ইসলামে অর্থনৈতিক নীতিমালা

ইসলামী অর্থনীতি প্রতিটি নাগরিকের সকল মৌলিক চাহিদা পূরনের গ্যারান্টি দেয়। এছাড়া অতিরিক্ত কিছু চাহিদা পূরণের পথও সুগম করে। তবে একথা প্রত্যেক নাগরিককে মেনে নিতে হবে যে, সে ইসলামী সমাজে বাস করছে এবং এর একটি বিশেষ জীবন পদ্ধতি আছে। সামগ্রিকভাবে বলা যায় যে, শরঈ আইন প্রতিটি ব্যক্তির মৌলিক চাহিদা তথা অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করার গ্যারান্টি দেয়। এর প্রক্রিয়া হলো এই যে, কোন ব্যক্তি যদি কর্মক্ষম হয় তাহলে ইসলাম তার নিজের এবং তার উপর যাদের ভরণ পোষনের দায়িত্ব রয়েছে, তাদের জীবিকা উপার্জনার্থে কাজ করা তার জন্য আবশ্যক করে দেয়। তাই পিতার উপর ফরয হয়ে যায়, তার সন্তানের জীবিকার ব্যবস্থা করা। যদি কোন ব্যক্তি কাজ করতে অক্ষম হয়, তখন তার দায়িত্ব অর্পন করা হয় তার ওয়ারিশদের উপর। তবে যদি তার দায়িত্ব পালন করার মত উপযুক্ত কাউকে না পাওয়া যায়, তখন তার দায়িত্ব ন্যাস্ত হয় বাইতুল মালের উপর। এভাবেই ইসলাম সব মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের দায়িত্ব পালন করে।

ইসলামের দৃষ্টিতে অর্থনৈতিক মূল সমস্যা

এটা হচ্ছে সম্পদ ও সেবা সকল নাগরিকের মাঝে বন্টন করার বিষয়। অর্থাৎ ইসলামের দৃষ্টিতে মূল সমস্যা সম্পদের উৎপাদন নয় বরং সমস্যা হচ্ছে সম্পদের বন্টন।

মালিকানার উৎস

মৌলিকভাবে সম্পদের প্রকৃত মালিক হচ্ছেন আল্লাহ্‌ তা’আলা। তিনিই মানুষকে এই সম্পদ দান করেছেন এবং এভাবেই মানুষ এক ধরনের সত্ত্বাধিকার লাভ করেছে। আল্লাহ্‌ নিজেই ব্যক্তিকে সম্পদের উপর অধিকার লাভের অনুমতি দিয়েছেন। এটা একটা বিশেষ অনুমতি। এই বিশেষ অনুমোদনের কারনেই কার্যত মানুষকে সম্পদের মালিক বলে ধরে নেয়া হয়। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইরশাদ করেন,

“তোমরা ঐ সম্পদ থেকে তাদেরকে দান কর, যা আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে দিয়েছেন।” [নূর, ৩৩]

এখানে সম্পদকে আল্লাহ্‌র বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি অন্যত্র ইরশাদ করেন,

“এবং আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে যা কিছুর উত্তরাধিকারী করেছেন তা থেকে ব্যয় কর।” [হাদীদ, ৭]

এ আয়াতে আল্লাহ্‌ মানুষকে সম্পদের উত্তরাধিকার দান করেছেন এবং তা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন।

মালিকানার প্রকার (انواع الملكية)

মালিকানা তিন প্রকার। যথা,

১- ব্যক্তি মালিকানা,
২- গণ মালিকানা ও
৩- রাষ্ট্রীয় মালিকানা।

১. ব্যক্তি মালিকানা

শরীআতের পক্ষ থেকে মানুষকে মূল সম্পদ, সম্পদ থেকে প্রাপ্ত সুবিধা (মানফা’আত) কিংবা এর বিনিময়কে খরচ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ইসলাম সম্পদের ব্যক্তিমালিকানাকে মানুষের জন্য শরঈ অধিকার হিসাবে নির্ধারন করেছে। ব্যক্তিগত ভাবে মানুষ অস্থাবর সম্পত্তি- যেমন পশু, নগদ অর্থ, যান বাহন, কাপড় ইত্যাদি এবং স্থাবর সম্পত্তি-যেমন জমীন, ঘর-বাড়ী, কারখানা ইত্যাদি সব কিছুর মালিক হতে পারে। শরীআত ব্যক্তিকে নিজের মালিকানা হস্তান্তর করার অধিকারও দিয়েছে। তবে শরীআত ঐসব উপায়গুলোও নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, যে উপায়ে ব্যক্তি সম্পদের মালিকানা লাভ করতে পারে এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে মালের প্রবৃদ্ধি সাধন করতে পারে। এমনি ভাবে সম্পদ খরচ করার ব্যাপারেও শরীআত নির্দিষ্ট কিছু উপায় ঠিক করে দিয়েছে।

মালিকানা লাভের উপায় সমূহ

শরীআত প্রনেতা ( شارع ) ঐসমস্ত উপায়-উপকরণ নির্ধারন করে দিয়েছেন, যার মাধ্যমে মানুষ সম্পদের মালিকানা লাভ কিংবা সম্পদ বিনিয়োগ করতে পারে। শরীআত বিভিন্ন ধরনের পরিশ্রমকে যেমন-নিজের কাজ নিজে কিংবা অন্যের কাজ নিজে করা বা কাউকে দিয়ে করিয়ে দেওয়াকে সম্পদের মালিকানা লাভের একটি উপায় হিসাবে নির্ধারন করেছে। অনাবাদী জমিন আবাদ করা, শিকার করা, ভূগর্ভস্থ খনিজ সম্পদ উত্তোলন, দালালী, ইত্যাদির মাধ্যমেও সম্পদের মালিক হওয়া যায়। এমনি ভাবে মুযারাবা (এক ধরনের অংশীদারী কারবার) ও মুসাকাতকেও (সেচ) মালিকানা হাসিলের উপায় হিসাবে নির্ধারন করা হয়েছে। অধিকন্তু মীরাস, জীবন রক্ষাকারী সাহায্য গ্রহন, সরকারী অনুদান, এমন সম্পদ, যা বিনা পরিশ্রম বা বিনা বিনিময়ে লাভ হয়- যেমন হেবা, অসিয়ত, দিয়্যত, মোহর ইত্যাদিকেও মালিকানার উপায় সাব্যস্ত করা হয়েছে। এছাড়া কৃষি কাজ, ব্যবসা ও শিল্পকেও সম্পদ উপার্জন ও বিনিয়োগের উপায় হিসাবে ধার্য্য করা হয়েছে। শরীআত যেমনিভাবে সম্পদ উপার্জন ও বিনিয়োগের পন্থাসমূহ নির্ধারন করে দিয়েছে, তেমনিভাবে সেসব পন্থাও চিহ্নিত করে দিয়েছে, যেগুলোকে একজন মুসলমান কখনও সম্পদ উপার্জন বা বিনিয়োগের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করতে পারেনা। নিম্ন বর্ণিত উপায়ে সম্পদ উপার্জন ও বিনিয়োগ করা নিষিদ্ধ।

দুই ব্যক্তি কিংবা এক ব্যক্তির শ্রম ও অন্য ব্যক্তির সম্পদের মধ্যে। কিন্তু ব্যক্তি ছাড়া শুধু সম্পত্তির মাঝে অংশিদারিত্ব জায়েয নেই। পুঁজিবাদী অংশিদারিত্ব কোম্পানী ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিকভাবে গঠিত নয় কেননা এ ক্ষেত্রে চুক্তির মৌলিক শর্তগুলোই পূরণ হয়না। এধরনের শেয়ার কোম্পানী যেহেতু বাতিল চুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত তাই এটা হারাম। অর্থাৎ শরীআত বর্ণিত নীতি মোতাবেক না হওয়ায় এধরনের ব্যবসায়িক চুক্তি আল্লাহ্‌র নিষেধের মধ্যে গণ্য। উপরন্ত যেহেতু আল্লাহ্‌ তা’আলা চুক্তির শর্ত পুরা করতে নির্দেশ দিয়েছেন আর তা পুরা না করার দরুন এ ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র হুকুমের বিরোধিতাও পরিলক্ষিত হয়।

পুঁজিবাদী অংশিদারিত্ব কম্পানী (শেয়ার হোল্ডার কোম্পানী)

পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কর্তৃক উদ্ভাবিত শেয়ার হোল্ডার কোম্পানী করার অনুমোদন ইসলাম দেয়না। বরং এটা হারাম। কারন চুক্তি ও বেচা-কেনা শুদ্ধ হওয়ার যেসব শর্ত শরীআত উল্লেখ করেছে, তা উপরোক্ত ক্ষেত্রে পাওয়া যায়না। এসব কোম্পানীর শেয়ারে চুক্তির রোকন তথা ইজাব-কবুলও পাওয়া যায়না, এটা এক পক্ষ থেকে এক তরফা ভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকে। কারন কেউ যদি কোম্পানীর পক্ষ থেকে নির্ধারিত শর্ত পুরা করে, তাহলেই সে শরীক বলে গণ্য হয়। এমনি ভাবে, যে শুধু মাত্র একটি শেয়ার খরীদ করে সেও কোম্পানীর অংশীদার বনে যায়। এখানে প্রকৃত কোন দুই পক্ষ থাকেনা। বরং একতরফাভাবে এক পক্ষ কোম্পানী পরিচালনা করে। এই পদ্ধতিতে ইজাব কবুলের বিষয়টিও পাওয়া যায়না। বরং শুধু ইজাব পাওয়া যায়। এতে সম্পদ ও ব্যক্তি একত্র হয়না। বরং শুধু সম্পদের অস্তিত্বই দৃশ্যমান হয়।

শরীআতের পক্ষ থেকে কোম্পানীর জন্য এই শর্ত আরোপ করা আছে যে, আকেদাইন অর্থাৎ ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের পক্ষ থেকে ইজাব ও কবুল পাওয়া যেতে হবে। যেমন ব্যবসা, ভাড়া ইত্যাদি আরো যত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি আছে। তাছাড়া অংশিদারিত্ব হতে পারে দুই ব্যক্তি কিংবা এক ব্যক্তির শ্রম ও অন্য ব্যক্তির সম্পদের মধ্যে। কিন্তু ব্যক্তি ছাড়া শুধু সম্পত্তির মাঝে অংশিদারিত্ব জায়েয নেই। পুঁজিবাদী অংশিদারিত্ব কোম্পানী ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিকভাবে গঠিত নয় কেননা এ ক্ষেত্রে চুক্তির মৌলিক শর্তগুলোই পূরণ হয়না। এধরনের শেয়ার কোম্পানী যেহেতু বাতিল চুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত তাই এটা হারাম। অর্থাৎ শরীআত বর্ণিত নীতি মোতাবেক না হওয়ায় এধরনের ব্যবসায়িক চুক্তি আল্লাহ্‌র নিষেধের মধ্যে গণ্য। উপরন্ত যেহেতু আল্লাহ্‌ তা’আলা চুক্তির শর্ত পুরা করতে নির্দেশ দিয়েছেন আর তা পুরা না করার দরুন এ ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র হুকুমের বিরোধিতাও পরিলক্ষিত হয়।

আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,

“সুতরাং যারা তাঁর (মুহাম্মদ) আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা এ বিষয়ে সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদেরকে স্পর্শ করবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে।” [নুর, ৬৩]

এমনি ভাবে ইসলামে সুদ, ঘুষ, মজুতদারী, জুয়া, একচেটিয়াত্ব, ধোঁকাবাজী, প্রতারনা, বিশ্বাস ঘাতকতা, মদের ক্রয়-বিক্রয়, শুকরের ব্যবসা, মৃত পশু-পাখির গোস্ত বিক্রি, ক্রুশ বিক্রি ক্রিসমাস ট্রি (জন্মোৎসব বৃক্ষ) বিক্রি, মূর্তি বিক্রি, চুরি, ছিনতাই, লুটতরাজ, ইত্যাদির মাধ্যমে সম্পদ উপার্জন করাও নিষেধ করা হয়েছে।

২. গণ মালিকানা

মালিকানার দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে গণ মালিকানা। গণ মালিকানা হয় ঐসব সম্পদের যেগুলোকে ইসলামিক শরীআ’হ সমস্ত মুসলমানের মালিকানায় দিয়ে দিয়েছে এবং একে মুসলমানদের যৌথ মালিকানাধীন সম্পত্তি বলে স্থির করেছে। শরীআতে এগুলো ব্যবহার করা ব্যক্তির জন্য বৈধ করা হয়েছে ঠিক, কিন্তু ব্যক্তিগত মালিকানায় নিয়ে নিতে নিষেধ করা হয়েছে। মৌলিক ভাবে এই সম্পত্তি মোট তিন ধরনের।

ক. সমাজের মানুষের বেঁচে থাকার নিত্য প্রয়োজনীয় উপকরন, যা ছাড়া মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাপন অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং যেগুলোর অভাবে মানুষ তার এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হয় যেমন- পানি। রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) ইরশাদ করেন,

“তিন জিনিষের মাঝে সকল মানুষ শরীক। এগুলো হচ্ছে পানি, ঘাস (চারণ ভূমি) এবং আগুন।”

এই হাদীসের আবেদন উক্ত তিন বস্তুর মাঝেই সীমিত নয়, বরং এর আওতায় প্রত্যেক ঐ সমস্ত বস্তুও শামিল, যা সমাজের সকল মানুষের সমান ভাবে প্রয়োজন। একারনে ঐ সমস্ত যন্ত্রপাতি এবং উপকরনও এর মধ্যে শামীল, যা মানুষের নিত্য দিনের প্রয়োজনে ব্যবহার হয়। যেমন-পানি উত্তোলনের পাম্প, পানি সরবরাহের পাইপ লাইন, পানি-বিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্ট, বিদ্যুতের খুটি, সরবরাহ তার ইত্যাদি।

খ. এমন সম্পত্তি যা তার স্বাভাবিক সৃষ্টিগত কারনেই ব্যক্তি মালিকানার কবজায় যাওয়ার উপযুক্ত নয়। যেমন নদী, বড় ময়দান, মসজিদ, মহা সড়ক ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে রাসূল (সাঃ) বলেন, (مني مناخ من سبق) “যে আগে আসে, আমার দিক থেকে পরিবেশ তার অনুকুলে” (অর্থাৎ আগে আসলে আগে পাবে)। এছাড়া আরো জিনিস আছে, যেমন- রেলগাড়ী, বিদ্যুতের খুটি, পানির পাইপ, মহা সড়কের সাথে সংযুক্ত পয়:প্রনালী ইত্যাদিও গণ মালিকানার মধ্যে গন্য। কারন এগুলো জন সাধারনের পথের সাথে সংযুক্ত। আর এমন পথ গণ মালিকানারই অন্তর্ভুক্ত। কোন মানুষ এসব জিনিসকে নিজের মালিকানায় নিয়ে নিতে পারেনা এবং এর থেকে উপকৃত হতে জন সাধারণকে বাধা দিতে পারেনা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,  (لا حمى الا لله ورسوله) “আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূল ছাড়া চারণ ভুমি আর কারো নয়”। অতএব, এক মাত্র সরকার ছাড়া আর কেউ এগুলো থেকে মানুষকে বারণ করার অধিকার রাখেনা।

গ. এমন খনি, যাতে বিপুল পরিমান সম্পদ মজুদ আছে। এধরনের অনেক খনি আছে, যা বিভিন্ন রকম মুল্যবান খনিজ সম্পদে ভরপুর। এগুলো সকল মুসলমানের মালিকানাধীন সম্পত্তি। কোন কোম্পানী কিংবা ব্যক্তি বিশেষের পক্ষে এগুলোর মালিকানা দাবি করা জায়েয নেই। একারনে এগুলো থেকে সম্পদ উত্তোলন করা, মজুদ করে রাখা এবং বন্টন করার জন্য কোন কোম্পানী কিংবা ব্যক্তি বিশেষকে এর মালিকানা দিয়ে দেওয়া বৈধ নয়। বরং এগুলোকে সমস্ত মুসলমানদের মালিকানায় রাখা জরুরী। এতে সকল মুসলমান শরীক। রাষ্ট্র নিজে এসব সম্পত্তি উত্তোলন করবে কিংবা কাউকে ঠিকাদার নিয়োগ করবে অথবা সকল মুসলমানের প্রতিনিধি হওয়ার ভিত্তিতে এসব খনিজ দ্রব্য বিক্রি করে এর রাজস্ব বাইতুল মালে গচ্ছিত রাখবে। এসমস্ত খনি ভূগর্ভস্থ হউক বা ভূপৃষ্টে হউক তাতে হুকুমের ক্ষেত্রে কোন তারতম্য হবেনা। ভূপৃষ্টের খনি যেমন-লবন, সুরমা ইত্যাদির খনি। ভূগর্ভস্থ খনি (যার সম্পদ উত্তোলন করা খুবই কষ্ট সাধ্য ব্যাপার) যেমন- সোনা, রূপা, পিতল, তামা, ইউরেনিয়াম, পেট্রোল ইত্যাদির খনি। এর দলীল হচ্ছে ইবনে হাম্মাল আল মাযূনী (রা) এর বর্ণিত হাদীস,

“ইবনে হাম্মাল (রা) বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসূল (সাঃ) এর নিকট মারিব নামক স্থানের কিছু সম্পত্তি অনুদান হিসাবে তাকে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। রাসূল (সা) তা তাকে দিয়ে দিলেন। যখন তিনি চলে গেলেন তখন লোকেরা বলল- ইয়া রাসূলাল্লাহ্‌! আপনি কি জানেন আপনি তাকে কি দিয়েছেন? আপনি তাকে অফুরন্ত পানির উৎস দিয়ে দিয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন- এরপর রাসূল (সা) এটা ফেরত নিয়ে নিলেন।”

ছোট এবং পরিমানে সীমিত খনি গুলোর হুকুম অবশ্য ভিন্ন। কোন ব্যক্তি বিশেষও এ ধরনের খনির মালিক হতে পারে। যেমন আল্লাহ্‌র রাসূল (সা) হযরত বিলাল বিন হারিস আল-মাযূনীকে (রা) হিজাজে-“মাআদিনুল কবিলা” নামক খনিটির মালিক বানিয়ে দিয়েছিলেন।

গণ মালিকানাধীন সম্পত্তি ব্যবহারের উপায়

যেহেতু গণ মালিকানাধীন সম্পত্তিতে যৌথ ভাবে সকল নাগরিকের মালিকানা রয়েছে, সেহেতু প্রত্যেক ব্যক্তিই এই সম্পদ ব্যবহার করতে পারে। যদি এর ধরন এমন হয় যে, প্রত্যেকে সরাসরি এটা ব্যবহার করতে পারে – যেমন- পানি, ঘাস, আগুন, জনপথ ইত্যাদি; তাহলে ব্যক্তিগত ভাবে তারা এগুলো থেকে উপকৃত হতে পারে। আর যদি এমনটা সম্ভব না হয়, যেমন পেট্রোল বা অন্যান্য প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পত্তির ক্ষেত্রে, তাহলে ইসলামী রাষ্ট্র এগুলো উত্তোলনের ব্যবস্থা করবে, এগুলো থেকে উপার্জিত অর্থ বাইতুল মালে জমা রাখবে। খলীফা প্রয়োজন অনুযায়ী মুসলমানদের কল্যানার্থে উপযুক্ত খাতে এগুলো ব্যয় করবেন। নিম্ন বর্নিত পদ্ধতিতে খলীফা তা বন্টনও করে দিতে পারেন।

ক. খনিজ সম্পদ সংক্রান্ত বিভাগে এগুলোর অর্থ ব্যয় করা অর্থাৎ এ বিভাগের জন্য ভবন নির্মান, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, উপদেষ্টা, বিশেষজ্ঞ, যন্ত্র পাতি এবং কারখানা ইত্যাদি খাতে ব্যয় করা যাবে।

খ. এই সম্পত্তির মালিক অর্থাৎ মুসলমানদের জন্য তা সরাসরি ব্যয় করা যাবে অর্থাৎ খলীফা সরাসরি এগুলো মানুষের মাঝে বিতরন করে দিতে পারবেন। যেমন পেট্রোল, পানি, বিদ্যুৎ ইত্যাদি বিনা মূল্যে সরবরাহ করবেন কিংবা এর আয় থেকে উপার্জিত অর্থ মুসলমানদের কল্যাণ মূলক খাতে ব্যয় করবেন।

গ. যখন বাইতুল মালে পর্যাপ্ত অর্থ থাকবেনা তখন জিহাদ কিংবা এর জন্য অস্ত্র ও সৈন্য প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এধরনের সম্পদ ব্যয় করা হবে। প্রনিধান যোগ্য যে, বাইতুল মালে কোন সম্পত্তি না থাকলেও জিহাদের জন্য খরচ করা মুসলমানদের জন্য ফরয।

৩. রাষ্ট্রীয় মালিকানা

মালিকানার তৃতীয় প্রকার হচ্ছে রাষ্ট্রীয় মালিকানা। এর মাঝে এমন প্রত্যেক সম্পদ শামীল, যা ভূমি বা ইমারাত হওয়ার দিক থেকে যদিও সাধারন জনগনের সাথে সংশ্লিষ্ট, কিন্তু গণমালিকনার অন্তর্ভূক্ত নয়। এ ধরনের সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানারও উপযুক্ত। যেমন ভূমি, অট্টালিকা, স্থাবর সম্পত্তি ইত্যাদি। কিন্তু যেহেতু এগুলো সাধারন জনগনের ব্যবহারের সাথে সংশ্লিষ্ট সেহেতু এগুলোর রক্ষনাবেক্ষন ও নিয়ন্ত্রন করার দায়িত্ব খলীফার উপর ন্যাস্ত। কেননা জনগনের অধিকার সংরক্ষনের স্বার্থে যেকোন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা কেবলমাত্র খলীফারই রয়েছে। মরুভূমি, পাহাড়, বন্দর এলাকা, বিশেষ কোন ব্যক্তির মালিকনাধীন নয়- এমন অনাবাদী জমিন, অট্টালিকা এবং পানি পানের স্থান (কুপ ইত্যাদি), এমন সম্পত্তি-যা রাষ্ট্র কর্তৃক খরীদ করা, কিংবা রাষ্ট্র যা নির্মান করেছে, অথবা যুদ্ধ করে শত্রু থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে, বিভিনড়ব অফিসের জন্য ব্যবহৃত বাড়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ইত্যাদি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সম্পদ।

খলীফা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিকে ব্যক্তির মালিকানায়ও দিতে পারে। যেমন ভূমি, বাড়ী ইত্যাদি। এটা মুনাফার ব্যাপারেও হতে পারে আবার মূল সম্পত্তির বেলায়ও হতে পারে। অথবা খলীফা তাদেরকে এমন অনুমতি দিতে পারে যে, ব্যক্তি কোন অনাবাদী জমীন আবাদ করে তার মালিক হয়ে যাবে। মোট কথা যেভাবেই এটা ব্যবহার করা হোকনা কেন তা অবশ্যই মুসলমানদের উপকারার্থে হতে হবে।

ভূমি সমহূ  (الاراضى)

ভূমির ক্ষেত্রে একটি বিষয় হচ্ছে ভূমির মূল ( رقبة ) এর মালিকানা। আরেকটি বিষয় হচেছ ভূমির মুনাফা বা রাকাবাহ থেকে প্রাপ্ত সুবিধা ( منفعة )। ইসলাম উভয়কে মানুষের জন্য মুবাহ (বৈধ) করেছে। তবে উভয়ের জন্য বিশেষ বিশেষ বিধি-বিধানও রেখেছে।

ভূমির প্রকার সমূহ

ভূমি দুই প্রকার উশরী ও খারাজী।

ক. উশরী জমিন বলা হয় এমন ভূমিকে, যেখানকার বাসিন্দারা নিজে থেকেই মুসলমান হয়েছে। যেমন হিজাজ ও ইন্দোনিশিয়ার মুসলমান। এমন অনাবাদী জমিনকেও উশরী জমিন বলা হয়, যা মানুষ নিজে আবাদ করে।

উশরী জমীনের ক্ষেত্রে খোদ ভূমি বা তার আয় উভয়েরই মালিক হওয়া যায়। উশরী জমিনের উৎপাদিত ফসলের উপর যাকাত দিতে হয়। যে ভূমি সেচের জন্য বৃষ্টি কিংবা জোয়ারের পানি ছাড়া অন্য উপায় অবলম্বন করার প্রয়োজন হয় না, সেভূমির ফসলের দশ ভাগের এক ভাগ যাকাত (উশর) হিসাবে প্রদান করতে হয়। যদি তা সেচ করার জন্য অন্য উপায় অবলম্বন করতে হয়, তাহলে উৎপন্ন ফসলের বিশ ভাগের এক ভাগ (নিসফে উশর) যাকাত হিসাবে প্রদান করতে হয়।

খ. খারাজী জমিন হচ্ছে হিজাজ ব্যতীত এমন ভূমি, যা জিহাদ কিংবা সন্ধির মাধ্যমে হস্তগত হয়েছে। যেমন ইরাক, সিরিয়া ও মিশরের ভূমি। এমন জমিনের ক্ষেত্রে রাকাবা তথা মূল ভূমি সমস্ত মুসলমানের মালিকানাধীন থাকে, তবে রাষ্ট্র থাকে এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের নায়েব বা প্রতিনিধি। ব্যক্তি শুধু এর মুনাফার মালিক হতে পারে। খেরাজি জমিনের ক্ষেত্রে খারাজ আদায় করতে হয়। এর পরিমান সেটাই হবে, যেটা রাষ্ট্র নির্ধারন করবে। খারাজ আলাদা করার পর যদি এ জমিনের উৎপন্ন ফসল নেসাব পরিমান হয়, তাহলে তা থেকে যাকাত আদায় করতে হবে।

মোট কথা ব্যক্তি উশরী জমিন থেকে লাভবান হতে পারে এই অর্থে যে, সে তা বিক্রি করতে পারে, মিরাছ বা হেবা হিসাবে প্রদান বা গ্রহন করতে পারে। এ হুকুম খারাজী জমির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

শিল্প কারখানা (المصانع)

শিল্প কারখানাও ব্যক্তি মালিকানায় থাকা জায়েয আছে। যেমন গাড়ীর কারখানা, ফার্নিচার, গার্মেন্টস সামগ্রী ইত্যাদির কারখানা। এমনি ভাবে রাষ্ট্রের মালিকানায়ও বিভিন্ন কল- কারখানা থাকতে পারে। যেমন-অস্ত্র কারখানা, তেল উত্তোলন ও শোধনাগার, বিভিন্ন খনিজ সম্পদ উত্তোলন কেন্দ্র ইত্যাদি। এ ছাড়া গণমালিকানায়ও কল কারখানা থাকতে পারে। যেমন লোহা, ইস্পাত, স্বর্ন-রৌপ্য, পেট্রোল ইত্যাদি খনিজ সম্পদের ফ্যাক্টরী।

এধরনের কল কারখানার মালিকানা এগুলো থেকে উৎপাদিত পন্যের মালিকানার অনুরূপ হবে। কারণ মূলনীতি হলো ان المصنع يأخذ حكم ما ينتج অর্থাৎ ” উৎপাদিত পন্যের হুকুমই কারখানার হুকুম”।

বাইতুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার)

বাইতুল মালের আয়ের উৎস সমূহ

১- আনফাল, গনিমত, মালে ফায় এবং খুমুছ
২- খারাজ
৩- জিযিয়া
৪- গণ মালিকানাধীন সম্পত্তি থেকে উপার্জিত বিভিন্ন প্রকার আয়; এগুলো রাখা হয় বিশেষ বিভাগে
৫- রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সম্পদ থেকে অর্জিত রাজস্ব
৬- বিভিন্ন সীমান্তে সংগৃহীত শুল্ক
৭- গুপ্তধন এবং ছোট খনির এক পঞ্চমাংশ (খুমুছ)
৮- বিভিন্ন প্রকার কর (ضرائب)
৯- যাকাত বাবত আদায়কৃত সম্পদ। এটিও বিশেষ বিভাগে রাখা হয়

নগদ অর্থের ব্যাপারে স্বর্ন- রৌপ্যকে মূল ভিত্তি বানানোর-বাধ্যবাধকতা (وجوب ان يكون النقد ذهبا وفضة)

রাসূল (সা) এর যুগে মানুষ স্বর্ন ও রৌপ্যকেই তাদের লেন-দেনের জন্য বিনিময় মূদ্রা বা নগদ অর্থের মানদন্ড হিসাবে মনে করতো এবং পাশাপাশি উভয়টিই ব্যবহার করতো। এছাড়া প্রাথমিক যুগে পার্সী ও রোমান দেরহাম দীনারই নগদ অর্থ হিসাবে আরবদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। রাসূল (সা) এর যুগ থেকে খলীফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ান পর্যন্ত মুসলমানরা নিজেরা কোন মুদ্রা তৈরী করেনি। খলীফা আবদুল মালেক বিন মারওয়ান তার যুগে এক ধরনের বিশেষ আকৃতির মুদ্রা বানিয়ে ছিলেন, যা ছিল ইসলামী কারূকার্য দ্বারা সুশোভিত। আর তার ভিত্তিও রাখা হয়েছিল স্বর্ন রূপার মানদন্ডের উপর। অর্থাৎ শরঈ দীনার ও দেরহামের মাপের উপর।

ইসলাম স্বর্ন-রৌপ্যের সাথে অনেক বিধি-বিধানকে সংশ্লিষ্ট করে রেখেছে। যেমন এগুলো সোনা-রূপা হওয়ার দিক থেকে অর্থাৎ ব্যবহার্য্য মূল্যবান ধাতু হিসাবে, নগদ অর্থ ও মুদ্রা হওয়ার দিক থেকে, পণ্য সামগ্রীর মুল্য হওয়ার দিক থেকে এবং শ্রমের বিনিময় হওয়ার দিক থেকে। শরীআত সোনা-রূপার মুদ্রা মজুত করে রাখাকে হারাম করে দিয়েছে। এগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট এমন মাসআলাও আছে, যা সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয়। ইসলাম সোনা ও রূপা এই দুই প্রকার মুদ্রা হওয়ার কথা বলেছে। এগুলোর উপর যাকাত ফরয হয়েছে এবং এসব মুদ্রাকে পন্য সামগ্রীর মূল্য হিসাবে বিবেচনা করেছে। সোনার দীনার আর রূপার দিরহামের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন বিষয়ের (যেমন যাকাত) নেসাব নির্ণয় করা হয়েছে। যদি দিয়্যাত (রক্ত পন) ওয়াজিব হয়, তখনও এই মুদ্রার হিসাবে তা পরিশোধ করার কথা বলা হয়েছে। এর জন্য সোনা রূপার একটি নির্দিষ্ট পরিমান নির্ধারন করা হয়েছে। যার বিবরণ হচ্ছে এই যে, স্বর্নের ক্ষেত্রে একহাজার দীনার। আর রূপার ক্ষেত্রে ১২ হাজার দিরহাম। যখন চুরি করলে হাত কাটা ফরয করা হয়েছে, তখন এর জন্য একটি ন্যুনতম সীমাও নির্ধারন করা হয়েছে। অর্থাৎ কি পরিমান সম্পদ চুরি করলে হাত কাটা যাবে, সেটিও নির্ধারিত হয়েছে সোনা রূপার পরিমাণের ভিত্তিতে।

দুই প্রকার মুদ্রা, বিনিময় মাধ্যম, জিনিষপত্রের মূল্য ইত্যাদি হিসাবে সোনা-রূপার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি রাসূল (সাঃ) এর কাছ থেকেই গৃহীত হয়েছে। এটা খোদ রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)ই নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন যে, শুধু সোনা-রূপাই হবে নগদ অর্থ নির্ণয়ের মাপ কাঠি। যার মাধ্যমে জিনিস পত্রের দাম নির্ধারন করা হবে এবং শ্রমের বিনিময় দেওয়া হবে। এটাই হচ্ছে এ কথার বড় দলীল যে ইসলাম সোনা রূপাকেই নগদ অর্থের মান দন্ড নির্ণয় করেছে। কারণ নগদ অর্থের সাথে সম্পর্কিত যত হুকুম আহকাম আছে, সবই সোনা রূপার মানে আবদ্ধ।

এই ভিত্তির উপর নির্ভর করেই মুসলমানদের নগদ লেনদেনের মাপকাঠি সোনা-রূপা হওয়াই অপরিহার্য্য। খলীফারও করনীয় হলো সোনা-রূপাকেই নগদ অর্থের ভিত্তি নির্ধারণ করা, আর সোনা-রূপার ঐ নিয়মের উপর চলা, যা রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে প্রচলিত ছিল। খিলাফত ভিত্তিক সরকারের আরো দায়িত্ব হলো একটি নির্দিষ্ট ও বিশেষ রূপের মুদ্রা চালু করা, দীনারের পরিমাপ শরঈ দীনারের মাপে নির্ধারণ করা অর্থাৎ এক দীনার সমান ৪.২৫ গ্রাম। এটা হচ্ছে মিছকালের ( مثقال ) ওজন। রূপার দেরহামের ওজনও হবে শরঈ দেরহাম বরাবর। যাকে وزن بيع ও বলা হয়। অথার্ৎ প্রতি দশ দেরহামের ওজন হবে সাত মিছকাল বরাবর। দেরহামের মুদ্রা হবে- ২.৯৭৫ গ্রাম বরাবর। সোনা-রূপার মুদ্রার প্রচলনকে ফিরিয়ে আনাই মুদ্রা সম্পর্কিত অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধানের একমাত্র উপায়। এছাড়া বিশ্বব্যাপী বিরাজমান তীব্র মূল্য স্ফীতি নিয়ন্ত্রনের উপায়ও এটিই। মুদ্রা বিনিময় হারের ক্ষেত্রে স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উন্নয়ন সাধন করাও এর মাধ্যমে সম্ভব হবে। এই সোনা-রূপার নীতি অবলম্বন করেই আর্ন্তজাতিক বাণিজ্যের উপর মার্কিন প্রাধান্য এবং বিশ্ব অর্থনীতির উপর ডলারের প্রভাব ও কর্তৃত্ব খর্ব করে দেয়া সম্ভব।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply