প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহ, আমাদের সম্মানিত শাইখ।
আমি আশা করি এই প্রশ্নটি আপনার কাছে সুস্বাস্থ্য ও সুস্থতার সাথে পৌঁছেছে। আমি আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা)’র কাছে দু’আ করি যেন তিনি আপনাকে তাঁর দ্বীনকে সমুন্নত রাখতে এবং তাঁর আইন বাস্তবায়নে সহায়তা করেন।
আমার প্রশ্ন হচ্ছে: সাম্প্রতিক সময়ে আমরা স্বর্ণের মূল্যে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করছি। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এর মূল্য দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেছে। এর অর্থ কি এই যে, স্বর্ণ—যা দীর্ঘদিন ধরে একটি স্থিতিশীল ধাতু এবং মুদ্রাব্যবস্থার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে—এখন আর সেই স্থিতিশীলতা বজায় রাখছে না, বরং পরিবর্তনশীল হয়ে উঠেছে? নাকি এই মূল্য পরিবর্তনের পেছনে কিছু নির্দিষ্ট শাসকগোষ্ঠীর আরোপিত নিয়ন্ত্রণ এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রভাবই প্রধান ভূমিকা পালন করছে?
যদি তাই হয়ে থাকে, তবে ইনশাআল্লাহ অদূর ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত হতে যাওয়া ইসলামী রাষ্ট্র কীভাবে তার মুদ্রাব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে এবং ইসলামের শত্রুদের সম্ভাব্য প্রভাব ও কারসাজি থেকে তাকে সুরক্ষিত রাখবে?
বারাকাল্লাহু ফিক
আপনার ইসলামের ভাই, আহমেদ সাঈদ, ফিলিস্তিনের ইসরা ও মিরাজের ভূমি থেকে।
উত্তর:
ওয়া আলাইকুম আসসালামু ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
স্বর্ণের মূল্যের ওঠানামার (প্রধান) কারণ হলো—স্বর্ণ নিজেই একটি পণ্য (commodity)। ফলে অন্যান্য পণ্যের মতোই বাজারের জল্পনা-কল্পনা ও আর্থিক স্পেকুলেশনের প্রভাব এর ওপর পড়ে; যার ফলে এর মূল্য কখনো ঊর্ধ্বমুখী হয় আবার কখনো নিম্নমুখী হয়। বিশেষত বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বৃহৎ শক্তিগুলো—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র—ডলারকে আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তারা কার্যত কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই প্রয়োজনমতো ডলার ছাপানোর পরিমাণ ইচ্ছামতো বাড়াতে বা কমাতে পারে। তদুপরি বহু দেশের সঙ্গে তাদের বিদ্যমান ঔপনিবেশিক ধাঁচের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে ডলারকে একটি কৃত্রিম স্থিতিশীলতা প্রদান করে, যার ফলে তা প্রায় স্বর্ণের সমতুল্য মর্যাদা লাভ করেছে। কিন্তু যদি বাস্তবতা ভিন্ন হতো—অর্থাৎ মুদ্রাব্যবস্থা প্রকৃত অর্থেই স্বর্ণভিত্তিক হতো এবং প্রতিটি কাগুজে মুদ্রার বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ সংরক্ষিত থাকত, যা যেকোনো সময় বিনিময়যোগ্য—যাকে রিজার্ভ কাগুজে মুদ্রা বলা হয়—তাহলে তথাকথিত ফিয়াট মুদ্রা (অর্থাৎ বাস্তব সম্পদ দ্বারা সমর্থিত নয় এমন কাগুজে টাকা) কেবল যে কাগজে তা মুদ্রিত হয়েছে সেই কাগজের মূল্য ছাড়া আর কোনো প্রকৃত মূল্য বহন করত না। এ বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য আমি দুটি বিষয় উল্লেখ করছি-
প্রথমতঃ আমার বই “Economic Crises: Their Reality and Solutions from the Viewpoint of Islam”-এ আমি আলোচনা করেছি যে—
[মুদ্রার বাস্তবতার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট: যখন বিশ্ব অর্থনৈতিক লেনদেনে স্বর্ণমান (Gold Standard) অনুসরণ করত, তখন বৈশ্বিক অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধি ও মুদ্রার স্থিতিশীলতার এক পর্যায় অতিক্রম করছিল। কিন্তু যখন এই ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে গেল এবং লেনদেন সম্পূর্ণরূপে বাধ্যতামূলক কাগুজে মুদ্রার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল, তখন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে এবং একের পর এক আর্থিক সংকট দেখা দিতে থাকে। স্বর্ণমান ব্যবস্থায় প্রতিটি দেশের মুদ্রা হয় সরাসরি স্বর্ণ ছিল, অথবা এমন কাগুজে নোট ছিল যা পূর্ণমূল্যে স্বর্ণ দ্বারা সমর্থিত এবং যেকোনো সময় স্বর্ণে রূপান্তরযোগ্য ছিল। ফলে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকত, কারণ তা একটি স্বীকৃত স্বর্ণের এককের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী একটি দিনার নির্ধারিত হয়েছে ৪.২৫ গ্রাম স্বর্ণ হিসেবে। ব্রিটিশ পাউন্ড আইনি ভাবে নির্ধারিত ছিল ২ গ্রাম খাঁটি স্বর্ণ, এবং ফরাসি ফ্রাঁ ছিল ১ গ্রাম স্বর্ণের সমমূল্য। ফলে বিভিন্ন মুদ্রার মধ্যে বিনিময় হার ছিল নির্দিষ্ট ও স্থিতিশীল।
এই ব্যবস্থার ফলে মুদ্রার মূল্য দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে উভয় ক্ষেত্রেই স্থিতিশীল থাকত। এর একটি প্রমাণ হলো—১৯১০ সালে স্বর্ণের মানদণ্ডমূল্য প্রায় একই স্তরে ছিল যেমনটি ১৮৯০ সালে ছিল। কিন্তু যখন এই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, তখন থেকেই অর্থনৈতিক সংকটের ঘনঘটা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে]
দ্বিতীয়তঃ
ইনশাআল্লাহ যখন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন তার মুদ্রা নিয়ে কোনো আশঙ্কা থাকবে না। অন্যান্য দেশ যদি স্বর্ণ ও রৌপ্যকে মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ না করে এবং ফিয়াট কাগুজে মুদ্রাভিত্তিক ব্যবস্থাই অব্যাহত রাখে, তবুও তারা ইসলামী রাষ্ট্রের মুদ্রাকে প্রভাবিত করতে পারবে না। কারণ মুসলিম দেশগুলোর এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা তাদের বাইরের জল্পনা-কল্পনা থেকে নিরাপদ রাখবে।
ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এ বিষয়ে বলা হয়েছে:
[ইসলামী রাষ্ট্রের মুদ্রা এবং অন্যান্য দেশের মুদ্রার মধ্যকার বিনিময় হারের তারতম্য ইসলামী রাষ্ট্রের ওপর কোনো কার্যকর প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না; এর পেছনে দুটি মৌলিক কারণ রয়েছে:
১। ইসলামী ভূখণ্ডে এমন প্রায় সব ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ ও কাঁচামাল বিদ্যমান, যা উম্মাহ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম। ফলে অন্যান্য দেশের পণ্যের ওপর তাদের নির্ভরতা মৌলিকভাবে অপরিহার্য নয়। নিজস্ব সম্পদ ও উৎপাদনক্ষমতার কারণে ইসলামী রাষ্ট্র মূলত স্বনির্ভর থাকবে; তাই আন্তর্জাতিক মুদ্রাবিনিময় হারের ওঠানামা তার অর্থনীতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারবে না।
২। মুসলিম ভূখণ্ডে এমন কিছু কৌশলগত পণ্য ও সম্পদ রয়েছে, যেগুলোর প্রয়োজন বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য অপরিহার্য—যেমন তেল। ইসলামী রাষ্ট্র চাইলে এসব পণ্য বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এই শর্ত আরোপ করতে পারে যে এর মূল্য স্বর্ণে পরিশোধ করতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র নিজস্ব সম্পদ ও উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে অন্য দেশের পণ্যের প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে। যে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এমন কৌশলগত সম্পদ থাকে, যা বিশ্বের অন্যান্য জাতির জন্য অপরিহার্য, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত তার হাতেই ন্যস্ত থাকে; অন্য কোনো শক্তির পক্ষে তার মুদ্রাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না]
প্রিয় ভাই, নিশ্চিত থাকুন যে, এই দলের মধ্যে জ্ঞানী, সচেতন এবং সুবিবেচনাপ্রসূত ব্যক্তিরা আছেন, আর সবকিছুর আগে এবং পরে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা)’র সাহায্য ও নির্দেশনা রয়েছে, যা ইসলামের শত্রুদের চক্রান্তকে তাদের নিজেদের উপর ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর আল্লাহ হলেন সৎকর্মপরায়ণদের রক্ষাকর্তা।
আমি আশা করি এটাই যথেষ্ট, আর আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন এবং তিনিই সবচেয়ে প্রজ্ঞাময়।
আপনাদের ভাই
আতা ইবন খলিল আবু আল-রাশতাহ
৭ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি
২৪/০২/২০২৬ ইং











