কেন কিছু কিছু মানুষ হঠাৎ চুপ হয়ে যায়

কখনো কি এমন মুহূর্ত এসেছে যখন আমাদের মনে এ অনুভূতি এসেছে, “আমি এই বিষয়ে আর কথা বলতে চাই না”?

কিছু মানুষের মনে এই ভাবনা অন্যদের চেয়ে বেশি আসে। কখনো কখনো “চুপ করে থাকা” কেবলই মানসিক পরিপক্কতার একটি চিহ্ন; অনেকের মাঝে এ উপলব্ধি তৈরি হয় যে, বেশি কথা বললেই যে যোগাযোগ আরও ভালো হবে, এমনটা নয়। তাই তারা যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই কথা বলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

যে আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান রাখে যে যেন কথা বললে উত্তম কথা বলে নতুবা নিশ্চুপ থাকে

কিন্তু কখনো কখনো মানুষ অন্য কারণেও চুপ করে থাকে।

মানুষের “চুপ করে থাকার” কিছু কারণ:

অন্যদের সাথে কম মেলামেশা করা বা “চুপ করে থাকা” এমন একটি আচরণগত প্রতিক্রিয়া যা এতটাই সূক্ষ্ম যে, এটি কখনো কখনো দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের নজরে নাও পড়তে পারে।

এমনকি যখন মানুষ খেয়াল করে যে তারা বেশ সময় ধরে কারো সাথে কথা বলেনি কিংবা কোনো বন্ধুকে দেখে যে সে স্বাভাবিকের চেয়ে কম কথা বলছে, তখনও তারা ধরে নেন হয়তো অন্য ব্যক্তিটি কিছুটা ক্লান্ত, অন্যমনস্ক কিংবা ব্যস্ত।

নিশ্চয়ই এমন কিছু মানুষ আছেন যারা পরোক্ষ-আক্রমণাত্মক যোগাযোগ (Passive-Aggressive Communication)-এর একটি রূপ হিসেবে নীরবতা এবং নীরব আচরণকে ব্যবহার করেন। তথ্য চেপে যাওয়ার মাধ্যমে, এই ধরনের মানুষেরা প্রায়শই পারস্পরিক যোগাযোগের পরিমাণ এবং গভীরতা নিয়ন্ত্রণ করে অন্যদের সাথে তাদের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।

কিন্তু নীরবতার অন্য অর্থও হতে পারে: এর অর্থ হতে পারে যে, যে ব্যক্তি চুপ করে আছেন তিনি একটি “প্রতিরক্ষামূলক মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া” (defensive psychological response) প্রদর্শন করছেন।

নিজেদের রক্ষা করার উপায় হিসেবে চুপ করে থাকা

প্রতিরক্ষামূলক মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়াগুলো ব্যক্তিবিশেষে (এবং নিজেদের মধ্যকার সম্পর্কে) নানাভাবে প্রকাশ পায়।

মানুষের নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার অন্যতম সাধারণ কারণ হলো আবেগের অতিরিক্ত চাপ। যখন রাগ, দুঃখ, এমনকি ব্যর্থতা বা বিভ্রান্তির অনুভূতিগুলো অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন মানুষ নিজেকে শান্ত করার জন্য কখনও কখনও কথা বলা বন্ধ করে দেয় বা শারীরিকভাবে নিজেকে গুটিয়েও নেয়।

সাধারণ উদ্বেগ (general anxiety) বা ঘন ঘন বিষণ্ণতা (depression)-এর মতো দীর্ঘমেয়াদী সমস্যাগুলোও মানুষকে অন্যদের সাথে কম মেলামেশা করতে ধাবিত করতে পারে। বিষণ্ণতা বা অবসাদের শিকার হলে ব্যক্তিরা প্রায়শই “স্তব্ধ” হয়ে যাওয়ার কথা বলেন এবং জানান যে অন্যদের সাথে যোগাযোগ বা কথা বলার মতো শক্তি তাদের নেই।

চরম ক্ষেত্রে, মানুষ ভাবতে শুরু করতে পারে যে তাদের কোনো কথাই কোনো কাজে আসে না, অথবা তাদের জীবনে কেউই তাদের কথা শুনছে না, তাই কথা বলে আর কী লাভ? মনোবিজ্ঞানী মার্টিন সেলিগম্যান এই প্রতিক্রিয়াটিকে “অর্জিত অসহায়ত্ব” (learned helplessness) বলে অভিহিত করেছেন, এবং এটি মানুষকে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে অথবা তাদের মতামত বা চাহিদা প্রকাশ করার চেষ্টা সম্পূর্ণরূপে আটকে দিতে পারে।

এই প্রতিরক্ষামূলক মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়াগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য এর নামের মধ্যেই নিহিত: এগুলো প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে। অনেক সময় আমরা এই আচরণগুলোর আশ্রয় নিই কারণ এগুলো আমাদের আরও নিরাপদ বোধ করতে সাহায্য করে।

কিন্তু চুপ করে থাকা কি আসলেই আমাদের আরও নিরাপদ করে তোলে?

নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া কীভাবে আমাদের (এবং অন্যদের) ক্ষতি করতে পারে

যখন মানুষ অন্যদের কাছে নিজেদের, তাদের বিশ্বাস বা কাজের ব্যাখ্যা দেওয়ার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলে, তখন তারা অন্যদের সাথে কম মেলামেশা করতে এবং নিজেদের কম প্রকাশ করতে শুরু করতে পারে।

কিছু সময়ের জন্য, এটি সঠিক বলে মনে হতে পারে। ব্যক্তিটি হয়তো অনুভব করতে পারে যে তার জীবনের বিষয়গুলো কম জটিল হয়ে উঠছে, অথবা সে মানুষকে যত কম বলবে, তত বেশি সুরক্ষিত এবং শান্ত বোধ করতে পারবে।

তবে, একটি সময়ে যেয়ে এই প্রতিরক্ষামূলক আচরণটি এই পথের পথিক ব্যক্তির জন্য সমস্যা তৈরি করতে শুরু করতে পারে। স্নায়ুবিজ্ঞানীরা মনে করেন যে যখন আবেগ প্রকাশ করা হয় না বা বাহ্যিকভাবে প্রকাশ করা হয় না, তখন “মস্তিষ্ক অভ্যন্তরীণভাবে সেগুলোকে আবর্তন করতে থাকে।”

যখন ব্যক্তিরা তাদের ক্রমাগত অনুভূত আবেগগুলোকে বোঝার চেষ্টা করে, কিন্তু অন্যদের সাথে তা ভাগ করে নেওয়ার বা প্রকাশ করার কোনো সুযোগ পায় না, তখন এটি একটি অপ্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ চক্র তৈরি করতে পারে যা তাদের মানসিক শক্তি নিঃশেষ করে দেয়।

কেউ যখন আমাদের আঘাত করার চেষ্টা করছে, বা হয়তো নিজেরাই আঘাত পেয়েছে, তা বোঝা

বছরের পর বছর ধরে, যোগাযোগ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া এবং আবেগগতভাবে জড়িত না থাকাকে আমরা “নীরব আচরণ” (silent treatment) দেওয়া (বা পাওয়া) বলে উল্লেখ করে আসছি।

যেহেতু আমরা অনেকেই শৈশবে কিংবা তরুণ বয়সে কারো না কারো কাছ থেকে এই নীরব আচরণ (silent treatment)-এর শিকার হয়েছি, তাই আমাদের মনে হতে পারে যে এটি প্রায় সবসময়ই আমাদের আঘাত করার জন্য কিংবা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য করা হয়ে থাকে।

যদিও নীরব আচরণ ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে আঘাত করতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যবহার করা যেতে পারে, বিশেষ করে পরোক্ষ-আক্রমণাত্মক যোগাযোগ (Passive-Aggressive Communication) শৈলীর মানুষেরা এটি করে থাকে, তবে কখনো কখনো “চুপ করে থাকা” ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিতও দিতে পারে।

অনেক মানুষ যারা নিজেদের বা কোনো নির্দিষ্ট সম্পর্ককে আবেগগতভাবে রক্ষা করার জন্য নিজেকে গুটিয়ে নেয়, তারা আসলে অন্যদের প্রতি বেশ সহানুভূতিশীল হয়। তারা আসলে “অন্যদের গভীরভাবে বোঝে” এবং বিনিময়ে তারা চায় অন্যরাও যাতে তাদের বুঝে।

কখনো কখনো অন্যদের নীরবতাকে এভাবে বুঝতে হবে যে এটি তাদের কথা শোনার জন্য আমাদের প্রতি একটি আমন্ত্রণ।

আমাদের চারপাশের নীরবতাকে সযত্নে নিরাময় করা

কেউ আপনার অনুভূতিতে আঘাত করতে বা আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে যে নীরব আচরণ (silent treatment) ব্যবহার করে, তার প্রতিক্রিয়া জানানোর অনেক উপায় আছে। সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর মধ্যে একটি হলো নিজের সীমা ও প্রয়োজনগুলো নির্ধারণ করা এবং অন্য ব্যক্তিকে তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া। যদি এই নীরব আচরণ আপনাকে কষ্ট দেয়, তবে অন্য ব্যক্তিকে জানিয়ে দেওয়া যেতে পারে যে আপনি আপনার মানসিক স্বাস্থ্য ও সুখকে মূল্য দেন এবং আরও স্বাস্থ্যকর যোগাযোগের ধরন তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আপনি সরে আসবেন।

তবে, যে ব্যক্তি নিজেকে রক্ষা করার জন্য চুপ হয়ে গেছে, তার সাথে যোগাযোগ করার আগে আপনাকে কৌশল নিয়ে ভাবতে হতে পারে। আপনি কি মনে করেন এই সম্পর্কটির কোনো মূল্য আছে? আপনি কি মনে করেন যে ব্যক্তিটি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে এ কারণেই যে সে এটিকে তার নিজের উদ্বেগ বা বিষণ্ণতা থেকে মুক্ত থাকার একটি উপায় হিসেবে দেখে? অর্থাৎ সে তার জীবনে আর অতিরিক্ত ঝামেলা চায় না। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আপনি কী প্রতিক্রিয়া দেখাবেন তার ধরনকে প্রভাবিত করবে। অর্থাৎ, এ উত্তরগুলো জানার মাধ্যমে আমরা আরো গুছিয়ে আমাদের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতে পারবো।

একটি উপায় যা আপনি ব্যবহার করতে পারেন তা হলো আরও দৃঢ়ভাবে যোগাযোগ করা। ব্যক্তিটিকে (নরমভাবে) জানান যে আপনি তার যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি পরিবর্তন বা অনুপস্থিতি লক্ষ্য করেছেন। তাকে জানান যে আপনি বোঝেন তার এই নীরবতা একটি মানিয়ে নেওয়ার কৌশল হতে পারে, এবং তাকে জানান যে যদি তার কিছু আলোচনা করার থাকে তবে আপনি তার জন্য এভেলেভল আছেন।

সম্ভব হলে, সম্পর্কে আরও চাপ সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকুন। চূড়ান্ত শর্ত বা আপনার সময়সূচী অনুযায়ী কথা বলার দাবি না করার চেষ্টা করুন; পরিবর্তে, তাকে “যখন সে প্রস্তুত বোধ করবে” তখন আপনার সাথে যোগাযোগ করতে উৎসাহিত করুন। এমনকি আপনি তাকে কাউন্সেলিং বা অন্য কোনো থেরাপির কথা ভাবতেও উৎসাহিত করতে পারেন, যাতে সে তার চিন্তা ও অনুভূতিগুলো ভাগ করে নেওয়ার জন্য একটি নিরাপদ স্থান খুঁজে পায়।

আমরা একে অপরকে আরো স্বাস্থ্যকর যোগাযোগের উপায় বের করতে সাহায্য করতে পারি

আমরা এক অবিরাম ও বিভ্রান্তিতে পরিপূর্ণ কোলাহলের জগতে বাস করি। আমাদের বন্ধু বা পরিবারের নীরবতা বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া সবসময় লক্ষ্য করা (কিংবা তা ব্যাখ্যা করা বা বোঝা) সহজ নয়।

কিন্তু যদি আমরা লক্ষ্য করি যে আমাদের কাছের মানুষগুলো আগের চেয়ে কম কথা বলছে বা কম কিছু জানাচ্ছে, তবে এটি একটি লক্ষণ হতে পারে যে তারা এই কোলাহলপূর্ণ পৃথিবী কিংবা অন্য কোনো কারণে দিশেহারা বোধ করছে এবং যোগাযোগ করতে শক্তি পাচ্ছে না।

কখনও কখনও কারো নীরব থাকাটা আমাদের জন্য কষ্টদায়ক হয়, এবং আমাদের স্বাস্থ্য ও সুখ বজায় রেখে তার প্রতিক্রিয়া জানানোর অধিকার আমাদের আছে। কিন্তু যখন মানুষ দিশেহারা হয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয় এবং চুপ হয়ে যায়? তখন তাদের নিরাপদ এবং গুরুত্বপূর্ণ বোধ করাতে সাহায্য করাটা আমাদের দায়িত্ব হতে পারে। আমরা যদি সত্যিই আরও ভালো সম্পর্ক গড়তে চাই, তবে “নীরবতা”কে আরও গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করা আমাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে।

ইসলাম আমাদের নিজেদের সম্পর্কগুলোকে একনিষ্ঠ বা সিনসিয়ারভাবে ধরে রাখার জন্য তাগিদ দেয়। শুধুমাত্র সামাজিকতার খাতিরে সম্পর্ক মেনটেইন করা কিংবা স্বার্থের খাতির সম্পর্ক ধরে রাখা একজন ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। উপরিতলের সম্পর্ক (superficial relation) কোনো সুস্থ সম্পর্ক হতে পারে না। সাহাবী (রা)-দের বৈশিষ্টের ব্যপারে গবেষনা করতে গেলে আমরা জানতে পারি যে, তারা একেবারেই উপরিতলের মানুষ ছিলেন না (اكلف تكلفا)। অর্থাৎ, তাদের সম্পর্কগুলো ছিল গভীর ও মজবুত সম্পর্ক। তাদের ভেতরে ও বাইরের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। একে অপরের সাথে বিবাদ হলেও তারা কেউ কারো সাথে সম্পর্ক বিচ্ছেদ করতেন না। মতপার্থক্য থাকলেও একে অপরকে নসীহত করে যেতেন। ভুল হয়ে গেলে আল্লাহর ওয়াস্তে ক্ষমা চাইতেন এবং সহানুভূতি প্রদর্শন করতেন। এভাবেই তারা আমাদের জন্য রোলমডেল হয়েছেন।

নিজেদের আবেগ-অনুভূতি দাফন করাও ইসলামী দৃষ্টিভংগিতে সঠিক নয়। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর একটি হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে বলা হয়েছে, “যদি তুমি তোমার ভাইকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসো তবে তোমার উচিত তাকে সেটা বলা যে “আমি তোমাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি।” আর আবু দাউদে বর্ণিত সেই বিখ্যাত হাদীসটিতো আমরা সবাই জানি যেখানে বলা হয়েছে,

الدِّينُ النَّصيحةُ. قُلنا: لمَن؟ قال: للَّهِ ولكِتابِه ولرَسولِه، ولأئِمَّةِ المُسلِمينَ وعامَّتِهم

দ্বীন হচ্ছে নাসীহাহ (sincerity)। আমরা প্রশ্ন করলাম, কার জন্য (নাসীহাহ হে আল্লাহর রাসূল?) তিনি (সা) বললেন, আল্লাহ’র জন্য নাসীহাহ, তাঁর রাসূলের জন্য (নাসীহাহ), তাঁর কিতাবের জন্য (নাসীহাহ), মুসলিমদের নেতৃত্বের জন্য (নাসীহাহ) এবং সকল সাধারণ মুসলিমদের জন্য (নাসীহাহ)।

অর্থাৎ, আমাদের আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর কিতাবের ব্যপারে যেমন একনিষ্ঠ থাকতে হবে, একইভাবে আমাদের মুসলিম ভাইবোনদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একনিষ্ঠ থাকতে হবে। আলোচনার সুযোগ থাকলে কোনোভাবেই নীরব ও একাকী হয়ে যাওয়া যাবে না। শায়খ তাকী উদ্দিন আন-নাবহানি (রহ) তার গ্রন্থ আত-তাকাত্তুল আল-হিযবিতে বলেন,

“একাকীত্ব হচ্ছে একটি অসুস্থতা, অবশ্যই ব্যক্তি ও সমাজ হতে এর মূলোৎপাটন করতে হবে”

Leave a Reply