ডোনাল্ড ট্রাম্প কি সত্যিই গাজার দখল নিতে চলেছে?

মার্কিন রাষ্ট্রপতি তার অদ্ভুত বক্তব্যের জন্য পরিচিত, কিন্তু এই ধরনের মন্তব্যের চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে তা এখনো দেখার বাকি আছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাষ্ট্রপতিত্বের একটি ভালো দিক আছে: সে যা আছে তা-ই বলে। এবং আমেরিকা যা ভাবে তা সে গোপন করে না।

কয়েক দশক ধরে, হ্যারি ট্রুম্যান, বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা, অথবা জো বাইডেন যে-ই হোক না কেন, আমরা ফিলিস্তিনিদের প্রতি “ন্যায়বিচার করার” কথা বলতে শুনেছি।

আমরা বারবার “ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র” তৈরির প্রতিশ্রুতি শুনেছি যা রাষ্ট্রের প্রকৃত অর্থে বাস্তবসম্মত নয়!

ট্রাম্প অবশ্যই তার ভেতরকার কথা বলে থাকে।

কিন্তু এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট এমনভাবে কথা বলে থাকে ঠিক যেভাবে আমেরিকা ভাবে তাদের ক্ষেত্রে হওয়া উচিত।

মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে সে বলে,

“আমেরিকা গাজা উপত্যকা দখল করবে এবং আমরা এতে কাজও করব।

আমরা এর মালিক হব এবং এ অঞ্চলে থাকা সমস্ত বিপজ্জনক অবিস্ফোরিত বোমা এবং অন্যান্য অস্ত্র নিস্ক্রিয় করে ফেলার দায়িত্ব পালন করব।

অঞ্চলটি সমতল করব এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনগুলো সরিয়ে ফেলব। এমন অর্থনৈতিক উন্নয়ন তৈরি করব যা এলাকার মানুষের জন্য সীমাহীন সংখ্যক কর্মসংস্থান এবং আবাসন সরবরাহ করবে।

আমাদের এমন কিছু করার সুযোগ রয়েছে যা অসাধারণ হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের রিভেরা (আকর্ষনীয় উপকূল)। এটি দুর্দান্ত কিছু হতে পারে।”

যায়নবাদী রাষ্ট্র মূলত একটি ইউরোপীয় উপনিবেশ

আমরা যারা কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্য পর্যবেক্ষণ করেছি তারা ভালো করেই জানি যে ফিলিস্তিনের ইহুদিবাদী দখলদারিত্ব মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী একটি উপনিবেশ ছাড়া আর কিছুই নয়।

প্রকৃতপক্ষে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশরা মূলত এই দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল।

কিন্তু এখন, ৭৫ বছরেরও বেশি সময় পর এই প্রথম ট্রাম্প প্রস্তাব করছে যে ফিলিস্তিনের অংশ, অর্থাৎ গাজা উপত্যকা, সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশভুক্ত করা উচিত।

এই বিষয়ে প্রতিটি সচেতন মহল – তা সে ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের মতো ইসরাইলপন্থী পশ্চিমা সরকার হোক কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দালাল রাষ্ট্র হোক – এই প্রস্তাবের নিন্দা করেছে।

তারা সকলেই জানে যে এটি অকার্যকর প্রস্তাব।

মধ্যপ্রাচ্যের দালাল রাষ্ট্রগুলোও নড়েচড়ে উঠেছে

মধ্যপ্রাচ্যের দালাল রাষ্ট্রগুলো – উপসাগরীয় ও আশেপাশের সরকারসমূহ, যেমন মিশরের সিসির শাসন – নিঃসন্দেহে তাদের সেরা সময়েও বিপজ্জনকভাবে ভঙ্গুর।

যদি তারা গাজার জাতিগত নির্মূল এবং সরাসরি মার্কিন দখলদারিত্ব মেনে নেয়, সেইসাথে লক্ষ লক্ষ শরণার্থী তাদের দেশে প্রবেশ করে, তবে তারা নিশ্চিতভাবে জানে যে এর ফলে যে ভিন্নমত এবং অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে তা তাদের নিজস্ব অবস্থানের জন্য হুমকিস্বরূপ হবে।

ট্রাম্পের চিন্তা প্রক্রিয়া বোঝা

একটি সম্ভাব্য কারণ

তাহলে উপরের কথা অনুযায়ী এই প্রশ্ন উঠে, ট্রাম্প কেন এই প্রস্তাব দিচ্ছে?

এর একটা কারণ হতে পারে যে, ট্রাম্পের ব্যবসা করার ধরণই এটি। সে এমন একজন ব্যবসায়ী যে সে যা কিনতে চায় তা এত কম দামে কিনতে চায় এবং তার জন্য দর কষাকষি শুরু করে যে, এটি বিক্রেতার জন্য অপমানজনক হয়!

কিন্তু একই সাথে সে এমন একজন ব্যবসায়ীও যার পেছনে শক্তি (muscle) আছে।

সে বাজারের সেই সওদাগরদের মতো যে কৃষকদেরকে দিয়ে একেবারেই কম দামে সবজি বিক্রি করাতে পারে, এমনকি যদি তাদের দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিও থাকে… কারণ তাদের কাছে তা করার মতো আর্থিক শক্তি আছে।

এবং আন্তর্জাতিক ময়দানে ট্রাম্পের ঠিক এটাই কর্মপদ্ধতি।

সে আমেরিকার পক্ষে এতটাই দৃঢ়ভাবে এজেন্ডা স্থাপন করে যে এটি যে কোনও বহিরাগত পর্যবেক্ষকের কাছে অযৌক্তিক বলে মনে হবে।

কিন্তু ফলাফল হল হয় সে যা চায় তা পায়, অথবা সে যা চায় তার একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পায়, এমনকি যদি তাকে তার দর কষাকষির অবস্থানের সাথে আপস করতে বাধ্যও করা হয়।

এবং এটি কেবল এই কারণে যে সে একটি হাস্যকর জায়গা থেকে তার দর কষাকষি শুরু করেছিল।

আরেকটি ব্যাখ্যা?

আরেকটি সম্ভাবনা হল, ট্রাম্প সত্যিই মনে করে যে ইহুদিবাদী আক্রমণে গাজা এতটাই ধ্বংসপ্রাপ্ত যে কেউই এমন অঞ্চলে থাকতে চাইবে না।

যদি তাই হয় (এবং আমার সন্দেহ আছে যে তা সত্য), তাহলে ট্রাম্প ফিলিস্তিনের জনগণ এবং গাজার জনগণকে চেনে না।

এই জনগোষ্ঠীকে ১৯৪৮ সালে এবং তার আগে তাদের বাড়িঘর থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল এবং অনেকেই পশ্চিম তীর, গাজা এবং লেবাননের শরণার্থী শিবিরে অথবা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য স্থানে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করে আসছেন।

ফিলিস্তিনি জনগণ তাদের নতুন জীবনযাত্রাকে “সুন্দর” বলে মনে করে না। তাই, তারা তার সাথে একমত হবে না, এবং তারা আশা করবে না যে গাজা থেকে স্থানান্তরের তার প্রতিশ্রুতি আজ পর্যন্ত তাদের অভিজ্ঞতার চেয়ে ভালো কিছু হবে।

ট্রাম্প বোকা না; সে মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে সরাসরি ভালোভাবে অবগত নাও হতে পারে, তবে সে নিজেকে এমন উপদেষ্টাদের সাথে ঘিরে রাখবে যারা বিষয়গুলো জানে এবং বুঝবে যে তার প্রস্তাবগুলি ইহুদিবাদী দখলদারদের বাদে অঞ্চলের যেকোনো গোষ্ঠীর কাছেই অগ্রহণযোগ্য হতে পারে।

তৃতীয় সম্ভাব্য ব্যাখ্যা

তৃতীয় সম্ভাবনা হলো, তার এবং যুক্তরাষ্ট্রের অহংকারের কারণে, সে সত্যিকার অর্থেই বিশ্বাস করে যে দেশটির এমন ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব রয়েছে যে এই অঞ্চলে একে একটি সৎ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখা যায়।

সে এমনকি এও বিশ্বাস করতে পারে যে গাজা পুনর্নির্মাণ করে এবং মিশর ও জর্ডানকে শরণার্থীদের গ্রহণে উৎসাহিত করে আমেরিকা এই অঞ্চলে শান্তি আনতে পারবে, একই সাথে উপসাগরীয় দেশগুলোকে স্থানান্তরের জন্য অর্থায়নের জন্য চাপ দিতে হবে যাতে তারা কোনোরকম ভালো পরিস্থিতিতে (সেখানে) বসবাস করতে পারে।

এই স্তরের অহংকার ও দম্ভ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বিপর্যয়ের বীজ বপন ছাড়া আর কিছু হিসাবে দেখা কঠিন।

এটি অহংকারের এমন এক পর্যায় যা ইরাক যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে “স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র” আনতে চলেছে অথবা এটিকে স্বাগত জানানো হবে, এই ধারণার চেয়েও বড়!

যায়নবাদী শাসনের প্রতি পশ্চিমাদের সমর্থন

গত ১৫ মাস ধরে, গণহত্যা, ফিলিস্তিনের জাতিগত নির্মূল এবং অকথিত যুদ্ধাপরাধের সমর্থনে আমরা পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিটি পবিত্র মূল্যবোধ (sacred cow)-কে তাদের নিজস্ব হাতে জবাই করতে দেখেছি।

আমরা দেখেছি যে পশ্চিমা নেতারা রাজনৈতিকভাবে এটিকে সমর্থন করেছে এবং সামরিকভাবে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের জন্য ইহুদিবাদী দখলদারদের অস্ত্র সরবরাহ করেছে। এই নতুন প্রস্তাব একই দিকের কেবল আরেকটি পদক্ষেপ।

ট্রাম্প বিশ্বের অন্য অংশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দখলকে ন্যায্যতা দিচ্ছে, কারণ সে মনে করে আমেরিকা পারবে!

উপসংহার

আমার বিশ্বাস, হয় ট্রাম্প এই পরিকল্পনা থেকে সরে আসবে এবং কম কিছু পাবার জন্য আপস করবে – যদিও সেটাও নিঃসন্দেহে ফিলিস্তিনিদের জন্য ক্ষতিকর হবে – অথবা যদি সে এগিয়ে যায়, তাহলে সে ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধের চেয়েও অঞ্চলটিকে বেশি অস্থিতিশীল করবে।

এবং যদি অঞ্চলটি অস্থিতিশীল হয়, তাহলে সে সেই দিনের জন্য অনুশোচনা করতে পারে যেদিন সে মধ্যপ্রাচ্যে ভঙ্গুর শাসনব্যবস্থার পতনের সূচনা করেছিল, যারা কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলের জনগণের স্বার্থের চেয়ে তাদের নিজস্ব এবং পশ্চিমা স্বার্থ সুরক্ষিত করে আসছে।

প্রকৃতপক্ষে, এটিই হতে পারে ফিলিস্তিনের মুক্তি এবং এই অঞ্চলে আরও উন্নততর শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার দিকে প্রথম পদক্ষেপ, যা সকল মানুষের জন্য শান্তি, ন্যায়বিচার এবং নিরাপত্তা বয়ে আনবে।

কেবলমাত্র ইসলামী শাসনের ইতিহাসেই মুসলিম, ইহুদি এবং খ্রিস্টানরা যে কোনও উল্লেখযোগ্য সময়ের জন্য শান্তি ও ন্যায়বিচারের সাথে বসবাস করতে পেরেছে এবং করেছে।

আমরা দু’আ করি যে আমরা সেই সময়টি আবারও পুনরুদ্ধার হতে দেখতে পাব!

২ thoughts on “ডোনাল্ড ট্রাম্প কি সত্যিই গাজার দখল নিতে চলেছে?”

Leave a Reply