রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রায়া (الراية) ও লিওয়া (اللواء) সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসসমূহ
প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আমাদের সম্মানিত শায়খ, আপনি কেমন আছেন?
আমার একটি প্রশ্ন রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রায়া (الراية) সম্পর্কে কতগুলো হাদিস বর্ণিত হয়েছে এবং সেগুলোর বিশুদ্ধতা (Authenticity) কতটুকু?
এবং যদি আপনি কোনো হাদিস উল্লেখ করেন, তাহলে অনুগ্রহ করে তার সনদ (السند)-এর মান বা গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কেও উল্লেখ করবেন।
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
লিওয়া (পতাকা) এবং রায়া (ব্যানার) এবং সেগুলোর উপর কী লেখা ছিল— এ বিষয়ে আমাদের গ্রন্থসমূহে আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষভাবে এ বিষয়ে আলোচনা রয়েছে “আযহিজা” (Ajhiza – أجهزة الدولة في الخلافة: The Institutions of State in the Khilafah) (খিলাফতের রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানসমূহ—শাসন ও প্রশাসন বিষয়ে) গ্রন্থে, যার আরবি সংস্করণের ২০০ পৃষ্ঠা এবং ইংরেজি সংস্করণের ১৬৩ পৃষ্ঠায় নিম্নরূপ বলা হয়েছে—
রাষ্ট্রের পতাকা (ألوية/ Alwiyah) এবং ব্যানার (رايات/ Rayāt) থাকবে। এই বিধানটি নির্ণীত হয়েছে ইসলামের প্রথম রাষ্ট্র—যা রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনা আল-মুনাওয়ারায় (المدينة المنورة) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন—সেই রাষ্ট্রের পতাকা ও ব্যানারের দৃষ্টান্ত থেকে। এগুলো হবে নিম্নরূপ—
১. ভাষাতাত্ত্বিক ও অভিধানগত দৃষ্টিকোণ থেকে পতাকা (Flag) এবং ব্যানার (Banner)—উভয়কেই আরবি ভাষায় সাধারণভাবে ‘আলাম’ (عَلَم) বলা হয় (এর অর্থ হলো কোনো দল, বাহিনী বা রাষ্ট্রকে শনাক্ত করার জন্য ব্যবহৃত প্রতীক, চিহ্ন বা নিশান)।
প্রখ্যাত আরবি অভিধান আল-কামুস আল-মুহীত (القاموس المحيط) গ্রন্থে শব্দমূলভিত্তিক আলোচনায় বলা হয়েছে—
(روي) (র-ও-য়) ধাতুর অধীনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আর-রায়া (الراية) হলো ‘আলাম’ (عَلَم) যার বহুবচন রায়াত (رايات)। অন্যদিকে (لوي) (ল-ও-য়) ধাতুর অধীনে বলা হয়েছে—আল-লিওয়া (اللواء)-ও ‘আলাম’ (عَلَم) যার বহুবচন আলউইয়াহ (ألوية)।
তবে শরিয়ত এই দুটি শব্দের জন্য নির্দিষ্ট শর’ঈ পরিভাষাগত অর্থ নির্ধারণ করেছে, যা নিম্নরূপ—
লিওয়া (পতাকা) সাদা রঙের, যার উপর কালো অক্ষরে লেখা থাকে— “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”। এই পতাকা সেনাবাহিনীর আমির বা প্রধান সেনানায়কের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। এটি তার অবস্থান নির্দেশকারী প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং তার অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গেই অবস্থান করে। সেনাপতির সঙ্গে পতাকা সংযুক্ত থাকার প্রমাণ হলো—রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয়ের দিন একটি সাদা পতাকা উত্তোলন করে মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন। এই হাদিসটি জাবির (রা.) থেকে ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন। আর আন-নাসাঈ আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে— যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) উসামা ইবনে যায়েদকে রোম অভিযানের জন্য সেনাপতি নিযুক্ত করেন, তখন তিনি নিজ হাতে তার জন্য পতাকা বাঁধেন।
রায়া (ব্যানার) টি কালো রঙের, যার উপর সাদা অক্ষরে লেখা থাকে—“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” এটি বহন করে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের নেতারা—যেমন রেজিমেন্ট, ডিটাচমেন্ট বা অন্যান্য সামরিক বিভাগের কমান্ডারগণ। এর প্রমাণ হলো—খাইবার অভিযানের সময়, যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেই সেনাপতি ছিলেন, তিনি বলেন—“আমি আগামীকাল এই রায়া এমন এক ব্যক্তিকে প্রদান করব, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও তাকে ভালোবাসেন।” পরদিন তিনি এটি আলী (রা.)-কে প্রদান করেন। এই হাদিসটি (বুখারি ও মুসলিম উভয়েই বর্ণনা করেছেন) মুত্তাফাকুন আলাইহি। তখন আলী (রা.) সেনাবাহিনীর একটি ডিভিশন বা ইউনিটের নেতা ছিলেন। আরও একটি হাদিসে হারিস ইবনে হাসান আল-বাকরি বলেন—“আমরা মদিনায় আগমন করলাম এবং দেখলাম রাসূলুল্লাহ (সা.) মিম্বারের উপর আছেন। বিলাল তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, তার কোমরে তরবারি বাঁধা। আর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে কিছু কালো ব্যানার ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম—এই ব্যানারগুলো কী? তারা বলল—এটি আমর ইবনে আল-আস, যিনি সদ্য একটি অভিযানে থেকে ফিরে এসেছেন।” এখানে বলা হয়েছে—“কালো ব্যানারসমূহ (Rayaat)” অর্থাৎ একাধিক ব্যানার ছিল, যদিও সেনাপতি ছিলেন একজন—আমর ইবনে আল-আস। এ থেকে বোঝা যায়—একই সেনাবাহিনীতে পতাকা (Liwa’) একটি মাত্র কিন্তু ব্যানার (Rayat) একাধিক হতে পারে, যা বিভিন্ন ইউনিট বহন করে। অতএব—লিওয়া (পতাকা) কেবল সেনাপতির প্রতীক (আলাম) আর রায়া (ব্যানার) সৈন্যদের বহনকৃত প্রতীকসমূহ (আলাম)।
২. পূর্বে যা উল্লেখ করা হয়েছে তার সাথে আরও একটি হাদিস সংযোজন করছি, যা আত-তাবারানি তাঁর গ্রন্থ আল-মুʿজাম আল-আওসাত (المعجم الأوسط) (১/২২৩)-এ নিম্নোক্ত হাদিসটি বর্ণনা করেছেন—
[২২৪ আহমদ ইবন রুশদীন আমাদের নিকট বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আবদুল গাফ্ফার ইবন দাউদ আবু সালিহ আল-হাররানি আমাদের নিকট বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: হাইয়ান ইবন উবাইদুল্লাহ আমাদের নিকট বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আবু মাজলাজ লাহিক ইবন হুমায়দ আমাদের নিকট বর্ণনা করেন, তিনি ইবন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে—
«كَانَتْ رَايَةُ رَسُولِ اللهِ ﷺ سَوْدَاءَ وَلِوَاؤُهُ أَبْيَضُ، مَكْتُوبٌ عَلَيْهِ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللهِ»
অর্থাৎ—“রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর রায়া (ঝাণ্ডা) ছিল কালো, এবং তাঁর লিওয়া (পতাকা) ছিল সাদা। তাতে লেখা ছিল—‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।’” এই হাদিসটি ইবন আব্বাস (রা.) থেকে কেবল এই সনদের মাধ্যমেই বর্ণিত হয়েছে; অর্থাৎ এই বর্ণনাটি হাইয়ান ইবন উবাইদুল্লাহ-এর বর্ণনার মাধ্যমে এককভাবে (unique narration) প্রাপ্ত। ইবন হিব্বান তার গ্রন্থ আস-সিকাত (الثقات) (খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ২৩০)-এ হাইয়ানকে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অন্যদিকে আবু হাতিম তার গ্রন্থ আল-জারহ ওয়া আত-তা‘দিল (الجرح والتعديل) (খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৪৬)-এ তার সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন— “তিনি সত্যবাদী (صدوق)।”
রায়া (ব্যানার) ও লিওয়া (পতাকা)-এর বিষয়টি ইসলামের ইতিহাসে সুপরিচিত। ইসলামের প্রারম্ভিক যুগ থেকেই মুসলমানদের জন্য রায়া (ব্যানার) উত্তোলিত হয়ে এসেছে। অতএব এ বিষয়ে অতিরিক্ত ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।
আমি আশা করি এই আলোচনা যথেষ্ট হবে। আর আল্লাহই সর্বাধিক অবগত এবং সর্বাধিক প্রজ্ঞাময়।
ওয়াস সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনাদের ভাই
আতা ইবনু খলিল আবু আল-রাশতা
২৮ শা‘বান ১৪৪৭ হিজরি
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ











