একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে দাঁড়িয়ে সমগ্র বিশ্ব এক নজিরবিহীন ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশের সরকার কর্তৃক তাদের নাগরিকদের জরুরি খাদ্য, পানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি মজুত করার সরকারি নির্দেশনা। এমনকি ধারণা করা হচ্ছে যে ডনাল্ড ট্রাম্প কিছুদিনের মাঝে ইরানে নিউক্লিয়ার স্ট্রাইক করতে পারেন। এ প্রেক্ষিতে দেখা যাচ্ছে যুক্তরাজ্যের ‘বি রেডি’ (Be Ready) ক্যাম্পেইন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৭২ ঘণ্টার জরুরি প্রস্তুতির কৌশল। আপাতদৃষ্টিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সাইবার হামলার সতর্কতা হিসেবে প্রচারিত হলেও এর অন্তরালে লুকিয়ে আছে পশ্চিমা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার গভীর কাঠামোগত ক্ষয়।
সমসাময়িক প্রেক্ষাপট: ‘বি রেডি’ ক্যাম্পেইন এবং যুদ্ধের পদধ্বনি
আধুনিক পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘকাল ধরে নিজেদের সভ্যতার চরম উৎকর্ষ, অর্থনৈতিক প্রাচুর্য এবং সামাজিক নিরাপত্তার রোল মডেল হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করে এসেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে যুক্তরাজ্য সরকার কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত ‘বি রেডি’ (Be Ready) ক্যাম্পেইন এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের জন্য জারি করা জরুরি সতর্কবার্তা সেই চকচকে আবরণের নিচে থাকা এক ভয়াবহ বাস্তবতাকে উন্মোচিত করেছে। এসব সরকারি নির্দেশনায় নাগরিকদের অন্তত তিন দিন (৭২ ঘণ্টা) থেকে শুরু করে ক্ষেত্রবিশেষে দশ দিন পর্যন্ত টিকে থাকার মতো বোতলজাত পানি (প্রতিদিন জনপ্রতি অন্তত ৩ লিটার পানের জন্য), টিনজাত বা পচনশীল নয় এমন খাবার, নগদ অর্থ, টর্চলাইট, ব্যাটারি, পাওয়ার ব্যাংক এবং দম দেওয়া বা ব্যাটারিচালিত রেডিও ঘরে মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি ভাষ্যে দাবি করা হয়েছে যে, এটি কোনো আসন্ন যুদ্ধ বা সুনির্দিষ্ট হুমকির কারণে নয়, বরং বিরূপ আবহাওয়া, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, পানি সরবরাহের বিঘ্ন কিংবা সাইবার হামলার মতো আকস্মিক পরিস্থিতির মোকাবিলায় একটি সাধারণ পূর্বসতর্কতা মাত্র। কিন্তু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘটনাপ্রবাহকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে একটি ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে। ২০২৬ সালের অক্টোবরের শেষভাগে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে যুক্তরাজ্যে তিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে:
১. নাগরিকদের রসদ মজুতের আহ্বান: ২২ অক্টোবর সরকার ‘বি রেডি’ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে জনগণকে তিন দিনের খাদ্য ও পানি মজুত করার পরামর্শ দেয়।
২. এক হাজার দিনের মধ্যে যুদ্ধের সতর্কবার্তা: এর ঠিক কয়েক দিন পরই যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা সচিব ও সরকারি নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে ন্যাটোর (NATO) হুমকি মূল্যায়নের বরাত দিয়ে বলা হয় যে, রাশিয়ার সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য ব্রিটেনের হাতে মাত্র এক হাজার দিন—অর্থাৎ ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় রয়েছে।
৩. সামরিক বাজেটের বিশাল উল্লম্ফন ও জনকল্যাণ খাতে সংকোচন: উক্ত সাক্ষাৎকারের পরদিনই ব্রিটিশ চ্যান্সেলর ইউক্রেনের জন্য অতিরিক্ত অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তার ঘোষণা দেন এবং ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সামরিক ব্যয় জিডিপির (GDP) ৩ শতাংশে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৩.৫ শতাংশে উন্নীত করার অঙ্গীকার করেন। অথচ এই বিশাল সামরিক ব্যয়ের অর্থ জোগাতে গিয়ে ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা খাতের (NHS) জরাজীর্ণ ভবন ও চিকিৎসা সরঞ্জাম মেরামতের বাজেট সংকুচিত করা হয় এবং সাধারণ মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা বা ‘বেনিফিট’ বিল কমানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, যুক্তরাজ্য সরকার অক্টোবরে এই ঘোষণা দেওয়ার ঠিক এক মাস আগে—সেপ্টেম্বর মাসেই—‘পলিমার্কেট’ (Polymarket) নামক একটি আন্তর্জাতিক বেটিং বা জুয়ার ওয়েবসাইটে পোস্ট করা হয়েছিল যে, ব্রিটিশ সরকার সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নাগরিকদের টিনজাত খাবার ও খাবার পানি মজুত করার আহ্বান জানাতে যাচ্ছে। উল্লেখ্য যে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানে সামরিক হামলা চালানোর কয়েক ঘণ্টা আগেও এই পলিমার্কেটে কয়েকটি নতুন অ্যাকাউন্ট থেকে বাজি ধরে মিলিয়ন ডলার মুনাফা লুটে নেওয়া হয়েছিল, যা রাষ্ট্র ও সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ গোপন তথ্যের (Insider Information) বাণিজ্যিক ব্যবহারের প্রমাণ দেয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয় এবং রাষ্ট্রীয় জরুরি অবস্থাও কীভাবে মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর জুয়া ও মুনাফা অর্জনের হাতিয়ারে পরিণত হয়, এটি তার এক নগ্ন দৃষ্টা
পশ্চিমা অবকাঠামোগত ক্ষয় এবং ‘জাস্ট-ইন-টাইম’ সরবরাহ ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা
পশ্চিমা সরকারগুলো যখন জনগণের সামনে রাশিয়া, ইরান বা সাইবার হামলাকে প্রধান হুমকি হিসেবে তুলে ধরছে, তখন তাদের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো ও সরবরাহ ব্যবস্থা ভেতর থেকেই ধসে পড়ছে। তথাকথিত উন্নত বিশ্বের এই অভ্যন্তরীণ ক্ষয়কে তিনটি প্রধান খাতের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়:
পানির সংকট ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগহীনতা
ব্রিটেন বিশ্বের অন্যতম বৃষ্টিপ্রবণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও সেখানে তীব্র পানি সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সামারসেটের (Somerset) একটি প্রধান জলাধার, যা চার লক্ষাধিক মানুষের পানির চাহিদা মেটায়, তার পানির স্তর ২০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। বিস্ময়কর তথ্য হলো, ১৯৯২ সালের পর থেকে ইংল্যান্ডে একটিও নতুন জলাধার (Reservoir) নির্মিত হয়নি, অথচ এই সময়ের মধ্যে দেশটির জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ। পুঁজিবাদী বেসরকারীকরণের ফলে পানি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো অবকাঠামো উন্নয়ন ও নতুন জলাধার নির্মাণের পরিবর্তে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ (Dividends) প্রদান এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের বোনাস বাড়াতেই ব্যস্ত থেকেছে। ফলে কোনো বিদেশি শত্রুর সাইবার হামলা নয়, বরং জরাজীর্ণ ও ভঙ্গুর পাইপলাইন এবং অপর্যাপ্ত জলাধারের কারণেই সাধারণ মানুষের ঘরে পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও জনসেবা খাতের ধস
যুক্তরাজ্যের গর্ব হিসেবে পরিচিত এনএইচএস (NHS) হাসপাতালের ভবনগুলোর মেরামতের বকেয়া বিল (Repair Backlog) রেকর্ড ১৬ বিলিয়ন পাউন্ডে পৌঁছেছে। ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়া, অকেজো চিকিৎসা যন্ত্রপাতি এবং ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা হাসপাতাল ভবনগুলো প্রমাণ করে যে, একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জীবন বাঁচানোর চেয়ে অস্ত্র উৎপাদন ও বিদেশের মাটিতে যুদ্ধ পরিচালনাকেই অধিক লাভজনক মনে করে।
খাদ্য নিরাপত্তা ও মুনাফাকেন্দ্রিক ‘জাস্ট-ইন-টাইম’ (Just-in-Time) মডেল
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে—ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে—প্রকাশিত একটি সরকারি সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্টে (Sustainability Report) ব্রিটেনের খাদ্য ব্যবস্থাকে একটি ‘টিন্ডারবক্স’ বা বারুদের স্তূপের সাথে তুলনা করা হয়েছিল। যুক্তরাজ্য তার মোট খাদ্য চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। কিন্তু মূল সমস্যাটি নিহিত পুঁজিবাদী কর্পোরেট সুপারমার্কেটগুলোর ‘জাস্ট-ইন-টাইম’ (Just-in-Time) সরবরাহ মডেলের ভেতরে।
পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে গুদামজাতকরণ বা সংরক্ষণের খরচ (Storage Cost) কমিয়ে মুনাফা সর্বোচ্চ করার জন্য সুপারমার্কেটগুলো কোনো অতিরিক্ত খাদ্য মজুত রাখে না। চীন, পূর্ব ইউরোপ বা বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত থেকে খাদ্যদ্রব্য, ফলমূল, ব্যাটারি ও ইলেকট্রনিক পণ্য জাহাজ ও ট্রাকে করে ঠিক তখনই দোকানে পৌঁছায় যখন তাকগুলো খালি হতে শুরু করে। এই ব্যবস্থাটি কর্পোরেট মালিকদের বিলিয়ন ডলারের মুনাফা দিলেও সমাজকে চরম অরক্ষিত করে তোলে। উক্ত প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল যে, চরম আবহাওয়া, সাইবার হামলা বা যুদ্ধের মতো যেকোনো একটি ধাক্কায় এই সূক্ষ্ম সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়লে কয়েক দিনের মধ্যে সুপারমার্কেটগুলো সম্পূর্ণ খাদ্যশূন্য হয়ে পড়বে। এর সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হিসেবে সরকারি মূল্যায়নেই ‘খাদ্য দাঙ্গা’ (Food Riots)-এর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যেখানে খাদ্যের আকাশচুম্বী মূল্য এবং সরকারের ওপর জনগণের চরম আস্থাহীনতার সংমিশ্রণে সৃষ্ট দাঙ্গায় এক বছরেই ৩০,০০০-এর বেশি মানুষ সহিংসভাবে আহত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
মূল সংকট
ওপরে বর্ণিত অবকাঠামোগত ক্ষয়, যুদ্ধের উন্মাদনা এবং সামাজিক অস্থিরতা কোনো আকস্মিক প্রশাসনিক ভুল বা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের সাময়িক ব্যর্থতা নয়। এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে বর্তমান বিশ্বের নিয়ন্ত্রক মতাদর্শ—পুঁজিবাদ (Capitalism) এবং তার ভিত্তিমূল ধর্মনিরপেক্ষ বা সেক্যুলার জীবনদর্শন (Secular Worldview)-এর গভীরে।
পশ্চিমা জীবনদর্শনের দার্শনিক ভিত্তি ও নৈতিক শূন্যতা
সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মূলত এই ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, মানবজীবন, রাষ্ট্র পরিচালনা, আইন প্রণয়ন এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্রষ্টার কোনো বিধান বা হস্তক্ষেপ থাকবে না (Separation of Religion from State and Life Affairs)। যখন মানুষ স্রষ্টার সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করে নিজের সীমিত ও পক্ষপাতদুষ্ট বুদ্ধিকে ভালো-মন্দ নির্ধারণের একমাত্র মাপকাঠি বানায়, তখন মানবজীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় পার্থিব ভোগবাদ (Materialism) এবং উপযোগবাদ (Utilitarianism)।
সেক্যুলার দর্শনে কোনো কাজ সঠিক কি না তা নির্ধারিত হয় কাজটি কতটুকু বস্তুগত সুবিধা বা মুনাফা এনে দিচ্ছে তার ওপর। এর ফলে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে নৈতিকতা, মানবিক মমত্ববোধ এবং পরকালীন জবাবদিহিতার ধারণা বিলুপ্ত হয়ে যায়। যে জীবনদর্শনে মৃত্যুর পরের জবাবদিহিতার কোনো স্থান নেই, সেখানে ক্ষমতাবান শাসক ও পুঁজিপতি শ্রেণি স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থ রক্ষায় সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বলি দেবে—এটাই সেক্যুলার দর্শনের অনিবার্য পরিণতি।
অর্থনীতির মুনাফাকেন্দ্রিক চরিত্র ও সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্স
পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি মানুষের কল্যাণ নয়, বরং পুঁজির সঞ্চয়ন (Capital Accumulation) এবং মুনাফা সর্বোচ্চকরণ (Profit Maximization)। পুঁজিবাদে মূল্য (Value) এবং বণ্টন ব্যবস্থা পরিচালিত হয় ‘মূল্য কৌশল’ (Price Mechanism)-এর মাধ্যমে, যার অর্থ হলো—যার ক্রয়ক্ষমতা আছে কেবল সেই পণ্য ও সেবা পাবে, আর যে খাতে মুনাফা বেশি কেবল সেই খাতেই পুঁজি বিনিয়োগ হবে।
এই কারণেই পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে জলাধার নির্মাণ, হাসপাতাল মেরামত বা সস্তায় খাদ্য সরবরাহের চেয়ে যুদ্ধাস্ত্র উৎপাদন অনেক বেশি আকর্ষণীয়। কারণ শান্তিতে অস্ত্র বিক্রি হয় না, অস্ত্র বিক্রির জন্য প্রয়োজন নিরন্তর যুদ্ধ ও ভীতির পরিবেশ। যুক্তরাজ্যের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্রিটেনের অস্ত্র শিল্প বা ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রির (যেমন—BAE Systems) সাথে সরকারের সম্পর্ক যেকোনো বেসরকারি খাতের চেয়ে গভীর। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ব্রিটিশ মন্ত্রী ও শীর্ষ কর্মকর্তারা গড়ে প্রতিদিন ১.৬৪ বার অস্ত্র কোম্পানির প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করেছেন। দেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে অন্য যেকোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ‘বিএই সিস্টেমস’ (BAE Systems)-এর বৈঠক হয়েছে সবচেয়ে বেশি। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে—ঠিক যখন সামরিক বাজেট বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়—প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় (MOD) এবং অস্ত্র কোম্পানিগুলোর মধ্যকার বৈঠক ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
অর্থাৎ, প্রতিরক্ষা সচিব যখন জনগণকে বলেন যে ‘যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে মাত্র এক হাজার দিন সময় আছে’ কিংবা সরকার যখন জিডিপির ৩ শতাংশ থেকে ৩.৫ শতাংশ সামরিক খাতে ব্যয়ের ঘোষণা দেয়, তখন জনগণের মনে ভীতির সঞ্চার করে হাসপাতাল ও শিক্ষা খাতের টাকা কেটে অস্ত্র ব্যবসায়ীদের পকেটে তুলে দেওয়ার পথ সুগম করা হয়। পুঁজিবাদে রাষ্ট্র মূলত মুষ্টিমেয় কর্পোরেট ও অস্ত্র ব্যবসায়ীদের একটি এজেন্ট হিসেবে কাজ করে।
রাষ্ট্রের দায়মুক্তি এবং জনগণের ওপর ব্যর্থতার দায় চাপানো
পুঁজিবাদী ও সেক্যুলার রাষ্ট্রের আরেকটি বড় প্রতারণা হলো নিজের কাঠামোগত ব্যর্থতার দায় সাধারণ নাগরিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া (Individualization of Systemic Risk)। ব্রিটেনের ‘ক্যাম্পেইন ফর নিউক্লিয়ার ডিসআর্মামেন্ট’ (CND) যথার্থই উল্লেখ করেছে যে, ‘বি রেডি’ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে সরকার সব দায়িত্ব সাধারণ পরিবারের কাঁধে চাপিয়ে দিচ্ছে। এর পেছনে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের চারটি সুস্পষ্ট কৌশল কাজ করছে:
ঝুঁকি স্থানান্তর (Moving the Risk): যদি অবকাঠামোগত ব্যর্থতায় তিন দিন বিদ্যুৎ বা পানি না থাকে এবং নাগরিকরা নিজেদের অর্থে কেনা টিনজাত খাবার ও পানি দিয়ে সেই তিন দিন পার করে দেয়, তবে ওই তিন দিন রাষ্ট্রকে জনগণের কোনো দায়িত্ব নিতে হলো না।
আইনি ও রাজনৈতিক দায়মুক্তি (Covering the State): বড় কোনো বিপর্যয় ঘটলে সরকার অনায়াসেই বলতে পারবে—”আমরা তো সরকারি ওয়েবসাইটে আগেই বলেছিলাম তিন দিনের খাবার ও পানি মজুত রাখতে; তোমরা প্রস্তুতি নাওনি, তাই এই দুর্ভোগের জন্য তোমরাই দায়ী।”
সামরিক ব্যয়ের বৈধতা উৎপাদন: জনগণকে সার্বক্ষণিক যুদ্ধের আতঙ্কে রাখলে তারা হাসপাতাল, শিক্ষা ও সামাজিক ভাতার বাজেট কেটে সমরাস্ত্র কেনার সিদ্ধান্তকে বিনা বাক্যে মেনে নেয়।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের স্থানীয় প্রক্সি হওয়া: যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের সৈন্য না পাঠিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোকে দিয়েই নিজের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চায়, যার জন্য ট্রাম্প প্রশাসন ন্যাটো দেশগুলোকে জিডিপির ৩.৫ শতাংশ সামরিক ব্যয়ের চাপ দিয়েছে এবং ইউরোপীয় সরকারগুলো নিজ দেশের জনগণের রক্ত চুষে সেই হুকুম তামিল করছে।
বৈশ্বিক অস্থিরতা, সাম্রাজ্যবাদী পররাষ্ট্রনীতি এবং ইউরোপজুড়ে গণবিক্ষোভ
পুঁজিবাদী ও সেক্যুলার মতাদর্শের পররাষ্ট্রনীতি হলো উপনিবেশবাদ (Colonialism) ও সাম্রাজ্যবাদ। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি, খনিজ সম্পদ ও বাণিজ্যিক রুটগুলোর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে দুর্বল দেশগুলোর ওপর আগ্রাসন চালায়। বিগত দুই দশকে আফগানিস্তান ও ইরাকে আগ্রাসন, রাশিয়ার সীমান্তে ন্যাটোর সম্প্রসারণ, গাজায় সংঘটিত ভয়াবহ গণহত্যায় পশ্চিমা বিশ্বের প্রত্যক্ষ মদদ এবং ২০২৬ সালে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ—এ সবই পশ্চিমা পুঁজিবাদী পররাষ্ট্রনীতির ফসল।
কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, জুলুম ও আগ্রাসন কখনো কেবল আক্রান্ত অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা আগ্রাসী শক্তির নিজ ঘরেও বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে। ইরান যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz), বাব আল-মান্দেব (Bab el-Mandeb) এবং সুয়েজ খালের (Suez Canal) মতো বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান ধমনীগুলোতে মারাত্মক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে বিশ্ববাজারে কেবল তেল ও গ্যাসের দামই বাড়েনি, বরং কৃষিকাজের জন্য অপরিহার্য সারের (Fertilizer) সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়েছে। সারের সংকট ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে খাদ্যদ্রব্যের দামকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে গেছে।
এই অর্থনৈতিক নিষ্পেষণ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির (Cost of Living Crisis) ফলে খোদ ইউরোপের হৃদপিণ্ডে আজ গণবিক্ষোভের আগুন জ্বলছে:
ফ্রান্সে বিস্ফোরণ: ২০২৬ সালের অক্টোবরে ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি নীতির বিরুদ্ধে তীব্র গণআন্দোলন শুরু হয়। কেবল ১৭ অক্টোবর এক দিনেই ফ্রান্সে ১,২০০ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়, সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে এবং পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
ইউরোপজুড়ে ‘জেন-জি’ (Gen Z) বিদ্রোহ: ফ্রান্সের পর এই বিক্ষোভ দ্রুত জার্মানি, ইতালি, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, সুইজারল্যান্ড এবং গ্রিসে ছড়িয়ে পড়েছে। জার্মানিতে তরুণ শিক্ষার্থীরা উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছে।
ভবিষ্যৎহীনতার সংকট: ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্বের তরুণ প্রজন্ম আজ দেখতে পাচ্ছে যে, একদিকে বাড়িভাড়া, মর্টগেজ, বিদ্যুৎ বিল ও খাবারের দাম আকাশচুম্বী হচ্ছে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট ছাঁটাই করা হচ্ছে; অন্যদিকে মুষ্টিমেয় বিলিয়নিয়ারদের সম্পদ ফুলেফেঁপে উঠছে এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিদেশে যুদ্ধের পেছনে ঢালা হচ্ছে।
যখন একটি সমাজে চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ক্ষুধার সাথে সরকারের প্রতি চরম আস্থাহীনতা যুক্ত হয়, তখন সেই সমাজ ভেতর থেকে ধসে পড়ে। পুঁজিবাদ আজ আর কোনো ‘সাময়িক কারিগরি ত্রুটি’ (Temporary Glitch) পার করছে না; বরং একটি জীবনব্যবস্থা হিসেবে পুঁজিবাদ তার চূড়ান্ত ও কাঠামোগত ব্যর্থতার (Systemic Failure) মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
বিকল্প পথ ও স্থায়ী সমাধান: ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা
পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার এই সর্বগ্রাসী সংকট থেকে মানবজাতিকে মুক্ত করতে হলে কোনো জোড়াতালি দেওয়া সংস্কার (Patchwork Reform) যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এমন এক মৌলিক ও পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার, যা সমস্যার মূলে আঘাত করে। ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা (Islamic Khilafah System) মানবজাতির সামনে সেই পরীক্ষিত, ন্যায়ভিত্তিক ও পূর্ণাঙ্গ বিকল্প উপস্থাপন করে। খিলাফত ব্যবস্থা কেন এবং কীভাবে এই বৈশ্বিক বিশৃঙ্খলা দূর করতে সক্ষম, তার চারটি মৌলিক স্তম্ভ নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
মুনাফাকেন্দ্রিকতার বিপরীতে মানবকেন্দ্রিক জীবনদর্শন (Human-Centric vs. Profit-Centric Worldview)
পুঁজিবাদী অর্থনীতির মূল লক্ষ্য যেখানে জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধি এবং পুঁজিপতিদের মুনাফা সর্বোচ্চকরণ, সেখানে ইসলামী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হলো মানুষ (Human Being) এবং প্রতিটি মানুষের মর্যাদা ও মৌলিক চাহিদা নিশ্চিতকরণ।
মৌলিক চাহিদার শতভাগ নিশ্চয়তা: ইসলামে প্রতিটি নাগরিকের—ধর্ম, বর্ণ বা জাতি নির্বিশেষে—মৌলিক মানবিক চাহিদা (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান) এবং সমাজের সামগ্রিক মৌলিক সেবা (শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা) নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের ওপর ফরজ বা অলঙ্ঘনীয় দায়িত্ব। পুঁজিবাদে হাসপাতাল বা জলাধার নির্মাণ নির্ভর করে তা থেকে মুনাফা আসবে কি না তার ওপর; কিন্তু খিলাফত ব্যবস্থায় জনগণের জীবন, স্বাস্থ্য ও পানির চাহিদা পূরণ কোনো ব্যবসায়িক পণ্য নয়, বরং নাগরিকের মৌলিক অধিকার।
সার্বজনীন সম্পদের (Public Property) ধারণা: পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং খনিজ সম্পদ বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর হাতে বেসরকারীকরণ (Privatization) করে দেওয়া হয়, যার ফলে ইংল্যান্ডের মতো দেশে তিন দশকে একটিও নতুন জলাধার তৈরি হয় না অথচ সাধারণ মানুষকে পানির চড়া বিল গুণতে হয়। বিপরীতে, রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:
“المُسْلِمُونَ شُرَكَاءُ فِي ثَلاَثٍ فِي الْمَاءِ وَالْكَلإِ وَالنَّارِ”
“মানুষ তিনটি জিনিসে অংশীদার: পানি, চারণভূমি এবং আগুন (জ্বালানি ও শক্তি)” (সুনানে আবু দাউদ)। খিলাফত ব্যবস্থায় পানি, জ্বালানি, তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ হলো ‘আল-মিলকিয়্যাতুল আম্মাহ’ বা সার্বজনীন জনসম্পত্তি। এগুলো কোনো ব্যক্তি বা কর্পোরেশনের মালিকানায় দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। রাষ্ট্র জনগণের পক্ষে এই সম্পদ ব্যবস্থাপনা করে এবং এর লভ্যাংশ সরাসরি জনগণের অবকাঠামো, বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং খাদ্য নিরাপত্তায় ব্যয় করে।
সম্পদের সুষম বণ্টন ও মজুতদারি উচ্ছেদ: পুঁজিবাদ সম্পদকে মুষ্টিমেয় বিলিয়নিয়ার ও অস্ত্র ব্যবসায়ীদের হাতে পুঞ্জীভূত করে। অথচ পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা অর্থনৈতিক নীতির মূল ভিত্তি ঘোষণা করে বলেছেন:
كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنكُمْ
“যাতে সম্পদ কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।” (সূরা আল-হাশর: ৭)
ইসলামে সুদ (Riba), জুয়া (যেমন পলিমার্কেটের মতো স্পেকুলেটিভ বেটিং), কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা মজুতদারি (Ihtikar) এবং একচেটিয়া কারবার (Monopoly) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। পাশাপাশি স্বর্ণ ও রৌপ্যভিত্তিক মুদ্রাব্যবস্থা (Gold and Silver Standard) চালু থাকার কারণে পুঁজিবাদী ফিয়াট কারেন্সির (Fiat Currency) মতো কৃত্রিম মুদ্রাস্ফীতি তৈরি করে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা চুরি করা খিলাফত ব্যবস্থায় অসম্ভব।

আখিরাতে জবাবদিহিতা এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব (Accountability in the Hereafter and Responsible Leadership)
পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ও সেক্যুলার ব্যবস্থায় শাসকদের জবাবদিহিতা সীমাবদ্ধ কেবল চার বা পাঁচ বছর পরপর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্যে, যা আবার নিয়ন্ত্রিত হয় কর্পোরেট লবি (যেমন BAE Systems), মিডিয়া এবং বিলিয়নিয়ারদের অর্থের দ্বারা। ফলে শাসকরা জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ না থেকে অস্ত্র ব্যবসায়ী ও পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষা করে এবং সংকটের সময় ‘বি রেডি’ ক্যাম্পেইনের নামে জনগণের ওপর দায় চাপিয়ে হাত ধুয়ে ফেলে।
বিপরীতে, ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থায় নেতৃত্ব বা শাসনক্ষমতা কোনো ভোগের বস্তু নয়, বরং তা এক মহা আমানত এবং আখিরাতে জবাবদিহিতার বিষয়।
অভিভাবকত্বের (Ri’ayah) নীতি: রাসূলুল্লাহ (সা.) শাসকের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন: “ইমাম বা খলিফা হলেন একজন অভিভাবক (রাখাল) এবং তাঁকে তাঁর অধীনস্থ জনগণের (দায়িত্ব) সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। ইসলামে রাষ্ট্রপ্রধান জনগণের শাসক নন, বরং জনগণের বিষয়াবলীর দেখাশোনাকারী (রা’ঈ)।
আখিরাতের ভয় ও আত্মিক জবাবদিহিতা: একজন খলিফা ও তাঁর প্রশাসনের প্রতিটি কর্মকর্তা জানেন যে, পার্থিব আদালত বা জনগণের চোখ ফাঁকি দেওয়া গেলেও কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহর দরবারে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার সম্পর্কে নিখুঁত হিসাব দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করেছেন: “আল্লাহ কোনো বান্দাকে জনগণের তত্ত্বাবধায়ক বানানোর পর সে যদি তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তবে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন” (সহীহ মুসলিম)।
ইতিহাসের বাস্তব দৃষ্টান্ত: এই পরকালীন জবাবদিহিতার কারণেই খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছিলেন: “ফোরাত নদীর তীরে যদি একটি পথহারা ছাগল বা উটও অনাহারে মারা যায়, তবে আমার ভয় হয় কিয়ামতের দিন আল্লাহ উমরকে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন।” দুর্ভিক্ষের বছর (আম আর-রামাদাহ) উমর (রা.) জনগণের ঘরে তিন দিনের খাবার মজুত করার নির্দেশ দিয়ে নিজের দায়িত্ব শেষ করেননি; বরং যতদিন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ঘরে পর্যাপ্ত খাবার না পৌঁছেছে, ততদিন তিনি নিজে ঘি, মাংস ও ভালো খাবার স্পর্শ করেননি এবং মদিনা থেকে শুরু করে মিসর ও শাম প্রদেশ থেকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে খাদ্যের বিশাল ক্যারাভান এনে প্রতিটি মানুষের মুখে আহার তুলে দিয়েছেন। যেখানে পরকালীন জবাবদিহিতা থাকে, সেখানে রাষ্ট্র নিজের ব্যর্থতা নাগরিকের ঘাড়ে চাপাতে পারে না।
গভীর দার্শনিক প্রশ্নের সমাধান ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব (Intellectual Leadership Addressing Deep Philosophical Questions)
একটি জীবনব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও সাফল্য নির্ভর করে তার বৌদ্ধিক বা দার্শনিক ভিত্তির ওপর। আজ পশ্চিমা বিশ্বে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে হতাশা, মানসিক অবসাদ, আত্মহত্যার প্রবণতা এবং উদ্দেশ্যহীন ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে, তার মূল কারণ হলো সেক্যুলারিজম মানুষের জীবনের সবচেয়ে মৌলিক ও গভীর দার্শনিক প্রশ্নগুলোর (আল-উকদাতুল কুবরা বা মহাগ্রন্থি) কোনো যৌক্তিক ও প্রশান্তিদায়ক উত্তর দিতে পারেনি।
প্রতিটি মানুষের বিবেক তিনটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজে:
১. এই মহাবিশ্ব ও মানুষ কোথা থেকে এসেছে? (পূর্ববর্তী অস্তিত্বের সাথে সম্পর্ক)
২. পৃথিবীতে মানুষের আগমনের উদ্দেশ্য কী এবং সে কীভাবে জীবন যাপন করবে? (বর্তমান জীবনের বিধান)
৩. মৃত্যুর পর মানুষ কোথায় ফিরে যাবে? (পরবর্তী জীবনের গন্তব্য)
সেক্যুলার ও পুঁজিবাদী দর্শন এই প্রশ্নগুলোকে এড়িয়ে গিয়ে মানুষকে কেবল একজন ‘অর্থনৈতিক প্রাণী’ (Economic Animal) বা ভোগবাদী ভোক্তা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। ফলে মানুষ যখন অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে বা দেখে যে তার চারপাশের সমাজ অন্যায়ে ডুবে আছে, তখন তার সামনে বেঁচে থাকার আর কোনো উচ্চতর দর্শন অবশিষ্ট থাকে না।
ইসলামী জীবনদর্শন ও খিলাফত ব্যবস্থা মানবজাতিকে এই দার্শনিক অন্ধত্ব থেকে মুক্ত করে এক অনন্য বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব (Intellectual Leadership) প্রদান করে:
ইসলাম মানুষের বিবেক ও যুক্তির (আকল) মাধ্যমে প্রমাণ করে যে, এই সুশৃঙ্খল মহাবিশ্ব, মানুষ ও জীবন এক সর্বশক্তিমান স্রষ্টার (আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা) সৃষ্টি।
পার্থিব জীবন কোনো লাগামহীন ভোগের ক্ষেত্র নয়, বরং স্রষ্টার আদেশ-নিষেধ মোতাবেক ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনার মাধ্যমে পরীক্ষা দেওয়ার স্থান।
মৃত্যুর পর প্রতিটি মানুষকে পুনরুত্থিত হতে হবে এবং তার কৃতকর্মের জন্য চূড়ান্ত পুরস্কার বা শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে।
যখন এই মৌলিক দার্শনিক প্রশ্নের সমাধান হয়ে যায়, তখন মানুষের চিন্তা, অর্থনীতি, রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি একটি সুদৃঢ় নৈতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন কোনো রাষ্ট্র অন্য জাতিকে শোষণ বা ধ্বংস করার জন্য পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করে না, বরং সমগ্র মানবজাতিকে বস্তুবাদের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে ন্যায়বিচার ও আলোর পথে নিয়ে আসার জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক নেতৃত্ব প্রদান করে।
মানুষের স্বভাব (ফিতরাত), প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষার ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান (Balanced System Addressing Human Nature, Needs, and Wants)
মানব ইতিহাসে মানব রচিত মতবাদগুলো মানুষের স্বভাব বা প্রকৃতি (Human Nature / Fitrah) বুঝতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে:
একদিকে সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম (Socialism/Communism) মানুষের সহজাত মালিকানার প্রবৃত্তি ও আধ্যাত্মিক চাহিদাকে জোরপূর্বক দমন করতে চেয়েছিল, যা মানুষের স্বভাবের বিরুদ্ধে যাওয়ার কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
অন্যদিকে পুঁজিবাদ (Capitalism) মানুষের লোভ, লালসা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে কোনো নৈতিক সীমারেখা ছাড়াই অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছে, যার ফলে মুষ্টিমেয় শক্তিশালী মানুষ পুরো সমাজের সম্পদ গ্রাস করেছে এবং পরিবার ব্যবস্থা, সামাজিক সংহতি ও পরিবেশ ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
ইসলামী জীবনব্যবস্থা মানুষের স্রষ্টা কর্তৃক প্রদত্ত হওয়ায় তা মানুষের সহজাত স্বভাব বা ফিতরাত (Fitrah)-এর সাথে শতভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ
“তিনিই কি জানেন না যিনি সৃষ্টি করেছেন? আর তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত।” (সূরা আল-মুলক: ১৪)
ইসলামী ব্যবস্থা মানুষের শারীরিক প্রয়োজন (Organic Needs—যেমন ক্ষুধা, তৃষ্ণা, বিশ্রাম) এবং সহজাত প্রবৃত্তিসমূহকে (Instincts—যেমন বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি বা মালিকানার আকাঙ্ক্ষা, বংশরক্ষার প্রবৃত্তি এবং উপাসনা বা পবিত্রতার প্রবৃত্তি) কখনো দমন করে না, আবার পুঁজিবাদের মতো লাগামহীনভাবে ছেড়েও দেয় না; বরং সেগুলোকে একটি সুশৃঙ্খল ও ভারসাম্যপূর্ণ নিয়মের (System of Solutions) অধীনে পরিচালিত করে:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | পুঁজিবাদী ও সেক্যুলার ব্যবস্থা | ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা |
|---|---|---|
| অর্থনৈতিক লক্ষ্য | জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও পুঁজিপতিদের মুনাফা সর্বোচ্চকরণ | প্রতিটি মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ ও সম্পদের সুষম প্রবাহ |
| মালিকানা নীতি | পানিসহ সকল জনসম্পদের বেসরকারীকরণ ও কর্পোরেট একচেটিয়াবাদ | ব্যক্তি মালিকানা, রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও সার্বজনীন জনসম্পত্তির ভারসাম্য |
| নেতৃত্বের ভিত্তি | কর্পোরেট লবিং, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ ও সাময়িক নির্বাচনী রাজনীতি | আখিরাতের জবাবদিহিতা, আমানতদারিতা ও জনগণের অভিভাবকত্ব |
| সংকট ব্যবস্থাপনা | রাষ্ট্রের ব্যর্থতার দায় নাগরিকের কাঁধে চাপানো (যেমন: Be Ready) | নাগরিকের খাদ্য, পানি ও নিরাপত্তার শতভাগ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণ |
| মানব প্রকৃতি ও দর্শন | উগ্র বস্তুবাদ, ভোগবাদ ও দার্শনিক শূন্যতা | ফিতরাত বা মানব স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও আধ্যাত্মিক-বস্তুগত ভারসাম্য |
১. ব্যক্তি ও সমাজের ভারসাম্য: ইসলাম মানুষকে বৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জন ও ভোগ করার অধিকার দেয় (ব্যক্তিগত মালিকানা), কিন্তু একই সাথে যাকাত, উশর, মিরাস এবং সার্বজনীন সম্পদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র ও দুর্বল মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে।
২. বস্তু ও আত্মার ভারসাম্য: ইসলাম মানুষকে সন্ন্যাসী হতে বলে না, আবার পুঁজিবাদের মতো টাকার গোলামও বানায় না। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন: “আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন তা দ্বারা আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান করো, এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না; আর মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করো যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চেয়ো না” (সূরা আল-কাসাস: ৭৭)।
৩. টেকসই সরবরাহ ও কৃষি নীতি: পুঁজিবাদী ‘জাস্ট-ইন-টাইম’ মডেলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ও মুনাফালোভী ব্যবস্থার বিপরীতে ইসলামী অর্থনীতি কৃষি উৎপাদন, ভূমি আবাদ (যেমন—অনাবাদি জমি তিন বছর ফেলে রাখলে তা কেড়ে নিয়ে চাষাবাদকারীকে প্রদান করা) এবং কৌশলগত খাদ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও যেকোনো সংকটে অবিচল রাখে।
উপসংহার: মাকড়সার জালের ভঙ্গুরতা বনাম স্থায়ী ন্যায়বিচার
সমসাময়িক বিশ্বের চিত্রটি আজ অত্যন্ত স্পষ্ট। যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের সরকারগুলো যখন তাদের নাগরিকদের তিন থেকে দশ দিনের খাবার, পানি ও মোমবাতি মজুত করার পরামর্শ দিচ্ছে, তখন তারা মূলত নিজেদের অজান্তেই পুঁজিবাদী সভ্যতার দেউলিয়াত্বের ঘোষণা দিচ্ছে। যে ব্যবস্থা শত শত বছর ধরে উপনিবেশ স্থাপন করে গোটা বিশ্বের সম্পদ লুণ্ঠন করেছে, সেই ব্যবস্থা আজ নিজের দেশের নাগরিকদের নিরবচ্ছিন্ন পানি, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা ও সাশ্রয়ী মূল্যে খাবার দেওয়ার নিশ্চয়তাও দিতে পারছে না। উল্টো নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ও অস্ত্র ব্যবসার মুনাফা টিকিয়ে রাখতে জনগণের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বাজেট কেড়ে নিচ্ছে, যার অনিবার্য প্রতিক্রিয়ায় প্যারিস থেকে বার্লিন, রোম থেকে এথেন্স পর্যন্ত তরুণ প্রজন্ম আজ বিদ্রোহে ফেটে পড়ছে।
পলিটিক্যাল অ্যালকেমির বিশ্লেষণে যথার্থই পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আনকাবুতের সেই ঐতিহাসিক উপমাটি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেখানে আল্লাহ তাআলা স্রষ্টার বিধান ও অভিভাবকত্ব ছেড়ে অন্য কিছুর ওপর নির্ভরশীল ব্যবস্থাকে মাকড়সার ঘরের সাথে তুলনা করেছেন:
مَثَلُ الَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِ اللَّهِ أَوْلِيَاءَ كَمَثَلِ الْعَنكَبُوتِ اتَّخَذَتْ بَيْتًا ۖ وَإِنَّ أَوْهَنَ الْبُيُوتِ لَبَيْتُ الْعَنكَبُوتِ ۖ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ
“যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে অভিভাবক রূপে গ্রহণ করে, তাদের দৃষ্টান্ত মাকড়সার মতো, যে নিজের জন্য ঘর বানায়; আর নিশ্চয়ই ঘরসমূহের মধ্যে মাকড়সার ঘরই সবচেয়ে দুর্বল, যদি তারা জানত!” (সূরা আল-আনকাবুত: ৪১)
পশ্চিমা পুঁজিবাদী ও সেক্যুলার বিশ্বব্যবস্থা বাহ্যিকভাবে যতই প্রযুক্তিনির্ভর ও পরাক্রমশালী মনে হোক না কেন, এর ভেতরের নৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো মাকড়সার জালের মতোই ভঙ্গুর। সামান্য এক সরবরাহ সংকট বা ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কায় এর সুপারমার্কেটগুলো শূন্য হয়ে যায় এবং সমাজ দাঙ্গার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।
সুতরাং, আজকের বিশ্বজুড়ে চলমান অস্থিরতা, মুদ্রাস্ফীতি, যুদ্ধ এবং মানবিক বিপর্যয় থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো মুনাফাকেন্দ্রিক ও সেক্যুলার পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার মূলোৎপাটন করে এমন এক ব্যবস্থার দিকে ফিরে যাওয়া, যা মানুষের স্রষ্টা কর্তৃক নির্ধারিত। ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা তার মানবকেন্দ্রিক অর্থনীতি, আখিরাতের জবাবদিহিতানির্ভর দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, মানুষের গভীর দার্শনিক প্রশ্নের সমাধানকারী বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশনা এবং মানব প্রকৃতির (ফিতরাত) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন ও বণ্টন ব্যবস্থার মাধ্যমেই কেবল এই জরাজীর্ণ পৃথিবীতে প্রকৃত শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
তথ্যসূত্র:
১. যুক্তরাজ্যের ‘বি রেডি’ (Be Ready) ক্যাম্পেইন ও জরুরি রসদ মজুতের নির্দেশনা: Cabinet Office, United Kingdom, Prepare: Get Ready for Emergencies (Be Ready Campaign), October 22, 2026 (London: HM Government, prepare.campaign.gov.uk). এতে নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টার খাবার, জনপ্রতি দৈনিক ৩ লিটার পানি, পাওয়ার ব্যাংক ও ব্যাটারিচালিত রেডিও মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
২. ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৭২ ঘণ্টার জরুরি প্রস্তুতি কৌশল: Sauli Niinistö, Safer Together: Strengthening Europe’s Civilian and Military Preparedness and Readiness (Brussels: European Commission, 2024–2026 Implementation Framework).
৩. রাশিয়ার সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য ‘এক হাজার দিনের’ সতর্কবার্তা ও ন্যাটোর মূল্যায়ন: Political Alchemy, “What Everyone Missed About the Government’s Stockpiling Warning,” YouTube video, 00:00:48–00:01:18, published November 4, 2026, [https://www.youtube.com/watch?v=PYK7WztHr5E](https://www.youtube.com/watch?v=PYK7WztHr5E).
৪. যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৩% (২০৩০) ও ৩.৫% (২০৩৫)-এ উন্নীতকরণ এবং ইউক্রেন সহায়তা: HM Treasury and Ministry of Defence, Autumn Budget & Defence Spending Commitment: Pathway to 3% of GDP, October 2026; আরও দেখুন: Political Alchemy, 00:01:20–00:02:10 এবং 00:08:55–00:09:42.
৫. পলিমার্কেট (Polymarket)-এ যুদ্ধের পূর্বাভাস ও ইনসাইডার ট্রেডিং বিতর্ক: Political Alchemy, “What Everyone Missed About the Government’s Stockpiling Warning,” 00:02:11–00:03:25 (সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ যুক্তরাজ্যের মজুতদারি সংক্রান্ত পোস্ট এবং ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ইরান হামলার পূর্বে নতুন অ্যাকাউন্ট থেকে মিলিয়ন ডলারের বাজি)।
৬. যুক্তরাজ্যের পানি সংকট ও ১৯৯২ সালের পর নতুন জলাধার নির্মাণ না হওয়া: Environment Agency & Ofwat, Water Resources Planning and Reservoir Infrastructure Assessment in England (London: UK Government); সামারসেট জলাধারের পানির স্তর ২০%-এর নিচে নামা ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির পরিসংখ্যানের জন্য দেখুন: Political Alchemy, 00:04:25–00:04:49.
৭. এনএইচএস (NHS) হাসপাতালের ১৬ বিলিয়ন পাউন্ডের মেরামত বকেয়া (Repair Backlog): NHS England / NHS Digital, Estates Returns Information Collection (ERIC) Summary Report: Maintenance Backlog and Infrastructure Risk (London: Department of Health and Social Care, 2025–2026); আরও দেখুন: Political Alchemy, 00:04:50–00:05:14.
৮. যুক্তরাজ্যের খাদ্য নিরাপত্তা, ৩৫% খাদ্য আমদানি এবং ‘জাস্ট-ইন-টাইম’ (Just-in-Time) সরবরাহ শৃঙ্খল: UK Food Security and Sustainability Assessment Report (February 2026); আরও দেখুন: Department for Environment, Food & Rural Affairs (DEFRA), United Kingdom Food Security Report (London: HM Government).
৯. খাদ্য দাঙ্গা (Food Riots) ও ৩০,০০০ মানুষের সহিংসভাবে আহত হওয়ার পূর্বাভাস: Global Sustainability Institute (Anglia Ruskin University) & UK Food System Resilience Scenario Analysis, cited in Political Alchemy, “What Everyone Missed About the Government’s Stockpiling Warning,” 00:05:18–00:06:58.
১০. সেক্যুলারিজম ও পুঁজিবাদী উপযোগবাদের দার্শনিক ভিত্তি: তাকিউদ্দিন আন-নাবহানী, নিযামুল ইসলাম (ইসলামের জীবনব্যবস্থা), অধ্যায়: “হাদারা ও মাদানিয়্যাহ এবং পুঁজিবাদী জীবনদর্শনের অসারতা” (বৈরুত: দারুল উম্মাহ)।
১১. যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় (MOD) ও অস্ত্র কোম্পানি (BAE Systems)-এর লবিং পরিসংখ্যান: Campaign Against Arms Trade (CAAT) & Declassified UK, Arms Industry Access to the UK Government (2009–2025) — ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সরকারি মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের সাথে অস্ত্র কোম্পানির দৈনিক গড়ে ১.৬৪ বার বৈঠক এবং ২০২৪-২০২৫ সালে সর্বোচ্চ বৈঠকের রেকর্ড; উদ্ধৃত: Political Alchemy, 00:12:22–00:13:08.
১২. রাষ্ট্রের ব্যর্থতা জনগণের কাঁধে চাপানো বিষয়ে সিএনডি (CND)-এর সমালোচনা: Campaign for Nuclear Disarmament (CND), Statement on the UK Government’s ‘Be Ready’ Campaign and Public Service Cuts vs. Military Spending, October 2026; উদ্ধৃত: Political Alchemy, 00:10:40–00:12:15.
১৩. হরমুজ প্রণালী, বাব আল-মান্দেব ও সুয়েজ খালে বাণিজ্য বিঘ্ন এবং সার ও জ্বালানি সংকট: Political Alchemy, “What Everyone Missed About the Government’s Stockpiling Warning,” 00:08:00–00:08:45.
১৪. ২০২৬ সালের অক্টোবরে ফ্রান্স ও ইউরোপজুড়ে (জার্মানি, ইতালি, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, গ্রিস) জেন-জি গণবিক্ষোভ ও গ্রেপ্তার: European Cost-of-Living and Youth Protest Reports (October 2026), বিশেষত ১৭ অক্টোবর ২০২৬-এ ফ্রান্সে ১,২০০ জন গ্রেপ্তারের ঘটনার জন্য দেখুন: Political Alchemy, 00:07:00–00:07:58.








