তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
চিন্তা পরিবর্তনের সাথে সাথে আচরণের আমূল পরিবর্তন

ইসলামের এক মহান দ্বীন যেখান এমন সব বিধান, শিক্ষা, সংগঠন ও আইনে পরিপূর্ণ যা মানুষকে দুর্দশা ও অবক্ষয়ের অবস্থা থেকে মর্যাদা, গর্ব ও আভিজাত্যের দিকে উন্নীত করে, তুচ্ছ বিষয়ের ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। আজকের আলোচনায়, আমরা ইসলামের প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের বাস্তবতার অনেক উদাহরণের মধ্যে একটির কথা আলোচনা করব।
আমাদের নবী এবং আমাদের প্রিয় নেতা মুহাম্মদ (সা) এর হৃদয়ে অবতীর্ণ ইসলামের আহ্বান নারীদের ব্যতিরেকে কেবল পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নারীরা এই বরকতময় আহ্বানের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, আল্লাহর বাণীকে উচ্চে তুলে ধরার জন্য আত্মত্যাগ করেছিলেন। শহীদ সুমাইয়া বিনতে খায়য়াত (রা.) এর ঘটনা আমাদের অজানা নয়, তিনি ছিলেন প্রথম শহীদ যিনি ইসলামের পথে আরোহণ করেছিলেন, যদিও তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি এই সম্মান পেয়েছিলেন। এ থেকে, আমরা এই দ্বীনের মহত্ত্ব এবং সকল মানুষের জন্য এর ব্যাপকতা স্বীকার করি। যখন কেউ ইসলামে প্রবেশ করে, তখন তারা এর জন্য দায়িত্বশীল হয়ে থাকেন ঠিক যেমন সেরা সাহাবী, আবু বকর আল-সিদ্দিক, উমর আল-ফারুক, উসমান যুন-নূরাইন এবং আলী কাররামাল্লাহু ওজহাহু (রা.) ছিলেন।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে, আমরা একজন মহান সাহাবিয়্যার জীবন দেখি যার ইসলামী ইতিহাসে বিরাট প্রভাব ছিল: আল-খানসা (রা.) (তামাদির বিনতে আমর ইবনে আল-হারিস), যাকে আল্লাহর রাসূল (সা.) আরবদের মধ্যে সেরা কবি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। উমর ইবনে আল খাত্তাব (রা.) তাকে দেখলেই কবিতা আবৃত্তি করতে বলতেন। তার কবিতা এত সুন্দর এবং মসৃণ ছিল যে, পানির শীতল স্রোতের মতো হৃদয়ে প্রবাহিত হওয়ার অনুভূতি হতো। বলা হয় যে, ভাষায় “আল-খানসা” অর্থ “হরিণ”।
আল-খানসা (রা.) মক্কা বিজয়ের পর অষ্টম হিজরীতে তার গোত্র বনু সুলাইমের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। আল্লাহর রহমতে তিনি ইসলামের প্রতি অনুগত ছিলেন। নবী (সা) তার কবিতা শুনতেন এবং তাকে বলতেন,
«هيه يا خنساء»
“চালিয়ে যাও, হে খানসা।”তিনি তার দুই ভাই, সাখর এবং মুয়াবিয়ার জন্য তীব্র ক্রন্দনের জন্য পরিচিত ছিলেন, যারা ইসলাম-পূর্ব যুগে নিহত হয়েছিল। তিনি তাদের জন্য অনেক শোকগাথা রচনা করেছিলেন এবং এই বিষয়বস্তু তার কবিতায় প্রাধান্য পেয়েছিল, এমনকি তিনি ইসলাম গ্রহণের পরেও। ভাই সাখরের জন্য শোক প্রকাশে তার কবিতায় এসেছে:
“তোমার চোখে কি ধুলো ঢুকেছে, নাকি কাঁদছে,
অথবা ঘর খালি মনে হলে তোমার চোখ (এর পানি) কি উপচে পড়ে?
এটা এমন যেন আমার চোখ, যখন তার স্মৃতি আসে,
আমার গাল বেয়ে অবিরাম প্রবাহিত একটি স্রোত।
খানসা সাখরের জন্য কাঁদে, আকাঙ্ক্ষায় আচ্ছন্ন,
যদিও সে তাজা মাটির স্তরের নীচে আবৃত।
সে কাঁদে এবং যতদিন সে বেঁচে থাকে ততদিন থামবে না,
তার দীর্ঘশ্বাস চিরকাল শোকে প্রতিধ্বনিত হয়।
খানসা সাখরের জন্য কাঁদে এবং ঠিকই বলেছে,
কারণ সময় তাকে আঘাত করেছে, এবং সময় কঠোর।”
তার গোত্রের কিছু লোক আল্লাহর রাসূল (সা) এর খলিফা (খলিফা) উমর ইবনুল খাত্তাবের কাছে তার অতিরিক্ত শোকের অভিযোগ করে বলেছিল যে তার শোকগ্রন্থ আল্লাহর বিধানের প্রতি ধৈর্যের অভাব প্রদর্শন করে।
উল্লেখ করা হয়েছে যে তিনি একবার তার গোত্রের লোকদের সাথে একটি প্রয়োজনে মদীনায় এসেছিলেন। তারা উমরকে বলল, “এই আল-খানসা। তুমি যদি তাকে ধমক দিতে, কারণ তার কান্না অজ্ঞতার যুগে এবং ইসলামে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে।” উমর তার কাছে গিয়ে বললেন, “হে খানসা।” তিনি মাথা তুলে বললেন, “তুমি কী চাও? তুমি কী চাও?” তিনি বললেন, “কোন কষ্টে তোমার চোখ কান্না করে?” তিনি বললেন, “মুদারের নেতাদের জন্য কাঁদছি।” তিনি বললেন, “তারা অজ্ঞতার যুগে ধ্বংস হয়ে গেছে; তারা এখন জাহান্নামের জ্বালানি।” তিনি বললেন, “আমার বাবা-মা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক, এতে আমার কষ্ট আরও বেড়ে যায়।” তিনি বললেন, “তুমি যা রচনা করেছো তা আমাকে শোনাও।” তিনি বললেন, “আমি আপনাকে আগে যা রচনা করেছি তা শোনাবো না বরং এখন যা বলেছি তা শোনাবো।” তাই তিনি কবিতার পংক্তি আবৃত্তি করলেন। উমর বললেন, “তাকে ছেড়ে দাও, কারণ সে সর্বদা দুঃখিত থাকবে।” তিনি তাকে নিষেধ করেননি বা তিরস্কার করেননি, তার প্রতি দয়া ও ভদ্রতা প্রদর্শন করেছেন।
ইসলাম-পূর্ব যুগে (জাহিলিয়াহ) এবং তার প্রাথমিক ইসলামের কিছু অংশে তার ভাইদের সম্পর্কে আল-খানসার (রা.) অবস্থা এই ছিল। তবে, ইসলাম তার আত্মার গভীরে প্রবেশ করেছিল। তিনি তার ঈমান, দ্বীন এবং এই জীবনের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছিলেন, তাই তিনি আরবের বাইরে প্রথম মুসলিম বিজয়ে অংশগ্রহণের জন্য তাড়াহুড়ো করেছিলেন। তিনি ইসলামের অন্যতম সিংহ সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর নেতৃত্বে তার পুত্রদের সাথে ইরাক বিজয়ে যান। যুদ্ধের আগের রাতে, তিনি তার চার পুত্রকে সম্বোধন করে বললেন, “হে আমার পুত্রগণ, তোমরা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছ এবং তোমাদের ইচ্ছানুযায়ী হিজরত করেছ। সেই আল্লাহর কসম, যিনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই, তোমরা যেমন একজন পুরুষের সন্তান, তেমনি তোমরাও একজন মহিলার সন্তান। আমি কখনও তোমার পিতার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি, তোমার চাচাকে অপমান করিনি, তোমার বংশকে কলঙ্কিত করিনি, তোমার সম্মানকে কলুষিত করিনি। তোমরা জানো, কাফেরদের সাথে যুদ্ধকারী মুসলমানদের জন্য আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) কত মহান পুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন। এবং জেনে রাখো যে, চিরস্থায়ী আবাস এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর চেয়ে উত্তম। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“হে ঈমানদারগণ! ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্য ধারণ করো, সতর্ক থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও” [সূরা আল- ইমরান: ২০০]।
আগামীকাল, যদি আল্লাহ চান এবং তোমরা নিরাপদ থাকো, তাহলে তোমাদের শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বের হও। অন্তর্দৃষ্টির সাথে, আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) শত্রুদের বিরুদ্ধে সাহায্য প্রার্থনা করো। যখন তুমি দেখবে যুদ্ধের আগুন প্রচণ্ডভাবে জ্বলছে এবং এর শিখা উঁচুতে উঠছে, তখন তার উত্তাপে ঝাঁপিয়ে পড়ো এবং যুদ্ধের শীর্ষে তাদের নেতার সাথে লড়াই করো। তুমি জান্নাতের চিরস্থায়ী আবাসে বিজয়, গনীমত এবং সম্মান অর্জন করবে।”
তার পুত্ররা তার ইচ্ছা মেনে নিয়েছিল, যুদ্ধে বেরিয়েছিল এবং সকলেই আল-কাদিসিয়ায় শহীদ হয়েছিল। তাদের কেউই ফিরে আসেনি। আল-খানসা (রা.) যখন এই খবর পেয়েছিলেন, তখন তিনি তাদের জন্য আতঙ্কিত হননি বা শোক করেননি যেমনটি তিনি তার ভাই সাখরের জন্য করেছিলেন। পরিবর্তে, তিনি ধৈর্যের সাথে তা সহ্য করেছিলেন এবং তার বিখ্যাত বাক্যগুলি বলেছিলেন,
“الحمد لله الذي شرفني بقتلهم، وأرجو من ربي أن يجمعني بهم في مستقر رحمته»
“সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাদের শাহাদাতের মাধ্যমে আমাকে সম্মানিত করেছেন।” আমি আমার প্রভুর কাছে আশা করি যে তিনি আমাকে তাঁর রহমতের আবাসে তাদের সাথে একত্রিত করবেন।”
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তার চার ছেলের প্রত্যেকের জন্য ২০০ দিরহাম করে ভাতা দিতেন, যতদিন না তিনি (রা.) ইন্তেকাল করেন।
এভাবে ইসলাম তার ধারণা, চিন্তাভাবনা এবং মৃত্যুর প্রতি তার আচরণ পরিবর্তন করে, যা কেউ এড়াতে পারে না। কখনও এমন খবর পাওয়া যায়নি যে তিনি তার ছেলেদের শোক প্রকাশ করে একটিও কবিতা রচনা করেছেন, যদিও তিনি একদিনে চারটি ছেলেকেই হারিয়েছিলেন।
অতএব, আমরা বলি: যে মুসলিমের বিশ্বাস, আচরণ এবং জীবনযাত্রা ইসলামের চিন্তাভাবনা এবং ধারণা দ্বারা পরিবর্তিত হয় না, সে তার দ্বীনকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারেনি, অথবা ইসলামকে একটি সম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ এবং তারপরে আল্লাহর করুণার দ্বারা জান্নাতে যাওয়ার পথ হিসাবে বিবেচনা করেনি। এবং এটিই প্রকৃতপক্ষে সর্বোচ্চ সাফল্য।
হে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা), আপনার রহমত দ্বারা যা সমস্ত কিছুতে বিস্তৃত, এবং আপনার উদারতা ও অনুগ্রহের দ্বারা, আমাদের প্রতি দয়া করুন এবং আমাদেরকে আমাদের নেতা ও নবী মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা.) সাথে আপনার ক্ষমা ও করুণার স্থানে একত্রিত করুন, হে দয়ালুদের মধ্যে সবচেয়ে দয়ালু।
খিলাফত রাষ্ট্রে শিক্ষা পাঠ্যক্রমের ভিত্তি | ভূমিকা ও নীতিসমূহ

১. ভূমিকা
যেকোনো জাতির সংস্কৃতি (ثقافة) তার অস্তিত্ব ও টিকে থাকার মেরুদণ্ড। এই সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করেই উম্মাহর সভ্যতা (حضارة) প্রতিষ্ঠিত হয়, এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারিত হয় এবং এর জীবনধারা সংজ্ঞায়িত হয়। উম্মাহর ব্যক্তিরা এই সংস্কৃতির মাধ্যমে একটি অভিন্ন ধারায় গড়ে ওঠে, যার ফলে উম্মাহ অন্যান্য জাতি থেকে স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে। এই সংস্কৃতি হলো: উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ (আকিদা) এবং এই মতবাদ থেকে উদ্ভূত বিধি, সমাধান ও ব্যবস্থা। এটি হলো এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা জ্ঞান ও বিজ্ঞান, সেইসাথে এই বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদের সাথে সম্পর্কিত ঘটনাবলী, যেমন উম্মাহর জীবনচরিত (সিরাত) ও ইতিহাস। যদি এই সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে এই উম্মাহ একটি স্বতন্ত্র উম্মাহ হিসেবে বিলীন হয়ে যাবে; ফলে এর লক্ষ্য ও জীবনধারা পরিবর্তিত হবে, এর আনুগত্যের কেন্দ্রবিন্দু সরে যাবে এবং এটি অন্যান্য জাতির সংস্কৃতি অনুসরণ করতে গিয়ে পথভ্রষ্ট হবে।
ইসলামী সংস্কৃতি হলো ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ (তথা আকীদা) দ্বারা অনুপ্রাণিত জ্ঞান (معارف)। এই জ্ঞান ইসলামী মতবাদকে অন্তর্ভুক্ত করে কি না, যেমন ‘তাওহীদ’ সংক্রান্ত জ্ঞান; অথবা এটি বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদের উপর ভিত্তি করে গঠিত কি না, যেমন ফিকহ (আইনশাস্ত্র), কুরআনের তাফসীর এবং হাদিস; অথবা এটি ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ (তথা আকীদা) থেকে উদ্ভূত নিয়মাবলী বোঝার জন্য একটি পূর্বশর্ত কি না, যেমন ইসলামে ইজতিহাদের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, যেমন আরবি ভাষার জ্ঞান, হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষা এবং উসুলুল ফিকহ (আইনশাস্ত্রের মূলনীতি)। এই সবকিছুই ইসলামী সংস্কৃতির অংশ, কারণ ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ (আকীদা)ই এর গবেষণার চালিকাশক্তি। একইভাবে, ইসলামী উম্মাহর ইতিহাসও এর সংস্কৃতির একটি অংশ, কারণ এতে তার সভ্যতা, ব্যক্তিত্ব, নেতা এবং আলেমদের সম্পর্কে সংবাদ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রাক-ইসলামী আরবের ইতিহাস ইসলামী সংস্কৃতির অংশ নয়, তবে প্রাক-ইসলামী আরবের কবিতাকে এই সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, কারণ এতে এমন প্রমাণ রয়েছে যা আরবি ভাষার শব্দ ও বাক্য গঠন বুঝতে সাহায্য করে এবং ফলস্বরূপ ইজতিহাদ, কুরআনের তাফসীর ও হাদিস বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়।
উম্মাহর সংস্কৃতি তার ব্যক্তিদের চরিত্র গঠন করে। এটি ব্যক্তির বুদ্ধিবৃত্তিকে সংগঠিত করে এবং (তা দ্বারা) বস্তু, বক্তব্য ও কাজ বিচার করার পদ্ধতিকে গঠন করে, ঠিক যেমন এটি তার প্রবণতাগুলোকে গঠন করে, যার ফলে (এই সংস্কৃতি) তার মানসিকতা, স্বভাব (নাফসিয়্যা) এবং আচরণকে প্রভাবিত করে। সুতরাং, সমাজে উম্মাহর সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও বিস্তার করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। সোভিয়েত ইউনিয়ন ঐতিহাসিকভাবে তার সন্তানদের কমিউনিস্ট সংস্কৃতির ওপর গড়ে তুলেছিল এবং তার সংস্কৃতিতে পুঁজিবাদী বা ইসলামী চিন্তাধারার কোনো অনুপ্রবেশ রোধ করার চেষ্টা করেছিল। সমগ্র পশ্চিমা বিশ্ব তার সন্তানদের এমন পুঁজিবাদী সংস্কৃতির ওপর লালন-পালন করেছে যা জীবন থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করার নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। তারা সেই ভিত্তির ওপর তাদের জীবনকে সংগঠিত ও প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং যুদ্ধ করেছে—যেমনটি তারা আজও করে চলেছে—যাতে ইসলামী সংস্কৃতি তাদের মতবাদ ও সংস্কৃতিতে প্রবেশ করতে না পারে। ইসলামী রাষ্ট্র তার সন্তানদের মধ্যে ইসলামী সংস্কৃতিকে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয় এমন কোনো চিন্তাধারার প্রচার থেকে সবাইকে বিরত রেখেছে। রাষ্ট্র দাওয়াহ ও জিহাদের মাধ্যমে তার সংস্কৃতিকে অন্যান্য রাষ্ট্র ও জাতির কাছেও পৌঁছে দিয়েছে। এটি ততক্ষণ পর্যন্ত চলতে থাকবে যতক্ষণ না আল্লাহ পৃথিবী এবং তার উপর বসবাসকারী সকলকে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেন (অর্থাৎ কেয়ামত দিবস পর্যন্ত)।
উম্মাহর সংস্কৃতি সংরক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিশ্চয়তা হলো, এর সংস্কৃতি তার সন্তানদের হৃদয়ে মুখস্থ থাকবে এবং বইপত্রে সংরক্ষিত থাকবে। এর পাশাপাশি উম্মাহর উপর একটি রাষ্ট্র থাকবে, যা এই সংস্কৃতির বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ থেকে উদ্ভূত নিয়মকানুন অনুযায়ী এর বিষয়াদি পরিচালনা ও দেখাশোনা করবে।
শিক্ষা হলো উম্মাহর সংস্কৃতিকে তার সন্তানদের হৃদয়ে এবং বইয়ের পাতায় সংরক্ষণ করার একটি পদ্ধতি, তা আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাক্রমই হোক না কেন। শিক্ষাক্রম বলতে বোঝায় রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থা ও নীতিমালা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা, যার বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর ন্যস্ত থাকে, যেমন শিক্ষার শুরুর বয়স, অধ্যয়নের বিষয় এবং শিক্ষাদান পদ্ধতি নির্ধারণ করা। অন্যদিকে, অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাক্রম মুসলমানদের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়, যাতে তারা ঘরে, মসজিদে, ক্লাবে, গণমাধ্যমের মাধ্যমে, সাময়িক প্রকাশনার মাধ্যমে ইত্যাদি ক্ষেত্রে শিক্ষা দিতে পারে, যা শিক্ষাক্রমের সংগঠন ও নীতিমালার অধীন নয়। তবে উভয় ক্ষেত্রেই, রাষ্ট্র এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে দায়বদ্ধ যে (শিক্ষিত) চিন্তাভাবনা এবং জ্ঞান হয় ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ থেকে উদ্ভূত হবে অথবা তার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে। আমরা এখানে খিলাফত রাষ্ট্রের শিক্ষাক্রমের ভিত্তিগুলো উপস্থাপন করছি।
২. খিলাফত রাষ্ট্রে শিক্ষা নীতি এবং এর সংগঠন
খিলাফত রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষা পাঠ্যক্রম সম্পর্কিত শরীয়াহ বিধি এবং প্রশাসনিক নীতিমালার সমষ্টি নিয়ে গঠিত। শিক্ষা সম্পর্কিত শরীয়াহ বিধিগুলো ইসলামী আকীদা থেকে উদ্ভূত এবং সেগুলোর শরীয়াহভিত্তিক প্রমাণ রয়েছে, যেমন অধ্যয়নের বিষয়বস্তু এবং ছাত্র ও ছাত্রীদের মধ্যে পৃথকীকরণ। আর শিক্ষা সম্পর্কিত প্রশাসনিক নীতিমালা হলো সেই অনুমোদিত উপায় ও পদ্ধতি, যা ক্ষমতায় থাকা শাসক এই ব্যবস্থা বাস্তবায়ন এবং এর লক্ষ্য অর্জনের জন্য উপকারী বলে মনে করেন। এগুলো পার্থিব বিষয়, যা শিক্ষা সম্পর্কিত শরীয়াহ বিধি এবং উম্মাহর মৌলিক চাহিদা বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মনে হওয়া অনুযায়ী বিকাশ ও পরিবর্তনের অধীন। একইভাবে, এগুলো অন্য জাতির অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং অনুমোদিত গবেষণা থেকে গ্রহণ করা যেতে পারে।
শরিয়াহ বিধি ও প্রশাসনিক কানুনসমূহের এই ব্যবস্থার জন্য এমন একটি বিকল্প কাঠামোর প্রয়োজন, যা খিলাফত রাষ্ট্রে শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্যগুলো অর্জনে সক্ষম হবে, অর্থাৎ ইসলামী ব্যক্তিত্ব গঠন করতে পারবে। এই কাঠামোটি পাঠ্যক্রম নির্ধারণ, যোগ্য শিক্ষক নির্বাচন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং স্কুল, ইনস্টিটিউট ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগার ও শিক্ষামূলক উপকরণ সরবরাহসহ শিক্ষার সমস্ত দিকের তত্ত্বাবধান, সংগঠন এবং হিসাবরক্ষণের দায়িত্ব পালন করে।
আমরা এখন ‘সংবিধানের ভূমিকা’ (মুকাদিমাত আদ-দুস্তুর) থেকে ‘শিক্ষা নীতির’ বেশিরভাগ ধারা উপস্থাপন করছি, যা হলো ইসলামি রাষ্ট্রের খসড়া সংবিধান।
ধারা ১৭০
ইসলামী আকীদাহ্ হবে শিক্ষা নীতির মূল ভিত্তি। পাঠ্যসূচী এবং শিক্ষার পদ্ধতি এমনভাবে পরিকল্পিত হবে যাতে এই মূল ভিত্তি থেকে বিচ্যূত হবার কোন সুযোগ না থাকে।
ধারা ১৭১
শিক্ষা নীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যক্তির চিন্তা ও চরিত্রকে ইসলামী ব্যক্তিত্বের রূপদান করা। পাঠ্যসূচীর অন্তর্গত সকল বিষয়েরই এ ভিত্তির উপর গভীরভাবে প্রোথিত থাকা আবশ্যক।
ধারা ১৭২
শিক্ষার লক্ষ্য হচ্ছে ইসলামী ব্যক্তিত্ব গঠন করা এবং জীবনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে জনগণকে শিক্ষা দান করা। শিক্ষার পদ্ধতি এ লক্ষ্য পূরণের জন্য পরিকল্পিত হবে এবং এই লক্ষ্য পূরণ থেকে বিচ্যুত অন্যকোন পদ্ধতিতে নিবৃত্ত করা হবে।
ধারা ১৭৩
ইসলামী সংস্কৃতি ও আরবী ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে সপ্তাহে ব্যয়কৃত সময় অন্য বিষয়গুলো শিক্ষার পিছনে ব্যয়কৃত সময়ের সমান হওয়া আবশ্যক।
ধারা ১৭৪
পরীক্ষালব্ধ বিজ্ঞান (empirical sciences) যেমন গণিত ও সাংস্কৃতিক বিষয়গুলোর (cultural subjects) মধ্যে সুস্পষ্ট বিভাজন থাকা আবশ্যক। পরীক্ষালব্ধ বিজ্ঞান এবং এর সাথে সম্পর্কিত যেকোন বিষয় অবশ্যই প্রয়োজন অনুসারে শেখানো হবে এবং কোন নির্দিষ্ট স্তরে সীমাবদ্ধ রাখা হবে না। অপরদিকে, সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে অবশ্যই ইসলামী ধারণা ও বিধিবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী শেখানো হবে। উচ্চশিক্ষার স্তরে এ বিষয়গুলো একটি নির্দিষ্ট বিষয়রূপে এমনভাবে শেখানো যেতে পারে, যাতে করে তা কোনক্রমেই উক্ত নীতিমালা ও শিক্ষার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয়।
ধারা ১৭৫
শিক্ষার সকল স্তরে অবশ্যই ইসলামী সংস্কৃতি শিক্ষা দিতে হবে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে চিকিৎসা, প্রকৌশল, পদার্থবিদ্যা এবং অন্যান্য বিষয়ের মত ইসলামী সংস্কৃতির বিভিন্ন বিভাগ প্রবর্তন করা হবে।
ধারা ১৭৬
কারিগরী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মত বিষয়গুলো একদিকে বিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পারে, যেমন: ব্যবসা প্রশাসন, নৌবিদ্যা ও কৃষিবিদ্যা ইত্যাদি। এ ধরনের বিষয়গুলো কোনরূপ সীমাবদ্ধতা বা শর্ত ছাড়াই শেখানো হবে। তারপরও মাঝেমধ্যে কারিগরী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত এবং একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গী দ্বারা প্রভাবিত থাকতে পারে, যেমন চারুশিল্প (অঙ্কন শিল্প) ও ভাস্কর্য। এ সকল ক্ষেত্রে যদি এগুলো ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সাংঘর্ষিক হয় তবে এ বিষয়গুলো শেখানো যাবে না।
ধারা ১৭৭
একমাত্র রাষ্ট্র প্রণীত শিক্ষা পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম অনুমোদন করা হবে এবং অন্য কোন পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। বেসরকারী বিদ্যালয় স্থাপনের অনুমতি থাকবে, তবে এগুলো বিদেশী হতে পারবে না, এবং তাদের অবশ্যই রাষ্ট্রের প্রণীত শিক্ষা পাঠ্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে, শিক্ষানীতির উপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এবং রাষ্ট্র নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী উভয় ক্ষেত্রেই, নারী-পুরুষ মেলামেশা করতে পারবে না। এছাড়া, এসকল বিদ্যালয় কোন ধর্ম, গোত্র বা বর্ণের লোকদের জন্য সীমাবদ্ধ থাকতে পারবে না।
ধারা ১৭৮
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিককে জীবন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয় শিক্ষা দান রাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। অন্ততঃ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত এটি সবার জন্য বিনামূল্যে প্রদান করতে হবে। রাষ্ট্রের সর্বাত্মক চেষ্টা করা উচিত যাতে করে সবাই বিনামূল্যে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ অব্যাহত রাখতে পারে।
ধারা ১৭৯
রাষ্ট্রকে বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে যথেষ্ট পরিমাণ পাঠাগার এবং পরীক্ষাগার সহ জ্ঞান বৃদ্ধির সুবিধাসমূহের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে করে যারা ফিক্হ, হাদীস, তাফসীর, চিকিৎসা, প্রকৌশল, রসায়নবিদ্যা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা অব্যাহত রাখতে চায়, তারা তা করতে পারে। রাষ্ট্রের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে মুজতাহিদ, সৃজনশীল বিজ্ঞানী ও আবিস্কারক তৈরী করার লক্ষ্যে এটি করা হবে।
ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোর ষড়যন্ত্র | ২য় অধ্যায়

কিভাবে খিলাফত ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়
২য় অধ্যায়: ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোর ষড়যন্ত্র
মুসলমানদের ভূমি ভাগাভাগি নিয়ে কাফেরদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও, ইসলামকে ধ্বংস করার ব্যাপারে তারা সম্পূর্ণ একমত ছিল। এই উদ্দেশ্যে তারা বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল। প্রাথমিকভাবে, তারা ইউরোপীয় দেশগুলোতে জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। তারা মানুষকে ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উস্কে দেয় এবং এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ করে, যেমনটি সার্বিয়া ও গ্রিসের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। এভাবে ইউরোপীয় দেশগুলো ইসলামী রাষ্ট্রের পিঠে ছুরিকাঘাত করার চেষ্টা করেছিল। ফ্রান্স ১৭৯৮ সালের জুলাই মাসে মিশর আক্রমণ করে এবং তা দখল করে নেয়, তারপর ফিলিস্তিনের দিকে অগ্রসর হয়ে সেটিও দখল করে। ফ্রান্স ইসলামী রাষ্ট্রকে চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য আল-শামের বাকি অংশ দখল করতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয় এবং পরে মিশর ত্যাগ করতে ও দখল করা ভূমিগুলো ইসলামী রাষ্ট্রের কাছে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়।
ওয়াহাবিদের জন্ম এবং সৌদি শাসনের প্রতিষ্ঠা
ব্রিটেন তার এজেন্ট আব্দুল-আজিজ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে সাউদের মাধ্যমে ইসলামিক রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে আঘাত করার চেষ্টা করেছিল। ততদিনে ওয়াহাবিরা মুহাম্মদ ইবনে সাউদ এবং পরবর্তীতে তার পুত্র আব্দুল-আজিজের নেতৃত্বে ইসলামী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে একটি সত্তা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। ব্রিটেন তাদের অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ করত এবং তারা সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে খিলাফতের অধীনে থাকা ইসলামী ভূমিগুলো দখল করতে অগ্রসর হয়। তারা খলিফার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে এবং ইসলামী সশস্ত্র বাহিনীর (আমিরুল মুমিনিনের সেনাবাহিনী) সাথে যুদ্ধ করে, আর এই পুরোটা সময়ই ব্রিটিশরা তাদের উস্কানি দিত এবং রসদ সরবরাহ করত। ওয়াহাবিরা খলিফা শাসিত ভূমিগুলো দখল করতে চেয়েছিল, যাতে তারা তাদের মাযহাব (চিন্তাধারা) অনুযায়ী সেই ভূমিগুলো শাসন করতে পারে এবং তাদের থেকে ভিন্ন সমস্ত ইসলামিক মাযহাবকে শক্তি প্রয়োগ করে দমন করতে পারে। তাই, তারা কুয়েত আক্রমণ করে এবং ১৭৮৮ সালে তা দখল করে নেয়, তারপর উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে বাগদাদ অবরোধ করে। তারা কারবালা এবং আল-হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু)’র কবর দখল করে তা ধ্বংস করতে এবং সেখানে যিয়ারত নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিল। এরপর ১৮০৩ সালে তারা মক্কা আক্রমণ করে এবং তা দখল করে নেয়। ১৮০৪ সালের বসন্তে মদিনা তাদের দখলে আসে। তারা আল্লাহর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবরকে ছায়া দেওয়া বিশাল গম্বুজগুলো ধ্বংস করে দেয় এবং সেগুলো থেকে সমস্ত রত্ন ও মূল্যবান অলঙ্কার লুট করে নেয়। পুরো আল-হিজাজ দখল সম্পন্ন করার পর তারা আল-শামের দিকে অগ্রসর হয়। ১৮১০ সালে হিমসের কাছাকাছি পৌঁছে তারা দ্বিতীয়বারের মতো দামেস্ক আক্রমণ করে এবং আল-নাজাফও আক্রমণ করে। দামেস্ক সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে নিজেদের রক্ষা করে। তবে দামেস্ক অবরোধ করার পাশাপাশি ওয়াহাবিরা একই সময়ে উত্তরে অগ্রসর হয় এবং আলেপ্পো পর্যন্ত সিরিয়ার বেশিরভাগ অঞ্চলের উপর তাদের কর্তৃত্ব বিস্তার করে। এটি একটি সুপরিচিত সত্য ছিল যে এই ওয়াহাবি অভিযান ব্রিটিশদের দ্বারা উস্কে দেওয়া হয়েছিল, কারণ আল সৌদ ছিল ব্রিটিশদের এজেন্ট। তারা ওয়াহাবি মাযহাবকে, যা ছিল ইসলামিক এবং যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন একজন মুজতাহিদ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল ইসলামিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এবং অন্যান্য মাযহাবের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া, যাতে উসমানীয় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ শুরু করা যায়। এই মাযহাবের অনুসারীরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিল না, কিন্তু সৌদি আমির এবং সৌদিরা এ সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত ছিল। এর কারণ হলো, সম্পর্কটি ব্রিটিশদের সাথে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল-ওয়াহহাবের ছিল না, বরং ব্রিটিশদের সাথে আব্দুল-আজিজ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে সাউদ এবং পরবর্তীতে তার পুত্র সাউদের ছিল।
মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব, যার মাযহাব ছিল হাম্বলী, তিনি বহু বিষয়ে ইজতিহাদ করেন এবং মনে করেন যে, অন্যান্য মাযহাবের অনুসারী মুসলমানরা এসব বিষয়ে তার মতের সাথে ভিন্নমত পোষণ করে। তাই তিনি তার মতামত প্রচার করতে, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য কাজ করতে এবং অন্যান্য ইসলামী মতামতের তীব্র সমালোচনা করতে শুরু করেন। তিনি বিভিন্ন আলেম, আমির এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে তীব্র বিরোধিতা ও প্রত্যাখ্যানের সম্মুখীন হন, যারা মনে করতেন যে তার মতামতগুলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কিতাব থেকে তাদের বোঝা বিষয়ের সাথে ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি বলতেন যে রাসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবর যিয়ারত করা হারাম এবং একটি পাপের কাজ। তিনি এমনকি এ পর্যন্তও বলেছিলেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবর যিয়ারত করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে, ভ্রমণের সময় তাকে নামাজ কসর করার অনুমতি দেওয়া হবে না, কারণ ভ্রমণের উদ্দেশ্য হবে একটি পাপের কাজ করা। তিনি সেই হাদিসটির উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন যেখানে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন বলে বর্ণিত আছে: “তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যাওয়া যাবে না: আমার এই মসজিদ, মসজিদুল হারাম এবং মসজিদুল আকসা।” মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব এই হাদিস থেকে বুঝেছিলেন যে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও ভ্রমণ করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং, যদি কেউ আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবর যিয়ারত করার জন্য ভ্রমণ করে, তবে সে তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও ভ্রমণ করছে, তাই এটি হারাম এবং একটি পাপের কাজ হবে। অন্যান্য মাযহাবগুলো আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবর যিয়ারত করাকে সুন্নাহ এবং একটি মুস্তাহাব কাজ বলে মনে করত, যা সওয়াব এনে দেয়, কারণ আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “আমি অতীতে তোমাদের কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, কিন্তু এখন তোমরা তা করতে পারো।” অধিকতর যুক্তিতে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবরও এই হাদিসের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত, এছাড়াও তারা অন্যান্য হাদিসও উদ্ধৃত করেছিল। তারা বলেছিল যে, মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব যে হাদিসটিকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন, তা মসজিদ সম্পর্কিত। অতএব, এর বিষয়বস্তু মসজিদ ভ্রমণের সাথে সম্পর্কিত এবং এর বাইরে নয়। হাদিসটি সাধারণ নয়, বরং নির্দিষ্ট এবং একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত: “তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যাওয়া যাবে না।” সুতরাং, একজন মুসলমানের জন্য ইস্তাম্বুলের আয়া সোফিয়া মসজিদ বা দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ বিশেষভাবে পরিদর্শন করা নিষিদ্ধ হবে, কারণ আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মসজিদ পরিদর্শনের জন্য ভ্রমণকে তিনটি মসজিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছেন এবং এর বেশি নয়। এই তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও ভ্রমণ করা নিষিদ্ধ হবে। এছাড়াও, ব্যবসা, পরিবার ও বন্ধুদের সাথে দেখা করা, দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন এবং পর্যটনসহ অন্যান্য কারণে ভ্রমণ করা অনুমোদিত। সুতরাং, হাদিসটি স্পষ্টভাবে ভ্রমণকে নিষিদ্ধ করে না এবং এটিকে এই তিনটি মসজিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে না, বরং এটি উল্লিখিত তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য মসজিদ পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণকে নিষিদ্ধ করে। একইভাবে, অন্যান্য মাযহাবের অনুসারীরা তার মতামতকে ভুল এবং কিতাব ও সুন্নাহ থেকে তাদের বোঝা বিষয়ের সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে করতেন। শীঘ্রই, তার এবং তাদের মধ্যে মতপার্থক্য তীব্র আকার ধারণ করে এবং তাকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হয়। ১৭৪০ সালে, তিনি আনজাহ গোত্রের শেখ মুহাম্মদ ইবনে সাউদের কাছে আশ্রয় নেন, যিনি উয়াইনাহর শেখের সাথে বিরোধে লিপ্ত ছিলেন এবং আল-দির’ইয়াহতে বসবাস করতেন, যা উয়াইনাহ থেকে মাত্র ছয় ঘণ্টার দূরত্বে ছিল। মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাবকে সাদরে গ্রহণ করা হয় এবং আতিথেয়তা করা হয়। তিনি আল-দির’ইয়াহ এবং আশেপাশের এলাকার মানুষের মধ্যে তার মতামত ও চিন্তাভাবনা প্রচার করতে শুরু করেন। কিছুকাল পরে তার চিন্তাভাবনা ও মতামত কিছু সাহায্যকারী ও সমর্থক লাভ করে। আমির মুহাম্মদ ইবনে সাউদ এই চিন্তাভাবনা ও মতামতের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং শেখ (তথা মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব)-এর কাছে আসতে শুরু করেন। ১৭৪৭ সালে, আমির মুহাম্মদ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাবের মতামত ও চিন্তাভাবনার প্রতি তার অনুমোদন ও স্বীকৃতি ঘোষণা করেন। তিনি শেখ (মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব) এবং এই চিন্তাভাবনা ও মতামতের প্রতি তার সমর্থনের প্রতিশ্রুতিও দেন। এই জোটের মাধ্যমে ওয়াহাবি আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটি একটি দাওয়াহ ও শাসনের রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে, কারণ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব এর দিকে আহ্বান করতেন এবং মানুষকে এর নিয়মকানুন শেখাতেন, আর মুহাম্মদ ইবনে সাউদ তার আদেশ ও কর্তৃত্বাধীন মানুষের উপর এর নিয়মকানুন প্রয়োগ করতেন। ওয়াহাবি আন্দোলন দাওয়াহ এবং শাসন—উভয় দিক থেকেই আল-দির’ইয়াহর পার্শ্ববর্তী এলাকা ও গোত্রগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মুহাম্মদ ইবনে সাউদের আমিরাতও প্রসারিত হতে থাকে, এবং দশ বছরের মধ্যে তিনি ৩০ বর্গ মাইল এলাকাকে নিজের কর্তৃত্ব ও নতুন মাযহাবের অধীনে আনতে সক্ষম হন। তবে, এই সম্প্রসারণ অর্জিত হয়েছিল দাওয়াহ এবং আনজাহ গোত্রের শেখের কর্তৃত্বের মাধ্যমে। কোনো ব্যক্তি তাকে চ্যালেঞ্জ করেনি এবং কেউ তার বিরোধিতা করেনি, এমনকি আল-ইহসার আমির, যিনি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল-ওয়াহহাবকে উয়াইনাহ থেকে বহিষ্কার করেছিলেন, তিনিও এই সম্প্রসারণে তার শত্রুর বিরোধিতা করেননি এবং ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সৈন্য সমাবেশ করেননি। তবে, তিনি পরাজিত হন এবং মুহাম্মদ ইবনে সাউদ তার আমিরাত দখল করে নেন। ফলস্বরূপ, মুহাম্মদ ইবনে সাউদের কর্তৃত্ব এবং নতুন মাযহাবের কর্তৃত্বের মাধ্যমে আনজাহ গোত্রের কর্তৃত্ব আল-দির’ইয়াহ ও তার আশেপাশের এলাকা, সেইসাথে আল-ইহসারও শাসক শক্তিতে পরিণত হয়। এভাবে কর্তৃত্বের বলে এই ভূমিগুলোতে ওয়াহাবি মাযহাব প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে, আল-ইহসার আমিরের সাথে সংঘর্ষ এবং তার ভূমি বিজয়ের পর ওয়াহাবি আন্দোলন সেখানেই থেমে যায়। এটি আরও প্রসারিত হয়েছিল কিনা বা কোনো কার্যক্রম চালিয়েছিল কিনা, সে সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। বরং এটি সেই এলাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। মুহাম্মদ ইবনে সাউদ সেই পর্যায়ে থেমে যান এবং ওয়াহাবি মাযহাব এই এলাকার সীমানায় এসে থেমে যায় এবং আন্দোলনটি সুপ্ত ও স্থবির হয়ে পড়ে। ১৭৬৫ সালে মুহাম্মদ ইবনে সাউদ মারা যান। তার পুত্র আবদুল-আজিজ আনজাহ গোত্রের শেখ হিসেবে তার স্থলাভিষিক্ত হন। তার পুত্র পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তার নিয়ন্ত্রিত এলাকা শাসন করেন। তবে, তিনি আন্দোলনের জন্য কোনো কার্যক্রম চালাননি, বা আশেপাশের এলাকায় কোনো সম্প্রসারণও করেননি। ফলে, আন্দোলনটি সুপ্ত অবস্থায় থাকে এবং স্থবিরতা দ্বারা চিহ্নিত হয়। এই আন্দোলন সম্পর্কে খুব কমই শোনা যেত এবং এর কোনো প্রতিবেশীই এটি নিয়ে আলোচনা করত না বা এর আক্রমণের ভয় পেত না। তবে, ওয়াহাবি আন্দোলন শুরু হওয়ার ৪১ বছর পর, ১৭৪৭ থেকে ১৭৮৮ সাল পর্যন্ত, এবং এর থেমে যাওয়া ও স্থবিরতার ৩১ বছর পর (১৭৫৭ থেকে ১৭৮৭ সাল পর্যন্ত), হঠাৎ করেই এর কার্যক্রম আবার শুরু হয়। এই আন্দোলনটি মাযহাব প্রচারের জন্য একটি নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করে এবং এটি এর সীমানা ছাড়িয়ে সমগ্র ইসলামী রাষ্ট্রে এবং অন্যান্য পরাশক্তিগুলোর মধ্যেও ব্যাপকভাবে ও উচ্চ পর্যায়ে প্রচারিত হয়। এই আন্দোলনটি তার প্রতিবেশীদের মধ্যে অস্বস্তি ও উদ্বেগের সৃষ্টি করতে শুরু করে এবং এমনকি সমগ্র ইসলামী রাষ্ট্রের জন্যও অস্বস্তি ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১৭৮৭ সালে আব্দুল-আজিজ একটি ইমারা প্রতিষ্ঠা করতে এবং বংশানুক্রমিক শাসনব্যবস্থা, যা সিংহাসনের উত্তরাধিকার নামে পরিচিত, তা গ্রহণ করার উদ্যোগ নেন। এর ফলে আব্দুল-আজিজ তার পুত্র সাউদকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে নিশ্চিত করেন। শেখ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল-ওয়াহহাবের নেতৃত্বে এক বিশাল জনসমাগম ঘটে। আব্দুল-আজিজ এই বিশাল জনসমাবেশের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন এবং ঘোষণা করেন যে, ইমারার অধিকার তার পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং তার উত্তরাধিকারী হওয়ার অধিকার কেবল তার পুত্রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তিনি আরও ঘোষণা করেন যে, তার পুত্র সাউদকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল-ওয়াহহাবের নেতৃত্বে এই বিশাল জনতা তার সাথে একমত হয় এবং তার ঘোষণাকে স্বীকার করে নেয়। এভাবে কোনো গোত্র বা গোত্রসমষ্টির পরিবর্তে একটি রাষ্ট্রের জন্য একটি ইমারা প্রতিষ্ঠিত হয়। এটাও প্রতীয়মান হয়েছিল যে, ওয়াহাবি মাযহাবের প্রধানের উত্তরাধিকারও মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল-ওয়াহহাবের পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আমির এবং মাযহাবের প্রধান উভয়ের উত্তরাধিকারের বিষয়টি নিষ্পত্তি হওয়ার পর, আন্দোলনটি হঠাৎ আবার প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে এবং তার বিজয় ও সম্প্রসারণ পুনরায় শুরু করে। তারা মাযহাব প্রচারের জন্য আবারও যুদ্ধ শুরু করে। ১৭৮৮ সালে আব্দুল-আজিজ একটি বিশাল সামরিক অভিযান প্রস্তুত ও সজ্জিত করার কাজে হাত দেন। তিনি কুয়েত আক্রমণ করে তা জয় ও দখল করেন। ব্রিটিশরা তাদের পক্ষ থেকে উসমানীয় রাষ্ট্র থেকে কুয়েত দখল করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছিল। এর কারণ ছিল জার্মানি, রাশিয়া এবং ফ্রান্সের মতো অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো তাদের বিরোধিতা করেছিল এবং খিলাফত রাষ্ট্র নিজেও তাদের প্রতিরোধ করেছিল। তাই, উসমানীয় রাষ্ট্র থেকে কুয়েতের বিচ্ছিন্নতা এবং এর সুরক্ষার জন্য উত্তরের দিকে অগ্রসর হওয়া রাশিয়া, জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো প্রধান রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি উসমানীয় রাষ্ট্রেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য যথেষ্ট ছিল। উপরন্তু, এই যুদ্ধটি একটি সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ হওয়ায় তা আধ্যাত্মিক আবেগকেও উস্কে দিত। এইভাবে, ওয়াহাবিরা বেশ কয়েক দশক ধরে চলা নীরবতার পর হঠাৎ করে তাদের কার্যকলাপ পুনরায় শুরু করে। তারা একটি নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে এই কার্যকলাপ শুরু করে, যা ছিল যুদ্ধ ও বিজয়ের মাধ্যমে মাযহাব প্রচার করা, যাতে অন্যান্য সমস্ত মাযহাবের অস্তিত্ব বিলুপ্ত করে সেগুলোকে তাদের মাযহাব দ্বারা প্রতিস্থাপন করা যায়। তারা কুয়েত আক্রমণ ও দখলের মাধ্যমে তাদের কার্যকলাপ শুরু করে। এরপর তারা এই কার্যকলাপের ধারাবাহিকতায় সম্প্রসারণের জন্য বেশ কয়েকটি প্রচেষ্টা চালায়। ফলস্বরূপ, তারা আরব উপদ্বীপের মধ্যে তাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য উদ্বেগ ও উপদ্রবের কারণ হয়ে ওঠে – যেমন ইরাক, আল-শাম এবং খিলাফত রাষ্ট্র হিসেবে উসমানীয় সাম্রাজ্য। তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তরবারি ধারণ করে এবং ওয়াহাবি মাযহাবের বাইরের মতবাদ পরিত্যাগ করতে ও ওয়াহাবি মাযহাবের মতামত গ্রহণ করতে বাধ্য করে। তারা খলিফার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং ইসলামী ভূমি জয় করে। এরপর ১৭৯২ সালে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব মারা যান এবং তার পুত্র তার স্থলাভিষিক্ত হন, ঠিক যেমন সৌদ তার পিতা আব্দুল আজিজের স্থলাভিষিক্ত হন। এরপর সৌদি আমিররা এই পথেই অগ্রসর হন, উসমানীয় রাষ্ট্রকে (খিলাফত রাষ্ট্র) আঘাত করার জন্য এবং মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ উস্কে দেওয়ার জন্য ওয়াহাবি মাযহাবকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।
ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ ষড়যন্ত্র:
আল সৌদের দালালিবৃত্তি এবং ব্রিটিশদের প্রতি তাদের আনুগত্য খিলাফত রাষ্ট্র এবং জার্মানি, ফ্রান্স ও রাশিয়ার মতো প্রধান শক্তিগুলোর কাছে একটি সুপরিচিত বিষয় ছিল। এটিও জানা ছিল যে তারা ব্রিটিশদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিল। ব্রিটিশরা নিজেরাও এই সত্যটি গোপন করত না যে তারা একটি রাষ্ট্র হিসেবে সৌদিদের সমর্থন করত। অধিকন্তু, ভারত হয়ে তাদের কাছে যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও সরঞ্জাম পৌঁছাত এবং যুদ্ধ পরিচালনার খরচ ও সশস্ত্র বাহিনীকে সজ্জিত করার জন্য যে অর্থ আসত, তা সবই ছিল ব্রিটিশ অস্ত্র ও অর্থ। তাই, অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো, বিশেষ করে ফ্রান্স, ওয়াহাবি অভিযানের বিরোধিতা করেছিল, কারণ এটিকে একটি ব্রিটিশ অভিযান হিসেবে গণ্য করা হতো। খিলাফত রাষ্ট্র ওয়াহাবিদের দমন করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি, এবং মদিনা ও বাগদাদের তার ওয়ালিরা তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হন। ফলে, তিনি মিশরের তার ওয়ালি মুহাম্মদ আলীকে তাদের মোকাবিলা করার জন্য একটি বাহিনী পাঠানোর নির্দেশ দেন। প্রথমে তিনি ইতস্তত করেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন ফ্রান্সের একজন চর, এবং ফ্রান্সই তাকে মিশরে অভ্যুত্থান ঘটাতে ও ক্ষমতা দখল করতে সাহায্য করেছিল, এবং তারপর খিলাফতকে তাকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য করেছিল। তাই ফ্রান্সের সম্মতি ও প্ররোচনায়, মুহাম্মদ আলী ১৮১১ সালে সুলতানের দাবিতে সাড়া দেন এবং ওয়াহাবিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তার পুত্র তোসুনকে পাঠান। মিশরীয় সেনাবাহিনী ও ওয়াহাবিদের মধ্যে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং ১৮১২ সালে মিশরীয় সেনাবাহিনী মদিনা জয় করতে সক্ষম হয়। এরপর ১৮১৬ সালে মুহাম্মদ আলী কায়রো থেকে তার পুত্র ইব্রাহিমকে পাঠান, যিনি ওয়াহাবিদের এমনভাবে পরাজিত করেন যে তারা তাদের রাজধানী আল-দিরিয়্যাতে পিছু হটে সেখানে নিজেদের সুরক্ষিত করে। এরপর ১৮১৮ সালের এপ্রিলে ইব্রাহিম তাদের অবরোধ করেন। এই অবরোধ পুরো গ্রীষ্মকাল ধরে চলে এবং ১৮১৮ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর ওয়াহাবিরা আত্মসমর্পণ করে। ইব্রাহিমের সেনাবাহিনী আল-দিরিয়্যা ধ্বংস করে এবং এটিকে সম্পূর্ণরূপে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। বলা হয় যে, তিনি সেই স্থানটি এমনভাবে কর্ষণ করিয়েছিলেন যাতে এর কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট না থাকে। এর মাধ্যমেই ব্রিটিশ অভিযানের সমাপ্তি ঘটে।
ইসলামী রাষ্ট্রকে আঘাত করার জন্য ফ্রান্সের প্রচেষ্টা:
ফ্রান্স তখন তার প্রতিনিধি, মিশরের ওয়ালী মুহাম্মদ আলীর মাধ্যমে পেছন থেকে ইসলামী রাষ্ট্রকে আঘাত করার চেষ্টা করে। ফ্রান্স আন্তর্জাতিকভাবে ও রাজনৈতিকভাবে তাকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছিল এবং তিনি খলিফার আনুগত্য ত্যাগ করে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি ১৮৩১ সালে আল-শাম (বৃহত্তর সিরিয়া) জয় করার লক্ষ্যে সেদিকে অগ্রসর হন। তিনি ফিলিস্তিন, লেবানন এবং সিরিয়া দখল করে আনাতোলিয়ার দিকে অনুপ্রবেশ শুরু করেন। তবে, খলিফা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। ব্রিটেন, রাশিয়া এবং দুটি জার্মান রাজ্য মুহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে চলে যায়। ১৮৪০ সালের জুলাই মাসে ব্রিটেন, রাশিয়া এবং দুটি জার্মান রাজ্য মিলে একটি জোট গঠন করে, যা “চতুর্পক্ষীয় জোট” নামে পরিচিতি লাভ করে। এই চুক্তি অনুসারে, এই রাজ্যগুলো উসমানীয় রাষ্ট্রের ঐক্য রক্ষা করতে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে মুহাম্মদ আলীকে সিরিয়া সমর্পণে বাধ্য করতে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। ইউরোপীয় দেশগুলোর এই অবস্থান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে খলিফার অনুকূলে নিয়ে আসে। এটি মুহাম্মদ আলীকে প্রতিরোধ করতে এবং তাকে সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও লেবানন থেকে বিতাড়িত করতে সাহায্য করে। মুহাম্মদ আলী মিশরে ফিরে আসেন, যেখানে তিনি খলিফার কর্তৃত্বের অধীনে ওয়ালী হিসেবে থাকতে সম্মত হন।
For Audio:
“কম ক্ষতি বেছে নেওয়া” নীতি: শরিয়াহ, রাজনীতি ও নির্বাচনে এর অপপ্রয়োগ

ভূমিকা
সমসাময়িক রাজনীতি, বিশেষত গণতান্ত্রিক নির্বাচন ও ভোটের প্রশ্নে মুসলিম সমাজে প্রায়শই ব্যবহৃত একটি যুক্তি হলো — “মন্দের ভালো” তথা “দুটি অনিষ্টের মধ্যে কম অনিষ্টটি বেছে নেওয়া” (The Lesser of Two Evils / Lesser of the Two Harms)। অনেক ইসলামি কর্মী, সংগঠন ও চিন্তাবিদ এই নীতিকে সামনে রেখে সংসদীয় রাজনীতি, আইন প্রণয়নকারী পরিষদ কিংবা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণকে বৈধ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই নীতি কি সত্যিই শরিয়াহসম্মত? এর সঠিক ক্ষেত্র ও শর্ত কী? আর আধুনিক নির্বাচনী রাজনীতিতে এর প্রয়োগ কি আদৌ সঠিক, নাকি এটি একটি মারাত্মক অপব্যাখ্যা?
এই প্রবন্ধে এই প্রশ্নগুলোর বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট শরঈ বিশ্লেষণ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এবং সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
১. “দুটি অনিষ্টের মধ্যে কম অনিষ্ট” নীতি: শরিয়াহর অবস্থান
প্রথমেই বুঝতে হবে, “কম ক্ষতিকরটি বেছে নেওয়া” নীতি সম্পূর্ণ মনগড়া কোনো ধারণা নয়। বহু ফকিহ ও উসূলবিদ এই নীতির কথা উল্লেখ করেছেন। এটি মূলত একটি উপ-নীতি, যা বৃহত্তর নীতির অধীনে আসে— “ক্ষতি দূর করা আবশ্যক” (الضرر يزال)
তবে শরিয়াহ অনুযায়ী এই নীতির প্রয়োগের জন্য কিছু কঠোর শর্ত রয়েছে:
১. সামনে থাকা দুটি বিষয়ই অবশ্যই নিষিদ্ধ (হারাম) হতে হবে
২. উভয় হারাম একসাথে পরিহার করা বাস্তবিক অর্থে অসম্ভব হতে হবে
৩. কোনটি কম ক্ষতিকর আর কোনটি বেশি ক্ষতিকর—তা শরিয়াহ নিজেই নির্ধারণ করবে, ব্যক্তিগত মত, সুবিধা বা আবেগ নয়
৪. কোনো তৃতীয় হালাল বা বৈধ বিকল্প থাকলে এই নীতির প্রয়োগ সম্পূর্ণ বাতিল
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
“আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।” (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)
এ আয়াত থেকেই ফকিহরা এই নীতির সীমিত বৈধতা বুঝিয়েছেন।
২. শরিয়াহতে নীতিটির সঠিক প্রয়োগ: ক্লাসিক উদাহরণ
ফকিহগণ এই নীতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বাস্তব ও অনিবার্য পরিস্থিতির উদাহরণ দিয়েছেন:
- প্রসবকালে যদি মা ও শিশুর উভয়ের জীবন বিপন্ন হয়, এবং একজনকে বাঁচালে অন্যজন মারা যাবে—তাহলে মাকে বাঁচানো অগ্রাধিকার পায়
- কেউ যদি দেখেন, একজন মানুষ ডুবে যাচ্ছে বা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, আর একই সময়ে নামাজের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে—তাহলে নামাজ বিলম্ব করে জীবন রক্ষা করা অগ্রাধিকার পায়
- কাউকে যদি জোর করে বলা হয়—তুমি অন্য একজন মুসলিমকে হত্যা করো, নতুবা তোমাকে হত্যা করা হবে—তাহলে শরিয়াহ অনুযায়ী তাকে নিজে নিহত হওয়াই গ্রহণযোগ্য, হত্যা করা নয়
এই সব উদাহরণে একটি বিষয় পরিষ্কার: এগুলো অনিবার্য পরিস্থিতি, যেখানে উভয় হারাম একসাথে পরিহার করা অসম্ভব
৩. নির্বাচনে ভোট দেওয়া: অনিবার্যতা নাকি কৃত্রিম সংকট?
এখন প্রশ্ন আসে—গণতান্ত্রিক নির্বাচনে ভোট দেওয়া কি এমন কোনো অনিবার্য পরিস্থিতি? না
কারণ:
- কাউকে ভোট দিতে শরিয়াহ বা বাস্তবতা কেউ বাধ্য করছে না
- ভোট না দেওয়ার বিকল্পটি সম্পূর্ণভাবে বিদ্যমান
- ভোট দেওয়া বা না দেওয়া—দুটোর মধ্যেই জীবন, ঈমান বা অস্তিত্ব রক্ষার মতো কোনো জরুরি অবস্থা নেই
অতএব এখানে “দুটি অনিষ্ট ছাড়া উপায় নেই”—এই দাবি মিথ্যা।
বরং এখানে একটি তৃতীয় হালাল বিকল্প রয়েছে:
ভোট থেকে বিরত থাকা এবং এই বাতিল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান গ্রহণ করা।
যেখানে তৃতীয় বিকল্প থাকে, সেখানে “কম অনিষ্ট” নীতির প্রয়োগ শরিয়াহ অনুযায়ী বাতিল।
৪. আইন প্রণয়ন ও কুফরি শাসনে অংশগ্রহণের সমস্যা
আরও গুরুতর সমস্যা হলো—গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে এমন ব্যক্তিকে ক্ষমতায় আনা, যিনি:
- আল্লাহর শরিয়াহ অনুযায়ী আইন প্রণয়ন করেন না
- মানুষের খেয়াল-খুশিকে আইন বানান
- হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম করার ক্ষমতা নিজের হাতে নেন
এ ধরনের ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া মানে তাকে এই কুফরি ক্ষমতায় অংশীদার বানানো।
এখানে একটি শক্তিশালী উপমা দেওয়া যেতে পারে:
“এটা এমন বলা যে—আমরা নিজেরা মদের দোকান খুলবো, যেন কাফিররা খুলে লাভ না করে।”
এই যুক্তি যেমন অযৌক্তিক, তেমনি ভোটের ক্ষেত্রে “কম অনিষ্ট” যুক্তিও অযৌক্তিক
৫. “কম ক্ষতিকর” কার জন্য? মুসলিম না সিস্টেম?
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—কে নির্ধারণ করবে কোন প্রার্থী কম ক্ষতিকর?
একজন মুসলিমের জন্য ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত স্বার্থে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত:
- মুসলিমদের হত্যা ও নিপীড়ন
- মুসলিম ভূমিতে আগ্রাসন
- কুফরি আইন প্রতিষ্ঠা
- ইসলামকে ব্যক্তিগত ধর্মে সীমাবদ্ধ করে রাখা
পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোতে নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি দল হয়তো অভ্যন্তরীণভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য করবে, আরেকটি দল বিদেশে মুসলিমদের ওপর বোমা ফেলবে—এখন কোনটি কম ক্ষতিকর? এই তুলনাই প্রমাণ করে যে বিষয়টি সম্পূর্ণ আপেক্ষিক ও খেয়ালনির্ভর, শরিয়াহনির্ধারিত নয়।
৬. পরাজিত মানসিকতা ও “রাজনৈতিক বাস্তবতা”
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক দিক তুলে ধরা প্রয়োজন, তা হলো — পরাজিত মানসিকতা
এই মানসিকতার বৈশিষ্ট্য হলো:
- ইসলামকে সম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসেবে বিশ্বাস না করা
- “রাজনৈতিক বাস্তবতা”কে চূড়ান্ত সত্য মনে করা
- কুফরি ব্যবস্থার ভেতরে জায়গা পাওয়াকেই সাফল্য ভাবা
কিন্তু রাসূল ﷺ এর সীরাত সম্পূর্ণ বিপরীত শিক্ষা দেয়। তিনি:
- কুরাইশের শাসন ভাগাভাগির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন
- আপসের বিনিময়ে ক্ষমতা গ্রহণ করেননি
- শর্তযুক্ত রাজনৈতিক সমর্থন গ্রহণ করেননি
ইসলাম কখনো “মন্দের ভালো” তথা “কম কুফর” চায় না; ইসলাম চায় কুফরের অবসান।
উপসংহার
“দুটি অনিষ্টের মধ্যে কম অনিষ্ট” নীতি একটি অত্যন্ত সীমিত, জরুরি ও শর্তসাপেক্ষ শর’ঈ নীতি। এটিকে গণতান্ত্রিক নির্বাচন, ভোট দেওয়া কিংবা কুফরি শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের বৈধতা দিতে ব্যবহার করা—একটি স্পষ্ট অপপ্রয়োগ।
শরিয়াহ আমাদের শিক্ষা দেয়:
- যতক্ষণ হারাম থেকে বাঁচা সম্ভব, ততক্ষণ হারাম বেছে নেওয়া বৈধ নয়
- রাজনৈতিক সুবিধা বা ভয় শর’ঈ ওজর নয়
- ইসলাম আপসের মাধ্যমে নয়, আদর্শের মাধ্যমে পরিবর্তন আনে
অতএব মুসলিমদের দায়িত্ব হলো—এই বিভ্রান্তিকর যুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে ইসলামের নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও সমাধানের দিকে ফিরে যাওয়া।
আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ ۖ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ ۚ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের চিন্তা কর। তোমরা যখন সৎপথে রয়েছ, তখন কেউ পথভ্রান্ত হলে তাতে তোমাদের কোন ক্ষতি নাই। তোমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। তখন তিনি তোমাদেরকে বলে দেবেন, যা কিছু তোমরা করতে। [আল-মায়েদা ৫:১০৫]
অডিও ভার্শন:
ইসলাম ও কুফরের মধ্যকার সংগ্রাম | ১ম অধ্যায়

কিভাবে খিলাফত ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়
১ম অধ্যায়: ইসলাম ও কুফরের মধ্যকার সংগ্রাম
ইসলামী চিন্তাধারা ও কুফরি চিন্তাধারার মধ্যে এবং মুসলিম ও কাফিরদের মধ্যে তীব্র সংগ্রাম ইসলামের সূচনা লগ্ন থেকেই চলে আসছে। যখন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে প্রেরণ করা হলো, তখন এই সংগ্রামটি ছিল কেবল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম, এবং এর সাথে কোনো বস্তুগত সংগ্রাম জড়িত ছিল না। এই অবস্থা মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত বজায় ছিল, এরপর সেনাবাহিনী ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তখন থেকে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বস্তুগত সংগ্রামের সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামকে একত্রিত করেন। জিহাদের আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয় এবং সংগ্রাম চলতে থাকে। কেয়ামত আসা পর্যন্ত এবং আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) পৃথিবী ও তার উপর যা কিছু আছে তার উত্তরাধিকারী হওয়া পর্যন্ত এইভাবেই—বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের পাশাপাশি একটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম—চলতে থাকবে। একারণেই কুফর ইসলামের শত্রু, এবং একারণেই কাফিররা মুসলিমদের শত্রু থাকবে, যতক্ষণ এই পৃথিবীতে ইসলাম ও কুফর থাকবে, মুসলিম ও কাফির থাকবে, যতক্ষণ না সকলকে পুনরুত্থিত করা হয়। এটি একটি চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় সত্য। তাই এই বিষয়টি সম্পর্কে মুসলিমদের সারা জীবন সর্বদা স্পষ্ট ধারণা থাকা উচিত এবং ইসলাম ও কুফরের মধ্যে এবং মুসলিম ও কাফিরদের মধ্যে সম্পর্ক বিচার করার জন্য এটিকে একটি মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
বিশুদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম তেরো বছর ধরে চলেছিল। এটি ছিল সবচেয়ে কঠিন ও ভয়ংকর সংগ্রাম। অবশেষে ইসলামী চিন্তাধারা কুফরি চিন্তাধারাকে পরাজিত করে এবং আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) ইসলামকে বিজয়ী করেন। যে রাষ্ট্র মুসলিমদের সম্মান রক্ষা করে, ইসলামের ঢাল হিসেবে কাজ করে এবং জিহাদের মাধ্যমে মানুষের মাঝে হেদায়েত ছড়িয়ে দেয়, তা মদিনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
ইসলাম ও কুফরের মধ্যে এবং মুসলিম ও কাফির সেনাবাহিনীর মধ্যে একের পর এক যুদ্ধে সবচেয়ে ভয়াবহ ও কঠিন যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই সমস্ত যুদ্ধে বিজয় মুসলমানদেরই হয়েছিল। যদিও মুসলমানরা কিছু যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল, তবুও তারা সর্বদা যুদ্ধে জয়লাভ করেছিল এবং ছয় শতাব্দী ধরে তারা কোনো যুদ্ধে হারেনি, বরং সেই সময়ে তাদের সমস্ত যুদ্ধে বিজয়ী ছিল। পুরো এই সময়কাল জুড়ে ইসলামী রাষ্ট্রই ছিল শীর্ষস্থানীয় জাতি। মুসলমানদের ছাড়া মানবজাতির ইতিহাসে এমনটি আর কখনও ঘটেনি, বরং এটি কেবল ইসলামী রাষ্ট্রের জন্যই নির্দিষ্ট ছিল। তবে অবিশ্বাসীরা, বিশেষ করে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো ইসলাম সম্পর্কে সচেতন ছিল, কারণ তারা এর উপর আক্রমণ করতে চেয়েছিল এবং তারা মুসলমানদের সম্পর্কেও সচেতন ছিল, কারণ তারা তাদের অস্তিত্বকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। সুযোগ পেলেই তারা মুসলমানদের উপর আক্রমণ করার বা তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার চেষ্টা করত। হিজরি ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ (খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দী) এবং হিজরি সপ্তম শতাব্দীর শুরুর (খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দী) মধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলো ইসলামী রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার সেই অবস্থাটি উপলব্ধি করেছিল, যেখানে রাষ্ট্রের দেহ থেকে প্রদেশগুলো খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাচ্ছিল এবং কিছু ওয়ালি (শাসক) সশস্ত্র বাহিনী, অর্থ, ক্ষমতা এবং এই জাতীয় অভ্যন্তরীণ নীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে স্বাধীন হয়ে পড়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, এটি একটি একক ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রের পরিবর্তে রাজ্যগুলোর একটি ফেডারেশনের মতো হয়ে গিয়েছিল। কিছু প্রদেশে খলিফার কর্তৃত্ব কেবল মিম্বরে তার জন্য দোয়া করা, তার নামে মুদ্রা তৈরি করা এবং খারাজ থেকে তাকে কিছু অর্থ পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো এটি বুঝতে পেরেছিল, তাই তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড প্রেরণ করে এবং যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে মুসলমানরা পরাজিত হয় এবং কাফিররা পুরো আল-শাম অঞ্চল দখল করে নেয়: ফিলিস্তিন, লেবানন এবং সিরিয়া। তারা কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলগুলো দখল করে রেখেছিল, এমনকি ত্রিপোলির মতো কিছু এলাকা একশ বছর ধরে তাদের দখলে ছিল।
যদিও ক্রুসেডার এবং মুসলমানদের মধ্যে যুদ্ধগুলো শত বছর ধরে অবিরাম চলছিল, এবং যদিও ক্রুসেডারদের দ্বারা বিজিত ভূমিগুলো পুনরুদ্ধার করার জন্য মুসলমানদের প্রচেষ্টা থেমে যায়নি, তবুও এই যুদ্ধগুলো ইসলামী উম্মাহকে অস্থির করে তুলেছিল এবং ইসলামী রাষ্ট্রের মর্যাদা হ্রাস করেছিল। মুসলমানরা যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল এবং কাফিরদের হাতে পরাস্ত হয়েছিল। যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফিরদের বিজয় হয়েছিল। যদিও ইসলাম বনাম কুফরের বিজয়, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বা আধ্যাত্মিকভাবে, কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি, তবুও মুসলমানদের উপর যে লজ্জা ও অপমান নেমে এসেছিল তা ছিল কল্পনাতীত। সুতরাং, ক্রুসেডের যুগকে মুসলমানদের জন্য পরাজয়ের যুগ হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ আল-শাম থেকে ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করে শেষ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করা সত্ত্বেও, তারা অবিশ্বাসীদের সাথে বিজয় অভিযান ও যুদ্ধ চালিয়ে যায়নি। ক্রুসেড শেষ হওয়ার পরপরই মোঙ্গলরা এসে পড়ে এবং বাগদাদের গণহত্যা সংঘটিত হয়। এই বিপর্যয়ের পরপরই একই বছরে (৬৫৬ হিজরি, ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ) মোঙ্গলদের হাতে দামেস্কের পতন ঘটে। এরপর ১২৬০ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর আইন জালুতের যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যেখানে মোঙ্গলরা ধ্বংস হয়। মোঙ্গলদের ধ্বংসের পর মুসলমানদের অন্তরে জিহাদের আবেগ জেগে ওঠে এবং তারা বিশ্বে দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার কাজ পুনরায় শুরু করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ফলে, কাফিরদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় অভিযান আবারও শুরু হয় এবং বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে জিহাদ পুনরায় শুরু করা হয়। যুদ্ধ শুরু হয় এবং একের পর এক বিজয় অর্জিত হতে থাকে। হিজরি সপ্তম শতাব্দীর (খ্রিস্টীয় ১৩শ শতাব্দী) দিকে ইসলামী উম্মাহ পুনরায় বিজয় অভিযান শুরু করে। যুদ্ধ চলতে থাকে এবং বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়, এবং মুসলমানরা সর্বদা বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়, কারণ যদিও মুসলমানরা কিছু যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল, তারা যুদ্ধগুলো জিতত এবং ভূমি জয় করত। ইসলামী রাষ্ট্র ছিল অগ্রণী জাতি এবং এটি হিজরি ১২শ শতাব্দীর মাঝামাঝি (খ্রিস্টীয় ১৮শ শতাব্দী) পর্যন্ত চার শতাব্দী ধরে শীর্ষস্থান দখল করে রেখেছিল। এরপর ইউরোপে শিল্প বিপ্লব এক অসাধারণভাবে আবির্ভূত হয়, যা রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এই বিপ্লবের ফলে মুসলমানরা নিষ্ক্রিয় ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল, ফলে বিশ্বে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তিত হয় এবং ইসলামী রাষ্ট্র ধীরে ধীরে শীর্ষস্থান থেকে পতনের দিকে ধাবিত হতে শুরু করে, অবশেষে তা লোভীদের কাঙ্ক্ষিত বস্তুতে পরিণত হয়। ফলে, তারা তাদের বিজিত ভূমি এবং পূর্বে তাদের অধীনে থাকা অঞ্চলগুলো থেকে সরে যেতে শুরু করে। অবিশ্বাসী দেশগুলো তাদের কাছ থেকে ইসলামের ভূমি খণ্ড খণ্ড করে দখল করতে শুরু করে, এবং এটিই ছিল মুসলমানদের জন্য উত্থানের সমাপ্তি ও পতনের সূচনা। তখন থেকেই ইউরোপীয় দেশগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে ইসলামী রাষ্ট্রকে অপসারণ এবং জীবনের সকল ক্ষেত্র ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক থেকে ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলার দিকে মনোযোগ দেয়। অন্য কথায়, তারা একটি নতুন ক্রুসেড অভিযানের কথা ভাবতে শুরু করে। তবে প্রথম ক্রুসেডের মতো নয়, নতুন ক্রুসেডগুলো মুসলমানদের পরাজিত করতে এবং ইসলামী রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার জন্য নিছক একটি সামরিক আক্রমণের চেয়েও বেশি কিছু ছিল। নতুন ক্রুসেডগুলো ছিল আরও ভয়াবহ এবং এর পরিণতি ছিল আরও সুদূরপ্রসারী। এগুলো এমনভাবে পরিকল্পিত হয়েছিল যাতে ইসলামী রাষ্ট্রকে সমূলে উৎপাটিত করা যায়, তার কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট না থাকে এবং তার একটি শিকড়ও যেন আর গজাতে না পারে। এগুলো মুসলমানদের অন্তর থেকে ইসলামকে উপড়ে ফেলার জন্যও পরিকল্পিত হয়েছিল, যাতে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও আধ্যাত্মিক রীতিনীতি ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট না থাকে।
অডিও ভার্শন:
জিলবাব ও মুসলিম নারীর পোশাকবিধি

ইসলামী আইনের উৎসসমূহ
ইসলামী আইনের প্রধান উৎস হলো কুরআন ও সুন্নাহ। কুরআন — যা মুসলমানদের কাছে পবিত্র গ্রন্থ — এতে প্রায় ৫০০টি আয়াত রয়েছে, যা বিভিন্ন বিষয়ে আইনি গুরুত্ব বহন করে। সুন্নাহ বলতে বোঝায় নবী মুহাম্মদ ﷺ–এর বাণী, কাজ ও অনুমোদনের বর্ণনাসমূহের সংকলন। সুন্নাহর ভূমিকা হলো কুরআনের নির্দেশনাগুলোকে ব্যাখ্যা ও বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা। এই দুটি মূল উৎস থেকে আরও কিছু গৌণ উৎস নির্ধারিত হয়েছে, যেমন ইজমা (আইনগত ঐকমত্য), কিয়াস (তুলনামূলক যুক্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ) এবং আরও কিছু বিতর্কিত উৎস, তবে এগুলো বর্তমান আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক নয়।
ইসলামী পোশাকবিধির ধারণা
ইসলামী আইন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ও সামাজিক আচরণ—উভয় ক্ষেত্রেই একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান উপস্থাপন করে। এরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পোশাক ও সাজসজ্জা সংক্রান্ত বিধান। এই পোশাকবিধান নারী ও পুরুষ—উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। যেমন, একজন পুরুষের জন্য নির্দিষ্ট অংশ শরীর ঢেকে রাখা ফরজ। পাশাপাশি তার জন্য স্বর্ণ ও রেশম পরিধান নিষিদ্ধ, যা নারীদের জন্য অনুমোদিত। অন্যদিকে, নারীদের জন্য পরিবারের বাইরে বের হলে দেহের নির্দিষ্ট অংশ আবৃত রাখা বাধ্যতামূলক; এর মধ্যে রয়েছে মাথা ঢাকার কাপড় (খিমার) এবং বাহ্যিক পোশাক (জিলবাব), যা পুরুষদের জন্য আবশ্যক নয়। অতএব, জিলবাব কোনো নতুন উদ্ভাবন নয়; বরং এটি মুসলিম নারীদের সুপরিচিত ও প্রাচীন পোশাকবিধানেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শরীয়ায় জিলবাবের স্পষ্ট উল্লেখ:
নারীদের জন্য জিলবাব পরিধানের বিধান সরাসরি কুরআন থেকেই প্রমাণিত। সূরা আল-আহযাব এ আল্লাহ তা’আলা নবী মুহাম্মদ ﷺ-কে উদ্দেশ্য করে বলেন:
“হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের, তোমার কন্যাদের এবং মুমিন নারীদের বলে দাও—তারা যেন নিজেদের উপর তাদের জিলবাব টেনে দেয়। এতে তারা সহজে চিহ্নিত হবে এবং তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [২]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত এই আয়াতে নারীদের জিলবাব পরিধানের উল্লেখ করা হয়েছে,যাতে — তারা শালীনভাবে আবৃত থাকে এবং অসৎ ও চরিত্রহীন লোকদের কটূক্তি ও অপমান থেকে রক্ষা পায়।
জিলবাবের বাধ্যবাধকতা নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর সুন্নাহ থেকেও প্রমাণিত, যা মুসলমানদের জন্য আইনের দ্বিতীয় প্রধান উৎস।
উম্মে আতিয়্যা (রা.) বর্ণনা করেন:
আমাদেরকে আদেশ দেওয়া হতো — ঈদের দিনে ঋতুবতী নারী ও পর্দানশীল নারীদেরও ঈদের সমাবেশ ও মুসলমানদের দোয়া-মুনাজাতে উপস্থিত করতে। তবে ঋতুবতী নারীরা নামাজের স্থানে (মুসাল্লায়) যাবে না। তখন এক নারী জিজ্ঞেস করল, “হে আল্লাহর রাসূল! যার কাছে জিলবাব নেই, তার কী হবে?” তিনি বললেন, “সে যেন তার সখীর কাছ থেকে একটি জিলবাব ধার নেয়।” [৩]
উপরোক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার সময় নারীদের বাস্তব আচরণ থেকেও এই বিধানের প্রয়োগ স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, যেমন: নিচের বর্ণনাগুলোতে দেখা যায়:
উম্মে সালামা (রা.)—বর্ণনা করেন:
যখন এই আয়াত নাযিল হলো—“তারা যেন নিজেদের উপর তাদের জিলবাব টেনে দেয়”—তখন আনসার নারীরা এমনভাবে বাইরে বের হলেন, যেন তাদের মাথার উপর কাক বসে আছে (অর্থাৎ সম্পূর্ণভাবে আবৃত অবস্থায় জিলবাব পরিধান করে)। [৪]
আয়িশা (রা.)—বর্ণনা করেন:
রিফা‘আ আল-কুরাযির স্ত্রী আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে এলেন, তখন আমি সেখানে বসা ছিলাম… এবং তিনি তার জিলবাবের কিনারা দেখাচ্ছিলেন। [৫]
কুরআনের ব্যাখ্যাকারক (মুফাসসির) আলেমদের মতামত
কুরআনের প্রাচীন ও খ্যাতনামা তাফসিরকারকগণ সবাই জিলবাবের শরঈ বৈধতা ও বাধ্যবাধকতাকে সমর্থন করেছেন। পার্থক্য কেবল এ বিষয়ে—এটি মুখমণ্ডল ঢাকাকেও অন্তর্ভুক্ত করে কি না!
নিচে সুন্নি মুসলিমদের সবচেয়ে স্বীকৃত তাফসির গ্রন্থসমূহ থেকে কিছু উদ্ধৃতি দেওয়া হলো:
ইবন জারির আত-তাবারি (মৃ. ৩১০ হি.) বলেন:
“আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী মুহাম্মদ ﷺ-কে বলেছেন—তুমি তোমার স্ত্রীদের, কন্যাদের এবং মুমিন নারীদের বলে দাও যেন তারা নিজেদের উপর তাদের জিলবাব টেনে নেয়।”
আল-কুরতুবি (মৃ. ৬৭১ হি.) বলেন:
“জালাবীব হলো জিলবাবের বহুবচন। এটি খিমার (মাথা ঢাকার কাপড়)-এর চেয়েও বড় একটি পোশাক। ইবন আব্বাস ও ইবন মাসউদের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে—এটি একটি রিদা (বড় চাদর)। কেউ কেউ বলেন এটি নেকাব বা পর্দা; তবে সঠিক মত হলো—এটি এমন একটি পোশাক যা পুরো শরীর আবৃত করে। সহিহ মুসলিমে উম্মে আতিয়্যা (রা)-এর হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যেখানে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল! যার কাছে জিলবাব নেই, তার কী হবে?’ তিনি উত্তর দেন: ‘সে তার সাথীর জিলবাব ধার নিক।’”
ফখরুদ্দীন আর-রাজি (মৃ. ৬০৬ হি.) বলেন:
“জাহিলিয়াতের যুগে স্বাধীন নারী ও দাসী উভয়েই অনাবৃত অবস্থায় বাইরে যেত এবং ব্যভিচারপ্রবণ লোকেরা তাদের পিছু নিত; ফলে তাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া হতো। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা স্বাধীন নারীদের জিলবাব পরিধানের নির্দেশ দিয়েছেন।” [৮]
ইবন কাসির (মৃ. ৭৭৪ হি.) বলেন:
“আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল মুহাম্মদ ﷺ-কে নির্দেশ দেন—তিনি যেন মুমিন নারীদের, বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী ও কন্যাদের, নিজেদের উপর জিলবাব টেনে নিতে আদেশ করেন।” [৯]
আধুনিক যুগের একটি প্রসিদ্ধ সংকলিত তাফসির গ্রন্থ সাফওয়াতুত তাফাসির, যার রচয়িতা মুহাম্মদ আলি আস-সাবুনি, সেখানে বলা হয়েছে—সূরা আহযাবের ৫৯ নম্বর আয়াতে নবী ﷺ-কে বলা হয়েছে যেন তিনি নারীদের জানান যে, তারা একটি প্রশস্ত বাহ্যিক পোশাক পরিধান করবে। [১০] এটি ঐতিহ্যবাহী সুন্নি আলেমদের সর্বসম্মত মত।
এই মত কেবল সুন্নিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ইমামি শিয়া আলেমদের মধ্যেও একই দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান:
আল-জানাবিজি বলেন:
“নারীরা তাদের জিলবাব দিয়ে মুখ ও বুক ঢাকত না। তাই আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জিলবাব দিয়ে মুখ ও বুক ঢাকার নির্দেশ দেন, যেন তারা অন্য নারীদের থেকে পৃথকভাবে চিহ্নিত হয়। নারীর জিলবাব হলো সাধারণ পোশাকের উপর পরিধেয় একটি প্রশস্ত পোশাক…” [১১]
সমকালীন আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি
প্রাচীন (ক্লাসিক্যাল) আলেমদের মতে জিলবাব ফরজ—এই অবস্থানটি সমকালীন আলেমদের মধ্যেও সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। প্রাচীন আলেমদের মতোই সমকালীন আলেমদের মতপার্থক্য মূলত একটি বিষয়েই সীমাবদ্ধ—জিলবাব কি মুখমণ্ডল ঢাকাকে অন্তর্ভুক্ত করে, নাকি করে না। তবে জিলবাবের শর্ত ও মৌলিক ধারণা নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই।
সমকালীন দৃষ্টিভঙ্গির একটি প্রতিনিধিত্বমূলক উদাহরণ হিসেবে দেওবন্দি আলেম মুফতি ইবন আদম আল-কাউসারি বলেন:
“উপরোক্ত ব্যাখ্যা ও অন্যান্য ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট হয় যে, জিলবাব হলো এমন একটি বাহ্যিক পোশাক যা নারীকে অপরিচিত পুরুষদের সামনে বের হওয়ার সময় পরিধান করতে হয়। এই পোশাকটি প্রশস্ত, ঢিলেঢালা, শালীন এবং সম্পূর্ণ শরীর আবৃতকারী হতে হবে।”
শাইখ মুহাম্মদ আল-হানূতি বলেন:
“সূরা আল-আহযাবের ৫৯ নম্বর আয়াত একজন নারীকে জিলবাব পরিধানে উদ্বুদ্ধ করে। জিলবাব বলতে বোঝায় তার অভ্যন্তরীণ পোশাকের উপর পরিধেয় বাহ্যিক পোশাক, যার মাধ্যমে তার শরীরের সবকিছু আবৃত থাকে এবং দেহের আকৃতি প্রকাশ পায় না। এটিই শরিয়তের উদ্দেশ্য।”
জিলবাব কী?
জিলবাব হলো এমন একটি বাহ্যিক পোশাক, যা সম্পূর্ণ শরীর ঢেকে রাখে। এই সংজ্ঞাটি ভাষাগত (lexical) এবং পাঠগত (textual)—উভয় ভিত্তিতেই নির্ধারিত।
ভাষাগত দিক থেকে জিলবাবের সংজ্ঞা (বাহ্যিক পোশাক হিসেবে):
প্রাচীন আরবি অভিধানসমূহে “জিলবাব” শব্দের ব্যাখ্যা থেকে এর প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এসব উৎসে জিলবাবকে একটি বাহ্যিক পোশাক হিসেবেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ইবনে মানযূর বলেন:
“জিলবাব হলো বাহ্যিক পোশাক, চাদর বা আলখাল্লা। এটি ‘তাজাল্লাবাবা’ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো পোশাক পরিধান করা। জিলবাব এমন একটি বাহ্যিক কাপড় বা আবরণ, যা নারী তার অন্যান্য পোশাকের উপর জড়িয়ে নেয়—মাথা থেকে পা পর্যন্ত নিজেকে আবৃত করার জন্য। এটি সম্পূর্ণভাবে তার দেহ আড়াল করে।” [১২]
আল-ফাইরূজ আবাদি বলেন:
“জিলবাব হলো এমন বস্তু, যা ঢাকনার মতো করে ভেতরের পোশাকগুলোকে আচ্ছাদিত করে।” [১৩]
আধুনিক অভিধানগুলোর মধ্যেও ১৯শ শতকের প্রখ্যাত ব্রিটিশ ভাষাবিদ এডওয়ার্ড উইলিয়াম লেন-এর Arabic–English Lexicon উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন:
“জিলবাব: … এমন একটি পোশাক যা পুরো শরীরকে আবৃত করে; এটি নারীর জন্য একটি প্রশস্ত পোশাক, যা মিলহাফা (বড় চাদর)-এর চেয়ে কিছুটা ছোট; অথবা এমন একটি পোশাক, যার মাধ্যমে নারী তার অন্যান্য পোশাকের উপর আবরণ দেয়…” [১৪]
একই সংজ্ঞা পাওয়া যায় জন এল. এসপোসিতো সম্পাদিত Oxford Dictionary of Islam-এ:
“জিলবাব: আরব সমাজে ইসলাম-পূর্ব ও ইসলাম-পরবর্তী যুগে নারীদের বাহ্যিক পোশাকের একটি সাধারণ নাম (শাল, চাদর, আবরণ)। কুরআনের (৩৩:৫৯) আয়াতে মুসলিম নারীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—তারা যেন নিজেদের উপর আবরণ টেনে নেয়, যা সামাজিক মর্যাদার পরিচয় এবং জনসমক্ষে যৌন হয়রানি থেকে রক্ষার একটি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা।” [১৫]
শর’ঈ (textual) দিক থেকে জিলবাবের সংজ্ঞা:
জিলবাব যে একটি বাহ্যিক পোশাক—এই সিদ্ধান্ত কেবল ভাষাগত নয়; বরং কুরআন ও রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ থেকেও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত।
কুরআনের সূরা নূর (২৪:৬০)-এ বয়স্ক নারীদের জন্য একটি বিশেষ রুখসত (ছাড়) উল্লেখ করা হয়েছে:
“আর যারা সন্তান ধারণের বয়স অতিক্রম করেছে এবং বিয়ের আশা রাখে না—তাদের জন্য কোনো গুনাহ নেই যদি তারা তাদের বাহ্যিক পোশাক খুলে রাখে, শর্ত হলো তারা যেন নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তবে সংযম অবলম্বন করাই তাদের জন্য উত্তম। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
এখানে যে পোশাক খুলে রাখার কথা বলা হয়েছে, তা অবশ্যই বাহ্যিক পোশাক। কারণ সাধারণ দৈনন্দিন পোশাক খুলে রাখার অনুমতি দেওয়া হতে পারে না। এ কারণেই নবী ﷺ-এর সাহাবিগণ—যেমন ইবন আব্বাস (রাঃ) ও ইবন মাসউদ (রাঃ)—এই পোশাককে জিলবাব হিসেবেই বুঝেছেন। তাঁরা উভয়েই কুরআনের তাফসিরে বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃত। [১৬]
সুন্নাহ থেকে প্রমাণ:
উম্মে আতিয়্যা (রাঃ)-এর পূর্বে বর্ণিত হাদিস থেকেও স্পষ্ট বোঝা যায় যে,
জিলবাব একটি বাহ্যিক পোশাক। নবী ﷺ স্পষ্টভাবে বলেছেন—নারী বাইরে বের হওয়ার আগে অবশ্যই জিলবাব পরিধান করবে; আর যার কাছে নেই, সে যেন অন্যের কাছ থেকে ধার করে নেয়। [১৭]
এ থেকে বোঝা যায়—জিলবাব ছাড়া বাইরে যাওয়া অনুমোদিত নয় এবং এটি স্বতন্ত্র একটি বাহ্যিক পোশাক।
আবু দাউদ-এ উম্মে সালামা (রা.)—নবী ﷺ-এর স্ত্রী—থেকে বর্ণিত একটি হাদিসও এ বিষয়টি স্পষ্ট করে। তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন:
“একজন নারী কি ইজার (এক ধরনের জিলবাব) ছাড়া শুধু লম্বা জামা ও মাথার ওড়না পরে নামাজ পড়তে পারে?” নবী ﷺ উত্তরে বলেন: “যদি লম্বা জামাটি যথেষ্ট প্রশস্ত হয় এবং তার পায়ের উপরিভাগ ঢেকে রাখে।”
উম্মে সালামা (রা.)-এর এই প্রশ্ন থেকেই বোঝা যায়—ইজার বা জিলবাব সাধারণ পোশাকের উপরেই পরিধান করা হতো।
সাহাবিদের বক্তব্যও একই বিষয়কে সমর্থন করে। যেমন, উমর (রা.) বলেন:
“নারী তিনটি পোশাক পরে নামাজ আদায় করবে—লম্বা জামা, মাথার ওড়না এবং ইজার (জিলবাব)।”
তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.) বলেন:
“নারী লম্বা জামা, মাথার ওড়না এবং মিলহাফা (জিলবাব) পরে নামাজ আদায় করবে।” [২০]
ফিকহবিদদের মতামত
এইসব বর্ণনার ভিত্তিতেই আল-শিরাজি বলেন:
“নারীর জন্য নামাজে তিনটি পোশাক পরিধান করা মুস্তাহাব—একটি মাথার ওড়না, একটি জামা যা শরীর ও পা ঢাকে, এবং একটি মিলহাফা (জিলবাব), যা তার পোশাকের উপর আবরণ হবে… এবং জিলবাবটি মোটা হওয়া উচিত, যাতে তা শরীরের আকৃতি প্রকাশ না করে এবং রুকু-সিজদার সময় সরে না যায়।”
ইমাম আন-নববি (রহ.)—যিনি আল-শিরাজির মুহাযযাব গ্রন্থের ব্যাখ্যাকার—এই মতকে ইমাম শাফেয়ির সঙ্গে সম্পৃক্ত করে বলেন:
“এই বিধান ইমাম শাফেয়ি উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর মাযহাবের আলেমরা এ বিষয়ে একমত।”
তিনি আরও বলেন:
“জিলবাব হলো এমন একটি চাদর, যা পোশাকের উপর পরিধান করা হয়—এটাই সঠিক মত এবং ইমাম শাফেয়ির মত।” [২২]
ইবনে হাযম তাঁর আল-মুহাল্লা গ্রন্থে বলেন:
“নবী ﷺ-এর যুগের আরবি ভাষায় জিলবাব বলতে বোঝায় এমন একটি বাহ্যিক পোশাক, যা সম্পূর্ণ শরীর ঢেকে দেয়। যে কাপড় পুরো শরীর ঢাকতে পারে না, তাকে কখনোই জিলবাব বলা যায় না।” [২৩]
অতএব, জিলবাব যে একটি বাহ্যিক পোশাক—এই বিষয়টি কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবিদের ব্যাখ্যা এবং প্রাচীন ও আধুনিক আলেমদের সর্বসম্মত মতের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত।
অন্যান্য শর্তাবলি
জিলবাবের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়—এমন কিছু শর্তও রয়েছে, যা নারীরা মাহরাম নন এমন পুরুষদের সামনে (যাদের সঙ্গে বিবাহ বৈধ নয়) ঘরের ভেতরে বা বাইরে উপস্থিত হলে তাদের সকল পোশাকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। শর্তগুলো হলো—
- পোশাক ঢিলেঢালা হতে হবে
- আধা-স্বচ্ছ বা স্বচ্ছ হওয়া চলবে না
- দৃষ্টি আকর্ষণকারী হওয়া যাবে না (তাবাররুজ)
- পুরুষদের পোশাকের সঙ্গে সাদৃশ্য থাকা যাবে না
এই শর্তগুলো সুপরিচিত ও সর্বস্বীকৃত। তাই এখানে এগুলোর বিস্তারিত প্রমাণ আলোচনার প্রয়োজন নেই। এ বিষয়ে আরও জানতে চাইলে ইসলামী ফিকহের প্রাসঙ্গিক গ্রন্থসমূহ দেখা যেতে পারে। [২৪]
সালওয়ার-কামিজ কি যথেষ্ট?
এখানে মূল প্রশ্ন হলো—সালওয়ার-কামিজ কি জিলবাবের মৌলিক শর্তগুলো পূরণ করে? অর্থাৎ, এটি কি এমন একটি ঢিলেঢালা বাহ্যিক পোশাক, যা পুরো শরীর আবৃত করে?
সাধারণভাবে সালওয়ার-কামিজ পুরো শরীর ঢাকে না; অনেক সময় শরীরের কিছু অংশ খোলা থাকে এবং এটি সবসময় ঢিলেঢালাও হয় না। এমনকি যদি ঢিলেঢালা ও আবৃত হওয়ার শর্ত পূরণও করা হয়, তবুও এটি বাহ্যিক পোশাক (outer garment) নয়। সালওয়ার-কামিজ সাধারণত দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের দৈনন্দিন পোশাক—যা ঘরের ভেতরে পরা হয়।
সংজ্ঞাগতভাবে বাহ্যিক পোশাক হলো—যা ঘরের পোশাকের উপর পরিধান করে বাইরে যাওয়ার সময় ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সালওয়ার-কামিজ নিজেই ঘরের স্বাভাবিক পোশাক। অতএব, অন্যান্য শর্ত আলোচনায় যাওয়ার আগেই এটি প্রথম ও মৌলিক শর্ত—বাহ্যিক পোশাক হওয়া—এই মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয় না।
শালীন পোশাক পরাই কি জিলবাবের শর্ত পূরণ করে?
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে—শালীন পোশাক বলতে আমরা কী বুঝি—তার ওপর। যদি শালীনতার সংজ্ঞার মধ্যে উপরে উল্লিখিত শর্তগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে উত্তর ভিন্ন হতে পারে।
এটি সত্য যে বাহ্যিক পোশাকের নকশা বা রূপ একরকম হওয়া জরুরি নয়; তবে সেগুলোকে অবশ্যই ইসলামী শরিয়ত নির্ধারিত শর্তগুলো পূরণ করতে হবে। শালীনতা কোনো ব্যক্তির নিজস্ব বা ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার বিষয় নয়; বরং এর জন্য সুস্পষ্ট নিয়ম নির্ধারিত আছে। শালীনতা এসব শর্তের ঊর্ধ্বে যেতে পারে না; বরং এগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করেই শালীনতা পূর্ণতা পায়।
অতএব, শুধু পুরো শরীর ঢাকলেই যথেষ্ট নয়—যদি পোশাকটি আঁটসাঁট হয়। আবার শুধু ঢিলেঢালা হলেই চলবে না—যদি তা বাহ্যিক পোশাক না হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাহ্যিক পোশাক বিভিন্ন রূপে হতে পারে—শর্ত হলো, প্রতিটি নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে হবে।
ইসলামী আইনগত মতভেদ ও একজন মুসলমান:
যারা ইসলামী আইনের সঙ্গে পরিচিত নন, তারা প্রায়ই অবাক হন—কেন কিছু মুসলিম এমন একটি বিধান অনুসরণ করেন, যা অন্য মুসলিমরা অনুসরণ করেন না। ফলে তারা মনে করেন—যিনি এই বিধান মানছেন, তিনি হয়তো অতিরিক্ত কঠোর বা চরমপন্থী।
বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। যেমন—কোনো নির্দিষ্ট আলেম একটি পোশাককে বৈধ বলেছেন—এর অর্থ এই নয় যে অন্যরা সেই মত অনুসরণ করতে বাধ্য, এমনকি অনুমতিপ্রাপ্তও। ইসলামী আইন একটি সমৃদ্ধ আইনব্যবস্থা, যেখানে আলেমদের মধ্যে বিস্তারিত বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো—যে আলেমকে তিনি সবচেয়ে যোগ্য, বিশ্বস্ত ও জ্ঞানী মনে করেন—তার ফতোয়া অনুসরণ করা।
এখানে নিজস্ব সুবিধা বা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা মানদণ্ড নয়; বরং তা আলেমের যোগ্যতা ও প্রজ্ঞা। একবার কোনো ব্যক্তি আন্তরিকভাবে একটি ফতোয়া অনুসরণ করলে, সেটিই তার জন্য আল্লাহর বিধান হিসেবে গণ্য হয় এবং সামাজিক সমর্থন বা বিরোধিতার কারণে তা পরিবর্তন করা বৈধ নয়। কারণ, সেই বিধান অমান্য করা মানে একটি ধর্মীয় দায়িত্ব পরিত্যাগ করা—যার জবাব আখিরাতে দিতে হবে।
এই প্রসঙ্গে, কোনো মুসলিম নারী যদি কোনো নির্দিষ্ট আলেমের ব্যাখ্যা অনুযায়ী জিলবাব ফরজ মনে করেন, তবে অন্য ভিন্নমত থাকলেও তার জন্য সেই মত অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন—এই মতটিই সঠিক। এখানে প্রচলিত বা সুবিধাজনক মতের কোনো গুরুত্ব নেই। বিশেষ করে জিলবাবের বিষয়টি এমন একটি বিধান—যা শরিয়তের ভাষা ও আত্মা—উভয়ের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্রাচীন সুন্নি ও শিয়া আলেমদের মধ্যেও এটি কখনো বড় কোনো বিতর্কের বিষয় ছিল না।
ধর্মীয় দায়িত্ব নাকি রাজনৈতিক বক্তব্য?
জিলবাব মূলত এবং সর্বাগ্রে একটি ধর্মীয় দায়িত্ব। এর ভিত্তি এসেছে সরাসরি ইসলামী উৎস থেকে—আধুনিক মুসলিমদের রাজনৈতিক লেখালেখি থেকে নয়। প্রাচীন ফকিহগণ প্রায় এক হাজার বছর আগেই এর বাধ্যবাধকতা ব্যাখ্যা করেছেন—বর্তমান রাজনৈতিক ইসলামের উত্থানের বহু আগে।
অতএব, জিলবাব আজকের রাজনৈতিক বিতর্কের ফসল নয়। এটি পরিধানের প্রেরণা আসে ধর্মীয় দায়িত্ববোধ থেকে—রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার জন্য নয়। যদি কেউ জিলবাবকে রাজনৈতিক বা ফ্যাশনের প্রতীক হিসেবে পরে—ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে নয়—তবে তা ইবাদত হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না; বরং গুনাহ হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ আল্লাহর ইবাদতে গ্রহণযোগ্য একমাত্র উদ্দেশ্য হলো—খাঁটি আনুগত্য।
জিলবাব কি নিপীড়নের প্রতীক?
কিছু অমুসলিমের দৃষ্টিতে মুসলিম নারীর পোশাক নিপীড়নের প্রতীক। তাদের দাবি—জিলবাব নারীর নীচু মর্যাদার পরিচায়ক, এটি জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, অথবা এটি নারীর সামাজিক অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে।
পোশাকের বিধান নিয়ে এই দৃষ্টিভঙ্গী আল্লাহর প্রজ্ঞা কে বুঝতে না পারা বা এই হুকুম পালনের ইতিবাচক দিক বিবেচনা না করা থেকেও আসে নি বরং এমন চিন্তার উৎস হলো—কিছু মুসলিম পুরুষের দ্বারা নারীর ওপর সংঘটিত অপব্যবহার (যা ইসলাম নিজেই নিন্দা করে) অথবা ইসলামে নারীর ভূমিকা সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা। [২৫]
ইসলামী আইন আল্লাহর কাছে নারী ও পুরুষকে মর্যাদা ও তাকওয়ার দিক থেকে সমান মনে করে। বিধানের ভিন্নতা কোনো লিঙ্গবৈষম্য থেকে নয়; বরং নারী-পুরুষের স্বভাবগত পার্থক্যকে স্বীকার করার ফল। অধিকাংশ বিধান নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই এক; অল্প কিছু ক্ষেত্রে পার্থক্য এসেছে স্বভাবগত ভিন্নতার কারণে।
মুসলিম নারীরা জিলবাব পরিধান করেন জনজীবনে শালীনতা বজায় রাখার জন্য এবং তারা মনে করেন—এটি তাদের মর্যাদা হ্রাস করে না; বরং বৃদ্ধি করে। বাস্তব অভিজ্ঞতায় অনেক নারী দেখেন—জিলবাব পরিধানের মাধ্যমে তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ, শিক্ষা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন—পুরুষদের অশোভন দৃষ্টি ও অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আগ্রাসন থেকে মুক্ত থেকে। [২৬]
অতএব, সামাজিক অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার পরিবর্তে, জিলবাব বরং নারীর ক্ষমতায়ন ও স্বাধীনতাকে সহজ করে—একটি শালীন ও নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলে।
—–
পরিশিষ্ট–১:
মুফতি আল-কাউসারির ফতোয়া [২৭]
আল্লাহর নামে—যিনি পরম দয়ালু, পরম করুণাময়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের, কন্যাদের এবং মুমিন নারীদের বলে দাও—তারা যেন নিজেদের উপর তাদের বাহ্যিক পোশাক (জিলবাব) টেনে নেয়। এতে তারা পরিচিত হবে এবং তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আল-আহযাব: ৫৯)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে—নারীর জন্য জিলবাব দ্বারা নিজেকে আবৃত করা ফরজ। এখন প্রশ্ন আসে—জিলবাব কী?
লিসানুল আরব-এ বলা হয়েছে:
“জিলবাব (বহুবচন: জালাবীব) হলো বাহ্যিক পোশাক বা চাদর, যার মাধ্যমে নারী তার মাথা ও বুক ঢাকে। আরও বলা হয়েছে—এটি এমন একটি লম্বা চাদর, যা নারীকে সম্পূর্ণভাবে আবৃত করে।” (ইবন মানযূর)
ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন:
“জিলবাব হলো এমন একটি লম্বা চাদর, যা নারীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে দেয়।”
এই ব্যাখ্যাগুলো স্পষ্ট করে—জিলবাব হলো এমন একটি বাহ্যিক পোশাক, যা নারী অপরিচিত পুরুষদের সামনে বের হওয়ার সময় পরিধান করবে। এটি প্রশস্ত, ঢিলেঢালা, শালীন এবং সম্পূর্ণ শরীর আবৃতকারী হতে হবে।
এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর সাহাবি নারীরা এমনভাবে বাইরে বের হতেন—যেন তাদের মাথার উপর পাখি বসে আছে—অত্যন্ত সংযম ও শালীনতার সঙ্গে। তারা লম্বা কালো চাদর দিয়ে নিজেদের আবৃত করতেন।
অতএব, নারীর জন্য অপরিচিত পুরুষদের সামনে বের হওয়ার সময় ঢিলেঢালা ও শালীন বাহ্যিক পোশাক পরিধান করা আবশ্যক—তা বোরকা হোক বা অন্য কোনো উপযুক্ত পোশাক।
আর আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।
পরিশিষ্ট ২: আলেমদের জীবনী:
সমসাময়িক আলেমগণ:
মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনী: মক্কার শরিয়া ও ইসলামিক স্টাডিজ কলেজের একজন অধ্যাপক। তিনি ‘সাফওয়াত আত-তাফাসির’ গ্রন্থের লেখক (বৈরুত: দারুল কুরআন আল-কারিম, ১৪০২ হিজরি, ১৯৮১)।
মুফতি মুহাম্মদ ইবনে আদম আল-কাউসারি: মুফতি মুহাম্মদ ইবনে আদম আল-কাউসারি ব্রিটেনে ঐতিহ্যবাহী আলেমদের অধীনে ইসলামিক স্টাডিজের দারসে নিজামী পাঠ্যক্রম সম্পন্ন করেন, এরপর তিনি হাদিসে বিশেষীকরণ করেন, যেখানে তিনি হাদিসের ৯টি প্রধান গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন এবং পাকিস্তানে মুফতি তাকি উসমানী ও অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় আলেমদের অধীনে ফতোয়া প্রদানের বিজ্ঞানে ২ বছরের বিশেষীকরণ অর্জনের মাধ্যমে এটি সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি সিরিয়া যান, যেখানে তিনি আল-আজহার (কায়রো) থেকে উন্নত ফিকহে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন এবং শীর্ষস্থানীয় আরব আলেমদের অধীনে অধ্যয়ন করেন। এই আলেমদের মধ্যে একজন, শায়খ আবদ আল-লতিফ ফারফুর বলেছেন যে, মুফতি মুহাম্মদ ইবনে আদমের একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে এবং তিনি আমাদের সময়ের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আলেম হতে চলেছেন বলে মনে হয়। তিনি বর্তমানে লেস্টারের একটি দারুল উলুমে শিক্ষকতা করেন এবং দারুল ইফতাতে মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেন।[২৮]
শেখ মুহাম্মদ আল-হানুতি: জন্ম: ১২ মার্চ, ১৯৩৭, হাইফা, ফিলিস্তিন। শিক্ষা: তিনি তার পিতা শেখ আলী হানুতি থেকে শরিয়া শিক্ষা লাভ করেন এবং আল-আজহারে ১৯৫৩-১৯৫৮ সাল পর্যন্ত শেখ মুহাম্মদ সাঈদ আজ্জাওয়ীর কাছে হাদিস অধ্যয়ন করেন। পূর্ববর্তী পদসমূহ: ১৯৬২-১৯৬৫ সাল পর্যন্ত বাগদাদে ইমাম, শিক্ষক ও খতিব ছিলেন। ১৯৬৫-১৯৭৮ সাল পর্যন্ত কুয়েতে ইমাম, শিক্ষক ও খতিব ছিলেন। তিনি ১৯৭৮ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ইসলামিক কেন্দ্রের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যার মধ্যে নিউ জার্সির জার্সি সিটি এবং ভার্জিনিয়ার দার আল-হিজরাহ অন্তর্ভুক্ত। তিনি উত্তর আমেরিকান ফিকহ কাউন্সিলের একজন সদস্য।
শাস্ত্রীয় পণ্ডিতগণ:
ইবনে হাযম: জন্ম ৭ নভেম্বর, ৯৯৪, কর্ডোবা, কর্ডোবার খিলাফত; মৃত্যু ১৫ আগস্ট, ১০৬৪, মান্টা লিশাম, সেভিয়ার কাছে। পুরো নাম আবু মুহাম্মদ ‘আলী ইবনে আহমদ ইবনে সাঈদ ইবনে হাযম। ইসলামিক স্পেনের একজন মুসলিম সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ, আইনজ্ঞ এবং ধর্মতত্ত্ববিদ, যিনি তার সাহিত্যকর্মের প্রাচুর্য, জ্ঞানের বিশালতা এবং আরবি ভাষার উপর দক্ষতার জন্য বিখ্যাত। জাহিরি (আক্ষরিকতাবাদী) মাযহাবের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হিসেবে তিনি আইনশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় ৪০০টি গ্রন্থ রচনা করেন।[২৯]
ইবনে জারির আত-তাবারি (মৃ. ৩১০): জন্ম আনুমানিক ৮৩৯, আমোল, তাবারিস্থান [ইরান]; মৃত্যু ৯২৩, বাগদাদ, ইরাক। পুরো নাম আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারির আত-তাবারি। মুসলিম পণ্ডিত, যিনি প্রাথমিক ইসলামের ইতিহাস এবং কুরআনের ব্যাখ্যার উপর বিশাল সংকলন গ্রন্থের রচয়িতা এবং ৯ম শতাব্দীতে সুন্নি চিন্তাধারাকে সুসংহত করতে একটি স্বতন্ত্র অবদান রেখেছিলেন। প্রধান কর্মসমূহ: তার জীবনের কাজ শুরু হয়েছিল কুরআন ব্যাখ্যার মাধ্যমে এবং এরপর তিনি নবী ও রাজাদের ইতিহাস রচনা করেন। আত-তাবারি’র ইতিহাস এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে সামানিদ রাজপুত্র মনসুর ইবনে নূহ এটি ফারসি ভাষায় অনুবাদ করিয়েছিলেন (আনুমানিক ৯৬৩)।[৩০]
ফখর আদ-দীন আর-রাজি (মৃ. ৬০৬): জন্ম ১১৪৯, রায়, ইরান; মৃত্যু ১২০৯, হেরাতের কাছে, খোয়ারাজম। আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে উমর ইবনে আল-হুসাইন ফখর আদ-দীন আর-রাজি। মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিদ এবং পণ্ডিত, যিনি ইসলামের ইতিহাসে কুরআনের অন্যতম প্রামাণ্য ব্যাখ্যার রচয়িতা। তার আগ্রাসী মনোভাব এবং প্রতিহিংসাপরায়ণতা অনেক শত্রু তৈরি করেছিল এবং তাকে অসংখ্য ষড়যন্ত্রে জড়িত করেছিল। তবে তার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিভা সর্বজনীনভাবে প্রশংসিত হয়েছিল এবং মাফাতিহ আল-গায়ব বা কিতাব আত-তাফসীর আল-কবীর (অদৃশ্যের চাবিকাঠি” বা “বৃহৎ ব্যাখ্যা”) এবং মুহাসসাল আফকার আল-মুতাকাদ্দিমিন ওয়া-আল-মুতা’আখখিরিন (“প্রাচীন ও আধুনিকদের মতামতের সংগ্রহ”) এর মতো কাজের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হয়।[৩১] ইবনে কাসির (মৃ. ৭৭৪ হিজরি): ছিলেন একজন ইসলামী পণ্ডিত, যিনি ১৩০১ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ার বুসরা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সিরিয়ার দামেস্কে ইসলামী পণ্ডিত ইবনে তাইমিয়া এবং ইবনে আল-কাইয়্যিমের কাছে শিক্ষা লাভ করেন। ইবনে কাসির ‘তাফসিরে ইবনে কাসির’ নামে কুরআনের একটি বিখ্যাত তাফসীর রচনা করেন, যেখানে তিনি ব্যাখ্যার জন্য কুরআনের আয়াতগুলোর সাথে নির্দিষ্ট কিছু হাদিস বা মুহাম্মদের বাণী এবং সাহাবাদের বাণীকে সংযুক্ত করেছেন। তাফসিরে ইবনে কাসির সমগ্র ইসলামী বিশ্বে এবং পশ্চিমা বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে বিখ্যাত, এবং এটি বর্তমানে কুরআনের অন্যতম বহুল ব্যবহৃত ব্যাখ্যাগ্রন্থ।[৩২]
আন-নাওয়াভি (মৃ. ৬৭৬ হিজরি): (জন্ম ১২৩৩ – মৃত্যু ১২৭৮), ফিকহ ও হাদিস বিষয়ক লেখক, দামেস্কের কাছে নাওয়াতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আঠারো বছর বয়স থেকে এই শহরেই পড়াশোনা করেন এবং সেখানে ১২৫৩ সালে হজ করার পর ১২৬৭ সাল পর্যন্ত একজন স্বাধীন পণ্ডিত হিসেবে বসবাস করেন। এরপর তিনি আশরাফিয়া মাদ্রাসায় আবু শামা-র স্থলাভিষিক্ত হয়ে হাদিসের অধ্যাপক হন। তিনি তুলনামূলকভাবে অল্প বয়সে নাওয়াতে মারা যান এবং তিনি কখনো বিয়ে করেননি।[৩৩]
আল-কুরতুবি (মৃ. ৬৭১ হিজরি): ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে আবু বকর আল-আনসারি আল-কুরতুবি স্পেনের কর্ডোবায় জন্মগ্রহণ করেন, যা ছিল ইসলামী সভ্যতার স্বর্ণযুগের শীর্ষ সময়। তিনি একজন বিশিষ্ট মালিকি পণ্ডিত ছিলেন এবং ফিকহ ও হাদিসে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তার পাণ্ডিত্যের ব্যাপকতা ও গভীরতা তার লেখায় সুস্পষ্ট। তার সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ হলো বিশ খণ্ডের তাফসীর ‘আল-জামি’ লি-আহকাম আল-কুরআন’।[৩৪]
আশ-শাফিঈ: জন্ম ৭৬৭ খ্রিস্টাব্দ, আরব; মৃত্যু ২০ জানুয়ারি ৮২০ খ্রিস্টাব্দ, আল-ফুস্তাত, মিশর। মুসলিম আইনজ্ঞ পণ্ডিত যিনি ইসলামী আইন চিন্তাধারার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং শাফিঈ মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি ঐতিহ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও আইনি পদ্ধতির ক্ষেত্রেও একটি মৌলিক অবদান রাখেন।[৩৫]
ক্লাসিকাল আরবি অভিধানকারগণ:
আল-ফাইরুযাবাদী: আবু-ত-তাহির ইবনে ইব্রাহিম মাজদ উদ-দিন উল-ফাইরুযাবাদী (১৩২৯–১৪১৪) ছিলেন একজন আরবি অভিধানকার, যিনি আধুনিক ইরানের শিরাজ শহরের কাছে কারাজিনে জন্মগ্রহণ করেন এবং শিরাজ, ওয়াসিত, বাগদাদ ও দামেস্কে শিক্ষা লাভ করেন। তিনি দশ বছর জেরুজালেমে বসবাস করেন এবং তারপর পশ্চিম এশিয়া ও মিশর ভ্রমণ করে ১৩৬৮ সালে মক্কায় বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তী তিন দশকের বেশিরভাগ সময় তিনি সেখানেই কাটান, ১৩৮০-এর দশকে কিছুকাল দিল্লিতে অবস্থান করেন এবং অবশেষে ১৩৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে মক্কা ত্যাগ করে বাগদাদ, শিরাজ (যেখানে তিনি তৈমুরের দ্বারা সমাদৃত হন) এবং সবশেষে আধুনিক ইয়েমেনের তাইজে ভ্রমণ করেন। ১৩৯৫ সালে তাকে ইয়েমেনের প্রধান কাজী (বিচারক) নিযুক্ত করা হয় এবং তিনি সুলতানের এক কন্যাকে বিবাহ করেন। জীবনের শেষ বছরগুলিতে ফাইরুযাবাদী মক্কায় তার বাড়িটিকে মালিকি আইনের একটি বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করেন এবং সেখানে তিনজন শিক্ষক নিয়োগ করেন। তিনি স্প্যানিশ ভাষাবিদ ইবনে সিদা (মৃত্যু ১০৬৬) এবং সাজানির (মৃত্যু ১২৫২) অভিধানগুলিকে একত্রিত করে একটি বিশাল অভিধানমূলক গ্রন্থও রচনা করেন। এই শেষোক্ত গ্রন্থটির একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ ‘আল-কামুস আল-মুহিত’ (ব্যাপক অভিধান) নামে প্রকাশিত হয় এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি নিজেই পরবর্তী কিছু অভিধানের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।[৩৬] ইবনে মানজুর: সময়কাল: ১২৩০ – ১৩১১। পুরো নাম: জামালউদ্দিন মুহাম্মদ বিন মুকাররাম ইবনে মানজুর, তিউনিসে জন্মগ্রহণ করেন এবং কায়রোতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি বিশ খণ্ডে রচিত আরবি ভাষার সবচেয়ে ব্যাপক অভিধান ‘লিসানুল আরব’-এর লেখক।[৩৭]
Sources:
[1] For a good over view see: Sources of Islamic Law: An Overview by Yasin Dutton. http://www.muhajabah.com/docstorage/dutton.htm
[2] Qur’an: (33:59)
[3] Sahih Bukhari Book 8/347
[4] Sunan Abu Dawud 32/4090
[5] Sahih Bukhari Book 72/684
[6] Date of death according to Hijri calendar.
[7] pbuh is abbreviation for ‘peace be upon him.’
[8] ar-Razi, Fakhr ad-Din, at-Tafsir al-Kabir, p.231.
[9] Ibn Kathir, Tafsir al-Qur’an al-‘Azim.
[10] as-Sabuni, Muhammad Ali, safwat at-tafasir, p.538.
[11] al-Janabizi, Tafsir bayan al-sa’adah fi muqaddimat al-ibadah, see commentary of verse 59 of surah Ahzab.
[12]Ibn Man.zur, Mu.hammad ibn Mukarram, Lisan al-`Arab, (Bayrut : Dar .Sadir, 1955-56). Vol.7, p. 273.
[13] Al-Fayruzabadi, al-Qamus al-Muhit,
[14]Lane, Edward William, An Arabic-English lexicon, (London 1863-1893) under the relevant root verb.
[15] Esposito, John L. (ed.), The Oxford Dictionary of Islam, (Oxford University Press, 2003).p.160.
[16] al-Qurtubi, Jami li-ahkam al-Qur’an, verse 60 of sura Nur.
[17] Sahih Bukhari Book 8/347
[18] This narration is mawquf and is attributed more correctly to Umm Salama, the wife of the Prophet.
[19] Milhafa is a synonym of jilbab. Notice here Abdullah b. Umar uses the word milhafa (jilbab) instead of izar, indicating that izar here is the jilbab. See al-majmu’ sharh al-muhazzab, p.259.
[20] Al-Nawawi, al-majmu’ sharh al-muhazzab, (Beirut, 2002), pp.258.
[21] A major reference for Islamic law who’s interpretation of law is canonized in the Malaysian legal code.
[22] An-Nawawi, al-majmu’ sharh al-muhazzab, (Beirut, 2002), pp.258-9.
[23] Ibn Hazm, Al-Muhalla, vol. 3, p.217
[24] For a contemporary source see Badawi, Jamal, The Muslim Woman’s Dress According to the Qur’an and Sunnah, (Ta-Ha Publishers Ltd,1980) or http://members.tripod.com/iaislam/TMWD.htm
[25] Bullock, Kathrine, Rethinking Muslim Women and the Veil: Challenging and Historical and Modern Stereotypes, (Herndon, VA: International Institute of Islamic Thought, 2002).p.73.
[26] Ali, Sayyid, ‘Why Here, Why Now? Young Muslim Women Wearing Hijab,’ The Muslim World, vol.95, (2005), pp.515-530.
[27] http://sunnipath.com/resources/Questions/QA00002148.aspx
[28] http://www.sunnipath.com/aboutTeachers.aspx?sectionid=5&teacherid=12
[29] http://www.britannica.com/eb/article-9041918?query=Ibn%20Hazm&ct=
[30] http://www.britannica.com/eb/article-7063
[31] http://www.britannica.com/eb/article-9033610
[32] http://en.wikipedia.org/wiki/Ibn_Kathir
[33] http://en.wikipedia.org/wiki/Nawawi
[34] http://www.bysiness.co.uk/quran/qurtubi.htm
[35] http://www.britannica.com/eb/article-9067053?query=shafi%27i&ct=
[36] http://en.wikipedia.org/wiki/Fairuzabadi
[37] http://www.salaam.co.uk/knowledge/biography/viewentry.php?id=812প্রশ্ন-উত্তর: গান, সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্রের উপর শরীয়তের বিধান?

প্রশ্ন: গান গাওয়া বা শোনার ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান কী? বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের হুকুম কী এবং এর ব্যবসা কি অনুমোদিত? আমি আপনাকে দলিল সহ বিস্তারিত উত্তর দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি?
উত্তর: ইমাম (মুজতাহিদ) এবং ফকীহগণ গান গাওয়ার বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন এবং তাদের বিভিন্ন মতামত রয়েছে যেমন হারাম (নিষিদ্ধ), মাকরুহ (অপছন্দনীয়) এবং মুবাহ (অনুমোদিত), যারা এটি নিষিদ্ধ করেছেন তারা হলেন তাদের মধ্যে যারা গান গাওয়াকে ব্যবসা বা পেশা হিসেবে নিষিদ্ধ করার মতামত রাখেন এবং ইমাম শাফিঈ (রহ.) থেকেও একই মতামত এসেছে, এবং যারা এটি অপছন্দ করেছেন তাদের মধ্যে আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) এই বিষয়টিকে অপছন্দ করেছেন এবং এর পরিবেশনাকে অপছন্দনীয় কাজের মধ্যে শ্রেণীবদ্ধ করেছেন, শাফিঈ (রহ.) এবং আল-কাযী (রহ.) থেকেও একই মতামত এসেছে। এবং যারা এটিকে (অনুমোদিত) করেছেন তাদের মধ্যে ইবনে হাজম, আবু বকর আল খালাল, আবু বকর আব্দুল আজিজ, সাদ ইবনে ইব্রাহিম এবং আনবারী এবং মদীনার বাসিন্দাদের অনেকেই রয়েছেন। তারা নাশিদকে ভিন্ন শ্রেণীতে নিয়েছিলেন এবং হুকুম থেকে বাদ দিয়েছিল এবং অনুমোদন করেছিলেন। ইবনে কুদামা তার আলমুগনি গ্রন্থে এ সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন।
এবং এই বিষয়ে সঠিক মতামত প্রকাশের জন্য আসুন আমরা এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত গ্রন্থগুলি (আয়াত/আহাদীস/ইজমা) অধ্যয়ন করি:
ক. যারা গান গাইতে নিষেধ করেন তাদের দ্বারা দলিল হিসাবে ব্যবহৃত গ্রন্থগুলো:
1. عن أنس بن مالك قال: قال رسول الله r “من جلس إلى قَيْنَةٍ فسمع منها، صبَّ الله في أذنيه الآنُكَ يوم القيامة” رواه عبد الله بن المبارك. والقينة هي الجارية. والآنُك هو الرصاص.
আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোন গায়িকা মহিলার গান শোনে, কিয়ামতের দিন তার কানে গলিত সীসা ঢেলে দেওয়া হবে।” আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রা.) থেকে বর্ণিত।
2. عن أبي مالك الأشعري رضي الله تعالى عنه قال: قال رسول الله r”ليشربَنَّ ناسٌ من أمتي الخمرَ يسمونها بغير اسمها فيُعزَفُ على رؤوسهم بالمعازف والمغنِّيات يَخْسِف الله بهم الأرضَ، ويجعل منهم القردة والخنازير ” رواه ابن ماجة.
আবু মালিক আলাশারি (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী (সা)-কে বলতে শুনেছেন: “মানুষ মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে এবং বাদ্যযন্ত্র বাজাবে, আল্লাহ তাদেরকে পৃথিবী কর্তৃক গ্রাস করিয়ে বানর ও শূকরে পরিণত করবেন।” (ইবনে মাজাহ তার সুনানে বর্ণনা করেছেন)
3. عن أبي أُمامة قال ” نهى رسول الله r عن بيع المغنيات وعن شرائهن وعن كسبهن وعن أكل أثمانهن ” رواه ابن ماجة.
আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “গায়িকাদের বিক্রি করো না, কিনো না বা শিক্ষা দিও না, কারণ তাদের জন্য যে মূল্য দেওয়া হয়েছে তা অবৈধ।” (ইবনে মাজাহ ও তিরমিযী বর্ণনা করেছেন)
4. عن أبي أُمامة t قال: قال رسول الله r ” إن الله بعثني رحمة للعالمين، وهدى للعالمين، وأمرني ربي عزَّ وجلَّ بمحق المعازفِ والمزاميِر والأوثانِ والصُّلُبِ وأمرِ الجاهلية… ولا يحل بيعُهن ولاشراؤُهن، ولا تعليمهن، ولا تجارةٌفيهن، وثمنهنَّ حرامٌ، يعني الضاربات. وفي رواية المغنيات ” رواه أحمد.والصُّلُب جمع صليب.
আবু উমামা বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আযযা ওয়া জাল আমাকে মানবজাতির জন্য হেদায়েত এবং রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন এবং (এ সত্ত্বেও) তিনি আমাকে বাদ্যযন্ত্র, মূর্তি, ক্রুশ এবং জাহেলী জিনিসপত্র ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়েছেন… এবং এগুলো বিক্রি করা জায়েজ নয় এবং এগুলো কেনা, শিক্ষা দেওয়া, ব্যবসা করাও জায়েজ নয়, এবং এগুলোর দাম হারাম, অর্থাৎ ঢোল বাজানো (ঢোল বাজানো) এবং অন্য কোন রিওয়াতে – মহিলা গায়িকাদের।” (আহমদ কর্তৃক বর্ণিত)
5. عن ابن عباس t عن رسول الله r قال ” والذي نفسي بيده لَيبيتَنَّ ناسٌ من أمتي على أَشَرٍ وبَطَرٍ ولعبٍ ولهوٍ، فيصبحوا قردةً وخنازير باستحلالهم المحارم والقَيْنات وشربهم الخمر وأكلهم الربا، ولبسهم الحرير ” رواه عبد الله بن أحمد في زوائد المسند.
ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যার হাতে আমার প্রাণ, সেই প্রভুর শপথ, আমার উম্মতের একটি দল রাত্রি যাপন করবে, খাবার, পানীয় এবং আড্ডা দিয়ে। পরের দিন সকালে তারা শুকর ও বানরে পরিণত হবে, কারণ তারা হালালকে হারাম এবং সঙ্গীতকে হারাম বলে অভিহিত করবে, মদ পান করবে, সুদ খাবে এবং রেশম পরবে।” (আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ কর্তৃক জাওয়াইদ আল-মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণিত)
6. عن عبيد الله بن زَحْر عن علي بن يزيد عن القاسم عن أبي أُمامة t عن رسول الله r قال ” لا تبيعوا القَيْنات ولا تشتروهن ولا تُعلِّموهنَّ، ولا خير في تجارةٍ فيهن، وثمنُهنَّ حرام، في مثل هذا أُنزلت هذه الآية {ومِنَ الناسِ مَنْ يشتري لهوَ الحديثِ ليُضِلَّ عن سبيلِ اللهِ } إلى آخر الآية “. رواه الترمذي وأحمد وابن ماجة والبيهقي.
আবু উমামা বর্ণনা করেন যে, নবী (সা) বলেছেন: “কখনও গায়িকাদের দাসী বাণিজ্য করো না এবং তাদেরকে গান গাওয়ার প্রশিক্ষণও দিও না। তাদের বাণিজ্য করা ভালো নয়, এবং [তোমাদের জন্য] তাদের মূল্য নিষিদ্ধ, এবং এই কারণেই আয়াতটি নাজিল হয়েছে:
ومِنَ الناسِ مَنْ يشتري لهوَ الحديثِ ليُضِلَّ عن سبيلِ اللهِ
(মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা জ্ঞান ছাড়াই ‘লাহওয়াল হাদিস’ ক্রয় করে, যাতে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করা যায় এবং তা উপহাস করে। তাদের জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি)। [লুকমান: ৬] (তিরমিযী, আহমদ, ইবনে মাজাহ এবং আল বায়হাকী বর্ণনা করেছেন)
7. عن شيخٍ شهد أبا وائلٍ في وليمة، فجعلوا يتلَعَّبون ويُغنُّون، فحلَّ أبو وائلٍ حبوتَه، وقال: سمعت عبد الله يقول: سمعت رسول الله r يقول “الغناء يُنبتُ النفاقَ في القلب ” رواه أبو داود. والحبوة (بفتح الحاء وضمها وكسرها) هي الجلوس على الإِليتين مع ضم الفخذين والساقين إلى البطن بالذراعين.
একজন শায়খ আবু ওয়ায়েলকে এক ওলীমায় গান-বাজনা ও খেলাধুলা করতে দেখেছিলেন। তাই আবু ওয়ায়েল সোজা হয়ে বসে বললেন, আমি আব্দুল্লাহকে বলতে শুনেছি যে, তিনি নবী (সা)-কে বলতে শুনেছেন: “গান অন্তরে মুনাফিকি বৃদ্ধি করে, যেমন পানি উদ্ভিদ জন্মায়।” (আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন)
8. عن أبي الصَّهباء “أنه سأل ابن مسعود عن قول الله {ومن الناس من يشتري لهو الحديث } قال: الغناء”. رواه ابن جرير الطبري في تفسيره.
আবু সুহাবা বলেন যে, তিনি ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে “মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা ‘লাহওয়াল হাদিস’ ক্রয় করে” এই আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি উত্তরে বলেন যে এটি গান গাওয়া। (ইবনে জারির এবং তাবারী তার তাফসীরে বর্ণনা করেছেন)
9. جاء في صحيح البخاري ما يلي (وقال هشام بن عمَّار حدثنا صَدَقة بن خالد حدثنا عبد الرحمن بن يزيد بن جابر حدثنا عطية بن قيس الكلابي حدثني عبد الرحمن بن غَنْمٍ الأشعري قال: حدثني أبو عامر أو أبو مالك الأشعري، والله ما كذبني، سمع النبي r يقول ” ليكونَنَّ من أمتي أقوامٌ يستحلون الحِرَّ والحرير، والخمرَ والمعازفَ، ولَينـزِلنَّ أقوامٌ إلى جنب عَلَم يروح عليهم بسارحةٍ لهم يأتيهم لحاجة فيقولون: إرجع إلينا غداً، فيُبَيِّتُهم الله ويضع العَلَم، ويمسخ آخرين قردةً وخنازيرَ إلى يوم القيامة “) ورواه الطبراني. والسارحة هي الماشية. والعَلََم هو الجبل.
সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে (এবং ইবনে হিশাম ইবনে আম্মার বলেছেন যে সাদাকা ইবনে খালিদ তাকে আবদুর রহমান ইবনে ইয়াজিদ ইবনে জাবির থেকে বর্ণনা করেছেন যে তিনি আতিয়া ইবনে কায়েস আল কিলাবি থেকে শুনেছেন যে তিনি আবদুর রহমান ইবনে গানাম আল আশআরী থেকে শুনেছেন যিনি বলেছেন: আবু আমির আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন অথবা আবু মালিক আল আশআরী আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, এবং আল্লাহর কসম তিনি আমাকে মিথ্যা বলেননি যে তিনি নবী (সা) কে বলতে শুনেছেন: “আমার উম্মাতের মধ্যে এমন কিছু লোক আসবে যারা ব্যভিচার, রেশম (পুরুষদের জন্য), মদ এবং সঙ্গীতকে হালাল মনে করবে; এবং এমন কিছু লোক থাকবে যারা একটি উঁচু পাহাড়ের পাশে তাঁবু খাবে, যখন কোন দরিদ্র ব্যক্তি তাদের পাশ দিয়ে যাবে এবং কোন প্রয়োজন চাইবে, তখন তারা তাকে বলবে, ‘আগামীকাল আমাদের কাছে ফিরে এসো।’ সকালে আল্লাহ তাদের উপর পাহাড়টি আছড়ে ফেলবেন এবং বাকিরা (যারা রক্ষা পেয়েছে) কেয়ামত পর্যন্ত বানর এবং শূকরে রূপান্তরিত হবে।” (তাবারানী বর্ণনা করেছেন)
খ. যেসব গ্রন্থের উপর নির্ভরশীল তারা গান গাওয়ার অনুমতি দেয় বা অপছন্দ করে এটা।
1. عن عامر بن سعد قال ” دخلتُ على قُرَظةَ بنِ كعبٍ وأبي مسعود الأنصاري في عرسٍ، وإذا جَوارٍ يُغنِّين، فقلت: أنتما صاحبا رسول الله r، ومِن أهل بدرٍ يُفعل هذا عندكم ؟ فقالا: إجلس إن شئت فاسمع معنا، وإن شئتَ فاذهب، قد رُخِّص لنا في اللهو عند العرس” رواه النَّسائي والحاكم وصححه.
‘আমির ইবনে সা’দ বর্ণনা করেন: এক বিবাহ অনুষ্ঠানে যখন গান-বাজনা চলছিল, তখন আমি কারাযা ইবনে কা’ব এবং আবি মাস’উদ আল-আনসারী (রা.)-এর কাছে গেলাম এবং তাদের বললাম: “তোমরা নবী (সা.)-এর সাহাবী এবং বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলে, অথচ তোমাদের চারপাশে এই (গান) চলছে? তারা বলল: যদি তোমরা চাও, আমাদের সাথে বসে শোনো, আর যদি চাও, তাহলে চলে যাও। বিবাহ অনুষ্ঠানে আমাদের জন্য এই অসার কাজটি বৈধ।” [নাসায়িতে বর্ণিত এবং হাকিম কর্তৃক প্রমাণিত]
2. عن السائب بن يزيد t ” أن امرأة جاءت إلى رسول الله r فقال: يا عائشة أتعرفين هذه ؟ قالت: لا يا نبي الله فقال: هذه قَيْنةُ بني فلان، تحبين أن تغنيَكِ ؟ قالت: نعم، فأعطاها طَبَقاً فغنَّتها، فقال النبي r: قد نفخ الشيطان في مِنْخريها ” رواه أحمد بسند صحيح، ورواه الطبراني. والطبق هو الإناء.
সায়েব ইবনে ইয়াজিদ থেকে বর্ণিত: এক মহিলা নবী (সা) এর কাছে এলেন। তিনি আয়েশা (রা) কে জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তুমি কি তাকে চেনো?’ তিনি বললেন: ‘না, হে আল্লাহর রাসূল (সা)।’ তিনি বললেন: ‘এটি অমুক গোত্রের পেশাদার গায়িকা। তুমি কি চাও যে সে তোমার জন্য গান গাইবে?’ আয়েশা (রা.) বললেন: ‘হ্যাঁ’, তাই মহিলাটি তার জন্য গান গাইলেন, তারপর নবী (সা) বললেন: ‘শয়তান তার নাকে ফুঁ দিয়েছে।’ (আহমদ ও তাবারানী বর্ণনা করেছেন)
3. عن جابر رضي الله تعالى عنه قال: قال رسول الله r لعائشة ” أهديتم الجارية إلى بيتها ؟ قالت: نعم، قال: فهلا بعثتم معهم من يُغَنِّيهم يقول: أتيناكم فحيُّونا نُحَيِّيكم، فإن الأنصار قومٌ فيهم غَزَل ” رواه أحمد بسند صحيح، ورواه البخاري من طريق عائشة بلفظ” أنها زَفَّت امرأةً إِلى رجلٍ من الأنصار، فقال نبي الله r: ياعائشة، ما كان معكم لهوٌ ؟ فإنَّ الأنصار يُعجبهم اللهو ” ورواه الحاكم وصححه، ووافقه الذهبي.
জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত: নবী (সা) আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন: “তুমি কি কনেকে তার বাড়িতে পাঠিয়েছ?” তিনি বললেন: “হ্যাঁ”। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: “তুমি কি তাদের সাথে এমন কোন গায়ক পাঠিয়েছ যে তাদের জন্য গান গাইতে পারে?” আয়েশা (রা.) না-করে উত্তর দিলেন। নবী (সা) তখন বললেন: “তুমি যদি তাদের সাথে এমন একজন গায়ক পাঠাতে যে গাইত যে আমরা তোমার কাছে এসেছি, তাই আমাদের স্বাগত জানাও, কারণ আনসাররা এমন একটি জাতি যারা গান গাইতে ভালোবাসে।” (সহীহ সনদে আহমাদ বর্ণনা করেছেন, এবং বুখারীতে আয়েশা (রা.)-এর সূত্রে এই শব্দগুলি বর্ণনা করেছেন) “তিনি আনসারদের একজনের সাথে বিবাহের জন্য একজন কনে পাঠিয়েছিলেন, নবী (সা) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আয়েশা” তোমার কি লাহও নেই? আনসাররা লাহও ভালোবাসে” (হাকিম বর্ণনা করেছেন এবং যাহাবী এটি অনুমোদন করেছেন)।
4. عن عائشة رضي الله عنها ” أن أبا بكر الصديق دخل عليها وعندها جاريتان في أيام مِنى تُغَنِّينان وتَضْرِبان، ورسول الله r مسجَّى بثوبه، فانتهرهما أبو بكر، فكشف رسول الله r عنه، وقال: دعهما يا أبا بكر، فإِنها أيام عيد… ” رواه مسلم.
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত: আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তার ঘরে এলেন, যখন দুজন মহিলা গায়িকা গান গাইছিলেন এবং বাজনা বাজাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর পোশাক দিয়ে তাঁর মুখ ঢেকে রেখেছিলেন। ইতিমধ্যে আবু বকর (রা) প্রবেশ করলেন এবং [গায়কদের দেখে] আমাকে ধমক দিলেন: ‘রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপস্থিতিতে শয়তানী বাদ্যযন্ত্র?’ এই কথা শুনে আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর দিকে ফিরে বললেন: ‘এগুলো ছেড়ে দাও, আজ ঈদের দিন।’ (মুসলিম বর্ণনা করেছেন)
5. عن عبد الله بن بُريدة قال: سمعت بُريدة يقول ” خرج رسول الله r في بعض مغازيه، فلما انصرف جاءت جاريةٌ سوداءُ فقالت: يا رسول الله، إني كنتُ نذرتُ إِنْ ردَّك الله سالماً أن أضرب بين يديك بالدُّفِّ وأَتغنَّى، فقال لها رسول الله r: إن كنتِ نذرتِ فاضربي وإلا فلا، فجعلت تضرب، فدخل أبو بكر وهي تضرب ثم دخل علي وهي تضرب ثم دخل عثمان وهي تضرب ثم دخل عمر فألقت الدُّف تحت إِستها ثم قعدت عليه، فقال رسول الله r: إن الشيطان ليخاف منك يا عمر، إني كنت جالساً وهي تضرب فدخل أبو بكر وهي تضرب ثم دخل علي وهي تضرب ثم دخل عثمان وهي تضرب، فلما دخلتَ أنت يا عمر ألقت الدُّفَّ ” رواه الترمذي وقال: هذا حديث حسنٌ صحيحٌ غريبٌ، ورواه أحمد بسند صحيح، ورواه أبو داود والبيهقي.
আবদুল্লাহ ইবনে বুরাইদাহ তার পিতার বর্ণনা থেকে বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর কিছু সামরিক অভিযান থেকে ফিরে এলেন। এক কৃষ্ণাঙ্গ দাসী তাঁর কাছে এসে বলল, ‘আমি মানত করেছিলাম যে, যদি আল্লাহ আপনাকে নিরাপদে এবং অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে আনেন, তাহলে আমি আপনার আগে দাফ মারব।’ রাসূলুল্লাহ (সা) উত্তর দিলেন, ‘যদি আপনি মানত করে থাকেন, তাহলে এগিয়ে যান, অন্যথায় করবেন না।’ সে দাফ মারতে শুরু করল। ইতিমধ্যে আবু বকর (রা) এসে গেলেন এবং তিনি দাফ মারতে থাকলেন। এরপর ‘উসমান (রা) এবং ‘আলী (রা) এলেন এবং তিনি দাফ মারতে থাকলেন। তারপর ‘উমর (রা) এলেন এবং তিনি তার যন্ত্রটি নিজের নীচে ঢেকে ফেললেন এবং তাকে দেখার সাথে সাথে তার উপর বসে পড়লেন। এ কথা শুনে নবী (সা) বললেন, ‘ওমর, শয়তানও তোমাকে ভয় করে। আমি বসে ছিলাম এবং সে দফ মারছিল, তারপর আবু বকর প্রবেশ করলেন এবং তিনি মারতে থাকলেন, তারপর আলী প্রবেশ করলেন এবং তিনি মারতে থাকলেন, উসমান প্রবেশ করলেন এবং তিনি মারতে থাকলেন, কিন্তু যখন তুমি প্রবেশ করলে হে ওমর, সে দফ থামিয়ে দিল।’ (তিরমিযী বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বলেছেন যে এটি হাসান গরীব হাদিস এবং আহমদ এটিকে সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন এবং আবু দাউদ ও আল বায়হাকীও এটি বর্ণনা করেছেন)
6. عن يحيى بن سليم قال: قلتُ لمحمد بن حاطب: تزوجتُ امرأتين ما كان في واحدةٍ منهما صوت، يعني دُفَّاً، فقال محمد t: قال رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم” فصْلُ ما بين الحلال والحرام الصوتُ بالدُّفُّ ” رواه الحاكم وصححه ووافقه الذهبي. ورواه أحمد بسند صحيح. ورواه ابن ماجة والنَّسائي، والترمذي وحسَّنه.
ইয়াহিয়া বিন সালিম বলেন, আমি মুহাম্মদ ইবনে হাতিবকে বললাম, “আমি দুইজন মহিলাকে বিয়ে করেছি এবং তাদের মধ্যে কোন আওয়াজ ছিল না, অর্থাৎ বিবাহে কোন দফ ছিল না, তাই মুহাম্মদ ইবনে হাতিব বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘যা বৈধ কাজ (অর্থাৎ নিকাহ) এবং নিষিদ্ধ কাজ (ব্যভিচার) এর মধ্যে পার্থক্য করে তা হল দফের সুর এবং নিকাহের প্রকাশ্য ঘোষণা।’” (আল হাকিম বর্ণনা করেছেন এবং যাহাবী এটিকে সমর্থন করেছেন, আহমদও এটিকে সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন, ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন এবং নাসায়ীও করেছেন, এবং তিরমিযী এটিকে বর্ণনা করেছেন এবং এটিকে হাসান হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন)।
7. عن الرُّبيِّع بنتِ مُعَوّذ رضي الله عنها قالت ” دخل عليَّ رسول الله r صبيحة عُرسي وعندي جاريتان تغنيان وتُندبان آبائي الذين قُتلوا يوم بدرٍ، وتقولان فيما تقولان: وفينا نبيٌّ يعلم ما في غدٍ، فقال: أمَّا هذا فلا تقولوه، ما يعلم ما في غدٍ إلا الله ” رواه ابن ماجة، ورواه أبو داود بمعناه ورواه الترمذي وقال: هذا حديث حسن صحيح وجاء في روايته ” وجُوَيْراتٌ لنا يضربن بدُفُوفِهِن “.
মু’ওয়ায (রা)-এর কন্যা রাবী’ থেকে বর্ণিত: আমার বিবাহের দিন সকালে, নবী (সা) আমাদের সাথে দেখা করতে এলেন, যখন দুজন দাসী দাফ মারছিল এবং বদরের যুদ্ধে নিহত আমার পূর্বপুরুষদের জন্য বিলাপ করছিল। মেয়েরা গাইছিল: “আমাদের মধ্যে নবী (সা) আছেন যিনি জানেন আগামীকাল কী ঘটবে”, তিনি (সা) বললেন: “এ কথা বলো না, কারণ আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) ছাড়া কেউ জানে না আগামীকাল কী ঘটবে।” (ইবনে মাজাহ এবং আবু দাউদ, তিরমিযীও এটি বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে এই হাদিসটি হাসান সহীহ”
8. عن عائشة رضي الله عنها قالت ” دخل عليَّ أبو بكر وعندي جاريتان من جواري الأنصار تُغنيان بما تقاولت به الأنصار في يوم بُعاث، قالت: وليستا بمغنيتين فقال أبو بكر: أبمزمور الشيطان في بيت النبي r ؟ وذلك في يوم عيد الفطر، فقال النبي r: يا أبا بكر، إن لكل قومٍ عيداً، وهذا عيدُنا ” رواه ابن ماجة.
আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত: আবু বকর সিদ্দিক (রা) তার ঘরে এলেন, যখন দুজন আনসারী মহিলা গায়িকা বু‘আস-এর গান গাইছিলেন এবং বাজিয়ে (বাদ্যযন্ত্র) বাজাচ্ছিলেন। ইতিমধ্যে আবু বকর (রা) প্রবেশ করলেন এবং [গায়কদের দেখে] আমাকে ধমক দিলেন: ‘রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উপস্থিতিতে শয়তানী বাদ্যযন্ত্র?’ এই কথা শুনে আল্লাহর রাসূল (সা) তার দিকে ফিরে বললেন: ‘হে আবু বকর, সকল মানুষের জন্যই একটি ঈদ আছে এবং এটি আমাদের ঈদ” (ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন)।
9. عن أنس بن مالك t” أن النبي r مرَّ ببعض المدينة، فإذا بجوارٍ يضربن بدُفِّهنَّ ويتغنَّين ويقلن:
نحـن جَـوَارٍ مـن بني النجـارِ يـا حبـذا محمـدٌ من جـارِ فقال النبي (ص) : اللهُ أعلم إِني لأُحِبُّكُنَّ ” رواه ابن ماجة بسند صحيح.
আনাস ইবনে মালিক (রা) বর্ণনা করেন যে, নবী (সা) মদীনার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় এক নির্দিষ্ট স্থানে দেখতে পেলেন যে, কিছু লোক তাদের দাফ বাজাচ্ছে এবং গান গাইছে: “আমরা বনী নাজ্জারের লোক; আমরা মুহাম্মদকে আমাদের প্রতিবেশী হিসেবে স্বাগত জানাই।”
নবী (সা) বলেছেন: “জেনে রেখো যে আমি তোমাদের সকলকে ভালোবাসি।” (ইবনে মাজাহ সহীহ সনদের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন)।
10. عن نافع مولى ابن عمر t” أن ابن عمر رضي الله عنهما سمع صوتَ زَمَّارةِ راعٍ، فوضع أُصبعيه في أُذُنيه وعَدَل راحلته عن الطريق وهو يقول: يا نافع أتسمع ؟ فأقول: نعم، فيمضي حتى قلتُ: لا، فوضع يديه وأعاد راحلته إلى الطريق وقال: رأيتُ رسول الله r، وسمع صوتَ زَمارةِ راعٍ، فصنع مثل هذا ” رواه أحمد بإسناد صحيح.ورواه ابن ماجة والخلاَّل.
ইবনে ওমর (রা) এর চাকর নাফে (রা) বর্ণনা করেন যে, ইবনে ওমর (রা) বাঁশির শব্দ শুনতে পেয়ে কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিলেন এবং পথ ঘুরিয়ে বললেন, “হে নাফে!” তুমি কি শুনতে পাচ্ছো? আমি তাকে বললাম: “হ্যাঁ” এবং তিনি বারবার এই কথাটি বলতে থাকলেন যতক্ষণ না আমি বললাম “না”। এরপর তিনি কান থেকে আঙ্গুল সরিয়ে পূর্বের পথে ফিরে গেলেন এবং বললেন: “আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বাঁশির শব্দ শুনে একই কাজ করতে দেখেছি।” [মুসনাদে আহমাদে একটি নির্ভরযোগ্য সনদ সহ বর্ণিত, ইবনে মাজাহ এবং আল-খাল্লালও বর্ণনা করেছেন]।
11. عن عُقبة بنِ عامر رضي الله تعالى عنه قال: قال رسول الله r ” تعلموا كتاب الله وتعاهدوه وتغنَّوا به، فوالذي نفسي بيده لهو أشدُّ تفلُّتاً من المخاض في العُقُل ” رواه أحمد والدَّارمي والنَّسائي، ورواه النَّسائي أيضاً في السُّنن الكبرى، بلفظ “…والذي نفس محمدٍ بيده لهو أشدُّ تَفلُّتاً من العِشَارِ في العُقُل ” والعِشار والمخاض هي النياق الحوامل، جمع ناقة. والعُقُل جمع عِقال وهو الحبل الذي يُربطُ به.
উকবা ইবনে আমির (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “আল্লাহর কিতাব শিখো, তা মেনে চলো এবং ভালোভাবে তেলাওয়াত করো, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ, এটি (অর্থাৎ, কুরআন) রশি থেকে উটের চেয়েও (স্মৃতি থেকে) হারিয়ে ফেলা সহজ।” মুসনাদে আহমাদ, আল-দারিমী, আল-নাসায়ী এবং সুনান আল-কুবরাহ গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্ন শব্দ এবং অভিন্ন অর্থে বর্ণিত।
12. عن سعد بن أبي وقاص t أن رسول الله r قال ” ليس منَّا مَنْ لم يتغنَّ بالقرآن ” رواه الدَّارمي وابن ماجة.
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কুরআনে গান গায় না সে আমাদের দলভুক্ত নয়” (আল-দারমী এবং ইবনে মাজাহ কর্তৃক বর্ণিত)
এখন আমরা প্রথম মতের অধীনে বর্ণিত হাদিসের সনদ পরীক্ষা করে দেখব যে এগুলো নির্ভরযোগ্য কিনা?
আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত প্রথম হাদিসটির সনদ (শব্দ) ভাঙা, কারণ এর চারজন বর্ণনাকারী দুর্বল বা অজানা, এবং তারা হলেন ইব্রাহিম ইবনে উসমান, আহমদ ইবনে গামার, ইয়াজিদ ইবনে আবদুসসামাদ এবং ওবায়দ ইবনে হিশাম আল-হালাবী, তাই হাদিসটিকে প্রমাণ হিসেবে নির্ভর করা যাবে না।
দ্বিতীয় হাদিসটি ইবনে মাজাহ আবু মালিক আল-আশ’আরী থেকে বর্ণনা করেছেন এবং এই সনদে মালিক ইবনে আবি মারিয়াম আছেন এবং যাহাবী তাঁর সম্পর্কে বলেছেন: তিনি অজানা, এবং তাই তিনি একজন অজানা বর্ণনাকারী, বর্ণনাকারী মু’আবিয়া ইবনে সালেহ ছাড়াও, যাকে অনেক হাদিস পণ্ডিত তার দুর্বলতার কারণে গ্রহণ করেননি, তাই হাদিসটি অত্যন্ত দুর্বল এবং পরিত্যক্ত।
ইবনে মাজাহ আবু উমামা থেকে তার সনদে যে তৃতীয় হাদিসটি বর্ণনা করেছেন তা হল আবু মুহাল্লাব মুতরাহ ইবনে ইয়াজিদ, যাকে আবু যার-আল-রাযী এবং আবু হাতেম আল-রাযী দুর্বল করেছেন। এবং ইবনে মু’ইন বলেছেন: তিনি কেউ নন, এবং বুখারী বলেছেন: তিনি হাদীস অস্বীকারকারী, এবং সনদে ওবায়দুল্লাহ আল-আফ্রিকীও আছেন যাকে আহমদ, দারিমি এবং দারকুতনী দুর্বল বর্ণনাকারী হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেছেন। এবং ইবনে মু’ইন বলেছেন: তিনি কেউ নন। এবং ইবনে মাদেনী বলেছেন: তিনি হাদীস অস্বীকারকারী। এবং আবু মিশ’আর বলেছেন: তিনি প্রতিটি সমস্যার সঙ্গী। অতএব, হাদিসটি খুবই দুর্বল এবং গ্রহণযোগ্য নয়।
চতুর্থ হাদিসটি যা আহমদ আবু উমামা থেকে বর্ণনা করেছেন, তার ক্রমানুসারে আলী ইবনে ইয়াজিদ আল-আলহানি আছেন এবং তিনি দুর্বল। একইভাবে কাসিমও দুর্বল, তাই হাদিসটি খুবই দুর্বল এবং তাই গ্রহণযোগ্য নয়।
পঞ্চম হাদিসটি যা আব্দুল্লাহ ইবনে আহমদ ইবনে হাম্বল থেকে জাওয়াইদ আল-মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, এই সনদে ফারকাদকে সাবাখি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, হাইসামি মাজমু’আ আজ্জাওয়াইদ গ্রন্থে বলেছেন: ফারকাদ দুর্বল; আল-মুনযিরিও বলেছেন যে হাদিসটি দুর্বল। এই হাদিসটি সাঈদ ইবনে মনসুরও বর্ণনা করেছেন এবং তার সনদে তিনজন দুর্বল বর্ণনাকারী আছেন, তাই হাদিসটি দুর্বল এবং তাই গ্রহণযোগ্য নয়।
ষষ্ঠ হাদিসটি যা তিরমিযী বর্ণনা করেছেন আব্দুল্লাহ ইবনে যাহর থেকে আলী ইবনে ইয়াজিদ থেকে কাসিম ইবনে আবু উমামা থেকে, আলী ইবনে ইয়াজিদ থেকে, তিরমিযী বলেছেন (কিছু জ্ঞানী ব্যক্তি আলী ইবনে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন এবং তারা দাবি করেছেন যে তিনি দুর্বল) এবং বুখারী বলেছেন যে তিনি হাদীস অস্বীকারকারী এবং নাসাঈ বলেছেন: বিশ্বাসযোগ্য নয়। দারকুতনি এটি গ্রহণ করেননি। এবং শাওকানি দাবি করেছেন ‘ওবাইদুল্লাহ ইবনে যাহর এবং কাসিমকে দুর্বল। অতএব হাদিসটি অত্যন্ত দুর্বল এবং তাই গ্রহণযোগ্য নয়।
সপ্তম হাদিসটি আবু দাউদ একজন শায়খ থেকে বর্ণনা করেছেন যাকে আবু ওয়াইল দেখেছিলেন এবং এটা স্পষ্ট যে একজন অজানা বর্ণনাকারী আছেন যার নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং তিনিই সেই শায়খ যাকে আবু ওয়াইল দেখেছিলেন, তাই হাদিসটি দুর্বল এবং গৃহীত হয়নি।
ইবনে জারির আল-তাবারী তার তাফসিরে যে অষ্টম হাদিসটি বর্ণনা করেছেন তা ইবনে মাসউদের একটি কওল (কথা) এবং এটি মারফু হাদিস নয়, এবং সাহাবাদের বক্তব্য প্রমাণ (দলিল) নয়, এবং এটি তাদের জন্য এবং যারা মুসলিমদের মধ্যে তাদের সাথে তাক্বলীদ করে তাদের জন্য আহকাম শরীয়ত, এবং সমস্ত মুসলিমের জন্য এটির সাথে তাক্বলীদ করা বাধ্যতামূলক নয়, এবং এটি ইবনে মাসউদ (রা.) এর উক্তি এবং আয়াত থেকে তার উপলব্ধি, প্রকৃতপক্ষে এটি (লাহু) এর শরহ এবং এটি একটি সঠিক উপলব্ধি যেমনটি দ্বিতীয় অংশের প্রথম হাদিসে উদ্ধৃত করা হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে: “বিবাহ অনুষ্ঠানের সময় এই অনর্থক কাজটি আমাদের জন্য বৈধ।” অর্থাৎ বিবাহ অনুষ্ঠানে গান গাওয়া অনুমোদিত। তৃতীয় হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা) এর বাণী সম্পর্কে, যখন তিনি (সা) আয়েশা (রা.) কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: “আপনি কি তাদের সাথে এমন কোন গায়ক পাঠিয়েছিলেন যিনি তাদের জন্য গান গাইতে পারতেন, কারণ আনসাররা এটি পছন্দ করে”, অর্থাৎ তারা গান গাওয়া পছন্দ করে। এই ব্যাখ্যায় একজন পর্যবেক্ষক সহজেই লক্ষ্য করবেন যে গান গাওয়াকে নিন্দা করা হয় কারণ এটি (ক্বারীনাহ) আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) পথ থেকে বিচ্যুত করার সাথে সম্পর্কিত। যদি তা না হত, তাহলে কোন নিন্দা করা হত না। যেকোনো কথায় আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) পথ থেকে বিচ্যুত করার সাথে সম্পর্কিত হলে তা নিন্দা করা হয় এবং কাজটি নিজেই জায়েয থাকে। গান গাওয়াও অনুরূপ, এটি অন্য যেকোনো জায়েয কাজের মতোই জায়েয, যদি না আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) পথ থেকে বিচ্যুত করার সাথে সম্পর্কিত হয়। অতএব, এই ব্যাখ্যাটি এর নিষেধের প্রমাণ নয়।
সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত হাদিসটি একটি মু’আল্লাক হাদিস, এবং যারা সঙ্গীত এবং বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ বলে মনে করেন তাদের পক্ষে এটি একটি প্রমাণ, আমরা এই হাদিসটি বিস্তারিতভাবে দেখব:
যদিও এই হাদিসটি সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত, তবুও এটা বলা ঠিক হবে না যে বুখারী এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন কারণ বুখারী (তিনি আমাদের অবহিত করেছেন) বা (তিনি আমাদের জানিয়েছেন) বা অনুরূপ কিছু বলেননি, তিনি মু’আল্লাক পদ্ধতিতে বর্ণনা করেছেন (এবং হিশাম ইবনে আম্মার বলেছেন) এবং সহীহ আল বুখারীতে মু’আল্লাক হাদিসগুলিকে প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক নয় যদিও সেগুলি উল্লেখ করা যেতে পারে। মু’আল্লাক হাদিসের অর্থ হল একজন বা একাধিক বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ করা হয়নি, এবং তাই হাদিসটি মুনকাতি (অসংযুক্ত) এবং আমি প্রশ্ন করছি: কেন বুখারী এই হাদিসটি বর্ণনাকারীর নাম উল্লেখ করেননি? এটি কি ইমাম বুখারীর বর্ণনা এবং বর্ণনাকারীর উপর সন্দেহের ইঙ্গিত দেয় না, এবং তাই এই হাদিসটি সহীহ হওয়ার স্তর থেকে নেমে আসে।
হিশাম বিন আম্মার একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি কিন্তু যখন তিনি বৃদ্ধ হয়ে যান তখন তার অবস্থা পরিবর্তিত হয়, তার কথা সন্দেহাতীতভাবে গ্রহণ করা যেত না, আবু হাতেম আর রাজি বলেন (যখন হিশাম বৃদ্ধ হয়ে যান তখন তিনি পরিবর্তন করেন, তাকে যা দেওয়া হত তা পড়তেন এবং যা তাকে বলা হত তা গ্রহণ করতেন) এবং আবু দাউদ যার কাছ থেকে আল-‘আজারি বর্ণনা করেছেন (হিশাম চারশত হাদীস বর্ণনা করেছেন কিন্তু তার সনদের ভিত্তি নেই), এবং তিনি আরও বলেছেন যে হিশাম আবু মিশার থেকে হাদীস গ্রহণ করতেন এবং তারপর সেগুলো বর্ণনা করতেন, এবং এর পরে তিনি অর্থাৎ আবু দাউদ বলেন (আমি ভয় পেয়েছিলাম যে তিনি ইসলামের বিষয়ে সন্দেহ তৈরি করবেন)। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল বলেছেন: “তিনি কিছুটা চঞ্চল ছিলেন” এবং আরও বলেছেন: “যদি তুমি তার পিছনে নামাজ পড়ো, তাহলে তোমার নামাজ পুনরাবৃত্তি করো।” এমন বর্ণনাকারীর কাছ থেকে হাদীস গ্রহণ করা ঠিক নয়, তাছাড়া সহীহ হাদীস তার বর্ণনাকে অস্বীকার করে।
আবু দাউদ তার সুনানে হিশাম বিন আম্মার থেকে শুরু করে একটি সুন্দর সনদে বর্ণনা করেছেন: (আবদুল ওহাব বিন নাজদাহ আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, বাশার বিন বকর আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, আব্দুর রহমান ইবনে ইয়াজিদ ইবনে জাবির থেকে, আতিয়াহ ইবনে কায়েস আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন: আমি আব্দুর রহমান ইবনে গানাম আল-আশ’আরীকে বলতে শুনেছি: আবু আমির আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন অথবা আবু মালিক, আমি আল্লাহর কসম করে বলছি যে তিনি আমাকে বিশ্বাস করেননি যে তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছেন: আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক থাকবে যারা খাজ্জ এবং রেশম (ব্যবহার) হালাল করবে। তাদের মধ্যে কিছু লোক কিয়ামত পর্যন্ত বানর এবং শূকরে রূপান্তরিত হবে। এবং এর একটি শক্তিশালী সনদ রয়েছে যার কোনও সন্দেহ নেই তবে বাদ্যযন্ত্র এবং মহিলা গায়িকাদের কোনও উল্লেখ নেই, তাই এটি স্পষ্ট যে এই বর্ণনাগুলির মধ্যে কোনটি পছন্দনীয়?
শরীয়ত মানুষের সহজাত প্রকৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং এমন কোন প্রমাণ নেই যে এটি মানুষের প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক, এবং যেমনটি আমরা সবাই জানি, গান গাওয়া, এটা এমন প্রকৃতির ব্যাপার যা আমি বুঝতে পারি না যে, যে ব্যক্তি চার বছর বা তার বেশি সময় ধরে বেঁচে থাকে এবং গান শোনে না, তার জন্য আমাদের শিশুরা খুব ছোটবেলা থেকেই গান গাইতে এবং নাচতে পছন্দ করে, তাহলে কি ইসলাম আমাদের প্রকৃতির অংশ যা তা নিষিদ্ধ করেছে?
পরিশেষে আমি বলছি, যদি এটি এমন একটি হাদিস হত, যার সাথে আমরা উপস্থাপিত অন্যান্য সহীহ হাদিসের কোন বিরোধিতা ছিল না, তাহলে আমরা দুর্বল হাদিসের উপর নির্ভর করতাম। কিন্তু এখানে সমস্যাটি ভিন্ন, অনেক হাদিস সহীহ এবং হাসান এবং এই হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক, তাহলে আমরা এটি কীভাবে নেব?
এই ৫টি কারণে আমি এই হাদিসটিকে গান গাওয়া এবং বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ করার প্রমাণ হিসেবে নিচ্ছি না।
প্রথম অংশের হাদিসগুলো আলোচনা শেষ করার পর এবং তাদের দুর্বলতা প্রমাণ করার পর, আসুন এখন দ্বিতীয় অংশের হাদিসগুলো দেখি, এবং এগুলোর সবগুলোই সহীহ, এগুলো থেকে আমরা গান গাওয়ার হুকুম বের করব।
প্রথম হাদিসটি বিবাহ অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার অনুমতি দেয়।
দ্বিতীয় হাদিসটি বাদ্যযন্ত্র ছাড়া অন্য কোথাও গান গাওয়ার অনুমতি দেয়।
তৃতীয় হাদিসটি গান গাওয়ার অনুমতি দেয় এবং এটি একটি বিবাহ অনুষ্ঠানে ঘটেছিল।
চতুর্থ হাদিসটি একটি প্রহার যন্ত্রের সাথে গান গাওয়ার অনুমতি দেয় এবং এটি দফ হতে পারে এবং এটি ঈদুল আযহার দিনে ঘটেছিল।
পঞ্চম হাদিসটি পুরুষদের উপস্থিতিতে একজন মহিলার দ্বারা দফ দিয়ে গান গাওয়ার অনুমতি দেয়। এটা বলা যায় না যে এটি গান গাওয়ার অনুমতি নয়; বরং এটি একজনের মানত (নাযর) পালনের অনুমতি দেয়, কারণ যদি কোন মানত না থাকে, তাহলে কোন গান গাওয়া হবে না। এই দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক নয় কারণ যদি মানত (নাযর) একটি পাপ কাজের জন্য হত, তাহলে এর পালন মোটেও অনুমোদিত হত না। যদি গান গাওয়া পাপ হতো, তাহলে নবী (সা) অনুমতি দিতেন না, কারণ আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি (সা) বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের মানত করে, তাকে অবশ্যই তাঁর আনুগত্য করতে হবে, আর যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতার মানত করে, তার যেন তাঁর অবাধ্যতা না হয়।” বুখারী, আবু দাউদ এবং নাসায়ী এই কথাটি বর্ণনা করেছেন। এছাড়াও যেহেতু নবী (সা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি (সা) বলেছেন: “কোন পাপের জন্য মানত (নাযর) পূরণ হয় না।” মুসলিমে এটি বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং যেহেতু গান গাওয়া জায়েজ, তাই নবী (সা) মহিলাকে তার মানত পালন করতে অনুমতি দিয়েছিলেন কারণ নবী (সা) যুদ্ধ থেকে নিরাপদে ফিরে এসেছিলেন।
ষষ্ঠ হাদিসটি ইঙ্গিত দেয় যে, দফের সাথে গান গাওয়া বিবাহে মুস্তাহাব, এবং কেবল জায়েজ (মুবাহ) নয়, তাই বিবাহে গান গাওয়া মানদুব (উৎসাহিত) এবং কেবল জায়েজ নয়।
সপ্তম হাদিসে নবী (সা) কর্তৃক গৃহীত গান গাওয়ার অনুমতির জন্য দলিল দেওয়া হয়েছে, শর্ত ছিল যে হারাম কথা বলা যাবে না, কারণ গান গাওয়াটা বিবাহের সময় ঘটেছিল।
অষ্টম হাদিসে নবী (সা) এর সামনে নারীদের গান গাওয়ার অনুমতির অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং এটি ঈদের দিন ঘটেছিল।
নবম হাদিসে উত্তম শব্দের সাথে গান গাওয়াকে মুস্তাহাব করা হয়েছে, এই প্রমাণের মাধ্যমে যে, নবী (সা) “আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে ভালোবাসি” বলার সময় গায়ক এবং (দুফ) বাজিকরদের অনুমতি দিয়েছিলেন এবং এটি গায়কদের উৎসাহিত করার জন্য এবং তিনি গান গাওয়ার এই সময়টি কেবল বিবাহ বা অন্যান্য অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রাখেননি।
দশম হাদিসে বাঁশি বাজিয়ে গান গাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, এই প্রমাণের মাধ্যমে যে, নবী (সা) রাখালকে বাঁশি বাজিয়ে গান গাওয়া থেকে বিরত রাখেননি, যদিও তিনি তার কান নিজের ইচ্ছায় বন্ধ করে রেখেছিলেন, বাধ্যবাধকতা হিসেবে নয়, যেমনটি তাকে পঙ্গপালের মাংস দেওয়া হয়েছিল কিন্তু তিনি তা খায়নি এবং অন্যদেরও খেতে দেননি। রাসূলুল্লাহ (সা) এর এই কাজ থেকে মানুষ বুঝতে পারে যে গান গাওয়া মাকরূহ (অপছন্দনীয়), কিন্তু যদিও তাদের এতে (সন্দেহ) শুবহাহ আছে, তারা ভুল করেছে। বিবাহ অনুষ্ঠান বা ঈদের দিন গান গাওয়া বিশেষভাবে অনুমোদিত ছিল না, বরং অনুমতি সাধারণ।
একাদশ হাদিসে দলিল দেওয়া হয়েছে যে আল্লাহর কিতাব গান গাওয়া মুস্তাহাব (পছন্দনীয়), এবং যদি গান গাওয়া হারাম হত তবে আল্লাহর কিতাবের জন্য গান গাওয়া সুপারিশ করা হত না।
দ্বাদশ হাদিসে আল্লাহর কিতাবে গান গাওয়ার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এই আলোচনা থেকে আমরা এমন একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হই যার কোন শুবহাহ (সন্দেহ) নেই, গান গাওয়া মুবাহ (অনুমোদিত), এবং বিবাহের ক্ষেত্রে মানদুব (উৎসাহিত) এবং এটি সম্ভবত কুরআনে ফরজ। এই সহীহ এবং হাসান হাদিসগুলি উপস্থাপন করার পর, কি এটা বলা সঠিক যে গান গাওয়া বা গান শোনা নিষিদ্ধ?
সঠিক শর’ঈ বিধান হলো, বিয়ে, ঈদ এবং সকল অনুষ্ঠানে গান গাওয়া জায়েজ এবং হারাম নয়, তা সে গাওয়া হোক বা শোনা হোক, এবং বাদ্যযন্ত্রের সাথে থাকুক বা না থাকুক।
মিশ্র সমাবেশে গান গাওয়া, অথবা মেয়েরা তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করে নাচ করে, তাহলে এটা হারাম এবং অনুমোদিত নয়; গান গাওয়ার নিষেধাজ্ঞার কারণে নয়, বরং গান গাওয়ার সাথে যা মিলিত হয় অর্থাৎ অবাধে মেলামেশা, নৃত্য এবং তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন (তাবাররুজ) এর কারণে। এবং আমি এটা বলছি এমন গান গাওয়ার ক্ষেত্রে যা পাপ বা খারাপ কথাবার্তা এবং কুফর ধারণার দিকে পরিচালিত করে, যেমন আব্দুল হালিম হাফিজ যে গানগুলি গেয়েছেন (قَدَرٌ أحمقُ الخُطا)। এই ধরনের গান গাওয়ার নিষেধে কোন সন্দেহ নেই, তবে এর বাইরে অন্যান্য গান গাওয়ার ক্ষেত্রে, এগুলি সাধারণত জায়েজ, এবং বিবাহের ক্ষেত্রে সুপারিশকৃত এবং কুরআনের জন্য বাধ্যতামূলক হতে পারে, তবে এটি বলা সম্পূর্ণ ভুল যে এটি হারাম।
নবী-রাসূলগণের ইসমত

নবী ও রাসূলগণের ‘ইসমাহ’ (তথা নিষ্পাপ হওয়া) বুদ্ধিবৃত্তি দ্বারা নির্ধারিত একটি বিষয়। কারণ তিনি একজন নবী বা রাসূল হওয়ায় তিনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার পক্ষ থেকে বার্তা পৌছানোর ক্ষেত্রে নিষ্পাপ। যদি (তাদের) একটি বিষয়ে ‘ইসমাহ’ না থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়, তাহলে এই ত্রুটি প্রতিটি বিষয়েই পৌঁছে যাবে (অর্থাৎ সন্দেহযুক্ত হবে); এবং এতে সমগ্র নবুয়্যত ও বার্তার (সত্যতার বিষয়টি) ভেঙে পড়বে। একজন ব্যক্তি আল্লাহর নবী অথবা আল্লাহর রাসূল হওয়ার প্রমাণের অর্থ হল তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যা প্রচার করেন তাতে তিনি নিষ্পাপ। সুতরাং তার পৌছানোর ক্ষেত্রে নিষ্পাপতা (বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে) অনিবার্য, এবং এই নিষ্পাপতার প্রত্যাখ্যান হলো তিনি যে বার্তা নিয়ে এসেছেন এবং যে নবুয়্যত দিয়ে তাকে পাঠানো হয়েছে তা প্রত্যাখ্যান করা। আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের সাথে সাংঘর্ষিক কাজ করার ক্ষেত্রে তার নিষ্পাপতার ক্ষেত্রে, এটি নিশ্চিত বিষয় যে তিনি স্পষ্টভাবে কাবায়ের (কবীরা গুনাহ) করেন না, অর্থাৎ তিনি অকাট্যভাবে কোনও কাবায়ের করেন না। কারণ একটি কাবায়ের তথা বড় পাপ করার অর্থ হল অবাধ্যতা করা। আল্লাহর অবাধ্যতাকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করা যায় না তথা অবাধ্যতা বিভক্ত হয় না। সুতরাং যদি অবাধ্যতা কর্ম পর্যন্ত পৌঁছায়, তাহলে তা প্রচার (তাবলীগ) পর্যন্ত পৌঁছাবে, এবং এটি (ওহীর) বার্তা এবং নবুয়্যতের পরিপন্থী। এই কারণেই নবী ও রাসূলগণ কাবায়ের থেকে মুক্ত, ঠিক যেমন তারা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা)’র থেকে আনীত বার্তা প্রচারে নিষ্পাপ। সাগাইর (সগীরা গুনাহ) সম্পর্কে নিষ্পাপতার বিষয়ে, আলেমদের ভিন্ন ভিন্ন মতামত রয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেছেন যে তারা তা থেকে মুক্ত নন, কারণ তা অবাধ্যতা নয়; আবার কেউ কেউ বলেছেন যে তারা নিষ্পাপ কারণ তা অবাধ্যতা। এর প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি হল যা-ই হারাম বলে বিবেচিত হোক এবং যা-ই ফরজ হোক, অর্থাৎ সমস্ত কর্তব্য (ফুরুদ) এবং নিষেধ (মুহাররামাত), সেগুলো মেনে চলার ক্ষেত্রে তারা নিষ্পাপ। সুতরাং তারা বাধ্যবাধকতার অবহেলা করা কিংবা নিষেধাজ্ঞাগুলো পালনের ব্যপারে নিষ্পাপ, সেগুলো কাবায়ের হোক কিংবা সাগাইর হোক। অন্য কথায়, তারা অবাধ্যতা (মা’সিয়াহ) নামক যেকোনো কিছু থেকে নিষ্পাপ। তাছাড়া, খিলাফ-উল-আওলা (যা সবচেয়ে উপযুক্ত তার বিপরীত), তারা তা থেকে মুক্ত নন। তাই, তারা একেবারেই যা সবচেয়ে উপযুক্ত তার ভিন্ন কিছু করতে পারেন (অর্থাৎ অতি উত্তম না করে উত্তম কিছু করতে পারেন), কারণ এর সকল বিবেচনায়, এটি “মা’সিয়াহ” (অবাধ্যতা) শব্দের অর্থের আওতায় আসে না। এটিই বুদ্ধিবৃত্তির বিবেচনায় অনিবার্য তথা তারা নবী ও রাসূল হওয়ার কারণে তা আবশ্যক।
আমাদের পয়গম্বর মুহাম্মদ (সা) একজন নবী ও রাসূল। সুতরাং, অন্যান্য রাসূল ও নবীদের মতো, তিনিও আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) থেকে যা প্রচার করেন তাতে ভুল করা হতে মুক্ত। এটি একটি সুনির্দিষ্ট নিষ্পাপতা যা বুদ্ধিবৃত্তি ও শর’ঈ দলীল দ্বারা প্রমাণিত। রাসূল (সা) আহকাম ওহী (প্রত্যাদেশ) ব্যতিত অন্য কিছু দ্বারা প্রচার করেননি। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) সূরা আল-আম্বিয়াতে বলেছেন:
“বলুন: আমি কেবল ওহী (প্রত্যাদেশ) দ্বারা তোমাদের সতর্ক করছি।” [TMQ আল-আম্বিয়া: ৪৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) সূরা আন-নাজমে বলেন:
“তিনি (নিজের) ইচ্ছা থেকে কথা বলেন না। কেবল ওহীই, যা প্রেরণ করা হয়।” [TMQ আন-নাজম: ৩-৪]
‘কথা বলা’ (ইয়ান্তিক) শব্দটি সাধারণ (উমুম) শব্দের অন্তর্গত, তাই এতে কুরআন এবং অন্যান্য শব্দও অন্তর্ভুক্ত। কুরআন বা সুন্নাহতে এমন কিছু নেই যা এটিকে নির্দিষ্ট করে, তাই এটি সাধারণই থেকে যায়, অর্থাৎ তিনি আইন প্রণয়নের কথা যা বলেন তা একটি নাযিলকৃত ওহী। তিনি কেবল কুরআনের সাথে যা বলেন তা নির্দিষ্ট করা অবৈধ; বরং এটিকে সাধারণই থাকতে হবে, যার মধ্যে কুরআন এবং হাদিসও অন্তর্ভুক্ত। আইন প্রণয়ন এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে, আহকাম, আকীদা, চিন্তাভাবনা এবং কাহিনী (বর্ণনার) ক্ষেত্রে, পরিকল্পনা তৈরি থেকে শুরু করে যুদ্ধ, খেজুর গাছের কলম করা বা অনুরূপ জিনিসকে ধরণ ও উপায়কে (আহকামে) অন্তর্ভুক্ত না করে, এটি নির্দিষ্ট করতে হবে, কারণ তিনি একজন রাসূল। আলোচনা একজন রাসূল এবং তাকে কী সহ পাঠানো হয়েছিল তা অধ্যয়ন সম্পর্কে, অন্য কোনও ব্যপারে নয়। সুতরাং (রাসূলের) বক্তব্যই (এসব) বিষয়বস্তুকে নির্দিষ্ট করে। সুতরাং যে বিষয়টি নিয়ে তিনি এসেছেন তাতে সাধারণতার রূপ সাধারণই থাকে এবং তারপরে এটিকে নির্দিষ্টকরণের একটি রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর কারণ তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) এই বাণী:
“বলুন, আমি কেবল ওহীর মাধ্যমে তোমাদের সতর্ক করছি।” [TMQ আল-আম্বিয়া: ৪৫]
এটি সূরা সাদে তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) এই বাণীর কারণেও:
“আমার কাছে কেবল এই ওহী পাঠানো হয়েছে যে আমি স্পষ্ট সতর্ককারী।” [TMQ সাদ: ৭০]
এটি দেখায় যে লক্ষ্য হল তিনি যা নিয়ে এসেছিলেন তা হল আকীদা, আহকাম এবং যা কিছু তাকে জানানো এবং সতর্ক করার জন্য আদেশ করা হয়েছিল। অতএব, এর মধ্যে শৈলী বা তার স্বাভাবিক কর্মের ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত নয় যা মানুষের সহজাত প্রকৃতির (ফিতরাহ) অর্থাৎ তার প্রাকৃতিক সৃষ্টি থেকে, যেমন হাঁটাচলা, কথা বলা, খাওয়া ইত্যাদি। এটি মানুষের কর্ম এবং তাদের চিন্তাভাবনায়, তা নির্দিষ্ট, শৈলী, উপায় এবং অনুরূপ জিনিসে নয়। সুতরাং, মানুষের কর্ম এবং চিন্তাভাবনার সাথে সম্পর্কিত যা কিছু রাসূল (সা) কে জানানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তা আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী। ওহীতে রাসূল (সা) এর কথা এবং কর্মের পাশাপাশি তাঁর সম্মতিও (সুকুত) অন্তর্ভুক্ত, কারণ আমাদের তাঁর অনুসরণ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ (সা) বলেছেন:
“রাসূল তোমাদের জন্য কাছে যা কিছু এনেছেন তা গ্রহণ করো; এবং তিনি তোমাদের যা কিছু থেকে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকো।” [TMQ আল-হাশর: ৭]
আর তিনি (সা) বললেন:
“নিশ্চয়ই, আল্লাহর রাসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ রয়েছে।” [TMQ আল-আহযাব: ২১]
অতএব, রাসূল (সা)-এর কথা, কাজ এবং চুক্তি হলো শর’ঈ প্রমাণ এবং এগুলো সবই আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) থেকে ওহী। রাসূল (সা) ওহী গ্রহণ করতেন, ওহী আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) কাছ থেকে তাঁর কাছে পৌঁছে দিতেন এবং ওহী অনুসারে বিষয়গুলো সমাধান করতেন, ওহী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত না হয়ে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) সূরা আহকাফে বলেছেন: “আমি কেবল আমার প্রতি যা ওহী করা হয় তারই অনুসরণ করি।” [TMQ আল-আহকাফ: ৯] এবং তিনি (সা) সূরা আ’রাফে বলেছেন: “আমি কেবল আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা ওহী করা হয় তারই অনুসরণ করি।” [TMQ আল-আ’রাফ: ২০৩] এর অর্থ, আমি কেবল আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা ওহী করা হয় তারই অনুসরণ করি। তাই তিনি তাঁর আনুগত্য (ইত্তিবা’) কেবল তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা ওহী করা হয় তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। এই সবকিছুই স্পষ্ট, স্পষ্ট এবং সাধারণ (আ’আম) হওয়ার জন্য স্পষ্ট; এবং রাসূল (সা)-এর সাথে যা সম্পর্কিত তা কেবল ওহী (প্রত্যাদেশ)। রাসূল (সা)-এর আইনগত জীবন মানুষের কাছে আহকাম ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অনুসরণ করত। সুতরাং, তিনি (সা) অনেক আহকামে, যেমন যিহার (ইসলামপূর্ব বিবাহবিচ্ছেদের ধরণ) এবং লি’আন (স্ত্রীর দ্বারা ব্যভিচারের শপথ করা অভিযোগ) এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ওহীর অপেক্ষা করতেন। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলার) পক্ষ থেকে কোন ওহীর উপর ভিত্তি ব্যতীত, তিনি কখনও কোন বিষয়ে হুকুমের কথা বলেননি, অথবা কোন আইন প্রণয়ন করেননি বা কোন আইনগত চুক্তি করেননি। সাহাবাগণ কখনও কখনও কোনও মানবিক কর্মের হুকুম এবং কোনও বিষয়, উপায় বা শৈলী সম্পর্কে মতামতের মধ্যে বিভ্রান্ত হয়ে পড়তেন, তাই তারা রাসূল (সা)-কে জিজ্ঞাসা করতেন: “এটা কি ওহী, হে আল্লাহর রাসূল, নাকি এটি মতামত এবং উপদেশ”: তিনি যদি তাদের বলেন, এটি ওহী, তবে তারা চুপ থাকত, কারণ তারা জানত যে এটি তাঁর কাছ থেকে নয়। যদি তিনি তাদের বলেন; বরং এটি ছিল মতামত এবং উপদেশ, তারপর তারা তার সাথে আলোচনা করত, এবং তিনি তাদের মতামত অনুসরণ করতে পারতেন; যেমন বদর, খন্দক এবং উহুদের (যুদ্ধ) যুদ্ধে যা ঘটেছিল। তিনি তাঁর রবের কাছ থেকে যা পৌঁছেছেন তা ছাড়া অন্য বিষয়ে তাদের বলতেন: “তোমাদের দুনিয়ার বিষয় সম্পর্কে তোমরাই ভালো জানো,” যেমন খেজুর গাছ কলম করার হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। যদি তিনি ওহী ছাড়া আইন সম্পর্কে কথা বলতেন, তাহলে তিনি ওহীর অপেক্ষা করতেন না হুকুম বলার জন্য, এবং সাহাবারা তাকে জিজ্ঞাসা করতেন না যে এটি ওহী নাকি মতামত; তিনি বরং নিজের কাছ থেকে উত্তর দিতেন, এবং তারা তাকে জিজ্ঞাসা না করেই তার সাথে আলোচনা করতেন। অতএব, রাসূল(সা) আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ওহীর ভিত্তিতেই বক্তব্য দিতেন, কাজ করতেন বা কাজের স্বীকৃতি দিতেন এবং তাঁর(নিজের) মতামতের উপর ভিত্তি করেও নয়। তিনি(সা) আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) কাছ থেকে যা কিছু প্রচার করেন তাতে ভুল থেকেও মুক্ত।
প্রশ্ন-উত্তর: সময়ের পূর্বেই যাকাত প্রদান

প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম আমাদের শাইখ, আল্লাহ আপনাকে ইসলামের সাথে প্রতিপালন করুন এবং ইসলামকে আপনার সাথে লালন করুন। আমি আল্লাহর কাছে দুআ করি যে আমি যেন তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হই যারা আপনাকে নবুূয়্যতের আদলের খিলাফতের জন্য বাইয়াত দান করবেন, কারণ তিনিই সবকিছুর একচ্ছত্র ক্ষমতাবান।
যাকাত, ব্যবসায়িক লেনদেন বা অর্থের যাকাত সম্পর্কে আমার একটি প্রশ্ন আছে; পূর্ণ এক (চন্দ্র) বছর (আল-হাওল) অতিবাহিত হওয়ার আগে কি এদের যাকাত বা এদের কিছু অংশের যাকাত দেওয়া জায়েজ হবে এবং (আল-হাওল) কি যাকাত প্রদানের জন্য শর্ত?
আল্লাহ আপনাকে দুনিয়া ও আখেরাতে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য কল্যাণকর কিছু করার জন্য সাহায্য করুন, ওয়া আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
ইমাদ এম. সা’আদ থেকে
উত্তর:
ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ,
যাকাত প্রদানের জন্য আল-হাওল পূর্ণ করা একটি শর্ত, যা “নিসাব”। যদি শর্ত পূরণ হয়, অর্থাৎ “নিসাব” এর মাধ্যমে আল-হাওল পরিপূর্ণ হয়েছে এবং তা হ্রাস করা হয়নি, তাহলে যাকাত বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। তবে, যদি এটি নির্ধারিত সময়ের আগে প্রদান করা হয় তবে শরীয়ত প্রমাণ অনুসারে এই প্রদান জায়েজ, যার (দলীলের) মধ্যে নিম্নলিখিত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:
– আল-বায়হাকী আল-সুনান আল-কুবরা থেকে আলী থেকে উদ্ধৃত করেছেন:
«أَنَّ الْعَبَّاسَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ سَأَلَ رَسُولَ اللهِ فِي تَعْجِيلِ صَدَقَتِهِ قَبْلَ أَنْ تَحِلَّ فَأَذِنَ لَهُ فِي ذَلِكَ».
“আল আব্বাস (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা)-কে জিজ্ঞাসা করলেন যে, তিনি কি তার সাদাকাহ্ হাওল সম্পন্ন হওয়ার আগেই তাড়াহুড়ো করে আদায় করতে পারবেন, আর আল্লাহর রাসূল (সা) তাকে অনুমতি দিলেন”।
– আল-দারকিতনী তার সুনানে হুজর আল-আদাবী থেকে আলী (রা.) থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, তিনি বলেছেন: আল্লাহর রাসূল (সা) উমরকে বলেছিলেন:
«إِنَّا قَدْ أَخَذْنَا مِنَ الْعَبَّاسِ زَكَاةَ الْعَامِ عَامِ الْأَوَّلِ»
“আমরা প্রথম বছরেই আল-আব্বাসের কাছ থেকে বছরের যাকাত গ্রহণ করেছি”।
– আল-দারকিতনী মুসা বিন তালহা থেকে তালহা থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«يَا عُمَرُ أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ عَمَّ الرَّجُلِ صِنْوُ أَبِيهِ؟ إِنَّا كُنَّا احْتَجْنَا إِلَى مَالٍ فَتَعَجَّلْنَا مِنَ الْعَبَّاسِ صَدَقَةَ مَالِهِ لِسَنَتَيْنِ».
“হে উমর, তুমি কি জানতে না যে, লোকটির চাচা তার পিতার যমজ? আমাদের টাকার প্রয়োজন ছিল তাই আমরা দুই বছর আগে আব্বাসের টাকা থেকে সাদাকাহ করেছিলাম”।
আল-হাকামের সনদে মতবিরোধ ছিল এবং সঠিকটি আল-হাসান ইবনে মুসলিমের কাছ থেকে এসেছে যা মুরসাল।
অতএব, যাকাত আদায়ের আগে তাড়াহুড়ো করা জায়েজ।
আপনার তথ্যের জন্য, বেশিরভাগ আলেমও এটিই বলেন।
আপনার ভাই,
আতা বিন খলিল আবু আল-রাশতাহ১১ই শাওয়াল ১৪৩৫ হিজরি
০৭/০৮/২০১৪ ইংঅডিও ভার্শন:
প্রশ্ন-উত্তর: যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর সাথে লেনদেন

প্রশ্ন-উত্তর
প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর সাথে লেনদেন
প্রাপক: আবু মুহাম্মদ সালিম
(অনুবাদিত)প্রশ্ন:
আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
আবু মুহাম্মদ সালিম
আমি মহান আল্লাহর কাছে দুআ করছি যে আপনি সুস্থ থাকুন, এবং আল্লাহ আপনাকে একটি মহান বিজয় দান করুন। আমি আল্লাহর কাছে দুআ করছি যে তিনি আপনার হাত দিয়ে কল্যাণের সকল দরজা খুলে দিন।
আমি এই প্রশ্নটি আমাদের শেখ এবং প্রিয়, হিযবুত তাহরীরের আমির, আতা বিন খলিল আবু আল-রাশতাহকে উদ্দেশ্য করে করছি:
এক ভাই আমাকে বারকান বসতিতে কন্টেইনার তৈরির একটি কারখানায় কাজ করার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। সম্প্রতি, এই কারখানার একটি অংশ ‘ইসরায়েলি’ সেনাবাহিনীর সুবিধার জন্য রূপান্তরিত করা হয়েছে এবং এটি বৈদ্যুতিক জেনারেটর এবং অন্যান্য সামরিক-সম্পর্কিত জিনিসপত্র পরিবহনের জন্য ট্রেলার তৈরি করে। সেনাবাহিনীর জন্য ট্রেলার তৈরি করে এমন এই বিভাগে কাজ করা কি জায়েজ?
আল্লাহ আপনাকে বরকতময় করুন এবং আপনাকে সর্বোত্তম প্রতিদান দিন।
আল্লাহ আপনাকে আশ্রয় দিন, আপনাকে বিজয় দান করুন, আপনাকে রক্ষা করুন, আপনাকে ক্ষমতায়িত করুন এবং আপনার হাতে বিজয় এবং ক্ষমতায়ন আনুন।
যদি সম্ভব হয়, তাহলে একটি দ্রুত উত্তর পেলে খুশি হবো – আল্লাহ আপনাকে পুরস্কৃত করুন।
উত্তর:
ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ,
উল্লেখিত কারখানার (যার একটি অংশ সম্প্রতি ‘ইসরায়েলি’ সেনাবাহিনীর সুবিধার জন্য রূপান্তরিত হয়েছে এবং বৈদ্যুতিক জেনারেটর এবং অন্যান্য সামরিক-সম্পর্কিত জিনিসপত্র পরিবহনের জন্য ট্রেলার তৈরি করে) ক্ষেত্রে, এটি ইহুদি সত্তার অন্তর্গত, যা আসলে যুদ্ধরত একটি রাষ্ট্র। উত্তর দুটি ক্ষেত্রে নির্ভর করে:
১. দখলদারিত্বের অধীনে বসবাসকারী মুসলমানরা।
২. দখলদারিত্বের বাইরের মুসলমানরা।প্রথম ক্ষেত্রে:
ইহুদি দখলদারিত্বের অধীনে থাকা মুসলিমরা মদিনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর মক্কায় থাকা মুসলিমদের মতো। ইহুদি দখলদারিত্বের অধীনে থাকা ফিলিস্তিনের জনগণের জন্য ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদিতে জড়িত থাকা বৈধ, শত্রুকে শক্তিশালী করে এমন কাজ ছাড়া। একইভাবে, একজন মুসলিম, উদাহরণস্বরূপ, যার আমেরিকান নাগরিকত্ব রয়েছে, তার জন্য হুকম হচ্ছে মক্কার মুসলমানদের মতো যারা হিজরত করেনি, তাই তাদের জন্য দার আল-হারব (যুদ্ধরত দেশে) লেনদেন করা বৈধ, যেখানে তারা বাস করে। তবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদের শক্তিশালী করে এমন বিষয় যার (তাহকিক আল-মানাত) করে আইনগত প্রয়োগ নিরূপন করা যায়, তা ছাড়া।
দ্বিতীয় ক্ষেত্রে:
আমরা পূর্বে একাধিক জবাবে একই ধরণের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি, যার মধ্যে রয়েছে:
৩১/০৩/২০০৯ তারিখের একটি প্রশ্নের উত্তর:
১. যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর সাথে সরাসরি কাজ করা জায়েজ নয়, এবং সেই রাষ্ট্রগুলোর কোম্পানিগুলোর সাথে কাজ করাও জায়েজ নয়, কারণ প্রকৃত যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক একটি যুদ্ধ সম্পর্ক, শান্তিপূর্ণ ব্যবসায়িক সম্পর্ক নয়।
২. যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর সাথে কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবতা নিম্নরূপে নিরূপন করা হয়:
ক. যদি প্রতিষ্ঠানটি যে প্রকল্পে কাজ করছে তা আসলে যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলির জন্য হয়, তাহলে সেই প্রকল্পে প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করা জায়েজ নয়।
খ. যদি প্রকল্পটি যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর জন্য না হয়, বরং স্থানীয় জনগণের জন্য হয়, যেমন স্কুল নির্মাণ বা রাস্তা নির্মাণ, তাহলে পাপ সেই প্রতিষ্ঠানের উপর বর্তাবে যারা যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলির সাথে কাজ করে, তবে কাজটি জায়েজ যতক্ষণ না প্রকল্পটি যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলির জন্য না হয়।
২৪/০৭/২০১১ তারিখের একটি প্রশ্নের উত্তর:
“… মুসলিম ভূখণ্ডের দখলদার রাষ্ট্রগুলোর (যারা আসলে যুদ্ধে লিপ্ত) কোম্পানি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সরাসরি চুক্তি করা অনুমোদিত নয়, কারণ এটি আসলে যুদ্ধে লিপ্ত রাষ্ট্রগুলির সাথে লেনদেনের একটি রূপ। স্থানীয় সরকার বা স্থানীয় সংস্থার সাথে চুক্তি করার ক্ষেত্রে যা দখলদার রাষ্ট্রের সাথে (সরাসরি) সম্পর্কিত নয় কিন্তু এর সাথে সম্পর্কযুক্ত, সেক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়:
১. যদি সম্পর্কটি দখলদার রাষ্ট্রের সাথে সামরিক প্রকল্পের সাথে জড়িত থাকে, তবে এটি অনুমোদিত নয়।
২. যদি সম্পর্কের মধ্যে এমন বাণিজ্যিক প্রকল্প জড়িত থাকে যা দেশের ক্ষতি করে না, তবে এটি অনুমোদিত, তবে ক্ষতি করার সন্দেহের কারণে এটি এড়ানো ভাল।
৩. যদি কর্মী স্থানীয় রাষ্ট্র দ্বারা নিযুক্ত হন, তবে তার চুক্তি সরাসরি দখলদার রাষ্ট্রের সাথে হয়, তবে এটি অনুমোদিত নয়।
৪. যদি কর্মী স্থানীয় রাষ্ট্র দ্বারা নিযুক্ত হন এবং তার চুক্তি স্থানীয় রাষ্ট্রের সাথে হয়, তবে এটি অনুমোদিত, এমনকি যদি স্থানীয় রাষ্ট্র দখলদার রাষ্ট্র থেকে আর্থিক সহায়তা পায়।
৫. যদি কর্মী স্থানীয় রাষ্ট্র দ্বারা নিযুক্ত হন, তবে তার চুক্তিটি স্থানীয় রাষ্ট্রের সাথে , কিন্তু সে সরাসরি দখলদার রাষ্ট্র থেকে তার বেতন পায়, তাহলে তা জায়েজ নয়।
এর প্রমাণ হল যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর সাথে লেনদেনের বিধান।”
আমি আশা করি এটি যথেষ্ট, এবং আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন এবং সর্বাধিক প্রজ্ঞাময়।
আপনার ভাই,
আতা বিন খলিল আবু আল-রাশতাহ১২ মহররম ১৪৪৭ হিজরি
০৭/০৭/২০২৫ ইং


















