১৯৬৭ সালে পশ্চিম তীর ইহুদিদের দ্বারা দখল হওয়ার পর থেকে ফিলিস্তিন ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুটি প্রকল্প বা পরিকল্পনা একে অপরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছে। প্রথমটি হলো আমেরিকান পরিকল্পনা, যার লক্ষ্য আন্তর্জাতিক আইন ও সংস্থাসমূহের কাঠামোর মধ্যে একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয়টি হলো ইহুদি প্রকল্প, যার মূল লক্ষ্য হলো পশ্চিম তীরের ভূমি দখল করা।
প্রথম পরিকল্পনাটি কয়েক দশক ধরে স্থবির হয়ে আছে এবং এটি কেবল মিডিয়া, রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং কনফারেন্স হলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, দ্বিতীয় বা ইহুদি পরিকল্পনাটি প্রতিদিন অত্যন্ত নির্মমভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ইহুদিরা পশ্চিম তীর দখল করে এর মর্যাদা ‘আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে একটি অধিকৃত অঞ্চল’ থেকে পরিবর্তন করে তাদের ‘নিজস্ব ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশে’ পরিণত করতে চায়। তাদের লক্ষ্য হলো (জর্ডান) নদী থেকে (ভুমধ্য) সাগর পর্যন্ত একটি “ইহুদি রাষ্ট্র” গঠন করা, যেখানে অন্য কারো স্থান থাকবে না এবং যা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে চিরতরে নস্যাৎ করে দেবে। এটি এখন ইহুদি রাজনৈতিক শক্তি এবং তাদের জনগণের মধ্যে একটি ঐকমত্যের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
এটি অর্জনের জন্য ইহুদি রাষ্ট্রটি শুরু থেকেই পশ্চিম তীরের ভৌগলিক ও জনতাত্ত্বিক (demography) কাঠামো পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে। তারা বসতি স্থাপনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের সমান্তরাল একটি উপস্থিতি তৈরি করতে চেয়েছে। অর্থাৎ, তারা শহর ও জনবসতি তৈরির মাধ্যমে এক বিশাল বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠী তৈরি করেছে যারা তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অবস্থান শক্তিশালী করতে নিরলস কাজ করছে।
অন্যদিকে, যেহেতু ফিলিস্তিনি জনগণই তাদের এই প্রকল্পের প্রধান বাধা—তাদের উপস্থিতি ও অবিচলতার কারণে—তাই ইহুদি রাষ্ট্রটি জনতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় “মানুষহীন ভূমি” নীতি গ্রহণ করেছে। তারা বসতি স্থাপনের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার নীতিতে মনোযোগ দিয়েছে। তারা ফিলিস্তিনিদের জীবনকে চরম দুর্বিষহ করে তুলে তাদের হিজরত বা দেশত্যাগে বাধ্য করছে। এর জন্য তারা অবরোধ, শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি, হত্যাকাণ্ড, নিরাপত্তাহীনতা, নির্যাতন এবং ঘরবাড়ি ও ক্যাম্প ধ্বংস করার মতো পথ বেছে নিয়েছে। যদিও উচ্ছেদ বা বাস্তুচ্যুতি ঐতিহাসিকভাবেই তাদের পরিকল্পনার অংশ ছিল, তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভূমি সংক্রান্ত তাদের ‘ক্যাবিনেট’ সিদ্ধান্তগুলোর মাধ্যমে এই অপরাধের মাত্রা ও গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (PA) প্রসঙ্গে বলা যায়, তারা আমেরিকার প্রস্তাবিত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রকল্পের লেজ ধরে ঝুলে আছে এবং একে “জাতীয় প্রকল্প” হিসেবে প্রচার করে জনগণের কাছে মিথ্যা আশা বিক্রি করছে। কিন্তু ইহুদি রাষ্ট্রটি কখনোই এই কর্তৃপক্ষকে বা অসলো চুক্তিকে (Oslo Accords) সম্মানের চোখে দেখেনি; বরং তারা একে একটি “অধীনস্থ সত্তা” হিসেবেই বিবেচনা করেছে। ইহুদি রাষ্ট্র ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে কেবল তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি প্রাথমিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। দখলদার হিসেবে ইহুদি রাষ্ট্রটি ফিলিস্তিনি জনগণের বোঝা নিজে বহন না করে তা এই কর্তৃপক্ষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। এটি একদিকে জনগণের ক্ষোভ দমনের ঢাল হিসেবে কাজ করছে, অন্যদিকে ইহুদিদের চাপ জনগণের ওপর প্রয়োগের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এই কর্তৃপক্ষের আইন, পদ্ধতি এবং বিশ্বাসঘাতকতামূলক কর্মকাণ্ড এতটাই চরমে পৌঁছেছে যে তারা নিজ দেশের মানুষকে হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না। ফলে এটি এখন ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য দখলদারিত্বের মতোই একটি ভারী বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ তাদের এই “নোংরা দায়িত্ব” পালন করে যাচ্ছে কারণ তারা মনে করে তাদের অস্তিত্ব এর সাথেই মিশে আছে।
বর্তমান পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কোনো কিছুই স্থির নয়। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভাঙন, আন্তর্জাতিক আইনের অবজ্ঞা এবং আমেরিকার নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে পেশীশক্তির জোরে চুক্তি করার প্রবণতার কারণে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রকল্পটি আজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে। বিশেষ করে ইহুদিদের কর্মকাণ্ড এই প্রকল্পের কার্যকারিতাকে ধ্বংস করে দিয়েছে এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে একটি তুচ্ছ ও অর্থহীন চরিত্রে নামিয়ে এনেছে। পশ্চিমা বিশ্ব এখনো এই প্রকল্পটি টেবিলে টিকিয়ে রেখেছে সম্ভবত ইহুদি রাষ্ট্রকে তার নিজের ধ্বংসাত্মক উন্মাদনা থেকে রক্ষা করার জন্য। যদিও ইহুদি রাষ্ট্রটি দম্ভের সাথে পুরো ভূখণ্ড গিলে ফেলতে চায়, তবে এটি অর্জন করা সহজ নয় এবং এটিই তাদের পতনের কারণ হতে পারে।
নিঃসন্দেহে ফিলিস্তিন ও এর জনগণের সামনে কঠিন দিন আসছে। যতক্ষণ পর্যন্ত উম্মাহর নিজস্ব প্রকল্প ইহুদি ও আমেরিকান প্রকল্পের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে সগৌরবে যাত্রা শুরু না করবে, ততক্ষণ এই সংকট কাটবে না। উম্মাহর এই প্রকল্প হলো ফিলিস্তিনের পূর্ণাঙ্গ মুক্তি এবং অবৈধ ইহুদি রাষ্ট্রের মূলোৎপাটন। এটিই ইসলামের দাবি এবং শরীয়তের বিধান, যা উম্মাহর জন্য অন্য কোনো বিকল্প রাখেনি। ফিলিস্তিন কেবল ফিলিস্তিনিদের নয়, বরং এটি পুরো উম্মাহর ইস্যু।
তাত্ত্বিকভাবে উম্মাহর এই লক্ষ্য জনগণের হৃদয়ে বিদ্যমান থাকলেও, এটি বাস্তবায়নের জন্য কোনো নির্বাহী সংস্থা—অর্থাৎ ইসলামি রাষ্ট্র (খিলাফত)—বর্তমানে অনুপস্থিত। মূলত খিলাফত প্রতিষ্ঠাই হলো উম্মাহর সবচেয়ে বড় প্রকল্প, যার সাথে ফিলিস্তিন মুক্তিসহ সমস্ত সমস্যার সমাধান জড়িত। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ উম্মাহর ভেতরের শক্তিকে যেমন ফুটিয়ে তুলেছে, তেমনি ঔপনিবেশিক দালাল শাসকদের অধীনে উম্মাহর অসহায়ত্ব ও পঙ্গুত্বকেও উন্মোচিত করেছে। এই ঘটনাগুলো উম্মাহর জন্য একটি ইসলামি রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করেছে, যা উম্মাহর বন্দি সেনাবাহিনী এবং সুপ্ত শক্তিকে শৃঙ্খলমুক্ত করবে। তা না হলে উম্মাহ এক বিপর্যয় থেকে অন্য বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হতে থাকবে।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এটিও নিশ্চিত করেছে যে, গত কয়েক দশকের পশ্চিমা রাষ্ট্রীয় সমাধানের (Two-state solution) চেয়ে ফিলিস্তিনের পূর্ণাঙ্গ মুক্তি এবং দখলদার ইহুদি রাষ্ট্রের পতন অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ও নিকটবর্তী। আর তার চেয়েও নিকটবর্তী হলো এই দালাল শাসক এবং জালিম শাসনব্যবস্থার পতন—যদি উম্মাহ এবং তার সশস্ত্র বাহিনী সঠিক পথে অগ্রসর হয়। এই শাসকদের উম্মাহর মাঝে কোনো শিকড় নেই; তাদের সিংহাসনগুলো আজ নড়বড়ে এবং পতনোন্মুখ। জালিমরা যাই চিত্রায়িত করুক না কেন, উম্মাহকে সর্বদা আল্লাহর বাণী স্মরণ রাখতে হবে:
”জেনে রেখো, আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটে।” [সূরা আল-বাকারাহ: ২১৪]
উস্তাদ আবদুল রহমান আল-লাদাওয়ি
আল-রায়া পত্রিকার ৫৯১ নম্বর সংখ্যায় (১৮/০৩/২০২৬) প্রকাশিত











