তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
উম্মাহর বার্তা

নিম্নে আল-ওয়াই ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ দেওয়া হল, আরবি থেকে অনুদিত
উম্মাহর বার্তা (رسالة الأمة)
আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা যেমন মানুষের মধ্যে প্রাণশক্তি (Vital energy) নিহিত রেখেছেন, যা তাকে তার প্রবৃত্তি ও জৈবিক চাহিদা মেটাতে তাড়িত করে—যা মানুষকে বুদ্ধিবৃত্তিক সৃজনশীলতা, নিরন্তর তৎপরতা এবং সর্বোত্তম ও নিখুঁতভাবে তৃপ্তি লাভের জন্য সর্বোচ্চ শারীরিক প্রচেষ্টা ব্যয় করতে পরিচালিত করে—তেমনিভাবে তিনি কোনো জাতির উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য একটি নিয়ম বা সুন্নাহ নির্ধারণ করেছেন। আর তা হলো পার্থিব জীবনে তাদের একটি ‘রিসালাত’ বা বার্তার উপস্থিতি, যা ধারণ করে তারা বেঁচে থাকে এবং যার জন্য তারা বাঁচে। এটি তাদের সুপ্ত শক্তিকে জাগ্রত করে, তাদের প্রতিভাকে বিকশিত করে এবং তাদের উন্নতি ও পুনর্জাগরণের উৎস হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং, জাতির জন্য এমন একটি বার্তার উপস্থিতি অপরিহার্য, যার জন্য তারা বাঁচবে এবং যাকে রক্ষা করতে গিয়ে তারা হাসিমুখে শাহাদাত বরণ করবে। বস্তুত, কোনো জাতিই এমন কোনো বার্তা গ্রহণ করা ছাড়া জেগে উঠতে বা ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
বিভিন্ন জাতির বার্তার মধ্যে এর উৎসের দিক থেকে পার্থক্য রয়েছে—তা কি ঐশী ওহী নাকি মানুষের বুদ্ধিপ্রসূত (যার ওপর ভিত্তি করে এর বিশুদ্ধতা বা ভ্রষ্টতা নির্ধারিত হয়)। তদুপরি, এর স্থায়িত্ব বা বিলুপ্তি, এবং তা কি সমগ্র বিশ্ব ও সকল জাতির জন্য প্রযোজ্য নাকি কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট অবস্থায় শুধু এর অনুসারীদের জন্য প্রযোজ্য—এসব দিক থেকেও পার্থক্য বিদ্যমান। তবে এতদসত্ত্বেও, প্রতিটি বার্তাই এর বাহক জাতির ওপর ঠিক ততটাই প্রভাব ফেলেছে, যতটা কল্যাণ ও স্থায়িত্ব তার মধ্যে বিদ্যমান ছিল।
এটি সর্বজনবিদিত যে, ‘রিসালাত’ বা বার্তা হলো দ্বীন, অথবা আধুনিক পরিভাষায় এটি হলো একটি মতাদর্শ (মাবদা’)। আর এই বার্তাটি অবশ্যই এমন একটি মৌলিক চিন্তা হতে হবে যা মানুষের জীবনের পূর্ববর্তী অবস্থা, পরবর্তী অবস্থা এবং বর্তমান জীবন ও তার নিত্যনতুন সমস্যাগুলো সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। এটি জীবনের সাথে তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জীবনের সম্পর্ক (সংযুক্ত নাকি বিচ্ছিন্ন) নির্ধারণ করবে। এই মৌলিক চিন্তার ওপর ভিত্তি করেই জীবনের ব্যবস্থাগুলো গড়ে উঠবে এবং জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে এমন একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করবে যা ব্যক্তি ও সমাজের সুখ নিশ্চিত করে। এই সুখ নিশ্চিত করার বিষয়টি অন্য কোনো ব্যক্তি বা সমাজের সুখের সাথে সাংঘর্ষিক হবে না; বরং, এটি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করলে তা সকলের জন্যই সুখ নিশ্চিত করবে।
আজ আমরা যদি বিশ্বের দিকে তাকাই, তবে দেখতে পাব যে বিভিন্ন জাতি একসময় যেসব বার্তা ধারণ করেছিল, সেগুলো মৃত ও বিলুপ্ত হয়ে গেছে, অথবা সেগুলোর অনুসারীরা তা ধারণ করা ছেড়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক জীবনের সংগ্রামমুখর ময়দানে আজ পশ্চিমাদের বার্তা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, অর্থাৎ সেই পুঁজিবাদী মতাদর্শ যা গণতন্ত্র, সাধারণ স্বাধীনতা এবং মুক্ত অর্থনীতির ডাক দেয়। কিন্তু পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজেদের দেশে এই মতাদর্শ যেভাবে বোঝে ও প্রয়োগ করে, অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে তা সেভাবে প্রয়োগ করে না। পশ্চিমা বিশ্ব পুঁজিবাদী মতাদর্শকে একটি সাম্রাজ্যবাদী বার্তা হিসেবে গ্রহণ করেছে, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের জাতির কল্যাণের জন্য অন্য জাতিগুলোকে শোষণ করতে এবং জনগণের রক্ত চুষে নিতে সচেষ্ট। তারা পুরো বিশ্বকে নিজেদের চারণভূমি মনে করে। এই বার্তাটি এখন জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে, এর দুর্নীতি প্রকাশ পেয়েছে এবং এটি এমন কিছু পর্যায় অতিক্রম করেছে যা প্রমাণ করে যে এটি ধ্বংসের পথে। পৃথিবীর বুকে পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক শক্তি এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য টিকে থাকার কারণেই কেবল এটি এখনও টিকে আছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দুর্নীতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো আমাদের সমাজের বর্তমান বাস্তবতা। মুসলিম দেশগুলোর সমাজ আজ অর্থনৈতিক, শাসনব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক এবং মিডিয়া—সবদিক থেকেই পশ্চিমাদের বার্তা তথা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। তা সত্ত্বেও, এই সমাজ আজ এক ভয়ানক বাস্তবতায় বাস করছে; পশ্চিমাদের দাসত্ব করছে, এক নজিরবিহীন বিভাজন ও ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে, তাদের ইচ্ছাশক্তি হরণ করা হয়েছে, পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে এবং সর্বস্তরে তারা অক্ষম হয়ে পড়েছে।
ইসলামি উম্মাহর আজ সময় এসেছে পশ্চিম ও তাদের মতবাদ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন তাদের নিজস্ব অনন্য বার্তায় ফিরে যাওয়ার। যে সন্তানেরা পশ্চিমা সভ্যতার চাকচিক্যে প্রতারিত হয়েছিল, তারা বাস্তবে প্রমাণ পেয়েছে যে অন্যদের বার্তা ও মতাদর্শ আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। তারা উপলব্ধি করেছে যে তাদের নিজস্ব অনন্য বার্তাটি হলো এর সঠিক ও বিশুদ্ধ ধারণায় ‘ইসলামি বার্তা’। এটি একটি সর্বজনীন মতাদর্শিক ধারণা। এই বার্তার নিজস্ব একটি দর্শন—একটি মৌলিক চিন্তা—রয়েছে, যা জীবনের আগের অবস্থা, জীবনের পরের অবস্থা এবং খোদ জীবনের বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করে। এটি এই দর্শনকে একটি আকীদায় (বিশ্বাস) রূপ দেয়, যার ভিত্তিতে এর অনুসারীকে মুমিন অথবা কাফির হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই দর্শনের উপরই জীবনের সকল ব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং সে অনুযায়ী সংবিধান প্রণীত হয়। এটি এমন কোনো নিছক আধ্যাত্মিক দর্শন নয় যা কেবল আধ্যাত্মিক আত্মসমর্পণের উপর ভিত্তি করে, আবার এটি কোনো বস্তুগত বা অর্থনৈতিক দর্শনও নয় যা কেবল বস্তু বা অর্থনীতির উপর ভিত্তি করে।
এর দৃষ্টিতে মানুষ কেবল পুণ্যে ভরা কোনো ফেরেশতা বা উচ্চতর সত্তা নয়, আবার চাকার ভেতরের দাঁত (spoke) বা যান্ত্রিকভাবে কাজ করা কোনো যন্ত্রের মতো জড়বস্তুও নয়। বরং মানুষ এমন এক সত্তা যার মধ্যে আত্মা, বুদ্ধি, অনুভূতি এবং আবেগ রয়েছে; একই সাথে তার শরীর, জৈবিক চাহিদা এবং প্রবৃত্তিও রয়েছে। মানুষ সম্পর্কে এই বাস্তব ধারণার উপর ভিত্তি করেই এর দর্শন বস্তু ও রূহ (spirit)-এর এমন এক নিখুঁত সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে, যা অবিচ্ছেদ্য। এদের আলাদা করার চেষ্টা করা হলে তা ইসলামের মূল দর্শনের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়াবে। তাই শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক দিকটিকে ইসলাম বলা যায় না, আবার শুধুমাত্র বস্তুগত দিকটিকেও ইসলাম বলা যায় না। বরং উভয় দিকের এমন এক পূর্ণাঙ্গ সংমিশ্রণকেই ইসলাম বলা হয়, যা এদেরকে এমন এক একক সত্তায় পরিণত করে যেখানে একটি দিক অন্যটি থেকে আলাদা করা যায় না। সুতরাং, যে ইসলামি বার্তার উপর এর সভ্যতা দাঁড়িয়ে ছিল এবং এখনও দাঁড়িয়ে আছে, তা অন্য কোনো দর্শনের সাথে একমত নয় যা কেবল বস্তু (mundane)-কে বা কেবল রূহ (divine)-কে চূড়ান্ত আদর্শ বলে মনে করে; বরং এতে বস্তু (material world) ও রূহ (divine ordinance)-এর সংমিশ্রণ হওয়া অপরিহার্য।
আর এ কারণেই ইসলামের বার্তার দর্শন খৃষ্টান বার্তার দর্শন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, কারণ খৃষ্টান দর্শন কেবল আধ্যাত্মিক; এবং এটি কমিউনিজম বা পুঁজিবাদের দর্শনের থেকেও আলাদা, কারণ এই দুটি পুরোপুরি বস্তুগত।
ইসলামি বার্তা তার সম্প্রসারণ (توسع), প্রভাব বিস্তার (تأثير) এবং প্রসারের (انتشار) সক্ষমতার জন্য অনন্য। এর সম্প্রসারণ বলতে বোঝায় যে, এটি যেকোনো যুগের যেকোনো সমস্যার সমাধান কুরআন ও সুন্নাহ থেকে বিধান (হুকুম) বের করার মাধ্যমে প্রদান করে। এর প্রভাব আসে এই কারণে যে, ইসলাম মানুষের বুদ্ধি বা বিবেকের সাথে কথা বলে এবং মানুষের সহজাত প্রকৃতির (ফিতরাত) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর এর প্রসার ঘটে কারণ এটি কেবল নির্দিষ্ট কোনো পরিবেশের সমস্যা হিসেবে নয়, বরং মানুষ হিসেবে মানুষের সমস্যার সমাধান করে। ফলে সময়ের আবর্তন এর বৈশিষ্ট্যগুলো মুছে ফেলতে, এর দিকগুলোতে বৈপরীত্য সৃষ্টি করতে বা এর অর্থ হারিয়ে ফেলতে পারে না। ঘটনাপ্রবাহের বিকাশ, সময়ের পরিবর্তন এবং ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশের সামনেও এটি স্থবির হয়ে পড়ে না।
একই সাথে, ইসলামি বার্তা স্থায়িত্ব ও ব্যাপকতার অধিকারী। এটি এমন কিছু সাধারণ ও সর্বজনীন নিয়ম প্রদান করে যা যুগ, ঘটনা, মানুষের স্বভাব এবং পরিস্থিতির ভিন্নতা সত্ত্বেও প্রয়োগযোগ্য। এই নিয়মগুলো এমন সাংবিধানিক ধারায় পরিণত হতে পারে, যা মানুষের সামনে উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতির সাথে মানানসই আইন প্রণয়নের উপযুক্ত। এটি বিস্তারিত ব্যাখ্যাও প্রদান করে, তবে এই বিস্তারিত বিষয়গুলো এমন সাধারণ ক্ষেত্রে দেওয়া হয় যা সময়, স্থান ও মানুষের পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তিত হয় না। উদ্দেশ্য হলো, এসব খুঁটিনাটি বিষয়ে ভুল ইজতিহাদের সুযোগ না রাখা, যা সম্প্রসারণের বদলে বিকৃতির জন্ম দিতে পারে। এতদসত্ত্বেও, এই বিস্তারিত ব্যাখ্যার উদ্দেশ্য হলো এমন একটি মতাদর্শিক মডেল উপস্থাপন করা, যা অনুসরণ করে মানুষ বিস্তারিত ঘটনাবলির ওপর সাধারণ নিয়মগুলো প্রয়োগ করতে পারে। পাশাপাশি, এই বার্তার টেক্সটগুলো থেকে আইন প্রণয়ন এবং ব্যবস্থা নির্ধারণের সময় মুজতাহিদদের কোন পথ অবলম্বন করা উচিত, তা স্পষ্ট করা।
এই বার্তার ভিত্তি যে ইসলামি আকীদা, তা মানুষের মনের গভীরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক প্রভাব সৃষ্টি করে। এটি মানুষকে আমূল বদলে দেয়, তাকে সর্বনিম্ন স্তর থেকে সর্বোচ্চ শিখরে উন্নীত করে এবং তার সামনে এমন এক দিগন্ত উন্মোচন করে, যার মাধ্যমে সে মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং জীবনের উদ্দেশ্য, মূল্যবোধ ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলো উপলব্ধি করতে পারে। এই আকীদা আরবদের সম্পূর্ণ নতুনভাবে গড়ে তুলেছিল, তাদের মধ্যে এমন এক উদ্দীপনা সঞ্চার করেছিল যা তাদের নতুন সৃষ্টিতে পরিণত করেছিল এবং তাদের এক বিশাল আধ্যাত্মিক শক্তি প্রদান করেছিল। ফলে তারা ইসলামের বার্তা নিয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল, মানবজাতির মধ্যে হিদায়াতের আলো বিস্তার করেছিল; শেষমেশ পৃথিবী তাদের কাছে নতি স্বীকার করেছিল এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে সর্বত্র ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছিল।
ইসলামি বার্তা বহন করা কেবল আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালার পক্ষ থেকে এই উম্মাহর ওপর আরোপিত কোনো ফরজ দায়িত্ব নয়; বরং এটি এই জীবনে তাদের প্রধান কাজ এবং তাদের অস্তিত্বের মূল রহস্য। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:
وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا
“আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী জাতি বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষী হও এবং রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষী হন।” (সূরা আল-বাকারা: ১৪৩)
আল্লাহ আরও বলেন:
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
“তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও, অন্যায় কাজে নিষেধ করো এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখো।” (সূরা আল ইমরান: ১১০)
হ্যাঁ, এই উম্মাহর সৃষ্টিই হয়েছে মানবজাতির জন্য, যেন তারা মানুষকে সৎকাজের আদেশ দেয়, অন্যায় থেকে বিরত রাখে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার পথ দেখায়, যাতে বিচার দিবসে তারা মানবজাতির (পক্ষে বা) বিপক্ষে সাক্ষী হতে পারে। এটিই হলো সেই বার্তা এবং দায়িত্ব যা আল্লাহ এই মধ্যপন্থী জাতিকে অর্পণ করেছেন। এই দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত থাকলেই কেবল তারা সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বাধিক ন্যায়পরায়ণ জাতি হিসেবে বিবেচিত হবে।
আর আজ ইসলামি উম্মাহর সামনে সেই সত্য ও সুস্পষ্ট পথে হাঁটা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই, যা তাদের পুনর্জাগরণের দিকে নিয়ে যাবে এবং কুফরের নিয়ন্ত্রণ ও কাফিরদের আধিপত্য থেকে তাদের মুক্ত করবে। আর সেই পথটি হলো সমগ্র মানবজাতির কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেওয়া, যাতে বান্দাদেরকে মানুষের দাসত্ব থেকে এবং পুঁজিবাদের জুলুম থেকে বের করে ইসলামের ন্যায়বিচারের দিকে, অর্থাৎ একমাত্র সঠিক মানবিক সভ্যতার দিকে নিয়ে আসা যায়।
কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, এই উম্মাহর কি এখন এই কঠিন দায়িত্ব পালন করার এবং এই মহান আমানত বহন করার সক্ষমতা আছে?
এর উত্তর নিশ্চিতভাবেই ‘হ্যাঁ’। কারণ এই উম্মাহ:
প্রথমত: তারা অতীতেও এই বার্তা বহন করেছে। মূলত তাদের উৎপত্তি এবং ঐক্যবদ্ধতাই ঘটেছিল এর মাধ্যমে, যখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা ষষ্ঠ শতাব্দীতে মক্কা এবং এর আশেপাশের অঞ্চলে আমাদের সাইয়্যিদ মুহাম্মদ (সা.)-কে ইসলামের বার্তা দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন। তারা এই বার্তা নিয়ে দুনিয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং এমন এক নজিরবিহীন পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছিল, যার মানবিক উৎকর্ষের ধারেকাছেও বিশ্বের অন্য কোনো পুনর্জাগরণ পৌঁছাতে পারেনি। তারা এই উৎকর্ষ কেবল নিজেদের ওপরই প্রয়োগ করেনি, বরং যারা এই বার্তা গ্রহণ করেনি, অথচ এর ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের ওপরও প্রয়োগ করেছিল। অতীতে মুসলমানরা যখন কোনো বার্তা ছাড়াই একটি বার্তা বহন করতে সক্ষম হয়েছিল, তখন আজ তারা নিঃসন্দেহে এই বার্তা বহন করতে এবং এর মাধ্যমে পুনর্জাগরণ ঘটাতে সক্ষম, বিশেষত যখন তারা এই বার্তার মাধ্যমে এমন এক অতুলনীয় সাংস্কৃতিক ও আইনগত সম্পদের অধিকারী হয়েছে।
দ্বিতীয়ত: কুরআনিক চিন্তাধারার প্রকৃতি ইসলামি উম্মাহর সদস্যদের গভীর ও আলোকিত চিন্তার অধিকারী করেছে এবং সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনশীলতাকে এই উম্মাহর একটি সহজাত বৈশিষ্ট্যে পরিণত করেছে। এমনকি তাদের পতনের যুগে এবং ইসলামি রাষ্ট্রের বিলুপ্তির পরও এই উম্মাহর সদস্যরা তাদের প্রখর বুদ্ধিমত্তা, প্রতিভা, বিশুদ্ধতা, সত্যের প্রতি ভালোবাসা এবং এর প্রতি আত্মমর্যাদাবোধ দ্বারা আলাদা হয়ে আছে। এর সাথে রয়েছে তাদের সুস্থ স্বভাব (ফিতরাত) এবং উন্নত মানসিকতা, যা ইসলামের ধারণাগুলোকে সঠিকভাবে অনুধাবন ও অনুসরণ করার মাধ্যমে তাদের ঐক্যবদ্ধ করে।
তৃতীয়ত: ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি ও খনিজ উৎপাদন এবং এর সন্তানদের কাছে শত শত বিলিয়ন ডলার মূল্যের বিপুল সম্পদের উপস্থিতির দিক থেকে আমাদের দেশগুলো এক চমৎকার অবস্থানে রয়েছে। তাছাড়া, এই দেশগুলো প্রায় একত্রিত অবস্থায় তিনটি মহাদেশের সংযোগস্থলে এমন এক ভূখণ্ডে অবস্থিত, যা বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি স্থান হিসেবে বিবেচিত।
চতুর্থত: বিশ্বের এমন কোনো দেশ নেই যেখানে বিজ্ঞানের এবং শিল্পের বিভিন্ন শাখায় মুসলিম সন্তানরা সম্মানজনক অবস্থানে নেই। পশ্চিমা বিশ্ব নিজেই শিল্প, কৃষি, গবেষণাকেন্দ্র, ল্যাবরেটরি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত ক্ষেত্রে হাজার হাজার মুসলিম সন্তানে পরিপূর্ণ। সেখানে রয়েছেন শত শত প্রথম সারির ব্যবসায়ী। যারা পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সময় কাটিয়েছেন, তারা উপলব্ধি করতে পারেন মুসলিম সন্তানরা কীভাবে উৎকর্ষ সাধন করছে। ভাষার বাধা এবং জীবনের নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সমবয়সীদের তুলনায় তাদের শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্ট চোখে পড়ে।
এর পাশাপাশি আমরা যদি এ কথা স্মরণ করি যে, এটি আল্লাহর বার্তা এবং তাঁর বাণী—যা তিনি সত্য ও ন্যায়ের সাথে পূর্ণতা দান করেছেন এবং সমগ্র মানবতার জন্য অপরিহার্য করেছেন। তিনি সত্যই জানিয়েছেন যে, তিনি এই দ্বীনকে সকল দ্বীনের ওপর বিজয়ী করবেন, কাফিররা তা যত অপছন্দই করুক না কেন। এটিই চিরস্থায়ী বাণী ও শাশ্বত বার্তা। এরপরও কি এই বার্তা বহনে ইসলামি উম্মাহর সক্ষমতা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে? আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা বলেছেন:
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ
“তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি একে সকল দ্বীনের ওপর বিজয়ী করেন, মুশরিকরা তা যত অপছন্দই করুক না কেন।” (সূরা আস-সাফ: ৯)
মহান আল্লাহ আরও বলেন:
إِنَّا لَنَنصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُومُ الْأَشْهَادُ
“নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলদেরকে এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে দুনিয়ার জীবনে সাহায্য করি এবং যেদিন সাক্ষীরা দণ্ডায়মান হবে (সেদিনও সাহায্য করব)।” (সূরা গাফির: ৫১)
এই সত্যগুলো অবশ্যই সমগ্র মানবতার কাছে হিদায়াতের বার্তা বহন করার জন্য আমাদের কাছে অনুপ্রেরণা ও চালিকাশক্তি হওয়া উচিত।
وَلَيَنصُرَنَّ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ
“আর আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করেন যে তাঁকে সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী।” (সূরা আল-হাজ্জ: ৪০)
ওপেক (OPEC) – এর ঐতিহাসিক পটভূমি, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং মুসলিম বিশ্বের ভবিষ্যৎ

সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) ওপেক (OPEC) ত্যাগ করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা বিশ্ব অর্থনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে চলেছে। সংবাদমাধ্যমগুলোতে এটিকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, যা বিশ্ববাজারে তেলের দামের গতিপ্রকৃতি বদলে দিতে পারে এবং ওপেকের মতো শক্তিশালী তেল কার্টেলের একচেটিয়া আধিপত্যের অবসান ঘটাতে পারে।
তবে এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে শুধু অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ কাজ করছে না। এর গভীরে লুকিয়ে আছে সৌদি আরবের সাথে আমিরাতের ক্ষমতার নীরব লড়াই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক কৌশল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান জায়নিস্ট-মার্কিন-ইরান সংঘাত। এই সম্পূর্ণ পরিস্থিতি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হলে আমাদের ইতিহাসের পাতা উল্টে ওপেক গঠনের প্রকৃত কারণ, পেট্রোডলারের ফাঁদ এবং গালফ দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের দিকে তাকাতে হবে।
ওপেকের জন্ম – প্রচলিত আখ্যান বনাম ঐতিহাসিক বাস্তবতা
ওপেক (OPEC) বা ‘অর্গানাইজেশন অফ পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ’ হলো মূলত তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি জোট বা ‘কার্টেল’। অর্থনৈতিক পরিভাষায়, কার্টেল হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে একই ধরনের পণ্য সরবরাহকারী প্রতিযোগীরা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা না করে জোটবদ্ধ হয়ে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে। ওপেকের ক্ষেত্রে, তারা তেলের উৎপাদন বাড়িয়ে বা কমিয়ে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করে। উৎপাদন কমালে দাম বাড়ে, আর বাড়ালে দাম কমে। এটি বাজারের একটি সাধারণ মনোপলি বা একচেটিয়া কৌশল।
ওপেক গঠনের একটি বহুল প্রচলিত সাধারণ আখ্যান রয়েছে। বলা হয়, ১৯৬০-এর দশকের আগে বিশ্বের তেল বাজার নিয়ন্ত্রণ করত সাতটি বৃহৎ পশ্চিমা তেল কোম্পানি, যাদের একত্রে ‘সেভেন সিস্টার্স’ (Seven Sisters) বলা হতো। তারা উৎপাদনকারী দেশগুলোর সাথে কোনো আলোচনা না করেই একতরফাভাবে তেলের দাম কমিয়ে দিত, যার ফলে আরব রাষ্ট্রগুলো এবং ভেনিজুয়েলা রাতারাতি বিপুল রাজস্ব হারাত। এই পশ্চিমা শোষণের হাত থেকে নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতেই ১৯৬০ সালে সৌদি আরব, ইরাক, ইরান, কুয়েত এবং ভেনিজুয়েলা মিলে ওপেক গঠন করে।
কিন্তু এই আখ্যানটি সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক সত্য নয়; বরং এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুদূরপ্রসারী কৌশলকে আড়াল করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে তিনটি বড় পরিবর্তন ঘটছিল:
১. ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের পতন: দুটি বিধ্বংসী বিশ্বযুদ্ধের পর, এক সময়ের পরাক্রমশালী ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের মতো ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো আর্থিকভাবে প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল। যুদ্ধের বিপুল ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাদের অর্থনীতি চরম সংকটের মুখে পড়ে এবং সামরিক শক্তিও ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে যায়। একই সময়ে, আফ্রিকা, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের উপনিবেশগুলোতে স্বাধীনতার দাবি ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। উপনিবেশগুলোতে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা এবং বিদ্রোহ দমন করা এই যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপীয় শক্তিগুলোর পক্ষে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলস্বরূপ, তারা বাধ্য হয়ে একে একে তাদের উপনিবেশগুলোর ওপর থেকে সরাসরি শাসন প্রত্যাহার করে নিতে শুরু করে, যা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করে এবং নতুন পরাশক্তিগুলোর উত্থানের পথ প্রশস্ত করে।
২. সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থান এবং সমাজতন্ত্রের ভীতি: সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ, বিশেষ করে প্রাকৃতিক সম্পদের ‘জাতীয়করণ’-এর ধারণা, তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ১৯৫১ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি জাতীয়করণ করেন। এর জবাবে ১৯৫৩ সালে সিআইএ (CIA) এবং এমআই৬ (MI6) এর মদদে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। একইভাবে ১৯৫৬ সালে মিসরের জামাল আব্দুল নাসের সুয়েজ খাল কোম্পানি জাতীয়করণ করলে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েল মিসরে আক্রমণ চালায়।
৩. মার্কিন সাম্রাজ্যের বিস্তার: ইউরোপীয় শক্তিগুলোর পতনের সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল, যাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিস্তার ঠেকানো যায় এবং বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ—তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়।
এই প্রেক্ষাপটে, পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বদলে যুক্তরাষ্ট্র এক নতুন কৌশল গ্রহণ করে। তারা এমন একদল পশ্চিমা-ঘেঁষা আরব ও ভেনিজুয়েলান নেতার মাধ্যমে ওপেক গঠন করে, যারা পশ্চিমাদের দ্বারা শিক্ষিত এবং প্রভাবিত ছিলেন। বাইরে থেকে মনে হতো স্থানীয় নেতারাই তেলের দাম নির্ধারণ করছেন এবং তারা স্বাধীন। কিন্তু বাস্তবে তারা বিপি (BP), শেল (Shell) বা টেক্সাকোর (Texaco) মতো পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলোর পরামর্শেই কাজ করতেন। এটি ছিল সরাসরি উপনিবেশবাদের বদলে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের এক নতুন পশ্চিমা মেকানিজম, যার উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয়দের ক্ষোভ প্রশমন করা এবং তাদের সোভিয়েত ব্লকে যোগ দেওয়া থেকে বিরত রাখা।
১৯৭৩ সালের তেল অবরোধ এবং পেট্রোডলার সাম্রাজ্যের উত্থান
অনেকেই ১৯৭৩ সালের তেল অবরোধকে (Oil Embargo) পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে ওপেকের একটি স্বাধীন ও সাহসী পদক্ষেপ বলে মনে করেন। ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধে (Yom Kippur War) ইসরায়েলকে সমর্থন করার প্রতিবাদে আরব দেশগুলো পশ্চিমাদের ওপর তেল অবরোধ আরোপ করে, যার ফলে তেলের দাম তিনগুণ বেড়ে যায় এবং আমেরিকায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।
কিন্তু ডিক্লাসিফায়েড সিআইএ (CIA) ফাইল এবং তৎকালীন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের নিজস্ব বক্তব্য থেকে এক ভিন্ন ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিসিঞ্জার মনে করতেন, মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের জন্য প্রয়োজন। তিনি এই আরব-ইসরায়েল যুদ্ধকে এমনভাবে পরিচালিত হতে দিয়েছিলেন যাতে দুটি লক্ষ্য অর্জিত হয়:
প্রথমত, ইসরায়েলকে কিছুটা দুর্বল করে তাদের আরব প্রতিবেশীদের সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা।
দ্বিতীয়ত, আরব দেশগুলোকে বুঝিয়ে দেওয়া যে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির একমাত্র পথ ওয়াশিংটন হয়েই যায়।
এই তেল অবরোধের সবচেয়ে বড় ফলাফল ছিল ‘পেট্রোডলার’ (Petrodollar) সিস্টেমের জন্ম। ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর (বিশেষ করে সৌদি আরব) মধ্যে একটি অলিখিত চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ওপেকভুক্ত দেশগুলো শুধুমাত্র মার্কিন ডলারে তেল বিক্রি করতে সম্মত হয়। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র এই রাজতন্ত্রগুলোর সামরিক সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়। এটি ছিল এমন এক চুক্তি যা পুরো বিশ্বের অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
যেহেতু বিশ্বের প্রতিটি দেশের তেল কেনার জন্য মার্কিন ডলারের প্রয়োজন, তাই বিশ্বজুড়ে ডলারের অসীম চাহিদা তৈরি হয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ইচ্ছেমতো ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ছাপিয়ে তাদের বিশাল জাতীয় ঋণ মেটাতে সক্ষম হয়, কারণ তারা জানত মুদ্রাস্ফীতি হবে না। অন্যদিকে, উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের তেলের মুনাফা পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র এবং মার্কিন রাষ্ট্রীয় বন্ডে (Treasuries) বিনিয়োগ করতে শুরু করে। এভাবেই ওপেক, যা কিনা পশ্চিমা প্রভাব কমানোর কথা বলে তৈরি হয়েছিল, তা পরোক্ষভাবে মার্কিন আধিপত্যকে পাকাপোক্ত করে এবং মুসলিম বিশ্বের সম্পদ দিয়ে পশ্চিমা অর্থনীতিকে চিরস্থায়ী শক্তিতে পরিণত করে।
ব্রিটিশ বিদায়, জিসিসি গঠন এবং সৌদি আরবের আধিপত্য
সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের বর্তমান দ্বন্দ্ব বুঝতে হলে গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল (GCC) বা উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।
দশকের পর দশক ধরে এই উপসাগরীয় আমিরাতগুলো (Sheikhdom) ব্রিটিশদের সুরক্ষায় ছিল। বৃটেন কেবল তাদের উপদেষ্টাই ছিল না, বরং তাদের পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা এবং বাণিজ্য সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু ১৯৭১ সালের দিকে বৃটিশ সাম্রাজ্যের পতন স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং তারা এই অঞ্চল থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়।
বৃটিশদের এই বিদায়ের পর উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি বিশাল ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। ইরান এবং বড় প্রতিবেশী সৌদি আরবের দ্বারা গ্রাস হয়ে যাওয়ার ভয়ে ছোট ছোট উপসাগরীয় দেশগুলো ভীত ছিল। এই ভয় এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের রেখে যাওয়া কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই ১৯৮১ সালে গঠিত হয় জিসিসি (GCC)—যার সদস্য হয় সৌদি আরব, আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন এবং ওমান। এর লক্ষ্য ছিল আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা।
কিন্তু এই নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থায় একটি দেশ সবার ওপরে স্থান করে নেয়—সৌদি আরব। বিশাল ভূখণ্ড, সাড়ে তিন কোটি জনসংখ্যা, শক্তিশালী মার্কিন-সমর্থিত সামরিক বাহিনী এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—তাদের হাতে থাকা ‘অতিরিক্ত তেল উৎপাদন ক্ষমতা’ (Spare Oil Capacity)।
‘স্পেয়ার অয়েল ক্যাপাসিটি’ মানে হলো, সৌদি আরবের এমন অবকাঠামো প্রস্তুত আছে যা দিয়ে তারা চাইলেই খুব দ্রুত দীর্ঘ সময়ের জন্য তেলের উৎপাদন বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তেলের দাম নির্ধারণের এই ক্ষমতা সৌদি আরবকে ওপেকের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করে। তারা কোটা নির্ধারণ করে দিত এবং অন্য গালফ রাষ্ট্রগুলো তা মেনে চলতে বাধ্য হতো, যাতে তেলের দাম কমে গিয়ে তাদের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের উত্থান এবং অস্তিত্ব রক্ষার নীরব যুদ্ধ
সৌদি আরবের তুলনায় সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) অত্যন্ত ছোট একটি দেশ। তাদের মোট জনসংখ্যা মাত্র ১.১ কোটি, যার মধ্যে প্রকৃত আমিরাতি নাগরিক মাত্র ১০ লক্ষের কিছু বেশি। তাদের সামরিক বাহিনী এবং ভৌগোলিক আয়তনও সৌদির তুলনায় নগণ্য। প্রথাগত মাপকাঠিতে আমিরাতের পক্ষে সৌদিকে চ্যালেঞ্জ করা অসম্ভব।
কিন্তু আমিরাতের নেতৃত্ব শুরুতেই তাদের দুটি বড় দুর্বলতা চিহ্নিত করতে পেরেছিল:
১. তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং
২. কৌশলগত গভীরতার (Strategic Depth) অভাব।অন্যান্য দেশ যখন তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে বসেছিল, আমিরাত তখন ভিন্ন পথে হাঁটে। তারা দুবাইকে কেন্দ্র করে বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক, লজিস্টিক এবং এভিয়েশন হাব গড়ে তোলে। এশিয়া, আফ্রিকা এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে বাণিজ্যের মূল প্রবেশদ্বার হয়ে ওঠে দুবাই।
কিন্তু শুধু অর্থনৈতিক শক্তিই যথেষ্ট ছিল না। কৌশলগত গভীরতা অর্জনের জন্য আমিরাত তাদের বিশাল সম্পদ ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে (বিশেষ করে লোহিত সাগর এবং ভারত মহাসাগরের কৌশলগত নৌপথগুলোতে) বন্দর নিয়ন্ত্রণ এবং প্রক্সি মিলিশিয়াদের অর্থায়ন শুরু করে। তারা সামরিকভাবে দেশ দখল না করে অর্থনৈতিক ও লোহিত সাগরের বাণিজ্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করে।
সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু: আমিরাতেরও বিশাল তেল মজুত এবং ‘স্পেয়ার অয়েল ক্যাপাসিটি’ রয়েছে। তারা দিনে প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করতে সক্ষম হলেও সৌদি নেতৃত্বাধীন ওপেকের কোটার কারণে তাদের ৩০ লাখ ব্যারেলে আটকে থাকতে হয়। সৌদি আরবের এক ব্যারেল তেল তুলতে খরচ হয় মাত্র ৩ ডলার, কিন্তু আমিরাতের জন্য এটি লাভজনক হলেও সৌদির কোটার কারণে তারা পূর্ণ মুনাফা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ২০২০ সালে রাশিয়া যখন সৌদির কোটা মানতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন সৌদি আরব বিশ্ববাজারে সস্তায় তেল ভাসিয়ে দিয়ে তেলের দাম ৪০ ডলারে নামিয়ে এনেছিল, যা অন্য দেশগুলোর অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করেছিল। আমিরাত সৌদির এই একচেটিয়া খবরদারির ওপর চরম ক্ষুব্ধ।
এর পাশাপাশি যোগ হয়েছে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’। রিয়াদ এখন দুবাইয়ের বিকল্প হিসেবে লজিস্টিক ও ফিন্যান্সিয়াল হাব হতে চাইছে। এটি দুবাইয়ের অর্থনৈতিক মডেলের জন্য সরাসরি একটি অস্তিত্বের সংকট।
বর্তমান ভূ-রাজনীতি, হরমুজ প্রণালী এবং আমিরাতের ওপেক ত্যাগের সিদ্ধান্ত

UAE leaves OPEC বর্তমান জায়নিস্ট-মার্কিন-ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে এক অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আমিরাত এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে ওপেক থেকে বেরিয়ে আসার রাজনৈতিক আবরণ (Political Cover) পেয়ে গেছে।
যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধের মতো পরিস্থিতিতে আমিরাতের প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। তারা চায় ওপেকের কোটা থেকে বেরিয়ে তাদের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করে বেশি তেল বিক্রি করতে। তারা আর সৌদির নিয়ন্ত্রণ মানতে রাজি নয়, কারণ ইরানের পর তারা সৌদি আরবকেই তাদের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে দেখে।
আমিরাত বিশ্বাস করে, ওয়াশিংটনের সাথে তাদের গভীর সম্পর্ক (যেমন- কারেন্সি সোয়াপ লাইন যা তাদের সস্তায় ডলার পেতে সাহায্য করে) এবং ইসরায়েলের সাথে স্বাভাবিকীকরণ চুক্তির মাধ্যমে তারা একটি স্বাধীন শক্তিশালী বলয় তৈরি করতে পারবে। তারা এখন সৌদি বলয় থেকে বেরিয়ে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ভারত অক্ষের দিকে ঝুঁকছে।
আমেরিকার নীতি পরিবর্তন এবং ওপেকের ভবিষ্যৎ
স্নায়ুযুদ্ধের সময় এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগ পর্যন্ত ওপেকের মতো বহুজাতিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ আমেরিকার জন্য সুবিধাজনক ছিল। এটি মার্কিন নিয়ন্ত্রণকে বৈধতা দিত।
কিন্তু আজকের দিনে আমেরিকা বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি এবং তারা নিজেরাই বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ। এখন আর তাদের এসব বহুজাতিক সংগঠনের প্রয়োজন নেই। আমেরিকা এখন বহুজাতিক চুক্তির বদলে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে বেশি আগ্রহী।
ওপেক দুর্বল হলে বা ভেঙে গেলে তা মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী তো নয়ই, বরং সহায়ক। ওপেকের কোটা প্রথা ভেঙে গেলে দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়বে, তেলের দাম কমবে, যা পশ্চিমা অর্থনীতির মুদ্রাস্ফীতি কমাতে সাহায্য করবে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যেই আমিরাতের এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন, কারণ সস্তা তেল আমেরিকার অর্থনীতির জন্য লাভজনক।
মুসলিম বিশ্বের ট্র্যাজেডি এবং ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা
এই সম্পূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক চালচিত্র মুসলিম বিশ্বের জন্য এক বিশাল ট্র্যাজেডি এবং শিক্ষণীয় বিষয়। ওপেক এবং তেলের ইতিহাস স্পষ্টভাবে দেখায় কীভাবে মুসলিম উম্মাহর অমূল্য সম্পদ পশ্চিমা শক্তি এবং গুটিকয়েক রাজপরিবারের স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হয়েছে।
এই প্রাকৃতিক সম্পদ কোনো নির্দিষ্ট পরিবার, রাজা বা শাসকের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি পুরো মুসলিম উম্মাহর সম্পদ। গত কয়েক দশকে তেল থেকে উপার্জিত ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার যদি পশ্চিমা ব্যাংকে বা মার্কিন ট্রেজারিতে বিনিয়োগ না করে মুসলিম বিশ্বের কল্যাণে ব্যয় করা হতো, তবে আজ এই অঞ্চলে কোনো ক্ষুধা, দারিদ্র্য বা বেকারত্ব থাকত না। এই অর্থ দিয়ে পুরো মুসলিম বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী শিল্প ও প্রযুক্তিগত ভিত্তি গড়ে তোলা যেত, যা সত্যিকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করত।
বর্তমানে আমরা মধ্যপ্রাচ্যে যে জোটগুলো দেখছি—একদিকে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো দেশগুলোর জোটবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা, অন্যদিকে আমিরাত, ভারত এবং ইসরায়েলের নতুন অক্ষ—এগুলো সবই ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ এবং সাময়িক লেনদেনের (Transactional interests) ওপর ভিত্তি করে তৈরি। স্বার্থের মিল থাকলে এই দেশগুলো বন্ধু হয়, আর স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে তারা একে অপরের শত্রুতে পরিণত হয় (যেমনটি এখন সৌদি এবং আমিরাতের মধ্যে ঘটছে)। জাতীয়তাবাদী স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া কোনো ঐক্যই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না; তা সহজেই ভেঙে যায় বা বিক্রি হয়ে যায়।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই অঞ্চলের মানুষের ঐক্যের ভিত্তি ছিল ভিন্ন। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর এঁকে দেওয়া মানচিত্র বা ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং ইসলামী সভ্যতার অভিন্ন দৃষ্টিভংগি ও মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে তাদের ঐক্য ছিল। এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ধর্ম নয়, বরং ছিল শাসন ও ঐক্যের মূল ভিত্তি। যতক্ষণ না মুসলিম বিশ্ব এই কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে একটি আদর্শিক ও সত্যিকারের ঐক্যের পথে ফিরে আসছে, ততক্ষণ ইয়েমেন বা ফিলিস্তিনের মতো সংঘাত থামবে না, এবং বাইরের শক্তির কাছে মুসলিম সম্পদের এই নীরব লুণ্ঠন চলতেই থাকবে।
পশ্চিমা বিশ্ব ও তৃতীয় বিশ্বের সম্পদ: উপনিবেশবাদ থেকে আধুনিক অর্থনৈতিক লুণ্ঠনের এক সুদীর্ঘ ইতিহাস

আধুনিক বিশ্বে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা বা বয়ান (Narrative) হলো, পশ্চিমা বিশ্ব—বিশেষ করে উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপীয় দেশগুলো—তাদের বর্তমান অর্থনৈতিক পরাশক্তি এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের শিখরে আরোহণ করেছে কেবল তাদের নিজস্ব মেধা, কঠোর পরিশ্রম, মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর মাধ্যমে। কিন্তু ইতিহাসের পাতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির গভীরতর সামষ্টিক বিশ্লেষণ আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার মুখোমুখি করে। এই নির্জলা বাস্তবতা হলো শোষণ, উপনিবেশবাদ (Colonialism) এবং সুকৌশলী আধুনিক আর্থিক কাঠামোর মাধ্যমে তৃতীয় বিশ্ব বা গ্লোবাল সাউথ (Global South) থেকে অবিরাম সম্পদ পাচারের এক ভয়াবহ ও ধারাবাহিক চিত্র।
প্রদত্ত ভিডিওটির মূল সুর এবং বিভিন্ন গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে এটি স্পষ্ট যে, পশ্চিমা উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি তাদের নিজেদের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরের সম্পদ নয়; বরং শতাব্দী ধরে এশিয়া, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে পদ্ধতিগতভাবে লুণ্ঠিত সম্পদই তাদের এই অভাবনীয় উন্নতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। নিচে এই ঐতিহাসিক ও আধুনিক লুণ্ঠন প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত বিস্তারিত এবং ব্যাখ্যামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।
১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: উপনিবেশবাদ এবং বৃটিশ ভারতের সম্পদ লুণ্ঠন
বর্তমান বৈশ্বিক বৈষম্যকে বুঝতে হলে আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। সম্পদ লুণ্ঠনের এই প্রথা আজকের নয়, বরং এটি শত শত বছর ধরে চলে আসা এক সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। এর সবচেয়ে বড় এবং প্রকট উদাহরণ হলো ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসন।
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক উৎসা পট্টনায়ক (Utsa Patnaik) প্রায় দুই শতাব্দীর কর এবং বাণিজ্যের বিশদ উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেছেন যে, বৃটিশরা ভারত থেকে যে পরিমাণ সম্পদ লুণ্ঠন করেছে তার আর্থিক মূল্যমান কল্পনাতীত। তার গবেষণা অনুযায়ী, ১৭৬৫ সাল থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে বৃটেন ভারত থেকে প্রায় ৯.২ ট্রিলিয়ন পাউন্ড সম্পদ পাচার করেছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন (৪৫ লাখ কোটি) মার্কিন ডলার। এই হিসাবটি বের করা হয়েছে ভারতের রপ্তানি উদ্বৃত্ত আয়কে ৫ শতাংশ সুদের হারে চক্রবৃদ্ধি করে।
লুণ্ঠনের অভিনব মেকানিজম (Tax-and-Buy System & Council Bills):
বৃটিশরা কীভাবে এই বিশাল সম্পদ পাচার করেছিল, তার পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত ধূর্ত। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন দেওয়ানি লাভ করে, তখন তারা একটি অদ্ভুত ব্যবস্থার জন্ম দেয়। এর আগে বৃটেন সাধারণ নিয়মে রুপা বা সোনা দিয়ে ভারতের কৃষিপণ্য ও টেক্সটাইল কিনত। কিন্তু দেওয়ানি লাভের পর তারা ভারতীয় কৃষকদের ওপর চড়া করারোপ করে এবং সেই করের টাকার একটি বড় অংশ (প্রায় এক-তৃতীয়াংশ) দিয়েই আবার ভারতীয়দের পণ্য কিনতে শুরু করে। অর্থাৎ, বৃটিশরা ভারতীয়দের নিজস্ব উৎপাদিত পণ্য কিনছিল ভারতীয়দেরই দেওয়া করের টাকা দিয়ে। এটি ছিল মূলত বিনা মূল্যে পণ্য আত্মসাৎ করার এক অভিনব প্রতারণা।
পরবর্তীতে ১৮৫৮ সালে বৃটিশ রাজ শাসনভার গ্রহণের পর এই ব্যবস্থা আরও জটিল আকার ধারণ করে। তখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারতীয়দের পণ্য কেনার জন্য “কাউন্সিল বিল” (Council Bills) নামক একটি বিশেষ পেপার কারেন্সি বা কাগজের মুদ্রা চালু করা হয়, যা কেবল লন্ডনে সোনা বা রুপা দিয়ে কেনা যেত। বিদেশি ব্যবসায়ীরা লন্ডনে সোনা দিয়ে এই বিল কিনতেন এবং সেই বিল দিয়ে ভারতীয়দের মূল্য পরিশোধ করতেন। ভারতীয়রা যখন স্থানীয় বৃটিশ অফিসে সেই বিল ভাঙাতেন, তখন তাদেরকে স্থানীয় করের টাকা থেকে রুপি দেওয়া হতো। ফলে ভারতের পাওনা সমস্ত সোনা ও রুপা সরাসরি লন্ডনের কোষাগারে জমা হতে থাকে।
ভারতীয় অর্থনীতি ও জনজীবনে প্রভাব:
এই অপরিসীম লুণ্ঠনের ফলাফল ছিল ভারতের জন্য চরম বিপর্যয়কর।
- ১৯০০ সাল থেকে ১৯৪৬ সালের মধ্যে ভারতে মাথাপিছু আয়ে কার্যত কোনো প্রবৃদ্ধি হয়নি।
- উচ্চ করের চাপে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এতটাই কমে গিয়েছিল যে, ১৯০০ সালে যেখানে বার্ষিক মাথাপিছু খাদ্যশস্য ভোগের পরিমাণ ছিল ২০০ কেজি, তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ১৫৭ কেজিতে এবং ১৯৪৬ সালে তা ১৩৭ কেজিতে নেমে আসে।
- পুষ্টিহীনতা এবং রোগের কারণে মানুষ মাছির মতো মারা যেত; ১৯১১ সালে একজন ভারতীয়র গড় আয়ু ছিল মাত্র ২২ বছর।
- অন্যদিকে, এই লুণ্ঠিত সম্পদ এবং সস্তা কাঁচামালই বৃটেনে শিল্প বিপ্লবের (Industrial Revolution) মূল চালিকাশক্তি এবং অর্থায়নের উৎস হিসেবে কাজ করেছিল।
২. আধুনিক লুণ্ঠনের হাতিয়ার: পেট্রো-ডলার এবং”কালো সোনা”

Oil: The Black Gold উপনিবেশবাদের যুগ শেষ হলেও লুণ্ঠন থামেনি, কেবল তার রূপ পরিবর্তন হয়েছে। আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানি হলো তেল, যাকে ‘কালো সোনা’ (Black Gold) বলা হয়। মধ্যপ্রাচ্যসহ তৃতীয় বিশ্বের এই মহামূল্যবান সম্পদকে পশ্চিমা বিশ্ব কীভাবে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে, তা বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অবিচারগুলোর একটি।
তেলের অবমূল্যায়ন এবং পেট্রো-ডলার ব্যবস্থা:
গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের গড় মূল্য কৃত্রিমভাবে ব্যারেল প্রতি মাত্র ২৫ ডলারের আশেপাশে রাখা হয়েছিল। একটি ব্যারেল তেলের যে অর্থনৈতিক উপযোগিতা, তার তুলনায় এই দাম ছিল হাস্যকর। ফ্রান্সের সাধারণ মিনারেল ওয়াটারের দামও এই তেলের চেয়ে বহুগুণ বেশি। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মাইকেল মুর (Michael Moore) তার “ফারেনহাইট ৯/১১” (Fahrenheit 9/11) ডকুমেনটারিতে দেখিয়েছেন যে, এই কম দামের সুযোগ নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো প্রায় ৮৪ ট্রিলিয়ন ডলার সমমূল্যের সম্পদ তৃতীয় বিশ্ব থেকে লুটে নিয়েছে। পশ্চিমাদের গত ৬০-৮০ বছরের বিশাল শিল্পায়ন এবং কারখানাগুলোর বিকাশ মূলত এই অত্যন্ত সস্তা জ্বালানির ওপর নির্ভর করেই ঘটেছে।
তেলের এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো পেট্রো-ডলার সিস্টেম (Petrodollar System)। সত্তরের দশকের পর থেকে এই ব্যবস্থা মার্কিন ডলারের আধিপত্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে। এই ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল কেনাবেচা বাধ্যতামূলকভাবে মার্কিন ডলারে করতে হয়। এর ফলে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো প্রচুর ডলার আয় করে এবং পরবর্তীতে সেই ডলার “পেট্রো-ডলার রিসাইক্লিং” (Petrodollar Recycling) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বা পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগ করতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ, তেলের টাকা শেষ পর্যন্ত ঘুরেফিরে আমেরিকার কোষাগারেই জমা হয়, যা তাদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী রাখে।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন:
তবে, এই পেট্রো-ডলার ব্যবস্থায় সম্প্রতি ফাটল ধরতে শুরু করেছে।
- ২০২১ সালে ইরান চীনের সাথে ২৫ বছর মেয়াদী একটি কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং তাদের তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ ইউয়ানে (Yuan) বিক্রি শুরু করে।
- ২০২৩ সালে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো (Aramco) এবং চীনের সিনোপেকের (Sinopec) মধ্যে চুক্তির ফলে দ্বিপাক্ষিক তেল বাণিজ্যের প্রায় ৬৫ শতাংশ ইউয়ানে লেনদেন শুরু হয়।
- একই বছর কাতার পেত্রোচায়নার (PetroChina) সাথে দীর্ঘমেয়াদী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) চুক্তিতে ডলারকে পাশ কাটিয়েছে।
এই পরিবর্তনগুলো প্রমাণ করে যে, ডলারের আধিপত্য এবং পশ্চিমাদের একচেটিয়া অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
৩. সার্বভৌম সম্পদ তহবিল (Sovereign Wealth Fund) এবং পশ্চিমাদের অর্থায়ন
পশ্চিমা বিশ্বের বড় বড় প্রকল্প, মহাকাশ গবেষণা, কিংবা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বিপ্লবের পেছনে যে বিশাল অর্থের প্রয়োজন, তা পশ্চিমা দেশগুলো নিজস্ব পকেট থেকে খরচ করে না। এই অর্থের একটি বিশাল জোগান আসে মধ্যপ্রাচ্য এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর “সার্বভৌম সম্পদ তহবিল” (Sovereign Wealth Fund – SWF) থেকে।
সার্বভৌম সম্পদ তহবিল কী?
সার্বভৌম সম্পদ তহবিল হলো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিনিয়োগ তহবিল, যা সাধারণত কোনো দেশের পণ্য রপ্তানি (যেমন: তেল বা গ্যাস) থেকে অর্জিত রাজস্ব বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে গঠিত হয়। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের সময় থেকে এই তহবিলগুলো বিশ্বজুড়ে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমানে বৈশ্বিক SWF-এর সম্পদের পরিমাণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (GCC) এবং মার্কিন অর্থনীতি:
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো—বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ইত্যাদি—তাদের তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে এই ধরনের বিশাল তহবিল গঠন করেছে। বর্তমানে এই অঞ্চলে প্রায় এক ডজন সাভরেইন ফান্ডের অধীনে ৪ থেকে ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পদ রয়েছে।
- আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিশাল সম্পদের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হলো স্বয়ং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গ্লোবাল এসডাব্লিউএফ-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে উপসাগরীয় অঞ্চলের বৃহত্তম সাতটি তহবিল প্রায় ১১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যার সিংহভাগই গেছে যুক্তরাষ্ট্রে।
- সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (PIF) ব্ল্যাকস্টোনের (Blackstone) একটি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ডে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং ব্ল্যাকরক (BlackRock), গোল্ডম্যান স্যাক্স-এর (Goldman Sachs) মতো পশ্চিমা আর্থিক জায়ান্টদের সাথে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে।
- এছাড়া, মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং প্রযুক্তি খাতেও এই দেশগুলোর অর্থ ঢালা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ওপেনএআই (OpenAI) এবং এক্সএআই (xAI)-এর মূলধন সংগ্রহে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এমজিএক্স (MGX) বিশাল বিনিয়োগ করেছে।
অর্থাৎ, তৃতীয় বিশ্বের যে অর্থ তাদের নিজেদের দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল, সেই অর্থ দিয়ে আমেরিকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লব ঘটানো হচ্ছে এবং মার্কিন শেয়ারবাজারকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে রাখা হচ্ছে।
৪. আধুনিক ঋণ ফাঁদ এবং নিট সম্পদ স্থানান্তর (Net Resource Transfer)
পশ্চিমা বহুজাতিক কোম্পানি (Multinational Corporations) এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর (যেমন: IMF, World Bank) মাধ্যমে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) এবং ঋণের আড়ালে একটি কাঠামোগত লুণ্ঠন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
উন্নয়নশীলদেশগুলোর বর্তমান সংকট:
জাতিসংঘের ‘ফাইন্যান্সিং ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৪’ (Financing for Sustainable Development Report 2024) অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।
- বর্তমানে এই দেশগুলোর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বার্ষিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন ঘাটতি রয়েছে।
- বহু উন্নয়নশীল অর্থনীতি আজ ঋণের ভারে জর্জরিত, যার ফলে দারিদ্র্য এবং ক্ষুধা নিরসনের কয়েক দশকের অগ্রগতি থমকে গেছে।
ঋণ এবং লুণ্ঠনের চক্র:
১৯৮০ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে বিভিন্ন শর্তে প্রায় ১৫০০ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ১৫০০ বিলিয়ন ডলার ঋণের মধ্যে প্রায় ১০০০ বিলিয়ন ডলারই আবার পশ্চিমা বিশ্বে ফেরত চলে গেছে। এটি কীভাবে সম্ভব?
এটি ঘটে মূলত অসম বিনিময়, ঋণের চড়া সুদ, এবং “ক্যাপিটাল ফ্লাইট” (Capital Flight) বা অর্থ পাচারের মাধ্যমে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নীতিনির্ধারণের কাজ প্রায়ই আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, যারা পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষা করে এমন একতরফা নীতি চাপিয়ে দেয় (one-size-fits-all approach)। ফলে ঋণের মাধ্যমে যে অর্থ তৃতীয় বিশ্বে আসে, তা দেশের প্রকৃত উন্নয়নে ব্যবহৃত না হয়ে বহুজাতিক কোম্পানির লভ্যাংশ হিসেবে কিংবা দুর্নীতিবাজ অভিজাত শ্রেণির মাধ্যমে সুইজারল্যান্ড বা আমেরিকার ব্যাংকেই আবার জমা হয়।
৫. শাসকশ্রেণির দায়বদ্ধতা এবং সুবিধাভোগী মানসিকতা (Rent-Seeking)
এই সামগ্রিক লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায় তৃতীয় বিশ্ব বা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো এবং শাসকশ্রেণির ভূমিকা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। পশ্চিমা বিশ্ব তাদের শোষণ প্রক্রিয়া এতটা মসৃণভাবে চালাতে পারত না, যদি না তৃতীয় বিশ্বের শাসকরা তাদের সহযোগী হতেন।
রেন্ট-সিকিং বা সুবিধাভোগী এলিট শ্রেণি:
উন্নয়নশীল দেশগুলোর, বিশেষ করে পাকিস্তান বা অন্যান্য গ্লোবাল সাউথ দেশগুলোর শাসক এবং এলিট শ্রেণি প্রায়শই ‘রেন্ট-সিকিং’ (rent-seeking) বা সুবিধাভোগী মানসিকতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। তারা বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে সম্পদ (প্রধানত ঋণের চুক্তির মাধ্যমে) সংগ্রহ করে এবং তার বোঝা পরোক্ষ করের মাধ্যমে দরিদ্র ও কর্মজীবী মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়।
রাজনৈতিক শর্তারোপ এবং সহায়তার প্রহসন:
পশ্চিমা মদদপুষ্ট এই ব্যবস্থায় আর্থিক সহায়তার নামে কীভাবে প্রহসন করা হয়, তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো পাকিস্তানের স্টেট ব্যাংকে সৌদি আরবের অর্থ জমা রাখা। পাকিস্তান যখন চরম ডলার সংকটে ভোগে, তখন সৌদি আরব স্টেট ব্যাংকে ১ বিলিয়ন ডলার জমা রাখে, কিন্তু শর্ত জুড়ে দেয় যে এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে না। এটি কেবল ব্যালেন্স শিট ভারী করে দেখানোর জন্য রাখা হয়, যাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) কাছে দেশের আর্থিক সামর্থ্যের একটি বিভ্রম তৈরি করা যায়। একইভাবে, তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে মেগা প্রজেক্ট বা রিফাইনারি স্থাপনের নামে বছরের পর বছর কালক্ষেপণ করা হয়, যার মূল উদ্দেশ্য থাকে পশ্চিমা দেশগুলোর ফিজিবিলিটি স্টাডি বা কনসালটেন্সির নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া।
৬. উপসংহার: উত্তরণের পথ এবং ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থা
উপরের এই বিশদ আলোচনা থেকে এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, পশ্চিমা বিশ্বের বর্তমান অর্থনৈতিক আধিপত্য কোনো অলৌকিক জাদুর ফল নয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির করের টাকায় ভারতের পণ্য কেনা থেকে শুরু করে আজকের পেট্রো-ডলার পুনর্ব্যবহার এবং সাভরেইন ওয়েলথ ফান্ডের মার্কিন প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ—পুরো প্রক্রিয়াটি একই সুতোর ভিন্ন ভিন্ন প্রান্ত। এটি একটি নিঁখুত ঔপনিবেশিক মডেল (Colonial Model), যা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে তার বাহ্যিক রূপ পরিবর্তন করেছে মাত্র।
উন্নয়নশীল বিশ্ব এবং মুসলিম দেশগুলোর সম্পদ মূলত একটি “গ্লোবাল ওয়েলথ ড্রেইন” (Global Wealth Drain) প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত পশ্চিমা কোষাগারে গিয়ে জমা হচ্ছে। এর থেকে মুক্তির পথ অত্যন্ত দুর্গম। যতক্ষণ পর্যন্ত না গ্লোবাল সাউথ তাদের নিজস্ব মুদ্রা ব্যবস্থা (যেমনটি ব্রিকস বা ইউয়ানের মাধ্যমে শুরু হয়েছে) শক্তিশালী করতে পারবে, আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোতে নিজেদের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে পারবে এবং অভ্যন্তরীণ দুর্নীতিবাজ ও পরজীবী শাসকশ্রেণির পতন ঘটিয়ে দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আধুনিক এই লুণ্ঠন প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে। পশ্চিমা বিশ্বের চোখধাঁধানো উন্নয়নের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই বঞ্চনার ইতিহাস ও অর্থনীতি সম্পর্কে সচেতন হওয়াই এই শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ঈমানের মাধুর্য; মানব নেতৃত্বের হৃদস্পন্দন

ঈমানের মাধুর্য (حَلاوةُ الإيمانِ হালাওয়াতুল ঈমান); মানব নেতৃত্বের হৃদস্পন্দন
হযরত আনাস ইবন মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—
«ثَلَاثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ: مَنْ كَانَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَمَنْ أَحَبَّ عَبْدًا لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، وَمَنْ يَكْرَهُ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنْقَذَهُ اللَّهُ مِنْهُ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُلْقَى فِي النَّارِ»
“তিনটি গুণ আছে; যার মধ্যে এগুলো থাকবে, সে ঈমানের মাধুর্য (মিষ্ট স্বাদ) লাভ করবে: আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার কাছে অন্য সবকিছুর চেয়ে অধিক প্রিয় হবে; সে কোনো বান্দাকে ভালোবাসবে কেবল আল্লাহর জন্য; এবং আল্লাহ তাকে কুফর থেকে রক্ষা করার পর আবার কুফরে ফিরে যাওয়াকে সে তেমনই অপছন্দ করবে, যেমন সে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে”। [বুখারি বর্ণিত]।
ইমাম আন-নাওয়াবী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর শরহে (شرح হাদিস ব্যাখ্যা) বলেছেন,
(هَذَا حَدِيثٌ عَظِيمٌ أَصْلٌ مِنْ أُصُولِ الْإِسْلَامِ قَالَ الْعُلَمَاءُ رَحِمَهُمُ اللَّهُ مَعْنَى حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ اسْتِلْذَاذُ الطاعات وتحمل المشقات في رضى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَرَسُولِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَإِيثَارُ ذَلِكَ عَلَى عَرَضِ الدُّنْيَا وَمَحَبَّةِ الْعَبْدِ رَبَّهُ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى بِفِعْلِ طَاعَتِهِ وَتَرْكِ مُخَالَفَتِهِ وَكَذَلِكَ مَحَبَّةُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ)
“এই মহান হাদিসটি ইসলামের মৌলিক ভিত্তিসমূহের অন্তর্ভুক্ত একটি মৌলিক বিষয়। আলেমগণ বলেছেন, ঈমানের মাধুর্যের অর্থ হলো আনুগত্যমূলক কাজে আনন্দ অনুভব করা, আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কষ্ট সহ্য করা, একে দুনিয়াবি লাভের ওপর প্রাধান্য দেওয়া, এবং আল্লাহর আনুগত্য ও অবাধ্যতা পরিহার করে তাঁকে ভালোবাসা; তদ্রূপ আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ভালোবাসা।”
ক্বাযী ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন—
«هَذَا الْحَدِيثُ بِمَعْنَى الْحَدِيثِ الْمُتَقَدِّمِ (ذَاقَ طَعْمَ الْإِيمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللَّهِ رَبًّا ، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا ، وَبِمُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَسُولًا) وَذَلِكَ أَنَّهُ لَا يَصِحُّ الْمَحَبَّةُ لِلَّهِ وَرَسُولِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَقِيقَةً وَحُبُّ الْآدَمِيِّ فِي اللَّهِ وَرَسُولِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَكَرَاهَةُ الرُّجُوعِ إِلَى الْكُفْرِ إِلَّا لِمَنْ قَوَّى بِالْإِيمَانِ يَقِينُهُ ، وَاطْمَأَنَّتْ بِهِ نَفْسُهُ ، وَانْشَرَحَ لَهُ صَدْرُهُ ، وَخَالَطَ لَحْمَهُ وَدَمَهُ . وَهَذَا هُوهُ الَّذِي وَجَدَ حَلَاوَتَهُ»
এই হাদিসটি পূর্ববর্তী সেই হাদিসেরই অর্থ বহন করে: “যে ব্যক্তি আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে এবং মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে রাসূল হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করেছে, সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করেছে।” এর কারণ হলো—আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা, আল্লাহর জন্য মানুষকে ভালোবাসা এবং কুফরে ফিরে যাওয়ার প্রতি ঘৃণা—এসব কেবল তার মধ্যেই সত্যভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যার ঈমানের দৃঢ়তা শক্তিশালী, যার অন্তর এতে প্রশান্তি লাভ করেছে, যার বক্ষ এর জন্য উন্মুক্ত হয়েছে এবং যার সত্তা-মাংস-রক্তের সঙ্গে তা মিশে গেছে। এ ব্যক্তিই প্রকৃতপক্ষে ঈমানের মাধুর্য লাভ করেছে। তিনি আরও বলেন—
(وَالْحُبُّ فِي اللَّهِ مِنْ ثَمَرَاتِ حُبِّ اللَّهِ)
“আল্লাহর জন্য ভালোবাসা, আল্লাহকে ভালোবাসারই ফল।”
কারী বদরুদ্দীন আল-আইনী বলেছেন,
(وَقَالَ بَعضهم الْمحبَّة مواطأة الْقلب على مَا يُرْضِي الرب سُبْحَانَهُ، فيحب مَا أحبَّ وَيكرهُ مَا يكره)
“কিছু উলামা বলেছেন, মহব্বত’ হলো অন্তরের এমন সামঞ্জস্য, যা মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টির সাথে মিলিত হয়; ফলে সে ভালোবাসে যা তিনি ভালোবাসেন এবং অপছন্দ করে যা তিনি অপছন্দ করেন।”
সংক্ষেপে বলা যায়, ভালোবাসার সারকথা হলো প্রিয় সত্তার সন্তুষ্টির দিকে অন্তরের ঝোঁক। এই ঝোঁক কখনো হতে পারে মানুষের স্বাভাবিক পছন্দনীয় ও আকর্ষণীয় বিষয়ের দিকে—যেমন সুন্দর অবয়ব, সুমধুর কণ্ঠ, রুচিকর খাদ্য ইত্যাদি। আবার তা হতে পারে অন্তর্নিহিত অর্থ ও গুণাবলির কারণে—যেমন নেককার ব্যক্তিবর্গ, আলিম-উলামা এবং সাধারণভাবে সৎ ও গুণী মানুষের প্রতি ভালোবাসা। কখনো এটি হয় কারো অনুগ্রহ, উপকার কিংবা বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করার কারণে।
এই সকল অর্থ ও গুণ নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মধ্যে পূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিল; কারণ তিনি বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের সমন্বয়, পূর্ণাঙ্গ মহিমাময় গুণাবলির অধিকারী এবং সর্বপ্রকার উৎকৃষ্ট গুণের সমাবেশস্থল ছিলেন। আর আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) সকল মুসলমানের ওপর অনুগ্রহ করেছেন—তাদের সরল পথে পরিচালিত করে, নেয়ামতসমূহ অব্যাহত রেখে এবং জাহান্নামের আগুন থেকে তাদের রক্ষা করে।
কিছু আলিম বলেছেন, এই ভালোবাসার ধারণা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য; কারণ সমস্ত কল্যাণ তাঁর পক্ষ থেকেই উৎসারিত। ইমাম মালিকসহ অন্যান্য আলিমগণ বলেছেন—
(الْمَحَبَّةُ فِي اللَّهِ مِنْ وَاجِبَاتِ الْإِسْلَامِ)
“আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ইসলামের ফরজ দায়িত্বসমূহের অন্তর্ভুক্ত।”
এটি হাদিসের অর্থ সম্পর্কিত আলোচনা। বর্তমান মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে এর সম্পর্ক বোঝাতে গিয়ে বলা হচ্ছে, যখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন—
«اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا»
অর্থাৎ “আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) এবং তাঁর রাসূল তার নিকট অন্য সবকিছুর চেয়ে অধিক প্রিয় হবে”— তখন তিনি এমন এক গভীর অনুভূতির কথা বলছেন, যা হৃদয়ের গোপনতম কোণাগুলোতেও অবস্থান করে, এবং যার সঙ্গে থাকে এমন এক গভীর আবেগিক রূপান্তর, যা সব প্রতিদ্বন্দ্বী আকর্ষণকে মুছে দেয়।
এই ভালোবাসাই হলো সেই কেন্দ্রবিন্দু, যার দিকে মানুষের সকল অনুভূতি ও ইন্দ্রিয় আকৃষ্ট হয়। এতে কোনো নেতার প্রতি অন্ধ আনুগত্য থাকে না, কোনো মানবসৃষ্ট সংবিধানকে পবিত্রতা দেওয়া হয় না, এবং আদর্শিক রাজনীতির ভারসাম্যের নামে বিশ্বের নেতৃত্বদানকারী শক্তিগুলোর হুকুমের কাছে আত্মসমর্পণও করা হয় না। বরং এই ভালোবাসা হলো শরীয়াহর পূর্ণ সার্বভৌমত্বের প্রতি আনুগত্য । এটি সেই মুহূর্ত, যখন মুমিন দেখে যে আন্তর্জাতিক আইন ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-র পরিবর্তে উপাসিত আধুনিক মূর্তি ছাড়া আর কিছু নয়।
এখানে ঈমানের মাধুর্য নিহিত রয়েছে সেই আত্মিক গৌরবে, যা মানুষকে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) ছাড়া অন্য কারও সামনে মাথা নত করতে অস্বীকার করতে শেখায়। এতে বিশ্বাস করা হয় যে, ইসলামের আদর্শ কেবল সালাত, কিয়াম, তাহাজ্জুদ ও দোয়ার মতো ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা হলো শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি, সামাজিক কাঠামোসহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)- এর প্রদত্ত শরীয়াহর পূর্ণ বাস্তবায়নের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার। পৃথিবীতে কেবল তাদেরই আনুগত্য করা হবে, যাদের আনুগত্য করার নির্দেশ আল্লাহ দিয়েছেন। আর এই অঙ্গীকারের মাধ্যমেই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালোবাসা বাস্তবভাবে প্রকাশ পায়।
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এই বাণী—
«اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا»
অর্থাৎ “আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) এবং তাঁর রাসূল তার কাছে অন্য সবকিছুর চেয়ে অধিক প্রিয়”—উম্মাহর বিষয়াবলির দেখভালের মূল ভিত্তি ও সারকথা। ইসলামের আদর্শিক বোঝাপড়ায় ভালোবাসা মানে পূর্ণ আত্মসমর্পণ, এবং এটি আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর শরীয়াহ ব্যতীত সকল ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করার দাবি রাখে।
যে ব্যক্তি এই ভালোবাসার মাধুর্য আস্বাদন করেছে, সে গণতন্ত্রে জনগণের জন্য আইন প্রণয়নের সার্বভৌমত্বকে গ্রহণ করতে পারে না, এবং মানবসৃষ্ট সংবিধানের পবিত্রতাকেও স্বীকৃতি দেয় না। এটি এমন এক দাওয়াহ, যা উপনিবেশিকদের দ্বারা আমাদের ভূখণ্ডে স্থাপন করা তথাকথিত “রাজনৈতিক প্রতিমা”-গুলোকে ভেঙে চূর্ণ করার আহ্বান জানায়; এবং ঘোষণা করে যে, আনুগত্য কেবল উম্মাহর সেই সভ্যতাগত প্রকল্পের প্রতিই , যা দ্বিতীয় খিলাফাহ রাশিদাহর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে—যা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর কালিমাকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করবে এবং কাফিরদের অবস্থাকে নিম্নতম পর্যায়ে নামিয়ে আনবে।
আর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বাণী—
«وَمن أَحَبَّ َعبًدا ال ُيِحُّبه إاَّل ِهلل عَّز وجَّل»
অর্থাৎ “সে কোনো বান্দাকে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ভালোবাসে”—এটি এমন এক গভীর বন্ধন, যা তথাকথিত জাতিরাষ্ট্রের বিকৃত কাঠামোর ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এটি এমন এক সম্পর্ক, যা ভৌগোলিক সীমানা, রক্তের সম্পর্ক ও ভাষার বিভাজনকে অতিক্রম করে উম্মাহকে এক দেহে রূপান্তরিত করে। যখন তুমি আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর জন্য তোমার ভাইকে ভালোবাসো, তখন তুমি তোমার জাতিগত পরিচয়কে তার সহায়তার পথে বাধা হতে দাও না, এবং কোনো “জাতীয় স্বার্থ”-কে তার সাহায্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার বৈধতা হিসেবেও গ্রহণ করো না। এই বক্তব্য যেন এক আলোর বন্ধন তৈরি করে, যা পাকিস্তানের এক মুসলমানের হৃদয়কে তার সুদানের ভাইয়ের হৃদয়ের সঙ্গে একাকার করে দেয়; আর উপনিবেশবাদীদের রক্তে আঁকা কৃত্রিম জাতীয় সীমানার বিভাজনকে ছাপিয়ে উম্মাহর একতাবদ্ধ চেতনাকে জাগিয়ে তোলে।
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বাণী—
«وَمن َيكَرُه أن َيعوَد في الُكفِر َبعَد إذ أنَق َذه ا ُهلل منه كما َيكَرُه أن ُيلقى في الَّنار»
অর্থাৎ “আল্লাহ তাকে কুফর থেকে রক্ষা করার পর পুনরায় কুফরে ফিরে যেতে সে এমনভাবে ঘৃণা করে, যেমন সে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে ঘৃণা করে”— এটি ইসলামের আলো এবং মানবসৃষ্ট ব্যবস্থার অন্ধকারের মধ্যকার এক গভীর হৃদয়গত বিচ্ছেদের প্রকাশ। এটি এমন এক স্পষ্ট ঘোষণা, যেখানে অন্ধকার যুগ ও পরাধীনতার দিকে আর কখনো ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ফুটে ওঠে। এতে প্রতিফলিত হয় সেই মানুষদের মানসিকতা, যারা ইসলামের মাধ্যমে মর্যাদা ও সম্মানের স্বাদ পেয়েছে, কিন্তু পরে তাদের আবার পশ্চিমা আধিপত্য ও পরনির্ভরতার কাঠামোয় ফিরে যেতে বলা হয়। এখানে ‘কুফর’ কেবল স্রষ্টাকে অস্বীকার করাকেই বোঝায় না; বরং এমন এক দমনমূলক ব্যবস্থা, যা উম্মাহকে ঋণের শৃঙ্খল, অপমানজনক চুক্তি এবং ভণ্ড গণতন্ত্রের মাধ্যমে আবদ্ধ করে রাখে। যে মুমিন পুনর্জাগরণের (نهضة) চিন্তাধারায় নিজেকে গড়ে তুলেছে, তার কাছে তথাকথিত নাগরিক রাষ্ট্র বা সেক্যুলারিজম হলো এমন এক আগুন, যা উম্মাহর পরিচয়কে দগ্ধ করে এবং তার ভবিষ্যৎকে গ্রাস করে। তাই তার আদর্শে অটল থাকা, রাজনৈতিক আপসকে প্রত্যাখ্যান করা এবং আধা-সমাধান মেনে না নেওয়া—সবই সেই আগুন থেকে দূরে সরে যাওয়ারই নামান্তর।
এখানে ঈমানের আসল স্বাদ হলো সেই গভীর বিশ্বাস, যা একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষকে এই উপলব্ধি দেয় যে, বাতিলের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কষ্টকর জীবন যাপন করা, কুফরী ব্যবস্থার ছায়াতলে ভোগবাদী ও ভ্রান্ত সুখে ডুবে থাকার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর, পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ।
দুর্নীতিগ্রস্ত পুঁজিবাদের নেতৃত্বে পরিচালিত তীব্র উপনিবেশবাদী আক্রমণের ভারে, এবং যখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাগুলো উম্মাহকে দমন করে মানবসৃষ্ট আইন ও জঙ্গলের নীতির অধীন করতে তাদের সকল উপকরণ ব্যবহার করছে, তখন নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বাণী এক দৃঢ় বৌদ্ধিক ভিত্তি (intellectual foundation) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা মৌলিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে শক্তি জোগায়। ঈমানের মাধুর্য সংঘাতের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ইবাদতমূলক আচার নয়; বরং এটি এমন এক বিপ্লবী শক্তি, যা মানবতাকে পশ্চিমা ব্যবস্থার দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এবং তাকে ওহির কর্তৃত্বে ফিরিয়ে আনে। এই ভালোবাসাই গাজা, সিরিয়া, কাশ্মীর এবং তুর্কিস্তানের মুসলমানদের রক্তকে এক রক্তে পরিণত করে। এটি সেই বন্ধন, যা কৃত্রিম জাতীয়তাবাদী সীমানাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং সেগুলোকে ঔপনিবেশিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে।
এখানে ঈমানের মাধুর্য নিহিত রয়েছে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির জাতীয়তাবাদকে প্রত্যাখ্যান করে সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে একক পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ করার নিরন্তর প্রচেষ্টায়—যা রায়াহ আল-উকাবের পতাকা হিসেবে অভিহিত—যাতে মুসলমানরা এমন এক শক্তিশালী আন্তর্জাতিক শক্তিতে পরিণত হয়, যাকে অবিশ্বাসী ও উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো ভয় করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসে, সে এমন কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে মেনে নিতে পারে না, যার মাধ্যমে একটি ইহুদি রাষ্ট্রকে সেই ভূমিতে অধিকার প্রদান করা হয়েছে, যা ইসরা (রাত্রিকালীন সফর)-এর গন্তব্য হিসেবে পরিচিত।
ঈমানের এই স্বাদ জাতিসংঘ ও তার নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবসমূহকে প্রত্যাখ্যান করা এবং আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর শরীয়াহর প্রতি অটল থাকা অপরিহার্য করে তোলে—যা ফিলিস্তিনের প্রতি ইঞ্চি ভূমিকে সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে মুক্ত করার (তাহরীর) নির্দেশ দেয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ভিক্ষা চাওয়ার মাধ্যমে নয়; কারণ সেটি সমস্যার মূল উৎস। বরং এটি আল্লাহর ওহির সার্বভৌমত্বকে পশ্চিমা রাজনৈতিক কেন্দ্র যেমন হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনার ওপর ওপর সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার আহ্বান।
ঈমানের মাধুর্য নিহিত রয়েছে সেই বিশ্বাসের বন্ধনে, যা ইসলামি উম্মাহকে এক দেহের মতো ঐক্যবদ্ধ করে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর জন্য ভালোবাসা সাইকস-পিকট দ্বারা আরোপিত জাতীয়তাবাদী সীমারেখাকে ভেঙে দেওয়ার দাবি তোলে, যেগুলো তথাকথিত ইহুদি রাষ্ট্রকে রক্ষা করে রেখেছে। গাজা ও বায়তুল মাকদিসকে সমর্থন করা কেবল মানবিক সংহতির বিষয় নয়; বরং এটি এমন এক শরয়ি বাধ্যবাধকতা, যা মুসলিম ভূমিতে সামরিক শক্তি ও সুরক্ষার অধিকারীদের (أهل القوة والمنعة আহলুল কুওয়াহ ওয়াল মানাআহ) ওপর বাধ্য করে যে তারা সেই রুয়াইবিদাহদের— দুর্বল ও অযোগ্য শাসকদের —উৎখাত করবে, যারা সেনাবাহিনীকে আল-মসজিদ আল-আকসা মুক্ত করতে অগ্রসর হতে বাধা দেয়।
এই ভ্রাতৃত্ব দখলদার ইহুদি শক্তির সঙ্গে নিরাপত্তা-সমন্বয়কে প্রত্যাখ্যান করে এবং ভূমি ও তার জনগণকে মুক্ত করার লক্ষ্যে জিহাদের চেতনাকে পুনর্জীবিত করে।
ঈমানের এই মাধুর্য আকিদাভিত্তিক ভ্রাতৃত্বকে জাতীয়তাবাদী সামরিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে স্থান দেয়। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর জন্য ভালোবাসা দাবি করে যে, জর্ডান, মিশর, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সেনাবাহিনীতে থাকা মুসলমানরা গাজা, সুদান, মিয়ানমার (বার্মা) ও সিরিয়ার মুসলমানদের রক্ত ও ঈমানের ভাই হিসেবে দেখবে এবং তাদের তাৎক্ষণিক সহায়তার যোগ্য মনে করবে।
সামরিক বাহিনীতে থাকা একজন মুমিনকে কুফরের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মধ্যে থাকা এবং তার অধীনতাকে ততটাই ঘৃণা করতে হবে, যতটা সে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে ঘৃণা করে। এখানে ইসলামী আদর্শের প্রতি অবিচল থাকা মানে হলো পশ্চিমা আধিপত্য থেকে মুক্ত হওয়া এবং সামরিক বাহিনীকে উপনিবেশবাদীদের স্বার্থরক্ষার প্রহরী বা সন্ত্রাসবাদ বিরোধীতার নামে জনগণের ওপর নিপীড়নের হাতিয়ার হতে না দেওয়া। ঈমানের এই মাধুর্য সামর্থ্যবান ও শক্তিধর গোষ্ঠীসমূহকে (أهل القوة والمنعة) এ অপমানজনক বাস্তবতাকে প্রত্যাখ্যান করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং এমন এক মৌলিক পরিবর্তনের জন্য কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে, যা বর্তমান শাসনব্যবস্থার বৈধতাকে বিলুপ্ত করে দিয়ে নেতৃত্বকে এমন এক অভিভাবক ইমামের হাতে ন্যস্ত করবে—যার পেছনে থেকে সংগ্রাম করা হয় এবং যাকে রক্ষা করা হয়।
আজকের ফিলিস্তিন কোনো দুর্বল আরব সম্মেলন বা বিভ্রান্তিকর আন্তর্জাতিক প্রস্তাবের প্রতীক্ষায় নেই; বরং সে অপেক্ষা করছে এমন এক উম্মাহর, যার সন্তানেরা ঈমানের মাধুর্য আস্বাদন করেছে—যারা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর পথে নিজেদের রক্ত উৎসর্গ করতে প্রস্তুত এবং পুঁজিবাদী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
আজকের এই সংগ্রাম মূলত দুই ধারার মধ্যে—মুক্তির আদর্শ (তাহরীর) এবং আত্মসমর্পণের আদর্শের মধ্যে সংগ্রাম।
খিলাফতের প্রতি বিশ্বাস হোক দিকনির্দেশক, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর জন্য একজন মুসলমানের অপর মুসলমানের প্রতি ভালোবাসা হোক তার শক্তির উৎস, আর কুফরী ব্যবস্থার প্রতি ঘৃণা হোক তার চালিকাশক্তি। আজকের মুসলিম বিশ্বের অবস্থা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, তাদের সংকট অস্ত্র বা জনশক্তির ঘাটতিতে নয়; বরং তাদের যুদ্ধনীতি এমন শাসনব্যবস্থার শৃঙ্খলে আবদ্ধ, যা উপনিবেশিক শক্তির প্রতি আনুগত্যে বন্দী । এখানেই ‘ঈমানের মাধুর্য’ বিষয়ক এই আলোচনা সামরিক পরিমণ্ডলের ভেতরে মৌলিক পরিবর্তনের এক অঙ্গীকারে রূপ নেয় এবং সৈন্যদের তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্যপানে সংগঠিত করার প্রেরণা হিসেবে কাজ করে ।
উপনিবেশবাদীরা এমন এক মানসিকতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে একজন মুসলিম সৈনিক তার পাশের দেশের সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম পরা আরেক মুসলমানকেই শত্রু হিসেবে দেখতে শেখে; অথচ একই সময়ে আমেরিকা ও ফ্রান্সের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়াকে নিরাপত্তার অপরিহার্যতা হিসেবে গ্রহণ করে!
ধর্মনিরপেক্ষ সামরিক দর্শনে একজন সৈনিক আদেশকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেয়—সে আদেশ বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ হলেও—এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে, তা যতই জালিম হোক না কেন। কিন্তু ইসলামী আকীদাহর দাবি হলো, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশ একজন অফিসার ও সৈনিকের কাছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ও অধিক প্রিয় হতে হবে। এই নির্দেশ তখন সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ডারের আদেশেরও ঊর্ধ্বে অবস্থান করে, যদি তা ইসলামের শরীয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়; এবং সেই শাসনব্যবস্থার স্বার্থেরও ঊর্ধ্বে, যা তথাকথিত ইহুদি সত্তার জাতীয়তাবাদী সীমানাকে পাহারা দেয়।
প্রকৃত সামরিক ডকট্রিন হলো সেই চেতনা, যা একজন সৈনিককে উপলব্ধি করায় যে, সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর অবাধ্য হয়ে অজ্ঞ ও অযোগ্য মানুষের আনুগত্য করা চরম ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়; আর প্রকৃত আনুগত্য হলো আল্লাহর দ্বীনকে সমর্থন করা এবং তাঁর কালিমাকে সর্বোচ্চ স্থানে প্রতিষ্ঠা করা। আজকের বাস্তবতায় এর প্রতিফলন ঘটে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক সহায়তা (নুসরাহ) প্রদানের মাধ্যমে— যা বাহিনীকে নিছক কুচকাওয়াজ বা প্রদর্শনীর বাহিনী না বানিয়ে ইতিহাস নির্ধারণকারী মহাকাব্যিক যুদ্ধের দিকে ধাবিত করে।
আমেরিকান সহায়তা, পশ্চিমা প্রশিক্ষণ এবং অপমানজনক নিরাপত্তা চুক্তির ওপর বাহিনীগুলোর অব্যাহত নির্ভরতা আসলে এমন এক আগুন, যা সৈনিকের মর্যাদা ও দ্বীনকে গ্রাস করে। আর দাওয়াহ বহনকারীর দৃষ্টিতে ঈমানের মাধুর্যই সেই শক্তি, যা দুর্বলতাকে শক্তিতে রূপ দেয়, বিভক্তিকে ঐক্যে পরিণত করে, এবং হতাশাকে পরিণত করে দৃঢ় অঙ্গীকারে।
এটি এমন কোনো অনুভূতি নয়, যা সালাত শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা—যা এ ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে যে, মহাগ্রন্থ কুরআনের উম্মাহ পুঁজিবাদী শক্তির অধীনস্থ হয়ে থাকবে, কিংবা অবিশ্বাসী শক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চে পরিণত হবে। যখন উম্মাহর শাবাব—তরুণ-তরুণীরা—এই ঈমানের মাধুর্য আস্বাদন করবে,, তখন জুলুমের সিংহাসন তাদের কাছে মাকড়সার জালের চেয়েও তুচ্ছ হয়ে যায়; আর তথাকথিত বাস্তববাদী, পরাজিত রাজনৈতিক যুক্তির পাথরসম ভিত্তি তাদের দৃঢ় আদর্শিক অবস্থানের সামনে ধসে পড়ে। এই ঈমানের মাধুর্যই খিলাফতের ভোরের পথ প্রশস্ত করে—যেখানে ইসলাম আবার মানবতার নেতৃত্ব দেবে, আর ঈমান কেবল অন্তরের স্পন্দন হয়ে থাকবে না; বরং তা রূপ নেবে এমন ন্যায়বিচারে, যা সমগ্র পৃথিবীকে ভরিয়ে দেবে, এবং এমন এক শক্তিতে, যা অহংকারীদের শৃঙ্খল ভেঙে চূর্ণ করে দেবে।
যে উম্মাহর হৃদয় এই বার্তার সত্যে পরিপূর্ণভাবে সিক্ত, সে উম্মাহকে পরাজিত করা যায় না। ঈমানের মাধুর্য হলো সেই রসদ, যা আন্তরিক ও সত্যনিষ্ঠদেরকে জালিমদের নিপীড়নের মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলে।
তোমার ঈমানকে তোমার রাজনৈতিক কর্মের চালিকাশক্তি হতে দাও; আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ভালোবাসাকে বিভ্রান্তির অন্ধকারে আলোর দিশারী হিসেবে গ্রহণ কর; আর কুফরী ব্যবস্থার প্রতি ঘৃণাকে তাদের মূল থেকে উপড়ে ফেলার প্রেরণা বানাও।
খিলাফতের ভোর কোনো জাতিসংঘের প্রস্তাবের মাধ্যমে উদিত হবে না; বরং তা উদিত হবে সেই হৃদয়গুলোর মাধ্যমে, যারা ঈমানের মাধুর্য আস্বাদন করেছে, নিজেদের আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর কাছে সমর্পণ করেছে এবং তাঁর দ্বীন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছে। আর এটি আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর জন্য কোনো কঠিন বিষয় নয়।
মার্কিন ডলারের আধিপত্য: ব্রেটন উডস থেকে পেট্রোডলার এবং ভবিষ্যতের বিশ্ব ব্যবস্থা

বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দিকে লক্ষ্য করলে একটি অদ্ভুত বিষয় চোখে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিয়ত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বস্তুগত পণ্য আমদানি করছে—জার্মানির বিলাসবহুল গাড়ি, জাপানের অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক্স, চীনের তৈরি পোশাক ও যন্ত্রাংশ, কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেল। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র যা দিচ্ছে, তা মূলত ছাপাখানার কাগজ বা ডিজিটাল স্পেসের কিছু সংখ্যা—যার নাম ‘মার্কিন ডলার’। সাধারণ অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, বছরের পর বছর ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ে কোনো দেশের অর্থনীতি টিকে থাকতে পারে না। স্বাভাবিক নিয়মে সেই দেশের মুদ্রার মান ধসে পড়ার কথা এবং চরম মূল্যস্ফীতি দেখা দেওয়ার কথা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটছে না। এই বিস্ময়কর অর্থনৈতিক মডেলের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ কয়েক দশকের সুপরিকল্পিত আর্থিক কূটনীতি, সামরিক শক্তির প্রভাব এবং একটি বিশেষ ব্যবস্থা—যা বিশ্বকে মার্কিন মুদ্রার ওপর নির্ভরশীল করে রেখেছে। এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো মার্কিন ডলারের এই আধিপত্যের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, পেট্রোডলার ব্যবস্থার কার্যপ্রণালী এবং বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণ করা।
ব্রেটন উডস চুক্তি ও স্বর্ণের মানদণ্ড
মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্যের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে ১৯৪৪ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন প্রায় শেষের দিকে। ইউরোপ ও এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল যুদ্ধবিধ্বস্ত, অর্থনীতি বিপর্যস্ত। এই অবস্থায় বিশ্ব অর্থনীতিকে পুনর্গঠন এবং একটি স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মিত্রশক্তির ৪৪টি দেশের প্রতিনিধিরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটন উডস নামক স্থানে মিলিত হন। এই ঐতিহাসিক সম্মেলনেই জন্ম নেয় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিশ্বব্যাংক।
ব্রেটন উডস চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য একটি নতুন মানদণ্ড নির্ধারণ। যুদ্ধের সময় মিত্র দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রচুর অস্ত্র ও রসদ কিনেছিল এবং এর মূল্য পরিশোধ করেছিল স্বর্ণের মাধ্যমে। ফলে যুদ্ধের শেষে বিশ্বের মোট মজুত স্বর্ণের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই চলে আসে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। এই সুবিশাল স্বর্ণভাণ্ডারের ওপর ভিত্তি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাব দেয় যে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মুদ্রার মান ডলারের সাপেক্ষে নির্ধারিত হবে এবং ডলারের মান স্বর্ণের সাপেক্ষে নির্দিষ্ট থাকবে।
এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল একটি সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি: মার্কিন সরকার ঘোষণা করে যে, তারা যেকোনো বিদেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রতি আউন্স স্বর্ণের বিনিময়ে ৩৫ মার্কিন ডলার প্রদান করবে। অর্থাৎ, ডলার কেবল একটি কাগজের টুকরো ছিল না; এটি ছিল নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণের একটি আস্থার দলিল বা রসিদ। বিশ্বব্যাপী ডলারের প্রতি এই অগাধ আস্থার কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের ভল্টে সুরক্ষিত থাকা বাস্তব স্বর্ণ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ডলারকে গ্রহণ করেছিল কারণ তারা জানত, চাইলেই এই কাগজ দিয়ে সরাসরি ভৌত স্বর্ণ পাওয়া সম্ভব। এই চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন ডলার ব্রিটিশ পাউন্ডকে সরিয়ে বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রার স্থান দখল করে নেয়।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ, মুদ্রাস্ফীতি এবং নিক্সন শক
১৯৪৫ থেকে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত ব্রেটন উডস ব্যবস্থা বেশ সফলভাবেই কাজ করে। কিন্তু ষাটের দশকের শেষের দিকে এসে এই ব্যবস্থায় ফাটল ধরতে শুরু করে। এর প্রধান কারণ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যধিক ব্যয়। এক দিকে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসনের ‘গ্রেট সোসাইটি’ কর্মসূচির অধীনে ব্যাপক অভ্যন্তরীণ ব্যয়, অন্যদিকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিপুল সামরিক খরচ—সব মিলিয়ে মার্কিন অর্থনীতি চরম চাপের মুখে পড়ে।
যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ ঘাটতি মেটাতে মার্কিন সরকার তাদের স্বর্ণের মজুতের তুলনায় অনেক বেশি ডলার ছাপাতে শুরু করে। অর্থনীতিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ডলারের সরবরাহ মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের প্রকৃত মান কমতে শুরু করে। ইউরোপীয় দেশগুলো, বিশেষ করে ফ্রান্স, এই অসঙ্গতি প্রথম ধরতে পারে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট চার্লস দ্য গল মার্কিন সরকারের এই নীতির তীব্র সমালোচনা করেন এবং তাদের কাছে থাকা উদ্বৃত্ত ডলারের বিনিময়ে ব্রেটন উডস চুক্তি অনুযায়ী স্বর্ণ দাবি করতে শুরু করেন।
ফ্রান্সের দেখাদেখি অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও ডলারের ওপর আস্থা হারিয়ে তা স্বর্ণে রূপান্তর করতে শুরু করে। এই ব্যাপক দাবির ফলে আমেরিকার ফোর্ট নক্সের স্বর্ণের ভল্টগুলো দ্রুত খালি হতে থাকে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা স্বর্ণের পরিমাণ দিয়ে বাজারে থাকা সমস্ত ডলারের ব্যাকআপ দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। সরকার এমন স্বর্ণের রসিদ ইস্যু করছিল, বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্ব ছিল না।
এই চরম সংকটময় মুহূর্তে, ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন একটি যুগান্তকারী এবং একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি ঘোষণা দেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে ডলারের বিনিময়ে স্বর্ণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসছে। ইতিহাসে এই ঘটনা ‘নিক্সন শক’ (Nixon Shock) নামে পরিচিত। এই একটি মাত্র ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্বের প্রধান মুদ্রার সাথে একটি ভৌত পণ্যের (স্বর্ণ) দীর্ঘদিনের সংযোগ সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়ে যায়। ডলার পরিণত হয় একটি ‘ফিয়াট মুদ্রা’ বা আস্থানির্ভর মুদ্রায়—যার নিজস্ব কোনো অন্তর্নিহিত মূল্য নেই, কেবল সরকারের আদেশের কারণেই তা চলে। স্বর্ণের এই নিশ্চয়তা ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলার ব্যবহার চালিয়ে যাওয়ার আর কোনো যৌক্তিক কারণ বাকি ছিল না বিশ্বের কাছে।
পেট্রোডলারের জন্ম এবং মার্কিন-সৌদি কৌশলগত চুক্তি
স্বর্ণের মানদণ্ড বাতিল হওয়ার পর ডলারের ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন চরম অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, ঠিক তখনই মার্কিন নীতিনির্ধারকরা ডলারের জন্য একটি নতুন ‘অ্যাঙ্কর’ বা ভিত্তি খুঁজতে শুরু করেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, বিশ্বের প্রতিটি দেশের বেঁচে থাকার জন্য এমন একটি জিনিস প্রয়োজন যার চাহিদা কখনোই শেষ হবে না। সেই জিনিসটি হলো জ্বালানি তেল। আধুনিক শিল্পায়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সামরিক শক্তির মূল চালিকাশক্তি হলো তেল।
১৯৭০-এর দশকের শুরুতে সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদক এবং রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছিল। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার এবং প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের প্রশাসন সৌদি রাজপরিবারের সাথে একটি গোপন ও অত্যন্ত কৌশলগত চুক্তি সম্পাদনের উদ্যোগ নেয়। ১৯৭৪ সালে মার্কিন অর্থমন্ত্রী উইলিয়াম সাইমন সৌদি আরব সফর করেন এবং একটি ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছান।
এই চুক্তির শর্তগুলো ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি রাজতন্ত্রকে দীর্ঘমেয়াদী সামরিক সুরক্ষা প্রদান, অত্যাধুনিক অস্ত্র সরবরাহ এবং তাদের তেলের খনিগুলোকে যেকোনো বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেয়। এর বিনিময়ে সৌদি আরব একটি যুগান্তকারী শর্ত মেনে নেয়: তারা তাদের সমস্ত অপরিশোধিত তেল রপ্তানির মূল্য নির্ধারণ এবং বিক্রি করবে শুধুমাত্র এবং একচেটিয়াভাবে মার্কিন ডলারে। অন্য কোনো দেশের মুদ্রা তারা গ্রহণ করবে না।
সৌদি আরবের এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। অর্গানাইজেশন অফ দ্য পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ (OPEC) বা ওপেক-এর ভেতরে সৌদি আরবের ব্যাপক প্রভাব ছিল। তাদের নেতৃত্বে ১৯৭৫ সালের মধ্যে ওপেকের সদস্যভুক্ত অন্যান্য প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোও একই পথ অনুসরণ করে এবং ডলারে তেল বিক্রির নীতি গ্রহণ করে। স্বর্ণের মানদণ্ড থেকে তেলের মানদণ্ডে এই রূপান্তরের মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় ‘পেট্রোডলার’ (Petrodollar) ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থাটি মার্কিন মুদ্রার বৈশ্বিক চাহিদা স্থায়ীভাবে নিশ্চিত করে।
পেট্রোডলার রিসাইক্লিং: বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণের চক্র
পেট্রোডলার ব্যবস্থা কেবল ডলারের চাহিদাই বাড়ায়নি, এটি এমন একটি অর্থনৈতিক চক্র তৈরি করেছে যা পরোক্ষভাবে মার্কিন অর্থনীতিকে অর্থায়ন করে চলেছে। এই চক্রটি ‘পেট্রোডলার রিসাইক্লিং’ (Petrodollar Recycling) নামে পরিচিত। এই চক্রের কার্যপ্রণালী বিশ্লেষণ করলে বিশ্ব অর্থনীতির একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায়।
প্রথম ধাপ: ডলার অর্জন
জাপান, ভারত, চীন বা ইউরোপের যেকোনো দেশের তাদের অর্থনীতি সচল রাখার জন্য তেলের প্রয়োজন। কিন্তু ওপেক দেশগুলো যেহেতু তেল বিক্রির বিনিময়ে কেবল ডলারই গ্রহণ করে, তাই এই দেশগুলোকে আগে মার্কিন ডলার জোগাড় করতে হয়। ডলার পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো নিজেদের উৎপাদিত পণ্য, সেবা বা কাঁচামাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র খুব সহজেই শুধু কাগজ ছাপিয়ে বিশ্বের সেরা পণ্যগুলো ভোগ করার সুযোগ পায়।
দ্বিতীয় ধাপ: তেলের মূল্য পরিশোধ
পণ্য রপ্তানি করে অর্জিত ডলার দিয়ে এই দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাজার থেকে (মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে) অপরিশোধিত তেল ক্রয় করে। ফলে প্রচুর পরিমাণ মার্কিন ডলার তেল আমদানিকারক দেশগুলো থেকে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর (যেমন: সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত) হাতে গিয়ে জমা হয়।
তৃতীয় ধাপ: উদ্বৃত্ত ডলারের বিনিয়োগ (রিসাইক্লিং)
তেল বিক্রি করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর হাতে যে বিপুল পরিমাণ ‘উদ্বৃত্ত ডলার’ জমা হয়, তা তারা নিজেদের দেশের ভেতরে পুরোপুরি খরচ করতে পারে না। এই বিশাল অংকের অর্থ ফেলে রাখলে মুদ্রাস্ফীতি হতে পারে। তাই এই অর্থ পুনরায় বিনিয়োগ করার প্রয়োজন পড়ে। চুক্তির অলিখিত শর্ত এবং নিরাপত্তার খাতিরে, এই দেশগুলো তাদের উদ্বৃত্ত পেট্রোডলার পুনরায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেই বিনিয়োগ করে। তারা মূলত মার্কিন ট্রেজারি বন্ড (Treasury Bonds) কেনে এবং আমেরিকান স্টক মার্কেটে বা রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করে।
এই চক্রের চূড়ান্ত ফলাফল হলো একটি বাধ্যতামূলক অর্থায়ন ব্যবস্থা। পুরো বিশ্বকে তেলের জন্য ডলার মজুত করতে হচ্ছে এবং তেল উৎপাদকরা সেই ডলার আবার আমেরিকাতেই ফেরত পাঠাচ্ছে। এটি মার্কিন সরকারকে তাদের বিশাল বাজেট ঘাটতি এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের জন্য একটি স্থায়ী রক্ষাকবচ প্রদান করে। এই ব্যবস্থার কারণেই আমেরিকা তাদের সামর্থ্যের চেয়েও বেশি ঋণ নিতে পারে এবং সুদের হার কৃত্রিমভাবে কম রাখতে সক্ষম হয়।
ভূ-রাজনীতি, সামরিক আধিপত্য এবং সুইফট (SWIFT) ব্যবস্থা
পেট্রোডলার ব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কেবল অর্থনৈতিক সুবিধাই দেয় না, এটি তাদের ভূ-রাজনৈতিক এবং সামরিক আধিপত্যেরও মূল চাবিকাঠি। এই ব্যবস্থার কল্যাণে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ অর্থ সামরিক খাতে ব্যয় করার স্বাধীনতা পায়। বর্তমান বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট তাদের পরবর্তী ১০টি শক্তিশালী দেশের সম্মিলিত সামরিক বাজেটের চেয়েও বেশি। বিশ্বজুড়ে তাদের শত শত সামরিক ঘাঁটি এবং অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের পেছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তার জোগান পরোক্ষভাবে এই ডলারভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থাই দিয়ে থাকে।
এর বাইরে, ডলারের এই আধিপত্য যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রাথমিক অবকাঠামো ‘সুইফট’ (SWIFT – Society for Worldwide Interbank Financial Telecommunication)-এর ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রদান করে। সুইফট হলো আন্তর্জাতিক লেনদেনের একটি মেসেজিং নেটওয়ার্ক, যার মাধ্যমে এক দেশ থেকে অন্য দেশে অর্থ স্থানান্তরিত হয়। যেহেতু বিশ্বের প্রায় ৮০% এর বেশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং লেনদেন ডলারে হয়, তাই যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেই অধিকাংশ লেনদেন ক্লিয়ারেন্স পায়।
এই নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রকে একটি মারাত্মক অর্থনৈতিক অস্ত্র প্রদান করেছে। যদি কোনো দেশ মার্কিন নীতির বিরোধিতা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র সহজেই সেই দেশের ব্যাংকগুলোকে সুইফট নেটওয়ার্ক থেকে ব্লক করে দিতে পারে। আর্থিক অ্যাক্সেস বাতিল করার এই ক্ষমতা একটি আধুনিক রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান, ভেনিজুয়েলা এবং সর্বশেষ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার ওপর আরোপিত আর্থিক নিষেধাজ্ঞাগুলো এই ‘ওয়েপনাইজেশন অফ ফাইন্যান্স’ (Weaponization of Finance) বা ডলারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ এবং ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা
পেট্রোডলার একটি ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থা মনে হলেও, এর ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে অপরিশোধিত তেলের ভৌত (Physical) স্থানান্তরের ওপর। আর এই ভৌত স্থানান্তর মূলত কয়েকটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সংকীর্ণ সামুদ্রিক করিডোরের ওপর নির্ভরশীল। এই জায়গাগুলো বিশ্ব বাণিজ্যের ‘চোক পয়েন্ট’ (Choke points) হিসেবে পরিচিত।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz)। এটি পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী একটি অত্যন্ত সংকীর্ণ জলপথ, যার এক পাশে রয়েছে ইরান এবং অন্য পাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ২০% থেকে ৩০% প্রতিদিন এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার হয়। এই পথটি যদি কোনো কারণে বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি অচল হয়ে পড়ার উপক্রম হবে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ রুটটি হলো বাব-আল-মান্দেব প্রণালী (Bab-el-Mandeb Strait), যা লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরকে যুক্ত করেছে। এই প্রণালীটি ভারত মহাসাগর থেকে সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপের বাজারে পণ্য ও তেল সরবরাহের প্রধান পথ।
এই প্রণালীগুলোর ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান খুবই স্পর্শকাতর। হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের বিশাল নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং তারা প্রায়শই পশ্চিমা দেশগুলোর চাপের মুখে এই প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়। অন্যদিকে বাব-আল-মান্দেব প্রণালীর কাছেই ইয়েমেনের অবস্থান, যেখানে হুথি বিদ্রোহীরা প্রায়ই বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে আক্রমণ চালায়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বিশাল। তাদের প্রধান কাজগুলোর একটি হলো বিশ্বব্যাপী এই সমুদ্রপথগুলো খোলা রাখা এবং বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলী প্রমাণ করে যে, শক্তিশালী নৌবাহিনী থাকা সত্ত্বেও এই সংকীর্ণ প্রণালীগুলোর নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অসম যুদ্ধনীতি (Asymmetric warfare), ড্রোন হামলা এবং মাইন ব্যবহারের কারণে এই চ্যানেলগুলো সবসময়ই ঝুঁকির মধ্যে থাকে। এই পথগুলো সুরক্ষিত করতে না পারার এই অক্ষমতাই ডলার-ভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ভৌত দুর্বলতা প্রকাশ করে। যখনই এই রুটগুলোতে সংঘাত দেখা দেয়, গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হয় এবং মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের পলিসি যা-ই হোক না কেন, বিশ্বজুড়ে তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে।
মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে বিভাজন
সামুদ্রিক পথের এই দুর্বলতা এবং পেট্রোডলারের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতার কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি একটি নির্দিষ্ট ছকে আবদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে তেল সমৃদ্ধ আরব দেশগুলোর মধ্যে, কোনোভাবেই যেন রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে একটি ঐক্যবদ্ধ ব্লক বা জোট গড়ে উঠতে না পারে।
যদি কোনো কারণে মুসলিম তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা ডলারের পাশাপাশি অন্যান্য বিকল্প মুদ্রায় (যেমন ইউরো, চাইনিজ ইউয়ান বা স্বর্ণ) তেলের বাণিজ্য করবে, তবে সেটি হবে মার্কিন আধিপত্যের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা। মার্কিন নীতি নির্ধারকরা সর্বদা নিশ্চিত করতে চান যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যেন সুরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকে। এই বিভাজন নীতি বা ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসি নিশ্চিত করে যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা অন্যান্য গালফ দেশগুলো কখনোই পেট্রোডলার চুক্তির বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে অন্য মুদ্রায় বাণিজ্যের ঝুঁকি নেবে না।
ডি-ডলারাইজেশন: একটি নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার পদধ্বনি?
গত পাঁচ দশকে পেট্রোডলার ব্যবস্থা বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করলেও, বর্তমানে এর ভিত্তি কিছুটা হলেও নড়বড়ে হতে শুরু করেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন ‘ডি-ডলারাইজেশন’ (De-dollarization) বা ডলার নির্ভরতা কমানোর একটি সুস্পষ্ট প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
প্রথমত, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চীনের উত্থান। চীন বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ। তারা ক্রমশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে চাপ দিচ্ছে ডলারে নয়, বরং চীনের নিজস্ব মুদ্রা ‘ইউয়ান’-এ (Yuan) তেলের মূল্য গ্রহণ করার জন্য। একে বলা হচ্ছে ‘পেট্রো-ইউয়ান’ (Petro-yuan) এর ধারণা। সম্প্রতি সৌদি আরব এবং চীনের মধ্যে বেশ কয়েকটি বাণিজ্য চুক্তি ইউয়ানে সম্পন্ন হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা কয়েক দশক আগে অকল্পনীয় ছিল।
দ্বিতীয়ত, ব্রিকস (BRICS) জোটের সম্প্রসারণ। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত এই জোট সম্প্রতি সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর এবং ইথিওপিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে নিজেদের কলেবর বৃদ্ধি করেছে। ব্রিকস দেশগুলো নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ডলারের পরিবর্তে স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে একটি অভিন্ন ব্রিকস কারেন্সি চালুর ব্যাপারেও আলোচনা করছে।
তৃতীয়ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাত্রাতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞার প্রয়োগ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ বাজেয়াপ্ত করা এবং তাদের সুইফট ব্যবস্থা থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করেছে। অনেক দেশই এখন বুঝতে পারছে যে নিজেদের সম্পূর্ণ রিজার্ভ ডলারে রাখা এবং পশ্চিমা ব্যাংকিং সিস্টেমের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হওয়া জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হতে পারে। ফলে দেশগুলো এখন স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে এবং বাণিজ্যের বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম (যেমন চীনের CIPS) তৈরি করছে।
পেট্রোডলার ব্যবস্থার পতন হলে কী ঘটবে?
যদি সত্যিই বিশ্বজুড়ে তেলের বাণিজ্য থেকে ডলারের একচেটিয়া আধিপত্য কমে যায়, তবে তার ফলাফল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। কাঠামোগতভাবে এর প্রভাবগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ডলারের মান পতন: জ্বালানি কেনার জন্য যদি বিশ্বের আর ডলার মজুত রাখার বাধ্যবাধকতা না থাকে, তবে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের মজুতকৃত ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার বিশ্ববাজারে ছেড়ে দেবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের ব্যাপক অবমূল্যায়ন ঘটবে।
২. সুদের হার ও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি: পেট্রোডলার রিসাইক্লিংয়ের অভাবে মার্কিন ট্রেজারি বন্ড কেনার মতো বিদেশী ক্রেতার অভাব দেখা দেবে। সরকারকে ঋণ নেওয়ার জন্য বাধ্য হয়েই বন্ডের সুদের হার বাড়াতে হবে। এর ফলে আমেরিকান নাগরিকদের জন্য বাড়ি কেনার মর্টগেজ লোন, গাড়ির লোন এবং ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার বহুগুণ বেড়ে যাবে। অর্থনীতিতে চরম মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে যা জীবনযাত্রার মানকে ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেবে।
৩. নিষেধাজ্ঞার প্রভাবহীনতা: লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত দেশগুলো যদি ডলার-নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে নিজেদের মধ্যে জ্বালানি এবং প্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর বাণিজ্য করতে সক্ষম হয়, তবে মার্কিন আর্থিক নিষেধাজ্ঞার আর কোনো ধার থাকবে না। এটি বৈশ্বিক রাজনীতিতে আমেরিকার খবরদারি করার ক্ষমতা অনেকাংশে খর্ব করবে।
৪. সামরিক বাজেট সংকোচন: অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়লে এবং ঋণের বোঝা বেড়ে গেলে মার্কিন সরকারের পক্ষে বর্তমানের মতো এত বিশাল সামরিক বাজেট বজায় রাখা সম্ভব হবে না। এর ফলে বিশ্বব্যাপী তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলোর কার্যক্রম গুটিয়ে আনতে হতে পারে, যা বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে (Balance of Power) সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দেবে।
উপসংহার
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে অবস্থান কোনো শূন্য থেকে তৈরি হয়নি। এটি একটি অত্যন্ত জটিল, সুপরিকল্পিত এবং পঞ্চাশ বছর ধরে চলমান ‘তেল এবং ঋণের চক্রের’ ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলনে যে ডলারের আধিপত্যের বীজ বপন করা হয়েছিল, ১৯৭১ সালের স্বর্ণের মানদণ্ড বাতিলের মাধ্যমে তা এক গভীর সংকটে পড়েছিল। কিন্তু ১৯৭৪ সালের পেট্রোডলার চুক্তি সেই সংকট থেকে কেবল উত্তরণই ঘটায়নি, বরং মার্কিন অর্থনীতিকে একটি চিরস্থায়ী লাইফ-সাপোর্ট প্রদান করেছে।
আজকের দিনে পেট্রোডলার কেবল একটি অর্থনৈতিক ধারণা নয়; এটি বিশ্বের ভূ-রাজনীতি, যুদ্ধ এবং শান্তির নিয়ন্ত্রক। এই ব্যবস্থাটি ততদিনই স্থিতিশীল এবং কার্যকর থাকবে, যতদিন বিশ্বের প্রধান তেল উৎপাদক দেশগুলো তাদের এই অমূল্য সম্পদের দাম কেবল মার্কিন ডলারে নির্ধারণ করতে রাজি থাকবে এবং বিশ্ব বাণিজ্যে শক্তির প্রধান উৎস হিসেবে অপরিশোধিত তেল তার প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখবে।
তবে, ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে কোনো বৈশ্বিক মুদ্রার আধিপত্য চিরস্থায়ী হয় না। একসময় ডাচ গিল্ডার, ফরাসি ফ্রাঙ্ক এবং ব্রিটিশ পাউন্ডের যে আধিপত্য ছিল, তা সময়ের পরিক্রমায় ম্লান হয়ে গেছে। বর্তমান বিশ্বে ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ, নতুন অর্থনৈতিক জোটের উত্থান, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন (যেমন ডিজিটাল মুদ্রা) এবং ডলারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার মার্কিন নীতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিকল্প ব্যবস্থার যে সন্ধান চলছে, তা আগামী দশকগুলোতে মার্কিন ডলারের আধিপত্যের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। পেট্রোডলারের পতন হয়তো রাতারাতি ঘটবে না, তবে পরিবর্তনের হাওয়া যে বইতে শুরু করেছে, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। মুসলিম বিশ্বের মধ্যে ইতোমধ্যেই ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান প্রতিনিয়ত শক্তিশালী হচ্ছে। দীর্ঘ সময় সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব, শান্তি-নিরাপত্তার অভাব এবং মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য বিভিন্ন অধঃপতন ক্রমেই মুসলিমদের মাঝে ঐক্যের আওয়াজকে বুলন্দ করে চলছে। ঐতিহাসিকভাবে খিলাফত ব্যবস্থা যেভাবে মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি বৈশ্বিক শক্তিতে রূপান্তর করেছিল, অনেকেই ধারণা করেন আবারো মুসলিরা রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে মুসলিমরা পৃথিবীর নেতৃত্বের আসনে আসীন হতে পারবে এবং ইসলামের সার্বজনীন আদর্শ দ্বারা শাসনের মাধ্যমে মানবজাতিকে পুঁজিবাদী অর্থনীতির ভয়াল গ্রাস হতে মুক্ত করতে পারবে। ভবিষ্যতে যা-ই ঘটুক না কেন, বিশ্ব ব্যবস্থা আর এককেন্দ্রিক থাকবে না বলেই ইংগিত পাওয়া যাচ্ছে, বরং তা একটি ভিন্ন রকমের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকেই ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে।
মূল লেখা হতে ঈষৎ পরিমার্জিত
ভয়াবহ খাদ্য সঙ্কটের পদধ্বনি: বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের অনাহারের ঝুঁকি

ভূমিকা:
একটি আসন্ন বৈশ্বিক বিপর্যয়
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের কোনো এক প্রান্তিক কৃষকের মাথায় হয়তো এই চিন্তাই ঘুরছে যে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই মৌসুমে তার পক্ষে ধান চাষ করা আদৌ সম্ভব কি না। ঠিক একই সময়ে, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, আমেরিকার মিডওয়েস্ট অঞ্চলের একজন কৃষক ভুট্টার বদলে সয়াবিন চাষের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন মনে হলেও এই ধরনের সিদ্ধান্তগুলো আগামী ছয় মাসের মধ্যে সাধারণ ভোক্তাদের জন্য তাদের বাজারদর ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ রূপ নিতে পারে যে, জাতিসংঘ ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে প্রায় সাড়ে চার কোটি (৪৫ মিলিয়ন) মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হতে পারে এবং অনেক বিশেষজ্ঞ এমনকি বিশ্বব্যাপী একটি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের আশঙ্কাও করছেন।
সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে আমেরিকা এবং জায়নবাদীদের দ্বারা ইরানের বিরুদ্ধে সূচিত একটি আগ্রাসী যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। বিশ্ববাসী জানত যে এই প্রণালীটি জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি বন্ধ হলে তেলের দাম আকাশছোঁয়া হবে, কিন্তু অনেকের কাছেই যা চরম বিস্ময়ের বিষয় ছিল তা হলো—এই সংকীর্ণ জলপথটি বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে ঠিক কতটা অপরিহার্য!
উপসাগরীয় অঞ্চল এবং বৈশ্বিক সারের একচেটিয়া বাজার
বিশ্বের মানচিত্রে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েতের মতো দেশগুলোকে খুব সহজেই চিহ্নিত করা যায়। এই দেশগুলো বিশ্বের অন্যতম প্রধান সার রপ্তানিকারক হিসেবে পরিচিত। মজার ব্যাপার হলো, তাদের এই আধিপত্যের কারণ তাদের উর্বর কৃষিজমি নয় (যা তাদের নেই), বরং রসায়নবিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে জ্বালানি শক্তিকে সারে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে তাদের এই অসামান্য দক্ষতা।
ফসল ফলানোর জন্য তিনটি প্রধান পুষ্টি উপাদানের প্রয়োজন হয়: নাইট্রোজেন, ফসফরাস এবং পটাশিয়াম। এর মধ্যে নাইট্রোজেন এবং ফসফরাস—এই দুটির উৎপাদনে উপসাগরীয় অঞ্চল একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।
– নাইট্রোজেন ও ইউরিয়া: নাইট্রোজেন সার তৈরির রসায়নটি প্রায় এক শতাব্দী আগে ‘হাইবার-বশ’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয়। প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে হাইড্রোজেন নিষ্কাশন করে অত্যন্ত উচ্চ চাপে বাতাসের নাইট্রোজেনের সাথে মিশিয়ে অ্যামোনিয়া তৈরি করা হয়, যা পরবর্তীতে ইউরিয়ায় পরিণত হয়। অর্থাৎ, প্রাকৃতিক গ্যাস এখানে শুধু কারখানা চালানোর জ্বালানি নয়, এটি সার তৈরির মূল কাঁচামাল। সিন্থেটিক সার ছাড়া আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা প্রায় অচল, যা বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যার খাদ্যের জোগান দেয়। এই সারগুলো না থাকলে বিশ্বব্যাপী ফসলের ফলন ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ হ্রাস পাবে, যার ফলে বিশ্বের অর্ধেক মানুষ অনাহারে মারা যেতে পারে।
– ফসফরাস ও সালফার: সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ফসফেট রপ্তানিকারক দেশ। ফসফেট প্রক্রিয়াজাত করে ব্যবহারযোগ্য সার তৈরি করতে সালফার অপরিহার্য, যা তেল পরিশোধন প্রক্রিয়ার একটি উপজাত (byproduct) হিসেবে পাওয়া যায়। যুদ্ধ বা অবরোধের কারণে যখন তেল শোধনাগারগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, তখন সালফারের সরবরাহও থেমে যায়। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ফসফেট প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর।
পটাশিয়াম সরবরাহ এবং পরাশক্তিদের বিধিনিষেধ
তৃতীয় প্রয়োজনীয় উপাদান পটাশিয়াম মূলত কানাডা, রাশিয়া এবং বেলারুশ থেকে আসে। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রাশিয়া ইতোমধ্যে তাদের সার রপ্তানি স্থগিত করেছে। অন্যদিকে, সংঘাত শুরু হওয়ার আগে থেকেই চীন সার রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল, কিন্তু যুদ্ধের মাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে বেইজিং নাইট্রোজেন, ফসফেট এবং বিভিন্ন মিশ্র সারের ওপরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। রাশিয়া এবং চীনের মতো দেশগুলো যখন নিজেদের কৃষির জন্য সার মজুদ করতে শুরু করে, তখন এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বিশ্ব একটি ভয়াবহ খাদ্য সঙ্কটের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
জ্বালানি সঙ্কট: খাদ্যের ওপর ‘লুকানো কর’
খাদ্য উৎপাদন শুধু সার প্রয়োগের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। কৃষকের মাঠ তৈরি করা, বীজ বপন, সেচ পাম্প চালানো থেকে শুরু করে ফসল কাটা, শস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, রেফ্রিজারেশন এবং ট্রাক বা জাহাজে করে পরিবহন—এই প্রতিটি ধাপে প্রচুর পরিমাণ জ্বালানির প্রয়োজন হয়। যখন তেলের দাম বৃদ্ধি পায়, তখন পরিবহন ও উৎপাদিত প্রতিটি ক্যালোরি খাদ্যের ওপর এক ধরনের ‘লুকানো কর’ (hidden tax) আরোপিত হয়, যা শেষ পর্যন্ত ক্রেতাকেই বহন করতে হয়।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে কমোডিটি মার্কেট বা পণ্য বাজারের জটিলতা। তেল, গ্যাস এবং সারের মতো পণ্যগুলো বিনিয়োগকারীদের দ্বারা ফিউচার মার্কেটে লেনদেন হয়, যারা জীবনে হয়তো এক ব্যারেল তেল বা এক বস্তা ইউরিয়া স্পর্শও করেনি। কিন্তু যখনই যুদ্ধ বেধে যায়, তখন এই ট্রেডাররা ঝুঁকির মূল্য নির্ধারণ করতে শুরু করেন, যার ফলে বিশ্বজুড়ে শুধু জ্বালানি নয়, সারের দামও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। এই দুই সঙ্কটের—সারের ঘাটতি এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধি—সম্মিলিত রূপ শুধু খাদ্যের দামই বাড়ায় না, বরং খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়াকেই চরম হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
বিশ্বজুড়ে সঙ্কটের বহুমুখী প্রভাব
খাদ্য সঙ্কটের এই ঢেউ বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় আঘাত হানছে:
– উপসাগরীয় দেশসমূহ: যারা সার ও জ্বালানি রপ্তানি করে, তারা নিজেদের প্রয়োজনীয় খাদ্যের ৯০ শতাংশেরও বেশি আমদানি করে থাকে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং কুয়েতের মতো দেশগুলো এখন নিজেদের মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য অনেক বেশি খরচে বিকল্প আমদানির পথ খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
– দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকা: এই অঞ্চলগুলো ব্যাপকভাবে আমদানিকৃত সারের ওপর নির্ভরশীল। ভারত তার প্রয়োজনীয় অ্যামোনিয়া-ভিত্তিক সারের তিন-চতুর্থাংশ মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করে। সুদান ৫০ শতাংশেরও বেশি এবং শ্রীলঙ্কা ও সোমালিয়া প্রায় ৩০ শতাংশ সার আমদানি করে। কেনিয়া বা শ্রীলঙ্কার একজন ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য সারের এই মূল্যবৃদ্ধির অর্থ হলো, তিনি এবার ফসল ফলাতে পারবেন কি পারবেন না তার মধ্যকার পার্থক্য।
– ব্রাজিল: বিশ্বের বৃহত্তম সয়াবিন রপ্তানিকারক দেশ ব্রাজিল, যারা চীন এবং ইউরোপের গবাদি পশুর খাদ্যের জোগান দেয়। কিন্তু ব্রাজিল তাদের সারের ৯২ শতাংশই আমদানি করে মূলত রাশিয়া এবং উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। ব্রাজিলের ফলন কমে গেলে ইউরোপ ও চীনে মাংসের দাম বহুগুণ বেড়ে যাবে।
– পাশ্চাত্য বিশ্ব: আমেরিকা বা ইউরোপ হয়তো সরাসরি অনাহারের মুখে পড়বে না, কিন্তু তাদেরও চড়া মূল্য চোকাতে হবে। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন কৃষকরা তাদের স্বাভাবিক সারের মাত্র ৭৫ শতাংশ সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন এবং মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ইউরিয়ার দাম ৩২ শতাংশ বেড়ে যায়। অন্যদিকে, ব্রিটেনে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের বেশি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিপর্যয়ের আসল রূপ এখনো আসা বাকি
জ্বালানির বাজার তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখালেও, খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা একটি নির্দিষ্ট ফসল চক্র বা ক্রপ সাইকেলের (crop cycle) ওপর নির্ভর করে। উত্তর গোলার্ধের কৃষকরা এই মুহূর্তে যে বীজ বপনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তার ওপর ভিত্তি করেই আগামী শরৎ-এর ফলন নির্ধারিত হবে। গবাদি পশুর খাদ্য ব্যয়বহুল হয়ে যাওয়ায় এখন যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তা ২০২৭ সালের মাংসের সহজলভ্যতা নির্ধারণ করবে।
বর্তমান বিশ্বে গুদামগুলোতে পর্যাপ্ত খাবার মজুত রয়েছে যা হয়তো তাৎক্ষণিক সঙ্কট সামাল দিতে পারে, কিন্তু ২০২৬-২০২৭ সালের ফসল উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি বীজ বোনার আগেই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সঙ্কটের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপটি দেখা যাবে আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে, এবং খাদ্যের এই চড়া মূল্য দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকবে। প্রণালী যদি আজই খুলে দেওয়া হয় এবং যুদ্ধ যদি এখনই থেমে যায়, তবুও এই সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান সম্ভব নয়; কারণ মার্চ-এপ্রিলে যে সার প্রয়োগ করার কথা ছিল, তা জুন মাস পার হয়ে গেলে পূর্বাপেক্ষায় (retroactively) প্রয়োগ করা যায় না। বীজ বপনের সময়কাল কোনো কূটনৈতিক আলোচনার জন্য অপেক্ষা করে না।
মানবিক মূল্য ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
দিনশেষে এই খাদ্য সঙ্কট একটি গভীর মানবিক সঙ্কট। বাংলাদেশের একটি দরিদ্র পরিবারকে যখন চালের জন্য ৩০ শতাংশ বেশি দাম দিতে হয়, অথবা কেনিয়ার একজন ক্ষুদ্র কৃষক যখন তার ফসলের জন্য ইউরিয়া কিনতে পারেন না, তখন এর প্রভাব হয় ধ্বংসাত্মক। একইভাবে, বার্মিংহামের একজন সিঙ্গেল মাদারের সাপ্তাহিক বাজারের খরচ যখন ২০ শতাংশ বেড়ে যায়, তখন পশ্চিমা বিশ্বও এর আঁচ থেকে রেহাই পায় না। কারণ, সারের দাম বিশ্বব্যাপী নির্ধারিত হয়, এবং মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এর সরবরাহ বন্ধ হলে পুরো পৃথিবীতেই খাদ্যের দাম বাড়বে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সঙ্কটটি এমন একটি যুদ্ধের ফল যা ট্রাম্প প্রশাসন এবং যায়নবাদীদের দ্বারা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, অথচ এর ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে বিশ্বের ৮০০ কোটি সাধারণ মানুষকে, যাদের এই সিদ্ধান্তে কোনো হাত ছিল না। ক্ষমতাশালীরা নিজেদের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, আর তার মূল্য চোকাচ্ছে সাধারণ মানুষ।
এই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে মুসলিম বিশ্ব এবং তাদের সম্পদ। কিন্তু মুসলিম উম্মাহর মধ্যে একতার অভাব, জাতি-রাষ্ট্রে বিভাজন এবং পশ্চিমাদের অনুগত নেতৃত্বের কারণেই আজ এই বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্য সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে। মুসলিম উম্মাহর নিজেদের স্বাধীনতা এবং স্বয়ংসম্পূর্ণতার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত উপকরণ রয়েছে। কিন্তু তাদের নিজেদের পানিপথ এবং কৌশলগত সম্পদগুলোর (যেমন জ্বালানি ও সার) ওপর সম্পূর্ণ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আমেরিকা এবং জায়নবাদীদের এই অঞ্চলে হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। পশ্চিমা বিশ্ব কখনোই স্থিতিশীলতা বা প্রগতির রক্ষক নয়; বরং তারা হলো বিশৃঙ্খলার প্রধান রূপকার। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই সম্পদগুলো উপহার হিসেবে দিয়েছেন, যা মুষ্টিমেয় ধনীদের শোষণের জন্য নয়, বরং শরিয়াহর বিধান অনুযায়ী বিশ্বের সমস্ত মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য। ইসলামে খাদ্য কোনো বিলাসবহুল বস্তু নয়, বরং এটি আদম সন্তানের প্রতিটি মানুষের একটি মৌলিক অধিকার বা ‘হক’ হিসেবে স্বীকৃত।
কেন কিছু কিছু মানুষ হঠাৎ চুপ হয়ে যায়

কখনো কি এমন মুহূর্ত এসেছে যখন আমাদের মনে এ অনুভূতি এসেছে, “আমি এই বিষয়ে আর কথা বলতে চাই না”?
কিছু মানুষের মনে এই ভাবনা অন্যদের চেয়ে বেশি আসে। কখনো কখনো “চুপ করে থাকা” কেবলই মানসিক পরিপক্কতার একটি চিহ্ন; অনেকের মাঝে এ উপলব্ধি তৈরি হয় যে, বেশি কথা বললেই যে যোগাযোগ আরও ভালো হবে, এমনটা নয়। তাই তারা যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই কথা বলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
যে আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান রাখে যে যেন কথা বললে উত্তম কথা বলে নতুবা নিশ্চুপ থাকে
কিন্তু কখনো কখনো মানুষ অন্য কারণেও চুপ করে থাকে।
মানুষের “চুপ করে থাকার” কিছু কারণ:
অন্যদের সাথে কম মেলামেশা করা বা “চুপ করে থাকা” এমন একটি আচরণগত প্রতিক্রিয়া যা এতটাই সূক্ষ্ম যে, এটি কখনো কখনো দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের নজরে নাও পড়তে পারে।
এমনকি যখন মানুষ খেয়াল করে যে তারা বেশ সময় ধরে কারো সাথে কথা বলেনি কিংবা কোনো বন্ধুকে দেখে যে সে স্বাভাবিকের চেয়ে কম কথা বলছে, তখনও তারা ধরে নেন হয়তো অন্য ব্যক্তিটি কিছুটা ক্লান্ত, অন্যমনস্ক কিংবা ব্যস্ত।
নিশ্চয়ই এমন কিছু মানুষ আছেন যারা পরোক্ষ-আক্রমণাত্মক যোগাযোগ (Passive-Aggressive Communication)-এর একটি রূপ হিসেবে নীরবতা এবং নীরব আচরণকে ব্যবহার করেন। তথ্য চেপে যাওয়ার মাধ্যমে, এই ধরনের মানুষেরা প্রায়শই পারস্পরিক যোগাযোগের পরিমাণ এবং গভীরতা নিয়ন্ত্রণ করে অন্যদের সাথে তাদের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
কিন্তু নীরবতার অন্য অর্থও হতে পারে: এর অর্থ হতে পারে যে, যে ব্যক্তি চুপ করে আছেন তিনি একটি “প্রতিরক্ষামূলক মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া” (defensive psychological response) প্রদর্শন করছেন।
নিজেদের রক্ষা করার উপায় হিসেবে চুপ করে থাকা
প্রতিরক্ষামূলক মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়াগুলো ব্যক্তিবিশেষে (এবং নিজেদের মধ্যকার সম্পর্কে) নানাভাবে প্রকাশ পায়।
মানুষের নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার অন্যতম সাধারণ কারণ হলো আবেগের অতিরিক্ত চাপ। যখন রাগ, দুঃখ, এমনকি ব্যর্থতা বা বিভ্রান্তির অনুভূতিগুলো অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন মানুষ নিজেকে শান্ত করার জন্য কখনও কখনও কথা বলা বন্ধ করে দেয় বা শারীরিকভাবে নিজেকে গুটিয়েও নেয়।
সাধারণ উদ্বেগ (general anxiety) বা ঘন ঘন বিষণ্ণতা (depression)-এর মতো দীর্ঘমেয়াদী সমস্যাগুলোও মানুষকে অন্যদের সাথে কম মেলামেশা করতে ধাবিত করতে পারে। বিষণ্ণতা বা অবসাদের শিকার হলে ব্যক্তিরা প্রায়শই “স্তব্ধ” হয়ে যাওয়ার কথা বলেন এবং জানান যে অন্যদের সাথে যোগাযোগ বা কথা বলার মতো শক্তি তাদের নেই।
চরম ক্ষেত্রে, মানুষ ভাবতে শুরু করতে পারে যে তাদের কোনো কথাই কোনো কাজে আসে না, অথবা তাদের জীবনে কেউই তাদের কথা শুনছে না, তাই কথা বলে আর কী লাভ? মনোবিজ্ঞানী মার্টিন সেলিগম্যান এই প্রতিক্রিয়াটিকে “অর্জিত অসহায়ত্ব” (learned helplessness) বলে অভিহিত করেছেন, এবং এটি মানুষকে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে অথবা তাদের মতামত বা চাহিদা প্রকাশ করার চেষ্টা সম্পূর্ণরূপে আটকে দিতে পারে।
এই প্রতিরক্ষামূলক মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়াগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য এর নামের মধ্যেই নিহিত: এগুলো প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে। অনেক সময় আমরা এই আচরণগুলোর আশ্রয় নিই কারণ এগুলো আমাদের আরও নিরাপদ বোধ করতে সাহায্য করে।
কিন্তু চুপ করে থাকা কি আসলেই আমাদের আরও নিরাপদ করে তোলে?
নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া কীভাবে আমাদের (এবং অন্যদের) ক্ষতি করতে পারে
যখন মানুষ অন্যদের কাছে নিজেদের, তাদের বিশ্বাস বা কাজের ব্যাখ্যা দেওয়ার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলে, তখন তারা অন্যদের সাথে কম মেলামেশা করতে এবং নিজেদের কম প্রকাশ করতে শুরু করতে পারে।
কিছু সময়ের জন্য, এটি সঠিক বলে মনে হতে পারে। ব্যক্তিটি হয়তো অনুভব করতে পারে যে তার জীবনের বিষয়গুলো কম জটিল হয়ে উঠছে, অথবা সে মানুষকে যত কম বলবে, তত বেশি সুরক্ষিত এবং শান্ত বোধ করতে পারবে।
তবে, একটি সময়ে যেয়ে এই প্রতিরক্ষামূলক আচরণটি এই পথের পথিক ব্যক্তির জন্য সমস্যা তৈরি করতে শুরু করতে পারে। স্নায়ুবিজ্ঞানীরা মনে করেন যে যখন আবেগ প্রকাশ করা হয় না বা বাহ্যিকভাবে প্রকাশ করা হয় না, তখন “মস্তিষ্ক অভ্যন্তরীণভাবে সেগুলোকে আবর্তন করতে থাকে।”
যখন ব্যক্তিরা তাদের ক্রমাগত অনুভূত আবেগগুলোকে বোঝার চেষ্টা করে, কিন্তু অন্যদের সাথে তা ভাগ করে নেওয়ার বা প্রকাশ করার কোনো সুযোগ পায় না, তখন এটি একটি অপ্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ চক্র তৈরি করতে পারে যা তাদের মানসিক শক্তি নিঃশেষ করে দেয়।
কেউ যখন আমাদের আঘাত করার চেষ্টা করছে, বা হয়তো নিজেরাই আঘাত পেয়েছে, তা বোঝা
বছরের পর বছর ধরে, যোগাযোগ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া এবং আবেগগতভাবে জড়িত না থাকাকে আমরা “নীরব আচরণ” (silent treatment) দেওয়া (বা পাওয়া) বলে উল্লেখ করে আসছি।
যেহেতু আমরা অনেকেই শৈশবে কিংবা তরুণ বয়সে কারো না কারো কাছ থেকে এই নীরব আচরণ (silent treatment)-এর শিকার হয়েছি, তাই আমাদের মনে হতে পারে যে এটি প্রায় সবসময়ই আমাদের আঘাত করার জন্য কিংবা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য করা হয়ে থাকে।
যদিও নীরব আচরণ ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে আঘাত করতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যবহার করা যেতে পারে, বিশেষ করে পরোক্ষ-আক্রমণাত্মক যোগাযোগ (Passive-Aggressive Communication) শৈলীর মানুষেরা এটি করে থাকে, তবে কখনো কখনো “চুপ করে থাকা” ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিতও দিতে পারে।
অনেক মানুষ যারা নিজেদের বা কোনো নির্দিষ্ট সম্পর্ককে আবেগগতভাবে রক্ষা করার জন্য নিজেকে গুটিয়ে নেয়, তারা আসলে অন্যদের প্রতি বেশ সহানুভূতিশীল হয়। তারা আসলে “অন্যদের গভীরভাবে বোঝে” এবং বিনিময়ে তারা চায় অন্যরাও যাতে তাদের বুঝে।
কখনো কখনো অন্যদের নীরবতাকে এভাবে বুঝতে হবে যে এটি তাদের কথা শোনার জন্য আমাদের প্রতি একটি আমন্ত্রণ।
আমাদের চারপাশের নীরবতাকে সযত্নে নিরাময় করা
কেউ আপনার অনুভূতিতে আঘাত করতে বা আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে যে নীরব আচরণ (silent treatment) ব্যবহার করে, তার প্রতিক্রিয়া জানানোর অনেক উপায় আছে। সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর মধ্যে একটি হলো নিজের সীমা ও প্রয়োজনগুলো নির্ধারণ করা এবং অন্য ব্যক্তিকে তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া। যদি এই নীরব আচরণ আপনাকে কষ্ট দেয়, তবে অন্য ব্যক্তিকে জানিয়ে দেওয়া যেতে পারে যে আপনি আপনার মানসিক স্বাস্থ্য ও সুখকে মূল্য দেন এবং আরও স্বাস্থ্যকর যোগাযোগের ধরন তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আপনি সরে আসবেন।
তবে, যে ব্যক্তি নিজেকে রক্ষা করার জন্য চুপ হয়ে গেছে, তার সাথে যোগাযোগ করার আগে আপনাকে কৌশল নিয়ে ভাবতে হতে পারে। আপনি কি মনে করেন এই সম্পর্কটির কোনো মূল্য আছে? আপনি কি মনে করেন যে ব্যক্তিটি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে এ কারণেই যে সে এটিকে তার নিজের উদ্বেগ বা বিষণ্ণতা থেকে মুক্ত থাকার একটি উপায় হিসেবে দেখে? অর্থাৎ সে তার জীবনে আর অতিরিক্ত ঝামেলা চায় না। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আপনি কী প্রতিক্রিয়া দেখাবেন তার ধরনকে প্রভাবিত করবে। অর্থাৎ, এ উত্তরগুলো জানার মাধ্যমে আমরা আরো গুছিয়ে আমাদের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতে পারবো।
একটি উপায় যা আপনি ব্যবহার করতে পারেন তা হলো আরও দৃঢ়ভাবে যোগাযোগ করা। ব্যক্তিটিকে (নরমভাবে) জানান যে আপনি তার যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি পরিবর্তন বা অনুপস্থিতি লক্ষ্য করেছেন। তাকে জানান যে আপনি বোঝেন তার এই নীরবতা একটি মানিয়ে নেওয়ার কৌশল হতে পারে, এবং তাকে জানান যে যদি তার কিছু আলোচনা করার থাকে তবে আপনি তার জন্য এভেলেভল আছেন।
সম্ভব হলে, সম্পর্কে আরও চাপ সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকুন। চূড়ান্ত শর্ত বা আপনার সময়সূচী অনুযায়ী কথা বলার দাবি না করার চেষ্টা করুন; পরিবর্তে, তাকে “যখন সে প্রস্তুত বোধ করবে” তখন আপনার সাথে যোগাযোগ করতে উৎসাহিত করুন। এমনকি আপনি তাকে কাউন্সেলিং বা অন্য কোনো থেরাপির কথা ভাবতেও উৎসাহিত করতে পারেন, যাতে সে তার চিন্তা ও অনুভূতিগুলো ভাগ করে নেওয়ার জন্য একটি নিরাপদ স্থান খুঁজে পায়।
আমরা একে অপরকে আরো স্বাস্থ্যকর যোগাযোগের উপায় বের করতে সাহায্য করতে পারি
আমরা এক অবিরাম ও বিভ্রান্তিতে পরিপূর্ণ কোলাহলের জগতে বাস করি। আমাদের বন্ধু বা পরিবারের নীরবতা বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া সবসময় লক্ষ্য করা (কিংবা তা ব্যাখ্যা করা বা বোঝা) সহজ নয়।
কিন্তু যদি আমরা লক্ষ্য করি যে আমাদের কাছের মানুষগুলো আগের চেয়ে কম কথা বলছে বা কম কিছু জানাচ্ছে, তবে এটি একটি লক্ষণ হতে পারে যে তারা এই কোলাহলপূর্ণ পৃথিবী কিংবা অন্য কোনো কারণে দিশেহারা বোধ করছে এবং যোগাযোগ করতে শক্তি পাচ্ছে না।
কখনও কখনও কারো নীরব থাকাটা আমাদের জন্য কষ্টদায়ক হয়, এবং আমাদের স্বাস্থ্য ও সুখ বজায় রেখে তার প্রতিক্রিয়া জানানোর অধিকার আমাদের আছে। কিন্তু যখন মানুষ দিশেহারা হয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয় এবং চুপ হয়ে যায়? তখন তাদের নিরাপদ এবং গুরুত্বপূর্ণ বোধ করাতে সাহায্য করাটা আমাদের দায়িত্ব হতে পারে। আমরা যদি সত্যিই আরও ভালো সম্পর্ক গড়তে চাই, তবে “নীরবতা”কে আরও গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করা আমাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে।
ইসলাম আমাদের নিজেদের সম্পর্কগুলোকে একনিষ্ঠ বা সিনসিয়ারভাবে ধরে রাখার জন্য তাগিদ দেয়। শুধুমাত্র সামাজিকতার খাতিরে সম্পর্ক মেনটেইন করা কিংবা স্বার্থের খাতির সম্পর্ক ধরে রাখা একজন ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। উপরিতলের সম্পর্ক (superficial relation) কোনো সুস্থ সম্পর্ক হতে পারে না। সাহাবী (রা)-দের বৈশিষ্টের ব্যপারে গবেষনা করতে গেলে আমরা জানতে পারি যে, তারা একেবারেই উপরিতলের মানুষ ছিলেন না (اكلف تكلفا)। অর্থাৎ, তাদের সম্পর্কগুলো ছিল গভীর ও মজবুত সম্পর্ক। তাদের ভেতরে ও বাইরের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। একে অপরের সাথে বিবাদ হলেও তারা কেউ কারো সাথে সম্পর্ক বিচ্ছেদ করতেন না। মতপার্থক্য থাকলেও একে অপরকে নসীহত করে যেতেন। ভুল হয়ে গেলে আল্লাহর ওয়াস্তে ক্ষমা চাইতেন এবং সহানুভূতি প্রদর্শন করতেন। এভাবেই তারা আমাদের জন্য রোলমডেল হয়েছেন।
নিজেদের আবেগ-অনুভূতি দাফন করাও ইসলামী দৃষ্টিভংগিতে সঠিক নয়। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর একটি হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে বলা হয়েছে, “যদি তুমি তোমার ভাইকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসো তবে তোমার উচিত তাকে সেটা বলা যে “আমি তোমাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি।” আর আবু দাউদে বর্ণিত সেই বিখ্যাত হাদীসটিতো আমরা সবাই জানি যেখানে বলা হয়েছে,
الدِّينُ النَّصيحةُ. قُلنا: لمَن؟ قال: للَّهِ ولكِتابِه ولرَسولِه، ولأئِمَّةِ المُسلِمينَ وعامَّتِهم
দ্বীন হচ্ছে নাসীহাহ (sincerity)। আমরা প্রশ্ন করলাম, কার জন্য (নাসীহাহ হে আল্লাহর রাসূল?) তিনি (সা) বললেন, আল্লাহ’র জন্য নাসীহাহ, তাঁর রাসূলের জন্য (নাসীহাহ), তাঁর কিতাবের জন্য (নাসীহাহ), মুসলিমদের নেতৃত্বের জন্য (নাসীহাহ) এবং সকল সাধারণ মুসলিমদের জন্য (নাসীহাহ)।
অর্থাৎ, আমাদের আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর কিতাবের ব্যপারে যেমন একনিষ্ঠ থাকতে হবে, একইভাবে আমাদের মুসলিম ভাইবোনদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একনিষ্ঠ থাকতে হবে। আলোচনার সুযোগ থাকলে কোনোভাবেই নীরব ও একাকী হয়ে যাওয়া যাবে না। শায়খ তাকী উদ্দিন আন-নাবহানি (রহ) তার গ্রন্থ আত-তাকাত্তুল আল-হিযবিতে বলেন,
“একাকীত্ব হচ্ছে একটি অসুস্থতা, অবশ্যই ব্যক্তি ও সমাজ হতে এর মূলোৎপাটন করতে হবে”
শত্রুতা ঘোষণা না করেই চীনের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ

بسم الله الرحمن الرحيم
শত্রুতা ঘোষণা না করেই চীনের জ্বালানি সরবরাহ লাইন নিয়ন্ত্রণ
(অনূদিত)আল-রায়াহ পত্রিকা – সংখ্যা ৫৯৩ – ০১/০৪/২০২৬
লেখক: উস্তাদ নাবিল আব্দুল করিমসমসাময়িক বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে, প্রধান শক্তিগুলো অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অঙ্গনে আধিপত্য বিস্তারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, যাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সংগ্রাম হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে। এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক বা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং উদীয়মান বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা নির্ধারণের একটি সংগ্রাম। এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকায় চীনের দ্রুত প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাব আমেরিকার দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা আধিপত্যকে হুমকির মুখে ফেলছে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুন রূপ দিচ্ছে। আমরা এটা বোঝাতে চাইছি না যে, চীন বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার বা একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার জন্য উপযুক্ত; চীনের নিজস্ব কোনো স্বতন্ত্র মতাদর্শ নেই। তবে, আমেরিকার আধিপত্যকে দমন করার, বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতাকে দুর্বল করার এবং একটি বহুমেরু বিশ্ব প্রতিষ্ঠা করার মতো ক্ষমতা চীনের রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে, প্রতিটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, প্রতিটি প্রযুক্তিগত চুক্তি, এবং সামুদ্রিক প্রণালী ও জ্বালানি করিডোরের প্রতিটি পদক্ষেপ একটি কৌশলগত দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়।
চীনের উত্থান এখন আর কেবল একটি শিল্পশক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি একটি আন্তঃমহাদেশীয় অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তিতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে, পরোক্ষ চাপের মাধ্যমে চীনের সম্প্রসারণকে প্রতিহত করে এই উত্থানকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে।
আমরা দেখছি, যুক্তরাষ্ট্র চীনে উন্নত চিপ ও এর উৎপাদন উপাদানের রপ্তানি বন্ধ করে চীনা প্রযুক্তিকে দমন করছে। এই উন্নত চিপগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন সরঞ্জাম এবং উন্নত ফটোলিথোগ্রাফি প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাষ্ট্র চীন থেকে কারখানাগুলো ভিয়েতনাম, ভারত এবং মেক্সিকোতে স্থানান্তর করে সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্গঠনের জন্য কাজ করেছে এবং ২০২২ সালের চিপস অ্যাক্টের মতো আইনের মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করেছে। চীনের উপর নির্ভরতা কমাতে এটি এশীয় দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক জোটও গঠন করেছে। এর লক্ষ্য হলো চীনা কারখানার উপর বিশ্বব্যাপী নির্ভরতা কমানো, যার ফলে বেইজিংকে একটি কৌশলগত দর কষাকষির হাতিয়ার থেকে বঞ্চিত করা।
এছাড়াও, যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের চারপাশে অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রতিরোধের একটি বলয় তৈরির লক্ষ্যে QUAD এবং AUCUS অংশীদারিত্বের মতো এশিয়ায় জোটগুলোকে শক্তিশালী করেছে।
তবে, তিনটি বিষয় অত্যন্ত সংবেদনশীল রয়ে গেছে: সামুদ্রিক পথ, স্থল শক্তি করিডোর এবং তাইওয়ান।
১. সমুদ্রপথে চাপ প্রয়োগ:
সমুদ্রপথে চাপ সরাসরি অবরোধ আরোপের মাধ্যমে নয়; বরং প্রতিরোধসক্ষমতা গড়ে তোলা বা এমন সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করার মাধ্যমে করা হয়, যাতে চীন উপলব্ধি করে যে সংঘাত বৃদ্ধি পেলে তার সামুদ্রিক Lifeline বিঘ্নিত হতে পারে। একে বলা যেতে পারে—“সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণে রাখা”।
দক্ষিণ চীন সাগর – সামুদ্রিক সম্প্রসারণ রোধ: যুক্তরাষ্ট্র চীনের নিয়ন্ত্রিত দ্বীপপুঞ্জের কাছে ‘ফ্রিডম অফ নেভিগেশন অপারেশনস’ (FONOPs) পরিচালনা করে, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম এবং মালয়েশিয়াকে তাদের সামুদ্রিক বিরোধে সমর্থন করে, ফিলিপাইনে অগ্রবর্তী ঘাঁটি স্থাপন করে এবং তাইওয়ানের কাছে যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করে চাপ প্রয়োগ করে। এইভাবে, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে চীনের সামুদ্রিক পরিসরে ব্যাঘাত ঘটাতে সক্ষম।
ভারত মহাসাগর – একটি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য:
ডিয়েগো গার্সিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগিতা এবং অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (OECD)-এর শক্তিশালী চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো—চীন যেন ভারত মহাসাগরকে তার স্থায়ী প্রভাবক্ষেত্রে রূপান্তর করতে না পারে।
হরমুজ প্রণালী – জ্বালানি চাপ: এই প্রণালীটি চীনের উদ্দেশ্যে গমনকারী উপসাগরীয় তেলের একটি বড় অংশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে ইরানের ওপর হামলা এবং প্রণালীটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি—এসব হয়তো ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল হতে পারে, তবে বাস্তবে এটি পুরোপুরি বন্ধ করা সহজ নয়। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে সংঘাতটি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, অথবা এমন কোনো সমঝোতা তৈরি হতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে ইচ্ছামতো প্রণালীটি নিয়ন্ত্রণ ও বন্ধ করার সুযোগ দেবে।
তাইওয়ান – সামুদ্রিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু: তাইওয়ান কেবল একটি রাজনৈতিক বা সার্বভৌমত্বের ইস্যু নয়; এটি একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথ। এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি চীনের বাণিজ্যিক নৌপথের ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।
এখানে দৃশ্যত কোনো সরাসরি অবরোধ নেই, নেই খোলামেলা সামরিক সংঘর্ষও। বরং এটি এমন এক সূক্ষ্ম কিন্তু শক্তিশালী কৌশল—যাকে বলা যায় “প্রয়োজনে সক্রিয় করা যায় এমন প্রতিরোধ ব্যবস্থা”। যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে এমন এক বিস্তৃত জোট ও সামরিক ঘাঁটির বলয় গড়ে তুলছে, যা চাইলে চীনের নৌবাণিজ্যকে ব্যাহত করতে, গতি কমিয়ে দিতে এবং ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ, আনুষ্ঠানিক অবরোধ ঘোষণা না করেই এই সক্ষমতাকে তারা কৌশলগত চাপ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে।
মালাক্কা প্রণালী – সবচেয়ে বিপজ্জনক সংকীর্ণ পথ: চীনের তেল আমদানির প্রায় ৬০% এই প্রণালীর মধ্য দিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র তার সপ্তম নৌবহরের স্থায়ী উপস্থিতি, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার সাথে নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব এবং চতুষ্পাক্ষিক জোটকে (ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র) শক্তিশালী করার মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করে। প্রয়োজনে এই প্রণালীর মধ্য দিয়ে যান চলাচল দ্রুত সীমাবদ্ধ করা যেতে পারে।
২. স্থলপথে চাপ প্রয়োগ:
চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর মাধ্যমে মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থলপথে বিকল্প সংযোগ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে।
মধ্য এশিয়া, রাশিয়া ও পাকিস্তান জুড়ে সড়ক, রেলপথ এবং জ্বালানি পাইপলাইনের এক বিস্তৃত নেটওয়ার্ক নির্মাণের মাধ্যমে তারা সামুদ্রিক নির্ভরতা হ্রাস করতে চায়।
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল সরাসরি এই পথগুলো বন্ধ করে দেওয়া নয়; বরং এগুলোকে আরও ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ এবং অস্থিতিশীল করে তোলা।
মধ্য এশিয়া – চীনের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ভারসাম্য পুনর্বিন্যাস: কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান এবং উজবেকিস্তান থেকে গ্যাস, তেল ও পণ্য পশ্চিম চীনে পরিবহন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ চাপের উদ্দেশ্য হলো—এই দেশগুলোকে বেইজিং-কেন্দ্রিক অংশীদারিত্ব থেকে সরে এসে বৈচিত্র্যময় সম্পর্ক গড়ে তুলতে উৎসাহিত করা; ইউরোপীয় ও আমেরিকান বিকল্প বিনিয়োগকে সমর্থন জোগাতে প্ররোচিত করা; এবং চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে আর্থিক হাতিয়ার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তা নেওয়া। এর মূল লক্ষ্য হলো এই অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক প্রভাবের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করা।
রাশিয়া – নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে চাপ: রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো পরিবহন নেটওয়ার্ক, ব্যাংকিং লেনদেন, শিপিং কোম্পানি এবং বীমা খাত—সবকিছুকেই গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো রাশিয়ার ভূখণ্ড ব্যবহার করে চীনের স্থলভিত্তিক বাণিজ্যকে জটিল করে তোলা এবং এর পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়া।
ভবিষ্যতে এমন উপায়ও খোঁজা হতে পারে, যার মাধ্যমে রাশিয়া ও চীনের মধ্যে জ্বালানি সংযোগ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া সম্ভব হবে।
চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC): এটি পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত হয়ে গোয়াদার বন্দরে গিয়ে শেষ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ভারতের সাথে আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখার মাধ্যমে; পাকিস্তানের অবকাঠামো খাতে চীনের বিনিয়োগের ওপর নজরদারির মাধ্যমে; এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ইসলামাবাদের ওপর আর্থিক চাপ প্রয়োগ করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো—এই প্রকল্পটিকে অভ্যন্তরীণ ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঝুঁকির মুখে রেখে সর্বদা অরক্ষিত অবস্থায় রাখা। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে কোনো সংঘাত দেখা দিলে এই করিডোরটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে; এমনকি যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রয়োজন মনে করে—এবং দুই দেশের মধ্যে আঞ্চলিক সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে—তবে এর ফলে এই করিডোরটি সম্পূর্ণ ধ্বংসও হয়ে যেতে পারে।
ইরান – একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থলভিত্তিক জ্বালানি কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত: বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি পরোক্ষভাবে এমন যেকোনো সমাধানের পথ রুদ্ধ করে দিতে পারে, যার মাধ্যমে ইরান হয়ে চীনে জ্বালানি সরবরাহের সুযোগ তৈরি হতে পারত। এই বিশৃঙ্খলা ও যুদ্ধের কারণে জ্বালানি পাইপলাইন এবং পরিবহন রুটগুলো আকস্মিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে—যা ঠিক প্রয়োজনীয় মুহূর্তে চীনের ওপর একটি পরোক্ষ আঘাত হিসেবে কাজ করবে।
স্থলপথগুলো সমুদ্রপথের মতো নয়; একটি স্থলপথ চাইলেই সহজে বন্ধ করে দেওয়া যায় না। তবে, এই কৌশলটিকে চীনের স্থলভিত্তিক জ্বালানি নেটওয়ার্ককে পরোক্ষভাবে দুর্বল করে তোলার একটি কৌশল হিসেবেই বর্ণনা করা যেতে পারে।
৩. পরিশেষে, তাইওয়ান ইস্যু:
এটিই হলো সবচেয়ে স্পর্শকাতর একটি বিষয়, যাকে অনেক সময় একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বা মোড়-পরিবর্তনকারী মুহূর্ত হিসেবে গণ্য করা হয়। তাইওয়ান এমন একটি অবস্থানে অবস্থিত, যা চীনের সমুদ্রসীমাকে বেষ্টন করে থাকা ‘প্রথম দ্বীপ শৃঙ্খল’ বা ‘ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন’-এর ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তাইওয়ান যদি চীনের প্রভাববলয় থেকে সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে এসে স্বাধীন হয়ে যায়, তবে চীন তার কৌশলগত সামুদ্রিক গভীরতা বা ‘স্ট্র্যাটেজিক মেরিটাইম ডেপথ’ হারিয়ে ফেলবে। তাছাড়া, তাইওয়ান হলো উন্নত চিপ তৈরির একটি বৈশ্বিক কেন্দ্র; সেখানে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে তা বিশ্ব অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেবে। এমনকি চীন যদি তাইওয়ান দখল করে নেয়, কিংবা তাইপেই থেকে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণা আসে, অথবা যুক্তরাষ্ট্র যদি সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করে—তবে তা একটি যুদ্ধেরও সূত্রপাত ঘটাতে পারে। তাই, এই বিষয়টি কৌশলগত অস্পষ্টতার এক ‘ধূসর অঞ্চলে’ (gray area) অবস্থান করছে; আর তাইওয়ানই হলো সেই কেন্দ্রবিন্দু বা ‘গিঁট’, যেখানে এসে এই সমস্ত সুতো একত্রিত হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, বর্তমানে চীনের সাথে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রকে খুব একটা আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না। এর পরিবর্তে, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি কৌশলগত পরিবেশ গড়ে তোলায় মগ্ন বলে মনে হচ্ছে, যেখানে ‘চাপ প্রয়োগ’ করার বিষয়টি যেকোনো মুহূর্তে ব্যবহারের উপযোগী একটি সহজলভ্য ও পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হিসেবে সর্বদা প্রস্তুত থাকে। যুক্তরাষ্ট্র কোনো আনুষ্ঠানিক অবরোধ ঘোষণা করছে না ঠিকই, কিন্তু তারা জ্বালানি মানচিত্রগুলো নতুন করে সাজাচ্ছে, সামরিক ঘাঁটিগুলোর অবস্থান পুনর্বিন্যাস করছে, দক্ষিণ চীন সাগরে নৌ-জোট গড়ে তুলছে, চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর বিকল্প পথগুলোতে সহায়তা দিচ্ছে এবং বাণিজ্যের সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন না করেই স্পর্শকাতর প্রযুক্তিগুলোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের জন্য তাদের দুয়ার পুরোপুরি বন্ধ করে দিচ্ছে না, বরং সেই যাতায়াতের পথগুলোকে ক্রমশ সংকুচিত করে আনছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কোনো গুলি ছুড়ছে না বটে, কিন্তু তাদের আঙুলটি ঠিকই বন্দুকের ট্রিগারের ওপর রাখা আছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের টিকে থাকার বা প্রতিরোধ গড়ে তোলার মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং একই সাথে চীনকে ‘বেষ্টন করে রাখার’ (containment) বিকল্প পথগুলোও খোলা রাখছে।
এভাবেই সেখানে একটি ‘প্রভাব বিস্তারকারী শক্তির’ দৃশ্যপট ফুটে ওঠে—যা তার চারপাশের পরিবেশকে নতুন করে ঢেলে সাজায়; যার ফলে চীনের প্রতিটি অগ্রগতি হয়ে ওঠে শর্তসাপেক্ষ, প্রতিটি পদক্ষেপ হয়ে ওঠে সুপরিকল্পিত এবং প্রতিটি চাল হয়ে ওঠে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অন্তত বর্তমান সময়ের জন্য হলেও, চীনের সাথে সম্পর্কের বাস্তবতাটি এখন এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে—যা মূলত ‘অঘোষিত চাপ’ এবং ‘যুদ্ধবিহীন সংঘাত’-এরই নামান্তর।
তখন স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্নটি সামনে চলে আসে: চীন কি এই প্রবল চাপ সামলে উঠতে পারবে? এই সমীকরণ কি শেষমেশ বদলে যাবে? এমন কি অন্য কোনো উপাদান বা শক্তি ক্রিয়াশীল রয়েছে, যা এই পুরো পরিস্থিতিকে উল্টে দিতে পারে? সময়ের পরিক্রমায়ই কেবল এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া সম্ভব হবে।
সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রমাণে নির্ভরশীলতার যুক্তি

কল্পনা করুন, আপনি একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে দেখলেন রাস্তায় ডোমিনোর একটি লম্বা সারি রয়েছে। এই সারি এতই দীর্ঘ যে চোখের শেষ সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। হঠাৎ একটি পরিচিত শব্দ কানে এলো – ডোমিনো পড়ার আওয়াজ। ছোটবেলায় আপনি ডোমিনো খেলতেন, তাই এই শব্দ চেনা। আওয়াজটি ধীরে ধীরে জোরালো হচ্ছে এবং কাছে আসছে।

কিছুক্ষণ পর দেখলেন, সত্যিই একের পর একে ডোমিনোগুলো পড়ে আসছে। পদার্থবিদ্যার সাধারণ নিয়মে এমন দুর্দান্ত দৃশ্য দেখে আপনি মুগ্ধ। কিন্তু একটু দুঃখও লাগলো, কারণ শেষ ডোমিনোটি আপনার পায়ের কাছে এসে পড়ে গেছে। এই চমৎকার অভিজ্ঞতায় রোমাঞ্চিত হয়ে আপনি স্থির করলেন – রাস্তা ধরে হেঁটে প্রথম ডোমিনো খুঁজে বের করবেন। যে ব্যক্তি এই অসাধারণ ব্যাপারটি ঘটিয়েছে, তার সাথে দেখা করতে চান।
এবার আসি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে,
প্রশ্ন ১: আপনি কি হেঁটে হেঁটে প্রথম ডোমিনো পাবেন, নাকি চিরকাল হাঁটতেই থাকবেন?
সবাই বলবে – অবশ্যই প্রথম ডোমিনো পাবেন। কিন্তু কেন এই উত্তর? কারণটি খুবই সহজ। যদি ডোমিনোর সারি অসীম হতো, তাহলে আপনার পায়ের কাছে যে শেষ ডোমিনোটি পড়লো, সেটি আসলে কখনোই পড়তো না। কেন? কারণ অসীম সংখ্যক ডোমিনো পড়তে অসীম সময় লাগবে। আর অসীম সময় মানে কখনোই শেষ হবে না। তাহলে শেষ ডোমিনো পড়ার সুযোগই থাকে না।
সহজ ভাষায় বললে – শেষ ডোমিনো পড়ার জন্য তার আগের ডোমিনো পড়তে হবে। সেই ডোমিনো পড়ার জন্য তার আগেরটি পড়তে হবে। যদি এই ব্যাপারটি অনন্তকাল চলতে থাকে, তাহলে শেষ ডোমিনো কখনোই পড়বে না।
প্রশ্ন ২: এখন ধরুন, হেঁটে হেঁটে আপনি প্রথম ডোমিনো খুঁজে পেলেন। এই প্রথম ডোমিনো সম্পর্কে আপনার মনে কী চিন্তা আসবে? মনে করবেন কি এটি নিজে নিজেই পড়েছে?
অবশ্যই না! আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতায় কিছুই নিজে নিজে ঘটে না। সবকিছুর পেছনে কোনো না কোনো কারণ থাকে। তাহলে প্রথম ডোমিনো পড়ার পেছনেও কোনো কারণ ছিল – হয়তো কোনো ব্যক্তি ধাক্কা দিয়েছে, বাতাসের ঝাপটায় পড়েছে, অথবা অন্য কিছু এটিকে আঘাত করেছে। যাই হোক না কেন, কোনো বাহ্যিক কারণ অবশ্যই ছিল।
সারকথা: ডোমিনোর সারি অসীম হতে পারে না এবং প্রথম ডোমিনো কোনো কারণ ছাড়া নিজে নিজে পড়তে পারে না।
এই ডোমিনোর গল্প আসলে “নির্ভরশীলতার যুক্তি” (Argument from Dependency) এর একটি সুন্দর উদাহরণ। মহাবিশ্ব অনেকটা এই ডোমিনোর সারির মতো। মহাবিশ্ব এবং এর ভেতরের সবকিছুই নির্ভরশীল। তারা অন্য কিছুর উপর নির্ভর করে, সেটি আবার অন্য কিছুর উপর – এভাবে চলতে থাকলে অসীম হয়ে যায়। কিন্তু আমরা দেখেছি অসীম নির্ভরতার শৃঙ্খল অসম্ভব।
তাহলে একমাত্র যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা হলো – মহাবিশ্ব এবং এর সবকিছু এমন একটি সত্তার উপর নির্ভরশীল যিনি স্বয়ং কারো উপর নির্ভরশীল নন। তিনি স্বাধীন ও চিরন্তন। সহজভাবে বলতে গেলে, এমন একটি স্বাধীন ও চিরন্তন সত্তা থাকতেই হবে যার উপর সবকিছু নির্ভরশীল।
Video courtesy: Somrat কোনো কিছু নির্ভরশীল বলতে আমরা কী বুঝি? (What does it mean when we say something is dependent?)
এই যুক্তি বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে “নির্ভরশীল” বলতে আমরা কী বুঝি। “Philosophy” বা “দর্শনে” নির্ভরশীলতার কয়েকটি সংজ্ঞা রয়েছে:
প্রথমত, প্রয়োজনীয় নয় এমন কিছু (It is something that is not necessary)
ফিলোসফিতে “প্রয়োজনীয়” বা “Necessary” শব্দের একটি বিশেষ অর্থ রয়েছে। এর মানে হলো যার অস্তিত্ব না থাকা অসম্ভব বা অকল্পনীয়। এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের “প্রয়োজন” শব্দের চেয়ে ভিন্ন। আমরা আমাদের চারপাশে যা কিছু দেখি, কিছুই প্রয়োজনীয় নয়। সবকিছুই থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে।
মনে করেন, আপনি যে চেয়ারে বসে আছেন, সেটি প্রয়োজনীয় নয়। এই চেয়ারটি না থাকতে পারতো। আপনি হয়তো এটি কিনতেন না, কোম্পানি হয়তো এটি তৈরি করতো না, দোকানদার হয়তো বিক্রি করতো না। অনেক কারণেই এই চেয়ার না থাকতে পারতো। এই “না থাকার সম্ভাবনা” হলো নির্ভরশীল জিনিসের মূল বৈশিষ্ট্য।
যে জিনিসটা নাও থাকতে পারত, তার ক্ষেত্রে খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে: “এই জিনিসটা কেন আছে?” এটা একটা যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন। এটা হতে পারে না যে জিনিসটা নিজেই নিজের কারণ, কারণ এর অস্তিত্বে অপরিহার্য কিছু নেই। যদি বলি যে জিনিসটা নিজেই নিজেকে ব্যাখ্যা করে, তাহলে আমরা যে নির্ভরশীলতার কথা বললাম সেটাকেই অস্বীকার করা হয়। তাই ব্যাখ্যাটা হতে হবে এর বাইরের কিছু। এই প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা মানে হলো বাহ্যিক কতগুলো বিষয় যা কোনো কিছুর অস্তিত্বের যুক্তিসঙ্গত কারণ দেয়।
আমাদের চেয়ারের উদাহরণে ফিরে যাই – কয়েকটা বিষয় মিলে, যেমন কারখানায় এটা তৈরি হওয়া, দোকানে এটা বিক্রি হওয়া, এবং আপনার এটা কেনা – এগুলো মিলেই চেয়ারটার অস্তিত্বের ব্যাখ্যা। সুতরাং কোনো কিছুর জন্য যদি বাহ্যিক বিষয়গুলোর (External factors) দরকার হয়, তার মানে সেটা নিজের চেয়ে অন্য কিছুর উপর নির্ভরশীল। ফলে এর অস্তিত্ব বাইরের কিছুর উপর নির্ভর করে। এটা একটা মৌলিক, স্বজ্ঞাত এবং বুদ্ধিবৃত্তিক (Rational) চিন্তাভাবনা। কারণ যে জিনিসের অস্তিত্ব আছে অথচ নাও থাকতে পারত, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাই বুদ্ধিমান মনের (Rational Mind) পরিচয়।
বিজ্ঞানীরা কী করেন ভেবে দেখুন। তাঁরা বাস্তবতার বিভিন্ন দিক দেখিয়ে প্রশ্ন করেন—এই ফুলটা কেন এমন? ওই ব্যাকটেরিয়া কেন এই রোগ ঘটায়? মহাবিশ্ব কেন এই গতিতে প্রসারিত হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলো যুক্তিসঙ্গত কারণ এগুলোর কোনোটাই অপরিহার্য নয়; এগুলো সব যেমন আছে তেমন নাও থাকতে পারত।
এই ধারণাটা আরও ভালো করে বোঝার জন্য এই উদাহরণটা ভাবুন:
আবার, সকালে ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘরে গেলেন। ফ্রিজ খুলে দেখলেন ডিমের বাক্সের উপর একটি কলম রয়েছে। আপনি কি মনে করবেন যে কলমটি নিজে নিজেই সেখানে গেছে? কখনোই না! আপনি অবশ্যই প্রশ্ন করবেন – কলমটি কীভাবে সেখানে এলো? কারণ কলমের ফ্রিজে থাকাটা প্রয়োজনীয় নয়। এর জন্য একটি ব্যাখ্যা দরকার। হয়তো আপনার ছেলে কলম কিনে এনে ফ্রিজে রেখেছে। তাই কলমটা এই বাহ্যিক বিষয়গুলোর উপর নির্ভরশীল, এবং এই বিষয়গুলোই কলমের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা দেয়।
দ্বিতীয়ত, উপাদানের বিন্যাস পরিবর্তনযোগ্য (Something is dependent if its components or basic building blocks could have been arranged in a different way).
যদি কোনো কিছুর উপাদানগুলো ভিন্নভাবে সাজানো যায়, তাহলে বুঝতে হবে কোনো বাহ্যিক শক্তি এই নির্দিষ্ট বিন্যাস নির্ধারণ করেছে। একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে বলি:
আপনি গাড়িতে করে বাড়ি ফিরছেন। রাস্তায় একটি চত্বর পার হওয়ার সময় দেখলেন ফুল দিয়ে লেখা “আমি তোমায় ভালোবাসি”। এই ফুলগুলোর বিন্যাস কি প্রয়োজনীয়? মোটেও না। এখানে “আমি তোমাকে পছন্দ করি” লেখাও হতে পারতো। অথবা একেবারেই এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে থাকতে পারতো। যেহেতু ভিন্ন বিন্যাস সম্ভব ছিল, তাই কোনো বাহ্যিক শক্তি (হয়তো মালী বা স্থানীয় সরকারের কোনো প্রকল্প) এই নির্দিষ্ট বিন্যাস তৈরি করেছে।
এই নিয়মটি আমরা যা কিছু দেখি সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একটি পরমাণু হোক, ল্যাপটপ হোক বা জীবদেহ হোক – সবকিছুর উপাদান একটি নির্দিষ্ট উপায়ে সাজানো। প্রতিটি উপাদানের অস্তিত্ব প্রয়োজনীয় নয়। তারা নিজেদের ব্যাখ্যা নিজেরা দিতে পারে না, তাই ব্যাখ্যা দরকার।
তৃতীয়ত, বাহ্যিক সহায়তার উপর নির্ভরতা (A thing is dependent if it relies on something outside itself for its existence)
এটি নির্ভরশীলতার সবচেয়ে সাধারণ সংজ্ঞা। যে কিছু অস্তিত্বের জন্য নিজের বাইরের কিছুর উপর নির্ভর করে, সেটি নির্ভরশীল। আরেকভাবে বলা যায়, যা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়।
একটা উদাহরণ হলো পোষা বিড়াল। বিড়াল নিজে নিজের ভরণপোষণ করতে পারে না। খাবার, পানি, অক্সিজেন, আশ্রয় – এসব বাহ্যিক জিনিসের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে।
সর্বশেষে, সীমিত ভৌত গুণাবলী (The defining features of a dependent thing are that it has limited physical qualities)
নির্ভরশীল জিনিসের একটি নির্দিষ্ট আকার, রং, তাপমাত্রা, চার্জ, ভর ইত্যাদি থাকে। কেন এই বৈশিষ্ট্যগুলো সীমিত? কারণ কোনো বাহ্যিক উৎস বা কারণ এই সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করেছে।
প্রশ্ন: কেন এই জিনিসটি এই আকারের? কেন দ্বিগুণ বড় নয়? কেন এই রং, অন্য রং নয়? এই জিনিসটি তো নিজে নিজেকে এই সীমাবদ্ধতা দেয়নি।
চলেন একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝি। আমি যদি একটা কাপকেক নিয়ে এর সীমিত ভৌত গুণাবলী – আকার, আকৃতি, রং আর গঠন – দেখিয়ে বলি যে এটা অপরিহারযভাবে অস্তিত্বশীল (existed necessarily), তাহলে আপনি আমাকে বোকা ভাববেন। আপনি জানেন যে এর আকার, রং আর গঠন বাহ্যিক কোনো উৎস নিয়ন্ত্রণ করেছে: এক্ষেত্রে সেটা হলো বেকার (Baker)। সীমিত ভৌত গুণাবলীর জিনিসগুলো নিজেরা এই গুণাবলী তৈরি করেনি। এই সীমিত ভৌত গুণাবলীর অস্তিত্বের ব্যাখ্যা অবশ্যই থাকতে হবে।
এ থেকে সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, সীমিত ভৌত গুণ বিশিষ্ট সব কিছুই সসীম। এর মানে হলো তারা একসময় শুরু হয়েছে। কারণ এসব সীমিত জিনিস চিরন্তন হওয়া অকল্পনীয়। তাদের সীমাবদ্ধতার জন্য দায়ী একটি বাহ্যিক উৎস বা কারণ তাদের আগে থেকেই থাকতে হবে।
ভাবুন তো, আমি যদি একটা গাছ নিয়ে বলি যে এটা চিরন্তন। আপনি কী বলবেন? আপনি এমন দাবি শুনে হাসবেন। এমনকি যদি গাছটার শুরুটা আপনি না দেখে থাকেন, তবুও আপনি জানেন যে এটা সসীম, কারণ এর সীমিত ভৌত গুণাবলী রয়েছে।
তবে সীমিত ভৌত বস্তুগুলো (মহাবিশ্ব সহ) যদি চিরন্তনও হয়, তাহলেও এটা পাল্টাবে না যে তারা নির্ভরশীল এবং অপরিহার্যভাবে নেই। এই যুক্তি কাজ করে বস্তুগুলো চিরন্তন হোক কিংবা এর কোনো শুরু থাকুক না কেন।
নির্ভরশীল হওয়ার এই সম্পূর্ণ সংজ্ঞা প্রয়োগ করলে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসি যে মহাবিশ্ব এবং এর ভেতরের সবকিছুই নির্ভরশীল। যে কোনো কিছু নিয়ে ভাবুন – একটি কলম, একটি গাছ, সূর্য, একটি ইলেকট্রন, এমনকি কোয়ান্টাম ফিল্ডও। এগুলো সবই কোনো না কোনোভাবে নির্ভরশীল।
যদি এটি সত্য হয়, তাহলে মহাবিশ্ব এবং এর সবকিছুর অস্তিত্ব তিনটি উপায়ের কোনো একটিতে ব্যাখ্যা করা যায়:
১. মহাবিশ্ব এবং আমাদের অনুভূত সবকিছু চিরন্তন, অপরিহার্য এবং স্বাধীন (The universe and all that we perceive are eternal, necessary and independent.)
২. মহাবিশ্ব এবং আমাদের অনুভূত সবকিছুর অস্তিত্ব অন্য কোন নির্ভরশীল বস্তুর উপর নির্ভর করে অর্থাৎ অসীম নির্ভরতার শৃঙ্খল (The existence of the universe and all that we perceive depends on something else which is also dependent.)
৩. মহাবিশ্ব এবং আমাদের অনুভূত সবকিছু তার অস্তিত্ব পায় এমন কিছু থেকে যা নিজের প্রকৃতি দ্বারাই বিদ্যমান এবং সেই কারণে চিরন্তন ও স্বাধীন (The universe and all that we perceive derives its existence from something else that exists by its own nature and is accordingly eternal and independent.)
আসুন দেখি কোন ব্যাখ্যাটি সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত।
১) মহাবিশ্ব এবং আমাদের অনুভূত সবকিছু চিরন্তন, অপরিহার্য এবং স্বাধীন
মহাবিশ্ব এবং এর সবকিছু কি নিজেদের উপর নির্ভর করে চিরকাল থাকতে পারে? এটি যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা নয়।
কেন নয়? মহাবিশ্ব এবং এর সবকিছুর অস্তিত্ব প্রয়োজনীয় নয়। তারা না-ও থাকতে পারতো। এছাড়াও তাদের সীমিত ভৌত গুণাবলী রয়েছে। যেহেতু তারা নিজেদের এই সীমাবদ্ধতা দিতে পারে না, তাই কোনো বাহ্যিক কারণ এই সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। মহাবিশ্ব এবং এর সবকিছু নিজেদের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা নিজেরা দিতে পারে না। তাদের উপাদানগুলো ভিন্নভাবেও সাজানো যেতে পারতো। তাই তারা নির্ভরশীল, স্বাধীন নয়।
এমনকি যদি মহাবিশ্ব চিরন্তন হয়, তবুও কিছু বাহ্যিক কারণ অবশ্যই ছিল যা এর সীমিত ভৌত গুণাবলী (Limited Physical Qualities) সৃষ্টি করেছে। মহাবিশ্বের উপাদানগুলো ভিন্নভাবে সাজানো যেতে পারতো এবং মহাবিশ্ব আদৌ না-ও থাকতে পারতো। মহাবিশ্ব নিজের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা নিজেই দিতে পারে না।
এসব বিবেচনায়, আমরা নিরাপদে এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করতে পারি যে মহাবিশ্বের চিরন্তনতা কোনোভাবে এর অস্তিত্বের ব্যাখ্যা দেয়।
২) মহাবিশ্ব এবং আমাদের অনুভূত সবকিছুর অস্তিত্ব অন্য কোন নির্ভরশীল বস্তুর উপর নির্ভর করে (অসীম নির্ভরতার শৃঙ্খল)
মহাবিশ্ব এবং এর সবকিছুর অস্তিত্ব কি এমন কিছুর উপর নির্ভর করতে পারে যেটিও নির্ভরশীল? যেহেতু মহাবিশ্ব এবং এর সবকিছু নিজেদের ব্যাখ্যা দিতে পারে না, তাই আরেকটি নির্ভরশীল জিনিস দিয়ে তাদের ব্যাখ্যা করা আসলে কিছুই ব্যাখ্যা করা হয় না। কারণ যে নির্ভরশীল জিনিসটি মহাবিশ্বের ব্যাখ্যা দেওয়ার কথা, সেটিও নিজের অস্তিত্বের জন্য ব্যাখ্যার প্রয়োজন। তাই নির্ভরশীল জিনিসের ব্যাখ্যার একমাত্র উপায় হলো এমন কিছুর কাছে যাওয়া যেটি নির্ভরশীল নয়, অর্থাৎ প্রয়োজনীয়।
তবে কেউ বলতে পারে, সবকিছু এমনভাবে একে অপরের উপর নির্ভরশীল যে এর কোনো শেষ নেই। অর্থাৎ অসীম শৃঙ্খল (Infinite regress)।
যেমন: এই মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করে আরেকটি মহাবিশ্ব, সেটিকে আরেকটি – এভাবে চিরকাল। এটি কি সমস্যার সমাধান? না, মোটেও না। এমনকি যদি অসীম সংখ্যক মহাবিশ্ব থাকে যারা সবাই একে অপরের উপর নির্ভরশীল, তবুও প্রশ্ন থেকে যায়: “কেন এই অসীম শৃঙ্খলের অস্তিত্ব আছে?” মহাবিশ্ব চিরন্তন হোক বা না হোক, এর অস্তিত্বের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
আবার, কল্পনা করুন অসীম সংখ্যক মানুষ রয়েছে। প্রত্যেক মানুষ তার বাবা-মার জৈবিক কার্যকলাপের ফল, তারা আবার তাদের বাবা-মার ফল – এভাবে অসীমকাল। তবুও প্রশ্ন করা সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত: “আদৌ মানুষ কেন আছে?” এই শৃঙ্খলের কোনো শুরু না থাকলেও এর একটি ব্যাখ্যা প্রয়োজন। যেহেতু প্রতিটি মানুষ না-ও থাকতে পারতো এবং তাদের সীমিত ভৌত গুণ রয়েছে, তাই তারা নির্ভরশীল ও অপ্রয়োজনীয়। তাদের এখনও ব্যাখ্যা প্রয়োজন। শুধু বলা যে মানুষের শৃঙ্খল অসীম, এতে ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা কমে না।
আরেকটি সমস্যা, এই ব্যাখ্যা ধরে নেয় যে অসীম নির্ভরতার শৃঙ্খল (infinite regress of dependencies) সম্ভব। কিন্তু এটি অকল্পনীয়।
চিন্তা করুন: এই মহাবিশ্বের অস্তিত্ব আরেকটি মহাবিশ্বের উপর নির্ভরশীল, সেটি আবার আরেকটির উপর – এভাবে চলতে থাকলে এই মহাবিশ্ব কি কখনো অস্তিত্ব লাভ করতে পারবে? না, কারণ অসীম সংখ্যক নির্ভরতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে এই মহাবিশ্ব অস্তিত্ব পেতে পারে না। মনে রাখবেন, অসীম সংখ্যক জিনিসের কোনো শেষ নেই। তাই অসীম নির্ভরতা থাকলে এই মহাবিশ্ব কখনোই অস্তিত্ব পেতে পারে না।
৩) মহাবিশ্ব এবং আমাদের অনুভূত সবকিছু তার অস্তিত্ব পায় এমন কিছু থেকে যা নিজের প্রকৃতি দ্বারাই বিদ্যমান এবং সেই কারণে চিরন্তন ও স্বাধীন
যেহেতু আমরা যা কিছু দেখি সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে নির্ভরশীল, তাই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা হলো – সবকিছুর অস্তিত্ব এমন কিছুর উপর নির্ভরশীল যেটি স্বাধীন এবং তাই চিরন্তন। এটি স্বাধীন হতেই হবে কারণ নির্ভরশীল হলে এরও ব্যাখ্যা লাগবে। এটি চিরন্তনও হতে হবে কারণ চিরন্তন না হলে – অর্থাৎ সসীম হলে – এটি নির্ভরশীল হয়ে যাবে, কারণ সসীম জিনিসের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
তাই আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে মহাবিশ্ব এবং আমরা যা কিছু দেখি সবকিছুই এমন কিছুর উপর নির্ভরশীল যেটি চিরন্তন ও স্বাধীন। এটিই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের সর্বোত্তম ব্যাখ্যা।
ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে এই যুক্তি
নির্ভরশীলতার যুক্তি ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য দ্বারা সমর্থিত। কুরআনে বিভিন্ন জায়গায় এই ধারণা তুলে ধরা হয়েছে যে আল্লাহ একটি স্বাধীন সত্তা যিনি সবকিছু সৃষ্টির জন্য দায়ী।
“আল্লাহ সমগ্র সৃষ্টি থেকে অমুখাপেক্ষী।” (সূরা আল-ইমরান: ৯৭)
“হে মানুষ! তোমরাই আল্লাহর মুখাপেক্ষী, অথচ আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত।” (সূরা ফাতির: ১৫)
বিখ্যাত তাফসীরকার ইবনে কাসীর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন: “তারা তাদের সকল কাজে তাঁর মুখাপেক্ষী, কিন্তু তিনি তাদের মুখাপেক্ষী নন… তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং তাঁর কোনো অংশীদার নেই।”
ইবনে সিনা (পশ্চিমে আভিসেনা নামে পরিচিত) অনুরূপ যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ হলেন “ওয়াজিব আল-উজুদ” অর্থাৎ অপরিহার্যভাবে অস্তিত্বশীল (Necessary existence)। ইবনে সিনার মতে, আল্লাহ অপরিহার্যভাবে অস্তিত্বশীল এবং তিনিই সবকিছুর অস্তিত্বের জন্য দায়ী। আল্লাহ ব্যতীত অন্য সবকিছুই নির্ভরশীল, যাকে ইবনে সিনা “মুমকিন আল-উজুদ” (Contingent or Dependent existence) বলে বর্ণনা করেছেন।
নির্ভরশীলতার যুক্তি অন্যান্য প্রভাবশালী ইসলামি পণ্ডিতগণও গ্রহণ, রূপান্তর ও সমৃদ্ধ করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন আল-রাযী, আল-গাযালী, ইমাম আল-হারামাইন আল-জুওয়াইনী (এবং কাছাকাছি সময়ের মধ্যে রয়েছেন তাকি উদ্দীন আন নাবহানি)।
আল-গাযালী এই যুক্তির একটি সংক্ষিপ্ত সারাংশ উপস্থাপন করেছেন:
“অস্তিত্বকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিছু না কিছু অবশ্যই অস্তিত্বশীল এবং যে কেউ বলে যে কিছুই নেই, সে বুদ্ধি ও প্রয়োজনীয়তাকে উপহাস করে। এই যে অস্তিত্বের কথা স্বীকার করা হলো, এটি একটি অপরিহার্য ভিত্তি। এখন এই অস্তিত্ব যা স্বীকার করা হয়েছে তা হয় প্রয়োজনীয় নয়তো আকস্মিক… এর মানে হলো একটি সত্তা হয় স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়তো নির্ভরশীল… এখানে আমরা যুক্তি দেই: যদি সত্তাটি যার অস্তিত্ব স্বীকৃত সেটি প্রয়োজনীয় হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় সত্তার অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত। আর যদি এর অস্তিত্ব আকস্মিক হয়, তাহলে প্রতিটি আকস্মিক সত্তা একটি প্রয়োজনীয় সত্তার উপর নির্ভরশীল। কারণ আকস্মিকতার অর্থই হলো এর অস্তিত্ব ও অনস্তিত্ব উভয়ই সম্ভব। যার এই বৈশিষ্ট্য রয়েছে একটি নির্ধারক বা নির্বাচনকারী ব্যতীত এর অস্তিত্ব হতে পারে না। এটিও অপরিহার্য। সুতরাং এই অপরিহার্য ভিত্তি থেকে প্রয়োজনীয় সত্তার অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত।”
ইসলামি থিওলজি অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তা :
- স্বাধীন (Independent)
- যার উপর সবকিছু নির্ভরশীল (The being that everything depends on)
- যিনি সবকিছু ধারণ করেন (The one that sustains everything)
- চিরস্থায়ী (Everlasting)
- স্বয়ংসম্পূর্ণ (Self-sufficient)
- ওয়াজিব আল-ওজুদ (অপরিহার্যভাবে অস্তিত্বশীল) (Necessary existence)
এই যুক্তির বিরুদ্ধে কিছু মূল আপত্তি (Some of the key objections against this argument)
Objection 1: মহাবিশ্ব স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল (The universe exists independently)
একটি সাধারণ নাস্তিক্যবাদী আপত্তি হলো: যদি আমরা বলি যে আল্লাহ স্বাধীন ও প্রয়োজনীয়, তাহলে মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে কেন একই কথা বলতে পারি না?
জবাব: তবে এই আপত্তি ভুল জায়গায়। আমাদের অভিজ্ঞতায় নির্ভরশীল জিনিস সবসময় নির্ভরশীল সমগ্র তৈরি করে। উদাহরণ: একটি বাড়ি নির্ভরশীল উপকরণ দিয়ে তৈরি এবং বাড়িও নির্ভরশীল। এর সীমিত ভৌত গুণ রয়েছে, এটি না-ও থাকতে পারতো এবং এর মৌলিক উপাদানগুলো ভিন্নভাবে সাজানো যেতে পারতো। একইভাবে মহাবিশ্ব নির্ভরশীল জিনিস দিয়ে তৈরি তাই এটি নির্ভরশীল।
আপত্তিকারীর উপর প্রমাণের দায়ভার (burden of proof) রয়েছে যে নির্ভরশীল জিনিসগুলো নির্ভরশীল সমগ্র তৈরি করে না।
Objection 2: মহাবিশ্ব একটি নিছক সত্য (The universe is just a brute fact)
আরেকটি আপত্তি বলে যে মহাবিশ্ব নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা উচিত নয়। দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল ফাদার কপলেস্টনের সাথে তার বিখ্যাত রেডিও বিতর্কে বলেছিলেন, “আমি বলব যে মহাবিশ্ব আছে, এই পর্যন্তই।”
এই অবস্থান সত্যিকার অর্থে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পলায়ন (Intellectual cop-out)।
ভাসমান সবুজ বলের উপমা (Hovering green ball analogy): কল্পনা করুন আপনি স্থানীয় পার্কে হাঁটছেন এবং শিশুদের খেলার মাঠের মাঝখানে একটি ভাসমান সবুজ বল দেখতে পেলেন। আপনার প্রতিক্রিয়া কী হবে? আপনি কি এটিকে খেলার মাঠের একটি প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে চলে যাবেন? অবশ্যই না! আপনি প্রশ্ন করবেন কেন এর অস্তিত্ব এবং কীভাবে এটি এমন হলো। এখন বলটিকে মহাবিশ্বের আকার পর্যন্ত বাড়িয়ে দিন। প্রশ্ন এখনও থেকে যায়: কেন বলটির অস্তিত্ব এবং কেন এটি এমন?
তাছাড়া, এই আপত্তি অযৌক্তিক কারণ এটি বিজ্ঞানকেই ক্ষুন্ন করে। বৈজ্ঞানিক সমাজে মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ও মৌলিক বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করার জন্য উৎসর্গীকৃত একটি গবেষণা ক্ষেত্র রয়েছে। এর নাম কসমোলজি। এটি একটি সম্পূর্ণ বৈধ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ক্ষেত্র। মহাবিশ্বকে ‘নিছক সত্য’ (Brute Fact) বলে চিহ্নিত করা একটি প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক অনুশীলনের অসম্মান।
Objection 3: বিজ্ঞান অবশেষে একটি উত্তর খুঁজে পাবে! (Science will eventually find an answer!)
এই অবজেকশনে যুক্তি দেওয়া হয় যে, এই আর্টিকেলে যা উপস্থাপিত হয়েছে তা ‘God of the gaps’ fallacy বা ভ্রান্তির একটি রূপ। এটি বলে যে বৈজ্ঞানিক ঘটনা সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতাকে আল্লাহর অস্তিত্ব বা ঐশ্বরিক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ হিসেবে নেওয়া উচিত নয়, কারণ বিজ্ঞান অবশেষে একটি ব্যাখ্যা প্রদান করবে।
জবাব: এটি ভুল অবজেকশন, কারণ নির্ভরশীলতার যুক্তি কোনো বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের সমাধান করতে চায় না। এর উদ্দেশ্য মেটাফিজিক্স নিয়ে; এটি নির্ভরশীল জিনিসের প্রকৃতি ও তাৎপর্য বুঝতে চায়। এই যুক্তি সকল বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও ঘটনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
যেমন: প্রাকৃতিক ঘটনার ব্যাখ্যা হিসেবে আমরা যদি একাধিক মহাবিশ্বের (Multiple universe) তত্ত্বকে বিশ্বাস করি, তবুও সেগুলো নির্ভরশীল থাকবে। কেন? কারণ এই ব্যাখ্যার উপাদানগুলো ভিন্নভাবে সাজানো যেতে পারে এবং নিজেদের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা নিজেরা দিতে পারে না। অথবা তাদের অস্তিত্বের জন্য নিজেদের বাইরে কিছুর প্রয়োজন এবং তাদের সীমিত ভৌত গুণ (Limited Physical Qualities) রয়েছে। তাই তারা নির্ভরশীল। আর এই অধ্যায়ে আলোচনা অনুযায়ী, একটি নির্ভরশীল জিনিসকে আরেকটি নির্ভরশীল জিনিস দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
যদি বৈজ্ঞানিক সমাজ দাবি করে যে তারা এমন কিছু পেয়েছে যা স্বাধীন ও চিরন্তন এবং পালটা মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করে, তাহলে আমি প্রমাণ চাইব। মজার বিষয় হলো, তারা যে মুহূর্তে কোনো অভিজ্ঞতালব্ধ প্রমাণ দেবে সেই মুহূর্তেই তারা নিজেদের সাথে দ্বন্দ্বে পড়বে। কারণ যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তার সীমিত ভৌত গুণ রয়েছে, তাই নির্ভরশীল।
বিজ্ঞান কখনোই স্বাধীন ও চিরন্তন কিছু আবিষ্কার করতে পারে না – শুধু এই কারণে নয় যে এটি অভিজ্ঞতালব্ধ হবে, বরং এজন্যও যে বিজ্ঞান শুধু পর্যবেক্ষণযোগ্য নির্ভরশীল জিনিস নিয়ে কাজ করে। তাই বিজ্ঞান একটি অবৈজ্ঞানিক সত্ত্বা বা কিছু আবিষ্কার করবে বলা কোনো অর্থ রাখে না!
একটু থেমে চিন্তা করি বিজ্ঞান কী! বিজ্ঞান একটি শাস্ত্র হিসেবে উত্তর ও ব্যাখ্যা প্রদানের কাজে নিয়োজিত। কেবল নির্ভরশীল জিনিসের ব্যাখ্যা থাকতে পারে। এই বিবেচনায় আমরা বুঝতে পারি বিজ্ঞানের পরিসর নির্ভরশীল বস্তুর রাজ্যে সীমাবদ্ধ। তাই বিজ্ঞান শুধু এমন উত্তর দিতে পারে যা আরেকটি নির্ভরশীল বস্তুর সাথে সম্পর্কিত। এটি এই যুক্তির মেটাফিজিক্যাল প্রকৃতির সাথে কাজ করতে পারে না।
যেমন আমরা ব্যাখ্যা করেছি, একটি নির্ভরশীল বস্তুকে আরেকটি নির্ভরশীল বস্তু দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, কারণ সেই নির্ভরশীল বস্তুরও ব্যাখ্যা প্রয়োজন। আর আমরা আলোচনা করেছি যে এমন হতে পারে না যে একটি জিনিস অন্য কিছুর উপর নির্ভর করে, সেটি আবার আরেকটির উপর – এভাবে অনন্তকাল। যেহেতু ব্যাখ্যাটি এমন কিছু যা স্বাধীন ও চিরন্তন, তাই বিজ্ঞান কখনো এই আলোচনায় প্রবেশ করতে পারে না কারণ এর সীমিত পরিসর অভিজ্ঞতালব্ধ, নির্ভরশীল জিনিসের মধ্যে।
Objection 4: আপনি ধরে নিয়েছেন আল্লাহর অস্তিত্ব, কারণ তিনিই একমাত্র যিনি প্রয়োজনীয়ভাবে অস্তিত্বশীল (You’ve assumed God exists, as He is the only thing that necessarily exists)
জবাব: এই আর্টিকেলের যুক্তিতে আল্লাহর অস্তিত্ব ধরে নেওয়া হয়নি। যুক্তিতে আল্লাহর দিকে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয়তার ধারণা তৈরি করা হয়নি। বরং, মহাবিশ্ব এবং আমরা যা কিছু দেখি তার নির্ভরশীলতা এই ধারণার দিকে নিয়ে গেছে যে একটি চিরন্তন, স্বাধীন সত্তা থাকতে হবে যিনি অপরিহার্যভাবে অস্তিত্বশীল। এই সিদ্ধান্ত ইসলামে সৃষ্টিকর্তার সংজ্ঞার সাথে হুবহু মিলে যায়।
অপরিহার্যতা (Necessity) ও নির্ভরশীলতার (Dependent) ধারণা ফিলোসফিতে সুপরিচিত ও আলোচিত (ফিলোসফিতে ‘‘Dependent’’ বস্তুকে “Contingent” বস্তু হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে)। এগুলো সৃষ্টিকর্তার ব্যাখ্যা পেছনের দরজা দিয়ে ঢোকানোর জন্য তৈরি করা ধারণা নয়।
Objection 5: সৃষ্টিকর্তার কি ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই? (Doesn’t God require an explanation?)
এই আর্টিকেলে উপস্থাপিত যুক্তি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে একটি চিরন্তন, স্বাধীন সত্তা থাকতে হবে যিনি অপরিহার্যভাবে অস্তিত্বশীল। এটি ইসলামি সৃষ্টিকর্তার ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
জবাব: অপরিহার্য সত্তার কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। আরো নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, এমন সত্তার নিজের বাইরে কোনো কিছুর উল্লেখ করে ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই (নির্ভরশীল জিনিসের বিপরীতে)। বরং অপরিহার্য সত্তা নিজের অস্তিত্বেই ব্যাখ্যাত। অর্থাৎ, তাঁর অস্তিত্ব না থাকা অসম্ভব ছিল। তাই তিনি নিজের বাইরে কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন রাখেন না।
এমন একটি সত্তার নিজের বাইরে কিছুর উল্লেখ করে এমন ব্যাখ্যা প্রয়োজন হয় না (নির্ভরশীল জিনিসের বিপরীতে)। বরং, একটি অপরিহার্য সত্তা নিজের অস্তিত্বের কারণেই ব্যাখ্যা হয়। অন্য কথায়, তার অস্তিত্ব না থাকা অসম্ভব ছিল।
Objection 6: গঠনগত ভ্রান্তি (Fallacy of Composition)
Fallacy of composition এক ধরনের যুক্তিগত ভ্রান্তি যা ভুলভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে সম্পূর্ণ বস্তুটির অবশ্যই তার এককভাবে তার প্রতিটি অংশগুলোর মতো একই বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। তবে এমন দাবি করা সবসময় ভ্রান্তিপূর্ণ নয়। হতে পারে কিছু সমগ্রের মধ্যে তার ব্যক্তিগত অংশের বৈশিষ্ট্য রয়েছে; তবে এটি সবসময় এমন নয়।
উদাহরণস্বরুপ, একটি দেয়াল (সমগ্র) ইট (একক অংশ) দিয়ে তৈরি। ইট শক্ত, তাই দেয়াল শক্ত। এটি সত্য। বিপরীতে, একটি পার্সিয়ান কার্পেট বিবেচনা করুন। কার্পেট (সমগ্র) সুতা (একক অংশ) দিয়ে তৈরি; এককভাবে সুতাগুলো হালকা বলে কার্পেটও হালকা – এই সিদ্ধান্ত ভুল হবে।
জবাব: অবজেকশনকারী হয়তো বলতে পারেন যে মহাবিশ্ব নির্ভরশীল অংশ দিয়ে তৈরি বলেই যে সম্পূর্ণ মহাবিশ্ব নির্ভরশীল, এটা যুক্তিগতভাবে সঠিক নয়। এই অবজেকশন ভিত্তিহীন।
আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে নির্ভরশীল জিনিসগুলো সবসময়ই নির্ভরশীল সমগ্র গঠন করে। যেমন, একটি বাড়ি নির্ভরশীল উপকরণ (ইট, সিমেন্ট, লোহা) দিয়ে তৈরি এবং বাড়িটিও নির্ভরশীল। এর সীমিত ভৌত গুণাবলী আছে, এটি নাও থাকতে পারত এবং এর মূল উপাদানগুলো ভিন্নভাবে সাজানো যেত। একইভাবে মহাবিশ্ব নির্ভরশীল জিনিসপত্র দিয়ে গঠিত, তাই এটিও নির্ভরশীল।
এখন প্রমাণের দায়িত্ব অবজেকশনকারীর উপর যে তিনি দেখাবেন নির্ভরশীল জিনিসগুলো নির্ভরশীল সমগ্র তৈরি করে না। কিন্তু আমাদের সমস্ত অভিজ্ঞতা এর বিপরীত সাক্ষ্য দেয়।
সবশেষে,
সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে এই উপলব্ধি শুধু একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন নয়; বরং এটি সৃষ্টিকর্তার প্রতি গভীর আকুতি ও ভালোবাসা জাগানো উচিত। এই অধ্যায়ে আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে আল্লাহ অপরিহার্যভাবে অস্তিত্বশীল এবং সবকিছু কেবল তাঁরই কারণে অস্তিত্ব লাভ করতে পারে। এই অর্থে আমরা মানুষেরা শুধু দার্শনিক অর্থেই সৃষ্টিকর্তার উপর নির্ভরশীল নই, বরং শব্দটির সাধারণ ব্যবহারেও; তাঁর অস্তিত্ব ছাড়া আমাদের অস্তিত্ব থাকতো না, এবং আমাদের যা কিছু আছে তা শেষ পর্যন্ত একমাত্র তাঁরই কারণে।
নিচের এই চমৎকার ছোট গল্পটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, যেহেতু আমরা চূড়ান্তভাবে সৃষ্টিকর্তার ওপর নির্ভরশীল এবং এই জীবন ও পরকালের সাফল্য তাঁর অসীম করুণার ওপর নিহিত, তাই আমাদের উচিত তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করা এবং তাঁর ইচ্ছা পূরণ করা:
“একদিন আমি আমার ক্ষেতের পরিচর্যা করার জন্য বের হলাম। সাথে ছিল আমার ছোট্ট কুকুর—বাগানে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো বানরদের চিরশত্রু। সময়টা ছিল প্রচণ্ড গরমের। গরমে আমার এবং আমার কুকুরের এমন অবস্থা হয়েছিল যে আমরা প্রায় শ্বাস নিতে পারছিলাম না। আমার মনে হতে লাগল যে আমাদের দুজনের মধ্যে কেউ একজন হয়তো শীঘ্রই অজ্ঞান হয়ে পড়বে। তারপর, সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, আমি একটি ‘টিয়াকি’ (Tiayki) গাছ দেখতে পেলাম, যার ডালপালাগুলো সতেজ সবুজ পাতার এক সুশীতল আচ্ছাদন তৈরি করেছিল। আমার কুকুরটি আনন্দে ছোট ছোট শব্দ করে উঠল এবং এই আশীর্বাদপুষ্ট ছায়ার দিকে ছুটে গেল।
কিন্তু ছায়ায় পৌঁছানোর পর, সেখানে না থেকে সে জিভ বের করে আমার কাছে ফিরে এল। তার বুক কীভাবে ধুকপুক করছে তা দেখে আমি বুঝতে পারলাম সে কতটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আমি ছায়ার দিকে হাঁটতে লাগলাম। আমার কুকুরটি তখন আনন্দে আত্মহারা। তারপর, কিছুক্ষণের জন্য, আমি ভান করলাম যেন আমি আমার পথ ধরে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। বেচারা প্রাণীটি করুণ সুরে কেঁদে উঠল, কিন্তু তবুও লেজ গুটিয়ে আমার পিছু নিল। সে স্পষ্টতই হতাশ ছিল, কিন্তু যা-ই ঘটুক না কেন, আমাকে অনুসরণ করতে সে ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
তার এই বিশ্বস্ততা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিল। কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও আমাকে অনুসরণ করার জন্য এই প্রাণীটির যে প্রস্তুতি, তা কীভাবে পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব? আমি নিজেকে বললাম, সে আমার প্রতি গভীরভাবে অনুগত, কারণ সে আমাকে তার মনিব হিসেবে মানে এবং শুধুমাত্র আমার পাশে থাকার জন্য সে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে।
আমি কেঁদে বলে উঠলাম, ‘হে আমার প্রভু, আমার অশান্ত আত্মাকে সুস্থ করুন! যাকে আমি তাচ্ছিল্যভরে কুকুর বলে ডাকি, তার মতো বিশ্বস্ততা আমাকে দান করুন। আপনি যেমন তাকে দিয়েছেন, তেমনি আমাকেও আমার জীবন নিয়ন্ত্রণের শক্তি দিন, যেন আমি আপনার ইচ্ছা পূরণ করতে পারি এবং আপনি আমাকে যে পথে চালান—আমি কোথায় যাচ্ছি, তা না জিজ্ঞেস করেই—সেই পথ অনুসরণ করতে পারি! আমি এই কুকুরটির স্রষ্টা নই, তবুও সে হাজারো কষ্টের বিনিময়ে বশ মেনে আমাকে অনুসরণ করে। হে প্রভু, আপনিই তাকে এই গুণের অধিকারী করেছেন। হে প্রভু, আমার মতো যারা আপনার কাছে এটি চায়, তাদের সবাইকে ভালোবাসার গুণ এবং দয়া করার সাহস দান করুন!’
তারপর আমি আমার পদচিহ্ন ধরে ফিরে গেলাম এবং সেই ছায়ায় আশ্রয় নিলাম। আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে আমার ছোট্ট সঙ্গী আমার মুখোমুখি শুয়ে পড়ল, তার চোখ দুটি আমার চোখের দিকে নিবদ্ধ রইল; যেন সে আমার সাথে খুব জরুরি কোনো কথা বলতে চাইছে।”
Last updated 15/10/2019. Adapted from my book “The Divine Reality: God, Islam & The Mirage of Atheism”. You can purchase the book here.
তথ্যসূত্র
[1] উপমাটি ওয়েনরাইট, ডব্লিউজে (1988) থেকে গৃহীত। ধর্মের দর্শন। দ্বিতীয় সংস্করণ । বেলমন্ট, ক্যালিফোর্নিয়া: ওয়েডসওয়ার্থ পাবলিশিং।
[2] কুরআন, অধ্যায় ৩, আয়াত ৯৭।
[3] কুরআন, ৩৫তম সূরা, ১৫তম আয়াত।
[4] ইবনে কাসির, আই. (1999)। তাফসির আল-কুরআন আল-আযীম। সামি আস-সালামা দ্বারা সম্পাদিত। ২ য় সংস্করণ। রিয়াদ: দার তাইয়্যিবা। খণ্ড ৬, পৃ. ৫৪১।
[5] হোসেইন, এস. (১৯৯৩)। ইসলামিক কসমোলজিক্যাল ডকট্রিনসের একটি ভূমিকা। আলবানি: স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্ক প্রেস, পৃষ্ঠা ১৯৭-২০০।
[6] আল-গাজ্জালী, এম. (1964)। ফাদাহিহ আল-বাতিনিয়্যা। আবদুর রহমান বাদাউই কর্তৃক সম্পাদিত। কুয়েত: মুয়াসাসা দার আল-কুতুব আল-থিকাফা, পৃ. ৮২।
[7] ক্রেগ, ডব্লিউএল (2008)। যুক্তিসঙ্গত বিশ্বাস: খ্রিস্টীয় সত্য এবং ক্ষমাপ্রার্থনা। তৃতীয় সংস্করণ । হুইটন, ইলিনয়: ক্রসওয়ে বুকস, পৃষ্ঠা 109।
[8] গডউইন, এসজে (তারিখ নেই)। রাসেল/কপলস্টন রেডিও বিতর্কের প্রতিলিপি। এখানে পাওয়া যাবে: http://www.scandalon.co.uk/philosophy/cosmological_radio.htm [অ্যাক্সেস করা হয়েছে ৪ অক্টোবর ২০১৬]।
[9] ক্রেগ, ডব্লিউএল রিজনেবল ফেইথ থেকে গৃহীত। এখানে পাওয়া যাবে: http://www.reasonablefaith.org/defenders-1-podcast/transcript/s04-01 [অ্যাক্সেস করা হয়েছে: ২৪ শে অক্টোবর ২০১৬]।
[10] প্রুস, আর. এবং রাসমুসেন, জেএল (2018)। প্রয়োজনীয় অস্তিত্ব । অক্সফোর্ড: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস।
[11] হিজাব, এম. (2019)। কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টস । স্বাধীনভাবে প্রকাশিত।
[12] ইটন, জি. (2001)। ঈশ্বরকে স্মরণ করা: ইসলামের প্রতিফলন । লাহোর: সুহাইল একাডেমি, পৃষ্ঠা 18-19।
ফিলিস্তিন এখন তৃতীয় প্রকল্পের অপেক্ষায়

১৯৬৭ সালে পশ্চিম তীর ইহুদিদের দ্বারা দখল হওয়ার পর থেকে ফিলিস্তিন ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুটি প্রকল্প বা পরিকল্পনা একে অপরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছে। প্রথমটি হলো আমেরিকান পরিকল্পনা, যার লক্ষ্য আন্তর্জাতিক আইন ও সংস্থাসমূহের কাঠামোর মধ্যে একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয়টি হলো ইহুদি প্রকল্প, যার মূল লক্ষ্য হলো পশ্চিম তীরের ভূমি দখল করা।
প্রথম পরিকল্পনাটি কয়েক দশক ধরে স্থবির হয়ে আছে এবং এটি কেবল মিডিয়া, রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং কনফারেন্স হলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, দ্বিতীয় বা ইহুদি পরিকল্পনাটি প্রতিদিন অত্যন্ত নির্মমভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ইহুদিরা পশ্চিম তীর দখল করে এর মর্যাদা ‘আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে একটি অধিকৃত অঞ্চল’ থেকে পরিবর্তন করে তাদের ‘নিজস্ব ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশে’ পরিণত করতে চায়। তাদের লক্ষ্য হলো (জর্ডান) নদী থেকে (ভুমধ্য) সাগর পর্যন্ত একটি “ইহুদি রাষ্ট্র” গঠন করা, যেখানে অন্য কারো স্থান থাকবে না এবং যা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে চিরতরে নস্যাৎ করে দেবে। এটি এখন ইহুদি রাজনৈতিক শক্তি এবং তাদের জনগণের মধ্যে একটি ঐকমত্যের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
এটি অর্জনের জন্য ইহুদি রাষ্ট্রটি শুরু থেকেই পশ্চিম তীরের ভৌগলিক ও জনতাত্ত্বিক (demography) কাঠামো পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে। তারা বসতি স্থাপনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের সমান্তরাল একটি উপস্থিতি তৈরি করতে চেয়েছে। অর্থাৎ, তারা শহর ও জনবসতি তৈরির মাধ্যমে এক বিশাল বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠী তৈরি করেছে যারা তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অবস্থান শক্তিশালী করতে নিরলস কাজ করছে।
অন্যদিকে, যেহেতু ফিলিস্তিনি জনগণই তাদের এই প্রকল্পের প্রধান বাধা—তাদের উপস্থিতি ও অবিচলতার কারণে—তাই ইহুদি রাষ্ট্রটি জনতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় “মানুষহীন ভূমি” নীতি গ্রহণ করেছে। তারা বসতি স্থাপনের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার নীতিতে মনোযোগ দিয়েছে। তারা ফিলিস্তিনিদের জীবনকে চরম দুর্বিষহ করে তুলে তাদের হিজরত বা দেশত্যাগে বাধ্য করছে। এর জন্য তারা অবরোধ, শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি, হত্যাকাণ্ড, নিরাপত্তাহীনতা, নির্যাতন এবং ঘরবাড়ি ও ক্যাম্প ধ্বংস করার মতো পথ বেছে নিয়েছে। যদিও উচ্ছেদ বা বাস্তুচ্যুতি ঐতিহাসিকভাবেই তাদের পরিকল্পনার অংশ ছিল, তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভূমি সংক্রান্ত তাদের ‘ক্যাবিনেট’ সিদ্ধান্তগুলোর মাধ্যমে এই অপরাধের মাত্রা ও গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (PA) প্রসঙ্গে বলা যায়, তারা আমেরিকার প্রস্তাবিত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রকল্পের লেজ ধরে ঝুলে আছে এবং একে “জাতীয় প্রকল্প” হিসেবে প্রচার করে জনগণের কাছে মিথ্যা আশা বিক্রি করছে। কিন্তু ইহুদি রাষ্ট্রটি কখনোই এই কর্তৃপক্ষকে বা অসলো চুক্তিকে (Oslo Accords) সম্মানের চোখে দেখেনি; বরং তারা একে একটি “অধীনস্থ সত্তা” হিসেবেই বিবেচনা করেছে। ইহুদি রাষ্ট্র ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে কেবল তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি প্রাথমিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। দখলদার হিসেবে ইহুদি রাষ্ট্রটি ফিলিস্তিনি জনগণের বোঝা নিজে বহন না করে তা এই কর্তৃপক্ষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। এটি একদিকে জনগণের ক্ষোভ দমনের ঢাল হিসেবে কাজ করছে, অন্যদিকে ইহুদিদের চাপ জনগণের ওপর প্রয়োগের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এই কর্তৃপক্ষের আইন, পদ্ধতি এবং বিশ্বাসঘাতকতামূলক কর্মকাণ্ড এতটাই চরমে পৌঁছেছে যে তারা নিজ দেশের মানুষকে হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না। ফলে এটি এখন ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য দখলদারিত্বের মতোই একটি ভারী বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ তাদের এই “নোংরা দায়িত্ব” পালন করে যাচ্ছে কারণ তারা মনে করে তাদের অস্তিত্ব এর সাথেই মিশে আছে।
বর্তমান পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কোনো কিছুই স্থির নয়। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভাঙন, আন্তর্জাতিক আইনের অবজ্ঞা এবং আমেরিকার নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে পেশীশক্তির জোরে চুক্তি করার প্রবণতার কারণে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রকল্পটি আজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে। বিশেষ করে ইহুদিদের কর্মকাণ্ড এই প্রকল্পের কার্যকারিতাকে ধ্বংস করে দিয়েছে এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে একটি তুচ্ছ ও অর্থহীন চরিত্রে নামিয়ে এনেছে। পশ্চিমা বিশ্ব এখনো এই প্রকল্পটি টেবিলে টিকিয়ে রেখেছে সম্ভবত ইহুদি রাষ্ট্রকে তার নিজের ধ্বংসাত্মক উন্মাদনা থেকে রক্ষা করার জন্য। যদিও ইহুদি রাষ্ট্রটি দম্ভের সাথে পুরো ভূখণ্ড গিলে ফেলতে চায়, তবে এটি অর্জন করা সহজ নয় এবং এটিই তাদের পতনের কারণ হতে পারে।
নিঃসন্দেহে ফিলিস্তিন ও এর জনগণের সামনে কঠিন দিন আসছে। যতক্ষণ পর্যন্ত উম্মাহর নিজস্ব প্রকল্প ইহুদি ও আমেরিকান প্রকল্পের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে সগৌরবে যাত্রা শুরু না করবে, ততক্ষণ এই সংকট কাটবে না। উম্মাহর এই প্রকল্প হলো ফিলিস্তিনের পূর্ণাঙ্গ মুক্তি এবং অবৈধ ইহুদি রাষ্ট্রের মূলোৎপাটন। এটিই ইসলামের দাবি এবং শরীয়তের বিধান, যা উম্মাহর জন্য অন্য কোনো বিকল্প রাখেনি। ফিলিস্তিন কেবল ফিলিস্তিনিদের নয়, বরং এটি পুরো উম্মাহর ইস্যু।
তাত্ত্বিকভাবে উম্মাহর এই লক্ষ্য জনগণের হৃদয়ে বিদ্যমান থাকলেও, এটি বাস্তবায়নের জন্য কোনো নির্বাহী সংস্থা—অর্থাৎ ইসলামি রাষ্ট্র (খিলাফত)—বর্তমানে অনুপস্থিত। মূলত খিলাফত প্রতিষ্ঠাই হলো উম্মাহর সবচেয়ে বড় প্রকল্প, যার সাথে ফিলিস্তিন মুক্তিসহ সমস্ত সমস্যার সমাধান জড়িত। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ উম্মাহর ভেতরের শক্তিকে যেমন ফুটিয়ে তুলেছে, তেমনি ঔপনিবেশিক দালাল শাসকদের অধীনে উম্মাহর অসহায়ত্ব ও পঙ্গুত্বকেও উন্মোচিত করেছে। এই ঘটনাগুলো উম্মাহর জন্য একটি ইসলামি রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করেছে, যা উম্মাহর বন্দি সেনাবাহিনী এবং সুপ্ত শক্তিকে শৃঙ্খলমুক্ত করবে। তা না হলে উম্মাহ এক বিপর্যয় থেকে অন্য বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হতে থাকবে।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এটিও নিশ্চিত করেছে যে, গত কয়েক দশকের পশ্চিমা রাষ্ট্রীয় সমাধানের (Two-state solution) চেয়ে ফিলিস্তিনের পূর্ণাঙ্গ মুক্তি এবং দখলদার ইহুদি রাষ্ট্রের পতন অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ও নিকটবর্তী। আর তার চেয়েও নিকটবর্তী হলো এই দালাল শাসক এবং জালিম শাসনব্যবস্থার পতন—যদি উম্মাহ এবং তার সশস্ত্র বাহিনী সঠিক পথে অগ্রসর হয়। এই শাসকদের উম্মাহর মাঝে কোনো শিকড় নেই; তাদের সিংহাসনগুলো আজ নড়বড়ে এবং পতনোন্মুখ। জালিমরা যাই চিত্রায়িত করুক না কেন, উম্মাহকে সর্বদা আল্লাহর বাণী স্মরণ রাখতে হবে:
”জেনে রেখো, আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটে।” [সূরা আল-বাকারাহ: ২১৪]
উস্তাদ আবদুল রহমান আল-লাদাওয়ি
আল-রায়া পত্রিকার ৫৯১ নম্বর সংখ্যায় (১৮/০৩/২০২৬) প্রকাশিত




















