তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২জিলবাব ও মুসলিম নারীর পোশাকবিধি

ইসলামী আইনের উৎসসমূহ
ইসলামী আইনের প্রধান উৎস হলো কুরআন ও সুন্নাহ। কুরআন — যা মুসলমানদের কাছে পবিত্র গ্রন্থ — এতে প্রায় ৫০০টি আয়াত রয়েছে, যা বিভিন্ন বিষয়ে আইনি গুরুত্ব বহন করে। সুন্নাহ বলতে বোঝায় নবী মুহাম্মদ ﷺ–এর বাণী, কাজ ও অনুমোদনের বর্ণনাসমূহের সংকলন। সুন্নাহর ভূমিকা হলো কুরআনের নির্দেশনাগুলোকে ব্যাখ্যা ও বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা। এই দুটি মূল উৎস থেকে আরও কিছু গৌণ উৎস নির্ধারিত হয়েছে, যেমন ইজমা (আইনগত ঐকমত্য), কিয়াস (তুলনামূলক যুক্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ) এবং আরও কিছু বিতর্কিত উৎস, তবে এগুলো বর্তমান আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক নয়।
ইসলামী পোশাকবিধির ধারণা
ইসলামী আইন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ও সামাজিক আচরণ—উভয় ক্ষেত্রেই একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান উপস্থাপন করে। এরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পোশাক ও সাজসজ্জা সংক্রান্ত বিধান। এই পোশাকবিধান নারী ও পুরুষ—উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। যেমন, একজন পুরুষের জন্য নির্দিষ্ট অংশ শরীর ঢেকে রাখা ফরজ। পাশাপাশি তার জন্য স্বর্ণ ও রেশম পরিধান নিষিদ্ধ, যা নারীদের জন্য অনুমোদিত। অন্যদিকে, নারীদের জন্য পরিবারের বাইরে বের হলে দেহের নির্দিষ্ট অংশ আবৃত রাখা বাধ্যতামূলক; এর মধ্যে রয়েছে মাথা ঢাকার কাপড় (খিমার) এবং বাহ্যিক পোশাক (জিলবাব), যা পুরুষদের জন্য আবশ্যক নয়। অতএব, জিলবাব কোনো নতুন উদ্ভাবন নয়; বরং এটি মুসলিম নারীদের সুপরিচিত ও প্রাচীন পোশাকবিধানেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শরীয়ায় জিলবাবের স্পষ্ট উল্লেখ:
নারীদের জন্য জিলবাব পরিধানের বিধান সরাসরি কুরআন থেকেই প্রমাণিত। সূরা আল-আহযাব এ আল্লাহ তা’আলা নবী মুহাম্মদ ﷺ-কে উদ্দেশ্য করে বলেন:
“হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের, তোমার কন্যাদের এবং মুমিন নারীদের বলে দাও—তারা যেন নিজেদের উপর তাদের জিলবাব টেনে দেয়। এতে তারা সহজে চিহ্নিত হবে এবং তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [২]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত এই আয়াতে নারীদের জিলবাব পরিধানের উল্লেখ করা হয়েছে,যাতে — তারা শালীনভাবে আবৃত থাকে এবং অসৎ ও চরিত্রহীন লোকদের কটূক্তি ও অপমান থেকে রক্ষা পায়।
জিলবাবের বাধ্যবাধকতা নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর সুন্নাহ থেকেও প্রমাণিত, যা মুসলমানদের জন্য আইনের দ্বিতীয় প্রধান উৎস।
উম্মে আতিয়্যা (রা.) বর্ণনা করেন:
আমাদেরকে আদেশ দেওয়া হতো — ঈদের দিনে ঋতুবতী নারী ও পর্দানশীল নারীদেরও ঈদের সমাবেশ ও মুসলমানদের দোয়া-মুনাজাতে উপস্থিত করতে। তবে ঋতুবতী নারীরা নামাজের স্থানে (মুসাল্লায়) যাবে না। তখন এক নারী জিজ্ঞেস করল, “হে আল্লাহর রাসূল! যার কাছে জিলবাব নেই, তার কী হবে?” তিনি বললেন, “সে যেন তার সখীর কাছ থেকে একটি জিলবাব ধার নেয়।” [৩]
উপরোক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার সময় নারীদের বাস্তব আচরণ থেকেও এই বিধানের প্রয়োগ স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, যেমন: নিচের বর্ণনাগুলোতে দেখা যায়:
উম্মে সালামা (রা.)—বর্ণনা করেন:
যখন এই আয়াত নাযিল হলো—“তারা যেন নিজেদের উপর তাদের জিলবাব টেনে দেয়”—তখন আনসার নারীরা এমনভাবে বাইরে বের হলেন, যেন তাদের মাথার উপর কাক বসে আছে (অর্থাৎ সম্পূর্ণভাবে আবৃত অবস্থায় জিলবাব পরিধান করে)। [৪]
আয়িশা (রা.)—বর্ণনা করেন:
রিফা‘আ আল-কুরাযির স্ত্রী আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে এলেন, তখন আমি সেখানে বসা ছিলাম… এবং তিনি তার জিলবাবের কিনারা দেখাচ্ছিলেন। [৫]
কুরআনের ব্যাখ্যাকারক (মুফাসসির) আলেমদের মতামত
কুরআনের প্রাচীন ও খ্যাতনামা তাফসিরকারকগণ সবাই জিলবাবের শরঈ বৈধতা ও বাধ্যবাধকতাকে সমর্থন করেছেন। পার্থক্য কেবল এ বিষয়ে—এটি মুখমণ্ডল ঢাকাকেও অন্তর্ভুক্ত করে কি না!
নিচে সুন্নি মুসলিমদের সবচেয়ে স্বীকৃত তাফসির গ্রন্থসমূহ থেকে কিছু উদ্ধৃতি দেওয়া হলো:
ইবন জারির আত-তাবারি (মৃ. ৩১০ হি.) বলেন:
“আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী মুহাম্মদ ﷺ-কে বলেছেন—তুমি তোমার স্ত্রীদের, কন্যাদের এবং মুমিন নারীদের বলে দাও যেন তারা নিজেদের উপর তাদের জিলবাব টেনে নেয়।”
আল-কুরতুবি (মৃ. ৬৭১ হি.) বলেন:
“জালাবীব হলো জিলবাবের বহুবচন। এটি খিমার (মাথা ঢাকার কাপড়)-এর চেয়েও বড় একটি পোশাক। ইবন আব্বাস ও ইবন মাসউদের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে—এটি একটি রিদা (বড় চাদর)। কেউ কেউ বলেন এটি নেকাব বা পর্দা; তবে সঠিক মত হলো—এটি এমন একটি পোশাক যা পুরো শরীর আবৃত করে। সহিহ মুসলিমে উম্মে আতিয়্যা (রা)-এর হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যেখানে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল! যার কাছে জিলবাব নেই, তার কী হবে?’ তিনি উত্তর দেন: ‘সে তার সাথীর জিলবাব ধার নিক।’”
ফখরুদ্দীন আর-রাজি (মৃ. ৬০৬ হি.) বলেন:
“জাহিলিয়াতের যুগে স্বাধীন নারী ও দাসী উভয়েই অনাবৃত অবস্থায় বাইরে যেত এবং ব্যভিচারপ্রবণ লোকেরা তাদের পিছু নিত; ফলে তাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া হতো। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা স্বাধীন নারীদের জিলবাব পরিধানের নির্দেশ দিয়েছেন।” [৮]
ইবন কাসির (মৃ. ৭৭৪ হি.) বলেন:
“আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল মুহাম্মদ ﷺ-কে নির্দেশ দেন—তিনি যেন মুমিন নারীদের, বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী ও কন্যাদের, নিজেদের উপর জিলবাব টেনে নিতে আদেশ করেন।” [৯]
আধুনিক যুগের একটি প্রসিদ্ধ সংকলিত তাফসির গ্রন্থ সাফওয়াতুত তাফাসির, যার রচয়িতা মুহাম্মদ আলি আস-সাবুনি, সেখানে বলা হয়েছে—সূরা আহযাবের ৫৯ নম্বর আয়াতে নবী ﷺ-কে বলা হয়েছে যেন তিনি নারীদের জানান যে, তারা একটি প্রশস্ত বাহ্যিক পোশাক পরিধান করবে। [১০] এটি ঐতিহ্যবাহী সুন্নি আলেমদের সর্বসম্মত মত।
এই মত কেবল সুন্নিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ইমামি শিয়া আলেমদের মধ্যেও একই দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান:
আল-জানাবিজি বলেন:
“নারীরা তাদের জিলবাব দিয়ে মুখ ও বুক ঢাকত না। তাই আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জিলবাব দিয়ে মুখ ও বুক ঢাকার নির্দেশ দেন, যেন তারা অন্য নারীদের থেকে পৃথকভাবে চিহ্নিত হয়। নারীর জিলবাব হলো সাধারণ পোশাকের উপর পরিধেয় একটি প্রশস্ত পোশাক…” [১১]
সমকালীন আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি
প্রাচীন (ক্লাসিক্যাল) আলেমদের মতে জিলবাব ফরজ—এই অবস্থানটি সমকালীন আলেমদের মধ্যেও সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। প্রাচীন আলেমদের মতোই সমকালীন আলেমদের মতপার্থক্য মূলত একটি বিষয়েই সীমাবদ্ধ—জিলবাব কি মুখমণ্ডল ঢাকাকে অন্তর্ভুক্ত করে, নাকি করে না। তবে জিলবাবের শর্ত ও মৌলিক ধারণা নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই।
সমকালীন দৃষ্টিভঙ্গির একটি প্রতিনিধিত্বমূলক উদাহরণ হিসেবে দেওবন্দি আলেম মুফতি ইবন আদম আল-কাউসারি বলেন:
“উপরোক্ত ব্যাখ্যা ও অন্যান্য ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট হয় যে, জিলবাব হলো এমন একটি বাহ্যিক পোশাক যা নারীকে অপরিচিত পুরুষদের সামনে বের হওয়ার সময় পরিধান করতে হয়। এই পোশাকটি প্রশস্ত, ঢিলেঢালা, শালীন এবং সম্পূর্ণ শরীর আবৃতকারী হতে হবে।”
শাইখ মুহাম্মদ আল-হানূতি বলেন:
“সূরা আল-আহযাবের ৫৯ নম্বর আয়াত একজন নারীকে জিলবাব পরিধানে উদ্বুদ্ধ করে। জিলবাব বলতে বোঝায় তার অভ্যন্তরীণ পোশাকের উপর পরিধেয় বাহ্যিক পোশাক, যার মাধ্যমে তার শরীরের সবকিছু আবৃত থাকে এবং দেহের আকৃতি প্রকাশ পায় না। এটিই শরিয়তের উদ্দেশ্য।”
জিলবাব কী?
জিলবাব হলো এমন একটি বাহ্যিক পোশাক, যা সম্পূর্ণ শরীর ঢেকে রাখে। এই সংজ্ঞাটি ভাষাগত (lexical) এবং পাঠগত (textual)—উভয় ভিত্তিতেই নির্ধারিত।
ভাষাগত দিক থেকে জিলবাবের সংজ্ঞা (বাহ্যিক পোশাক হিসেবে):
প্রাচীন আরবি অভিধানসমূহে “জিলবাব” শব্দের ব্যাখ্যা থেকে এর প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এসব উৎসে জিলবাবকে একটি বাহ্যিক পোশাক হিসেবেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ইবনে মানযূর বলেন:
“জিলবাব হলো বাহ্যিক পোশাক, চাদর বা আলখাল্লা। এটি ‘তাজাল্লাবাবা’ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো পোশাক পরিধান করা। জিলবাব এমন একটি বাহ্যিক কাপড় বা আবরণ, যা নারী তার অন্যান্য পোশাকের উপর জড়িয়ে নেয়—মাথা থেকে পা পর্যন্ত নিজেকে আবৃত করার জন্য। এটি সম্পূর্ণভাবে তার দেহ আড়াল করে।” [১২]
আল-ফাইরূজ আবাদি বলেন:
“জিলবাব হলো এমন বস্তু, যা ঢাকনার মতো করে ভেতরের পোশাকগুলোকে আচ্ছাদিত করে।” [১৩]
আধুনিক অভিধানগুলোর মধ্যেও ১৯শ শতকের প্রখ্যাত ব্রিটিশ ভাষাবিদ এডওয়ার্ড উইলিয়াম লেন-এর Arabic–English Lexicon উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন:
“জিলবাব: … এমন একটি পোশাক যা পুরো শরীরকে আবৃত করে; এটি নারীর জন্য একটি প্রশস্ত পোশাক, যা মিলহাফা (বড় চাদর)-এর চেয়ে কিছুটা ছোট; অথবা এমন একটি পোশাক, যার মাধ্যমে নারী তার অন্যান্য পোশাকের উপর আবরণ দেয়…” [১৪]
একই সংজ্ঞা পাওয়া যায় জন এল. এসপোসিতো সম্পাদিত Oxford Dictionary of Islam-এ:
“জিলবাব: আরব সমাজে ইসলাম-পূর্ব ও ইসলাম-পরবর্তী যুগে নারীদের বাহ্যিক পোশাকের একটি সাধারণ নাম (শাল, চাদর, আবরণ)। কুরআনের (৩৩:৫৯) আয়াতে মুসলিম নারীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—তারা যেন নিজেদের উপর আবরণ টেনে নেয়, যা সামাজিক মর্যাদার পরিচয় এবং জনসমক্ষে যৌন হয়রানি থেকে রক্ষার একটি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা।” [১৫]
শর’ঈ (textual) দিক থেকে জিলবাবের সংজ্ঞা:
জিলবাব যে একটি বাহ্যিক পোশাক—এই সিদ্ধান্ত কেবল ভাষাগত নয়; বরং কুরআন ও রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ থেকেও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত।
কুরআনের সূরা নূর (২৪:৬০)-এ বয়স্ক নারীদের জন্য একটি বিশেষ রুখসত (ছাড়) উল্লেখ করা হয়েছে:
“আর যারা সন্তান ধারণের বয়স অতিক্রম করেছে এবং বিয়ের আশা রাখে না—তাদের জন্য কোনো গুনাহ নেই যদি তারা তাদের বাহ্যিক পোশাক খুলে রাখে, শর্ত হলো তারা যেন নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তবে সংযম অবলম্বন করাই তাদের জন্য উত্তম। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
এখানে যে পোশাক খুলে রাখার কথা বলা হয়েছে, তা অবশ্যই বাহ্যিক পোশাক। কারণ সাধারণ দৈনন্দিন পোশাক খুলে রাখার অনুমতি দেওয়া হতে পারে না। এ কারণেই নবী ﷺ-এর সাহাবিগণ—যেমন ইবন আব্বাস (রাঃ) ও ইবন মাসউদ (রাঃ)—এই পোশাককে জিলবাব হিসেবেই বুঝেছেন। তাঁরা উভয়েই কুরআনের তাফসিরে বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃত। [১৬]
সুন্নাহ থেকে প্রমাণ:
উম্মে আতিয়্যা (রাঃ)-এর পূর্বে বর্ণিত হাদিস থেকেও স্পষ্ট বোঝা যায় যে,
জিলবাব একটি বাহ্যিক পোশাক। নবী ﷺ স্পষ্টভাবে বলেছেন—নারী বাইরে বের হওয়ার আগে অবশ্যই জিলবাব পরিধান করবে; আর যার কাছে নেই, সে যেন অন্যের কাছ থেকে ধার করে নেয়। [১৭]
এ থেকে বোঝা যায়—জিলবাব ছাড়া বাইরে যাওয়া অনুমোদিত নয় এবং এটি স্বতন্ত্র একটি বাহ্যিক পোশাক।
আবু দাউদ-এ উম্মে সালামা (রা.)—নবী ﷺ-এর স্ত্রী—থেকে বর্ণিত একটি হাদিসও এ বিষয়টি স্পষ্ট করে। তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন:
“একজন নারী কি ইজার (এক ধরনের জিলবাব) ছাড়া শুধু লম্বা জামা ও মাথার ওড়না পরে নামাজ পড়তে পারে?” নবী ﷺ উত্তরে বলেন: “যদি লম্বা জামাটি যথেষ্ট প্রশস্ত হয় এবং তার পায়ের উপরিভাগ ঢেকে রাখে।”
উম্মে সালামা (রা.)-এর এই প্রশ্ন থেকেই বোঝা যায়—ইজার বা জিলবাব সাধারণ পোশাকের উপরেই পরিধান করা হতো।
সাহাবিদের বক্তব্যও একই বিষয়কে সমর্থন করে। যেমন, উমর (রা.) বলেন:
“নারী তিনটি পোশাক পরে নামাজ আদায় করবে—লম্বা জামা, মাথার ওড়না এবং ইজার (জিলবাব)।”
তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.) বলেন:
“নারী লম্বা জামা, মাথার ওড়না এবং মিলহাফা (জিলবাব) পরে নামাজ আদায় করবে।” [২০]
ফিকহবিদদের মতামত
এইসব বর্ণনার ভিত্তিতেই আল-শিরাজি বলেন:
“নারীর জন্য নামাজে তিনটি পোশাক পরিধান করা মুস্তাহাব—একটি মাথার ওড়না, একটি জামা যা শরীর ও পা ঢাকে, এবং একটি মিলহাফা (জিলবাব), যা তার পোশাকের উপর আবরণ হবে… এবং জিলবাবটি মোটা হওয়া উচিত, যাতে তা শরীরের আকৃতি প্রকাশ না করে এবং রুকু-সিজদার সময় সরে না যায়।”
ইমাম আন-নববি (রহ.)—যিনি আল-শিরাজির মুহাযযাব গ্রন্থের ব্যাখ্যাকার—এই মতকে ইমাম শাফেয়ির সঙ্গে সম্পৃক্ত করে বলেন:
“এই বিধান ইমাম শাফেয়ি উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর মাযহাবের আলেমরা এ বিষয়ে একমত।”
তিনি আরও বলেন:
“জিলবাব হলো এমন একটি চাদর, যা পোশাকের উপর পরিধান করা হয়—এটাই সঠিক মত এবং ইমাম শাফেয়ির মত।” [২২]
ইবনে হাযম তাঁর আল-মুহাল্লা গ্রন্থে বলেন:
“নবী ﷺ-এর যুগের আরবি ভাষায় জিলবাব বলতে বোঝায় এমন একটি বাহ্যিক পোশাক, যা সম্পূর্ণ শরীর ঢেকে দেয়। যে কাপড় পুরো শরীর ঢাকতে পারে না, তাকে কখনোই জিলবাব বলা যায় না।” [২৩]
অতএব, জিলবাব যে একটি বাহ্যিক পোশাক—এই বিষয়টি কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবিদের ব্যাখ্যা এবং প্রাচীন ও আধুনিক আলেমদের সর্বসম্মত মতের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত।
অন্যান্য শর্তাবলি
জিলবাবের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়—এমন কিছু শর্তও রয়েছে, যা নারীরা মাহরাম নন এমন পুরুষদের সামনে (যাদের সঙ্গে বিবাহ বৈধ নয়) ঘরের ভেতরে বা বাইরে উপস্থিত হলে তাদের সকল পোশাকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। শর্তগুলো হলো—
- পোশাক ঢিলেঢালা হতে হবে
- আধা-স্বচ্ছ বা স্বচ্ছ হওয়া চলবে না
- দৃষ্টি আকর্ষণকারী হওয়া যাবে না (তাবাররুজ)
- পুরুষদের পোশাকের সঙ্গে সাদৃশ্য থাকা যাবে না
এই শর্তগুলো সুপরিচিত ও সর্বস্বীকৃত। তাই এখানে এগুলোর বিস্তারিত প্রমাণ আলোচনার প্রয়োজন নেই। এ বিষয়ে আরও জানতে চাইলে ইসলামী ফিকহের প্রাসঙ্গিক গ্রন্থসমূহ দেখা যেতে পারে। [২৪]
সালওয়ার-কামিজ কি যথেষ্ট?
এখানে মূল প্রশ্ন হলো—সালওয়ার-কামিজ কি জিলবাবের মৌলিক শর্তগুলো পূরণ করে? অর্থাৎ, এটি কি এমন একটি ঢিলেঢালা বাহ্যিক পোশাক, যা পুরো শরীর আবৃত করে?
সাধারণভাবে সালওয়ার-কামিজ পুরো শরীর ঢাকে না; অনেক সময় শরীরের কিছু অংশ খোলা থাকে এবং এটি সবসময় ঢিলেঢালাও হয় না। এমনকি যদি ঢিলেঢালা ও আবৃত হওয়ার শর্ত পূরণও করা হয়, তবুও এটি বাহ্যিক পোশাক (outer garment) নয়। সালওয়ার-কামিজ সাধারণত দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের দৈনন্দিন পোশাক—যা ঘরের ভেতরে পরা হয়।
সংজ্ঞাগতভাবে বাহ্যিক পোশাক হলো—যা ঘরের পোশাকের উপর পরিধান করে বাইরে যাওয়ার সময় ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সালওয়ার-কামিজ নিজেই ঘরের স্বাভাবিক পোশাক। অতএব, অন্যান্য শর্ত আলোচনায় যাওয়ার আগেই এটি প্রথম ও মৌলিক শর্ত—বাহ্যিক পোশাক হওয়া—এই মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয় না।
শালীন পোশাক পরাই কি জিলবাবের শর্ত পূরণ করে?
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে—শালীন পোশাক বলতে আমরা কী বুঝি—তার ওপর। যদি শালীনতার সংজ্ঞার মধ্যে উপরে উল্লিখিত শর্তগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে উত্তর ভিন্ন হতে পারে।
এটি সত্য যে বাহ্যিক পোশাকের নকশা বা রূপ একরকম হওয়া জরুরি নয়; তবে সেগুলোকে অবশ্যই ইসলামী শরিয়ত নির্ধারিত শর্তগুলো পূরণ করতে হবে। শালীনতা কোনো ব্যক্তির নিজস্ব বা ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার বিষয় নয়; বরং এর জন্য সুস্পষ্ট নিয়ম নির্ধারিত আছে। শালীনতা এসব শর্তের ঊর্ধ্বে যেতে পারে না; বরং এগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করেই শালীনতা পূর্ণতা পায়।
অতএব, শুধু পুরো শরীর ঢাকলেই যথেষ্ট নয়—যদি পোশাকটি আঁটসাঁট হয়। আবার শুধু ঢিলেঢালা হলেই চলবে না—যদি তা বাহ্যিক পোশাক না হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাহ্যিক পোশাক বিভিন্ন রূপে হতে পারে—শর্ত হলো, প্রতিটি নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে হবে।
ইসলামী আইনগত মতভেদ ও একজন মুসলমান:
যারা ইসলামী আইনের সঙ্গে পরিচিত নন, তারা প্রায়ই অবাক হন—কেন কিছু মুসলিম এমন একটি বিধান অনুসরণ করেন, যা অন্য মুসলিমরা অনুসরণ করেন না। ফলে তারা মনে করেন—যিনি এই বিধান মানছেন, তিনি হয়তো অতিরিক্ত কঠোর বা চরমপন্থী।
বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। যেমন—কোনো নির্দিষ্ট আলেম একটি পোশাককে বৈধ বলেছেন—এর অর্থ এই নয় যে অন্যরা সেই মত অনুসরণ করতে বাধ্য, এমনকি অনুমতিপ্রাপ্তও। ইসলামী আইন একটি সমৃদ্ধ আইনব্যবস্থা, যেখানে আলেমদের মধ্যে বিস্তারিত বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো—যে আলেমকে তিনি সবচেয়ে যোগ্য, বিশ্বস্ত ও জ্ঞানী মনে করেন—তার ফতোয়া অনুসরণ করা।
এখানে নিজস্ব সুবিধা বা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা মানদণ্ড নয়; বরং তা আলেমের যোগ্যতা ও প্রজ্ঞা। একবার কোনো ব্যক্তি আন্তরিকভাবে একটি ফতোয়া অনুসরণ করলে, সেটিই তার জন্য আল্লাহর বিধান হিসেবে গণ্য হয় এবং সামাজিক সমর্থন বা বিরোধিতার কারণে তা পরিবর্তন করা বৈধ নয়। কারণ, সেই বিধান অমান্য করা মানে একটি ধর্মীয় দায়িত্ব পরিত্যাগ করা—যার জবাব আখিরাতে দিতে হবে।
এই প্রসঙ্গে, কোনো মুসলিম নারী যদি কোনো নির্দিষ্ট আলেমের ব্যাখ্যা অনুযায়ী জিলবাব ফরজ মনে করেন, তবে অন্য ভিন্নমত থাকলেও তার জন্য সেই মত অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন—এই মতটিই সঠিক। এখানে প্রচলিত বা সুবিধাজনক মতের কোনো গুরুত্ব নেই। বিশেষ করে জিলবাবের বিষয়টি এমন একটি বিধান—যা শরিয়তের ভাষা ও আত্মা—উভয়ের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্রাচীন সুন্নি ও শিয়া আলেমদের মধ্যেও এটি কখনো বড় কোনো বিতর্কের বিষয় ছিল না।
ধর্মীয় দায়িত্ব নাকি রাজনৈতিক বক্তব্য?
জিলবাব মূলত এবং সর্বাগ্রে একটি ধর্মীয় দায়িত্ব। এর ভিত্তি এসেছে সরাসরি ইসলামী উৎস থেকে—আধুনিক মুসলিমদের রাজনৈতিক লেখালেখি থেকে নয়। প্রাচীন ফকিহগণ প্রায় এক হাজার বছর আগেই এর বাধ্যবাধকতা ব্যাখ্যা করেছেন—বর্তমান রাজনৈতিক ইসলামের উত্থানের বহু আগে।
অতএব, জিলবাব আজকের রাজনৈতিক বিতর্কের ফসল নয়। এটি পরিধানের প্রেরণা আসে ধর্মীয় দায়িত্ববোধ থেকে—রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার জন্য নয়। যদি কেউ জিলবাবকে রাজনৈতিক বা ফ্যাশনের প্রতীক হিসেবে পরে—ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে নয়—তবে তা ইবাদত হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না; বরং গুনাহ হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ আল্লাহর ইবাদতে গ্রহণযোগ্য একমাত্র উদ্দেশ্য হলো—খাঁটি আনুগত্য।
জিলবাব কি নিপীড়নের প্রতীক?
কিছু অমুসলিমের দৃষ্টিতে মুসলিম নারীর পোশাক নিপীড়নের প্রতীক। তাদের দাবি—জিলবাব নারীর নীচু মর্যাদার পরিচায়ক, এটি জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, অথবা এটি নারীর সামাজিক অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে।
পোশাকের বিধান নিয়ে এই দৃষ্টিভঙ্গী আল্লাহর প্রজ্ঞা কে বুঝতে না পারা বা এই হুকুম পালনের ইতিবাচক দিক বিবেচনা না করা থেকেও আসে নি বরং এমন চিন্তার উৎস হলো—কিছু মুসলিম পুরুষের দ্বারা নারীর ওপর সংঘটিত অপব্যবহার (যা ইসলাম নিজেই নিন্দা করে) অথবা ইসলামে নারীর ভূমিকা সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা। [২৫]
ইসলামী আইন আল্লাহর কাছে নারী ও পুরুষকে মর্যাদা ও তাকওয়ার দিক থেকে সমান মনে করে। বিধানের ভিন্নতা কোনো লিঙ্গবৈষম্য থেকে নয়; বরং নারী-পুরুষের স্বভাবগত পার্থক্যকে স্বীকার করার ফল। অধিকাংশ বিধান নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই এক; অল্প কিছু ক্ষেত্রে পার্থক্য এসেছে স্বভাবগত ভিন্নতার কারণে।
মুসলিম নারীরা জিলবাব পরিধান করেন জনজীবনে শালীনতা বজায় রাখার জন্য এবং তারা মনে করেন—এটি তাদের মর্যাদা হ্রাস করে না; বরং বৃদ্ধি করে। বাস্তব অভিজ্ঞতায় অনেক নারী দেখেন—জিলবাব পরিধানের মাধ্যমে তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ, শিক্ষা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন—পুরুষদের অশোভন দৃষ্টি ও অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আগ্রাসন থেকে মুক্ত থেকে। [২৬]
অতএব, সামাজিক অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার পরিবর্তে, জিলবাব বরং নারীর ক্ষমতায়ন ও স্বাধীনতাকে সহজ করে—একটি শালীন ও নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলে।
—–
পরিশিষ্ট–১:
মুফতি আল-কাউসারির ফতোয়া [২৭]
আল্লাহর নামে—যিনি পরম দয়ালু, পরম করুণাময়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের, কন্যাদের এবং মুমিন নারীদের বলে দাও—তারা যেন নিজেদের উপর তাদের বাহ্যিক পোশাক (জিলবাব) টেনে নেয়। এতে তারা পরিচিত হবে এবং তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আল-আহযাব: ৫৯)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে—নারীর জন্য জিলবাব দ্বারা নিজেকে আবৃত করা ফরজ। এখন প্রশ্ন আসে—জিলবাব কী?
লিসানুল আরব-এ বলা হয়েছে:
“জিলবাব (বহুবচন: জালাবীব) হলো বাহ্যিক পোশাক বা চাদর, যার মাধ্যমে নারী তার মাথা ও বুক ঢাকে। আরও বলা হয়েছে—এটি এমন একটি লম্বা চাদর, যা নারীকে সম্পূর্ণভাবে আবৃত করে।” (ইবন মানযূর)
ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন:
“জিলবাব হলো এমন একটি লম্বা চাদর, যা নারীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে দেয়।”
এই ব্যাখ্যাগুলো স্পষ্ট করে—জিলবাব হলো এমন একটি বাহ্যিক পোশাক, যা নারী অপরিচিত পুরুষদের সামনে বের হওয়ার সময় পরিধান করবে। এটি প্রশস্ত, ঢিলেঢালা, শালীন এবং সম্পূর্ণ শরীর আবৃতকারী হতে হবে।
এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর সাহাবি নারীরা এমনভাবে বাইরে বের হতেন—যেন তাদের মাথার উপর পাখি বসে আছে—অত্যন্ত সংযম ও শালীনতার সঙ্গে। তারা লম্বা কালো চাদর দিয়ে নিজেদের আবৃত করতেন।
অতএব, নারীর জন্য অপরিচিত পুরুষদের সামনে বের হওয়ার সময় ঢিলেঢালা ও শালীন বাহ্যিক পোশাক পরিধান করা আবশ্যক—তা বোরকা হোক বা অন্য কোনো উপযুক্ত পোশাক।
আর আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।
পরিশিষ্ট ২: আলেমদের জীবনী:
সমসাময়িক আলেমগণ:
মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনী: মক্কার শরিয়া ও ইসলামিক স্টাডিজ কলেজের একজন অধ্যাপক। তিনি ‘সাফওয়াত আত-তাফাসির’ গ্রন্থের লেখক (বৈরুত: দারুল কুরআন আল-কারিম, ১৪০২ হিজরি, ১৯৮১)।
মুফতি মুহাম্মদ ইবনে আদম আল-কাউসারি: মুফতি মুহাম্মদ ইবনে আদম আল-কাউসারি ব্রিটেনে ঐতিহ্যবাহী আলেমদের অধীনে ইসলামিক স্টাডিজের দারসে নিজামী পাঠ্যক্রম সম্পন্ন করেন, এরপর তিনি হাদিসে বিশেষীকরণ করেন, যেখানে তিনি হাদিসের ৯টি প্রধান গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন এবং পাকিস্তানে মুফতি তাকি উসমানী ও অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় আলেমদের অধীনে ফতোয়া প্রদানের বিজ্ঞানে ২ বছরের বিশেষীকরণ অর্জনের মাধ্যমে এটি সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি সিরিয়া যান, যেখানে তিনি আল-আজহার (কায়রো) থেকে উন্নত ফিকহে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন এবং শীর্ষস্থানীয় আরব আলেমদের অধীনে অধ্যয়ন করেন। এই আলেমদের মধ্যে একজন, শায়খ আবদ আল-লতিফ ফারফুর বলেছেন যে, মুফতি মুহাম্মদ ইবনে আদমের একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে এবং তিনি আমাদের সময়ের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আলেম হতে চলেছেন বলে মনে হয়। তিনি বর্তমানে লেস্টারের একটি দারুল উলুমে শিক্ষকতা করেন এবং দারুল ইফতাতে মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেন।[২৮]
শেখ মুহাম্মদ আল-হানুতি: জন্ম: ১২ মার্চ, ১৯৩৭, হাইফা, ফিলিস্তিন। শিক্ষা: তিনি তার পিতা শেখ আলী হানুতি থেকে শরিয়া শিক্ষা লাভ করেন এবং আল-আজহারে ১৯৫৩-১৯৫৮ সাল পর্যন্ত শেখ মুহাম্মদ সাঈদ আজ্জাওয়ীর কাছে হাদিস অধ্যয়ন করেন। পূর্ববর্তী পদসমূহ: ১৯৬২-১৯৬৫ সাল পর্যন্ত বাগদাদে ইমাম, শিক্ষক ও খতিব ছিলেন। ১৯৬৫-১৯৭৮ সাল পর্যন্ত কুয়েতে ইমাম, শিক্ষক ও খতিব ছিলেন। তিনি ১৯৭৮ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ইসলামিক কেন্দ্রের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যার মধ্যে নিউ জার্সির জার্সি সিটি এবং ভার্জিনিয়ার দার আল-হিজরাহ অন্তর্ভুক্ত। তিনি উত্তর আমেরিকান ফিকহ কাউন্সিলের একজন সদস্য।
শাস্ত্রীয় পণ্ডিতগণ:
ইবনে হাযম: জন্ম ৭ নভেম্বর, ৯৯৪, কর্ডোবা, কর্ডোবার খিলাফত; মৃত্যু ১৫ আগস্ট, ১০৬৪, মান্টা লিশাম, সেভিয়ার কাছে। পুরো নাম আবু মুহাম্মদ ‘আলী ইবনে আহমদ ইবনে সাঈদ ইবনে হাযম। ইসলামিক স্পেনের একজন মুসলিম সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ, আইনজ্ঞ এবং ধর্মতত্ত্ববিদ, যিনি তার সাহিত্যকর্মের প্রাচুর্য, জ্ঞানের বিশালতা এবং আরবি ভাষার উপর দক্ষতার জন্য বিখ্যাত। জাহিরি (আক্ষরিকতাবাদী) মাযহাবের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হিসেবে তিনি আইনশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় ৪০০টি গ্রন্থ রচনা করেন।[২৯]
ইবনে জারির আত-তাবারি (মৃ. ৩১০): জন্ম আনুমানিক ৮৩৯, আমোল, তাবারিস্থান [ইরান]; মৃত্যু ৯২৩, বাগদাদ, ইরাক। পুরো নাম আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারির আত-তাবারি। মুসলিম পণ্ডিত, যিনি প্রাথমিক ইসলামের ইতিহাস এবং কুরআনের ব্যাখ্যার উপর বিশাল সংকলন গ্রন্থের রচয়িতা এবং ৯ম শতাব্দীতে সুন্নি চিন্তাধারাকে সুসংহত করতে একটি স্বতন্ত্র অবদান রেখেছিলেন। প্রধান কর্মসমূহ: তার জীবনের কাজ শুরু হয়েছিল কুরআন ব্যাখ্যার মাধ্যমে এবং এরপর তিনি নবী ও রাজাদের ইতিহাস রচনা করেন। আত-তাবারি’র ইতিহাস এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে সামানিদ রাজপুত্র মনসুর ইবনে নূহ এটি ফারসি ভাষায় অনুবাদ করিয়েছিলেন (আনুমানিক ৯৬৩)।[৩০]
ফখর আদ-দীন আর-রাজি (মৃ. ৬০৬): জন্ম ১১৪৯, রায়, ইরান; মৃত্যু ১২০৯, হেরাতের কাছে, খোয়ারাজম। আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে উমর ইবনে আল-হুসাইন ফখর আদ-দীন আর-রাজি। মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিদ এবং পণ্ডিত, যিনি ইসলামের ইতিহাসে কুরআনের অন্যতম প্রামাণ্য ব্যাখ্যার রচয়িতা। তার আগ্রাসী মনোভাব এবং প্রতিহিংসাপরায়ণতা অনেক শত্রু তৈরি করেছিল এবং তাকে অসংখ্য ষড়যন্ত্রে জড়িত করেছিল। তবে তার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিভা সর্বজনীনভাবে প্রশংসিত হয়েছিল এবং মাফাতিহ আল-গায়ব বা কিতাব আত-তাফসীর আল-কবীর (অদৃশ্যের চাবিকাঠি” বা “বৃহৎ ব্যাখ্যা”) এবং মুহাসসাল আফকার আল-মুতাকাদ্দিমিন ওয়া-আল-মুতা’আখখিরিন (“প্রাচীন ও আধুনিকদের মতামতের সংগ্রহ”) এর মতো কাজের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হয়।[৩১] ইবনে কাসির (মৃ. ৭৭৪ হিজরি): ছিলেন একজন ইসলামী পণ্ডিত, যিনি ১৩০১ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ার বুসরা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সিরিয়ার দামেস্কে ইসলামী পণ্ডিত ইবনে তাইমিয়া এবং ইবনে আল-কাইয়্যিমের কাছে শিক্ষা লাভ করেন। ইবনে কাসির ‘তাফসিরে ইবনে কাসির’ নামে কুরআনের একটি বিখ্যাত তাফসীর রচনা করেন, যেখানে তিনি ব্যাখ্যার জন্য কুরআনের আয়াতগুলোর সাথে নির্দিষ্ট কিছু হাদিস বা মুহাম্মদের বাণী এবং সাহাবাদের বাণীকে সংযুক্ত করেছেন। তাফসিরে ইবনে কাসির সমগ্র ইসলামী বিশ্বে এবং পশ্চিমা বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে বিখ্যাত, এবং এটি বর্তমানে কুরআনের অন্যতম বহুল ব্যবহৃত ব্যাখ্যাগ্রন্থ।[৩২]
আন-নাওয়াভি (মৃ. ৬৭৬ হিজরি): (জন্ম ১২৩৩ – মৃত্যু ১২৭৮), ফিকহ ও হাদিস বিষয়ক লেখক, দামেস্কের কাছে নাওয়াতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আঠারো বছর বয়স থেকে এই শহরেই পড়াশোনা করেন এবং সেখানে ১২৫৩ সালে হজ করার পর ১২৬৭ সাল পর্যন্ত একজন স্বাধীন পণ্ডিত হিসেবে বসবাস করেন। এরপর তিনি আশরাফিয়া মাদ্রাসায় আবু শামা-র স্থলাভিষিক্ত হয়ে হাদিসের অধ্যাপক হন। তিনি তুলনামূলকভাবে অল্প বয়সে নাওয়াতে মারা যান এবং তিনি কখনো বিয়ে করেননি।[৩৩]
আল-কুরতুবি (মৃ. ৬৭১ হিজরি): ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে আবু বকর আল-আনসারি আল-কুরতুবি স্পেনের কর্ডোবায় জন্মগ্রহণ করেন, যা ছিল ইসলামী সভ্যতার স্বর্ণযুগের শীর্ষ সময়। তিনি একজন বিশিষ্ট মালিকি পণ্ডিত ছিলেন এবং ফিকহ ও হাদিসে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তার পাণ্ডিত্যের ব্যাপকতা ও গভীরতা তার লেখায় সুস্পষ্ট। তার সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ হলো বিশ খণ্ডের তাফসীর ‘আল-জামি’ লি-আহকাম আল-কুরআন’।[৩৪]
আশ-শাফিঈ: জন্ম ৭৬৭ খ্রিস্টাব্দ, আরব; মৃত্যু ২০ জানুয়ারি ৮২০ খ্রিস্টাব্দ, আল-ফুস্তাত, মিশর। মুসলিম আইনজ্ঞ পণ্ডিত যিনি ইসলামী আইন চিন্তাধারার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং শাফিঈ মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি ঐতিহ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও আইনি পদ্ধতির ক্ষেত্রেও একটি মৌলিক অবদান রাখেন।[৩৫]
ক্লাসিকাল আরবি অভিধানকারগণ:
আল-ফাইরুযাবাদী: আবু-ত-তাহির ইবনে ইব্রাহিম মাজদ উদ-দিন উল-ফাইরুযাবাদী (১৩২৯–১৪১৪) ছিলেন একজন আরবি অভিধানকার, যিনি আধুনিক ইরানের শিরাজ শহরের কাছে কারাজিনে জন্মগ্রহণ করেন এবং শিরাজ, ওয়াসিত, বাগদাদ ও দামেস্কে শিক্ষা লাভ করেন। তিনি দশ বছর জেরুজালেমে বসবাস করেন এবং তারপর পশ্চিম এশিয়া ও মিশর ভ্রমণ করে ১৩৬৮ সালে মক্কায় বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তী তিন দশকের বেশিরভাগ সময় তিনি সেখানেই কাটান, ১৩৮০-এর দশকে কিছুকাল দিল্লিতে অবস্থান করেন এবং অবশেষে ১৩৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে মক্কা ত্যাগ করে বাগদাদ, শিরাজ (যেখানে তিনি তৈমুরের দ্বারা সমাদৃত হন) এবং সবশেষে আধুনিক ইয়েমেনের তাইজে ভ্রমণ করেন। ১৩৯৫ সালে তাকে ইয়েমেনের প্রধান কাজী (বিচারক) নিযুক্ত করা হয় এবং তিনি সুলতানের এক কন্যাকে বিবাহ করেন। জীবনের শেষ বছরগুলিতে ফাইরুযাবাদী মক্কায় তার বাড়িটিকে মালিকি আইনের একটি বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করেন এবং সেখানে তিনজন শিক্ষক নিয়োগ করেন। তিনি স্প্যানিশ ভাষাবিদ ইবনে সিদা (মৃত্যু ১০৬৬) এবং সাজানির (মৃত্যু ১২৫২) অভিধানগুলিকে একত্রিত করে একটি বিশাল অভিধানমূলক গ্রন্থও রচনা করেন। এই শেষোক্ত গ্রন্থটির একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ ‘আল-কামুস আল-মুহিত’ (ব্যাপক অভিধান) নামে প্রকাশিত হয় এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি নিজেই পরবর্তী কিছু অভিধানের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।[৩৬] ইবনে মানজুর: সময়কাল: ১২৩০ – ১৩১১। পুরো নাম: জামালউদ্দিন মুহাম্মদ বিন মুকাররাম ইবনে মানজুর, তিউনিসে জন্মগ্রহণ করেন এবং কায়রোতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি বিশ খণ্ডে রচিত আরবি ভাষার সবচেয়ে ব্যাপক অভিধান ‘লিসানুল আরব’-এর লেখক।[৩৭]
Sources:
[1] For a good over view see: Sources of Islamic Law: An Overview by Yasin Dutton. http://www.muhajabah.com/docstorage/dutton.htm
[2] Qur’an: (33:59)
[3] Sahih Bukhari Book 8/347
[4] Sunan Abu Dawud 32/4090
[5] Sahih Bukhari Book 72/684
[6] Date of death according to Hijri calendar.
[7] pbuh is abbreviation for ‘peace be upon him.’
[8] ar-Razi, Fakhr ad-Din, at-Tafsir al-Kabir, p.231.
[9] Ibn Kathir, Tafsir al-Qur’an al-‘Azim.
[10] as-Sabuni, Muhammad Ali, safwat at-tafasir, p.538.
[11] al-Janabizi, Tafsir bayan al-sa’adah fi muqaddimat al-ibadah, see commentary of verse 59 of surah Ahzab.
[12]Ibn Man.zur, Mu.hammad ibn Mukarram, Lisan al-`Arab, (Bayrut : Dar .Sadir, 1955-56). Vol.7, p. 273.
[13] Al-Fayruzabadi, al-Qamus al-Muhit,
[14]Lane, Edward William, An Arabic-English lexicon, (London 1863-1893) under the relevant root verb.
[15] Esposito, John L. (ed.), The Oxford Dictionary of Islam, (Oxford University Press, 2003).p.160.
[16] al-Qurtubi, Jami li-ahkam al-Qur’an, verse 60 of sura Nur.
[17] Sahih Bukhari Book 8/347
[18] This narration is mawquf and is attributed more correctly to Umm Salama, the wife of the Prophet.
[19] Milhafa is a synonym of jilbab. Notice here Abdullah b. Umar uses the word milhafa (jilbab) instead of izar, indicating that izar here is the jilbab. See al-majmu’ sharh al-muhazzab, p.259.
[20] Al-Nawawi, al-majmu’ sharh al-muhazzab, (Beirut, 2002), pp.258.
[21] A major reference for Islamic law who’s interpretation of law is canonized in the Malaysian legal code.
[22] An-Nawawi, al-majmu’ sharh al-muhazzab, (Beirut, 2002), pp.258-9.
[23] Ibn Hazm, Al-Muhalla, vol. 3, p.217
[24] For a contemporary source see Badawi, Jamal, The Muslim Woman’s Dress According to the Qur’an and Sunnah, (Ta-Ha Publishers Ltd,1980) or http://members.tripod.com/iaislam/TMWD.htm
[25] Bullock, Kathrine, Rethinking Muslim Women and the Veil: Challenging and Historical and Modern Stereotypes, (Herndon, VA: International Institute of Islamic Thought, 2002).p.73.
[26] Ali, Sayyid, ‘Why Here, Why Now? Young Muslim Women Wearing Hijab,’ The Muslim World, vol.95, (2005), pp.515-530.
[27] http://sunnipath.com/resources/Questions/QA00002148.aspx
[28] http://www.sunnipath.com/aboutTeachers.aspx?sectionid=5&teacherid=12
[29] http://www.britannica.com/eb/article-9041918?query=Ibn%20Hazm&ct=
[30] http://www.britannica.com/eb/article-7063
[31] http://www.britannica.com/eb/article-9033610
[32] http://en.wikipedia.org/wiki/Ibn_Kathir
[33] http://en.wikipedia.org/wiki/Nawawi
[34] http://www.bysiness.co.uk/quran/qurtubi.htm
[35] http://www.britannica.com/eb/article-9067053?query=shafi%27i&ct=
[36] http://en.wikipedia.org/wiki/Fairuzabadi
[37] http://www.salaam.co.uk/knowledge/biography/viewentry.php?id=812প্রশ্ন-উত্তর: গান, সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্রের উপর শরীয়তের বিধান?

প্রশ্ন: গান গাওয়া বা শোনার ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান কী? বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের হুকুম কী এবং এর ব্যবসা কি অনুমোদিত? আমি আপনাকে দলিল সহ বিস্তারিত উত্তর দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি?
উত্তর: ইমাম (মুজতাহিদ) এবং ফকীহগণ গান গাওয়ার বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন এবং তাদের বিভিন্ন মতামত রয়েছে যেমন হারাম (নিষিদ্ধ), মাকরুহ (অপছন্দনীয়) এবং মুবাহ (অনুমোদিত), যারা এটি নিষিদ্ধ করেছেন তারা হলেন তাদের মধ্যে যারা গান গাওয়াকে ব্যবসা বা পেশা হিসেবে নিষিদ্ধ করার মতামত রাখেন এবং ইমাম শাফিঈ (রহ.) থেকেও একই মতামত এসেছে, এবং যারা এটি অপছন্দ করেছেন তাদের মধ্যে আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) এই বিষয়টিকে অপছন্দ করেছেন এবং এর পরিবেশনাকে অপছন্দনীয় কাজের মধ্যে শ্রেণীবদ্ধ করেছেন, শাফিঈ (রহ.) এবং আল-কাযী (রহ.) থেকেও একই মতামত এসেছে। এবং যারা এটিকে (অনুমোদিত) করেছেন তাদের মধ্যে ইবনে হাজম, আবু বকর আল খালাল, আবু বকর আব্দুল আজিজ, সাদ ইবনে ইব্রাহিম এবং আনবারী এবং মদীনার বাসিন্দাদের অনেকেই রয়েছেন। তারা নাশিদকে ভিন্ন শ্রেণীতে নিয়েছিলেন এবং হুকুম থেকে বাদ দিয়েছিল এবং অনুমোদন করেছিলেন। ইবনে কুদামা তার আলমুগনি গ্রন্থে এ সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন।
এবং এই বিষয়ে সঠিক মতামত প্রকাশের জন্য আসুন আমরা এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত গ্রন্থগুলি (আয়াত/আহাদীস/ইজমা) অধ্যয়ন করি:
ক. যারা গান গাইতে নিষেধ করেন তাদের দ্বারা দলিল হিসাবে ব্যবহৃত গ্রন্থগুলো:
1. عن أنس بن مالك قال: قال رسول الله r “من جلس إلى قَيْنَةٍ فسمع منها، صبَّ الله في أذنيه الآنُكَ يوم القيامة” رواه عبد الله بن المبارك. والقينة هي الجارية. والآنُك هو الرصاص.
আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোন গায়িকা মহিলার গান শোনে, কিয়ামতের দিন তার কানে গলিত সীসা ঢেলে দেওয়া হবে।” আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রা.) থেকে বর্ণিত।
2. عن أبي مالك الأشعري رضي الله تعالى عنه قال: قال رسول الله r”ليشربَنَّ ناسٌ من أمتي الخمرَ يسمونها بغير اسمها فيُعزَفُ على رؤوسهم بالمعازف والمغنِّيات يَخْسِف الله بهم الأرضَ، ويجعل منهم القردة والخنازير ” رواه ابن ماجة.
আবু মালিক আলাশারি (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী (সা)-কে বলতে শুনেছেন: “মানুষ মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে এবং বাদ্যযন্ত্র বাজাবে, আল্লাহ তাদেরকে পৃথিবী কর্তৃক গ্রাস করিয়ে বানর ও শূকরে পরিণত করবেন।” (ইবনে মাজাহ তার সুনানে বর্ণনা করেছেন)
3. عن أبي أُمامة قال ” نهى رسول الله r عن بيع المغنيات وعن شرائهن وعن كسبهن وعن أكل أثمانهن ” رواه ابن ماجة.
আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “গায়িকাদের বিক্রি করো না, কিনো না বা শিক্ষা দিও না, কারণ তাদের জন্য যে মূল্য দেওয়া হয়েছে তা অবৈধ।” (ইবনে মাজাহ ও তিরমিযী বর্ণনা করেছেন)
4. عن أبي أُمامة t قال: قال رسول الله r ” إن الله بعثني رحمة للعالمين، وهدى للعالمين، وأمرني ربي عزَّ وجلَّ بمحق المعازفِ والمزاميِر والأوثانِ والصُّلُبِ وأمرِ الجاهلية… ولا يحل بيعُهن ولاشراؤُهن، ولا تعليمهن، ولا تجارةٌفيهن، وثمنهنَّ حرامٌ، يعني الضاربات. وفي رواية المغنيات ” رواه أحمد.والصُّلُب جمع صليب.
আবু উমামা বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আযযা ওয়া জাল আমাকে মানবজাতির জন্য হেদায়েত এবং রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন এবং (এ সত্ত্বেও) তিনি আমাকে বাদ্যযন্ত্র, মূর্তি, ক্রুশ এবং জাহেলী জিনিসপত্র ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়েছেন… এবং এগুলো বিক্রি করা জায়েজ নয় এবং এগুলো কেনা, শিক্ষা দেওয়া, ব্যবসা করাও জায়েজ নয়, এবং এগুলোর দাম হারাম, অর্থাৎ ঢোল বাজানো (ঢোল বাজানো) এবং অন্য কোন রিওয়াতে – মহিলা গায়িকাদের।” (আহমদ কর্তৃক বর্ণিত)
5. عن ابن عباس t عن رسول الله r قال ” والذي نفسي بيده لَيبيتَنَّ ناسٌ من أمتي على أَشَرٍ وبَطَرٍ ولعبٍ ولهوٍ، فيصبحوا قردةً وخنازير باستحلالهم المحارم والقَيْنات وشربهم الخمر وأكلهم الربا، ولبسهم الحرير ” رواه عبد الله بن أحمد في زوائد المسند.
ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যার হাতে আমার প্রাণ, সেই প্রভুর শপথ, আমার উম্মতের একটি দল রাত্রি যাপন করবে, খাবার, পানীয় এবং আড্ডা দিয়ে। পরের দিন সকালে তারা শুকর ও বানরে পরিণত হবে, কারণ তারা হালালকে হারাম এবং সঙ্গীতকে হারাম বলে অভিহিত করবে, মদ পান করবে, সুদ খাবে এবং রেশম পরবে।” (আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ কর্তৃক জাওয়াইদ আল-মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণিত)
6. عن عبيد الله بن زَحْر عن علي بن يزيد عن القاسم عن أبي أُمامة t عن رسول الله r قال ” لا تبيعوا القَيْنات ولا تشتروهن ولا تُعلِّموهنَّ، ولا خير في تجارةٍ فيهن، وثمنُهنَّ حرام، في مثل هذا أُنزلت هذه الآية {ومِنَ الناسِ مَنْ يشتري لهوَ الحديثِ ليُضِلَّ عن سبيلِ اللهِ } إلى آخر الآية “. رواه الترمذي وأحمد وابن ماجة والبيهقي.
আবু উমামা বর্ণনা করেন যে, নবী (সা) বলেছেন: “কখনও গায়িকাদের দাসী বাণিজ্য করো না এবং তাদেরকে গান গাওয়ার প্রশিক্ষণও দিও না। তাদের বাণিজ্য করা ভালো নয়, এবং [তোমাদের জন্য] তাদের মূল্য নিষিদ্ধ, এবং এই কারণেই আয়াতটি নাজিল হয়েছে:
ومِنَ الناسِ مَنْ يشتري لهوَ الحديثِ ليُضِلَّ عن سبيلِ اللهِ
(মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা জ্ঞান ছাড়াই ‘লাহওয়াল হাদিস’ ক্রয় করে, যাতে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করা যায় এবং তা উপহাস করে। তাদের জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি)। [লুকমান: ৬] (তিরমিযী, আহমদ, ইবনে মাজাহ এবং আল বায়হাকী বর্ণনা করেছেন)
7. عن شيخٍ شهد أبا وائلٍ في وليمة، فجعلوا يتلَعَّبون ويُغنُّون، فحلَّ أبو وائلٍ حبوتَه، وقال: سمعت عبد الله يقول: سمعت رسول الله r يقول “الغناء يُنبتُ النفاقَ في القلب ” رواه أبو داود. والحبوة (بفتح الحاء وضمها وكسرها) هي الجلوس على الإِليتين مع ضم الفخذين والساقين إلى البطن بالذراعين.
একজন শায়খ আবু ওয়ায়েলকে এক ওলীমায় গান-বাজনা ও খেলাধুলা করতে দেখেছিলেন। তাই আবু ওয়ায়েল সোজা হয়ে বসে বললেন, আমি আব্দুল্লাহকে বলতে শুনেছি যে, তিনি নবী (সা)-কে বলতে শুনেছেন: “গান অন্তরে মুনাফিকি বৃদ্ধি করে, যেমন পানি উদ্ভিদ জন্মায়।” (আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন)
8. عن أبي الصَّهباء “أنه سأل ابن مسعود عن قول الله {ومن الناس من يشتري لهو الحديث } قال: الغناء”. رواه ابن جرير الطبري في تفسيره.
আবু সুহাবা বলেন যে, তিনি ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে “মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা ‘লাহওয়াল হাদিস’ ক্রয় করে” এই আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি উত্তরে বলেন যে এটি গান গাওয়া। (ইবনে জারির এবং তাবারী তার তাফসীরে বর্ণনা করেছেন)
9. جاء في صحيح البخاري ما يلي (وقال هشام بن عمَّار حدثنا صَدَقة بن خالد حدثنا عبد الرحمن بن يزيد بن جابر حدثنا عطية بن قيس الكلابي حدثني عبد الرحمن بن غَنْمٍ الأشعري قال: حدثني أبو عامر أو أبو مالك الأشعري، والله ما كذبني، سمع النبي r يقول ” ليكونَنَّ من أمتي أقوامٌ يستحلون الحِرَّ والحرير، والخمرَ والمعازفَ، ولَينـزِلنَّ أقوامٌ إلى جنب عَلَم يروح عليهم بسارحةٍ لهم يأتيهم لحاجة فيقولون: إرجع إلينا غداً، فيُبَيِّتُهم الله ويضع العَلَم، ويمسخ آخرين قردةً وخنازيرَ إلى يوم القيامة “) ورواه الطبراني. والسارحة هي الماشية. والعَلََم هو الجبل.
সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে (এবং ইবনে হিশাম ইবনে আম্মার বলেছেন যে সাদাকা ইবনে খালিদ তাকে আবদুর রহমান ইবনে ইয়াজিদ ইবনে জাবির থেকে বর্ণনা করেছেন যে তিনি আতিয়া ইবনে কায়েস আল কিলাবি থেকে শুনেছেন যে তিনি আবদুর রহমান ইবনে গানাম আল আশআরী থেকে শুনেছেন যিনি বলেছেন: আবু আমির আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন অথবা আবু মালিক আল আশআরী আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, এবং আল্লাহর কসম তিনি আমাকে মিথ্যা বলেননি যে তিনি নবী (সা) কে বলতে শুনেছেন: “আমার উম্মাতের মধ্যে এমন কিছু লোক আসবে যারা ব্যভিচার, রেশম (পুরুষদের জন্য), মদ এবং সঙ্গীতকে হালাল মনে করবে; এবং এমন কিছু লোক থাকবে যারা একটি উঁচু পাহাড়ের পাশে তাঁবু খাবে, যখন কোন দরিদ্র ব্যক্তি তাদের পাশ দিয়ে যাবে এবং কোন প্রয়োজন চাইবে, তখন তারা তাকে বলবে, ‘আগামীকাল আমাদের কাছে ফিরে এসো।’ সকালে আল্লাহ তাদের উপর পাহাড়টি আছড়ে ফেলবেন এবং বাকিরা (যারা রক্ষা পেয়েছে) কেয়ামত পর্যন্ত বানর এবং শূকরে রূপান্তরিত হবে।” (তাবারানী বর্ণনা করেছেন)
খ. যেসব গ্রন্থের উপর নির্ভরশীল তারা গান গাওয়ার অনুমতি দেয় বা অপছন্দ করে এটা।
1. عن عامر بن سعد قال ” دخلتُ على قُرَظةَ بنِ كعبٍ وأبي مسعود الأنصاري في عرسٍ، وإذا جَوارٍ يُغنِّين، فقلت: أنتما صاحبا رسول الله r، ومِن أهل بدرٍ يُفعل هذا عندكم ؟ فقالا: إجلس إن شئت فاسمع معنا، وإن شئتَ فاذهب، قد رُخِّص لنا في اللهو عند العرس” رواه النَّسائي والحاكم وصححه.
‘আমির ইবনে সা’দ বর্ণনা করেন: এক বিবাহ অনুষ্ঠানে যখন গান-বাজনা চলছিল, তখন আমি কারাযা ইবনে কা’ব এবং আবি মাস’উদ আল-আনসারী (রা.)-এর কাছে গেলাম এবং তাদের বললাম: “তোমরা নবী (সা.)-এর সাহাবী এবং বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলে, অথচ তোমাদের চারপাশে এই (গান) চলছে? তারা বলল: যদি তোমরা চাও, আমাদের সাথে বসে শোনো, আর যদি চাও, তাহলে চলে যাও। বিবাহ অনুষ্ঠানে আমাদের জন্য এই অসার কাজটি বৈধ।” [নাসায়িতে বর্ণিত এবং হাকিম কর্তৃক প্রমাণিত]
2. عن السائب بن يزيد t ” أن امرأة جاءت إلى رسول الله r فقال: يا عائشة أتعرفين هذه ؟ قالت: لا يا نبي الله فقال: هذه قَيْنةُ بني فلان، تحبين أن تغنيَكِ ؟ قالت: نعم، فأعطاها طَبَقاً فغنَّتها، فقال النبي r: قد نفخ الشيطان في مِنْخريها ” رواه أحمد بسند صحيح، ورواه الطبراني. والطبق هو الإناء.
সায়েব ইবনে ইয়াজিদ থেকে বর্ণিত: এক মহিলা নবী (সা) এর কাছে এলেন। তিনি আয়েশা (রা) কে জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তুমি কি তাকে চেনো?’ তিনি বললেন: ‘না, হে আল্লাহর রাসূল (সা)।’ তিনি বললেন: ‘এটি অমুক গোত্রের পেশাদার গায়িকা। তুমি কি চাও যে সে তোমার জন্য গান গাইবে?’ আয়েশা (রা.) বললেন: ‘হ্যাঁ’, তাই মহিলাটি তার জন্য গান গাইলেন, তারপর নবী (সা) বললেন: ‘শয়তান তার নাকে ফুঁ দিয়েছে।’ (আহমদ ও তাবারানী বর্ণনা করেছেন)
3. عن جابر رضي الله تعالى عنه قال: قال رسول الله r لعائشة ” أهديتم الجارية إلى بيتها ؟ قالت: نعم، قال: فهلا بعثتم معهم من يُغَنِّيهم يقول: أتيناكم فحيُّونا نُحَيِّيكم، فإن الأنصار قومٌ فيهم غَزَل ” رواه أحمد بسند صحيح، ورواه البخاري من طريق عائشة بلفظ” أنها زَفَّت امرأةً إِلى رجلٍ من الأنصار، فقال نبي الله r: ياعائشة، ما كان معكم لهوٌ ؟ فإنَّ الأنصار يُعجبهم اللهو ” ورواه الحاكم وصححه، ووافقه الذهبي.
জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত: নবী (সা) আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন: “তুমি কি কনেকে তার বাড়িতে পাঠিয়েছ?” তিনি বললেন: “হ্যাঁ”। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: “তুমি কি তাদের সাথে এমন কোন গায়ক পাঠিয়েছ যে তাদের জন্য গান গাইতে পারে?” আয়েশা (রা.) না-করে উত্তর দিলেন। নবী (সা) তখন বললেন: “তুমি যদি তাদের সাথে এমন একজন গায়ক পাঠাতে যে গাইত যে আমরা তোমার কাছে এসেছি, তাই আমাদের স্বাগত জানাও, কারণ আনসাররা এমন একটি জাতি যারা গান গাইতে ভালোবাসে।” (সহীহ সনদে আহমাদ বর্ণনা করেছেন, এবং বুখারীতে আয়েশা (রা.)-এর সূত্রে এই শব্দগুলি বর্ণনা করেছেন) “তিনি আনসারদের একজনের সাথে বিবাহের জন্য একজন কনে পাঠিয়েছিলেন, নবী (সা) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আয়েশা” তোমার কি লাহও নেই? আনসাররা লাহও ভালোবাসে” (হাকিম বর্ণনা করেছেন এবং যাহাবী এটি অনুমোদন করেছেন)।
4. عن عائشة رضي الله عنها ” أن أبا بكر الصديق دخل عليها وعندها جاريتان في أيام مِنى تُغَنِّينان وتَضْرِبان، ورسول الله r مسجَّى بثوبه، فانتهرهما أبو بكر، فكشف رسول الله r عنه، وقال: دعهما يا أبا بكر، فإِنها أيام عيد… ” رواه مسلم.
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত: আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তার ঘরে এলেন, যখন দুজন মহিলা গায়িকা গান গাইছিলেন এবং বাজনা বাজাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর পোশাক দিয়ে তাঁর মুখ ঢেকে রেখেছিলেন। ইতিমধ্যে আবু বকর (রা) প্রবেশ করলেন এবং [গায়কদের দেখে] আমাকে ধমক দিলেন: ‘রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপস্থিতিতে শয়তানী বাদ্যযন্ত্র?’ এই কথা শুনে আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর দিকে ফিরে বললেন: ‘এগুলো ছেড়ে দাও, আজ ঈদের দিন।’ (মুসলিম বর্ণনা করেছেন)
5. عن عبد الله بن بُريدة قال: سمعت بُريدة يقول ” خرج رسول الله r في بعض مغازيه، فلما انصرف جاءت جاريةٌ سوداءُ فقالت: يا رسول الله، إني كنتُ نذرتُ إِنْ ردَّك الله سالماً أن أضرب بين يديك بالدُّفِّ وأَتغنَّى، فقال لها رسول الله r: إن كنتِ نذرتِ فاضربي وإلا فلا، فجعلت تضرب، فدخل أبو بكر وهي تضرب ثم دخل علي وهي تضرب ثم دخل عثمان وهي تضرب ثم دخل عمر فألقت الدُّف تحت إِستها ثم قعدت عليه، فقال رسول الله r: إن الشيطان ليخاف منك يا عمر، إني كنت جالساً وهي تضرب فدخل أبو بكر وهي تضرب ثم دخل علي وهي تضرب ثم دخل عثمان وهي تضرب، فلما دخلتَ أنت يا عمر ألقت الدُّفَّ ” رواه الترمذي وقال: هذا حديث حسنٌ صحيحٌ غريبٌ، ورواه أحمد بسند صحيح، ورواه أبو داود والبيهقي.
আবদুল্লাহ ইবনে বুরাইদাহ তার পিতার বর্ণনা থেকে বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর কিছু সামরিক অভিযান থেকে ফিরে এলেন। এক কৃষ্ণাঙ্গ দাসী তাঁর কাছে এসে বলল, ‘আমি মানত করেছিলাম যে, যদি আল্লাহ আপনাকে নিরাপদে এবং অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে আনেন, তাহলে আমি আপনার আগে দাফ মারব।’ রাসূলুল্লাহ (সা) উত্তর দিলেন, ‘যদি আপনি মানত করে থাকেন, তাহলে এগিয়ে যান, অন্যথায় করবেন না।’ সে দাফ মারতে শুরু করল। ইতিমধ্যে আবু বকর (রা) এসে গেলেন এবং তিনি দাফ মারতে থাকলেন। এরপর ‘উসমান (রা) এবং ‘আলী (রা) এলেন এবং তিনি দাফ মারতে থাকলেন। তারপর ‘উমর (রা) এলেন এবং তিনি তার যন্ত্রটি নিজের নীচে ঢেকে ফেললেন এবং তাকে দেখার সাথে সাথে তার উপর বসে পড়লেন। এ কথা শুনে নবী (সা) বললেন, ‘ওমর, শয়তানও তোমাকে ভয় করে। আমি বসে ছিলাম এবং সে দফ মারছিল, তারপর আবু বকর প্রবেশ করলেন এবং তিনি মারতে থাকলেন, তারপর আলী প্রবেশ করলেন এবং তিনি মারতে থাকলেন, উসমান প্রবেশ করলেন এবং তিনি মারতে থাকলেন, কিন্তু যখন তুমি প্রবেশ করলে হে ওমর, সে দফ থামিয়ে দিল।’ (তিরমিযী বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বলেছেন যে এটি হাসান গরীব হাদিস এবং আহমদ এটিকে সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন এবং আবু দাউদ ও আল বায়হাকীও এটি বর্ণনা করেছেন)
6. عن يحيى بن سليم قال: قلتُ لمحمد بن حاطب: تزوجتُ امرأتين ما كان في واحدةٍ منهما صوت، يعني دُفَّاً، فقال محمد t: قال رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم” فصْلُ ما بين الحلال والحرام الصوتُ بالدُّفُّ ” رواه الحاكم وصححه ووافقه الذهبي. ورواه أحمد بسند صحيح. ورواه ابن ماجة والنَّسائي، والترمذي وحسَّنه.
ইয়াহিয়া বিন সালিম বলেন, আমি মুহাম্মদ ইবনে হাতিবকে বললাম, “আমি দুইজন মহিলাকে বিয়ে করেছি এবং তাদের মধ্যে কোন আওয়াজ ছিল না, অর্থাৎ বিবাহে কোন দফ ছিল না, তাই মুহাম্মদ ইবনে হাতিব বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘যা বৈধ কাজ (অর্থাৎ নিকাহ) এবং নিষিদ্ধ কাজ (ব্যভিচার) এর মধ্যে পার্থক্য করে তা হল দফের সুর এবং নিকাহের প্রকাশ্য ঘোষণা।’” (আল হাকিম বর্ণনা করেছেন এবং যাহাবী এটিকে সমর্থন করেছেন, আহমদও এটিকে সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন, ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন এবং নাসায়ীও করেছেন, এবং তিরমিযী এটিকে বর্ণনা করেছেন এবং এটিকে হাসান হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন)।
7. عن الرُّبيِّع بنتِ مُعَوّذ رضي الله عنها قالت ” دخل عليَّ رسول الله r صبيحة عُرسي وعندي جاريتان تغنيان وتُندبان آبائي الذين قُتلوا يوم بدرٍ، وتقولان فيما تقولان: وفينا نبيٌّ يعلم ما في غدٍ، فقال: أمَّا هذا فلا تقولوه، ما يعلم ما في غدٍ إلا الله ” رواه ابن ماجة، ورواه أبو داود بمعناه ورواه الترمذي وقال: هذا حديث حسن صحيح وجاء في روايته ” وجُوَيْراتٌ لنا يضربن بدُفُوفِهِن “.
মু’ওয়ায (রা)-এর কন্যা রাবী’ থেকে বর্ণিত: আমার বিবাহের দিন সকালে, নবী (সা) আমাদের সাথে দেখা করতে এলেন, যখন দুজন দাসী দাফ মারছিল এবং বদরের যুদ্ধে নিহত আমার পূর্বপুরুষদের জন্য বিলাপ করছিল। মেয়েরা গাইছিল: “আমাদের মধ্যে নবী (সা) আছেন যিনি জানেন আগামীকাল কী ঘটবে”, তিনি (সা) বললেন: “এ কথা বলো না, কারণ আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) ছাড়া কেউ জানে না আগামীকাল কী ঘটবে।” (ইবনে মাজাহ এবং আবু দাউদ, তিরমিযীও এটি বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে এই হাদিসটি হাসান সহীহ”
8. عن عائشة رضي الله عنها قالت ” دخل عليَّ أبو بكر وعندي جاريتان من جواري الأنصار تُغنيان بما تقاولت به الأنصار في يوم بُعاث، قالت: وليستا بمغنيتين فقال أبو بكر: أبمزمور الشيطان في بيت النبي r ؟ وذلك في يوم عيد الفطر، فقال النبي r: يا أبا بكر، إن لكل قومٍ عيداً، وهذا عيدُنا ” رواه ابن ماجة.
আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত: আবু বকর সিদ্দিক (রা) তার ঘরে এলেন, যখন দুজন আনসারী মহিলা গায়িকা বু‘আস-এর গান গাইছিলেন এবং বাজিয়ে (বাদ্যযন্ত্র) বাজাচ্ছিলেন। ইতিমধ্যে আবু বকর (রা) প্রবেশ করলেন এবং [গায়কদের দেখে] আমাকে ধমক দিলেন: ‘রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উপস্থিতিতে শয়তানী বাদ্যযন্ত্র?’ এই কথা শুনে আল্লাহর রাসূল (সা) তার দিকে ফিরে বললেন: ‘হে আবু বকর, সকল মানুষের জন্যই একটি ঈদ আছে এবং এটি আমাদের ঈদ” (ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন)।
9. عن أنس بن مالك t” أن النبي r مرَّ ببعض المدينة، فإذا بجوارٍ يضربن بدُفِّهنَّ ويتغنَّين ويقلن:
نحـن جَـوَارٍ مـن بني النجـارِ يـا حبـذا محمـدٌ من جـارِ فقال النبي (ص) : اللهُ أعلم إِني لأُحِبُّكُنَّ ” رواه ابن ماجة بسند صحيح.
আনাস ইবনে মালিক (রা) বর্ণনা করেন যে, নবী (সা) মদীনার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় এক নির্দিষ্ট স্থানে দেখতে পেলেন যে, কিছু লোক তাদের দাফ বাজাচ্ছে এবং গান গাইছে: “আমরা বনী নাজ্জারের লোক; আমরা মুহাম্মদকে আমাদের প্রতিবেশী হিসেবে স্বাগত জানাই।”
নবী (সা) বলেছেন: “জেনে রেখো যে আমি তোমাদের সকলকে ভালোবাসি।” (ইবনে মাজাহ সহীহ সনদের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন)।
10. عن نافع مولى ابن عمر t” أن ابن عمر رضي الله عنهما سمع صوتَ زَمَّارةِ راعٍ، فوضع أُصبعيه في أُذُنيه وعَدَل راحلته عن الطريق وهو يقول: يا نافع أتسمع ؟ فأقول: نعم، فيمضي حتى قلتُ: لا، فوضع يديه وأعاد راحلته إلى الطريق وقال: رأيتُ رسول الله r، وسمع صوتَ زَمارةِ راعٍ، فصنع مثل هذا ” رواه أحمد بإسناد صحيح.ورواه ابن ماجة والخلاَّل.
ইবনে ওমর (রা) এর চাকর নাফে (রা) বর্ণনা করেন যে, ইবনে ওমর (রা) বাঁশির শব্দ শুনতে পেয়ে কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিলেন এবং পথ ঘুরিয়ে বললেন, “হে নাফে!” তুমি কি শুনতে পাচ্ছো? আমি তাকে বললাম: “হ্যাঁ” এবং তিনি বারবার এই কথাটি বলতে থাকলেন যতক্ষণ না আমি বললাম “না”। এরপর তিনি কান থেকে আঙ্গুল সরিয়ে পূর্বের পথে ফিরে গেলেন এবং বললেন: “আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বাঁশির শব্দ শুনে একই কাজ করতে দেখেছি।” [মুসনাদে আহমাদে একটি নির্ভরযোগ্য সনদ সহ বর্ণিত, ইবনে মাজাহ এবং আল-খাল্লালও বর্ণনা করেছেন]।
11. عن عُقبة بنِ عامر رضي الله تعالى عنه قال: قال رسول الله r ” تعلموا كتاب الله وتعاهدوه وتغنَّوا به، فوالذي نفسي بيده لهو أشدُّ تفلُّتاً من المخاض في العُقُل ” رواه أحمد والدَّارمي والنَّسائي، ورواه النَّسائي أيضاً في السُّنن الكبرى، بلفظ “…والذي نفس محمدٍ بيده لهو أشدُّ تَفلُّتاً من العِشَارِ في العُقُل ” والعِشار والمخاض هي النياق الحوامل، جمع ناقة. والعُقُل جمع عِقال وهو الحبل الذي يُربطُ به.
উকবা ইবনে আমির (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “আল্লাহর কিতাব শিখো, তা মেনে চলো এবং ভালোভাবে তেলাওয়াত করো, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ, এটি (অর্থাৎ, কুরআন) রশি থেকে উটের চেয়েও (স্মৃতি থেকে) হারিয়ে ফেলা সহজ।” মুসনাদে আহমাদ, আল-দারিমী, আল-নাসায়ী এবং সুনান আল-কুবরাহ গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্ন শব্দ এবং অভিন্ন অর্থে বর্ণিত।
12. عن سعد بن أبي وقاص t أن رسول الله r قال ” ليس منَّا مَنْ لم يتغنَّ بالقرآن ” رواه الدَّارمي وابن ماجة.
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কুরআনে গান গায় না সে আমাদের দলভুক্ত নয়” (আল-দারমী এবং ইবনে মাজাহ কর্তৃক বর্ণিত)
এখন আমরা প্রথম মতের অধীনে বর্ণিত হাদিসের সনদ পরীক্ষা করে দেখব যে এগুলো নির্ভরযোগ্য কিনা?
আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত প্রথম হাদিসটির সনদ (শব্দ) ভাঙা, কারণ এর চারজন বর্ণনাকারী দুর্বল বা অজানা, এবং তারা হলেন ইব্রাহিম ইবনে উসমান, আহমদ ইবনে গামার, ইয়াজিদ ইবনে আবদুসসামাদ এবং ওবায়দ ইবনে হিশাম আল-হালাবী, তাই হাদিসটিকে প্রমাণ হিসেবে নির্ভর করা যাবে না।
দ্বিতীয় হাদিসটি ইবনে মাজাহ আবু মালিক আল-আশ’আরী থেকে বর্ণনা করেছেন এবং এই সনদে মালিক ইবনে আবি মারিয়াম আছেন এবং যাহাবী তাঁর সম্পর্কে বলেছেন: তিনি অজানা, এবং তাই তিনি একজন অজানা বর্ণনাকারী, বর্ণনাকারী মু’আবিয়া ইবনে সালেহ ছাড়াও, যাকে অনেক হাদিস পণ্ডিত তার দুর্বলতার কারণে গ্রহণ করেননি, তাই হাদিসটি অত্যন্ত দুর্বল এবং পরিত্যক্ত।
ইবনে মাজাহ আবু উমামা থেকে তার সনদে যে তৃতীয় হাদিসটি বর্ণনা করেছেন তা হল আবু মুহাল্লাব মুতরাহ ইবনে ইয়াজিদ, যাকে আবু যার-আল-রাযী এবং আবু হাতেম আল-রাযী দুর্বল করেছেন। এবং ইবনে মু’ইন বলেছেন: তিনি কেউ নন, এবং বুখারী বলেছেন: তিনি হাদীস অস্বীকারকারী, এবং সনদে ওবায়দুল্লাহ আল-আফ্রিকীও আছেন যাকে আহমদ, দারিমি এবং দারকুতনী দুর্বল বর্ণনাকারী হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেছেন। এবং ইবনে মু’ইন বলেছেন: তিনি কেউ নন। এবং ইবনে মাদেনী বলেছেন: তিনি হাদীস অস্বীকারকারী। এবং আবু মিশ’আর বলেছেন: তিনি প্রতিটি সমস্যার সঙ্গী। অতএব, হাদিসটি খুবই দুর্বল এবং গ্রহণযোগ্য নয়।
চতুর্থ হাদিসটি যা আহমদ আবু উমামা থেকে বর্ণনা করেছেন, তার ক্রমানুসারে আলী ইবনে ইয়াজিদ আল-আলহানি আছেন এবং তিনি দুর্বল। একইভাবে কাসিমও দুর্বল, তাই হাদিসটি খুবই দুর্বল এবং তাই গ্রহণযোগ্য নয়।
পঞ্চম হাদিসটি যা আব্দুল্লাহ ইবনে আহমদ ইবনে হাম্বল থেকে জাওয়াইদ আল-মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, এই সনদে ফারকাদকে সাবাখি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, হাইসামি মাজমু’আ আজ্জাওয়াইদ গ্রন্থে বলেছেন: ফারকাদ দুর্বল; আল-মুনযিরিও বলেছেন যে হাদিসটি দুর্বল। এই হাদিসটি সাঈদ ইবনে মনসুরও বর্ণনা করেছেন এবং তার সনদে তিনজন দুর্বল বর্ণনাকারী আছেন, তাই হাদিসটি দুর্বল এবং তাই গ্রহণযোগ্য নয়।
ষষ্ঠ হাদিসটি যা তিরমিযী বর্ণনা করেছেন আব্দুল্লাহ ইবনে যাহর থেকে আলী ইবনে ইয়াজিদ থেকে কাসিম ইবনে আবু উমামা থেকে, আলী ইবনে ইয়াজিদ থেকে, তিরমিযী বলেছেন (কিছু জ্ঞানী ব্যক্তি আলী ইবনে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন এবং তারা দাবি করেছেন যে তিনি দুর্বল) এবং বুখারী বলেছেন যে তিনি হাদীস অস্বীকারকারী এবং নাসাঈ বলেছেন: বিশ্বাসযোগ্য নয়। দারকুতনি এটি গ্রহণ করেননি। এবং শাওকানি দাবি করেছেন ‘ওবাইদুল্লাহ ইবনে যাহর এবং কাসিমকে দুর্বল। অতএব হাদিসটি অত্যন্ত দুর্বল এবং তাই গ্রহণযোগ্য নয়।
সপ্তম হাদিসটি আবু দাউদ একজন শায়খ থেকে বর্ণনা করেছেন যাকে আবু ওয়াইল দেখেছিলেন এবং এটা স্পষ্ট যে একজন অজানা বর্ণনাকারী আছেন যার নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং তিনিই সেই শায়খ যাকে আবু ওয়াইল দেখেছিলেন, তাই হাদিসটি দুর্বল এবং গৃহীত হয়নি।
ইবনে জারির আল-তাবারী তার তাফসিরে যে অষ্টম হাদিসটি বর্ণনা করেছেন তা ইবনে মাসউদের একটি কওল (কথা) এবং এটি মারফু হাদিস নয়, এবং সাহাবাদের বক্তব্য প্রমাণ (দলিল) নয়, এবং এটি তাদের জন্য এবং যারা মুসলিমদের মধ্যে তাদের সাথে তাক্বলীদ করে তাদের জন্য আহকাম শরীয়ত, এবং সমস্ত মুসলিমের জন্য এটির সাথে তাক্বলীদ করা বাধ্যতামূলক নয়, এবং এটি ইবনে মাসউদ (রা.) এর উক্তি এবং আয়াত থেকে তার উপলব্ধি, প্রকৃতপক্ষে এটি (লাহু) এর শরহ এবং এটি একটি সঠিক উপলব্ধি যেমনটি দ্বিতীয় অংশের প্রথম হাদিসে উদ্ধৃত করা হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে: “বিবাহ অনুষ্ঠানের সময় এই অনর্থক কাজটি আমাদের জন্য বৈধ।” অর্থাৎ বিবাহ অনুষ্ঠানে গান গাওয়া অনুমোদিত। তৃতীয় হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা) এর বাণী সম্পর্কে, যখন তিনি (সা) আয়েশা (রা.) কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: “আপনি কি তাদের সাথে এমন কোন গায়ক পাঠিয়েছিলেন যিনি তাদের জন্য গান গাইতে পারতেন, কারণ আনসাররা এটি পছন্দ করে”, অর্থাৎ তারা গান গাওয়া পছন্দ করে। এই ব্যাখ্যায় একজন পর্যবেক্ষক সহজেই লক্ষ্য করবেন যে গান গাওয়াকে নিন্দা করা হয় কারণ এটি (ক্বারীনাহ) আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) পথ থেকে বিচ্যুত করার সাথে সম্পর্কিত। যদি তা না হত, তাহলে কোন নিন্দা করা হত না। যেকোনো কথায় আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) পথ থেকে বিচ্যুত করার সাথে সম্পর্কিত হলে তা নিন্দা করা হয় এবং কাজটি নিজেই জায়েয থাকে। গান গাওয়াও অনুরূপ, এটি অন্য যেকোনো জায়েয কাজের মতোই জায়েয, যদি না আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) পথ থেকে বিচ্যুত করার সাথে সম্পর্কিত হয়। অতএব, এই ব্যাখ্যাটি এর নিষেধের প্রমাণ নয়।
সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত হাদিসটি একটি মু’আল্লাক হাদিস, এবং যারা সঙ্গীত এবং বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ বলে মনে করেন তাদের পক্ষে এটি একটি প্রমাণ, আমরা এই হাদিসটি বিস্তারিতভাবে দেখব:
যদিও এই হাদিসটি সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত, তবুও এটা বলা ঠিক হবে না যে বুখারী এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন কারণ বুখারী (তিনি আমাদের অবহিত করেছেন) বা (তিনি আমাদের জানিয়েছেন) বা অনুরূপ কিছু বলেননি, তিনি মু’আল্লাক পদ্ধতিতে বর্ণনা করেছেন (এবং হিশাম ইবনে আম্মার বলেছেন) এবং সহীহ আল বুখারীতে মু’আল্লাক হাদিসগুলিকে প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক নয় যদিও সেগুলি উল্লেখ করা যেতে পারে। মু’আল্লাক হাদিসের অর্থ হল একজন বা একাধিক বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ করা হয়নি, এবং তাই হাদিসটি মুনকাতি (অসংযুক্ত) এবং আমি প্রশ্ন করছি: কেন বুখারী এই হাদিসটি বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ করেননি? এটি কি ইমাম বুখারীর বর্ণনা এবং বর্ণনাকারীর উপর সন্দেহের ইঙ্গিত দেয় না, এবং তাই এই হাদিসটি সহীহ হওয়ার স্তর থেকে নেমে আসে।
হিশাম বিন আম্মার একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি কিন্তু যখন তিনি বৃদ্ধ হয়ে যান তখন তার অবস্থা পরিবর্তিত হয়, তার কথা সন্দেহাতীতভাবে গ্রহণ করা যেত না, আবু হাতেম আর রাজি বলেন (যখন হিশাম বৃদ্ধ হয়ে যান তখন তিনি পরিবর্তন করেন, তাকে যা দেওয়া হত তা পড়তেন এবং যা তাকে বলা হত তা গ্রহণ করতেন) এবং আবু দাউদ যার কাছ থেকে আল-‘আজারি বর্ণনা করেছেন (হিশাম চারশত হাদীস বর্ণনা করেছেন কিন্তু তার সনদের ভিত্তি নেই), এবং তিনি আরও বলেছেন যে হিশাম আবু মিশার থেকে হাদীস গ্রহণ করতেন এবং তারপর সেগুলো বর্ণনা করতেন, এবং এর পরে তিনি অর্থাৎ আবু দাউদ বলেন (আমি ভয় পেয়েছিলাম যে তিনি ইসলামের বিষয়ে সন্দেহ তৈরি করবেন)। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল বলেছেন: “তিনি কিছুটা চঞ্চল ছিলেন” এবং আরও বলেছেন: “যদি তুমি তার পিছনে নামাজ পড়ো, তাহলে তোমার নামাজ পুনরাবৃত্তি করো।” এমন বর্ণনাকারীর কাছ থেকে হাদীস গ্রহণ করা ঠিক নয়, তাছাড়া সহীহ হাদীস তার বর্ণনাকে অস্বীকার করে।
আবু দাউদ তার সুনানে হিশাম বিন আম্মার থেকে শুরু করে একটি সুন্দর সনদে বর্ণনা করেছেন: (আবদুল ওহাব বিন নাজদাহ আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, বাশার বিন বকর আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, আব্দুর রহমান ইবনে ইয়াজিদ ইবনে জাবির থেকে, আতিয়াহ ইবনে কায়েস আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন: আমি আব্দুর রহমান ইবনে গানাম আল-আশ’আরীকে বলতে শুনেছি: আবু আমির আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন অথবা আবু মালিক, আমি আল্লাহর কসম করে বলছি যে তিনি আমাকে বিশ্বাস করেননি যে তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছেন: আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক থাকবে যারা খাজ্জ এবং রেশম (ব্যবহার) হালাল করবে। তাদের মধ্যে কিছু লোক কিয়ামত পর্যন্ত বানর এবং শূকরে রূপান্তরিত হবে। এবং এর একটি শক্তিশালী সনদ রয়েছে যার কোনও সন্দেহ নেই তবে বাদ্যযন্ত্র এবং মহিলা গায়িকাদের কোনও উল্লেখ নেই, তাই এটি স্পষ্ট যে এই বর্ণনাগুলির মধ্যে কোনটি পছন্দনীয়?
শরীয়ত মানুষের সহজাত প্রকৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং এমন কোন প্রমাণ নেই যে এটি মানুষের প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক, এবং যেমনটি আমরা সবাই জানি, গান গাওয়া, এটা এমন প্রকৃতির ব্যাপার যা আমি বুঝতে পারি না যে, যে ব্যক্তি চার বছর বা তার বেশি সময় ধরে বেঁচে থাকে এবং গান শোনে না, তার জন্য আমাদের শিশুরা খুব ছোটবেলা থেকেই গান গাইতে এবং নাচতে পছন্দ করে, তাহলে কি ইসলাম আমাদের প্রকৃতির অংশ যা তা নিষিদ্ধ করেছে?
পরিশেষে আমি বলছি, যদি এটি এমন একটি হাদিস হত, যার সাথে আমরা উপস্থাপিত অন্যান্য সহীহ হাদিসের কোন বিরোধিতা ছিল না, তাহলে আমরা দুর্বল হাদিসের উপর নির্ভর করতাম। কিন্তু এখানে সমস্যাটি ভিন্ন, অনেক হাদিস সহীহ এবং হাসান এবং এই হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক, তাহলে আমরা এটি কীভাবে নেব?
এই ৫টি কারণে আমি এই হাদিসটিকে গান গাওয়া এবং বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ করার প্রমাণ হিসেবে নিচ্ছি না।
প্রথম অংশের হাদিসগুলো আলোচনা শেষ করার পর এবং তাদের দুর্বলতা প্রমাণ করার পর, আসুন এখন দ্বিতীয় অংশের হাদিসগুলো দেখি, এবং এগুলোর সবগুলোই সহীহ, এগুলো থেকে আমরা গান গাওয়ার হুকুম বের করব।
প্রথম হাদিসটি বিবাহ অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার অনুমতি দেয়।
দ্বিতীয় হাদিসটি বাদ্যযন্ত্র ছাড়া অন্য কোথাও গান গাওয়ার অনুমতি দেয়।
তৃতীয় হাদিসটি গান গাওয়ার অনুমতি দেয় এবং এটি একটি বিবাহ অনুষ্ঠানে ঘটেছিল।
চতুর্থ হাদিসটি একটি প্রহার যন্ত্রের সাথে গান গাওয়ার অনুমতি দেয় এবং এটি দফ হতে পারে এবং এটি ঈদুল আযহার দিনে ঘটেছিল।
পঞ্চম হাদিসটি পুরুষদের উপস্থিতিতে একজন মহিলার দ্বারা দফ দিয়ে গান গাওয়ার অনুমতি দেয়। এটা বলা যায় না যে এটি গান গাওয়ার অনুমতি নয়; বরং এটি একজনের মানত (নাযর) পালনের অনুমতি দেয়, কারণ যদি কোন মানত না থাকে, তাহলে কোন গান গাওয়া হবে না। এই দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক নয় কারণ যদি মানত (নাযর) একটি পাপ কাজের জন্য হত, তাহলে এর পালন মোটেও অনুমোদিত হত না। যদি গান গাওয়া পাপ হতো, তাহলে নবী (সা) অনুমতি দিতেন না, কারণ আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি (সা) বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের মানত করে, তাকে অবশ্যই তাঁর আনুগত্য করতে হবে, আর যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতার মানত করে, তার যেন তাঁর অবাধ্যতা না হয়।” বুখারী, আবু দাউদ এবং নাসায়ী এই কথাটি বর্ণনা করেছেন। এছাড়াও যেহেতু নবী (সা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি (সা) বলেছেন: “কোন পাপের জন্য মানত (নাযর) পূরণ হয় না।” মুসলিমে এটি বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং যেহেতু গান গাওয়া জায়েজ, তাই নবী (সা) মহিলাকে তার মানত পালন করতে অনুমতি দিয়েছিলেন কারণ নবী (সা) যুদ্ধ থেকে নিরাপদে ফিরে এসেছিলেন।
ষষ্ঠ হাদিসটি ইঙ্গিত দেয় যে, দফের সাথে গান গাওয়া বিবাহে মুস্তাহাব, এবং কেবল জায়েজ (মুবাহ) নয়, তাই বিবাহে গান গাওয়া মানদুব (উৎসাহিত) এবং কেবল জায়েজ নয়।
সপ্তম হাদিসে নবী (সা) কর্তৃক গৃহীত গান গাওয়ার অনুমতির জন্য দলিল দেওয়া হয়েছে, শর্ত ছিল যে হারাম কথা বলা যাবে না, কারণ গান গাওয়াটা বিবাহের সময় ঘটেছিল।
অষ্টম হাদিসে নবী (সা) এর সামনে নারীদের গান গাওয়ার অনুমতির অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং এটি ঈদের দিন ঘটেছিল।
নবম হাদিসে উত্তম শব্দের সাথে গান গাওয়াকে মুস্তাহাব করা হয়েছে, এই প্রমাণের মাধ্যমে যে, নবী (সা) “আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে ভালোবাসি” বলার সময় গায়ক এবং (দুফ) বাজিকরদের অনুমতি দিয়েছিলেন এবং এটি গায়কদের উৎসাহিত করার জন্য এবং তিনি গান গাওয়ার এই সময়টি কেবল বিবাহ বা অন্যান্য অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রাখেননি।
দশম হাদিসে বাঁশি বাজিয়ে গান গাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, এই প্রমাণের মাধ্যমে যে, নবী (সা) রাখালকে বাঁশি বাজিয়ে গান গাওয়া থেকে বিরত রাখেননি, যদিও তিনি তার কান নিজের ইচ্ছায় বন্ধ করে রেখেছিলেন, বাধ্যবাধকতা হিসেবে নয়, যেমনটি তাকে পঙ্গপালের মাংস দেওয়া হয়েছিল কিন্তু তিনি তা খায়নি এবং অন্যদেরও খেতে দেননি। রাসূলুল্লাহ (সা) এর এই কাজ থেকে মানুষ বুঝতে পারে যে গান গাওয়া মাকরূহ (অপছন্দনীয়), কিন্তু যদিও তাদের এতে (সন্দেহ) শুবহাহ আছে, তারা ভুল করেছে। বিবাহ অনুষ্ঠান বা ঈদের দিন গান গাওয়া বিশেষভাবে অনুমোদিত ছিল না, বরং অনুমতি সাধারণ।
একাদশ হাদিসে দলিল দেওয়া হয়েছে যে আল্লাহর কিতাব গান গাওয়া মুস্তাহাব (পছন্দনীয়), এবং যদি গান গাওয়া হারাম হত তবে আল্লাহর কিতাবের জন্য গান গাওয়া সুপারিশ করা হত না।
দ্বাদশ হাদিসে আল্লাহর কিতাবে গান গাওয়ার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এই আলোচনা থেকে আমরা এমন একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হই যার কোন শুবহাহ (সন্দেহ) নেই, গান গাওয়া মুবাহ (অনুমোদিত), এবং বিবাহের ক্ষেত্রে মানদুব (উৎসাহিত) এবং এটি সম্ভবত কুরআনে ফরজ। এই সহীহ এবং হাসান হাদিসগুলি উপস্থাপন করার পর, কি এটা বলা সঠিক যে গান গাওয়া বা গান শোনা নিষিদ্ধ?
সঠিক শর’ঈ বিধান হলো, বিয়ে, ঈদ এবং সকল অনুষ্ঠানে গান গাওয়া জায়েজ এবং হারাম নয়, তা সে গাওয়া হোক বা শোনা হোক, এবং বাদ্যযন্ত্রের সাথে থাকুক বা না থাকুক।
মিশ্র সমাবেশে গান গাওয়া, অথবা মেয়েরা তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করে নাচ করে, তাহলে এটা হারাম এবং অনুমোদিত নয়; গান গাওয়ার নিষেধাজ্ঞার কারণে নয়, বরং গান গাওয়ার সাথে যা মিলিত হয় অর্থাৎ অবাধে মেলামেশা, নৃত্য এবং তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন (তাবাররুজ) এর কারণে। এবং আমি এটা বলছি এমন গান গাওয়ার ক্ষেত্রে যা পাপ বা খারাপ কথাবার্তা এবং কুফর ধারণার দিকে পরিচালিত করে, যেমন আব্দুল হালিম হাফিজ যে গানগুলি গেয়েছেন (قَدَرٌ أحمقُ الخُطا)। এই ধরনের গান গাওয়ার নিষেধে কোন সন্দেহ নেই, তবে এর বাইরে অন্যান্য গান গাওয়ার ক্ষেত্রে, এগুলি সাধারণত জায়েজ, এবং বিবাহের ক্ষেত্রে সুপারিশকৃত এবং কুরআনের জন্য বাধ্যতামূলক হতে পারে, তবে এটি বলা সম্পূর্ণ ভুল যে এটি হারাম।
নবী-রাসূলগণের ইসমত

নবী ও রাসূলগণের ‘ইসমাহ’ (তথা নিষ্পাপ হওয়া) বুদ্ধিবৃত্তি দ্বারা নির্ধারিত একটি বিষয়। কারণ তিনি একজন নবী বা রাসূল হওয়ায় তিনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার পক্ষ থেকে বার্তা পৌছানোর ক্ষেত্রে নিষ্পাপ। যদি (তাদের) একটি বিষয়ে ‘ইসমাহ’ না থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়, তাহলে এই ত্রুটি প্রতিটি বিষয়েই পৌঁছে যাবে (অর্থাৎ সন্দেহযুক্ত হবে); এবং এতে সমগ্র নবুয়্যত ও বার্তার (সত্যতার বিষয়টি) ভেঙে পড়বে। একজন ব্যক্তি আল্লাহর নবী অথবা আল্লাহর রাসূল হওয়ার প্রমাণের অর্থ হল তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যা প্রচার করেন তাতে তিনি নিষ্পাপ। সুতরাং তার পৌছানোর ক্ষেত্রে নিষ্পাপতা (বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে) অনিবার্য, এবং এই নিষ্পাপতার প্রত্যাখ্যান হলো তিনি যে বার্তা নিয়ে এসেছেন এবং যে নবুয়্যত দিয়ে তাকে পাঠানো হয়েছে তা প্রত্যাখ্যান করা। আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের সাথে সাংঘর্ষিক কাজ করার ক্ষেত্রে তার নিষ্পাপতার ক্ষেত্রে, এটি নিশ্চিত বিষয় যে তিনি স্পষ্টভাবে কাবায়ের (কবীরা গুনাহ) করেন না, অর্থাৎ তিনি অকাট্যভাবে কোনও কাবায়ের করেন না। কারণ একটি কাবায়ের তথা বড় পাপ করার অর্থ হল অবাধ্যতা করা। আল্লাহর অবাধ্যতাকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করা যায় না তথা অবাধ্যতা বিভক্ত হয় না। সুতরাং যদি অবাধ্যতা কর্ম পর্যন্ত পৌঁছায়, তাহলে তা প্রচার (তাবলীগ) পর্যন্ত পৌঁছাবে, এবং এটি (ওহীর) বার্তা এবং নবুয়্যতের পরিপন্থী। এই কারণেই নবী ও রাসূলগণ কাবায়ের থেকে মুক্ত, ঠিক যেমন তারা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা)’র থেকে আনীত বার্তা প্রচারে নিষ্পাপ। সাগাইর (সগীরা গুনাহ) সম্পর্কে নিষ্পাপতার বিষয়ে, আলেমদের ভিন্ন ভিন্ন মতামত রয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেছেন যে তারা তা থেকে মুক্ত নন, কারণ তা অবাধ্যতা নয়; আবার কেউ কেউ বলেছেন যে তারা নিষ্পাপ কারণ তা অবাধ্যতা। এর প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি হল যা-ই হারাম বলে বিবেচিত হোক এবং যা-ই ফরজ হোক, অর্থাৎ সমস্ত কর্তব্য (ফুরুদ) এবং নিষেধ (মুহাররামাত), সেগুলো মেনে চলার ক্ষেত্রে তারা নিষ্পাপ। সুতরাং তারা বাধ্যবাধকতার অবহেলা করা কিংবা নিষেধাজ্ঞাগুলো পালনের ব্যপারে নিষ্পাপ, সেগুলো কাবায়ের হোক কিংবা সাগাইর হোক। অন্য কথায়, তারা অবাধ্যতা (মা’সিয়াহ) নামক যেকোনো কিছু থেকে নিষ্পাপ। তাছাড়া, খিলাফ-উল-আওলা (যা সবচেয়ে উপযুক্ত তার বিপরীত), তারা তা থেকে মুক্ত নন। তাই, তারা একেবারেই যা সবচেয়ে উপযুক্ত তার ভিন্ন কিছু করতে পারেন (অর্থাৎ অতি উত্তম না করে উত্তম কিছু করতে পারেন), কারণ এর সকল বিবেচনায়, এটি “মা’সিয়াহ” (অবাধ্যতা) শব্দের অর্থের আওতায় আসে না। এটিই বুদ্ধিবৃত্তির বিবেচনায় অনিবার্য তথা তারা নবী ও রাসূল হওয়ার কারণে তা আবশ্যক।
আমাদের পয়গম্বর মুহাম্মদ (সা) একজন নবী ও রাসূল। সুতরাং, অন্যান্য রাসূল ও নবীদের মতো, তিনিও আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) থেকে যা প্রচার করেন তাতে ভুল করা হতে মুক্ত। এটি একটি সুনির্দিষ্ট নিষ্পাপতা যা বুদ্ধিবৃত্তি ও শর’ঈ দলীল দ্বারা প্রমাণিত। রাসূল (সা) আহকাম ওহী (প্রত্যাদেশ) ব্যতিত অন্য কিছু দ্বারা প্রচার করেননি। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) সূরা আল-আম্বিয়াতে বলেছেন:
“বলুন: আমি কেবল ওহী (প্রত্যাদেশ) দ্বারা তোমাদের সতর্ক করছি।” [TMQ আল-আম্বিয়া: ৪৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) সূরা আন-নাজমে বলেন:
“তিনি (নিজের) ইচ্ছা থেকে কথা বলেন না। কেবল ওহীই, যা প্রেরণ করা হয়।” [TMQ আন-নাজম: ৩-৪]
‘কথা বলা’ (ইয়ান্তিক) শব্দটি সাধারণ (উমুম) শব্দের অন্তর্গত, তাই এতে কুরআন এবং অন্যান্য শব্দও অন্তর্ভুক্ত। কুরআন বা সুন্নাহতে এমন কিছু নেই যা এটিকে নির্দিষ্ট করে, তাই এটি সাধারণই থেকে যায়, অর্থাৎ তিনি আইন প্রণয়নের কথা যা বলেন তা একটি নাযিলকৃত ওহী। তিনি কেবল কুরআনের সাথে যা বলেন তা নির্দিষ্ট করা অবৈধ; বরং এটিকে সাধারণই থাকতে হবে, যার মধ্যে কুরআন এবং হাদিসও অন্তর্ভুক্ত। আইন প্রণয়ন এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে, আহকাম, আকীদা, চিন্তাভাবনা এবং কাহিনী (বর্ণনার) ক্ষেত্রে, পরিকল্পনা তৈরি থেকে শুরু করে যুদ্ধ, খেজুর গাছের কলম করা বা অনুরূপ জিনিসকে ধরণ ও উপায়কে (আহকামে) অন্তর্ভুক্ত না করে, এটি নির্দিষ্ট করতে হবে, কারণ তিনি একজন রাসূল। আলোচনা একজন রাসূল এবং তাকে কী সহ পাঠানো হয়েছিল তা অধ্যয়ন সম্পর্কে, অন্য কোনও ব্যপারে নয়। সুতরাং (রাসূলের) বক্তব্যই (এসব) বিষয়বস্তুকে নির্দিষ্ট করে। সুতরাং যে বিষয়টি নিয়ে তিনি এসেছেন তাতে সাধারণতার রূপ সাধারণই থাকে এবং তারপরে এটিকে নির্দিষ্টকরণের একটি রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর কারণ তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) এই বাণী:
“বলুন, আমি কেবল ওহীর মাধ্যমে তোমাদের সতর্ক করছি।” [TMQ আল-আম্বিয়া: ৪৫]
এটি সূরা সাদে তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) এই বাণীর কারণেও:
“আমার কাছে কেবল এই ওহী পাঠানো হয়েছে যে আমি স্পষ্ট সতর্ককারী।” [TMQ সাদ: ৭০]
এটি দেখায় যে লক্ষ্য হল তিনি যা নিয়ে এসেছিলেন তা হল আকীদা, আহকাম এবং যা কিছু তাকে জানানো এবং সতর্ক করার জন্য আদেশ করা হয়েছিল। অতএব, এর মধ্যে শৈলী বা তার স্বাভাবিক কর্মের ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত নয় যা মানুষের সহজাত প্রকৃতির (ফিতরাহ) অর্থাৎ তার প্রাকৃতিক সৃষ্টি থেকে, যেমন হাঁটাচলা, কথা বলা, খাওয়া ইত্যাদি। এটি মানুষের কর্ম এবং তাদের চিন্তাভাবনায়, তা নির্দিষ্ট, শৈলী, উপায় এবং অনুরূপ জিনিসে নয়। সুতরাং, মানুষের কর্ম এবং চিন্তাভাবনার সাথে সম্পর্কিত যা কিছু রাসূল (সা) কে জানানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তা আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী। ওহীতে রাসূল (সা) এর কথা এবং কর্মের পাশাপাশি তাঁর সম্মতিও (সুকুত) অন্তর্ভুক্ত, কারণ আমাদের তাঁর অনুসরণ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ (সা) বলেছেন:
“রাসূল তোমাদের জন্য কাছে যা কিছু এনেছেন তা গ্রহণ করো; এবং তিনি তোমাদের যা কিছু থেকে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকো।” [TMQ আল-হাশর: ৭]
আর তিনি (সা) বললেন:
“নিশ্চয়ই, আল্লাহর রাসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ রয়েছে।” [TMQ আল-আহযাব: ২১]
অতএব, রাসূল (সা)-এর কথা, কাজ এবং চুক্তি হলো শর’ঈ প্রমাণ এবং এগুলো সবই আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) থেকে ওহী। রাসূল (সা) ওহী গ্রহণ করতেন, ওহী আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) কাছ থেকে তাঁর কাছে পৌঁছে দিতেন এবং ওহী অনুসারে বিষয়গুলো সমাধান করতেন, ওহী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত না হয়ে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) সূরা আহকাফে বলেছেন: “আমি কেবল আমার প্রতি যা ওহী করা হয় তারই অনুসরণ করি।” [TMQ আল-আহকাফ: ৯] এবং তিনি (সা) সূরা আ’রাফে বলেছেন: “আমি কেবল আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা ওহী করা হয় তারই অনুসরণ করি।” [TMQ আল-আ’রাফ: ২০৩] এর অর্থ, আমি কেবল আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা ওহী করা হয় তারই অনুসরণ করি। তাই তিনি তাঁর আনুগত্য (ইত্তিবা’) কেবল তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা ওহী করা হয় তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। এই সবকিছুই স্পষ্ট, স্পষ্ট এবং সাধারণ (আ’আম) হওয়ার জন্য স্পষ্ট; এবং রাসূল (সা)-এর সাথে যা সম্পর্কিত তা কেবল ওহী (প্রত্যাদেশ)। রাসূল (সা)-এর আইনগত জীবন মানুষের কাছে আহকাম ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অনুসরণ করত। সুতরাং, তিনি (সা) অনেক আহকামে, যেমন যিহার (ইসলামপূর্ব বিবাহবিচ্ছেদের ধরণ) এবং লি’আন (স্ত্রীর দ্বারা ব্যভিচারের শপথ করা অভিযোগ) এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ওহীর অপেক্ষা করতেন। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলার) পক্ষ থেকে কোন ওহীর উপর ভিত্তি ব্যতীত, তিনি কখনও কোন বিষয়ে হুকুমের কথা বলেননি, অথবা কোন আইন প্রণয়ন করেননি বা কোন আইনগত চুক্তি করেননি। সাহাবাগণ কখনও কখনও কোনও মানবিক কর্মের হুকুম এবং কোনও বিষয়, উপায় বা শৈলী সম্পর্কে মতামতের মধ্যে বিভ্রান্ত হয়ে পড়তেন, তাই তারা রাসূল (সা)-কে জিজ্ঞাসা করতেন: “এটা কি ওহী, হে আল্লাহর রাসূল, নাকি এটি মতামত এবং উপদেশ”: তিনি যদি তাদের বলেন, এটি ওহী, তবে তারা চুপ থাকত, কারণ তারা জানত যে এটি তাঁর কাছ থেকে নয়। যদি তিনি তাদের বলেন; বরং এটি ছিল মতামত এবং উপদেশ, তারপর তারা তার সাথে আলোচনা করত, এবং তিনি তাদের মতামত অনুসরণ করতে পারতেন; যেমন বদর, খন্দক এবং উহুদের (যুদ্ধ) যুদ্ধে যা ঘটেছিল। তিনি তাঁর রবের কাছ থেকে যা পৌঁছেছেন তা ছাড়া অন্য বিষয়ে তাদের বলতেন: “তোমাদের দুনিয়ার বিষয় সম্পর্কে তোমরাই ভালো জানো,” যেমন খেজুর গাছ কলম করার হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। যদি তিনি ওহী ছাড়া আইন সম্পর্কে কথা বলতেন, তাহলে তিনি ওহীর অপেক্ষা করতেন না হুকুম বলার জন্য, এবং সাহাবারা তাকে জিজ্ঞাসা করতেন না যে এটি ওহী নাকি মতামত; তিনি বরং নিজের কাছ থেকে উত্তর দিতেন, এবং তারা তাকে জিজ্ঞাসা না করেই তার সাথে আলোচনা করতেন। অতএব, রাসূল(সা) আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ওহীর ভিত্তিতেই বক্তব্য দিতেন, কাজ করতেন বা কাজের স্বীকৃতি দিতেন এবং তাঁর(নিজের) মতামতের উপর ভিত্তি করেও নয়। তিনি(সা) আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) কাছ থেকে যা কিছু প্রচার করেন তাতে ভুল থেকেও মুক্ত।
প্রশ্ন-উত্তর: সময়ের পূর্বেই যাকাত প্রদান

প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম আমাদের শাইখ, আল্লাহ আপনাকে ইসলামের সাথে প্রতিপালন করুন এবং ইসলামকে আপনার সাথে লালন করুন। আমি আল্লাহর কাছে দুআ করি যে আমি যেন তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হই যারা আপনাকে নবুূয়্যতের আদলের খিলাফতের জন্য বাইয়াত দান করবেন, কারণ তিনিই সবকিছুর একচ্ছত্র ক্ষমতাবান।
যাকাত, ব্যবসায়িক লেনদেন বা অর্থের যাকাত সম্পর্কে আমার একটি প্রশ্ন আছে; পূর্ণ এক (চন্দ্র) বছর (আল-হাওল) অতিবাহিত হওয়ার আগে কি এদের যাকাত বা এদের কিছু অংশের যাকাত দেওয়া জায়েজ হবে এবং (আল-হাওল) কি যাকাত প্রদানের জন্য শর্ত?
আল্লাহ আপনাকে দুনিয়া ও আখেরাতে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য কল্যাণকর কিছু করার জন্য সাহায্য করুন, ওয়া আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
ইমাদ এম. সা’আদ থেকে
উত্তর:
ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ,
যাকাত প্রদানের জন্য আল-হাওল পূর্ণ করা একটি শর্ত, যা “নিসাব”। যদি শর্ত পূরণ হয়, অর্থাৎ “নিসাব” এর মাধ্যমে আল-হাওল পরিপূর্ণ হয়েছে এবং তা হ্রাস করা হয়নি, তাহলে যাকাত বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। তবে, যদি এটি নির্ধারিত সময়ের আগে প্রদান করা হয় তবে শরীয়ত প্রমাণ অনুসারে এই প্রদান জায়েজ, যার (দলীলের) মধ্যে নিম্নলিখিত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:
– আল-বায়হাকী আল-সুনান আল-কুবরা থেকে আলী থেকে উদ্ধৃত করেছেন:
«أَنَّ الْعَبَّاسَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ سَأَلَ رَسُولَ اللهِ فِي تَعْجِيلِ صَدَقَتِهِ قَبْلَ أَنْ تَحِلَّ فَأَذِنَ لَهُ فِي ذَلِكَ».
“আল আব্বাস (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা)-কে জিজ্ঞাসা করলেন যে, তিনি কি তার সাদাকাহ্ হাওল সম্পন্ন হওয়ার আগেই তাড়াহুড়ো করে আদায় করতে পারবেন, আর আল্লাহর রাসূল (সা) তাকে অনুমতি দিলেন”।
– আল-দারকিতনী তার সুনানে হুজর আল-আদাবী থেকে আলী (রা.) থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, তিনি বলেছেন: আল্লাহর রাসূল (সা) উমরকে বলেছিলেন:
«إِنَّا قَدْ أَخَذْنَا مِنَ الْعَبَّاسِ زَكَاةَ الْعَامِ عَامِ الْأَوَّلِ»
“আমরা প্রথম বছরেই আল-আব্বাসের কাছ থেকে বছরের যাকাত গ্রহণ করেছি”।
– আল-দারকিতনী মুসা বিন তালহা থেকে তালহা থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«يَا عُمَرُ أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ عَمَّ الرَّجُلِ صِنْوُ أَبِيهِ؟ إِنَّا كُنَّا احْتَجْنَا إِلَى مَالٍ فَتَعَجَّلْنَا مِنَ الْعَبَّاسِ صَدَقَةَ مَالِهِ لِسَنَتَيْنِ».
“হে উমর, তুমি কি জানতে না যে, লোকটির চাচা তার পিতার যমজ? আমাদের টাকার প্রয়োজন ছিল তাই আমরা দুই বছর আগে আব্বাসের টাকা থেকে সাদাকাহ করেছিলাম”।
আল-হাকামের সনদে মতবিরোধ ছিল এবং সঠিকটি আল-হাসান ইবনে মুসলিমের কাছ থেকে এসেছে যা মুরসাল।
অতএব, যাকাত আদায়ের আগে তাড়াহুড়ো করা জায়েজ।
আপনার তথ্যের জন্য, বেশিরভাগ আলেমও এটিই বলেন।
আপনার ভাই,
আতা বিন খলিল আবু আল-রাশতাহ১১ই শাওয়াল ১৪৩৫ হিজরি
০৭/০৮/২০১৪ ইংঅডিও ভার্শন:
প্রশ্ন-উত্তর: যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর সাথে লেনদেন

প্রশ্ন-উত্তর
প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর সাথে লেনদেন
প্রাপক: আবু মুহাম্মদ সালিম
(অনুবাদিত)প্রশ্ন:
আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
আবু মুহাম্মদ সালিম
আমি মহান আল্লাহর কাছে দুআ করছি যে আপনি সুস্থ থাকুন, এবং আল্লাহ আপনাকে একটি মহান বিজয় দান করুন। আমি আল্লাহর কাছে দুআ করছি যে তিনি আপনার হাত দিয়ে কল্যাণের সকল দরজা খুলে দিন।
আমি এই প্রশ্নটি আমাদের শেখ এবং প্রিয়, হিযবুত তাহরীরের আমির, আতা বিন খলিল আবু আল-রাশতাহকে উদ্দেশ্য করে করছি:
এক ভাই আমাকে বারকান বসতিতে কন্টেইনার তৈরির একটি কারখানায় কাজ করার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। সম্প্রতি, এই কারখানার একটি অংশ ‘ইসরায়েলি’ সেনাবাহিনীর সুবিধার জন্য রূপান্তরিত করা হয়েছে এবং এটি বৈদ্যুতিক জেনারেটর এবং অন্যান্য সামরিক-সম্পর্কিত জিনিসপত্র পরিবহনের জন্য ট্রেলার তৈরি করে। সেনাবাহিনীর জন্য ট্রেলার তৈরি করে এমন এই বিভাগে কাজ করা কি জায়েজ?
আল্লাহ আপনাকে বরকতময় করুন এবং আপনাকে সর্বোত্তম প্রতিদান দিন।
আল্লাহ আপনাকে আশ্রয় দিন, আপনাকে বিজয় দান করুন, আপনাকে রক্ষা করুন, আপনাকে ক্ষমতায়িত করুন এবং আপনার হাতে বিজয় এবং ক্ষমতায়ন আনুন।
যদি সম্ভব হয়, তাহলে একটি দ্রুত উত্তর পেলে খুশি হবো – আল্লাহ আপনাকে পুরস্কৃত করুন।
উত্তর:
ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ,
উল্লেখিত কারখানার (যার একটি অংশ সম্প্রতি ‘ইসরায়েলি’ সেনাবাহিনীর সুবিধার জন্য রূপান্তরিত হয়েছে এবং বৈদ্যুতিক জেনারেটর এবং অন্যান্য সামরিক-সম্পর্কিত জিনিসপত্র পরিবহনের জন্য ট্রেলার তৈরি করে) ক্ষেত্রে, এটি ইহুদি সত্তার অন্তর্গত, যা আসলে যুদ্ধরত একটি রাষ্ট্র। উত্তর দুটি ক্ষেত্রে নির্ভর করে:
১. দখলদারিত্বের অধীনে বসবাসকারী মুসলমানরা।
২. দখলদারিত্বের বাইরের মুসলমানরা।প্রথম ক্ষেত্রে:
ইহুদি দখলদারিত্বের অধীনে থাকা মুসলিমরা মদিনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর মক্কায় থাকা মুসলিমদের মতো। ইহুদি দখলদারিত্বের অধীনে থাকা ফিলিস্তিনের জনগণের জন্য ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদিতে জড়িত থাকা বৈধ, শত্রুকে শক্তিশালী করে এমন কাজ ছাড়া। একইভাবে, একজন মুসলিম, উদাহরণস্বরূপ, যার আমেরিকান নাগরিকত্ব রয়েছে, তার জন্য হুকম হচ্ছে মক্কার মুসলমানদের মতো যারা হিজরত করেনি, তাই তাদের জন্য দার আল-হারব (যুদ্ধরত দেশে) লেনদেন করা বৈধ, যেখানে তারা বাস করে। তবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদের শক্তিশালী করে এমন বিষয় যার (তাহকিক আল-মানাত) করে আইনগত প্রয়োগ নিরূপন করা যায়, তা ছাড়া।
দ্বিতীয় ক্ষেত্রে:
আমরা পূর্বে একাধিক জবাবে একই ধরণের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি, যার মধ্যে রয়েছে:
৩১/০৩/২০০৯ তারিখের একটি প্রশ্নের উত্তর:
১. যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর সাথে সরাসরি কাজ করা জায়েজ নয়, এবং সেই রাষ্ট্রগুলোর কোম্পানিগুলোর সাথে কাজ করাও জায়েজ নয়, কারণ প্রকৃত যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক একটি যুদ্ধ সম্পর্ক, শান্তিপূর্ণ ব্যবসায়িক সম্পর্ক নয়।
২. যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর সাথে কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবতা নিম্নরূপে নিরূপন করা হয়:
ক. যদি প্রতিষ্ঠানটি যে প্রকল্পে কাজ করছে তা আসলে যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলির জন্য হয়, তাহলে সেই প্রকল্পে প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করা জায়েজ নয়।
খ. যদি প্রকল্পটি যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর জন্য না হয়, বরং স্থানীয় জনগণের জন্য হয়, যেমন স্কুল নির্মাণ বা রাস্তা নির্মাণ, তাহলে পাপ সেই প্রতিষ্ঠানের উপর বর্তাবে যারা যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলির সাথে কাজ করে, তবে কাজটি জায়েজ যতক্ষণ না প্রকল্পটি যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলির জন্য না হয়।
২৪/০৭/২০১১ তারিখের একটি প্রশ্নের উত্তর:
“… মুসলিম ভূখণ্ডের দখলদার রাষ্ট্রগুলোর (যারা আসলে যুদ্ধে লিপ্ত) কোম্পানি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সরাসরি চুক্তি করা অনুমোদিত নয়, কারণ এটি আসলে যুদ্ধে লিপ্ত রাষ্ট্রগুলির সাথে লেনদেনের একটি রূপ। স্থানীয় সরকার বা স্থানীয় সংস্থার সাথে চুক্তি করার ক্ষেত্রে যা দখলদার রাষ্ট্রের সাথে (সরাসরি) সম্পর্কিত নয় কিন্তু এর সাথে সম্পর্কযুক্ত, সেক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়:
১. যদি সম্পর্কটি দখলদার রাষ্ট্রের সাথে সামরিক প্রকল্পের সাথে জড়িত থাকে, তবে এটি অনুমোদিত নয়।
২. যদি সম্পর্কের মধ্যে এমন বাণিজ্যিক প্রকল্প জড়িত থাকে যা দেশের ক্ষতি করে না, তবে এটি অনুমোদিত, তবে ক্ষতি করার সন্দেহের কারণে এটি এড়ানো ভাল।
৩. যদি কর্মী স্থানীয় রাষ্ট্র দ্বারা নিযুক্ত হন, তবে তার চুক্তি সরাসরি দখলদার রাষ্ট্রের সাথে হয়, তবে এটি অনুমোদিত নয়।
৪. যদি কর্মী স্থানীয় রাষ্ট্র দ্বারা নিযুক্ত হন এবং তার চুক্তি স্থানীয় রাষ্ট্রের সাথে হয়, তবে এটি অনুমোদিত, এমনকি যদি স্থানীয় রাষ্ট্র দখলদার রাষ্ট্র থেকে আর্থিক সহায়তা পায়।
৫. যদি কর্মী স্থানীয় রাষ্ট্র দ্বারা নিযুক্ত হন, তবে তার চুক্তিটি স্থানীয় রাষ্ট্রের সাথে , কিন্তু সে সরাসরি দখলদার রাষ্ট্র থেকে তার বেতন পায়, তাহলে তা জায়েজ নয়।
এর প্রমাণ হল যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর সাথে লেনদেনের বিধান।”
আমি আশা করি এটি যথেষ্ট, এবং আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন এবং সর্বাধিক প্রজ্ঞাময়।
আপনার ভাই,
আতা বিন খলিল আবু আল-রাশতাহ১২ মহররম ১৪৪৭ হিজরি
০৭/০৭/২০২৫ ইংএকজন মতাদর্শিক মুসলিম হওয়ার অপরিহার্যতা

অক্সফোর্ড ডিকশনারি Ideology (আদর্শ) শব্দটির সংজ্ঞা দিয়েছে এভাবে:
“a system of ideas and ideals, especially one which forms the basis of economic or political theory and policy or a set of beliefs characteristic of a social group or individual.”
অর্থাৎ, একটি ধারণা ও বিশ্বাসের সমষ্টি, যা বিশেষভাবে কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও নীতির ভিত্তি গঠন করে, কিংবা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্যমূলক বিশ্বাসব্যবস্থা।
“Ideology” শব্দটির উৎপত্তি ফরাসি বিপ্লবের সময়। ১৭৮৯ সালে ফরাসি দার্শনিক Antoine Destutt de Tracy প্রথম এটি ব্যবহার করেন idéologie শব্দ থেকে, যার মূল অর্থ ছিল “science of ideas” বা ধারণার বিজ্ঞান। পরবর্তীতে এটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামাজিক চিন্তাধারার প্রসারে ব্যবহার হতে থাকে, যার উদ্দেশ্য ছিল মানবসমাজের ভাষা, বর্ণ, ভৌগোলিক পার্থক্য নির্বিশেষে এসব ধারণাকে বাস্তবে কার্যকর করা।
শেখ তাকিউদ্দিন আন-নাবাহানী রহিমাহুল্লাহ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ نظام الإسلام (System of Islam)-এ Ideology (مبدأ) এর সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে:
«المبدأ هو عقيدة عقلية ينبثق عنها نظام»
অর্থাৎ, “আদর্শ (মাবদা’) হলো একটি বুদ্ধিভিত্তিক আক্বীদাহ, যার থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা উৎসারিত হয়। আক্বীদাহ হলো মানুষ, জীবন ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা—যা এই জীবনের পূর্ববর্তী বাস্তবতা, মৃত্যুর পরবর্তী বাস্তবতা এবং এ জীবনের সাথে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বাস্তবতার সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করে।”
কেউ যদি ইসলাম ও আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ এর জীবনকে বুঝতে চান, তবে সহজেই এই পরিভাষাটি ইসলাম ও নবীর সংগ্রামের সাথে সম্পৃক্ত করতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে, এ শব্দটি ইসলামের ক্ষেত্রে যথার্থভাবে প্রযোজ্য এবং স্পষ্টভাবে ব্যবহার করা যায় আমাদের নবী ﷺ -এর জীবন ও ইসলামের প্রকৃতি (The essence of Islam) বর্ণনা করতে। কেননা ইসলাম নিজেই একটি আদর্শ (Ideology)—যা পূর্ণাঙ্গ ও বিশদ ব্যবস্থাসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করে, যা আল-কুরআনে সংজ্ঞায়িত এবং আল্লাহর রাসূল ﷺ -এর জীবনে বাস্তবভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর জীবন ছিল এক আদর্শিক সংগ্রাম, যা পৃথিবীতে বাস্তবায়নের জন্য পরিচালিত হয়েছিল—মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরে: ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে এবং নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় ও জনজীবনের (public life) পর্যায়ে, যেখানে সমাজের কাঠামো, অর্থনৈতিক নীতি, এমনকি বিশ্বব্যাপী বৈদেশিক সম্পর্ক পর্যন্ত ইসলামের নির্দেশনা দ্বারা পরিচালিত হতো।
ঐতিহাসিকভাবে ইসলামকে আদর্শ (Ideology) ছাড়া অন্য কিছু হিসেবে বোঝার কোনো দ্ব্যর্থতা বা অস্পষ্টতা ছিল না। আমাদের পূর্বসূরিরা এর স্পষ্ট প্রমাণ আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন, তারা ইসলামকে শুধুমাত্র ইবাদত বা আধ্যাত্মিকতায় সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ হিসেবে বুঝেছিলেন। তাদের আদর্শিক উপলব্ধিই তাদেরকে দাওয়াহ ও জিহাদের মাধ্যমে ইসলামকে বিশ্বব্যাপী বিস্তার করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।যখন তারা ইসলামকে সর্বত্র প্রচার করেছেন এমন পর্যায়ে যে, খিলাফাহ রাষ্ট্র একটি ক্ষুদ্র চারাগাছের মতো মদিনা থেকে শুরু করে ৪৫০০ মাইল বিস্তৃত এক বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়েছিল। এর শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হয়েছিল পূর্ব দিকে চীনের সীমান্ত পর্যন্ত এবং পশ্চিমে ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত।
তাদের ইসলামের প্রতি এই আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গিই এমন এক প্রজন্মের জন্ম দিয়েছিল, যারা আদর্শ দ্বারা চালিত মুসলিম ছিল। তাদের প্রতিটি কর্ম তাদের আক্বীদাহ’র (عقيدة) সঙ্গে যুক্ত ছিল। আর এই ইসলামী আক্বীদাহ-ই (عقيدة إسلامية) তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছিল ইসলামকে পৃথিবীব্যাপী বাস্তবায়ন করতে।
অতএব, একজন মুসলিমের জন্য অপরিহার্য হলো ইসলামকে একই আদর্শিক কাঠামোর ভেতরে বুঝতে পারা। কারণ এই ধারণা থেকে সামান্যতম বিচ্যুতিও একজন মুসলিমের কর্মকে প্রভাবিত করে এবং তা অবিশ্বাসী ঔপনিবেশিকদের সেই ষড়যন্ত্রকে সফল করতে পারে, যা ইসলামের প্রকৃত বার্তাকে (message) ক্ষীণ ও দুর্বল করে ফেলে। তারা ইসলামের সংগ্রামকে—যা বিশ্বের সব ভ্রান্ত মতবাদ ও আদর্শের বিরুদ্ধে একটি চ্যালেঞ্জ—তা থেকে সরিয়ে এনে এক বহুত্ববাদী (pluralistic) ইসলাম উপস্থাপন করতে চায়। এমন এক ইসলাম, যেখানে রয়েছে পরস্পর বিরোধিতা, অসামঞ্জস্য, আপোস ও সংশয়বাদ—যা আজকাল আমরা সমাজে বহুলভাবে দেখতে পাই।
ইসলামের আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি হারানোর বিপদ ও এর বাস্তব পরিণতি এবং তা আজ উম্মাহ হিসেবে আমরা প্রত্যক্ষ করছি। আমরা এমন মুসলিমদের দেখতে পাচ্ছি যারা ইসলামের বার্তায় (narration) ঈমান রাখে, কিন্তু নিজেদের উপর শাসন করার জন্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়। আমরা এমন মুসলিমদেরও দেখি যারা কিছু হারাম থেকে দূরে থাকে—যেমন মদ্যপান থেকে বিরত থাকে, বিবাহ-পূর্ব যৌন সম্পর্ক এড়িয়ে চলে এবং শূকরের মাংস খায় না—কিন্তু ব্যবসায় সুদের সঙ্গে খেলা করে কিংবা সুদভিত্তিক ছাত্রঋণ গ্রহণ করে। আমরা এমন মুসলিমদেরও দেখি যারা নিয়মিত মসজিদে যায় এবং এমনকি ইসলামের দাওয়াত কার্যক্রমেও যুক্ত থাকে; কিন্তু ইসলামের প্রতি আদর্শিক (Ideological) উপলব্ধি অনুপস্থিত থাকার কারণে তারা পশ্চিমা নৈতিকতা ও নীতিশাস্ত্রের ধারণার উপর ভিত্তি করে ব্যক্তিগত সংস্কার (individual reform) ও দানশীলতার (philanthropy) আহ্বান জানায়। আবার কেউ কেউ জাগতিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আহ্বান জানায়—ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম পালন করে কিন্তু জনসমক্ষে ইসলামের বাস্তবায়নের ব্যাপারে অবহেলা করে।
আরেকটি বিষয় যা একজন মুসলিমের জানা ও বোঝা জরুরি, তা হলো—ইসলামের আদর্শ (Ideology of Islam) ইতিহাসে, বর্তমানে এবং সর্বদা অন্যান্য সকল আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধী থাকবে; তা সে আধুনিক ও প্রভাবশালী যেমন পুঁজিবাদ (Capitalism) হোক বা বিলুপ্তপ্রায় যেমন উপজাতীয়তাবাদ (Tribalism), সমাজতন্ত্র (Socialism), বিশৃঙ্খলাবাদ (Anarchism) কিংবা অন্য যে কোনো –বাদ যা বিশ্বে প্রবেশের চেষ্টা করে। এই আদর্শিক লড়াইয়ের মধ্যে একজন মুসলিম কোনোভাবেই ভীত, উৎকণ্ঠিত, লজ্জিত, ভেঙে পড়া বা কাপুরুষ হতে পারবে না—ইসলামের আদর্শ প্রচার ও বাস্তবায়নের কাজে—মিডিয়া, জনমত বা রাজনীতিবিদদের কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট চাপ যাই থাকুক না কেন।
গত দুই দশকে আমরা ইসলামী শরিয়াহর বিরুদ্ধে অসংখ্য আক্রমণ প্রত্যক্ষ করেছি, বিশেষত ৯/১১ ঘটনার পর এবং মার্কিন নেতৃত্বাধীন তথাকথিত “সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধ”-এর পর থেকে। এর পর লন্ডন বোমা হামলা, ভারতীয় বোমা হামলা, আত্মঘাতী বোমা হামলা, বোস্টন বোমা হামলা এবং লন্ডনে এক ব্রিটিশ সেনাকে ছুরিকাঘাত করার মতো ঘটনাগুলো ঘটেছে। এমনকি এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, ইসলামের প্রেক্ষাপটে বলা যেকোনো রাজনৈতিক শব্দ, পদ বা অভিব্যক্তি জুড়ে দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত রাজনৈতিকভাবে কলুষিত পরিভাষার সঙ্গে—যেমন “সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ, ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ, র্যাডিকালিজম” ইত্যাদি। এ সকল আদর্শিক আক্রমণ আসলে ইসলামের জন্য নতুন কিছু নয় কিংবা কেলেঙ্কারির বিষয় নয়; কেননা ইসলামি উম্মাহ এ ধরনের বিরোধিতা বহু শতাব্দী ধরে প্রত্যক্ষ করেছে—আদম (আঃ) সৃষ্টির পর থেকেই এবং কিয়ামত পর্যন্ত এ ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে থাকবে।
নিশ্চয়ই ইসলামের আদর্শ হুমকি—আজকের বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য নয়, অমুসলিমদের জন্যও নয়, যারা ইসলামী রাষ্ট্রে ধিম্মি (ذِمِّي) হিসেবে বৈধ নাগরিকত্বের মর্যাদা পাবে; নয় বিশ্বের নিরীহ নারী বা শিশুদের জন্য, ধর্ম-বিশ্বাস বা মূল্যবোধ যাই হোক না কেন। বরং এ আদর্শ হুমকি তাদের জন্য—যারা অক্লান্তভাবে ও নিরন্তর চেষ্টা করছে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা খিলাফাহ’র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঠেকাতে, ইসলামী আদর্শের পুনর্জাগরণকে বাধাগ্রস্ত করতে—নিজেদের কামনা-বাসনা পূরণ করার জন্য অথবা ইসলামের প্রতি তাদের ঘৃণাকে লালন করার জন্য।
ইসলাম এক চিরন্তন/ কালজয়ী আদর্শ হিসেবে আগমন করেছে, যা সমগ্র বিশ্বে বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য। ইসলামের একটি অনন্য রাজনৈতিক ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে শাসকদের জবাবদিহিতা সম্পূর্ণ স্বচ্ছ। ইসলামের একটি অনন্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও রয়েছে, যার প্রধান উদ্দেশ্য হলো দারিদ্র্যতা দূর করা এবং সম্পদ বণ্টনে যে কোনো প্রতিবন্ধকতা দূর করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কিভাবে ইসলামকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। এটাই সেই আদর্শ, যা তাদের জন্য হুমকি যারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা প্রদত্ত স্বাধীনতাকে অপব্যবহার করে উল্টো পথে চলে, অহংকারভরে পৃথিবীতে বিচরণ করে এবং মানুষকে নিপীড়ন করে। এটাই সেই আদর্শ যা পুঁজিবাদের জন্যও হুমকি, কেননা এটি সেই অস্বাভাবিক ও অবিচারমূলক ফলাফলগুলোকে উল্টে দেবে, যেখানে আজকের দিনে বিশ্বের ৮০% সম্পদ পৃথিবীর মাত্র ৫% জনগণের হাতে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এটাই সেই আদর্শ, যা আজকে প্রবলভাবে আক্রমণ ও ধর্মনিরপেক্ষীকরণের (secularized) মাধ্যমে সংকুচিত করা হচ্ছে—যাতে ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ থেকে শুধুমাত্র এক অন্ধ বিশ্বাসে (blind faith) পরিণত করা যায়।
একজন মুসলিম যখন ইসলাম গ্রহণ করে, তখন সে মূলত আদর্শিক (ideological) হয়ে যায়। কারণ তার প্রত্যেকটি কর্মের বিধান তাকে ইসলামি ‘আক্বীদাহ’ থেকে গ্রহণ করতে হয়। আর এই আক্বীদাহই নির্ধারণ করে দেয় সে কিভাবে জীবন যাপন করবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কে তার ধারণা কিরূপ হবে। ইসলামের সংজ্ঞা অনুযায়ী শাসনব্যবস্থা নির্ধারিত, যা সংবিধান ও আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সব সমস্যার সমাধান দেয়। ইসলামে বিশ্বাস করা মানেই এই বিশ্বাস করা যে ইসলামকে বিশ্ব শাসন করতে হবে, কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদেরকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন।
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
“তোমরা মানবজাতির জন্য উদ্ভূত সর্বোত্তম উম্মাহ। তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজ থেকে নিষেধ কর এবং আল্লাহতে ঈমান রাখ।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১১০)
একজন আদর্শিক মুসলিম তার সকল কর্মকাণ্ডে সতর্ক থাকবেন যেন তা ইসলামের শরীয়াহ’র সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং তিনি সর্বশক্তি ব্যয় করবেন ইসলামকে পূর্ণাঙ্গভাবে অনুসরণের জন্য। আদর্শিক মুসলিম বিশ্বে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব কামনা করবেন, কেননা তিনি বুঝতে পারবেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ -এর দাওয়াহ মিশন ও লক্ষ্য কী ছিল। আদর্শিক মুসলিম বিনয়ী হয়ে ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করবেন এবং সব কাজ করবেন একমাত্র তাঁর সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির জন্য, অন্য কোনো কামনা বা লালসার জন্য নয়। কেননা তিনি ভালো করেই জানেন তার কর্মকাণ্ডের পরিণতি কী এবং কিয়ামতের দিনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সামনে দাঁড়িয়ে তাকে কীভাবে হিসাব দিতে হবে।
যে মুসলিম নবী মুহাম্মদ ﷺ এর জীবনকে অনুকরণ করতে চায় এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে সন্তুষ্ট করতে চায়, তার উচিত নিজের ইসলামের বোধ (understanding) সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করা। আপনার ইসলামের ধারণা কি সত্যিকার অর্থে ইসলামকে একটি আদর্শবাদী মতাদর্শ হিসেবে প্রতিফলিত করে? যদি না করে, তবে আপনি কোন ইসলামকে বিশ্বাস করছেন? একজন মুসলিম কখনো কুরআনের সেই আয়াতগুলোকে উপেক্ষা বা অবহেলা করতে পারে না, যেখানে স্পষ্টভাবে শরিয়াহর বিধান, জিহাদ ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। শুধু এ কারণে যে এগুলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে বা চরমপন্থী হিসেবে আখ্যায়িত হয়, একজন আদর্শবাদী মুসলিমের উচিত নয় এগুলো থেকে দূরে সরে থাকা। বরং তার উচিত এসব বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করা, অধ্যয়ন করা এবং সঠিকভাবে বুঝে দাওয়াহ প্রদান করা, যাতে শরিয়াহ ও ইসলামের পররাষ্ট্রনীতিকে যথাযথভাবে রক্ষা করা যায়, যা আজ কঠোর সমালোচনার শিকার।
রাসূল ﷺ বলেছেন:
«مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَى أَمْرِي فَهُوَ رَدٌّ»
“যে কোনো কাজ আমার প্রদত্ত নির্দেশনা অনুযায়ী করা হয়নি, তা প্রত্যাখ্যাত।” (সহীহ বুখারি ৩৪২৫)
একজন আদর্শিক মুসলিম প্রতিটি সমস্যাকে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করবে। এটি সত্যিই একটি জীবনব্যাপী যাত্রা—একজন মুসলিমকে তার পূর্ববর্তী মনোভাব, পছন্দ-অপছন্দ, এবং ইসলামের বাইরে থাকা অন্যান্য আদর্শ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থেকে মুক্ত হতে হবে এবং তার কর্মকাণ্ডকে ইসলামের বিশুদ্ধ রূপের (pure form) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। বাস্তবতা হলো, ইসলামী রাষ্ট্রের অভাবে, যা উম্মাহকে ইসলামিক সংস্কৃতির মাধ্যমে গড়ে তোলে, প্রত্যেক মুসলিম ভুল ধারণার শিকার হতে পারে, যা ইসলামের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ। এই ভুল ধারণা যে কোনো রূপে হতে পারে—সেক্যুলার, আধুনিকতাবাদী, সংস্কারবাদী, সাংস্কৃতিক বা বিদেশী (Secular, Modernist, Reformist, Cultural বা Foreign) ইত্যাদি। এই কারণেই একজন মুসলিমের জন্য ইসলামকে একটি আদর্শ (Ideology) হিসেবে বোঝা দ্বিগুণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়, যাতে সে তার ইসলামী ব্যক্তিত্ব (Islamic Personality) সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারে এবং জীবনযাপন করতে পারে ইসলামের নির্দেশিত পথ অনুযায়ী।
ইসলামের পুনর্জাগরণের জন্য যত্নসহকারে ও নিরলসভাবে কাজ করার প্রেরণা মূলত ইসলামের আদর্শগত উপলব্ধি (ideological understanding) থেকে উদ্ভূত। একজন মুসলিম যখন কোনো সমস্যার অনুভব করে—তা সে পরিবারের মধ্যে ব্যক্তিগত সমস্যা হোক, কিংবা বাইরের জগতে দৈনন্দিন লেনদেনের সময় (যেমন বাজার করা, কাজ করা, ভ্রমণ ইত্যাদি) উপলব্ধি করা সমস্যা হোক, অথবা রাজনৈতিক আলোচনা সম্পর্কিত সমস্যা হোক—যেমন মুসলিম বিশ্বের ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি, স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা কিংবা আমাদের ভূমিতে পাশ্চাত্যের হস্তক্ষেপ—তখন সে সমস্যার প্রকৃতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে এবং উপলব্ধি করে যে, এই সমস্যাগুলির মূল কারণ হলো দুনিয়ায় ইসলামী বিধানসমূহের অনুপস্থিতি। কারণ মুসলমানদের মাঝে ইসলামের আদর্শগত উপলব্ধির ঘাটতির কারণে তারা তাদের কর্মে ইসলামকে অবহেলা করছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানদণ্ড হিসেবে ইসলামের পরিবর্তে পশ্চিমা ধারণাকে (Western ideas) ব্যবহার করছে। যেমন— মতপ্রকাশের স্বাধীনতা “freedom of speech” বা মালিকানার স্বাধীনতা “freedom of ownership” এর মানদণ্ড দিয়ে নির্ধারণ করছে কোনো কাজ করা যাবে কিনা, অথচ ইসলামের দিকে ফিরে যাচ্ছেনা। আমরা এর উদাহরণ দেখি, যখন কোনো মুসলিম কিশোর বলে বসে: “I can do what I want, it is my choice” (আমি যা খুশি তাই করতে পারি, এটা আমার পছন্দ)। অথবা যখন কোনো মুসলিম দম্পতি সুদভিত্তিক মর্টগেজে তাদের প্রথম বাড়ি কেনার সময় দাবি করে, “এটি আমাদের জন্য বৈধ।” কিংবা কোনো মুসলিম মনে করে যে, মুসলিমদের একটি নির্দিষ্ট এমপি (member of parliament) -কে ভোট দেওয়ার জন্য সংগঠিত করে সে ইসলামকে সাহায্য করছে। কিন্তু যে মুসলিম ইসলামকে তার সঠিক আদর্শিক রূপে (correct ideological narrative) বোঝে, সে এসব সমস্যার উৎসকে ইসলামের অনুপস্থিতি এবং জনজীবন (public life) থেকে ইসলামের বিচ্ছিন্নতার সাথে সম্পর্কিত করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন:
«مَثَلُ الْقَائِمِ عَلَى حُدُودِ اللَّهِ وَالْوَاقِعِ فِيهَا، كَمَثَلِ قَوْمٍ اسْتَهَمُوا عَلَى سَفِينَةٍ، فَأَصَابَ بَعْضُهُمْ أَعْلَاهَا وَبَعْضُهُمْ أَسْفَلَهَا، فَكَانَ الَّذِينَ فِي أَسْفَلِهَا إِذَا اسْتَقَوْا مِنَ الْمَاءِ مَرُّوا عَلَى مَنْ فَوْقَهُمْ، فَقَالُوا: لَوْ أَنَّا خَرَقْنَا فِي نَصِيبِنَا خَرْقًا وَلَمْ نُؤْذِ مَنْ فَوْقَنَا، فَإِنْ يَتْرُكُوهُمْ وَمَا أَرَادُوا هَلَكُوا جَمِيعًا، وَإِنْ أَخَذُوا عَلَى أَيْدِيهِمْ نَجَوْا وَنَجَوْا جَمِيعًا»
অর্থাৎ: “আল্লাহর সীমারেখা (হুদূদ) রক্ষা করার চেষ্টা করা লোকদের দৃষ্টান্ত এবং যারা তা ভঙ্গ করে তাদের দৃষ্টান্ত একটি নৌকায় একসাথে বসবাসকারী লোকদের মতো। তাদের কেউ উপরের তলায় এবং কেউ নিচের তলায় বাস করে। নিচের তলার লোকেরা যখন পানি নিতে চায় তখন তাদের উপরের তলায় যেতে হয়। তখন তারা বলে, ‘যদি আমরা আমাদের অংশে নিচে একটি ছিদ্র করি (যাতে সরাসরি পানি নিতে পারি) এবং উপরতলার লোকদের কষ্ট না দিই, তাহলে কেমন হয়?’ যদি উপরতলার লোকেরা তাদের (নিচের তলার লোকদের) ইচ্ছামতো কাজ করতে দেয় তবে সবাই ধ্বংস হবে। আর যদি তারা তা থেকে বাধা দেয় তবে সবাই রক্ষা পাবে।”(সহীহ বুখারী)
তিনি (আদর্শিক মুসলিম) উপলব্ধি করবেন যে, পুঁজিবাদী অর্থনীতি এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে যেখানে একজন মানুষের পক্ষে বাড়ি কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে এবং তাকে বাধ্য হয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয়। অথচ ইসলাম সুদকে (রিবা) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে এবং ঋণ-ভিত্তিক অর্থনীতির ধারণার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। তিনি বুঝবেন যে, যৌন স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তিশালী জনমত না থাকা এবং শরীয়াহ্ দ্বারা এটি নিয়ন্ত্রণ না করাই হচ্ছে সে কারণ, যার ফলে একজন মুসলিম তার প্রবৃত্তি হারাম উপায়ে পূরণ করছে। কিংবা একজন মুসলিম নারী ইসলামী পোশাক বিধান পরিত্যাগ করছে, কারণ পশ্চিমা সামাজিক ব্যবস্থা তাকে উন্মুক্তভাবে ও আকর্ষণীয়ভাবে পোশাক পরার স্বাধীনতা দিচ্ছে; অথচ ইসলাম একজন মুসলিম নারীর জন্য নির্দিষ্ট পোশাকের বিধান সংজ্ঞায়িত করে দিয়েছে। আদর্শিক (Ideological) মুসলিম উপলব্ধি করেন যে, আজকের তরুণ মুসলিমরা ইসলামী শিক্ষাবিজ্ঞান থেকে বঞ্চিত একটি পরিবেশে বেড়ে উঠছে। জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামী সংস্কৃতির অনুপস্থিতিই হলো সেই কারণ, যার জন্য আজকের মুসলিম কিশোর তার খেয়াল-খুশি ও প্রবৃত্তিকে অনুসরণ করছে, ইসলামের মানদণ্ড অনুসারে নয়। তিনি উপলব্ধি করবেন যে, ইসলামী রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি মুসলিমদের জন্য তাদের দ্বীন পালন করার প্রাকৃতিক পরিবেশ কেড়ে নিয়েছে এবং এর পরিবর্তে এমন এক আদর্শ চাপিয়ে দিয়েছে যা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক—যেমন দুর্নীতিগ্রস্ত ধর্মনিরপেক্ষ (secular) ধারণা অথবা গোত্রবাদ (tribalism)-প্রসূত সাংস্কৃতিক ভ্রান্ত চিন্তাধারা।
অনেক আন্তরিক মুসলিম (sincere Muslims) ইসলামের প্রচার ও প্রসারে সাহায্য করার জন্য নানা কাজ সম্পাদন করেন। কিন্তু অত্যন্ত জরুরি হলো—এই কাজগুলো যেন ইসলামের সংজ্ঞায়িত আদর্শিক লক্ষ্য (Ideological objectives)-এর সাথে সম্পর্কিত হয়। এ বিষয়ে একজনকে শুধু মহানবী মুহাম্মদ ﷺ-এর মক্কী জীবনের দিকে মনোযোগ দিলেই যথেষ্ট। এমনকি একজন অমুসলিমও উপলব্ধি করবে যে, রাসূল ﷺ-এর মিশন ছিল আজকের ভাষায় যাকে বলা হয় একটি বিপ্লব। তিনি ﷺ আরব সমাজকে গোত্রীয় ও প্রথাগত সামাজিক রীতি থেকে ইসলামি বিধি-বিধানের দিকে রূপান্তরিত করেছিলেন। এ পরিবর্তন বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হয়েছিল এবং চলতে থাকে ১৯২৪ সালে ইসলামী খিলাফতের ধ্বংস পর্যন্ত। সুতরাং যে মুসলিম ইসলামের দাওয়াহ বহন করতে চায়, তার উদ্দেশ্যও একই হতে হবে—অর্থাৎ পুরো পৃথিবীতে ইসলামী বিধি-বিধান প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো। আজ একশ বছরেরো অধিক সময় ধরে রাষ্ট্র ও সমাজে ইসলামী বিধান ছাড়া জীবনযাপনের পর মুসলিম উম্মাহ আজ আবার শারিয়াহ্র বাস্তবায়নের জন্য তীব্রভাবে আকাঙ্ক্ষিত। অসংখ্য জরিপে দেখা গেছে—মুসলিম বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শারিয়াহ্র অধীনে জীবনযাপন করতে চায়। যদিও এ সত্য প্রমাণে জরিপের প্রয়োজন নেই। শুধু গত দুই দশক ধরে দেখা গেছে মুসলিম বিশ্ব ইসলামকে আঁকড়ে ধরতে জীবন দিতেও প্রস্তুত, যেমন আমরা সিরিয়ার উম্মাহর দৃষ্টান্তে প্রত্যক্ষ করেছি। অতএব যে মুসলিম ইসলামকে সঠিকভাবে বুঝেছে, সে উপলব্ধি করবে যে ইসলামী রাষ্ট্রই মুসলিমদের পুনর্জাগরণের কেন্দ্রবিন্দু এবং তাই সে ইসলামের দাওয়াহ ও রাসূল ﷺ-এর মিশন বাস্তবায়নের প্রচেষ্টায় এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানাবে।
আদর্শিক মুসলিম, যে ইসলামী পুনর্জাগরণের চেষ্টা করে, তার জীবন হবে না একঘেয়ে—যেখানে কেবল অফিসে যাওয়া, ঘরে ফেরা, ঘুমানো ও ছুটির দিনে আরাম করা। বরং সে প্রতিদিন হাজারো সমস্যা অনুভব করে এবং উপলব্ধি করে যে, ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা কতটা জরুরি। সে জানে তার হাতে কী বিশাল দায়িত্ব রয়েছে এবং সর্বশক্তি দিয়ে সে এই চিন্তাধারা ছড়িয়ে দিতে আগ্রহী। তার মন মেনে নিতে পারে না যে মানবজাতি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাকে অবহেলা করে কুফরের অতল গহ্বরে পতিত হয়েছে, আর এর ফলেই মানবজাতির উপর নির্যাতন নেমে এসেছে—অথচ মুসলিমরা ব্যাপকভাবে এ সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আল্লাহ تعالى বলেন:
هُوَ ٱلَّذِيٓ أَرۡسَلَ رَسُولَهُۥ بِٱلۡهُدَىٰ وَدِينِ ٱلۡحَقِّ لِيُظۡهِرَهُۥ عَلَى ٱلدِّينِ كُلِّهِۦ وَلَوۡ كَرِهَ ٱلۡمُشۡرِكُونَ
“তিনিই সেই সত্তা যিনি তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দ্বীন সহ প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি এটিকে সমস্ত দ্বীনের উপর বিজয়ী করেন, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।”
(সূরা আত-তাওবাহ: ৩৩)তার সংবাদ অনুসরণ (following the news) করার অভ্যাস তাকে সপ্তাহান্তে আরামে থাকতে দেয় না। কারণ সে অনুভব করে, ইসলামকে ঘিরে প্রচারণা এবং আক্রমণের নতুন নতুন কৌশল চলছে। সে রাষ্ট্রসমূহের পারস্পরিক সম্পর্কের গভীরতা বোঝে এবং উপলব্ধি করে কীভাবে রাষ্ট্রগুলো চতুরভাবে যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে মুসলিম ভূমিগুলোর উপর তাদের সাম্রাজ্যবাদ কায়েম রাখছে এবং ইসলামী রাষ্ট্রের উত্থানকে রোধ করছে। ফলে সে অনুভব করে—এটার মোকাবিলা করতে হবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিশ্লেষণমূলক আলোচনার মাধ্যমে তার সমাজের মধ্যে। সে চায় মানবজাতি শান্তিতে থাকুক এবং সে বোঝে যে, এটি কেবল তখনই সম্ভব হবে যখন মানবজাতিকে ইসলাম দ্বারা পুনর্জীবিত (revived) করা হবে। অতএব অবসর সময়ে কোনো নির্দিষ্ট আলোচনার বিষয়ে তার বোধ (understanding) বৃদ্ধি করার জন্য তার হাত বই ছাড়া পিছিয়ে থাকে না। জনজীবনে (in public life) তার অংশগ্রহণও এমন আলোচনাহীন হয় না, যেখানে সে নিজের আদর্শ শেয়ার করতে পারে। স্ত্রী, পরিবার বা বন্ধুদের সাথে তার সময় শুধু বিনোদন বা অপ্রাসঙ্গিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সেই সময়কে সে একটি সুবর্ণ সুযোগে পরিণত করে—যাতে আরো মানুষকে ইসলামের আদর্শের দিকে আকৃষ্ট ও আহ্বান জানাতে পারে। সে একটি পরিকল্পনার সাথে কাজ করে, যেখানে তার সপ্তাহগুলো যতটা সম্ভব ফলপ্রসূ হয় এবং অগ্রাধিকার থাকে ইসলামের পুনর্জাগরণের আহ্বান। এজন্য সে নিজের নফসী আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে—যেমন সিনেমায় নতুন মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র দেখতে যাওয়া, স্ত্রীকে নিয়ে নতুন রেস্টুরেন্টে ঘন ঘন ভ্রমণ করা, খেলাধুলায় অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা, কিংবা ঘর, গাড়ি বা ব্যক্তিগত যন্ত্রপাতি নিয়ে নিখুঁত সাজসজ্জায় অতিরিক্ত সময় নষ্ট করা। সে সর্বদা নিম্নোক্ত কুরআন ও হাদীসকে মনে রাখে-
আল্লাহ تعالى বলেন:
قُلۡ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحۡيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ
“বলুন: নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু—সবই আল্লাহর জন্য, যিনি সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক।” (সূরা আল-আন‘আম: ১৬২)
আর রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ»
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে ঈমান রাখে, সে যেন কল্যাণকর কথা বলে অথবা নীরব থাকে।”
(সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)“একজন মতাদর্শপ্রাণ মুসলিম বা আদর্শিকভাবে চালিত মুসলিম (ideologically driven Muslim) হওয়ার অর্থ হলো—এই আদর্শের দাওয়াহ’ই তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু, যার চারপাশে তার সমগ্র জীবন আবর্তিত হয়। যদি এমন না হয়, তবে বুঝতে হবে সে মুসলিম ইসলামকে আদর্শ (Ideology) হিসেবে অনুধাবন করতে পারেনি। অর্থাৎ, ইসলাম এমন একটি চিন্তা-ধারা যা বর্ণ বা ভৌগোলিক সীমানাকে অতিক্রম করে এবং এমন বিধান ধারণ করে যা সকল মানুষের জন্য, সকল সময়ে, সকল পরিস্থিতিতে সমভাবে প্রযোজ্য—ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনে যেমন, তেমনি সমাজ জীবনের ক্ষেত্রেও।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আমাদের ইসলামের নেয়ামত দান করেছেন, যাতে আমরা নির্বাচিত উম্মাহ হিসেবে ইসলামের আদর্শকে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিই। আজ আমরা সারা বিশ্বে বিস্তৃত—এটি আমাদের পূর্বসূরিদের কর্মফল, যারা ইসলামের পতাকা (راية الإسلام) উঁচিয়ে ধরেছিলেন এবং তাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উৎসর্গ করেছিলেন ইসলামের বাস্তবায়নের জন্য, ইসলামের সঠিক আদর্শিক বোঝাপড়া (understanding) নিয়ে।
যদি আমরা ইসলামকে একইভাবে না বুঝি, তবে মুসলিমরা কুফরের ছায়ায় থেকেই যাবে এবং আমাদের প্রজন্ম ইসলামের বাস্তব রূপকে (practical manifestation of Islam) খিলাফাহর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করতে পারবে না। ইসলামী খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজ কেবলমাত্র আদর্শিক মুসলিমদের দ্বারাই সম্পন্ন হবে, এবং ইসলামের পুনর্জাগরণ (revival) ঘটবে তখনই—যখন উম্মাহ স্পষ্টভাবে ইসলামকে একটি আদর্শ (ideology) হিসেবে বুঝবে।
আল্লাহ تعالى বলেন:
ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗا
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।”
(সূরা আল-মায়েদাহ: ৩)দু’আ:
“হে আল্লাহ, আমাদেরকে সত্যিকার অর্থে ইসলামের আদর্শিক বোঝাপড়া দান করুন, যেভাবে আপনি আপনার প্রিয় রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ-কে এবং তাঁর সাহাবীগণকে দান করেছিলেন। আমাদের চিন্তা, বিশ্বাস, ভালোবাসা, পছন্দ-অপছন্দ ও কর্মসমূহ যেন কেবল আপনার দ্বীন ইসলাম অনুযায়ী হয়।” …আমীন।
আল্লাহর ইচ্ছায় সমাপ্ত
– কায়েস আবু মুহাম্মদ কর্তৃক অনুবাদকৃত ও পরিমার্জিত।
গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার চিন্তা: হুকুম শরীয়াহ এবং ইতিহাসের আলোকে বাস্তবতা ও ভ্রান্তি

الحمد لله، والصلاة والسلام على رسول الله، وعلى آله وصحبه ومن والاه، أما بعد
আজকের মুসলিম সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা হলো — “গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।” প্রথমে বিষয়টি শুনতে আকর্ষণীয় মনে হলেও, শরীয়াহর দৃষ্টিতে এবং বাস্তবতার আলোকে এটি একটি ভয়াবহ ভ্রান্তি। কেননা, এটি ইসলামের মৌলিক রাজনৈতিক চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক, এবং ইসলামী পদ্ধতির পরিবর্তে কাফিরদের পদ্ধতি গ্রহণের নামান্তর।
গণতন্ত্র কী এবং কেন এটি ইসলামের পরিপন্থী?
সংক্ষেপে, গণতন্ত্র এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে সার্বভৌমত্ব মানুষের হাতে। সংসদে বসে মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠ মত অনুযায়ী আইন তৈরি হয়। এক কথায়, মানুষ যা চাইবে, তাই হবে — এমনকি তা আল্লাহর বিধানের বিরোধী হলেও।
অন্যদিকে ইসলাম ঘোষণা করে:
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ
“হুকুম তো কেবল আল্লাহরই।”
(সূরা ইউসুফ: ৪০)এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, শাসন ও আইন প্রণয়নের পূর্ণ অধিকার একমাত্র আল্লাহর। সুতরাং গণতন্ত্রের মূল দর্শন — মানবসৃষ্ট আইন — সরাসরি কুরআনের এই মৌলিক নীতির বিরোধিতা করে।
হারাম পথে হালাল প্রতিষ্ঠার চেষ্টার ভ্রান্তি
অনেকে যুক্তি দেন, “উদ্দেশ্য যদি ভালো হয় — ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা — তাহলে গণতান্ত্রিক পথ অবলম্বন করাতে দোষ কী?”
কিন্তু শরীয়াহর একটি মৌলিক নীতি হলো:
إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا
“নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি শুধুমাত্র পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন।”
(সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০১৫)অতএব, আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার মতো পবিত্র কাজ হারাম পদ্ধতিতে করা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। উদ্দেশ্য পবিত্র হলেও যদি মাধ্যম হারাম হয়, তা ইসলামে বৈধ নয়।
কুরআনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা
১. যালিমদের সাথে আপস করার পরিণাম
আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ
وَلَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُم مِّن دُونِ اللَّهِ مِنْ أَوْلِيَاءَ ثُمَّ لَا تُنصَرُونَ
“আর তোমরা যালিমদের দিকে ঝুঁকো না, তা না হলে তোমাদেরকে আগুন স্পর্শ করবে। আল্লাহ ছাড়া তোমাদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই। তারপর তোমরা সাহায্যপ্রাপ্তও হবে না।”
(সূরা হুদ: ১১:১১৩)গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করা মানে কুফরী আইনপ্রণেতাদের সাথে আপস করা, যা আল্লাহ স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছেন।
২. কুফরী ব্যবস্থার অংশীদার হওয়ার নিষেধাজ্ঞা
আল্লাহ বলেনঃ
وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّىٰ يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ ۚ إِنَّكُمْ إِذًا مِّثْلُهُمْ
“তোমাদের প্রতি কিতাবে নাযিল করা হয়েছে যে, যখন তোমরা শুনবে আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করা হচ্ছে এবং উপহাস করা হচ্ছে, তখন তাদের সাথে বসো না যতক্ষণ না তারা অন্য বিষয়ে প্রবেশ করে। নিশ্চয়ই তোমরা যদি (তাদের সাথে বসো) তবে তোমরা তাদের মতই হবে।” (সূরা আন-নিসা: ৪:১৪০)
অতএব, কুফরী ব্যবস্থার অংশীদার হওয়া মানে সেই অপরাধে শরিক হওয়া।
৩. আল্লাহর বিধানকে অগ্রাহ্য করা কুফরী
আল্লাহ বলেনঃ
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُو۟لَـٰٓئِكَ هُمُ ٱلْكَـٰفِرُونَ
“আর যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা দ্বারা হুকুম করে না, তারাই কাফির।”
(সূরা আল-মায়িদাহ: ৫:৪৪)গণতন্ত্রে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা আল্লাহর পরিবর্তে মানুষের হাতে। এটি সরাসরি কুফরীর শামিল।
হাদীসের প্রমাণসমূহ
১. কাফিরদের পদ্ধতি অনুসরণের বিরুদ্ধে সতর্কতা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
“যে কোনো জাতির সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে।”
(সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৪০৩১)অতএব, গণতন্ত্রের মতো কাফিরদের জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করা সরাসরি এই হাদীসের আওতায় পড়ে।
২. প্রতারণামূলক সময়ের সতর্কবার্তা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ
سَيَأْتِي عَلَى النَّاسِ سَنَوَاتٌ خَدَّاعَاتٌ … وَيَنْطِقُ فِيهَا الرُّوَيْبِضَةُ
“মানুষের উপর প্রতারণামূলক বছর আসবে … তখন তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট লোকেরা নেতৃত্বে কথা বলবে।”
(সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস: ৪০৩৬)গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রকৃত নেতৃত্বের পরিবর্তে নিকৃষ্ট ও অযোগ্য লোকেরা নেতৃত্বের আসনে বসে — যা এই হাদীসের প্রতিফলন।
ইসলামী শূরা ও পাশ্চাত্য গণতন্ত্র:
অনেকেই গণতন্ত্র (ডেমোক্রেসি) ও শূরা (পরামর্শ) কে এক করে দেখে, অথচ বাস্তবে এ দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। শূরা হলো— ইসলামী নেতৃত্বের পক্ষ থেকে যোগ্য আলেম ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ করা। পক্ষান্তরে গণতন্ত্র হলো— মানুষের খেয়াল-খুশি ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে আইন প্রণয়ন করা, যা আল্লাহর অবতীর্ণ শরীয়াহর বিপরীত।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা শূরার কথা বলেছেন:
وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ
“আর তাদের কাজকর্ম নিজেদের মধ্যে পরামর্শের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়।”
(সূরা আশ-শূরা: ৩৮)এখানে স্পষ্টভাবে পরামর্শের গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু এই পরামর্শ কেবল শরীয়াহর সীমার মধ্যে হবে।
অন্যদিকে গণতন্ত্রে সংসদে পরামর্শ হয় বটে, কিন্তু তা মানব-রচিত আইনের বলয়ের ভেতরে সীমাবদ্ধ। সেখানে কুরআন-সুন্নাহর আইন প্রণয়নের কোনো কর্তৃত্ব নেই। বরং অধিকাংশ মানুষের মতামতকেই আইন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা আল্লাহ তাআলার ঘোষণার স্পষ্ট বিরোধিতা:
অন্যদিকে গণতন্ত্রে সংসদে পরামর্শ হয় বটে, কিন্তু তা মানব-রচিত আইনের বলয়ের ভেতরে সীমাবদ্ধ। সেখানে কুরআন-সুন্নাহর আইন প্রণয়নের কোনো কর্তৃত্ব নেই। বরং অধিকাংশ মানুষের মতামতকেই আইন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা আল্লাহ তাআলার ঘোষণার স্পষ্ট বিরোধিতা:
وَإِن تُطِعْ أَكْثَرَ مَن فِى الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ ۚ إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُونَ
“আর যদি তুমি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের নির্দেশ মানো, তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে দেবে। তারা শুধুমাত্র অনুমান অনুসরণ করে এবং শুধুমাত্র বাজে কথা বলে।” (সূরা আল‑আন‘আম : ১১৬)
আয়াতটি স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্যের মানদণ্ড নয়, বরং অনেকেই শুধুমাত্র অনুমান (ظنّ) অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয় ও সেই কারণেই তারা বিভ্রান্ত হয়।ইসলামিক চিন্তাভাবনায়, সত্য অনুসন্ধানে কুরআন- সুন্নাহ, বিচার-বিবেচনা ও জ্ঞানের গুরুত্ব অগ্রাধিকার পায়, শুধুমাত্র সংখাধিক্যের ভিত্তিতে নয়।
ইসলামে শূরার পদ্ধতি:
খিলাফাহ শাসনব্যবস্থায় খলিফা “আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ”-এর সঙ্গে পরামর্শ করবেন। এরা হবেন এমন যোগ্য আলেম ও বিশেষজ্ঞ, যারা উম্মাহর প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্য। হাদীসে এসেছে:مَا خَابَ مَنِ اسْتَخَارَ وَلاَ نَدِمَ مَنِ اسْتَشَارَ
“যে ইস্তিখারা করেছে সে ব্যর্থ হয়নি, আর যে পরামর্শ নিয়েছে সে অনুতপ্ত হয়নি।”
(মুসনাদ আহমাদ: ২৮৬)তবে খলিফা শূরা কমিটির সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য নন; তিনি চাইলে নিজের সিদ্ধান্ত বহাল রাখতে পারেন। শূরা ইসলামে বাধ্যতামূলক নয় বরং পরামর্শ গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
সুতরাং, গণতন্ত্র ও শূরা এক নয়।
- গণতন্ত্রে: মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতই আইন।
- শূরায়: আল্লাহর শরীয়াহর সীমার মধ্যে যোগ্য আলেমদের পরামর্শ গ্রহণ।
এ কারণে ইসলামী শূরা ও পাশ্চাত্য গণতন্ত্রকে এক করা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।
উপরের কুরআন ও হাদীসের দলীল থেকে স্পষ্ট যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার চিন্তা একটি আত্মপ্রতারণা। হারাম পদ্ধতিতে হালাল প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। ইসলামের পথ হলো — রাসূল ﷺ এর দেখানো পদ্ধতিতে খিলাফাহ প্রতিষ্ঠা করা: দাওয়াহ, জনমত সৃষ্টি এবং আহলে কুওয়া ও নুসরাহর সহায়তা গ্রহণের মাধ্যমে।
গণতন্ত্রের পথে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা: ইতিহাস থেকে শিক্ষণীয় বাস্তবতা
দীর্ঘদিনের উপনিবেশিক শাসন ও পশ্চিমা আধিপত্য মুসলিম উম্মাহকে তাদের প্রকৃত শাসনব্যবস্থা খিলাফাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এমন এক অচলাবস্থায় দাঁড় করিয়েছে যেখানে বহু ইসলামী দল ভেবেছে, “গণতন্ত্রের মাধ্যমে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।” বাস্তবে দেখা গেছে, এই চিন্তা ইসলামী পদ্ধতির সাথে সাংঘর্ষিক এবং ব্যর্থতাই এর পরিণতি।
নিচে ইতিহাস থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ বিশ্লেষণ করা হলো—
১. মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমীন (Muslim Brotherhood)
মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড (ইখওয়ানুল মুসলিমীন) দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক রাজনীতির মাধ্যমে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। ২০১২ সালে মুহাম্মদ মুরসি গণতান্ত্রিক নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
কি হয়েছিল?
- মুরসি ক্ষমতায় এসেও পূর্ণ ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি।
- মিশরের বিদ্যমান সংবিধানের কাঠামো ও আন্তর্জাতিক চাপের কারণে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
- তিনি পশ্চিমা বিশ্বের সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য বহু আপস করেন।
ফলাফল
এক বছরের মধ্যেই সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। ইখওয়ান নেতাদের অনেকে গ্রেফতার ও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন।
শিক্ষণীয় দিক
গণতান্ত্রিক পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা ও বাহ্যিক চাপ ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
২. তুরস্কের রেফাহ পার্টি এবং এ.কে. পার্টি
১৯৯৬ সালে নাজমুদ্দিন এরবাকানের নেতৃত্বে রেফাহ পার্টি ক্ষমতায় আসে। পরে রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান নেতৃত্বে এ.কে. পার্টি (AKP) রাজনীতিতে আসে।
কি হয়েছিল?
- রেফাহ পার্টি ইসলাম প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করলেও সামরিক বাহিনী ও পশ্চিমা চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
- এ.কে. পার্টি ক্ষমতায় এসে স্পষ্ট ঘোষণা দেয় যে তারা ধর্মনিরপেক্ষ (Secular) গণতান্ত্রিক কাঠামো বজায় রাখবে।
- ইসলামী ফৌজদারি আইন, হুদুদ, শরীয়াহ আদালত কোনো কিছুই প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।
ফলাফল: তুরস্ক ধর্মনিরপেক্ষতার কাঠামো অটুট রাখে, বরং ইসলামী শাসনের দাবিগুলোকে পাশ কাটিয়ে গণতান্ত্রিক আধুনিকতাকে শক্তিশালী করে।
৩. তিউনিসিয়ার আন-নাহদাহ (Ennahda)
আরব বসন্তের পর ২০১১ সালে আন-নাহদাহ পার্টি তিউনিসিয়ায় গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতায় আসে।
কি হয়েছিল?
- শুরুতে ইসলামী শাসনের প্রতিশ্রুতি দিলেও পরবর্তীতে তারা ঘোষণা করে যে তারা “মডারেট ইসলাম” ও “গণতান্ত্রিক ইসলাম” প্রতিষ্ঠা করবে।
- শরীয়াহভিত্তিক আইন প্রণয়ন এজেন্ডা থেকে বাদ দেয়।
ফলাফল
আন-নাহদাহ এক প্রকার সেক্যুলার ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে পরিণত হয় এবং ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ত্যাগ করে।
৪. পাকিস্তানের জামাত-ই-ইসলামী
পাকিস্তানের জামাত-ই-ইসলামী প্রতিষ্ঠার পর থেকেই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অংশগ্রহণ করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে আসছে।
কি হয়েছিল?
- নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও তারা আজও ক্ষমতায় যেতে পারেনি তার মানেইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ।
- সংবিধানের ভেতরে থেকে কাজ করতে গিয়ে বহু ইসলামী এজেন্ডা ত্যাগ করে সমঝোতার রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে।
ফলাফল
পাকিস্তান আজও পশ্চিমা ধাঁচের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে শরীয়াহ কেবল আংশিকভাবে আছে।
৫. ফিলিস্তিনের হামাস (Hamas)
২০০৬ সালে হামাস গণতান্ত্রিক নির্বাচনে জয়লাভ করে গাজায় ক্ষমতায় আসে।
কি হয়েছিল?
- আন্তর্জাতিক চাপ, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে পূর্ণ ইসলামী শাসন কায়েম সম্ভব হয়নি।
- হামাসও ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সমঝোতার পথে যায় এবং ফাতাহ’র সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছিল
ফলাফল
গাজায় ইসলামী শাসনের পরিবর্তে রাজনৈতিক বেঁচে থাকার কৌশলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
৬. আলজেরিয়ার ইসলামী সালভেশন ফ্রন্ট (FIS)
১৯৯১ সালে আলজেরিয়ার FIS (Islamic Salvation Front) নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে।
কি হয়েছিল?
- তারা পূর্ণ ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছিল।
- কিন্তু সেনাবাহিনী ও পশ্চিমা শক্তির চাপে নির্বাচন বাতিল করে দেওয়া হয়।
- FIS এর নেতারা গ্রেফতার হন এবং দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।
ফলাফল
গণতান্ত্রিক পথ চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং আলজেরিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়।
বাস্তবতার সারসংক্ষেপ
১. কোনো ইসলামী দলই গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে থেকে ইসলামী শাসন (খিলাফাহ) প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
২. ক্ষমতায় গেলে তারা গণতন্ত্রকে আঁকড়ে ধরে এবং ইসলামী শরীয়াহর পূর্ণ বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকে।
৩. আন্তর্জাতিক চাপ, সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ, এবং পশ্চিমা শক্তির প্রভাব ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার যেকোনো প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে।কেন এমন হয়?
- গণতন্ত্র ইসলামী শাসনব্যবস্থার বিপরীত দর্শনে দাঁড়ানো। এখানে সার্বভৌমত্ব মানুষের হাতে, ইসলামে তা আল্লাহর হাতে।
- পশ্চিমা শক্তির হস্তক্ষেপ — কোনো ইসলামী দল গণতন্ত্রের মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করতে চাইলে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো কঠোর ব্যবস্থা নেয়।
- সমঝোতার রাজনীতি — ইসলামী দলগুলো গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে থাকতে গিয়ে ইসলামের মূলনীতি ত্যাগ করে কুফরের সাথে সমঝোতার রাজনীতি করতে বাধ্য হয়।
ইসলাম প্রতিষ্ঠার সঠিক পথ:
ইসলাম প্রতিষ্ঠার সঠিক পথ আসলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ আমাদের জন্য সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এটি হলো রাসূল ﷺ যে পদ্ধতিতে মক্কা থেকে মদিনায় ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই নববী পদ্ধতি।
এটি সংক্ষেপে তিনটি ধাপে বোঝা যায়ঃ
১. দাওয়াহ ও চিন্তাগত সংগ্রাম
রাসূল ﷺ প্রথমে গোপনে, পরে প্রকাশ্যে মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাস পরিবর্তনের দাওয়াহ দেন। মক্কায় তিনি আকীদাহ ভিত্তিক দাওয়াহ চালিয়ে মানুষের মনে ইসলামের চিন্তাধারা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেন।
এর মূল কাজ হলো মানুষকে তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাতের সঠিক ধারণা দেওয়া, বিদ্যমান ভুল বিশ্বাস ও মতাদর্শকে চ্যালেঞ্জ করা।
فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ
“তুমি যা আদিষ্ট হয়েছ তা প্রকাশ্যে ঘোষণা কর।”
(সূরা আল-হিজর: ১৫:৯৪)২. জনমত সৃষ্টি ও উম্মাহকে প্রস্তুত করা
রাসূল ﷺ মক্কায় সমাজের প্রভাবশালী ও সাধারণ মানুষদের মধ্যে একটি জনমত তৈরি করেন যে, কেবল ইসলামই ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা।
এর মূল কাজ হলো মিথ্যা শাসনব্যবস্থা ও সামাজিক প্রথার অন্যায়গুলো প্রকাশ্যে তুলে ধরা, সমাজে বিকল্প হিসেবে ইসলামের নিজস্ব মডেল তুলে ধরা।
৩. আহলে কুওয়া (ক্ষমতাধরদের) নুসরাহ গ্রহণ
রাসূল ﷺ মক্কায় বহু গোত্রের নেতাদের কাছে গিয়েছিলেন শক্তিশালী সমর্থন (নুসরাহ) চাওয়ার জন্য। অবশেষে আনসার সাহাবারা (আওস ও খাজরাজ) তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেন।
এক্ষেত্রে মূল কাজ হলো সমাজের ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালীদের কাছ থেকে শক্তির সহায়তা (নুসরাহ) গ্রহণ, যাতে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়।(সীরাতে ইবনে হিশাম দ্রষ্টব্যঃ)
وَإِنِ اسْتَنصَرُوكُمْ فِي الدِّينِ فَعَلَيْكُمُ النَّصْرُ
“আর যদি তারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের কাছে সাহায্য চায়, তবে তোমাদের কর্তব্য তাদের সাহায্য করা।”
(সূরা আনফাল: ৮:৭২)কী ইসলাম প্রতিষ্ঠার পথ নয়?
- গণতন্ত্রের ভেতরে প্রবেশ করা: কারণ এটি কুফরী ব্যবস্থা।
- সশস্ত্র বিদ্রোহ (অব্যবস্থিত জিহাদ): রাসূল ﷺ কখনো মক্কায় জোর করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেননি।
- সংস্কারবাদী আপস: বিদ্যমান শিরকী ও কুফরী ব্যবস্থাকে মানিয়ে নেওয়া ইসলামের পদ্ধতি নয়।
রাসূল ﷺ বলেছেনঃ
وَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ
“তোমরা আমার সুন্নাহ এবং সুপথপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ আঁকড়ে ধর।”
(সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৪৬০৭)রাসূল ﷺ ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন কুফরী কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে নয়, বরং দাওয়াহ, জনমত সৃষ্টি এবং আহলে কুওয়া (ক্ষমতাশালী জনগোষ্ঠীর) নুসরাহ গ্রহণের মাধ্যমে।
তিনি কখনো মক্কার দারুন নাদওয়া (কুফরী রাজনৈতিক পরিষদ) তে অংশ নেননি ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি
- গণতন্ত্রের মাধ্যমে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার আশা ইতিহাসে ব্যর্থ হয়েছে এবং যা শরীয়াহ অনুমোদিত ও নয়।
- ইসলামী আন্দোলনের মূল এজেন্ডা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে গিয়েই দুর্বল ও লক্ষ্যচ্যুত হয়ে পড়ে।
- রাসূল ﷺ এর পদ্ধতিই একমাত্র পথ: দাওয়াহ, জনমত সৃষ্টি এবং নুসরাহর মাধ্যমে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর এক দীর্ঘ হাদীসের শেষে বলেনঃ
“ثُمَّ تَكُونُ خِلَافَةً عَلَى مِنْهَاجِ النُّبُوَّةِ”
“…তারপর আবার আসবে খিলাফত, যা হবে নবুয়্যতের আদলে।”দোয়া
اللَّهُمَّ أَرِنَا الْحَقَّ حَقًّا وَارْزُقْنَا اتِّبَاعَهُ، وَأَرِنَا الْبَاطِلَ بَاطِلًا وَارْزُقْنَا اجْتِنَابَهُ.
“হে আল্লাহ! আমাদেরকে সত্যকে সত্যরূপে দেখাও এবং তা অনুসরণ করার তাওফীক দাও; আর মিথ্যাকে মিথ্যারূপে দেখাও এবং তা থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দাও।”
আল্লাহর ইচ্ছায় সমাপ্ত।
একটি আদর্শ শাসনব্যবস্থা: গণতন্ত্র না খিলাফাহ — প্রেক্ষাপট ও বিশ্লেষণ

সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার, যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, ও কুরআন ও রাসূলের (সা.) মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা দিয়েছেন। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি, যাঁর মাধ্যমে মানবজাতি এক পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসেবে ইসলাম পেয়েছে।
বর্তমান দুনিয়ায় মুসলিম উম্মাহর একটি বড় অংশ ইসলামি শাসনব্যবস্থা তথা খিলাফাহ এবং পশ্চিমা শাসনব্যবস্থা, বিশেষ করে গণতন্ত্রের পার্থক্য বোঝে না। অনেকে এই দুটি ব্যবস্থাকে মিলিয়ে দেখে, কেউ আবার খিলাফাহকে মধ্যযুগীয় বা অগণতান্ত্রিক ভাবে অপপ্রচার করে। অথচ খিলাফাহ একটি স্বতন্ত্র এবং আল্লাহ-নির্ধারিত শাসনব্যবস্থা, যেখানে সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর। বিপরীতে, গণতন্ত্র মানুষের তৈরি একটি পদ্ধতি—যেখানে আইন প্রণয়ন ও শাসনের অধিকার জনগণের হাতে।
এই প্রবন্ধে আমরা আলোচনা করব—খিলাফাহ শাসনব্যবস্থা কী, এর মূল বৈশিষ্ট্য কীভাবে এটি গণতন্ত্রসহ অন্যান্য শাসনব্যবস্থা থেকে পৃথক, এবং কেন ইসলাম অনুযায়ী গণতন্ত্র একটি কুফরী শাসনব্যবস্থা।
গণতন্ত্র কেন একটি কুফরী শাসনব্যবস্থা
গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা (Democracy & Secularism): আধুনিক গণতন্ত্রের উৎস ইউরোপীয় রেনেসাঁ, তারপরে ১৭শ এবং ১৮শ শতকের আমেরিকান-ব্রিটিশ রাজনৈতিক আন্দোলনে নিহিত। এই কাঠামো ধর্ম ও রাজ্যের পৃথকীকরণ (secularism) থেকে উদ্ভূত, যেখানে শাসন ও আইনের উৎস জনগণ ও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ইচ্ছা। ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সব ধর্ম পুরোটাই ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ, রাষ্ট্র ধর্মীয় সিদ্ধান্ত থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। আইন ও নীতি সম্পূর্ণভাবে মানব তৈরি নিয়মে গঠিত, যা ধর্মীয় বিধির নয় বরং মানব ইচ্ছায় নির্ধারিত।
কিন্তু ইসলামে ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো স্থান নেই, কারণ ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। তাই জীবনের কোনো অংশকে ধর্ম থেকে আলাদা করার সুযোগ নেই। আল্লাহ বলেন:
إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ্র কাছে গ্রহণযোগ্য একমাত্র ধর্ম হলো ইসলাম।”
(সূরা আলে ইমরান, ৩:১৯)গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ (Democracy & Nationalism): বিশ্বের প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জাতীয়তাবাদ বজায় রাখা ও লালন করা হয়। জাতীয়তাবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে, প্রতিটি জাতি একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সঙ্গে আবদ্ধ থাকে, যাকে সীমানা বলা হয়। প্রত্যেক জাতি নিজেদের অন্য জাতির তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করে এবং এই শ্রেষ্ঠত্ববোধ থেকে তারা অন্য জাতিকে দমন করার চেষ্টা করে। এর ফলস্বরূপ সংঘটিত হয় যুদ্ধ। ফলে গণতান্ত্রিক-জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রগুলো পরোক্ষভাবে বিশ্বে ঘৃণা ছড়ায় এবং আধিপত্য বিস্তার করে বেড়ায়। বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে এ ধরনের অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যাবে।
অন্যদিকে, ইসলামি রাষ্ট্রে জাতীয়তাবাদ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যাত, কারণ জাতীয়তাবাদ হারাম। রাসূল (সা.) জাতীয়তাবাদ অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন এবং উম্মাহকে তা বর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন। জাতীয়তাবাদের বিষয়ে রাসূল (সা.) একটি হাদীসে বলেন:
‘যে ব্যক্তি জাতীয়তাবাদের আহ্বান জানায়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।‘
(- মুসনাদে আহমদ/আবু দাউদ থেকে বর্ণিত হাদীস)- আইন প্রণয়নের উৎস (Source of Law) এবং সার্বভৌমত্বের (sovereignty) ধারণা:
- গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো ‘জনগণের সার্বভৌমত্ব’, যেখানে জনগণই সকল ক্ষমতার আধার ও আইনের উৎস।আধুনিক গণতন্ত্রে আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ ক্ষমতা জনগণের হাতে, অর্থাৎ মানুষই আইন গঠন করে ।
এর বিপরীতে, ইসলামে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হলেন একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন। তাঁর এ ক্ষমতায় কোনো অংশীদার বা প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। ইসলামী রাষ্ট্রে তিনিই হচ্ছেন মৌলিক আইনের উৎস এবং সকল ক্ষমতার আধার।আল্লাহ বলেন:
“أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ ۗ تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ”
“إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ…”“তোমরা জেনে রাখবে, সার্বভৌমত্ব কেবলমাত্র (সেই) আল্লাহরই, আর তিনিই হচ্ছেন সর্বাধিক দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।” (সূরা আরাফ ৭:৫৪)”
গণতন্ত্রে জনগণই আইনি অধিকারে অংশ রাখে, যা ইসলামি দৃষ্টিতে “সুবৎ শরীক” ধরা হয়, কেননা শুধু আল্লাহরই আইন প্রণয়নের অধিকার আছে।
ইসলামে আইন প্রণয়নের অধিকার কেবল আল্লাহর। কুরআনের অসংখ্য আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট বলেছেন:
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُو۟لَـٰٓئِكَ هُمُ ٱلْكَـٰفِرُونَ
“যারা আল্লাহর অবতীর্ণ বিধানের আলোকে বিচার করে না, তারা কাফের।” (সূরা মায়েদা: ৪৪)إِنِ ٱلْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ۚ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوٓا۟ إِلَّآ إِيَّاهُ ۚ ذَٰلِكَ ٱلدِّينُ ٱلْقَيِّمُ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
“নিশ্চয় আইন প্রণয়নের মালিক একমাত্র আল্লাহ্। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাকে ব্যতীত আর কারও ইবাদত করো না। এটাই সরল পথ কিন্তু অধিকাংশ লোকই তা জানে না। [সূরা ইউসুফ: ৪০]
গণতন্ত্র এই মূলনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এখানে মানুষ নিজেই আইন তৈরি করে, হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল বানায়। এই স্বেচ্ছাচারিতা ইসলামে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।
- সেন্স অফ প্লুরালিজম (Pluralism):
এটি হলো এমন এক মানসিকতা যেখানে সমাজে বিভিন্ন মতাদর্শ, ধর্ম, রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী এক সঙ্গে টিকে থাকতে পারে এবং আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকে। এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্ব পূর্ণ উপাদান। কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গনে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রে বহুত্ববাদের চেতনা (sense of pluralism) বজায় রাখা হচ্ছে না; বরং বিশ্ব গণতন্ত্রে ইসলাম, মুসলিম এবং তাদের আদর্শিক মানসিকতার বিরুদ্ধে গণতন্ত্রকে ব্যবহার করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, বিভিন্ন দেশে হিজাব নিষিদ্ধ করা, মুসলিমদের ধর্মীয় কারণে নির্যাতন করা, রাসূল (সা.)-এর প্রতি অসম্মান প্রদর্শন ইত্যাদি।
এখন প্রশ্ন হল এটি (সেন্স অফ প্লুরালিজম) কি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক?
এখানে দুই দিক থেকে দেখা যায়:
- ইসলামে ভিন্ন মতের অস্তিত্ব:
ইসলাম মুসলিম সমাজে আলাদা মত, মাজহাব এবং এমনকি অমুসলিমদের ও (যেমন আহলে কিতাব) নিরাপদে বসবাসের সুযোগ দিয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে—
لَاإِكْرَاهَفِيالدِّينِ
“দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।” (সূরাবাকারা: ২৫৬)অতএব, মানুষের নিজস্ব ধর্ম ও মত অনুসরণ করার স্বাধীনতা ইসলামে স্বীকৃত।
- কিন্তু ইসলামে সীমারেখা আছে:
ইসলামী রাষ্ট্রে ভিন্ন ধর্ম বা মতের অস্তিত্ব সহ্য করা হয়, কিন্তু ইসলামের মৌলিক বিধান অস্বীকার বা ইসলাম বিরোধী আইন চালু করার অনুমতি দেওয়া হয়না। অর্থাৎ, ইসলামে অসীম স্বাধীনতা বা ধর্মনিরপেক্ষ প্লুরালিজম (Pluralism) নেই।
সুতরাং গণতান্ত্রিক প্লুরালিজম (সেটি এখন প্রশ্নবিদ্ধ ) যেখানে সব মতবাদকে সমানভাবে সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে চায়, সেটি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। কিন্তু অমুসলিমদের নিরাপদে বসবাস, নিজ ধর্ম পালন ও ন্যায্য অধিকার দেওয়া—এ অংশ ইসলামে স্বীকৃত।
নিম্নে কিছু বাস্তব উদাহরনের মাধ্যমে গণতন্ত্র ও ইসলামের সংঘর্ষিকতাকে তুলে ধরা হলো:
১. সমকামীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অধিকার সংরক্ষণ
গণতন্ত্রে: LGBTQ+ সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা, তাদের বিয়ে, দত্তক নেওয়ার অধিকার এবং এমনকি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের কোটা বা প্রতীক স্থাপন এখন অনেক দেশে বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে।
ইসলামে: সমকামীতা (লাওতী আমল) স্পষ্টত হারাম এবং নূহ (আ.) এর জাতি এ কাজের কারণে ধ্বংস হয়েছিল।
আল্লাহ বলেন:
أَتَأْتُونَ ٱلذُّكْرَانَ مِنَ ٱلْعَـٰلَمِينَ ﴿١٦٥﴾ وَتَذَرُونَ مَا خَلَقَ لَكُمْ رَبُّكُم مِّنْ أَزْوَٰجِكُم ۚ بَلْ أَنتُمْ قَوْمٌ عَادُونَ
“তোমরা কি পুরুষের কাছে কামনা পূরণ করো নারীদের ছেড়ে?“ (সূরা আশ-শু‘আরা: ১৬৫-১৬৬)২. সুদ (ব্যাংকিং ব্যবস্থা)
গণতন্ত্রে: আধুনিক রাষ্ট্রগুলোতে সুদ (interest) ভিত্তিক ব্যাংকিং বৈধ এবং এটি একটি রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক নীতি। সুদের হার নির্ধারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, এবং এর ভিত্তিতে ঋণ ও সঞ্চয়ের ব্যবস্থা চলে।
ইসলামে: সুদ (রিবা) কুরআন ও সুন্নাহতে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
আল্লাহ বলেন:
يَمْحَقُ ٱللَّهُ ٱلرِّبَوٰا۟ وَيُرْبِى ٱلصَّدَقَٰتِ ۗ وَٱللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ كَفَّارٍ أَثِيمٍ
“আর আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করেন এবং সদকাকে বৃদ্ধি দেন।“ [সূরা আল-বাকারা: ২৭৬]আল্লাহ বলেন:
فَإِن لَّمْ تَفْعَلُوا۟ فَأْذَنُوا۟ بِحَرْبٍۢ مِّنَ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ ۖ
“যদি তোমরা তা (সুদ) না ছাড়ো, তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও।” (সূরা আল-বাকারা: ২৭৯)৩. অশ্লীলতা ও পর্নোগ্রাফি
গণতন্ত্রে: বাকস্বাধীনতা ও ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে পর্নোগ্রাফি, নগ্নতা ও অশ্লীলতা প্রকাশকে ‘মতপ্রকাশের অধিকার’ হিসেবে বিবেচনা করে বৈধতা দেওয়া হয়। অনেক দেশেই এগুলোর জন্য বৈধ ও নিয়ন্ত্রিত ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে।
ইসলামে: পর্দা লঙ্ঘন, অশ্লীলতা, ও জিনা সংক্রান্ত যেকোনো কিছু কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا۟ ٱلْفَوَٰحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ
“তোমরা নির্লজ্জতার কাছেও যেয়ো না, তা প্রকাশ্য হোক বা গোপন।“ [সূরা আল-আন’আম: ১৫১]৪. ধর্মত্যাগ বা ধর্ম পরিবর্তনের স্বাধীনতা
গণতন্ত্রে: অধিকাংশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধর্ম পরিবর্তন, এমনকি ইসলাম ত্যাগ করাকেও “ব্যক্তিগত অধিকার” বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কেউ ইসলাম ছেড়ে অন্য ধর্ম গ্রহণ করলে সেটি আইনত বৈধ এবং শাস্তিযোগ্য নয়।
ইসলামে: ইসলাম পরিত্যাগ (রিদ্দা) মারাত্মক অপরাধ। শরীয়াহ অনুযায়ী ইচ্ছাকৃতভাবে ইসলাম ত্যাগকারীকে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে (যদি সে প্রকাশ্যে দাওয়াত দেয় বা বিদ্রোহ করে)।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
‘مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ
“যে ব্যক্তি তার দ্বীন পরিবর্তন করে, তাকে হত্যা করো।” (সহীহ বুখারী: ৩০১৭)৫. অশ্লীল নারীদের “মডেল” বা “বডি পারেড” আইনি স্বীকৃতি
গণতন্ত্রে: অনেক দেশে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অর্ধনগ্ন ফ্যাশন শো, বিউটি কনটেস্ট, এবং খোলামেলা পোশাককে আইনি অধিকার ও শিল্পের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
ইসলামে: নারীদের খোলামেলা পোশাক, বেপর্দা চলাফেরা এবং তাদের দেহকে বাণিজ্যিকভাবে উপস্থাপন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا: … نِسَاءٌ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ
“দুই ধরনের জাহান্নামী মানুষ আমি (আমার জীবনে)দেখিনি … এমন কিছু নারী থাকবে যারা পোশাক পরিধান করেও নগ্ন থাকবে…” (সহীহ মুসলিম: ২১২৮)৬. মাতৃগর্ভে শিশু হত্যা (Abortion)
গণতন্ত্রে: অনেক দেশে গর্ভপাতকে নারীর “স্বাস্থ্যগত অধিকার” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এমনকি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থেকে জন্ম নেওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তানদেরও হত্যার অনুমতি দেওয়া হয়।
ইসলামে: গর্ভপাত (নিষেধ না থাকলে) শুধুমাত্র নির্দিষ্ট যৌক্তিক কারণে করা যায় এবং ৪ মাস পর এটা স্পষ্টতই হারাম।
আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ مِنْ إِمْلَاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُمْ
“তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না দারিদ্র্যের আশঙ্কায়…“ (সূরা আল-আন’আম: ১৫১)৭. যৌন স্বাধীনতা (Sexual Freedom)
গণতন্ত্রে: প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মতিতে যেকোনো ধরনের যৌন সম্পর্ক, এমনকি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কও আইনত বৈধ (যদি তা জোরপূর্বক না হয়)। “Live-in relationship”, casual dating ইত্যাদি সামাজিকভাবে স্বীকৃত।
ইসলামে: বিবাহ ছাড়া যেকোনো ধরনের যৌন সম্পর্ক জিনা হিসেবে পরিগণিত এবং শরীয়াহ অনুযায়ী তার জন্য কঠিন শাস্তি নির্ধারিত।
আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
“আর জিনার কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই এটি অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ।” (সূরা আল-ইসরা: ৩২)৮. ইসলাম ও নবীকে অবমাননা “মতপ্রকাশের অধিকার” বলে মনে করা
গণতন্ত্রে: অনেক দেশে নবী মুহাম্মদ ﷺ, কুরআন ও ইসলামী চিহ্ন অবমাননা করাকেও মতপ্রকাশের অধিকার বলে মনে করা হয় এবং সেসব আইনত দণ্ডনীয় নয়।
ইসলামে: নবী অবমাননার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। সাহাবাগণ এমন দৃষ্টান্ত রেখেছেন।
আল্লাহ বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مُّهِينًا
“যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে লাঞ্ছনা রয়েছে।“
(সূরা আহযাব: ৫৭)১০. শরীয়া আইনকে “Radical” বা “সন্ত্রাসী” ঘোষণা করা
গণতন্ত্রে: অনেক দেশে শরীয়া আইনের প্রচার, বিশেষ করে শরীয়াহ অনুযায়ী শাস্তির কথা বলা (যেমন: চোরের হাত কাটা, ব্যভিচারীর শাস্তি) সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রপন্থা (extremism) হিসেবে গণ্য করা হয়।
ইসলামে: এগুলো আল্লাহ প্রদত্ত বিধান, যা মানবজাতির শান্তি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রণীত।
আল্লাহ বলেন:
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالًا مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
“চোর, পুরুষ ও চোর, নারী—তাদের হাত কেটে দাও; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত শাস্তি…“
(সূরা আল-মায়িদা: ৩৮)১১. নারীদের “পুরুষের সমতুল্য” ঘোষণা করে সমস্ত যৌন পার্থক্য বিলোপ
গণতন্ত্রে: “Gender equality” এর নামে অনেক দেশে নারীদেরকে জোরপূর্বক পুরুষের মতো সব কাজ করতে বাধ্য করা হয়, এমনকি পুরুষদের সেনাবাহিনীতে, খনি বা যুদ্ধক্ষেত্রেও পাঠানো হয়।
ইসলামে: নারী ও পুরুষের নিজ নিজ ভূমিকাকে সম্মান করা হয়। ইসলাম নারীর মর্যাদা রক্ষা করে তার জন্য আর্থ-সামাজিক সুরক্ষা বিধান দিয়েছে।
আল্লাহ বলেন:
ٱلرِّجَالُ قَوَّٰمُونَ عَلَى ٱلنِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ ٱللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَآ أَنفَقُوا۟ مِنْ أَمْوَٰلِهِمْ
“পুরুষেরা নারীদের অভিভাবক, কারণ আল্লাহ তাদের একের ওপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন…”
(সূরা আন-নিসা: ৩৪)১২. বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানের বৈধতা ও উত্তরাধিকার অধিকার
গণতন্ত্রে: “Illegitimate children” বা বিবাহ বহির্ভূত সন্তানের আইনি বৈধতা ও উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে। সন্তান পিতা-মাতার বিবাহ ছাড়া জন্ম নিলেও তাকে সমান অধিকার দেওয়া হচ্ছে।
ইসলামে: এ ধরনের সন্তান শরীয়তের দৃষ্টিতে পিতার নাম বা সম্পত্তিতে অধিকার পায় না। সমাজে জিনার দৃষ্টান্ত বন্ধ করতে ইসলাম এ বিধান দিয়েছে।
রাসূল ﷺ বলেন:
الْوَلَدُ لِلْفِرَاشِ وَلِلْعَاهِرِ الْحَجَرُ
“শয্যা (বিবাহিত সম্পর্ক) সন্তানের জন্য, আর ব্যভিচারীর জন্য পাথর (শাস্তি)।” (সহীহ বুখারী: ৬৭৭২)১৩. ‘প্রাইড মান্থ‘ ও LGBTQ+ শিক্ষাকে স্কুলে বাধ্যতামূলক করা
গণতন্ত্রে: যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপসহ বহু দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শিশুদের “gender identity”, “same-sex family” বা “drag queen story hour” ইত্যাদি শেখানো হয়। মুসলিম পরিবারের শিশুরাও এসব পাঠে বাধ্য।
ইসলামে: এ ধরনের শিক্ষা বেহায়াপনায় উৎসাহ দেয় এবং শিশুদের ফিতরাহ নষ্ট করে।
রাসূল ﷺ বলেন:
كُلُّ وَلَدٍ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ
“প্রত্যেক নবজাতক ফিতরাহ (প্রাকৃতিক স্বভাব) অনুযায়ী জন্ম নেয়…” (সহীহ মুসলিম: ২৬৫৮)১৪. ধর্মীয় (Islamic) অনুভূতিকে আইনগতভাবে অপরাধ না ধরা
গণতন্ত্রে: যেকোনো ধর্মের উপাস্য, ধর্মীয় প্রতীক বা নবীকে ব্যঙ্গ করে কেউ “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা” দাবি করলে তা অনেক রাষ্ট্রে বৈধ। যেমন: ফ্রান্সে মুহাম্মদ ﷺ এর ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ।
ইসলামে: এটি স্পষ্ট কুফরি এবং ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
আল্লাহ বলেন:
وَإِذَا سَمِعُوا۟ مَا أُنزِلَ ٱللَّهُ يَسْتَہْزِئُونَ بِہِۦ فَلَا تَقْعُدْ مَعَهُمْ حَتَّىٰ يَخُوضُوا۟ فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِۦ ۚ إِنَّكَ إِذًا مِّثْلُهُمْ
“তারা যখন শুনে যে আল্লাহর আয়াত নিয়ে ঠাট্টা করা হচ্ছে, তখন তাদের সঙ্গে বসো না…”
(সূরা আন-নিসা: ১৪০)১৫. পর্দাহীনতা ও পোশাকের স্বাধীনতা আইন
গণতন্ত্রে: অনেক দেশে “freedom of dress” বা “bodily autonomy” নামক ধারণার আওতায় নারীরা যেকোনো ধরনের পোশাক পরতে পারে—even নগ্ন হওয়ার স্বাধীনতা দাবি করে। অনেক দেশে হিজাব নিষিদ্ধও করা হয়েছে (যেমন: ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড ইত্যাদি)।
ইসলামে: নারীদের জন্য নির্ধারিত পোশাকের নিয়ম রয়েছে। পর্দা করা ফরজ এবং বেহায়াপনা হারাম।
আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ…
“হে নবী! মুমিন নারীদের বলো যেন তারা তাদের জামার ওপর অতিরিক্ত চাদর (জিলবাব) পরিধান করে…” (সূরা আহযাব: ৫৯)১৬. পতিতাবৃত্তি (Prostitution) বৈধতা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ
গণতন্ত্রে: নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, থাইল্যান্ড, কানাডা প্রভৃতি দেশে যৌনকর্ম (sex work) আইনি ও করযোগ্য পেশা হিসেবে বিবেচিত।বাংলাদেশের মতো একটি মুসলিম দেশেও আইন দ্বারা যৌনকর্ম বৈধ করা হয়েছে এবং সম্প্রতি সরকার ঘোষণা করেছে যে যৌনকর্মীদের সাধারণ শ্রমিকের মতোই ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
ইসলামে: এটি জঘন্য হারাম। পতিতাবৃত্তির ব্যবসা করা, পরিচালনা করা কিংবা অনুমোদন দেওয়া সবই কবিরা গুনাহ।
আল্লাহ বলেন:
وَلَا تُكْرِهُوا۟ فَتَيَٰتِكُمْ عَلَى ٱلْبِغَاءِ إِنْ أَرَدْنَ تَزْكِيَّهَاۥ وَٱلَّٰهُ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًۭا
“আর তোমরা তোমাদের দাসীদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করো না, যদি তারা পবিত্র থাকতে চায়…”
(সূরা নূর: ৩৩)১৭. কুকুর ও শূকরের মাংস খাওয়ার আইনগত বৈধতা
গণতন্ত্রে: পশ্চিমা অনেক দেশে কুকুর, শূকর বা যেকোনো প্রাণীর মাংস খাওয়া বৈধ এবং তা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রয় করা হয়।
ইসলামে: শূকর ও মৃত পশুর মাংস হারাম। কুকুর ও অপবিত্র বলে বিবেচিত।
আল্লাহ বলেন:
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ …
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের মাংস…” (সূরা আল-মায়িদা: ৩)১৮. পিতৃ-মাতৃ পরিচয় নির্ধারণে “মায়ের নাম” কিংবা “নিরপেক্ষ পরিচয়” ব্যবহারের প্রচলন
গণতন্ত্রে: কিছু রাষ্ট্রে (যেমন: সুইডেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া) শিশুদের শুধু “guardian” হিসেবে মা বা অন্য কেউ নির্বাচন করতে পারে, এবং সন্তানের “father” পরিচয় আইনি ভিত্তিতে প্রয়োজন হয় না।
ইসলামে: সন্তান পিতার নামেই পরিচিত হবে; মিথ্যা পরিচয় কিয়ামতের দিনে গোনাহর কারণ হবে।
রাসূল ﷺ বলেন:
عَرَّفُوا أَنفُسَكُمْ بِأَبَوَاتِكُمْ فَإِنَّهُ أَحَقُّ بِأَنْ يَعْرِفَكُمْ اللَّهُ
“তোমরা নিজেদেরকে নিজেদের পিতার নামে পরিচিত করো, কেননা এটি আল্লাহর কাছে অধিক ন্যায়সঙ্গত।” (সহীহ বুখারী: ৩৫১০)১৯. সমকামিতাকে উৎসাহ দেওয়া ও ‘গর্ভধারণে সক্ষম পুরুষ’ তত্ত্ব
গণতন্ত্রে: পশ্চিমা অনেক দেশে এমন শিক্ষা চালু হয়েছে যে, পুরুষ ও সন্তান ধারণ করতে পারে (যদি সে নিজেকে নারী হিসেবে দাবি করে)। এছাড়া “pregnant man emoji” ও “trans men birthing” কে সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।
ইসলামে: এগুলো ফিতরাহ বিরোধী এবং জাহিলিয়াত যুগের চেয়েও নিচু স্তরের কুফরি।
রাসূল ﷺ বলেন:
مَنْ جَامَعَ ذَكَرًا فِي نَفْسِ الذَّكَرِ نَزَلَ عَلَيْهِ غَضَبُ اللَّهِ
“পুরুষরা যখন পুরুষের সঙ্গে এবং নারীরা নারীর সঙ্গে যৌন সঙ্গম করে, তখন আল্লাহর গজব নেমে আসে।” — (মুসনাদে আহমদ)২০. ইসলাম বিদ্বেষমূলক কার্টুন বা চিত্র প্রদর্শনের স্বাধীনতা (Blasphemy Laws Exemption)
গণতন্ত্রে: ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফ্রান্স ও সুইডেনে ইসলামবিদ্বেষী ব্যঙ্গচিত্র আঁকা “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা” হিসেবে বৈধ। এমনকি এই কার্টুনগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রদর্শন করা হয়েছে।
ইসলামে: এটি মহানবী ﷺ এর অবমাননা এবং স্পষ্ট কুফরি। মুসলিমদের জন্য তা সহ্য করা বা এই ব্যাপারে উদাসীন থাকা হারাম।
আল্লাহ বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مُّهِينًا
“যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, তাদের উপর দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর লা’নত আছে।” (সূরা আহযাব: ৫৭)নির্বাচন ব্যবস্থাকে গণতন্ত্র নামে মুসলিম উম্মাহকে বিভ্রান্ত করা:
আজকের মুসলিম সমাজে গণতন্ত্রকে ইসলামের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হয়েছে। ভোট, নির্বাচন, গণমত—এইসব শব্দকে ইসলামী মূল্যবোধ বলে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। নির্বাচন ব্যবস্থা নিজে গণতন্ত্র নয়; বরং এটি গণতন্ত্রে পৌঁছানোর একটি মাধ্যম মাত্র। যে কোনো শাসন ব্যবস্থাই তাদের নেতা বা শাসক বাছাইয়ের জন্য নির্বাচন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। গণতন্ত্র, সাম্যবাদ এমনকি ইসলামী শাসন ব্যবস্থাতে ও নির্বাচন একটি পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই ‘নির্বাচন মানেই গণতন্ত্র’—এমন বলা চরম অজ্ঞতার পরিচায়ক। বাস্তবে, গণতন্ত্র এমন একটি ব্যবস্থা যা মানুষকে আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে নিজেদের তৈরি আইনের অধীনে পরিচালিত করে। এটি কেবল অজ্ঞতা নয়, বরং এক বিপজ্জনক বিপথগামিতা।
পরিশেষে একথা বলা যায় যে, গণতন্ত্র একটি কুফরী শাসনব্যবস্থা। এটি এ কারণে নয় যে, এটি মানুষকে শাসক নির্বাচনের ক্ষমতা দেয়। কারণ এটি প্রকৃত অর্থে মূল আলোচ্য বিষয়ও নয়। বরং, এটি এ কারণে যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হলো মানুষের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা, স্বাধীনতা (Freedom) এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব।
খিলাফাহ একটি আদর্শ শাসনব্যবস্থা
খিলাফাহ: সংজ্ঞা ও ভিত্তি
খিলাফাহ বলতে বোঝায় একটি ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যার নেতৃত্ব দেয় একজন খলীফা। এই খলীফা নিযুক্ত হন মুসলিম উম্মাহর বাই‘আত বা আনুগত্যের মাধ্যমে। খলীফা নিজে আইনপ্রণেতা নন; বরং তিনি আল্লাহর আইন—কুরআন, হাদীস, ইজমা ও কিয়াস—অনুযায়ী শাসন পরিচালনা করেন।
আল্লাহ তা’আলা রাসূল (সা.)-কে মানুষের মাঝে তাঁর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করার নির্দেশ দিয়েছেন:
فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ…
“অতএব, তাদের মধ্যে বিচার করো আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা দ্বারা এবং তাদের খেয়ালখুশির অনুসরণ করো না, যা তোমার কাছে সত্য এসেছে তা থেকে বিচ্যুত হয়ে…” [সূরা মায়েদাহ: ৪৮]। “আর তাদের মধ্যে বিচার করো আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা দ্বারা এবং তাদের খেয়ালখুশির অনুসরণ করো না, আর তাদের থেকে সতর্ক থাকো যেন তারা তোমাকে আল্লাহর নাযিলকৃত কোনো কিছু থেকে বিচ্যুত করতে না পারে।” [সূরা মায়েদাহ: ৪৯]।
“যারা আল্লাহর অবতীর্ণ বিধানের আলোকে বিচার করে না, তারা কাফের।” (সূরা মায়েদা: ৪৪)
এই নির্দেশগুলো উম্মতের জন্যও প্রযোজ্য, যা শরিয়া বাস্তবায়নের জন্য খলিফার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে, কারণ শরিয়া বাস্তবায়ন একজন ক্ষমতাসীন শাসক ছাড়া সম্ভব নয়।
(من مات وليس في عنقه بيعة مات ميتة جاهلية)
“যে ব্যক্তি বাইয়াত ছাড়া মারা যায়, সে জাহিলিয়াতের মৃত্যু বরণ করে”আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি আনুগত্য থেকে হাত গুটিয়ে নেয়, সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে যে, তার জন্য কোনো যুক্তি থাকবে না। আর যে ব্যক্তি বাইয়াত ছাড়া মারা যায়, সে জাহিলিয়াতের মৃত্যু বরণ করে।” [সহীহ মুসলিম ১৮৫১, মিশকাতুল মাসাবীহ ৩৬৭৪, সহীহাহ ৯৮৪, সহীহ আল জামি’ ৬২২৯]।
এই হাদিসটি মুসলিম উম্মাহর জন্য একজন স্বীকৃত ইমাম বা খলিফার বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) এর আবশ্যকতা নির্দেশ করে। জাহিলিয়াতের মৃত্যু বলতে ইসলামী নেতৃত্ববিহীন অবস্থায় মৃত্যুকে বোঝায়, যা অত্যন্ত গুরুতর। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, মুসলিমদের জন্য একটি সুসংগঠিত ও স্বীকৃত নেতৃত্বের অধীনে থাকা অপরিহার্য, যা তাদের বিশৃঙ্খলা ও অনৈসলামিক জীবনযাত্রা থেকে রক্ষা করে । বাইয়াত ছাড়া মৃত্যুবরণকে জাহিলিয়াতের মৃত্যুর সাথে তুলনা করা একটি গুরুতর সতর্কবাণী। জাহিলিয়াত হলো বিশৃঙ্খলা, আইনহীনতা এবং ঐশী নির্দেশনার অনুপস্থিতির একটি অবস্থা। যদি বাইয়াত ছাড়া মৃত্যুবরণ এই অবস্থার সমতুল্য হয়, তবে এর অর্থ হলো একজন মুসলিমের জন্য ইসলামী অবস্থায়, সঠিক নির্দেশনা ও শৃঙ্খলার অধীনে মৃত্যুবরণ করতে হলে বাইয়াত (এবং যার কাছে বাইয়াত করা হয়, সেই ইমাম/খলিফা) অপরিহার্য। এটি খিলাফতের আবশ্যকতাকে একটি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার স্তরে উন্নীত করে, যা প্রতিটি মুসলিমের আধ্যাত্মিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে।
“ইমাম ঢালস্বরূপ” (إنما الإمام جنة)
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “ইমাম তো ঢালস্বরূপ, যার পিছনে যুদ্ধ করা হয় এবং যার দ্বারা আত্মরক্ষা করা হয়। যদি তিনি আল্লাহর তাকওয়া অনুযায়ী আদেশ করেন এবং ন্যায়বিচার করেন, তবে এর জন্য তিনি পুরস্কার পাবেন। আর যদি এর বিপরীত করেন, তবে তার উপর এর দায়ভার বর্তাবে।” [সহীহ মুসলিম ১৮৫৯, সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী) ৪৬৮৭ [১৮৫১], সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ইমারাহ]।
এই হাদিসটি ইমাম বা খলিফার অপরিহার্য ভূমিকা তুলে ধরে। তিনি মুসলিম উম্মাহর নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা এবং শরিয়া বাস্তবায়নের জন্য ঢালস্বরূপ। ঢাল যুদ্ধের সময় সুরক্ষা এবং সংহতি বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। এর অনুপস্থিতি দুর্বলতা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, খিলাফত কেবল একটি কাঙ্ক্ষিত ব্যবস্থা নয়, বরং মুসলিম সম্প্রদায়ের শারীরিক ও আধ্যাত্মিক সুস্থতার জন্য একটি অত্যাবশ্যক, অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান, যা ছাড়া তারা অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় প্রকার হুমকির মুখে পড়ে। এটি খিলাফতের বাস্তব প্রয়োজনীয়তাকে ধর্মীয় আবশ্যকতায় রূপান্তরিত করে ।
“আমার পরে বহু খলিফা হবে” (وسيكون خلفاء فيكثرون)
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “বনী ইসরাঈলকে নবীরা শাসন করতেন। যখন একজন নবী মারা যেতেন, আরেকজন তার স্থলাভিষিক্ত হতেন। আমার পরে কোনো নবী নেই, তবে খলিফা হবে এবং তারা অনেক হবে।” সাহাবারা জিজ্ঞাসা করলেন: “আপনি আমাদেরকে কী নির্দেশ দেন?” তিনি বললেন: “প্রথমজনের পর প্রথমজনের বাইয়াত পূর্ণ করবে, তাদের অধিকার দেবে। কেননা আল্লাহ তাদেরকে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন।” [সহীহ বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া, অধ্যায়: বনী ইসরাঈল, হাদিস ৩২৬৮]।
এই হাদিসটি রাসূল (সা.)-এর পরে খিলাফতের ধারাবাহিকতা এবং বহু খলিফার আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করে। এর দ্বারা বোঝা যায় যে খিলাফত একটি চলমান প্রতিষ্ঠান যা খোলাফায়ে রাশেদীনের পরেও টিকে থাকবে। “বহু খলিফা হবে” এবং “প্রথমজনের পর প্রথমজনের বাইয়াত পূর্ণ করবে” এই নির্দেশনাবলী নেতৃত্বের একটি ধারাবাহিক শৃঙ্খলার ধারণাটিকে আরও শক্তিশালী করে। এটি এই ধারণাকে খণ্ডন করে যে খিলাফত একটি অস্থায়ী ঘটনা ছিল যা কেবল প্রাথমিক ইসলামী সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এটি উম্মাহর মধ্যে নেতৃত্বের একটি চিরন্তন প্রয়োজনীয়তাকে নির্দেশ করে, এমনকি যদি সেই শাসনের প্রকৃতি নবুয়তি পদ্ধতির মতো আদর্শ নাও হয়।
কোনটি আদর্শ শাসনব্যবস্থা?
উপরের দীর্ঘ আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, খিলাফাহ একটি শাসন ব্যবস্থা হিসেবে কুরআন ও রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। এটি কেবল আদর্শ শাসন ব্যবস্থাই নয়, বরং প্রতিটি মুসলিমের জন্য খিলাফাহর অধীনে জীবন যাপন করা ফরজ বা আবশ্যিক।
খিলাফাহ এমন একটি শাসনব্যবস্থা যা কেবল মুসলিমদের জন্য নয়, অমুসলিমদের জন্যও ন্যায়, নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। অপরদিকে, গণতন্ত্র অনেক সময় সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনে সংখ্যালঘুদের অধিকার হরণ করে। তদুপরি, এর ভিত্তিই মানুষের ইচ্ছা—যা পরিবর্তনশীল, সীমাহীন এবং কখনো কখনো চরম অবিচারপ্রবণ।
সিদ্ধান্ত:
গণতন্ত্র মানুষকে আইন প্রণয়নের অধিকার দেয়, ফলে মানবীয় সীমাবদ্ধতা ও খেয়াল-খুশির ভিত্তিতে বহু আইন শরীয়াহর বিরুদ্ধে গঠিত হয়।গণতন্ত্র একটি কুফরী ভিত্তিক, মানবসৃষ্ট ও পরিবর্তনশীল শাসনব্যবস্থা যা শরীয়াহর মৌলিক ধারণার বিপরীত।
বিপরীতে, খিলাফাহ শাসনব্যবস্থা একমাত্র আল্লাহর বিধানকে চূড়ান্ত আইন হিসেবে গ্রহণ করে, যা মানুষ ও সমাজ উভয়ের কল্যাণ নিশ্চিত করে।খিলাফাহ একটি স্বতন্ত্র, আল্লাহ-নির্ধারিত শাসনব্যবস্থা যা ন্যায়, হেদায়াত এবং মানবকল্যাণের প্রকৃত মানদণ্ড।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَعَمِلُوا۟ ٱلصَّـٰلِحَـٰتِ كَفَّرَ عَنْهُمْ سَيِّـَٰٔتِهِمْ وَأَجْرَهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ ۚ وَكَانَ رَبُّهُمْ غَفُورًا رَّحِيمًا
“যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, আল্লাহ তাদের পাপ ক্ষমা করবেন এবং তাদের জন্য তার পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান প্রস্তুত আছে; কারণ তিনি দয়ালু ও করুণাময়।” (সূরা নূর: ৫৫)وَعْدَ ٱللَّهِ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ مِنكُمْ وَعَمِلُوا۟ ٱلصَّـٰلِحَـٰتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُم فِي ٱلْأَرْضِ كَمَا ٱسْتَخْلَفَ ٱلَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ ٱلَّذِي ٱرْتَضَىٰ لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّنۢ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا ۚ يَعْبُدُونَنِى لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْـًٔا
“আল্লাহ ওয়াদা করেছেন তাদের প্রতি যারা তোমাদের মধ্যে ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, যে তিনি অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে খিলাফত দান করবেন, যেমন তিনি পূর্ববর্তী জাতিগুলোকেও দান করেছিলেন। তিনি তাদের দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করবেন, যা তিনি মুমিনদের জন্য পছন্দ করেছেন, এবং তাদের ভয়কে পরিবর্তে শান্তি দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরিক করবে না।” (সূরা নূর: ৫৬)গণতন্ত্র ইসলামি শরিয়াহ আইনকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে এবং এর অবস্থান ইসলামের বিরুদ্ধে। সুতরাং একজন মুসলিম গণতন্ত্রকে সমর্থন করতে পারে না; বরং তাদের উচিত শাসনব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্রকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করা।
হে আল্লাহ, আমাদেরকে সত্য বুঝার তৌফিক দান করো এবং ইসলামকে পরিপূর্ন দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করবার দৃঢ় ঈমান দান করো, আমীন।
আল্লাহ’র ইচ্ছায় সমাপ্ত
ইসলাম কি আসলেই একটি মৌলবাদ?

১৯ শতকের শেষের দিকে সর্বপ্রথম ইউরোপে “মৌলবাদ” শব্দটির আবির্ভাব ঘটে। এটি তখন সাধারণত নব বিজ্ঞান ও দর্শনের বিরুদ্ধে চার্চের দৃষ্টিভঙ্গি এবং খৃষ্টান বিশ্বাসের প্রতি গোঁড়া আনুগত্যকে বোঝাতে ব্যবহৃত হতো।
প্রোটেস্টেন্ট আন্দোলনকে মৌলবাদের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই মতবাদের মৌলিক নীতিমালা ১৮৭৮ সালের নায়াগ্রা কনফারেন্স এবং ১৯১০ সালে অনুষ্ঠিত জেনারেল প্রিসবিটারিয়ান সম্মেলনে চূড়ান্ত করা হয়। তারা এমন কিছু খ্রিস্ট-মতাদর্শের ভিত্তিতে নিজেদের নীতি নির্ধারণ করে, যেগুলো সুস্পষ্টত জীবন থেকে ধর্মকে আলাদা করার পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত পুঁজিবাদীদের তথাকথিত বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রার পথে অন্তরায় ছিল।
যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই মতবাদ বিলীন হয়ে যায়, তথাপি ইউরোপীয়দের বদ্ধমূল ধারণা হচ্ছে উন্নতি এবং অগ্রযাত্রার পথে মৌলবাদ অন্যতম বাধা। এটিকে বুদ্ধিবৃত্তিক পশ্চাৎপদতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা নবজাগরণের যুগে বেমানান। এবং তারা ব্রত করে নেয় যে, এর প্রভাব সমাজ ও ব্যক্তি জীবন থেকে দূর করতে শক্তভাবে লড়াই করতে হবে।
খ্রিস্ট ধর্মকে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার ফলে বিজ্ঞান ও শৈল্পিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াস্বরূপ এই মতবাদ আবির্ভূত হয়। পুঁজিবাদ এবং ধর্মকে জীবন থেকে আলাদা করার এই নব জীবনধারার সাথে খ্রিস্ট ধর্মের সমন্বয়হীনতা দূর করতে এই মতবাদ সামনে আসে। এটি খ্রিস্ট ধর্ম অনুসারীদের বস্তুগত উন্নতি এবং পুঁজিবাদী সংস্কৃতির বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। এই মৌলবাদ আন্দোলন ব্যর্থ হয়। মানুষের জীবনের বিভিন্ন সমস্যার বাস্তবমুখী সমাধান দিতে না পারায় এটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এ ছাড়া বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো এবং খ্রিস্টানদের কাছে অগ্রহণযোগ্য কিছু নীতিমালা তৈরি করার কারণে এই আন্দোলন সফলতার মুখ দেখেনি।
ইয়াহুদি ও খৃষ্টানদের আন্দোলনকে মৌলবাদ বলার মূল ক্রীড়নক হচ্ছে পশ্চিমারা। পুঁজিবাদী মতবাদ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষিতে সাধিত প্রযুক্তিগত, শৈল্পিক এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন অগ্রগতিকে প্রশ্ন করলেই এটিকে ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
তাই তো দেখা যায়, বিভিন্ন ইসলামি আন্দোলন এবং মুসলমানদের সংশ্লিষ্ট কোনো সংগঠনকে পশ্চিমা রাষ্ট্র-চিন্তক, রাজনীতিবিদ আর তাদের পদলেহনকারী কিছু নামধারী মুসলমানেরা মৌলবাদের ধোঁয়া তুলে তাদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক জনমত গড়ে তোলে। কারণ তাদের দৃষ্টিতে মৌলবাদ মানে পশ্চাৎপদতা এবং প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ করা। আর এটি বিজ্ঞান ও শৈল্পিক অগ্রগতির পথে অন্তরায়।
কোনো নির্দিষ্ট দল বা আন্দোলনকে সেরেফ মৌলবাদী আখ্যা দেওয়াই এটিকে আধুনিক বস্তুবাদী সমাজ আর মানুষের সামনে ভয়ংকরভাবে উপস্থাপন করার জন্য যথেষ্ট। মিসর কিংবা আলজেরিয়ার মতো রাষ্ট্র যদি কোনো মুসলমানকে মৌলবাদী আখ্যা দিয়ে হত্যা করে, তখন পশ্চিমা সুশীল সমাজ এটিকে স্বাগত জানায় এবং নিজেদের সমর্থন ব্যক্ত করে। তখন কোনো মানবাধিকার সংগঠন এই মৃত্যুদণ্ড নিয়ে কথা বলে না। কারণ নিহত ব্যক্তি তাদের ভাষায় মৌলবাদী। সবাই তাদেরকে মানবতার শত্রু হিসেবে ঘৃণার নজরে দেখে। বিশেষ করে যখন তাদের বিরুদ্ধে খুবই জঘন্য অভিযোগ আরোপ করা হয়। যেমন: আলজেরিয়ার নিরীহ মানুষ হত্যা এবং মিসরে পর্যটক হত্যার জন্য তারা দায়ী।
ইসলামের খিলাফত ও শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলমানদের বর্তমান দুর্বিষহ জীবনকে ইসলামী জীবনে পরিবর্তন করতে যারা কাজ করে, এমন প্রতিটি আন্দোলন ও দলকে মৌলবাদী আখ্যা দিয়ে মৌলবাদ শব্দটিকে বর্তমানে এর মূল টার্ম থেকে বিচ্যুত করা হয়েছে।
ইয়াহুদি, সার্বিয়ান, আমেরিকা এবং অন্যান্য নিপীড়ক ও মুসলমানদের ভূমি অন্যায়ভাবে দখলকারীদের বিরুদ্ধে চলমান সকল আন্দোলনকেও এভাবে মৌলবাদী আখ্যা দিয়ে দমনের চেষ্টা করা হয়। তাদের ভাষায় মুসলিম যোদ্ধা, যারা নিজেদের ভূমি দখলকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তারা মৌলবাদী এবং সন্ত্রাসী। বিদেশি দখলবাজ সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়ে যারা শাহাদাত বরণ করেছে, তাদের ভাষায় তারাও আত্মঘাতী ও সন্ত্রাসী। প্রত্যেক মুসলমান এবং অন্যায় ও দখলদারত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী প্রতিটি দলের জন্য এই ট্যাগ বিপজ্জনক।
ইসলামি জীবনবিধান পুনরুদ্ধারের জন্য শরিয়ার নিরিখে কাজ করে এমন প্রতিটি দলের জন্য বিষয়টি উদ্বেগজনক। এই বয়ান দাঁড় করিয়ে মৌলবাদী তকমা ব্যবহার করে তারা পুঁজিবাদী রেনেসাঁর যুগে শিল্প ও বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী ইয়াহুদি ও খ্রিস্টান মৌলবাদীদের মতো মুসলমানদের বিরুদ্ধে আক্রমণের জন্য বৈধ ন্যায্যতা তৈরির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। ইসলামি বিভিন্ন আন্দোলনকে এই মৌলবাদ ট্যাগ দেওয়ার মূল কারণ হচ্ছে, পশ্চিমা সমাজে এই টার্মটির ঐতিহাসিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। মৌলবাদ শব্দটির কারণে পশ্চিমা লোকেরা জীবনবিধান হিসেবে রাজনৈতিক ইসলামকে রুখে দিতে তাদের শাসকের পক্ষে এসে দাঁড়াবে।
কোনো মুসলমানের এমনটি ভাবা উচিত নয় যে, দ্বীনের মূল ভিত্তি অথবা ফিকহি বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি অনুরক্ত থাকার কারণে ইসলামি আন্দোলনকে মৌলবাদ আখ্যা দেওয়া হয়। ইসলামি আকীদার মূল ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহ তা’আলা, ফেরেশতা, ঐশী গ্রন্থসমূহ, নবী-রাসুলগণ, বিচার দিবস এবং তাকদীরের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। বিভিন্ন ফিকহি নীতিমালার মৌলিক বিষয় হচ্ছে, বিভিন্ন দলিল ও প্রমাণ, যেগুলোর ওপর গবেষণা করে মুজতাহিদ (স্কলার) আলেমগণ ব্যবহারিক শর’ঈ আইন প্রণয়ন করেছেন।
পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে মৌলবাদ প্রোটেস্টেন্ট খৃষ্টান সমাজ কর্তৃক পরিচালিত একটি আন্দোলন। যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই আন্দোলন গড়ে ওঠেছে, ইসলামি মূল্যবোধ বা ইসলামি আন্দোলনের সাথে এর সমসাময়িক কিংবা ঐতিহাসিক কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
ইসলামের ইতিহাসে রাজনৈতিক আন্দোলন, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আইনি বিভিন্ন স্কুল অব থট সৃষ্টি হয়েছে। এগুলো কোনোভাবেই খৃষ্টানদের মৌলবাদ মতাদর্শের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এমনকি হিজরি সপ্তম শতাব্দীতে ‘ইজতিহাদ’ (শর’ঈ কোনো মাসআলা নিয়ে গবেষণা করা) এর রাস্তা এই জন্য বন্ধ করা হয়নি যে, উলামায়ে কিরাম পুরোনো নীতিমালাকে আঁকড়ে ধরতে চায় আর নতুন নীতিমালা প্রত্যাখ্যান করতে চায়। বরং তারা ধরে নিয়েছিলেন যে, ইসলামি ফিক্বহ নিয়ে যত সমস্যা আছে, সব সালাফদের মাধ্যমে সমাধা হয়ে গিয়েছে। সুতরাং এখানে নতুন কোনো গবেষণার আর প্রয়োজন নেই।
ইসলাম অন্যান্য ধর্ম থেকে এই ভিত্তিতে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম যে, এটিই চূড়ান্ত ধর্ম এবং এর পূর্বে আগত সকল ধর্মকে রহিতকারী। আল্লাহ তা’আলা এটিকে কিয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত সংরক্ষণ করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّا نَحْنُ نَزَلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهَ لَحَفِظُوْنَ
নিশ্চয় আমি কুরআন নাজিল করেছি এবং আমিই এর হিফাজত করব। [সুরা হিজর, আয়াত ৯]
এটি মানুষের মনস্তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তৃত মতবাদ। যেখান থেকে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত আগত মানুষের যাবতীয় বিষয়ের সমাধানে একটি বিস্তৃত ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে। এটি একটি অকল্পনীয় বিষয় যে, এই আদর্শ মানুষের কোনো সমস্যার সমাধান প্রদান করতে পারবে না। এটি বরং সকল সমস্যার সমাধান প্রদান করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَبَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ
আমি আপনার প্রতি কিতাব নাজিল করেছি, যা প্রত্যেক বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা। [সুরা নাহল, আয়াত ৮৯]
অতীতে মুসলিম বিশ্ব যে বৈজ্ঞানিক এবং শৈল্পিক উন্নতির মধ্য দিয়ে গিয়েছে, এটি ছিল ইসলামের ব্যাপক ভূমিকার ফল। জীবন থেকে ইসলামকে বিচ্ছিন্ন করে এটি সম্ভব হতো না। আজকের যুগেও মানুষ বিজ্ঞান ও শিল্পের যে উৎকর্ষতা দেখতে পাচ্ছে, এর পেছনে পূর্বেকার সেসব মুসলিম বিজ্ঞানীদের থিওরি এবং নীতিশাস্ত্রের অনেক প্রভাব রয়েছে, যারা ইসলামি জীবনধারা এবং ইসলামি রাষ্ট্রের ছায়ায় বসবাস করে এসব কাজ করেছেন।
তাই খৃষ্টানদের আন্দোলনের সাথে সাদৃশ্য টেনে বিভিন্ন ইসলামি আন্দোলনকে মৌলবাদ আখ্যা দেওয়া চরম ভুল এবং পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা। এটি ইসলাম কিংবা যারা ইসলামকে প্রাণবন্ত করে তুলতে কাজ করে, তাদের প্রকৃত বাস্তবতা নয়। কারণ তারা শুধু মানবসৃষ্ট সিস্টেমের দুঃশাসনের কারণে মুসলমানদের জীবনে আগত এই দুর্বিষহ অবস্থা দূর করতে চায়। যেটি সুস্পষ্টত খৃষ্টান মৌলবাদের বিপরীত। তারা মূলত পুঁজিবাদের উত্থানের পূর্বে যে ভোগবাদী জীবন নিয়ে মেতেছিল, সেটি আবার ফেরত পেতে চাচ্ছিল।
সুতরাং বিভিন্ন ইসলামি আন্দোলনকে পশ্চিমা সমাজ কর্তৃক মৌলবাদ আখ্যা দেওয়া স্পষ্টতই এই বিষয়টি নির্দেশ করে যে, তারা পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে ইসলামের প্রত্যাবর্তনের বিপক্ষে পরোক্ষ যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।
এটি পশ্চিমাদের জন্য একটি কৌশলগত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। তারা তৃতীয় বিশ্ব-বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বকে যে কোনো ধরনের সত্যিকার রেনেসাঁ থেকে পেছনে এবং দূরে সরিয়ে রাখতে চায়। এটি খিলাফত প্রতিষ্ঠা রুখে দেওয়ার অপচেষ্টা। কারণ তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, খিলাফাহ তাদের এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা উপড়ে ফেলবে এবং তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা আর লোভের ইতি ঘটাবে।
তাদেরই একজন ব্যক্তির সাক্ষ্য শুনুন। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য স্টাডিজের ভিজিটিং স্কলার। তিনি মার্কিন কংগ্রেসে একটি রিপোর্ট জমা দেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ‘মৌলবাদীরা মনে করে, শরীয়া আইন অবশ্যই পূর্ণাঙ্গভাবে প্রয়োগ করা উচিত এবং আল্লাহ তা’আলার আদেশ-নিষেধ অবশ্যই পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হতে হবে। আর এই নীতিমালা সকল মুসলমানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। ইসলাম তাদের চালিকাশক্তির প্রাথমিক উৎস। আর শরিয়া আইন পূর্বেও যেভাবে প্রয়োগ উপযোগী ছিল, আজও এর উপযোগিতা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মৌলবাদীরা পশ্চিমা সভ্যতাকে অত্যন্ত ঘৃণার নজরে দেখে। ইসলামি আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তারা পশ্চিমা সভ্যতাকে পথের কাটা মনে করে।’
আমেরিকান স্কলার জন এসপজিটো মার্কিন কংগ্রেসে জমা দেওয়া রিপোর্টে উল্লেখ করেন, ‘মুসলিম মৌলবাদী গোষ্ঠী আমেরিকার স্বার্থের জন্য মারাত্মক হুমকি।’
সুতরাং কাফিররা মূলত মৌলবাদের নামে জীবনে ইসলামের আইন পুনঃপ্রয়োগের আন্দোলনকে আক্রমণ করছে। এটা যদি মৌলবাদ হয়, তাহলে তাদের দৃষ্টিতে সকল মুসলমান মৌলবাদী। কারণ সকল মুসলমান অধীর আগ্রহ ও উৎফুল্লতার সাথে খিলাফতের ছায়ায় ইসলামের সকল বিধান পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা, এই বিশ্বকে পুঁজিবাদের থাবা থেকে মুক্ত করা এবং সবাইকে ইসলামের গৌরবান্বিত সোনালি যুগে ফিরিয়ে নিতে অপেক্ষা করছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ وَهُوَ يُدْعَى إِلَى الْإِسْلَامُ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّلِمِينَ * يُرِيدُونَ لِيُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَاللَّهُ مُتِمُّ نُوْرِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْكَفِرُونَ
যে ইসলামের আহ্বান পেয়েছে, তারপরও সে আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যারোপ করে, তার চেয়ে বড় জালিম আর কে? আল্লাহ জালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত দেন না। তারা ফুঁ দিয়ে আল্লাহর নুর নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তো তাঁর নুর পরিপূর্ণ উদ্ভাসিত করবেন, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে। [সুরা সফ, আয়াত ৭-৮]
Taken from the book “Dangerous Concepts”
Translated by “Sabah Publication”অনুন্নত দেশের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, মেধা পাচার ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা

খবর:
বিএসসি প্রকৌশলীদের প্রতি বৈষম্য নিরসনের তিন দফা দাবিতে চট্টগ্রামে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন চুয়েট, চবি, আইআইইউসি সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শনিবার (৫ জুলাই) বিকাল ৪টায় নগরীর ২ নং গেইট এলাকায় তারা এই প্রতিবাদ সমাবেশ পালন করেন।
এ সময় বিক্ষোভ মিছিলে হাজারো শিক্ষার্থীদের ‘আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’; ‘কোটা না মেধা, মেধা, মেধা’; ‘কোটার নামে বৈষম্য, চলবে না, চলবে না’; ‘এই মুহূর্তে দরকার, কোটাপ্রথার সংস্কার’ প্রভৃতি স্লোগান দিতে দেখা যায়।
২ নং গেইট থেকে শুরু হয়ে জিইসি মোড় ঘুরে আবার উৎপত্তিস্থলে ফেরত আসে মিছিলটি। এরপর অনুষ্ঠিত সমাবেশে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবিতে বক্তব্য দেয়া শুরু করেন। এ সময় তারা তাদের পূর্বে উত্থাপিত তিন দফা দাবি তুলে ধরেন— প্রকৌশল নবম গ্রেডে সহকারী প্রকৌশলী বা সমমান পদে প্রবেশের জন্য সবাইকে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়া এবং বিএসসি ডিগ্রিধারী হওয়া, কারিগরি দশম গ্রেডে উপ-সহকারী প্রকৌশলী বা সমমান পদ সবার জন্য উন্মুক্ত করা এবং বিএসসি ডিগ্রীধারী ব্যতীত অন্য কেউ ‘প্রকৌশলী’ পদবি ব্যবহার করতে পারবে না মর্মে আইন পাশ করে গেজেট প্রকাশ করা। এই তিন দফা দাবি দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানান শিক্ষার্থীরা।
তাদের মতে, ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কারণে প্রকৌশল পেশায় বিএসসি ডিগ্রিধারীরা পদোন্নতি ও নিয়োগে ন্যায্যতা থেকে অনেকদিন ধরেই বঞ্চিত হয়ে আসছেন। দীর্ঘ ৪ বছর কঠিন পাঠ্যক্রম, ল্যাব, থিসিস ও প্রজেক্টের মধ্য দিয়ে পাস করা বিএসসি ডিগ্রিধারী প্রকৌশলীরা চাকরির বাজারে চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। সরকারি চাকরির দশম গ্রেডে একচেটিয়া শতভাগ ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ এবং নবম গ্রেডে পদোন্নতিতে ৩৩.৩ শতাংশ কোটা বরাদ্দ করা আছে ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের জন্য। অধিকন্তু নবম গ্রেডে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোটার ব্যবস্থা ৫০ শতাংশ করার অন্যায্য দাবিও জানিয়ে আসছিলেন তারা।
এ সময় প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলন এর যুগ্ম আহ্বায়ক শাকিল আহমাদ ইকবাল বলেন, ‘যেই কোটার জন্য আমাদের গত জুলাইয়ে আন্দোলন করতে হয়েছে, সেই কোটার জন্য এক বছর পর আবার আন্দোলনে নামতে হচ্ছে। ডিপ্লোমারা ১০ম গ্রেড সরাসরি নিজেদের করে নিয়েছে, এখন ৯ম গ্রেডে ৩৩% কোটার নামে অনেক জায়গায় ১০০% প্রমোশন নিয়ে নিচ্ছে। এভাবে কোটার মাধ্যমে কেউ বিশেষ সুবিধা পেতে পারে না।’
এই আন্দোলনের মুখ্য সংগঠক শাকিবুল হক লিপু বলেন, ‘ডিপ্লোমাদের বিএসসি সার্টিফিকেট নেই। এভাবে প্রকৌশলী না হয়েও তারা প্রকৌশলীদের জন্য বরাদ্দকৃত চাকরির পোস্টসমূহ নিয়ে নিচ্ছে। চার বছর কষ্ট করে, পরিশ্রম করে বিএসসি ডিগ্রী অর্জন করতে হয়। এরপর এমন বৈষম্য মেনে নেয়া যায় না। এভাবে চলতে পারে না। আমরা তাই আমাদের নিজেদের দাবি আদায়ে মাঠে নেমেছি।’
বিক্ষোভকারী চুয়েট শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন, ‘সমবাহু ত্রিভূজের ক্ষেত্রফল নির্ণয় শিখে এসে ডিপ্লোমারা প্রকৌশলের জন্য বরাদ্দকৃত পদ নিচ্ছে। এদিকে চার বছরে কঠিন কঠিন কোর্স শেষ করে আমরা চাকরিই পাচ্ছি না। আমাদেরকে আবেদন করা থেকেই বঞ্চিত করা হচ্ছে। বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করে সমমর্যাদার পদ বাগিয়ে নিচ্ছে। স্বাধীন বাংলায় এমন বৈষম্য মেনে নেয়া যায় না।’
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমান মোহাব্বত বলেন, ‘পেশিশক্তি ও লবিংয়ের মাধ্যমে অবৈধ পদোন্নতি পাচ্ছে ডিপ্লোমারা। নিয়ম ভেঙে পদ সৃষ্টি করা হচ্ছে। চরম মাত্রার অনিয়ম চলছে। এগুলোর প্রমাণও রয়েছে। এরকম করেও তারা পার পেয়ে যাচ্ছে। এমনটা হতে পারে না। সরকারের উচিত দ্রুত উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া। বৈষম্য দূর করা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সমাবেশ হচ্ছে। সবাই প্রকৌশলীই এই দাবির পক্ষে সোচ্চার।’
মন্তব্য:
দেশে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের প্রতি বৈষম্য যে হচ্ছে, সেটা অবশ্যই সত্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো,এই বৈষম্য দূর হলেই কি তারা তাদের প্রাপ্য সম্মান ও মূল্য পাবে? এই রাষ্ট্র কি এমন কোনো ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করেছে, যেখানে এই উচ্চশিক্ষিত ইঞ্জিনিয়াররা দেশের নিজস্ব ইন্ডাস্ট্রিতে দক্ষতা ও মেধা কাজে লাগাতে পারবে? আসলে, এই দেশে এমন কোনো শক্তিশালী শিল্পখাতই নেই, যেখানে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের নলেজ বা স্কিল প্রপারলি কাজে লাগবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই কাজ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার বা টেকনিশিয়ান দিয়েই চালানো সম্ভব।

বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীরা বিশ্বের নানা প্রান্তে গিয়েও বিশ্বমানের কাজ করছে গুগল, মাইক্রোসফট, আমাজন, স্পেসএক্স থেকে শুরু করে ইউরোপের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত। আমাদের ইঞ্জিনিয়াররা, সফটওয়্যার ডেভেলপাররা, ডাক্তাররা বিশ্বের বাজারে highly valued।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে এই সক্ষমতা আমরা নিজের দেশে ব্যবহার করতে পারছি না কেন? এই সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর মতো কোনো ভিশন আমাদের রাষ্ট্র দেয় না।
এখানে আসল সমস্যা ডিপ্লোমা বনাম বিএসসি নয়, আসল সমস্যা হচ্ছে এই রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিজেই একটা ভাঙা কাঠামো, যা কোনো বাস্তব ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠেনি।
এই কাঠামোটি গড়ে তোলা হয়েছে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার (Capitalism) শর্ত ও নির্দেশনা অনুযায়ী। পুঁজিবাদ এর প্রধান ধারক-বাহক পশ্চিমা দেশগুলা আমাদের শিক্ষিত, মেধাবী জনগোষ্ঠীকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। তারা আমাদের জন্য উন্নয়নের আশ্বাস দেয়, কিন্তু আসলে এমন একটি কাঠামো তৈরি করে রেখেছে যেখানে আমরা চিরকাল পরনির্ভরশীলই থেকে যাই।
এই সমস্যাগুলোর গোড়ায় আছে রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুসৃত দাসসুলভ পলিসি, যা আমাদের শিক্ষা, শিল্প, গবেষণা সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে পশ্চিমা কর্পোরেট ও সংস্থাগুলোর স্বার্থ অনুযায়ী। যেমন বিশ্বব্যাংক, IMF, WTO এরা আমাদের দেশের পলিসিতে এমন সব শর্ত দিয়ে থাকে, যাতে আমরা নিজস্ব শিল্প, প্রযুক্তি বা উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারি। স্থানীয় প্রোডাকশন ও রিসার্চ বন্ধ হয়ে যায়, আর আমাদের ইঞ্জিনিয়াররা হয় কাঁচামাল ও সস্তা শ্রমের যোগানদাতা। এর ফলে আমাদের দেশ থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী বিদেশে পাড়ি জমায় উচ্চশিক্ষা, ভালো চাকরি কিংবা স্থায়ীভাবে বসবাসের আশায়। পাবলিক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা দেশের জনগনের ট্যাক্স এর টাকায় পড়ে ৭০-৮০% বিদেশি কোম্পানির শ্রমিকে পরিণত হয়।
আমরা যারা এই সিস্টেমের ভুক্তভোগী, তারা নিজেদের মধ্যেই একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী বানিয়ে ফেলেছি, বিএসসি বনাম ডিপ্লোমা, পাবলিক বনাম প্রাইভেট, গ্রেড-ভিত্তিক দ্বন্দ্ব। অথচ, এই বিভক্তি তৈরি করেছে সেই সিস্টেম, যারা চায় আমরা বিভক্ত থাকি, যেন মূল শত্রুর দিকে কেউ আঙুল না তোলে।
এই কাঠামো আমাদের দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করে না, বরং আমাদের দারিদ্র্যই টিকিয়ে রাখে, যাতে পশ্চিমা কোম্পানিগুলো সস্তায় পণ্য তৈরি ও মেধা ব্যবহার করতে পারে। এটা শুধু অর্থনৈতিক শোষণ নয়, এটা আদর্শিক, কাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক দাসত্ব।
এই বাস্তবতা বদলাতে হলে প্রয়োজন এই পুজিবাদী সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করা। একটা দুইটা আইন পরিবর্তন করলেই হবে না। প্রয়োজন এমন একটি কাঠামো যা আমাদের স্বার্থ, আমাদের মেধা, আমাদের সম্পদকে দেশেই কাজে লাগাবে। প্রয়োজন এমন এক আদর্শিক ব্যবস্থা, যা ন্যায়ভিত্তিক হবে এবং ১৩০০ বছর এই ব্যবস্থা পুরো বিশ্বে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে গেছে। যেখানে ইঞ্জিনিয়ার, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, শ্রমিক – সবার কাজই ছিল সম্মানিত ও রাষ্ট্রের কল্যাণে নিবেদিত।
ইসলামই একমাত্র আদর্শ যা প্রকৃত সমাধান দেয়
ইসলাম শুধু একটা ধর্ম নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যার মধ্যে আছে রাষ্ট্র, সমাজ, শিক্ষা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও জ্ঞানচর্চার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা। এই আদর্শব্যবস্থায় মেধা কখনোই অবহেলিত ছিল না। বরং ইসলামি রাষ্ট্র মেধাকে সম্মান দিয়ে কাজে লাগিয়েছে, এবং সেটি শুধু থিওরিতে নয়, বাস্তবে ১৩০০ বছর ধরে বাস্তবায়িত হয়েছে।
কুরআনের নির্দেশনাই ছিল জ্ঞান, গবেষণা ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রের ভিত্তি:
“আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাদের মর্যাদা বহু গুণে উন্নীত করেন।” সূরা আল-মুজাদিলা (৫৮:১১)
“যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান?” সূরা আয-যুমার (৩৯:৯)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সরাসরি জ্ঞানীদের মর্যাদা তুলে ধরেছেন, যা ইসলামি সভ্যতায় গবেষণা, শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রযুক্তির উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- “প্রত্যেক মুসলমানের উপর জ্ঞান অর্জন করা ফরজ।” [সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২৪]
মুসলিম বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের ইসলামি রাষ্ট্রে অবদান:
ইবনে সিনা (Avicenna): মেডিক্যাল সায়েন্স ও দর্শনের পথিকৃৎ। খিলাফতের পৃষ্ঠপোষকতায় গবেষণা, হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রশাসনে যুক্ত ছিলেন।
আল-খোয়ারিজমি: অ্যালজেব্রা ও অ্যালগরিদমের জনক। তার কাজ Bayt al-Hikmah (জ্ঞানাগার)-এ রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত হয়েছিল।
আল-জাজারি: মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও রোবোটিক্সের প্রবর্তক। পানির মেশিন, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র বানিয়ে রাষ্ট্রীয় কাজে লাগিয়েছেন।
আল-রাযী ও আল-জাবির ইবনে হাইয়ান: রসায়ন ও চিকিৎসায় বিপ্লব এনেছেন। তাদের গবেষণাগার পরিচালিত হতো সরকারি তত্ত্বাবধানে।
আল-বাতানি ও মারিয়া আল-আস্ট্রোলাবি: জ্যোতির্বিদ্যা ও নেভিগেশন টেকনোলজিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। নারীদের জন্যও জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল খিলাফতের অধীনে।
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা মেধাকে সংরক্ষণ করত, বিকাশ ঘটাত এবং বাস্তবে কাজে লাগাত – একটি আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের জন্য। আজ যেখানে মেধা পাচার হয়, সেখানে ইসলামি আদর্শ মেধাকে সম্মান দেয়, রক্ষা করে এবং সমাজ-রাষ্ট্রে বাস্তব ভূমিকা রাখতে দেয়।

























