ভূমিকা
সমসাময়িক রাজনীতি, বিশেষত গণতান্ত্রিক নির্বাচন ও ভোটের প্রশ্নে মুসলিম সমাজে প্রায়শই ব্যবহৃত একটি যুক্তি হলো — “মন্দের ভালো” তথা “দুটি অনিষ্টের মধ্যে কম অনিষ্টটি বেছে নেওয়া” (The Lesser of Two Evils / Lesser of the Two Harms)। অনেক ইসলামি কর্মী, সংগঠন ও চিন্তাবিদ এই নীতিকে সামনে রেখে সংসদীয় রাজনীতি, আইন প্রণয়নকারী পরিষদ কিংবা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণকে বৈধ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই নীতি কি সত্যিই শরিয়াহসম্মত? এর সঠিক ক্ষেত্র ও শর্ত কী? আর আধুনিক নির্বাচনী রাজনীতিতে এর প্রয়োগ কি আদৌ সঠিক, নাকি এটি একটি মারাত্মক অপব্যাখ্যা?
এই প্রবন্ধে এই প্রশ্নগুলোর বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট শরঈ বিশ্লেষণ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এবং সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
১. “দুটি অনিষ্টের মধ্যে কম অনিষ্ট” নীতি: শরিয়াহর অবস্থান
প্রথমেই বুঝতে হবে, “কম ক্ষতিকরটি বেছে নেওয়া” নীতি সম্পূর্ণ মনগড়া কোনো ধারণা নয়। বহু ফকিহ ও উসূলবিদ এই নীতির কথা উল্লেখ করেছেন। এটি মূলত একটি উপ-নীতি, যা বৃহত্তর নীতির অধীনে আসে— “ক্ষতি দূর করা আবশ্যক” (الضرر يزال)
তবে শরিয়াহ অনুযায়ী এই নীতির প্রয়োগের জন্য কিছু কঠোর শর্ত রয়েছে:
১. সামনে থাকা দুটি বিষয়ই অবশ্যই নিষিদ্ধ (হারাম) হতে হবে
২. উভয় হারাম একসাথে পরিহার করা বাস্তবিক অর্থে অসম্ভব হতে হবে
৩. কোনটি কম ক্ষতিকর আর কোনটি বেশি ক্ষতিকর—তা শরিয়াহ নিজেই নির্ধারণ করবে, ব্যক্তিগত মত, সুবিধা বা আবেগ নয়
৪. কোনো তৃতীয় হালাল বা বৈধ বিকল্প থাকলে এই নীতির প্রয়োগ সম্পূর্ণ বাতিল
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
“আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।” (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)
এ আয়াত থেকেই ফকিহরা এই নীতির সীমিত বৈধতা বুঝিয়েছেন।
২. শরিয়াহতে নীতিটির সঠিক প্রয়োগ: ক্লাসিক উদাহরণ
ফকিহগণ এই নীতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বাস্তব ও অনিবার্য পরিস্থিতির উদাহরণ দিয়েছেন:
- প্রসবকালে যদি মা ও শিশুর উভয়ের জীবন বিপন্ন হয়, এবং একজনকে বাঁচালে অন্যজন মারা যাবে—তাহলে মাকে বাঁচানো অগ্রাধিকার পায়
- কেউ যদি দেখেন, একজন মানুষ ডুবে যাচ্ছে বা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, আর একই সময়ে নামাজের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে—তাহলে নামাজ বিলম্ব করে জীবন রক্ষা করা অগ্রাধিকার পায়
- কাউকে যদি জোর করে বলা হয়—তুমি অন্য একজন মুসলিমকে হত্যা করো, নতুবা তোমাকে হত্যা করা হবে—তাহলে শরিয়াহ অনুযায়ী তাকে নিজে নিহত হওয়াই গ্রহণযোগ্য, হত্যা করা নয়
এই সব উদাহরণে একটি বিষয় পরিষ্কার: এগুলো অনিবার্য পরিস্থিতি, যেখানে উভয় হারাম একসাথে পরিহার করা অসম্ভব
৩. নির্বাচনে ভোট দেওয়া: অনিবার্যতা নাকি কৃত্রিম সংকট?
এখন প্রশ্ন আসে—গণতান্ত্রিক নির্বাচনে ভোট দেওয়া কি এমন কোনো অনিবার্য পরিস্থিতি? না
কারণ:
- কাউকে ভোট দিতে শরিয়াহ বা বাস্তবতা কেউ বাধ্য করছে না
- ভোট না দেওয়ার বিকল্পটি সম্পূর্ণভাবে বিদ্যমান
- ভোট দেওয়া বা না দেওয়া—দুটোর মধ্যেই জীবন, ঈমান বা অস্তিত্ব রক্ষার মতো কোনো জরুরি অবস্থা নেই
অতএব এখানে “দুটি অনিষ্ট ছাড়া উপায় নেই”—এই দাবি মিথ্যা।
বরং এখানে একটি তৃতীয় হালাল বিকল্প রয়েছে:
ভোট থেকে বিরত থাকা এবং এই বাতিল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান গ্রহণ করা।
যেখানে তৃতীয় বিকল্প থাকে, সেখানে “কম অনিষ্ট” নীতির প্রয়োগ শরিয়াহ অনুযায়ী বাতিল।
৪. আইন প্রণয়ন ও কুফরি শাসনে অংশগ্রহণের সমস্যা
আরও গুরুতর সমস্যা হলো—গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে এমন ব্যক্তিকে ক্ষমতায় আনা, যিনি:
- আল্লাহর শরিয়াহ অনুযায়ী আইন প্রণয়ন করেন না
- মানুষের খেয়াল-খুশিকে আইন বানান
- হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম করার ক্ষমতা নিজের হাতে নেন
এ ধরনের ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া মানে তাকে এই কুফরি ক্ষমতায় অংশীদার বানানো।
এখানে একটি শক্তিশালী উপমা দেওয়া যেতে পারে:
“এটা এমন বলা যে—আমরা নিজেরা মদের দোকান খুলবো, যেন কাফিররা খুলে লাভ না করে।”
এই যুক্তি যেমন অযৌক্তিক, তেমনি ভোটের ক্ষেত্রে “কম অনিষ্ট” যুক্তিও অযৌক্তিক
৫. “কম ক্ষতিকর” কার জন্য? মুসলিম না সিস্টেম?
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—কে নির্ধারণ করবে কোন প্রার্থী কম ক্ষতিকর?
একজন মুসলিমের জন্য ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত স্বার্থে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত:
- মুসলিমদের হত্যা ও নিপীড়ন
- মুসলিম ভূমিতে আগ্রাসন
- কুফরি আইন প্রতিষ্ঠা
- ইসলামকে ব্যক্তিগত ধর্মে সীমাবদ্ধ করে রাখা
পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোতে নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি দল হয়তো অভ্যন্তরীণভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য করবে, আরেকটি দল বিদেশে মুসলিমদের ওপর বোমা ফেলবে—এখন কোনটি কম ক্ষতিকর? এই তুলনাই প্রমাণ করে যে বিষয়টি সম্পূর্ণ আপেক্ষিক ও খেয়ালনির্ভর, শরিয়াহনির্ধারিত নয়।
৬. পরাজিত মানসিকতা ও “রাজনৈতিক বাস্তবতা”
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক দিক তুলে ধরা প্রয়োজন, তা হলো — পরাজিত মানসিকতা
এই মানসিকতার বৈশিষ্ট্য হলো:
- ইসলামকে সম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসেবে বিশ্বাস না করা
- “রাজনৈতিক বাস্তবতা”কে চূড়ান্ত সত্য মনে করা
- কুফরি ব্যবস্থার ভেতরে জায়গা পাওয়াকেই সাফল্য ভাবা
কিন্তু রাসূল ﷺ এর সীরাত সম্পূর্ণ বিপরীত শিক্ষা দেয়। তিনি:
- কুরাইশের শাসন ভাগাভাগির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন
- আপসের বিনিময়ে ক্ষমতা গ্রহণ করেননি
- শর্তযুক্ত রাজনৈতিক সমর্থন গ্রহণ করেননি
ইসলাম কখনো “মন্দের ভালো” তথা “কম কুফর” চায় না; ইসলাম চায় কুফরের অবসান।
উপসংহার
“দুটি অনিষ্টের মধ্যে কম অনিষ্ট” নীতি একটি অত্যন্ত সীমিত, জরুরি ও শর্তসাপেক্ষ শর’ঈ নীতি। এটিকে গণতান্ত্রিক নির্বাচন, ভোট দেওয়া কিংবা কুফরি শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের বৈধতা দিতে ব্যবহার করা—একটি স্পষ্ট অপপ্রয়োগ।
শরিয়াহ আমাদের শিক্ষা দেয়:
- যতক্ষণ হারাম থেকে বাঁচা সম্ভব, ততক্ষণ হারাম বেছে নেওয়া বৈধ নয়
- রাজনৈতিক সুবিধা বা ভয় শর’ঈ ওজর নয়
- ইসলাম আপসের মাধ্যমে নয়, আদর্শের মাধ্যমে পরিবর্তন আনে
অতএব মুসলিমদের দায়িত্ব হলো—এই বিভ্রান্তিকর যুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে ইসলামের নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও সমাধানের দিকে ফিরে যাওয়া।
আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ ۖ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ ۚ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের চিন্তা কর। তোমরা যখন সৎপথে রয়েছ, তখন কেউ পথভ্রান্ত হলে তাতে তোমাদের কোন ক্ষতি নাই। তোমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। তখন তিনি তোমাদেরকে বলে দেবেন, যা কিছু তোমরা করতে। [আল-মায়েদা ৫:১০৫]








