সূরা কদর
৫ আয়াত, ১ রুকূ’, মক্কী
بسم الله الرحمن الرحيم
॥ দয়াময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে ॥
শানে নুযূল: তিরমিযী, হাকিম ও ইবন জারীর তাবারী (র) হাসান ইবন আলী (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-কে স্বপ্নে দেখানো হলো যে, উমায়্যা গোত্র তাঁর মিম্বরে অধিষ্ঠিত। স্বপ্নটি তাকে পীড়া দিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সূরা কাওছার ও সূরা কদর নাযিল হয়। সূরা কদরে বলা হয়েছে, ‘আমি এটা অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রজনীতে। আর মহিমান্বিত রজনী সম্বন্ধে আপনি কী জানেন? মহিমান্বিত রজনী হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেয়। অর্থাৎ উমায়্যা গোত্র যে হাজার মাস রাজত্ব করবে, তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কাসিম ইব্ন ফাযল হামাদানী (র) বলেন: এটা শোনার পর আমরা গুণে দেখলাম ঠিকই উমায়্যা গোত্রের রাজত্বকাল ছিল এক হাজার মাস। তার চেয়ে কমও নয়, বেশীও নয়। তিরমিযী (র) বলেন: হাদীসটি গারীব। মুযানী ও ইব্ন কাছীর বলেন: এটি নিতান্তই মুনকার (প্রত্যাখ্যাত)।
ইব্ন আবু হাতিম ও ওয়াহিদী (র) মুজাহিদ (র) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, একদা রাসূলুল্লাহ্ (সা) বনূ ইসরাঈলের এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছিলেন, যে আল্লাহর রাহে এক হাজার মাস রণ-সাজে সজ্জিত ছিল। একথা শুনে সাহাবীগণ অবাক হয়ে যান। তখন আল্লাহ্ তা’আলা এ সূরা নাযিল করেন। এতে বুঝানো হয়েছে যে, সে লোকটি আল্লাহর পথে যে এক হাজার মাস রণ-সাজে সজ্জিত ছিল, ‘লায়লাতুল-কদর’ সে হাজার মাস অপেক্ষাও উত্তম।
ইবন জারীর তাবারী (র) মুজাহিদ (র) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, বনু ইসরাঈলে এমন একজন লোক ছিল, যে ফজর পর্যন্ত গোটা রাত জেগে ইবাদত করতো এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত গোটা দিন দীনের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতো। এভাবে সে এক হাজার মাস কাটিয়ে দেয়। সে প্রসঙ্গেই আল্লাহ তাআলা নাযিল করেন: لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ ألف شهر অর্থাৎ, সে ব্যক্তির ঐ এক হাজার মাস অপেক্ষাও ‘লায়লাতুল-কদর’ উত্তম।
ইমাম মালিক (র) তাঁর ‘মুওয়াত্তা’ গ্রন্থে জনৈক নির্ভরযোগ্য আলিমের সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ভাবলেন, তাঁর উম্মতের আয়ু অত্যন্ত কম। তাদের পূর্ববর্তী উম্মতেরা তাদের সুদীর্ঘ আয়ুতে যে পরিমাণ পুণ্যের কাজ করতে পারতো, এদের আমল সে পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ্ তা’আলা নবী (সা)-কে ‘লায়লাতুল-কদর’ দান করেন, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (গ্রন্থকার বলেন:) আমার মতে, এ বর্ণনাটি যদিও মুরসাল (যার বর্ণনাসূত্র হতে সাহাবীর নাম বাদ পড়ে গেছে), কিন্তু এ বিষয়ে আর যা-কিছু বর্ণিত হয়েছে, সে তুলনায় অধিকতর বিশুদ্ধ।
(1) إِنَّا أَنزَلْتُهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِة
১. আমি এটি অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রজনীতে;
এটা প্রমাণ করে যে, ‘লায়লাতুল-কদর’ উম্মতে মুহাম্মদী (সা)-এর জন্য একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মালিকী মাযহাবের প্রখ্যাত আলিম ইবন হাবীব অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এ মতের পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করেন। শাফিঈ আলিমদের মধ্য হতে ‘আল-উদ্দা’ গ্রন্থের প্রণেতার বর্ণনা অনুযায়ী, এটাই ইসলামের অধিকাংশ আলিমের মত। কিন্তু নাসাঈ শরীফে উদ্ধৃত আবূ যার (রা) বর্ণিত একটি হাদীসের মর্ম এর পরিপন্থী। তাতে আবূ যার (রা) বলেন, আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! এটা কি কেবল নবীগণের সঙ্গেই থাকে, যে তাদের ওফাতের সঙ্গে সঙ্গে একেও উঠিয়ে নেওয়া হয়? তিনি বললেন : بل هي باقية না, বরং এটি বিদ্যমান থাকে।’
হাফিয ইবন হাজার (র) এ মতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন যে, ‘লায়লাতুল কদর’ পূর্ববর্তী উম্মতসমূহের কালেও ছিল। তিনি বলেন: ইমাম মালিক (র) যে মুরসাল বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, তা বিভিন্ন ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে। কাজেই, তার দ্বারা সুস্পষ্ট বর্ণনা রদ হতে পারে না। (গ্রন্থকার বলেন:) আমার মতে, বরং মালিক (র)-এর বর্ণনা নাসাঈ শরীফে বর্ণিত আবূ যার (রা)-এর বর্ণনা অপেক্ষা অধিকতর সুস্পষ্ট। কেননা, তাতে যে বলা হয়েছে: بل هي باقية ‘বরং তা বিদ্যমান থাকে’, এর অর্থ তো এরূপও হওয়া সম্ভব যে, সে রাত আমাদের নবী (সা)-এর পরও বাকী থাকবে। তবে আবূ যার (রা) বর্ণিত হাদীস দ্বারা তাদের মত প্রত্যাখ্যাত হয়, যারা বলেন: ‘লায়লাতুল-কদর’ কেবল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম-এর জীবদ্দশায়ই এসেছিল এবং তাও মাত্র এক বছরের জন্য। তাঁর ওফাতের সঙ্গে সঙ্গে এ রাতও তুলে নেওয়া হয়েছে।
এর সমর্থনে আবু হুরায়রা (রা)-এর হাদীসও পেশ করা যেতে পারে। তাঁর সামনে কেউ বলেছিল, মানুষের তো ধারণা ‘লায়লাতুল-কদর’ তুলে নেওয়া হয়েছে। তখন তিনি বলেন: ‘যারা এরূপ বলে, তারা মিথ্যা বলে।’ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আবদুর রায্যাক। বর্ণনাকারী বলেন, আমি বললাম: এটা কি প্রতি বছর যে রমাযান আসে, তাতেই থাকে? তিনি বললেন: হাঁ।
إِنَّا أَنْزَلْنَهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ (আমি এটি অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রজনীতে): অর্থাৎ কুরআন মাজীদ। এর জন্য বিশেষ্যের উল্লেখ ব্যতিরেকে প্রথমেই সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে কুরআনের মর্যাদা প্রকাশ এবং সেই সঙ্গে এই সাক্ষ্য প্রদানের জন্য যে, কুরআন এমনই মহান গ্রন্থ যে, চিন্তাশক্তি তার দিকে ধাবিত হওয়ার জন্য বিশেষ্যের ব্যবহার অপরিহার্য নয়, সর্বনাম ব্যবহারই যথেষ্ট। আল্লাহ্ তা’আলা যে অবতীর্ণ করার কাজকে নিজের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন, তার দ্বারাও কুরআনের মাহাত্ম্য ফুটে উঠেছে। أنزلناه ক্রিয়া প্রধান বাক্যটি বিধেয় এবং أنا -এর মাঝে নিহিত কর্তৃবাচ্য সর্বনাম نحن তার উদ্দেশ্য, যাকে প্রথমে এনে উপরিউক্ত সম্পৃক্ততাকে বলিষ্ঠ ও জোরদার করা হয়েছে এবং অবতীর্ণ করাটা যে কেবলই তাঁর কাজ, এ বিশেষত্ব ব্যক্ত করা হয়েছে।
এরপর নাযিলের সময় বিবেচনায়ও যে কুরআন মর্যাদাপূর্ণ তা প্রকাশের জন্য আল্লাহ্ তা’আলা বলেন : আমি একে নাযিল করেছি ‘লায়লাতুল-কদর’-এ। অর্থাৎ যে রাতে আল্লাহ্ তা’আলা স্বীয় রাজত্বে পরবর্তী বছর পর্যন্ত বান্দাদের গোটা বছরের তাকদীর বা ভাগ্য নির্ধারণ করেন।
লায়লাতুল-কাদর নামকরণের তাৎপর্য
হুসায়ন ইব্ন ফাদলকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আল্লাহ্ তা’আলা কি আসমান-যমীন সৃষ্টির আগেই তাকদীর নির্ধারণ করেননি? তিনি বলেন: নিশ্চয়ই। এরপর জিজ্ঞেস করা হলো: তবে ‘লায়লাতুল-কদর’-এর অর্থ কী? তিনি বললেন: এর অর্থ- তাকদীরকে যথাস্থানে পৌঁছানো এবং পূর্ব-স্থিরীকৃত ফায়সালাকে কার্যকর করা। অর্থাৎ পরবর্তী বছর পর্যন্ত মহাবিশ্বের যাবতীয় বিষয়ে আল্লাহ্ তা’আলা বান্দাদের জন্য যা-কিছু স্থির করে রেখেছেন, তা তিনি সংশ্লিষ্ট ফেরেশতাদেরকে এ রাতে বুঝিয়ে দেন।
ইকরিমা (র) বলেন, তাকদীর নির্ধারণ এবং যাবতীয় বিষয়ের চূড়ান্ত ফায়সালা দান করা হয় পনেরই শা’বানের রাতে। এ রাতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হযে যায় জীবিতদের মধ্য হতে কার কার মৃত্যু হবে। এরপর তাদের মধ্যে একজনও বাড়ানো এবং তাদের থেকে একজন কমানোও হয় না। ইমাম বাগাবী (র) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে এর সমর্থন পাওয়া যায়। যাতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
يقطع الاجال من شعبان الى شعبان حتى ان الرجل لينكح ويولد له ولقد خرج اسمه في الموتى
‘এক শা’বান হতে অপর শা’বান পর্যন্ত বছরের মৃতের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়। এমনকি কোন লোক বিবাহ করে এবং তার আওলাদ-ফরযন্দ হবে সে আশায় থাকে, অথচ তার নাম লেখা হয়ে যায় মৃতদের তালিকায়।’
(গ্রন্থকার বলেন:) আমার মতে, হতে পারে বিশেষ কোন ধরনের তাকদীর নির্ধারণ বা তাকদীরের অংশ বিশেষ নির্ধারণ করা, হয় পনেরই শা’বানের রাতে, আর পূর্ণাঙ্গ তাকদীর নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের হাতে তা অর্পণ করা হয় ‘লায়লাতুল-কদর’-এ। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন : فِيْهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ ‘এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়’। (সূরা দুখান: ৪)
ইবন আব্বাস (রা) বলেন: প্রতি বছরে শুভ, অশুভ, রিষ্ক, মৃত্যু যা কিছু হবে, তা লায়লাতুল কদরে উম্মুল কিতাব (লাওহে মাহফুয) হতে নকল করা হয়। এমনকি, কে হজ্জ করবে তাও আল্লাহর তরফ থেকে বলা হয়: এ বছর অমুক অমুক ব্যক্তি হজ্জ করবে।
আবুদ্-দুহা ইব্ন আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, আল্লাহ্ তা’আলা পনেরই শা’বানের রাতে যাবতীয় বিষয় ফায়সালা করেন এবং লায়লাতুল-কদরে তা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের হাতে অর্পণ করেন। বাগাবী (র) এরূপ বর্ণনা করেছেন।
যুহরী (ব) বলেন, এ রাতকে লায়লাতু-কাদর নামে অভিহিত করা হয়েছে এর বিশেষ মর্যাদা ও ফযীলতের কারণে (অর্থাৎ কাদর অর্থ মর্যাদা ও মহিমা। যেমন আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, : وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِةٍ ‘তারা আল্লাহর যথোচিত মর্যাদা জ্ঞাপন করে না।’ (সূরা যুমার: ৬৭) (এ আয়াতে এ শব্দটি মর্যাদা ও সম্মানের অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে)।
কেউ কেউ বলেন: এ নামকরণের কারণ এই যে, এ রাতের ইবাদত-বন্দেগী আল্লাহর কাছে অত্যন্ত কদরসম্পন্ন ও মূল্যবান।
লায়লাতুল-কদরে কুরআন নাযিলের অর্থ
লায়লাতুল-কদরে কুরআন নাযিলের অর্থ কী এ সম্পর্ক ইব্ন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ্ তা’আলা লাওহে মাহফুয হতে একবারে সমস্ত কুরআন প্রথম আসমানে অবস্থিত বায়তুল-ইয্যাতে নাযিল করেন। আর এটা করেন রমযান মাসের লায়লাতুল-কদরে। এরপর সেখান থেকে জিবরাঈল (আ) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট খণ্ড খণ্ড আকারে তা নিয়ে আসেন দীর্ঘ তেইশ বছরে। এ সম্পর্কেই আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন: فلا أقسم بمواقع النجوم ‘আমি শপথ করছি (কুরআনের) অংশসমূহের অবতরণকাল (বা স্থান)-এর’ (সূরা ওয়াকি’আ: ৭৫)।
আবু যর (রা) সূত্রে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
انزل صحف ابراهيم ثلث مضين من رمضان ويروى في أول ليلة من رمضان وانزلت توراة موسى فى ست ليال مضين من رمضان وانزل الانجيل في ثلث عشرة مضت من رمضان وانزل زبور داؤد في ثمان عشرة ليلة من رمضان وانزل القرآن على النبي صلعم واربعة وعشرين لست بقين بعدها .
ইবরাহীম (আ)-এর সহীফাসমূহ নাযিল হয়েছিল রমযানের তিন রাত অতিবাহিত হওয়ার পরবর্তী রাতে, বর্ণনান্তরে রমযানের প্রথম রাতে। মূসা (আ)-এর উপর তাওরাত নাযিল হয়েছিল রমযানের ছয় রাত অতিবাহিত হওয়ার পরবর্তী রাতে। ইনজীল নাযিল হয় রমযানের তের রাত অতিবাহিত হওয়ার পরবর্তী রাতে। দাউদ (আ)-এর উপর যাবুর নাযিল হয়েছিল রমযানের অষ্টাদশতম রাতে এবং কুরআন নাযিল হয় নবী (সা)-এর উপর রমযানের ছয়দিন বাকী থাকতে- চব্বিশতম রাতে।’
ইমাম আহমদ ও তাবারানী (র) ওয়াছিলা ইব্ন আসকা’ (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে,
نزلت صحف ابراهيم أول ليلة من رمضان وانزلت التوراة لست مضين والانجيل لثلث عشرة والقرآن الاربع وعشرين ..
‘ইব্রাহীম (আ)-এর উপর সহীফাসমূহ নাযিল হয়েছিল রমযানের প্রথম রাতে। তাওরাত নাযিল হয় ছয়দিন গত হওয়ার পরবর্তী রাতে। ইনজীল নাযিল হয়েছিল রমযানের তের তারিখে। আর কুরআন নাযিল হয় রমযানের চব্বিশ তারিখে’।
উপরিউক্ত হাদীসের ভিত্তিতেই কতিপয় আলিম বলেন: ‘লায়লাতুল-কাদর’ হচ্ছে রমযানের চল্লিশ তারিখের রাত। অনুরূপ মত বর্ণিত আছে ইবন মাসউদ (রা), শা’বী (র), হাসান (র) ও কাতাদা (র) হতে। তাদের মত সমর্থিত হয় বিলাল (রা) বর্ণিত হাদীস দ্বারা, যা মুসনাদে আহমদে নিম্নরূপ বর্ণিত আছে। রাসুলুল্লাহ্ (সা) বলেন: التمسوا ليلة القدر ليلة أربع وعشرين “তোমরা রমযানের চব্বিশের রাতে লায়লাতুল-কাদর সন্ধান কর।’
হাদীসটির বর্ণনাকারীদের মাঝে একজন হচ্ছেন ইবন লিহী’আ। হাফিয ইবন হাজার (র) বলেন, হাদীসটিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম-এর উক্তি হিসেবে বর্ণনা করাটা ইবন লিহী’আর বিভ্রমের পরিচায়ক।
(গ্রন্থকার বলেন:) আমার মতে, উপরোক্ত হাদীসগুলো যদি সহীহও হয়, তবু এর দ্বারা প্রমাণিত হয় না যে, প্রতি বছরই লায়লাতুল-কাদর রমযানের চব্বিশের রাতে হবে। বরং এর দ্বারা কেবল এতটুকুই প্রমাণিত হয় যে, এ তারিখে শবে কদর হয়েছিল ‘বায়তুল-ইয্যতে’ কুরআন নাযিলের বছর কিংবা বিলাল (রা)-এর বর্ণনা যে বছরের সাথে সংশ্লিষ্ট, সে বছরই।
লায়লাতুল-কদর কোন্ তারিখে?
লায়লাতুল-কদরের তারিখ নির্ণয় সম্পর্কে উলামায়ে কিরামের মধ্যে মত-পার্থক্য রয়েছে। এ সম্পর্কে প্রায় চল্লিশটি মত পাওয়া যায়। তন্মধ্যে সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত এই যে, তা প্রতি রমযানের শেষ দশকের মাঝে আবর্তিত হয়ে থাকে। এমত গ্রহণ করলে বিশুদ্ধ হাদীসসমূহের মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা হয়। আর যে সব হাদীস এর মধ্যে পড়ে না, তা সহীহ্ নয় বলে সহীহ্ হাদীস দৃষ্টে গ্রহণযোগ্যও নয়।
সহীহ্ হাদীসসমূহের মধ্যে অন্যতম হাদীস হচ্ছে সালমান ফারিসী (রা) বর্ণিত হাদীস। তিনি বলেন: একদা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বক্তৃতা করছিলেন। দিনটি ছিল শা’বানের শেষ দিকের। তিনি বলেছিলেন:
ايها الناس قد أظلكم شهر عظيم شهر مبارك شهر فيه ليلة خير من الف شهر
‘হে লোক সকল! তোমাদের সামনে সমুপস্থিত একটি মহান মাস, বরকতময় মাস। এ মাসে এমন একটি রাত আছে, যা হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সূরা বাকারায় রমযানের ফযীলত প্রসঙ্গে এ হাদীস উল্লিখিত হয়েছে। যারা বলেন: শবে কদর রমযানেও হয়, আবার অন্য মাসেও হয়, তাদের মত এ হাদীস দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়। কাযীখান (র) ইমাম আবু হানীফা (র)-এর মাযহাব এরূপই বর্ণনা করেছেন।
কেউ বলতে পারে, এরূপ হয়তো কুরআন নাযিলের বছর হয়েছিল অথবা সালমান (রা) যে বছরের কথা বর্ণনা করেছেন, সেই বছর। তখন আর এ হাদীস এবং আয়াত দ্বারা উপরিউক্ত মত খণ্ডন হবে না।
আমরা উত্তরে বলবো: সালমান (রা) বর্ণিত হাদীসে সাধারণভাবে রমযান মাসের বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে:
جعل الله صيامه فريضة وقيام ليلة تطوعا ومن تطوع فيه كان كمن أدى فريضة في غيره ومن أدى فريضة كان كمن أدى سبعين فريضة وانه شهر الصبر وشهر المواساة .
‘আল্লাহ্ তা’আলা এ মাসের রোযা ফরয করেছেন। রাতের কিয়াম তথা তারাবীহ অতিরিক্ত বিধানরূপে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি এ মাসে একটি নফল ইবাদত করবে, সে সেই ব্যক্তির সমান সওয়াব পাবে, যে অন্য মাসে একটি ফরয আদায় করে। কোন ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরয আদায় করলে সেই ব্যক্তির সমান সওয়াব পাবে, যে অন্য মাসে সত্তরটি ফরয আদায় করে। এটি ধৈর্যের মাস, সহমর্মিতার মাস’। এরূপ আরও যত বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে তার কোনটিই সেই এক বছরের রমযানের জন্য নির্দিষ্ট নয়। সুতরাং লায়লাতুল-কদর অন্তর্ভুক্ত থাকার বৈশিষ্ট্যটিও সেই বছরের রমযানের জন্য খাস হবে না।
আরেকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে আইশা (রা)-এর সূত্রে। তিনি বলেন: ‘রাসূলুল্লাহ (সা) (রমযানের) শেষ দশকে ইবাদত-বন্দেগীতে এতটা পরিশ্রম করতেন, যেরূপ পরিশ্রম অন্য সময়ে করতেন না’- মুসলিম শরীফ বর্ণিত। আইশা (রা) আরও বলেন: ‘রমযানের শেষ দশক আসলে তিনি কোমর বেঁধে লেগে যেতেন এবং গোটা রাত নিজে জাগরণ করতেন ও পরিবারের লোকদেরকেও জাগিয়ে রাখতেন।’ – বুখারী ও মুসলিম বর্ণিত। তিনি আরও বলেন: ‘রাসূলুল্লাহ (সা) রমযানের শেষ দশকে মৃত্যু পর্যন্ত ইতিকাফ করতেন এবং তাঁর ইনতিকালের পর, তাঁর সহধর্মিণীগণও এরূপ ইতিকাফ করেন।’ বুখারী-মুসলিম বর্ণিত। তিনি আরো বলেন: ‘রাসূলুল্লাহ্ (সা) রমযানের শেষ দশ দিন মসজিদে ইতিকাফ করতেন এবং বলতেন: তোমরা রমযানের শেষ দশ দিনে লায়লাতুল-কাদর তালাশ কর’-বুখারী শরীফ বর্ণিত।
আরেকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে আবূ সাঈদ খুদরী (র) সূত্রে। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম রমযানের প্রথম দশ দিন ইতিকাফ করলেন। তারপর ইতিকাফ করলেন মধ্য দশকে একটি তুর্কী তাঁবুতে। এরপর তিনি তার ভিতর থেকে মাথা বের করে দিয়ে বললেন:
اني اعتكف العشر الأول التمس هذه الليلة ثم اعتكف العشر الأوسط ثم اتيت فقيل لى انها في العشر الأواخر فمن اعتكف معى فليعتكف العشر الأواخر فاني اريت هذه الليلة ثم اتيتها وقد رأيتني اسجد في الماء والطين من صبيحتها فالتمسوها في كل وتر .
‘আমি রমযানের প্রথম দশ দিন ইতিকাফ করেছি এই রাত (শবে কদর)-এর তালাশে। এরপর এ উদ্দেশ্যেই মাঝের দশ দিন ইতিকাফ করি। তারপর আমার কাছে এসে জানানো হয় যে, সে রাত রয়েছে শেষের দশ দিনে। কাজেই কেউ যদি আমার সঙ্গে ইতিকাফ করতে চায়, সে যেন শেষের দশ দিন ইতিকাফ করে। আমাকে (স্বপ্নে) এ রাত দেখানো হয়েছে। এরপর তা আমাকে (স্বপ্নে) দেখানো হয়েছে। আমি দেখলাম যে, সেদিন ঊষাকালে আমি পানি ও কাদার মধ্যে সাজদা করছি। সুতরাং তোমরা তার সন্ধান কর প্রত্যেক বেজোড় রাতে।’
আবু সা’ঈদ খুদরী (রা) বলেন: সে রাতেই আকাশ বৃষ্টি বর্ষণ করে। মসজিদে ছিল খেজুর পাতার ছাওনী। ফলে সব পানিই মসজিদের ভিতরে পড়ে। আমার চোখ নিবদ্ধ ছিল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রতি। দেখতে পেলাম, তাঁর কপালে পানি ও কাদার চিহ্ন। এটা ছিল একুশে রমযানের ভোর’ বুখারী ও মুসলিম বর্ণিত।
ইমাম মুসলিম (র) হযরত সাঈদ (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম লায়লাতুল-কাদরের সন্ধানে রমযানের মধ্য দশকে ইতিকাফ করলেন। তা শেষ হওয়ার পর তাঁকে আবার নতুন করে ইতিকাফ করার নির্দেশ দেওয়া হলো। তিনি তা ভেঙ্গে ফেললেন। এরপর তাঁকে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়। তবে এ কথা ঠিক যে, সে রাত শেষ দশকেই আছে। তারপর তাকে পুনরায় ইতিকাফের আদেশ দেওয়া হয়। সুতরাং আবার তা করা হয়।
তারপর রাসূলুল্লাহ (সা) লোকদের সামনে বেরিয়ে আসেন এবং বলেন:
يا أيها الناس انها كانت أريت لى ليلة القدر واتى خرجت لا خيركم فجاء رجلان معهما شيطان فنسيتها فالتمسوها في العشرة الأواخر من رمضان والتمسوها في التاسعة والسابعة والخامسة .
‘হে লোক সকল। আমাকে লায়লাতুল-কাদর দেখানো হয়েছিল। আমি তা তোমাদের জানানোর জন্যই বের হয়ে এসেছিলাম, কিন্তু ইতোমধ্যে দু’জন লোক এসে পড়ে, যাদের সঙ্গে ছিল শয়তান। ফলে আমি তা ভুলে যাই। এখন তোমরা তা রমযানের শেষ দশ রাতের মধ্যে তালাশ কর এবং তা সন্ধানকর এর নবম, সপ্তম ও পঞ্চম রাতে।
আবু সাঈদ (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর এ হাদীস বর্ণনা করলে পরে রাবী বললেন: হে আবু সা’ঈদ। নিশ্চয়ই আমাদের চেয়ে আপনারা গণনায় পারদর্শী। আবূ সাঈদ (রা) বললেন: অবশ্যই আমরা এ ক্ষেত্রে তোমাদের চেয়ে অধিক যোগ্য। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
নবম, সপ্তম ও পঞ্চম। এর অর্থ- যখন একুশ পার হয়ে যায, তখন তার পরবর্তী রাত বাইশ তারিখের এবং এটাই নবম। যখন তেইশ পার হয়ে যায়, তার পরবর্তী রাতই সপ্তম এবং যখন পঁচিশ পার হয়ে যায়, তার পরবর্তী রাতই পঞ্চম।
তায়ালিসী (র) আবু সাঈদ (রা) সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস বর্ণনা করেছেন, যাতে তিনি বলেছেন: ليلة القدر ليلة اربع وعشرين ‘লায়লাতুল-কাদর হচ্ছে চব্বিশের রাত।’
আরেকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে আবদুল্লাহ ইব্ন উনায়স (রা) সূত্রে। তাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
اريت ليلة القدر وثم انسيتها واراني صبيحتها اسجد في الماء والطين فمطرنا ليلة ثلث وعشرين فصلى بنا رسول الله صلى الله عليه وسلم يعنى الفجر فانصرف واثر الماء والطين على جبهته وانفه .
‘আমাকে লায়লাতুল-কদর দেখানো হয়েছিল, কিন্তু পরে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়। আমি দেখলাম, সে দিন ফজরের পানি ও কাদার মধ্যে আমি সাজদা করছি। আবদুল্লাহ (রা) বলেন: সুতরাং তেইশের রাতে বৃষ্টি হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করেন। সালাত শেষে তিনি যখন চলে যাচ্ছিলেন, তখন তার কপাল ও নাকে পানি-কাদার চিহ্ন ছিল’ -মুসলিম ও আবূ দাউদ বর্ণিত।
আবদুল্লাহ ইব্ন উনায়স (রা) হতে অপর এক বর্ণনায় আছে। তিনি বলেন, আমি বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)। আমার একটা মাঠ আছে, যেখানে আমি সাধারণত থাকি। কাজেই আপনি আমাকে একটা রাতের কথা বলে দিন, যে রাতে আমি ইবাদত-বন্দেগীতে লিপ্ত থাকব। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তুমি তেইশের রাতে জাগরণ করবে। তাঁরই সূত্রে অপর এক বর্ণনায় আছে, তিনি একুশের রাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে শবে কদর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন: আজ কত তারিখের রাত? আমি বললাম: বাইশ তারিখ দিবাগত রাত। তিনি বললেন: এ রাতই (শবে কদর) কিংবা আগামী রাত।
আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে ইবন উমর (রা) সূত্রে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি সারারাত من كان متحريا فليتحرها سبع وعشرين লায়লাতুল-কাদর সন্ধান করতে চায়, সে যেন তা সন্ধান করে সাতাইশের রাতে।’ আহমদ ও ইবন মুনযির বর্ণিত।
জাবির ইবন সামুরা (রা) সূত্রেও অনুরূপ বর্ণিত আছে, যা ইমাম তাবারানী বর্ণনা করেছেন।
আরেকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে মু’আবিয়া ইবন আবু সুফইয়ান (রা) সূত্রে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) লায়লাতুল-কাদর সম্পর্কে বলেছেন : ليلة القدر سبع وعشرين ‘লায়লাতুল-কাদর হচ্ছে সাতাইশের রাত।’ -আবু দাউদ বর্ণিত।
যে সব হাদীসে সাতাইশের রাতকে লায়লাতুল-কাদর বলা হয়েছে, ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (র) সেগুলোকেই অবলম্বন করেছেন। আবু হানীফা (র) হতেও অনুরূপ একটি মত বর্ণিত আছে। উবাই ইব্ন কা’ব (রা)-এর স্থির বিশ্বাস হলো যে, শবে কদর তো সাতাইশেরই রাত। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল: হে আবুল মুনযির। [উবাই (রা)-এর উপনাম! এটা আপনি বলেন কিসের ভিত্তিতে? তিনি উত্তর দেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে এ রাতের যে লক্ষণ বলে দিয়েছেন, তার ভিত্তিতে। তিনি বলেছেন: সে দিনের সূর্য উদিত হবে দ্যুতিহীন অবস্থায়। -মুসলিম শরীফ বর্ণিত।
ইবন আবু শায়বা (র) উমর (রা) ও হুযায়ফা (রা)-সহ বহু সাহাবী হতে এ মত বর্ণনা করেছেন।
এ মতের সমর্থনে মুসলিম শরীফে বর্ণিত আবু হুরায়রা (রা)-এর হাদীসও পেশ করা হয়। তাতে তিনি বলেন: একদা আমরা লায়লাতুল-কাদূর সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করছিলাম। তা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ايكم يذكركم حين طلع القمر كانه شق جفنة কে তোমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেবে (সে রাতের কথা), যখন চাঁদ উদিত হবে অর্ধ থালার আকারে?’ আবুল হাসান ফারিসী (র) বলেন, এর অর্থ সাতাইশের রাত। কেননা, সে রাতের চাঁদ এ আকৃতিতেই উদিত হয়। তিনি আরও বলেন: এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে তার পূর্ণ সময়ের কথা, আর তা হয় সাতাইশের রাতে।
এ দলীল শক্তিশাল নয়। কেননা, দৃশ্যত হাদীসের অর্থ এই যে, সে দিনের সূর্য যেমন উদিত হয় দ্যুতিহীন অবস্থায়, তেমনি সে রাতের চাঁদও উদিত হয় দ্যুতিহীন। আর তার কারণ সময়ের পূর্ণতা নয়, বরং অন্য কিছু।
বস্তুত উপরোক্ত হাদীসসমূহ কেবল এটাই প্রমাণ করে যে, লায়লাতুল-কাদর কখনও কখনও সাতাশের রাতও হয়। এ রাত ছাড়া যে অন্য রাত হয়ই না, তা এর দ্বারা প্রমাণিত হয় না।
আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে ইবন উমর (রা) হতে। তিনি বলেন: এক ব্যক্তি সাতাশের রাতে লায়লাতুল-কাদর দেখতে পায়। তার পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন, ارى رؤياكم في العشر الأواخر فاطلبوها في الوتر فيها আমি দেখতে পাচ্ছি যে, তোমাদেরকে (লায়লাতুল-কাদর) দেখানো হচ্ছে শেষ দশকে। সুতরাং তোমরা শেষ দশকের বেজোড় রাতে তা সন্ধান কর’ -মুসলিম বর্ণিত।
এ সম্পর্কে ইবন উমর (রা) হতে আরও একটি হাদীস বর্ণিত আছে। তাতে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, فليتحرها ليلة السابعة (যে ব্যক্তি লায়লাতুল কাদর তালাশ করতে চায়) সে যেন তা শেষ সাত তারিখ রাতে তালাশ করে।’ ‘আব্দুর রাযযাক বর্ণিত।
ইমাম আহমদ (র) ইব্ন আব্বাস (রা) হতেও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। এর অর্থ বিশের পরে সপ্তম বা অবশিষ্ট রাতগুলোর মধ্যে সপ্তম (তথা সাতাশের) রাত।
আরেকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে নু’মান ইব্ন বাশীর (রা) সূত্রে, যাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: سابعة لمضى أو سابعة تبقى (বিশের পরে) যা গত হয় তার সপ্তম রাতে বা যা বাকী থাকে তার সপ্তম রাতে। -আহমদ বর্ণিত।
ইবন আব্বাস (রা) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণনা করেন:
هي في العشر الأواخر في تسع يمضين أو سبع يبقين وفي لفظ تسع يمضين
‘শবে কদর শেষ দশকে বিগত হওয়ার দিক থেকে নবম রাতে বা বাকী থাকার দিক থেকে সপ্তাম রাতে। অন্য বর্ণনায় আছে, ‘বিগত হওয়ার দিক থেকে নবম রাতে।’ -বুখারী বর্ণিত।
বুখারী শরীফে অপর এক বর্ণনায় আছে,
التحسوها في العشر الأواخر في تاسعة تبقى في سابعة تبقى في خامسة تبقى .
‘তোমরা শবে কদর তালাশ কর শেষ দশকে নয় দিন বাকী থাকতে, সাত দিন বাকী থাকবে এবং পাঁচ দিন বাকী থাকতে।’
আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে উবাদা ইব্ন সামিত (রা) সূত্রে। তিনি বলেন: একদা রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদেরকে লায়লাতুল-কাদূর সম্পর্কে অবহিত করতে বের হয়ে আসেন। এ সময় দু’জন মুসলিম ঝগড়ায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। তখন তিনি বলেন:
خرجت لاخبركم بليلة القدر فتلاحى فلان وفلان فرفعت عسى ان يكون خيرا لكم فالتمسوها في التاسعة والسابعة والخامسة اراه أو سبع يبقين –
‘আমি তো বের হয়ে এসেছিলাম তোমাদের লায়লাতুল-কদর সম্পর্কে জানাতে। কিন্তু অমুক অমুক ব্যক্তি ঝগড়ায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। যদ্দরুন তারিখটি তুলে নেওয়া হয়েছে। হয়তো এর মধ্যে তোমাদের জন্য কোন কল্যাণ নিহিত আছে। যা হোক, তোমরা নবম, সপ্তম ও পঞ্চম রাতে তা সন্ধান করবে। বর্ণনাকারী বলেন: আমার ধারণা তিনি আরও বলেছেন, ‘অথবা সাতদিন বাকী থাকতে।’
আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে আবূ বকর (রা) সূত্রে। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি:
التمسوها يعنى ليلة القدر في تسع يبقين أو خمس يبقين او ثلث او اخر ليلة
‘তোমরা তা অর্থাৎ লায়লাতুল-কাদূর খোঁজ করবে নয় দিন বাকী থাকতে বা পাঁচদিন বাকী থাকতে বা তিন দিন বাকী থাকতে কিংবা সর্বশেষ রাতে। -তিরমিযী বর্ণিত।
ইমাম আহমদ (র) উবাদা ইবন সামিত (রা) থেকেও অনুরূপ বর্ণনা করছেন।
আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে ইবন উমর (রা) সূত্রে। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলায়হি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবীদের মধ্যে একজন স্বপ্নে শেষ দশকের সাত রাতে লায়লাতুল-কদর দেখতে পান। তা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:
ارى رؤياكم قد تواطئت في السبع الأواخر فمن كان متحريا فليتحرها في السبع الأواخر
‘আমি দেখতে পাচ্ছি তোমাদের স্বপ্ন শেষ সাত দিনের মধ্যেই ঘটছে। কাজেই যে ব্যক্তি শবে কদর খোঁজ করতে চায়, সে যেন তা শেষের সাত দিনেই খোঁজ করে। -বুখারী ও মুসলিম বর্ণিত। অপর এক বর্ণনায় আছে, কতিপয় লোক স্বপ্নযোগে শেষের সাত দিনের মধ্যে শবে কদর দেখতে পায়। আবার কতিপয়কে দেখানো হয় শেষ দশকে। এ পরিপ্রেক্ষিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন: التمسوها في السبع الاواخر ‘তোমরা তার সন্ধান কর শেষের সাত দিনে’।
এরূপ আরেকটি হাদীস বর্ণিত আছে আলী (রা) সূত্রে। তাতে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন: إن غلبتم فلا تغلبوا في السبع البواقي যদি তোমরা ব্যর্থই হও, তবে অবশিষ্ট সাত রাতকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়ো না।’ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমদ (র)।
ইবন উমর (রা) সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন:
التمسوها في العشر الأواخر فان ضعف احدكم أو عجز فلا يغلين على السبع البواقي
‘তোমরা শবে কদরের সন্ধান কর শেষ দশকে। যদি তোমাদের মেধ্য কেউ দুর্বল বা অক্ষম হয়ে পড়ে, তবে সে যেন অবশিষ্ট সাত দিনে কিছুতেই ব্যর্থ না হয়।’ মুসলিম বর্ণিত।
উপরোক্ত হাদীসসমূহ দ্বারা স্পষ্ট জানা যায় যে, লায়লাতুল-কদর রমযানের শেষ দশ দিনের মধ্যে নিহিত। অবশ্যই কখনও তা হয় একুশের রাতে, যেমন আবূ সাঈদ (রা) বর্ণিত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়। কখনও হয় তেইশের, রাতে, যেমন আবদুল্লাহ্ ইব্ন উনায়স (রা)-এর হাদীস দ্বারা জানা যায়। কখনও হয় চব্বিশের রাতে, যে রাতে কুরআন নাযিল হয়েছে। কখনও হয় সাতাইশের রাতে, যেমন আলামত দেখে উবাই ইব্ন কা’ব (রা) জানতে পেরেছিলেন। আবার কখনও নয় দিন বাকী থাকতে অর্থাৎ বাইশের রাতে অথবা পাঁচদিন বাকী থাকতে অর্থাৎ ছাব্বিশের রাতে অথবা তিন দিন বাকী থাকতে অর্থাৎ আটাশের রাতে অথবা (দ্বিতীয় দশক পার হওয়ার পর) গত হওয়ার দিক থেকে নবম রাতে অর্থাৎ উনত্রিশের রাতে কিংবা সর্বশেষ তথা ত্রিশের রাতে।
এ ব্যাখ্যা অনুযায়ী হাদীসসমূহের মধ্যে কোন দ্বন্দু থাকে না। বাকী প্রকৃত অবস্থা আল্লাহ তা’আলাই ভাল জানেন। কারও কারও মতে আয়াতের অর্থ: আমি কুরআন নাযিল করেছি লায়লাতুল-কাদূরের ফযীলত ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করার জন্য, যা পরবর্তী আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।
(۲) وَمَا أَدْرَيكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِبُ
(۳) لَيْلَةُ الْقَدْرِهُ خَيْرٌ مِنَ الْفِ شَهْرِة
(٤) تَنَزَّلُ الْمَلائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرِي
২. আর মহিমান্বিত রজনী সম্বন্ধে আপনি কী জানেন?
৩. মহিমান্বিত রজনী হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।
৪. সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে।
وما أَدْرَكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ (মহিমান্বিত রজনী সম্পর্কে আপনি কী জানেন?): ما ادراك -এর ما অব্যয়টি প্রশ্নবোধক, যার মাঝে অস্বীকৃতির অর্থ প্রচ্ছন্ন আছে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য ‘লায়লাতুল-কাদূরের মহিমা ও সে সম্পর্কে বিস্ময় প্রকাশ করা। অনুরূপ ما ليلة القدر -এর ما-ও। আর ما ليلة القدر বাক্যটিকে একটি শব্দের পর্যায়ে ধরে নিয়ে ادراك ক্রিয়ার দ্বিতীয় কর্মপদ সাব্যস্ত করতে হবে। আয়াতটির সারমর্ম এই যে, কোন জিনিস আপনাকে লায়লাতুল-কদরের মাহাত্ম্য ও ফযীলত অবগত করেছে? কারণ, এর মাহাত্ম্য ও ফযীলত তো কল্পনাতীত। এরপর আল্লাহ তা’আলা একটি স্বতন্ত্র বাক্য দ্বারা এ রাতের ফযীলত বর্ণনা করেছেন। মাঝখানে এটি একটি অন্তর্বর্তী বাক্য।
ليلة القدرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ (মহিমান্বিত রজনী হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ): অর্থাৎ এমন হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, যার মধ্যে লায়লাতুল-কাদর নেই। যদি কেউ এ রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগীতে লিপ্ত থাকে, তবে সে সেই ব্যক্তির চাইতেও বেশী সওয়াব পাবে, যে এক হাজার মাস আয়ু পেয়েছে এবং সবটাই ইবাদত-বন্দেগীর মধ্যে কাটিয়ে দিয়েছে।
আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
من قام ليلة القدر ايمانا واحتسابا غفر له من تقدم من ذنبه رواه البخاري وعند مسلم بلفظ من يقم ليلة القدر فيوافقها
‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় লায়লাতুল-কারে জাগ্রত থেকে ‘ইবাদত-বন্দেগী করে তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। বুখারী বর্ণিত। হাদীসটি মুসলিম শরীফেও কিছুটা শাব্দিক পার্থক্যের সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে।
মুসনাদে আহমদে উবাদা ইবন সামিত (রা) সূত্রেও হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। তার ভাষা من قامها ثم وافقت له غفر له ما تقدم من ذنبه লায়লাতুল-কাদরও তার আনুকূল্য দান করে অর্থাৎ সে রাত প্রকৃতপক্ষেই লায়লাতুল-কাদর হয়, তবে তার গুনাহ মাফ হয়ে যায়।’
تنزل المليكة والروح فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مَنْ كُلِّ أَمْرٍ ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে।):
(٥) سَلَمُ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِة
৫. শান্তিই শান্তি, সে রজনী ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত
تنزل মূলে ছিল تتنزل দুই একত্র হওয়ার কারণে একটিকে বিলোপ করা হয়েছে। الروح (রহ)-এর ব্যাখ্যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। باذن ربهم এর সম্পর্ক تنزل এর সাথে। এ বাক্যটি ليلة القدر -এর দ্বিতীয় বিধেয়, যা দ্বারা লায়লাতুল-কদরেরও একটি তাৎপর্য বর্ণনা করা হয়েছে অথবা এর দ্বারা কারণ বর্ণনা করা হয়েছে যে, লায়লাতুল-কদর হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কেন? আয়াতের সারমর্ম এই যে, এ রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ আল্লাহর নির্দেশে আসমান হতে যমীনে অবতরণ করে এমন সব কাজ নিয়ে, যা এ রাতের জন্য নির্ধারিত আছে।
আনাস (রা) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:
اذا كان ليلة القدر ينزل جبرئيل في كيكية من الملئكة يصلون على كل عبد قائم او قاعد يذكر الله عز وجل
‘লায়লাতুল-কদরে জিবরাঈল (আ) একদল ফেরেশতা নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন। তারা দাঁড়িয়ে কি বসে আল্লাহর যিকরে মশগুল বান্দাদের জন্য মাগফিরাতের দু’আ করেন।’
سلام (শান্তিই শান্তি,): এটা হয়তো উহ্য উদ্দেশ্য هو -এর বিধেয়, অর্থাৎ তা শান্তি। এ হিসেবে বাক্যটি أمر এর বিশেষণ। অর্থাৎ ফেরেশতাগণ ও রূহ সে রাতে অবতরণ করে এমন সব কাজের উদ্দেশ্যে- যা কেবল শান্তি। কাজকে শান্তি বলা হয়েছে- আধিক্য জ্ঞাপনের জন্য। যেমন বলা হয়ে থাকে: زید عدل ‘যায়দ ন্যায়’। অথবা سلام-এর পূর্বে সম্বন্ধযুক্ত পদ موجب (কারণ) উহ্য আছে। অর্থাৎ যে কাজ সর্বপ্রকার অমঙ্গল হতে নিরাপত্তা ও শান্তির কারণ।
বস্তুত এ أمر অর্থাৎ কাজ বা বিষয় বলতে বোঝানো হয়েছে রহমত, আমলের পুরস্কারে বরকত এবং আল্লাহর যিকররত মু’মিনদের প্রতি বর্ষিত প্রশান্তি।
هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ (তা ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত): هی উদ্দেশ্য এবং حتى مطلع الفجر তার বিধেয়। এ সর্বনাম দ্বারা রাতকে বুঝানো হয়েছে, তবে সাধারণভাবে নয়। কেননা, তা হলে বিধেয় নিরর্থক হয়ে যায়, যেহেতু রাত যে ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত থাকে, এটা তো সুবিদিত কথা, যা সবাই জানে; বরং এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে এমন রাতকে, যা শ্রেষ্ঠত্বের বিশেষণে বিশেষিত ও ফেরেশতা অবতরণের বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত।
অথবা বাক্যের বিশ্লেষণ হবে এরূপ যে, هي উদ্দেশ্য এবং سلام তার বিধেয়, যাকে পূর্বে স্থান দেওয়া হয়েছে। এ হিসেবে বাক্যটি ليلة القدر -এর আরেকটি বিধেয়। বিধেয়কে উদ্দেশ্যের পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে সীমাবদ্ধতার অর্থ বুঝানোর জন্য অর্থাৎ সে রাত সবটা শুধুই শান্তি ও মঙ্গল। তার মধ্যে অমঙ্গলের কিছুই নেই। যাহহাক (র) বলেন: আল্লাহ তা’আলা সে রাতে কোন অমঙ্গল স্থির করেন না এবং শান্তি ছাড়া কিছুর ফায়সালা দেন না।
মুজাহিদ (র) বলেন: এটা নিরাপদ রাত। শয়তান এ রাতে কোন মন্দ কাজ করতে সক্ষম হয় না এবং কারও কোনরূপ অনিষ্টও সে করতে পারে না।
কেউ কেউ বলেন: এর অর্থ- সে রাত সালাম ছাড়া আর কিছু নয়। এটা বলা হয়েছে এ কারণে যে, সে রাতে মু’মিনদের প্রতি ফেরেশতাগণ সালাম করতে থাকে অজস্র ধারায়।
এ হিসেবে حتى مطلع الفجر এ কালাধিকরণের সম্পর্ক হবে হয়তো سلام-এর দ্বারা উপলব্ধি করা যায় এমন ক্রিয়ার সঙ্গে। অর্থাৎ সে রাত আর কিছুই নয়, উষার আবির্ভাব পর্যন্ত কেবল সালাম দেওয়ার মধ্যেই সীমিত। অথবা এটা উহ্য ক্রিয়ার অধিকরণ হয়ে উহ্য উদ্দেশ্যের বিধেয় হবে। অর্থাৎ তা জারী থাকে উষার আবির্ভাব পর্যন্ত। এ হিসেবে বাক্যটি ليلة القدر -এর আরেকটি বিধেয় অথবা تنزل-এর সাথে সম্পর্কযুক্ত। এ উভয় অবস্থায় سلام هی একটি অন্তর্বর্তী বাক্য।
কিসাঈ (র) مطلع -এর ل-এ যের দিয়ে পড়েন। বাকী সকলে পড়েন যবর দিয়ে। শব্দটি মাসদার, যার অর্থ উদয় হওয়া (الطلوع) অথবা কালাধিকরণ অর্থাৎ উদিত হওয়ার সময়।
এ রাতে সব কিছুর সাজদা করা, আলোর বিকাশ এবং ফেরেশতাদের সালাম-কালাম প্রসঙ্গে কথিত আছে, লায়লাতুল-কারে সব কিছুকে সাজদারত দেখা যায় এবং সব জায়গায় আলোর বিকিরণ পরিলক্ষিত হয়। তা ছাড়া ফেরেশতাদের সালাম ও কথাও শোনা যায়।
(গ্রন্থকার বলেন:) আমার মতে, এটা এমন একটা বিষয়, যা বুযুর্গানে দীনের মধ্যে কারও কারও কাফের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে, সকলের দৃষ্টিতে নয়। এ রাতের সওয়াব লাভের জন্য এ সবের কিছু প্রকাশ পাওয়া শর্ত নয়। যদি এসব বিষয়ের প্রকাশ কোন সামগ্রিক বা বহুল ঘটিত বিষয় হতো, তবে উম্মতের কাছে- বিশেষত সাহাবা, তাবিঈন, তাবে’ তাবিঈন ও শীর্ষস্থানীয় বুযুর্গানে দীনের কাছে তা গোপন ও অস্পষ্ট থাকার কথা চিন্তা করা যায় না। আসলে লায়লাতুল-কদরের সওয়াব লাভের জন্য শর্ত হচ্ছে আল্লাহর ইবাদত করা, যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয়। তিনি বলেন: যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় লায়লাতুল-কদরে জাগ্রত থেকে ইবাদত-বন্দেগী করে, তার সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন: এ রাতে দাঁড়িয়ে কি বসে যারা আল্লাহর যিকরে মশগুল থাকে, ফেরেশতাগণ তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করে।
মাসআলা: যে ব্যক্তি সে রাতে ইশা ও ফজরের নামায জামা’আতের সাথে আদায় করে, সেই এ রাতের সওয়াব পেয়ে যায়। তবে যে যত বেশী ইবাদত করবে, আল্লাহ্ তা’আলা তাকে তত বেশী সওয়াব দেবেন। উসমান (রা) সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
من صلى العشاء في جماعة فكانما قام نصف الليل ومن صلى الصبح في جماعة فكانما صلى الليل كله – رواه مسلم
‘যে ব্যক্তি ইশার নামায জামাআতের সাথে আদায় করলো, সে যেন অর্ধেক রাত জেগে ইবাদত করলো; আর যে ব্যক্তি ফজরের নামায জামা’আতসহ আদায় করলো, সে যেন সারা রাত জেগে ইবাদত করলো’ মুসলিম শরীফ বর্ণিত। অর্থাৎ যে ব্যক্তি ইশার নামায আদায়ের পর ফজরের নামায জামাআতের সাথে আদায় করলো, সে যেন সারারাত জেগে নামায পড়লো। ইশা ও ফজর-এর প্রত্যেক নামায অর্থরাত্রির স্থলাভিষিক্ত। কেননা, রাতের ফরয নামায প্রকৃতপক্ষে এ দুটিই। আর মাগরিব হচ্ছে দিনান্তের বিতর স্বরূপ।
লায়লাতুল-কদরে নিম্নের দু’আটি বেশী বেশী পড়া মুস্তাহাব: اللَّهُمَّ إِنَّكَ مَفو تحب الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّى হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাকারী, ক্ষমা করতে তুমি ভালবাস। সুতরাং আমাকে ক্ষমা কর।’ আইশা (রা) বর্ণনা করেন, আমি বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)। বলুন তো, আমি যদি বুঝতে পারি কোন রাত লায়লাতুল-কাদর, তবে আমি সে রাতে কী বলবো? তুমি বলবে: اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَني
আহমদ, ইবন মাজাহ ও তিরমিযী বর্ণিত। আল্লাহ্ তা’আলা সম্যক অবহিত।











