শরীয়াহ অনুযায়ী অঙ্কন (drawing), আলোকচিত্র (photography) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) বিধান
ইসলামি জীবনবিধানে ছবি বা প্রতিকৃতি তৈরির বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এ সম্পর্কে বিস্তারিত শর’ঈ নির্দেশনা রয়েছে। আধুনিক যুগে প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে অঙ্কন (Drawing), আলোকচিত্র (Photography) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) মাধ্যমে ছবি তৈরির নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। নিম্নে এ সংক্রান্ত শরঈ বিধানগুলো আলোচনা করা হলো।
১. প্রাণবন্ত বস্তুর ছবি বা প্রতিকৃতি অঙ্কনের বিধান
শরীয়াহ অনুযায়ী মানুষ, পশু বা পাখির মতো প্রাণসম্পন্ন (যার প্রাণ বা ‘রুহ’ আছে) কোনো বস্তুর ছবি অঙ্কন করা স্পষ্টত নিষিদ্ধ বা হারাম। এটি কাগজে আঁকা, কাপড়ে বোনা, অলঙ্কার বা মুদ্রায় খোদাই করা কিংবা মাটির তৈরি ভাস্কর্য—যেকোনো মাধ্যমেই হোক না কেন, তা নিষিদ্ধের অন্তর্ভুক্ত। হাদিস অনুসারে, কিয়ামতের দিন সেই চিত্রকরদের সবচেয়ে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে যারা আল্লাহর সৃষ্টির অনুকরণ করার চেষ্টা করে। তাদের বলা হবে, “তোমরা যা সৃষ্টি করেছ তাতে প্রাণ সঞ্চার করো,” কিন্তু তারা তা করতে পারবে না।
তবে প্রাণহীন বস্তু যেমন গাছপালা, পাহাড়-পর্বত, ফুল, নদী ইত্যাদির ছবি আঁকা সম্পূর্ণ জায়েজ। শরীয়াহ শুধুমাত্র সেই সব ছবির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যেগুলোতে প্রাণ আছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময় জিবরাঈল (আ.) একটি ঘরে প্রবেশ করতে অস্বীকার করেছিলেন কারণ সেখানে মানুষের মূর্তি এবং প্রাণীর ছবিযুক্ত পর্দা ছিল। পরবর্তীতে সেই মূর্তির মাথা কেটে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয় যাতে সেটি একটি গাছের রূপ ধারণ করে, যা প্রমাণ করে যে মূর্তির মাথা বা প্রাণবন্ত রূপ না থাকলে তা ব্যবহারযোগ্য হতে পারে।
তবে শিশুদের খেলনা বা পুতুলের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। আয়েশা (রা.) রাসুল (সা.)-এর উপস্থিতিতে পুতুল ও ডানাযুক্ত ঘোড়া দিয়ে খেলতেন এবং তিনি এতে বাধা দেননি। সুতরাং শিশুদের শিক্ষা ও বিনোদনের জন্য প্রাণীর আকৃতির খেলনা বা কার্টুন ব্যবহার করা বৈধ।
এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, ইসলাম আগমন পূর্ববর্তী কোনো নবী-রাসূলের আইনের ক্ষেত্রে ভাস্কর্য (পুজার মুর্তি নয়) অর্থাৎ সম্মানিত ব্যক্তিদের ভাস্কর্য তৈরি অনুমোদিত ছিল। যেমন, কুরআন ও হাদীসে নূহ (আ)-এর জাতি এবং সুলাইমান (আ)-এর জাতির কথা এসেছে। তবে আমাদের বর্তমান আইনে তথা শরীয়াহ’তে এটি অনুমোদিত নয়। এটি উসূল আল ফিকহের একটি প্রসিদ্ধ নীতি (شرع من قبلنا ليس شرعا لنا) “পূর্ববর্তীতের আইন আমাদের জন্য বিধান নয়”
২. ক্যামেরায় তোলা আলোকচিত্র বা ফটোগ্রাফির বিধান
ক্যামেরার মাধ্যমে তোলা ছবির বিধান সাধারণ হাতে আঁকা ছবির চেয়ে ভিন্ন। উৎস অনুসারে, ক্যামেরা বা ফটোগ্রাফিক যন্ত্রের মাধ্যমে ছবি তোলা জায়েজ এবং এটি নিষিদ্ধ ‘তাসউইর’ বা অঙ্কনের অন্তর্ভুক্ত নয়। এর কারণ হলো:
- ছায়ার প্রতিফলন: ফটোগ্রাফি মূলত কোনো জিনিসের ছায়া তথা প্রতিবিম্বকে ফিল্ম বা সেন্সরে স্থানান্তর করা মাত্র, এটি নতুন করে কোনো কিছু সৃষ্টি বা অঙ্কন করা নয়। এটি অনেকটা আয়নায় প্রতিফলিত প্রতিচ্ছবির মতো।
- সৃষ্টির অনুকরণ নয়: ফটোগ্রাফার নিজের মেধা বা সৃজনশীলতা দিয়ে শূন্য থেকে কোনো অবয়ব তৈরি করেন না, বরং আল্লাহর তৈরি একটি অস্তিত্বের ছায়া বা রিফ্লেকশনকে ধরে রাখেন। যেহেতু এতে ‘সৃষ্টির অনুকরণ’ (তাশবীহ) নেই, তাই এটি হারাম নয়।
তবে মনে রাখতে হবে, ক্যামেরায় তোলা ছবি যদি পরবর্তীতে হাতে বা কম্পিউটারের মাউস ব্যবহার করে সংশোধন (Editing) করা হয়—যেমন বলিরেখা মুছে ফেলা, চোখের রঙ পরিবর্তন করা বা চেহারা পরিবর্তন করা—তবে সেটি ‘হস্তক্ষেপ’ হিসেবে গণ্য হবে এবং যেকোনো প্রাণী (মানুষ, পশুপাখি)’র ক্ষেত্রে এমন পরিবর্তন করা নিষিদ্ধ।
৩. আলোকচিত্র এবং অঙ্কিত ছবি ব্যবহারের বিধান
ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্র ও উদ্দেশ্যভেদে এর হুকুম বা বিধানে ভিন্নতা রয়েছে:
- ইবাদতের স্থানে: মসজিদ বা নামাজের স্থানে প্রাণীর ছবি রাখা বা ঝুলিয়ে রাখা হারাম। রাসুল (সা.) কাবা ঘরে প্রবেশ করতে অস্বীকার করেছিলেন যতক্ষণ না সেখানে থাকা ছবিগুলো মুছে ফেলা হয়।
- সম্মানের স্থানে: ঘরের দেয়ালে বা পর্দার মতো সম্মানজনক স্থানে প্রাণীর ছবি বা পেইন্টিং টাঙানো মাকরূহ বা অপছন্দনীয়। আয়েশা (রা.)-এর ঘরে প্রাণীর ছবিযুক্ত পর্দা দেখে রাসুল (সা.) অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন এবং তা ছিঁড়ে ফেলে বালিশ বানানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
- অসম্মানের স্থানে: যদি ছবি এমন জায়গায় থাকে যেখানে তাকে সম্মান করা হয় না—যেমন মেঝেতে বিছানো কার্পেট, যা মাড়ানো হয়, অথবা বসার বালিশ—তবে তা ব্যবহার করা জায়েজ।
- পোশাকের ক্ষেত্রে: পোশাকে বা কাপড়ে অঙ্কিত ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য; যদি তা সম্মানের সাথে ব্যবহার করা হয় তবে তা অপছন্দনীয়।
৪. এআই (AI) ভিডিও তৈরিতে সংরক্ষিত ছবি ও স্ক্যান করা পেইন্টিং ব্যবহারের বিধান
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর মাধ্যমে ভিডিও তৈরির ক্ষেত্রে যদি পুরাতন কোনো সংরক্ষিত আলোকচিত্র (Archived Photos) বা স্ক্যান করা পেইন্টিং ব্যবহার করা হয়, তবে তার বিধান নিম্নরূপ:
- যদি এআই ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকৃত কোনো ভিডিও কিংবা অংকিত স্থির চিত্রকে কেবল এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয় (যেমন স্লাইডশো বা সাধারণ ভিডিও), তবে তা আলোকচিত্রের মতোই জায়েজ।
- কিন্তু যদি এআই ব্যবহার করে কোনো মানুষের চেহারা পরিবর্তন করা হয়, তাকে এমন কোনো কাজ করতে দেখানো হয় যা সে বাস্তবে করেনি, তবে তা মিথ্যা ও প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় হারাম। উদাহরণস্বরূপ, মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখানো বা কাউকে এমন কথা বলতে দেখানো যা সে বলেনি, তা ধোঁকাবাজি (Deception) হিসেবে গণ্য হবে।
৫. জেনারেটিভ এআই-এর মাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্ত ছবি ও ভিডিও তৈরির বিধান
জেনারেটিভ এআই-এর মাধ্যমে যখন কোনো টেক্সট কমান্ড দিয়ে নতুন কোনো প্রাণীর বা মানুষের ছবি তৈরি করা হয়, তখন তা ডিজিটাল অঙ্কনের (Digital Drawing) অন্তর্ভুক্ত হয়।
- অনুকরণ ও সৃষ্টি: এআই যখন মানুষের নির্দেশে কোনো অবয়ব তৈরি করে, তখন সেটি মানুষের সৃজনশীল প্রচেষ্টারই একটি উন্নত রূপ। যদি এআই কোনো প্রাণবন্ত সত্তার এমন ছবি তৈরি করে যা বাস্তবের হুবহু অনুকরণ, তবে সেটি নিষিদ্ধ অঙ্কনের বিধানের আওতায় পড়বে।
- মিথ্যাচার ও বিকৃতি: এআই-এর মাধ্যমে যদি এমন ছবি বা ভিডিও তৈরি করা হয় যা বাস্তবতাকে বিকৃত করে (যেমন Deepfake), তবে তা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কারণ এটি মিথ্যা (Lying), প্রতারণা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ক্ষতির কারণ হতে পারে।
- পবিত্র ব্যক্তিত্বের অবমাননা: নবী-রাসুলদের ছবি বা ভিডিও তৈরি করা বা তাদের কণ্ঠে কথা বলানো চরম অন্যায় এবং হারাম। এটি নবুওয়াতের মর্যাদার পরিপন্থী।
৬. ঘর সাজাতে পেইন্টিং টাঙানো এবং সম্মানার্থে ছবি ব্যবহারের বিধান
অনেকেই ঘর সাজানোর জন্য প্রাণীর ছবিযুক্ত পেইন্টিং ব্যবহার করেন অথবা মৃত বা জীবিত ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ছবি ফ্রেম করে রাখেন। শরিয়তের দৃষ্টিতে এর বিধান হলো:
- সাজসজ্জা: প্রাণীর ছবি বা পেইন্টিং দিয়ে ঘর সাজানো মাকরূহ। এটি রহমতের ফেরেশতাদের ঘরে প্রবেশে বাধা দেয়। তবে গাছপালা বা প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি দিয়ে ঘর সাজানো সম্পূর্ণ বৈধ। হাদীসে যে নিষেধাজ্ঞা এসেছে তা ছবির মালিকের বিরুদ্ধে হুমকি বা নিন্দার মতো অনুরূপ কোনো চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত আকারে আসেনি, যেমনটি আঁকার ক্ষেত্রে এসেছে; বরং এটি কেবল (এটি) ছেড়ে দেওয়ার তলব হিসেবে তলবে গাইরে জাযিম হিসেবে এসেছে। মূর্তি রাখা নিষিদ্ধ করার এবং সূচিকর্ম (embroidery) করা (মারকুমা) ছবি রাখার অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে আরও একটি হাদিস এসেছে, যা এই নিষেধাজ্ঞার আইনী নির্ণায়ক তথা কারীনা হিসেবে এসেছে। মুসলিমে আবু তালহার হাদিসে এই কথাটি বলা হয়েছে: “আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি: ‘যে ঘরে কুকুর বা ছবি থাকে সেখানে ফেরেশতারা প্রবেশ করেন না’ এবং মুসলিমে বর্ণিত একটি বর্ণনায় তিনি বলেছেন: “… কাপড়ের উপর (রাকম/embroidery) ব্যতীত।” এটি পোশাকের মধ্যে সূচিকর্ম করা (মারকুমা) ছবি বাদ দেওয়ার ইঙ্গিত দেয় এবং এর অর্থ হল যে ফেরেশতারা সেই ঘরে প্রবেশ করেন যেখানে পোশাকের উপর খোদাই করা (তিমছাল) থাকে অর্থাৎ স্কেচিং (রসম) কিংবা আঁকা ছবি থাকে।
- সম্মান ও স্মরণ: যদিও উপরে উল্লিখিত হাদিসটি অন্যান্য নিষিদ্ধের হাদিসের সাথে যুক্ত করা ইসতিম্বাত করা হলে এর অর্থ দাড়ায় যে তলবটি চুড়ান্ত তথাপি কোনো স্থানে ছবি রাখা যেখানে তা সম্মানের জন্য রাখা হয় তা অপছন্দনীয়, নিষিদ্ধ নয়। তবে কারো প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন বা তাকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে ছবি প্রদর্শন করা হলে তা ‘তা’জিম’ বা অতি-সম্মানের পর্যায়ে চলে যায়, যা ইসলামে অপছন্দনীয়। ইসলামি বিধান অনুযায়ী, কাউকে সম্মান জানানোর মাধ্যম ছবি হওয়া উচিত নয়, বরং তাদের জন্য দোয়া করা বা তাদের আদর্শ অনুসরণ করাই কাম্য।
পরিশেষে বলা যায়, শরীয়াহ প্রযুক্তির ব্যবহারকে স্বাগত জানায় যতক্ষণ না তা আল্লাহর সৃষ্টির সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় অথবা মিথ্যা ও অশ্লীলতা প্রসারে ব্যবহৃত হয়। প্রাণহীন বস্তুর অঙ্কন এবং সাধারণ আলোকচিত্রের ক্ষেত্রে শরীয়তে প্রশস্ততা থাকলেও প্রাণবন্ত বস্তুর প্রতিকৃতি তৈরি এবং এ সংক্রান্ত অতিরঞ্জনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।











