ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রের পরাশক্তি রোম ও পারস্য বিজয়

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

৬২২ খ্রিষ্টাব্দে  রাসূল (সাঃ) মদিনাতে  হিজরত করার পর সেখানে ইসলামি রাষ্ট্র  প্রতিষ্ঠা করেন যার পরিচালনা হতো এমন এক আদর্শ দিয়ে যেটা মহান আল্লাহর নিকট একমাত্র জীবনব্যবস্থা। রাসুল (সাঃ) – এর সময় থেকেই সেই আদর্শের ধারক ও বাহকগন দাওয়াত ও জিহাদের মাধ্যমে সেই মানবতার আদর্শকে পৌঁছে দেয়া শুরু করেন মদিনার বাইরে নতুন নতুন অঞ্চলে, যেসব অঞ্চলের শাসকগণ সেই অঞ্চলের সাধারণ জনগনের উপর খোদা হয়ে বসে ছিল, প্রতিষ্ঠা করত সেথায় সীমাবদ্ধ জ্ঞানে আবদ্ধ মানব তৈরি শাসন, অত্যাচারে অত্যাচারে নিষ্পেষিত করত নাগরিকদের জীবন, বঞ্চিত করত তাদের প্রাপ্য ন্যায্য অধিকার। হয়ত কোন কোন শাসক রাসুল (সা) ও তার উত্তরসূরি  খিলাফতের শাসকদের  দাওয়াত গ্রহন করে স্বানন্দে ইসলামক গ্রহন করত, নয়ত কেউ কেউ শান্তির আদর্শ ইসলাম গ্রহন না করে  জিযয়া কর দেয়ার মাধ্যমে অন্য রাষ্ট্র থেকে নিরাপত্তার সন্ধি করত, নয়ত বা কেউ কেউ দুটোই অস্বীকার করে যুদ্ধে লিপ্ত হতো।  এভাবেই আল্লাহ তায়ালা মানবতার আদর্শের ধারক ও বাহকদের সুযোগ করে দিতেন  একের পর এক রাষ্ট্রে ইসলামকে পৌঁছে দিতে। ফলশ্রুতিতে মুসলিমরা একের পর এক ক্ষমতাধর রাষ্ট্র বিজয়ের মাধ্যমে খিলাফত রাষ্ট্রকে নিয়ে যায় দূর বহু দূর।  


ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনের আগে থেকেই পৃথিবীর পরাশক্তি হিসেবে রোম সাম্রাজ্য (বাইজেণ্টাইন) ও পারস্য সাম্রাজ্য (বর্তমান ইরান) নিজেদেরকে আত্মপ্রকাশ করে। রোমের সীমানা ছিল সিরিয়া  থেকে পশ্চিমে  স্পেন পর্যন্ত, আর পারস্যের সীমানা ছিল ইরাক থেকে পূর্বে খোরাসান (আফগানিস্তান) পর্যন্ত। রোম আর পারস্য উভয়েই যুগের পর যুগ ধরে পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত থাকত।  রাসুল (সাঃ) -এর সময় থকেই  রোমের সাথে সদ্য প্রতিষ্ঠিত  ইসলামিক রাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হয়। একবার রাসুল (সাঃ) হারেস ইবনে ওমায়র আযদী (রাঃ) কে এক চিঠি দিয়ে  বসরার গভর্নরের কাছে দূত হিসেবে পাঠালে রোমের কায়সারের নিযুক্ত  ‘বালাকা’ এলাকার গভর্নর শোরাহবিল ইবনে আমর গাসসানি সেই দূতকে হত্যা করে। তখন দূতকে হত্যা করা যুদ্ধ ঘোষণার শামিল ছিল, তাই রাসুল (সাঃ) ৩০০০ মুজাহিদ সেনাবাহিনী নিয়ে রোমানদের ২ লক্ষ সেনাবাহিনীর উপর হামলা করেন, এটিই মুতারযুদ্ধ হিসেবে প্রসিদ্ধ। খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) -এর বুদ্ধিমত্তায় সে জিহাদে মুসলিমরা জয় লাভ করে। পরে মুতার যুদ্ধ ও তাবুকের অভিযানের পরে রাসুল (সাঃ) সবশেষে  ওসামা (রাঃ) কে সেনাপতি নিযুক্ত করে  সর্বশেষ বাহিনী প্রেরন করেন রোমদের বিরুদ্ধে।  আবু বকর (রাঃ) -এর খিলাফত কালে  তিনি সে বাহিনীর নেতৃত্ব অপরিবর্তনীয় রেখেই সামনে অগ্রসর হতে বলেন।  রাসুল (সাঃ) –এর  ওফাতের পরে যখন ইরাকে বিভিন্ন গোত্র বিদ্রোহ করে বসে, তখন আবু বকর (রাঃ) হযরত  মুছান্না (রাঃ) কে দিয়ে সুকৌশলে সেই বিদ্রোহ দূর করে ইরাকেই মুসলিমদের এক বিশাল  বাহিনী গড়ে তোলেন, যারা ইরাকের মুসলিমদের বিদ্রোহ থেকে শান্তির পথে একীভূত করে ইরানের দিকে ধাবিত হন।

পারস্যের কাহিনী:

খলীফা আবু বকর (রাঃ) মদিনা থেকে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) –এর সেনাপতিত্তে ১০ হাজার মুজাহিদদের এক সেনা বাহিনী মুছান্নার (রাঃ) সাহায্যে ইরাকে পাঠান। সে বাহিনীতে কা’কা বিন আমর তমিমীকে (রাঃ) পাঠানো হয়, যার ব্যাপারে খলীফা বলেন, কা’কা যে বাহিনীতে থাকবে তারা কখনো পরাজিত হবে না’। মাত্র ১৮ হাজার মুজাহিদ নিয়ে ইরাকের সীমান্তে পারস্য বাহিনীর সেনাপতি হরমুজের বিশাল বাহিনীর সাথে জিহাদে লিপ্ত হয় মুসলিম বাহিনী। হরমুজের বাহিনীতে মুসলিমদের ২.৫ গুন সৈন্য ছিল, আরও ২০,০০০ সৈন্য পথে আসছিল সেই বাহিনীর সাহায্যার্থে। মুসলিমরা পারস্যদের  ধরাসয়ি করতে শুরু করলে প্রচণ্ড যুদ্ধের পর পালিয়ে যায় পারস্যরা, হরমুজ নিহত হয় এ যুদ্ধে। মুছান্না (রাঃ) পরাজিত সৈন্যদের  ধাওয়া করে তাদের সাহায্যার্থে আগত কারেনের সৈন্যবাহিনীকে মাযারের নিকট আক্রমন করলে  তারাও পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়। খালিদ (রাঃ) সেসব এলাকার পরাজিত বন্দী  নাগরিকদের ছেড়ে দেন, কারণ সেনাপতি  হরমুজ সেইসব গরীব কৃষকদের জোরপূর্বক যুদ্ধে এনেছিল। পরে সেই কৃষকরা একে একে ইসলাম গ্রহন করে তাদের এলাকায় থাকতে শুরু করে।

হীরা বিজয়ঃ  ফোরাতের তীরে বিশাল বন্দর ইমপেশিয়া  দখল করলেন খালিদ (রাঃ), কিছু ফৌজ নিয়ে সন্ধির বিনিময়ে ‘হীরা’  বিজয় করলেন,  হীরার গভর্নর আজাদবাহ পালিয়ে গেল। ইরাকের খৃস্টান কবিলাগুলোর কেন্দ্র ছিল হীরা। হীরাবাসি মনে করেছিল সাধারণত বিজয়ী সৈন্য যেমন পরাজিতের এলাকায় এসে সন্ধি  ভেঙ্গে তাদের উপর অত্যাচার করে, মুসলিমরা হয়ত তেমনি করবে। কিন্তু তারা মুসলিমদের  কাছে ভিন্ন আচরন দেখে অভিভূত হয়ে গেল, মুসলিমদের কাছে আনুগত্য স্বীকার করল।  হীরার পর খালিদ (রাঃ) ‘আম্মারায়‘ জমায়েত হওয়া  ইরানী ফৌজের মোকাবেলা করলেন, পরে ‘আইনুত্তামরে আক্রমণ করলেন। আইনুত্তামরের সেনাপতিছিল মেহরান, ইরানীরা এবারো পরাজিত হল।


দুমাতুল জন্দল জিহাদঃ  খলীফা আবু বকর (রাঃ) খালিদ (রাঃ) কে ইরাকে পাঠানোর পরেই আয়াজ বিন গনমকে দুমাতুল জন্দলে পাঠান। রাসুল (সাঃ) তাবুকের যুদ্ধে খালিদ (রাঃ) কে দুমাতুল জন্দলে রোমানদের উপর হামলা করতে বলেছিলেন। সেসময় খালিদ (রাঃ)  মাত্র ৫ শত জানবাজ  নিয়ে  সেখানকার খৃস্টান শাসক ওকিদর বিন আব্দুল মালিককে গ্রেপ্তার করে মদিনায় পাঠায়, সে মদিনায় এসে ইসলাম  কবুল করলে রাসুল (সাঃ) তাকে পুনরায় তার এলাকার শাসনভার দিয়ে দেন। কিন্তু রাসুলের (সাঃ) ইন্তিকালের পর সে আবার বিদ্রোহ করে বসে। তাই খালিদ (রাঃ) আয়াজ বিন গনমকে  সাহায্যের জন্য আইনুত্তামর থেকে ৩০০ মাইল দূরে দুমাতুল জান্দালে আক্রমণ করেন। সেখান থেকে  ইরানে যুদ্ধরত মুসলিম বাহিনীর উপর এবং মদিনাতেও  হামলার সম্ভাবনা ছিল। আবার উত্তরে আলজারিয়ার খৃস্টানদের   থেকেও হামলার সম্ভাবনা ছিল, যা খালিদ (রাঃ) দুমাতুল জন্দল জয় করে মিটিয়ে দেন।

ফেরাজে রোম পারস্যের সম্মিলিত বাহিনীর সাথে জিহাদঃ  খালিদ (রাঃ) দুমাতুল জন্দল থেকে আবারও  আইনুত্তামরে ফিরে এসে ফোরাতের তীরধরে  ‘ফেরাজে’ পৌঁছেন। ফেরাজের পশ্চিমে রোম ও পূর্বে পারস্য, ফেরাজ এই দু দেশের সীমানার ন্যায় ছিল।  সেখানে খালিদ (রাঃ) এর অবস্থানের খবর পেয়ে রোম আর পারস্য প্রথম বারের  মত একত্রে মুসলিমদের উপর হামলার সিদ্ধান্ত নেয়। কিছুদিন পূর্বে রোমানদের কাছে পারস্যরা  হারার কারনে রোমানদের মুল সেনাপতিত্তে  তারা মুসলিমদের হামলা করে। কিন্তু মুসলিমদের তিব্র হামলার মুখে টিকতে না পেরে ইরানীরা  রোমদের অনুমতির অপেক্ষা না করেই পূর্ব দিকে পালিয়ে যায়। তাদের দেখে রোমরাও পশ্চিম দিকে পালায়। তাদের লাশের স্তূপ পরে থাকে  ফেরাজের ময়দানে। এতে সাথে সাথেই রোম-পারস্যের  ঐক্যের ভিত্তি শেষ হয়ে গেল  যেটা ভবিষ্যতে  হুমকি হয়ে দাড়াতে পারতো। এযুদ্ধে পরাজিত হয়ে রোম ও ইরান একে ওপরকে দোষারোপ করতে থাকে।


এদিকে সিরিয়ায় রোমদের সাথে নিয়মিত যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় খলীফা আবু বকর (রাঃ) খালিদ (রাঃ) কে ইরানের জিহাদ থেকে সিরিয়াতে যাওয়ার আদেশ দেন। তাই তিনি ইরাকে মুছান্না (রাঃ) কে সেনাপতি রেখে ৯ হাজার অভিজ্ঞ মুজাহিদ ও সিপাহ সালার নিয়ে সিরিয়াতে চলে যান। এদিকে পারস্যের রাজা ও তার পুত্র উভয়ই মৃত্যুবরণ করলে তারা পারস্য শাহানশাহ হিসেবে শাহরিয়ারকে খমতায় বসায়। শাহরিয়ার ভেবেছিল মুছান্না (রাঃ) খালিদ (রাঃ) চলে যাওয়ায় তাদের বিশাল সেনাবাহিনীর আগমন দেখে পালাবে, তাই সে জেনারেল হরমুজকে ১০ হাজার সৈন্য সহ এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে মুছান্না (রাঃ) কে হামলা করতে ‘ব্যাবিলন’ পাঠায়। কিন্তু কিছুদিনপরেই সে শুনেন হরমুজ পরাজিত হয়ে ফিরছে, পাছে ব্যাবিলন ময়দানে হাজার হাজার ইরানী সৈন্যের লাশ পরে আছে।

রোমের কাহিনী:

এদিকে খালিদ (রাঃ) কে মদিনা থেকে ইরাকের দিকে অভিযানে প্রেরণের পরই খলীফা আবু বকর (রাঃ)  সেনাপতিদের পতাকা বেধে দিয়ে দায়িত্ব প্রাপ্ত  নিজ নিজ এলাকার দিকে প্রেরন করেন। তিনি  খালিদ ইবনে  সাইদ (রাঃ) কে তায়মার দিকে (এখানে ওমর (রাঃ) খালিদ ইবনে সাইদকে সিরিয়াতে পাঠাতে খলীফাকে নিষেধ করেন, কারণ সে রেশমের জুব্বা  পরার ব্যাপারে ওমর (রাঃ) এর সাথে তর্ক করেছিল), ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান (রাঃ) কে দামেশকের দিকে,  আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রাঃ) কে হিমসের  (হোমস)  দিকে এবং আমরইবনুল আস  (রাঃ) কে ফিলিস্তিনে‘র দিকে দায়িত্ব দিয়ে পাঠান।  পথে বালাকা অঞ্চলে আবু উবায়দা (রাঃ) সে এলাকার জনগনের সাথে জিহাদে সেটা সন্ধির মাধ্যমে জয় করেন, এটাই সিরিয়ায়  প্রথম  সন্ধি চুক্তি।

ইয়ারমুকের জিহাদঃ  মুসলিম মুজাহিদরা যখন  সিরিয়ার দিকে আগমন করেন তখন  রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস ভয় পেয়ে যায়, সে জানত রাসুল (সাঃ) শেষ নবী আর তাদের খৃস্টান ধর্মের সময় শেষ হয়ে গেছে। হিরাক্লিয়াস তখন হিমসে (হোমস) অবস্থান করছিল।   আবু   বকর (রাঃ) এর মোট সৈন্য সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ও তাদের সাহায্যার্থে ছিল ইকরিমা ইবনে আবু জেহেল এর ৬ হাজার সৈন্য। হিরাক্লিয়াসের সম্মুখ বাহিনীর দায়িত্বে ছিল জুরজা যিনি পরে ইসলাম গ্রহনের পরই ইয়ারমুকের জিহাদে শহীদ হন (তার খালিদ (রাঃ) এর সাথে এই প্রসিদ্ধ ঘটনা  আমি আমার আরেক নোটে বর্ণনা করেছি);  হিরাক্লিইয়াসের  ২ লাখ  সৈন্যের বিরুদ্ধে  মুজাহিদদের  সংখ্যা কম হয়ায় তারা খলীফার কাছে সাহায্য চাইলে খলীফা  খালিদ বিন ওয়ালিদ  (রাঃ) কে ইরাক থেকে সিরিয়া যেতে নির্দেশ দেন। তিনি ৫ দিন পর তার ৯ হাজার মুজাহিদ নিয়ে ইয়ারমুকের জিহাদে মুল সেনাপতির দায়িত্বে এসে নিযুক্ত হন। খালিদ (রাঃ) সেখানে যেয়ে দেখেন মুজাহিদগণ রোমানদের সাথে জিহাদে লিপ্ত, অতপর খালিদ (রাঃ) এর আগমনের সংবাদ শুনে রোমানরা মুসলিমদের সাথে সন্ধি করতে চায়। সিরিয়াই ছিল মুজাহিদদের প্রথম বিজিত এলাকা। 

বর্ণিত আছে যে, যখন ইয়ারমুকের যুদ্ধে দুই বাহিনী প্রচণ্ড লড়াই করছিল, তখন আরব থেকে এক পত্র বাহক এসে খালিদ বিন ওয়ালিদের (রাঃ) কাছে খলীফার একটি চিঠি দেন। পত্র বাহক খালিদ (রাঃ) কে একান্তে নিয়ে গিয়ে বলেন, খলীফা আবু বকর ইন্তেকাল করেছেন, ওমর (রাঃ) পরবর্তী খলীফা নিযুক্ত হয়েছেন। ওমর (রাঃ) আপনার স্থলে মুল সেনাপতির দায়িত্বে আবু উবায়দা আমির ইবনে জাররাহ (রাঃ) কে নিযুক্ত করেছেন। খালিদ (রাঃ) এই সংবাদ যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত গোপন রাখেন, যেন এতে মুজাহিদদের মনবল ভেঙ্গে না যায়। 

আজনাদায়নের জিহাদঃ “মা’ওয়ারের আরবা” অঞ্চলে আমর ইবনে আস (রাঃ) এর সাথে রোমানরা যুদ্ধে লিপ্ত ছিল,  সেখানে তার সাহায্যার্থে খালিদ (রাঃ), আবু উবায়দা (রাঃ), শুরাহবিল (রাঃ) ও মুরছাদ (রাঃ) মুজাহিদদের নিয়ে এলেই আজনাদায়নের জিহাদ শুরু হয়। এযুদ্ধে রোমানরা ছিল ২ লক্ষ ৪০ হাজার। আর মুসলিম মুজাহিদরা ছিলেন মাত্র ৪০ হাজার। অবশেষে মুসলিম মুজাহিদরাই কাফিরদের পরাজিত করেন। সেনাপতি কায়কালান নিহত হয়।

পারস্যের কাহিনী:

 রাজা-রানীর ঝামেলার কারনে পারস্য থেকে চাপ অনেকটাই কম ছিল মুছান্না (রাঃ) এর উপর। তিনি একদিন নিজেই খলীফা আবু বকরের (রাঃ) কাছে সাহায্যের জন্য গেলেন। সেখানে যেয়ে তিনি আবু বকর (রাঃ) কে মৃত্যু মুখে দেখলেন। আবু বকর (রাঃ) তখনি ওমর (রাঃ) কে পারস্যের দিকে সৈন্য প্রেরণ করতে বলেন এবং সেদিনই (সোমবার) তিনি মুছান্না (রাঃ) ও অন্যান্য সাহাবাদের সাথে শেষ সাক্ষাৎ করে ইন্তিকাল করেন। 


আবু বকর (রাঃ) এর ইন্তিকালের পর ওমর (রাঃ) ও মুছান্না (রাঃ) মদিনাতে ইরাকের ব্যাপারে বক্তৃতা দিয়ে মুজাহিদদের সংগ্রহ করতে থাকেন, প্রথমে কেউ রাজি না হলেও পরে আবু উবায়দ ইবনে মাসউদ ছাকাফির (র) রাজি হলে একে একে অনেকেই রাজি হয়। আবু উবায়দা  প্রথম রাজি হয়ায় তাকে সেনাপতি বানিয়ে ওমর (রাঃ) ৭ হাজার মুজাহিদকে ইরাকে পাঠায়। এদিকে খালিদ (রাঃ) এর সাথে যে বাহিনী ইরাক থেকে সিরিয়া  এসেছিল তাদেরকেও ওমর (রাঃ) আবার ইরাক পাঠাতে বলেন।

নামারিকের জিহাদঃ  নামারিক হোল হীরাও কাদেসিয়ার মধ্যবর্তী স্থান। সম্রাট রুস্তম,  বাহমানকে সেনাপতি করে আবু উবায়দ  কে হামলা করার জন্য নামারিক পাঠায়। তারা পরাজিত হয় ও মাদায়েন (পারস্যের সেকালের রাজধানী) পালিয়ে যায়।

সেতুর জিহাদঃ  পারসিকরা  হাতী সহ এক বিশাল বাহিনী নিয়ে ফোরাতের পারে জমা হয়। মুসলিমরা ছিল মাত্র ১০ হাজার। পারসিকরা মুসলিমদের বলে তোমরা নদী পার হয়ে আসবে না আমরা যাব? অভিজ্ঞ মুসলিম সালাররা বলছিলেন তাদের পার হয়ে আসতে, কিন্তু আবু উবায়দ বললেন, “আমরা মৃত্যুর ব্যাপারে যতটা নির্ভীক ওরা ততটা নির্ভীক নয়”,  এই বলে তিনি নদী পার হয়ে গেলেন। কিন্তু অধিকাংশ মুসলিম পাড় না হতেই পারসিকরা  তীর নিক্ষেপ করে, এবং মুসলিমদের ওপাড়ে দাঁড়ানোর জন্য সংকীর্ণ জায়গা দেয়, যেটা যুদ্ধের নিয়মের পরিপন্থী। তারা হাতীগুলো ছেড়ে দিলে মুজাহিদদের ঘোরাগুলো ভয়ে পালাতে থাকে, এতে তারা অনেক মুজাহিদদের তীর মেরে শহীদ করে। আবু উবায়দ ও কয়েকজন   কয়েকটা হাতী মেরে ফেলে, একটা হাতী সেনাপতি আবু উবায়দকে পায়ে পিসে শহীদ করে দেয়, এভাবে পর পর ৭ জন সেনাপতি শহীদ হলে মুছান্না (রাঃ) সেতুর মুখে দাড়িয়ে সকল মুজাহিদদের ধীরে সুস্থে  নদী পার হয়ে চলে যেতে বলেন। এর আগেই ৪ হাজার মুজাহিদ সেতু ভেঙ্গে ফোরাত নদীতে পরে শহীদ হন। অবশেষে বাকিরা পাড় হয়ে জীবন রক্ষাকরে। এযুদ্ধে পারসিকরা জয় লাভ করে, তবুও মুজাহিদরা ৬ হাজার পারসিক ও অনেক হাতীকে হত্যা করে।
 

এযুদ্ধের পর পারসিকদের রাজা-রানি সমস্যা আবার দেখা দেয়, তারা রুস্তমকে পদচ্যুত করে, পরে আবার ক্ষমতা দিয়ে ফিরুজানের সাথে ক্ষমতা দু ভাগ করে বসায়। এতে  তারা দু ভাগে বিভক্ত হয়ে পরে।


বুওয়ায়ব এর জিহাদপারসিকদের উপর মুসলিমদের প্রতিশোধঃ  বুওয়ায়ব  হচ্ছে  কুফার নিকটবর্তী স্থান। পারসিকরা  মুসলিমদের আগের মত বলে, তোমরা এপারে এসবে না আমরা  ওপাড়ে যাব? সেনাপতি মুছান্না (রাঃ) তাদের আসতে বলেন এবং  তাদের জন্য  অনেক জায়গা ছেড়ে দেন, যদিও তারা সেতুর যুদ্ধে কম জায়গা ছেড়েছিল ও সব মুসলিম পার না হতেই আক্রমণ করেছিল, কিন্তু মুছান্না তারা আসার ও সারি বদ্ধ ভাবে দাঁড়ানোর অনেক পরে আক্রমনের  সিদ্ধান্ত নেন। পারসিকরাই পরে মুসলিমদের আগে আক্রমণ করে, প্রচণ্ড যুদ্ধের পর তাদের  সেনাপতি মেহরান মারা যায় ও তারা পরাজিত হয়। এযুদ্ধে ১ লক্ষ পারসিক সৈন্য নিহত হয়।


রোমের কাহিনিঃ

দামেশক বিজয়ঃ  আবু  উবায়দা (রাঃ) ‘ইয়ারমুক’ থেকে ‘মারজ সাকর‘ এ আসলেন, সম্রাট হিরাক্লিয়াস ছিল হিমস-এ (হোমস)। রোমানরা ফিলিস্তিনের সিংহল –এ ৮০ হাজার সৈন্য নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তাই খলীফা ওমর (রাঃ) আবু উবায়দা (রাঃ) কে বললেন হিমসের দিকে এক দল ও ফিলিস্তিনের পথে ফিহল –এর দিকে একদল মুজাহিদ  পাঠাতে যেন তারা হিরাক্লিয়াস ও ফিলিস্তিনের সৈন্যদের বাধা দিতে পারে। পরে আবু উবায়দা (রাঃ) দামেশক অবরোধ করলেন।  একদিন দামেশকবাসী ফুর্তিতে মত্ত থাকলে খালিদ (রাঃ) কা’কা (রাঃ) ও অন্যান্য মুজাহিদদের নিয়ে দামেশকের উপর ঝাপিয়ে পড়েন  ও দামেশকের কিছু অংশ যুদ্ধ ও কিছু সন্ধি করে জয় করলেন।

ফিহলএর জিহাদঃ  দামেশক বিজয়ের পর শুরাহবীল ইবনে হাসানা (রাঃ) এর সেনাপতিত্বে মুজাহিদগন ফিহল-এর দিকে যাত্রা করেন। এ যুদ্ধে ৮০ হাজার রোমান মারা যায়। আবু উবায়দা (রাঃ) শুরাহবীল (রাঃ) কে জর্ডানের শাসক বানিয়ে খালিদ (রাঃ) ও অন্যান্যদের নিয়ে হিমস-এর দিকে যাত্রা করেন। পরে শুরাহবীল (রাঃ) জর্ডান থেকে গিয়ে বীসান জয় করেন।
 

পারস্যের কাহিনীঃ

এদিকে খলীফা ওমর (রাঃ) নিজেই ইরাক যুদ্ধে যেতে চাইলে সাহাবাগন তাকে নিষেধ করেন এবং সা’দ (রাঃ) কে সেনাপতি নিযুক্ত করে ইরাক পাঠাতে বলেন।  ফলে ওমর (রাঃ) সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ)-এর সেনাপতিত্বে মুজাহিদের এক বাহিনী ইরাকে পাঠান, সা’দ (রাঃ) এসে পৌছার আগেই মুছান্না (রাঃ) ইন্তিকাল করেন।

কাদেসিয়ার জিহাদঃ  সেনাপতি সা’দ (রাঃ) কাদেসিয়ায় পৌঁছালে পারসিকরা তাদের মহাবীর সাবেক রাজা রুস্তম কে মুসলিমদের মুকাবিলার জন্য মুল ৮০ হাজার  মতান্তরে ১ লক্ষ ২০ হাজার সৈন্য ও আরও ৮০ হাজার সৈন্য  সাহায্যার্থে পাঠায়। তাদের সাথে ৩৩ টি জঙ্গি হাতী ছিল।  এ যুদ্ধে  রুস্তম নিহত হয় ও পারসিকদের বাকি সৈন্য রাজধানী মাদায়েন পালায়।

রোমের কাহিনীঃ 

হিমস জিহাদঃ আবু উবায়দা (রাঃ) রোমান সৈন্যদের তারা করে হিমসে নিয়ে যান। সেখানে  হিরাক্লিয়াস অবস্থান করছিল। পরে খালিদ (রাঃ) তার সৈন্য নিয়ে সেখানে পৌছলে অবরোধ দৃঢ় হয়, হিমসবাসী সন্ধি করে। হিমস জয় হয়।

কিন্নাসরীনের জিহাদঃ  হিমস জয়ের পর আবু উবায়দা (রাঃ) খালিদ (রাঃ) কে কিন্নাসরীনে পাঠান, খালিদ (রাঃ) সেখানে যেয়ে সব রোমান সৈন্যদের হত্যা করে। পরে গ্রামবাসী সন্ধি করে। কিন্নাসরীন জয় হয়। 

এবছরই হিরাক্লিয়াস সিরিয়া ছেড়ে ‘কন্সটাণ্টিনোপল’ চলে যায়।


কায়সারিয়্যার জিহাদঃ  খলীফা ওমর (রাঃ) মুয়াবিয়া ইবনে আবী সুফিয়ান (রাঃ) কে সেনাপতি নিযুক্ত করে তাকে কায়সারিয়্যা আক্রমণ করতে বলেন। মুয়াবিয়া (রাঃ) সেখানে পৌছলে রোমানরা যুদ্ধ শুরু করে, প্রচণ্ড  যুদ্ধের পর তাদের ৮০ হাজার সৈন্য নিহত হয় এবং ১ লাখ পলায়ন করে। মুসলিমরা জয়লাভ করেন।

 রোমান সেনাপতি আরতাবুন বায়তুল মুকাদ্দাস (জেরুজালেম) ও রামাল্লার কাছে বিশাল বিশাল দুটি সেনাবাহিনী প্রস্তুত করে রেখেছিল। তাই আমর ইবনুল আস (রাঃ)  বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করতে চাইলে বায়তুল মুকাদ্দাসের বাসিন্দারা তাকে ওমর (রাঃ) কে এসে সন্ধি করে জয় করতে বলে। 

হযরত ওমর (রাঃ) এর হাতে বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়ঃ  সন্ধির মাধ্যমে বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে ওমর (রাঃ) ‘সাখরা’  নামক এক পাথরের উপর থেকে ময়লা আবর্জনা সরান। এটি ইহুদীদের একটি পবিত্র পাথর যেটিকে কিবলা বানিয়ে তারা ইবাদাত করত, পরে রোমান  খৃস্টানরা বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে এটির উপর সবচেয়ে নোংরা আবর্জনা ফেলত। রাসুল (সাঃ) একদিন রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে  চিঠির মাধ্যমে সে পাথর থেকে আবর্জনা সরাতে বললে হিরাক্লিয়াস সেখান থেকে ময়লা সরানো শুরু করে, ১/৩ অংশ সরানোর পরেই ওমর (রাঃ) বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করেন। রোমানরা রাসুল (সাঃ) এর ৩০০ বছর আগে বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে। ইহুদীরা বায়তুল মুকাদ্দাসে খৃস্টানদের ‘আল কামামা’ নামক স্থানকে ডাস্টবিন বানিয়ে ছিল। ‘আল কামামা’ হল এমন একস্থান যেখানে ইহুদীরা ইসা (আঃ) ভেবে এক লোককে ক্রুশ বিদ্ধ করে হত্যা করার পর সেখানে কবর দেয়। তাই খৃস্টানরাও এর প্রতিশোধসরূপ ‘সাখরা’ পাথরে ময়লা ফেলে সেটাকে ডাস্টবিন বানায়। 

পারস্যের কাহিনী:


ব্যাবিলনের জিহাদঃ   কাদেসিয়ার পরাজয়ের পর লক্ষাধিক সৈন্য ব্যাবিলনে আশ্রয় নেয়। এঘটনা সা’দ (রাঃ) জানার পরে ব্যাবিলনে আক্রমণ করেন। পারসিকরা ব্যাবিলন ছেড়ে মাদায়েন ও নিহাওয়ান্দের দিকে পালিয়ে যায়।

নাহারশীরের জিহাদঃ  সা’দ (রাঃ) সালমান ফারসী (রাঃ) কে  নাহারশীরের জন্য সেনাপতি করে পাঠায়। সেখানে পারসিকরা এক সিংহকে মুসলিমদের চলাচলের রাস্তায় বেধে রাখে, সা’দ (রাঃ) এর ভাতিজা হাশেম সেটিকে হত্যা করে। অবশেষে, প্রচণ্ড অবরোধের পর মুসলিমরা এযুদ্ধে জয় লাভ করেন।

মাদায়েন বিজয়ঃ   সা’দ (রাঃ) সেনাবাহিনী নিয়ে মাদায়েন যাত্রা করেন। তারা দজলা নদীর তীরে যেয়ে দেখেন সেখানে কোন নৌকা নেই, সব নৌকা পারসিকরা অপর পারে নিয়ে গেছে, সেতুও ভেঙ্গে ফেলেছে। তাই সা’দ (রাঃ) মুজাহিদদের নিয়ে ঘোড়া সহই  পানিতে নেমে পরেন, নদীর পানি কূলে কূলে ভরা  ছিল। এদেখে অপর পাড়ে দাঁড়ানো পারসিক সেনারা পাগল-পাগল, জীন-ভুত বলে ভয়ে পালিয়ে যায়। সেখানে পারস্যের রাজা-বাদশার প্রচুর ধন সম্পদ পড়েছিল, কিছুই তারা নিতে পারেনি। ৩  কোটি স্বর্ণ মুদ্রা ফেলে রেখে ইয়াযদগিরদ ‘হুলওয়ানে’ পালিয়ে যায়। এ যুদ্ধে  ‘ফাই’  সম্পদ অনেক বেশি ছিল। 


জলুলার জিহাদঃ  ইয়াযদগিরদ  ‘জলুলা’তে  মাহরানের নেতৃত্বে বিশাল বাহিনী রেখে হুলওয়ান পালায়। জলুলাতে সা’দ (রাঃ) এর সাথে তাদের যুদ্ধ হয়। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর মাহরান পালায়, পারসিকদের ১ লক্ষ সৈন্য নিহত হয়। পরে কা’কা (রাঃ) তারা করে মাহরানকে হত্যা করেন।

পরে মুসলিমরা  হুলওয়ানের  তিকরীত ও মুসেল এবং মাসিবযান বিজয় করেন।

রোমের কাহিনী:


কিরকিসিয়্যাহ হীত বিজয়ঃ  জাযীরার অধিবাসিগন হিমসের অধিবাসীদের খালিদ (রাঃ) ও উবায়দা (রাঃ) এর বিরুদ্ধে উস্কানি দিলে তারা হীত এসে জমা হয়। তখন খলীফা উমর ইবনে মালিককে হীত আক্রমণ করতে পাঠালে  তিনি হারিস ইবনে ইয়াজিদকে হীত অবরোধ করতে দিয়ে কিরকিসিয়্যাহ জয় করেন। পরে হীতবাসীরা ও আত্মসমর্পণ করে।জাযীরা বিজয়ঃ  ইয়ায ইবনে গানামের নেতৃত্বে  একদল মুজাহিদ জাযীরা বিজয় করেন। ইয়ায ইবনে গানাম পরে  রাহা  বিজয় করেন। পরে  হাররান  বিজয় করেন। ‘হাররান’ থেকে উমর ইবনে যাদ  ‘রাসুল আয়ন,  আবু মুসা আসআরী  নসীবীনইয়ায ইবনে গানাম  দারা  এবং উসমান ইবনে আবদিল আস  আরমিনিয়া  বিজয়করেন।

পারস্যের কাহিনিঃ  

আহওয়ায, মানাযির নাহার তায়রী বিজয়ঃ  মুসলিমরা ‘তুসতার’ পর্যন্ত সকল রাজ্য পারসিকদের থেকে ছিনিয়ে নেন। তুসতারে সম্রাট ইয়াযদগিরদ জোর করে সাধারণ জনগন থেকে সৈন্য জমা করে। খলীফা ‘কূফা’ ও ‘বসরা’ থেকে ‘আহওয়াযে’ সৈন্য পাঠায়, তারা হরমুজানকে পরাজিত করে, হরমুজান ‘তুসতার’ পালায়। তুসতারে যুদ্ধে প্রত্যেক মুসলিম ১০০ জন করে পারসিক সৈন্য হত্যা করে। হরমুজান বন্দী হয়, পরে তাকে খলীফার কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সে ইসলাম গ্রহন করলে খলীফা তাকে কিছু জায়গা ও ভাতা দিয়ে মুক্ত করে দেন। বলা হয় খলীফা ওমর (রাঃ) এর হত্যাকারীর সাথে  এই হরমুজানের হাত ছিল। 

    
সুইস (সুস) বিজয়ঃ  তুসতারের পর  সাবরা আবু মুসা আসআরি ও অন্যদের নিয়ে সুইস অবরোধ করলে সেখানকার বিজ্ঞজনেরা বলে  দাজ্জাল ছাড়া এটি কেউ জয় করতে পারবে না। তখন সাফ ইবনে সায়াদ এক লাত্থি দিয়ে দরজার তালা ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকে পরলে মুসলিমরা সুইস জয় করেন। এদিকে পারস্য সম্রাট ইয়াযদগির্দ ইস্পাহানে পালিয়ে যায়।

মিসর ইসকান্দারীয়া বিজয়ঃ  সিরিয়া বিজয়ের পর খলীফা ওমর (রাঃ) আমর ইবনে আস (রাঃ) কে মিসর ও ইসকান্দারীয়ার উদ্দেশ্যে পাঠান। তারা সেখানে গেলে ক্যাথলিক নেতা মারইয়াম ও পাদ্রী মিরইয়াম তাদের সাথে দেখা করলে তারা তাদেরকে ইসলাম গ্রহন করতে বলেন। কিন্তু ইসকান্দারীয়ার শাসক মুকাওকাস  তাদের মুসলিমদের আক্রমণ করতে বলেন এতে বুদ্ধিমান জনগন বলেন, “যে সম্প্রদায় দুটি বিশাল  সাম্রাজ্য রোম ও পারস্য বিজর করল তোমরা তাদের বিরুদ্ধে কিভাবে যুদ্ধ করবে”? পরে সিদ্ধান্তের বেধে দেয়া সময় শেষ হলে মুসলিমরা তাদের উপর আক্রমণ করে, এতে কিছু পাদ্রী ভয়ে মদিনাতে যেয়ে সন্ধি  করে মিসর মুসলিমদের দিয়ে দেয়। এরপর আমর (রাঃ) ইসকান্দারীয়াতে সৈন্য পাঠালে মুকাওকাস জিযিয়া করের বিনিময়ে সন্ধি করলে ইসকান্দারীয়াও বিজিত হয়।

নিহাওয়ান্দ বিজয়ঃ   একটার পর একটা পরাজয়ের পর সম্রাট ইয়াযদগির্দ আসে পাশের সব এলাকায় সাহায্য চাইলে ১ লাখ ৫০ হাজার সৈন্য নিয়ে ফিরযান এক বাহিনী তৈরি করে নিহাওয়ান্দের কাছে সমাগত হয়। এদি কে কূফাবাসী  সা’দ (রাঃ) বিরুদ্ধে সংগ্রাম করলে কোন কারণ ছাড়াই ওমর (রাঃ) তাকে পদচ্যুত করে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহকে কূফায় শাসনভার দিয়ে পাঠান। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ খলীফা  ওমর (রাঃ)  এর কাছে সাহায্য চাইলে তিনি আন-নূমান ইবনে মুকরিন কে সেনাপতি করে নিহাওয়ান্দে প্রেরণ করেন। এক প্রচণ্ড যুদ্ধের পর আন-নূমান ঘোড়া থেকে পরে গেলে তার কোমরে তীর লাগলে তিনি শহীদ হন। হুযাইফা পতাকা তুলে নেন ও পরে তার ভাই নুয়াইমকে পতাকা তুলে দিয়ে শহীদ হয়ে যান। এ যুদ্ধে  মুসলিমদের জন্য তৈরি পরিখায় নিজেরাই পড়ে ১ লক্ষ  পারসিক নিহত হয়।

নুয়াইম ইবনে মুকরিম হামাদান দখল করেন। নুয়াইম ইবনে মুকরিম এর যখন ১২ হাজার সৈন্য তখন রোম, দাইলাম, রাই ও আজারবাইজানের সৈন্যরা একত্রে ‘ওয়াজরুয’ এ হামলা করতে চাইলে  নুয়াইম একা সবগুলকে পরাজিত করেন।

রাই, কোমাস, জুরজান, আজারবাইজান, আলবাব, আরমানিয়া বিজয়ঃ নুয়াইম ইবনে মুকরিম নিজে ও সেনাবাহিনী পাঠিয়ে রাই, কোমাস ও জুরজান বিজয় করেন। আজারবাইজানের শাসক ছিল রুস্তমের ভাই ইসকান্দিয়ায সে সন্ধির মাধ্যমে আজারবাইজান মুসলিমদের কাছে সমর্পণ করে।  ওমর (রাঃ) সুরাকাহ ইবনে আমর (রাঃ) কে আল-বাবে পাঠান। সুরাকাহ নিজে ও সেনাবাহিনী পাঠিয়ে আল-বাব ও পরে আরমানিয়া সহ আশে-পাশের অনেক অঞ্চল জয় করেন। সুরাকাহ সেখানে ইন্তিকাল করলে আব্দুর রাহমান ইবনে  রাবীয়াহ কে ওমর (রাঃ) সে এলাকার দায়িত্ব দিয়ে তুর্কিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য রেখে দেন।

তুর্কিদের বিরুদ্ধে প্রথম জিহাদঃ আব্দুর রাহমান ইবনে রাবীয়াহ কে ওমর (রাঃ) তুর্কিদের বিরুদ্ধে অভিযানে যেতে বললে তিনি ৬৫০ মাইল দূরে ‘বানাঞ্জারে অভিযান পরিচালনা করেন এবং কয়েকবার যুদ্ধ করেন। পরে উসমান (রাঃ) এর খিলাফত কালেও অনেক বার প্রচণ্ড যুদ্ধ হয় তুর্কিদের সাথে।

খোরাসান (আফগানিস্তান) বিজয়ঃ  সম্রাট ইয়াযদগির্দ খোরাসানে পলায়ন করে। আহনাফ (রাঃ) খোরাসান বিজয় করেন। সম্রাট চিনের বাদশাকে সাহায্য করতে বললে চিনের বাদশা মুসলিমদের ভয় পেয়ে তাকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে আর যুদ্ধ করতে নিষেধ করে।

কিরমান, সিজিস্তান মাকরন বিজয়ঃ  ওমর (রাঃ) এর শাসনামলেই কিরমান, সিজিস্তানের পর মাকরনের নদী পর্যন্ত বিজয় হয় মুসলিমদের দ্বারা।

কুর্দীদের বিরুদ্ধে বিজয়ঃ  ওমর (রাঃ) এর খিলাফত কালে সর্বশেষ কুর্দীদের সাথে মুসলিমদের যুদ্ধ হয়। পরে ওমর (রাঃ) ১০ বছর ৫ মাস ২১ দিনের খিলাফতে সবচেয়ে বেশি রাজ্য জয়করে সেখানে ইসলামের শান্তির বানী পৌঁছে পরলোক গমন করেন।

রাসুল (সাঃ) যখন মক্কায় ইসলাম প্রচার শুরু করেছিলেন, তখন মক্কার মুশরিক-কাফিররা সাহাবাদের এই বলে উত্যোক্ত করত যে, এরা নাকি রোম বিজয় করবে? এরা নাকি পারস্য বিজয়  করবে? ওই দেখ দেখ রোম বিজয়ী যায়, পারস্য বিজয়ী যায়, ওই দেখ দেখ পাগল যায় …….ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এই  বাপ-দাদার  ধর্ম ত্যাগকারী,  কথিত পাগলরাই মাত্র ২০-২৫ বছরের মধ্যেই একত্রে   রোম-পারস্যের মত দুইটা পরাশক্তিকে ধ্বংস করে দিয়ে আফ্রিকা এবং হিন্দুস্তান, চিন ও রাশিয়ার সীমানায় ইসলামকে নিয়ে গিয়েছিল। তার কিছুদিন পরেই মাত্র ১০০ বছরের ভিতর মদিনা থেকে পশ্চিমে স্পেইন, পূর্বে  হিন্দুস্তান (ভারতীয় উপমহাদেশ), চিনের অনেক অঞ্চল, উত্তরে রাশিয়ার  অনেক অঞ্চল এবং দক্ষিনে আফ্রিকাকে পরাজয় করে সেখানে ইসলাম পৌঁছে দিয়ে ইসলামিক খিলাফত রাষ্ট্রকে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। ১৩০০ বছর ধরে সেই রাষ্ট্রকে পরিচালিত করে সবচেয়ে স্থায়ীরাষ্ট্র হিসেবে রেকর্ড গড়েছিল। আজও ক্রুসেডাররা সেই খিলাফত রাষ্ট্রের নাম শুনলে জামা-কাপড় ভিজিয়ে দেয়ার মত অবস্থা করে। হ্যাঁ,  তবে আবার আসছে সেই রাষ্ট্র, খুবই নিকটে, তবে এবার আসলে এটি আর পৃথিবীর সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র হবে না, এটি সমগ্র পৃথিবী নিয়েই গঠিত হবে, আর স্থায়ী হবে কিয়ামত পর্যন্ত।

[সূত্রঃ ১. আল বিদায় ওয়ান নিহায়া  (৬ ষ্ঠ ও ৭ম খণ্ড) …… আবুল ফিদা হাফিজ  ইবনে কাসির আল-দামেশকি (তাফসীরে ইবনে কাসির -এর লেখক)।
২. আর রাহীকুল মাখতূম ……. আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপূরী।
৩. আসহাবে রাসুলের জীবনকথা ….  আবু বকর (রাঃ) ও ওমর (রাঃ) এর জীবনী …. ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ।
৪. হেজাজের কাফেলা …… নসীম হিজাযী।]




Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply