Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • শত্রুতা ঘোষণা না করেই চীনের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ

    শত্রুতা ঘোষণা না করেই চীনের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ

    بسم الله الرحمن الرحيم

    শত্রুতা ঘোষণা না করেই চীনের জ্বালানি সরবরাহ লাইন নিয়ন্ত্রণ
    (অনূদিত)

    আল-রায়াহ পত্রিকা – সংখ্যা ৫৯৩ – ০১/০৪/২০২৬
    লেখক: উস্তাদ নাবিল আব্দুল করিম

    সমসাময়িক বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে, প্রধান শক্তিগুলো অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অঙ্গনে আধিপত্য বিস্তারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, যাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সংগ্রাম হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে। এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক বা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং উদীয়মান বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা নির্ধারণের একটি সংগ্রাম। এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকায় চীনের দ্রুত প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাব আমেরিকার দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা আধিপত্যকে হুমকির মুখে ফেলছে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুন রূপ দিচ্ছে। আমরা এটা বোঝাতে চাইছি না যে, চীন বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার বা একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার জন্য উপযুক্ত; চীনের নিজস্ব কোনো স্বতন্ত্র মতাদর্শ নেই। তবে, আমেরিকার আধিপত্যকে দমন করার, বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতাকে দুর্বল করার এবং একটি বহুমেরু বিশ্ব প্রতিষ্ঠা করার মতো ক্ষমতা চীনের রয়েছে।

    এই প্রেক্ষাপটে, প্রতিটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, প্রতিটি প্রযুক্তিগত চুক্তি, এবং সামুদ্রিক প্রণালী ও জ্বালানি করিডোরের প্রতিটি পদক্ষেপ একটি কৌশলগত দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়।

    চীনের উত্থান এখন আর কেবল একটি শিল্পশক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি একটি আন্তঃমহাদেশীয় অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তিতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে, পরোক্ষ চাপের মাধ্যমে চীনের সম্প্রসারণকে প্রতিহত করে এই উত্থানকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে।

    আমরা দেখছি, যুক্তরাষ্ট্র চীনে উন্নত চিপ ও এর উৎপাদন উপাদানের রপ্তানি বন্ধ করে চীনা প্রযুক্তিকে দমন করছে। এই উন্নত চিপগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন সরঞ্জাম এবং উন্নত ফটোলিথোগ্রাফি প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাষ্ট্র চীন থেকে কারখানাগুলো ভিয়েতনাম, ভারত এবং মেক্সিকোতে স্থানান্তর করে সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্গঠনের জন্য কাজ করেছে এবং ২০২২ সালের চিপস অ্যাক্টের মতো আইনের মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করেছে। চীনের উপর নির্ভরতা কমাতে এটি এশীয় দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক জোটও গঠন করেছে। এর লক্ষ্য হলো চীনা কারখানার উপর বিশ্বব্যাপী নির্ভরতা কমানো, যার ফলে বেইজিংকে একটি কৌশলগত দর কষাকষির হাতিয়ার থেকে বঞ্চিত করা।

    এছাড়াও, যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের চারপাশে অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রতিরোধের একটি বলয় তৈরির লক্ষ্যে QUAD এবং AUCUS অংশীদারিত্বের মতো এশিয়ায় জোটগুলোকে শক্তিশালী করেছে।

    তবে, তিনটি বিষয় অত্যন্ত সংবেদনশীল রয়ে গেছে: সামুদ্রিক পথ, স্থল শক্তি করিডোর এবং তাইওয়ান।

    ১. সমুদ্রপথে চাপ প্রয়োগ:

    সমুদ্রপথে চাপ সরাসরি অবরোধ আরোপের মাধ্যমে নয়; বরং প্রতিরোধসক্ষমতা গড়ে তোলা বা এমন সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করার মাধ্যমে করা হয়, যাতে চীন উপলব্ধি করে যে সংঘাত বৃদ্ধি পেলে তার সামুদ্রিক Lifeline বিঘ্নিত হতে পারে। একে বলা যেতে পারে—“সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণে রাখা”।

    দক্ষিণ চীন সাগর – সামুদ্রিক সম্প্রসারণ রোধ: যুক্তরাষ্ট্র চীনের নিয়ন্ত্রিত দ্বীপপুঞ্জের কাছে ‘ফ্রিডম অফ নেভিগেশন অপারেশনস’ (FONOPs) পরিচালনা করে, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম এবং মালয়েশিয়াকে তাদের সামুদ্রিক বিরোধে সমর্থন করে, ফিলিপাইনে অগ্রবর্তী ঘাঁটি স্থাপন করে এবং তাইওয়ানের কাছে যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করে চাপ প্রয়োগ করে। এইভাবে, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে চীনের সামুদ্রিক পরিসরে ব্যাঘাত ঘটাতে সক্ষম।

    ভারত মহাসাগর – একটি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য:

    ডিয়েগো গার্সিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগিতা এবং অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (OECD)-এর শক্তিশালী চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো—চীন যেন ভারত মহাসাগরকে তার স্থায়ী প্রভাবক্ষেত্রে রূপান্তর করতে না পারে।

    হরমুজ প্রণালী – জ্বালানি চাপ: এই প্রণালীটি চীনের উদ্দেশ্যে গমনকারী উপসাগরীয় তেলের একটি বড় অংশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে ইরানের ওপর হামলা এবং প্রণালীটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি—এসব হয়তো ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল হতে পারে, তবে বাস্তবে এটি পুরোপুরি বন্ধ করা সহজ নয়। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে সংঘাতটি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, অথবা এমন কোনো সমঝোতা তৈরি হতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে ইচ্ছামতো প্রণালীটি নিয়ন্ত্রণ ও বন্ধ করার সুযোগ দেবে।

    তাইওয়ান – সামুদ্রিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু: তাইওয়ান কেবল একটি রাজনৈতিক বা সার্বভৌমত্বের ইস্যু নয়; এটি একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথ। এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি চীনের বাণিজ্যিক নৌপথের ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।

    এখানে দৃশ্যত কোনো সরাসরি অবরোধ নেই, নেই খোলামেলা সামরিক সংঘর্ষও। বরং এটি এমন এক সূক্ষ্ম কিন্তু শক্তিশালী কৌশল—যাকে বলা যায় “প্রয়োজনে সক্রিয় করা যায় এমন প্রতিরোধ ব্যবস্থা”। যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে এমন এক বিস্তৃত জোট ও সামরিক ঘাঁটির বলয় গড়ে তুলছে, যা চাইলে চীনের নৌবাণিজ্যকে ব্যাহত করতে, গতি কমিয়ে দিতে এবং ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ, আনুষ্ঠানিক অবরোধ ঘোষণা না করেই এই সক্ষমতাকে তারা কৌশলগত চাপ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে।

    মালাক্কা প্রণালী – সবচেয়ে বিপজ্জনক সংকীর্ণ পথ: চীনের তেল আমদানির প্রায় ৬০% এই প্রণালীর মধ্য দিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র তার সপ্তম নৌবহরের স্থায়ী উপস্থিতি, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার সাথে নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব এবং চতুষ্পাক্ষিক জোটকে (ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র) শক্তিশালী করার মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করে। প্রয়োজনে এই প্রণালীর মধ্য দিয়ে যান চলাচল দ্রুত সীমাবদ্ধ করা যেতে পারে।

    ২. স্থলপথে চাপ প্রয়োগ:

    চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর মাধ্যমে মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থলপথে বিকল্প সংযোগ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে।

    মধ্য এশিয়া, রাশিয়া ও পাকিস্তান জুড়ে সড়ক, রেলপথ এবং জ্বালানি পাইপলাইনের এক বিস্তৃত নেটওয়ার্ক নির্মাণের মাধ্যমে তারা সামুদ্রিক নির্ভরতা হ্রাস করতে চায়।

    এখানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল সরাসরি এই পথগুলো বন্ধ করে দেওয়া নয়; বরং এগুলোকে আরও ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ এবং অস্থিতিশীল করে তোলা।

    মধ্য এশিয়া – চীনের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ভারসাম্য পুনর্বিন্যাস: কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান এবং উজবেকিস্তান থেকে গ্যাস, তেল ও পণ্য পশ্চিম চীনে পরিবহন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ চাপের উদ্দেশ্য হলো—এই দেশগুলোকে বেইজিং-কেন্দ্রিক অংশীদারিত্ব থেকে সরে এসে বৈচিত্র্যময় সম্পর্ক গড়ে তুলতে উৎসাহিত করা; ইউরোপীয় ও আমেরিকান বিকল্প বিনিয়োগকে সমর্থন জোগাতে প্ররোচিত করা; এবং চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে আর্থিক হাতিয়ার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তা নেওয়া। এর মূল লক্ষ্য হলো এই অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক প্রভাবের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করা।

    রাশিয়া – নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে চাপ: রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো পরিবহন নেটওয়ার্ক, ব্যাংকিং লেনদেন, শিপিং কোম্পানি এবং বীমা খাত—সবকিছুকেই গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো রাশিয়ার ভূখণ্ড ব্যবহার করে চীনের স্থলভিত্তিক বাণিজ্যকে জটিল করে তোলা এবং এর পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়া।

    ভবিষ্যতে এমন উপায়ও খোঁজা হতে পারে, যার মাধ্যমে রাশিয়া ও চীনের মধ্যে জ্বালানি সংযোগ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া সম্ভব হবে।

    চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC): এটি পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত হয়ে গোয়াদার বন্দরে গিয়ে শেষ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ভারতের সাথে আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখার মাধ্যমে; পাকিস্তানের অবকাঠামো খাতে চীনের বিনিয়োগের ওপর নজরদারির মাধ্যমে; এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ইসলামাবাদের ওপর আর্থিক চাপ প্রয়োগ করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো—এই প্রকল্পটিকে অভ্যন্তরীণ ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঝুঁকির মুখে রেখে সর্বদা অরক্ষিত অবস্থায় রাখা। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে কোনো সংঘাত দেখা দিলে এই করিডোরটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে; এমনকি যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রয়োজন মনে করে—এবং দুই দেশের মধ্যে আঞ্চলিক সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে—তবে এর ফলে এই করিডোরটি সম্পূর্ণ ধ্বংসও হয়ে যেতে পারে।

    ইরান – একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থলভিত্তিক জ্বালানি কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত: বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি পরোক্ষভাবে এমন যেকোনো সমাধানের পথ রুদ্ধ করে দিতে পারে, যার মাধ্যমে ইরান হয়ে চীনে জ্বালানি সরবরাহের সুযোগ তৈরি হতে পারত। এই বিশৃঙ্খলা ও যুদ্ধের কারণে জ্বালানি পাইপলাইন এবং পরিবহন রুটগুলো আকস্মিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে—যা ঠিক প্রয়োজনীয় মুহূর্তে চীনের ওপর একটি পরোক্ষ আঘাত হিসেবে কাজ করবে।

    স্থলপথগুলো সমুদ্রপথের মতো নয়; একটি স্থলপথ চাইলেই সহজে বন্ধ করে দেওয়া যায় না। তবে, এই কৌশলটিকে চীনের স্থলভিত্তিক জ্বালানি নেটওয়ার্ককে পরোক্ষভাবে দুর্বল করে তোলার একটি কৌশল হিসেবেই বর্ণনা করা যেতে পারে।

    ৩. পরিশেষে, তাইওয়ান ইস্যু:

    এটিই হলো সবচেয়ে স্পর্শকাতর একটি বিষয়, যাকে অনেক সময় একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বা মোড়-পরিবর্তনকারী মুহূর্ত হিসেবে গণ্য করা হয়। তাইওয়ান এমন একটি অবস্থানে অবস্থিত, যা চীনের সমুদ্রসীমাকে বেষ্টন করে থাকা ‘প্রথম দ্বীপ শৃঙ্খল’ বা ‘ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন’-এর ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তাইওয়ান যদি চীনের প্রভাববলয় থেকে সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে এসে স্বাধীন হয়ে যায়, তবে চীন তার কৌশলগত সামুদ্রিক গভীরতা বা ‘স্ট্র্যাটেজিক মেরিটাইম ডেপথ’ হারিয়ে ফেলবে। তাছাড়া, তাইওয়ান হলো উন্নত চিপ তৈরির একটি বৈশ্বিক কেন্দ্র; সেখানে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে তা বিশ্ব অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেবে। এমনকি চীন যদি তাইওয়ান দখল করে নেয়, কিংবা তাইপেই থেকে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণা আসে, অথবা যুক্তরাষ্ট্র যদি সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করে—তবে তা একটি যুদ্ধেরও সূত্রপাত ঘটাতে পারে। তাই, এই বিষয়টি কৌশলগত অস্পষ্টতার এক ‘ধূসর অঞ্চলে’ (gray area) অবস্থান করছে; আর তাইওয়ানই হলো সেই কেন্দ্রবিন্দু বা ‘গিঁট’, যেখানে এসে এই সমস্ত সুতো একত্রিত হতে পারে।

    পরিশেষে বলা যায়, বর্তমানে চীনের সাথে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রকে খুব একটা আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না। এর পরিবর্তে, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি কৌশলগত পরিবেশ গড়ে তোলায় মগ্ন বলে মনে হচ্ছে, যেখানে ‘চাপ প্রয়োগ’ করার বিষয়টি যেকোনো মুহূর্তে ব্যবহারের উপযোগী একটি সহজলভ্য ও পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হিসেবে সর্বদা প্রস্তুত থাকে। যুক্তরাষ্ট্র কোনো আনুষ্ঠানিক অবরোধ ঘোষণা করছে না ঠিকই, কিন্তু তারা জ্বালানি মানচিত্রগুলো নতুন করে সাজাচ্ছে, সামরিক ঘাঁটিগুলোর অবস্থান পুনর্বিন্যাস করছে, দক্ষিণ চীন সাগরে নৌ-জোট গড়ে তুলছে, চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর বিকল্প পথগুলোতে সহায়তা দিচ্ছে এবং বাণিজ্যের সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন না করেই স্পর্শকাতর প্রযুক্তিগুলোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের জন্য তাদের দুয়ার পুরোপুরি বন্ধ করে দিচ্ছে না, বরং সেই যাতায়াতের পথগুলোকে ক্রমশ সংকুচিত করে আনছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কোনো গুলি ছুড়ছে না বটে, কিন্তু তাদের আঙুলটি ঠিকই বন্দুকের ট্রিগারের ওপর রাখা আছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের টিকে থাকার বা প্রতিরোধ গড়ে তোলার মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং একই সাথে চীনকে ‘বেষ্টন করে রাখার’ (containment) বিকল্প পথগুলোও খোলা রাখছে।

    এভাবেই সেখানে একটি ‘প্রভাব বিস্তারকারী শক্তির’ দৃশ্যপট ফুটে ওঠে—যা তার চারপাশের পরিবেশকে নতুন করে ঢেলে সাজায়; যার ফলে চীনের প্রতিটি অগ্রগতি হয়ে ওঠে শর্তসাপেক্ষ, প্রতিটি পদক্ষেপ হয়ে ওঠে সুপরিকল্পিত এবং প্রতিটি চাল হয়ে ওঠে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অন্তত বর্তমান সময়ের জন্য হলেও, চীনের সাথে সম্পর্কের বাস্তবতাটি এখন এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে—যা মূলত ‘অঘোষিত চাপ’ এবং ‘যুদ্ধবিহীন সংঘাত’-এরই নামান্তর।

    তখন স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্নটি সামনে চলে আসে: চীন কি এই প্রবল চাপ সামলে উঠতে পারবে? এই সমীকরণ কি শেষমেশ বদলে যাবে? এমন কি অন্য কোনো উপাদান বা শক্তি ক্রিয়াশীল রয়েছে, যা এই পুরো পরিস্থিতিকে উল্টে দিতে পারে? সময়ের পরিক্রমায়ই কেবল এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া সম্ভব হবে।

  • সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রমাণে নির্ভরশীলতার যুক্তি

    সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রমাণে নির্ভরশীলতার যুক্তি

    কল্পনা করুন, আপনি একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে দেখলেন রাস্তায় ডোমিনোর একটি লম্বা সারি রয়েছে। এই সারি এতই দীর্ঘ যে চোখের শেষ সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। হঠাৎ একটি পরিচিত শব্দ কানে এলো – ডোমিনো পড়ার আওয়াজ। ছোটবেলায় আপনি ডোমিনো খেলতেন, তাই এই শব্দ চেনা। আওয়াজটি ধীরে ধীরে জোরালো হচ্ছে এবং কাছে আসছে।

    কিছুক্ষণ পর দেখলেন, সত্যিই একের পর একে ডোমিনোগুলো পড়ে আসছে। পদার্থবিদ্যার সাধারণ নিয়মে এমন দুর্দান্ত দৃশ্য দেখে আপনি মুগ্ধ। কিন্তু একটু দুঃখও লাগলো, কারণ শেষ ডোমিনোটি আপনার পায়ের কাছে এসে পড়ে গেছে। এই চমৎকার অভিজ্ঞতায় রোমাঞ্চিত হয়ে আপনি স্থির করলেন – রাস্তা ধরে হেঁটে প্রথম ডোমিনো খুঁজে বের করবেন। যে ব্যক্তি এই অসাধারণ ব্যাপারটি ঘটিয়েছে, তার সাথে দেখা করতে চান।

    এবার আসি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে,

    প্রশ্ন ১: আপনি কি হেঁটে হেঁটে প্রথম ডোমিনো পাবেন, নাকি চিরকাল হাঁটতেই থাকবেন?

    সবাই বলবে – অবশ্যই প্রথম ডোমিনো পাবেন। কিন্তু কেন এই উত্তর? কারণটি খুবই সহজ। যদি ডোমিনোর সারি অসীম হতো, তাহলে আপনার পায়ের কাছে যে শেষ ডোমিনোটি পড়লো, সেটি আসলে কখনোই পড়তো না। কেন? কারণ অসীম সংখ্যক ডোমিনো পড়তে অসীম সময় লাগবে। আর অসীম সময় মানে কখনোই শেষ হবে না। তাহলে শেষ ডোমিনো পড়ার সুযোগই থাকে না।

    সহজ ভাষায় বললে – শেষ ডোমিনো পড়ার জন্য তার আগের ডোমিনো পড়তে হবে। সেই ডোমিনো পড়ার জন্য তার আগেরটি পড়তে হবে। যদি এই ব্যাপারটি অনন্তকাল চলতে থাকে, তাহলে শেষ ডোমিনো কখনোই পড়বে না।

    প্রশ্ন ২: এখন ধরুন, হেঁটে হেঁটে আপনি প্রথম ডোমিনো খুঁজে পেলেন। এই প্রথম ডোমিনো সম্পর্কে আপনার মনে কী চিন্তা আসবে? মনে করবেন কি এটি নিজে নিজেই পড়েছে?

    অবশ্যই না! আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতায় কিছুই নিজে নিজে ঘটে না। সবকিছুর পেছনে কোনো না কোনো কারণ থাকে। তাহলে প্রথম ডোমিনো পড়ার পেছনেও কোনো কারণ ছিল – হয়তো কোনো ব্যক্তি ধাক্কা দিয়েছে, বাতাসের ঝাপটায় পড়েছে, অথবা অন্য কিছু এটিকে আঘাত করেছে। যাই হোক না কেন, কোনো বাহ্যিক কারণ অবশ্যই ছিল।

    সারকথা: ডোমিনোর সারি অসীম হতে পারে না এবং প্রথম ডোমিনো কোনো কারণ ছাড়া নিজে নিজে পড়তে পারে না।

    এই ডোমিনোর গল্প আসলে “নির্ভরশীলতার যুক্তি” (Argument from Dependency) এর একটি সুন্দর উদাহরণ। মহাবিশ্ব অনেকটা এই ডোমিনোর সারির মতো। মহাবিশ্ব এবং এর ভেতরের সবকিছুই নির্ভরশীল। তারা অন্য কিছুর উপর নির্ভর করে, সেটি আবার অন্য কিছুর উপর – এভাবে চলতে থাকলে অসীম হয়ে যায়। কিন্তু আমরা দেখেছি অসীম নির্ভরতার শৃঙ্খল অসম্ভব।

    তাহলে একমাত্র যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা হলো – মহাবিশ্ব এবং এর সবকিছু এমন একটি সত্তার উপর নির্ভরশীল যিনি স্বয়ং কারো উপর নির্ভরশীল নন। তিনি স্বাধীন ও চিরন্তন। সহজভাবে বলতে গেলে, এমন একটি স্বাধীন ও চিরন্তন সত্তা থাকতেই হবে যার উপর সবকিছু নির্ভরশীল।

    Video courtesy: Somrat

    কোনো কিছু নির্ভরশীল বলতে আমরা কী বুঝি? (What does it mean when we say something is dependent?)

    এই যুক্তি বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে “নির্ভরশীল” বলতে আমরা কী বুঝি। “Philosophy” বা “দর্শনে” নির্ভরশীলতার কয়েকটি সংজ্ঞা রয়েছে:

    প্রথমত, প্রয়োজনীয় নয় এমন কিছু (It is something that is not necessary)

    ফিলোসফিতে “প্রয়োজনীয়” বা “Necessary” শব্দের একটি বিশেষ অর্থ রয়েছে। এর মানে হলো যার অস্তিত্ব না থাকা অসম্ভব বা অকল্পনীয়। এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের “প্রয়োজন” শব্দের চেয়ে ভিন্ন। আমরা আমাদের চারপাশে যা কিছু দেখি, কিছুই প্রয়োজনীয় নয়। সবকিছুই থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে।

    মনে করেন, আপনি যে চেয়ারে বসে আছেন, সেটি প্রয়োজনীয় নয়। এই চেয়ারটি না থাকতে পারতো। আপনি হয়তো এটি কিনতেন না, কোম্পানি হয়তো এটি তৈরি করতো না, দোকানদার হয়তো বিক্রি করতো না। অনেক কারণেই এই চেয়ার না থাকতে পারতো। এই “না থাকার সম্ভাবনা” হলো নির্ভরশীল জিনিসের মূল বৈশিষ্ট্য।

    যে জিনিসটা নাও থাকতে পারত, তার ক্ষেত্রে খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে: “এই জিনিসটা কেন আছে?” এটা একটা যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন। এটা হতে পারে না যে জিনিসটা নিজেই নিজের কারণ, কারণ এর অস্তিত্বে অপরিহার্য কিছু নেই। যদি বলি যে জিনিসটা নিজেই নিজেকে ব্যাখ্যা করে, তাহলে আমরা যে নির্ভরশীলতার কথা বললাম সেটাকেই অস্বীকার করা হয়। তাই ব্যাখ্যাটা হতে হবে এর বাইরের কিছু। এই প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা মানে হলো বাহ্যিক কতগুলো বিষয় যা কোনো কিছুর অস্তিত্বের যুক্তিসঙ্গত কারণ দেয়।

    আমাদের চেয়ারের উদাহরণে ফিরে যাই – কয়েকটা বিষয় মিলে, যেমন কারখানায় এটা তৈরি হওয়া, দোকানে এটা বিক্রি হওয়া, এবং আপনার এটা কেনা – এগুলো মিলেই চেয়ারটার অস্তিত্বের ব্যাখ্যা। সুতরাং কোনো কিছুর জন্য যদি বাহ্যিক বিষয়গুলোর (External factors) দরকার হয়, তার মানে সেটা নিজের চেয়ে অন্য কিছুর উপর নির্ভরশীল। ফলে এর অস্তিত্ব বাইরের কিছুর উপর নির্ভর করে। এটা একটা মৌলিক, স্বজ্ঞাত এবং বুদ্ধিবৃত্তিক (Rational) চিন্তাভাবনা। কারণ যে জিনিসের অস্তিত্ব আছে অথচ নাও থাকতে পারত, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাই বুদ্ধিমান মনের (Rational Mind) পরিচয়।

    বিজ্ঞানীরা কী করেন ভেবে দেখুন। তাঁরা বাস্তবতার বিভিন্ন দিক দেখিয়ে প্রশ্ন করেন—এই ফুলটা কেন এমন? ওই ব্যাকটেরিয়া কেন এই রোগ ঘটায়? মহাবিশ্ব কেন এই গতিতে প্রসারিত হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলো যুক্তিসঙ্গত কারণ এগুলোর কোনোটাই অপরিহার্য নয়; এগুলো সব যেমন আছে তেমন নাও থাকতে পারত।

    এই ধারণাটা আরও ভালো করে বোঝার জন্য এই উদাহরণটা ভাবুন:

    আবার, সকালে ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘরে গেলেন। ফ্রিজ খুলে দেখলেন ডিমের বাক্সের উপর একটি কলম রয়েছে। আপনি কি মনে করবেন যে কলমটি নিজে নিজেই সেখানে গেছে? কখনোই না! আপনি অবশ্যই প্রশ্ন করবেন – কলমটি কীভাবে সেখানে এলো? কারণ কলমের ফ্রিজে থাকাটা প্রয়োজনীয় নয়। এর জন্য একটি ব্যাখ্যা দরকার। হয়তো আপনার ছেলে কলম কিনে এনে ফ্রিজে রেখেছে। তাই কলমটা এই বাহ্যিক বিষয়গুলোর উপর নির্ভরশীল, এবং এই বিষয়গুলোই কলমের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা দেয়।

    দ্বিতীয়ত, উপাদানের বিন্যাস পরিবর্তনযোগ্য (Something is dependent if its components or basic building blocks could have been arranged in a different way).

    যদি কোনো কিছুর উপাদানগুলো ভিন্নভাবে সাজানো যায়, তাহলে বুঝতে হবে কোনো বাহ্যিক শক্তি এই নির্দিষ্ট বিন্যাস নির্ধারণ করেছে। একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে বলি:

    আপনি গাড়িতে করে বাড়ি ফিরছেন। রাস্তায় একটি চত্বর পার হওয়ার সময় দেখলেন ফুল দিয়ে লেখা “আমি তোমায় ভালোবাসি”। এই ফুলগুলোর বিন্যাস কি প্রয়োজনীয়? মোটেও না। এখানে “আমি তোমাকে পছন্দ করি” লেখাও হতে পারতো। অথবা একেবারেই এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে থাকতে পারতো। যেহেতু ভিন্ন বিন্যাস সম্ভব ছিল, তাই কোনো বাহ্যিক শক্তি (হয়তো মালী বা স্থানীয় সরকারের কোনো প্রকল্প) এই নির্দিষ্ট বিন্যাস তৈরি করেছে।

    এই নিয়মটি আমরা যা কিছু দেখি সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একটি পরমাণু হোক, ল্যাপটপ হোক বা জীবদেহ হোক – সবকিছুর উপাদান একটি নির্দিষ্ট উপায়ে সাজানো। প্রতিটি উপাদানের অস্তিত্ব প্রয়োজনীয় নয়। তারা নিজেদের ব্যাখ্যা নিজেরা দিতে পারে না, তাই ব্যাখ্যা দরকার।

    তৃতীয়ত, বাহ্যিক সহায়তার উপর নির্ভরতা  (A thing is dependent if it relies on something outside itself for its existence)

    এটি নির্ভরশীলতার সবচেয়ে সাধারণ সংজ্ঞা। যে কিছু অস্তিত্বের জন্য নিজের বাইরের কিছুর উপর নির্ভর করে, সেটি নির্ভরশীল। আরেকভাবে বলা যায়, যা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়।

    একটা উদাহরণ হলো পোষা বিড়াল। বিড়াল নিজে নিজের ভরণপোষণ করতে পারে না। খাবার, পানি, অক্সিজেন, আশ্রয় – এসব বাহ্যিক জিনিসের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে।

    সর্বশেষে, সীমিত ভৌত গুণাবলী (The defining features of a dependent thing are that it has limited physical qualities)

    নির্ভরশীল জিনিসের একটি নির্দিষ্ট আকার, রং, তাপমাত্রা, চার্জ, ভর ইত্যাদি থাকে। কেন এই বৈশিষ্ট্যগুলো সীমিত? কারণ কোনো বাহ্যিক উৎস বা কারণ এই সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করেছে।

    প্রশ্ন: কেন এই জিনিসটি এই আকারের? কেন দ্বিগুণ বড় নয়? কেন এই রং, অন্য রং নয়? এই জিনিসটি তো নিজে নিজেকে এই সীমাবদ্ধতা দেয়নি।

    চলেন একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝি। আমি যদি একটা কাপকেক নিয়ে এর সীমিত ভৌত গুণাবলী – আকার, আকৃতি, রং আর গঠন – দেখিয়ে বলি যে এটা অপরিহারযভাবে অস্তিত্বশীল (existed necessarily), তাহলে আপনি আমাকে বোকা ভাববেন। আপনি জানেন যে এর আকার, রং আর গঠন বাহ্যিক কোনো উৎস নিয়ন্ত্রণ করেছে: এক্ষেত্রে সেটা হলো বেকার (Baker)। সীমিত ভৌত গুণাবলীর জিনিসগুলো নিজেরা এই গুণাবলী তৈরি করেনি। এই সীমিত ভৌত গুণাবলীর অস্তিত্বের ব্যাখ্যা অবশ্যই থাকতে হবে।

    এ থেকে সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, সীমিত ভৌত গুণ বিশিষ্ট সব কিছুই সসীম। এর মানে হলো তারা একসময় শুরু হয়েছে। কারণ এসব সীমিত জিনিস চিরন্তন হওয়া অকল্পনীয়। তাদের সীমাবদ্ধতার জন্য দায়ী একটি বাহ্যিক উৎস বা কারণ তাদের আগে থেকেই থাকতে হবে।

    ভাবুন তো, আমি যদি একটা গাছ নিয়ে বলি যে এটা চিরন্তন। আপনি কী বলবেন? আপনি এমন দাবি শুনে হাসবেন। এমনকি যদি গাছটার শুরুটা আপনি না দেখে থাকেন, তবুও আপনি জানেন যে এটা সসীম, কারণ এর সীমিত ভৌত গুণাবলী রয়েছে।

    তবে সীমিত ভৌত বস্তুগুলো (মহাবিশ্ব সহ) যদি চিরন্তনও হয়, তাহলেও এটা পাল্টাবে না যে তারা নির্ভরশীল এবং অপরিহার্যভাবে নেই। এই যুক্তি কাজ করে বস্তুগুলো চিরন্তন হোক কিংবা এর কোনো শুরু থাকুক না কেন।

    নির্ভরশীল হওয়ার এই সম্পূর্ণ সংজ্ঞা প্রয়োগ করলে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসি যে মহাবিশ্ব এবং এর ভেতরের সবকিছুই নির্ভরশীল। যে কোনো কিছু নিয়ে ভাবুন – একটি কলম, একটি গাছ, সূর্য, একটি ইলেকট্রন, এমনকি কোয়ান্টাম ফিল্ডও। এগুলো সবই কোনো না কোনোভাবে নির্ভরশীল।

    যদি এটি সত্য হয়, তাহলে মহাবিশ্ব এবং এর সবকিছুর অস্তিত্ব তিনটি উপায়ের কোনো একটিতে ব্যাখ্যা করা যায়:

    ১. মহাবিশ্ব এবং আমাদের অনুভূত সবকিছু চিরন্তন, অপরিহার্য এবং স্বাধীন (The universe and all that we perceive are eternal, necessary and independent.)

    ২. মহাবিশ্ব এবং আমাদের অনুভূত সবকিছুর অস্তিত্ব অন্য কোন নির্ভরশীল বস্তুর উপর নির্ভর করে অর্থাৎ অসীম নির্ভরতার শৃঙ্খল (The existence of the universe and all that we perceive depends on something else which is also dependent.)

    ৩. মহাবিশ্ব এবং আমাদের অনুভূত সবকিছু তার অস্তিত্ব পায় এমন কিছু থেকে যা নিজের প্রকৃতি দ্বারাই বিদ্যমান এবং সেই কারণে চিরন্তন ও স্বাধীন (The universe and all that we perceive derives its existence from something else that exists by its own nature and is accordingly eternal and independent.)

    আসুন দেখি কোন ব্যাখ্যাটি সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত।

    ১) মহাবিশ্ব এবং আমাদের অনুভূত সবকিছু চিরন্তন, অপরিহার্য এবং স্বাধীন

    মহাবিশ্ব এবং এর সবকিছু কি নিজেদের উপর নির্ভর করে চিরকাল থাকতে পারে? এটি যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা নয়।

    কেন নয়? মহাবিশ্ব এবং এর সবকিছুর অস্তিত্ব প্রয়োজনীয় নয়। তারা না-ও থাকতে পারতো। এছাড়াও তাদের সীমিত ভৌত গুণাবলী রয়েছে। যেহেতু তারা নিজেদের এই সীমাবদ্ধতা দিতে পারে না, তাই কোনো বাহ্যিক কারণ এই সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। মহাবিশ্ব এবং এর সবকিছু নিজেদের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা নিজেরা দিতে পারে না। তাদের উপাদানগুলো ভিন্নভাবেও সাজানো যেতে পারতো। তাই তারা নির্ভরশীল, স্বাধীন নয়।

    এমনকি যদি মহাবিশ্ব চিরন্তন হয়, তবুও কিছু বাহ্যিক কারণ অবশ্যই ছিল যা এর সীমিত ভৌত গুণাবলী (Limited Physical Qualities) সৃষ্টি করেছে। মহাবিশ্বের উপাদানগুলো ভিন্নভাবে সাজানো যেতে পারতো এবং মহাবিশ্ব আদৌ না-ও থাকতে পারতো। মহাবিশ্ব নিজের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা নিজেই দিতে পারে না।

    এসব বিবেচনায়, আমরা নিরাপদে এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করতে পারি যে মহাবিশ্বের চিরন্তনতা কোনোভাবে এর অস্তিত্বের ব্যাখ্যা দেয়।

    ২) মহাবিশ্ব এবং আমাদের অনুভূত সবকিছুর অস্তিত্ব অন্য কোন নির্ভরশীল বস্তুর উপর নির্ভর করে (অসীম নির্ভরতার শৃঙ্খল)

    মহাবিশ্ব এবং এর সবকিছুর অস্তিত্ব কি এমন কিছুর উপর নির্ভর করতে পারে যেটিও নির্ভরশীল? যেহেতু মহাবিশ্ব এবং এর সবকিছু নিজেদের ব্যাখ্যা দিতে পারে না, তাই আরেকটি নির্ভরশীল জিনিস দিয়ে তাদের ব্যাখ্যা করা আসলে কিছুই ব্যাখ্যা করা হয় না। কারণ যে নির্ভরশীল জিনিসটি মহাবিশ্বের ব্যাখ্যা দেওয়ার কথা, সেটিও নিজের অস্তিত্বের জন্য ব্যাখ্যার প্রয়োজন। তাই নির্ভরশীল জিনিসের ব্যাখ্যার একমাত্র উপায় হলো এমন কিছুর কাছে যাওয়া যেটি নির্ভরশীল নয়, অর্থাৎ প্রয়োজনীয়।

    তবে কেউ বলতে পারে, সবকিছু এমনভাবে একে অপরের উপর নির্ভরশীল যে এর কোনো শেষ নেই। অর্থাৎ অসীম শৃঙ্খল (Infinite regress)।

    যেমন: এই মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করে আরেকটি মহাবিশ্ব, সেটিকে আরেকটি – এভাবে চিরকাল। এটি কি সমস্যার সমাধান? না, মোটেও না। এমনকি যদি অসীম সংখ্যক মহাবিশ্ব থাকে যারা সবাই একে অপরের উপর নির্ভরশীল, তবুও প্রশ্ন থেকে যায়: “কেন এই অসীম শৃঙ্খলের অস্তিত্ব আছে?” মহাবিশ্ব চিরন্তন হোক বা না হোক, এর অস্তিত্বের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

    আবার, কল্পনা করুন অসীম সংখ্যক মানুষ রয়েছে। প্রত্যেক মানুষ তার বাবা-মার জৈবিক কার্যকলাপের ফল, তারা আবার তাদের বাবা-মার ফল – এভাবে অসীমকাল। তবুও প্রশ্ন করা সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত: “আদৌ মানুষ কেন আছে?” এই শৃঙ্খলের কোনো শুরু না থাকলেও এর একটি ব্যাখ্যা প্রয়োজন। যেহেতু প্রতিটি মানুষ না-ও থাকতে পারতো এবং তাদের সীমিত ভৌত গুণ রয়েছে, তাই তারা নির্ভরশীল ও অপ্রয়োজনীয়। তাদের এখনও ব্যাখ্যা প্রয়োজন। শুধু বলা যে মানুষের শৃঙ্খল অসীম, এতে ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা কমে না।

    আরেকটি সমস্যা, এই ব্যাখ্যা ধরে নেয় যে অসীম নির্ভরতার শৃঙ্খল (infinite regress of dependencies) সম্ভব। কিন্তু এটি অকল্পনীয়।

    চিন্তা করুন: এই মহাবিশ্বের অস্তিত্ব আরেকটি মহাবিশ্বের উপর নির্ভরশীল, সেটি আবার আরেকটির উপর – এভাবে চলতে থাকলে এই মহাবিশ্ব কি কখনো অস্তিত্ব লাভ করতে পারবে? না, কারণ অসীম সংখ্যক নির্ভরতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে এই মহাবিশ্ব অস্তিত্ব পেতে পারে না। মনে রাখবেন, অসীম সংখ্যক জিনিসের কোনো শেষ নেই। তাই অসীম নির্ভরতা থাকলে এই মহাবিশ্ব কখনোই অস্তিত্ব পেতে পারে না।

    ৩) মহাবিশ্ব এবং আমাদের অনুভূত সবকিছু তার অস্তিত্ব পায় এমন কিছু থেকে যা নিজের প্রকৃতি দ্বারাই বিদ্যমান এবং সেই কারণে চিরন্তন ও স্বাধীন

    যেহেতু আমরা যা কিছু দেখি সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে নির্ভরশীল, তাই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা হলো – সবকিছুর অস্তিত্ব এমন কিছুর উপর নির্ভরশীল যেটি স্বাধীন এবং তাই চিরন্তন। এটি স্বাধীন হতেই হবে কারণ নির্ভরশীল হলে এরও ব্যাখ্যা লাগবে। এটি চিরন্তনও হতে হবে কারণ চিরন্তন না হলে – অর্থাৎ সসীম হলে – এটি নির্ভরশীল হয়ে যাবে, কারণ সসীম জিনিসের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

    তাই আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে মহাবিশ্ব এবং আমরা যা কিছু দেখি সবকিছুই এমন কিছুর উপর নির্ভরশীল যেটি চিরন্তন ও স্বাধীন। এটিই  সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের সর্বোত্তম ব্যাখ্যা।

    ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে এই যুক্তি

    নির্ভরশীলতার যুক্তি ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য দ্বারা সমর্থিত। কুরআনে বিভিন্ন জায়গায় এই ধারণা তুলে ধরা হয়েছে যে আল্লাহ একটি স্বাধীন সত্তা যিনি সবকিছু সৃষ্টির জন্য দায়ী।

    “আল্লাহ সমগ্র সৃষ্টি থেকে অমুখাপেক্ষী।” (সূরা আল-ইমরান: ৯৭)

    “হে মানুষ! তোমরাই আল্লাহর মুখাপেক্ষী, অথচ আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত।” (সূরা ফাতির: ১৫)

    বিখ্যাত তাফসীরকার ইবনে কাসীর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন: “তারা তাদের সকল কাজে তাঁর মুখাপেক্ষী, কিন্তু তিনি তাদের মুখাপেক্ষী নন… তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং তাঁর কোনো অংশীদার নেই।”

    ইবনে সিনা (পশ্চিমে আভিসেনা নামে পরিচিত) অনুরূপ যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ হলেন “ওয়াজিব আল-উজুদ” অর্থাৎ অপরিহার্যভাবে অস্তিত্বশীল (Necessary existence)। ইবনে সিনার মতে, আল্লাহ অপরিহার্যভাবে অস্তিত্বশীল এবং তিনিই সবকিছুর অস্তিত্বের জন্য দায়ী। আল্লাহ ব্যতীত অন্য সবকিছুই নির্ভরশীল, যাকে ইবনে সিনা “মুমকিন আল-উজুদ” (Contingent or Dependent existence) বলে বর্ণনা করেছেন।

    নির্ভরশীলতার যুক্তি অন্যান্য প্রভাবশালী ইসলামি পণ্ডিতগণও গ্রহণ, রূপান্তর ও সমৃদ্ধ করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন আল-রাযী, আল-গাযালী, ইমাম আল-হারামাইন আল-জুওয়াইনী (এবং কাছাকাছি সময়ের মধ্যে রয়েছেন তাকি উদ্দীন আন নাবহানি)।

    আল-গাযালী এই যুক্তির একটি সংক্ষিপ্ত সারাংশ উপস্থাপন করেছেন:

    “অস্তিত্বকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিছু না কিছু অবশ্যই অস্তিত্বশীল এবং যে কেউ বলে যে কিছুই নেই, সে বুদ্ধি ও প্রয়োজনীয়তাকে উপহাস করে। এই যে অস্তিত্বের কথা স্বীকার করা হলো, এটি একটি অপরিহার্য ভিত্তি। এখন এই অস্তিত্ব যা স্বীকার করা হয়েছে তা হয় প্রয়োজনীয় নয়তো আকস্মিক… এর মানে হলো একটি সত্তা হয় স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়তো নির্ভরশীল… এখানে আমরা যুক্তি দেই: যদি সত্তাটি যার অস্তিত্ব স্বীকৃত সেটি প্রয়োজনীয় হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় সত্তার অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত। আর যদি এর অস্তিত্ব আকস্মিক হয়, তাহলে প্রতিটি আকস্মিক সত্তা একটি প্রয়োজনীয় সত্তার উপর নির্ভরশীল। কারণ আকস্মিকতার অর্থই হলো এর অস্তিত্ব ও অনস্তিত্ব উভয়ই সম্ভব। যার এই বৈশিষ্ট্য রয়েছে একটি নির্ধারক বা নির্বাচনকারী ব্যতীত এর অস্তিত্ব হতে পারে না। এটিও অপরিহার্য। সুতরাং এই অপরিহার্য ভিত্তি থেকে প্রয়োজনীয় সত্তার অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত।”

    ইসলামি থিওলজি অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তা :

    • স্বাধীন (Independent)
    • যার উপর সবকিছু নির্ভরশীল (The being that everything depends on)
    • যিনি সবকিছু ধারণ করেন (The one that sustains everything)
    • চিরস্থায়ী (Everlasting)
    • স্বয়ংসম্পূর্ণ (Self-sufficient)
    • ওয়াজিব আল-ওজুদ (অপরিহার্যভাবে অস্তিত্বশীল) (Necessary existence)

    এই যুক্তির বিরুদ্ধে কিছু মূল আপত্তি  (Some of the key objections against this argument)

    Objection 1: মহাবিশ্ব স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল (The universe exists independently)

    একটি সাধারণ নাস্তিক্যবাদী আপত্তি হলো: যদি আমরা বলি যে আল্লাহ স্বাধীন ও প্রয়োজনীয়, তাহলে মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে কেন একই কথা বলতে পারি না?

    জবাব: তবে এই আপত্তি ভুল জায়গায়। আমাদের অভিজ্ঞতায় নির্ভরশীল জিনিস সবসময় নির্ভরশীল সমগ্র তৈরি করে। উদাহরণ: একটি বাড়ি নির্ভরশীল উপকরণ দিয়ে তৈরি এবং বাড়িও নির্ভরশীল। এর সীমিত ভৌত গুণ রয়েছে, এটি না-ও থাকতে পারতো এবং এর মৌলিক উপাদানগুলো ভিন্নভাবে সাজানো যেতে পারতো। একইভাবে মহাবিশ্ব নির্ভরশীল জিনিস দিয়ে তৈরি তাই এটি নির্ভরশীল।

    আপত্তিকারীর উপর প্রমাণের দায়ভার (burden of proof) রয়েছে যে নির্ভরশীল জিনিসগুলো নির্ভরশীল সমগ্র তৈরি করে না।

    Objection 2: মহাবিশ্ব একটি নিছক সত্য (The universe is just a brute fact)

    আরেকটি আপত্তি বলে যে মহাবিশ্ব নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা উচিত নয়। দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল ফাদার কপলেস্টনের সাথে তার বিখ্যাত রেডিও বিতর্কে বলেছিলেন, “আমি বলব যে মহাবিশ্ব আছে, এই পর্যন্তই।”

    এই অবস্থান সত্যিকার অর্থে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পলায়ন (Intellectual cop-out)।

    ভাসমান সবুজ বলের উপমা (Hovering green ball analogy): কল্পনা করুন আপনি স্থানীয় পার্কে হাঁটছেন এবং শিশুদের খেলার মাঠের মাঝখানে একটি ভাসমান সবুজ বল দেখতে পেলেন। আপনার প্রতিক্রিয়া কী হবে? আপনি কি এটিকে খেলার মাঠের একটি প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে চলে যাবেন? অবশ্যই না! আপনি প্রশ্ন করবেন কেন এর অস্তিত্ব এবং কীভাবে এটি এমন হলো। এখন বলটিকে মহাবিশ্বের আকার পর্যন্ত বাড়িয়ে দিন। প্রশ্ন এখনও থেকে যায়: কেন বলটির অস্তিত্ব এবং কেন এটি এমন?

    তাছাড়া, এই আপত্তি অযৌক্তিক কারণ এটি বিজ্ঞানকেই ক্ষুন্ন করে। বৈজ্ঞানিক সমাজে মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ও মৌলিক বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করার জন্য উৎসর্গীকৃত একটি গবেষণা ক্ষেত্র রয়েছে। এর নাম কসমোলজি। এটি একটি সম্পূর্ণ বৈধ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ক্ষেত্র। মহাবিশ্বকে ‘নিছক সত্য’ (Brute Fact) বলে চিহ্নিত করা একটি প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক অনুশীলনের অসম্মান।

    Objection 3: বিজ্ঞান অবশেষে একটি উত্তর খুঁজে পাবে! (Science will eventually find an answer!)

    এই অবজেকশনে যুক্তি দেওয়া হয় যে, এই আর্টিকেলে যা উপস্থাপিত হয়েছে তা ‘God of the gaps’ fallacy বা ভ্রান্তির একটি রূপ। এটি বলে যে বৈজ্ঞানিক ঘটনা সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতাকে আল্লাহর অস্তিত্ব বা ঐশ্বরিক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ হিসেবে নেওয়া উচিত নয়, কারণ বিজ্ঞান অবশেষে একটি ব্যাখ্যা প্রদান করবে।

    জবাব: এটি ভুল অবজেকশন, কারণ নির্ভরশীলতার যুক্তি কোনো বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের সমাধান করতে চায় না। এর উদ্দেশ্য মেটাফিজিক্স নিয়ে; এটি নির্ভরশীল জিনিসের প্রকৃতি ও তাৎপর্য বুঝতে চায়। এই যুক্তি সকল বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও ঘটনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

    যেমন: প্রাকৃতিক ঘটনার ব্যাখ্যা হিসেবে আমরা যদি একাধিক মহাবিশ্বের (Multiple universe) তত্ত্বকে বিশ্বাস করি, তবুও সেগুলো নির্ভরশীল থাকবে। কেন? কারণ এই ব্যাখ্যার উপাদানগুলো ভিন্নভাবে সাজানো যেতে পারে এবং নিজেদের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা নিজেরা দিতে পারে না। অথবা তাদের অস্তিত্বের জন্য নিজেদের বাইরে কিছুর প্রয়োজন এবং তাদের সীমিত ভৌত গুণ (Limited Physical Qualities) রয়েছে। তাই তারা নির্ভরশীল। আর এই অধ্যায়ে আলোচনা অনুযায়ী, একটি নির্ভরশীল জিনিসকে আরেকটি নির্ভরশীল জিনিস দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

    যদি বৈজ্ঞানিক সমাজ দাবি করে যে তারা এমন কিছু পেয়েছে যা স্বাধীন ও চিরন্তন এবং পালটা মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করে, তাহলে আমি প্রমাণ চাইব। মজার বিষয় হলো, তারা যে মুহূর্তে কোনো অভিজ্ঞতালব্ধ প্রমাণ দেবে সেই মুহূর্তেই তারা নিজেদের সাথে দ্বন্দ্বে পড়বে। কারণ যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তার সীমিত ভৌত গুণ রয়েছে, তাই নির্ভরশীল।

    বিজ্ঞান কখনোই স্বাধীন ও চিরন্তন কিছু আবিষ্কার করতে পারে না – শুধু এই কারণে নয় যে এটি অভিজ্ঞতালব্ধ হবে, বরং এজন্যও যে বিজ্ঞান শুধু পর্যবেক্ষণযোগ্য নির্ভরশীল জিনিস নিয়ে কাজ করে। তাই বিজ্ঞান একটি অবৈজ্ঞানিক সত্ত্বা বা কিছু আবিষ্কার করবে বলা কোনো অর্থ রাখে না!

    একটু থেমে চিন্তা করি বিজ্ঞান কী! বিজ্ঞান একটি শাস্ত্র হিসেবে উত্তর ও ব্যাখ্যা প্রদানের কাজে নিয়োজিত। কেবল নির্ভরশীল জিনিসের ব্যাখ্যা থাকতে পারে। এই বিবেচনায় আমরা বুঝতে পারি বিজ্ঞানের পরিসর নির্ভরশীল বস্তুর রাজ্যে সীমাবদ্ধ। তাই বিজ্ঞান শুধু এমন উত্তর দিতে পারে যা আরেকটি নির্ভরশীল বস্তুর সাথে সম্পর্কিত। এটি এই যুক্তির মেটাফিজিক্যাল প্রকৃতির সাথে কাজ করতে পারে না।

    যেমন আমরা ব্যাখ্যা করেছি, একটি নির্ভরশীল বস্তুকে আরেকটি নির্ভরশীল বস্তু দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, কারণ সেই নির্ভরশীল বস্তুরও ব্যাখ্যা প্রয়োজন। আর আমরা আলোচনা করেছি যে এমন হতে পারে না যে একটি জিনিস অন্য কিছুর উপর নির্ভর করে, সেটি আবার আরেকটির উপর – এভাবে অনন্তকাল। যেহেতু ব্যাখ্যাটি এমন কিছু যা স্বাধীন ও চিরন্তন, তাই বিজ্ঞান কখনো এই আলোচনায় প্রবেশ করতে পারে না কারণ এর সীমিত পরিসর অভিজ্ঞতালব্ধ, নির্ভরশীল জিনিসের মধ্যে।

    Objection 4: আপনি ধরে নিয়েছেন আল্লাহর অস্তিত্ব, কারণ তিনিই একমাত্র যিনি প্রয়োজনীয়ভাবে অস্তিত্বশীল (You’ve assumed God exists, as He is the only thing that necessarily exists)

    জবাব: এই আর্টিকেলের যুক্তিতে আল্লাহর অস্তিত্ব ধরে নেওয়া হয়নি। যুক্তিতে আল্লাহর দিকে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয়তার ধারণা তৈরি করা হয়নি। বরং, মহাবিশ্ব এবং আমরা যা কিছু দেখি তার নির্ভরশীলতা এই ধারণার দিকে নিয়ে গেছে যে একটি চিরন্তন, স্বাধীন সত্তা থাকতে হবে যিনি অপরিহার্যভাবে অস্তিত্বশীল। এই সিদ্ধান্ত ইসলামে সৃষ্টিকর্তার সংজ্ঞার সাথে হুবহু মিলে যায়।

    অপরিহার্যতা (Necessity) ও নির্ভরশীলতার (Dependent) ধারণা ফিলোসফিতে সুপরিচিত ও আলোচিত (ফিলোসফিতে ‘‘Dependent’’ বস্তুকে “Contingent” বস্তু হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে)। এগুলো সৃষ্টিকর্তার ব্যাখ্যা পেছনের দরজা দিয়ে ঢোকানোর জন্য তৈরি করা ধারণা নয়।

    Objection 5: সৃষ্টিকর্তার  কি ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই? (Doesn’t God require an explanation?)

    এই আর্টিকেলে উপস্থাপিত যুক্তি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে একটি চিরন্তন, স্বাধীন সত্তা থাকতে হবে যিনি অপরিহার্যভাবে অস্তিত্বশীল। এটি ইসলামি সৃষ্টিকর্তার ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

    জবাব: অপরিহার্য সত্তার কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। আরো নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, এমন সত্তার নিজের বাইরে কোনো কিছুর উল্লেখ করে ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই (নির্ভরশীল জিনিসের বিপরীতে)। বরং অপরিহার্য সত্তা নিজের অস্তিত্বেই ব্যাখ্যাত। অর্থাৎ, তাঁর অস্তিত্ব না থাকা অসম্ভব ছিল। তাই তিনি নিজের বাইরে কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন রাখেন না।

    এমন একটি সত্তার নিজের বাইরে কিছুর উল্লেখ করে এমন ব্যাখ্যা প্রয়োজন হয় না (নির্ভরশীল জিনিসের বিপরীতে)। বরং, একটি অপরিহার্য সত্তা নিজের অস্তিত্বের কারণেই ব্যাখ্যা হয়। অন্য কথায়, তার অস্তিত্ব না থাকা অসম্ভব ছিল।

    Objection 6: গঠনগত ভ্রান্তি (Fallacy of Composition)

    Fallacy of composition এক ধরনের যুক্তিগত ভ্রান্তি যা ভুলভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে সম্পূর্ণ বস্তুটির অবশ্যই তার এককভাবে তার প্রতিটি অংশগুলোর মতো একই বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। তবে এমন দাবি করা সবসময় ভ্রান্তিপূর্ণ নয়। হতে পারে কিছু সমগ্রের মধ্যে তার ব্যক্তিগত অংশের বৈশিষ্ট্য রয়েছে; তবে এটি সবসময় এমন নয়।

    উদাহরণস্বরুপ, একটি দেয়াল (সমগ্র) ইট (একক অংশ) দিয়ে তৈরি। ইট শক্ত, তাই দেয়াল শক্ত। এটি সত্য। বিপরীতে, একটি পার্সিয়ান কার্পেট বিবেচনা করুন। কার্পেট (সমগ্র) সুতা (একক অংশ) দিয়ে তৈরি; এককভাবে সুতাগুলো হালকা বলে কার্পেটও হালকা – এই সিদ্ধান্ত ভুল হবে।

    জবাব: অবজেকশনকারী হয়তো বলতে পারেন যে মহাবিশ্ব নির্ভরশীল অংশ দিয়ে তৈরি বলেই যে সম্পূর্ণ মহাবিশ্ব নির্ভরশীল, এটা যুক্তিগতভাবে সঠিক নয়। এই অবজেকশন ভিত্তিহীন।

    আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে নির্ভরশীল জিনিসগুলো সবসময়ই নির্ভরশীল সমগ্র গঠন করে। যেমন, একটি বাড়ি নির্ভরশীল উপকরণ (ইট, সিমেন্ট, লোহা) দিয়ে তৈরি এবং বাড়িটিও নির্ভরশীল। এর সীমিত ভৌত গুণাবলী আছে, এটি নাও থাকতে পারত এবং এর মূল উপাদানগুলো ভিন্নভাবে সাজানো যেত। একইভাবে মহাবিশ্ব নির্ভরশীল জিনিসপত্র দিয়ে গঠিত, তাই এটিও নির্ভরশীল।

    এখন প্রমাণের দায়িত্ব অবজেকশনকারীর উপর যে তিনি দেখাবেন নির্ভরশীল জিনিসগুলো নির্ভরশীল সমগ্র তৈরি করে না। কিন্তু আমাদের সমস্ত অভিজ্ঞতা এর বিপরীত সাক্ষ্য দেয়।

    সবশেষে,

    সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে এই উপলব্ধি শুধু একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন নয়; বরং এটি সৃষ্টিকর্তার প্রতি গভীর আকুতি ও ভালোবাসা জাগানো উচিত। এই অধ্যায়ে আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে আল্লাহ অপরিহার্যভাবে অস্তিত্বশীল এবং সবকিছু কেবল তাঁরই কারণে অস্তিত্ব লাভ করতে পারে। এই অর্থে আমরা মানুষেরা শুধু দার্শনিক অর্থেই সৃষ্টিকর্তার উপর নির্ভরশীল নই, বরং শব্দটির সাধারণ ব্যবহারেও; তাঁর অস্তিত্ব ছাড়া আমাদের অস্তিত্ব থাকতো না, এবং আমাদের যা কিছু আছে তা শেষ পর্যন্ত একমাত্র তাঁরই কারণে।

    নিচের এই চমৎকার ছোট গল্পটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, যেহেতু আমরা চূড়ান্তভাবে সৃষ্টিকর্তার ওপর নির্ভরশীল এবং এই জীবন ও পরকালের সাফল্য তাঁর অসীম করুণার ওপর নিহিত, তাই আমাদের উচিত তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করা এবং তাঁর ইচ্ছা পূরণ করা:

    “একদিন আমি আমার ক্ষেতের পরিচর্যা করার জন্য বের হলাম। সাথে ছিল আমার ছোট্ট কুকুর—বাগানে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো বানরদের চিরশত্রু। সময়টা ছিল প্রচণ্ড গরমের। গরমে আমার এবং আমার কুকুরের এমন অবস্থা হয়েছিল যে আমরা প্রায় শ্বাস নিতে পারছিলাম না। আমার মনে হতে লাগল যে আমাদের দুজনের মধ্যে কেউ একজন হয়তো শীঘ্রই অজ্ঞান হয়ে পড়বে। তারপর, সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, আমি একটি ‘টিয়াকি’ (Tiayki) গাছ দেখতে পেলাম, যার ডালপালাগুলো সতেজ সবুজ পাতার এক সুশীতল আচ্ছাদন তৈরি করেছিল। আমার কুকুরটি আনন্দে ছোট ছোট শব্দ করে উঠল এবং এই আশীর্বাদপুষ্ট ছায়ার দিকে ছুটে গেল।

    কিন্তু ছায়ায় পৌঁছানোর পর, সেখানে না থেকে সে জিভ বের করে আমার কাছে ফিরে এল। তার বুক কীভাবে ধুকপুক করছে তা দেখে আমি বুঝতে পারলাম সে কতটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আমি ছায়ার দিকে হাঁটতে লাগলাম। আমার কুকুরটি তখন আনন্দে আত্মহারা। তারপর, কিছুক্ষণের জন্য, আমি ভান করলাম যেন আমি আমার পথ ধরে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। বেচারা প্রাণীটি করুণ সুরে কেঁদে উঠল, কিন্তু তবুও লেজ গুটিয়ে আমার পিছু নিল। সে স্পষ্টতই হতাশ ছিল, কিন্তু যা-ই ঘটুক না কেন, আমাকে অনুসরণ করতে সে ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

    তার এই বিশ্বস্ততা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিল। কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও আমাকে অনুসরণ করার জন্য এই প্রাণীটির যে প্রস্তুতি, তা কীভাবে পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব? আমি নিজেকে বললাম, সে আমার প্রতি গভীরভাবে অনুগত, কারণ সে আমাকে তার মনিব হিসেবে মানে এবং শুধুমাত্র আমার পাশে থাকার জন্য সে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে।

    আমি কেঁদে বলে উঠলাম, ‘হে আমার প্রভু, আমার অশান্ত আত্মাকে সুস্থ করুন! যাকে আমি তাচ্ছিল্যভরে কুকুর বলে ডাকি, তার মতো বিশ্বস্ততা আমাকে দান করুন। আপনি যেমন তাকে দিয়েছেন, তেমনি আমাকেও আমার জীবন নিয়ন্ত্রণের শক্তি দিন, যেন আমি আপনার ইচ্ছা পূরণ করতে পারি এবং আপনি আমাকে যে পথে চালান—আমি কোথায় যাচ্ছি, তা না জিজ্ঞেস করেই—সেই পথ অনুসরণ করতে পারি! আমি এই কুকুরটির স্রষ্টা নই, তবুও সে হাজারো কষ্টের বিনিময়ে বশ মেনে আমাকে অনুসরণ করে। হে প্রভু, আপনিই তাকে এই গুণের অধিকারী করেছেন। হে প্রভু, আমার মতো যারা আপনার কাছে এটি চায়, তাদের সবাইকে ভালোবাসার গুণ এবং দয়া করার সাহস দান করুন!’

    তারপর আমি আমার পদচিহ্ন ধরে ফিরে গেলাম এবং সেই ছায়ায় আশ্রয় নিলাম। আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে আমার ছোট্ট সঙ্গী আমার মুখোমুখি শুয়ে পড়ল, তার চোখ দুটি আমার চোখের দিকে নিবদ্ধ রইল; যেন সে আমার সাথে খুব জরুরি কোনো কথা বলতে চাইছে।”

    Last updated 15/10/2019. Adapted from my book “The Divine Reality: God, Islam & The Mirage of Atheism”. You can purchase the book here.

    তথ্যসূত্র

    [1] উপমাটি ওয়েনরাইট, ডব্লিউজে (1988) থেকে গৃহীত। ধর্মের দর্শন। দ্বিতীয় সংস্করণ । বেলমন্ট, ক্যালিফোর্নিয়া: ওয়েডসওয়ার্থ পাবলিশিং।

    [2] কুরআন, অধ্যায় ৩, আয়াত ৯৭।

    [3] কুরআন, ৩৫তম সূরা, ১৫তম আয়াত।

    [4] ইবনে কাসির, আই. (1999)। তাফসির আল-কুরআন আল-আযীম। সামি আস-সালামা দ্বারা সম্পাদিত। ২ য় সংস্করণ। রিয়াদ: দার তাইয়্যিবা। খণ্ড ৬, পৃ. ৫৪১।

    [5] হোসেইন, এস. (১৯৯৩)। ইসলামিক কসমোলজিক্যাল ডকট্রিনসের একটি ভূমিকা। আলবানি: স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্ক প্রেস, পৃষ্ঠা ১৯৭-২০০।

    [6] আল-গাজ্জালী, এম. (1964)। ফাদাহিহ আল-বাতিনিয়্যা। আবদুর রহমান বাদাউই কর্তৃক সম্পাদিত। কুয়েত: মুয়াসাসা দার আল-কুতুব আল-থিকাফা, পৃ. ৮২।

    [7] ক্রেগ, ডব্লিউএল (2008)। যুক্তিসঙ্গত বিশ্বাস: খ্রিস্টীয় সত্য এবং ক্ষমাপ্রার্থনা। তৃতীয় সংস্করণ । হুইটন, ইলিনয়: ক্রসওয়ে বুকস, পৃষ্ঠা 109।

    [8] গডউইন, এসজে (তারিখ নেই)। রাসেল/কপলস্টন রেডিও বিতর্কের প্রতিলিপি। এখানে পাওয়া যাবে: http://www.scandalon.co.uk/philosophy/cosmological_radio.htm [অ্যাক্সেস করা হয়েছে ৪ অক্টোবর ২০১৬]।

    [9] ক্রেগ, ডব্লিউএল রিজনেবল ফেইথ থেকে গৃহীত। এখানে পাওয়া যাবে: http://www.reasonablefaith.org/defenders-1-podcast/transcript/s04-01 [অ্যাক্সেস করা হয়েছে: ২৪ শে অক্টোবর ২০১৬]।

    [10] প্রুস, আর. এবং রাসমুসেন, জেএল (2018)। প্রয়োজনীয় অস্তিত্ব । অক্সফোর্ড: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস।

    [11] হিজাব, এম. (2019)। কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টস । স্বাধীনভাবে প্রকাশিত।

    [12] ইটন, জি. (2001)। ঈশ্বরকে স্মরণ করা: ইসলামের প্রতিফলন । লাহোর: সুহাইল একাডেমি, পৃষ্ঠা 18-19।

  • ফিলিস্তিন এখন তৃতীয় প্রকল্পের অপেক্ষায়

    ফিলিস্তিন এখন তৃতীয় প্রকল্পের অপেক্ষায়

    ​১৯৬৭ সালে পশ্চিম তীর ইহুদিদের দ্বারা দখল হওয়ার পর থেকে ফিলিস্তিন ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুটি প্রকল্প বা পরিকল্পনা একে অপরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছে। প্রথমটি হলো আমেরিকান পরিকল্পনা, যার লক্ষ্য আন্তর্জাতিক আইন ও সংস্থাসমূহের কাঠামোর মধ্যে একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয়টি হলো ইহুদি প্রকল্প, যার মূল লক্ষ্য হলো পশ্চিম তীরের ভূমি দখল করা।

    ​প্রথম পরিকল্পনাটি কয়েক দশক ধরে স্থবির হয়ে আছে এবং এটি কেবল মিডিয়া, রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং কনফারেন্স হলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, দ্বিতীয় বা ইহুদি পরিকল্পনাটি প্রতিদিন অত্যন্ত নির্মমভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ইহুদিরা পশ্চিম তীর দখল করে এর মর্যাদা ‘আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে একটি অধিকৃত অঞ্চল’ থেকে পরিবর্তন করে তাদের ‘নিজস্ব ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশে’ পরিণত করতে চায়। তাদের লক্ষ্য হলো (জর্ডান) নদী থেকে (ভুমধ্য) সাগর পর্যন্ত একটি “ইহুদি রাষ্ট্র” গঠন করা, যেখানে অন্য কারো স্থান থাকবে না এবং যা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে চিরতরে নস্যাৎ করে দেবে। এটি এখন ইহুদি রাজনৈতিক শক্তি এবং তাদের জনগণের মধ্যে একটি ঐকমত্যের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

    ​এটি অর্জনের জন্য ইহুদি রাষ্ট্রটি শুরু থেকেই পশ্চিম তীরের ভৌগলিক ও জনতাত্ত্বিক (demography) কাঠামো পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে। তারা বসতি স্থাপনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের সমান্তরাল একটি উপস্থিতি তৈরি করতে চেয়েছে। অর্থাৎ, তারা শহর ও জনবসতি তৈরির মাধ্যমে এক বিশাল বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠী তৈরি করেছে যারা তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অবস্থান শক্তিশালী করতে নিরলস কাজ করছে।

    ​অন্যদিকে, যেহেতু ফিলিস্তিনি জনগণই তাদের এই প্রকল্পের প্রধান বাধা—তাদের উপস্থিতি ও অবিচলতার কারণে—তাই ইহুদি রাষ্ট্রটি জনতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় “মানুষহীন ভূমি” নীতি গ্রহণ করেছে। তারা বসতি স্থাপনের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার নীতিতে মনোযোগ দিয়েছে। তারা ফিলিস্তিনিদের জীবনকে চরম দুর্বিষহ করে তুলে তাদের হিজরত বা দেশত্যাগে বাধ্য করছে। এর জন্য তারা অবরোধ, শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি, হত্যাকাণ্ড, নিরাপত্তাহীনতা, নির্যাতন এবং ঘরবাড়ি ও ক্যাম্প ধ্বংস করার মতো পথ বেছে নিয়েছে। যদিও উচ্ছেদ বা বাস্তুচ্যুতি ঐতিহাসিকভাবেই তাদের পরিকল্পনার অংশ ছিল, তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভূমি সংক্রান্ত তাদের ‘ক্যাবিনেট’ সিদ্ধান্তগুলোর মাধ্যমে এই অপরাধের মাত্রা ও গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

    ​ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (PA) প্রসঙ্গে বলা যায়, তারা আমেরিকার প্রস্তাবিত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রকল্পের লেজ ধরে ঝুলে আছে এবং একে “জাতীয় প্রকল্প” হিসেবে প্রচার করে জনগণের কাছে মিথ্যা আশা বিক্রি করছে। কিন্তু ইহুদি রাষ্ট্রটি কখনোই এই কর্তৃপক্ষকে বা অসলো চুক্তিকে (Oslo Accords) সম্মানের চোখে দেখেনি; বরং তারা একে একটি “অধীনস্থ সত্তা” হিসেবেই বিবেচনা করেছে। ইহুদি রাষ্ট্র ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে কেবল তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি প্রাথমিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। দখলদার হিসেবে ইহুদি রাষ্ট্রটি ফিলিস্তিনি জনগণের বোঝা নিজে বহন না করে তা এই কর্তৃপক্ষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। এটি একদিকে জনগণের ক্ষোভ দমনের ঢাল হিসেবে কাজ করছে, অন্যদিকে ইহুদিদের চাপ জনগণের ওপর প্রয়োগের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এই কর্তৃপক্ষের আইন, পদ্ধতি এবং বিশ্বাসঘাতকতামূলক কর্মকাণ্ড এতটাই চরমে পৌঁছেছে যে তারা নিজ দেশের মানুষকে হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না। ফলে এটি এখন ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য দখলদারিত্বের মতোই একটি ভারী বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ তাদের এই “নোংরা দায়িত্ব” পালন করে যাচ্ছে কারণ তারা মনে করে তাদের অস্তিত্ব এর সাথেই মিশে আছে।

    ​বর্তমান পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কোনো কিছুই স্থির নয়। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভাঙন, আন্তর্জাতিক আইনের অবজ্ঞা এবং আমেরিকার নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে পেশীশক্তির জোরে চুক্তি করার প্রবণতার কারণে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রকল্পটি আজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে। বিশেষ করে ইহুদিদের কর্মকাণ্ড এই প্রকল্পের কার্যকারিতাকে ধ্বংস করে দিয়েছে এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে একটি তুচ্ছ ও অর্থহীন চরিত্রে নামিয়ে এনেছে। পশ্চিমা বিশ্ব এখনো এই প্রকল্পটি টেবিলে টিকিয়ে রেখেছে সম্ভবত ইহুদি রাষ্ট্রকে তার নিজের ধ্বংসাত্মক উন্মাদনা থেকে রক্ষা করার জন্য। যদিও ইহুদি রাষ্ট্রটি দম্ভের সাথে পুরো ভূখণ্ড গিলে ফেলতে চায়, তবে এটি অর্জন করা সহজ নয় এবং এটিই তাদের পতনের কারণ হতে পারে।

    ​নিঃসন্দেহে ফিলিস্তিন ও এর জনগণের সামনে কঠিন দিন আসছে। যতক্ষণ পর্যন্ত উম্মাহর নিজস্ব প্রকল্প ইহুদি ও আমেরিকান প্রকল্পের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে সগৌরবে যাত্রা শুরু না করবে, ততক্ষণ এই সংকট কাটবে না। উম্মাহর এই প্রকল্প হলো ফিলিস্তিনের পূর্ণাঙ্গ মুক্তি এবং অবৈধ ইহুদি রাষ্ট্রের মূলোৎপাটন। এটিই ইসলামের দাবি এবং শরীয়তের বিধান, যা উম্মাহর জন্য অন্য কোনো বিকল্প রাখেনি। ফিলিস্তিন কেবল ফিলিস্তিনিদের নয়, বরং এটি পুরো উম্মাহর ইস্যু।

    ​তাত্ত্বিকভাবে উম্মাহর এই লক্ষ্য জনগণের হৃদয়ে বিদ্যমান থাকলেও, এটি বাস্তবায়নের জন্য কোনো নির্বাহী সংস্থা—অর্থাৎ ইসলামি রাষ্ট্র (খিলাফত)—বর্তমানে অনুপস্থিত। মূলত খিলাফত প্রতিষ্ঠাই হলো উম্মাহর সবচেয়ে বড় প্রকল্প, যার সাথে ফিলিস্তিন মুক্তিসহ সমস্ত সমস্যার সমাধান জড়িত। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ উম্মাহর ভেতরের শক্তিকে যেমন ফুটিয়ে তুলেছে, তেমনি ঔপনিবেশিক দালাল শাসকদের অধীনে উম্মাহর অসহায়ত্ব ও পঙ্গুত্বকেও উন্মোচিত করেছে। এই ঘটনাগুলো উম্মাহর জন্য একটি ইসলামি রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করেছে, যা উম্মাহর বন্দি সেনাবাহিনী এবং সুপ্ত শক্তিকে শৃঙ্খলমুক্ত করবে। তা না হলে উম্মাহ এক বিপর্যয় থেকে অন্য বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হতে থাকবে।

    ​সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এটিও নিশ্চিত করেছে যে, গত কয়েক দশকের পশ্চিমা রাষ্ট্রীয় সমাধানের (Two-state solution) চেয়ে ফিলিস্তিনের পূর্ণাঙ্গ মুক্তি এবং দখলদার ইহুদি রাষ্ট্রের পতন অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ও নিকটবর্তী। আর তার চেয়েও নিকটবর্তী হলো এই দালাল শাসক এবং জালিম শাসনব্যবস্থার পতন—যদি উম্মাহ এবং তার সশস্ত্র বাহিনী সঠিক পথে অগ্রসর হয়। এই শাসকদের উম্মাহর মাঝে কোনো শিকড় নেই; তাদের সিংহাসনগুলো আজ নড়বড়ে এবং পতনোন্মুখ। জালিমরা যাই চিত্রায়িত করুক না কেন, উম্মাহকে সর্বদা আল্লাহর বাণী স্মরণ রাখতে হবে:

    ​”জেনে রেখো, আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটে।” [সূরা আল-বাকারাহ: ২১৪]

    ​উস্তাদ আবদুল রহমান আল-লাদাওয়ি
    আল-রায়া পত্রিকার ৫৯১ নম্বর সংখ্যায় (১৮/০৩/২০২৬) প্রকাশিত

  • ইরান যুদ্ধ ও শক্তির পরীক্ষা

    ইরান যুদ্ধ ও শক্তির পরীক্ষা

    ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইহুদি রাষ্ট্র (ইসরায়েল) যে আগ্রাসী যুদ্ধ শুরু করেছে, তা কেবল উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি সামরিক অভিযান নয়। বরং এটি মার্কিন শক্তির সীমাবদ্ধতা এবং একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক শক্তি কাঠামোর মধ্যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সক্ষমতার এক জটিল পরীক্ষা। কারণ, সামরিক শক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তা দিয়ে বড় কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করা সবসময় সম্ভব হয় না। অধিকন্তু, পারস্য উপসাগরের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলের সামরিক সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং বিশ্ব বাণিজ্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত—বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর নৈকট্যের কারণে, যেখান দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ হয়।

    ​শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধারণা করেছিল যে, ইরানের সাথে যুদ্ধ কেবল একটি ক্ষণস্থায়ী সামরিক সংঘর্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তারা অনুমান করতে ব্যর্থ হয়েছিল যে, এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত তাদের শক্তির সীমাবদ্ধতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় পরিণত হবে। যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত বিজয়ের ঘোষণা দিলেও বাস্তব পরিস্থিতি শীঘ্রই সেই দাবির অসারতা প্রকাশ করে দেয়। ফলস্বরূপ, নিরুপায় হয়ে ট্রাম্প তার ইউরোপীয় ও ন্যাটো মিত্রদের পাশাপাশি চীন, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানের কাছে হরমুজ প্রণালীতে নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা চান। এটি কার্যত ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার আহ্বান ছিল, যা তার নিজস্ব ‘বিজয়’ এর বয়ানের সম্পূর্ণ বিপরীত।

    ​হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে সামুদ্রিক ট্রাফিক ব্যাহত করার ইরানের সক্ষমতা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকটে ফেলে দিয়েছে। এটি প্রমাণ করেছে যে উপসাগরীয় অঞ্চলের যেকোনো সামরিক মোকাবিলা আর আঞ্চলিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা মুহূর্তেই বিশ্ব অর্থনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়। ইরান এই সংগ্রামের মাধ্যমে এক নতুন ধরনের ‘প্রতিরোধ’ (deterrence) গড়ে তুলতে চাইছে যাতে তার শাসনব্যবস্থাকে পতন থেকে রক্ষা করা যায়। ইরান অন্য কোনো রাষ্ট্রের অনুগত বা পরাধীন রাষ্ট্র হয়ে থাকতে অস্বীকার করছে। তাই তারা মার্কিন ও ইহুদি রাষ্ট্রের প্রচণ্ড আঘাত সহ্য করেও ত্যাগ স্বীকার করছে, যাতে গত ৪০ বছরের শাসনব্যবস্থা ও নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখা যায়।

    ​ইউরোপের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত নৌ-জোটে যোগ দিতে তাদের দ্বিধা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ফাটলকেই স্পষ্ট করে তুলছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্জ ইউরোপের এই অবস্থানটি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, “এটি সর্বদা স্পষ্ট ছিল যে এই যুদ্ধ ন্যাটোর বিষয় নয়। হস্তক্ষেপের বিষয়ে কোনো যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তাই জার্মানি এখানে সামরিকভাবে অবদান রাখবে কি না, সেই প্রশ্নই ওঠে না। আমরা তা করব না।” এমনকি যেসকল ইউরোপীয় রাষ্ট্র ইরানের লাগাম টেনে ধরতে চায়, তারাও এই সংঘাত দ্রুত শেষ করার কোনো স্পষ্ট ও যৌথ কৌশলের অভাব নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে।

    ​অন্যদিকে, রাশিয়া এবং চীন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই সামরিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তারা চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলের এই চোরাবালিতে আটকে পড়ুক, যাতে দীর্ঘস্থায়ী ও নিরর্থক যুদ্ধের মাধ্যমে তাদের শক্তি ক্ষয় হয়। এটি ভবিষ্যতে ওই অঞ্চলে রুশ ও চীনা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের পথ সুগম করবে।

    ​সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় হরমুজ প্রণালীর দুই পাশে তেলের ট্যাঙ্কারগুলো আটকা পড়ে আছে। ফলে তেলের দাম ইতিমধ্যেই প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলারে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধ চলতে থাকলে ২০০ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে। ইরানের ‘সাউথ পার্স’ অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার জবাবে ইরান যখন উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তখন বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা আরও তীব্র হয়।

    ​নিঃসন্দেহে এই যুদ্ধ আগামী বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রূপরেখা বদলে দেবে। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে ব্যর্থ হওয়ার পর এখন দাবি করছে যে, তাদের লক্ষ্য কেবল ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা। ইরানের প্রতিক্রিয়া ছিল অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের মতো, যা ট্রাম্প প্রশাসনের অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল। ইরান কেবল ইহুদি রাষ্ট্র বা উপসাগরীয় দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তারা হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। এছাড়া লেবাননে হিজবুল্লাহকে ব্যবহারের মাধ্যমে তারা ইহুদি রাষ্ট্রকে আবারও আশির দশকের মতো লেবাননের চোরাবালিতে টেনে আনার ইঙ্গিত দিয়েছে।

    ​মার্কিন প্রতিবেদনগুলো নিশ্চিত করেছে যে ট্রাম্প প্রশাসন দুটি বিষয়ে ভুল হিসাব করেছিল:

    ১. ইরান এই যুদ্ধকে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখবে এবং সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করবে।

    ২. হরমুজ প্রণালী ও জ্বালানি বাজারের বিপর্যয় দ্রুত সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।

    ​এখন ট্রাম্প প্রশাসন সম্মানজনকভাবে এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে, বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চাপ এবং আগামী নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাবের কথা মাথায় রেখে। সম্ভবত ট্রাম্প মিথ্যে জয়ের দাবি করে বলবেন যে, তিনি ইরানের সামরিক সক্ষমতার ৯০% ধ্বংস করে দিয়েছেন এবং দেশটিকে ২০ বছর পিছিয়ে দিয়েছেন।

    ​পরিশেষে, এই সংঘাত কৌশলগত নৌ-পথগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরাশক্তিগুলোর ব্যর্থতা এবং বিশ্ব অর্থনীতির ভঙ্গুরতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে। এটি বিশ্ব ব্যবস্থায় মার্কিন একাধিপত্যের অবসান এবং একটি ‘এককেন্দ্রিক’ বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ার ট্রাম্পের প্রচেষ্টার চূড়ান্ত ব্যর্থতাকেই ফুটিয়ে তুলেছে।

  • সূরাতুল কদর – তাফসীর মাযহারী

    সূরাতুল কদর – তাফসীর মাযহারী

    সূরা কদর

    ৫ আয়াত, ১ রুকূ’, মক্কী

    بسم الله الرحمن الرحيم

    ॥ দয়াময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে ॥

    শানে নুযূল: তিরমিযী, হাকিম ও ইবন জারীর তাবারী (র) হাসান ইবন আলী (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-কে স্বপ্নে দেখানো হলো যে, উমায়্যা গোত্র তাঁর মিম্বরে অধিষ্ঠিত। স্বপ্নটি তাকে পীড়া দিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সূরা কাওছার ও সূরা কদর নাযিল হয়। সূরা কদরে বলা হয়েছে, ‘আমি এটা অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রজনীতে। আর মহিমান্বিত রজনী সম্বন্ধে আপনি কী জানেন? মহিমান্বিত রজনী হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেয়। অর্থাৎ উমায়্যা গোত্র যে হাজার মাস রাজত্ব করবে, তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কাসিম ইব্‌ন ফাযল হামাদানী (র) বলেন: এটা শোনার পর আমরা গুণে দেখলাম ঠিকই উমায়্যা গোত্রের রাজত্বকাল ছিল এক হাজার মাস। তার চেয়ে কমও নয়, বেশীও নয়। তিরমিযী (র) বলেন: হাদীসটি গারীব। মুযানী ও ইব্‌ন কাছীর বলেন: এটি নিতান্তই মুনকার (প্রত্যাখ্যাত)।

    ইব্‌ন আবু হাতিম ও ওয়াহিদী (র) মুজাহিদ (র) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, একদা রাসূলুল্লাহ্ (সা) বনূ ইসরাঈলের এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছিলেন, যে আল্লাহর রাহে এক হাজার মাস রণ-সাজে সজ্জিত ছিল। একথা শুনে সাহাবীগণ অবাক হয়ে যান। তখন আল্লাহ্ তা’আলা এ সূরা নাযিল করেন। এতে বুঝানো হয়েছে যে, সে লোকটি আল্লাহর পথে যে এক হাজার মাস রণ-সাজে সজ্জিত ছিল, ‘লায়লাতুল-কদর’ সে হাজার মাস অপেক্ষাও উত্তম।

    ইবন জারীর তাবারী (র) মুজাহিদ (র) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, বনু ইসরাঈলে এমন একজন লোক ছিল, যে ফজর পর্যন্ত গোটা রাত জেগে ইবাদত করতো এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত গোটা দিন দীনের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতো। এভাবে সে এক হাজার মাস কাটিয়ে দেয়। সে প্রসঙ্গেই আল্লাহ তাআলা নাযিল করেন: لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ ألف شهر অর্থাৎ, সে ব্যক্তির ঐ এক হাজার মাস অপেক্ষাও ‘লায়লাতুল-কদর’ উত্তম।

    ইমাম মালিক (র) তাঁর ‘মুওয়াত্তা’ গ্রন্থে জনৈক নির্ভরযোগ্য আলিমের সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ভাবলেন, তাঁর উম্মতের আয়ু অত্যন্ত কম। তাদের পূর্ববর্তী উম্মতেরা তাদের সুদীর্ঘ আয়ুতে যে পরিমাণ পুণ্যের কাজ করতে পারতো, এদের আমল সে পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ্ তা’আলা নবী (সা)-কে ‘লায়লাতুল-কদর’ দান করেন, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (গ্রন্থকার বলেন:) আমার মতে, এ বর্ণনাটি যদিও মুরসাল (যার বর্ণনাসূত্র হতে সাহাবীর নাম বাদ পড়ে গেছে), কিন্তু এ বিষয়ে আর যা-কিছু বর্ণিত হয়েছে, সে তুলনায় অধিকতর বিশুদ্ধ।

    (1) إِنَّا أَنزَلْتُهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِة
    ১. আমি এটি অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রজনীতে;

    এটা প্রমাণ করে যে, ‘লায়লাতুল-কদর’ উম্মতে মুহাম্মদী (সা)-এর জন্য একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মালিকী মাযহাবের প্রখ্যাত আলিম ইবন হাবীব অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এ মতের পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করেন। শাফিঈ আলিমদের মধ্য হতে ‘আল-উদ্‌দা’ গ্রন্থের প্রণেতার বর্ণনা অনুযায়ী, এটাই ইসলামের অধিকাংশ আলিমের মত। কিন্তু নাসাঈ শরীফে উদ্ধৃত আবূ যার (রা) বর্ণিত একটি হাদীসের মর্ম এর পরিপন্থী। তাতে আবূ যার (রা) বলেন, আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! এটা কি কেবল নবীগণের সঙ্গেই থাকে, যে তাদের ওফাতের সঙ্গে সঙ্গে একেও উঠিয়ে নেওয়া হয়? তিনি বললেন : بل هي باقية না, বরং এটি বিদ্যমান থাকে।’

    হাফিয ইবন হাজার (র) এ মতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন যে, ‘লায়লাতুল কদর’ পূর্ববর্তী উম্মতসমূহের কালেও ছিল। তিনি বলেন: ইমাম মালিক (র) যে মুরসাল বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, তা বিভিন্ন ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে। কাজেই, তার দ্বারা সুস্পষ্ট বর্ণনা রদ হতে পারে না। (গ্রন্থকার বলেন:) আমার মতে, বরং মালিক (র)-এর বর্ণনা নাসাঈ শরীফে বর্ণিত আবূ যার (রা)-এর বর্ণনা অপেক্ষা অধিকতর সুস্পষ্ট। কেননা, তাতে যে বলা হয়েছে: بل هي باقية ‘বরং তা বিদ্যমান থাকে’, এর অর্থ তো এরূপও হওয়া সম্ভব যে, সে রাত আমাদের নবী (সা)-এর পরও বাকী থাকবে। তবে আবূ যার (রা) বর্ণিত হাদীস দ্বারা তাদের মত প্রত্যাখ্যাত হয়, যারা বলেন: ‘লায়লাতুল-কদর’ কেবল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম-এর জীবদ্দশায়ই এসেছিল এবং তাও মাত্র এক বছরের জন্য। তাঁর ওফাতের সঙ্গে সঙ্গে এ রাতও তুলে নেওয়া হয়েছে।

    এর সমর্থনে আবু হুরায়রা (রা)-এর হাদীসও পেশ করা যেতে পারে। তাঁর সামনে কেউ বলেছিল, মানুষের তো ধারণা ‘লায়লাতুল-কদর’ তুলে নেওয়া হয়েছে। তখন তিনি বলেন: ‘যারা এরূপ বলে, তারা মিথ্যা বলে।’ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আবদুর রায্যাক। বর্ণনাকারী বলেন, আমি বললাম: এটা কি প্রতি বছর যে রমাযান আসে, তাতেই থাকে? তিনি বললেন: হাঁ।

    إِنَّا أَنْزَلْنَهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ (আমি এটি অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রজনীতে): অর্থাৎ কুরআন মাজীদ। এর জন্য বিশেষ্যের উল্লেখ ব্যতিরেকে প্রথমেই সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে কুরআনের মর্যাদা প্রকাশ এবং সেই সঙ্গে এই সাক্ষ্য প্রদানের জন্য যে, কুরআন এমনই মহান গ্রন্থ যে, চিন্তাশক্তি তার দিকে ধাবিত হওয়ার জন্য বিশেষ্যের ব্যবহার অপরিহার্য নয়, সর্বনাম ব্যবহারই যথেষ্ট। আল্লাহ্ তা’আলা যে অবতীর্ণ করার কাজকে নিজের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন, তার দ্বারাও কুরআনের মাহাত্ম্য ফুটে উঠেছে। أنزلناه ক্রিয়া প্রধান বাক্যটি বিধেয় এবং أنا -এর মাঝে নিহিত কর্তৃবাচ্য সর্বনাম نحن তার উদ্দেশ্য, যাকে প্রথমে এনে উপরিউক্ত সম্পৃক্ততাকে বলিষ্ঠ ও জোরদার করা হয়েছে এবং অবতীর্ণ করাটা যে কেবলই তাঁর কাজ, এ বিশেষত্ব ব্যক্ত করা হয়েছে।

    এরপর নাযিলের সময় বিবেচনায়ও যে কুরআন মর্যাদাপূর্ণ তা প্রকাশের জন্য আল্লাহ্ তা’আলা বলেন : আমি একে নাযিল করেছি ‘লায়লাতুল-কদর’-এ। অর্থাৎ যে রাতে আল্লাহ্ তা’আলা স্বীয় রাজত্বে পরবর্তী বছর পর্যন্ত বান্দাদের গোটা বছরের তাকদীর বা ভাগ্য নির্ধারণ করেন।

    লায়লাতুল-কাদর নামকরণের তাৎপর্য

    হুসায়ন ইব্‌ন ফাদলকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আল্লাহ্ তা’আলা কি আসমান-যমীন সৃষ্টির আগেই তাকদীর নির্ধারণ করেননি? তিনি বলেন: নিশ্চয়ই। এরপর জিজ্ঞেস করা হলো: তবে ‘লায়লাতুল-কদর’-এর অর্থ কী? তিনি বললেন: এর অর্থ- তাকদীরকে যথাস্থানে পৌঁছানো এবং পূর্ব-স্থিরীকৃত ফায়সালাকে কার্যকর করা। অর্থাৎ পরবর্তী বছর পর্যন্ত মহাবিশ্বের যাবতীয় বিষয়ে আল্লাহ্ তা’আলা বান্দাদের জন্য যা-কিছু স্থির করে রেখেছেন, তা তিনি সংশ্লিষ্ট ফেরেশতাদেরকে এ রাতে বুঝিয়ে দেন।

    ইকরিমা (র) বলেন, তাকদীর নির্ধারণ এবং যাবতীয় বিষয়ের চূড়ান্ত ফায়সালা দান করা হয় পনেরই শা’বানের রাতে। এ রাতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হযে যায় জীবিতদের মধ্য হতে কার কার মৃত্যু হবে। এরপর তাদের মধ্যে একজনও বাড়ানো এবং তাদের থেকে একজন কমানোও হয় না। ইমাম বাগাবী (র) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে এর সমর্থন পাওয়া যায়। যাতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

    يقطع الاجال من شعبان الى شعبان حتى ان الرجل لينكح ويولد له ولقد خرج اسمه في الموتى

    ‘এক শা’বান হতে অপর শা’বান পর্যন্ত বছরের মৃতের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়। এমনকি কোন লোক বিবাহ করে এবং তার আওলাদ-ফরযন্দ হবে সে আশায় থাকে, অথচ তার নাম লেখা হয়ে যায় মৃতদের তালিকায়।’

    (গ্রন্থকার বলেন:) আমার মতে, হতে পারে বিশেষ কোন ধরনের তাকদীর নির্ধারণ বা তাকদীরের অংশ বিশেষ নির্ধারণ করা, হয় পনেরই শা’বানের রাতে, আর পূর্ণাঙ্গ তাকদীর নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের হাতে তা অর্পণ করা হয় ‘লায়লাতুল-কদর’-এ। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন : فِيْهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ ‘এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়’। (সূরা দুখান: ৪)

    ইবন আব্বাস (রা) বলেন: প্রতি বছরে শুভ, অশুভ, রিষ্ক, মৃত্যু যা কিছু হবে, তা লায়লাতুল কদরে উম্মুল কিতাব (লাওহে মাহফুয) হতে নকল করা হয়। এমনকি, কে হজ্জ করবে তাও আল্লাহর তরফ থেকে বলা হয়: এ বছর অমুক অমুক ব্যক্তি হজ্জ করবে।

    আবুদ্-দুহা ইব্‌ন আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, আল্লাহ্ তা’আলা পনেরই শা’বানের রাতে যাবতীয় বিষয় ফায়সালা করেন এবং লায়লাতুল-কদরে তা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের হাতে অর্পণ করেন। বাগাবী (র) এরূপ বর্ণনা করেছেন।

    যুহরী (ব) বলেন, এ রাতকে লায়লাতু-কাদর নামে অভিহিত করা হয়েছে এর বিশেষ মর্যাদা ও ফযীলতের কারণে (অর্থাৎ কাদর অর্থ মর্যাদা ও মহিমা। যেমন আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, : وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِةٍ ‘তারা আল্লাহর যথোচিত মর্যাদা জ্ঞাপন করে না।’ (সূরা যুমার: ৬৭) (এ আয়াতে এ শব্দটি মর্যাদা ও সম্মানের অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে)।

    কেউ কেউ বলেন: এ নামকরণের কারণ এই যে, এ রাতের ইবাদত-বন্দেগী আল্লাহর কাছে অত্যন্ত কদরসম্পন্ন ও মূল্যবান।

    লায়লাতুল-কদরে কুরআন নাযিলের অর্থ

    লায়লাতুল-কদরে কুরআন নাযিলের অর্থ কী এ সম্পর্ক ইব্‌ন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ্ তা’আলা লাওহে মাহফুয হতে একবারে সমস্ত কুরআন প্রথম আসমানে অবস্থিত বায়তুল-ইয্যাতে নাযিল করেন। আর এটা করেন রমযান মাসের লায়লাতুল-কদরে। এরপর সেখান থেকে জিবরাঈল (আ) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট খণ্ড খণ্ড আকারে তা নিয়ে আসেন দীর্ঘ তেইশ বছরে। এ সম্পর্কেই আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন: فلا أقسم بمواقع النجوم ‘আমি শপথ করছি (কুরআনের) অংশসমূহের অবতরণকাল (বা স্থান)-এর’ (সূরা ওয়াকি’আ: ৭৫)।

    আবু যর (রা) সূত্রে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

    انزل صحف ابراهيم ثلث مضين من رمضان ويروى في أول ليلة من رمضان وانزلت توراة موسى فى ست ليال مضين من رمضان وانزل الانجيل في ثلث عشرة مضت من رمضان وانزل زبور داؤد في ثمان عشرة ليلة من رمضان وانزل القرآن على النبي صلعم واربعة وعشرين لست بقين بعدها .

    ইবরাহীম (আ)-এর সহীফাসমূহ নাযিল হয়েছিল রমযানের তিন রাত অতিবাহিত হওয়ার পরবর্তী রাতে, বর্ণনান্তরে রমযানের প্রথম রাতে। মূসা (আ)-এর উপর তাওরাত নাযিল হয়েছিল রমযানের ছয় রাত অতিবাহিত হওয়ার পরবর্তী রাতে। ইনজীল নাযিল হয় রমযানের তের রাত অতিবাহিত হওয়ার পরবর্তী রাতে। দাউদ (আ)-এর উপর যাবুর নাযিল হয়েছিল রমযানের অষ্টাদশতম রাতে এবং কুরআন নাযিল হয় নবী (সা)-এর উপর রমযানের ছয়দিন বাকী থাকতে- চব্বিশতম রাতে।’

    ইমাম আহমদ ও তাবারানী (র) ওয়াছিলা ইব্‌ন আসকা’ (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে,

    نزلت صحف ابراهيم أول ليلة من رمضان وانزلت التوراة لست مضين والانجيل لثلث عشرة والقرآن الاربع وعشرين ..

    ‘ইব্রাহীম (আ)-এর উপর সহীফাসমূহ নাযিল হয়েছিল রমযানের প্রথম রাতে। তাওরাত নাযিল হয় ছয়দিন গত হওয়ার পরবর্তী রাতে। ইনজীল নাযিল হয়েছিল রমযানের তের তারিখে। আর কুরআন নাযিল হয় রমযানের চব্বিশ তারিখে’।

    উপরিউক্ত হাদীসের ভিত্তিতেই কতিপয় আলিম বলেন: ‘লায়লাতুল-কাদর’ হচ্ছে রমযানের চল্লিশ তারিখের রাত। অনুরূপ মত বর্ণিত আছে ইবন মাসউদ (রা), শা’বী (র), হাসান (র) ও কাতাদা (র) হতে। তাদের মত সমর্থিত হয় বিলাল (রা) বর্ণিত হাদীস দ্বারা, যা মুসনাদে আহমদে নিম্নরূপ বর্ণিত আছে। রাসুলুল্লাহ্ (সা) বলেন: التمسوا ليلة القدر ليلة أربع وعشرين “তোমরা রমযানের চব্বিশের রাতে লায়লাতুল-কাদর সন্ধান কর।’

    হাদীসটির বর্ণনাকারীদের মাঝে একজন হচ্ছেন ইবন লিহী’আ। হাফিয ইবন হাজার (র) বলেন, হাদীসটিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম-এর উক্তি হিসেবে বর্ণনা করাটা ইবন লিহী’আর বিভ্রমের পরিচায়ক।

    (গ্রন্থকার বলেন:) আমার মতে, উপরোক্ত হাদীসগুলো যদি সহীহও হয়, তবু এর দ্বারা প্রমাণিত হয় না যে, প্রতি বছরই লায়লাতুল-কাদর রমযানের চব্বিশের রাতে হবে। বরং এর দ্বারা কেবল এতটুকুই প্রমাণিত হয় যে, এ তারিখে শবে কদর হয়েছিল ‘বায়তুল-ইয্যতে’ কুরআন নাযিলের বছর কিংবা বিলাল (রা)-এর বর্ণনা যে বছরের সাথে সংশ্লিষ্ট, সে বছরই।

    লায়লাতুল-কদর কোন্ তারিখে?

    লায়লাতুল-কদরের তারিখ নির্ণয় সম্পর্কে উলামায়ে কিরামের মধ্যে মত-পার্থক্য রয়েছে। এ সম্পর্কে প্রায় চল্লিশটি মত পাওয়া যায়। তন্মধ্যে সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত এই যে, তা প্রতি রমযানের শেষ দশকের মাঝে আবর্তিত হয়ে থাকে। এমত গ্রহণ করলে বিশুদ্ধ হাদীসসমূহের মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা হয়। আর যে সব হাদীস এর মধ্যে পড়ে না, তা সহীহ্ নয় বলে সহীহ্ হাদীস দৃষ্টে গ্রহণযোগ্যও নয়।

    সহীহ্ হাদীসসমূহের মধ্যে অন্যতম হাদীস হচ্ছে সালমান ফারিসী (রা) বর্ণিত হাদীস। তিনি বলেন: একদা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বক্তৃতা করছিলেন। দিনটি ছিল শা’বানের শেষ দিকের। তিনি বলেছিলেন:

    ايها الناس قد أظلكم شهر عظيم شهر مبارك شهر فيه ليلة خير من الف شهر

    ‘হে লোক সকল! তোমাদের সামনে সমুপস্থিত একটি মহান মাস, বরকতময় মাস। এ মাসে এমন একটি রাত আছে, যা হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সূরা বাকারায় রমযানের ফযীলত প্রসঙ্গে এ হাদীস উল্লিখিত হয়েছে। যারা বলেন: শবে কদর রমযানেও হয়, আবার অন্য মাসেও হয়, তাদের মত এ হাদীস দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়। কাযীখান (র) ইমাম আবু হানীফা (র)-এর মাযহাব এরূপই বর্ণনা করেছেন।

    কেউ বলতে পারে, এরূপ হয়তো কুরআন নাযিলের বছর হয়েছিল অথবা সালমান (রা) যে বছরের কথা বর্ণনা করেছেন, সেই বছর। তখন আর এ হাদীস এবং আয়াত দ্বারা উপরিউক্ত মত খণ্ডন হবে না।

    আমরা উত্তরে বলবো: সালমান (রা) বর্ণিত হাদীসে সাধারণভাবে রমযান মাসের বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে:

    جعل الله صيامه فريضة وقيام ليلة تطوعا ومن تطوع فيه كان كمن أدى فريضة في غيره ومن أدى فريضة كان كمن أدى سبعين فريضة وانه شهر الصبر وشهر المواساة .

    ‘আল্লাহ্ তা’আলা এ মাসের রোযা ফরয করেছেন। রাতের কিয়াম তথা তারাবীহ অতিরিক্ত বিধানরূপে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি এ মাসে একটি নফল ইবাদত করবে, সে সেই ব্যক্তির সমান সওয়াব পাবে, যে অন্য মাসে একটি ফরয আদায় করে। কোন ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরয আদায় করলে সেই ব্যক্তির সমান সওয়াব পাবে, যে অন্য মাসে সত্তরটি ফরয আদায় করে। এটি ধৈর্যের মাস, সহমর্মিতার মাস’। এরূপ আরও যত বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে তার কোনটিই সেই এক বছরের রমযানের জন্য নির্দিষ্ট নয়। সুতরাং লায়লাতুল-কদর অন্তর্ভুক্ত থাকার বৈশিষ্ট্যটিও সেই বছরের রমযানের জন্য খাস হবে না।

    আরেকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে আইশা (রা)-এর সূত্রে। তিনি বলেন: ‘রাসূলুল্লাহ (সা) (রমযানের) শেষ দশকে ইবাদত-বন্দেগীতে এতটা পরিশ্রম করতেন, যেরূপ পরিশ্রম অন্য সময়ে করতেন না’- মুসলিম শরীফ বর্ণিত। আইশা (রা) আরও বলেন: ‘রমযানের শেষ দশক আসলে তিনি কোমর বেঁধে লেগে যেতেন এবং গোটা রাত নিজে জাগরণ করতেন ও পরিবারের লোকদেরকেও জাগিয়ে রাখতেন।’ – বুখারী ও মুসলিম বর্ণিত। তিনি আরও বলেন: ‘রাসূলুল্লাহ (সা) রমযানের শেষ দশকে মৃত্যু পর্যন্ত ইতিকাফ করতেন এবং তাঁর ইনতিকালের পর, তাঁর সহধর্মিণীগণও এরূপ ইতিকাফ করেন।’ বুখারী-মুসলিম বর্ণিত। তিনি আরো বলেন: ‘রাসূলুল্লাহ্ (সা) রমযানের শেষ দশ দিন মসজিদে ইতিকাফ করতেন এবং বলতেন: তোমরা রমযানের শেষ দশ দিনে লায়লাতুল-কাদর তালাশ কর’-বুখারী শরীফ বর্ণিত।

    আরেকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে আবূ সাঈদ খুদরী (র) সূত্রে। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম রমযানের প্রথম দশ দিন ইতিকাফ করলেন। তারপর ইতিকাফ করলেন মধ্য দশকে একটি তুর্কী তাঁবুতে। এরপর তিনি তার ভিতর থেকে মাথা বের করে দিয়ে বললেন:

    اني اعتكف العشر الأول التمس هذه الليلة ثم اعتكف العشر الأوسط ثم اتيت فقيل لى انها في العشر الأواخر فمن اعتكف معى فليعتكف العشر الأواخر فاني اريت هذه الليلة ثم اتيتها وقد رأيتني اسجد في الماء والطين من صبيحتها فالتمسوها في كل وتر .

    ‘আমি রমযানের প্রথম দশ দিন ইতিকাফ করেছি এই রাত (শবে কদর)-এর তালাশে। এরপর এ উদ্দেশ্যেই মাঝের দশ দিন ইতিকাফ করি। তারপর আমার কাছে এসে জানানো হয় যে, সে রাত রয়েছে শেষের দশ দিনে। কাজেই কেউ যদি আমার সঙ্গে ইতিকাফ করতে চায়, সে যেন শেষের দশ দিন ইতিকাফ করে। আমাকে (স্বপ্নে) এ রাত দেখানো হয়েছে। এরপর তা আমাকে (স্বপ্নে) দেখানো হয়েছে। আমি দেখলাম যে, সেদিন ঊষাকালে আমি পানি ও কাদার মধ্যে সাজদা করছি। সুতরাং তোমরা তার সন্ধান কর প্রত্যেক বেজোড় রাতে।’

    আবু সা’ঈদ খুদরী (রা) বলেন: সে রাতেই আকাশ বৃষ্টি বর্ষণ করে। মসজিদে ছিল খেজুর পাতার ছাওনী। ফলে সব পানিই মসজিদের ভিতরে পড়ে। আমার চোখ নিবদ্ধ ছিল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রতি। দেখতে পেলাম, তাঁর কপালে পানি ও কাদার চিহ্ন। এটা ছিল একুশে রমযানের ভোর’ বুখারী ও মুসলিম বর্ণিত।

    ইমাম মুসলিম (র) হযরত সাঈদ (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম লায়লাতুল-কাদরের সন্ধানে রমযানের মধ্য দশকে ইতিকাফ করলেন। তা শেষ হওয়ার পর তাঁকে আবার নতুন করে ইতিকাফ করার নির্দেশ দেওয়া হলো। তিনি তা ভেঙ্গে ফেললেন। এরপর তাঁকে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়। তবে এ কথা ঠিক যে, সে রাত শেষ দশকেই আছে। তারপর তাকে পুনরায় ইতিকাফের আদেশ দেওয়া হয়। সুতরাং আবার তা করা হয়।

    তারপর রাসূলুল্লাহ (সা) লোকদের সামনে বেরিয়ে আসেন এবং বলেন:

    يا أيها الناس انها كانت أريت لى ليلة القدر واتى خرجت لا خيركم فجاء رجلان معهما شيطان فنسيتها فالتمسوها في العشرة الأواخر من رمضان والتمسوها في التاسعة والسابعة والخامسة .

    ‘হে লোক সকল। আমাকে লায়লাতুল-কাদর দেখানো হয়েছিল। আমি তা তোমাদের জানানোর জন্যই বের হয়ে এসেছিলাম, কিন্তু ইতোমধ্যে দু’জন লোক এসে পড়ে, যাদের সঙ্গে ছিল শয়তান। ফলে আমি তা ভুলে যাই। এখন তোমরা তা রমযানের শেষ দশ রাতের মধ্যে তালাশ কর এবং তা সন্ধানকর এর নবম, সপ্তম ও পঞ্চম রাতে।

    আবু সাঈদ (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর এ হাদীস বর্ণনা করলে পরে রাবী বললেন: হে আবু সা’ঈদ। নিশ্চয়ই আমাদের চেয়ে আপনারা গণনায় পারদর্শী। আবূ সাঈদ (রা) বললেন: অবশ্যই আমরা এ ক্ষেত্রে তোমাদের চেয়ে অধিক যোগ্য। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:

    নবম, সপ্তম ও পঞ্চম। এর অর্থ- যখন একুশ পার হয়ে যায, তখন তার পরবর্তী রাত বাইশ তারিখের এবং এটাই নবম। যখন তেইশ পার হয়ে যায়, তার পরবর্তী রাতই সপ্তম এবং যখন পঁচিশ পার হয়ে যায়, তার পরবর্তী রাতই পঞ্চম।

    তায়ালিসী (র) আবু সাঈদ (রা) সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস বর্ণনা করেছেন, যাতে তিনি বলেছেন: ليلة القدر ليلة اربع وعشرين ‘লায়লাতুল-কাদর হচ্ছে চব্বিশের রাত।’

    আরেকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে আবদুল্লাহ ইব্‌ন উনায়স (রা) সূত্রে। তাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

    اريت ليلة القدر وثم انسيتها واراني صبيحتها اسجد في الماء والطين فمطرنا ليلة ثلث وعشرين فصلى بنا رسول الله صلى الله عليه وسلم يعنى الفجر فانصرف واثر الماء والطين على جبهته وانفه .

    ‘আমাকে লায়লাতুল-কদর দেখানো হয়েছিল, কিন্তু পরে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়। আমি দেখলাম, সে দিন ফজরের পানি ও কাদার মধ্যে আমি সাজদা করছি। আবদুল্লাহ (রা) বলেন: সুতরাং তেইশের রাতে বৃষ্টি হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করেন। সালাত শেষে তিনি যখন চলে যাচ্ছিলেন, তখন তার কপাল ও নাকে পানি-কাদার চিহ্ন ছিল’ -মুসলিম ও আবূ দাউদ বর্ণিত।

    আবদুল্লাহ ইব্‌ন উনায়স (রা) হতে অপর এক বর্ণনায় আছে। তিনি বলেন, আমি বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)। আমার একটা মাঠ আছে, যেখানে আমি সাধারণত থাকি। কাজেই আপনি আমাকে একটা রাতের কথা বলে দিন, যে রাতে আমি ইবাদত-বন্দেগীতে লিপ্ত থাকব। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তুমি তেইশের রাতে জাগরণ করবে। তাঁরই সূত্রে অপর এক বর্ণনায় আছে, তিনি একুশের রাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে শবে কদর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন: আজ কত তারিখের রাত? আমি বললাম: বাইশ তারিখ দিবাগত রাত। তিনি বললেন: এ রাতই (শবে কদর) কিংবা আগামী রাত।

    আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে ইবন উমর (রা) সূত্রে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি সারারাত من كان متحريا فليتحرها سبع وعشرين লায়লাতুল-কাদর সন্ধান করতে চায়, সে যেন তা সন্ধান করে সাতাইশের রাতে।’ আহমদ ও ইবন মুনযির বর্ণিত।

    জাবির ইবন সামুরা (রা) সূত্রেও অনুরূপ বর্ণিত আছে, যা ইমাম তাবারানী বর্ণনা করেছেন।

    আরেকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে মু’আবিয়া ইবন আবু সুফইয়ান (রা) সূত্রে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) লায়লাতুল-কাদর সম্পর্কে বলেছেন : ليلة القدر سبع وعشرين ‘লায়লাতুল-কাদর হচ্ছে সাতাইশের রাত।’ -আবু দাউদ বর্ণিত।

    যে সব হাদীসে সাতাইশের রাতকে লায়লাতুল-কাদর বলা হয়েছে, ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (র) সেগুলোকেই অবলম্বন করেছেন। আবু হানীফা (র) হতেও অনুরূপ একটি মত বর্ণিত আছে। উবাই ইব্‌ন কা’ব (রা)-এর স্থির বিশ্বাস হলো যে, শবে কদর তো সাতাইশেরই রাত। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল: হে আবুল মুনযির। [উবাই (রা)-এর উপনাম! এটা আপনি বলেন কিসের ভিত্তিতে? তিনি উত্তর দেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে এ রাতের যে লক্ষণ বলে দিয়েছেন, তার ভিত্তিতে। তিনি বলেছেন: সে দিনের সূর্য উদিত হবে দ্যুতিহীন অবস্থায়। -মুসলিম শরীফ বর্ণিত।

    ইবন আবু শায়বা (র) উমর (রা) ও হুযায়ফা (রা)-সহ বহু সাহাবী হতে এ মত বর্ণনা করেছেন।

    এ মতের সমর্থনে মুসলিম শরীফে বর্ণিত আবু হুরায়রা (রা)-এর হাদীসও পেশ করা হয়। তাতে তিনি বলেন: একদা আমরা লায়লাতুল-কাদূর সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করছিলাম। তা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ايكم يذكركم حين طلع القمر كانه شق جفنة কে তোমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেবে (সে রাতের কথা), যখন চাঁদ উদিত হবে অর্ধ থালার আকারে?’ আবুল হাসান ফারিসী (র) বলেন, এর অর্থ সাতাইশের রাত। কেননা, সে রাতের চাঁদ এ আকৃতিতেই উদিত হয়। তিনি আরও বলেন: এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে তার পূর্ণ সময়ের কথা, আর তা হয় সাতাইশের রাতে।

    এ দলীল শক্তিশাল নয়। কেননা, দৃশ্যত হাদীসের অর্থ এই যে, সে দিনের সূর্য যেমন উদিত হয় দ্যুতিহীন অবস্থায়, তেমনি সে রাতের চাঁদও উদিত হয় দ্যুতিহীন। আর তার কারণ সময়ের পূর্ণতা নয়, বরং অন্য কিছু।

    বস্তুত উপরোক্ত হাদীসসমূহ কেবল এটাই প্রমাণ করে যে, লায়লাতুল-কাদর কখনও কখনও সাতাশের রাতও হয়। এ রাত ছাড়া যে অন্য রাত হয়ই না, তা এর দ্বারা প্রমাণিত হয় না।

    আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে ইবন উমর (রা) হতে। তিনি বলেন: এক ব্যক্তি সাতাশের রাতে লায়লাতুল-কাদর দেখতে পায়। তার পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন, ارى رؤياكم في العشر الأواخر فاطلبوها في الوتر فيها আমি দেখতে পাচ্ছি যে, তোমাদেরকে (লায়লাতুল-কাদর) দেখানো হচ্ছে শেষ দশকে। সুতরাং তোমরা শেষ দশকের বেজোড় রাতে তা সন্ধান কর’ -মুসলিম বর্ণিত।

    এ সম্পর্কে ইবন উমর (রা) হতে আরও একটি হাদীস বর্ণিত আছে। তাতে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, فليتحرها ليلة السابعة (যে ব্যক্তি লায়লাতুল কাদর তালাশ করতে চায়) সে যেন তা শেষ সাত তারিখ রাতে তালাশ করে।’ ‘আব্দুর রাযযাক বর্ণিত।

    ইমাম আহমদ (র) ইব্‌ন আব্বাস (রা) হতেও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। এর অর্থ বিশের পরে সপ্তম বা অবশিষ্ট রাতগুলোর মধ্যে সপ্তম (তথা সাতাশের) রাত।

    আরেকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে নু’মান ইব্‌ন বাশীর (রা) সূত্রে, যাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: سابعة لمضى أو سابعة تبقى (বিশের পরে) যা গত হয় তার সপ্তম রাতে বা যা বাকী থাকে তার সপ্তম রাতে। -আহমদ বর্ণিত।

    ইবন আব্বাস (রা) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণনা করেন:

    هي في العشر الأواخر في تسع يمضين أو سبع يبقين وفي لفظ تسع يمضين

    ‘শবে কদর শেষ দশকে বিগত হওয়ার দিক থেকে নবম রাতে বা বাকী থাকার দিক থেকে সপ্তাম রাতে। অন্য বর্ণনায় আছে, ‘বিগত হওয়ার দিক থেকে নবম রাতে।’ -বুখারী বর্ণিত।

    বুখারী শরীফে অপর এক বর্ণনায় আছে,

    التحسوها في العشر الأواخر في تاسعة تبقى في سابعة تبقى في خامسة تبقى .

    ‘তোমরা শবে কদর তালাশ কর শেষ দশকে নয় দিন বাকী থাকতে, সাত দিন বাকী থাকবে এবং পাঁচ দিন বাকী থাকতে।’

    আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে উবাদা ইব্‌ন সামিত (রা) সূত্রে। তিনি বলেন: একদা রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদেরকে লায়লাতুল-কাদূর সম্পর্কে অবহিত করতে বের হয়ে আসেন। এ সময় দু’জন মুসলিম ঝগড়ায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। তখন তিনি বলেন:

    خرجت لاخبركم بليلة القدر فتلاحى فلان وفلان فرفعت عسى ان يكون خيرا لكم فالتمسوها في التاسعة والسابعة والخامسة اراه أو سبع يبقين –

    ‘আমি তো বের হয়ে এসেছিলাম তোমাদের লায়লাতুল-কদর সম্পর্কে জানাতে। কিন্তু অমুক অমুক ব্যক্তি ঝগড়ায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। যদ্দরুন তারিখটি তুলে নেওয়া হয়েছে। হয়তো এর মধ্যে তোমাদের জন্য কোন কল্যাণ নিহিত আছে। যা হোক, তোমরা নবম, সপ্তম ও পঞ্চম রাতে তা সন্ধান করবে। বর্ণনাকারী বলেন: আমার ধারণা তিনি আরও বলেছেন, ‘অথবা সাতদিন বাকী থাকতে।’

    আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে আবূ বকর (রা) সূত্রে। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি:

    التمسوها يعنى ليلة القدر في تسع يبقين أو خمس يبقين او ثلث او اخر ليلة

    ‘তোমরা তা অর্থাৎ লায়লাতুল-কাদূর খোঁজ করবে নয় দিন বাকী থাকতে বা পাঁচদিন বাকী থাকতে বা তিন দিন বাকী থাকতে কিংবা সর্বশেষ রাতে। -তিরমিযী বর্ণিত।

    ইমাম আহমদ (র) উবাদা ইবন সামিত (রা) থেকেও অনুরূপ বর্ণনা করছেন।

    আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে ইবন উমর (রা) সূত্রে। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলায়হি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবীদের মধ্যে একজন স্বপ্নে শেষ দশকের সাত রাতে লায়লাতুল-কদর দেখতে পান। তা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:

    ارى رؤياكم قد تواطئت في السبع الأواخر فمن كان متحريا فليتحرها في السبع الأواخر

    ‘আমি দেখতে পাচ্ছি তোমাদের স্বপ্ন শেষ সাত দিনের মধ্যেই ঘটছে। কাজেই যে ব্যক্তি শবে কদর খোঁজ করতে চায়, সে যেন তা শেষের সাত দিনেই খোঁজ করে। -বুখারী ও মুসলিম বর্ণিত। অপর এক বর্ণনায় আছে, কতিপয় লোক স্বপ্নযোগে শেষের সাত দিনের মধ্যে শবে কদর দেখতে পায়। আবার কতিপয়কে দেখানো হয় শেষ দশকে। এ পরিপ্রেক্ষিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন: التمسوها في السبع الاواخر ‘তোমরা তার সন্ধান কর শেষের সাত দিনে’।

    এরূপ আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে আলী (রা) সূত্রে। তাতে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন: إن غلبتم فلا تغلبوا في السبع البواقي যদি তোমরা ব্যর্থই হও, তবে অবশিষ্ট সাত রাতকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়ো না।’ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমদ (র)।

    ইবন উমর (রা) সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন:

    التمسوها في العشر الأواخر فان ضعف احدكم أو عجز فلا يغلين على السبع البواقي

    ‘তোমরা শবে কদরের সন্ধান কর শেষ দশকে। যদি তোমাদের মেধ্য কেউ দুর্বল বা অক্ষম হয়ে পড়ে, তবে সে যেন অবশিষ্ট সাত দিনে কিছুতেই ব্যর্থ না হয়।’ মুসলিম বর্ণিত।

    উপরোক্ত হাদীসসমূহ দ্বারা স্পষ্ট জানা যায় যে, লায়লাতুল-কদর রমযানের শেষ দশ দিনের মধ্যে নিহিত। অবশ্যই কখনও তা হয় একুশের রাতে, যেমন আবূ সাঈদ (রা) বর্ণিত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়। কখনও হয় তেইশের, রাতে, যেমন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন উনায়স (রা)-এর হাদীস দ্বারা জানা যায়। কখনও হয় চব্বিশের রাতে, যে রাতে কুরআন নাযিল হয়েছে। কখনও হয় সাতাইশের রাতে, যেমন আলামত দেখে উবাই ইব্‌ন কা’ব (রা) জানতে পেরেছিলেন। আবার কখনও নয় দিন বাকী থাকতে অর্থাৎ বাইশের রাতে অথবা পাঁচদিন বাকী থাকতে অর্থাৎ ছাব্বিশের রাতে অথবা তিন দিন বাকী থাকতে অর্থাৎ আটাশের রাতে অথবা (দ্বিতীয় দশক পার হওয়ার পর) গত হওয়ার দিক থেকে নবম রাতে অর্থাৎ উনত্রিশের রাতে কিংবা সর্বশেষ তথা ত্রিশের রাতে।

    এ ব্যাখ্যা অনুযায়ী হাদীসসমূহের মধ্যে কোন দ্বন্দু থাকে না। বাকী প্রকৃত অবস্থা আল্লাহ তা’আলাই ভাল জানেন। কারও কারও মতে আয়াতের অর্থ: আমি কুরআন নাযিল করেছি লায়লাতুল-কাদূরের ফযীলত ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করার জন্য, যা পরবর্তী আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।

    (۲) وَمَا أَدْرَيكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِبُ
    (۳) لَيْلَةُ الْقَدْرِهُ خَيْرٌ مِنَ الْفِ شَهْرِة
    (٤) تَنَزَّلُ الْمَلائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرِي
    ২. আর মহিমান্বিত রজনী সম্বন্ধে আপনি কী জানেন?
    ৩. মহিমান্বিত রজনী হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।
    ৪. সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে।

    وما أَدْرَكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ (মহিমান্বিত রজনী সম্পর্কে আপনি কী জানেন?): ما ادراك -এর ما অব্যয়টি প্রশ্নবোধক, যার মাঝে অস্বীকৃতির অর্থ প্রচ্ছন্ন আছে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য ‘লায়লাতুল-কাদূরের মহিমা ও সে সম্পর্কে বিস্ময় প্রকাশ করা। অনুরূপ ما ليلة القدر -এর ما-ও। আর ما ليلة القدر বাক্যটিকে একটি শব্দের পর্যায়ে ধরে নিয়ে ادراك ক্রিয়ার দ্বিতীয় কর্মপদ সাব্যস্ত করতে হবে। আয়াতটির সারমর্ম এই যে, কোন জিনিস আপনাকে লায়লাতুল-কদরের মাহাত্ম্য ও ফযীলত অবগত করেছে? কারণ, এর মাহাত্ম্য ও ফযীলত তো কল্পনাতীত। এরপর আল্লাহ তা’আলা একটি স্বতন্ত্র বাক্য দ্বারা এ রাতের ফযীলত বর্ণনা করেছেন। মাঝখানে এটি একটি অন্তর্বর্তী বাক্য।

    ليلة القدرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ (মহিমান্বিত রজনী হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ): অর্থাৎ এমন হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, যার মধ্যে লায়লাতুল-কাদর নেই। যদি কেউ এ রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগীতে লিপ্ত থাকে, তবে সে সেই ব্যক্তির চাইতেও বেশী সওয়াব পাবে, যে এক হাজার মাস আয়ু পেয়েছে এবং সবটাই ইবাদত-বন্দেগীর মধ্যে কাটিয়ে দিয়েছে।

    আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

    من قام ليلة القدر ايمانا واحتسابا غفر له من تقدم من ذنبه رواه البخاري وعند مسلم بلفظ من يقم ليلة القدر فيوافقها

    ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় লায়লাতুল-কারে জাগ্রত থেকে ‘ইবাদত-বন্দেগী করে তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। বুখারী বর্ণিত। হাদীসটি মুসলিম শরীফেও কিছুটা শাব্দিক পার্থক্যের সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে।

    মুসনাদে আহমদে উবাদা ইবন সামিত (রা) সূত্রেও হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তার ভাষা من قامها ثم وافقت له غفر له ما تقدم من ذنبه লায়লাতুল-কাদরও তার আনুকূল্য দান করে অর্থাৎ সে রাত প্রকৃতপক্ষেই লায়লাতুল-কাদর হয়, তবে তার গুনাহ মাফ হয়ে যায়।’

    تنزل المليكة والروح فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مَنْ كُلِّ أَمْرٍ ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে।):

    (٥) سَلَمُ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِة
    ৫. শান্তিই শান্তি, সে রজনী ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত

    تنزل মূলে ছিল تتنزل দুই একত্র হওয়ার কারণে একটিকে বিলোপ করা হয়েছে। الروح (রহ)-এর ব্যাখ্যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। باذن ربهم এর সম্পর্ক تنزل এর সাথে। এ বাক্যটি ليلة القدر -এর দ্বিতীয় বিধেয়, যা দ্বারা লায়লাতুল-কদরেরও একটি তাৎপর্য বর্ণনা করা হয়েছে অথবা এর দ্বারা কারণ বর্ণনা করা হয়েছে যে, লায়লাতুল-কদর হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কেন? আয়াতের সারমর্ম এই যে, এ রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ আল্লাহর নির্দেশে আসমান হতে যমীনে অবতরণ করে এমন সব কাজ নিয়ে, যা এ রাতের জন্য নির্ধারিত আছে।

    আনাস (রা) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:

    اذا كان ليلة القدر ينزل جبرئيل في كيكية من الملئكة يصلون على كل عبد قائم او قاعد يذكر الله عز وجل

    ‘লায়লাতুল-কদরে জিবরাঈল (আ) একদল ফেরেশতা নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন। তারা দাঁড়িয়ে কি বসে আল্লাহর যিকরে মশগুল বান্দাদের জন্য মাগফিরাতের দু’আ করেন।’

    سلام (শান্তিই শান্তি,): এটা হয়তো উহ্য উদ্দেশ্য هو -এর বিধেয়, অর্থাৎ তা শান্তি। এ হিসেবে বাক্যটি أمر এর বিশেষণ। অর্থাৎ ফেরেশতাগণ ও রূহ সে রাতে অবতরণ করে এমন সব কাজের উদ্দেশ্যে- যা কেবল শান্তি। কাজকে শান্তি বলা হয়েছে- আধিক্য জ্ঞাপনের জন্য। যেমন বলা হয়ে থাকে: زید عدل ‘যায়দ ন্যায়’। অথবা سلام-এর পূর্বে সম্বন্ধযুক্ত পদ موجب (কারণ) উহ্য আছে। অর্থাৎ যে কাজ সর্বপ্রকার অমঙ্গল হতে নিরাপত্তা ও শান্তির কারণ।

    বস্তুত এ أمر অর্থাৎ কাজ বা বিষয় বলতে বোঝানো হয়েছে রহমত, আমলের পুরস্কারে বরকত এবং আল্লাহর যিকররত মু’মিনদের প্রতি বর্ষিত প্রশান্তি।

    هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ (তা ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত): هی উদ্দেশ্য এবং حتى مطلع الفجر তার বিধেয়। এ সর্বনাম দ্বারা রাতকে বুঝানো হয়েছে, তবে সাধারণভাবে নয়। কেননা, তা হলে বিধেয় নিরর্থক হয়ে যায়, যেহেতু রাত যে ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত থাকে, এটা তো সুবিদিত কথা, যা সবাই জানে; বরং এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে এমন রাতকে, যা শ্রেষ্ঠত্বের বিশেষণে বিশেষিত ও ফেরেশতা অবতরণের বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত।

    অথবা বাক্যের বিশ্লেষণ হবে এরূপ যে, هي উদ্দেশ্য এবং سلام তার বিধেয়, যাকে পূর্বে স্থান দেওয়া হয়েছে। এ হিসেবে বাক্যটি ليلة القدر -এর আরেকটি বিধেয়। বিধেয়কে উদ্দেশ্যের পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে সীমাবদ্ধতার অর্থ বুঝানোর জন্য অর্থাৎ সে রাত সবটা শুধুই শান্তি ও মঙ্গল। তার মধ্যে অমঙ্গলের কিছুই নেই। যাহহাক (র) বলেন: আল্লাহ তা’আলা সে রাতে কোন অমঙ্গল স্থির করেন না এবং শান্তি ছাড়া কিছুর ফায়সালা দেন না।

    মুজাহিদ (র) বলেন: এটা নিরাপদ রাত। শয়তান এ রাতে কোন মন্দ কাজ করতে সক্ষম হয় না এবং কারও কোনরূপ অনিষ্টও সে করতে পারে না।

    কেউ কেউ বলেন: এর অর্থ- সে রাত সালাম ছাড়া আর কিছু নয়। এটা বলা হয়েছে এ কারণে যে, সে রাতে মু’মিনদের প্রতি ফেরেশতাগণ সালাম করতে থাকে অজস্র ধারায়।

    এ হিসেবে حتى مطلع الفجر এ কালাধিকরণের সম্পর্ক হবে হয়তো سلام-এর দ্বারা উপলব্ধি করা যায় এমন ক্রিয়ার সঙ্গে। অর্থাৎ সে রাত আর কিছুই নয়, উষার আবির্ভাব পর্যন্ত কেবল সালাম দেওয়ার মধ্যেই সীমিত। অথবা এটা উহ্য ক্রিয়ার অধিকরণ হয়ে উহ্য উদ্দেশ্যের বিধেয় হবে। অর্থাৎ তা জারী থাকে উষার আবির্ভাব পর্যন্ত। এ হিসেবে বাক্যটি ليلة القدر -এর আরেকটি বিধেয় অথবা تنزل-এর সাথে সম্পর্কযুক্ত। এ উভয় অবস্থায় سلام هی একটি অন্তর্বর্তী বাক্য।

    কিসাঈ (র) مطلع -এর ل-এ যের দিয়ে পড়েন। বাকী সকলে পড়েন যবর দিয়ে। শব্দটি মাসদার, যার অর্থ উদয় হওয়া (الطلوع) অথবা কালাধিকরণ অর্থাৎ উদিত হওয়ার সময়।

    এ রাতে সব কিছুর সাজদা করা, আলোর বিকাশ এবং ফেরেশতাদের সালাম-কালাম প্রসঙ্গে কথিত আছে, লায়লাতুল-কারে সব কিছুকে সাজদারত দেখা যায় এবং সব জায়গায় আলোর বিকিরণ পরিলক্ষিত হয়। তা ছাড়া ফেরেশতাদের সালাম ও কথাও শোনা যায়।

    (গ্রন্থকার বলেন:) আমার মতে, এটা এমন একটা বিষয়, যা বুযুর্গানে দীনের মধ্যে কারও কারও কাফের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে, সকলের দৃষ্টিতে নয়। এ রাতের সওয়াব লাভের জন্য এ সবের কিছু প্রকাশ পাওয়া শর্ত নয়। যদি এসব বিষয়ের প্রকাশ কোন সামগ্রিক বা বহুল ঘটিত বিষয় হতো, তবে উম্মতের কাছে- বিশেষত সাহাবা, তাবিঈন, তাবে’ তাবিঈন ও শীর্ষস্থানীয় বুযুর্গানে দীনের কাছে তা গোপন ও অস্পষ্ট থাকার কথা চিন্তা করা যায় না। আসলে লায়লাতুল-কদরের সওয়াব লাভের জন্য শর্ত হচ্ছে আল্লাহর ইবাদত করা, যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয়। তিনি বলেন: যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় লায়লাতুল-কদরে জাগ্রত থেকে ইবাদত-বন্দেগী করে, তার সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন: এ রাতে দাঁড়িয়ে কি বসে যারা আল্লাহর যিকরে মশগুল থাকে, ফেরেশতাগণ তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করে।

    মাসআলা: যে ব্যক্তি সে রাতে ইশা ও ফজরের নামায জামা’আতের সাথে আদায় করে, সেই এ রাতের সওয়াব পেয়ে যায়। তবে যে যত বেশী ইবাদত করবে, আল্লাহ্ তা’আলা তাকে তত বেশী সওয়াব দেবেন। উসমান (রা) সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

    من صلى العشاء في جماعة فكانما قام نصف الليل ومن صلى الصبح في جماعة فكانما صلى الليل كله – رواه مسلم

    ‘যে ব্যক্তি ইশার নামায জামাআতের সাথে আদায় করলো, সে যেন অর্ধেক রাত জেগে ইবাদত করলো; আর যে ব্যক্তি ফজরের নামায জামা’আতসহ আদায় করলো, সে যেন সারা রাত জেগে ইবাদত করলো’ মুসলিম শরীফ বর্ণিত। অর্থাৎ যে ব্যক্তি ইশার নামায আদায়ের পর ফজরের নামায জামাআতের সাথে আদায় করলো, সে যেন সারারাত জেগে নামায পড়লো। ইশা ও ফজর-এর প্রত্যেক নামায অর্থরাত্রির স্থলাভিষিক্ত। কেননা, রাতের ফরয নামায প্রকৃতপক্ষে এ দুটিই। আর মাগরিব হচ্ছে দিনান্তের বিতর স্বরূপ।

    লায়লাতুল-কদরে নিম্নের দু’আটি বেশী বেশী পড়া মুস্তাহাব: اللَّهُمَّ إِنَّكَ مَفو تحب الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّى হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাকারী, ক্ষমা করতে তুমি ভালবাস। সুতরাং আমাকে ক্ষমা কর।’ আইশা (রা) বর্ণনা করেন, আমি বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)। বলুন তো, আমি যদি বুঝতে পারি কোন রাত লায়লাতুল-কাদর, তবে আমি সে রাতে কী বলবো? তুমি বলবে: اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَني

    আহমদ, ইবন মাজাহ ও তিরমিযী বর্ণিত। আল্লাহ্ তা’আলা সম্যক অবহিত।

  • সূরাতুল কদর – তাফসীর ইবন কাছীর

    সূরাতুল কদর – তাফসীর ইবন কাছীর

    [بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَـنِ الرَّحِيمِ ]

    এটি মক্কায় অবতীর্ণ

    কদরের রাত্রির মর্যাদা

    আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন জানিয়ে দিচ্ছেন যে, লাইলাতুল কদরে কুরআনুল কারীম অবতীর্ণ করেন। এই রাতকে লাইলাতুল মুবারাকও বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,

    إِنَّا أَنزَلْنَـهُ فِى لَيْلَةِ الْقَدْرِ

    আমি তো ইহা অবতীৰ্ণ করেছি এক মুবারাক রাতে । (সূরা দুখান, ৪৪: ৩) কুরআন কারীম দ্বারাই এটা প্রমাণিত যে, এ রাত রামাযানুল মুবারাক মাসে রয়েছে। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন,

    [شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِى أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ]

    রামাযান মাস, যে মাসে বিশ্বমানবের জন্য পথ প্রদর্শন এবং সু-পথের উজ্জ্বল নিদৰ্শন এবং হক ও বাতিলের প্রভেদকারী কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে । (সূরা বাকারাহ, ২: ১৮৫)

    ইব্‌ন আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ সাহাবী হতে বর্ণিত আছে যে, লাইলাতুল কদরে সমগ্র কুরআন লাওহে মাহফুয হতে প্রথম আসমানে অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর ঘটনা অনুযায়ী দীর্ঘ তেইশ বছরে ধীরে ধীরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর অবতীর্ণ হয়েছে।

    তারপর আল্লাহ তাআলা লাইলাতুল কদরের শান শাওকত ও বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে বলেন, [إِنَّا أَنزَلْنَـهُ فِى لَيْلَةِ الْقَدْرِ] এই রাতের এক বিরাট বারাকাত হল এই যে, এ রাতে কুরআনুম মাজীদের মত মহান নি‘আমাত নাযিল হয়েছে।

    আল্লাহ তা’আলা বলেন,

    [وَمَآ أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ – لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ]

    হে নবী! লাইলাতুল কদর কী তা কি তোমার জানা আছে? লাইলাতুল কদর হচ্ছে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (তাবারী ২৪/৫৩১, ৫৩২; কুরতুবী ২০/১২৩)

    মুসনাদ আহমাদে আবু হুরাইরাহ (রা) হতে বর্ণিত আছে যে, রামাযান মাস এসে গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন

    «قَدْ جَاءَكُمْ شَهْرُ رَمَضَانَ، شَهْرٌ مُبَارَكٌ، افْتَرَضَ اللهُ عَلَيْكُمْ صِيَامَهُ، تُفْتَحُ فِيهِ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ، وَتُغْلَقُ فِيهِ أَبْوَابُ الْجَحِيمِ، وَتُغَلُّ فِيهِ الشَّيَاطِينُ، فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ، مَنْ حُرِمَ خَيْرَهَا فَقَدْ حُرِم»

    ‘(হে জনমণ্ডলী!) তোমাদের উপর রামাযান মাস এসে পড়েছে। এ মাস খুবই বারাকাত পূর্ণ বা কল্যাণময়। আল্লাহ তা’আলা তোমাদের উপর এ মাসের সিয়াম ফারয করেছেন। এ মাসে জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। আর শাইতানদেরকে বন্দী করে রাখা হয়। এ মাসে এমন একটি রাত রয়েছে যে রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম । এ মাসের কল্যাণ হতে যে ব্যক্তি বঞ্চিত হয় সে প্রকৃতই হতভাগা ৷’ ইমাম নাসাঈও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। (আহমাদ ২/২৩০, নাসাঈ ৪/১২৯)

    কদরের রাতে ইবাদাত করার সাওয়াব এক হাজার মাস অপেক্ষা অধিক হওয়ার ব্যাপারে সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

    «مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِه»

    যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াবের নিয়াতে কদরের রাতে ইবাদাত করে, তার পূর্বাপর সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেয়া হয়৷’ (ফাতহুল বারী ৪/২৯৪, মুসলিম ১/৫২৩)

    কদরের রাতে ফেরেশতাদের উপস্থিতি এবং উত্তম বিষয়ের অবতরণ

    এরপর আল্লাহ তা’আলা বলেন, [تَنَزَّلُ الْمَلَـئِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمْرٍ] এ রাতের বারাকাতের আধিক্যের কারণে এ রাত্রে বহু সংখ্যক মালাইকা অবতীর্ণ হন। এমনিতেই মালাইকা সকল বারাকাত ও রাহমাতের সাথেই অবর্তীণ হন। যেমন কুরআন তিলাওয়াতের সময়ে অবতীর্ণ হন, যিক্রের মাজলিস ঘিরে ফেলেন এবং দীনী ইলম বা বিদ্যা শিক্ষার্থীদের জন্য সানন্দে নিজেদের পাখা বিছিয়ে দেন ও তাদের প্রতি বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করেন। রূহ্‌ দ্বারা এখানে জিবরাঈলকে (আঃ) বুঝানো হয়েছে। এ আয়াতে অন্যান্য মালাইকা থেকে আলাদা করে উল্লেখ করার কারণ এই যে, অন্যান্য মালাইকা থেকে তার যে ভিন্ন মর্যাদা রয়েছে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা তা প্রকাশ করে দিলেন। পরবর্তী আয়াতাংশ [مِّن كُلِّ أَمْرٍ] এর ব্যাখ্যায় মুজাহিদ (রহঃ) বলেন যে, সব কিছুর উপর তখন শান্তি বর্ষিত হয়। অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’আলা বলেন, [سَلَـمٌ هِىَ] কদরের রাত আগাগোড়াই শান্তির রাত। সাঈদ ইব্‌ন মানসুর (রহঃ) বলেন: ঈসা ইব্‌ন ইউনুস (রহঃ) আমাদেরকে বলেছেন যে, আমাশ (রহ.) আমাদেরকে বলেছেন যে, মুজাহিদ (রহঃ) [سَلَـمٌ هِىَ] এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এ রাতে শাইতান কোন অনিষ্ট করতে পারেনা, কেহকে কোন কষ্ট দিতে পারেনা কাতাদাহ (রহঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এই রাতে সমস্ত কাজের ফাইসালা করা হয়, বয়স, মৃত্যু ও রিয্ক নির্ধারণ করা হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, [فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ] এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপুর্ণ বিষয়ে স্থিরীকৃত হয় । (সূরা দুখান, 88: 8) সাঈদ ইবৃন মানসুর বলেন, হুসাইম (রহঃ) আবূ ইসহাকের (রহঃ) বরাতে আমাদের কাছে বর্ণনা করেন যে, শাবী (রহঃ) [سَلَـمٌ هِىَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ] আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন যে, এই রাতে মালাইকা মাসজিদে অবস্থানকারীদের প্রতি সকাল পর্যন্ত সালাম প্রেরণ করতে থাকেন। কাতাদাহ (রহঃ) এবং ইব্ন যায়িদ (রহঃ) বলেন যে, এ রাতে শুধুই শান্তি আর শান্তি, কোন খারাবীই এতে নিহিত নেই এবং তা ফাজর পৰ্যন্ত বলবৎ থাকে।

    মর্যাদাপূর্ণ রাত কোনটি এবং উহার লক্ষণ

    মুসনাদ আহমাদে উবাদাহ ইব্‌ন সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

    «لَيْلَةُ الْقَدْرِ فِي الْعَشْرِ الْبَوَاقِي، مَنْ قَامَهُنَّ ابْتِغَاءَ حِسْبَتِهِنَّ فَإِنَّ اللهَ يَغْفِرُ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ، وَهِيَ لَيْلَةُ وِتْرٍ: تِسْعٍ أَوْ سَبْعٍ أَوْ خَامِسَةٍ أَوْ ثَالِثَةٍ أَوْ آخِرِ لَيْلَة»

    ‘(রামাযান মাসের) শেষ দশ রাতের মধ্যে লাইলাতুল কদর রয়েছে। যে ব্যক্তি এই রাতে সাওয়াবের আশায় ইবাদাত করে আল্লাহ তা‘আলা তার পূর্বাপর সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেন। ইহা হল বেজোড় রাত । অর্থাৎ একুশ, তেইশ, পঁচিশ, সাতাশ কিংবা উনত্রিশতম রাত৷’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন:

    «إِنَّ أَمَارَةَ لَيْلَةِ الْقَدْرِ أَنَّهَا صَافِيَةٌ بَلْجَةٌ، كَأَنَّ فِيهَا قَمَرًا سَاطِعًا، سَاكِنَةٌ سَاجِيَةٌ، لَا بَرْدَ فِيهَا وَلَا حَرَّ، وَلَا يَحِلُّ لِكَوْكَبٍ يُرْمَى بِهِ فِيهَا حَتْى يُصْبِحَ، وَإِنَّ أَمَارَتَهَا أَنَّ الشَّمْسَ صَبِيحَتَهَا تَخْرُجُ مُسْتَوِيَةً لَيْسَ لَهَا شُعَاعٌ، مِثْلَ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ، وَلَا يَحِلُّ لِلشَّيْطَانِ أَنْ يَخْرُجَ مَعَهَا يَوْمَئِذ»

    ‘লাইলাতুল কদরের নিদর্শন এই যে, এটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও পরিষ্কার এবং এমন উজ্জ্বল হয় যে, যেন চন্দ্রোদয় ঘটেছে। এ রাতে শান্তি ও শৈত্য বিরাজ করে। ঠাণ্ডা ও গরম কোনটাই বেশী থাকেনা । সকাল পর্যন্ত নক্ষত্র আকাশে জ্বল জ্বল করে। এ রাতের আর একটি নিদর্শন এই যে, এর শেষ প্রভাতে সূর্য প্রখর কিরণের সাথে উদিত হয়না । বরং চতুর্দশ রাতের চন্দ্রের মত উদিত হয়। সেদিন ওর সাথে শাইতানেরও আবির্ভাব হয়না৷’ (আহমাদ ৫/৩২৪ মুরসাল) এ হাদীসটির সনদ সহীহ বা বিশুদ্ধ, কিন্তু মতন গারীব। কিছু কিছু শব্দের ব্যবহার বিতর্কিত রয়েছে।

    ইমাম আবু দাউদ (রহঃ) তার সুনান গ্রন্থে কদরের রাত সম্পর্কে একটি ভিন্ন অধ্যায় রচনা করেছেন। তাতে তিনি লিখেছেন যে, প্রতি বছর রামাযান মাসে কদরের রাতের আবির্ভাব হয়। তিনি আরও লিখেছেন যে, আবদুল্লাহ্‌ ইব্ন উমার (রা) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এক ব্যক্তি কদরের রাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তখন আমিও তার কাছে ছিলাম । তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, «هِيَ فِي كُلِّ رَمَضَان» ইহা প্রতি রামাযান মাসেই আবির্ভূত হয়। (হাদীস নং ২/১১১ মাওকুফ) এ হাদীসটি বর্ণনার ব্যক্তিবর্গ বিশ্বস্ত, কিন্তু ইমাম আবূ দাউদ (রহঃ) বলেছেন যে, শুবাহ (রহঃ) এবং সুফিয়ান (রহঃ) উভয়ে এটি ইসহাক (রহঃ) হতে বর্ণনা করেছেন এবং তারা মনে করেন যে, আলোচ্য বর্ণনাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের নয়, বরং ইব্‌ন উমারের (রাঃ) নিজের ।

    আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়৷ সাল্লাম রামাযান মাসের প্রথম দশদিনে ই’তিফাক করেন, আমরাও তার সাথে ই’তিকাফ করতে থাকি। অতঃপর জিবরাঈল (আঃ) এসে বলেন, ‘আপনি যা খুঁজছেন তাতো এখনো সামনে রয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মধ্যভাগের দশদিন ই’তিকাফ করেন এবং আমরাও তীর সাথে ই’তিকাফ করি। আবার জিবরাঈল (আঃ) এসে বলেন, ‘আপনি যা খুঁজছেন তাতো এখনো সামনে রয়েছে।’ অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাযামানের বিশ তারিখের সকালে দাড়িয়ে খুতবাহ দেন এবং বলেন,

    «مَنْ كَانَ اعْتَكَفَ مَعِيَ فَلْيَرْجِعْ فَإِنِّي رَأَيْتُ لَيْلَةَ الْقَدْرِ، وَإِنِّي أُنْسِيتُهَا، وَإِنَّهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ فِي وِتْرٍ، وَإِنِّي رَأَيْتُ كَأَنِّي أَسْجُدُ فِي طِينٍ وَمَاء»

    ‘আমার সাথে রাত দেখেছি, কিন্তু এরপর তা আমাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে ইহা রামাযানের শেষ দশদিনের বেজোড় রাতে রয়েছে। আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে যে, আমি যেন কাদা ও পানির মধ্যে সাজদাহ করছি।’ মাসজিদে নাববীর ছাদ ছিল শুকনা খেজুর পাতার তৈরি । আকাশে তখন মেঘের কোন চিহ্নই ছিলনা । হঠাৎ মেঘ জমা হল এবং বৃষ্টি হল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে সাথে নিয়ে সালাত আদায় করেন এবং আমরা লক্ষ্য করলাম যে, তার কপালে ভিজা মাটি লেগে রয়েছে’ (ফাতহুল বারী ৪/৩২৯, মুসলিম ২/৮২৪) এভাবে তার স্বপ্ন সত্য প্রমাণিত হল। ইহা রামাযান মাসের একুশ তারিখের রাতের ঘটনা বলে ইমাম বুখারী (রহঃ) ও ইমাম মুসলিম এ হাদীসটি দু’টি ভিন্ন বর্ণনা ধারায় উল্লেখ করেছেন। ইমাম শাফিঈ (রহঃ) বলেন যে, বর্ণনার দিক দিয়ে এ হাদীসটি সহীহ। আবদুল্লাহ ইবৃন উনাইস (রহঃ) থেকে বর্ণিত সহীহ মুসলিমে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে যাতে বলা হয়েছে যে, কদরের রাত হল রামাযানের তেইশতম রাত। (হাদীস নং ২/৮২৭) ইব্‌ন আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত অপর একটি হাদীসে বলা হয়েছে যে, কদরের রাত হল রামাযানের পঁচিশতম রাত। ওতে বলা হয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা রামাযানের শেষ দশ রাতে কদরের রাত অন্বেষন কর। নবম রাতেও থাকতে পারে, সপ্তম রাতেও থাকতে পারে অথবা পঞ্চম রাতেও থাকতে পারে। (ফাতহুল বারী ৪/৩০৬)

    নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

    «الْتَمِسُوهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ فِي تَاسِعَةٍ تَبْقَى، فِي سَابِعَةٍ تَبْقَى، فِي خَامِسَةٍ تَبْقَى»

    ‘কদরের রাতকে রামাযানের শেষ দশকে খৌজ কর। এটি নয় (এর রাত্রে) থাকে, সাত (এর রাত্রে) থাকে, পাঁচ (এর রাতেও এ সুযোগ) থাকে’ অধিকাংশ মুহাদ্দিস বলেছেন যে, এর দ্বারা বেজোড় রাতকে বুঝানো হয়েছে। এটাই সর্বাধিক সুস্পষ্ট ও প্রসিদ্ধ উক্তি।

    কদরের রাত রামাযানের সাতাশতম রাত বলেও উল্লেখ রয়েছে। উবাই ইব্‌ন কা’ব (রা.) হতে বর্ণিত একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘এটি সাতাশতম রাত !’ (মুসলিম ২/৮২৮)

    মুসনাদ আহমাদে রয়েছে যে, যির (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি উবাই ইব্‌ন কা‘বকে (রা.) জিজ্ঞেস করেন, হে আবু মুনযির! বলা হল: আপনার ভাই আবদুল্লাহ ইব্‌ন মাসউদ (রাঃ) বলেন: যে ব্যক্তি বছরের প্রত্যেক রাতে জেগে থাকবে সে কদরের রাত পেয়ে যাবে। এ কথা শুনে উবাই (রা.) বললেন: ‘আল্লাহ তার প্রতি রহম করুন, তিনি জানতেন যে, এ রাত রামাযান মাসের মধ্যে রয়েছে এবং আমি শপথ করে বলছি যে, কদরের রাত যে রামাযানের সাতাশতম রাত এটাও আবদুল্লাহ ইব্‌ন মাসউদ (রা.) জানতেন । উবাই ইব্‌ন কা’বকে (রা.) আবার জিজ্ঞেস করা হল, আপনি এটা কি করে জানলেন? জবাবে তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের যে সব নিদর্শনের কথা বলেছেন সে সব দেখেই আমরা বুঝতে পেরেছি। যেমন এ দিন রাতের পর সূর্য উদিত হওয়ার সময় কিরণহীন অবস্থায় উদিত হয়। ইমাম মুসলিমও (রহঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। (আহমাদ ৫/১৩০, মুসলিম ২/৮২৮)

    লাইলাতুল কদর রামাযান মাসের উনত্রিশতম রাত বলেও উল্লেখ রয়েছে। উবাদা ইব্‌ন সামিতের (রা.) প্রশ্নের জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

    «فِي رَمَضَانَ فَالْتَمِسُوهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ، فَإِنَّهَا فِي وِتْرٍ إِحْدَى وَعِشْرِينَ، أَوْ ثَلَاثٍ وَعِشْرِينَ، أَوْ خَمْسٍ وَعِشْرِينَ، أَوْ سَبْعٍ وَعِشْرِينَ، أَوْ تِسْعٍ وَعِشْرِينَ، أَوْ فِي آخِرِ لَيْلَة»

    ‘এ রাতে রামাযান মাসের শেষ দশকে বেজোড় রাতসমূহে অনুসন্ধান কর অর্থাৎ একুশ, তেইশ, পঁচিশ, সাতাশ, উনত্রিশ অথবা শেষ রাতে ৷’ (আহমাদ ৫/৩১৮) মুসনাদ আহমাদে আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

    «إِنَّهَا لَيْلَةُ سَابِعَةٍ أَوْ تَاسِعَةٍ وَعِشْرِينَ، وَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ تِلْكَ اللَّيْلَةَ فِي الْأَرْضِ أَكْثَرُ مِنْ عَدَدِ الْحَصَى»

    ‘লাইলাতুল কদর হল সাতাশতম অথবা উনত্রিশতম রাত। এ রাতে যে মালাইকা পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন তাদের সংখ্যা পৃথিবীর প্রস্তর খণ্ডের সংখ্যার চেয়েও অধিক ।’ (আহমাদ ২/৫১৯) একমাত্র ইমাম আহমাদ (রহ.) এ হাদীসটি লিপিবদ্ধ করেছেন এবং এর বর্ণনায় কোন ভুল পরিলক্ষিত হয়না ।

    ‘রামাযানের সর্বশেষ রাতও কদরের রাত’ এর উপরও একটি বর্ণনা রয়েছে। জামে’ তিরমিধী এবং সুনান নাসাঈতে রয়েছে: ‘নয়টি রাত যখন বাকী থাকে বা সাত পাচ বা তিন অথবা শেষ রাত অর্থাৎ এ রাতগুলিতে কদরের রাত তালাশ কর !’

    ইমাম তিরমিযী (রহঃ) আবূ কিলাবা (রহঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রামাযানের শেষ দশ দিনের রাতের মধ্যে এ রদবদল হয়ে থাকে। ইমাম মালিক (রহঃ) ইমাম সাওরী (রহঃ), ইমাম আহমাদ ইব্‌ন হাম্বল (রহঃ), ইমাম ইসহাক ইব্‌ন রাহওয়াই (রহঃ), ইমাম আবূ সাওর (রহঃ), আল মুযানী (রহঃ), ইমাম আবূ বাকর ইব্‌ন খুযাইমা (রহঃ) প্রমুখ গুরুজনও এ কথাই বলেছেন। আল্লাহ তা‘আলাই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।

    কদরের রাতে পঠিতব্য দু’আ

    এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, সব সময়েই আল্লাহর কাছে দু’আ চাওয়া উচিত তবে রামাযান মাসে আরো বেশী করে দুআ করতে হবে, বিশেষ করে রামাযানের শেষ দশকে এবং বেজোড় রাতে নিম্নের দু‘আটি খুব বেশী পাঠ করতে হবে, ‘হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করাকে আপনি ভালবাসেন, সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন!” মুসনাদ আহমাদে বর্ণিত আছে যে, আয়িশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি যদি কদরের রাত পেয়ে যাই তাহলে আমি কি দু‘আ পাঠ করব? উত্তরে তিনি বললেন,

    «قُولِي: اللْهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي»

    এই দু‘আটি পাঠ করবে (আহমাদ ৬/১৮২) এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রহঃ) এবং নাসাঈও (রহঃ) বর্ণনা করেছেন। সুনান ইব্‌ন মাজাহয়ও বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রহঃ) এটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। মুসতাদরাক হাকিম গ্রন্থেও এটি ভিন্ন রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে এবং তিনি দুই শায়খের (ইমাম বুখারী ও মুসলিম (রহঃ)) শর্তে সহীহ বলেছেন। (তিরমিযী ৯/৪৯৫, নাসাঈও ৬/২১৮, ইব্ন মাজাহয় ২/১২৬৫, হাকিম ১/৫৩০)

  • প্রশ্ন-উত্তর: হাদীসে বর্ণিত রায়া (ঝাণ্ডা) ও লিওয়া (পতাকা)

    প্রশ্ন-উত্তর: হাদীসে বর্ণিত রায়া (ঝাণ্ডা) ও লিওয়া (পতাকা)

    রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রায়া (الراية) ও লিওয়া (اللواء) সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসসমূহ

    প্রশ্ন:

    আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

    আমাদের সম্মানিত শায়খ, আপনি কেমন আছেন?

    আমার একটি প্রশ্ন রয়েছে।

    রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রায়া (الراية) সম্পর্কে কতগুলো হাদিস বর্ণিত হয়েছে এবং সেগুলোর বিশুদ্ধতা (Authenticity) কতটুকু?

    এবং যদি আপনি কোনো হাদিস উল্লেখ করেন, তাহলে অনুগ্রহ করে তার সনদ (السند)-এর মান বা গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কেও উল্লেখ করবেন।

    উত্তর:

    ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

    লিওয়া (পতাকা) এবং রায়া (ব্যানার) এবং সেগুলোর উপর কী লেখা ছিল এ বিষয়ে আমাদের গ্রন্থসমূহে আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষভাবে এ বিষয়ে আলোচনা রয়েছে “আযহিজা” (Ajhiza – أجهزة الدولة في الخلافة: The Institutions of State in the Khilafah) (খিলাফতের রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানসমূহ—শাসন ও প্রশাসন বিষয়ে) গ্রন্থে, যার আরবি সংস্করণের ২০০ পৃষ্ঠা এবং ইংরেজি সংস্করণের ১৬৩ পৃষ্ঠায় নিম্নরূপ বলা হয়েছে—

    রাষ্ট্রের পতাকা (ألوية/ Alwiyah) এবং ব্যানার (رايات/ Rayāt) থাকবে। এই বিধানটি নির্ণীত হয়েছে ইসলামের প্রথম রাষ্ট্র—যা রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনা আল-মুনাওয়ারায় (المدينة المنورة) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন—সেই রাষ্ট্রের পতাকা ও ব্যানারের দৃষ্টান্ত থেকে। এগুলো হবে নিম্নরূপ—

    ১. ভাষাতাত্ত্বিক ও অভিধানগত দৃষ্টিকোণ থেকে পতাকা (Flag) এবং ব্যানার (Banner)—উভয়কেই আরবি ভাষায় সাধারণভাবে ‘আলাম’ (عَلَم) বলা হয় (এর অর্থ হলো কোনো দল, বাহিনী বা রাষ্ট্রকে শনাক্ত করার জন্য ব্যবহৃত প্রতীক, চিহ্ন বা নিশান)।

    প্রখ্যাত আরবি অভিধান আল-কামুস আল-মুহীত (القاموس المحيط) গ্রন্থে শব্দমূলভিত্তিক আলোচনায় বলা হয়েছে—

    (روي) (র-ও-য়)  ধাতুর অধীনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আর-রায়া (الراية) হলো ‘আলাম’ (عَلَم) যার বহুবচন রায়াত (رايات)। অন্যদিকে (لوي) (ল-ও-য়)  ধাতুর অধীনে বলা হয়েছে—আল-লিওয়া (اللواء)-ও ‘আলাম’ (عَلَم) যার বহুবচন আলউইয়াহ (ألوية)

    তবে শরিয়ত এই দুটি শব্দের জন্য নির্দিষ্ট শর’ঈ পরিভাষাগত অর্থ নির্ধারণ করেছে, যা নিম্নরূপ—

    লিওয়া (পতাকা) সাদা রঙের, যার উপর কালো অক্ষরে লেখা থাকে— “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”। এই পতাকা সেনাবাহিনীর আমির বা প্রধান সেনানায়কের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। এটি তার অবস্থান নির্দেশকারী প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং তার অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গেই অবস্থান করে। সেনাপতির সঙ্গে পতাকা সংযুক্ত থাকার প্রমাণ হলো—রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয়ের দিন একটি সাদা পতাকা উত্তোলন করে মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন। এই হাদিসটি জাবির (রা.) থেকে ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন। আর আন-নাসাঈ আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে— যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) উসামা ইবনে যায়েদকে রোম অভিযানের জন্য সেনাপতি নিযুক্ত করেন, তখন তিনি নিজ হাতে তার জন্য পতাকা বাঁধেন

    রায়া (ব্যানার) টি কালো রঙের, যার উপর সাদা অক্ষরে লেখা থাকে—“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” এটি বহন করে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের নেতারা—যেমন রেজিমেন্ট, ডিটাচমেন্ট বা অন্যান্য সামরিক বিভাগের কমান্ডারগণ। এর প্রমাণ হলো—খাইবার অভিযানের সময়, যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেই সেনাপতি ছিলেন, তিনি বলেন—“আমি আগামীকাল এই রায়া এমন এক ব্যক্তিকে প্রদান করব, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও তাকে ভালোবাসেন।” পরদিন তিনি এটি আলী (রা.)-কে প্রদান করেন। এই হাদিসটি (বুখারি ও মুসলিম উভয়েই বর্ণনা করেছেন) মুত্তাফাকুন আলাইহি। তখন আলী (রা.) সেনাবাহিনীর একটি ডিভিশন বা ইউনিটের নেতা ছিলেন। আরও একটি হাদিসে হারিস ইবনে হাসান আল-বাকরি বলেন—“আমরা মদিনায় আগমন করলাম এবং দেখলাম রাসূলুল্লাহ (সা.) মিম্বারের উপর আছেন। বিলাল তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, তার কোমরে তরবারি বাঁধা। আর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে কিছু কালো ব্যানার ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম—এই ব্যানারগুলো কী? তারা বলল—এটি আমর ইবনে আল-আস, যিনি সদ্য একটি অভিযানে থেকে ফিরে এসেছেন।” এখানে বলা হয়েছে—“কালো ব্যানারসমূহ (Rayaat)” অর্থাৎ একাধিক ব্যানার ছিল, যদিও সেনাপতি ছিলেন একজন—আমর ইবনে আল-আস। এ থেকে বোঝা যায়—একই সেনাবাহিনীতে পতাকা (Liwa’) একটি মাত্র কিন্তু ব্যানার (Rayat) একাধিক হতে পারে, যা বিভিন্ন ইউনিট বহন করে। অতএব—লিওয়া (পতাকা) কেবল সেনাপতির প্রতীক (আলাম) আর রায়া (ব্যানার) সৈন্যদের বহনকৃত প্রতীকসমূহ (আলাম)।

    ২. পূর্বে যা উল্লেখ করা হয়েছে তার সাথে আরও একটি হাদিস সংযোজন করছি, যা আত-তাবারানি তাঁর গ্রন্থ আল-মুʿজাম আল-আওসাত (المعجم الأوسط) (১/২২৩)-এ নিম্নোক্ত হাদিসটি বর্ণনা করেছেন—

    [২২৪ আহমদ ইবন রুশদীন আমাদের নিকট বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আবদুল গাফ্ফার ইবন দাউদ আবু সালিহ আল-হাররানি আমাদের নিকট বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: হাইয়ান ইবন উবাইদুল্লাহ আমাদের নিকট বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আবু মাজলাজ লাহিক ইবন হুমায়দ আমাদের নিকট বর্ণনা করেন, তিনি ইবন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে—

    «كَانَتْ رَايَةُ رَسُولِ اللهِ ﷺ سَوْدَاءَ وَلِوَاؤُهُ أَبْيَضُ، مَكْتُوبٌ عَلَيْهِ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللهِ»

    অর্থাৎ—“রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রায়া (ঝাণ্ডা) ছিল কালো, এবং তাঁর লিওয়া (পতাকা) ছিল সাদা। তাতে লেখা ছিল—‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।’” এই হাদিসটি ইবন আব্বাস (রা.) থেকে কেবল এই সনদের মাধ্যমেই বর্ণিত হয়েছে; অর্থাৎ এই বর্ণনাটি হাইয়ান ইবন উবাইদুল্লাহ-এর বর্ণনার মাধ্যমে এককভাবে (unique narration) প্রাপ্ত। ইবন হিব্বান তার গ্রন্থ আস-সিকাত (الثقات) (খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২৩০)-এ হাইয়ানকে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অন্যদিকে আবু হাতিম তার গ্রন্থ আল-জারহ ওয়া আত-তা‘দিল (الجرح والتعديل) (খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৪৬)-এ তার সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন— “তিনি সত্যবাদী (صدوق)।”

    রায়া (ব্যানার) ও লিওয়া (পতাকা)-এর বিষয়টি ইসলামের ইতিহাসে সুপরিচিত। ইসলামের প্রারম্ভিক যুগ থেকেই মুসলমানদের জন্য রায়া (ব্যানার) উত্তোলিত হয়ে এসেছে। অতএব এ বিষয়ে অতিরিক্ত ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।

    আমি আশা করি এই আলোচনা যথেষ্ট হবে। আর আল্লাহই সর্বাধিক অবগত এবং সর্বাধিক প্রজ্ঞাময়।

    ওয়াস সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

    আপনাদের ভাই
    আতা ইবনু খলিল আবু আল-রাশতা

    ২৮ শা‘বান ১৪৪৭ হিজরি
    ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

  • প্রশ্ন-উত্তর: স্বর্ণের দামের ওঠা-নামা

    প্রশ্ন-উত্তর: স্বর্ণের দামের ওঠা-নামা

    প্রশ্ন:

    আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহ, আমাদের সম্মানিত শাইখ।

    আমি আশা করি এই প্রশ্নটি আপনার কাছে সুস্বাস্থ্য ও সুস্থতার সাথে পৌঁছেছে। আমি আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা)’র কাছে দু’আ করি যেন তিনি আপনাকে তাঁর দ্বীনকে সমুন্নত রাখতে এবং তাঁর আইন বাস্তবায়নে সহায়তা করেন।

    আমার প্রশ্ন হচ্ছে: সাম্প্রতিক সময়ে আমরা স্বর্ণের মূল্যে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করছি। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এর মূল্য দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেছে। এর অর্থ কি এই যে, স্বর্ণ—যা দীর্ঘদিন ধরে একটি স্থিতিশীল ধাতু এবং মুদ্রাব্যবস্থার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে—এখন আর সেই স্থিতিশীলতা বজায় রাখছে না, বরং পরিবর্তনশীল হয়ে উঠেছে? নাকি এই মূল্য পরিবর্তনের পেছনে কিছু নির্দিষ্ট শাসকগোষ্ঠীর আরোপিত নিয়ন্ত্রণ এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রভাবই প্রধান ভূমিকা পালন করছে?

    যদি তাই হয়ে থাকে, তবে ইনশাআল্লাহ অদূর ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত হতে যাওয়া ইসলামী রাষ্ট্র কীভাবে তার মুদ্রাব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে এবং ইসলামের শত্রুদের সম্ভাব্য প্রভাব ও কারসাজি থেকে তাকে সুরক্ষিত রাখবে?

    বারাকাল্লাহু ফিক

    আপনার ইসলামের ভাই, আহমেদ সাঈদ, ফিলিস্তিনের ইসরা ও মিরাজের ভূমি থেকে।

    উত্তর:

    ওয়া আলাইকুম আসসালামু ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

    স্বর্ণের মূল্যের ওঠানামার (প্রধান) কারণ হলো—স্বর্ণ নিজেই একটি পণ্য (commodity)। ফলে অন্যান্য পণ্যের মতোই বাজারের জল্পনা-কল্পনা ও আর্থিক স্পেকুলেশনের প্রভাব এর ওপর পড়ে; যার ফলে এর মূল্য কখনো ঊর্ধ্বমুখী হয় আবার কখনো নিম্নমুখী হয়। বিশেষত বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বৃহৎ শক্তিগুলো—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র—ডলারকে আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তারা কার্যত কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই প্রয়োজনমতো ডলার ছাপানোর পরিমাণ ইচ্ছামতো বাড়াতে বা কমাতে পারে। তদুপরি বহু দেশের সঙ্গে তাদের বিদ্যমান ঔপনিবেশিক ধাঁচের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে ডলারকে একটি কৃত্রিম স্থিতিশীলতা প্রদান করে, যার ফলে তা প্রায় স্বর্ণের সমতুল্য মর্যাদা লাভ করেছে। কিন্তু যদি বাস্তবতা ভিন্ন হতো—অর্থাৎ মুদ্রাব্যবস্থা প্রকৃত অর্থেই স্বর্ণভিত্তিক হতো এবং প্রতিটি কাগুজে মুদ্রার বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ সংরক্ষিত থাকত, যা যেকোনো সময় বিনিময়যোগ্য—যাকে রিজার্ভ কাগুজে মুদ্রা বলা হয়—তাহলে তথাকথিত ফিয়াট মুদ্রা (অর্থাৎ বাস্তব সম্পদ দ্বারা সমর্থিত নয় এমন কাগুজে টাকা) কেবল যে কাগজে তা মুদ্রিত হয়েছে সেই কাগজের মূল্য ছাড়া আর কোনো প্রকৃত মূল্য বহন করত না। এ বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য আমি দুটি বিষয় উল্লেখ করছি-

    প্রথমতঃ আমার বই “Economic Crises: Their Reality and Solutions from the Viewpoint of Islam”-এ আমি আলোচনা করেছি যে—

    [মুদ্রার বাস্তবতার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট: যখন বিশ্ব অর্থনৈতিক লেনদেনে স্বর্ণমান (Gold Standard) অনুসরণ করত, তখন বৈশ্বিক অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধি ও মুদ্রার স্থিতিশীলতার এক পর্যায় অতিক্রম করছিল। কিন্তু যখন এই ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে গেল এবং লেনদেন সম্পূর্ণরূপে বাধ্যতামূলক কাগুজে মুদ্রার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল, তখন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে এবং একের পর এক আর্থিক সংকট দেখা দিতে থাকে। স্বর্ণমান ব্যবস্থায় প্রতিটি দেশের মুদ্রা হয় সরাসরি স্বর্ণ ছিল, অথবা এমন কাগুজে নোট ছিল যা পূর্ণমূল্যে স্বর্ণ দ্বারা সমর্থিত এবং যেকোনো সময় স্বর্ণে রূপান্তরযোগ্য ছিল। ফলে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকত, কারণ তা একটি স্বীকৃত স্বর্ণের এককের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী একটি দিনার নির্ধারিত হয়েছে ৪.২৫ গ্রাম স্বর্ণ হিসেবে। ব্রিটিশ পাউন্ড আইনি ভাবে নির্ধারিত ছিল ২ গ্রাম খাঁটি স্বর্ণ, এবং ফরাসি ফ্রাঁ ছিল ১ গ্রাম স্বর্ণের সমমূল্য। ফলে বিভিন্ন মুদ্রার মধ্যে বিনিময় হার ছিল নির্দিষ্ট ও স্থিতিশীল।

    এই ব্যবস্থার ফলে মুদ্রার মূল্য দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে উভয় ক্ষেত্রেই স্থিতিশীল থাকত। এর একটি প্রমাণ হলো—১৯১০ সালে স্বর্ণের মানদণ্ডমূল্য প্রায় একই স্তরে ছিল যেমনটি ১৮৯০ সালে ছিল। কিন্তু যখন এই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, তখন থেকেই অর্থনৈতিক সংকটের ঘনঘটা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে]

    দ্বিতীয়তঃ

    ইনশাআল্লাহ যখন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন তার মুদ্রা নিয়ে কোনো আশঙ্কা থাকবে না। অন্যান্য দেশ যদি স্বর্ণ ও রৌপ্যকে মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ না করে এবং ফিয়াট কাগুজে মুদ্রাভিত্তিক ব্যবস্থাই অব্যাহত রাখে, তবুও তারা ইসলামী রাষ্ট্রের মুদ্রাকে প্রভাবিত করতে পারবে না। কারণ মুসলিম দেশগুলোর এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা তাদের বাইরের জল্পনা-কল্পনা থেকে নিরাপদ রাখবে।

    ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এ বিষয়ে বলা হয়েছে:

    [ইসলামী রাষ্ট্রের মুদ্রা এবং অন্যান্য দেশের মুদ্রার মধ্যকার বিনিময় হারের তারতম্য ইসলামী রাষ্ট্রের ওপর কোনো কার্যকর প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না; এর পেছনে দুটি মৌলিক কারণ রয়েছে:

    ১। ইসলামী ভূখণ্ডে এমন প্রায় সব ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ ও কাঁচামাল বিদ্যমান, যা উম্মাহ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম। ফলে অন্যান্য দেশের পণ্যের ওপর তাদের নির্ভরতা মৌলিকভাবে অপরিহার্য নয়। নিজস্ব সম্পদ ও উৎপাদনক্ষমতার কারণে ইসলামী রাষ্ট্র মূলত স্বনির্ভর থাকবে; তাই আন্তর্জাতিক মুদ্রাবিনিময় হারের ওঠানামা তার অর্থনীতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারবে না।

    ২। মুসলিম ভূখণ্ডে এমন কিছু কৌশলগত পণ্য ও সম্পদ রয়েছে, যেগুলোর প্রয়োজন বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য অপরিহার্য—যেমন তেল। ইসলামী রাষ্ট্র চাইলে এসব পণ্য বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এই শর্ত আরোপ করতে পারে যে এর মূল্য স্বর্ণে পরিশোধ করতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র নিজস্ব সম্পদ ও উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে অন্য দেশের পণ্যের প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে। যে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এমন কৌশলগত সম্পদ থাকে, যা বিশ্বের অন্যান্য জাতির জন্য অপরিহার্য, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত তার হাতেই ন্যস্ত থাকে; অন্য কোনো শক্তির পক্ষে তার মুদ্রাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না]

    প্রিয় ভাই, নিশ্চিত থাকুন যে, এই দলের মধ্যে জ্ঞানী, সচেতন এবং সুবিবেচনাপ্রসূত ব্যক্তিরা আছেন, আর সবকিছুর আগে এবং পরে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা)’র সাহায্য ও নির্দেশনা রয়েছে, যা ইসলামের শত্রুদের চক্রান্তকে তাদের নিজেদের উপর ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর আল্লাহ হলেন সৎকর্মপরায়ণদের রক্ষাকর্তা।

    আমি আশা করি এটাই যথেষ্ট, আর আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন এবং তিনিই সবচেয়ে প্রজ্ঞাময়।

    আপনাদের ভাই
    আতা ইবন খলিল আবু আল-রাশতাহ

    ৭ই রমজান, ‌১৪৪৭ হিজরি
    ২৪/০২/২০২৬ ইং

  • অঙ্কন, আলোকচিত্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিধান

    অঙ্কন, আলোকচিত্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিধান

    শরীয়াহ অনুযায়ী অঙ্কন (drawing), আলোকচিত্র (photography) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) বিধান

    ইসলামি জীবনবিধানে ছবি বা প্রতিকৃতি তৈরির বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এ সম্পর্কে বিস্তারিত শর’ঈ নির্দেশনা রয়েছে। আধুনিক যুগে প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে অঙ্কন (Drawing), আলোকচিত্র (Photography) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) মাধ্যমে ছবি তৈরির নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। নিম্নে এ সংক্রান্ত শরঈ বিধানগুলো আলোচনা করা হলো।

    ১. প্রাণবন্ত বস্তুর ছবি বা প্রতিকৃতি অঙ্কনের বিধান

    শরীয়াহ অনুযায়ী মানুষ, পশু বা পাখির মতো প্রাণসম্পন্ন (যার প্রাণ বা ‘রুহ’ আছে) কোনো বস্তুর ছবি অঙ্কন করা স্পষ্টত নিষিদ্ধ বা হারাম। এটি কাগজে আঁকা, কাপড়ে বোনা, অলঙ্কার বা মুদ্রায় খোদাই করা কিংবা মাটির তৈরি ভাস্কর্য—যেকোনো মাধ্যমেই হোক না কেন, তা নিষিদ্ধের অন্তর্ভুক্ত। হাদিস অনুসারে, কিয়ামতের দিন সেই চিত্রকরদের সবচেয়ে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে যারা আল্লাহর সৃষ্টির অনুকরণ করার চেষ্টা করে। তাদের বলা হবে, “তোমরা যা সৃষ্টি করেছ তাতে প্রাণ সঞ্চার করো,” কিন্তু তারা তা করতে পারবে না।

    তবে প্রাণহীন বস্তু যেমন গাছপালা, পাহাড়-পর্বত, ফুল, নদী ইত্যাদির ছবি আঁকা সম্পূর্ণ জায়েজ। শরীয়াহ শুধুমাত্র সেই সব ছবির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যেগুলোতে প্রাণ আছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময় জিবরাঈল (আ.) একটি ঘরে প্রবেশ করতে অস্বীকার করেছিলেন কারণ সেখানে মানুষের মূর্তি এবং প্রাণীর ছবিযুক্ত পর্দা ছিল। পরবর্তীতে সেই মূর্তির মাথা কেটে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয় যাতে সেটি একটি গাছের রূপ ধারণ করে, যা প্রমাণ করে যে মূর্তির মাথা বা প্রাণবন্ত রূপ না থাকলে তা ব্যবহারযোগ্য হতে পারে।

    তবে শিশুদের খেলনা বা পুতুলের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। আয়েশা (রা.) রাসুল (সা.)-এর উপস্থিতিতে পুতুল ও ডানাযুক্ত ঘোড়া দিয়ে খেলতেন এবং তিনি এতে বাধা দেননি। সুতরাং শিশুদের শিক্ষা ও বিনোদনের জন্য প্রাণীর আকৃতির খেলনা বা কার্টুন ব্যবহার করা বৈধ

    এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, ইসলাম আগমন পূর্ববর্তী কোনো নবী-রাসূলের আইনের ক্ষেত্রে ভাস্কর্য (পুজার মুর্তি নয়) অর্থাৎ সম্মানিত ব্যক্তিদের ভাস্কর্য তৈরি অনুমোদিত ছিল। যেমন, কুরআন ও হাদীসে নূহ (আ)-এর জাতি এবং সুলাইমান (আ)-এর জাতির কথা এসেছে। তবে আমাদের বর্তমান আইনে তথা শরীয়াহ’তে এটি অনুমোদিত নয়। এটি উসূল আল ফিকহের একটি প্রসিদ্ধ নীতি (شرع من قبلنا ليس شرعا لنا) “পূর্ববর্তীতের আইন আমাদের জন্য বিধান নয়”

    ২. ক্যামেরায় তোলা আলোকচিত্র বা ফটোগ্রাফির বিধান

    ক্যামেরার মাধ্যমে তোলা ছবির বিধান সাধারণ হাতে আঁকা ছবির চেয়ে ভিন্ন। ক্যামেরা বা ফটোগ্রাফিক যন্ত্রের মাধ্যমে ছবি তোলা জায়েজ এবং এটি নিষিদ্ধ ‘তাসউইর’ বা অঙ্কনের অন্তর্ভুক্ত নয়। এর কারণ হলো:

    • ছায়ার প্রতিফলন: ফটোগ্রাফি মূলত কোনো জিনিসের ছায়া তথা প্রতিবিম্বকে ফিল্ম বা সেন্সরে স্থানান্তর করা মাত্র, এটি নতুন করে কোনো কিছু সৃষ্টি বা অঙ্কন করা নয়। এটি অনেকটা আয়নায় প্রতিফলিত প্রতিচ্ছবির মতো।
    • সৃষ্টির অনুকরণ নয়: ফটোগ্রাফার নিজের মেধা বা সৃজনশীলতা দিয়ে শূন্য থেকে কোনো অবয়ব তৈরি করেন না, বরং আল্লাহর তৈরি একটি অস্তিত্বের ছায়া বা রিফ্লেকশনকে ধরে রাখেন। যেহেতু এতে ‘সৃষ্টির অনুকরণ’ (তাশবীহ) নেই, তাই এটি হারাম নয়।

    তবে মনে রাখতে হবে, ক্যামেরায় তোলা ছবি যদি পরবর্তীতে হাতে বা কম্পিউটারের মাউস ব্যবহার করে সংশোধন (Editing) করা হয়—যেমন বলিরেখা মুছে ফেলা, চোখের রঙ পরিবর্তন করা বা চেহারা পরিবর্তন করা—তবে সেটি ‘হস্তক্ষেপ’ হিসেবে গণ্য হবে এবং যেকোনো প্রাণী (মানুষ, পশুপাখি)’র ক্ষেত্রে এমন পরিবর্তন করা নিষিদ্ধ।

    ৩. আলোকচিত্র এবং অঙ্কিত ছবি ব্যবহারের বিধান

    ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্র ও উদ্দেশ্যভেদে এর হুকুম বা বিধানে ভিন্নতা রয়েছে:

    • ইবাদতের স্থানে: মসজিদ বা নামাজের স্থানে প্রাণীর ছবি রাখা বা ঝুলিয়ে রাখা হারাম। রাসুল (সা.) কাবা ঘরে প্রবেশ করতে অস্বীকার করেছিলেন যতক্ষণ না সেখানে থাকা ছবিগুলো মুছে ফেলা হয়।
    • সম্মানের স্থানে: ঘরের দেয়ালে বা পর্দার মতো সম্মানজনক স্থানে প্রাণীর ছবি বা পেইন্টিং টাঙানো মাকরূহ বা অপছন্দনীয়। আয়েশা (রা.)-এর ঘরে প্রাণীর ছবিযুক্ত পর্দা দেখে রাসুল (সা.) অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন এবং তা ছিঁড়ে ফেলে বালিশ বানানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
    • অসম্মানের স্থানে: যদি ছবি এমন জায়গায় থাকে যেখানে তাকে সম্মান করা হয় না—যেমন মেঝেতে বিছানো কার্পেট, যা মাড়ানো হয়, অথবা বসার বালিশ—তবে তা ব্যবহার করা জায়েজ
    • পোশাকের ক্ষেত্রে: পোশাকে বা কাপড়ে অঙ্কিত ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য; যদি তা সম্মানের সাথে ব্যবহার করা হয় তবে তা অপছন্দনীয়।

    ৪. এআই (AI) ভিডিও তৈরিতে সংরক্ষিত ছবি ও স্ক্যান করা পেইন্টিং ব্যবহারের বিধান

    কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর মাধ্যমে ভিডিও তৈরির ক্ষেত্রে যদি পুরাতন কোনো সংরক্ষিত আলোকচিত্র (Archived Photos) বা স্ক্যান করা পেইন্টিং ব্যবহার করা হয়, তবে তার বিধান নিম্নরূপ:

    • যদি এআই ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকৃত কোনো ভিডিও কিংবা অংকিত স্থির চিত্রকে কেবল এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয় (যেমন স্লাইডশো বা সাধারণ ভিডিও), তবে তা আলোকচিত্রের মতোই জায়েজ।
    • কিন্তু যদি এআই ব্যবহার করে কোনো মানুষের চেহারা পরিবর্তন করা হয়, তাকে এমন কোনো কাজ করতে দেখানো হয় যা সে বাস্তবে করেনি, তবে তা মিথ্যা ও প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় হারাম। উদাহরণস্বরূপ, মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখানো বা কাউকে এমন কথা বলতে দেখানো যা সে বলেনি, তা ধোঁকাবাজি (Deception) হিসেবে গণ্য হবে।

    ৫. জেনারেটিভ এআই-এর মাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্ত ছবি ও ভিডিও তৈরির বিধান

    জেনারেটিভ এআই-এর মাধ্যমে যখন কোনো টেক্সট কমান্ড দিয়ে নতুন কোনো প্রাণীর বা মানুষের ছবি তৈরি করা হয়, তখন তা ডিজিটাল অঙ্কনের (Digital Drawing) অন্তর্ভুক্ত হয়।

    • অনুকরণ ও সৃষ্টি: এআই যখন মানুষের নির্দেশে কোনো অবয়ব তৈরি করে, তখন সেটি মানুষের সৃজনশীল প্রচেষ্টারই একটি উন্নত রূপ। যদি এআই কোনো প্রাণবন্ত সত্তার এমন ছবি তৈরি করে যা বাস্তবের হুবহু অনুকরণ, তবে সেটি নিষিদ্ধ অঙ্কনের বিধানের আওতায় পড়বে
    • মিথ্যাচার ও বিকৃতি: এআই-এর মাধ্যমে যদি এমন ছবি বা ভিডিও তৈরি করা হয় যা বাস্তবতাকে বিকৃত করে (যেমন Deepfake), তবে তা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কারণ এটি মিথ্যা (Lying), প্রতারণা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ক্ষতির কারণ হতে পারে।
    • পবিত্র ব্যক্তিত্বের অবমাননা: নবী-রাসুলদের ছবি বা ভিডিও তৈরি করা বা তাদের কণ্ঠে কথা বলানো চরম অন্যায় এবং হারাম। এটি নবুওয়াতের মর্যাদার পরিপন্থী।

    ৬. ঘর সাজাতে পেইন্টিং টাঙানো এবং সম্মানার্থে ছবি ব্যবহারের বিধান

    অনেকেই ঘর সাজানোর জন্য প্রাণীর ছবিযুক্ত পেইন্টিং ব্যবহার করেন অথবা মৃত বা জীবিত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ছবি ফ্রেম করে রাখেন। শরিয়তের দৃষ্টিতে এর বিধান হলো:

    • সাজসজ্জা: প্রাণীর ছবি বা পেইন্টিং দিয়ে ঘর সাজানো মাকরূহ। এটি রহমতের ফেরেশতাদের ঘরে প্রবেশে বাধা দেয়। তবে গাছপালা বা প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি দিয়ে ঘর সাজানো সম্পূর্ণ বৈধ। হাদীসে যে নিষেধাজ্ঞা এসেছে তা ছবির মালিকের বিরুদ্ধে হুমকি বা নিন্দার মতো অনুরূপ কোনো চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত আকারে আসেনি, যেমনটি আঁকার ক্ষেত্রে এসেছে; বরং এটি কেবল (এটি) ছেড়ে দেওয়ার তলব হিসেবে তলবে গাইরে জাযিম হিসেবে এসেছে। মূর্তি রাখা নিষিদ্ধ করার এবং সূচিকর্ম (embroidery) করা (মারকুমা) ছবি রাখার অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে আরও একটি হাদিস এসেছে, যা এই নিষেধাজ্ঞার আইনী নির্ণায়ক তথা কারীনা হিসেবে এসেছে। মুসলিমে আবু তালহার হাদিসে এই কথাটি বলা হয়েছে: “আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি: ‘যে ঘরে কুকুর বা ছবি থাকে সেখানে ফেরেশতারা প্রবেশ করেন না’ এবং মুসলিমে বর্ণিত একটি বর্ণনায় তিনি বলেছেন: “… কাপড়ের উপর (রাকম/embroidery) ব্যতীত।” এটি পোশাকের মধ্যে সূচিকর্ম করা (মারকুমা) ছবি বাদ দেওয়ার ইঙ্গিত দেয় এবং এর অর্থ হল যে ফেরেশতারা সেই ঘরে প্রবেশ করেন যেখানে পোশাকের উপর খোদাই করা (তিমছাল) থাকে অর্থাৎ স্কেচিং (রসম) কিংবা আঁকা ছবি থাকে।
    • সম্মান ও স্মরণ: যদিও উপরে উল্লিখিত হাদিসটি অন্যান্য নিষিদ্ধের হাদিসের সাথে যুক্ত করা ইসতিম্বাত করা হলে এর অর্থ দাড়ায় যে তলবটি চুড়ান্ত তথাপি কোনো স্থানে ছবি রাখা যেখানে তা সম্মানের জন্য রাখা হয় তা অপছন্দনীয়, নিষিদ্ধ নয়। তবে কারো প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন বা তাকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে ছবি প্রদর্শন করা হলে তা ‘তা’জিম’ বা অতি-সম্মানের পর্যায়ে চলে যায়, যা ইসলামে অপছন্দনীয়। ইসলামি বিধান অনুযায়ী, কাউকে সম্মান জানানোর মাধ্যম ছবি হওয়া উচিত নয়, বরং তাদের জন্য দোয়া করা বা তাদের আদর্শ অনুসরণ করাই কাম্য।

    পরিশেষে বলা যায়, শরীয়াহ প্রযুক্তির ব্যবহারকে স্বাগত জানায় যতক্ষণ না তা আল্লাহর সৃষ্টির সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় অথবা মিথ্যা ও অশ্লীলতা প্রসারে ব্যবহৃত হয়। প্রাণহীন বস্তুর অঙ্কন এবং সাধারণ আলোকচিত্রের ক্ষেত্রে শরীয়তে প্রশস্ততা থাকলেও প্রাণবন্ত বস্তুর প্রতিকৃতি তৈরি এবং এ সংক্রান্ত অতিরঞ্জনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।

  • কুরআনের সাত হরফ

    কুরআনের সাত হরফ

    তৃতীয় অধ্যায়

    কুরআনের সাত হরফ

    একটি সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

    إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ أُنْزِلَ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ فَاقْرَءُوا مَا تَيَسَّرَ مِنْهُ

    “নিশ্চয় এ কুরআন সাত হরফে অবতীর্ণ করা হয়েছে। সুতরাং সেগুলোর মধ্য হতে তোমাদের সহজ-সাধ্য পন্থা অবলম্বন করে পাঠ কর।”১১৯

    এই হাদীসে কুরআনুল কারীম সাত হরফে অবতীর্ণ হওয়া দ্বারা কি উদ্দেশ্য? এটি অসংখ্য মতামতের মিলনমেলা এবং বিশাল পরিধি বিশিষ্ট একটি আলোচনা৷ আর সন্দেহাতীতভাবে তা কুরআনুল কারীমের দুর্বোধ্য ও কঠিনতম আলোচনার একটি। এখানে সম্পূর্ণ আলোচনা উদ্ধৃত করা তো মুশকিল। তবে এর সাথে সংশ্লিষ্ট অত্যাবশ্যকীয় বিষয়গুলো উপস্থাপন করছি।

    উপরে যে হাদীস বর্ণনা করা হয়েছে অর্থের দিক থেকে তা মুতাওয়াতির। [অর্থাৎ নিরবিচ্ছিন্ন সনদ সূত্রে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত] যেমন, বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম আবু উবাইদ কাসেম ইবনে সালাম হাদীসটির তাওয়াতুর হবার বিষয়টি সুস্পষ্ট করেছেন। হাদীস ও কেরাতের সুপ্রসিদ্ধ ইমাম আল্লামা ইবনে জাযারী (রহ.) বলেন, আমি একটি পৃথক গ্রন্থে এই হাদীসের সবগুলো সূত্র একত্রিত করেছি । আর সেগুলোর আলোকে হাদীসটি হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.), হিশাম ইবনে হাকিম ইবনে হিযাম (রা.), আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.), উবাই ইবনে কা’ব (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.), মুআয ইবনে জাবাল (রা.), আবু হুরায়রা (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), আবু সাঈদ খুদরী (রা.), হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রা.), আবু বাকরা (রা.), আমর ইবনুল আস (রা.), যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.), আনাস ইবনে মালিক (রা.), সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.), ওমর ইবনে আবী সালামা (রা.), আবু জাহাম (রা.), আবু তালহা (রা.) ও উম্মে আইউব আনসারীয়্যাহ (রা.) থেকে বর্ণিত।১২০ এতদ্যতীত বহু মুহাদ্দিস এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, একবার হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) মিম্বরে দীড়িয়ে ঘোষণা দিলেন যে, যেসব সম্মানিত ব্যক্তিগণ দাড়িয়ে যান, যারা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এই হাদীস শোনেছেন, “কুরআনুল কারীম সাত হরফে নাযিল করা হয়েছে। যার প্রত্যেকটিই নিরাময়কারী ও যথেষ্ট।” তখন সাহাবায়ে কেরামের বিরাট একটি দল দাড়িয়ে গেলেন, যাদের সংখ্যা গণনা করা অসম্ভব।১২১

    সাত হরফের মর্মার্থ

    এই হাদীসে সর্ব প্রথম বিষয় হচ্ছে, সাত হরফে কুরআন নাযিল হওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য কী? এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন মতামত ও চিন্তাধারার কঠিন মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয়। এমনকি আল্লামা ইবনে আরাবী (রহ.) এ ব্যাপারে পয়ত্রিশটি মতামত একত্রিত করেছেন।১২ সেগুলোর মধ্য হতে প্রসিদ্ধ ও উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মতামত এখানে পেশ করা হলো-

    ১. কেউ কেউ মনে করেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সুপ্রসিদ্ধ সাতজন কারীর সাত কেরাত। কিন্তু এ ধারণা একেবারেই ভুল ও ভ্রান্ত। কেননা, তাওয়াতুর বা নিরবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরায় সাব্যস্ত কেরাতসমূহ শুধু ‘সাত কেরাতে’র মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং আরো বহু কেরাত তাওয়াতুর সূত্রে সাব্যস্ত আছে। এ সাত কেরাত তো শুধু এ কারণেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে যে, আল্লামা ইবনে মুজাহিদ (রহ.) একটি গ্রন্থে ওই সাতজন কারীর কেরাতকে একত্রিত করেছেন। এর দ্বারা তার না এই উদ্দেশ্য ছিল যে, কেরাতকে সাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা আর না তিনি ওই সাত হরফের ব্যাখ্যা এই ‘সাত কেরাত’ দ্বারা করেছেন। যেমন, এর বিস্তারিত বর্ণনা যথাস্থানে আসবে।

    ২. উপরোক্ত কথার ভিত্তিতেই কোনো কোনো আলেম এই খেয়াল ব্যক্ত করেছেন যে, ‘হরফ’ দ্বারা সকল কেরাতকে বুঝানো হয়েছে। তবে ‘সাত’ শব্দ দ্বারা বিশেষ করে ‘সাত সংখ্যা’কেই বুঝানো হয়নি। বরং এর দ্বারা সংখ্যার আধিক্য বুঝানো হয়েছে। আরবী ভাষায় ‘সাত’ শব্দটি অধিকাংশ সময় কোনো বন্তর শুধু সংখ্যাধিক্য বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। এখানেও হাদীসের উদ্দেশ্য এই নয় যে, কুরআনুল কারীম শুধু সাত হরফের উপরই নাযিল হয়েছে। বরং উদ্দেশ্য হলো, কুরআনুল কারীম বহু পদ্ধতিতে নাযিল হয়েছে। মুতাকাদ্দিমীন উলামায়ে কেরামের মধ্য হতে কাযি আয়ায (রহ.)-এর অভিমত এটাই।১২৩ আর শেষ যুগের উলামায়ে কেরামের মধ্যে হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)ও এই মত গ্রহণ করেছেন।১২৪

    কিন্ত এই মতটি এ জন্য সঠিক বলে মনে হয় না যে, বুখারী ও মুসলিম-এর এক হাদীসে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই বাণী বর্ণিত আছে যে-

    أَقْرَأَنِي جِبْرِيلُ عَلَى حَرْفٍ فَرَاجَعْتُهُ، فَلَمْ أَزَلْ أَسْتَزِيدُهُ وَيَزِيدُنِي حَتَّى انْتَهَى إِلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ

    “জিবরাঈল আমাকে এক হরফের উপর কুরআনুল কারীম আবৃত্তি করিয়েছেন। ফলে আমি তার শরণাপন্ন হলাম এবং আমি হরফ বৃদ্ধির আবেদন করলাম। তিনি বৃদ্ধি করতে থাকলেন। এমনকি তা সাত হরফে গিয়ে পৌছেছে।”১২৫

    এর বিস্তারিত আলোচনা সহীহ মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) থেকে এভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনু গিফারের কূপের কাছে ছিলেন-

    فَأَتَاهُ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلاَمُ فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكَ أَنْ تَقْرَأَ أُمَّتُكَ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفٍ، فَقَالَ: أَسْأَلُ اللَّهَ مُعَافَاتَهُ وَمَغْفِرَتَهُ، وَإِنَّ أُمَّتِى لاَ تُطِيقُ ذَلِكَ، ثُمَّ أَتَاهُ الثَّانِيَةَ فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكَ أَنْ تَقْرَأَ أُمَّتُكَ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفَيْنِ، فَقَالَ: أَسْأَلُ اللَّهَ مُعَافَاتَهُ وَمَغْفِرَتَهُ، وَإِنَّ أُمَّتِى لاَ تُطِيقُ ذَلِكَ، ثُمَّ جَاءَهُ الثَّالِثَةَ، فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكَ أَنْ تَقْرَأَ أُمَّتُكَ الْقُرْآنَ عَلَى ثَلاَثَةِ أَحْرُفٍ، فَقَالَ: أَسْأَلُ اللَّهَ مُعَافَاتَهُ وَمَغْفِرَتَهُ، وَإِنَّ أُمَّتِى لاَ تُطِيقُ ذَلِكَ، ثُمَّ جَاءَهُ الرَّابِعَةَ فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكَ أَنْ تَقْرَأَ أُمَّتُكَ الْقُرْآنَ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ، فَأَيُّمَا حَرْفٍ قَرَءُوا عَلَيْهِ فَقَدْ أَصَابُوا.

    “অতঃপর রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট জিবরাঈল (আ.) আসলেন। তিনি বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা আপনাকে আদেশ করছেন, আপনার [গোটা] উম্মত যেন এক হরফের উপরই কুরআনুল কারীম পাঠ করে। এতে তিনি বললেন, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করছি। আমার উম্মত এতে সক্ষম হবে না। অতঃপর জিবরাঈল (আ.) দ্বিতীয়বার তার নিকট আসলেন। বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আপনাকে আদেশ করছেন, আপনার [গোটা] উম্মত যেন দুই হরফের উপর কুরআনুল কারীম পাঠ করে। এতে তিনি বললেন, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও মাগফিরাতপ্রার্থনা করছি। আমার উম্মত এতে সক্ষম হবে না। আবার তৃতীয়বার জিবরাঈল (আ.) আসলেন এবং বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আপনাকে আদেশ করছেন, আপনার [গোটা] উম্মত যেন তিন হরফের উপর কুরআনুল কারীম পাঠ করে। এতে তিনি বললেন, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করছি। আমার উম্মত এতে সক্ষম হবে না। চতুর্থবার আবার জিবরাঈল (আ.) আসলেন এবং বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আপনাকে আদেশ করছেন, আপনার [গোটা] উম্মত যেন সাত হরফের উপর কুরআনুল কারীম পাঠ করে। অতঃপর তারা যে হরফের উপরই পাঠ করবে, তাদের কেরাত সঠিক হবে।”১২৬

    এই রেওয়ায়েতগুলোর পূর্বাপর বর্ণনাভঙ্গি সুস্পষ্টভাবে বলছে যে, এখানে ‘সাত’ শব্দটি দ্বারা সংখ্যাধিক্য বুঝানো হয়নি; বরং নির্দিষ্ট করে ‘সাত’ সংখ্যাটিকেই বুঝানো হয়েছে। তাই এই হাদীসগুলোর আলোকে উপরোক্ত মতটি গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। এমনকি জমহুর উলামায়ে কেরামও এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

    ৩. অন্যান্য উলামায়ে কেরাম, যেমন হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) সহ আরো অনেকে বলেছেন যে, উল্লিখিত হাদীসে সাত হরফ দ্বারা আরব জাতির গোত্রগত সাত ভাষাকে বুঝানো হয়েছে। যেহেতু আরব জাতি বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত ছিল এবং প্রত্যেক গোত্রের ভাষা আরবী হওয়া সত্ত্বেও অন্য গোত্রের সাথে ভাষার সামান্য গড়মিল ছিল। এই গড়মিলটা এমন, যেমন জাতীয় একটি ভাষায় আঞ্চলিকতার কারণে তারতম্য সৃষ্টি হয়। তাই আল্লাহ তাআলা ওই বিভিন্ন গোত্রের সহজ-সাধ্যের জন্য কুরআনুল কারীমকে সাত ভাষায় নাযিল করেছেন। যেন প্রত্যেক গোত্রই নিজ নিজ গোত্রীয় ভাষায় পাঠ করতে পারে।১২৭

    ইমাম আবু হাতেম সাজিসতানী (রহ.) ওই গোত্রগুলোর নামও নির্ধারণ করেছেন এবং বলেছেন যে, কুরআনুল কারীম এই সাত গোত্রের সাত ভাষা অনুযায়ী নাযিল হয়েছে। গোত্র সাতটি হচ্ছে- [১] কুরাইশ। [২] হুযাইল। [৩] তাইমুর-রুবাব। [8] আজদ। [৫] রবীআ। [৬] হাওয়াজিন | [৭] সা’দ বিন বকর।

    আর হাফেয ইবনে আবদুল বার (রহ.) কারো কারো থেকে রেওয়ায়েত বর্ণনা করে উপরোক্ত গোত্রগুলোর স্থলে নিয়োক্ত গোত্রগুলো উল্লেখ করেছেন-[১] হুযাইল। [২] কেনানা। [৩] কায়েস। [8] যব্বা। [৫] তাইমুর রুবাব। [৬] আসাদ ইবনে খুযাইমাহ। [৭] কুরাইশ।১২৮

    কিন্তু বহু মুহাক্কিক আলেম যেমন, হাফেয ইবনে আবদুল বার (রহ.), আল্লামা সুযুতী (রহ.) ও আল্লামা ইবনে জাযারীসহ আরো অনেকে এই মতটিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন । প্রথমতঃ এ কারণে যে, আরবের গোত্র তো অনেকগুলো ছিল। এর মধ্য হতে শুধু এ সাতটিকেই বেছে নেওয়ার হেতু কি? দ্বিতীয়তঃ হযরত ওমর (রা.) ও হযরত হিশাম ইবনে হাকীম (রা.)-এর মাঝে কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াত নিয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। যার বিস্তারিত বর্ণনা সহীহ বুখারীসহ অন্যান্য কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। অথচ তারা উভয়েই ছিলেন কুরাইশ বংশের। আর রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাদের উভয়ের কেরাতকে সত্যায়ন করেছেন এবং কুরআনুল কারীম সাত হরফে নাযিল হওয়াকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদি সাত হরফ দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন সাতটি গোত্রের ভাষাকেই বুঝানো হতো তাহলে হযরত ওমর (রা.) ও হযরত হিশাম ইবনে হাকীম (রা.)-এর মাঝে মতবিরোধের কোনো কারণই থাকতে পারে না। কারণ উভয়ই তো কুরাইশী ছিলেন।২৯

    যদিও আল্লামা আলসী (রহ.) এর জবাব দিয়েছেন যে, “হতে পারে তাদের দু’জনের মধ্য হতে যে কোনো একজনকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরাইশ ভিন্ন অন্য কোনো ভাষায় কুরআন পড়িয়েছেন।”১৩০

    কিন্ত এই জবাবটি অত্যন্ত দুর্বল। কারণ বিভিন্ন ভাষায় কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য এটাই ছিল যে, প্রত্যেক গোত্রের লোকেরা যেন নিজ ভাষা অনুযায়ী সহজ-সাধ্যভাবে পড়তে পারে । তাই এ বিষয়টা রিসালতের হেকমত থেকে অনেক দূরবর্তী মনে হয় যে, এক কুরাইশীকে অন্য ভাষায় কুরআনুল কারীম পড়ানো হয়েছে।

    এতদ্যতীত ইমাম তাহাভী (রহ.) এর উপর আপত্তি করেন যে, যদি এটা মেনে নেওয়া হয় যে, সাত হরফ দ্বারা সাত গোত্রের ভাষাকে বুঝানো হয়েছে তাহলে তা ওই আয়াতের বিপরীত হয়ে দাড়াবে যাতে বলা হয়েছে-

    وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ

    “আমি যখনই কোনো রাসূল প্রেরণ করি, তখন তার সম্প্রদায়ের ভাষায়ই প্রেরণ করি।

    আর এ কথা তো সবারই জানা যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরইশী ছিলেন। তাই এ কথা সুস্পষ্ট যে, কুরআনুল কারীম শুধু কুরইশী ভাষায়ই নাযিল হয়েছে।১৩১

    ইমাম তাহাভী (রহ.)-এর এ কথার সমর্থন এভাবেও হয় যে, যে সময়ে হযরত উসমান (রা.) দ্বিতীয়বার কুরআনুল কারীম সংকলনের ইচ্ছা করলেন এবং হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর নেতৃত্বে সাহাবায়ে কেরামের একটি জামাতকে কুরআনের কপি তৈরীর নির্দেশ দিলেন, তখন তাদেরকে তিনি এই নির্দেশনা দিয়েছিলেন-

    إِذَا اخْتَلَفْتُمْ أَنْتُمْ وَزَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ فِي شَيْءٍ مِنْ الْقُرْآنِ فَاكْتُبُوهُ بِلِسَانِ قُرَيْشٍ، فَإِنَّمَا نَزَلَ بِلِسَانِهِمْ

    “কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে যায়েদ যখন ইবনে সাবেত এবং তোমাদের মাঝে পরস্পর কোনো মতানৈক্য দেখা দিবে তখন তোমরা কুরাইশদের ভাষায় লিখবে। কেননা কুরআন তাদের ভাষায়ই নাযিল হয়েছে।”১৩২

    এখানে হযরত উসমান (রা.) সুস্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে, কুরআন শুধু কুরাইশদের ভাষায়ই অবতীর্ণ হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো যে, কুরআন যখন কুরাইশদের ভাষায়ই নাধিল হয়েছে তাহলে এই ‘মতানৈক্য’ সৃষ্টি হবার উদ্দেশ্য কি? এর বিস্তারিত জবাব সামনে আসবে ইন শা আল্লাহ।

    এতদ্যতীত এ বক্তব্যের প্রবক্তাগণ এ ব্যাপারে একমত যে, ‘সাত হরফ’ এবং ‘সাত কেরাত’ দু’টা পৃথক পৃথক বিষয়। কেরাতের মতানৈক্য, যা আজও বিদ্যমান সেটা শুধু এক হরফ অর্থাৎ কুরাইশদের ভাষায়ই। আর বাকি হরফগুলো হয়তো রহিত হয়েছে অথবা কল্যাণের জন্য মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে অন্যান্য আপত্তি ছাড়াও একটি আপত্তি এই হয় যে, গোটা হাদীসের ভাণ্ডারে কোথাও এ কথার প্রমাণ মিলে না যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতে দুই ধরনের মতানৈক্য ছিল। একটি হচ্ছে ‘সাত হরফ’ আরেকটি হচ্ছে ‘কেরাত’। বরং হাদীসের ভাণ্ডারে যেখানেই কুরআনুল কারীমের শব্দগত কোনো মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে শুধু ‘আহরুফ’ [হরফের বহুবচন]-এর মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পৃথকভাবে ‘কেরাতের’ কোনো মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করা হয়নি। এসব কারণের ভিত্তিতে এ মতামতটিও অত্যন্ত দুর্বল বলে মনে হয়।

    ৪. চতুর্থ হলো, ইমাম তহাভী (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ বক্তব্য। তিনি বলেন, কুরআনুল কারীম তো শুধু কুরাইশদের ভাষাতেই অবতীর্ণ হয়েছে । তবে যেহেতু আরববাসী বিভিন্ন এলাকা ও গোত্রে বিভক্ত ছিল তাই প্রত্যেকের জন্য এই একটি মাত্র ভাষায় কুরআন তেলাওয়াত করা বেশ কঠিন ছিল। তাই ইসলামের শুরু লগ্নে এই অনুমতি দেওয়া হয়েছিল যে, তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ অঞ্চলের ভাষা অনুযায়ী সমার্থবোধক শব্দ দ্বারা কুরআন তেলাওয়াত করতে পারবে। এমনকি যেসব লোকের জন্য কুরআনুল কারীমের মুল শব্দ দ্বারা তেলাওয়াত করা মুশকিল ছিল তাদের জন্য স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমার্থবোধক শব্দ নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যেগুলো দ্বারা তারা তেলাওয়াত করতে পারে। এই সমার্থবোধক শব্দগুলো কুরাইশদের ভাষা ও অন্যদের ভাষা থেকে চয়ন করা হয়েছিল। আর এগুলো এমন ছিল যে,  تعالএর স্থলে  هلمঅথবা أقبل কিংবা  أدنপড়া হতো। সবগুলোর অর্থ একই থাকত। কিন্ত এই অনুমতি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল, যখন সমস্ত আরববাসী কুরআনী ভাষায় পুরোপুরি অভ্যস্ত ছিল না। অতঃপর ধীরে ধীরে যখন কুরআনী ভাষার পরিধি বৃদ্ধি পেল তখন আরববাসী সে ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে গেল এবং তাদের জন্য কুরআনের মূল ভাষায় তেলাওয়াত করা সহজ হয়ে গেল। ওই সময়ে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকালের পূর্বে রমযান মাসে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে কুরআনুল কারীমের আখেরী দাওর করেন, যেটাকে ‘আরযায়ে আখীরা’ বলা হয়। তখনই সমার্থবোধক শব্দ দ্বারা কুরআন তেলাওয়াত করার অনুমতি বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়। কেবল ওই পদ্ধতিই বাকি থাকে যার উপর কুরআন নাযিল হয়েছিল।১৩৩

    এ বক্তব্য অনুযায়ী “সাত হরফ” বিশিষ্ট হাদীসটি ওই যুগের সাথে সম্পৃক্ত, যখন তেলাওয়াতের মধ্যে সমার্থবোধক শব্দ ব্যবহারের অনুমতি ছিল। আর এটার উদ্দেশ্য এই ছিল না যে, কুরআনুল কারীম ‘সাত হরফে’ অবতীর্ণ হয়েছে। বরং উদ্দেশ্য ছিল এই যে, কুরআনুল কারীম এমন প্রশস্ত-তার সাথে অবতীর্ণ হয়েছে যে, নির্দিষ্ট একটা জামানা পর্যন্ত তা সাত হরফে পাঠ করা যেত।

    আবার “সাত হরফ” দ্বারাও এ উদ্দেশ্য নয় যে, কুরআনুল কারীমের প্রত্যেক শব্দের সাতটি সমার্থবোধক শব্দ ব্যবহারের অনুমতি আছে। বরং উদ্দেশ্য ছিল এই যে, বেশির থেকে বেশি যতগুলো সমার্থবোধক শব্দ ব্যবহার করা যায়, সেগুলোর সংখ্যা হচ্ছে, “সাত” । আবার সে অনুমতির অর্থ এটাও ছিল না যে, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের মর্জি মতো শব্দ প্রয়োগ করবে। বরং পরিবর্তিত শব্দগুলোও স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সন্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। আর তিনি প্রত্যেক ব্যক্তিকে এমনভাবে কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন যা তার জন্য সহজ-সাধ্য ছিল। সুতরাং শুধু ওই সকল সমার্থবোধক শব্দের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল যা রাসূল সম্পাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত ছিল।১৩৪

    ইমাম তহাভী (রহ.) ছাড়াও হযরত সুফিয়ান ইবনে উআইনা (রহ.), ইবনে ওয়াহাব (রহ.) এবং হাফেয ইবনে আবদুল বার (রহ.)ও এ মতকে গ্রহণ করেছেন। বরং হাফেয ইবনে আবদুল বার (রহ.) তো এ মতকে অধিকাংশ আলেমের দিকে সম্বন্ধ করেছেন।৩৫

    পেছনের সমস্ত মতামতের মধ্যে এই মতটি কেয়াসের অধিক নিকটবর্তী । আর এ মতের প্রবক্তাগণ নিজেদের স্বপক্ষে দলীল দিতে গিয়ে মুসনাদে আহমদের সেই রেওয়ায়েতকে উল্লেখ করেন যা হযরত আবু বাকরা (রা.) থেকে বর্ণিত-

    أَنَّ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَام قَالَ: يَا مُحَمَّدُ اقْرَأْ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفٍ، قَالَ مِيكَائِيلُ عَلَيْهِ السَّلَام: اسْتَزِدْهُ فَاسْتَزَادَهُ قَالَ: اقْرَأْهُ عَلَى حَرْفَيْنِ، قَالَ مِيكَائِيلُ: اسْتَزِدْهُ فَاسْتَزَادَهُ حَتَّى بَلَغَ سَبْعَةَ أَحْرُفٍ، قَالَ كُلٌّ شَافٍ كَافٍ مَا لَمْ تَخْتِمْ آيَةَ عَذَابٍ بِرَحْمَةٍ أَوْ آيَةَ رَحْمَةٍ بِعَذَابٍ نَحْوَ قَوْلِكَ تَعَالَ وَأَقْبِلْ وَهَلُمَّ وَاذْهَبْ وَأَسْرِعْ وَاعْجَلْ

    জিবরাঈল (আ.) [রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে] বললেন, হে মুহাম্মাদ! কুরআনুল কারীমকে এক হরফের উপর পাঠ করুন। মিকাঈল (আ.) [রাসূল স.কে] বললেন, এর সাথে আরও [হরফ] সংযোজন করুন। ফলে তিনি সংযোজন করলেন। আর এভাবে তা সাতে গিয়ে পৌছল। জিবরাঈল (আ.) বলেলেন, এর প্রত্যেকটিই নিরাময়কারী, যথেষ্ট। যতক্ষণ না আযাবের আয়াতকে রহমতের আয়াতের সাথে এবং রহমতের আয়াতকে আযাবের আয়াতের সাথে মিশ্রিত করবে। এটা এমন হবে যে, আপনি تعال [আস]-কে أقبل – هلم – اذهب – اسرع –  ও عجل শব্দ দ্বারা আদায় করবেন।”১৩৬

    এই মত ও বক্তব্যের উপর আর কোনো আপত্তি নেই। তবে এর মাঝেও একটি সমস্যা থেকে যায়। আর তা হলো, কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন যে কেরাত আজ পর্যন্ত ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় চলে আসছে, এ বক্তব্য অনুযায়ী সেগুলোর কোনো অবস্থান পরিষ্কার হয় না। যদি সে কেরাতগুলোকে ‘সাত হরফ’ না বলে অন্য কিছু বলা হয় তাহলে তার স্বপক্ষে দলীল পেশ করা উচিত। কিন্তু হাদীসের বিশাল ভাণ্ডারে ‘আহরুফ’-এর মতানৈক্য ব্যতীত কুরআনুল কারীমের শব্দগত অন্য কোনো মতানৈক্যের আলোচনা পাওয়া যায় না। তাহলে নিজের পক্ষ থেকে এটা কি করে বলা যেতে পারে যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে ‘আহরুফে সাবআ’ ছাড়া অন্য আরেক প্রকার মতানৈক্যও ছিল! এ বক্তব্যের প্রবক্তাদের কাছ থেকে এ সমস্যার এমন কোনো সমাধান আমি পাইনি, যা মেনে নেওয়া যায়।

    ‘সাত হরফ’-এর সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আমাদের দৃষ্টিতে কুরআনুল কারীমের ‘সাত হরফ’-এর সর্বোত্তম ব্যাখ্যা হয়েছে । আর ‘সাত হরফ’ দ্বারা ‘কেরাতের বিভিন্নতার’ সাত প্রকারকে বুঝানো হয়েছে। তাইতো কেরাতগুলো যদিও সাতের চেয়ে বেশি, কিন্তু ওই কেরাতগুলোর মাঝে যে মতানৈক্য পাওয়া যায় তা সাত প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। [সেই সাত প্রকার কেরাতের ব্যাখ্যা সামনে আসবে।]

    আমাদের জ্ঞান অনুযায়ী এই মত ও বক্তব্য মুতাকাদ্দিমীন উলামায়ে কেরামের মাঝে সর্ব প্রথম ইমাম মালেক (রহ.)-এর নিকট পাওয়া যায়। বিখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন, আল্লামা নিযামুদ্দীন কিম্মী নিশাপুরী (রহ.) স্বীয় তাফসীর ‘গারায়িবুল কুরআন’-এ লিখেন, ‘আহরুফে সাব্আ’-এর ব্যাপারে ইমাম মালেক (রহ.)-এর এ মাযহাব উদ্ধৃত আছে যে, এর দ্বারা কেরাতের নিম্নলিখিত সাত প্রকারের বিভিন্নতা ও মতানৈক্যকে বুঝানো হয়েছে।

    ১. একবচন ও বহুবচনের মতানৈক্য। এক কেরাতে শব্দটি একবচন ব্যবহৃত হয়েছে আবার অন্য কেরাতে বহুবচনের শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন- كَلِمَاتُ رَبِّكَ এবং وّتَمَّتْ كَلِمَةُ رَبِّكَ

    ২. পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গের বিভিন্নতা। এক কেরাতে পুংলিঙ্গ এবং অন্য কেরাতে স্ত্রীলিঙ্গ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে । যেমন-لا يقبل  এবং لا تقبل  ।

    ৩. এ’রাব তথা কারক ও বিভক্তি চিহ্বের বিভিন্নতা। কোনো কেরাতে যের আবার কোনো কেরাতে যবর থাকে। যেমন- غَيرِ اللهِ এবং هل مِن خالقٍ غَيرُ اللهِ

    ৪. ‘সরফী অবস্থা’ বা শব্দ-প্রকরণের বিভিন্নতা। যেমন, এক কেরাতে يَعْرِشُونَ এবং অন্য কেরাতে يُعَرِّشُونَ

    ৫. ‘নাহভী হরফ’ বা অব্যয় পদের বিভিন্নতা। যেমন, এক কেরাতে لَكِنَّ الشَّياطِينَ এবং অন্য কেরাতে لَكِنِ الشَّياطِينُ

    ৬. হরফ পরিবর্তনকারী শব্দের বিভিন্নতা। যেমন, تَعْلَمُونَيَعْلَمُونَ এবং نُنْشِزُهانَنْشُزُها  

    ৭. সুর-ভঙ্গিমার বিভিন্নতা। যেমন, তাখফীফ [জযম দিয়ে পড়া], তাফখীম [শেষ অক্ষর ছেড়ে দেওয়া], ইমালা [যের ও যবরের মধ্যবর্তী উচ্চারণ করা], মন্দ দীর্ঘস্বর করা] কৃসর [হুস্ব স্বর করা], ইজহার [স্পষ্ট করা], ইদগাম [মিলিয়ে পড়া] ইত্যাদি।১৩৭

    অতঃপর আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.), ইমাম আবুল ফযল রাষি (রহ.), কাষী আবু বকর আত্-তাইয়্যেব বাকিল্লানী (রহ.) এবং মুহার্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) এই মতকে গ্রহণ করেছেন।৩৮

    কেরাতের সুপ্রসিদ্ধ ইমাম, মুহাক্ষিক ইবনুল জাযারী (রহ.) নিজের এই মত পেশ করার পূর্বে লিখেন-

    “আমি এই হাদীসের ব্যাপারে অসংখ্য প্রশ্নে জর্জরিত ছিলাম! ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় এর উপর গভীর চিন্তা-গবেষণায় লিপ্ত ছিলাম । এমনকি মহান আল্লাহ আমার জন্য এর এমন ব্যাখ্যা বিকাশিত করে দিয়েছেন, যা সঠিক ও নির্ভুল হবে ইনশা আল্লাহ।”৩৯

    এ সকল উলামায়ে কেরাম এ কথার উপর একমত যে, হাদীসে বর্ণিত ‘সাত হরফ’ দ্বারা কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু সেই কেরাতগুলোর প্রকারসমূহ নির্ধারণ করতে গিয়ে তাদের বক্তব্যের মাঝে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে। এর কারণ হলো, প্রত্যেকেই নিজ নিজ চিন্তা অনুযায়ী সেই কেরাত বিষয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধান চালিয়েছেন। এর মধ্যে যার অনুসন্ধান সবচেয়ে শক্তিশালী, সমৃদ্ধ এবং পূর্ণাঙ্গ ও সর্বগুণে গুণান্বিত তিনি হলেন, ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.)। তিনি বলেন, কেরাতের বিভিন্নতা [নিম্নোক্ত] সাত প্রকারেই সীমাবদ্ধ।

    ১. নাম বা বিশেষ্য শব্দসমূহের বিভিন্নতা ৷ একবচন, দ্বিবচন, বহুবচন এবং পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গের বিভিন্নতা এই প্রকারের অন্তর্ভূক্ত । [এর উদাহরণ সেই- تَمَّتْ كَلِمَةُ رَبِّكَ যা অন্য কেরাতে تَمَّتْ كَلِمَاتُ رَبِّكَ বলা হয়েছে ।]

    ২. ফেয়েল বা ক্রিয়াপদের পার্থক্য ও বিভিন্নতা। কোনো কেরাতে মাযী [অতীতকাল. বাচক ক্রিয়া, কোনোটিতে মুযারি’ [বর্তমান ও ভবিষ্যতকাল বাচক ক্রিয়া আবার কোনোটিতে আমর [নির্দেশ বাচক ক্রিয়া] ব্যবহৃত হয়েছে। [এর উদাহরণ হলো, এক কেরাতে رَبَّنا باعِدْ بَينَ أسْفارِنا । অন্য এক কেরাতে এর স্থলে রয়েছে رَبُّنا باعَّدَ بَينَ أسْفارِنا]

    ৩. এরাব তথা কারক ও বিভক্তি চিহ্নের বিভিন্নতা। বিভিন্ন কেরাতে বিভিন্ন কারক চিহ বা হরকত বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে । [এর উদাহরণ হলো,  ولا يُضارَّ كاتِبٌএবং لا يُضارُّ كاتِبٌ আর ذُو العَرْشِ المَجِيدُ এবং ذُو العَرْشِ المَجِيدِ ]

    ৪. শব্দের কম-বেশি হওয়ার বিভিন্রতা। এক কেরাতে কোনো শব্দ কম আছে। আর অন্য কেরাতে বেশি আছে। [যেমন, এক কেরাতে وَما خَلَقَ الذكَرَ وَالأُنْثى আছে]। আর অন্য কেরাতে وَالذكَرَ وَالأُنْثى আছে। এখানে  وَما خَلَقَশব্দের উল্লেখ নেই। অনুরূপভাবে এক কেরাতে تَجْرِي مِن تَحْتِها الأَنْهارُ আছে। আর অন্য কেরাতে আছে  تَجْرِي تَحْتَها الأَنْهارُ

    ৫. তাকদীম-তা’খীর বা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী শব্দের বিভিন্নতা। এক কেরাতে কোনো শব্দকে পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার অন্য কেরাতে সেটাকে পরে উল্লেখ করা হয়েছে। [যেমন,  وَجاءَتْ سَكْرَةُ المَوْتِ بِالحَقِّএবং وَجاءَتْ بالمَوْتِ سَكْرَةُ الحَقِّ]

    ৬. বদল বা শব্দ পরিবর্তনের বিভিন্নতা। এক কেরাতে এক শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য কেরাতে তার স্থলে অন্য শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। [যেমন, (نُنشِزُها) এবং (نَنشُزُها)। অনুরূপভাবে (فَتَبَيَّنُوا) এবং (فَتَثَبَّتُوا) আর (طَلْحٍ) এবং (طَلْعٍ)]।

    ৭. সুর-ভঙ্গিমার বিভিন্নতা। যার মধ্যে তাফখীম, তারকীক, এমালা, কসর, মদ্দ, হামর, ইজহার ও ইত্যাদির বিভিন্নতা শামিল রয়েছে।১৪০

    আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.), আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.) এবং কাযী আবু তাইয়্যেব (রহ.)-এর বর্ণনাকৃত বিভিন্নতার কারণগুলোও এ বক্তব্যের সাথে মিলে যায়। তবে ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.)-এর অনুসন্ধান এ জন্য এত বেশি সমৃদ্ধ বলে মনে হয় যে, এতে কোনো প্রকারের মতানৈক্য ও বিভিন্নতার বর্ণনা তো করা হয়েছে, কিন্তু শব্দের কম-বেশি, পূর্ববর্তী-পরবর্তী এবং শব্দ পরিবর্তনের বিভিন্নতার বিষয়গুলো পুরোপুরি ফুটে উঠেনি। এর বিপরীত ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.) অনুসন্ধান ও গবেষনায় এ সকল প্রকার বিভিন্নতা ও মতানৈক্য সুস্পষ্টভাবে গ্রন্থিত হয়েছে। বিদগ্ধ গবেষক ইবনুল জাযারী (রহ.) যিনি ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় পর্যন্ত চিন্তা গবেষনা করার পর ‘সাত হরফ’কে কেরাতের সাত প্রকারের বিভিন্নতার উপর প্রয়োগ করেছেন, তিনিও ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.)-এর বক্তব্য বড় সম্মানের সাথে উদ্ধৃত করেছেন এবং এর উপর কোনো প্রকার অভিযোগ-আপত্তি উত্থাপন করেননি। বরং তাঁর আলোচনার সমষ্টি থেকে বুঝা যায় যে, ইমাম আবুল ফযল (রহ.)-এর অনুসন্ধান তাঁর নিজের অনুসন্ধানের চেয়ে বেশি পছন্দ হয়েছে।১৪১

    এতদ্ব্যতীত হাফেয ইবনে হাযার আসকালানী (রহ.)-এর বক্তব্য থেকেও অনুভূত হয় যে, তিনি উক্ত তিনটি বক্তব্যের মাঝে ইমাম রাযি (রহ.)-এর অনুসন্ধান ও বক্তব্যকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কেননা তিনি আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে লিখেন- (هذا أوجه حسن) [এটা সর্বোত্তম ব্যাখ্যা] অতঃপর ইমাম ফযল (রহ.)-এর বর্ণনাকৃত সাত প্রকার বিভিন্নতা বর্ণনা করার পর লিখেন-

    قلت وقد أخذ كلام ابن قتيبة ونقحه

    ‘আমার ধারণা, তিনি [ইমাম আবুল ফযল রাযি] ইবন কুতাইবা (রহ.)-এর বক্তব্যকে গ্রহণ করে এটাকে সুসজ্জিত করেছেন।১৪২

    শেষ যুগে শায়খ আবদুল আযীম যুরকানী (রহ.) ও তাঁর এই বক্তব্যকে গ্রহণ করে এটাকে শক্তিশালী করার জন্য সংশ্লিষ্ট দলীল-প্রমাণাদি পেশ করেছেন।১৪৩

    যা হোক, অনুসন্ধানের প্রকারের মাঝে মতানৈক্য আছে ঠিক; তবে ইমাম মালেক (রহ.), আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.), ইমাম আবুল ফখর রাযি (রহ), মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) এবং কাযী বাকিল্লানী (রহ.) সকলেই এ কথার উপর এক মত যে, হাদীসে বর্ণিত “সাত হরফ” দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, কেরাতের ওই বিভিন্নতা যা সাত প্রকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

    অধমের দৃষ্টিতে “সাত হরফ”-এর এই ব্যাখ্যাটিই সবচেয়ে উত্তম। হাদীসের মর্মার্থ এটাই বুঝে আসে যে, কুরআনুল কারীমের শব্দগুলো বিভিন্নভাবে পড়া যেতে পারে। আর এই বিভিন্ন পদ্ধতিগুলো ধরন হিসেবে সাত প্রকার। ওই সাত প্রকারের নির্ধারণ যেহেতু কোনো হাদীসে পাওয়া যায় না, তাই নিশ্চিতভাবে কোনো অনুসন্ধানের ব্যাপারে এ কথা বলা যাবে না যে, হাদীসে এ প্রকারকেই বুঝানো হয়েছে। তবে বাহ্যিকভাবে ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ)-এর অনুসন্ধান ও গবেষণা অধিকতর সঠিক বলে মনে হয়। কারণ বর্তমান কালের কেরাতের সবগুলো প্রকার এতে শামিল রয়েছে।

    বক্তব্যটির অগ্রাধিকারের কারণসমূহ

    “সাত হরফ” এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে হাদীস, তাফসীর ও উলূমুল কুরআনের কিতাবসমূহে যতগুলো ব্যাখ্যা বর্ণনা করা হয়েছে, আমাদের দৃষ্টিতে সেগুলোর মধ্যে এ বক্তব্যটি [সাত হরফ দ্বারা কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকে বুঝানো] সবচেয়ে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত, নির্ভরযোগ্য এবং মেনে নেওয়ার মতো। তার কারণগুলো নিম্নরূপ:

    ১. এ বক্তব্য অনুযায়ী “হরফ” এবং “কেরাত” পৃথক পৃথক দু’টি বিষয় সাব্যস্ত করার প্রয়োজন পড়ে না। আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.) ও ইমাম তাহাভী (রহ.)-এর বক্তব্যসমূহে একটি যৌথ সমস্যা রয়েছে যে, এতে এ কথা মেনে নিতে হয় যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতের মাঝে দু’ধরনের মতানৈক্য রয়েছে। একটি হলো, হরফের মতানৈক্য। আরেকটি হলো, কেরাতের মতানৈক্য। হরফের মতানৈক্য তো এখন বিলুপ্ত। আর কেরাতের মতানৈক্য এখনো বহাল রয়েছে। অথচ হাদীসের এত বিশাল ভাণ্ডারে এমন একটি দুর্বল হাদীসও পাওয়া যায় না, যার দ্বারা এ কথা সাব্যস্ত হয় যে, “হরফ” এবং “কেরাত” দু’টি আলগ আলগ বিষয়। হাদীসের ভাণ্ডারে শুধুমাত্র হরফের মতানৈক্যের কথা পাওয়া যায়। আর এর জন্যই অধিক হারে “কেরাত” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। “কেরাত” যদি ওই “হরফগুলো” থেকে পৃথক হতো তাহলে কোনো না কোনো হাদীসে এর প্রতি ইঙ্গিত থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল। পরিশেষে এ কথার কোন যুক্তি আছে যে, “হরফ”-এর মতানৈক্য সংক্রান্ত হাদীসটি প্রায় তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় এসে পৌঁছেছে, অথচ “কেরাত”-এর পৃথক আলোচনা একটি হাদীসেও নেই? অতএব, নিজের ধারণা-প্রসূত কেয়াস দ্বারা এ কথা কিভাবে বলে দেওয়া সম্ভব যে, হরফের মতানৈক্য ও বিভিন্নতা ছাড়াও কুরআনুল কারীমের শব্দাবলীর মাঝে আরেক প্রকার মতানৈক্য ও বিভিন্নতা ছিল?

    উপরোল্লিখিত [ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.)-এর] বক্তব্যে এই সমস্যা সম্পূর্ণরূপে দূর হয়ে যায়। কারণ এতে “হরফ” এবং “কেরাত”কে অভিন্ন প্রকার সাব্যস্ত করা হয়েছে।

    ২. আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী এ কথা মানতে হয় যে, সাত হরফের মধ্য হতে ছয় হরফ রহিত বা পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। একমাত্র কুরাইশী হরফই অবশিষ্ট রয়েছে। [বর্তমান কেরাত ওই কুরাইশী হরফের আদায়গত বিভিন্নতা]। এ বক্তব্যের নিন্দনীয় দিকগুলো আমরা সামনে বর্ণনা করব। উপরোল্লিখিত শেষ বক্তব্যটিতে [অর্থাৎ অগ্রাধিকার প্রাপ্ত বক্তব্যটিতে] এসব নিন্দনীয় বিষয় নেই। কেননা এ বক্তব্য অনুযায়ী সাত হরফের সবগুলো আজও অবশিষ্ট ও সংরক্ষিত আছে।

    ৩. এই অগ্রাধিকার প্রাপ্ত বক্তব্য অনুযায়ী কোনো প্রকার তাভীল বা জটিল ব্যাখ্যা ব্যতিরেকে “সাত হরফ”-এর অর্থ সঠিক অবিকৃত থাকে। পক্ষান্তরে অন্যান্য বক্তব্যের মাঝে হয়তো “হরফ”-এর অর্থের মধ্যে নতুবা “সাত” সংখ্যার মধ্যে তাভীল বা জটিল ব্যাখ্যা করতে হয়।

    ৪. “সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যত উলামায়ে কেরামের বক্তব্য আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মর্যাদাবান এবং নববী যুগের নিকটবর্তী ব্যক্তিত্ব ছিলেন ইমাম মালেক (রহ.)। আর আল্লামা নিশাপুরী (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী তিনিও এই বক্তব্যেরই প্রবক্তা।

    ৫. আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.) এবং মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) উভয়ে ছিলেন ইলমে কেরাতের সর্বজনস্বীকৃত ইমাম। আর তাঁরা উভয়েই এই বক্তব্যের প্রবক্তা। মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর কথা তো পূর্বে আলোচনা হয়েছে যে, তিনি ত্রিশ বছরেরও অধিক সময় পর্যন্ত চিন্তা-গবেষণা করার পর এই বক্তব্যকে গ্রহণ করেছেন।

    এ বক্তব্যের উপর উত্থাপিত অভিযোগ ও তার জবাব

    “সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত বক্তব্যের উপর যেসব আপত্তি-অভিযোগ ও সমালোচনা উত্থাপিত হতে পারে সেগুলোর উপর দৃষ্টি বুলিয়ে নিন।

    প্রথম অভিযোগ:

    এর উপর প্রথম অভিযোগ করা হয়েছে যে, এ বক্তব্যে মতানৈক্য ও বিভিন্নতার যতগুলো প্রকার বর্ণনা করা হয়েছে তার বেশির ভাগই “সরফী” এবং “নাহভী” [শব্দ-প্রকরণ ও বাক্য-প্রকরণ]-এর প্রকারভেদের উপর ভিত্তিশীল। অথচ রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এই হাদীস বর্ণনা করেছেন তখন সরফ-নাহুর এই বিষয়ভিত্তিক পরিভাষা ও প্রকারভেদ প্রচলিত ছিল না। ওই সময় অধিকাংশ মানুষ লেখা-পড়াও জানত না। এমতাবস্থায় বিভিন্নতার এই প্রকারগুলোকে “সাত হরফ” হিসেবে ধরে নেওয়াটা মুশকিল বলে মনে হয়।

    হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) এই আপত্তি উদ্ধৃত করার পর এর জবাব দিয়েছেন এভাবে-

    وَلَا يَلْزَمُ من ذلك توهين ما ذهب إليه ابن قتيبة لاحتمال أَنْ يَكُونَ الالحصَارُ الْمَذْكُورُ فِي ذَلِكَ وَقَعَ اتفاقا وإِنَّمَا اطَّلَعَ عَلَيْهِ بالاستقراء وَفِي ذَلِكَ مِنَ الْحِكْمَةِ الْبَالِغَة ما لا يخفى

    “এর দ্বারা ইবনে কুতাইবা (রহ.)-এর বক্তব্যের দুর্বলতা প্রকাশ পায় না। কেননা হতে পারে এটা কোনো ঘটানাক্রমে হয়ে গেছে। আর অনুসন্ধানের মাধ্যমে এর পূর্বাভাস পাওয়া গেছে। আর এর মাঝে যে পরিপূর্ণ হেকমত লুকায়িত আছে তা গোপন নয়।”১৪৪

    আমাদের ক্ষুদ্র উপলব্ধি অনুযায়ী এই জবাবের সারাংশ হচ্ছে, এ কথাটি ঠিক যে, নববী যুগে এই পরিভাষাগুলো প্রচলিত ছিল না। আর হয়তো এ কারণেই রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম “সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেননি। তবে এটা তো পরিষ্কার যে, এই বৈষয়িক পরিভাষাগুলো যে ভাবার্থ থেকে আহরিত, সেই ভাবার্থ তো ওই যুগেও বিদ্যমান ছিল। যদি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেসব ভাবার্থের প্রতি লক্ষ্য করে বিভিন্নতার প্রকারসমূহকে “সাত”-এর মাঝে সীমাবদ্ধ করেন তাতে আশ্চর্যের কী আছে? হ্যাঁ, ওই যুগে যদি বিভিন্নতার সাত প্রকার বিস্তারিত বর্ণনা করা হতো তাহলে হয়তো তা সাধারণ মানুষের উপলব্ধির ঊর্ধ্বে হয়ে যেত। তাই রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বিস্তারিত বর্ণনা না করে শুধু এতটুকু বলেছেন যে, বিভিন্নতার এ প্রকারগুলো সাত প্রকারে সীমাবদ্ধ। পরবর্তীতে যখন এ পরিভাষাগুলো প্রচলিত হয়ে গেল তখন উলামায়ে কেরাম পরিপূর্ণ অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিভিন্নতার এ প্রকারগুলোকে পারিভাষিক শব্দ দ্বারা চিহ্নিত করেছেন।

    আর এটা আমরা আগেই বলেছি, বিশেষ কোনো ব্যক্তির অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে পূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে এ কথা বলা মুশকিল যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য এটাই ছিল। কিন্তু যখন বিভিন্ন লোকের অনুসন্ধান এটা প্রমাণ করে যে, বিভিন্নতার প্রকার মোট সাত প্রকার, তখন এ কথা নিশ্চয়তার নিকটবর্তী হয়ে যায় যে, “সাত হরফ” দ্বারা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য ছিল “বিভিন্নতার সাত প্রকার।” চাই এর বিস্তারিত বর্ণনা ওই রকম না হোক, যা পরবর্তীতে অনুসন্ধানের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে যখন “সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যুক্তিগ্রাহ্য অন্য কোনো প্রকার পাওয়া না যায়।

    দ্বিতীয় অভিযোগ:

    সাত হরফ দ্বারা কি সহজবোধ্যতা সৃষ্টি হলো?

    এই [অগ্রাধিকার প্রাপ্ত] বক্তব্যটির উপর দ্বিতীয় অভিযোগ এ হতে পারে যে, কুরআনুল কারীম তো সাত হরফে নাযিল করা হয়েছে। উম্মত যাতে সহজ-সাধ্যভাবে কুরআন তেলাওয়াত করতে পারে। আর এই সহজতা আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্য অনুসারে তো বোধগম্য হয়। কেননা আরবে বিভিন্ন গোত্রের লোক ছিল। আর এক গোত্রের জন্য অন্য গোত্রের ভাষায় কুরআন তেলাওয়াত ছিল অত্যন্ত মুশকিল। কিন্তু ইমাম মালেক (রহ.), ইমাম রাযী (রহ.) এবং ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী সাত হরফ তো শুধু কুরাইশী ভাষার সাথেই সম্পৃক্ত। এতে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয় না যে, কুরআনুল কারীম যখন এক ভাষাতেই নাযিল করা উদ্দেশ্য ছিল, তাহলে এতে কেরাতের বিভিন্নতা অবশিষ্ট রাখার প্রয়োজনটা কি ছিল?

    এ অভিযোগের ভিত্তি হলো এ কথার উপর যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআন তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে সাত হরফের যে সহজতা উম্মতের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন, এতে আরবের গোত্রভিত্তিক ভাষার ভিন্নতা তাঁর দৃষ্টির সামনে ছিল। এ কথার উপর ভিত্তি করেই হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) “সাত হরফ” দ্বারা আরবের “সাত ভাষা”-এর অর্থ করেছেন। অথচ এটা এমন একটা কথা যার সমর্থন কোনো হাদীস দ্বারা পাওয়া যায় না। পক্ষান্তরে এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে, সাত হরফের সহজ-সাধ্যতা প্রার্থনা করার সময় তাঁর লক্ষ্যবস্তু কী ছিল? ইমাম তিরমিযী (রহ.) সহীহ সনদ সূত্রে হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন-

    لَقِي رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم جبريل عند احجار المرأ، فَقَالَ: ” يا جبريل إنِّي بُعثتُ إِلَى أُمَّةٍ أُميين: اِنهُمُ العَجُوزُ، والشيخ الكبير، والغُلَامُ، قال فمرهم فليقرأوا القرآن على سبعة أحرف

    “এক মৃত পাথরের নিকট হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাক্ষাত হলো। তখন তিনি জিবরাঈল (আ.) কে বললেন, আমি এমন এক নিরক্ষর জাতির নিকট প্রেরিত হয়েছি, যাদের মধ্যে রয়েছে-অতিশয় বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা। রয়েছে-শিশু-কিশোররা। তখন হযরত জিবরাঈল (আ.) বললেন, আপনি তাদেরকে নির্দেশ দিন, তারা যেন সাত হরফে কুরআন পাঠ করে।১৪৫

    তিরমিযী শরীফেরই অপর এক রেওয়ায়েতে এমন শব্দ এসেছে যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিবরাঈল (আ.) কে বলেছেন-

    إنِّي بُعثتُ إلى أُمَّةٍ أُميِّينَ مِنْهُمُ العجُوزُ، وَالشَّيْخ الكبيرُ، وَالغُلَامُ، وَالْجَارِيَةُ، وَالرَّجُلُ الَّذِي لَمْ يَقْرَأُ كِتَابًا قَطُّ “

    “আমি এমন এক নিরক্ষর জাতির নিকট প্রেরিত হয়েছি, যাদের মধ্যে রয়েছে-অতিশয় বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা। রয়েছে-শিশু-কিশোররা এবং প্রাপ্ত বয়স্ক ও বালক-বালিকা। যারা কখনো কোনো কিতাব পড়েনি।”১৪৬

    উপরোল্লিখিত হাদীসের শব্দমালা সুস্পষ্টভাবে জানান দিচ্ছে যে, উম্মতের জন্য সাত হরফের সহজতা প্রার্থনা করার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে এ কথা ছিল যে, তিনি এক নিরক্ষর জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছেন। যার মধ্যে সব ধরনের লোক রয়েছে। যদি কুরআনুল কারীম তেলাওয়াতের জন্য শুধু একটা পদ্ধতিই নির্ধারণ করে দেওয়া হয় তাহলে উম্মত মুশকিলে পড়ে যাবে। পক্ষান্তরে যদি কয়েকটি পন্থা রাখা হয়, তাহলে এটা সম্ভব যে কোনো লোক এক পদ্ধতিতে তেলাওয়াত করতে সক্ষম না হলে অন্য পদ্ধতিতে সে তেলাওয়াত করবে। এভাবে তার নামায এবং তেলাওয়াতের ইবাদত বিশুদ্ধ হয়ে যাবে। অনেক সময় এমন হয় যে, বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা লোক বা অপড়ুয়া লোকদের যবানে একটি শব্দ আদায় করা কষ্টকর হয় এবং তাদের জন্য যের-যবরের সাধারণ প্রার্থক্যও কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। এ জন্যই তিনি এই সহজতা কামনা করেছেন। যেমন, কোনো ব্যক্তি মা’রূফের সীগা আদায় করতে পারে না, তখন এর স্থলে অন্য কেরাত অনুযায়ী মাজহুলের সীগা আদায় করে নিবে। অথবা কারো জন্য একবচন শব্দ আদায় করতে কষ্ট হয়, তখন সে ওই আয়াতকেই বহুবচন শব্দ দ্বারা আদায় করবে। কারো জন্য সুর-ভঙ্গিমার একটি পদ্ধতি কষ্টকর হয়, তখন সে অন্যটা অবলম্বন করবে। এভাবে গোটা কুরআনে তার জন্য সাত প্রকারের সহজতা লাভ হয়ে যাবে।

    আপনি উপরোল্লিখিত হাদীসে হয়তো লক্ষ্য করে থাকবেন যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাত হরফের সহজতা প্রার্থনা করার সময় এ কথা বলেননি যে, “আমি যে জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছি তারা বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত এবং তাদের প্রত্যেকের ভাষা আলাদা আলাদা। এ জন্য কুরআনুল কারীমকে বিভিন্ন ভাষায় পড়ার অনুমতি দেওয়া হোক।” বরং এর উল্টো গোত্রভিত্তিক বিভিন্নতা থেকে দৃষ্টি এড়িয়ে তিনি বয়সের তারতম্য এবং তাদের নিরক্ষর হবার বিষয়টার উপর জোর দিয়েছেন। এ কথা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, সাত হরফের সহজ-সাধ্যতার মধ্যে মূলভিত্তি গোত্রসমূহের ভাষাভিত্তিক ছিল না। বরং উম্মত অপড়ুয়া হওয়ার উপর লক্ষ্য রেখে তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে একটা সাধারণ সহজ-সাধ্যতা প্রদান উদ্দেশ্য ছিল। যার দ্বারা উম্মতের সকল সদস্য উপকৃত হতে পারে।

    তৃতীয় অভিযোগ:

    এই [অগ্রাধিকার প্রাপ্ত] বক্তব্যের প্রতি তৃতীয় অভিযোগ এই হতে পারে যে, কেরাতের বিভিন্নতার যে সাতটি প্রকার বর্ণনা করা হয়েছে, চাই সেটা ইমাম মালেক (রহ.)-এর বর্ণনা হোক অথবা আবুল ফযল রাযি (রহ.)-এর বক্তব্য হোক কিংবা আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.), মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) এবং কাযী আবুত তাইয়্যেব (রহ.)-এর বর্ণনাকৃত হোক, সর্বাবস্থায় এখানে কেয়াস ও অনুমানের একটি অবকাশ থেকেই যায়। এ কারণেই তাঁরা প্রত্যেকেই বিভিন্নতার এই সাত প্রকারের বিস্তারিত বর্ণনা পৃথক পৃথকভাবে দিয়েছেন। কাজেই এগুলোর ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিভাবে বলা যেতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য এটাই ছিল?

    এর জবাব হচ্ছে, “সাত হরফ”-এর কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা কোনো হাদীস বা সাহাবীর বর্ণনা থেকে পাওয়া যায় না। তাই এই অধ্যায়ে যত বর্ণনা রয়েছে, সেসবগুলোর ভাবসমগ্র একত্রিত করে এর থেকে বিশেষ ফলাফল বের করা হয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে এ বক্তব্যটি বিশুদ্ধ হওয়ার অধিক নিকটবর্তী বলে মনে হয়। কারণ এর উপর মৌলিক কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হয় না। বর্ণনাগুলোকে সামগ্রিক দৃষ্টিতে দেখার পর আমাদের কাছে বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায় যে, হাদীসে বর্ণিত “সাত হরফ” দ্বারা কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকে বুঝানো হয়েছে।

    বাকি থাকল ওই প্রকারগুলো নির্ধারণ ও নিরূপণ করার বিষয়টি। আর এ ব্যাপারে তো আমরা আগেই বলে এসেছি যে, এটা জানার জন্য গভীর অনুসন্ধানের বিকল্প কোনো পথ নেই। ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.)-এর অনুসন্ধান আমাদের কাছে অবশ্যই সকল গুণাগুণসম্বলিত বলে মনে হয়। এতদ্বসত্ত্বেও আমরা নিশ্চিতভাবে কারো অনুসন্ধানকেই বলি না যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য এটাই ছিল। কিন্তু এর দ্বারা এ মৌলিক হাকীকত প্রশ্নবিদ্ধ হয় না যে, “সাত হরফ” দ্বারা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য ছিল কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকার। যেগুলোর বিশদ বর্ণনার নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করার না আমাদের কাছে কোনো পথ আছে আর না এর কোনো প্রয়োজন আছে।

    চতুর্থ অভিযোগ:

    এই বক্তব্যের উপর চতুর্থ অভিযোগ এ হতে পারে যে, ওই বক্তব্যে “সাত হরফ” দ্বারা শব্দমালা ও সেগুলোর উচ্চারণের বিভিন্ন পদ্ধতিকে বুঝানো হয়েছে। এতে অর্থগত দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়নি। অথচ এক রেওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে, এর দ্বারা সাত ধরনের অর্থকে বুঝানো হয়েছে। ইমাম তহাভী (রহ.) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ বাণী রেওয়ায়েত করেন-

    كان الكتاب الأول ينزل من باب واحد على حرف واحد ونزل القرآن من سبعة ابواب على سبعة احرف زاجر و امر وحلال وحرام ومحكم ومتشابه وامثال . الخ….

    ‘পূর্ববর্তী কিতাব এক দরজা দিয়ে এক হরফে অবতীর্ণ হয়েছিল। আর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে সাত দরজা দিয়ে সাত হরফে। সেই সাতটি হরফ হলো-[১] যাজির [কোনো কাজ থেকে বাধা প্রদানকারী]। [২] আমের [কোনো বিষয়ে আদেশ প্রদানকারী]। [৩.] হালাল। [৪.] হারাম। [৫] মুহকাম [যার অর্থ জানা আছে]। [৬.] মুতাশাবিহ্ [যার নিশ্চিত কোনো অর্থ জানা নেই]। [৭.] আমছাল।

    এ হাদীসের ভিত্তিতেই কোনো কোনো আলেম থেকে বর্ণিত আছে যে, তাঁরা সাত “হরফ”-এর তাফসীর “সাত প্রকারের অর্থ” দ্বারা করেছেন।

    এর জবাব হলো, উপরোল্লিখিত রেওয়ায়েতটি সনদের দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল। ইমাম তহাভী (রহ.) এর সনদের সমালোচনা করতে গিয়ে বলেন যে, আবু সালামা আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। অথচ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর সাথে আবু সালামার সাক্ষাতই হয়নি।১৪৭

    এতদ্ব্যতীত পূর্ব যুগের যেসব বুযুর্গের কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য বর্ণিত আছে সেগুলোর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) লিখেন- ’এর দ্বারা “সাত হরফ” বিষয়ক হাদীসটি ব্যাখ্যা করা তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল না। বরং সাত হরফের আলোচনার বিষয় থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে তাঁরা এ কথা বলতে চেয়েছেন যে, কুরআনুল কারীম এ ধরনের বিষয় দ্বারা সমৃদ্ধ।’১৪৮

    আর যারা “সাবআতু আহরুফ” বা সাত হরফের আলোচনা সম্বলিত হাদীসগুলোর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এ ধরনেরই কথা বলেছেন, তাদের কথা যুক্তিগ্রাহ্যভাবেই বাতিল। কারণ পেছনে যতগুলো হাদীস বর্ণনা করা হয়েছে, সেগুলোর প্রতি নযর বুলাতেই একজন সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিই বুঝতে পারবে যে, হরফের বিভিন্নতা দ্বারা অর্থ ও বিষয়াবলীর বিভিন্নতাকে বুঝানো হয়নি। বরং আলফায বা শব্দমালার বিভিন্নতাকে বুঝানো হয়েছে। তাইতো মুহাক্কিক আলেমগণের মধ্য হতে কেউ এ মতকে গ্রহণ করেননি; বরং এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।১৪৯

    হরূফে সাবআ” এখনো সংরক্ষিত নাকি পরিত্যক্ত?

    “হরফে সাবআ” বা সাত হরফের অর্থ নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার পর এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, এ সাত হরফ এখনো অবশিষ্ট আছে নাকি নেই? এ বিষয়ে মুতাক্কাদিমীন বা পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরাম থেকে তিনটি মতামত বা বক্তব্য বর্ণিত আছে।

    [এক] প্রথম বক্তব্য হচ্ছে হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) এবং তাঁর অনুসারীদের। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করে এসেছি যে, তাঁদের নিকট সাত হরফ দ্বারা আরবের গোত্রভিত্তিক সাত ভাষাকে বুঝানো হয়েছে। এ কথার উপর ভিত্তি করেই তিনি বলেন যে, হযরত উসমান (রা.)-এর যুগ পর্যন্ত কুরআনুল কারীম সাত হরফে পড়া হতো। কিন্তু হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে যখন ইসলাম দূর-দূরান্ত পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করল, তখন এ সাত হরফের তাৎপর্য সম্পর্কে জানা না থাকার কারণে মানুষের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা শুরু হতে লাগল। বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা বিভিন্ন হরফে কুরআন তেলাওয়াত করত এবং একে অন্যের তেলাওয়াতকে ভুল আখ্যায়িত করত। এ ফেতনাকে নির্মূল করার জন্য হযরত উসমান (রা.) সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শে গোটা উম্মতকে শুধু এক হরফ তথা কুরাইশী ভাষা অনুযায়ী কুরআন তেলাওয়াতের নিমিত্তে সাতটি মাসহাফ সুবিন্যস্ত করে বিভিন্ন প্রদেশে পাঠিয়ে দেন। আর বাকি সব মাসহাফকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন। যেন আর কোনো মতানৈক্য সৃষ্টি হতে না পারে। সুতরাং এখন কেবল কুরাইশী ভাষার হরফই অবশিষ্ট রয়েছে। আর অবশিষ্ট ছয় হরফ সংরক্ষিত রয়নি। আর কেরাতের যে মতানৈক্য আজ পর্যন্ত চলে আসছে, সেগুলো সেই কুরাইশী এক হরফ আদায়ের বিভিন্ন পদ্ধতি মাত্র।১৫০

    হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর চিন্তাধারা ও এর নিন্দনীয় দিকগুলো

    হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) যেহেতু নিজের চিন্তা ও মতকে স্বীয় তাফসীর গ্রন্থের ভূমিকায় অত্যন্ত দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন, তাই তাঁর এ বক্তব্য অত্যাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। আর আজ-কাল সাত হরফের ব্যাখ্যা সাধারণত এর আলোকেই করা হয়ে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ মুহাক্কিক আলেমগণ১৫১ এ মতকে গ্রহণই করেননি; বরং অত্যন্ত কঠোরভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ এ বক্তব্যে এমন কিছু সমস্যা দাঁড়ায় যার কোনো সমাধান নেই।

    এ মতের উপর সর্ব প্রথম তো ওই আপত্তি আরোপিত হয়, যার আলোচনা আমরা আগেই করে এসেছি যে, এতে “হরফ” এবং “কেরাত” দু’টিকে পৃথক পৃথক বিষয় সাব্যস্ত করা হয়েছে। অথচ কোনো হাদীস দ্বারা এর প্রমাণ পাওয়া যায় না।

    দ্বিতীয় আপত্তি এই হয় যে, হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) এক দিকে তো এটা মেনে নেন যে, সাত হরফের সবকটিই আল্লাহর পক্ষ হতে নাযিলকৃত। আবার অন্য দিকে বলেন, হযরত উসমান (রা.) সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শক্রমে ছয় হরফের তেলাওয়াতকে বিলুপ্ত করে দেন! অথচ এ কথা মেনে নেওয়া খুবই মুশকিল যে, সাহাবায়ে কেরাম ওই হরফগুলোকেই একেবারে বিলুপ্ত করার জন্য একমত হয়ে গেলেন, উম্মতের সহজ-সাধ্যের জন্য রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুআর জবাবে আল্লাহ তাআলা যা নাযিল করেছিলেন!? সাহাবায়ে কেরামের ইজমা বা ঐক্যমত নিঃসন্দেহে দীনের অকাট্য দলীল, কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর জন্য এটা সম্ভাব্য ব্যাপার বলে মনে হয় না যে, যে বিষয় কুরআন হওয়ার ব্যাপারটা তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক পরম্পরায় সাব্যস্ত হয়েছে, তাঁরা সেটাকে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে মুছে ফেলার জন্য ঐক্যমত পোষণ করবেন!

    হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) এই আপত্তির জবাব এভাবে দিয়েছেন যে, ‘প্রকৃতপক্ষে উম্মতকে কুরআনুল কারীম সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং সাথে সাথে এ এখতেয়ারও দেওয়া হয়েছিল যে, তারা সাত হরফের যে কোনো একটিকে বেছে নিতে পারবে। তাইতো উম্মত সেই এখতেয়ার দ্বারা উপকৃত হয়ে সার্বজনীন কল্যাণার্থে ছয় হরফের তেলাওয়াতকে পরিত্যাগ করেছেন আর এক হরফের সংরক্ষণের উপর একমত হয়েছেন। এ পদক্ষেপ দ্বারা ওই হরফগুলোকে রহিত করা এবং সেগুলোর তেলাওয়াতকে হারাম করে দেওয়া উদ্দেশ্য ছিল না। বরং উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের জন্য সার্বজনীন এক হরফকে নির্বাচন করা।’

    কিন্তু এ জবাবটিও এ জন্য দুর্বল বলে মনে হয় যে, প্রকৃত অবস্থা যদি এটাই হয়ে থাকে তাহলে এটা কি সমীচীন ছিল না যে, উম্মত নিজেদের আমলের জন্য এক হরফকে বেছে নিত আর বাকি ছয় হরফকে একেবারে বিলুপ্ত করার পরিবর্তে কোনো এক স্থানে তা সংরক্ষণ করে রাখত? যেন সে হরফগুলোর অস্তি ত্ব একেকারেই খতম না হয়ে যায়। কুরআনুল কারীমের ঘোষণা রয়েছে-

    إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ

    নিশ্চয় আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই তার সংরক্ষক।

    যখন সাত হরফের সবগুলোই কুরআন ছিল তখন এই আয়াতের সুস্পষ্ট দাবী হলো, ওই সাত হরফও কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে এবং কোনো ব্যক্তি যদি এগুলোর তেলাওয়াকে ছেড়েও দিতে চায়, তবু তা একেবারে বিলুপ্ত হতে পারে না।

    হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) এর উপমা দিতে গিয়ে একটি মাসআলা পেশ করেছেন যে, কুরআনুল কারীম মিথ্যা শপথের কাফ্ফারা ক্ষেত্রে মানুষকে তিনটি এখতেয়ার দিয়েছে। চাইলে সে একজন দাসকে মুক্ত করতে পারবে, চাইলে দশজন মেসকীনকে আহার করাতে পারবে আর চাইলে দশজন মেসকীনকে বস্ত্র দিতে পারবে। এখন যদি উম্মত বাকি দু’টি প্রকারকে নাজায়েয না করে নিজেদের আমলের জন্য একটিকে গ্রহণ করে নেয় তাহলে তা তার জন্য বৈধ। ঠিক তদ্রূপ উম্মত সাত হরফের মধ্য হতে একটি হরফকে সার্বজনীনভাবে বেছে নিয়েছে কিন্তু এই উপমা পেশ করা এ জন্য সঠিক নয় যে, উম্মত যদি শপথের কাফ্ফারার ক্ষেত্রে তিন প্রকারের যে কোনো একটি প্রকারকে এমনভাবে গ্রহণ করে যে, বাকি দু’টি প্রকারকে নাজায়েয তো বলে না; কিন্তু কার্যত সেগুলোর অস্তিত্ব একেবারেই বিলুপ্ত থেকে যায় এবং লোকদের কেবল এ টুকু জানা থাকে যে, শপথের কাফ্ফারার আরো দু’টি প্রকার ছিল যেগুলোর আমলকে উম্মত পরিহার করেছে। কিন্তু সে প্রকারগুলো কি ছিল? তা জানে এমন লোকও বাকি না থাকে, তাহলে অবশ্যই উম্মতের জন্য এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো অবকাশ নেই।

    অতঃপর প্রশ্ন থেকে যায় যে, বাকি ছয় হরফকে পরিহার করার কি প্রয়োজন দেখা দিল? হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) বলেছেন যে, এই হরফগুলোর মতানৈক্যের কারণে মুসলমানদের মাঝে প্রচণ্ড ঝগড়া বাঁধত। এ জন্য হযরত উসমান (রা.) সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শে সকল হরফের মাঝে সমন্বয় সাধন করে সেটাকে এক হরফে রূপান্তরিত করাকে সমীচীন মনে করলেন। কিন্তু এটাও এমন এক কথা যেটাকে মেনে নেওয়া খুব মুশকিল। হরফের বিভিন্নতার উপর ভিত্তি করে মুসলমানদের মতবিরোধ তো স্বয়ং রাসূলুলাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগেও ছিল। হাদীসের ভাণ্ডারে এ ধরনের বহু ঘটনা বর্ণিত আছে যে, এক সাহাবী অপর সাহাবীকে ভিন্নভাবে কুরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন তখন তাঁদের পরস্পরে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়ে যেত। এমনকি সহীহ বুখারীর রেওয়ায়েত অনুযায়ী হযরত ওমর (রা.) তো হযরত হিশাম (রা.)-এর গলায় চাদর পেঁছিয়ে তাঁকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে নিয়ে এসেছিলেন। হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) বলেন, হরফের এই মতবিরোধের কথা শোনে আমার অন্তরে মস্তবড় সন্দেহ সৃষ্টি হতে লাগল। এ ধরনের ঘটনার প্রেক্ষিতে রাসূলুলাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাত হরফকে বিলুপ্ত করার পরিবর্তে সে হরফগুলোর অনুমোদনের ব্যাপারে জানালেন। আর এতে কোনো ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনাও ঘটেনি। সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে এটা অসম্ভব যে, তাঁরা এই ‘উসওয়ায়ে হাসানা’ বা উত্তম আদর্শের উপর আমল করার পরিবর্তে ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার সিদ্ধন্ত গ্রহণ করবেন।

    তারপর আশ্চর্যের কথা হলো, আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী সাহাবায়ে কেরাম মতবিরোধের ভয়ে ছয় হরফকে তো বিলুপ্ত করে দিয়েছেন। কিন্তু কেরাতগুলোকে যা তাঁর বক্তব্য মতে হরফ থেকে আলাদা বিষয়। হুবহু বাকি রেখেছেন! যা আজ পর্যন্ত সংরক্ষিত হয়ে চলে আসছে। এখন প্রশ্ন হলো, বিভিন্ন হরফের উপর কুরআন তেলাওয়াত জারী রাখার ক্ষেত্রে যে মতবিরোধ ও মতানৈক্যের আশঙ্কা ছিল, কেরাতের বিভিন্নতার মাঝে কি সেই আশঙ্কাটা ছিল না? যখন ওই কেরাতগুলোর আলোকে কখনো কখনো এক একটি হরফকে বিশটি পদ্ধতিতে পড়া যায়। যদি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার উদ্দেশ্য এটাই হয়ে থাকে যে, মুসলমানদের মাঝে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা হবে এবং সবাই এক পদ্ধতিতে কুরআন তেলাওয়াত করবে, তাহলে কেরাতের বিভিন্নতাকে অবশেষে কেন বিলুপ্ত করা হলো না? যখন কেরাতের মতানৈক্য থাকা সত্ত্বেও মুসলমানদের বিক্ষিপ্ততাকে বাধা দেওয়া যেত এবং মুসলমানদেরকে এটা বুঝানো যেত যে, এই সবগুলো পদ্ধতিতে তেলাওয়াত করা জায়েয, তাহলে এই শিক্ষাটাই কেন সাত হরফের ক্ষেত্রে ফেতনার কারণরূপে উপলব্ধি হলো? প্রকৃত কথা হচ্ছে, হাফেয ইবনে জারীর তবারী (রহ.)-এর বক্তব্যে “সাত হরফ” এবং “কেরাত”-এর ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি এমন বিস্ময়কর দু’টি আমলী সম্বন্ধ করতে হয়, যার যুক্তিগ্রাহ্য কোনো কারণ বুঝে আসে না।

    উপরন্তু হযরত উসমান (রা.) ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামের প্রতি এত বড় পদক্ষেপের সম্বন্ধ কোনো সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধ রেওয়ায়েতের উপর ভিত্তি করে নয়। বরং সংক্ষিপ্ত কিছু শব্দের কেয়াসনির্ভর ব্যাখ্যার মাধ্যমে করা হয়েছে। যে সকল রেওয়ায়েতে হযরত উসমান (রা.)-এর কুরআন সংকলনের কথা বর্ণনা করা হয়েছে সেখানে এ কথার উল্লেখ নেই যে, তিনি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন। বরং এর বিপরীত অনেক দলীল বিদ্যমান রয়েছে যেগুলোর বিশদ বর্ণনা সামনে আসবে। এখন কোনো সুস্পষ্ট ও সহীহ রেওয়ায়েত ব্যতীত এ কথা কিভাবে বলা সম্ভব হতে পারে যে, সাহাবায়ে কেরাম ওই ছয় হরফকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ব্যাপারটা মেনে নিয়েছেন, যা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বার বার আবদনের প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছিল?

    প্রকৃত কথা হচ্ছে, যে সকল সাহাবায়ে কেরাম কুরআনুল কারীমের সংকলন ও বিন্যাসের মহান কাজে শুধু এ জন্যই গবেষণা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কাজ করে যাননি। যারা কুরআনুল কারীমের এক একটি শব্দ সংরক্ষণের জন্য নিজেদের পুরো জীবন ব্যয় করেছেন এবং যারা রহিত তেলাওয়াতের আয়াতগুলোও সংরক্ষণ করে উম্মতের নিকট পৌছিয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে এ কাজ হওয়াটা খুবই দূরবর্তী ব্যাপার যে, তাঁরা সবাই ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার জন্য এভাবে একমত হয়ে যাবেন যে, আজ সেই হরফগুলোর কোনো নাম ও নিশানাও বাকি থাকবে না। যে সকল আয়াতের তেলাওয়াত রহিত হয়ে গিয়েছিল, সাহাবায়ে কেরাম সেগুলোকেও কমপক্ষে ঐতিহাসিক ভিত্তিতে অবশিষ্ট রেখে আমাদের পর্যন্ত পৌছিয়েছেন। তাহলে কি সেই কারণ যে, ওই “হরফগুলো” যেগুলোর ব্যাপারে হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) ও মানেন যে, তা রহিত হয়নি-বরং কোনো কল্যাণার্থে কেরাত ও লিপিমালাকে বিলুপ্ত করা হয়েছে, সেগুলোর কোনো একটি উদাহরণ কোনো দুর্বল রেওয়ায়েতেও সংরক্ষিত হতে পারেনি!

    এ কারণেই অধিকাংশ মুহাক্কিক উলামায়ে কেরাম হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর এই বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। যাদের বক্তব্যের বিশদ বর্ণনা সামনে আসবে।

    [দুই.] ইমাম তহাভী (রহ.)-এর বক্তব্য:

    সাত হরফের ব্যাপারে ইমাম তহাভী (রহ.) দ্বিতীয় মতটি গ্রহণ করেছেন। পূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁর মত অনুযায়ী কুরআনুল কারীম তো শুধু এক কুরাইশী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছিল। তবে উম্মতের সহজ-সাধ্যের জন্য এ অনুমতি প্রদান করা হয়েছে যে, তারা কুরআনুল কারীম তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে সাত পর্যন্ত সমার্থবোধক শব্দ ব্যবহার করতে পারবে। এই সমার্থবোধক শব্দগুলোও স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। এই অনুমতি প্রদানকেই হাদীসে কুরআনুল কারীম “সাত হরফ” এর উপর নাযিল হয়েছে বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই অনুমতি ছিল ইসলামের প্রাথমিক যুগে। পরবর্তীতে মানুষ যখন কুরআনী ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে গেল, তখন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগেই সেই অনুমতি রহিত হয়ে গেল। মৃত্যুর পূর্বে যখন শেষ বারের মতো তিনি হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে কুরআনুল কারীমের অনুশীলন করেন তখন সমার্থবোধক শব্দগুলো রহিত হয়ে গেল। এখন শুধু সেই হরফগুলোই অবশিষ্ট রয়েছে যেগুলোর উপর কুরআন নাযিল হয়েছিল। অর্থাৎ কুরাইশী হরফ। আর বাকি ছয় হরফ রহিত হয়ে গেছে।

    হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্যের তুলনায় এই বক্তব্যটি এ দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তম যে, এতে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি রহিত করার সম্বন্ধ করা হয়নি যে, তাঁরা ছয় হরফকে রহিত করেছেন। বরং রহিত হবার সম্বন্ধ স্বয়ং নববী যুগের দিকে করা হয়েছে। তবে এ বক্তব্যের উপর একটি প্রশ্ন আরোপিত হয় যে, এই বক্তব্য অনুযায়ী ছয় হরফ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে নাযিলকৃত নয়। অথচ হযরত ওমর (রা.) ও হযরত হিশাম (রা.)-এর মাঝে যে মতবিরোধ হয়েছিল, সে ক্ষেত্রে হযরত হিশাম (রা.) রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে ‘সূরা ফুরকান’ নিজ পদ্ধতি অনুযায়ী পাঠ করলেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা শোনে বললেন- هكذا انزلت এই সূরা এভাবেই নাযিল করা হয়েছে)। এরপর হযরত হযরত ওমর (রা.) ও নিজের পদ্ধতি অনুযায়ী তেলাওয়াত করলেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা শোনেও বললেন- هكذا انزلت এই সূরা এভাবেই নাযিল করা হয়েছে।১৫২ এই শব্দমালা থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, উভয় পদ্ধতিটিই আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে নাযিলকৃত ছিল।

    দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, যা পূর্বে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ বক্তব্যেও কেরাতের অবস্থানগত মর্যাদা ফুটে উঠেনি যে, তা সাত হরফের মধ্যে শামিল কি-না? যদি শামিল থাকে তাহলে ছয় হরফের মতো এ ক্ষেত্রেও বলতে হবে যে, [নাউযুবিল্লাহ এটা আল্লাহর পক্ষ হতে নাযিলকৃত নয়। অথচ এ কথা ইজমায়ে উম্মতের পরিপন্থী। আর যদি শামিল না থাকে তাহলে কেরাতের পৃথক অস্তিত্বের উপর কোনো দলীল নেই। কাজেই এ বক্তব্যের উপরও আত্মপ্রশান্তি লাভ হয় না।

    [তিন.] সর্বোত্তম বক্তব্য

    তৃতীয় বক্তব্য হলো সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ও মেনে নেওয়ার মতো। সাত হরফ দ্বারা যেহেতু কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকেই বুঝানো হয়েছে যার আলোচনা পূর্বে করা হয়েছে), তাই এই সাত হরফ আজও পুরোপুরি সংরক্ষিত ও অবশিষ্ট আছে এবং এগুলোর তেলাওয়াতও করা হয়। অবশ্য এতটুকু পার্থক্য রয়েছে যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে কেরাতসমূহের বিভিন্নতার সংখ্যা ছিল অনেক বেশি এবং তাতে সমার্থবোধক শব্দের অধিক্য ছিল। যার উদ্দেশ্য ছিল, যারা কুরআনের ভাষায় তেলাওয়াত করতে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়নি তাদেরকে বেশি থেকে বেশি সহজতার অবকাশ দেওয়া। পরবর্তীতে যখন আরবের লোকেরা কুরআনের ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে গেল তখন সমার্থবোধক শব্দের বহু মতানৈক্য বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে। যেমন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সর্বশেষ বার হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে দাওর করেন [যেটাকে হাদীসে আরযায়ে আখীরা বলা হয়। সে সময় অনেক কেরাতই রহিত করে দেওয়া হয়েছে। যার দলীল সামনে আসবে। কিন্তু যতগুলো কেরাত সে সময় অবশিষ্ট ছিল তার সবগুলোই আজ পর্যন্ত ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় চলে আসছে এবং এগুলোর তেলাওয়াত করা হয়।

    “সাত হরফ”-এর পেঁচানো আলোচনার মধ্যে এটা সেই কণ্টকমুক্ত পথ যার উপর হাদীসের সবগুলো রেওয়ায়েত নিজ নিজ স্থানে সঠিক হয়ে যায়। এবং সেগুলোর মাঝে কোনো দ্বন্দ্ব বা মতবিরোধ বাকি থাকে না। আর না থাকে যুক্তিগ্রাহ্য কোনো আপত্তি। এ ব্যাপারে সম্ভাব্য আরো যত সন্দেহাবলী রয়েছে, আমরা সামনে বিস্তারিতভাবে সেগুলোর উত্তর দেব। যাতে এ বক্তব্যের যথার্থতা ভালোভাবে ফুটে উঠে। তবে এর আগে শোনে নিন যে, এ বক্তব্যের প্রবক্তাগণ কারা কারা? আমরা এখানে ওই মনীষীদের নাম এবং উদ্ধৃতি উপস্থাপন করব। যারা এ বক্তব্য গ্রহণ করেছেন অথবা হাফেয ইবনে জারীর তবারী (রহ.)-এর বক্তব্যকে খণ্ডন করেছেন।

    এই বক্তব্যের প্রবক্তা যারা

    ইলমে কেরাতের সর্বশ্রেষ্ঠ বিখ্যাত ইমাম, হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্রে হাফেয ইবনে কাছীর (রহ.)-এর শাগরিদ এবং হাফেয ইবনে হাযার (রহ.)-এর উস্তাদ, হাফেয আবুল খায়ের মুহাম্মদ ইবনুল জাযারী (রহ.) (মৃত্যু: ৮৩৩ হিজরী। স্বীয় গ্রন্থ “আন-নশরু ফী কিরাতিল আশর”-এর লিখেন-

    وَأَمَّا كَوْنُ الْمَصَاحِفِ الْعُثْمَانِيَّة مُسْتَملَةً عَلَى جميع الأَحْرُفَ السَّبْعَةِ، فَإِنَّ هذه مسألة كبيرة اختَلَفَ الْعُلَمَاء فِيهَا : فَذَهَبَ جَمَاعَاتٌ من الْفُقَهَاءِ وَالْقُرَّاءِ وَالْمُتَكَلِّمِينَ إِلَى أَنَّ الْمَصَاحِفَ الْعُثْمَانِيَّةَ مُسْتَملة على جميع الأحرف السَّبْعَةِ، وَبَنَوْا ذَلِكَ عَلَى أَنَّهُ لَا يَجُوزُ عَلَى الْأُمَّةِ أَنْ تُهْمَلَ نَقْلَ شَيْءٍ مِنَ الْحُرُوف السبعة الَّتِي نَزَلَ الْقُرْآنُ بِهَا، وَقَدْ أَجْمَعَ الصَّحَابَةُ عَلَى نَقْلِ الْمَصَاحِفِ الْعُثْمَانِيَّة مِنَ الصُّحُفِ الَّتِي كَتَبَهَا أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ وَإِرْسَالَ كُلِّ مُصْحَفِ مِنْهَا إِلَى مِصْرٍ مِنْ أَمْصَارِ الْمُسْلِمِينَ وَأَجْمَعُوا عَلَى تَرْكِ مَا سَوَى ذلك، قَالَ هَؤُلَاءِ: وَلَا يَجُوزُ أَنْ يَنْهَى عَنِ الْقَراءة ببَعْضِ الْأَحْرُفَ السَّبْعَةَ وَلَا أَنْ يُجْمَعُوا عَلَى تَرْك شَيْءٍ مِنَ الْقُرْآن وَذَهَبَ جَمَاهِيرُ الْعُلَمَاء من السلف والخلف وأئمة الْمُسْلِمينَ إِلَى أَنَّ هَذه الْمَصَاحِفَ الْعُثمَانِيَّةَ مُسْتَملَةٌ عَلَى مَا يَحْتَمَلُهُ رَسْمُهَا مِنَ الْأَحْرُف السَّبْعَة فَقَط جَامعة لِلْعَرْضَة الأخيرة التي عرضها النَّبي – صلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – عَلَى جبْرَائِيلَ – عَلَيْهِ السَّلَامُ – مُتَضَمِّنَةٌ لَهَا لَمْ تَتْرُكَ حَرْفًا مِنْهَا.

    )قُلْتُ( : وَهَذَا الْقَوْلُ هُوَ الَّذِي يَظْهَرُ صَوَابُهُ : لأَنَّ الْأَحَادِيثِ الصَّحِيحَة والآثار الْمَشْهُورَةَ الْمُسْتَفِيضَةً تَدُلُّ عَلَيْهِ وَتَشْهَدُ لَهُ

    ‘হযরত উসমান (রা.) যে মাসহাফ [কুরআনের কপি প্রস্তুত করেছিলেন তাতে সাত হরফ শামিল ছিল কি-না, তা অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। উলামায়ে কেরাম এতে মতবিরোধ করেছেন। ফুকাহা, কারী এবং কালাম শাস্ত্রবিদদের একটি দলের মতামত হলো, সাত হরফ মাসহাফে উসমানীর মাঝে শামিল রয়েছে। এ কথার ভিত্তি এর উপর যে, উম্মতের জন্য এটা বৈধ নয় যে, তারা ওই সাত হরফের মধ্য হতে কোনো একটি হরফকে বর্ণনা করা ছেড়ে দিবে, যেগুলোর উপর কুরআন নাযিল হয়েছে। আর সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সর্বসম্মতিতে উসমানী মাসহাফকে ওই সকল সহীফা থেকেই সংকলন করেছিলেন, যা হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত ওমর (রা.) লিপিবদ্ধ করেছিলেন। সেগুলোর প্রত্যেকটি কপি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন শহরে পাঠানো হয়েছিল এবং সেগুলো ব্যতীত যত সহীফা ছিল সবগুলো পরিহার করার উপর ঐক্যমত পোষণ করেছিলেন। তাঁরা বলেন, না সাত হরফের মধ্য হতে কোনো একটির কেরাতকে পরিহার করা জায়েয হবে আর না সাহাবায়ে কেরাম কুরআনের কোনো অংশ ছেড়ে দেওয়ার উপর ঐক্যমত পোষণ করবেন। আর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উলামায়ে কেরামের অধিকাংশের মত এটাই যে, মাসহাফে উসমানী ওই সকল হরফকে নিয়ে শামিল, যা এর রসমেরখতের মাঝে সন্নিবেশিত হয়েছে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বশেষ যখন হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে কুরআনুল কারীমের দাওর করেছিলেন, এর সমস্ত শব্দ এ মাসহাফে সন্নিবেশিত হয়ে গেছে। সেগুলোর কোনো হরফই সেই মাসহাফ থেকে বাদ পড়েনি।

    আমার ধারণা, এটাই সে বক্তব্য যার বিশুদ্ধতা সুস্পষ্ট। কেননা বিশুদ্ধ হাদীসগুলো এবং প্রসিদ্ধ রেওয়ায়েতগুলো এর বিশুদ্ধতার প্রমাণ বহন করে এবং এর সাক্ষ্য প্রদান করে।১৫৩

    আল্লামা বদরুদ্দীন আল-আইনী (রহ.) উদ্ধৃত করেন-

    واختلف الأصوليون هل يقرأ اليوم على سبعة أحرف فمنعه الطبري وغيره وقال إنما يجوز بحرف واحد اليوم وهو حرف زيد ونحى إليه القاضي أبو بكر وقال الشيخ أبو الحسن الأشعري أجمع المسلمون على أنه لا يجوز حظر ما وسعه الله تعالى من القرآت بالأحرف التي أنزلها الله تعالى ولا يسوغ للأمة أن تمنع ما يُطلقه الله تعالى بل هي موجودة في قراءتنا وهي مفرقة في القرآن غير معلومة بأعيانها فيجوز على هذا وبه قال القاضي أن يقرأ بكل ما نقله أهل التواتر من غير تمييز حرف من حرف فيحفظ حرف نافع بحرف الكسائي وحمزة ولا حرج في ذلك

    ‘বর্তমানে কুরআনুল কারীম সাত হরফের উপর পড়া হয় কি-না, এ ব্যাপারে উসূলী তথা নীতি নির্ধারক উলামায়ে কেরামের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। হাফেয ইবনে জারীর তবারী (রহ.) ও কতক উলামায়ে কেরাম তা অস্বীকার করে বলেন, বর্তমানে শুধু এক হরফের উপরই কুরআনুল কারীম পাঠ করা জায়েয। আর তা হচ্ছে, হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর হরফ। কাযী আবু বকর রাযী (রহ.) এ মতের দিকেই ঝুঁকে পড়েছেন। কিন্তু ইমাম আবুল হাসান আশআরী (রহ.) বলেন, মুসলিম উম্মাহ এ ব্যাপারে একমত যে, মহান আল্লাহ যেসব হরফের উপর কুরআন অবতীর্ণ করে সহজ-সাধ্য করেছেন, সেগুলো থেকে বিরত থাকা জায়েয নেই। আর আল্লাহ তাআলা যে জিনিসের অনুমতি প্রদান করেছেন সেগুলোকে প্রত্যাখ্যান করার উম্মতের অধিকার নেই। বরং বস্তু বতা তো হলো এই যে, সাত হরফের সবগুলোই আমাদের প্রচলিত কেরাতের মাঝে বিদ্যমান রয়েছে এবং কুরআনুল কারীমের মাঝে বিচ্ছিন্ন ও অনির্দিষ্টভাবে শামিল আছে। এ হিসেবে সে হরফগুলোর কেরাত আজও জায়েয আছে। আর এটাই কাযী১৫৪ সাহেবের মত। যত হরফ তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় বর্ণিত আছে সেগুলোর প্রত্যেকটিই পড়া জায়েয। এক হরফ থেকে অন্য হরফের পার্থক্য করারও প্রয়োজন নেই। নাফে (রহ.)-এর কেরাতকে কেসাই এবং হামযা (রহ.)-এর কেরাতের সাথে মিলিয়ে যদি আত্মস্থ করা হয় তাতে কোনো অসুবিধা নেই।১৫৫

    আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশী (রহ.) কাযী আবু বকর (রহ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে লিখেন-

    وَالسَّابِعُ: اخْتَارَهُ الْقَاضِي أَبُو بَكْرٍ وَقَالَ الصَّحِيحُ أَنَّ هَذِهِ الْأَحْرُفَ السَّبْعَةَ ظَهَرَتْ وَاسْتَفَاضَتْ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَضَبَطَهَا عَنْهُ الْأَئِمَّةُ وَأَثْبَتَهَا عُثْمَانُ وَالصَّحَابَةُ فِي الْمُصْحَفِ

    ‘সপ্তম বক্তব্যটি কাযী আবু বকর১৫৬ (রহ.) গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, সাত হরফের সবগুলোই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রসিদ্ধির সাথে বর্ণিত আছে। আইম্মায়ে কেরাম এগুলোকে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। হযরত উসমান (রা.) ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম এগুলোকে তাঁদের মাসহাফে বিদ্যমান রেখেছেন।’১৫৭

    আল্লামা ইবনে হযম (রহ.)ও হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্যকে কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার বক্তব্যটি একেবারেই ভুল। হযরত উসমান (রা.) যদি এমন করতেও চাইতেন তবুও সক্ষম হতেন না। কারণ মুসলিম বিশ্বের আনাচে-কানাচে এ সাত হরফের হাফেযে ভরপুর ছিল। তিনি লিখেন-

    وأما قول من قال أبطل الأحرف الستة فقد كذب من قال ذلك ولو فعل عثمان ذلك أو أراده لخرج عن الإسلام ولما مطل ساعة بل الأحرف السبعة كلها عندنا قائمة كما كانت مثبوتة في القراآت المشهورة المأثورة

    ‘আর যারা বলেন যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছেন, তারা একেবারেই ভুল বলেছেন। যদি হযরত উসমান (রা.) এমনটি করতেন বা এর ইচ্ছা করতেন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি ইসলাম থেকে বের হয়ে যেতেন।১৫৮ বরং বাস্তবতা হলো, সাত হরফের সবগুলোই অবিকল আমাদের নিকট বিদ্যমান রয়েছে এবং মাশহুর কেরাতের মধ্যে সংরক্ষিত রয়েছে।’১৫৯

    মুয়াত্ত্বা ইমাম মালেকে’র বিখ্যাত ভাষ্যকার, আল্লামা আবুল ওলীদ বাজি মালেকী (রহ.) “সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যা “সাত কেরাত” দ্বারা করার পর লিখেন-

    فَإِنْ قِيلَ هَلْ يَقُولُونَ إِنَّ جَمِيعَ هَذِهِ السَّبْعَةِ الْأَحْرُفِ ثَابِتَةٌ فِي الْمُصْحَفِ فَإِنَّ الْقِرَاءَةَ بِجَمِيعِهَا جَائِزَةٌ قِيلَ لَهُمْ كَذَلِكَ نَقُولُ وَالدَّلِيلُ عَلَى صِحَّةِ ذَلِكَ قَوْلُهُ عَزَّ وَجَلَّ إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ وَلَا يَصِحُّ انْفِصَالُ الذِّكْرِ الْمُنَزَّلِ مِنْ قِرَاءَتِهِ فَيُمْكِنُ حِفْظُهُ دُونَهَا وَمِمَّا يَدُلُّ عَلَى صِحَّةِ مَا ذَهَبْنَا إِلَيْهِ أَنَّ ظَاهِرَ قَوْلِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم يَدُلُّ عَلَى أَنَّ الْقُرْآنَ أُنْزِلَ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ تَيْسِيرًا عَلَى مَنْ أَرَادَ قِرَاءَتَهُ لِيَقْرَأَ كُلُّ رَجُلٍ مِنْهُمْ بِمَا تَيَسَّرَ عَلَيْهِ وَبِمَا هُوَ أَخَفُّ عَلَى طَبْعِهِ وَأَقْرَبُ إِلَى لُغَتِهِ لِمَا يَلْحَقُ مِنَ الْمَشَقَّةِ بِذَلِكَ الْمَأْلُوفِ مِنَ الْعَادَةِ فِي النُّطْقِ وَنَحْنُ الْيَوْمَ مَعَ عُجْمَةِ أَلْسِنَتِنَا وَبُعْدِنَا عَنْ فَصَاحَةِ الْعَرَبِ أَحْوَجُ

    ‘যদি প্রশ্ন করা হয় যে, “আপনাদের বক্তব্য কি এ রকম যে, এই সাত হরফ কি আজও মাসহাফে বিদ্যমান আছে? তাইতো আপনাদের মত অনুযায়ী সবগুলোর কেরাত জায়েয।” তখন আমরা বলব, হ্যাঁ আমাদের বক্তব্য এটাই। আর এটা বিশুদ্ধ হওয়ার দলীল হলো, আল্লাহ তাআলার বাণী إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ [নিশ্চয় আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক]। আর কুরআনুল কারীমকে তার কেরাত থেকে এভাবে পৃথক করা যাবে না যে, কুরআন তো সংরক্ষিত রয়েছে আর তার কেরাত বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

    আমাদের বক্তব্যের বিশুদ্ধতার স্বপক্ষে আরো একটি দলীল হলো এই যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ বহন করে যে, কুরআনকে সাত হরফের উপর নাযিল করা হয়েছে, যাতে তেলাওয়াতকারীর জন্য সহজ হয় যে, প্রত্যেক ব্যক্তি ওই পদ্ধতিতে তেলাওয়াত করতে পারে যে পদ্ধতি তার জন্য সহজ হয়। তার স্বভাব-রুচির দিক থেকে অধিক সহজ হয় এবং ভাষার দিক থেকে অধিক নিকটবর্তী হয়। কেননা, কথোপকথনের মধ্যে যা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায় তা পরিত্যাগ করা খুবই কঠিন। বর্তমান যুগে আমরা অনারবী এবং আরবী ভাষার পাণ্ডিত্য থেকে দূরে থাকার কারণে এ সহজতার প্রতি আমরা অধিক মুখাপেক্ষী।১৬০

    ইমাম গাযালী (রহ.) স্বীয় উসূলে ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ “আল-মুসতাসফা”-এ কুরআনুল কারীমের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লিখেন-

    مَا نُقِلَ إِلَيْنَا بَيْنَ دَفَّتَي الْمُصْحَفِ عَلَى الْأَحْرُفِ السَّبْعَةِ الْمَشْهُورَةِ نَقْلًا مُتَوَاتِرًا.

    ‘মাসহাফের পার্শ্বদ্বয়ের মাঝখানে সুপ্রসিদ্ধ সাত হরফের উপর ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় যা আমাদের পর্যন্ত বর্ণিত হয়ে এসেছে [তাই কুরআন]।’১৬১

    এর দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, ইমাম গাযালী (রহ.)ও আজ পর্যন্ত সাত হরফ বাকি থাকার প্রবক্তা।

    আর মোল্লা আলী কারী (রহ.) লিখেন-

    وَكَأَنَّهُ – عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ – كُشِفَ لَهُ أَنَّ الْقِرَاءَةَ الْمُتَوَاتِرَةَ تَسْتَقِرُّ فِي أُمَّتِهِ عَلَى سَبْعٍ، وَهِيَ الْمَوْجُودَةُ الْآنَ الْمُتَّفَقُ عَلَى تَوَاتُرِهَا، وَالْجُمْهُورُ عَلَى أَنَّ مَا فَوْقَهَا شَاذٌّ لَا يَحِلُّ الْقِرَاءَةُ بِهِ

    ‘মনে হয় যেন হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর বিষয়টা উন্মোচিত হয়ে গিয়েছিল যে, তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় বর্ণিত কেরাতগুলো শেষ পর্যন্ত তাঁর উম্মতের মাঝে সাত হরফের উপরই বাকি থেকে যাবে। আর তাইতো আজ এগুলোই বিদ্যমান আছে এবং সবাই এগুলোর তাওয়াতুরের ব্যাপারে একমত। জমহুর উলামায়ে কেরামের মত হলো, এগুলো ব্যতীত আর যত কেরাত আছে তা [প্রায়] শায বা অপ্রচলিত এবং সেগুলোর তেলাওয়াত জায়েয নেই।’১৬২

    এতে মোল্লা আলী কারী (রহ.)-এর এ কথাটি যদিও সঠিক নয় যে, ‘সাত কেরাত ব্যতীত বাকি অন্য সব কেরাত শায বা অপ্রচলিত।’ কারণ ইলমে কেরাত বিশেষজ্ঞগণ কঠোরভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।১৬৩ কিন্তু এর দ্বারা এটা নিশ্চিত জানা যায় যে, তাঁর মত অনুযায়ী সাত হরফ আজও বাকি আছে। হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)-এর বক্তব্য পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি “সাত হরফ”-এর মাঝে ‘সাত’ সংখ্যাটি আধিক্যের অর্থে প্রয়োগ করেন। এর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন-

    “হাদীসের মধ্যে ‘সাত’ শব্দটি সংখ্যাধিক্যের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। নির্দিষ্ট সংখ্যা বুঝানোর জন্য নয়। ‘দশ’ কেরাতের উপর আইম্মায়ে কেরাম ঐক্যমত পোষণ করেছেন এবং দশ কেরাতের প্রত্যেকটির জন্য দু’জন করে বর্ণনাকারী রয়েছেন। একজন অপর জনের সাথে মতবিরোধ করেন। ফলে কেরাতের সংখ্যা বিশ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায়।”১৬৪

    এই উক্তিতে যদিও শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) জমহুর উলামায়ে কেরামের সাথে মতবিরোধ করে “সাত” সংখ্যাটিকে সংখ্যাধিক্যের জন্য সাব্যস্ত করেছেন। [হয়তো বিশটি কেরাতকে কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারে সীমাবদ্ধ করার বিষয়টি তাঁর কাছে সুস্পষ্ট হয়নি] কিন্তু এর দ্বারা এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ হয়ে পড়ে যে, হাদীসে যে হরফগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে শাহ সাহেবের নিকট সেগুলো কেরাতই এবং সেগুলো রহিত বা বা পরিত্যক্ত হয়নি; বরং আজও বিদ্যমান রয়েছে।

    শেষ জামানায় দীনি জ্ঞানের ইমাম, যুগশ্রেষ্ঠ মুহাক্কিক এবং হাফেযে হাদীস আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) এই হাদীসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সংক্ষিপ্ত ভাষায় মাসআলাটির স্বরূপ এমনভাবে উন্মোচন করেছেন যে, এটাকে শেষ হরফ বলা উচিত। এখানে আমরা তাঁর পুরো তাহকীক ও গবেষণাটি হুবহু উল্লেখ করছি-

    واعلم انهم اتفقوا على انه ليس المراد من سبعة احرف القراة السبعة المشهورة بان يكون كل حرف منها قراءة من تلك القراءات، اعنى انه لا انطباق بين القراءات السبع والاحرف السبعة كما يذهب اليه الوهم بالنظر الى لفظ السبعة فى الموضعين، بل بين ذلك الاحرف والقراءة عموم وخصوص وجهى، كيف، وان القراءات لاتنحصر فى السبعة، كما صرح ابن الجوزى فى رسالة النشر فى قراءة العشر، وانما اشتهرت السبعة على الالسنة لانها التى جمعها الشاطبي ثم اعلم ان بعضهم فهم ان بين تلك الاحرف تغايرا من كل وجه، بحيث لارباط بينها وليس كذلك، بل قد يكون الفرق بالمجرد والمزيد واخرى الابواب، ومرة باعتبار الصيغ من الغائب والحاضر، وطورا بتحقيق الهمزة وتسهيلها فكل هذه التغييرات يسيرة كانت او كثيرة حرف براسه، وغلط من فهم ان هذه الاحرف متغايرة كلها بحيث يتعذر اجتماعها اما انه كيف عدد السبعة فتوجه اليه ابن الجوزى وحقق ان التصرفات كلها ترجع الى السبعة و راجع القسطلاني والزرقاني، بقى الكلام فى ان تلك الاحرف كلها موجودة او رفع بعضها وبقى البعض فاعلم ان ماقرأة جبرئيل عليه السلام فى العرضة الاخيرة على النبي صلى الله عليه وسلم كله ثابت فى مصحف عثمان، ولما يتعين معنى الاحرف عند ابن جرير ذهب الى رفع الاحرف الست منها وبقى واحد فقط.

    ‘জেনে রাখুন, সমস্ত উলামায়ে কেরাম এ কথার উপর একমত যে, সাত হরফ দ্বারা প্রসিদ্ধ সাত কেরাত উদ্দেশ্য নয় এবং এমনও নয় যে, প্রত্যেক হরফ ওই সাত কেরাতের মধ্য হতে একটি কেরাত। ফলকথা, সাত কেরাত ও সাত হরফ এক কথা নয়। যা প্রথম দৃষ্টিতে সাত হরফ দ্বারা এমন ধারণা জন্ম নেয়। বরং সাত হরফ ও সাত কেরাতের মাঝে উম্মুম-খুসূস মিন ওয়াজহিন১৬৫-এর সম্পর্ক। আর কেরাত যখন সাত সংখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় তখন উভয়টা এক হতে পারে কি করে? যেমন, আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.) “আন-নশরু ফী কিরাআতিল আশর” কিতাবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। তবে “সাত কেরাত” শব্দটি মানুষের মুখে মুখে প্রসিদ্ধি লাভ করার কারণ হলো, আল্লামা শাত্বীবী (রহ.) এই সাত প্রকার কেরাতকে গ্রন্থনা করেছেন। অতঃপর এ কথাটাও মনে রাখবেন যে, কোনো কোনো লোক মনে করে যে, সাত হরফের মাঝে পরস্পর সম্পূর্ণ “বিপরীতমুখী” সম্পর্ক, যে একটির সাথে অপরটির কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ বাস্তবতা এমন নয়। বরং কখনো কখনো দুই হরফের মাঝে একবচন ও বহুবচনের মধ্যে পার্থক্য হয়ে থাকে। আবার কখনো ব্যাকরণগত বিষয়ে। আবার কখনো গায়েব [নাম পুরুষ] ও হাযের [মধ্যম পুরুষ]-এর শব্দের পার্থক্য হয়ে থাকে। কখনো শুধু হামযাকে বাকি রাখার ও সেটাকে তাসীল করার পার্থক্য হয়। ব্যাস, এ সকল পরিবর্তন চাই সাধারণ হোক কিংবা বড় বড়, সবই স্বতন্ত্র একটি হরফ। আর যারা এ কথা মনে করেন যে, এ হরফগুলোর মাঝে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী সম্পর্ক এবং এগুলোকে এক শব্দে একত্রিত করা সম্ভব নয়, তারা ভুল করেছেন। বাকি থাকল এ কথা যে, হাদীসে “সাত” সংখ্যাটি দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে? আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর উত্তর দিয়েছেন। তিনি তাহকীক বর্ণনা করেছেন যে, এ সমস্ত পরিবর্তন-পরিবর্ধন সাত প্রকার। এ মাসআলায় ‘কাসতালানী’ (রহ.) ও ‘যুরকানী’ (রহ.)-[এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ] দেখে নিন।

    এখন বাকি থাকল শুধু এ কথা যে, এ সকল হরফ এখন আছে নাকি কিছু হরফ বিলুপ্ত করা হয়েছে আর কিছু হরফ অবশিষ্ট আছে? সুতরাং এটা জেনে নিন যে, হযরত জিবরাঈল (আ.) কুরআনুল কারীমের আরযায়ে আখীরার সময় যতগুলো হরফ পাঠ করেছিলেন, তার সবগুলোই মাসহাফে উসমানীতে বিদ্যমান রয়েছে। যেহেতু ইবনে জারীর (রহ.)-এর নিকট হরফের অর্থ সুস্পষ্ট নয় তাই তিনি এ মাযহাব গ্রহণ করেছেন যে, ছয় হরফকে বিলুপ্ত করা হয়েছে আর এক হরফ অবশিষ্ট রয়েছে।১৬৬

    অনুরূপভাবে মিসরের পরবর্তী উলামায়ে কেরামের মাঝে সুপ্রসিদ্ধ গবেষক আল্লামা যাহেদ কাউসারী (রহ.) [মৃত্যু ১৩৭১ হিজরী] লিখেন-

    والاول رأى القائلين بان الاحرف السبعة كانت في مبدأ الامر ثم نسخت العرضة الاخيرة في عهد النبي صلى الله عليه وسلم فلم يبق الا حرف واحد و رأى القائلين بان عثمان رضى الله عنه جمع الناس على حرف واحد ومنع من الستة الباقية لمصلحة، واليه نحا ابن جرير وتهيبه ناس فتابعوه لكن هذا رأى خطير قام ابن حزم باشد النكير عليه في الفصل وفي الاحكام وله الحق في ذلك، والثاني رأى القائلين بان هي الاحرف السبعة المحفوظة كما هي في العرضة الاخيرة. الخ..

    ‘প্রথম মতটি [বর্তমান কেরাত এক হরফেরই বিভিন্ন রূপ] সেসব মনীষীর, যারা বলেন-সাত হরফ ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল। অতঃপর আরযায়ে আখীরার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগেই তা রহিত হয়ে গেছে। বর্তমানে শুধু একটিই অবশিষ্ট রয়েছে। এই মতটি সেসব ব্যক্তিদেরও যারা বলেন, হযরত উসমান (রা.) সমস্ত মানুষকে এক হরফের উপর একত্রিত করেছিলেন এবং বিশেষ কল্যাণার্থে বাকি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করেছিলেন। হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর মতও এটাই এবং এ ক্ষেত্রে বহু লোক তাঁর কথায় প্রভাবিত হয়ে তাঁর পিছু ধরেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা খুবই স্পর্শকাতর ও বিপজ্জনক রায়। আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.) “আল-ফছ্ল” এবং “আল-আহকাম”-এ এর কড়া বিরোধিতা করেছেন, যা তাঁর অধিকার ছিল। দ্বিতীয় মত হচ্ছে [বর্তমান কেরাতই সাত হরফ] সেসব ব্যক্তিদের, যারা বলেন-এগুলোই সেই সাত হরফ আরযায়ে আখীরা থেকে যা সংরক্ষিত হয়ে আসছে।১৬৭

    আমরা উপরোল্লিখিত এ বক্তব্য ও মতামতগুলো বিস্তারিতভাবে এ জন্য পেশ করলাম যে, বর্তমান যুগে আল্লামা ইবনে জারীর তবারী (রহ.)-এর বক্তব্যটি অধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। আর আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.)-এর সুমহান ব্যক্তিত্বের দিকে তাকিয়ে তাঁকে সাধারণত সব ধরনের সন্দেহ ও সংশয়ের ঊর্ধ্বে মনে করা হয়। এর ভিত্তিতেই আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর এ পরিচ্ছন্ন ও সুস্পষ্ট বক্তব্যটি হয়তো মানুষ জানে না অথবা জানা থাকলেও সেটাকে একটা দুর্বল মত বলে মনে করা হয়। অথচ পূর্বোক্ত আলোচনার আলোকে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইমাম মালেক (রহ.), আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.), আল্লামা আবুল ফযল রাজী (রহ.), কাযী আবু বকর ইবনে তাইয়্যেব (রহ.), ইমাম আবুল হাসান আশআরী (রহ.), কাযী ইয়ায (রহ.), আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.), আল্লামা আবুল ওলীদ বাজী (রহ.), ইমাম গাযালী (রহ.) ও মোল্লা আলী কারী (রহ.)-এর ন্যায় উলামায়ে কেরাম এ কথার উপর ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, সাত হরফের সবগুলো আজও সংরক্ষিত ও বিদ্যমান রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আরযায়ে আখীরার সময় যতগুলো হরফ বাকি ছিল, তার মধ্য হতে কোনো হরফ না রহিত হয়েছে আর না পরিত্যক্ত হয়েছে। বরং মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) নিজের এ বক্তব্যকে নিজের পূর্বে জমহুর উলামায়ে কেরামের রায় বলেও সাব্যস্ত করেছেন।

    পরবর্তী উলামায়ে কেরামের মাঝে হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ (রহ.), হযরত আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) এবং আল্লামা যাহেদ কাউসারী (রহ.)-এর বক্তব্যও এটাই। অনুরূপভাবে মিসরের প্রসিদ্ধ উলামায়ে কেরাম আল্লামা নাযীত মুতীয়ী (রহ.), আল্লামা খাজারী দিম্ইয়াাতী (রহ.) ও শায়েখ আবদুল আযীম যুরকানী (রহ.)ও এ বক্তব্যকে গ্রহণ করেছেন।১৬৮ অতএব, প্রমাণপঞ্জির দিকে না তাকিয়ে শুধু ব্যক্তিত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও এটা অত্যন্ত উঁচু মানের একটা বক্তব্য।

    এ বক্তব্যের দলীলসমূহ

    এখন সে সকল দলীল উপস্থাপন করছি, যেগুলো দ্বারা এ বক্তব্যটি শক্তিশালী হয়। এর কিছু দলীল তো উপরোক্ত বক্তব্যগুলোতে এসে গেছে।

    অতিরিক্ত কিছু দলীল নিম্নে পেশ করা হলো :

    ১. কুরআনুল কারীমের আয়াত- إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ [নিশ্চয় আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক] সুস্পষ্টভাবে এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, কুরআনের যে সকল আয়াত স্বয়ং আল্লাহ তাআলা রহিত করেননি সেগুলো কেয়ামত পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে। অপর দিকে সে সকল হাদীস পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলো দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, কুরআনের সাত হরফ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে নাযিলকৃত ছিল। তাই উল্লিখিত আয়াতের সুস্পষ্ট দাবী হলো, ওই সাত হরফ কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকা।

    ২. হযরত উসমান (রা.) যদি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে শুধু এক হরফ দ্বারা কুরআন প্রস্তুত করে থাকেন, তাহলে স্পষ্ট করে কোথাও তার কোনো প্রমাণ অবশ্যই পাওয়া যাওয়া উচিত ছিল। অথচ এর কোনো প্রমাণ তো পাওয়া যায়ই না; বরং রেওয়ায়েতসমূহ থেকে জানা যায় যে, মাসহাফে উসমানীর মাঝে সাত হরফের সবগুলোই বিদ্যমান ছিল। যেমন, রেওয়ায়েতে সুস্পষ্টভাবে এ কথা উল্লেখ আছে যে, হযরত উসমান (রা.) স্বীয় মাসহাফ হযরত আবু বকর (রা.) কর্তৃক সংকলিত মাসহাফের অনুকরণে লিপিবদ্ধ করেছিলেন এবং লিপিবদ্ধ করার উভয় কপিকে মিলানোও হয়েছিল। এ ব্যাপারে হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.) বলেন-

    فعرضت المصحف عليها فلم يختلفا في شيئ

    “আমি ওই সহীফাগুলো দ্বারা মাসহাফকে মিলিয়ে দেখেছি, উভয়ের মধ্যে কোনো ধরনের পার্থক্য [বেশ-কম] ছিল না।’১৬৯

    এ কথা সুস্পষ্ট যে, হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)ও স্বীকার করেন যে, হযরত আবু বকর (রা.)-এর জামানায় সাত হরফের সবগুলোই বিদ্যমান ছিল। তাই হযরত আবু বকর (রা.)-এর সহীফাগুলোতে নিশ্চিতভাবে কুরআনুল কারীমকে সাত হরফে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কাজেই হযরত উসমান (রা.) যদি ছয় হরফকে বিলুপ্তই করে দিয়ে থাকেন তাহলে হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)- এর এ কথা কিভাবে সঠিক হতে পারে যে, “উভয়ের মাঝে কোনো পার্থক্য বা কম-বেশি ছিল না।”?

    ৩. আল্লামা ইবনুল আম্বারী (রহ.) “কিতাবুল মাসাহিফ”-এ প্রসিদ্ধ তাবেঈ হযরত উবায়দা সালমানী (রহ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করেন-

    قراءتنا التي جمع الناس عثمان عليها هي العرضة الأخيرة

    ‘আমাদের ওই কেরাত, যার উপর হযরত উসমান রা.) মানুষকে একত্রিত করেছেন, সেটা ছিল “আরযায়ে আখীরা”-এর কেরাত।’১৭০

    হযরত উবায়দা (রা.)-এর এ বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে যে, আরযায়ে আখীরা [হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কুরআনের শেষ দাওর]-এর সময় যে হরফগুলো বাকি ছিল, হযরত উসমান (রা.) ওই হরফের কোনোটিই ছাড়েননি।

    এ ক্ষেত্রে কোনো কোনো আলেম বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আরযায়ে আখীরা তো শুধু এক কুরাইশী হরফের উপরই হয়েছিল। আর এটার উপরই হযরত উসমান (রা.) সাবাইকে একত্রিত করেছিলেন। কিন্তু এ কথা খুবই দূরবর্তী যে, যে হরফগুলো রহিত হয়েছিল না, সেগুলো এই দাওর [আরযায়ে আখীরা] থেকে বাদ পড়ে যাবে।

    ৪. প্রসিদ্ধ তাবেঈ হযরত মুহাম্মদ ইবনে সিরীন (রহ.) থেকে আল্লামা ইবনে সা’দ (রহ.) এ বক্তব্য উদ্ধৃত করেন-

    كان جبريل يعرض القرآن على النبي صلى الله عليه وسلم كل عام مرة في رمضان فلما كان العام الذي توفي فيه عرضه عليه مرتين قال محمد فأنا أرجو أن تكون قراءتنا العرضة الأخيرة

    ‘হযরত জিবরাঈল (আ.) প্রতি বছর একবার রমযান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে কুরআন উপস্থাপন করতেন। যখন তাঁর ইন্তেকালের বছর আসল তখন হযরত জিবরাঈল (আ.) দু’বার কুরআন উপস্থাপন করেছেন। [মুহাম্মাদ ইবনে সিরীন (রহ.) বলেন,] আমি আশাবাদী যে, আমাদের বর্তমান কেরাত ওই আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী।’১৭১

    ৫. হযরত আমের শা’বী (রহ.) ছিলেন প্রসিদ্ধ একজন তাবেঈ। যিনি সাতশত সাহাবায়ে কেরাম থেকে ইলমী ফায়দা অর্জন করেছেন। আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.) তাঁর থেকেও এ ধরনের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন।

    উল্লিখিত ব্যক্তিদ্বয় ছিলেন তাবেঈ এবং হযরত উসমান (রা.)-এর যুগের অত্যন্ত নিকটবর্তী ব্যক্তিত্ব। তাই এ ক্ষেত্রে তাঁদের বক্তব্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মর্যাদা রাখে।

    ৬. সমগ্র হাদীসের ভাণ্ডারে আমরা কোনো একটি রেওয়ায়েতেও এমন পাইনি, যা দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে দু’ধরনের মতানৈক্য ছিল। এক. সাত হরফের মতানৈক্য। দুই. কেরাতের মতানৈক্য। এর পরিবর্তে বহু রেওয়ায়েত দ্বারা এ কথা জানা যায় যে, উভয়টি অভিন্ন বিষয়। কেননা, একই ধরনের মতানৈক্যের উপর একই সময়ে “কেরাতের মতানৈক্য” ও “হরফের মতানৈক্য” শব্দ দু’টি প্রয়োগ করা হয়েছে। যেমন হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) বলেন-

    عَنْ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ، قَالَ: كُنْتُ فِي الْمَسْجِدِ، فَدَخَلَ رَجُلٌ يُصَلِّي، فَقَرَأَ قِرَاءَةً أَنْكَرْتُهَا عَلَيْهِ، ثُمَّ دَخَلَ آخَرُ فَقَرَأَ قِرَاءَةً سِوَى قِرَاءَةِ صَاحِبِهِ، فَلَمَّا قَضَيْنَا الصَّلَاةَ دَخَلْنَا جَمِيعًا عَلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقُلْتُ: إِنَّ هَذَا قَرَأَ قِرَاءَةً أَنْكَرْتُهَا عَلَيْهِ، وَدَخَلَ آخَرُ فَقَرَأَ سِوَى قِرَاءَةِ صَاحِبِهِ، فَأَمَرَهُمَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَرَآ، فَحَسَّنَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَأْنَهُمَا، فَسَقَطَ فِي نَفْسِي مِنَ التَّكْذِيبِ، وَلَا إِذْ كُنْتُ فِي الْجَاهِلِيَّةِ، فَلَمَّا رَأَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا قَدْ غَشِيَنِي، ضَرَبَ فِي صَدْرِي، فَفَضْتُ عَرَقًا وَكَأَنَّمَا أَنْظُرُ إِلَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ فَرَقًا، فَقَالَ لِي: ” يَا أُبَيُّ أُرْسِلَ إِلَيَّ أَنِ اقْرَأِ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفٍ، فَرَدَدْتُ إِلَيْهِ أَنْ هَوِّنْ عَلَى أُمَّتِي، فَرَدَّ إِلَيَّ الثَّانِيَةَ أَقْرَأْهُ عَلَى حَرْفَيْنِ، فَرَدَدْتُ إِلَيْهِ أَنْ هَوِّنْ عَلَى أُمَّتِي، فَرَدَّ إِلَيَّ الثَّالِثَةَ اقْرَأْهُ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ

    ‘আমি মসজিদে ছিলাম। একব্যক্তি প্রবেশ করে নামায আদায় করতে লাগল। সে এমন এক কেরাত পাঠ করল যা আমার কাছে অপরিচিত বলে মনে হলো। অতঃপর অপর এক ব্যক্তি এসে মসজিদে প্রবেশ করল। সে প্রথম ব্যক্তির কেরাত ব্যতীত অন্য এক ধরনের কেরাত পাঠ করল। আমরা যখন নামায সমাপ্ত করলাম তখন সবাই মিলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-নিকট উপস্থিত হলাম। আমি আরয করলাম যে, এ ব্যক্তি এমন এক কেরাত পাঠ করেছে যা আমার কাছে অপরিচিত বলে মনে হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় আরেক ব্যক্তি এসে প্রথম ব্যক্তির কেরাতের চেয়ে ভিন্ন আরেক ধরনের কেরাত পাঠ করল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উভয়কে পড়ার নির্দেশ দিলেন। তারা উভয়ে পাঠ করার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উভয়ের কেরাতকে সুন্দর হয়েছে বলে মন্তব্য করলেন। এতে আমার অন্তরে মিথ্যাচারিতার এমন এমন ওয়াসওয়াসা আসতে লাগল, জাহেলী যুগেও যা আমার খেয়ালে আসত না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আমার এ অবস্থা দেখলেন তখন তিনি আমার বক্ষে [আলতো] আঘাত করলেন। এতে আমি ঘামে স্নাত হয়ে গেলাম এবং ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় আমি এমন অনুভব করলাম, আমি যেন আল্লাহকে দেখছি। এরপর তিনি আমাকে বললেন, হে উবাই! আমার পালনকর্তা আমার নিকট পয়গাম পাঠিয়েছেন যে, আমি কুরআনকে এক হরফে পাঠ করব। প্রতি উত্তরে আমি আবেদন করলাম, আমার উম্মতের জন্য সহজ করুন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা দ্বিতীয় বারের জন্য পয়গাম পাঠালেন যে, আমি কুরআনকে দুই হরফের উপর পাঠ করব। এর উত্তরেও আমি আবেদন করলাম, আমার উম্মতের জন্য সহজ করুন। তখন আল্লাহ তাআলা তৃতীয়বার পয়গাম পাঠালেন যে, আমি যেন এটাকে সাত হরফের উপর পাঠ করি।’১৭২

    এক রেওয়ায়েতে হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) উভয় ব্যক্তির তেলাওয়াতের মতানৈক্যকে বার বার কেরাতের মতানৈক্য বলে উল্লেখ করেছেন। আর এটাকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাত হরফের মতানৈক্য বলে উল্লেখ করেছেন। এর দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, নববী যুগে কেরাতের মতানৈক্য ও হরফের মতানৈক্যকে এক ও অভিন্ন বিষয় বুঝা হতো। উপরন্তু এর বিপরীত এমন কোনো দলীল-প্রমাণ নেই, যা উভয়টার পৃথক হবার প্রমাণ বহন করে। এর দ্বারা প্রমাণ হয় যে, উভয়টা এক ও অভিন্ন বিষয়। আর কেরাত যখন সংরক্ষিত হওয়ার বিষয়টি তাওয়াতুর ও ইজমা দ্বারা প্রমাণিত, তখন এর দ্বারা বুঝা যায় যে, সাত হরফও আজও সংরক্ষিত।

    উপরোল্লিখিত দলীল-প্রমাণগুলোর আলোকে এ কথা একেবারে সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, আরযায়ে আখীরার সময় সাত হরফের যে অংশ বাকি ছিল, তার সম্পূর্ণটাই মাসহাফে উসমানীতে সংরক্ষণ করা হয়েছিল এবং আজ পর্যন্ত তা সংরক্ষিত হয়েই চলে আসছে। এটাকে কেউ রহিত করেনি এবং এর কেরাতকে নিষিদ্ধও করা হয়নি। তবে এটাকে পরিপূর্ণরূপে স্পষ্ট করার জন্য এর উপর আরোপিত সম্ভাব্য প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া আবশ্যক।

    এ বক্তব্যের উপর আরোপিত প্রশ্নগুলো ও তার জবাব

    প্রশ্ন : ১. যদি হযরত উসমান (রা.) সাত হরফের সবগুলোকেই অবশিষ্ট রাখেন, তাহলে তাঁর সেই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কীর্তি কোন্টি ছিল যার জন্য তাঁকে “জামিউল কুরআন” বা কুরআনের সংকলক বলা হয়?

    জবাব : যদিও অসংখ্য সাহাবায়ে কেরামের কুরআনুল কারীম মুখস্থ ছিল, কিন্তু হযরত উসমান (রা.)-এর যুগ পর্যন্ত কুরআনুল কারীমের মানদণ্ডমূলক কপি ছিল একটিই, যা হযরত আবু বকর (রা.) সংকলন করেছিলেন। তা আবার মাসহাফের আকৃতিতে ছিল না। বরং প্রত্যেকটি সূরা পৃথক পৃথক সহীফায় লিপিবদ্ধ ছিল। কিন্তু কোনো কোনো সাহাবী ব্যক্তিগতভাবে নিজ নিজ সহীফা পৃথক পৃথকভাবে প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। এগুলোতে না ছিল রসমেখতের মধ্যে কোনো মিল, সূরাগুলোর বিন্যাসের মধ্যে কোনো মিল আর না ছিল সাত হরফের মধ্যে কোনো সমন্বয়। বরং প্রত্যেকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যে হরফ অনুযায়ী কুরআন শিখেছিলেন, সেটাকেই নিজের মতো করে লিখে নিয়েছিলেন। তাই কোনো মাসহাফে একটি আয়াত এক হরফ অনুযায়ী লিখা হয়েছিল, পক্ষান্তরে অপর মাসহাফে অন্য কোনো হরফ অনুযায়ী লিখা হয়েছিল। যতক্ষণ পর্যন্ত নববী যুগ নিকটবর্তী ছিল এবং মুসলমানদের সম্পর্ক ইসলামের মারকায বা পবিত্র মদীনার সাথে মজবুত সম্পর্ক ছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত মাসহাফসমূহের এই মতানৈক্যের কারণে উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষতি এ জন্য সাধিত হয়নি যে, কুরআনুল কারীমের সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আসল ভিত্তিটা মাসহাফের পরিবর্তে মুখস্থ শক্তির উপর ছিল। আর অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরামই এ ব্যাপারে ওয়াকিফহাল ছিলেন যে, কুরআনুল কারীম সাত হরফে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু যখন ইসলাম দূর-দূরান্তের রাষ্ট্রসমূহে ছড়িয়ে পড়ল এবং নতুন নতুন লোক মুসলমান হতে লাগল তখন তারা শুধু একটি পদ্ধতিতেই কুরআন শিখল। আর এ কথাটির প্রচার তাদের মাঝে ব্যাপকতা লাভ করেনি যে, কুরআন সাত হরফে নাযিল হয়েছে। তাদের মাঝে মতানৈক্য সৃষ্টি হতে লাগল। কোনো কোনো ব্যক্তি নিজের কেরাতকে সঠিক এবং অন্যের কেরাতকে ভুল মনে করতে লাগল। ওদিকে যেহেতু ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত মাসহাফগুলোও হরফ ও রুসমেখতের দিক থেকে বিভিন্ন ধরনের ছিল এবং সেগুলোতে সাত হরফকে একত্রিত করার কোনো ব্যবস্থাও ছিল না। এ কারণে এমন কোনো মানদণ্ডমূলক কপিও বিদ্যমান ছিল না, যার মাধ্যমে সেসব মতানৈক্যের নিরসন করা যায়।

    এমতাবস্থায় হযরত উসমান (রা.) অনুভব করলেন যে, যদি এ অবস্থা চলতে থাকে এবং ব্যক্তিগত মাসহাফগুলো বিলুপ্ত করে কুরআনুল কারীমের মানদণ্ডমূলক একটি কপি ইসলামী বিশ্বে প্রেরণ না করা হয়, তাহলে বিরাট ফেতনা মাথা তুলে দাঁড়াবে। তাই তিনি নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করেন :

    [এক.] কুরআনুল কারীমের সাতটি মানদণ্ডমূলক কপি প্রস্তুত করান এবং বিভিন্ন শহরে তা প্রেরণ করেন।

    [দুই.] ওই মাসহাফগুলোর রুসমেখত [লিখন পদ্ধতি] এমনভাবে রাখেন যাতে সাত হরফের সবগুলো এতে সংকুলান হয়। যেমন, এ মাসহাফগুলো নুকতা ও হরকতশূন্য ছিল। এগুলোকে প্রত্যেক হরফের অনুকরণে পাঠ করা যেত।

    [৩.] ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত সবগুলো মাসহাফ পুড়িয়ে দাফন করে দেন।

    [৪.] ভবিষ্যতে যত মাসহাফ লিপিবদ্ধ করা হবে, তা যাতে ওই সাত হরফের অনুকরণে হয়, এ আইন বাধ্যতামূলক করে দেন।

    [৫.] হযরত আবু বকর (রা.) কর্তৃক সংকলিত সহীফাগুলোতে পৃথক পৃথকভাবে বিভিন্ন সূরা লিপিবদ্ধ ছিল। হযরত উসমান (রা.) সূরাগুলোকে বিন্যাস করে একই মাসহাফের আকৃতি দান করেন।

    হযরত উসমান (রা.)-এর সকল পদক্ষেপ দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল, যেন গোটা ইসলামী বিশ্বে রুসমেখত ও সূরাগুলোর বিন্যাসের দিক থেকে সবগুলো মাসহাফ এক রকম হয়ে যায়। আর এগুলোতে সাত হরফ এমনভাবে একত্রিত হয়ে যায় যে, পরবর্তীতে কোনো ব্যক্তির জন্য কোনো কেরাতকে অস্বীকার করার বা কোনো অশুদ্ধ কেরাতের উপর চর্চা করার অবকাশ বাকি না থাকে। কখনো যদি কোনো কেরাতের ব্যাপারে মতানৈক্য দেখা দেয় তাহলে মাসহাফের দিকে প্রত্যাবর্তন করে যাতে অতি সহজেই তা নিরসন করা যায়।

    হযরত আলী (রা.)-এর একটি বক্তব্য দ্বারা এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়, যা ইমাম ইবনে আবী দাউদ (রহ.) কিতাবুল মাসাহিফ-এ বিশুদ্ধ সনদের মাধ্যমে উদ্ধৃত করেছেন-

    قال علي بن أبي طالب رضي الله عنه لا تقولوا في عثمان إلا خيرا فوالله ما فعل الذي فعل في المصاحف إلا عن ملأ منا، فقال : ما تقولون في هذه القراءة ؟ فقد بلغني أن بعضهم يقول : إن قراءتي خير من قراءتك ، وهذا يكاد أن يكون كفرا ، قلنا : فما ترى ؟ قال : أرى أن نجمع الناس على مصحف واحد ، فلا تكون فرقة ، ولا يكون اختلاف ، قلنا : فنعم ما رأيت

    ‘হযরত আলী (রা.) বলেন, তোমরা হযরত উসমান (রা.)-এর ব্যাপারে ভালো ব্যতীত কোনো সমালোচনা করো না। আল্লাহর শপথ! তিনি মাসহাফের ব্যাপারে যা কিছু করেছেন, তা আমাদের সকলের উপস্থিতিতেই করেছেন। তিনি আমাদের নিকট পরামর্শ চেয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই কেরাতের ব্যাপারে তোমাদের রায় কি? কারণ আমি জানতে পেরেছি যে কোনো কোনো ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে বলছে যে, “আমার কেরাত তোমার কেরাতের চেয়ে উত্তম।” অথচ এটা এমন কথা যা কুফরীর নিকট পৌঁছে যায়। তখন আমরা বললাম, এ ক্ষেত্রে আপনার রায় কি? তিনি বললেন, আমার রায় হচ্ছে, আমরা মানুষকে একই মাসহাফের উপর সমবেত করে দেব। যাতে কোনো পার্থক্য ও মতানৈক্য বাকি না থাকে। আমরা বললাম, আপনি খুবই চমৎকার রায় প্রদান করেছেন।১৭৩

    এই হাদীসটি হযরত উসমান (রা.)-এর মাসহাফ সংক্রান্ত কাজের ব্যাপারে সুস্পষ্ট একটি হাদীস। এতে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, হযরত উসমান (রা.) “نجمع الناس على مصحف واحد” [আমরা মানুষকে একই মাসহাফের উপর সমবেত করে দেব]” বলে এই ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন যে, আমরা এমন একটি মাসহাফ প্রস্তুত করতে চাই, যা গোটা ইসলামী বিশ্বের জন্য একই রকম হবে এবং এর মাধ্যমে পারস্পরিক মতানৈক্যের অবসান ঘটবে। এরপর কোনো বিশুদ্ধ কেরাতকে অস্বীকার করার এবং রহিত বলার বা অপ্রচলিত কেরাতের উপর চর্চা করার অবকাশ বাকি থাকবে না।১৭৪

    অনুরূপ ইবনে আশতাহ (রহ.) হযরত আনাস (রা.) থেকে উদ্ধৃত করেন-

    اختلفوا في القرآن على عهد عثمان حتى اقتتل الغلمان والمعلمون، فبلغ ذلك عثمان بن عفان فقال: عندي تكذبون به وتلحنون فيه، فمن نأى عني كان أشد تكذيباً وأكثر لحناً، يا أصحاب محمد اجتمعوا فاكتبوا للناس إماماً،

    ‘হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে কুরআনুল কারীমের ব্যাপারে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি শিশু ও শিক্ষকরা লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। হযরত উসমান (রা.)-এর নিকট এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি বললেন, তোমরা আমার কাছে থাকতেই [বিশুদ্ধ কেরাতকে] অস্বীকার করছ এবং তাতে ভুল করছ! তাহলে যারা আমার কাছ থেকে দূরে অবস্থান করছে, তারা তো আরো বেশি মিথ্যারোপ ও ভুল করতে থাকবে। সুতরাং হে মুহাম্মাদের সাথীবৃন্দ! তোমরা একত্রিত হও এবং মানুষের জন্য এমন একটি কপি প্রস্তুত কর, মানুষ যার অনুসরণ করতে পারে।

    এর দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, কুরআনুল কারীমের কোনো হরফ বিলুপ্ত করা হযরত উসমান (রা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল না। বরং তাঁর তো এ ব্যাপারে আক্ষেপ ছিল যে, কোনো কোনো লোক বিশুদ্ধ কেরাতকে অস্বীকার করছে। আর কেউ কেউ অশুদ্ধ কেরাতের চর্চার উপর জোর দিচ্ছে। তাই তিনি মানদণ্ডমূলক একটি কপি প্রস্তুত করতে চাইতেন। যা গোটা ইসলামী জগতের জন্য এক ও অভিন্ন রকম হবে।১৭৫

    প্রশ্ন : ২. কুরাইশী ভাষায় লিপিবদ্ধ করার উদ্দেশ্য :

    সহীহ বুখারীর রেওয়ায়েত অনুযায়ী যখন হযরত উসমান (রা.) হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর নেতৃত্বে কুরআনের মাসহাফ বিন্যাস দেওয়ার জন্য সাহাবায়ে কেরামের একটি দল নির্বাচন করলেন, তখন তিনি তাঁদেরকে বলেছিলেন-

    إِذَا اخْتَلَفْتُمْ أَنْتُمْ وَزَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ فِي شَيْءٍ مِنَ الْقُرْآنِ فَاكْتُبُوهُ بِلِسَانِ قُرَيْشٍ فَإِنَّمَا نَزَلَ بِلِسَانِهِمْ

    ‘যখন তোমাদের এবং যায়্যেদ ইবনে সাবেতের মাঝে কুরআনের কোনো অংশে মতানৈক্য হবে তখন তোমরা সেটাকে কুরাইশের ভাষা অনুযায়ী লিখবে। কেননা কুরআন তাঁদের ভাষায় নাযিল হয়েছে।’১৭৬

    হযরত উসমান (রা.) যদি সাত হরফের সবগুলোই অবশিষ্ট রাখতেন তাহলে তাঁর এ নির্দেশের উদ্দেশ্য কী?

    জবাব : এটি মূলত হযরত উসমান (রা.)-এর ওই বাক্য, যা দ্বারা হাফেয ইবনে জারীরসহ অন্যান্য উলামায়ে কেরাম বুঝে নিয়েছেন যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে মাসহাফে শুধু এক কুরাইশী হরফকে অবশিষ্ট রেখেছেন। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে যদি হযরত উসমান (রা.)-এর এ বাক্যটির উপর গভীরভাবে চিন্তা করা হয় তাহলে এ কথা বুঝে আসে যে, এ বাক্য দ্বারা এই উদ্দেশ্য নেওয়া সঠিক নয় যে, তিনি বাকি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন। বরং সবগুলো রেওয়ায়াতের প্রতি সামগ্রিকভাবে তাকালে বুঝে আসে যে, এ বাক্য দ্বারা হযরত উসমান (রা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল এই যে, যদি কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে রুসমেখতের দিক থেকে কোনো মতানৈক্য সৃষ্টি হয় তাহলে যেন কুরাইশী ভাষার রুসমেখত গ্রহণ করা হয়। এর প্রমাণ হলো, হযরত উসমান (রা.)-এর নির্দেশনার পর সাহাবায়ে কেরামের দলটি যখন কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার কাজ শুরু করেন তখন সমগ্র কুরআনুল কারীমের শুধু একটি স্থানে তাঁদের মাঝে মতানৈক্য হয়। ইমাম যুহরী (রহ.) যার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-

    فاختلفوا يومئذ في التابوت والتابوه فقال النفر القرشيون التابوت وقال زيد بن ثابت التابوه فرفع اختلافهم إلى عثمان فقال : اكتبوه التابوت فانه بلسان قريش نزل

    ‘অতঃপর “تابوت” এবং “تابوه” শব্দের মধ্যে এসে তাঁদের মাঝে মতানৈক্য সৃষ্টি হলো। কুরাইশী সাহাবায়ে কেরাম বললেন, এটাকে [দীর্ঘ তা] দ্বারা “تابوت” লিখা হোক। আর যায়্যেদ ইবনে সাবেত (রা.) বললেন, [গোল তা দ্বারা] “تابوه” লিখা হোক। পরে তাঁদের এই মতানৈক্য হযরত উসমান (রা.)-এর কাছে গিয়ে পৌঁছল। তখন তিনি বললেন “تابوت” লিখ। কেননা কুরআন কুরাইশী ভাষায় নাযিল হয়েছে।১৭৭

    অতএব, এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, হযরত উসমান (রা.) হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত এবং কুরাইশী সাহাবায়ে কেরামের মাঝে যে মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করেছেন এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো রসমখত-এর মতানৈক্য; ভাষাগত মতানৈক্য নয়।

    প্রশ্ন : ৩. সমার্থবোধক শব্দ দ্বারা তেলাওয়াতের মাসআলা :

    হযরত আবু বাকরা (রা.) সাত হরফের মতানৈক্যের যে ব্যাখ্যা করেছেন, তা দেখে বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হয় যে, এই সাত হরফ মাসহাফে উসমানীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। কেননা তিনি বলেন-

    أَنَّ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ قَالَ: يَا مُحَمَّدُ اقْرَأِ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفٍ، قَالَ مِيكَائِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ: اسْتَزِدْهُ، فَاسْتَزَادَهُ حَتَّى بَلَغَ سَبْعَةَ أَحْرُفٍ، قَالَ: كُلٌّ شَافٍ كَافٍ مَا لَمْ تَخْلِطْ آيَةَ عَذَابٍ بِرَحْمَةٍ، أَوْ آيَةَ رَحْمَةٍ بِعَذَابٍ نَحْوُ قَوْلِكَ تَعَالَ وَأَقْبِلْ، وَهَلُمَّ وَاذْهَبْ، وَأَسْرِعْ وَأَعْجِلْ “

    ‘জিবরাঈল (আ.) [রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে] বললেন, হে মুহাম্মাদ! কুরআনুল কারীমকে এক হরফের উপর পাঠ করুন। মিকাঈল (আ.) [রাসূল স.কে] বললেন, এর সাথে আরও [হরফ] সংযোজন করুন। ফলে তিনি সংযোজন করলেন। আর এভাবে তা সাতে গিয়ে পৌঁছল। জিবরাঈল (আ.) বললেন, এর প্রতিটিই নিরাময়কারী, যথেষ্ট। যতক্ষণ না আযাবের আয়াতকে রহমতের আয়াতের সাথে এবং রহমতের আয়াতকে আযাবের আয়াতের সাথে মিশ্রিত করবে। এটা এমন হবে যে, আপনি تعال [আস]-কে هلم – اقبل – اذهب – اسرع و عجل শব্দ দ্বারা আদায় করবেন।’১৭৮

    এই হাদীস থেকে বুঝে আসে যে, সাত হরফের মতানৈক্য মূলত সমার্থবোধক শব্দের মতানৈক্যই ছিল। অর্থাৎ এক হরফের ভিত্তিতে কোনো এক শব্দকে গ্রহণ করা হয়েছে। আবার অন্য হরফের ভিত্তিতে সে শব্দেরই সমার্থবোধক অন্য আরেকটি শব্দ গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ মাসহাফে উসমানীর মধ্যে যেসব কেরাত সংকলিত হয়েছে সেগুলোর মাঝে সমার্থবোধকের এই মতানৈক্য খুবই স্বল্প। ওই কেরাতগুলোর মাঝে অধিকাংশই হরকত [কারক চিহ্ন], সীগা [শব্দরূপ], পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ এবং সুর ও ভঙ্গিমার মতানৈক্য সংঘটিত হয়েছে।

    জবাব : সাত হরফের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আমরা যে বক্তব্যটি গ্রহণ করেছি, এতে কেরাতগুলোর মাঝে সাত প্রকারের মতপার্থক্য বর্ণনা করা হয়েছে। ওই প্রকারগুলোর মাঝে একটি প্রকার হলো, ‘বদল’ তথা সমার্থবোধক শব্দের মাধ্যমে পরিবর্তন করে পড়ার মতানৈক্য। হযরত আবু বাকুরা (রা.) এখানে সাত হরফের পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করেননি। বরং এর একটি উদাহরণ দিয়েছেন মাত্র। তাই মতানৈক্যের একটি মাত্র প্রকার অর্থাৎ শব্দের পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন।

    কেরাতের ভিন্নতার এই প্রকারটি অর্থাৎ শব্দের ভিন্নতা ইসলামের প্রাথমিক যুগে অনেক বেশি ছিল। যেহেতু গোটা আরববাসী কুরাইশী ভাষায় পুরোপুরি অভ্যস্ত ছিল না। তাই শুরুতে তাদেরকে এ সহজতা বেশি থেকে বেশি দেওয়া হয়েছিল যে, তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শ্রবণকৃত পরিবর্তনশীল শব্দগুচ্ছ থেকে যে কোনো একটি শব্দ দ্বারা তেলাওয়াত করবে। তাই শুরু শুরুতে অধিকতর এমন ছিল যে, এক কেরাতের মাঝে এক শব্দ এবং অন্য কেরাতের মাঝে এর সমার্থবোধক অন্য শব্দ রয়েছে। কিন্তু যখন মানুষ কুরআনের ভাষার সাথে পুরোপুরি পরিচিত হয়ে উঠল তখন কেরাতের ভিন্নতার এই প্রকারকে ধীরে ধীরে হ্রাস করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকালের পূর্বে রমযান মাসে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে দুইবার কুরআনুল কারীম দাওর করেন। ওই সময় অনেক শব্দ রহিত করা হয়েছে। আর এভাবে সমার্থবোধক শব্দগুলোর মতানৈক্যও হ্রাস পেয়ে গেল।

    উসমান (রা.) নিজের মাসহাফে সে সকল সমার্থবোধক শব্দ সংকলন করেননি, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আরযায়ে আখীরার সময় রহিত হয়ে গিয়েছিল। কারণ সেগুলোর অবস্থান ছিল তেলাওয়াত রহিত হওয়া আয়াতসমূহের ন্যায়। অবশ্য কেরাতের যে মতানৈক্য আরযায়ে আখীরায় অবশিষ্ট ছিল, হযরত উসমান (রা.) সেগুলোকে হুবহু বহাল রেখেছেন। অতএব, হযরত আবু বাকুরা (রা.) হরফের ভিন্নতার যে প্রকারটিকে উল্লিখিত হাদীসে উদাহরণ স্বরূপ পেশ করেছেন, তা ওই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত যার অধিকাংশ আরযায়ে আখীরার সময় রহিত হয়ে গিয়েছিল। এ জন্যই তা মাসহাফে উসমানীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি এবং বর্তমান কেরাতগুলোও সেগুলোকে শামিল করেনি।

    উপরোল্লিখিত ফলাফলটি তিনটি ভূমিকা থেকে আহরিত হয় :

    [এক.] আরযায়ে আখীরা [হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কুরআনের শেষ দাওর]-এর সময় কুরআনুল কারীমের বহু কেরাত রহিত করা হয়েছিল।

    [দুই.] হযরত উসমান (রা.) মাসহাফে উসমানীকে আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী বিন্যস্ত করেছেন।

    [তিন.] হযরত উসমান (রা.)-এর মাসহাফে সমার্থবোধক শব্দের ওই মতানৈক্য বিদ্যমান নেই যা হযরত আবু বাকরা (রা.) বর্ণনা করেছেন।

    তৃতীয় ভূমিকাটি তো একেবারে স্পষ্ট। আর দ্বিতীয় ভূমিকার প্রমাণপঞ্জি আমরা ইতোপূর্বে বর্ণনা করে এসেছি। যার মধ্যে সর্বাধিক স্পষ্ট দলীল হচ্ছে হযরত উবায়দা সালমানী (রহ.)-এর এই ইরশাদ যে, “হযরত উসমান (রা.) আমাদেরকে যে কেরাতের উপর সমবেত করেছেন, তা ছিল আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী।১৭৯

    এখন বাকি থেকে যায় প্রথম ভূমিকাটি। আর তা হলো, আরযায়ে আখীরার সময় অনেক কেরাত রহিত হয়ে গিয়েছিল। এর প্রমাণ হচ্ছে মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর এই ইরশাদ-

    ولا شك أن القرآن نسخ منه وغير فيه في العرضة الأخيرة فقد صح النص بذلك عن غير واحد من الصحابة وروينا بإسناد صحيح عن زر ابن حبيش قال قال لي ابن عباس أي القراءتين تقرأ؟ قلت الأخيرة قال فإن النبي صلى الله عليه وسلم كان يعرض القرآن على جبريل عليه السلام في كل عام مرة قال فعرض عليه القرآن في العام الذي قبض فيه النبي صلى الله عليه وسلم مرتين فشهد عبد الله يعني ابن مسعود ما نسخ منه وما بدل.

    ‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আরযায়ে আখীরার সময় কুরআনুল কারীম থেকে অনেক কিছু রহিত হয়ে গেছে এবং এতে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। কেননা একাধিক সাহাবী থেকে এর স্পষ্টতা উদ্ধৃত রয়েছে। আমাদের কাছে সহীহ সনদসূত্রে হযরত যর ইবনে হুবাইশ (রা.)-এর এ বক্তব্য পৌঁছেছে যে, ইবনে আব্বাস (রা.) আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কোন্ কেরাত পাঠ কর? আমি বললাম, শেষ কেরাত। তিনি বললেন, প্রতি বছর রাসূল সাল্লাল্লাহু

    আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে কেরাত শোনাতেন। যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেছেন, সে বছর তিনি দুই বার হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে কুরআন শুনিয়েছেন। ওই সময় যা কিছু রহিত হয়েছে এবং যা পরিবর্তন হয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) তার সাক্ষী ছিলেন।১৮০

    এর দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, আরযায়ে আখীরার সময় অনেক কেরাত স্বয়ং আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে রহিত করে দেওয়া হয়। হযরত আবু বাকরা (রা.) সমার্থবোধক শব্দের যে মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করেছেন, নিশ্চিত এর অধিকাংশই ওই সময় রহিত হয়ে গেছে। কেননা হযরত উসমান (রা.) আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন। এর মধ্যে সমার্থবোধক শব্দের মতানৈক্য খুবই শায বা বিরল।

    প্রশ্ন : ৪. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ও তাঁর মাসহাফ

    উপরোক্ত তাহকীকের উপর চতুর্থ প্রশ্ন এ হতে পারে যে, একাধিক রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণিত আছে যে, হযরত উসমান (রা.) যে মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এর প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন না এবং তিনি তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত সহীফাটিও আগুনে পোড়াননি। যদি হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত না করে থাকেন, তাহলে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর এ আপত্তির কারণটা কি ছিল?

    জবাব : প্রকৃতপক্ষে হযরত উসমান (রা.)-এর উপর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর দু’টি অভিযোগ ছিল। প্রথমটি হলো, কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার মহান কাজে তাঁকে কেন দায়িত্ব দেওয়া হলো না? দ্বিতীয়টি হলো, অন্যান্য মাসহাফগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হলো কেন?

    সুনানে তিরমিযীর এক বর্ণনায় ইমাম যুহরী (রহ.) প্রথম অভিযোগের আলোচনা করেছেন। যার সারাংশ হচ্ছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর এ অভিযোগ ছিল যে, কুরআন লিপিবদ্ধ করার মহান কাজ তাঁর দায়িত্বে কেন অর্পণ করা হলো না? যখন তিনি হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর তুলনায় অধিক সময় হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহচর্যে থেকে ধন্য হয়েছেন। হাফেয ইবনে হাজার (রহ.) এ অভিযোগটি উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, এ ব্যাপারে হযরত উসমান (রা.)-এর জবাব ছিল যে, তিনি এ মহান কাজটি পবিত্র মদীনায় আরম্ভ করেছিলেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) তখন কূফায় ছিলেন। আর হযরত উসমান (রা.) তাঁর অপেক্ষায় থেকে এ মহান কাজটিকে বিলম্বিত করতে চাচ্ছিলেন না। উপরন্তু হযরত আবু বকর (রা.)ও হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর উপরই এ দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। তাই হযরত উসমান (রা.)ও সমীচীন মনে করলেন যে, কুরআনের সংকলন এবং বিন্যাসের এ কাজটিও তাঁর হাতে সমাধা হোক।১৮১

    হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর দ্বিতীয় অভিযোগ ছিল এই যে, হযরত উসমান (রা.) নতুন মাসহাফ প্রস্তুত করার পর ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত সবগুলো মাসহাফ পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর তিনি তাঁর মাসহাফ পুড়িয়ে ফেলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। হযরত আবু মূসা আশআরী (রা.) এবং হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রা.) তাঁকে বুঝানোর জন্য তাঁর নিকট গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বললেন-

    والله لا أدفعه إليهم أقرأني رسول الله صلى الله عليه وسلم بضعا وسبعين سورة ثم أدفعه إليهم والله لا أدفعه إليهم

    ‘আল্লাহর শপথ! আমি এই মাসহাফ তাঁর নিকট সোপর্দ করব না। আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্তরের চেয়ে অধিক সূরা শিক্ষা দিয়েছেন। এরপরও আমি এই মাসহাফ তাঁকে দিয়ে দেব? আল্লাহর শপথ! আমি এটা তাঁকে দেব না।’১৮২

    যারা কূফায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর অনুকরণে ব্যক্তিগতভাবে মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) তাদেরকেও এ উৎসাহ দিলেন যে, তারা যেন তাদের মাসহাফ সোপর্দ না করে। হযরত খুমাইর ইবনে মালিক (রহ.) বলেন-

    أُمِرَ بِالْمَصَاحِفِ أَنْ تُغَيَّرَ قَالَ قَالَ ابْنُ مَسْعُودٍ مَنْ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ أَنْ يَغُلَّ مُصْحَفَهُ فَلْيَغُلَّهُ ….. قَالَ ثُمَّ قَالَ قَرَأْتُ مِنْ فَمِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَبْعِينَ سُورَةً أَفَأَتْرُكُ مَا أَخَذْتُ مِنْ فِي رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وعلى اله وصحبه وسلم.

    ‘মাসহাফগুলোর মাঝে পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হলো। তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) [মানুষকে] বললেন, তোমাদের মধ্যে যারা নিজের মাসহাফকে লুকাতে সক্ষম হও তারা লুকিয়ে রাখ।……………অতঃপর তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র যবান থেকে সত্তরটি সূরা শিখেছি। আমি কি ওই বিষয় ছেড়ে দেব, যা আমি সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র যবান থেকে অর্জন করেছি।১৮৩

    এ থেকে বুঝা যায় যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফটি উসমানী মাসহাফ থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল এবং তিনি সেটাকে সংরক্ষিত রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এর মধ্যে কোন্ বিষয়গুলো উসমানী মাসহাফ থেকে ভিন্নতর ছিল? সহীহ রেওয়ায়েতগুলোতে এর কোনো স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় না। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হয় যে, তাঁর মাসহাফের মৌলিক পার্থক্য ছিল সূরার বিন্যাস। আর এ কথা আগেও বলা হয়েছে যে, হযরত আবু বকর (রা.) যেসব সহীফায় কুরআন সংকলন করেছিলেন, সেগুলোতে সূরাগুলো পৃথক পৃথকভাবে লিপিবদ্ধ ছিল এবং সেগুলোতে কোনো বিন্যাস ছিল না। আর হযরত উসমান (রা.) যে কুরআন সংকলন করেছিলেন তাতে সূরাগুলো একটি বিশেষ বিন্যাস অনুযায়ী লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। ইমাম হাকেম (রহ.) লিখেন-

    أن جمع القرآن لم يكن مرة واحدة فقد جمع بعضه بحضرة رسول الله صلى الله عليه وسلم ثم جمع بعضه بحضرة أبي بكر الصديق والجمع الثالث هو في ترتيب السورة كان في خلافة أمير المؤمنين عثمان بن عفان رضى الله تعالى عنهم أجمعين

    ‘কুরআন সংকলনের কাজ এক বারেই সমাপ্ত হয়নি। বরং কুরআনুল কারীমের কিছু অংশ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপস্থিতিতেই সংকলন করা হয়েছিল। অতঃপর আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর যুগে আরো কিছু সংকলন করা হয়েছিল। অতঃপর কুরআন সংকলনের তৃতীয় পর্যায়ে সূরাগুলোকে বিন্যস্ত করা হয়েছিল। যা ছিল আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর শাসনামলে।১৮৪

    হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফ হযরত উসমান (রা.)-এর মাসহাফের সাথে বিন্যাসের দিক থেকে অনেক পার্থক্য ছিল। যেমন, এতে সূরা নিসা ছিল আগে আর সূরা আলে-ইমরান ছিল তার পরে।১৮৫ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) সম্ভবত এই বিন্যাস অনুযায়ীই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছ থেকে কুরআন শিখেছিলেন। তাই এই বিন্যাস অনুযায়ী কুরআনকে রাখাই তাঁর অভিপ্রায় ছিল। সহীহ বুখারীর একটি বর্ণনা দ্বারা এর সমর্থন পাওয়া যায়। ইরাকের এক অধিবাসী একদিন হযরত আয়েশা (রা.)-এর নিকট আসল এবং বলল-

    قال يا أم المؤمنين أريني مصحفك قالت لم ؟ قال لعلي أؤلف القرآن عليه فإنه يقرأ غير مؤلف قالت وما يضرك أيه قرأت قبل

    ‘সে বলল, হে উম্মুল মুমিনীন! আমাকে আপনার মাসহাফটি দেখান। হযরত আয়েশা (রা.) বললেন, কেন? লোকটি বলল, আমি [আমার] কুরআনের মাসহাফটি এর অনুকরণে বিন্যস্ত করব। কেননা তা [আমাদের এলাকায়] অবিন্যস্ত অবস্থায়ই পড়া হয়। হযরত আয়েশা (রা.) বললেন, কুরআনের যে অংশই আগে তুমি পড় না কেন, তা তোমার জন্য কোনো অসুবিধা হবে না।’১৮৬

    এই হাদীসের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনে হাজার (রহ.) লিখেন, এই ইরাকী ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর কেরাতের অনুসারী ছিলেন। আর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) যেহেতু নিজের মাসহাফে পরিবর্তন করেননি এবং তা বিলুপ্তও করেননি, তাই এর বিন্যাস উসমানী মাসহাফের বিন্যাসের চেয়ে ভিন্নতর ছিল। আর এ কথা তো স্পষ্ট যে, উসমানী মাসহাফের বিন্যাস অন্যান্য মাসহাফের বিন্যাসের তুলনায় অধিক সমীচীন ছিল। তাই এই ইরাকী লোকটি নিজের মাসহাফকে উসমানী মাসহাফের তুলনায় অবিন্যস্ত বলে আখ্যা দিয়েছেন।১৮৭

    এই হাদীস থেকে জানা যায় যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)- এর মাসহাফে মৌলিক পার্থক্য ছিল, সূরাগুলোর বিন্যাস। এ ছাড়া রুসমেখতের পার্থক্যও থাকতে পারে এবং এতে এমন রুসমেখত অবলম্বন করা হয়েছে যার মধ্যে উসমানী মাসহাফের ন্যায় সকল কেরাতের জন্য অবকাশ থাকে না। অন্যথায় যদি হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী বলা হয় যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে শুধু এক হরফের উপর কুরআন লিপিবদ্ধ করেছিলেন আর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফ সেই পরিত্যক্ত হরফের কোনো একটির উপর লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল, তাহলে নিম্নোক্ত অভিযোগগুলো আরোপিত হয়।

    ১. সহীহ বুখারীর উল্লিখিত হাদীসে ইরাকী ব্যক্তি শুধু সূরার বিন্যাসের পার্থক্যের কথা উল্লেখ করেছেন। নতুবা যদি হরফের পার্থক্যও হতো, তাহলে তা ছিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং অধিক গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হতো।

    ২. হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) ও অন্যান্যদের বক্তব্য অনুযায়ী সাত হরফ দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন সাত গোত্রের ভাষাকে বুঝানো হয়েছে। যদি এ কথা সঠিক হয়, তাহলে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ও হযরত উসমান (রা.)-এর মাসহাফের মাঝে কোনো পার্থক্য না থাকাই উচিত ছিল। কারণ এ বক্তব্য অনুযায়ী হযরত উসমান (রা.) সবাইকে কুরাইশী হরফের উপর সমবেত করে সে অনুযায়ী মাসহাফ লিপিবদ্ধ করিয়ে ছিলেন। আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)ও কুরাইশী ছিলেন।

    ৩. হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) ও তাঁর অনুসারীরা ছয় হরফ বিলুপ্ত করার স্বপক্ষে সবচেয়ে বড় দলীল হিসেবে ‘সাহাবায়ে কেরামের ইজমা’কে পেশ করেছেন। কিন্তু যদি হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) অন্য কোনো হরফের উপর পাঠ করে থাকেন এবং এর লিখনকেও জায়েয মনে করে থাকেন তাহলে এই ইজমা বা ঐক্যমত সংঘটিত হলো কি করে? যে ইজমার মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর ন্যায় বিজ্ঞ ফকীহ সাহাবী শামিল নেই। এটাকে ইজমা বলার যুক্তি কোথায়? কেউ কেউ এই দাবী করেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) পরবর্তীতে হযরত উসমান (রা.)-এর রায়কে মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো রেওয়ায়েত মজুদ নেই।

    হাফেয ইবনে হাজার (রহ.) লিখেন- ‘ইবনে আবী দাউদ (রহ.) “ইবনে মাসউদ (রা.)-এর পরবর্তীতে হযরত উসমানের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়া” শিরোনামে স্বতন্ত্র একটি অধ্যায় লিখেছেন। তবে তিনি এই অধ্যায়ের অধীনে এমন কোনো সুস্পষ্ট রেওয়ায়েত উল্লেখ করতে পারেননি, যা এই শিরোনামের সাথে যায়।১৮৮ হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)সহ অন্যান্যদের বক্তব্যের উপর আরোপিত এ অভিযোগগুলোর কোনো সমাধান পাওয়া যায় না। কাজেই এটাই বিশুদ্ধ কথা যে, হযরত উসমান (রা.) সাত হরফের সবগুলোই মাসহাফে উসমানীতে বাকি রেখেছেন। আর হযরত ইবনে মাসউদ (রা.)-এর এ অভিযোগ ছিল না যে, ছয় হরফকে কেন বিলুপ্ত করা হয়েছে?১৮৯ কারণ বাস্তবে এটা ঘটেই ছিল না। বরং তাঁর অভিযোগটা ছিল এই যে, যে মাসহাফগুলো পূর্ব থেকেই লিপিবদ্ধ ছিল এবং যেগুলোর বিন্যাস ও রুসমেখত উসমানী মাসহাফ অনুযায়ী ছিল না, সেগুলো সঠিক হওয়া সত্ত্বেও নষ্ট করা হচ্ছে কেন?

    আলোচনার ফলাফল

    “সাত হরফ”-এর আলোচনা অনুমানের চেয়ে অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে। তাই অবশেষে এ থেকে অর্জিত ফলাফলের সারাংশ সংক্ষিপ্তাকারে পেশ করে দেওয়া সমীচীন মনে করছি। যেন স্মরণ রাখতে সহজ হয়।

    ১. উম্মতের সহজ-সাধ্যের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার নিকট আবেদন করেন যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতকে যেন শুধু একটি পদ্ধতিতেই সীমাবদ্ধ রাখা না হয়। বরং বিভিন্ন পদ্ধতিতে যেন তেলাওয়াতের অনুমতি প্রদান করা হয়। এর প্রেক্ষিতেই সাত হরফের উপর কুরআন নাযিল করা হয়েছে।

    ২. সাত হরফে নাযিল হবার সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য উদ্দেশ্য হলো, এর কেরাতের মধ্যে সাত প্রকারের বিভিন্নতা রাখা হয়েছে। যার আওতায় অনেকগুলো কেরাত অস্তিত্বে এসে গেছে।

    ৩. শুরু শুরুতে মতানৈক্যের সাত প্রকারের মধ্যে শব্দমালা ও সমার্থবোধক শব্দের মতানৈক্যের প্রকারটি বেশ ব্যাপক ছিল। অর্থাৎ এমনটি অধিকতর হতো যে, এক কেরাতে এক শব্দ আর অন্য কেরাতে সে শব্দেরই সমার্থবোধক অন্য একটি শব্দ হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন আরববাসী কুরআনী ভাষার সাথে পরিচিত হতে লাগল তখন মতানৈক্যের এই প্রকারটিও হ্রাস পেয়ে গেল। এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মৃত্যুর পূর্বে রমযান মাসে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে সর্বশেষ দাওর [আরযায়ে আখীরা] করলেন তখন এর মধ্যে এ ধরনের মতানৈক্য শূন্যের কোঠায় পৌঁছিয়ে দেওয়া হলো। বেশির চেয়ে বেশি শব্দরূপ, পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ, একবচন, বহুবচন, মারূফ [কর্তৃবাচ্য], মাজহুল [কর্মবাচ্য] এবং সুর-ভঙ্গিমার মতানৈক্য বাকি থাকল।

    ৪. আরযায়ে আখীরার সময় যে সব মতানৈক্য অবশিষ্ট ছিল, হযরত উসমান (রা.) সেগুলোকে মাসহাফে এমনভাবে সংকলন করেছিলেন যে, সেগুলোকে নুকতা [বিন্দু] ও হরকত [কারক চিহ্ন] থেকে মুক্ত রেখেছিলেন। এর ফলে এতে কেরাতের অধিকাংশ মতানৈক্যের সংকুলান হয়ে গেছে। আর যেসব কেরাতের এভাবে এক মাসহাফে সংকুলান হয়নি সেগুলোকে অন্য মাসহাফে প্রকাশ করা হয়েছে। এর ভিত্তিতেই উসমানী মাসহাফে কোথাও কোথাও এক-এক, দুই-দুই শব্দের মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে।

    ৫. হযরত উসমান (রা.) এভাবে সাতটি মাসহাফ লিপিবদ্ধ করিয়েছেন এবং সেগুলোতে সূরাগুলোরও বিন্যাস দিয়েছেন। যখন হযরত আবু বকর (রা.) কর্তৃক সংকলিত মাসহাফগুলোতে সূরার কোনো বিন্যাস ছিল না। সাথে সাথে কুরআনুল কারীমের জন্য একটি রুসমেখতও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর যেসব মাসহাফ এই বিন্যাস ও রুসমেখতের বিপরীত ছিল সেগুলোকে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছেন।

    ৬. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফের বিন্যাস উসমানী মাসহাফের চেয়ে ভিন্ন ছিল। তিনি যেহেতু তাঁর বিন্যাসকে বাকি রাখতে চেয়েছিলেন তাই তিনি তাঁর মাসহাফকে অগ্নিতে ভস্ম করার জন্য হযরত উসমান (রা.)-এর হাতে সোপর্দ করেননি।

    সাত হরফের ব্যাপারে একটি ভুল ধারণার অপনোদন

    অবশেষে আরেকটি মৌলিক ভুল ধারণার অপনোদন করা আবশ্যক। আর সেটা হলো, “সাত হরফ”-এর উপরোক্ত আলোচনার পাঠক স্থূল দৃষ্টিতে এ সন্দেহ ও সংশয়ে পড়তে পারে যে, মহান আল্লাহর সংরক্ষণে কুরআনুল কারীমের ন্যায় মহাগ্ৰন্থ আজ পর্যন্ত কোনো ধরনের সামান্যতম পরিবর্তন ব্যতিরেকে সংরক্ষিত হয়ে চলে আসছে। এতদসত্ত্বেও মুসলমানদের মাঝে সাত হরফ নিয়ে এত বড় মতানৈক্য সৃষ্টি হলো কি করে?

    কিন্তু সাত হরফের আলোচনায় আমরা পেছনে যেসব মতামত ও বক্তব্য উল্লেখ করে এসেছি যদি গভীর দৃষ্টিতে সেগুলোকে অধ্যয়ন করা হয় তাহলে অতি সহজেই এসব সন্দেহ ও সংশয়ের অপনোদন হয়ে যায়। যে ব্যক্তিই এই মতানৈক্যের হাকীকত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করবে, তার কাছে এ কথাটা একেবারেই স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এ সকল মতানৈক্য স্রেফ যুক্তি-তর্ক ও চিন্তা-প্রসূত। বাস্তব ক্ষেত্রে কুরআনের সত্যতা ও বাস্তবতা এবং কুরআন সংরক্ষিত থাকার উপর এই মতানৈক্যের বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়ে না। কারণ এ কথার উপর সবাই ঐক্যমত পোষণ করেন যে, বর্তমানে আমাদের নিকট যে আকৃতিতে কুরআনুল কারীম বিদ্যমান আছে, তা তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় আমাদের নিকট চলে আসছে। এতে সামান্য কোনো পরিবর্তনও হয়নি। এ কথার ওপরও সকল উলামায়ে কেরাম একমত যে, কুরআনুল কারীমের যতগুলো কেরাত তাওয়াতুরের সাথে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে, সবগুলোই সহীহ। এগুলোর প্রত্যেকটি অনুযায়ীই কুরআনুল কারীম তেলাওয়াত করা যায়। আবার এ কথার ওপরও উম্মতের ইজমা বা ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, মুতাওয়াতির কেরাত ব্যতীত অপ্রচলিত ও বিরল যত কেরাত বর্ণিত রয়েছে সেগুলোকে কুরআনুল কারীমের অংশ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ কথাও সর্বসম্মত যে, আরযায়ে আখীরা অথবা তারও পূর্বে যে সকল কেরাতকে রহিত করা হয়েছে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশনা অনুযায়ী সেগুলো কুরআনের অংশ হতে পারেনি। এ কথাও সবার নিকট সকল সন্দেহের ঊর্ধ্বে যে, কুরআনুল কারীমের সাত হরফের মধ্যে যে মতানৈক্য ছিল, তা ছিল শুধু শব্দগত। কিন্তু অর্থের দৃষ্টিকোণ থেকে সবগুলো হরফ ছিল অভিন্ন। সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি কুরআনুল কারীমের এক কেরাত বা এক হরফ অনুযায়ী কুরআন পাঠ করে তাহলে কুরআনের বিষয়বস্তু তার অর্জিত হয়ে যাবে এবং কুরআনের দিক-নির্দেশনা অর্জন করার জন্য অন্য কোনো হরফ জানার প্রয়োজন পড়বে না। এর মাঝেও সামান্য কোনো মতানৈক্য নেই যে, হযরত উসমান (রা.) যে মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন, তা পরিপূর্ণ সতর্কতা, হাজার হাজার সাহাবায়ে কেরামের সাক্ষ্য এবং গোটা মুসলিম উম্মাহ’র সত্যায়নের সাথে করেছিলেন। আর তাতে কুরআনুল কারীম ঠিক সেভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে যেভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এতে কোনো একজন মানুষেরও মতপার্থক্য হয়নি।১৯০

    অতএব, যে মতানৈক্যের কথা পেছনের পৃষ্ঠাগুলোতে করা হয়েছে তা শুধু এ ব্যাপারে যে, হাদীসে “সাত হরফ” দ্বারা উদ্দেশ্য কি ছিল? বর্তমানে যত মুতাওয়াতির কেরাত বিদ্যমান রয়েছে, তা কি সাত হরফের উপর সন্নিবিষ্ট নাকি এক হরফের উপর? তা একটা যুক্তিগত ও দার্শনিক মতপার্থক্য মাত্র। যার দ্বারা জ্ঞানগত কোনো পার্থক্য সৃষ্টি হয় না। তাই এর দ্বারা এ ধারণা করা একদম ভুল হবে যে, এসব মতানৈক্যের কারণে [নাউযুবিল্লাহ] কুরআনুল কারীম বিতর্কিত হয়ে গেছে! এর উপমা কিছুটা এমন যে, একটি গ্রন্থের ব্যাপারে পুরো পৃথিবীর মানুষ ঐক্যমত পোষণ করে যে, এটা অমুক গ্রন্থকারের রচিত। ওই গ্রন্থকারের প্রতি এই গ্রন্থের সম্বন্ধ করা নির্ভরযোগ্য। আর তিনি স্বয়ং ছাপিয়ে সেটার সত্যায়নও করলেন যে, এটা আমার রচিত গ্রন্থ এবং এ কপির আদলে এটা কেয়ামত পর্যন্ত ছাপানো যেতে পারে। পরবর্তীতে মানুষের মাঝে এ মতানৈক্য সৃষ্টি হলো যে, ছাপানোর পূর্বে গ্রন্থকার তার পাণ্ডুলিপিতে শব্দগত কোনো পরিবর্তন-পরিবর্ধন করেছেন? নাকি প্রথমে যেমন ছিল তেমনি সেটাকে প্রকাশ করেছেন? এটা স্পষ্ট যে, শুধু এতটুকু দার্শনিক মতপার্থক্যের উপর ভিত্তি করে ওই হাকীকত বিতর্কিত হতে পারে না, যার উপর সবাই ঐক্যমত পোষণ করেছে। অর্থাৎ এটা ওই গ্রন্থ যা গ্রন্থকার নিজেই ছাপিয়েছেন এবং নিজের দিকে এর সম্বন্ধ করেছেন। আর কেয়ামত পর্যন্ত এটাকে প্রকাশ করার অনুমতিও প্রদান করেছেন। ঠিক তদ্রূপ গোটা উম্মত যখন এ কথার উপর একমত যে, কুরআনুল কারীমকে মাসহাফে উসমানীতে হুবহু সেভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে যেভাবে তা অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এর সকল মুতাওয়াতির কেরাত বিশুদ্ধ ও আল্লাহর পক্ষ হতে নাযিলকৃত তখন এই হাকীকত ওই সব দার্শনিক মতপার্থক্যের ভিত্তিতে বিতর্কিত হতে পারে না, যা সাত হরফের ব্যাখ্যায় উপস্থাপিত হয়েছে। [আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।]

    তথ্যসূত্র:

    ১১৯. সহীহ বুখারী, কাসতালানীসহ ৭/৪৫৩ “ফাযায়িলে কুরআন অধ্যায় ।

    ১২০. ইবনে জাযারী : আন-নাশরু ফী কিরাআতিল আশ্‌র ১/২১

    ১২১, প্রাগুক্ত

    ১২২. যারকাশী : আল-বুরহান ফী উলুমিল কুরআন : ১/২১২

    ১২৩. আওজাযুল মাসালিক : ২/৩৫৬ সাহারানপুর ৷

    ১২৪. মুসাফ্ফা শরহে মুয়াত্তা : ১/১৮৭ দিল্লী ১২৯৩ হিজরী ।

    ১২৫. মানাহিলুল ইরফান : ১/১৩৩

    ১২৬. মানাহিলুল ইরফান : ১/১৩৩

    ১২৭. তাফসীরে ইবনে জারীর ১/১৫

    ১২৮. ফাতহুল বারী : ৯/২২, রুহুল মাআনী : ১/২১

    ১২৯. আন নশরু ফিল কিরআতিল আশৃর : ১/২৫ ফাতহুল বারী : ৯/২৩

    ১৩০. রুহুল মাআনী : ১/২১

    ১৩১. আত্‌ তাহাভী : মুশকিলুল আসার : ৪/১৮৫-১৮৬

    ১৩২. সহীহ বুখারী : (কুরআন সংকলন অধ্যায়)

    ১৩৩. মুশকিলুল আসার : [তহাভী] : ৪/১৮৬-১৯১

    ১৩৪. ফাতহুল বারী : ৯/২২-২৩

    ১৩৫. আয-যুরকানী : শরহে মুয়াত্তা : ২/১১

    ১৩৬. রেওয়ায়েতটি ইমাম আহমদ (রহ.) বর্ণনা করেছেন। এর সনদ নির্ভরযোগ্য। (আওজাযুল মাসালিক : ২/৩৫৭)

    ১৩৭. নিশাপুরী : “গারায়েবুল কুরআন ওয়া রাগায়েবুল ফুরকান” : টীকা ইবনে জারীর : ১/২১ মিসর

    ১৩৮. ইবনে কুতাইবা, আবুল ফযল রাযি এবং ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর মতামত : ফাতহুল বারী : ৯/২৫-২৬, ইতকান : ১/৪৭ গ্রন্থে বিদ্যমান রয়েছে। আর কাষী ইবনে তাইয়্েব (রহ.)-এর মত তাফসীরে করতুবী ১/৪৫-এ দেখা যেতে পারে ।

    ১৩৯. আন নশরু ফী কিরাতিল আশর : ১/২৬

    ১৪০. ফাতহুল বারী : ৯/২৪

    ১৪১. আন নশরু ফী কিরাতিল আশর : ১/২৭-২৮

    ১৪২. ফাতহুল বারী : ৯/২৪

    ১৪৩. মানাহিলুল ইরফান ফী উলূমিল কুরআন : ১/১৫৪-১৫৬

    ১৪৪. ফাতহুল বারী: ৯/২৪

    ১৪৫. আন-নশরু ফী কেরআতিল আশর: ১/২০

    ১৪৬. তিরমিযী: ২/১৩৮, কুরআন মহল, করাচী।

    ১৪৭. মুশকিলুল আসার: ৪/১৮৫

    ১৪৮. তাফসীরে ইবনে জারীর: ১/১৫

    ১৪৯. বিস্তারিত প্রত্যাখ্যানের জন্য দেখুন: আল-ইতকান ১/৪৯

    ১৫০. তাফসীরে ইবনে জারীর: ১/১৫

    ১৫১. সম্মানিত সেই আলেমগণের তালিকা সামনে আসবে।

    ১৫২. সহীহ বুখারী, উমদাতুল কারী সহ ১২/২৫৮

    ১৫৩. আন-নশরু ফী কিরআতিল আশর : ১/৩১

    ১৫৪. সম্ভবত এখানে কাযী ইয়াযকে বুঝানো হয়েছে।

    ১৫৫. উমদাতুল কারী : [কিতাবুল খুসুমাত] : ১২/২৫৮, বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন : আন-নশরু ফী কিরআাতিল আশর : ১/১৮-১৯

    ১৫৬. সম্ভবত কাযী বকর বাকিল্লানী (রহ.) উদ্দেশ্য। কারণ এই এবারতই ইমাম নববী (রহ.) কাযী বাকিল্লানী (রহ.)-এর নামে উদ্ধৃত করেছেন।

    ১৫৭. আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন : ১/২২৩

    ১৫৮. আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.)-এর এ উক্তি তখনই প্রযোজ্য হবে যখন বলা হবে যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছেন [নাউযুবিল্লাহ]। তবে এ কথা সুস্পষ্ট যে, হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর উক্তি মতে তিনি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করেননি। বরং সেগুলোর কেরাতকে বর্জন করেছেন মাত্র। তাই যদিও হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর উক্তি সঠিক, কিন্তু এত কঠোর ভাষার উপযোগী নন।

    ১৫৯. আল-ফাসলু ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল : ২/৭৭-৭৮

    ১৬০. আল-মুনতাকা শারহে মুয়াত্তা : ১/৩৪৭

    ১৬১. আল-মুসতাসফা : ১/৬৫

    ১৬২. মিরকাতুল মাফাতীহ : ৫/১৬

    ১৬৩. আন-নশরু ফী কিরাআতিল আশর : ১/৩৩

    ১৬৪. আল-মুসাফফা : পৃঃ ১৮৭

    ১৬৫. এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সাত কেরাতের মধ্যে কোনো কোনো কেরাত সাত হরফের অন্তর্ভুক্ত। যেমন, সমস্ত মুতাওয়াতির কেরাত সাত হরফের অন্তর্ভুক্ত। আবার কোনো কোনো কেরাত এমন আছে যা সাত হরফের অন্তর্ভুক্ত নয়। যেমন, সাত কারীদের বিরল কেরাতসমূহ অথবা মতানৈক্যমুক্ত কেরাতসমূহ। আবার সাত হরফের কোনো কোনো মতভেদ এমন আছে যা সাত কেরাতের মধ্যে শামিল নয়। যেমন, ইমাম ইয়াকুব (রহ.), ইমাম আবু যাফর (রহ.) ও খালাফ (রহ.)-এর মুতাওয়াতির কেরাতসমূহ। এগুলো যদিও সাত হরফের মধ্য হতে; কিন্তু প্রসিদ্ধ সাত কেরাতের মধ্য হতে নয়। -মুহাম্মদ তাকী।

    ১৬৬. ফয়যুল বারী : ৩/৩২১-৩২২

    ১৬৭. মাকালাতুল কাউসারী : পৃ : ২০-২১

    ১৬৮. মানাহিলুল ইরফান : ১/১৫১

    ১৬৯. মুশকিলুল আছার : ৪/১৯৩

    ১৭০. কানযুল উম্মাল : ১ম খণ্ড, হাদীস নং ৪৮৪

    ১৭১. ইবনে সা’দ রচিত আত-তবকাতুল কুবরা : ২/১৯৫

    ১৭২. সহীহ মুসলিম : ১/২৭৩

    ১৭৩. ইবনে আবী দাউদ (রহ.) রচিত “কিতাবুল মাসাহিফ” পৃ : ২২, ফাতহুল বারী : ৯/১৫

    ১৭৪. আল-ইতকান : ১/৬১

    ১৭৫. বহু উলামায়ে কেরাম হযরত উসমান (রা.)-এর এ পদক্ষেপের এই ব্যাখ্যাই করেছেন। দেখুন, আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.) রচিত “الفصل فى الملل والاهواء والنحل”-এর ৭ম খণ্ডের ৭৭ নং পৃষ্ঠা; মাওলানা আবদুল হক হক্কানী (রহ.) রচিত “البيان فى علوم القرآن”-এর দ্বিতীয় অধ্যায় দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ, পৃ. ৫৮; এবং মাবাহেস ফি উলুমিল কুরআন : ১/২৪৮-২৫৬

    ১৭৬. সহীহ বুখারী [ফাতহুল বারী সহ] : ৯/১৬

    ১৭৭. কানযুল উম্মাল : ১/২৮২ হাদীস নং ৪৭৮৩

    ১৭৮. রেওয়ায়েতটি ইমাম আহমদ (রহ.) বর্ণনা করেছেন। এর সনদ নির্ভরযোগ্য। (আওজাযুল মাসালিক : ২/৩৫৭)

    ১৭৯. কানযুল উম্মাল : ১/২৮৬ হাদীস নং ৪৮৪

    ১৮০. আন-নশরু ফী কিরআতিল আশর : ১/৩২, হাফেয ইবনে হাজার (রহ.)-ও বিভিন্ন মুহাদ্দিসীনের বরাত দিয়ে এ বিষয়ে একাধিক রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন। (ফাতহুল বারী : ৯/৩৬)

    ১৮১. ফাতহুল বারী : ৯/১৬

    ১৮২. মুসতাদরাক হাকেম : ২/২২৮, হাকেম (রহ.) বলেন, এটা সহীহ সনদবিশিষ্ট হাদীস। আল্লামা যাহাবী (রহ) তা সত্যায়ন করেছেন।

    ১৮৩. আল-ফাতহুর রব্বানী : ১৮/৩৫

    ১৮৪. মুসতাদরাক হাকেম : ২/২২৯

    ১৮৫. আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) ইবনে আশতা (রহ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে হযরত ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফের বিন্যাস সম্পূর্ণ নকল করেছেন। মাসহাফে উসমানীর সাথে যার প্রচুর গড়মিল রয়েছে। (আল-ইতকান : ১/৬৬

    ১৮৬. সহীহ বুখারী : কুরআন সংকলন অধ্যায়।

    ১৮৭. ফাতহুল বারী : ৯/৩২

    ১৮৮. ফাতহুল বারী : ৯/৪০

    ১৮৯. মুসনাদে আহমদের মধ্যে কেবল একটি রেওয়ায়েত এমন পাওয়া যায়, যা দ্বারা বাহ্যিকভাবে মনে হয় যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এর উপরই আপত্তি করেছিলেন। (ফাতহুর রাব্বানী : ১৮/৩৬) কিন্তু এটা এক মাজহুল তথা অপরিচিত ব্যক্তি থেকে বর্ণিত বলে নির্ভরযোগ্য নয়।

    ১৯০. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) নিজের মাসহাফকে বাকি রাখার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু মাসহাফে উসমানীর কোনো কথার উপর তিনি বিন্দুমাত্রও দ্বিমত পোষণ করেননি।