আত-তোঈফা আয-যোহেরা তথা বিজয়ী দল সম্পর্কে ব্যাখ্যা

প্রশ্ন: আত-তোঈফা আয-যোহেরা (বিজয়ী দল) সম্পর্কে বেশ কিছু হাদীস রয়েছে। এ হাদীসগুলোর ব্যাখ্যা কী? এগুলো কি উসূলের আলেম কিংবা হাদীসের আলেমগণ সম্পর্কে বলা হয়েছে – যেমনটি কেউ কেউ ব্যাখ্যা করেছেন? এছাড়াও, আমরা মাঝে-মধ্যে শুনি যে অমুক বা তমুক দল হচ্ছে বিজয়ী দল – এক্ষেত্রে আমাদের ব্যাখ্যা কী হওয়া উচিত? আল্লাহ আপনাকে বরকত দান করুন।

উত্তর:

আলোচনাটি আমি দুটি অংশে করবো,

১. প্রথমত এই হাদীসগুলোর ব্যাখ্যা
২. (আমাদের জীবনে) হাদীসগুলোর প্রয়োগ

বিজয়ী দল (الطائفة الظاهرة) সম্পর্কে বেশ কিছু হাদীস রয়েছে। 

বুখারীতে বর্ণিত আল মুগীরাহ ইবনে শু’বাহ বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

 لاَ يَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ حَتَّى يَأْتِيَهُمْ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ ظَاهِرُونَ

“আমার উম্মাহর মধ্যে সবসময়ই একটি দল থাকবে যারা বিজয়ী থাকবে, যতক্ষন না তাদের জন্য আল্লাহর আদেশ চলে আসে এবং তারা সেসময় বিজয়ী বেশে থাকবে”।

মুসলিমে বর্ণিত ছাওবান বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ عَلَى الْحَقِّ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ كَذَلِكَ

“আমার উম্মাহর মধ্যে সবসময়ই একটি দল সত্যের উপর বিজয়ী থাকবে, যারা তাদের ত্যাগ করবে তারা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবেনা, যতক্ষন না পর্যন্ত আল্লাহর আদেশ তাদের উপর এসে পৌঁছায় এবং তারা সে অবস্থায় বিদ্যমান রয়েছে।

মুসলিমে বর্ণিত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ قَالَ فَيَنْزِلُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَيَقُولُ أَمِيرُهُمْ تَعَالَ صَلِّ لَنَا فَيَقُولُ لاَ إِنَّ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ أُمَرَاءُ تَكْرِمَةَ اللَّهِ هَذِهِ الأُمَّةَ

আমার উম্মত হতে সবসময়ই একটি দল কিয়ামত পর্যন্ত বিজয়ী বেশে সত্যের উপর থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে। তিনি (সা) বলেন: অতঃপর ঈসা ইবন মারইয়াম (সা) নেমে আসবেন, অতঃপর তাদের নেতা তাকে বলবে, আসুন, (ইমাম হিসেবে) আমাদের সালাত পড়ান। সে বলবে, নিশ্চয়ই তোমরা একে অপরের উপর নেতৃবৃন্দ, এটি এই উম্মতের জন্য সম্মানস্বরূপ।

মুসলিমে বর্ণিত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

وَلاَ تَزَالُ عِصَابَةٌ مِنْ الْمُسْلِمِينَ يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ عَلَى مَنْ نَاوَأَهُمْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَة

মুসলিমদের মধ্য হতে একটি গোষ্ঠী কিয়ামতের আগ পর্যন্ত তাদের বিরোধীদের উপর বিজয়ী বেশে সবসময়ই সত্যের উপর থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে।

মুসলিমে বর্ণিত উকবা বিন আমের বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

لاَ تَزَالُ عِصَابَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى أَمْرِ اللَّهِ قَاهِرِينَ لِعَدُوِّهِمْ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ خَالَفَهُمْ حَتَّى تَأْتِيَهُمُ السَّاعَةُ وَهُمْ عَلَى ذَلِكَ

আমার উম্মত হতে একটি গোষ্ঠী সবসময়ই আল্লাহর আদেশের উপর থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে, তাদের শত্রুদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে রইবে। যারা তাদের বিরোধিতা করবে তারা তাদের কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না যতক্ষন না তাদের উপর (কিয়ামতের) সেই সময় এসে পৌঁছায় এবং তারা (তাদের অবস্থানে) অবিচল রয়েছে।

মুসলিমে বর্ণিত মু’আবিয়াহ বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي قَائِمَةً بِأَمْرِ اللَّهِ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ أَوْ خَالَفَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ ظَاهِرُونَ عَلَى النَّاسِ

আমার উম্মত হতে একটি দল সবসময়ই আল্লাহর আদেশের উপর কায়েম থাকবে। যারা তাদের পরিত্যাগ কিংবা বিরোধিতা করবে, তারা তাদের কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না যতক্ষন না আল্লাহর আদেশ চলে আসে এবং তারা সেসময় মানুষের উপর বিজয়ী বেশে বিদ্যমান রয়েছে।

তিরমিযিতে বর্ণিত ছাওবান বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

 لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ يَخْذُلُهُمْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ

“আমার উম্মাহর মধ্যে সবসময়ই একটি দল সত্যের উপর বিজয়ী থাকবে, যারা তাদের ত্যাগ করবে তারা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবেনা, যতক্ষন না পর্যন্ত আল্লাহর আদেশ তাদের উপর এসে পৌঁছায়।

আবু দাউদে বর্ণিত ইমরান ইবনে হাসসিন বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ عَلَى مَنْ نَاوَأَهُمْ حَتَّى يُقَاتِلَ آخِرُهُمُ الْمَسِيحَ الدَّجَّالَ

আমার উম্মত হতে সবসময়ই একটি দল সত্যের উপর থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে, তাদের বিরোধীদের উপর বিজয়ী রইবে, এমনকি তাদের সর্বশেষ অংশ আল-মাসীহ আদ-দাজ্জাল এর সাথে লড়াই করবে। 

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে আহমদ বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ

কিয়ামতের আগ পর্যন্ত আমার উম্মত হতে সবসময়ই একটি দল বিজয়ী বেশে সত্যের উপর থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে।

আহমদ বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ لَعَدُوِّهِمْ قَاهِرِينَ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ خَالَفَهُمْ إِلاَّ مَا أَصَابَهُمْ مِنْ لأْوَاءَ حَتَّى يَأْتِيَهُمْ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ كَذَلِكَ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَأَيْنَ هُمْ؟ قَالَ: بِبَيْتِ الْمَقْدِسِ وَأَكْنَافِ بَيْتِ الْمَقْدِسِ

আমার উম্মত হতে সবসময়ই একটি দল বিজয়ী বেশে সত্যের উপর (অটল) থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে, তাদের শত্রুদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে রইবে। কেবলমাত্র (এ পথে) যতটুকু তাদের কষ্ট ভোগ করতে হয় তা ছাড়া যারা তাদের বিরোধিতা করবে তারা তাদের অন্য কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, যতক্ষন না তাদের উপর আল্লাহ আদেশ এসে পৌছায় এবং তারা সেসময় (তাদের অবস্থানে) অবিচল রয়েছে। তারা বললো: হে আল্লাহর রাসূল, তারা কোথায় (অবস্থান করবে)? তিনি (সা) বললেন, বাইতুল মাকদিস ও বাইতুল মাকদিসের পরিপার্শ্বে।

আত-তাবারানি আল-কাবীর এ বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ عَلَى مَنْ يَغْزُوهُمْ قَاهِرِينَ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ نَاوَأَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَهُمْ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ كَذَلِكَ قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَأَيْنَ هُمْ قَالَ بِبَيْتِ الْمَقْدِسِ

আমার উম্মত হতে সবসময়ই একটি দল বিজয়ী বেশে সত্যের উপর (অটল) থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরতদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে রইবে। যারা তাদের বিরোধিতা করবে তারা তাদের কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না যতক্ষন না তাদের উপর আল্লাহর আদেশ এসে পৌঁছায় এবং তারা (তাদের অবস্থানে) অবিচল রয়েছে। বলা হলো: হে আল্লাহর রাসূল, তারা কোথায় (অবস্থান করবে)? তিনি (সা) বললেন, বাইতুল মাকদিসে।

আহমদ বর্ণিত আবু উমামা’র হাদীসে বাইতুল মাকদিসের কথা উল্লেখ আছে, এবং একই কথা আত-তাবারানি বর্ণিত একটি অনুরূপ হাদীস উল্লেখ রয়েছে। আর আত তাবারানির আল-আওসাতে আবূ হুরাইরা কর্তৃক বর্ণিত এক হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

يقاتلون على أبواب دمشق وما حولها، وعلى أبواب بيت المقدس وما حوله، لا يضرهم من خذلهم ظاهرين إلى يوم القيامة

তারা দামেশ্ক এর দরজায় ও এর আশেপাশে যুদ্ধরত অবস্থায় রইবে এবং যুদ্ধরত রইবে বাইতুল মাকদিসের দরজায় ও এর আশেপাশে। তাদের যারা পরিত্যাগ করবে তারা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, তারা কিয়ামত পর্যন্ত বিজয়ী বেশে রইবে। [ফাতহুল-বারি]

لا تزال عصابة من أمتي يقاتلون على أبواب دمشق وما حولها وعلى أبواب بيت المقدس وما حولها، لا يضرهم خذلان من خذلهم ظاهرين على الحق إلى أن تقوم الساعة

আমার উম্মত হতে সবসময়ই একটি গোষ্ঠী দামেশ্ক এর দরজায় ও এর আশেপাশে লড়াই চালিয়ে যাবে এবং লড়াই চালিয়ে যাবে বাইতুল মাকদিসের দরজায় ও এর আশেপাশে। তাদের পরিত্যাগকারীদের পরিত্যাগ তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, (বরং কিয়ামতের) সে সময় কায়েম হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা সত্যের উপর বিজয়ী বেশে (অটল) থাকবে।

হাদীসগুলোর দিকে তাকালে দেখবো:

১. এগুলো উম্মাহ’র একটি অংশের দিকে নির্দেশ করে, সমগ্র উম্মাহ নয়। এটা এই কারণে তা’ঈফা শব্দের ভাষাগত অর্থই হলো কোন কিছুর অংশ এবং প্রত্যেক বিষয়ের একটি অংশকে উক্ত বিষয়ের তা’ঈফা বলা হয়। কামুসে বলা হচ্ছে: (والطائفة من الشيء: القطعة منه) এবং কোন কিছুর তা’ঈফা হলো এর একটি অংশ।

২. এটি সত্য তথা ইসলামের উপর দৃঢ় থাকবে। হাদীসগুলোতে আমরা দেখতে পাই, “قائمة بأمر الله” অর্থাৎ আল্লাহ’র আদেশের উপর কায়েম থাকা।

৩. তাঁরা সত্যের উপর থেকে আল্লাহ’র পথে লড়াই করবে (يقاتلون على الحق), তাঁরা সত্যের উপর (অটল) থেকে লড়াই করবে (يقاتلون على أمر الله), অর্থাৎ তাঁরা আল্লাহ’র আদেশ অনুযায়ী লড়াই করবে।

৪. এই একই শক্তি ও ক্ষমতার বলেই তারা শত্রুর সাথে লড়াই করবে, তাদের চূড়ান্তভাবে পরাভূত করবে এবং স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান বিজয় নিশ্চিত করবে।

يقاتلون على الحق ظاهرين على من ناوأهم

তাদের বিরোধীদের উপর বিজয়ী বেশে সবসময়ই সত্যের উপর থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে।

يقاتلون على أمر الله قاهرين لعدوهم

আল্লাহর আদেশের উপর থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে, তাদের শত্রুদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে রইবে।

৫. নিশ্চয়ই এই দল, (يقاتلون على أبواب دمشق وما حولها وعلى أبواب بيت المقدس وما حوله) দামেস্কের দুয়ার ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা এবং বাইতুল মাকদিসের দুয়ার ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় লড়াই করবে। অর্থাৎ শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করবে এবং আশ-শাম ও তদসংলগ্ন অঞ্চলে বিজয়ী বেশে আবির্ভুত হবে। 
 
(হাদীসসমূহ হতে) এসব বর্ণনাসমূহ এই দলের ব্যাপারে এটি নির্দেশ করে, এ দলটি ইসলামের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, তার (তথা ইসলামের) জন্যই যুদ্ধ করবে, এবং শত্রুদের নিশ্চিতরূপে পরাস্ত করার মত ক্ষমতা এদের রয়েছে। রাষ্ট্রের শত্রু ও সেনাবাহিনীর কথা বিবেচনায় রেখে, এই বিজয়ী দলকে অবশ্যই কোনো মুসলিম দেশের মুসলিম সেনাবাহিনী হতে হবে, যা খলীফাহ কিংবা কোনো সেনাপ্রধান দ্বারা পরিচালিত হবে, তারা শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করবে, তাদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করবে, তাদের উপর বিজয়ীবেশে তাদের পরাভূত করে তাদের উপর কর্তৃত্ব করবে। এবং এটি আশ-শাম এবং তার আশেপাশের এলাকা থেকে শুরু হবে এবং এখান থেকেই রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনী শত্রুদের সাথে ক্রমাগত যুদ্ধ চালিয়ে তাদের হারাবে এবং কর্তৃত্ব করবে। উদাহরণস্বরূপ; এ দল হতে পারে (মুসলিম) রাষ্ট্রের নিজস্ব অংশ ও সেনাবাহিনী যারা শত্রুদের উপর বিজয়ী হবে, তাদের পরাভূত করবে এবং কর্তৃত্ব স্থাপন করবে, অথবা এ দল তাঁরা যারা (মুসলিম) রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীর জন্য শত্রুকে পরাভূত করে, বিজয়ী হয়ে দ্বীনের কর্তৃত্ব স্থাপনের কাজ করে চলেছে।

এটি রাসূল (সা) এবং সাহাবীদের (রা) সময়ে শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করা এবং তাদের উপর কর্তৃত্ব করার বিষয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।

এমনকি এটি ইসলামের স্বর্ণযুগে শত্রুদের হারানো, তাদের উপর কর্তৃত্ব করা এবং এটি প্রত্যেক খলীফাহ এবং মুসলিম সেনাপ্রধান কর্তৃক শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করা, তাদের হারানো, পরাস্ত করা কিংবা তাদের উপর কর্তৃত্ব করার বিষয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।

এটা সালাহউদ্দিন ও তাঁর সেনাবাহিনী কর্তৃক ক্রুসেডারদের হারানোর ঘটনা, এছাড়াও এটি (সাইফুদ্দিন) কুতুয ও (জহির উদ্দিন) বাবর কর্তৃক তাঁতারদের উপর বিজয় লাভ করার ঘটনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।

বিষয়টা আমাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে, কারণ আমরা একটি শক্তিশালী ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছি – যা হল একটি সঠিকভাবে পরিচালিত খিলাফাহ — কাফের শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করবার জন্য, তাদের পরাস্ত করার জন্য, তাদের উপর কর্তৃত্ব করে বিজয়ী শক্তিরূপে উথিত হবার জন্য। সুতরাং, ইহুদী রাষ্ট্রকে উচ্ছেদ করবে এবং প্রতিশ্রুত রোম বিজয় করবে। এটি হতে পারে এবং এটিই সম্ভাব্য।

সুতরাং, বিষয়টি সেসব দলের জন্য প্রযোজ্য হবেনা যারা কোন রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বিহীন (অবস্থায় রয়েছে) এবং শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করছে। কারণ বিজয়ী দল (তথা তাঈফাতুয যাহেরা)-এর বর্ণনা অনুযায়ী তারা শুধুমাত্র শত্রুদের সাথে লড়াই করবে না, বরং শত্রুদের পরাস্তও করবে। আর একটি রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনী ব্যতিত শত্রুরাষ্ট্র ও তাদের সেনাবাহিনীকে হারিয়ে, পরাস্ত করে, তাদের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করা সম্ভব নয়। একইভাবে, আলোচ্য বিষয়টি দ্বারা এমন কোন দলকে বোঝায়না যারা একটি ইসলামী রাষ্ট্র – তথা খিলাফত – প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে না, কারণ তারা শত্রুরাষ্ট্র ও (তাদের) সেনাবাহিনীকে পরাভুত করতে পারবে না। শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করা এবং তাদের উপর কর্তৃত্ব করা— এটিই হল এই বিজয়ী দলের মৌলিক বিবরণ, হোক তা ইতোমধ্যে প্রায়োগিকভাবে প্রতিষ্ঠিত অথবা (দল কর্তৃক) তা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ চলছে।

এছাড়া এ বিষয়টি হাদীস কিংবা উসূলের আলেমদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবেনা যদিনা তাঁরা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন, যে রাষ্ট্রটি শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করবে, তাদের হারাবে এবং বিজয়ী হবে।

সহীহ আলা-বুখারীতে বর্ণিত রাসূল (সা) এর হাদীসে,

لا تزال طائفة من أمتي ظاهرين على الحق يقاتلون وهم أهل العلم

অর্থ্যাৎ, আমার উম্মতের মধ্যে একটি দল থাকবে যারা সর্বদা সত্যের উপর থেকে লড়াই করে বিজয়ী রইবে এবং তাঁরা হলেন আহলুল-ইলম (তথা আলেমগণ)।

হাদীসের এই অংশটি (وهم أهل العلم) ‘তাঁরা হলেন আহলুল-ইলম’ হাদীসের বর্ণনাকারীর বক্তব্য, রাসূল (সা) এর নয়। এ ব্যাপারে ফাতহুল বারীতে ইমাম আসকালানি বলেছেন, “বর্ণনায় আসা ‘তাঁরা হলো জ্ঞানের ব্যক্তিগণ’ এটা বর্ণনাকারীর বক্তব্য”।

উল্লেখ্য যে, যে দলই আন্তরিকভাবে শত্রুদের মোকাবেলা করবে, তাঁরা পুরস্কৃত হবে, যদি তারা শত্রুদের উপর কর্তৃত্ব করতে নাও পারে, তাদের হারাতে না পারে অথবা তাদের উপর বিজয়ী নাও হয়। এমনকি শত্রুর সাথে যুদ্ধটা যদি একাও হয় এবং একনিষ্ঠতার সাথে হয়, তবে তাতেও পুরষ্কার আছে। এবং কোনো দল যদি কোন কল্যাণের কাজে নিয়োজিত থাকে, তাতে পুরস্কার রয়েছে, এমনকি যদি তা যেকোনো একজন ব্যক্তির কাজও হয়। এবং কোন দল যদি ইসলামী জ্ঞানের কাজে নিয়োজিত থাকে, হোক তা উসূল কিংবা হাদিসের জ্ঞান অন্বেষণ, তাতে পুরষ্কার রয়েছে, যদি এসব কাজে শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির কৃতিত্বও থাকে। তবে এটি কোনো দলকে সফলকাম দল (তথা তা’ঈফা আয-যাহেরা) হিসেবে বর্ণনা করার বিষয়ের ক্ষেত্র নয়।

কোন একটি দলকে ‘সফলকাম দল’ (তথা তা’ঈফা আয-যাহেরা) বলার জন্য রাসূল (সা)-এর বর্ণিত হাদীসসমূহের আলোকে তা মিলিয়ে দেখা জরুরী।

হাদীসগুলোকে একত্রিত করে, অনুধাবন করে যে ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তা ইতোপূর্বে উল্লেখ্য করা হয়েছে। এবং এটি আমি তারজীহ (outweigh) করেছি এবং সঠিকভাবে মত পোষণ করেছি।

আর বাক্যাংশে لا يزال ‘সবসময়ই থাকবে’ এর অর্থ এই নয় যে, এর মাঝে কোন বিরতি থাকবেনা, বরং এর মানে হল কেয়ামতের আগ পর্যন্ত তারা ক্রমাগতভাবে শত্রুদের উপর প্রভাবশালী হবে। অর্থাৎ বিষয়টি এরকম নয় যে শত্রুদের উপর তাদের বিজয় কেবলমাত্র একবার এবং এরপর শত্রু ফিরে এসে আমাদের চিরতরে পরাজিত করবে বরং পুনরুত্থান দিবসের আগ পর্যন্ত আমাদের বিজয় ক্রমাগত ভাবে চলতে থাকবে। এটিই ঘটেছিল যখন আমরা কুফ্ফারের উপর বিজয়ী ছিলাম, এবং ইসলামের (সোনালী) দিনগুলোতে তাদের উপর জয়লাভ করেছিলাম অতঃপর আমরা (কোনো যুদ্ধে) পরাজিত হতাম এবং আবার জয়ী হতাম এবং এ দিনগুলো আমরা আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী একের পর এক (আবর্তিত বাস্তবতা হিসেবে) পেতাম এবং এরপর ক্রুসেডারদের আগমন ঘটল এবং তারা পরাজিতও হল, এবং এরপর এলো তাতাররা এবং তারাও পরাজিত হল, এবং এরপর আমরা দুর্বল হয়ে গিয়েছিলাম এবং এরপর আমরা আবার ফিরে এলাম এবং কনস্টান্টিনোপল বিজয় করলাম এবং এটি ইস্তাম্বুল (তথা ইস্লাম্বুলে) পরিনত হল……… এবং এটি খিলাফত এর উপর (দায়িত্ব), আল্লাহ্‌র নির্দেশে যখন তা আবার ফিরে আসবে, এটি ইহুদীদের অস্তিত্ব নির্মূল করবে, যা ফিলিস্তিন দখল করে আছে, এবং তা (অর্থাৎ খিলাফত) রোম বিজয় করবে আল্লাহ্‌র নির্দেশে, এবং এই বর্ণিত দল ও এর শেষ সদস্যটি দাজ্জালের সাথে যুদ্ধ করা পর্যন্ত সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। এখানে এটি উল্লেখ্য যে পুনরুত্থান দিবসের আগে ইসা (আ) এর আগমন সংক্রান্ত হাদীসটিতে বর্ণিত আছে যে, উনি একটি রাষ্ট্র ও একজন আমীর পাবেন, এরপর শত্রুদের উপর তারা সন্দেহাতীত ও সুনিশ্চিতরূপে বিজয় লাভ করবে।

সুতরাং ‘সবসময়ই থাকবে’ এর অর্থ এটা নয় যে এদের মাঝে কোন বিরতি থাকবেনা, কিন্তু এর অর্থ হল যে পৃথিবীর (আগত সময়কালের) কোনো পর্যায়ই শত্রুদের বিপক্ষে মুসলিমদের বিজয়বিহীন থাকবে না। নিশ্চিতরূপে ও অনুরণিত হয়ে (সারা পৃথিবীতে) পুনরুত্থান দিবসের আগ পর্যন্ত তা হতে থাকবে।

এটি অনেকটি বুখারীতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সেই হাদীসের মতো: 

لن يزال أمر هذه الأمة مستقيماً حتى تقوم الساعة

সবসময়ই এই উম্মতের অবস্থা সঠিকরূপে (তথা ন্যায়পরায়নভাবে) কায়েম থাকবে, (কিয়ামতের প্রারম্ভিক ধ্বংসের) সেই সময় আসা পর্যন্ত।

এর অর্থ এটা নয় যে এই উম্মাহর মধ্যে ন্যায়পরায়ণতা সবসময় থাকবে, যথা, বিবিধ সময় এটি ব্যাহত হয়েছে, যেমন খিলাফাহ ধ্বংসের পর থেকে।

এর অর্থ হল কিয়ামতের আগ পর্যন্ত এ দুনিয়াতে এই উম্মাহ কখনোই ন্যায়পরায়ণতা ছাড়া থাকবেনা, এই উম্মাহ একেবারেই কুটিল (তথা অন্তঃসারশূণ্য) হয়ে যাবে এবং ন্যায়পরায়ণতায় আর ফিরে আসবেনা – এমনটি নয়। যখন তার খিলাফতের পতন ঘটে তখন তার (ন্যায়পরায়নতার) অবস্থাও প্রস্থান করে, আর পুনরুত্থান দিবসের আগ পর্যন্ত যখনই কুটিলতা ফেরত আসবে, তখনই উম্মাহর মাঝে ন্যায়পরায়নতাও ফিরে আসবে।

এটিই হচ্ছে উত্তরের প্রথম অংশ, এবং এই বিষয়ে এটিই হল তা যা আমি দলীলের ওজন মাপের মাধ্যমে বের করেছি, তবে এক্ষেত্রে যে অন্য ব্যাখ্যা থাকতে পারে, সে সম্ভাবনা আমি বাতিল করে দিচ্ছি না। তবে দলীলের ওজনের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি এটিই সঠিক।

আলোচনার দ্বিতীয় অংশ হিসেবে, এই হাদীসগুলোর আমাদের জীবনে প্রয়োগের প্রেক্ষিতে:

এসকল হাদীসমূহ আমাদের প্রায়োগিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা আবশ্যক, যেভাবে সাহাবা (রা) এবং যারা তাদের উত্তমরূপে অনুসরণ করেছেন তাঁরা রাসূল (সা)-এর এই হাদীসসমূহকে দেখেছেন, যেগুলো ওয়াদা করছে এবং সেসব বিষয় অবহিত করছে যা মুসলিমদের জন্য কল্যাণ বহন করে। যথা, যখন তাঁরা কনস্টান্টিনোপল বা রোম জয় সংক্রান্ত হাদীসগুলো শুনতেন বা পড়তেন, তাঁদের মধ্যে সবাই আগ্রহী হয়ে উঠতেন যাতে করে এ ওয়াদা তাঁদের হাতেই পূরণ হয়, যতক্ষণ আল্লাহ্‌ এ রহমত ও অনুগ্রহ প্রথমবারের মতো মুহাম্মদ আল ফাতিহ’র উপর পতিত করার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হন, যা পরবর্তীতে ইস্তাম্বুলে পরিনত হয়। সুতরাং যখন তাঁরা এ হাদীস শুনেন তখন তাঁরা এ হাদীসের বাস্তবতাকে আবির্ভুত করার উদ্দেশ্যে পরিশ্রম শুরু করার ব্যপারে একমত হন এবং তাঁরা সে কল্যাণটি অর্জন করতে সক্ষম হন, যেখানে আল্লাহ্‌ তার (রাসূলের মাধ্যমে) কন্সট্যান্টিনোপল বিজয়ের ব্যাপারে বলেন;

نعم الأمير أميرها ونعم الجيش ذلك الجيش

“কতই না চমৎকার সেই আমীর এবং সেই সেনাবাহিনী”

অনেক খলীফা কনস্টান্টিনোপল জয় করতে সেনাবাহিনী পাঠিয়েছেন এবং অনেক সাহাবাও, যতদিন পর্যন্ত না তাঁরা বার্ধক্যে পৌঁছেছেন। যেমন আবু আইয়ূব (রা) প্রমুখও এই মহান অনুগ্রহ অর্জন করার জন্য এই সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

এটিই বিজয়ী দলের ব্যাপারে হাদীসের বিষয়। সুতরাং যখন রাসুল (সা) এই ব্যাপারে আমাদের অবহিত করেছেন এবং এর অনুগ্রহ ঘোষণা করেছেন যে তা শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করবে, তাদের উপর বিজয় লাভ করবে, তাদের পরাস্ত করবে এবং সুনিশ্চিতভাবে তাদের উপর বিজয়ী হবে, তা ইসলামি রাষ্ট্র ও মুসলিম সেনাবাহিনী ছাড়া সম্ভব হবে না, যারা কাফির রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীকে পরাজিত করবে। সুতরাং আমাদের ইসলামী রাষ্ট্র তথা সঠিকপথপ্রাপ্ত খিলাফত প্রতিষ্ঠার পথে অবিরত সহায়তা এবং চেষ্টা ও সংগ্রাম বাড়াতে হবে, যাতে আমরা এই তার সেনাবাহিনীতে থাকতে পারি এবং শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করতে পারি, তাদের পরাস্ত করতে পারি, তাদের উপর বিজয়ী হতে পারি এবং সন্দেহাতীত ও সুনিশ্চিতভাবে তাদের উপর কর্তৃত্ব করতে পারি। সুতরাং, তাহলেই আমরা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে আশা করি যাতে আমরা সে দলের অন্তর্ভুক্ত হই যাদের কথা রাসূল (সা) তাঁর মহান হাদীসে বর্ণনা করেছেন।

এরপর যে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, বিষয়টি এমন নয় যে আমরা অমুক দলকে সফলকাম দল বলবো অথবা আমরা বলবো এই দল কিংবা ঐ দল হচ্ছে বিজয়ী দল। মূল বিষয়টি হচ্ছে, যে বিজয়ী দলের অন্তর্ভুক্ত হতে পছন্দ করে তাকে সে দল সম্পর্কে যা বর্ণনা দেয়া হয়েছে, তা অর্জন করতে কাজ করতে হবে। সুতরাং, তাকে ইসলামী রাষ্ট্র ও ইসলামী সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠা করতে কাজ করতে হবে যেটা কাফির শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করবে যেমন আমেরিকা, বৃটেন ও ইহুদি ইত্যাদি, এবং তাদের হারাবে, তাদের উপর বিজয়ী হয়ে কর্তৃত্ব স্থাপন করবে। এবং এটিই নির্দেশ করে যে সে ওই বিজয়ী দলের অন্তর্ভুক্ত, সুতরাং যে ইচ্ছা পোষণ করে যে সে বিজয়ী দলের অন্তর্ভুক্ত হোক, তার যা কিছু আছে তা দিয়ে তাকে কাজ করে যেতে হবে আল্লাহ্‌র অনুমতিক্রমে, শত্রুদের (শক্তি) গুড়িয়ে দেয়া (হাদীসের সেই) বর্ণনা অর্জন করতে, বিজয় লাভ করতে এবং তাদের উপর কর্তৃত্ব অর্জন করতে।

আমরা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে দুয়া করি যাতে করে আমরা সেই বিজয়ী দলের অন্তর্ভুক্ত হই, যারা সৎপথপ্রাপ্ত ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রকে প্রত্যক্ষ করবে এবং যাতে করে আমরা ইসলামী সেনাবাহিনীর অংশ হতে পারি যারা শত্রুদের হারাবে, তাদের পরাস্ত করবে এবং তাদের উপর বিজয়ী ও সফলকাম হবে।

এবং আল্লাহ্‌ তাদেরকেই সাহায্য করেন যারা তাঁকে সাহায্য করে এবং তিনি (القوي) পরম শক্তিশালী, (العزيز) পরাক্রমশালী।

আতা ইবনু খালীল আবু আর-রাশতা
৭ রমজান ১৪২৫
২১/১০/২০০৪

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply