বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে: নবুওয়াতের আদলের খিলাফতে রাশিদাহ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কিতাব ও সুন্নাহকে পুনরুজ্জীবিত করুন
মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যখন ইসলামকে সর্বশেষ দ্বীন বা বার্তা হিসেবে নির্ধারণ করেছেন, আমাদের নেতা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বশেষ রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন এবং আমাদের জন্য এই দ্বীনকে সংরক্ষণ করে এতে যেকোনো ধরনের বিকৃতি ও পরিবর্তনের পথ বন্ধ করে দিয়েছেন… তার অর্থ হলো, আল্লাহ ইসলামকে মানবজাতির জন্য সর্বকাল ও সর্বস্থানের এবং কিয়ামত পর্যন্ত প্রযোজ্য একমাত্র সত্য দ্বীন হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তিনি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নিয়ে আসা কিতাব ও সুন্নাহকে আল্লাহর দ্বীনের একমাত্র মানদণ্ড ও সূত্র বানিয়েছেন… এর মানে হলো, একজন মুসলিম আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী থেকে এটাই বুঝবে যে:
(وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى (3) إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى )
“তিনি মনগড়া কথা বলেন না। এতো ওহী, যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ হয়।” [সূরা আন-নাজম: ৩-৪]
এবং আল্লাহর এই বাণী থেকে বুঝবে:
(وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا)
“রাসূল তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।” [সূরা হাশর: ৭]
এবং মহিমান্বিত আল্লাহর এই বাণী থেকে বুঝবে:
(وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ)
“আমি কোনো রাসূলকেই পাঠাইনি এ উদ্দেশ্য ছাড়া যে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর আনুগত্য করা হবে।” [সূরা নিসা: ৬৪]
অর্থাৎ, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সে এই আদেশে আদিষ্ট যে, তাকে সর্বকালে, সর্বস্থানে এবং কিয়ামত পর্যন্ত এই দ্বীনের অনুসরণ করতে হবে, ঠিক যেমনটি এই উম্মতের পূর্বসূরিগণ করেছিলেন… এর অর্থ হলো, তাকে সালাত আদায় করতে হবে, যাকাত দিতে হবে, সাওম পালন করতে হবে এবং হজ করতে হবে… ঠিক সেভাবেই যেভাবে রাসূল (সা.) সালাত, যাকাত, সাওম ও হজ পালন করেছেন। তাকে ক্রয়-বিক্রয় ও বিবাহ সেভাবেই করতে হবে যেভাবে রাসূল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন এবং দাওয়াতের পথে ঠিক সেভাবেই চলতে হবে যেভাবে রাসূল (সা.) চলেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই ধরনের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ দ্বীনের একটি অকাট্য ও স্বতঃসিদ্ধ বিষয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
(كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا )
“তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালের আশা রাখে এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে, তাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” [সূরা আহযাব: ২১]
আর এ ব্যাপারে কোনো মুসলিমের নিজস্ব কোনো পছন্দ বা ছাড়ের সুযোগ নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
(فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا)
“অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তারা তাদের মধ্যকার বিরোধের ক্ষেত্রে তোমাকে বিচারক না মানে, এরপর তুমি যে ফয়সালা করবে সে ব্যাপারে নিজেদের মনে কোনো দ্বিধা না রাখে এবং তা পূর্ণাঙ্গরূপে মেনে নেয়।” [সূরা নিসা: ৬৫]
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন:
(فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ)
“সুতরাং যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা যেন ভয় করে যে, তাদের উপর কোনো ফিতনা (বিপর্যয়) আপতিত হবে কিংবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদের গ্রাস করবে।” [সূরা নূর: ৬৩]
এ কারণেই সমগ্র সৃষ্টির সরদার (সা.) যা নিয়ে এসেছেন তা-ই হলো সিরাতুল মুস্তাকিম (সরল পথ) এবং এই পথে চলার জন্য তা-ই আমাদের জন্য নূর ও আলো। প্রতি বছর রাসূল (সা.)-এর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আমাদের সর্বপ্রথম এই শিক্ষার ওপরই আলোকপাত করা উচিত… এরপর আমাদের স্মরণ করা উচিত যে সত্যিকার অর্থে ইসলাম ছাড়া মুসলিমদের কোনো সম্মান নেই, স্মরণ করা উচিত কীভাবে ইসলাম মরুভূমির বেদুঈনদের মধ্য থেকে মানবজাতির জন্য শ্রেষ্ঠ উম্মত বের করে এনেছিল, এবং কীভাবে যতদিন তারা ইসলামকে আঁকড়ে ধরেছিল ও এর পথ অনুসরণ করেছিল ততদিন বিজয় তাদের সাথী ছিল। নবীর নেতৃত্বে কীভাবে তারা মানবজাতির পথপ্রদর্শক ও রক্ষক হয়েছিল এবং শত শত বছর ধরে তারা এই অবস্থানে অটুট ছিল। ইসলাম অনুসরণের শক্তির কারণেই তারা শক্তিশালী ছিল এবং ইসলাম অনুসরণ থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণেই তারা দুর্বল হয়েছে; এমনকি হযরত উমর (রা.)-এর সেই বিখ্যাত উক্তিটি পূর্ববর্তী মুসলিমদের জন্য একটি ধ্রুব সত্যে পরিণত হয়েছিল:
« نحن قوم أعزنا الله بالإسلام. فإن ابتغينا العزة بغيره أذلنا الله»
“আমরা এমন এক জাতি যাদেরকে আল্লাহ ইসলামের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন। আমরা যদি ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুর মাধ্যমে সম্মান খুঁজি, তবে আল্লাহ আমাদের অপদস্থ করবেন।”
আমাদের স্মরণ করা উচিত, কীভাবে মক্কায় রাসূল (সা.)-এর প্রধান কাজ ছিল আকীদা প্রচারের পাশাপাশি প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্ঠা চালানো।
মক্কায় তিনি তাঁর জাতিকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকতেন এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে নিয়ে একটি দল গঠন করেছিলেন। দারুল আরকামে তিনি:
( يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ )
“তিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন।” [সূরা জুমুআহ: ২]
অতঃপর আল্লাহর নির্দেশে তিনি প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়া শুরু করেন:
(فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ )
“সুতরাং আপনাকে যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা প্রকাশ্যে প্রচার করুন এবং মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন।” [সূরা হিজর: ৯৪]
তিনি মুশরিকদের বলেছিলেন:
«كلمة واحدة تعطونيها تملكون بها العرب، وتدين لكم بها العجم»
“তোমরা আমাকে একটিমাত্র বাক্য দাও, যার মাধ্যমে তোমরা আরবদের আধিপত্য লাভ করবে এবং অনারবরা তোমাদের বশ্যতা স্বীকার করবে।”
তিনিই সেই ব্যক্তি যিনি আরব গোত্রগুলোর শক্তিমানদের কাছে ‘নুসরাহ’ (সাহায্য ও ক্ষমতা) চেয়েছিলেন। মদীনার যে শক্তিমানরা তাঁকে সাহায্য করেছিলেন, আল্লাহ সম্মানসূচকভাবে তাঁদের নাম দিয়েছিলেন ‘আনসার’ এবং তাঁদের প্রশংসা করে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
(وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ )
“মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম ও অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন জান্নাত, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই হলো মহাসাফল্য।” [সূরা তাওবাহ: ১০০]
এই আনসারদের মাধ্যমেই মহান আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করেছিলেন এবং প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এরপর মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর, রাসূল (সা.) ইসলামের ভিত্তিতে শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন, ইসলামের দ্বারা মুসলিমদের বিষয়াদি দেখাশোনা করেছেন এবং আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করার জন্য জিহাদ কায়েম করেছেন। ফলে এই রাষ্ট্র সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করেছিল এবং ইসলামকে চারিদিকে ছড়িয়ে দিয়েছিল… আর আজ আমরাও রাসূল (সা.)-এর সেই একই পথ অনুসরণ করতে আদিষ্ট। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি যে কাজগুলো করেছিলেন, আমাদেরও সেই কাজগুলো করতে হবে এবং তিনি যে পর্যায়গুলো পার করেছিলেন, আমাদেরও ঠিক সেই পর্যায়গুলো পার করতে হবে…
সত্য দ্বীন ইসলামের জন্মের (রাসূলের জন্মের সাথে) এত দীর্ঘ সময় পর আজ আমাদের ওপর বর্তানো পবিত্র আমানত হলো ইসলামের সেই সুবাসিত জীবনীর দিকে ফিরে যাওয়া এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূল (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করা। আর এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই জীবনে দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়ন করা, যা মুসলিমদেরকে এমন একটি জীবনযাপনে সক্ষম করবে যা তাদের রবের সন্তুষ্টি অর্জন করবে এবং তাদেরকে সম্মানিত ও পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রাসূল (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে এবং আল্লাহর শরীয়তের শাসন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কারণে মুসলিম উম্মাহ তাদের সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থায় জীবনযাপন করছে। যখনই তারা তাদের উজ্জ্বল অতীতের কথা স্মরণ করে, পুনরায় ইসলামের শাসনে ফিরে আসতে চায়, ইসলামের ছায়াতলে বাঁচতে চায় এবং এর বার্তা বহন করতে চায়; তখনই তাদেরকে বাঁধা দেওয়ার ও যুদ্ধ করার জন্য কেউ না কেউ দাঁড়িয়ে যায়। হ্যাঁ, উম্মাহ আজ জেগে উঠেছে, তারা তাদের বর্তমান বাস্তবতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে এবং ফিরে আসতে চাচ্ছে… কিন্তু পাশ্চাত্যের শাসক ও তাদের লেজুড়বৃত্তি করা মুসলিম বিশ্বের নিকৃষ্ট শাসকরা শয়তানি কায়দায় তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে, চরম চক্রান্ত, হীনতা ও অপরাধের মাধ্যমে তাদেরকে প্রতিহত করতে চাচ্ছে। তারা উম্মাহর বিরুদ্ধে এক বৈশ্বিক যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে যেন উম্মাহ পৃথিবীতে আল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারে।
যখন বিপ্লবগুলো «هي لله هي لله» (সবকিছুই আল্লাহর জন্য, আল্লাহর জন্য) স্লোগান তুলল, তখন তা পাশ্চাত্যের বুকে কাঁপুনি ধরিয়ে দিল। মুসলিমদের « محمد رسول الله قائدنا» (মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল আমাদের নেতা) এবং «الأمة تريد خلافة من جديد» (উম্মাহ পুনরায় খিলাফত চায়) স্লোগান শুনে তাদের হৃদয় কেঁপে উঠল। জুমার দিনের স্লোগানগুলো যখন কুরআনের আয়াতের রূপ নিল, যেমন:
(إِنْ تَنْصُرُوا اللَّهَ يَنْصُرْكُمْ )
“যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য করো, তবে তিনিও তোমাদের সাহায্য করবেন।” [সূরা মুহাম্মদ: ৭]
এবং সশস্ত্র দলগুলো যখন সাহাবী, জিহাদ ও প্রথম যুগের বিজয়ী মুসলিম সেনাপতিদের নামে নিজেদের নামকরণ করতে শুরু করল… বিশেষ করে সিরিয়ায় যখন এই পরিস্থিতি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠল, তখন কাফির পশ্চিমা বিশ্ব এবং তাদের লেজুড় শাসকরা মুসলিমদের এই পথে এগিয়ে যাওয়া রোধ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। আর এটি প্রতিরোধের জন্যই তারা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও সামরিক জোট গঠন করেছে।
পাশ্চাত্য যখন ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জীবনের আঙিনায় ইসলামের প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে কাজ করে, তখন তারা খুব ভালো করেই জানে যে এই রাষ্ট্রটি কেমন হবে। তারা জানে যে এই রাষ্ট্রটি সভ্যতা ও শক্তির দিক থেকে বিশ্বের এক নম্বর রাষ্ট্র হবে। তারা জানে যে, ইসলামকে সুন্দরভাবে প্রয়োগ, দাওয়াত এবং জিহাদের মাধ্যমে সম্প্রসারণ, প্রভাব বিস্তার ও ছড়িয়ে পড়ার বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই রাষ্ট্রের রয়েছে, যা তাদের সমস্ত অর্জনকে ধ্বংস করে দেবে। শুধু তাই নয়, তারা দেখতে পাচ্ছে যে এটি তাদের অস্তিত্বকেই নিশ্চিহ্ন করে দেবে এবং তাদের আদর্শকে সমূলে উৎপাটন করবে… পাশ্চাত্য ভালো করেই জানে যে পুঁজিবাদের পতন আসন্ন। অন্যদের আগে তাদের নিজেদের কাছেই স্পষ্ট হয়ে গেছে যে এই ব্যবস্থা শান্তি দিতে পারে না, বরং এটি সংকট তৈরির কারখানামাত্র। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষের ঘামে মুষ্টিমেয় কিছু লোভী মানুষ (যাদের সংখ্যা কয়েক হাজারের বেশি নয়) লাভবান হয়। এই ব্যবস্থা জুলুম, হত্যা এবং যুদ্ধের ব্যবসার ওপর দাঁড়িয়ে আছে… পাশ্চাত্য এই উপসংহারে পৌঁছেছে যে তাদের মতাদর্শের বিদায় নেওয়ার সময় এসে গেছে এবং জীবনের মঞ্চে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মঞ্চে ও বৈশ্বিক নেতৃত্বের মঞ্চে ইসলামের পুনরায় ফিরে আসার সময় ঘনিয়ে এসেছে।
এ কারণেই এই প্রতারক ও অপরাধী পাশ্চাত্য- যাদের শাসনামলে মানবতা কেবল যুদ্ধ, দুর্দশা, গণহত্যা, শোষণ, জাতির সম্পদ লুণ্ঠন ও দারিদ্র্য ছাড়া আর কিছুই দেখেনি; এমনকি তারা জাতিগুলোকে শত শত বিলিয়ন ডলারের ঋণে জর্জরিত করে প্রতি বছর হাজার হাজার বিলিয়ন ডলার সুদ দিতে বাধ্য করেছে… তারা খিলাফত পুনরায় প্রতিষ্ঠা হওয়া ঠেকাতে মরণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে… ইসলামের প্রত্যাবর্তনের বিরুদ্ধে এই হিংস্র আক্রমণের মাধ্যমে মূলত পাশ্চাত্য নিজেদেরকে রক্ষা করছে এবং তাদের মতাদর্শের পতনের ঝুঁকি থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছে…
আর একারণেই ইসলামের প্রতি এবং খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রকল্প বহনকারীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী এই পাশ্চাত্য বিপ্লবগুলোকে ছিনতাই করার ষড়যন্ত্র করেছে। তারা মিশরে সিসিকে নিয়ে এসেছে যে মোবারকের চেয়ে কোনো অংশে কম অপরাধী নয়, তিউনিসিয়ায় বেন আলীর সবচেয়ে কাছের মানুষ সিবসিকে নিয়ে এসেছে এবং ইয়েমেনে স্বৈরশাসক আলী আবদুল্লাহ সালেহের ডেপুটি মনসুর হাদি আবদে রাব্বুকে বসিয়েছে… লিবিয়াতে পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে আনার জন্য তারা এখনো চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে। আর সিরিয়া! সিরিয়া তো বিপ্লবগুলোর কেন্দ্রবিন্দু; সেখানে পাশ্চাত্য ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণহত্যা চালানো হয়েছে এবং এখন বাশারমুক্ত হবার পর তা আমেরিকার বলয়ে নেবার জন্য বড় ষড়যন্ত্রের জাল বুনন করা হচ্ছে; কারণ সিরিয়া নিজেকে একটি ইসলামি বিপ্লব হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং এর জনগণ খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মহান আল্লাহ কতই না সত্য বলেছেন:
(وَمَا نَقَمُوا مِنْهُمْ إِلَّا أَنْ يُؤْمِنُوا بِاللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ )
“তারা তো তাদের সাথে কেবল এ কারণেই শত্রুতা করেছিল যে, তারা মহাপরাক্রমশালী, প্রশংসিত আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল।” [সূরা বুরুজ: ৮]
আজকের দিনে একজন মুসলিম যখন বাস্তবতার দিকে তাকায়, তখন সে দেখতে পায় যে ইসলামকে বিকৃত করার এবং মুসলিমদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার ও তাদের অবলীলায় হত্যা করার এক তীব্র ষড়যন্ত্র চলছে। সে দেখতে পায় যে চারপাশ থেকে ظالمين (অত্যাচারীরা) তাকে ঘিরে রেখেছে এবং সত্যের পক্ষে কোনো সাহায্যকারী নেই… যখন সে আমেরিকা, রাশিয়া ও ইউরোপীয় দেশগুলোর শক্তির দিকে তাকায় এবং তাদের অনুগত দালাল শাসকদের সমর্থন দেখে, তখন তার মধ্যে হতাশা আসতে পারে। কিন্তু যখন সে ঈমানের দৃষ্টিতে তাকায়, যখন সে স্মরণ করে রাসূল (সা.) এবং পূর্ববর্তী নবীদের সাথে কী ঘটেছিল, তারা কী পরিমাণ অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, এবং কীভাবে তারা আল্লাহর হুকুম যথাযথভাবে পালনের মাধ্যমে, অনুসরণ ও একমাত্র আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করার মাধ্যমে সেই পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছিলেন; তখন সে বুঝতে পারে যে এই বাস্তবতার চেয়ে সে অনেক বেশি শক্তিশালী। সে আল্লাহর সঙ্গ, তাঁর সুরক্ষা এবং তাঁর সাহায্যের অনুভূতি লাভ করে; ফলে তার হিসাব-নিকাশ পাল্টে যায়। সে বুঝতে পারে যে, এই অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হলো সেই পথ, যে পথে রাসূল (সা.) চলেছিলেন। সে বুঝতে পারে যে বিজয় একমাত্র আল্লাহর হাতে, পাশ্চাত্যের হাতে নয় বা তাদের দালাল শাসকদের হাতেও নয়। সে দেখতে পায় যে আল্লাহ তাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং তিনি তাঁর মুমিন বান্দাদের সাহায্য করেন, তারা যতই দুর্বল হোক না কেন বা তাদের ওপর যতই বিপদ আসুক না কেন। কুফরী রাষ্ট্রগুলোর শক্তি সম্পর্কে যতই বড়াই করা হোক না কেন— অতীতেও এমন বড়াই করা হয়েছিল— কিন্তু আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.)-কে নমরূদ থেকে, মূসা (আ.)-কে ফেরাউন থেকে, এবং হুদ, সালেহ, লূত (আ.) সহ অন্যান্য নবীদেরকে তাদের সম্প্রদায়ের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। হ্যাঁ, আজ মুসলিমদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে তাদের মুক্তি কেবল তাদের দ্বীনের মধ্যেই নিহিত। পাশ্চাত্য মূলত তাদের দ্বীনের কারণেই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে এবং তাদেরকে একই তীর ধনুক থেকে আঘাত করছে, তাই মুসলিমদেরও উচিত সকলে মিলে নিজেদের দ্বীন দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা।
আজ রাসূল (সা.)-এর জন্মবার্ষিকী বা ইসলামের জন্মবার্ষিকীতে আমরা তাঁকে যে সবচেয়ে বড় উপহার দিতে পারি, তা হলো তাঁর দেখানো পরিবর্তনের পদ্ধতি অনুসরণ করা। তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড় কৃতজ্ঞতা হলো তাঁর সেই সুবাসিত জীবনীর দিকে ফিরে যাওয়া এবং সেই পথে চলার পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করা। মুসলিমদের জেনে রাখা উচিত যে, তাদের ওপর বিপদ, কষ্ট ও দুর্দশা যতই আসুক না কেন, তারা এমন এক ফিতনার সম্মুখীন হয়েছে যেখান থেকে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উদ্ধারকর্তা নেই, এবং তাকওয়া ছাড়া কোনো মুক্তি নেই। তা না হলে তাদের দুর্দশা কেবল বাড়তেই থাকবে এবং সেই সংকীর্ণ জীবন তাদের তাড়া করবে, যে সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
(وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا )
“আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন-জীবিকা হবে অত্যন্ত সংকীর্ণ।” [সূরা ত্বোয়া-হা: ১২৪]
আজ মুসলিমদের সামনে একটিই সমাধান আছে, দ্বিতীয় কোনো পথ নেই। আর তা হলো একমাত্র আল্লাহর ওপর ঈমানের ভিত্তিতে তাদের সমস্যার সমাধানের জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং তাদের সামনে একটিমাত্র লক্ষ্য নির্ধারণ করা: তা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকারী খিলাফতে রাশিদাহ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যা প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সুস্পষ্ট ও অকাট্য নির্দেশ দিয়েছেন। আর এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় কেবল তাঁরই সাহায্য চাওয়া, পূর্ব-পশ্চিম কারো দিকে না ঝুঁকা। কারণ আল্লাহ কখনোই শাসন ও আনুগত্যে অন্য কাউকে শরিক করা পছন্দ করেন না। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
(مَا لَهُمْ مِنْ دُونِهِ مِنْ وَلِيٍّ وَلَا يُشْرِكُ فِي حُكْمِهِ أَحَدًا )
“তিনি ছাড়া তাদের কোনো অভিভাবক নেই এবং তিনি তাঁর কর্তৃত্বে (হুকুমে) কাউকে শরীক করেন না।” [সূরা কাহফ: ২৬]
সত্য কেবল এই দ্বীনের মাঝেই নিহিত, আর এছাড়া যা কিছু আছে সবই ভ্রষ্টতা ও মূর্খতা (জাহেলিয়াত)। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
(فَذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمُ الْحَقُّ فَمَاذَا بَعْدَ الْحَقِّ إِلَّا الضَّلَالُ فَأَنَّى تُصْرَفُونَ )
“তিনিই আল্লাহ, তোমাদের সত্য রব। সুতরাং সত্যের পর ভ্রষ্টতা ছাড়া আর কী থাকতে পারে? অতএব তোমাদের কোথায় ফেরানো হচ্ছে?” [সূরা ইউনূস: ৩২]
মহান আল্লাহ আরও বলেন:
(أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ )
“তারা কি তবে জাহেলিয়াতের বিচার-ফয়সালা কামনা করে? নিশ্চিত বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য ফয়সালা প্রদানে আল্লাহর চেয়ে কে বেশি উত্তম?” [সূরা মায়েদাহ: ৫০]
যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর কিতাবের দিকে দৃষ্টিপাত করবে, সে দেখতে পাবে যে আজ মুসলিমরা এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যা আমাদের প্রিয় রাসূল (সা.) এবং পূর্ববর্তী সম্মানিত নবীগণের (আ.) জীবনের পরিস্থিতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। আল্লাহ তাদেরকে আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ বানিয়েছেন; যাতে আমরা তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করি, তাদের কাজের অনুকরণ করি এবং তাদের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিই… হযরত ইব্রাহিম (আ.)-ও এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন যখন তিনি একাই তাঁর সম্প্রদায়ের মোকাবিলা করেছিলেন এবং তাদের মূর্তি ভেঙে তাদের চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তখন আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করেছিলেন এবং তাদের শাসকের আগুনকে তাঁর জন্য শীতল ও শান্তিদায়ক করে দিয়েছিলেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
(قُلْنَا يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ )
“আমি বললাম, হে আগুন! তুমি ইব্রাহিমের জন্য শীতল ও শান্তিদায়ক হয়ে যাও।” [সূরা আম্বিয়া: ৬৯]
হযরত মূসা (আ.) এবং তাঁর সঙ্গী দুর্বল মুমিনরাও অনুরূপ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন, যখন তারা অস্ত্রে সজ্জিত ফেরাউনের শক্তিশালী বাহিনীর মুখোমুখি হয়েছিলেন। আল্লাহ অত্যন্ত অন্ধকার পরিস্থিতিতে তাঁকে দেওয়া বিজয়ের প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছিলেন এবং কীলক বিশিষ্ট ফেরাউনকে ধ্বংস করেছিলেন। মহিমান্বিত আল্লাহ বলেন:
(فَلَمَّا تَرَاءَى الْجَمْعَانِ قَالَ أَصْحَابُ مُوسَى إِنَّا لَمُدْرَكُونَ (61) قَالَ كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ (62) فَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنِ اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْبَحْرَ فَانْفَلَقَ فَكَانَ كُلُّ فِرْقٍ كَالطَّوْدِ الْعَظِيمِ )
“অতঃপর যখন উভয় দল পরস্পরকে দেখল, মূসার সঙ্গীরা বলল, আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম। মূসা বলল, কখনোই নয়! নিশ্চয়ই আমার সাথে আমার রব আছেন, তিনি আমাকে পথ দেখাবেন। অতঃপর আমি মূসাকে ওহী করলাম, তোমার লাঠি দিয়ে সাগরে আঘাত করো। ফলে তা বিভক্ত হয়ে গেল এবং প্রতিটি ভাগ এক বিশাল পর্বতের মতো হয়ে গেল।” [সূরা শুআরা: ৬১-৬৩]
আর এই যে আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ, যিনি রহমত ও যুদ্ধের নবী, খন্দক (আহযাব) যুদ্ধের সময় যখন কুফরের সমস্ত নেতারা রাসূল (সা.) এবং তাঁর সাথে থাকা মুমিনদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল দাওয়াতকে সমূলে উৎপাটন করার উদ্দেশ্যে- ঠিক যেমনটি আজ মুসলিমদের ক্ষেত্রে ঘটছে। তখন তাঁর রব মুমিনদের অবস্থা কতটা কঠিন ছিল তা বর্ণনা করে সূরা আহযাবে বলেন:
( يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَاءَتْكُمْ جُنُودٌ فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا وَجُنُودًا لَمْ تَرَوْهَا وَكَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرًا (9) إِذْ جَاءُوكُمْ مِنْ فَوْقِكُمْ وَمِنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَبَلَغَتِ الْقُلُوبُ الْحَنَاجِرَ وَتَظُنُّونَ بِاللَّهِ الظُّنُونَا (10) هُنَالِكَ ابْتُلِيَ الْمُؤْمِنُونَ وَزُلْزِلُوا زِلْزَالًا شَدِيدًا)
“হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের ওপর চড়াও হয়েছিল। তখন আমি তাদের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলাম ঝঞ্ঝাবায়ু এবং এমন বাহিনী, যা তোমরা দেখোনি। তোমরা যা কিছু করো, আল্লাহ তা দেখেন। যখন তারা তোমাদের ওপর ও নিচ থেকে আক্রমণ করেছিল, যখন তোমাদের চোখ স্থির হয়ে গিয়েছিল, প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়েছিল এবং তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানা ধারণা পোষণ করছিলে। সেখানে মুমিনগণ পরীক্ষিত হয়েছিল এবং তারা ভীষণভাবে প্রকম্পিত হয়েছিল।” [সূরা আহযাব: ৯-১১]
অতঃপর আল্লাহ তায়ালা এই সূরার মাঝখানে বলেন:
(لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا )
“তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালের আশা রাখে এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে, তাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” [সূরা আহযাব: ২১]
এরপর মহান সত্তা আরও বলেন:
(وَلَمَّا رَأَى الْمُؤْمِنُونَ الْأَحْزَابَ قَالُوا هَذَا مَا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَصَدَقَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَمَا زَادَهُمْ إِلَّا إِيمَانًا وَتَسْلِيمًا (22) مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ فَمِنْهُمْ مَنْ قَضَى نَحْبَهُ وَمِنْهُمْ مَنْ يَنْتَظِرُ وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِيلًا (23) لِيَجْزِيَ اللَّهُ الصَّادِقِينَ بِصِدْقِهِمْ وَيُعَذِّبَ الْمُنَافِقِينَ إِنْ شَاءَ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَحِيمًا (24) وَرَدَّ اللَّهُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِغَيْظِهِمْ لَمْ يَنَالُوا خَيْرًا وَكَفَى اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ الْقِتَالَ وَكَانَ اللَّهُ قَوِيًّا عَزِيزًا (25) وَأَنْزَلَ الَّذِينَ ظَاهَرُوهُمْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ مِنْ صَيَاصِيهِمْ وَقَذَفَ فِي قُلُوبِهِمُ الرُّعْبَ فَرِيقًا تَقْتُلُونَ وَتَأْسِرُونَ فَرِيقًا (26) وَأَوْرَثَكُمْ أَرْضَهُمْ وَدِيَارَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ وَأَرْضًا لَمْ تَطَئُوهَا وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرًا )
“আর মুমিনরা যখন সম্মিলিত বাহিনীকে দেখল, তখন তারা বলে উঠল, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তো আমাদেরকে এরই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্যই বলেছেন।’ আর এতে তাদের ঈমান ও আত্মসমর্পণ কেবল বৃদ্ধিই পেয়েছিল। মুমিনদের মধ্যে এমন কিছু মানুষ রয়েছে, যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার সত্যে পরিণত করেছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের লক্ষ্য পূরণ করেছে (শাহাদাত বরণ করেছে), আর কেউ কেউ অপেক্ষায় আছে। তারা তাদের অঙ্গীকারে সামান্যতমও পরিবর্তন করেনি। যাতে আল্লাহ সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদিতার জন্য পুরস্কৃত করেন এবং মুনাফিকদেরকে ইচ্ছা করলে শাস্তি দেন অথবা তাদের তওবা কবুল করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর আল্লাহ কাফিরদেরকে তাদের ক্রোধসহ ফিরিয়ে দিয়েছেন, তারা কোনো কল্যাণ লাভ করতে পারেনি। মুমিনদের যুদ্ধের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট হয়েছেন এবং আল্লাহ চরম শক্তিধর, মহাপরাক্রমশালী। আর কিতাবীদের মধ্যে যারা তাদেরকে (কাফিরদের) সাহায্য করেছিল, তাদেরকে তিনি তাদের দুর্গ থেকে নামিয়ে আনলেন এবং তাদের অন্তরে আতঙ্ক ঢুকিয়ে দিলেন। ফলে তোমরা তাদের একদলকে হত্যা করছ এবং আরেক দলকে বন্দি করছ। আর তিনি তোমাদেরকে তাদের ভূমি, ঘরবাড়ি ও সম্পদের উত্তরাধিকারী করেছেন এবং এমন এক ভূমিরও (অধিকারী করেছেন) যেখানে তোমরা এখনো পা রাখোনি। আর আল্লাহ সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।” [সূরা আহযাব: ২২-২৭]
হুনায়নের যুদ্ধে আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূল এবং মুমিনদের উদ্দেশ্য করে বলেন:
(لَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ فِي مَوَاطِنَ كَثِيرَةٍ وَيَوْمَ حُنَيْنٍ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنْكُمْ شَيْئًا وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَّيْتُمْ مُدْبِرِينَ (25) ثُمَّ أَنْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَى رَسُولِهِ وَعَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَأَنْزَلَ جُنُودًا لَمْ تَرَوْهَا وَعَذَّبَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَذَلِكَ جَزَاءُ الْكَافِرِينَ )
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে বহু ক্ষেত্রে সাহায্য করেছেন এবং হুনায়নের দিনেও, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে উৎফুল্ল করেছিল; কিন্তু তা তোমাদের কোনো কাজেই আসেনি এবং পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের জন্য তা সঙ্কুচিত হয়ে গিয়েছিল। এরপর তোমরা পিঠ দেখিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলে। তারপর আল্লাহ তাঁর রাসূল ও মুমিনদের ওপর তাঁর প্রশান্তি নাজিল করলেন এবং এমন বাহিনী পাঠালেন যা তোমরা দেখতে পাওনি। আর তিনি কাফিরদের শাস্তি দিলেন; এটাই কাফিরদের প্রতিফল।” [সূরা তাওবাহ: ২৫-২৬]
বদরের যুদ্ধ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
(وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ بِبَدْرٍ وَأَنْتُمْ أَذِلَّةٌ فَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ (123) إِذْ تَقُولُ لِلْمُؤْمِنِينَ أَلَنْ يَكْفِيَكُمْ أَنْ يُمِدَّكُمْ رَبُّكُمْ بِثَلَاثَةِ آلَافٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ مُنْزَلِينَ (124) بَلَى إِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا وَيَأْتُوكُمْ مِنْ فَوْرِهِمْ هَذَا يُمْدِدْكُمْ رَبُّكُمْ بِخَمْسَةِ آلَافٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ مُسَوِّمِينَ (125) وَمَا جَعَلَهُ اللَّهُ إِلَّا بُشْرَى لَكُمْ وَلِتَطْمَئِنَّ قُلُوبُكُمْ بِهِ وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ )
“আর আল্লাহ বদরের যুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করেছিলেন যখন তোমরা ছিলে হীনবল। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারো। যখন তুমি মুমিনদের বলছিলে, ‘তোমাদের জন্য কি এটা যথেষ্ট নয় যে, তোমাদের রব তিন হাজার ফেরেশতা অবতীর্ণ করে তোমাদের সাহায্য করবেন?’ হ্যাঁ, যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, আর তারা (শত্রুরা) এখনই তোমাদের ওপর চড়াও হয়, তবে তোমাদের রব সুনির্দিষ্ট চিহ্নধারী পাঁচ হাজার ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের সাহায্য করবেন। আর আল্লাহ এটি কেবল তোমাদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ করেছেন, যাতে তোমাদের অন্তর প্রশান্তি লাভ করে। আর সাহায্য তো কেবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।” [সূরা আলে ইমরান: ১২৩-১২৬]
যুগে যুগে মুমিনদের প্রতি আল্লাহর সাহায্যের সম্পূর্ণ চিত্রটি সংক্ষেপে তুলে ধরে এমন আয়াতও রয়েছে, আল্লাহ তায়ালা বলেন:
(أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِعَادٍ (6) إِرَمَ ذَاتِ الْعِمَادِ (7) الَّتِي لَمْ يُخْلَقْ مِثْلُهَا فِي الْبِلَادِ (8) وَثَمُودَ الَّذِينَ جَابُوا الصَّخْرَ بِالْوَادِ (9) وَفِرْعَوْنَ ذِي الْأَوْتَادِ (10) الَّذِينَ طَغَوْا فِي الْبِلَادِ (11) فَأَكْثَرُوا فِيهَا الْفَسَادَ (12) فَصَبَّ عَلَيْهِمْ رَبُّكَ سَوْطَ عَذَابٍ (13) إِنَّ رَبَّكَ لَبِالْمِرْصَادِ )
“তুমি কি দেখোনি তোমার রব আদ জাতির সাথে কী আচরণ করেছিলেন? সুউচ্চ স্তম্ভবিশিষ্ট ইরাম গোত্রের সাথে? যাদের মতো অন্য কাউকে কোনো দেশে সৃষ্টি করা হয়নি? এবং সামূদ জাতির সাথে, যারা উপত্যকায় পাথর কেটে গৃহ নির্মাণ করত? এবং কীলক বিশিষ্ট (বিশাল বাহিনীর অধিকারী) ফেরাউনের সাথে? যারা দেশে সীমালঙ্ঘন করেছিল। এবং সেখানে প্রচুর ফাসাদ (বিপর্যয়) সৃষ্টি করেছিল। অতঃপর তোমার রব তাদের ওপর শাস্তির কশাঘাত হানলেন। নিশ্চয়ই তোমার রব সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।” [সূরা ফজর: ৬-১৪]
অতএব, আমরা যদি চাই যে আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন— আর আল্লাহ ছাড়া কোনো সাহায্যকারী নেই— তবে আমাদের অবশ্যই তাঁর শর্ত পূরণ করতে হবে: শক্তিশালী ঈমান, সঠিক আনুগত্য, একমাত্র তাঁর ওপর উত্তম তাওয়াক্কুল (নির্ভরতা), একমাত্র তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা এবং তাঁর নির্দেশের ওপর সুন্দর ধৈর্য ধারণ করা… আর একইসাথে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও দিকে হাত না বাড়ানো।
পরিশেষে আমরা বলব: এই দাওয়াত ততদিন বিজয়ী হবে না, যতদিন না ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা (আহলে কুওয়াহ) একে সাহায্য করবে, ঠিক যেমনটি মদীনার আনসারগণ রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সাহায্য করেছিলেন। আর এর জন্য প্রয়োজন সশস্ত্র দলগুলোর নেতাদের কেবল বিদ্রোহী না হয়ে ‘আহলে নুসরাহ’ বা সাহায্যকারীতে পরিণত হওয়া, এবং সামরিক বাহিনীর অফিসারদের (যারা দলত্যাগ করেছেন অথবা যারা এখনও চাকরিতে বহাল আছেন) আল্লাহর হুকুম কায়েমের জন্য দাওয়াতি দলের সাথে যুক্ত হওয়া, যাতে উভয়ের সমন্বয়ে কাজটি পূর্ণতা পায়। এই পূর্ণতা শরিয়তের দৃষ্টিতে অত্যাবশ্যকীয়, তা সিরিয়াতে হোক বা অন্য কোথাও… আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যদি আমাদের বিজয় দান করেন, তবে সমগ্র বিশ্ব বদলে যাবে। এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সাধারণ মুসলিমরা এর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এবং আমরা আজ যা নিয়ে কথা বলছি তাতেই পশ্চিমা বিশ্ব চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। অতএব, আসুন আমরা এই মহৎ কাজের দিকে মুসলিমদেরকে আহ্বান জানাই, যে কাজে মহান আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন, যাতে পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়।








