ট্রাম্পের কথায় পশ্চিমাদের প্রকৃত ঔপনিবেশিক চরিত্র ফুটে উঠেছে

মার্কিন নেতার লুণ্ঠনমূলক “গাজা দখল” এর ভাষা পশ্চিমাদের উপনিবেশ স্থাপনের আকাঙ্ক্ষাকে নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছে

সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক গাজাকে দখল করে নেওয়া, এর মালিকানা নিয়ে নেওয়া, একে রিভেরা কিংবা রিসোর্টে পরিণত করা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তার বক্তব্য বিশ্বব্যাপী ঔপনিবেশিক ওদ্ধত্যের এক বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সমালোচিত হয়েছে।

এসব বক্তব্যের মাধ্যমে পশ্চিমাদের আসল চেহারা তথা তাদের ঔপনিবেশিক পুঁজিবাদী ডিএনএকেই কেবলমাত্র উন্মোচিত করে।

যুদ্ধাপরাধী নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প নির্লজ্জভাবে একে অপরকে শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে কাজ করার প্রশংসা করে প্রশংসা করেছেন।

গাজায় তাদের গণহত্যা – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করার জন্য সহায়তা করেছে – তা-ই কি যথেষ্ট ছিল না?

গাজা ও ফিলিস্তিন কোন ধ্বংসস্তূপের নাম না

গাজাকে “বাসযোগ্য নয়” বলে দাবি করার এই অযৌক্তিক প্রস্তাবটি একটি পুরোন ঔপনিবেশিক কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়।

এর উদ্দেশ্য হল বিভাজন, অস্থিতিশীলতা, ধ্বংস, অস্থিরতা তৈরি করা এবং তারপর নিজেকে এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমাধান হিসাবে উপস্থাপন করা, এবং এই প্রক্রিয়ায় মূল ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে মুছে ফেলা।

ইসরাইলের সীমানা বাড়ানোর আমেরিকান আকাঙ্ক্ষা

কয়েক দশক ধরে, পশ্চিমা শক্তিগুলো ফিলিস্তিনের ভাগ্য নির্ধারণ করে আসছে, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নয় বরং জায়নবাদীদের শক্তিশালী করার জন্য এবং প্রতিরোধ দমন করার জন্য।

গণহত্যা সমর্থনকারী এবং যুদ্ধবাজরা ‘তথাকথিত’ শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে কাজ করছে। প্রথমে ধ্বংসের জন্য অর্থায়ন করছে এবং এরপর পুনর্নির্মাণের দাবি তুলছে। এখন তারা গাজার সরাসরি মালিকানা নিতে চায়, এই প্রক্রিয়ায় ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়। যদিও তারা দাবি করে যে এটি সবই অস্থায়ী!

এটি এমন কিছু নয় যা আমরা আগে কখনও দেখিনি, এটি মার্কিনিদের পুরনো উপনিবেশবাদ এবং পুঁজিবাদী আগ্রাসন যা বিদ্যমান জায়নবাদী দখলদারিত্বকে প্রসারিত করা এবং যেকোনো মূল্যে তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত করা।

কিছু মুসলিম শাসক অনেক আগেই ফিলিস্তিনকে বিক্রি করে দিয়েছে!

ঔপনিবেশিকতাবাদকে সফল হতে হলে, ম্যালকম এক্স যেমন বলেছিলেন, তার জন্য দালাল, প্রক্সি তথা “গৃহপালিত নিগ্রোদের” প্রয়োজন।

এই ধরনের এজেন্টরা তাদের ঔপনিবেশিক প্রভুদের পক্ষে কাজ করার জন্য রয়েছে এবং বর্তমান মুসলিম শাসকগণ – যারা তাদের পূর্বপুরুষদের মতো – সম্পূর্ণরূপে সহযোগী এজেন্ট।

গাজায় গণহত্যা প্রত্যক্ষ করার সময় এসব মুসলিম শাসকদের লজ্জাজনক অবস্থান, তাদের “দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান” – যা প্রায় বিলোপ হতে বসেছে – এবং গণহত্যা-প্ররোচনাকারীদের সাথে “স্বাভাবিকীকরণ” এর রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা আজ আমাদের চোখের সামনে পরিষ্কার।

ট্রাম্প সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন যে, রিয়াদ দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের দাবি ত্যাগ করেছে!

এই শাসকরা আসলে যা ভয় পায় তা হলো তাদের নিজস্ব জনগণের ক্রোধ।

যদি তারা গাজার জাতিগত নির্মূল এবং মার্কিন উপনিবেশবাদ মেনে নেয় – তাদের নিজস্ব ভূমি ইতিমধ্যেই বিশাল সামরিক ঘাঁটির মাধ্যমে মার্কিন উপনিবেশের অধীনে রয়েছে – তাহলে ভিন্নমত এবং অস্থিতিশীলতা তাদের অবস্থানের জন্য একটি বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

সত্য হলো ট্রাম্প, নেতানিয়াহু এবং গাজা গণহত্যা কখনোই এই শাসক এবং তাদের পূর্বপুরুষদের সহযোগিতা এবং সমর্থন ছাড়া ঘটতে পারত না।

এই ধরনের শাসকরা:

  • তাদের নিজেদের নাগরিকদের বিক্রি করে দিয়েছে, যেমন, পাকিস্তান ড. আফিয়া সিদ্দিকীর সাথে করেছে
  • ভবিষ্যতের দোহাই তুলে ফিলিস্তিনকে বিক্রি করেছে, যেমন সৌদি আরবের এমবিএস
  • ইহুদিবাদীদের সাথে ক্রমাগত বাণিজ্য এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিনিময়ে গাজা বিক্রি করেছে, যেমন তুর্কির এরদোগান এবং উপসাগরীয় শেখতন্ত্র।

এটা কোন কারণ ছাড়া বলা হয় না যে কিছু মুসলিম শাসকদের ইসরায়েলের প্রতিরক্ষার প্রথম সারির সদস্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

কয়েক দশক ধরে, তারা পশ্চিমা নীতি প্রয়োগ করেছে, ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে এবং শান্তি নামে পরিচিত একটি বিভ্রম প্রচার করেছে।

ফিলিস্তিনি স্বার্থের জন্য তাদের মুক্তি অনিবার্য

উপনিবেশবাদীদের পূর্বপুরুষদের (ক্রুসেডারদের) দানবীয়তা হোক বা ইহুদিবাদীদের বর্ণবাদ, জাতিগত নির্মূল এবং গণহত্যা হোক না কেন, গাজা ও ফিলিস্তিন বরকতময় ভূমি এবং এর জনগণ অধ্যবসায়ী এবং প্রতিরোধ ও অটুট চেতনার অধিকারী, যারা আত্মসমর্পণ বা পরাজয় জানে না।

পশ্চিম তীর, গাজা এবং বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ শরণার্থী শিবিরে বসবাস করেছে। দশকের পর দশক ধরে দখলদারিত্ব, গণহত্যা এবং অবরোধের মধ্যে বসবাস করা সত্ত্বেও, তারা তাদের অধিকারের জন্য সবরের সাথে পুনর্নির্মাণ ও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তারা তাদের স্বদেশে ফিরে যাওয়ার এবং ফিলিস্তিনকে মুক্ত করার জন্য কাজ করে চলেছে।

দুটি বিষয় পরিষ্কারভাবে স্পষ্ট

প্রথমত, ইসলামী উম্মাহ এবং ফিলিস্তিনকে মুক্ত করার লক্ষ্য আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, গাজা বা ফিলিস্তিন বিক্রির জন্য নয়। এই জমি নিয়ে দেন-দরবার করার, এটি দান করা বা কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।

ঠিক যেমন ১৯০১ সালে এটি বিক্রির জন্য ছিল না, যখন আধুনিক রাজনৈতিক ইহুদিবাদের প্রতিষ্ঠাতা থিওডর হার্জল ফিলিস্তিনে ইহুদি বসতি স্থাপনের অনুমতি দেওয়ার জন্য জমির বিনিময়ে খলিফা দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের কাছে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তা দিতে চেয়েছিল।

খলিফা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন:

“আমি এক ফুট জমিও বিক্রি করতে পারি না, কারণ এটি আমার নয়, বরং আমার জনগণের।

আমার জনগণ তাদের রক্ত ​​দিয়ে এই সাম্রাজ্যের জন্য লড়াই করে জয়লাভ করেছে এবং তাদের রক্ত ​​দিয়ে এটিকে রঞ্জিত করেছে।

আমরা এটিকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার আগে আবার আমাদের রক্ত ​​দিয়ে ঢেকে দেব।”

আমি কীভাবে ফিলিস্তিনিদের সাহায্য করতে পারি এবং ফিলিস্তিনের সেবা করতে পারি?

ব্যক্তি পর্যায়ে

আপনার কণ্ঠস্বরের শক্তিকে অবমূল্যায়ন করবেন না, চুপ থাকবেন না।

আপনি যদি নীরব থাকেন, তাহলে আপনি নিপীড়নকে চ্যালেঞ্জ ছাড়াই ছেড়ে দিলেন। তাই আপনার পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং সহকর্মীদের সাথে কথা বলুন। গাজার বাস্তবতা এবং পশ্চিমা উপনিবেশবাদ সম্পর্কে তাদের সচেতন করুন।

এবং যারা কিছুই বলেন না তাদের চ্যালেঞ্জ করুন। তাদের মনে করিয়ে দিন যে নীরবতা হল সহযোগিতা।

আপনি যখন কথা বলেন, তখন আপনি নিপীড়কের বর্ণনাকে দুর্বল করে দেন এবং ন্যায়বিচারের কারণকে শক্তিশালী করেন!

অন্যায়ের বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রতিটি কণ্ঠস্বর গুরুত্বপূর্ণ, এবং ইতিহাস দেখিয়েছে যে জনগণ যখন নীরব থাকতে অস্বীকার করে তখন সাম্রাজ্যের পতন হয়।

প্রভাবশালী পর্যায়ে

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবশালীরা: যদি আপনার কোন প্ল্যাটফর্ম থাকে, তাহলে তাদের মিথ্যা উন্মোচন  করে, সত্য প্রকাশ করে ফিলিস্তিনের পক্ষে তা ব্যবহার করুন!

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গাজার “মালিকানা” নিতে পারে এই ধারণাটি ফিলিস্তিনিদের তাদের ভূমি থেকে বিতাড়িত করার এবং ইসরায়েলের আধিপত্যকে বৈধতা দেওয়ার আরেকটি পদক্ষেপ।

ইহুদিবাদী রাষ্ট্রকে সমর্থনকারী মুসলিম শাসকদের ভণ্ডামি উন্মোচন করুন, দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের ব্যর্থতা উন্মোচন করুন এবং এই অঞ্চলে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক প্রকল্প উন্মোচন করুন।

আপনি বিশ্বকে দেখাতে পারেন যে এটি “রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন” সম্পর্কে নয় – এটি একটি জনগোষ্ঠীকে মুছে ফেলা এবং উপনিবেশবাদের সাথে সম্পর্কিত।

এই বিপজ্জনক পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আপনার কণ্ঠস্বর ব্যবহার করুন এবং জনসাধারণকে জাগিয়ে তুলুন।

আলেম পর্যায়ে

ইমাম ও আলেমগণ, উম্মাহর কান আছে এবং কথা বলা কর্তব্য; জুমার খুতবায় এই বিষয়টির সমাধান আলোচনা করা উচিত।

এটি কেবল রাজনৈতিক বিষয় নয় – এটি ন্যায়বিচার, নিপীড়ন এবং মুসলিম ভূমির পবিত্রতা সংক্রান্ত বিষয়।

গাজার জনগণকে বহিষ্কার করা হচ্ছে, বিদেশী শক্তি তাদের ভূমি দাবি করছে এবং তাদের মর্যাদা ভুলুন্ঠিত করা হচ্ছে।

মানুষকে মনে করিয়ে দিন যে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো একটি কর্তব্য, এবং নিপীড়নকে প্রত্যাখ্যান করা আমাদের দ্বীনের অংশ।

যদি উম্মাহর মিম্বরগুলি নীরব থাকে, তাহলে তারা কী উদ্দেশ্যে কাজ করবে?!

উম্মাহ পর্যায়ে

এটি একটি মোক্ষম সময়; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে তার ঔপনিবেশিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ঘোষণা করেছে, কিন্তু জনগণকে এটি মেনে নিতে দেয়া যাবে না।

আমাদের সম্মিলিত কর্তব্য হলো আমাদের আওয়াজ তোলা, এই প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করা এবং স্পষ্ট করে বলা যে গাজা ফিলিস্তিনের জনগণের!

উম্মাহর রাজনৈতিক ঐক্যের মধ্যেই সমাধান নিহিত

আমরা প্রতিটি সমাধান প্রত্যক্ষ করেছি, এবং একটি প্রকল্প ছাড়া সব প্রকল্প উম্মাহর জন্য ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের খেলাফতের প্রত্যাবর্তনকে আমাদের সত্যিকারের সমাধানের প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

আল্লাহর প্রতিশ্রুতি থেকে আমাদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া উচিত নয়। আমাদের অবশ্যই প্রকাশ্যে এবং সাহসের সাথে আমাদের ঢাল – খেলাফত – ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানাতে হবে যা নিশ্চিত করবে যে কোনও মুসলিম ভূমি দখল হয়ে থাকবে না।

শুধুমাত্র উম্মাহর ঐক্য এবং খেলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই আমরা নিশ্চিত করতে পারি যে গাজা এবং সমস্ত মুসলিম ভূমি ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত থাকবে।

উম্মাহ শক্তিহীন নয়। ইতিহাস দেখিয়েছে যে যখন জনগণ উত্থিত হয়, তখন সাম্রাজ্যের পতন হয়।

ন্যায়বিচারের পক্ষে, ফিলিস্তিনের পক্ষে এবং নিপীড়িতদের মর্যাদার পক্ষে দাঁড়ান। গাজা বিক্রির জন্য নয়।

প্রবন্ধটি ইংরেজি থেকে ভাবানুবাদ ও ঈষৎ পরিমার্জিত করা হয়েছে

Leave a Reply

Discover more from RETURN OF ISLAM

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading