তৃতীয় অধ্যায়
কুরআনের সাত হরফ
একটি সহীহ হাদীসে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ أُنْزِلَ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ فَاقْرَءُوا مَا تَيَسَّرَ مِنْهُ
“নিশ্চয় এ কুরআন সাত হরফে অবতীর্ণ করা হয়েছে। সুতরাং সেগুলোর মধ্য হতে তোমাদের সহজ-সাধ্য পন্থা অবলম্বন করে পাঠ কর।”১১৯
এই হাদীসে কুরআনুল কারীম সাত হরফে অবতীর্ণ হওয়া দ্বারা কি উদ্দেশ্য? এটি অসংখ্য মতামতের মিলনমেলা এবং বিশাল পরিধি বিশিষ্ট একটি আলোচনা৷ আর সন্দেহাতীতভাবে তা কুরআনুল কারীমের দুর্বোধ্য ও কঠিনতম আলোচনার একটি। এখানে সম্পূর্ণ আলোচনা উদ্ধৃত করা তো মুশকিল। তবে এর সাথে সংশ্লিষ্ট অত্যাবশ্যকীয় বিষয়গুলো উপস্থাপন করছি।
উপরে যে হাদীস বর্ণনা করা হয়েছে অর্থের দিক থেকে তা মুতাওয়াতির। [অর্থাৎ নিরবিচ্ছিন্ন সনদ সূত্রে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত] যেমন, বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম আবু উবাইদ কাসেম ইবনে সালাম হাদীসটির তাওয়াতুর হবার বিষয়টি সুস্পষ্ট করেছেন। হাদীস ও কেরাতের সুপ্রসিদ্ধ ইমাম আল্লামা ইবনে জাযারী (রহ.) বলেন, আমি একটি পৃথক গ্রন্থে এই হাদীসের সবগুলো সূত্র একত্রিত করেছি । আর সেগুলোর আলোকে হাদীসটি হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.), হিশাম ইবনে হাকিম ইবনে হিযাম (রা.), আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.), উবাই ইবনে কা’ব (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.), মুআয ইবনে জাবাল (রা.), আবু হুরায়রা (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), আবু সাঈদ খুদরী (রা.), হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রা.), আবু বাকরা (রা.), আমর ইবনুল আস (রা.), যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.), আনাস ইবনে মালিক (রা.), সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.), ওমর ইবনে আবী সালামা (রা.), আবু জাহাম (রা.), আবু তালহা (রা.) ও উম্মে আইউব আনসারীয়্যাহ (রা.) থেকে বর্ণিত।১২০ এতদ্যতীত বহু মুহাদ্দিস এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, একবার হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) মিম্বরে দীড়িয়ে ঘোষণা দিলেন যে, যেসব সম্মানিত ব্যক্তিগণ দাড়িয়ে যান, যারা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এই হাদীস শোনেছেন, “কুরআনুল কারীম সাত হরফে নাযিল করা হয়েছে। যার প্রত্যেকটিই নিরাময়কারী ও যথেষ্ট।” তখন সাহাবায়ে কেরামের বিরাট একটি দল দাড়িয়ে গেলেন, যাদের সংখ্যা গণনা করা অসম্ভব।১২১
সাত হরফের মর্মার্থ
এই হাদীসে সর্ব প্রথম বিষয় হচ্ছে, সাত হরফে কুরআন নাযিল হওয়া দ্বারা উদ্দেশ্য কী? এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন মতামত ও চিন্তাধারার কঠিন মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয়। এমনকি আল্লামা ইবনে আরাবী (রহ.) এ ব্যাপারে পয়ত্রিশটি মতামত একত্রিত করেছেন।১২২ সেগুলোর মধ্য হতে প্রসিদ্ধ ও উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মতামত এখানে পেশ করা হলো-
১. কেউ কেউ মনে করেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সুপ্রসিদ্ধ সাতজন কারীর সাত কেরাত। কিন্তু এ ধারণা একেবারেই ভুল ও ভ্রান্ত। কেননা, তাওয়াতুর বা নিরবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরায় সাব্যস্ত কেরাতসমূহ শুধু ‘সাত কেরাতে’র মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং আরো বহু কেরাত তাওয়াতুর সূত্রে সাব্যস্ত আছে। এ সাত কেরাত তো শুধু এ কারণেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে যে, আল্লামা ইবনে মুজাহিদ (রহ.) একটি গ্রন্থে ওই সাতজন কারীর কেরাতকে একত্রিত করেছেন। এর দ্বারা তার না এই উদ্দেশ্য ছিল যে, কেরাতকে সাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা আর না তিনি ওই সাত হরফের ব্যাখ্যা এই ‘সাত কেরাত’ দ্বারা করেছেন। যেমন, এর বিস্তারিত বর্ণনা যথাস্থানে আসবে।
২. উপরোক্ত কথার ভিত্তিতেই কোনো কোনো আলেম এই খেয়াল ব্যক্ত করেছেন যে, ‘হরফ’ দ্বারা সকল কেরাতকে বুঝানো হয়েছে। তবে ‘সাত’ শব্দ দ্বারা বিশেষ করে ‘সাত সংখ্যা’কেই বুঝানো হয়নি। বরং এর দ্বারা সংখ্যার আধিক্য বুঝানো হয়েছে। আরবী ভাষায় ‘সাত’ শব্দটি অধিকাংশ সময় কোনো বন্তর শুধু সংখ্যাধিক্য বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। এখানেও হাদীসের উদ্দেশ্য এই নয় যে, কুরআনুল কারীম শুধু সাত হরফের উপরই নাযিল হয়েছে। বরং উদ্দেশ্য হলো, কুরআনুল কারীম বহু পদ্ধতিতে নাযিল হয়েছে। মুতাকাদ্দিমীন উলামায়ে কেরামের মধ্য হতে কাযি আয়ায (রহ.)-এর অভিমত এটাই।১২৩ আর শেষ যুগের উলামায়ে কেরামের মধ্যে হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)ও এই মত গ্রহণ করেছেন।১২৪
কিন্ত এই মতটি এ জন্য সঠিক বলে মনে হয় না যে, বুখারী ও মুসলিম-এর এক হাদীসে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই বাণী বর্ণিত আছে যে-
أَقْرَأَنِي جِبْرِيلُ عَلَى حَرْفٍ فَرَاجَعْتُهُ، فَلَمْ أَزَلْ أَسْتَزِيدُهُ وَيَزِيدُنِي حَتَّى انْتَهَى إِلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ
“জিবরাঈল আমাকে এক হরফের উপর কুরআনুল কারীম আবৃত্তি করিয়েছেন। ফলে আমি তার শরণাপন্ন হলাম এবং আমি হরফ বৃদ্ধির আবেদন করলাম। তিনি বৃদ্ধি করতে থাকলেন। এমনকি তা সাত হরফে গিয়ে পৌছেছে।”১২৫
এর বিস্তারিত আলোচনা সহীহ মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) থেকে এভাবে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনু গিফারের কূপের কাছে ছিলেন-
فَأَتَاهُ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلاَمُ فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكَ أَنْ تَقْرَأَ أُمَّتُكَ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفٍ، فَقَالَ: أَسْأَلُ اللَّهَ مُعَافَاتَهُ وَمَغْفِرَتَهُ، وَإِنَّ أُمَّتِى لاَ تُطِيقُ ذَلِكَ، ثُمَّ أَتَاهُ الثَّانِيَةَ فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكَ أَنْ تَقْرَأَ أُمَّتُكَ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفَيْنِ، فَقَالَ: أَسْأَلُ اللَّهَ مُعَافَاتَهُ وَمَغْفِرَتَهُ، وَإِنَّ أُمَّتِى لاَ تُطِيقُ ذَلِكَ، ثُمَّ جَاءَهُ الثَّالِثَةَ، فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكَ أَنْ تَقْرَأَ أُمَّتُكَ الْقُرْآنَ عَلَى ثَلاَثَةِ أَحْرُفٍ، فَقَالَ: أَسْأَلُ اللَّهَ مُعَافَاتَهُ وَمَغْفِرَتَهُ، وَإِنَّ أُمَّتِى لاَ تُطِيقُ ذَلِكَ، ثُمَّ جَاءَهُ الرَّابِعَةَ فَقَالَ: إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكَ أَنْ تَقْرَأَ أُمَّتُكَ الْقُرْآنَ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ، فَأَيُّمَا حَرْفٍ قَرَءُوا عَلَيْهِ فَقَدْ أَصَابُوا.
“অতঃপর রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট জিবরাঈল (আ.) আসলেন। তিনি বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা আপনাকে আদেশ করছেন, আপনার [গোটা] উম্মত যেন এক হরফের উপরই কুরআনুল কারীম পাঠ করে। এতে তিনি বললেন, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করছি। আমার উম্মত এতে সক্ষম হবে না। অতঃপর জিবরাঈল (আ.) দ্বিতীয়বার তার নিকট আসলেন। বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আপনাকে আদেশ করছেন, আপনার [গোটা] উম্মত যেন দুই হরফের উপর কুরআনুল কারীম পাঠ করে। এতে তিনি বললেন, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও মাগফিরাতপ্রার্থনা করছি। আমার উম্মত এতে সক্ষম হবে না। আবার তৃতীয়বার জিবরাঈল (আ.) আসলেন এবং বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আপনাকে আদেশ করছেন, আপনার [গোটা] উম্মত যেন তিন হরফের উপর কুরআনুল কারীম পাঠ করে। এতে তিনি বললেন, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করছি। আমার উম্মত এতে সক্ষম হবে না। চতুর্থবার আবার জিবরাঈল (আ.) আসলেন এবং বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আপনাকে আদেশ করছেন, আপনার [গোটা] উম্মত যেন সাত হরফের উপর কুরআনুল কারীম পাঠ করে। অতঃপর তারা যে হরফের উপরই পাঠ করবে, তাদের কেরাত সঠিক হবে।”১২৬
এই রেওয়ায়েতগুলোর পূর্বাপর বর্ণনাভঙ্গি সুস্পষ্টভাবে বলছে যে, এখানে ‘সাত’ শব্দটি দ্বারা সংখ্যাধিক্য বুঝানো হয়নি; বরং নির্দিষ্ট করে ‘সাত’ সংখ্যাটিকেই বুঝানো হয়েছে। তাই এই হাদীসগুলোর আলোকে উপরোক্ত মতটি গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। এমনকি জমহুর উলামায়ে কেরামও এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
৩. অন্যান্য উলামায়ে কেরাম, যেমন হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) সহ আরো অনেকে বলেছেন যে, উল্লিখিত হাদীসে সাত হরফ দ্বারা আরব জাতির গোত্রগত সাত ভাষাকে বুঝানো হয়েছে। যেহেতু আরব জাতি বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত ছিল এবং প্রত্যেক গোত্রের ভাষা আরবী হওয়া সত্ত্বেও অন্য গোত্রের সাথে ভাষার সামান্য গড়মিল ছিল। এই গড়মিলটা এমন, যেমন জাতীয় একটি ভাষায় আঞ্চলিকতার কারণে তারতম্য সৃষ্টি হয়। তাই আল্লাহ তাআলা ওই বিভিন্ন গোত্রের সহজ-সাধ্যের জন্য কুরআনুল কারীমকে সাত ভাষায় নাযিল করেছেন। যেন প্রত্যেক গোত্রই নিজ নিজ গোত্রীয় ভাষায় পাঠ করতে পারে।১২৭
ইমাম আবু হাতেম সাজিসতানী (রহ.) ওই গোত্রগুলোর নামও নির্ধারণ করেছেন এবং বলেছেন যে, কুরআনুল কারীম এই সাত গোত্রের সাত ভাষা অনুযায়ী নাযিল হয়েছে। গোত্র সাতটি হচ্ছে- [১] কুরাইশ। [২] হুযাইল। [৩] তাইমুর-রুবাব। [8] আজদ। [৫] রবীআ। [৬] হাওয়াজিন | [৭] সা’দ বিন বকর।
আর হাফেয ইবনে আবদুল বার (রহ.) কারো কারো থেকে রেওয়ায়েত বর্ণনা করে উপরোক্ত গোত্রগুলোর স্থলে নিয়োক্ত গোত্রগুলো উল্লেখ করেছেন-[১] হুযাইল। [২] কেনানা। [৩] কায়েস। [8] যব্বা। [৫] তাইমুর রুবাব। [৬] আসাদ ইবনে খুযাইমাহ। [৭] কুরাইশ।১২৮
কিন্তু বহু মুহাক্কিক আলেম যেমন, হাফেয ইবনে আবদুল বার (রহ.), আল্লামা সুযুতী (রহ.) ও আল্লামা ইবনে জাযারীসহ আরো অনেকে এই মতটিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন । প্রথমতঃ এ কারণে যে, আরবের গোত্র তো অনেকগুলো ছিল। এর মধ্য হতে শুধু এ সাতটিকেই বেছে নেওয়ার হেতু কি? দ্বিতীয়তঃ হযরত ওমর (রা.) ও হযরত হিশাম ইবনে হাকীম (রা.)-এর মাঝে কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াত নিয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। যার বিস্তারিত বর্ণনা সহীহ বুখারীসহ অন্যান্য কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। অথচ তারা উভয়েই ছিলেন কুরাইশ বংশের। আর রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাদের উভয়ের কেরাতকে সত্যায়ন করেছেন এবং কুরআনুল কারীম সাত হরফে নাযিল হওয়াকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদি সাত হরফ দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন সাতটি গোত্রের ভাষাকেই বুঝানো হতো তাহলে হযরত ওমর (রা.) ও হযরত হিশাম ইবনে হাকীম (রা.)-এর মাঝে মতবিরোধের কোনো কারণই থাকতে পারে না। কারণ উভয়ই তো কুরাইশী ছিলেন।১২৯
যদিও আল্লামা আলসী (রহ.) এর জবাব দিয়েছেন যে, “হতে পারে তাদের দু’জনের মধ্য হতে যে কোনো একজনকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরাইশ ভিন্ন অন্য কোনো ভাষায় কুরআন পড়িয়েছেন।”১৩০
কিন্ত এই জবাবটি অত্যন্ত দুর্বল। কারণ বিভিন্ন ভাষায় কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য এটাই ছিল যে, প্রত্যেক গোত্রের লোকেরা যেন নিজ ভাষা অনুযায়ী সহজ-সাধ্যভাবে পড়তে পারে । তাই এ বিষয়টা রিসালতের হেকমত থেকে অনেক দূরবর্তী মনে হয় যে, এক কুরাইশীকে অন্য ভাষায় কুরআনুল কারীম পড়ানো হয়েছে।
এতদ্যতীত ইমাম তাহাভী (রহ.) এর উপর আপত্তি করেন যে, যদি এটা মেনে নেওয়া হয় যে, সাত হরফ দ্বারা সাত গোত্রের ভাষাকে বুঝানো হয়েছে তাহলে তা ওই আয়াতের বিপরীত হয়ে দাড়াবে যাতে বলা হয়েছে-
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ
“আমি যখনই কোনো রাসূল প্রেরণ করি, তখন তার সম্প্রদায়ের ভাষায়ই প্রেরণ করি।
আর এ কথা তো সবারই জানা যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরইশী ছিলেন। তাই এ কথা সুস্পষ্ট যে, কুরআনুল কারীম শুধু কুরইশী ভাষায়ই নাযিল হয়েছে।১৩১
ইমাম তাহাভী (রহ.)-এর এ কথার সমর্থন এভাবেও হয় যে, যে সময়ে হযরত উসমান (রা.) দ্বিতীয়বার কুরআনুল কারীম সংকলনের ইচ্ছা করলেন এবং হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর নেতৃত্বে সাহাবায়ে কেরামের একটি জামাতকে কুরআনের কপি তৈরীর নির্দেশ দিলেন, তখন তাদেরকে তিনি এই নির্দেশনা দিয়েছিলেন-
إِذَا اخْتَلَفْتُمْ أَنْتُمْ وَزَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ فِي شَيْءٍ مِنْ الْقُرْآنِ فَاكْتُبُوهُ بِلِسَانِ قُرَيْشٍ، فَإِنَّمَا نَزَلَ بِلِسَانِهِمْ
“কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে যায়েদ যখন ইবনে সাবেত এবং তোমাদের মাঝে পরস্পর কোনো মতানৈক্য দেখা দিবে তখন তোমরা কুরাইশদের ভাষায় লিখবে। কেননা কুরআন তাদের ভাষায়ই নাযিল হয়েছে।”১৩২
এখানে হযরত উসমান (রা.) সুস্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে, কুরআন শুধু কুরাইশদের ভাষায়ই অবতীর্ণ হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো যে, কুরআন যখন কুরাইশদের ভাষায়ই নাধিল হয়েছে তাহলে এই ‘মতানৈক্য’ সৃষ্টি হবার উদ্দেশ্য কি? এর বিস্তারিত জবাব সামনে আসবে ইন শা আল্লাহ।
এতদ্যতীত এ বক্তব্যের প্রবক্তাগণ এ ব্যাপারে একমত যে, ‘সাত হরফ’ এবং ‘সাত কেরাত’ দু’টা পৃথক পৃথক বিষয়। কেরাতের মতানৈক্য, যা আজও বিদ্যমান সেটা শুধু এক হরফ অর্থাৎ কুরাইশদের ভাষায়ই। আর বাকি হরফগুলো হয়তো রহিত হয়েছে অথবা কল্যাণের জন্য মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে অন্যান্য আপত্তি ছাড়াও একটি আপত্তি এই হয় যে, গোটা হাদীসের ভাণ্ডারে কোথাও এ কথার প্রমাণ মিলে না যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতে দুই ধরনের মতানৈক্য ছিল। একটি হচ্ছে ‘সাত হরফ’ আরেকটি হচ্ছে ‘কেরাত’। বরং হাদীসের ভাণ্ডারে যেখানেই কুরআনুল কারীমের শব্দগত কোনো মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে শুধু ‘আহরুফ’ [হরফের বহুবচন]-এর মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পৃথকভাবে ‘কেরাতের’ কোনো মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করা হয়নি। এসব কারণের ভিত্তিতে এ মতামতটিও অত্যন্ত দুর্বল বলে মনে হয়।
৪. চতুর্থ হলো, ইমাম তহাভী (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ বক্তব্য। তিনি বলেন, কুরআনুল কারীম তো শুধু কুরাইশদের ভাষাতেই অবতীর্ণ হয়েছে । তবে যেহেতু আরববাসী বিভিন্ন এলাকা ও গোত্রে বিভক্ত ছিল তাই প্রত্যেকের জন্য এই একটি মাত্র ভাষায় কুরআন তেলাওয়াত করা বেশ কঠিন ছিল। তাই ইসলামের শুরু লগ্নে এই অনুমতি দেওয়া হয়েছিল যে, তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ অঞ্চলের ভাষা অনুযায়ী সমার্থবোধক শব্দ দ্বারা কুরআন তেলাওয়াত করতে পারবে। এমনকি যেসব লোকের জন্য কুরআনুল কারীমের মুল শব্দ দ্বারা তেলাওয়াত করা মুশকিল ছিল তাদের জন্য স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমার্থবোধক শব্দ নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যেগুলো দ্বারা তারা তেলাওয়াত করতে পারে। এই সমার্থবোধক শব্দগুলো কুরাইশদের ভাষা ও অন্যদের ভাষা থেকে চয়ন করা হয়েছিল। আর এগুলো এমন ছিল যে, تعالএর স্থলে هلمঅথবা أقبل কিংবা أدنপড়া হতো। সবগুলোর অর্থ একই থাকত। কিন্ত এই অনুমতি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল, যখন সমস্ত আরববাসী কুরআনী ভাষায় পুরোপুরি অভ্যস্ত ছিল না। অতঃপর ধীরে ধীরে যখন কুরআনী ভাষার পরিধি বৃদ্ধি পেল তখন আরববাসী সে ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে গেল এবং তাদের জন্য কুরআনের মূল ভাষায় তেলাওয়াত করা সহজ হয়ে গেল। ওই সময়ে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকালের পূর্বে রমযান মাসে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে কুরআনুল কারীমের আখেরী দাওর করেন, যেটাকে ‘আরযায়ে আখীরা’ বলা হয়। তখনই সমার্থবোধক শব্দ দ্বারা কুরআন তেলাওয়াত করার অনুমতি বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়। কেবল ওই পদ্ধতিই বাকি থাকে যার উপর কুরআন নাযিল হয়েছিল।১৩৩
এ বক্তব্য অনুযায়ী “সাত হরফ” বিশিষ্ট হাদীসটি ওই যুগের সাথে সম্পৃক্ত, যখন তেলাওয়াতের মধ্যে সমার্থবোধক শব্দ ব্যবহারের অনুমতি ছিল। আর এটার উদ্দেশ্য এই ছিল না যে, কুরআনুল কারীম ‘সাত হরফে’ অবতীর্ণ হয়েছে। বরং উদ্দেশ্য ছিল এই যে, কুরআনুল কারীম এমন প্রশস্ত-তার সাথে অবতীর্ণ হয়েছে যে, নির্দিষ্ট একটা জামানা পর্যন্ত তা সাত হরফে পাঠ করা যেত।
আবার “সাত হরফ” দ্বারাও এ উদ্দেশ্য নয় যে, কুরআনুল কারীমের প্রত্যেক শব্দের সাতটি সমার্থবোধক শব্দ ব্যবহারের অনুমতি আছে। বরং উদ্দেশ্য ছিল এই যে, বেশির থেকে বেশি যতগুলো সমার্থবোধক শব্দ ব্যবহার করা যায়, সেগুলোর সংখ্যা হচ্ছে, “সাত” । আবার সে অনুমতির অর্থ এটাও ছিল না যে, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের মর্জি মতো শব্দ প্রয়োগ করবে। বরং পরিবর্তিত শব্দগুলোও স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সন্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। আর তিনি প্রত্যেক ব্যক্তিকে এমনভাবে কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন যা তার জন্য সহজ-সাধ্য ছিল। সুতরাং শুধু ওই সকল সমার্থবোধক শব্দের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল যা রাসূল সম্পাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত ছিল।১৩৪
ইমাম তহাভী (রহ.) ছাড়াও হযরত সুফিয়ান ইবনে উআইনা (রহ.), ইবনে ওয়াহাব (রহ.) এবং হাফেয ইবনে আবদুল বার (রহ.)ও এ মতকে গ্রহণ করেছেন। বরং হাফেয ইবনে আবদুল বার (রহ.) তো এ মতকে অধিকাংশ আলেমের দিকে সম্বন্ধ করেছেন।১৩৫
পেছনের সমস্ত মতামতের মধ্যে এই মতটি কেয়াসের অধিক নিকটবর্তী । আর এ মতের প্রবক্তাগণ নিজেদের স্বপক্ষে দলীল দিতে গিয়ে মুসনাদে আহমদের সেই রেওয়ায়েতকে উল্লেখ করেন যা হযরত আবু বাকরা (রা.) থেকে বর্ণিত-
أَنَّ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَام قَالَ: يَا مُحَمَّدُ اقْرَأْ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفٍ، قَالَ مِيكَائِيلُ عَلَيْهِ السَّلَام: اسْتَزِدْهُ فَاسْتَزَادَهُ قَالَ: اقْرَأْهُ عَلَى حَرْفَيْنِ، قَالَ مِيكَائِيلُ: اسْتَزِدْهُ فَاسْتَزَادَهُ حَتَّى بَلَغَ سَبْعَةَ أَحْرُفٍ، قَالَ كُلٌّ شَافٍ كَافٍ مَا لَمْ تَخْتِمْ آيَةَ عَذَابٍ بِرَحْمَةٍ أَوْ آيَةَ رَحْمَةٍ بِعَذَابٍ نَحْوَ قَوْلِكَ تَعَالَ وَأَقْبِلْ وَهَلُمَّ وَاذْهَبْ وَأَسْرِعْ وَاعْجَلْ
জিবরাঈল (আ.) [রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে] বললেন, হে মুহাম্মাদ! কুরআনুল কারীমকে এক হরফের উপর পাঠ করুন। মিকাঈল (আ.) [রাসূল স.কে] বললেন, এর সাথে আরও [হরফ] সংযোজন করুন। ফলে তিনি সংযোজন করলেন। আর এভাবে তা সাতে গিয়ে পৌছল। জিবরাঈল (আ.) বলেলেন, এর প্রত্যেকটিই নিরাময়কারী, যথেষ্ট। যতক্ষণ না আযাবের আয়াতকে রহমতের আয়াতের সাথে এবং রহমতের আয়াতকে আযাবের আয়াতের সাথে মিশ্রিত করবে। এটা এমন হবে যে, আপনি تعال [আস]-কে أقبل – هلم – اذهب – اسرع – ও عجل শব্দ দ্বারা আদায় করবেন।”১৩৬
এই মত ও বক্তব্যের উপর আর কোনো আপত্তি নেই। তবে এর মাঝেও একটি সমস্যা থেকে যায়। আর তা হলো, কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন যে কেরাত আজ পর্যন্ত ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় চলে আসছে, এ বক্তব্য অনুযায়ী সেগুলোর কোনো অবস্থান পরিষ্কার হয় না। যদি সে কেরাতগুলোকে ‘সাত হরফ’ না বলে অন্য কিছু বলা হয় তাহলে তার স্বপক্ষে দলীল পেশ করা উচিত। কিন্তু হাদীসের বিশাল ভাণ্ডারে ‘আহরুফ’-এর মতানৈক্য ব্যতীত কুরআনুল কারীমের শব্দগত অন্য কোনো মতানৈক্যের আলোচনা পাওয়া যায় না। তাহলে নিজের পক্ষ থেকে এটা কি করে বলা যেতে পারে যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে ‘আহরুফে সাবআ’ ছাড়া অন্য আরেক প্রকার মতানৈক্যও ছিল! এ বক্তব্যের প্রবক্তাদের কাছ থেকে এ সমস্যার এমন কোনো সমাধান আমি পাইনি, যা মেনে নেওয়া যায়।
‘সাত হরফ’-এর সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আমাদের দৃষ্টিতে কুরআনুল কারীমের ‘সাত হরফ’-এর সর্বোত্তম ব্যাখ্যা হয়েছে । আর ‘সাত হরফ’ দ্বারা ‘কেরাতের বিভিন্নতার’ সাত প্রকারকে বুঝানো হয়েছে। তাইতো কেরাতগুলো যদিও সাতের চেয়ে বেশি, কিন্তু ওই কেরাতগুলোর মাঝে যে মতানৈক্য পাওয়া যায় তা সাত প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। [সেই সাত প্রকার কেরাতের ব্যাখ্যা সামনে আসবে।]
আমাদের জ্ঞান অনুযায়ী এই মত ও বক্তব্য মুতাকাদ্দিমীন উলামায়ে কেরামের মাঝে সর্ব প্রথম ইমাম মালেক (রহ.)-এর নিকট পাওয়া যায়। বিখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন, আল্লামা নিযামুদ্দীন কিম্মী নিশাপুরী (রহ.) স্বীয় তাফসীর ‘গারায়িবুল কুরআন’-এ লিখেন, ‘আহরুফে সাব্আ’-এর ব্যাপারে ইমাম মালেক (রহ.)-এর এ মাযহাব উদ্ধৃত আছে যে, এর দ্বারা কেরাতের নিম্নলিখিত সাত প্রকারের বিভিন্নতা ও মতানৈক্যকে বুঝানো হয়েছে।
১. একবচন ও বহুবচনের মতানৈক্য। এক কেরাতে শব্দটি একবচন ব্যবহৃত হয়েছে আবার অন্য কেরাতে বহুবচনের শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন- كَلِمَاتُ رَبِّكَ এবং وّتَمَّتْ كَلِمَةُ رَبِّكَ ।
২. পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গের বিভিন্নতা। এক কেরাতে পুংলিঙ্গ এবং অন্য কেরাতে স্ত্রীলিঙ্গ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে । যেমন-لا يقبل এবং لا تقبل ।
৩. এ’রাব তথা কারক ও বিভক্তি চিহ্বের বিভিন্নতা। কোনো কেরাতে যের আবার কোনো কেরাতে যবর থাকে। যেমন- غَيرِ اللهِ এবং هل مِن خالقٍ غَيرُ اللهِ
৪. ‘সরফী অবস্থা’ বা শব্দ-প্রকরণের বিভিন্নতা। যেমন, এক কেরাতে يَعْرِشُونَ এবং অন্য কেরাতে يُعَرِّشُونَ ।
৫. ‘নাহভী হরফ’ বা অব্যয় পদের বিভিন্নতা। যেমন, এক কেরাতে لَكِنَّ الشَّياطِينَ এবং অন্য কেরাতে لَكِنِ الشَّياطِينُ ।
৬. হরফ পরিবর্তনকারী শব্দের বিভিন্নতা। যেমন, تَعْلَمُونَ ও يَعْلَمُونَ এবং نُنْشِزُها ওنَنْشُزُها ।
৭. সুর-ভঙ্গিমার বিভিন্নতা। যেমন, তাখফীফ [জযম দিয়ে পড়া], তাফখীম [শেষ অক্ষর ছেড়ে দেওয়া], ইমালা [যের ও যবরের মধ্যবর্তী উচ্চারণ করা], মন্দ দীর্ঘস্বর করা] কৃসর [হুস্ব স্বর করা], ইজহার [স্পষ্ট করা], ইদগাম [মিলিয়ে পড়া] ইত্যাদি।১৩৭
অতঃপর আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.), ইমাম আবুল ফযল রাষি (রহ.), কাষী আবু বকর আত্-তাইয়্যেব বাকিল্লানী (রহ.) এবং মুহার্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) এই মতকে গ্রহণ করেছেন।১৩৮
কেরাতের সুপ্রসিদ্ধ ইমাম, মুহাক্ষিক ইবনুল জাযারী (রহ.) নিজের এই মত পেশ করার পূর্বে লিখেন-
“আমি এই হাদীসের ব্যাপারে অসংখ্য প্রশ্নে জর্জরিত ছিলাম! ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় এর উপর গভীর চিন্তা-গবেষণায় লিপ্ত ছিলাম । এমনকি মহান আল্লাহ আমার জন্য এর এমন ব্যাখ্যা বিকাশিত করে দিয়েছেন, যা সঠিক ও নির্ভুল হবে ইনশা আল্লাহ।”১৩৯
এ সকল উলামায়ে কেরাম এ কথার উপর একমত যে, হাদীসে বর্ণিত ‘সাত হরফ’ দ্বারা কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু সেই কেরাতগুলোর প্রকারসমূহ নির্ধারণ করতে গিয়ে তাদের বক্তব্যের মাঝে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে। এর কারণ হলো, প্রত্যেকেই নিজ নিজ চিন্তা অনুযায়ী সেই কেরাত বিষয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধান চালিয়েছেন। এর মধ্যে যার অনুসন্ধান সবচেয়ে শক্তিশালী, সমৃদ্ধ এবং পূর্ণাঙ্গ ও সর্বগুণে গুণান্বিত তিনি হলেন, ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.)। তিনি বলেন, কেরাতের বিভিন্নতা [নিম্নোক্ত] সাত প্রকারেই সীমাবদ্ধ।
১. নাম বা বিশেষ্য শব্দসমূহের বিভিন্নতা ৷ একবচন, দ্বিবচন, বহুবচন এবং পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গের বিভিন্নতা এই প্রকারের অন্তর্ভূক্ত । [এর উদাহরণ সেই- تَمَّتْ كَلِمَةُ رَبِّكَ যা অন্য কেরাতে تَمَّتْ كَلِمَاتُ رَبِّكَ বলা হয়েছে ।]
২. ফেয়েল বা ক্রিয়াপদের পার্থক্য ও বিভিন্নতা। কোনো কেরাতে মাযী [অতীতকাল. বাচক ক্রিয়া, কোনোটিতে মুযারি’ [বর্তমান ও ভবিষ্যতকাল বাচক ক্রিয়া আবার কোনোটিতে আমর [নির্দেশ বাচক ক্রিয়া] ব্যবহৃত হয়েছে। [এর উদাহরণ হলো, এক কেরাতে رَبَّنا باعِدْ بَينَ أسْفارِنا । অন্য এক কেরাতে এর স্থলে রয়েছে رَبُّنا باعَّدَ بَينَ أسْفارِنا]
৩. এরাব তথা কারক ও বিভক্তি চিহ্নের বিভিন্নতা। বিভিন্ন কেরাতে বিভিন্ন কারক চিহ বা হরকত বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে । [এর উদাহরণ হলো, ولا يُضارَّ كاتِبٌএবং لا يُضارُّ كاتِبٌ আর ذُو العَرْشِ المَجِيدُ এবং ذُو العَرْشِ المَجِيدِ ]
৪. শব্দের কম-বেশি হওয়ার বিভিন্রতা। এক কেরাতে কোনো শব্দ কম আছে। আর অন্য কেরাতে বেশি আছে। [যেমন, এক কেরাতে وَما خَلَقَ الذكَرَ وَالأُنْثى আছে]। আর অন্য কেরাতে وَالذكَرَ وَالأُنْثى আছে। এখানে وَما خَلَقَশব্দের উল্লেখ নেই। অনুরূপভাবে এক কেরাতে تَجْرِي مِن تَحْتِها الأَنْهارُ আছে। আর অন্য কেরাতে আছে تَجْرِي تَحْتَها الأَنْهارُ ।
৫. তাকদীম-তা’খীর বা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী শব্দের বিভিন্নতা। এক কেরাতে কোনো শব্দকে পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার অন্য কেরাতে সেটাকে পরে উল্লেখ করা হয়েছে। [যেমন, وَجاءَتْ سَكْرَةُ المَوْتِ بِالحَقِّএবং وَجاءَتْ بالمَوْتِ سَكْرَةُ الحَقِّ]
৬. বদল বা শব্দ পরিবর্তনের বিভিন্নতা। এক কেরাতে এক শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য কেরাতে তার স্থলে অন্য শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। [যেমন, (نُنشِزُها) এবং (نَنشُزُها)। অনুরূপভাবে (فَتَبَيَّنُوا) এবং (فَتَثَبَّتُوا) আর (طَلْحٍ) এবং (طَلْعٍ)]।
৭. সুর-ভঙ্গিমার বিভিন্নতা। যার মধ্যে তাফখীম, তারকীক, এমালা, কসর, মদ্দ, হামর, ইজহার ও ইত্যাদির বিভিন্নতা শামিল রয়েছে।১৪০
আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.), আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.) এবং কাযী আবু তাইয়্যেব (রহ.)-এর বর্ণনাকৃত বিভিন্নতার কারণগুলোও এ বক্তব্যের সাথে মিলে যায়। তবে ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.)-এর অনুসন্ধান এ জন্য এত বেশি সমৃদ্ধ বলে মনে হয় যে, এতে কোনো প্রকারের মতানৈক্য ও বিভিন্নতার বর্ণনা তো করা হয়েছে, কিন্তু শব্দের কম-বেশি, পূর্ববর্তী-পরবর্তী এবং শব্দ পরিবর্তনের বিভিন্নতার বিষয়গুলো পুরোপুরি ফুটে উঠেনি। এর বিপরীত ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.) অনুসন্ধান ও গবেষনায় এ সকল প্রকার বিভিন্নতা ও মতানৈক্য সুস্পষ্টভাবে গ্রন্থিত হয়েছে। বিদগ্ধ গবেষক ইবনুল জাযারী (রহ.) যিনি ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় পর্যন্ত চিন্তা গবেষনা করার পর ‘সাত হরফ’কে কেরাতের সাত প্রকারের বিভিন্নতার উপর প্রয়োগ করেছেন, তিনিও ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.)-এর বক্তব্য বড় সম্মানের সাথে উদ্ধৃত করেছেন এবং এর উপর কোনো প্রকার অভিযোগ-আপত্তি উত্থাপন করেননি। বরং তাঁর আলোচনার সমষ্টি থেকে বুঝা যায় যে, ইমাম আবুল ফযল (রহ.)-এর অনুসন্ধান তাঁর নিজের অনুসন্ধানের চেয়ে বেশি পছন্দ হয়েছে।১৪১
এতদ্ব্যতীত হাফেয ইবনে হাযার আসকালানী (রহ.)-এর বক্তব্য থেকেও অনুভূত হয় যে, তিনি উক্ত তিনটি বক্তব্যের মাঝে ইমাম রাযি (রহ.)-এর অনুসন্ধান ও বক্তব্যকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কেননা তিনি আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে লিখেন- (هذا أوجه حسن) [এটা সর্বোত্তম ব্যাখ্যা] অতঃপর ইমাম ফযল (রহ.)-এর বর্ণনাকৃত সাত প্রকার বিভিন্নতা বর্ণনা করার পর লিখেন-
قلت وقد أخذ كلام ابن قتيبة ونقحه
‘আমার ধারণা, তিনি [ইমাম আবুল ফযল রাযি] ইবন কুতাইবা (রহ.)-এর বক্তব্যকে গ্রহণ করে এটাকে সুসজ্জিত করেছেন।১৪২
শেষ যুগে শায়খ আবদুল আযীম যুরকানী (রহ.) ও তাঁর এই বক্তব্যকে গ্রহণ করে এটাকে শক্তিশালী করার জন্য সংশ্লিষ্ট দলীল-প্রমাণাদি পেশ করেছেন।১৪৩
যা হোক, অনুসন্ধানের প্রকারের মাঝে মতানৈক্য আছে ঠিক; তবে ইমাম মালেক (রহ.), আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.), ইমাম আবুল ফখর রাযি (রহ), মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) এবং কাযী বাকিল্লানী (রহ.) সকলেই এ কথার উপর এক মত যে, হাদীসে বর্ণিত “সাত হরফ” দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, কেরাতের ওই বিভিন্নতা যা সাত প্রকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
অধমের দৃষ্টিতে “সাত হরফ”-এর এই ব্যাখ্যাটিই সবচেয়ে উত্তম। হাদীসের মর্মার্থ এটাই বুঝে আসে যে, কুরআনুল কারীমের শব্দগুলো বিভিন্নভাবে পড়া যেতে পারে। আর এই বিভিন্ন পদ্ধতিগুলো ধরন হিসেবে সাত প্রকার। ওই সাত প্রকারের নির্ধারণ যেহেতু কোনো হাদীসে পাওয়া যায় না, তাই নিশ্চিতভাবে কোনো অনুসন্ধানের ব্যাপারে এ কথা বলা যাবে না যে, হাদীসে এ প্রকারকেই বুঝানো হয়েছে। তবে বাহ্যিকভাবে ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ)-এর অনুসন্ধান ও গবেষণা অধিকতর সঠিক বলে মনে হয়। কারণ বর্তমান কালের কেরাতের সবগুলো প্রকার এতে শামিল রয়েছে।
বক্তব্যটির অগ্রাধিকারের কারণসমূহ
“সাত হরফ” এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে হাদীস, তাফসীর ও উলূমুল কুরআনের কিতাবসমূহে যতগুলো ব্যাখ্যা বর্ণনা করা হয়েছে, আমাদের দৃষ্টিতে সেগুলোর মধ্যে এ বক্তব্যটি [সাত হরফ দ্বারা কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকে বুঝানো] সবচেয়ে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত, নির্ভরযোগ্য এবং মেনে নেওয়ার মতো। তার কারণগুলো নিম্নরূপ:
১. এ বক্তব্য অনুযায়ী “হরফ” এবং “কেরাত” পৃথক পৃথক দু’টি বিষয় সাব্যস্ত করার প্রয়োজন পড়ে না। আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.) ও ইমাম তাহাভী (রহ.)-এর বক্তব্যসমূহে একটি যৌথ সমস্যা রয়েছে যে, এতে এ কথা মেনে নিতে হয় যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতের মাঝে দু’ধরনের মতানৈক্য রয়েছে। একটি হলো, হরফের মতানৈক্য। আরেকটি হলো, কেরাতের মতানৈক্য। হরফের মতানৈক্য তো এখন বিলুপ্ত। আর কেরাতের মতানৈক্য এখনো বহাল রয়েছে। অথচ হাদীসের এত বিশাল ভাণ্ডারে এমন একটি দুর্বল হাদীসও পাওয়া যায় না, যার দ্বারা এ কথা সাব্যস্ত হয় যে, “হরফ” এবং “কেরাত” দু’টি আলগ আলগ বিষয়। হাদীসের ভাণ্ডারে শুধুমাত্র হরফের মতানৈক্যের কথা পাওয়া যায়। আর এর জন্যই অধিক হারে “কেরাত” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। “কেরাত” যদি ওই “হরফগুলো” থেকে পৃথক হতো তাহলে কোনো না কোনো হাদীসে এর প্রতি ইঙ্গিত থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল। পরিশেষে এ কথার কোন যুক্তি আছে যে, “হরফ”-এর মতানৈক্য সংক্রান্ত হাদীসটি প্রায় তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় এসে পৌঁছেছে, অথচ “কেরাত”-এর পৃথক আলোচনা একটি হাদীসেও নেই? অতএব, নিজের ধারণা-প্রসূত কেয়াস দ্বারা এ কথা কিভাবে বলে দেওয়া সম্ভব যে, হরফের মতানৈক্য ও বিভিন্নতা ছাড়াও কুরআনুল কারীমের শব্দাবলীর মাঝে আরেক প্রকার মতানৈক্য ও বিভিন্নতা ছিল?
উপরোল্লিখিত [ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.)-এর] বক্তব্যে এই সমস্যা সম্পূর্ণরূপে দূর হয়ে যায়। কারণ এতে “হরফ” এবং “কেরাত”কে অভিন্ন প্রকার সাব্যস্ত করা হয়েছে।
২. আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী এ কথা মানতে হয় যে, সাত হরফের মধ্য হতে ছয় হরফ রহিত বা পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। একমাত্র কুরাইশী হরফই অবশিষ্ট রয়েছে। [বর্তমান কেরাত ওই কুরাইশী হরফের আদায়গত বিভিন্নতা]। এ বক্তব্যের নিন্দনীয় দিকগুলো আমরা সামনে বর্ণনা করব। উপরোল্লিখিত শেষ বক্তব্যটিতে [অর্থাৎ অগ্রাধিকার প্রাপ্ত বক্তব্যটিতে] এসব নিন্দনীয় বিষয় নেই। কেননা এ বক্তব্য অনুযায়ী সাত হরফের সবগুলো আজও অবশিষ্ট ও সংরক্ষিত আছে।
৩. এই অগ্রাধিকার প্রাপ্ত বক্তব্য অনুযায়ী কোনো প্রকার তাভীল বা জটিল ব্যাখ্যা ব্যতিরেকে “সাত হরফ”-এর অর্থ সঠিক অবিকৃত থাকে। পক্ষান্তরে অন্যান্য বক্তব্যের মাঝে হয়তো “হরফ”-এর অর্থের মধ্যে নতুবা “সাত” সংখ্যার মধ্যে তাভীল বা জটিল ব্যাখ্যা করতে হয়।
৪. “সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যত উলামায়ে কেরামের বক্তব্য আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মর্যাদাবান এবং নববী যুগের নিকটবর্তী ব্যক্তিত্ব ছিলেন ইমাম মালেক (রহ.)। আর আল্লামা নিশাপুরী (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী তিনিও এই বক্তব্যেরই প্রবক্তা।
৫. আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.) এবং মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) উভয়ে ছিলেন ইলমে কেরাতের সর্বজনস্বীকৃত ইমাম। আর তাঁরা উভয়েই এই বক্তব্যের প্রবক্তা। মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর কথা তো পূর্বে আলোচনা হয়েছে যে, তিনি ত্রিশ বছরেরও অধিক সময় পর্যন্ত চিন্তা-গবেষণা করার পর এই বক্তব্যকে গ্রহণ করেছেন।
এ বক্তব্যের উপর উত্থাপিত অভিযোগ ও তার জবাব
“সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত বক্তব্যের উপর যেসব আপত্তি-অভিযোগ ও সমালোচনা উত্থাপিত হতে পারে সেগুলোর উপর দৃষ্টি বুলিয়ে নিন।
প্রথম অভিযোগ:
এর উপর প্রথম অভিযোগ করা হয়েছে যে, এ বক্তব্যে মতানৈক্য ও বিভিন্নতার যতগুলো প্রকার বর্ণনা করা হয়েছে তার বেশির ভাগই “সরফী” এবং “নাহভী” [শব্দ-প্রকরণ ও বাক্য-প্রকরণ]-এর প্রকারভেদের উপর ভিত্তিশীল। অথচ রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এই হাদীস বর্ণনা করেছেন তখন সরফ-নাহুর এই বিষয়ভিত্তিক পরিভাষা ও প্রকারভেদ প্রচলিত ছিল না। ওই সময় অধিকাংশ মানুষ লেখা-পড়াও জানত না। এমতাবস্থায় বিভিন্নতার এই প্রকারগুলোকে “সাত হরফ” হিসেবে ধরে নেওয়াটা মুশকিল বলে মনে হয়।
হাফেয ইবনে হাযার (রহ.) এই আপত্তি উদ্ধৃত করার পর এর জবাব দিয়েছেন এভাবে-
وَلَا يَلْزَمُ من ذلك توهين ما ذهب إليه ابن قتيبة لاحتمال أَنْ يَكُونَ الالحصَارُ الْمَذْكُورُ فِي ذَلِكَ وَقَعَ اتفاقا وإِنَّمَا اطَّلَعَ عَلَيْهِ بالاستقراء وَفِي ذَلِكَ مِنَ الْحِكْمَةِ الْبَالِغَة ما لا يخفى
“এর দ্বারা ইবনে কুতাইবা (রহ.)-এর বক্তব্যের দুর্বলতা প্রকাশ পায় না। কেননা হতে পারে এটা কোনো ঘটানাক্রমে হয়ে গেছে। আর অনুসন্ধানের মাধ্যমে এর পূর্বাভাস পাওয়া গেছে। আর এর মাঝে যে পরিপূর্ণ হেকমত লুকায়িত আছে তা গোপন নয়।”১৪৪
আমাদের ক্ষুদ্র উপলব্ধি অনুযায়ী এই জবাবের সারাংশ হচ্ছে, এ কথাটি ঠিক যে, নববী যুগে এই পরিভাষাগুলো প্রচলিত ছিল না। আর হয়তো এ কারণেই রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম “সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেননি। তবে এটা তো পরিষ্কার যে, এই বৈষয়িক পরিভাষাগুলো যে ভাবার্থ থেকে আহরিত, সেই ভাবার্থ তো ওই যুগেও বিদ্যমান ছিল। যদি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেসব ভাবার্থের প্রতি লক্ষ্য করে বিভিন্নতার প্রকারসমূহকে “সাত”-এর মাঝে সীমাবদ্ধ করেন তাতে আশ্চর্যের কী আছে? হ্যাঁ, ওই যুগে যদি বিভিন্নতার সাত প্রকার বিস্তারিত বর্ণনা করা হতো তাহলে হয়তো তা সাধারণ মানুষের উপলব্ধির ঊর্ধ্বে হয়ে যেত। তাই রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বিস্তারিত বর্ণনা না করে শুধু এতটুকু বলেছেন যে, বিভিন্নতার এ প্রকারগুলো সাত প্রকারে সীমাবদ্ধ। পরবর্তীতে যখন এ পরিভাষাগুলো প্রচলিত হয়ে গেল তখন উলামায়ে কেরাম পরিপূর্ণ অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিভিন্নতার এ প্রকারগুলোকে পারিভাষিক শব্দ দ্বারা চিহ্নিত করেছেন।
আর এটা আমরা আগেই বলেছি, বিশেষ কোনো ব্যক্তির অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে পূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে এ কথা বলা মুশকিল যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য এটাই ছিল। কিন্তু যখন বিভিন্ন লোকের অনুসন্ধান এটা প্রমাণ করে যে, বিভিন্নতার প্রকার মোট সাত প্রকার, তখন এ কথা নিশ্চয়তার নিকটবর্তী হয়ে যায় যে, “সাত হরফ” দ্বারা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য ছিল “বিভিন্নতার সাত প্রকার।” চাই এর বিস্তারিত বর্ণনা ওই রকম না হোক, যা পরবর্তীতে অনুসন্ধানের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে যখন “সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যুক্তিগ্রাহ্য অন্য কোনো প্রকার পাওয়া না যায়।
দ্বিতীয় অভিযোগ:
সাত হরফ দ্বারা কি সহজবোধ্যতা সৃষ্টি হলো?
এই [অগ্রাধিকার প্রাপ্ত] বক্তব্যটির উপর দ্বিতীয় অভিযোগ এ হতে পারে যে, কুরআনুল কারীম তো সাত হরফে নাযিল করা হয়েছে। উম্মত যাতে সহজ-সাধ্যভাবে কুরআন তেলাওয়াত করতে পারে। আর এই সহজতা আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্য অনুসারে তো বোধগম্য হয়। কেননা আরবে বিভিন্ন গোত্রের লোক ছিল। আর এক গোত্রের জন্য অন্য গোত্রের ভাষায় কুরআন তেলাওয়াত ছিল অত্যন্ত মুশকিল। কিন্তু ইমাম মালেক (রহ.), ইমাম রাযী (রহ.) এবং ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী সাত হরফ তো শুধু কুরাইশী ভাষার সাথেই সম্পৃক্ত। এতে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয় না যে, কুরআনুল কারীম যখন এক ভাষাতেই নাযিল করা উদ্দেশ্য ছিল, তাহলে এতে কেরাতের বিভিন্নতা অবশিষ্ট রাখার প্রয়োজনটা কি ছিল?
এ অভিযোগের ভিত্তি হলো এ কথার উপর যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআন তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে সাত হরফের যে সহজতা উম্মতের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন, এতে আরবের গোত্রভিত্তিক ভাষার ভিন্নতা তাঁর দৃষ্টির সামনে ছিল। এ কথার উপর ভিত্তি করেই হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) “সাত হরফ” দ্বারা আরবের “সাত ভাষা”-এর অর্থ করেছেন। অথচ এটা এমন একটা কথা যার সমর্থন কোনো হাদীস দ্বারা পাওয়া যায় না। পক্ষান্তরে এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে, সাত হরফের সহজ-সাধ্যতা প্রার্থনা করার সময় তাঁর লক্ষ্যবস্তু কী ছিল? ইমাম তিরমিযী (রহ.) সহীহ সনদ সূত্রে হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন-
لَقِي رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم جبريل عند احجار المرأ، فَقَالَ: ” يا جبريل إنِّي بُعثتُ إِلَى أُمَّةٍ أُميين: اِنهُمُ العَجُوزُ، والشيخ الكبير، والغُلَامُ، قال فمرهم فليقرأوا القرآن على سبعة أحرف
“এক মৃত পাথরের নিকট হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাক্ষাত হলো। তখন তিনি জিবরাঈল (আ.) কে বললেন, আমি এমন এক নিরক্ষর জাতির নিকট প্রেরিত হয়েছি, যাদের মধ্যে রয়েছে-অতিশয় বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা। রয়েছে-শিশু-কিশোররা। তখন হযরত জিবরাঈল (আ.) বললেন, আপনি তাদেরকে নির্দেশ দিন, তারা যেন সাত হরফে কুরআন পাঠ করে।১৪৫
তিরমিযী শরীফেরই অপর এক রেওয়ায়েতে এমন শব্দ এসেছে যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিবরাঈল (আ.) কে বলেছেন-
إنِّي بُعثتُ إلى أُمَّةٍ أُميِّينَ مِنْهُمُ العجُوزُ، وَالشَّيْخ الكبيرُ، وَالغُلَامُ، وَالْجَارِيَةُ، وَالرَّجُلُ الَّذِي لَمْ يَقْرَأُ كِتَابًا قَطُّ “
“আমি এমন এক নিরক্ষর জাতির নিকট প্রেরিত হয়েছি, যাদের মধ্যে রয়েছে-অতিশয় বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা। রয়েছে-শিশু-কিশোররা এবং প্রাপ্ত বয়স্ক ও বালক-বালিকা। যারা কখনো কোনো কিতাব পড়েনি।”১৪৬
উপরোল্লিখিত হাদীসের শব্দমালা সুস্পষ্টভাবে জানান দিচ্ছে যে, উম্মতের জন্য সাত হরফের সহজতা প্রার্থনা করার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে এ কথা ছিল যে, তিনি এক নিরক্ষর জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছেন। যার মধ্যে সব ধরনের লোক রয়েছে। যদি কুরআনুল কারীম তেলাওয়াতের জন্য শুধু একটা পদ্ধতিই নির্ধারণ করে দেওয়া হয় তাহলে উম্মত মুশকিলে পড়ে যাবে। পক্ষান্তরে যদি কয়েকটি পন্থা রাখা হয়, তাহলে এটা সম্ভব যে কোনো লোক এক পদ্ধতিতে তেলাওয়াত করতে সক্ষম না হলে অন্য পদ্ধতিতে সে তেলাওয়াত করবে। এভাবে তার নামায এবং তেলাওয়াতের ইবাদত বিশুদ্ধ হয়ে যাবে। অনেক সময় এমন হয় যে, বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা লোক বা অপড়ুয়া লোকদের যবানে একটি শব্দ আদায় করা কষ্টকর হয় এবং তাদের জন্য যের-যবরের সাধারণ প্রার্থক্যও কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। এ জন্যই তিনি এই সহজতা কামনা করেছেন। যেমন, কোনো ব্যক্তি মা’রূফের সীগা আদায় করতে পারে না, তখন এর স্থলে অন্য কেরাত অনুযায়ী মাজহুলের সীগা আদায় করে নিবে। অথবা কারো জন্য একবচন শব্দ আদায় করতে কষ্ট হয়, তখন সে ওই আয়াতকেই বহুবচন শব্দ দ্বারা আদায় করবে। কারো জন্য সুর-ভঙ্গিমার একটি পদ্ধতি কষ্টকর হয়, তখন সে অন্যটা অবলম্বন করবে। এভাবে গোটা কুরআনে তার জন্য সাত প্রকারের সহজতা লাভ হয়ে যাবে।
আপনি উপরোল্লিখিত হাদীসে হয়তো লক্ষ্য করে থাকবেন যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাত হরফের সহজতা প্রার্থনা করার সময় এ কথা বলেননি যে, “আমি যে জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছি তারা বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত এবং তাদের প্রত্যেকের ভাষা আলাদা আলাদা। এ জন্য কুরআনুল কারীমকে বিভিন্ন ভাষায় পড়ার অনুমতি দেওয়া হোক।” বরং এর উল্টো গোত্রভিত্তিক বিভিন্নতা থেকে দৃষ্টি এড়িয়ে তিনি বয়সের তারতম্য এবং তাদের নিরক্ষর হবার বিষয়টার উপর জোর দিয়েছেন। এ কথা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, সাত হরফের সহজ-সাধ্যতার মধ্যে মূলভিত্তি গোত্রসমূহের ভাষাভিত্তিক ছিল না। বরং উম্মত অপড়ুয়া হওয়ার উপর লক্ষ্য রেখে তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে একটা সাধারণ সহজ-সাধ্যতা প্রদান উদ্দেশ্য ছিল। যার দ্বারা উম্মতের সকল সদস্য উপকৃত হতে পারে।
তৃতীয় অভিযোগ:
এই [অগ্রাধিকার প্রাপ্ত] বক্তব্যের প্রতি তৃতীয় অভিযোগ এই হতে পারে যে, কেরাতের বিভিন্নতার যে সাতটি প্রকার বর্ণনা করা হয়েছে, চাই সেটা ইমাম মালেক (রহ.)-এর বর্ণনা হোক অথবা আবুল ফযল রাযি (রহ.)-এর বক্তব্য হোক কিংবা আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.), মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) এবং কাযী আবুত তাইয়্যেব (রহ.)-এর বর্ণনাকৃত হোক, সর্বাবস্থায় এখানে কেয়াস ও অনুমানের একটি অবকাশ থেকেই যায়। এ কারণেই তাঁরা প্রত্যেকেই বিভিন্নতার এই সাত প্রকারের বিস্তারিত বর্ণনা পৃথক পৃথকভাবে দিয়েছেন। কাজেই এগুলোর ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিভাবে বলা যেতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য এটাই ছিল?
এর জবাব হচ্ছে, “সাত হরফ”-এর কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা কোনো হাদীস বা সাহাবীর বর্ণনা থেকে পাওয়া যায় না। তাই এই অধ্যায়ে যত বর্ণনা রয়েছে, সেসবগুলোর ভাবসমগ্র একত্রিত করে এর থেকে বিশেষ ফলাফল বের করা হয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে এ বক্তব্যটি বিশুদ্ধ হওয়ার অধিক নিকটবর্তী বলে মনে হয়। কারণ এর উপর মৌলিক কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হয় না। বর্ণনাগুলোকে সামগ্রিক দৃষ্টিতে দেখার পর আমাদের কাছে বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায় যে, হাদীসে বর্ণিত “সাত হরফ” দ্বারা কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকে বুঝানো হয়েছে।
বাকি থাকল ওই প্রকারগুলো নির্ধারণ ও নিরূপণ করার বিষয়টি। আর এ ব্যাপারে তো আমরা আগেই বলে এসেছি যে, এটা জানার জন্য গভীর অনুসন্ধানের বিকল্প কোনো পথ নেই। ইমাম আবুল ফযল রাযি (রহ.)-এর অনুসন্ধান আমাদের কাছে অবশ্যই সকল গুণাগুণসম্বলিত বলে মনে হয়। এতদ্বসত্ত্বেও আমরা নিশ্চিতভাবে কারো অনুসন্ধানকেই বলি না যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য এটাই ছিল। কিন্তু এর দ্বারা এ মৌলিক হাকীকত প্রশ্নবিদ্ধ হয় না যে, “সাত হরফ” দ্বারা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য ছিল কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকার। যেগুলোর বিশদ বর্ণনার নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করার না আমাদের কাছে কোনো পথ আছে আর না এর কোনো প্রয়োজন আছে।
চতুর্থ অভিযোগ:
এই বক্তব্যের উপর চতুর্থ অভিযোগ এ হতে পারে যে, ওই বক্তব্যে “সাত হরফ” দ্বারা শব্দমালা ও সেগুলোর উচ্চারণের বিভিন্ন পদ্ধতিকে বুঝানো হয়েছে। এতে অর্থগত দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়নি। অথচ এক রেওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে, এর দ্বারা সাত ধরনের অর্থকে বুঝানো হয়েছে। ইমাম তহাভী (রহ.) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ বাণী রেওয়ায়েত করেন-
كان الكتاب الأول ينزل من باب واحد على حرف واحد ونزل القرآن من سبعة ابواب على سبعة احرف زاجر و امر وحلال وحرام ومحكم ومتشابه وامثال . الخ….
‘পূর্ববর্তী কিতাব এক দরজা দিয়ে এক হরফে অবতীর্ণ হয়েছিল। আর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে সাত দরজা দিয়ে সাত হরফে। সেই সাতটি হরফ হলো-[১] যাজির [কোনো কাজ থেকে বাধা প্রদানকারী]। [২] আমের [কোনো বিষয়ে আদেশ প্রদানকারী]। [৩.] হালাল। [৪.] হারাম। [৫] মুহকাম [যার অর্থ জানা আছে]। [৬.] মুতাশাবিহ্ [যার নিশ্চিত কোনো অর্থ জানা নেই]। [৭.] আমছাল।
এ হাদীসের ভিত্তিতেই কোনো কোনো আলেম থেকে বর্ণিত আছে যে, তাঁরা সাত “হরফ”-এর তাফসীর “সাত প্রকারের অর্থ” দ্বারা করেছেন।
এর জবাব হলো, উপরোল্লিখিত রেওয়ায়েতটি সনদের দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল। ইমাম তহাভী (রহ.) এর সনদের সমালোচনা করতে গিয়ে বলেন যে, আবু সালামা আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। অথচ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর সাথে আবু সালামার সাক্ষাতই হয়নি।১৪৭
এতদ্ব্যতীত পূর্ব যুগের যেসব বুযুর্গের কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য বর্ণিত আছে সেগুলোর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) লিখেন- ’এর দ্বারা “সাত হরফ” বিষয়ক হাদীসটি ব্যাখ্যা করা তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল না। বরং সাত হরফের আলোচনার বিষয় থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে তাঁরা এ কথা বলতে চেয়েছেন যে, কুরআনুল কারীম এ ধরনের বিষয় দ্বারা সমৃদ্ধ।’১৪৮
আর যারা “সাবআতু আহরুফ” বা সাত হরফের আলোচনা সম্বলিত হাদীসগুলোর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এ ধরনেরই কথা বলেছেন, তাদের কথা যুক্তিগ্রাহ্যভাবেই বাতিল। কারণ পেছনে যতগুলো হাদীস বর্ণনা করা হয়েছে, সেগুলোর প্রতি নযর বুলাতেই একজন সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিই বুঝতে পারবে যে, হরফের বিভিন্নতা দ্বারা অর্থ ও বিষয়াবলীর বিভিন্নতাকে বুঝানো হয়নি। বরং আলফায বা শব্দমালার বিভিন্নতাকে বুঝানো হয়েছে। তাইতো মুহাক্কিক আলেমগণের মধ্য হতে কেউ এ মতকে গ্রহণ করেননি; বরং এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।১৪৯
“হরূফে সাবআ” এখনো সংরক্ষিত নাকি পরিত্যক্ত?
“হরফে সাবআ” বা সাত হরফের অর্থ নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার পর এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, এ সাত হরফ এখনো অবশিষ্ট আছে নাকি নেই? এ বিষয়ে মুতাক্কাদিমীন বা পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরাম থেকে তিনটি মতামত বা বক্তব্য বর্ণিত আছে।
[এক] প্রথম বক্তব্য হচ্ছে হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) এবং তাঁর অনুসারীদের। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করে এসেছি যে, তাঁদের নিকট সাত হরফ দ্বারা আরবের গোত্রভিত্তিক সাত ভাষাকে বুঝানো হয়েছে। এ কথার উপর ভিত্তি করেই তিনি বলেন যে, হযরত উসমান (রা.)-এর যুগ পর্যন্ত কুরআনুল কারীম সাত হরফে পড়া হতো। কিন্তু হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে যখন ইসলাম দূর-দূরান্ত পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করল, তখন এ সাত হরফের তাৎপর্য সম্পর্কে জানা না থাকার কারণে মানুষের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা শুরু হতে লাগল। বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা বিভিন্ন হরফে কুরআন তেলাওয়াত করত এবং একে অন্যের তেলাওয়াতকে ভুল আখ্যায়িত করত। এ ফেতনাকে নির্মূল করার জন্য হযরত উসমান (রা.) সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শে গোটা উম্মতকে শুধু এক হরফ তথা কুরাইশী ভাষা অনুযায়ী কুরআন তেলাওয়াতের নিমিত্তে সাতটি মাসহাফ সুবিন্যস্ত করে বিভিন্ন প্রদেশে পাঠিয়ে দেন। আর বাকি সব মাসহাফকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন। যেন আর কোনো মতানৈক্য সৃষ্টি হতে না পারে। সুতরাং এখন কেবল কুরাইশী ভাষার হরফই অবশিষ্ট রয়েছে। আর অবশিষ্ট ছয় হরফ সংরক্ষিত রয়নি। আর কেরাতের যে মতানৈক্য আজ পর্যন্ত চলে আসছে, সেগুলো সেই কুরাইশী এক হরফ আদায়ের বিভিন্ন পদ্ধতি মাত্র।১৫০
হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর চিন্তাধারা ও এর নিন্দনীয় দিকগুলো
হাফেয ইবনে জারীর তাবারী (রহ.) যেহেতু নিজের চিন্তা ও মতকে স্বীয় তাফসীর গ্রন্থের ভূমিকায় অত্যন্ত দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন, তাই তাঁর এ বক্তব্য অত্যাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। আর আজ-কাল সাত হরফের ব্যাখ্যা সাধারণত এর আলোকেই করা হয়ে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ মুহাক্কিক আলেমগণ১৫১ এ মতকে গ্রহণই করেননি; বরং অত্যন্ত কঠোরভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ এ বক্তব্যে এমন কিছু সমস্যা দাঁড়ায় যার কোনো সমাধান নেই।
এ মতের উপর সর্ব প্রথম তো ওই আপত্তি আরোপিত হয়, যার আলোচনা আমরা আগেই করে এসেছি যে, এতে “হরফ” এবং “কেরাত” দু’টিকে পৃথক পৃথক বিষয় সাব্যস্ত করা হয়েছে। অথচ কোনো হাদীস দ্বারা এর প্রমাণ পাওয়া যায় না।
দ্বিতীয় আপত্তি এই হয় যে, হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) এক দিকে তো এটা মেনে নেন যে, সাত হরফের সবকটিই আল্লাহর পক্ষ হতে নাযিলকৃত। আবার অন্য দিকে বলেন, হযরত উসমান (রা.) সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শক্রমে ছয় হরফের তেলাওয়াতকে বিলুপ্ত করে দেন! অথচ এ কথা মেনে নেওয়া খুবই মুশকিল যে, সাহাবায়ে কেরাম ওই হরফগুলোকেই একেবারে বিলুপ্ত করার জন্য একমত হয়ে গেলেন, উম্মতের সহজ-সাধ্যের জন্য রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুআর জবাবে আল্লাহ তাআলা যা নাযিল করেছিলেন!? সাহাবায়ে কেরামের ইজমা বা ঐক্যমত নিঃসন্দেহে দীনের অকাট্য দলীল, কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর জন্য এটা সম্ভাব্য ব্যাপার বলে মনে হয় না যে, যে বিষয় কুরআন হওয়ার ব্যাপারটা তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক পরম্পরায় সাব্যস্ত হয়েছে, তাঁরা সেটাকে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে মুছে ফেলার জন্য ঐক্যমত পোষণ করবেন!
হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) এই আপত্তির জবাব এভাবে দিয়েছেন যে, ‘প্রকৃতপক্ষে উম্মতকে কুরআনুল কারীম সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং সাথে সাথে এ এখতেয়ারও দেওয়া হয়েছিল যে, তারা সাত হরফের যে কোনো একটিকে বেছে নিতে পারবে। তাইতো উম্মত সেই এখতেয়ার দ্বারা উপকৃত হয়ে সার্বজনীন কল্যাণার্থে ছয় হরফের তেলাওয়াতকে পরিত্যাগ করেছেন আর এক হরফের সংরক্ষণের উপর একমত হয়েছেন। এ পদক্ষেপ দ্বারা ওই হরফগুলোকে রহিত করা এবং সেগুলোর তেলাওয়াতকে হারাম করে দেওয়া উদ্দেশ্য ছিল না। বরং উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের জন্য সার্বজনীন এক হরফকে নির্বাচন করা।’
কিন্তু এ জবাবটিও এ জন্য দুর্বল বলে মনে হয় যে, প্রকৃত অবস্থা যদি এটাই হয়ে থাকে তাহলে এটা কি সমীচীন ছিল না যে, উম্মত নিজেদের আমলের জন্য এক হরফকে বেছে নিত আর বাকি ছয় হরফকে একেবারে বিলুপ্ত করার পরিবর্তে কোনো এক স্থানে তা সংরক্ষণ করে রাখত? যেন সে হরফগুলোর অস্তি ত্ব একেকারেই খতম না হয়ে যায়। কুরআনুল কারীমের ঘোষণা রয়েছে-
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
‘নিশ্চয় আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই তার সংরক্ষক।‘
যখন সাত হরফের সবগুলোই কুরআন ছিল তখন এই আয়াতের সুস্পষ্ট দাবী হলো, ওই সাত হরফও কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে এবং কোনো ব্যক্তি যদি এগুলোর তেলাওয়াকে ছেড়েও দিতে চায়, তবু তা একেবারে বিলুপ্ত হতে পারে না।
হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) এর উপমা দিতে গিয়ে একটি মাসআলা পেশ করেছেন যে, কুরআনুল কারীম মিথ্যা শপথের কাফ্ফারা ক্ষেত্রে মানুষকে তিনটি এখতেয়ার দিয়েছে। চাইলে সে একজন দাসকে মুক্ত করতে পারবে, চাইলে দশজন মেসকীনকে আহার করাতে পারবে আর চাইলে দশজন মেসকীনকে বস্ত্র দিতে পারবে। এখন যদি উম্মত বাকি দু’টি প্রকারকে নাজায়েয না করে নিজেদের আমলের জন্য একটিকে গ্রহণ করে নেয় তাহলে তা তার জন্য বৈধ। ঠিক তদ্রূপ উম্মত সাত হরফের মধ্য হতে একটি হরফকে সার্বজনীনভাবে বেছে নিয়েছে কিন্তু এই উপমা পেশ করা এ জন্য সঠিক নয় যে, উম্মত যদি শপথের কাফ্ফারার ক্ষেত্রে তিন প্রকারের যে কোনো একটি প্রকারকে এমনভাবে গ্রহণ করে যে, বাকি দু’টি প্রকারকে নাজায়েয তো বলে না; কিন্তু কার্যত সেগুলোর অস্তিত্ব একেবারেই বিলুপ্ত থেকে যায় এবং লোকদের কেবল এ টুকু জানা থাকে যে, শপথের কাফ্ফারার আরো দু’টি প্রকার ছিল যেগুলোর আমলকে উম্মত পরিহার করেছে। কিন্তু সে প্রকারগুলো কি ছিল? তা জানে এমন লোকও বাকি না থাকে, তাহলে অবশ্যই উম্মতের জন্য এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো অবকাশ নেই।
অতঃপর প্রশ্ন থেকে যায় যে, বাকি ছয় হরফকে পরিহার করার কি প্রয়োজন দেখা দিল? হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) বলেছেন যে, এই হরফগুলোর মতানৈক্যের কারণে মুসলমানদের মাঝে প্রচণ্ড ঝগড়া বাঁধত। এ জন্য হযরত উসমান (রা.) সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শে সকল হরফের মাঝে সমন্বয় সাধন করে সেটাকে এক হরফে রূপান্তরিত করাকে সমীচীন মনে করলেন। কিন্তু এটাও এমন এক কথা যেটাকে মেনে নেওয়া খুব মুশকিল। হরফের বিভিন্নতার উপর ভিত্তি করে মুসলমানদের মতবিরোধ তো স্বয়ং রাসূলুলাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগেও ছিল। হাদীসের ভাণ্ডারে এ ধরনের বহু ঘটনা বর্ণিত আছে যে, এক সাহাবী অপর সাহাবীকে ভিন্নভাবে কুরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন তখন তাঁদের পরস্পরে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়ে যেত। এমনকি সহীহ বুখারীর রেওয়ায়েত অনুযায়ী হযরত ওমর (রা.) তো হযরত হিশাম (রা.)-এর গলায় চাদর পেঁছিয়ে তাঁকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে নিয়ে এসেছিলেন। হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) বলেন, হরফের এই মতবিরোধের কথা শোনে আমার অন্তরে মস্তবড় সন্দেহ সৃষ্টি হতে লাগল। এ ধরনের ঘটনার প্রেক্ষিতে রাসূলুলাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাত হরফকে বিলুপ্ত করার পরিবর্তে সে হরফগুলোর অনুমোদনের ব্যাপারে জানালেন। আর এতে কোনো ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনাও ঘটেনি। সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে এটা অসম্ভব যে, তাঁরা এই ‘উসওয়ায়ে হাসানা’ বা উত্তম আদর্শের উপর আমল করার পরিবর্তে ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার সিদ্ধন্ত গ্রহণ করবেন।
তারপর আশ্চর্যের কথা হলো, আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী সাহাবায়ে কেরাম মতবিরোধের ভয়ে ছয় হরফকে তো বিলুপ্ত করে দিয়েছেন। কিন্তু কেরাতগুলোকে যা তাঁর বক্তব্য মতে হরফ থেকে আলাদা বিষয়। হুবহু বাকি রেখেছেন! যা আজ পর্যন্ত সংরক্ষিত হয়ে চলে আসছে। এখন প্রশ্ন হলো, বিভিন্ন হরফের উপর কুরআন তেলাওয়াত জারী রাখার ক্ষেত্রে যে মতবিরোধ ও মতানৈক্যের আশঙ্কা ছিল, কেরাতের বিভিন্নতার মাঝে কি সেই আশঙ্কাটা ছিল না? যখন ওই কেরাতগুলোর আলোকে কখনো কখনো এক একটি হরফকে বিশটি পদ্ধতিতে পড়া যায়। যদি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার উদ্দেশ্য এটাই হয়ে থাকে যে, মুসলমানদের মাঝে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা হবে এবং সবাই এক পদ্ধতিতে কুরআন তেলাওয়াত করবে, তাহলে কেরাতের বিভিন্নতাকে অবশেষে কেন বিলুপ্ত করা হলো না? যখন কেরাতের মতানৈক্য থাকা সত্ত্বেও মুসলমানদের বিক্ষিপ্ততাকে বাধা দেওয়া যেত এবং মুসলমানদেরকে এটা বুঝানো যেত যে, এই সবগুলো পদ্ধতিতে তেলাওয়াত করা জায়েয, তাহলে এই শিক্ষাটাই কেন সাত হরফের ক্ষেত্রে ফেতনার কারণরূপে উপলব্ধি হলো? প্রকৃত কথা হচ্ছে, হাফেয ইবনে জারীর তবারী (রহ.)-এর বক্তব্যে “সাত হরফ” এবং “কেরাত”-এর ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি এমন বিস্ময়কর দু’টি আমলী সম্বন্ধ করতে হয়, যার যুক্তিগ্রাহ্য কোনো কারণ বুঝে আসে না।
উপরন্তু হযরত উসমান (রা.) ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামের প্রতি এত বড় পদক্ষেপের সম্বন্ধ কোনো সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধ রেওয়ায়েতের উপর ভিত্তি করে নয়। বরং সংক্ষিপ্ত কিছু শব্দের কেয়াসনির্ভর ব্যাখ্যার মাধ্যমে করা হয়েছে। যে সকল রেওয়ায়েতে হযরত উসমান (রা.)-এর কুরআন সংকলনের কথা বর্ণনা করা হয়েছে সেখানে এ কথার উল্লেখ নেই যে, তিনি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন। বরং এর বিপরীত অনেক দলীল বিদ্যমান রয়েছে যেগুলোর বিশদ বর্ণনা সামনে আসবে। এখন কোনো সুস্পষ্ট ও সহীহ রেওয়ায়েত ব্যতীত এ কথা কিভাবে বলা সম্ভব হতে পারে যে, সাহাবায়ে কেরাম ওই ছয় হরফকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ব্যাপারটা মেনে নিয়েছেন, যা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বার বার আবদনের প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছিল?
প্রকৃত কথা হচ্ছে, যে সকল সাহাবায়ে কেরাম কুরআনুল কারীমের সংকলন ও বিন্যাসের মহান কাজে শুধু এ জন্যই গবেষণা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কাজ করে যাননি। যারা কুরআনুল কারীমের এক একটি শব্দ সংরক্ষণের জন্য নিজেদের পুরো জীবন ব্যয় করেছেন এবং যারা রহিত তেলাওয়াতের আয়াতগুলোও সংরক্ষণ করে উম্মতের নিকট পৌছিয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে এ কাজ হওয়াটা খুবই দূরবর্তী ব্যাপার যে, তাঁরা সবাই ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার জন্য এভাবে একমত হয়ে যাবেন যে, আজ সেই হরফগুলোর কোনো নাম ও নিশানাও বাকি থাকবে না। যে সকল আয়াতের তেলাওয়াত রহিত হয়ে গিয়েছিল, সাহাবায়ে কেরাম সেগুলোকেও কমপক্ষে ঐতিহাসিক ভিত্তিতে অবশিষ্ট রেখে আমাদের পর্যন্ত পৌছিয়েছেন। তাহলে কি সেই কারণ যে, ওই “হরফগুলো” যেগুলোর ব্যাপারে হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) ও মানেন যে, তা রহিত হয়নি-বরং কোনো কল্যাণার্থে কেরাত ও লিপিমালাকে বিলুপ্ত করা হয়েছে, সেগুলোর কোনো একটি উদাহরণ কোনো দুর্বল রেওয়ায়েতেও সংরক্ষিত হতে পারেনি!
এ কারণেই অধিকাংশ মুহাক্কিক উলামায়ে কেরাম হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর এই বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। যাদের বক্তব্যের বিশদ বর্ণনা সামনে আসবে।
[দুই.] ইমাম তহাভী (রহ.)-এর বক্তব্য:
সাত হরফের ব্যাপারে ইমাম তহাভী (রহ.) দ্বিতীয় মতটি গ্রহণ করেছেন। পূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁর মত অনুযায়ী কুরআনুল কারীম তো শুধু এক কুরাইশী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছিল। তবে উম্মতের সহজ-সাধ্যের জন্য এ অনুমতি প্রদান করা হয়েছে যে, তারা কুরআনুল কারীম তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে সাত পর্যন্ত সমার্থবোধক শব্দ ব্যবহার করতে পারবে। এই সমার্থবোধক শব্দগুলোও স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। এই অনুমতি প্রদানকেই হাদীসে কুরআনুল কারীম “সাত হরফ” এর উপর নাযিল হয়েছে বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই অনুমতি ছিল ইসলামের প্রাথমিক যুগে। পরবর্তীতে মানুষ যখন কুরআনী ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে গেল, তখন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগেই সেই অনুমতি রহিত হয়ে গেল। মৃত্যুর পূর্বে যখন শেষ বারের মতো তিনি হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে কুরআনুল কারীমের অনুশীলন করেন তখন সমার্থবোধক শব্দগুলো রহিত হয়ে গেল। এখন শুধু সেই হরফগুলোই অবশিষ্ট রয়েছে যেগুলোর উপর কুরআন নাযিল হয়েছিল। অর্থাৎ কুরাইশী হরফ। আর বাকি ছয় হরফ রহিত হয়ে গেছে।
হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্যের তুলনায় এই বক্তব্যটি এ দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তম যে, এতে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি রহিত করার সম্বন্ধ করা হয়নি যে, তাঁরা ছয় হরফকে রহিত করেছেন। বরং রহিত হবার সম্বন্ধ স্বয়ং নববী যুগের দিকে করা হয়েছে। তবে এ বক্তব্যের উপর একটি প্রশ্ন আরোপিত হয় যে, এই বক্তব্য অনুযায়ী ছয় হরফ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে নাযিলকৃত নয়। অথচ হযরত ওমর (রা.) ও হযরত হিশাম (রা.)-এর মাঝে যে মতবিরোধ হয়েছিল, সে ক্ষেত্রে হযরত হিশাম (রা.) রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে ‘সূরা ফুরকান’ নিজ পদ্ধতি অনুযায়ী পাঠ করলেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা শোনে বললেন- هكذا انزلت এই সূরা এভাবেই নাযিল করা হয়েছে)। এরপর হযরত হযরত ওমর (রা.) ও নিজের পদ্ধতি অনুযায়ী তেলাওয়াত করলেন। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা শোনেও বললেন- هكذا انزلت এই সূরা এভাবেই নাযিল করা হয়েছে।১৫২ এই শব্দমালা থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, উভয় পদ্ধতিটিই আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে নাযিলকৃত ছিল।
দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, যা পূর্বে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ বক্তব্যেও কেরাতের অবস্থানগত মর্যাদা ফুটে উঠেনি যে, তা সাত হরফের মধ্যে শামিল কি-না? যদি শামিল থাকে তাহলে ছয় হরফের মতো এ ক্ষেত্রেও বলতে হবে যে, [নাউযুবিল্লাহ এটা আল্লাহর পক্ষ হতে নাযিলকৃত নয়। অথচ এ কথা ইজমায়ে উম্মতের পরিপন্থী। আর যদি শামিল না থাকে তাহলে কেরাতের পৃথক অস্তিত্বের উপর কোনো দলীল নেই। কাজেই এ বক্তব্যের উপরও আত্মপ্রশান্তি লাভ হয় না।
[তিন.] সর্বোত্তম বক্তব্য
তৃতীয় বক্তব্য হলো সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ও মেনে নেওয়ার মতো। সাত হরফ দ্বারা যেহেতু কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারকেই বুঝানো হয়েছে যার আলোচনা পূর্বে করা হয়েছে), তাই এই সাত হরফ আজও পুরোপুরি সংরক্ষিত ও অবশিষ্ট আছে এবং এগুলোর তেলাওয়াতও করা হয়। অবশ্য এতটুকু পার্থক্য রয়েছে যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে কেরাতসমূহের বিভিন্নতার সংখ্যা ছিল অনেক বেশি এবং তাতে সমার্থবোধক শব্দের অধিক্য ছিল। যার উদ্দেশ্য ছিল, যারা কুরআনের ভাষায় তেলাওয়াত করতে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়নি তাদেরকে বেশি থেকে বেশি সহজতার অবকাশ দেওয়া। পরবর্তীতে যখন আরবের লোকেরা কুরআনের ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে গেল তখন সমার্থবোধক শব্দের বহু মতানৈক্য বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে। যেমন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সর্বশেষ বার হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে দাওর করেন [যেটাকে হাদীসে আরযায়ে আখীরা বলা হয়। সে সময় অনেক কেরাতই রহিত করে দেওয়া হয়েছে। যার দলীল সামনে আসবে। কিন্তু যতগুলো কেরাত সে সময় অবশিষ্ট ছিল তার সবগুলোই আজ পর্যন্ত ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় চলে আসছে এবং এগুলোর তেলাওয়াত করা হয়।
“সাত হরফ”-এর পেঁচানো আলোচনার মধ্যে এটা সেই কণ্টকমুক্ত পথ যার উপর হাদীসের সবগুলো রেওয়ায়েত নিজ নিজ স্থানে সঠিক হয়ে যায়। এবং সেগুলোর মাঝে কোনো দ্বন্দ্ব বা মতবিরোধ বাকি থাকে না। আর না থাকে যুক্তিগ্রাহ্য কোনো আপত্তি। এ ব্যাপারে সম্ভাব্য আরো যত সন্দেহাবলী রয়েছে, আমরা সামনে বিস্তারিতভাবে সেগুলোর উত্তর দেব। যাতে এ বক্তব্যের যথার্থতা ভালোভাবে ফুটে উঠে। তবে এর আগে শোনে নিন যে, এ বক্তব্যের প্রবক্তাগণ কারা কারা? আমরা এখানে ওই মনীষীদের নাম এবং উদ্ধৃতি উপস্থাপন করব। যারা এ বক্তব্য গ্রহণ করেছেন অথবা হাফেয ইবনে জারীর তবারী (রহ.)-এর বক্তব্যকে খণ্ডন করেছেন।
এই বক্তব্যের প্রবক্তা যারা
ইলমে কেরাতের সর্বশ্রেষ্ঠ বিখ্যাত ইমাম, হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্রে হাফেয ইবনে কাছীর (রহ.)-এর শাগরিদ এবং হাফেয ইবনে হাযার (রহ.)-এর উস্তাদ, হাফেয আবুল খায়ের মুহাম্মদ ইবনুল জাযারী (রহ.) (মৃত্যু: ৮৩৩ হিজরী। স্বীয় গ্রন্থ “আন-নশরু ফী কিরাতিল আশর”-এর লিখেন-
وَأَمَّا كَوْنُ الْمَصَاحِفِ الْعُثْمَانِيَّة مُسْتَملَةً عَلَى جميع الأَحْرُفَ السَّبْعَةِ، فَإِنَّ هذه مسألة كبيرة اختَلَفَ الْعُلَمَاء فِيهَا : فَذَهَبَ جَمَاعَاتٌ من الْفُقَهَاءِ وَالْقُرَّاءِ وَالْمُتَكَلِّمِينَ إِلَى أَنَّ الْمَصَاحِفَ الْعُثْمَانِيَّةَ مُسْتَملة على جميع الأحرف السَّبْعَةِ، وَبَنَوْا ذَلِكَ عَلَى أَنَّهُ لَا يَجُوزُ عَلَى الْأُمَّةِ أَنْ تُهْمَلَ نَقْلَ شَيْءٍ مِنَ الْحُرُوف السبعة الَّتِي نَزَلَ الْقُرْآنُ بِهَا، وَقَدْ أَجْمَعَ الصَّحَابَةُ عَلَى نَقْلِ الْمَصَاحِفِ الْعُثْمَانِيَّة مِنَ الصُّحُفِ الَّتِي كَتَبَهَا أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ وَإِرْسَالَ كُلِّ مُصْحَفِ مِنْهَا إِلَى مِصْرٍ مِنْ أَمْصَارِ الْمُسْلِمِينَ وَأَجْمَعُوا عَلَى تَرْكِ مَا سَوَى ذلك، قَالَ هَؤُلَاءِ: وَلَا يَجُوزُ أَنْ يَنْهَى عَنِ الْقَراءة ببَعْضِ الْأَحْرُفَ السَّبْعَةَ وَلَا أَنْ يُجْمَعُوا عَلَى تَرْك شَيْءٍ مِنَ الْقُرْآن وَذَهَبَ جَمَاهِيرُ الْعُلَمَاء من السلف والخلف وأئمة الْمُسْلِمينَ إِلَى أَنَّ هَذه الْمَصَاحِفَ الْعُثمَانِيَّةَ مُسْتَملَةٌ عَلَى مَا يَحْتَمَلُهُ رَسْمُهَا مِنَ الْأَحْرُف السَّبْعَة فَقَط جَامعة لِلْعَرْضَة الأخيرة التي عرضها النَّبي – صلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – عَلَى جبْرَائِيلَ – عَلَيْهِ السَّلَامُ – مُتَضَمِّنَةٌ لَهَا لَمْ تَتْرُكَ حَرْفًا مِنْهَا.
)قُلْتُ( : وَهَذَا الْقَوْلُ هُوَ الَّذِي يَظْهَرُ صَوَابُهُ : لأَنَّ الْأَحَادِيثِ الصَّحِيحَة والآثار الْمَشْهُورَةَ الْمُسْتَفِيضَةً تَدُلُّ عَلَيْهِ وَتَشْهَدُ لَهُ
‘হযরত উসমান (রা.) যে মাসহাফ [কুরআনের কপি প্রস্তুত করেছিলেন তাতে সাত হরফ শামিল ছিল কি-না, তা অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। উলামায়ে কেরাম এতে মতবিরোধ করেছেন। ফুকাহা, কারী এবং কালাম শাস্ত্রবিদদের একটি দলের মতামত হলো, সাত হরফ মাসহাফে উসমানীর মাঝে শামিল রয়েছে। এ কথার ভিত্তি এর উপর যে, উম্মতের জন্য এটা বৈধ নয় যে, তারা ওই সাত হরফের মধ্য হতে কোনো একটি হরফকে বর্ণনা করা ছেড়ে দিবে, যেগুলোর উপর কুরআন নাযিল হয়েছে। আর সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সর্বসম্মতিতে উসমানী মাসহাফকে ওই সকল সহীফা থেকেই সংকলন করেছিলেন, যা হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত ওমর (রা.) লিপিবদ্ধ করেছিলেন। সেগুলোর প্রত্যেকটি কপি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন শহরে পাঠানো হয়েছিল এবং সেগুলো ব্যতীত যত সহীফা ছিল সবগুলো পরিহার করার উপর ঐক্যমত পোষণ করেছিলেন। তাঁরা বলেন, না সাত হরফের মধ্য হতে কোনো একটির কেরাতকে পরিহার করা জায়েয হবে আর না সাহাবায়ে কেরাম কুরআনের কোনো অংশ ছেড়ে দেওয়ার উপর ঐক্যমত পোষণ করবেন। আর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উলামায়ে কেরামের অধিকাংশের মত এটাই যে, মাসহাফে উসমানী ওই সকল হরফকে নিয়ে শামিল, যা এর রসমেরখতের মাঝে সন্নিবেশিত হয়েছে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বশেষ যখন হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে কুরআনুল কারীমের দাওর করেছিলেন, এর সমস্ত শব্দ এ মাসহাফে সন্নিবেশিত হয়ে গেছে। সেগুলোর কোনো হরফই সেই মাসহাফ থেকে বাদ পড়েনি।
আমার ধারণা, এটাই সে বক্তব্য যার বিশুদ্ধতা সুস্পষ্ট। কেননা বিশুদ্ধ হাদীসগুলো এবং প্রসিদ্ধ রেওয়ায়েতগুলো এর বিশুদ্ধতার প্রমাণ বহন করে এবং এর সাক্ষ্য প্রদান করে।১৫৩
আল্লামা বদরুদ্দীন আল-আইনী (রহ.) উদ্ধৃত করেন-
واختلف الأصوليون هل يقرأ اليوم على سبعة أحرف فمنعه الطبري وغيره وقال إنما يجوز بحرف واحد اليوم وهو حرف زيد ونحى إليه القاضي أبو بكر وقال الشيخ أبو الحسن الأشعري أجمع المسلمون على أنه لا يجوز حظر ما وسعه الله تعالى من القرآت بالأحرف التي أنزلها الله تعالى ولا يسوغ للأمة أن تمنع ما يُطلقه الله تعالى بل هي موجودة في قراءتنا وهي مفرقة في القرآن غير معلومة بأعيانها فيجوز على هذا وبه قال القاضي أن يقرأ بكل ما نقله أهل التواتر من غير تمييز حرف من حرف فيحفظ حرف نافع بحرف الكسائي وحمزة ولا حرج في ذلك
‘বর্তমানে কুরআনুল কারীম সাত হরফের উপর পড়া হয় কি-না, এ ব্যাপারে উসূলী তথা নীতি নির্ধারক উলামায়ে কেরামের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। হাফেয ইবনে জারীর তবারী (রহ.) ও কতক উলামায়ে কেরাম তা অস্বীকার করে বলেন, বর্তমানে শুধু এক হরফের উপরই কুরআনুল কারীম পাঠ করা জায়েয। আর তা হচ্ছে, হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর হরফ। কাযী আবু বকর রাযী (রহ.) এ মতের দিকেই ঝুঁকে পড়েছেন। কিন্তু ইমাম আবুল হাসান আশআরী (রহ.) বলেন, মুসলিম উম্মাহ এ ব্যাপারে একমত যে, মহান আল্লাহ যেসব হরফের উপর কুরআন অবতীর্ণ করে সহজ-সাধ্য করেছেন, সেগুলো থেকে বিরত থাকা জায়েয নেই। আর আল্লাহ তাআলা যে জিনিসের অনুমতি প্রদান করেছেন সেগুলোকে প্রত্যাখ্যান করার উম্মতের অধিকার নেই। বরং বস্তু বতা তো হলো এই যে, সাত হরফের সবগুলোই আমাদের প্রচলিত কেরাতের মাঝে বিদ্যমান রয়েছে এবং কুরআনুল কারীমের মাঝে বিচ্ছিন্ন ও অনির্দিষ্টভাবে শামিল আছে। এ হিসেবে সে হরফগুলোর কেরাত আজও জায়েয আছে। আর এটাই কাযী১৫৪ সাহেবের মত। যত হরফ তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় বর্ণিত আছে সেগুলোর প্রত্যেকটিই পড়া জায়েয। এক হরফ থেকে অন্য হরফের পার্থক্য করারও প্রয়োজন নেই। নাফে (রহ.)-এর কেরাতকে কেসাই এবং হামযা (রহ.)-এর কেরাতের সাথে মিলিয়ে যদি আত্মস্থ করা হয় তাতে কোনো অসুবিধা নেই।১৫৫
আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশী (রহ.) কাযী আবু বকর (রহ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে লিখেন-
وَالسَّابِعُ: اخْتَارَهُ الْقَاضِي أَبُو بَكْرٍ وَقَالَ الصَّحِيحُ أَنَّ هَذِهِ الْأَحْرُفَ السَّبْعَةَ ظَهَرَتْ وَاسْتَفَاضَتْ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَضَبَطَهَا عَنْهُ الْأَئِمَّةُ وَأَثْبَتَهَا عُثْمَانُ وَالصَّحَابَةُ فِي الْمُصْحَفِ
‘সপ্তম বক্তব্যটি কাযী আবু বকর১৫৬ (রহ.) গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, সাত হরফের সবগুলোই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রসিদ্ধির সাথে বর্ণিত আছে। আইম্মায়ে কেরাম এগুলোকে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। হযরত উসমান (রা.) ও অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম এগুলোকে তাঁদের মাসহাফে বিদ্যমান রেখেছেন।’১৫৭
আল্লামা ইবনে হযম (রহ.)ও হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর বক্তব্যকে কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, ছয় হরফকে বিলুপ্ত করার বক্তব্যটি একেবারেই ভুল। হযরত উসমান (রা.) যদি এমন করতেও চাইতেন তবুও সক্ষম হতেন না। কারণ মুসলিম বিশ্বের আনাচে-কানাচে এ সাত হরফের হাফেযে ভরপুর ছিল। তিনি লিখেন-
وأما قول من قال أبطل الأحرف الستة فقد كذب من قال ذلك ولو فعل عثمان ذلك أو أراده لخرج عن الإسلام ولما مطل ساعة بل الأحرف السبعة كلها عندنا قائمة كما كانت مثبوتة في القراآت المشهورة المأثورة
‘আর যারা বলেন যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছেন, তারা একেবারেই ভুল বলেছেন। যদি হযরত উসমান (রা.) এমনটি করতেন বা এর ইচ্ছা করতেন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি ইসলাম থেকে বের হয়ে যেতেন।১৫৮ বরং বাস্তবতা হলো, সাত হরফের সবগুলোই অবিকল আমাদের নিকট বিদ্যমান রয়েছে এবং মাশহুর কেরাতের মধ্যে সংরক্ষিত রয়েছে।’১৫৯
মুয়াত্ত্বা ইমাম মালেকে’র বিখ্যাত ভাষ্যকার, আল্লামা আবুল ওলীদ বাজি মালেকী (রহ.) “সাত হরফ”-এর ব্যাখ্যা “সাত কেরাত” দ্বারা করার পর লিখেন-
فَإِنْ قِيلَ هَلْ يَقُولُونَ إِنَّ جَمِيعَ هَذِهِ السَّبْعَةِ الْأَحْرُفِ ثَابِتَةٌ فِي الْمُصْحَفِ فَإِنَّ الْقِرَاءَةَ بِجَمِيعِهَا جَائِزَةٌ قِيلَ لَهُمْ كَذَلِكَ نَقُولُ وَالدَّلِيلُ عَلَى صِحَّةِ ذَلِكَ قَوْلُهُ عَزَّ وَجَلَّ إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ وَلَا يَصِحُّ انْفِصَالُ الذِّكْرِ الْمُنَزَّلِ مِنْ قِرَاءَتِهِ فَيُمْكِنُ حِفْظُهُ دُونَهَا وَمِمَّا يَدُلُّ عَلَى صِحَّةِ مَا ذَهَبْنَا إِلَيْهِ أَنَّ ظَاهِرَ قَوْلِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم يَدُلُّ عَلَى أَنَّ الْقُرْآنَ أُنْزِلَ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ تَيْسِيرًا عَلَى مَنْ أَرَادَ قِرَاءَتَهُ لِيَقْرَأَ كُلُّ رَجُلٍ مِنْهُمْ بِمَا تَيَسَّرَ عَلَيْهِ وَبِمَا هُوَ أَخَفُّ عَلَى طَبْعِهِ وَأَقْرَبُ إِلَى لُغَتِهِ لِمَا يَلْحَقُ مِنَ الْمَشَقَّةِ بِذَلِكَ الْمَأْلُوفِ مِنَ الْعَادَةِ فِي النُّطْقِ وَنَحْنُ الْيَوْمَ مَعَ عُجْمَةِ أَلْسِنَتِنَا وَبُعْدِنَا عَنْ فَصَاحَةِ الْعَرَبِ أَحْوَجُ
‘যদি প্রশ্ন করা হয় যে, “আপনাদের বক্তব্য কি এ রকম যে, এই সাত হরফ কি আজও মাসহাফে বিদ্যমান আছে? তাইতো আপনাদের মত অনুযায়ী সবগুলোর কেরাত জায়েয।” তখন আমরা বলব, হ্যাঁ আমাদের বক্তব্য এটাই। আর এটা বিশুদ্ধ হওয়ার দলীল হলো, আল্লাহ তাআলার বাণী إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ [নিশ্চয় আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক]। আর কুরআনুল কারীমকে তার কেরাত থেকে এভাবে পৃথক করা যাবে না যে, কুরআন তো সংরক্ষিত রয়েছে আর তার কেরাত বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
আমাদের বক্তব্যের বিশুদ্ধতার স্বপক্ষে আরো একটি দলীল হলো এই যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ বহন করে যে, কুরআনকে সাত হরফের উপর নাযিল করা হয়েছে, যাতে তেলাওয়াতকারীর জন্য সহজ হয় যে, প্রত্যেক ব্যক্তি ওই পদ্ধতিতে তেলাওয়াত করতে পারে যে পদ্ধতি তার জন্য সহজ হয়। তার স্বভাব-রুচির দিক থেকে অধিক সহজ হয় এবং ভাষার দিক থেকে অধিক নিকটবর্তী হয়। কেননা, কথোপকথনের মধ্যে যা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায় তা পরিত্যাগ করা খুবই কঠিন। বর্তমান যুগে আমরা অনারবী এবং আরবী ভাষার পাণ্ডিত্য থেকে দূরে থাকার কারণে এ সহজতার প্রতি আমরা অধিক মুখাপেক্ষী।১৬০
ইমাম গাযালী (রহ.) স্বীয় উসূলে ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ “আল-মুসতাসফা”-এ কুরআনুল কারীমের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লিখেন-
مَا نُقِلَ إِلَيْنَا بَيْنَ دَفَّتَي الْمُصْحَفِ عَلَى الْأَحْرُفِ السَّبْعَةِ الْمَشْهُورَةِ نَقْلًا مُتَوَاتِرًا.
‘মাসহাফের পার্শ্বদ্বয়ের মাঝখানে সুপ্রসিদ্ধ সাত হরফের উপর ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় যা আমাদের পর্যন্ত বর্ণিত হয়ে এসেছে [তাই কুরআন]।’১৬১
এর দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, ইমাম গাযালী (রহ.)ও আজ পর্যন্ত সাত হরফ বাকি থাকার প্রবক্তা।
আর মোল্লা আলী কারী (রহ.) লিখেন-
وَكَأَنَّهُ – عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ – كُشِفَ لَهُ أَنَّ الْقِرَاءَةَ الْمُتَوَاتِرَةَ تَسْتَقِرُّ فِي أُمَّتِهِ عَلَى سَبْعٍ، وَهِيَ الْمَوْجُودَةُ الْآنَ الْمُتَّفَقُ عَلَى تَوَاتُرِهَا، وَالْجُمْهُورُ عَلَى أَنَّ مَا فَوْقَهَا شَاذٌّ لَا يَحِلُّ الْقِرَاءَةُ بِهِ
‘মনে হয় যেন হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর বিষয়টা উন্মোচিত হয়ে গিয়েছিল যে, তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় বর্ণিত কেরাতগুলো শেষ পর্যন্ত তাঁর উম্মতের মাঝে সাত হরফের উপরই বাকি থেকে যাবে। আর তাইতো আজ এগুলোই বিদ্যমান আছে এবং সবাই এগুলোর তাওয়াতুরের ব্যাপারে একমত। জমহুর উলামায়ে কেরামের মত হলো, এগুলো ব্যতীত আর যত কেরাত আছে তা [প্রায়] শায বা অপ্রচলিত এবং সেগুলোর তেলাওয়াত জায়েয নেই।’১৬২
এতে মোল্লা আলী কারী (রহ.)-এর এ কথাটি যদিও সঠিক নয় যে, ‘সাত কেরাত ব্যতীত বাকি অন্য সব কেরাত শায বা অপ্রচলিত।’ কারণ ইলমে কেরাত বিশেষজ্ঞগণ কঠোরভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।১৬৩ কিন্তু এর দ্বারা এটা নিশ্চিত জানা যায় যে, তাঁর মত অনুযায়ী সাত হরফ আজও বাকি আছে। হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)-এর বক্তব্য পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি “সাত হরফ”-এর মাঝে ‘সাত’ সংখ্যাটি আধিক্যের অর্থে প্রয়োগ করেন। এর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন-
“হাদীসের মধ্যে ‘সাত’ শব্দটি সংখ্যাধিক্যের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। নির্দিষ্ট সংখ্যা বুঝানোর জন্য নয়। ‘দশ’ কেরাতের উপর আইম্মায়ে কেরাম ঐক্যমত পোষণ করেছেন এবং দশ কেরাতের প্রত্যেকটির জন্য দু’জন করে বর্ণনাকারী রয়েছেন। একজন অপর জনের সাথে মতবিরোধ করেন। ফলে কেরাতের সংখ্যা বিশ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায়।”১৬৪
এই উক্তিতে যদিও শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) জমহুর উলামায়ে কেরামের সাথে মতবিরোধ করে “সাত” সংখ্যাটিকে সংখ্যাধিক্যের জন্য সাব্যস্ত করেছেন। [হয়তো বিশটি কেরাতকে কেরাতের বিভিন্নতার সাত প্রকারে সীমাবদ্ধ করার বিষয়টি তাঁর কাছে সুস্পষ্ট হয়নি] কিন্তু এর দ্বারা এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ হয়ে পড়ে যে, হাদীসে যে হরফগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে শাহ সাহেবের নিকট সেগুলো কেরাতই এবং সেগুলো রহিত বা বা পরিত্যক্ত হয়নি; বরং আজও বিদ্যমান রয়েছে।
শেষ জামানায় দীনি জ্ঞানের ইমাম, যুগশ্রেষ্ঠ মুহাক্কিক এবং হাফেযে হাদীস আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) এই হাদীসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সংক্ষিপ্ত ভাষায় মাসআলাটির স্বরূপ এমনভাবে উন্মোচন করেছেন যে, এটাকে শেষ হরফ বলা উচিত। এখানে আমরা তাঁর পুরো তাহকীক ও গবেষণাটি হুবহু উল্লেখ করছি-
واعلم انهم اتفقوا على انه ليس المراد من سبعة احرف القراة السبعة المشهورة بان يكون كل حرف منها قراءة من تلك القراءات، اعنى انه لا انطباق بين القراءات السبع والاحرف السبعة كما يذهب اليه الوهم بالنظر الى لفظ السبعة فى الموضعين، بل بين ذلك الاحرف والقراءة عموم وخصوص وجهى، كيف، وان القراءات لاتنحصر فى السبعة، كما صرح ابن الجوزى فى رسالة النشر فى قراءة العشر، وانما اشتهرت السبعة على الالسنة لانها التى جمعها الشاطبي ثم اعلم ان بعضهم فهم ان بين تلك الاحرف تغايرا من كل وجه، بحيث لارباط بينها وليس كذلك، بل قد يكون الفرق بالمجرد والمزيد واخرى الابواب، ومرة باعتبار الصيغ من الغائب والحاضر، وطورا بتحقيق الهمزة وتسهيلها فكل هذه التغييرات يسيرة كانت او كثيرة حرف براسه، وغلط من فهم ان هذه الاحرف متغايرة كلها بحيث يتعذر اجتماعها اما انه كيف عدد السبعة فتوجه اليه ابن الجوزى وحقق ان التصرفات كلها ترجع الى السبعة و راجع القسطلاني والزرقاني، بقى الكلام فى ان تلك الاحرف كلها موجودة او رفع بعضها وبقى البعض فاعلم ان ماقرأة جبرئيل عليه السلام فى العرضة الاخيرة على النبي صلى الله عليه وسلم كله ثابت فى مصحف عثمان، ولما يتعين معنى الاحرف عند ابن جرير ذهب الى رفع الاحرف الست منها وبقى واحد فقط.
‘জেনে রাখুন, সমস্ত উলামায়ে কেরাম এ কথার উপর একমত যে, সাত হরফ দ্বারা প্রসিদ্ধ সাত কেরাত উদ্দেশ্য নয় এবং এমনও নয় যে, প্রত্যেক হরফ ওই সাত কেরাতের মধ্য হতে একটি কেরাত। ফলকথা, সাত কেরাত ও সাত হরফ এক কথা নয়। যা প্রথম দৃষ্টিতে সাত হরফ দ্বারা এমন ধারণা জন্ম নেয়। বরং সাত হরফ ও সাত কেরাতের মাঝে উম্মুম-খুসূস মিন ওয়াজহিন১৬৫-এর সম্পর্ক। আর কেরাত যখন সাত সংখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় তখন উভয়টা এক হতে পারে কি করে? যেমন, আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.) “আন-নশরু ফী কিরাআতিল আশর” কিতাবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। তবে “সাত কেরাত” শব্দটি মানুষের মুখে মুখে প্রসিদ্ধি লাভ করার কারণ হলো, আল্লামা শাত্বীবী (রহ.) এই সাত প্রকার কেরাতকে গ্রন্থনা করেছেন। অতঃপর এ কথাটাও মনে রাখবেন যে, কোনো কোনো লোক মনে করে যে, সাত হরফের মাঝে পরস্পর সম্পূর্ণ “বিপরীতমুখী” সম্পর্ক, যে একটির সাথে অপরটির কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ বাস্তবতা এমন নয়। বরং কখনো কখনো দুই হরফের মাঝে একবচন ও বহুবচনের মধ্যে পার্থক্য হয়ে থাকে। আবার কখনো ব্যাকরণগত বিষয়ে। আবার কখনো গায়েব [নাম পুরুষ] ও হাযের [মধ্যম পুরুষ]-এর শব্দের পার্থক্য হয়ে থাকে। কখনো শুধু হামযাকে বাকি রাখার ও সেটাকে তাসীল করার পার্থক্য হয়। ব্যাস, এ সকল পরিবর্তন চাই সাধারণ হোক কিংবা বড় বড়, সবই স্বতন্ত্র একটি হরফ। আর যারা এ কথা মনে করেন যে, এ হরফগুলোর মাঝে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী সম্পর্ক এবং এগুলোকে এক শব্দে একত্রিত করা সম্ভব নয়, তারা ভুল করেছেন। বাকি থাকল এ কথা যে, হাদীসে “সাত” সংখ্যাটি দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে? আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর উত্তর দিয়েছেন। তিনি তাহকীক বর্ণনা করেছেন যে, এ সমস্ত পরিবর্তন-পরিবর্ধন সাত প্রকার। এ মাসআলায় ‘কাসতালানী’ (রহ.) ও ‘যুরকানী’ (রহ.)-[এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ] দেখে নিন।
এখন বাকি থাকল শুধু এ কথা যে, এ সকল হরফ এখন আছে নাকি কিছু হরফ বিলুপ্ত করা হয়েছে আর কিছু হরফ অবশিষ্ট আছে? সুতরাং এটা জেনে নিন যে, হযরত জিবরাঈল (আ.) কুরআনুল কারীমের আরযায়ে আখীরার সময় যতগুলো হরফ পাঠ করেছিলেন, তার সবগুলোই মাসহাফে উসমানীতে বিদ্যমান রয়েছে। যেহেতু ইবনে জারীর (রহ.)-এর নিকট হরফের অর্থ সুস্পষ্ট নয় তাই তিনি এ মাযহাব গ্রহণ করেছেন যে, ছয় হরফকে বিলুপ্ত করা হয়েছে আর এক হরফ অবশিষ্ট রয়েছে।১৬৬
অনুরূপভাবে মিসরের পরবর্তী উলামায়ে কেরামের মাঝে সুপ্রসিদ্ধ গবেষক আল্লামা যাহেদ কাউসারী (রহ.) [মৃত্যু ১৩৭১ হিজরী] লিখেন-
والاول رأى القائلين بان الاحرف السبعة كانت في مبدأ الامر ثم نسخت العرضة الاخيرة في عهد النبي صلى الله عليه وسلم فلم يبق الا حرف واحد و رأى القائلين بان عثمان رضى الله عنه جمع الناس على حرف واحد ومنع من الستة الباقية لمصلحة، واليه نحا ابن جرير وتهيبه ناس فتابعوه لكن هذا رأى خطير قام ابن حزم باشد النكير عليه في الفصل وفي الاحكام وله الحق في ذلك، والثاني رأى القائلين بان هي الاحرف السبعة المحفوظة كما هي في العرضة الاخيرة. الخ..
‘প্রথম মতটি [বর্তমান কেরাত এক হরফেরই বিভিন্ন রূপ] সেসব মনীষীর, যারা বলেন-সাত হরফ ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল। অতঃপর আরযায়ে আখীরার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগেই তা রহিত হয়ে গেছে। বর্তমানে শুধু একটিই অবশিষ্ট রয়েছে। এই মতটি সেসব ব্যক্তিদেরও যারা বলেন, হযরত উসমান (রা.) সমস্ত মানুষকে এক হরফের উপর একত্রিত করেছিলেন এবং বিশেষ কল্যাণার্থে বাকি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করেছিলেন। হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর মতও এটাই এবং এ ক্ষেত্রে বহু লোক তাঁর কথায় প্রভাবিত হয়ে তাঁর পিছু ধরেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা খুবই স্পর্শকাতর ও বিপজ্জনক রায়। আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.) “আল-ফছ্ল” এবং “আল-আহকাম”-এ এর কড়া বিরোধিতা করেছেন, যা তাঁর অধিকার ছিল। দ্বিতীয় মত হচ্ছে [বর্তমান কেরাতই সাত হরফ] সেসব ব্যক্তিদের, যারা বলেন-এগুলোই সেই সাত হরফ আরযায়ে আখীরা থেকে যা সংরক্ষিত হয়ে আসছে।১৬৭
আমরা উপরোল্লিখিত এ বক্তব্য ও মতামতগুলো বিস্তারিতভাবে এ জন্য পেশ করলাম যে, বর্তমান যুগে আল্লামা ইবনে জারীর তবারী (রহ.)-এর বক্তব্যটি অধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। আর আল্লামা ইবনে জারীর (রহ.)-এর সুমহান ব্যক্তিত্বের দিকে তাকিয়ে তাঁকে সাধারণত সব ধরনের সন্দেহ ও সংশয়ের ঊর্ধ্বে মনে করা হয়। এর ভিত্তিতেই আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর এ পরিচ্ছন্ন ও সুস্পষ্ট বক্তব্যটি হয়তো মানুষ জানে না অথবা জানা থাকলেও সেটাকে একটা দুর্বল মত বলে মনে করা হয়। অথচ পূর্বোক্ত আলোচনার আলোকে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইমাম মালেক (রহ.), আল্লামা ইবনে কুতাইবা (রহ.), আল্লামা আবুল ফযল রাজী (রহ.), কাযী আবু বকর ইবনে তাইয়্যেব (রহ.), ইমাম আবুল হাসান আশআরী (রহ.), কাযী ইয়ায (রহ.), আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.), আল্লামা আবুল ওলীদ বাজী (রহ.), ইমাম গাযালী (রহ.) ও মোল্লা আলী কারী (রহ.)-এর ন্যায় উলামায়ে কেরাম এ কথার উপর ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, সাত হরফের সবগুলো আজও সংরক্ষিত ও বিদ্যমান রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আরযায়ে আখীরার সময় যতগুলো হরফ বাকি ছিল, তার মধ্য হতে কোনো হরফ না রহিত হয়েছে আর না পরিত্যক্ত হয়েছে। বরং মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.) নিজের এ বক্তব্যকে নিজের পূর্বে জমহুর উলামায়ে কেরামের রায় বলেও সাব্যস্ত করেছেন।
পরবর্তী উলামায়ে কেরামের মাঝে হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ (রহ.), হযরত আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) এবং আল্লামা যাহেদ কাউসারী (রহ.)-এর বক্তব্যও এটাই। অনুরূপভাবে মিসরের প্রসিদ্ধ উলামায়ে কেরাম আল্লামা নাযীত মুতীয়ী (রহ.), আল্লামা খাজারী দিম্ইয়াাতী (রহ.) ও শায়েখ আবদুল আযীম যুরকানী (রহ.)ও এ বক্তব্যকে গ্রহণ করেছেন।১৬৮ অতএব, প্রমাণপঞ্জির দিকে না তাকিয়ে শুধু ব্যক্তিত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও এটা অত্যন্ত উঁচু মানের একটা বক্তব্য।
এ বক্তব্যের দলীলসমূহ
এখন সে সকল দলীল উপস্থাপন করছি, যেগুলো দ্বারা এ বক্তব্যটি শক্তিশালী হয়। এর কিছু দলীল তো উপরোক্ত বক্তব্যগুলোতে এসে গেছে।
অতিরিক্ত কিছু দলীল নিম্নে পেশ করা হলো :
১. কুরআনুল কারীমের আয়াত- إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ [নিশ্চয় আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক] সুস্পষ্টভাবে এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, কুরআনের যে সকল আয়াত স্বয়ং আল্লাহ তাআলা রহিত করেননি সেগুলো কেয়ামত পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে। অপর দিকে সে সকল হাদীস পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলো দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, কুরআনের সাত হরফ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে নাযিলকৃত ছিল। তাই উল্লিখিত আয়াতের সুস্পষ্ট দাবী হলো, ওই সাত হরফ কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকা।
২. হযরত উসমান (রা.) যদি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে শুধু এক হরফ দ্বারা কুরআন প্রস্তুত করে থাকেন, তাহলে স্পষ্ট করে কোথাও তার কোনো প্রমাণ অবশ্যই পাওয়া যাওয়া উচিত ছিল। অথচ এর কোনো প্রমাণ তো পাওয়া যায়ই না; বরং রেওয়ায়েতসমূহ থেকে জানা যায় যে, মাসহাফে উসমানীর মাঝে সাত হরফের সবগুলোই বিদ্যমান ছিল। যেমন, রেওয়ায়েতে সুস্পষ্টভাবে এ কথা উল্লেখ আছে যে, হযরত উসমান (রা.) স্বীয় মাসহাফ হযরত আবু বকর (রা.) কর্তৃক সংকলিত মাসহাফের অনুকরণে লিপিবদ্ধ করেছিলেন এবং লিপিবদ্ধ করার উভয় কপিকে মিলানোও হয়েছিল। এ ব্যাপারে হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.) বলেন-
فعرضت المصحف عليها فلم يختلفا في شيئ
“আমি ওই সহীফাগুলো দ্বারা মাসহাফকে মিলিয়ে দেখেছি, উভয়ের মধ্যে কোনো ধরনের পার্থক্য [বেশ-কম] ছিল না।’১৬৯
এ কথা সুস্পষ্ট যে, হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)ও স্বীকার করেন যে, হযরত আবু বকর (রা.)-এর জামানায় সাত হরফের সবগুলোই বিদ্যমান ছিল। তাই হযরত আবু বকর (রা.)-এর সহীফাগুলোতে নিশ্চিতভাবে কুরআনুল কারীমকে সাত হরফে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কাজেই হযরত উসমান (রা.) যদি ছয় হরফকে বিলুপ্তই করে দিয়ে থাকেন তাহলে হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)- এর এ কথা কিভাবে সঠিক হতে পারে যে, “উভয়ের মাঝে কোনো পার্থক্য বা কম-বেশি ছিল না।”?
৩. আল্লামা ইবনুল আম্বারী (রহ.) “কিতাবুল মাসাহিফ”-এ প্রসিদ্ধ তাবেঈ হযরত উবায়দা সালমানী (রহ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করেন-
قراءتنا التي جمع الناس عثمان عليها هي العرضة الأخيرة
‘আমাদের ওই কেরাত, যার উপর হযরত উসমান রা.) মানুষকে একত্রিত করেছেন, সেটা ছিল “আরযায়ে আখীরা”-এর কেরাত।’১৭০
হযরত উবায়দা (রা.)-এর এ বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে যে, আরযায়ে আখীরা [হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কুরআনের শেষ দাওর]-এর সময় যে হরফগুলো বাকি ছিল, হযরত উসমান (রা.) ওই হরফের কোনোটিই ছাড়েননি।
এ ক্ষেত্রে কোনো কোনো আলেম বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আরযায়ে আখীরা তো শুধু এক কুরাইশী হরফের উপরই হয়েছিল। আর এটার উপরই হযরত উসমান (রা.) সাবাইকে একত্রিত করেছিলেন। কিন্তু এ কথা খুবই দূরবর্তী যে, যে হরফগুলো রহিত হয়েছিল না, সেগুলো এই দাওর [আরযায়ে আখীরা] থেকে বাদ পড়ে যাবে।
৪. প্রসিদ্ধ তাবেঈ হযরত মুহাম্মদ ইবনে সিরীন (রহ.) থেকে আল্লামা ইবনে সা’দ (রহ.) এ বক্তব্য উদ্ধৃত করেন-
كان جبريل يعرض القرآن على النبي صلى الله عليه وسلم كل عام مرة في رمضان فلما كان العام الذي توفي فيه عرضه عليه مرتين قال محمد فأنا أرجو أن تكون قراءتنا العرضة الأخيرة
‘হযরত জিবরাঈল (আ.) প্রতি বছর একবার রমযান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে কুরআন উপস্থাপন করতেন। যখন তাঁর ইন্তেকালের বছর আসল তখন হযরত জিবরাঈল (আ.) দু’বার কুরআন উপস্থাপন করেছেন। [মুহাম্মাদ ইবনে সিরীন (রহ.) বলেন,] আমি আশাবাদী যে, আমাদের বর্তমান কেরাত ওই আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী।’১৭১
৫. হযরত আমের শা’বী (রহ.) ছিলেন প্রসিদ্ধ একজন তাবেঈ। যিনি সাতশত সাহাবায়ে কেরাম থেকে ইলমী ফায়দা অর্জন করেছেন। আল্লামা ইবনুল জাযারী (রহ.) তাঁর থেকেও এ ধরনের বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন।
উল্লিখিত ব্যক্তিদ্বয় ছিলেন তাবেঈ এবং হযরত উসমান (রা.)-এর যুগের অত্যন্ত নিকটবর্তী ব্যক্তিত্ব। তাই এ ক্ষেত্রে তাঁদের বক্তব্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মর্যাদা রাখে।
৬. সমগ্র হাদীসের ভাণ্ডারে আমরা কোনো একটি রেওয়ায়েতেও এমন পাইনি, যা দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে দু’ধরনের মতানৈক্য ছিল। এক. সাত হরফের মতানৈক্য। দুই. কেরাতের মতানৈক্য। এর পরিবর্তে বহু রেওয়ায়েত দ্বারা এ কথা জানা যায় যে, উভয়টি অভিন্ন বিষয়। কেননা, একই ধরনের মতানৈক্যের উপর একই সময়ে “কেরাতের মতানৈক্য” ও “হরফের মতানৈক্য” শব্দ দু’টি প্রয়োগ করা হয়েছে। যেমন হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) বলেন-
عَنْ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ، قَالَ: كُنْتُ فِي الْمَسْجِدِ، فَدَخَلَ رَجُلٌ يُصَلِّي، فَقَرَأَ قِرَاءَةً أَنْكَرْتُهَا عَلَيْهِ، ثُمَّ دَخَلَ آخَرُ فَقَرَأَ قِرَاءَةً سِوَى قِرَاءَةِ صَاحِبِهِ، فَلَمَّا قَضَيْنَا الصَّلَاةَ دَخَلْنَا جَمِيعًا عَلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقُلْتُ: إِنَّ هَذَا قَرَأَ قِرَاءَةً أَنْكَرْتُهَا عَلَيْهِ، وَدَخَلَ آخَرُ فَقَرَأَ سِوَى قِرَاءَةِ صَاحِبِهِ، فَأَمَرَهُمَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَرَآ، فَحَسَّنَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَأْنَهُمَا، فَسَقَطَ فِي نَفْسِي مِنَ التَّكْذِيبِ، وَلَا إِذْ كُنْتُ فِي الْجَاهِلِيَّةِ، فَلَمَّا رَأَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا قَدْ غَشِيَنِي، ضَرَبَ فِي صَدْرِي، فَفَضْتُ عَرَقًا وَكَأَنَّمَا أَنْظُرُ إِلَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ فَرَقًا، فَقَالَ لِي: ” يَا أُبَيُّ أُرْسِلَ إِلَيَّ أَنِ اقْرَأِ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفٍ، فَرَدَدْتُ إِلَيْهِ أَنْ هَوِّنْ عَلَى أُمَّتِي، فَرَدَّ إِلَيَّ الثَّانِيَةَ أَقْرَأْهُ عَلَى حَرْفَيْنِ، فَرَدَدْتُ إِلَيْهِ أَنْ هَوِّنْ عَلَى أُمَّتِي، فَرَدَّ إِلَيَّ الثَّالِثَةَ اقْرَأْهُ عَلَى سَبْعَةِ أَحْرُفٍ
‘আমি মসজিদে ছিলাম। একব্যক্তি প্রবেশ করে নামায আদায় করতে লাগল। সে এমন এক কেরাত পাঠ করল যা আমার কাছে অপরিচিত বলে মনে হলো। অতঃপর অপর এক ব্যক্তি এসে মসজিদে প্রবেশ করল। সে প্রথম ব্যক্তির কেরাত ব্যতীত অন্য এক ধরনের কেরাত পাঠ করল। আমরা যখন নামায সমাপ্ত করলাম তখন সবাই মিলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-নিকট উপস্থিত হলাম। আমি আরয করলাম যে, এ ব্যক্তি এমন এক কেরাত পাঠ করেছে যা আমার কাছে অপরিচিত বলে মনে হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় আরেক ব্যক্তি এসে প্রথম ব্যক্তির কেরাতের চেয়ে ভিন্ন আরেক ধরনের কেরাত পাঠ করল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উভয়কে পড়ার নির্দেশ দিলেন। তারা উভয়ে পাঠ করার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উভয়ের কেরাতকে সুন্দর হয়েছে বলে মন্তব্য করলেন। এতে আমার অন্তরে মিথ্যাচারিতার এমন এমন ওয়াসওয়াসা আসতে লাগল, জাহেলী যুগেও যা আমার খেয়ালে আসত না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আমার এ অবস্থা দেখলেন তখন তিনি আমার বক্ষে [আলতো] আঘাত করলেন। এতে আমি ঘামে স্নাত হয়ে গেলাম এবং ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় আমি এমন অনুভব করলাম, আমি যেন আল্লাহকে দেখছি। এরপর তিনি আমাকে বললেন, হে উবাই! আমার পালনকর্তা আমার নিকট পয়গাম পাঠিয়েছেন যে, আমি কুরআনকে এক হরফে পাঠ করব। প্রতি উত্তরে আমি আবেদন করলাম, আমার উম্মতের জন্য সহজ করুন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা দ্বিতীয় বারের জন্য পয়গাম পাঠালেন যে, আমি কুরআনকে দুই হরফের উপর পাঠ করব। এর উত্তরেও আমি আবেদন করলাম, আমার উম্মতের জন্য সহজ করুন। তখন আল্লাহ তাআলা তৃতীয়বার পয়গাম পাঠালেন যে, আমি যেন এটাকে সাত হরফের উপর পাঠ করি।’১৭২
এক রেওয়ায়েতে হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) উভয় ব্যক্তির তেলাওয়াতের মতানৈক্যকে বার বার কেরাতের মতানৈক্য বলে উল্লেখ করেছেন। আর এটাকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাত হরফের মতানৈক্য বলে উল্লেখ করেছেন। এর দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, নববী যুগে কেরাতের মতানৈক্য ও হরফের মতানৈক্যকে এক ও অভিন্ন বিষয় বুঝা হতো। উপরন্তু এর বিপরীত এমন কোনো দলীল-প্রমাণ নেই, যা উভয়টার পৃথক হবার প্রমাণ বহন করে। এর দ্বারা প্রমাণ হয় যে, উভয়টা এক ও অভিন্ন বিষয়। আর কেরাত যখন সংরক্ষিত হওয়ার বিষয়টি তাওয়াতুর ও ইজমা দ্বারা প্রমাণিত, তখন এর দ্বারা বুঝা যায় যে, সাত হরফও আজও সংরক্ষিত।
উপরোল্লিখিত দলীল-প্রমাণগুলোর আলোকে এ কথা একেবারে সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, আরযায়ে আখীরার সময় সাত হরফের যে অংশ বাকি ছিল, তার সম্পূর্ণটাই মাসহাফে উসমানীতে সংরক্ষণ করা হয়েছিল এবং আজ পর্যন্ত তা সংরক্ষিত হয়েই চলে আসছে। এটাকে কেউ রহিত করেনি এবং এর কেরাতকে নিষিদ্ধও করা হয়নি। তবে এটাকে পরিপূর্ণরূপে স্পষ্ট করার জন্য এর উপর আরোপিত সম্ভাব্য প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া আবশ্যক।
এ বক্তব্যের উপর আরোপিত প্রশ্নগুলো ও তার জবাব
প্রশ্ন : ১. যদি হযরত উসমান (রা.) সাত হরফের সবগুলোকেই অবশিষ্ট রাখেন, তাহলে তাঁর সেই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কীর্তি কোন্টি ছিল যার জন্য তাঁকে “জামিউল কুরআন” বা কুরআনের সংকলক বলা হয়?
জবাব : যদিও অসংখ্য সাহাবায়ে কেরামের কুরআনুল কারীম মুখস্থ ছিল, কিন্তু হযরত উসমান (রা.)-এর যুগ পর্যন্ত কুরআনুল কারীমের মানদণ্ডমূলক কপি ছিল একটিই, যা হযরত আবু বকর (রা.) সংকলন করেছিলেন। তা আবার মাসহাফের আকৃতিতে ছিল না। বরং প্রত্যেকটি সূরা পৃথক পৃথক সহীফায় লিপিবদ্ধ ছিল। কিন্তু কোনো কোনো সাহাবী ব্যক্তিগতভাবে নিজ নিজ সহীফা পৃথক পৃথকভাবে প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। এগুলোতে না ছিল রসমেখতের মধ্যে কোনো মিল, সূরাগুলোর বিন্যাসের মধ্যে কোনো মিল আর না ছিল সাত হরফের মধ্যে কোনো সমন্বয়। বরং প্রত্যেকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যে হরফ অনুযায়ী কুরআন শিখেছিলেন, সেটাকেই নিজের মতো করে লিখে নিয়েছিলেন। তাই কোনো মাসহাফে একটি আয়াত এক হরফ অনুযায়ী লিখা হয়েছিল, পক্ষান্তরে অপর মাসহাফে অন্য কোনো হরফ অনুযায়ী লিখা হয়েছিল। যতক্ষণ পর্যন্ত নববী যুগ নিকটবর্তী ছিল এবং মুসলমানদের সম্পর্ক ইসলামের মারকায বা পবিত্র মদীনার সাথে মজবুত সম্পর্ক ছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত মাসহাফসমূহের এই মতানৈক্যের কারণে উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষতি এ জন্য সাধিত হয়নি যে, কুরআনুল কারীমের সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আসল ভিত্তিটা মাসহাফের পরিবর্তে মুখস্থ শক্তির উপর ছিল। আর অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরামই এ ব্যাপারে ওয়াকিফহাল ছিলেন যে, কুরআনুল কারীম সাত হরফে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু যখন ইসলাম দূর-দূরান্তের রাষ্ট্রসমূহে ছড়িয়ে পড়ল এবং নতুন নতুন লোক মুসলমান হতে লাগল তখন তারা শুধু একটি পদ্ধতিতেই কুরআন শিখল। আর এ কথাটির প্রচার তাদের মাঝে ব্যাপকতা লাভ করেনি যে, কুরআন সাত হরফে নাযিল হয়েছে। তাদের মাঝে মতানৈক্য সৃষ্টি হতে লাগল। কোনো কোনো ব্যক্তি নিজের কেরাতকে সঠিক এবং অন্যের কেরাতকে ভুল মনে করতে লাগল। ওদিকে যেহেতু ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত মাসহাফগুলোও হরফ ও রুসমেখতের দিক থেকে বিভিন্ন ধরনের ছিল এবং সেগুলোতে সাত হরফকে একত্রিত করার কোনো ব্যবস্থাও ছিল না। এ কারণে এমন কোনো মানদণ্ডমূলক কপিও বিদ্যমান ছিল না, যার মাধ্যমে সেসব মতানৈক্যের নিরসন করা যায়।
এমতাবস্থায় হযরত উসমান (রা.) অনুভব করলেন যে, যদি এ অবস্থা চলতে থাকে এবং ব্যক্তিগত মাসহাফগুলো বিলুপ্ত করে কুরআনুল কারীমের মানদণ্ডমূলক একটি কপি ইসলামী বিশ্বে প্রেরণ না করা হয়, তাহলে বিরাট ফেতনা মাথা তুলে দাঁড়াবে। তাই তিনি নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করেন :
[এক.] কুরআনুল কারীমের সাতটি মানদণ্ডমূলক কপি প্রস্তুত করান এবং বিভিন্ন শহরে তা প্রেরণ করেন।
[দুই.] ওই মাসহাফগুলোর রুসমেখত [লিখন পদ্ধতি] এমনভাবে রাখেন যাতে সাত হরফের সবগুলো এতে সংকুলান হয়। যেমন, এ মাসহাফগুলো নুকতা ও হরকতশূন্য ছিল। এগুলোকে প্রত্যেক হরফের অনুকরণে পাঠ করা যেত।
[৩.] ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত সবগুলো মাসহাফ পুড়িয়ে দাফন করে দেন।
[৪.] ভবিষ্যতে যত মাসহাফ লিপিবদ্ধ করা হবে, তা যাতে ওই সাত হরফের অনুকরণে হয়, এ আইন বাধ্যতামূলক করে দেন।
[৫.] হযরত আবু বকর (রা.) কর্তৃক সংকলিত সহীফাগুলোতে পৃথক পৃথকভাবে বিভিন্ন সূরা লিপিবদ্ধ ছিল। হযরত উসমান (রা.) সূরাগুলোকে বিন্যাস করে একই মাসহাফের আকৃতি দান করেন।
হযরত উসমান (রা.)-এর সকল পদক্ষেপ দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল, যেন গোটা ইসলামী বিশ্বে রুসমেখত ও সূরাগুলোর বিন্যাসের দিক থেকে সবগুলো মাসহাফ এক রকম হয়ে যায়। আর এগুলোতে সাত হরফ এমনভাবে একত্রিত হয়ে যায় যে, পরবর্তীতে কোনো ব্যক্তির জন্য কোনো কেরাতকে অস্বীকার করার বা কোনো অশুদ্ধ কেরাতের উপর চর্চা করার অবকাশ বাকি না থাকে। কখনো যদি কোনো কেরাতের ব্যাপারে মতানৈক্য দেখা দেয় তাহলে মাসহাফের দিকে প্রত্যাবর্তন করে যাতে অতি সহজেই তা নিরসন করা যায়।
হযরত আলী (রা.)-এর একটি বক্তব্য দ্বারা এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়, যা ইমাম ইবনে আবী দাউদ (রহ.) কিতাবুল মাসাহিফ-এ বিশুদ্ধ সনদের মাধ্যমে উদ্ধৃত করেছেন-
قال علي بن أبي طالب رضي الله عنه لا تقولوا في عثمان إلا خيرا فوالله ما فعل الذي فعل في المصاحف إلا عن ملأ منا، فقال : ما تقولون في هذه القراءة ؟ فقد بلغني أن بعضهم يقول : إن قراءتي خير من قراءتك ، وهذا يكاد أن يكون كفرا ، قلنا : فما ترى ؟ قال : أرى أن نجمع الناس على مصحف واحد ، فلا تكون فرقة ، ولا يكون اختلاف ، قلنا : فنعم ما رأيت
‘হযরত আলী (রা.) বলেন, তোমরা হযরত উসমান (রা.)-এর ব্যাপারে ভালো ব্যতীত কোনো সমালোচনা করো না। আল্লাহর শপথ! তিনি মাসহাফের ব্যাপারে যা কিছু করেছেন, তা আমাদের সকলের উপস্থিতিতেই করেছেন। তিনি আমাদের নিকট পরামর্শ চেয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই কেরাতের ব্যাপারে তোমাদের রায় কি? কারণ আমি জানতে পেরেছি যে কোনো কোনো ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে বলছে যে, “আমার কেরাত তোমার কেরাতের চেয়ে উত্তম।” অথচ এটা এমন কথা যা কুফরীর নিকট পৌঁছে যায়। তখন আমরা বললাম, এ ক্ষেত্রে আপনার রায় কি? তিনি বললেন, আমার রায় হচ্ছে, আমরা মানুষকে একই মাসহাফের উপর সমবেত করে দেব। যাতে কোনো পার্থক্য ও মতানৈক্য বাকি না থাকে। আমরা বললাম, আপনি খুবই চমৎকার রায় প্রদান করেছেন।১৭৩
এই হাদীসটি হযরত উসমান (রা.)-এর মাসহাফ সংক্রান্ত কাজের ব্যাপারে সুস্পষ্ট একটি হাদীস। এতে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, হযরত উসমান (রা.) “نجمع الناس على مصحف واحد” [আমরা মানুষকে একই মাসহাফের উপর সমবেত করে দেব]” বলে এই ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন যে, আমরা এমন একটি মাসহাফ প্রস্তুত করতে চাই, যা গোটা ইসলামী বিশ্বের জন্য একই রকম হবে এবং এর মাধ্যমে পারস্পরিক মতানৈক্যের অবসান ঘটবে। এরপর কোনো বিশুদ্ধ কেরাতকে অস্বীকার করার এবং রহিত বলার বা অপ্রচলিত কেরাতের উপর চর্চা করার অবকাশ বাকি থাকবে না।১৭৪
অনুরূপ ইবনে আশতাহ (রহ.) হযরত আনাস (রা.) থেকে উদ্ধৃত করেন-
اختلفوا في القرآن على عهد عثمان حتى اقتتل الغلمان والمعلمون، فبلغ ذلك عثمان بن عفان فقال: عندي تكذبون به وتلحنون فيه، فمن نأى عني كان أشد تكذيباً وأكثر لحناً، يا أصحاب محمد اجتمعوا فاكتبوا للناس إماماً،
‘হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে কুরআনুল কারীমের ব্যাপারে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি শিশু ও শিক্ষকরা লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। হযরত উসমান (রা.)-এর নিকট এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি বললেন, তোমরা আমার কাছে থাকতেই [বিশুদ্ধ কেরাতকে] অস্বীকার করছ এবং তাতে ভুল করছ! তাহলে যারা আমার কাছ থেকে দূরে অবস্থান করছে, তারা তো আরো বেশি মিথ্যারোপ ও ভুল করতে থাকবে। সুতরাং হে মুহাম্মাদের সাথীবৃন্দ! তোমরা একত্রিত হও এবং মানুষের জন্য এমন একটি কপি প্রস্তুত কর, মানুষ যার অনুসরণ করতে পারে।
এর দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, কুরআনুল কারীমের কোনো হরফ বিলুপ্ত করা হযরত উসমান (রা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল না। বরং তাঁর তো এ ব্যাপারে আক্ষেপ ছিল যে, কোনো কোনো লোক বিশুদ্ধ কেরাতকে অস্বীকার করছে। আর কেউ কেউ অশুদ্ধ কেরাতের চর্চার উপর জোর দিচ্ছে। তাই তিনি মানদণ্ডমূলক একটি কপি প্রস্তুত করতে চাইতেন। যা গোটা ইসলামী জগতের জন্য এক ও অভিন্ন রকম হবে।১৭৫
প্রশ্ন : ২. কুরাইশী ভাষায় লিপিবদ্ধ করার উদ্দেশ্য :
সহীহ বুখারীর রেওয়ায়েত অনুযায়ী যখন হযরত উসমান (রা.) হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর নেতৃত্বে কুরআনের মাসহাফ বিন্যাস দেওয়ার জন্য সাহাবায়ে কেরামের একটি দল নির্বাচন করলেন, তখন তিনি তাঁদেরকে বলেছিলেন-
إِذَا اخْتَلَفْتُمْ أَنْتُمْ وَزَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ فِي شَيْءٍ مِنَ الْقُرْآنِ فَاكْتُبُوهُ بِلِسَانِ قُرَيْشٍ فَإِنَّمَا نَزَلَ بِلِسَانِهِمْ
‘যখন তোমাদের এবং যায়্যেদ ইবনে সাবেতের মাঝে কুরআনের কোনো অংশে মতানৈক্য হবে তখন তোমরা সেটাকে কুরাইশের ভাষা অনুযায়ী লিখবে। কেননা কুরআন তাঁদের ভাষায় নাযিল হয়েছে।’১৭৬
হযরত উসমান (রা.) যদি সাত হরফের সবগুলোই অবশিষ্ট রাখতেন তাহলে তাঁর এ নির্দেশের উদ্দেশ্য কী?
জবাব : এটি মূলত হযরত উসমান (রা.)-এর ওই বাক্য, যা দ্বারা হাফেয ইবনে জারীরসহ অন্যান্য উলামায়ে কেরাম বুঝে নিয়েছেন যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে মাসহাফে শুধু এক কুরাইশী হরফকে অবশিষ্ট রেখেছেন। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে যদি হযরত উসমান (রা.)-এর এ বাক্যটির উপর গভীরভাবে চিন্তা করা হয় তাহলে এ কথা বুঝে আসে যে, এ বাক্য দ্বারা এই উদ্দেশ্য নেওয়া সঠিক নয় যে, তিনি বাকি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন। বরং সবগুলো রেওয়ায়াতের প্রতি সামগ্রিকভাবে তাকালে বুঝে আসে যে, এ বাক্য দ্বারা হযরত উসমান (রা.)-এর উদ্দেশ্য ছিল এই যে, যদি কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে রুসমেখতের দিক থেকে কোনো মতানৈক্য সৃষ্টি হয় তাহলে যেন কুরাইশী ভাষার রুসমেখত গ্রহণ করা হয়। এর প্রমাণ হলো, হযরত উসমান (রা.)-এর নির্দেশনার পর সাহাবায়ে কেরামের দলটি যখন কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার কাজ শুরু করেন তখন সমগ্র কুরআনুল কারীমের শুধু একটি স্থানে তাঁদের মাঝে মতানৈক্য হয়। ইমাম যুহরী (রহ.) যার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-
فاختلفوا يومئذ في التابوت والتابوه فقال النفر القرشيون التابوت وقال زيد بن ثابت التابوه فرفع اختلافهم إلى عثمان فقال : اكتبوه التابوت فانه بلسان قريش نزل
‘অতঃপর “تابوت” এবং “تابوه” শব্দের মধ্যে এসে তাঁদের মাঝে মতানৈক্য সৃষ্টি হলো। কুরাইশী সাহাবায়ে কেরাম বললেন, এটাকে [দীর্ঘ তা] দ্বারা “تابوت” লিখা হোক। আর যায়্যেদ ইবনে সাবেত (রা.) বললেন, [গোল তা দ্বারা] “تابوه” লিখা হোক। পরে তাঁদের এই মতানৈক্য হযরত উসমান (রা.)-এর কাছে গিয়ে পৌঁছল। তখন তিনি বললেন “تابوت” লিখ। কেননা কুরআন কুরাইশী ভাষায় নাযিল হয়েছে।১৭৭
অতএব, এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, হযরত উসমান (রা.) হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত এবং কুরাইশী সাহাবায়ে কেরামের মাঝে যে মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করেছেন এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো রসমখত-এর মতানৈক্য; ভাষাগত মতানৈক্য নয়।
প্রশ্ন : ৩. সমার্থবোধক শব্দ দ্বারা তেলাওয়াতের মাসআলা :
হযরত আবু বাকরা (রা.) সাত হরফের মতানৈক্যের যে ব্যাখ্যা করেছেন, তা দেখে বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হয় যে, এই সাত হরফ মাসহাফে উসমানীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। কেননা তিনি বলেন-
أَنَّ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ قَالَ: يَا مُحَمَّدُ اقْرَأِ الْقُرْآنَ عَلَى حَرْفٍ، قَالَ مِيكَائِيلُ عَلَيْهِ السَّلَامُ: اسْتَزِدْهُ، فَاسْتَزَادَهُ حَتَّى بَلَغَ سَبْعَةَ أَحْرُفٍ، قَالَ: كُلٌّ شَافٍ كَافٍ مَا لَمْ تَخْلِطْ آيَةَ عَذَابٍ بِرَحْمَةٍ، أَوْ آيَةَ رَحْمَةٍ بِعَذَابٍ نَحْوُ قَوْلِكَ تَعَالَ وَأَقْبِلْ، وَهَلُمَّ وَاذْهَبْ، وَأَسْرِعْ وَأَعْجِلْ “
‘জিবরাঈল (আ.) [রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে] বললেন, হে মুহাম্মাদ! কুরআনুল কারীমকে এক হরফের উপর পাঠ করুন। মিকাঈল (আ.) [রাসূল স.কে] বললেন, এর সাথে আরও [হরফ] সংযোজন করুন। ফলে তিনি সংযোজন করলেন। আর এভাবে তা সাতে গিয়ে পৌঁছল। জিবরাঈল (আ.) বললেন, এর প্রতিটিই নিরাময়কারী, যথেষ্ট। যতক্ষণ না আযাবের আয়াতকে রহমতের আয়াতের সাথে এবং রহমতের আয়াতকে আযাবের আয়াতের সাথে মিশ্রিত করবে। এটা এমন হবে যে, আপনি تعال [আস]-কে هلم – اقبل – اذهب – اسرع و عجل শব্দ দ্বারা আদায় করবেন।’১৭৮
এই হাদীস থেকে বুঝে আসে যে, সাত হরফের মতানৈক্য মূলত সমার্থবোধক শব্দের মতানৈক্যই ছিল। অর্থাৎ এক হরফের ভিত্তিতে কোনো এক শব্দকে গ্রহণ করা হয়েছে। আবার অন্য হরফের ভিত্তিতে সে শব্দেরই সমার্থবোধক অন্য আরেকটি শব্দ গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ মাসহাফে উসমানীর মধ্যে যেসব কেরাত সংকলিত হয়েছে সেগুলোর মাঝে সমার্থবোধকের এই মতানৈক্য খুবই স্বল্প। ওই কেরাতগুলোর মাঝে অধিকাংশই হরকত [কারক চিহ্ন], সীগা [শব্দরূপ], পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ এবং সুর ও ভঙ্গিমার মতানৈক্য সংঘটিত হয়েছে।
জবাব : সাত হরফের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আমরা যে বক্তব্যটি গ্রহণ করেছি, এতে কেরাতগুলোর মাঝে সাত প্রকারের মতপার্থক্য বর্ণনা করা হয়েছে। ওই প্রকারগুলোর মাঝে একটি প্রকার হলো, ‘বদল’ তথা সমার্থবোধক শব্দের মাধ্যমে পরিবর্তন করে পড়ার মতানৈক্য। হযরত আবু বাকুরা (রা.) এখানে সাত হরফের পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করেননি। বরং এর একটি উদাহরণ দিয়েছেন মাত্র। তাই মতানৈক্যের একটি মাত্র প্রকার অর্থাৎ শব্দের পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন।
কেরাতের ভিন্নতার এই প্রকারটি অর্থাৎ শব্দের ভিন্নতা ইসলামের প্রাথমিক যুগে অনেক বেশি ছিল। যেহেতু গোটা আরববাসী কুরাইশী ভাষায় পুরোপুরি অভ্যস্ত ছিল না। তাই শুরুতে তাদেরকে এ সহজতা বেশি থেকে বেশি দেওয়া হয়েছিল যে, তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শ্রবণকৃত পরিবর্তনশীল শব্দগুচ্ছ থেকে যে কোনো একটি শব্দ দ্বারা তেলাওয়াত করবে। তাই শুরু শুরুতে অধিকতর এমন ছিল যে, এক কেরাতের মাঝে এক শব্দ এবং অন্য কেরাতের মাঝে এর সমার্থবোধক অন্য শব্দ রয়েছে। কিন্তু যখন মানুষ কুরআনের ভাষার সাথে পুরোপুরি পরিচিত হয়ে উঠল তখন কেরাতের ভিন্নতার এই প্রকারকে ধীরে ধীরে হ্রাস করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকালের পূর্বে রমযান মাসে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে দুইবার কুরআনুল কারীম দাওর করেন। ওই সময় অনেক শব্দ রহিত করা হয়েছে। আর এভাবে সমার্থবোধক শব্দগুলোর মতানৈক্যও হ্রাস পেয়ে গেল।
উসমান (রা.) নিজের মাসহাফে সে সকল সমার্থবোধক শব্দ সংকলন করেননি, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আরযায়ে আখীরার সময় রহিত হয়ে গিয়েছিল। কারণ সেগুলোর অবস্থান ছিল তেলাওয়াত রহিত হওয়া আয়াতসমূহের ন্যায়। অবশ্য কেরাতের যে মতানৈক্য আরযায়ে আখীরায় অবশিষ্ট ছিল, হযরত উসমান (রা.) সেগুলোকে হুবহু বহাল রেখেছেন। অতএব, হযরত আবু বাকুরা (রা.) হরফের ভিন্নতার যে প্রকারটিকে উল্লিখিত হাদীসে উদাহরণ স্বরূপ পেশ করেছেন, তা ওই প্রকারের অন্তর্ভুক্ত যার অধিকাংশ আরযায়ে আখীরার সময় রহিত হয়ে গিয়েছিল। এ জন্যই তা মাসহাফে উসমানীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি এবং বর্তমান কেরাতগুলোও সেগুলোকে শামিল করেনি।
উপরোল্লিখিত ফলাফলটি তিনটি ভূমিকা থেকে আহরিত হয় :
[এক.] আরযায়ে আখীরা [হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কুরআনের শেষ দাওর]-এর সময় কুরআনুল কারীমের বহু কেরাত রহিত করা হয়েছিল।
[দুই.] হযরত উসমান (রা.) মাসহাফে উসমানীকে আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী বিন্যস্ত করেছেন।
[তিন.] হযরত উসমান (রা.)-এর মাসহাফে সমার্থবোধক শব্দের ওই মতানৈক্য বিদ্যমান নেই যা হযরত আবু বাকরা (রা.) বর্ণনা করেছেন।
তৃতীয় ভূমিকাটি তো একেবারে স্পষ্ট। আর দ্বিতীয় ভূমিকার প্রমাণপঞ্জি আমরা ইতোপূর্বে বর্ণনা করে এসেছি। যার মধ্যে সর্বাধিক স্পষ্ট দলীল হচ্ছে হযরত উবায়দা সালমানী (রহ.)-এর এই ইরশাদ যে, “হযরত উসমান (রা.) আমাদেরকে যে কেরাতের উপর সমবেত করেছেন, তা ছিল আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী।১৭৯
এখন বাকি থেকে যায় প্রথম ভূমিকাটি। আর তা হলো, আরযায়ে আখীরার সময় অনেক কেরাত রহিত হয়ে গিয়েছিল। এর প্রমাণ হচ্ছে মুহাক্কিক ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর এই ইরশাদ-
ولا شك أن القرآن نسخ منه وغير فيه في العرضة الأخيرة فقد صح النص بذلك عن غير واحد من الصحابة وروينا بإسناد صحيح عن زر ابن حبيش قال قال لي ابن عباس أي القراءتين تقرأ؟ قلت الأخيرة قال فإن النبي صلى الله عليه وسلم كان يعرض القرآن على جبريل عليه السلام في كل عام مرة قال فعرض عليه القرآن في العام الذي قبض فيه النبي صلى الله عليه وسلم مرتين فشهد عبد الله يعني ابن مسعود ما نسخ منه وما بدل.
‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আরযায়ে আখীরার সময় কুরআনুল কারীম থেকে অনেক কিছু রহিত হয়ে গেছে এবং এতে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। কেননা একাধিক সাহাবী থেকে এর স্পষ্টতা উদ্ধৃত রয়েছে। আমাদের কাছে সহীহ সনদসূত্রে হযরত যর ইবনে হুবাইশ (রা.)-এর এ বক্তব্য পৌঁছেছে যে, ইবনে আব্বাস (রা.) আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কোন্ কেরাত পাঠ কর? আমি বললাম, শেষ কেরাত। তিনি বললেন, প্রতি বছর রাসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে কেরাত শোনাতেন। যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেছেন, সে বছর তিনি দুই বার হযরত জিবরাঈল (আ.)-কে কুরআন শুনিয়েছেন। ওই সময় যা কিছু রহিত হয়েছে এবং যা পরিবর্তন হয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) তার সাক্ষী ছিলেন।১৮০
এর দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, আরযায়ে আখীরার সময় অনেক কেরাত স্বয়ং আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে রহিত করে দেওয়া হয়। হযরত আবু বাকরা (রা.) সমার্থবোধক শব্দের যে মতানৈক্যের কথা উল্লেখ করেছেন, নিশ্চিত এর অধিকাংশই ওই সময় রহিত হয়ে গেছে। কেননা হযরত উসমান (রা.) আরযায়ে আখীরা অনুযায়ী মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন। এর মধ্যে সমার্থবোধক শব্দের মতানৈক্য খুবই শায বা বিরল।
প্রশ্ন : ৪. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ও তাঁর মাসহাফ
উপরোক্ত তাহকীকের উপর চতুর্থ প্রশ্ন এ হতে পারে যে, একাধিক রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণিত আছে যে, হযরত উসমান (রা.) যে মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এর প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন না এবং তিনি তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত সহীফাটিও আগুনে পোড়াননি। যদি হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত না করে থাকেন, তাহলে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর এ আপত্তির কারণটা কি ছিল?
জবাব : প্রকৃতপক্ষে হযরত উসমান (রা.)-এর উপর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর দু’টি অভিযোগ ছিল। প্রথমটি হলো, কুরআনুল কারীম লিপিবদ্ধ করার মহান কাজে তাঁকে কেন দায়িত্ব দেওয়া হলো না? দ্বিতীয়টি হলো, অন্যান্য মাসহাফগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হলো কেন?
সুনানে তিরমিযীর এক বর্ণনায় ইমাম যুহরী (রহ.) প্রথম অভিযোগের আলোচনা করেছেন। যার সারাংশ হচ্ছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর এ অভিযোগ ছিল যে, কুরআন লিপিবদ্ধ করার মহান কাজ তাঁর দায়িত্বে কেন অর্পণ করা হলো না? যখন তিনি হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর তুলনায় অধিক সময় হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহচর্যে থেকে ধন্য হয়েছেন। হাফেয ইবনে হাজার (রহ.) এ অভিযোগটি উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, এ ব্যাপারে হযরত উসমান (রা.)-এর জবাব ছিল যে, তিনি এ মহান কাজটি পবিত্র মদীনায় আরম্ভ করেছিলেন। হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) তখন কূফায় ছিলেন। আর হযরত উসমান (রা.) তাঁর অপেক্ষায় থেকে এ মহান কাজটিকে বিলম্বিত করতে চাচ্ছিলেন না। উপরন্তু হযরত আবু বকর (রা.)ও হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.)-এর উপরই এ দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। তাই হযরত উসমান (রা.)ও সমীচীন মনে করলেন যে, কুরআনের সংকলন এবং বিন্যাসের এ কাজটিও তাঁর হাতে সমাধা হোক।১৮১
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর দ্বিতীয় অভিযোগ ছিল এই যে, হযরত উসমান (রা.) নতুন মাসহাফ প্রস্তুত করার পর ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রস্তুতকৃত সবগুলো মাসহাফ পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর তিনি তাঁর মাসহাফ পুড়িয়ে ফেলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। হযরত আবু মূসা আশআরী (রা.) এবং হযরত হুযাইফা ইবনে ইয়ামান (রা.) তাঁকে বুঝানোর জন্য তাঁর নিকট গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বললেন-
والله لا أدفعه إليهم أقرأني رسول الله صلى الله عليه وسلم بضعا وسبعين سورة ثم أدفعه إليهم والله لا أدفعه إليهم
‘আল্লাহর শপথ! আমি এই মাসহাফ তাঁর নিকট সোপর্দ করব না। আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্তরের চেয়ে অধিক সূরা শিক্ষা দিয়েছেন। এরপরও আমি এই মাসহাফ তাঁকে দিয়ে দেব? আল্লাহর শপথ! আমি এটা তাঁকে দেব না।’১৮২
যারা কূফায় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর অনুকরণে ব্যক্তিগতভাবে মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) তাদেরকেও এ উৎসাহ দিলেন যে, তারা যেন তাদের মাসহাফ সোপর্দ না করে। হযরত খুমাইর ইবনে মালিক (রহ.) বলেন-
أُمِرَ بِالْمَصَاحِفِ أَنْ تُغَيَّرَ قَالَ قَالَ ابْنُ مَسْعُودٍ مَنْ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ أَنْ يَغُلَّ مُصْحَفَهُ فَلْيَغُلَّهُ ….. قَالَ ثُمَّ قَالَ قَرَأْتُ مِنْ فَمِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَبْعِينَ سُورَةً أَفَأَتْرُكُ مَا أَخَذْتُ مِنْ فِي رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وعلى اله وصحبه وسلم.
‘মাসহাফগুলোর মাঝে পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হলো। তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) [মানুষকে] বললেন, তোমাদের মধ্যে যারা নিজের মাসহাফকে লুকাতে সক্ষম হও তারা লুকিয়ে রাখ।……………অতঃপর তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র যবান থেকে সত্তরটি সূরা শিখেছি। আমি কি ওই বিষয় ছেড়ে দেব, যা আমি সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র যবান থেকে অর্জন করেছি।১৮৩
এ থেকে বুঝা যায় যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফটি উসমানী মাসহাফ থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল এবং তিনি সেটাকে সংরক্ষিত রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এর মধ্যে কোন্ বিষয়গুলো উসমানী মাসহাফ থেকে ভিন্নতর ছিল? সহীহ রেওয়ায়েতগুলোতে এর কোনো স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় না। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হয় যে, তাঁর মাসহাফের মৌলিক পার্থক্য ছিল সূরার বিন্যাস। আর এ কথা আগেও বলা হয়েছে যে, হযরত আবু বকর (রা.) যেসব সহীফায় কুরআন সংকলন করেছিলেন, সেগুলোতে সূরাগুলো পৃথক পৃথকভাবে লিপিবদ্ধ ছিল এবং সেগুলোতে কোনো বিন্যাস ছিল না। আর হযরত উসমান (রা.) যে কুরআন সংকলন করেছিলেন তাতে সূরাগুলো একটি বিশেষ বিন্যাস অনুযায়ী লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। ইমাম হাকেম (রহ.) লিখেন-
أن جمع القرآن لم يكن مرة واحدة فقد جمع بعضه بحضرة رسول الله صلى الله عليه وسلم ثم جمع بعضه بحضرة أبي بكر الصديق والجمع الثالث هو في ترتيب السورة كان في خلافة أمير المؤمنين عثمان بن عفان رضى الله تعالى عنهم أجمعين
‘কুরআন সংকলনের কাজ এক বারেই সমাপ্ত হয়নি। বরং কুরআনুল কারীমের কিছু অংশ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপস্থিতিতেই সংকলন করা হয়েছিল। অতঃপর আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর যুগে আরো কিছু সংকলন করা হয়েছিল। অতঃপর কুরআন সংকলনের তৃতীয় পর্যায়ে সূরাগুলোকে বিন্যস্ত করা হয়েছিল। যা ছিল আমীরুল মুমিনীন হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর শাসনামলে।১৮৪
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফ হযরত উসমান (রা.)-এর মাসহাফের সাথে বিন্যাসের দিক থেকে অনেক পার্থক্য ছিল। যেমন, এতে সূরা নিসা ছিল আগে আর সূরা আলে-ইমরান ছিল তার পরে।১৮৫ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) সম্ভবত এই বিন্যাস অনুযায়ীই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছ থেকে কুরআন শিখেছিলেন। তাই এই বিন্যাস অনুযায়ী কুরআনকে রাখাই তাঁর অভিপ্রায় ছিল। সহীহ বুখারীর একটি বর্ণনা দ্বারা এর সমর্থন পাওয়া যায়। ইরাকের এক অধিবাসী একদিন হযরত আয়েশা (রা.)-এর নিকট আসল এবং বলল-
قال يا أم المؤمنين أريني مصحفك قالت لم ؟ قال لعلي أؤلف القرآن عليه فإنه يقرأ غير مؤلف قالت وما يضرك أيه قرأت قبل
‘সে বলল, হে উম্মুল মুমিনীন! আমাকে আপনার মাসহাফটি দেখান। হযরত আয়েশা (রা.) বললেন, কেন? লোকটি বলল, আমি [আমার] কুরআনের মাসহাফটি এর অনুকরণে বিন্যস্ত করব। কেননা তা [আমাদের এলাকায়] অবিন্যস্ত অবস্থায়ই পড়া হয়। হযরত আয়েশা (রা.) বললেন, কুরআনের যে অংশই আগে তুমি পড় না কেন, তা তোমার জন্য কোনো অসুবিধা হবে না।’১৮৬
এই হাদীসের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনে হাজার (রহ.) লিখেন, এই ইরাকী ব্যক্তি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর কেরাতের অনুসারী ছিলেন। আর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) যেহেতু নিজের মাসহাফে পরিবর্তন করেননি এবং তা বিলুপ্তও করেননি, তাই এর বিন্যাস উসমানী মাসহাফের বিন্যাসের চেয়ে ভিন্নতর ছিল। আর এ কথা তো স্পষ্ট যে, উসমানী মাসহাফের বিন্যাস অন্যান্য মাসহাফের বিন্যাসের তুলনায় অধিক সমীচীন ছিল। তাই এই ইরাকী লোকটি নিজের মাসহাফকে উসমানী মাসহাফের তুলনায় অবিন্যস্ত বলে আখ্যা দিয়েছেন।১৮৭
এই হাদীস থেকে জানা যায় যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)- এর মাসহাফে মৌলিক পার্থক্য ছিল, সূরাগুলোর বিন্যাস। এ ছাড়া রুসমেখতের পার্থক্যও থাকতে পারে এবং এতে এমন রুসমেখত অবলম্বন করা হয়েছে যার মধ্যে উসমানী মাসহাফের ন্যায় সকল কেরাতের জন্য অবকাশ থাকে না। অন্যথায় যদি হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী বলা হয় যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে শুধু এক হরফের উপর কুরআন লিপিবদ্ধ করেছিলেন আর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফ সেই পরিত্যক্ত হরফের কোনো একটির উপর লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল, তাহলে নিম্নোক্ত অভিযোগগুলো আরোপিত হয়।
১. সহীহ বুখারীর উল্লিখিত হাদীসে ইরাকী ব্যক্তি শুধু সূরার বিন্যাসের পার্থক্যের কথা উল্লেখ করেছেন। নতুবা যদি হরফের পার্থক্যও হতো, তাহলে তা ছিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং অধিক গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হতো।
২. হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) ও অন্যান্যদের বক্তব্য অনুযায়ী সাত হরফ দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন সাত গোত্রের ভাষাকে বুঝানো হয়েছে। যদি এ কথা সঠিক হয়, তাহলে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ও হযরত উসমান (রা.)-এর মাসহাফের মাঝে কোনো পার্থক্য না থাকাই উচিত ছিল। কারণ এ বক্তব্য অনুযায়ী হযরত উসমান (রা.) সবাইকে কুরাইশী হরফের উপর সমবেত করে সে অনুযায়ী মাসহাফ লিপিবদ্ধ করিয়ে ছিলেন। আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)ও কুরাইশী ছিলেন।
৩. হাফেয ইবনে জারীর (রহ.) ও তাঁর অনুসারীরা ছয় হরফ বিলুপ্ত করার স্বপক্ষে সবচেয়ে বড় দলীল হিসেবে ‘সাহাবায়ে কেরামের ইজমা’কে পেশ করেছেন। কিন্তু যদি হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) অন্য কোনো হরফের উপর পাঠ করে থাকেন এবং এর লিখনকেও জায়েয মনে করে থাকেন তাহলে এই ইজমা বা ঐক্যমত সংঘটিত হলো কি করে? যে ইজমার মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর ন্যায় বিজ্ঞ ফকীহ সাহাবী শামিল নেই। এটাকে ইজমা বলার যুক্তি কোথায়? কেউ কেউ এই দাবী করেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) পরবর্তীতে হযরত উসমান (রা.)-এর রায়কে মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো রেওয়ায়েত মজুদ নেই।
হাফেয ইবনে হাজার (রহ.) লিখেন- ‘ইবনে আবী দাউদ (রহ.) “ইবনে মাসউদ (রা.)-এর পরবর্তীতে হযরত উসমানের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়া” শিরোনামে স্বতন্ত্র একটি অধ্যায় লিখেছেন। তবে তিনি এই অধ্যায়ের অধীনে এমন কোনো সুস্পষ্ট রেওয়ায়েত উল্লেখ করতে পারেননি, যা এই শিরোনামের সাথে যায়।১৮৮ হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)সহ অন্যান্যদের বক্তব্যের উপর আরোপিত এ অভিযোগগুলোর কোনো সমাধান পাওয়া যায় না। কাজেই এটাই বিশুদ্ধ কথা যে, হযরত উসমান (রা.) সাত হরফের সবগুলোই মাসহাফে উসমানীতে বাকি রেখেছেন। আর হযরত ইবনে মাসউদ (রা.)-এর এ অভিযোগ ছিল না যে, ছয় হরফকে কেন বিলুপ্ত করা হয়েছে?১৮৯ কারণ বাস্তবে এটা ঘটেই ছিল না। বরং তাঁর অভিযোগটা ছিল এই যে, যে মাসহাফগুলো পূর্ব থেকেই লিপিবদ্ধ ছিল এবং যেগুলোর বিন্যাস ও রুসমেখত উসমানী মাসহাফ অনুযায়ী ছিল না, সেগুলো সঠিক হওয়া সত্ত্বেও নষ্ট করা হচ্ছে কেন?
আলোচনার ফলাফল
“সাত হরফ”-এর আলোচনা অনুমানের চেয়ে অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে। তাই অবশেষে এ থেকে অর্জিত ফলাফলের সারাংশ সংক্ষিপ্তাকারে পেশ করে দেওয়া সমীচীন মনে করছি। যেন স্মরণ রাখতে সহজ হয়।
১. উম্মতের সহজ-সাধ্যের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার নিকট আবেদন করেন যে, কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াতকে যেন শুধু একটি পদ্ধতিতেই সীমাবদ্ধ রাখা না হয়। বরং বিভিন্ন পদ্ধতিতে যেন তেলাওয়াতের অনুমতি প্রদান করা হয়। এর প্রেক্ষিতেই সাত হরফের উপর কুরআন নাযিল করা হয়েছে।
২. সাত হরফে নাযিল হবার সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য উদ্দেশ্য হলো, এর কেরাতের মধ্যে সাত প্রকারের বিভিন্নতা রাখা হয়েছে। যার আওতায় অনেকগুলো কেরাত অস্তিত্বে এসে গেছে।
৩. শুরু শুরুতে মতানৈক্যের সাত প্রকারের মধ্যে শব্দমালা ও সমার্থবোধক শব্দের মতানৈক্যের প্রকারটি বেশ ব্যাপক ছিল। অর্থাৎ এমনটি অধিকতর হতো যে, এক কেরাতে এক শব্দ আর অন্য কেরাতে সে শব্দেরই সমার্থবোধক অন্য একটি শব্দ হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন আরববাসী কুরআনী ভাষার সাথে পরিচিত হতে লাগল তখন মতানৈক্যের এই প্রকারটিও হ্রাস পেয়ে গেল। এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মৃত্যুর পূর্বে রমযান মাসে হযরত জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে সর্বশেষ দাওর [আরযায়ে আখীরা] করলেন তখন এর মধ্যে এ ধরনের মতানৈক্য শূন্যের কোঠায় পৌঁছিয়ে দেওয়া হলো। বেশির চেয়ে বেশি শব্দরূপ, পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ, একবচন, বহুবচন, মারূফ [কর্তৃবাচ্য], মাজহুল [কর্মবাচ্য] এবং সুর-ভঙ্গিমার মতানৈক্য বাকি থাকল।
৪. আরযায়ে আখীরার সময় যে সব মতানৈক্য অবশিষ্ট ছিল, হযরত উসমান (রা.) সেগুলোকে মাসহাফে এমনভাবে সংকলন করেছিলেন যে, সেগুলোকে নুকতা [বিন্দু] ও হরকত [কারক চিহ্ন] থেকে মুক্ত রেখেছিলেন। এর ফলে এতে কেরাতের অধিকাংশ মতানৈক্যের সংকুলান হয়ে গেছে। আর যেসব কেরাতের এভাবে এক মাসহাফে সংকুলান হয়নি সেগুলোকে অন্য মাসহাফে প্রকাশ করা হয়েছে। এর ভিত্তিতেই উসমানী মাসহাফে কোথাও কোথাও এক-এক, দুই-দুই শব্দের মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে।
৫. হযরত উসমান (রা.) এভাবে সাতটি মাসহাফ লিপিবদ্ধ করিয়েছেন এবং সেগুলোতে সূরাগুলোরও বিন্যাস দিয়েছেন। যখন হযরত আবু বকর (রা.) কর্তৃক সংকলিত মাসহাফগুলোতে সূরার কোনো বিন্যাস ছিল না। সাথে সাথে কুরআনুল কারীমের জন্য একটি রুসমেখতও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর যেসব মাসহাফ এই বিন্যাস ও রুসমেখতের বিপরীত ছিল সেগুলোকে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছেন।
৬. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফের বিন্যাস উসমানী মাসহাফের চেয়ে ভিন্ন ছিল। তিনি যেহেতু তাঁর বিন্যাসকে বাকি রাখতে চেয়েছিলেন তাই তিনি তাঁর মাসহাফকে অগ্নিতে ভস্ম করার জন্য হযরত উসমান (রা.)-এর হাতে সোপর্দ করেননি।
সাত হরফের ব্যাপারে একটি ভুল ধারণার অপনোদন
অবশেষে আরেকটি মৌলিক ভুল ধারণার অপনোদন করা আবশ্যক। আর সেটা হলো, “সাত হরফ”-এর উপরোক্ত আলোচনার পাঠক স্থূল দৃষ্টিতে এ সন্দেহ ও সংশয়ে পড়তে পারে যে, মহান আল্লাহর সংরক্ষণে কুরআনুল কারীমের ন্যায় মহাগ্ৰন্থ আজ পর্যন্ত কোনো ধরনের সামান্যতম পরিবর্তন ব্যতিরেকে সংরক্ষিত হয়ে চলে আসছে। এতদসত্ত্বেও মুসলমানদের মাঝে সাত হরফ নিয়ে এত বড় মতানৈক্য সৃষ্টি হলো কি করে?
কিন্তু সাত হরফের আলোচনায় আমরা পেছনে যেসব মতামত ও বক্তব্য উল্লেখ করে এসেছি যদি গভীর দৃষ্টিতে সেগুলোকে অধ্যয়ন করা হয় তাহলে অতি সহজেই এসব সন্দেহ ও সংশয়ের অপনোদন হয়ে যায়। যে ব্যক্তিই এই মতানৈক্যের হাকীকত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করবে, তার কাছে এ কথাটা একেবারেই স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এ সকল মতানৈক্য স্রেফ যুক্তি-তর্ক ও চিন্তা-প্রসূত। বাস্তব ক্ষেত্রে কুরআনের সত্যতা ও বাস্তবতা এবং কুরআন সংরক্ষিত থাকার উপর এই মতানৈক্যের বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়ে না। কারণ এ কথার উপর সবাই ঐক্যমত পোষণ করেন যে, বর্তমানে আমাদের নিকট যে আকৃতিতে কুরআনুল কারীম বিদ্যমান আছে, তা তাওয়াতুর বা ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় আমাদের নিকট চলে আসছে। এতে সামান্য কোনো পরিবর্তনও হয়নি। এ কথার ওপরও সকল উলামায়ে কেরাম একমত যে, কুরআনুল কারীমের যতগুলো কেরাত তাওয়াতুরের সাথে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে, সবগুলোই সহীহ। এগুলোর প্রত্যেকটি অনুযায়ীই কুরআনুল কারীম তেলাওয়াত করা যায়। আবার এ কথার ওপরও উম্মতের ইজমা বা ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, মুতাওয়াতির কেরাত ব্যতীত অপ্রচলিত ও বিরল যত কেরাত বর্ণিত রয়েছে সেগুলোকে কুরআনুল কারীমের অংশ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ কথাও সর্বসম্মত যে, আরযায়ে আখীরা অথবা তারও পূর্বে যে সকল কেরাতকে রহিত করা হয়েছে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশনা অনুযায়ী সেগুলো কুরআনের অংশ হতে পারেনি। এ কথাও সবার নিকট সকল সন্দেহের ঊর্ধ্বে যে, কুরআনুল কারীমের সাত হরফের মধ্যে যে মতানৈক্য ছিল, তা ছিল শুধু শব্দগত। কিন্তু অর্থের দৃষ্টিকোণ থেকে সবগুলো হরফ ছিল অভিন্ন। সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি কুরআনুল কারীমের এক কেরাত বা এক হরফ অনুযায়ী কুরআন পাঠ করে তাহলে কুরআনের বিষয়বস্তু তার অর্জিত হয়ে যাবে এবং কুরআনের দিক-নির্দেশনা অর্জন করার জন্য অন্য কোনো হরফ জানার প্রয়োজন পড়বে না। এর মাঝেও সামান্য কোনো মতানৈক্য নেই যে, হযরত উসমান (রা.) যে মাসহাফ প্রস্তুত করেছিলেন, তা পরিপূর্ণ সতর্কতা, হাজার হাজার সাহাবায়ে কেরামের সাক্ষ্য এবং গোটা মুসলিম উম্মাহ’র সত্যায়নের সাথে করেছিলেন। আর তাতে কুরআনুল কারীম ঠিক সেভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে যেভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এতে কোনো একজন মানুষেরও মতপার্থক্য হয়নি।১৯০
অতএব, যে মতানৈক্যের কথা পেছনের পৃষ্ঠাগুলোতে করা হয়েছে তা শুধু এ ব্যাপারে যে, হাদীসে “সাত হরফ” দ্বারা উদ্দেশ্য কি ছিল? বর্তমানে যত মুতাওয়াতির কেরাত বিদ্যমান রয়েছে, তা কি সাত হরফের উপর সন্নিবিষ্ট নাকি এক হরফের উপর? তা একটা যুক্তিগত ও দার্শনিক মতপার্থক্য মাত্র। যার দ্বারা জ্ঞানগত কোনো পার্থক্য সৃষ্টি হয় না। তাই এর দ্বারা এ ধারণা করা একদম ভুল হবে যে, এসব মতানৈক্যের কারণে [নাউযুবিল্লাহ] কুরআনুল কারীম বিতর্কিত হয়ে গেছে! এর উপমা কিছুটা এমন যে, একটি গ্রন্থের ব্যাপারে পুরো পৃথিবীর মানুষ ঐক্যমত পোষণ করে যে, এটা অমুক গ্রন্থকারের রচিত। ওই গ্রন্থকারের প্রতি এই গ্রন্থের সম্বন্ধ করা নির্ভরযোগ্য। আর তিনি স্বয়ং ছাপিয়ে সেটার সত্যায়নও করলেন যে, এটা আমার রচিত গ্রন্থ এবং এ কপির আদলে এটা কেয়ামত পর্যন্ত ছাপানো যেতে পারে। পরবর্তীতে মানুষের মাঝে এ মতানৈক্য সৃষ্টি হলো যে, ছাপানোর পূর্বে গ্রন্থকার তার পাণ্ডুলিপিতে শব্দগত কোনো পরিবর্তন-পরিবর্ধন করেছেন? নাকি প্রথমে যেমন ছিল তেমনি সেটাকে প্রকাশ করেছেন? এটা স্পষ্ট যে, শুধু এতটুকু দার্শনিক মতপার্থক্যের উপর ভিত্তি করে ওই হাকীকত বিতর্কিত হতে পারে না, যার উপর সবাই ঐক্যমত পোষণ করেছে। অর্থাৎ এটা ওই গ্রন্থ যা গ্রন্থকার নিজেই ছাপিয়েছেন এবং নিজের দিকে এর সম্বন্ধ করেছেন। আর কেয়ামত পর্যন্ত এটাকে প্রকাশ করার অনুমতিও প্রদান করেছেন। ঠিক তদ্রূপ গোটা উম্মত যখন এ কথার উপর একমত যে, কুরআনুল কারীমকে মাসহাফে উসমানীতে হুবহু সেভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে যেভাবে তা অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এর সকল মুতাওয়াতির কেরাত বিশুদ্ধ ও আল্লাহর পক্ষ হতে নাযিলকৃত তখন এই হাকীকত ওই সব দার্শনিক মতপার্থক্যের ভিত্তিতে বিতর্কিত হতে পারে না, যা সাত হরফের ব্যাখ্যায় উপস্থাপিত হয়েছে। [আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলাই সবচেয়ে ভালো জানেন।]
তথ্যসূত্র:
১১৯. সহীহ বুখারী, কাসতালানীসহ ৭/৪৫৩ “ফাযায়িলে কুরআন অধ্যায় ।
১২০. ইবনে জাযারী : আন-নাশরু ফী কিরাআতিল আশ্র ১/২১
১২১, প্রাগুক্ত
১২২. যারকাশী : আল-বুরহান ফী উলুমিল কুরআন : ১/২১২
১২৩. আওজাযুল মাসালিক : ২/৩৫৬ সাহারানপুর ৷
১২৪. মুসাফ্ফা শরহে মুয়াত্তা : ১/১৮৭ দিল্লী ১২৯৩ হিজরী ।
১২৫. মানাহিলুল ইরফান : ১/১৩৩
১২৬. মানাহিলুল ইরফান : ১/১৩৩
১২৭. তাফসীরে ইবনে জারীর ১/১৫
১২৮. ফাতহুল বারী : ৯/২২, রুহুল মাআনী : ১/২১
১২৯. আন নশরু ফিল কিরআতিল আশৃর : ১/২৫ ফাতহুল বারী : ৯/২৩
১৩০. রুহুল মাআনী : ১/২১
১৩১. আত্ তাহাভী : মুশকিলুল আসার : ৪/১৮৫-১৮৬
১৩২. সহীহ বুখারী : (কুরআন সংকলন অধ্যায়)
১৩৩. মুশকিলুল আসার : [তহাভী] : ৪/১৮৬-১৯১
১৩৪. ফাতহুল বারী : ৯/২২-২৩
১৩৫. আয-যুরকানী : শরহে মুয়াত্তা : ২/১১
১৩৬. রেওয়ায়েতটি ইমাম আহমদ (রহ.) বর্ণনা করেছেন। এর সনদ নির্ভরযোগ্য। (আওজাযুল মাসালিক : ২/৩৫৭)
১৩৭. নিশাপুরী : “গারায়েবুল কুরআন ওয়া রাগায়েবুল ফুরকান” : টীকা ইবনে জারীর : ১/২১ মিসর
১৩৮. ইবনে কুতাইবা, আবুল ফযল রাযি এবং ইবনুল জাযারী (রহ.)-এর মতামত : ফাতহুল বারী : ৯/২৫-২৬, ইতকান : ১/৪৭ গ্রন্থে বিদ্যমান রয়েছে। আর কাষী ইবনে তাইয়্েব (রহ.)-এর মত তাফসীরে করতুবী ১/৪৫-এ দেখা যেতে পারে ।
১৩৯. আন নশরু ফী কিরাতিল আশর : ১/২৬
১৪০. ফাতহুল বারী : ৯/২৪
১৪১. আন নশরু ফী কিরাতিল আশর : ১/২৭-২৮
১৪২. ফাতহুল বারী : ৯/২৪
১৪৩. মানাহিলুল ইরফান ফী উলূমিল কুরআন : ১/১৫৪-১৫৬
১৪৪. ফাতহুল বারী: ৯/২৪
১৪৫. আন-নশরু ফী কেরআতিল আশর: ১/২০
১৪৬. তিরমিযী: ২/১৩৮, কুরআন মহল, করাচী।
১৪৭. মুশকিলুল আসার: ৪/১৮৫
১৪৮. তাফসীরে ইবনে জারীর: ১/১৫
১৪৯. বিস্তারিত প্রত্যাখ্যানের জন্য দেখুন: আল-ইতকান ১/৪৯
১৫০. তাফসীরে ইবনে জারীর: ১/১৫
১৫১. সম্মানিত সেই আলেমগণের তালিকা সামনে আসবে।
১৫২. সহীহ বুখারী, উমদাতুল কারী সহ ১২/২৫৮
১৫৩. আন-নশরু ফী কিরআতিল আশর : ১/৩১
১৫৪. সম্ভবত এখানে কাযী ইয়াযকে বুঝানো হয়েছে।
১৫৫. উমদাতুল কারী : [কিতাবুল খুসুমাত] : ১২/২৫৮, বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন : আন-নশরু ফী কিরআাতিল আশর : ১/১৮-১৯
১৫৬. সম্ভবত কাযী বকর বাকিল্লানী (রহ.) উদ্দেশ্য। কারণ এই এবারতই ইমাম নববী (রহ.) কাযী বাকিল্লানী (রহ.)-এর নামে উদ্ধৃত করেছেন।
১৫৭. আল-বুরহান ফী উলূমিল কুরআন : ১/২২৩
১৫৮. আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.)-এর এ উক্তি তখনই প্রযোজ্য হবে যখন বলা হবে যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছেন [নাউযুবিল্লাহ]। তবে এ কথা সুস্পষ্ট যে, হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর উক্তি মতে তিনি ছয় হরফকে বিলুপ্ত করেননি। বরং সেগুলোর কেরাতকে বর্জন করেছেন মাত্র। তাই যদিও হাফেয ইবনে জারীর (রহ.)-এর উক্তি সঠিক, কিন্তু এত কঠোর ভাষার উপযোগী নন।
১৫৯. আল-ফাসলু ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল : ২/৭৭-৭৮
১৬০. আল-মুনতাকা শারহে মুয়াত্তা : ১/৩৪৭
১৬১. আল-মুসতাসফা : ১/৬৫
১৬২. মিরকাতুল মাফাতীহ : ৫/১৬
১৬৩. আন-নশরু ফী কিরাআতিল আশর : ১/৩৩
১৬৪. আল-মুসাফফা : পৃঃ ১৮৭
১৬৫. এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সাত কেরাতের মধ্যে কোনো কোনো কেরাত সাত হরফের অন্তর্ভুক্ত। যেমন, সমস্ত মুতাওয়াতির কেরাত সাত হরফের অন্তর্ভুক্ত। আবার কোনো কোনো কেরাত এমন আছে যা সাত হরফের অন্তর্ভুক্ত নয়। যেমন, সাত কারীদের বিরল কেরাতসমূহ অথবা মতানৈক্যমুক্ত কেরাতসমূহ। আবার সাত হরফের কোনো কোনো মতভেদ এমন আছে যা সাত কেরাতের মধ্যে শামিল নয়। যেমন, ইমাম ইয়াকুব (রহ.), ইমাম আবু যাফর (রহ.) ও খালাফ (রহ.)-এর মুতাওয়াতির কেরাতসমূহ। এগুলো যদিও সাত হরফের মধ্য হতে; কিন্তু প্রসিদ্ধ সাত কেরাতের মধ্য হতে নয়। -মুহাম্মদ তাকী।
১৬৬. ফয়যুল বারী : ৩/৩২১-৩২২
১৬৭. মাকালাতুল কাউসারী : পৃ : ২০-২১
১৬৮. মানাহিলুল ইরফান : ১/১৫১
১৬৯. মুশকিলুল আছার : ৪/১৯৩
১৭০. কানযুল উম্মাল : ১ম খণ্ড, হাদীস নং ৪৮৪
১৭১. ইবনে সা’দ রচিত আত-তবকাতুল কুবরা : ২/১৯৫
১৭২. সহীহ মুসলিম : ১/২৭৩
১৭৩. ইবনে আবী দাউদ (রহ.) রচিত “কিতাবুল মাসাহিফ” পৃ : ২২, ফাতহুল বারী : ৯/১৫
১৭৪. আল-ইতকান : ১/৬১
১৭৫. বহু উলামায়ে কেরাম হযরত উসমান (রা.)-এর এ পদক্ষেপের এই ব্যাখ্যাই করেছেন। দেখুন, আল্লামা ইবনে হাযম (রহ.) রচিত “الفصل فى الملل والاهواء والنحل”-এর ৭ম খণ্ডের ৭৭ নং পৃষ্ঠা; মাওলানা আবদুল হক হক্কানী (রহ.) রচিত “البيان فى علوم القرآن”-এর দ্বিতীয় অধ্যায় দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ, পৃ. ৫৮; এবং মাবাহেস ফি উলুমিল কুরআন : ১/২৪৮-২৫৬
১৭৬. সহীহ বুখারী [ফাতহুল বারী সহ] : ৯/১৬
১৭৭. কানযুল উম্মাল : ১/২৮২ হাদীস নং ৪৭৮৩
১৭৮. রেওয়ায়েতটি ইমাম আহমদ (রহ.) বর্ণনা করেছেন। এর সনদ নির্ভরযোগ্য। (আওজাযুল মাসালিক : ২/৩৫৭)
১৭৯. কানযুল উম্মাল : ১/২৮৬ হাদীস নং ৪৮৪
১৮০. আন-নশরু ফী কিরআতিল আশর : ১/৩২, হাফেয ইবনে হাজার (রহ.)-ও বিভিন্ন মুহাদ্দিসীনের বরাত দিয়ে এ বিষয়ে একাধিক রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন। (ফাতহুল বারী : ৯/৩৬)
১৮১. ফাতহুল বারী : ৯/১৬
১৮২. মুসতাদরাক হাকেম : ২/২২৮, হাকেম (রহ.) বলেন, এটা সহীহ সনদবিশিষ্ট হাদীস। আল্লামা যাহাবী (রহ) তা সত্যায়ন করেছেন।
১৮৩. আল-ফাতহুর রব্বানী : ১৮/৩৫
১৮৪. মুসতাদরাক হাকেম : ২/২২৯
১৮৫. আল্লামা সুয়ূতী (রহ.) ইবনে আশতা (রহ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে হযরত ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মাসহাফের বিন্যাস সম্পূর্ণ নকল করেছেন। মাসহাফে উসমানীর সাথে যার প্রচুর গড়মিল রয়েছে। (আল-ইতকান : ১/৬৬
১৮৬. সহীহ বুখারী : কুরআন সংকলন অধ্যায়।
১৮৭. ফাতহুল বারী : ৯/৩২
১৮৮. ফাতহুল বারী : ৯/৪০
১৮৯. মুসনাদে আহমদের মধ্যে কেবল একটি রেওয়ায়েত এমন পাওয়া যায়, যা দ্বারা বাহ্যিকভাবে মনে হয় যে, হযরত উসমান (রা.) ছয় হরফকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন আর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এর উপরই আপত্তি করেছিলেন। (ফাতহুর রাব্বানী : ১৮/৩৬) কিন্তু এটা এক মাজহুল তথা অপরিচিত ব্যক্তি থেকে বর্ণিত বলে নির্ভরযোগ্য নয়।
১৯০. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) নিজের মাসহাফকে বাকি রাখার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু মাসহাফে উসমানীর কোনো কথার উপর তিনি বিন্দুমাত্রও দ্বিমত পোষণ করেননি।








