[بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَـنِ الرَّحِيمِ ]
এটি মক্কায় অবতীর্ণ
কদরের রাত্রির মর্যাদা
আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন জানিয়ে দিচ্ছেন যে, লাইলাতুল কদরে কুরআনুল কারীম অবতীর্ণ করেন। এই রাতকে লাইলাতুল মুবারাকও বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّا أَنزَلْنَـهُ فِى لَيْلَةِ الْقَدْرِ
আমি তো ইহা অবতীৰ্ণ করেছি এক মুবারাক রাতে । (সূরা দুখান, ৪৪: ৩) কুরআন কারীম দ্বারাই এটা প্রমাণিত যে, এ রাত রামাযানুল মুবারাক মাসে রয়েছে। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন,
[شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِى أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ]
রামাযান মাস, যে মাসে বিশ্বমানবের জন্য পথ প্রদর্শন এবং সু-পথের উজ্জ্বল নিদৰ্শন এবং হক ও বাতিলের প্রভেদকারী কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে । (সূরা বাকারাহ, ২: ১৮৫)
ইব্ন আব্বাস (রাঃ) প্রমুখ সাহাবী হতে বর্ণিত আছে যে, লাইলাতুল কদরে সমগ্র কুরআন লাওহে মাহফুয হতে প্রথম আসমানে অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর ঘটনা অনুযায়ী দীর্ঘ তেইশ বছরে ধীরে ধীরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর অবতীর্ণ হয়েছে।
তারপর আল্লাহ তাআলা লাইলাতুল কদরের শান শাওকত ও বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে বলেন, [إِنَّا أَنزَلْنَـهُ فِى لَيْلَةِ الْقَدْرِ] এই রাতের এক বিরাট বারাকাত হল এই যে, এ রাতে কুরআনুম মাজীদের মত মহান নি‘আমাত নাযিল হয়েছে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
[وَمَآ أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ – لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ]
হে নবী! লাইলাতুল কদর কী তা কি তোমার জানা আছে? লাইলাতুল কদর হচ্ছে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (তাবারী ২৪/৫৩১, ৫৩২; কুরতুবী ২০/১২৩)
মুসনাদ আহমাদে আবু হুরাইরাহ (রা) হতে বর্ণিত আছে যে, রামাযান মাস এসে গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন
«قَدْ جَاءَكُمْ شَهْرُ رَمَضَانَ، شَهْرٌ مُبَارَكٌ، افْتَرَضَ اللهُ عَلَيْكُمْ صِيَامَهُ، تُفْتَحُ فِيهِ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ، وَتُغْلَقُ فِيهِ أَبْوَابُ الْجَحِيمِ، وَتُغَلُّ فِيهِ الشَّيَاطِينُ، فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ، مَنْ حُرِمَ خَيْرَهَا فَقَدْ حُرِم»
‘(হে জনমণ্ডলী!) তোমাদের উপর রামাযান মাস এসে পড়েছে। এ মাস খুবই বারাকাত পূর্ণ বা কল্যাণময়। আল্লাহ তা’আলা তোমাদের উপর এ মাসের সিয়াম ফারয করেছেন। এ মাসে জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। আর শাইতানদেরকে বন্দী করে রাখা হয়। এ মাসে এমন একটি রাত রয়েছে যে রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম । এ মাসের কল্যাণ হতে যে ব্যক্তি বঞ্চিত হয় সে প্রকৃতই হতভাগা ৷’ ইমাম নাসাঈও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। (আহমাদ ২/২৩০, নাসাঈ ৪/১২৯)
কদরের রাতে ইবাদাত করার সাওয়াব এক হাজার মাস অপেক্ষা অধিক হওয়ার ব্যাপারে সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
«مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِه»
যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াবের নিয়াতে কদরের রাতে ইবাদাত করে, তার পূর্বাপর সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেয়া হয়৷’ (ফাতহুল বারী ৪/২৯৪, মুসলিম ১/৫২৩)
কদরের রাতে ফেরেশতাদের উপস্থিতি এবং উত্তম বিষয়ের অবতরণ
এরপর আল্লাহ তা’আলা বলেন, [تَنَزَّلُ الْمَلَـئِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمْرٍ] এ রাতের বারাকাতের আধিক্যের কারণে এ রাত্রে বহু সংখ্যক মালাইকা অবতীর্ণ হন। এমনিতেই মালাইকা সকল বারাকাত ও রাহমাতের সাথেই অবর্তীণ হন। যেমন কুরআন তিলাওয়াতের সময়ে অবতীর্ণ হন, যিক্রের মাজলিস ঘিরে ফেলেন এবং দীনী ইলম বা বিদ্যা শিক্ষার্থীদের জন্য সানন্দে নিজেদের পাখা বিছিয়ে দেন ও তাদের প্রতি বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করেন। রূহ্ দ্বারা এখানে জিবরাঈলকে (আঃ) বুঝানো হয়েছে। এ আয়াতে অন্যান্য মালাইকা থেকে আলাদা করে উল্লেখ করার কারণ এই যে, অন্যান্য মালাইকা থেকে তার যে ভিন্ন মর্যাদা রয়েছে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা তা প্রকাশ করে দিলেন। পরবর্তী আয়াতাংশ [مِّن كُلِّ أَمْرٍ] এর ব্যাখ্যায় মুজাহিদ (রহঃ) বলেন যে, সব কিছুর উপর তখন শান্তি বর্ষিত হয়। অতঃপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’আলা বলেন, [سَلَـمٌ هِىَ] কদরের রাত আগাগোড়াই শান্তির রাত। সাঈদ ইব্ন মানসুর (রহঃ) বলেন: ঈসা ইব্ন ইউনুস (রহঃ) আমাদেরকে বলেছেন যে, আমাশ (রহ.) আমাদেরকে বলেছেন যে, মুজাহিদ (রহঃ) [سَلَـمٌ هِىَ] এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এ রাতে শাইতান কোন অনিষ্ট করতে পারেনা, কেহকে কোন কষ্ট দিতে পারেনা কাতাদাহ (রহঃ) প্রমুখ গুরুজন বলেন যে, এই রাতে সমস্ত কাজের ফাইসালা করা হয়, বয়স, মৃত্যু ও রিয্ক নির্ধারণ করা হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, [فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ] এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপুর্ণ বিষয়ে স্থিরীকৃত হয় । (সূরা দুখান, 88: 8) সাঈদ ইবৃন মানসুর বলেন, হুসাইম (রহঃ) আবূ ইসহাকের (রহঃ) বরাতে আমাদের কাছে বর্ণনা করেন যে, শাবী (রহঃ) [سَلَـمٌ هِىَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ] আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন যে, এই রাতে মালাইকা মাসজিদে অবস্থানকারীদের প্রতি সকাল পর্যন্ত সালাম প্রেরণ করতে থাকেন। কাতাদাহ (রহঃ) এবং ইব্ন যায়িদ (রহঃ) বলেন যে, এ রাতে শুধুই শান্তি আর শান্তি, কোন খারাবীই এতে নিহিত নেই এবং তা ফাজর পৰ্যন্ত বলবৎ থাকে।
মর্যাদাপূর্ণ রাত কোনটি এবং উহার লক্ষণ
মুসনাদ আহমাদে উবাদাহ ইব্ন সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«لَيْلَةُ الْقَدْرِ فِي الْعَشْرِ الْبَوَاقِي، مَنْ قَامَهُنَّ ابْتِغَاءَ حِسْبَتِهِنَّ فَإِنَّ اللهَ يَغْفِرُ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ، وَهِيَ لَيْلَةُ وِتْرٍ: تِسْعٍ أَوْ سَبْعٍ أَوْ خَامِسَةٍ أَوْ ثَالِثَةٍ أَوْ آخِرِ لَيْلَة»
‘(রামাযান মাসের) শেষ দশ রাতের মধ্যে লাইলাতুল কদর রয়েছে। যে ব্যক্তি এই রাতে সাওয়াবের আশায় ইবাদাত করে আল্লাহ তা‘আলা তার পূর্বাপর সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেন। ইহা হল বেজোড় রাত । অর্থাৎ একুশ, তেইশ, পঁচিশ, সাতাশ কিংবা উনত্রিশতম রাত৷’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন:
«إِنَّ أَمَارَةَ لَيْلَةِ الْقَدْرِ أَنَّهَا صَافِيَةٌ بَلْجَةٌ، كَأَنَّ فِيهَا قَمَرًا سَاطِعًا، سَاكِنَةٌ سَاجِيَةٌ، لَا بَرْدَ فِيهَا وَلَا حَرَّ، وَلَا يَحِلُّ لِكَوْكَبٍ يُرْمَى بِهِ فِيهَا حَتْى يُصْبِحَ، وَإِنَّ أَمَارَتَهَا أَنَّ الشَّمْسَ صَبِيحَتَهَا تَخْرُجُ مُسْتَوِيَةً لَيْسَ لَهَا شُعَاعٌ، مِثْلَ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ، وَلَا يَحِلُّ لِلشَّيْطَانِ أَنْ يَخْرُجَ مَعَهَا يَوْمَئِذ»
‘লাইলাতুল কদরের নিদর্শন এই যে, এটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও পরিষ্কার এবং এমন উজ্জ্বল হয় যে, যেন চন্দ্রোদয় ঘটেছে। এ রাতে শান্তি ও শৈত্য বিরাজ করে। ঠাণ্ডা ও গরম কোনটাই বেশী থাকেনা । সকাল পর্যন্ত নক্ষত্র আকাশে জ্বল জ্বল করে। এ রাতের আর একটি নিদর্শন এই যে, এর শেষ প্রভাতে সূর্য প্রখর কিরণের সাথে উদিত হয়না । বরং চতুর্দশ রাতের চন্দ্রের মত উদিত হয়। সেদিন ওর সাথে শাইতানেরও আবির্ভাব হয়না৷’ (আহমাদ ৫/৩২৪ মুরসাল) এ হাদীসটির সনদ সহীহ বা বিশুদ্ধ, কিন্তু মতন গারীব। কিছু কিছু শব্দের ব্যবহার বিতর্কিত রয়েছে।
ইমাম আবু দাউদ (রহঃ) তার সুনান গ্রন্থে কদরের রাত সম্পর্কে একটি ভিন্ন অধ্যায় রচনা করেছেন। তাতে তিনি লিখেছেন যে, প্রতি বছর রামাযান মাসে কদরের রাতের আবির্ভাব হয়। তিনি আরও লিখেছেন যে, আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমার (রা) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এক ব্যক্তি কদরের রাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তখন আমিও তার কাছে ছিলাম । তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, «هِيَ فِي كُلِّ رَمَضَان» ইহা প্রতি রামাযান মাসেই আবির্ভূত হয়। (হাদীস নং ২/১১১ মাওকুফ) এ হাদীসটি বর্ণনার ব্যক্তিবর্গ বিশ্বস্ত, কিন্তু ইমাম আবূ দাউদ (রহঃ) বলেছেন যে, শুবাহ (রহঃ) এবং সুফিয়ান (রহঃ) উভয়ে এটি ইসহাক (রহঃ) হতে বর্ণনা করেছেন এবং তারা মনে করেন যে, আলোচ্য বর্ণনাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের নয়, বরং ইব্ন উমারের (রাঃ) নিজের ।
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়৷ সাল্লাম রামাযান মাসের প্রথম দশদিনে ই’তিফাক করেন, আমরাও তার সাথে ই’তিকাফ করতে থাকি। অতঃপর জিবরাঈল (আঃ) এসে বলেন, ‘আপনি যা খুঁজছেন তাতো এখনো সামনে রয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মধ্যভাগের দশদিন ই’তিকাফ করেন এবং আমরাও তীর সাথে ই’তিকাফ করি। আবার জিবরাঈল (আঃ) এসে বলেন, ‘আপনি যা খুঁজছেন তাতো এখনো সামনে রয়েছে।’ অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাযামানের বিশ তারিখের সকালে দাড়িয়ে খুতবাহ দেন এবং বলেন,
«مَنْ كَانَ اعْتَكَفَ مَعِيَ فَلْيَرْجِعْ فَإِنِّي رَأَيْتُ لَيْلَةَ الْقَدْرِ، وَإِنِّي أُنْسِيتُهَا، وَإِنَّهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ فِي وِتْرٍ، وَإِنِّي رَأَيْتُ كَأَنِّي أَسْجُدُ فِي طِينٍ وَمَاء»
‘আমার সাথে রাত দেখেছি, কিন্তু এরপর তা আমাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে ইহা রামাযানের শেষ দশদিনের বেজোড় রাতে রয়েছে। আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে যে, আমি যেন কাদা ও পানির মধ্যে সাজদাহ করছি।’ মাসজিদে নাববীর ছাদ ছিল শুকনা খেজুর পাতার তৈরি । আকাশে তখন মেঘের কোন চিহ্নই ছিলনা । হঠাৎ মেঘ জমা হল এবং বৃষ্টি হল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে সাথে নিয়ে সালাত আদায় করেন এবং আমরা লক্ষ্য করলাম যে, তার কপালে ভিজা মাটি লেগে রয়েছে’ (ফাতহুল বারী ৪/৩২৯, মুসলিম ২/৮২৪) এভাবে তার স্বপ্ন সত্য প্রমাণিত হল। ইহা রামাযান মাসের একুশ তারিখের রাতের ঘটনা বলে ইমাম বুখারী (রহঃ) ও ইমাম মুসলিম এ হাদীসটি দু’টি ভিন্ন বর্ণনা ধারায় উল্লেখ করেছেন। ইমাম শাফিঈ (রহঃ) বলেন যে, বর্ণনার দিক দিয়ে এ হাদীসটি সহীহ। আবদুল্লাহ ইবৃন উনাইস (রহঃ) থেকে বর্ণিত সহীহ মুসলিমে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে যাতে বলা হয়েছে যে, কদরের রাত হল রামাযানের তেইশতম রাত। (হাদীস নং ২/৮২৭) ইব্ন আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত অপর একটি হাদীসে বলা হয়েছে যে, কদরের রাত হল রামাযানের পঁচিশতম রাত। ওতে বলা হয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা রামাযানের শেষ দশ রাতে কদরের রাত অন্বেষন কর। নবম রাতেও থাকতে পারে, সপ্তম রাতেও থাকতে পারে অথবা পঞ্চম রাতেও থাকতে পারে। (ফাতহুল বারী ৪/৩০৬)
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«الْتَمِسُوهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ فِي تَاسِعَةٍ تَبْقَى، فِي سَابِعَةٍ تَبْقَى، فِي خَامِسَةٍ تَبْقَى»
‘কদরের রাতকে রামাযানের শেষ দশকে খৌজ কর। এটি নয় (এর রাত্রে) থাকে, সাত (এর রাত্রে) থাকে, পাঁচ (এর রাতেও এ সুযোগ) থাকে’ অধিকাংশ মুহাদ্দিস বলেছেন যে, এর দ্বারা বেজোড় রাতকে বুঝানো হয়েছে। এটাই সর্বাধিক সুস্পষ্ট ও প্রসিদ্ধ উক্তি।
কদরের রাত রামাযানের সাতাশতম রাত বলেও উল্লেখ রয়েছে। উবাই ইব্ন কা’ব (রা.) হতে বর্ণিত একটি হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘এটি সাতাশতম রাত !’ (মুসলিম ২/৮২৮)
মুসনাদ আহমাদে রয়েছে যে, যির (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি উবাই ইব্ন কা‘বকে (রা.) জিজ্ঞেস করেন, হে আবু মুনযির! বলা হল: আপনার ভাই আবদুল্লাহ ইব্ন মাসউদ (রাঃ) বলেন: যে ব্যক্তি বছরের প্রত্যেক রাতে জেগে থাকবে সে কদরের রাত পেয়ে যাবে। এ কথা শুনে উবাই (রা.) বললেন: ‘আল্লাহ তার প্রতি রহম করুন, তিনি জানতেন যে, এ রাত রামাযান মাসের মধ্যে রয়েছে এবং আমি শপথ করে বলছি যে, কদরের রাত যে রামাযানের সাতাশতম রাত এটাও আবদুল্লাহ ইব্ন মাসউদ (রা.) জানতেন । উবাই ইব্ন কা’বকে (রা.) আবার জিজ্ঞেস করা হল, আপনি এটা কি করে জানলেন? জবাবে তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের যে সব নিদর্শনের কথা বলেছেন সে সব দেখেই আমরা বুঝতে পেরেছি। যেমন এ দিন রাতের পর সূর্য উদিত হওয়ার সময় কিরণহীন অবস্থায় উদিত হয়। ইমাম মুসলিমও (রহঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। (আহমাদ ৫/১৩০, মুসলিম ২/৮২৮)
লাইলাতুল কদর রামাযান মাসের উনত্রিশতম রাত বলেও উল্লেখ রয়েছে। উবাদা ইব্ন সামিতের (রা.) প্রশ্নের জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
«فِي رَمَضَانَ فَالْتَمِسُوهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ، فَإِنَّهَا فِي وِتْرٍ إِحْدَى وَعِشْرِينَ، أَوْ ثَلَاثٍ وَعِشْرِينَ، أَوْ خَمْسٍ وَعِشْرِينَ، أَوْ سَبْعٍ وَعِشْرِينَ، أَوْ تِسْعٍ وَعِشْرِينَ، أَوْ فِي آخِرِ لَيْلَة»
‘এ রাতে রামাযান মাসের শেষ দশকে বেজোড় রাতসমূহে অনুসন্ধান কর অর্থাৎ একুশ, তেইশ, পঁচিশ, সাতাশ, উনত্রিশ অথবা শেষ রাতে ৷’ (আহমাদ ৫/৩১৮) মুসনাদ আহমাদে আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
«إِنَّهَا لَيْلَةُ سَابِعَةٍ أَوْ تَاسِعَةٍ وَعِشْرِينَ، وَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ تِلْكَ اللَّيْلَةَ فِي الْأَرْضِ أَكْثَرُ مِنْ عَدَدِ الْحَصَى»
‘লাইলাতুল কদর হল সাতাশতম অথবা উনত্রিশতম রাত। এ রাতে যে মালাইকা পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন তাদের সংখ্যা পৃথিবীর প্রস্তর খণ্ডের সংখ্যার চেয়েও অধিক ।’ (আহমাদ ২/৫১৯) একমাত্র ইমাম আহমাদ (রহ.) এ হাদীসটি লিপিবদ্ধ করেছেন এবং এর বর্ণনায় কোন ভুল পরিলক্ষিত হয়না ।
‘রামাযানের সর্বশেষ রাতও কদরের রাত’ এর উপরও একটি বর্ণনা রয়েছে। জামে’ তিরমিধী এবং সুনান নাসাঈতে রয়েছে: ‘নয়টি রাত যখন বাকী থাকে বা সাত পাচ বা তিন অথবা শেষ রাত অর্থাৎ এ রাতগুলিতে কদরের রাত তালাশ কর !’
ইমাম তিরমিযী (রহঃ) আবূ কিলাবা (রহঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রামাযানের শেষ দশ দিনের রাতের মধ্যে এ রদবদল হয়ে থাকে। ইমাম মালিক (রহঃ) ইমাম সাওরী (রহঃ), ইমাম আহমাদ ইব্ন হাম্বল (রহঃ), ইমাম ইসহাক ইব্ন রাহওয়াই (রহঃ), ইমাম আবূ সাওর (রহঃ), আল মুযানী (রহঃ), ইমাম আবূ বাকর ইব্ন খুযাইমা (রহঃ) প্রমুখ গুরুজনও এ কথাই বলেছেন। আল্লাহ তা‘আলাই এ সম্পর্কে ভাল জানেন।
কদরের রাতে পঠিতব্য দু’আ
এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, সব সময়েই আল্লাহর কাছে দু’আ চাওয়া উচিত তবে রামাযান মাসে আরো বেশী করে দুআ করতে হবে, বিশেষ করে রামাযানের শেষ দশকে এবং বেজোড় রাতে নিম্নের দু‘আটি খুব বেশী পাঠ করতে হবে, ‘হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করাকে আপনি ভালবাসেন, সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন!” মুসনাদ আহমাদে বর্ণিত আছে যে, আয়িশা (রাঃ) জিজ্ঞেস করেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি যদি কদরের রাত পেয়ে যাই তাহলে আমি কি দু‘আ পাঠ করব? উত্তরে তিনি বললেন,
«قُولِي: اللْهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي»
এই দু‘আটি পাঠ করবে (আহমাদ ৬/১৮২) এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী (রহঃ) এবং নাসাঈও (রহঃ) বর্ণনা করেছেন। সুনান ইব্ন মাজাহয়ও বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (রহঃ) এটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। মুসতাদরাক হাকিম গ্রন্থেও এটি ভিন্ন রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে এবং তিনি দুই শায়খের (ইমাম বুখারী ও মুসলিম (রহঃ)) শর্তে সহীহ বলেছেন। (তিরমিযী ৯/৪৯৫, নাসাঈও ৬/২১৮, ইব্ন মাজাহয় ২/১২৬৫, হাকিম ১/৫৩০)











