জিলবাব ও মুসলিম নারীর পোশাকবিধি

ইসলামী আইনের উৎসসমূহ

ইসলামী আইনের প্রধান উৎস হলো কুরআন ও সুন্নাহ। কুরআন — যা মুসলমানদের কাছে পবিত্র গ্রন্থ — এতে প্রায় ৫০০টি আয়াত রয়েছে, যা বিভিন্ন বিষয়ে আইনি গুরুত্ব বহন করে। সুন্নাহ বলতে বোঝায় নবী মুহাম্মদ ﷺ–এর বাণী, কাজ ও অনুমোদনের বর্ণনাসমূহের সংকলন। সুন্নাহর ভূমিকা হলো কুরআনের নির্দেশনাগুলোকে ব্যাখ্যা ও বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা। এই দুটি মূল উৎস থেকে আরও কিছু গৌণ উৎস নির্ধারিত হয়েছে, যেমন ইজমা (আইনগত ঐকমত্য), কিয়াস (তুলনামূলক যুক্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ) এবং আরও কিছু বিতর্কিত উৎস, তবে এগুলো বর্তমান আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক নয়।

ইসলামী পোশাকবিধির ধারণা

ইসলামী আইন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ও সামাজিক আচরণ—উভয় ক্ষেত্রেই একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান উপস্থাপন করে। এরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পোশাক ও সাজসজ্জা সংক্রান্ত বিধান। এই পোশাকবিধান নারী ও পুরুষ—উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। যেমন, একজন পুরুষের জন্য নির্দিষ্ট অংশ শরীর ঢেকে রাখা ফরজ। পাশাপাশি তার জন্য স্বর্ণ ও রেশম পরিধান নিষিদ্ধ, যা নারীদের জন্য অনুমোদিত। অন্যদিকে, নারীদের জন্য পরিবারের বাইরে বের হলে দেহের নির্দিষ্ট অংশ আবৃত রাখা বাধ্যতামূলক; এর মধ্যে রয়েছে মাথা ঢাকার কাপড় (খিমার) এবং বাহ্যিক পোশাক (জিলবাব), যা পুরুষদের জন্য আবশ্যক নয়। অতএব, জিলবাব কোনো নতুন উদ্ভাবন নয়; বরং এটি মুসলিম নারীদের সুপরিচিত ও প্রাচীন পোশাকবিধানেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

শরীয়ায় জিলবাবের স্পষ্ট উল্লেখ:

নারীদের জন্য জিলবাব পরিধানের বিধান সরাসরি কুরআন থেকেই প্রমাণিত। সূরা আল-আহযাব এ আল্লাহ তা’আলা নবী মুহাম্মদ ﷺ-কে উদ্দেশ্য করে বলেন:

“হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের, তোমার কন্যাদের এবং মুমিন নারীদের বলে দাও—তারা যেন নিজেদের উপর তাদের জিলবাব টেনে দেয়। এতে তারা সহজে চিহ্নিত হবে এবং তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [২]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত এই আয়াতে নারীদের জিলবাব পরিধানের উল্লেখ করা হয়েছে,যাতে — তারা শালীনভাবে আবৃত থাকে এবং অসৎ ও চরিত্রহীন লোকদের কটূক্তি ও অপমান থেকে রক্ষা পায়।

জিলবাবের বাধ্যবাধকতা নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর সুন্নাহ থেকেও প্রমাণিত, যা মুসলমানদের জন্য আইনের দ্বিতীয় প্রধান উৎস।

উম্মে আতিয়্যা (রা.) বর্ণনা করেন:

আমাদেরকে আদেশ দেওয়া হতো — ঈদের দিনে ঋতুবতী নারী ও পর্দানশীল নারীদেরও ঈদের সমাবেশ ও মুসলমানদের দোয়া-মুনাজাতে উপস্থিত করতে। তবে ঋতুবতী নারীরা নামাজের স্থানে (মুসাল্লায়) যাবে না। তখন এক নারী জিজ্ঞেস করল, “হে আল্লাহর রাসূল! যার কাছে জিলবাব নেই, তার কী হবে?” তিনি বললেন, “সে যেন তার সখীর কাছ থেকে একটি জিলবাব ধার নেয়।” [৩]

উপরোক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার সময় নারীদের বাস্তব আচরণ থেকেও এই বিধানের প্রয়োগ স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, যেমন: নিচের বর্ণনাগুলোতে দেখা যায়:

উম্মে সালামা (রা.)—বর্ণনা করেন:

যখন এই আয়াত নাযিল হলো—“তারা যেন নিজেদের উপর তাদের জিলবাব টেনে দেয়”—তখন আনসার নারীরা এমনভাবে বাইরে বের হলেন, যেন তাদের মাথার উপর কাক বসে আছে (অর্থাৎ সম্পূর্ণভাবে আবৃত অবস্থায় জিলবাব পরিধান করে)। [৪]

আয়িশা (রা.)—বর্ণনা করেন:

রিফা‘আ আল-কুরাযির স্ত্রী আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে এলেন, তখন আমি সেখানে বসা ছিলাম… এবং তিনি তার জিলবাবের কিনারা দেখাচ্ছিলেন। [৫]

কুরআনের ব্যাখ্যাকারক (মুফাসসির) আলেমদের মতামত

কুরআনের প্রাচীন ও খ্যাতনামা তাফসিরকারকগণ সবাই জিলবাবের শরঈ বৈধতা ও বাধ্যবাধকতাকে সমর্থন করেছেন। পার্থক্য কেবল এ বিষয়ে—এটি মুখমণ্ডল ঢাকাকেও অন্তর্ভুক্ত করে কি না!

নিচে সুন্নি মুসলিমদের সবচেয়ে স্বীকৃত তাফসির গ্রন্থসমূহ থেকে কিছু উদ্ধৃতি দেওয়া হলো:

ইবন জারির আত-তাবারি (মৃ. ৩১০ হি.) বলেন:

“আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী মুহাম্মদ ﷺ-কে বলেছেন—তুমি তোমার স্ত্রীদের, কন্যাদের এবং মুমিন নারীদের বলে দাও যেন তারা নিজেদের উপর তাদের জিলবাব টেনে নেয়।”

আল-কুরতুবি (মৃ. ৬৭১ হি.) বলেন:

“জালাবীব হলো জিলবাবের বহুবচন। এটি খিমার (মাথা ঢাকার কাপড়)-এর চেয়েও বড় একটি পোশাক। ইবন আব্বাস ও ইবন মাসউদের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে—এটি একটি রিদা (বড় চাদর)। কেউ কেউ বলেন এটি নেকাব বা পর্দা; তবে সঠিক মত হলো—এটি এমন একটি পোশাক যা পুরো শরীর আবৃত করে। সহিহ মুসলিমে উম্মে আতিয়্যা (রা)-এর হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যেখানে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল! যার কাছে জিলবাব নেই, তার কী হবে?’ তিনি উত্তর দেন: ‘সে তার সাথীর জিলবাব ধার নিক।’”

ফখরুদ্দীন আর-রাজি (মৃ. ৬০৬ হি.) বলেন:

“জাহিলিয়াতের যুগে স্বাধীন নারী ও দাসী উভয়েই অনাবৃত অবস্থায় বাইরে যেত এবং ব্যভিচারপ্রবণ লোকেরা তাদের পিছু নিত; ফলে তাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়া হতো। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা স্বাধীন নারীদের জিলবাব পরিধানের নির্দেশ দিয়েছেন।” [৮]

ইবন কাসির (মৃ. ৭৭৪ হি.) বলেন:

“আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল মুহাম্মদ ﷺ-কে নির্দেশ দেন—তিনি যেন মুমিন নারীদের, বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী ও কন্যাদের, নিজেদের উপর জিলবাব টেনে নিতে আদেশ করেন।” [৯]

আধুনিক যুগের একটি প্রসিদ্ধ সংকলিত তাফসির গ্রন্থ সাফওয়াতুত তাফাসির, যার রচয়িতা মুহাম্মদ আলি আস-সাবুনি, সেখানে বলা হয়েছে—সূরা আহযাবের ৫৯ নম্বর আয়াতে নবী ﷺ-কে বলা হয়েছে যেন তিনি নারীদের জানান যে, তারা একটি প্রশস্ত বাহ্যিক পোশাক পরিধান করবে। [১০] এটি ঐতিহ্যবাহী সুন্নি আলেমদের সর্বসম্মত মত।

এই মত কেবল সুন্নিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ইমামি শিয়া আলেমদের মধ্যেও একই দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান:

আল-জানাবিজি বলেন:

“নারীরা তাদের জিলবাব দিয়ে মুখ ও বুক ঢাকত না। তাই আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জিলবাব দিয়ে মুখ ও বুক ঢাকার নির্দেশ দেন, যেন তারা অন্য নারীদের থেকে পৃথকভাবে চিহ্নিত হয়। নারীর জিলবাব হলো সাধারণ পোশাকের উপর পরিধেয় একটি প্রশস্ত পোশাক…” [১১]

সমকালীন আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি

প্রাচীন (ক্লাসিক্যাল) আলেমদের মতে জিলবাব ফরজ—এই অবস্থানটি সমকালীন আলেমদের মধ্যেও সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। প্রাচীন আলেমদের মতোই সমকালীন আলেমদের মতপার্থক্য মূলত একটি বিষয়েই সীমাবদ্ধ—জিলবাব কি মুখমণ্ডল ঢাকাকে অন্তর্ভুক্ত করে, নাকি করে না। তবে জিলবাবের শর্ত ও মৌলিক ধারণা নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই।

সমকালীন দৃষ্টিভঙ্গির একটি প্রতিনিধিত্বমূলক উদাহরণ হিসেবে দেওবন্দি আলেম মুফতি ইবন আদম আল-কাউসারি বলেন:

 “উপরোক্ত ব্যাখ্যা ও অন্যান্য ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট হয় যে, জিলবাব হলো এমন একটি বাহ্যিক পোশাক যা নারীকে অপরিচিত পুরুষদের সামনে বের হওয়ার সময় পরিধান করতে হয়। এই পোশাকটি প্রশস্ত, ঢিলেঢালা, শালীন এবং সম্পূর্ণ শরীর আবৃতকারী হতে হবে।”

শাইখ মুহাম্মদ আল-হানূতি বলেন:

 “সূরা আল-আহযাবের ৫৯ নম্বর আয়াত একজন নারীকে জিলবাব পরিধানে উদ্বুদ্ধ করে। জিলবাব বলতে বোঝায় তার অভ্যন্তরীণ পোশাকের উপর পরিধেয় বাহ্যিক পোশাক, যার মাধ্যমে তার শরীরের সবকিছু আবৃত থাকে এবং দেহের আকৃতি প্রকাশ পায় না। এটিই শরিয়তের উদ্দেশ্য।”

জিলবাব কী?

জিলবাব হলো এমন একটি বাহ্যিক পোশাক, যা সম্পূর্ণ শরীর ঢেকে রাখে। এই সংজ্ঞাটি ভাষাগত (lexical) এবং পাঠগত (textual)—উভয় ভিত্তিতেই নির্ধারিত।

ভাষাগত দিক থেকে জিলবাবের সংজ্ঞা (বাহ্যিক পোশাক হিসেবে):

প্রাচীন আরবি অভিধানসমূহে “জিলবাব” শব্দের ব্যাখ্যা থেকে এর প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এসব উৎসে জিলবাবকে একটি বাহ্যিক পোশাক হিসেবেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

ইবনে মানযূর বলেন:

 “জিলবাব হলো বাহ্যিক পোশাক, চাদর বা আলখাল্লা। এটি ‘তাজাল্লাবাবা’ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো পোশাক পরিধান করা। জিলবাব এমন একটি বাহ্যিক কাপড় বা আবরণ, যা নারী তার অন্যান্য পোশাকের উপর জড়িয়ে নেয়—মাথা থেকে পা পর্যন্ত নিজেকে আবৃত করার জন্য। এটি সম্পূর্ণভাবে তার দেহ আড়াল করে।” [১২]

আল-ফাইরূজ আবাদি বলেন:

 “জিলবাব হলো এমন বস্তু, যা ঢাকনার মতো করে ভেতরের পোশাকগুলোকে আচ্ছাদিত করে।” [১৩]

আধুনিক অভিধানগুলোর মধ্যেও ১৯শ শতকের প্রখ্যাত ব্রিটিশ ভাষাবিদ এডওয়ার্ড উইলিয়াম লেন-এর Arabic–English Lexicon উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন:

 “জিলবাব: … এমন একটি পোশাক যা পুরো শরীরকে আবৃত করে; এটি নারীর জন্য একটি প্রশস্ত পোশাক, যা মিলহাফা (বড় চাদর)-এর চেয়ে কিছুটা ছোট; অথবা এমন একটি পোশাক, যার মাধ্যমে নারী তার অন্যান্য পোশাকের উপর আবরণ দেয়…” [১৪]

একই সংজ্ঞা পাওয়া যায় জন এল. এসপোসিতো সম্পাদিত Oxford Dictionary of Islam-এ:

 “জিলবাব: আরব সমাজে ইসলাম-পূর্ব ও ইসলাম-পরবর্তী যুগে নারীদের বাহ্যিক পোশাকের একটি সাধারণ নাম (শাল, চাদর, আবরণ)। কুরআনের (৩৩:৫৯) আয়াতে মুসলিম নারীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—তারা যেন নিজেদের উপর আবরণ টেনে নেয়, যা সামাজিক মর্যাদার পরিচয় এবং জনসমক্ষে যৌন হয়রানি থেকে রক্ষার একটি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা।” [১৫]

শর’ঈ (textual) দিক থেকে জিলবাবের সংজ্ঞা:

জিলবাব যে একটি বাহ্যিক পোশাক—এই সিদ্ধান্ত কেবল ভাষাগত নয়; বরং কুরআন ও রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ থেকেও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত।

কুরআনের সূরা নূর (২৪:৬০)-এ বয়স্ক নারীদের জন্য একটি বিশেষ রুখসত (ছাড়) উল্লেখ করা হয়েছে:

 “আর যারা সন্তান ধারণের বয়স অতিক্রম করেছে এবং বিয়ের আশা রাখে না—তাদের জন্য কোনো গুনাহ নেই যদি তারা তাদের বাহ্যিক পোশাক খুলে রাখে, শর্ত হলো তারা যেন নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তবে সংযম অবলম্বন করাই তাদের জন্য উত্তম। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”

এখানে যে পোশাক খুলে রাখার কথা বলা হয়েছে, তা অবশ্যই বাহ্যিক পোশাক। কারণ সাধারণ দৈনন্দিন পোশাক খুলে রাখার অনুমতি দেওয়া হতে পারে না। এ কারণেই নবী ﷺ-এর সাহাবিগণ—যেমন ইবন আব্বাস (রাঃ) ও ইবন মাসউদ (রাঃ)—এই পোশাককে জিলবাব হিসেবেই বুঝেছেন। তাঁরা উভয়েই কুরআনের তাফসিরে বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃত। [১৬]

সুন্নাহ থেকে প্রমাণ:

উম্মে আতিয়্যা (রাঃ)-এর পূর্বে বর্ণিত হাদিস থেকেও স্পষ্ট বোঝা যায় যে,

জিলবাব একটি বাহ্যিক পোশাক। নবী ﷺ স্পষ্টভাবে বলেছেন—নারী বাইরে বের হওয়ার আগে অবশ্যই জিলবাব পরিধান করবে; আর যার কাছে নেই, সে যেন অন্যের কাছ থেকে ধার করে নেয়। [১৭]

এ থেকে বোঝা যায়—জিলবাব ছাড়া বাইরে যাওয়া অনুমোদিত নয় এবং এটি স্বতন্ত্র একটি বাহ্যিক পোশাক।

আবু দাউদ-এ উম্মে সালামা (রা.)—নবী ﷺ-এর স্ত্রী—থেকে বর্ণিত একটি হাদিসও এ বিষয়টি স্পষ্ট করে। তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন:

“একজন নারী কি ইজার (এক ধরনের জিলবাব) ছাড়া শুধু লম্বা জামা ও মাথার ওড়না পরে নামাজ পড়তে পারে?” নবী ﷺ উত্তরে বলেন: “যদি লম্বা জামাটি যথেষ্ট প্রশস্ত হয় এবং তার পায়ের উপরিভাগ ঢেকে রাখে।”

উম্মে সালামা (রা.)-এর এই প্রশ্ন থেকেই বোঝা যায়—ইজার বা জিলবাব সাধারণ পোশাকের উপরেই পরিধান করা হতো।

সাহাবিদের বক্তব্যও একই বিষয়কে সমর্থন করে। যেমন, উমর (রা.) বলেন:

“নারী তিনটি পোশাক পরে নামাজ আদায় করবে—লম্বা জামা, মাথার ওড়না এবং ইজার (জিলবাব)।”

তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.) বলেন:

“নারী লম্বা জামা, মাথার ওড়না এবং মিলহাফা (জিলবাব) পরে নামাজ আদায় করবে।” [২০]

ফিকহবিদদের মতামত

এইসব বর্ণনার ভিত্তিতেই আল-শিরাজি বলেন:

“নারীর জন্য নামাজে তিনটি পোশাক পরিধান করা মুস্তাহাব—একটি মাথার ওড়না, একটি জামা যা শরীর ও পা ঢাকে, এবং একটি মিলহাফা (জিলবাব), যা তার পোশাকের উপর আবরণ হবে… এবং জিলবাবটি মোটা হওয়া উচিত, যাতে তা শরীরের আকৃতি প্রকাশ না করে এবং রুকু-সিজদার সময় সরে না যায়।”

ইমাম আন-নববি (রহ.)—যিনি আল-শিরাজির মুহাযযাব গ্রন্থের ব্যাখ্যাকার—এই মতকে ইমাম শাফেয়ির সঙ্গে সম্পৃক্ত করে বলেন:

“এই বিধান ইমাম শাফেয়ি উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর মাযহাবের আলেমরা এ বিষয়ে একমত।”

তিনি আরও বলেন:

“জিলবাব হলো এমন একটি চাদর, যা পোশাকের উপর পরিধান করা হয়—এটাই সঠিক মত এবং ইমাম শাফেয়ির মত।” [২২]

ইবনে হাযম তাঁর আল-মুহাল্লা গ্রন্থে বলেন:

“নবী ﷺ-এর যুগের আরবি ভাষায় জিলবাব বলতে বোঝায় এমন একটি বাহ্যিক পোশাক, যা সম্পূর্ণ শরীর ঢেকে দেয়। যে কাপড় পুরো শরীর ঢাকতে পারে না, তাকে কখনোই জিলবাব বলা যায় না।” [২৩]

অতএব, জিলবাব যে একটি বাহ্যিক পোশাক—এই বিষয়টি কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবিদের ব্যাখ্যা এবং প্রাচীন ও আধুনিক আলেমদের সর্বসম্মত মতের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত।

অন্যান্য শর্তাবলি

জিলবাবের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়—এমন কিছু শর্তও রয়েছে, যা নারীরা মাহরাম নন এমন পুরুষদের সামনে (যাদের সঙ্গে বিবাহ বৈধ নয়) ঘরের ভেতরে বা বাইরে উপস্থিত হলে তাদের সকল পোশাকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। শর্তগুলো হলো—

  1. পোশাক ঢিলেঢালা হতে হবে
  2. আধা-স্বচ্ছ বা স্বচ্ছ হওয়া চলবে না
  3. দৃষ্টি আকর্ষণকারী হওয়া যাবে না (তাবাররুজ)
  4. পুরুষদের পোশাকের সঙ্গে সাদৃশ্য থাকা যাবে না

এই শর্তগুলো সুপরিচিত ও সর্বস্বীকৃত। তাই এখানে এগুলোর বিস্তারিত প্রমাণ আলোচনার প্রয়োজন নেই। এ বিষয়ে আরও জানতে চাইলে ইসলামী ফিকহের প্রাসঙ্গিক গ্রন্থসমূহ দেখা যেতে পারে। [২৪]

সালওয়ার-কামিজ কি যথেষ্ট?

এখানে মূল প্রশ্ন হলো—সালওয়ার-কামিজ কি জিলবাবের মৌলিক শর্তগুলো পূরণ করে? অর্থাৎ, এটি কি এমন একটি ঢিলেঢালা বাহ্যিক পোশাক, যা পুরো শরীর আবৃত করে?

সাধারণভাবে সালওয়ার-কামিজ পুরো শরীর ঢাকে না; অনেক সময় শরীরের কিছু অংশ খোলা থাকে এবং এটি সবসময় ঢিলেঢালাও হয় না। এমনকি যদি ঢিলেঢালা ও আবৃত হওয়ার শর্ত পূরণও করা হয়, তবুও এটি বাহ্যিক পোশাক (outer garment) নয়। সালওয়ার-কামিজ সাধারণত দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের দৈনন্দিন পোশাক—যা ঘরের ভেতরে পরা হয়।

সংজ্ঞাগতভাবে বাহ্যিক পোশাক হলো—যা ঘরের পোশাকের উপর পরিধান করে বাইরে যাওয়ার সময় ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সালওয়ার-কামিজ নিজেই ঘরের স্বাভাবিক পোশাক। অতএব, অন্যান্য শর্ত আলোচনায় যাওয়ার আগেই এটি প্রথম ও মৌলিক শর্ত—বাহ্যিক পোশাক হওয়া—এই মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয় না।

শালীন পোশাক পরাই কি জিলবাবের শর্ত পূরণ করে?

এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে—শালীন পোশাক বলতে আমরা কী বুঝি—তার ওপর। যদি শালীনতার সংজ্ঞার মধ্যে উপরে উল্লিখিত শর্তগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে উত্তর ভিন্ন হতে পারে।

এটি সত্য যে বাহ্যিক পোশাকের নকশা বা রূপ একরকম হওয়া জরুরি নয়; তবে সেগুলোকে অবশ্যই ইসলামী শরিয়ত নির্ধারিত শর্তগুলো পূরণ করতে হবে। শালীনতা কোনো ব্যক্তির নিজস্ব বা ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার বিষয় নয়; বরং এর জন্য সুস্পষ্ট নিয়ম নির্ধারিত আছে। শালীনতা এসব শর্তের ঊর্ধ্বে যেতে পারে না; বরং এগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করেই শালীনতা পূর্ণতা পায়।

অতএব, শুধু পুরো শরীর ঢাকলেই যথেষ্ট নয়—যদি পোশাকটি আঁটসাঁট হয়। আবার শুধু ঢিলেঢালা হলেই চলবে না—যদি তা বাহ্যিক পোশাক না হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাহ্যিক পোশাক বিভিন্ন রূপে হতে পারে—শর্ত হলো, প্রতিটি নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে হবে।

ইসলামী আইনগত মতভেদ ও একজন মুসলমান:

যারা ইসলামী আইনের সঙ্গে পরিচিত নন, তারা প্রায়ই অবাক হন—কেন কিছু মুসলিম এমন একটি বিধান অনুসরণ করেন, যা অন্য মুসলিমরা অনুসরণ করেন না। ফলে তারা মনে করেন—যিনি এই বিধান মানছেন, তিনি হয়তো অতিরিক্ত কঠোর বা চরমপন্থী।

বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। যেমন—কোনো নির্দিষ্ট আলেম একটি পোশাককে বৈধ বলেছেন—এর অর্থ এই নয় যে অন্যরা সেই মত অনুসরণ করতে বাধ্য, এমনকি অনুমতিপ্রাপ্তও। ইসলামী আইন একটি সমৃদ্ধ আইনব্যবস্থা, যেখানে আলেমদের মধ্যে বিস্তারিত বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো—যে আলেমকে তিনি সবচেয়ে যোগ্য, বিশ্বস্ত ও জ্ঞানী মনে করেন—তার ফতোয়া অনুসরণ করা।

এখানে নিজস্ব সুবিধা বা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা মানদণ্ড নয়; বরং তা আলেমের যোগ্যতা ও প্রজ্ঞা। একবার কোনো ব্যক্তি আন্তরিকভাবে একটি ফতোয়া অনুসরণ করলে, সেটিই তার জন্য আল্লাহর বিধান হিসেবে গণ্য হয় এবং সামাজিক সমর্থন বা বিরোধিতার কারণে তা পরিবর্তন করা বৈধ নয়। কারণ, সেই বিধান অমান্য করা মানে একটি ধর্মীয় দায়িত্ব পরিত্যাগ করা—যার জবাব আখিরাতে দিতে হবে।

এই প্রসঙ্গে, কোনো মুসলিম নারী যদি কোনো নির্দিষ্ট আলেমের ব্যাখ্যা অনুযায়ী জিলবাব ফরজ মনে করেন, তবে অন্য ভিন্নমত থাকলেও তার জন্য সেই মত অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন—এই মতটিই সঠিক। এখানে প্রচলিত বা সুবিধাজনক মতের কোনো গুরুত্ব নেই। বিশেষ করে জিলবাবের বিষয়টি এমন একটি বিধান—যা শরিয়তের ভাষা ও আত্মা—উভয়ের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্রাচীন সুন্নি ও শিয়া আলেমদের মধ্যেও এটি কখনো বড় কোনো বিতর্কের বিষয় ছিল না।

ধর্মীয় দায়িত্ব নাকি রাজনৈতিক বক্তব্য?

জিলবাব মূলত এবং সর্বাগ্রে একটি ধর্মীয় দায়িত্ব। এর ভিত্তি এসেছে সরাসরি ইসলামী উৎস থেকে—আধুনিক মুসলিমদের রাজনৈতিক লেখালেখি থেকে নয়। প্রাচীন ফকিহগণ প্রায় এক হাজার বছর আগেই এর বাধ্যবাধকতা ব্যাখ্যা করেছেন—বর্তমান রাজনৈতিক ইসলামের উত্থানের বহু আগে।

অতএব, জিলবাব আজকের রাজনৈতিক বিতর্কের ফসল নয়। এটি পরিধানের প্রেরণা আসে ধর্মীয় দায়িত্ববোধ থেকে—রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার জন্য নয়। যদি কেউ জিলবাবকে রাজনৈতিক বা ফ্যাশনের প্রতীক হিসেবে পরে—ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে নয়—তবে তা ইবাদত হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না; বরং গুনাহ হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ আল্লাহর ইবাদতে গ্রহণযোগ্য একমাত্র উদ্দেশ্য হলো—খাঁটি আনুগত্য।

জিলবাব কি নিপীড়নের প্রতীক?

কিছু অমুসলিমের দৃষ্টিতে মুসলিম নারীর পোশাক নিপীড়নের প্রতীক। তাদের দাবি—জিলবাব নারীর নীচু মর্যাদার পরিচায়ক, এটি জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, অথবা এটি নারীর সামাজিক অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে।

পোশাকের বিধান নিয়ে এই দৃষ্টিভঙ্গী আল্লাহর প্রজ্ঞা কে বুঝতে না পারা বা এই হুকুম পালনের ইতিবাচক দিক বিবেচনা না করা থেকেও আসে নি বরং এমন চিন্তার উৎস হলো—কিছু মুসলিম পুরুষের দ্বারা নারীর ওপর সংঘটিত অপব্যবহার (যা ইসলাম নিজেই নিন্দা করে) অথবা ইসলামে নারীর ভূমিকা সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা। [২৫]

ইসলামী আইন আল্লাহর কাছে নারী ও পুরুষকে মর্যাদা ও তাকওয়ার দিক থেকে সমান মনে করে। বিধানের ভিন্নতা কোনো লিঙ্গবৈষম্য থেকে নয়; বরং নারী-পুরুষের স্বভাবগত পার্থক্যকে স্বীকার করার ফল। অধিকাংশ বিধান নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই এক; অল্প কিছু ক্ষেত্রে পার্থক্য এসেছে স্বভাবগত ভিন্নতার কারণে।

মুসলিম নারীরা জিলবাব পরিধান করেন জনজীবনে শালীনতা বজায় রাখার জন্য এবং তারা মনে করেন—এটি তাদের মর্যাদা হ্রাস করে না; বরং বৃদ্ধি করে। বাস্তব অভিজ্ঞতায় অনেক নারী দেখেন—জিলবাব পরিধানের মাধ্যমে তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ, শিক্ষা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন—পুরুষদের অশোভন দৃষ্টি ও অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আগ্রাসন থেকে মুক্ত থেকে। [২৬]

অতএব, সামাজিক অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার পরিবর্তে, জিলবাব বরং নারীর ক্ষমতায়ন ও স্বাধীনতাকে সহজ করে—একটি শালীন ও নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলে।

—–

পরিশিষ্ট–১:

মুফতি আল-কাউসারির ফতোয়া [২৭]

আল্লাহর নামে—যিনি পরম দয়ালু, পরম করুণাময়।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

 “হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের, কন্যাদের এবং মুমিন নারীদের বলে দাও—তারা যেন নিজেদের উপর তাদের বাহ্যিক পোশাক (জিলবাব) টেনে নেয়। এতে তারা পরিচিত হবে এবং তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আল-আহযাব: ৫৯)

এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে—নারীর জন্য জিলবাব দ্বারা নিজেকে আবৃত করা ফরজ। এখন প্রশ্ন আসে—জিলবাব কী?

লিসানুল আরব-এ বলা হয়েছে:

 “জিলবাব (বহুবচন: জালাবীব) হলো বাহ্যিক পোশাক বা চাদর, যার মাধ্যমে নারী তার মাথা ও বুক ঢাকে। আরও বলা হয়েছে—এটি এমন একটি লম্বা চাদর, যা নারীকে সম্পূর্ণভাবে আবৃত করে।” (ইবন মানযূর)

ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন:

 “জিলবাব হলো এমন একটি লম্বা চাদর, যা নারীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে দেয়।”

এই ব্যাখ্যাগুলো স্পষ্ট করে—জিলবাব হলো এমন একটি বাহ্যিক পোশাক, যা নারী অপরিচিত পুরুষদের সামনে বের হওয়ার সময় পরিধান করবে। এটি প্রশস্ত, ঢিলেঢালা, শালীন এবং সম্পূর্ণ শরীর আবৃতকারী হতে হবে।

এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর সাহাবি নারীরা এমনভাবে বাইরে বের হতেন—যেন তাদের মাথার উপর পাখি বসে আছে—অত্যন্ত সংযম ও শালীনতার সঙ্গে। তারা লম্বা কালো চাদর দিয়ে নিজেদের আবৃত করতেন।

অতএব, নারীর জন্য অপরিচিত পুরুষদের সামনে বের হওয়ার সময় ঢিলেঢালা ও শালীন বাহ্যিক পোশাক পরিধান করা আবশ্যক—তা বোরকা হোক বা অন্য কোনো উপযুক্ত পোশাক।

আর আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।

পরিশিষ্ট ২: আলেমদের জীবনী:

সমসাময়িক আলেমগণ:

মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনী: মক্কার শরিয়া ও ইসলামিক স্টাডিজ কলেজের একজন অধ্যাপক। তিনি ‘সাফওয়াত আত-তাফাসির’ গ্রন্থের লেখক (বৈরুত: দারুল কুরআন আল-কারিম, ১৪০২ হিজরি, ১৯৮১)।

মুফতি মুহাম্মদ ইবনে আদম আল-কাউসারি: মুফতি মুহাম্মদ ইবনে আদম আল-কাউসারি ব্রিটেনে ঐতিহ্যবাহী আলেমদের অধীনে ইসলামিক স্টাডিজের দারসে নিজামী পাঠ্যক্রম সম্পন্ন করেন, এরপর তিনি হাদিসে বিশেষীকরণ করেন, যেখানে তিনি হাদিসের ৯টি প্রধান গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন এবং পাকিস্তানে মুফতি তাকি উসমানী ও অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় আলেমদের অধীনে ফতোয়া প্রদানের বিজ্ঞানে ২ বছরের বিশেষীকরণ অর্জনের মাধ্যমে এটি সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি সিরিয়া যান, যেখানে তিনি আল-আজহার (কায়রো) থেকে উন্নত ফিকহে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন এবং শীর্ষস্থানীয় আরব আলেমদের অধীনে অধ্যয়ন করেন। এই আলেমদের মধ্যে একজন, শায়খ আবদ আল-লতিফ ফারফুর বলেছেন যে, মুফতি মুহাম্মদ ইবনে আদমের একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে এবং তিনি আমাদের সময়ের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আলেম হতে চলেছেন বলে মনে হয়। তিনি বর্তমানে লেস্টারের একটি দারুল উলুমে শিক্ষকতা করেন এবং দারুল ইফতাতে মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেন।[২৮]

শেখ মুহাম্মদ আল-হানুতি: জন্ম: ১২ মার্চ, ১৯৩৭, হাইফা, ফিলিস্তিন। শিক্ষা: তিনি তার পিতা শেখ আলী হানুতি থেকে শরিয়া শিক্ষা লাভ করেন এবং আল-আজহারে ১৯৫৩-১৯৫৮ সাল পর্যন্ত শেখ মুহাম্মদ সাঈদ আজ্জাওয়ীর কাছে হাদিস অধ্যয়ন করেন। পূর্ববর্তী পদসমূহ: ১৯৬২-১৯৬৫ সাল পর্যন্ত বাগদাদে ইমাম, শিক্ষক ও খতিব ছিলেন। ১৯৬৫-১৯৭৮ সাল পর্যন্ত কুয়েতে ইমাম, শিক্ষক ও খতিব ছিলেন। তিনি ১৯৭৮ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ইসলামিক কেন্দ্রের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যার মধ্যে নিউ জার্সির জার্সি সিটি এবং ভার্জিনিয়ার দার আল-হিজরাহ অন্তর্ভুক্ত। তিনি উত্তর আমেরিকান ফিকহ কাউন্সিলের একজন সদস্য।

শাস্ত্রীয় পণ্ডিতগণ:

ইবনে হাযম: জন্ম ৭ নভেম্বর, ৯৯৪, কর্ডোবা, কর্ডোবার খিলাফত; মৃত্যু ১৫ আগস্ট, ১০৬৪, মান্টা লিশাম, সেভিয়ার কাছে। পুরো নাম আবু মুহাম্মদ ‘আলী ইবনে আহমদ ইবনে সাঈদ ইবনে হাযম। ইসলামিক স্পেনের একজন মুসলিম সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ, আইনজ্ঞ এবং ধর্মতত্ত্ববিদ, যিনি তার সাহিত্যকর্মের প্রাচুর্য, জ্ঞানের বিশালতা এবং আরবি ভাষার উপর দক্ষতার জন্য বিখ্যাত। জাহিরি (আক্ষরিকতাবাদী) মাযহাবের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হিসেবে তিনি আইনশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় ৪০০টি গ্রন্থ রচনা করেন।[২৯]

ইবনে জারির আত-তাবারি (মৃ. ৩১০): জন্ম আনুমানিক ৮৩৯, আমোল, তাবারিস্থান [ইরান]; মৃত্যু ৯২৩, বাগদাদ, ইরাক। পুরো নাম আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারির আত-তাবারি। মুসলিম পণ্ডিত, যিনি প্রাথমিক ইসলামের ইতিহাস এবং কুরআনের ব্যাখ্যার উপর বিশাল সংকলন গ্রন্থের রচয়িতা এবং ৯ম শতাব্দীতে সুন্নি চিন্তাধারাকে সুসংহত করতে একটি স্বতন্ত্র অবদান রেখেছিলেন। প্রধান কর্মসমূহ: তার জীবনের কাজ শুরু হয়েছিল কুরআন ব্যাখ্যার মাধ্যমে এবং এরপর তিনি নবী ও রাজাদের ইতিহাস রচনা করেন। আত-তাবারি’র ইতিহাস এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে সামানিদ রাজপুত্র মনসুর ইবনে নূহ এটি ফারসি ভাষায় অনুবাদ করিয়েছিলেন (আনুমানিক ৯৬৩)।[৩০]

ফখর আদ-দীন আর-রাজি (মৃ. ৬০৬): জন্ম ১১৪৯, রায়, ইরান; মৃত্যু ১২০৯, হেরাতের কাছে, খোয়ারাজম। আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে উমর ইবনে আল-হুসাইন ফখর আদ-দীন আর-রাজি। মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিদ এবং পণ্ডিত, যিনি ইসলামের ইতিহাসে কুরআনের অন্যতম প্রামাণ্য ব্যাখ্যার রচয়িতা। তার আগ্রাসী মনোভাব এবং প্রতিহিংসাপরায়ণতা অনেক শত্রু তৈরি করেছিল এবং তাকে অসংখ্য ষড়যন্ত্রে জড়িত করেছিল। তবে তার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিভা সর্বজনীনভাবে প্রশংসিত হয়েছিল এবং মাফাতিহ আল-গায়ব বা কিতাব আত-তাফসীর আল-কবীর (অদৃশ্যের চাবিকাঠি” বা “বৃহৎ ব্যাখ্যা”) এবং মুহাসসাল আফকার আল-মুতাকাদ্দিমিন ওয়া-আল-মুতা’আখখিরিন (“প্রাচীন ও আধুনিকদের মতামতের সংগ্রহ”) এর মতো কাজের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হয়।[৩১] ইবনে কাসির (মৃ. ৭৭৪ হিজরি): ছিলেন একজন ইসলামী পণ্ডিত, যিনি ১৩০১ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ার বুসরা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সিরিয়ার দামেস্কে ইসলামী পণ্ডিত ইবনে তাইমিয়া এবং ইবনে আল-কাইয়্যিমের কাছে শিক্ষা লাভ করেন। ইবনে কাসির ‘তাফসিরে ইবনে কাসির’ নামে কুরআনের একটি বিখ্যাত তাফসীর রচনা করেন, যেখানে তিনি ব্যাখ্যার জন্য কুরআনের আয়াতগুলোর সাথে নির্দিষ্ট কিছু হাদিস বা মুহাম্মদের বাণী এবং সাহাবাদের বাণীকে সংযুক্ত করেছেন। তাফসিরে ইবনে কাসির সমগ্র ইসলামী বিশ্বে এবং পশ্চিমা বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে বিখ্যাত, এবং এটি বর্তমানে কুরআনের অন্যতম বহুল ব্যবহৃত ব্যাখ্যাগ্রন্থ।[৩২]

আন-নাওয়াভি (মৃ. ৬৭৬ হিজরি): (জন্ম ১২৩৩ – মৃত্যু ১২৭৮), ফিকহ ও হাদিস বিষয়ক লেখক, দামেস্কের কাছে নাওয়াতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আঠারো বছর বয়স থেকে এই শহরেই পড়াশোনা করেন এবং সেখানে ১২৫৩ সালে হজ করার পর ১২৬৭ সাল পর্যন্ত একজন স্বাধীন পণ্ডিত হিসেবে বসবাস করেন। এরপর তিনি আশরাফিয়া মাদ্রাসায় আবু শামা-র স্থলাভিষিক্ত হয়ে হাদিসের অধ্যাপক হন। তিনি তুলনামূলকভাবে অল্প বয়সে নাওয়াতে মারা যান এবং তিনি কখনো বিয়ে করেননি।[৩৩]

আল-কুরতুবি (মৃ. ৬৭১ হিজরি): ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে আবু বকর আল-আনসারি আল-কুরতুবি স্পেনের কর্ডোবায় জন্মগ্রহণ করেন, যা ছিল ইসলামী সভ্যতার স্বর্ণযুগের শীর্ষ সময়। তিনি একজন বিশিষ্ট মালিকি পণ্ডিত ছিলেন এবং ফিকহ ও হাদিসে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তার পাণ্ডিত্যের ব্যাপকতা ও গভীরতা তার লেখায় সুস্পষ্ট। তার সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ হলো বিশ খণ্ডের তাফসীর ‘আল-জামি’ লি-আহকাম আল-কুরআন’।[৩৪]

আশ-শাফিঈ: জন্ম ৭৬৭ খ্রিস্টাব্দ, আরব; মৃত্যু ২০ জানুয়ারি ৮২০ খ্রিস্টাব্দ, আল-ফুস্তাত, মিশর। মুসলিম আইনজ্ঞ পণ্ডিত যিনি ইসলামী আইন চিন্তাধারার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং শাফিঈ মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি ঐতিহ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও আইনি পদ্ধতির ক্ষেত্রেও একটি মৌলিক অবদান রাখেন।[৩৫]

ক্লাসিকাল আরবি অভিধানকারগণ:

আল-ফাইরুযাবাদী: আবু-ত-তাহির ইবনে ইব্রাহিম মাজদ উদ-দিন উল-ফাইরুযাবাদী (১৩২৯–১৪১৪) ছিলেন একজন আরবি অভিধানকার, যিনি আধুনিক ইরানের শিরাজ শহরের কাছে কারাজিনে জন্মগ্রহণ করেন এবং শিরাজ, ওয়াসিত, বাগদাদ ও দামেস্কে শিক্ষা লাভ করেন। তিনি দশ বছর জেরুজালেমে বসবাস করেন এবং তারপর পশ্চিম এশিয়া ও মিশর ভ্রমণ করে ১৩৬৮ সালে মক্কায় বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তী তিন দশকের বেশিরভাগ সময় তিনি সেখানেই কাটান, ১৩৮০-এর দশকে কিছুকাল দিল্লিতে অবস্থান করেন এবং অবশেষে ১৩৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে মক্কা ত্যাগ করে বাগদাদ, শিরাজ (যেখানে তিনি তৈমুরের দ্বারা সমাদৃত হন) এবং সবশেষে আধুনিক ইয়েমেনের তাইজে ভ্রমণ করেন। ১৩৯৫ সালে তাকে ইয়েমেনের প্রধান কাজী (বিচারক) নিযুক্ত করা হয় এবং তিনি সুলতানের এক কন্যাকে বিবাহ করেন। জীবনের শেষ বছরগুলিতে ফাইরুযাবাদী মক্কায় তার বাড়িটিকে মালিকি আইনের একটি বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করেন এবং সেখানে তিনজন শিক্ষক নিয়োগ করেন। তিনি স্প্যানিশ ভাষাবিদ ইবনে সিদা (মৃত্যু ১০৬৬) এবং সাজানির (মৃত্যু ১২৫২) অভিধানগুলিকে একত্রিত করে একটি বিশাল অভিধানমূলক গ্রন্থও রচনা করেন। এই শেষোক্ত গ্রন্থটির একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ ‘আল-কামুস আল-মুহিত’ (ব্যাপক অভিধান) নামে প্রকাশিত হয় এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি নিজেই পরবর্তী কিছু অভিধানের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।[৩৬] ইবনে মানজুর: সময়কাল: ১২৩০ – ১৩১১। পুরো নাম: জামালউদ্দিন মুহাম্মদ বিন মুকাররাম ইবনে মানজুর, তিউনিসে জন্মগ্রহণ করেন এবং কায়রোতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি বিশ খণ্ডে রচিত আরবি ভাষার সবচেয়ে ব্যাপক অভিধান ‘লিসানুল আরব’-এর লেখক।[৩৭]

Sources:

[1] For a good over view see: Sources of Islamic Law: An Overview by Yasin Dutton. http://www.muhajabah.com/docstorage/dutton.htm
[2] Qur’an: (33:59)
[3] Sahih Bukhari Book 8/347
[4] Sunan Abu Dawud 32/4090
[5] Sahih Bukhari Book 72/684
[6] Date of death according to Hijri calendar.
[7] pbuh is abbreviation for ‘peace be upon him.’
[8] ar-Razi, Fakhr ad-Din, at-Tafsir al-Kabir, p.231.
[9] Ibn Kathir, Tafsir al-Qur’an al-‘Azim.
[10] as-Sabuni, Muhammad Ali, safwat at-tafasir, p.538.
[11] al-Janabizi, Tafsir bayan al-sa’adah fi muqaddimat al-ibadah, see commentary of verse 59 of surah Ahzab.
[12]Ibn Man.zur, Mu.hammad ibn Mukarram, Lisan al-`Arab, (Bayrut : Dar .Sadir, 1955-56). Vol.7, p. 273.
[13] Al-Fayruzabadi, al-Qamus al-Muhit,
[14]Lane, Edward William, An Arabic-English lexicon, (London 1863-1893) under the relevant root verb.
[15] Esposito, John L. (ed.), The Oxford Dictionary of Islam, (Oxford University Press, 2003).p.160.
[16] al-Qurtubi, Jami li-ahkam al-Qur’an, verse 60 of sura Nur.
[17] Sahih Bukhari Book 8/347
[18] This narration is mawquf and is attributed more correctly to Umm Salama, the wife of the Prophet.
[19] Milhafa is a synonym of jilbab. Notice here Abdullah b. Umar uses the word milhafa (jilbab) instead of izar, indicating that izar here is the jilbab. See al-majmu’ sharh al-muhazzab, p.259.
[20] Al-Nawawi, al-majmu’ sharh al-muhazzab, (Beirut, 2002), pp.258.
[21] A major reference for Islamic law who’s interpretation of law is canonized in the Malaysian legal code.
[22] An-Nawawi, al-majmu’ sharh al-muhazzab, (Beirut, 2002), pp.258-9.
[23] Ibn Hazm, Al-Muhalla, vol. 3, p.217
[24] For a contemporary source see Badawi, Jamal, The Muslim Woman’s Dress According to the Qur’an and Sunnah, (Ta-Ha Publishers Ltd,1980) or http://members.tripod.com/iaislam/TMWD.htm
[25] Bullock, Kathrine, Rethinking Muslim Women and the Veil: Challenging and Historical and Modern Stereotypes, (Herndon, VA: International Institute of Islamic Thought, 2002).p.73.
[26] Ali, Sayyid, ‘Why Here, Why Now? Young Muslim Women Wearing Hijab,’ The Muslim World, vol.95, (2005), pp.515-530.
[27] http://sunnipath.com/resources/Questions/QA00002148.aspx
[28] http://www.sunnipath.com/aboutTeachers.aspx?sectionid=5&teacherid=12
[29] http://www.britannica.com/eb/article-9041918?query=Ibn%20Hazm&ct=
[30] http://www.britannica.com/eb/article-7063
[31] http://www.britannica.com/eb/article-9033610
[32] http://en.wikipedia.org/wiki/Ibn_Kathir
[33] http://en.wikipedia.org/wiki/Nawawi
[34] http://www.bysiness.co.uk/quran/qurtubi.htm
[35] http://www.britannica.com/eb/article-9067053?query=shafi%27i&ct=
[36] http://en.wikipedia.org/wiki/Fairuzabadi
[37] http://www.salaam.co.uk/knowledge/biography/viewentry.php?id=812

Leave a Reply