তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২সূরাতুল কদর – তাফসীর ইবন কাছীর

[بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَـنِ الرَّحِيمِ ]
এটি মক্কায় অবতীর্ণ
কদরের রাত্রির মর্যাদা
আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন জানিয়ে দিচ্ছেন যে, লাইলাতুল কদরে কুরআনুল কারীম অবতীর্ণ করেন। এই রাতকে লাইলাতুল মুবারাকও বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّا أَنزَلْنَـهُ فِى لَيْلَةِ الْقَدْرِ
আমি তো ইহা অবতীৰ্ণ করেছি এক মুবারাক রাতে । (সূরা দুখান, ৪৪: ৩) কুরআন কারীম দ্বারাই এটা প্রমাণিত যে, এ রাত রামাযানুল মুবারাক মাসে রয়েছে। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন,
[شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِى أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ]
রামাযান মাস, যে মাসে বিশ্বমানবের জন্য পথ প্রদর্শন এবং সু-পথের উজ্জ্বল নিদৰ্শন এবং হক ও বাতিলের প্রভেদকারী কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে । (সূরা বাকারাহ, ২: ১৮৫)
ইব্ন আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ সাহাবী হতে বর্ণিত আছে যে, লাইলাতুল কদরে সমগ্র কুরআন লাওহে মাহফুয হতে প্রথম আসমানে অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর ঘটনা অনুযায়ী দীর্ঘ তেইশ বছরে ধীরে ধীরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর অবতীর্ণ হয়েছে।
তারপর আল্লাহ তাআলা লাইলাতুল কদরের শান শাওকত ও বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে বলেন, [إِنَّا أَنزَلْنَـهُ فِى لَيْلَةِ الْقَدْرِ] এই রাতের এক বিরাট বারাকাত হল এই যে, এ রাতে কুরআনুম মাজীদের মত মহান নি‘আমাত নাযিল হয়েছে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
[وَمَآ أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ – لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ]
হে নবী! লাইলাতুল কদর কী তা কি তোমার জানা আছে? লাইলাতুল কদর হচ্ছে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (তাবারী ২৪/৫৩১, ৫৩২; কুরতুবী ২০/১২৩)
মুসনাদ আহমাদে আবু হুরাইরাহ (রা) হতে বর্ণিত আছে যে, রামাযান মাস এসে গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন
«قَدْ جَاءَكُمْ شَهْرُ رَمَضَانَ، شَهْرٌ مُبَارَكٌ، افْتَرَضَ اللهُ عَلَيْكُمْ صِيَامَهُ، تُفْتَحُ فِيهِ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ، وَتُغْلَقُ فِيهِ أَبْوَابُ الْجَحِيمِ، وَتُغَلُّ فِيهِ الشَّيَاطِينُ، فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ، مَنْ حُرِمَ خَيْرَهَا فَقَدْ حُرِم»
‘(হে জনমণ্ডলী!) তোমাদের উপর রামাযান মাস এসে পড়েছে। এ মাস খুবই বারাকাত পূর্ণ বা কল্যাণময়। আল্লাহ তা’আলা তোমাদের উপর এ মাসের সিয়াম ফারয করেছেন। এ মাসে জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। আর শাইতানদেরকে বন্দী করে রাখা হয়। এ মাসে এমন একটি রাত রয়েছে যে রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম । এ মাসের কল্যাণ হতে যে ব্যক্তি বঞ্চিত হয় সে প্রকৃতই হতভাগা ৷’ ইমাম নাসাঈও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। (আহমাদ ২/২৩০, নাসাঈ ৪/১২৯)
কদরের রাতে ইবাদাত করার সাওয়াব এক হাজার মাস অপেক্ষা অধিক হওয়ার ব্যাপারে সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
«مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِه»
যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াবের নিয়াতে কদরের রাতে ইবাদাত করে, তার পূর্বাপর সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেয়া হয়৷’ (ফাতহুল বারী ৪/২৯৪, মুসলিম ১/৫২৩)
কদরের রাতে ফেরেশতাদের উপস্থিতি এবং উত্তম বিষয়ের অবতরণ
এরপর আল্লাহ তা’আলা বলেন, [تَنَزَّلُ الْمَلَـئِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمْرٍ] এ রাতের বারাকাতের আধিক্যের কারণে এ রাত্রে বহু সংখ্যক মালাইকা অবতীর্ণ হন। এমনিতেই মালাইকা সকল বারাকাত ও রাহমাতের সাথেই অবর্তীণ হন। যেমন কুরআন তিলাওয়াতের সময়ে অবতীর্ণ হন, যিক্রের মাজলিস ঘিরে ফেলেন এবং দীনী ইলম বা বিদ্যা শিক্ষার্থীদের জন্য সানন্দে নিজেদের পাখা বিছিয়ে দেন ও তাদের প্রতি বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করেন। রূহ্ দ্বারা এখানে জিবরাঈলকে (আঃ) বুঝানো হয়েছে। এ আয়াতে অন্যান্য মালাইকা থেকে আলাদা করে উল্লেখ করার কারণ এই যে, অন্যান্য মালাইকা থেকে তার যে ভিন্ন মর্যাদা রয়েছে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা তা প্রকাশ করে দিলেন। পরবর্তী আয়াতাংশ [مِّن كُلِّ أَمْرٍ] এর ব্যাখ্যায় মুজাহিদ (রহঃ) বলেন যে, সব কিছুর উপর তখন শান্তি বর্ষিত হয়। অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’আলা বলেন, [سَلَـمٌ هِىَ] কদরের রাত আগাগোড়াই শান্তির রাত। সাঈদ ইব্ন মানসুর (রহঃ) বলেন: ঈসা ইব্ন ইউনুস (রহঃ) আমাদেরকে বলেছেন যে, আমাশ (রহ.) আমাদেরকে বলেছেন যে, মুজাহিদ (রহঃ) [سَلَـمٌ هِىَ] এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এ রাতে শাইতান কোন অনিষ্ট করতে পারেনা, কেহকে কোন কষ্ট দিতে পারেনা কাতাদাহ (রহঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এই রাতে সমস্ত কাজের ফাইসালা করা হয়, বয়স, মৃত্যু ও রিয্ক নির্ধারণ করা হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, [فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ] এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপুর্ণ বিষয়ে স্থিরীকৃত হয় । (সূরা দুখান, 88: 8) সাঈদ ইবৃন মানসুর বলেন, হুসাইম (রহঃ) আবূ ইসহাকের (রহঃ) বরাতে আমাদের কাছে বর্ণনা করেন যে, শাবী (রহঃ) [سَلَـمٌ هِىَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ] আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন যে, এই রাতে মালাইকা মাসজিদে অবস্থানকারীদের প্রতি সকাল পর্যন্ত সালাম প্রেরণ করতে থাকেন। কাতাদাহ (রহঃ) এবং ইব্ন যায়িদ (রহঃ) বলেন যে, এ রাতে শুধুই শান্তি আর শান্তি, কোন খারাবীই এতে নিহিত নেই এবং তা ফাজর পৰ্যন্ত বলবৎ থাকে।
মর্যাদাপূর্ণ রাত কোনটি এবং উহার লক্ষণ
মুসনাদ আহমাদে উবাদাহ ইব্ন সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«لَيْلَةُ الْقَدْرِ فِي الْعَشْرِ الْبَوَاقِي، مَنْ قَامَهُنَّ ابْتِغَاءَ حِسْبَتِهِنَّ فَإِنَّ اللهَ يَغْفِرُ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ، وَهِيَ لَيْلَةُ وِتْرٍ: تِسْعٍ أَوْ سَبْعٍ أَوْ خَامِسَةٍ أَوْ ثَالِثَةٍ أَوْ آخِرِ لَيْلَة»
‘(রামাযান মাসের) শেষ দশ রাতের মধ্যে লাইলাতুল কদর রয়েছে। যে ব্যক্তি এই রাতে সাওয়াবের আশায় ইবাদাত করে আল্লাহ তা‘আলা তার পূর্বাপর সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেন। ইহা হল বেজোড় রাত । অর্থাৎ একুশ, তেইশ, পঁচিশ, সাতাশ কিংবা উনত্রিশতম রাত৷’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন:
«إِنَّ أَمَارَةَ لَيْلَةِ الْقَدْرِ أَنَّهَا صَافِيَةٌ بَلْجَةٌ، كَأَنَّ فِيهَا قَمَرًا سَاطِعًا، سَاكِنَةٌ سَاجِيَةٌ، لَا بَرْدَ فِيهَا وَلَا حَرَّ، وَلَا يَحِلُّ لِكَوْكَبٍ يُرْمَى بِهِ فِيهَا حَتْى يُصْبِحَ، وَإِنَّ أَمَارَتَهَا أَنَّ الشَّمْسَ صَبِيحَتَهَا تَخْرُجُ مُسْتَوِيَةً لَيْسَ لَهَا شُعَاعٌ، مِثْلَ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ، وَلَا يَحِلُّ لِلشَّيْطَانِ أَنْ يَخْرُجَ مَعَهَا يَوْمَئِذ»
‘লাইলাতুল কদরের নিদর্শন এই যে, এটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও পরিষ্কার এবং এমন উজ্জ্বল হয় যে, যেন চন্দ্রোদয় ঘটেছে। এ রাতে শান্তি ও শৈত্য বিরাজ করে। ঠাণ্ডা ও গরম কোনটাই বেশী থাকেনা । সকাল পর্যন্ত নক্ষত্র আকাশে জ্বল জ্বল করে। এ রাতের আর একটি নিদর্শন এই যে, এর শেষ প্রভাতে সূর্য প্রখর কিরণের সাথে উদিত হয়না । বরং চতুর্দশ রাতের চন্দ্রের মত উদিত হয়। সেদিন ওর সাথে শাইতানেরও আবির্ভাব হয়না৷’ (আহমাদ ৫/৩২৪ মুরসাল) এ হাদীসটির সনদ সহীহ বা বিশুদ্ধ, কিন্তু মতন গারীব। কিছু কিছু শব্দের ব্যবহার বিতর্কিত রয়েছে।
ইমাম আবু দাউদ (রহঃ) তার সুনান গ্রন্থে কদরের রাত সম্পর্কে একটি ভিন্ন অধ্যায় রচনা করেছেন। তাতে তিনি লিখেছেন যে, প্রতি বছর রামাযান মাসে কদরের রাতের আবির্ভাব হয়। তিনি আরও লিখেছেন যে, আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমার (রা) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এক ব্যক্তি কদরের রাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তখন আমিও তার কাছে ছিলাম । তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, «هِيَ فِي كُلِّ رَمَضَان» ইহা প্রতি রামাযান মাসেই আবির্ভূত হয়। (হাদীস নং ২/১১১ মাওকুফ) এ হাদীসটি বর্ণনার ব্যক্তিবর্গ বিশ্বস্ত, কিন্তু ইমাম আবূ দাউদ (রহঃ) বলেছেন যে, শুবাহ (রহঃ) এবং সুফিয়ান (রহঃ) উভয়ে এটি ইসহাক (রহঃ) হতে বর্ণনা করেছেন এবং তারা মনে করেন যে, আলোচ্য বর্ণনাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের নয়, বরং ইব্ন উমারের (রাঃ) নিজের ।
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়৷ সাল্লাম রামাযান মাসের প্রথম দশদিনে ই’তিফাক করেন, আমরাও তার সাথে ই’তিকাফ করতে থাকি। অতঃপর জিবরাঈল (আঃ) এসে বলেন, ‘আপনি যা খুঁজছেন তাতো এখনো সামনে রয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মধ্যভাগের দশদিন ই’তিকাফ করেন এবং আমরাও তীর সাথে ই’তিকাফ করি। আবার জিবরাঈল (আঃ) এসে বলেন, ‘আপনি যা খুঁজছেন তাতো এখনো সামনে রয়েছে।’ অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাযামানের বিশ তারিখের সকালে দাড়িয়ে খুতবাহ দেন এবং বলেন,
«مَنْ كَانَ اعْتَكَفَ مَعِيَ فَلْيَرْجِعْ فَإِنِّي رَأَيْتُ لَيْلَةَ الْقَدْرِ، وَإِنِّي أُنْسِيتُهَا، وَإِنَّهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ فِي وِتْرٍ، وَإِنِّي رَأَيْتُ كَأَنِّي أَسْجُدُ فِي طِينٍ وَمَاء»
‘আমার সাথে রাত দেখেছি, কিন্তু এরপর তা আমাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে ইহা রামাযানের শেষ দশদিনের বেজোড় রাতে রয়েছে। আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে যে, আমি যেন কাদা ও পানির মধ্যে সাজদাহ করছি।’ মাসজিদে নাববীর ছাদ ছিল শুকনা খেজুর পাতার তৈরি । আকাশে তখন মেঘের কোন চিহ্নই ছিলনা । হঠাৎ মেঘ জমা হল এবং বৃষ্টি হল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে সাথে নিয়ে সালাত আদায় করেন এবং আমরা লক্ষ্য করলাম যে, তার কপালে ভিজা মাটি লেগে রয়েছে’ (ফাতহুল বারী ৪/৩২৯, মুসলিম ২/৮২৪) এভাবে তার স্বপ্ন সত্য প্রমাণিত হল। ইহা রামাযান মাসের একুশ তারিখের রাতের ঘটনা বলে ইমাম বুখারী (রহঃ) ও ইমাম মুসলিম এ হাদীসটি দু’টি ভিন্ন বর্ণনা ধারায় উল্লেখ করেছেন। ইমাম শাফিঈ (রহঃ) বলেন যে, বর্ণনার দিক দিয়ে এ হাদীসটি সহীহ। আবদুল্লাহ ইবৃন উনাইস (রহঃ) থেকে বর্ণিত সহীহ মুসলিমে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে যাতে বলা হয়েছে যে, কদরের রাত হল রামাযানের তেইশতম রাত। (হাদীস নং ২/৮২৭) ইব্ন আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত অপর একটি হাদীসে বলা হয়েছে যে, কদরের রাত হল রামাযানের পঁচিশতম রাত। ওতে বলা হয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা রামাযানের শেষ দশ রাতে কদরের রাত অন্বেষন কর। নবম রাতেও থাকতে পারে, সপ্তম রাতেও থাকতে পারে অথবা পঞ্চম রাতেও থাকতে পারে। (ফাতহুল বারী ৪/৩০৬)
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«الْتَمِسُوهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ فِي تَاسِعَةٍ تَبْقَى، فِي سَابِعَةٍ تَبْقَى، فِي خَامِسَةٍ تَبْقَى»
‘কদরের রাতকে রামাযানের শেষ দশকে খৌজ কর। এটি নয় (এর রাত্রে) থাকে, সাত (এর রাত্রে) থাকে, পাঁচ (এর রাতেও এ সুযোগ) থাকে’ অধিকাংশ মুহাদ্দিস বলেছেন যে, এর দ্বারা বেজোড় রাতকে বুঝানো হয়েছে। এটাই সর্বাধিক সুস্পষ্ট ও প্রসিদ্ধ উক্তি।
কদরের রাত রামাযানের সাতাশতম রাত বলেও উল্লেখ রয়েছে। উবাই ইব্ন কা’ব (রা.) হতে বর্ণিত একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘এটি সাতাশতম রাত !’ (মুসলিম ২/৮২৮)
মুসনাদ আহমাদে রয়েছে যে, যির (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি উবাই ইব্ন কা‘বকে (রা.) জিজ্ঞেস করেন, হে আবু মুনযির! বলা হল: আপনার ভাই আবদুল্লাহ ইব্ন মাসউদ (রাঃ) বলেন: যে ব্যক্তি বছরের প্রত্যেক রাতে জেগে থাকবে সে কদরের রাত পেয়ে যাবে। এ কথা শুনে উবাই (রা.) বললেন: ‘আল্লাহ তার প্রতি রহম করুন, তিনি জানতেন যে, এ রাত রামাযান মাসের মধ্যে রয়েছে এবং আমি শপথ করে বলছি যে, কদরের রাত যে রামাযানের সাতাশতম রাত এটাও আবদুল্লাহ ইব্ন মাসউদ (রা.) জানতেন । উবাই ইব্ন কা’বকে (রা.) আবার জিজ্ঞেস করা হল, আপনি এটা কি করে জানলেন? জবাবে তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের যে সব নিদর্শনের কথা বলেছেন সে সব দেখেই আমরা বুঝতে পেরেছি। যেমন এ দিন রাতের পর সূর্য উদিত হওয়ার সময় কিরণহীন অবস্থায় উদিত হয়। ইমাম মুসলিমও (রহঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। (আহমাদ ৫/১৩০, মুসলিম ২/৮২৮)
লাইলাতুল কদর রামাযান মাসের উনত্রিশতম রাত বলেও উল্লেখ রয়েছে। উবাদা ইব্ন সামিতের (রা.) প্রশ্নের জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
«فِي رَمَضَانَ فَالْتَمِسُوهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ، فَإِنَّهَا فِي وِتْرٍ إِحْدَى وَعِشْرِينَ، أَوْ ثَلَاثٍ وَعِشْرِينَ، أَوْ خَمْسٍ وَعِشْرِينَ، أَوْ سَبْعٍ وَعِشْرِينَ، أَوْ تِسْعٍ وَعِشْرِينَ، أَوْ فِي آخِرِ لَيْلَة»
‘এ রাতে রামাযান মাসের শেষ দশকে বেজোড় রাতসমূহে অনুসন্ধান কর অর্থাৎ একুশ, তেইশ, পঁচিশ, সাতাশ, উনত্রিশ অথবা শেষ রাতে ৷’ (আহমাদ ৫/৩১৮) মুসনাদ আহমাদে আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
«إِنَّهَا لَيْلَةُ سَابِعَةٍ أَوْ تَاسِعَةٍ وَعِشْرِينَ، وَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ تِلْكَ اللَّيْلَةَ فِي الْأَرْضِ أَكْثَرُ مِنْ عَدَدِ الْحَصَى»
‘লাইলাতুল কদর হল সাতাশতম অথবা উনত্রিশতম রাত। এ রাতে যে মালাইকা পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন তাদের সংখ্যা পৃথিবীর প্রস্তর খণ্ডের সংখ্যার চেয়েও অধিক ।’ (আহমাদ ২/৫১৯) একমাত্র ইমাম আহমাদ (রহ.) এ হাদীসটি লিপিবদ্ধ করেছেন এবং এর বর্ণনায় কোন ভুল পরিলক্ষিত হয়না ।
‘রামাযানের সর্বশেষ রাতও কদরের রাত’ এর উপরও একটি বর্ণনা রয়েছে। জামে’ তিরমিধী এবং সুনান নাসাঈতে রয়েছে: ‘নয়টি রাত যখন বাকী থাকে বা সাত পাচ বা তিন অথবা শেষ রাত অর্থাৎ এ রাতগুলিতে কদরের রাত তালাশ কর !’
ইমাম তিরমিযী (রহঃ) আবূ কিলাবা (রহঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রামাযানের শেষ দশ দিনের রাতের মধ্যে এ রদবদল হয়ে থাকে। ইমাম মালিক (রহঃ) ইমাম সাওরী (রহঃ), ইমাম আহমাদ ইব্ন হাম্বল (রহঃ), ইমাম ইসহাক ইব্ন রাহওয়াই (রহঃ), ইমাম আবূ সাওর (রহঃ), আল মুযানী (রহঃ), ইমাম আবূ বাকর ইব্ন খুযাইমা (রহঃ) প্রমুখ গুরুজনও এ কথাই বলেছেন। আল্লাহ তা‘আলাই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।
কদরের রাতে পঠিতব্য দু’আ
এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, সব সময়েই আল্লাহর কাছে দু’আ চাওয়া উচিত তবে রামাযান মাসে আরো বেশী করে দুআ করতে হবে, বিশেষ করে রামাযানের শেষ দশকে এবং বেজোড় রাতে নিম্নের দু‘আটি খুব বেশী পাঠ করতে হবে, ‘হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করাকে আপনি ভালবাসেন, সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন!” মুসনাদ আহমাদে বর্ণিত আছে যে, আয়িশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি যদি কদরের রাত পেয়ে যাই তাহলে আমি কি দু‘আ পাঠ করব? উত্তরে তিনি বললেন,
«قُولِي: اللْهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي»
এই দু‘আটি পাঠ করবে (আহমাদ ৬/১৮২) এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রহঃ) এবং নাসাঈও (রহঃ) বর্ণনা করেছেন। সুনান ইব্ন মাজাহয়ও বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রহঃ) এটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। মুসতাদরাক হাকিম গ্রন্থেও এটি ভিন্ন রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে এবং তিনি দুই শায়খের (ইমাম বুখারী ও মুসলিম (রহঃ)) শর্তে সহীহ বলেছেন। (তিরমিযী ৯/৪৯৫, নাসাঈও ৬/২১৮, ইব্ন মাজাহয় ২/১২৬৫, হাকিম ১/৫৩০)
প্রশ্ন-উত্তর: হাদীসে বর্ণিত রায়া (ঝাণ্ডা) ও লিওয়া (পতাকা)

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রায়া (الراية) ও লিওয়া (اللواء) সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসসমূহ
প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আমাদের সম্মানিত শায়খ, আপনি কেমন আছেন?
আমার একটি প্রশ্ন রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রায়া (الراية) সম্পর্কে কতগুলো হাদিস বর্ণিত হয়েছে এবং সেগুলোর বিশুদ্ধতা (Authenticity) কতটুকু?
এবং যদি আপনি কোনো হাদিস উল্লেখ করেন, তাহলে অনুগ্রহ করে তার সনদ (السند)-এর মান বা গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কেও উল্লেখ করবেন।
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
লিওয়া (পতাকা) এবং রায়া (ব্যানার) এবং সেগুলোর উপর কী লেখা ছিল— এ বিষয়ে আমাদের গ্রন্থসমূহে আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষভাবে এ বিষয়ে আলোচনা রয়েছে “আযহিজা” (Ajhiza – أجهزة الدولة في الخلافة: The Institutions of State in the Khilafah) (খিলাফতের রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানসমূহ—শাসন ও প্রশাসন বিষয়ে) গ্রন্থে, যার আরবি সংস্করণের ২০০ পৃষ্ঠা এবং ইংরেজি সংস্করণের ১৬৩ পৃষ্ঠায় নিম্নরূপ বলা হয়েছে—
রাষ্ট্রের পতাকা (ألوية/ Alwiyah) এবং ব্যানার (رايات/ Rayāt) থাকবে। এই বিধানটি নির্ণীত হয়েছে ইসলামের প্রথম রাষ্ট্র—যা রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনা আল-মুনাওয়ারায় (المدينة المنورة) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন—সেই রাষ্ট্রের পতাকা ও ব্যানারের দৃষ্টান্ত থেকে। এগুলো হবে নিম্নরূপ—
১. ভাষাতাত্ত্বিক ও অভিধানগত দৃষ্টিকোণ থেকে পতাকা (Flag) এবং ব্যানার (Banner)—উভয়কেই আরবি ভাষায় সাধারণভাবে ‘আলাম’ (عَلَم) বলা হয় (এর অর্থ হলো কোনো দল, বাহিনী বা রাষ্ট্রকে শনাক্ত করার জন্য ব্যবহৃত প্রতীক, চিহ্ন বা নিশান)।
প্রখ্যাত আরবি অভিধান আল-কামুস আল-মুহীত (القاموس المحيط) গ্রন্থে শব্দমূলভিত্তিক আলোচনায় বলা হয়েছে—
(روي) (র-ও-য়) ধাতুর অধীনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আর-রায়া (الراية) হলো ‘আলাম’ (عَلَم) যার বহুবচন রায়াত (رايات)। অন্যদিকে (لوي) (ল-ও-য়) ধাতুর অধীনে বলা হয়েছে—আল-লিওয়া (اللواء)-ও ‘আলাম’ (عَلَم) যার বহুবচন আলউইয়াহ (ألوية)।
তবে শরিয়ত এই দুটি শব্দের জন্য নির্দিষ্ট শর’ঈ পরিভাষাগত অর্থ নির্ধারণ করেছে, যা নিম্নরূপ—
লিওয়া (পতাকা) সাদা রঙের, যার উপর কালো অক্ষরে লেখা থাকে— “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”। এই পতাকা সেনাবাহিনীর আমির বা প্রধান সেনানায়কের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। এটি তার অবস্থান নির্দেশকারী প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং তার অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গেই অবস্থান করে। সেনাপতির সঙ্গে পতাকা সংযুক্ত থাকার প্রমাণ হলো—রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয়ের দিন একটি সাদা পতাকা উত্তোলন করে মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন। এই হাদিসটি জাবির (রা.) থেকে ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন। আর আন-নাসাঈ আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে— যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) উসামা ইবনে যায়েদকে রোম অভিযানের জন্য সেনাপতি নিযুক্ত করেন, তখন তিনি নিজ হাতে তার জন্য পতাকা বাঁধেন।
রায়া (ব্যানার) টি কালো রঙের, যার উপর সাদা অক্ষরে লেখা থাকে—“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” এটি বহন করে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের নেতারা—যেমন রেজিমেন্ট, ডিটাচমেন্ট বা অন্যান্য সামরিক বিভাগের কমান্ডারগণ। এর প্রমাণ হলো—খাইবার অভিযানের সময়, যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেই সেনাপতি ছিলেন, তিনি বলেন—“আমি আগামীকাল এই রায়া এমন এক ব্যক্তিকে প্রদান করব, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও তাকে ভালোবাসেন।” পরদিন তিনি এটি আলী (রা.)-কে প্রদান করেন। এই হাদিসটি (বুখারি ও মুসলিম উভয়েই বর্ণনা করেছেন) মুত্তাফাকুন আলাইহি। তখন আলী (রা.) সেনাবাহিনীর একটি ডিভিশন বা ইউনিটের নেতা ছিলেন। আরও একটি হাদিসে হারিস ইবনে হাসান আল-বাকরি বলেন—“আমরা মদিনায় আগমন করলাম এবং দেখলাম রাসূলুল্লাহ (সা.) মিম্বারের উপর আছেন। বিলাল তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, তার কোমরে তরবারি বাঁধা। আর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে কিছু কালো ব্যানার ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম—এই ব্যানারগুলো কী? তারা বলল—এটি আমর ইবনে আল-আস, যিনি সদ্য একটি অভিযানে থেকে ফিরে এসেছেন।” এখানে বলা হয়েছে—“কালো ব্যানারসমূহ (Rayaat)” অর্থাৎ একাধিক ব্যানার ছিল, যদিও সেনাপতি ছিলেন একজন—আমর ইবনে আল-আস। এ থেকে বোঝা যায়—একই সেনাবাহিনীতে পতাকা (Liwa’) একটি মাত্র কিন্তু ব্যানার (Rayat) একাধিক হতে পারে, যা বিভিন্ন ইউনিট বহন করে। অতএব—লিওয়া (পতাকা) কেবল সেনাপতির প্রতীক (আলাম) আর রায়া (ব্যানার) সৈন্যদের বহনকৃত প্রতীকসমূহ (আলাম)।
২. পূর্বে যা উল্লেখ করা হয়েছে তার সাথে আরও একটি হাদিস সংযোজন করছি, যা আত-তাবারানি তাঁর গ্রন্থ আল-মুʿজাম আল-আওসাত (المعجم الأوسط) (১/২২৩)-এ নিম্নোক্ত হাদিসটি বর্ণনা করেছেন—
[২২৪ আহমদ ইবন রুশদীন আমাদের নিকট বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আবদুল গাফ্ফার ইবন দাউদ আবু সালিহ আল-হাররানি আমাদের নিকট বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: হাইয়ান ইবন উবাইদুল্লাহ আমাদের নিকট বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আবু মাজলাজ লাহিক ইবন হুমায়দ আমাদের নিকট বর্ণনা করেন, তিনি ইবন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে—
«كَانَتْ رَايَةُ رَسُولِ اللهِ ﷺ سَوْدَاءَ وَلِوَاؤُهُ أَبْيَضُ، مَكْتُوبٌ عَلَيْهِ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللهِ»
অর্থাৎ—“রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রায়া (ঝাণ্ডা) ছিল কালো, এবং তাঁর লিওয়া (পতাকা) ছিল সাদা। তাতে লেখা ছিল—‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।’” এই হাদিসটি ইবন আব্বাস (রা.) থেকে কেবল এই সনদের মাধ্যমেই বর্ণিত হয়েছে; অর্থাৎ এই বর্ণনাটি হাইয়ান ইবন উবাইদুল্লাহ-এর বর্ণনার মাধ্যমে এককভাবে (unique narration) প্রাপ্ত। ইবন হিব্বান তার গ্রন্থ আস-সিকাত (الثقات) (খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২৩০)-এ হাইয়ানকে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অন্যদিকে আবু হাতিম তার গ্রন্থ আল-জারহ ওয়া আত-তা‘দিল (الجرح والتعديل) (খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৪৬)-এ তার সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন— “তিনি সত্যবাদী (صدوق)।”
রায়া (ব্যানার) ও লিওয়া (পতাকা)-এর বিষয়টি ইসলামের ইতিহাসে সুপরিচিত। ইসলামের প্রারম্ভিক যুগ থেকেই মুসলমানদের জন্য রায়া (ব্যানার) উত্তোলিত হয়ে এসেছে। অতএব এ বিষয়ে অতিরিক্ত ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।
আমি আশা করি এই আলোচনা যথেষ্ট হবে। আর আল্লাহই সর্বাধিক অবগত এবং সর্বাধিক প্রজ্ঞাময়।
ওয়াস সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনাদের ভাই
আতা ইবনু খলিল আবু আল-রাশতা২৮ শা‘বান ১৪৪৭ হিজরি
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দপ্রশ্ন-উত্তর: স্বর্ণের দামের ওঠা-নামা

প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহ, আমাদের সম্মানিত শাইখ।
আমি আশা করি এই প্রশ্নটি আপনার কাছে সুস্বাস্থ্য ও সুস্থতার সাথে পৌঁছেছে। আমি আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা)’র কাছে দু’আ করি যেন তিনি আপনাকে তাঁর দ্বীনকে সমুন্নত রাখতে এবং তাঁর আইন বাস্তবায়নে সহায়তা করেন।
আমার প্রশ্ন হচ্ছে: সাম্প্রতিক সময়ে আমরা স্বর্ণের মূল্যে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করছি। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এর মূল্য দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেছে। এর অর্থ কি এই যে, স্বর্ণ—যা দীর্ঘদিন ধরে একটি স্থিতিশীল ধাতু এবং মুদ্রাব্যবস্থার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে—এখন আর সেই স্থিতিশীলতা বজায় রাখছে না, বরং পরিবর্তনশীল হয়ে উঠেছে? নাকি এই মূল্য পরিবর্তনের পেছনে কিছু নির্দিষ্ট শাসকগোষ্ঠীর আরোপিত নিয়ন্ত্রণ এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রভাবই প্রধান ভূমিকা পালন করছে?
যদি তাই হয়ে থাকে, তবে ইনশাআল্লাহ অদূর ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত হতে যাওয়া ইসলামী রাষ্ট্র কীভাবে তার মুদ্রাব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে এবং ইসলামের শত্রুদের সম্ভাব্য প্রভাব ও কারসাজি থেকে তাকে সুরক্ষিত রাখবে?
বারাকাল্লাহু ফিক
আপনার ইসলামের ভাই, আহমেদ সাঈদ, ফিলিস্তিনের ইসরা ও মিরাজের ভূমি থেকে।
উত্তর:
ওয়া আলাইকুম আসসালামু ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
স্বর্ণের মূল্যের ওঠানামার (প্রধান) কারণ হলো—স্বর্ণ নিজেই একটি পণ্য (commodity)। ফলে অন্যান্য পণ্যের মতোই বাজারের জল্পনা-কল্পনা ও আর্থিক স্পেকুলেশনের প্রভাব এর ওপর পড়ে; যার ফলে এর মূল্য কখনো ঊর্ধ্বমুখী হয় আবার কখনো নিম্নমুখী হয়। বিশেষত বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বৃহৎ শক্তিগুলো—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র—ডলারকে আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তারা কার্যত কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই প্রয়োজনমতো ডলার ছাপানোর পরিমাণ ইচ্ছামতো বাড়াতে বা কমাতে পারে। তদুপরি বহু দেশের সঙ্গে তাদের বিদ্যমান ঔপনিবেশিক ধাঁচের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে ডলারকে একটি কৃত্রিম স্থিতিশীলতা প্রদান করে, যার ফলে তা প্রায় স্বর্ণের সমতুল্য মর্যাদা লাভ করেছে। কিন্তু যদি বাস্তবতা ভিন্ন হতো—অর্থাৎ মুদ্রাব্যবস্থা প্রকৃত অর্থেই স্বর্ণভিত্তিক হতো এবং প্রতিটি কাগুজে মুদ্রার বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ সংরক্ষিত থাকত, যা যেকোনো সময় বিনিময়যোগ্য—যাকে রিজার্ভ কাগুজে মুদ্রা বলা হয়—তাহলে তথাকথিত ফিয়াট মুদ্রা (অর্থাৎ বাস্তব সম্পদ দ্বারা সমর্থিত নয় এমন কাগুজে টাকা) কেবল যে কাগজে তা মুদ্রিত হয়েছে সেই কাগজের মূল্য ছাড়া আর কোনো প্রকৃত মূল্য বহন করত না। এ বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য আমি দুটি বিষয় উল্লেখ করছি-
প্রথমতঃ আমার বই “Economic Crises: Their Reality and Solutions from the Viewpoint of Islam”-এ আমি আলোচনা করেছি যে—
[মুদ্রার বাস্তবতার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট: যখন বিশ্ব অর্থনৈতিক লেনদেনে স্বর্ণমান (Gold Standard) অনুসরণ করত, তখন বৈশ্বিক অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধি ও মুদ্রার স্থিতিশীলতার এক পর্যায় অতিক্রম করছিল। কিন্তু যখন এই ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে গেল এবং লেনদেন সম্পূর্ণরূপে বাধ্যতামূলক কাগুজে মুদ্রার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল, তখন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে এবং একের পর এক আর্থিক সংকট দেখা দিতে থাকে। স্বর্ণমান ব্যবস্থায় প্রতিটি দেশের মুদ্রা হয় সরাসরি স্বর্ণ ছিল, অথবা এমন কাগুজে নোট ছিল যা পূর্ণমূল্যে স্বর্ণ দ্বারা সমর্থিত এবং যেকোনো সময় স্বর্ণে রূপান্তরযোগ্য ছিল। ফলে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকত, কারণ তা একটি স্বীকৃত স্বর্ণের এককের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী একটি দিনার নির্ধারিত হয়েছে ৪.২৫ গ্রাম স্বর্ণ হিসেবে। ব্রিটিশ পাউন্ড আইনি ভাবে নির্ধারিত ছিল ২ গ্রাম খাঁটি স্বর্ণ, এবং ফরাসি ফ্রাঁ ছিল ১ গ্রাম স্বর্ণের সমমূল্য। ফলে বিভিন্ন মুদ্রার মধ্যে বিনিময় হার ছিল নির্দিষ্ট ও স্থিতিশীল।
এই ব্যবস্থার ফলে মুদ্রার মূল্য দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে উভয় ক্ষেত্রেই স্থিতিশীল থাকত। এর একটি প্রমাণ হলো—১৯১০ সালে স্বর্ণের মানদণ্ডমূল্য প্রায় একই স্তরে ছিল যেমনটি ১৮৯০ সালে ছিল। কিন্তু যখন এই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, তখন থেকেই অর্থনৈতিক সংকটের ঘনঘটা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে]
দ্বিতীয়তঃ
ইনশাআল্লাহ যখন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন তার মুদ্রা নিয়ে কোনো আশঙ্কা থাকবে না। অন্যান্য দেশ যদি স্বর্ণ ও রৌপ্যকে মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ না করে এবং ফিয়াট কাগুজে মুদ্রাভিত্তিক ব্যবস্থাই অব্যাহত রাখে, তবুও তারা ইসলামী রাষ্ট্রের মুদ্রাকে প্রভাবিত করতে পারবে না। কারণ মুসলিম দেশগুলোর এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা তাদের বাইরের জল্পনা-কল্পনা থেকে নিরাপদ রাখবে।
ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এ বিষয়ে বলা হয়েছে:
[ইসলামী রাষ্ট্রের মুদ্রা এবং অন্যান্য দেশের মুদ্রার মধ্যকার বিনিময় হারের তারতম্য ইসলামী রাষ্ট্রের ওপর কোনো কার্যকর প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না; এর পেছনে দুটি মৌলিক কারণ রয়েছে:
১। ইসলামী ভূখণ্ডে এমন প্রায় সব ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ ও কাঁচামাল বিদ্যমান, যা উম্মাহ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম। ফলে অন্যান্য দেশের পণ্যের ওপর তাদের নির্ভরতা মৌলিকভাবে অপরিহার্য নয়। নিজস্ব সম্পদ ও উৎপাদনক্ষমতার কারণে ইসলামী রাষ্ট্র মূলত স্বনির্ভর থাকবে; তাই আন্তর্জাতিক মুদ্রাবিনিময় হারের ওঠানামা তার অর্থনীতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারবে না।
২। মুসলিম ভূখণ্ডে এমন কিছু কৌশলগত পণ্য ও সম্পদ রয়েছে, যেগুলোর প্রয়োজন বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য অপরিহার্য—যেমন তেল। ইসলামী রাষ্ট্র চাইলে এসব পণ্য বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এই শর্ত আরোপ করতে পারে যে এর মূল্য স্বর্ণে পরিশোধ করতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র নিজস্ব সম্পদ ও উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে অন্য দেশের পণ্যের প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে। যে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এমন কৌশলগত সম্পদ থাকে, যা বিশ্বের অন্যান্য জাতির জন্য অপরিহার্য, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত তার হাতেই ন্যস্ত থাকে; অন্য কোনো শক্তির পক্ষে তার মুদ্রাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না]
প্রিয় ভাই, নিশ্চিত থাকুন যে, এই দলের মধ্যে জ্ঞানী, সচেতন এবং সুবিবেচনাপ্রসূত ব্যক্তিরা আছেন, আর সবকিছুর আগে এবং পরে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা)’র সাহায্য ও নির্দেশনা রয়েছে, যা ইসলামের শত্রুদের চক্রান্তকে তাদের নিজেদের উপর ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর আল্লাহ হলেন সৎকর্মপরায়ণদের রক্ষাকর্তা।
আমি আশা করি এটাই যথেষ্ট, আর আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন এবং তিনিই সবচেয়ে প্রজ্ঞাময়।
আপনাদের ভাই
আতা ইবন খলিল আবু আল-রাশতাহ৭ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি
২৪/০২/২০২৬ ইংঅঙ্কন, আলোকচিত্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিধান

শরীয়াহ অনুযায়ী অঙ্কন (drawing), আলোকচিত্র (photography) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) বিধান
ইসলামি জীবনবিধানে ছবি বা প্রতিকৃতি তৈরির বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এ সম্পর্কে বিস্তারিত শর’ঈ নির্দেশনা রয়েছে। আধুনিক যুগে প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে অঙ্কন (Drawing), আলোকচিত্র (Photography) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) মাধ্যমে ছবি তৈরির নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। নিম্নে এ সংক্রান্ত শরঈ বিধানগুলো আলোচনা করা হলো।
১. প্রাণবন্ত বস্তুর ছবি বা প্রতিকৃতি অঙ্কনের বিধান
শরীয়াহ অনুযায়ী মানুষ, পশু বা পাখির মতো প্রাণসম্পন্ন (যার প্রাণ বা ‘রুহ’ আছে) কোনো বস্তুর ছবি অঙ্কন করা স্পষ্টত নিষিদ্ধ বা হারাম। এটি কাগজে আঁকা, কাপড়ে বোনা, অলঙ্কার বা মুদ্রায় খোদাই করা কিংবা মাটির তৈরি ভাস্কর্য—যেকোনো মাধ্যমেই হোক না কেন, তা নিষিদ্ধের অন্তর্ভুক্ত। হাদিস অনুসারে, কিয়ামতের দিন সেই চিত্রকরদের সবচেয়ে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে যারা আল্লাহর সৃষ্টির অনুকরণ করার চেষ্টা করে। তাদের বলা হবে, “তোমরা যা সৃষ্টি করেছ তাতে প্রাণ সঞ্চার করো,” কিন্তু তারা তা করতে পারবে না।
তবে প্রাণহীন বস্তু যেমন গাছপালা, পাহাড়-পর্বত, ফুল, নদী ইত্যাদির ছবি আঁকা সম্পূর্ণ জায়েজ। শরীয়াহ শুধুমাত্র সেই সব ছবির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যেগুলোতে প্রাণ আছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময় জিবরাঈল (আ.) একটি ঘরে প্রবেশ করতে অস্বীকার করেছিলেন কারণ সেখানে মানুষের মূর্তি এবং প্রাণীর ছবিযুক্ত পর্দা ছিল। পরবর্তীতে সেই মূর্তির মাথা কেটে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয় যাতে সেটি একটি গাছের রূপ ধারণ করে, যা প্রমাণ করে যে মূর্তির মাথা বা প্রাণবন্ত রূপ না থাকলে তা ব্যবহারযোগ্য হতে পারে।
তবে শিশুদের খেলনা বা পুতুলের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। আয়েশা (রা.) রাসুল (সা.)-এর উপস্থিতিতে পুতুল ও ডানাযুক্ত ঘোড়া দিয়ে খেলতেন এবং তিনি এতে বাধা দেননি। সুতরাং শিশুদের শিক্ষা ও বিনোদনের জন্য প্রাণীর আকৃতির খেলনা বা কার্টুন ব্যবহার করা বৈধ।
এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, ইসলাম আগমন পূর্ববর্তী কোনো নবী-রাসূলের আইনের ক্ষেত্রে ভাস্কর্য (পুজার মুর্তি নয়) অর্থাৎ সম্মানিত ব্যক্তিদের ভাস্কর্য তৈরি অনুমোদিত ছিল। যেমন, কুরআন ও হাদীসে নূহ (আ)-এর জাতি এবং সুলাইমান (আ)-এর জাতির কথা এসেছে। তবে আমাদের বর্তমান আইনে তথা শরীয়াহ’তে এটি অনুমোদিত নয়। এটি উসূল আল ফিকহের একটি প্রসিদ্ধ নীতি (شرع من قبلنا ليس شرعا لنا) “পূর্ববর্তীতের আইন আমাদের জন্য বিধান নয়”
২. ক্যামেরায় তোলা আলোকচিত্র বা ফটোগ্রাফির বিধান
ক্যামেরার মাধ্যমে তোলা ছবির বিধান সাধারণ হাতে আঁকা ছবির চেয়ে ভিন্ন। ক্যামেরা বা ফটোগ্রাফিক যন্ত্রের মাধ্যমে ছবি তোলা জায়েজ এবং এটি নিষিদ্ধ ‘তাসউইর’ বা অঙ্কনের অন্তর্ভুক্ত নয়। এর কারণ হলো:
- ছায়ার প্রতিফলন: ফটোগ্রাফি মূলত কোনো জিনিসের ছায়া তথা প্রতিবিম্বকে ফিল্ম বা সেন্সরে স্থানান্তর করা মাত্র, এটি নতুন করে কোনো কিছু সৃষ্টি বা অঙ্কন করা নয়। এটি অনেকটা আয়নায় প্রতিফলিত প্রতিচ্ছবির মতো।
- সৃষ্টির অনুকরণ নয়: ফটোগ্রাফার নিজের মেধা বা সৃজনশীলতা দিয়ে শূন্য থেকে কোনো অবয়ব তৈরি করেন না, বরং আল্লাহর তৈরি একটি অস্তিত্বের ছায়া বা রিফ্লেকশনকে ধরে রাখেন। যেহেতু এতে ‘সৃষ্টির অনুকরণ’ (তাশবীহ) নেই, তাই এটি হারাম নয়।
তবে মনে রাখতে হবে, ক্যামেরায় তোলা ছবি যদি পরবর্তীতে হাতে বা কম্পিউটারের মাউস ব্যবহার করে সংশোধন (Editing) করা হয়—যেমন বলিরেখা মুছে ফেলা, চোখের রঙ পরিবর্তন করা বা চেহারা পরিবর্তন করা—তবে সেটি ‘হস্তক্ষেপ’ হিসেবে গণ্য হবে এবং যেকোনো প্রাণী (মানুষ, পশুপাখি)’র ক্ষেত্রে এমন পরিবর্তন করা নিষিদ্ধ।
৩. আলোকচিত্র এবং অঙ্কিত ছবি ব্যবহারের বিধান
ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্র ও উদ্দেশ্যভেদে এর হুকুম বা বিধানে ভিন্নতা রয়েছে:
- ইবাদতের স্থানে: মসজিদ বা নামাজের স্থানে প্রাণীর ছবি রাখা বা ঝুলিয়ে রাখা হারাম। রাসুল (সা.) কাবা ঘরে প্রবেশ করতে অস্বীকার করেছিলেন যতক্ষণ না সেখানে থাকা ছবিগুলো মুছে ফেলা হয়।
- সম্মানের স্থানে: ঘরের দেয়ালে বা পর্দার মতো সম্মানজনক স্থানে প্রাণীর ছবি বা পেইন্টিং টাঙানো মাকরূহ বা অপছন্দনীয়। আয়েশা (রা.)-এর ঘরে প্রাণীর ছবিযুক্ত পর্দা দেখে রাসুল (সা.) অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন এবং তা ছিঁড়ে ফেলে বালিশ বানানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
- অসম্মানের স্থানে: যদি ছবি এমন জায়গায় থাকে যেখানে তাকে সম্মান করা হয় না—যেমন মেঝেতে বিছানো কার্পেট, যা মাড়ানো হয়, অথবা বসার বালিশ—তবে তা ব্যবহার করা জায়েজ।
- পোশাকের ক্ষেত্রে: পোশাকে বা কাপড়ে অঙ্কিত ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য; যদি তা সম্মানের সাথে ব্যবহার করা হয় তবে তা অপছন্দনীয়।
৪. এআই (AI) ভিডিও তৈরিতে সংরক্ষিত ছবি ও স্ক্যান করা পেইন্টিং ব্যবহারের বিধান
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর মাধ্যমে ভিডিও তৈরির ক্ষেত্রে যদি পুরাতন কোনো সংরক্ষিত আলোকচিত্র (Archived Photos) বা স্ক্যান করা পেইন্টিং ব্যবহার করা হয়, তবে তার বিধান নিম্নরূপ:
- যদি এআই ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকৃত কোনো ভিডিও কিংবা অংকিত স্থির চিত্রকে কেবল এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয় (যেমন স্লাইডশো বা সাধারণ ভিডিও), তবে তা আলোকচিত্রের মতোই জায়েজ।
- কিন্তু যদি এআই ব্যবহার করে কোনো মানুষের চেহারা পরিবর্তন করা হয়, তাকে এমন কোনো কাজ করতে দেখানো হয় যা সে বাস্তবে করেনি, তবে তা মিথ্যা ও প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় হারাম। উদাহরণস্বরূপ, মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখানো বা কাউকে এমন কথা বলতে দেখানো যা সে বলেনি, তা ধোঁকাবাজি (Deception) হিসেবে গণ্য হবে।
৫. জেনারেটিভ এআই-এর মাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্ত ছবি ও ভিডিও তৈরির বিধান
জেনারেটিভ এআই-এর মাধ্যমে যখন কোনো টেক্সট কমান্ড দিয়ে নতুন কোনো প্রাণীর বা মানুষের ছবি তৈরি করা হয়, তখন তা ডিজিটাল অঙ্কনের (Digital Drawing) অন্তর্ভুক্ত হয়।
- অনুকরণ ও সৃষ্টি: এআই যখন মানুষের নির্দেশে কোনো অবয়ব তৈরি করে, তখন সেটি মানুষের সৃজনশীল প্রচেষ্টারই একটি উন্নত রূপ। যদি এআই কোনো প্রাণবন্ত সত্তার এমন ছবি তৈরি করে যা বাস্তবের হুবহু অনুকরণ, তবে সেটি নিষিদ্ধ অঙ্কনের বিধানের আওতায় পড়বে।
- মিথ্যাচার ও বিকৃতি: এআই-এর মাধ্যমে যদি এমন ছবি বা ভিডিও তৈরি করা হয় যা বাস্তবতাকে বিকৃত করে (যেমন Deepfake), তবে তা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কারণ এটি মিথ্যা (Lying), প্রতারণা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ক্ষতির কারণ হতে পারে।
- পবিত্র ব্যক্তিত্বের অবমাননা: নবী-রাসুলদের ছবি বা ভিডিও তৈরি করা বা তাদের কণ্ঠে কথা বলানো চরম অন্যায় এবং হারাম। এটি নবুওয়াতের মর্যাদার পরিপন্থী।
৬. ঘর সাজাতে পেইন্টিং টাঙানো এবং সম্মানার্থে ছবি ব্যবহারের বিধান
অনেকেই ঘর সাজানোর জন্য প্রাণীর ছবিযুক্ত পেইন্টিং ব্যবহার করেন অথবা মৃত বা জীবিত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ছবি ফ্রেম করে রাখেন। শরিয়তের দৃষ্টিতে এর বিধান হলো:
- সাজসজ্জা: প্রাণীর ছবি বা পেইন্টিং দিয়ে ঘর সাজানো মাকরূহ। এটি রহমতের ফেরেশতাদের ঘরে প্রবেশে বাধা দেয়। তবে গাছপালা বা প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি দিয়ে ঘর সাজানো সম্পূর্ণ বৈধ। হাদীসে যে নিষেধাজ্ঞা এসেছে তা ছবির মালিকের বিরুদ্ধে হুমকি বা নিন্দার মতো অনুরূপ কোনো চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত আকারে আসেনি, যেমনটি আঁকার ক্ষেত্রে এসেছে; বরং এটি কেবল (এটি) ছেড়ে দেওয়ার তলব হিসেবে তলবে গাইরে জাযিম হিসেবে এসেছে। মূর্তি রাখা নিষিদ্ধ করার এবং সূচিকর্ম (embroidery) করা (মারকুমা) ছবি রাখার অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে আরও একটি হাদিস এসেছে, যা এই নিষেধাজ্ঞার আইনী নির্ণায়ক তথা কারীনা হিসেবে এসেছে। মুসলিমে আবু তালহার হাদিসে এই কথাটি বলা হয়েছে: “আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি: ‘যে ঘরে কুকুর বা ছবি থাকে সেখানে ফেরেশতারা প্রবেশ করেন না’ এবং মুসলিমে বর্ণিত একটি বর্ণনায় তিনি বলেছেন: “… কাপড়ের উপর (রাকম/embroidery) ব্যতীত।” এটি পোশাকের মধ্যে সূচিকর্ম করা (মারকুমা) ছবি বাদ দেওয়ার ইঙ্গিত দেয় এবং এর অর্থ হল যে ফেরেশতারা সেই ঘরে প্রবেশ করেন যেখানে পোশাকের উপর খোদাই করা (তিমছাল) থাকে অর্থাৎ স্কেচিং (রসম) কিংবা আঁকা ছবি থাকে।
- সম্মান ও স্মরণ: যদিও উপরে উল্লিখিত হাদিসটি অন্যান্য নিষিদ্ধের হাদিসের সাথে যুক্ত করা ইসতিম্বাত করা হলে এর অর্থ দাড়ায় যে তলবটি চুড়ান্ত তথাপি কোনো স্থানে ছবি রাখা যেখানে তা সম্মানের জন্য রাখা হয় তা অপছন্দনীয়, নিষিদ্ধ নয়। তবে কারো প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন বা তাকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে ছবি প্রদর্শন করা হলে তা ‘তা’জিম’ বা অতি-সম্মানের পর্যায়ে চলে যায়, যা ইসলামে অপছন্দনীয়। ইসলামি বিধান অনুযায়ী, কাউকে সম্মান জানানোর মাধ্যম ছবি হওয়া উচিত নয়, বরং তাদের জন্য দোয়া করা বা তাদের আদর্শ অনুসরণ করাই কাম্য।
পরিশেষে বলা যায়, শরীয়াহ প্রযুক্তির ব্যবহারকে স্বাগত জানায় যতক্ষণ না তা আল্লাহর সৃষ্টির সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় অথবা মিথ্যা ও অশ্লীলতা প্রসারে ব্যবহৃত হয়। প্রাণহীন বস্তুর অঙ্কন এবং সাধারণ আলোকচিত্রের ক্ষেত্রে শরীয়তে প্রশস্ততা থাকলেও প্রাণবন্ত বস্তুর প্রতিকৃতি তৈরি এবং এ সংক্রান্ত অতিরঞ্জনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
কুরআনের সাত হরফ

তৃতীয় অধ্যায়
কুরআনের সাত হরফ
একটি সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ أُنْزِلَ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ فَاقْرَءُوا مَا تَيَسَّرَ مِنْهُ
“নিশ্চয় এ কুরআন সাত হরফে অবতীর্ণ করা হয়েছে। সুতরাং সেগুলোর মধ্য হতে তোমাদের সহজ-সাধ্য পন্থা অবলম্বন করে পাঠ কর।”১১৯
এই হাদীসে কুরআনুল কারীম সাত হরফে অবতীর্ণ হওয়া দ্বারা কি উদ্দেশ্য? এটি অসংখ্য মতামতের মিলনমেলা এবং বিশাল পরিধি বিশিষ্ট একটি আলোচনা৷ আর সন্দেহাতীতভাবে তা কুরআনুল কারীমের দুর্বোধ্য ও কঠিনতম আলোচনার একটি। এখানে সম্পূর্ণ আলোচনা উদ্ধৃত করা তো মুশকিল। তবে এর সাথে সংশ্লিষ্ট অত্যাবশ্যকীয় বিষয়গুলো উপস্থাপন করছি।
উপরে যে হাদীস বর্ণনা করা হয়েছে অর্থের দিক থেকে তা মুতাওয়াতির। [অর্থাৎ নিরবিচ্ছিন্ন সনদ সূত্রে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত] যেমন, বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম আবু উবাইদ কাসেম ইবনে সালাম হাদীসটির তাওয়াতুর হবার বিষয়টি সুস্পষ্ট করেছেন। হাদীস ও কেরাতের সুপ্রসিদ্ধ ইমাম আল্লামা ইবনে জাযারী (রহ.) বলেন, আমি একটি পৃথক গ্রন্থে এই হাদীসের সবগুলো সূত্র একত্রিত করেছি । আর সেগুলোর আলোকে হাদীসটি হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.), হিশাম ইবনে হাকিম ইবনে হিযাম (রা.), আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.), উবাই ইবনে কা’ব (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.), মুআয ইবনে জাবাল (রা.), আবু হুরায়রা (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), আবু সাঈদ খুদরী (রা.), হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রা.), আবু বাকরা (রা.), আমর ইবনুল আস (রা.), যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.), আনাস ইবনে মালিক (রা.), সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.), ওমর ইবনে আবী সালামা (রা.), আবু জাহাম (রা.), আবু তালহা (রা.) ও উম্মে আইউব আনসারীয়্যাহ (রা.) থেকে বর্ণিত।১২০ এতদ্যতীত বহু মুহাদ্দিস এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, একবার হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) মিম্বরে দীড়িয়ে ঘোষণা দিলেন যে, যেসব সম্মানিত ব্যক্তিগণ দাড়িয়ে যান, যারা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এই হাদীস শোনেছেন, “কুরআনুল কারীম সাত হরফে নাযিল করা হয়েছে। যার প্রত্যেকটিই নিরাময়কারী ও যথেষ্ট।” তখন সাহাবায়ে কেরামের বিরাট একটি দল দাড়িয়ে গেলেন, যাদের সংখ্যা গণনা করা অসম্ভব।১২১
সাত হরফের মর্মার্থ
এই হাদীসে সর্ব প্রথম বিষয় হচ্ছে, সাত হরফে কুরআন নাযিল হওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য কী? এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন মতামত ও চিন্তাধারার কঠিন মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয়। এমনকি আল্লামা ইবনে আরাবী (রহ.) এ ব্যাপারে পয়ত্রিশটি মতামত একত্রিত করেছেন।১২২ সেগুলোর মধ্য হতে প্রসিদ্ধ ও উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মতামত এখানে পেশ করা হলো-
১. কেউ কেউ মনে করেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সুপ্রসিদ্ধ সাতজন কারীর সাত কেরাত। কিন্তু এ ধারণা একেবারেই ভুল ও ভ্রান্ত। কেননা, তাওয়াতুর বা নিরবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরায় সাব্যস্ত কেরাতসমূহ শুধু ‘সাত কেরাতে’র মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং আরো বহু কেরাত তাওয়াতুর সূত্রে সাব্যস্ত আছে। এ সাত কেরাত তো শুধু এ কারণেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে যে, আল্লামা ইবনে মুজাহিদ (রহ.) একটি গ্রন্থে ওই সাতজন কারীর কেরাতকে একত্রিত করেছেন। এর দ্বারা তার না এই উদ্দেশ্য ছিল যে, কেরাতকে সাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা আর না তিনি ওই সাত হরফের ব্যাখ্যা এই ‘সাত কেরাত’ দ্বারা করেছেন। যেমন, এর বিস্তারিত বর্ণনা যথাস্থানে আসবে।
২. উপরোক্ত কথার ভিত্তিতেই কোনো কোনো আলেম এই খেয়াল ব্যক্ত করেছেন যে, ‘হরফ’ দ্বারা সকল কেরাতকে বুঝানো হয়েছে। তবে ‘সাত’ শব্দ দ্বারা বিশেষ করে ‘সাত সংখ্যা’কেই বুঝানো হয়নি। বরং এর দ্বারা সংখ্যার আধিক্য বুঝানো হয়েছে। আরবী ভাষায় ‘সাত’ শব্দটি অধিকাংশ সময় কোনো বন্তর শুধু সংখ্যাধিক্য বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। এখানেও হাদীসের উদ্দেশ্য এই নয় যে, কুরআনুল কারীম শুধু সাত হরফের উপরই নাযিল হয়েছে। বরং উদ্দেশ্য হলো, কুরআনুল কারীম বহু পদ্ধতিতে নাযিল হয়েছে। মুতাকাদ্দিমীন উলামায়ে কেরামের মধ্য হতে কাযি আয়ায (রহ.)-এর অভিমত এটাই।১২৩ আর শেষ যুগের উলামায়ে কেরামের মধ্যে হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)ও এই মত গ্রহণ করেছেন।১২৪
কিন্ত এই মতটি এ জন্য সঠিক বলে মনে হয় না যে, বুখারী ও মুসলিম-এর এক হাদীসে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই বাণী বর্ণিত আছে যে-
أَقْرَأَنِي جِبْرِيلُ عَلَى حَرْفٍ فَرَاجَعْتُهُ، فَلَمْ أَزَلْ أَسْتَزِيدُهُ وَيَزِيدُنِي حَتَّى انْتَهَى إِلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ
“জিবরাঈল আমাকে এক হরফের উপর কুরআনুল কারীম আবৃত্তি করিয়েছেন। ফলে আমি তার শরণাপন্ন হলাম এবং আমি হরফ বৃদ্ধির আবেদন করলাম। তিনি বৃদ্ধি করতে থাকলেন। এমনকি তা সাত হরফে গিয়ে পৌছেছে।”১২৫
এর বিস্তারিত আলোচনা সহীহ মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) থেকে এভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনু গিফারের কূপের কাছে ছিলেন-
فَأَتَاهُ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلاَمُ فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكَ أَنْ تَقْرَأَ أُمَّتُكَ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفٍ، فَقَالَ: أَسْأَلُ اللَّهَ مُعَافَاتَهُ وَمَغْفِرَتَهُ، وَإِنَّ أُمَّتِى لاَ تُطِيقُ ذَلِكَ، ثُمَّ أَتَاهُ الثَّانِيَةَ فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكَ أَنْ تَقْرَأَ أُمَّتُكَ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفَيْنِ، فَقَالَ: أَسْأَلُ اللَّهَ مُعَافَاتَهُ وَمَغْفِرَتَهُ، وَإِنَّ أُمَّتِى لاَ تُطِيقُ ذَلِكَ، ثُمَّ جَاءَهُ الثَّالِثَةَ، فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكَ أَنْ تَقْرَأَ أُمَّتُكَ الْقُرْآنَ عَلَى ثَلاَثَةِ أَحْرُفٍ، فَقَالَ: أَسْأَلُ اللَّهَ مُعَافَاتَهُ وَمَغْفِرَتَهُ، وَإِنَّ أُمَّتِى لاَ تُطِيقُ ذَلِكَ، ثُمَّ جَاءَهُ الرَّابِعَةَ فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكَ أَنْ تَقْرَأَ أُمَّتُكَ الْقُرْآنَ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ، فَأَيُّمَا حَرْفٍ قَرَءُوا عَلَيْهِ فَقَدْ أَصَابُوا.
“অতঃপর রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট জিবরাঈল (আ.) আসলেন। তিনি বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা আপনাকে আদেশ করছেন, আপনার [গোটা] উম্মত যেন এক হরফের উপরই কুরআনুল কারীম পাঠ করে। এতে তিনি বললেন, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করছি। আমার উম্মত এতে সক্ষম হবে না। অতঃপর জিবরাঈল (আ.) দ্বিতীয়বার তার নিকট আসলেন। বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আপনাকে আদেশ করছেন, আপনার [গোটা] উম্মত যেন দুই হরফের উপর কুরআনুল কারীম পাঠ করে। এতে তিনি বললেন, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও মাগফিরাতপ্রার্থনা করছি। আমার উম্মত এতে সক্ষম হবে না। আবার তৃতীয়বার জিবরাঈল (আ.) আসলেন এবং বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আপনাকে আদেশ করছেন, আপনার [গোটা] উম্মত যেন তিন হরফের উপর কুরআনুল কারীম পাঠ করে। এতে তিনি বললেন, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করছি। আমার উম্মত এতে সক্ষম হবে না। চতুর্থবার আবার জিবরাঈল (আ.) আসলেন এবং বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আপনাকে আদেশ করছেন, আপনার [গোটা] উম্মত যেন সাত হরফের উপর কুরআনুল কারীম পাঠ করে। অতঃপর তারা যে হরফের উপরই পাঠ করবে, তাদের কেরাত সঠিক হবে।”১২৬
এই রেওয়ায়েতগুলোর পূর্বাপর বর্ণনাভঙ্গি সুস্পষ্টভাবে বলছে যে, এখানে ‘সাত’ শব্দটি দ্বারা সংখ্যাধিক্য বুঝানো হয়নি; বরং নির্দিষ্ট করে ‘সাত’ সংখ্যাটিকেই বুঝানো হয়েছে। তাই এই হাদীসগুলোর আলোকে উপরোক্ত মতটি গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। এমনকি জমহুর উলামায়ে কেরামও এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
৩. অন্যান্য উলামায়ে কেরাম, যেমন হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) সহ আরো অনেকে বলেছেন যে, উল্লিখিত হাদীসে সাত হরফ দ্বারা আরব জাতির গোত্রগত সাত ভাষাকে বুঝানো হয়েছে। যেহেতু আরব জাতি বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত ছিল এবং প্রত্যেক গোত্রের ভাষা আরবী হওয়া সত্ত্বেও অন্য গোত্রের সাথে ভাষার সামান্য গড়মিল ছিল। এই গড়মিলটা এমন, যেমন জাতীয় একটি ভাষায় আঞ্চলিকতার কারণে তারতম্য সৃষ্টি হয়। তাই আল্লাহ তাআলা ওই বিভিন্ন গোত্রের সহজ-সাধ্যের জন্য কুরআনুল কারীমকে সাত ভাষায় নাযিল করেছেন। যেন প্রত্যেক গোত্রই নিজ নিজ গোত্রীয় ভাষায় পাঠ করতে পারে।১২৭
ইমাম আবু হাতেম সাজিসতানী (রহ.) ওই গোত্রগুলোর নামও নির্ধারণ করেছেন এবং বলেছেন যে, কুরআনুল কারীম এই সাত গোত্রের সাত ভাষা অনুযায়ী নাযিল হয়েছে। গোত্র সাতটি হচ্ছে- [১] কুরাইশ। [২] হুযাইল। [৩] তাইমুর-রুবাব। [8] আজদ। [৫] রবীআ। [৬] হাওয়াজিন | [৭] সা’দ বিন বকর।
আর হাফেয ইবনে আবদুল বার (রহ.) কারো কারো থেকে রেওয়ায়েত বর্ণনা করে উপরোক্ত গোত্রগুলোর স্থলে নিয়োক্ত গোত্রগুলো উল্লেখ করেছেন-[১] হুযাইল। [২] কেনানা। [৩] কায়েস। [8] যব্বা। [৫] তাইমুর রুবাব। [৬] আসাদ ইবনে খুযাইমাহ। [৭] কুরাইশ।১২৮
কিন্তু বহু মুহাক্কিক আলেম যেমন, হাফেয ইবনে আবদুল বার (রহ.), আল্লামা সুযুতী (রহ.) ও আল্লামা ইবনে জাযারীসহ আরো অনেকে এই মতটিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন । প্রথমতঃ এ কারণে যে, আরবের গোত্র তো অনেকগুলো ছিল। এর মধ্য হতে শুধু এ সাতটিকেই বেছে নেওয়ার হেতু কি? দ্বিতীয়তঃ হযরত ওমর (রা.) ও হযরত হিশাম ইবনে হাকীম (রা.)-এর মাঝে কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াত নিয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। যার বিস্তারিত বর্ণনা সহীহ বুখারীসহ অন্যান্য কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। অথচ তারা উভয়েই ছিলেন কুরাইশ বংশের। আর রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাদের উভয়ের কেরাতকে সত্যায়ন করেছেন এবং কুরআনুল কারীম সাত হরফে নাযিল হওয়াকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদি সাত হরফ দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন সাতটি গোত্রের ভাষাকেই বুঝানো হতো তাহলে হযরত ওমর (রা.) ও হযরত হিশাম ইবনে হাকীম (রা.)-এর মাঝে মতবিরোধের কোনো কারণই থাকতে পারে না। কারণ উভয়ই তো কুরাইশী ছিলেন।১২৯
যদিও আল্লামা আলসী (রহ.) এর জবাব দিয়েছেন যে, “হতে পারে তাদের দু’জনের মধ্য হতে যে কোনো একজনকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরাইশ ভিন্ন অন্য কোনো ভাষায় কুরআন পড়িয়েছেন।”১৩০
কিন্ত এই জবাবটি অত্যন্ত দুর্বল। কারণ বিভিন্ন ভাষায় কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য এটাই ছিল যে, প্রত্যেক গোত্রের লোকেরা যেন নিজ ভাষা অনুযায়ী সহজ-সাধ্যভাবে পড়তে পারে । তাই এ বিষয়টা রিসালতের হেকমত থেকে অনেক দূরবর্তী মনে হয় যে, এক কুরাইশীকে অন্য ভাষায় কুরআনুল কারীম পড়ানো হয়েছে।
এতদ্যতীত ইমাম তাহাভী (রহ.) এর উপর আপত্তি করেন যে, যদি এটা মেনে নেওয়া হয় যে, সাত হরফ দ্বারা সাত গোত্রের ভাষাকে বুঝানো হয়েছে তাহলে তা ওই আয়াতের বিপরীত হয়ে দাড়াবে যাতে বলা হয়েছে-
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ
“আমি যখনই কোনো রাসূল প্রেরণ করি, তখন তার সম্প্রদায়ের ভাষায়ই প্রেরণ করি।
আর এ কথা তো সবারই জানা যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরইশী ছিলেন। তাই এ কথা সুস্পষ্ট যে, কুরআনুল কারীম শুধু কুরইশী ভাষায়ই নাযিল হয়েছে।১৩১
ইমাম তাহাভী (রহ.)-এর এ কথার সমর্থন এভাবেও হয় যে, যে সময়ে হযরত উসমান (রা.) দ্বিতীয়বার কুরআনুল কারীম সংকলনের ইচ্ছা করলেন এবং হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর নেতৃত্বে সাহাবায়ে কেরামের একটি জামাতকে কুরআনের কপি তৈরীর নির্দেশ দিলেন, তখন তাদেরকে তিনি এই নির্দেশনা দিয়েছিলেন-
إِذَا اخْتَلَفْتُمْ أَنْتُمْ وَزَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ فِي شَيْءٍ مِنْ الْقُرْآنِ فَاكْتُبُوهُ بِلِسَانِ قُرَيْشٍ، فَإِنَّمَا نَزَلَ بِلِسَانِهِمْ
“কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে যায়েদ যখন ইবনে সাবেত এবং তোমাদের মাঝে পরস্পর কোনো মতানৈক্য দেখা দিবে তখন তোমরা কুরাইশদের ভাষায় লিখবে। কেননা কুরআন তাদের ভাষায়ই নাযিল হয়েছে।”১৩২
এখানে হযরত উসমান (রা.) সুস্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে, কুরআন শুধু কুরাইশদের ভাষায়ই অবতীর্ণ হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো যে, কুরআন যখন কুরাইশদের ভাষায়ই নাধিল হয়েছে তাহলে এই ‘মতানৈক্য’ সৃষ্টি হবার উদ্দেশ্য কি? এর বিস্তারিত জবাব সামনে আসবে ইন শা আল্লাহ।
এতদ্যতীত এ বক্তব্যের প্রবক্তাগণ এ ব্যাপারে একমত যে, ‘সাত হরফ’ এবং ‘সাত কেরাত’ দু’টা পৃথক পৃথক বিষয়। কেরাতের মতানৈক্য, যা আজও বিদ্যমান সেটা শুধু এক হরফ অর্থাৎ কুরাইশদের ভাষায়ই। আর বাকি হরফগুলো হয়তো রহিত হয়েছে অথবা কল্যাণের জন্য মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে অন্যান্য আপত্তি ছাড়াও একটি আপত্তি এই হয় যে, গোটা হাদীসের ভাণ্ডারে কোথাও এ কথার প্রমাণ মিলে না যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতে দুই ধরনের মতানৈক্য ছিল। একটি হচ্ছে ‘সাত হরফ’ আরেকটি হচ্ছে ‘কেরাত’। বরং হাদীসের ভাণ্ডারে যেখানেই কুরআনুল কারীমের শব্দগত কোনো মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে শুধু ‘আহরুফ’ [হরফের বহুবচন]-এর মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পৃথকভাবে ‘কেরাতের’ কোনো মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করা হয়নি। এসব কারণের ভিত্তিতে এ মতামতটিও অত্যন্ত দুর্বল বলে মনে হয়।
৪. চতুর্থ হলো, ইমাম তহাভী (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ বক্তব্য। তিনি বলেন, কুরআনুল কারীম তো শুধু কুরাইশদের ভাষাতেই অবতীর্ণ হয়েছে । তবে যেহেতু আরববাসী বিভিন্ন এলাকা ও গোত্রে বিভক্ত ছিল তাই প্রত্যেকের জন্য এই একটি মাত্র ভাষায় কুরআন তেলাওয়াত করা বেশ কঠিন ছিল। তাই ইসলামের শুরু লগ্নে এই অনুমতি দেওয়া হয়েছিল যে, তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ অঞ্চলের ভাষা অনুযায়ী সমার্থবোধক শব্দ দ্বারা কুরআন তেলাওয়াত করতে পারবে। এমনকি যেসব লোকের জন্য কুরআনুল কারীমের মুল শব্দ দ্বারা তেলাওয়াত করা মুশকিল ছিল তাদের জন্য স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমার্থবোধক শব্দ নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যেগুলো দ্বারা তারা তেলাওয়াত করতে পারে। এই সমার্থবোধক শব্দগুলো কুরাইশদের ভাষা ও অন্যদের ভাষা থেকে চয়ন করা হয়েছিল। আর এগুলো এমন ছিল যে, تعالএর স্থলে هلمঅথবা أقبل কিংবা أدنপড়া হতো। সবগুলোর অর্থ একই থাকত। কিন্ত এই অনুমতি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল, যখন সমস্ত আরববাসী কুরআনী ভাষায় পুরোপুরি অভ্যস্ত ছিল না। অতঃপর ধীরে ধীরে যখন কুরআনী ভাষার পরিধি বৃদ্ধি পেল তখন আরববাসী সে ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে গেল এবং তাদের জন্য কুরআনের মূল ভাষায় তেলাওয়াত করা সহজ হয়ে গেল। ওই সময়ে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকালের পূর্বে রমযান মাসে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে কুরআনুল কারীমের আখেরী দাওর করেন, যেটাকে ‘আরযায়ে আখীরা’ বলা হয়। তখনই সমার্থবোধক শব্দ দ্বারা কুরআন তেলাওয়াত করার অনুমতি বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়। কেবল ওই পদ্ধতিই বাকি থাকে যার উপর কুরআন নাযিল হয়েছিল।১৩৩
এ বক্তব্য অনুযায়ী “সাত হরফ” বিশিষ্ট হাদীসটি ওই যুগের সাথে সম্পৃক্ত, যখন তেলাওয়াতের মধ্যে সমার্থবোধক শব্দ ব্যবহারের অনুমতি ছিল। আর এটার উদ্দেশ্য এই ছিল না যে, কুরআনুল কারীম ‘সাত হরফে’ অবতীর্ণ হয়েছে। বরং উদ্দেশ্য ছিল এই যে, কুরআনুল কারীম এমন প্রশস্ত-তার সাথে অবতীর্ণ হয়েছে যে, নির্দিষ্ট একটা জামানা পর্যন্ত তা সাত হরফে পাঠ করা যেত।
আবার “সাত হরফ” দ্বারাও এ উদ্দেশ্য নয় যে, কুরআনুল কারীমের প্রত্যেক শব্দের সাতটি সমার্থবোধক শব্দ ব্যবহারের অনুমতি আছে। বরং উদ্দেশ্য ছিল এই যে, বেশির থেকে বেশি যতগুলো সমার্থবোধক শব্দ ব্যবহার করা যায়, সেগুলোর সংখ্যা হচ্ছে, “সাত” । আবার সে অনুমতির অর্থ এটাও ছিল না যে, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের মর্জি মতো শব্দ প্রয়োগ করবে। বরং পরিবর্তিত শব্দগুলোও স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সন্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। আর তিনি প্রত্যেক ব্যক্তিকে এমনভাবে কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন যা তার জন্য সহজ-সাধ্য ছিল। সুতরাং শুধু ওই সকল সমার্থবোধক শব্দের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল যা রাসূল সম্পাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত ছিল।১৩৪
ইমাম তহাভী (রহ.) ছাড়াও হযরত সুফিয়ান ইবনে উআইনা (রহ.), ইবনে ওয়াহাব (রহ.) এবং হাফেয ইবনে আবদুল বার (রহ.)ও এ মতকে গ্রহণ করেছেন। বরং হাফেয ইবনে আবদুল বার (রহ.) তো এ মতকে অধিকাংশ আলেমের দিকে সম্বন্ধ করেছেন।১৩৫
পেছনের সমস্ত মতামতের মধ্যে এই মতটি কেয়াসের অধিক নিকটবর্তী । আর এ মতের প্রবক্তাগণ নিজেদের স্বপক্ষে দলীল দিতে গিয়ে মুসনাদে আহমদের সেই রেওয়ায়েতকে উল্লেখ করেন যা হযরত আবু বাকরা (রা.) থেকে বর্ণিত-
أَنَّ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَام قَالَ: يَا مُحَمَّدُ اقْرَأْ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفٍ، قَالَ مِيكَائِيلُ عَلَيْهِ السَّلَام: اسْتَزِدْهُ فَاسْتَزَادَهُ قَالَ: اقْرَأْهُ عَلَى حَرْفَيْنِ، قَالَ مِيكَائِيلُ: اسْتَزِدْهُ فَاسْتَزَادَهُ حَتَّى بَلَغَ سَبْعَةَ أَحْرُفٍ، قَالَ كُلٌّ شَافٍ كَافٍ مَا لَمْ تَخْتِمْ آيَةَ عَذَابٍ بِرَحْمَةٍ أَوْ آيَةَ رَحْمَةٍ بِعَذَابٍ نَحْوَ قَوْلِكَ تَعَالَ وَأَقْبِلْ وَهَلُمَّ وَاذْهَبْ وَأَسْرِعْ وَاعْجَلْ
জিবরাঈল (আ.) [রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে] বললেন, হে মুহাম্মাদ! কুরআনুল কারীমকে এক হরফের উপর পাঠ করুন। মিকাঈল (আ.) [রাসূল স.কে] বললেন, এর সাথে আরও [হরফ] সংযোজন করুন। ফলে তিনি সংযোজন করলেন। আর এভাবে তা সাতে গিয়ে পৌছল। জিবরাঈল (আ.) বলেলেন, এর প্রত্যেকটিই নিরাময়কারী, যথেষ্ট। যতক্ষণ না আযাবের আয়াতকে রহমতের আয়াতের সাথে এবং রহমতের আয়াতকে আযাবের আয়াতের সাথে মিশ্রিত করবে। এটা এমন হবে যে, আপনি تعال [আস]-কে أقبل – هلم – اذهب – اسرع – ও عجل শব্দ দ্বারা আদায় করবেন।”১৩৬
এই মত ও বক্তব্যের উপর আর কোনো আপত্তি নেই। তবে এর মাঝেও একটি সমস্যা থেকে যায়। আর তা হলো, কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন যে কেরাত আজ পর্যন্ত ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় চলে আসছে, এ বক্তব্য অনুযায়ী সেগুলোর কোনো অবস্থান পরিষ্কার হয় না। যদি সে কেরাতগুলোকে ‘সাত হরফ’ না বলে অন্য কিছু বলা হয় তাহলে তার স্বপক্ষে দলীল পেশ করা উচিত। কিন্তু হাদীসের বিশাল ভাণ্ডারে ‘আহরুফ’-এর মতানৈক্য ব্যতীত কুরআনুল কারীমের শব্দগত অন্য কোনো মতানৈক্যের আলোচনা পাওয়া যায় না। তাহলে নিজের পক্ষ থেকে এটা কি করে বলা যেতে পারে যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে ‘আহরুফে সাবআ’ ছাড়া অন্য আরেক প্রকার মতানৈক্যও ছিল! এ বক্তব্যের প্রবক্তাদের কাছ থেকে এ সমস্যার এমন কোনো সমাধান আমি পাইনি, যা মেনে নেওয়া যায়।
‘সাত হরফ’-এর সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আমাদের দৃষ্টিতে কুরআনুল কারীমের ‘সাত হরফ’-এর সর্বোত্তম ব্যাখ্যা হয়েছে । আর ‘সাত হরফ’ দ্বারা ‘কেরাতের বিভিন্নতার’ সাত প্রকারকে বুঝানো হয়েছে। তাইতো কেরাতগুলো যদিও সাতের চেয়ে বেশি, কিন্তু ওই কেরাতগুলোর মাঝে যে মতানৈক্য পাওয়া যায় তা সাত প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। [সেই সাত প্রকার কেরাতের ব্যাখ্যা সামনে আসবে।]
আমাদের জ্ঞান অনুযায়ী এই মত ও বক্তব্য মুতাকাদ্দিমীন উলামায়ে কেরামের মাঝে সর্ব প্রথম ইমাম মালেক (রহ.)-এর নিকট পাওয়া যায়। বিখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন, আল্লামা নিযামুদ্দীন কিম্মী নিশাপুরী (রহ.) স্বীয় তাফসীর ‘গারায়িবুল কুরআন’-এ লিখেন, ‘আহরুফে সাব্আ’-এর ব্যাপারে ইমাম মালেক (রহ.)-এর এ মাযহাব উদ্ধৃত আছে যে, এর দ্বারা কেরাতের নিম্নলিখিত সাত প্রকারের বিভিন্নতা ও মতানৈক্যকে বুঝানো হয়েছে।
১. একবচন ও বহুবচনের মতানৈক্য। এক কেরাতে শব্দটি একবচন ব্যবহৃত হয়েছে আবার অন্য কেরাতে বহুবচনের শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন- كَلِمَاتُ رَبِّكَ এবং وّتَمَّتْ كَلِمَةُ رَبِّكَ ।
২. পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গের বিভিন্নতা। এক কেরাতে পুংলিঙ্গ এবং অন্য কেরাতে স্ত্রীলিঙ্গ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে । যেমন-لا يقبل এবং لا تقبل ।
৩. এ’রাব তথা কারক ও বিভক্তি চিহ্বের বিভিন্নতা। কোনো কেরাতে যের আবার কোনো কেরাতে যবর থাকে। যেমন- غَيرِ اللهِ এবং هل مِن خالقٍ غَيرُ اللهِ
৪. ‘সরফী অবস্থা’ বা শব্দ-প্রকরণের বিভিন্নতা। যেমন, এক কেরাতে يَعْرِشُونَ এবং অন্য কেরাতে يُعَرِّشُونَ ।
৫. ‘নাহভী হরফ’ বা অব্যয় পদের বিভিন্নতা। যেমন, এক কেরাতে لَكِنَّ الشَّياطِينَ এবং অন্য কেরাতে لَكِنِ الشَّياطِينُ ।
৬. হরফ পরিবর্তনকারী শব্দের বিভিন্নতা। যেমন, تَعْلَمُونَ ও يَعْلَمُونَ এবং نُنْشِزُها ওنَنْشُزُها ।
৭. সুর-ভঙ্গিমার বিভিন্নতা। যেমন, তাখফীফ [জযম দিয়ে পড়া], তাফখীম [শেষ অক্ষর ছেড়ে দেওয়া], ইমালা [যের ও যবরের মধ্যবর্তী উচ্চারণ করা], মন্দ দীর্ঘস্বর করা] কৃসর [হুস্ব স্বর করা], ইজহার [স্পষ্ট করা], ইদগাম [মিলিয়ে পড়া] ইত্যাদি।১৩৭
অতঃপর আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.), ইমাম আবুল ফযল রাষি (রহ.), কাষী আবু বকর আত্-তাইয়্যেব বাকিল্লানী (রহ.) এবং মুহার্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) এই মতকে গ্রহণ করেছেন।১৩৮
কেরাতের সুপ্রসিদ্ধ ইমাম, মুহাক্ষিক ইবনুল জাযারী (রহ.) নিজের এই মত পেশ করার পূর্বে লিখেন-
“আমি এই হাদীসের ব্যাপারে অসংখ্য প্রশ্নে জর্জরিত ছিলাম! ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় এর উপর গভীর চিন্তা-গবেষণায় লিপ্ত ছিলাম । এমনকি মহান আল্লাহ আমার জন্য এর এমন ব্যাখ্যা বিকাশিত করে দিয়েছেন, যা সঠিক ও নির্ভুল হবে ইনশা আল্লাহ।”১৩৯
এ সকল উলামায়ে কেরাম এ কথার উপর একমত যে, হাদীসে বর্ণিত ‘সাত হরফ’ দ্বারা কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু সেই কেরাতগুলোর প্রকারসমূহ নির্ধারণ করতে গিয়ে তাদের বক্তব্যের মাঝে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে। এর কারণ হলো, প্রত্যেকেই নিজ নিজ চিন্তা অনুযায়ী সেই কেরাত বিষয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধান চালিয়েছেন। এর মধ্যে যার অনুসন্ধান সবচেয়ে শক্তিশালী, সমৃদ্ধ এবং পূর্ণাঙ্গ ও সর্বগুণে গুণান্বিত তিনি হলেন, ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.)। তিনি বলেন, কেরাতের বিভিন্নতা [নিম্নোক্ত] সাত প্রকারেই সীমাবদ্ধ।
১. নাম বা বিশেষ্য শব্দসমূহের বিভিন্নতা ৷ একবচন, দ্বিবচন, বহুবচন এবং পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গের বিভিন্নতা এই প্রকারের অন্তর্ভূক্ত । [এর উদাহরণ সেই- تَمَّتْ كَلِمَةُ رَبِّكَ যা অন্য কেরাতে تَمَّتْ كَلِمَاتُ رَبِّكَ বলা হয়েছে ।]
২. ফেয়েল বা ক্রিয়াপদের পার্থক্য ও বিভিন্নতা। কোনো কেরাতে মাযী [অতীতকাল. বাচক ক্রিয়া, কোনোটিতে মুযারি’ [বর্তমান ও ভবিষ্যতকাল বাচক ক্রিয়া আবার কোনোটিতে আমর [নির্দেশ বাচক ক্রিয়া] ব্যবহৃত হয়েছে। [এর উদাহরণ হলো, এক কেরাতে رَبَّنا باعِدْ بَينَ أسْفارِنا । অন্য এক কেরাতে এর স্থলে রয়েছে رَبُّنا باعَّدَ بَينَ أسْفارِنا]
৩. এরাব তথা কারক ও বিভক্তি চিহ্নের বিভিন্নতা। বিভিন্ন কেরাতে বিভিন্ন কারক চিহ বা হরকত বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে । [এর উদাহরণ হলো, ولا يُضارَّ كاتِبٌএবং لا يُضارُّ كاتِبٌ আর ذُو العَرْشِ المَجِيدُ এবং ذُو العَرْشِ المَجِيدِ ]
৪. শব্দের কম-বেশি হওয়ার বিভিন্রতা। এক কেরাতে কোনো শব্দ কম আছে। আর অন্য কেরাতে বেশি আছে। [যেমন, এক কেরাতে وَما خَلَقَ الذكَرَ وَالأُنْثى আছে]। আর অন্য কেরাতে وَالذكَرَ وَالأُنْثى আছে। এখানে وَما خَلَقَশব্দের উল্লেখ নেই। অনুরূপভাবে এক কেরাতে تَجْرِي مِن تَحْتِها الأَنْهارُ আছে। আর অন্য কেরাতে আছে تَجْرِي تَحْتَها الأَنْهارُ ।
৫. তাকদীম-তা’খীর বা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী শব্দের বিভিন্নতা। এক কেরাতে কোনো শব্দকে পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার অন্য কেরাতে সেটাকে পরে উল্লেখ করা হয়েছে। [যেমন, وَجاءَتْ سَكْرَةُ المَوْتِ بِالحَقِّএবং وَجاءَتْ بالمَوْتِ سَكْرَةُ الحَقِّ]
৬. বদল বা শব্দ পরিবর্তনের বিভিন্নতা। এক কেরাতে এক শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য কেরাতে তার স্থলে অন্য শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। [যেমন, (نُنشِزُها) এবং (نَنشُزُها)। অনুরূপভাবে (فَتَبَيَّنُوا) এবং (فَتَثَبَّتُوا) আর (طَلْحٍ) এবং (طَلْعٍ)]।
৭. সুর-ভঙ্গিমার বিভিন্নতা। যার মধ্যে তাফখীম, তারকীক, এমালা, কসর, মদ্দ, হামর, ইজহার ও ইত্যাদির বিভিন্নতা শামিল রয়েছে।১৪০
আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.), আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.) এবং কাযী আবু তাইয়্যেব (রহ.)-এর বর্ণনাকৃত বিভিন্নতার কারণগুলোও এ বক্তব্যের সাথে মিলে যায়। তবে ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.)-এর অনুসন্ধান এ জন্য এত বেশি সমৃদ্ধ বলে মনে হয় যে, এতে কোনো প্রকারের মতানৈক্য ও বিভিন্নতার বর্ণনা তো করা হয়েছে, কিন্তু শব্দের কম-বেশি, পূর্ববর্তী-পরবর্তী এবং শব্দ পরিবর্তনের বিভিন্নতার বিষয়গুলো পুরোপুরি ফুটে উঠেনি। এর বিপরীত ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.) অনুসন্ধান ও গবেষনায় এ সকল প্রকার বিভিন্নতা ও মতানৈক্য সুস্পষ্টভাবে গ্রন্থিত হয়েছে। বিদগ্ধ গবেষক ইবনুল জাযারী (রহ.) যিনি ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় পর্যন্ত চিন্তা গবেষনা করার পর ‘সাত হরফ’কে কেরাতের সাত প্রকারের বিভিন্নতার উপর প্রয়োগ করেছেন, তিনিও ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.)-এর বক্তব্য বড় সম্মানের সাথে উদ্ধৃত করেছেন এবং এর উপর কোনো প্রকার অভিযোগ-আপত্তি উত্থাপন করেননি। বরং তাঁর আলোচনার সমষ্টি থেকে বুঝা যায় যে, ইমাম আবুল ফযল (রহ.)-এর অনুসন্ধান তাঁর নিজের অনুসন্ধানের চেয়ে বেশি পছন্দ হয়েছে।১৪১
এতদ্ব্যতীত হাফেয ইবনে হাযার আসকালানী (রহ.)-এর বক্তব্য থেকেও অনুভূত হয় যে, তিনি উক্ত তিনটি বক্তব্যের মাঝে ইমাম রাযি (রহ.)-এর অনুসন্ধান ও বক্তব্যকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কেননা তিনি আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে লিখেন- (هذا أوجه حسن) [এটা সর্বোত্তম ব্যাখ্যা] অতঃপর ইমাম ফযল (রহ.)-এর বর্ণনাকৃত সাত প্রকার বিভিন্নতা বর্ণনা করার পর লিখেন-
قلت وقد أخذ كلام ابن قتيبة ونقحه
‘আমার ধারণা, তিনি [ইমাম আবুল ফযল রাযি] ইবন কুতাইবা (রহ.)-এর বক্তব্যকে গ্রহণ করে এটাকে সুসজ্জিত করেছেন।১৪২
শেষ যুগে শায়খ আবদুল আযীম যুরকানী (রহ.) ও তাঁর এই বক্তব্যকে গ্রহণ করে এটাকে শক্তিশালী করার জন্য সংশ্লিষ্ট দলীল-প্রমাণাদি পেশ করেছেন।১৪৩
যা হোক, অনুসন্ধানের প্রকারের মাঝে মতানৈক্য আছে ঠিক; তবে ইমাম মালেক (রহ.), আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.), ইমাম আবুল ফখর রাযি (রহ), মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) এবং কাযী বাকিল্লানী (রহ.) সকলেই এ কথার উপর এক মত যে, হাদীসে বর্ণিত “সাত হরফ” দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, কেরাতের ওই বিভিন্নতা যা সাত প্রকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
অধমের দৃষ্টিতে “সাত হরফ”-এর এই ব্যাখ্যাটিই সবচেয়ে উত্তম। হাদীসের মর্মার্থ এটাই বুঝে আসে যে, কুরআনুল কারীমের শব্দগুলো বিভিন্নভাবে পড়া যেতে পারে। আর এই বিভিন্ন পদ্ধতিগুলো ধরন হিসেবে সাত প্রকার। ওই সাত প্রকারের নির্ধারণ যেহেতু কোনো হাদীসে পাওয়া যায় না, তাই নিশ্চিতভাবে কোনো অনুসন্ধানের ব্যাপারে এ কথা বলা যাবে না যে, হাদীসে এ প্রকারকেই বুঝানো হয়েছে। তবে বাহ্যিকভাবে ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ)-এর অনুসন্ধান ও গবেষণা অধিকতর সঠিক বলে মনে হয়। কারণ বর্তমান কালের কেরাতের সবগুলো প্রকার এতে শামিল রয়েছে।
বক্তব্যটির অগ্রাধিকারের কারণসমূহ
“সাত হরফ” এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে হাদীস, তাফসীর ও উলূমুল কুরআনের কিতাবসমূহে যতগুলো ব্যাখ্যা বর্ণনা করা হয়েছে, আমাদের দৃষ্টিতে সেগুলোর মধ্যে এ বক্তব্যটি [সাত হরফ দ্বারা কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকে বুঝানো] সবচেয়ে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত, নির্ভরযোগ্য এবং মেনে নেওয়ার মতো। তার কারণগুলো নিম্নরূপ:
১. এ বক্তব্য অনুযায়ী “হরফ” এবং “কেরাত” পৃথক পৃথক দু’টি বিষয় সাব্যস্ত করার প্রয়োজন পড়ে না। আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.) ও ইমাম তাহাভী (রহ.)-এর বক্তব্যসমূহে একটি যৌথ সমস্যা রয়েছে যে, এতে এ কথা মেনে নিতে হয় যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতের মাঝে দু’ধরনের মতানৈক্য রয়েছে। একটি হলো, হরফের মতানৈক্য। আরেকটি হলো, কেরাতের মতানৈক্য। হরফের মতানৈক্য তো এখন বিলুপ্ত। আর কেরাতের মতানৈক্য এখনো বহাল রয়েছে। অথচ হাদীসের এত বিশাল ভাণ্ডারে এমন একটি দুর্বল হাদীসও পাওয়া যায় না, যার দ্বারা এ কথা সাব্যস্ত হয় যে, “হরফ” এবং “কেরাত” দু’টি আলগ আলগ বিষয়। হাদীসের ভাণ্ডারে শুধুমাত্র হরফের মতানৈক্যের কথা পাওয়া যায়। আর এর জন্যই অধিক হারে “কেরাত” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। “কেরাত” যদি ওই “হরফগুলো” থেকে পৃথক হতো তাহলে কোনো না কোনো হাদীসে এর প্রতি ইঙ্গিত থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল। পরিশেষে এ কথার কোন যুক্তি আছে যে, “হরফ”-এর মতানৈক্য সংক্রান্ত হাদীসটি প্রায় তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় এসে পৌঁছেছে, অথচ “কেরাত”-এর পৃথক আলোচনা একটি হাদীসেও নেই? অতএব, নিজের ধারণা-প্রসূত কেয়াস দ্বারা এ কথা কিভাবে বলে দেওয়া সম্ভব যে, হরফের মতানৈক্য ও বিভিন্নতা ছাড়াও কুরআনুল কারীমের শব্দাবলীর মাঝে আরেক প্রকার মতানৈক্য ও বিভিন্নতা ছিল?
উপরোল্লিখিত [ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.)-এর] বক্তব্যে এই সমস্যা সম্পূর্ণরূপে দূর হয়ে যায়। কারণ এতে “হরফ” এবং “কেরাত”কে অভিন্ন প্রকার সাব্যস্ত করা হয়েছে।
২. আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী এ কথা মানতে হয় যে, সাত হরফের মধ্য হতে ছয় হরফ রহিত বা পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। একমাত্র কুরাইশী হরফই অবশিষ্ট রয়েছে। [বর্তমান কেরাত ওই কুরাইশী হরফের আদায়গত বিভিন্নতা]। এ বক্তব্যের নিন্দনীয় দিকগুলো আমরা সামনে বর্ণনা করব। উপরোল্লিখিত শেষ বক্তব্যটিতে [অর্থাৎ অগ্রাধিকার প্রাপ্ত বক্তব্যটিতে] এসব নিন্দনীয় বিষয় নেই। কেননা এ বক্তব্য অনুযায়ী সাত হরফের সবগুলো আজও অবশিষ্ট ও সংরক্ষিত আছে।
৩. এই অগ্রাধিকার প্রাপ্ত বক্তব্য অনুযায়ী কোনো প্রকার তাভীল বা জটিল ব্যাখ্যা ব্যতিরেকে “সাত হরফ”-এর অর্থ সঠিক অবিকৃত থাকে। পক্ষান্তরে অন্যান্য বক্তব্যের মাঝে হয়তো “হরফ”-এর অর্থের মধ্যে নতুবা “সাত” সংখ্যার মধ্যে তাভীল বা জটিল ব্যাখ্যা করতে হয়।
৪. “সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যত উলামায়ে কেরামের বক্তব্য আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মর্যাদাবান এবং নববী যুগের নিকটবর্তী ব্যক্তিত্ব ছিলেন ইমাম মালেক (রহ.)। আর আল্লামা নিশাপুরী (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী তিনিও এই বক্তব্যেরই প্রবক্তা।
৫. আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.) এবং মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) উভয়ে ছিলেন ইলমে কেরাতের সর্বজনস্বীকৃত ইমাম। আর তাঁরা উভয়েই এই বক্তব্যের প্রবক্তা। মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর কথা তো পূর্বে আলোচনা হয়েছে যে, তিনি ত্রিশ বছরেরও অধিক সময় পর্যন্ত চিন্তা-গবেষণা করার পর এই বক্তব্যকে গ্রহণ করেছেন।
এ বক্তব্যের উপর উত্থাপিত অভিযোগ ও তার জবাব
“সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত বক্তব্যের উপর যেসব আপত্তি-অভিযোগ ও সমালোচনা উত্থাপিত হতে পারে সেগুলোর উপর দৃষ্টি বুলিয়ে নিন।
প্রথম অভিযোগ:
এর উপর প্রথম অভিযোগ করা হয়েছে যে, এ বক্তব্যে মতানৈক্য ও বিভিন্নতার যতগুলো প্রকার বর্ণনা করা হয়েছে তার বেশির ভাগই “সরফী” এবং “নাহভী” [শব্দ-প্রকরণ ও বাক্য-প্রকরণ]-এর প্রকারভেদের উপর ভিত্তিশীল। অথচ রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এই হাদীস বর্ণনা করেছেন তখন সরফ-নাহুর এই বিষয়ভিত্তিক পরিভাষা ও প্রকারভেদ প্রচলিত ছিল না। ওই সময় অধিকাংশ মানুষ লেখা-পড়াও জানত না। এমতাবস্থায় বিভিন্নতার এই প্রকারগুলোকে “সাত হরফ” হিসেবে ধরে নেওয়াটা মুশকিল বলে মনে হয়।
হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) এই আপত্তি উদ্ধৃত করার পর এর জবাব দিয়েছেন এভাবে-
وَلَا يَلْزَمُ من ذلك توهين ما ذهب إليه ابن قتيبة لاحتمال أَنْ يَكُونَ الالحصَارُ الْمَذْكُورُ فِي ذَلِكَ وَقَعَ اتفاقا وإِنَّمَا اطَّلَعَ عَلَيْهِ بالاستقراء وَفِي ذَلِكَ مِنَ الْحِكْمَةِ الْبَالِغَة ما لا يخفى
“এর দ্বারা ইবনে কুতাইবা (রহ.)-এর বক্তব্যের দুর্বলতা প্রকাশ পায় না। কেননা হতে পারে এটা কোনো ঘটানাক্রমে হয়ে গেছে। আর অনুসন্ধানের মাধ্যমে এর পূর্বাভাস পাওয়া গেছে। আর এর মাঝে যে পরিপূর্ণ হেকমত লুকায়িত আছে তা গোপন নয়।”১৪৪
আমাদের ক্ষুদ্র উপলব্ধি অনুযায়ী এই জবাবের সারাংশ হচ্ছে, এ কথাটি ঠিক যে, নববী যুগে এই পরিভাষাগুলো প্রচলিত ছিল না। আর হয়তো এ কারণেই রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম “সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেননি। তবে এটা তো পরিষ্কার যে, এই বৈষয়িক পরিভাষাগুলো যে ভাবার্থ থেকে আহরিত, সেই ভাবার্থ তো ওই যুগেও বিদ্যমান ছিল। যদি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেসব ভাবার্থের প্রতি লক্ষ্য করে বিভিন্নতার প্রকারসমূহকে “সাত”-এর মাঝে সীমাবদ্ধ করেন তাতে আশ্চর্যের কী আছে? হ্যাঁ, ওই যুগে যদি বিভিন্নতার সাত প্রকার বিস্তারিত বর্ণনা করা হতো তাহলে হয়তো তা সাধারণ মানুষের উপলব্ধির ঊর্ধ্বে হয়ে যেত। তাই রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বিস্তারিত বর্ণনা না করে শুধু এতটুকু বলেছেন যে, বিভিন্নতার এ প্রকারগুলো সাত প্রকারে সীমাবদ্ধ। পরবর্তীতে যখন এ পরিভাষাগুলো প্রচলিত হয়ে গেল তখন উলামায়ে কেরাম পরিপূর্ণ অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিভিন্নতার এ প্রকারগুলোকে পারিভাষিক শব্দ দ্বারা চিহ্নিত করেছেন।
আর এটা আমরা আগেই বলেছি, বিশেষ কোনো ব্যক্তির অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে পূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে এ কথা বলা মুশকিল যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য এটাই ছিল। কিন্তু যখন বিভিন্ন লোকের অনুসন্ধান এটা প্রমাণ করে যে, বিভিন্নতার প্রকার মোট সাত প্রকার, তখন এ কথা নিশ্চয়তার নিকটবর্তী হয়ে যায় যে, “সাত হরফ” দ্বারা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য ছিল “বিভিন্নতার সাত প্রকার।” চাই এর বিস্তারিত বর্ণনা ওই রকম না হোক, যা পরবর্তীতে অনুসন্ধানের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে যখন “সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যুক্তিগ্রাহ্য অন্য কোনো প্রকার পাওয়া না যায়।
দ্বিতীয় অভিযোগ:
সাত হরফ দ্বারা কি সহজবোধ্যতা সৃষ্টি হলো?
এই [অগ্রাধিকার প্রাপ্ত] বক্তব্যটির উপর দ্বিতীয় অভিযোগ এ হতে পারে যে, কুরআনুল কারীম তো সাত হরফে নাযিল করা হয়েছে। উম্মত যাতে সহজ-সাধ্যভাবে কুরআন তেলাওয়াত করতে পারে। আর এই সহজতা আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্য অনুসারে তো বোধগম্য হয়। কেননা আরবে বিভিন্ন গোত্রের লোক ছিল। আর এক গোত্রের জন্য অন্য গোত্রের ভাষায় কুরআন তেলাওয়াত ছিল অত্যন্ত মুশকিল। কিন্তু ইমাম মালেক (রহ.), ইমাম রাযী (রহ.) এবং ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী সাত হরফ তো শুধু কুরাইশী ভাষার সাথেই সম্পৃক্ত। এতে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয় না যে, কুরআনুল কারীম যখন এক ভাষাতেই নাযিল করা উদ্দেশ্য ছিল, তাহলে এতে কেরাতের বিভিন্নতা অবশিষ্ট রাখার প্রয়োজনটা কি ছিল?
এ অভিযোগের ভিত্তি হলো এ কথার উপর যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআন তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে সাত হরফের যে সহজতা উম্মতের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন, এতে আরবের গোত্রভিত্তিক ভাষার ভিন্নতা তাঁর দৃষ্টির সামনে ছিল। এ কথার উপর ভিত্তি করেই হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) “সাত হরফ” দ্বারা আরবের “সাত ভাষা”-এর অর্থ করেছেন। অথচ এটা এমন একটা কথা যার সমর্থন কোনো হাদীস দ্বারা পাওয়া যায় না। পক্ষান্তরে এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে, সাত হরফের সহজ-সাধ্যতা প্রার্থনা করার সময় তাঁর লক্ষ্যবস্তু কী ছিল? ইমাম তিরমিযী (রহ.) সহীহ সনদ সূত্রে হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন-
لَقِي رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم جبريل عند احجار المرأ، فَقَالَ: ” يا جبريل إنِّي بُعثتُ إِلَى أُمَّةٍ أُميين: اِنهُمُ العَجُوزُ، والشيخ الكبير، والغُلَامُ، قال فمرهم فليقرأوا القرآن على سبعة أحرف
“এক মৃত পাথরের নিকট হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাক্ষাত হলো। তখন তিনি জিবরাঈল (আ.) কে বললেন, আমি এমন এক নিরক্ষর জাতির নিকট প্রেরিত হয়েছি, যাদের মধ্যে রয়েছে-অতিশয় বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা। রয়েছে-শিশু-কিশোররা। তখন হযরত জিবরাঈল (আ.) বললেন, আপনি তাদেরকে নির্দেশ দিন, তারা যেন সাত হরফে কুরআন পাঠ করে।১৪৫
তিরমিযী শরীফেরই অপর এক রেওয়ায়েতে এমন শব্দ এসেছে যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিবরাঈল (আ.) কে বলেছেন-
إنِّي بُعثتُ إلى أُمَّةٍ أُميِّينَ مِنْهُمُ العجُوزُ، وَالشَّيْخ الكبيرُ، وَالغُلَامُ، وَالْجَارِيَةُ، وَالرَّجُلُ الَّذِي لَمْ يَقْرَأُ كِتَابًا قَطُّ “
“আমি এমন এক নিরক্ষর জাতির নিকট প্রেরিত হয়েছি, যাদের মধ্যে রয়েছে-অতিশয় বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা। রয়েছে-শিশু-কিশোররা এবং প্রাপ্ত বয়স্ক ও বালক-বালিকা। যারা কখনো কোনো কিতাব পড়েনি।”১৪৬
উপরোল্লিখিত হাদীসের শব্দমালা সুস্পষ্টভাবে জানান দিচ্ছে যে, উম্মতের জন্য সাত হরফের সহজতা প্রার্থনা করার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে এ কথা ছিল যে, তিনি এক নিরক্ষর জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছেন। যার মধ্যে সব ধরনের লোক রয়েছে। যদি কুরআনুল কারীম তেলাওয়াতের জন্য শুধু একটা পদ্ধতিই নির্ধারণ করে দেওয়া হয় তাহলে উম্মত মুশকিলে পড়ে যাবে। পক্ষান্তরে যদি কয়েকটি পন্থা রাখা হয়, তাহলে এটা সম্ভব যে কোনো লোক এক পদ্ধতিতে তেলাওয়াত করতে সক্ষম না হলে অন্য পদ্ধতিতে সে তেলাওয়াত করবে। এভাবে তার নামায এবং তেলাওয়াতের ইবাদত বিশুদ্ধ হয়ে যাবে। অনেক সময় এমন হয় যে, বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা লোক বা অপড়ুয়া লোকদের যবানে একটি শব্দ আদায় করা কষ্টকর হয় এবং তাদের জন্য যের-যবরের সাধারণ প্রার্থক্যও কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। এ জন্যই তিনি এই সহজতা কামনা করেছেন। যেমন, কোনো ব্যক্তি মা’রূফের সীগা আদায় করতে পারে না, তখন এর স্থলে অন্য কেরাত অনুযায়ী মাজহুলের সীগা আদায় করে নিবে। অথবা কারো জন্য একবচন শব্দ আদায় করতে কষ্ট হয়, তখন সে ওই আয়াতকেই বহুবচন শব্দ দ্বারা আদায় করবে। কারো জন্য সুর-ভঙ্গিমার একটি পদ্ধতি কষ্টকর হয়, তখন সে অন্যটা অবলম্বন করবে। এভাবে গোটা কুরআনে তার জন্য সাত প্রকারের সহজতা লাভ হয়ে যাবে।
আপনি উপরোল্লিখিত হাদীসে হয়তো লক্ষ্য করে থাকবেন যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাত হরফের সহজতা প্রার্থনা করার সময় এ কথা বলেননি যে, “আমি যে জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছি তারা বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত এবং তাদের প্রত্যেকের ভাষা আলাদা আলাদা। এ জন্য কুরআনুল কারীমকে বিভিন্ন ভাষায় পড়ার অনুমতি দেওয়া হোক।” বরং এর উল্টো গোত্রভিত্তিক বিভিন্নতা থেকে দৃষ্টি এড়িয়ে তিনি বয়সের তারতম্য এবং তাদের নিরক্ষর হবার বিষয়টার উপর জোর দিয়েছেন। এ কথা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, সাত হরফের সহজ-সাধ্যতার মধ্যে মূলভিত্তি গোত্রসমূহের ভাষাভিত্তিক ছিল না। বরং উম্মত অপড়ুয়া হওয়ার উপর লক্ষ্য রেখে তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে একটা সাধারণ সহজ-সাধ্যতা প্রদান উদ্দেশ্য ছিল। যার দ্বারা উম্মতের সকল সদস্য উপকৃত হতে পারে।
তৃতীয় অভিযোগ:
এই [অগ্রাধিকার প্রাপ্ত] বক্তব্যের প্রতি তৃতীয় অভিযোগ এই হতে পারে যে, কেরাতের বিভিন্নতার যে সাতটি প্রকার বর্ণনা করা হয়েছে, চাই সেটা ইমাম মালেক (রহ.)-এর বর্ণনা হোক অথবা আবুল ফযল রাযি (রহ.)-এর বক্তব্য হোক কিংবা আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.), মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) এবং কাযী আবুত তাইয়্যেব (রহ.)-এর বর্ণনাকৃত হোক, সর্বাবস্থায় এখানে কেয়াস ও অনুমানের একটি অবকাশ থেকেই যায়। এ কারণেই তাঁরা প্রত্যেকেই বিভিন্নতার এই সাত প্রকারের বিস্তারিত বর্ণনা পৃথক পৃথকভাবে দিয়েছেন। কাজেই এগুলোর ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিভাবে বলা যেতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য এটাই ছিল?
এর জবাব হচ্ছে, “সাত হরফ”-এর কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা কোনো হাদীস বা সাহাবীর বর্ণনা থেকে পাওয়া যায় না। তাই এই অধ্যায়ে যত বর্ণনা রয়েছে, সেসবগুলোর ভাবসমগ্র একত্রিত করে এর থেকে বিশেষ ফলাফল বের করা হয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে এ বক্তব্যটি বিশুদ্ধ হওয়ার অধিক নিকটবর্তী বলে মনে হয়। কারণ এর উপর মৌলিক কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হয় না। বর্ণনাগুলোকে সামগ্রিক দৃষ্টিতে দেখার পর আমাদের কাছে বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায় যে, হাদীসে বর্ণিত “সাত হরফ” দ্বারা কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকে বুঝানো হয়েছে।
বাকি থাকল ওই প্রকারগুলো নির্ধারণ ও নিরূপণ করার বিষয়টি। আর এ ব্যাপারে তো আমরা আগেই বলে এসেছি যে, এটা জানার জন্য গভীর অনুসন্ধানের বিকল্প কোনো পথ নেই। ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.)-এর অনুসন্ধান আমাদের কাছে অবশ্যই সকল গুণাগুণসম্বলিত বলে মনে হয়। এতদ্বসত্ত্বেও আমরা নিশ্চিতভাবে কারো অনুসন্ধানকেই বলি না যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য এটাই ছিল। কিন্তু এর দ্বারা এ মৌলিক হাকীকত প্রশ্নবিদ্ধ হয় না যে, “সাত হরফ” দ্বারা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য ছিল কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকার। যেগুলোর বিশদ বর্ণনার নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করার না আমাদের কাছে কোনো পথ আছে আর না এর কোনো প্রয়োজন আছে।
চতুর্থ অভিযোগ:
এই বক্তব্যের উপর চতুর্থ অভিযোগ এ হতে পারে যে, ওই বক্তব্যে “সাত হরফ” দ্বারা শব্দমালা ও সেগুলোর উচ্চারণের বিভিন্ন পদ্ধতিকে বুঝানো হয়েছে। এতে অর্থগত দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়নি। অথচ এক রেওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে, এর দ্বারা সাত ধরনের অর্থকে বুঝানো হয়েছে। ইমাম তহাভী (রহ.) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ বাণী রেওয়ায়েত করেন-
كان الكتاب الأول ينزل من باب واحد على حرف واحد ونزل القرآن من سبعة ابواب على سبعة احرف زاجر و امر وحلال وحرام ومحكم ومتشابه وامثال . الخ….
‘পূর্ববর্তী কিতাব এক দরজা দিয়ে এক হরফে অবতীর্ণ হয়েছিল। আর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে সাত দরজা দিয়ে সাত হরফে। সেই সাতটি হরফ হলো-[১] যাজির [কোনো কাজ থেকে বাধা প্রদানকারী]। [২] আমের [কোনো বিষয়ে আদেশ প্রদানকারী]। [৩.] হালাল। [৪.] হারাম। [৫] মুহকাম [যার অর্থ জানা আছে]। [৬.] মুতাশাবিহ্ [যার নিশ্চিত কোনো অর্থ জানা নেই]। [৭.] আমছাল।
এ হাদীসের ভিত্তিতেই কোনো কোনো আলেম থেকে বর্ণিত আছে যে, তাঁরা সাত “হরফ”-এর তাফসীর “সাত প্রকারের অর্থ” দ্বারা করেছেন।
এর জবাব হলো, উপরোল্লিখিত রেওয়ায়েতটি সনদের দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল। ইমাম তহাভী (রহ.) এর সনদের সমালোচনা করতে গিয়ে বলেন যে, আবু সালামা আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। অথচ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর সাথে আবু সালামার সাক্ষাতই হয়নি।১৪৭
এতদ্ব্যতীত পূর্ব যুগের যেসব বুযুর্গের কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য বর্ণিত আছে সেগুলোর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) লিখেন- ’এর দ্বারা “সাত হরফ” বিষয়ক হাদীসটি ব্যাখ্যা করা তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল না। বরং সাত হরফের আলোচনার বিষয় থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে তাঁরা এ কথা বলতে চেয়েছেন যে, কুরআনুল কারীম এ ধরনের বিষয় দ্বারা সমৃদ্ধ।’১৪৮
আর যারা “সাবআতু আহরুফ” বা সাত হরফের আলোচনা সম্বলিত হাদীসগুলোর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এ ধরনেরই কথা বলেছেন, তাদের কথা যুক্তিগ্রাহ্যভাবেই বাতিল। কারণ পেছনে যতগুলো হাদীস বর্ণনা করা হয়েছে, সেগুলোর প্রতি নযর বুলাতেই একজন সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিই বুঝতে পারবে যে, হরফের বিভিন্নতা দ্বারা অর্থ ও বিষয়াবলীর বিভিন্নতাকে বুঝানো হয়নি। বরং আলফায বা শব্দমালার বিভিন্নতাকে বুঝানো হয়েছে। তাইতো মুহাক্কিক আলেমগণের মধ্য হতে কেউ এ মতকে গ্রহণ করেননি; বরং এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।১৪৯
“হরূফে সাবআ” এখনো সংরক্ষিত নাকি পরিত্যক্ত?
“হরফে সাবআ” বা সাত হরফের অর্থ নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার পর এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, এ সাত হরফ এখনো অবশিষ্ট আছে নাকি নেই? এ বিষয়ে মুতাক্কাদিমীন বা পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরাম থেকে তিনটি মতামত বা বক্তব্য বর্ণিত আছে।
[এক] প্রথম বক্তব্য হচ্ছে হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) এবং তাঁর অনুসারীদের। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করে এসেছি যে, তাঁদের নিকট সাত হরফ দ্বারা আরবের গোত্রভিত্তিক সাত ভাষাকে বুঝানো হয়েছে। এ কথার উপর ভিত্তি করেই তিনি বলেন যে, হযরত উসমান (রা.)-এর যুগ পর্যন্ত কুরআনুল কারীম সাত হরফে পড়া হতো। কিন্তু হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে যখন ইসলাম দূর-দূরান্ত পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করল, তখন এ সাত হরফের তাৎপর্য সম্পর্কে জানা না থাকার কারণে মানুষের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা শুরু হতে লাগল। বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা বিভিন্ন হরফে কুরআন তেলাওয়াত করত এবং একে অন্যের তেলাওয়াতকে ভুল আখ্যায়িত করত। এ ফেতনাকে নির্মূল করার জন্য হযরত উসমান (রা.) সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শে গোটা উম্মতকে শুধু এক হরফ তথা কুরাইশী ভাষা অনুযায়ী কুরআন তেলাওয়াতের নিমিত্তে সাতটি মাসহাফ সুবিন্যস্ত করে বিভিন্ন প্রদেশে পাঠিয়ে দেন। আর বাকি সব মাসহাফকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন। যেন আর কোনো মতানৈক্য সৃষ্টি হতে না পারে। সুতরাং এখন কেবল কুরাইশী ভাষার হরফই অবশিষ্ট রয়েছে। আর অবশিষ্ট ছয় হরফ সংরক্ষিত রয়নি। আর কেরাতের যে মতানৈক্য আজ পর্যন্ত চলে আসছে, সেগুলো সেই কুরাইশী এক হরফ আদায়ের বিভিন্ন পদ্ধতি মাত্র।১৫০
হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর চিন্তাধারা ও এর নিন্দনীয় দিকগুলো
হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) যেহেতু নিজের চিন্তা ও মতকে স্বীয় তাফসীর গ্রন্থের ভূমিকায় অত্যন্ত দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন, তাই তাঁর এ বক্তব্য অত্যাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। আর আজ-কাল সাত হরফের ব্যাখ্যা সাধারণত এর আলোকেই করা হয়ে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ মুহাক্কিক আলেমগণ১৫১ এ মতকে গ্রহণই করেননি; বরং অত্যন্ত কঠোরভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ এ বক্তব্যে এমন কিছু সমস্যা দাঁড়ায় যার কোনো সমাধান নেই।
এ মতের উপর সর্ব প্রথম তো ওই আপত্তি আরোপিত হয়, যার আলোচনা আমরা আগেই করে এসেছি যে, এতে “হরফ” এবং “কেরাত” দু’টিকে পৃথক পৃথক বিষয় সাব্যস্ত করা হয়েছে। অথচ কোনো হাদীস দ্বারা এর প্রমাণ পাওয়া যায় না।
দ্বিতীয় আপত্তি এই হয় যে, হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) এক দিকে তো এটা মেনে নেন যে, সাত হরফের সবকটিই আল্লাহর পক্ষ হতে নাযিলকৃত। আবার অন্য দিকে বলেন, হযরত উসমান (রা.) সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শক্রমে ছয় হরফের তেলাওয়াতকে বিলুপ্ত করে দেন! অথচ এ কথা মেনে নেওয়া খুবই মুশকিল যে, সাহাবায়ে কেরাম ওই হরফগুলোকেই একেবারে বিলুপ্ত করার জন্য একমত হয়ে গেলেন, উম্মতের সহজ-সাধ্যের জন্য রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুআর জবাবে আল্লাহ তাআলা যা নাযিল করেছিলেন!? সাহাবায়ে কেরামের ইজমা বা ঐক্যমত নিঃসন্দেহে দীনের অকাট্য দলীল, কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর জন্য এটা সম্ভাব্য ব্যাপার বলে মনে হয় না যে, যে বিষয় কুরআন হওয়ার ব্যাপারটা তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক পরম্পরায় সাব্যস্ত হয়েছে, তাঁরা সেটাকে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে মুছে ফেলার জন্য ঐক্যমত পোষণ করবেন!
হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) এই আপত্তির জবাব এভাবে দিয়েছেন যে, ‘প্রকৃতপক্ষে উম্মতকে কুরআনুল কারীম সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং সাথে সাথে এ এখতেয়ারও দেওয়া হয়েছিল যে, তারা সাত হরফের যে কোনো একটিকে বেছে নিতে পারবে। তাইতো উম্মত সেই এখতেয়ার দ্বারা উপকৃত হয়ে সার্বজনীন কল্যাণার্থে ছয় হরফের তেলাওয়াতকে পরিত্যাগ করেছেন আর এক হরফের সংরক্ষণের উপর একমত হয়েছেন। এ পদক্ষেপ দ্বারা ওই হরফগুলোকে রহিত করা এবং সেগুলোর তেলাওয়াতকে হারাম করে দেওয়া উদ্দেশ্য ছিল না। বরং উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের জন্য সার্বজনীন এক হরফকে নির্বাচন করা।’
কিন্তু এ জবাবটিও এ জন্য দুর্বল বলে মনে হয় যে, প্রকৃত অবস্থা যদি এটাই হয়ে থাকে তাহলে এটা কি সমীচীন ছিল না যে, উম্মত নিজেদের আমলের জন্য এক হরফকে বেছে নিত আর বাকি ছয় হরফকে একেবারে বিলুপ্ত করার পরিবর্তে কোনো এক স্থানে তা সংরক্ষণ করে রাখত? যেন সে হরফগুলোর অস্তি ত্ব একেকারেই খতম না হয়ে যায়। কুরআনুল কারীমের ঘোষণা রয়েছে-
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
‘নিশ্চয় আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই তার সংরক্ষক।‘
যখন সাত হরফের সবগুলোই কুরআন ছিল তখন এই আয়াতের সুস্পষ্ট দাবী হলো, ওই সাত হরফও কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে এবং কোনো ব্যক্তি যদি এগুলোর তেলাওয়াকে ছেড়েও দিতে চায়, তবু তা একেবারে বিলুপ্ত হতে পারে না।
হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) এর উপমা দিতে গিয়ে একটি মাসআলা পেশ করেছেন যে, কুরআনুল কারীম মিথ্যা শপথের কাফ্ফারা ক্ষেত্রে মানুষকে তিনটি এখতেয়ার দিয়েছে। চাইলে সে একজন দাসকে মুক্ত করতে পারবে, চাইলে দশজন মেসকীনকে আহার করাতে পারবে আর চাইলে দশজন মেসকীনকে বস্ত্র দিতে পারবে। এখন যদি উম্মত বাকি দু’টি প্রকারকে নাজায়েয না করে নিজেদের আমলের জন্য একটিকে গ্রহণ করে নেয় তাহলে তা তার জন্য বৈধ। ঠিক তদ্রূপ উম্মত সাত হরফের মধ্য হতে একটি হরফকে সার্বজনীনভাবে বেছে নিয়েছে কিন্তু এই উপমা পেশ করা এ জন্য সঠিক নয় যে, উম্মত যদি শপথের কাফ্ফারার ক্ষেত্রে তিন প্রকারের যে কোনো একটি প্রকারকে এমনভাবে গ্রহণ করে যে, বাকি দু’টি প্রকারকে নাজায়েয তো বলে না; কিন্তু কার্যত সেগুলোর অস্তিত্ব একেবারেই বিলুপ্ত থেকে যায় এবং লোকদের কেবল এ টুকু জানা থাকে যে, শপথের কাফ্ফারার আরো দু’টি প্রকার ছিল যেগুলোর আমলকে উম্মত পরিহার করেছে। কিন্তু সে প্রকারগুলো কি ছিল? তা জানে এমন লোকও বাকি না থাকে, তাহলে অবশ্যই উম্মতের জন্য এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো অবকাশ নেই।
অতঃপর প্রশ্ন থেকে যায় যে, বাকি ছয় হরফকে পরিহার করার কি প্রয়োজন দেখা দিল? হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) বলেছেন যে, এই হরফগুলোর মতানৈক্যের কারণে মুসলমানদের মাঝে প্রচণ্ড ঝগড়া বাঁধত। এ জন্য হযরত উসমান (রা.) সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শে সকল হরফের মাঝে সমন্বয় সাধন করে সেটাকে এক হরফে রূপান্তরিত করাকে সমীচীন মনে করলেন। কিন্তু এটাও এমন এক কথা যেটাকে মেনে নেওয়া খুব মুশকিল। হরফের বিভিন্নতার উপর ভিত্তি করে মুসলমানদের মতবিরোধ তো স্বয়ং রাসূলুলাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগেও ছিল। হাদীসের ভাণ্ডারে এ ধরনের বহু ঘটনা বর্ণিত আছে যে, এক সাহাবী অপর সাহাবীকে ভিন্নভাবে কুরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন তখন তাঁদের পরস্পরে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়ে যেত। এমনকি সহীহ বুখারীর রেওয়ায়েত অনুযায়ী হযরত ওমর (রা.) তো হযরত হিশাম (রা.)-এর গলায় চাদর পেঁছিয়ে তাঁকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে নিয়ে এসেছিলেন। হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) বলেন, হরফের এই মতবিরোধের কথা শোনে আমার অন্তরে মস্তবড় সন্দেহ সৃষ্টি হতে লাগল। এ ধরনের ঘটনার প্রেক্ষিতে রাসূলুলাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাত হরফকে বিলুপ্ত করার পরিবর্তে সে হরফগুলোর অনুমোদনের ব্যাপারে জানালেন। আর এতে কোনো ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনাও ঘটেনি। সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে এটা অসম্ভব যে, তাঁরা এই ‘উসওয়ায়ে হাসানা’ বা উত্তম আদর্শের উপর আমল করার পরিবর্তে ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার সিদ্ধন্ত গ্রহণ করবেন।
তারপর আশ্চর্যের কথা হলো, আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী সাহাবায়ে কেরাম মতবিরোধের ভয়ে ছয় হরফকে তো বিলুপ্ত করে দিয়েছেন। কিন্তু কেরাতগুলোকে যা তাঁর বক্তব্য মতে হরফ থেকে আলাদা বিষয়। হুবহু বাকি রেখেছেন! যা আজ পর্যন্ত সংরক্ষিত হয়ে চলে আসছে। এখন প্রশ্ন হলো, বিভিন্ন হরফের উপর কুরআন তেলাওয়াত জারী রাখার ক্ষেত্রে যে মতবিরোধ ও মতানৈক্যের আশঙ্কা ছিল, কেরাতের বিভিন্নতার মাঝে কি সেই আশঙ্কাটা ছিল না? যখন ওই কেরাতগুলোর আলোকে কখনো কখনো এক একটি হরফকে বিশটি পদ্ধতিতে পড়া যায়। যদি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার উদ্দেশ্য এটাই হয়ে থাকে যে, মুসলমানদের মাঝে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা হবে এবং সবাই এক পদ্ধতিতে কুরআন তেলাওয়াত করবে, তাহলে কেরাতের বিভিন্নতাকে অবশেষে কেন বিলুপ্ত করা হলো না? যখন কেরাতের মতানৈক্য থাকা সত্ত্বেও মুসলমানদের বিক্ষিপ্ততাকে বাধা দেওয়া যেত এবং মুসলমানদেরকে এটা বুঝানো যেত যে, এই সবগুলো পদ্ধতিতে তেলাওয়াত করা জায়েয, তাহলে এই শিক্ষাটাই কেন সাত হরফের ক্ষেত্রে ফেতনার কারণরূপে উপলব্ধি হলো? প্রকৃত কথা হচ্ছে, হাফেয ইবনে জারীর তবারী (রহ.)-এর বক্তব্যে “সাত হরফ” এবং “কেরাত”-এর ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি এমন বিস্ময়কর দু’টি আমলী সম্বন্ধ করতে হয়, যার যুক্তিগ্রাহ্য কোনো কারণ বুঝে আসে না।
উপরন্তু হযরত উসমান (রা.) ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামের প্রতি এত বড় পদক্ষেপের সম্বন্ধ কোনো সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধ রেওয়ায়েতের উপর ভিত্তি করে নয়। বরং সংক্ষিপ্ত কিছু শব্দের কেয়াসনির্ভর ব্যাখ্যার মাধ্যমে করা হয়েছে। যে সকল রেওয়ায়েতে হযরত উসমান (রা.)-এর কুরআন সংকলনের কথা বর্ণনা করা হয়েছে সেখানে এ কথার উল্লেখ নেই যে, তিনি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন। বরং এর বিপরীত অনেক দলীল বিদ্যমান রয়েছে যেগুলোর বিশদ বর্ণনা সামনে আসবে। এখন কোনো সুস্পষ্ট ও সহীহ রেওয়ায়েত ব্যতীত এ কথা কিভাবে বলা সম্ভব হতে পারে যে, সাহাবায়ে কেরাম ওই ছয় হরফকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ব্যাপারটা মেনে নিয়েছেন, যা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বার বার আবদনের প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছিল?
প্রকৃত কথা হচ্ছে, যে সকল সাহাবায়ে কেরাম কুরআনুল কারীমের সংকলন ও বিন্যাসের মহান কাজে শুধু এ জন্যই গবেষণা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কাজ করে যাননি। যারা কুরআনুল কারীমের এক একটি শব্দ সংরক্ষণের জন্য নিজেদের পুরো জীবন ব্যয় করেছেন এবং যারা রহিত তেলাওয়াতের আয়াতগুলোও সংরক্ষণ করে উম্মতের নিকট পৌছিয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে এ কাজ হওয়াটা খুবই দূরবর্তী ব্যাপার যে, তাঁরা সবাই ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার জন্য এভাবে একমত হয়ে যাবেন যে, আজ সেই হরফগুলোর কোনো নাম ও নিশানাও বাকি থাকবে না। যে সকল আয়াতের তেলাওয়াত রহিত হয়ে গিয়েছিল, সাহাবায়ে কেরাম সেগুলোকেও কমপক্ষে ঐতিহাসিক ভিত্তিতে অবশিষ্ট রেখে আমাদের পর্যন্ত পৌছিয়েছেন। তাহলে কি সেই কারণ যে, ওই “হরফগুলো” যেগুলোর ব্যাপারে হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) ও মানেন যে, তা রহিত হয়নি-বরং কোনো কল্যাণার্থে কেরাত ও লিপিমালাকে বিলুপ্ত করা হয়েছে, সেগুলোর কোনো একটি উদাহরণ কোনো দুর্বল রেওয়ায়েতেও সংরক্ষিত হতে পারেনি!
এ কারণেই অধিকাংশ মুহাক্কিক উলামায়ে কেরাম হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর এই বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। যাদের বক্তব্যের বিশদ বর্ণনা সামনে আসবে।
[দুই.] ইমাম তহাভী (রহ.)-এর বক্তব্য:
সাত হরফের ব্যাপারে ইমাম তহাভী (রহ.) দ্বিতীয় মতটি গ্রহণ করেছেন। পূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁর মত অনুযায়ী কুরআনুল কারীম তো শুধু এক কুরাইশী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছিল। তবে উম্মতের সহজ-সাধ্যের জন্য এ অনুমতি প্রদান করা হয়েছে যে, তারা কুরআনুল কারীম তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে সাত পর্যন্ত সমার্থবোধক শব্দ ব্যবহার করতে পারবে। এই সমার্থবোধক শব্দগুলোও স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। এই অনুমতি প্রদানকেই হাদীসে কুরআনুল কারীম “সাত হরফ” এর উপর নাযিল হয়েছে বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই অনুমতি ছিল ইসলামের প্রাথমিক যুগে। পরবর্তীতে মানুষ যখন কুরআনী ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে গেল, তখন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগেই সেই অনুমতি রহিত হয়ে গেল। মৃত্যুর পূর্বে যখন শেষ বারের মতো তিনি হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে কুরআনুল কারীমের অনুশীলন করেন তখন সমার্থবোধক শব্দগুলো রহিত হয়ে গেল। এখন শুধু সেই হরফগুলোই অবশিষ্ট রয়েছে যেগুলোর উপর কুরআন নাযিল হয়েছিল। অর্থাৎ কুরাইশী হরফ। আর বাকি ছয় হরফ রহিত হয়ে গেছে।
হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্যের তুলনায় এই বক্তব্যটি এ দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তম যে, এতে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি রহিত করার সম্বন্ধ করা হয়নি যে, তাঁরা ছয় হরফকে রহিত করেছেন। বরং রহিত হবার সম্বন্ধ স্বয়ং নববী যুগের দিকে করা হয়েছে। তবে এ বক্তব্যের উপর একটি প্রশ্ন আরোপিত হয় যে, এই বক্তব্য অনুযায়ী ছয় হরফ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে নাযিলকৃত নয়। অথচ হযরত ওমর (রা.) ও হযরত হিশাম (রা.)-এর মাঝে যে মতবিরোধ হয়েছিল, সে ক্ষেত্রে হযরত হিশাম (রা.) রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে ‘সূরা ফুরকান’ নিজ পদ্ধতি অনুযায়ী পাঠ করলেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা শোনে বললেন- هكذا انزلت এই সূরা এভাবেই নাযিল করা হয়েছে)। এরপর হযরত হযরত ওমর (রা.) ও নিজের পদ্ধতি অনুযায়ী তেলাওয়াত করলেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা শোনেও বললেন- هكذا انزلت এই সূরা এভাবেই নাযিল করা হয়েছে।১৫২ এই শব্দমালা থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, উভয় পদ্ধতিটিই আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে নাযিলকৃত ছিল।
দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, যা পূর্বে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ বক্তব্যেও কেরাতের অবস্থানগত মর্যাদা ফুটে উঠেনি যে, তা সাত হরফের মধ্যে শামিল কি-না? যদি শামিল থাকে তাহলে ছয় হরফের মতো এ ক্ষেত্রেও বলতে হবে যে, [নাউযুবিল্লাহ এটা আল্লাহর পক্ষ হতে নাযিলকৃত নয়। অথচ এ কথা ইজমায়ে উম্মতের পরিপন্থী। আর যদি শামিল না থাকে তাহলে কেরাতের পৃথক অস্তিত্বের উপর কোনো দলীল নেই। কাজেই এ বক্তব্যের উপরও আত্মপ্রশান্তি লাভ হয় না।
[তিন.] সর্বোত্তম বক্তব্য
তৃতীয় বক্তব্য হলো সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ও মেনে নেওয়ার মতো। সাত হরফ দ্বারা যেহেতু কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকেই বুঝানো হয়েছে যার আলোচনা পূর্বে করা হয়েছে), তাই এই সাত হরফ আজও পুরোপুরি সংরক্ষিত ও অবশিষ্ট আছে এবং এগুলোর তেলাওয়াতও করা হয়। অবশ্য এতটুকু পার্থক্য রয়েছে যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে কেরাতসমূহের বিভিন্নতার সংখ্যা ছিল অনেক বেশি এবং তাতে সমার্থবোধক শব্দের অধিক্য ছিল। যার উদ্দেশ্য ছিল, যারা কুরআনের ভাষায় তেলাওয়াত করতে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়নি তাদেরকে বেশি থেকে বেশি সহজতার অবকাশ দেওয়া। পরবর্তীতে যখন আরবের লোকেরা কুরআনের ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে গেল তখন সমার্থবোধক শব্দের বহু মতানৈক্য বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে। যেমন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সর্বশেষ বার হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে দাওর করেন [যেটাকে হাদীসে আরযায়ে আখীরা বলা হয়। সে সময় অনেক কেরাতই রহিত করে দেওয়া হয়েছে। যার দলীল সামনে আসবে। কিন্তু যতগুলো কেরাত সে সময় অবশিষ্ট ছিল তার সবগুলোই আজ পর্যন্ত ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় চলে আসছে এবং এগুলোর তেলাওয়াত করা হয়।
“সাত হরফ”-এর পেঁচানো আলোচনার মধ্যে এটা সেই কণ্টকমুক্ত পথ যার উপর হাদীসের সবগুলো রেওয়ায়েত নিজ নিজ স্থানে সঠিক হয়ে যায়। এবং সেগুলোর মাঝে কোনো দ্বন্দ্ব বা মতবিরোধ বাকি থাকে না। আর না থাকে যুক্তিগ্রাহ্য কোনো আপত্তি। এ ব্যাপারে সম্ভাব্য আরো যত সন্দেহাবলী রয়েছে, আমরা সামনে বিস্তারিতভাবে সেগুলোর উত্তর দেব। যাতে এ বক্তব্যের যথার্থতা ভালোভাবে ফুটে উঠে। তবে এর আগে শোনে নিন যে, এ বক্তব্যের প্রবক্তাগণ কারা কারা? আমরা এখানে ওই মনীষীদের নাম এবং উদ্ধৃতি উপস্থাপন করব। যারা এ বক্তব্য গ্রহণ করেছেন অথবা হাফেয ইবনে জারীর তবারী (রহ.)-এর বক্তব্যকে খণ্ডন করেছেন।
এই বক্তব্যের প্রবক্তা যারা
ইলমে কেরাতের সর্বশ্রেষ্ঠ বিখ্যাত ইমাম, হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্রে হাফেয ইবনে কাছীর (রহ.)-এর শাগরিদ এবং হাফেয ইবনে হাযার (রহ.)-এর উস্তাদ, হাফেয আবুল খায়ের মুহাম্মদ ইবনুল জাযারী (রহ.) (মৃত্যু: ৮৩৩ হিজরী। স্বীয় গ্রন্থ “আন-নশরু ফী কিরাতিল আশর”-এর লিখেন-
وَأَمَّا كَوْنُ الْمَصَاحِفِ الْعُثْمَانِيَّة مُسْتَملَةً عَلَى جميع الأَحْرُفَ السَّبْعَةِ، فَإِنَّ هذه مسألة كبيرة اختَلَفَ الْعُلَمَاء فِيهَا : فَذَهَبَ جَمَاعَاتٌ من الْفُقَهَاءِ وَالْقُرَّاءِ وَالْمُتَكَلِّمِينَ إِلَى أَنَّ الْمَصَاحِفَ الْعُثْمَانِيَّةَ مُسْتَملة على جميع الأحرف السَّبْعَةِ، وَبَنَوْا ذَلِكَ عَلَى أَنَّهُ لَا يَجُوزُ عَلَى الْأُمَّةِ أَنْ تُهْمَلَ نَقْلَ شَيْءٍ مِنَ الْحُرُوف السبعة الَّتِي نَزَلَ الْقُرْآنُ بِهَا، وَقَدْ أَجْمَعَ الصَّحَابَةُ عَلَى نَقْلِ الْمَصَاحِفِ الْعُثْمَانِيَّة مِنَ الصُّحُفِ الَّتِي كَتَبَهَا أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ وَإِرْسَالَ كُلِّ مُصْحَفِ مِنْهَا إِلَى مِصْرٍ مِنْ أَمْصَارِ الْمُسْلِمِينَ وَأَجْمَعُوا عَلَى تَرْكِ مَا سَوَى ذلك، قَالَ هَؤُلَاءِ: وَلَا يَجُوزُ أَنْ يَنْهَى عَنِ الْقَراءة ببَعْضِ الْأَحْرُفَ السَّبْعَةَ وَلَا أَنْ يُجْمَعُوا عَلَى تَرْك شَيْءٍ مِنَ الْقُرْآن وَذَهَبَ جَمَاهِيرُ الْعُلَمَاء من السلف والخلف وأئمة الْمُسْلِمينَ إِلَى أَنَّ هَذه الْمَصَاحِفَ الْعُثمَانِيَّةَ مُسْتَملَةٌ عَلَى مَا يَحْتَمَلُهُ رَسْمُهَا مِنَ الْأَحْرُف السَّبْعَة فَقَط جَامعة لِلْعَرْضَة الأخيرة التي عرضها النَّبي – صلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – عَلَى جبْرَائِيلَ – عَلَيْهِ السَّلَامُ – مُتَضَمِّنَةٌ لَهَا لَمْ تَتْرُكَ حَرْفًا مِنْهَا.
)قُلْتُ( : وَهَذَا الْقَوْلُ هُوَ الَّذِي يَظْهَرُ صَوَابُهُ : لأَنَّ الْأَحَادِيثِ الصَّحِيحَة والآثار الْمَشْهُورَةَ الْمُسْتَفِيضَةً تَدُلُّ عَلَيْهِ وَتَشْهَدُ لَهُ
‘হযরত উসমান (রা.) যে মাসহাফ [কুরআনের কপি প্রস্তুত করেছিলেন তাতে সাত হরফ শামিল ছিল কি-না, তা অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। উলামায়ে কেরাম এতে মতবিরোধ করেছেন। ফুকাহা, কারী এবং কালাম শাস্ত্রবিদদের একটি দলের মতামত হলো, সাত হরফ মাসহাফে উসমানীর মাঝে শামিল রয়েছে। এ কথার ভিত্তি এর উপর যে, উম্মতের জন্য এটা বৈধ নয় যে, তারা ওই সাত হরফের মধ্য হতে কোনো একটি হরফকে বর্ণনা করা ছেড়ে দিবে, যেগুলোর উপর কুরআন নাযিল হয়েছে। আর সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সর্বসম্মতিতে উসমানী মাসহাফকে ওই সকল সহীফা থেকেই সংকলন করেছিলেন, যা হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত ওমর (রা.) লিপিবদ্ধ করেছিলেন। সেগুলোর প্রত্যেকটি কপি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন শহরে পাঠানো হয়েছিল এবং সেগুলো ব্যতীত যত সহীফা ছিল সবগুলো পরিহার করার উপর ঐক্যমত পোষণ করেছিলেন। তাঁরা বলেন, না সাত হরফের মধ্য হতে কোনো একটির কেরাতকে পরিহার করা জায়েয হবে আর না সাহাবায়ে কেরাম কুরআনের কোনো অংশ ছেড়ে দেওয়ার উপর ঐক্যমত পোষণ করবেন। আর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উলামায়ে কেরামের অধিকাংশের মত এটাই যে, মাসহাফে উসমানী ওই সকল হরফকে নিয়ে শামিল, যা এর রসমেরখতের মাঝে সন্নিবেশিত হয়েছে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বশেষ যখন হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে কুরআনুল কারীমের দাওর করেছিলেন, এর সমস্ত শব্দ এ মাসহাফে সন্নিবেশিত হয়ে গেছে। সেগুলোর কোনো হরফই সেই মাসহাফ থেকে বাদ পড়েনি।
আমার ধারণা, এটাই সে বক্তব্য যার বিশুদ্ধতা সুস্পষ্ট। কেননা বিশুদ্ধ হাদীসগুলো এবং প্রসিদ্ধ রেওয়ায়েতগুলো এর বিশুদ্ধতার প্রমাণ বহন করে এবং এর সাক্ষ্য প্রদান করে।১৫৩
আল্লামা বদরুদ্দীন আল-আইনী (রহ.) উদ্ধৃত করেন-
واختلف الأصوليون هل يقرأ اليوم على سبعة أحرف فمنعه الطبري وغيره وقال إنما يجوز بحرف واحد اليوم وهو حرف زيد ونحى إليه القاضي أبو بكر وقال الشيخ أبو الحسن الأشعري أجمع المسلمون على أنه لا يجوز حظر ما وسعه الله تعالى من القرآت بالأحرف التي أنزلها الله تعالى ولا يسوغ للأمة أن تمنع ما يُطلقه الله تعالى بل هي موجودة في قراءتنا وهي مفرقة في القرآن غير معلومة بأعيانها فيجوز على هذا وبه قال القاضي أن يقرأ بكل ما نقله أهل التواتر من غير تمييز حرف من حرف فيحفظ حرف نافع بحرف الكسائي وحمزة ولا حرج في ذلك
‘বর্তমানে কুরআনুল কারীম সাত হরফের উপর পড়া হয় কি-না, এ ব্যাপারে উসূলী তথা নীতি নির্ধারক উলামায়ে কেরামের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। হাফেয ইবনে জারীর তবারী (রহ.) ও কতক উলামায়ে কেরাম তা অস্বীকার করে বলেন, বর্তমানে শুধু এক হরফের উপরই কুরআনুল কারীম পাঠ করা জায়েয। আর তা হচ্ছে, হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর হরফ। কাযী আবু বকর রাযী (রহ.) এ মতের দিকেই ঝুঁকে পড়েছেন। কিন্তু ইমাম আবুল হাসান আশআরী (রহ.) বলেন, মুসলিম উম্মাহ এ ব্যাপারে একমত যে, মহান আল্লাহ যেসব হরফের উপর কুরআন অবতীর্ণ করে সহজ-সাধ্য করেছেন, সেগুলো থেকে বিরত থাকা জায়েয নেই। আর আল্লাহ তাআলা যে জিনিসের অনুমতি প্রদান করেছেন সেগুলোকে প্রত্যাখ্যান করার উম্মতের অধিকার নেই। বরং বস্তু বতা তো হলো এই যে, সাত হরফের সবগুলোই আমাদের প্রচলিত কেরাতের মাঝে বিদ্যমান রয়েছে এবং কুরআনুল কারীমের মাঝে বিচ্ছিন্ন ও অনির্দিষ্টভাবে শামিল আছে। এ হিসেবে সে হরফগুলোর কেরাত আজও জায়েয আছে। আর এটাই কাযী১৫৪ সাহেবের মত। যত হরফ তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় বর্ণিত আছে সেগুলোর প্রত্যেকটিই পড়া জায়েয। এক হরফ থেকে অন্য হরফের পার্থক্য করারও প্রয়োজন নেই। নাফে (রহ.)-এর কেরাতকে কেসাই এবং হামযা (রহ.)-এর কেরাতের সাথে মিলিয়ে যদি আত্মস্থ করা হয় তাতে কোনো অসুবিধা নেই।১৫৫
আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশী (রহ.) কাযী আবু বকর (রহ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে লিখেন-
وَالسَّابِعُ: اخْتَارَهُ الْقَاضِي أَبُو بَكْرٍ وَقَالَ الصَّحِيحُ أَنَّ هَذِهِ الْأَحْرُفَ السَّبْعَةَ ظَهَرَتْ وَاسْتَفَاضَتْ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَضَبَطَهَا عَنْهُ الْأَئِمَّةُ وَأَثْبَتَهَا عُثْمَانُ وَالصَّحَابَةُ فِي الْمُصْحَفِ
‘সপ্তম বক্তব্যটি কাযী আবু বকর১৫৬ (রহ.) গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, সাত হরফের সবগুলোই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রসিদ্ধির সাথে বর্ণিত আছে। আইম্মায়ে কেরাম এগুলোকে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। হযরত উসমান (রা.) ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম এগুলোকে তাঁদের মাসহাফে বিদ্যমান রেখেছেন।’১৫৭
আল্লামা ইবনে হযম (রহ.)ও হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্যকে কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার বক্তব্যটি একেবারেই ভুল। হযরত উসমান (রা.) যদি এমন করতেও চাইতেন তবুও সক্ষম হতেন না। কারণ মুসলিম বিশ্বের আনাচে-কানাচে এ সাত হরফের হাফেযে ভরপুর ছিল। তিনি লিখেন-
وأما قول من قال أبطل الأحرف الستة فقد كذب من قال ذلك ولو فعل عثمان ذلك أو أراده لخرج عن الإسلام ولما مطل ساعة بل الأحرف السبعة كلها عندنا قائمة كما كانت مثبوتة في القراآت المشهورة المأثورة
‘আর যারা বলেন যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছেন, তারা একেবারেই ভুল বলেছেন। যদি হযরত উসমান (রা.) এমনটি করতেন বা এর ইচ্ছা করতেন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি ইসলাম থেকে বের হয়ে যেতেন।১৫৮ বরং বাস্তবতা হলো, সাত হরফের সবগুলোই অবিকল আমাদের নিকট বিদ্যমান রয়েছে এবং মাশহুর কেরাতের মধ্যে সংরক্ষিত রয়েছে।’১৫৯
মুয়াত্ত্বা ইমাম মালেকে’র বিখ্যাত ভাষ্যকার, আল্লামা আবুল ওলীদ বাজি মালেকী (রহ.) “সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যা “সাত কেরাত” দ্বারা করার পর লিখেন-
فَإِنْ قِيلَ هَلْ يَقُولُونَ إِنَّ جَمِيعَ هَذِهِ السَّبْعَةِ الْأَحْرُفِ ثَابِتَةٌ فِي الْمُصْحَفِ فَإِنَّ الْقِرَاءَةَ بِجَمِيعِهَا جَائِزَةٌ قِيلَ لَهُمْ كَذَلِكَ نَقُولُ وَالدَّلِيلُ عَلَى صِحَّةِ ذَلِكَ قَوْلُهُ عَزَّ وَجَلَّ إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ وَلَا يَصِحُّ انْفِصَالُ الذِّكْرِ الْمُنَزَّلِ مِنْ قِرَاءَتِهِ فَيُمْكِنُ حِفْظُهُ دُونَهَا وَمِمَّا يَدُلُّ عَلَى صِحَّةِ مَا ذَهَبْنَا إِلَيْهِ أَنَّ ظَاهِرَ قَوْلِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم يَدُلُّ عَلَى أَنَّ الْقُرْآنَ أُنْزِلَ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ تَيْسِيرًا عَلَى مَنْ أَرَادَ قِرَاءَتَهُ لِيَقْرَأَ كُلُّ رَجُلٍ مِنْهُمْ بِمَا تَيَسَّرَ عَلَيْهِ وَبِمَا هُوَ أَخَفُّ عَلَى طَبْعِهِ وَأَقْرَبُ إِلَى لُغَتِهِ لِمَا يَلْحَقُ مِنَ الْمَشَقَّةِ بِذَلِكَ الْمَأْلُوفِ مِنَ الْعَادَةِ فِي النُّطْقِ وَنَحْنُ الْيَوْمَ مَعَ عُجْمَةِ أَلْسِنَتِنَا وَبُعْدِنَا عَنْ فَصَاحَةِ الْعَرَبِ أَحْوَجُ
‘যদি প্রশ্ন করা হয় যে, “আপনাদের বক্তব্য কি এ রকম যে, এই সাত হরফ কি আজও মাসহাফে বিদ্যমান আছে? তাইতো আপনাদের মত অনুযায়ী সবগুলোর কেরাত জায়েয।” তখন আমরা বলব, হ্যাঁ আমাদের বক্তব্য এটাই। আর এটা বিশুদ্ধ হওয়ার দলীল হলো, আল্লাহ তাআলার বাণী إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ [নিশ্চয় আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক]। আর কুরআনুল কারীমকে তার কেরাত থেকে এভাবে পৃথক করা যাবে না যে, কুরআন তো সংরক্ষিত রয়েছে আর তার কেরাত বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
আমাদের বক্তব্যের বিশুদ্ধতার স্বপক্ষে আরো একটি দলীল হলো এই যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ বহন করে যে, কুরআনকে সাত হরফের উপর নাযিল করা হয়েছে, যাতে তেলাওয়াতকারীর জন্য সহজ হয় যে, প্রত্যেক ব্যক্তি ওই পদ্ধতিতে তেলাওয়াত করতে পারে যে পদ্ধতি তার জন্য সহজ হয়। তার স্বভাব-রুচির দিক থেকে অধিক সহজ হয় এবং ভাষার দিক থেকে অধিক নিকটবর্তী হয়। কেননা, কথোপকথনের মধ্যে যা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায় তা পরিত্যাগ করা খুবই কঠিন। বর্তমান যুগে আমরা অনারবী এবং আরবী ভাষার পাণ্ডিত্য থেকে দূরে থাকার কারণে এ সহজতার প্রতি আমরা অধিক মুখাপেক্ষী।১৬০
ইমাম গাযালী (রহ.) স্বীয় উসূলে ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ “আল-মুসতাসফা”-এ কুরআনুল কারীমের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লিখেন-
مَا نُقِلَ إِلَيْنَا بَيْنَ دَفَّتَي الْمُصْحَفِ عَلَى الْأَحْرُفِ السَّبْعَةِ الْمَشْهُورَةِ نَقْلًا مُتَوَاتِرًا.
‘মাসহাফের পার্শ্বদ্বয়ের মাঝখানে সুপ্রসিদ্ধ সাত হরফের উপর ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় যা আমাদের পর্যন্ত বর্ণিত হয়ে এসেছে [তাই কুরআন]।’১৬১
এর দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, ইমাম গাযালী (রহ.)ও আজ পর্যন্ত সাত হরফ বাকি থাকার প্রবক্তা।
আর মোল্লা আলী কারী (রহ.) লিখেন-
وَكَأَنَّهُ – عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ – كُشِفَ لَهُ أَنَّ الْقِرَاءَةَ الْمُتَوَاتِرَةَ تَسْتَقِرُّ فِي أُمَّتِهِ عَلَى سَبْعٍ، وَهِيَ الْمَوْجُودَةُ الْآنَ الْمُتَّفَقُ عَلَى تَوَاتُرِهَا، وَالْجُمْهُورُ عَلَى أَنَّ مَا فَوْقَهَا شَاذٌّ لَا يَحِلُّ الْقِرَاءَةُ بِهِ
‘মনে হয় যেন হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর বিষয়টা উন্মোচিত হয়ে গিয়েছিল যে, তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় বর্ণিত কেরাতগুলো শেষ পর্যন্ত তাঁর উম্মতের মাঝে সাত হরফের উপরই বাকি থেকে যাবে। আর তাইতো আজ এগুলোই বিদ্যমান আছে এবং সবাই এগুলোর তাওয়াতুরের ব্যাপারে একমত। জমহুর উলামায়ে কেরামের মত হলো, এগুলো ব্যতীত আর যত কেরাত আছে তা [প্রায়] শায বা অপ্রচলিত এবং সেগুলোর তেলাওয়াত জায়েয নেই।’১৬২
এতে মোল্লা আলী কারী (রহ.)-এর এ কথাটি যদিও সঠিক নয় যে, ‘সাত কেরাত ব্যতীত বাকি অন্য সব কেরাত শায বা অপ্রচলিত।’ কারণ ইলমে কেরাত বিশেষজ্ঞগণ কঠোরভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।১৬৩ কিন্তু এর দ্বারা এটা নিশ্চিত জানা যায় যে, তাঁর মত অনুযায়ী সাত হরফ আজও বাকি আছে। হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)-এর বক্তব্য পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি “সাত হরফ”-এর মাঝে ‘সাত’ সংখ্যাটি আধিক্যের অর্থে প্রয়োগ করেন। এর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন-
“হাদীসের মধ্যে ‘সাত’ শব্দটি সংখ্যাধিক্যের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। নির্দিষ্ট সংখ্যা বুঝানোর জন্য নয়। ‘দশ’ কেরাতের উপর আইম্মায়ে কেরাম ঐক্যমত পোষণ করেছেন এবং দশ কেরাতের প্রত্যেকটির জন্য দু’জন করে বর্ণনাকারী রয়েছেন। একজন অপর জনের সাথে মতবিরোধ করেন। ফলে কেরাতের সংখ্যা বিশ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায়।”১৬৪
এই উক্তিতে যদিও শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) জমহুর উলামায়ে কেরামের সাথে মতবিরোধ করে “সাত” সংখ্যাটিকে সংখ্যাধিক্যের জন্য সাব্যস্ত করেছেন। [হয়তো বিশটি কেরাতকে কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারে সীমাবদ্ধ করার বিষয়টি তাঁর কাছে সুস্পষ্ট হয়নি] কিন্তু এর দ্বারা এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ হয়ে পড়ে যে, হাদীসে যে হরফগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে শাহ সাহেবের নিকট সেগুলো কেরাতই এবং সেগুলো রহিত বা বা পরিত্যক্ত হয়নি; বরং আজও বিদ্যমান রয়েছে।
শেষ জামানায় দীনি জ্ঞানের ইমাম, যুগশ্রেষ্ঠ মুহাক্কিক এবং হাফেযে হাদীস আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) এই হাদীসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সংক্ষিপ্ত ভাষায় মাসআলাটির স্বরূপ এমনভাবে উন্মোচন করেছেন যে, এটাকে শেষ হরফ বলা উচিত। এখানে আমরা তাঁর পুরো তাহকীক ও গবেষণাটি হুবহু উল্লেখ করছি-
واعلم انهم اتفقوا على انه ليس المراد من سبعة احرف القراة السبعة المشهورة بان يكون كل حرف منها قراءة من تلك القراءات، اعنى انه لا انطباق بين القراءات السبع والاحرف السبعة كما يذهب اليه الوهم بالنظر الى لفظ السبعة فى الموضعين، بل بين ذلك الاحرف والقراءة عموم وخصوص وجهى، كيف، وان القراءات لاتنحصر فى السبعة، كما صرح ابن الجوزى فى رسالة النشر فى قراءة العشر، وانما اشتهرت السبعة على الالسنة لانها التى جمعها الشاطبي ثم اعلم ان بعضهم فهم ان بين تلك الاحرف تغايرا من كل وجه، بحيث لارباط بينها وليس كذلك، بل قد يكون الفرق بالمجرد والمزيد واخرى الابواب، ومرة باعتبار الصيغ من الغائب والحاضر، وطورا بتحقيق الهمزة وتسهيلها فكل هذه التغييرات يسيرة كانت او كثيرة حرف براسه، وغلط من فهم ان هذه الاحرف متغايرة كلها بحيث يتعذر اجتماعها اما انه كيف عدد السبعة فتوجه اليه ابن الجوزى وحقق ان التصرفات كلها ترجع الى السبعة و راجع القسطلاني والزرقاني، بقى الكلام فى ان تلك الاحرف كلها موجودة او رفع بعضها وبقى البعض فاعلم ان ماقرأة جبرئيل عليه السلام فى العرضة الاخيرة على النبي صلى الله عليه وسلم كله ثابت فى مصحف عثمان، ولما يتعين معنى الاحرف عند ابن جرير ذهب الى رفع الاحرف الست منها وبقى واحد فقط.
‘জেনে রাখুন, সমস্ত উলামায়ে কেরাম এ কথার উপর একমত যে, সাত হরফ দ্বারা প্রসিদ্ধ সাত কেরাত উদ্দেশ্য নয় এবং এমনও নয় যে, প্রত্যেক হরফ ওই সাত কেরাতের মধ্য হতে একটি কেরাত। ফলকথা, সাত কেরাত ও সাত হরফ এক কথা নয়। যা প্রথম দৃষ্টিতে সাত হরফ দ্বারা এমন ধারণা জন্ম নেয়। বরং সাত হরফ ও সাত কেরাতের মাঝে উম্মুম-খুসূস মিন ওয়াজহিন১৬৫-এর সম্পর্ক। আর কেরাত যখন সাত সংখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় তখন উভয়টা এক হতে পারে কি করে? যেমন, আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.) “আন-নশরু ফী কিরাআতিল আশর” কিতাবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। তবে “সাত কেরাত” শব্দটি মানুষের মুখে মুখে প্রসিদ্ধি লাভ করার কারণ হলো, আল্লামা শাত্বীবী (রহ.) এই সাত প্রকার কেরাতকে গ্রন্থনা করেছেন। অতঃপর এ কথাটাও মনে রাখবেন যে, কোনো কোনো লোক মনে করে যে, সাত হরফের মাঝে পরস্পর সম্পূর্ণ “বিপরীতমুখী” সম্পর্ক, যে একটির সাথে অপরটির কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ বাস্তবতা এমন নয়। বরং কখনো কখনো দুই হরফের মাঝে একবচন ও বহুবচনের মধ্যে পার্থক্য হয়ে থাকে। আবার কখনো ব্যাকরণগত বিষয়ে। আবার কখনো গায়েব [নাম পুরুষ] ও হাযের [মধ্যম পুরুষ]-এর শব্দের পার্থক্য হয়ে থাকে। কখনো শুধু হামযাকে বাকি রাখার ও সেটাকে তাসীল করার পার্থক্য হয়। ব্যাস, এ সকল পরিবর্তন চাই সাধারণ হোক কিংবা বড় বড়, সবই স্বতন্ত্র একটি হরফ। আর যারা এ কথা মনে করেন যে, এ হরফগুলোর মাঝে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী সম্পর্ক এবং এগুলোকে এক শব্দে একত্রিত করা সম্ভব নয়, তারা ভুল করেছেন। বাকি থাকল এ কথা যে, হাদীসে “সাত” সংখ্যাটি দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে? আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর উত্তর দিয়েছেন। তিনি তাহকীক বর্ণনা করেছেন যে, এ সমস্ত পরিবর্তন-পরিবর্ধন সাত প্রকার। এ মাসআলায় ‘কাসতালানী’ (রহ.) ও ‘যুরকানী’ (রহ.)-[এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ] দেখে নিন।
এখন বাকি থাকল শুধু এ কথা যে, এ সকল হরফ এখন আছে নাকি কিছু হরফ বিলুপ্ত করা হয়েছে আর কিছু হরফ অবশিষ্ট আছে? সুতরাং এটা জেনে নিন যে, হযরত জিবরাঈল (আ.) কুরআনুল কারীমের আরযায়ে আখীরার সময় যতগুলো হরফ পাঠ করেছিলেন, তার সবগুলোই মাসহাফে উসমানীতে বিদ্যমান রয়েছে। যেহেতু ইবনে জারীর (রহ.)-এর নিকট হরফের অর্থ সুস্পষ্ট নয় তাই তিনি এ মাযহাব গ্রহণ করেছেন যে, ছয় হরফকে বিলুপ্ত করা হয়েছে আর এক হরফ অবশিষ্ট রয়েছে।১৬৬
অনুরূপভাবে মিসরের পরবর্তী উলামায়ে কেরামের মাঝে সুপ্রসিদ্ধ গবেষক আল্লামা যাহেদ কাউসারী (রহ.) [মৃত্যু ১৩৭১ হিজরী] লিখেন-
والاول رأى القائلين بان الاحرف السبعة كانت في مبدأ الامر ثم نسخت العرضة الاخيرة في عهد النبي صلى الله عليه وسلم فلم يبق الا حرف واحد و رأى القائلين بان عثمان رضى الله عنه جمع الناس على حرف واحد ومنع من الستة الباقية لمصلحة، واليه نحا ابن جرير وتهيبه ناس فتابعوه لكن هذا رأى خطير قام ابن حزم باشد النكير عليه في الفصل وفي الاحكام وله الحق في ذلك، والثاني رأى القائلين بان هي الاحرف السبعة المحفوظة كما هي في العرضة الاخيرة. الخ..
‘প্রথম মতটি [বর্তমান কেরাত এক হরফেরই বিভিন্ন রূপ] সেসব মনীষীর, যারা বলেন-সাত হরফ ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল। অতঃপর আরযায়ে আখীরার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগেই তা রহিত হয়ে গেছে। বর্তমানে শুধু একটিই অবশিষ্ট রয়েছে। এই মতটি সেসব ব্যক্তিদেরও যারা বলেন, হযরত উসমান (রা.) সমস্ত মানুষকে এক হরফের উপর একত্রিত করেছিলেন এবং বিশেষ কল্যাণার্থে বাকি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করেছিলেন। হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর মতও এটাই এবং এ ক্ষেত্রে বহু লোক তাঁর কথায় প্রভাবিত হয়ে তাঁর পিছু ধরেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা খুবই স্পর্শকাতর ও বিপজ্জনক রায়। আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.) “আল-ফছ্ল” এবং “আল-আহকাম”-এ এর কড়া বিরোধিতা করেছেন, যা তাঁর অধিকার ছিল। দ্বিতীয় মত হচ্ছে [বর্তমান কেরাতই সাত হরফ] সেসব ব্যক্তিদের, যারা বলেন-এগুলোই সেই সাত হরফ আরযায়ে আখীরা থেকে যা সংরক্ষিত হয়ে আসছে।১৬৭
আমরা উপরোল্লিখিত এ বক্তব্য ও মতামতগুলো বিস্তারিতভাবে এ জন্য পেশ করলাম যে, বর্তমান যুগে আল্লামা ইবনে জারীর তবারী (রহ.)-এর বক্তব্যটি অধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। আর আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.)-এর সুমহান ব্যক্তিত্বের দিকে তাকিয়ে তাঁকে সাধারণত সব ধরনের সন্দেহ ও সংশয়ের ঊর্ধ্বে মনে করা হয়। এর ভিত্তিতেই আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর এ পরিচ্ছন্ন ও সুস্পষ্ট বক্তব্যটি হয়তো মানুষ জানে না অথবা জানা থাকলেও সেটাকে একটা দুর্বল মত বলে মনে করা হয়। অথচ পূর্বোক্ত আলোচনার আলোকে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইমাম মালেক (রহ.), আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.), আল্লামা আবুল ফযল রাজী (রহ.), কাযী আবু বকর ইবনে তাইয়্যেব (রহ.), ইমাম আবুল হাসান আশআরী (রহ.), কাযী ইয়ায (রহ.), আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.), আল্লামা আবুল ওলীদ বাজী (রহ.), ইমাম গাযালী (রহ.) ও মোল্লা আলী কারী (রহ.)-এর ন্যায় উলামায়ে কেরাম এ কথার উপর ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, সাত হরফের সবগুলো আজও সংরক্ষিত ও বিদ্যমান রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আরযায়ে আখীরার সময় যতগুলো হরফ বাকি ছিল, তার মধ্য হতে কোনো হরফ না রহিত হয়েছে আর না পরিত্যক্ত হয়েছে। বরং মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) নিজের এ বক্তব্যকে নিজের পূর্বে জমহুর উলামায়ে কেরামের রায় বলেও সাব্যস্ত করেছেন।
পরবর্তী উলামায়ে কেরামের মাঝে হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ (রহ.), হযরত আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) এবং আল্লামা যাহেদ কাউসারী (রহ.)-এর বক্তব্যও এটাই। অনুরূপভাবে মিসরের প্রসিদ্ধ উলামায়ে কেরাম আল্লামা নাযীত মুতীয়ী (রহ.), আল্লামা খাজারী দিম্ইয়াাতী (রহ.) ও শায়েখ আবদুল আযীম যুরকানী (রহ.)ও এ বক্তব্যকে গ্রহণ করেছেন।১৬৮ অতএব, প্রমাণপঞ্জির দিকে না তাকিয়ে শুধু ব্যক্তিত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও এটা অত্যন্ত উঁচু মানের একটা বক্তব্য।
এ বক্তব্যের দলীলসমূহ
এখন সে সকল দলীল উপস্থাপন করছি, যেগুলো দ্বারা এ বক্তব্যটি শক্তিশালী হয়। এর কিছু দলীল তো উপরোক্ত বক্তব্যগুলোতে এসে গেছে।
অতিরিক্ত কিছু দলীল নিম্নে পেশ করা হলো :
১. কুরআনুল কারীমের আয়াত- إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ [নিশ্চয় আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক] সুস্পষ্টভাবে এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, কুরআনের যে সকল আয়াত স্বয়ং আল্লাহ তাআলা রহিত করেননি সেগুলো কেয়ামত পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে। অপর দিকে সে সকল হাদীস পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলো দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, কুরআনের সাত হরফ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে নাযিলকৃত ছিল। তাই উল্লিখিত আয়াতের সুস্পষ্ট দাবী হলো, ওই সাত হরফ কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকা।
২. হযরত উসমান (রা.) যদি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে শুধু এক হরফ দ্বারা কুরআন প্রস্তুত করে থাকেন, তাহলে স্পষ্ট করে কোথাও তার কোনো প্রমাণ অবশ্যই পাওয়া যাওয়া উচিত ছিল। অথচ এর কোনো প্রমাণ তো পাওয়া যায়ই না; বরং রেওয়ায়েতসমূহ থেকে জানা যায় যে, মাসহাফে উসমানীর মাঝে সাত হরফের সবগুলোই বিদ্যমান ছিল। যেমন, রেওয়ায়েতে সুস্পষ্টভাবে এ কথা উল্লেখ আছে যে, হযরত উসমান (রা.) স্বীয় মাসহাফ হযরত আবু বকর (রা.) কর্তৃক সংকলিত মাসহাফের অনুকরণে লিপিবদ্ধ করেছিলেন এবং লিপিবদ্ধ করার উভয় কপিকে মিলানোও হয়েছিল। এ ব্যাপারে হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.) বলেন-
فعرضت المصحف عليها فلم يختلفا في شيئ
“আমি ওই সহীফাগুলো দ্বারা মাসহাফকে মিলিয়ে দেখেছি, উভয়ের মধ্যে কোনো ধরনের পার্থক্য [বেশ-কম] ছিল না।’১৬৯
এ কথা সুস্পষ্ট যে, হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)ও স্বীকার করেন যে, হযরত আবু বকর (রা.)-এর জামানায় সাত হরফের সবগুলোই বিদ্যমান ছিল। তাই হযরত আবু বকর (রা.)-এর সহীফাগুলোতে নিশ্চিতভাবে কুরআনুল কারীমকে সাত হরফে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কাজেই হযরত উসমান (রা.) যদি ছয় হরফকে বিলুপ্তই করে দিয়ে থাকেন তাহলে হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)- এর এ কথা কিভাবে সঠিক হতে পারে যে, “উভয়ের মাঝে কোনো পার্থক্য বা কম-বেশি ছিল না।”?
৩. আল্লামা ইবনুল আম্বারী (রহ.) “কিতাবুল মাসাহিফ”-এ প্রসিদ্ধ তাবেঈ হযরত উবায়দা সালমানী (রহ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করেন-
قراءتنا التي جمع الناس عثمان عليها هي العرضة الأخيرة
‘আমাদের ওই কেরাত, যার উপর হযরত উসমান রা.) মানুষকে একত্রিত করেছেন, সেটা ছিল “আরযায়ে আখীরা”-এর কেরাত।’১৭০
হযরত উবায়দা (রা.)-এর এ বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে যে, আরযায়ে আখীরা [হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কুরআনের শেষ দাওর]-এর সময় যে হরফগুলো বাকি ছিল, হযরত উসমান (রা.) ওই হরফের কোনোটিই ছাড়েননি।
এ ক্ষেত্রে কোনো কোনো আলেম বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আরযায়ে আখীরা তো শুধু এক কুরাইশী হরফের উপরই হয়েছিল। আর এটার উপরই হযরত উসমান (রা.) সাবাইকে একত্রিত করেছিলেন। কিন্তু এ কথা খুবই দূরবর্তী যে, যে হরফগুলো রহিত হয়েছিল না, সেগুলো এই দাওর [আরযায়ে আখীরা] থেকে বাদ পড়ে যাবে।
৪. প্রসিদ্ধ তাবেঈ হযরত মুহাম্মদ ইবনে সিরীন (রহ.) থেকে আল্লামা ইবনে সা’দ (রহ.) এ বক্তব্য উদ্ধৃত করেন-
كان جبريل يعرض القرآن على النبي صلى الله عليه وسلم كل عام مرة في رمضان فلما كان العام الذي توفي فيه عرضه عليه مرتين قال محمد فأنا أرجو أن تكون قراءتنا العرضة الأخيرة
‘হযরত জিবরাঈল (আ.) প্রতি বছর একবার রমযান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে কুরআন উপস্থাপন করতেন। যখন তাঁর ইন্তেকালের বছর আসল তখন হযরত জিবরাঈল (আ.) দু’বার কুরআন উপস্থাপন করেছেন। [মুহাম্মাদ ইবনে সিরীন (রহ.) বলেন,] আমি আশাবাদী যে, আমাদের বর্তমান কেরাত ওই আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী।’১৭১
৫. হযরত আমের শা’বী (রহ.) ছিলেন প্রসিদ্ধ একজন তাবেঈ। যিনি সাতশত সাহাবায়ে কেরাম থেকে ইলমী ফায়দা অর্জন করেছেন। আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.) তাঁর থেকেও এ ধরনের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন।
উল্লিখিত ব্যক্তিদ্বয় ছিলেন তাবেঈ এবং হযরত উসমান (রা.)-এর যুগের অত্যন্ত নিকটবর্তী ব্যক্তিত্ব। তাই এ ক্ষেত্রে তাঁদের বক্তব্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মর্যাদা রাখে।
৬. সমগ্র হাদীসের ভাণ্ডারে আমরা কোনো একটি রেওয়ায়েতেও এমন পাইনি, যা দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে দু’ধরনের মতানৈক্য ছিল। এক. সাত হরফের মতানৈক্য। দুই. কেরাতের মতানৈক্য। এর পরিবর্তে বহু রেওয়ায়েত দ্বারা এ কথা জানা যায় যে, উভয়টি অভিন্ন বিষয়। কেননা, একই ধরনের মতানৈক্যের উপর একই সময়ে “কেরাতের মতানৈক্য” ও “হরফের মতানৈক্য” শব্দ দু’টি প্রয়োগ করা হয়েছে। যেমন হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) বলেন-
عَنْ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ، قَالَ: كُنْتُ فِي الْمَسْجِدِ، فَدَخَلَ رَجُلٌ يُصَلِّي، فَقَرَأَ قِرَاءَةً أَنْكَرْتُهَا عَلَيْهِ، ثُمَّ دَخَلَ آخَرُ فَقَرَأَ قِرَاءَةً سِوَى قِرَاءَةِ صَاحِبِهِ، فَلَمَّا قَضَيْنَا الصَّلَاةَ دَخَلْنَا جَمِيعًا عَلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقُلْتُ: إِنَّ هَذَا قَرَأَ قِرَاءَةً أَنْكَرْتُهَا عَلَيْهِ، وَدَخَلَ آخَرُ فَقَرَأَ سِوَى قِرَاءَةِ صَاحِبِهِ، فَأَمَرَهُمَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَرَآ، فَحَسَّنَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَأْنَهُمَا، فَسَقَطَ فِي نَفْسِي مِنَ التَّكْذِيبِ، وَلَا إِذْ كُنْتُ فِي الْجَاهِلِيَّةِ، فَلَمَّا رَأَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا قَدْ غَشِيَنِي، ضَرَبَ فِي صَدْرِي، فَفَضْتُ عَرَقًا وَكَأَنَّمَا أَنْظُرُ إِلَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ فَرَقًا، فَقَالَ لِي: ” يَا أُبَيُّ أُرْسِلَ إِلَيَّ أَنِ اقْرَأِ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفٍ، فَرَدَدْتُ إِلَيْهِ أَنْ هَوِّنْ عَلَى أُمَّتِي، فَرَدَّ إِلَيَّ الثَّانِيَةَ أَقْرَأْهُ عَلَى حَرْفَيْنِ، فَرَدَدْتُ إِلَيْهِ أَنْ هَوِّنْ عَلَى أُمَّتِي، فَرَدَّ إِلَيَّ الثَّالِثَةَ اقْرَأْهُ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ
‘আমি মসজিদে ছিলাম। একব্যক্তি প্রবেশ করে নামায আদায় করতে লাগল। সে এমন এক কেরাত পাঠ করল যা আমার কাছে অপরিচিত বলে মনে হলো। অতঃপর অপর এক ব্যক্তি এসে মসজিদে প্রবেশ করল। সে প্রথম ব্যক্তির কেরাত ব্যতীত অন্য এক ধরনের কেরাত পাঠ করল। আমরা যখন নামায সমাপ্ত করলাম তখন সবাই মিলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-নিকট উপস্থিত হলাম। আমি আরয করলাম যে, এ ব্যক্তি এমন এক কেরাত পাঠ করেছে যা আমার কাছে অপরিচিত বলে মনে হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় আরেক ব্যক্তি এসে প্রথম ব্যক্তির কেরাতের চেয়ে ভিন্ন আরেক ধরনের কেরাত পাঠ করল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উভয়কে পড়ার নির্দেশ দিলেন। তারা উভয়ে পাঠ করার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উভয়ের কেরাতকে সুন্দর হয়েছে বলে মন্তব্য করলেন। এতে আমার অন্তরে মিথ্যাচারিতার এমন এমন ওয়াসওয়াসা আসতে লাগল, জাহেলী যুগেও যা আমার খেয়ালে আসত না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আমার এ অবস্থা দেখলেন তখন তিনি আমার বক্ষে [আলতো] আঘাত করলেন। এতে আমি ঘামে স্নাত হয়ে গেলাম এবং ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় আমি এমন অনুভব করলাম, আমি যেন আল্লাহকে দেখছি। এরপর তিনি আমাকে বললেন, হে উবাই! আমার পালনকর্তা আমার নিকট পয়গাম পাঠিয়েছেন যে, আমি কুরআনকে এক হরফে পাঠ করব। প্রতি উত্তরে আমি আবেদন করলাম, আমার উম্মতের জন্য সহজ করুন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা দ্বিতীয় বারের জন্য পয়গাম পাঠালেন যে, আমি কুরআনকে দুই হরফের উপর পাঠ করব। এর উত্তরেও আমি আবেদন করলাম, আমার উম্মতের জন্য সহজ করুন। তখন আল্লাহ তাআলা তৃতীয়বার পয়গাম পাঠালেন যে, আমি যেন এটাকে সাত হরফের উপর পাঠ করি।’১৭২
এক রেওয়ায়েতে হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) উভয় ব্যক্তির তেলাওয়াতের মতানৈক্যকে বার বার কেরাতের মতানৈক্য বলে উল্লেখ করেছেন। আর এটাকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাত হরফের মতানৈক্য বলে উল্লেখ করেছেন। এর দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, নববী যুগে কেরাতের মতানৈক্য ও হরফের মতানৈক্যকে এক ও অভিন্ন বিষয় বুঝা হতো। উপরন্তু এর বিপরীত এমন কোনো দলীল-প্রমাণ নেই, যা উভয়টার পৃথক হবার প্রমাণ বহন করে। এর দ্বারা প্রমাণ হয় যে, উভয়টা এক ও অভিন্ন বিষয়। আর কেরাত যখন সংরক্ষিত হওয়ার বিষয়টি তাওয়াতুর ও ইজমা দ্বারা প্রমাণিত, তখন এর দ্বারা বুঝা যায় যে, সাত হরফও আজও সংরক্ষিত।
উপরোল্লিখিত দলীল-প্রমাণগুলোর আলোকে এ কথা একেবারে সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, আরযায়ে আখীরার সময় সাত হরফের যে অংশ বাকি ছিল, তার সম্পূর্ণটাই মাসহাফে উসমানীতে সংরক্ষণ করা হয়েছিল এবং আজ পর্যন্ত তা সংরক্ষিত হয়েই চলে আসছে। এটাকে কেউ রহিত করেনি এবং এর কেরাতকে নিষিদ্ধও করা হয়নি। তবে এটাকে পরিপূর্ণরূপে স্পষ্ট করার জন্য এর উপর আরোপিত সম্ভাব্য প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া আবশ্যক।
এ বক্তব্যের উপর আরোপিত প্রশ্নগুলো ও তার জবাব
প্রশ্ন : ১. যদি হযরত উসমান (রা.) সাত হরফের সবগুলোকেই অবশিষ্ট রাখেন, তাহলে তাঁর সেই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কীর্তি কোন্টি ছিল যার জন্য তাঁকে “জামিউল কুরআন” বা কুরআনের সংকলক বলা হয়?
জবাব : যদিও অসংখ্য সাহাবায়ে কেরামের কুরআনুল কারীম মুখস্থ ছিল, কিন্তু হযরত উসমান (রা.)-এর যুগ পর্যন্ত কুরআনুল কারীমের মানদণ্ডমূলক কপি ছিল একটিই, যা হযরত আবু বকর (রা.) সংকলন করেছিলেন। তা আবার মাসহাফের আকৃতিতে ছিল না। বরং প্রত্যেকটি সূরা পৃথক পৃথক সহীফায় লিপিবদ্ধ ছিল। কিন্তু কোনো কোনো সাহাবী ব্যক্তিগতভাবে নিজ নিজ সহীফা পৃথক পৃথকভাবে প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। এগুলোতে না ছিল রসমেখতের মধ্যে কোনো মিল, সূরাগুলোর বিন্যাসের মধ্যে কোনো মিল আর না ছিল সাত হরফের মধ্যে কোনো সমন্বয়। বরং প্রত্যেকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যে হরফ অনুযায়ী কুরআন শিখেছিলেন, সেটাকেই নিজের মতো করে লিখে নিয়েছিলেন। তাই কোনো মাসহাফে একটি আয়াত এক হরফ অনুযায়ী লিখা হয়েছিল, পক্ষান্তরে অপর মাসহাফে অন্য কোনো হরফ অনুযায়ী লিখা হয়েছিল। যতক্ষণ পর্যন্ত নববী যুগ নিকটবর্তী ছিল এবং মুসলমানদের সম্পর্ক ইসলামের মারকায বা পবিত্র মদীনার সাথে মজবুত সম্পর্ক ছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত মাসহাফসমূহের এই মতানৈক্যের কারণে উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষতি এ জন্য সাধিত হয়নি যে, কুরআনুল কারীমের সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আসল ভিত্তিটা মাসহাফের পরিবর্তে মুখস্থ শক্তির উপর ছিল। আর অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরামই এ ব্যাপারে ওয়াকিফহাল ছিলেন যে, কুরআনুল কারীম সাত হরফে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু যখন ইসলাম দূর-দূরান্তের রাষ্ট্রসমূহে ছড়িয়ে পড়ল এবং নতুন নতুন লোক মুসলমান হতে লাগল তখন তারা শুধু একটি পদ্ধতিতেই কুরআন শিখল। আর এ কথাটির প্রচার তাদের মাঝে ব্যাপকতা লাভ করেনি যে, কুরআন সাত হরফে নাযিল হয়েছে। তাদের মাঝে মতানৈক্য সৃষ্টি হতে লাগল। কোনো কোনো ব্যক্তি নিজের কেরাতকে সঠিক এবং অন্যের কেরাতকে ভুল মনে করতে লাগল। ওদিকে যেহেতু ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত মাসহাফগুলোও হরফ ও রুসমেখতের দিক থেকে বিভিন্ন ধরনের ছিল এবং সেগুলোতে সাত হরফকে একত্রিত করার কোনো ব্যবস্থাও ছিল না। এ কারণে এমন কোনো মানদণ্ডমূলক কপিও বিদ্যমান ছিল না, যার মাধ্যমে সেসব মতানৈক্যের নিরসন করা যায়।
এমতাবস্থায় হযরত উসমান (রা.) অনুভব করলেন যে, যদি এ অবস্থা চলতে থাকে এবং ব্যক্তিগত মাসহাফগুলো বিলুপ্ত করে কুরআনুল কারীমের মানদণ্ডমূলক একটি কপি ইসলামী বিশ্বে প্রেরণ না করা হয়, তাহলে বিরাট ফেতনা মাথা তুলে দাঁড়াবে। তাই তিনি নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করেন :
[এক.] কুরআনুল কারীমের সাতটি মানদণ্ডমূলক কপি প্রস্তুত করান এবং বিভিন্ন শহরে তা প্রেরণ করেন।
[দুই.] ওই মাসহাফগুলোর রুসমেখত [লিখন পদ্ধতি] এমনভাবে রাখেন যাতে সাত হরফের সবগুলো এতে সংকুলান হয়। যেমন, এ মাসহাফগুলো নুকতা ও হরকতশূন্য ছিল। এগুলোকে প্রত্যেক হরফের অনুকরণে পাঠ করা যেত।
[৩.] ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত সবগুলো মাসহাফ পুড়িয়ে দাফন করে দেন।
[৪.] ভবিষ্যতে যত মাসহাফ লিপিবদ্ধ করা হবে, তা যাতে ওই সাত হরফের অনুকরণে হয়, এ আইন বাধ্যতামূলক করে দেন।
[৫.] হযরত আবু বকর (রা.) কর্তৃক সংকলিত সহীফাগুলোতে পৃথক পৃথকভাবে বিভিন্ন সূরা লিপিবদ্ধ ছিল। হযরত উসমান (রা.) সূরাগুলোকে বিন্যাস করে একই মাসহাফের আকৃতি দান করেন।
হযরত উসমান (রা.)-এর সকল পদক্ষেপ দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল, যেন গোটা ইসলামী বিশ্বে রুসমেখত ও সূরাগুলোর বিন্যাসের দিক থেকে সবগুলো মাসহাফ এক রকম হয়ে যায়। আর এগুলোতে সাত হরফ এমনভাবে একত্রিত হয়ে যায় যে, পরবর্তীতে কোনো ব্যক্তির জন্য কোনো কেরাতকে অস্বীকার করার বা কোনো অশুদ্ধ কেরাতের উপর চর্চা করার অবকাশ বাকি না থাকে। কখনো যদি কোনো কেরাতের ব্যাপারে মতানৈক্য দেখা দেয় তাহলে মাসহাফের দিকে প্রত্যাবর্তন করে যাতে অতি সহজেই তা নিরসন করা যায়।
হযরত আলী (রা.)-এর একটি বক্তব্য দ্বারা এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়, যা ইমাম ইবনে আবী দাউদ (রহ.) কিতাবুল মাসাহিফ-এ বিশুদ্ধ সনদের মাধ্যমে উদ্ধৃত করেছেন-
قال علي بن أبي طالب رضي الله عنه لا تقولوا في عثمان إلا خيرا فوالله ما فعل الذي فعل في المصاحف إلا عن ملأ منا، فقال : ما تقولون في هذه القراءة ؟ فقد بلغني أن بعضهم يقول : إن قراءتي خير من قراءتك ، وهذا يكاد أن يكون كفرا ، قلنا : فما ترى ؟ قال : أرى أن نجمع الناس على مصحف واحد ، فلا تكون فرقة ، ولا يكون اختلاف ، قلنا : فنعم ما رأيت
‘হযরত আলী (রা.) বলেন, তোমরা হযরত উসমান (রা.)-এর ব্যাপারে ভালো ব্যতীত কোনো সমালোচনা করো না। আল্লাহর শপথ! তিনি মাসহাফের ব্যাপারে যা কিছু করেছেন, তা আমাদের সকলের উপস্থিতিতেই করেছেন। তিনি আমাদের নিকট পরামর্শ চেয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই কেরাতের ব্যাপারে তোমাদের রায় কি? কারণ আমি জানতে পেরেছি যে কোনো কোনো ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে বলছে যে, “আমার কেরাত তোমার কেরাতের চেয়ে উত্তম।” অথচ এটা এমন কথা যা কুফরীর নিকট পৌঁছে যায়। তখন আমরা বললাম, এ ক্ষেত্রে আপনার রায় কি? তিনি বললেন, আমার রায় হচ্ছে, আমরা মানুষকে একই মাসহাফের উপর সমবেত করে দেব। যাতে কোনো পার্থক্য ও মতানৈক্য বাকি না থাকে। আমরা বললাম, আপনি খুবই চমৎকার রায় প্রদান করেছেন।১৭৩
এই হাদীসটি হযরত উসমান (রা.)-এর মাসহাফ সংক্রান্ত কাজের ব্যাপারে সুস্পষ্ট একটি হাদীস। এতে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, হযরত উসমান (রা.) “نجمع الناس على مصحف واحد” [আমরা মানুষকে একই মাসহাফের উপর সমবেত করে দেব]” বলে এই ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন যে, আমরা এমন একটি মাসহাফ প্রস্তুত করতে চাই, যা গোটা ইসলামী বিশ্বের জন্য একই রকম হবে এবং এর মাধ্যমে পারস্পরিক মতানৈক্যের অবসান ঘটবে। এরপর কোনো বিশুদ্ধ কেরাতকে অস্বীকার করার এবং রহিত বলার বা অপ্রচলিত কেরাতের উপর চর্চা করার অবকাশ বাকি থাকবে না।১৭৪
অনুরূপ ইবনে আশতাহ (রহ.) হযরত আনাস (রা.) থেকে উদ্ধৃত করেন-
اختلفوا في القرآن على عهد عثمان حتى اقتتل الغلمان والمعلمون، فبلغ ذلك عثمان بن عفان فقال: عندي تكذبون به وتلحنون فيه، فمن نأى عني كان أشد تكذيباً وأكثر لحناً، يا أصحاب محمد اجتمعوا فاكتبوا للناس إماماً،
‘হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে কুরআনুল কারীমের ব্যাপারে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি শিশু ও শিক্ষকরা লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। হযরত উসমান (রা.)-এর নিকট এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি বললেন, তোমরা আমার কাছে থাকতেই [বিশুদ্ধ কেরাতকে] অস্বীকার করছ এবং তাতে ভুল করছ! তাহলে যারা আমার কাছ থেকে দূরে অবস্থান করছে, তারা তো আরো বেশি মিথ্যারোপ ও ভুল করতে থাকবে। সুতরাং হে মুহাম্মাদের সাথীবৃন্দ! তোমরা একত্রিত হও এবং মানুষের জন্য এমন একটি কপি প্রস্তুত কর, মানুষ যার অনুসরণ করতে পারে।
এর দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, কুরআনুল কারীমের কোনো হরফ বিলুপ্ত করা হযরত উসমান (রা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল না। বরং তাঁর তো এ ব্যাপারে আক্ষেপ ছিল যে, কোনো কোনো লোক বিশুদ্ধ কেরাতকে অস্বীকার করছে। আর কেউ কেউ অশুদ্ধ কেরাতের চর্চার উপর জোর দিচ্ছে। তাই তিনি মানদণ্ডমূলক একটি কপি প্রস্তুত করতে চাইতেন। যা গোটা ইসলামী জগতের জন্য এক ও অভিন্ন রকম হবে।১৭৫
প্রশ্ন : ২. কুরাইশী ভাষায় লিপিবদ্ধ করার উদ্দেশ্য :
সহীহ বুখারীর রেওয়ায়েত অনুযায়ী যখন হযরত উসমান (রা.) হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর নেতৃত্বে কুরআনের মাসহাফ বিন্যাস দেওয়ার জন্য সাহাবায়ে কেরামের একটি দল নির্বাচন করলেন, তখন তিনি তাঁদেরকে বলেছিলেন-
إِذَا اخْتَلَفْتُمْ أَنْتُمْ وَزَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ فِي شَيْءٍ مِنَ الْقُرْآنِ فَاكْتُبُوهُ بِلِسَانِ قُرَيْشٍ فَإِنَّمَا نَزَلَ بِلِسَانِهِمْ
‘যখন তোমাদের এবং যায়্যেদ ইবনে সাবেতের মাঝে কুরআনের কোনো অংশে মতানৈক্য হবে তখন তোমরা সেটাকে কুরাইশের ভাষা অনুযায়ী লিখবে। কেননা কুরআন তাঁদের ভাষায় নাযিল হয়েছে।’১৭৬
হযরত উসমান (রা.) যদি সাত হরফের সবগুলোই অবশিষ্ট রাখতেন তাহলে তাঁর এ নির্দেশের উদ্দেশ্য কী?
জবাব : এটি মূলত হযরত উসমান (রা.)-এর ওই বাক্য, যা দ্বারা হাফেয ইবনে জারীরসহ অন্যান্য উলামায়ে কেরাম বুঝে নিয়েছেন যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে মাসহাফে শুধু এক কুরাইশী হরফকে অবশিষ্ট রেখেছেন। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে যদি হযরত উসমান (রা.)-এর এ বাক্যটির উপর গভীরভাবে চিন্তা করা হয় তাহলে এ কথা বুঝে আসে যে, এ বাক্য দ্বারা এই উদ্দেশ্য নেওয়া সঠিক নয় যে, তিনি বাকি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন। বরং সবগুলো রেওয়ায়াতের প্রতি সামগ্রিকভাবে তাকালে বুঝে আসে যে, এ বাক্য দ্বারা হযরত উসমান (রা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল এই যে, যদি কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে রুসমেখতের দিক থেকে কোনো মতানৈক্য সৃষ্টি হয় তাহলে যেন কুরাইশী ভাষার রুসমেখত গ্রহণ করা হয়। এর প্রমাণ হলো, হযরত উসমান (রা.)-এর নির্দেশনার পর সাহাবায়ে কেরামের দলটি যখন কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার কাজ শুরু করেন তখন সমগ্র কুরআনুল কারীমের শুধু একটি স্থানে তাঁদের মাঝে মতানৈক্য হয়। ইমাম যুহরী (রহ.) যার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-
فاختلفوا يومئذ في التابوت والتابوه فقال النفر القرشيون التابوت وقال زيد بن ثابت التابوه فرفع اختلافهم إلى عثمان فقال : اكتبوه التابوت فانه بلسان قريش نزل
‘অতঃপর “تابوت” এবং “تابوه” শব্দের মধ্যে এসে তাঁদের মাঝে মতানৈক্য সৃষ্টি হলো। কুরাইশী সাহাবায়ে কেরাম বললেন, এটাকে [দীর্ঘ তা] দ্বারা “تابوت” লিখা হোক। আর যায়্যেদ ইবনে সাবেত (রা.) বললেন, [গোল তা দ্বারা] “تابوه” লিখা হোক। পরে তাঁদের এই মতানৈক্য হযরত উসমান (রা.)-এর কাছে গিয়ে পৌঁছল। তখন তিনি বললেন “تابوت” লিখ। কেননা কুরআন কুরাইশী ভাষায় নাযিল হয়েছে।১৭৭
অতএব, এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, হযরত উসমান (রা.) হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত এবং কুরাইশী সাহাবায়ে কেরামের মাঝে যে মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করেছেন এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো রসমখত-এর মতানৈক্য; ভাষাগত মতানৈক্য নয়।
প্রশ্ন : ৩. সমার্থবোধক শব্দ দ্বারা তেলাওয়াতের মাসআলা :
হযরত আবু বাকরা (রা.) সাত হরফের মতানৈক্যের যে ব্যাখ্যা করেছেন, তা দেখে বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হয় যে, এই সাত হরফ মাসহাফে উসমানীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। কেননা তিনি বলেন-
أَنَّ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ قَالَ: يَا مُحَمَّدُ اقْرَأِ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفٍ، قَالَ مِيكَائِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ: اسْتَزِدْهُ، فَاسْتَزَادَهُ حَتَّى بَلَغَ سَبْعَةَ أَحْرُفٍ، قَالَ: كُلٌّ شَافٍ كَافٍ مَا لَمْ تَخْلِطْ آيَةَ عَذَابٍ بِرَحْمَةٍ، أَوْ آيَةَ رَحْمَةٍ بِعَذَابٍ نَحْوُ قَوْلِكَ تَعَالَ وَأَقْبِلْ، وَهَلُمَّ وَاذْهَبْ، وَأَسْرِعْ وَأَعْجِلْ “
‘জিবরাঈল (আ.) [রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে] বললেন, হে মুহাম্মাদ! কুরআনুল কারীমকে এক হরফের উপর পাঠ করুন। মিকাঈল (আ.) [রাসূল স.কে] বললেন, এর সাথে আরও [হরফ] সংযোজন করুন। ফলে তিনি সংযোজন করলেন। আর এভাবে তা সাতে গিয়ে পৌঁছল। জিবরাঈল (আ.) বললেন, এর প্রতিটিই নিরাময়কারী, যথেষ্ট। যতক্ষণ না আযাবের আয়াতকে রহমতের আয়াতের সাথে এবং রহমতের আয়াতকে আযাবের আয়াতের সাথে মিশ্রিত করবে। এটা এমন হবে যে, আপনি تعال [আস]-কে هلم – اقبل – اذهب – اسرع و عجل শব্দ দ্বারা আদায় করবেন।’১৭৮
এই হাদীস থেকে বুঝে আসে যে, সাত হরফের মতানৈক্য মূলত সমার্থবোধক শব্দের মতানৈক্যই ছিল। অর্থাৎ এক হরফের ভিত্তিতে কোনো এক শব্দকে গ্রহণ করা হয়েছে। আবার অন্য হরফের ভিত্তিতে সে শব্দেরই সমার্থবোধক অন্য আরেকটি শব্দ গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ মাসহাফে উসমানীর মধ্যে যেসব কেরাত সংকলিত হয়েছে সেগুলোর মাঝে সমার্থবোধকের এই মতানৈক্য খুবই স্বল্প। ওই কেরাতগুলোর মাঝে অধিকাংশই হরকত [কারক চিহ্ন], সীগা [শব্দরূপ], পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ এবং সুর ও ভঙ্গিমার মতানৈক্য সংঘটিত হয়েছে।
জবাব : সাত হরফের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আমরা যে বক্তব্যটি গ্রহণ করেছি, এতে কেরাতগুলোর মাঝে সাত প্রকারের মতপার্থক্য বর্ণনা করা হয়েছে। ওই প্রকারগুলোর মাঝে একটি প্রকার হলো, ‘বদল’ তথা সমার্থবোধক শব্দের মাধ্যমে পরিবর্তন করে পড়ার মতানৈক্য। হযরত আবু বাকুরা (রা.) এখানে সাত হরফের পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করেননি। বরং এর একটি উদাহরণ দিয়েছেন মাত্র। তাই মতানৈক্যের একটি মাত্র প্রকার অর্থাৎ শব্দের পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন।
কেরাতের ভিন্নতার এই প্রকারটি অর্থাৎ শব্দের ভিন্নতা ইসলামের প্রাথমিক যুগে অনেক বেশি ছিল। যেহেতু গোটা আরববাসী কুরাইশী ভাষায় পুরোপুরি অভ্যস্ত ছিল না। তাই শুরুতে তাদেরকে এ সহজতা বেশি থেকে বেশি দেওয়া হয়েছিল যে, তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শ্রবণকৃত পরিবর্তনশীল শব্দগুচ্ছ থেকে যে কোনো একটি শব্দ দ্বারা তেলাওয়াত করবে। তাই শুরু শুরুতে অধিকতর এমন ছিল যে, এক কেরাতের মাঝে এক শব্দ এবং অন্য কেরাতের মাঝে এর সমার্থবোধক অন্য শব্দ রয়েছে। কিন্তু যখন মানুষ কুরআনের ভাষার সাথে পুরোপুরি পরিচিত হয়ে উঠল তখন কেরাতের ভিন্নতার এই প্রকারকে ধীরে ধীরে হ্রাস করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকালের পূর্বে রমযান মাসে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে দুইবার কুরআনুল কারীম দাওর করেন। ওই সময় অনেক শব্দ রহিত করা হয়েছে। আর এভাবে সমার্থবোধক শব্দগুলোর মতানৈক্যও হ্রাস পেয়ে গেল।
উসমান (রা.) নিজের মাসহাফে সে সকল সমার্থবোধক শব্দ সংকলন করেননি, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আরযায়ে আখীরার সময় রহিত হয়ে গিয়েছিল। কারণ সেগুলোর অবস্থান ছিল তেলাওয়াত রহিত হওয়া আয়াতসমূহের ন্যায়। অবশ্য কেরাতের যে মতানৈক্য আরযায়ে আখীরায় অবশিষ্ট ছিল, হযরত উসমান (রা.) সেগুলোকে হুবহু বহাল রেখেছেন। অতএব, হযরত আবু বাকুরা (রা.) হরফের ভিন্নতার যে প্রকারটিকে উল্লিখিত হাদীসে উদাহরণ স্বরূপ পেশ করেছেন, তা ওই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত যার অধিকাংশ আরযায়ে আখীরার সময় রহিত হয়ে গিয়েছিল। এ জন্যই তা মাসহাফে উসমানীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি এবং বর্তমান কেরাতগুলোও সেগুলোকে শামিল করেনি।
উপরোল্লিখিত ফলাফলটি তিনটি ভূমিকা থেকে আহরিত হয় :
[এক.] আরযায়ে আখীরা [হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কুরআনের শেষ দাওর]-এর সময় কুরআনুল কারীমের বহু কেরাত রহিত করা হয়েছিল।
[দুই.] হযরত উসমান (রা.) মাসহাফে উসমানীকে আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী বিন্যস্ত করেছেন।
[তিন.] হযরত উসমান (রা.)-এর মাসহাফে সমার্থবোধক শব্দের ওই মতানৈক্য বিদ্যমান নেই যা হযরত আবু বাকরা (রা.) বর্ণনা করেছেন।
তৃতীয় ভূমিকাটি তো একেবারে স্পষ্ট। আর দ্বিতীয় ভূমিকার প্রমাণপঞ্জি আমরা ইতোপূর্বে বর্ণনা করে এসেছি। যার মধ্যে সর্বাধিক স্পষ্ট দলীল হচ্ছে হযরত উবায়দা সালমানী (রহ.)-এর এই ইরশাদ যে, “হযরত উসমান (রা.) আমাদেরকে যে কেরাতের উপর সমবেত করেছেন, তা ছিল আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী।১৭৯
এখন বাকি থেকে যায় প্রথম ভূমিকাটি। আর তা হলো, আরযায়ে আখীরার সময় অনেক কেরাত রহিত হয়ে গিয়েছিল। এর প্রমাণ হচ্ছে মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর এই ইরশাদ-
ولا شك أن القرآن نسخ منه وغير فيه في العرضة الأخيرة فقد صح النص بذلك عن غير واحد من الصحابة وروينا بإسناد صحيح عن زر ابن حبيش قال قال لي ابن عباس أي القراءتين تقرأ؟ قلت الأخيرة قال فإن النبي صلى الله عليه وسلم كان يعرض القرآن على جبريل عليه السلام في كل عام مرة قال فعرض عليه القرآن في العام الذي قبض فيه النبي صلى الله عليه وسلم مرتين فشهد عبد الله يعني ابن مسعود ما نسخ منه وما بدل.
‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আরযায়ে আখীরার সময় কুরআনুল কারীম থেকে অনেক কিছু রহিত হয়ে গেছে এবং এতে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। কেননা একাধিক সাহাবী থেকে এর স্পষ্টতা উদ্ধৃত রয়েছে। আমাদের কাছে সহীহ সনদসূত্রে হযরত যর ইবনে হুবাইশ (রা.)-এর এ বক্তব্য পৌঁছেছে যে, ইবনে আব্বাস (রা.) আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কোন্ কেরাত পাঠ কর? আমি বললাম, শেষ কেরাত। তিনি বললেন, প্রতি বছর রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে কেরাত শোনাতেন। যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেছেন, সে বছর তিনি দুই বার হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে কুরআন শুনিয়েছেন। ওই সময় যা কিছু রহিত হয়েছে এবং যা পরিবর্তন হয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) তার সাক্ষী ছিলেন।১৮০
এর দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, আরযায়ে আখীরার সময় অনেক কেরাত স্বয়ং আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে রহিত করে দেওয়া হয়। হযরত আবু বাকরা (রা.) সমার্থবোধক শব্দের যে মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করেছেন, নিশ্চিত এর অধিকাংশই ওই সময় রহিত হয়ে গেছে। কেননা হযরত উসমান (রা.) আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন। এর মধ্যে সমার্থবোধক শব্দের মতানৈক্য খুবই শায বা বিরল।
প্রশ্ন : ৪. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ও তাঁর মাসহাফ
উপরোক্ত তাহকীকের উপর চতুর্থ প্রশ্ন এ হতে পারে যে, একাধিক রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণিত আছে যে, হযরত উসমান (রা.) যে মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এর প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন না এবং তিনি তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত সহীফাটিও আগুনে পোড়াননি। যদি হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত না করে থাকেন, তাহলে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর এ আপত্তির কারণটা কি ছিল?
জবাব : প্রকৃতপক্ষে হযরত উসমান (রা.)-এর উপর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর দু’টি অভিযোগ ছিল। প্রথমটি হলো, কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার মহান কাজে তাঁকে কেন দায়িত্ব দেওয়া হলো না? দ্বিতীয়টি হলো, অন্যান্য মাসহাফগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হলো কেন?
সুনানে তিরমিযীর এক বর্ণনায় ইমাম যুহরী (রহ.) প্রথম অভিযোগের আলোচনা করেছেন। যার সারাংশ হচ্ছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর এ অভিযোগ ছিল যে, কুরআন লিপিবদ্ধ করার মহান কাজ তাঁর দায়িত্বে কেন অর্পণ করা হলো না? যখন তিনি হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর তুলনায় অধিক সময় হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহচর্যে থেকে ধন্য হয়েছেন। হাফেয ইবনে হাজার (রহ.) এ অভিযোগটি উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, এ ব্যাপারে হযরত উসমান (রা.)-এর জবাব ছিল যে, তিনি এ মহান কাজটি পবিত্র মদীনায় আরম্ভ করেছিলেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) তখন কূফায় ছিলেন। আর হযরত উসমান (রা.) তাঁর অপেক্ষায় থেকে এ মহান কাজটিকে বিলম্বিত করতে চাচ্ছিলেন না। উপরন্তু হযরত আবু বকর (রা.)ও হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর উপরই এ দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। তাই হযরত উসমান (রা.)ও সমীচীন মনে করলেন যে, কুরআনের সংকলন এবং বিন্যাসের এ কাজটিও তাঁর হাতে সমাধা হোক।১৮১
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর দ্বিতীয় অভিযোগ ছিল এই যে, হযরত উসমান (রা.) নতুন মাসহাফ প্রস্তুত করার পর ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত সবগুলো মাসহাফ পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর তিনি তাঁর মাসহাফ পুড়িয়ে ফেলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। হযরত আবু মূসা আশআরী (রা.) এবং হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রা.) তাঁকে বুঝানোর জন্য তাঁর নিকট গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বললেন-
والله لا أدفعه إليهم أقرأني رسول الله صلى الله عليه وسلم بضعا وسبعين سورة ثم أدفعه إليهم والله لا أدفعه إليهم
‘আল্লাহর শপথ! আমি এই মাসহাফ তাঁর নিকট সোপর্দ করব না। আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্তরের চেয়ে অধিক সূরা শিক্ষা দিয়েছেন। এরপরও আমি এই মাসহাফ তাঁকে দিয়ে দেব? আল্লাহর শপথ! আমি এটা তাঁকে দেব না।’১৮২
যারা কূফায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর অনুকরণে ব্যক্তিগতভাবে মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) তাদেরকেও এ উৎসাহ দিলেন যে, তারা যেন তাদের মাসহাফ সোপর্দ না করে। হযরত খুমাইর ইবনে মালিক (রহ.) বলেন-
أُمِرَ بِالْمَصَاحِفِ أَنْ تُغَيَّرَ قَالَ قَالَ ابْنُ مَسْعُودٍ مَنْ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ أَنْ يَغُلَّ مُصْحَفَهُ فَلْيَغُلَّهُ ….. قَالَ ثُمَّ قَالَ قَرَأْتُ مِنْ فَمِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَبْعِينَ سُورَةً أَفَأَتْرُكُ مَا أَخَذْتُ مِنْ فِي رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وعلى اله وصحبه وسلم.
‘মাসহাফগুলোর মাঝে পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হলো। তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) [মানুষকে] বললেন, তোমাদের মধ্যে যারা নিজের মাসহাফকে লুকাতে সক্ষম হও তারা লুকিয়ে রাখ।……………অতঃপর তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র যবান থেকে সত্তরটি সূরা শিখেছি। আমি কি ওই বিষয় ছেড়ে দেব, যা আমি সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র যবান থেকে অর্জন করেছি।১৮৩
এ থেকে বুঝা যায় যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফটি উসমানী মাসহাফ থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল এবং তিনি সেটাকে সংরক্ষিত রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এর মধ্যে কোন্ বিষয়গুলো উসমানী মাসহাফ থেকে ভিন্নতর ছিল? সহীহ রেওয়ায়েতগুলোতে এর কোনো স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় না। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হয় যে, তাঁর মাসহাফের মৌলিক পার্থক্য ছিল সূরার বিন্যাস। আর এ কথা আগেও বলা হয়েছে যে, হযরত আবু বকর (রা.) যেসব সহীফায় কুরআন সংকলন করেছিলেন, সেগুলোতে সূরাগুলো পৃথক পৃথকভাবে লিপিবদ্ধ ছিল এবং সেগুলোতে কোনো বিন্যাস ছিল না। আর হযরত উসমান (রা.) যে কুরআন সংকলন করেছিলেন তাতে সূরাগুলো একটি বিশেষ বিন্যাস অনুযায়ী লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। ইমাম হাকেম (রহ.) লিখেন-
أن جمع القرآن لم يكن مرة واحدة فقد جمع بعضه بحضرة رسول الله صلى الله عليه وسلم ثم جمع بعضه بحضرة أبي بكر الصديق والجمع الثالث هو في ترتيب السورة كان في خلافة أمير المؤمنين عثمان بن عفان رضى الله تعالى عنهم أجمعين
‘কুরআন সংকলনের কাজ এক বারেই সমাপ্ত হয়নি। বরং কুরআনুল কারীমের কিছু অংশ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপস্থিতিতেই সংকলন করা হয়েছিল। অতঃপর আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর যুগে আরো কিছু সংকলন করা হয়েছিল। অতঃপর কুরআন সংকলনের তৃতীয় পর্যায়ে সূরাগুলোকে বিন্যস্ত করা হয়েছিল। যা ছিল আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর শাসনামলে।১৮৪
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফ হযরত উসমান (রা.)-এর মাসহাফের সাথে বিন্যাসের দিক থেকে অনেক পার্থক্য ছিল। যেমন, এতে সূরা নিসা ছিল আগে আর সূরা আলে-ইমরান ছিল তার পরে।১৮৫ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) সম্ভবত এই বিন্যাস অনুযায়ীই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছ থেকে কুরআন শিখেছিলেন। তাই এই বিন্যাস অনুযায়ী কুরআনকে রাখাই তাঁর অভিপ্রায় ছিল। সহীহ বুখারীর একটি বর্ণনা দ্বারা এর সমর্থন পাওয়া যায়। ইরাকের এক অধিবাসী একদিন হযরত আয়েশা (রা.)-এর নিকট আসল এবং বলল-
قال يا أم المؤمنين أريني مصحفك قالت لم ؟ قال لعلي أؤلف القرآن عليه فإنه يقرأ غير مؤلف قالت وما يضرك أيه قرأت قبل
‘সে বলল, হে উম্মুল মুমিনীন! আমাকে আপনার মাসহাফটি দেখান। হযরত আয়েশা (রা.) বললেন, কেন? লোকটি বলল, আমি [আমার] কুরআনের মাসহাফটি এর অনুকরণে বিন্যস্ত করব। কেননা তা [আমাদের এলাকায়] অবিন্যস্ত অবস্থায়ই পড়া হয়। হযরত আয়েশা (রা.) বললেন, কুরআনের যে অংশই আগে তুমি পড় না কেন, তা তোমার জন্য কোনো অসুবিধা হবে না।’১৮৬
এই হাদীসের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনে হাজার (রহ.) লিখেন, এই ইরাকী ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর কেরাতের অনুসারী ছিলেন। আর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) যেহেতু নিজের মাসহাফে পরিবর্তন করেননি এবং তা বিলুপ্তও করেননি, তাই এর বিন্যাস উসমানী মাসহাফের বিন্যাসের চেয়ে ভিন্নতর ছিল। আর এ কথা তো স্পষ্ট যে, উসমানী মাসহাফের বিন্যাস অন্যান্য মাসহাফের বিন্যাসের তুলনায় অধিক সমীচীন ছিল। তাই এই ইরাকী লোকটি নিজের মাসহাফকে উসমানী মাসহাফের তুলনায় অবিন্যস্ত বলে আখ্যা দিয়েছেন।১৮৭
এই হাদীস থেকে জানা যায় যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)- এর মাসহাফে মৌলিক পার্থক্য ছিল, সূরাগুলোর বিন্যাস। এ ছাড়া রুসমেখতের পার্থক্যও থাকতে পারে এবং এতে এমন রুসমেখত অবলম্বন করা হয়েছে যার মধ্যে উসমানী মাসহাফের ন্যায় সকল কেরাতের জন্য অবকাশ থাকে না। অন্যথায় যদি হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী বলা হয় যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে শুধু এক হরফের উপর কুরআন লিপিবদ্ধ করেছিলেন আর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফ সেই পরিত্যক্ত হরফের কোনো একটির উপর লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল, তাহলে নিম্নোক্ত অভিযোগগুলো আরোপিত হয়।
১. সহীহ বুখারীর উল্লিখিত হাদীসে ইরাকী ব্যক্তি শুধু সূরার বিন্যাসের পার্থক্যের কথা উল্লেখ করেছেন। নতুবা যদি হরফের পার্থক্যও হতো, তাহলে তা ছিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং অধিক গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হতো।
২. হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) ও অন্যান্যদের বক্তব্য অনুযায়ী সাত হরফ দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন সাত গোত্রের ভাষাকে বুঝানো হয়েছে। যদি এ কথা সঠিক হয়, তাহলে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ও হযরত উসমান (রা.)-এর মাসহাফের মাঝে কোনো পার্থক্য না থাকাই উচিত ছিল। কারণ এ বক্তব্য অনুযায়ী হযরত উসমান (রা.) সবাইকে কুরাইশী হরফের উপর সমবেত করে সে অনুযায়ী মাসহাফ লিপিবদ্ধ করিয়ে ছিলেন। আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)ও কুরাইশী ছিলেন।
৩. হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) ও তাঁর অনুসারীরা ছয় হরফ বিলুপ্ত করার স্বপক্ষে সবচেয়ে বড় দলীল হিসেবে ‘সাহাবায়ে কেরামের ইজমা’কে পেশ করেছেন। কিন্তু যদি হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) অন্য কোনো হরফের উপর পাঠ করে থাকেন এবং এর লিখনকেও জায়েয মনে করে থাকেন তাহলে এই ইজমা বা ঐক্যমত সংঘটিত হলো কি করে? যে ইজমার মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর ন্যায় বিজ্ঞ ফকীহ সাহাবী শামিল নেই। এটাকে ইজমা বলার যুক্তি কোথায়? কেউ কেউ এই দাবী করেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) পরবর্তীতে হযরত উসমান (রা.)-এর রায়কে মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো রেওয়ায়েত মজুদ নেই।
হাফেয ইবনে হাজার (রহ.) লিখেন- ‘ইবনে আবী দাউদ (রহ.) “ইবনে মাসউদ (রা.)-এর পরবর্তীতে হযরত উসমানের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়া” শিরোনামে স্বতন্ত্র একটি অধ্যায় লিখেছেন। তবে তিনি এই অধ্যায়ের অধীনে এমন কোনো সুস্পষ্ট রেওয়ায়েত উল্লেখ করতে পারেননি, যা এই শিরোনামের সাথে যায়।১৮৮ হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)সহ অন্যান্যদের বক্তব্যের উপর আরোপিত এ অভিযোগগুলোর কোনো সমাধান পাওয়া যায় না। কাজেই এটাই বিশুদ্ধ কথা যে, হযরত উসমান (রা.) সাত হরফের সবগুলোই মাসহাফে উসমানীতে বাকি রেখেছেন। আর হযরত ইবনে মাসউদ (রা.)-এর এ অভিযোগ ছিল না যে, ছয় হরফকে কেন বিলুপ্ত করা হয়েছে?১৮৯ কারণ বাস্তবে এটা ঘটেই ছিল না। বরং তাঁর অভিযোগটা ছিল এই যে, যে মাসহাফগুলো পূর্ব থেকেই লিপিবদ্ধ ছিল এবং যেগুলোর বিন্যাস ও রুসমেখত উসমানী মাসহাফ অনুযায়ী ছিল না, সেগুলো সঠিক হওয়া সত্ত্বেও নষ্ট করা হচ্ছে কেন?
আলোচনার ফলাফল
“সাত হরফ”-এর আলোচনা অনুমানের চেয়ে অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে। তাই অবশেষে এ থেকে অর্জিত ফলাফলের সারাংশ সংক্ষিপ্তাকারে পেশ করে দেওয়া সমীচীন মনে করছি। যেন স্মরণ রাখতে সহজ হয়।
১. উম্মতের সহজ-সাধ্যের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার নিকট আবেদন করেন যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতকে যেন শুধু একটি পদ্ধতিতেই সীমাবদ্ধ রাখা না হয়। বরং বিভিন্ন পদ্ধতিতে যেন তেলাওয়াতের অনুমতি প্রদান করা হয়। এর প্রেক্ষিতেই সাত হরফের উপর কুরআন নাযিল করা হয়েছে।
২. সাত হরফে নাযিল হবার সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য উদ্দেশ্য হলো, এর কেরাতের মধ্যে সাত প্রকারের বিভিন্নতা রাখা হয়েছে। যার আওতায় অনেকগুলো কেরাত অস্তিত্বে এসে গেছে।
৩. শুরু শুরুতে মতানৈক্যের সাত প্রকারের মধ্যে শব্দমালা ও সমার্থবোধক শব্দের মতানৈক্যের প্রকারটি বেশ ব্যাপক ছিল। অর্থাৎ এমনটি অধিকতর হতো যে, এক কেরাতে এক শব্দ আর অন্য কেরাতে সে শব্দেরই সমার্থবোধক অন্য একটি শব্দ হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন আরববাসী কুরআনী ভাষার সাথে পরিচিত হতে লাগল তখন মতানৈক্যের এই প্রকারটিও হ্রাস পেয়ে গেল। এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মৃত্যুর পূর্বে রমযান মাসে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে সর্বশেষ দাওর [আরযায়ে আখীরা] করলেন তখন এর মধ্যে এ ধরনের মতানৈক্য শূন্যের কোঠায় পৌঁছিয়ে দেওয়া হলো। বেশির চেয়ে বেশি শব্দরূপ, পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ, একবচন, বহুবচন, মারূফ [কর্তৃবাচ্য], মাজহুল [কর্মবাচ্য] এবং সুর-ভঙ্গিমার মতানৈক্য বাকি থাকল।
৪. আরযায়ে আখীরার সময় যে সব মতানৈক্য অবশিষ্ট ছিল, হযরত উসমান (রা.) সেগুলোকে মাসহাফে এমনভাবে সংকলন করেছিলেন যে, সেগুলোকে নুকতা [বিন্দু] ও হরকত [কারক চিহ্ন] থেকে মুক্ত রেখেছিলেন। এর ফলে এতে কেরাতের অধিকাংশ মতানৈক্যের সংকুলান হয়ে গেছে। আর যেসব কেরাতের এভাবে এক মাসহাফে সংকুলান হয়নি সেগুলোকে অন্য মাসহাফে প্রকাশ করা হয়েছে। এর ভিত্তিতেই উসমানী মাসহাফে কোথাও কোথাও এক-এক, দুই-দুই শব্দের মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে।
৫. হযরত উসমান (রা.) এভাবে সাতটি মাসহাফ লিপিবদ্ধ করিয়েছেন এবং সেগুলোতে সূরাগুলোরও বিন্যাস দিয়েছেন। যখন হযরত আবু বকর (রা.) কর্তৃক সংকলিত মাসহাফগুলোতে সূরার কোনো বিন্যাস ছিল না। সাথে সাথে কুরআনুল কারীমের জন্য একটি রুসমেখতও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর যেসব মাসহাফ এই বিন্যাস ও রুসমেখতের বিপরীত ছিল সেগুলোকে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছেন।
৬. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফের বিন্যাস উসমানী মাসহাফের চেয়ে ভিন্ন ছিল। তিনি যেহেতু তাঁর বিন্যাসকে বাকি রাখতে চেয়েছিলেন তাই তিনি তাঁর মাসহাফকে অগ্নিতে ভস্ম করার জন্য হযরত উসমান (রা.)-এর হাতে সোপর্দ করেননি।
সাত হরফের ব্যাপারে একটি ভুল ধারণার অপনোদন
অবশেষে আরেকটি মৌলিক ভুল ধারণার অপনোদন করা আবশ্যক। আর সেটা হলো, “সাত হরফ”-এর উপরোক্ত আলোচনার পাঠক স্থূল দৃষ্টিতে এ সন্দেহ ও সংশয়ে পড়তে পারে যে, মহান আল্লাহর সংরক্ষণে কুরআনুল কারীমের ন্যায় মহাগ্ৰন্থ আজ পর্যন্ত কোনো ধরনের সামান্যতম পরিবর্তন ব্যতিরেকে সংরক্ষিত হয়ে চলে আসছে। এতদসত্ত্বেও মুসলমানদের মাঝে সাত হরফ নিয়ে এত বড় মতানৈক্য সৃষ্টি হলো কি করে?
কিন্তু সাত হরফের আলোচনায় আমরা পেছনে যেসব মতামত ও বক্তব্য উল্লেখ করে এসেছি যদি গভীর দৃষ্টিতে সেগুলোকে অধ্যয়ন করা হয় তাহলে অতি সহজেই এসব সন্দেহ ও সংশয়ের অপনোদন হয়ে যায়। যে ব্যক্তিই এই মতানৈক্যের হাকীকত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করবে, তার কাছে এ কথাটা একেবারেই স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এ সকল মতানৈক্য স্রেফ যুক্তি-তর্ক ও চিন্তা-প্রসূত। বাস্তব ক্ষেত্রে কুরআনের সত্যতা ও বাস্তবতা এবং কুরআন সংরক্ষিত থাকার উপর এই মতানৈক্যের বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়ে না। কারণ এ কথার উপর সবাই ঐক্যমত পোষণ করেন যে, বর্তমানে আমাদের নিকট যে আকৃতিতে কুরআনুল কারীম বিদ্যমান আছে, তা তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় আমাদের নিকট চলে আসছে। এতে সামান্য কোনো পরিবর্তনও হয়নি। এ কথার ওপরও সকল উলামায়ে কেরাম একমত যে, কুরআনুল কারীমের যতগুলো কেরাত তাওয়াতুরের সাথে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে, সবগুলোই সহীহ। এগুলোর প্রত্যেকটি অনুযায়ীই কুরআনুল কারীম তেলাওয়াত করা যায়। আবার এ কথার ওপরও উম্মতের ইজমা বা ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, মুতাওয়াতির কেরাত ব্যতীত অপ্রচলিত ও বিরল যত কেরাত বর্ণিত রয়েছে সেগুলোকে কুরআনুল কারীমের অংশ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ কথাও সর্বসম্মত যে, আরযায়ে আখীরা অথবা তারও পূর্বে যে সকল কেরাতকে রহিত করা হয়েছে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশনা অনুযায়ী সেগুলো কুরআনের অংশ হতে পারেনি। এ কথাও সবার নিকট সকল সন্দেহের ঊর্ধ্বে যে, কুরআনুল কারীমের সাত হরফের মধ্যে যে মতানৈক্য ছিল, তা ছিল শুধু শব্দগত। কিন্তু অর্থের দৃষ্টিকোণ থেকে সবগুলো হরফ ছিল অভিন্ন। সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি কুরআনুল কারীমের এক কেরাত বা এক হরফ অনুযায়ী কুরআন পাঠ করে তাহলে কুরআনের বিষয়বস্তু তার অর্জিত হয়ে যাবে এবং কুরআনের দিক-নির্দেশনা অর্জন করার জন্য অন্য কোনো হরফ জানার প্রয়োজন পড়বে না। এর মাঝেও সামান্য কোনো মতানৈক্য নেই যে, হযরত উসমান (রা.) যে মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন, তা পরিপূর্ণ সতর্কতা, হাজার হাজার সাহাবায়ে কেরামের সাক্ষ্য এবং গোটা মুসলিম উম্মাহ’র সত্যায়নের সাথে করেছিলেন। আর তাতে কুরআনুল কারীম ঠিক সেভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে যেভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এতে কোনো একজন মানুষেরও মতপার্থক্য হয়নি।১৯০
অতএব, যে মতানৈক্যের কথা পেছনের পৃষ্ঠাগুলোতে করা হয়েছে তা শুধু এ ব্যাপারে যে, হাদীসে “সাত হরফ” দ্বারা উদ্দেশ্য কি ছিল? বর্তমানে যত মুতাওয়াতির কেরাত বিদ্যমান রয়েছে, তা কি সাত হরফের উপর সন্নিবিষ্ট নাকি এক হরফের উপর? তা একটা যুক্তিগত ও দার্শনিক মতপার্থক্য মাত্র। যার দ্বারা জ্ঞানগত কোনো পার্থক্য সৃষ্টি হয় না। তাই এর দ্বারা এ ধারণা করা একদম ভুল হবে যে, এসব মতানৈক্যের কারণে [নাউযুবিল্লাহ] কুরআনুল কারীম বিতর্কিত হয়ে গেছে! এর উপমা কিছুটা এমন যে, একটি গ্রন্থের ব্যাপারে পুরো পৃথিবীর মানুষ ঐক্যমত পোষণ করে যে, এটা অমুক গ্রন্থকারের রচিত। ওই গ্রন্থকারের প্রতি এই গ্রন্থের সম্বন্ধ করা নির্ভরযোগ্য। আর তিনি স্বয়ং ছাপিয়ে সেটার সত্যায়নও করলেন যে, এটা আমার রচিত গ্রন্থ এবং এ কপির আদলে এটা কেয়ামত পর্যন্ত ছাপানো যেতে পারে। পরবর্তীতে মানুষের মাঝে এ মতানৈক্য সৃষ্টি হলো যে, ছাপানোর পূর্বে গ্রন্থকার তার পাণ্ডুলিপিতে শব্দগত কোনো পরিবর্তন-পরিবর্ধন করেছেন? নাকি প্রথমে যেমন ছিল তেমনি সেটাকে প্রকাশ করেছেন? এটা স্পষ্ট যে, শুধু এতটুকু দার্শনিক মতপার্থক্যের উপর ভিত্তি করে ওই হাকীকত বিতর্কিত হতে পারে না, যার উপর সবাই ঐক্যমত পোষণ করেছে। অর্থাৎ এটা ওই গ্রন্থ যা গ্রন্থকার নিজেই ছাপিয়েছেন এবং নিজের দিকে এর সম্বন্ধ করেছেন। আর কেয়ামত পর্যন্ত এটাকে প্রকাশ করার অনুমতিও প্রদান করেছেন। ঠিক তদ্রূপ গোটা উম্মত যখন এ কথার উপর একমত যে, কুরআনুল কারীমকে মাসহাফে উসমানীতে হুবহু সেভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে যেভাবে তা অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এর সকল মুতাওয়াতির কেরাত বিশুদ্ধ ও আল্লাহর পক্ষ হতে নাযিলকৃত তখন এই হাকীকত ওই সব দার্শনিক মতপার্থক্যের ভিত্তিতে বিতর্কিত হতে পারে না, যা সাত হরফের ব্যাখ্যায় উপস্থাপিত হয়েছে। [আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।]
তথ্যসূত্র:
১১৯. সহীহ বুখারী, কাসতালানীসহ ৭/৪৫৩ “ফাযায়িলে কুরআন অধ্যায় ।
১২০. ইবনে জাযারী : আন-নাশরু ফী কিরাআতিল আশ্র ১/২১
১২১, প্রাগুক্ত
১২২. যারকাশী : আল-বুরহান ফী উলুমিল কুরআন : ১/২১২
১২৩. আওজাযুল মাসালিক : ২/৩৫৬ সাহারানপুর ৷
১২৪. মুসাফ্ফা শরহে মুয়াত্তা : ১/১৮৭ দিল্লী ১২৯৩ হিজরী ।
১২৫. মানাহিলুল ইরফান : ১/১৩৩
১২৬. মানাহিলুল ইরফান : ১/১৩৩
১২৭. তাফসীরে ইবনে জারীর ১/১৫
১২৮. ফাতহুল বারী : ৯/২২, রুহুল মাআনী : ১/২১
১২৯. আন নশরু ফিল কিরআতিল আশৃর : ১/২৫ ফাতহুল বারী : ৯/২৩
১৩০. রুহুল মাআনী : ১/২১
১৩১. আত্ তাহাভী : মুশকিলুল আসার : ৪/১৮৫-১৮৬
১৩২. সহীহ বুখারী : (কুরআন সংকলন অধ্যায়)
১৩৩. মুশকিলুল আসার : [তহাভী] : ৪/১৮৬-১৯১
১৩৪. ফাতহুল বারী : ৯/২২-২৩
১৩৫. আয-যুরকানী : শরহে মুয়াত্তা : ২/১১
১৩৬. রেওয়ায়েতটি ইমাম আহমদ (রহ.) বর্ণনা করেছেন। এর সনদ নির্ভরযোগ্য। (আওজাযুল মাসালিক : ২/৩৫৭)
১৩৭. নিশাপুরী : “গারায়েবুল কুরআন ওয়া রাগায়েবুল ফুরকান” : টীকা ইবনে জারীর : ১/২১ মিসর
১৩৮. ইবনে কুতাইবা, আবুল ফযল রাযি এবং ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর মতামত : ফাতহুল বারী : ৯/২৫-২৬, ইতকান : ১/৪৭ গ্রন্থে বিদ্যমান রয়েছে। আর কাষী ইবনে তাইয়্েব (রহ.)-এর মত তাফসীরে করতুবী ১/৪৫-এ দেখা যেতে পারে ।
১৩৯. আন নশরু ফী কিরাতিল আশর : ১/২৬
১৪০. ফাতহুল বারী : ৯/২৪
১৪১. আন নশরু ফী কিরাতিল আশর : ১/২৭-২৮
১৪২. ফাতহুল বারী : ৯/২৪
১৪৩. মানাহিলুল ইরফান ফী উলূমিল কুরআন : ১/১৫৪-১৫৬
১৪৪. ফাতহুল বারী: ৯/২৪
১৪৫. আন-নশরু ফী কেরআতিল আশর: ১/২০
১৪৬. তিরমিযী: ২/১৩৮, কুরআন মহল, করাচী।
১৪৭. মুশকিলুল আসার: ৪/১৮৫
১৪৮. তাফসীরে ইবনে জারীর: ১/১৫
১৪৯. বিস্তারিত প্রত্যাখ্যানের জন্য দেখুন: আল-ইতকান ১/৪৯
১৫০. তাফসীরে ইবনে জারীর: ১/১৫
১৫১. সম্মানিত সেই আলেমগণের তালিকা সামনে আসবে।
১৫২. সহীহ বুখারী, উমদাতুল কারী সহ ১২/২৫৮
১৫৩. আন-নশরু ফী কিরআতিল আশর : ১/৩১
১৫৪. সম্ভবত এখানে কাযী ইয়াযকে বুঝানো হয়েছে।
১৫৫. উমদাতুল কারী : [কিতাবুল খুসুমাত] : ১২/২৫৮, বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন : আন-নশরু ফী কিরআাতিল আশর : ১/১৮-১৯
১৫৬. সম্ভবত কাযী বকর বাকিল্লানী (রহ.) উদ্দেশ্য। কারণ এই এবারতই ইমাম নববী (রহ.) কাযী বাকিল্লানী (রহ.)-এর নামে উদ্ধৃত করেছেন।
১৫৭. আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন : ১/২২৩
১৫৮. আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.)-এর এ উক্তি তখনই প্রযোজ্য হবে যখন বলা হবে যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছেন [নাউযুবিল্লাহ]। তবে এ কথা সুস্পষ্ট যে, হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর উক্তি মতে তিনি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করেননি। বরং সেগুলোর কেরাতকে বর্জন করেছেন মাত্র। তাই যদিও হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর উক্তি সঠিক, কিন্তু এত কঠোর ভাষার উপযোগী নন।
১৫৯. আল-ফাসলু ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল : ২/৭৭-৭৮
১৬০. আল-মুনতাকা শারহে মুয়াত্তা : ১/৩৪৭
১৬১. আল-মুসতাসফা : ১/৬৫
১৬২. মিরকাতুল মাফাতীহ : ৫/১৬
১৬৩. আন-নশরু ফী কিরাআতিল আশর : ১/৩৩
১৬৪. আল-মুসাফফা : পৃঃ ১৮৭
১৬৫. এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সাত কেরাতের মধ্যে কোনো কোনো কেরাত সাত হরফের অন্তর্ভুক্ত। যেমন, সমস্ত মুতাওয়াতির কেরাত সাত হরফের অন্তর্ভুক্ত। আবার কোনো কোনো কেরাত এমন আছে যা সাত হরফের অন্তর্ভুক্ত নয়। যেমন, সাত কারীদের বিরল কেরাতসমূহ অথবা মতানৈক্যমুক্ত কেরাতসমূহ। আবার সাত হরফের কোনো কোনো মতভেদ এমন আছে যা সাত কেরাতের মধ্যে শামিল নয়। যেমন, ইমাম ইয়াকুব (রহ.), ইমাম আবু যাফর (রহ.) ও খালাফ (রহ.)-এর মুতাওয়াতির কেরাতসমূহ। এগুলো যদিও সাত হরফের মধ্য হতে; কিন্তু প্রসিদ্ধ সাত কেরাতের মধ্য হতে নয়। -মুহাম্মদ তাকী।
১৬৬. ফয়যুল বারী : ৩/৩২১-৩২২
১৬৭. মাকালাতুল কাউসারী : পৃ : ২০-২১
১৬৮. মানাহিলুল ইরফান : ১/১৫১
১৬৯. মুশকিলুল আছার : ৪/১৯৩
১৭০. কানযুল উম্মাল : ১ম খণ্ড, হাদীস নং ৪৮৪
১৭১. ইবনে সা’দ রচিত আত-তবকাতুল কুবরা : ২/১৯৫
১৭২. সহীহ মুসলিম : ১/২৭৩
১৭৩. ইবনে আবী দাউদ (রহ.) রচিত “কিতাবুল মাসাহিফ” পৃ : ২২, ফাতহুল বারী : ৯/১৫
১৭৪. আল-ইতকান : ১/৬১
১৭৫. বহু উলামায়ে কেরাম হযরত উসমান (রা.)-এর এ পদক্ষেপের এই ব্যাখ্যাই করেছেন। দেখুন, আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.) রচিত “الفصل فى الملل والاهواء والنحل”-এর ৭ম খণ্ডের ৭৭ নং পৃষ্ঠা; মাওলানা আবদুল হক হক্কানী (রহ.) রচিত “البيان فى علوم القرآن”-এর দ্বিতীয় অধ্যায় দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ, পৃ. ৫৮; এবং মাবাহেস ফি উলুমিল কুরআন : ১/২৪৮-২৫৬
১৭৬. সহীহ বুখারী [ফাতহুল বারী সহ] : ৯/১৬
১৭৭. কানযুল উম্মাল : ১/২৮২ হাদীস নং ৪৭৮৩
১৭৮. রেওয়ায়েতটি ইমাম আহমদ (রহ.) বর্ণনা করেছেন। এর সনদ নির্ভরযোগ্য। (আওজাযুল মাসালিক : ২/৩৫৭)
১৭৯. কানযুল উম্মাল : ১/২৮৬ হাদীস নং ৪৮৪
১৮০. আন-নশরু ফী কিরআতিল আশর : ১/৩২, হাফেয ইবনে হাজার (রহ.)-ও বিভিন্ন মুহাদ্দিসীনের বরাত দিয়ে এ বিষয়ে একাধিক রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন। (ফাতহুল বারী : ৯/৩৬)
১৮১. ফাতহুল বারী : ৯/১৬
১৮২. মুসতাদরাক হাকেম : ২/২২৮, হাকেম (রহ.) বলেন, এটা সহীহ সনদবিশিষ্ট হাদীস। আল্লামা যাহাবী (রহ) তা সত্যায়ন করেছেন।
১৮৩. আল-ফাতহুর রব্বানী : ১৮/৩৫
১৮৪. মুসতাদরাক হাকেম : ২/২২৯
১৮৫. আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) ইবনে আশতা (রহ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে হযরত ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফের বিন্যাস সম্পূর্ণ নকল করেছেন। মাসহাফে উসমানীর সাথে যার প্রচুর গড়মিল রয়েছে। (আল-ইতকান : ১/৬৬
১৮৬. সহীহ বুখারী : কুরআন সংকলন অধ্যায়।
১৮৭. ফাতহুল বারী : ৯/৩২
১৮৮. ফাতহুল বারী : ৯/৪০
১৮৯. মুসনাদে আহমদের মধ্যে কেবল একটি রেওয়ায়েত এমন পাওয়া যায়, যা দ্বারা বাহ্যিকভাবে মনে হয় যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এর উপরই আপত্তি করেছিলেন। (ফাতহুর রাব্বানী : ১৮/৩৬) কিন্তু এটা এক মাজহুল তথা অপরিচিত ব্যক্তি থেকে বর্ণিত বলে নির্ভরযোগ্য নয়।
১৯০. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) নিজের মাসহাফকে বাকি রাখার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু মাসহাফে উসমানীর কোনো কথার উপর তিনি বিন্দুমাত্রও দ্বিমত পোষণ করেননি।
চিন্তা পরিবর্তনের সাথে সাথে আচরণের আমূল পরিবর্তন

ইসলামের এক মহান দ্বীন যেখান এমন সব বিধান, শিক্ষা, সংগঠন ও আইনে পরিপূর্ণ যা মানুষকে দুর্দশা ও অবক্ষয়ের অবস্থা থেকে মর্যাদা, গর্ব ও আভিজাত্যের দিকে উন্নীত করে, তুচ্ছ বিষয়ের ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। আজকের আলোচনায়, আমরা ইসলামের প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের বাস্তবতার অনেক উদাহরণের মধ্যে একটির কথা আলোচনা করব।
আমাদের নবী এবং আমাদের প্রিয় নেতা মুহাম্মদ (সা) এর হৃদয়ে অবতীর্ণ ইসলামের আহ্বান নারীদের ব্যতিরেকে কেবল পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নারীরা এই বরকতময় আহ্বানের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, আল্লাহর বাণীকে উচ্চে তুলে ধরার জন্য আত্মত্যাগ করেছিলেন। শহীদ সুমাইয়া বিনতে খায়য়াত (রা.) এর ঘটনা আমাদের অজানা নয়, তিনি ছিলেন প্রথম শহীদ যিনি ইসলামের পথে আরোহণ করেছিলেন, যদিও তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি এই সম্মান পেয়েছিলেন। এ থেকে, আমরা এই দ্বীনের মহত্ত্ব এবং সকল মানুষের জন্য এর ব্যাপকতা স্বীকার করি। যখন কেউ ইসলামে প্রবেশ করে, তখন তারা এর জন্য দায়িত্বশীল হয়ে থাকেন ঠিক যেমন সেরা সাহাবী, আবু বকর আল-সিদ্দিক, উমর আল-ফারুক, উসমান যুন-নূরাইন এবং আলী কাররামাল্লাহু ওজহাহু (রা.) ছিলেন।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে, আমরা একজন মহান সাহাবিয়্যার জীবন দেখি যার ইসলামী ইতিহাসে বিরাট প্রভাব ছিল: আল-খানসা (রা.) (তামাদির বিনতে আমর ইবনে আল-হারিস), যাকে আল্লাহর রাসূল (সা.) আরবদের মধ্যে সেরা কবি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। উমর ইবনে আল খাত্তাব (রা.) তাকে দেখলেই কবিতা আবৃত্তি করতে বলতেন। তার কবিতা এত সুন্দর এবং মসৃণ ছিল যে, পানির শীতল স্রোতের মতো হৃদয়ে প্রবাহিত হওয়ার অনুভূতি হতো। বলা হয় যে, ভাষায় “আল-খানসা” অর্থ “হরিণ”।
আল-খানসা (রা.) মক্কা বিজয়ের পর অষ্টম হিজরীতে তার গোত্র বনু সুলাইমের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। আল্লাহর রহমতে তিনি ইসলামের প্রতি অনুগত ছিলেন। নবী (সা) তার কবিতা শুনতেন এবং তাকে বলতেন,
«هيه يا خنساء»
“চালিয়ে যাও, হে খানসা।”তিনি তার দুই ভাই, সাখর এবং মুয়াবিয়ার জন্য তীব্র ক্রন্দনের জন্য পরিচিত ছিলেন, যারা ইসলাম-পূর্ব যুগে নিহত হয়েছিল। তিনি তাদের জন্য অনেক শোকগাথা রচনা করেছিলেন এবং এই বিষয়বস্তু তার কবিতায় প্রাধান্য পেয়েছিল, এমনকি তিনি ইসলাম গ্রহণের পরেও। ভাই সাখরের জন্য শোক প্রকাশে তার কবিতায় এসেছে:
“তোমার চোখে কি ধুলো ঢুকেছে, নাকি কাঁদছে,
অথবা ঘর খালি মনে হলে তোমার চোখ (এর পানি) কি উপচে পড়ে?
এটা এমন যেন আমার চোখ, যখন তার স্মৃতি আসে,
আমার গাল বেয়ে অবিরাম প্রবাহিত একটি স্রোত।
খানসা সাখরের জন্য কাঁদে, আকাঙ্ক্ষায় আচ্ছন্ন,
যদিও সে তাজা মাটির স্তরের নীচে আবৃত।
সে কাঁদে এবং যতদিন সে বেঁচে থাকে ততদিন থামবে না,
তার দীর্ঘশ্বাস চিরকাল শোকে প্রতিধ্বনিত হয়।
খানসা সাখরের জন্য কাঁদে এবং ঠিকই বলেছে,
কারণ সময় তাকে আঘাত করেছে, এবং সময় কঠোর।”
তার গোত্রের কিছু লোক আল্লাহর রাসূল (সা) এর খলিফা (খলিফা) উমর ইবনুল খাত্তাবের কাছে তার অতিরিক্ত শোকের অভিযোগ করে বলেছিল যে তার শোকগ্রন্থ আল্লাহর বিধানের প্রতি ধৈর্যের অভাব প্রদর্শন করে।
উল্লেখ করা হয়েছে যে তিনি একবার তার গোত্রের লোকদের সাথে একটি প্রয়োজনে মদীনায় এসেছিলেন। তারা উমরকে বলল, “এই আল-খানসা। তুমি যদি তাকে ধমক দিতে, কারণ তার কান্না অজ্ঞতার যুগে এবং ইসলামে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে।” উমর তার কাছে গিয়ে বললেন, “হে খানসা।” তিনি মাথা তুলে বললেন, “তুমি কী চাও? তুমি কী চাও?” তিনি বললেন, “কোন কষ্টে তোমার চোখ কান্না করে?” তিনি বললেন, “মুদারের নেতাদের জন্য কাঁদছি।” তিনি বললেন, “তারা অজ্ঞতার যুগে ধ্বংস হয়ে গেছে; তারা এখন জাহান্নামের জ্বালানি।” তিনি বললেন, “আমার বাবা-মা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক, এতে আমার কষ্ট আরও বেড়ে যায়।” তিনি বললেন, “তুমি যা রচনা করেছো তা আমাকে শোনাও।” তিনি বললেন, “আমি আপনাকে আগে যা রচনা করেছি তা শোনাবো না বরং এখন যা বলেছি তা শোনাবো।” তাই তিনি কবিতার পংক্তি আবৃত্তি করলেন। উমর বললেন, “তাকে ছেড়ে দাও, কারণ সে সর্বদা দুঃখিত থাকবে।” তিনি তাকে নিষেধ করেননি বা তিরস্কার করেননি, তার প্রতি দয়া ও ভদ্রতা প্রদর্শন করেছেন।
ইসলাম-পূর্ব যুগে (জাহিলিয়াহ) এবং তার প্রাথমিক ইসলামের কিছু অংশে তার ভাইদের সম্পর্কে আল-খানসার (রা.) অবস্থা এই ছিল। তবে, ইসলাম তার আত্মার গভীরে প্রবেশ করেছিল। তিনি তার ঈমান, দ্বীন এবং এই জীবনের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছিলেন, তাই তিনি আরবের বাইরে প্রথম মুসলিম বিজয়ে অংশগ্রহণের জন্য তাড়াহুড়ো করেছিলেন। তিনি ইসলামের অন্যতম সিংহ সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর নেতৃত্বে তার পুত্রদের সাথে ইরাক বিজয়ে যান। যুদ্ধের আগের রাতে, তিনি তার চার পুত্রকে সম্বোধন করে বললেন, “হে আমার পুত্রগণ, তোমরা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছ এবং তোমাদের ইচ্ছানুযায়ী হিজরত করেছ। সেই আল্লাহর কসম, যিনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই, তোমরা যেমন একজন পুরুষের সন্তান, তেমনি তোমরাও একজন মহিলার সন্তান। আমি কখনও তোমার পিতার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি, তোমার চাচাকে অপমান করিনি, তোমার বংশকে কলঙ্কিত করিনি, তোমার সম্মানকে কলুষিত করিনি। তোমরা জানো, কাফেরদের সাথে যুদ্ধকারী মুসলমানদের জন্য আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) কত মহান পুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন। এবং জেনে রাখো যে, চিরস্থায়ী আবাস এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর চেয়ে উত্তম। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“হে ঈমানদারগণ! ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্য ধারণ করো, সতর্ক থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও” [সূরা আল- ইমরান: ২০০]।
আগামীকাল, যদি আল্লাহ চান এবং তোমরা নিরাপদ থাকো, তাহলে তোমাদের শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বের হও। অন্তর্দৃষ্টির সাথে, আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) শত্রুদের বিরুদ্ধে সাহায্য প্রার্থনা করো। যখন তুমি দেখবে যুদ্ধের আগুন প্রচণ্ডভাবে জ্বলছে এবং এর শিখা উঁচুতে উঠছে, তখন তার উত্তাপে ঝাঁপিয়ে পড়ো এবং যুদ্ধের শীর্ষে তাদের নেতার সাথে লড়াই করো। তুমি জান্নাতের চিরস্থায়ী আবাসে বিজয়, গনীমত এবং সম্মান অর্জন করবে।”
তার পুত্ররা তার ইচ্ছা মেনে নিয়েছিল, যুদ্ধে বেরিয়েছিল এবং সকলেই আল-কাদিসিয়ায় শহীদ হয়েছিল। তাদের কেউই ফিরে আসেনি। আল-খানসা (রা.) যখন এই খবর পেয়েছিলেন, তখন তিনি তাদের জন্য আতঙ্কিত হননি বা শোক করেননি যেমনটি তিনি তার ভাই সাখরের জন্য করেছিলেন। পরিবর্তে, তিনি ধৈর্যের সাথে তা সহ্য করেছিলেন এবং তার বিখ্যাত বাক্যগুলি বলেছিলেন,
“الحمد لله الذي شرفني بقتلهم، وأرجو من ربي أن يجمعني بهم في مستقر رحمته»
“সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাদের শাহাদাতের মাধ্যমে আমাকে সম্মানিত করেছেন।” আমি আমার প্রভুর কাছে আশা করি যে তিনি আমাকে তাঁর রহমতের আবাসে তাদের সাথে একত্রিত করবেন।”
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তার চার ছেলের প্রত্যেকের জন্য ২০০ দিরহাম করে ভাতা দিতেন, যতদিন না তিনি (রা.) ইন্তেকাল করেন।
এভাবে ইসলাম তার ধারণা, চিন্তাভাবনা এবং মৃত্যুর প্রতি তার আচরণ পরিবর্তন করে, যা কেউ এড়াতে পারে না। কখনও এমন খবর পাওয়া যায়নি যে তিনি তার ছেলেদের শোক প্রকাশ করে একটিও কবিতা রচনা করেছেন, যদিও তিনি একদিনে চারটি ছেলেকেই হারিয়েছিলেন।
অতএব, আমরা বলি: যে মুসলিমের বিশ্বাস, আচরণ এবং জীবনযাত্রা ইসলামের চিন্তাভাবনা এবং ধারণা দ্বারা পরিবর্তিত হয় না, সে তার দ্বীনকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারেনি, অথবা ইসলামকে একটি সম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ এবং তারপরে আল্লাহর করুণার দ্বারা জান্নাতে যাওয়ার পথ হিসাবে বিবেচনা করেনি। এবং এটিই প্রকৃতপক্ষে সর্বোচ্চ সাফল্য।
হে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা), আপনার রহমত দ্বারা যা সমস্ত কিছুতে বিস্তৃত, এবং আপনার উদারতা ও অনুগ্রহের দ্বারা, আমাদের প্রতি দয়া করুন এবং আমাদেরকে আমাদের নেতা ও নবী মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা.) সাথে আপনার ক্ষমা ও করুণার স্থানে একত্রিত করুন, হে দয়ালুদের মধ্যে সবচেয়ে দয়ালু।
খিলাফত রাষ্ট্রে শিক্ষা পাঠ্যক্রমের ভিত্তি | ভূমিকা ও নীতিসমূহ

১. ভূমিকা
যেকোনো জাতির সংস্কৃতি (ثقافة) তার অস্তিত্ব ও টিকে থাকার মেরুদণ্ড। এই সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করেই উম্মাহর সভ্যতা (حضارة) প্রতিষ্ঠিত হয়, এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারিত হয় এবং এর জীবনধারা সংজ্ঞায়িত হয়। উম্মাহর ব্যক্তিরা এই সংস্কৃতির মাধ্যমে একটি অভিন্ন ধারায় গড়ে ওঠে, যার ফলে উম্মাহ অন্যান্য জাতি থেকে স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে। এই সংস্কৃতি হলো: উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ (আকিদা) এবং এই মতবাদ থেকে উদ্ভূত বিধি, সমাধান ও ব্যবস্থা। এটি হলো এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা জ্ঞান ও বিজ্ঞান, সেইসাথে এই বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদের সাথে সম্পর্কিত ঘটনাবলী, যেমন উম্মাহর জীবনচরিত (সিরাত) ও ইতিহাস। যদি এই সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে এই উম্মাহ একটি স্বতন্ত্র উম্মাহ হিসেবে বিলীন হয়ে যাবে; ফলে এর লক্ষ্য ও জীবনধারা পরিবর্তিত হবে, এর আনুগত্যের কেন্দ্রবিন্দু সরে যাবে এবং এটি অন্যান্য জাতির সংস্কৃতি অনুসরণ করতে গিয়ে পথভ্রষ্ট হবে।
ইসলামী সংস্কৃতি হলো ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ (তথা আকীদা) দ্বারা অনুপ্রাণিত জ্ঞান (معارف)। এই জ্ঞান ইসলামী মতবাদকে অন্তর্ভুক্ত করে কি না, যেমন ‘তাওহীদ’ সংক্রান্ত জ্ঞান; অথবা এটি বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদের উপর ভিত্তি করে গঠিত কি না, যেমন ফিকহ (আইনশাস্ত্র), কুরআনের তাফসীর এবং হাদিস; অথবা এটি ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ (তথা আকীদা) থেকে উদ্ভূত নিয়মাবলী বোঝার জন্য একটি পূর্বশর্ত কি না, যেমন ইসলামে ইজতিহাদের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, যেমন আরবি ভাষার জ্ঞান, হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষা এবং উসুলুল ফিকহ (আইনশাস্ত্রের মূলনীতি)। এই সবকিছুই ইসলামী সংস্কৃতির অংশ, কারণ ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ (আকীদা)ই এর গবেষণার চালিকাশক্তি। একইভাবে, ইসলামী উম্মাহর ইতিহাসও এর সংস্কৃতির একটি অংশ, কারণ এতে তার সভ্যতা, ব্যক্তিত্ব, নেতা এবং আলেমদের সম্পর্কে সংবাদ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রাক-ইসলামী আরবের ইতিহাস ইসলামী সংস্কৃতির অংশ নয়, তবে প্রাক-ইসলামী আরবের কবিতাকে এই সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, কারণ এতে এমন প্রমাণ রয়েছে যা আরবি ভাষার শব্দ ও বাক্য গঠন বুঝতে সাহায্য করে এবং ফলস্বরূপ ইজতিহাদ, কুরআনের তাফসীর ও হাদিস বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়।
উম্মাহর সংস্কৃতি তার ব্যক্তিদের চরিত্র গঠন করে। এটি ব্যক্তির বুদ্ধিবৃত্তিকে সংগঠিত করে এবং (তা দ্বারা) বস্তু, বক্তব্য ও কাজ বিচার করার পদ্ধতিকে গঠন করে, ঠিক যেমন এটি তার প্রবণতাগুলোকে গঠন করে, যার ফলে (এই সংস্কৃতি) তার মানসিকতা, স্বভাব (নাফসিয়্যা) এবং আচরণকে প্রভাবিত করে। সুতরাং, সমাজে উম্মাহর সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও বিস্তার করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। সোভিয়েত ইউনিয়ন ঐতিহাসিকভাবে তার সন্তানদের কমিউনিস্ট সংস্কৃতির ওপর গড়ে তুলেছিল এবং তার সংস্কৃতিতে পুঁজিবাদী বা ইসলামী চিন্তাধারার কোনো অনুপ্রবেশ রোধ করার চেষ্টা করেছিল। সমগ্র পশ্চিমা বিশ্ব তার সন্তানদের এমন পুঁজিবাদী সংস্কৃতির ওপর লালন-পালন করেছে যা জীবন থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করার নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। তারা সেই ভিত্তির ওপর তাদের জীবনকে সংগঠিত ও প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং যুদ্ধ করেছে—যেমনটি তারা আজও করে চলেছে—যাতে ইসলামী সংস্কৃতি তাদের মতবাদ ও সংস্কৃতিতে প্রবেশ করতে না পারে। ইসলামী রাষ্ট্র তার সন্তানদের মধ্যে ইসলামী সংস্কৃতিকে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয় এমন কোনো চিন্তাধারার প্রচার থেকে সবাইকে বিরত রেখেছে। রাষ্ট্র দাওয়াহ ও জিহাদের মাধ্যমে তার সংস্কৃতিকে অন্যান্য রাষ্ট্র ও জাতির কাছেও পৌঁছে দিয়েছে। এটি ততক্ষণ পর্যন্ত চলতে থাকবে যতক্ষণ না আল্লাহ পৃথিবী এবং তার উপর বসবাসকারী সকলকে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেন (অর্থাৎ কেয়ামত দিবস পর্যন্ত)।
উম্মাহর সংস্কৃতি সংরক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিশ্চয়তা হলো, এর সংস্কৃতি তার সন্তানদের হৃদয়ে মুখস্থ থাকবে এবং বইপত্রে সংরক্ষিত থাকবে। এর পাশাপাশি উম্মাহর উপর একটি রাষ্ট্র থাকবে, যা এই সংস্কৃতির বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ থেকে উদ্ভূত নিয়মকানুন অনুযায়ী এর বিষয়াদি পরিচালনা ও দেখাশোনা করবে।
শিক্ষা হলো উম্মাহর সংস্কৃতিকে তার সন্তানদের হৃদয়ে এবং বইয়ের পাতায় সংরক্ষণ করার একটি পদ্ধতি, তা আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাক্রমই হোক না কেন। শিক্ষাক্রম বলতে বোঝায় রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থা ও নীতিমালা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা, যার বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর ন্যস্ত থাকে, যেমন শিক্ষার শুরুর বয়স, অধ্যয়নের বিষয় এবং শিক্ষাদান পদ্ধতি নির্ধারণ করা। অন্যদিকে, অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাক্রম মুসলমানদের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়, যাতে তারা ঘরে, মসজিদে, ক্লাবে, গণমাধ্যমের মাধ্যমে, সাময়িক প্রকাশনার মাধ্যমে ইত্যাদি ক্ষেত্রে শিক্ষা দিতে পারে, যা শিক্ষাক্রমের সংগঠন ও নীতিমালার অধীন নয়। তবে উভয় ক্ষেত্রেই, রাষ্ট্র এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে দায়বদ্ধ যে (শিক্ষিত) চিন্তাভাবনা এবং জ্ঞান হয় ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ থেকে উদ্ভূত হবে অথবা তার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে। আমরা এখানে খিলাফত রাষ্ট্রের শিক্ষাক্রমের ভিত্তিগুলো উপস্থাপন করছি।
২. খিলাফত রাষ্ট্রে শিক্ষা নীতি এবং এর সংগঠন
খিলাফত রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষা পাঠ্যক্রম সম্পর্কিত শরীয়াহ বিধি এবং প্রশাসনিক নীতিমালার সমষ্টি নিয়ে গঠিত। শিক্ষা সম্পর্কিত শরীয়াহ বিধিগুলো ইসলামী আকীদা থেকে উদ্ভূত এবং সেগুলোর শরীয়াহভিত্তিক প্রমাণ রয়েছে, যেমন অধ্যয়নের বিষয়বস্তু এবং ছাত্র ও ছাত্রীদের মধ্যে পৃথকীকরণ। আর শিক্ষা সম্পর্কিত প্রশাসনিক নীতিমালা হলো সেই অনুমোদিত উপায় ও পদ্ধতি, যা ক্ষমতায় থাকা শাসক এই ব্যবস্থা বাস্তবায়ন এবং এর লক্ষ্য অর্জনের জন্য উপকারী বলে মনে করেন। এগুলো পার্থিব বিষয়, যা শিক্ষা সম্পর্কিত শরীয়াহ বিধি এবং উম্মাহর মৌলিক চাহিদা বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মনে হওয়া অনুযায়ী বিকাশ ও পরিবর্তনের অধীন। একইভাবে, এগুলো অন্য জাতির অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং অনুমোদিত গবেষণা থেকে গ্রহণ করা যেতে পারে।
শরিয়াহ বিধি ও প্রশাসনিক কানুনসমূহের এই ব্যবস্থার জন্য এমন একটি বিকল্প কাঠামোর প্রয়োজন, যা খিলাফত রাষ্ট্রে শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্যগুলো অর্জনে সক্ষম হবে, অর্থাৎ ইসলামী ব্যক্তিত্ব গঠন করতে পারবে। এই কাঠামোটি পাঠ্যক্রম নির্ধারণ, যোগ্য শিক্ষক নির্বাচন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং স্কুল, ইনস্টিটিউট ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগার ও শিক্ষামূলক উপকরণ সরবরাহসহ শিক্ষার সমস্ত দিকের তত্ত্বাবধান, সংগঠন এবং হিসাবরক্ষণের দায়িত্ব পালন করে।
আমরা এখন ‘সংবিধানের ভূমিকা’ (মুকাদিমাত আদ-দুস্তুর) থেকে ‘শিক্ষা নীতির’ বেশিরভাগ ধারা উপস্থাপন করছি, যা হলো ইসলামি রাষ্ট্রের খসড়া সংবিধান।
ধারা ১৭০
ইসলামী আকীদাহ্ হবে শিক্ষা নীতির মূল ভিত্তি। পাঠ্যসূচী এবং শিক্ষার পদ্ধতি এমনভাবে পরিকল্পিত হবে যাতে এই মূল ভিত্তি থেকে বিচ্যূত হবার কোন সুযোগ না থাকে।
ধারা ১৭১
শিক্ষা নীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যক্তির চিন্তা ও চরিত্রকে ইসলামী ব্যক্তিত্বের রূপদান করা। পাঠ্যসূচীর অন্তর্গত সকল বিষয়েরই এ ভিত্তির উপর গভীরভাবে প্রোথিত থাকা আবশ্যক।
ধারা ১৭২
শিক্ষার লক্ষ্য হচ্ছে ইসলামী ব্যক্তিত্ব গঠন করা এবং জীবনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে জনগণকে শিক্ষা দান করা। শিক্ষার পদ্ধতি এ লক্ষ্য পূরণের জন্য পরিকল্পিত হবে এবং এই লক্ষ্য পূরণ থেকে বিচ্যুত অন্যকোন পদ্ধতিতে নিবৃত্ত করা হবে।
ধারা ১৭৩
ইসলামী সংস্কৃতি ও আরবী ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে সপ্তাহে ব্যয়কৃত সময় অন্য বিষয়গুলো শিক্ষার পিছনে ব্যয়কৃত সময়ের সমান হওয়া আবশ্যক।
ধারা ১৭৪
পরীক্ষালব্ধ বিজ্ঞান (empirical sciences) যেমন গণিত ও সাংস্কৃতিক বিষয়গুলোর (cultural subjects) মধ্যে সুস্পষ্ট বিভাজন থাকা আবশ্যক। পরীক্ষালব্ধ বিজ্ঞান এবং এর সাথে সম্পর্কিত যেকোন বিষয় অবশ্যই প্রয়োজন অনুসারে শেখানো হবে এবং কোন নির্দিষ্ট স্তরে সীমাবদ্ধ রাখা হবে না। অপরদিকে, সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে অবশ্যই ইসলামী ধারণা ও বিধিবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী শেখানো হবে। উচ্চশিক্ষার স্তরে এ বিষয়গুলো একটি নির্দিষ্ট বিষয়রূপে এমনভাবে শেখানো যেতে পারে, যাতে করে তা কোনক্রমেই উক্ত নীতিমালা ও শিক্ষার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয়।
ধারা ১৭৫
শিক্ষার সকল স্তরে অবশ্যই ইসলামী সংস্কৃতি শিক্ষা দিতে হবে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে চিকিৎসা, প্রকৌশল, পদার্থবিদ্যা এবং অন্যান্য বিষয়ের মত ইসলামী সংস্কৃতির বিভিন্ন বিভাগ প্রবর্তন করা হবে।
ধারা ১৭৬
কারিগরী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মত বিষয়গুলো একদিকে বিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পারে, যেমন: ব্যবসা প্রশাসন, নৌবিদ্যা ও কৃষিবিদ্যা ইত্যাদি। এ ধরনের বিষয়গুলো কোনরূপ সীমাবদ্ধতা বা শর্ত ছাড়াই শেখানো হবে। তারপরও মাঝেমধ্যে কারিগরী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত এবং একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গী দ্বারা প্রভাবিত থাকতে পারে, যেমন চারুশিল্প (অঙ্কন শিল্প) ও ভাস্কর্য। এ সকল ক্ষেত্রে যদি এগুলো ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সাংঘর্ষিক হয় তবে এ বিষয়গুলো শেখানো যাবে না।
ধারা ১৭৭
একমাত্র রাষ্ট্র প্রণীত শিক্ষা পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম অনুমোদন করা হবে এবং অন্য কোন পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। বেসরকারী বিদ্যালয় স্থাপনের অনুমতি থাকবে, তবে এগুলো বিদেশী হতে পারবে না, এবং তাদের অবশ্যই রাষ্ট্রের প্রণীত শিক্ষা পাঠ্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে, শিক্ষানীতির উপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এবং রাষ্ট্র নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী উভয় ক্ষেত্রেই, নারী-পুরুষ মেলামেশা করতে পারবে না। এছাড়া, এসকল বিদ্যালয় কোন ধর্ম, গোত্র বা বর্ণের লোকদের জন্য সীমাবদ্ধ থাকতে পারবে না।
ধারা ১৭৮
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিককে জীবন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয় শিক্ষা দান রাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। অন্ততঃ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত এটি সবার জন্য বিনামূল্যে প্রদান করতে হবে। রাষ্ট্রের সর্বাত্মক চেষ্টা করা উচিত যাতে করে সবাই বিনামূল্যে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ অব্যাহত রাখতে পারে।
ধারা ১৭৯
রাষ্ট্রকে বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে যথেষ্ট পরিমাণ পাঠাগার এবং পরীক্ষাগার সহ জ্ঞান বৃদ্ধির সুবিধাসমূহের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে করে যারা ফিক্হ, হাদীস, তাফসীর, চিকিৎসা, প্রকৌশল, রসায়নবিদ্যা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা অব্যাহত রাখতে চায়, তারা তা করতে পারে। রাষ্ট্রের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে মুজতাহিদ, সৃজনশীল বিজ্ঞানী ও আবিস্কারক তৈরী করার লক্ষ্যে এটি করা হবে।
ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোর ষড়যন্ত্র | ২য় অধ্যায়

কিভাবে খিলাফত ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়
২য় অধ্যায়: ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোর ষড়যন্ত্র
মুসলমানদের ভূমি ভাগাভাগি নিয়ে কাফেরদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও, ইসলামকে ধ্বংস করার ব্যাপারে তারা সম্পূর্ণ একমত ছিল। এই উদ্দেশ্যে তারা বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল। প্রাথমিকভাবে, তারা ইউরোপীয় দেশগুলোতে জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। তারা মানুষকে ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উস্কে দেয় এবং এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ করে, যেমনটি সার্বিয়া ও গ্রিসের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। এভাবে ইউরোপীয় দেশগুলো ইসলামী রাষ্ট্রের পিঠে ছুরিকাঘাত করার চেষ্টা করেছিল। ফ্রান্স ১৭৯৮ সালের জুলাই মাসে মিশর আক্রমণ করে এবং তা দখল করে নেয়, তারপর ফিলিস্তিনের দিকে অগ্রসর হয়ে সেটিও দখল করে। ফ্রান্স ইসলামী রাষ্ট্রকে চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য আল-শামের বাকি অংশ দখল করতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয় এবং পরে মিশর ত্যাগ করতে ও দখল করা ভূমিগুলো ইসলামী রাষ্ট্রের কাছে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়।
ওয়াহাবিদের জন্ম এবং সৌদি শাসনের প্রতিষ্ঠা
ব্রিটেন তার এজেন্ট আব্দুল-আজিজ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে সাউদের মাধ্যমে ইসলামিক রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে আঘাত করার চেষ্টা করেছিল। ততদিনে ওয়াহাবিরা মুহাম্মদ ইবনে সাউদ এবং পরবর্তীতে তার পুত্র আব্দুল-আজিজের নেতৃত্বে ইসলামী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে একটি সত্তা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। ব্রিটেন তাদের অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ করত এবং তারা সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে খিলাফতের অধীনে থাকা ইসলামী ভূমিগুলো দখল করতে অগ্রসর হয়। তারা খলিফার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে এবং ইসলামী সশস্ত্র বাহিনীর (আমিরুল মুমিনিনের সেনাবাহিনী) সাথে যুদ্ধ করে, আর এই পুরোটা সময়ই ব্রিটিশরা তাদের উস্কানি দিত এবং রসদ সরবরাহ করত। ওয়াহাবিরা খলিফা শাসিত ভূমিগুলো দখল করতে চেয়েছিল, যাতে তারা তাদের মাযহাব (চিন্তাধারা) অনুযায়ী সেই ভূমিগুলো শাসন করতে পারে এবং তাদের থেকে ভিন্ন সমস্ত ইসলামিক মাযহাবকে শক্তি প্রয়োগ করে দমন করতে পারে। তাই, তারা কুয়েত আক্রমণ করে এবং ১৭৮৮ সালে তা দখল করে নেয়, তারপর উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে বাগদাদ অবরোধ করে। তারা কারবালা এবং আল-হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহু)’র কবর দখল করে তা ধ্বংস করতে এবং সেখানে যিয়ারত নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিল। এরপর ১৮০৩ সালে তারা মক্কা আক্রমণ করে এবং তা দখল করে নেয়। ১৮০৪ সালের বসন্তে মদিনা তাদের দখলে আসে। তারা আল্লাহর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবরকে ছায়া দেওয়া বিশাল গম্বুজগুলো ধ্বংস করে দেয় এবং সেগুলো থেকে সমস্ত রত্ন ও মূল্যবান অলঙ্কার লুট করে নেয়। পুরো আল-হিজাজ দখল সম্পন্ন করার পর তারা আল-শামের দিকে অগ্রসর হয়। ১৮১০ সালে হিমসের কাছাকাছি পৌঁছে তারা দ্বিতীয়বারের মতো দামেস্ক আক্রমণ করে এবং আল-নাজাফও আক্রমণ করে। দামেস্ক সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে নিজেদের রক্ষা করে। তবে দামেস্ক অবরোধ করার পাশাপাশি ওয়াহাবিরা একই সময়ে উত্তরে অগ্রসর হয় এবং আলেপ্পো পর্যন্ত সিরিয়ার বেশিরভাগ অঞ্চলের উপর তাদের কর্তৃত্ব বিস্তার করে। এটি একটি সুপরিচিত সত্য ছিল যে এই ওয়াহাবি অভিযান ব্রিটিশদের দ্বারা উস্কে দেওয়া হয়েছিল, কারণ আল সৌদ ছিল ব্রিটিশদের এজেন্ট। তারা ওয়াহাবি মাযহাবকে, যা ছিল ইসলামিক এবং যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন একজন মুজতাহিদ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল ইসলামিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এবং অন্যান্য মাযহাবের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া, যাতে উসমানীয় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ শুরু করা যায়। এই মাযহাবের অনুসারীরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিল না, কিন্তু সৌদি আমির এবং সৌদিরা এ সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত ছিল। এর কারণ হলো, সম্পর্কটি ব্রিটিশদের সাথে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল-ওয়াহহাবের ছিল না, বরং ব্রিটিশদের সাথে আব্দুল-আজিজ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে সাউদ এবং পরবর্তীতে তার পুত্র সাউদের ছিল।
মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব, যার মাযহাব ছিল হাম্বলী, তিনি বহু বিষয়ে ইজতিহাদ করেন এবং মনে করেন যে, অন্যান্য মাযহাবের অনুসারী মুসলমানরা এসব বিষয়ে তার মতের সাথে ভিন্নমত পোষণ করে। তাই তিনি তার মতামত প্রচার করতে, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য কাজ করতে এবং অন্যান্য ইসলামী মতামতের তীব্র সমালোচনা করতে শুরু করেন। তিনি বিভিন্ন আলেম, আমির এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে তীব্র বিরোধিতা ও প্রত্যাখ্যানের সম্মুখীন হন, যারা মনে করতেন যে তার মতামতগুলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কিতাব থেকে তাদের বোঝা বিষয়ের সাথে ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি বলতেন যে রাসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবর যিয়ারত করা হারাম এবং একটি পাপের কাজ। তিনি এমনকি এ পর্যন্তও বলেছিলেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবর যিয়ারত করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে, ভ্রমণের সময় তাকে নামাজ কসর করার অনুমতি দেওয়া হবে না, কারণ ভ্রমণের উদ্দেশ্য হবে একটি পাপের কাজ করা। তিনি সেই হাদিসটির উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন যেখানে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন বলে বর্ণিত আছে: “তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যাওয়া যাবে না: আমার এই মসজিদ, মসজিদুল হারাম এবং মসজিদুল আকসা।” মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব এই হাদিস থেকে বুঝেছিলেন যে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও ভ্রমণ করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং, যদি কেউ আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবর যিয়ারত করার জন্য ভ্রমণ করে, তবে সে তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও ভ্রমণ করছে, তাই এটি হারাম এবং একটি পাপের কাজ হবে। অন্যান্য মাযহাবগুলো আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবর যিয়ারত করাকে সুন্নাহ এবং একটি মুস্তাহাব কাজ বলে মনে করত, যা সওয়াব এনে দেয়, কারণ আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “আমি অতীতে তোমাদের কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, কিন্তু এখন তোমরা তা করতে পারো।” অধিকতর যুক্তিতে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবরও এই হাদিসের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত, এছাড়াও তারা অন্যান্য হাদিসও উদ্ধৃত করেছিল। তারা বলেছিল যে, মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব যে হাদিসটিকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন, তা মসজিদ সম্পর্কিত। অতএব, এর বিষয়বস্তু মসজিদ ভ্রমণের সাথে সম্পর্কিত এবং এর বাইরে নয়। হাদিসটি সাধারণ নয়, বরং নির্দিষ্ট এবং একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত: “তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যাওয়া যাবে না।” সুতরাং, একজন মুসলমানের জন্য ইস্তাম্বুলের আয়া সোফিয়া মসজিদ বা দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ বিশেষভাবে পরিদর্শন করা নিষিদ্ধ হবে, কারণ আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মসজিদ পরিদর্শনের জন্য ভ্রমণকে তিনটি মসজিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছেন এবং এর বেশি নয়। এই তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও ভ্রমণ করা নিষিদ্ধ হবে। এছাড়াও, ব্যবসা, পরিবার ও বন্ধুদের সাথে দেখা করা, দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন এবং পর্যটনসহ অন্যান্য কারণে ভ্রমণ করা অনুমোদিত। সুতরাং, হাদিসটি স্পষ্টভাবে ভ্রমণকে নিষিদ্ধ করে না এবং এটিকে এই তিনটি মসজিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে না, বরং এটি উল্লিখিত তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য মসজিদ পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণকে নিষিদ্ধ করে। একইভাবে, অন্যান্য মাযহাবের অনুসারীরা তার মতামতকে ভুল এবং কিতাব ও সুন্নাহ থেকে তাদের বোঝা বিষয়ের সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে করতেন। শীঘ্রই, তার এবং তাদের মধ্যে মতপার্থক্য তীব্র আকার ধারণ করে এবং তাকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হয়। ১৭৪০ সালে, তিনি আনজাহ গোত্রের শেখ মুহাম্মদ ইবনে সাউদের কাছে আশ্রয় নেন, যিনি উয়াইনাহর শেখের সাথে বিরোধে লিপ্ত ছিলেন এবং আল-দির’ইয়াহতে বসবাস করতেন, যা উয়াইনাহ থেকে মাত্র ছয় ঘণ্টার দূরত্বে ছিল। মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাবকে সাদরে গ্রহণ করা হয় এবং আতিথেয়তা করা হয়। তিনি আল-দির’ইয়াহ এবং আশেপাশের এলাকার মানুষের মধ্যে তার মতামত ও চিন্তাভাবনা প্রচার করতে শুরু করেন। কিছুকাল পরে তার চিন্তাভাবনা ও মতামত কিছু সাহায্যকারী ও সমর্থক লাভ করে। আমির মুহাম্মদ ইবনে সাউদ এই চিন্তাভাবনা ও মতামতের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং শেখ (তথা মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব)-এর কাছে আসতে শুরু করেন। ১৭৪৭ সালে, আমির মুহাম্মদ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাবের মতামত ও চিন্তাভাবনার প্রতি তার অনুমোদন ও স্বীকৃতি ঘোষণা করেন। তিনি শেখ (মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব) এবং এই চিন্তাভাবনা ও মতামতের প্রতি তার সমর্থনের প্রতিশ্রুতিও দেন। এই জোটের মাধ্যমে ওয়াহাবি আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটি একটি দাওয়াহ ও শাসনের রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে, কারণ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব এর দিকে আহ্বান করতেন এবং মানুষকে এর নিয়মকানুন শেখাতেন, আর মুহাম্মদ ইবনে সাউদ তার আদেশ ও কর্তৃত্বাধীন মানুষের উপর এর নিয়মকানুন প্রয়োগ করতেন। ওয়াহাবি আন্দোলন দাওয়াহ এবং শাসন—উভয় দিক থেকেই আল-দির’ইয়াহর পার্শ্ববর্তী এলাকা ও গোত্রগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মুহাম্মদ ইবনে সাউদের আমিরাতও প্রসারিত হতে থাকে, এবং দশ বছরের মধ্যে তিনি ৩০ বর্গ মাইল এলাকাকে নিজের কর্তৃত্ব ও নতুন মাযহাবের অধীনে আনতে সক্ষম হন। তবে, এই সম্প্রসারণ অর্জিত হয়েছিল দাওয়াহ এবং আনজাহ গোত্রের শেখের কর্তৃত্বের মাধ্যমে। কোনো ব্যক্তি তাকে চ্যালেঞ্জ করেনি এবং কেউ তার বিরোধিতা করেনি, এমনকি আল-ইহসার আমির, যিনি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল-ওয়াহহাবকে উয়াইনাহ থেকে বহিষ্কার করেছিলেন, তিনিও এই সম্প্রসারণে তার শত্রুর বিরোধিতা করেননি এবং ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সৈন্য সমাবেশ করেননি। তবে, তিনি পরাজিত হন এবং মুহাম্মদ ইবনে সাউদ তার আমিরাত দখল করে নেন। ফলস্বরূপ, মুহাম্মদ ইবনে সাউদের কর্তৃত্ব এবং নতুন মাযহাবের কর্তৃত্বের মাধ্যমে আনজাহ গোত্রের কর্তৃত্ব আল-দির’ইয়াহ ও তার আশেপাশের এলাকা, সেইসাথে আল-ইহসারও শাসক শক্তিতে পরিণত হয়। এভাবে কর্তৃত্বের বলে এই ভূমিগুলোতে ওয়াহাবি মাযহাব প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে, আল-ইহসার আমিরের সাথে সংঘর্ষ এবং তার ভূমি বিজয়ের পর ওয়াহাবি আন্দোলন সেখানেই থেমে যায়। এটি আরও প্রসারিত হয়েছিল কিনা বা কোনো কার্যক্রম চালিয়েছিল কিনা, সে সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। বরং এটি সেই এলাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। মুহাম্মদ ইবনে সাউদ সেই পর্যায়ে থেমে যান এবং ওয়াহাবি মাযহাব এই এলাকার সীমানায় এসে থেমে যায় এবং আন্দোলনটি সুপ্ত ও স্থবির হয়ে পড়ে। ১৭৬৫ সালে মুহাম্মদ ইবনে সাউদ মারা যান। তার পুত্র আবদুল-আজিজ আনজাহ গোত্রের শেখ হিসেবে তার স্থলাভিষিক্ত হন। তার পুত্র পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তার নিয়ন্ত্রিত এলাকা শাসন করেন। তবে, তিনি আন্দোলনের জন্য কোনো কার্যক্রম চালাননি, বা আশেপাশের এলাকায় কোনো সম্প্রসারণও করেননি। ফলে, আন্দোলনটি সুপ্ত অবস্থায় থাকে এবং স্থবিরতা দ্বারা চিহ্নিত হয়। এই আন্দোলন সম্পর্কে খুব কমই শোনা যেত এবং এর কোনো প্রতিবেশীই এটি নিয়ে আলোচনা করত না বা এর আক্রমণের ভয় পেত না। তবে, ওয়াহাবি আন্দোলন শুরু হওয়ার ৪১ বছর পর, ১৭৪৭ থেকে ১৭৮৮ সাল পর্যন্ত, এবং এর থেমে যাওয়া ও স্থবিরতার ৩১ বছর পর (১৭৫৭ থেকে ১৭৮৭ সাল পর্যন্ত), হঠাৎ করেই এর কার্যক্রম আবার শুরু হয়। এই আন্দোলনটি মাযহাব প্রচারের জন্য একটি নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করে এবং এটি এর সীমানা ছাড়িয়ে সমগ্র ইসলামী রাষ্ট্রে এবং অন্যান্য পরাশক্তিগুলোর মধ্যেও ব্যাপকভাবে ও উচ্চ পর্যায়ে প্রচারিত হয়। এই আন্দোলনটি তার প্রতিবেশীদের মধ্যে অস্বস্তি ও উদ্বেগের সৃষ্টি করতে শুরু করে এবং এমনকি সমগ্র ইসলামী রাষ্ট্রের জন্যও অস্বস্তি ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১৭৮৭ সালে আব্দুল-আজিজ একটি ইমারা প্রতিষ্ঠা করতে এবং বংশানুক্রমিক শাসনব্যবস্থা, যা সিংহাসনের উত্তরাধিকার নামে পরিচিত, তা গ্রহণ করার উদ্যোগ নেন। এর ফলে আব্দুল-আজিজ তার পুত্র সাউদকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে নিশ্চিত করেন। শেখ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল-ওয়াহহাবের নেতৃত্বে এক বিশাল জনসমাগম ঘটে। আব্দুল-আজিজ এই বিশাল জনসমাবেশের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন এবং ঘোষণা করেন যে, ইমারার অধিকার তার পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং তার উত্তরাধিকারী হওয়ার অধিকার কেবল তার পুত্রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তিনি আরও ঘোষণা করেন যে, তার পুত্র সাউদকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল-ওয়াহহাবের নেতৃত্বে এই বিশাল জনতা তার সাথে একমত হয় এবং তার ঘোষণাকে স্বীকার করে নেয়। এভাবে কোনো গোত্র বা গোত্রসমষ্টির পরিবর্তে একটি রাষ্ট্রের জন্য একটি ইমারা প্রতিষ্ঠিত হয়। এটাও প্রতীয়মান হয়েছিল যে, ওয়াহাবি মাযহাবের প্রধানের উত্তরাধিকারও মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল-ওয়াহহাবের পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আমির এবং মাযহাবের প্রধান উভয়ের উত্তরাধিকারের বিষয়টি নিষ্পত্তি হওয়ার পর, আন্দোলনটি হঠাৎ আবার প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে এবং তার বিজয় ও সম্প্রসারণ পুনরায় শুরু করে। তারা মাযহাব প্রচারের জন্য আবারও যুদ্ধ শুরু করে। ১৭৮৮ সালে আব্দুল-আজিজ একটি বিশাল সামরিক অভিযান প্রস্তুত ও সজ্জিত করার কাজে হাত দেন। তিনি কুয়েত আক্রমণ করে তা জয় ও দখল করেন। ব্রিটিশরা তাদের পক্ষ থেকে উসমানীয় রাষ্ট্র থেকে কুয়েত দখল করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছিল। এর কারণ ছিল জার্মানি, রাশিয়া এবং ফ্রান্সের মতো অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো তাদের বিরোধিতা করেছিল এবং খিলাফত রাষ্ট্র নিজেও তাদের প্রতিরোধ করেছিল। তাই, উসমানীয় রাষ্ট্র থেকে কুয়েতের বিচ্ছিন্নতা এবং এর সুরক্ষার জন্য উত্তরের দিকে অগ্রসর হওয়া রাশিয়া, জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো প্রধান রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি উসমানীয় রাষ্ট্রেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য যথেষ্ট ছিল। উপরন্তু, এই যুদ্ধটি একটি সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ হওয়ায় তা আধ্যাত্মিক আবেগকেও উস্কে দিত। এইভাবে, ওয়াহাবিরা বেশ কয়েক দশক ধরে চলা নীরবতার পর হঠাৎ করে তাদের কার্যকলাপ পুনরায় শুরু করে। তারা একটি নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে এই কার্যকলাপ শুরু করে, যা ছিল যুদ্ধ ও বিজয়ের মাধ্যমে মাযহাব প্রচার করা, যাতে অন্যান্য সমস্ত মাযহাবের অস্তিত্ব বিলুপ্ত করে সেগুলোকে তাদের মাযহাব দ্বারা প্রতিস্থাপন করা যায়। তারা কুয়েত আক্রমণ ও দখলের মাধ্যমে তাদের কার্যকলাপ শুরু করে। এরপর তারা এই কার্যকলাপের ধারাবাহিকতায় সম্প্রসারণের জন্য বেশ কয়েকটি প্রচেষ্টা চালায়। ফলস্বরূপ, তারা আরব উপদ্বীপের মধ্যে তাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য উদ্বেগ ও উপদ্রবের কারণ হয়ে ওঠে – যেমন ইরাক, আল-শাম এবং খিলাফত রাষ্ট্র হিসেবে উসমানীয় সাম্রাজ্য। তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তরবারি ধারণ করে এবং ওয়াহাবি মাযহাবের বাইরের মতবাদ পরিত্যাগ করতে ও ওয়াহাবি মাযহাবের মতামত গ্রহণ করতে বাধ্য করে। তারা খলিফার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং ইসলামী ভূমি জয় করে। এরপর ১৭৯২ সালে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব মারা যান এবং তার পুত্র তার স্থলাভিষিক্ত হন, ঠিক যেমন সৌদ তার পিতা আব্দুল আজিজের স্থলাভিষিক্ত হন। এরপর সৌদি আমিররা এই পথেই অগ্রসর হন, উসমানীয় রাষ্ট্রকে (খিলাফত রাষ্ট্র) আঘাত করার জন্য এবং মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ উস্কে দেওয়ার জন্য ওয়াহাবি মাযহাবকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।
ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ ষড়যন্ত্র:
আল সৌদের দালালিবৃত্তি এবং ব্রিটিশদের প্রতি তাদের আনুগত্য খিলাফত রাষ্ট্র এবং জার্মানি, ফ্রান্স ও রাশিয়ার মতো প্রধান শক্তিগুলোর কাছে একটি সুপরিচিত বিষয় ছিল। এটিও জানা ছিল যে তারা ব্রিটিশদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিল। ব্রিটিশরা নিজেরাও এই সত্যটি গোপন করত না যে তারা একটি রাষ্ট্র হিসেবে সৌদিদের সমর্থন করত। অধিকন্তু, ভারত হয়ে তাদের কাছে যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও সরঞ্জাম পৌঁছাত এবং যুদ্ধ পরিচালনার খরচ ও সশস্ত্র বাহিনীকে সজ্জিত করার জন্য যে অর্থ আসত, তা সবই ছিল ব্রিটিশ অস্ত্র ও অর্থ। তাই, অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো, বিশেষ করে ফ্রান্স, ওয়াহাবি অভিযানের বিরোধিতা করেছিল, কারণ এটিকে একটি ব্রিটিশ অভিযান হিসেবে গণ্য করা হতো। খিলাফত রাষ্ট্র ওয়াহাবিদের দমন করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি, এবং মদিনা ও বাগদাদের তার ওয়ালিরা তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হন। ফলে, তিনি মিশরের তার ওয়ালি মুহাম্মদ আলীকে তাদের মোকাবিলা করার জন্য একটি বাহিনী পাঠানোর নির্দেশ দেন। প্রথমে তিনি ইতস্তত করেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন ফ্রান্সের একজন চর, এবং ফ্রান্সই তাকে মিশরে অভ্যুত্থান ঘটাতে ও ক্ষমতা দখল করতে সাহায্য করেছিল, এবং তারপর খিলাফতকে তাকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য করেছিল। তাই ফ্রান্সের সম্মতি ও প্ররোচনায়, মুহাম্মদ আলী ১৮১১ সালে সুলতানের দাবিতে সাড়া দেন এবং ওয়াহাবিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তার পুত্র তোসুনকে পাঠান। মিশরীয় সেনাবাহিনী ও ওয়াহাবিদের মধ্যে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং ১৮১২ সালে মিশরীয় সেনাবাহিনী মদিনা জয় করতে সক্ষম হয়। এরপর ১৮১৬ সালে মুহাম্মদ আলী কায়রো থেকে তার পুত্র ইব্রাহিমকে পাঠান, যিনি ওয়াহাবিদের এমনভাবে পরাজিত করেন যে তারা তাদের রাজধানী আল-দিরিয়্যাতে পিছু হটে সেখানে নিজেদের সুরক্ষিত করে। এরপর ১৮১৮ সালের এপ্রিলে ইব্রাহিম তাদের অবরোধ করেন। এই অবরোধ পুরো গ্রীষ্মকাল ধরে চলে এবং ১৮১৮ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর ওয়াহাবিরা আত্মসমর্পণ করে। ইব্রাহিমের সেনাবাহিনী আল-দিরিয়্যা ধ্বংস করে এবং এটিকে সম্পূর্ণরূপে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। বলা হয় যে, তিনি সেই স্থানটি এমনভাবে কর্ষণ করিয়েছিলেন যাতে এর কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট না থাকে। এর মাধ্যমেই ব্রিটিশ অভিযানের সমাপ্তি ঘটে।
ইসলামী রাষ্ট্রকে আঘাত করার জন্য ফ্রান্সের প্রচেষ্টা:
ফ্রান্স তখন তার প্রতিনিধি, মিশরের ওয়ালী মুহাম্মদ আলীর মাধ্যমে পেছন থেকে ইসলামী রাষ্ট্রকে আঘাত করার চেষ্টা করে। ফ্রান্স আন্তর্জাতিকভাবে ও রাজনৈতিকভাবে তাকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছিল এবং তিনি খলিফার আনুগত্য ত্যাগ করে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি ১৮৩১ সালে আল-শাম (বৃহত্তর সিরিয়া) জয় করার লক্ষ্যে সেদিকে অগ্রসর হন। তিনি ফিলিস্তিন, লেবানন এবং সিরিয়া দখল করে আনাতোলিয়ার দিকে অনুপ্রবেশ শুরু করেন। তবে, খলিফা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। ব্রিটেন, রাশিয়া এবং দুটি জার্মান রাজ্য মুহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে চলে যায়। ১৮৪০ সালের জুলাই মাসে ব্রিটেন, রাশিয়া এবং দুটি জার্মান রাজ্য মিলে একটি জোট গঠন করে, যা “চতুর্পক্ষীয় জোট” নামে পরিচিতি লাভ করে। এই চুক্তি অনুসারে, এই রাজ্যগুলো উসমানীয় রাষ্ট্রের ঐক্য রক্ষা করতে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে মুহাম্মদ আলীকে সিরিয়া সমর্পণে বাধ্য করতে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। ইউরোপীয় দেশগুলোর এই অবস্থান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে খলিফার অনুকূলে নিয়ে আসে। এটি মুহাম্মদ আলীকে প্রতিরোধ করতে এবং তাকে সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও লেবানন থেকে বিতাড়িত করতে সাহায্য করে। মুহাম্মদ আলী মিশরে ফিরে আসেন, যেখানে তিনি খলিফার কর্তৃত্বের অধীনে ওয়ালী হিসেবে থাকতে সম্মত হন।
For Audio:
“কম ক্ষতি বেছে নেওয়া” নীতি: শরিয়াহ, রাজনীতি ও নির্বাচনে এর অপপ্রয়োগ

ভূমিকা
সমসাময়িক রাজনীতি, বিশেষত গণতান্ত্রিক নির্বাচন ও ভোটের প্রশ্নে মুসলিম সমাজে প্রায়শই ব্যবহৃত একটি যুক্তি হলো — “মন্দের ভালো” তথা “দুটি অনিষ্টের মধ্যে কম অনিষ্টটি বেছে নেওয়া” (The Lesser of Two Evils / Lesser of the Two Harms)। অনেক ইসলামি কর্মী, সংগঠন ও চিন্তাবিদ এই নীতিকে সামনে রেখে সংসদীয় রাজনীতি, আইন প্রণয়নকারী পরিষদ কিংবা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণকে বৈধ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই নীতি কি সত্যিই শরিয়াহসম্মত? এর সঠিক ক্ষেত্র ও শর্ত কী? আর আধুনিক নির্বাচনী রাজনীতিতে এর প্রয়োগ কি আদৌ সঠিক, নাকি এটি একটি মারাত্মক অপব্যাখ্যা?
এই প্রবন্ধে এই প্রশ্নগুলোর বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট শরঈ বিশ্লেষণ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এবং সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
১. “দুটি অনিষ্টের মধ্যে কম অনিষ্ট” নীতি: শরিয়াহর অবস্থান
প্রথমেই বুঝতে হবে, “কম ক্ষতিকরটি বেছে নেওয়া” নীতি সম্পূর্ণ মনগড়া কোনো ধারণা নয়। বহু ফকিহ ও উসূলবিদ এই নীতির কথা উল্লেখ করেছেন। এটি মূলত একটি উপ-নীতি, যা বৃহত্তর নীতির অধীনে আসে— “ক্ষতি দূর করা আবশ্যক” (الضرر يزال)
তবে শরিয়াহ অনুযায়ী এই নীতির প্রয়োগের জন্য কিছু কঠোর শর্ত রয়েছে:
১. সামনে থাকা দুটি বিষয়ই অবশ্যই নিষিদ্ধ (হারাম) হতে হবে
২. উভয় হারাম একসাথে পরিহার করা বাস্তবিক অর্থে অসম্ভব হতে হবে
৩. কোনটি কম ক্ষতিকর আর কোনটি বেশি ক্ষতিকর—তা শরিয়াহ নিজেই নির্ধারণ করবে, ব্যক্তিগত মত, সুবিধা বা আবেগ নয়
৪. কোনো তৃতীয় হালাল বা বৈধ বিকল্প থাকলে এই নীতির প্রয়োগ সম্পূর্ণ বাতিল
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
“আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।” (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)
এ আয়াত থেকেই ফকিহরা এই নীতির সীমিত বৈধতা বুঝিয়েছেন।
২. শরিয়াহতে নীতিটির সঠিক প্রয়োগ: ক্লাসিক উদাহরণ
ফকিহগণ এই নীতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বাস্তব ও অনিবার্য পরিস্থিতির উদাহরণ দিয়েছেন:
- প্রসবকালে যদি মা ও শিশুর উভয়ের জীবন বিপন্ন হয়, এবং একজনকে বাঁচালে অন্যজন মারা যাবে—তাহলে মাকে বাঁচানো অগ্রাধিকার পায়
- কেউ যদি দেখেন, একজন মানুষ ডুবে যাচ্ছে বা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, আর একই সময়ে নামাজের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে—তাহলে নামাজ বিলম্ব করে জীবন রক্ষা করা অগ্রাধিকার পায়
- কাউকে যদি জোর করে বলা হয়—তুমি অন্য একজন মুসলিমকে হত্যা করো, নতুবা তোমাকে হত্যা করা হবে—তাহলে শরিয়াহ অনুযায়ী তাকে নিজে নিহত হওয়াই গ্রহণযোগ্য, হত্যা করা নয়
এই সব উদাহরণে একটি বিষয় পরিষ্কার: এগুলো অনিবার্য পরিস্থিতি, যেখানে উভয় হারাম একসাথে পরিহার করা অসম্ভব
৩. নির্বাচনে ভোট দেওয়া: অনিবার্যতা নাকি কৃত্রিম সংকট?
এখন প্রশ্ন আসে—গণতান্ত্রিক নির্বাচনে ভোট দেওয়া কি এমন কোনো অনিবার্য পরিস্থিতি? না
কারণ:
- কাউকে ভোট দিতে শরিয়াহ বা বাস্তবতা কেউ বাধ্য করছে না
- ভোট না দেওয়ার বিকল্পটি সম্পূর্ণভাবে বিদ্যমান
- ভোট দেওয়া বা না দেওয়া—দুটোর মধ্যেই জীবন, ঈমান বা অস্তিত্ব রক্ষার মতো কোনো জরুরি অবস্থা নেই
অতএব এখানে “দুটি অনিষ্ট ছাড়া উপায় নেই”—এই দাবি মিথ্যা।
বরং এখানে একটি তৃতীয় হালাল বিকল্প রয়েছে:
ভোট থেকে বিরত থাকা এবং এই বাতিল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান গ্রহণ করা।
যেখানে তৃতীয় বিকল্প থাকে, সেখানে “কম অনিষ্ট” নীতির প্রয়োগ শরিয়াহ অনুযায়ী বাতিল।
৪. আইন প্রণয়ন ও কুফরি শাসনে অংশগ্রহণের সমস্যা
আরও গুরুতর সমস্যা হলো—গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে এমন ব্যক্তিকে ক্ষমতায় আনা, যিনি:
- আল্লাহর শরিয়াহ অনুযায়ী আইন প্রণয়ন করেন না
- মানুষের খেয়াল-খুশিকে আইন বানান
- হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম করার ক্ষমতা নিজের হাতে নেন
এ ধরনের ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া মানে তাকে এই কুফরি ক্ষমতায় অংশীদার বানানো।
এখানে একটি শক্তিশালী উপমা দেওয়া যেতে পারে:
“এটা এমন বলা যে—আমরা নিজেরা মদের দোকান খুলবো, যেন কাফিররা খুলে লাভ না করে।”
এই যুক্তি যেমন অযৌক্তিক, তেমনি ভোটের ক্ষেত্রে “কম অনিষ্ট” যুক্তিও অযৌক্তিক
৫. “কম ক্ষতিকর” কার জন্য? মুসলিম না সিস্টেম?
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—কে নির্ধারণ করবে কোন প্রার্থী কম ক্ষতিকর?
একজন মুসলিমের জন্য ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত স্বার্থে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত:
- মুসলিমদের হত্যা ও নিপীড়ন
- মুসলিম ভূমিতে আগ্রাসন
- কুফরি আইন প্রতিষ্ঠা
- ইসলামকে ব্যক্তিগত ধর্মে সীমাবদ্ধ করে রাখা
পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোতে নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি দল হয়তো অভ্যন্তরীণভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য করবে, আরেকটি দল বিদেশে মুসলিমদের ওপর বোমা ফেলবে—এখন কোনটি কম ক্ষতিকর? এই তুলনাই প্রমাণ করে যে বিষয়টি সম্পূর্ণ আপেক্ষিক ও খেয়ালনির্ভর, শরিয়াহনির্ধারিত নয়।
৬. পরাজিত মানসিকতা ও “রাজনৈতিক বাস্তবতা”
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক দিক তুলে ধরা প্রয়োজন, তা হলো — পরাজিত মানসিকতা
এই মানসিকতার বৈশিষ্ট্য হলো:
- ইসলামকে সম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসেবে বিশ্বাস না করা
- “রাজনৈতিক বাস্তবতা”কে চূড়ান্ত সত্য মনে করা
- কুফরি ব্যবস্থার ভেতরে জায়গা পাওয়াকেই সাফল্য ভাবা
কিন্তু রাসূল ﷺ এর সীরাত সম্পূর্ণ বিপরীত শিক্ষা দেয়। তিনি:
- কুরাইশের শাসন ভাগাভাগির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন
- আপসের বিনিময়ে ক্ষমতা গ্রহণ করেননি
- শর্তযুক্ত রাজনৈতিক সমর্থন গ্রহণ করেননি
ইসলাম কখনো “মন্দের ভালো” তথা “কম কুফর” চায় না; ইসলাম চায় কুফরের অবসান।
উপসংহার
“দুটি অনিষ্টের মধ্যে কম অনিষ্ট” নীতি একটি অত্যন্ত সীমিত, জরুরি ও শর্তসাপেক্ষ শর’ঈ নীতি। এটিকে গণতান্ত্রিক নির্বাচন, ভোট দেওয়া কিংবা কুফরি শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের বৈধতা দিতে ব্যবহার করা—একটি স্পষ্ট অপপ্রয়োগ।
শরিয়াহ আমাদের শিক্ষা দেয়:
- যতক্ষণ হারাম থেকে বাঁচা সম্ভব, ততক্ষণ হারাম বেছে নেওয়া বৈধ নয়
- রাজনৈতিক সুবিধা বা ভয় শর’ঈ ওজর নয়
- ইসলাম আপসের মাধ্যমে নয়, আদর্শের মাধ্যমে পরিবর্তন আনে
অতএব মুসলিমদের দায়িত্ব হলো—এই বিভ্রান্তিকর যুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে ইসলামের নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও সমাধানের দিকে ফিরে যাওয়া।
আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ ۖ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ ۚ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের চিন্তা কর। তোমরা যখন সৎপথে রয়েছ, তখন কেউ পথভ্রান্ত হলে তাতে তোমাদের কোন ক্ষতি নাই। তোমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। তখন তিনি তোমাদেরকে বলে দেবেন, যা কিছু তোমরা করতে। [আল-মায়েদা ৫:১০৫]
অডিও ভার্শন:
ইসলাম ও কুফরের মধ্যকার সংগ্রাম | ১ম অধ্যায়

কিভাবে খিলাফত ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়
১ম অধ্যায়: ইসলাম ও কুফরের মধ্যকার সংগ্রাম
ইসলামী চিন্তাধারা ও কুফরি চিন্তাধারার মধ্যে এবং মুসলিম ও কাফিরদের মধ্যে তীব্র সংগ্রাম ইসলামের সূচনা লগ্ন থেকেই চলে আসছে। যখন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে প্রেরণ করা হলো, তখন এই সংগ্রামটি ছিল কেবল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম, এবং এর সাথে কোনো বস্তুগত সংগ্রাম জড়িত ছিল না। এই অবস্থা মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত বজায় ছিল, এরপর সেনাবাহিনী ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তখন থেকে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বস্তুগত সংগ্রামের সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামকে একত্রিত করেন। জিহাদের আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয় এবং সংগ্রাম চলতে থাকে। কেয়ামত আসা পর্যন্ত এবং আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) পৃথিবী ও তার উপর যা কিছু আছে তার উত্তরাধিকারী হওয়া পর্যন্ত এইভাবেই—বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের পাশাপাশি একটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম—চলতে থাকবে। একারণেই কুফর ইসলামের শত্রু, এবং একারণেই কাফিররা মুসলিমদের শত্রু থাকবে, যতক্ষণ এই পৃথিবীতে ইসলাম ও কুফর থাকবে, মুসলিম ও কাফির থাকবে, যতক্ষণ না সকলকে পুনরুত্থিত করা হয়। এটি একটি চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় সত্য। তাই এই বিষয়টি সম্পর্কে মুসলিমদের সারা জীবন সর্বদা স্পষ্ট ধারণা থাকা উচিত এবং ইসলাম ও কুফরের মধ্যে এবং মুসলিম ও কাফিরদের মধ্যে সম্পর্ক বিচার করার জন্য এটিকে একটি মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
বিশুদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম তেরো বছর ধরে চলেছিল। এটি ছিল সবচেয়ে কঠিন ও ভয়ংকর সংগ্রাম। অবশেষে ইসলামী চিন্তাধারা কুফরি চিন্তাধারাকে পরাজিত করে এবং আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) ইসলামকে বিজয়ী করেন। যে রাষ্ট্র মুসলিমদের সম্মান রক্ষা করে, ইসলামের ঢাল হিসেবে কাজ করে এবং জিহাদের মাধ্যমে মানুষের মাঝে হেদায়েত ছড়িয়ে দেয়, তা মদিনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
ইসলাম ও কুফরের মধ্যে এবং মুসলিম ও কাফির সেনাবাহিনীর মধ্যে একের পর এক যুদ্ধে সবচেয়ে ভয়াবহ ও কঠিন যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই সমস্ত যুদ্ধে বিজয় মুসলমানদেরই হয়েছিল। যদিও মুসলমানরা কিছু যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল, তবুও তারা সর্বদা যুদ্ধে জয়লাভ করেছিল এবং ছয় শতাব্দী ধরে তারা কোনো যুদ্ধে হারেনি, বরং সেই সময়ে তাদের সমস্ত যুদ্ধে বিজয়ী ছিল। পুরো এই সময়কাল জুড়ে ইসলামী রাষ্ট্রই ছিল শীর্ষস্থানীয় জাতি। মুসলমানদের ছাড়া মানবজাতির ইতিহাসে এমনটি আর কখনও ঘটেনি, বরং এটি কেবল ইসলামী রাষ্ট্রের জন্যই নির্দিষ্ট ছিল। তবে অবিশ্বাসীরা, বিশেষ করে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো ইসলাম সম্পর্কে সচেতন ছিল, কারণ তারা এর উপর আক্রমণ করতে চেয়েছিল এবং তারা মুসলমানদের সম্পর্কেও সচেতন ছিল, কারণ তারা তাদের অস্তিত্বকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। সুযোগ পেলেই তারা মুসলমানদের উপর আক্রমণ করার বা তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার চেষ্টা করত। হিজরি ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ (খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দী) এবং হিজরি সপ্তম শতাব্দীর শুরুর (খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দী) মধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলো ইসলামী রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার সেই অবস্থাটি উপলব্ধি করেছিল, যেখানে রাষ্ট্রের দেহ থেকে প্রদেশগুলো খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাচ্ছিল এবং কিছু ওয়ালি (শাসক) সশস্ত্র বাহিনী, অর্থ, ক্ষমতা এবং এই জাতীয় অভ্যন্তরীণ নীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে স্বাধীন হয়ে পড়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, এটি একটি একক ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রের পরিবর্তে রাজ্যগুলোর একটি ফেডারেশনের মতো হয়ে গিয়েছিল। কিছু প্রদেশে খলিফার কর্তৃত্ব কেবল মিম্বরে তার জন্য দোয়া করা, তার নামে মুদ্রা তৈরি করা এবং খারাজ থেকে তাকে কিছু অর্থ পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো এটি বুঝতে পেরেছিল, তাই তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড প্রেরণ করে এবং যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে মুসলমানরা পরাজিত হয় এবং কাফিররা পুরো আল-শাম অঞ্চল দখল করে নেয়: ফিলিস্তিন, লেবানন এবং সিরিয়া। তারা কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলগুলো দখল করে রেখেছিল, এমনকি ত্রিপোলির মতো কিছু এলাকা একশ বছর ধরে তাদের দখলে ছিল।
যদিও ক্রুসেডার এবং মুসলমানদের মধ্যে যুদ্ধগুলো শত বছর ধরে অবিরাম চলছিল, এবং যদিও ক্রুসেডারদের দ্বারা বিজিত ভূমিগুলো পুনরুদ্ধার করার জন্য মুসলমানদের প্রচেষ্টা থেমে যায়নি, তবুও এই যুদ্ধগুলো ইসলামী উম্মাহকে অস্থির করে তুলেছিল এবং ইসলামী রাষ্ট্রের মর্যাদা হ্রাস করেছিল। মুসলমানরা যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল এবং কাফিরদের হাতে পরাস্ত হয়েছিল। যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফিরদের বিজয় হয়েছিল। যদিও ইসলাম বনাম কুফরের বিজয়, বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বা আধ্যাত্মিকভাবে, কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি, তবুও মুসলমানদের উপর যে লজ্জা ও অপমান নেমে এসেছিল তা ছিল কল্পনাতীত। সুতরাং, ক্রুসেডের যুগকে মুসলমানদের জন্য পরাজয়ের যুগ হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ আল-শাম থেকে ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করে শেষ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করা সত্ত্বেও, তারা অবিশ্বাসীদের সাথে বিজয় অভিযান ও যুদ্ধ চালিয়ে যায়নি। ক্রুসেড শেষ হওয়ার পরপরই মোঙ্গলরা এসে পড়ে এবং বাগদাদের গণহত্যা সংঘটিত হয়। এই বিপর্যয়ের পরপরই একই বছরে (৬৫৬ হিজরি, ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ) মোঙ্গলদের হাতে দামেস্কের পতন ঘটে। এরপর ১২৬০ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর আইন জালুতের যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যেখানে মোঙ্গলরা ধ্বংস হয়। মোঙ্গলদের ধ্বংসের পর মুসলমানদের অন্তরে জিহাদের আবেগ জেগে ওঠে এবং তারা বিশ্বে দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার কাজ পুনরায় শুরু করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ফলে, কাফিরদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় অভিযান আবারও শুরু হয় এবং বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে জিহাদ পুনরায় শুরু করা হয়। যুদ্ধ শুরু হয় এবং একের পর এক বিজয় অর্জিত হতে থাকে। হিজরি সপ্তম শতাব্দীর (খ্রিস্টীয় ১৩শ শতাব্দী) দিকে ইসলামী উম্মাহ পুনরায় বিজয় অভিযান শুরু করে। যুদ্ধ চলতে থাকে এবং বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়, এবং মুসলমানরা সর্বদা বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়, কারণ যদিও মুসলমানরা কিছু যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল, তারা যুদ্ধগুলো জিতত এবং ভূমি জয় করত। ইসলামী রাষ্ট্র ছিল অগ্রণী জাতি এবং এটি হিজরি ১২শ শতাব্দীর মাঝামাঝি (খ্রিস্টীয় ১৮শ শতাব্দী) পর্যন্ত চার শতাব্দী ধরে শীর্ষস্থান দখল করে রেখেছিল। এরপর ইউরোপে শিল্প বিপ্লব এক অসাধারণভাবে আবির্ভূত হয়, যা রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এই বিপ্লবের ফলে মুসলমানরা নিষ্ক্রিয় ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল, ফলে বিশ্বে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তিত হয় এবং ইসলামী রাষ্ট্র ধীরে ধীরে শীর্ষস্থান থেকে পতনের দিকে ধাবিত হতে শুরু করে, অবশেষে তা লোভীদের কাঙ্ক্ষিত বস্তুতে পরিণত হয়। ফলে, তারা তাদের বিজিত ভূমি এবং পূর্বে তাদের অধীনে থাকা অঞ্চলগুলো থেকে সরে যেতে শুরু করে। অবিশ্বাসী দেশগুলো তাদের কাছ থেকে ইসলামের ভূমি খণ্ড খণ্ড করে দখল করতে শুরু করে, এবং এটিই ছিল মুসলমানদের জন্য উত্থানের সমাপ্তি ও পতনের সূচনা। তখন থেকেই ইউরোপীয় দেশগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে ইসলামী রাষ্ট্রকে অপসারণ এবং জীবনের সকল ক্ষেত্র ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক থেকে ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলার দিকে মনোযোগ দেয়। অন্য কথায়, তারা একটি নতুন ক্রুসেড অভিযানের কথা ভাবতে শুরু করে। তবে প্রথম ক্রুসেডের মতো নয়, নতুন ক্রুসেডগুলো মুসলমানদের পরাজিত করতে এবং ইসলামী রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার জন্য নিছক একটি সামরিক আক্রমণের চেয়েও বেশি কিছু ছিল। নতুন ক্রুসেডগুলো ছিল আরও ভয়াবহ এবং এর পরিণতি ছিল আরও সুদূরপ্রসারী। এগুলো এমনভাবে পরিকল্পিত হয়েছিল যাতে ইসলামী রাষ্ট্রকে সমূলে উৎপাটিত করা যায়, তার কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট না থাকে এবং তার একটি শিকড়ও যেন আর গজাতে না পারে। এগুলো মুসলমানদের অন্তর থেকে ইসলামকে উপড়ে ফেলার জন্যও পরিকল্পিত হয়েছিল, যাতে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও আধ্যাত্মিক রীতিনীতি ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট না থাকে।
অডিও ভার্শন:
























