১. প্রস্তাবনা: আবেগ বনাম বাস্তবতা
সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক রাজনীতি এবং মুসলিম বিশ্বের জন্য অন্যতম একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা হলো পাকিস্তান, তুরস্ক এবং সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তি, যা ‘মক্কা প্যাক্ট’ বা ‘মক্কা চুক্তি’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। মক্কার পবিত্র ভূমিতে বসে, এহরাম পরিহিত অবস্থায় এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার ছবি যখন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন বিশ্বের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মনে আশার সঞ্চার হয়েছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো এবার ফিলিস্তিন, কাশ্মীর বা সিরিয়ার মজলুম মুসলিমদের রক্ষার্থে মুসলিম বিশ্ব এক হচ্ছে। পাকিস্তানের পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত রাস্তায় রাস্তায় এই চুক্তির সমর্থনে বিলবোর্ড টানানো হয়েছে। কিন্তু এই বাহ্যিক ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য এবং অপটিক্সের আড়ালে লুকিয়ে আছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা। এটি মূলত উম্মাহর ঐক্যের কোনো পদক্ষেপ নয়, বরং এটি পরাশক্তি আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদী বৈশ্বিক কৌশল বাস্তবায়নের একটি সুনিপুণ হাতিয়ার মাত্র।
২. সামরিক জোট গঠনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান স্ববিরোধিতা
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দুটি বা ততোধিক দেশের মধ্যে সামরিক জোট বা চুক্তি সাধারণত তখনই হয়, যখন তারা কোনো শক্তিশালী ও অভিন্ন শত্রুর সম্মুখীন হয়।
– ইতিহাসের শিক্ষা: প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির আগ্রাসন ঠেকাতে ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং পরবর্তীতে রাশিয়া ও আমেরিকা মিত্রশক্তি গঠন করেছিল। বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের বৈশ্বিক সমাজতান্ত্রিক বিস্তৃতি ঠেকানোর জন্য আমেরিকা ও ইউরোপ মিলে তৈরি করেছিল ‘ন্যাটো’ (NATO)। এর জবাবে সোভিয়েত ব্লক তৈরি করেছিল ‘ওয়ারশ প্যাক্ট’ (Warsaw Pact)। অর্থাৎ, জোট গঠনের প্রধান শর্তই হলো একটি দৃশ্যমান, শক্তিশালী অভিন্ন হুমকি।
– উম্মাহর সংকট ও জোটের অনুপস্থিতি: পাকিস্তান, তুরস্ক এবং সৌদি আরব আজ যে চুক্তি করল, তাদের সামনে সেই অভিন্ন শত্রুটি কে? গত ৬০-৭০ বছর ধরে ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমি ইহুদিবাদীদের দখলে, কাশ্মীর প্রায় সাত দশক ধরে দখলদারিত্বের শিকার। সেখানে তো কোনো জোট হয়নি! সিরিয়ায় ২০২১ সাল থেকে নতুন করে ইসরাইলি আগ্রাসন চলছে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে গত দুই বছর ধরে প্রতিনিয়ত বোমাবর্ষণ হচ্ছে, গাজাকে গত তিন বছর ধরে আক্ষরিক অর্থেই একটি উন্মুক্ত গোরস্থানে পরিণত করা হয়েছে। এর আগে আফগানিস্তানে ২০ বছর ধরে বোমাবর্ষণ করে লাখো মানুষ মারা হয়েছে, ইরাকে আগ্রাসন চালিয়ে সভ্যতা ধ্বংস করা হয়েছে। তখন এই তথাকথিত স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর শাসকরা কোথায় ছিলেন? কেন তখন ফিলিস্তিন বা আফগানিস্তানকে বাঁচানোর জন্য কোনো ‘মক্কা চুক্তি’ হয়নি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই এই চুক্তির আসল উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে যায়।
৩. চুক্তির নেপথ্যে আমেরিকার ‘বার্ডেন শেয়ারিং’ (বোঝা ভাগাভাগি) নীতি
এর শেকড় খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ২০১১-২০১২ সালের ওবামা প্রশাসনের দিকে।
– আমেরিকার সাম্রাজ্যিক ক্লান্তি: আফগানিস্তান ও ইরাকের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ আমেরিকার অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছিল। একদিকে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়, অন্যদিকে কফিনে মোড়ানো মার্কিন সৈন্যদের লাশ—আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছিল। ওবামা প্রশাসন তখন সিদ্ধান্ত নেয় “No further boots on ground” অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে আর কোনো মার্কিন সৈন্য সরাসরি যুদ্ধে নামবে না।
– চীনের উত্থান ও আমেরিকার পলিসি শিফট: আমেরিকা যখন মধ্যপ্রাচ্যের অন্তহীন যুদ্ধে আটকে ছিল, সেই সুযোগে চীন প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তিতে নিজেদের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে গড়ে তোলে। আমেরিকার নীতি-নির্ধারকরা বুঝতে পারেন, মধ্যপ্রাচ্যে আটকে থাকলে তারা চীনের কাছে বৈশ্বিক নেতৃত্ব হারাবে।
– ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’: আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চরম মেরুকরণ শুরু হয়। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (MAGA) আন্দোলন প্রশ্ন তোলে—কেন আমেরিকার জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পুরো বিশ্বের পুলিশিং করা হবে? কেন আমেরিকা ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে?
– বার্ডেন শেয়ারিং বা বোঝা ভাগাভাগি: এই প্রেক্ষাপটেই জন্ম নেয় আমেরিকার নতুন নীতি ‘Burden Sharing’। এই নীতির মূল কথা হলো—আমেরিকা আর নিজে রক্ত বা অর্থ ব্যয় করবে না। তারা শুধুমাত্র গোয়েন্দা তথ্য (Intelligence), প্রযুক্তি (Technology) এবং কৌশলগত পরিকল্পনা (Strategic Planning) নিয়ন্ত্রণ করবে। আর যুদ্ধক্ষেত্রে রক্ত (Human Cost) দেবে তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা, ট্যাঙ্ক ও অস্ত্র কিনবে মিত্ররা এবং যুদ্ধের পুরো অর্থনৈতিক ব্যয়ভার (Financial Cost) বহন করবে মিত্র রাষ্ট্রগুলো।
এই চুক্তির মাধ্যমে মূলত আমেরিকা তার অনুগত তিন মিত্র—পাকিস্তান, তুরস্ক এবং সৌদি আরবকে মধ্যপ্রাচ্যের পাহারাদারের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছে। আমেরিকা চাইছে এরা যেন তাদের হয়ে ইরানের প্রভাব ঠেকায় এবং অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখে, যাতে আমেরিকা নিশ্চিন্তে এশিয়া-প্যাসিফিকে চীনের দিকে মনোযোগ দিতে পারে।
৪. ধর্মীয় অনুভূতির নিপুণ ব্যবহার বনাম বাস্তবতার ভণ্ডামি
চুক্তির নাম দেওয়া হয়েছে ‘মক্কা প্যাক্ট’। নেতারা এহরাম পরে ছবি তুলছেন। কিন্তু চুক্তির মূল খসড়া বা দলিলে কোথাও আল্লাহ বা রাসুল (সা.)-এর নাম নেই, নেই ইসলামি ভ্রাতৃত্বের কোনো উল্লেখ। সেখানে লেখা হয়েছে দেশগুলোর ‘ঐতিহাসিক সম্পর্কের’ কথা।
এটি একটি নিছক রাজনৈতিক অপটিক্স বা জনসংযোগ কৌশল। আলোচকরা স্মরণ করিয়ে দেন যে, যদি এই শাসকরা সত্যিই তওবা করে উম্মাহর স্বার্থে এক হতেন, তবে ৬ আগস্ট রাতে চুক্তি স্বাক্ষরের পর ৭ আগস্ট তাদের ঘোষণা দেওয়ার কথা ছিল যে—”আমাদের যৌথ বাহিনী গাজা বা কাশ্মীরের দিকে মার্চ করছে।” কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে?
– সৌদি আরব: তারা এখনও ইয়েমেনে বোমাবর্ষণ করছে। আমেরিকার নির্দেশে পেট্রো-ডলার টিকিয়ে রেখেছে।
– তুরস্ক: তারা এখনও ইসরাইলের সাথে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরাইলি নাগরিকদের তুরস্কে প্রবেশের জন্য কোনো ভিসার প্রয়োজন হয় না। ন্যাটো সদস্য হিসেবে তারা পশ্চিমাদের অন্যতম প্রধান মিত্র।
– পাকিস্তান: ‘ওয়ার অন টেরর’-এ আমেরিকার মিত্র হয়ে নিজ দেশের মানুষের ওপরই অভিযান চালিয়েছে। আমেরিকার সিগন্যাল পেয়ে কাশ্মীর নীতি থেকে সরে এসেছে।
সুতরাং, এই চুক্তি উম্মাহর স্বার্থে নয়, বরং যেটুকু ইসলামি মোড়ক দিলে জনগণ খুশি থাকে এবং আমেরিকাও নারাজ হয় না, ঠিক ততটুকুই করা হয়েছে।
৫. ইসরাইল-ইরান সমীকরণ এবং ব্যালেন্স অফ পাওয়ার
আমেরিকার কাছে ইসরাইল হলো মধ্যপ্রাচ্যের বুকে বসানো তাদের একটি বিশাল সামরিক ঘাঁটি (Military Base), যা আগে ব্রিটেনের ছিল। আমেরিকার মূল লক্ষ্য এই ঘাঁটিকে টিকিয়ে রাখা। কিন্তু অনেক সময় উগ্র ইসরাইলি নেতারা আমেরিকার বেঁধে দেওয়া সীমানা পার করে অতি-উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে ওঠে (যেমন গ্রেটার ইসরাইল গড়ার স্বপ্ন)। ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও মাঝে মাঝে ইসরাইলি নেতাদের ধমক দিয়ে লাইনে রাখতে হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরান সরাসরি আমেরিকার আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করেছে। আমেরিকা চাইছে মধ্যপ্রাচ্যে একটি ‘ব্যালেন্স অফ পাওয়ার’ বা ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করতে। একদিকে পাকিস্তান-তুরস্ক-সৌদি জোট, অন্যদিকে ইসরাইল, গ্রিস, সাইপ্রাস, আরব আমিরাত ও ভারতের আরেকটি অঘোষিত অক্ষ। আমেরিকা এই দুই পক্ষকে এমনভাবে ব্যালেন্স করতে চায়, যাতে কেউ মাত্রাতিরিক্ত শক্তিশালী না হয়, আবার কেউ ধ্বংসও না হয়। এতে করে আমেরিকাকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে হবে না, শুধু দূর থেকে কলকাঠি নাড়লেই চলবে।
৬. অতীতের ব্যর্থ জোটগুলোর করুণ ইতিহাস
মুসলিম বিশ্বের নামে এর আগেও বহু জোট হয়েছে, যার প্রতিটিই চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
– আরব লীগ (১৯৫০): তাদেরও মূলনীতি ছিল “একজনের ওপর আক্রমণ সবার ওপর আক্রমণ”। কিন্তু ১৯৬৭ ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধে এই জোট পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।
– বাগদাদ প্যাক্ট (১৯৫৫): পশ্চিমা এজেন্ডায় তৈরি এই জোট ইরাকে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
– ওআইসি (OIC): বায়তুল মুকাদ্দাস রক্ষার প্রতিশ্রুতি নিয়ে তৈরি হলেও, ইসরাইল শত শত বার রেড লাইন ক্রস করার পরও ওআইসি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
– ৩৪ দেশের সামরিক জোট: কয়েক বছর আগে জেনারেল রাহিল শরীফের নেতৃত্বে সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে যে জোট হয়েছিল, তার পেছনের সত্যটি ছিল ভয়াবহ। ওয়াশিংটন ডিসি থেকে একটি ফ্যাক্স আসে এবং কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই, রূপরেখা বা মেনিফেস্টো তৈরি হওয়ার আগেই পাকিস্তান ও সৌদি আরব তাতে স্বাক্ষর করে দেয়। অর্থাৎ, হুকুম এসেছিল আমেরিকা থেকে।
এই ন্যাশন-স্টেট বা জাতিরাষ্ট্রভিত্তিক জোটগুলো ব্যর্থ হওয়ার মূল কারণ হলো ‘কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট’ বা স্বার্থের দ্বন্দ্ব। যখনই তুরস্ক বা সৌদি আরবের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ (যেমন ভারতের সাথে বাণিজ্য বা ন্যাটোর সাথে সম্পর্ক) সামনে আসবে, তখনই এই জোটগুলো অকার্যকর হয়ে যাবে।
৭. যুদ্ধের পরিবর্তিত সমীকরণ: প্রযুক্তির নতুন রূপ
বিংশ শতাব্দীতে পরাশক্তি হওয়ার মাপকাঠি ছিল বিশাল বিমানবাহী রণতরী (Aircraft Carrier), অত্যাধুনিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এবং পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার জেট। আমেরিকা এই শক্তি দিয়েই পুরো বিশ্বকে ভয় দেখিয়ে রাখত। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এই ‘ইনভিন্সিবিলিটি’ বা অজেয় হওয়ার মিথ ভেঙে গেছে।
ইরান বা ইয়েমেনের মতো দেশগুলো প্রমাণ করেছে যে, সস্তা কিন্তু নিখুঁত ড্রোন এবং হাইপারসনিক মিসাইল দিয়ে বিলিয়ন ডলারের মার্কিন বা ইসরাইলি এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম অকার্যকর করে দেওয়া সম্ভব।
এখানে একটি বড় প্রশ্ন জাগে—যদি সীমিত সামরিক ক্ষমতা নিয়েও কেউ আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে, তবে তুরস্কের মতো ড্রোন পরাশক্তি, পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক শক্তি এবং সৌদি আরবের মতো অত্যাধুনিক বিমানবাহিনীর অধিকারী দেশগুলো কেন গাজাকে বাঁচাতে পারছে না? তাদের তো সক্ষমতার অভাব নেই। অভাব শুধু সদিচ্ছার। তারা চাইলেই আমেরিকার আধিপত্যকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে চিরতরে মুছে দিতে পারে, কিন্তু তারা তাদের বিদেশি প্রভুদের নির্দেশনার বাইরে যেতে নারাজ।
৮. ইসলামি শরীয়ত ও ফিকহের দৃষ্টিকোণ: উম্মাহর একটিমাত্র পরিচয়
যদি প্রশ্ন করা হয়—তিন-চারটি মুসলিম রাষ্ট্র মিলে জোট করা ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে কেমন?
ইসলামি ফিকহ বা আইনশাস্ত্রের কোথাও এরকম একাধিক মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে জোট গঠনের কোনো অধ্যায় নেই। কেন নেই? কারণ ইসলাম মুসলিম বিশ্বকে একাধিক রাষ্ট্রে বিভক্ত হওয়াকেই স্বীকৃতি দেয় না।
– একক সত্তা: ইসলাম পুরো উম্মাহকে একটি একক শরীর বা রাষ্ট্র (খিলাফত) হিসেবে দেখে। যেমন, পাকিস্তানের পেশোয়ার কোর এবং লাহোর কোরের মধ্যে যুদ্ধ লাগলে কী হবে বা তারা একে অপরকে সাহায্য করবে কি না—এমন প্রশ্ন যেমন অবান্তর (কারণ তারা একই সেনাপ্রধানের অধীনে), তেমনি মক্কা, কায়রো, দামেস্ক বা বাগদাদের মধ্যে জোট গঠনের ধারণাও ইসলামের কাছে অবান্তর। কারণ তারা সকলেই এক নেতার (খলিফা) অধীনে থাকার কথা।
– বিভাজনকে বৈধতা দান: যখন স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরব জোট করে এবং বলে যে “আমরা ভাই ভাই”, তখন তারা মূলত এই পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেওয়া কৃত্রিম সীমানা এবং বিভাজনকেই স্থায়ী রূপ দেয়।
– কাফিরদের সাথে জোট সম্পূর্ণ হারাম: ইসলামি শরীয়তে কুফফার বা অমুসলিম পরাশক্তির (যেমন আমেরিকা) এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য তাদের সাথে বা তাদের ইশারায় সামরিক জোট করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে আমাদের জানিয়েছেন যে মুসলিমরা কাফিরদের আগুন থেকে আলো গ্রহণ করে না।
৯. বর্তমান সুযোগ, নেতৃত্বের শূন্যতা এবং উম্মাহর ভবিষ্যৎ
বর্তমানে আমেরিকা বিশ্বমঞ্চে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে পালাতে চাইছে। মুসলিম বিশ্বের সামনে আজ এক বিশাল সুযোগ (Opportunity) উপস্থিত হয়েছে।
চারটি পুঁজি: মুসলিম বিশ্বের হাতে আজ ৪টি বিশাল পুঁজি রয়েছে:
১. সামরিক পুঁজি (Military Capital): বিশাল সেনাবাহিনী, ড্রোন, মিসাইল ও পারমাণবিক অস্ত্র।
২. রাজনৈতিক পুঁজি (Political Capital): পুরো বিশ্বের জনমত আজ ফিলিস্তিনের পক্ষে।
৩. আধ্যাত্মিক পুঁজি (Spiritual Capital): আল্লাহর সাহায্য এবং উম্মাহর কোটি কোটি মানুষের দোয়া।
৪. আর্থিক পুঁজি (Financial Capital): আরব বিশ্বের ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ।
– কী করতে হবে? মুসলিম বিশ্বের সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক কর্মকর্তাদের প্রতি একটি উদাত্ত আহ্বান জানান। তাদের বয়স এখন ৬০-এর কোঠায়। আখেরাতে আল্লাহর সামনে তাদের একা দাঁড়াতে হবে। চাকরির মায়া ত্যাগ করে তাদের উচিত এই পশ্চিমা দালাল শাসকদের উৎখাত করে প্রকৃত ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করা। যদি আজ তারা গাজা মুক্তির জন্য এই বিশাল সামরিক শক্তি নিয়ে অগ্রসর হয়, তবে পুরো উম্মাহ তাদের পেছনে এসে দাঁড়াবে।
– সাহাবিদের শিক্ষা: সাহাবি সাদ ইবনে মুয়ায (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর মাত্র ৬ বছর বেঁচে ছিলেন। কিন্তু তিনি মদীনার ক্ষমতা রাসূল (সা.)-এর হাতে তুলে দিয়ে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যে ভূমিকা রেখেছিলেন, তার মৃত্যুর পর স্বয়ং আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠেছিল এবং ৭০ হাজার ফেরেশতা তার জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন। আজকের মুসলিম সেনাপতিদের সামনেও ঠিক একই সুযোগ রয়েছে ইতিহাস রচনা করার।
উপসংহার
পরিশেষে, ‘মক্কা চুক্তি’ কোনোভাবেই মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক নয়; এটি কেবলই আমেরিকার ‘বার্ডেন শেয়ারিং’ নীতির একটি সফল প্রয়োগ। যতক্ষণ না মুসলিম বিশ্ব এই জাতিরাষ্ট্রের বিভাজন থেকে বেরিয়ে এসে, পশ্চিমা আধিপত্যের শৃঙ্খল ভেঙে একটি একক ইসলামি নেতৃত্বের (খিলাফত) অধীনে সংঘবদ্ধ হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ ধরনের শত শত চুক্তি গাজার একটি শিশুর রক্তপাতও ঠেকাতে পারবে না। ফিলিস্তিন বা কাশ্মীরের মুক্তি আসবে তখন, যখন মুসলিম সেনাবাহিনী আমেরিকার এজেন্ডা নয়, বরং কেবলই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত পথে মজলুমের ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে যাবে।








