, এর প্রতিষ্ঠাতাদের দ্বারা নয়। রাষ্ট্রই এর মেমোরেন্ডাম অফ অ্যাসোসিয়েশন (সংঘস্মারক) ইস্যু করে, এর ব্যবসার ধরন এবং শেয়ারের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেয়। রাষ্ট্রই এর মূল আর্টিক্যালস অফ অ্যাসোসিয়েশন (সংঘবিধি) প্রকাশ করে। তাই, পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির একটি কর্পোরেট বা কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তা রয়েছে যা এর বিনিয়োগকারীদের থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন। এটি কোম্পানির সাথে সংশ্লিষ্ট স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিদেরকে কেবল কোম্পানির কাছে জবাবদিহিতা চাওয়ার অধিকার দেয়, বিনিয়োগকারীদের কাছে নয়। ফলে, কোম্পানির দায়বদ্ধতা কেবল কোম্পানির নিজস্ব অবশিষ্ট সম্পদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং বিনিয়োগকারীদের ব্যক্তিগত অর্থের ওপর বর্তায় না।

    যখন রাষ্ট্র কোনো পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির জন্য মেমোরেন্ডাম অফ অ্যাসোসিয়েশন ইস্যু করে, তখন প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্য থেকে অর্থাৎ যারা কোম্পানি প্রতিষ্ঠার জন্য আবেদন করেছিল তাদের নিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন পরিচালনা পর্ষদ (বোর্ড অফ ডিরেক্টরস) নিয়োগ করে। পর্ষদ একজন চেয়ারম্যান নিয়োগ করে এবং কোম্পানি হস্তান্তরযোগ্য সার্টিফিকেটের আকারে শেয়ার বিক্রি শুরু করে। এই ধরনের শেয়ারের মালিকের কিছু নির্দিষ্ট এবং সীমিত অধিকার থাকে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে কোম্পানি মুনাফা হিসেবে যা বণ্টন করার সিদ্ধান্ত নেয় তা থেকে তার লভ্যাংশ, অথবা কোম্পানি যদি ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তবে কোম্পানির মূলধন থেকে তার প্রাপ্ত অংশ। এছাড়া প্রতি বছর নতুন পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনের জন্য ভোট দেওয়ার অধিকারও তাদের থাকে। তবে, এই সব অধিকার তাদের ধারণকৃত শেয়ারের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, বিনিয়োগকারী ব্যক্তি হিসেবে নয়। উদাহরণস্বরূপ, পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনের সময়, ব্যক্তির সংখ্যার ভিত্তিতে নয় বরং শেয়ারের সংখ্যার ভিত্তিতে ভোট গণনা করা হয়। ফলে, যদি একজন ব্যক্তির কাছে অর্ধেকের চেয়ে একটি শেয়ার বেশি থাকে এবং অবশিষ্ট শেয়ারের মালিক বাকি শেয়ারহোল্ডারদের সংখ্যা ১,০০,০০০ জনও হয়, তবুও সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারের অধিকারী সেই একক শেয়ারহোল্ডারই পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনে নির্ধারক ভোটটি প্রদান করবে এবং অন্যান্য শেয়ারহোল্ডারদের ভোটের কোনো মূল্যই থাকবে না।

    কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ব্যবসায়ীদের সাধারণত একটি কোম্পানির অর্ধেক শেয়ারের প্রয়োজন হয় না, কখনো কখনো ৫% বা ১০% শেয়ারই যথেষ্ট হয়। এর কারণ হতে পারে যে বেশিরভাগ ছোট শেয়ারহোল্ডাররা বিক্ষিপ্ত থাকে, অথবা একটি পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচন করার জন্য একদল বড় শেয়ারহোল্ডারের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা গড়ে ওঠে, যা সকল শেয়ারহোল্ডারের মূলধন নিয়ন্ত্রণ করে এবং কোম্পানির সমস্ত বিষয়াদি পরিচালনা করে। এটি একটি দৃশ্যমান বাস্তবতা যা সবাই উপলব্ধি করতে পারে এবং এমন বাস্তবতার সামনে শেয়ার বাজারে কোম্পানির শেয়ার লেনদেন করা ছাড়া কোম্পানিতে বিনিয়োগকৃত নিজস্ব মূলধনের ওপর বেশিরভাগ শেয়ারহোল্ডারের কোনো কর্তৃত্বই থাকে না। প্রকৃতপক্ষে এটি তাদেরকে কোম্পানির অংশীদার বানায় না, বরং কেবলমাত্র কোম্পানির শেয়ার সার্টিফিকেটের মালিক বানায়, যা তারা কোম্পানি বা এর শেয়ারহোল্ডারদের অনুমতি ছাড়াই শেয়ার বাজারে কেনাবেচা করে।

    অধিকন্তু, শেয়ার বাজারগুলো নিয়ন্ত্রণকারী শেয়ারহোল্ডারদের কারও অনুমতি না নিয়ে এবং কাউকে না জানিয়ে তাদের শেয়ার বিক্রি করতে সক্ষম করে। সুতরাং, তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এবং পরিচালিত কোম্পানির কার্যকলাপ সংক্রান্ত যেকোনো দায়বদ্ধতা থেকে সহজেই হাত ধুয়ে ফেলতে পারে। এছাড়াও, যখন তারা আরও শেয়ার কিনতে চায়—তা ওই একই কোম্পানির হোক বা অন্য কোনো কোম্পানির—তাদের কারও সাথে পরামর্শ করার প্রয়োজন হয় না। কিছু শেয়ার কেনা এবং কিছু বিক্রি করার পেছনে তাৎক্ষণিক মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যই তাদের প্ররোচিত করে; তাই, যদি তাদের নিয়ন্ত্রিত কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়ে যায়, তবে তারা তাদের সব বা কিছু শেয়ার বিক্রি করে দেয়, আবার দাম কমে গেলে তারা তাদের শেয়ারগুলো পুনরায় কিনে নেয়। অতএব, কোম্পানি, অন্যান্য শেয়ারহোল্ডার, কোম্পানির ব্যবসা বা এর কর্মীদের প্রতি তাদের কোনো আনুগত্য থাকে না। পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে কোনো একটি নির্দিষ্ট কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রণ করার পেছনে পুঁজিপতিদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে এর কার্যক্রমকে এমনভাবে প্রভাবিত করা যাতে এর শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পায়।

    এই সব কিছুই শেয়ার বাজার ও অন্যান্য সিকিউরিটিজ এবং প্রকৃত অর্থনীতি—অর্থাৎ যেসব কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয় তাদের বাস্তবতার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি করেছে। যে বিষয়টি এই সত্যকে নিশ্চিত করে তা হলো সেই অনুপাত (মূল্য/আয় অনুপাত বা price/earnings ratio) যা ট্রেডাররা শেয়ার বাজারে প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করে এবং এটিকে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি ও হ্রাসের পরিমাপক হিসেবে ব্যবহার করে। এটি হলো শেয়ারের বর্তমান দামের সাথে কোম্পানি কর্তৃক প্রতিটি একক শেয়ারের জন্য প্রদত্ত বার্ষিক লভ্যাংশের অনুপাত। উদাহরণস্বরূপ, যদি একটি একক শেয়ারের বার্ষিক মুনাফা ২ ডলার হয় এবং শেয়ার বাজারে শেয়ারটির দাম ৪০ ডলার হয়, তবে মূল্য/আয় অনুপাত হবে ২০। অন্য কথায়, প্রতি শেয়ারে কোম্পানির মুনাফা হবে সেই শেয়ারের দামের ৫%। সংবাদপত্রগুলো শেয়ার বাজারে লেনদেন হওয়া সব কোম্পানির জন্য প্রতিদিন এই অনুপাতগুলো প্রকাশ করে। এই অনুপাতগুলো পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে সেগুলো একে অপরের থেকে অনেক বেশি আলাদা। কিছু কোম্পানির ক্ষেত্রে এই হার ১০০ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, আবার অন্যদের ক্ষেত্রে তা ৫-এর মতো কমও হতে পারে। এটি সিকিউরিটিজ ও শেয়ার বাজার এবং প্রকৃত অর্থনীতি ও কোম্পানির বাস্তবতার মধ্যকার সম্পর্কের ফাটলকে নির্দেশ করে। এটি এও নির্দেশ করে যে শেয়ার বাজার একটি বিশাল জুয়ার আড্ডায় (ক্যাসিনো) পরিণত হয়েছে। ফটকা কারবার (Speculation) শেয়ার বাজারগুলোতে আধিপত্য বিস্তার করে আছে, আর তীব্র ও বারবার ওঠানামা বাজারের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।

    পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আলোচনা এখানেই শেষ। আর সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রে, এটিকে পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রধান বিপর্যয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি এজন্য যে, এর বদৌলতে ব্যাংকগুলো আমানত বা ডিপোজিটের নামে মানুষের অর্থ সংগ্রহ করতে পেরেছে এবং এমনভাবে মানুষের অর্থ ব্যয় করতে পেরেছে যেন সেগুলো আমানতকারীদের অর্থ নয়, বরং ব্যাংকেরই অর্থ। তারা আমানতকারীদের কাছ থেকে তহবিল হিসেবে যা সংগ্রহ করে তা পুঁজিপতি এবং ব্যবসায়ী—যার মধ্যে শেয়ার বাজারের ট্রেডাররাও অন্তর্ভুক্ত—তাদেরকে ঋণ দিয়ে এবং কিছু ক্ষেত্রে আমানতকারীদের নিজেদেরকেই ঋণ দিয়ে প্রতিটি ঋণের জন্য একটি গ্যারান্টিযুক্ত সুদের হার আদায় করে তাদের সংগৃহীত অর্থকে বৈধতা দিতেও সক্ষম হয়েছে।

    তবে, এই বৈধকরণের প্রক্রিয়াটি কেবল আংশিক। এর কারণ হলো, ব্যাংকের মালিকরা, যাদের অধিকাংশই পুঁজিপতি এবং তাদের কোম্পানি, ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পায় এবং এই ঋণগুলো দেওয়া হয় হ্রাসকৃত সুদের হারে। খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি কম—এই অজুহাতে অন্যান্য পুঁজিপতি এবং ব্যবসায়ীরা তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকে। সবশেষে আসে সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে ছোট ব্যবসায়ী এবং ভোক্তারা। সুদের হারের এই বৈষম্যের মাধ্যমে এই পক্ষপাতিত্ব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকায় পুঁজিপতি এবং বড় কোম্পানিগুলোকে দেওয়া ঋণের সুদের হার ৫.৮% থেকে শুরু করে গাড়ি কেনার জন্য দেওয়া ঋণের ক্ষেত্রে তা ২০% পর্যন্ত হয়ে থাকে। উপসংহারে বলা যায়, সুদী ব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবেই মানুষের অর্থকে খুব অল্প কিছু মানুষের মধ্যে আবর্তিত করতে ভূমিকা রাখে।

    প্রকৃত অর্থনীতিতে ব্যাংকের ভূমিকার চেয়ে শেয়ার বাজারে তাদের ভূমিকা অনেক বেশি বিপজ্জনক। এটি এজন্য যে, তারা শেয়ার ব্যবসায়ীদের এমন অঙ্কের ঋণ দেয় যা তাদের কাছে থাকা নগদের চেয়ে বহুগুণ বেশি। উদাহরণস্বরূপ, শেয়ার বাজারে ১০০ ডলার মূল্যের একটি শেয়ার ক্রেতার নিজের নগদ অর্থ থেকে ৫ ডলার এবং ব্যাংক থেকে ধার করা ৯৫ ডলার, অথবা ব্রোকারেজ হাউস—যারা আবার ব্যাংক থেকে ধার করে—তাদের কাছ থেকে ধার করা অর্থ দিয়ে কেনা যেতে পারে। এর মানে হলো, যে ব্যক্তি শেয়ার বাজারে লেনদেন করেন, তিনি এমন সংখ্যক শেয়ার কিনতে পারেন যার দাম তার কাছে থাকা নগদ অর্থের ক্রয়ক্ষমতার চেয়ে বিশ গুণ বেশি। তবে ব্যাংক অত্যন্ত ধনী পুঁজিপতি ছাড়া অন্য কাউকে এই ধরনের ঋণ দেয় না; এর মানে হলো, কেবল সেই ব্যক্তিরাই ব্যাংকের বদৌলতে বাজারে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে পারবে, এবং ফলস্বরূপ, এই বাজারগুলোর ওপর তাদের প্রভাব বাড়াতে পারবে এবং আমানতকারী বা ব্যবসায়ীদের মতো সাধারণ মানুষের মূল্যে নিজেদের সম্পদ বৃদ্ধি করতে পারবে।

    যেহেতু শেয়ার হিসেবে যা কিছু কেনা হয় তার বেশিরভাগই এমন ঋণ দ্বারা অর্থায়িত হয় যা সেগুলোর মূল্যকে ব্যাপকভাবে ছাড়িয়ে যায়, তাই শেয়ারের দামে তীব্র পতনের পর প্রায়ই আরও বড় পতন ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো ব্যাংক কোনো ট্রেডারকে তার ক্রয় করতে চাওয়া শেয়ারের মূল্যের ৯০% ঋণ দিতে সম্মত হয় এবং এই ট্রেডার যদি ১,০০০,০০০ ডলারের শেয়ার কেনে, তবে ব্যাংক থেকে তার ঋণ হবে ৯০০,০০০ ডলার। তারপর যদি আমরা ধরে নিই যে তার শেয়ারের দাম ২০% কমে গেছে, অর্থাৎ তা ৮০০,০০০ ডলারে নেমে এসেছে, তবে অনুমোদিত ঋণটি হবে ৭২০,০০০ ডলার, অর্থাৎ ৮০০,০০০ ডলারের ৯০%। এই ক্ষেত্রে, শেয়ারের মূল্যের ৯০% ঋণের অনুপাত বজায় রাখার জন্য তাকে অবিলম্বে ব্যাংককে তার ঋণের ১৮০,০০০ ডলার পরিশোধ করতে হবে। যদি তার কাছে অর্থ থাকে তবে সে তার কোনো শেয়ার বিক্রি করতে বাধ্য হবে না, কিন্তু যদি তার কাছে অর্থ না থাকে তবে ব্যাংকের কাছে তার বকেয়া ঋণ পরিশোধ করার জন্য তাকে অবিলম্বে তার শেয়ার বিক্রি করতে বাধ্য হতে হবে। এটি বাজারে শেয়ারের সরবরাহ বাড়িয়ে দেবে এবং দাম আরও কমার দিকে নিয়ে যাবে। যদি অনেক ট্রেডার একই পরিস্থিতিতে পড়ে, তবে এটি দামের ক্রমাগত পতনের দিকে নিয়ে যাবে এবং সম্ভবত বাজারে এক চরম অস্থিরতা সৃষ্টি করবে।

    অতএব, শেয়ার বাজারে সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভূমিকা লেনদেন এবং দাম বাড়ানো (স্ফীতি) এবং কমানোর (সংকোচন) মধ্যে ওঠানামা করে। তাই, যখন কিছু নির্দিষ্ট শেয়ারের দাম বাড়ে, ব্যাংকগুলো সেই নির্দিষ্ট শেয়ারে লেনদেনকারীদের বড় অঙ্কের ঋণ দিতে আগ্রহী হয়, যা তাদের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই ট্রেডাররাও তখন ছুটে গিয়ে আরও শেয়ার কিনতে শুরু করে এবং দাম বাড়তে বাড়তে একটি অতিরঞ্জিত পর্যায়ে পৌঁছায়। তবে, পরিস্থিতি রাতারাতি বদলে যেতে পারে। কোনো গুজব বা কোনো প্রকল্পের ব্যর্থতার মতো যেকোনো কারণে কিছু নির্দিষ্ট শেয়ারের দাম পড়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো তাদের ঋণদান কমিয়ে দেয় কারণ যেসব শেয়ার ট্রেডারদের দেওয়া ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে কাজ করছিল সেগুলোর দাম কমে যায়। এই ট্রেডাররা তখন তাদের কিছু বা সমস্ত শেয়ার বিক্রি করার পথ বেছে নেয় এবং এটি অতিরঞ্জিত পর্যায়ে থাকা দামের দ্রুত পতন ঘটাতে শুরু করে। ফলস্বরূপ, শেয়ারের দামের ক্রমাগত পতনের কারণে ব্যাংকগুলো তাদের ঋণ আরও কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়।

    ব্যাংকগুলো এই তহবিল কোথা থেকে পায় এবং যখন তারা তাদের ঋণ কমিয়ে দেয় তখন তারা এগুলো কোথায় নিয়ে যায়—এই প্রশ্নের উত্তর হলো, এই তহবিলগুলো মূলত আমানতকারীদের। সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলো মানুষের সঞ্চয় ব্যাংকে রাখার ওপর নির্ভরশীল। তারা এই বাস্তবতার ওপরও নির্ভর করে যে একটি অ্যাকাউন্ট থেকে যা কিছু তোলা হয় তার বেশিরভাগই একই ব্যাংক বা অন্য কোনো ব্যাংকের অন্য একটি অ্যাকাউন্টে গিয়ে জমা হয় এবং বেশিরভাগ অর্থ ব্যাংকেই থেকে যায়। ব্যাংক ঋণগ্রহীতাদের যা ঋণ দেয় তা আসলে ব্যাংক জমা থেকে বেরিয়ে যাওয়া বস্তুগত অর্থ নয়, বরং এটি একটি অ্যাকাউন্টের অর্থ, যা ব্যাংক ঋণগ্রহীতার জন্য দুটি অ্যাকাউন্ট খুলে তৈরি করে—একটি তার ঋণের জন্য এবং আরেকটি ঋণ থেকে উৎপন্ন অর্থের অ্যাকাউন্ট হিসেবে, যাতে ঋণগ্রহীতা তার প্রয়োজনীয় অর্থ তুলে নিতে পারে। যদি বেশিরভাগ আমানতকারী এবং ঋণগ্রহীতা তাদের আমানত একবারে নগদে তুলে নিতে চায়, তবে তারা তা করতে পারবে না, কারণ সেই আমানতগুলোর বেশিরভাগই ঋণে পরিণত হয়েছে যা হয়তো ক্ষতি হয়েছে বা অন্য ব্যাংকে থাকতে পারে, এবং তাই সেগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে নগদায়ন করা যায় না। এমন ক্ষেত্রে, প্রায়ই ব্যাংকটিকে বন্ধ করে দিয়ে গুটিয়ে ফেলতে হয়।

    সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যাংকগুলোর ওপর আস্থার ওপর এবং মানুষের আমানত নিরাপদ—অর্থাৎ তারা যখন খুশি তাদের সব আমানত তুলে নিতে পারে—এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। তবে, এই বক্তব্যটি প্রতারণামূলক এবং ব্যাংকের বাস্তবতার বিপরীত। পাশ্চাত্যে এবং বিশ্বের অন্যান্য অংশে এই প্রতারণা বেশ কয়েকবার উন্মোচিত হয়েছে, যখন আমানতকারীরা তাদের আমানত তুলতে পারেনি এবং ফলস্বরূপ বিপুল পরিমাণ অর্থ হারিয়েছে এবং ব্যাংকগুলো বন্ধ বা দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়েছে। তাই, পাশ্চাত্য অপরিবর্তনযোগ্য কাগুজে মুদ্রা (Inconvertible Paper Money) আবিষ্কার করেছে, যা ‘বাধ্যতামূলক বিল’ (Compulsory Bills) নামেও পরিচিত। এই অপরিবর্তনযোগ্য মুদ্রার তদারকি করার দায়িত্ব সরকার কর্তৃক একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর ন্যস্ত থাকে। আর এই সবই করা হয় নিছক সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো ঢাকতে, এটি যে প্রতারণার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে সেই সত্যকে আড়াল করতে, এটিকে ধসে পড়ার হাত থেকে বাঁচাতে এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা বজায় রাখতে।

    অপরিবর্তনযোগ্য কাগুজে মুদ্রা ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মুদ্রিত কাগজের আকারে এমন একটি মুদ্রা ইস্যু করার ক্ষমতা দেয় যার নিজস্ব কোনো অন্তর্নিহিত মূল্য নেই এবং যা সারা দেশে প্রচলিত থাকে। সরকার দেশের মানুষকে তাদের আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে এই মুদ্রা গ্রহণ করতে বাধ্য করে। দেশের কোনো নাগরিক যদি তার পাওনা ঋণের নিষ্পত্তি হিসেবে এই কাগজ নিতে অস্বীকার করে, তবে আইন ও আদালত তাকে তা গ্রহণ করতে বাধ্য করবে; অন্যথায় সে তার দাবি এবং অধিকার হারাবে।

    এর মানে হলো, সরকারের নীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত অর্থ ইস্যু করার অধিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংরক্ষণ করে। উদাহরণস্বরূপ, সরকার যখন কর বা অন্যান্য উপায়ে আদায় করা অর্থ ফুরিয়ে ফেলে, তখন সে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শরণাপন্ন হয় এবং তার কাছ থেকে ঋণ নেয়। যা ধার করা হয় তার বিপরীতে একটি ঋণ লিপিবদ্ধ করা হয় এবং একটি জমা অ্যাকাউন্ট খোলা হয় যাতে সরকারি কোষাগার তার ব্যয় মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ তুলতে পারে। এটিকে নতুন অর্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি মনে করে যে ঋণগ্রহীতাদের ঋণ দেওয়ার জন্য দেশে আরও অর্থের প্রয়োজন, তবে তারা প্রচুর এক্সচেকার বিল (সরকারি বিল) বা কোম্পানির সিকিউরিটিজ কিনবে এবং যারা এগুলো বিক্রি করে তাদের অ্যাকাউন্টে—তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকেই হোক বা বাণিজ্যিক ব্যাংকে—এই বিলগুলোর মূল্য লিপিবদ্ধ করবে। এটিও নতুন অর্থ হিসেবে গণ্য হবে।

    এর একটি উদাহরণ হলো ১৯৮৭ সালের অক্টোবরে যা ঘটেছিল, যখন নিউইয়র্কে একদিনেই শেয়ারের দাম ২২% পড়ে যায়। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাৎক্ষণিকভাবে প্রচুর পরিমাণ অর্থ ইস্যু করে এবং ধাক্কার প্রভাব সামাল দিতে এটি ব্যাংকগুলোর হাতে তুলে দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোটি কোটি ডলার মূল্যের বিল (সিকিউরিটিজ) কিনে নেয় এবং এই পরিমাণ অর্থ ব্যাংকগুলোর হাতে রাখে, যাতে তারা শেয়ার বাজারের ব্যবসায়ীদের ঋণ দিতে পারে এবং তাদের কষ্ট লাঘব করতে পারে; নিউইয়র্কের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক সিটিব্যাংক বন্ধ হতে চলেছে—এমন গুজব ছড়ানো সত্ত্বেও এই ব্যবস্থাটি সাময়িকভাবে ঝড় সামলাতে এবং সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো আড়াল করতে সফল হয়েছিল।

    কাগুজে মুদ্রা ছাপিয়ে অর্থ ইস্যু করা এবং তা সরকার বা মানুষের অ্যাকাউন্টে রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, আর এই খরচের বোঝা সাধারণ মানুষের ঘাড়েই চাপে, যারা বেশিরভাগ সময় এর কারণগুলো বুঝতে ব্যর্থ হয়। এর কারণ হলো, প্রচলিত অর্থের বৃদ্ধি মুদ্রার মূল্যহ্রাসের দিকে নিয়ে যায়; তাই এই ব্যবস্থার অন্যতম একটি ত্রুটি হলো এটি সর্বদা পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধিতে ভোগে। এই মূল্যবৃদ্ধির বাস্তবতা, যাকে কেউ কেউ মুদ্রাস্ফীতি বলে, তা আসলে মানুষের অর্থের মূল্য হ্রাস এবং তাদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মানের অবনতি। তবে, এই ব্যবস্থার প্রধান ত্রুটি হলো এটি একটি বিশ্বাসগত প্রতারণার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, অর্থাৎ এই প্রতারণা যে কাগুজে মুদ্রার একটি মূল্য আছে, যেখানে আসলে এর কোনো অন্তর্নিহিত মূল্য নেই; তবে দেশের আইন এটিকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দিয়েছে এবং বিচার বিভাগের চোখে এটিকে বৈধ মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এ কারণেই আমরা দেখতে পাই যে, যখন কোনো দুর্বল দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সহজেই অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং যখন রাষ্ট্রের প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রভাব ক্ষুণ্ণ হয়, তখন তার কাগুজে মুদ্রা খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তার শাসকরা প্রায়ই বিশ্বাসগত প্রতারণাটি নতুন করে শুরু করতে এবং মুদ্রার মূল্যের ব্যাপারে মানুষকে ধোঁকা দিতে অন্যান্য মুদ্রার তুলনায় নিজ দেশের মুদ্রার মূল্য হ্রাস করার (অবমূল্যায়ন) আশ্রয় নেয়।

    পাশ্চাত্যের এবং পাশ্চাত্যকে অনুসরণ ও অনুকরণকারী প্রতিটি দেশের শেয়ার বাজারগুলোর বাস্তবতা এটাই। শেয়ার বাজারগুলো হলো ব্যবসায়ীদের প্রজনন ক্ষেত্র, কারণ তারা এমন কোনো পণ্য উৎপাদন করে না যা মানুষের কাজে লাগতে পারে এবং ব্যবসায়ীদের জন্য দ্রুত ও সহজ মুনাফা ছাড়া আর কোনো প্রণোদনা সেখানে থাকে না। শেয়ার বাজারগুলো অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে ক্যাসিনোর সাথেই বেশি তুলনীয়। এগুলো মাকড়সার জালের মতো যা সহজেই কেঁপে উঠে। এগুলো পুঁজিবাদী লোভ এবং বস্তুগত মূল্যবোধের পেছনে হাঁসফাঁস করার প্রতীকের প্রতিনিধিত্ব করে। যদি পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেমন পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি, সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং অপরিবর্তনযোগ্য কাগুজে মুদ্রা না থাকত, তবে এই পরজীবী বাজারগুলোর অস্তিত্বই থাকত না এবং এগুলো টিকে থাকতে পারত না। পাশ্চাত্যের এবং পাশ্চাত্যকে অনুসরণ ও অনুকরণকারী প্রতিটি দেশের শেয়ার বাজারগুলোর বাস্তবতা এটাই।

    এ বিষয়ে শর’ঈ বিধান নিচে দেওয়া হলো:

    পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি ব্যবস্থা পাবলিক কোম্পানিকে সীমিত দায়ের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য প্রদান করে, যার উদ্দেশ্য হলো কোম্পানি ব্যর্থ হলে ও লোকসান করলে বড় বড় পুঁজিপতি ও ব্যবসায়ীদের রক্ষা করা। এক্ষেত্রে, যাদের কোম্পানির কাছে দাবি বা পাওনা রয়েছে, তারা বিনিয়োগকারীদের ব্যক্তিগত সম্পদ যতই বিশাল হোক না কেন, তাদের কাছ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবে না। আর্থিক দাবিগুলো কেবল কোম্পানির নিজস্ব সম্পদ হিসেবে যা অবশিষ্ট আছে তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই ব্যবস্থা প্রতিটি দিক থেকেই শরীয়তের পরিপন্থী। শরয়ী বিধান সবাইকে ন্যায্য পাওনাদারদের কাছে তাদের ঋণ পুরোপুরি পরিশোধ করতে বাধ্য করে, এবং তা থেকে কোনো কিছু কেটে নেওয়া নিষিদ্ধ।

    ইমাম বুখারী (রহ.) আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন:

    “‏ مَنْ أَخَذَ أَمْوَالَ النَّاسِ يُرِيدُ أَدَاءَهَا أَدَّى اللَّهُ عَنْهُ، وَمَنْ أَخَذَ يُرِيدُ إِتْلاَفَهَا أَتْلَفَهُ اللَّهُ ‏”

    “যে ব্যক্তি পরিশোধের নিয়তে মানুষের সম্পদ গ্রহণ করে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করে দেন, আর যে তা নষ্ট করার নিয়তে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করে দেন।”

    ইমাম আহমদ (রহ.)ও আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যিনি বলেন: আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন:

    لَتُؤَدُّنَّ ‌الْحُقُوقَ ‌إِلَى ‌أَهْلِهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ، حَتَّى يُقْتَصَّ لِلشَّاةِ الْجَمَّاءِ مِنَ الشَّاةِ الْقَرْنَاءِ نَطَحَتْهَا

    “কিয়ামতের দিন তোমরা অবশ্যই পাওনাদারদের অধিকার ফিরিয়ে দেবে, এমনকি শিংবিহীন ছাগল শিংযুক্ত ছাগলটিকে পাল্টা গুঁতো দিয়ে তার প্রতিশোধ নেবে।”

    অতএব, আল্লাহর রাসূল (সা.) দুনিয়ার জীবনে কারও অধিকার পুরোপুরি আদায় করার বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করেছেন, আর যদি কেউ তা না করে তবে সে কিয়ামতের দিন তা করবে। এটি যারা মানুষের অধিকার গ্রাস করে তাদের জন্য একটি সতর্কবাণী হিসেবে কাজ করে।

    ধনী ব্যক্তিদের ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করাকে শরীয়ত একটি অন্যায় কাজ হিসেবে গণ্য করেছে। ইমাম বুখারী (রহ.) আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যিনি বলেন: আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন:

    مَطْلُ الْغَنِيِّ ظُلْمٌ

    “ধনী ব্যক্তির (ঋণ পরিশোধে) টালবাহানা করা একটি জুলুম।”

    যদি ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করা জুলুম হয়, তবে অধিকার গ্রাস করা এবং ঋণ পরিশোধ না করাটা কেমন হবে? নিঃসন্দেহে এটি একটি বৃহত্তর অন্যায় এবং এটি গুরুতর শাস্তির দাবি রাখে। আল্লাহর রাসূল (সা.) আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে যারা উত্তম তারাই শ্রেষ্ঠ মানুষ। কারণ ইমাম বুখারী (রহ.) বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন:

    فَإِنَّ خَيْرَكُمْ أَحْسَنُكُمْ قَضَاءً

    “প্রকৃতপক্ষে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম তারাই, যারা ঋণ পরিশোধে সবচেয়ে উত্তম।”

    অতএব, কোম্পানির লোকসান সমন্বয় করার পর যাদের কোম্পানির কাছে পাওনা রয়েছে তাদের ঋণ পরিশোধকে শুধুমাত্র অবশিষ্ট সম্পত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করা নিষিদ্ধ। বরং বিনিয়োগকারীদের সম্পদ থেকে তাদের প্রাপ্য অধিকার বা ঋণ পুরোপুরি পরিশোধ করতে হবে।

    এই হলো পাবলিক কোম্পানিগুলোকে সীমিত দায় দেওয়ার কথা। আর পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিগুলো নিজেই ইসলামে অংশীদারি ব্যবসার (কোম্পানির) নিয়মের পরিপন্থী। এর কারণ হলো, পাবলিক কোম্পানির তাদের নিজস্ব সংজ্ঞা অনুযায়ী: “এটি এমন একটি চুক্তি যেখানে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি অঙ্গীকার করে যে তাদের প্রত্যেকেই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিয়ে একটি আর্থিক প্রকল্পে অংশগ্রহণ করবে, এবং এর ফলে এই প্রকল্প থেকে যে মুনাফা বা লোকসান হবে তা তারা ভাগ করে নেবে।” এই সংজ্ঞা এবং পাবলিক কোম্পানি বা জয়েন্ট স্টক কোম্পানি প্রতিষ্ঠার বাস্তবতা অনুযায়ী, এটি স্পষ্ট যে এটি ইসলামী শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী দুই বা ততোধিক ব্যক্তির মধ্যে কোনো চুক্তি নয়। কারণ শরীয়ত অনুযায়ী চুক্তি দুই পক্ষের মধ্যে প্রস্তাব (ইজাব) ও গ্রহণের (কবুল) ভিত্তিতে হতে হবে। অন্য কথায়, চুক্তিতে দুটি পক্ষ থাকা উচিত। এক পক্ষ প্রস্তাব দেয়, অর্থাৎ সে এই বলে চুক্তির সূচনা করে: “আমি আপনার সাথে অংশীদারিত্বে প্রবেশ করলাম” বা এই জাতীয় কোনো কথা; এবং অন্য পক্ষ গ্রহণ প্রকাশ করে এই বলে: “আমি গ্রহণ করলাম” বা “আমি রাজি” বা এই জাতীয় কোনো কথা। যদি চুক্তিতে দুটি পক্ষের উপস্থিতি এবং প্রস্তাব ও গ্রহণের উপস্থিতি না থাকে, তবে কোনো চুক্তি সম্পাদিত হতে পারে না এবং কোনো কিছুকেই বৈধ চুক্তি বলা যায় না।

    পাবলিক কোম্পানিতে অংশ নেওয়া কেবল এর শেয়ার কেনার মাধ্যমেই কার্যকর হতে পারে, তা কোম্পানির কাছ থেকেই হোক বা আগে থেকে শেয়ার কিনেছে এমন কারও কাছ থেকেই হোক। শেয়ারহোল্ডারের অংশীদারিত্ব কোম্পানি বা অন্য কোনো শেয়ারহোল্ডারের সাথে কোনো আলোচনা বা চুক্তির দাবি রাখে না। প্রথম থেকেই যা একটি পাবলিক কোম্পানিকে অস্তিত্বে আনে এবং যা একে শেয়ারহোল্ডারদের থেকে স্বাধীন নিজস্ব কৃত্রিম সত্তা বা আইনি সত্তা প্রদান করে, তা হলো সরকার। সরকারই “মেমোরেন্ডাম অফ অ্যাসোসিয়েশন” ইস্যু করে। আর প্রতিষ্ঠাতাদের ক্ষেত্রে, তাদের মধ্যে একমাত্র চুক্তি হলো কোম্পানি প্রতিষ্ঠার জন্য তারা সরকারের কাছে যে আবেদন জমা দিয়েছিল তা। যখন “মেমোরেন্ডাম অফ অ্যাসোসিয়েশন” ইস্যু হয়, কোম্পানি কার্যকরভাবে নিজের বিষয়গুলোর দায়িত্বে নিয়োজিত হয় এবং সেভাবেই এটি প্রতিষ্ঠাতা ও অন্যান্য মানুষের কাছে শেয়ার বিক্রি করে।

    এখানে এটা স্পষ্ট যে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো চুক্তি হচ্ছে না এবং সেখানে কোনো প্রস্তাব ও গ্রহণ নেই, কারণ একটিমাত্র শেয়ার কিনলেও যেকোনো ব্যক্তি অংশীদার হয়ে যায়। তাই, পাবলিক কোম্পানি কোনো দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি নয়। বরং এটি একটি কোম্পানিতে অংশীদার হওয়ার জন্য কোনো ব্যক্তির নেওয়া একক সিদ্ধান্ত। সুতরাং, সে কেবল কোম্পানির একটি শেয়ার কিনেই অংশীদার হয়ে যায়। পাশ্চাত্যের আইন বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের কাজকে চুক্তি মেনে চলা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যদিও তা একতরফা হয়। তাদের মতে, এটি নিজের ইচ্ছা প্রকাশের একটি উপায়, যেখানে একজন ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে বা জনসাধারণের কাছে নিজেকে কোনো বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করে, অন্য ব্যক্তি বা জনসাধারণের সম্মতি বা অসম্মতি নির্বিশেষে। অতএব, পাবলিক কোম্পানির চুক্তিটি শরীয়ত অনুযায়ী অবৈধ। এর কারণ হলো, শরীয়তের বিধান অনুযায়ী চুক্তিতে এক পক্ষের দেওয়া প্রস্তাব এবং অন্য পক্ষের গ্রহণের মধ্যে এমন একটি যোগসূত্র থাকা আবশ্যক, যা চুক্তিকৃত বিষয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। কিন্তু পাবলিক কোম্পানির চুক্তির ক্ষেত্রে এটি ঘটে না।

    পাবলিক কোম্পানির বাস্তবতা ইসলামে কোম্পানির বাস্তবতার বিপরীত। ইসলামে কোম্পানি হলো: “মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে একটি আর্থিক উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য দুই বা ততোধিক পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি।” তাই এটি দুই বা ততোধিক পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি; সুতরাং এটি একতরফা হতে পারে না। বরং দুই বা ততোধিক পক্ষের মধ্যে একটি সম্মতি হতে হবে। চুক্তিটি নিজেই মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে একটি আর্থিক লেনদেন গ্রহণের ওপর ভিত্তি করে হতে হবে। চুক্তিটি নিছক অর্থ প্রদানের ওপর ভিত্তি করে হওয়াটা মানানসই নয়। শুধু অংশীদারিত্বে প্রবেশের উদ্দেশ্যে এমনটা করাও যুক্তিসঙ্গত নয়। তাই, কোম্পানি চুক্তিতে আর্থিক উদ্যোগ গ্রহণ করাই হলো মূল ভিত্তি।

    এই কাজটি চুক্তিবদ্ধ সব পক্ষের দ্বারা বা অন্ততপক্ষে তাদের একজনের দ্বারা, অথবা একপক্ষের শ্রম এবং অন্যপক্ষের মূলধনের সমন্বয়ে পরিচালিত হওয়া উচিত। চুক্তিকারীদের বা তাদের অন্তত একজনের দ্বারা এই আর্থিক উদ্যোগ গ্রহণ করার ফলে কমপক্ষে একজন সশরীরে কাজ করা (Physical) অংশীদারের উপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে ওঠে, যাকে চুক্তির অংশ হতে হবে। তাই ইসলামে সব ধরনের কোম্পানিতে কমপক্ষে একজন সশরীরে কাজ করা অংশীদারের উপস্থিতি পূর্বশর্ত। এটি কোম্পানি চুক্তির একটি মৌলিক উপাদানও। যদি দৈহিক শ্রমদানকারী অংশীদার উপস্থিত থাকে, তবে অংশীদারিত্ব চুক্তি সম্পাদিত হয়, অন্যথায় অংশীদারিত্ব চুক্তি সম্পাদিত হতে পারে না।

    এটি প্রমাণ করে যে পাবলিক কোম্পানিতে অংশীদারিত্ব চুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় শর্তগুলোর অভাব রয়েছে, কারণ যারা পাবলিক কোম্পানিতে নিজেদের অংশীদার হিসেবে দাবি করে তারা কেবল মূলধনের অংশীদার এবং সেখানে সশরীরে কাজ করা কোনো অংশীদার নেই; যদিও কোম্পানির চুক্তিতে দৈহিক শ্রমদানকারী অংশীদারের উপস্থিতি অপরিহার্য। পাবলিক কোম্পানিগুলোতে অংশীদারিত্ব কেবল মূলধন বিনিয়োগকারী অংশীদারদের উপস্থিতির মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। পাবলিক কোম্পানি কোনো শ্রমদানকারী অংশীদারের উপস্থিতি ছাড়াই এর কার্যক্রম পরিচালনা করে। শরীয়ত অনুযায়ী, যিনি কেবল মূলধনের অংশীদার, কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনা করার কোনো অধিকার তার নেই, বা অংশীদার হিসেবে কোম্পানিতে কাজ করার অধিকারও তার নেই। কোম্পানি চালানো এবং কোম্পানিতে কাজ করার অধিকার কেবল শ্রমদানকারী অংশীদারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পাবলিক কোম্পানিতে অংশীদারিত্ব কেবল মূলধনের অংশীদারিত্বের ওপর ভিত্তি করে হয়, ব্যক্তিদের অংশীদারিত্বের ওপর নয়। ফলে, যার যত বেশি শেয়ার, তার তত বেশি ভোট এবং যার যত কম শেয়ার, তার তত কম ভোট থাকে। এছাড়া, পশ্চিমাদের মতে, পাবলিক কোম্পানির একটি আইনি বা কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তা রয়েছে যার ক্ষমতা ব্যবহারের অধিকার আছে। আবারও, শরীয়ত অনুযায়ী, ক্ষমতা ব্যবহারের অধিকার কেবল এমন একজন ব্যক্তিকেই দেওয়া যেতে পারে যার সেটির যোগ্যতা রয়েছে। এমন কোনো কার্যক্রম যা এই পদ্ধতিতে পরিচালিত হয় না তা শরীয়তের দৃষ্টিতে বাতিল বলে গণ্য হবে।

    অতএব, কোম্পানির পরিচালনার অধিকার একটি কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তার ওপর ন্যস্ত করা নিষিদ্ধ। বরং এটি এমন কারও ওপর ন্যস্ত করা উচিত যার পরিচালনা করার যোগ্যতা রয়েছে। যে কোনো কার্যক্রম যা এই পদ্ধতিতে পরিচালিত হয় না তা শরীয়তের দৃষ্টিতে বাতিল বলে গণ্য হয়। অতএব, একটি কোম্পানির পরিচালনার ভার কোনো কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তার ওপর ন্যস্ত করা নিষিদ্ধ। বরং এটি এমন কারও ওপর ন্যস্ত করা উচিত যার পরিচালনার যোগ্যতা রয়েছে এবং তাকে অবশ্যই একজন বাস্তব মানুষ হতে হবে। সুতরাং, শরীয়তের দৃষ্টিতে পাবলিক কোম্পানি বাতিল। পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে এ পর্যন্তই।

    এ ধরনের কোম্পানির শেয়ারের ক্ষেত্রে বলা যায়, এগুলো হলো আর্থিক কাগজ যা কেনার সময় বা মূল্যায়নের সময় কোম্পানির একটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। এগুলো প্রতিষ্ঠার সময় কোম্পানির মূলধনের প্রতিনিধিত্ব করে না। শেয়ার হলো কোম্পানির অস্তিত্বের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, এটি এর মূলধনের অংশ নয়। শেয়ারের মূল্য অদ্বিতীয় নয় বা এটি স্থিতিশীলও নয়। বরং এটি কোম্পানির লাভ-ক্ষতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। এগুলো অদ্বিতীয় এবং সব সময় নির্দিষ্ট থাকে না, বরং এগুলো প্রতিনিয়ত ওঠানামা করে। শরয়ী বিধান অনুযায়ী, এই শেয়ার এবং সিকিউরিটিজগুলো লেনদেন করা—তা কেনা হোক বা বিক্রি করা হোক—নিষিদ্ধ। এর কারণ হলো, এই শেয়ারগুলো এমন একটি কোম্পানির যা শরীয়ত অনুযায়ী অবৈধ। এগুলো মূলত বিলের সার্টিফিকেট, যাতে বৈধ মূলধন এবং অবৈধ লেনদেন থেকে অর্জিত অবৈধ মুনাফার মিশ্রণ রয়েছে। প্রতিটি বিল একটি শেয়ারের মূল্যের প্রতিনিধিত্ব করে, এবং এই শেয়ারটি অবৈধ কোম্পানির মালিকানাধীন সম্পদের একটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। এই সম্পদগুলো এমন একটি অবৈধ লেনদেনের সাথে মিশ্রিত হয়েছে যা শরীয়ত নিষিদ্ধ করেছে। সুতরাং, এটি অবৈধ অর্থ, যার কেনাবেচা অবৈধ, এবং এই ধরনের অর্থের লেনদেন করাও নিষিদ্ধ। যেসব বন্ডে সুদের সাথে অর্থ বিনিয়োগ করা হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য, এবং ব্যাংক শেয়ার ও অনুরূপ জিনিসগুলোর ক্ষেত্রেও এটি সত্য, কারণ এগুলোর সবটিতেই অবৈধ অর্থের পরিমাণ রয়েছে; তাই এগুলো কেনাবেচা করা অবৈধ, কারণ এর অন্তর্ভুক্ত অর্থটি অবৈধ।

    এই হলো পাবলিক কোম্পানি, সেগুলোর ব্যবস্থা এবং সেগুলোর শেয়ারের কথা। আর সুদের ক্ষেত্রে, যা পুঁজিবাদী অর্থনীতি এবং অন্যান্য অর্থনীতির প্রধান বিপর্যয়, হার যাই হোক না কেন ইসলাম এটিকে চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ করেছে। সুদের অর্থ নিঃসন্দেহে অবৈধ, এবং কোনো ব্যক্তির এই ধরনের অর্থের মালিক হওয়ার অধিকার নেই এবং যদি তাদের মূল মালিক জানা থাকে তবে এটি তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। সুদের ভয়াবহতার কারণে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) যারা সুদ খায় তাদের বর্ণনা করেছেন এমন ব্যক্তি হিসেবে, যাদের শয়তান তার স্পর্শ দিয়ে পাগল করে দিয়েছে।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেন:

     ٱلَّذِینَ یَأۡكُلُونَ ٱلرِّبَوٰا۟ لَا یَقُومُونَ إِلَّا كَمَا یَقُومُ ٱلَّذِی یَتَخَبَّطُهُ ٱلشَّیۡطَٰنُ مِنَ ٱلۡمَسِّۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمۡ قَالُوۤا۟ إِنَّمَا ٱلۡبَیۡعُ مِثۡلُ ٱلرِّبَوٰا۟ۗ وَأَحَلَّ ٱللَّهُ ٱلۡبَیۡعَ وَحَرَّمَ ٱلرِّبَوٰا۟ۚ فَمَن جَاۤءَهُۥ مَوۡعِظَةࣱ مِّن رَّبِّهِۦ فَٱنتَهَىٰ فَلَهُۥ مَا سَلَفَ وَأَمۡرُهُۥۤ إِلَى ٱللَّهِۖ وَمَنۡ عَادَ فَأُو۟لَٰۤئِكَ أَصۡحَٰبُ ٱلنَّارِۖ هُمۡ فِیهَا خَٰلِدُونَ

    “যারা সুদ খায় তারা (কিয়ামতে) কেবল সেভাবেই দাঁড়াবে যেভাবে দাঁড়ায় সে যাকে শয়তান তার স্পর্শ দ্বারা পাগল করে দিয়েছে। এটি এজন্য যে তারা বলে: ব্যবসাও তো সুদেরই মতো। অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। অতএব, যার কাছে তার রবের পক্ষ থেকে উপদেশ এসেছে এবং সে বিরত হয়েছে, তবে অতীতে যা হয়েছে তা ক্ষমার যোগ্য, তার ব্যাপারটি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে; কিন্তু যারা পুনরায় এই অপরাধ করবে তারা জাহান্নামের অধিবাসী। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে।” [আল-বাকারাহ: ২৭৫]

    এছাড়াও, সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার তীব্রতার কারণে, যারা এটি ভক্ষণ করে আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেন:

    یَٰۤأَیُّهَا ٱلَّذِینَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَذَرُوا۟ مَا بَقِیَ مِنَ ٱلرِّبَوٰۤا۟ إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِینَ ۝٢٧٨ فَإِن لَّمۡ تَفۡعَلُوا۟ فَأۡذَنُوا۟ بِحَرۡبࣲ مِّنَ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦۖ وَإِن تُبۡتُمۡ فَلَكُمۡ رُءُوسُ أَمۡوَٰلِكُمۡ لَا تَظۡلِمُونَ وَلَا تُظۡلَمُونَ 

    “হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা সত্যি মুমিন হও। যদি তোমরা তা না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা নিয়ে নাও; কিন্তু যদি তোমরা তওবা করো, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে, তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদের প্রতিও জুলুম করা হবে না।” [আল-বাকারাহ: ২৭৮-২৭৯]

    অপরিবর্তনযোগ্য কাগুজে মুদ্রা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে: অর্থ বা মুদ্রাকে এমন একটি মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করা হয় যা মানুষ পণ্য ও সেবার মূল্যের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য সম্মত হয়েছে, তা ধাতব হোক বা অন্য কিছু। এটি এমন একটি মানদণ্ড যার মাধ্যমে সমস্ত পণ্য এবং পরিষেবা পরিমাপ করা হয়। ইসলামের আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই ধাতব মুদ্রার মানদণ্ড ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত এবং প্রচলিত ছিল। যখন ইসলাম এলো, আল্লাহর রাসূল (সা.) দিনার এবং দিরহামকে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহারের অনুমোদন দিলেন, অর্থাৎ তিনি ধাতব মুদ্রার মানদণ্ড গ্রহণ করলেন। তিনি এগুলোকে একক মুদ্রার পরিমাপক করে দিলেন, যার মাধ্যমে সমস্ত পণ্য ও পরিষেবা পরিমাপ করা হতো।

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগ পর্যন্ত বিশ্ব সোনা ও রুপাকে মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করতে থাকে, যখন সোনা ও রুপার লেনদেন স্থগিত করা হয়েছিল। তারপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সোনা ও রুপার লেনদেন আংশিকভাবে আবার শুরু হয়। তারপর এই লেনদেন ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে এবং অবশেষে ১৫ জুলাই ১৯৭১ তারিখে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়, যখন ব্রেটন উডস ব্যবস্থাটি—যা নির্দেশ করেছিল যে ডলারকে সোনার আওতায় রাখা উচিত এবং একটি নির্দিষ্ট মূল্যের সাথে যুক্ত করা উচিত—বাতিল করা হয়েছিল। ফলে, কাগুজে মুদ্রা অপরিবর্তনযোগ্য (বাধ্যতামূলক) হয়ে ওঠে এবং এর পেছনে সোনা বা রুপার কোনো ব্যাকআপ থাকল না। এটি আর সোনা ও রুপার বিকল্প হিসেবেও কাজ করল না এবং এর কোনো অন্তর্নিহিত মূল্যও রইল না। বরং কাগুজে মুদ্রার মূল্য সেই আইন থেকে নেওয়া হয় যা একে একটি বৈধ মুদ্রা হিসেবে চাপিয়ে দেয়। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো একে তাদের উপনিবেশবাদের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এবং নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য তারা বিশ্বের মুদ্রাব্যবস্থা নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে শুরু করে। এভাবে তারা আর্থিক বিপর্যয় ঘটিয়েছে এবং অর্থনৈতিক ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে এনেছে। তারা অপরিবর্তনযোগ্য কাগুজে মুদ্রা ছাপানো বাড়িয়ে দেয়, যা মূল্যস্ফীতির হার আকাশচুম্বী করে এবং মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতার অবনতি ঘটায়। এটি ছিল মুদ্রা বাজারে ধাক্কা লাগার পেছনে অবদান রাখা অন্যতম একটি কারণ।

    পশ্চিমা বিশ্বে এই ধাক্কাগুলোর পুনরাবৃত্তি পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, পাবলিক কোম্পানি ব্যবস্থা, সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং অপরিবর্তনযোগ্য কাগুজে মুদ্রা ব্যবস্থার দুর্নীতিকে তুলে ধরে। এটি এই সত্যকেও তুলে ধরে যে যতদিন এই ব্যবস্থাগুলো বিদ্যমান থাকবে ততদিন পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যাধি এবং মুদ্রা বাজারের ধাক্কা থেকে বিশ্বকে রক্ষা করা যাবে না। একমাত্র যে জিনিসটি বিশ্বকে এই দুর্নীতিগ্রস্ত পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, পাবলিক কোম্পানি ব্যবস্থা, সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং অপরিবর্তনযোগ্য কাগুজে মুদ্রা ব্যবস্থা থেকে বাঁচাতে পারে, তা হলো পাবলিক কোম্পানি ব্যবস্থা বাতিল করা বা এই কোম্পানিগুলোকে ইসলামী কোম্পানিতে রূপান্তরিত করা সহ এই দুর্নীতিগ্রস্ত পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বাতিল করা। এই ব্যাধি থেকে বিশ্বকে বাঁচাতে হলে, সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং অপরিবর্তনযোগ্য কাগুজে মুদ্রা ব্যবস্থা বাতিল করতে হবে এবং পুনরায় সোনা ও রুপার মানদণ্ড চালু করতে হবে।

    এটি ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি এবং ব্যাংকগুলোর সুদী ঋণের অবসান ঘটাবে। এটি সেই ফটকা কারবারগুলোরও (speculations) অবসান ঘটাবে যা মুদ্রা বাজারে এই ধাক্কাগুলোর কারণ হয়েছে। সুদী ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তাও শেষ হয়ে যাবে। ফলস্বরূপ, বিশ্বের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে এবং আর্থিক সংকট দূর হবে। মুদ্রা বাজার থাকার অজুহাতও অদৃশ্য হয়ে যাবে এবং এর সাথে অর্থনৈতিক সংকটও দূর হবে।

    আমাদের সাইয়্যিদ (নেতা) আল্লাহর রাসূল (সা.), তাঁর পরিবার, সাহাবী এবং কিয়ামত পর্যন্ত যারা নিষ্ঠার সাথে তাঁদের অনুসরণ করবেন, তাঁদের ওপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।

  • রিসেট ইউর অ্যালগরিদম

    রিসেট ইউর অ্যালগরিদম

    রাত ১১টা বাজে, আগামীকাল পরীক্ষা। নোট খোলা আছে সামনে, কিন্তু হাতে ফোন। শুধু “একটু” দেখবো বলে Instagram খুললাম। একটা রিলস, তারপর আরেকটা, তারপর আরেকটা। হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত দেড়টা। দুই ঘণ্টা কোথায় গেল? কী দেখলাম? মনে নেই ঠিকমতো। একটা র‍্যান্ডম রান্নার ভিডিও, কারো ট্যুরের ভ্লগ, একটা ক্রাইম নিউজ, কিছু মিম, একটা মোটিভেশনাল কোট, আর মাঝে মাঝে বিজ্ঞাপন। কিন্তু একবারও থামাতে পারিনি নিজেকে।

    এই অনুভূতিটা আমরা প্রায় সবাই ই রিলেট করতে পারি।

    এর নাম Doom Scrolling! এবং এটি একটি সুনির্দিষ্ট ডিজাইন। ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা একটা সিস্টেম, যেটার একমাত্র কাজ হলো আমাদের স্ক্রিনের সামনে আটকে রাখা। যত বেশি সময় আমরা থাকবো, তাদের তত বেশি প্রফিট।

    কিন্তু এই সিস্টেমটা আসলে কিভাবে কাজ করে?

    আমরা মনে করি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছি। তবে প্রকৃতপক্ষে, সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের ব্যবহার করছে।

    Facebook, Instagram, TikTok, YouTube, Google এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের আচরণ রেকর্ড করছে। কোন পোস্টে কতক্ষণ চোখ থামলো, কোন ভিডিওতে দ্বিতীয়বার ফিরে এলাম, কোন বিজ্ঞাপনে একটু ধীরে স্ক্রল করলাম, প্রতিটা ডেটা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এই ডেটা দিয়ে তৈরি হচ্ছে আমাদের একটা “Psychological Profile“। তারপর সেই প্রোফাইল অনুযায়ী এমন কন্টেন্ট সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেটা দেখলে আমরা স্ক্রলিং বন্ধই করতে পারবো না।

    একটু চিন্তা করুন-  বন্ধুর সাথে কথায় কথায় নতুন একটা জুতার ব্র্যান্ডের কথা বললাম, কিছুক্ষণ পর ফিডে সেই ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন। কাকতালীয়? না। Meta তার অ্যাপের মাধ্যমে ফোনের মাইক্রোফোন অ্যাক্সেস করে । এটা নিয়ে বহু গবেষণা ও অভিযোগ হয়েছে। Google Maps “লোকেশন হিস্টোরি অফ” থাকলেও আমাদের মুভমেন্ট ট্র্যাক করতে পারে। ২০১৮ সালে Associated Press-এর একটি তদন্তে এটা প্রমাণিত হয়েছে। Cambridge Analytica স্ক্যান্ডালে প্রকাশ পেয়েছিল যে ফেসবুক থেকে ৮৭ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের ব্যক্তিগত ডেটা চুরি করে তা রাজনৈতিক মতামত পরিবর্তনে ব্যবহার করেছে। হার্ভার্ডের Shoshana Zuboff-এর বই The Age of Surveillance Capitalism (২০১৯) এ Surveillance Capitalism বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে। টেক কোম্পানিগুলো মানুষের আচরণকে “raw material” হিসেবে ব্যবহার করে ভবিষ্যৎ প্রেডিক্ট এবং প্রভাবিত করে প্রফিট ম্যাক্সিমাইজ করে।

    এবং সবচেয়ে ভয়ের বিষয় – আমরা এটা জেনেও মেনে নিয়েছি। কারণ “ফ্রি” সার্ভিস ছেড়ে দেওয়াটা কঠিন মনে হয়। এই স্ক্রলিং ছাড়তে না পারার পেছনে একটা নিউরোলজিক্যাল কারণ আছে। যাকে Dopamine Trap বলা যায়।

    প্রতিটা লাইক, প্রতিটা নোটিফিকেশন, প্রতিটা চমকপ্রদ ভিডিও – এগুলো আমাদের ব্রেইনে Dopamine রিলিজ করায়। Dopamine হলো সেই হরমোন যেটা আমাদের “ভালো লাগার” অনুভূতি দেয়। সিগারেট, গেমিং, জুয়া  এগুলোও একইভাবে কাজ করে। সোশ্যাল মিডিয়ার এই ডিজাইন মাদকের আসক্তির সাথে তুলনীয়।

    আর এই ডিজাইনটা দুর্ঘটনাবশত হয়নি।

    ২০১৭ সালে Facebook-এর প্রথম দিকের প্রেসিডেন্ট Sean Parker নিজেই স্বীকার করেছিলেন-

     “আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন একটা সিস্টেম বানিয়েছিলাম যেটা মানুষের মনোযোগ ও সময়কে যতটা সম্ভব বেশি নেবে।” তিনি আরো বললেন, “এই সিস্টেম মানুষের মস্তিষ্কের “Vulnerability” কে exploit করে।”

    ২০২১ সালে Facebook-এর সাবেক প্রোডাক্ট ম্যানেজার Frances Haugen হুইসেলব্লোয়ার হিসেবে প্রকাশ করেছিলেন যে, Facebook-এর নিজস্ব গবেষণাই দেখিয়েছিল তাদের অ্যালগরিদম কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে।  বিশেষত মেয়েদের মধ্যে body image সমস্যা ও ডিপ্রেশন বাড়াচ্ছে। Facebook সেটা জেনেও কিছু করেনি। কারণ এনগেজমেন্ট কমানো মানে আয় কমানো। AI-চালিত অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর মস্তিষ্কের Reward Center-কে ক্রমাগত সক্রিয় রাখে। এই চক্র মস্তিষ্কের Prefrontal Cortex ও Amygdala-তে পরিবর্তন আনে, যার ফলে আবেগ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়।

    এটা শুধু একটা অ্যাপের সমস্যা না। এটা একটা সিস্টেমিক সমস্যা।

    এক গবেষণায় দেখা গেছে, গড়ে একজন মানুষ দিনে ৪ ঘণ্টার বেশি সময় স্মার্টফোনে ব্যয় করে। বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে এই সংখ্যা আরো বেশি। চার ঘণ্টা মানে দিনের এক-ষষ্ঠাংশ। এক বছরে প্রায় ৬০ দিন। যে কিশোর-কিশোরীরা দিনে তিন ঘণ্টার বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে anxiety ও depression-এর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। প্রায় ২৪.৪% কিশোর-কিশোরী সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তির ক্লিনিক্যাল মানদণ্ড পূরণ করে।

    ১০% কিশোর-কিশোরী প্রতিদিন ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটায়। যত বেশি সময়, তত বেশি depression-এর ঝুঁকি। অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার ঘুমের সমস্যা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং পড়াশোনায় খারাপ ফলাফলের সাথে সরাসরি যুক্ত।

    এখন আসি, এতো কিছু জানার পর ও কেন আমরা এই স্ক্রলিং এর নেশায় থাকি?

    আমরা হয়তো অনেক সময় স্ক্রলিং এডিকশন কমানোর জন্য বিভিন্ন মেথড এপ্লাই করি। যেমন- ফোন লক করি, নোটিফিকেশন, টাইমার সেট করি, মাঝে মাঝে সোশ্যাল মিডিয়া এপ আনইনস্টল করে দিই। কিন্তু তারপর ও কেন কয়েকদিন পর আবার একই অবস্থা হয়?

    এর মুল কারণ আমরা আমাদের এই কাজের কোনো “Why” খুঁজে পাই না। এই কাজের কোনো উদ্দেশ্য বা purpose খুঁজে পাই না। যখন আমাদের কাজের বা জীবনের কোনো উদ্দেশ্য না থাকবে, তখন বিদ্যমান সিস্টেমের উদ্দেশ্যই আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য হয়ে যায়। এর মাধ্যমে বিদ্যমান সিস্টেম তাদের অ্যালগরিদম দিয়ে আমাদের ইউজ করে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করে নেয়।

    Doom Scrolling কিভাবে বর্তমান পুঁজিবাদী সিস্টেমের উদ্দেশ্য হাসিলে সাহায্য করছে?

    পুঁজিবাদ (Capitalism) হচ্ছে একটা আইডিওলজি বা জীবনব্যবস্থা। যার মুল উদ্দেশ্য প্রফিট ম্যাক্সিমাইজ করা আর অধিক ইন্দ্রীয়গত সুখ (Sensual Pleasure) অর্জন।

    আধুনিক পুঁজিবাদী সিস্টেমে এখন শুধু পণ্য বিক্রি হয় না। বিক্রি হয় মানুষের মনোযোগ। এই ধারণার নামই হলো Attention Economy।

    আমরা Facebook বা Instagram-কে কোনো টাকা দিই না। তাহলে তারা প্রতি বছর শত শত বিলিয়ন ডলার আয় কোথা থেকে করে? উত্তর সহজ- আমাদের মনোযোগ তারা বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করে। আমরা যত বেশি সময় প্ল্যাটফর্মে থাকবো, তত বেশি বিজ্ঞাপন দেখবো, তাদের তত বেশি আয়। Silicon Valley-র একটা বহুল পরিচিত কথা আছে- “If you are not paying for the product, you are the product.”

    Meta-র বার্ষিক রিপোর্ট অনুযায়ী তাদের মোট আয়ের ৯৭%-ই আসে বিজ্ঞাপন থেকে। আর সেই বিজ্ঞাপনের মূল্য নির্ধারিত হয় আমাদের ডেটা দিয়ে। আমরা কী পছন্দ করি, কোথায় যাই, কী কিনি, কী নিয়ে ভাবি। এই ডেটাই তাদের আসল সম্পদ। আর এই সম্পদ তৈরি হয় আমাদের প্রতিটি স্ক্রলের মাধ্যমে।

    সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের কাছে অলিখিতভাবে একটা বার্তা পাঠাচ্ছে প্রতিদিন। সুন্দর জায়গায় ঘুরতে পারলেই ভালো জীবন। দামি পণ্য ব্যবহার করলেই সফল। ভাইরাল হলেই মূল্যবান। বেশি ফলোয়ার মানেই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা না বুঝেই এই সংজ্ঞাটা মেনে নিচ্ছি। ফলে আমাদের জীবনের পারপাস আর আমাদের নিজেদের না। সেটা তৈরি হচ্ছে Silicon Valley-র একটা কর্পোরেট অফিসে।

    তাহলে আসল অ্যালগরিদম কী?

    আসল অ্যালগরিদম খোঁজার জন্য আমাদের নিজেদের কে কিছু মৌলিক প্রশ্ন করতে হবে।

    ১) আমরা কোথা থেকে এসেছি?
    ২) আমরা কেন এই পৃথিবীতে এসেছি?
    ৩) আবার কোথায় যাবো?

    এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পেলে আমরা আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পাবো এবং আমরা রিভাইভড বা পূনর্জাগরিত হতে পারবো। শাইখ ত্বাকীউদ্দীন নাবহানী (রহ) তার “নিযাম-উল-ইসলাম” বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে বলেছেন –

    মানুষের পূনর্জাগরণ (ইয়ানহাদু) হয় মানুষ, জীবন এবং মহাবিশ্ব সম্পর্কে তার সার্বিক চিন্তাধারণার ভিত্তিতে। অর্থাৎ এ জীবনের পূর্বে কি ছিল, পরবর্তীতে কি আছে এবং বর্তমান জীবনের সাথে পূর্বে কি ছিল ও পরে কি আছে তার পারস্পরিক সম্পর্ক সম্বন্ধে সার্বিক চিন্তা ভাবনা’র উপর ভিত্তি করেই মানুষের পূনর্জাগরণ হয় (ইয়ানহাদু)

    ইসলাম এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সামগ্রিকভাবে দিয়েছে। মানুষ, জীবন ও মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সুবহানাহু-ওয়া-তায়ালা আমাদের কে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,

    যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে পারেন যে, কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম। আর তিনি মহাপরাক্রমশালী, অতিশয় ক্ষমাশীল। (সূরা মুলক: ২) 

    “আমি জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার ইবাদত করবে।”  (সূরা আয-যারিয়াত: ৫৬)।

    এটাই আমাদের Core Algorithm, এবং এটা কোনো কর্পোরেট বোর্ডরুমে তৈরি হয়নি। কোনো ডেটা অ্যানালিসিস করে বানানো হয়নি। এটা মানুষ, জীবন ও মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা নিজে নির্ধারণ করেছেন এবং এখানে কোনো hidden agenda নেই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ সবকিছু সম্পর্কেই অবগত। আমদের ইন্টারনাল অ্যালগরিদম সম্পর্কে একমাত্র তিনিই (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) সবচেয়ে ভালো জানেন। তিনি যেহেতু আমাদের পরীক্ষা করার জন্য পাঠিয়েছেন এবং একটি উদ্দেশ্য সেট করে দিয়েছেন তাই তা ফুলফিল করার মাধ্যমেই আমাদের জীবনের প্রকৃত সফলতা অর্জন হবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    ٱعْلَمُوٓاْ أَنَّمَا ٱلْحَيَوٲةُ ٱلدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرُۢ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِى ٱلْأَمْوَٲلِ وَٱلْأَوْلَـٰدِ‌ۖ كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ ٱلْكُفَّارَ نَبَاتُهُۥ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَٮٰهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُونُ حُطَـٰمًا‌ۖ وَفِى ٱلْأَخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَمَغْفِرَةٌ مِّنَ ٱللَّهِ وَرِضْوَٲنٌ‌ۚ وَمَا ٱلْحَيَوٲةُ ٱلدُّنْيَآ إِلَّا مَتَـٰعُ ٱلْغُرُورِ

    তোমরা জেনে রাখ যে, দুনিয়ার জীবন ক্রীড়া কৌতুক, শোভা-সৌন্দর্য, তোমাদের পারস্পরিক গর্ব-অহঙ্কার এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র। এর উপমা হল বৃষ্টির মত, যার উৎপন্ন ফসল কৃষকদেরকে আনন্দ দেয়, তারপর তা শুকিয়ে যায়, তখন তুমি তা হলুদ বর্ণের দেখতে পাও, তারপর তা খড়-কুটায় পরিণত হয়। আর আখিরাতে আছে কঠিন আযাব এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। আর দুনিয়ার জীবনটা তো ধোকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়। – (সূরা আল-হাদিদ: ২০)

    لَهْوٌ  “লাহউন” – অর্থহীন বিনোদন (Amusement)। Reels, Shorts, TikTok – ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখলাম কিন্তু কিছুই মাথায় রইলো না।

    زِينَةٌ “যীনাতুন” –  সাজসজ্জ, জাঁকজমক (Adornment)। Aesthetic feed, ফিল্টার, নিজেকে সবচেয়ে সুন্দর করে উপস্থাপন করার প্রতিযোগিতা।

    َتَفَاخُرُۢ بَيْنَكُمْ “তাফাখুরুন বায়নাকুম” – পরস্পরের মধ্যে গর্ব। Flex culture, ভ্রমণের ছবি, দামি পণ্যের শো-অফ, “আমি কতটা ভালো আছি” দেখানোর রেস।

    وَتَكَاثُرٌ فِى ٱلْأَمْوَٲلِ “তাকাসুরুন ফিল আমওয়াল” –  সম্পদের প্রতিযোগিতা। “কে কতটা Luxurious জীবন কাটাচ্ছে” – এই অন্তহীন তুলনা।

    বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়াকে বর্ণনা করতে এই একটি আয়াতই যথেষ্ট। দুনিয়া সবসময় এভাবেই মানুষকে ধোঁকা দিবে, শুধু মাধ্যমটা বদলাবে।

    এই জীবন কতটুকু?

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,

    كُلُّ نَفْسٍ ذَآئِقَةُ ٱلْمَوْتِ‌ۗ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ ٱلْقِيَـٰمَةِ‌ۖ فَمَن زُحْزِحَ عَنِ ٱلنَّارِ وَأُدْخِلَ ٱلْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ‌ۗ وَمَا ٱلْحَيَوٲةُ ٱلدُّنْيَآ إِلَّا مَتَـٰعُ ٱلْغُرُورِ

    প্রতিটি প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর ‘অবশ্যই কিয়ামতের দিনে তাদের প্রতিদান পরিপূর্ণভাবে দেয়া হবে। সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলতা পাবে। আর দুনিয়ার জীবন শুধু ধোঁকার সামগ্রী। (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫)

    مَتَـٰعُ ٱلْغُرُورِ  “মাতাউল গুরূর” – ধোঁকার সামগ্রী। এর চেয়ে সুন্দর করে দুনিয়ার চরিত্র বলা সম্ভব না। দুনিয়া আমাদের ধোঁকা দেয়। সোশ্যাল মিডিয়াও আমাদের ধোঁকা দেয় – মনে করায় যে এই স্ক্রলিং, এই লাইক, এই ভাইরাল হওয়াটাই জীবনের অর্থ। কিন্তু মৃত্যুর পর? এসব কিছুই কাজে আসবে না। ফলোয়ারের সংখ্যা কাজে আসবে না। কতটা ট্রেন্ডি ছিলাম সেটা কাজে আসবে না।

    এখন করনীয় কী?

    ইসলাম আমাদের পূর্বে করা তিনটি প্রশ্নের উত্তর দেয়। আমরা একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারি যে আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা থেকে এসেছি এবং আবার তার কাছেই ফিরে যাবো। তাই আল্লাহ আমাদের কে অবশ্যই একটি উদ্দেশ্যেই এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। সেটি হচ্ছে তার ইবাদত করা। অর্থাৎ আমরা যে কাজই করবো তার লক্ষ্য হবে আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জন।

    তাই আমাদের জীবনের প্রতিটি কাজ আমাদের সেই কোর উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখেই সাজিয়ে নিতে হবে। আমাদের কাজের প্রায়োরিটি’র ভিত্তিতেই সেট করতে হবে। আমাদের সময়, মনোযোগ, শক্তি – এগুলো সীমিত। প্রতিটি মুহূর্ত আমরা একটা বিনিয়োগ করছি। সোশ্যাল মিডিয়া সেই বিনিয়োগটা নিজের কাছে নিতে চায়। এখন এই বিনিয়োগ যদি আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার গাইডেন্স অনুযায়ী করি, তাহলে আমরা দুনিয়া ও আখিরাত – দুই জায়গায়ই হাইয়েস্ট রিটার্ন পাবো।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা বলেন,

    যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয় । (সূরা আর-রাদ: ২৮)

    Doom Scrolling-এর পরে আমরা কেমন অনুভব করি? ক্লান্ত, অস্থির, কিছু একটা মিস করার অনুভূতি। এটাকে বলে FOMO – Fear of Missing Out। কিন্তু আমরা আসলে কিছু মিস করিনি – শুধু সময় আর প্রশান্তি হারিয়েছি। অন্যদিকে আল্লাহর স্মরণ বা আল্লাহর যিকির আমাদের সত্যিকারভাবে অন্তরে প্রশান্তি দেয় সেটা আমরা বাস্তবে উপলব্ধি করতে পারি আবার নিউরোলজিক্যালিও এটা প্রমানিত।

    কিন্তু “বোঝা” আর “করা” তো এক না। ফোন রাখতে চেষ্টা করি, কিন্তু পারি না। নামাজে মনোযোগ দিতে চাই, কিন্তু মন ঘুরে যায় রিলসের দিকে। এটা কেন হচ্ছে?

    কারণ আমরা এখনো সেই জিনিসটা পাইনি – সেটা হচ্ছে “হালাওয়াতুল ঈমান” – ঈমানের মাধুর্য।

    হযরত আনাস ইবন মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন —

    “তিনটি গুণ আছে; যার মধ্যে এগুলো থাকবে, সে ঈমানের মাধুর্য (মিষ্ট স্বাদ) লাভ করবে: আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার কাছে অন্য সবকিছুর চেয়ে অধিক প্রিয় হবে; সে কোনো বান্দাকে ভালোবাসবে কেবল আল্লাহর জন্য; এবং আল্লাহ তাকে কুফর থেকে রক্ষা করার পর আবার কুফরে ফিরে যাওয়াকে সে তেমনই অপছন্দ করবে, যেমন সে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে” [বুখারি]।

    এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলছেন ঈমানের একটা “স্বাদ” আছে, মাধুর্য আছে। এটা abstract কিছু না — এটা অনুভব করার জিনিস।

    ইমাম আন-নাওয়াবী (রহিমাহুল্লাহ) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন —

    “এই মহান হাদিসটি ইসলামের মৌলিক ভিত্তিসমূহের অন্তর্ভুক্ত একটি মৌলিক বিষয়। আলেমগণ বলেছেন, ঈমানের মাধুর্যের অর্থ হলো আনুগত্যমূলক কাজে আনন্দ অনুভব করা, আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূল -এর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কষ্ট সহ্য করা, একে দুনিয়াবি লাভের ওপর প্রাধান্য দেওয়া, এবং আল্লাহর আনুগত্য ও অবাধ্যতা পরিহার করে তাঁকে ভালোবাসা।”

    আর ক্বাযী ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন —

    “এ ব্যক্তিই প্রকৃতপক্ষে ঈমানের মাধুর্য লাভ করেছে , যার ঈমানের দৃঢ়তা শক্তিশালী, যার অন্তর এতে প্রশান্তি লাভ করেছে, যার বক্ষ এর জন্য উন্মুক্ত হয়েছে এবং যার সত্তা-মাংস-রক্তের সঙ্গে তা মিশে গেছে।”

    “মাংস-রক্তের সঙ্গে মিশে যাওয়া” – কী অসাধারণ উপমা!! এটা মানে যখন ঈমান আমাদের পরিচয়ের অংশ হয়ে যাবে, শুধু বাইরের আচার না – তখন এই মাধুর্য অনুভব হবে।

    আরেকটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন –

    “যে ব্যক্তি আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে দীন হিসেবে এবং মুহাম্মাদ -কে রাসূল হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিয়েছে – সে ঈমানের স্বাদ পেয়েছে।” [মুসলিম]

    এখানে রাসুলুল্লাহ (সা) আমাদেরকে ঈমানের মাধুর্য অনুভব করার একটা এলগোরিদম দিয়েছেন। এর মাধ্যমে আমরা পাবো “হায়াতান তাইয়িবা”–  পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন জীবন। উদ্দেশ্যময় জীবন। প্রশান্তির জীবন। এরপর আখিরাতে পাবো চিরশান্তির জান্নাত,যার তলদেশে নহরসমুহ প্রবাহিত। সেখানে আমরা চিরকাল থাকবো। চিরকাল একটা প্রিমিয়াম লাইফ লিড করবো, ইনশাআল্লাহ। এই প্রতিশ্রুতি কোনো টেক কোম্পানি দিতে পারবে না, কোনো ইনফ্লুয়েন্সার দিতে পারবে না – একমাত্র আল্লাহই দিতে পারেন।

    আর আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন,

    যে পুরুষ বা নারী ঈমানদার হয়ে সৎকর্ম করবে, আমি তাকে অবশ্যই পবিত্র জীবন দান করবো।”  (সূরা আন-নাহল: ৯৭)

    “যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে তুমি তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ…” (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫)।

    সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম চায় আমাদের সময়, মনোযোগ, স্বপ্ন  সবকিছু তাদের অনুযায়ী শেইপ করতে। কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার দেওয়া অ্যালগরিদমে কোনো ট্র্যাকিং নেই। কোনো বিজ্ঞাপন নেই। কোনো ম্যানিপুলেশন নেই।

    পরের বার ফোন তোলার আগে এক সেকেন্ড থামি। জিজ্ঞেস করি নিজেকে  এই মুহূর্তে আমি যা করছি  এটা কি আমার আসল পারপাসের সাথে যায়?” সময় চলে যাচ্ছে। প্রতিটি স্ক্রল আমাদের হায়াতের একটা মুহূর্ত শেষ করছে। সেই মুহূর্তগুলো আর ফিরে আসবে না।

    কিন্তু এখনো সময় আছে – রিসেট করার।

  • ইসলাম: একটি ফিকরাহ (আদর্শ) ও তরীকা (কর্মপদ্ধতি)

    ইসলাম: একটি ফিকরাহ (আদর্শ) ও তরীকা (কর্মপদ্ধতি)

    ইসলাম মানুষের মধ্যে থাকা সেই প্রাণশক্তির (Vital energy) অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা তাকে চালিত করে এবং দৈনন্দিন জীবনে সে যে কাজগুলো করে তার দিকে ধাবিত করে। কারণ, এই প্রাণশক্তির অস্তিত্বের ওপর ভিত্তি করেই ইসলাম প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও সমাধানসমূহ গড়ে তুলেছে। ইসলাম মানুষের মধ্যে সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভক্তি বা ধার্মিকতার সহজাত প্রবৃত্তির অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

    فَأَقِمۡ وَجۡهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفٗاۚ فِطۡرَتَ ٱللَّهِ ٱلَّتِي فَطَرَ ٱلنَّاسَ عَلَيۡهَاۚ لَا تَبۡدِيلَ لِخَلۡقِ ٱللَّهِۚ ذَٰلِكَ ٱلدِّينُ ٱلۡقَيِّمُ وَلَٰكِنَّ أَكۡثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يَعۡلَمُونَ

    “অতএব আপনি একনিষ্ঠ হয়ে দ্বীনের জন্য নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করুন। আল্লাহর সেই প্রকৃতির অনুসরণ করুন, যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন নেই। এটিই সরল সুদৃঢ় দ্বীন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।” (সূরা আর-রূম: ৩০)।

    মহান আল্লাহ আরও বলেছেন:

    وَإِذۡ أَخَذَ رَبُّكَ مِنۢ بَنِيٓ ءَادَمَ مِن ظُهُورِهِمۡ ذُرِّيَّتَهُمۡ وَأَشۡهَدَهُمۡ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمۡ أَلَسۡتُ بِرَبِّكُمۡۖ قَالُواْ بَلَىٰ شَهِدۡنَآۚ أَن تَقُولُواْ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ إِنَّا كُنَّا عَنۡ هَٰذَا غَٰفِلِينَ

    “আর স্মরণ করুন, যখন আপনার রব বনী আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন এবং তাদেরকে তাদের নিজেদের ওপর সাক্ষী করে বললেন, ‘আমি কি তোমাদের রব নই?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ, আমরা সাক্ষী রইলাম।’ (যাতে) তোমরা কিয়ামতের দিন এ কথা না বলো যে, ‘আমরা তো এ বিষয়ে গাফেল ছিলাম।’” (সূরা আল-আরাফ: ১৭২)।

    পাশাপাশি, ইসলাম মানুষের অন্যান্য প্রবৃত্তি এবং জৈবিক চাহিদার অস্তিত্বকেও স্বীকৃতি দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:

    زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ ٱلشَّهَوَٰتِ مِنَ ٱلنِّسَآءِ وَٱلۡبَنِينَ وَٱلۡقَنَٰطِيرِ ٱلۡمُقَنطَرَةِ مِنَ ٱلذَّهَبِ وَٱلۡفِضَّةِ وَٱلۡخَيۡلِ ٱلۡمُسَوَّمَةِ وَٱلۡأَنۡعَٰمِ وَٱلۡحَرۡثِۗ ذَٰلِكَ مَتَٰعُ ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَاۖ وَٱللَّهُ عِندَهُۥ حُسۡنُ ٱلۡمَ‍َٔابِ

    “মানুষের জন্য আকর্ষণীয় করা হয়েছে নারী, সন্তান-সন্ততি, স্তূপীকৃত সোনা ও রূপা, চিহ্নিত অশ্বরাজি, গবাদি পশু ও ক্ষেত-খামারের প্রতি আসক্তিকে। এসব হলো পার্থিব জীবনের ভোগ্য বস্তু। আর আল্লাহর কাছেই রয়েছে উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল।” (সূরা আল ইমরান: ১৪)।

    এই জৈবিক চাহিদা এবং প্রবৃত্তিগুলোই মানুষের প্রাণশক্তি গঠন করে, কারণ সে প্রাকৃতিকভাবেই এগুলো পূরণের জন্য ধাবিত হয়। যদি ক্ষুধা ও তৃষ্ণার অনুভূতি না থাকত, তবে মানুষ খাওয়া ও পানের দিকে ধাবিত হতো না। যদি স্রষ্টা ও পরিচালকের প্রয়োজনীয়তার অনুভূতি না থাকত, তবে সে পবিত্রতা ঘোষণা ও ইবাদতের দিকে ধাবিত হতো না। যদি বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা না থাকত, তবে সে বিপদ ও ভয় থেকে নিজেকে রক্ষা করত না, রোগের চিকিৎসা করাত না এবং সম্পদের মালিক হওয়ার চেষ্টা করত না। যদি মানব প্রজাতি টিকিয়ে রাখার প্রবণতা না থাকত, তবে সে পারিবারিক জীবন গড়ত না এবং তার সন্তান, পিতা-মাতা ও ভাই-বোনদের প্রতি স্নেহশীল হতো না… সুতরাং জৈবিক চাহিদা এবং প্রবৃত্তিগুলোর মধ্যে নিহিত এই প্রাণশক্তিই হলো মানবীয় আচরণের মূল উৎস।

    যেহেতু জৈবিক চাহিদা এবং প্রবৃত্তিগুলো পূরণের জন্য এমন কিছু আচরণগত নিয়মাবলি নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যা মানুষের জন্য সঠিক পূরণকে নির্দেশ করবে এবং তাকে সুখ ও শান্তির দিকে নিয়ে যাবে, এবং একে এমন ভুল পূরণ থেকে আলাদা করবে যা তাকে দুঃখ-কষ্টের দিকে ঠেলে দেয়; তাই আল্লাহ তাআলা—যিনি মানুষ এবং তার চাহিদা ও প্রবৃত্তিগুলোর স্রষ্টা—মানুষের এই চাহিদাগুলো পূরণের সঠিক আচরণ বর্ণনা করে ওহী নাযিল করেছেন।

    ঈমানের বিষয়গুলো—বিশেষ করে স্রষ্টা, পরিচালক ও পথপ্রদর্শক হিসেবে মহামহিম আল্লাহর প্রতি ঈমান—বর্ণনার মাধ্যমে, এবং এরপর ইবাদতসমূহ (নামাজ, রোজা, হজ ইত্যাদি) যার মাধ্যমে মানুষ তার স্রষ্টার ইবাদত করে তা বর্ণনার মাধ্যমে ইসলাম মানুষের মধ্যে ধার্মিকতার প্রবৃত্তি পূরণকে সুশৃঙ্খল করেছে এবং স্রষ্টার সাথে মানুষের সম্পর্ককে সুসংগঠিত করেছে।

    ব্যভিচারকে হারাম করে এবং বিবাহ, পিতৃত্বের বিধান, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, পিতা-মাতার প্রতি সদয় হওয়া ইত্যাদির বিধান দিয়ে ইসলাম প্রজনন প্রবৃত্তি পূরণকে সুশৃঙ্খল করেছে।

    অর্থ উপার্জনের বিভিন্ন পথ, মালিকানার বিধান, চুরি ও অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ হারাম করা, এবং এমনকি হত্যার মাধ্যমে হলেও নিজের জীবন ও সম্পদ রক্ষার অধিকার প্রদানের মাধ্যমে ইসলাম বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি পূরণকে সুশৃঙ্খল করেছে।

    পবিত্র খাবার ও পানীয় হালাল করে এবং অপবিত্র বস্তু হারাম করে জৈবিক চাহিদা পূরণকে সুশৃঙ্খল করেছে… এভাবেই ইসলাম ব্যবস্থা দিয়েছে। ওপরে যা উল্লেখ করা হয়েছে তা কেবল উদাহরণমাত্র; ইসলাম মানুষের সমস্ত সহজাত চাহিদা পূরণকে এমনভাবে সুশৃঙ্খল করেছে যে, কোনো একটি চাহিদাকে অবহেলা করেনি এবং একটি ভারসাম্য বজায় রেখেছে যাতে কোনো একটি প্রবৃত্তি বা চাহিদা অন্যটির ওপর প্রাধান্য বিস্তার না করে।

    যেহেতু মানুষের অনেক সহজাত চাহিদা পূরণের জন্য অন্যান্য মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা প্রয়োজন, যাতে তারা পারস্পরিক সম্মতিতে উপকারিতা বিনিময় করতে পারে এবং সম্ভাব্য বিপদ থেকে বাঁচতে পারে, তাই মানুষের জন্য সমাজ গঠন করা অপরিহার্য ছিল। ফলস্বরূপ, সমাজের সম্পর্কগুলোকে সুসংগঠিত করা মানুষের সহজাত চাহিদা পূরণের ব্যবস্থার একটি মৌলিক অংশ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, এই চাহিদাগুলো না থাকলে সমাজই গড়ে উঠত না। এর অর্থ হলো, মানবীয় আচরণ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে তৈরি যেকোনো ব্যবস্থাকে কেবল ব্যক্তি-কেন্দ্রিক নির্দেশনার বাইরে গিয়ে মানব সমাজকে একটি সামষ্টিক সত্তা হিসেবে সম্বোধন করতে হবে, পাশাপাশি ব্যক্তিকে দেওয়া নির্দেশনার বিষয়টি তো রয়েছেই।

    এর মানে আরও এই যে, এই ব্যবস্থা কেবল কিছু ব্যক্তির স্বেচ্ছায় এর নির্দেশনা ও নিয়মাবলি মেনে চলার উদ্যোগের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতে পারে না। কারণ, সমাজের সম্পর্কগুলোকে সুশৃঙ্খল করা ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যতক্ষণ না সমাজের সাধারণ সদস্যরা তা মেনে চলে। এখান থেকেই এমন একটি ব্যবস্থার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়, যা মানুষের সহজাত চাহিদা পূরণের নিয়মাবলির সাথে এমন একটি পদ্ধতি যুক্ত করে, যা বাস্তব জীবনে একে কীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, কীভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং কীভাবে তা রক্ষা করতে হবে তা বর্ণনা করবে।

    এ কারণেই ইসলাম কেবল সেই ফিকরাহ (মৌলিক দর্শন বা আদর্শ)-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি যা প্রবৃত্তি ও জৈবিক চাহিদাগুলোর সঠিক পূরণের দিক নির্দেশনা দেয়, বরং এটি সেই তরীকা (পদ্ধতি)-কেও বর্ণনা করেছে যার মাধ্যমে এই মতাদর্শ বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়, সমাজে বাস্তবায়িত হয়, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর মাধ্যমে তা সংরক্ষিত হয়। আর এ কারণেই বলা হয়, ইসলাম হলো “ফিকরাহ ও তরিকা” (আদর্শ ও কর্মপদ্ধতি)।

    সুতরাং ইসলাম, যা প্রজনন প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে ব্যভিচারকে হারাম করেছে, সেই হারামের সাথে ব্যভিচারের শাস্তির (হদ) বিধানও যুক্ত করেছে—যা হলো এই সমাধানের বাস্তবায়নের একটি তরীকা (পদ্ধতি)। এটি যখন মদ, চুরি, ধর্মত্যাগ (রিদ্দাহ) এবং মুমিন নারী-পুরুষের ওপর মিথ্যা অপবাদ দেওয়াকে হারাম করেছে, তখন এই নিষেধাজ্ঞার সাথে এমন দণ্ডবিধি যুক্ত করেছে যার মাধ্যমে লঙ্ঘনকারীদের শাস্তি দেওয়া হয়। এটি যখন জীবন ও শরীরের ওপর আক্রমণকে হারাম করেছে, তখন এর পাশাপাশি কিসাস (প্রতিশোধমূলক শাস্তি)-এর বিধান দিয়েছে এবং অন্যান্য শরিয়াহ লঙ্ঘনের জন্য তা’যীর (শাস্তিমূলক ব্যবস্থা)-এরও বিধান দিয়েছে।

    ইসলাম যখন সাধারণভাবে শরীয়ত বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে, তখন এই বাস্তবায়নের একমাত্র বৈধ পদ্ধতিও বর্ণনা করেছে, আর তা হলো রাষ্ট্র, যা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ ইসলাম দিয়েছে এবং এর প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি ও এর ব্যবস্থা বিস্তারিতভাবে কিতাব (কুরআন) ও সুন্নাহতে বর্ণনা করেছে। নবুওয়ত লাভের পর থেকে মদিনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত এই রাষ্ট্র কায়েমের উদ্দেশ্যে রাসূল (সা.) যে কাজগুলো করেছিলেন, তা-ই হলো এই রাষ্ট্র অনুপস্থিত থাকলে তা প্রতিষ্ঠার একমাত্র শরীয়াহসম্মত ও বাস্তব পদ্ধতি।

    এরপর রাসূল (সা.) মদিনায় যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা তাঁর যুগেই পুরো আরব উপদ্বীপ জুড়ে বিস্তৃত হয়েছিল, তা-ই সব যুগে ইসলাম বাস্তবায়নের জন্য অনুকরণীয় বাস্তব মডেল; কারণ এটি মানুষের সমস্যাগুলো সমাধান করে এবং তার প্রবৃত্তিগুলোকে সুসংগঠিত করে। সুতরাং এই মডেলটিকে কতটা অনুসরণ করা হলো, তা-ই হলো এই ব্যবস্থা ও সমাধানগুলো বাস্তবায়নে সফলতার মাপকাঠি।

    ইসলাম, যা এর দাওয়াতকে সমগ্র বিশ্বের কাছে পৌঁছানোর নির্দেশ দিয়েছে, তা পৌঁছানোর তরিকা (পদ্ধতি)-ও বর্ণনা করেছে—আর তা হলো দাওয়াত ও জিহাদ, যা রাষ্ট্র পরিচালনা করে এবং এটিকে তার পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি বানায়। ইসলাম, যা শাসকের হিসাব নেওয়া এবং সে যদি ইসলামি ব্যবস্থার বিরোধিতা করে বা এর অপপ্রয়োগ করে তবে তাকে পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছে, তা করার একটি তরিকাও নির্ধারণ করেছে—আর তা হলো ইসলামি আকিদার ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক দল গঠন করা অপরিহার্য, যা রাষ্ট্র, সমাজের চিন্তাভাবনা এবং সংস্কৃতির ওপর নজর রাখবে; যাতে তারা দাওয়াত, শিক্ষাদান এবং হিসাব নেওয়ার মাধ্যমে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের দায়িত্ব পালন করতে পারে।

    ইসলাম, যা তার বার্তাকে রক্ষা এবং প্রতিরক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছে, এর জন্য একটি পদ্ধতি নির্ধারণ করেছে—তা হলো প্রতিরোধমূলক জিহাদ, যার মাধ্যমে উম্মাহ এবং মতাদর্শের শত্রুদের প্রতিহত করা হয়।

    ইসলাম ফিকরাহ (ধারণা)-এর বিধান এবং তরীকা (পদ্ধতি)-এর বিধানের মধ্যে তা মেনে চলা ও আঁকড়ে ধরার আবশ্যিকতার ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য করেনি। এগুলো সবই শর’ঈ বিধান, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাব এবং তাঁর নবীর (সা.) সুন্নাহতে নাজিল করেছেন এবং এগুলো মহান আল্লাহর এই বাণীর অন্তর্ভুক্ত:

    ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗاۚ

    “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের ওপর আমার নেয়ামতকে সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩)।

    সুতরাং এগুলো মেনে চলার আবশ্যিকতার দিক থেকে ফিকরাহ এবং তরিকার বিধানের মধ্যে পার্থক্য করা জায়েজ নয়; কারণ এ দুটিই হলো দ্বীন, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:

    يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱدۡخُلُواْ فِي ٱلسِّلۡمِ كَآفَّةٗ وَلَا تَتَّبِعُواْ خُطُوَٰتِ ٱلشَّيۡطَٰنِۚ إِنَّهُۥ لَكُمۡ عَدُوّٞ مُّبِينٞ

    “হে মুমিনগণ, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না; নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” (সূরা আল-বাকারাহ: ২০৮)।

    এই আয়াতে ‘সিলম’ বলতে সমগ্র ইসলামকে বোঝানো হয়েছে। বিধানের এই দুটি প্রকারের (ফিকরাহ ও তরীকা) মধ্যকার এই বিভাজন নবুওয়তের যুগ থেকে শুরু করে পরবর্তী শতকগুলোতে অধিকাংশ যুগের ফিকহবিদদের কাছে পরিচিত ছিল না। তাহলে কেন আমরা আমাদের বর্তমান ইসলামি সংস্কৃতিতে এই বিভাজনটি গ্রহণ করছি? এটি একটি অত্যন্ত যৌক্তিক প্রশ্ন। বরং আমাদের এই বিভাজন সম্পর্কে যারা অবগত হবেন, তাদের প্রত্যেকেরই এই প্রশ্নটি উত্থাপন করা উচিত। কারণ, যদিও পরিভাষার বিষয়ে কোনো বাধানিষেধ নেই, তবুও কোনো ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা ছাড়া কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক বিলাসিতার জন্য নতুন ফিকহি বা চিন্তাগত বিভাজন এবং পরিভাষা তৈরি করা জায়েজ নয়।

    তাই আমরা এই প্রশ্নের উত্তরে বলব যে, এই বিভাজনের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে এবং নিচে তা বর্ণনা করা হলো:

    বিগত দুই শতাব্দীতে অনেক মুসলিম বুদ্ধিজীবী এবং কিছু ফিকহবিদের মধ্যে একটি ধারণা প্রবল হয়ে ওঠে যে, ইসলাম মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং তার সমস্যা সমাধানে কিছু বিধান দিয়েছে, যা মেনে চলা অপরিহার্য। তবে, এই ব্যবস্থা ও সমাধানগুলো বাস্তবায়নের জন্য ইসলাম যেসব পদ্ধতির প্রস্তাব করেছিল, সেগুলো ইসলামের প্রাথমিক যুগের জন্য উপযুক্ত ছিল; বর্তমান যুগে সেগুলো মেনে চলার কোনো আবশ্যকতা নেই, এবং আমরা বর্তমান যুগের সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ এমন নতুন পদ্ধতি ও উপায় গ্রহণ করতে পারি।

    উসমানীয় খিলাফতের শেষ যুগে এমন কিছু মতামতের উদ্ভব হয় যা অতীতের যুগে পূর্ববর্তীদের অজানা ছিল। কেউ কেউ শর’ঈ হদ (নির্ধারিত শাস্তি)-এর পরিবর্তে তা’যিরী (বিচারকের বিবেচনামূলক) শাস্তির বিধান দেওয়াকে বৈধ ঘোষণা করে। ফলে উসমানীয় দণ্ডবিধি প্রণীত হয়, যা শর’ঈ হদগুলোকে অকার্যকর করে দেয় এবং তার জায়গায় তা’যিরী শাস্তির প্রবর্তন করে। এর পেছনে যুক্তি দেখানো হয় যে, শরিয়তের উদ্দেশ্য হলো হারাম কাজ থেকে বিরত রাখা এবং হদগুলো হলো সেই বিরত রাখার উপায়; সুতরাং একটি শাস্তির বদলে অন্যটি দিলে কোনো ক্ষতি নেই, যতক্ষণ না এর উদ্দেশ্য অপরাধীকে নিবৃত্ত করা হয়।

    তৎকালীন লেখক এবং গ্রন্থকাররা ‘মাকাসিদ আশ-শরীয়াহ’ (শরীয়তের উদ্দেশ্য) তত্ত্বের কথা বারবার বলতে থাকেন। এর মূল কথা হলো, আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রণীত বিধানগুলোর কিছু উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেছেন, যার জন্য এই বিধানগুলো দেওয়া হয়েছে; এবং এই বিধানগুলো তাদের উদ্দেশ্য থাকা বা না থাকার ওপর নির্ভরশীল। ফলে তারা মনে করতে লাগলেন যে, মূল বিধানগুলোর চেয়ে এর উদ্দেশ্যগুলোর ওপরই বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত। এটি শেষ পর্যন্ত উদ্দেশ্যের দোহাই দিয়ে মূল বিধানগুলোকেই বর্জন করার দিকে নিয়ে যায়।

    সত্য হলো, যারা এই তত্ত্বের পক্ষে কথা বলেছেন, তারা বেশ কিছু ভুল করেছেন; এবং পরবর্তীতে যারা এসেছেন, তারা প্রাথমিক যুগের প্রবক্তাদের নির্ধারিত সীমারেখা ও শর্তগুলোকে উপেক্ষা করে সেই ভুলগুলোকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন।

    প্রথম ভুলটি হলো: তারা শরিয়তের ‘ইল্লত’ (যে কারণের ওপর ভিত্তি করে আইনপ্রণেতা বিধান দিয়েছেন) এবং বিধানের ‘উদ্দেশ্য’ (মাকসাদ)-এর মধ্যে গোলমাল করে ফেলেছেন। ইল্লত হলো এমন একটি বৈশিষ্ট্য, যার ওপর শরীয়তপ্রণেতা কোনো বিধানকে নির্ভরশীল করেছেন—অর্থাৎ, ইল্লত থাকলে বিধান থাকে, ইল্লত না থাকলে বিধান থাকে না। অন্যদিকে, উদ্দেশ্যগুলো হলো এমন কিছু যা শরীয়তপ্রণেতা বিধানের মাধ্যমে অর্জন করতে চেয়েছেন, কিন্তু বিধানগুলোকে এর ওপর নির্ভরশীল করেননি; অর্থাৎ, বিধানগুলোর ওপর এর কোনো প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ নেই। কারণ, কোনো ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য অর্জিত না-ও হতে পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে বিধানটি বাতিল হয়ে যাবে। এটি শর’ঈ ইল্লতের ঠিক বিপরীত, কারণ ইল্লত ছাড়া বিধানের কোনো অস্তিত্ব থাকে না।

    দ্বিতীয় ভুলটি হলো: তারা ভেবেছিলেন যে কোনো শর’ঈ প্রমাণ (দলীল) ছাড়াই তারা বিধানের উদ্দেশ্যগুলো জানতে পারবেন।

    তৃতীয়ত: তারা মনে করেছিলেন যে শর’ঈ প্রমাণ ছাড়াই তারা শরীয়তের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য নতুন বিধান তৈরি করার অধিকার রাখেন; এমনকি যদি এর ফলে শরীয়তপ্রণেতা যে বিধানগুলো নির্ধারণ করেছেন তা বাতিল করার প্রয়োজনও হয়। তারা যুক্তি দেখিয়েছেন যে, নতুন বাস্তবতার কারণে বিধানগুলোকে উন্নত করা প্রয়োজন এবং পুরোনো পদ্ধতির ওপর অটল থাকা ঠিক নয়। তারা এমন একটি কথা প্রচার করেন যে, “সময় ও স্থানের পরিবর্তনে বিধানের পরিবর্তন করা যায়” এবং যা তার ভুলভাবে দাবি করেন যে এটি একটি শর’ঈ মূলনীতি।

    ইসলামি রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি এবং ইসলামি জীবনব্যবস্থা থেকে উম্মাহর ছিটকে পড়ার পর থেকে আমরা যে বর্তমান বাস্তবতায় বাস করছি, তাতে পশ্চিমা সংস্কৃতি, প্রচলিত মানবসৃষ্ট ব্যবস্থা এবং ইসলামের বিধানের ওপর সুপরিকল্পিত আক্রমণের চাপে অনেক মুসলিম বুদ্ধিজীবী পরাস্ত হয়েছেন; যাদের মধ্যে ইসলামি জীবন পুনরায় শুরু করার আহ্বানকারী ব্যক্তি এবং দলগুলোও রয়েছে। তারা ইসলামের বিধানের বিকল্প হিসেবে দেওয়া অনেক প্রস্তাবনার কাছে মাথানত করেছেন, বিশেষত যেগুলো তরীকা (পদ্ধতি)-র বিধানের সাথে সম্পর্কিত।

    একটি কথা বেশ প্রচলিত হয়ে গেছে যে, ইসলাম শাসনব্যবস্থার জন্য কোনো বিস্তারিত পদ্ধতি নির্ধারণ করেনি; সুতরাং এমন কোনো মানবসৃষ্ট শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করায় কোনো বাধা নেই যা পরামর্শ (শূরা) এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে। এর ফলে প্রজাতন্ত্র, সংসদীয়, মন্ত্রীপরিষদ শাসিত এবং নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের মতো গণতন্ত্রের বিভিন্ন রূপ গ্রহণের দরজা খুলে যায়।

    একইভাবে, একটি ধারণা প্রচলিত হয় যে, অতীতে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি এবং যোগাযোগের দুর্বল মাধ্যমের কারণে জিহাদকে গ্রহণ করা হয়েছিল; কিন্তু আজ জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ধারণার প্রসারের এবং যোগাযোগ ও গণমাধ্যমের উন্নতির কারণে জিহাদের মাধ্যমে ইসলামি দাওয়াত পৌঁছানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। ফলে দাবি করা হয় যে, জিহাদ কেবল আগ্রাসন প্রতিরোধের ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য।

    ইসলামি রাষ্ট্র পুনর্গঠনে কর্মরতদের মাঝে এ কথাও ছড়িয়ে পড়ে যে, ইসলাম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়নি; রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাসূল (সা.) যে কাজগুলো করেছিলেন, সেগুলো নিছক কিছু পদ্ধতি, ইজতিহাদ এবং মানবিক অভিজ্ঞতা, যা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। তারা রাসূল (সা.)-এর সেই কাজগুলোর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্যটি লক্ষ্য করতে ব্যর্থ হন—যেগুলো তিনি আল্লাহর নির্দেশে বাধ্যতামূলকভাবে করেছিলেন এবং যেগুলো তিনি কেবল অনুমোদিত হিসেবে আইনি উদ্দেশ্য পূরণের পদ্ধতি বা মাধ্যম হিসেবে স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছিলেন।

    ফলে তারা পরিবর্তনের এমন সব পদ্ধতি গ্রহণ করতে শুরু করেন, যা রাসূল (সা.)-এর পদ্ধতির বিরোধী। কখনও তারা কোনো নিয়মনীতি ছাড়া সশস্ত্র সংগ্রাম গ্রহণ করেছেন, কখনও তারা গণতন্ত্র এবং মানবসৃষ্ট আইনে পরিচালিত ক্ষমতায় অংশগ্রহণের পথ বেছে নিয়েছেন, আবার কখনও দাতব্য কাজকে অনুসারী ও সমর্থক টানার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

    এমনকি কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, ইসলামি রাষ্ট্র ছাড়াই ইসলামের সমাধানগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তাদের মতে, ওয়াজ ও নসিহতই মানুষকে ফরয ও নফল ইবাদত পালনে এবং হারাম ও মাকরূহ ছেড়ে দেওয়ার ব্যপারে উৎসাহিত করতে যথেষ্ট। তারা মনে করেন ইসলামি স্কুল-কলেজগুলো ইসলামি সংস্কৃতি ও জ্ঞান শেখাতে সক্ষম; দাতব্য সংস্থা ও স্বেচ্ছায় দেওয়া যাকাত তহবিল দরিদ্রদের প্রয়োজন মেটাতে যথেষ্ট; ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থনীতি ও সম্পদের ইসলামি বিধান বাস্তবায়ন করবে; এবং পারিবারিক বিষয়াদি ও সামাজিক লেনদেনের আইনের জন্য শরীয়াহ আদালত তো রয়েছেই এবং মুসলিমদের মধ্যকার দন্দ্ব নিরসনের জন্য আলেম ও ফকীহগণ ঐক্যবদ্ধ মত দিতে পারেন। আধুনিক গণমাধ্যম এবং ইন্টারনেট বিশ্বের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে সক্ষম।

    এমন আরও অনেক দাবি, যা ইসলামের সেই শ্রেষ্ঠত্ব ও সার্বভৌমত্বের বৈশিষ্ট্য কেড়ে নেয় যা আল্লাহ তা’আলা এর জন্য নির্ধারণ করেছেন, যখন তিনি বলেছেন:

    هُوَ ٱلَّذِيٓ أَرۡسَلَ رَسُولَهُۥ بِٱلۡهُدَىٰ وَدِينِ ٱلۡحَقِّ لِيُظۡهِرَهُۥ عَلَى ٱلدِّينِ كُلِّهِۦ وَلَوۡ كَرِهَ ٱلۡمُشۡرِكُونَ

    “তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি একে সকল দ্বীনের ওপর বিজয়ী করেন, মুশরিকরা তা যত অপছন্দই করুক না কেন।” (সূরা আস-সাফ: ৯)।

    এবং যেমনটি রাসূল (সা.) বলেছেন:

    الإسلام يعلو ولا يعلى

    “ইসলাম বিজয়ী হয়, এর ওপর কেউ বিজয়ী হতে পারে না।”

    এই মানুষগুলো ভুলে গেছেন—বা হয়তো জেনেও না জানার ভান করছেন—যে সমাজে রাষ্ট্র কর্তৃক বাস্তবায়িত ব্যবস্থাই মূলত সমাজের সম্পর্কগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এবং এর ওপর তার নিজস্ব ছাপ ফেলে। প্রকৃতপক্ষে, এই ভ্রান্ত ধারণার মানুষগুলো যেসব দাতব্য, শিক্ষামূলক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, সেগুলো প্রচলিত মানবসৃষ্ট আইন এবং সেই শাসকদের নীতির অনুমোদন ছাড়া টিকিয়ে রাখা অসম্ভব।

    এরা ভুলে গেছেন যে শাসনক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ছাড়া জীবন এবং সমাজের কোনো ব্যবস্থাই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, এবং এক সমাজে কখনও দুটি ব্যবস্থা একসাথে চলতে পারে না, বিশেষ করে যখন এর একটি হয় ইসলাম।

    সুতরাং, এটা স্পষ্ট করা অপরিহার্য যে, ইসলাম কেবল কিছু আধ্যাত্মিক, নৈতিক বা আচরণগত নির্দেশিকার সমষ্টি নয়, যা মানুষ তাদের জীবন পরিচালনাকারী (বিদ্যমান) প্রভাবশালী ব্যবস্থার তোয়াক্কা না করে (তা আলাদাভাবে) স্বেচ্ছায় অনুসরণ করে। বরং, ইসলাম হলো জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। এটি মানুষের প্রাণশক্তি এবং এই শক্তির জন্য প্রয়োজনীয় সম্পর্কগুলো থেকে উদ্ভূত সমস্যাগুলোর সমাধান প্রদান করে। ইসলামে এমন একটি পদ্ধতি রয়েছে যা এই ব্যবস্থাকে গ্রহণকারীদের কাছে ব্যাখ্যা করে দেয় কীভাবে এটিকে বাস্তবায়ন, প্রচার এবং রক্ষা করতে হবে।

    সংক্ষেপে বলতে গেলে, যে আকিদা (বিশ্বাস) এই দুনিয়ার জীবন, এর আগে কী ছিল এবং পরে কী হবে সে সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা দেয় এবং মানুষের সমস্যার সমাধান দেয়, পাশাপাশি যে শর’ঈ বিধানগুলো মানুষের বিষয়াবলি সুসংগঠিত করে—তা-ই আমরা “ফিকরাহর বিধান” পরিভাষা দ্বারা বুঝিয়েছি। অন্যদিকে, বাস্তব জীবনে ও সমাজে এই সমাধানগুলো বাস্তবায়ন করতে, পৃথিবীতে এর প্রসার ঘটাতে এবং একে রক্ষা করার জন্য ইসলাম যে বিধানগুলো পদ্ধতি হিসেবে নির্ধারণ করেছে, তাকেই আমরা “তরীকার বিধান” পরিভাষা দ্বারা বুঝিয়েছি।

    সুতরাং, ইবাদতের বিধান, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সম্পত্তি আইন, নারী-পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ক এবং তার ফলাফল, খাদ্য, পোশাক ও নৈতিকতার বিধান… এ সবই হলো ফিকরাহ-এর বিধান।

    অন্যদিকে, ইসলামি রাষ্ট্র, এর শাসনব্যবস্থা, বায়তুল মাল, গণমাধ্যম, শাস্তির বিধান (হদ, কিসাস, তা’যীর), পররাষ্ট্রনীতি এবং জিহাদের বিধানগুলো… সবই হলো তরীকার বিধান। রাজনৈতিক দল গঠন এবং শাসকদের হিসাব নেওয়ার দায়িত্বও তরীকার বিধানের অন্তর্ভুক্ত।

    ফিকরাহ এবং তরিকার বিধানগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে আমরা এদের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য দেখতে পাই। ফিকরাহ-এর বিধানগুলো শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলোর মূল উদ্দেশ্যই হলো এগুলো মেনে চলা এবং এদের নিজস্ব সত্তার জন্য এগুলো বাস্তবায়ন করা। অন্যদিকে, তরীকার বিধানগুলো যেহেতু ফিকরাহ-এর বিধানগুলো বাস্তবায়ন, প্রচার এবং সংরক্ষণের পদ্ধতি হিসেবে প্রণীত হয়েছে, তাই এই কাজগুলো এদের নিজস্ব সত্তার জন্য কাম্য নয়; অর্থাৎ এর কাঙ্ক্ষিত ফলাফলের দিকে খেয়াল না রেখে শুধু এগুলো পালন করা জায়েজ নয়। বরং, তরীকার বিধানগুলোকে ঠিক এমনভাবেই বাস্তবায়ন করতে হবে যা সেই উদ্দেশ্য অর্জনে সহায়ক হয়, যার জন্য এগুলো প্রণীত হয়েছে, যদিও সম্ভাবনা রয়েছে কখনো কখনো এসব উদ্দেশ্য অর্জিত নাও হতে পারে।

    অতএব, ইসলামি রাষ্ট্র তার নিজস্ব সত্তার কারণেই কাঙ্ক্ষিত নয়, এবং এটি মুসলমানদের জন্য চূড়ান্ত কোনো লক্ষ্য নয়; বরং এটি সমাজে ইসলাম বাস্তবায়ন এবং বিশ্বে এর বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি তরীকা (পদ্ধতি)। সুতরাং, শরীয়ত অনুযায়ী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও এর প্রতিষ্ঠানসমূহ গঠন করার সময় এবং এর গৃহীত নীতিসমূহ নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে, ইসলামী ব্যবস্থার যথাযথ বাস্তবায়ন এবং বিশ্বের কাছে ইসলামের রিসালাহ বার্তার যথাযথ বহন নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

    এই রাষ্ট্রের যথাযথ কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে এবং এর জন্য নির্ধারিত ভূমিকা বজায় রাখতে, শরীয়ত মুসলমানদেরকে রাষ্ট্রকে আন্তরিক পরামর্শ প্রদানে বাধ্য করে। প্রকৃতপক্ষে, প্রয়োজন দেখা দিলে রাষ্ট্রকে জবাবদিহি করার জন্য তাদেরই উদ্যোগ নিতে হবে, যেহেতু রাষ্ট্র তাদের পক্ষ থেকেই ইসলাম বাস্তবায়ন এবং এর রিসালাহ বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে। এই জবাবদিহিতা কেবল স্বেচ্ছামূলক বা ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে ছেড়ে দেওয়া হয়নি। এই রাষ্ট্র যাতে সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য শরীয়ত মুসলমানদের ওপর অন্তত একটি রাজনৈতিক দল গঠন করা ফরজ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

    وَلۡتَكُن مِّنكُمۡ أُمَّةٞ يَدۡعُونَ إِلَى ٱلۡخَيۡرِ وَيَأۡمُرُونَ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِۚ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ

    “আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত যারা কল্যাণের দিকে ডাকবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম।” (সূরা আল ইমরান: ১০৪)।

    ইমাম ইবনে কাছীর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “এই আয়াতের অর্থ হলো, উম্মতের মধ্য থেকে এই কাজের জন্য নিবেদিত একটি দল থাকা উচিত, যদিও নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী এই কাজটি করা প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ফরজ।”

    এই কর্তব্যের অগ্রভাগে রয়েছে শাসকদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেওয়া এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা, কারণ রাষ্ট্রের ন্যায়পরায়ণতা অপরিসীম কল্যাণ বয়ে আনে, পক্ষান্তরে এর দুর্নীতি ব্যাপক ক্ষতি ও ধ্বংস ডেকে আনে।

    রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    أفضل الجهاد كلمة حق عند سلطان جائر

    “সবচেয়ে উত্তম জিহাদ হলো অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা বলা।”

    সুতরাং, ইসলামি আকিদার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য শরীয়ত নিজস্ব কোনো কারণে নির্দেশ দেয়নি; বরং এগুলো তরিকার বিধানের অন্তর্ভুক্ত যা অন্য উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়েছে।

    ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে যখন ইসলামী জীবনযাত্রা বিদ্যমান থাকে, তখন এই রাজনৈতিক কাঠামোগুলোর ভূমিকা হলো শাসকদের উপর নজর রাখা, তাদের পরামর্শ দেওয়া এবং যখনই তারা ব্যর্থ হয়, অন্যায় আচরণ করে বা নিপীড়ন চালায়, তখন তাদের জবাবদিহি করা। তাদের ভূমিকার মধ্যে সমাজের সংস্কৃতি ও সম্মিলিত জনসচেতনতার অভিভাবকত্বও অন্তর্ভুক্ত, যাতে তা ইসলামী সংস্কৃতি ও তার ভাবধারা দ্বারা গঠিত হতে থাকে এবং ইসলামের জন্য অপরিচিত কোনো সাংস্কৃতিক বা সভ্যতামূলক প্রভাব যেন জনরীতিতে, এবং ফলস্বরূপ জনমত ও সামাজিক সম্পর্কে অনুপ্রবেশ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। কারণ একটি ইসলামী সমাজ অ-ইসলামী ধারণা ও আবেগ দ্বারা কতটা প্রভাবিত হয়, তা-ই নির্ধারণ করে যে তার ইসলামী জীবনযাত্রা কতটা বিঘ্নিত হবে এবং ইসলামী জীবন থেকে কতটা দূরে সরে যেতে শুরু করবে। ইসলামী ইতিহাস এই নীতির সবচেয়ে সুস্পষ্ট সাক্ষ্য।

    আর যখন ইসলামী জীবন অনুপস্থিত থাকে, যেমনটা আজকের উম্মাহর বাস্তবতা, তখন ধরে নেওয়া হয় যে, এই রাজনৈতিক কাঠামোসমূহ এবং তাদের দ্বারা পরিচালিত বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অবশ্যই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামী জীবন পুনঃপ্রবর্তনের জন্য শরীয়াহসম্মত ও বাস্তবসম্মত পদ্ধতি হিসেবে কাজ করবে।

    সুতরাং, শরীয়াহর প্রমাণ থেকে উদ্ভূত পদ্ধতির শরীয়াহসম্মত বিধানের উপর ভিত্তি করে এই কাঠামো কর্তৃক পরিচালিত কর্মকাণ্ডসমূহ—এর গঠন থেকে শুরু করে, এর পাঠচক্র তৈরি, চক্রের মধ্যে আদর্শগত সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রক্রিয়া, সমাজের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখা, অ-ইসলামী ধারণার মোকাবিলা করা, শাসককে রাজনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ করা, এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য নুসরাহ (সামরিক সমর্থন) চাওয়া পর্যন্ত—এই সবকিছুর কোনোটিই কেবল নিজের স্বার্থে করা যাবে না। বরং, প্রতিটি কাজই সেই উদ্দেশ্যগুলো অর্জনের প্রতি সতর্ক মনোযোগ দিয়ে সম্পাদন করতে হবে, যার জন্য সেগুলো আইন হিসেবে প্রণীত হয়েছে। অন্যথায়, এই কর্মকাণ্ডগুলো কেবল প্রতীকী ও অর্থহীন অনুশীলন এবং প্রকৃতপক্ষে সময়ের অপচয় হবে।

    কাঠামোটিকে অবশ্যই একটি বাস্তব ও কার্যকর হতে হবে, কেবল আনুষ্ঠানিক বা বাহ্যিক কাঠামো হলে চলবে না। এটি কেবল তখনই অর্জন করা সম্ভব, যদি তা একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতি ও পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে গঠিত হয়, যা এর সকল সদস্য ব্যতিক্রমহীনভাবে গ্রহণ ও মেনে চলে এবং যদি এর এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো থাকে যা এর লক্ষ্য অর্জনের পথে অগ্রগতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। এর পরিমণ্ডলগুলোর গঠন এবং সেগুলোর মধ্যে আদর্শগত সংস্কৃতিচর্চা অবশ্যই সেই উদ্দেশ্য দ্বারা পরিচালিত হতে হবে, যার জন্য এগুলো মূলত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

    এর উদ্দেশ্য হলো ইসলামী ব্যক্তিত্ব এবং দাওয়াহর আন্তরিক বাহক তৈরি করা। জনসমক্ষে আলোচনা অবশ্যই সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে পরিচালিত হতে হবে, যার জন্য এটি আইন হিসেবে প্রণীত হয়েছিল, অর্থাৎ প্রচলিত রীতিনীতি পরিবর্তন করা এবং তারপর সেগুলোকে ইসলামী ধারণা অনুযায়ী নতুন রূপ দেওয়া, যা চূড়ান্তভাবে ইসলামী জনমত গঠনে নেতৃত্ব দেবে।

    রাজনৈতিক সংগ্রামও অবশ্যই তার উদ্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে পরিচালিত হতে হবে: ঔপনিবেশিক আধিপত্যের পরিকল্পনা উন্মোচন করা, শাসকদের বিশ্বাসঘাতকতা ও শরীয়াহ লঙ্ঘন প্রকাশ করা এবং তাদের মিথ্যা বৈধতাকে ভেঙে ফেলা।

    আর নুসরাহ (সামরিক সমর্থন) চাওয়ার ক্ষেত্রে, তা অবশ্যই সেই উদ্দেশ্যেই গ্রহণ করতে হবে যার জন্য এটি বিধান করা হয়েছিল: ইসলামকে বাস্তবে রূপ দেওয়া, অর্থাৎ একে শাসন ও কর্তৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করা।

    জিহাদ, যা তরীকার বিধানগুলোর মধ্যে অন্যতম মহৎ, এটিও নিজের সত্তার জন্য করা হয় না; বরং এটি করার সময় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে খেয়াল রাখতে হয়। যেমন: ইসলামি ভূখণ্ড থেকে কাফির শত্রুকে বিতাড়ন করা, দারুল কুফর জয় করে দারুল ইসলামে পরিণত করা, শত্রুকে দুর্বল করা যাতে তার বিপদ হতে রক্ষা পাওয়া যায় এবং তাকে পরাজিত করা যায় অথবা শত্রুর মনে ভীতি সঞ্চার করা যাতে সে উম্মাহ ও তার স্বার্থের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালাতে না পারে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    وَأَعِدُّواْ لَهُم مَّا ٱسۡتَطَعۡتُم مِّن قُوَّةٖ وَمِن رِّبَاطِ ٱلۡخَيۡلِ تُرۡهِبُونَ بِهِۦ عَدُوَّ ٱللَّهِ وَعَدُوَّكُمۡ وَءَاخَرِينَ مِن دُونِهِمۡ لَا تَعۡلَمُونَهُمُ ٱللَّهُ يَعۡلَمُهُمۡۚ

    “আর তোমরা তাদের মোকাবিলার জন্য তোমাদের সাধ্যমতো শক্তি ও অশ্ববাহিনী প্রস্তুত রাখো, যা দিয়ে তোমরা আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে ভীত-সন্ত্রস্ত করবে…” (সূরা আল-আনফাল: ৬০)।

    আর তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    [وَقَٰتِلُوهُمۡ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتۡنَةٞوَيَكُونَ ٱلدِّينُ كُلُّهُۥ لِلَّهِۚ] 

    আর তাদের সাথে যুদ্ধ করো, যতক্ষণ না তাদের উপর অত্যাচার শেষ হয়ে যায় এবং দ্বীন একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট হয়। [সূরা আল-বাকারা: ১৯৩]

    আর তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    [وَمَا لَكُمۡ لَا تُقَٰتِلُونَ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ وَٱلۡمُسۡتَضۡعَفِينَ مِنَ ٱلرِّجَالِ وَٱلنِّسَآءِ وَٱلۡوِلۡدَٰنِ ٱلَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَآ أَخۡرِجۡنَا مِنۡ هَٰذِهِ ٱلۡقَرۡيَةِ ٱلظَّالِمِ أَهۡلُهَا وَٱجۡعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ وَلِيّٗا وَٱجۡعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ نَصِيرًا]

    আর তোমাদের কী হয়েছে? তোমরা আল্লাহর পথে এবং সেইসব নির্যাতিত পুরুষ, নারী ও শিশুদের জন্য যুদ্ধ করো না, যারা বলে, “হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে এই অত্যাচারী লোকদের শহর থেকে বের করে আনো এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একজন রক্ষক নিযুক্ত করো ও তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একজন সাহায্যকারী নিযুক্ত করো।” [সূরা আন-নিসা: ৭৫]

    হুদুদ (নির্ধারিত শাস্তি) এবং কিসাস (প্রতিশোধমূলক শাস্তি)-এর মতো শাস্তির বিধানগুলো শুধুমাত্র অপরাধীদের এবং অন্যদের, যাদের আত্মা তাদেরকে অপরাধ, মন্দ কাজ ও সীমালঙ্ঘন করতে প্রলুব্ধ করতে পারে, তাদের নিবৃত্ত করার জন্যই প্রণয়ন করা হয়েছিল। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেছেন,

    [وَلَكُمۡ فِي ٱلۡقِصَاصِ حَيَوٰةٞ يَٰٓأُوْلِي ٱلۡأَلۡبَٰبِ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ] 

    আর হে জ্ঞানীরা, কিসাসের বিধানে তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে, যাতে তোমরা সৎকর্মশীল হতে পারো। [সূরা আল-বাকারা: ১৭৯]।

    আর তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বললেন,

    [ٱلزَّانِيَةُ وَٱلزَّانِي فَٱجۡلِدُواْ كُلَّ وَٰحِدٖ مِّنۡهُمَا مِاْئَةَ جَلۡدَةٖۖ وَلَا تَأۡخُذۡكُم بِهِمَا رَأۡفَةٞ فِي دِينِ ٱللَّهِ إِن كُنتُمۡ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِۖ وَلۡيَشۡهَدۡ عَذَابَهُمَا طَآئِفَةٞ مِّنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ]

    [ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী পুরুষ—তাদের প্রত্যেককে একশটি করে বেত্রাঘাত কর। আর তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে আল্লাহর দ্বীন পালনে বিরত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হও। আর একদল মুমিনকে তাদের শাস্তির সাক্ষী থাকতে দাও।] [সূরা আন-নূর: ২]।

    সুতরাং, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এই আদেশ দিয়েছেন যে, মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। এর উদ্দেশ্য হলো, যারা অশ্লীল কাজ করতে প্রলুব্ধ হতে পারে, তাদের জন্য তারা একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।

    তবে, আমাদের এই বক্তব্য যে, ইসলাম একটি আদর্শ ও কর্মপদ্ধতি এবং এই পদ্ধতি সম্পর্কিত শরীয়াহ বিধানসমূহ বাধ্যতামূলক, এর অর্থ এই নয় যে, ইসলাম এই ধারণার প্রতিটি দিকের জন্য একটি বিশদ বিধান প্রণয়ন করেছে, যা এর বাস্তবায়ন পদ্ধতিকে স্পষ্ট করে দেবে। বরং এর অর্থ হলো, এই পদ্ধতি (তরীকাহ) সম্পর্কিত যে বিধানসমূহ ইসলাম প্রণয়ন করেছে, তা আমাদের উপর বাধ্যতামূলক, ঠিক যেমন অন্যান্য সকল শরীয়াহ বিধান, ঠিক যেমন মূল ফিকরাহ’র শরীয়াহ বিধানসমূহ। এই অজুহাতে সেগুলোকে উপেক্ষা করা জায়েজ নয় যে, এগুলো অন্য কিছুর জন্য প্রণীত বিধান, নিজেদের জন্য নয়, অথবা এই দাবিতেও নয় যে, বিধানসমূহ সময় ও স্থানভেদে পরিবর্তিত হতে পারে।

    অতএব, শরীয়ত যখন ফিকরাহর কোনো বিধান দেয় কিন্তু তা বাস্তবায়নের জন্য কোনো বিস্তারিত তরিকা নির্ধারণ করে না, তখন মুসলমানরা উপযুক্ত “ওসায়িল” (উপকরণ) এবং “আসালীব” (শৈলী/কৌশল) বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা রাখে। এখান থেকেই “তরীকা”-এর সাথে “ওসায়িল ও আসালীব”-এর মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। তরীকার বিধানগুলো শর’ঈ দলিল দ্বারা প্রমাণিত এবং মানা বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে, ওসায়িল এবং আসালীব হলো বৈধ বস্তু এবং কাজ, যার মধ্য থেকে মুসলমানরা উপযুক্তটি বেছে নিতে পারে।

    পদ্ধতির বিধানগুলো বাধ্যতামূলক, কারণ শরীয়ত এগুলোকে বাধ্যতামূলক করেছে এবং এর সপক্ষে শরীয়তসম্মত প্রমাণও দিয়েছে। সুতরাং, মুসলমানরা এগুলো মেনে চলতে বাধ্য এবং এগুলো গ্রহণ করা বা না করার ব্যাপারে তাদের কোনো বিকল্প নেই। আর উপায় (style) ও উপকরণ (means)-এর ক্ষেত্রে, এগুলো হলো অনুমোদিত কাজ বা উপকরণ; শরীয়ত এগুলোর অনুমোদন নির্দেশ করেছে, বাধ্যবাধকতা নয়। তাই, মুসলমানরা ধারণাটির শরীয়তসম্মত বিধান বাস্তবায়নের জন্য এগুলোর মধ্যে যেটি অধিকতর উপযুক্ত, সেটি বেছে নিতে পারে। একটি উদাহরণই বিষয়টি স্পষ্ট করার সর্বোত্তম উপায়।

    ইসলাম যাদের সম্পদের নিসাব (ন্যূনতম পরিমাণ) আছে তাদের সম্পদের উপর যাকাত দিতে বাধ্য করেছে এবং এটি রাষ্ট্রকে যাকাতের তহবিল সংগ্রহ এবং তাদের বৈধ প্রাপকদের মধ্যে বিতরণ করার পদ্ধতি তৈরি করেছে। আল্লাহ বলেন,

    [خُذۡ مِنۡ أَمۡوَٰلِهِمۡ صَدَقَةٗ تُطَهِّرُهُمۡ وَتُزَكِّيهِم بِهَا]

    “তাদের ধন-সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ কর যাতে তারা তা দ্বারা তাদের পবিত্র ও পবিত্র করে।” [TMQ সূরা আত-তওবা: ১০৩]।

    সুতরাং, ইসলাম রাষ্ট্রপ্রধানকে মুসলমানদের কাছ থেকে যাকাত আদায়ের নির্দেশ দেয়।

    তবে, যাকাত কীভাবে আদায় করা হবে সে বিষয়ে ইসলাম কোনো বিস্তারিত উপায় নির্দিষ্ট করে দেয়নি। তাই, এই বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্র শরীয়তসম্মত যেকোনো উপকরণ ও উপায় অবলম্বন করতে পারে। এ কারণেই নবী (সা.)-এর সময় এবং তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে পদ্ধতি ও উপায়ের পার্থক্য ছিল। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে নতুন নতুন উপায় ও পদ্ধতির উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে।

    এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো খুলাফা আল-রাশিদীন (সৎপথপ্রাপ্ত খলীফাগণ এর মধ্যে) উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) কর্তৃক দিওয়ান (প্রশাসনিক নথিপত্র) প্রতিষ্ঠা, যা এই ক্ষেত্রে একটি গুণগত অগ্রগতি ছিল।

    এর একটি উদাহরণ হলো, ইসলাম মুসলমানদের সাধারণ নেতা, অর্থাৎ খলিফা নিয়োগের জন্য বা’য়াতকে শরীয়তসম্মত পদ্ধতি হিসেবে নির্ধারণ করেছে। এটিই মুসলমানদের জন্য একমাত্র বৈধ ও বাধ্যতামূলক পদ্ধতি। বা’য়াহ হলো মুসলিম জনগণ এবং যিনি নেতৃত্বের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন, তাদের মধ্যে একটি পারস্পরিক সম্মতিমূলক চুক্তি, যার মাধ্যমে তিনি শরীয়ত অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিকভাবে জনগণের বিষয়াদি শাসন করেন।

    কেবলমাত্র ক্ষমতা দখল (গালাবা), বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার (উইলিয়াত আল-আহদ) বা অন্য কোনো উপায়ে কারো খিলাফাহ গ্রহণ করার অনুমতি নেই। বা’য়াহ, যা ইসলাম খলিফা নিয়োগের পদ্ধতি হিসেবে বিধান করেছে, তা এই বিষয়টি নিশ্চিত করে যে কর্তৃত্ব উম্মাহরই।

    তবে, এই পদ্ধতিটি কীভাবে পালন করা হবে সে সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশাবলী ছিল না। ফলে, খোলাফায়ে রাশেদীন (সঠিক পথের দিশারী খলীফাগণ) (রহঃ)-দের মধ্যে এর বাস্তবায়নের ধরন ও প্রক্রিয়া ভিন্ন ছিল, অপরদিকে সাহাবীগণ (রহঃ) তাঁদের প্রত্যেক আনুগত্যের শপথের বৈধতার বিষয়ে সর্বসম্মত ছিলেন।

    আমাদের বর্তমান সময়ে, খলিফার নির্বাচন এবং তাঁর প্রতি বায়াত (আনুগত্যের শপথ) বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন উপকরণ ও উপায় অবলম্বন করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, উম্মাহ ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, যারা হবেন আহলুল হাল ওয়াল আকদ (কর্তৃত্ব ও সিদ্ধান্তের অধিকারী ব্যক্তিগণ) অথবা উম্মাহর পরিষদ। বিকল্পভাবে, উম্মাহ সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেরাই এই নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারে। তৃতীয় একটি সম্ভাবনা হলো, প্রক্রিয়াটিকে উম্মাহ এবং এর প্রতিনিধিদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া: উম্মাহর পরিষদ প্রার্থীদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করবে এবং তারপর উম্মাহ সরাসরি ভোটের মাধ্যমে মনোনীত প্রার্থীদের মধ্য থেকে একজনকে বেছে নেবে।

    আর পদ্ধতি (তরীকাহ) এবং উপকরণ ও শৈলীর (ওসাইল ওয়া আসালিব) মধ্যে পার্থক্যের উদাহরণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

    ইসলামী জীবন পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য কর্মরত রাজনৈতিক কাঠামোকে সমাজের কাছে পৌঁছাতে এবং শাসকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রাম করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এগুলো ইসলামী জীবন প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত পদ্ধতির বাধ্যতামূলক শরীয়াহ বিধান, কারণ নবী (সা.) পবিত্র কুরআনের বাণী অনুসারে এটি বাধ্যতামূলক করেছেন। তবে, শরীয়াহর আইনগত বিধানে প্রকাশ্য দাওয়াহ এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের জন্য বিস্তারিত পদ্ধতি নির্দিষ্ট করা হয়নি, তাই এমন বৈধ উপকরণ ও শৈলী বেছে নেওয়া জায়েজ যা এই দুটি দায়িত্বের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে।

    মক্কায় নবী (সা.) বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করতেন, যার মধ্যে ছিল পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে লোকদের উদ্দেশে ভাষণ দেওয়া, মক্কার পাড়া-মহল্লায় মিছিল আয়োজন করা, বাজার, জনসমাগমস্থল এবং কাবা শরীফের সামনে মানুষের সাথে কথা বলা। আমাদের সময়ে, জনসমক্ষে ভাষণ, বক্তৃতা, সম্মেলন, স্যাটেলাইট চ্যানেল, বেতার সম্প্রচার, ইন্টারনেট, বই, পত্রিকা, প্রচারপত্র প্রকাশ, মিছিল এবং সম্মেলন—এগুলো সবই ব্যবহার করা যেতে পারে। এগুলো সবই অনুমোদিত উপায়-উপকরণ যা সমাজকে সম্বোধন করা এবং রাজনৈতিক সংগ্রামে অংশগ্রহণের শরীয়ত পালনের জন্য প্রয়োগ করা যেতে পারে।

    সংক্ষেপে, ইসলাম একটি মতাদর্শ যা একটি আদর্শ ও কর্মপদ্ধতি উভয় দ্বারা গঠিত। আদর্শ বলতে বোঝায় আকিদা এবং এর সাথে সম্পর্কিত সবকিছু—চিন্তাভাবনা, তথ্য এবং তা থেকে উদ্ভূত শরীয়তের বিধানসমূহ, যা মানুষ হিসেবে মানুষের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর পদ্ধতিটি হলো শরীয়তের বিধানসমূহ, যা ব্যাখ্যা করে কীভাবে বাস্তব জীবনে এই সমাধানগুলো প্রয়োগ করা যায়, যাতে একটি ইসলামী জীবনধারায় জীবনযাপনকারী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যায়। এতে আরও রূপরেখা দেওয়া হয়েছে যে, কীভাবে বিশ্বজুড়ে এই মতাদর্শ ছড়িয়ে দিয়ে বাকি মানবজাতিকে ইসলামী সমাজে অন্তর্ভুক্ত করা যায় এবং কীভাবে এই মতাদর্শকে সংরক্ষণ, সুরক্ষা ও রক্ষা করা যায়।

    আর উপায় ও পদ্ধতি হলো সেইসব অনুমোদিত বিষয় ও কাজ, যা মুসলমানরা এমন বিধান বাস্তবায়নের উপায় হিসেবে অবলম্বন করতে পারে, যেগুলোর বাস্তবায়নের জন্য শরীয়াহ কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি উল্লেখ করেনি। কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা উপায় অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক নয়; বরং শরীয়াহর বিধান বাস্তবায়নের জন্য সেগুলোর মধ্যে থেকে সবচেয়ে উপযুক্ত, সহজ এবং কার্যকরটি বেছে নেওয়া জায়েজ, তবে শর্ত হলো, সেগুলো যেন পদ্ধতির বিধানের বিকল্প না হয় এবং সেগুলোর বৈধতার পক্ষে শরীয়াহর প্রমাণ থাকে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    [قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِي يُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡۚ وَٱللَّهُ غَفُورٞ رَّحِيمٞ]

    “বলুন, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমাকে অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’” (সূরা আল ইমরান: ৩১)।

    মূল লেখা হতে ঈষৎ পরিমার্জিত

  • উম্মাহর বার্তা

    উম্মাহর বার্তা

    নিম্নে আল-ওয়াই ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ দেওয়া হল, আরবি থেকে অনুদিত

    উম্মাহর বার্তা (رسالة الأمة)

    আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা যেমন মানুষের মধ্যে প্রাণশক্তি (Vital energy) নিহিত রেখেছেন, যা তাকে তার প্রবৃত্তি ও জৈবিক চাহিদা মেটাতে তাড়িত করে—যা মানুষকে বুদ্ধিবৃত্তিক সৃজনশীলতা, নিরন্তর তৎপরতা এবং সর্বোত্তম ও নিখুঁতভাবে তৃপ্তি লাভের জন্য সর্বোচ্চ শারীরিক প্রচেষ্টা ব্যয় করতে পরিচালিত করে—তেমনিভাবে তিনি কোনো জাতির উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য একটি নিয়ম বা সুন্নাহ নির্ধারণ করেছেন। আর তা হলো পার্থিব জীবনে তাদের একটি ‘রিসালাত’ বা বার্তার উপস্থিতি, যা ধারণ করে তারা বেঁচে থাকে এবং যার জন্য তারা বাঁচে। এটি তাদের সুপ্ত শক্তিকে জাগ্রত করে, তাদের প্রতিভাকে বিকশিত করে এবং তাদের উন্নতি ও পুনর্জাগরণের উৎস হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং, জাতির জন্য এমন একটি বার্তার উপস্থিতি অপরিহার্য, যার জন্য তারা বাঁচবে এবং যাকে রক্ষা করতে গিয়ে তারা হাসিমুখে শাহাদাত বরণ করবে। বস্তুত, কোনো জাতিই এমন কোনো বার্তা গ্রহণ করা ছাড়া জেগে উঠতে বা ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।

    বিভিন্ন জাতির বার্তার মধ্যে এর উৎসের দিক থেকে পার্থক্য রয়েছে—তা কি ঐশী ওহী নাকি মানুষের বুদ্ধিপ্রসূত (যার ওপর ভিত্তি করে এর বিশুদ্ধতা বা ভ্রষ্টতা নির্ধারিত হয়)। তদুপরি, এর স্থায়িত্ব বা বিলুপ্তি, এবং তা কি সমগ্র বিশ্ব ও সকল জাতির জন্য প্রযোজ্য নাকি কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট অবস্থায় শুধু এর অনুসারীদের জন্য প্রযোজ্য—এসব দিক থেকেও পার্থক্য বিদ্যমান। তবে এতদসত্ত্বেও, প্রতিটি বার্তাই এর বাহক জাতির ওপর ঠিক ততটাই প্রভাব ফেলেছে, যতটা কল্যাণ ও স্থায়িত্ব তার মধ্যে বিদ্যমান ছিল।

    এটি সর্বজনবিদিত যে, ‘রিসালাত’ বা বার্তা হলো দ্বীন, অথবা আধুনিক পরিভাষায় এটি হলো একটি মতাদর্শ (মাবদা’)। আর এই বার্তাটি অবশ্যই এমন একটি মৌলিক চিন্তা হতে হবে যা মানুষের জীবনের পূর্ববর্তী অবস্থা, পরবর্তী অবস্থা এবং বর্তমান জীবন ও তার নিত্যনতুন সমস্যাগুলো সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। এটি জীবনের সাথে তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জীবনের সম্পর্ক (সংযুক্ত নাকি বিচ্ছিন্ন) নির্ধারণ করবে। এই মৌলিক চিন্তার ওপর ভিত্তি করেই জীবনের ব্যবস্থাগুলো গড়ে উঠবে এবং জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে এমন একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করবে যা ব্যক্তি ও সমাজের সুখ নিশ্চিত করে। এই সুখ নিশ্চিত করার বিষয়টি অন্য কোনো ব্যক্তি বা সমাজের সুখের সাথে সাংঘর্ষিক হবে না; বরং, এটি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করলে তা সকলের জন্যই সুখ নিশ্চিত করবে।

    আজ আমরা যদি বিশ্বের দিকে তাকাই, তবে দেখতে পাব যে বিভিন্ন জাতি একসময় যেসব বার্তা ধারণ করেছিল, সেগুলো মৃত ও বিলুপ্ত হয়ে গেছে, অথবা সেগুলোর অনুসারীরা তা ধারণ করা ছেড়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক জীবনের সংগ্রামমুখর ময়দানে আজ পশ্চিমাদের বার্তা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, অর্থাৎ সেই পুঁজিবাদী মতাদর্শ যা গণতন্ত্র, সাধারণ স্বাধীনতা এবং মুক্ত অর্থনীতির ডাক দেয়। কিন্তু পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজেদের দেশে এই মতাদর্শ যেভাবে বোঝে ও প্রয়োগ করে, অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে তা সেভাবে প্রয়োগ করে না। পশ্চিমা বিশ্ব পুঁজিবাদী মতাদর্শকে একটি সাম্রাজ্যবাদী বার্তা হিসেবে গ্রহণ করেছে, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের জাতির কল্যাণের জন্য অন্য জাতিগুলোকে শোষণ করতে এবং জনগণের রক্ত চুষে নিতে সচেষ্ট। তারা পুরো বিশ্বকে নিজেদের চারণভূমি মনে করে। এই বার্তাটি এখন জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে, এর দুর্নীতি প্রকাশ পেয়েছে এবং এটি এমন কিছু পর্যায় অতিক্রম করেছে যা প্রমাণ করে যে এটি ধ্বংসের পথে। পৃথিবীর বুকে পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক শক্তি এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য টিকে থাকার কারণেই কেবল এটি এখনও টিকে আছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দুর্নীতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো আমাদের সমাজের বর্তমান বাস্তবতা। মুসলিম দেশগুলোর সমাজ আজ অর্থনৈতিক, শাসনব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক এবং মিডিয়া—সবদিক থেকেই পশ্চিমাদের বার্তা তথা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। তা সত্ত্বেও, এই সমাজ আজ এক ভয়ানক বাস্তবতায় বাস করছে; পশ্চিমাদের দাসত্ব করছে, এক নজিরবিহীন বিভাজন ও ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে, তাদের ইচ্ছাশক্তি হরণ করা হয়েছে, পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে এবং সর্বস্তরে তারা অক্ষম হয়ে পড়েছে।

    ইসলামি উম্মাহর আজ সময় এসেছে পশ্চিম ও তাদের মতবাদ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন তাদের নিজস্ব অনন্য বার্তায় ফিরে যাওয়ার। যে সন্তানেরা পশ্চিমা সভ্যতার চাকচিক্যে প্রতারিত হয়েছিল, তারা বাস্তবে প্রমাণ পেয়েছে যে অন্যদের বার্তা ও মতাদর্শ আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। তারা উপলব্ধি করেছে যে তাদের নিজস্ব অনন্য বার্তাটি হলো এর সঠিক ও বিশুদ্ধ ধারণায় ‘ইসলামি বার্তা’। এটি একটি সর্বজনীন মতাদর্শিক ধারণা। এই বার্তার নিজস্ব একটি দর্শন—একটি মৌলিক চিন্তা—রয়েছে, যা জীবনের আগের অবস্থা, জীবনের পরের অবস্থা এবং খোদ জীবনের বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করে। এটি এই দর্শনকে একটি আকীদায় (বিশ্বাস) রূপ দেয়, যার ভিত্তিতে এর অনুসারীকে মুমিন অথবা কাফির হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই দর্শনের উপরই জীবনের সকল ব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং সে অনুযায়ী সংবিধান প্রণীত হয়। এটি এমন কোনো নিছক আধ্যাত্মিক দর্শন নয় যা কেবল আধ্যাত্মিক আত্মসমর্পণের উপর ভিত্তি করে, আবার এটি কোনো বস্তুগত বা অর্থনৈতিক দর্শনও নয় যা কেবল বস্তু বা অর্থনীতির উপর ভিত্তি করে।

    এর দৃষ্টিতে মানুষ কেবল পুণ্যে ভরা কোনো ফেরেশতা বা উচ্চতর সত্তা নয়, আবার চাকার ভেতরের দাঁত (spoke) বা যান্ত্রিকভাবে কাজ করা কোনো যন্ত্রের মতো জড়বস্তুও নয়। বরং মানুষ এমন এক সত্তা যার মধ্যে আত্মা, বুদ্ধি, অনুভূতি এবং আবেগ রয়েছে; একই সাথে তার শরীর, জৈবিক চাহিদা এবং প্রবৃত্তিও রয়েছে। মানুষ সম্পর্কে এই বাস্তব ধারণার উপর ভিত্তি করেই এর দর্শন বস্তু ও রূহ (spirit)-এর এমন এক নিখুঁত সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে, যা অবিচ্ছেদ্য। এদের আলাদা করার চেষ্টা করা হলে তা ইসলামের মূল দর্শনের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়াবে। তাই শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক দিকটিকে ইসলাম বলা যায় না, আবার শুধুমাত্র বস্তুগত দিকটিকেও ইসলাম বলা যায় না। বরং উভয় দিকের এমন এক পূর্ণাঙ্গ সংমিশ্রণকেই ইসলাম বলা হয়, যা এদেরকে এমন এক একক সত্তায় পরিণত করে যেখানে একটি দিক অন্যটি থেকে আলাদা করা যায় না। সুতরাং, যে ইসলামি বার্তার উপর এর সভ্যতা দাঁড়িয়ে ছিল এবং এখনও দাঁড়িয়ে আছে, তা অন্য কোনো দর্শনের সাথে একমত নয় যা কেবল বস্তু (mundane)-কে বা কেবল রূহ (divine)-কে চূড়ান্ত আদর্শ বলে মনে করে; বরং এতে বস্তু (material world) ও রূহ (divine ordinance)-এর সংমিশ্রণ হওয়া অপরিহার্য।

    আর এ কারণেই ইসলামের বার্তার দর্শন খৃষ্টান বার্তার দর্শন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, কারণ খৃষ্টান দর্শন কেবল আধ্যাত্মিক; এবং এটি কমিউনিজম বা পুঁজিবাদের দর্শনের থেকেও আলাদা, কারণ এই দুটি পুরোপুরি বস্তুগত।

    ইসলামি বার্তা তার সম্প্রসারণ (توسع), প্রভাব বিস্তার (تأثير) এবং প্রসারের (انتشار) সক্ষমতার জন্য অনন্য। এর সম্প্রসারণ বলতে বোঝায় যে, এটি যেকোনো যুগের যেকোনো সমস্যার সমাধান কুরআন ও সুন্নাহ থেকে বিধান (হুকুম) বের করার মাধ্যমে প্রদান করে। এর প্রভাব আসে এই কারণে যে, ইসলাম মানুষের বুদ্ধি বা বিবেকের সাথে কথা বলে এবং মানুষের সহজাত প্রকৃতির (ফিতরাত) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর এর প্রসার ঘটে কারণ এটি কেবল নির্দিষ্ট কোনো পরিবেশের সমস্যা হিসেবে নয়, বরং মানুষ হিসেবে মানুষের সমস্যার সমাধান করে। ফলে সময়ের আবর্তন এর বৈশিষ্ট্যগুলো মুছে ফেলতে, এর দিকগুলোতে বৈপরীত্য সৃষ্টি করতে বা এর অর্থ হারিয়ে ফেলতে পারে না। ঘটনাপ্রবাহের বিকাশ, সময়ের পরিবর্তন এবং ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশের সামনেও এটি স্থবির হয়ে পড়ে না।

    একই সাথে, ইসলামি বার্তা স্থায়িত্ব ও ব্যাপকতার অধিকারী। এটি এমন কিছু সাধারণ ও সর্বজনীন নিয়ম প্রদান করে যা যুগ, ঘটনা, মানুষের স্বভাব এবং পরিস্থিতির ভিন্নতা সত্ত্বেও প্রয়োগযোগ্য। এই নিয়মগুলো এমন সাংবিধানিক ধারায় পরিণত হতে পারে, যা মানুষের সামনে উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতির সাথে মানানসই আইন প্রণয়নের উপযুক্ত। এটি বিস্তারিত ব্যাখ্যাও প্রদান করে, তবে এই বিস্তারিত বিষয়গুলো এমন সাধারণ ক্ষেত্রে দেওয়া হয় যা সময়, স্থান ও মানুষের পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তিত হয় না। উদ্দেশ্য হলো, এসব খুঁটিনাটি বিষয়ে ভুল ইজতিহাদের সুযোগ না রাখা, যা সম্প্রসারণের বদলে বিকৃতির জন্ম দিতে পারে। এতদসত্ত্বেও, এই বিস্তারিত ব্যাখ্যার উদ্দেশ্য হলো এমন একটি মতাদর্শিক মডেল উপস্থাপন করা, যা অনুসরণ করে মানুষ বিস্তারিত ঘটনাবলির ওপর সাধারণ নিয়মগুলো প্রয়োগ করতে পারে। পাশাপাশি, এই বার্তার টেক্সটগুলো থেকে আইন প্রণয়ন এবং ব্যবস্থা নির্ধারণের সময় মুজতাহিদদের কোন পথ অবলম্বন করা উচিত, তা স্পষ্ট করা।

    এই বার্তার ভিত্তি যে ইসলামি আকীদা, তা মানুষের মনের গভীরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক প্রভাব সৃষ্টি করে। এটি মানুষকে আমূল বদলে দেয়, তাকে সর্বনিম্ন স্তর থেকে সর্বোচ্চ শিখরে উন্নীত করে এবং তার সামনে এমন এক দিগন্ত উন্মোচন করে, যার মাধ্যমে সে মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং জীবনের উদ্দেশ্য, মূল্যবোধ ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলো উপলব্ধি করতে পারে। এই আকীদা আরবদের সম্পূর্ণ নতুনভাবে গড়ে তুলেছিল, তাদের মধ্যে এমন এক উদ্দীপনা সঞ্চার করেছিল যা তাদের নতুন সৃষ্টিতে পরিণত করেছিল এবং তাদের এক বিশাল আধ্যাত্মিক শক্তি প্রদান করেছিল। ফলে তারা ইসলামের বার্তা নিয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল, মানবজাতির মধ্যে হিদায়াতের আলো বিস্তার করেছিল; শেষমেশ পৃথিবী তাদের কাছে নতি স্বীকার করেছিল এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে সর্বত্র ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছিল।

    ইসলামি বার্তা বহন করা কেবল আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালার পক্ষ থেকে এই উম্মাহর ওপর আরোপিত কোনো ফরজ দায়িত্ব নয়; বরং এটি এই জীবনে তাদের প্রধান কাজ এবং তাদের অস্তিত্বের মূল রহস্য। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:

    وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا

    “আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী জাতি বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষী হও এবং রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষী হন।” (সূরা আল-বাকারা: ১৪৩)

    আল্লাহ আরও বলেন:

    كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ

    “তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও, অন্যায় কাজে নিষেধ করো এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখো।” (সূরা আল ইমরান: ১১০)

    হ্যাঁ, এই উম্মাহর সৃষ্টিই হয়েছে মানবজাতির জন্য, যেন তারা মানুষকে সৎকাজের আদেশ দেয়, অন্যায় থেকে বিরত রাখে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার পথ দেখায়, যাতে বিচার দিবসে তারা মানবজাতির (পক্ষে বা) বিপক্ষে সাক্ষী হতে পারে। এটিই হলো সেই বার্তা এবং দায়িত্ব যা আল্লাহ এই মধ্যপন্থী জাতিকে অর্পণ করেছেন। এই দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত থাকলেই কেবল তারা সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বাধিক ন্যায়পরায়ণ জাতি হিসেবে বিবেচিত হবে।

    আর আজ ইসলামি উম্মাহর সামনে সেই সত্য ও সুস্পষ্ট পথে হাঁটা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই, যা তাদের পুনর্জাগরণের দিকে নিয়ে যাবে এবং কুফরের নিয়ন্ত্রণ ও কাফিরদের আধিপত্য থেকে তাদের মুক্ত করবে। আর সেই পথটি হলো সমগ্র মানবজাতির কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেওয়া, যাতে বান্দাদেরকে মানুষের দাসত্ব থেকে এবং পুঁজিবাদের জুলুম থেকে বের করে ইসলামের ন্যায়বিচারের দিকে, অর্থাৎ একমাত্র সঠিক মানবিক সভ্যতার দিকে নিয়ে আসা যায়।

    কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, এই উম্মাহর কি এখন এই কঠিন দায়িত্ব পালন করার এবং এই মহান আমানত বহন করার সক্ষমতা আছে?

    এর উত্তর নিশ্চিতভাবেই ‘হ্যাঁ’। কারণ এই উম্মাহ:

    প্রথমত: তারা অতীতেও এই বার্তা বহন করেছে। মূলত তাদের উৎপত্তি এবং ঐক্যবদ্ধতাই ঘটেছিল এর মাধ্যমে, যখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা ষষ্ঠ শতাব্দীতে মক্কা এবং এর আশেপাশের অঞ্চলে আমাদের সাইয়্যিদ মুহাম্মদ (সা.)-কে ইসলামের বার্তা দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন। তারা এই বার্তা নিয়ে দুনিয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং এমন এক নজিরবিহীন পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছিল, যার মানবিক উৎকর্ষের ধারেকাছেও বিশ্বের অন্য কোনো পুনর্জাগরণ পৌঁছাতে পারেনি। তারা এই উৎকর্ষ কেবল নিজেদের ওপরই প্রয়োগ করেনি, বরং যারা এই বার্তা গ্রহণ করেনি, অথচ এর ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের ওপরও প্রয়োগ করেছিল। অতীতে মুসলমানরা যখন কোনো বার্তা ছাড়াই একটি বার্তা বহন করতে সক্ষম হয়েছিল, তখন আজ তারা নিঃসন্দেহে এই বার্তা বহন করতে এবং এর মাধ্যমে পুনর্জাগরণ ঘটাতে সক্ষম, বিশেষত যখন তারা এই বার্তার মাধ্যমে এমন এক অতুলনীয় সাংস্কৃতিক ও আইনগত সম্পদের অধিকারী হয়েছে।

    দ্বিতীয়ত: কুরআনিক চিন্তাধারার প্রকৃতি ইসলামি উম্মাহর সদস্যদের গভীর ও আলোকিত চিন্তার অধিকারী করেছে এবং সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনশীলতাকে এই উম্মাহর একটি সহজাত বৈশিষ্ট্যে পরিণত করেছে। এমনকি তাদের পতনের যুগে এবং ইসলামি রাষ্ট্রের বিলুপ্তির পরও এই উম্মাহর সদস্যরা তাদের প্রখর বুদ্ধিমত্তা, প্রতিভা, বিশুদ্ধতা, সত্যের প্রতি ভালোবাসা এবং এর প্রতি আত্মমর্যাদাবোধ দ্বারা আলাদা হয়ে আছে। এর সাথে রয়েছে তাদের সুস্থ স্বভাব (ফিতরাত) এবং উন্নত মানসিকতা, যা ইসলামের ধারণাগুলোকে সঠিকভাবে অনুধাবন ও অনুসরণ করার মাধ্যমে তাদের ঐক্যবদ্ধ করে।

    তৃতীয়ত: ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি ও খনিজ উৎপাদন এবং এর সন্তানদের কাছে শত শত বিলিয়ন ডলার মূল্যের বিপুল সম্পদের উপস্থিতির দিক থেকে আমাদের দেশগুলো এক চমৎকার অবস্থানে রয়েছে। তাছাড়া, এই দেশগুলো প্রায় একত্রিত অবস্থায় তিনটি মহাদেশের সংযোগস্থলে এমন এক ভূখণ্ডে অবস্থিত, যা বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি স্থান হিসেবে বিবেচিত।

    চতুর্থত: বিশ্বের এমন কোনো দেশ নেই যেখানে বিজ্ঞানের এবং শিল্পের বিভিন্ন শাখায় মুসলিম সন্তানরা সম্মানজনক অবস্থানে নেই। পশ্চিমা বিশ্ব নিজেই শিল্প, কৃষি, গবেষণাকেন্দ্র, ল্যাবরেটরি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত ক্ষেত্রে হাজার হাজার মুসলিম সন্তানে পরিপূর্ণ। সেখানে রয়েছেন শত শত প্রথম সারির ব্যবসায়ী। যারা পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সময় কাটিয়েছেন, তারা উপলব্ধি করতে পারেন মুসলিম সন্তানরা কীভাবে উৎকর্ষ সাধন করছে। ভাষার বাধা এবং জীবনের নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সমবয়সীদের তুলনায় তাদের শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্ট চোখে পড়ে।

    এর পাশাপাশি আমরা যদি এ কথা স্মরণ করি যে, এটি আল্লাহর বার্তা এবং তাঁর বাণী—যা তিনি সত্য ও ন্যায়ের সাথে পূর্ণতা দান করেছেন এবং সমগ্র মানবতার জন্য অপরিহার্য করেছেন। তিনি সত্যই জানিয়েছেন যে, তিনি এই দ্বীনকে সকল দ্বীনের ওপর বিজয়ী করবেন, কাফিররা তা যত অপছন্দই করুক না কেন। এটিই চিরস্থায়ী বাণী ও শাশ্বত বার্তা। এরপরও কি এই বার্তা বহনে ইসলামি উম্মাহর সক্ষমতা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে? আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা বলেছেন:

    هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ

    “তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি একে সকল দ্বীনের ওপর বিজয়ী করেন, মুশরিকরা তা যত অপছন্দই করুক না কেন।” (সূরা আস-সাফ: ৯)

    মহান আল্লাহ আরও বলেন:

    إِنَّا لَنَنصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُومُ الْأَشْهَادُ

    “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে দুনিয়ার জীবনে সাহায্য করি এবং যেদিন সাক্ষীরা দণ্ডায়মান হবে (সেদিনও সাহায্য করব)।” (সূরা গাফির: ৫১)

    এই সত্যগুলো অবশ্যই সমগ্র মানবতার কাছে হিদায়াতের বার্তা বহন করার জন্য আমাদের কাছে অনুপ্রেরণা ও চালিকাশক্তি হওয়া উচিত।

    وَلَيَنصُرَنَّ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ

    “আর আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করেন যে তাঁকে সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী।” (সূরা আল-হাজ্জ: ৪০)

  • ওপেক (OPEC) – এর ঐতিহাসিক পটভূমি, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং মুসলিম বিশ্বের ভবিষ্যৎ

    ওপেক (OPEC) – এর ঐতিহাসিক পটভূমি, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং মুসলিম বিশ্বের ভবিষ্যৎ

    সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) ওপেক (OPEC) ত্যাগ করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা বিশ্ব অর্থনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে চলেছে। সংবাদমাধ্যমগুলোতে এটিকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, যা বিশ্ববাজারে তেলের দামের গতিপ্রকৃতি বদলে দিতে পারে এবং ওপেকের মতো শক্তিশালী তেল কার্টেলের একচেটিয়া আধিপত্যের অবসান ঘটাতে পারে।

    তবে এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে শুধু অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ কাজ করছে না। এর গভীরে লুকিয়ে আছে সৌদি আরবের সাথে আমিরাতের ক্ষমতার নীরব লড়াই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক কৌশল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান জায়নিস্ট-মার্কিন-ইরান সংঘাত। এই সম্পূর্ণ পরিস্থিতি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হলে আমাদের ইতিহাসের পাতা উল্টে ওপেক গঠনের প্রকৃত কারণ, পেট্রোডলারের ফাঁদ এবং গালফ দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের দিকে তাকাতে হবে।

    ওপেকের জন্ম – প্রচলিত আখ্যান বনাম ঐতিহাসিক বাস্তবতা

    ওপেক (OPEC) বা ‘অর্গানাইজেশন অফ পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ’ হলো মূলত তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি জোট বা ‘কার্টেল’। অর্থনৈতিক পরিভাষায়, কার্টেল হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে একই ধরনের পণ্য সরবরাহকারী প্রতিযোগীরা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা না করে জোটবদ্ধ হয়ে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে। ওপেকের ক্ষেত্রে, তারা তেলের উৎপাদন বাড়িয়ে বা কমিয়ে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করে। উৎপাদন কমালে দাম বাড়ে, আর বাড়ালে দাম কমে। এটি বাজারের একটি সাধারণ মনোপলি বা একচেটিয়া কৌশল।

    ওপেক গঠনের একটি বহুল প্রচলিত সাধারণ আখ্যান রয়েছে। বলা হয়, ১৯৬০-এর দশকের আগে বিশ্বের তেল বাজার নিয়ন্ত্রণ করত সাতটি বৃহৎ পশ্চিমা তেল কোম্পানি, যাদের একত্রে ‘সেভেন সিস্টার্স’ (Seven Sisters) বলা হতো। তারা উৎপাদনকারী দেশগুলোর সাথে কোনো আলোচনা না করেই একতরফাভাবে তেলের দাম কমিয়ে দিত, যার ফলে আরব রাষ্ট্রগুলো এবং ভেনিজুয়েলা রাতারাতি বিপুল রাজস্ব হারাত। এই পশ্চিমা শোষণের হাত থেকে নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতেই ১৯৬০ সালে সৌদি আরব, ইরাক, ইরান, কুয়েত এবং ভেনিজুয়েলা মিলে ওপেক গঠন করে।

    কিন্তু এই আখ্যানটি সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক সত্য নয়; বরং এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুদূরপ্রসারী কৌশলকে আড়াল করে।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে তিনটি বড় পরিবর্তন ঘটছিল:

    ১. ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের পতন: দুটি বিধ্বংসী বিশ্বযুদ্ধের পর, এক সময়ের পরাক্রমশালী ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের মতো ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো আর্থিকভাবে প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল। যুদ্ধের বিপুল ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাদের অর্থনীতি চরম সংকটের মুখে পড়ে এবং সামরিক শক্তিও ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে যায়। একই সময়ে, আফ্রিকা, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের উপনিবেশগুলোতে স্বাধীনতার দাবি ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। উপনিবেশগুলোতে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা এবং বিদ্রোহ দমন করা এই যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপীয় শক্তিগুলোর পক্ষে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলস্বরূপ, তারা বাধ্য হয়ে একে একে তাদের উপনিবেশগুলোর ওপর থেকে সরাসরি শাসন প্রত্যাহার করে নিতে শুরু করে, যা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করে এবং নতুন পরাশক্তিগুলোর উত্থানের পথ প্রশস্ত করে।

    ২. সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থান এবং সমাজতন্ত্রের ভীতি: সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ, বিশেষ করে প্রাকৃতিক সম্পদের ‘জাতীয়করণ’-এর ধারণা, তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ১৯৫১ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি জাতীয়করণ করেন। এর জবাবে ১৯৫৩ সালে সিআইএ (CIA) এবং এমআই৬ (MI6) এর মদদে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। একইভাবে ১৯৫৬ সালে মিসরের জামাল আব্দুল নাসের সুয়েজ খাল কোম্পানি জাতীয়করণ করলে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েল মিসরে আক্রমণ চালায়।

    ৩. মার্কিন সাম্রাজ্যের বিস্তার: ইউরোপীয় শক্তিগুলোর পতনের সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল, যাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিস্তার ঠেকানো যায় এবং বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ—তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়।

    এই প্রেক্ষাপটে, পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বদলে যুক্তরাষ্ট্র এক নতুন কৌশল গ্রহণ করে। তারা এমন একদল পশ্চিমা-ঘেঁষা আরব ও ভেনিজুয়েলান নেতার মাধ্যমে ওপেক গঠন করে, যারা পশ্চিমাদের দ্বারা শিক্ষিত এবং প্রভাবিত ছিলেন। বাইরে থেকে মনে হতো স্থানীয় নেতারাই তেলের দাম নির্ধারণ করছেন এবং তারা স্বাধীন। কিন্তু বাস্তবে তারা বিপি (BP), শেল (Shell) বা টেক্সাকোর (Texaco) মতো পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলোর পরামর্শেই কাজ করতেন। এটি ছিল সরাসরি উপনিবেশবাদের বদলে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের এক নতুন পশ্চিমা মেকানিজম, যার উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয়দের ক্ষোভ প্রশমন করা এবং তাদের সোভিয়েত ব্লকে যোগ দেওয়া থেকে বিরত রাখা।

    ১৯৭৩ সালের তেল অবরোধ এবং পেট্রোডলার সাম্রাজ্যের উত্থান

    অনেকেই ১৯৭৩ সালের তেল অবরোধকে (Oil Embargo) পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে ওপেকের একটি স্বাধীন ও সাহসী পদক্ষেপ বলে মনে করেন। ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধে (Yom Kippur War) ইসরায়েলকে সমর্থন করার প্রতিবাদে আরব দেশগুলো পশ্চিমাদের ওপর তেল অবরোধ আরোপ করে, যার ফলে তেলের দাম তিনগুণ বেড়ে যায় এবং আমেরিকায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।

    কিন্তু ডিক্লাসিফায়েড সিআইএ (CIA) ফাইল এবং তৎকালীন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের নিজস্ব বক্তব্য থেকে এক ভিন্ন ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিসিঞ্জার মনে করতেন, মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের জন্য প্রয়োজন। তিনি এই আরব-ইসরায়েল যুদ্ধকে এমনভাবে পরিচালিত হতে দিয়েছিলেন যাতে দুটি লক্ষ্য অর্জিত হয়:

    প্রথমত, ইসরায়েলকে কিছুটা দুর্বল করে তাদের আরব প্রতিবেশীদের সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা।

    দ্বিতীয়ত, আরব দেশগুলোকে বুঝিয়ে দেওয়া যে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির একমাত্র পথ ওয়াশিংটন হয়েই যায়।

    এই তেল অবরোধের সবচেয়ে বড় ফলাফল ছিল ‘পেট্রোডলার’ (Petrodollar) সিস্টেমের জন্ম। ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর (বিশেষ করে সৌদি আরব) মধ্যে একটি অলিখিত চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ওপেকভুক্ত দেশগুলো শুধুমাত্র মার্কিন ডলারে তেল বিক্রি করতে সম্মত হয়। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র এই রাজতন্ত্রগুলোর সামরিক সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়। এটি ছিল এমন এক চুক্তি যা পুরো বিশ্বের অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

    যেহেতু বিশ্বের প্রতিটি দেশের তেল কেনার জন্য মার্কিন ডলারের প্রয়োজন, তাই বিশ্বজুড়ে ডলারের অসীম চাহিদা তৈরি হয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ইচ্ছেমতো ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ছাপিয়ে তাদের বিশাল জাতীয় ঋণ মেটাতে সক্ষম হয়, কারণ তারা জানত মুদ্রাস্ফীতি হবে না। অন্যদিকে, উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের তেলের মুনাফা পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র এবং মার্কিন রাষ্ট্রীয় বন্ডে (Treasuries) বিনিয়োগ করতে শুরু করে। এভাবেই ওপেক, যা কিনা পশ্চিমা প্রভাব কমানোর কথা বলে তৈরি হয়েছিল, তা পরোক্ষভাবে মার্কিন আধিপত্যকে পাকাপোক্ত করে এবং মুসলিম বিশ্বের সম্পদ দিয়ে পশ্চিমা অর্থনীতিকে চিরস্থায়ী শক্তিতে পরিণত করে।

    ব্রিটিশ বিদায়, জিসিসি গঠন এবং সৌদি আরবের আধিপত্য

    সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের বর্তমান দ্বন্দ্ব বুঝতে হলে গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল (GCC) বা উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।

    দশকের পর দশক ধরে এই উপসাগরীয় আমিরাতগুলো (Sheikhdom) ব্রিটিশদের সুরক্ষায় ছিল। বৃটেন কেবল তাদের উপদেষ্টাই ছিল না, বরং তাদের পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা এবং বাণিজ্য সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু ১৯৭১ সালের দিকে বৃটিশ সাম্রাজ্যের পতন স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং তারা এই অঞ্চল থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়।

    বৃটিশদের এই বিদায়ের পর উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি বিশাল ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। ইরান এবং বড় প্রতিবেশী সৌদি আরবের দ্বারা গ্রাস হয়ে যাওয়ার ভয়ে ছোট ছোট উপসাগরীয় দেশগুলো ভীত ছিল। এই ভয় এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের রেখে যাওয়া কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই ১৯৮১ সালে গঠিত হয় জিসিসি (GCC)—যার সদস্য হয় সৌদি আরব, আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন এবং ওমান। এর লক্ষ্য ছিল আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা।

    কিন্তু এই নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থায় একটি দেশ সবার ওপরে স্থান করে নেয়—সৌদি আরব। বিশাল ভূখণ্ড, সাড়ে তিন কোটি জনসংখ্যা, শক্তিশালী মার্কিন-সমর্থিত সামরিক বাহিনী এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—তাদের হাতে থাকা ‘অতিরিক্ত তেল উৎপাদন ক্ষমতা’ (Spare Oil Capacity)

    ‘স্পেয়ার অয়েল ক্যাপাসিটি’ মানে হলো, সৌদি আরবের এমন অবকাঠামো প্রস্তুত আছে যা দিয়ে তারা চাইলেই খুব দ্রুত দীর্ঘ সময়ের জন্য তেলের উৎপাদন বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তেলের দাম নির্ধারণের এই ক্ষমতা সৌদি আরবকে ওপেকের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করে। তারা কোটা নির্ধারণ করে দিত এবং অন্য গালফ রাষ্ট্রগুলো তা মেনে চলতে বাধ্য হতো, যাতে তেলের দাম কমে গিয়ে তাদের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

    সংযুক্ত আরব আমিরাতের উত্থান এবং অস্তিত্ব রক্ষার নীরব যুদ্ধ

    সৌদি আরবের তুলনায় সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) অত্যন্ত ছোট একটি দেশ। তাদের মোট জনসংখ্যা মাত্র ১.১ কোটি, যার মধ্যে প্রকৃত আমিরাতি নাগরিক মাত্র ১০ লক্ষের কিছু বেশি। তাদের সামরিক বাহিনী এবং ভৌগোলিক আয়তনও সৌদির তুলনায় নগণ্য। প্রথাগত মাপকাঠিতে আমিরাতের পক্ষে সৌদিকে চ্যালেঞ্জ করা অসম্ভব।

    কিন্তু আমিরাতের নেতৃত্ব শুরুতেই তাদের দুটি বড় দুর্বলতা চিহ্নিত করতে পেরেছিল:

    ১. তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং
    ২. কৌশলগত গভীরতার (Strategic Depth) অভাব।

    অন্যান্য দেশ যখন তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে বসেছিল, আমিরাত তখন ভিন্ন পথে হাঁটে। তারা দুবাইকে কেন্দ্র করে বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক, লজিস্টিক এবং এভিয়েশন হাব গড়ে তোলে। এশিয়া, আফ্রিকা এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে বাণিজ্যের মূল প্রবেশদ্বার হয়ে ওঠে দুবাই।

    কিন্তু শুধু অর্থনৈতিক শক্তিই যথেষ্ট ছিল না। কৌশলগত গভীরতা অর্জনের জন্য আমিরাত তাদের বিশাল সম্পদ ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে (বিশেষ করে লোহিত সাগর এবং ভারত মহাসাগরের কৌশলগত নৌপথগুলোতে) বন্দর নিয়ন্ত্রণ এবং প্রক্সি মিলিশিয়াদের অর্থায়ন শুরু করে। তারা সামরিকভাবে দেশ দখল না করে অর্থনৈতিক ও লোহিত সাগরের বাণিজ্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করে।

    সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু: আমিরাতেরও বিশাল তেল মজুত এবং ‘স্পেয়ার অয়েল ক্যাপাসিটি’ রয়েছে। তারা দিনে প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করতে সক্ষম হলেও সৌদি নেতৃত্বাধীন ওপেকের কোটার কারণে তাদের ৩০ লাখ ব্যারেলে আটকে থাকতে হয়। সৌদি আরবের এক ব্যারেল তেল তুলতে খরচ হয় মাত্র ৩ ডলার, কিন্তু আমিরাতের জন্য এটি লাভজনক হলেও সৌদির কোটার কারণে তারা পূর্ণ মুনাফা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ২০২০ সালে রাশিয়া যখন সৌদির কোটা মানতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন সৌদি আরব বিশ্ববাজারে সস্তায় তেল ভাসিয়ে দিয়ে তেলের দাম ৪০ ডলারে নামিয়ে এনেছিল, যা অন্য দেশগুলোর অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করেছিল। আমিরাত সৌদির এই একচেটিয়া খবরদারির ওপর চরম ক্ষুব্ধ।

    এর পাশাপাশি যোগ হয়েছে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’। রিয়াদ এখন দুবাইয়ের বিকল্প হিসেবে লজিস্টিক ও ফিন্যান্সিয়াল হাব হতে চাইছে। এটি দুবাইয়ের অর্থনৈতিক মডেলের জন্য সরাসরি একটি অস্তিত্বের সংকট।

    বর্তমান ভূ-রাজনীতি, হরমুজ প্রণালী এবং আমিরাতের ওপেক ত্যাগের সিদ্ধান্ত

    UAE leaves OPEC

    বর্তমান জায়নিস্ট-মার্কিন-ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে এক অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আমিরাত এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে ওপেক থেকে বেরিয়ে আসার রাজনৈতিক আবরণ (Political Cover) পেয়ে গেছে।

    যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধের মতো পরিস্থিতিতে আমিরাতের প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। তারা চায় ওপেকের কোটা থেকে বেরিয়ে তাদের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করে বেশি তেল বিক্রি করতে। তারা আর সৌদির নিয়ন্ত্রণ মানতে রাজি নয়, কারণ ইরানের পর তারা সৌদি আরবকেই তাদের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে দেখে।

    আমিরাত বিশ্বাস করে, ওয়াশিংটনের সাথে তাদের গভীর সম্পর্ক (যেমন- কারেন্সি সোয়াপ লাইন যা তাদের সস্তায় ডলার পেতে সাহায্য করে) এবং ইসরায়েলের সাথে স্বাভাবিকীকরণ চুক্তির মাধ্যমে তারা একটি স্বাধীন শক্তিশালী বলয় তৈরি করতে পারবে। তারা এখন সৌদি বলয় থেকে বেরিয়ে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ভারত অক্ষের দিকে ঝুঁকছে।

    আমেরিকার নীতি পরিবর্তন এবং ওপেকের ভবিষ্যৎ

    স্নায়ুযুদ্ধের সময় এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগ পর্যন্ত ওপেকের মতো বহুজাতিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ আমেরিকার জন্য সুবিধাজনক ছিল। এটি মার্কিন নিয়ন্ত্রণকে বৈধতা দিত।

    কিন্তু আজকের দিনে আমেরিকা বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি এবং তারা নিজেরাই বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ। এখন আর তাদের এসব বহুজাতিক সংগঠনের প্রয়োজন নেই। আমেরিকা এখন বহুজাতিক চুক্তির বদলে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে বেশি আগ্রহী।

    ওপেক দুর্বল হলে বা ভেঙে গেলে তা মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী তো নয়ই, বরং সহায়ক। ওপেকের কোটা প্রথা ভেঙে গেলে দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়বে, তেলের দাম কমবে, যা পশ্চিমা অর্থনীতির মুদ্রাস্ফীতি কমাতে সাহায্য করবে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যেই আমিরাতের এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন, কারণ সস্তা তেল আমেরিকার অর্থনীতির জন্য লাভজনক।

    মুসলিম বিশ্বের ট্র্যাজেডি এবং ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা

    এই সম্পূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক চালচিত্র মুসলিম বিশ্বের জন্য এক বিশাল ট্র্যাজেডি এবং শিক্ষণীয় বিষয়। ওপেক এবং তেলের ইতিহাস স্পষ্টভাবে দেখায় কীভাবে মুসলিম উম্মাহর অমূল্য সম্পদ পশ্চিমা শক্তি এবং গুটিকয়েক রাজপরিবারের স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হয়েছে।

    এই প্রাকৃতিক সম্পদ কোনো নির্দিষ্ট পরিবার, রাজা বা শাসকের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি পুরো মুসলিম উম্মাহর সম্পদ। গত কয়েক দশকে তেল থেকে উপার্জিত ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার যদি পশ্চিমা ব্যাংকে বা মার্কিন ট্রেজারিতে বিনিয়োগ না করে মুসলিম বিশ্বের কল্যাণে ব্যয় করা হতো, তবে আজ এই অঞ্চলে কোনো ক্ষুধা, দারিদ্র্য বা বেকারত্ব থাকত না। এই অর্থ দিয়ে পুরো মুসলিম বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী শিল্প ও প্রযুক্তিগত ভিত্তি গড়ে তোলা যেত, যা সত্যিকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করত।

    বর্তমানে আমরা মধ্যপ্রাচ্যে যে জোটগুলো দেখছি—একদিকে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো দেশগুলোর জোটবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা, অন্যদিকে আমিরাত, ভারত এবং ইসরায়েলের নতুন অক্ষ—এগুলো সবই ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ এবং সাময়িক লেনদেনের (Transactional interests) ওপর ভিত্তি করে তৈরি। স্বার্থের মিল থাকলে এই দেশগুলো বন্ধু হয়, আর স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে তারা একে অপরের শত্রুতে পরিণত হয় (যেমনটি এখন সৌদি এবং আমিরাতের মধ্যে ঘটছে)। জাতীয়তাবাদী স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া কোনো ঐক্যই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না; তা সহজেই ভেঙে যায় বা বিক্রি হয়ে যায়।

    শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই অঞ্চলের মানুষের ঐক্যের ভিত্তি ছিল ভিন্ন। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর এঁকে দেওয়া মানচিত্র বা ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং ইসলামী সভ্যতার অভিন্ন দৃষ্টিভংগি ও মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে তাদের ঐক্য ছিল। এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ধর্ম নয়, বরং ছিল শাসন ও ঐক্যের মূল ভিত্তি। যতক্ষণ না মুসলিম বিশ্ব এই কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে একটি আদর্শিক ও সত্যিকারের ঐক্যের পথে ফিরে আসছে, ততক্ষণ ইয়েমেন বা ফিলিস্তিনের মতো সংঘাত থামবে না, এবং বাইরের শক্তির কাছে মুসলিম সম্পদের এই নীরব লুণ্ঠন চলতেই থাকবে।

  • পশ্চিমা বিশ্ব ও তৃতীয় বিশ্বের সম্পদ: উপনিবেশবাদ থেকে আধুনিক অর্থনৈতিক লুণ্ঠনের এক সুদীর্ঘ ইতিহাস

    পশ্চিমা বিশ্ব ও তৃতীয় বিশ্বের সম্পদ: উপনিবেশবাদ থেকে আধুনিক অর্থনৈতিক লুণ্ঠনের এক সুদীর্ঘ ইতিহাস

    আধুনিক বিশ্বে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা বা বয়ান (Narrative) হলো, পশ্চিমা বিশ্ব—বিশেষ করে উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপীয় দেশগুলো—তাদের বর্তমান অর্থনৈতিক পরাশক্তি এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের শিখরে আরোহণ করেছে কেবল তাদের নিজস্ব মেধা, কঠোর পরিশ্রম, মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর মাধ্যমে। কিন্তু ইতিহাসের পাতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির গভীরতর সামষ্টিক বিশ্লেষণ আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার মুখোমুখি করে। এই নির্জলা বাস্তবতা হলো শোষণ, উপনিবেশবাদ (Colonialism) এবং সুকৌশলী আধুনিক আর্থিক কাঠামোর মাধ্যমে তৃতীয় বিশ্ব বা গ্লোবাল সাউথ (Global South) থেকে অবিরাম সম্পদ পাচারের এক ভয়াবহ ও ধারাবাহিক চিত্র।

    প্রদত্ত ভিডিওটির মূল সুর এবং বিভিন্ন গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে এটি স্পষ্ট যে, পশ্চিমা উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি তাদের নিজেদের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরের সম্পদ নয়; বরং শতাব্দী ধরে এশিয়া, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে পদ্ধতিগতভাবে লুণ্ঠিত সম্পদই তাদের এই অভাবনীয় উন্নতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। নিচে এই ঐতিহাসিক ও আধুনিক লুণ্ঠন প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত বিস্তারিত এবং ব্যাখ্যামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।

    ১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: উপনিবেশবাদ এবং বৃটিশ ভারতের সম্পদ লুণ্ঠন

    বর্তমান বৈশ্বিক বৈষম্যকে বুঝতে হলে আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। সম্পদ লুণ্ঠনের এই প্রথা আজকের নয়, বরং এটি শত শত বছর ধরে চলে আসা এক সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। এর সবচেয়ে বড় এবং প্রকট উদাহরণ হলো ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসন।

    প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক উৎসা পট্টনায়ক (Utsa Patnaik) প্রায় দুই শতাব্দীর কর এবং বাণিজ্যের বিশদ উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেছেন যে, বৃটিশরা ভারত থেকে যে পরিমাণ সম্পদ লুণ্ঠন করেছে তার আর্থিক মূল্যমান কল্পনাতীত। তার গবেষণা অনুযায়ী, ১৭৬৫ সাল থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে বৃটেন ভারত থেকে প্রায় ৯.২ ট্রিলিয়ন পাউন্ড সম্পদ পাচার করেছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন (৪৫ লাখ কোটি) মার্কিন ডলার। এই হিসাবটি বের করা হয়েছে ভারতের রপ্তানি উদ্বৃত্ত আয়কে ৫ শতাংশ সুদের হারে চক্রবৃদ্ধি করে।

    লুণ্ঠনের অভিনব মেকানিজম (Tax-and-Buy System & Council Bills):

    বৃটিশরা কীভাবে এই বিশাল সম্পদ পাচার করেছিল, তার পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত ধূর্ত। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন দেওয়ানি লাভ করে, তখন তারা একটি অদ্ভুত ব্যবস্থার জন্ম দেয়। এর আগে বৃটেন সাধারণ নিয়মে রুপা বা সোনা দিয়ে ভারতের কৃষিপণ্য ও টেক্সটাইল কিনত। কিন্তু দেওয়ানি লাভের পর তারা ভারতীয় কৃষকদের ওপর চড়া করারোপ করে এবং সেই করের টাকার একটি বড় অংশ (প্রায় এক-তৃতীয়াংশ) দিয়েই আবার ভারতীয়দের পণ্য কিনতে শুরু করে। অর্থাৎ, বৃটিশরা ভারতীয়দের নিজস্ব উৎপাদিত পণ্য কিনছিল ভারতীয়দেরই দেওয়া করের টাকা দিয়ে। এটি ছিল মূলত বিনা মূল্যে পণ্য আত্মসাৎ করার এক অভিনব প্রতারণা।

    পরবর্তীতে ১৮৫৮ সালে বৃটিশ রাজ শাসনভার গ্রহণের পর এই ব্যবস্থা আরও জটিল আকার ধারণ করে। তখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারতীয়দের পণ্য কেনার জন্য “কাউন্সিল বিল” (Council Bills) নামক একটি বিশেষ পেপার কারেন্সি বা কাগজের মুদ্রা চালু করা হয়, যা কেবল লন্ডনে সোনা বা রুপা দিয়ে কেনা যেত। বিদেশি ব্যবসায়ীরা লন্ডনে সোনা দিয়ে এই বিল কিনতেন এবং সেই বিল দিয়ে ভারতীয়দের মূল্য পরিশোধ করতেন। ভারতীয়রা যখন স্থানীয় বৃটিশ অফিসে সেই বিল ভাঙাতেন, তখন তাদেরকে স্থানীয় করের টাকা থেকে রুপি দেওয়া হতো। ফলে ভারতের পাওনা সমস্ত সোনা ও রুপা সরাসরি লন্ডনের কোষাগারে জমা হতে থাকে।

    ভারতীয় অর্থনীতি ও জনজীবনে প্রভাব:

    এই অপরিসীম লুণ্ঠনের ফলাফল ছিল ভারতের জন্য চরম বিপর্যয়কর।

    • ১৯০০ সাল থেকে ১৯৪৬ সালের মধ্যে ভারতে মাথাপিছু আয়ে কার্যত কোনো প্রবৃদ্ধি হয়নি।
    • উচ্চ করের চাপে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এতটাই কমে গিয়েছিল যে, ১৯০০ সালে যেখানে বার্ষিক মাথাপিছু খাদ্যশস্য ভোগের পরিমাণ ছিল ২০০ কেজি, তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ১৫৭ কেজিতে এবং ১৯৪৬ সালে তা ১৩৭ কেজিতে নেমে আসে।
    • পুষ্টিহীনতা এবং রোগের কারণে মানুষ মাছির মতো মারা যেত; ১৯১১ সালে একজন ভারতীয়র গড় আয়ু ছিল মাত্র ২২ বছর।
    • অন্যদিকে, এই লুণ্ঠিত সম্পদ এবং সস্তা কাঁচামালই বৃটেনে শিল্প বিপ্লবের (Industrial Revolution) মূল চালিকাশক্তি এবং অর্থায়নের উৎস হিসেবে কাজ করেছিল।

    ২. আধুনিক লুণ্ঠনের হাতিয়ার: পেট্রো-ডলার এবং”কালো সোনা”

    Oil: The Black Gold

    উপনিবেশবাদের যুগ শেষ হলেও লুণ্ঠন থামেনি, কেবল তার রূপ পরিবর্তন হয়েছে। আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানি হলো তেল, যাকে ‘কালো সোনা’ (Black Gold) বলা হয়। মধ্যপ্রাচ্যসহ তৃতীয় বিশ্বের এই মহামূল্যবান সম্পদকে পশ্চিমা বিশ্ব কীভাবে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে, তা বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অবিচারগুলোর একটি।

    তেলের অবমূল্যায়ন এবং পেট্রো-ডলার ব্যবস্থা:

    গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের গড় মূল্য কৃত্রিমভাবে ব্যারেল প্রতি মাত্র ২৫ ডলারের আশেপাশে রাখা হয়েছিল। একটি ব্যারেল তেলের যে অর্থনৈতিক উপযোগিতা, তার তুলনায় এই দাম ছিল হাস্যকর। ফ্রান্সের সাধারণ মিনারেল ওয়াটারের দামও এই তেলের চেয়ে বহুগুণ বেশি। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মাইকেল মুর (Michael Moore) তার “ফারেনহাইট ৯/১১” (Fahrenheit 9/11) ডকুমেনটারিতে দেখিয়েছেন যে, এই কম দামের সুযোগ নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো প্রায় ৮৪ ট্রিলিয়ন ডলার সমমূল্যের সম্পদ তৃতীয় বিশ্ব থেকে লুটে নিয়েছে। পশ্চিমাদের গত ৬০-৮০ বছরের বিশাল শিল্পায়ন এবং কারখানাগুলোর বিকাশ মূলত এই অত্যন্ত সস্তা জ্বালানির ওপর নির্ভর করেই ঘটেছে।

    তেলের এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো পেট্রো-ডলার সিস্টেম (Petrodollar System)। সত্তরের দশকের পর থেকে এই ব্যবস্থা মার্কিন ডলারের আধিপত্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে। এই ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল কেনাবেচা বাধ্যতামূলকভাবে মার্কিন ডলারে করতে হয়। এর ফলে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো প্রচুর ডলার আয় করে এবং পরবর্তীতে সেই ডলার “পেট্রো-ডলার রিসাইক্লিং” (Petrodollar Recycling) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বা পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগ করতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ, তেলের টাকা শেষ পর্যন্ত ঘুরেফিরে আমেরিকার কোষাগারেই জমা হয়, যা তাদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী রাখে।

    বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন:

    তবে, এই পেট্রো-ডলার ব্যবস্থায় সম্প্রতি ফাটল ধরতে শুরু করেছে।

    • ২০২১ সালে ইরান চীনের সাথে ২৫ বছর মেয়াদী একটি কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং তাদের তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ ইউয়ানে (Yuan) বিক্রি শুরু করে।
    • ২০২৩ সালে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো (Aramco) এবং চীনের সিনোপেকের (Sinopec) মধ্যে চুক্তির ফলে দ্বিপাক্ষিক তেল বাণিজ্যের প্রায় ৬৫ শতাংশ ইউয়ানে লেনদেন শুরু হয়।
    • একই বছর কাতার পেত্রোচায়নার (PetroChina) সাথে দীর্ঘমেয়াদী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) চুক্তিতে ডলারকে পাশ কাটিয়েছে।

    এই পরিবর্তনগুলো প্রমাণ করে যে, ডলারের আধিপত্য এবং পশ্চিমাদের একচেটিয়া অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

    ৩. সার্বভৌম সম্পদ তহবিল (Sovereign Wealth Fund) এবং পশ্চিমাদের অর্থায়ন

    পশ্চিমা বিশ্বের বড় বড় প্রকল্প, মহাকাশ গবেষণা, কিংবা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বিপ্লবের পেছনে যে বিশাল অর্থের প্রয়োজন, তা পশ্চিমা দেশগুলো নিজস্ব পকেট থেকে খরচ করে না। এই অর্থের একটি বিশাল জোগান আসে মধ্যপ্রাচ্য এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর “সার্বভৌম সম্পদ তহবিল” (Sovereign Wealth Fund – SWF) থেকে।

    সার্বভৌম সম্পদ তহবিল কী?

    সার্বভৌম সম্পদ তহবিল হলো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিনিয়োগ তহবিল, যা সাধারণত কোনো দেশের পণ্য রপ্তানি (যেমন: তেল বা গ্যাস) থেকে অর্জিত রাজস্ব বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে গঠিত হয়। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের সময় থেকে এই তহবিলগুলো বিশ্বজুড়ে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমানে বৈশ্বিক SWF-এর সম্পদের পরিমাণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

    গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (GCC) এবং মার্কিন অর্থনীতি:

    মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো—বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ইত্যাদি—তাদের তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে এই ধরনের বিশাল তহবিল গঠন করেছে। বর্তমানে এই অঞ্চলে প্রায় এক ডজন সাভরেইন ফান্ডের অধীনে ৪ থেকে ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পদ রয়েছে।

    • আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিশাল সম্পদের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হলো স্বয়ং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গ্লোবাল এসডাব্লিউএফ-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে উপসাগরীয় অঞ্চলের বৃহত্তম সাতটি তহবিল প্রায় ১১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যার সিংহভাগই গেছে যুক্তরাষ্ট্রে।
    • সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (PIF) ব্ল্যাকস্টোনের (Blackstone) একটি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ডে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং ব্ল্যাকরক (BlackRock), গোল্ডম্যান স্যাক্স-এর (Goldman Sachs) মতো পশ্চিমা আর্থিক জায়ান্টদের সাথে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে।
    • এছাড়া, মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং প্রযুক্তি খাতেও এই দেশগুলোর অর্থ ঢালা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ওপেনএআই (OpenAI) এবং এক্সএআই (xAI)-এর মূলধন সংগ্রহে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এমজিএক্স (MGX) বিশাল বিনিয়োগ করেছে।

    অর্থাৎ, তৃতীয় বিশ্বের যে অর্থ তাদের নিজেদের দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল, সেই অর্থ দিয়ে আমেরিকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লব ঘটানো হচ্ছে এবং মার্কিন শেয়ারবাজারকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে রাখা হচ্ছে।

    ৪. আধুনিক ঋণ ফাঁদ এবং নিট সম্পদ স্থানান্তর (Net Resource Transfer)

    পশ্চিমা বহুজাতিক কোম্পানি (Multinational Corporations) এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর (যেমন: IMF, World Bank) মাধ্যমে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) এবং ঋণের আড়ালে একটি কাঠামোগত লুণ্ঠন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

    উন্নয়নশীলদেশগুলোর বর্তমান সংকট:

    জাতিসংঘের ‘ফাইন্যান্সিং ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৪’ (Financing for Sustainable Development Report 2024) অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।

    • বর্তমানে এই দেশগুলোর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বার্ষিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন ঘাটতি রয়েছে।
    • বহু উন্নয়নশীল অর্থনীতি আজ ঋণের ভারে জর্জরিত, যার ফলে দারিদ্র্য এবং ক্ষুধা নিরসনের কয়েক দশকের অগ্রগতি থমকে গেছে।

    ঋণ এবং লুণ্ঠনের চক্র:

    ১৯৮০ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে বিভিন্ন শর্তে প্রায় ১৫০০ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ১৫০০ বিলিয়ন ডলার ঋণের মধ্যে প্রায় ১০০০ বিলিয়ন ডলারই আবার পশ্চিমা বিশ্বে ফেরত চলে গেছে। এটি কীভাবে সম্ভব?

    এটি ঘটে মূলত অসম বিনিময়, ঋণের চড়া সুদ, এবং “ক্যাপিটাল ফ্লাইট” (Capital Flight) বা অর্থ পাচারের মাধ্যমে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নীতিনির্ধারণের কাজ প্রায়ই আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, যারা পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষা করে এমন একতরফা নীতি চাপিয়ে দেয় (one-size-fits-all approach)। ফলে ঋণের মাধ্যমে যে অর্থ তৃতীয় বিশ্বে আসে, তা দেশের প্রকৃত উন্নয়নে ব্যবহৃত না হয়ে বহুজাতিক কোম্পানির লভ্যাংশ হিসেবে কিংবা দুর্নীতিবাজ অভিজাত শ্রেণির মাধ্যমে সুইজারল্যান্ড বা আমেরিকার ব্যাংকেই আবার জমা হয়।

    ৫. শাসকশ্রেণির দায়বদ্ধতা এবং সুবিধাভোগী মানসিকতা (Rent-Seeking)

    এই সামগ্রিক লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায় তৃতীয় বিশ্ব বা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো এবং শাসকশ্রেণির ভূমিকা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। পশ্চিমা বিশ্ব তাদের শোষণ প্রক্রিয়া এতটা মসৃণভাবে চালাতে পারত না, যদি না তৃতীয় বিশ্বের শাসকরা তাদের সহযোগী হতেন।

    রেন্ট-সিকিং বা সুবিধাভোগী এলিট শ্রেণি:

    উন্নয়নশীল দেশগুলোর, বিশেষ করে পাকিস্তান বা অন্যান্য গ্লোবাল সাউথ দেশগুলোর শাসক এবং এলিট শ্রেণি প্রায়শই ‘রেন্ট-সিকিং’ (rent-seeking) বা সুবিধাভোগী মানসিকতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। তারা বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে সম্পদ (প্রধানত ঋণের চুক্তির মাধ্যমে) সংগ্রহ করে এবং তার বোঝা পরোক্ষ করের মাধ্যমে দরিদ্র ও কর্মজীবী মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়।

    রাজনৈতিক শর্তারোপ এবং সহায়তার প্রহসন:

    পশ্চিমা মদদপুষ্ট এই ব্যবস্থায় আর্থিক সহায়তার নামে কীভাবে প্রহসন করা হয়, তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো পাকিস্তানের স্টেট ব্যাংকে সৌদি আরবের অর্থ জমা রাখা। পাকিস্তান যখন চরম ডলার সংকটে ভোগে, তখন সৌদি আরব স্টেট ব্যাংকে ১ বিলিয়ন ডলার জমা রাখে, কিন্তু শর্ত জুড়ে দেয় যে এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে না। এটি কেবল ব্যালেন্স শিট ভারী করে দেখানোর জন্য রাখা হয়, যাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) কাছে দেশের আর্থিক সামর্থ্যের একটি বিভ্রম তৈরি করা যায়। একইভাবে, তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে মেগা প্রজেক্ট বা রিফাইনারি স্থাপনের নামে বছরের পর বছর কালক্ষেপণ করা হয়, যার মূল উদ্দেশ্য থাকে পশ্চিমা দেশগুলোর ফিজিবিলিটি স্টাডি বা কনসালটেন্সির নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া।

    ৬. উপসংহার: উত্তরণের পথ এবং ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থা

    উপরের এই বিশদ আলোচনা থেকে এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, পশ্চিমা বিশ্বের বর্তমান অর্থনৈতিক আধিপত্য কোনো অলৌকিক জাদুর ফল নয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির করের টাকায় ভারতের পণ্য কেনা থেকে শুরু করে আজকের পেট্রো-ডলার পুনর্ব্যবহার এবং সাভরেইন ওয়েলথ ফান্ডের মার্কিন প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ—পুরো প্রক্রিয়াটি একই সুতোর ভিন্ন ভিন্ন প্রান্ত। এটি একটি নিঁখুত ঔপনিবেশিক মডেল (Colonial Model), যা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে তার বাহ্যিক রূপ পরিবর্তন করেছে মাত্র।

    উন্নয়নশীল বিশ্ব এবং মুসলিম দেশগুলোর সম্পদ মূলত একটি “গ্লোবাল ওয়েলথ ড্রেইন” (Global Wealth Drain) প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত পশ্চিমা কোষাগারে গিয়ে জমা হচ্ছে। এর থেকে মুক্তির পথ অত্যন্ত দুর্গম। যতক্ষণ পর্যন্ত না গ্লোবাল সাউথ তাদের নিজস্ব মুদ্রা ব্যবস্থা (যেমনটি ব্রিকস বা ইউয়ানের মাধ্যমে শুরু হয়েছে) শক্তিশালী করতে পারবে, আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোতে নিজেদের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে পারবে এবং অভ্যন্তরীণ দুর্নীতিবাজ ও পরজীবী শাসকশ্রেণির পতন ঘটিয়ে দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আধুনিক এই লুণ্ঠন প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে। পশ্চিমা বিশ্বের চোখধাঁধানো উন্নয়নের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই বঞ্চনার ইতিহাস ও অর্থনীতি সম্পর্কে সচেতন হওয়াই এই শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।