খলিফা ও রাজার মধ্যে পার্থক্য

খলিফা ও রাজার মধ্যে পার্থক্য: যখন শাসক মানুষকে ভয় পাওয়ার আগে আল্লাহকে ভয় করেন

ক্ষমতার মসনদে বসা শাসকের নাম কী, তা এখানে মূল বিষয় নয়, এমনকি তার নামের আগে যে উপাধি লেখা থাকে তা তার শাসনের ধরন নির্দেশ করলেও নয়; বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তিনি শাসনকাজে যে পদ্ধতি অবলম্বন করেন, যে উদ্দেশ্যে তিনি প্রতিষ্ঠিত এবং আল্লাহর আইন ও জনগণের অধিকারের সামনে তার ক্ষমতার সীমা কোথায় গিয়ে থামে।

এখানে আমিরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর জীবনী থেকে একটি মহান ঘটনা আমাদের সামনে উঠে আসে। ইবনে সাদ (রহ.) যাদান থেকে এবং তিনি সালমান (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, উমর (রা.) সালমান (রা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন: “আমি কি রাজা, নাকি খলিফা?” উত্তরে সালমান (রা.) বলেছিলেন: “আপনি যদি মুসলমানদের ভূমি থেকে এক দিরহাম বা তার চেয়ে কম বা বেশি কর আদায় করেন, অতঃপর তা অনুচিত খাতে ব্যয় করেন, তবে আপনি রাজা, খলিফা নন।” এ কথা শুনে উমর (রা.) কেঁদে ফেললেন।

একই অর্থে তার (রা.) থেকে আরেকটি উক্তি বর্ণিত হয়েছে, যা ইমাম ইবনে সাদ তার ‘আত-তাবাকাতুল কুবরা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: “আল্লাহর কসম! আমি জানি না, আমি কি খলিফা, নাকি রাজা।” তখন তাকে বলা হলো: “উভয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে; খলিফা শুধু ন্যায়সঙ্গত সম্পদই গ্রহণ করেন এবং তা সঠিক খাতেই ব্যয় করেন, আর আলহামদুলিল্লাহ, আপনি তেমনই। অন্যদিকে, রাজা মানুষের ওপর জুলুম করেন, এর কাছ থেকে কেড়ে নেন এবং ওকে দান করেন।”

এই গভীর অনুধাবনের দিকে একবার লক্ষ্য করুন! উমর ইবনুল খাত্তাব, যার সামনে আরবরা বশ্যতা স্বীকার করেছিল, অনারবরা এবং পৃথিবীর এক বিশাল ভূখণ্ড যার অধীনস্ত হয়েছিল এবং যার রাষ্ট্র পারস্য থেকে শুরু করে সিরিয়া ও মিশর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল—তিনি ক্ষমতাকে কখনো ব্যক্তিগত বিশেষাধিকার মনে করতেন না, কিংবা এমন কোনো গনিমত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) মনে করতেন না যা তিনি নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারেন। বরং তিনি মুসলমানদের প্রতিটি দিরহাম, প্রতিটি প্রাণ এবং প্রতিটি অধিকারের ব্যাপারে নিজেকে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে বাধ্য মনে করতেন। আর এটাই হলো মূল বিষয়। সমস্যা মুকুট নিয়ে নয়… বরং ক্ষমতার উৎস এবং শাসন পদ্ধতির মধ্যে।

ইসলাম কোনো শাসককে মানুষের ওপর ইলাহ বা খোদা বানিয়ে দেয় না, সত্য ও ন্যায়ের জবাবদিহিতা থেকে তাকে কোনো দায়মুক্তি দেয় না এবং উম্মাহ বা জাতিকে তার ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করে না। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে:

নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারের কাছে পৌঁছে দিতে এবং তোমরা যখন মানুষের মাঝে বিচার করবে, তখন ন্যায়ভিত্তিক বিচার করবে [সূরা আন-নিসা: ৫৮]।

সুতরাং, ইসলামে ক্ষমতা হলো একটি আমানত, শাসন হলো একটি দায়িত্ব, রাষ্ট্রীয় সম্পদ শাসকের নিজস্ব সম্পদ নয়, জাতি কোনো ব্যক্তিগত খামার নয় এবং প্রজারা কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা দলের সম্পত্তি নয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা প্রয়োজন: কেবল রাজা হওয়ার কারণেই প্রতিটি রাজা নিন্দনীয় নন। যেমন আল্লাহ তায়ালা দাউদ (আ.) সম্পর্কে বলেছেন:

আর আল্লাহ তাকে রাজত্ব ও প্রজ্ঞা দান করেছেন [সূরা আল-বাকারাহ: ২৫১]।

এবং সুলাইমান (আ.) সম্পর্কে বলেছেন:

আমাকে এমন রাজত্ব দান করুন, যা আমার পরে আর কারও জন্যই শোভনীয় হবে না [সূরা সোয়াদ: ৩৫]।

বরং এখানে সেই রাজতন্ত্রের কথা বলা হচ্ছে, যেখানে শাসনব্যবস্থা রূপ নেয় স্বৈরতন্ত্র, জবরদস্তি, আধিপত্য এবং একচেটিয়া কর্তৃত্বে, যাকে হাদিসের ভাষায় ‘আঁকড়ে ধরা রাজতন্ত্র’ (মুলকান আদদ্বান) বলা হয়েছে।

উমরের আদর্শ থেকে আজ আমরা কোথায়? উমর (রা.) মুসলমানদের সম্পদের একটি দিরহামের ব্যাপারেও আল্লাহর দরবারে হিসাব দেওয়ার ভয় করতেন। আর আমাদের যুগে, জাতির সম্পদ বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, প্রকল্প ও বিশেষ সুবিধার নামে বিশাল অঙ্কে পরিণত হয়, তারপর জনগণকে চুপ থাকতে বলা হয়। শাসকের কাছে জবাবদিহিতা চাওয়াকে রাষ্ট্রের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং ক্ষমতার সমালোচনা করাকে অপরাধে পরিণত করা হয়, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যেন তা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তির নিজস্ব সম্পত্তি।

সেই খলিফা যিনি একটি দিরহাম অনুচিত খাতে ব্যয় করার ভয় করতেন, আর সেই শাসক যিনি রাষ্ট্র এবং এর অন্তর্ভুক্ত ভূমি, সম্পদ, প্রতিষ্ঠান ও সম্ভাবনাকে নিজের ও তার চারপাশের লোকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে মনে করেন—এই দুজনের মাঝে কতই না পার্থক্য! এটি কেবল স্লোগানের বিষয় নয়। এটি আমানত, ন্যায়বিচার এবং আল্লাহর আইনে শাসন পরিচালনার বিষয়।

আর সেসব জাতির কী হবে, যারা এর জন্য চরম মূল্য চুকিয়েছে? বিগত দশকগুলোতে আমরা দেখেছি, বহু জাতি স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর বহু শাসনব্যবস্থার পতন ঘটেছে, শহরগুলো ধ্বংস হয়েছে, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং এর জন্য বিশাল মূল্য দিতে হয়েছে। জুলুম যখন পুঞ্জীভূত হয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ে এবং ন্যায়বিচার যখন হারিয়ে যায়, তখন স্বৈরতন্ত্র ও সশস্ত্র সংঘাত কী পরিণতি ডেকে আনতে পারে, সিরিয়া তার একটি বেদনাদায়ক উদাহরণ। তবে কেবল এক ব্যক্তির বদলে অন্য ব্যক্তিকে, এক স্লোগানের বদলে অন্য স্লোগানকে, অথবা এক অভিজাত শ্রেণির বদলে অন্য অভিজাত শ্রেণিকে বসানোই কোনো সমাধান নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো: জুলুমের পতনের পর জনগণকে কোন ব্যবস্থা শাসন করবে? যদি এক স্বৈরশাসক বিদায় নেয় এবং আরেকজন স্বৈরশাসক আসে, তবে পরিবর্তনটা কোথায় হলো? যদি কেবল মুখগুলোই বদলায় কিন্তু স্বৈরতন্ত্র উৎপাদনকারী নিয়মগুলো একই থাকে, তবে কি সমস্যার সমাধান হলো?

মূলত চাওয়াটা কেবল ক্ষমতার চেয়ারে বসা ব্যক্তির পরিবর্তন নয়, বরং শাসনপদ্ধতির পরিবর্তন; যাতে ক্ষমতা শরিয়তের দ্বারা সীমাবদ্ধ থাকে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ সুরক্ষিত থাকে, অধিকার সংরক্ষিত থাকে এবং শাসক তার প্রজাদের জন্য আল্লাহ ও জাতির কাছে দায়বদ্ধ থাকেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককে তার অধীনস্তদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।” সুতরাং শাসক একজন দায়িত্বশীল রক্ষক, তিনি জনগণের মালিক নন। আসুন, আমরা নিজেদেরকে মূল্যায়ন করি, আমাদের জন্য এখন এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ানোর সময় এসেছে, কেবল এই প্রশ্ন করার জন্য নয় যে: কে আমাদের শাসন করছে? বরং এই প্রশ্ন করার জন্য যে: সে কোন বিধান দিয়ে আমাদের শাসন করছে? কার স্বার্থে সে শাসন করছে? সে তার ক্ষমতার উৎস কোথা থেকে পাচ্ছে? তার কাছে কি জাতির সম্পদ আমানত, নাকি গনিমত? একজন মজলুম কি তার শাসনামলে নিজের অধিকার ফিরে পায়? শরিয়ত অনুমোদিত পন্থায় জনগণ কি তাদের ওপর জুলুমকারীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে? শাসক কি জাতির সেবক, নাকি তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তারকারী? বুদ্ধিমান ও দূরদর্শী মানুষদের এই প্রশ্নগুলো নিয়েই ভাবা উচিত।

উম্মাহর আজ এক স্বৈরশাসকের বদলে আরেক স্বৈরশাসকের কোনো প্রয়োজন নেই, এবং নতুন নামে জুলুমের পুনরুৎপাদনেরও দরকার নেই। তাদের এমন একটি শাসনব্যবস্থা প্রয়োজন, যা ন্যায়বিচার, শরিয়ত, জবাবদিহিতা এবং মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান সুরক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর এ কারণেই মুসলমানদের কর্তব্য হলো, শরিয়তসম্মত পন্থায় ও বৈধ উপায়ে আল্লাহর আইনের শাসন দাবি করা, এবং এমন একটি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা, যা বিশৃঙ্খলা, প্রতিশোধস্পৃহা এবং রক্তপাত থেকে দূরে থেকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে, অধিকার রক্ষা করবে এবং ইসলামের বিধানসমূহ বাস্তবায়ন করবে। কেবল ‘খিলাফত’-এর স্লোগান তোলাই বড় কথা নয়, বরং বড় কথা হলো এর অর্থকে—দায়িত্ব, ন্যায়বিচার, আমানত এবং আল্লাহর আইনে শাসন হিসেবে অনুধাবন করা।

আসুন, উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর কথা স্মরণ করি, যিনি নিজেকে প্রশ্ন করতেন: “আমি কি রাজা, নাকি খলিফা?” তিনি সবসময় এই ভয়ে থাকতেন যে, হয়তো তিনি মুসলমানদের সম্পদ থেকে এক দিরহাম নিয়ে ফেলেছেন এবং তা অন্যায়ভাবে ব্যয় করেছেন।

হে ক্ষমতাপ্রত্যাশীরা এবং হে যারা মানুষের বিষয়াবলির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন: আপনারা কি উমরের (রা.) মতো করে নিজেদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারবেন?

আর হে মুসলিম উম্মাহ: আমরা কি এতেই সন্তুষ্ট থাকব যে, মুসলিম দেশগুলো স্বৈরতন্ত্র ও দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি থাকুক, নাকি আমরা এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ার জন্য কাজ করব যা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে, জাতিকে রক্ষা করবে এবং শাসককে তার অধীনস্তদের বিষয়ে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিমূলক করবে?

শরিয়তসম্মত পথ হলো শরিয়তসম্মত পরিবর্তন; বিশৃঙ্খলা, রক্তপাত বা নিরীহ মানুষের ওপর আক্রমণের মাধ্যমে নয়। বরং সচেতনতা, ন্যায়বিচার, সুশৃঙ্খল বৈধ কার্যক্রম এবং ইসলামের ভিত্তিতে জাতিকে গড়ে তোলার মাধ্যমেই এই পরিবর্তন সম্ভব। যাতে শাসনক্ষমতা পরিণত হয় একটি আমানতে—কোনো গনিমতের মালে নয়, এবং এটি হয় একটি দায়িত্ব—কোনো আধিপত্য নয়।

বিধান দেওয়ার অধিকার কেবল আল্লাহরই [সূরা ইউসুফ: ৪০]।

হে আল্লাহ! আপনি মুসলমানদের অবস্থা সংশোধন করে দিন। আমাদের সামনে সত্যকে সত্য হিসেবে তুলে ধরুন এবং তা অনুসরণ করার তৌফিক দিন; আর বাতিলকে বাতিল হিসেবে দেখিয়ে দিন এবং তা থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দিন। আমাদের উম্মাহর মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করুন, তাদের থেকে জুলুম, স্বৈরতন্ত্র ও পরাধীনতা দূর করে দিন। আর তাদের মাঝে এমন শাসনব্যবস্থা কায়েম করুন, যা আপনার আনুগত্য, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের সুরক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।

Leave a Reply