ইরান যুদ্ধ ও শক্তির পরীক্ষা

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইহুদি রাষ্ট্র (ইসরায়েল) যে আগ্রাসী যুদ্ধ শুরু করেছে, তা কেবল উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি সামরিক অভিযান নয়। বরং এটি মার্কিন শক্তির সীমাবদ্ধতা এবং একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক শক্তি কাঠামোর মধ্যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সক্ষমতার এক জটিল পরীক্ষা। কারণ, সামরিক শক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তা দিয়ে বড় কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করা সবসময় সম্ভব হয় না। অধিকন্তু, পারস্য উপসাগরের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলের সামরিক সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং বিশ্ব বাণিজ্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত—বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর নৈকট্যের কারণে, যেখান দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ হয়।

​শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধারণা করেছিল যে, ইরানের সাথে যুদ্ধ কেবল একটি ক্ষণস্থায়ী সামরিক সংঘর্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তারা অনুমান করতে ব্যর্থ হয়েছিল যে, এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত তাদের শক্তির সীমাবদ্ধতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় পরিণত হবে। যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত বিজয়ের ঘোষণা দিলেও বাস্তব পরিস্থিতি শীঘ্রই সেই দাবির অসারতা প্রকাশ করে দেয়। ফলস্বরূপ, নিরুপায় হয়ে ট্রাম্প তার ইউরোপীয় ও ন্যাটো মিত্রদের পাশাপাশি চীন, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানের কাছে হরমুজ প্রণালীতে নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা চান। এটি কার্যত ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার আহ্বান ছিল, যা তার নিজস্ব ‘বিজয়’ এর বয়ানের সম্পূর্ণ বিপরীত।

​হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে সামুদ্রিক ট্রাফিক ব্যাহত করার ইরানের সক্ষমতা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকটে ফেলে দিয়েছে। এটি প্রমাণ করেছে যে উপসাগরীয় অঞ্চলের যেকোনো সামরিক মোকাবিলা আর আঞ্চলিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা মুহূর্তেই বিশ্ব অর্থনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়। ইরান এই সংগ্রামের মাধ্যমে এক নতুন ধরনের ‘প্রতিরোধ’ (deterrence) গড়ে তুলতে চাইছে যাতে তার শাসনব্যবস্থাকে পতন থেকে রক্ষা করা যায়। ইরান অন্য কোনো রাষ্ট্রের অনুগত বা পরাধীন রাষ্ট্র হয়ে থাকতে অস্বীকার করছে। তাই তারা মার্কিন ও ইহুদি রাষ্ট্রের প্রচণ্ড আঘাত সহ্য করেও ত্যাগ স্বীকার করছে, যাতে গত ৪০ বছরের শাসনব্যবস্থা ও নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখা যায়।

​ইউরোপের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত নৌ-জোটে যোগ দিতে তাদের দ্বিধা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ফাটলকেই স্পষ্ট করে তুলছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্জ ইউরোপের এই অবস্থানটি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, “এটি সর্বদা স্পষ্ট ছিল যে এই যুদ্ধ ন্যাটোর বিষয় নয়। হস্তক্ষেপের বিষয়ে কোনো যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তাই জার্মানি এখানে সামরিকভাবে অবদান রাখবে কি না, সেই প্রশ্নই ওঠে না। আমরা তা করব না।” এমনকি যেসকল ইউরোপীয় রাষ্ট্র ইরানের লাগাম টেনে ধরতে চায়, তারাও এই সংঘাত দ্রুত শেষ করার কোনো স্পষ্ট ও যৌথ কৌশলের অভাব নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে।

​অন্যদিকে, রাশিয়া এবং চীন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই সামরিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তারা চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলের এই চোরাবালিতে আটকে পড়ুক, যাতে দীর্ঘস্থায়ী ও নিরর্থক যুদ্ধের মাধ্যমে তাদের শক্তি ক্ষয় হয়। এটি ভবিষ্যতে ওই অঞ্চলে রুশ ও চীনা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের পথ সুগম করবে।

​সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় হরমুজ প্রণালীর দুই পাশে তেলের ট্যাঙ্কারগুলো আটকা পড়ে আছে। ফলে তেলের দাম ইতিমধ্যেই প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলারে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধ চলতে থাকলে ২০০ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে। ইরানের ‘সাউথ পার্স’ অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার জবাবে ইরান যখন উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তখন বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা আরও তীব্র হয়।

​নিঃসন্দেহে এই যুদ্ধ আগামী বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রূপরেখা বদলে দেবে। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে ব্যর্থ হওয়ার পর এখন দাবি করছে যে, তাদের লক্ষ্য কেবল ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা। ইরানের প্রতিক্রিয়া ছিল অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের মতো, যা ট্রাম্প প্রশাসনের অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল। ইরান কেবল ইহুদি রাষ্ট্র বা উপসাগরীয় দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তারা হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। এছাড়া লেবাননে হিজবুল্লাহকে ব্যবহারের মাধ্যমে তারা ইহুদি রাষ্ট্রকে আবারও আশির দশকের মতো লেবাননের চোরাবালিতে টেনে আনার ইঙ্গিত দিয়েছে।

​মার্কিন প্রতিবেদনগুলো নিশ্চিত করেছে যে ট্রাম্প প্রশাসন দুটি বিষয়ে ভুল হিসাব করেছিল:

১. ইরান এই যুদ্ধকে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখবে এবং সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করবে।

২. হরমুজ প্রণালী ও জ্বালানি বাজারের বিপর্যয় দ্রুত সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।

​এখন ট্রাম্প প্রশাসন সম্মানজনকভাবে এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে, বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চাপ এবং আগামী নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাবের কথা মাথায় রেখে। সম্ভবত ট্রাম্প মিথ্যে জয়ের দাবি করে বলবেন যে, তিনি ইরানের সামরিক সক্ষমতার ৯০% ধ্বংস করে দিয়েছেন এবং দেশটিকে ২০ বছর পিছিয়ে দিয়েছেন।

​পরিশেষে, এই সংঘাত কৌশলগত নৌ-পথগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরাশক্তিগুলোর ব্যর্থতা এবং বিশ্ব অর্থনীতির ভঙ্গুরতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে। এটি বিশ্ব ব্যবস্থায় মার্কিন একাধিপত্যের অবসান এবং একটি ‘এককেন্দ্রিক’ বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ার ট্রাম্পের প্রচেষ্টার চূড়ান্ত ব্যর্থতাকেই ফুটিয়ে তুলেছে।

Leave a Reply