মিশনারী আগ্রাসন | ইসলামী রাষ্ট্র

[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]

মিশনারী আক্রমন: ইসলামী রাষ্ট্রে বিজ্ঞানের নাম করে ইউরোপের অনুপ্রবেশ শুরু হয়ে গিয়েছিল। এ কাজের জন্য তাদের মোটা অংকের অর্থ বরাদ্দ ছিল। মূলতঃ এটি ছিল বিজ্ঞান ও মানবতার নামে মিশনারীদের (ধর্মপ্রচার প্রতিষ্ঠান) ছদ্মাবরণে পরোক্ষভাবে উপনিবেশিকতার প্রসার। এ আক্রমনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল মুসলিম ভূখন্ডে রাজনৈতিক গোয়েন্দা শাখা কার্যকর করতে এবং সাংস্কৃতিক উপনিবেশিকতার বিপ্লব ঘটাতে, যাতে করে মুসলিম ভূখন্ড গুলো পশ্চিমা কুচক্রীদের অন্যতম প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। এ উপনিবেশবাদের সূচনা হয় যখন মুসলিম বিশ্ব পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুপ্রবেশের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিল এবং এটি মূলত পরিচালিত হয়েছিল ফরাসী, ইংরেজ ও মার্কিণ মিশনারীদের মাধ্যমে।

ফলাফল স্বরূপ এ মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে ফরাসী ও ইংরেজরা প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। এরা মূলত জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান চালিকা শক্তিতে পরিণত হয়েছিল যারা প্যান আরব ও প্যান তুর্কীবাদকে উৎসাহিত করেছিল। পাশাপাশি শিক্ষিত মুসলিমদের পশ্চিমাভিমুখী করার ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। এর পিছনে প্রধানত দুটি লক্ষ্য ছিল। প্রথমত: বর্ণবাদকে উস্কে দিয়ে উসমানী রাষ্ট্র তুরস্ক হতে আরবদের বিচ্ছিন্ন করা ও সেই সুবাদে ইসলামী রাষ্ট্রে ফাটল সৃষ্টি করা। দ্বিতীয়ত: মুসলিমদের অজ্ঞতার সুযোগে তাদের ইসলামের প্রকৃত বন্ধন সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ করে তোলা।

মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সঙ্কল্পনার (স্কীম) মাধ্যমে প্রথম পর্বটি ভালোমত সম্পন্ন করলেও দ্বিতীয় বিষয়টি অসম্পূর্ণ রয়ে গিয়েছিল। এ বিষয়টিকে তারা তুরস্ক, আরব, পারস্য এবং অন্যান্য জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উপর ছেড়ে দিয়েছিল যা মুসলিমদের ঐক্য বিনষ্ট করতে ও ইসলামের মূলনীতি হতে বিচ্ছিন্ন করতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল।

মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করেছিল বিভিন্ন পর্যায়ে এবং তার ফলাফল পুরো মুসলিম বিশ্বেই পরিলক্ষিত হয়েছিল। বর্তমানে আমরা যে দুর্বলতা ও অধঃপতন প্রত্যক্ষ করছি তা এই সংগঠনগুলোর প্রচেষ্টার ফলাফল। উপনিবেশবাদী শক্তি গুলোই আমাদের অগ্রযাত্রায় বাঁধার প্রাচীর সৃষ্টিতে প্রথম ইটটি স্থাপন করেছিল যা পরবর্তীতে আমাদের ও আমাদের আদর্শের মাঝে একটি দুর্জ্জেয় ব্যবধান রচনা করে দিয়েছে।

ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো মুসলিম বিশ্বে তাদের মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরী করেছিল কারণ মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদের মিথ্যা প্রচারণা (propaganda) কোন কার্যকর ফল বয়ে আনছিল না। ক্রুসেডের বিরুদ্ধে জিহাদে মুসলিমরা তাদের ধৈর্য্য, সাহস এবং শক্তিমত্তার স্বাক্ষর রেখেছিল। যখন যুদ্ধক্ষেত্রে ক্রুসেডারগণ মুসলিমদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হয়েছিল, তখন তারা মূলত দুটি বিষয়ের উপর ভরসা করেছিল। এগুলো ছিল তাদের নিজস্ব হিসাব প্রসূত এবং এক্ষেত্রে তারা সাফল্যের ব্যাপারে ব্যাপক আশাবাদী ছিল। তারা ধারণা করেছিল এ দুটি বিষয় ইসলাম ও মুসলিমদের চিরতরে নিশ্চিহ্ন করতে প্রধান ভূমিকা রাখবে।

প্রথমতঃ তারা মুসলিম বিশ্বে বসবাসরত, বিশেষত আল শাম অঞ্চলের খৃষ্টানদের উপর নির্ভর করেছিল। কারণ তারা সংখ্যায় ছিল অনেক এবং অত্যন্ত ধার্মিক। ইউরোপীয়রা তাদের অভিন্ন বিশ্বাসের ভাই হিসাবে বিবেচনা করত। ইউরোপীয়দের ধারণা ছিল ধর্মীয় যুদ্ধের খাতিরে তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও গুপ্তচরবৃত্তিতে তাদের সহায়তা করবে।

দ্বিতীয়তঃ ইউরোপীয়রা তাদের সংখ্যাধিক্য ও শক্তিমত্তার উপর বেশ আস্থাশীল ছিল। তারা জানত যে মুসলিমরা ইতিমধ্যেই বিভক্ত হয়ে পড়েছিল এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে বিবাদে লিপ্ত থাকত। স্পষ্টতঃ তাদের ঐক্যে ফাটল ধরেছিল। ইউরোপীয়রা ধারণা করত, একবার মুসলিমদের পরাজিত করতে পারলে তারা চিরতরে তাদের পদানত হবে ও সমূলে ধ্বংস হবে এবং তাদের দ্বীন কতগুলো আচার সর্বস্ব অনুষ্ঠানে পরিণত হবে। অবশ্য বাস্তবে তাদের এ আশা ভেস্তে গিয়েছিল এবং তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও বিফলে গেল। তারা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে লক্ষ্য করল যে রণক্ষেত্রে মুসলিমদের পাশাপাশি আরব খৃষ্টানরা ইউরোপীয়দের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ করেছিল। ইউরোপীয়দের যাবতীয় মিথ্যা প্রচারণা তাদের উপর কোন কার্যকর প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। ইউরোপীয়রা যে বিষয়টি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল তা হচ্ছে, আরব খৃষ্টানরা মুসলিমদের সাথে একত্রে বসবাস করত, সমঅধিকার ভোগ করত এবং রাষ্ট্রের প্রতি সমান দায়িত্ব পালন করত। মুসলিমরা তাদের নিকট হতে খাবার গ্রহণ করত, খৃষ্টান নারীদের বিয়ে করত, তাদের দৈনন্দিন কাজে অংশীদার ছিল এবং তাদের অধিকার সংরক্ষণ করত।

খলীফা ও গভর্নরগণ রাষ্ট্রে আইনের শাসন ন্যায় সম্মতভাবে বাস্তবায়ন করতেন। আল কুরাফী এবং ইবনে হায়াম লিখেছেন,

“যদি আগ্রাসী শক্তি আমাদের ভূখণ্ডকে আক্রমন করে তবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে যিন্মিদের রক্ষা করা আর এজন্য প্রয়োজনে আমরা জীবন দেব। এ দায়িত্ব পালনে সামান্য অবহেলা যিম্মীদের অধিকার লঙ্ঘনের শামিল হবে।”

আল কুরাফী আরো বলেছেন,

“যিম্মিদের প্রতি মুসলিমদের দায়িত্ব হচ্ছে ভদ্র ব্যবহার, দুরবলদের প্রতি সহমর্মিতা, দরীদ্রদের সাহায্য, ক্ষুধার্তদের আহারের ব্যবস্থা করা, তাদের জন্য পোষাকের ব্যবস্থা করা এবং তাদের সাথে মার্জিতভাবে কথা বলা। মুসলিমদের প্রত্যাঘাত করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রতিবেশীদের আঘাতকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা উচিত। যে কোন সংকর্মশীল ধর্মপরায়ণ মুসলিমের দায়িত্ব হচ্ছে তাদের প্রতি উত্তম উপদেশ দেয়া, তাদের সম্পদ, পরিবার, সম্মান ও অধিকার রক্ষা করা।”

একথা বিবেচনা করলে মুসলিমদের সহযোগী হিসাবে খৃষ্টানদের লড়াই করার বিষয়টি স্বাভাবিক। ইউরোপীয়রা আরো বিস্মিত হল যখন দেখল তাদের দ্বিতীয় কৌশলটিও বাস্তব ফল বয়ে আনতে ব্যর্থ হল। তারা আল শাম দখল করে নিয়েছিল এবং মুসলিমদের সামগ্রিকভাবে পরাজিত করেছিল। তারা নিকৃষ্টতম নৃশংসতার স্বাক্ষর রেখেছিল এবং এ সময় তারা প্রথমবারের মত ব্যাপকভাবে মুসলিমদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করেছিল যা আজও অব্যাহত রয়েছে। তারা ধারণা করেছিল, সবকিছুই তাদের পক্ষে গিয়েছে এবং মুসলিমরা আর কোনদিন তাদের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। অবশ্য মুসলিমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল যে তাদের ভূখণ্ড থেকে দখলদার বাহিনীকে অপসারণ করতে হবে। যদিওবা প্রায় দুইশত বছর ক্রুসেডারগণ মুসলিম ভূখণ্ড দখল করে রেখেছিল এবং ইতিমধ্যে তারা তাদের সাম্রাজ্য ও principalities স্থাপন করেছিল, কিন্তু মুসলিমরা অবশেষে তাদের বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়েছিল।

ইউরোপীয়রা মুসলিমদের এ অভাবিত সাফল্যের রহস্য উদ্ঘাটনে মনোযোগ দিল। তারা লক্ষ্য করল এর বীজ ইসলামেই নিহিত আছে। মুসলিমদের শক্তির উৎস হচ্ছে তাদের আকীদা এবং তার সাথে যুক্ত হয়েছিল আইনকানুন ও অমুসলিমদের অধিকার সংরক্ষণের অনুপম ব্যবস্থাটি। ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের ঐক্যের পিছনে এটিই ছিল মূল কারণ। তাদের সময়ে অবিশ্বাসী উপনিবেশবাদীরা ইসলামী বিশ্ব দখলের নতুন কৌশল গ্রহণ করল। তারা ইসলামী বিশ্বে অনুপ্রবেশের সর্বোত্তম পথটি বেছে নিয়েছিল এবং তা হচ্ছে মিশনারীদের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। এর লক্ষ্য ছিল খৃষ্টানদের সমর্থন অর্জন ও মুসলিমদের মধ্যে তাদের দ্বীন সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করা।

তারা আশা করেছিল যে এ পদ্ধতিটি মুসলিমদের দ্বীনের ব্যাপারে সন্দেহের উদ্রেক করবে এবং তাদের আকীদা নড়বড়ে হয়ে যাবে। এর মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করা যাবে এবং তা মুসলিমদের দুর্বল করে ফেলবে।

উপনিবেশবাদীরা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সফল হয়েছিল। ১৬শ শতাব্দীর শেষ নাগাদ তারা মাল্টায় মিশনারী কেন্দ্র স্থাপন করতে সমর্থ হল এবং এটি তাদের প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হল যেখান থেকে পরবর্তীতে তারা মুসলিম বিশ্বে মিশনারী কার্যক্রমের মাধ্যমে ধ্বংসযজ্ঞের সূচনা করেছিল। প্রাথমিক অবস্থায় তারা এখান থেকেই তাদের মিশন কার্য পরিচালনা করত। পরবর্তীতে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল। ১৬২৫ খৃষ্টাব্দে তারা তাদের মূল ঘাঁটি আল শাম এ সরিয়ে নেয় এবং এখান থেকে তাদের মিশনারী আন্দোলনের শুরু করে।

অবশ্য এসময় তাদের কার্যক্রম ছিল সীমিত। তারা কিছু স্কুল স্থাপন ও বই পুস্তক প্রকাশ করা ছাড়া বিশেষ কিছু করতে পারে নি। বস্তুত: তারা সবার নিকট থেকে ব্যাপক বাধা ও অসহযোগিতার সম্মুখীন হয়েছিল। ১৭৭৩ খৃষ্টাব্দ পর্যান্তদের কাজ অব্যাহত থাকে এবং এ সময় তাদের ঈসায়ী (jesuits) কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য কিছু কিছু উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম তখনো চলছিল – যেমন ‘আজ়ারীয়’ মিশনারী। এদের কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও তাদের অস্তিত্ব প্রায় শূন্যের পর্যায়ে নেমে এসেছিল। ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তাদের কাজ মাল্টায় সীমাবদ্ধ ছিল। এসময় বৈরুতে তাদের একটি কেন্দ্র চালু হয় এবং মিশনারীদের কাজ পুনর্দোমে শুরু হয়। প্রথমদিকে তারা বেশ প্রতিকূলতার শিকার হলেও তাদের কাজ অব্যাহত ছিল। প্রাথমিকভাবে তাদের কাজের ক্ষেত্র ছিল ধর্মবাণী ও ধর্মীয় সংস্কৃতি প্রচার। তাদের শিক্ষা কার্যক্রম ছিল সীমিত ও দুর্বল।

১৮৩৪ সালে মিশনারী তৎপরতা সমগ্র শাম এ ছড়িয়ে পড়ল। লেবাননের আন্তুরা গ্রামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হল এবং মার্কিন মিশন তাদের বই পুস্তক প্রকাশনা ও প্রচারের সুবিধার্থে মাল্টা থেকে ছাপাখানা ও দোকান বৈরুতে সরিয়ে নিল।

প্রখ্যাত মার্কিন মিশনারী এলাই স্মিথ এ সময়ে খুবই তৎপর ছিল। সে মাল্টায় স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে মিশনের ছাপাখানার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। ১৮২৭ সালে তিনি বৈরুতে এসেছিল। কিন্তু ভয় এবং একঘেয়েমী তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল বলে সে পুনরায় মাল্টায় ফিরে যায়। অবশেষে পুনরায় ১৮৩৪ সালে তার স্ত্রী সহ সে বৈরুতে আসে এবং মেয়েদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। এ সময় তার কাজের পরিধি বেড়ে গেল এবং আল শাম অঞ্চলে, বিশেষত বৈরুতে তার কাজে আত্মনিয়োগ করল। তার ও তার মত আরও অনেকের নিরলস প্রচেষ্টার ফলে মিশনারী আন্দোলনের পুনর্জন্ম হল। যখন ইব্রাহিম পাশা প্রাথমিক স্কুলের জন্য একটি নতুন পাঠ্যসূচী গ্রহণ করে তা সিরিয়াতে বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নিলেন তখন মিশনারীদের সামনে এক নতুন সুযোগের দ্বার খুলে গেল। মিশরীয় শিক্ষা ব্যবস্থা হতে উদ্বুদ্ধ হয়ে এ সিলেবাসটি প্রণীত হয়েছিল এবং মিশরীয় ব্যবস্থাটি গৃহীত হয়েছিল ফরাসী শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে। মিশনারীরা এ সুযোগটি গ্রহণ করেছিল এবং তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষা আন্দোলনে কার্যকর অবদান রেখেছিল। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা তাদের প্রকাশনার কাজ বিস্তৃত করতে সক্ষম হল। সবকিছু ছাড়িয়ে মিশনারী আন্দোলন সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করল। তারা ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের ধর্মের স্বাধীনতার নামে পরস্পরের প্রতি ক্রোধের আগুন প্রজ্বলিত করল এবং মুসলিম, খৃষ্টান ও দ্রুজ ধর্মাবলম্বীদের মাঝে আকীদা সম্পর্কিত বিভিন্ন ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে শুরু করল।

ইব্রাহিম পাশা যখন আল শাম থেকে পিছু হটল তখন অস্থিরতা, আতঙ্ক আর নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়েছিল এবং জনগণের মাঝে ব্যাপক বিভেদ সৃষ্টি হয়েছিল। বিদেশী প্রতিনিধিবৃন্দ, বিশেষত: মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো এর সুযোগ নিল। আল শামে উসমানী রাষ্ট্রের দুর্বল প্রভাবের সুযোগে তারা নাগরিকদের মাঝে অসন্তুষ্টি উস্কে দিতে লাগল। এক বছরের মাথায়, ১৮৪১ সালে লেবাননের পার্বত্য অঞ্চলে খৃষ্টান ও ইসমাইলী দারাজী সম্প্রদায়ের (druze) মাঝে মারাত্মক গোলযোগ ছড়িয়ে পড়ল। অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে বিদেশী রাষ্ট্র সমূহের চাপে ও হস্তক্ষেপে উসমানী রাষ্ট্র লেবাননের জন্য পৃথক একটি শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হল। এ ব্যবস্থায় প্রদেশটিকে দুটি পৃথক ভাগে ভাগ করে ফেলা হল এবং এক অংশে খৃষ্টান সম্প্রদায় ও অন্য অংশে দারাজী (druze) সম্প্রদায়ের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হল। উসমানী রাষ্ট্র উভয় প্রদেশে একজন করে গভর্ণর নিযুক্ত করলেন যাতে উভয় সম্প্রদায়ের মাঝে কোন বিরোধ বা সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়। এ ব্যবস্থাটি সফল হয়নি, কারণ এটি ছিল একটি অস্বাভাবিক সমাধান। এসময় বৃটেন ও ফ্রান্স এতে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়ল এবং যেখানেই কর্তৃপক্ষ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছিল সেখানেই তারা নাগরিকদের মাঝে বিবাদ ও সংঘাত উস্কে দিতে লাগল।

বৃটেন ও ফ্রান্স এ সংঘাতের অজুহাতে লেবাননের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপ করা শুরু করল। ফরাসীরা মাওয়ারিন ক্যাথলিক খৃষ্টান সম্প্রদায় (maronites) এবং বৃটিশরা দারাজী সম্প্রদায়ের পক্ষাবলন্বন করল। এর মাধ্যমে ১৮৪৫ সালে নতুন করে গোলযোগ সৃষ্টি হল। এ সময় দৃশ্যপট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। আক্রমণের নৃশংসতা এত ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল যে গীর্জা, মঠ পর্যন্ত রক্ষা পায়নি। চৌর্যবৃত্তি, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে সমস্যাটির একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য উসমানী রাষ্ট্র তার পররাষ্ট্র বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিকে লেবাননে পাঠালো। কিন্তু তিনি উত্তেজনার সাময়িক প্রশমন ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোন সাফল্য অর্জন করতে পারেন নি। এ দিকে মিশনারীরা তাদের কার্যক্রম আরো ঘনীভূত করল। ১৮৫৭ সালে মাওয়ারিন খৃষ্টান সম্প্রদায় (maronite) বিপ্লব ও সশস্ত্র সংগ্রামের ঘোষণা দিল। মাওয়ারিন ধর্মগুরুরা কৃষকদের মধ্যে তাদের সামন্তপ্রভুদের বিরুদ্ধে বিষিয়ে তুলল। ফলশ্রুতিতে উত্তরাঞ্চলে তারা এক ভয়াবহ আক্রমণের সূচনা করল। এভাবে এক রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের শুরু হল এবং তা দক্ষিণেও ছড়িয়ে পড়ল। খৃষ্টান কৃষকেরা তাদের দারাজী সামন্তপ্রভুদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল এবং বৃটিশ ও ফরাসীরা তাদের মিত্রদের সাহায্য করতে লাগল। এর ফলাফলস্বরূপ গোটা লেবাননে গৃহ যুদ্ধ (civil strife) ছড়িয়ে পড়ল। দারাজী সম্প্রদায় নির্বিচারে পাদ্রী, সাধারণ জনগণ নির্বিশেষে খৃষ্টান হত্যা করতে শুরু করল। এ সংঘাতের ফলে হাজার হাজার লোক হতাহত হল কিংবা উদ্বাস্তু ও গৃহহীন হয়ে পড়ল।

আল শাম এর সর্বত্র গোলযোগের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিল। দামাস্কাসে মুসলিম ও খৃষ্টান অধিবাসীদের মধ্যে তীব্র ঘৃণার বিষ ছড়ানো হচ্ছিল। অবশেষে ১৮৬০ সালে মুসলিমরা একটি খৃষ্টান জেলা আক্রমন করে বসলে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এ সংঘর্ষের সাথে যুক্ত হয়েছিল যুগপৎ গণলুন্ঠন ও ধ্বংসযজ্ঞ। এ সংঘাতের পরিসমাপ্তি ঘটাতে উসমানী রাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হল। এর ফলে যদিও বা লেবাননে শান্তি স্থাপন করা সম্ভব হল, কিন্তু পশ্চিমা ষড়যন্ত্রকারী রাষ্ট্রগুলো আল শাম এ অনুপ্রবেশের জন্য একে একটি সুযোগ হিসাবে নিল। ফলে তারা উপকূলে তাদের রণতরী সমাবেশ করতে শুরু করল।

একই বছরের আগস্টে ফ্রান্স বিপ্লব দমন করতে বৈরুতে তাদের পদাতিক বাহিনীর একটি ডিভিশন প্রেরণ করেছিল। এভাবেই লেবানন ও সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে উসমানী রাষ্ট্রে অসন্তোষ ও সংঘাত ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। এর প্রধান কারণ ছিল পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহ, যারা বহুদিন থেকেই উসমানী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করে আসছিল। তারা এ ব্যাপারে সফল হয়েছিল এবং উসমানী রাষ্ট্রকে বাধ্য করেছিল সিরিয়ার জন্য দুটি প্রদেশে বিভক্ত করে একটি আলাদা শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে এবং লেবাননকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে। এ ঘটনার মাধ্যমেই লেবানন, আল শাম থেকে পৃথক হয়ে গেল। লেবাননের জন্য স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত স্বায়ত্ত শাসন দেয়া হল। এ ব্যবস্থায় সরকার প্রধান হল একজন খ্রিষ্টান যে স্থানীয় অধিবাসীদের প্রতিনিধিদের একটি কাউন্সিলের সহায়তায় শাসন কার্য পরিচালনা করে।

তখন থেকেই বিদেশী শক্তিগুলো লেবাননের বিষয়গুলো পরিচালনা করে আসছে এবং তাদের কাজের মূল কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এভাবে লেবানন একটি সেতু হিসাবে কাজ করেছে যার মাধ্যমে বিদেশী শক্তি উসমানী রাষ্ট্র তথা ইসলামী ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে।

এদিকে মিশনারীরা একটি নতুন কর্মপন্থা গ্রহণ করল। মিশনারীরা শুধুমাত্র স্কুল প্রতিষ্ঠা, ছাপাখানা ও ক্লিনিক স্থাপন করেই সন্তুষ্ট ছিলনা, বরং তারা তাদের মধ্যে একটি সংঘ (এসোসিয়েশন) সৃষ্টির পরিকল্পনা গ্রহণ করল। ১৮৪২ সালে মার্বিশ মিশনের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি বিজ্ঞান সংঘ স্থাপনের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হল। এ কমিটির কাজ প্রায় পাঁচ বছর স্থায়ী হয়েছিল। এর মধ্যে তারা একটি সংঘ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল যার নাম ছিল “বিজ্ঞান ও শিল্প সংঘ” (Association of Arts and Sciences)। এর সদস্যদের মধ্যে ছিল নাসিফ আল ইয়াযিজী, এবং বুত্রুস আল বুসতাদী, (আরবদের উদ্দেশ্যে গঠিত বিধায় লেবানীজ খ্রিষ্টানদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল) এবং এলাই স্মিথ, কর্নেলিয়াস ভ্যান ডাইক ও ব্রাইটন কর্ণেল চার্চিল। প্রথমে এ সংঘের উদ্দেশ্য ছিল অস্পষ্ট। তারা বয়স্কদের ও শিশু কিশোরদের স্কুলে বিজ্ঞান শিক্ষা দিত। তারা বয়স্ক ও কিশোরদের পশ্চিমা সংস্কৃতি শেখার ব্যাপারে উৎসাহিত করত এবং এভাবে মিশনারী পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের মন ও চিন্তাধারাকে গড়ে তুলছিল।

অবশ্য সংঘটির নিরলস প্রচেষ্টার পরও দু বছরে তারা গোটা শাম অঞ্চলে মাত্র পঞ্চাশ জন সদস্যকে দলে টানতে সক্ষম হয়েছিল। তারা সকলেই ছিল খ্রিষ্টান, বিশেষত বৈরুত অঞ্চলের অধিবাসী। কোন মুসলিম কিংবা দারাজী সম্প্রদায় তাদের দলে তখনো যোগ দেয়নি। তাদের কাজ সম্প্রসারিত ও ত্বরান্বিত করতে ব্যাপক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও খুব একটা সফল হচ্ছিল না। পাঁচ বছরের মাথায় এ সংঘটির অবলুপ্তি ঘটে। এর মাঝে তারা উল্লেখযোগ্য কোন সাফল্য না পেলেও মিশনারীদের মাঝে আরো অনেকগুলো সংঘ তৈরীর আকাঙ্খা সৃষ্টি হয়েছিল। কাজেই ১৮৫০ সালে আরেকটি সংঘ স্থাপিত হল এবং এর নাম দেয়া হয়েছিল “প্রাচ্য সংঘ” (oriental association). ফরাসী ঈসায়ী সঙ্ঘের যাজক হেনরি দেব্রোনিয়ের অভিভাবকত্বে ও সহযোগিতায় খ্রিষ্টান সদস্যদের নিয়ে ঈসায়ীগণ (Jesuits) এ সংঘটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি তার পূর্ববর্তী “বিজ্ঞান ও শিল্প সংঘের” পথ অনুসরণ করেছিল এবং স্বল্প সময় পর এটিও ভেঙ্গে যায়।

এরপর আরো বেশ কটি সংঘ স্থাপিত হয় কিন্তু তাদের সবকটিই ব্যর্থতার বোঝা মাথায় নিয়ে অপসৃত হয়। ১৮৫৭ সালে একটি নতুন সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয় যারা একটি ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল। এর সকল সদস্যই ছিল আরব এবং এতে কোন বিদেশী সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এবার তাদের প্রচেষ্টা সাফল্যের মুখ দেখল এবং কিছু মুসলিম ও দারাজী সম্প্রদায়ের লোকও তাদের সংঘে যোগ দিল। এ সংঘটি তাদের গ্রহণ করেছিল, কারণ তারা সবাই ছিল আরব। এর নাম দেয়া হল, “সিরীয় বিজ্ঞান সংঘ” (Syrian Science Association)। সংঘটি তাদের কাজে সাফল্য পেতে শুরু করল এবং বিদেশী সদস্য না থাকায় আরবদের নিকট গ্রহণ যোগ্যতা পেল। এর সদস্যরা নতুন সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করতে লাগল, তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমর্থন পেতে লাগল এবং ক্রমে এর সদস্য সংখ্যা একশত পঞ্চাশে উন্নীত হল। এর প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গের মধ্যে কিছু প্রখ্যাত আরব ব্যক্তিত্ব ছিল, যেমন দারাজী সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে মোহাম্মদ আরসালান, মুসলিমদের মধ্য থেকে হুসাইন বায়হাম। আরব খ্রিষ্টান সম্প্রদায় থেকেও অনেকে যোগ দিল। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল বুত্রুস বুসতাদীর সন্তান ইব্রাহীম আল ইয়াযিজী। এ সংঘটি অন্যান্য সংঘের চেয়ে বেশী সময় স্থায়ী হয়েছিল। এর কর্মসূচীর পরিকল্পনা করা হয়েছিল আরব জাতীয়তাবাদ কে প্রজ্বলিত করার উদ্দেশ্যে। অবশ্য বিজ্ঞানের মোড়কে এর গুপ্ত উদ্দেশ্যটি ছিল উপনিবেশবাদ ও মিশনারীর প্রসার। এটি পশ্চিমা সংস্কৃতি ও শিক্ষা বিস্তারের জন্য একটি ছায়া সংগঠন হিসাবে কাজ করছিল।

১৮৭৫ সালে বৈরুতে “গুপ্ত সংঘ” (secret association) নামে একটি সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি মূলত রাজনৈতিক চিন্তাধারণার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি আরব জাতীয়তাবাদের ধারণাটি উস্কে দিতে শুরু করল। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিল বৈরুত প্রোটেস্ট্যান্ট কলেজের পাঁচজন তরুণ। এরা সকলেই ছিল খ্রিষ্টান, যাদের মিশনারী সংগঠনগুলো প্রভাবিত করতে পেরেছিল। প্রতিষ্ঠার পর তারা অল্প সংখ্যক সদস্য দলে নিল। এ সংঘটি তাদের লিফলেট ও ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে আরব জাতীয়তাবাদের ডাক দিল এবং তারা আরবদের, বিশেষত সিরীয় ও লেবানীজদের, রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবী তুলল।

অবশ্য এদের প্রকৃত কাজ ও কর্মসূচী একেবারেই ভিন্ন উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হত। এরা মানুষের অন্তরে অদ্ভুত আকাঙ্খা ও মিথ্যা আশার জন্ম দিতে লাগল। তারা আরব জাতীয়তাবাদের প্রতি আহ্বান করত এবং উসমানী রাষ্ট্রকে তুর্কী রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করে এর বিরোধিতাকে উৎসাহিত করত। এটি রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করার জন্য কাজ করছিল এবং আরব জাতীয়তাবাদকে জীবনের ভিত্তি হিসাবে প্রচার করতে লাগল। এ সংঘটি সর্বদা আরব জাতীয়তাবাদকে উর্ধ্বে তুলে ধরত। দায়িত্বপ্রাপ্তরা সকলেই তাদের সাহিত্য ও লেখনীতে তুর্কীদের আরবদের নিকট থেকে ইসলামী খিলাফত ছিনিয়ে নেয়া, ইসলামী শরীয়াহ লংঘন ও দীনকে অবমাননা করার জন্য দায়ী করত। এ থেকে সংঘটির প্রকৃত চরিত্র ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় এবং তা হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের বিপক্ষে একধরণের অসন্তোষ সৃষ্টি করা। এরা দীন সম্পর্কে সন্দেহ ও হতাশা সৃষ্টি করত এবং অনৈসলামিক মূলনীতির ভিত্তিতে রাজনৈতিক আন্দোলন প্রতিষ্ঠার সুযোগ খুঁজত। প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমা শক্তিরাই এ আন্দোলনগুলো শুরু করেছিল। তারাই এদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল, তাদের পর্যবেক্ষণ করত ও তাদের পরিচালনা করত। তারা তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে বিবরণী লিখত। উদাহরণ স্বরূপ, ১৮৮০ সালের ২৮ জুলাই, বৈরুতে নিযুক্ত ব্রিটিশ কন্স্যাল, তার সরকারের নিকট একটি টেলিগ্রাম পাঠায় যাতে বলা হয়, “বিপ্লবী লিফলেটের বিতরণ শুরু হয়েছে। উৎস হিসাবে মিজাতকে সন্দেহ করা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও অবস্থা শান্ত রয়েছে। ডাকযোগে বিস্তারিত জানান হবে।”

বৈরুতের রাস্তায় একটি লিফলেট বিলি ও দেয়ালে লাগানোর পর এই টেলিগ্রামটি পাঠানো হয়েছিল। এরপর বৈরুত ও দামাস্কাসে নিযুক্ত ব্রিটিশ কন্স্যালগণ বেশ কিছু চিঠি পাঠায়।

এ চিঠিগুলোর সাথে ছিল সংঘের সদস্যদের বিলিকৃত লিফলেটের কপি। এটি একটি যথার্থ তথ্যপ্রমাণ যা থেকে স্পষ্টতঃ প্রতীয়মান হয় যে, আল শাম এ তাদের কার্যক্রম শুরু করা প্রোটেস্ট্যান্ট কলেজের আন্দোলনটি তাদের পরিকল্পনা ছিল। আল শাম অঞ্চলেই সংঘের কার্যক্রম বেশী পরিলক্ষিত হত। অবশ্য অন্যান্য আরব অধ্যুষিত অঞ্চলেও এদের কার্যক্রম চলছিল। ১৮৮২ সালে জেদ্দায় নিযুক্ত ব্রিটিশ কমিশনারের তার সরকারের কাছে লেখা চিঠিতে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠে। আরব আন্দোলন সম্পর্কে সে লিখে,

“আমার কাছে এ খবর পৌঁছেছে যে, এমনকি মক্কায়ও কিছু কিছু বুদ্ধিজীবী স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে। আমি যা শুনেছি তা থেকে মনে হচ্ছে নাজদের সাথে দুই নদীর মধ্যবর্তী ভূখন্ড অর্থাৎ দক্ষিণ ইরাককে একত্রিত করার একটি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে যেখানে মনসুর পাশাকে নিয়োগ দেয়া হবে এবং আসীর ও ইয়েমেন কে একত্রিত করে আলী ইবনে আবিদ কে তার শাসক নিযুক্ত করা হবে।”

এ বিষয়গুলোতে শুধুমাত্র বৃটেনই আগ্রহী ছিল না বরং ফ্রান্সও গভীর আগ্রহ প্রকাশ করছিল। ১৮৮২ সালে বৈরুতে নিযুক্ত একজন ফরাসী কর্মকর্তা ফরাসী উদ্বেগের কথা জানায় এই বলে,

“স্বাধীনতার চেতনা ছড়িয়ে পড়েছে এবং আমি বৈরুতে থাকাকালীন সময়ে মুসলিম যুবকদের স্কুল ও ক্লিনিক স্থাপন এবং দেশের পুনর্জাগরণের কাজে একাগ্রতা লক্ষ্য করেছি। এখানে যে বিষয়টি উল্লেখ করা প্রয়োজন তা হচ্ছে এ আন্দোলনটি যে কোন উপদলীয় প্রভাব থেকে মুক্ত। এ সংঘে খৃষ্টান সদস্যদের স্বাগত জানানো হয় এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তাদের উপর নির্ভর করা হয়।”

বাগদাদ থেকে একজন ফরাসী লিখেছিল,

“আমি যেখানেই গিয়েছি সেখানেই একই মাত্রার একটি সাধারণ অনুভূতি লক্ষ্য করেছি এবং তা হচ্ছে তুর্কীদের প্রতি বিদ্বেষ। এই তীব্র বিদ্বেষপূর্ণ অবস্থা হতে উত্তরণের জন্য সমষ্টিগত কাজ শুরুর জন্য একটি ধারণা প্রণয়নের কাজ চলছে। দিগন্তপ্রসারী আরব জাতীয়তাবাদ আন্দোলন দানা বাঁধছে এবং অচিরেই তা আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। এই জাতি, যারা দীর্ঘকাল যাবৎ শোষিত হয়েছে তারা মুসলিম বিশ্বে তাদের স্বাভাবিক মর্যাদার দাবী তুলতে যাচ্ছে এবং বিশ্বের ভবিষ্যৎ দিক নির্দেশনা দিতে যাচ্ছে।”

ধর্ম ও বিজ্ঞানের নামে এই মিশনারী কার্যক্রম শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও বৃটেনের আকর্ষণবিন্দুতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং আরো বহুদূর ছড়িয়ে গিয়েছিল এবং অধিকাংশ অনৈসলামীক রাষ্ট্রগুলোতেও তাদের কার্যপরিধি বিস্তৃত করেছিল। এর মধ্যে ছিল জারের শাসনাধীন রাশিয়া কর্তৃক প্রেরিত মিশনারী অভিযান এবং প্রুশিয়া (জার্মানী) কর্তৃক বিভিন্ন মিশনারী কাজে প্রেরিত একদল সেবিকা (ক্যারডের সন্ন্যাসিনী)। বিভিন্ন মিশনারী ও পশ্চিমা প্রতিনিধিদের মধ্যে মতভেদ, রাজনৈতিক কার্যক্রমের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল এক ও অভিন্ন। তা হচ্ছে প্রাচ্যে খৃষ্টধর্মের প্রচার, পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রসার এবং মুসলিমদের মাঝে তাদের দ্বীন সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করা, তিক্ততা ছড়িয়ে দেয়া, তাদের ইতিহাসের প্রতি অবজ্ঞা সূচক দৃষ্টিভঙ্গী তৈরী করা এবং পশ্চিম ও পশ্চিমাদের জীবন যাত্রা সম্পর্কে প্রশংসা করতে প্ররোচিত করা।

মিশনারীরা ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি তীব্র ঘৃণা নিয়ে তাদের ধর্মপ্রচার অব্যাহত রেখেছিল। তারা ইসলামী সংস্কৃতি ও ইসলামী জীবনযাত্রাকে অবজ্ঞা করে, মুসলিমদের পশ্চাদপদ ও বর্বর হিসাবে চিহ্নিত করেছে যা প্রায় প্রতিটি ইউরোপীয়ানের অসুস্থ বিবেচনা লব্ধ মতমতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে আমাদের ভূখন্ডে অবিশ্বাস্য ও উপনিবেশবাদের ব্যাপক বিস্তৃতি তাদের সাফল্যকেই প্রতিফলিত করে।

Leave a Reply