একজন মতাদর্শিক মুসলিম হওয়ার অপরিহার্যতা

অক্সফোর্ড ডিকশনারি Ideology (আদর্শ) শব্দটির সংজ্ঞা দিয়েছে এভাবে:
“a system of ideas and ideals, especially one which forms the basis of economic or political theory and policy or a set of beliefs characteristic of a social group or individual.”
অর্থাৎ, একটি ধারণা ও বিশ্বাসের সমষ্টি, যা বিশেষভাবে কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও নীতির ভিত্তি গঠন করে, কিংবা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যমূলক বিশ্বাসব্যবস্থা।
“Ideology” শব্দটির উৎপত্তি ফরাসি বিপ্লবের সময়। ১৭৮৯ সালে ফরাসি দার্শনিক Antoine Destutt de Tracy প্রথম এটি ব্যবহার করেন idéologie শব্দ থেকে, যার মূল অর্থ ছিল “science of ideas” বা ধারণার বিজ্ঞান। পরবর্তীতে এটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামাজিক চিন্তাধারার প্রসারে ব্যবহার হতে থাকে, যার উদ্দেশ্য ছিল মানবসমাজের ভাষা, বর্ণ, ভৌগোলিক পার্থক্য নির্বিশেষে এসব ধারণাকে বাস্তবে কার্যকর করা।
শেখ তাকিউদ্দিন আন-নাবাহানী রহিমাহুল্লাহ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ نظام الإسلام (System of Islam)-এ Ideology (مبدأ) এর সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে:
«المبدأ هو عقيدة عقلية ينبثق عنها نظام»
অর্থাৎ, “আদর্শ (মাবদা’) হলো একটি বুদ্ধিভিত্তিক আক্বীদাহ, যার থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা উৎসারিত হয়। আক্বীদাহ হলো মানুষ, জীবন ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা—যা এই জীবনের পূর্ববর্তী বাস্তবতা, মৃত্যুর পরবর্তী বাস্তবতা এবং এ জীবনের সাথে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বাস্তবতার সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করে।”
কেউ যদি ইসলাম ও আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ এর জীবনকে বুঝতে চান, তবে সহজেই এই পরিভাষাটি ইসলাম ও নবীর সংগ্রামের সাথে সম্পৃক্ত করতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে, এ শব্দটি ইসলামের ক্ষেত্রে যথার্থভাবে প্রযোজ্য এবং স্পষ্টভাবে ব্যবহার করা যায় আমাদের নবী ﷺ -এর জীবন ও ইসলামের প্রকৃতি (The essence of Islam) বর্ণনা করতে। কেননা ইসলাম নিজেই একটি আদর্শ (Ideology)—যা পূর্ণাঙ্গ ও বিশদ ব্যবস্থাসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করে, যা আল-কুরআনে সংজ্ঞায়িত এবং আল্লাহর রাসূল ﷺ -এর জীবনে বাস্তবভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর জীবন ছিল এক আদর্শিক সংগ্রাম, যা পৃথিবীতে বাস্তবায়নের জন্য পরিচালিত হয়েছিল—মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরে: ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে এবং নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় ও জনজীবনের (public life) পর্যায়ে, যেখানে সমাজের কাঠামো, অর্থনৈতিক নীতি, এমনকি বিশ্বব্যাপী বৈদেশিক সম্পর্ক পর্যন্ত ইসলামের নির্দেশনা দ্বারা পরিচালিত হতো।
ঐতিহাসিকভাবে ইসলামকে আদর্শ (Ideology) ছাড়া অন্য কিছু হিসেবে বোঝার কোনো দ্ব্যর্থতা বা অস্পষ্টতা ছিল না। আমাদের পূর্বসূরিরা এর স্পষ্ট প্রমাণ আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন, তারা ইসলামকে শুধুমাত্র ইবাদত বা আধ্যাত্মিকতায় সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ হিসেবে বুঝেছিলেন। তাদের আদর্শিক উপলব্ধিই তাদেরকে দাওয়াহ ও জিহাদের মাধ্যমে ইসলামকে বিশ্বব্যাপী বিস্তার করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।যখন তারা ইসলামকে সর্বত্র প্রচার করেছেন এমন পর্যায়ে যে, খিলাফাহ রাষ্ট্র একটি ক্ষুদ্র চারাগাছের মতো মদিনা থেকে শুরু করে ৪৫০০ মাইল বিস্তৃত এক বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়েছিল। এর শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হয়েছিল পূর্ব দিকে চীনের সীমান্ত পর্যন্ত এবং পশ্চিমে ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত।
তাদের ইসলামের প্রতি এই আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গিই এমন এক প্রজন্মের জন্ম দিয়েছিল, যারা আদর্শ দ্বারা চালিত মুসলিম ছিল। তাদের প্রতিটি কর্ম তাদের আক্বীদাহ’র (عقيدة) সঙ্গে যুক্ত ছিল। আর এই ইসলামী আক্বীদাহ-ই (عقيدة إسلامية) তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছিল ইসলামকে পৃথিবীব্যাপী বাস্তবায়ন করতে।
অতএব, একজন মুসলিমের জন্য অপরিহার্য হলো ইসলামকে একই আদর্শিক কাঠামোর ভেতরে বুঝতে পারা। কারণ এই ধারণা থেকে সামান্যতম বিচ্যুতিও একজন মুসলিমের কর্মকে প্রভাবিত করে এবং তা অবিশ্বাসী ঔপনিবেশিকদের সেই ষড়যন্ত্রকে সফল করতে পারে, যা ইসলামের প্রকৃত বার্তাকে (message) ক্ষীণ ও দুর্বল করে ফেলে। তারা ইসলামের সংগ্রামকে—যা বিশ্বের সব ভ্রান্ত মতবাদ ও আদর্শের বিরুদ্ধে একটি চ্যালেঞ্জ—তা থেকে সরিয়ে এনে এক বহুত্ববাদী (pluralistic) ইসলাম উপস্থাপন করতে চায়। এমন এক ইসলাম, যেখানে রয়েছে পরস্পর বিরোধিতা, অসামঞ্জস্য, আপোস ও সংশয়বাদ—যা আজকাল আমরা সমাজে বহুলভাবে দেখতে পাই।
ইসলামের আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি হারানোর বিপদ ও এর বাস্তব পরিণতি এবং তা আজ উম্মাহ হিসেবে আমরা প্রত্যক্ষ করছি। আমরা এমন মুসলিমদের দেখতে পাচ্ছি যারা ইসলামের বার্তায় (narration) ঈমান রাখে, কিন্তু নিজেদের উপর শাসন করার জন্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়। আমরা এমন মুসলিমদেরও দেখি যারা কিছু হারাম থেকে দূরে থাকে—যেমন মদ্যপান থেকে বিরত থাকে, বিবাহ-পূর্ব যৌন সম্পর্ক এড়িয়ে চলে এবং শূকরের মাংস খায় না—কিন্তু ব্যবসায় সুদের সঙ্গে খেলা করে কিংবা সুদভিত্তিক ছাত্রঋণ গ্রহণ করে। আমরা এমন মুসলিমদেরও দেখি যারা নিয়মিত মসজিদে যায় এবং এমনকি ইসলামের দাওয়াত কার্যক্রমেও যুক্ত থাকে; কিন্তু ইসলামের প্রতি আদর্শিক (Ideological) উপলব্ধি অনুপস্থিত থাকার কারণে তারা পশ্চিমা নৈতিকতা ও নীতিশাস্ত্রের ধারণার উপর ভিত্তি করে ব্যক্তিগত সংস্কার (individual reform) ও দানশীলতার (philanthropy) আহ্বান জানায়। আবার কেউ কেউ জাগতিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আহ্বান জানায়—ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম পালন করে কিন্তু জনসমক্ষে ইসলামের বাস্তবায়নের ব্যাপারে অবহেলা করে।
আরেকটি বিষয় যা একজন মুসলিমের জানা ও বোঝা জরুরি, তা হলো—ইসলামের আদর্শ (Ideology of Islam) ইতিহাসে, বর্তমানে এবং সর্বদা অন্যান্য সকল আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধী থাকবে; তা সে আধুনিক ও প্রভাবশালী যেমন পুঁজিবাদ (Capitalism) হোক বা বিলুপ্তপ্রায় যেমন উপজাতীয়তাবাদ (Tribalism), সমাজতন্ত্র (Socialism), বিশৃঙ্খলাবাদ (Anarchism) কিংবা অন্য যে কোনো –বাদ যা বিশ্বে প্রবেশের চেষ্টা করে। এই আদর্শিক লড়াইয়ের মধ্যে একজন মুসলিম কোনোভাবেই ভীত, উৎকণ্ঠিত, লজ্জিত, ভেঙে পড়া বা কাপুরুষ হতে পারবে না—ইসলামের আদর্শ প্রচার ও বাস্তবায়নের কাজে—মিডিয়া, জনমত বা রাজনীতিবিদদের কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট চাপ যাই থাকুক না কেন।
গত দুই দশকে আমরা ইসলামী শরিয়াহর বিরুদ্ধে অসংখ্য আক্রমণ প্রত্যক্ষ করেছি, বিশেষত ৯/১১ ঘটনার পর এবং মার্কিন নেতৃত্বাধীন তথাকথিত “সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধ”-এর পর থেকে। এর পর লন্ডন বোমা হামলা, ভারতীয় বোমা হামলা, আত্মঘাতী বোমা হামলা, বোস্টন বোমা হামলা এবং লন্ডনে এক ব্রিটিশ সেনাকে ছুরিকাঘাত করার মতো ঘটনাগুলো ঘটেছে। এমনকি এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, ইসলামের প্রেক্ষাপটে বলা যেকোনো রাজনৈতিক শব্দ, পদ বা অভিব্যক্তি জুড়ে দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত রাজনৈতিকভাবে কলুষিত পরিভাষার সঙ্গে—যেমন “সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ, ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ, র্যাডিকালিজম” ইত্যাদি। এ সকল আদর্শিক আক্রমণ আসলে ইসলামের জন্য নতুন কিছু নয় কিংবা কেলেঙ্কারির বিষয় নয়; কেননা ইসলামি উম্মাহ এ ধরনের বিরোধিতা বহু শতাব্দী ধরে প্রত্যক্ষ করেছে—আদম (আঃ) সৃষ্টির পর থেকেই এবং কিয়ামত পর্যন্ত এ ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে থাকবে।
নিশ্চয়ই ইসলামের আদর্শ হুমকি—আজকের বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য নয়, অমুসলিমদের জন্যও নয়, যারা ইসলামী রাষ্ট্রে ধিম্মি (ذِمِّي) হিসেবে বৈধ নাগরিকত্বের মর্যাদা পাবে; নয় বিশ্বের নিরীহ নারী বা শিশুদের জন্য, ধর্ম-বিশ্বাস বা মূল্যবোধ যাই হোক না কেন। বরং এ আদর্শ হুমকি তাদের জন্য—যারা অক্লান্তভাবে ও নিরন্তর চেষ্টা করছে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা খিলাফাহ’র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঠেকাতে, ইসলামী আদর্শের পুনর্জাগরণকে বাধাগ্রস্ত করতে—নিজেদের কামনা-বাসনা পূরণ করার জন্য অথবা ইসলামের প্রতি তাদের ঘৃণাকে লালন করার জন্য।
ইসলাম এক চিরন্তন/ কালজয়ী আদর্শ হিসেবে আগমন করেছে, যা সমগ্র বিশ্বে বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য। ইসলামের একটি অনন্য রাজনৈতিক ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে শাসকদের জবাবদিহিতা সম্পূর্ণ স্বচ্ছ। ইসলামের একটি অনন্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও রয়েছে, যার প্রধান উদ্দেশ্য হলো দারিদ্র্যতা দূর করা এবং সম্পদ বণ্টনে যে কোনো প্রতিবন্ধকতা দূর করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কিভাবে ইসলামকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। এটাই সেই আদর্শ, যা তাদের জন্য হুমকি যারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা প্রদত্ত স্বাধীনতাকে অপব্যবহার করে উল্টো পথে চলে, অহংকারভরে পৃথিবীতে বিচরণ করে এবং মানুষকে নিপীড়ন করে। এটাই সেই আদর্শ যা পুঁজিবাদের জন্যও হুমকি, কেননা এটি সেই অস্বাভাবিক ও অবিচারমূলক ফলাফলগুলোকে উল্টে দেবে, যেখানে আজকের দিনে বিশ্বের ৮০% সম্পদ পৃথিবীর মাত্র ৫% জনগণের হাতে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এটাই সেই আদর্শ, যা আজকে প্রবলভাবে আক্রমণ ও ধর্মনিরপেক্ষীকরণের (secularized) মাধ্যমে সংকুচিত করা হচ্ছে—যাতে ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ থেকে শুধুমাত্র এক অন্ধ বিশ্বাসে (blind faith) পরিণত করা যায়।
একজন মুসলিম যখন ইসলাম গ্রহণ করে, তখন সে মূলত আদর্শিক (ideological) হয়ে যায়। কারণ তার প্রত্যেকটি কর্মের বিধান তাকে ইসলামি ‘আক্বীদাহ’ থেকে গ্রহণ করতে হয়। আর এই আক্বীদাহই নির্ধারণ করে দেয় সে কিভাবে জীবন যাপন করবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কে তার ধারণা কিরূপ হবে। ইসলামের সংজ্ঞা অনুযায়ী শাসনব্যবস্থা নির্ধারিত, যা সংবিধান ও আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সব সমস্যার সমাধান দেয়। ইসলামে বিশ্বাস করা মানেই এই বিশ্বাস করা যে ইসলামকে বিশ্ব শাসন করতে হবে, কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদেরকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন।
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
“তোমরা মানবজাতির জন্য উদ্ভূত সর্বোত্তম উম্মাহ। তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজ থেকে নিষেধ কর এবং আল্লাহতে ঈমান রাখ।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১১০)
একজন আদর্শিক মুসলিম তার সকল কর্মকাণ্ডে সতর্ক থাকবেন যেন তা ইসলামের শরীয়াহ’র সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং তিনি সর্বশক্তি ব্যয় করবেন ইসলামকে পূর্ণাঙ্গভাবে অনুসরণের জন্য। আদর্শিক মুসলিম বিশ্বে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব কামনা করবেন, কেননা তিনি বুঝতে পারবেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ -এর দাওয়াহ মিশন ও লক্ষ্য কী ছিল। আদর্শিক মুসলিম বিনয়ী হয়ে ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করবেন এবং সব কাজ করবেন একমাত্র তাঁর সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির জন্য, অন্য কোনো কামনা বা লালসার জন্য নয়। কেননা তিনি ভালো করেই জানেন তার কর্মকাণ্ডের পরিণতি কী এবং কিয়ামতের দিনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সামনে দাঁড়িয়ে তাকে কীভাবে হিসাব দিতে হবে।
যে মুসলিম নবী মুহাম্মদ ﷺ এর জীবনকে অনুকরণ করতে চায় এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে সন্তুষ্ট করতে চায়, তার উচিত নিজের ইসলামের বোধ (understanding) সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করা। আপনার ইসলামের ধারণা কি সত্যিকার অর্থে ইসলামকে একটি আদর্শবাদী মতাদর্শ হিসেবে প্রতিফলিত করে? যদি না করে, তবে আপনি কোন ইসলামকে বিশ্বাস করছেন? একজন মুসলিম কখনো কুরআনের সেই আয়াতগুলোকে উপেক্ষা বা অবহেলা করতে পারে না, যেখানে স্পষ্টভাবে শরিয়াহর বিধান, জিহাদ ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। শুধু এ কারণে যে এগুলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে বা চরমপন্থী হিসেবে আখ্যায়িত হয়, একজন আদর্শবাদী মুসলিমের উচিত নয় এগুলো থেকে দূরে সরে থাকা। বরং তার উচিত এসব বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করা, অধ্যয়ন করা এবং সঠিকভাবে বুঝে দাওয়াহ প্রদান করা, যাতে শরিয়াহ ও ইসলামের পররাষ্ট্রনীতিকে যথাযথভাবে রক্ষা করা যায়, যা আজ কঠোর সমালোচনার শিকার।
রাসূল ﷺ বলেছেন:
«مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَى أَمْرِي فَهُوَ رَدٌّ»
“যে কোনো কাজ আমার প্রদত্ত নির্দেশনা অনুযায়ী করা হয়নি, তা প্রত্যাখ্যাত।” (সহীহ বুখারি ৩৪২৫)
একজন আদর্শিক মুসলিম প্রতিটি সমস্যাকে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করবে। এটি সত্যিই একটি জীবনব্যাপী যাত্রা—একজন মুসলিমকে তার পূর্ববর্তী মনোভাব, পছন্দ-অপছন্দ, এবং ইসলামের বাইরে থাকা অন্যান্য আদর্শ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থেকে মুক্ত হতে হবে এবং তার কর্মকাণ্ডকে ইসলামের বিশুদ্ধ রূপের (pure form) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। বাস্তবতা হলো, ইসলামী রাষ্ট্রের অভাবে, যা উম্মাহকে ইসলামিক সংস্কৃতির মাধ্যমে গড়ে তোলে, প্রত্যেক মুসলিম ভুল ধারণার শিকার হতে পারে, যা ইসলামের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ। এই ভুল ধারণা যে কোনো রূপে হতে পারে—সেক্যুলার, আধুনিকতাবাদী, সংস্কারবাদী, সাংস্কৃতিক বা বিদেশী (Secular, Modernist, Reformist, Cultural বা Foreign) ইত্যাদি। এই কারণেই একজন মুসলিমের জন্য ইসলামকে একটি আদর্শ (Ideology) হিসেবে বোঝা দ্বিগুণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়, যাতে সে তার ইসলামী ব্যক্তিত্ব (Islamic Personality) সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারে এবং জীবনযাপন করতে পারে ইসলামের নির্দেশিত পথ অনুযায়ী।
ইসলামের পুনর্জাগরণের জন্য যত্নসহকারে ও নিরলসভাবে কাজ করার প্রেরণা মূলত ইসলামের আদর্শগত উপলব্ধি (ideological understanding) থেকে উদ্ভূত। একজন মুসলিম যখন কোনো সমস্যার অনুভব করে—তা সে পরিবারের মধ্যে ব্যক্তিগত সমস্যা হোক, কিংবা বাইরের জগতে দৈনন্দিন লেনদেনের সময় (যেমন বাজার করা, কাজ করা, ভ্রমণ ইত্যাদি) উপলব্ধি করা সমস্যা হোক, অথবা রাজনৈতিক আলোচনা সম্পর্কিত সমস্যা হোক—যেমন মুসলিম বিশ্বের ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি, স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা কিংবা আমাদের ভূমিতে পাশ্চাত্যের হস্তক্ষেপ—তখন সে সমস্যার প্রকৃতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে এবং উপলব্ধি করে যে, এই সমস্যাগুলির মূল কারণ হলো দুনিয়ায় ইসলামী বিধানসমূহের অনুপস্থিতি। কারণ মুসলমানদের মাঝে ইসলামের আদর্শগত উপলব্ধির ঘাটতির কারণে তারা তাদের কর্মে ইসলামকে অবহেলা করছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানদণ্ড হিসেবে ইসলামের পরিবর্তে পশ্চিমা ধারণাকে (Western ideas) ব্যবহার করছে। যেমন— মতপ্রকাশের স্বাধীনতা “freedom of speech” বা মালিকানার স্বাধীনতা “freedom of ownership” এর মানদণ্ড দিয়ে নির্ধারণ করছে কোনো কাজ করা যাবে কিনা, অথচ ইসলামের দিকে ফিরে যাচ্ছেনা। আমরা এর উদাহরণ দেখি, যখন কোনো মুসলিম কিশোর বলে বসে: “I can do what I want, it is my choice” (আমি যা খুশি তাই করতে পারি, এটা আমার পছন্দ)। অথবা যখন কোনো মুসলিম দম্পতি সুদভিত্তিক মর্টগেজে তাদের প্রথম বাড়ি কেনার সময় দাবি করে, “এটি আমাদের জন্য বৈধ।” কিংবা কোনো মুসলিম মনে করে যে, মুসলিমদের একটি নির্দিষ্ট এমপি (member of parliament) -কে ভোট দেওয়ার জন্য সংগঠিত করে সে ইসলামকে সাহায্য করছে। কিন্তু যে মুসলিম ইসলামকে তার সঠিক আদর্শিক রূপে (correct ideological narrative) বোঝে, সে এসব সমস্যার উৎসকে ইসলামের অনুপস্থিতি এবং জনজীবন (public life) থেকে ইসলামের বিচ্ছিন্নতার সাথে সম্পর্কিত করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন:
«مَثَلُ الْقَائِمِ عَلَى حُدُودِ اللَّهِ وَالْوَاقِعِ فِيهَا، كَمَثَلِ قَوْمٍ اسْتَهَمُوا عَلَى سَفِينَةٍ، فَأَصَابَ بَعْضُهُمْ أَعْلَاهَا وَبَعْضُهُمْ أَسْفَلَهَا، فَكَانَ الَّذِينَ فِي أَسْفَلِهَا إِذَا اسْتَقَوْا مِنَ الْمَاءِ مَرُّوا عَلَى مَنْ فَوْقَهُمْ، فَقَالُوا: لَوْ أَنَّا خَرَقْنَا فِي نَصِيبِنَا خَرْقًا وَلَمْ نُؤْذِ مَنْ فَوْقَنَا، فَإِنْ يَتْرُكُوهُمْ وَمَا أَرَادُوا هَلَكُوا جَمِيعًا، وَإِنْ أَخَذُوا عَلَى أَيْدِيهِمْ نَجَوْا وَنَجَوْا جَمِيعًا»
অর্থাৎ: “আল্লাহর সীমারেখা (হুদূদ) রক্ষা করার চেষ্টা করা লোকদের দৃষ্টান্ত এবং যারা তা ভঙ্গ করে তাদের দৃষ্টান্ত একটি নৌকায় একসাথে বসবাসকারী লোকদের মতো। তাদের কেউ উপরের তলায় এবং কেউ নিচের তলায় বাস করে। নিচের তলার লোকেরা যখন পানি নিতে চায় তখন তাদের উপরের তলায় যেতে হয়। তখন তারা বলে, ‘যদি আমরা আমাদের অংশে নিচে একটি ছিদ্র করি (যাতে সরাসরি পানি নিতে পারি) এবং উপরতলার লোকদের কষ্ট না দিই, তাহলে কেমন হয়?’ যদি উপরতলার লোকেরা তাদের (নিচের তলার লোকদের) ইচ্ছামতো কাজ করতে দেয় তবে সবাই ধ্বংস হবে। আর যদি তারা তা থেকে বাধা দেয় তবে সবাই রক্ষা পাবে।”(সহীহ বুখারী)
তিনি (আদর্শিক মুসলিম) উপলব্ধি করবেন যে, পুঁজিবাদী অর্থনীতি এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে যেখানে একজন মানুষের পক্ষে বাড়ি কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে এবং তাকে বাধ্য হয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয়। অথচ ইসলাম সুদকে (রিবা) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে এবং ঋণ-ভিত্তিক অর্থনীতির ধারণার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। তিনি বুঝবেন যে, যৌন স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তিশালী জনমত না থাকা এবং শরীয়াহ্ দ্বারা এটি নিয়ন্ত্রণ না করাই হচ্ছে সে কারণ, যার ফলে একজন মুসলিম তার প্রবৃত্তি হারাম উপায়ে পূরণ করছে। কিংবা একজন মুসলিম নারী ইসলামী পোশাক বিধান পরিত্যাগ করছে, কারণ পশ্চিমা সামাজিক ব্যবস্থা তাকে উন্মুক্তভাবে ও আকর্ষণীয়ভাবে পোশাক পরার স্বাধীনতা দিচ্ছে; অথচ ইসলাম একজন মুসলিম নারীর জন্য নির্দিষ্ট পোশাকের বিধান সংজ্ঞায়িত করে দিয়েছে। আদর্শিক (Ideological) মুসলিম উপলব্ধি করেন যে, আজকের তরুণ মুসলিমরা ইসলামী শিক্ষাবিজ্ঞান থেকে বঞ্চিত একটি পরিবেশে বেড়ে উঠছে। জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামী সংস্কৃতির অনুপস্থিতিই হলো সেই কারণ, যার জন্য আজকের মুসলিম কিশোর তার খেয়াল-খুশি ও প্রবৃত্তিকে অনুসরণ করছে, ইসলামের মানদণ্ড অনুসারে নয়। তিনি উপলব্ধি করবেন যে, ইসলামী রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি মুসলিমদের জন্য তাদের দ্বীন পালন করার প্রাকৃতিক পরিবেশ কেড়ে নিয়েছে এবং এর পরিবর্তে এমন এক আদর্শ চাপিয়ে দিয়েছে যা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক—যেমন দুর্নীতিগ্রস্ত ধর্মনিরপেক্ষ (secular) ধারণা অথবা গোত্রবাদ (tribalism)-প্রসূত সাংস্কৃতিক ভ্রান্ত চিন্তাধারা।
অনেক আন্তরিক মুসলিম (sincere Muslims) ইসলামের প্রচার ও প্রসারে সাহায্য করার জন্য নানা কাজ সম্পাদন করেন। কিন্তু অত্যন্ত জরুরি হলো—এই কাজগুলো যেন ইসলামের সংজ্ঞায়িত আদর্শিক লক্ষ্য (Ideological objectives)-এর সাথে সম্পর্কিত হয়। এ বিষয়ে একজনকে শুধু মহানবী মুহাম্মদ ﷺ-এর মক্কী জীবনের দিকে মনোযোগ দিলেই যথেষ্ট। এমনকি একজন অমুসলিমও উপলব্ধি করবে যে, রাসূল ﷺ-এর মিশন ছিল আজকের ভাষায় যাকে বলা হয় একটি বিপ্লব। তিনি ﷺ আরব সমাজকে গোত্রীয় ও প্রথাগত সামাজিক রীতি থেকে ইসলামি বিধি-বিধানের দিকে রূপান্তরিত করেছিলেন। এ পরিবর্তন বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হয়েছিল এবং চলতে থাকে ১৯২৪ সালে ইসলামী খিলাফতের ধ্বংস পর্যন্ত। সুতরাং যে মুসলিম ইসলামের দাওয়াহ বহন করতে চায়, তার উদ্দেশ্যও একই হতে হবে—অর্থাৎ পুরো পৃথিবীতে ইসলামী বিধি-বিধান প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো। আজ একশ বছরেরো অধিক সময় ধরে রাষ্ট্র ও সমাজে ইসলামী বিধান ছাড়া জীবনযাপনের পর মুসলিম উম্মাহ আজ আবার শারিয়াহ্র বাস্তবায়নের জন্য তীব্রভাবে আকাঙ্ক্ষিত। অসংখ্য জরিপে দেখা গেছে—মুসলিম বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শারিয়াহ্র অধীনে জীবনযাপন করতে চায়। যদিও এ সত্য প্রমাণে জরিপের প্রয়োজন নেই। শুধু গত দুই দশক ধরে দেখা গেছে মুসলিম বিশ্ব ইসলামকে আঁকড়ে ধরতে জীবন দিতেও প্রস্তুত, যেমন আমরা সিরিয়ার উম্মাহর দৃষ্টান্তে প্রত্যক্ষ করেছি। অতএব যে মুসলিম ইসলামকে সঠিকভাবে বুঝেছে, সে উপলব্ধি করবে যে ইসলামী রাষ্ট্রই মুসলিমদের পুনর্জাগরণের কেন্দ্রবিন্দু এবং তাই সে ইসলামের দাওয়াহ ও রাসূল ﷺ-এর মিশন বাস্তবায়নের প্রচেষ্টায় এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানাবে।
আদর্শিক মুসলিম, যে ইসলামী পুনর্জাগরণের চেষ্টা করে, তার জীবন হবে না একঘেয়ে—যেখানে কেবল অফিসে যাওয়া, ঘরে ফেরা, ঘুমানো ও ছুটির দিনে আরাম করা। বরং সে প্রতিদিন হাজারো সমস্যা অনুভব করে এবং উপলব্ধি করে যে, ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা কতটা জরুরি। সে জানে তার হাতে কী বিশাল দায়িত্ব রয়েছে এবং সর্বশক্তি দিয়ে সে এই চিন্তাধারা ছড়িয়ে দিতে আগ্রহী। তার মন মেনে নিতে পারে না যে মানবজাতি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাকে অবহেলা করে কুফরের অতল গহ্বরে পতিত হয়েছে, আর এর ফলেই মানবজাতির উপর নির্যাতন নেমে এসেছে—অথচ মুসলিমরা ব্যাপকভাবে এ সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আল্লাহ تعالى বলেন:
هُوَ ٱلَّذِيٓ أَرۡسَلَ رَسُولَهُۥ بِٱلۡهُدَىٰ وَدِينِ ٱلۡحَقِّ لِيُظۡهِرَهُۥ عَلَى ٱلدِّينِ كُلِّهِۦ وَلَوۡ كَرِهَ ٱلۡمُشۡرِكُونَ
“তিনিই সেই সত্তা যিনি তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দ্বীন সহ প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি এটিকে সমস্ত দ্বীনের উপর বিজয়ী করেন, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।”
(সূরা আত-তাওবাহ: ৩৩)তার সংবাদ অনুসরণ (following the news) করার অভ্যাস তাকে সপ্তাহান্তে আরামে থাকতে দেয় না। কারণ সে অনুভব করে, ইসলামকে ঘিরে প্রচারণা এবং আক্রমণের নতুন নতুন কৌশল চলছে। সে রাষ্ট্রসমূহের পারস্পরিক সম্পর্কের গভীরতা বোঝে এবং উপলব্ধি করে কীভাবে রাষ্ট্রগুলো চতুরভাবে যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে মুসলিম ভূমিগুলোর উপর তাদের সাম্রাজ্যবাদ কায়েম রাখছে এবং ইসলামী রাষ্ট্রের উত্থানকে রোধ করছে। ফলে সে অনুভব করে—এটার মোকাবিলা করতে হবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিশ্লেষণমূলক আলোচনার মাধ্যমে তার সমাজের মধ্যে। সে চায় মানবজাতি শান্তিতে থাকুক এবং সে বোঝে যে, এটি কেবল তখনই সম্ভব হবে যখন মানবজাতিকে ইসলাম দ্বারা পুনর্জীবিত (revived) করা হবে। অতএব অবসর সময়ে কোনো নির্দিষ্ট আলোচনার বিষয়ে তার বোধ (understanding) বৃদ্ধি করার জন্য তার হাত বই ছাড়া পিছিয়ে থাকে না। জনজীবনে (in public life) তার অংশগ্রহণও এমন আলোচনাহীন হয় না, যেখানে সে নিজের আদর্শ শেয়ার করতে পারে। স্ত্রী, পরিবার বা বন্ধুদের সাথে তার সময় শুধু বিনোদন বা অপ্রাসঙ্গিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সেই সময়কে সে একটি সুবর্ণ সুযোগে পরিণত করে—যাতে আরো মানুষকে ইসলামের আদর্শের দিকে আকৃষ্ট ও আহ্বান জানাতে পারে। সে একটি পরিকল্পনার সাথে কাজ করে, যেখানে তার সপ্তাহগুলো যতটা সম্ভব ফলপ্রসূ হয় এবং অগ্রাধিকার থাকে ইসলামের পুনর্জাগরণের আহ্বান। এজন্য সে নিজের নফসী আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে—যেমন সিনেমায় নতুন মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র দেখতে যাওয়া, স্ত্রীকে নিয়ে নতুন রেস্টুরেন্টে ঘন ঘন ভ্রমণ করা, খেলাধুলায় অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা, কিংবা ঘর, গাড়ি বা ব্যক্তিগত যন্ত্রপাতি নিয়ে নিখুঁত সাজসজ্জায় অতিরিক্ত সময় নষ্ট করা। সে সর্বদা নিম্নোক্ত কুরআন ও হাদীসকে মনে রাখে-
আল্লাহ تعالى বলেন:
قُلۡ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحۡيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ
“বলুন: নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু—সবই আল্লাহর জন্য, যিনি সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক।” (সূরা আল-আন‘আম: ১৬২)
আর রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ»
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে ঈমান রাখে, সে যেন কল্যাণকর কথা বলে অথবা নীরব থাকে।”
(সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)“একজন মতাদর্শপ্রাণ মুসলিম বা আদর্শিকভাবে চালিত মুসলিম (ideologically driven Muslim) হওয়ার অর্থ হলো—এই আদর্শের দাওয়াহ’ই তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু, যার চারপাশে তার সমগ্র জীবন আবর্তিত হয়। যদি এমন না হয়, তবে বুঝতে হবে সে মুসলিম ইসলামকে আদর্শ (Ideology) হিসেবে অনুধাবন করতে পারেনি। অর্থাৎ, ইসলাম এমন একটি চিন্তা-ধারা যা বর্ণ বা ভৌগোলিক সীমানাকে অতিক্রম করে এবং এমন বিধান ধারণ করে যা সকল মানুষের জন্য, সকল সময়ে, সকল পরিস্থিতিতে সমভাবে প্রযোজ্য—ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনে যেমন, তেমনি সমাজ জীবনের ক্ষেত্রেও।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আমাদের ইসলামের নেয়ামত দান করেছেন, যাতে আমরা নির্বাচিত উম্মাহ হিসেবে ইসলামের আদর্শকে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিই। আজ আমরা সারা বিশ্বে বিস্তৃত—এটি আমাদের পূর্বসূরিদের কর্মফল, যারা ইসলামের পতাকা (راية الإسلام) উঁচিয়ে ধরেছিলেন এবং তাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উৎসর্গ করেছিলেন ইসলামের বাস্তবায়নের জন্য, ইসলামের সঠিক আদর্শিক বোঝাপড়া (understanding) নিয়ে।
যদি আমরা ইসলামকে একইভাবে না বুঝি, তবে মুসলিমরা কুফরের ছায়ায় থেকেই যাবে এবং আমাদের প্রজন্ম ইসলামের বাস্তব রূপকে (practical manifestation of Islam) খিলাফাহর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করতে পারবে না। ইসলামী খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজ কেবলমাত্র আদর্শিক মুসলিমদের দ্বারাই সম্পন্ন হবে, এবং ইসলামের পুনর্জাগরণ (revival) ঘটবে তখনই—যখন উম্মাহ স্পষ্টভাবে ইসলামকে একটি আদর্শ (ideology) হিসেবে বুঝবে।
আল্লাহ تعالى বলেন:
ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗا
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।”
(সূরা আল-মায়েদাহ: ৩)দু’আ:
“হে আল্লাহ, আমাদেরকে সত্যিকার অর্থে ইসলামের আদর্শিক বোঝাপড়া দান করুন, যেভাবে আপনি আপনার প্রিয় রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ-কে এবং তাঁর সাহাবীগণকে দান করেছিলেন। আমাদের চিন্তা, বিশ্বাস, ভালোবাসা, পছন্দ-অপছন্দ ও কর্মসমূহ যেন কেবল আপনার দ্বীন ইসলাম অনুযায়ী হয়।” …আমীন।
আল্লাহর ইচ্ছায় সমাপ্ত
– কায়েস আবু মুহাম্মদ কর্তৃক অনুবাদকৃত ও পরিমার্জিত।
কুরআনের সাত হরফ

তৃতীয় অধ্যায়
কুরআনের সাত হরফ
একটি সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ أُنْزِلَ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ فَاقْرَءُوا مَا تَيَسَّرَ مِنْهُ
“নিশ্চয় এ কুরআন সাত হরফে অবতীর্ণ করা হয়েছে। সুতরাং সেগুলোর মধ্য হতে তোমাদের সহজ-সাধ্য পন্থা অবলম্বন করে পাঠ কর।”১১৯
এই হাদীসে কুরআনুল কারীম সাত হরফে অবতীর্ণ হওয়া দ্বারা কি উদ্দেশ্য? এটি অসংখ্য মতামতের মিলনমেলা এবং বিশাল পরিধি বিশিষ্ট একটি আলোচনা৷ আর সন্দেহাতীতভাবে তা কুরআনুল কারীমের দুর্বোধ্য ও কঠিনতম আলোচনার একটি। এখানে সম্পূর্ণ আলোচনা উদ্ধৃত করা তো মুশকিল। তবে এর সাথে সংশ্লিষ্ট অত্যাবশ্যকীয় বিষয়গুলো উপস্থাপন করছি।
উপরে যে হাদীস বর্ণনা করা হয়েছে অর্থের দিক থেকে তা মুতাওয়াতির। [অর্থাৎ নিরবিচ্ছিন্ন সনদ সূত্রে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত] যেমন, বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম আবু উবাইদ কাসেম ইবনে সালাম হাদীসটির তাওয়াতুর হবার বিষয়টি সুস্পষ্ট করেছেন। হাদীস ও কেরাতের সুপ্রসিদ্ধ ইমাম আল্লামা ইবনে জাযারী (রহ.) বলেন, আমি একটি পৃথক গ্রন্থে এই হাদীসের সবগুলো সূত্র একত্রিত করেছি । আর সেগুলোর আলোকে হাদীসটি হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.), হিশাম ইবনে হাকিম ইবনে হিযাম (রা.), আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.), উবাই ইবনে কা’ব (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.), মুআয ইবনে জাবাল (রা.), আবু হুরায়রা (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), আবু সাঈদ খুদরী (রা.), হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রা.), আবু বাকরা (রা.), আমর ইবনুল আস (রা.), যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.), আনাস ইবনে মালিক (রা.), সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.), ওমর ইবনে আবী সালামা (রা.), আবু জাহাম (রা.), আবু তালহা (রা.) ও উম্মে আইউব আনসারীয়্যাহ (রা.) থেকে বর্ণিত।১২০ এতদ্যতীত বহু মুহাদ্দিস এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, একবার হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) মিম্বরে দীড়িয়ে ঘোষণা দিলেন যে, যেসব সম্মানিত ব্যক্তিগণ দাড়িয়ে যান, যারা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এই হাদীস শোনেছেন, “কুরআনুল কারীম সাত হরফে নাযিল করা হয়েছে। যার প্রত্যেকটিই নিরাময়কারী ও যথেষ্ট।” তখন সাহাবায়ে কেরামের বিরাট একটি দল দাড়িয়ে গেলেন, যাদের সংখ্যা গণনা করা অসম্ভব।১২১
সাত হরফের মর্মার্থ
এই হাদীসে সর্ব প্রথম বিষয় হচ্ছে, সাত হরফে কুরআন নাযিল হওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য কী? এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন মতামত ও চিন্তাধারার কঠিন মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয়। এমনকি আল্লামা ইবনে আরাবী (রহ.) এ ব্যাপারে পয়ত্রিশটি মতামত একত্রিত করেছেন।১২২ সেগুলোর মধ্য হতে প্রসিদ্ধ ও উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মতামত এখানে পেশ করা হলো-
১. কেউ কেউ মনে করেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সুপ্রসিদ্ধ সাতজন কারীর সাত কেরাত। কিন্তু এ ধারণা একেবারেই ভুল ও ভ্রান্ত। কেননা, তাওয়াতুর বা নিরবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরায় সাব্যস্ত কেরাতসমূহ শুধু ‘সাত কেরাতে’র মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং আরো বহু কেরাত তাওয়াতুর সূত্রে সাব্যস্ত আছে। এ সাত কেরাত তো শুধু এ কারণেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে যে, আল্লামা ইবনে মুজাহিদ (রহ.) একটি গ্রন্থে ওই সাতজন কারীর কেরাতকে একত্রিত করেছেন। এর দ্বারা তার না এই উদ্দেশ্য ছিল যে, কেরাতকে সাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা আর না তিনি ওই সাত হরফের ব্যাখ্যা এই ‘সাত কেরাত’ দ্বারা করেছেন। যেমন, এর বিস্তারিত বর্ণনা যথাস্থানে আসবে।
২. উপরোক্ত কথার ভিত্তিতেই কোনো কোনো আলেম এই খেয়াল ব্যক্ত করেছেন যে, ‘হরফ’ দ্বারা সকল কেরাতকে বুঝানো হয়েছে। তবে ‘সাত’ শব্দ দ্বারা বিশেষ করে ‘সাত সংখ্যা’কেই বুঝানো হয়নি। বরং এর দ্বারা সংখ্যার আধিক্য বুঝানো হয়েছে। আরবী ভাষায় ‘সাত’ শব্দটি অধিকাংশ সময় কোনো বন্তর শুধু সংখ্যাধিক্য বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। এখানেও হাদীসের উদ্দেশ্য এই নয় যে, কুরআনুল কারীম শুধু সাত হরফের উপরই নাযিল হয়েছে। বরং উদ্দেশ্য হলো, কুরআনুল কারীম বহু পদ্ধতিতে নাযিল হয়েছে। মুতাকাদ্দিমীন উলামায়ে কেরামের মধ্য হতে কাযি আয়ায (রহ.)-এর অভিমত এটাই।১২৩ আর শেষ যুগের উলামায়ে কেরামের মধ্যে হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)ও এই মত গ্রহণ করেছেন।১২৪
কিন্ত এই মতটি এ জন্য সঠিক বলে মনে হয় না যে, বুখারী ও মুসলিম-এর এক হাদীসে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই বাণী বর্ণিত আছে যে-
أَقْرَأَنِي جِبْرِيلُ عَلَى حَرْفٍ فَرَاجَعْتُهُ، فَلَمْ أَزَلْ أَسْتَزِيدُهُ وَيَزِيدُنِي حَتَّى انْتَهَى إِلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ
“জিবরাঈল আমাকে এক হরফের উপর কুরআনুল কারীম আবৃত্তি করিয়েছেন। ফলে আমি তার শরণাপন্ন হলাম এবং আমি হরফ বৃদ্ধির আবেদন করলাম। তিনি বৃদ্ধি করতে থাকলেন। এমনকি তা সাত হরফে গিয়ে পৌছেছে।”১২৫
এর বিস্তারিত আলোচনা সহীহ মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) থেকে এভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনু গিফারের কূপের কাছে ছিলেন-
فَأَتَاهُ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلاَمُ فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكَ أَنْ تَقْرَأَ أُمَّتُكَ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفٍ، فَقَالَ: أَسْأَلُ اللَّهَ مُعَافَاتَهُ وَمَغْفِرَتَهُ، وَإِنَّ أُمَّتِى لاَ تُطِيقُ ذَلِكَ، ثُمَّ أَتَاهُ الثَّانِيَةَ فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكَ أَنْ تَقْرَأَ أُمَّتُكَ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفَيْنِ، فَقَالَ: أَسْأَلُ اللَّهَ مُعَافَاتَهُ وَمَغْفِرَتَهُ، وَإِنَّ أُمَّتِى لاَ تُطِيقُ ذَلِكَ، ثُمَّ جَاءَهُ الثَّالِثَةَ، فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكَ أَنْ تَقْرَأَ أُمَّتُكَ الْقُرْآنَ عَلَى ثَلاَثَةِ أَحْرُفٍ، فَقَالَ: أَسْأَلُ اللَّهَ مُعَافَاتَهُ وَمَغْفِرَتَهُ، وَإِنَّ أُمَّتِى لاَ تُطِيقُ ذَلِكَ، ثُمَّ جَاءَهُ الرَّابِعَةَ فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكَ أَنْ تَقْرَأَ أُمَّتُكَ الْقُرْآنَ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ، فَأَيُّمَا حَرْفٍ قَرَءُوا عَلَيْهِ فَقَدْ أَصَابُوا.
“অতঃপর রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট জিবরাঈল (আ.) আসলেন। তিনি বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা আপনাকে আদেশ করছেন, আপনার [গোটা] উম্মত যেন এক হরফের উপরই কুরআনুল কারীম পাঠ করে। এতে তিনি বললেন, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করছি। আমার উম্মত এতে সক্ষম হবে না। অতঃপর জিবরাঈল (আ.) দ্বিতীয়বার তার নিকট আসলেন। বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আপনাকে আদেশ করছেন, আপনার [গোটা] উম্মত যেন দুই হরফের উপর কুরআনুল কারীম পাঠ করে। এতে তিনি বললেন, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও মাগফিরাতপ্রার্থনা করছি। আমার উম্মত এতে সক্ষম হবে না। আবার তৃতীয়বার জিবরাঈল (আ.) আসলেন এবং বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আপনাকে আদেশ করছেন, আপনার [গোটা] উম্মত যেন তিন হরফের উপর কুরআনুল কারীম পাঠ করে। এতে তিনি বললেন, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করছি। আমার উম্মত এতে সক্ষম হবে না। চতুর্থবার আবার জিবরাঈল (আ.) আসলেন এবং বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আপনাকে আদেশ করছেন, আপনার [গোটা] উম্মত যেন সাত হরফের উপর কুরআনুল কারীম পাঠ করে। অতঃপর তারা যে হরফের উপরই পাঠ করবে, তাদের কেরাত সঠিক হবে।”১২৬
এই রেওয়ায়েতগুলোর পূর্বাপর বর্ণনাভঙ্গি সুস্পষ্টভাবে বলছে যে, এখানে ‘সাত’ শব্দটি দ্বারা সংখ্যাধিক্য বুঝানো হয়নি; বরং নির্দিষ্ট করে ‘সাত’ সংখ্যাটিকেই বুঝানো হয়েছে। তাই এই হাদীসগুলোর আলোকে উপরোক্ত মতটি গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। এমনকি জমহুর উলামায়ে কেরামও এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
৩. অন্যান্য উলামায়ে কেরাম, যেমন হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) সহ আরো অনেকে বলেছেন যে, উল্লিখিত হাদীসে সাত হরফ দ্বারা আরব জাতির গোত্রগত সাত ভাষাকে বুঝানো হয়েছে। যেহেতু আরব জাতি বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত ছিল এবং প্রত্যেক গোত্রের ভাষা আরবী হওয়া সত্ত্বেও অন্য গোত্রের সাথে ভাষার সামান্য গড়মিল ছিল। এই গড়মিলটা এমন, যেমন জাতীয় একটি ভাষায় আঞ্চলিকতার কারণে তারতম্য সৃষ্টি হয়। তাই আল্লাহ তাআলা ওই বিভিন্ন গোত্রের সহজ-সাধ্যের জন্য কুরআনুল কারীমকে সাত ভাষায় নাযিল করেছেন। যেন প্রত্যেক গোত্রই নিজ নিজ গোত্রীয় ভাষায় পাঠ করতে পারে।১২৭
ইমাম আবু হাতেম সাজিসতানী (রহ.) ওই গোত্রগুলোর নামও নির্ধারণ করেছেন এবং বলেছেন যে, কুরআনুল কারীম এই সাত গোত্রের সাত ভাষা অনুযায়ী নাযিল হয়েছে। গোত্র সাতটি হচ্ছে- [১] কুরাইশ। [২] হুযাইল। [৩] তাইমুর-রুবাব। [8] আজদ। [৫] রবীআ। [৬] হাওয়াজিন | [৭] সা’দ বিন বকর।
আর হাফেয ইবনে আবদুল বার (রহ.) কারো কারো থেকে রেওয়ায়েত বর্ণনা করে উপরোক্ত গোত্রগুলোর স্থলে নিয়োক্ত গোত্রগুলো উল্লেখ করেছেন-[১] হুযাইল। [২] কেনানা। [৩] কায়েস। [8] যব্বা। [৫] তাইমুর রুবাব। [৬] আসাদ ইবনে খুযাইমাহ। [৭] কুরাইশ।১২৮
কিন্তু বহু মুহাক্কিক আলেম যেমন, হাফেয ইবনে আবদুল বার (রহ.), আল্লামা সুযুতী (রহ.) ও আল্লামা ইবনে জাযারীসহ আরো অনেকে এই মতটিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন । প্রথমতঃ এ কারণে যে, আরবের গোত্র তো অনেকগুলো ছিল। এর মধ্য হতে শুধু এ সাতটিকেই বেছে নেওয়ার হেতু কি? দ্বিতীয়তঃ হযরত ওমর (রা.) ও হযরত হিশাম ইবনে হাকীম (রা.)-এর মাঝে কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াত নিয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। যার বিস্তারিত বর্ণনা সহীহ বুখারীসহ অন্যান্য কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। অথচ তারা উভয়েই ছিলেন কুরাইশ বংশের। আর রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাদের উভয়ের কেরাতকে সত্যায়ন করেছেন এবং কুরআনুল কারীম সাত হরফে নাযিল হওয়াকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদি সাত হরফ দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন সাতটি গোত্রের ভাষাকেই বুঝানো হতো তাহলে হযরত ওমর (রা.) ও হযরত হিশাম ইবনে হাকীম (রা.)-এর মাঝে মতবিরোধের কোনো কারণই থাকতে পারে না। কারণ উভয়ই তো কুরাইশী ছিলেন।১২৯
যদিও আল্লামা আলসী (রহ.) এর জবাব দিয়েছেন যে, “হতে পারে তাদের দু’জনের মধ্য হতে যে কোনো একজনকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরাইশ ভিন্ন অন্য কোনো ভাষায় কুরআন পড়িয়েছেন।”১৩০
কিন্ত এই জবাবটি অত্যন্ত দুর্বল। কারণ বিভিন্ন ভাষায় কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য এটাই ছিল যে, প্রত্যেক গোত্রের লোকেরা যেন নিজ ভাষা অনুযায়ী সহজ-সাধ্যভাবে পড়তে পারে । তাই এ বিষয়টা রিসালতের হেকমত থেকে অনেক দূরবর্তী মনে হয় যে, এক কুরাইশীকে অন্য ভাষায় কুরআনুল কারীম পড়ানো হয়েছে।
এতদ্যতীত ইমাম তাহাভী (রহ.) এর উপর আপত্তি করেন যে, যদি এটা মেনে নেওয়া হয় যে, সাত হরফ দ্বারা সাত গোত্রের ভাষাকে বুঝানো হয়েছে তাহলে তা ওই আয়াতের বিপরীত হয়ে দাড়াবে যাতে বলা হয়েছে-
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ
“আমি যখনই কোনো রাসূল প্রেরণ করি, তখন তার সম্প্রদায়ের ভাষায়ই প্রেরণ করি।
আর এ কথা তো সবারই জানা যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরইশী ছিলেন। তাই এ কথা সুস্পষ্ট যে, কুরআনুল কারীম শুধু কুরইশী ভাষায়ই নাযিল হয়েছে।১৩১
ইমাম তাহাভী (রহ.)-এর এ কথার সমর্থন এভাবেও হয় যে, যে সময়ে হযরত উসমান (রা.) দ্বিতীয়বার কুরআনুল কারীম সংকলনের ইচ্ছা করলেন এবং হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর নেতৃত্বে সাহাবায়ে কেরামের একটি জামাতকে কুরআনের কপি তৈরীর নির্দেশ দিলেন, তখন তাদেরকে তিনি এই নির্দেশনা দিয়েছিলেন-
إِذَا اخْتَلَفْتُمْ أَنْتُمْ وَزَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ فِي شَيْءٍ مِنْ الْقُرْآنِ فَاكْتُبُوهُ بِلِسَانِ قُرَيْشٍ، فَإِنَّمَا نَزَلَ بِلِسَانِهِمْ
“কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে যায়েদ যখন ইবনে সাবেত এবং তোমাদের মাঝে পরস্পর কোনো মতানৈক্য দেখা দিবে তখন তোমরা কুরাইশদের ভাষায় লিখবে। কেননা কুরআন তাদের ভাষায়ই নাযিল হয়েছে।”১৩২
এখানে হযরত উসমান (রা.) সুস্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে, কুরআন শুধু কুরাইশদের ভাষায়ই অবতীর্ণ হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো যে, কুরআন যখন কুরাইশদের ভাষায়ই নাধিল হয়েছে তাহলে এই ‘মতানৈক্য’ সৃষ্টি হবার উদ্দেশ্য কি? এর বিস্তারিত জবাব সামনে আসবে ইন শা আল্লাহ।
এতদ্যতীত এ বক্তব্যের প্রবক্তাগণ এ ব্যাপারে একমত যে, ‘সাত হরফ’ এবং ‘সাত কেরাত’ দু’টা পৃথক পৃথক বিষয়। কেরাতের মতানৈক্য, যা আজও বিদ্যমান সেটা শুধু এক হরফ অর্থাৎ কুরাইশদের ভাষায়ই। আর বাকি হরফগুলো হয়তো রহিত হয়েছে অথবা কল্যাণের জন্য মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে অন্যান্য আপত্তি ছাড়াও একটি আপত্তি এই হয় যে, গোটা হাদীসের ভাণ্ডারে কোথাও এ কথার প্রমাণ মিলে না যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতে দুই ধরনের মতানৈক্য ছিল। একটি হচ্ছে ‘সাত হরফ’ আরেকটি হচ্ছে ‘কেরাত’। বরং হাদীসের ভাণ্ডারে যেখানেই কুরআনুল কারীমের শব্দগত কোনো মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে শুধু ‘আহরুফ’ [হরফের বহুবচন]-এর মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পৃথকভাবে ‘কেরাতের’ কোনো মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করা হয়নি। এসব কারণের ভিত্তিতে এ মতামতটিও অত্যন্ত দুর্বল বলে মনে হয়।
৪. চতুর্থ হলো, ইমাম তহাভী (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ বক্তব্য। তিনি বলেন, কুরআনুল কারীম তো শুধু কুরাইশদের ভাষাতেই অবতীর্ণ হয়েছে । তবে যেহেতু আরববাসী বিভিন্ন এলাকা ও গোত্রে বিভক্ত ছিল তাই প্রত্যেকের জন্য এই একটি মাত্র ভাষায় কুরআন তেলাওয়াত করা বেশ কঠিন ছিল। তাই ইসলামের শুরু লগ্নে এই অনুমতি দেওয়া হয়েছিল যে, তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ অঞ্চলের ভাষা অনুযায়ী সমার্থবোধক শব্দ দ্বারা কুরআন তেলাওয়াত করতে পারবে। এমনকি যেসব লোকের জন্য কুরআনুল কারীমের মুল শব্দ দ্বারা তেলাওয়াত করা মুশকিল ছিল তাদের জন্য স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমার্থবোধক শব্দ নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যেগুলো দ্বারা তারা তেলাওয়াত করতে পারে। এই সমার্থবোধক শব্দগুলো কুরাইশদের ভাষা ও অন্যদের ভাষা থেকে চয়ন করা হয়েছিল। আর এগুলো এমন ছিল যে, تعالএর স্থলে هلمঅথবা أقبل কিংবা أدنপড়া হতো। সবগুলোর অর্থ একই থাকত। কিন্ত এই অনুমতি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল, যখন সমস্ত আরববাসী কুরআনী ভাষায় পুরোপুরি অভ্যস্ত ছিল না। অতঃপর ধীরে ধীরে যখন কুরআনী ভাষার পরিধি বৃদ্ধি পেল তখন আরববাসী সে ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে গেল এবং তাদের জন্য কুরআনের মূল ভাষায় তেলাওয়াত করা সহজ হয়ে গেল। ওই সময়ে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকালের পূর্বে রমযান মাসে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে কুরআনুল কারীমের আখেরী দাওর করেন, যেটাকে ‘আরযায়ে আখীরা’ বলা হয়। তখনই সমার্থবোধক শব্দ দ্বারা কুরআন তেলাওয়াত করার অনুমতি বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়। কেবল ওই পদ্ধতিই বাকি থাকে যার উপর কুরআন নাযিল হয়েছিল।১৩৩
এ বক্তব্য অনুযায়ী “সাত হরফ” বিশিষ্ট হাদীসটি ওই যুগের সাথে সম্পৃক্ত, যখন তেলাওয়াতের মধ্যে সমার্থবোধক শব্দ ব্যবহারের অনুমতি ছিল। আর এটার উদ্দেশ্য এই ছিল না যে, কুরআনুল কারীম ‘সাত হরফে’ অবতীর্ণ হয়েছে। বরং উদ্দেশ্য ছিল এই যে, কুরআনুল কারীম এমন প্রশস্ত-তার সাথে অবতীর্ণ হয়েছে যে, নির্দিষ্ট একটা জামানা পর্যন্ত তা সাত হরফে পাঠ করা যেত।
আবার “সাত হরফ” দ্বারাও এ উদ্দেশ্য নয় যে, কুরআনুল কারীমের প্রত্যেক শব্দের সাতটি সমার্থবোধক শব্দ ব্যবহারের অনুমতি আছে। বরং উদ্দেশ্য ছিল এই যে, বেশির থেকে বেশি যতগুলো সমার্থবোধক শব্দ ব্যবহার করা যায়, সেগুলোর সংখ্যা হচ্ছে, “সাত” । আবার সে অনুমতির অর্থ এটাও ছিল না যে, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের মর্জি মতো শব্দ প্রয়োগ করবে। বরং পরিবর্তিত শব্দগুলোও স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সন্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। আর তিনি প্রত্যেক ব্যক্তিকে এমনভাবে কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন যা তার জন্য সহজ-সাধ্য ছিল। সুতরাং শুধু ওই সকল সমার্থবোধক শব্দের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল যা রাসূল সম্পাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত ছিল।১৩৪
ইমাম তহাভী (রহ.) ছাড়াও হযরত সুফিয়ান ইবনে উআইনা (রহ.), ইবনে ওয়াহাব (রহ.) এবং হাফেয ইবনে আবদুল বার (রহ.)ও এ মতকে গ্রহণ করেছেন। বরং হাফেয ইবনে আবদুল বার (রহ.) তো এ মতকে অধিকাংশ আলেমের দিকে সম্বন্ধ করেছেন।১৩৫
পেছনের সমস্ত মতামতের মধ্যে এই মতটি কেয়াসের অধিক নিকটবর্তী । আর এ মতের প্রবক্তাগণ নিজেদের স্বপক্ষে দলীল দিতে গিয়ে মুসনাদে আহমদের সেই রেওয়ায়েতকে উল্লেখ করেন যা হযরত আবু বাকরা (রা.) থেকে বর্ণিত-
أَنَّ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَام قَالَ: يَا مُحَمَّدُ اقْرَأْ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفٍ، قَالَ مِيكَائِيلُ عَلَيْهِ السَّلَام: اسْتَزِدْهُ فَاسْتَزَادَهُ قَالَ: اقْرَأْهُ عَلَى حَرْفَيْنِ، قَالَ مِيكَائِيلُ: اسْتَزِدْهُ فَاسْتَزَادَهُ حَتَّى بَلَغَ سَبْعَةَ أَحْرُفٍ، قَالَ كُلٌّ شَافٍ كَافٍ مَا لَمْ تَخْتِمْ آيَةَ عَذَابٍ بِرَحْمَةٍ أَوْ آيَةَ رَحْمَةٍ بِعَذَابٍ نَحْوَ قَوْلِكَ تَعَالَ وَأَقْبِلْ وَهَلُمَّ وَاذْهَبْ وَأَسْرِعْ وَاعْجَلْ
জিবরাঈল (আ.) [রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে] বললেন, হে মুহাম্মাদ! কুরআনুল কারীমকে এক হরফের উপর পাঠ করুন। মিকাঈল (আ.) [রাসূল স.কে] বললেন, এর সাথে আরও [হরফ] সংযোজন করুন। ফলে তিনি সংযোজন করলেন। আর এভাবে তা সাতে গিয়ে পৌছল। জিবরাঈল (আ.) বলেলেন, এর প্রত্যেকটিই নিরাময়কারী, যথেষ্ট। যতক্ষণ না আযাবের আয়াতকে রহমতের আয়াতের সাথে এবং রহমতের আয়াতকে আযাবের আয়াতের সাথে মিশ্রিত করবে। এটা এমন হবে যে, আপনি تعال [আস]-কে أقبل – هلم – اذهب – اسرع – ও عجل শব্দ দ্বারা আদায় করবেন।”১৩৬
এই মত ও বক্তব্যের উপর আর কোনো আপত্তি নেই। তবে এর মাঝেও একটি সমস্যা থেকে যায়। আর তা হলো, কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন যে কেরাত আজ পর্যন্ত ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় চলে আসছে, এ বক্তব্য অনুযায়ী সেগুলোর কোনো অবস্থান পরিষ্কার হয় না। যদি সে কেরাতগুলোকে ‘সাত হরফ’ না বলে অন্য কিছু বলা হয় তাহলে তার স্বপক্ষে দলীল পেশ করা উচিত। কিন্তু হাদীসের বিশাল ভাণ্ডারে ‘আহরুফ’-এর মতানৈক্য ব্যতীত কুরআনুল কারীমের শব্দগত অন্য কোনো মতানৈক্যের আলোচনা পাওয়া যায় না। তাহলে নিজের পক্ষ থেকে এটা কি করে বলা যেতে পারে যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে ‘আহরুফে সাবআ’ ছাড়া অন্য আরেক প্রকার মতানৈক্যও ছিল! এ বক্তব্যের প্রবক্তাদের কাছ থেকে এ সমস্যার এমন কোনো সমাধান আমি পাইনি, যা মেনে নেওয়া যায়।
‘সাত হরফ’-এর সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আমাদের দৃষ্টিতে কুরআনুল কারীমের ‘সাত হরফ’-এর সর্বোত্তম ব্যাখ্যা হয়েছে । আর ‘সাত হরফ’ দ্বারা ‘কেরাতের বিভিন্নতার’ সাত প্রকারকে বুঝানো হয়েছে। তাইতো কেরাতগুলো যদিও সাতের চেয়ে বেশি, কিন্তু ওই কেরাতগুলোর মাঝে যে মতানৈক্য পাওয়া যায় তা সাত প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। [সেই সাত প্রকার কেরাতের ব্যাখ্যা সামনে আসবে।]
আমাদের জ্ঞান অনুযায়ী এই মত ও বক্তব্য মুতাকাদ্দিমীন উলামায়ে কেরামের মাঝে সর্ব প্রথম ইমাম মালেক (রহ.)-এর নিকট পাওয়া যায়। বিখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন, আল্লামা নিযামুদ্দীন কিম্মী নিশাপুরী (রহ.) স্বীয় তাফসীর ‘গারায়িবুল কুরআন’-এ লিখেন, ‘আহরুফে সাব্আ’-এর ব্যাপারে ইমাম মালেক (রহ.)-এর এ মাযহাব উদ্ধৃত আছে যে, এর দ্বারা কেরাতের নিম্নলিখিত সাত প্রকারের বিভিন্নতা ও মতানৈক্যকে বুঝানো হয়েছে।
১. একবচন ও বহুবচনের মতানৈক্য। এক কেরাতে শব্দটি একবচন ব্যবহৃত হয়েছে আবার অন্য কেরাতে বহুবচনের শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন- كَلِمَاتُ رَبِّكَ এবং وّتَمَّتْ كَلِمَةُ رَبِّكَ ।
২. পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গের বিভিন্নতা। এক কেরাতে পুংলিঙ্গ এবং অন্য কেরাতে স্ত্রীলিঙ্গ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে । যেমন-لا يقبل এবং لا تقبل ।
৩. এ’রাব তথা কারক ও বিভক্তি চিহ্বের বিভিন্নতা। কোনো কেরাতে যের আবার কোনো কেরাতে যবর থাকে। যেমন- غَيرِ اللهِ এবং هل مِن خالقٍ غَيرُ اللهِ
৪. ‘সরফী অবস্থা’ বা শব্দ-প্রকরণের বিভিন্নতা। যেমন, এক কেরাতে يَعْرِشُونَ এবং অন্য কেরাতে يُعَرِّشُونَ ।
৫. ‘নাহভী হরফ’ বা অব্যয় পদের বিভিন্নতা। যেমন, এক কেরাতে لَكِنَّ الشَّياطِينَ এবং অন্য কেরাতে لَكِنِ الشَّياطِينُ ।
৬. হরফ পরিবর্তনকারী শব্দের বিভিন্নতা। যেমন, تَعْلَمُونَ ও يَعْلَمُونَ এবং نُنْشِزُها ওنَنْشُزُها ।
৭. সুর-ভঙ্গিমার বিভিন্নতা। যেমন, তাখফীফ [জযম দিয়ে পড়া], তাফখীম [শেষ অক্ষর ছেড়ে দেওয়া], ইমালা [যের ও যবরের মধ্যবর্তী উচ্চারণ করা], মন্দ দীর্ঘস্বর করা] কৃসর [হুস্ব স্বর করা], ইজহার [স্পষ্ট করা], ইদগাম [মিলিয়ে পড়া] ইত্যাদি।১৩৭
অতঃপর আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.), ইমাম আবুল ফযল রাষি (রহ.), কাষী আবু বকর আত্-তাইয়্যেব বাকিল্লানী (রহ.) এবং মুহার্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) এই মতকে গ্রহণ করেছেন।১৩৮
কেরাতের সুপ্রসিদ্ধ ইমাম, মুহাক্ষিক ইবনুল জাযারী (রহ.) নিজের এই মত পেশ করার পূর্বে লিখেন-
“আমি এই হাদীসের ব্যাপারে অসংখ্য প্রশ্নে জর্জরিত ছিলাম! ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় এর উপর গভীর চিন্তা-গবেষণায় লিপ্ত ছিলাম । এমনকি মহান আল্লাহ আমার জন্য এর এমন ব্যাখ্যা বিকাশিত করে দিয়েছেন, যা সঠিক ও নির্ভুল হবে ইনশা আল্লাহ।”১৩৯
এ সকল উলামায়ে কেরাম এ কথার উপর একমত যে, হাদীসে বর্ণিত ‘সাত হরফ’ দ্বারা কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু সেই কেরাতগুলোর প্রকারসমূহ নির্ধারণ করতে গিয়ে তাদের বক্তব্যের মাঝে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে। এর কারণ হলো, প্রত্যেকেই নিজ নিজ চিন্তা অনুযায়ী সেই কেরাত বিষয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধান চালিয়েছেন। এর মধ্যে যার অনুসন্ধান সবচেয়ে শক্তিশালী, সমৃদ্ধ এবং পূর্ণাঙ্গ ও সর্বগুণে গুণান্বিত তিনি হলেন, ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.)। তিনি বলেন, কেরাতের বিভিন্নতা [নিম্নোক্ত] সাত প্রকারেই সীমাবদ্ধ।
১. নাম বা বিশেষ্য শব্দসমূহের বিভিন্নতা ৷ একবচন, দ্বিবচন, বহুবচন এবং পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গের বিভিন্নতা এই প্রকারের অন্তর্ভূক্ত । [এর উদাহরণ সেই- تَمَّتْ كَلِمَةُ رَبِّكَ যা অন্য কেরাতে تَمَّتْ كَلِمَاتُ رَبِّكَ বলা হয়েছে ।]
২. ফেয়েল বা ক্রিয়াপদের পার্থক্য ও বিভিন্নতা। কোনো কেরাতে মাযী [অতীতকাল. বাচক ক্রিয়া, কোনোটিতে মুযারি’ [বর্তমান ও ভবিষ্যতকাল বাচক ক্রিয়া আবার কোনোটিতে আমর [নির্দেশ বাচক ক্রিয়া] ব্যবহৃত হয়েছে। [এর উদাহরণ হলো, এক কেরাতে رَبَّنا باعِدْ بَينَ أسْفارِنا । অন্য এক কেরাতে এর স্থলে রয়েছে رَبُّنا باعَّدَ بَينَ أسْفارِنا]
৩. এরাব তথা কারক ও বিভক্তি চিহ্নের বিভিন্নতা। বিভিন্ন কেরাতে বিভিন্ন কারক চিহ বা হরকত বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে । [এর উদাহরণ হলো, ولا يُضارَّ كاتِبٌএবং لا يُضارُّ كاتِبٌ আর ذُو العَرْشِ المَجِيدُ এবং ذُو العَرْشِ المَجِيدِ ]
৪. শব্দের কম-বেশি হওয়ার বিভিন্রতা। এক কেরাতে কোনো শব্দ কম আছে। আর অন্য কেরাতে বেশি আছে। [যেমন, এক কেরাতে وَما خَلَقَ الذكَرَ وَالأُنْثى আছে]। আর অন্য কেরাতে وَالذكَرَ وَالأُنْثى আছে। এখানে وَما خَلَقَশব্দের উল্লেখ নেই। অনুরূপভাবে এক কেরাতে تَجْرِي مِن تَحْتِها الأَنْهارُ আছে। আর অন্য কেরাতে আছে تَجْرِي تَحْتَها الأَنْهارُ ।
৫. তাকদীম-তা’খীর বা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী শব্দের বিভিন্নতা। এক কেরাতে কোনো শব্দকে পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার অন্য কেরাতে সেটাকে পরে উল্লেখ করা হয়েছে। [যেমন, وَجاءَتْ سَكْرَةُ المَوْتِ بِالحَقِّএবং وَجاءَتْ بالمَوْتِ سَكْرَةُ الحَقِّ]
৬. বদল বা শব্দ পরিবর্তনের বিভিন্নতা। এক কেরাতে এক শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য কেরাতে তার স্থলে অন্য শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। [যেমন, (نُنشِزُها) এবং (نَنشُزُها)। অনুরূপভাবে (فَتَبَيَّنُوا) এবং (فَتَثَبَّتُوا) আর (طَلْحٍ) এবং (طَلْعٍ)]।
৭. সুর-ভঙ্গিমার বিভিন্নতা। যার মধ্যে তাফখীম, তারকীক, এমালা, কসর, মদ্দ, হামর, ইজহার ও ইত্যাদির বিভিন্নতা শামিল রয়েছে।১৪০
আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.), আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.) এবং কাযী আবু তাইয়্যেব (রহ.)-এর বর্ণনাকৃত বিভিন্নতার কারণগুলোও এ বক্তব্যের সাথে মিলে যায়। তবে ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.)-এর অনুসন্ধান এ জন্য এত বেশি সমৃদ্ধ বলে মনে হয় যে, এতে কোনো প্রকারের মতানৈক্য ও বিভিন্নতার বর্ণনা তো করা হয়েছে, কিন্তু শব্দের কম-বেশি, পূর্ববর্তী-পরবর্তী এবং শব্দ পরিবর্তনের বিভিন্নতার বিষয়গুলো পুরোপুরি ফুটে উঠেনি। এর বিপরীত ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.) অনুসন্ধান ও গবেষনায় এ সকল প্রকার বিভিন্নতা ও মতানৈক্য সুস্পষ্টভাবে গ্রন্থিত হয়েছে। বিদগ্ধ গবেষক ইবনুল জাযারী (রহ.) যিনি ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় পর্যন্ত চিন্তা গবেষনা করার পর ‘সাত হরফ’কে কেরাতের সাত প্রকারের বিভিন্নতার উপর প্রয়োগ করেছেন, তিনিও ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.)-এর বক্তব্য বড় সম্মানের সাথে উদ্ধৃত করেছেন এবং এর উপর কোনো প্রকার অভিযোগ-আপত্তি উত্থাপন করেননি। বরং তাঁর আলোচনার সমষ্টি থেকে বুঝা যায় যে, ইমাম আবুল ফযল (রহ.)-এর অনুসন্ধান তাঁর নিজের অনুসন্ধানের চেয়ে বেশি পছন্দ হয়েছে।১৪১
এতদ্ব্যতীত হাফেয ইবনে হাযার আসকালানী (রহ.)-এর বক্তব্য থেকেও অনুভূত হয় যে, তিনি উক্ত তিনটি বক্তব্যের মাঝে ইমাম রাযি (রহ.)-এর অনুসন্ধান ও বক্তব্যকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কেননা তিনি আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে লিখেন- (هذا أوجه حسن) [এটা সর্বোত্তম ব্যাখ্যা] অতঃপর ইমাম ফযল (রহ.)-এর বর্ণনাকৃত সাত প্রকার বিভিন্নতা বর্ণনা করার পর লিখেন-
قلت وقد أخذ كلام ابن قتيبة ونقحه
‘আমার ধারণা, তিনি [ইমাম আবুল ফযল রাযি] ইবন কুতাইবা (রহ.)-এর বক্তব্যকে গ্রহণ করে এটাকে সুসজ্জিত করেছেন।১৪২
শেষ যুগে শায়খ আবদুল আযীম যুরকানী (রহ.) ও তাঁর এই বক্তব্যকে গ্রহণ করে এটাকে শক্তিশালী করার জন্য সংশ্লিষ্ট দলীল-প্রমাণাদি পেশ করেছেন।১৪৩
যা হোক, অনুসন্ধানের প্রকারের মাঝে মতানৈক্য আছে ঠিক; তবে ইমাম মালেক (রহ.), আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.), ইমাম আবুল ফখর রাযি (রহ), মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) এবং কাযী বাকিল্লানী (রহ.) সকলেই এ কথার উপর এক মত যে, হাদীসে বর্ণিত “সাত হরফ” দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, কেরাতের ওই বিভিন্নতা যা সাত প্রকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
অধমের দৃষ্টিতে “সাত হরফ”-এর এই ব্যাখ্যাটিই সবচেয়ে উত্তম। হাদীসের মর্মার্থ এটাই বুঝে আসে যে, কুরআনুল কারীমের শব্দগুলো বিভিন্নভাবে পড়া যেতে পারে। আর এই বিভিন্ন পদ্ধতিগুলো ধরন হিসেবে সাত প্রকার। ওই সাত প্রকারের নির্ধারণ যেহেতু কোনো হাদীসে পাওয়া যায় না, তাই নিশ্চিতভাবে কোনো অনুসন্ধানের ব্যাপারে এ কথা বলা যাবে না যে, হাদীসে এ প্রকারকেই বুঝানো হয়েছে। তবে বাহ্যিকভাবে ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ)-এর অনুসন্ধান ও গবেষণা অধিকতর সঠিক বলে মনে হয়। কারণ বর্তমান কালের কেরাতের সবগুলো প্রকার এতে শামিল রয়েছে।
বক্তব্যটির অগ্রাধিকারের কারণসমূহ
“সাত হরফ” এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে হাদীস, তাফসীর ও উলূমুল কুরআনের কিতাবসমূহে যতগুলো ব্যাখ্যা বর্ণনা করা হয়েছে, আমাদের দৃষ্টিতে সেগুলোর মধ্যে এ বক্তব্যটি [সাত হরফ দ্বারা কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকে বুঝানো] সবচেয়ে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত, নির্ভরযোগ্য এবং মেনে নেওয়ার মতো। তার কারণগুলো নিম্নরূপ:
১. এ বক্তব্য অনুযায়ী “হরফ” এবং “কেরাত” পৃথক পৃথক দু’টি বিষয় সাব্যস্ত করার প্রয়োজন পড়ে না। আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.) ও ইমাম তাহাভী (রহ.)-এর বক্তব্যসমূহে একটি যৌথ সমস্যা রয়েছে যে, এতে এ কথা মেনে নিতে হয় যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতের মাঝে দু’ধরনের মতানৈক্য রয়েছে। একটি হলো, হরফের মতানৈক্য। আরেকটি হলো, কেরাতের মতানৈক্য। হরফের মতানৈক্য তো এখন বিলুপ্ত। আর কেরাতের মতানৈক্য এখনো বহাল রয়েছে। অথচ হাদীসের এত বিশাল ভাণ্ডারে এমন একটি দুর্বল হাদীসও পাওয়া যায় না, যার দ্বারা এ কথা সাব্যস্ত হয় যে, “হরফ” এবং “কেরাত” দু’টি আলগ আলগ বিষয়। হাদীসের ভাণ্ডারে শুধুমাত্র হরফের মতানৈক্যের কথা পাওয়া যায়। আর এর জন্যই অধিক হারে “কেরাত” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। “কেরাত” যদি ওই “হরফগুলো” থেকে পৃথক হতো তাহলে কোনো না কোনো হাদীসে এর প্রতি ইঙ্গিত থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল। পরিশেষে এ কথার কোন যুক্তি আছে যে, “হরফ”-এর মতানৈক্য সংক্রান্ত হাদীসটি প্রায় তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় এসে পৌঁছেছে, অথচ “কেরাত”-এর পৃথক আলোচনা একটি হাদীসেও নেই? অতএব, নিজের ধারণা-প্রসূত কেয়াস দ্বারা এ কথা কিভাবে বলে দেওয়া সম্ভব যে, হরফের মতানৈক্য ও বিভিন্নতা ছাড়াও কুরআনুল কারীমের শব্দাবলীর মাঝে আরেক প্রকার মতানৈক্য ও বিভিন্নতা ছিল?
উপরোল্লিখিত [ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.)-এর] বক্তব্যে এই সমস্যা সম্পূর্ণরূপে দূর হয়ে যায়। কারণ এতে “হরফ” এবং “কেরাত”কে অভিন্ন প্রকার সাব্যস্ত করা হয়েছে।
২. আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী এ কথা মানতে হয় যে, সাত হরফের মধ্য হতে ছয় হরফ রহিত বা পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। একমাত্র কুরাইশী হরফই অবশিষ্ট রয়েছে। [বর্তমান কেরাত ওই কুরাইশী হরফের আদায়গত বিভিন্নতা]। এ বক্তব্যের নিন্দনীয় দিকগুলো আমরা সামনে বর্ণনা করব। উপরোল্লিখিত শেষ বক্তব্যটিতে [অর্থাৎ অগ্রাধিকার প্রাপ্ত বক্তব্যটিতে] এসব নিন্দনীয় বিষয় নেই। কেননা এ বক্তব্য অনুযায়ী সাত হরফের সবগুলো আজও অবশিষ্ট ও সংরক্ষিত আছে।
৩. এই অগ্রাধিকার প্রাপ্ত বক্তব্য অনুযায়ী কোনো প্রকার তাভীল বা জটিল ব্যাখ্যা ব্যতিরেকে “সাত হরফ”-এর অর্থ সঠিক অবিকৃত থাকে। পক্ষান্তরে অন্যান্য বক্তব্যের মাঝে হয়তো “হরফ”-এর অর্থের মধ্যে নতুবা “সাত” সংখ্যার মধ্যে তাভীল বা জটিল ব্যাখ্যা করতে হয়।
৪. “সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যত উলামায়ে কেরামের বক্তব্য আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মর্যাদাবান এবং নববী যুগের নিকটবর্তী ব্যক্তিত্ব ছিলেন ইমাম মালেক (রহ.)। আর আল্লামা নিশাপুরী (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী তিনিও এই বক্তব্যেরই প্রবক্তা।
৫. আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.) এবং মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) উভয়ে ছিলেন ইলমে কেরাতের সর্বজনস্বীকৃত ইমাম। আর তাঁরা উভয়েই এই বক্তব্যের প্রবক্তা। মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর কথা তো পূর্বে আলোচনা হয়েছে যে, তিনি ত্রিশ বছরেরও অধিক সময় পর্যন্ত চিন্তা-গবেষণা করার পর এই বক্তব্যকে গ্রহণ করেছেন।
এ বক্তব্যের উপর উত্থাপিত অভিযোগ ও তার জবাব
“সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত বক্তব্যের উপর যেসব আপত্তি-অভিযোগ ও সমালোচনা উত্থাপিত হতে পারে সেগুলোর উপর দৃষ্টি বুলিয়ে নিন।
প্রথম অভিযোগ:
এর উপর প্রথম অভিযোগ করা হয়েছে যে, এ বক্তব্যে মতানৈক্য ও বিভিন্নতার যতগুলো প্রকার বর্ণনা করা হয়েছে তার বেশির ভাগই “সরফী” এবং “নাহভী” [শব্দ-প্রকরণ ও বাক্য-প্রকরণ]-এর প্রকারভেদের উপর ভিত্তিশীল। অথচ রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এই হাদীস বর্ণনা করেছেন তখন সরফ-নাহুর এই বিষয়ভিত্তিক পরিভাষা ও প্রকারভেদ প্রচলিত ছিল না। ওই সময় অধিকাংশ মানুষ লেখা-পড়াও জানত না। এমতাবস্থায় বিভিন্নতার এই প্রকারগুলোকে “সাত হরফ” হিসেবে ধরে নেওয়াটা মুশকিল বলে মনে হয়।
হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) এই আপত্তি উদ্ধৃত করার পর এর জবাব দিয়েছেন এভাবে-
وَلَا يَلْزَمُ من ذلك توهين ما ذهب إليه ابن قتيبة لاحتمال أَنْ يَكُونَ الالحصَارُ الْمَذْكُورُ فِي ذَلِكَ وَقَعَ اتفاقا وإِنَّمَا اطَّلَعَ عَلَيْهِ بالاستقراء وَفِي ذَلِكَ مِنَ الْحِكْمَةِ الْبَالِغَة ما لا يخفى
“এর দ্বারা ইবনে কুতাইবা (রহ.)-এর বক্তব্যের দুর্বলতা প্রকাশ পায় না। কেননা হতে পারে এটা কোনো ঘটানাক্রমে হয়ে গেছে। আর অনুসন্ধানের মাধ্যমে এর পূর্বাভাস পাওয়া গেছে। আর এর মাঝে যে পরিপূর্ণ হেকমত লুকায়িত আছে তা গোপন নয়।”১৪৪
আমাদের ক্ষুদ্র উপলব্ধি অনুযায়ী এই জবাবের সারাংশ হচ্ছে, এ কথাটি ঠিক যে, নববী যুগে এই পরিভাষাগুলো প্রচলিত ছিল না। আর হয়তো এ কারণেই রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম “সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেননি। তবে এটা তো পরিষ্কার যে, এই বৈষয়িক পরিভাষাগুলো যে ভাবার্থ থেকে আহরিত, সেই ভাবার্থ তো ওই যুগেও বিদ্যমান ছিল। যদি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেসব ভাবার্থের প্রতি লক্ষ্য করে বিভিন্নতার প্রকারসমূহকে “সাত”-এর মাঝে সীমাবদ্ধ করেন তাতে আশ্চর্যের কী আছে? হ্যাঁ, ওই যুগে যদি বিভিন্নতার সাত প্রকার বিস্তারিত বর্ণনা করা হতো তাহলে হয়তো তা সাধারণ মানুষের উপলব্ধির ঊর্ধ্বে হয়ে যেত। তাই রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বিস্তারিত বর্ণনা না করে শুধু এতটুকু বলেছেন যে, বিভিন্নতার এ প্রকারগুলো সাত প্রকারে সীমাবদ্ধ। পরবর্তীতে যখন এ পরিভাষাগুলো প্রচলিত হয়ে গেল তখন উলামায়ে কেরাম পরিপূর্ণ অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিভিন্নতার এ প্রকারগুলোকে পারিভাষিক শব্দ দ্বারা চিহ্নিত করেছেন।
আর এটা আমরা আগেই বলেছি, বিশেষ কোনো ব্যক্তির অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে পূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে এ কথা বলা মুশকিল যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য এটাই ছিল। কিন্তু যখন বিভিন্ন লোকের অনুসন্ধান এটা প্রমাণ করে যে, বিভিন্নতার প্রকার মোট সাত প্রকার, তখন এ কথা নিশ্চয়তার নিকটবর্তী হয়ে যায় যে, “সাত হরফ” দ্বারা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য ছিল “বিভিন্নতার সাত প্রকার।” চাই এর বিস্তারিত বর্ণনা ওই রকম না হোক, যা পরবর্তীতে অনুসন্ধানের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে যখন “সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যুক্তিগ্রাহ্য অন্য কোনো প্রকার পাওয়া না যায়।
দ্বিতীয় অভিযোগ:
সাত হরফ দ্বারা কি সহজবোধ্যতা সৃষ্টি হলো?
এই [অগ্রাধিকার প্রাপ্ত] বক্তব্যটির উপর দ্বিতীয় অভিযোগ এ হতে পারে যে, কুরআনুল কারীম তো সাত হরফে নাযিল করা হয়েছে। উম্মত যাতে সহজ-সাধ্যভাবে কুরআন তেলাওয়াত করতে পারে। আর এই সহজতা আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্য অনুসারে তো বোধগম্য হয়। কেননা আরবে বিভিন্ন গোত্রের লোক ছিল। আর এক গোত্রের জন্য অন্য গোত্রের ভাষায় কুরআন তেলাওয়াত ছিল অত্যন্ত মুশকিল। কিন্তু ইমাম মালেক (রহ.), ইমাম রাযী (রহ.) এবং ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী সাত হরফ তো শুধু কুরাইশী ভাষার সাথেই সম্পৃক্ত। এতে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয় না যে, কুরআনুল কারীম যখন এক ভাষাতেই নাযিল করা উদ্দেশ্য ছিল, তাহলে এতে কেরাতের বিভিন্নতা অবশিষ্ট রাখার প্রয়োজনটা কি ছিল?
এ অভিযোগের ভিত্তি হলো এ কথার উপর যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআন তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে সাত হরফের যে সহজতা উম্মতের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন, এতে আরবের গোত্রভিত্তিক ভাষার ভিন্নতা তাঁর দৃষ্টির সামনে ছিল। এ কথার উপর ভিত্তি করেই হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) “সাত হরফ” দ্বারা আরবের “সাত ভাষা”-এর অর্থ করেছেন। অথচ এটা এমন একটা কথা যার সমর্থন কোনো হাদীস দ্বারা পাওয়া যায় না। পক্ষান্তরে এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে, সাত হরফের সহজ-সাধ্যতা প্রার্থনা করার সময় তাঁর লক্ষ্যবস্তু কী ছিল? ইমাম তিরমিযী (রহ.) সহীহ সনদ সূত্রে হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন-
لَقِي رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم جبريل عند احجار المرأ، فَقَالَ: ” يا جبريل إنِّي بُعثتُ إِلَى أُمَّةٍ أُميين: اِنهُمُ العَجُوزُ، والشيخ الكبير، والغُلَامُ، قال فمرهم فليقرأوا القرآن على سبعة أحرف
“এক মৃত পাথরের নিকট হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাক্ষাত হলো। তখন তিনি জিবরাঈল (আ.) কে বললেন, আমি এমন এক নিরক্ষর জাতির নিকট প্রেরিত হয়েছি, যাদের মধ্যে রয়েছে-অতিশয় বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা। রয়েছে-শিশু-কিশোররা। তখন হযরত জিবরাঈল (আ.) বললেন, আপনি তাদেরকে নির্দেশ দিন, তারা যেন সাত হরফে কুরআন পাঠ করে।১৪৫
তিরমিযী শরীফেরই অপর এক রেওয়ায়েতে এমন শব্দ এসেছে যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিবরাঈল (আ.) কে বলেছেন-
إنِّي بُعثتُ إلى أُمَّةٍ أُميِّينَ مِنْهُمُ العجُوزُ، وَالشَّيْخ الكبيرُ، وَالغُلَامُ، وَالْجَارِيَةُ، وَالرَّجُلُ الَّذِي لَمْ يَقْرَأُ كِتَابًا قَطُّ “
“আমি এমন এক নিরক্ষর জাতির নিকট প্রেরিত হয়েছি, যাদের মধ্যে রয়েছে-অতিশয় বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা। রয়েছে-শিশু-কিশোররা এবং প্রাপ্ত বয়স্ক ও বালক-বালিকা। যারা কখনো কোনো কিতাব পড়েনি।”১৪৬
উপরোল্লিখিত হাদীসের শব্দমালা সুস্পষ্টভাবে জানান দিচ্ছে যে, উম্মতের জন্য সাত হরফের সহজতা প্রার্থনা করার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে এ কথা ছিল যে, তিনি এক নিরক্ষর জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছেন। যার মধ্যে সব ধরনের লোক রয়েছে। যদি কুরআনুল কারীম তেলাওয়াতের জন্য শুধু একটা পদ্ধতিই নির্ধারণ করে দেওয়া হয় তাহলে উম্মত মুশকিলে পড়ে যাবে। পক্ষান্তরে যদি কয়েকটি পন্থা রাখা হয়, তাহলে এটা সম্ভব যে কোনো লোক এক পদ্ধতিতে তেলাওয়াত করতে সক্ষম না হলে অন্য পদ্ধতিতে সে তেলাওয়াত করবে। এভাবে তার নামায এবং তেলাওয়াতের ইবাদত বিশুদ্ধ হয়ে যাবে। অনেক সময় এমন হয় যে, বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা লোক বা অপড়ুয়া লোকদের যবানে একটি শব্দ আদায় করা কষ্টকর হয় এবং তাদের জন্য যের-যবরের সাধারণ প্রার্থক্যও কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। এ জন্যই তিনি এই সহজতা কামনা করেছেন। যেমন, কোনো ব্যক্তি মা’রূফের সীগা আদায় করতে পারে না, তখন এর স্থলে অন্য কেরাত অনুযায়ী মাজহুলের সীগা আদায় করে নিবে। অথবা কারো জন্য একবচন শব্দ আদায় করতে কষ্ট হয়, তখন সে ওই আয়াতকেই বহুবচন শব্দ দ্বারা আদায় করবে। কারো জন্য সুর-ভঙ্গিমার একটি পদ্ধতি কষ্টকর হয়, তখন সে অন্যটা অবলম্বন করবে। এভাবে গোটা কুরআনে তার জন্য সাত প্রকারের সহজতা লাভ হয়ে যাবে।
আপনি উপরোল্লিখিত হাদীসে হয়তো লক্ষ্য করে থাকবেন যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাত হরফের সহজতা প্রার্থনা করার সময় এ কথা বলেননি যে, “আমি যে জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছি তারা বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত এবং তাদের প্রত্যেকের ভাষা আলাদা আলাদা। এ জন্য কুরআনুল কারীমকে বিভিন্ন ভাষায় পড়ার অনুমতি দেওয়া হোক।” বরং এর উল্টো গোত্রভিত্তিক বিভিন্নতা থেকে দৃষ্টি এড়িয়ে তিনি বয়সের তারতম্য এবং তাদের নিরক্ষর হবার বিষয়টার উপর জোর দিয়েছেন। এ কথা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, সাত হরফের সহজ-সাধ্যতার মধ্যে মূলভিত্তি গোত্রসমূহের ভাষাভিত্তিক ছিল না। বরং উম্মত অপড়ুয়া হওয়ার উপর লক্ষ্য রেখে তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে একটা সাধারণ সহজ-সাধ্যতা প্রদান উদ্দেশ্য ছিল। যার দ্বারা উম্মতের সকল সদস্য উপকৃত হতে পারে।
তৃতীয় অভিযোগ:
এই [অগ্রাধিকার প্রাপ্ত] বক্তব্যের প্রতি তৃতীয় অভিযোগ এই হতে পারে যে, কেরাতের বিভিন্নতার যে সাতটি প্রকার বর্ণনা করা হয়েছে, চাই সেটা ইমাম মালেক (রহ.)-এর বর্ণনা হোক অথবা আবুল ফযল রাযি (রহ.)-এর বক্তব্য হোক কিংবা আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.), মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) এবং কাযী আবুত তাইয়্যেব (রহ.)-এর বর্ণনাকৃত হোক, সর্বাবস্থায় এখানে কেয়াস ও অনুমানের একটি অবকাশ থেকেই যায়। এ কারণেই তাঁরা প্রত্যেকেই বিভিন্নতার এই সাত প্রকারের বিস্তারিত বর্ণনা পৃথক পৃথকভাবে দিয়েছেন। কাজেই এগুলোর ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিভাবে বলা যেতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য এটাই ছিল?
এর জবাব হচ্ছে, “সাত হরফ”-এর কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা কোনো হাদীস বা সাহাবীর বর্ণনা থেকে পাওয়া যায় না। তাই এই অধ্যায়ে যত বর্ণনা রয়েছে, সেসবগুলোর ভাবসমগ্র একত্রিত করে এর থেকে বিশেষ ফলাফল বের করা হয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে এ বক্তব্যটি বিশুদ্ধ হওয়ার অধিক নিকটবর্তী বলে মনে হয়। কারণ এর উপর মৌলিক কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হয় না। বর্ণনাগুলোকে সামগ্রিক দৃষ্টিতে দেখার পর আমাদের কাছে বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায় যে, হাদীসে বর্ণিত “সাত হরফ” দ্বারা কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকে বুঝানো হয়েছে।
বাকি থাকল ওই প্রকারগুলো নির্ধারণ ও নিরূপণ করার বিষয়টি। আর এ ব্যাপারে তো আমরা আগেই বলে এসেছি যে, এটা জানার জন্য গভীর অনুসন্ধানের বিকল্প কোনো পথ নেই। ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.)-এর অনুসন্ধান আমাদের কাছে অবশ্যই সকল গুণাগুণসম্বলিত বলে মনে হয়। এতদ্বসত্ত্বেও আমরা নিশ্চিতভাবে কারো অনুসন্ধানকেই বলি না যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য এটাই ছিল। কিন্তু এর দ্বারা এ মৌলিক হাকীকত প্রশ্নবিদ্ধ হয় না যে, “সাত হরফ” দ্বারা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য ছিল কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকার। যেগুলোর বিশদ বর্ণনার নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করার না আমাদের কাছে কোনো পথ আছে আর না এর কোনো প্রয়োজন আছে।
চতুর্থ অভিযোগ:
এই বক্তব্যের উপর চতুর্থ অভিযোগ এ হতে পারে যে, ওই বক্তব্যে “সাত হরফ” দ্বারা শব্দমালা ও সেগুলোর উচ্চারণের বিভিন্ন পদ্ধতিকে বুঝানো হয়েছে। এতে অর্থগত দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়নি। অথচ এক রেওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে, এর দ্বারা সাত ধরনের অর্থকে বুঝানো হয়েছে। ইমাম তহাভী (রহ.) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ বাণী রেওয়ায়েত করেন-
كان الكتاب الأول ينزل من باب واحد على حرف واحد ونزل القرآن من سبعة ابواب على سبعة احرف زاجر و امر وحلال وحرام ومحكم ومتشابه وامثال . الخ….
‘পূর্ববর্তী কিতাব এক দরজা দিয়ে এক হরফে অবতীর্ণ হয়েছিল। আর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে সাত দরজা দিয়ে সাত হরফে। সেই সাতটি হরফ হলো-[১] যাজির [কোনো কাজ থেকে বাধা প্রদানকারী]। [২] আমের [কোনো বিষয়ে আদেশ প্রদানকারী]। [৩.] হালাল। [৪.] হারাম। [৫] মুহকাম [যার অর্থ জানা আছে]। [৬.] মুতাশাবিহ্ [যার নিশ্চিত কোনো অর্থ জানা নেই]। [৭.] আমছাল।
এ হাদীসের ভিত্তিতেই কোনো কোনো আলেম থেকে বর্ণিত আছে যে, তাঁরা সাত “হরফ”-এর তাফসীর “সাত প্রকারের অর্থ” দ্বারা করেছেন।
এর জবাব হলো, উপরোল্লিখিত রেওয়ায়েতটি সনদের দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল। ইমাম তহাভী (রহ.) এর সনদের সমালোচনা করতে গিয়ে বলেন যে, আবু সালামা আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। অথচ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর সাথে আবু সালামার সাক্ষাতই হয়নি।১৪৭
এতদ্ব্যতীত পূর্ব যুগের যেসব বুযুর্গের কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য বর্ণিত আছে সেগুলোর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) লিখেন- ’এর দ্বারা “সাত হরফ” বিষয়ক হাদীসটি ব্যাখ্যা করা তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল না। বরং সাত হরফের আলোচনার বিষয় থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে তাঁরা এ কথা বলতে চেয়েছেন যে, কুরআনুল কারীম এ ধরনের বিষয় দ্বারা সমৃদ্ধ।’১৪৮
আর যারা “সাবআতু আহরুফ” বা সাত হরফের আলোচনা সম্বলিত হাদীসগুলোর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এ ধরনেরই কথা বলেছেন, তাদের কথা যুক্তিগ্রাহ্যভাবেই বাতিল। কারণ পেছনে যতগুলো হাদীস বর্ণনা করা হয়েছে, সেগুলোর প্রতি নযর বুলাতেই একজন সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিই বুঝতে পারবে যে, হরফের বিভিন্নতা দ্বারা অর্থ ও বিষয়াবলীর বিভিন্নতাকে বুঝানো হয়নি। বরং আলফায বা শব্দমালার বিভিন্নতাকে বুঝানো হয়েছে। তাইতো মুহাক্কিক আলেমগণের মধ্য হতে কেউ এ মতকে গ্রহণ করেননি; বরং এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।১৪৯
“হরূফে সাবআ” এখনো সংরক্ষিত নাকি পরিত্যক্ত?
“হরফে সাবআ” বা সাত হরফের অর্থ নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার পর এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, এ সাত হরফ এখনো অবশিষ্ট আছে নাকি নেই? এ বিষয়ে মুতাক্কাদিমীন বা পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরাম থেকে তিনটি মতামত বা বক্তব্য বর্ণিত আছে।
[এক] প্রথম বক্তব্য হচ্ছে হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) এবং তাঁর অনুসারীদের। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করে এসেছি যে, তাঁদের নিকট সাত হরফ দ্বারা আরবের গোত্রভিত্তিক সাত ভাষাকে বুঝানো হয়েছে। এ কথার উপর ভিত্তি করেই তিনি বলেন যে, হযরত উসমান (রা.)-এর যুগ পর্যন্ত কুরআনুল কারীম সাত হরফে পড়া হতো। কিন্তু হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে যখন ইসলাম দূর-দূরান্ত পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করল, তখন এ সাত হরফের তাৎপর্য সম্পর্কে জানা না থাকার কারণে মানুষের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা শুরু হতে লাগল। বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা বিভিন্ন হরফে কুরআন তেলাওয়াত করত এবং একে অন্যের তেলাওয়াতকে ভুল আখ্যায়িত করত। এ ফেতনাকে নির্মূল করার জন্য হযরত উসমান (রা.) সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শে গোটা উম্মতকে শুধু এক হরফ তথা কুরাইশী ভাষা অনুযায়ী কুরআন তেলাওয়াতের নিমিত্তে সাতটি মাসহাফ সুবিন্যস্ত করে বিভিন্ন প্রদেশে পাঠিয়ে দেন। আর বাকি সব মাসহাফকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন। যেন আর কোনো মতানৈক্য সৃষ্টি হতে না পারে। সুতরাং এখন কেবল কুরাইশী ভাষার হরফই অবশিষ্ট রয়েছে। আর অবশিষ্ট ছয় হরফ সংরক্ষিত রয়নি। আর কেরাতের যে মতানৈক্য আজ পর্যন্ত চলে আসছে, সেগুলো সেই কুরাইশী এক হরফ আদায়ের বিভিন্ন পদ্ধতি মাত্র।১৫০
হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর চিন্তাধারা ও এর নিন্দনীয় দিকগুলো
হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) যেহেতু নিজের চিন্তা ও মতকে স্বীয় তাফসীর গ্রন্থের ভূমিকায় অত্যন্ত দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন, তাই তাঁর এ বক্তব্য অত্যাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। আর আজ-কাল সাত হরফের ব্যাখ্যা সাধারণত এর আলোকেই করা হয়ে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ মুহাক্কিক আলেমগণ১৫১ এ মতকে গ্রহণই করেননি; বরং অত্যন্ত কঠোরভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ এ বক্তব্যে এমন কিছু সমস্যা দাঁড়ায় যার কোনো সমাধান নেই।
এ মতের উপর সর্ব প্রথম তো ওই আপত্তি আরোপিত হয়, যার আলোচনা আমরা আগেই করে এসেছি যে, এতে “হরফ” এবং “কেরাত” দু’টিকে পৃথক পৃথক বিষয় সাব্যস্ত করা হয়েছে। অথচ কোনো হাদীস দ্বারা এর প্রমাণ পাওয়া যায় না।
দ্বিতীয় আপত্তি এই হয় যে, হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) এক দিকে তো এটা মেনে নেন যে, সাত হরফের সবকটিই আল্লাহর পক্ষ হতে নাযিলকৃত। আবার অন্য দিকে বলেন, হযরত উসমান (রা.) সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শক্রমে ছয় হরফের তেলাওয়াতকে বিলুপ্ত করে দেন! অথচ এ কথা মেনে নেওয়া খুবই মুশকিল যে, সাহাবায়ে কেরাম ওই হরফগুলোকেই একেবারে বিলুপ্ত করার জন্য একমত হয়ে গেলেন, উম্মতের সহজ-সাধ্যের জন্য রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুআর জবাবে আল্লাহ তাআলা যা নাযিল করেছিলেন!? সাহাবায়ে কেরামের ইজমা বা ঐক্যমত নিঃসন্দেহে দীনের অকাট্য দলীল, কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর জন্য এটা সম্ভাব্য ব্যাপার বলে মনে হয় না যে, যে বিষয় কুরআন হওয়ার ব্যাপারটা তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক পরম্পরায় সাব্যস্ত হয়েছে, তাঁরা সেটাকে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে মুছে ফেলার জন্য ঐক্যমত পোষণ করবেন!
হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) এই আপত্তির জবাব এভাবে দিয়েছেন যে, ‘প্রকৃতপক্ষে উম্মতকে কুরআনুল কারীম সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং সাথে সাথে এ এখতেয়ারও দেওয়া হয়েছিল যে, তারা সাত হরফের যে কোনো একটিকে বেছে নিতে পারবে। তাইতো উম্মত সেই এখতেয়ার দ্বারা উপকৃত হয়ে সার্বজনীন কল্যাণার্থে ছয় হরফের তেলাওয়াতকে পরিত্যাগ করেছেন আর এক হরফের সংরক্ষণের উপর একমত হয়েছেন। এ পদক্ষেপ দ্বারা ওই হরফগুলোকে রহিত করা এবং সেগুলোর তেলাওয়াতকে হারাম করে দেওয়া উদ্দেশ্য ছিল না। বরং উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের জন্য সার্বজনীন এক হরফকে নির্বাচন করা।’
কিন্তু এ জবাবটিও এ জন্য দুর্বল বলে মনে হয় যে, প্রকৃত অবস্থা যদি এটাই হয়ে থাকে তাহলে এটা কি সমীচীন ছিল না যে, উম্মত নিজেদের আমলের জন্য এক হরফকে বেছে নিত আর বাকি ছয় হরফকে একেবারে বিলুপ্ত করার পরিবর্তে কোনো এক স্থানে তা সংরক্ষণ করে রাখত? যেন সে হরফগুলোর অস্তি ত্ব একেকারেই খতম না হয়ে যায়। কুরআনুল কারীমের ঘোষণা রয়েছে-
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
‘নিশ্চয় আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই তার সংরক্ষক।‘
যখন সাত হরফের সবগুলোই কুরআন ছিল তখন এই আয়াতের সুস্পষ্ট দাবী হলো, ওই সাত হরফও কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে এবং কোনো ব্যক্তি যদি এগুলোর তেলাওয়াকে ছেড়েও দিতে চায়, তবু তা একেবারে বিলুপ্ত হতে পারে না।
হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) এর উপমা দিতে গিয়ে একটি মাসআলা পেশ করেছেন যে, কুরআনুল কারীম মিথ্যা শপথের কাফ্ফারা ক্ষেত্রে মানুষকে তিনটি এখতেয়ার দিয়েছে। চাইলে সে একজন দাসকে মুক্ত করতে পারবে, চাইলে দশজন মেসকীনকে আহার করাতে পারবে আর চাইলে দশজন মেসকীনকে বস্ত্র দিতে পারবে। এখন যদি উম্মত বাকি দু’টি প্রকারকে নাজায়েয না করে নিজেদের আমলের জন্য একটিকে গ্রহণ করে নেয় তাহলে তা তার জন্য বৈধ। ঠিক তদ্রূপ উম্মত সাত হরফের মধ্য হতে একটি হরফকে সার্বজনীনভাবে বেছে নিয়েছে কিন্তু এই উপমা পেশ করা এ জন্য সঠিক নয় যে, উম্মত যদি শপথের কাফ্ফারার ক্ষেত্রে তিন প্রকারের যে কোনো একটি প্রকারকে এমনভাবে গ্রহণ করে যে, বাকি দু’টি প্রকারকে নাজায়েয তো বলে না; কিন্তু কার্যত সেগুলোর অস্তিত্ব একেবারেই বিলুপ্ত থেকে যায় এবং লোকদের কেবল এ টুকু জানা থাকে যে, শপথের কাফ্ফারার আরো দু’টি প্রকার ছিল যেগুলোর আমলকে উম্মত পরিহার করেছে। কিন্তু সে প্রকারগুলো কি ছিল? তা জানে এমন লোকও বাকি না থাকে, তাহলে অবশ্যই উম্মতের জন্য এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো অবকাশ নেই।
অতঃপর প্রশ্ন থেকে যায় যে, বাকি ছয় হরফকে পরিহার করার কি প্রয়োজন দেখা দিল? হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) বলেছেন যে, এই হরফগুলোর মতানৈক্যের কারণে মুসলমানদের মাঝে প্রচণ্ড ঝগড়া বাঁধত। এ জন্য হযরত উসমান (রা.) সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শে সকল হরফের মাঝে সমন্বয় সাধন করে সেটাকে এক হরফে রূপান্তরিত করাকে সমীচীন মনে করলেন। কিন্তু এটাও এমন এক কথা যেটাকে মেনে নেওয়া খুব মুশকিল। হরফের বিভিন্নতার উপর ভিত্তি করে মুসলমানদের মতবিরোধ তো স্বয়ং রাসূলুলাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগেও ছিল। হাদীসের ভাণ্ডারে এ ধরনের বহু ঘটনা বর্ণিত আছে যে, এক সাহাবী অপর সাহাবীকে ভিন্নভাবে কুরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন তখন তাঁদের পরস্পরে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়ে যেত। এমনকি সহীহ বুখারীর রেওয়ায়েত অনুযায়ী হযরত ওমর (রা.) তো হযরত হিশাম (রা.)-এর গলায় চাদর পেঁছিয়ে তাঁকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে নিয়ে এসেছিলেন। হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) বলেন, হরফের এই মতবিরোধের কথা শোনে আমার অন্তরে মস্তবড় সন্দেহ সৃষ্টি হতে লাগল। এ ধরনের ঘটনার প্রেক্ষিতে রাসূলুলাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাত হরফকে বিলুপ্ত করার পরিবর্তে সে হরফগুলোর অনুমোদনের ব্যাপারে জানালেন। আর এতে কোনো ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনাও ঘটেনি। সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে এটা অসম্ভব যে, তাঁরা এই ‘উসওয়ায়ে হাসানা’ বা উত্তম আদর্শের উপর আমল করার পরিবর্তে ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার সিদ্ধন্ত গ্রহণ করবেন।
তারপর আশ্চর্যের কথা হলো, আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী সাহাবায়ে কেরাম মতবিরোধের ভয়ে ছয় হরফকে তো বিলুপ্ত করে দিয়েছেন। কিন্তু কেরাতগুলোকে যা তাঁর বক্তব্য মতে হরফ থেকে আলাদা বিষয়। হুবহু বাকি রেখেছেন! যা আজ পর্যন্ত সংরক্ষিত হয়ে চলে আসছে। এখন প্রশ্ন হলো, বিভিন্ন হরফের উপর কুরআন তেলাওয়াত জারী রাখার ক্ষেত্রে যে মতবিরোধ ও মতানৈক্যের আশঙ্কা ছিল, কেরাতের বিভিন্নতার মাঝে কি সেই আশঙ্কাটা ছিল না? যখন ওই কেরাতগুলোর আলোকে কখনো কখনো এক একটি হরফকে বিশটি পদ্ধতিতে পড়া যায়। যদি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার উদ্দেশ্য এটাই হয়ে থাকে যে, মুসলমানদের মাঝে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা হবে এবং সবাই এক পদ্ধতিতে কুরআন তেলাওয়াত করবে, তাহলে কেরাতের বিভিন্নতাকে অবশেষে কেন বিলুপ্ত করা হলো না? যখন কেরাতের মতানৈক্য থাকা সত্ত্বেও মুসলমানদের বিক্ষিপ্ততাকে বাধা দেওয়া যেত এবং মুসলমানদেরকে এটা বুঝানো যেত যে, এই সবগুলো পদ্ধতিতে তেলাওয়াত করা জায়েয, তাহলে এই শিক্ষাটাই কেন সাত হরফের ক্ষেত্রে ফেতনার কারণরূপে উপলব্ধি হলো? প্রকৃত কথা হচ্ছে, হাফেয ইবনে জারীর তবারী (রহ.)-এর বক্তব্যে “সাত হরফ” এবং “কেরাত”-এর ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি এমন বিস্ময়কর দু’টি আমলী সম্বন্ধ করতে হয়, যার যুক্তিগ্রাহ্য কোনো কারণ বুঝে আসে না।
উপরন্তু হযরত উসমান (রা.) ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামের প্রতি এত বড় পদক্ষেপের সম্বন্ধ কোনো সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধ রেওয়ায়েতের উপর ভিত্তি করে নয়। বরং সংক্ষিপ্ত কিছু শব্দের কেয়াসনির্ভর ব্যাখ্যার মাধ্যমে করা হয়েছে। যে সকল রেওয়ায়েতে হযরত উসমান (রা.)-এর কুরআন সংকলনের কথা বর্ণনা করা হয়েছে সেখানে এ কথার উল্লেখ নেই যে, তিনি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন। বরং এর বিপরীত অনেক দলীল বিদ্যমান রয়েছে যেগুলোর বিশদ বর্ণনা সামনে আসবে। এখন কোনো সুস্পষ্ট ও সহীহ রেওয়ায়েত ব্যতীত এ কথা কিভাবে বলা সম্ভব হতে পারে যে, সাহাবায়ে কেরাম ওই ছয় হরফকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ব্যাপারটা মেনে নিয়েছেন, যা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বার বার আবদনের প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছিল?
প্রকৃত কথা হচ্ছে, যে সকল সাহাবায়ে কেরাম কুরআনুল কারীমের সংকলন ও বিন্যাসের মহান কাজে শুধু এ জন্যই গবেষণা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কাজ করে যাননি। যারা কুরআনুল কারীমের এক একটি শব্দ সংরক্ষণের জন্য নিজেদের পুরো জীবন ব্যয় করেছেন এবং যারা রহিত তেলাওয়াতের আয়াতগুলোও সংরক্ষণ করে উম্মতের নিকট পৌছিয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে এ কাজ হওয়াটা খুবই দূরবর্তী ব্যাপার যে, তাঁরা সবাই ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার জন্য এভাবে একমত হয়ে যাবেন যে, আজ সেই হরফগুলোর কোনো নাম ও নিশানাও বাকি থাকবে না। যে সকল আয়াতের তেলাওয়াত রহিত হয়ে গিয়েছিল, সাহাবায়ে কেরাম সেগুলোকেও কমপক্ষে ঐতিহাসিক ভিত্তিতে অবশিষ্ট রেখে আমাদের পর্যন্ত পৌছিয়েছেন। তাহলে কি সেই কারণ যে, ওই “হরফগুলো” যেগুলোর ব্যাপারে হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) ও মানেন যে, তা রহিত হয়নি-বরং কোনো কল্যাণার্থে কেরাত ও লিপিমালাকে বিলুপ্ত করা হয়েছে, সেগুলোর কোনো একটি উদাহরণ কোনো দুর্বল রেওয়ায়েতেও সংরক্ষিত হতে পারেনি!
এ কারণেই অধিকাংশ মুহাক্কিক উলামায়ে কেরাম হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর এই বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। যাদের বক্তব্যের বিশদ বর্ণনা সামনে আসবে।
[দুই.] ইমাম তহাভী (রহ.)-এর বক্তব্য:
সাত হরফের ব্যাপারে ইমাম তহাভী (রহ.) দ্বিতীয় মতটি গ্রহণ করেছেন। পূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁর মত অনুযায়ী কুরআনুল কারীম তো শুধু এক কুরাইশী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছিল। তবে উম্মতের সহজ-সাধ্যের জন্য এ অনুমতি প্রদান করা হয়েছে যে, তারা কুরআনুল কারীম তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে সাত পর্যন্ত সমার্থবোধক শব্দ ব্যবহার করতে পারবে। এই সমার্থবোধক শব্দগুলোও স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। এই অনুমতি প্রদানকেই হাদীসে কুরআনুল কারীম “সাত হরফ” এর উপর নাযিল হয়েছে বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই অনুমতি ছিল ইসলামের প্রাথমিক যুগে। পরবর্তীতে মানুষ যখন কুরআনী ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে গেল, তখন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগেই সেই অনুমতি রহিত হয়ে গেল। মৃত্যুর পূর্বে যখন শেষ বারের মতো তিনি হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে কুরআনুল কারীমের অনুশীলন করেন তখন সমার্থবোধক শব্দগুলো রহিত হয়ে গেল। এখন শুধু সেই হরফগুলোই অবশিষ্ট রয়েছে যেগুলোর উপর কুরআন নাযিল হয়েছিল। অর্থাৎ কুরাইশী হরফ। আর বাকি ছয় হরফ রহিত হয়ে গেছে।
হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্যের তুলনায় এই বক্তব্যটি এ দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তম যে, এতে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি রহিত করার সম্বন্ধ করা হয়নি যে, তাঁরা ছয় হরফকে রহিত করেছেন। বরং রহিত হবার সম্বন্ধ স্বয়ং নববী যুগের দিকে করা হয়েছে। তবে এ বক্তব্যের উপর একটি প্রশ্ন আরোপিত হয় যে, এই বক্তব্য অনুযায়ী ছয় হরফ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে নাযিলকৃত নয়। অথচ হযরত ওমর (রা.) ও হযরত হিশাম (রা.)-এর মাঝে যে মতবিরোধ হয়েছিল, সে ক্ষেত্রে হযরত হিশাম (রা.) রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে ‘সূরা ফুরকান’ নিজ পদ্ধতি অনুযায়ী পাঠ করলেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা শোনে বললেন- هكذا انزلت এই সূরা এভাবেই নাযিল করা হয়েছে)। এরপর হযরত হযরত ওমর (রা.) ও নিজের পদ্ধতি অনুযায়ী তেলাওয়াত করলেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা শোনেও বললেন- هكذا انزلت এই সূরা এভাবেই নাযিল করা হয়েছে।১৫২ এই শব্দমালা থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, উভয় পদ্ধতিটিই আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে নাযিলকৃত ছিল।
দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, যা পূর্বে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ বক্তব্যেও কেরাতের অবস্থানগত মর্যাদা ফুটে উঠেনি যে, তা সাত হরফের মধ্যে শামিল কি-না? যদি শামিল থাকে তাহলে ছয় হরফের মতো এ ক্ষেত্রেও বলতে হবে যে, [নাউযুবিল্লাহ এটা আল্লাহর পক্ষ হতে নাযিলকৃত নয়। অথচ এ কথা ইজমায়ে উম্মতের পরিপন্থী। আর যদি শামিল না থাকে তাহলে কেরাতের পৃথক অস্তিত্বের উপর কোনো দলীল নেই। কাজেই এ বক্তব্যের উপরও আত্মপ্রশান্তি লাভ হয় না।
[তিন.] সর্বোত্তম বক্তব্য
তৃতীয় বক্তব্য হলো সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ও মেনে নেওয়ার মতো। সাত হরফ দ্বারা যেহেতু কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকেই বুঝানো হয়েছে যার আলোচনা পূর্বে করা হয়েছে), তাই এই সাত হরফ আজও পুরোপুরি সংরক্ষিত ও অবশিষ্ট আছে এবং এগুলোর তেলাওয়াতও করা হয়। অবশ্য এতটুকু পার্থক্য রয়েছে যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে কেরাতসমূহের বিভিন্নতার সংখ্যা ছিল অনেক বেশি এবং তাতে সমার্থবোধক শব্দের অধিক্য ছিল। যার উদ্দেশ্য ছিল, যারা কুরআনের ভাষায় তেলাওয়াত করতে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়নি তাদেরকে বেশি থেকে বেশি সহজতার অবকাশ দেওয়া। পরবর্তীতে যখন আরবের লোকেরা কুরআনের ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে গেল তখন সমার্থবোধক শব্দের বহু মতানৈক্য বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে। যেমন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সর্বশেষ বার হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে দাওর করেন [যেটাকে হাদীসে আরযায়ে আখীরা বলা হয়। সে সময় অনেক কেরাতই রহিত করে দেওয়া হয়েছে। যার দলীল সামনে আসবে। কিন্তু যতগুলো কেরাত সে সময় অবশিষ্ট ছিল তার সবগুলোই আজ পর্যন্ত ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় চলে আসছে এবং এগুলোর তেলাওয়াত করা হয়।
“সাত হরফ”-এর পেঁচানো আলোচনার মধ্যে এটা সেই কণ্টকমুক্ত পথ যার উপর হাদীসের সবগুলো রেওয়ায়েত নিজ নিজ স্থানে সঠিক হয়ে যায়। এবং সেগুলোর মাঝে কোনো দ্বন্দ্ব বা মতবিরোধ বাকি থাকে না। আর না থাকে যুক্তিগ্রাহ্য কোনো আপত্তি। এ ব্যাপারে সম্ভাব্য আরো যত সন্দেহাবলী রয়েছে, আমরা সামনে বিস্তারিতভাবে সেগুলোর উত্তর দেব। যাতে এ বক্তব্যের যথার্থতা ভালোভাবে ফুটে উঠে। তবে এর আগে শোনে নিন যে, এ বক্তব্যের প্রবক্তাগণ কারা কারা? আমরা এখানে ওই মনীষীদের নাম এবং উদ্ধৃতি উপস্থাপন করব। যারা এ বক্তব্য গ্রহণ করেছেন অথবা হাফেয ইবনে জারীর তবারী (রহ.)-এর বক্তব্যকে খণ্ডন করেছেন।
এই বক্তব্যের প্রবক্তা যারা
ইলমে কেরাতের সর্বশ্রেষ্ঠ বিখ্যাত ইমাম, হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্রে হাফেয ইবনে কাছীর (রহ.)-এর শাগরিদ এবং হাফেয ইবনে হাযার (রহ.)-এর উস্তাদ, হাফেয আবুল খায়ের মুহাম্মদ ইবনুল জাযারী (রহ.) (মৃত্যু: ৮৩৩ হিজরী। স্বীয় গ্রন্থ “আন-নশরু ফী কিরাতিল আশর”-এর লিখেন-
وَأَمَّا كَوْنُ الْمَصَاحِفِ الْعُثْمَانِيَّة مُسْتَملَةً عَلَى جميع الأَحْرُفَ السَّبْعَةِ، فَإِنَّ هذه مسألة كبيرة اختَلَفَ الْعُلَمَاء فِيهَا : فَذَهَبَ جَمَاعَاتٌ من الْفُقَهَاءِ وَالْقُرَّاءِ وَالْمُتَكَلِّمِينَ إِلَى أَنَّ الْمَصَاحِفَ الْعُثْمَانِيَّةَ مُسْتَملة على جميع الأحرف السَّبْعَةِ، وَبَنَوْا ذَلِكَ عَلَى أَنَّهُ لَا يَجُوزُ عَلَى الْأُمَّةِ أَنْ تُهْمَلَ نَقْلَ شَيْءٍ مِنَ الْحُرُوف السبعة الَّتِي نَزَلَ الْقُرْآنُ بِهَا، وَقَدْ أَجْمَعَ الصَّحَابَةُ عَلَى نَقْلِ الْمَصَاحِفِ الْعُثْمَانِيَّة مِنَ الصُّحُفِ الَّتِي كَتَبَهَا أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ وَإِرْسَالَ كُلِّ مُصْحَفِ مِنْهَا إِلَى مِصْرٍ مِنْ أَمْصَارِ الْمُسْلِمِينَ وَأَجْمَعُوا عَلَى تَرْكِ مَا سَوَى ذلك، قَالَ هَؤُلَاءِ: وَلَا يَجُوزُ أَنْ يَنْهَى عَنِ الْقَراءة ببَعْضِ الْأَحْرُفَ السَّبْعَةَ وَلَا أَنْ يُجْمَعُوا عَلَى تَرْك شَيْءٍ مِنَ الْقُرْآن وَذَهَبَ جَمَاهِيرُ الْعُلَمَاء من السلف والخلف وأئمة الْمُسْلِمينَ إِلَى أَنَّ هَذه الْمَصَاحِفَ الْعُثمَانِيَّةَ مُسْتَملَةٌ عَلَى مَا يَحْتَمَلُهُ رَسْمُهَا مِنَ الْأَحْرُف السَّبْعَة فَقَط جَامعة لِلْعَرْضَة الأخيرة التي عرضها النَّبي – صلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – عَلَى جبْرَائِيلَ – عَلَيْهِ السَّلَامُ – مُتَضَمِّنَةٌ لَهَا لَمْ تَتْرُكَ حَرْفًا مِنْهَا.
)قُلْتُ( : وَهَذَا الْقَوْلُ هُوَ الَّذِي يَظْهَرُ صَوَابُهُ : لأَنَّ الْأَحَادِيثِ الصَّحِيحَة والآثار الْمَشْهُورَةَ الْمُسْتَفِيضَةً تَدُلُّ عَلَيْهِ وَتَشْهَدُ لَهُ
‘হযরত উসমান (রা.) যে মাসহাফ [কুরআনের কপি প্রস্তুত করেছিলেন তাতে সাত হরফ শামিল ছিল কি-না, তা অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। উলামায়ে কেরাম এতে মতবিরোধ করেছেন। ফুকাহা, কারী এবং কালাম শাস্ত্রবিদদের একটি দলের মতামত হলো, সাত হরফ মাসহাফে উসমানীর মাঝে শামিল রয়েছে। এ কথার ভিত্তি এর উপর যে, উম্মতের জন্য এটা বৈধ নয় যে, তারা ওই সাত হরফের মধ্য হতে কোনো একটি হরফকে বর্ণনা করা ছেড়ে দিবে, যেগুলোর উপর কুরআন নাযিল হয়েছে। আর সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সর্বসম্মতিতে উসমানী মাসহাফকে ওই সকল সহীফা থেকেই সংকলন করেছিলেন, যা হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত ওমর (রা.) লিপিবদ্ধ করেছিলেন। সেগুলোর প্রত্যেকটি কপি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন শহরে পাঠানো হয়েছিল এবং সেগুলো ব্যতীত যত সহীফা ছিল সবগুলো পরিহার করার উপর ঐক্যমত পোষণ করেছিলেন। তাঁরা বলেন, না সাত হরফের মধ্য হতে কোনো একটির কেরাতকে পরিহার করা জায়েয হবে আর না সাহাবায়ে কেরাম কুরআনের কোনো অংশ ছেড়ে দেওয়ার উপর ঐক্যমত পোষণ করবেন। আর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উলামায়ে কেরামের অধিকাংশের মত এটাই যে, মাসহাফে উসমানী ওই সকল হরফকে নিয়ে শামিল, যা এর রসমেরখতের মাঝে সন্নিবেশিত হয়েছে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বশেষ যখন হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে কুরআনুল কারীমের দাওর করেছিলেন, এর সমস্ত শব্দ এ মাসহাফে সন্নিবেশিত হয়ে গেছে। সেগুলোর কোনো হরফই সেই মাসহাফ থেকে বাদ পড়েনি।
আমার ধারণা, এটাই সে বক্তব্য যার বিশুদ্ধতা সুস্পষ্ট। কেননা বিশুদ্ধ হাদীসগুলো এবং প্রসিদ্ধ রেওয়ায়েতগুলো এর বিশুদ্ধতার প্রমাণ বহন করে এবং এর সাক্ষ্য প্রদান করে।১৫৩
আল্লামা বদরুদ্দীন আল-আইনী (রহ.) উদ্ধৃত করেন-
واختلف الأصوليون هل يقرأ اليوم على سبعة أحرف فمنعه الطبري وغيره وقال إنما يجوز بحرف واحد اليوم وهو حرف زيد ونحى إليه القاضي أبو بكر وقال الشيخ أبو الحسن الأشعري أجمع المسلمون على أنه لا يجوز حظر ما وسعه الله تعالى من القرآت بالأحرف التي أنزلها الله تعالى ولا يسوغ للأمة أن تمنع ما يُطلقه الله تعالى بل هي موجودة في قراءتنا وهي مفرقة في القرآن غير معلومة بأعيانها فيجوز على هذا وبه قال القاضي أن يقرأ بكل ما نقله أهل التواتر من غير تمييز حرف من حرف فيحفظ حرف نافع بحرف الكسائي وحمزة ولا حرج في ذلك
‘বর্তমানে কুরআনুল কারীম সাত হরফের উপর পড়া হয় কি-না, এ ব্যাপারে উসূলী তথা নীতি নির্ধারক উলামায়ে কেরামের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। হাফেয ইবনে জারীর তবারী (রহ.) ও কতক উলামায়ে কেরাম তা অস্বীকার করে বলেন, বর্তমানে শুধু এক হরফের উপরই কুরআনুল কারীম পাঠ করা জায়েয। আর তা হচ্ছে, হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর হরফ। কাযী আবু বকর রাযী (রহ.) এ মতের দিকেই ঝুঁকে পড়েছেন। কিন্তু ইমাম আবুল হাসান আশআরী (রহ.) বলেন, মুসলিম উম্মাহ এ ব্যাপারে একমত যে, মহান আল্লাহ যেসব হরফের উপর কুরআন অবতীর্ণ করে সহজ-সাধ্য করেছেন, সেগুলো থেকে বিরত থাকা জায়েয নেই। আর আল্লাহ তাআলা যে জিনিসের অনুমতি প্রদান করেছেন সেগুলোকে প্রত্যাখ্যান করার উম্মতের অধিকার নেই। বরং বস্তু বতা তো হলো এই যে, সাত হরফের সবগুলোই আমাদের প্রচলিত কেরাতের মাঝে বিদ্যমান রয়েছে এবং কুরআনুল কারীমের মাঝে বিচ্ছিন্ন ও অনির্দিষ্টভাবে শামিল আছে। এ হিসেবে সে হরফগুলোর কেরাত আজও জায়েয আছে। আর এটাই কাযী১৫৪ সাহেবের মত। যত হরফ তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় বর্ণিত আছে সেগুলোর প্রত্যেকটিই পড়া জায়েয। এক হরফ থেকে অন্য হরফের পার্থক্য করারও প্রয়োজন নেই। নাফে (রহ.)-এর কেরাতকে কেসাই এবং হামযা (রহ.)-এর কেরাতের সাথে মিলিয়ে যদি আত্মস্থ করা হয় তাতে কোনো অসুবিধা নেই।১৫৫
আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশী (রহ.) কাযী আবু বকর (রহ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে লিখেন-
وَالسَّابِعُ: اخْتَارَهُ الْقَاضِي أَبُو بَكْرٍ وَقَالَ الصَّحِيحُ أَنَّ هَذِهِ الْأَحْرُفَ السَّبْعَةَ ظَهَرَتْ وَاسْتَفَاضَتْ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَضَبَطَهَا عَنْهُ الْأَئِمَّةُ وَأَثْبَتَهَا عُثْمَانُ وَالصَّحَابَةُ فِي الْمُصْحَفِ
‘সপ্তম বক্তব্যটি কাযী আবু বকর১৫৬ (রহ.) গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, সাত হরফের সবগুলোই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রসিদ্ধির সাথে বর্ণিত আছে। আইম্মায়ে কেরাম এগুলোকে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। হযরত উসমান (রা.) ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম এগুলোকে তাঁদের মাসহাফে বিদ্যমান রেখেছেন।’১৫৭
আল্লামা ইবনে হযম (রহ.)ও হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্যকে কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার বক্তব্যটি একেবারেই ভুল। হযরত উসমান (রা.) যদি এমন করতেও চাইতেন তবুও সক্ষম হতেন না। কারণ মুসলিম বিশ্বের আনাচে-কানাচে এ সাত হরফের হাফেযে ভরপুর ছিল। তিনি লিখেন-
وأما قول من قال أبطل الأحرف الستة فقد كذب من قال ذلك ولو فعل عثمان ذلك أو أراده لخرج عن الإسلام ولما مطل ساعة بل الأحرف السبعة كلها عندنا قائمة كما كانت مثبوتة في القراآت المشهورة المأثورة
‘আর যারা বলেন যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছেন, তারা একেবারেই ভুল বলেছেন। যদি হযরত উসমান (রা.) এমনটি করতেন বা এর ইচ্ছা করতেন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি ইসলাম থেকে বের হয়ে যেতেন।১৫৮ বরং বাস্তবতা হলো, সাত হরফের সবগুলোই অবিকল আমাদের নিকট বিদ্যমান রয়েছে এবং মাশহুর কেরাতের মধ্যে সংরক্ষিত রয়েছে।’১৫৯
মুয়াত্ত্বা ইমাম মালেকে’র বিখ্যাত ভাষ্যকার, আল্লামা আবুল ওলীদ বাজি মালেকী (রহ.) “সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যা “সাত কেরাত” দ্বারা করার পর লিখেন-
فَإِنْ قِيلَ هَلْ يَقُولُونَ إِنَّ جَمِيعَ هَذِهِ السَّبْعَةِ الْأَحْرُفِ ثَابِتَةٌ فِي الْمُصْحَفِ فَإِنَّ الْقِرَاءَةَ بِجَمِيعِهَا جَائِزَةٌ قِيلَ لَهُمْ كَذَلِكَ نَقُولُ وَالدَّلِيلُ عَلَى صِحَّةِ ذَلِكَ قَوْلُهُ عَزَّ وَجَلَّ إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ وَلَا يَصِحُّ انْفِصَالُ الذِّكْرِ الْمُنَزَّلِ مِنْ قِرَاءَتِهِ فَيُمْكِنُ حِفْظُهُ دُونَهَا وَمِمَّا يَدُلُّ عَلَى صِحَّةِ مَا ذَهَبْنَا إِلَيْهِ أَنَّ ظَاهِرَ قَوْلِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم يَدُلُّ عَلَى أَنَّ الْقُرْآنَ أُنْزِلَ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ تَيْسِيرًا عَلَى مَنْ أَرَادَ قِرَاءَتَهُ لِيَقْرَأَ كُلُّ رَجُلٍ مِنْهُمْ بِمَا تَيَسَّرَ عَلَيْهِ وَبِمَا هُوَ أَخَفُّ عَلَى طَبْعِهِ وَأَقْرَبُ إِلَى لُغَتِهِ لِمَا يَلْحَقُ مِنَ الْمَشَقَّةِ بِذَلِكَ الْمَأْلُوفِ مِنَ الْعَادَةِ فِي النُّطْقِ وَنَحْنُ الْيَوْمَ مَعَ عُجْمَةِ أَلْسِنَتِنَا وَبُعْدِنَا عَنْ فَصَاحَةِ الْعَرَبِ أَحْوَجُ
‘যদি প্রশ্ন করা হয় যে, “আপনাদের বক্তব্য কি এ রকম যে, এই সাত হরফ কি আজও মাসহাফে বিদ্যমান আছে? তাইতো আপনাদের মত অনুযায়ী সবগুলোর কেরাত জায়েয।” তখন আমরা বলব, হ্যাঁ আমাদের বক্তব্য এটাই। আর এটা বিশুদ্ধ হওয়ার দলীল হলো, আল্লাহ তাআলার বাণী إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ [নিশ্চয় আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক]। আর কুরআনুল কারীমকে তার কেরাত থেকে এভাবে পৃথক করা যাবে না যে, কুরআন তো সংরক্ষিত রয়েছে আর তার কেরাত বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
আমাদের বক্তব্যের বিশুদ্ধতার স্বপক্ষে আরো একটি দলীল হলো এই যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ বহন করে যে, কুরআনকে সাত হরফের উপর নাযিল করা হয়েছে, যাতে তেলাওয়াতকারীর জন্য সহজ হয় যে, প্রত্যেক ব্যক্তি ওই পদ্ধতিতে তেলাওয়াত করতে পারে যে পদ্ধতি তার জন্য সহজ হয়। তার স্বভাব-রুচির দিক থেকে অধিক সহজ হয় এবং ভাষার দিক থেকে অধিক নিকটবর্তী হয়। কেননা, কথোপকথনের মধ্যে যা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায় তা পরিত্যাগ করা খুবই কঠিন। বর্তমান যুগে আমরা অনারবী এবং আরবী ভাষার পাণ্ডিত্য থেকে দূরে থাকার কারণে এ সহজতার প্রতি আমরা অধিক মুখাপেক্ষী।১৬০
ইমাম গাযালী (রহ.) স্বীয় উসূলে ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ “আল-মুসতাসফা”-এ কুরআনুল কারীমের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লিখেন-
مَا نُقِلَ إِلَيْنَا بَيْنَ دَفَّتَي الْمُصْحَفِ عَلَى الْأَحْرُفِ السَّبْعَةِ الْمَشْهُورَةِ نَقْلًا مُتَوَاتِرًا.
‘মাসহাফের পার্শ্বদ্বয়ের মাঝখানে সুপ্রসিদ্ধ সাত হরফের উপর ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় যা আমাদের পর্যন্ত বর্ণিত হয়ে এসেছে [তাই কুরআন]।’১৬১
এর দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, ইমাম গাযালী (রহ.)ও আজ পর্যন্ত সাত হরফ বাকি থাকার প্রবক্তা।
আর মোল্লা আলী কারী (রহ.) লিখেন-
وَكَأَنَّهُ – عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ – كُشِفَ لَهُ أَنَّ الْقِرَاءَةَ الْمُتَوَاتِرَةَ تَسْتَقِرُّ فِي أُمَّتِهِ عَلَى سَبْعٍ، وَهِيَ الْمَوْجُودَةُ الْآنَ الْمُتَّفَقُ عَلَى تَوَاتُرِهَا، وَالْجُمْهُورُ عَلَى أَنَّ مَا فَوْقَهَا شَاذٌّ لَا يَحِلُّ الْقِرَاءَةُ بِهِ
‘মনে হয় যেন হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর বিষয়টা উন্মোচিত হয়ে গিয়েছিল যে, তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় বর্ণিত কেরাতগুলো শেষ পর্যন্ত তাঁর উম্মতের মাঝে সাত হরফের উপরই বাকি থেকে যাবে। আর তাইতো আজ এগুলোই বিদ্যমান আছে এবং সবাই এগুলোর তাওয়াতুরের ব্যাপারে একমত। জমহুর উলামায়ে কেরামের মত হলো, এগুলো ব্যতীত আর যত কেরাত আছে তা [প্রায়] শায বা অপ্রচলিত এবং সেগুলোর তেলাওয়াত জায়েয নেই।’১৬২
এতে মোল্লা আলী কারী (রহ.)-এর এ কথাটি যদিও সঠিক নয় যে, ‘সাত কেরাত ব্যতীত বাকি অন্য সব কেরাত শায বা অপ্রচলিত।’ কারণ ইলমে কেরাত বিশেষজ্ঞগণ কঠোরভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।১৬৩ কিন্তু এর দ্বারা এটা নিশ্চিত জানা যায় যে, তাঁর মত অনুযায়ী সাত হরফ আজও বাকি আছে। হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)-এর বক্তব্য পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি “সাত হরফ”-এর মাঝে ‘সাত’ সংখ্যাটি আধিক্যের অর্থে প্রয়োগ করেন। এর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন-
“হাদীসের মধ্যে ‘সাত’ শব্দটি সংখ্যাধিক্যের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। নির্দিষ্ট সংখ্যা বুঝানোর জন্য নয়। ‘দশ’ কেরাতের উপর আইম্মায়ে কেরাম ঐক্যমত পোষণ করেছেন এবং দশ কেরাতের প্রত্যেকটির জন্য দু’জন করে বর্ণনাকারী রয়েছেন। একজন অপর জনের সাথে মতবিরোধ করেন। ফলে কেরাতের সংখ্যা বিশ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায়।”১৬৪
এই উক্তিতে যদিও শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) জমহুর উলামায়ে কেরামের সাথে মতবিরোধ করে “সাত” সংখ্যাটিকে সংখ্যাধিক্যের জন্য সাব্যস্ত করেছেন। [হয়তো বিশটি কেরাতকে কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারে সীমাবদ্ধ করার বিষয়টি তাঁর কাছে সুস্পষ্ট হয়নি] কিন্তু এর দ্বারা এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ হয়ে পড়ে যে, হাদীসে যে হরফগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে শাহ সাহেবের নিকট সেগুলো কেরাতই এবং সেগুলো রহিত বা বা পরিত্যক্ত হয়নি; বরং আজও বিদ্যমান রয়েছে।
শেষ জামানায় দীনি জ্ঞানের ইমাম, যুগশ্রেষ্ঠ মুহাক্কিক এবং হাফেযে হাদীস আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) এই হাদীসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সংক্ষিপ্ত ভাষায় মাসআলাটির স্বরূপ এমনভাবে উন্মোচন করেছেন যে, এটাকে শেষ হরফ বলা উচিত। এখানে আমরা তাঁর পুরো তাহকীক ও গবেষণাটি হুবহু উল্লেখ করছি-
واعلم انهم اتفقوا على انه ليس المراد من سبعة احرف القراة السبعة المشهورة بان يكون كل حرف منها قراءة من تلك القراءات، اعنى انه لا انطباق بين القراءات السبع والاحرف السبعة كما يذهب اليه الوهم بالنظر الى لفظ السبعة فى الموضعين، بل بين ذلك الاحرف والقراءة عموم وخصوص وجهى، كيف، وان القراءات لاتنحصر فى السبعة، كما صرح ابن الجوزى فى رسالة النشر فى قراءة العشر، وانما اشتهرت السبعة على الالسنة لانها التى جمعها الشاطبي ثم اعلم ان بعضهم فهم ان بين تلك الاحرف تغايرا من كل وجه، بحيث لارباط بينها وليس كذلك، بل قد يكون الفرق بالمجرد والمزيد واخرى الابواب، ومرة باعتبار الصيغ من الغائب والحاضر، وطورا بتحقيق الهمزة وتسهيلها فكل هذه التغييرات يسيرة كانت او كثيرة حرف براسه، وغلط من فهم ان هذه الاحرف متغايرة كلها بحيث يتعذر اجتماعها اما انه كيف عدد السبعة فتوجه اليه ابن الجوزى وحقق ان التصرفات كلها ترجع الى السبعة و راجع القسطلاني والزرقاني، بقى الكلام فى ان تلك الاحرف كلها موجودة او رفع بعضها وبقى البعض فاعلم ان ماقرأة جبرئيل عليه السلام فى العرضة الاخيرة على النبي صلى الله عليه وسلم كله ثابت فى مصحف عثمان، ولما يتعين معنى الاحرف عند ابن جرير ذهب الى رفع الاحرف الست منها وبقى واحد فقط.
‘জেনে রাখুন, সমস্ত উলামায়ে কেরাম এ কথার উপর একমত যে, সাত হরফ দ্বারা প্রসিদ্ধ সাত কেরাত উদ্দেশ্য নয় এবং এমনও নয় যে, প্রত্যেক হরফ ওই সাত কেরাতের মধ্য হতে একটি কেরাত। ফলকথা, সাত কেরাত ও সাত হরফ এক কথা নয়। যা প্রথম দৃষ্টিতে সাত হরফ দ্বারা এমন ধারণা জন্ম নেয়। বরং সাত হরফ ও সাত কেরাতের মাঝে উম্মুম-খুসূস মিন ওয়াজহিন১৬৫-এর সম্পর্ক। আর কেরাত যখন সাত সংখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় তখন উভয়টা এক হতে পারে কি করে? যেমন, আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.) “আন-নশরু ফী কিরাআতিল আশর” কিতাবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। তবে “সাত কেরাত” শব্দটি মানুষের মুখে মুখে প্রসিদ্ধি লাভ করার কারণ হলো, আল্লামা শাত্বীবী (রহ.) এই সাত প্রকার কেরাতকে গ্রন্থনা করেছেন। অতঃপর এ কথাটাও মনে রাখবেন যে, কোনো কোনো লোক মনে করে যে, সাত হরফের মাঝে পরস্পর সম্পূর্ণ “বিপরীতমুখী” সম্পর্ক, যে একটির সাথে অপরটির কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ বাস্তবতা এমন নয়। বরং কখনো কখনো দুই হরফের মাঝে একবচন ও বহুবচনের মধ্যে পার্থক্য হয়ে থাকে। আবার কখনো ব্যাকরণগত বিষয়ে। আবার কখনো গায়েব [নাম পুরুষ] ও হাযের [মধ্যম পুরুষ]-এর শব্দের পার্থক্য হয়ে থাকে। কখনো শুধু হামযাকে বাকি রাখার ও সেটাকে তাসীল করার পার্থক্য হয়। ব্যাস, এ সকল পরিবর্তন চাই সাধারণ হোক কিংবা বড় বড়, সবই স্বতন্ত্র একটি হরফ। আর যারা এ কথা মনে করেন যে, এ হরফগুলোর মাঝে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী সম্পর্ক এবং এগুলোকে এক শব্দে একত্রিত করা সম্ভব নয়, তারা ভুল করেছেন। বাকি থাকল এ কথা যে, হাদীসে “সাত” সংখ্যাটি দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে? আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর উত্তর দিয়েছেন। তিনি তাহকীক বর্ণনা করেছেন যে, এ সমস্ত পরিবর্তন-পরিবর্ধন সাত প্রকার। এ মাসআলায় ‘কাসতালানী’ (রহ.) ও ‘যুরকানী’ (রহ.)-[এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ] দেখে নিন।
এখন বাকি থাকল শুধু এ কথা যে, এ সকল হরফ এখন আছে নাকি কিছু হরফ বিলুপ্ত করা হয়েছে আর কিছু হরফ অবশিষ্ট আছে? সুতরাং এটা জেনে নিন যে, হযরত জিবরাঈল (আ.) কুরআনুল কারীমের আরযায়ে আখীরার সময় যতগুলো হরফ পাঠ করেছিলেন, তার সবগুলোই মাসহাফে উসমানীতে বিদ্যমান রয়েছে। যেহেতু ইবনে জারীর (রহ.)-এর নিকট হরফের অর্থ সুস্পষ্ট নয় তাই তিনি এ মাযহাব গ্রহণ করেছেন যে, ছয় হরফকে বিলুপ্ত করা হয়েছে আর এক হরফ অবশিষ্ট রয়েছে।১৬৬
অনুরূপভাবে মিসরের পরবর্তী উলামায়ে কেরামের মাঝে সুপ্রসিদ্ধ গবেষক আল্লামা যাহেদ কাউসারী (রহ.) [মৃত্যু ১৩৭১ হিজরী] লিখেন-
والاول رأى القائلين بان الاحرف السبعة كانت في مبدأ الامر ثم نسخت العرضة الاخيرة في عهد النبي صلى الله عليه وسلم فلم يبق الا حرف واحد و رأى القائلين بان عثمان رضى الله عنه جمع الناس على حرف واحد ومنع من الستة الباقية لمصلحة، واليه نحا ابن جرير وتهيبه ناس فتابعوه لكن هذا رأى خطير قام ابن حزم باشد النكير عليه في الفصل وفي الاحكام وله الحق في ذلك، والثاني رأى القائلين بان هي الاحرف السبعة المحفوظة كما هي في العرضة الاخيرة. الخ..
‘প্রথম মতটি [বর্তমান কেরাত এক হরফেরই বিভিন্ন রূপ] সেসব মনীষীর, যারা বলেন-সাত হরফ ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল। অতঃপর আরযায়ে আখীরার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগেই তা রহিত হয়ে গেছে। বর্তমানে শুধু একটিই অবশিষ্ট রয়েছে। এই মতটি সেসব ব্যক্তিদেরও যারা বলেন, হযরত উসমান (রা.) সমস্ত মানুষকে এক হরফের উপর একত্রিত করেছিলেন এবং বিশেষ কল্যাণার্থে বাকি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করেছিলেন। হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর মতও এটাই এবং এ ক্ষেত্রে বহু লোক তাঁর কথায় প্রভাবিত হয়ে তাঁর পিছু ধরেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা খুবই স্পর্শকাতর ও বিপজ্জনক রায়। আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.) “আল-ফছ্ল” এবং “আল-আহকাম”-এ এর কড়া বিরোধিতা করেছেন, যা তাঁর অধিকার ছিল। দ্বিতীয় মত হচ্ছে [বর্তমান কেরাতই সাত হরফ] সেসব ব্যক্তিদের, যারা বলেন-এগুলোই সেই সাত হরফ আরযায়ে আখীরা থেকে যা সংরক্ষিত হয়ে আসছে।১৬৭
আমরা উপরোল্লিখিত এ বক্তব্য ও মতামতগুলো বিস্তারিতভাবে এ জন্য পেশ করলাম যে, বর্তমান যুগে আল্লামা ইবনে জারীর তবারী (রহ.)-এর বক্তব্যটি অধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। আর আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.)-এর সুমহান ব্যক্তিত্বের দিকে তাকিয়ে তাঁকে সাধারণত সব ধরনের সন্দেহ ও সংশয়ের ঊর্ধ্বে মনে করা হয়। এর ভিত্তিতেই আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর এ পরিচ্ছন্ন ও সুস্পষ্ট বক্তব্যটি হয়তো মানুষ জানে না অথবা জানা থাকলেও সেটাকে একটা দুর্বল মত বলে মনে করা হয়। অথচ পূর্বোক্ত আলোচনার আলোকে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইমাম মালেক (রহ.), আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.), আল্লামা আবুল ফযল রাজী (রহ.), কাযী আবু বকর ইবনে তাইয়্যেব (রহ.), ইমাম আবুল হাসান আশআরী (রহ.), কাযী ইয়ায (রহ.), আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.), আল্লামা আবুল ওলীদ বাজী (রহ.), ইমাম গাযালী (রহ.) ও মোল্লা আলী কারী (রহ.)-এর ন্যায় উলামায়ে কেরাম এ কথার উপর ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, সাত হরফের সবগুলো আজও সংরক্ষিত ও বিদ্যমান রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আরযায়ে আখীরার সময় যতগুলো হরফ বাকি ছিল, তার মধ্য হতে কোনো হরফ না রহিত হয়েছে আর না পরিত্যক্ত হয়েছে। বরং মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) নিজের এ বক্তব্যকে নিজের পূর্বে জমহুর উলামায়ে কেরামের রায় বলেও সাব্যস্ত করেছেন।
পরবর্তী উলামায়ে কেরামের মাঝে হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ (রহ.), হযরত আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) এবং আল্লামা যাহেদ কাউসারী (রহ.)-এর বক্তব্যও এটাই। অনুরূপভাবে মিসরের প্রসিদ্ধ উলামায়ে কেরাম আল্লামা নাযীত মুতীয়ী (রহ.), আল্লামা খাজারী দিম্ইয়াাতী (রহ.) ও শায়েখ আবদুল আযীম যুরকানী (রহ.)ও এ বক্তব্যকে গ্রহণ করেছেন।১৬৮ অতএব, প্রমাণপঞ্জির দিকে না তাকিয়ে শুধু ব্যক্তিত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও এটা অত্যন্ত উঁচু মানের একটা বক্তব্য।
এ বক্তব্যের দলীলসমূহ
এখন সে সকল দলীল উপস্থাপন করছি, যেগুলো দ্বারা এ বক্তব্যটি শক্তিশালী হয়। এর কিছু দলীল তো উপরোক্ত বক্তব্যগুলোতে এসে গেছে।
অতিরিক্ত কিছু দলীল নিম্নে পেশ করা হলো :
১. কুরআনুল কারীমের আয়াত- إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ [নিশ্চয় আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক] সুস্পষ্টভাবে এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, কুরআনের যে সকল আয়াত স্বয়ং আল্লাহ তাআলা রহিত করেননি সেগুলো কেয়ামত পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে। অপর দিকে সে সকল হাদীস পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলো দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, কুরআনের সাত হরফ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে নাযিলকৃত ছিল। তাই উল্লিখিত আয়াতের সুস্পষ্ট দাবী হলো, ওই সাত হরফ কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকা।
২. হযরত উসমান (রা.) যদি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে শুধু এক হরফ দ্বারা কুরআন প্রস্তুত করে থাকেন, তাহলে স্পষ্ট করে কোথাও তার কোনো প্রমাণ অবশ্যই পাওয়া যাওয়া উচিত ছিল। অথচ এর কোনো প্রমাণ তো পাওয়া যায়ই না; বরং রেওয়ায়েতসমূহ থেকে জানা যায় যে, মাসহাফে উসমানীর মাঝে সাত হরফের সবগুলোই বিদ্যমান ছিল। যেমন, রেওয়ায়েতে সুস্পষ্টভাবে এ কথা উল্লেখ আছে যে, হযরত উসমান (রা.) স্বীয় মাসহাফ হযরত আবু বকর (রা.) কর্তৃক সংকলিত মাসহাফের অনুকরণে লিপিবদ্ধ করেছিলেন এবং লিপিবদ্ধ করার উভয় কপিকে মিলানোও হয়েছিল। এ ব্যাপারে হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.) বলেন-
فعرضت المصحف عليها فلم يختلفا في شيئ
“আমি ওই সহীফাগুলো দ্বারা মাসহাফকে মিলিয়ে দেখেছি, উভয়ের মধ্যে কোনো ধরনের পার্থক্য [বেশ-কম] ছিল না।’১৬৯
এ কথা সুস্পষ্ট যে, হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)ও স্বীকার করেন যে, হযরত আবু বকর (রা.)-এর জামানায় সাত হরফের সবগুলোই বিদ্যমান ছিল। তাই হযরত আবু বকর (রা.)-এর সহীফাগুলোতে নিশ্চিতভাবে কুরআনুল কারীমকে সাত হরফে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কাজেই হযরত উসমান (রা.) যদি ছয় হরফকে বিলুপ্তই করে দিয়ে থাকেন তাহলে হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)- এর এ কথা কিভাবে সঠিক হতে পারে যে, “উভয়ের মাঝে কোনো পার্থক্য বা কম-বেশি ছিল না।”?
৩. আল্লামা ইবনুল আম্বারী (রহ.) “কিতাবুল মাসাহিফ”-এ প্রসিদ্ধ তাবেঈ হযরত উবায়দা সালমানী (রহ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করেন-
قراءتنا التي جمع الناس عثمان عليها هي العرضة الأخيرة
‘আমাদের ওই কেরাত, যার উপর হযরত উসমান রা.) মানুষকে একত্রিত করেছেন, সেটা ছিল “আরযায়ে আখীরা”-এর কেরাত।’১৭০
হযরত উবায়দা (রা.)-এর এ বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে যে, আরযায়ে আখীরা [হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কুরআনের শেষ দাওর]-এর সময় যে হরফগুলো বাকি ছিল, হযরত উসমান (রা.) ওই হরফের কোনোটিই ছাড়েননি।
এ ক্ষেত্রে কোনো কোনো আলেম বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আরযায়ে আখীরা তো শুধু এক কুরাইশী হরফের উপরই হয়েছিল। আর এটার উপরই হযরত উসমান (রা.) সাবাইকে একত্রিত করেছিলেন। কিন্তু এ কথা খুবই দূরবর্তী যে, যে হরফগুলো রহিত হয়েছিল না, সেগুলো এই দাওর [আরযায়ে আখীরা] থেকে বাদ পড়ে যাবে।
৪. প্রসিদ্ধ তাবেঈ হযরত মুহাম্মদ ইবনে সিরীন (রহ.) থেকে আল্লামা ইবনে সা’দ (রহ.) এ বক্তব্য উদ্ধৃত করেন-
كان جبريل يعرض القرآن على النبي صلى الله عليه وسلم كل عام مرة في رمضان فلما كان العام الذي توفي فيه عرضه عليه مرتين قال محمد فأنا أرجو أن تكون قراءتنا العرضة الأخيرة
‘হযরত জিবরাঈল (আ.) প্রতি বছর একবার রমযান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে কুরআন উপস্থাপন করতেন। যখন তাঁর ইন্তেকালের বছর আসল তখন হযরত জিবরাঈল (আ.) দু’বার কুরআন উপস্থাপন করেছেন। [মুহাম্মাদ ইবনে সিরীন (রহ.) বলেন,] আমি আশাবাদী যে, আমাদের বর্তমান কেরাত ওই আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী।’১৭১
৫. হযরত আমের শা’বী (রহ.) ছিলেন প্রসিদ্ধ একজন তাবেঈ। যিনি সাতশত সাহাবায়ে কেরাম থেকে ইলমী ফায়দা অর্জন করেছেন। আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.) তাঁর থেকেও এ ধরনের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন।
উল্লিখিত ব্যক্তিদ্বয় ছিলেন তাবেঈ এবং হযরত উসমান (রা.)-এর যুগের অত্যন্ত নিকটবর্তী ব্যক্তিত্ব। তাই এ ক্ষেত্রে তাঁদের বক্তব্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মর্যাদা রাখে।
৬. সমগ্র হাদীসের ভাণ্ডারে আমরা কোনো একটি রেওয়ায়েতেও এমন পাইনি, যা দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে দু’ধরনের মতানৈক্য ছিল। এক. সাত হরফের মতানৈক্য। দুই. কেরাতের মতানৈক্য। এর পরিবর্তে বহু রেওয়ায়েত দ্বারা এ কথা জানা যায় যে, উভয়টি অভিন্ন বিষয়। কেননা, একই ধরনের মতানৈক্যের উপর একই সময়ে “কেরাতের মতানৈক্য” ও “হরফের মতানৈক্য” শব্দ দু’টি প্রয়োগ করা হয়েছে। যেমন হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) বলেন-
عَنْ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ، قَالَ: كُنْتُ فِي الْمَسْجِدِ، فَدَخَلَ رَجُلٌ يُصَلِّي، فَقَرَأَ قِرَاءَةً أَنْكَرْتُهَا عَلَيْهِ، ثُمَّ دَخَلَ آخَرُ فَقَرَأَ قِرَاءَةً سِوَى قِرَاءَةِ صَاحِبِهِ، فَلَمَّا قَضَيْنَا الصَّلَاةَ دَخَلْنَا جَمِيعًا عَلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقُلْتُ: إِنَّ هَذَا قَرَأَ قِرَاءَةً أَنْكَرْتُهَا عَلَيْهِ، وَدَخَلَ آخَرُ فَقَرَأَ سِوَى قِرَاءَةِ صَاحِبِهِ، فَأَمَرَهُمَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَرَآ، فَحَسَّنَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَأْنَهُمَا، فَسَقَطَ فِي نَفْسِي مِنَ التَّكْذِيبِ، وَلَا إِذْ كُنْتُ فِي الْجَاهِلِيَّةِ، فَلَمَّا رَأَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا قَدْ غَشِيَنِي، ضَرَبَ فِي صَدْرِي، فَفَضْتُ عَرَقًا وَكَأَنَّمَا أَنْظُرُ إِلَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ فَرَقًا، فَقَالَ لِي: ” يَا أُبَيُّ أُرْسِلَ إِلَيَّ أَنِ اقْرَأِ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفٍ، فَرَدَدْتُ إِلَيْهِ أَنْ هَوِّنْ عَلَى أُمَّتِي، فَرَدَّ إِلَيَّ الثَّانِيَةَ أَقْرَأْهُ عَلَى حَرْفَيْنِ، فَرَدَدْتُ إِلَيْهِ أَنْ هَوِّنْ عَلَى أُمَّتِي، فَرَدَّ إِلَيَّ الثَّالِثَةَ اقْرَأْهُ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ
‘আমি মসজিদে ছিলাম। একব্যক্তি প্রবেশ করে নামায আদায় করতে লাগল। সে এমন এক কেরাত পাঠ করল যা আমার কাছে অপরিচিত বলে মনে হলো। অতঃপর অপর এক ব্যক্তি এসে মসজিদে প্রবেশ করল। সে প্রথম ব্যক্তির কেরাত ব্যতীত অন্য এক ধরনের কেরাত পাঠ করল। আমরা যখন নামায সমাপ্ত করলাম তখন সবাই মিলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-নিকট উপস্থিত হলাম। আমি আরয করলাম যে, এ ব্যক্তি এমন এক কেরাত পাঠ করেছে যা আমার কাছে অপরিচিত বলে মনে হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় আরেক ব্যক্তি এসে প্রথম ব্যক্তির কেরাতের চেয়ে ভিন্ন আরেক ধরনের কেরাত পাঠ করল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উভয়কে পড়ার নির্দেশ দিলেন। তারা উভয়ে পাঠ করার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উভয়ের কেরাতকে সুন্দর হয়েছে বলে মন্তব্য করলেন। এতে আমার অন্তরে মিথ্যাচারিতার এমন এমন ওয়াসওয়াসা আসতে লাগল, জাহেলী যুগেও যা আমার খেয়ালে আসত না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আমার এ অবস্থা দেখলেন তখন তিনি আমার বক্ষে [আলতো] আঘাত করলেন। এতে আমি ঘামে স্নাত হয়ে গেলাম এবং ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় আমি এমন অনুভব করলাম, আমি যেন আল্লাহকে দেখছি। এরপর তিনি আমাকে বললেন, হে উবাই! আমার পালনকর্তা আমার নিকট পয়গাম পাঠিয়েছেন যে, আমি কুরআনকে এক হরফে পাঠ করব। প্রতি উত্তরে আমি আবেদন করলাম, আমার উম্মতের জন্য সহজ করুন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা দ্বিতীয় বারের জন্য পয়গাম পাঠালেন যে, আমি কুরআনকে দুই হরফের উপর পাঠ করব। এর উত্তরেও আমি আবেদন করলাম, আমার উম্মতের জন্য সহজ করুন। তখন আল্লাহ তাআলা তৃতীয়বার পয়গাম পাঠালেন যে, আমি যেন এটাকে সাত হরফের উপর পাঠ করি।’১৭২
এক রেওয়ায়েতে হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) উভয় ব্যক্তির তেলাওয়াতের মতানৈক্যকে বার বার কেরাতের মতানৈক্য বলে উল্লেখ করেছেন। আর এটাকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাত হরফের মতানৈক্য বলে উল্লেখ করেছেন। এর দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, নববী যুগে কেরাতের মতানৈক্য ও হরফের মতানৈক্যকে এক ও অভিন্ন বিষয় বুঝা হতো। উপরন্তু এর বিপরীত এমন কোনো দলীল-প্রমাণ নেই, যা উভয়টার পৃথক হবার প্রমাণ বহন করে। এর দ্বারা প্রমাণ হয় যে, উভয়টা এক ও অভিন্ন বিষয়। আর কেরাত যখন সংরক্ষিত হওয়ার বিষয়টি তাওয়াতুর ও ইজমা দ্বারা প্রমাণিত, তখন এর দ্বারা বুঝা যায় যে, সাত হরফও আজও সংরক্ষিত।
উপরোল্লিখিত দলীল-প্রমাণগুলোর আলোকে এ কথা একেবারে সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, আরযায়ে আখীরার সময় সাত হরফের যে অংশ বাকি ছিল, তার সম্পূর্ণটাই মাসহাফে উসমানীতে সংরক্ষণ করা হয়েছিল এবং আজ পর্যন্ত তা সংরক্ষিত হয়েই চলে আসছে। এটাকে কেউ রহিত করেনি এবং এর কেরাতকে নিষিদ্ধও করা হয়নি। তবে এটাকে পরিপূর্ণরূপে স্পষ্ট করার জন্য এর উপর আরোপিত সম্ভাব্য প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া আবশ্যক।
এ বক্তব্যের উপর আরোপিত প্রশ্নগুলো ও তার জবাব
প্রশ্ন : ১. যদি হযরত উসমান (রা.) সাত হরফের সবগুলোকেই অবশিষ্ট রাখেন, তাহলে তাঁর সেই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কীর্তি কোন্টি ছিল যার জন্য তাঁকে “জামিউল কুরআন” বা কুরআনের সংকলক বলা হয়?
জবাব : যদিও অসংখ্য সাহাবায়ে কেরামের কুরআনুল কারীম মুখস্থ ছিল, কিন্তু হযরত উসমান (রা.)-এর যুগ পর্যন্ত কুরআনুল কারীমের মানদণ্ডমূলক কপি ছিল একটিই, যা হযরত আবু বকর (রা.) সংকলন করেছিলেন। তা আবার মাসহাফের আকৃতিতে ছিল না। বরং প্রত্যেকটি সূরা পৃথক পৃথক সহীফায় লিপিবদ্ধ ছিল। কিন্তু কোনো কোনো সাহাবী ব্যক্তিগতভাবে নিজ নিজ সহীফা পৃথক পৃথকভাবে প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। এগুলোতে না ছিল রসমেখতের মধ্যে কোনো মিল, সূরাগুলোর বিন্যাসের মধ্যে কোনো মিল আর না ছিল সাত হরফের মধ্যে কোনো সমন্বয়। বরং প্রত্যেকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যে হরফ অনুযায়ী কুরআন শিখেছিলেন, সেটাকেই নিজের মতো করে লিখে নিয়েছিলেন। তাই কোনো মাসহাফে একটি আয়াত এক হরফ অনুযায়ী লিখা হয়েছিল, পক্ষান্তরে অপর মাসহাফে অন্য কোনো হরফ অনুযায়ী লিখা হয়েছিল। যতক্ষণ পর্যন্ত নববী যুগ নিকটবর্তী ছিল এবং মুসলমানদের সম্পর্ক ইসলামের মারকায বা পবিত্র মদীনার সাথে মজবুত সম্পর্ক ছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত মাসহাফসমূহের এই মতানৈক্যের কারণে উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষতি এ জন্য সাধিত হয়নি যে, কুরআনুল কারীমের সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আসল ভিত্তিটা মাসহাফের পরিবর্তে মুখস্থ শক্তির উপর ছিল। আর অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরামই এ ব্যাপারে ওয়াকিফহাল ছিলেন যে, কুরআনুল কারীম সাত হরফে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু যখন ইসলাম দূর-দূরান্তের রাষ্ট্রসমূহে ছড়িয়ে পড়ল এবং নতুন নতুন লোক মুসলমান হতে লাগল তখন তারা শুধু একটি পদ্ধতিতেই কুরআন শিখল। আর এ কথাটির প্রচার তাদের মাঝে ব্যাপকতা লাভ করেনি যে, কুরআন সাত হরফে নাযিল হয়েছে। তাদের মাঝে মতানৈক্য সৃষ্টি হতে লাগল। কোনো কোনো ব্যক্তি নিজের কেরাতকে সঠিক এবং অন্যের কেরাতকে ভুল মনে করতে লাগল। ওদিকে যেহেতু ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত মাসহাফগুলোও হরফ ও রুসমেখতের দিক থেকে বিভিন্ন ধরনের ছিল এবং সেগুলোতে সাত হরফকে একত্রিত করার কোনো ব্যবস্থাও ছিল না। এ কারণে এমন কোনো মানদণ্ডমূলক কপিও বিদ্যমান ছিল না, যার মাধ্যমে সেসব মতানৈক্যের নিরসন করা যায়।
এমতাবস্থায় হযরত উসমান (রা.) অনুভব করলেন যে, যদি এ অবস্থা চলতে থাকে এবং ব্যক্তিগত মাসহাফগুলো বিলুপ্ত করে কুরআনুল কারীমের মানদণ্ডমূলক একটি কপি ইসলামী বিশ্বে প্রেরণ না করা হয়, তাহলে বিরাট ফেতনা মাথা তুলে দাঁড়াবে। তাই তিনি নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করেন :
[এক.] কুরআনুল কারীমের সাতটি মানদণ্ডমূলক কপি প্রস্তুত করান এবং বিভিন্ন শহরে তা প্রেরণ করেন।
[দুই.] ওই মাসহাফগুলোর রুসমেখত [লিখন পদ্ধতি] এমনভাবে রাখেন যাতে সাত হরফের সবগুলো এতে সংকুলান হয়। যেমন, এ মাসহাফগুলো নুকতা ও হরকতশূন্য ছিল। এগুলোকে প্রত্যেক হরফের অনুকরণে পাঠ করা যেত।
[৩.] ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত সবগুলো মাসহাফ পুড়িয়ে দাফন করে দেন।
[৪.] ভবিষ্যতে যত মাসহাফ লিপিবদ্ধ করা হবে, তা যাতে ওই সাত হরফের অনুকরণে হয়, এ আইন বাধ্যতামূলক করে দেন।
[৫.] হযরত আবু বকর (রা.) কর্তৃক সংকলিত সহীফাগুলোতে পৃথক পৃথকভাবে বিভিন্ন সূরা লিপিবদ্ধ ছিল। হযরত উসমান (রা.) সূরাগুলোকে বিন্যাস করে একই মাসহাফের আকৃতি দান করেন।
হযরত উসমান (রা.)-এর সকল পদক্ষেপ দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল, যেন গোটা ইসলামী বিশ্বে রুসমেখত ও সূরাগুলোর বিন্যাসের দিক থেকে সবগুলো মাসহাফ এক রকম হয়ে যায়। আর এগুলোতে সাত হরফ এমনভাবে একত্রিত হয়ে যায় যে, পরবর্তীতে কোনো ব্যক্তির জন্য কোনো কেরাতকে অস্বীকার করার বা কোনো অশুদ্ধ কেরাতের উপর চর্চা করার অবকাশ বাকি না থাকে। কখনো যদি কোনো কেরাতের ব্যাপারে মতানৈক্য দেখা দেয় তাহলে মাসহাফের দিকে প্রত্যাবর্তন করে যাতে অতি সহজেই তা নিরসন করা যায়।
হযরত আলী (রা.)-এর একটি বক্তব্য দ্বারা এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়, যা ইমাম ইবনে আবী দাউদ (রহ.) কিতাবুল মাসাহিফ-এ বিশুদ্ধ সনদের মাধ্যমে উদ্ধৃত করেছেন-
قال علي بن أبي طالب رضي الله عنه لا تقولوا في عثمان إلا خيرا فوالله ما فعل الذي فعل في المصاحف إلا عن ملأ منا، فقال : ما تقولون في هذه القراءة ؟ فقد بلغني أن بعضهم يقول : إن قراءتي خير من قراءتك ، وهذا يكاد أن يكون كفرا ، قلنا : فما ترى ؟ قال : أرى أن نجمع الناس على مصحف واحد ، فلا تكون فرقة ، ولا يكون اختلاف ، قلنا : فنعم ما رأيت
‘হযরত আলী (রা.) বলেন, তোমরা হযরত উসমান (রা.)-এর ব্যাপারে ভালো ব্যতীত কোনো সমালোচনা করো না। আল্লাহর শপথ! তিনি মাসহাফের ব্যাপারে যা কিছু করেছেন, তা আমাদের সকলের উপস্থিতিতেই করেছেন। তিনি আমাদের নিকট পরামর্শ চেয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই কেরাতের ব্যাপারে তোমাদের রায় কি? কারণ আমি জানতে পেরেছি যে কোনো কোনো ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে বলছে যে, “আমার কেরাত তোমার কেরাতের চেয়ে উত্তম।” অথচ এটা এমন কথা যা কুফরীর নিকট পৌঁছে যায়। তখন আমরা বললাম, এ ক্ষেত্রে আপনার রায় কি? তিনি বললেন, আমার রায় হচ্ছে, আমরা মানুষকে একই মাসহাফের উপর সমবেত করে দেব। যাতে কোনো পার্থক্য ও মতানৈক্য বাকি না থাকে। আমরা বললাম, আপনি খুবই চমৎকার রায় প্রদান করেছেন।১৭৩
এই হাদীসটি হযরত উসমান (রা.)-এর মাসহাফ সংক্রান্ত কাজের ব্যাপারে সুস্পষ্ট একটি হাদীস। এতে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, হযরত উসমান (রা.) “نجمع الناس على مصحف واحد” [আমরা মানুষকে একই মাসহাফের উপর সমবেত করে দেব]” বলে এই ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন যে, আমরা এমন একটি মাসহাফ প্রস্তুত করতে চাই, যা গোটা ইসলামী বিশ্বের জন্য একই রকম হবে এবং এর মাধ্যমে পারস্পরিক মতানৈক্যের অবসান ঘটবে। এরপর কোনো বিশুদ্ধ কেরাতকে অস্বীকার করার এবং রহিত বলার বা অপ্রচলিত কেরাতের উপর চর্চা করার অবকাশ বাকি থাকবে না।১৭৪
অনুরূপ ইবনে আশতাহ (রহ.) হযরত আনাস (রা.) থেকে উদ্ধৃত করেন-
اختلفوا في القرآن على عهد عثمان حتى اقتتل الغلمان والمعلمون، فبلغ ذلك عثمان بن عفان فقال: عندي تكذبون به وتلحنون فيه، فمن نأى عني كان أشد تكذيباً وأكثر لحناً، يا أصحاب محمد اجتمعوا فاكتبوا للناس إماماً،
‘হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে কুরআনুল কারীমের ব্যাপারে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি শিশু ও শিক্ষকরা লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। হযরত উসমান (রা.)-এর নিকট এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি বললেন, তোমরা আমার কাছে থাকতেই [বিশুদ্ধ কেরাতকে] অস্বীকার করছ এবং তাতে ভুল করছ! তাহলে যারা আমার কাছ থেকে দূরে অবস্থান করছে, তারা তো আরো বেশি মিথ্যারোপ ও ভুল করতে থাকবে। সুতরাং হে মুহাম্মাদের সাথীবৃন্দ! তোমরা একত্রিত হও এবং মানুষের জন্য এমন একটি কপি প্রস্তুত কর, মানুষ যার অনুসরণ করতে পারে।
এর দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, কুরআনুল কারীমের কোনো হরফ বিলুপ্ত করা হযরত উসমান (রা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল না। বরং তাঁর তো এ ব্যাপারে আক্ষেপ ছিল যে, কোনো কোনো লোক বিশুদ্ধ কেরাতকে অস্বীকার করছে। আর কেউ কেউ অশুদ্ধ কেরাতের চর্চার উপর জোর দিচ্ছে। তাই তিনি মানদণ্ডমূলক একটি কপি প্রস্তুত করতে চাইতেন। যা গোটা ইসলামী জগতের জন্য এক ও অভিন্ন রকম হবে।১৭৫
প্রশ্ন : ২. কুরাইশী ভাষায় লিপিবদ্ধ করার উদ্দেশ্য :
সহীহ বুখারীর রেওয়ায়েত অনুযায়ী যখন হযরত উসমান (রা.) হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর নেতৃত্বে কুরআনের মাসহাফ বিন্যাস দেওয়ার জন্য সাহাবায়ে কেরামের একটি দল নির্বাচন করলেন, তখন তিনি তাঁদেরকে বলেছিলেন-
إِذَا اخْتَلَفْتُمْ أَنْتُمْ وَزَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ فِي شَيْءٍ مِنَ الْقُرْآنِ فَاكْتُبُوهُ بِلِسَانِ قُرَيْشٍ فَإِنَّمَا نَزَلَ بِلِسَانِهِمْ
‘যখন তোমাদের এবং যায়্যেদ ইবনে সাবেতের মাঝে কুরআনের কোনো অংশে মতানৈক্য হবে তখন তোমরা সেটাকে কুরাইশের ভাষা অনুযায়ী লিখবে। কেননা কুরআন তাঁদের ভাষায় নাযিল হয়েছে।’১৭৬
হযরত উসমান (রা.) যদি সাত হরফের সবগুলোই অবশিষ্ট রাখতেন তাহলে তাঁর এ নির্দেশের উদ্দেশ্য কী?
জবাব : এটি মূলত হযরত উসমান (রা.)-এর ওই বাক্য, যা দ্বারা হাফেয ইবনে জারীরসহ অন্যান্য উলামায়ে কেরাম বুঝে নিয়েছেন যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে মাসহাফে শুধু এক কুরাইশী হরফকে অবশিষ্ট রেখেছেন। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে যদি হযরত উসমান (রা.)-এর এ বাক্যটির উপর গভীরভাবে চিন্তা করা হয় তাহলে এ কথা বুঝে আসে যে, এ বাক্য দ্বারা এই উদ্দেশ্য নেওয়া সঠিক নয় যে, তিনি বাকি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন। বরং সবগুলো রেওয়ায়াতের প্রতি সামগ্রিকভাবে তাকালে বুঝে আসে যে, এ বাক্য দ্বারা হযরত উসমান (রা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল এই যে, যদি কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে রুসমেখতের দিক থেকে কোনো মতানৈক্য সৃষ্টি হয় তাহলে যেন কুরাইশী ভাষার রুসমেখত গ্রহণ করা হয়। এর প্রমাণ হলো, হযরত উসমান (রা.)-এর নির্দেশনার পর সাহাবায়ে কেরামের দলটি যখন কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার কাজ শুরু করেন তখন সমগ্র কুরআনুল কারীমের শুধু একটি স্থানে তাঁদের মাঝে মতানৈক্য হয়। ইমাম যুহরী (রহ.) যার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-
فاختلفوا يومئذ في التابوت والتابوه فقال النفر القرشيون التابوت وقال زيد بن ثابت التابوه فرفع اختلافهم إلى عثمان فقال : اكتبوه التابوت فانه بلسان قريش نزل
‘অতঃপর “تابوت” এবং “تابوه” শব্দের মধ্যে এসে তাঁদের মাঝে মতানৈক্য সৃষ্টি হলো। কুরাইশী সাহাবায়ে কেরাম বললেন, এটাকে [দীর্ঘ তা] দ্বারা “تابوت” লিখা হোক। আর যায়্যেদ ইবনে সাবেত (রা.) বললেন, [গোল তা দ্বারা] “تابوه” লিখা হোক। পরে তাঁদের এই মতানৈক্য হযরত উসমান (রা.)-এর কাছে গিয়ে পৌঁছল। তখন তিনি বললেন “تابوت” লিখ। কেননা কুরআন কুরাইশী ভাষায় নাযিল হয়েছে।১৭৭
অতএব, এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, হযরত উসমান (রা.) হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত এবং কুরাইশী সাহাবায়ে কেরামের মাঝে যে মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করেছেন এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো রসমখত-এর মতানৈক্য; ভাষাগত মতানৈক্য নয়।
প্রশ্ন : ৩. সমার্থবোধক শব্দ দ্বারা তেলাওয়াতের মাসআলা :
হযরত আবু বাকরা (রা.) সাত হরফের মতানৈক্যের যে ব্যাখ্যা করেছেন, তা দেখে বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হয় যে, এই সাত হরফ মাসহাফে উসমানীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। কেননা তিনি বলেন-
أَنَّ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ قَالَ: يَا مُحَمَّدُ اقْرَأِ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفٍ، قَالَ مِيكَائِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ: اسْتَزِدْهُ، فَاسْتَزَادَهُ حَتَّى بَلَغَ سَبْعَةَ أَحْرُفٍ، قَالَ: كُلٌّ شَافٍ كَافٍ مَا لَمْ تَخْلِطْ آيَةَ عَذَابٍ بِرَحْمَةٍ، أَوْ آيَةَ رَحْمَةٍ بِعَذَابٍ نَحْوُ قَوْلِكَ تَعَالَ وَأَقْبِلْ، وَهَلُمَّ وَاذْهَبْ، وَأَسْرِعْ وَأَعْجِلْ “
‘জিবরাঈল (আ.) [রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে] বললেন, হে মুহাম্মাদ! কুরআনুল কারীমকে এক হরফের উপর পাঠ করুন। মিকাঈল (আ.) [রাসূল স.কে] বললেন, এর সাথে আরও [হরফ] সংযোজন করুন। ফলে তিনি সংযোজন করলেন। আর এভাবে তা সাতে গিয়ে পৌঁছল। জিবরাঈল (আ.) বললেন, এর প্রতিটিই নিরাময়কারী, যথেষ্ট। যতক্ষণ না আযাবের আয়াতকে রহমতের আয়াতের সাথে এবং রহমতের আয়াতকে আযাবের আয়াতের সাথে মিশ্রিত করবে। এটা এমন হবে যে, আপনি تعال [আস]-কে هلم – اقبل – اذهب – اسرع و عجل শব্দ দ্বারা আদায় করবেন।’১৭৮
এই হাদীস থেকে বুঝে আসে যে, সাত হরফের মতানৈক্য মূলত সমার্থবোধক শব্দের মতানৈক্যই ছিল। অর্থাৎ এক হরফের ভিত্তিতে কোনো এক শব্দকে গ্রহণ করা হয়েছে। আবার অন্য হরফের ভিত্তিতে সে শব্দেরই সমার্থবোধক অন্য আরেকটি শব্দ গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ মাসহাফে উসমানীর মধ্যে যেসব কেরাত সংকলিত হয়েছে সেগুলোর মাঝে সমার্থবোধকের এই মতানৈক্য খুবই স্বল্প। ওই কেরাতগুলোর মাঝে অধিকাংশই হরকত [কারক চিহ্ন], সীগা [শব্দরূপ], পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ এবং সুর ও ভঙ্গিমার মতানৈক্য সংঘটিত হয়েছে।
জবাব : সাত হরফের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আমরা যে বক্তব্যটি গ্রহণ করেছি, এতে কেরাতগুলোর মাঝে সাত প্রকারের মতপার্থক্য বর্ণনা করা হয়েছে। ওই প্রকারগুলোর মাঝে একটি প্রকার হলো, ‘বদল’ তথা সমার্থবোধক শব্দের মাধ্যমে পরিবর্তন করে পড়ার মতানৈক্য। হযরত আবু বাকুরা (রা.) এখানে সাত হরফের পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করেননি। বরং এর একটি উদাহরণ দিয়েছেন মাত্র। তাই মতানৈক্যের একটি মাত্র প্রকার অর্থাৎ শব্দের পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন।
কেরাতের ভিন্নতার এই প্রকারটি অর্থাৎ শব্দের ভিন্নতা ইসলামের প্রাথমিক যুগে অনেক বেশি ছিল। যেহেতু গোটা আরববাসী কুরাইশী ভাষায় পুরোপুরি অভ্যস্ত ছিল না। তাই শুরুতে তাদেরকে এ সহজতা বেশি থেকে বেশি দেওয়া হয়েছিল যে, তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শ্রবণকৃত পরিবর্তনশীল শব্দগুচ্ছ থেকে যে কোনো একটি শব্দ দ্বারা তেলাওয়াত করবে। তাই শুরু শুরুতে অধিকতর এমন ছিল যে, এক কেরাতের মাঝে এক শব্দ এবং অন্য কেরাতের মাঝে এর সমার্থবোধক অন্য শব্দ রয়েছে। কিন্তু যখন মানুষ কুরআনের ভাষার সাথে পুরোপুরি পরিচিত হয়ে উঠল তখন কেরাতের ভিন্নতার এই প্রকারকে ধীরে ধীরে হ্রাস করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকালের পূর্বে রমযান মাসে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে দুইবার কুরআনুল কারীম দাওর করেন। ওই সময় অনেক শব্দ রহিত করা হয়েছে। আর এভাবে সমার্থবোধক শব্দগুলোর মতানৈক্যও হ্রাস পেয়ে গেল।
উসমান (রা.) নিজের মাসহাফে সে সকল সমার্থবোধক শব্দ সংকলন করেননি, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আরযায়ে আখীরার সময় রহিত হয়ে গিয়েছিল। কারণ সেগুলোর অবস্থান ছিল তেলাওয়াত রহিত হওয়া আয়াতসমূহের ন্যায়। অবশ্য কেরাতের যে মতানৈক্য আরযায়ে আখীরায় অবশিষ্ট ছিল, হযরত উসমান (রা.) সেগুলোকে হুবহু বহাল রেখেছেন। অতএব, হযরত আবু বাকুরা (রা.) হরফের ভিন্নতার যে প্রকারটিকে উল্লিখিত হাদীসে উদাহরণ স্বরূপ পেশ করেছেন, তা ওই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত যার অধিকাংশ আরযায়ে আখীরার সময় রহিত হয়ে গিয়েছিল। এ জন্যই তা মাসহাফে উসমানীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি এবং বর্তমান কেরাতগুলোও সেগুলোকে শামিল করেনি।
উপরোল্লিখিত ফলাফলটি তিনটি ভূমিকা থেকে আহরিত হয় :
[এক.] আরযায়ে আখীরা [হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কুরআনের শেষ দাওর]-এর সময় কুরআনুল কারীমের বহু কেরাত রহিত করা হয়েছিল।
[দুই.] হযরত উসমান (রা.) মাসহাফে উসমানীকে আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী বিন্যস্ত করেছেন।
[তিন.] হযরত উসমান (রা.)-এর মাসহাফে সমার্থবোধক শব্দের ওই মতানৈক্য বিদ্যমান নেই যা হযরত আবু বাকরা (রা.) বর্ণনা করেছেন।
তৃতীয় ভূমিকাটি তো একেবারে স্পষ্ট। আর দ্বিতীয় ভূমিকার প্রমাণপঞ্জি আমরা ইতোপূর্বে বর্ণনা করে এসেছি। যার মধ্যে সর্বাধিক স্পষ্ট দলীল হচ্ছে হযরত উবায়দা সালমানী (রহ.)-এর এই ইরশাদ যে, “হযরত উসমান (রা.) আমাদেরকে যে কেরাতের উপর সমবেত করেছেন, তা ছিল আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী।১৭৯
এখন বাকি থেকে যায় প্রথম ভূমিকাটি। আর তা হলো, আরযায়ে আখীরার সময় অনেক কেরাত রহিত হয়ে গিয়েছিল। এর প্রমাণ হচ্ছে মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর এই ইরশাদ-
ولا شك أن القرآن نسخ منه وغير فيه في العرضة الأخيرة فقد صح النص بذلك عن غير واحد من الصحابة وروينا بإسناد صحيح عن زر ابن حبيش قال قال لي ابن عباس أي القراءتين تقرأ؟ قلت الأخيرة قال فإن النبي صلى الله عليه وسلم كان يعرض القرآن على جبريل عليه السلام في كل عام مرة قال فعرض عليه القرآن في العام الذي قبض فيه النبي صلى الله عليه وسلم مرتين فشهد عبد الله يعني ابن مسعود ما نسخ منه وما بدل.
‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আরযায়ে আখীরার সময় কুরআনুল কারীম থেকে অনেক কিছু রহিত হয়ে গেছে এবং এতে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। কেননা একাধিক সাহাবী থেকে এর স্পষ্টতা উদ্ধৃত রয়েছে। আমাদের কাছে সহীহ সনদসূত্রে হযরত যর ইবনে হুবাইশ (রা.)-এর এ বক্তব্য পৌঁছেছে যে, ইবনে আব্বাস (রা.) আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কোন্ কেরাত পাঠ কর? আমি বললাম, শেষ কেরাত। তিনি বললেন, প্রতি বছর রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে কেরাত শোনাতেন। যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেছেন, সে বছর তিনি দুই বার হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে কুরআন শুনিয়েছেন। ওই সময় যা কিছু রহিত হয়েছে এবং যা পরিবর্তন হয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) তার সাক্ষী ছিলেন।১৮০
এর দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, আরযায়ে আখীরার সময় অনেক কেরাত স্বয়ং আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে রহিত করে দেওয়া হয়। হযরত আবু বাকরা (রা.) সমার্থবোধক শব্দের যে মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করেছেন, নিশ্চিত এর অধিকাংশই ওই সময় রহিত হয়ে গেছে। কেননা হযরত উসমান (রা.) আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন। এর মধ্যে সমার্থবোধক শব্দের মতানৈক্য খুবই শায বা বিরল।
প্রশ্ন : ৪. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ও তাঁর মাসহাফ
উপরোক্ত তাহকীকের উপর চতুর্থ প্রশ্ন এ হতে পারে যে, একাধিক রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণিত আছে যে, হযরত উসমান (রা.) যে মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এর প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন না এবং তিনি তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত সহীফাটিও আগুনে পোড়াননি। যদি হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত না করে থাকেন, তাহলে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর এ আপত্তির কারণটা কি ছিল?
জবাব : প্রকৃতপক্ষে হযরত উসমান (রা.)-এর উপর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর দু’টি অভিযোগ ছিল। প্রথমটি হলো, কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার মহান কাজে তাঁকে কেন দায়িত্ব দেওয়া হলো না? দ্বিতীয়টি হলো, অন্যান্য মাসহাফগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হলো কেন?
সুনানে তিরমিযীর এক বর্ণনায় ইমাম যুহরী (রহ.) প্রথম অভিযোগের আলোচনা করেছেন। যার সারাংশ হচ্ছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর এ অভিযোগ ছিল যে, কুরআন লিপিবদ্ধ করার মহান কাজ তাঁর দায়িত্বে কেন অর্পণ করা হলো না? যখন তিনি হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর তুলনায় অধিক সময় হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহচর্যে থেকে ধন্য হয়েছেন। হাফেয ইবনে হাজার (রহ.) এ অভিযোগটি উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, এ ব্যাপারে হযরত উসমান (রা.)-এর জবাব ছিল যে, তিনি এ মহান কাজটি পবিত্র মদীনায় আরম্ভ করেছিলেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) তখন কূফায় ছিলেন। আর হযরত উসমান (রা.) তাঁর অপেক্ষায় থেকে এ মহান কাজটিকে বিলম্বিত করতে চাচ্ছিলেন না। উপরন্তু হযরত আবু বকর (রা.)ও হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর উপরই এ দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। তাই হযরত উসমান (রা.)ও সমীচীন মনে করলেন যে, কুরআনের সংকলন এবং বিন্যাসের এ কাজটিও তাঁর হাতে সমাধা হোক।১৮১
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর দ্বিতীয় অভিযোগ ছিল এই যে, হযরত উসমান (রা.) নতুন মাসহাফ প্রস্তুত করার পর ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত সবগুলো মাসহাফ পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর তিনি তাঁর মাসহাফ পুড়িয়ে ফেলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। হযরত আবু মূসা আশআরী (রা.) এবং হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রা.) তাঁকে বুঝানোর জন্য তাঁর নিকট গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বললেন-
والله لا أدفعه إليهم أقرأني رسول الله صلى الله عليه وسلم بضعا وسبعين سورة ثم أدفعه إليهم والله لا أدفعه إليهم
‘আল্লাহর শপথ! আমি এই মাসহাফ তাঁর নিকট সোপর্দ করব না। আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্তরের চেয়ে অধিক সূরা শিক্ষা দিয়েছেন। এরপরও আমি এই মাসহাফ তাঁকে দিয়ে দেব? আল্লাহর শপথ! আমি এটা তাঁকে দেব না।’১৮২
যারা কূফায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর অনুকরণে ব্যক্তিগতভাবে মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) তাদেরকেও এ উৎসাহ দিলেন যে, তারা যেন তাদের মাসহাফ সোপর্দ না করে। হযরত খুমাইর ইবনে মালিক (রহ.) বলেন-
أُمِرَ بِالْمَصَاحِفِ أَنْ تُغَيَّرَ قَالَ قَالَ ابْنُ مَسْعُودٍ مَنْ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ أَنْ يَغُلَّ مُصْحَفَهُ فَلْيَغُلَّهُ ….. قَالَ ثُمَّ قَالَ قَرَأْتُ مِنْ فَمِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَبْعِينَ سُورَةً أَفَأَتْرُكُ مَا أَخَذْتُ مِنْ فِي رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وعلى اله وصحبه وسلم.
‘মাসহাফগুলোর মাঝে পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হলো। তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) [মানুষকে] বললেন, তোমাদের মধ্যে যারা নিজের মাসহাফকে লুকাতে সক্ষম হও তারা লুকিয়ে রাখ।……………অতঃপর তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র যবান থেকে সত্তরটি সূরা শিখেছি। আমি কি ওই বিষয় ছেড়ে দেব, যা আমি সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র যবান থেকে অর্জন করেছি।১৮৩
এ থেকে বুঝা যায় যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফটি উসমানী মাসহাফ থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল এবং তিনি সেটাকে সংরক্ষিত রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এর মধ্যে কোন্ বিষয়গুলো উসমানী মাসহাফ থেকে ভিন্নতর ছিল? সহীহ রেওয়ায়েতগুলোতে এর কোনো স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় না। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হয় যে, তাঁর মাসহাফের মৌলিক পার্থক্য ছিল সূরার বিন্যাস। আর এ কথা আগেও বলা হয়েছে যে, হযরত আবু বকর (রা.) যেসব সহীফায় কুরআন সংকলন করেছিলেন, সেগুলোতে সূরাগুলো পৃথক পৃথকভাবে লিপিবদ্ধ ছিল এবং সেগুলোতে কোনো বিন্যাস ছিল না। আর হযরত উসমান (রা.) যে কুরআন সংকলন করেছিলেন তাতে সূরাগুলো একটি বিশেষ বিন্যাস অনুযায়ী লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। ইমাম হাকেম (রহ.) লিখেন-
أن جمع القرآن لم يكن مرة واحدة فقد جمع بعضه بحضرة رسول الله صلى الله عليه وسلم ثم جمع بعضه بحضرة أبي بكر الصديق والجمع الثالث هو في ترتيب السورة كان في خلافة أمير المؤمنين عثمان بن عفان رضى الله تعالى عنهم أجمعين
‘কুরআন সংকলনের কাজ এক বারেই সমাপ্ত হয়নি। বরং কুরআনুল কারীমের কিছু অংশ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপস্থিতিতেই সংকলন করা হয়েছিল। অতঃপর আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর যুগে আরো কিছু সংকলন করা হয়েছিল। অতঃপর কুরআন সংকলনের তৃতীয় পর্যায়ে সূরাগুলোকে বিন্যস্ত করা হয়েছিল। যা ছিল আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর শাসনামলে।১৮৪
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফ হযরত উসমান (রা.)-এর মাসহাফের সাথে বিন্যাসের দিক থেকে অনেক পার্থক্য ছিল। যেমন, এতে সূরা নিসা ছিল আগে আর সূরা আলে-ইমরান ছিল তার পরে।১৮৫ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) সম্ভবত এই বিন্যাস অনুযায়ীই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছ থেকে কুরআন শিখেছিলেন। তাই এই বিন্যাস অনুযায়ী কুরআনকে রাখাই তাঁর অভিপ্রায় ছিল। সহীহ বুখারীর একটি বর্ণনা দ্বারা এর সমর্থন পাওয়া যায়। ইরাকের এক অধিবাসী একদিন হযরত আয়েশা (রা.)-এর নিকট আসল এবং বলল-
قال يا أم المؤمنين أريني مصحفك قالت لم ؟ قال لعلي أؤلف القرآن عليه فإنه يقرأ غير مؤلف قالت وما يضرك أيه قرأت قبل
‘সে বলল, হে উম্মুল মুমিনীন! আমাকে আপনার মাসহাফটি দেখান। হযরত আয়েশা (রা.) বললেন, কেন? লোকটি বলল, আমি [আমার] কুরআনের মাসহাফটি এর অনুকরণে বিন্যস্ত করব। কেননা তা [আমাদের এলাকায়] অবিন্যস্ত অবস্থায়ই পড়া হয়। হযরত আয়েশা (রা.) বললেন, কুরআনের যে অংশই আগে তুমি পড় না কেন, তা তোমার জন্য কোনো অসুবিধা হবে না।’১৮৬
এই হাদীসের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনে হাজার (রহ.) লিখেন, এই ইরাকী ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর কেরাতের অনুসারী ছিলেন। আর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) যেহেতু নিজের মাসহাফে পরিবর্তন করেননি এবং তা বিলুপ্তও করেননি, তাই এর বিন্যাস উসমানী মাসহাফের বিন্যাসের চেয়ে ভিন্নতর ছিল। আর এ কথা তো স্পষ্ট যে, উসমানী মাসহাফের বিন্যাস অন্যান্য মাসহাফের বিন্যাসের তুলনায় অধিক সমীচীন ছিল। তাই এই ইরাকী লোকটি নিজের মাসহাফকে উসমানী মাসহাফের তুলনায় অবিন্যস্ত বলে আখ্যা দিয়েছেন।১৮৭
এই হাদীস থেকে জানা যায় যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)- এর মাসহাফে মৌলিক পার্থক্য ছিল, সূরাগুলোর বিন্যাস। এ ছাড়া রুসমেখতের পার্থক্যও থাকতে পারে এবং এতে এমন রুসমেখত অবলম্বন করা হয়েছে যার মধ্যে উসমানী মাসহাফের ন্যায় সকল কেরাতের জন্য অবকাশ থাকে না। অন্যথায় যদি হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী বলা হয় যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে শুধু এক হরফের উপর কুরআন লিপিবদ্ধ করেছিলেন আর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফ সেই পরিত্যক্ত হরফের কোনো একটির উপর লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল, তাহলে নিম্নোক্ত অভিযোগগুলো আরোপিত হয়।
১. সহীহ বুখারীর উল্লিখিত হাদীসে ইরাকী ব্যক্তি শুধু সূরার বিন্যাসের পার্থক্যের কথা উল্লেখ করেছেন। নতুবা যদি হরফের পার্থক্যও হতো, তাহলে তা ছিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং অধিক গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হতো।
২. হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) ও অন্যান্যদের বক্তব্য অনুযায়ী সাত হরফ দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন সাত গোত্রের ভাষাকে বুঝানো হয়েছে। যদি এ কথা সঠিক হয়, তাহলে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ও হযরত উসমান (রা.)-এর মাসহাফের মাঝে কোনো পার্থক্য না থাকাই উচিত ছিল। কারণ এ বক্তব্য অনুযায়ী হযরত উসমান (রা.) সবাইকে কুরাইশী হরফের উপর সমবেত করে সে অনুযায়ী মাসহাফ লিপিবদ্ধ করিয়ে ছিলেন। আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)ও কুরাইশী ছিলেন।
৩. হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) ও তাঁর অনুসারীরা ছয় হরফ বিলুপ্ত করার স্বপক্ষে সবচেয়ে বড় দলীল হিসেবে ‘সাহাবায়ে কেরামের ইজমা’কে পেশ করেছেন। কিন্তু যদি হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) অন্য কোনো হরফের উপর পাঠ করে থাকেন এবং এর লিখনকেও জায়েয মনে করে থাকেন তাহলে এই ইজমা বা ঐক্যমত সংঘটিত হলো কি করে? যে ইজমার মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর ন্যায় বিজ্ঞ ফকীহ সাহাবী শামিল নেই। এটাকে ইজমা বলার যুক্তি কোথায়? কেউ কেউ এই দাবী করেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) পরবর্তীতে হযরত উসমান (রা.)-এর রায়কে মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো রেওয়ায়েত মজুদ নেই।
হাফেয ইবনে হাজার (রহ.) লিখেন- ‘ইবনে আবী দাউদ (রহ.) “ইবনে মাসউদ (রা.)-এর পরবর্তীতে হযরত উসমানের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়া” শিরোনামে স্বতন্ত্র একটি অধ্যায় লিখেছেন। তবে তিনি এই অধ্যায়ের অধীনে এমন কোনো সুস্পষ্ট রেওয়ায়েত উল্লেখ করতে পারেননি, যা এই শিরোনামের সাথে যায়।১৮৮ হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)সহ অন্যান্যদের বক্তব্যের উপর আরোপিত এ অভিযোগগুলোর কোনো সমাধান পাওয়া যায় না। কাজেই এটাই বিশুদ্ধ কথা যে, হযরত উসমান (রা.) সাত হরফের সবগুলোই মাসহাফে উসমানীতে বাকি রেখেছেন। আর হযরত ইবনে মাসউদ (রা.)-এর এ অভিযোগ ছিল না যে, ছয় হরফকে কেন বিলুপ্ত করা হয়েছে?১৮৯ কারণ বাস্তবে এটা ঘটেই ছিল না। বরং তাঁর অভিযোগটা ছিল এই যে, যে মাসহাফগুলো পূর্ব থেকেই লিপিবদ্ধ ছিল এবং যেগুলোর বিন্যাস ও রুসমেখত উসমানী মাসহাফ অনুযায়ী ছিল না, সেগুলো সঠিক হওয়া সত্ত্বেও নষ্ট করা হচ্ছে কেন?
আলোচনার ফলাফল
“সাত হরফ”-এর আলোচনা অনুমানের চেয়ে অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে। তাই অবশেষে এ থেকে অর্জিত ফলাফলের সারাংশ সংক্ষিপ্তাকারে পেশ করে দেওয়া সমীচীন মনে করছি। যেন স্মরণ রাখতে সহজ হয়।
১. উম্মতের সহজ-সাধ্যের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার নিকট আবেদন করেন যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতকে যেন শুধু একটি পদ্ধতিতেই সীমাবদ্ধ রাখা না হয়। বরং বিভিন্ন পদ্ধতিতে যেন তেলাওয়াতের অনুমতি প্রদান করা হয়। এর প্রেক্ষিতেই সাত হরফের উপর কুরআন নাযিল করা হয়েছে।
২. সাত হরফে নাযিল হবার সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য উদ্দেশ্য হলো, এর কেরাতের মধ্যে সাত প্রকারের বিভিন্নতা রাখা হয়েছে। যার আওতায় অনেকগুলো কেরাত অস্তিত্বে এসে গেছে।
৩. শুরু শুরুতে মতানৈক্যের সাত প্রকারের মধ্যে শব্দমালা ও সমার্থবোধক শব্দের মতানৈক্যের প্রকারটি বেশ ব্যাপক ছিল। অর্থাৎ এমনটি অধিকতর হতো যে, এক কেরাতে এক শব্দ আর অন্য কেরাতে সে শব্দেরই সমার্থবোধক অন্য একটি শব্দ হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন আরববাসী কুরআনী ভাষার সাথে পরিচিত হতে লাগল তখন মতানৈক্যের এই প্রকারটিও হ্রাস পেয়ে গেল। এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মৃত্যুর পূর্বে রমযান মাসে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে সর্বশেষ দাওর [আরযায়ে আখীরা] করলেন তখন এর মধ্যে এ ধরনের মতানৈক্য শূন্যের কোঠায় পৌঁছিয়ে দেওয়া হলো। বেশির চেয়ে বেশি শব্দরূপ, পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ, একবচন, বহুবচন, মারূফ [কর্তৃবাচ্য], মাজহুল [কর্মবাচ্য] এবং সুর-ভঙ্গিমার মতানৈক্য বাকি থাকল।
৪. আরযায়ে আখীরার সময় যে সব মতানৈক্য অবশিষ্ট ছিল, হযরত উসমান (রা.) সেগুলোকে মাসহাফে এমনভাবে সংকলন করেছিলেন যে, সেগুলোকে নুকতা [বিন্দু] ও হরকত [কারক চিহ্ন] থেকে মুক্ত রেখেছিলেন। এর ফলে এতে কেরাতের অধিকাংশ মতানৈক্যের সংকুলান হয়ে গেছে। আর যেসব কেরাতের এভাবে এক মাসহাফে সংকুলান হয়নি সেগুলোকে অন্য মাসহাফে প্রকাশ করা হয়েছে। এর ভিত্তিতেই উসমানী মাসহাফে কোথাও কোথাও এক-এক, দুই-দুই শব্দের মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে।
৫. হযরত উসমান (রা.) এভাবে সাতটি মাসহাফ লিপিবদ্ধ করিয়েছেন এবং সেগুলোতে সূরাগুলোরও বিন্যাস দিয়েছেন। যখন হযরত আবু বকর (রা.) কর্তৃক সংকলিত মাসহাফগুলোতে সূরার কোনো বিন্যাস ছিল না। সাথে সাথে কুরআনুল কারীমের জন্য একটি রুসমেখতও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর যেসব মাসহাফ এই বিন্যাস ও রুসমেখতের বিপরীত ছিল সেগুলোকে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছেন।
৬. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফের বিন্যাস উসমানী মাসহাফের চেয়ে ভিন্ন ছিল। তিনি যেহেতু তাঁর বিন্যাসকে বাকি রাখতে চেয়েছিলেন তাই তিনি তাঁর মাসহাফকে অগ্নিতে ভস্ম করার জন্য হযরত উসমান (রা.)-এর হাতে সোপর্দ করেননি।
সাত হরফের ব্যাপারে একটি ভুল ধারণার অপনোদন
অবশেষে আরেকটি মৌলিক ভুল ধারণার অপনোদন করা আবশ্যক। আর সেটা হলো, “সাত হরফ”-এর উপরোক্ত আলোচনার পাঠক স্থূল দৃষ্টিতে এ সন্দেহ ও সংশয়ে পড়তে পারে যে, মহান আল্লাহর সংরক্ষণে কুরআনুল কারীমের ন্যায় মহাগ্ৰন্থ আজ পর্যন্ত কোনো ধরনের সামান্যতম পরিবর্তন ব্যতিরেকে সংরক্ষিত হয়ে চলে আসছে। এতদসত্ত্বেও মুসলমানদের মাঝে সাত হরফ নিয়ে এত বড় মতানৈক্য সৃষ্টি হলো কি করে?
কিন্তু সাত হরফের আলোচনায় আমরা পেছনে যেসব মতামত ও বক্তব্য উল্লেখ করে এসেছি যদি গভীর দৃষ্টিতে সেগুলোকে অধ্যয়ন করা হয় তাহলে অতি সহজেই এসব সন্দেহ ও সংশয়ের অপনোদন হয়ে যায়। যে ব্যক্তিই এই মতানৈক্যের হাকীকত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করবে, তার কাছে এ কথাটা একেবারেই স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এ সকল মতানৈক্য স্রেফ যুক্তি-তর্ক ও চিন্তা-প্রসূত। বাস্তব ক্ষেত্রে কুরআনের সত্যতা ও বাস্তবতা এবং কুরআন সংরক্ষিত থাকার উপর এই মতানৈক্যের বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়ে না। কারণ এ কথার উপর সবাই ঐক্যমত পোষণ করেন যে, বর্তমানে আমাদের নিকট যে আকৃতিতে কুরআনুল কারীম বিদ্যমান আছে, তা তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় আমাদের নিকট চলে আসছে। এতে সামান্য কোনো পরিবর্তনও হয়নি। এ কথার ওপরও সকল উলামায়ে কেরাম একমত যে, কুরআনুল কারীমের যতগুলো কেরাত তাওয়াতুরের সাথে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে, সবগুলোই সহীহ। এগুলোর প্রত্যেকটি অনুযায়ীই কুরআনুল কারীম তেলাওয়াত করা যায়। আবার এ কথার ওপরও উম্মতের ইজমা বা ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, মুতাওয়াতির কেরাত ব্যতীত অপ্রচলিত ও বিরল যত কেরাত বর্ণিত রয়েছে সেগুলোকে কুরআনুল কারীমের অংশ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ কথাও সর্বসম্মত যে, আরযায়ে আখীরা অথবা তারও পূর্বে যে সকল কেরাতকে রহিত করা হয়েছে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশনা অনুযায়ী সেগুলো কুরআনের অংশ হতে পারেনি। এ কথাও সবার নিকট সকল সন্দেহের ঊর্ধ্বে যে, কুরআনুল কারীমের সাত হরফের মধ্যে যে মতানৈক্য ছিল, তা ছিল শুধু শব্দগত। কিন্তু অর্থের দৃষ্টিকোণ থেকে সবগুলো হরফ ছিল অভিন্ন। সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি কুরআনুল কারীমের এক কেরাত বা এক হরফ অনুযায়ী কুরআন পাঠ করে তাহলে কুরআনের বিষয়বস্তু তার অর্জিত হয়ে যাবে এবং কুরআনের দিক-নির্দেশনা অর্জন করার জন্য অন্য কোনো হরফ জানার প্রয়োজন পড়বে না। এর মাঝেও সামান্য কোনো মতানৈক্য নেই যে, হযরত উসমান (রা.) যে মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন, তা পরিপূর্ণ সতর্কতা, হাজার হাজার সাহাবায়ে কেরামের সাক্ষ্য এবং গোটা মুসলিম উম্মাহ’র সত্যায়নের সাথে করেছিলেন। আর তাতে কুরআনুল কারীম ঠিক সেভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে যেভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এতে কোনো একজন মানুষেরও মতপার্থক্য হয়নি।১৯০
অতএব, যে মতানৈক্যের কথা পেছনের পৃষ্ঠাগুলোতে করা হয়েছে তা শুধু এ ব্যাপারে যে, হাদীসে “সাত হরফ” দ্বারা উদ্দেশ্য কি ছিল? বর্তমানে যত মুতাওয়াতির কেরাত বিদ্যমান রয়েছে, তা কি সাত হরফের উপর সন্নিবিষ্ট নাকি এক হরফের উপর? তা একটা যুক্তিগত ও দার্শনিক মতপার্থক্য মাত্র। যার দ্বারা জ্ঞানগত কোনো পার্থক্য সৃষ্টি হয় না। তাই এর দ্বারা এ ধারণা করা একদম ভুল হবে যে, এসব মতানৈক্যের কারণে [নাউযুবিল্লাহ] কুরআনুল কারীম বিতর্কিত হয়ে গেছে! এর উপমা কিছুটা এমন যে, একটি গ্রন্থের ব্যাপারে পুরো পৃথিবীর মানুষ ঐক্যমত পোষণ করে যে, এটা অমুক গ্রন্থকারের রচিত। ওই গ্রন্থকারের প্রতি এই গ্রন্থের সম্বন্ধ করা নির্ভরযোগ্য। আর তিনি স্বয়ং ছাপিয়ে সেটার সত্যায়নও করলেন যে, এটা আমার রচিত গ্রন্থ এবং এ কপির আদলে এটা কেয়ামত পর্যন্ত ছাপানো যেতে পারে। পরবর্তীতে মানুষের মাঝে এ মতানৈক্য সৃষ্টি হলো যে, ছাপানোর পূর্বে গ্রন্থকার তার পাণ্ডুলিপিতে শব্দগত কোনো পরিবর্তন-পরিবর্ধন করেছেন? নাকি প্রথমে যেমন ছিল তেমনি সেটাকে প্রকাশ করেছেন? এটা স্পষ্ট যে, শুধু এতটুকু দার্শনিক মতপার্থক্যের উপর ভিত্তি করে ওই হাকীকত বিতর্কিত হতে পারে না, যার উপর সবাই ঐক্যমত পোষণ করেছে। অর্থাৎ এটা ওই গ্রন্থ যা গ্রন্থকার নিজেই ছাপিয়েছেন এবং নিজের দিকে এর সম্বন্ধ করেছেন। আর কেয়ামত পর্যন্ত এটাকে প্রকাশ করার অনুমতিও প্রদান করেছেন। ঠিক তদ্রূপ গোটা উম্মত যখন এ কথার উপর একমত যে, কুরআনুল কারীমকে মাসহাফে উসমানীতে হুবহু সেভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে যেভাবে তা অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এর সকল মুতাওয়াতির কেরাত বিশুদ্ধ ও আল্লাহর পক্ষ হতে নাযিলকৃত তখন এই হাকীকত ওই সব দার্শনিক মতপার্থক্যের ভিত্তিতে বিতর্কিত হতে পারে না, যা সাত হরফের ব্যাখ্যায় উপস্থাপিত হয়েছে। [আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।]
তথ্যসূত্র:
১১৯. সহীহ বুখারী, কাসতালানীসহ ৭/৪৫৩ “ফাযায়িলে কুরআন অধ্যায় ।
১২০. ইবনে জাযারী : আন-নাশরু ফী কিরাআতিল আশ্র ১/২১
১২১, প্রাগুক্ত
১২২. যারকাশী : আল-বুরহান ফী উলুমিল কুরআন : ১/২১২
১২৩. আওজাযুল মাসালিক : ২/৩৫৬ সাহারানপুর ৷
১২৪. মুসাফ্ফা শরহে মুয়াত্তা : ১/১৮৭ দিল্লী ১২৯৩ হিজরী ।
১২৫. মানাহিলুল ইরফান : ১/১৩৩
১২৬. মানাহিলুল ইরফান : ১/১৩৩
১২৭. তাফসীরে ইবনে জারীর ১/১৫
১২৮. ফাতহুল বারী : ৯/২২, রুহুল মাআনী : ১/২১
১২৯. আন নশরু ফিল কিরআতিল আশৃর : ১/২৫ ফাতহুল বারী : ৯/২৩
১৩০. রুহুল মাআনী : ১/২১
১৩১. আত্ তাহাভী : মুশকিলুল আসার : ৪/১৮৫-১৮৬
১৩২. সহীহ বুখারী : (কুরআন সংকলন অধ্যায়)
১৩৩. মুশকিলুল আসার : [তহাভী] : ৪/১৮৬-১৯১
১৩৪. ফাতহুল বারী : ৯/২২-২৩
১৩৫. আয-যুরকানী : শরহে মুয়াত্তা : ২/১১
১৩৬. রেওয়ায়েতটি ইমাম আহমদ (রহ.) বর্ণনা করেছেন। এর সনদ নির্ভরযোগ্য। (আওজাযুল মাসালিক : ২/৩৫৭)
১৩৭. নিশাপুরী : “গারায়েবুল কুরআন ওয়া রাগায়েবুল ফুরকান” : টীকা ইবনে জারীর : ১/২১ মিসর
১৩৮. ইবনে কুতাইবা, আবুল ফযল রাযি এবং ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর মতামত : ফাতহুল বারী : ৯/২৫-২৬, ইতকান : ১/৪৭ গ্রন্থে বিদ্যমান রয়েছে। আর কাষী ইবনে তাইয়্েব (রহ.)-এর মত তাফসীরে করতুবী ১/৪৫-এ দেখা যেতে পারে ।
১৩৯. আন নশরু ফী কিরাতিল আশর : ১/২৬
১৪০. ফাতহুল বারী : ৯/২৪
১৪১. আন নশরু ফী কিরাতিল আশর : ১/২৭-২৮
১৪২. ফাতহুল বারী : ৯/২৪
১৪৩. মানাহিলুল ইরফান ফী উলূমিল কুরআন : ১/১৫৪-১৫৬
১৪৪. ফাতহুল বারী: ৯/২৪
১৪৫. আন-নশরু ফী কেরআতিল আশর: ১/২০
১৪৬. তিরমিযী: ২/১৩৮, কুরআন মহল, করাচী।
১৪৭. মুশকিলুল আসার: ৪/১৮৫
১৪৮. তাফসীরে ইবনে জারীর: ১/১৫
১৪৯. বিস্তারিত প্রত্যাখ্যানের জন্য দেখুন: আল-ইতকান ১/৪৯
১৫০. তাফসীরে ইবনে জারীর: ১/১৫
১৫১. সম্মানিত সেই আলেমগণের তালিকা সামনে আসবে।
১৫২. সহীহ বুখারী, উমদাতুল কারী সহ ১২/২৫৮
১৫৩. আন-নশরু ফী কিরআতিল আশর : ১/৩১
১৫৪. সম্ভবত এখানে কাযী ইয়াযকে বুঝানো হয়েছে।
১৫৫. উমদাতুল কারী : [কিতাবুল খুসুমাত] : ১২/২৫৮, বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন : আন-নশরু ফী কিরআাতিল আশর : ১/১৮-১৯
১৫৬. সম্ভবত কাযী বকর বাকিল্লানী (রহ.) উদ্দেশ্য। কারণ এই এবারতই ইমাম নববী (রহ.) কাযী বাকিল্লানী (রহ.)-এর নামে উদ্ধৃত করেছেন।
১৫৭. আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন : ১/২২৩
১৫৮. আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.)-এর এ উক্তি তখনই প্রযোজ্য হবে যখন বলা হবে যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছেন [নাউযুবিল্লাহ]। তবে এ কথা সুস্পষ্ট যে, হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর উক্তি মতে তিনি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করেননি। বরং সেগুলোর কেরাতকে বর্জন করেছেন মাত্র। তাই যদিও হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর উক্তি সঠিক, কিন্তু এত কঠোর ভাষার উপযোগী নন।
১৫৯. আল-ফাসলু ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল : ২/৭৭-৭৮
১৬০. আল-মুনতাকা শারহে মুয়াত্তা : ১/৩৪৭
১৬১. আল-মুসতাসফা : ১/৬৫
১৬২. মিরকাতুল মাফাতীহ : ৫/১৬
১৬৩. আন-নশরু ফী কিরাআতিল আশর : ১/৩৩
১৬৪. আল-মুসাফফা : পৃঃ ১৮৭
১৬৫. এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সাত কেরাতের মধ্যে কোনো কোনো কেরাত সাত হরফের অন্তর্ভুক্ত। যেমন, সমস্ত মুতাওয়াতির কেরাত সাত হরফের অন্তর্ভুক্ত। আবার কোনো কোনো কেরাত এমন আছে যা সাত হরফের অন্তর্ভুক্ত নয়। যেমন, সাত কারীদের বিরল কেরাতসমূহ অথবা মতানৈক্যমুক্ত কেরাতসমূহ। আবার সাত হরফের কোনো কোনো মতভেদ এমন আছে যা সাত কেরাতের মধ্যে শামিল নয়। যেমন, ইমাম ইয়াকুব (রহ.), ইমাম আবু যাফর (রহ.) ও খালাফ (রহ.)-এর মুতাওয়াতির কেরাতসমূহ। এগুলো যদিও সাত হরফের মধ্য হতে; কিন্তু প্রসিদ্ধ সাত কেরাতের মধ্য হতে নয়। -মুহাম্মদ তাকী।
১৬৬. ফয়যুল বারী : ৩/৩২১-৩২২
১৬৭. মাকালাতুল কাউসারী : পৃ : ২০-২১
১৬৮. মানাহিলুল ইরফান : ১/১৫১
১৬৯. মুশকিলুল আছার : ৪/১৯৩
১৭০. কানযুল উম্মাল : ১ম খণ্ড, হাদীস নং ৪৮৪
১৭১. ইবনে সা’দ রচিত আত-তবকাতুল কুবরা : ২/১৯৫
১৭২. সহীহ মুসলিম : ১/২৭৩
১৭৩. ইবনে আবী দাউদ (রহ.) রচিত “কিতাবুল মাসাহিফ” পৃ : ২২, ফাতহুল বারী : ৯/১৫
১৭৪. আল-ইতকান : ১/৬১
১৭৫. বহু উলামায়ে কেরাম হযরত উসমান (রা.)-এর এ পদক্ষেপের এই ব্যাখ্যাই করেছেন। দেখুন, আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.) রচিত “الفصل فى الملل والاهواء والنحل”-এর ৭ম খণ্ডের ৭৭ নং পৃষ্ঠা; মাওলানা আবদুল হক হক্কানী (রহ.) রচিত “البيان فى علوم القرآن”-এর দ্বিতীয় অধ্যায় দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ, পৃ. ৫৮; এবং মাবাহেস ফি উলুমিল কুরআন : ১/২৪৮-২৫৬
১৭৬. সহীহ বুখারী [ফাতহুল বারী সহ] : ৯/১৬
১৭৭. কানযুল উম্মাল : ১/২৮২ হাদীস নং ৪৭৮৩
১৭৮. রেওয়ায়েতটি ইমাম আহমদ (রহ.) বর্ণনা করেছেন। এর সনদ নির্ভরযোগ্য। (আওজাযুল মাসালিক : ২/৩৫৭)
১৭৯. কানযুল উম্মাল : ১/২৮৬ হাদীস নং ৪৮৪
১৮০. আন-নশরু ফী কিরআতিল আশর : ১/৩২, হাফেয ইবনে হাজার (রহ.)-ও বিভিন্ন মুহাদ্দিসীনের বরাত দিয়ে এ বিষয়ে একাধিক রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন। (ফাতহুল বারী : ৯/৩৬)
১৮১. ফাতহুল বারী : ৯/১৬
১৮২. মুসতাদরাক হাকেম : ২/২২৮, হাকেম (রহ.) বলেন, এটা সহীহ সনদবিশিষ্ট হাদীস। আল্লামা যাহাবী (রহ) তা সত্যায়ন করেছেন।
১৮৩. আল-ফাতহুর রব্বানী : ১৮/৩৫
১৮৪. মুসতাদরাক হাকেম : ২/২২৯
১৮৫. আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) ইবনে আশতা (রহ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে হযরত ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফের বিন্যাস সম্পূর্ণ নকল করেছেন। মাসহাফে উসমানীর সাথে যার প্রচুর গড়মিল রয়েছে। (আল-ইতকান : ১/৬৬
১৮৬. সহীহ বুখারী : কুরআন সংকলন অধ্যায়।
১৮৭. ফাতহুল বারী : ৯/৩২
১৮৮. ফাতহুল বারী : ৯/৪০
১৮৯. মুসনাদে আহমদের মধ্যে কেবল একটি রেওয়ায়েত এমন পাওয়া যায়, যা দ্বারা বাহ্যিকভাবে মনে হয় যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এর উপরই আপত্তি করেছিলেন। (ফাতহুর রাব্বানী : ১৮/৩৬) কিন্তু এটা এক মাজহুল তথা অপরিচিত ব্যক্তি থেকে বর্ণিত বলে নির্ভরযোগ্য নয়।
১৯০. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) নিজের মাসহাফকে বাকি রাখার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু মাসহাফে উসমানীর কোনো কথার উপর তিনি বিন্দুমাত্রও দ্বিমত পোষণ করেননি।
চিন্তা পরিবর্তনের সাথে সাথে আচরণের আমূল পরিবর্তন

ইসলামের এক মহান দ্বীন যেখান এমন সব বিধান, শিক্ষা, সংগঠন ও আইনে পরিপূর্ণ যা মানুষকে দুর্দশা ও অবক্ষয়ের অবস্থা থেকে মর্যাদা, গর্ব ও আভিজাত্যের দিকে উন্নীত করে, তুচ্ছ বিষয়ের ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। আজকের আলোচনায়, আমরা ইসলামের প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের বাস্তবতার অনেক উদাহরণের মধ্যে একটির কথা আলোচনা করব।
আমাদের নবী এবং আমাদের প্রিয় নেতা মুহাম্মদ (সা) এর হৃদয়ে অবতীর্ণ ইসলামের আহ্বান নারীদের ব্যতিরেকে কেবল পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নারীরা এই বরকতময় আহ্বানের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, আল্লাহর বাণীকে উচ্চে তুলে ধরার জন্য আত্মত্যাগ করেছিলেন। শহীদ সুমাইয়া বিনতে খায়য়াত (রা.) এর ঘটনা আমাদের অজানা নয়, তিনি ছিলেন প্রথম শহীদ যিনি ইসলামের পথে আরোহণ করেছিলেন, যদিও তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি এই সম্মান পেয়েছিলেন। এ থেকে, আমরা এই দ্বীনের মহত্ত্ব এবং সকল মানুষের জন্য এর ব্যাপকতা স্বীকার করি। যখন কেউ ইসলামে প্রবেশ করে, তখন তারা এর জন্য দায়িত্বশীল হয়ে থাকেন ঠিক যেমন সেরা সাহাবী, আবু বকর আল-সিদ্দিক, উমর আল-ফারুক, উসমান যুন-নূরাইন এবং আলী কাররামাল্লাহু ওজহাহু (রা.) ছিলেন।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে, আমরা একজন মহান সাহাবিয়্যার জীবন দেখি যার ইসলামী ইতিহাসে বিরাট প্রভাব ছিল: আল-খানসা (রা.) (তামাদির বিনতে আমর ইবনে আল-হারিস), যাকে আল্লাহর রাসূল (সা.) আরবদের মধ্যে সেরা কবি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। উমর ইবনে আল খাত্তাব (রা.) তাকে দেখলেই কবিতা আবৃত্তি করতে বলতেন। তার কবিতা এত সুন্দর এবং মসৃণ ছিল যে, পানির শীতল স্রোতের মতো হৃদয়ে প্রবাহিত হওয়ার অনুভূতি হতো। বলা হয় যে, ভাষায় “আল-খানসা” অর্থ “হরিণ”।
আল-খানসা (রা.) মক্কা বিজয়ের পর অষ্টম হিজরীতে তার গোত্র বনু সুলাইমের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। আল্লাহর রহমতে তিনি ইসলামের প্রতি অনুগত ছিলেন। নবী (সা) তার কবিতা শুনতেন এবং তাকে বলতেন,
«هيه يا خنساء»
“চালিয়ে যাও, হে খানসা।”তিনি তার দুই ভাই, সাখর এবং মুয়াবিয়ার জন্য তীব্র ক্রন্দনের জন্য পরিচিত ছিলেন, যারা ইসলাম-পূর্ব যুগে নিহত হয়েছিল। তিনি তাদের জন্য অনেক শোকগাথা রচনা করেছিলেন এবং এই বিষয়বস্তু তার কবিতায় প্রাধান্য পেয়েছিল, এমনকি তিনি ইসলাম গ্রহণের পরেও। ভাই সাখরের জন্য শোক প্রকাশে তার কবিতায় এসেছে:
“তোমার চোখে কি ধুলো ঢুকেছে, নাকি কাঁদছে,
অথবা ঘর খালি মনে হলে তোমার চোখ (এর পানি) কি উপচে পড়ে?
এটা এমন যেন আমার চোখ, যখন তার স্মৃতি আসে,
আমার গাল বেয়ে অবিরাম প্রবাহিত একটি স্রোত।
খানসা সাখরের জন্য কাঁদে, আকাঙ্ক্ষায় আচ্ছন্ন,
যদিও সে তাজা মাটির স্তরের নীচে আবৃত।
সে কাঁদে এবং যতদিন সে বেঁচে থাকে ততদিন থামবে না,
তার দীর্ঘশ্বাস চিরকাল শোকে প্রতিধ্বনিত হয়।
খানসা সাখরের জন্য কাঁদে এবং ঠিকই বলেছে,
কারণ সময় তাকে আঘাত করেছে, এবং সময় কঠোর।”
তার গোত্রের কিছু লোক আল্লাহর রাসূল (সা) এর খলিফা (খলিফা) উমর ইবনুল খাত্তাবের কাছে তার অতিরিক্ত শোকের অভিযোগ করে বলেছিল যে তার শোকগ্রন্থ আল্লাহর বিধানের প্রতি ধৈর্যের অভাব প্রদর্শন করে।
উল্লেখ করা হয়েছে যে তিনি একবার তার গোত্রের লোকদের সাথে একটি প্রয়োজনে মদীনায় এসেছিলেন। তারা উমরকে বলল, “এই আল-খানসা। তুমি যদি তাকে ধমক দিতে, কারণ তার কান্না অজ্ঞতার যুগে এবং ইসলামে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে।” উমর তার কাছে গিয়ে বললেন, “হে খানসা।” তিনি মাথা তুলে বললেন, “তুমি কী চাও? তুমি কী চাও?” তিনি বললেন, “কোন কষ্টে তোমার চোখ কান্না করে?” তিনি বললেন, “মুদারের নেতাদের জন্য কাঁদছি।” তিনি বললেন, “তারা অজ্ঞতার যুগে ধ্বংস হয়ে গেছে; তারা এখন জাহান্নামের জ্বালানি।” তিনি বললেন, “আমার বাবা-মা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক, এতে আমার কষ্ট আরও বেড়ে যায়।” তিনি বললেন, “তুমি যা রচনা করেছো তা আমাকে শোনাও।” তিনি বললেন, “আমি আপনাকে আগে যা রচনা করেছি তা শোনাবো না বরং এখন যা বলেছি তা শোনাবো।” তাই তিনি কবিতার পংক্তি আবৃত্তি করলেন। উমর বললেন, “তাকে ছেড়ে দাও, কারণ সে সর্বদা দুঃখিত থাকবে।” তিনি তাকে নিষেধ করেননি বা তিরস্কার করেননি, তার প্রতি দয়া ও ভদ্রতা প্রদর্শন করেছেন।
ইসলাম-পূর্ব যুগে (জাহিলিয়াহ) এবং তার প্রাথমিক ইসলামের কিছু অংশে তার ভাইদের সম্পর্কে আল-খানসার (রা.) অবস্থা এই ছিল। তবে, ইসলাম তার আত্মার গভীরে প্রবেশ করেছিল। তিনি তার ঈমান, দ্বীন এবং এই জীবনের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছিলেন, তাই তিনি আরবের বাইরে প্রথম মুসলিম বিজয়ে অংশগ্রহণের জন্য তাড়াহুড়ো করেছিলেন। তিনি ইসলামের অন্যতম সিংহ সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর নেতৃত্বে তার পুত্রদের সাথে ইরাক বিজয়ে যান। যুদ্ধের আগের রাতে, তিনি তার চার পুত্রকে সম্বোধন করে বললেন, “হে আমার পুত্রগণ, তোমরা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছ এবং তোমাদের ইচ্ছানুযায়ী হিজরত করেছ। সেই আল্লাহর কসম, যিনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই, তোমরা যেমন একজন পুরুষের সন্তান, তেমনি তোমরাও একজন মহিলার সন্তান। আমি কখনও তোমার পিতার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি, তোমার চাচাকে অপমান করিনি, তোমার বংশকে কলঙ্কিত করিনি, তোমার সম্মানকে কলুষিত করিনি। তোমরা জানো, কাফেরদের সাথে যুদ্ধকারী মুসলমানদের জন্য আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) কত মহান পুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন। এবং জেনে রাখো যে, চিরস্থায়ী আবাস এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর চেয়ে উত্তম। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“হে ঈমানদারগণ! ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্য ধারণ করো, সতর্ক থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও” [সূরা আল- ইমরান: ২০০]।
আগামীকাল, যদি আল্লাহ চান এবং তোমরা নিরাপদ থাকো, তাহলে তোমাদের শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বের হও। অন্তর্দৃষ্টির সাথে, আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) শত্রুদের বিরুদ্ধে সাহায্য প্রার্থনা করো। যখন তুমি দেখবে যুদ্ধের আগুন প্রচণ্ডভাবে জ্বলছে এবং এর শিখা উঁচুতে উঠছে, তখন তার উত্তাপে ঝাঁপিয়ে পড়ো এবং যুদ্ধের শীর্ষে তাদের নেতার সাথে লড়াই করো। তুমি জান্নাতের চিরস্থায়ী আবাসে বিজয়, গনীমত এবং সম্মান অর্জন করবে।”
তার পুত্ররা তার ইচ্ছা মেনে নিয়েছিল, যুদ্ধে বেরিয়েছিল এবং সকলেই আল-কাদিসিয়ায় শহীদ হয়েছিল। তাদের কেউই ফিরে আসেনি। আল-খানসা (রা.) যখন এই খবর পেয়েছিলেন, তখন তিনি তাদের জন্য আতঙ্কিত হননি বা শোক করেননি যেমনটি তিনি তার ভাই সাখরের জন্য করেছিলেন। পরিবর্তে, তিনি ধৈর্যের সাথে তা সহ্য করেছিলেন এবং তার বিখ্যাত বাক্যগুলি বলেছিলেন,
“الحمد لله الذي شرفني بقتلهم، وأرجو من ربي أن يجمعني بهم في مستقر رحمته»
“সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাদের শাহাদাতের মাধ্যমে আমাকে সম্মানিত করেছেন।” আমি আমার প্রভুর কাছে আশা করি যে তিনি আমাকে তাঁর রহমতের আবাসে তাদের সাথে একত্রিত করবেন।”
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তার চার ছেলের প্রত্যেকের জন্য ২০০ দিরহাম করে ভাতা দিতেন, যতদিন না তিনি (রা.) ইন্তেকাল করেন।
এভাবে ইসলাম তার ধারণা, চিন্তাভাবনা এবং মৃত্যুর প্রতি তার আচরণ পরিবর্তন করে, যা কেউ এড়াতে পারে না। কখনও এমন খবর পাওয়া যায়নি যে তিনি তার ছেলেদের শোক প্রকাশ করে একটিও কবিতা রচনা করেছেন, যদিও তিনি একদিনে চারটি ছেলেকেই হারিয়েছিলেন।
অতএব, আমরা বলি: যে মুসলিমের বিশ্বাস, আচরণ এবং জীবনযাত্রা ইসলামের চিন্তাভাবনা এবং ধারণা দ্বারা পরিবর্তিত হয় না, সে তার দ্বীনকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারেনি, অথবা ইসলামকে একটি সম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ এবং তারপরে আল্লাহর করুণার দ্বারা জান্নাতে যাওয়ার পথ হিসাবে বিবেচনা করেনি। এবং এটিই প্রকৃতপক্ষে সর্বোচ্চ সাফল্য।
হে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা), আপনার রহমত দ্বারা যা সমস্ত কিছুতে বিস্তৃত, এবং আপনার উদারতা ও অনুগ্রহের দ্বারা, আমাদের প্রতি দয়া করুন এবং আমাদেরকে আমাদের নেতা ও নবী মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা.) সাথে আপনার ক্ষমা ও করুণার স্থানে একত্রিত করুন, হে দয়ালুদের মধ্যে সবচেয়ে দয়ালু।
খিলাফত রাষ্ট্রে শিক্ষা পাঠ্যক্রমের ভিত্তি | ভূমিকা ও নীতিসমূহ

১. ভূমিকা
যেকোনো জাতির সংস্কৃতি (ثقافة) তার অস্তিত্ব ও টিকে থাকার মেরুদণ্ড। এই সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করেই উম্মাহর সভ্যতা (حضارة) প্রতিষ্ঠিত হয়, এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারিত হয় এবং এর জীবনধারা সংজ্ঞায়িত হয়। উম্মাহর ব্যক্তিরা এই সংস্কৃতির মাধ্যমে একটি অভিন্ন ধারায় গড়ে ওঠে, যার ফলে উম্মাহ অন্যান্য জাতি থেকে স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে। এই সংস্কৃতি হলো: উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ (আকিদা) এবং এই মতবাদ থেকে উদ্ভূত বিধি, সমাধান ও ব্যবস্থা। এটি হলো এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা জ্ঞান ও বিজ্ঞান, সেইসাথে এই বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদের সাথে সম্পর্কিত ঘটনাবলী, যেমন উম্মাহর জীবনচরিত (সিরাত) ও ইতিহাস। যদি এই সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে এই উম্মাহ একটি স্বতন্ত্র উম্মাহ হিসেবে বিলীন হয়ে যাবে; ফলে এর লক্ষ্য ও জীবনধারা পরিবর্তিত হবে, এর আনুগত্যের কেন্দ্রবিন্দু সরে যাবে এবং এটি অন্যান্য জাতির সংস্কৃতি অনুসরণ করতে গিয়ে পথভ্রষ্ট হবে।
ইসলামী সংস্কৃতি হলো ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ (তথা আকীদা) দ্বারা অনুপ্রাণিত জ্ঞান (معارف)। এই জ্ঞান ইসলামী মতবাদকে অন্তর্ভুক্ত করে কি না, যেমন ‘তাওহীদ’ সংক্রান্ত জ্ঞান; অথবা এটি বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদের উপর ভিত্তি করে গঠিত কি না, যেমন ফিকহ (আইনশাস্ত্র), কুরআনের তাফসীর এবং হাদিস; অথবা এটি ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ (তথা আকীদা) থেকে উদ্ভূত নিয়মাবলী বোঝার জন্য একটি পূর্বশর্ত কি না, যেমন ইসলামে ইজতিহাদের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, যেমন আরবি ভাষার জ্ঞান, হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষা এবং উসুলুল ফিকহ (আইনশাস্ত্রের মূলনীতি)। এই সবকিছুই ইসলামী সংস্কৃতির অংশ, কারণ ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ (আকীদা)ই এর গবেষণার চালিকাশক্তি। একইভাবে, ইসলামী উম্মাহর ইতিহাসও এর সংস্কৃতির একটি অংশ, কারণ এতে তার সভ্যতা, ব্যক্তিত্ব, নেতা এবং আলেমদের সম্পর্কে সংবাদ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রাক-ইসলামী আরবের ইতিহাস ইসলামী সংস্কৃতির অংশ নয়, তবে প্রাক-ইসলামী আরবের কবিতাকে এই সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, কারণ এতে এমন প্রমাণ রয়েছে যা আরবি ভাষার শব্দ ও বাক্য গঠন বুঝতে সাহায্য করে এবং ফলস্বরূপ ইজতিহাদ, কুরআনের তাফসীর ও হাদিস বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়।
উম্মাহর সংস্কৃতি তার ব্যক্তিদের চরিত্র গঠন করে। এটি ব্যক্তির বুদ্ধিবৃত্তিকে সংগঠিত করে এবং (তা দ্বারা) বস্তু, বক্তব্য ও কাজ বিচার করার পদ্ধতিকে গঠন করে, ঠিক যেমন এটি তার প্রবণতাগুলোকে গঠন করে, যার ফলে (এই সংস্কৃতি) তার মানসিকতা, স্বভাব (নাফসিয়্যা) এবং আচরণকে প্রভাবিত করে। সুতরাং, সমাজে উম্মাহর সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও বিস্তার করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। সোভিয়েত ইউনিয়ন ঐতিহাসিকভাবে তার সন্তানদের কমিউনিস্ট সংস্কৃতির ওপর গড়ে তুলেছিল এবং তার সংস্কৃতিতে পুঁজিবাদী বা ইসলামী চিন্তাধারার কোনো অনুপ্রবেশ রোধ করার চেষ্টা করেছিল। সমগ্র পশ্চিমা বিশ্ব তার সন্তানদের এমন পুঁজিবাদী সংস্কৃতির ওপর লালন-পালন করেছে যা জীবন থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করার নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। তারা সেই ভিত্তির ওপর তাদের জীবনকে সংগঠিত ও প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং যুদ্ধ করেছে—যেমনটি তারা আজও করে চলেছে—যাতে ইসলামী সংস্কৃতি তাদের মতবাদ ও সংস্কৃতিতে প্রবেশ করতে না পারে। ইসলামী রাষ্ট্র তার সন্তানদের মধ্যে ইসলামী সংস্কৃতিকে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয় এমন কোনো চিন্তাধারার প্রচার থেকে সবাইকে বিরত রেখেছে। রাষ্ট্র দাওয়াহ ও জিহাদের মাধ্যমে তার সংস্কৃতিকে অন্যান্য রাষ্ট্র ও জাতির কাছেও পৌঁছে দিয়েছে। এটি ততক্ষণ পর্যন্ত চলতে থাকবে যতক্ষণ না আল্লাহ পৃথিবী এবং তার উপর বসবাসকারী সকলকে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেন (অর্থাৎ কেয়ামত দিবস পর্যন্ত)।
উম্মাহর সংস্কৃতি সংরক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিশ্চয়তা হলো, এর সংস্কৃতি তার সন্তানদের হৃদয়ে মুখস্থ থাকবে এবং বইপত্রে সংরক্ষিত থাকবে। এর পাশাপাশি উম্মাহর উপর একটি রাষ্ট্র থাকবে, যা এই সংস্কৃতির বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ থেকে উদ্ভূত নিয়মকানুন অনুযায়ী এর বিষয়াদি পরিচালনা ও দেখাশোনা করবে।
শিক্ষা হলো উম্মাহর সংস্কৃতিকে তার সন্তানদের হৃদয়ে এবং বইয়ের পাতায় সংরক্ষণ করার একটি পদ্ধতি, তা আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাক্রমই হোক না কেন। শিক্ষাক্রম বলতে বোঝায় রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থা ও নীতিমালা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা, যার বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর ন্যস্ত থাকে, যেমন শিক্ষার শুরুর বয়স, অধ্যয়নের বিষয় এবং শিক্ষাদান পদ্ধতি নির্ধারণ করা। অন্যদিকে, অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাক্রম মুসলমানদের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়, যাতে তারা ঘরে, মসজিদে, ক্লাবে, গণমাধ্যমের মাধ্যমে, সাময়িক প্রকাশনার মাধ্যমে ইত্যাদি ক্ষেত্রে শিক্ষা দিতে পারে, যা শিক্ষাক্রমের সংগঠন ও নীতিমালার অধীন নয়। তবে উভয় ক্ষেত্রেই, রাষ্ট্র এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে দায়বদ্ধ যে (শিক্ষিত) চিন্তাভাবনা এবং জ্ঞান হয় ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ থেকে উদ্ভূত হবে অথবা তার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে। আমরা এখানে খিলাফত রাষ্ট্রের শিক্ষাক্রমের ভিত্তিগুলো উপস্থাপন করছি।
২. খিলাফত রাষ্ট্রে শিক্ষা নীতি এবং এর সংগঠন
খিলাফত রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষা পাঠ্যক্রম সম্পর্কিত শরীয়াহ বিধি এবং প্রশাসনিক নীতিমালার সমষ্টি নিয়ে গঠিত। শিক্ষা সম্পর্কিত শরীয়াহ বিধিগুলো ইসলামী আকীদা থেকে উদ্ভূত এবং সেগুলোর শরীয়াহভিত্তিক প্রমাণ রয়েছে, যেমন অধ্যয়নের বিষয়বস্তু এবং ছাত্র ও ছাত্রীদের মধ্যে পৃথকীকরণ। আর শিক্ষা সম্পর্কিত প্রশাসনিক নীতিমালা হলো সেই অনুমোদিত উপায় ও পদ্ধতি, যা ক্ষমতায় থাকা শাসক এই ব্যবস্থা বাস্তবায়ন এবং এর লক্ষ্য অর্জনের জন্য উপকারী বলে মনে করেন। এগুলো পার্থিব বিষয়, যা শিক্ষা সম্পর্কিত শরীয়াহ বিধি এবং উম্মাহর মৌলিক চাহিদা বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মনে হওয়া অনুযায়ী বিকাশ ও পরিবর্তনের অধীন। একইভাবে, এগুলো অন্য জাতির অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং অনুমোদিত গবেষণা থেকে গ্রহণ করা যেতে পারে।
শরিয়াহ বিধি ও প্রশাসনিক কানুনসমূহের এই ব্যবস্থার জন্য এমন একটি বিকল্প কাঠামোর প্রয়োজন, যা খিলাফত রাষ্ট্রে শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্যগুলো অর্জনে সক্ষম হবে, অর্থাৎ ইসলামী ব্যক্তিত্ব গঠন করতে পারবে। এই কাঠামোটি পাঠ্যক্রম নির্ধারণ, যোগ্য শিক্ষক নির্বাচন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং স্কুল, ইনস্টিটিউট ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগার ও শিক্ষামূলক উপকরণ সরবরাহসহ শিক্ষার সমস্ত দিকের তত্ত্বাবধান, সংগঠন এবং হিসাবরক্ষণের দায়িত্ব পালন করে।
আমরা এখন ‘সংবিধানের ভূমিকা’ (মুকাদিমাত আদ-দুস্তুর) থেকে ‘শিক্ষা নীতির’ বেশিরভাগ ধারা উপস্থাপন করছি, যা হলো ইসলামি রাষ্ট্রের খসড়া সংবিধান।
ধারা ১৭০
ইসলামী আকীদাহ্ হবে শিক্ষা নীতির মূল ভিত্তি। পাঠ্যসূচী এবং শিক্ষার পদ্ধতি এমনভাবে পরিকল্পিত হবে যাতে এই মূল ভিত্তি থেকে বিচ্যূত হবার কোন সুযোগ না থাকে।
ধারা ১৭১
শিক্ষা নীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যক্তির চিন্তা ও চরিত্রকে ইসলামী ব্যক্তিত্বের রূপদান করা। পাঠ্যসূচীর অন্তর্গত সকল বিষয়েরই এ ভিত্তির উপর গভীরভাবে প্রোথিত থাকা আবশ্যক।
ধারা ১৭২
শিক্ষার লক্ষ্য হচ্ছে ইসলামী ব্যক্তিত্ব গঠন করা এবং জীবনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে জনগণকে শিক্ষা দান করা। শিক্ষার পদ্ধতি এ লক্ষ্য পূরণের জন্য পরিকল্পিত হবে এবং এই লক্ষ্য পূরণ থেকে বিচ্যুত অন্যকোন পদ্ধতিতে নিবৃত্ত করা হবে।
ধারা ১৭৩
ইসলামী সংস্কৃতি ও আরবী ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে সপ্তাহে ব্যয়কৃত সময় অন্য বিষয়গুলো শিক্ষার পিছনে ব্যয়কৃত সময়ের সমান হওয়া আবশ্যক।
ধারা ১৭৪
পরীক্ষালব্ধ বিজ্ঞান (empirical sciences) যেমন গণিত ও সাংস্কৃতিক বিষয়গুলোর (cultural subjects) মধ্যে সুস্পষ্ট বিভাজন থাকা আবশ্যক। পরীক্ষালব্ধ বিজ্ঞান এবং এর সাথে সম্পর্কিত যেকোন বিষয় অবশ্যই প্রয়োজন অনুসারে শেখানো হবে এবং কোন নির্দিষ্ট স্তরে সীমাবদ্ধ রাখা হবে না। অপরদিকে, সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে অবশ্যই ইসলামী ধারণা ও বিধিবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী শেখানো হবে। উচ্চশিক্ষার স্তরে এ বিষয়গুলো একটি নির্দিষ্ট বিষয়রূপে এমনভাবে শেখানো যেতে পারে, যাতে করে তা কোনক্রমেই উক্ত নীতিমালা ও শিক্ষার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয়।
ধারা ১৭৫
শিক্ষার সকল স্তরে অবশ্যই ইসলামী সংস্কৃতি শিক্ষা দিতে হবে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে চিকিৎসা, প্রকৌশল, পদার্থবিদ্যা এবং অন্যান্য বিষয়ের মত ইসলামী সংস্কৃতির বিভিন্ন বিভাগ প্রবর্তন করা হবে।
ধারা ১৭৬
কারিগরী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মত বিষয়গুলো একদিকে বিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পারে, যেমন: ব্যবসা প্রশাসন, নৌবিদ্যা ও কৃষিবিদ্যা ইত্যাদি। এ ধরনের বিষয়গুলো কোনরূপ সীমাবদ্ধতা বা শর্ত ছাড়াই শেখানো হবে। তারপরও মাঝেমধ্যে কারিগরী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত এবং একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গী দ্বারা প্রভাবিত থাকতে পারে, যেমন চারুশিল্প (অঙ্কন শিল্প) ও ভাস্কর্য। এ সকল ক্ষেত্রে যদি এগুলো ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সাংঘর্ষিক হয় তবে এ বিষয়গুলো শেখানো যাবে না।
ধারা ১৭৭
একমাত্র রাষ্ট্র প্রণীত শিক্ষা পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম অনুমোদন করা হবে এবং অন্য কোন পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। বেসরকারী বিদ্যালয় স্থাপনের অনুমতি থাকবে, তবে এগুলো বিদেশী হতে পারবে না, এবং তাদের অবশ্যই রাষ্ট্রের প্রণীত শিক্ষা পাঠ্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে, শিক্ষানীতির উপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এবং রাষ্ট্র নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী উভয় ক্ষেত্রেই, নারী-পুরুষ মেলামেশা করতে পারবে না। এছাড়া, এসকল বিদ্যালয় কোন ধর্ম, গোত্র বা বর্ণের লোকদের জন্য সীমাবদ্ধ থাকতে পারবে না।
ধারা ১৭৮
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিককে জীবন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয় শিক্ষা দান রাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। অন্ততঃ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত এটি সবার জন্য বিনামূল্যে প্রদান করতে হবে। রাষ্ট্রের সর্বাত্মক চেষ্টা করা উচিত যাতে করে সবাই বিনামূল্যে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ অব্যাহত রাখতে পারে।
ধারা ১৭৯
রাষ্ট্রকে বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে যথেষ্ট পরিমাণ পাঠাগার এবং পরীক্ষাগার সহ জ্ঞান বৃদ্ধির সুবিধাসমূহের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে করে যারা ফিক্হ, হাদীস, তাফসীর, চিকিৎসা, প্রকৌশল, রসায়নবিদ্যা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা অব্যাহত রাখতে চায়, তারা তা করতে পারে। রাষ্ট্রের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে মুজতাহিদ, সৃজনশীল বিজ্ঞানী ও আবিস্কারক তৈরী করার লক্ষ্যে এটি করা হবে।
ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোর ষড়যন্ত্র | ২য় অধ্যায়

কিভাবে খিলাফত ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়
২য় অধ্যায়: ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোর ষড়যন্ত্র
মুসলমানদের ভূমি ভাগাভাগি নিয়ে কাফেরদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও, ইসলামকে ধ্বংস করার ব্যাপারে তারা সম্পূর্ণ একমত ছিল। এই উদ্দেশ্যে তারা বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল। প্রাথমিকভাবে, তারা ইউরোপীয় দেশগুলোতে জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। তারা মানুষকে ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উস্কে দেয় এবং এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ করে, যেমনটি সার্বিয়া ও গ্রিসের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। এভাবে ইউরোপীয় দেশগুলো ইসলামী রাষ্ট্রের পিঠে ছুরিকাঘাত করার চেষ্টা করেছিল। ফ্রান্স ১৭৯৮ সালের জুলাই মাসে মিশর আক্রমণ করে এবং তা দখল করে নেয়, তারপর ফিলিস্তিনের দিকে অগ্রসর হয়ে সেটিও দখল করে। ফ্রান্স ইসলামী রাষ্ট্রকে চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য আল-শামের বাকি অংশ দখল করতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয় এবং পরে মিশর ত্যাগ করতে ও দখল করা ভূমিগুলো ইসলামী রাষ্ট্রের কাছে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়।
ওয়াহাবিদের জন্ম এবং সৌদি শাসনের প্রতিষ্ঠা
ব্রিটেন তার এজেন্ট আব্দুল-আজিজ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে সাউদের মাধ্যমে ইসলামিক রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে আঘাত করার চেষ্টা করেছিল। ততদিনে ওয়াহাবিরা মুহাম্মদ ইবনে সাউদ এবং পরবর্তীতে তার পুত্র আব্দুল-আজিজের নেতৃত্বে ইসলামী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে একটি সত্তা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। ব্রিটেন তাদের অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ করত এবং তারা সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে খিলাফতের অধীনে থাকা ইসলামী ভূমিগুলো দখল করতে অগ্রসর হয়। তারা খলিফার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে এবং ইসলামী সশস্ত্র বাহিনীর (আমিরুল মুমিনিনের সেনাবাহিনী) সাথে যুদ্ধ করে, আর এই পুরোটা সময়ই ব্রিটিশরা তাদের উস্কানি দিত এবং রসদ সরবরাহ করত। ওয়াহাবিরা খলিফা শাসিত ভূমিগুলো দখল করতে চেয়েছিল, যাতে তারা তাদের মাযহাব (চিন্তাধারা) অনুযায়ী সেই ভূমিগুলো শাসন করতে পারে এবং তাদের থেকে ভিন্ন সমস্ত ইসলামিক মাযহাবকে শক্তি প্রয়োগ করে দমন করতে পারে। তাই, তারা কুয়েত আক্রমণ করে এবং ১৭৮৮ সালে তা দখল করে নেয়, তারপর উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে বাগদাদ অবরোধ করে। তারা কারবালা এবং আল-হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু)’র কবর দখল করে তা ধ্বংস করতে এবং সেখানে যিয়ারত নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিল। এরপর ১৮০৩ সালে তারা মক্কা আক্রমণ করে এবং তা দখল করে নেয়। ১৮০৪ সালের বসন্তে মদিনা তাদের দখলে আসে। তারা আল্লাহর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবরকে ছায়া দেওয়া বিশাল গম্বুজগুলো ধ্বংস করে দেয় এবং সেগুলো থেকে সমস্ত রত্ন ও মূল্যবান অলঙ্কার লুট করে নেয়। পুরো আল-হিজাজ দখল সম্পন্ন করার পর তারা আল-শামের দিকে অগ্রসর হয়। ১৮১০ সালে হিমসের কাছাকাছি পৌঁছে তারা দ্বিতীয়বারের মতো দামেস্ক আক্রমণ করে এবং আল-নাজাফও আক্রমণ করে। দামেস্ক সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে নিজেদের রক্ষা করে। তবে দামেস্ক অবরোধ করার পাশাপাশি ওয়াহাবিরা একই সময়ে উত্তরে অগ্রসর হয় এবং আলেপ্পো পর্যন্ত সিরিয়ার বেশিরভাগ অঞ্চলের উপর তাদের কর্তৃত্ব বিস্তার করে। এটি একটি সুপরিচিত সত্য ছিল যে এই ওয়াহাবি অভিযান ব্রিটিশদের দ্বারা উস্কে দেওয়া হয়েছিল, কারণ আল সৌদ ছিল ব্রিটিশদের এজেন্ট। তারা ওয়াহাবি মাযহাবকে, যা ছিল ইসলামিক এবং যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন একজন মুজতাহিদ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল ইসলামিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এবং অন্যান্য মাযহাবের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া, যাতে উসমানীয় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ শুরু করা যায়। এই মাযহাবের অনুসারীরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিল না, কিন্তু সৌদি আমির এবং সৌদিরা এ সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত ছিল। এর কারণ হলো, সম্পর্কটি ব্রিটিশদের সাথে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল-ওয়াহহাবের ছিল না, বরং ব্রিটিশদের সাথে আব্দুল-আজিজ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে সাউদ এবং পরবর্তীতে তার পুত্র সাউদের ছিল।
মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব, যার মাযহাব ছিল হাম্বলী, তিনি বহু বিষয়ে ইজতিহাদ করেন এবং মনে করেন যে, অন্যান্য মাযহাবের অনুসারী মুসলমানরা এসব বিষয়ে তার মতের সাথে ভিন্নমত পোষণ করে। তাই তিনি তার মতামত প্রচার করতে, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য কাজ করতে এবং অন্যান্য ইসলামী মতামতের তীব্র সমালোচনা করতে শুরু করেন। তিনি বিভিন্ন আলেম, আমির এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে তীব্র বিরোধিতা ও প্রত্যাখ্যানের সম্মুখীন হন, যারা মনে করতেন যে তার মতামতগুলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কিতাব থেকে তাদের বোঝা বিষয়ের সাথে ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি বলতেন যে রাসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবর যিয়ারত করা হারাম এবং একটি পাপের কাজ। তিনি এমনকি এ পর্যন্তও বলেছিলেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবর যিয়ারত করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে, ভ্রমণের সময় তাকে নামাজ কসর করার অনুমতি দেওয়া হবে না, কারণ ভ্রমণের উদ্দেশ্য হবে একটি পাপের কাজ করা। তিনি সেই হাদিসটির উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন যেখানে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন বলে বর্ণিত আছে: “তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যাওয়া যাবে না: আমার এই মসজিদ, মসজিদুল হারাম এবং মসজিদুল আকসা।” মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব এই হাদিস থেকে বুঝেছিলেন যে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও ভ্রমণ করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং, যদি কেউ আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবর যিয়ারত করার জন্য ভ্রমণ করে, তবে সে তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও ভ্রমণ করছে, তাই এটি হারাম এবং একটি পাপের কাজ হবে। অন্যান্য মাযহাবগুলো আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবর যিয়ারত করাকে সুন্নাহ এবং একটি মুস্তাহাব কাজ বলে মনে করত, যা সওয়াব এনে দেয়, কারণ আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “আমি অতীতে তোমাদের কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, কিন্তু এখন তোমরা তা করতে পারো।” অধিকতর যুক্তিতে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবরও এই হাদিসের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত, এছাড়াও তারা অন্যান্য হাদিসও উদ্ধৃত করেছিল। তারা বলেছিল যে, মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব যে হাদিসটিকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন, তা মসজিদ সম্পর্কিত। অতএব, এর বিষয়বস্তু মসজিদ ভ্রমণের সাথে সম্পর্কিত এবং এর বাইরে নয়। হাদিসটি সাধারণ নয়, বরং নির্দিষ্ট এবং একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত: “তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যাওয়া যাবে না।” সুতরাং, একজন মুসলমানের জন্য ইস্তাম্বুলের আয়া সোফিয়া মসজিদ বা দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ বিশেষভাবে পরিদর্শন করা নিষিদ্ধ হবে, কারণ আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মসজিদ পরিদর্শনের জন্য ভ্রমণকে তিনটি মসজিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছেন এবং এর বেশি নয়। এই তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও ভ্রমণ করা নিষিদ্ধ হবে। এছাড়াও, ব্যবসা, পরিবার ও বন্ধুদের সাথে দেখা করা, দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন এবং পর্যটনসহ অন্যান্য কারণে ভ্রমণ করা অনুমোদিত। সুতরাং, হাদিসটি স্পষ্টভাবে ভ্রমণকে নিষিদ্ধ করে না এবং এটিকে এই তিনটি মসজিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে না, বরং এটি উল্লিখিত তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য মসজিদ পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণকে নিষিদ্ধ করে। একইভাবে, অন্যান্য মাযহাবের অনুসারীরা তার মতামতকে ভুল এবং কিতাব ও সুন্নাহ থেকে তাদের বোঝা বিষয়ের সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে করতেন। শীঘ্রই, তার এবং তাদের মধ্যে মতপার্থক্য তীব্র আকার ধারণ করে এবং তাকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হয়। ১৭৪০ সালে, তিনি আনজাহ গোত্রের শেখ মুহাম্মদ ইবনে সাউদের কাছে আশ্রয় নেন, যিনি উয়াইনাহর শেখের সাথে বিরোধে লিপ্ত ছিলেন এবং আল-দির’ইয়াহতে বসবাস করতেন, যা উয়াইনাহ থেকে মাত্র ছয় ঘণ্টার দূরত্বে ছিল। মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাবকে সাদরে গ্রহণ করা হয় এবং আতিথেয়তা করা হয়। তিনি আল-দির’ইয়াহ এবং আশেপাশের এলাকার মানুষের মধ্যে তার মতামত ও চিন্তাভাবনা প্রচার করতে শুরু করেন। কিছুকাল পরে তার চিন্তাভাবনা ও মতামত কিছু সাহায্যকারী ও সমর্থক লাভ করে। আমির মুহাম্মদ ইবনে সাউদ এই চিন্তাভাবনা ও মতামতের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং শেখ (তথা মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব)-এর কাছে আসতে শুরু করেন। ১৭৪৭ সালে, আমির মুহাম্মদ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাবের মতামত ও চিন্তাভাবনার প্রতি তার অনুমোদন ও স্বীকৃতি ঘোষণা করেন। তিনি শেখ (মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব) এবং এই চিন্তাভাবনা ও মতামতের প্রতি তার সমর্থনের প্রতিশ্রুতিও দেন। এই জোটের মাধ্যমে ওয়াহাবি আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটি একটি দাওয়াহ ও শাসনের রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে, কারণ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব এর দিকে আহ্বান করতেন এবং মানুষকে এর নিয়মকানুন শেখাতেন, আর মুহাম্মদ ইবনে সাউদ তার আদেশ ও কর্তৃত্বাধীন মানুষের উপর এর নিয়মকানুন প্রয়োগ করতেন। ওয়াহাবি আন্দোলন দাওয়াহ এবং শাসন—উভয় দিক থেকেই আল-দির’ইয়াহর পার্শ্ববর্তী এলাকা ও গোত্রগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মুহাম্মদ ইবনে সাউদের আমিরাতও প্রসারিত হতে থাকে, এবং দশ বছরের মধ্যে তিনি ৩০ বর্গ মাইল এলাকাকে নিজের কর্তৃত্ব ও নতুন মাযহাবের অধীনে আনতে সক্ষম হন। তবে, এই সম্প্রসারণ অর্জিত হয়েছিল দাওয়াহ এবং আনজাহ গোত্রের শেখের কর্তৃত্বের মাধ্যমে। কোনো ব্যক্তি তাকে চ্যালেঞ্জ করেনি এবং কেউ তার বিরোধিতা করেনি, এমনকি আল-ইহসার আমির, যিনি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল-ওয়াহহাবকে উয়াইনাহ থেকে বহিষ্কার করেছিলেন, তিনিও এই সম্প্রসারণে তার শত্রুর বিরোধিতা করেননি এবং ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সৈন্য সমাবেশ করেননি। তবে, তিনি পরাজিত হন এবং মুহাম্মদ ইবনে সাউদ তার আমিরাত দখল করে নেন। ফলস্বরূপ, মুহাম্মদ ইবনে সাউদের কর্তৃত্ব এবং নতুন মাযহাবের কর্তৃত্বের মাধ্যমে আনজাহ গোত্রের কর্তৃত্ব আল-দির’ইয়াহ ও তার আশেপাশের এলাকা, সেইসাথে আল-ইহসারও শাসক শক্তিতে পরিণত হয়। এভাবে কর্তৃত্বের বলে এই ভূমিগুলোতে ওয়াহাবি মাযহাব প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে, আল-ইহসার আমিরের সাথে সংঘর্ষ এবং তার ভূমি বিজয়ের পর ওয়াহাবি আন্দোলন সেখানেই থেমে যায়। এটি আরও প্রসারিত হয়েছিল কিনা বা কোনো কার্যক্রম চালিয়েছিল কিনা, সে সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। বরং এটি সেই এলাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। মুহাম্মদ ইবনে সাউদ সেই পর্যায়ে থেমে যান এবং ওয়াহাবি মাযহাব এই এলাকার সীমানায় এসে থেমে যায় এবং আন্দোলনটি সুপ্ত ও স্থবির হয়ে পড়ে। ১৭৬৫ সালে মুহাম্মদ ইবনে সাউদ মারা যান। তার পুত্র আবদুল-আজিজ আনজাহ গোত্রের শেখ হিসেবে তার স্থলাভিষিক্ত হন। তার পুত্র পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তার নিয়ন্ত্রিত এলাকা শাসন করেন। তবে, তিনি আন্দোলনের জন্য কোনো কার্যক্রম চালাননি, বা আশেপাশের এলাকায় কোনো সম্প্রসারণও করেননি। ফলে, আন্দোলনটি সুপ্ত অবস্থায় থাকে এবং স্থবিরতা দ্বারা চিহ্নিত হয়। এই আন্দোলন সম্পর্কে খুব কমই শোনা যেত এবং এর কোনো প্রতিবেশীই এটি নিয়ে আলোচনা করত না বা এর আক্রমণের ভয় পেত না। তবে, ওয়াহাবি আন্দোলন শুরু হওয়ার ৪১ বছর পর, ১৭৪৭ থেকে ১৭৮৮ সাল পর্যন্ত, এবং এর থেমে যাওয়া ও স্থবিরতার ৩১ বছর পর (১৭৫৭ থেকে ১৭৮৭ সাল পর্যন্ত), হঠাৎ করেই এর কার্যক্রম আবার শুরু হয়। এই আন্দোলনটি মাযহাব প্রচারের জন্য একটি নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করে এবং এটি এর সীমানা ছাড়িয়ে সমগ্র ইসলামী রাষ্ট্রে এবং অন্যান্য পরাশক্তিগুলোর মধ্যেও ব্যাপকভাবে ও উচ্চ পর্যায়ে প্রচারিত হয়। এই আন্দোলনটি তার প্রতিবেশীদের মধ্যে অস্বস্তি ও উদ্বেগের সৃষ্টি করতে শুরু করে এবং এমনকি সমগ্র ইসলামী রাষ্ট্রের জন্যও অস্বস্তি ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১৭৮৭ সালে আব্দুল-আজিজ একটি ইমারা প্রতিষ্ঠা করতে এবং বংশানুক্রমিক শাসনব্যবস্থা, যা সিংহাসনের উত্তরাধিকার নামে পরিচিত, তা গ্রহণ করার উদ্যোগ নেন। এর ফলে আব্দুল-আজিজ তার পুত্র সাউদকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে নিশ্চিত করেন। শেখ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল-ওয়াহহাবের নেতৃত্বে এক বিশাল জনসমাগম ঘটে। আব্দুল-আজিজ এই বিশাল জনসমাবেশের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন এবং ঘোষণা করেন যে, ইমারার অধিকার তার পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং তার উত্তরাধিকারী হওয়ার অধিকার কেবল তার পুত্রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তিনি আরও ঘোষণা করেন যে, তার পুত্র সাউদকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল-ওয়াহহাবের নেতৃত্বে এই বিশাল জনতা তার সাথে একমত হয় এবং তার ঘোষণাকে স্বীকার করে নেয়। এভাবে কোনো গোত্র বা গোত্রসমষ্টির পরিবর্তে একটি রাষ্ট্রের জন্য একটি ইমারা প্রতিষ্ঠিত হয়। এটাও প্রতীয়মান হয়েছিল যে, ওয়াহাবি মাযহাবের প্রধানের উত্তরাধিকারও মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল-ওয়াহহাবের পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আমির এবং মাযহাবের প্রধান উভয়ের উত্তরাধিকারের বিষয়টি নিষ্পত্তি হওয়ার পর, আন্দোলনটি হঠাৎ আবার প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে এবং তার বিজয় ও সম্প্রসারণ পুনরায় শুরু করে। তারা মাযহাব প্রচারের জন্য আবারও যুদ্ধ শুরু করে। ১৭৮৮ সালে আব্দুল-আজিজ একটি বিশাল সামরিক অভিযান প্রস্তুত ও সজ্জিত করার কাজে হাত দেন। তিনি কুয়েত আক্রমণ করে তা জয় ও দখল করেন। ব্রিটিশরা তাদের পক্ষ থেকে উসমানীয় রাষ্ট্র থেকে কুয়েত দখল করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছিল। এর কারণ ছিল জার্মানি, রাশিয়া এবং ফ্রান্সের মতো অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো তাদের বিরোধিতা করেছিল এবং খিলাফত রাষ্ট্র নিজেও তাদের প্রতিরোধ করেছিল। তাই, উসমানীয় রাষ্ট্র থেকে কুয়েতের বিচ্ছিন্নতা এবং এর সুরক্ষার জন্য উত্তরের দিকে অগ্রসর হওয়া রাশিয়া, জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো প্রধান রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি উসমানীয় রাষ্ট্রেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য যথেষ্ট ছিল। উপরন্তু, এই যুদ্ধটি একটি সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ হওয়ায় তা আধ্যাত্মিক আবেগকেও উস্কে দিত। এইভাবে, ওয়াহাবিরা বেশ কয়েক দশক ধরে চলা নীরবতার পর হঠাৎ করে তাদের কার্যকলাপ পুনরায় শুরু করে। তারা একটি নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে এই কার্যকলাপ শুরু করে, যা ছিল যুদ্ধ ও বিজয়ের মাধ্যমে মাযহাব প্রচার করা, যাতে অন্যান্য সমস্ত মাযহাবের অস্তিত্ব বিলুপ্ত করে সেগুলোকে তাদের মাযহাব দ্বারা প্রতিস্থাপন করা যায়। তারা কুয়েত আক্রমণ ও দখলের মাধ্যমে তাদের কার্যকলাপ শুরু করে। এরপর তারা এই কার্যকলাপের ধারাবাহিকতায় সম্প্রসারণের জন্য বেশ কয়েকটি প্রচেষ্টা চালায়। ফলস্বরূপ, তারা আরব উপদ্বীপের মধ্যে তাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য উদ্বেগ ও উপদ্রবের কারণ হয়ে ওঠে – যেমন ইরাক, আল-শাম এবং খিলাফত রাষ্ট্র হিসেবে উসমানীয় সাম্রাজ্য। তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তরবারি ধারণ করে এবং ওয়াহাবি মাযহাবের বাইরের মতবাদ পরিত্যাগ করতে ও ওয়াহাবি মাযহাবের মতামত গ্রহণ করতে বাধ্য করে। তারা খলিফার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং ইসলামী ভূমি জয় করে। এরপর ১৭৯২ সালে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব মারা যান এবং তার পুত্র তার স্থলাভিষিক্ত হন, ঠিক যেমন সৌদ তার পিতা আব্দুল আজিজের স্থলাভিষিক্ত হন। এরপর সৌদি আমিররা এই পথেই অগ্রসর হন, উসমানীয় রাষ্ট্রকে (খিলাফত রাষ্ট্র) আঘাত করার জন্য এবং মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ উস্কে দেওয়ার জন্য ওয়াহাবি মাযহাবকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।
ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ ষড়যন্ত্র:
আল সৌদের দালালিবৃত্তি এবং ব্রিটিশদের প্রতি তাদের আনুগত্য খিলাফত রাষ্ট্র এবং জার্মানি, ফ্রান্স ও রাশিয়ার মতো প্রধান শক্তিগুলোর কাছে একটি সুপরিচিত বিষয় ছিল। এটিও জানা ছিল যে তারা ব্রিটিশদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিল। ব্রিটিশরা নিজেরাও এই সত্যটি গোপন করত না যে তারা একটি রাষ্ট্র হিসেবে সৌদিদের সমর্থন করত। অধিকন্তু, ভারত হয়ে তাদের কাছে যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও সরঞ্জাম পৌঁছাত এবং যুদ্ধ পরিচালনার খরচ ও সশস্ত্র বাহিনীকে সজ্জিত করার জন্য যে অর্থ আসত, তা সবই ছিল ব্রিটিশ অস্ত্র ও অর্থ। তাই, অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো, বিশেষ করে ফ্রান্স, ওয়াহাবি অভিযানের বিরোধিতা করেছিল, কারণ এটিকে একটি ব্রিটিশ অভিযান হিসেবে গণ্য করা হতো। খিলাফত রাষ্ট্র ওয়াহাবিদের দমন করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি, এবং মদিনা ও বাগদাদের তার ওয়ালিরা তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হন। ফলে, তিনি মিশরের তার ওয়ালি মুহাম্মদ আলীকে তাদের মোকাবিলা করার জন্য একটি বাহিনী পাঠানোর নির্দেশ দেন। প্রথমে তিনি ইতস্তত করেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন ফ্রান্সের একজন চর, এবং ফ্রান্সই তাকে মিশরে অভ্যুত্থান ঘটাতে ও ক্ষমতা দখল করতে সাহায্য করেছিল, এবং তারপর খিলাফতকে তাকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য করেছিল। তাই ফ্রান্সের সম্মতি ও প্ররোচনায়, মুহাম্মদ আলী ১৮১১ সালে সুলতানের দাবিতে সাড়া দেন এবং ওয়াহাবিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তার পুত্র তোসুনকে পাঠান। মিশরীয় সেনাবাহিনী ও ওয়াহাবিদের মধ্যে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং ১৮১২ সালে মিশরীয় সেনাবাহিনী মদিনা জয় করতে সক্ষম হয়। এরপর ১৮১৬ সালে মুহাম্মদ আলী কায়রো থেকে তার পুত্র ইব্রাহিমকে পাঠান, যিনি ওয়াহাবিদের এমনভাবে পরাজিত করেন যে তারা তাদের রাজধানী আল-দিরিয়্যাতে পিছু হটে সেখানে নিজেদের সুরক্ষিত করে। এরপর ১৮১৮ সালের এপ্রিলে ইব্রাহিম তাদের অবরোধ করেন। এই অবরোধ পুরো গ্রীষ্মকাল ধরে চলে এবং ১৮১৮ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর ওয়াহাবিরা আত্মসমর্পণ করে। ইব্রাহিমের সেনাবাহিনী আল-দিরিয়্যা ধ্বংস করে এবং এটিকে সম্পূর্ণরূপে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। বলা হয় যে, তিনি সেই স্থানটি এমনভাবে কর্ষণ করিয়েছিলেন যাতে এর কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট না থাকে। এর মাধ্যমেই ব্রিটিশ অভিযানের সমাপ্তি ঘটে।
ইসলামী রাষ্ট্রকে আঘাত করার জন্য ফ্রান্সের প্রচেষ্টা:
ফ্রান্স তখন তার প্রতিনিধি, মিশরের ওয়ালী মুহাম্মদ আলীর মাধ্যমে পেছন থেকে ইসলামী রাষ্ট্রকে আঘাত করার চেষ্টা করে। ফ্রান্স আন্তর্জাতিকভাবে ও রাজনৈতিকভাবে তাকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছিল এবং তিনি খলিফার আনুগত্য ত্যাগ করে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি ১৮৩১ সালে আল-শাম (বৃহত্তর সিরিয়া) জয় করার লক্ষ্যে সেদিকে অগ্রসর হন। তিনি ফিলিস্তিন, লেবানন এবং সিরিয়া দখল করে আনাতোলিয়ার দিকে অনুপ্রবেশ শুরু করেন। তবে, খলিফা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। ব্রিটেন, রাশিয়া এবং দুটি জার্মান রাজ্য মুহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে চলে যায়। ১৮৪০ সালের জুলাই মাসে ব্রিটেন, রাশিয়া এবং দুটি জার্মান রাজ্য মিলে একটি জোট গঠন করে, যা “চতুর্পক্ষীয় জোট” নামে পরিচিতি লাভ করে। এই চুক্তি অনুসারে, এই রাজ্যগুলো উসমানীয় রাষ্ট্রের ঐক্য রক্ষা করতে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে মুহাম্মদ আলীকে সিরিয়া সমর্পণে বাধ্য করতে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। ইউরোপীয় দেশগুলোর এই অবস্থান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে খলিফার অনুকূলে নিয়ে আসে। এটি মুহাম্মদ আলীকে প্রতিরোধ করতে এবং তাকে সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও লেবানন থেকে বিতাড়িত করতে সাহায্য করে। মুহাম্মদ আলী মিশরে ফিরে আসেন, যেখানে তিনি খলিফার কর্তৃত্বের অধীনে ওয়ালী হিসেবে থাকতে সম্মত হন।
For Audio:
“কম ক্ষতি বেছে নেওয়া” নীতি: শরিয়াহ, রাজনীতি ও নির্বাচনে এর অপপ্রয়োগ

ভূমিকা
সমসাময়িক রাজনীতি, বিশেষত গণতান্ত্রিক নির্বাচন ও ভোটের প্রশ্নে মুসলিম সমাজে প্রায়শই ব্যবহৃত একটি যুক্তি হলো — “মন্দের ভালো” তথা “দুটি অনিষ্টের মধ্যে কম অনিষ্টটি বেছে নেওয়া” (The Lesser of Two Evils / Lesser of the Two Harms)। অনেক ইসলামি কর্মী, সংগঠন ও চিন্তাবিদ এই নীতিকে সামনে রেখে সংসদীয় রাজনীতি, আইন প্রণয়নকারী পরিষদ কিংবা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণকে বৈধ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই নীতি কি সত্যিই শরিয়াহসম্মত? এর সঠিক ক্ষেত্র ও শর্ত কী? আর আধুনিক নির্বাচনী রাজনীতিতে এর প্রয়োগ কি আদৌ সঠিক, নাকি এটি একটি মারাত্মক অপব্যাখ্যা?
এই প্রবন্ধে এই প্রশ্নগুলোর বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট শরঈ বিশ্লেষণ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এবং সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
১. “দুটি অনিষ্টের মধ্যে কম অনিষ্ট” নীতি: শরিয়াহর অবস্থান
প্রথমেই বুঝতে হবে, “কম ক্ষতিকরটি বেছে নেওয়া” নীতি সম্পূর্ণ মনগড়া কোনো ধারণা নয়। বহু ফকিহ ও উসূলবিদ এই নীতির কথা উল্লেখ করেছেন। এটি মূলত একটি উপ-নীতি, যা বৃহত্তর নীতির অধীনে আসে— “ক্ষতি দূর করা আবশ্যক” (الضرر يزال)
তবে শরিয়াহ অনুযায়ী এই নীতির প্রয়োগের জন্য কিছু কঠোর শর্ত রয়েছে:
১. সামনে থাকা দুটি বিষয়ই অবশ্যই নিষিদ্ধ (হারাম) হতে হবে
২. উভয় হারাম একসাথে পরিহার করা বাস্তবিক অর্থে অসম্ভব হতে হবে
৩. কোনটি কম ক্ষতিকর আর কোনটি বেশি ক্ষতিকর—তা শরিয়াহ নিজেই নির্ধারণ করবে, ব্যক্তিগত মত, সুবিধা বা আবেগ নয়
৪. কোনো তৃতীয় হালাল বা বৈধ বিকল্প থাকলে এই নীতির প্রয়োগ সম্পূর্ণ বাতিল
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
“আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।” (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)
এ আয়াত থেকেই ফকিহরা এই নীতির সীমিত বৈধতা বুঝিয়েছেন।
২. শরিয়াহতে নীতিটির সঠিক প্রয়োগ: ক্লাসিক উদাহরণ
ফকিহগণ এই নীতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বাস্তব ও অনিবার্য পরিস্থিতির উদাহরণ দিয়েছেন:
- প্রসবকালে যদি মা ও শিশুর উভয়ের জীবন বিপন্ন হয়, এবং একজনকে বাঁচালে অন্যজন মারা যাবে—তাহলে মাকে বাঁচানো অগ্রাধিকার পায়
- কেউ যদি দেখেন, একজন মানুষ ডুবে যাচ্ছে বা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, আর একই সময়ে নামাজের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে—তাহলে নামাজ বিলম্ব করে জীবন রক্ষা করা অগ্রাধিকার পায়
- কাউকে যদি জোর করে বলা হয়—তুমি অন্য একজন মুসলিমকে হত্যা করো, নতুবা তোমাকে হত্যা করা হবে—তাহলে শরিয়াহ অনুযায়ী তাকে নিজে নিহত হওয়াই গ্রহণযোগ্য, হত্যা করা নয়
এই সব উদাহরণে একটি বিষয় পরিষ্কার: এগুলো অনিবার্য পরিস্থিতি, যেখানে উভয় হারাম একসাথে পরিহার করা অসম্ভব
৩. নির্বাচনে ভোট দেওয়া: অনিবার্যতা নাকি কৃত্রিম সংকট?
এখন প্রশ্ন আসে—গণতান্ত্রিক নির্বাচনে ভোট দেওয়া কি এমন কোনো অনিবার্য পরিস্থিতি? না
কারণ:
- কাউকে ভোট দিতে শরিয়াহ বা বাস্তবতা কেউ বাধ্য করছে না
- ভোট না দেওয়ার বিকল্পটি সম্পূর্ণভাবে বিদ্যমান
- ভোট দেওয়া বা না দেওয়া—দুটোর মধ্যেই জীবন, ঈমান বা অস্তিত্ব রক্ষার মতো কোনো জরুরি অবস্থা নেই
অতএব এখানে “দুটি অনিষ্ট ছাড়া উপায় নেই”—এই দাবি মিথ্যা।
বরং এখানে একটি তৃতীয় হালাল বিকল্প রয়েছে:
ভোট থেকে বিরত থাকা এবং এই বাতিল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান গ্রহণ করা।
যেখানে তৃতীয় বিকল্প থাকে, সেখানে “কম অনিষ্ট” নীতির প্রয়োগ শরিয়াহ অনুযায়ী বাতিল।
৪. আইন প্রণয়ন ও কুফরি শাসনে অংশগ্রহণের সমস্যা
আরও গুরুতর সমস্যা হলো—গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে এমন ব্যক্তিকে ক্ষমতায় আনা, যিনি:
- আল্লাহর শরিয়াহ অনুযায়ী আইন প্রণয়ন করেন না
- মানুষের খেয়াল-খুশিকে আইন বানান
- হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম করার ক্ষমতা নিজের হাতে নেন
এ ধরনের ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া মানে তাকে এই কুফরি ক্ষমতায় অংশীদার বানানো।
এখানে একটি শক্তিশালী উপমা দেওয়া যেতে পারে:
“এটা এমন বলা যে—আমরা নিজেরা মদের দোকান খুলবো, যেন কাফিররা খুলে লাভ না করে।”
এই যুক্তি যেমন অযৌক্তিক, তেমনি ভোটের ক্ষেত্রে “কম অনিষ্ট” যুক্তিও অযৌক্তিক
৫. “কম ক্ষতিকর” কার জন্য? মুসলিম না সিস্টেম?
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—কে নির্ধারণ করবে কোন প্রার্থী কম ক্ষতিকর?
একজন মুসলিমের জন্য ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত স্বার্থে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত:
- মুসলিমদের হত্যা ও নিপীড়ন
- মুসলিম ভূমিতে আগ্রাসন
- কুফরি আইন প্রতিষ্ঠা
- ইসলামকে ব্যক্তিগত ধর্মে সীমাবদ্ধ করে রাখা
পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোতে নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি দল হয়তো অভ্যন্তরীণভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য করবে, আরেকটি দল বিদেশে মুসলিমদের ওপর বোমা ফেলবে—এখন কোনটি কম ক্ষতিকর? এই তুলনাই প্রমাণ করে যে বিষয়টি সম্পূর্ণ আপেক্ষিক ও খেয়ালনির্ভর, শরিয়াহনির্ধারিত নয়।
৬. পরাজিত মানসিকতা ও “রাজনৈতিক বাস্তবতা”
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক দিক তুলে ধরা প্রয়োজন, তা হলো — পরাজিত মানসিকতা
এই মানসিকতার বৈশিষ্ট্য হলো:
- ইসলামকে সম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসেবে বিশ্বাস না করা
- “রাজনৈতিক বাস্তবতা”কে চূড়ান্ত সত্য মনে করা
- কুফরি ব্যবস্থার ভেতরে জায়গা পাওয়াকেই সাফল্য ভাবা
কিন্তু রাসূল ﷺ এর সীরাত সম্পূর্ণ বিপরীত শিক্ষা দেয়। তিনি:
- কুরাইশের শাসন ভাগাভাগির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন
- আপসের বিনিময়ে ক্ষমতা গ্রহণ করেননি
- শর্তযুক্ত রাজনৈতিক সমর্থন গ্রহণ করেননি
ইসলাম কখনো “মন্দের ভালো” তথা “কম কুফর” চায় না; ইসলাম চায় কুফরের অবসান।
উপসংহার
“দুটি অনিষ্টের মধ্যে কম অনিষ্ট” নীতি একটি অত্যন্ত সীমিত, জরুরি ও শর্তসাপেক্ষ শর’ঈ নীতি। এটিকে গণতান্ত্রিক নির্বাচন, ভোট দেওয়া কিংবা কুফরি শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের বৈধতা দিতে ব্যবহার করা—একটি স্পষ্ট অপপ্রয়োগ।
শরিয়াহ আমাদের শিক্ষা দেয়:
- যতক্ষণ হারাম থেকে বাঁচা সম্ভব, ততক্ষণ হারাম বেছে নেওয়া বৈধ নয়
- রাজনৈতিক সুবিধা বা ভয় শর’ঈ ওজর নয়
- ইসলাম আপসের মাধ্যমে নয়, আদর্শের মাধ্যমে পরিবর্তন আনে
অতএব মুসলিমদের দায়িত্ব হলো—এই বিভ্রান্তিকর যুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে ইসলামের নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও সমাধানের দিকে ফিরে যাওয়া।
আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ ۖ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ ۚ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের চিন্তা কর। তোমরা যখন সৎপথে রয়েছ, তখন কেউ পথভ্রান্ত হলে তাতে তোমাদের কোন ক্ষতি নাই। তোমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। তখন তিনি তোমাদেরকে বলে দেবেন, যা কিছু তোমরা করতে। [আল-মায়েদা ৫:১০৫]
অডিও ভার্শন:
ইসলাম ও কুফরের মধ্যকার সংগ্রাম | ১ম অধ্যায়

কিভাবে খিলাফত ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়
১ম অধ্যায়: ইসলাম ও কুফরের মধ্যকার সংগ্রাম
ইসলামী চিন্তাধারা ও কুফরি চিন্তাধারার মধ্যে এবং মুসলিম ও কাফিরদের মধ্যে তীব্র সংগ্রাম ইসলামের সূচনা লগ্ন থেকেই চলে আসছে। যখন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে প্রেরণ করা হলো, তখন এই সংগ্রামটি ছিল কেবল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম, এবং এর সাথে কোনো বস্তুগত সংগ্রাম জড়িত ছিল না। এই অবস্থা মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত বজায় ছিল, এরপর সেনাবাহিনী ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তখন থেকে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বস্তুগত সংগ্রামের সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামকে একত্রিত করেন। জিহাদের আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয় এবং সংগ্রাম চলতে থাকে। কেয়ামত আসা পর্যন্ত এবং আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) পৃথিবী ও তার উপর যা কিছু আছে তার উত্তরাধিকারী হওয়া পর্যন্ত এইভাবেই—বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের পাশাপাশি একটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম—চলতে থাকবে। একারণেই কুফর ইসলামের শত্রু, এবং একারণেই কাফিররা মুসলিমদের শত্রু থাকবে, যতক্ষণ এই পৃথিবীতে ইসলাম ও কুফর থাকবে, মুসলিম ও কাফির থাকবে, যতক্ষণ না সকলকে পুনরুত্থিত করা হয়। এটি একটি চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় সত্য। তাই এই বিষয়টি সম্পর্কে মুসলিমদের সারা জীবন সর্বদা স্পষ্ট ধারণা থাকা উচিত এবং ইসলাম ও কুফরের মধ্যে এবং মুসলিম ও কাফিরদের মধ্যে সম্পর্ক বিচার করার জন্য এটিকে একটি মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
বিশুদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম তেরো বছর ধরে চলেছিল। এটি ছিল সবচেয়ে কঠিন ও ভয়ংকর সংগ্রাম। অবশেষে ইসলামী চিন্তাধারা কুফরি চিন্তাধারাকে পরাজিত করে এবং আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) ইসলামকে বিজয়ী করেন। যে রাষ্ট্র মুসলিমদের সম্মান রক্ষা করে, ইসলামের ঢাল হিসেবে কাজ করে এবং জিহাদের মাধ্যমে মানুষের মাঝে হেদায়েত ছড়িয়ে দেয়, তা মদিনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
ইসলাম ও কুফরের মধ্যে এবং মুসলিম ও কাফির সেনাবাহিনীর মধ্যে একের পর এক যুদ্ধে সবচেয়ে ভয়াবহ ও কঠিন যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই সমস্ত যুদ্ধে বিজয় মুসলমানদেরই হয়েছিল। যদিও মুসলমানরা কিছু যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল, তবুও তারা সর্বদা যুদ্ধে জয়লাভ করেছিল এবং ছয় শতাব্দী ধরে তারা কোনো যুদ্ধে হারেনি, বরং সেই সময়ে তাদের সমস্ত যুদ্ধে বিজয়ী ছিল। পুরো এই সময়কাল জুড়ে ইসলামী রাষ্ট্রই ছিল শীর্ষস্থানীয় জাতি। মুসলমানদের ছাড়া মানবজাতির ইতিহাসে এমনটি আর কখনও ঘটেনি, বরং এটি কেবল ইসলামী রাষ্ট্রের জন্যই নির্দিষ্ট ছিল। তবে অবিশ্বাসীরা, বিশেষ করে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো ইসলাম সম্পর্কে সচেতন ছিল, কারণ তারা এর উপর আক্রমণ করতে চেয়েছিল এবং তারা মুসলমানদের সম্পর্কেও সচেতন ছিল, কারণ তারা তাদের অস্তিত্বকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। সুযোগ পেলেই তারা মুসলমানদের উপর আক্রমণ করার বা তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার চেষ্টা করত। হিজরি ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ (খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দী) এবং হিজরি সপ্তম শতাব্দীর শুরুর (খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দী) মধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলো ইসলামী রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার সেই অবস্থাটি উপলব্ধি করেছিল, যেখানে রাষ্ট্রের দেহ থেকে প্রদেশগুলো খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাচ্ছিল এবং কিছু ওয়ালি (শাসক) সশস্ত্র বাহিনী, অর্থ, ক্ষমতা এবং এই জাতীয় অভ্যন্তরীণ নীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে স্বাধীন হয়ে পড়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, এটি একটি একক ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রের পরিবর্তে রাজ্যগুলোর একটি ফেডারেশনের মতো হয়ে গিয়েছিল। কিছু প্রদেশে খলিফার কর্তৃত্ব কেবল মিম্বরে তার জন্য দোয়া করা, তার নামে মুদ্রা তৈরি করা এবং খারাজ থেকে তাকে কিছু অর্থ পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো এটি বুঝতে পেরেছিল, তাই তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড প্রেরণ করে এবং যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে মুসলমানরা পরাজিত হয় এবং কাফিররা পুরো আল-শাম অঞ্চল দখল করে নেয়: ফিলিস্তিন, লেবানন এবং সিরিয়া। তারা কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলগুলো দখল করে রেখেছিল, এমনকি ত্রিপোলির মতো কিছু এলাকা একশ বছর ধরে তাদের দখলে ছিল।
যদিও ক্রুসেডার এবং মুসলমানদের মধ্যে যুদ্ধগুলো শত বছর ধরে অবিরাম চলছিল, এবং যদিও ক্রুসেডারদের দ্বারা বিজিত ভূমিগুলো পুনরুদ্ধার করার জন্য মুসলমানদের প্রচেষ্টা থেমে যায়নি, তবুও এই যুদ্ধগুলো ইসলামী উম্মাহকে অস্থির করে তুলেছিল এবং ইসলামী রাষ্ট্রের মর্যাদা হ্রাস করেছিল। মুসলমানরা যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল এবং কাফিরদের হাতে পরাস্ত হয়েছিল। যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফিরদের বিজয় হয়েছিল। যদিও ইসলাম বনাম কুফরের বিজয়, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বা আধ্যাত্মিকভাবে, কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি, তবুও মুসলমানদের উপর যে লজ্জা ও অপমান নেমে এসেছিল তা ছিল কল্পনাতীত। সুতরাং, ক্রুসেডের যুগকে মুসলমানদের জন্য পরাজয়ের যুগ হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ আল-শাম থেকে ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করে শেষ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করা সত্ত্বেও, তারা অবিশ্বাসীদের সাথে বিজয় অভিযান ও যুদ্ধ চালিয়ে যায়নি। ক্রুসেড শেষ হওয়ার পরপরই মোঙ্গলরা এসে পড়ে এবং বাগদাদের গণহত্যা সংঘটিত হয়। এই বিপর্যয়ের পরপরই একই বছরে (৬৫৬ হিজরি, ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ) মোঙ্গলদের হাতে দামেস্কের পতন ঘটে। এরপর ১২৬০ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর আইন জালুতের যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যেখানে মোঙ্গলরা ধ্বংস হয়। মোঙ্গলদের ধ্বংসের পর মুসলমানদের অন্তরে জিহাদের আবেগ জেগে ওঠে এবং তারা বিশ্বে দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার কাজ পুনরায় শুরু করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ফলে, কাফিরদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় অভিযান আবারও শুরু হয় এবং বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে জিহাদ পুনরায় শুরু করা হয়। যুদ্ধ শুরু হয় এবং একের পর এক বিজয় অর্জিত হতে থাকে। হিজরি সপ্তম শতাব্দীর (খ্রিস্টীয় ১৩শ শতাব্দী) দিকে ইসলামী উম্মাহ পুনরায় বিজয় অভিযান শুরু করে। যুদ্ধ চলতে থাকে এবং বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়, এবং মুসলমানরা সর্বদা বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়, কারণ যদিও মুসলমানরা কিছু যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল, তারা যুদ্ধগুলো জিতত এবং ভূমি জয় করত। ইসলামী রাষ্ট্র ছিল অগ্রণী জাতি এবং এটি হিজরি ১২শ শতাব্দীর মাঝামাঝি (খ্রিস্টীয় ১৮শ শতাব্দী) পর্যন্ত চার শতাব্দী ধরে শীর্ষস্থান দখল করে রেখেছিল। এরপর ইউরোপে শিল্প বিপ্লব এক অসাধারণভাবে আবির্ভূত হয়, যা রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এই বিপ্লবের ফলে মুসলমানরা নিষ্ক্রিয় ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল, ফলে বিশ্বে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তিত হয় এবং ইসলামী রাষ্ট্র ধীরে ধীরে শীর্ষস্থান থেকে পতনের দিকে ধাবিত হতে শুরু করে, অবশেষে তা লোভীদের কাঙ্ক্ষিত বস্তুতে পরিণত হয়। ফলে, তারা তাদের বিজিত ভূমি এবং পূর্বে তাদের অধীনে থাকা অঞ্চলগুলো থেকে সরে যেতে শুরু করে। অবিশ্বাসী দেশগুলো তাদের কাছ থেকে ইসলামের ভূমি খণ্ড খণ্ড করে দখল করতে শুরু করে, এবং এটিই ছিল মুসলমানদের জন্য উত্থানের সমাপ্তি ও পতনের সূচনা। তখন থেকেই ইউরোপীয় দেশগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে ইসলামী রাষ্ট্রকে অপসারণ এবং জীবনের সকল ক্ষেত্র ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক থেকে ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলার দিকে মনোযোগ দেয়। অন্য কথায়, তারা একটি নতুন ক্রুসেড অভিযানের কথা ভাবতে শুরু করে। তবে প্রথম ক্রুসেডের মতো নয়, নতুন ক্রুসেডগুলো মুসলমানদের পরাজিত করতে এবং ইসলামী রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার জন্য নিছক একটি সামরিক আক্রমণের চেয়েও বেশি কিছু ছিল। নতুন ক্রুসেডগুলো ছিল আরও ভয়াবহ এবং এর পরিণতি ছিল আরও সুদূরপ্রসারী। এগুলো এমনভাবে পরিকল্পিত হয়েছিল যাতে ইসলামী রাষ্ট্রকে সমূলে উৎপাটিত করা যায়, তার কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট না থাকে এবং তার একটি শিকড়ও যেন আর গজাতে না পারে। এগুলো মুসলমানদের অন্তর থেকে ইসলামকে উপড়ে ফেলার জন্যও পরিকল্পিত হয়েছিল, যাতে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও আধ্যাত্মিক রীতিনীতি ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট না থাকে।
অডিও ভার্শন:
জিলবাব ও মুসলিম নারীর পোশাকবিধি

ইসলামী আইনের উৎসসমূহ
ইসলামী আইনের প্রধান উৎস হলো কুরআন ও সুন্নাহ। কুরআন — যা মুসলমানদের কাছে পবিত্র গ্রন্থ — এতে প্রায় ৫০০টি আয়াত রয়েছে, যা বিভিন্ন বিষয়ে আইনি গুরুত্ব বহন করে। সুন্নাহ বলতে বোঝায় নবী মুহাম্মদ ﷺ–এর বাণী, কাজ ও অনুমোদনের বর্ণনাসমূহের সংকলন। সুন্নাহর ভূমিকা হলো কুরআনের নির্দেশনাগুলোকে ব্যাখ্যা ও বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা। এই দুটি মূল উৎস থেকে আরও কিছু গৌণ উৎস নির্ধারিত হয়েছে, যেমন ইজমা (আইনগত ঐকমত্য), কিয়াস (তুলনামূলক যুক্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ) এবং আরও কিছু বিতর্কিত উৎস, তবে এগুলো বর্তমান আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক নয়।
ইসলামী পোশাকবিধির ধারণা
ইসলামী আইন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ও সামাজিক আচরণ—উভয় ক্ষেত্রেই একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান উপস্থাপন করে। এরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পোশাক ও সাজসজ্জা সংক্রান্ত বিধান। এই পোশাকবিধান নারী ও পুরুষ—উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। যেমন, একজন পুরুষের জন্য নির্দিষ্ট অংশ শরীর ঢেকে রাখা ফরজ। পাশাপাশি তার জন্য স্বর্ণ ও রেশম পরিধান নিষিদ্ধ, যা নারীদের জন্য অনুমোদিত। অন্যদিকে, নারীদের জন্য পরিবারের বাইরে বের হলে দেহের নির্দিষ্ট অংশ আবৃত রাখা বাধ্যতামূলক; এর মধ্যে রয়েছে মাথা ঢাকার কাপড় (খিমার) এবং বাহ্যিক পোশাক (জিলবাব), যা পুরুষদের জন্য আবশ্যক নয়। অতএব, জিলবাব কোনো নতুন উদ্ভাবন নয়; বরং এটি মুসলিম নারীদের সুপরিচিত ও প্রাচীন পোশাকবিধানেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শরীয়ায় জিলবাবের স্পষ্ট উল্লেখ:
নারীদের জন্য জিলবাব পরিধানের বিধান সরাসরি কুরআন থেকেই প্রমাণিত। সূরা আল-আহযাব এ আল্লাহ তা’আলা নবী মুহাম্মদ ﷺ-কে উদ্দেশ্য করে বলেন:
“হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের, তোমার কন্যাদের এবং মুমিন নারীদের বলে দাও—তারা যেন নিজেদের উপর তাদের জিলবাব টেনে দেয়। এতে তারা সহজে চিহ্নিত হবে এবং তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [২]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত এই আয়াতে নারীদের জিলবাব পরিধানের উল্লেখ করা হয়েছে,যাতে — তারা শালীনভাবে আবৃত থাকে এবং অসৎ ও চরিত্রহীন লোকদের কটূক্তি ও অপমান থেকে রক্ষা পায়।
জিলবাবের বাধ্যবাধকতা নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর সুন্নাহ থেকেও প্রমাণিত, যা মুসলমানদের জন্য আইনের দ্বিতীয় প্রধান উৎস।
উম্মে আতিয়্যা (রা.) বর্ণনা করেন:
আমাদেরকে আদেশ দেওয়া হতো — ঈদের দিনে ঋতুবতী নারী ও পর্দানশীল নারীদেরও ঈদের সমাবেশ ও মুসলমানদের দোয়া-মুনাজাতে উপস্থিত করতে। তবে ঋতুবতী নারীরা নামাজের স্থানে (মুসাল্লায়) যাবে না। তখন এক নারী জিজ্ঞেস করল, “হে আল্লাহর রাসূল! যার কাছে জিলবাব নেই, তার কী হবে?” তিনি বললেন, “সে যেন তার সখীর কাছ থেকে একটি জিলবাব ধার নেয়।” [৩]
উপরোক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার সময় নারীদের বাস্তব আচরণ থেকেও এই বিধানের প্রয়োগ স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, যেমন: নিচের বর্ণনাগুলোতে দেখা যায়:
উম্মে সালামা (রা.)—বর্ণনা করেন:
যখন এই আয়াত নাযিল হলো—“তারা যেন নিজেদের উপর তাদের জিলবাব টেনে দেয়”—তখন আনসার নারীরা এমনভাবে বাইরে বের হলেন, যেন তাদের মাথার উপর কাক বসে আছে (অর্থাৎ সম্পূর্ণভাবে আবৃত অবস্থায় জিলবাব পরিধান করে)। [৪]
আয়িশা (রা.)—বর্ণনা করেন:
রিফা‘আ আল-কুরাযির স্ত্রী আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে এলেন, তখন আমি সেখানে বসা ছিলাম… এবং তিনি তার জিলবাবের কিনারা দেখাচ্ছিলেন। [৫]
কুরআনের ব্যাখ্যাকারক (মুফাসসির) আলেমদের মতামত
কুরআনের প্রাচীন ও খ্যাতনামা তাফসিরকারকগণ সবাই জিলবাবের শরঈ বৈধতা ও বাধ্যবাধকতাকে সমর্থন করেছেন। পার্থক্য কেবল এ বিষয়ে—এটি মুখমণ্ডল ঢাকাকেও অন্তর্ভুক্ত করে কি না!
নিচে সুন্নি মুসলিমদের সবচেয়ে স্বীকৃত তাফসির গ্রন্থসমূহ থেকে কিছু উদ্ধৃতি দেওয়া হলো:
ইবন জারির আত-তাবারি (মৃ. ৩১০ হি.) বলেন:
“আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী মুহাম্মদ ﷺ-কে বলেছেন—তুমি তোমার স্ত্রীদের, কন্যাদের এবং মুমিন নারীদের বলে দাও যেন তারা নিজেদের উপর তাদের জিলবাব টেনে নেয়।”
আল-কুরতুবি (মৃ. ৬৭১ হি.) বলেন:
“জালাবীব হলো জিলবাবের বহুবচন। এটি খিমার (মাথা ঢাকার কাপড়)-এর চেয়েও বড় একটি পোশাক। ইবন আব্বাস ও ইবন মাসউদের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে—এটি একটি রিদা (বড় চাদর)। কেউ কেউ বলেন এটি নেকাব বা পর্দা; তবে সঠিক মত হলো—এটি এমন একটি পোশাক যা পুরো শরীর আবৃত করে। সহিহ মুসলিমে উম্মে আতিয়্যা (রা)-এর হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যেখানে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল! যার কাছে জিলবাব নেই, তার কী হবে?’ তিনি উত্তর দেন: ‘সে তার সাথীর জিলবাব ধার নিক।’”
ফখরুদ্দীন আর-রাজি (মৃ. ৬০৬ হি.) বলেন:
“জাহিলিয়াতের যুগে স্বাধীন নারী ও দাসী উভয়েই অনাবৃত অবস্থায় বাইরে যেত এবং ব্যভিচারপ্রবণ লোকেরা তাদের পিছু নিত; ফলে তাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া হতো। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা স্বাধীন নারীদের জিলবাব পরিধানের নির্দেশ দিয়েছেন।” [৮]
ইবন কাসির (মৃ. ৭৭৪ হি.) বলেন:
“আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল মুহাম্মদ ﷺ-কে নির্দেশ দেন—তিনি যেন মুমিন নারীদের, বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী ও কন্যাদের, নিজেদের উপর জিলবাব টেনে নিতে আদেশ করেন।” [৯]
আধুনিক যুগের একটি প্রসিদ্ধ সংকলিত তাফসির গ্রন্থ সাফওয়াতুত তাফাসির, যার রচয়িতা মুহাম্মদ আলি আস-সাবুনি, সেখানে বলা হয়েছে—সূরা আহযাবের ৫৯ নম্বর আয়াতে নবী ﷺ-কে বলা হয়েছে যেন তিনি নারীদের জানান যে, তারা একটি প্রশস্ত বাহ্যিক পোশাক পরিধান করবে। [১০] এটি ঐতিহ্যবাহী সুন্নি আলেমদের সর্বসম্মত মত।
এই মত কেবল সুন্নিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ইমামি শিয়া আলেমদের মধ্যেও একই দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান:
আল-জানাবিজি বলেন:
“নারীরা তাদের জিলবাব দিয়ে মুখ ও বুক ঢাকত না। তাই আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জিলবাব দিয়ে মুখ ও বুক ঢাকার নির্দেশ দেন, যেন তারা অন্য নারীদের থেকে পৃথকভাবে চিহ্নিত হয়। নারীর জিলবাব হলো সাধারণ পোশাকের উপর পরিধেয় একটি প্রশস্ত পোশাক…” [১১]
সমকালীন আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি
প্রাচীন (ক্লাসিক্যাল) আলেমদের মতে জিলবাব ফরজ—এই অবস্থানটি সমকালীন আলেমদের মধ্যেও সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। প্রাচীন আলেমদের মতোই সমকালীন আলেমদের মতপার্থক্য মূলত একটি বিষয়েই সীমাবদ্ধ—জিলবাব কি মুখমণ্ডল ঢাকাকে অন্তর্ভুক্ত করে, নাকি করে না। তবে জিলবাবের শর্ত ও মৌলিক ধারণা নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই।
সমকালীন দৃষ্টিভঙ্গির একটি প্রতিনিধিত্বমূলক উদাহরণ হিসেবে দেওবন্দি আলেম মুফতি ইবন আদম আল-কাউসারি বলেন:
“উপরোক্ত ব্যাখ্যা ও অন্যান্য ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট হয় যে, জিলবাব হলো এমন একটি বাহ্যিক পোশাক যা নারীকে অপরিচিত পুরুষদের সামনে বের হওয়ার সময় পরিধান করতে হয়। এই পোশাকটি প্রশস্ত, ঢিলেঢালা, শালীন এবং সম্পূর্ণ শরীর আবৃতকারী হতে হবে।”
শাইখ মুহাম্মদ আল-হানূতি বলেন:
“সূরা আল-আহযাবের ৫৯ নম্বর আয়াত একজন নারীকে জিলবাব পরিধানে উদ্বুদ্ধ করে। জিলবাব বলতে বোঝায় তার অভ্যন্তরীণ পোশাকের উপর পরিধেয় বাহ্যিক পোশাক, যার মাধ্যমে তার শরীরের সবকিছু আবৃত থাকে এবং দেহের আকৃতি প্রকাশ পায় না। এটিই শরিয়তের উদ্দেশ্য।”
জিলবাব কী?
জিলবাব হলো এমন একটি বাহ্যিক পোশাক, যা সম্পূর্ণ শরীর ঢেকে রাখে। এই সংজ্ঞাটি ভাষাগত (lexical) এবং পাঠগত (textual)—উভয় ভিত্তিতেই নির্ধারিত।
ভাষাগত দিক থেকে জিলবাবের সংজ্ঞা (বাহ্যিক পোশাক হিসেবে):
প্রাচীন আরবি অভিধানসমূহে “জিলবাব” শব্দের ব্যাখ্যা থেকে এর প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এসব উৎসে জিলবাবকে একটি বাহ্যিক পোশাক হিসেবেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ইবনে মানযূর বলেন:
“জিলবাব হলো বাহ্যিক পোশাক, চাদর বা আলখাল্লা। এটি ‘তাজাল্লাবাবা’ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো পোশাক পরিধান করা। জিলবাব এমন একটি বাহ্যিক কাপড় বা আবরণ, যা নারী তার অন্যান্য পোশাকের উপর জড়িয়ে নেয়—মাথা থেকে পা পর্যন্ত নিজেকে আবৃত করার জন্য। এটি সম্পূর্ণভাবে তার দেহ আড়াল করে।” [১২]
আল-ফাইরূজ আবাদি বলেন:
“জিলবাব হলো এমন বস্তু, যা ঢাকনার মতো করে ভেতরের পোশাকগুলোকে আচ্ছাদিত করে।” [১৩]
আধুনিক অভিধানগুলোর মধ্যেও ১৯শ শতকের প্রখ্যাত ব্রিটিশ ভাষাবিদ এডওয়ার্ড উইলিয়াম লেন-এর Arabic–English Lexicon উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন:
“জিলবাব: … এমন একটি পোশাক যা পুরো শরীরকে আবৃত করে; এটি নারীর জন্য একটি প্রশস্ত পোশাক, যা মিলহাফা (বড় চাদর)-এর চেয়ে কিছুটা ছোট; অথবা এমন একটি পোশাক, যার মাধ্যমে নারী তার অন্যান্য পোশাকের উপর আবরণ দেয়…” [১৪]
একই সংজ্ঞা পাওয়া যায় জন এল. এসপোসিতো সম্পাদিত Oxford Dictionary of Islam-এ:
“জিলবাব: আরব সমাজে ইসলাম-পূর্ব ও ইসলাম-পরবর্তী যুগে নারীদের বাহ্যিক পোশাকের একটি সাধারণ নাম (শাল, চাদর, আবরণ)। কুরআনের (৩৩:৫৯) আয়াতে মুসলিম নারীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—তারা যেন নিজেদের উপর আবরণ টেনে নেয়, যা সামাজিক মর্যাদার পরিচয় এবং জনসমক্ষে যৌন হয়রানি থেকে রক্ষার একটি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা।” [১৫]
শর’ঈ (textual) দিক থেকে জিলবাবের সংজ্ঞা:
জিলবাব যে একটি বাহ্যিক পোশাক—এই সিদ্ধান্ত কেবল ভাষাগত নয়; বরং কুরআন ও রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ থেকেও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত।
কুরআনের সূরা নূর (২৪:৬০)-এ বয়স্ক নারীদের জন্য একটি বিশেষ রুখসত (ছাড়) উল্লেখ করা হয়েছে:
“আর যারা সন্তান ধারণের বয়স অতিক্রম করেছে এবং বিয়ের আশা রাখে না—তাদের জন্য কোনো গুনাহ নেই যদি তারা তাদের বাহ্যিক পোশাক খুলে রাখে, শর্ত হলো তারা যেন নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তবে সংযম অবলম্বন করাই তাদের জন্য উত্তম। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
এখানে যে পোশাক খুলে রাখার কথা বলা হয়েছে, তা অবশ্যই বাহ্যিক পোশাক। কারণ সাধারণ দৈনন্দিন পোশাক খুলে রাখার অনুমতি দেওয়া হতে পারে না। এ কারণেই নবী ﷺ-এর সাহাবিগণ—যেমন ইবন আব্বাস (রাঃ) ও ইবন মাসউদ (রাঃ)—এই পোশাককে জিলবাব হিসেবেই বুঝেছেন। তাঁরা উভয়েই কুরআনের তাফসিরে বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃত। [১৬]
সুন্নাহ থেকে প্রমাণ:
উম্মে আতিয়্যা (রাঃ)-এর পূর্বে বর্ণিত হাদিস থেকেও স্পষ্ট বোঝা যায় যে,
জিলবাব একটি বাহ্যিক পোশাক। নবী ﷺ স্পষ্টভাবে বলেছেন—নারী বাইরে বের হওয়ার আগে অবশ্যই জিলবাব পরিধান করবে; আর যার কাছে নেই, সে যেন অন্যের কাছ থেকে ধার করে নেয়। [১৭]
এ থেকে বোঝা যায়—জিলবাব ছাড়া বাইরে যাওয়া অনুমোদিত নয় এবং এটি স্বতন্ত্র একটি বাহ্যিক পোশাক।
আবু দাউদ-এ উম্মে সালামা (রা.)—নবী ﷺ-এর স্ত্রী—থেকে বর্ণিত একটি হাদিসও এ বিষয়টি স্পষ্ট করে। তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন:
“একজন নারী কি ইজার (এক ধরনের জিলবাব) ছাড়া শুধু লম্বা জামা ও মাথার ওড়না পরে নামাজ পড়তে পারে?” নবী ﷺ উত্তরে বলেন: “যদি লম্বা জামাটি যথেষ্ট প্রশস্ত হয় এবং তার পায়ের উপরিভাগ ঢেকে রাখে।”
উম্মে সালামা (রা.)-এর এই প্রশ্ন থেকেই বোঝা যায়—ইজার বা জিলবাব সাধারণ পোশাকের উপরেই পরিধান করা হতো।
সাহাবিদের বক্তব্যও একই বিষয়কে সমর্থন করে। যেমন, উমর (রা.) বলেন:
“নারী তিনটি পোশাক পরে নামাজ আদায় করবে—লম্বা জামা, মাথার ওড়না এবং ইজার (জিলবাব)।”
তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.) বলেন:
“নারী লম্বা জামা, মাথার ওড়না এবং মিলহাফা (জিলবাব) পরে নামাজ আদায় করবে।” [২০]
ফিকহবিদদের মতামত
এইসব বর্ণনার ভিত্তিতেই আল-শিরাজি বলেন:
“নারীর জন্য নামাজে তিনটি পোশাক পরিধান করা মুস্তাহাব—একটি মাথার ওড়না, একটি জামা যা শরীর ও পা ঢাকে, এবং একটি মিলহাফা (জিলবাব), যা তার পোশাকের উপর আবরণ হবে… এবং জিলবাবটি মোটা হওয়া উচিত, যাতে তা শরীরের আকৃতি প্রকাশ না করে এবং রুকু-সিজদার সময় সরে না যায়।”
ইমাম আন-নববি (রহ.)—যিনি আল-শিরাজির মুহাযযাব গ্রন্থের ব্যাখ্যাকার—এই মতকে ইমাম শাফেয়ির সঙ্গে সম্পৃক্ত করে বলেন:
“এই বিধান ইমাম শাফেয়ি উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর মাযহাবের আলেমরা এ বিষয়ে একমত।”
তিনি আরও বলেন:
“জিলবাব হলো এমন একটি চাদর, যা পোশাকের উপর পরিধান করা হয়—এটাই সঠিক মত এবং ইমাম শাফেয়ির মত।” [২২]
ইবনে হাযম তাঁর আল-মুহাল্লা গ্রন্থে বলেন:
“নবী ﷺ-এর যুগের আরবি ভাষায় জিলবাব বলতে বোঝায় এমন একটি বাহ্যিক পোশাক, যা সম্পূর্ণ শরীর ঢেকে দেয়। যে কাপড় পুরো শরীর ঢাকতে পারে না, তাকে কখনোই জিলবাব বলা যায় না।” [২৩]
অতএব, জিলবাব যে একটি বাহ্যিক পোশাক—এই বিষয়টি কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবিদের ব্যাখ্যা এবং প্রাচীন ও আধুনিক আলেমদের সর্বসম্মত মতের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত।
অন্যান্য শর্তাবলি
জিলবাবের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়—এমন কিছু শর্তও রয়েছে, যা নারীরা মাহরাম নন এমন পুরুষদের সামনে (যাদের সঙ্গে বিবাহ বৈধ নয়) ঘরের ভেতরে বা বাইরে উপস্থিত হলে তাদের সকল পোশাকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। শর্তগুলো হলো—
- পোশাক ঢিলেঢালা হতে হবে
- আধা-স্বচ্ছ বা স্বচ্ছ হওয়া চলবে না
- দৃষ্টি আকর্ষণকারী হওয়া যাবে না (তাবাররুজ)
- পুরুষদের পোশাকের সঙ্গে সাদৃশ্য থাকা যাবে না
এই শর্তগুলো সুপরিচিত ও সর্বস্বীকৃত। তাই এখানে এগুলোর বিস্তারিত প্রমাণ আলোচনার প্রয়োজন নেই। এ বিষয়ে আরও জানতে চাইলে ইসলামী ফিকহের প্রাসঙ্গিক গ্রন্থসমূহ দেখা যেতে পারে। [২৪]
সালওয়ার-কামিজ কি যথেষ্ট?
এখানে মূল প্রশ্ন হলো—সালওয়ার-কামিজ কি জিলবাবের মৌলিক শর্তগুলো পূরণ করে? অর্থাৎ, এটি কি এমন একটি ঢিলেঢালা বাহ্যিক পোশাক, যা পুরো শরীর আবৃত করে?
সাধারণভাবে সালওয়ার-কামিজ পুরো শরীর ঢাকে না; অনেক সময় শরীরের কিছু অংশ খোলা থাকে এবং এটি সবসময় ঢিলেঢালাও হয় না। এমনকি যদি ঢিলেঢালা ও আবৃত হওয়ার শর্ত পূরণও করা হয়, তবুও এটি বাহ্যিক পোশাক (outer garment) নয়। সালওয়ার-কামিজ সাধারণত দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের দৈনন্দিন পোশাক—যা ঘরের ভেতরে পরা হয়।
সংজ্ঞাগতভাবে বাহ্যিক পোশাক হলো—যা ঘরের পোশাকের উপর পরিধান করে বাইরে যাওয়ার সময় ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সালওয়ার-কামিজ নিজেই ঘরের স্বাভাবিক পোশাক। অতএব, অন্যান্য শর্ত আলোচনায় যাওয়ার আগেই এটি প্রথম ও মৌলিক শর্ত—বাহ্যিক পোশাক হওয়া—এই মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয় না।
শালীন পোশাক পরাই কি জিলবাবের শর্ত পূরণ করে?
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে—শালীন পোশাক বলতে আমরা কী বুঝি—তার ওপর। যদি শালীনতার সংজ্ঞার মধ্যে উপরে উল্লিখিত শর্তগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে উত্তর ভিন্ন হতে পারে।
এটি সত্য যে বাহ্যিক পোশাকের নকশা বা রূপ একরকম হওয়া জরুরি নয়; তবে সেগুলোকে অবশ্যই ইসলামী শরিয়ত নির্ধারিত শর্তগুলো পূরণ করতে হবে। শালীনতা কোনো ব্যক্তির নিজস্ব বা ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার বিষয় নয়; বরং এর জন্য সুস্পষ্ট নিয়ম নির্ধারিত আছে। শালীনতা এসব শর্তের ঊর্ধ্বে যেতে পারে না; বরং এগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করেই শালীনতা পূর্ণতা পায়।
অতএব, শুধু পুরো শরীর ঢাকলেই যথেষ্ট নয়—যদি পোশাকটি আঁটসাঁট হয়। আবার শুধু ঢিলেঢালা হলেই চলবে না—যদি তা বাহ্যিক পোশাক না হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাহ্যিক পোশাক বিভিন্ন রূপে হতে পারে—শর্ত হলো, প্রতিটি নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে হবে।
ইসলামী আইনগত মতভেদ ও একজন মুসলমান:
যারা ইসলামী আইনের সঙ্গে পরিচিত নন, তারা প্রায়ই অবাক হন—কেন কিছু মুসলিম এমন একটি বিধান অনুসরণ করেন, যা অন্য মুসলিমরা অনুসরণ করেন না। ফলে তারা মনে করেন—যিনি এই বিধান মানছেন, তিনি হয়তো অতিরিক্ত কঠোর বা চরমপন্থী।
বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। যেমন—কোনো নির্দিষ্ট আলেম একটি পোশাককে বৈধ বলেছেন—এর অর্থ এই নয় যে অন্যরা সেই মত অনুসরণ করতে বাধ্য, এমনকি অনুমতিপ্রাপ্তও। ইসলামী আইন একটি সমৃদ্ধ আইনব্যবস্থা, যেখানে আলেমদের মধ্যে বিস্তারিত বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো—যে আলেমকে তিনি সবচেয়ে যোগ্য, বিশ্বস্ত ও জ্ঞানী মনে করেন—তার ফতোয়া অনুসরণ করা।
এখানে নিজস্ব সুবিধা বা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা মানদণ্ড নয়; বরং তা আলেমের যোগ্যতা ও প্রজ্ঞা। একবার কোনো ব্যক্তি আন্তরিকভাবে একটি ফতোয়া অনুসরণ করলে, সেটিই তার জন্য আল্লাহর বিধান হিসেবে গণ্য হয় এবং সামাজিক সমর্থন বা বিরোধিতার কারণে তা পরিবর্তন করা বৈধ নয়। কারণ, সেই বিধান অমান্য করা মানে একটি ধর্মীয় দায়িত্ব পরিত্যাগ করা—যার জবাব আখিরাতে দিতে হবে।
এই প্রসঙ্গে, কোনো মুসলিম নারী যদি কোনো নির্দিষ্ট আলেমের ব্যাখ্যা অনুযায়ী জিলবাব ফরজ মনে করেন, তবে অন্য ভিন্নমত থাকলেও তার জন্য সেই মত অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন—এই মতটিই সঠিক। এখানে প্রচলিত বা সুবিধাজনক মতের কোনো গুরুত্ব নেই। বিশেষ করে জিলবাবের বিষয়টি এমন একটি বিধান—যা শরিয়তের ভাষা ও আত্মা—উভয়ের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্রাচীন সুন্নি ও শিয়া আলেমদের মধ্যেও এটি কখনো বড় কোনো বিতর্কের বিষয় ছিল না।
ধর্মীয় দায়িত্ব নাকি রাজনৈতিক বক্তব্য?
জিলবাব মূলত এবং সর্বাগ্রে একটি ধর্মীয় দায়িত্ব। এর ভিত্তি এসেছে সরাসরি ইসলামী উৎস থেকে—আধুনিক মুসলিমদের রাজনৈতিক লেখালেখি থেকে নয়। প্রাচীন ফকিহগণ প্রায় এক হাজার বছর আগেই এর বাধ্যবাধকতা ব্যাখ্যা করেছেন—বর্তমান রাজনৈতিক ইসলামের উত্থানের বহু আগে।
অতএব, জিলবাব আজকের রাজনৈতিক বিতর্কের ফসল নয়। এটি পরিধানের প্রেরণা আসে ধর্মীয় দায়িত্ববোধ থেকে—রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার জন্য নয়। যদি কেউ জিলবাবকে রাজনৈতিক বা ফ্যাশনের প্রতীক হিসেবে পরে—ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে নয়—তবে তা ইবাদত হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না; বরং গুনাহ হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ আল্লাহর ইবাদতে গ্রহণযোগ্য একমাত্র উদ্দেশ্য হলো—খাঁটি আনুগত্য।
জিলবাব কি নিপীড়নের প্রতীক?
কিছু অমুসলিমের দৃষ্টিতে মুসলিম নারীর পোশাক নিপীড়নের প্রতীক। তাদের দাবি—জিলবাব নারীর নীচু মর্যাদার পরিচায়ক, এটি জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, অথবা এটি নারীর সামাজিক অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে।
পোশাকের বিধান নিয়ে এই দৃষ্টিভঙ্গী আল্লাহর প্রজ্ঞা কে বুঝতে না পারা বা এই হুকুম পালনের ইতিবাচক দিক বিবেচনা না করা থেকেও আসে নি বরং এমন চিন্তার উৎস হলো—কিছু মুসলিম পুরুষের দ্বারা নারীর ওপর সংঘটিত অপব্যবহার (যা ইসলাম নিজেই নিন্দা করে) অথবা ইসলামে নারীর ভূমিকা সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা। [২৫]
ইসলামী আইন আল্লাহর কাছে নারী ও পুরুষকে মর্যাদা ও তাকওয়ার দিক থেকে সমান মনে করে। বিধানের ভিন্নতা কোনো লিঙ্গবৈষম্য থেকে নয়; বরং নারী-পুরুষের স্বভাবগত পার্থক্যকে স্বীকার করার ফল। অধিকাংশ বিধান নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই এক; অল্প কিছু ক্ষেত্রে পার্থক্য এসেছে স্বভাবগত ভিন্নতার কারণে।
মুসলিম নারীরা জিলবাব পরিধান করেন জনজীবনে শালীনতা বজায় রাখার জন্য এবং তারা মনে করেন—এটি তাদের মর্যাদা হ্রাস করে না; বরং বৃদ্ধি করে। বাস্তব অভিজ্ঞতায় অনেক নারী দেখেন—জিলবাব পরিধানের মাধ্যমে তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ, শিক্ষা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন—পুরুষদের অশোভন দৃষ্টি ও অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আগ্রাসন থেকে মুক্ত থেকে। [২৬]
অতএব, সামাজিক অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার পরিবর্তে, জিলবাব বরং নারীর ক্ষমতায়ন ও স্বাধীনতাকে সহজ করে—একটি শালীন ও নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলে।
—–
পরিশিষ্ট–১:
মুফতি আল-কাউসারির ফতোয়া [২৭]
আল্লাহর নামে—যিনি পরম দয়ালু, পরম করুণাময়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের, কন্যাদের এবং মুমিন নারীদের বলে দাও—তারা যেন নিজেদের উপর তাদের বাহ্যিক পোশাক (জিলবাব) টেনে নেয়। এতে তারা পরিচিত হবে এবং তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আল-আহযাব: ৫৯)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে—নারীর জন্য জিলবাব দ্বারা নিজেকে আবৃত করা ফরজ। এখন প্রশ্ন আসে—জিলবাব কী?
লিসানুল আরব-এ বলা হয়েছে:
“জিলবাব (বহুবচন: জালাবীব) হলো বাহ্যিক পোশাক বা চাদর, যার মাধ্যমে নারী তার মাথা ও বুক ঢাকে। আরও বলা হয়েছে—এটি এমন একটি লম্বা চাদর, যা নারীকে সম্পূর্ণভাবে আবৃত করে।” (ইবন মানযূর)
ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন:
“জিলবাব হলো এমন একটি লম্বা চাদর, যা নারীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে দেয়।”
এই ব্যাখ্যাগুলো স্পষ্ট করে—জিলবাব হলো এমন একটি বাহ্যিক পোশাক, যা নারী অপরিচিত পুরুষদের সামনে বের হওয়ার সময় পরিধান করবে। এটি প্রশস্ত, ঢিলেঢালা, শালীন এবং সম্পূর্ণ শরীর আবৃতকারী হতে হবে।
এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর সাহাবি নারীরা এমনভাবে বাইরে বের হতেন—যেন তাদের মাথার উপর পাখি বসে আছে—অত্যন্ত সংযম ও শালীনতার সঙ্গে। তারা লম্বা কালো চাদর দিয়ে নিজেদের আবৃত করতেন।
অতএব, নারীর জন্য অপরিচিত পুরুষদের সামনে বের হওয়ার সময় ঢিলেঢালা ও শালীন বাহ্যিক পোশাক পরিধান করা আবশ্যক—তা বোরকা হোক বা অন্য কোনো উপযুক্ত পোশাক।
আর আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।
পরিশিষ্ট ২: আলেমদের জীবনী:
সমসাময়িক আলেমগণ:
মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনী: মক্কার শরিয়া ও ইসলামিক স্টাডিজ কলেজের একজন অধ্যাপক। তিনি ‘সাফওয়াত আত-তাফাসির’ গ্রন্থের লেখক (বৈরুত: দারুল কুরআন আল-কারিম, ১৪০২ হিজরি, ১৯৮১)।
মুফতি মুহাম্মদ ইবনে আদম আল-কাউসারি: মুফতি মুহাম্মদ ইবনে আদম আল-কাউসারি ব্রিটেনে ঐতিহ্যবাহী আলেমদের অধীনে ইসলামিক স্টাডিজের দারসে নিজামী পাঠ্যক্রম সম্পন্ন করেন, এরপর তিনি হাদিসে বিশেষীকরণ করেন, যেখানে তিনি হাদিসের ৯টি প্রধান গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন এবং পাকিস্তানে মুফতি তাকি উসমানী ও অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় আলেমদের অধীনে ফতোয়া প্রদানের বিজ্ঞানে ২ বছরের বিশেষীকরণ অর্জনের মাধ্যমে এটি সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি সিরিয়া যান, যেখানে তিনি আল-আজহার (কায়রো) থেকে উন্নত ফিকহে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন এবং শীর্ষস্থানীয় আরব আলেমদের অধীনে অধ্যয়ন করেন। এই আলেমদের মধ্যে একজন, শায়খ আবদ আল-লতিফ ফারফুর বলেছেন যে, মুফতি মুহাম্মদ ইবনে আদমের একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে এবং তিনি আমাদের সময়ের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আলেম হতে চলেছেন বলে মনে হয়। তিনি বর্তমানে লেস্টারের একটি দারুল উলুমে শিক্ষকতা করেন এবং দারুল ইফতাতে মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেন।[২৮]
শেখ মুহাম্মদ আল-হানুতি: জন্ম: ১২ মার্চ, ১৯৩৭, হাইফা, ফিলিস্তিন। শিক্ষা: তিনি তার পিতা শেখ আলী হানুতি থেকে শরিয়া শিক্ষা লাভ করেন এবং আল-আজহারে ১৯৫৩-১৯৫৮ সাল পর্যন্ত শেখ মুহাম্মদ সাঈদ আজ্জাওয়ীর কাছে হাদিস অধ্যয়ন করেন। পূর্ববর্তী পদসমূহ: ১৯৬২-১৯৬৫ সাল পর্যন্ত বাগদাদে ইমাম, শিক্ষক ও খতিব ছিলেন। ১৯৬৫-১৯৭৮ সাল পর্যন্ত কুয়েতে ইমাম, শিক্ষক ও খতিব ছিলেন। তিনি ১৯৭৮ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ইসলামিক কেন্দ্রের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যার মধ্যে নিউ জার্সির জার্সি সিটি এবং ভার্জিনিয়ার দার আল-হিজরাহ অন্তর্ভুক্ত। তিনি উত্তর আমেরিকান ফিকহ কাউন্সিলের একজন সদস্য।
শাস্ত্রীয় পণ্ডিতগণ:
ইবনে হাযম: জন্ম ৭ নভেম্বর, ৯৯৪, কর্ডোবা, কর্ডোবার খিলাফত; মৃত্যু ১৫ আগস্ট, ১০৬৪, মান্টা লিশাম, সেভিয়ার কাছে। পুরো নাম আবু মুহাম্মদ ‘আলী ইবনে আহমদ ইবনে সাঈদ ইবনে হাযম। ইসলামিক স্পেনের একজন মুসলিম সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ, আইনজ্ঞ এবং ধর্মতত্ত্ববিদ, যিনি তার সাহিত্যকর্মের প্রাচুর্য, জ্ঞানের বিশালতা এবং আরবি ভাষার উপর দক্ষতার জন্য বিখ্যাত। জাহিরি (আক্ষরিকতাবাদী) মাযহাবের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হিসেবে তিনি আইনশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় ৪০০টি গ্রন্থ রচনা করেন।[২৯]
ইবনে জারির আত-তাবারি (মৃ. ৩১০): জন্ম আনুমানিক ৮৩৯, আমোল, তাবারিস্থান [ইরান]; মৃত্যু ৯২৩, বাগদাদ, ইরাক। পুরো নাম আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারির আত-তাবারি। মুসলিম পণ্ডিত, যিনি প্রাথমিক ইসলামের ইতিহাস এবং কুরআনের ব্যাখ্যার উপর বিশাল সংকলন গ্রন্থের রচয়িতা এবং ৯ম শতাব্দীতে সুন্নি চিন্তাধারাকে সুসংহত করতে একটি স্বতন্ত্র অবদান রেখেছিলেন। প্রধান কর্মসমূহ: তার জীবনের কাজ শুরু হয়েছিল কুরআন ব্যাখ্যার মাধ্যমে এবং এরপর তিনি নবী ও রাজাদের ইতিহাস রচনা করেন। আত-তাবারি’র ইতিহাস এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে সামানিদ রাজপুত্র মনসুর ইবনে নূহ এটি ফারসি ভাষায় অনুবাদ করিয়েছিলেন (আনুমানিক ৯৬৩)।[৩০]
ফখর আদ-দীন আর-রাজি (মৃ. ৬০৬): জন্ম ১১৪৯, রায়, ইরান; মৃত্যু ১২০৯, হেরাতের কাছে, খোয়ারাজম। আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে উমর ইবনে আল-হুসাইন ফখর আদ-দীন আর-রাজি। মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিদ এবং পণ্ডিত, যিনি ইসলামের ইতিহাসে কুরআনের অন্যতম প্রামাণ্য ব্যাখ্যার রচয়িতা। তার আগ্রাসী মনোভাব এবং প্রতিহিংসাপরায়ণতা অনেক শত্রু তৈরি করেছিল এবং তাকে অসংখ্য ষড়যন্ত্রে জড়িত করেছিল। তবে তার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিভা সর্বজনীনভাবে প্রশংসিত হয়েছিল এবং মাফাতিহ আল-গায়ব বা কিতাব আত-তাফসীর আল-কবীর (অদৃশ্যের চাবিকাঠি” বা “বৃহৎ ব্যাখ্যা”) এবং মুহাসসাল আফকার আল-মুতাকাদ্দিমিন ওয়া-আল-মুতা’আখখিরিন (“প্রাচীন ও আধুনিকদের মতামতের সংগ্রহ”) এর মতো কাজের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হয়।[৩১] ইবনে কাসির (মৃ. ৭৭৪ হিজরি): ছিলেন একজন ইসলামী পণ্ডিত, যিনি ১৩০১ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ার বুসরা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সিরিয়ার দামেস্কে ইসলামী পণ্ডিত ইবনে তাইমিয়া এবং ইবনে আল-কাইয়্যিমের কাছে শিক্ষা লাভ করেন। ইবনে কাসির ‘তাফসিরে ইবনে কাসির’ নামে কুরআনের একটি বিখ্যাত তাফসীর রচনা করেন, যেখানে তিনি ব্যাখ্যার জন্য কুরআনের আয়াতগুলোর সাথে নির্দিষ্ট কিছু হাদিস বা মুহাম্মদের বাণী এবং সাহাবাদের বাণীকে সংযুক্ত করেছেন। তাফসিরে ইবনে কাসির সমগ্র ইসলামী বিশ্বে এবং পশ্চিমা বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে বিখ্যাত, এবং এটি বর্তমানে কুরআনের অন্যতম বহুল ব্যবহৃত ব্যাখ্যাগ্রন্থ।[৩২]
আন-নাওয়াভি (মৃ. ৬৭৬ হিজরি): (জন্ম ১২৩৩ – মৃত্যু ১২৭৮), ফিকহ ও হাদিস বিষয়ক লেখক, দামেস্কের কাছে নাওয়াতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আঠারো বছর বয়স থেকে এই শহরেই পড়াশোনা করেন এবং সেখানে ১২৫৩ সালে হজ করার পর ১২৬৭ সাল পর্যন্ত একজন স্বাধীন পণ্ডিত হিসেবে বসবাস করেন। এরপর তিনি আশরাফিয়া মাদ্রাসায় আবু শামা-র স্থলাভিষিক্ত হয়ে হাদিসের অধ্যাপক হন। তিনি তুলনামূলকভাবে অল্প বয়সে নাওয়াতে মারা যান এবং তিনি কখনো বিয়ে করেননি।[৩৩]
আল-কুরতুবি (মৃ. ৬৭১ হিজরি): ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে আবু বকর আল-আনসারি আল-কুরতুবি স্পেনের কর্ডোবায় জন্মগ্রহণ করেন, যা ছিল ইসলামী সভ্যতার স্বর্ণযুগের শীর্ষ সময়। তিনি একজন বিশিষ্ট মালিকি পণ্ডিত ছিলেন এবং ফিকহ ও হাদিসে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তার পাণ্ডিত্যের ব্যাপকতা ও গভীরতা তার লেখায় সুস্পষ্ট। তার সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ হলো বিশ খণ্ডের তাফসীর ‘আল-জামি’ লি-আহকাম আল-কুরআন’।[৩৪]
আশ-শাফিঈ: জন্ম ৭৬৭ খ্রিস্টাব্দ, আরব; মৃত্যু ২০ জানুয়ারি ৮২০ খ্রিস্টাব্দ, আল-ফুস্তাত, মিশর। মুসলিম আইনজ্ঞ পণ্ডিত যিনি ইসলামী আইন চিন্তাধারার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং শাফিঈ মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি ঐতিহ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও আইনি পদ্ধতির ক্ষেত্রেও একটি মৌলিক অবদান রাখেন।[৩৫]
ক্লাসিকাল আরবি অভিধানকারগণ:
আল-ফাইরুযাবাদী: আবু-ত-তাহির ইবনে ইব্রাহিম মাজদ উদ-দিন উল-ফাইরুযাবাদী (১৩২৯–১৪১৪) ছিলেন একজন আরবি অভিধানকার, যিনি আধুনিক ইরানের শিরাজ শহরের কাছে কারাজিনে জন্মগ্রহণ করেন এবং শিরাজ, ওয়াসিত, বাগদাদ ও দামেস্কে শিক্ষা লাভ করেন। তিনি দশ বছর জেরুজালেমে বসবাস করেন এবং তারপর পশ্চিম এশিয়া ও মিশর ভ্রমণ করে ১৩৬৮ সালে মক্কায় বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তী তিন দশকের বেশিরভাগ সময় তিনি সেখানেই কাটান, ১৩৮০-এর দশকে কিছুকাল দিল্লিতে অবস্থান করেন এবং অবশেষে ১৩৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে মক্কা ত্যাগ করে বাগদাদ, শিরাজ (যেখানে তিনি তৈমুরের দ্বারা সমাদৃত হন) এবং সবশেষে আধুনিক ইয়েমেনের তাইজে ভ্রমণ করেন। ১৩৯৫ সালে তাকে ইয়েমেনের প্রধান কাজী (বিচারক) নিযুক্ত করা হয় এবং তিনি সুলতানের এক কন্যাকে বিবাহ করেন। জীবনের শেষ বছরগুলিতে ফাইরুযাবাদী মক্কায় তার বাড়িটিকে মালিকি আইনের একটি বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করেন এবং সেখানে তিনজন শিক্ষক নিয়োগ করেন। তিনি স্প্যানিশ ভাষাবিদ ইবনে সিদা (মৃত্যু ১০৬৬) এবং সাজানির (মৃত্যু ১২৫২) অভিধানগুলিকে একত্রিত করে একটি বিশাল অভিধানমূলক গ্রন্থও রচনা করেন। এই শেষোক্ত গ্রন্থটির একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ ‘আল-কামুস আল-মুহিত’ (ব্যাপক অভিধান) নামে প্রকাশিত হয় এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি নিজেই পরবর্তী কিছু অভিধানের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।[৩৬] ইবনে মানজুর: সময়কাল: ১২৩০ – ১৩১১। পুরো নাম: জামালউদ্দিন মুহাম্মদ বিন মুকাররাম ইবনে মানজুর, তিউনিসে জন্মগ্রহণ করেন এবং কায়রোতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি বিশ খণ্ডে রচিত আরবি ভাষার সবচেয়ে ব্যাপক অভিধান ‘লিসানুল আরব’-এর লেখক।[৩৭]
Sources:
[1] For a good over view see: Sources of Islamic Law: An Overview by Yasin Dutton. http://www.muhajabah.com/docstorage/dutton.htm
[2] Qur’an: (33:59)
[3] Sahih Bukhari Book 8/347
[4] Sunan Abu Dawud 32/4090
[5] Sahih Bukhari Book 72/684
[6] Date of death according to Hijri calendar.
[7] pbuh is abbreviation for ‘peace be upon him.’
[8] ar-Razi, Fakhr ad-Din, at-Tafsir al-Kabir, p.231.
[9] Ibn Kathir, Tafsir al-Qur’an al-‘Azim.
[10] as-Sabuni, Muhammad Ali, safwat at-tafasir, p.538.
[11] al-Janabizi, Tafsir bayan al-sa’adah fi muqaddimat al-ibadah, see commentary of verse 59 of surah Ahzab.
[12]Ibn Man.zur, Mu.hammad ibn Mukarram, Lisan al-`Arab, (Bayrut : Dar .Sadir, 1955-56). Vol.7, p. 273.
[13] Al-Fayruzabadi, al-Qamus al-Muhit,
[14]Lane, Edward William, An Arabic-English lexicon, (London 1863-1893) under the relevant root verb.
[15] Esposito, John L. (ed.), The Oxford Dictionary of Islam, (Oxford University Press, 2003).p.160.
[16] al-Qurtubi, Jami li-ahkam al-Qur’an, verse 60 of sura Nur.
[17] Sahih Bukhari Book 8/347
[18] This narration is mawquf and is attributed more correctly to Umm Salama, the wife of the Prophet.
[19] Milhafa is a synonym of jilbab. Notice here Abdullah b. Umar uses the word milhafa (jilbab) instead of izar, indicating that izar here is the jilbab. See al-majmu’ sharh al-muhazzab, p.259.
[20] Al-Nawawi, al-majmu’ sharh al-muhazzab, (Beirut, 2002), pp.258.
[21] A major reference for Islamic law who’s interpretation of law is canonized in the Malaysian legal code.
[22] An-Nawawi, al-majmu’ sharh al-muhazzab, (Beirut, 2002), pp.258-9.
[23] Ibn Hazm, Al-Muhalla, vol. 3, p.217
[24] For a contemporary source see Badawi, Jamal, The Muslim Woman’s Dress According to the Qur’an and Sunnah, (Ta-Ha Publishers Ltd,1980) or http://members.tripod.com/iaislam/TMWD.htm
[25] Bullock, Kathrine, Rethinking Muslim Women and the Veil: Challenging and Historical and Modern Stereotypes, (Herndon, VA: International Institute of Islamic Thought, 2002).p.73.
[26] Ali, Sayyid, ‘Why Here, Why Now? Young Muslim Women Wearing Hijab,’ The Muslim World, vol.95, (2005), pp.515-530.
[27] http://sunnipath.com/resources/Questions/QA00002148.aspx
[28] http://www.sunnipath.com/aboutTeachers.aspx?sectionid=5&teacherid=12
[29] http://www.britannica.com/eb/article-9041918?query=Ibn%20Hazm&ct=
[30] http://www.britannica.com/eb/article-7063
[31] http://www.britannica.com/eb/article-9033610
[32] http://en.wikipedia.org/wiki/Ibn_Kathir
[33] http://en.wikipedia.org/wiki/Nawawi
[34] http://www.bysiness.co.uk/quran/qurtubi.htm
[35] http://www.britannica.com/eb/article-9067053?query=shafi%27i&ct=
[36] http://en.wikipedia.org/wiki/Fairuzabadi
[37] http://www.salaam.co.uk/knowledge/biography/viewentry.php?id=812প্রশ্ন-উত্তর: গান, সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্রের উপর শরীয়তের বিধান?

প্রশ্ন: গান গাওয়া বা শোনার ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান কী? বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের হুকুম কী এবং এর ব্যবসা কি অনুমোদিত? আমি আপনাকে দলিল সহ বিস্তারিত উত্তর দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি?
উত্তর: ইমাম (মুজতাহিদ) এবং ফকীহগণ গান গাওয়ার বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন এবং তাদের বিভিন্ন মতামত রয়েছে যেমন হারাম (নিষিদ্ধ), মাকরুহ (অপছন্দনীয়) এবং মুবাহ (অনুমোদিত), যারা এটি নিষিদ্ধ করেছেন তারা হলেন তাদের মধ্যে যারা গান গাওয়াকে ব্যবসা বা পেশা হিসেবে নিষিদ্ধ করার মতামত রাখেন এবং ইমাম শাফিঈ (রহ.) থেকেও একই মতামত এসেছে, এবং যারা এটি অপছন্দ করেছেন তাদের মধ্যে আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) এই বিষয়টিকে অপছন্দ করেছেন এবং এর পরিবেশনাকে অপছন্দনীয় কাজের মধ্যে শ্রেণীবদ্ধ করেছেন, শাফিঈ (রহ.) এবং আল-কাযী (রহ.) থেকেও একই মতামত এসেছে। এবং যারা এটিকে (অনুমোদিত) করেছেন তাদের মধ্যে ইবনে হাজম, আবু বকর আল খালাল, আবু বকর আব্দুল আজিজ, সাদ ইবনে ইব্রাহিম এবং আনবারী এবং মদীনার বাসিন্দাদের অনেকেই রয়েছেন। তারা নাশিদকে ভিন্ন শ্রেণীতে নিয়েছিলেন এবং হুকুম থেকে বাদ দিয়েছিল এবং অনুমোদন করেছিলেন। ইবনে কুদামা তার আলমুগনি গ্রন্থে এ সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন।
এবং এই বিষয়ে সঠিক মতামত প্রকাশের জন্য আসুন আমরা এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত গ্রন্থগুলি (আয়াত/আহাদীস/ইজমা) অধ্যয়ন করি:
ক. যারা গান গাইতে নিষেধ করেন তাদের দ্বারা দলিল হিসাবে ব্যবহৃত গ্রন্থগুলো:
1. عن أنس بن مالك قال: قال رسول الله r “من جلس إلى قَيْنَةٍ فسمع منها، صبَّ الله في أذنيه الآنُكَ يوم القيامة” رواه عبد الله بن المبارك. والقينة هي الجارية. والآنُك هو الرصاص.
আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোন গায়িকা মহিলার গান শোনে, কিয়ামতের দিন তার কানে গলিত সীসা ঢেলে দেওয়া হবে।” আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রা.) থেকে বর্ণিত।
2. عن أبي مالك الأشعري رضي الله تعالى عنه قال: قال رسول الله r”ليشربَنَّ ناسٌ من أمتي الخمرَ يسمونها بغير اسمها فيُعزَفُ على رؤوسهم بالمعازف والمغنِّيات يَخْسِف الله بهم الأرضَ، ويجعل منهم القردة والخنازير ” رواه ابن ماجة.
আবু মালিক আলাশারি (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী (সা)-কে বলতে শুনেছেন: “মানুষ মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে এবং বাদ্যযন্ত্র বাজাবে, আল্লাহ তাদেরকে পৃথিবী কর্তৃক গ্রাস করিয়ে বানর ও শূকরে পরিণত করবেন।” (ইবনে মাজাহ তার সুনানে বর্ণনা করেছেন)
3. عن أبي أُمامة قال ” نهى رسول الله r عن بيع المغنيات وعن شرائهن وعن كسبهن وعن أكل أثمانهن ” رواه ابن ماجة.
আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “গায়িকাদের বিক্রি করো না, কিনো না বা শিক্ষা দিও না, কারণ তাদের জন্য যে মূল্য দেওয়া হয়েছে তা অবৈধ।” (ইবনে মাজাহ ও তিরমিযী বর্ণনা করেছেন)
4. عن أبي أُمامة t قال: قال رسول الله r ” إن الله بعثني رحمة للعالمين، وهدى للعالمين، وأمرني ربي عزَّ وجلَّ بمحق المعازفِ والمزاميِر والأوثانِ والصُّلُبِ وأمرِ الجاهلية… ولا يحل بيعُهن ولاشراؤُهن، ولا تعليمهن، ولا تجارةٌفيهن، وثمنهنَّ حرامٌ، يعني الضاربات. وفي رواية المغنيات ” رواه أحمد.والصُّلُب جمع صليب.
আবু উমামা বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আযযা ওয়া জাল আমাকে মানবজাতির জন্য হেদায়েত এবং রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন এবং (এ সত্ত্বেও) তিনি আমাকে বাদ্যযন্ত্র, মূর্তি, ক্রুশ এবং জাহেলী জিনিসপত্র ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়েছেন… এবং এগুলো বিক্রি করা জায়েজ নয় এবং এগুলো কেনা, শিক্ষা দেওয়া, ব্যবসা করাও জায়েজ নয়, এবং এগুলোর দাম হারাম, অর্থাৎ ঢোল বাজানো (ঢোল বাজানো) এবং অন্য কোন রিওয়াতে – মহিলা গায়িকাদের।” (আহমদ কর্তৃক বর্ণিত)
5. عن ابن عباس t عن رسول الله r قال ” والذي نفسي بيده لَيبيتَنَّ ناسٌ من أمتي على أَشَرٍ وبَطَرٍ ولعبٍ ولهوٍ، فيصبحوا قردةً وخنازير باستحلالهم المحارم والقَيْنات وشربهم الخمر وأكلهم الربا، ولبسهم الحرير ” رواه عبد الله بن أحمد في زوائد المسند.
ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যার হাতে আমার প্রাণ, সেই প্রভুর শপথ, আমার উম্মতের একটি দল রাত্রি যাপন করবে, খাবার, পানীয় এবং আড্ডা দিয়ে। পরের দিন সকালে তারা শুকর ও বানরে পরিণত হবে, কারণ তারা হালালকে হারাম এবং সঙ্গীতকে হারাম বলে অভিহিত করবে, মদ পান করবে, সুদ খাবে এবং রেশম পরবে।” (আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ কর্তৃক জাওয়াইদ আল-মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণিত)
6. عن عبيد الله بن زَحْر عن علي بن يزيد عن القاسم عن أبي أُمامة t عن رسول الله r قال ” لا تبيعوا القَيْنات ولا تشتروهن ولا تُعلِّموهنَّ، ولا خير في تجارةٍ فيهن، وثمنُهنَّ حرام، في مثل هذا أُنزلت هذه الآية {ومِنَ الناسِ مَنْ يشتري لهوَ الحديثِ ليُضِلَّ عن سبيلِ اللهِ } إلى آخر الآية “. رواه الترمذي وأحمد وابن ماجة والبيهقي.
আবু উমামা বর্ণনা করেন যে, নবী (সা) বলেছেন: “কখনও গায়িকাদের দাসী বাণিজ্য করো না এবং তাদেরকে গান গাওয়ার প্রশিক্ষণও দিও না। তাদের বাণিজ্য করা ভালো নয়, এবং [তোমাদের জন্য] তাদের মূল্য নিষিদ্ধ, এবং এই কারণেই আয়াতটি নাজিল হয়েছে:
ومِنَ الناسِ مَنْ يشتري لهوَ الحديثِ ليُضِلَّ عن سبيلِ اللهِ
(মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা জ্ঞান ছাড়াই ‘লাহওয়াল হাদিস’ ক্রয় করে, যাতে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করা যায় এবং তা উপহাস করে। তাদের জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি)। [লুকমান: ৬] (তিরমিযী, আহমদ, ইবনে মাজাহ এবং আল বায়হাকী বর্ণনা করেছেন)
7. عن شيخٍ شهد أبا وائلٍ في وليمة، فجعلوا يتلَعَّبون ويُغنُّون، فحلَّ أبو وائلٍ حبوتَه، وقال: سمعت عبد الله يقول: سمعت رسول الله r يقول “الغناء يُنبتُ النفاقَ في القلب ” رواه أبو داود. والحبوة (بفتح الحاء وضمها وكسرها) هي الجلوس على الإِليتين مع ضم الفخذين والساقين إلى البطن بالذراعين.
একজন শায়খ আবু ওয়ায়েলকে এক ওলীমায় গান-বাজনা ও খেলাধুলা করতে দেখেছিলেন। তাই আবু ওয়ায়েল সোজা হয়ে বসে বললেন, আমি আব্দুল্লাহকে বলতে শুনেছি যে, তিনি নবী (সা)-কে বলতে শুনেছেন: “গান অন্তরে মুনাফিকি বৃদ্ধি করে, যেমন পানি উদ্ভিদ জন্মায়।” (আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন)
8. عن أبي الصَّهباء “أنه سأل ابن مسعود عن قول الله {ومن الناس من يشتري لهو الحديث } قال: الغناء”. رواه ابن جرير الطبري في تفسيره.
আবু সুহাবা বলেন যে, তিনি ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে “মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা ‘লাহওয়াল হাদিস’ ক্রয় করে” এই আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি উত্তরে বলেন যে এটি গান গাওয়া। (ইবনে জারির এবং তাবারী তার তাফসীরে বর্ণনা করেছেন)
9. جاء في صحيح البخاري ما يلي (وقال هشام بن عمَّار حدثنا صَدَقة بن خالد حدثنا عبد الرحمن بن يزيد بن جابر حدثنا عطية بن قيس الكلابي حدثني عبد الرحمن بن غَنْمٍ الأشعري قال: حدثني أبو عامر أو أبو مالك الأشعري، والله ما كذبني، سمع النبي r يقول ” ليكونَنَّ من أمتي أقوامٌ يستحلون الحِرَّ والحرير، والخمرَ والمعازفَ، ولَينـزِلنَّ أقوامٌ إلى جنب عَلَم يروح عليهم بسارحةٍ لهم يأتيهم لحاجة فيقولون: إرجع إلينا غداً، فيُبَيِّتُهم الله ويضع العَلَم، ويمسخ آخرين قردةً وخنازيرَ إلى يوم القيامة “) ورواه الطبراني. والسارحة هي الماشية. والعَلََم هو الجبل.
সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে (এবং ইবনে হিশাম ইবনে আম্মার বলেছেন যে সাদাকা ইবনে খালিদ তাকে আবদুর রহমান ইবনে ইয়াজিদ ইবনে জাবির থেকে বর্ণনা করেছেন যে তিনি আতিয়া ইবনে কায়েস আল কিলাবি থেকে শুনেছেন যে তিনি আবদুর রহমান ইবনে গানাম আল আশআরী থেকে শুনেছেন যিনি বলেছেন: আবু আমির আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন অথবা আবু মালিক আল আশআরী আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, এবং আল্লাহর কসম তিনি আমাকে মিথ্যা বলেননি যে তিনি নবী (সা) কে বলতে শুনেছেন: “আমার উম্মাতের মধ্যে এমন কিছু লোক আসবে যারা ব্যভিচার, রেশম (পুরুষদের জন্য), মদ এবং সঙ্গীতকে হালাল মনে করবে; এবং এমন কিছু লোক থাকবে যারা একটি উঁচু পাহাড়ের পাশে তাঁবু খাবে, যখন কোন দরিদ্র ব্যক্তি তাদের পাশ দিয়ে যাবে এবং কোন প্রয়োজন চাইবে, তখন তারা তাকে বলবে, ‘আগামীকাল আমাদের কাছে ফিরে এসো।’ সকালে আল্লাহ তাদের উপর পাহাড়টি আছড়ে ফেলবেন এবং বাকিরা (যারা রক্ষা পেয়েছে) কেয়ামত পর্যন্ত বানর এবং শূকরে রূপান্তরিত হবে।” (তাবারানী বর্ণনা করেছেন)
খ. যেসব গ্রন্থের উপর নির্ভরশীল তারা গান গাওয়ার অনুমতি দেয় বা অপছন্দ করে এটা।
1. عن عامر بن سعد قال ” دخلتُ على قُرَظةَ بنِ كعبٍ وأبي مسعود الأنصاري في عرسٍ، وإذا جَوارٍ يُغنِّين، فقلت: أنتما صاحبا رسول الله r، ومِن أهل بدرٍ يُفعل هذا عندكم ؟ فقالا: إجلس إن شئت فاسمع معنا، وإن شئتَ فاذهب، قد رُخِّص لنا في اللهو عند العرس” رواه النَّسائي والحاكم وصححه.
‘আমির ইবনে সা’দ বর্ণনা করেন: এক বিবাহ অনুষ্ঠানে যখন গান-বাজনা চলছিল, তখন আমি কারাযা ইবনে কা’ব এবং আবি মাস’উদ আল-আনসারী (রা.)-এর কাছে গেলাম এবং তাদের বললাম: “তোমরা নবী (সা.)-এর সাহাবী এবং বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলে, অথচ তোমাদের চারপাশে এই (গান) চলছে? তারা বলল: যদি তোমরা চাও, আমাদের সাথে বসে শোনো, আর যদি চাও, তাহলে চলে যাও। বিবাহ অনুষ্ঠানে আমাদের জন্য এই অসার কাজটি বৈধ।” [নাসায়িতে বর্ণিত এবং হাকিম কর্তৃক প্রমাণিত]
2. عن السائب بن يزيد t ” أن امرأة جاءت إلى رسول الله r فقال: يا عائشة أتعرفين هذه ؟ قالت: لا يا نبي الله فقال: هذه قَيْنةُ بني فلان، تحبين أن تغنيَكِ ؟ قالت: نعم، فأعطاها طَبَقاً فغنَّتها، فقال النبي r: قد نفخ الشيطان في مِنْخريها ” رواه أحمد بسند صحيح، ورواه الطبراني. والطبق هو الإناء.
সায়েব ইবনে ইয়াজিদ থেকে বর্ণিত: এক মহিলা নবী (সা) এর কাছে এলেন। তিনি আয়েশা (রা) কে জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তুমি কি তাকে চেনো?’ তিনি বললেন: ‘না, হে আল্লাহর রাসূল (সা)।’ তিনি বললেন: ‘এটি অমুক গোত্রের পেশাদার গায়িকা। তুমি কি চাও যে সে তোমার জন্য গান গাইবে?’ আয়েশা (রা.) বললেন: ‘হ্যাঁ’, তাই মহিলাটি তার জন্য গান গাইলেন, তারপর নবী (সা) বললেন: ‘শয়তান তার নাকে ফুঁ দিয়েছে।’ (আহমদ ও তাবারানী বর্ণনা করেছেন)
3. عن جابر رضي الله تعالى عنه قال: قال رسول الله r لعائشة ” أهديتم الجارية إلى بيتها ؟ قالت: نعم، قال: فهلا بعثتم معهم من يُغَنِّيهم يقول: أتيناكم فحيُّونا نُحَيِّيكم، فإن الأنصار قومٌ فيهم غَزَل ” رواه أحمد بسند صحيح، ورواه البخاري من طريق عائشة بلفظ” أنها زَفَّت امرأةً إِلى رجلٍ من الأنصار، فقال نبي الله r: ياعائشة، ما كان معكم لهوٌ ؟ فإنَّ الأنصار يُعجبهم اللهو ” ورواه الحاكم وصححه، ووافقه الذهبي.
জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত: নবী (সা) আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন: “তুমি কি কনেকে তার বাড়িতে পাঠিয়েছ?” তিনি বললেন: “হ্যাঁ”। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: “তুমি কি তাদের সাথে এমন কোন গায়ক পাঠিয়েছ যে তাদের জন্য গান গাইতে পারে?” আয়েশা (রা.) না-করে উত্তর দিলেন। নবী (সা) তখন বললেন: “তুমি যদি তাদের সাথে এমন একজন গায়ক পাঠাতে যে গাইত যে আমরা তোমার কাছে এসেছি, তাই আমাদের স্বাগত জানাও, কারণ আনসাররা এমন একটি জাতি যারা গান গাইতে ভালোবাসে।” (সহীহ সনদে আহমাদ বর্ণনা করেছেন, এবং বুখারীতে আয়েশা (রা.)-এর সূত্রে এই শব্দগুলি বর্ণনা করেছেন) “তিনি আনসারদের একজনের সাথে বিবাহের জন্য একজন কনে পাঠিয়েছিলেন, নবী (সা) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আয়েশা” তোমার কি লাহও নেই? আনসাররা লাহও ভালোবাসে” (হাকিম বর্ণনা করেছেন এবং যাহাবী এটি অনুমোদন করেছেন)।
4. عن عائشة رضي الله عنها ” أن أبا بكر الصديق دخل عليها وعندها جاريتان في أيام مِنى تُغَنِّينان وتَضْرِبان، ورسول الله r مسجَّى بثوبه، فانتهرهما أبو بكر، فكشف رسول الله r عنه، وقال: دعهما يا أبا بكر، فإِنها أيام عيد… ” رواه مسلم.
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত: আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তার ঘরে এলেন, যখন দুজন মহিলা গায়িকা গান গাইছিলেন এবং বাজনা বাজাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর পোশাক দিয়ে তাঁর মুখ ঢেকে রেখেছিলেন। ইতিমধ্যে আবু বকর (রা) প্রবেশ করলেন এবং [গায়কদের দেখে] আমাকে ধমক দিলেন: ‘রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপস্থিতিতে শয়তানী বাদ্যযন্ত্র?’ এই কথা শুনে আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর দিকে ফিরে বললেন: ‘এগুলো ছেড়ে দাও, আজ ঈদের দিন।’ (মুসলিম বর্ণনা করেছেন)
5. عن عبد الله بن بُريدة قال: سمعت بُريدة يقول ” خرج رسول الله r في بعض مغازيه، فلما انصرف جاءت جاريةٌ سوداءُ فقالت: يا رسول الله، إني كنتُ نذرتُ إِنْ ردَّك الله سالماً أن أضرب بين يديك بالدُّفِّ وأَتغنَّى، فقال لها رسول الله r: إن كنتِ نذرتِ فاضربي وإلا فلا، فجعلت تضرب، فدخل أبو بكر وهي تضرب ثم دخل علي وهي تضرب ثم دخل عثمان وهي تضرب ثم دخل عمر فألقت الدُّف تحت إِستها ثم قعدت عليه، فقال رسول الله r: إن الشيطان ليخاف منك يا عمر، إني كنت جالساً وهي تضرب فدخل أبو بكر وهي تضرب ثم دخل علي وهي تضرب ثم دخل عثمان وهي تضرب، فلما دخلتَ أنت يا عمر ألقت الدُّفَّ ” رواه الترمذي وقال: هذا حديث حسنٌ صحيحٌ غريبٌ، ورواه أحمد بسند صحيح، ورواه أبو داود والبيهقي.
আবদুল্লাহ ইবনে বুরাইদাহ তার পিতার বর্ণনা থেকে বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর কিছু সামরিক অভিযান থেকে ফিরে এলেন। এক কৃষ্ণাঙ্গ দাসী তাঁর কাছে এসে বলল, ‘আমি মানত করেছিলাম যে, যদি আল্লাহ আপনাকে নিরাপদে এবং অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে আনেন, তাহলে আমি আপনার আগে দাফ মারব।’ রাসূলুল্লাহ (সা) উত্তর দিলেন, ‘যদি আপনি মানত করে থাকেন, তাহলে এগিয়ে যান, অন্যথায় করবেন না।’ সে দাফ মারতে শুরু করল। ইতিমধ্যে আবু বকর (রা) এসে গেলেন এবং তিনি দাফ মারতে থাকলেন। এরপর ‘উসমান (রা) এবং ‘আলী (রা) এলেন এবং তিনি দাফ মারতে থাকলেন। তারপর ‘উমর (রা) এলেন এবং তিনি তার যন্ত্রটি নিজের নীচে ঢেকে ফেললেন এবং তাকে দেখার সাথে সাথে তার উপর বসে পড়লেন। এ কথা শুনে নবী (সা) বললেন, ‘ওমর, শয়তানও তোমাকে ভয় করে। আমি বসে ছিলাম এবং সে দফ মারছিল, তারপর আবু বকর প্রবেশ করলেন এবং তিনি মারতে থাকলেন, তারপর আলী প্রবেশ করলেন এবং তিনি মারতে থাকলেন, উসমান প্রবেশ করলেন এবং তিনি মারতে থাকলেন, কিন্তু যখন তুমি প্রবেশ করলে হে ওমর, সে দফ থামিয়ে দিল।’ (তিরমিযী বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বলেছেন যে এটি হাসান গরীব হাদিস এবং আহমদ এটিকে সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন এবং আবু দাউদ ও আল বায়হাকীও এটি বর্ণনা করেছেন)
6. عن يحيى بن سليم قال: قلتُ لمحمد بن حاطب: تزوجتُ امرأتين ما كان في واحدةٍ منهما صوت، يعني دُفَّاً، فقال محمد t: قال رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم” فصْلُ ما بين الحلال والحرام الصوتُ بالدُّفُّ ” رواه الحاكم وصححه ووافقه الذهبي. ورواه أحمد بسند صحيح. ورواه ابن ماجة والنَّسائي، والترمذي وحسَّنه.
ইয়াহিয়া বিন সালিম বলেন, আমি মুহাম্মদ ইবনে হাতিবকে বললাম, “আমি দুইজন মহিলাকে বিয়ে করেছি এবং তাদের মধ্যে কোন আওয়াজ ছিল না, অর্থাৎ বিবাহে কোন দফ ছিল না, তাই মুহাম্মদ ইবনে হাতিব বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘যা বৈধ কাজ (অর্থাৎ নিকাহ) এবং নিষিদ্ধ কাজ (ব্যভিচার) এর মধ্যে পার্থক্য করে তা হল দফের সুর এবং নিকাহের প্রকাশ্য ঘোষণা।’” (আল হাকিম বর্ণনা করেছেন এবং যাহাবী এটিকে সমর্থন করেছেন, আহমদও এটিকে সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন, ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন এবং নাসায়ীও করেছেন, এবং তিরমিযী এটিকে বর্ণনা করেছেন এবং এটিকে হাসান হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন)।
7. عن الرُّبيِّع بنتِ مُعَوّذ رضي الله عنها قالت ” دخل عليَّ رسول الله r صبيحة عُرسي وعندي جاريتان تغنيان وتُندبان آبائي الذين قُتلوا يوم بدرٍ، وتقولان فيما تقولان: وفينا نبيٌّ يعلم ما في غدٍ، فقال: أمَّا هذا فلا تقولوه، ما يعلم ما في غدٍ إلا الله ” رواه ابن ماجة، ورواه أبو داود بمعناه ورواه الترمذي وقال: هذا حديث حسن صحيح وجاء في روايته ” وجُوَيْراتٌ لنا يضربن بدُفُوفِهِن “.
মু’ওয়ায (রা)-এর কন্যা রাবী’ থেকে বর্ণিত: আমার বিবাহের দিন সকালে, নবী (সা) আমাদের সাথে দেখা করতে এলেন, যখন দুজন দাসী দাফ মারছিল এবং বদরের যুদ্ধে নিহত আমার পূর্বপুরুষদের জন্য বিলাপ করছিল। মেয়েরা গাইছিল: “আমাদের মধ্যে নবী (সা) আছেন যিনি জানেন আগামীকাল কী ঘটবে”, তিনি (সা) বললেন: “এ কথা বলো না, কারণ আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) ছাড়া কেউ জানে না আগামীকাল কী ঘটবে।” (ইবনে মাজাহ এবং আবু দাউদ, তিরমিযীও এটি বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে এই হাদিসটি হাসান সহীহ”
8. عن عائشة رضي الله عنها قالت ” دخل عليَّ أبو بكر وعندي جاريتان من جواري الأنصار تُغنيان بما تقاولت به الأنصار في يوم بُعاث، قالت: وليستا بمغنيتين فقال أبو بكر: أبمزمور الشيطان في بيت النبي r ؟ وذلك في يوم عيد الفطر، فقال النبي r: يا أبا بكر، إن لكل قومٍ عيداً، وهذا عيدُنا ” رواه ابن ماجة.
আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত: আবু বকর সিদ্দিক (রা) তার ঘরে এলেন, যখন দুজন আনসারী মহিলা গায়িকা বু‘আস-এর গান গাইছিলেন এবং বাজিয়ে (বাদ্যযন্ত্র) বাজাচ্ছিলেন। ইতিমধ্যে আবু বকর (রা) প্রবেশ করলেন এবং [গায়কদের দেখে] আমাকে ধমক দিলেন: ‘রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উপস্থিতিতে শয়তানী বাদ্যযন্ত্র?’ এই কথা শুনে আল্লাহর রাসূল (সা) তার দিকে ফিরে বললেন: ‘হে আবু বকর, সকল মানুষের জন্যই একটি ঈদ আছে এবং এটি আমাদের ঈদ” (ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন)।
9. عن أنس بن مالك t” أن النبي r مرَّ ببعض المدينة، فإذا بجوارٍ يضربن بدُفِّهنَّ ويتغنَّين ويقلن:
نحـن جَـوَارٍ مـن بني النجـارِ يـا حبـذا محمـدٌ من جـارِ فقال النبي (ص) : اللهُ أعلم إِني لأُحِبُّكُنَّ ” رواه ابن ماجة بسند صحيح.
আনাস ইবনে মালিক (রা) বর্ণনা করেন যে, নবী (সা) মদীনার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় এক নির্দিষ্ট স্থানে দেখতে পেলেন যে, কিছু লোক তাদের দাফ বাজাচ্ছে এবং গান গাইছে: “আমরা বনী নাজ্জারের লোক; আমরা মুহাম্মদকে আমাদের প্রতিবেশী হিসেবে স্বাগত জানাই।”
নবী (সা) বলেছেন: “জেনে রেখো যে আমি তোমাদের সকলকে ভালোবাসি।” (ইবনে মাজাহ সহীহ সনদের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন)।
10. عن نافع مولى ابن عمر t” أن ابن عمر رضي الله عنهما سمع صوتَ زَمَّارةِ راعٍ، فوضع أُصبعيه في أُذُنيه وعَدَل راحلته عن الطريق وهو يقول: يا نافع أتسمع ؟ فأقول: نعم، فيمضي حتى قلتُ: لا، فوضع يديه وأعاد راحلته إلى الطريق وقال: رأيتُ رسول الله r، وسمع صوتَ زَمارةِ راعٍ، فصنع مثل هذا ” رواه أحمد بإسناد صحيح.ورواه ابن ماجة والخلاَّل.
ইবনে ওমর (রা) এর চাকর নাফে (রা) বর্ণনা করেন যে, ইবনে ওমর (রা) বাঁশির শব্দ শুনতে পেয়ে কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিলেন এবং পথ ঘুরিয়ে বললেন, “হে নাফে!” তুমি কি শুনতে পাচ্ছো? আমি তাকে বললাম: “হ্যাঁ” এবং তিনি বারবার এই কথাটি বলতে থাকলেন যতক্ষণ না আমি বললাম “না”। এরপর তিনি কান থেকে আঙ্গুল সরিয়ে পূর্বের পথে ফিরে গেলেন এবং বললেন: “আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বাঁশির শব্দ শুনে একই কাজ করতে দেখেছি।” [মুসনাদে আহমাদে একটি নির্ভরযোগ্য সনদ সহ বর্ণিত, ইবনে মাজাহ এবং আল-খাল্লালও বর্ণনা করেছেন]।
11. عن عُقبة بنِ عامر رضي الله تعالى عنه قال: قال رسول الله r ” تعلموا كتاب الله وتعاهدوه وتغنَّوا به، فوالذي نفسي بيده لهو أشدُّ تفلُّتاً من المخاض في العُقُل ” رواه أحمد والدَّارمي والنَّسائي، ورواه النَّسائي أيضاً في السُّنن الكبرى، بلفظ “…والذي نفس محمدٍ بيده لهو أشدُّ تَفلُّتاً من العِشَارِ في العُقُل ” والعِشار والمخاض هي النياق الحوامل، جمع ناقة. والعُقُل جمع عِقال وهو الحبل الذي يُربطُ به.
উকবা ইবনে আমির (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “আল্লাহর কিতাব শিখো, তা মেনে চলো এবং ভালোভাবে তেলাওয়াত করো, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ, এটি (অর্থাৎ, কুরআন) রশি থেকে উটের চেয়েও (স্মৃতি থেকে) হারিয়ে ফেলা সহজ।” মুসনাদে আহমাদ, আল-দারিমী, আল-নাসায়ী এবং সুনান আল-কুবরাহ গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্ন শব্দ এবং অভিন্ন অর্থে বর্ণিত।
12. عن سعد بن أبي وقاص t أن رسول الله r قال ” ليس منَّا مَنْ لم يتغنَّ بالقرآن ” رواه الدَّارمي وابن ماجة.
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কুরআনে গান গায় না সে আমাদের দলভুক্ত নয়” (আল-দারমী এবং ইবনে মাজাহ কর্তৃক বর্ণিত)
এখন আমরা প্রথম মতের অধীনে বর্ণিত হাদিসের সনদ পরীক্ষা করে দেখব যে এগুলো নির্ভরযোগ্য কিনা?
আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত প্রথম হাদিসটির সনদ (শব্দ) ভাঙা, কারণ এর চারজন বর্ণনাকারী দুর্বল বা অজানা, এবং তারা হলেন ইব্রাহিম ইবনে উসমান, আহমদ ইবনে গামার, ইয়াজিদ ইবনে আবদুসসামাদ এবং ওবায়দ ইবনে হিশাম আল-হালাবী, তাই হাদিসটিকে প্রমাণ হিসেবে নির্ভর করা যাবে না।
দ্বিতীয় হাদিসটি ইবনে মাজাহ আবু মালিক আল-আশ’আরী থেকে বর্ণনা করেছেন এবং এই সনদে মালিক ইবনে আবি মারিয়াম আছেন এবং যাহাবী তাঁর সম্পর্কে বলেছেন: তিনি অজানা, এবং তাই তিনি একজন অজানা বর্ণনাকারী, বর্ণনাকারী মু’আবিয়া ইবনে সালেহ ছাড়াও, যাকে অনেক হাদিস পণ্ডিত তার দুর্বলতার কারণে গ্রহণ করেননি, তাই হাদিসটি অত্যন্ত দুর্বল এবং পরিত্যক্ত।
ইবনে মাজাহ আবু উমামা থেকে তার সনদে যে তৃতীয় হাদিসটি বর্ণনা করেছেন তা হল আবু মুহাল্লাব মুতরাহ ইবনে ইয়াজিদ, যাকে আবু যার-আল-রাযী এবং আবু হাতেম আল-রাযী দুর্বল করেছেন। এবং ইবনে মু’ইন বলেছেন: তিনি কেউ নন, এবং বুখারী বলেছেন: তিনি হাদীস অস্বীকারকারী, এবং সনদে ওবায়দুল্লাহ আল-আফ্রিকীও আছেন যাকে আহমদ, দারিমি এবং দারকুতনী দুর্বল বর্ণনাকারী হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেছেন। এবং ইবনে মু’ইন বলেছেন: তিনি কেউ নন। এবং ইবনে মাদেনী বলেছেন: তিনি হাদীস অস্বীকারকারী। এবং আবু মিশ’আর বলেছেন: তিনি প্রতিটি সমস্যার সঙ্গী। অতএব, হাদিসটি খুবই দুর্বল এবং গ্রহণযোগ্য নয়।
চতুর্থ হাদিসটি যা আহমদ আবু উমামা থেকে বর্ণনা করেছেন, তার ক্রমানুসারে আলী ইবনে ইয়াজিদ আল-আলহানি আছেন এবং তিনি দুর্বল। একইভাবে কাসিমও দুর্বল, তাই হাদিসটি খুবই দুর্বল এবং তাই গ্রহণযোগ্য নয়।
পঞ্চম হাদিসটি যা আব্দুল্লাহ ইবনে আহমদ ইবনে হাম্বল থেকে জাওয়াইদ আল-মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, এই সনদে ফারকাদকে সাবাখি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, হাইসামি মাজমু’আ আজ্জাওয়াইদ গ্রন্থে বলেছেন: ফারকাদ দুর্বল; আল-মুনযিরিও বলেছেন যে হাদিসটি দুর্বল। এই হাদিসটি সাঈদ ইবনে মনসুরও বর্ণনা করেছেন এবং তার সনদে তিনজন দুর্বল বর্ণনাকারী আছেন, তাই হাদিসটি দুর্বল এবং তাই গ্রহণযোগ্য নয়।
ষষ্ঠ হাদিসটি যা তিরমিযী বর্ণনা করেছেন আব্দুল্লাহ ইবনে যাহর থেকে আলী ইবনে ইয়াজিদ থেকে কাসিম ইবনে আবু উমামা থেকে, আলী ইবনে ইয়াজিদ থেকে, তিরমিযী বলেছেন (কিছু জ্ঞানী ব্যক্তি আলী ইবনে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন এবং তারা দাবি করেছেন যে তিনি দুর্বল) এবং বুখারী বলেছেন যে তিনি হাদীস অস্বীকারকারী এবং নাসাঈ বলেছেন: বিশ্বাসযোগ্য নয়। দারকুতনি এটি গ্রহণ করেননি। এবং শাওকানি দাবি করেছেন ‘ওবাইদুল্লাহ ইবনে যাহর এবং কাসিমকে দুর্বল। অতএব হাদিসটি অত্যন্ত দুর্বল এবং তাই গ্রহণযোগ্য নয়।
সপ্তম হাদিসটি আবু দাউদ একজন শায়খ থেকে বর্ণনা করেছেন যাকে আবু ওয়াইল দেখেছিলেন এবং এটা স্পষ্ট যে একজন অজানা বর্ণনাকারী আছেন যার নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং তিনিই সেই শায়খ যাকে আবু ওয়াইল দেখেছিলেন, তাই হাদিসটি দুর্বল এবং গৃহীত হয়নি।
ইবনে জারির আল-তাবারী তার তাফসিরে যে অষ্টম হাদিসটি বর্ণনা করেছেন তা ইবনে মাসউদের একটি কওল (কথা) এবং এটি মারফু হাদিস নয়, এবং সাহাবাদের বক্তব্য প্রমাণ (দলিল) নয়, এবং এটি তাদের জন্য এবং যারা মুসলিমদের মধ্যে তাদের সাথে তাক্বলীদ করে তাদের জন্য আহকাম শরীয়ত, এবং সমস্ত মুসলিমের জন্য এটির সাথে তাক্বলীদ করা বাধ্যতামূলক নয়, এবং এটি ইবনে মাসউদ (রা.) এর উক্তি এবং আয়াত থেকে তার উপলব্ধি, প্রকৃতপক্ষে এটি (লাহু) এর শরহ এবং এটি একটি সঠিক উপলব্ধি যেমনটি দ্বিতীয় অংশের প্রথম হাদিসে উদ্ধৃত করা হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে: “বিবাহ অনুষ্ঠানের সময় এই অনর্থক কাজটি আমাদের জন্য বৈধ।” অর্থাৎ বিবাহ অনুষ্ঠানে গান গাওয়া অনুমোদিত। তৃতীয় হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা) এর বাণী সম্পর্কে, যখন তিনি (সা) আয়েশা (রা.) কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: “আপনি কি তাদের সাথে এমন কোন গায়ক পাঠিয়েছিলেন যিনি তাদের জন্য গান গাইতে পারতেন, কারণ আনসাররা এটি পছন্দ করে”, অর্থাৎ তারা গান গাওয়া পছন্দ করে। এই ব্যাখ্যায় একজন পর্যবেক্ষক সহজেই লক্ষ্য করবেন যে গান গাওয়াকে নিন্দা করা হয় কারণ এটি (ক্বারীনাহ) আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) পথ থেকে বিচ্যুত করার সাথে সম্পর্কিত। যদি তা না হত, তাহলে কোন নিন্দা করা হত না। যেকোনো কথায় আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) পথ থেকে বিচ্যুত করার সাথে সম্পর্কিত হলে তা নিন্দা করা হয় এবং কাজটি নিজেই জায়েয থাকে। গান গাওয়াও অনুরূপ, এটি অন্য যেকোনো জায়েয কাজের মতোই জায়েয, যদি না আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) পথ থেকে বিচ্যুত করার সাথে সম্পর্কিত হয়। অতএব, এই ব্যাখ্যাটি এর নিষেধের প্রমাণ নয়।
সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত হাদিসটি একটি মু’আল্লাক হাদিস, এবং যারা সঙ্গীত এবং বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ বলে মনে করেন তাদের পক্ষে এটি একটি প্রমাণ, আমরা এই হাদিসটি বিস্তারিতভাবে দেখব:
যদিও এই হাদিসটি সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত, তবুও এটা বলা ঠিক হবে না যে বুখারী এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন কারণ বুখারী (তিনি আমাদের অবহিত করেছেন) বা (তিনি আমাদের জানিয়েছেন) বা অনুরূপ কিছু বলেননি, তিনি মু’আল্লাক পদ্ধতিতে বর্ণনা করেছেন (এবং হিশাম ইবনে আম্মার বলেছেন) এবং সহীহ আল বুখারীতে মু’আল্লাক হাদিসগুলিকে প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক নয় যদিও সেগুলি উল্লেখ করা যেতে পারে। মু’আল্লাক হাদিসের অর্থ হল একজন বা একাধিক বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ করা হয়নি, এবং তাই হাদিসটি মুনকাতি (অসংযুক্ত) এবং আমি প্রশ্ন করছি: কেন বুখারী এই হাদিসটি বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ করেননি? এটি কি ইমাম বুখারীর বর্ণনা এবং বর্ণনাকারীর উপর সন্দেহের ইঙ্গিত দেয় না, এবং তাই এই হাদিসটি সহীহ হওয়ার স্তর থেকে নেমে আসে।
হিশাম বিন আম্মার একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি কিন্তু যখন তিনি বৃদ্ধ হয়ে যান তখন তার অবস্থা পরিবর্তিত হয়, তার কথা সন্দেহাতীতভাবে গ্রহণ করা যেত না, আবু হাতেম আর রাজি বলেন (যখন হিশাম বৃদ্ধ হয়ে যান তখন তিনি পরিবর্তন করেন, তাকে যা দেওয়া হত তা পড়তেন এবং যা তাকে বলা হত তা গ্রহণ করতেন) এবং আবু দাউদ যার কাছ থেকে আল-‘আজারি বর্ণনা করেছেন (হিশাম চারশত হাদীস বর্ণনা করেছেন কিন্তু তার সনদের ভিত্তি নেই), এবং তিনি আরও বলেছেন যে হিশাম আবু মিশার থেকে হাদীস গ্রহণ করতেন এবং তারপর সেগুলো বর্ণনা করতেন, এবং এর পরে তিনি অর্থাৎ আবু দাউদ বলেন (আমি ভয় পেয়েছিলাম যে তিনি ইসলামের বিষয়ে সন্দেহ তৈরি করবেন)। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল বলেছেন: “তিনি কিছুটা চঞ্চল ছিলেন” এবং আরও বলেছেন: “যদি তুমি তার পিছনে নামাজ পড়ো, তাহলে তোমার নামাজ পুনরাবৃত্তি করো।” এমন বর্ণনাকারীর কাছ থেকে হাদীস গ্রহণ করা ঠিক নয়, তাছাড়া সহীহ হাদীস তার বর্ণনাকে অস্বীকার করে।
আবু দাউদ তার সুনানে হিশাম বিন আম্মার থেকে শুরু করে একটি সুন্দর সনদে বর্ণনা করেছেন: (আবদুল ওহাব বিন নাজদাহ আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, বাশার বিন বকর আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, আব্দুর রহমান ইবনে ইয়াজিদ ইবনে জাবির থেকে, আতিয়াহ ইবনে কায়েস আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন: আমি আব্দুর রহমান ইবনে গানাম আল-আশ’আরীকে বলতে শুনেছি: আবু আমির আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন অথবা আবু মালিক, আমি আল্লাহর কসম করে বলছি যে তিনি আমাকে বিশ্বাস করেননি যে তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছেন: আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক থাকবে যারা খাজ্জ এবং রেশম (ব্যবহার) হালাল করবে। তাদের মধ্যে কিছু লোক কিয়ামত পর্যন্ত বানর এবং শূকরে রূপান্তরিত হবে। এবং এর একটি শক্তিশালী সনদ রয়েছে যার কোনও সন্দেহ নেই তবে বাদ্যযন্ত্র এবং মহিলা গায়িকাদের কোনও উল্লেখ নেই, তাই এটি স্পষ্ট যে এই বর্ণনাগুলির মধ্যে কোনটি পছন্দনীয়?
শরীয়ত মানুষের সহজাত প্রকৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং এমন কোন প্রমাণ নেই যে এটি মানুষের প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক, এবং যেমনটি আমরা সবাই জানি, গান গাওয়া, এটা এমন প্রকৃতির ব্যাপার যা আমি বুঝতে পারি না যে, যে ব্যক্তি চার বছর বা তার বেশি সময় ধরে বেঁচে থাকে এবং গান শোনে না, তার জন্য আমাদের শিশুরা খুব ছোটবেলা থেকেই গান গাইতে এবং নাচতে পছন্দ করে, তাহলে কি ইসলাম আমাদের প্রকৃতির অংশ যা তা নিষিদ্ধ করেছে?
পরিশেষে আমি বলছি, যদি এটি এমন একটি হাদিস হত, যার সাথে আমরা উপস্থাপিত অন্যান্য সহীহ হাদিসের কোন বিরোধিতা ছিল না, তাহলে আমরা দুর্বল হাদিসের উপর নির্ভর করতাম। কিন্তু এখানে সমস্যাটি ভিন্ন, অনেক হাদিস সহীহ এবং হাসান এবং এই হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক, তাহলে আমরা এটি কীভাবে নেব?
এই ৫টি কারণে আমি এই হাদিসটিকে গান গাওয়া এবং বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ করার প্রমাণ হিসেবে নিচ্ছি না।
প্রথম অংশের হাদিসগুলো আলোচনা শেষ করার পর এবং তাদের দুর্বলতা প্রমাণ করার পর, আসুন এখন দ্বিতীয় অংশের হাদিসগুলো দেখি, এবং এগুলোর সবগুলোই সহীহ, এগুলো থেকে আমরা গান গাওয়ার হুকুম বের করব।
প্রথম হাদিসটি বিবাহ অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার অনুমতি দেয়।
দ্বিতীয় হাদিসটি বাদ্যযন্ত্র ছাড়া অন্য কোথাও গান গাওয়ার অনুমতি দেয়।
তৃতীয় হাদিসটি গান গাওয়ার অনুমতি দেয় এবং এটি একটি বিবাহ অনুষ্ঠানে ঘটেছিল।
চতুর্থ হাদিসটি একটি প্রহার যন্ত্রের সাথে গান গাওয়ার অনুমতি দেয় এবং এটি দফ হতে পারে এবং এটি ঈদুল আযহার দিনে ঘটেছিল।
পঞ্চম হাদিসটি পুরুষদের উপস্থিতিতে একজন মহিলার দ্বারা দফ দিয়ে গান গাওয়ার অনুমতি দেয়। এটা বলা যায় না যে এটি গান গাওয়ার অনুমতি নয়; বরং এটি একজনের মানত (নাযর) পালনের অনুমতি দেয়, কারণ যদি কোন মানত না থাকে, তাহলে কোন গান গাওয়া হবে না। এই দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক নয় কারণ যদি মানত (নাযর) একটি পাপ কাজের জন্য হত, তাহলে এর পালন মোটেও অনুমোদিত হত না। যদি গান গাওয়া পাপ হতো, তাহলে নবী (সা) অনুমতি দিতেন না, কারণ আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি (সা) বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের মানত করে, তাকে অবশ্যই তাঁর আনুগত্য করতে হবে, আর যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতার মানত করে, তার যেন তাঁর অবাধ্যতা না হয়।” বুখারী, আবু দাউদ এবং নাসায়ী এই কথাটি বর্ণনা করেছেন। এছাড়াও যেহেতু নবী (সা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি (সা) বলেছেন: “কোন পাপের জন্য মানত (নাযর) পূরণ হয় না।” মুসলিমে এটি বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং যেহেতু গান গাওয়া জায়েজ, তাই নবী (সা) মহিলাকে তার মানত পালন করতে অনুমতি দিয়েছিলেন কারণ নবী (সা) যুদ্ধ থেকে নিরাপদে ফিরে এসেছিলেন।
ষষ্ঠ হাদিসটি ইঙ্গিত দেয় যে, দফের সাথে গান গাওয়া বিবাহে মুস্তাহাব, এবং কেবল জায়েজ (মুবাহ) নয়, তাই বিবাহে গান গাওয়া মানদুব (উৎসাহিত) এবং কেবল জায়েজ নয়।
সপ্তম হাদিসে নবী (সা) কর্তৃক গৃহীত গান গাওয়ার অনুমতির জন্য দলিল দেওয়া হয়েছে, শর্ত ছিল যে হারাম কথা বলা যাবে না, কারণ গান গাওয়াটা বিবাহের সময় ঘটেছিল।
অষ্টম হাদিসে নবী (সা) এর সামনে নারীদের গান গাওয়ার অনুমতির অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং এটি ঈদের দিন ঘটেছিল।
নবম হাদিসে উত্তম শব্দের সাথে গান গাওয়াকে মুস্তাহাব করা হয়েছে, এই প্রমাণের মাধ্যমে যে, নবী (সা) “আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে ভালোবাসি” বলার সময় গায়ক এবং (দুফ) বাজিকরদের অনুমতি দিয়েছিলেন এবং এটি গায়কদের উৎসাহিত করার জন্য এবং তিনি গান গাওয়ার এই সময়টি কেবল বিবাহ বা অন্যান্য অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রাখেননি।
দশম হাদিসে বাঁশি বাজিয়ে গান গাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, এই প্রমাণের মাধ্যমে যে, নবী (সা) রাখালকে বাঁশি বাজিয়ে গান গাওয়া থেকে বিরত রাখেননি, যদিও তিনি তার কান নিজের ইচ্ছায় বন্ধ করে রেখেছিলেন, বাধ্যবাধকতা হিসেবে নয়, যেমনটি তাকে পঙ্গপালের মাংস দেওয়া হয়েছিল কিন্তু তিনি তা খায়নি এবং অন্যদেরও খেতে দেননি। রাসূলুল্লাহ (সা) এর এই কাজ থেকে মানুষ বুঝতে পারে যে গান গাওয়া মাকরূহ (অপছন্দনীয়), কিন্তু যদিও তাদের এতে (সন্দেহ) শুবহাহ আছে, তারা ভুল করেছে। বিবাহ অনুষ্ঠান বা ঈদের দিন গান গাওয়া বিশেষভাবে অনুমোদিত ছিল না, বরং অনুমতি সাধারণ।
একাদশ হাদিসে দলিল দেওয়া হয়েছে যে আল্লাহর কিতাব গান গাওয়া মুস্তাহাব (পছন্দনীয়), এবং যদি গান গাওয়া হারাম হত তবে আল্লাহর কিতাবের জন্য গান গাওয়া সুপারিশ করা হত না।
দ্বাদশ হাদিসে আল্লাহর কিতাবে গান গাওয়ার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এই আলোচনা থেকে আমরা এমন একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হই যার কোন শুবহাহ (সন্দেহ) নেই, গান গাওয়া মুবাহ (অনুমোদিত), এবং বিবাহের ক্ষেত্রে মানদুব (উৎসাহিত) এবং এটি সম্ভবত কুরআনে ফরজ। এই সহীহ এবং হাসান হাদিসগুলি উপস্থাপন করার পর, কি এটা বলা সঠিক যে গান গাওয়া বা গান শোনা নিষিদ্ধ?
সঠিক শর’ঈ বিধান হলো, বিয়ে, ঈদ এবং সকল অনুষ্ঠানে গান গাওয়া জায়েজ এবং হারাম নয়, তা সে গাওয়া হোক বা শোনা হোক, এবং বাদ্যযন্ত্রের সাথে থাকুক বা না থাকুক।
মিশ্র সমাবেশে গান গাওয়া, অথবা মেয়েরা তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করে নাচ করে, তাহলে এটা হারাম এবং অনুমোদিত নয়; গান গাওয়ার নিষেধাজ্ঞার কারণে নয়, বরং গান গাওয়ার সাথে যা মিলিত হয় অর্থাৎ অবাধে মেলামেশা, নৃত্য এবং তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন (তাবাররুজ) এর কারণে। এবং আমি এটা বলছি এমন গান গাওয়ার ক্ষেত্রে যা পাপ বা খারাপ কথাবার্তা এবং কুফর ধারণার দিকে পরিচালিত করে, যেমন আব্দুল হালিম হাফিজ যে গানগুলি গেয়েছেন (قَدَرٌ أحمقُ الخُطا)। এই ধরনের গান গাওয়ার নিষেধে কোন সন্দেহ নেই, তবে এর বাইরে অন্যান্য গান গাওয়ার ক্ষেত্রে, এগুলি সাধারণত জায়েজ, এবং বিবাহের ক্ষেত্রে সুপারিশকৃত এবং কুরআনের জন্য বাধ্যতামূলক হতে পারে, তবে এটি বলা সম্পূর্ণ ভুল যে এটি হারাম।
নবী-রাসূলগণের ইসমত

নবী ও রাসূলগণের ‘ইসমাহ’ (তথা নিষ্পাপ হওয়া) বুদ্ধিবৃত্তি দ্বারা নির্ধারিত একটি বিষয়। কারণ তিনি একজন নবী বা রাসূল হওয়ায় তিনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার পক্ষ থেকে বার্তা পৌছানোর ক্ষেত্রে নিষ্পাপ। যদি (তাদের) একটি বিষয়ে ‘ইসমাহ’ না থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়, তাহলে এই ত্রুটি প্রতিটি বিষয়েই পৌঁছে যাবে (অর্থাৎ সন্দেহযুক্ত হবে); এবং এতে সমগ্র নবুয়্যত ও বার্তার (সত্যতার বিষয়টি) ভেঙে পড়বে। একজন ব্যক্তি আল্লাহর নবী অথবা আল্লাহর রাসূল হওয়ার প্রমাণের অর্থ হল তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যা প্রচার করেন তাতে তিনি নিষ্পাপ। সুতরাং তার পৌছানোর ক্ষেত্রে নিষ্পাপতা (বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে) অনিবার্য, এবং এই নিষ্পাপতার প্রত্যাখ্যান হলো তিনি যে বার্তা নিয়ে এসেছেন এবং যে নবুয়্যত দিয়ে তাকে পাঠানো হয়েছে তা প্রত্যাখ্যান করা। আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের সাথে সাংঘর্ষিক কাজ করার ক্ষেত্রে তার নিষ্পাপতার ক্ষেত্রে, এটি নিশ্চিত বিষয় যে তিনি স্পষ্টভাবে কাবায়ের (কবীরা গুনাহ) করেন না, অর্থাৎ তিনি অকাট্যভাবে কোনও কাবায়ের করেন না। কারণ একটি কাবায়ের তথা বড় পাপ করার অর্থ হল অবাধ্যতা করা। আল্লাহর অবাধ্যতাকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করা যায় না তথা অবাধ্যতা বিভক্ত হয় না। সুতরাং যদি অবাধ্যতা কর্ম পর্যন্ত পৌঁছায়, তাহলে তা প্রচার (তাবলীগ) পর্যন্ত পৌঁছাবে, এবং এটি (ওহীর) বার্তা এবং নবুয়্যতের পরিপন্থী। এই কারণেই নবী ও রাসূলগণ কাবায়ের থেকে মুক্ত, ঠিক যেমন তারা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা)’র থেকে আনীত বার্তা প্রচারে নিষ্পাপ। সাগাইর (সগীরা গুনাহ) সম্পর্কে নিষ্পাপতার বিষয়ে, আলেমদের ভিন্ন ভিন্ন মতামত রয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেছেন যে তারা তা থেকে মুক্ত নন, কারণ তা অবাধ্যতা নয়; আবার কেউ কেউ বলেছেন যে তারা নিষ্পাপ কারণ তা অবাধ্যতা। এর প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি হল যা-ই হারাম বলে বিবেচিত হোক এবং যা-ই ফরজ হোক, অর্থাৎ সমস্ত কর্তব্য (ফুরুদ) এবং নিষেধ (মুহাররামাত), সেগুলো মেনে চলার ক্ষেত্রে তারা নিষ্পাপ। সুতরাং তারা বাধ্যবাধকতার অবহেলা করা কিংবা নিষেধাজ্ঞাগুলো পালনের ব্যপারে নিষ্পাপ, সেগুলো কাবায়ের হোক কিংবা সাগাইর হোক। অন্য কথায়, তারা অবাধ্যতা (মা’সিয়াহ) নামক যেকোনো কিছু থেকে নিষ্পাপ। তাছাড়া, খিলাফ-উল-আওলা (যা সবচেয়ে উপযুক্ত তার বিপরীত), তারা তা থেকে মুক্ত নন। তাই, তারা একেবারেই যা সবচেয়ে উপযুক্ত তার ভিন্ন কিছু করতে পারেন (অর্থাৎ অতি উত্তম না করে উত্তম কিছু করতে পারেন), কারণ এর সকল বিবেচনায়, এটি “মা’সিয়াহ” (অবাধ্যতা) শব্দের অর্থের আওতায় আসে না। এটিই বুদ্ধিবৃত্তির বিবেচনায় অনিবার্য তথা তারা নবী ও রাসূল হওয়ার কারণে তা আবশ্যক।
আমাদের পয়গম্বর মুহাম্মদ (সা) একজন নবী ও রাসূল। সুতরাং, অন্যান্য রাসূল ও নবীদের মতো, তিনিও আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) থেকে যা প্রচার করেন তাতে ভুল করা হতে মুক্ত। এটি একটি সুনির্দিষ্ট নিষ্পাপতা যা বুদ্ধিবৃত্তি ও শর’ঈ দলীল দ্বারা প্রমাণিত। রাসূল (সা) আহকাম ওহী (প্রত্যাদেশ) ব্যতিত অন্য কিছু দ্বারা প্রচার করেননি। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) সূরা আল-আম্বিয়াতে বলেছেন:
“বলুন: আমি কেবল ওহী (প্রত্যাদেশ) দ্বারা তোমাদের সতর্ক করছি।” [TMQ আল-আম্বিয়া: ৪৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) সূরা আন-নাজমে বলেন:
“তিনি (নিজের) ইচ্ছা থেকে কথা বলেন না। কেবল ওহীই, যা প্রেরণ করা হয়।” [TMQ আন-নাজম: ৩-৪]
‘কথা বলা’ (ইয়ান্তিক) শব্দটি সাধারণ (উমুম) শব্দের অন্তর্গত, তাই এতে কুরআন এবং অন্যান্য শব্দও অন্তর্ভুক্ত। কুরআন বা সুন্নাহতে এমন কিছু নেই যা এটিকে নির্দিষ্ট করে, তাই এটি সাধারণই থেকে যায়, অর্থাৎ তিনি আইন প্রণয়নের কথা যা বলেন তা একটি নাযিলকৃত ওহী। তিনি কেবল কুরআনের সাথে যা বলেন তা নির্দিষ্ট করা অবৈধ; বরং এটিকে সাধারণই থাকতে হবে, যার মধ্যে কুরআন এবং হাদিসও অন্তর্ভুক্ত। আইন প্রণয়ন এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে, আহকাম, আকীদা, চিন্তাভাবনা এবং কাহিনী (বর্ণনার) ক্ষেত্রে, পরিকল্পনা তৈরি থেকে শুরু করে যুদ্ধ, খেজুর গাছের কলম করা বা অনুরূপ জিনিসকে ধরণ ও উপায়কে (আহকামে) অন্তর্ভুক্ত না করে, এটি নির্দিষ্ট করতে হবে, কারণ তিনি একজন রাসূল। আলোচনা একজন রাসূল এবং তাকে কী সহ পাঠানো হয়েছিল তা অধ্যয়ন সম্পর্কে, অন্য কোনও ব্যপারে নয়। সুতরাং (রাসূলের) বক্তব্যই (এসব) বিষয়বস্তুকে নির্দিষ্ট করে। সুতরাং যে বিষয়টি নিয়ে তিনি এসেছেন তাতে সাধারণতার রূপ সাধারণই থাকে এবং তারপরে এটিকে নির্দিষ্টকরণের একটি রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর কারণ তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) এই বাণী:
“বলুন, আমি কেবল ওহীর মাধ্যমে তোমাদের সতর্ক করছি।” [TMQ আল-আম্বিয়া: ৪৫]
এটি সূরা সাদে তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) এই বাণীর কারণেও:
“আমার কাছে কেবল এই ওহী পাঠানো হয়েছে যে আমি স্পষ্ট সতর্ককারী।” [TMQ সাদ: ৭০]
এটি দেখায় যে লক্ষ্য হল তিনি যা নিয়ে এসেছিলেন তা হল আকীদা, আহকাম এবং যা কিছু তাকে জানানো এবং সতর্ক করার জন্য আদেশ করা হয়েছিল। অতএব, এর মধ্যে শৈলী বা তার স্বাভাবিক কর্মের ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত নয় যা মানুষের সহজাত প্রকৃতির (ফিতরাহ) অর্থাৎ তার প্রাকৃতিক সৃষ্টি থেকে, যেমন হাঁটাচলা, কথা বলা, খাওয়া ইত্যাদি। এটি মানুষের কর্ম এবং তাদের চিন্তাভাবনায়, তা নির্দিষ্ট, শৈলী, উপায় এবং অনুরূপ জিনিসে নয়। সুতরাং, মানুষের কর্ম এবং চিন্তাভাবনার সাথে সম্পর্কিত যা কিছু রাসূল (সা) কে জানানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তা আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী। ওহীতে রাসূল (সা) এর কথা এবং কর্মের পাশাপাশি তাঁর সম্মতিও (সুকুত) অন্তর্ভুক্ত, কারণ আমাদের তাঁর অনুসরণ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ (সা) বলেছেন:
“রাসূল তোমাদের জন্য কাছে যা কিছু এনেছেন তা গ্রহণ করো; এবং তিনি তোমাদের যা কিছু থেকে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকো।” [TMQ আল-হাশর: ৭]
আর তিনি (সা) বললেন:
“নিশ্চয়ই, আল্লাহর রাসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ রয়েছে।” [TMQ আল-আহযাব: ২১]
অতএব, রাসূল (সা)-এর কথা, কাজ এবং চুক্তি হলো শর’ঈ প্রমাণ এবং এগুলো সবই আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) থেকে ওহী। রাসূল (সা) ওহী গ্রহণ করতেন, ওহী আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) কাছ থেকে তাঁর কাছে পৌঁছে দিতেন এবং ওহী অনুসারে বিষয়গুলো সমাধান করতেন, ওহী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত না হয়ে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) সূরা আহকাফে বলেছেন: “আমি কেবল আমার প্রতি যা ওহী করা হয় তারই অনুসরণ করি।” [TMQ আল-আহকাফ: ৯] এবং তিনি (সা) সূরা আ’রাফে বলেছেন: “আমি কেবল আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা ওহী করা হয় তারই অনুসরণ করি।” [TMQ আল-আ’রাফ: ২০৩] এর অর্থ, আমি কেবল আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা ওহী করা হয় তারই অনুসরণ করি। তাই তিনি তাঁর আনুগত্য (ইত্তিবা’) কেবল তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা ওহী করা হয় তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। এই সবকিছুই স্পষ্ট, স্পষ্ট এবং সাধারণ (আ’আম) হওয়ার জন্য স্পষ্ট; এবং রাসূল (সা)-এর সাথে যা সম্পর্কিত তা কেবল ওহী (প্রত্যাদেশ)। রাসূল (সা)-এর আইনগত জীবন মানুষের কাছে আহকাম ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অনুসরণ করত। সুতরাং, তিনি (সা) অনেক আহকামে, যেমন যিহার (ইসলামপূর্ব বিবাহবিচ্ছেদের ধরণ) এবং লি’আন (স্ত্রীর দ্বারা ব্যভিচারের শপথ করা অভিযোগ) এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ওহীর অপেক্ষা করতেন। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলার) পক্ষ থেকে কোন ওহীর উপর ভিত্তি ব্যতীত, তিনি কখনও কোন বিষয়ে হুকুমের কথা বলেননি, অথবা কোন আইন প্রণয়ন করেননি বা কোন আইনগত চুক্তি করেননি। সাহাবাগণ কখনও কখনও কোনও মানবিক কর্মের হুকুম এবং কোনও বিষয়, উপায় বা শৈলী সম্পর্কে মতামতের মধ্যে বিভ্রান্ত হয়ে পড়তেন, তাই তারা রাসূল (সা)-কে জিজ্ঞাসা করতেন: “এটা কি ওহী, হে আল্লাহর রাসূল, নাকি এটি মতামত এবং উপদেশ”: তিনি যদি তাদের বলেন, এটি ওহী, তবে তারা চুপ থাকত, কারণ তারা জানত যে এটি তাঁর কাছ থেকে নয়। যদি তিনি তাদের বলেন; বরং এটি ছিল মতামত এবং উপদেশ, তারপর তারা তার সাথে আলোচনা করত, এবং তিনি তাদের মতামত অনুসরণ করতে পারতেন; যেমন বদর, খন্দক এবং উহুদের (যুদ্ধ) যুদ্ধে যা ঘটেছিল। তিনি তাঁর রবের কাছ থেকে যা পৌঁছেছেন তা ছাড়া অন্য বিষয়ে তাদের বলতেন: “তোমাদের দুনিয়ার বিষয় সম্পর্কে তোমরাই ভালো জানো,” যেমন খেজুর গাছ কলম করার হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। যদি তিনি ওহী ছাড়া আইন সম্পর্কে কথা বলতেন, তাহলে তিনি ওহীর অপেক্ষা করতেন না হুকুম বলার জন্য, এবং সাহাবারা তাকে জিজ্ঞাসা করতেন না যে এটি ওহী নাকি মতামত; তিনি বরং নিজের কাছ থেকে উত্তর দিতেন, এবং তারা তাকে জিজ্ঞাসা না করেই তার সাথে আলোচনা করতেন। অতএব, রাসূল(সা) আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ওহীর ভিত্তিতেই বক্তব্য দিতেন, কাজ করতেন বা কাজের স্বীকৃতি দিতেন এবং তাঁর(নিজের) মতামতের উপর ভিত্তি করেও নয়। তিনি(সা) আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) কাছ থেকে যা কিছু প্রচার করেন তাতে ভুল থেকেও মুক্ত।
প্রশ্ন-উত্তর: সময়ের পূর্বেই যাকাত প্রদান

প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম আমাদের শাইখ, আল্লাহ আপনাকে ইসলামের সাথে প্রতিপালন করুন এবং ইসলামকে আপনার সাথে লালন করুন। আমি আল্লাহর কাছে দুআ করি যে আমি যেন তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হই যারা আপনাকে নবুূয়্যতের আদলের খিলাফতের জন্য বাইয়াত দান করবেন, কারণ তিনিই সবকিছুর একচ্ছত্র ক্ষমতাবান।
যাকাত, ব্যবসায়িক লেনদেন বা অর্থের যাকাত সম্পর্কে আমার একটি প্রশ্ন আছে; পূর্ণ এক (চন্দ্র) বছর (আল-হাওল) অতিবাহিত হওয়ার আগে কি এদের যাকাত বা এদের কিছু অংশের যাকাত দেওয়া জায়েজ হবে এবং (আল-হাওল) কি যাকাত প্রদানের জন্য শর্ত?
আল্লাহ আপনাকে দুনিয়া ও আখেরাতে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য কল্যাণকর কিছু করার জন্য সাহায্য করুন, ওয়া আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
ইমাদ এম. সা’আদ থেকে
উত্তর:
ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ,
যাকাত প্রদানের জন্য আল-হাওল পূর্ণ করা একটি শর্ত, যা “নিসাব”। যদি শর্ত পূরণ হয়, অর্থাৎ “নিসাব” এর মাধ্যমে আল-হাওল পরিপূর্ণ হয়েছে এবং তা হ্রাস করা হয়নি, তাহলে যাকাত বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। তবে, যদি এটি নির্ধারিত সময়ের আগে প্রদান করা হয় তবে শরীয়ত প্রমাণ অনুসারে এই প্রদান জায়েজ, যার (দলীলের) মধ্যে নিম্নলিখিত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:
– আল-বায়হাকী আল-সুনান আল-কুবরা থেকে আলী থেকে উদ্ধৃত করেছেন:
«أَنَّ الْعَبَّاسَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ سَأَلَ رَسُولَ اللهِ فِي تَعْجِيلِ صَدَقَتِهِ قَبْلَ أَنْ تَحِلَّ فَأَذِنَ لَهُ فِي ذَلِكَ».
“আল আব্বাস (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা)-কে জিজ্ঞাসা করলেন যে, তিনি কি তার সাদাকাহ্ হাওল সম্পন্ন হওয়ার আগেই তাড়াহুড়ো করে আদায় করতে পারবেন, আর আল্লাহর রাসূল (সা) তাকে অনুমতি দিলেন”।
– আল-দারকিতনী তার সুনানে হুজর আল-আদাবী থেকে আলী (রা.) থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, তিনি বলেছেন: আল্লাহর রাসূল (সা) উমরকে বলেছিলেন:
«إِنَّا قَدْ أَخَذْنَا مِنَ الْعَبَّاسِ زَكَاةَ الْعَامِ عَامِ الْأَوَّلِ»
“আমরা প্রথম বছরেই আল-আব্বাসের কাছ থেকে বছরের যাকাত গ্রহণ করেছি”।
– আল-দারকিতনী মুসা বিন তালহা থেকে তালহা থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«يَا عُمَرُ أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ عَمَّ الرَّجُلِ صِنْوُ أَبِيهِ؟ إِنَّا كُنَّا احْتَجْنَا إِلَى مَالٍ فَتَعَجَّلْنَا مِنَ الْعَبَّاسِ صَدَقَةَ مَالِهِ لِسَنَتَيْنِ».
“হে উমর, তুমি কি জানতে না যে, লোকটির চাচা তার পিতার যমজ? আমাদের টাকার প্রয়োজন ছিল তাই আমরা দুই বছর আগে আব্বাসের টাকা থেকে সাদাকাহ করেছিলাম”।
আল-হাকামের সনদে মতবিরোধ ছিল এবং সঠিকটি আল-হাসান ইবনে মুসলিমের কাছ থেকে এসেছে যা মুরসাল।
অতএব, যাকাত আদায়ের আগে তাড়াহুড়ো করা জায়েজ।
আপনার তথ্যের জন্য, বেশিরভাগ আলেমও এটিই বলেন।
আপনার ভাই,
আতা বিন খলিল আবু আল-রাশতাহ১১ই শাওয়াল ১৪৩৫ হিজরি
০৭/০৮/২০১৪ ইংঅডিও ভার্শন:


















