কল্পনা করুন, আপনি একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে দেখলেন রাস্তায় ডোমিনোর একটি লম্বা সারি রয়েছে। এই সারি এতই দীর্ঘ যে চোখের শেষ সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। হঠাৎ একটি পরিচিত শব্দ কানে এলো – ডোমিনো পড়ার আওয়াজ। ছোটবেলায় আপনি ডোমিনো খেলতেন, তাই এই শব্দ চেনা। আওয়াজটি ধীরে ধীরে জোরালো হচ্ছে এবং কাছে আসছে।

কিছুক্ষণ পর দেখলেন, সত্যিই একের পর একে ডোমিনোগুলো পড়ে আসছে। পদার্থবিদ্যার সাধারণ নিয়মে এমন দুর্দান্ত দৃশ্য দেখে আপনি মুগ্ধ। কিন্তু একটু দুঃখও লাগলো, কারণ শেষ ডোমিনোটি আপনার পায়ের কাছে এসে পড়ে গেছে। এই চমৎকার অভিজ্ঞতায় রোমাঞ্চিত হয়ে আপনি স্থির করলেন – রাস্তা ধরে হেঁটে প্রথম ডোমিনো খুঁজে বের করবেন। যে ব্যক্তি এই অসাধারণ ব্যাপারটি ঘটিয়েছে, তার সাথে দেখা করতে চান।
এবার আসি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে,
প্রশ্ন ১: আপনি কি হেঁটে হেঁটে প্রথম ডোমিনো পাবেন, নাকি চিরকাল হাঁটতেই থাকবেন?
সবাই বলবে – অবশ্যই প্রথম ডোমিনো পাবেন। কিন্তু কেন এই উত্তর? কারণটি খুবই সহজ। যদি ডোমিনোর সারি অসীম হতো, তাহলে আপনার পায়ের কাছে যে শেষ ডোমিনোটি পড়লো, সেটি আসলে কখনোই পড়তো না। কেন? কারণ অসীম সংখ্যক ডোমিনো পড়তে অসীম সময় লাগবে। আর অসীম সময় মানে কখনোই শেষ হবে না। তাহলে শেষ ডোমিনো পড়ার সুযোগই থাকে না।
সহজ ভাষায় বললে – শেষ ডোমিনো পড়ার জন্য তার আগের ডোমিনো পড়তে হবে। সেই ডোমিনো পড়ার জন্য তার আগেরটি পড়তে হবে। যদি এই ব্যাপারটি অনন্তকাল চলতে থাকে, তাহলে শেষ ডোমিনো কখনোই পড়বে না।
প্রশ্ন ২: এখন ধরুন, হেঁটে হেঁটে আপনি প্রথম ডোমিনো খুঁজে পেলেন। এই প্রথম ডোমিনো সম্পর্কে আপনার মনে কী চিন্তা আসবে? মনে করবেন কি এটি নিজে নিজেই পড়েছে?
অবশ্যই না! আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতায় কিছুই নিজে নিজে ঘটে না। সবকিছুর পেছনে কোনো না কোনো কারণ থাকে। তাহলে প্রথম ডোমিনো পড়ার পেছনেও কোনো কারণ ছিল – হয়তো কোনো ব্যক্তি ধাক্কা দিয়েছে, বাতাসের ঝাপটায় পড়েছে, অথবা অন্য কিছু এটিকে আঘাত করেছে। যাই হোক না কেন, কোনো বাহ্যিক কারণ অবশ্যই ছিল।
সারকথা: ডোমিনোর সারি অসীম হতে পারে না এবং প্রথম ডোমিনো কোনো কারণ ছাড়া নিজে নিজে পড়তে পারে না।
এই ডোমিনোর গল্প আসলে “নির্ভরশীলতার যুক্তি” (Argument from Dependency) এর একটি সুন্দর উদাহরণ। মহাবিশ্ব অনেকটা এই ডোমিনোর সারির মতো। মহাবিশ্ব এবং এর ভেতরের সবকিছুই নির্ভরশীল। তারা অন্য কিছুর উপর নির্ভর করে, সেটি আবার অন্য কিছুর উপর – এভাবে চলতে থাকলে অসীম হয়ে যায়। কিন্তু আমরা দেখেছি অসীম নির্ভরতার শৃঙ্খল অসম্ভব।
তাহলে একমাত্র যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা হলো – মহাবিশ্ব এবং এর সবকিছু এমন একটি সত্তার উপর নির্ভরশীল যিনি স্বয়ং কারো উপর নির্ভরশীল নন। তিনি স্বাধীন ও চিরন্তন। সহজভাবে বলতে গেলে, এমন একটি স্বাধীন ও চিরন্তন সত্তা থাকতেই হবে যার উপর সবকিছু নির্ভরশীল।
কোনো কিছু নির্ভরশীল বলতে আমরা কী বুঝি? (What does it mean when we say something is dependent?)
এই যুক্তি বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে “নির্ভরশীল” বলতে আমরা কী বুঝি। “Philosophy” বা “দর্শনে” নির্ভরশীলতার কয়েকটি সংজ্ঞা রয়েছে:
প্রথমত, প্রয়োজনীয় নয় এমন কিছু (It is something that is not necessary)
ফিলোসফিতে “প্রয়োজনীয়” বা “Necessary” শব্দের একটি বিশেষ অর্থ রয়েছে। এর মানে হলো যার অস্তিত্ব না থাকা অসম্ভব বা অকল্পনীয়। এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের “প্রয়োজন” শব্দের চেয়ে ভিন্ন। আমরা আমাদের চারপাশে যা কিছু দেখি, কিছুই প্রয়োজনীয় নয়। সবকিছুই থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে।
মনে করেন, আপনি যে চেয়ারে বসে আছেন, সেটি প্রয়োজনীয় নয়। এই চেয়ারটি না থাকতে পারতো। আপনি হয়তো এটি কিনতেন না, কোম্পানি হয়তো এটি তৈরি করতো না, দোকানদার হয়তো বিক্রি করতো না। অনেক কারণেই এই চেয়ার না থাকতে পারতো। এই “না থাকার সম্ভাবনা” হলো নির্ভরশীল জিনিসের মূল বৈশিষ্ট্য।
যে জিনিসটা নাও থাকতে পারত, তার ক্ষেত্রে খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে: “এই জিনিসটা কেন আছে?” এটা একটা যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন। এটা হতে পারে না যে জিনিসটা নিজেই নিজের কারণ, কারণ এর অস্তিত্বে অপরিহার্য কিছু নেই। যদি বলি যে জিনিসটা নিজেই নিজেকে ব্যাখ্যা করে, তাহলে আমরা যে নির্ভরশীলতার কথা বললাম সেটাকেই অস্বীকার করা হয়। তাই ব্যাখ্যাটা হতে হবে এর বাইরের কিছু। এই প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা মানে হলো বাহ্যিক কতগুলো বিষয় যা কোনো কিছুর অস্তিত্বের যুক্তিসঙ্গত কারণ দেয়।
আমাদের চেয়ারের উদাহরণে ফিরে যাই – কয়েকটা বিষয় মিলে, যেমন কারখানায় এটা তৈরি হওয়া, দোকানে এটা বিক্রি হওয়া, এবং আপনার এটা কেনা – এগুলো মিলেই চেয়ারটার অস্তিত্বের ব্যাখ্যা। সুতরাং কোনো কিছুর জন্য যদি বাহ্যিক বিষয়গুলোর (External factors) দরকার হয়, তার মানে সেটা নিজের চেয়ে অন্য কিছুর উপর নির্ভরশীল। ফলে এর অস্তিত্ব বাইরের কিছুর উপর নির্ভর করে। এটা একটা মৌলিক, স্বজ্ঞাত এবং বুদ্ধিবৃত্তিক (Rational) চিন্তাভাবনা। কারণ যে জিনিসের অস্তিত্ব আছে অথচ নাও থাকতে পারত, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাই বুদ্ধিমান মনের (Rational Mind) পরিচয়।
বিজ্ঞানীরা কী করেন ভেবে দেখুন। তাঁরা বাস্তবতার বিভিন্ন দিক দেখিয়ে প্রশ্ন করেন—এই ফুলটা কেন এমন? ওই ব্যাকটেরিয়া কেন এই রোগ ঘটায়? মহাবিশ্ব কেন এই গতিতে প্রসারিত হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলো যুক্তিসঙ্গত কারণ এগুলোর কোনোটাই অপরিহার্য নয়; এগুলো সব যেমন আছে তেমন নাও থাকতে পারত।
এই ধারণাটা আরও ভালো করে বোঝার জন্য এই উদাহরণটা ভাবুন:
আবার, সকালে ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘরে গেলেন। ফ্রিজ খুলে দেখলেন ডিমের বাক্সের উপর একটি কলম রয়েছে। আপনি কি মনে করবেন যে কলমটি নিজে নিজেই সেখানে গেছে? কখনোই না! আপনি অবশ্যই প্রশ্ন করবেন – কলমটি কীভাবে সেখানে এলো? কারণ কলমের ফ্রিজে থাকাটা প্রয়োজনীয় নয়। এর জন্য একটি ব্যাখ্যা দরকার। হয়তো আপনার ছেলে কলম কিনে এনে ফ্রিজে রেখেছে। তাই কলমটা এই বাহ্যিক বিষয়গুলোর উপর নির্ভরশীল, এবং এই বিষয়গুলোই কলমের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা দেয়।
দ্বিতীয়ত, উপাদানের বিন্যাস পরিবর্তনযোগ্য (Something is dependent if its components or basic building blocks could have been arranged in a different way).
যদি কোনো কিছুর উপাদানগুলো ভিন্নভাবে সাজানো যায়, তাহলে বুঝতে হবে কোনো বাহ্যিক শক্তি এই নির্দিষ্ট বিন্যাস নির্ধারণ করেছে। একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে বলি:
আপনি গাড়িতে করে বাড়ি ফিরছেন। রাস্তায় একটি চত্বর পার হওয়ার সময় দেখলেন ফুল দিয়ে লেখা “আমি তোমায় ভালোবাসি”। এই ফুলগুলোর বিন্যাস কি প্রয়োজনীয়? মোটেও না। এখানে “আমি তোমাকে পছন্দ করি” লেখাও হতে পারতো। অথবা একেবারেই এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে থাকতে পারতো। যেহেতু ভিন্ন বিন্যাস সম্ভব ছিল, তাই কোনো বাহ্যিক শক্তি (হয়তো মালী বা স্থানীয় সরকারের কোনো প্রকল্প) এই নির্দিষ্ট বিন্যাস তৈরি করেছে।
এই নিয়মটি আমরা যা কিছু দেখি সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একটি পরমাণু হোক, ল্যাপটপ হোক বা জীবদেহ হোক – সবকিছুর উপাদান একটি নির্দিষ্ট উপায়ে সাজানো। প্রতিটি উপাদানের অস্তিত্ব প্রয়োজনীয় নয়। তারা নিজেদের ব্যাখ্যা নিজেরা দিতে পারে না, তাই ব্যাখ্যা দরকার।
তৃতীয়ত, বাহ্যিক সহায়তার উপর নির্ভরতা (A thing is dependent if it relies on something outside itself for its existence)
এটি নির্ভরশীলতার সবচেয়ে সাধারণ সংজ্ঞা। যে কিছু অস্তিত্বের জন্য নিজের বাইরের কিছুর উপর নির্ভর করে, সেটি নির্ভরশীল। আরেকভাবে বলা যায়, যা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়।
একটা উদাহরণ হলো পোষা বিড়াল। বিড়াল নিজে নিজের ভরণপোষণ করতে পারে না। খাবার, পানি, অক্সিজেন, আশ্রয় – এসব বাহ্যিক জিনিসের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে।
সর্বশেষে, সীমিত ভৌত গুণাবলী (The defining features of a dependent thing are that it has limited physical qualities)
নির্ভরশীল জিনিসের একটি নির্দিষ্ট আকার, রং, তাপমাত্রা, চার্জ, ভর ইত্যাদি থাকে। কেন এই বৈশিষ্ট্যগুলো সীমিত? কারণ কোনো বাহ্যিক উৎস বা কারণ এই সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করেছে।
প্রশ্ন: কেন এই জিনিসটি এই আকারের? কেন দ্বিগুণ বড় নয়? কেন এই রং, অন্য রং নয়? এই জিনিসটি তো নিজে নিজেকে এই সীমাবদ্ধতা দেয়নি।
চলেন একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝি। আমি যদি একটা কাপকেক নিয়ে এর সীমিত ভৌত গুণাবলী – আকার, আকৃতি, রং আর গঠন – দেখিয়ে বলি যে এটা অপরিহারযভাবে অস্তিত্বশীল (existed necessarily), তাহলে আপনি আমাকে বোকা ভাববেন। আপনি জানেন যে এর আকার, রং আর গঠন বাহ্যিক কোনো উৎস নিয়ন্ত্রণ করেছে: এক্ষেত্রে সেটা হলো বেকার (Baker)। সীমিত ভৌত গুণাবলীর জিনিসগুলো নিজেরা এই গুণাবলী তৈরি করেনি। এই সীমিত ভৌত গুণাবলীর অস্তিত্বের ব্যাখ্যা অবশ্যই থাকতে হবে।
এ থেকে সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, সীমিত ভৌত গুণ বিশিষ্ট সব কিছুই সসীম। এর মানে হলো তারা একসময় শুরু হয়েছে। কারণ এসব সীমিত জিনিস চিরন্তন হওয়া অকল্পনীয়। তাদের সীমাবদ্ধতার জন্য দায়ী একটি বাহ্যিক উৎস বা কারণ তাদের আগে থেকেই থাকতে হবে।
ভাবুন তো, আমি যদি একটা গাছ নিয়ে বলি যে এটা চিরন্তন। আপনি কী বলবেন? আপনি এমন দাবি শুনে হাসবেন। এমনকি যদি গাছটার শুরুটা আপনি না দেখে থাকেন, তবুও আপনি জানেন যে এটা সসীম, কারণ এর সীমিত ভৌত গুণাবলী রয়েছে।
তবে সীমিত ভৌত বস্তুগুলো (মহাবিশ্ব সহ) যদি চিরন্তনও হয়, তাহলেও এটা পাল্টাবে না যে তারা নির্ভরশীল এবং অপরিহার্যভাবে নেই। এই যুক্তি কাজ করে বস্তুগুলো চিরন্তন হোক কিংবা এর কোনো শুরু থাকুক না কেন।
নির্ভরশীল হওয়ার এই সম্পূর্ণ সংজ্ঞা প্রয়োগ করলে আমরা এই সিদ্ধান্তে আসি যে মহাবিশ্ব এবং এর ভেতরের সবকিছুই নির্ভরশীল। যে কোনো কিছু নিয়ে ভাবুন – একটি কলম, একটি গাছ, সূর্য, একটি ইলেকট্রন, এমনকি কোয়ান্টাম ফিল্ডও। এগুলো সবই কোনো না কোনোভাবে নির্ভরশীল।
যদি এটি সত্য হয়, তাহলে মহাবিশ্ব এবং এর সবকিছুর অস্তিত্ব তিনটি উপায়ের কোনো একটিতে ব্যাখ্যা করা যায়:
১. মহাবিশ্ব এবং আমাদের অনুভূত সবকিছু চিরন্তন, অপরিহার্য এবং স্বাধীন (The universe and all that we perceive are eternal, necessary and independent.)
২. মহাবিশ্ব এবং আমাদের অনুভূত সবকিছুর অস্তিত্ব অন্য কোন নির্ভরশীল বস্তুর উপর নির্ভর করে অর্থাৎ অসীম নির্ভরতার শৃঙ্খল (The existence of the universe and all that we perceive depends on something else which is also dependent.)
৩. মহাবিশ্ব এবং আমাদের অনুভূত সবকিছু তার অস্তিত্ব পায় এমন কিছু থেকে যা নিজের প্রকৃতি দ্বারাই বিদ্যমান এবং সেই কারণে চিরন্তন ও স্বাধীন (The universe and all that we perceive derives its existence from something else that exists by its own nature and is accordingly eternal and independent.)
আসুন দেখি কোন ব্যাখ্যাটি সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত।
১) মহাবিশ্ব এবং আমাদের অনুভূত সবকিছু চিরন্তন, অপরিহার্য এবং স্বাধীন
মহাবিশ্ব এবং এর সবকিছু কি নিজেদের উপর নির্ভর করে চিরকাল থাকতে পারে? এটি যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা নয়।
কেন নয়? মহাবিশ্ব এবং এর সবকিছুর অস্তিত্ব প্রয়োজনীয় নয়। তারা না-ও থাকতে পারতো। এছাড়াও তাদের সীমিত ভৌত গুণাবলী রয়েছে। যেহেতু তারা নিজেদের এই সীমাবদ্ধতা দিতে পারে না, তাই কোনো বাহ্যিক কারণ এই সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। মহাবিশ্ব এবং এর সবকিছু নিজেদের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা নিজেরা দিতে পারে না। তাদের উপাদানগুলো ভিন্নভাবেও সাজানো যেতে পারতো। তাই তারা নির্ভরশীল, স্বাধীন নয়।
এমনকি যদি মহাবিশ্ব চিরন্তন হয়, তবুও কিছু বাহ্যিক কারণ অবশ্যই ছিল যা এর সীমিত ভৌত গুণাবলী (Limited Physical Qualities) সৃষ্টি করেছে। মহাবিশ্বের উপাদানগুলো ভিন্নভাবে সাজানো যেতে পারতো এবং মহাবিশ্ব আদৌ না-ও থাকতে পারতো। মহাবিশ্ব নিজের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা নিজেই দিতে পারে না।
এসব বিবেচনায়, আমরা নিরাপদে এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করতে পারি যে মহাবিশ্বের চিরন্তনতা কোনোভাবে এর অস্তিত্বের ব্যাখ্যা দেয়।
২) মহাবিশ্ব এবং আমাদের অনুভূত সবকিছুর অস্তিত্ব অন্য কোন নির্ভরশীল বস্তুর উপর নির্ভর করে (অসীম নির্ভরতার শৃঙ্খল)
মহাবিশ্ব এবং এর সবকিছুর অস্তিত্ব কি এমন কিছুর উপর নির্ভর করতে পারে যেটিও নির্ভরশীল? যেহেতু মহাবিশ্ব এবং এর সবকিছু নিজেদের ব্যাখ্যা দিতে পারে না, তাই আরেকটি নির্ভরশীল জিনিস দিয়ে তাদের ব্যাখ্যা করা আসলে কিছুই ব্যাখ্যা করা হয় না। কারণ যে নির্ভরশীল জিনিসটি মহাবিশ্বের ব্যাখ্যা দেওয়ার কথা, সেটিও নিজের অস্তিত্বের জন্য ব্যাখ্যার প্রয়োজন। তাই নির্ভরশীল জিনিসের ব্যাখ্যার একমাত্র উপায় হলো এমন কিছুর কাছে যাওয়া যেটি নির্ভরশীল নয়, অর্থাৎ প্রয়োজনীয়।
তবে কেউ বলতে পারে, সবকিছু এমনভাবে একে অপরের উপর নির্ভরশীল যে এর কোনো শেষ নেই। অর্থাৎ অসীম শৃঙ্খল (Infinite regress)।
যেমন: এই মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করে আরেকটি মহাবিশ্ব, সেটিকে আরেকটি – এভাবে চিরকাল। এটি কি সমস্যার সমাধান? না, মোটেও না। এমনকি যদি অসীম সংখ্যক মহাবিশ্ব থাকে যারা সবাই একে অপরের উপর নির্ভরশীল, তবুও প্রশ্ন থেকে যায়: “কেন এই অসীম শৃঙ্খলের অস্তিত্ব আছে?” মহাবিশ্ব চিরন্তন হোক বা না হোক, এর অস্তিত্বের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
আবার, কল্পনা করুন অসীম সংখ্যক মানুষ রয়েছে। প্রত্যেক মানুষ তার বাবা-মার জৈবিক কার্যকলাপের ফল, তারা আবার তাদের বাবা-মার ফল – এভাবে অসীমকাল। তবুও প্রশ্ন করা সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত: “আদৌ মানুষ কেন আছে?” এই শৃঙ্খলের কোনো শুরু না থাকলেও এর একটি ব্যাখ্যা প্রয়োজন। যেহেতু প্রতিটি মানুষ না-ও থাকতে পারতো এবং তাদের সীমিত ভৌত গুণ রয়েছে, তাই তারা নির্ভরশীল ও অপ্রয়োজনীয়। তাদের এখনও ব্যাখ্যা প্রয়োজন। শুধু বলা যে মানুষের শৃঙ্খল অসীম, এতে ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা কমে না।
আরেকটি সমস্যা, এই ব্যাখ্যা ধরে নেয় যে অসীম নির্ভরতার শৃঙ্খল (infinite regress of dependencies) সম্ভব। কিন্তু এটি অকল্পনীয়।
চিন্তা করুন: এই মহাবিশ্বের অস্তিত্ব আরেকটি মহাবিশ্বের উপর নির্ভরশীল, সেটি আবার আরেকটির উপর – এভাবে চলতে থাকলে এই মহাবিশ্ব কি কখনো অস্তিত্ব লাভ করতে পারবে? না, কারণ অসীম সংখ্যক নির্ভরতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে এই মহাবিশ্ব অস্তিত্ব পেতে পারে না। মনে রাখবেন, অসীম সংখ্যক জিনিসের কোনো শেষ নেই। তাই অসীম নির্ভরতা থাকলে এই মহাবিশ্ব কখনোই অস্তিত্ব পেতে পারে না।
৩) মহাবিশ্ব এবং আমাদের অনুভূত সবকিছু তার অস্তিত্ব পায় এমন কিছু থেকে যা নিজের প্রকৃতি দ্বারাই বিদ্যমান এবং সেই কারণে চিরন্তন ও স্বাধীন
যেহেতু আমরা যা কিছু দেখি সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে নির্ভরশীল, তাই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা হলো – সবকিছুর অস্তিত্ব এমন কিছুর উপর নির্ভরশীল যেটি স্বাধীন এবং তাই চিরন্তন। এটি স্বাধীন হতেই হবে কারণ নির্ভরশীল হলে এরও ব্যাখ্যা লাগবে। এটি চিরন্তনও হতে হবে কারণ চিরন্তন না হলে – অর্থাৎ সসীম হলে – এটি নির্ভরশীল হয়ে যাবে, কারণ সসীম জিনিসের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
তাই আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে মহাবিশ্ব এবং আমরা যা কিছু দেখি সবকিছুই এমন কিছুর উপর নির্ভরশীল যেটি চিরন্তন ও স্বাধীন। এটিই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের সর্বোত্তম ব্যাখ্যা।
ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে এই যুক্তি
নির্ভরশীলতার যুক্তি ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য দ্বারা সমর্থিত। কুরআনে বিভিন্ন জায়গায় এই ধারণা তুলে ধরা হয়েছে যে আল্লাহ একটি স্বাধীন সত্তা যিনি সবকিছু সৃষ্টির জন্য দায়ী।
“আল্লাহ সমগ্র সৃষ্টি থেকে অমুখাপেক্ষী।” (সূরা আল-ইমরান: ৯৭)
“হে মানুষ! তোমরাই আল্লাহর মুখাপেক্ষী, অথচ আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত।” (সূরা ফাতির: ১৫)
বিখ্যাত তাফসীরকার ইবনে কাসীর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন: “তারা তাদের সকল কাজে তাঁর মুখাপেক্ষী, কিন্তু তিনি তাদের মুখাপেক্ষী নন… তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং তাঁর কোনো অংশীদার নেই।”
ইবনে সিনা (পশ্চিমে আভিসেনা নামে পরিচিত) অনুরূপ যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ হলেন “ওয়াজিব আল-উজুদ” অর্থাৎ অপরিহার্যভাবে অস্তিত্বশীল (Necessary existence)। ইবনে সিনার মতে, আল্লাহ অপরিহার্যভাবে অস্তিত্বশীল এবং তিনিই সবকিছুর অস্তিত্বের জন্য দায়ী। আল্লাহ ব্যতীত অন্য সবকিছুই নির্ভরশীল, যাকে ইবনে সিনা “মুমকিন আল-উজুদ” (Contingent or Dependent existence) বলে বর্ণনা করেছেন।
নির্ভরশীলতার যুক্তি অন্যান্য প্রভাবশালী ইসলামি পণ্ডিতগণও গ্রহণ, রূপান্তর ও সমৃদ্ধ করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন আল-রাযী, আল-গাযালী, ইমাম আল-হারামাইন আল-জুওয়াইনী (এবং কাছাকাছি সময়ের মধ্যে রয়েছেন তাকি উদ্দীন আন নাবহানি)।
আল-গাযালী এই যুক্তির একটি সংক্ষিপ্ত সারাংশ উপস্থাপন করেছেন:
“অস্তিত্বকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিছু না কিছু অবশ্যই অস্তিত্বশীল এবং যে কেউ বলে যে কিছুই নেই, সে বুদ্ধি ও প্রয়োজনীয়তাকে উপহাস করে। এই যে অস্তিত্বের কথা স্বীকার করা হলো, এটি একটি অপরিহার্য ভিত্তি। এখন এই অস্তিত্ব যা স্বীকার করা হয়েছে তা হয় প্রয়োজনীয় নয়তো আকস্মিক… এর মানে হলো একটি সত্তা হয় স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়তো নির্ভরশীল… এখানে আমরা যুক্তি দেই: যদি সত্তাটি যার অস্তিত্ব স্বীকৃত সেটি প্রয়োজনীয় হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় সত্তার অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত। আর যদি এর অস্তিত্ব আকস্মিক হয়, তাহলে প্রতিটি আকস্মিক সত্তা একটি প্রয়োজনীয় সত্তার উপর নির্ভরশীল। কারণ আকস্মিকতার অর্থই হলো এর অস্তিত্ব ও অনস্তিত্ব উভয়ই সম্ভব। যার এই বৈশিষ্ট্য রয়েছে একটি নির্ধারক বা নির্বাচনকারী ব্যতীত এর অস্তিত্ব হতে পারে না। এটিও অপরিহার্য। সুতরাং এই অপরিহার্য ভিত্তি থেকে প্রয়োজনীয় সত্তার অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত।”
ইসলামি থিওলজি অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তা :
- স্বাধীন (Independent)
- যার উপর সবকিছু নির্ভরশীল (The being that everything depends on)
- যিনি সবকিছু ধারণ করেন (The one that sustains everything)
- চিরস্থায়ী (Everlasting)
- স্বয়ংসম্পূর্ণ (Self-sufficient)
- ওয়াজিব আল-ওজুদ (অপরিহার্যভাবে অস্তিত্বশীল) (Necessary existence)
এই যুক্তির বিরুদ্ধে কিছু মূল আপত্তি (Some of the key objections against this argument)
Objection 1: মহাবিশ্ব স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল (The universe exists independently)
একটি সাধারণ নাস্তিক্যবাদী আপত্তি হলো: যদি আমরা বলি যে আল্লাহ স্বাধীন ও প্রয়োজনীয়, তাহলে মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে কেন একই কথা বলতে পারি না?
জবাব: তবে এই আপত্তি ভুল জায়গায়। আমাদের অভিজ্ঞতায় নির্ভরশীল জিনিস সবসময় নির্ভরশীল সমগ্র তৈরি করে। উদাহরণ: একটি বাড়ি নির্ভরশীল উপকরণ দিয়ে তৈরি এবং বাড়িও নির্ভরশীল। এর সীমিত ভৌত গুণ রয়েছে, এটি না-ও থাকতে পারতো এবং এর মৌলিক উপাদানগুলো ভিন্নভাবে সাজানো যেতে পারতো। একইভাবে মহাবিশ্ব নির্ভরশীল জিনিস দিয়ে তৈরি তাই এটি নির্ভরশীল।
আপত্তিকারীর উপর প্রমাণের দায়ভার (burden of proof) রয়েছে যে নির্ভরশীল জিনিসগুলো নির্ভরশীল সমগ্র তৈরি করে না।
Objection 2: মহাবিশ্ব একটি নিছক সত্য (The universe is just a brute fact)
আরেকটি আপত্তি বলে যে মহাবিশ্ব নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা উচিত নয়। দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল ফাদার কপলেস্টনের সাথে তার বিখ্যাত রেডিও বিতর্কে বলেছিলেন, “আমি বলব যে মহাবিশ্ব আছে, এই পর্যন্তই।”
এই অবস্থান সত্যিকার অর্থে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পলায়ন (Intellectual cop-out)।
ভাসমান সবুজ বলের উপমা (Hovering green ball analogy): কল্পনা করুন আপনি স্থানীয় পার্কে হাঁটছেন এবং শিশুদের খেলার মাঠের মাঝখানে একটি ভাসমান সবুজ বল দেখতে পেলেন। আপনার প্রতিক্রিয়া কী হবে? আপনি কি এটিকে খেলার মাঠের একটি প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে চলে যাবেন? অবশ্যই না! আপনি প্রশ্ন করবেন কেন এর অস্তিত্ব এবং কীভাবে এটি এমন হলো। এখন বলটিকে মহাবিশ্বের আকার পর্যন্ত বাড়িয়ে দিন। প্রশ্ন এখনও থেকে যায়: কেন বলটির অস্তিত্ব এবং কেন এটি এমন?
তাছাড়া, এই আপত্তি অযৌক্তিক কারণ এটি বিজ্ঞানকেই ক্ষুন্ন করে। বৈজ্ঞানিক সমাজে মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ও মৌলিক বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করার জন্য উৎসর্গীকৃত একটি গবেষণা ক্ষেত্র রয়েছে। এর নাম কসমোলজি। এটি একটি সম্পূর্ণ বৈধ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ক্ষেত্র। মহাবিশ্বকে ‘নিছক সত্য’ (Brute Fact) বলে চিহ্নিত করা একটি প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক অনুশীলনের অসম্মান।
Objection 3: বিজ্ঞান অবশেষে একটি উত্তর খুঁজে পাবে! (Science will eventually find an answer!)
এই অবজেকশনে যুক্তি দেওয়া হয় যে, এই আর্টিকেলে যা উপস্থাপিত হয়েছে তা ‘God of the gaps’ fallacy বা ভ্রান্তির একটি রূপ। এটি বলে যে বৈজ্ঞানিক ঘটনা সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতাকে আল্লাহর অস্তিত্ব বা ঐশ্বরিক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ হিসেবে নেওয়া উচিত নয়, কারণ বিজ্ঞান অবশেষে একটি ব্যাখ্যা প্রদান করবে।
জবাব: এটি ভুল অবজেকশন, কারণ নির্ভরশীলতার যুক্তি কোনো বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের সমাধান করতে চায় না। এর উদ্দেশ্য মেটাফিজিক্স নিয়ে; এটি নির্ভরশীল জিনিসের প্রকৃতি ও তাৎপর্য বুঝতে চায়। এই যুক্তি সকল বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও ঘটনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
যেমন: প্রাকৃতিক ঘটনার ব্যাখ্যা হিসেবে আমরা যদি একাধিক মহাবিশ্বের (Multiple universe) তত্ত্বকে বিশ্বাস করি, তবুও সেগুলো নির্ভরশীল থাকবে। কেন? কারণ এই ব্যাখ্যার উপাদানগুলো ভিন্নভাবে সাজানো যেতে পারে এবং নিজেদের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা নিজেরা দিতে পারে না। অথবা তাদের অস্তিত্বের জন্য নিজেদের বাইরে কিছুর প্রয়োজন এবং তাদের সীমিত ভৌত গুণ (Limited Physical Qualities) রয়েছে। তাই তারা নির্ভরশীল। আর এই অধ্যায়ে আলোচনা অনুযায়ী, একটি নির্ভরশীল জিনিসকে আরেকটি নির্ভরশীল জিনিস দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
যদি বৈজ্ঞানিক সমাজ দাবি করে যে তারা এমন কিছু পেয়েছে যা স্বাধীন ও চিরন্তন এবং পালটা মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করে, তাহলে আমি প্রমাণ চাইব। মজার বিষয় হলো, তারা যে মুহূর্তে কোনো অভিজ্ঞতালব্ধ প্রমাণ দেবে সেই মুহূর্তেই তারা নিজেদের সাথে দ্বন্দ্বে পড়বে। কারণ যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তার সীমিত ভৌত গুণ রয়েছে, তাই নির্ভরশীল।
বিজ্ঞান কখনোই স্বাধীন ও চিরন্তন কিছু আবিষ্কার করতে পারে না – শুধু এই কারণে নয় যে এটি অভিজ্ঞতালব্ধ হবে, বরং এজন্যও যে বিজ্ঞান শুধু পর্যবেক্ষণযোগ্য নির্ভরশীল জিনিস নিয়ে কাজ করে। তাই বিজ্ঞান একটি অবৈজ্ঞানিক সত্ত্বা বা কিছু আবিষ্কার করবে বলা কোনো অর্থ রাখে না!
একটু থেমে চিন্তা করি বিজ্ঞান কী! বিজ্ঞান একটি শাস্ত্র হিসেবে উত্তর ও ব্যাখ্যা প্রদানের কাজে নিয়োজিত। কেবল নির্ভরশীল জিনিসের ব্যাখ্যা থাকতে পারে। এই বিবেচনায় আমরা বুঝতে পারি বিজ্ঞানের পরিসর নির্ভরশীল বস্তুর রাজ্যে সীমাবদ্ধ। তাই বিজ্ঞান শুধু এমন উত্তর দিতে পারে যা আরেকটি নির্ভরশীল বস্তুর সাথে সম্পর্কিত। এটি এই যুক্তির মেটাফিজিক্যাল প্রকৃতির সাথে কাজ করতে পারে না।
যেমন আমরা ব্যাখ্যা করেছি, একটি নির্ভরশীল বস্তুকে আরেকটি নির্ভরশীল বস্তু দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, কারণ সেই নির্ভরশীল বস্তুরও ব্যাখ্যা প্রয়োজন। আর আমরা আলোচনা করেছি যে এমন হতে পারে না যে একটি জিনিস অন্য কিছুর উপর নির্ভর করে, সেটি আবার আরেকটির উপর – এভাবে অনন্তকাল। যেহেতু ব্যাখ্যাটি এমন কিছু যা স্বাধীন ও চিরন্তন, তাই বিজ্ঞান কখনো এই আলোচনায় প্রবেশ করতে পারে না কারণ এর সীমিত পরিসর অভিজ্ঞতালব্ধ, নির্ভরশীল জিনিসের মধ্যে।
Objection 4: আপনি ধরে নিয়েছেন আল্লাহর অস্তিত্ব, কারণ তিনিই একমাত্র যিনি প্রয়োজনীয়ভাবে অস্তিত্বশীল (You’ve assumed God exists, as He is the only thing that necessarily exists)
জবাব: এই আর্টিকেলের যুক্তিতে আল্লাহর অস্তিত্ব ধরে নেওয়া হয়নি। যুক্তিতে আল্লাহর দিকে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয়তার ধারণা তৈরি করা হয়নি। বরং, মহাবিশ্ব এবং আমরা যা কিছু দেখি তার নির্ভরশীলতা এই ধারণার দিকে নিয়ে গেছে যে একটি চিরন্তন, স্বাধীন সত্তা থাকতে হবে যিনি অপরিহার্যভাবে অস্তিত্বশীল। এই সিদ্ধান্ত ইসলামে সৃষ্টিকর্তার সংজ্ঞার সাথে হুবহু মিলে যায়।
অপরিহার্যতা (Necessity) ও নির্ভরশীলতার (Dependent) ধারণা ফিলোসফিতে সুপরিচিত ও আলোচিত (ফিলোসফিতে ‘‘Dependent’’ বস্তুকে “Contingent” বস্তু হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে)। এগুলো সৃষ্টিকর্তার ব্যাখ্যা পেছনের দরজা দিয়ে ঢোকানোর জন্য তৈরি করা ধারণা নয়।
Objection 5: সৃষ্টিকর্তার কি ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই? (Doesn’t God require an explanation?)
এই আর্টিকেলে উপস্থাপিত যুক্তি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে একটি চিরন্তন, স্বাধীন সত্তা থাকতে হবে যিনি অপরিহার্যভাবে অস্তিত্বশীল। এটি ইসলামি সৃষ্টিকর্তার ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
জবাব: অপরিহার্য সত্তার কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। আরো নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, এমন সত্তার নিজের বাইরে কোনো কিছুর উল্লেখ করে ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই (নির্ভরশীল জিনিসের বিপরীতে)। বরং অপরিহার্য সত্তা নিজের অস্তিত্বেই ব্যাখ্যাত। অর্থাৎ, তাঁর অস্তিত্ব না থাকা অসম্ভব ছিল। তাই তিনি নিজের বাইরে কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন রাখেন না।
এমন একটি সত্তার নিজের বাইরে কিছুর উল্লেখ করে এমন ব্যাখ্যা প্রয়োজন হয় না (নির্ভরশীল জিনিসের বিপরীতে)। বরং, একটি অপরিহার্য সত্তা নিজের অস্তিত্বের কারণেই ব্যাখ্যা হয়। অন্য কথায়, তার অস্তিত্ব না থাকা অসম্ভব ছিল।
Objection 6: গঠনগত ভ্রান্তি (Fallacy of Composition)
Fallacy of composition এক ধরনের যুক্তিগত ভ্রান্তি যা ভুলভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে সম্পূর্ণ বস্তুটির অবশ্যই তার এককভাবে তার প্রতিটি অংশগুলোর মতো একই বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। তবে এমন দাবি করা সবসময় ভ্রান্তিপূর্ণ নয়। হতে পারে কিছু সমগ্রের মধ্যে তার ব্যক্তিগত অংশের বৈশিষ্ট্য রয়েছে; তবে এটি সবসময় এমন নয়।
উদাহরণস্বরুপ, একটি দেয়াল (সমগ্র) ইট (একক অংশ) দিয়ে তৈরি। ইট শক্ত, তাই দেয়াল শক্ত। এটি সত্য। বিপরীতে, একটি পার্সিয়ান কার্পেট বিবেচনা করুন। কার্পেট (সমগ্র) সুতা (একক অংশ) দিয়ে তৈরি; এককভাবে সুতাগুলো হালকা বলে কার্পেটও হালকা – এই সিদ্ধান্ত ভুল হবে।
জবাব: অবজেকশনকারী হয়তো বলতে পারেন যে মহাবিশ্ব নির্ভরশীল অংশ দিয়ে তৈরি বলেই যে সম্পূর্ণ মহাবিশ্ব নির্ভরশীল, এটা যুক্তিগতভাবে সঠিক নয়। এই অবজেকশন ভিত্তিহীন।
আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে নির্ভরশীল জিনিসগুলো সবসময়ই নির্ভরশীল সমগ্র গঠন করে। যেমন, একটি বাড়ি নির্ভরশীল উপকরণ (ইট, সিমেন্ট, লোহা) দিয়ে তৈরি এবং বাড়িটিও নির্ভরশীল। এর সীমিত ভৌত গুণাবলী আছে, এটি নাও থাকতে পারত এবং এর মূল উপাদানগুলো ভিন্নভাবে সাজানো যেত। একইভাবে মহাবিশ্ব নির্ভরশীল জিনিসপত্র দিয়ে গঠিত, তাই এটিও নির্ভরশীল।
এখন প্রমাণের দায়িত্ব অবজেকশনকারীর উপর যে তিনি দেখাবেন নির্ভরশীল জিনিসগুলো নির্ভরশীল সমগ্র তৈরি করে না। কিন্তু আমাদের সমস্ত অভিজ্ঞতা এর বিপরীত সাক্ষ্য দেয়।
সবশেষে,
সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে এই উপলব্ধি শুধু একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন নয়; বরং এটি সৃষ্টিকর্তার প্রতি গভীর আকুতি ও ভালোবাসা জাগানো উচিত। এই অধ্যায়ে আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে আল্লাহ অপরিহার্যভাবে অস্তিত্বশীল এবং সবকিছু কেবল তাঁরই কারণে অস্তিত্ব লাভ করতে পারে। এই অর্থে আমরা মানুষেরা শুধু দার্শনিক অর্থেই সৃষ্টিকর্তার উপর নির্ভরশীল নই, বরং শব্দটির সাধারণ ব্যবহারেও; তাঁর অস্তিত্ব ছাড়া আমাদের অস্তিত্ব থাকতো না, এবং আমাদের যা কিছু আছে তা শেষ পর্যন্ত একমাত্র তাঁরই কারণে।
নিচের এই চমৎকার ছোট গল্পটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, যেহেতু আমরা চূড়ান্তভাবে সৃষ্টিকর্তার ওপর নির্ভরশীল এবং এই জীবন ও পরকালের সাফল্য তাঁর অসীম করুণার ওপর নিহিত, তাই আমাদের উচিত তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করা এবং তাঁর ইচ্ছা পূরণ করা:
“একদিন আমি আমার ক্ষেতের পরিচর্যা করার জন্য বের হলাম। সাথে ছিল আমার ছোট্ট কুকুর—বাগানে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো বানরদের চিরশত্রু। সময়টা ছিল প্রচণ্ড গরমের। গরমে আমার এবং আমার কুকুরের এমন অবস্থা হয়েছিল যে আমরা প্রায় শ্বাস নিতে পারছিলাম না। আমার মনে হতে লাগল যে আমাদের দুজনের মধ্যে কেউ একজন হয়তো শীঘ্রই অজ্ঞান হয়ে পড়বে। তারপর, সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, আমি একটি ‘টিয়াকি’ (Tiayki) গাছ দেখতে পেলাম, যার ডালপালাগুলো সতেজ সবুজ পাতার এক সুশীতল আচ্ছাদন তৈরি করেছিল। আমার কুকুরটি আনন্দে ছোট ছোট শব্দ করে উঠল এবং এই আশীর্বাদপুষ্ট ছায়ার দিকে ছুটে গেল।
কিন্তু ছায়ায় পৌঁছানোর পর, সেখানে না থেকে সে জিভ বের করে আমার কাছে ফিরে এল। তার বুক কীভাবে ধুকপুক করছে তা দেখে আমি বুঝতে পারলাম সে কতটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আমি ছায়ার দিকে হাঁটতে লাগলাম। আমার কুকুরটি তখন আনন্দে আত্মহারা। তারপর, কিছুক্ষণের জন্য, আমি ভান করলাম যেন আমি আমার পথ ধরে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। বেচারা প্রাণীটি করুণ সুরে কেঁদে উঠল, কিন্তু তবুও লেজ গুটিয়ে আমার পিছু নিল। সে স্পষ্টতই হতাশ ছিল, কিন্তু যা-ই ঘটুক না কেন, আমাকে অনুসরণ করতে সে ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
তার এই বিশ্বস্ততা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিল। কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও আমাকে অনুসরণ করার জন্য এই প্রাণীটির যে প্রস্তুতি, তা কীভাবে পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব? আমি নিজেকে বললাম, সে আমার প্রতি গভীরভাবে অনুগত, কারণ সে আমাকে তার মনিব হিসেবে মানে এবং শুধুমাত্র আমার পাশে থাকার জন্য সে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে।
আমি কেঁদে বলে উঠলাম, ‘হে আমার প্রভু, আমার অশান্ত আত্মাকে সুস্থ করুন! যাকে আমি তাচ্ছিল্যভরে কুকুর বলে ডাকি, তার মতো বিশ্বস্ততা আমাকে দান করুন। আপনি যেমন তাকে দিয়েছেন, তেমনি আমাকেও আমার জীবন নিয়ন্ত্রণের শক্তি দিন, যেন আমি আপনার ইচ্ছা পূরণ করতে পারি এবং আপনি আমাকে যে পথে চালান—আমি কোথায় যাচ্ছি, তা না জিজ্ঞেস করেই—সেই পথ অনুসরণ করতে পারি! আমি এই কুকুরটির স্রষ্টা নই, তবুও সে হাজারো কষ্টের বিনিময়ে বশ মেনে আমাকে অনুসরণ করে। হে প্রভু, আপনিই তাকে এই গুণের অধিকারী করেছেন। হে প্রভু, আমার মতো যারা আপনার কাছে এটি চায়, তাদের সবাইকে ভালোবাসার গুণ এবং দয়া করার সাহস দান করুন!’
তারপর আমি আমার পদচিহ্ন ধরে ফিরে গেলাম এবং সেই ছায়ায় আশ্রয় নিলাম। আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে আমার ছোট্ট সঙ্গী আমার মুখোমুখি শুয়ে পড়ল, তার চোখ দুটি আমার চোখের দিকে নিবদ্ধ রইল; যেন সে আমার সাথে খুব জরুরি কোনো কথা বলতে চাইছে।”
Last updated 15/10/2019. Adapted from my book “The Divine Reality: God, Islam & The Mirage of Atheism”. You can purchase the book here.
তথ্যসূত্র
[1] উপমাটি ওয়েনরাইট, ডব্লিউজে (1988) থেকে গৃহীত। ধর্মের দর্শন। দ্বিতীয় সংস্করণ । বেলমন্ট, ক্যালিফোর্নিয়া: ওয়েডসওয়ার্থ পাবলিশিং।
[2] কুরআন, অধ্যায় ৩, আয়াত ৯৭।
[3] কুরআন, ৩৫তম সূরা, ১৫তম আয়াত।
[4] ইবনে কাসির, আই. (1999)। তাফসির আল-কুরআন আল-আযীম। সামি আস-সালামা দ্বারা সম্পাদিত। ২ য় সংস্করণ। রিয়াদ: দার তাইয়্যিবা। খণ্ড ৬, পৃ. ৫৪১।
[5] হোসেইন, এস. (১৯৯৩)। ইসলামিক কসমোলজিক্যাল ডকট্রিনসের একটি ভূমিকা। আলবানি: স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্ক প্রেস, পৃষ্ঠা ১৯৭-২০০।
[6] আল-গাজ্জালী, এম. (1964)। ফাদাহিহ আল-বাতিনিয়্যা। আবদুর রহমান বাদাউই কর্তৃক সম্পাদিত। কুয়েত: মুয়াসাসা দার আল-কুতুব আল-থিকাফা, পৃ. ৮২।
[7] ক্রেগ, ডব্লিউএল (2008)। যুক্তিসঙ্গত বিশ্বাস: খ্রিস্টীয় সত্য এবং ক্ষমাপ্রার্থনা। তৃতীয় সংস্করণ । হুইটন, ইলিনয়: ক্রসওয়ে বুকস, পৃষ্ঠা 109।
[8] গডউইন, এসজে (তারিখ নেই)। রাসেল/কপলস্টন রেডিও বিতর্কের প্রতিলিপি। এখানে পাওয়া যাবে: http://www.scandalon.co.uk/philosophy/cosmological_radio.htm [অ্যাক্সেস করা হয়েছে ৪ অক্টোবর ২০১৬]।
[9] ক্রেগ, ডব্লিউএল রিজনেবল ফেইথ থেকে গৃহীত। এখানে পাওয়া যাবে: http://www.reasonablefaith.org/defenders-1-podcast/transcript/s04-01 [অ্যাক্সেস করা হয়েছে: ২৪ শে অক্টোবর ২০১৬]।
[10] প্রুস, আর. এবং রাসমুসেন, জেএল (2018)। প্রয়োজনীয় অস্তিত্ব । অক্সফোর্ড: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস।
[11] হিজাব, এম. (2019)। কালাম কসমোলজিক্যাল আর্গুমেন্টস । স্বাধীনভাবে প্রকাশিত।
[12] ইটন, জি. (2001)। ঈশ্বরকে স্মরণ করা: ইসলামের প্রতিফলন । লাহোর: সুহাইল একাডেমি, পৃষ্ঠা 18-19।











