নৈতিকতার দিকে আহ্বান-এর ভ্রান্তি

ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে অতি উৎসাহী কিছু ওয়াজের (ধর্মোপদেশ দাতার) মাঝে একটি কথা প্রচলিত আছে, যার সারমর্ম হলো: “নৈতিকতা বা উত্তম চরিত্র ছাড়া ব্যক্তি ও সমাজের কোনো জাগরণ বা উত্থান সম্ভব নয়।” তাদের মতে, মানুষ তার নৈতিকতার মাঝেই নিহিত। যদি এই নৈতিকতা থাকে, তবে সে উন্নতি লাভ করে, আর যদি তা না থাকে, তবে সে অধঃপতিত হয়। এরপর তারা মানুষের এই সংজ্ঞার ওপর ভিত্তি করে বলেন: সমাজ তো তার মানুষদের নিয়েই গঠিত। সুতরাং আমরা যদি ব্যক্তিকে সংশোধন করি, তবে সমাজও সংশোধিত হবে। তাই ব্যক্তি ও সমাজের উত্থানের মূলভিত্তিই হলো নৈতিকতা বা চরিত্র। অতঃপর তারা তাদের এই মতকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে দলিল পেশ করেন। তারা আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলা আয়াতটি দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেন:

(وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٖ٤) [القلم: ٤]

“আর নিশ্চয়ই আপনি এক মহান চরিত্রের অধিকারী।” [সূরা আল-ক্বালাম: ৪]

আর সুন্নাহ থেকে তারা সবচেয়ে বেশি যে দলিলটি দেন তা হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী:

«إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ»

“আমি তো কেবল উত্তম চরিত্রগুলোর পূর্ণতা দানের জন্যই প্রেরিত হয়েছি।”

অন্য বর্ণনায় এসেছে:

«صَالِحَ الْأَخْلَاقِ»

(সৎ চরিত্র),

এবং অপর বর্ণনায়:

«حُسْنَ الْأَخْلَاقِ»

(সুন্দর চরিত্র)

ইমাম মালেক, আহমাদ, তাবারানী এবং হাকিম এটি বর্ণনা করেছেন। এই টেক্সটগুলো উল্লেখ করার পর তারা বলেন যে, রাসূলদের প্রেরণের মূল উদ্দেশ্যই হলো একটি নৈতিক উদ্দেশ্য এবং দ্বীন বা ধর্ম নিজেই হলো চরিত্র!!! কিন্তু এই কথার বাস্তবতা কতটুকু? তারা যা দাবি করছেন, তাদের উপস্থাপিত দলিলগুলো কি সত্যিই তার প্রমাণ বহন করে? মানুষ ও সমাজের বাস্তবতার ক্ষেত্রে সঠিক কথাটি কী? ইসলামে নৈতিকতার স্থান কোথায়? ইসলামী শরিয়তে এর অবস্থান কোথায়?… এগুলো হলো কিছু প্রশ্ন, আর আল্লাহর রহমতে সামনে এর উত্তর দেওয়া হচ্ছে।

ইবনে মানযুর তার ‘লিসানুল আরব’ গ্রন্থে বলেছেন:

الخُلق (খুলুক) শব্দটির ‘লাম’ অক্ষরে পেশ বা সুকুন উভয়ই হতে পারে: এর অর্থ হলো ধর্ম (দ্বীন), স্বভাব ও প্রকৃতি। কুরআন ও সুন্নাহতে ‘খুলুক’ এবং ‘আখলাক’ শব্দটি এই আভিধানিক অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। শরিয়ত এই শব্দটির জন্য বিশেষ কোনো পারিভাষিক অর্থ নির্ধারণ করেনি, বরং এটি তার আভিধানিক অর্থ অনুসারেই এসেছে। আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলেছেন:

(وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٖ ٤) [القلم: ٤]

এই আয়াতের ব্যাপারে মুফাসসিরদের মতামত দুটি ভাগে বিভক্ত। প্রথম মত, আর এটিই অধিকাংশ মুফাসসিরের মত— যেমন ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, আবু মালেক, সুদ্দী, রাবী বিন আনাস, দাহহাক, মুকাতিল এবং ইবনে যায়েদ (রাহিমাহুমুল্লাহ)। তাদের মতে এর অর্থ হলো: আপনি এক মহান ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত, আর তা হলো ইসলাম। আর আলী (রা.) ও আতিয়া প্রমুখ কিছু মুফাসসিরের মতে এর অর্থ হলো: কুরআনের শিষ্টাচার বা আদব। ইমাম তাবারী এই দুই মতকে একত্রিত করে বলেছেন: হে মুহাম্মদ! আপনি এক মহান শিষ্টাচারের ওপর রয়েছেন। আর তা হলো কুরআনের শিষ্টাচার, যে শিষ্টাচার আল্লাহ আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন। আর সেটি হলো ইসলাম ও তার বিধিবিধান।

অতএব, অধিকাংশ মুফাসসির প্রথম অর্থটি (অর্থাৎ ধর্ম বা দ্বীন) গ্রহণ করেছেন এবং কেউ কেউ দ্বিতীয় অর্থটি (স্বভাব ও প্রকৃতি) গ্রহণ করেছেন। যদি আমরা প্রথম অর্থটিকে প্রাধান্য দিই— যা আয়াতের পূর্বাপর প্রসঙ্গ থেকে বোঝা যায়— তবে এটি তাদের দাবির সপক্ষে দলিল হতে পারে না। কারণ তারা তাদের দলিল দিয়ে এই অর্থের বাইরের অন্য একটি অর্থ বোঝাতে চেয়েছেন। আর যদি আমরা দ্বিতীয় অর্থটি (যা তারা উদ্দেশ্য করেছেন) মেনেও নিই, তবে তা সেভাবেই বুঝতে হবে যেভাবে আমাদের মা আয়িশা (রা.) বুঝেছিলেন: “তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন।” এর অর্থ হলো: কুরআনের যাবতীয় আদেশ-নিষেধসহ এর বিধিবিধানগুলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্বভাব ও প্রকৃতিতে পরিণত হয়েছিল। তাছাড়া, আয়াতটি তো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি গুণ বর্ণনা করছে মাত্র। সুতরাং একে ব্যক্তি ও সমাজের উত্থানের মূলভিত্তি হিসেবে সাব্যস্ত করার জন্য দলিল হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।

আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী:

«إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ»

(আমি তো কেবল উত্তম চরিত্রগুলোর পূর্ণতা দানের জন্যই প্রেরিত হয়েছি)- এটিও এই শব্দটির আভিধানিক অর্থের আওতাভুক্ত। ইমাম তাহাবী তাঁর ‘মুশকিলুল আছার’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: “আমাদের মতে এর অর্থ হলো— আল্লাহই ভালো জানেন— মহান আল্লাহ তাকে মানুষের ধর্মকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্যই প্রেরণ করেছেন। আর এই অর্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আয়াত তিনি নাজিল করেছেন:

(ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ)

“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম।” [সূরা আল-মায়িদাহ: ৩]

সুতরাং আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে প্রেরণের উদ্দেশ্য ছিল মানুষের ধর্মকে পূর্ণতা দান করা। এর আগে অতীত নবীদের মাধ্যমে যে ইবাদতের পদ্ধতি দেওয়া হয়েছিল, তার পূর্ণতা সাধন করা। অতঃপর মহান আল্লাহ তা পূর্ণ করেছেন এই আয়াতের মাধ্যমে:

(ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ) [المائدة: 3]

আর ‘ইকমাল’ (পূর্ণাঙ্গ করা) মানেই হলো ‘ইতমাম’ (সম্পন্ন করা)। এটাই হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী «بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ صَالِحَ الْأَخْلَاقِ» এর অর্থ। অর্থাৎ সৎ ধর্মগুলোর পূর্ণতা, আর তা হলো ইসলাম। আল্লাহর কাছেই তাওফিক কামনা করছি।” (ইমাম তাহাবীর বক্তব্য শেষ)।

হাদিসটিকে দ্বিতীয় অর্থেও (স্বভাব ও প্রকৃতি) বোঝা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে এর অর্থ প্রথম অর্থের কাছাকাছিই হবে। অর্থাৎ, মহান আল্লাহ তাঁর (নবীর) প্রেরণের মাধ্যমে উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দিয়েছেন। তাঁর প্রেরণ ছিল ধর্মকে সম্পূর্ণ করার জন্য, যার মধ্যে উত্তম চরিত্রও অন্তর্ভুক্ত। আভিধানিক অর্থ অনুযায়ী দুটি অর্থই প্রযোজ্য এবং একটিকে অন্যটির ওপর প্রাধান্য দেওয়ার মতো কোনো অকাট্য প্রমাণ এখানে নেই। হাদিসে ব্যবহৃত «إنما» (ইন্নামা) শব্দটি এই দুই অর্থের কোনোটিকে নির্দিষ্টভাবে প্রাধান্য দেয় না। কারণ, আরবি ভাষায় ‘ইন্নামা’ শব্দটি যেমন হাসর বা সীমাবদ্ধ করার জন্য ব্যবহৃত হয়, তেমনি সীমাবদ্ধ না করার অর্থেও ব্যবহৃত হয়। যদি প্রথম অর্থ (ধর্ম/দ্বীন) অনুযায়ী ধরা হয়, তবে এটি সীমাবদ্ধ করার (হাসর) অর্থে হবে। আর যদি দ্বিতীয় অর্থ (স্বভাব ও প্রকৃতি) অনুযায়ী ধরা হয়, তবে তা তাকীদ বা জোর দেওয়ার অর্থে হবে। সুতরাং এর অর্থ দাঁড়াবে যেমনটি আমরা উল্লেখ করেছি যে, তাঁর প্রেরণের মাধ্যমে দ্বীন সম্পূর্ণ হয়েছে, আর উত্তম চরিত্র সেই দ্বীনেরই একটি অংশ। এই অর্থের স্বপক্ষেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদিস এসেছে:

«إِنَّ مَثَلِي وَمَثَلَ الْأَنْبِيَاءِ مِنْ قَبْلِي كَمَثَلِ رَجُلٍ بَنَى بَيْتًا فَأَحْسَنَهُ وَأَجْمَلَهُ إِلَّا مَوْضِعَ لَبِنَةٍ مِنْ زَاوِيَةٍ، فَجَعَلَ النَّاسُ يَطُوفُونَ بِهِ وَيَعْجَبُونَ لَهُ وَيَقُولُونَ: هَلَّا وُضِعَتْ هَذِهِ اللَّبِنَةُ؟ قَالَ: فَأَنَا اللَّبِنَةُ وَأَنَا خَاتِمُ النَّبِيِّينَ»

“আমার এবং আমার পূর্ববর্তী নবীদের উদাহরণ হলো সেই ব্যক্তির মতো, যে একটি চমৎকার সুন্দর ঘর নির্মাণ করল, কিন্তু তার এক কোণে একটি ইটের জায়গা ফাঁকা রেখে দিল। লোকেরা এর চারদিকে ঘুরতে লাগল এবং আশ্চর্য হয়ে বলতে লাগল, এই ইটটি কেন স্থাপন করা হলো না? তিনি বললেন: আমিই সেই ইট, আর আমিই শেষ নবী।” (বুখারী)।

অতএব, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমন ছিল সেই ইটের মতো, যা শরিয়তের সমগ্রতাকে পূর্ণ করেছে, যার অন্তর্ভুক্ত হলো উত্তম চরিত্রও।

অতএব, আয়াত ও হাদিসের অর্থ ভুলভাবে বুঝে এই কথা বলা যে, ব্যক্তি-উত্থান কেবল চরিত্র দ্বারাই সম্ভব— এটি একটি বিভ্রান্তিকর অবস্থান। আর হাদিসের ব্যাখ্যায় এই দাবি করা যে, নবীর প্রেরণ কেবল সেই চরিত্র পূর্ণ করার জন্যই ছিল যা তাদের ধারণামতে কেবল কিছু (মানবিক গুণাবলি)— এটি একটি ভুল বোঝাবুঝি, যা আয়াত ও হাদিসের মূল নির্দেশনার সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। সুতরাং, তারা যে দলিল উপস্থাপন করে, তা তাদের দাবির ক্ষেত্রে খাটে না। এর মাধ্যমে এটি সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, সমগ্র ধর্মকে কেবল চরিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা এবং চরিত্রকেই ধর্ম মনে করা একটি ভ্রান্ত ধারণা, যার কোনো প্রামাণ্য ভিত্তি নেই। তাছাড়া, পুরো দ্বীন কেবলই নৈতিকতা— এমন কথা বাস্তবতার আলোকেই মিথ্যা প্রমাণিত হয়। কারণ দ্বীনের মধ্যে রয়েছে আকীদা (বিশ্বাস), ইবাদত, মুয়ামালাত (পারস্পরিক লেনদেন) এবং মানুষের বিষয়াদি পরিচালনার জন্য বিভিন্ন বিধি-ব্যবস্থা (أنظمة)। এর সবগুলোই নৈতিকতা বা চরিত্র নয়, বরং ইসলাম এই সবকিছুরই সমাহার নিয়ে এসেছে।

আর এই দাবির বাস্তবতা— যে ব্যক্তি ও সমাজের উত্থান কেবল নৈতিকতার মাধ্যমেই সম্ভব (যার অর্থ স্বভাব, প্রকৃতি বা গুণাবলি)— তা সঠিক অবস্থান থেকে বহুদূরে। কারণ জাগরণ বা উত্থান কখনো নৈতিকতার মতো আংশিক বা ক্ষুদ্র চিন্তার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয় না। বরং তা প্রতিষ্ঠিত হয় একটি সামগ্রিক চিন্তার (الفكرة الكلية) ওপর, যে চিন্তাটি জীবনের প্রতিটি বিষয়ে চিন্তাভাবনার মূলভিত্তি হওয়ার যোগ্যতা রাখে। এই সামগ্রিক চিন্তাটিই হবে বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি (القاعدة الفكرية), আর তা থেকেই যাবতীয় জীবনব্যবস্থা বা বিধান উৎসারিত হবে। এই বিষয়টি নৈতিকতার মতো আংশিক ধারণার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। নৈতিকতা সবকিছুর চিন্তার ভিত্তি হতে পারে না, এবং এর থেকে কোনো পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থাও উৎসারিত হয় না। অতএব, একটি সামগ্রিক চিন্তাই কেবল ব্যক্তি বা সমাজের জাগরণের মূলভিত্তি হওয়ার যোগ্যতা রাখে। আর এই সামগ্রিক চিন্তাটি হলো বুদ্ধিভিত্তিক আকীদা বা বিশ্বাস। অর্থাৎ, এমন একটি আকীদা, যা গভীর চিন্তাভাবনা ও যুক্তির মাধ্যমে অর্জিত হয়।

তাছাড়া, নৈতিকতা বা আখলাক হলো কাজের বৈশিষ্ট্য। আর মানুষের নিজের কোনো সক্ষমতা নেই কোনো কাজকে মূল্যায়ন করার বা তার ওপর রায় দেওয়ার। সুতরাং, যে কাজগুলো মেনে চলা বাধ্যতামূলক, তার সঠিক মূল্যায়ন ও বৈশিষ্ট্য একমাত্র শরিয়ত দ্বারাই নির্ধারিত হয়। আমাদের (ইসলামের) দৃষ্টিতে নৈতিকতা বা আখলাক হলো মূলত শরিয়তের হুকুম বা বিধান, যা শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী পালন করা হয়। কেবল “প্রশংসনীয় গুণ” হিসেবে নৈতিকতা মানা সঠিক নয়, বরং তা মানতে হবে “শরিয়তের বিধান” হিসেবে। আমাদের কাছে নৈতিকতার উৎস হলো ওহি, যা অন্যান্য ধর্ম ও মতবাদের নৈতিকতার ধারণা থেকে ভিন্ন। সব জাতি ও সম্প্রদায়ের কাছে নৈতিকতা এক জিনিস নয়, যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের মাঝে মিল থাকতে পারে।

মানুষ ও সমাজের বাস্তবতার ক্ষেত্রে বলতে গেলে, মানুষের মধ্যে রয়েছে শারীরিক চাহিদা ও প্রবৃত্তি, যা তাকে তা পূরণের দিকে তাড়িত করে। আর এই চাহিদা পূরণের প্রক্রিয়ায় তার মধ্যে বিভিন্ন সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। আমরা এই সম্পর্কগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করতে পারি:

১. স্রষ্টার সাথে মানুষের সম্পর্ক: এর অন্তর্ভুক্ত হলো আকীদা ও ইবাদত

২. নিজের সাথে মানুষের সম্পর্ক: এর অন্তর্ভুক্ত হলো নৈতিকতা, খাদ্য ও পোশাক

৩. অন্য মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক: এর অন্তর্ভুক্ত হলো লেনদেন (মুয়ামালাত) ও দণ্ডবিধি (উকূবাত)

ইসলাম মূলত এই সম্পর্কগুলোকে সুশৃঙ্খল করার জন্যই এসেছে, যাতে মানুষের উন্নতি ও জাগরণ নিশ্চিত হয়। এ থেকে আমরা ব্যক্তির উত্থানের মৌলিক উপাদানগুলো বের করতে পারি, যা গুরুত্বের ক্রমানুসারে সাজানো যায়: ১. আকীদা, ২. ইবাদত, ৩. মুয়ামালাত, ৪. আখলাক। যদি এর মধ্যে একটি উপাদানও অনুপস্থিত থাকে, তবে ব্যক্তির প্রকৃত জাগরণ বা উত্থান সম্ভব নয়। সুতরাং এটা বুঝতে হবে যে, মানুষ কেবল চরিত্র বা নৈতিকতা দ্বারা উন্নতি লাভ করে না, বরং এই সমস্ত উপাদানগুলোর মাধ্যমেই তার উন্নতি হয়। আর নৈতিকতা হলো ব্যক্তি উত্থানের চারটি উপাদানের একটি অংশ মাত্র।

আর সমাজের ক্ষেত্রে বলা যায়, মানুষ তার প্রবৃত্তি ও প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে, এবং যেহেতু সে নিজে নিজে এই চাহিদা পূরণে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, তাই সে অন্যের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে বাধ্য হয়। মানবসমাজে মানুষের জীবনযাপন স্থিতিশীল করতে হলে এই সম্পর্কটি অবশ্যই স্থায়ী হতে হয়। আর এই স্থায়ী সম্পর্কটি হলো মূলত এমন কিছু চিন্তাধারার সমষ্টি যার ওপর সবাই একমত, এই চিন্তাধারার সাথে মানানসই কিছু আবেগ-অনুভূতি, এবং এমন একটি শাসন ব্যবস্থা যা সমাজের এই চিন্তাধারা ও অনুভূতিগুলোকে সুরক্ষিত রাখে। সমাজের বাস্তবতার এই বর্ণনা থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে, সমাজ কেবল ব্যক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; বরং ব্যক্তি ছাড়াও এটি সমাজের সাধারণ প্রথা (চিন্তা ও আবেগ) এবং এই প্রথাকে রক্ষাকারী ব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। সুতরাং, সমাজের বাস্তবতায় কেবল চরিত্রের একক কোনো প্রভাব নেই, এটি সমাজের মূলভিত্তিও নয়, এমনকি সমাজের গাঠনিক উপাদানগুলোর কোনো অংশও নয়।

শরিয়ত মানুষের জন্য যে নৈতিকতা নির্ধারণ করেছে তার মূল অবস্থান হলো— এগুলো আদেশ ও নিষেধের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ এগুলো হলো বাধ্যতামূলক শর’ঈ বিধান, যা জীবনের পরিক্রমায় একজন মুসলিমকে অনুসরণ করতে হয়। যেমন, আল্লাহ তায়ালা সত্য বলার আদেশ দিয়েছেন এবং মিথ্যা বলাকে হারাম করেছেন একটি শর’ঈ বিধান হিসেবে। আবার যুদ্ধের ময়দানে মিথ্যা বলাকে তিনি শর’ঈ বিধান হিসেবেই বৈধতা দিয়েছেন। মুমিনদের প্রতি দয়াশীল হওয়া এবং কাফিরদের প্রতি কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন শর’ঈ বিধান হিসেবেই, এগুলো নিছক কোনো চারিত্রিক গুণাবলি নয়। এটাই হলো নৈতিকতার প্রকৃত অবস্থান। এগুলো মূলত শরিয়তের হুকুম, যা শরিয়তের মানদণ্ডেই মেনে চলতে হয়। তবে ব্যক্তি কেবল এর দ্বারাই উন্নতি করতে পারে না, এবং সমাজের উত্থান বা পতনের সাথে এর একক কোনো সম্পর্ক নেই।

Leave a Reply